Tuesday, January 8, 2019

নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করবে ঐক্যফ্রন্ট, নতুন কর্মসূচি ঘোষণা

বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণিত করার আভিযোগ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের দাবির পক্ষে জনমত তৈরি করতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংলাপ, ও ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের বিভিন্ন জেলা সফর।
আজ (মঙ্গলবার) বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডে ড. কামাল হোসেনের বাসবভনে  জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক শেষে ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সেনাবাহিনীকে নিস্ক্রিয় করে একাদশ নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে সরকার। এই নির্বাচন গোটা জাতি প্রত্যাখ্যান করেছে। আমরা পুনঃনির্বাচন দাবি করছি।
মির্জা ফখরুল আরো বলেন,  নির্বাচন কমিশন ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা করে প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছে; যে নির্বাচনে ভোট ডাকাতি হয়েছে, কেন্দ্র দখল হয়েছে, আগেই ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জগলুল হায়দার আফ্রিক, নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ক শহীদুল্লাহ কায়সার।
এর আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, যে নির্বাচনের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই, জনগণ যে  নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়নি,  সেই নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে গঠিত সরকারের কোনো নৈতিক অধিকার নেই বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের উপর  কর্তৃত্ব  করার। কারণ, জনগণ ভোট দিয়ে এ সরকারকে নির্বাচিত করে নাই।
নতুন নির্বাচন দাবি চরমোনাই পীরের
অপরদিকে,  ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-আমীর মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম (পীর চরমোনাই) বলেছেন, নির্বাচনের পরও সারাদেশে নেতাকর্মীদের ওপর দলীয় ক্যাডার ও পুলিশের হামলা, মামলা বন্ধ হয়নি। মানুষের মৌলিক ও ভোটাধিকার আজ ভূলুণ্ঠিত। এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। তিনি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা ও হয়রানি অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানান।
গত  রাতে (সোমবার) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর প্রেসিডিয়ামের এক সভায় সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের আমীর আরো বলেন, ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে মানুষের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে মানুষের অধিকার হরণ করা হয়েছে। তিনি প্রহসনের নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দাবি করেন। সভায় ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রেসিডেন্টের বরাবরে স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
সভায় ১৫ জানুয়ারি মজলিসে শুরা অধিবেশন এবং ১৬ জানুয়ারি ৩০০ আসনের প্রার্থীদের পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

রাফায়েল নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার একনাগাড়ে মিথ্যা কথা বলছে: গুলাম নবী আজাদ

ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার বিরোধীদলনেতা ও কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা গুলাম নবী আজাদ বলেছেন, ‘রাফায়েল যুদ্ধবিমান নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার একনাগাড়ে মিথ্যা কথা বলে চলেছে। তিনি আজ (সোমবার) নয়াদিল্লিতে ওই মন্তব্য করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী রাফায়েল ইস্যু ক্রমাগত  উত্থাপন করে আসছেন। গোটা দেশবাসী বলছে রাফায়েল যুদ্ধবিমান ক্রয়ে বড়সড় দুর্নীতি হয়েছে। রাজ্যসভায় এ নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত।’
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অপব্যবহার প্রসঙ্গে গুলাম নবী আজাদ  বলেন, ‘বিরোধী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ জোট ভাঙার জন্য সিবিআই (কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা), ইডি’র(এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট) মতো তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে। সাড়ে চার বছর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কর্মসংস্থান, কৃষি ও নারীদের নিরাপত্তার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এখন সিবিআই, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট, আয়কর দফতরকে বিরোধীদের বিরুদ্ধে কাজে লাগাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আমলের কথা উল্লেখ করে আজাদ বলেন, ‘তৎকালীন সময়ে রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধেও অনেক দল জোট বেধে ছিল। কিন্তু কংগ্রেস কখনো তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেয়নি। কিন্তু আজ সরকারবিরোধী মহাজোটের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, কংগ্রেসের নেতা হোন, এনসিপি নেতা, তৃণমূল, ডিএমকে বা এআইএডিএমকে নেতা হোন তাঁদের বিরুদ্ধে সিবিআই, আয়কর দফতর ও ইডি’র পদক্ষেপের মাধ্যমে তাদেরকে ভয় দেখানো ও হুমকি দেয়ার চেষ্টা চলছে।’ দেশবাসী কখনো এধরণের স্বৈরাচারী আচরণ মেনে নেবে না বলেও গুলাম নবী আজাদ মন্তব্য করেন।
এপ্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আব্দুল মাতিন আজ (সোমবার) রেডিও তেহরানকে বলেন, ‘মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিসগড়ে বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের ফলে বিজেপি এতবেশি হতাশ হয়ে পড়েছে যে, আর মানুষের কাছে তাঁরা কী ইস্যু নিয়ে যাবে! তাঁদের কাছে আর কোনো ইস্যু থাকছে না। এভাবে নির্বাচনকে তাঁরা ভয় পাচ্ছে। আগামী ২০১৯ এর নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তর প্রদেশে অখিলেশ যাদব ও মায়াবতীর মধ্যে যে সম্ভাবনাময় জোট দানা বেঁধেছে, সেটাকে যাতে ভেস্তে দেয়া যায় সেজন্য বিজেপির এটা বড় গেম প্ল্যান। উচ্চবর্ণের মানুষদের জন্য সংরক্ষণের সুবিধার যে কথা বলা হয়েছে  তা হল জনপ্রিয় গিমিক। এসব গিমিক নিয়ে বিজেপি চেষ্টা করছে রাফায়েল ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে শুরু করে অনিল আম্বানির দুর্নীতি চাঁপা দিতে। এজন্য পুরোনো দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করার চেষ্টা করছে। ২০১৯ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি জনগণের সামনে দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছে। তাঁদের নৈতিক পরাজয় হয়েছে।’

নি:সন্দেহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একজন 'বর্ণবাদী': মার্কিন কংগ্রেসওম্যান

মার্কিন সর্বকনিষ্ঠ কংগ্রেসওম্যান আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিয়ো কর্তেজ বলেছেন, নি:সন্দেহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একজন 'বর্ণবাদী'। মার্কিন সিবিএস টিভি চ্যানেলের সঙ্গে আলাপকালে ডেমোক্র্যাট দলীয় ওই কংগ্রেস সদস্য গতকাল এ কথা বলেন। তিনি বলেন কংগ্রেসের সঙ্গে ট্রাম্পের মতপার্থক্য ফেডারেল সরকারের কর্মীদের বেতন পরিশোধ না হবার কারণ। একইসঙ্গে ওই মতপার্থক্য সরকারে অচলাবস্থা সৃষ্টিরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে 'বর্ণবাদী' হিসেবে আত্মপরিচয় তুলে ধরেছেন বলেও মন্তব্য করেন ২৯ বছর বয়সী কর্তেজ।
এদিকে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন অপর মুসলিম কংগ্রেসওম্যানও সম্প্রতি ট্রাম্প সম্পর্কে কড়া মন্তব্য করেছেন। রাশিদা তালিব নামের ডেমোক্র্যাট দলীয় ওই কংগ্রেস সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম কংগ্রেসওম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি তার অফিসের প্রথম দিনেই দেয়ালের বিশাল মানচিত্রে ইসরাইলের নাম 'ফিলিস্তিন' লেখা কাগজ দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইমপিচ করার দাবিও তুলেছেন রাশিদা তালিব।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয়করণ নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে ভারতকে -দ্য ইকোনমিক টাইমসের রিপোর্ট by অভিজিৎ চক্রবর্তী

৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এটা এক অভূতপূর্ব বিষয়। তা সত্ত্বেও এই নির্বাচন যে ব্যতিক্রমী তার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য আছে।
এবারই প্রথম ক্ষমতাসীন দলের পৃষ্ঠপোষকতার অধীনে থেকে নির্বাচন কমিশন একটি নির্বাচন করেছে এবং তাতে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকারের দাবি প্রত্যাখ্যান করার কারণে বড় বিরোধী দলগুলো ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জন করেছিল। বিরোধীদের মতে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু নিশ্চিত করতে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারই হলো একমাত্র উপায়।
এবারই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। অক্টোবরে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে বিরোধী দলগুলোর ফ্রন্টের প্রধান ড. কামাল হোসেন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের মতো ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে সুখ্যাতি আছে এমন কিছু বিরোধী নেতা এবার খুব বেশি সিরিয়াস ছিলেন। তারা সম্ভবত বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে এখানে বলে রাখা ভালো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার দলের ধর্মনিরপেক্ষতাকে হালকা  করে ফেলেছেন। কারণ, তিনি নির্বাচনের আগে প্রকাশ্যে ধর্মীয় গ্রুপ হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কওমি মাদরাসা ডিগ্রিকে স্বীকৃতি দেয়ার যে মূল দাবি তাদের তা তিনি মেনে নিয়েছেন।
প্রথমবারের মতো, বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাস।
যখন পর্যবেক্ষকরা শেখ হাসিনার ক্ষমতায় ফেরাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে পারেন, তখন উপরে বর্ণিত প্রথমবারে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো আঞ্চলিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ক্লু হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সর্বশেষ অনুষ্ঠিত নির্বাচন বিস্তৃত গ্রহণযোগ্যতা (ওয়াইডস্প্রিড এক্সেপট্যাবলিটি) থেকে পিছিয়ে আছে, যেহেতু শুধু বিরোধী দলগুলোই নয়, কিন্তু একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র এই নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে তারা হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার রিপোর্টের তদন্ত দাবি করেছে। জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছে বিরোধীরা এবং এসব আসনে যারা বিজয়ী হয়েছেন তারা শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি বিজয় পেয়েছে। কিছু কিছু আসনে তারা বিস্ময়কর মার্জিনে জয় পেয়েছে, যার ফলে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, ওইসব এলাকা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রতিশ্রুত ভোটের ঘাঁটি বলে পরিচিত। যে দেশে অতীতে বার বার সামরিক হস্তক্ষেপ হয়েছে তেমন একটি দেশের স্থিতিশীল গণতন্ত্রে এসব ফ্যাক্টর হতে পারে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সব রাজনৈতিক দল যখন ধর্মীয় দলগুলোর দ্বারস্থ হয়েছে তখন একটি ইঙ্গিত মেলে, আওয়ামী লীগ ১০ বছর ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সামাজিক আবহ শক্তিশালী ইসলামী পরিচয়ের দিকেই অব্যাহতভাবে ধাবিত। ধর্মনিরপেক্ষতায় ক্ষয় ধরায় এতে শুধু সংখ্যালঘুরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এমন নয়, একই সঙ্গে উজ্জীবিত ইসলামপন্থিরা তরুণদের মধ্যে তাদের ভাবধারা ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপক সুযোগ খুঁজবে। এসব বিষয় ভারতের জন্য নিরাপত্তায় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। যদিও শেখ হাসিনা সন্ত্রাস মোকাবিলায় বেশ সক্রিয় তবু হেফাজতে ইসলামের মতো গ্রুপের সঙ্গে তার যুক্ত হওয়ায় উদ্বেগ সৃষ্টি করে। কারণ, ওই গ্রুপটি এখন তাদের বাকি দাবি-দাওয়া মেনে নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
উল্লসিত চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। এতে একটি ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। তাহলো, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক গতি নিয়ে পরিবর্তন হচ্ছে। অবকাঠামোগত প্রকল্প বাদেও চীন অস্ত্র সরবরাহ বৃদ্ধি করছে। এর মধ্যে দুটি মিং-ক্লাসের সাবমেরিন রয়েছে। এতে বোঝা যায়, বাণিজ্যিক বিবেচনার বাইরেও ঢাকায় স্বার্থ আছে বেইজিংয়ের। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ঘেঁষা বঙ্গোপসাগরের পাড়ে বাংলাদেশের অবস্থান। এসব এলাকা নিয়ে চীনের বিরোধ রয়েছে। তাছাড়া কুনমিংয়ে তারা আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়াকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের দহরম মহরমকে শুধুই শুভ হিসেবে নেয়া যেতে পারে না। এ ছাড়া চীনের রুট ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার করতে পারে পাকিস্তানের আইএসআই- এমন আশঙ্কাও এড়িয়ে দেয়া যায় না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় ভারতের জন্য শুভ সংবাদ। সহচরের জোরালো প্রবণতা দাবি রাখে বাস্তবভিত্তিক বিবেচনা ও নীতি মূল্যায়নের। নাগরিক সমাজে অস্থিরতার অপছায়া, ইসলামী কট্টরপন্থি ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিকট এই প্রতিবেশী দেশটিতে ইস্যু হতে পারে, যা ভারত অবজ্ঞা করার সামর্থ্য রাখে না।
(অভিজিত চক্রবর্তী ভারতের মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের সাবেক বিশেষ সচিব। দ্য ইকোনমিক টাইমসে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

ফেলানী হত্যার ৮ বছর: বিচারে দীর্ঘসূত্রতায় হতাশ পরিবার

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বিএসএফ’র গুলিতে নির্মমভাবে নিহত বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যার ৮ বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল সোমবার। দিনটি উপলক্ষে নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নে অবস্থিত নিজ বাড়ি কলোনীটারীতে সকালে ফেলানীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মিলাদ মাহফিল ও কাঙালি ভোজের আয়োজন করে তার পরিবার। রোববার রাতে লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়ার-উল-আলম নুর ইসলামের পরিবারের খোঁজখবর নেন। বিজিবি’র পক্ষ থেকে দোয়া মাহফিল পরিচালনা ও নতুন কাপড়-চোপড়ের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন পরিবারটিকে বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা করা ছাড়াও তাদের দেখভালের দায়িত্বের কথা জানান। ২০১১ সালের ৭ই জানুয়ারি ফুলবাড়ীর উপজেলার অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে বাবা নুর ইসলামের সঙ্গে মই দিয়ে কাঁটাতার বেড়া টপকিয়ে বাংলাদেশে ফেলার সময় বিএসএফ’র গুলিতে নিহত হয় ফেলানী। ফেলানীর নিথর দেহ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে ছিল দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা। এ হত্যাকাণ্ডে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমসহ মনবাধিকার কর্মীদের মাঝে সমালোচনার ঝড় উঠলে ২০১৩ সালের ১৩ই আগস্ট বিএসএফ’র বিশেষ আদালতে ফেলানী হত্যার বিচার কাজ শুরু হয়।
২০১৩ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাদ দেন ভারতের কোচবিহারের সোনারী ছাউনিতে স্থাপিত বিএসএফ’র বিশেষ আদালত। পুনঃবিচারের দাবিতে ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারত সরকারের নিকট আবেদন করেন। পরে বিজিবি-বিএসএফ’র দ্বিপীয় বৈঠকে ফেলানী হত্যার পুনঃ বিচারের সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৪ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর পুনঃবিচার শুরু করে বিএসএফ। ঐ বছরের ১৭ই নভেম্বর ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বিএসএফ’র বিশেষ আদালতে অমিয় ঘোষকে অভিযুক্ত করে পুনরায় সাক্ষ্য প্রদান করেন এবং অমিয় ঘোষের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। পরে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২০শে নভেম্বর বিচারিক কাজ চলার সময় বিএসএফ আদালতে অভিযুক্ত অমিয় ঘোষ অসুস্থ হয়ে পড়ায় ৪ মাসের জন্য বিশেষ আদালতের কার্যক্রম মুলতবি করা হয়েছে। এরপর ২০১৫ সালের ১৩ই জুলাই ভারতীয় মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) ফেলানী খাতুন হত্যার বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে দেশের সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করে। ২০১৭ সালের ২৫শে অক্টোবর শুনানির পর ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে বারবার তারিখ পিছিয়ে যায়। ফলে থমকে গেছে ফেলানী খাতুন হত্যার সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি।
ফেলানীর প্রতিবেশী পল্লী চিকিৎসক আব্দুল মান্নান ও কৃষক আজমত আলী জানান, সারা বিশ্ব এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জেনেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বিভিন্ন আশ্বাস দিয়ে ফিরে গেছে। কিন্তু ৮ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সুষ্ঠু বিচার হয়নি। আমরা বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে হতাশ। এই নির্মম হত্যার সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। অপরদিকে ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম ও মা জাহানারা বেগম জানান, সরকার ফেলানীর পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও হতদরিদ্র এই পরিবারের পাশে সেভাবে দাঁড়ায়নি বলে তারা অভিযোগ করেন। এ ছাড়াও বারবার শুনানি পিছিয়ে যাওয়া ও বিচার কাজ আটকে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। 
কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাড. এসএম আব্রাহাম লিংকন জানান, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চে ফেলানী হত্যা ও ক্ষতিপূরণের শুনানি রিট আবেদন গ্রহণ করে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি সংস্থাকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেয়। ২০১৭ সালের ২৫শে অক্টোবর ভারতের সর্বোচ্চ আদালত আগামী ১৮ই জানুয়ারি দুটি রিটের শুনানির দিন ধার্য করে। শুনানি পিছিয়ে গেলেও  ফেলানীর পরিবার ন্যায়বিচার পাবেন বলে প্রত্যাশা তার। ফুলবাড়ী উপজেলার সীমান্তের দায়িত্বে থাকা লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়ার-উল-আলম জানান, সাংবাদিকদের মাধ্যমে খবর পাওয়ার পরপরই তিনি রোববার রাতে ফেলানীর এলাকায় গিয়ে তার পরিবারের খোঁজ-খবর নেন। এ সময় অনুষ্ঠান পরিচালনা ও পরিবারটিকে আর্থিক সহযোগিতা করার জন্য ৬ হাজার টাকা প্রদান করা হয় বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন জানান, ফেলানীর পরিবারকে বিভিন্ন সহযোগিতা ছাড়াও জেলা প্রশাসন ও বিজিবি’র উদ্যোগে একটি দোকান করে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও তারা যখনই এসেছে তাদেরকে সহায়তা করা হয়েছে।

পরিবার থেকে পালানো সৌদি তরুণী থাইল্যান্ডে আটক: ‘আমার পরিবার আমাকে হত্যা করতে চায়’ -রাহাফ

নিজের পরিবারের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়া এক সৌদি তরুণী ব্যাংকক বিমানবন্দরে এক হোটেল কক্ষে নিজেকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা চাইছেন তাকে কুয়েতে পরিবারের কাছে ফেরত পাঠাতে। কিন্তু এই তরুণী দাবি করছেন সেখানে পাঠালে পরিবার তাকে হত্যা করবে। সোমবার কুয়েতগামী একটি ফ্লাইটে উঠতে অস্বীকৃতি জানান ১৮ বছর বয়সী রাহাফ মোহাম্মদ আল-কুনান। তিনি বলেন, কুয়েতে আমার ভাইয়েরা, আমার পরিবার এবং সৌদি দূতাবাস আমার অপেক্ষায় বসে আছে। তারা আমাকে মেরে ফেলবে। আমার জীবন এখন বিপন্ন। আমার পরিবার একেবারে সামান্য ঘটনার জন্য পর্যন্ত আমাকে হত্যার হুমকি দেয়। এ খবর দিয়েছে, বিবিসি বাংলা।
মোহাম্মদ আল-কুনান বিবিসিকে বলেছেন, তিনি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেছেন। তিনি আশঙ্কা করছেন, তার পরিবার এ জন্য তাকে হত্যা করবে। তিনি বলেন, আমি আমার নিজের দেশে পড়াশোনা ও কাজ করতে পারি না। আমি স্বাধীনতা চাই, আমি আমার মতো করে পড়াশোনা করতে চাই, কাজ করতে চাই। এর আগে, ২০১৭ সালের এপ্রিলে আরেক সৌদি নারীকে নিয়ে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। দিনা আলি লাসলুম নামের সেই নারী কুয়েত থেকে ম্যানিলা হয়ে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সহ বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠী রাহাফ মোহাম্মদ আল-কুনানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ডেপুটি এশিয়া ডিরেক্টর ফিল রবার্টসন টুইটারে লিখেছেন, রাহাফ মোহাম্মদ আল-কুনান হোটেল কক্ষের দরোজা আটকে বসে আছেন এবং কুয়েতে যাবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি আশ্রয় চাওয়ার জন্য জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।
রাহাফ মোহাম্মদ আল-কুনান তার পরিবারের সঙ্গে কুয়েতে ছুটি কাটাচ্ছিলেন। দুদিন আগে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান। তিনি ব্যাংকক হয়ে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সেখানে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু রোববার ব্যাংককে নামার পরই নাকি সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে একজন সৌদি কূটনীতিক এসে তার পাসপোর্ট জব্দ করেন। রাহাফ দাবি করছেন, তার পাসপোর্টে অস্ট্রেলিয়ার ভিসা রয়েছে এবং তিনি কখনোই থাইল্যান্ডে থাকতে চাননি। অন্যদিকে ব্যাংককের সৌদি দূতাবাস দাবি করছে, রাহাফ মোহাম্মদ আল-কুনানের কোনো রিটার্ন টিকিট নেই, সেজন্যই তাকে আটকে রাখা হয়েছে। আর যেহেতু তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য কুয়েতে থাকে, তাই তাকে সেখানেই পাঠানো হচ্ছে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফিল রবার্টসন বিবিসিকে জানিয়েছেন, থাই সরকার আসলে এখন একটা কাহিনী রটনার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা বলছে, রাহাফ একটি ভিসার আবেদন করার চেষ্টা করেছিল, সেটি প্রত্যাখ্যান করা হয়। তিনি বলেন, থাই কর্তৃপক্ষ সৌদি আরবের সঙ্গে সহযোগিতা করছে, সে কারণেই বিমানটি ব্যাংককে অবতরণের সঙ্গে সঙ্গেই সৌদি কর্মকর্তারা রাহাফের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান। সৌদি আরবে নারীকে ‘পুরুষ অভিভাবকত্ব আইনের’ অধীনে চলতে হয়। তাই এর আগেও সৌদি নারী দিনা আলি লাসলুম দেশ থেকে পালাতে চায়। কিন্তু তাকে ম্যানিলা বিমানবন্দর থেকেই তার পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয়। সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার পর তার কি পরিণতি হয়েছে তা জানা যায়নি।

চামড়া রপ্তানি কমেছে

দেশের রপ্তানি আয়ে পিছিয়ে পড়ছে চামড়া ও চামড়াজাত খাত। খাতটি থেকে আয় কমছে অব্যাহতভাবে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হলেও প্রবৃদ্ধি ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে মাসের পর মাস। চলতি অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। বিপুল চাহিদা ও নিজস্ব কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও পণ্যের জোগান দিতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। এ জন্য তারা দায়ী করছেন সঠিক পরিকল্পনার অভাব ও অবকাঠামোগত সমস্যাকে। বাংলাদেশের চামড়া রপ্তানি আয়ের ওপর  চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ ও ট্যানারি শিল্প নগরীর স্থানান্তরকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্বে চামড়াশিল্পের বাণিজ্য পরিমাণ একশ বিলিয়ন ডলার। এর মাত্র এক ভাগ যোগান দেয় বাংলাদেশ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত দুই বছর সাভারে চামড়া কারখানা সরানোর বিষয়ে নানা জটিলতায় ক্রেতা কমেছে। আর আমলান্ত্রিক জটিলতা ও সমন্বয়ের অভাবে চামড়া শিল্প পিছিয়ে পড়ছে। এছাড়া ট্যানারিশিল্প সাভারে স্থানান্তর, সেখানে যথাযথ অবকাঠামো গড়ে না ওঠা, কাঁচামাল সংগ্রহে জটিলতা ও নতুন বিনিয়োগ না হওয়াসহ নানা কারণে বাজার হারাচ্ছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। এ অবস্থায় ২০২১ সালের মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য শুধু কল্পনাতেই থেকে যাবে বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ৫৩ কোটি ২৩ লাখ ডলারের রপ্তানি আয় হয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই খাতের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৬২ কোটি ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি আয় কমেছে ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ট্যানারি এসোসিয়েশনের মতে, সাভারে পরিকল্পিত ট্যানারিশিল্প গড়ে না ওঠার আগেই ভুল তথ্য দিয়ে ট্যানারি মালিকদের সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এখানে যেসব ট্যানারি মালিক বিনিয়োগ করেছিলেন তাদের অধিকাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ট্যানারি ব্যবসার এই সংকট নিরসনে সরকারি সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে ট্যানারি এসোসিয়েশন।
ইপিবি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে আয় হয়েছিল ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১২ শতাংশ কম। এ অর্থবছর ১৩৮ কোটি ডলার রপ্তানি লক্ষ্য ধরা হলেও তা অর্জন হয়নি। নতুন অর্থবছরে এসেও এক অবস্থা বিরাজ করছে এখানে। ২০১৮ সালের শেষ ছয় মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ।
এছাড়া চামড়া রপ্তানিতে ২৪ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ২৩.৭১ শতাংশ কমে রপ্তানি হয়েছে ১৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার; যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ২৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। চামড়াজাত পণ্য থেকে ৫৪ কোটি ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৩৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার; যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ৪৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আর জুতা ও অন্যান্য পণ্যে গত অর্থবছরে ৬০ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৫৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয় ৫৩ কোটি ডলার। এ ছাড়া ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১১৩ কোটি ডলারের চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ১১৬ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এদিকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২৮ কোটি ডলার।
জানা গেছে, হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরিত হয়েছে বছর খানেক আগে। নতুন স্থানে প্লট পাওয়া ১৫৫টি ট্যানারি কারখানার মধ্যে মাত্র ৪০টির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাকি কারখানাগুলোর অবকাঠামো নির্মাণের কাজ এখনো শেষ হয়নি।
রপ্তানি আদেশ কমার অন্যতম কারণ হিসেবে ট্যানারি মালিকরা বলছেন, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় এমন অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, সমপ্রতি চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের চামড়া খাতে। কারণ বাংলাদেশ থেকে চামড়াজাত পণ্যের কাঁচামাল আমদানি করতো চীন। সেই চামড়া দিয়ে নিজেদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নত মানের পণ্য তৈরি করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতো তারা। এক্ষেত্রে চীনের জন্য একটি বড় বাজার ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু চীনের চামড়াজাত পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে চীনের চাহিদা কমার পাশাপাশি কমেছে বাংলাদেশের রপ্তানি।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর হওয়ার ফলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না থাকায় কাঁচা চামড়া সংগ্রহসহ নানা বিষয়ে বিপাকে পড়তে হয়। সংস্কারের জন্য ট্যানারি মালিকরা ব্যাংক ঋণও পাচ্ছেন না বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, পাদুকা উৎপাদনে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ একধাপ এগিয়ে সপ্তম হয়েছে। সুযোগ রয়েছে আরও এগিয়ে যাওয়ার। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও পাদুকা রপ্তানিতে আয় বাড়ছে।
২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে চামড়ার জুতা রপ্তানিতে আয় হয়েছে ৩০ কোটি ৭৫ লাখ ২০ হাজার ডলার; যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭.৫২ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই খাতের রপ্তানি আয় ৮.৫২ শতাংশ বেড়েছে।
লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মহিন বলেন, সম্ভাবনার বিচারে পাদুকাশিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু হচ্ছে না। এর মানে হলো পরিকল্পনার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

সেদিনের বীভৎসতায় এখনো আঁতকে ওঠেন নির্যাতিতা

চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সুবর্ণচরে  গণধর্ষণের আসামি আবু ও সালাউদ্দিন গতকাল ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে তারা জানায়, আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের নির্দেশে লাঞ্ছিত করার জন্য ১০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। ইতিপূর্বেও আমাদেরকে দিয়ে এ ধরনের আরো অনেক অপকর্ম করানো হয়েছে। না করলে বনদস্যু-জলদস্যু কেউ এলাকায় থাকতে পারবে না শীর্ষ সন্ত্রাসী রুহুল আমিনের ভয়ে। একবার অপারগতা প্রকাশ করলে বাড়িঘরে হামলা করা হয়। আমরা বাঁচার তাগিদে এই জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছি।
আদালত সূত্র জানায়, ধর্ষিতার পোস্ট ট্রমাটি স্টেচ ডিজ অর্ডার (পি.টি.এস.ডি) হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নবনীতা গুহ হাসপাতালের কেবিনে গিয়ে ২২ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করেন। ধর্ষিতা জানান, কোর্টের হাকিমকে মহিলা পেয়ে আমি ধানের শীষে ভোট দেয়ায় আমার ওপর কী অত্যাচার করেছে সব কথা বলেছি, যারা আমাকে ধর্ষণ করেছে তাদের সবার নাম বলেছি।
সেই দিনের বীভৎসতার কথা, যা এখনো মনে হলে আঁতকে উঠি। সুবর্ণচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ.ন.ম খায়রুল আলম সেলিম বলেন, রুহুল আমিন বিএনপি থেকে ভোটের আগে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে। গণধর্ষিতার চিকিৎসার ব্যয়ভারসহ সকল দায়-দায়িত্ব নিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি ও এমপি একরামুল করিম চৌধুরী। তিনি মাইজদী শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন শাহীন ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আবদুল মমিন বিএসসিকে হাসপাতালে পাঠিয়ে ভিকটিমের সঙ্গে দেখা করে দায়িত্ব নেয়ার কথা জানান।
চরাঞ্চল ঘুরে জানা গেছে, ভোটের রাতে গণধর্ষণের ঘটনায় এই আলোচিত ওসি মামলায় উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও সাবেক মেম্বার রুহুল আমিন এবং ধানের শীষে ভোট দেয়ার তথ্য-উপাত্ত বাদ দিয়ে গণধর্ষণ মামলা রেকর্ড করে। এ নিয়ে স্থানীয় জনমনে ক্ষোভ ও অসন্তোষ চলছে। সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবলী ইউনিয়নের মধ্য ব্যাগ্যা গ্রামে গৃহবধূ গণধর্ষণের ওই রাত থেকে পলাতক ছিল মামলায় এজাহারভুক্ত ৭ নং আসামি আবুল (৪০)। এর মধ্যে মাঝে মাঝে স্ত্রী ছেমনা খাতুনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করতো আবুল। ঘটনাটি নিয়ে যখন চারদিকে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় তখন পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়।
এরপর ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়। তখন ছেমনা তার স্বামী আবুলকে সেই সব বিষয়ে অবগত করেন এবং নিজ থেকে এসে পুলিশে ধরা দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু আবুল তাতে কর্ণপাত করেনি। গত ২/৩ দিন ধরে ছেমনা স্বামীকে বলেন- স্বেচ্ছায় পুলিশে ধরা না দিলে তার ফাঁসি হয়ে যাবে। এর সূত্র ধরে, রোববার বিকালে ছেমনা তার স্বামী আবুলকে দেখা করার জন্য আটকপালিয়া বাজারে আসতে বলে। স্ত্রীর কথামতো বিকাল ৫টার দিকে ওই বাজারে আসে আবুল। এসময় ছেমনা স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় কৌশলে আবুলকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
চরজব্বার থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ইব্রাহিম খলিল জানান, আবুলের স্ত্রীর সহযোগিতায় আটকপালিয়া বাজার থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে এই মামলার এজাহারভুক্ত ৭নং আসামি। সুবর্ণচরে গণধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার আরো ২ ধর্ষক। অভিযুক্ত আরো দুই আসামি নোয়াখালীর সেনবাগে গ্রেপ্তার মামলা গোয়েন্দা পুলিশে হস্তান্তর করা হয়েছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবলী ইউনিয়নের মধ্য ব্যাগ্যা গ্রামে ৩০শে ডিসেম্বর ধানের শীষ মার্কায় ভোট দেয়ার ঘটনায় স্বামী-সন্তানদের বেঁধে রেখে ৪ সন্তানের জননী গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত আরো দুই আসামি মুরাদ (৩০), ইব্রাহিম খলিল প্রকাশ বেচু (৪০)কে সেনবাগ থেকে গ্রেপ্তার করেছে নোয়াখালী গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।  রোববার ৬ই জানুয়ারি সন্ধ্যার সময় নোয়াখালী গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি’র) ওসি (তদন্ত) জাকির হোসেনের নেতৃত্বে সঙ্গীয় পুলিশ ফোর্স গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেনবাগ উপজেলার ছাতারপাইয়া ইউনিয়নের নুরুল আমিনের (এম.পি.ডি) ব্রিকফিল্ডে অভিযান চালিয়ে সুবর্ণচরের মধ্যব্যাগ্যা গ্রামের মো. রফিকের ছেলে মুরাদ তাকে গ্রেপ্তার করে। এর আগে গত ৩রা জানুয়ারি অপর এক অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত অপর আসামি ইব্রাহিম খলিল প্রকাশ বেচু, একই উপজেলার আরিফের ব্রিকফিল্ড থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এই নিয়ে শনিবার রাত থেকে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশ আলাদা অভিযান চালিয়ে ধর্ষণ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করলো। এ পর্যন্ত সর্বমোট ১০ জন গ্রেপ্তার হলো। গ্রেপ্তার হওয়া অপর দুইজন হচ্ছে মধ্যব্যাগ্যা গ্রামের টোকাইয়ের ছেলে সালাউদ্দিন ও একই গ্রামের সেরু মিয়ার ছেলে আবুল। এরই মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত ৭ জনের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান বলেছেন- নোয়াখালীতে গণধর্ষণের ঘটনাকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে এবং সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ গুরুত্বের কারণেই কিন্তু ৪৮ ঘণ্টার অ্যাকশন নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ১০ আসামিকে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা আশাবাদী সকল আসামি ধরা পড়বে এবং আইনানুগভাবেই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সোমবার সকালে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুবর্ণচর উপজেলার মধ্যব্যাগ্যা গ্রামে গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূর খোঁজখবর নেন বিভাগীয় কমিশনার।
এসময় তিনি ভিকটিমকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা এবং আইনি সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দেন। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। এসময় বিভাগীয় কমিশনার আরো বলেন, গণধর্ষণের সঙ্গে জড়িত কেউ ছাড় পাবে না। এই বিষয়টি কতটা রাজনৈতিক অথবা কতটা নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তা খতিয়ে দেখতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বিভাগীয় কমিশনার বলেন, আজকেও সময় টেলিভিশন চ্যানেলে দেখেছি, পূর্ব শত্রুতার জের ধরেই এ ঘটনাটি ঘটেছে। ৩০ তারিখের নির্বাচনের সঙ্গে এটাকে যুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ধর্ষিতার চিকিৎসা এবং তার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ভিকটিম নিজেই বলেছেন আগের চেয়ে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এসময় জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস, পুলিশ সুপার মো. ইলিয়াছ শরীফ, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী ড. মাহে আলম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ কামাল হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আব্দুর রউফ মণ্ডল, নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. খলিল উল্যাহ, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুল ইসলাম সরদার, স্বাচিপ নোয়াখালীর সভাপতি ডা. ফজলে এলাহী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার পাঙ্খার বাজার উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নারীদের নিরাপত্তা দাবি ও গণধর্ষণের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে উপজেলা ভূমিহীন কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন উন্নয়ন সংস্থা নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশি কবির।
উপজেলা ভূমিহীন সংগঠনের সভাপতি ছেরাজুল হক খোকনের সভাপতিত্বে ও পাঙ্খারবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাতেমা আক্তারের সঞ্চালনায় সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, মানবাধিকার আইনজীবী সমিতির নির্বাহী সদস্য এড. সালমা আলী, ভূমিহীন নেতা শাহানা আক্তার, ইব্রাহিম খলিল ও নুর উদ্দিন, পাঙ্খারবাজার জুনিয়র হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আক্তার হোসেন বাবুল, ভূমিহীন অঞ্চল কমিটির সমন্বয়ক খোদেজা বেগম, গণধর্ষণের শিকার পারুল বেগমের ওয়ার্ডের পুরুষ মেম্বার খলিল উল্যাহ, মহিলা মেম্বার আমেনা বেগম, ভুক্তভোগী অর্থসম্পদ ও সতীত্বহরণকারী ২৫ জন নারী মিনা, রহিমা, আয়েশা, মনোয়ারা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। প্রধান অতিথি সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সন্ত্রাসী-ধর্ষকদের প্রতিহত করার আহ্বান জানান। সমাবেশে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো নারী-পুরুষ সমাবেশস্থলে উপস্থিত হন।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে অনেকে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা গণধর্ষণকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবি করেন। একই সঙ্গে স্বাধীন দেশে নারীদের নিরাপত্তার দাবি করেন। নিজেরা করি এনজিও’র নির্বাহী পরিচালক খুশি কবির ডিসি, এসপি’র সঙ্গে সন্ধ্যায় দেখা করে গণধর্ষিতাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর অনুরোধ করেন। এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের সভাপতি ও জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া’র শাইখুল হাদিস মাওলানা মামুনুল হক গতকাল সোমবার সকাল ১১টার দিকে যুব মসলিসের নেতাকর্মীদের নিয়ে হাসপাতালে যান। এসময় তিনি ভিকটিমের সুচিকিৎসা, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করে প্রকৃত আসামিদের দ্রুত বিচার আইনের আওতায় এনে নরপিশাচদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও সুশাসনই চ্যালেঞ্জ by শুভ্র দেব ও মরিয়ম চম্পা

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাই নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। তারা বলছেন, স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি এবং উদার গণতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে বিরোধীদের আস্থায় নেয়ার বিষয়টিকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে নতুন সরকারকে। সাবেক মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মিজানুর রহমান শেলী বলেন, সরকারের এই বিপুল জয় এটাই তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ এ ধরনের জয় সাধারণত প্রচলিত এবং আমাদের পরিচিত গণতন্ত্রে অত্যন্ত বিরল ব্যাপার। সংসদে কোনো সক্রিয় বিরোধী দল থাকবে না। ফলে সেখানে এক ধরনের প্রবল একাত্মবাদ চলতে পারে। এবং সেভাবে যদি তাদের কাজকর্ম অগ্রসর হয় তাহলে সরকারের সত্যিকার গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়া বিরল ও দুরূহ হতে পারে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নতুন সরকারের সামনে নির্বাচনী ইশতেহারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এই ইশতেহারের সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা জড়িত।
এ ছাড়া দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশে উদার রাজনীতির ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, নতুনদের কাছে প্রত্যাশা তারা পুরনো মনোবৃত্তি থেকে বের হয়ে আসবে। আর পুরনো কিছু অভিজ্ঞ মন্ত্রীরা রয়েছেন, নতুন পুরাতনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কাজ করতে হবে। তবে ভালোই হবে বলে মনে করছি।
শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, প্রথমত তাদের ইশতেহারে যা যা লেখা আছে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ মানুষের মনে যে আশা তারা দিয়েছে সেটা ইশতেহারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। যদিও আমি মনে করি ইশতেহারের সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক থাকে না। তারপরও তারা যেহেতু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যেসকল অভিযোগ উঠেছে সে অভিযোগ যাতে আর না উঠে সে ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা। গণতান্ত্রিক পরিবেশ সুস্থ করা। বিরোধী পক্ষের ওপর অকারণে হামলা, গ্রেপ্তার ও তাদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা যাতে দেয়া না হয়। এটা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ মানুষ উন্নয়ন চায়, পাশাপাশি গণতন্ত্র চায়। সেই গণতন্ত্র নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন অর্থবহ হবে না। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, সরকার ও দল যেন এক না হয়ে যায়।
এটি সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে আমাদেরকে। প্রশাসন দলের হয়ে কাজ করে এটি বড় ক্ষতি করে গণতন্ত্রের। আমি মনে করি দলের কোনো সভা গণভবনে হওয়াটা অনুচিত। দলের সভা হবে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে। সরকার-দল সব এক হয়ে গেছে মন্তব্য করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, গণতন্ত্র এখানেই হোঁচট খেয়েছে। যার কারণে প্রশাসন পুলিশ অনেক সময় সরকারের কাজ করতে গিয়ে দলেরই কাজ করে। এটা থেকে বের হতে হবে। নতুনদের ওপর প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবাই ভেবে নিয়েছে পুরাতনরা যা করতে পারেনি নতুনরা তা করে দেখিয়েছে। পুরাতনরা ভালো কাজ করেছেন, কিন্তু সেটা একটা মাত্রায় এসে আটকে গেছে। যেমন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা একটি মাত্রায় গিয়ে ঘুরে ফিরে আবার পেছনের দিকে চলে এসেছে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এখন আনন্দ বঞ্চিত শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে গেল। কোচিং বাণিজ্যসহ নানা বাণিজ্যের মধ্যে পড়ে সত্যিকারের পড়ার উৎসাহ হারিয়ে যাচ্ছে। তাই তরুণরা যারা আসবেন তাদেরকে এই জিনিসগুলো মাথায় রেখে দুর্বলতা, অপূর্ণতাগুলোকে ভরাট করতে হবে। এটিকেও আমি চ্যালেঞ্জ মনে করি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা আমি মনে করি রাজনৈতিক। এবং সেটা হচ্ছে অভূতপূর্ব নির্বাচন এবং অভূতপূর্ব ফলাফল। বিশেষ করে অভূতপূর্ব সংখ্যাগরিষ্ঠতা। সেটাকে ম্যানেজ করা হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এবং বিশেষ করে এই জন্য যে এই প্রেক্ষিতে জবাবদিহিতার সম্ভাব্য যে ক্ষেত্র সেটা একেবারেই সংকুচিত ও নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তারা যদি ক্ষমতাটাকে মনে করেন নিজেদের সম্পদ বিকাশের সোপান। এবং এই মানসিকতা নিয়ে যদি মন্ত্রিত্বের ভূমিকা পালন করেন সেটাও একটি চ্যালেঞ্জ। যেটা প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির সঙ্গে  সাংঘর্ষিক হবে। দ্বিতীয়ত যে বিষয়টি তা হলো প্রধানমন্ত্রী বলেছেন অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। যেটা তাদের ইশতেহারে পরিষ্কারভাবে বলা আছে। এবং যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। কাজেই যে আইনগুলো মতপ্রকাশ এবং বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ সেই আইনগুলোকে সংসদে সংস্কার করে ঢেলে সাজাতে হবে। এক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব।

করণীয় নিয়ে কী ভাবছে ঐক্যফ্রন্ট by আব্দুল আলীম

নির্বাচনের পর নিজেদের করণীয় নিয়ে ভাবছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা। নির্বাচনের আগে রাজপথে কঠোর কোনো কর্মসূচিতে না গেলেও ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সব ধরনের কর্মসূচি দেয়ার চিন্তাভাবনা করছেন তারা। ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নির্ধারণ করতে আজ বিকালে বৈঠক করার কথা রয়েছে নেতাদের। ফ্রন্ট সূত্র বলছে এই মুহূর্তে জোরালো কর্মসূচিতে না গিয়ে সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিংয়ের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে শীর্ষ নেতারা। একইসঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দল এমনকি জোটের বাইরে থাকা ইসলামী দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা করে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গঠন করে সরকারবিরোধী আন্দোলনের দিকে যেতে চাইছেন তারা।
এর জন্য দেশের বাম রাজনৈতিক দলগুলোসহ ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গেও আলোচনায় বসতে ইতিবাচক অবস্থানে আছে ঐক্যফ্রন্ট। ইতিমধ্যে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সকল অনিয়ম নিয়ে ভিডিও এবং পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনসহ বিভিন্ন নথিপত্র দেয়া হয়েছে বিদেশি কূটনৈতিকদের কাছে। ফ্রন্ট নেতারা সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করার আবেদন রেখেছেন বিদেশিদের কাছে।
ভবিষ্যতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কি করতে চায় সে বিষয়েও জানতে চেয়েছেন বিদেশি কূটনৈতিকরা।
ঐক্যফ্রন্টের এক নেতা বলেন, সারা দেশের সকল প্রার্থীদের ঢাকায় এনে ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে তাদের মতামত নেয়া হতে পারে খুব শিগগিরই। একই সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের সকল দল নিজ নিজ দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও করণীয় নিয়ে বৈঠক করবে। নিজেদের মতামত গ্রহণ করবে।
গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিক মানবজমিনকে বলেন, আমরা অহিংস আন্দোলন করতে চাই। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে আন্দোলনের মধ্যে জনমত গঠন, প্রতিবাদ সভা-সমাবেশ করা হয়ে থাকে। আমরা সেগুলো করতে চাই। তবে এগুলোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। জাতীয় এক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা বসে কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলনের যে কর্মসূচিগুলো আছে আমরা তার সবগুলো নিয়েই ভাবছি। সাধারণত আমরা সভা-সমাবেশ ও মিছিল-মিটিং নিয়ে ভাবছি। আগামীতে আমাদের করণীয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে চাই। এক্ষেত্রে সারা দেশের সকল প্রার্থীদের ঢাকায় আনা যেতে পারে। অন্যদিকে সরকারবিরোধী সকল রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আমরা আলোচনা করতে চাই।
ইসলামিক দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা অব্যাহত রাখতে চাই। গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু মানবজমিনকে বলেন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে শিগগিরই আমাদের কর্মসূচি আসবে। মঙ্গলবার আমরা নতুন কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য বৈঠক করব। কি ধরনের কর্মসূচি আমরা গ্রহণ করবো সে বিষয়ে ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আজ বৈঠকে বসছে ঐক্যফ্রন্ট। ফ্রন্ট সূত্র জানিয়েছে, ড. কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাসায় বিকালে এ বৈঠক হবে। এতে শীর্ষ নেতারা পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা করবেন। এদিকে ঐক্যফ্রন্টের বাইরে বিএনপি নিজেদের করণীয় নিয়ে দলীয়ভাবে চিন্তাভাবনা করছে। নির্বাচনের পরই স্থায়ী কমিটির সদস্যরা তাৎক্ষণিক আলোচনা করেছেন। সূত্র জানায়, নির্বাচনে অনিয়মকে মোটা দাগে সামনে আনা হলেও সাংগঠনিক দুর্বলতাকেও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিএনপি নেতারা। তাই আন্দোলন কর্মসূচির পাশাপাশি সুশৃঙ্খল সংগঠন গড়ার দিকেও নজর দিচ্ছেন তারা।

হাসিনার রেকর্ড, নয়া চ্যালেঞ্জে যাত্রা শুরু

চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। দেশের ইতিহাসে চারবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার রেকর্ড গড়লেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। গতকাল প্রধানমন্ত্রীসহ  ৪৬ জনের মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে চ্যালেঞ্জ যাত্রা শুরু করেছে আওয়ামী লীগের নতুন সরকার। আর এ নিয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ শাসনের দায়িত্ব নিলো আওয়ামী লীগ। উন্নয়ন, গণতন্ত্র আর সুশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে সরকারের যাত্রার শুরুটাই অনেকটা চমকের। একঝাঁক তরুণ মুখ, সঙ্গে অভিজ্ঞদের নিয়ে গড়া মন্ত্রিসভার সদস্যরাও জানিয়েছেন তারা সবাই নতুন কিছু করতে চান দেশের জন্য। নিজেদের কর্মদক্ষতায় এগিয়ে নিয়ে যেতে যান উন্নয়নযাত্রা। গতকাল বিকাল তিনটা ৪০ মিনিটে বঙ্গভবনের দরবার হলে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ শেখ হাসিনাকে শপথ পাঠ করান।
নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে শেখ হাসিনা প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের কাছ থেকে সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন ও গোপনীয়তার শপথ নেন। প্রধানমন্ত্রী শপথ নেয়ার পর প্রেসিডেন্ট তাকে অভিনন্দন জানান।
এরপরই প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের নতুন সূচনায় পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে। এর আগে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ বঙ্গভবনে প্রবেশ করার পর পরই জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাজেদা চৌধুরী দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বুকে জড়িয়ে নেন, গালে চুমু খান। পরে হাত নেড়ে উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আসন গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। এরপর নতুন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা পর্যায়ক্রমে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে শপথ নেন। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। মন্ত্রিসভার এ শপথের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে ১২তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। এবারের সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হলে তিনি বাংলাদেশে ২০ বছরের রাষ্ট্র পরিচালনাকারী প্রধানমন্ত্রীর স্বীকৃতি পাবেন। এটা হবে স্বাধীন বাংলাদেশের একটি রেকর্ড। এর আগে বাংলাদেশে যারা সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের কেউই চারবারের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাননি।
এর আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ২১ বছর পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ২৩শে জুন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলে শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের ৬ই জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার বিজয়ী হলে ১২ই জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয়বার শপথ নেন তিনি। গত ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার আবারও নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে।
এর ভিত্তিতে গতকাল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। রাষ্ট্র পরিচালনায় এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গী হলেন ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী এবং তিনজন উপমন্ত্রী। শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শেখ রেহেনার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও তার স্ত্রী পেপপি উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন ও শেখ সালাউদ্দিন জুয়েলও শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অন্যদের মধ্যে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, সিইসি কেএম নূরুল হুদা এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরা নতুন সরকারের অভিষেকে উপস্থিত ছিলেন। একাদশ সংসদের প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসার সিদ্ধান্ত নেয়া জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বা তার স্ত্রী রওশন এরশাদকে নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি। তবে জোট শরিকদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সদ্য সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মহাসচিব আবদুল মান্নান ও যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম দরবার হলে উপস্থিত ছিলেন।
নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়া সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। গত সরকারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা এইচ টি ইমাম, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও গওহর রিজভীও ছিলেন বঙ্গভবনে। নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে দোয়া চান। এ ছাড়াও দরবার হলের অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিচারপতি, শিক্ষক, কূটনীতিকরাসহ প্রায় এক হাজার অতিথি উপস্থিত ছিলেন। এদিকে, মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যরা শপথ নিতে বঙ্গভবনে আসতে শুরু করেন বেলা ৩টার আগেই। তারা একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন, হাস্যরসে মেতে ওঠেন। নতুন রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের পা ছুঁয়ে সালাম করতে দেখা যায়। এদিনের শপথ অনুষ্ঠান শেষে বঙ্গভবনের মাঠে চা চক্রে যোগ দেন সবাই। প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে ঘুরে ঘুরে সবার সঙ্গে কথা বলেন।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এমপি হিসেবে শপথ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শপথ অনুষ্ঠান শেষে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় তিনি সংসদ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন। নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেয়ার পরের দিন আজ সকাল সাড়ে ৯টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে এবং সকাল সাড়ে ১০টায় সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করবেন। আগামীকাল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি রয়েছে।
একজন শেখ হাসিনা: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ হাসিনা। ১৯৯৬ সালের ২৩শে জুন প্রথম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। তার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সে বছরের ১২ই জুনের সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে শেখ হাসিনা ৩টি সংসদীয় আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই নির্বাচনের পরেই দেশ থেকে সামরিক আইন প্রত্যাহার করে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। শেখ হাসিনা নব্বইয়ের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং এই আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর এরশাদ সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। ১৯৯১ সালের সংসদীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনা পঞ্চম জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন।
তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে সংগঠিত করেন। ১৯৯৬ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচনের বিরুদ্ধে তিনি গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনের মুখে ৩০শে মার্চ তৎকালীন সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। ২০০৯ সালে সরকার পরিচালনায় দায়িত্ব নিয়ে তার সরকার ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের জন্য আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের আওতায় স্থাপিত ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছে এবং ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি রায় কার্যকর করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের পাঁচ সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ শেখ হাসিনা। গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৭ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সরকারি ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজের ছাত্রসংসদের সহসভাপতি ছিলেন। তিনি এই কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পরের বছর সভাপতি ছিলেন।
শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একজন সদস্য এবং ছাত্রলীগের রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা সেসময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় তারা প্রাণে বেঁচে যান। পরবর্তীকালে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছয়বছর ভারতে অবস্থান করেন। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষ করে ১৯৮১ সালের ১৭ই মে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
১৯৮১ সালে দেশে ফিরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে অংশ নেয়ায় তাকে বারবার কারান্তরীণ করা হয়। ১৯৮৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি সামরিক সরকার তাকে আটক করে ১৫ দিন অন্তরীণ রাখে। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং নভেম্বর মাসে তাকে দু’বার গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৫ সালের ২রা মার্চ তাকে আটক করে প্রায় ৩ মাস গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ১৯৮৬ সালের ১৫ই অক্টোবর থেকে তিনি ১৫ দিন গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৮৭ সালে ১১ই নভেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করে এক মাস অন্তরীণ রাখা হয়। ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হয়ে গৃহবন্দি হন। ১৯৯০ সালে ২৭শে নভেম্বর শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু ভবনে অন্তরীণ করা হয়। ২০০৭ সালের ১৬ই জুলাই সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে সংসদ ভবন চত্বরে সাবজেলে পাঠায়। প্রায় ১ বছর পর ২০০৮ সালের ১১ই জুন তিনি মুক্তি পান।
২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় বক্তব্য শেষ করার পরপরই শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছোড়া হয়। লোমহর্ষক সেই হামলায় শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও আইভি রহমানসহ দলের ২৪ নেতাকর্মী নিহত হন এবং ৫ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ২০০৮ সালে দ্বিতীয় বার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ।
শান্তি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য বিশ্বের বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিষ্ঠান শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন ডিগ্রি এবং পুরস্কার প্রদান করে। দল ও সরকার পরিচালনার পাশাপাশি লেখালেখিতেও সিদ্ধহস্ত শেখ হাসিনা। বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করছেন তিনি।

চাঁদাবাজি করার সময় আওয়ামী লীগ নেতাকে পিটিয়ে হত্যা

চাঁদাবাজি করার সময় মহিউদ্দিন সোহেল (৩৫) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেছে ব্যবসায়ীরা। সোহেল স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা   হিসেবে পরিচিত। সোমবার বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম মহানগরীর ডবলমুরিং থানাধীন পাহাড়তলী বাজারে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ বাজারের রেললাইনের পাশ থেকে সোহেলের মরদেহ উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেছে বলে জানান ডবলমুরিং থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) একেএম মহিউদ্দিন সেলিম।
মহিউদ্দিন সেলিম জানান, সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ডবলমুরিং থানার পাহাড়তলি বাজারে দোকানদারদের কাছ থেকে চাঁদা তুলতে যায় সোহেল। এ সময় দাবিকৃত চাঁদা না দেয়ায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে সোহেল সহযোগীদের ডেকে নিয়ে এসে ব্যবসায়ীদের ওপর চড়াও হয়। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ বাধে।
বেলা ১১টার দিকে ক্ষিপ্ত ব্যবসায়ীরা সোহেলকে পিটিয়ে হত্যা করে।
ওসি বলেন, সোহেল ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ হিসেবে পরিচিত সে। পাহাড়তলী বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সোহেলের মরদেহ উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে।

সাভার ও গাজীপুরেও শ্রমিক বিক্ষোভ: দ্বিতীয় দিনেও অচল বিমানবন্দর সড়ক

বকেয়া বেতন ও ন্যূনতম মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের দাবিতে আবারো সড়কে অবস্থান নিয়েছেন পোশাক শ্রমিকরা। গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করেন তারা। এ সময় শ্রমিক-পুলিশের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। ফলে ব্যস্ততম এ সড়কের দু’পাশে  যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে গার্মেন্ট শ্রমিক বিক্ষোভ করেছেন সাভার ও গাজীপুরে।
বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা জানান, নতুন মজুরি কাঠামো অনুযায়ী ৫১ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি শুধু সপ্তম গ্রেডের ক্ষেত্রেই দিচ্ছেন মালিকরা। সমান মজুরি দেয়া হচ্ছে না, মূল্যায়ন করা হচ্ছে না অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে।
রোববার দুপুরে মালিকপক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। তবে সে আশ্বাস উপেক্ষা করে সোমবার সকাল থেকে আবারও তারা মাঠে নেমেছেন।
সোমবার সকাল থেকে শ্রমিকরা বিভিন্ন গার্মেন্ট থেকে বিক্ষোভ সহকারে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে নেমে আসেন। একপর্যায়ে তারা ওই মহাসড়কে বিভিন্ন পরিত্যক্ত বস্তু ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেন। ফলে ওই সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
শ্রমিকদের বিক্ষোভের সূত্রপাত রোববার থেকে। ওইদিন উত্তরার বিভিন্ন গার্মেন্টের শত শত শ্রমিক আজমপুর থেকে জসীমউদদীন ক্রসিং পর্যন্ত অবস্থান নিলে অচল হয়ে পড়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। পাঁচ ঘণ্টা পর দুপুর ২টার দিকে তারা রাস্তা থেকে উঠে যাওয়ার আগে সোমবার ফের বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই ঘোষণা অনুযায়ীই তারা সোমবার সকালে রাস্তায় নামেন।
পুলিশ জানায়, সকাল ৯টার পর থেকে শ্রমিকরা রাস্তায় জড়ো হতে থাকে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জানানো হয়, শ্রমিকরা রাস্তায় অবস্থান নেয়ায় সকাল ১১টার পর উত্তরার আজমপুরে প্রথমে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বেলা সোয়া ১২টা থেকে বিমানবন্দরের সামনেও যান চলাচল বন্ধ হয়। দুপুরের দিকে বিমানবন্দরের সামনের সড়কে এনা পরিবহনের বাসটি ভাঙচুরের পর তাতে আগুন দেন শ্রমকিরা।  দুপুর ২টার দিকে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি আলী হোসেন পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকার কথা জানিয়ে বলেন, প্রায় ১০ জন কারখানা মালিক বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পরই পুলিশের বড় বহর শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়া শুরু করে। ২০ মিনিট পর থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে পরিস্থিতি।
এ বিষয়ে পুলিশের উওরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) নাবিদ কামাল শৈবাল বলেন, সরকার শ্রমিকদের জন্য যে বেতন কাঠামো তৈরি করেছে সেটা নজরদারির জন্য আমরা আপনাদের (শ্রমিক) সঙ্গে রয়েছি। ভাঙচুর, জ্বালাও পোড়াও করলে আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকব না। এ ব্যাপারে  যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। সরকারি মজুরি কাঠামো অনুযায়ী যাতে আপনারা বেতন পান সে বিষয়টি নিশ্চিত করতেই আপনাদের গার্মেন্টের মালিকরা এখানে এসেছেন আপনাদের আশ্বস্ত করতে ও কথা বলতে। তিনি আরো বলেন, যদি আপনাদের বেতন নিয়ে মালিক পক্ষের সঙ্গে কোনো ঝামেলা থাকে  তাদের সঙ্গে কথা বলে সমাধান করতে হবে। সেজন্য জনগণকে হয়রানি করা যাবে না।