Wednesday, July 2, 2025

ইসরায়েলিরা কেন দল বেঁধে দেশে ছেড়ে পালাচ্ছেন by জোসেফ মাসাদ

২০ মাস ধরে গাজায় টানা বোমা ফেলা হচ্ছে। পুরো গাজা অবরোধ করে গণহত্যা চালানো হচ্ছে। এখন ত্রাণের লাইনে দাঁড়ানো মানুষকেও গুলি করে মারা হচ্ছে। তারপরও ফিলিস্তিনিরা দাঁতে দাঁত চেপে গাজা আঁকড়ে আছেন।

অন্যদিকে ইরানের পাল্টা আঘাতে ইসরায়েলে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনার পর ইসরায়েলি ইহুদিদের আরেক দফা দেশত্যাগ শুরু হয়েছে।

ইসরায়েলি নাগরিক, দ্বৈত নাগরিক ও পর্যটকেরা ইসরায়েল ছেড়ে পালাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। অনেক ইসরায়েলি ‘রেসকিউ ফ্লাইট’ বা ‘পালানোর জাহাজ’ ধরে দেশ ছাড়তে চাইছেন। কিন্তু সরকার তাদের চলে যেতে দিচ্ছে না; বাধা দিচ্ছে।

এর আগেও দেখা গেছে, বহু ইসরায়েলি ইহুদি অন্য দেশে চলে যেতে চেয়েছেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ইসরায়েলি পত্রিকা মারিভ-এ বলা হয়, ‘চলো দেশ ছাড়ি একসঙ্গে’ নামের একটি নতুন গ্রুপ তৈরি হয়েছে, যারা ইসরায়েলি ইহুদিদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে চায়।

তারা প্রথম ধাপে ১০ হাজার ইহুদিকে পাঠাতে চেয়েছিল। এই গ্রুপের নেতাদের মধ্যে রয়েছেন নেতানিয়াহুবিরোধী কর্মী ইয়ানিভ গোরেলিক ও ইসরায়েলি-মার্কিন ব্যবসায়ী মোর্দিখাই কাহানা।

মোর্দিখাই কাহানা বলেন, ‘অনেকেই রোমানিয়া বা গ্রিসে যেতে চাইছেন। কিন্তু আমি বলি, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া সহজ। আমার নিউ জার্সিতে একটা বড় খামার আছে, চাইলে সবাই মিলে সেখানে কিবুতজ (একধরনের কমিউন) বানিয়ে থাকতে পারি।’

তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের এ সরকারের অধীন থাকা কঠিন। তাই যাঁরা ডাক্তার বা পাইলট—এ ধরনের পেশাজীবী, তাঁদের যুক্তরাষ্ট্র ঢুকতে দেওয়া উচিত।

আসলে বহু বছর ধরেই অনেক ইসরায়েলি ইহুদি মনে করছেন, ইসরায়েল টেকসই কোনো দেশ নয়। এখানে ইহুদিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হয়তো এক দিন থাকবে না।

রাজনীতি, সমাজ—সবই বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। তাই তাঁরা নিরাপদ ও ভালো ভবিষ্যতের জন্য অন্য দেশে যেতে চাইছেন।

সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় যাঁরা বিদেশে আটকা পড়েছিলেন, তাঁরা যদিও ফিরে এসেছেন। তবে ইসরায়েলি ইহুদিদের এ দেশত্যাগ এখনো অব্যাহত আছে। আসলে এটা বিগত কয়েক বছরের সেই বিস্তৃত প্রবণতার অংশ, যেখানে অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন।

ইসরায়েলি সরকারের হিসাবে দেখা যায়, ২০০৩ সালের শেষ নাগাদ সাড়ে সাত লাখ ইসরায়েলি স্থায়ীভাবে দেশের বাইরে বসবাস করছিলেন। তাঁদের বেশির ভাগই বাস করছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়।

তাঁদের মধ্যে ২ লাখ ৩০ হাজার ছিলেন ইসরায়েলে জন্ম নেওয়া ইহুদি। মানে, তাঁদের মা–বাবা ইসরায়েলি দখলদার সেটলার।

ইসরায়েলি সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ৭ লাখ ২০ হাজার ইসরায়েলি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁরা আর কখনোই ফিরে আসেননি।

২০১৬ সালের মধ্যে দেখা যায়, ফ্রান্স থেকে যাঁরা ইসরায়েলে অভিবাসী হয়ে এসেছিলেন, তাঁদের প্রায় ৩০ শতাংশ পরে আবার ফ্রান্সে ফিরে গেছেন। যদিও ইসরায়েল সরকার ও বিভিন্ন জায়নবাদী সংগঠন তাঁদের ধরে রাখার জন্য বহু চেষ্টা করেছিল।

২০১১ সালে ইসরায়েলের অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করেছিল। সেটির উদ্দেশ্য ছিল, বিদেশে থাকা ইসরায়েলিদের মনে অপরাধবোধ তৈরি করে তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনা।

বিজ্ঞাপনটিতে দেখা যেত, একটি ছোট ছেলে নিজের আঁকা ছবিতে রং করা শেষ করে তার বাবাকে ডাকে। কিন্তু বাবা ঘুমিয়ে আছেন একটি সোফায়। তাঁর বুকের ওপর দ্য ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিন। ছেলে প্রথমে ডাকে, ‘ড্যাডি!’ কোনো সাড়া মেলে না। এরপর সে আবার কোমল গলায় বলে, ‘আব্বা!’ এবার বাবা সঙ্গে সঙ্গে চোখ খোলেন। বাবা ছেলের আঁকা ছবিটি দেখে প্রশংসা করেন, ছেলের চুলে হাত বুলিয়ে দেন। তারপর ধীরে ধীরে দৃশ্য মিলিয়ে যায়। নেপথ্যে হিব্রু ভাষায় একটি ভয়েসওভার আসে, ‘তারা সব সময়ই ইসরায়েলি থাকবে। কিন্তু তাদের সন্তানেরা থাকবে না। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করুন।’

বিজ্ঞাপনটি প্রকাশের পরই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। কারণ, এতে বোঝানো হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র কোনো ভালো ইহুদির থাকার জায়গা নয়, আর যে ইহুদি ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন, তাঁর উচিত ইসরায়েলে থাকা। তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণে পরে বিজ্ঞাপনটি তুলে নেওয়া হয় এবং ইসরায়েলি মন্ত্রণালয় এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করে।

বহু ইসরায়েলি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাচ্ছেন দেখে ২০১৭ সালেই ইসরায়েল সরকার দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। তাই যাঁরা দেশে ফিরতে চান, তাঁদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়।

এমনকি ওই বছর বিজ্ঞানমন্ত্রী অফির আকুনিস সিলিকন ভ্যালিতে থাকা ইসরায়েলিদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য পিএইচডি স্কলারশিপের অফার দেন; কিন্তু তিনি সফল হননি।

ইসরায়েলের শীর্ষ জনসংখ্যা–গবেষক সের্জিও ডেলা পারগোলার মতে, বহু বছর ধরেই ইসরায়েল থেকে একটি বড় মাত্রার দেশত্যাগ বা ‘ম্যাস এক্সোডাস’ ঘটছে।

এটি ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর পরবর্তী যুদ্ধ শুরুর আগেই এ ‘গণনিষ্ক্রমণ’ শুরু হয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর পর সরকারি হিসাবে ৮২ হাজার ইহুদি ইসরায়েল ছেড়েছেন। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ।

এই ইহুদি দেশত্যাগ ঠেকাতে ইসরায়েল সরকার সম্প্রতি কঠোর হয়েছে। তারা নিয়ম করেছে, কেউ দেশ ছাড়তে চাইলে একটি সরকারি ‘বিচারবহির্ভূত কমিটির’ অনুমতি লাগবে।

সরকারি নির্দেশে এয়ারলাইনসগুলো ইসরায়েলি নাগরিকদের টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দেয়। তারপরও হাজার হাজার মানুষ পালাতে চাইছেন।

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ২০ জুনের আগেই ২৫ হাজারের বেশি আমেরিকান (অনেকেই দ্বৈত নাগরিক) ইসরায়েল, পশ্চিম তীর ও ইরান ছাড়তে চেয়ে যোগাযোগ করেছেন।

শুধু এক দিনেই ১০ হাজার মানুষ চলে যাওয়ার আবেদন করেছেন। কানাডাও ঘোষণা দিয়েছে, তারা ইসরায়েল থেকে ছয় হাজার নাগরিক ফিরিয়ে আনবে।

এদিকে বহু ইসরায়েলি সমুদ্রপথে নৌকা বা ইয়টে করে সাইপ্রাসে পালাচ্ছেন। হারেৎজ পত্রিকা এটিকে ‘পালানোর নৌবহর’ বলে অভিহিত করেছে।

এ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অনেক সংগঠন প্রতিবাদ করেছে। তারা বলছে, এটা দেশের সংবিধান লঙ্ঘন করছে। তাদের দাবি, যাঁরা দেশ ছাড়তে চান, তাঁদের যেতে দেওয়া উচিত।

১৯৭০ সালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নে আটকা পড়া ইহুদিদের জন্য ‘আমাদের মানুষদের ছেড়ে দাও’ বলে দাবি করেছিল। আজকে ইসরায়েলের ভেতরেই হাজার হাজার ইহুদি যেন একই দাবি করছেন, ‘নেতানিয়াহু, আমাদের যেতে দাও।’

- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া
- ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
* জোসেফ মাসাদ, নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক আরব রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস বিষয়ের অধ্যাপক

ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর দিয়ে দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন কয়েকজন ইসরায়েলি নাগরিক
ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর দিয়ে দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন কয়েকজন ইসরায়েলি নাগরিক। ছবি: এএফপি

আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার শর্ত কী, আসিফ মাহমুদ কীভাবে লাইসেন্স পেলেন by মাহমুদুল হাসান

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে কেউ চাইলে আগ্নেয়াস্ত্র রাখতে পারেন। তবে অস্ত্রের লাইসেন্স নেওয়া সহজ নয়। অনুমতির প্রক্রিয়া বেশ লম্বা—আবেদন, যাচাই-বাছাই, পুলিশি তদন্ত, জেলা প্রশাসকের সুপারিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি। এতগুলো ধাপ পার হওয়ার পরই পাওয়া যেতে পারে একটি বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স।

আবার বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার পর সেটির সংরক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য নীতিমালা রয়েছে। নীতিমালা না মেনে যদি বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করা হয়, সে ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিলের বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশে মূলত শটগান, রিভলবার ও পিস্তলের লাইসেন্স দেওয়া হয়। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, রাইফেল বা আধা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সাধারণ নাগরিকদের জন্য নিষিদ্ধ। এক ব্যক্তিকে দুটির বেশি লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে নিবন্ধিত শুটারদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট শুটারকে সর্বোচ্চ তিনটি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া যায়।

অস্ত্রের লাইসেন্সের যোগ্য কারা

আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য দেশের নাগরিকদের বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে আবেদনকারীর বয়স ৩০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে হতে হবে এবং তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সমর্থ হতে হবে। লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারীকে ‘ব্যক্তি শ্রেণির’ আয়করদাতা হতে হবে।

লাইসেন্স পেতে আবেদনের আগের তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে আয়কর দিতে হবে। পিস্তল, রিভলবার ও রাইফেলের ক্ষেত্রে ন্যূনতম তিন লাখ টাকা এবং শটগানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম এক লাখ টাকা আয়কর দিতে হবে।

প্রবাসী বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি দ্বৈত নাগরিকের ক্ষেত্রে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদনের যোগ্যতা হিসেবে ধারাবাহিকভাবে সর্বশেষ তিন বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ টাকা করে রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) পাঠানো এবং বিদেশে আয়কর দেওয়ার প্রমাণপত্র থাকতে হবে।

তবে কোনো ব্যক্তি যদি ফৌজদারি মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হন, তিনি অস্ত্রের লাইসেন্স পাবেন না। কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি আদালতের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে সাজা বা দণ্ডপ্রাপ্ত হলে দণ্ড শেষ হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য হবেন না।

আসিফ মাহমুদ লাইসেন্স পেলেন কীভাবে

আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০১৬ অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত পূরণ ছাড়া কারও লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ নেই। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া কীভাবে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পেলেন?

গত রোববার ভোরে আসিফ মাহমুদ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে দেশত্যাগ করেন। মরক্কোর মারাকেশে অনুষ্ঠেয় ‘ওআইসি ইয়ুথ ক্যাপিটাল ইন্টারন্যাশনাল প্রোগ্রামে’ অংশ নেবেন তিনি। বিমানবন্দরে স্ক্যানিংয়ের সময় তাঁর ব্যাগে ম্যাগাজিন পাওয়া যায়। প্রশ্ন ওঠে, ম্যাগাজিনটি কার? এটি কি বৈধ?

পরে ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া ব্যাখ্যায় আসিফ মাহমুদ বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁর লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র আছে। অস্ত্র রাখার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের ওপরে কয়েক দফায় যেভাবে হত্যাচেষ্টা চালানো হয়েছে, তাতে অস্ত্র রাখাটাই স্বাভাবিক। যখন সরকারি প্রটোকল বা সিকিউরিটি থাকে না, তখন নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে লাইসেন্স করা অস্ত্র রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

আসিফ মাহমুদের এ বক্তব্যের পর প্রশ্ন ওঠে ব্যক্তিপর্যায়ে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার সাধারণ যোগ্যতা (যেমন: বয়স ও আয়কর প্রদান) কি তাঁর রয়েছে? আসিফ মাহমুদের বয়স ৩০ হয়নি। তা ছাড়া তিনি ছাত্র ছিলেন, ফলে তাঁর টানা তিন বছর কর দেওয়ার কথা নয়। তাহলে তিনি কীভাবে লাইসেন্স পেলেন?

এর উত্তর পাওয়া যায় আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা ২০১৬–এ। এতে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ যোগ্যতার পাশাপাশি ১০ শ্রেণির ব্যক্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। নীতিমালার ৩২ ধারায় এই ব্যক্তিদের লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে আয়কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ও বয়সের ক্ষেত্রে শিথিলতার কথা বলা হয়েছে।

লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রাধিকার পাওয়া ব্যক্তিরা হলেন—স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সমপদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি; সংসদ সদস্য, সিটি করপোরেশনের মেয়র ও ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভার মেয়র; জেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান; বিচারপতিরা, সরকারি গেজেটে বিজ্ঞাপিত সনদপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। এ তালিকায় আরও আছেন জাতীয় বেতন স্কেলের ষষ্ঠ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডভুক্ত কর্মরত/অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা; সামরিক বাহিনীতে কমিশন্ড–প্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির কর্মরত/অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা; চলমান জাতীয় দলের শুটার (যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রত্যায়িত হতে হবে); শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বিজ্ঞান, গবেষণা, ইত্যাদি ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে অবদানের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি।

নীতিমালা অনুযায়ী, উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ যেহেতু মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টার দায়িত্বে আছেন, সে ক্ষেত্রে বয়স ৩০ বছর হওয়া এবং তিন বছর আয়কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য।

লাইসেন্স দেওয়া হয় যেভাবে

নীতিমালা অনুযায়ী, সব আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ের আগ্নেয়াস্ত্র শাখায় সংশ্লিষ্ট জেলার ইস্যু করা সব আগ্নেয়াস্ত্রের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকে।

ব্যক্তিপর্যায়ে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র পেতে আবেদনকারীকে অবশ্যই স্থায়ী ঠিকানায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (জেলা প্রশাসক) কাছে আবেদন করতে হয়। এ জন্য নির্ধারিত ফরম আছে। আবেদন করার পর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের মাধ্যমে আবেদনকারীর প্রাক্‌-পরিচয় যাচাই করেন। পরে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবেদনকারীর সাক্ষাৎকার নেন। আবেদনকারীর শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য, আবেদন করা অস্ত্র ও সেটির রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে তার জ্ঞান এবং অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা হয়।

নিয়ম অনুযায়ী, শটগানের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর লাইসেন্স পাওয়ার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যোগ্য বিবেচিত হতে হয়। এরপর তিনি লাইসেন্স ইস্যু করার নির্দেশ দেন। পিস্তল বা রিভলবারের ক্ষেত্রে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন যোগ্য বিবেচিত হলে সুপারিশসহকারে সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন। মন্ত্রণালয় অনাপত্তি দিলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লাইসেন্স ইস্যু করবেন।

লম্বা এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুমতি পেলে আগ্নেয়াস্ত্র কেনার তারিখ থেকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে তা লিপিবদ্ধ করতে হয়। তবে ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে পূর্বসূরির লাইসেন্স লিপিবদ্ধ করার তারিখ থেকে এই সময় গণনা করা হয়।

কতটি গুলি কেনা যায়, ব্যবহার কীভাবে

আইন অনুযায়ী, লং ব্যারেল (বন্দুক/শটগান/রাইফেল) আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রতিবছর সর্বোচ্চ ১০০টি গুলি কেনার অনুমতি দেওয়া হয়। শর্ট ব্যারেলের (পিস্তল/রিভলবার) আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৫০টি গুলি কেনার অনুমতি দেওয়া যায়। এর বাইরে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে ইস্যু করা প্রতিটি অস্ত্রের বিপরীতে বার্ষিক সর্বোচ্চ ৫০টি গুলি কেনা যায়।

লাইসেন্সের নিয়ম অনুযায়ী, শুধু আত্মরক্ষা ও টার্গেট প্র্যাকটিসের উদ্দেশ্যে গুলি ব্যবহার করা যায়। আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে গুলি ব্যবহারের পরপরই সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হবে। টার্গেট প্র্যাকটিসের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদিত ফায়ারিং রেঞ্জ এবং বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের নির্দিষ্ট অনুশীলন কেন্দ্র ছাড়া টার্গেট প্র্যাকটিস করা যাবে না।

টার্গেট প্র্যাকটিসে গুলি ব্যবহারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ফায়ারিং রেঞ্জ বা বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের প্রত্যয়নপত্র নিতে হবে। পরে নতুন গুলি কেনার আগে ব্যবহৃত গোলাবারুদের প্রত্যয়নপত্র এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জিডির অনুলিপিসহ ব্যবহৃত গুলির হিসাব জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জমা দিতে হয়।

নীতিমালা অনুযায়ী, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যাচাই করে ব্যবহার করা গুলির সমানসংখ্যক গুলি কেনার অনুমতি দিতে পারেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যয়নপত্র ছাড়া কোনো ডিলার লাইসেন্সধারীর কাছে গুলি বিক্রি করতে পারবেন না। নিবন্ধিত শুটারদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের অনুমোদন নিয়ে গুলি সংগ্রহ করতে হবে।

লাইসেন্স বাতিলও হতে পারে

পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন প্রায় ৫০ হাজার বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স আছে। তবে অনেক সময় বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার দেখা যায়। সর্বশেষ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনেও এমন ঘটনা ঘটেছে। এর আগে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করেন দলটির নেতা ও সমর্থকেরা। নীতিমালা অনুযায়ী, এ ধরনের কাজ নিষিদ্ধ।

আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালার ২৫ ধারায় অস্ত্র বহন ও ব্যবহারের বিষয়ে ৮টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর যেকোনো একটি ভঙ্গ করলে লাইসেন্স বাতিল হতে পারে।

আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহারের বিধানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি লাইসেন্স করা অস্ত্র আত্মরক্ষার জন্য নিজেই বহন বা ব্যবহার করতে পারবেন। অন্যের ভীতি বা বিরক্তি উদ্রেক করতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না। আর্থিক প্রতিষ্ঠান অথবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের গার্ড ইউনিফর্ম ছাড়া প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করতে পারবেন না।

বিধানে আরও বলা হয়েছে, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারী কোনো ব্যক্তি নিজের ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা বা সম্পত্তি রক্ষার জন্য প্রহরী হিসেবে নিয়োজিত হতে পারবেন না।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের নামে ইস্যু করা আগ্নেয়াস্ত্র ওই প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে, প্রতিষ্ঠানের মালিক কিংবা কর্মরত কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ব্যক্তির নিরাপত্তার কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

শেষ কথা হলো—অস্ত্র একটি নিরাপত্তা সরঞ্জাম। কিন্তু ব্যবহারে নিয়ম না মানা হলে তা সহিংসতার হাতিয়ার হতে পারে। তাই ব্যক্তিপর্যায়ে অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইন, শর্ত ও দায়িত্ববোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বৈধ অস্ত্র যেমন আত্মরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে, তেমনি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে তা হয়ে উঠতে পারে সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ।

অস্ত্রের লাইসেন্স শুধু অনুমতি নয়, এটা একধরনের বিশ্বাস ও দায়িত্বের চুক্তি। সেই বিশ্বাস যেন ক্ষুণ্ন না হয়—সেটাই সবার প্রত্যাশা।

- প্রথম আলো এক্সপ্লেইনার

আগ্নেয়াস্ত্র

নেতানিয়াহুর ঘুম যেভাবে কেড়ে নেওয়া যেত... by জাসিম আল-আজজাওয়ি

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র গাজায় যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে; কিন্তু এসব পদক্ষেপ মূলত প্রতীকী। আর এখানে ক্ষোভটাও যে লোক দেখানো সেটা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন।

ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ যখন গাজায় অনাহারে থাকা বেসামরিক মানুষদের কাছে খাদ্যসহায়তা পৌঁছানো হলে নেতানিয়াহুর সরকারকে ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেন, তখন ইউরোপের নেতারা কিন্তু ক্ষোভে ফেটে পড়েননি; বরং তাঁরা খুব নিচু স্বরে তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার কথা বলেছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে মত দিয়েছেন ১৭ জন। আর বিরোধিতা করেছেন ১০ জন। ফলাফল কী হলো? ব্যবস্থা হলো খুবই লঘু। কেউ ভিসা বাতিল করলেন, কেউ আবার অ্যাকাউন্ট জব্দ করলেন। আর এর মধে৵ই নিরীহ মানুষের ওপর বোমাবর্ষণ চলতেই থাকল।

এসব আসলে ইসরায়েলকে বাধা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নয়। এটা কেবল কূটনৈতিক নাটক। আর নেতানিয়াহু? তিনি কাঁপছেন না, হাসছেন। এটা একটা খুবই পুরোনো আর পরিচিত অনুশীলন। ইসরায়েল হামলা বাড়ায়। গাজা রক্তাক্ত হয়। পশ্চিমারা অসহায়ভাবে হাত মলে আর নেতানিয়াহু হাসেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন যতই মানবাধিকার আর নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার কথা বলুক না কেন বাস্তবে তারা এর ধারেকাছে দিয়ে হাঁটে না। ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ এখন পর্যন্ত প্রায় লাখো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, প্রায় গোটা গাজার বাসিন্দাদের উৎখাত করেছে এবং গাজাকে দুর্ভিক্ষের প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। এ সবকিছুর  প্রতিক্রিয়ায় ব্রাসেলস যা করছে, সেটা প্রায় ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের পর্যায়ে পড়ে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্য স্থগিত বা অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে বরং ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ’ নিয়েছে। তাদের ভিসা না দেওয়া এবং তাদের সম্ভাব্য ব্যাংক হিসাব জব্দ করার পদক্ষে নেওয়া হয়েছে। যেন এই দুই ব্যক্তি—যাঁরা স্পষ্টভাবে সেটলারদের সহিংসতা ও জাতিগত নিধনের পক্ষে সাফাই গান, তাঁরা প্যারিসে ছুটি কাটানোর জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন।

ইসরায়েলের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য নির্বিঘ্নেই চলছে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত সহযোগিতাসংক্রান্ত চুক্তির ২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, উভয় পক্ষকে মানবাধিকার রক্ষা করতে হবে। এখন সেই অনুচ্ছেদ নীতিতে নয়, শুধু প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বেঁচে আছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা বহুবার প্রমাণ করেছেন যে প্রয়োজনে তাঁরা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেন। রাশিয়া, বেলারুশ ও ইরানের বিরুদ্ধে তাঁরা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু ইসরায়েলের ক্ষেত্রে সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়। এর পরিবর্তে তাঁরা ‘পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ’ করছেন বলে ফাঁপা বিবৃতি দেন।

বেজালেল স্মোট্রিচ ও ইতামার বেন–গভির কোনো প্রান্তিক চরিত্র নন। নেতানিয়াহুর বর্তমান জোটের তাঁরা কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। স্মোট্রিচ কেবল ইসরায়েলের অর্থনীতি দেখেন না, পশ্চিম তীরে দখলদার নীতি বাস্তবায়নের বড় অংশের দায়িত্বেও তিনি রয়েছেন। বেন–গভির ইসরায়েলি পুলিশ বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং সেটলার আন্দোলনের প্রধান মুখও তিনি।

স্মোট্রিচ সম্প্রতি হুমকি দিয়েছেন, যদি গাজায় মানবিক সাহায্য ঢুকতে দেওয়া হয়, তবে তিনি সরকার ভেঙে দেবেন। অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়াব্যবস্থা হলো ভিসা না দেওয়ার আলাপ। অথচ তিনি একসময় গাজাকে ‘মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার’ ডাক দিয়েছিলেন। ফিলিস্তিনি শিশুদের ‘ছোট সাপ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

বেন–গভির চরমপন্থী রাব্বি মেইর কাহানের অনুসারী। উসকানি ও প্ররোচনাকে বেন–গভির তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ করে তুলেছেন। তিনি সেটলারদের হাতে অস্ত্র দেওয়ার পক্ষপাতী এবং তাদের আইনি জবাবদিহি থেকে রক্ষা করার পক্ষে যুক্তি দেন। তাঁর উত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ইসরায়েলি রাজনীতিতে যে কট্টর ডানপন্থী ঢেউ চলছে, তারই উপসর্গ।

স্মোট্রিচ ও বেন–গভিরের বিরুদ্ধে প্রতীকী শাস্তির পদক্ষেপ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বোঝাতে চায়, নেতানিয়াহু একজন যুক্তিসংগত নেতা। কিন্তু তিনি কট্টরপন্থীদের হাতে জিম্মি। কিন্তু এটি পুরোপুরি একটি কল্পকাহিনি। স্মোট্রিচ ও বেন–গভির নেতানিয়াহুর বোঝা নন; বরং তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল সাগরেদ। এই কট্টরপন্থী মতাদর্শই তাঁর জোটকে আঠার মতো আটকে রেখেছে। শুধু দু-একজনকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মানে হচ্ছে, বুলেটের ক্ষতে শুধু ব্যান্ডেজ লাগিয়ে সেটিকে অস্ত্রোপচার বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো একটি লোকদেখানো আয়োজন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে ইউরোপের জনসাধারণকে শান্ত রাখা। ইসরায়েলের যুদ্ধযন্ত্রকে থামানো নয়।

ইসরায়েল কোনো ‘উচ্ছেদে যাওয়া অংশীদার’ নয়; বরং ইসরায়েল পশ্চিমা কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ইসরায়েল একদিকে যেমন সামরিক ঘাঁটি, আবার অন্যদিকে প্রযুক্তি রপ্তানিকারক ও নজরদারি প্রযুক্তির উদ্ভাবক। ইসরায়েল হচ্ছে এমন একটি ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’যেটি নানা রকম সুবিধা ভোগ করে। প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি সামরিক সহায়তা দেয়। ইউরোপীয় দেশগুলো ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করছে।

দখলদারত্ব বজায় থাকার অভিজ্ঞতা থেকে ইসরায়েল যে সব নজরদারি ও দমন-পীড়ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে, সেটি তারা বিভিন্ন দেশে বিক্রি করে।

কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা বিশ্বের প্রক্সির ভূমিকা পালন করে। ইসলামবিরোধী বয়ানের মিশেলে ইসরায়েল ইরানবিরোধী প্রচারণা বাড়িয়ে চলেছে বহু পুরোনো ঔপনিবেশিক কাঠামোকেই শক্তিশালী করে।

এ কারণেই ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধগুলোকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলা হয়; কিন্তু এর জন্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অথচ রাশিয়া যখন ইউক্রেনে বোমা ফেলে, পশ্চিমা বিশ্ব তখন যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি তোলে; কিন্তু যখন ইসরায়েল গাজায় বোমা ফেলে, তখন তারা ‘সংযম’ দেখানোর আহ্বান জানায়।

এটা শুধু দ্বৈতনীতি নয়, এটাই আসল নীতি। আর ইসরায়েল জানে কীভাবে সেই নীতিকে কাজে লাগাতে হয়।

বাণিজ্য স্থগিত, অস্ত্র বিক্রি বন্ধ এবং ইসরায়েলি নেতাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানো হলেই প্রকৃত চাপটা আসতে পারে। এর পরিবর্তে পশ্চিমা বিশ্ব শুধু বিবৃতি দেওয়ায় এবং কার্যকর পদক্ষেপের জায়গায় দূর থেকে দেখার পথ বেছে নিয়েছে।

* জাসিম আল-আজজাওয়ি, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব
- মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

সংসদে প্রতিনিধিত্ব চান জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরা

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংসদের উচ্চকক্ষ (প্রস্তাবিত) ও নিম্ন কক্ষে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব চেয়েছেন জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা।

আজ মঙ্গলবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূতি উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত ‘গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪, জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তাঁরা এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন। এ ছাড়া ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে সভা উদ্বোধন করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

আলোচনা সভার শুরুতে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ, আহতসহ বিগত সরকারের আমলে গুম-খুন-নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য দেন। জুলাই অভ্যুত্থানে সাভারে শহীদ হওয়া ইয়ামিনের বাবা মহিউদ্দিন বলেন, শান্তির স্বার্থে শুধু সংসদের উচ্চকক্ষের নির্বাচন সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে হওয়া উচিত। একই সঙ্গে আগামী নির্বাচনে শহীদ পরিবার (জুলাই অভ্যুত্থান) থেকে সংসদের উচ্চ ও নিম্নকক্ষে ১০ জন প্রতিনিধি মনোনয়নের আশা করেন বলে জানান তিনি।

মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শহীদ পরিবার থেকে অংশীদারত্ব রাখতে হবে। রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের ভাই রমজান আলী বলেন, ‘আবু সাঈদ যদি বুক পেতে না দাঁড়াত, দেশের পরিস্থিতি (পরিবর্তন) এত সহজ হয়ে আসত না । আবু সাঈদ গুলির সামনে বুক পাতিয়ে সকল পেশাজীবী, দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে সাহস জুগিয়েছিল।’

সরকার থেকে শহীদ পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেওয়া হয় না বলে সভায় অভিযোগ করেন জুলাই অভ্যুত্থানে উত্তরায় শহীদ হওয়া আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা। তিনি বলেন, যাদের রক্তের বিনিময়ে এই পরিবর্তন, এই সরকার, তারা এখনই খোঁজ নেয় না, পরে আর কী হবে!

বিগত সরকারের আমলে গুমের শিকার বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসীনা রুশদীর অভিযোগ করে বলেন, গুম কমিশনে অভিযোগ জমা দেওয়ার পর বারবার তাঁরা ফোন করে আমাদের কাছ থেকে তথ্য নিতে চাচ্ছে। জানতে চেয়েছে, ইলিয়াস আলী ফিরে এসেছেন কি না। এসব থেকে ধারণা করা যায়, কমিশনের কাজের গতি কী, কতটা গুরুত্ব দিয়ে তারা কাজ করছে। ট্রাইব্যুনালে গুমের কোনো আইন না থাকার প্রসঙ্গটি টেনে তাহসীনা বলেন, ‘মামলা করব কীভাবে। সেই ২০১২ সালে জিডি করেছি, হাইকোর্টে রিটও করেছিলাম।’ মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য রাষ্ট্র কেন বাদী হয় না, এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।

গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’–এর আহ্বায়ক সানজিদা ইসলাম বলেন, ‘যাঁদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ, তাঁদের বিচার করতে হবে। শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত আমরা লড়ব।’

গুমের শিকার পুরান ঢাকার ছাত্রদল নেতা পারভেজ হোসেনের মেয়ে আবিদা ইসলাম বলেন, ‘১২ বছর ধরে বাবাকে খুঁজছি। ৫ আগস্টের পরে মনে হয়েছিল, বাবাকে ফেরত পাব, কিন্তু খোঁজই পাইনি।’

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন গুমের শিকার নুরুজ্জামান জনির ছোট ভাই মনিরুজ্জামান, চট্টগ্রামে ছাত্রদল নেতা শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম, ছাত্রলীগের হামলায় নিহত বিশ্বজিৎ দাসের বাবা অনন্ত চন্দ্র দাস প্রমুখ। সভাটি সঞ্চালনা করেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে বিএনপির বিশেষ আলোচনা সভায় শহীদ পরিবারের  সদস্যরা
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে বিএনপির বিশেষ আলোচনা সভায় শহীদ পরিবারের সদস্যরা। ছবি: প্রথম আলো