Sunday, June 20, 2010

রানীরবন্দরে মৈত্রীর মিলনমেলা by এম আর আলম

ফ্যাশন হাউস লুই ভুইত্তোঁ-এর সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপনটি অনেকেরই নজর কেড়েছে। আমাদের দেশে যাঁরা টাইম ম্যাগাজিন, দ্য ইকোনমিস্ট বা নিউজউইক পড়েন তাঁদের অনেকেই বিজ্ঞাপনটি দেখেছেন। বিজ্ঞাপন হিসেবে ছাপা হওয়ার আগে এ নিয়ে ছবিসহ খবরও হয়েছে পত্রপত্রিকায়। কারণ এটা খবরই, বড় খবর। বিশ্বকাপ ফুটবলের আগে থেকেই সবকিছু আস্তে আস্তে ফুটবলময় হয়ে উঠতে শুরু করে। এই বিজ্ঞাপনটিও বিশ্বকাপকে সামনে রেখে। মডেল তিন ফুটবলার—পেলে, ম্যারাডোনা, জিদান। প্রথম দুজনের কে খেলোয়াড় হিসেবে এক বা দুই নম্বরে আছেন, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। সেদিক থেকে জিদান অনেকটা নিরাপদ। কে মহান? পেলে-ম্যারাডোনা বিতর্ক তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে খুব প্রীতিকর রাখেনি। কিন্তু লুই ভুইত্তোঁ তাঁদের এক করেছে। মাদ্রিদের একটি ক্যাফেতে এই তিন মহান এক হয়েছেন, সেখানেই বিজ্ঞাপনটির ছবি তোলার কাজ হয়েছে। হাসিমুখে তাঁরা তিনজন টেবিল ফুটবল খেলছেন। ছবির কেন্দ্রে তাঁরা তিনজন। আলোর পরিকল্পনাও সেভাবে করা হয়েছে। নিচে তাঁদের ট্রাভেল ব্যাগ রাখা। লুই ভুইত্তোঁ -এর সুটকেস। এই ট্রাভেল ব্যাগ বা সুটকেসের জন্যই তাঁদের মাদ্রিদ উড়িয়ে আনা। বিজ্ঞাপনের নিচে শুধু লেখা ‘থ্রি একসেপশনাল জার্নি, ওয়ান হিস্টোরিক গেম, ক্যাফে মারাভিয়াস, মাদ্রিদ’।
পেলে, ম্যারাডোনা ও জিদান এই তিনজনকে সময় মিলিয়ে মাদ্রিদে উড়িয়ে আনতে, একসঙ্গে হাসিমুখে বিজ্ঞাপনে পোজ দিতে রাজি করাতে কত সম্মানী দিতে হয়েছে আর সব মিলিয়ে কত খরচ করেছে লুই ভেঁট্ট? আর এখন যে টাইম ম্যাগাজিন বা এ ধরনের পত্রিকায় যে বিজ্ঞাপনটি ছাপা হচ্ছে তার জন্যই বা কত খরচ করছে এই প্রতিষ্ঠানটি? বিশ্বের অন্যতম দামি ফ্যাশন ব্র্যান্ড লুই ভুইত্তোঁ । এ জন্য কত তারা খরচ করেছে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। দামি ব্র্যান্ডের সবচেয়ে দামি কাজটিই করতে হয়। সেটাই তারা করেছে। সবকিছু যখন বিশ্বকাপ ফুটবলময় হয়ে উঠেছে, তখন তাদেরও থাকতে হবে ফুটবল নিয়েই এবং তাক লাগানো কিছু নিয়ে। ফুটবলকে বিষয় করে করা এই বিজ্ঞাপন নিয়ে এখন নানা আলোচনা ও লেখালেখি হচ্ছে। এই বিজ্ঞাপনের পেছনে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাখ্যা হচ্ছে, ক্রীড়া বা ফুটবলের ‘সার্বজনীন’ আবেদনের কারণে তাঁরা এই বিজ্ঞাপনটি করেছেন। ফুটবল ফ্যাশনের পসার বাড়াতে পারবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু বিজ্ঞাপন বা ব্র্যান্ড নিয়ে যাঁরা কাজ করেন বা গবেষণা করেন এমন তাত্ত্বিকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ফ্যাশন কি ফুটবলের পসার বাড়াতে পারবে? বিজ্ঞাপন-তাত্ত্বিকদের এখনকার তর্ক-বিতর্কের বিষয়েও স্থান করে নিয়েছে ফুটবল। এগুলো সবই মাঠের বাইরের বিষয়। একটি বিজ্ঞাপন নিয়ে এত কথা বলার অর্থ বিশ্বকাপ ফুটবল মাঠে গড়ানোর কত আগে থেকেই ফুটবলময় হয়ে উঠতে শুরু করেছিল দুনিয়া।
এখন যখন বিশ্বকাপ শুরু হয়ে গেছে, মাঠে ও মাঠের বাইরের সবকিছুই এখন হয়ে উঠেছে ফুটবলময়। আসলে দুনিয়াই এখন ফুটবলময়। খেলাটি তো ‘দ্য গ্লোবাল গেম’। এক মাসের এই ফুটবল উৎসবে খেলা হবে মোট ৬৪টি। মাঠের খেলা আর কতক্ষণ? বাইরের খেলাই তো বেশি। বাংলাদেশ বিশ্বকাপের ধারে-কাছেও নেই। আমাদের কারও জীবদ্দশায় বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে, এমন স্বপ্ন দেখা কারও সঙ্গে নিশ্চয়ই আমাদের কারো দেখা হয়নি। এ দেশের ঘরোয়া ফুটবলও এখন আগের মতো উত্তাপ-উত্তেজনা নিয়ে হাজির নেই। কিন্তু ‘দ্য গ্লোবাল গেম’ ফুটবল নিয়ে উত্তাপ-উত্তেজনায় ঠিকই হাজির বাংলাদেশ। বিশ্বকাপের যে দুনিয়াজোড়া কাঁপুনি তাতে কেঁপে উঠতে চায় আমাদের জনগণ। বিশ্বকাপের মাঠে আমরা নেই, কিন্তু শরিক হয়ে যাই ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে। ভিন দেশের পতাকা নিয়ে আমরা কেন মাতামাতি করি, সে প্রশ্ন তোলা যায়, কিন্তু এই উত্তেজনায় শরিক হতে গেলে তো কিছু একটা লাগবে। তাই এবাড়ি ওবাড়ির ছাদের ভিনদেশি পতাকা, রাস্তার এপারে আর্জেন্টিনার পতাকা তো ওপারে ব্রাজিলের পতাকা। উত্তেজনায় শরিক হতে চায় বলেই নব্বইয়ের বিশ্বকাপের সময় মেক্সিকোর রেফারি কোডেসালের কুশপুত্তলিকা দাহ হয়েছে বাংলাদেশে, প্রত্যন্ত গ্রামে। কারণ, এই রেফারির ‘ভুল’ সিদ্ধান্তের বলি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। কোডেসালের কানে কি এ খবর গেছে? আমরা জানি না। যদি জানতেন বা জেনে থাকেন তবে এটা হয়তো তাঁর কাছে এক বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হবে। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকার সাইজ কত বড় বা কোন মহল্লা বা গ্রামে সংখ্যার দিক দিয়ে কোন দলের সমর্থক বেশি বা মেক্সিকান রেফারি কোডেসালের কুশপুত্তলিকা বানিয়ে তা পোড়ানো, বিশ্বকাপের মাঠে না থেকে বিশ্বকাপের উত্তেজনায় শরিক হওয়ার এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী?
টাইম ম্যাগাজিনের ১৪ জুনের বিশ্বকাপ প্রিভিউ সংখ্যার সম্পাদকীয় ও লেখাগুলোতে ফুটবল-বন্দনায় একটি বিষয়ে বাড়তি জোর দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, ফুটবল ‘সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা’। যুক্তিটা কী? টাইম ম্যাগাজিন তাদের সম্পাদকীয় কলামে যা লিখেছে তা অনেকটা এ রকম—‘এটা যেকোনো জায়গায় প্রায় যেকোনো বস্তু দিয়ে খেলা সম্ভব। ফুটবল না পাওয়া গেলে একটি টিনের ক্যান, এক টুকরো পাথর বা একজোড়া মোড়ানো মোজা—ফুটবল খেলার জন্য সবই সই। এই খেলা খেলতে কোনো সাজ-সরঞ্জামও লাগে না, কোনো প্যাড বা হেলমেটের দরকার নেই। এমনকি এর জন্য কোনো খেলোয়াড়ের ছয় ফুট আট ইঞ্চি লম্বা হওয়ারও দরকার নেই। আপনাকে শুধু একটু ক্ষিপ্রগতির আর তুখোড় হতে হবে। আর থাকতে হবে প্রচুর প্র্যাকটিস করার ইচ্ছা। দুনিয়ার যেকোনো দেশ, যেকোনো ধর্ম, যেকোনো গোত্র বা যেকোনো অর্থনৈতিক অবস্থা থেকেই উঠে আসুক না কেন ফুটবলে গ্রেট খেলোয়াড় হতে তা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।’ এর বিপক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো কঠিন। আমাদের এক বন্ধুর পরিবার বছর কয়েক আগে দক্ষিণ আফ্রিকা বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁরা তিন দিন কাটিয়েছেন বন্য প্রাণীর এক প্রাইভেট গেম রিজার্ভে। দক্ষিণ আফ্রিকা আর বিশ্বকাপ ফুটবল—এ নিয়েই এই বেড়ানোর গল্প শুরু হয়েছিল। সেই গেম রিজার্ভে বন্ধু দম্পতির দুই ছেলে ফুটবল খেলেছিল এক অদ্ভুত জিনিস দিয়ে। গাইড একদিন দুই ছেলেকে গেম রিজার্ভের একটি খোলা জায়গায় নিয়ে বলল, ‘চলো ফুটবল খেলি, এমন জিনিস দিয়ে খেলব, যা দিয়ে হয়তো আর কোথাও খেলার সুযোগ পাবে না।’ জিনিসটি কী? ‘এলিফ্যান্ট ডাং’ বাংলায় হাতির বিষ্ঠা। সবচেয়ে ‘গণতান্ত্রিক’ খেলা ফুটবল আসলেই সবকিছু দিয়ে খেলা যায়।
ফুটবল সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা—এর পক্ষে আরও কিছু যুক্তিও আমরা দাঁড় করাতে পারি। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে আমরা যারা বিশ্বকাপের ধারে-কাছে না গিয়ে মাতামাতিতে মেতে উঠি, তাদের কথা বিবেচনায় নিয়ে। ফুটবল খেলা দেখতে আর বুঝতে জ্ঞানের বা জানা-বোঝার দরকার হয় না, ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই রস নিতে পারেন গোল আর উত্তেজনার এই খেলা থেকে। আগে কখনো ফুটবল খেলা দেখেননি এমন কেউ যদি খেলাটি প্রথম দেখতে বসেন তবে সম্ভবত একমাত্র ‘অফসাইড’ বিষয়টি ছাড়া আর কোনো কিছুই খেলাটি বুঝতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
এত যুক্তি, এর পরও কি ফুটবলকে সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা বলে মেনে নিতে আপত্তি আছে? নিশ্চয়ই আছে। এ নিয়েও তর্ক শুরু হয়ে গেছে। সেই মাঠের বাইরের তর্ক। ‘ফুটবল সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা হতেই পারে না’—টাইম ম্যাগাজিনের সম্পাদকীয় আর লেখাগুলোর বিরোধিতা এভাবেই করেছেন ম্যারাথন দৌড়বিদ এমবি ব্রুফুট (Amby Bৎufoot)। ১৯৬৮ সালে বস্টন ম্যারাথনে বিজয়ী হয়েছিলেন তিনি। এখন সাংবাদিকতা আর লেখালেখির সঙ্গে জড়িত। রানার ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের শীর্ষ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর কাছে কোনটি সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা? অবশ্যই দৌড়। তাঁর যুক্তিটা কী? ‘দৌড়ানোর জন্য কোনো সাজসরঞ্জাম লাগে না, একাই দৌড়ানো যায়, অন্য কোনো খেলোয়াড়ের দরকার হয় না। আপনি তৈরি হবেন আর দৌড়ানো শুরু করবেন। এমনকি আপনি যদি চান বস্টন, নিউইয়র্ক, শিকাগো, লন্ডন বা অন্য কোনো বড় ম্যারাথনেও বিশ্বসেরাদের সঙ্গে দৌড়াতে পাররেন। আরও কিছু দরকার? আপনার চারপাশে দেখবেন দৌড়াচ্ছে অসংখ্য নারী।’ তাঁর যুক্তিকে উড়িয়ে দেবেন কীভাবে? তিনি তাঁর একটি লেখা শেষ করেছেন এভাবে—‘বিশ্বকাপ অবশ্যই একটি দুনিয়াজোড়া আলোড়ন তোলা ঘটনা, কিন্তু যদি গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রশ্ন বিবেচনায় নেওয়া হয় তবে তা দৌড়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে, অন্য সব খেলার ক্ষেত্রেও তাই।’
একসঙ্গে একাধিক খেলা ‘গণতান্ত্রিক’ হতে পারবে না, এমন তো কোনো কথা নেই! তবে বিতর্কটি ‘সবচেয়ে’ বিষয়টি নিয়ে। মাঠের খেলা শেষ হয়ে যাবে, মাঠের বাইরের এই বিতর্ক সামনে নিশ্চয়ই আরও জমে উঠবে।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaৎia@gmail.com

পুরো বিশ্ব অধীর অপেক্ষায়।

 অপেক্ষায় আছেন তাঁরাও। তবে সম্ভবত বিনিদ্র রজনী সঙ্গী করে!
কারা? কারা আবার, বিশ্বকাপের ৩২ দলের ম্যানেজার। শুধু ‘কোচ’ বললে ব্যাপ্তিটা পুরো বোঝা যায় না বলেই বোধ হয় ফুটবলে কোচের বদলে ম্যানেজার। শুধু তো প্রথাগত কোচিং নয়। দল কীভাবে খেলবে, কার কী ভূমিকা—এসব তো আছেই। মাঠের বাইরেও তো কত কাজ! ফুটবল যতটা খেলোয়াড়দের খেলা, ম্যানেজারেরও বোধ হয় তার চেয়ে কম নয়।
ফুটবলারদের মতো ম্যানেজারদের মোক্ষধামের নামও বিশ্বকাপ। বড় পার্থক্য হলো, বিশ্বকাপ ম্যানেজারদের বধ্যভূমিও। ‘কোচ দুই প্রকার—বরখাস্ত হয়েছে অথবা বরখাস্ত হতে চলেছে’—কথাটার জন্ম বোধ হয় ফুটবলকে মাথায় রেখেই।
মার্সেলো লিপ্পি অনেক বড় কোচ। মনে হচ্ছে, খুব বুদ্ধিমানও। বিশ্বকাপের আগেই বলে দেন, ‘বিশ্বকাপের পর আর আমি নেই।’ ২০০৬ বিশ্বকাপ জেতার পর অনেক সাধ্যসাধনায়ও থাকেননি। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের যখন মোটেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মতো লাগছে না, আবার ফিরেছেন আজ্জুরিদের উদ্ধারকর্তা হয়ে। এবারও বলে দিয়েছেন, বিশ্বকাপই শেষ। উত্তরসূরিও চূড়ান্ত হয়ে গেছে। ম্যানেজারদের বিনিদ্র রজনীর কথা বলছিলাম। লিপ্পি বোধ হয় ব্যতিক্রম। তিনি শান্তিতেই ঘুমাচ্ছেন।
কিন্তু দুঙ্গা? ম্যারাডোনা? তাঁদের বোধ হয় ঘুমের বড়িটড়ি লাগছে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ শুরুর আগেই একটা রেকর্ড করে বসে আছে। এই প্রথম দুজন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ম্যানেজারের ভূমিকায়। দায়িত্বটা নিয়ে দুজনই বড় ঝুঁকি নিয়েছেন। দুঙ্গার চেয়ে ম্যারাডোনাই বেশি। আর্জেন্টাইনদের হূদয়ে তাঁর আসন। বিশ্বকাপের পরও তা থাকবে তো!
দুঙ্গার সেই ভয় নেই। দুঙ্গাকে পছন্দ করেন, এমন একজন ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিকের সঙ্গেও পরিচয় হয়নি ২০০৬ বিশ্বকাপে। ২৪ বছর পর ব্রাজিলের বিশ্বকাপ-খরা ঘুচল যাঁর নেতৃত্বে, তাঁর প্রায় খলনায়কের ভাবমূর্তি! ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে ও’গ্লোবো টিভির এক সাংবাদিক তো দুঙ্গাকে ‘প্রতারক’ বলে গালিও দিয়েছিলেন। প্রতারণা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের চিরন্তন আদর্শের সঙ্গে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী দলের কোচ ছিলেন কার্লোস আলবার্তো পাহেইরা। কিন্তু দুঙ্গাই সে দলের ‘আগে জিতি, ফুটবল-সৌন্দর্যের চিন্তা পরে’ দর্শনের প্রতীক।
কোচ দুঙ্গা ব্যতিক্রম হবেন কীভাবে! ইংল্যান্ড দলের ইতালিয়ান কোচ ফ্যাবিও ক্যাপেলো সেদিন বলছিলেন, ফিওরেন্টিনায় কাটানো চার বছরই দুঙ্গাকে ‘বাস্তববাদী’ বানিয়ে দিয়েছে। দুঙ্গার ব্রাজিল তাই ‘জোগো বনিতো’কে বিসর্জন দিয়ে শুধুই জয়ের জন্য খেলে। এ নিয়ে সমালোচনা হলে বলেন, ‘ব্রাজিলের কাছে সুন্দর ফুটবল দেখতে চাওয়াটা ইউরোপের ষড়যন্ত্র।’
কিন্তু ব্রাজিলিয়ান মিডিয়াও যে দুঙ্গার ব্রাজিলকে পছন্দ করছে না। এরও জবাব আছে দুঙ্গার কাছে। এটা নাকি বিতর্ক তৈরি করে পত্রিকা বিক্রি আর টিভি রেটিং বাড়ানোর কৌশল।
সাফল্য কিন্তু দুঙ্গা ভালোই পেয়েছেন। কোপা আমেরিকায় ফাইনালের আগ পর্যন্ত দুর্দান্ত খেলল আর্জেন্টিনা, অথচ চ্যাম্পিয়ন ঠিকই ব্রাজিল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কনফেডারেশন কাপও। তার পরও দুঙ্গা খলনায়ক! আজকের খেলার পাতায়ই পড়ুন না, ১৯৮২ বিশ্বকাপের অধিনায়ক সক্রেটিস কেমন ধুয়ে দিয়েছেন দুঙ্গাকে।
খেলোয়াড় হিসেবে যেমন দুজন ছিলেন দুই মেরুর, কোচিং-দর্শনেও তাই। একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, আরেকজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। ম্যারাডোনার কাজ ছিল সৃষ্টি করা আর দুঙ্গার ধ্বংস করা। ম্যারাডোনা কদিন আগেই তো বললেন, সুন্দর ফুটবল খেলাটাও তাঁর কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
কিন্তু ফুটবল কোচকে তো দলকে শুধু ‘যাও, সুন্দর ফুটবল খেলো’ বললেই হয় না। আরও অনেক কিছু চিন্তা করতে হয়। নিজের দলের শক্তির জায়গা, প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা, সে অনুযায়ী ট্যাকটিকস। পরিস্থিতি বুঝে যা বদলাতেও হয়। এটা ম্যারাডোনার মতো আবেগপ্রবণ মানুষের কাজ কি না—এই প্রশ্ন কিন্তু আর্জেন্টিনাতেই গুরুতরভাবে উঠে আছে।
বড় খেলোয়াড়েরা কখনো বড় কোচ হয় না—কথাটা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ। ম্যারাডোনার মতো সহজাত প্রতিভাবানদের জন্য তা হওয়া আরও কঠিন। যে কাজটা তিনি অবলীলায় করতেন, অন্য কেউ কেন সেটি করতে গলদঘর্ম হচ্ছে—এটা বোঝাই তো কঠিন তাঁর জন্য। পেলের সর্বকালের সেরার স্বীকৃতি পাওয়ার মূলে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল, খেলার মাঠে চিন্তার এমন সব অভিনবত্ব দেখাতেন, যা দেখে মানুষ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যেত। কোনো একটা পরিস্থিতিতে এক কোটি সম্ভাবনা থাকলে পেলে নাকি করতেন এক কোটি এক নম্বরটা! সেই পেলে নিজের ভিডিও ফুটেজ দেখে বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, ‘কীভাবে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ে আমি সিদ্ধান্তটা নিতাম, ভেবে নিজেই অবাক হই।’
বড় খেলোয়াড়দের এটা সহজাত ক্ষমতা। যে কারণে তাঁদের বিশ্লেষণী ক্ষমতাও সাধারণত খুব ভালো হয় না। বিশ্বকাপ নিয়ে পেলের বিফল ভবিষ্যদ্বাণীগুলোই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কোচের ভূমিকায় বড় কোনো খেলোয়াড়ের বিশ্বকাপ-সাফল্য পাওয়ার একমাত্র উদাহরণ বলতে হবে ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারকে। ১৯৮৪ সালে যখন জার্মানির দায়িত্ব নেন, কোচিংয়ের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতাই ছিল না তাঁর। দুই বছর পর ফাইনালে তুললেন জার্মানিকে, ১৯৯০ বিশ্বকাপে তো জেতালেন ট্রফিই। তবে বেকেনবাওয়ার তো খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই চিন্তাশীলতার প্রমাণ রেখে এসেছেন। তাঁর ইতিহাসবোধটাও খুব প্রখর। রসবোধও। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের দিন এক জার্মান সাংবাদিক তাঁর রুমে যান কথা বলতে। হঠাৎ বেকেনবাওয়ার হো হো করে হাসতে শুরু করলেন। হতভম্ব সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘চিন্তা করো, এই পচা দল নিয়ে আমরা ফাইনালে উঠে গেছি!’
অধিনায়ক-কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব আছে শুধুই বেকেনবাওয়ারের। ‘শুধুই’ শব্দটা কি এই বিশ্বকাপের পরও থাকবে? থাকলে কিন্তু দুঙ্গা-ম্যারাডোনার কপালে দুঃখ আছে!

জনগণই রাজা -সিটি করপোরেশন নির্বাচন ২০১০: চট্টগ্রাম by আবুল মোমেন

আদর্শ নির্বাচনের খেতাব পাওয়ার পর ফলাফল ঘোষণায় দেরি করে একটু হোঁচট খেল নির্বাচন কমিশন। কেউ কি তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিল? কিন্তু তার আগেই তো কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের হাত ঘুরে ফলাফল জমা হয়েছে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর ক্যাম্পে। আর এই দেরি থেকে সন্দেহ, তা থেকে উত্তেজনা এবং পরিণামে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা। ফলে একটু কালিমা মেখেই ফলাফল ঘোষণা হলো এই নির্বাচনের।
দীর্ঘ পোড় খাওয়া বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে মহিউদ্দিন চৌধুরী বোধহয় সবচেয়ে বড় ঘা খেলেন এবারে। তিনি কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন সেটা ভবিষ্যৎই বলবে। তবে সেটা নির্ভর করবে যে ভুলগুলোর কারণে এবার তিনি পরাজিত হলেন তা বুঝে নিজেকে সংশোধনের ওপর।
জেদ এবং দম্ভ মানুষকে অনেক সময় ভুলের ফাঁদে আটকে ফেলে। ঘুরে দাঁড়াতে হলে পরাজয় মেনেই শুরু করতে হবে তাঁকে। অর্থাৎ ভুলগুলো বুঝে নিজেকে শুধরে নিয়েই তাঁকে শুরু করতে হবে। মন্জুর পক্ষে নেতিবাচক ভোট অর্থাৎ মহিউদ্দিনকে যাঁরা চাননি, তাঁদের ভোট গেছে বেশি। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও মেয়র জীবনের প্রথম দুই মেয়াদ মিলে মহিউদ্দিনের অর্জন অনেক। সুনাম প্রতিষ্ঠা হয়েছে বেশ। কিন্তু এ তো ব্যাংকের টাকা নয় যে জমা রাখলে সুদে-আসলে আপনিই বাড়বে। নিত্য ভালো কাজ করে যোগ না করলে বরং আপনিই খরচ হতে থাকে। সেটা যেন মহিউদ্দিন চৌধুরী হিসাবেই ধরেননি।
মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং মেয়র—এ দুই গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে আর স্বাভাবিক নেতৃত্বগুণ মিলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন চট্টগ্রামে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাধর ব্যক্তি। এই জি-হুজুরের দেশ ক্ষমতাধরকে অন্ধ ও অসহিষ্ণু করে সহজে। তৃতীয় মেয়াদে তিনি যেন হয়ে উঠলেন বেপরোয়া। তোয়াক্কা করলেন না দলীয় নেতা, সমাজনেতাদের অভিমতের।
মন্জুরের ওপর মানুষের গভীর আস্থা আছে এমন নয়, কিন্তু প্রায় পাঁচ লাখ ভোটার মহিউদ্দিনের ওপর আস্থা হারানোয় তাঁর জয় হয়ে ওঠে অনিবার্য। ভোটাররা তাঁর কাছে কী বার্তা পাঠিয়েছে এই ফলাফলের মাধ্যমে?
কেবল পাঁচ লাখ নতুন ভোটারই নয়, আদতে নগরবাসীই পরিবর্তন চায়। তারা গতানুগতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন চায়, সেই সঙ্গে নগরজীবনের গুণগত উত্তরণ চায়। এটি কিন্তু বেশ শক্ত চ্যালেঞ্জ। মন্জুর মূলত ব্যবসায়ী, রাজনীতির ভেতরমহলের মানুষ নন। তাই বিরোধীদলীয় মেয়র হয়ে ভোটারদের চাহিদা পূরণ হবে তাঁর জন্য বেশ কঠিন কাজ। তার ওপর জোটের শরিক ও তাঁর অন্যতম সমর্থক দল জামায়াতের এজেন্ডা তাঁকে না তরুণ ও সংখ্যালঘু সমর্থকদের কাছে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়।
এদিকে বিএনপির নেতাদের মধ্যে অনেকেই তাঁর মুরব্বি হয়ে উঠবেন। যোগ্য পরামর্শক পাওয়া ভাগ্যের কথা, কিন্তু অনেক মুরব্বির মন জুগিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করা সহজ নয়। তাঁকে ত্রিধারার চাপ মোকাবিলা করে এগোতে হবে—ভিন্নদলীয় সরকার, নিজদলীয় বহুমুখী টানাপোড়েন এবং শরিক জামায়াতের ভূমিকা। বিনয় ও সারল্য যাঁর ভূষণ, যিনি নির্বিবাদী ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত, তিনি এই বহুমুখী চাপ সামলে জনগণকে কাজ দিতে পারলে সেটা তাঁর নির্বাচনী বিজয়ের চেয়ে কম চমৎকার সাফল্য হবে না। মন্জুর তাঁর অতিসক্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রায় বিপরীত চরিত্রের মানুষ। সক্রিয় রাজনীতিতে এসে কাদের তিনি সঙ্গী হিসেবে পাবেন, নিজেই বা কাদের সঙ্গ পছন্দ করবেন সে ব্যাপারে হুঁশিয়ার থাকাই ভালো হবে।
মনে রাখা দরকার, চট্টগ্রামবাসী কিন্তু নিজেদের ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত। জাতীয় অর্থনীতিতে বন্দরের গুরুত্বের দোহাই দিলেও দিনে দিনে চট্টগ্রামের অবক্ষয় থামছে না, সরকার যথাযথ বরাদ্দ দিচ্ছে না। এ নিয়ে উদ্যোগ নিলে দলমত নির্বিশেষে চট্টগ্রামবাসীর সাড়া কিন্তু পাওয়া যাবে।
এ পরাজয় মহিউদ্দিন চৌধুরীকে নিশ্চয় দমাতে পারবে না। তিনি বরাবরের লড়াকু রাজনীতিক। তবে তিনি তো সেই বিলীয়মান জাতের রাজনীতিক, যে ধারা থেকে বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানীর মতো মহৎ জাতীয় নেতারা এসেছেন। সেটি গৌরবময় ধারা হলেও ক্ষয়িষ্ণু, সে ধারাকে সেকেলে হিসেবে জবাব দিতে শুরু করেছেন একালের জাতীয় নেতারা। আমাদের রাজনীতিকেরা সাধারণত নিজেদের নবায়নের কথা ভাবেন না, নতুন বক্তব্য ও স্লোগান দিলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনে আগ্রহী নন। তাতে রাজনীতি এবং রাজনীতিক উভয়েই তামাদি হয়ে পড়ে। মহিউদ্দিনের ডাইনামিক বা গতিময় প্রাণবন্ত চরিত্রের পরিচয় নগরবাসী পেয়েছে। ফলে এ পরাজয় তাঁকে রাজনৈতিক বিস্মৃতিতে তলিয়ে দেবে বলে মনে হয় না। তামাদিও করবে না নিশ্চয়।
তবে এটা সবাইকে বুঝতে হবে, আজকের নাগরিকেরা পরিবর্তন চায়, দিনবদল চায়, তারা কথা নয়, কাজ চায়। অন্ধ আনুগত্যের দিন শেষ, চোখ খুলে গেছে ভোটারদের, তারা বিচার করে নির্ভয়ে নিজেদের মতামত দেয়। ভোটার প্রার্থী সম্পর্কে জনশ্রুতির তোয়াক্কা করবে না আর, প্রার্থীকেই ভোটারের চাহিদার তোয়াক্কা করতে হবে।
গণতন্ত্রে মন্ত্রী-মেয়র রাজা নন, ভোটারই রাজা, তাঁর মতামতই মুখ্য। এটাই গণতন্ত্র। আমরা কি তাহলে সেই দিকেই যাচ্ছি?
তাহলে পরিবর্তনের শুভ সূচনা হলো এ দেশে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনকে এ রকম ইতিবাচকভাবে দেখাই সঠিক।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

জয়ী হয়েছে গণতন্ত্র, পরাস্ত অহমিকা by সোহরাব হাসান

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কে জয়ী হয়েছে? কে পরাস্ত হয়েছে? ভোটাররা যাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে বাছাই করেছেন, তাঁরা জয়ী হয়েছেন। জয়ী হয়েছে নির্বাচন কমিশন, যার দায়িত্ব ছিল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার। জয়ী হয়েছেন সুকান্তের ভাষায় বীর চট্টলার জনগণ, যারা পরিবর্তন চেয়েছিল। এসব ছাড়িয়ে যে জয়টি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হলো গণতন্ত্রের জয়। জনশক্তির জয়।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তো আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন, চট্টগ্রামের নির্বাচনে কারচুপি হলে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করবেন। নির্বাচন কমিশনকে পদত্যাগে বাধ্য করবেন। কারচুপি হয়নি। এখন কি তিনি সরকার পতনের লক্ষ্যে আহূত ২৭ জুনের হরতাল প্রত্যাহার করবেন? এখন কি তিনি নির্বাচন কমিশনকে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠু ও সুুচারুভাবে পালন করার জন্য ধন্যবাদ জানাবেন? কেন জানাবেন না? ১৭ জুন যদি চট্টগ্রামে মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে নীরব ভোট-বিপ্লব হয়ে থাকে, তাহলে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর খালেদা-তারেক-নিজামীদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সরব ভোট-বিপ্লব হয়েছিল। প্রথমটি জিন্দাবাদ পেলে দ্বিতীয়টি নিন্দাবাদ পাবে কেন?
আমাদের দেশে জনগণের রায় বা নির্বচনী ফল উল্টে দেওয়ার বহু নজির আছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তার পুনরাবৃত্তি হয়নি বলে নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানাই। ধন্যবাদ জানাই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও। বিরোধী দলের শঙ্কা ও অভিযোগকে অমূলক প্রমাণ করে তাঁরা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন জাতিকে উপহার দিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন বেসরকারিভাবে মন্জুর আলমকে মেয়র ঘোষণা করেছে। প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে তিনি তাঁর এককালীন ‘রাজনৈতিক গুরু’ মহিউদ্দিন চৌধুরীকে গো-হারা হারিয়ে দিয়েছেন। নির্বাচনী ফল দেখে ধারণা করা যায়, চট্টগ্রামবাসী মহিউদ্দিন চৌধুরীর উৎপাতে কতটা অতিষ্ঠ ছিল। সাধারণ মানুষের হাতে কোনো অস্ত্র নেই, বর্ম নেই, শক্তি নেই। কেবল একটি ব্যালটের শক্তিতে তাঁরা বাদশাহকে ফকির এবং ফকিরকে বাদশাহ করে দিতে পারেন। আজ যে জনগণ মহিউদ্দিন চৌধুরীকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, সেই জনগণই কিন্তু তাঁকে তিন-তিনবার মেয়র নির্বাচিত করেছেন। অতএব, জনগণই যে সব ক্ষমতার উৎস, এ কথাটি নেতা-নেত্রীরা বিরোধী দলে গিয়ে দোয়া ইউনুস পড়ার মতো জপ না করে ক্ষমতায় থাকতেও যদি স্মরণ করেন, তাহলে দেশের অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যেত।
এ নির্বাচনে মহিউদ্দিন চৌধুরী কত বেশি ভোটে হেরেছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাঁর অহমিকা চূর্ণ হয়েছে। ভোটারদের প্রতি একজন মেয়রের অবজ্ঞা, কথায় কথায় নারী কাউন্সিলরদের অপমান এবং শতবর্ষী বিপ্লবী বিনোদবিহারীর প্রতি কটাক্ষের মোক্ষম জবাব দিয়েছেন ভোটাররা। ভোটের মাধ্যমে জনগণ দেখিয়ে দিয়েছে, তারাই সার্বভৌম। তাদের সম্মিলিত শক্তির কাছে ব্যক্তি-অহমিকা, ঔদ্ধত্য যত প্রকটই হোক, পরাস্ত হতে বাধ্য। তিনি চট্টগ্রামের ‘কাল্ট’ হয়ে গিয়েছিলেন, আইনকানুন, বিধিশৃঙ্খলা—এসব তাঁর জন্য নয়। তিনি যা চাইবেন, চট্টগ্রামে তা-ই হবে। তাঁর কথায় বন্দর চলবে, তাঁর কথায় বন্ধ হবে। এ হতে পারে না। ব্যক্তির খেয়ালে প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না, চট্টগ্রামের ১৬ লাখ মানুষও জিম্মি থাকতে পারে না।
এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী গত দেড় দশকে চট্টগ্রাম নগরের উন্নয়নে কিছু করেননি, সে কথা আমরা বলছি না। তিনি রাস্তাঘাট প্রশস্ত করেছেন, বড় বড় শপিংমল করেছেন, অনেক স্কুল-কলেজ করেছেন। স্বাস্থ্যসেবায় সফল কর্মসূচি নিয়েছেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে আর্থিক সচ্ছলতা দিয়েছেন। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরের প্রধান দুই সমস্যা—জলাবদ্ধতা ও চাকতাই খাল ভরাটের ব্যাপারে তিনি নীরব থেকেছেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে তিনি ছুটেছেন চমক ও জনপ্রিয়তার পেছনে। কাতারবন্দী করে মানুষকে তীর্থে পাঠানো সিটি করপোরেশনের কাজ নয়। এসব করে অনেক জরুরি কাজ ফেলে রেখেছেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতেও দ্বিধা করেননি মহিউদ্দিন চৌধুরী। তাঁর ক্ষমতা ছিল, কর্মী ও ক্যাডার ছিল, ভয়ে এত দিন কেউ কথা বলেননি। এবারই জনগণ সুযোগ পেয়ে তাঁকে একহাত দেখিয়ে দিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল একজন রাজনীতিক হিসেবে, তাতে শরিক হওয়া দোষের কিছু নয়। কিন্তু আন্দোলনের নামে বিমানবন্দর ভাঙচুর কিংবা বন্দরকে জিম্মি করা মানুষ ভালোভাবে নেয়নি।
প্রশ্ন উঠতে পারে, তার পরও ২০০৫ সালে জনগণ তাঁকে কেন পুনর্নির্বাচিত করল। তখন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট সারা দেশে যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, তারই জবাব দিয়েছিল চট্টগ্রামবাসী ভোটের মাধ্যমে। আজ সেই ত্রাস নেই, তবে অন্য ত্রাস উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। জনগণের প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করতে বিএনপি সরকার যেসব কালো আইন ব্যবহার করেছিল, বর্তমান সরকারও সে পথই অনুসরণ করছে। এর ফলও ভালো হতে পারে না।
একটি স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনের ফলাফলে আওয়ামী লীগ সরকারের পরাজয় ঘটবে না, সংসদে আসনও কমবে না। কিন্তু জাতীয় সংসদে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের দেড় বছরের মাথায় চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে এ ভরাডুবি কেন ঘটল? যে ভোটাররা চট্টগ্রামের পাঁচটি আসনই আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটকে উপহার দিয়েছিলেন, সেই ভোটাররা তাঁদের সমর্থিত প্রার্থীকে এভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন কেন? যেখানে পরীক্ষিত প্রবীণ নেতারা গিয়ে চট্টগ্রামে পড়ে ছিলেন, ২০-২২ জন সাংসদ গোটা শহর চষে বেড়িয়েছেন, সেখানে এ ফল কেন হলো? আওয়ামী লীগের নেতারা কি গভীরভাবে চিন্তা করবেন? এ রায় কি শুধু মহিউদ্দিনের প্রতি অনাস্থা, না সরকারের প্রতিও? প্রতিপক্ষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা আওয়ামী রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা বলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল, সেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তারা গত ১৮ মাসে কী করেছে? এ হিসাব জনগণ চাইতেই পারে। আওয়ামী লীগ দিনবদলের কথা বলে ভোটারদের ভুলিয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, কিছুই বদলাচ্ছে না। খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আড়াই বছরের মাথায় যখন মোহাম্মদ হানিফ ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বচনে জিতেছিলেন, তখন থেকেই বিএনপির ক্ষণ গণনা শুরু হয়েছিল। আওয়ামী লীগ এভাবে দেশ চালালে জনগণ তাদের থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিতে সময় লাগবে না।
অতি আত্মবিশ্বাসী আওয়ামী লীগের নেতারা ভেবেছিলেন, মহিউদ্দিন চট্টগ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। তাঁকে কেউ হারাতে পারবেন না। অতীতে অনেক বড় নেতা ধূলিসাৎ হয়ে গেছেন। মনে করা হতো, মহিউদ্দিনের কথায় চট্টগ্রাম চলবে, সেই ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের জাতীয় নেতাদের কেউ কেউ সেই ভাষায়ই কথা বলছেন। সরকারি দলের হাবভাবে মনে হচ্ছে, তারা চিরদিন ক্ষমতায় থাকবে। আর বিরোধী দল বোঝাচ্ছে, এখন সংসদে গিয়ে কী হবে, আর কয়েক দিন পরই তো তারা ক্ষমতায় আসছে। এই হলো আমাদের গণতন্ত্র!
স্বীকার করি, চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের মধ্যে এক ধরনের বিজয়ও আছে। সরকার এখন জোর দিয়ে যে কথাটি বলতে পারে তা হলো, আওয়ামী লীগের আমলেও অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশনও একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সক্ষম। বিরোধী দল এত দিন যে বলে আসছিল, ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল সাজানো, নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ। এখন তারা কী বলবে? এটিও সাজানো নির্বাচন? বলতে পারেন, ইতিমধ্যে কেউ কেউ বলেছেন, নির্বাচনে ডিজিটাল কারচুপি হয়েছে। চট্টগ্রামে নির্বাচন হলো, ফল ঘোষণা করার আগেই ঢাকায় গাড়ি ভাঙচুর করা হলো। জনগণের মন জয় করতে হলে একটু ধৈর্য ও সহনশীলতা থাকা প্রয়োজন, যা আমাদের রাজনীতিকদের মধ্যে নেই। এ নির্বাচনে দেশবাসীর জন্য সুসংবাদ হলো, অন্তত এ মুহূর্তে খালেদা জিয়া সরকার পতনের আন্দোলন করতে পারছেন না। আর সরকারের জন্য আট নম্বর হুঁশিয়ারি হলো, আগামী সাড়ে তিন বছর ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে, দেশ চালাতে হলে নতুন করে ভাবতে হবে। পুরোনো ধ্যানধারণা দিয়ে চলবে না।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ রাজনীতি ও নেতাদের কাছে খুব বেশি আশা করে না। ১৯৩৭ সাল থেকে তারা বহুবার ভোট দিয়ে সরকার পতন করেছে, দুবার পতাকা বদল করেছে, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। তবে তারা একটি কাজ করতে পারে তা হলো, ক্ষমতাসীনদের দম্ভ ও আস্ফাালন চূর্ণ করে দেয়া। তারা কাউকে এভারেস্টে ওঠাতে পারে, আবার বঙ্গোপসাগরেও ছুড়ে ফেলে দিতে পারে। পূর্বাপর সরকারগুলো পাহাড়ে উঠে নিচের মানুষের কথা ভুলে গেছে, বর্তমান সরকার বা চট্টগ্রামের মেয়র একই কাজ করলে তাঁকেও নামাতে সময় লাগবে না।
চট্টগ্রামবাসী মন্জুর আলমকে নির্বাচিত করেছে চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য, সেখানকার মানুষের সমস্যা দূর করার জন্য। কিন্তু তাঁকে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে যদি কেউ ব্যবহার করে, তার পরিণামও ভালো হবে না। মাত্র দেড় বছর আগে যে চট্টগ্রামবাসী বিপুল ভোটে চট্টগ্রামের পাঁচটি আসন আওয়ামী লীগকে দিয়েছে, সেই চট্টগ্রামবাসী প্রায় এক লাখ ভোটে হারিয়ে দিয়েছে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে। এত কম সময়ে, এত ভোটের ব্যবধান। কেবল মহিউদ্দিন চৌধুরী নন, কাউন্সিলর পদেও আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটেছে। ৪১টি পদের মধ্যে ২০টি পেয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন কি ঠিক ছিল? মহিউদ্দিনের জনপ্রিয়তা কি আগের অবস্থানে আছে? না থাকলে আওয়ামী লীগ নতুন প্রার্থীর সন্ধান করল না কেন? মন্জুর আলম তো আওয়ামী লীগেরই লোক ছিলেন, নির্বাচনের কারণেই তিনি বিএনপিতে গেছেন।
সামনে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। সেখানেও যদি তারা ভুল প্রার্থী দেয়, একই ফল হবে। মানুষ কিন্তু তেতে আছে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

গণপিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যা -আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায় না

গত রোববার রাতে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে দুটি আলাদা ঘটনায় এলাকাবাসী ছিনতাইকারী সন্দেহে তিন যুবককে পিটুনি দিয়ে মেরে ফেলে। তাদের মধ্যে দুজন নৌযাত্রীদের টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে। অপর ঘটনায় মাঝরাতে এক যুবককে সন্দেহজনক ঘোরাফেরা করতে দেখে এলাকাবাসী এমন পিটুনি দেয় যে শেষপর্যন্ত তার মৃত্যু হয়। এই নিহত যুবককে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে তার মা অভিযোগ করেছেন।
চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারীদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে; তাদের বিরুদ্ধে যেমন থানা-পুলিশের সক্রিয় তৎপরতা দরকার, তেমনি দরকার জনপ্রতিরোধ। কিন্তু গণপিটুনি আর জনপ্রতিরোধ এক কথা নয়। শুধু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কেউ মানুষ মেরে ফেলতে পারে, এটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু বারবার এসব মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে চলেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মানুষ এতই ক্ষুব্ধ ও হতাশ যে তারা নিজের হাতে আইন তুলে নিতে দ্বিধা করছে না। অথচ ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে সবাই বুঝবেন, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে গণপিটুনির মতো হিংসাত্মক তৎপরতা চলতে পারে না।
আমাদের দেশে অপরাধীরা সহজেই ছাড়া পেয়ে যায়। আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে এ রকম হয়। তা ছাড়া আদালতে মামলা বছরের পর বছর গড়ায়। বিলম্বিত বিচার বিচারবঞ্চনারই শামিল। অপরাধীকে গ্রেপ্তারে থানা-পুলিশও অনেক সময় নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। মানুষ যুগ যুগ ধরে দেখে আসছে যে অনেক অপরাধীর শাস্তি হয় না, উপরন্তু তারা আইনের ফাঁকফোকরে বেরিয়ে এসে অভিযোগকারীদের ভয়ভীতি দেখায়, নিরীহ মানুষ প্রাণভয়ে কাঁপে।
সাধারণ মানুষ নিরীহ ও শান্তিপ্রিয়। কিন্তু বিচারবঞ্চনার খারাপ দৃষ্টান্তগুলো মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটায়। এটাই গণপিটুনির সামাজিক ভিত্তি। কিন্তু মনে রাখা দরকার, কোনো অপরাধের বিচারের ভার একমাত্র আদালতের। অপরাধীর বিরুদ্ধে ক্ষেত্রবিশেষে আইনি ব্যবস্থা নিতে সরকারের ব্যর্থতা কখনো গণপিটুনির মাধ্যমে হত্যার যুক্তি হতে পারে না। শুধু সন্দেহের কারণে কাউকে মারপিট বা গণপিটুনি দেওয়া আইনের চোখে অপরাধ। বুঝে বা না-বুঝে কেউ গণপিটুনিতে অংশ নিলে সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবেই
গণ্য হবে।
একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার রয়েছে। এটা তার মৌলিক মানবাধিকারের অংশ। এ কারণেই প্রচলিত ‘ক্রসফায়ারে’ বা পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু দেশে-বিদেশে মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলে গণ্য করা হয়। ক্রসফায়ার ও গণপিটুনির মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। দুটিই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। গণপিটুনির সংস্কৃতি থেকে সাধারণ মানুষকে বেরিয়ে আসতে হবে।

জার্মানিতে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ রানী এডিথের

জার্মানির একটি গির্জা থেকে ২০০৮ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রাচীন এক সদস্যের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। গবেষকেরা বলেছেন, ইংল্যান্ডের রানী এডিথের দেহাবশেষ হতে পারে এটি। কেননা, কফিনের গায়ে রানী এডিথের প্রাচীন বানান ‘Eadgyth’ লেখা রয়েছে। এ ছাড়া দেহাবশেষের দাঁত গবেষণা করে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সমগ্র ইংল্যান্ডের প্রথম রাজা এথেলস্টানের বোন ও আলফ্রেড দ্য গ্রেটের নাতনি রানী এডিথ ৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান। পূর্ব জার্মানির মাগডিবুর্গের একটি গির্জায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ২০০৮ সালে মাগডিবুর্গের গির্জায় প্রাচীন এ দেহাবশেষের সন্ধান পান। কফিনের ভেতরে পাওয়া এ দেহাবশেষ ছিল মধ্যবয়সী এক নারীর। দামি রেশমি কাপড়ে এ দেহাবশেষ মোড়ানো ছিল।
প্রচীনকালের এ দেহাবশেষ উদ্ধার প্রকল্পের পরিচালক অধ্যাপক হেরাল্ড মিলার বলেছেন, ‘আমরা এখনো শতভাগ নিশ্চিত নই যে, এগুলো রানী এডিথের দেহাবশেষ। যদিও সব বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণাদি এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এগুলো রানী এডিথেরই দেহাবশেষ।’ তিনি বলেন, বিজ্ঞানীরা এখন এ দেহাবশেষ নিয়ে উচ্চপ্রযুক্তিসম্পন্ন গবেষণা চালাচ্ছেন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের গবেষকেরা এ গবেষণা করছেন।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলেন, উদ্ধার করা এ দেহাবশেষ এমন এক ব্যক্তির, যিনি জার্মানি যাওয়ার আগে ওয়েসেক্সে বেড়ে উঠেছেন। তাঁর বয়স হবে ৩০ থেকে ৪০ বছর।

মেয়র ও কাউন্সিলরদের অভিনন্দন -চট্টগ্রামের উন্নয়নে সবাই একযোগে কাজ করুন

নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন যে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে, সে জন্য চট্টগ্রাম মহানগরের বাসিন্দাদের অভিনন্দন। একই সঙ্গে অভিনন্দন জানাই নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদেরও। এর মাধ্যমে গণতন্ত্র জয়ী হয়েছে, প্রতিফলন ঘটেছে জনগণের রায়ের। এ রকম একটি পরিচ্ছন্ন ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারে। প্রার্থী বা তাঁর সমর্থকেরা যাতে আচরণবিধি পুরো মেনে চলে, সে ব্যাপারে কমিশন শুরু থেকেই ছিল অত্যন্ত সজাগ ও সতর্ক। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে আইন মেনে চলার প্রবণতাও ছিল প্রশংসনীয়। আচরণবিধি লঙ্ঘন করে কেউ বাড়তি নির্বাচনী ক্যাম্প বা মিছিল বের করেনি। তাতে নির্বাচনী প্রচারণায় জৌলুশ কম থাকলেও নগরবাসী স্বস্তিতে ছিলেন।
বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণও হয়েছে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে। তবে মধ্যরাতে ফল ঘোষণা নিয়ে যে সংঘাত হয়েছে, তাতে রাজনৈতিক দলগুলোর অসহিষ্ণুতাই প্রকাশ পেয়েছে। নেতা-কর্মীরা ধৈর্য ধরলে এ সংঘাত এড়ানো অসম্ভব হতো না। শেষ পর্যন্ত বড় কোনো হাঙ্গামা ছাড়াই নির্বাচনের রায় ঘোষিত হয়েছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা তাকে স্বাগতও জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী অভিনন্দন জানিয়েছেন নবনির্বাচিত মেয়রকে। দেশের বৈরিতাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে এটি ইতিবাচক বলেই মনে করি। স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো যাতে পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে পারে, সে জন্য সরকারের সহযোগিতা- সমর্থন জরুরি। সরকার ও স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর সম্পর্ক হবে পরিপূরক, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয়।
নির্বাচনের মাধ্যমে বন্দরনগরের ভোটাররা তাঁদের দায়িত্ব শেষ করেছেন। এখন জনপ্রতিনিধিদের পালা। তাঁরা জনগণের কাছে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেগুলো কীভাবে পালন করবেন, সেসবেই মনোনিবেশ করতে হবে অহেতুক বিতর্কে না জড়িয়ে। মেয়র ও কাউন্সিলরদের মনে রাখতে হবে, তাঁরা যে ফোরাম বা কমিটি থেকেই নির্বাচিত হোন না কেন, নগরবাসী যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাঁদের নির্বাচন করেছেন, তা পূরণে একযোগে কাজ করতে হবে।
চট্টগ্রাম শুধু দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর নয়, আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তিও বটে। এ নগরের উন্নয়ন ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। জনপ্রতিনিধিদের একটা প্রবণতা আছে, তা হলো পূর্বসূরিদের ভালো কাজের স্বীকৃতি না দিয়ে সব ব্যর্থতার দায় তাঁদের ওপর চাপানো। চট্টগ্রামের নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলররা তা করবেন না বলেই প্রত্যাশিত। নবনির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ মন্জুর আলম অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, নগর পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি পূর্বসূরির পরামর্শ ও সহযোগিতা নেবেন। চট্টগ্রামবাসী তাঁর এ বক্তব্যের বাস্তবায়নই দেখতে চাইবেন। সেই সঙ্গে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত নারী কাউন্সিলরদের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
বিজয়ের এই শুভক্ষণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের যে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই তা হলো, নির্বাচিত জনপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। দেশ ও জনগণের কল্যাণে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। নির্বাচিত হওয়া মানে কেবল পদ-পদবি ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়া নয়, জনগণের প্রতি কর্তব্য পালনও। আশা করি, বীর চট্টলার জনপ্রতিনিধিরা সেই কথাটি বিস্মৃত হবেন না।

পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় সতর্কতা জারি

পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদী-অধ্যুষিত এলাকায় লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মাওবাদী বিদ্রোহীরা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে—গোয়েন্দাদের এমন খবরের ভিত্তিতে এই সতর্কতা জারি করা হলো।
মাওবাদীদের মোকাবিলায় গঠিত যৌথ বাহিনী গত মঙ্গলবার পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনীর রঞ্জার জঙ্গলে অভিযান চালায়। এ সময় মাওবাদী কোনো নেতাকে ধরা না গেলেও আটজন বিদ্রোহীর মৃত্যু হয়েছে বলে পুলিশ জানায়। তবে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে সংশয়ে পড়েছে পুলিশ। পুলিশের দেওয়া নামের তালিকার সঙ্গে মাওবাদীদের দেওয়া তালিকার মিল নেই।
পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার মনোজ ভার্মা নিহত বিদ্রোহীদের মধ্যে অর্জুন নামের একজনকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, অর্জুন হলেন মাওবাদী স্কোয়াডের অন্যতম বড় নেতা। পার্শ্ববর্তী রাজ্য ঝাড়খন্ড থেকে তিনি মেদিনীপুরে এসেছিলেন।


ভারতে রাজ্যসভার নির্বাচনে ১৮ সদস্য নির্বাচিত

ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় গত বৃহস্পতিবার নতুন ১৮ জন সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দ্বিবার্ষিক এই নির্বাচনে মোট পাঁচটি প্রদেশ থেকে বিভিন্ন দলের এমএলএদের প্রত্যক্ষ ভোটে নতুন এই সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন। নবনির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে রাজনীতিক ছাড়াও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী আইনজ্ঞ ও ব্যবসায়ী রয়েছেন।
যে পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচন হয়েছে সেগুলো হলো—বিহার, রাজস্থান, কর্ণাটক, ঝাড়খন্ড ও ওডিশা। ফলাফলে দেখা গেছে, বিহারে নির্বাচিত হয়েছেন মোট পাঁচজন। তাঁরা হলেন—রামবিলাস পবন (লোক জনশক্তি পার্টি), রাজীব প্রতাপ রুডি (ভারতীয় জনতা পার্টি—বিজেপি), রাম কৃপাল যাদব (রাষ্ট্রীয় জনতা দল), আরসিপি সিনহা (জনতা দল) ও উপেন্দ্র প্রসাদ কুশবাহা (জনতা দল)। রাজস্থান থেকে নির্বাচিত হয়েছেন চারজন। তাঁরা হলেন—রাম জেঠমালানি (বিজেপি), ভিপি সিং (বিজেপি), আনন্দ শর্মা (কংগ্রেস) ও আশক আলী তাক্ব (কংগ্রেস)। কর্ণাটকেও চারজন নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা হলেন—বিজয় মাল্য (স্বতন্ত্র), এম ভেঙ্কাইয়া নাইডু (বিজেপি), অস্কার ফার্নান্দেজ (কংগ্রেস) ও আইয়ানুর মাজুনাথ (বিজেপি)। ওডিশা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন প্রিয়মোহন মহাপাত্র (বিজু জনতা দল—বিজেডি), শশীভূষণ বেহারা (বিজেডি) ও বৈষ্ণব পারিদা (বিজেডি)। ঝাড়খন্ডের দুটি আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ধীরাজ প্রসাদ সাঁউ (কংগ্রেস) এবং কে ডি সিং (ঝাড়খন্ড মুক্তিমোর্চা)।
দুই এমপি বহিষ্কৃত: বিহারে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে রাজ্যসভার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জনতা দলের (ইউনাইটেড) প্রার্থীকে ভোট দেওয়ায় রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) তাদের দুজন এমপিকে গতকাল শুক্রবার বহিষ্কার করেছে। বহিষ্কৃত নেতারা হলেন—রাজেশ কুমার সিং ও পাপ্পু যাদব। আরজেডির সভাপতি আবদুল বারী সিদ্দিকী গতকাল তাঁদের ছয় বছরের জন্য বহিষ্কারের ঘোষণা দেন। আরজেডি ছাড়াও বহুজন সমাজবাদী পার্টির (বিএসপি) পাঁচজন, বিজেপির একজন এবং কংগ্রেসের একজন এমপি দলীয় হুইপের সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। বিজেপি ও বিএসপি নিজ নিজ দলের এসব এমপির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ বছরের মধ্যে প্রথম ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড

যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ বছরের মধ্যে প্রথম ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রনি লি গার্ডনারের সর্বশেষ আপিল খারিজ হওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের উতাহ অঙ্গরাজ্যের একটি কারাগারে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৯৭৬ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তৃতীয় ঘটনা এটি।
আদালতে এক আইনজীবীকে গুলি করে পালানোর চেষ্টার অভিযোগে ১৯৮৫ সালে রনিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আইনজীবীকে গুলি করে হত্যার সময় ১৯৮৪ সালের একটি মামলায় তাঁর বিচার চলছিল। ২০০৪ সালে উতাহ অঙ্গরাজ্যের সরকার সেখানে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ করে। কিন্তু এর আগেই রনি ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার এই পদ্ধতিকে বেছে নেন। মৃত্যুর আগে রনির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাঁর কিছু বলার আছে কি না। জবাবে রনি বলেন, ‘না, নেই।’

দুর্ঘটনার জন্য বিপির প্রধান নির্বাহী হেওয়ার্ড দায়ী

মেক্সিকো উপসাগরে তেলক্ষেত্রে দুর্ঘটনার জন্য ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের (বিপি) প্রধান নির্বাহী টনি হেওয়ার্ডকে দায়ী করেছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা। গত বৃহস্পতিবার হেওয়ার্ডের উপস্থিতিতে কংগ্রেস কমিটির শুনানিতে তাঁর কঠোর সমালোচনা করা হয়।
দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ বাবদ বিপি যুক্তরাষ্ট্রকে দুই হাজার কোটি ডলার দিতে রাজি হওয়ার একদিন পরই এই শুনানির মুখোমুখি হলেন হেওয়ার্ড। চার কিস্তিতে ওই টাকা পরিশোধ করবে বিপি।
বৃহস্পতিবারের শুনানিতে আইনপ্রণেতারা হেওয়ার্ডকে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে প্রশ্ন করেন। ডেমোক্রেটিক আইনপ্রণেতা হেনরি ওয়াক্সম্যান বলেন, তাঁর নেতৃত্বে বিপি চরম ঝুঁকি নিয়েছে। তিনি দুর্ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দাবি করেন। আইনপ্রণেতারা অভিযোগ করেন, বিপি লাখ লাখ ডলার বাঁচাতে ঠিকাদার ও তাঁর কর্মীদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে দিনের পর দিন কম খরচে দ্রুত কূপ খনন চালিয়ে গেছে। ফলে তেল উত্তোলন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। পরিণতিতে ভয়াবহ এই বিপর্যয় ঘটে।
তবে রিপাবলিকান নেতা জো বার্টন বিপিকে সমর্থন করেন। তিনি ক্ষতিপূরণের জন্য বিপির ওপর হোয়াইট হাউসের চাপের জন্য হেওয়ার্ডের কাছে দুঃখ প্রকাশও করেন। এর কিছুক্ষণ পরই অবশ্য রিপাবলিকান নেতারা বার্টনের ওই বক্তব্য প্রত্যাহার করে জানান, বিপিকে সমর্থন দিয়ে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় বার্টন দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
শুনানিতে হেওয়ার্ড দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বিপির নির্বাহী হিসেবে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। হেওয়ার্ড বলেন, দুর্ঘটনার জন্য আমাকে দায়ী করবেন না। এ ঘটনায় আমি ‘ব্যক্তিগতভাবে বিধ্বস্ত’। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। তবে হ্যাওয়ার্ড স্বীকার করেন, স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে আরও অনেক কিছু করতে হবে।
ক্যাপিটাল হিলে দ্য রেবার্ন হাউস অফিস বিল্ডিংয়ে হেওয়ার্ড যখন আইনপ্রণেতাদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হচ্ছিলেন, তখন বাইরেও তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলে। বিক্ষুব্ধ এক নারী চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘তুমি অপরাধী। তোমাকে কারাগারে পাঠানো উচিত।’
লুইজিয়ানার ট্রেজারার জন কেনেডি এ দুর্ঘটনায় ক্ষতির একটি হিসাব প্রকাশ করেছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি জানান, দুর্ঘটনায় পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ চার হাজার কোটি থেকে দশ হাজার কোটি ডলারের মধ্যে।
যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের কাছে মেক্সিকো উপসাগরের ওই তেলক্ষেত্রে গত ২০ এপ্রিল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় এক মাইল দীর্ঘ পাইপ দিয়ে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৬০ হাজার ব্যারেল তেল সাগরের পানিতে মিশছে। এতে সাগরের জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় এলাকার পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। বিপি অবশ্য দাবি করেছে, সাগরে ছড়িয়ে পড়া তেল থেকে তারা প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার ব্যারেল তেল সংগ্রহ করছে।

লন্ডনে জেনারেল দ্য গলের ভাস্কর্যে সারকোজির শ্রদ্ধা নিবেদন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে স্বদেশি যোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করতে ফরাসি জেনারেল শার্ল দ্য গলের দেওয়া সেই ঐতিহাসিক রেডিও ভাষণের ৭০তম বার্ষিকী ছিল গতকাল শুক্রবার। এ উপলক্ষে লন্ডনে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রবীণ যোদ্ধারা অংশ নেন। জেনারেল দ্য গল ১৯৪০ সালের ১৮ জুন বিবিসির লন্ডন স্টুডিও থেকে নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। খবর এএফপির।
১৯৪০ সালের ১৪ জুন নাৎসি বাহিনীর হাতে প্যারিসের পতন হয়। এরপর ১৭ জুন জেনারেল দ্য গল ফ্রান্স থেকে পালিয়ে লন্ডনে আসেন। ফরাসি সরকার ১৮ জুন জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রস্তুতি নেওয়ার প্রাক্কালে তিনি বিবিসি রেডিওতে এক ভাষণ দেন।
জেনারেল দ্য গলের এ ভাষণ উপলক্ষে রয়্যাল চেলসি হাসপাতালে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেওয়া ছাড়াও ফরাসি প্রেসিডেন্ট বিবিসির কার্যালয় পরিদর্শন করেন। পরে তিনি ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী এক বৈঠকে যোগ দেন। এ ছাড়া প্রিন্স চার্লসের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক করার কথা রয়েছে।
দ্য গলের ভাষণ উপলক্ষে ফরাসি কোনো প্রেসিডেন্টের এটাই প্রথম লন্ডন সফর। তিনি দ্য গলের ভাস্কর্যে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

মালয়েশিয়ায় পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের প্রমাণ মিলেছে

মালয়েশিয়ায় পুলিশি হেফাজতে বন্দী নির্যাতনের প্রমাণ পেয়েছেন জাতিসংঘের তদন্তকারী কর্মকর্তারা। যে নিবৃত্তিমূলক কঠোর নিরাপত্তা আইনের আওতায় আটকে রেখে বন্দীদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে, তা বাতিল করতে মালয়েশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
পুলিশি হেফাজতে বন্দী নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে দুই সপ্তাহের জন্য মালয়েশিয়ায় গেছেন জাতিসংঘের ওই কর্মকর্তারা। নিবৃত্তিমূলক আইনে আটক অবৈধ অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করবেন জাতিসংঘের ওই কর্মকর্তারা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদে প্রায় সব বন্দীই জানিয়েছেন, দায় স্বীকার করার জন্য পুলিশ তাঁদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে।
তদন্ত দলের প্রধান এল হেদি ম্যালিক সো বলেন, অস্ত্র ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়েছে বলে অনেকে জানিয়েছেন। কারও কারও শরীরে কিল-ঘুষি ও লাথি মারা হয়েছে এবং নোংরা পানি ছোড়া হয়েছে।
ম্যালিক সো আরও বলেন, শুধু শারীরিক নির্যাতনই নয়, কোনো কোনো বন্দীকে খাবার ছাড়াই ছোট কক্ষের মধ্যে আটকে রাখা হয়। আইনজীবীর সঙ্গে পরমর্শের অধিকার বা পরিবারের সঙ্গেও তাঁদের যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান।
বিতর্কিত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইনসহ নিবৃত্তিমূলক কঠোর আইন বাতিল করার জন্য মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। দেশটিতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইনের আওতায় যে কাউকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা যায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের এই আইনের লক্ষ্য ছিল কমিউনিস্ট বিদ্রোহীদের দমন। কিন্তু অভিযুক্ত সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এখনো ওই আইন ব্যবহূত হয়ে আসছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক তাঁর সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে অনেককে মুক্তি দিলেও এখনো প্রায় ১৫ জনকে ওই আইনের আওতায় আটকে রাখা হয়েছে।
তদন্তে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করার পর তদন্ত দলের প্রধান ম্যালিক সো বলেন, ‘এই আইন বিলুপ্ত করার জন্য আমরা সরকারের প্রতি সুপারিশ করেছি।’
আগামী বছরের মার্চে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত দল।
আবেদন নাকচ : মালয়েশিয়ায় বিরোধী দলীয় নেতা আনোয়ার ইব্রাহীম তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সমকামিতার অভিযোগসম্পর্কিত ডাক্তারি প্রমাণাদির জন্য আদালতে যে আবেদন করেছেন, গতকাল শুক্রবার তা নাকচ করে দিয়েছেন আদালত। তাঁর আইনজীবী শঙ্করা নায়ার বলেন, ডাক্তারি প্রতিবেদন, ক্লিনিক্যাল নোটসহ অন্য প্রমাণাদির জন্য আনোয়ার ইব্রাহীমের আবেদন হাইকোর্ট নাকচ করে দেওয়ায় আদালতে তাঁদের যুক্তি-তর্ক ও জেরা ব্যাহত হতে পারে। তিনি বলেন, এটা অনেকটা হাত পেছনে বেঁধে বক্সিং রিংয়ে যেতে বলার মতো।

ভারতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন হিটলার

নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের নাম শুনলে অনেকেই নাক কুঁচকে ফেলেন। জার্মানির একজন স্বৈরশাসক হিসেবে তিনি যে ইতিহাস রেখে গেছেন, তা শুধু এতদিন ধিক্কার আর ঘৃণা কুড়িয়ে এসেছে। বর্তমানে এর বিপরীত দিকটিও দেখা যাচ্ছে। ভারতীয় সমাজের কিছু ব্যক্তির কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন হিটলার।
ভারতীয় সমাজের একটি অংশে এই হিটলারপ্রীতির কারণে গত এক দশকে জার্মান নেতার বই ও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কিছু জিনিসের ছোটখাটো একটি শিল্প গড়ে উঠেছে। এ ব্যাপারে সাম্প্রতিক খবর হচ্ছে, হিটলারকে পুঁজি করে এবার দাঁও মারার পরিকল্পনা নিয়েছে বলিউড। এ বছরের শেষ নাগাদ ডিয়ার ফ্রেন্ড হিটলার নামে একটি ছবি মুক্তি পাওয়ার কথা।
হিটলারপ্রেমী বেশির ভাগ তরুণই হিটলারবিষয়ক বই, তাঁর ছবিযুক্ত টি-শার্ট, ব্যাগ, চাবির রিং ইত্যাদি দেদারছে কিনছে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে হিটলারের আত্মজীবনীমূলক বই ‘মেইন ক্যাম্প’।
ভারতে ‘মেইন ক্যাম্প’ বইটির সবেচেয়ে বড় প্রকাশক ও পরিবেশক হচ্ছে জাইকো। গত ১০ বছরে তারা বইটির এক লাখের বেশি কপি বিক্রি করেছে।

শ্রীলঙ্কার সামনে নুয়ে পড়ল বাংলাদেশ

ভারতের কাছে হারের পর দলের কাছে বাংলাদেশ অধিনায়ক সাকিব আল হাসান চেয়েছিলেন, ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের উন্নতি যেন দলীয় পারফরম্যান্সটাকেও আলোয় নিয়ে আসে। এশিয়া কাপে কাল নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে সাকিবের সেই বাংলাদেশকে তো দেখা গেলই না, বরং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আরও নুয়েই পড়ল দলটা। স্বাগতিকদের ৪ উইকেটে করা ৩১২ রানের জবাবে ১৮৬ রানে অলআউট হয়ে বাংলাদেশের হার ১২৬ রানের বিশাল ব্যবধানে।
তামিম ইকবালের ব্যাট বরাবরই ঝোড়ো, কালকের ঝোড়ো শুরুটা তাই ৩১২ রান টপকানোর ‘পজিটিভ টার্গেটের’ জন্যই কি না বোঝা মুশকিল। তাঁর সঙ্গে ২.৫ ওভারে ২০ রানের ওপেনিং জুটিতে ইমরুল কায়েসের অবদান মাত্র ৩। লং অন দিয়ে মারা এক ছক্কা আর পাঁচ বাউন্ডারিতে ৫৩ বলে ৫১ রান করে তামিম-ঝড় থেমেছে মুত্তিয়া মুরালিধরনের দুসরাতে, দিলশানের হাতে স্টাম্পড হয়ে। তার আগে মুরালির বলে কুলাসেকারার ক্যাচ হন জুনায়েদ সিদ্দিক। এই বাঁহাতিও ৩৮ রান করে ফেললেন ৩৪ বলে। দ্বিতীয় উইকেটে তামিম-জুনায়েদের ৫৭ রানের জুটি ছাড়া ৪০.২ ওভারে অলআউট বাংলাদেশের ব্যাটিং কেবলই ব্যর্থতার পাঁচালি।
উপুল থারাঙ্গা আর তিলকারত্নে দিলশানের ১১১ রানের ওপেনিং জুটির সৌজন্যেই স্বাগতিকদের অত রান। দিলশান করেছেন সর্বোচ্চ ৭১। বোলারদের ব্যর্থতাতেই সাঙ্গাকারার দলের এই রান উৎসব।
পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের শেষ ম্যাচ ২১ জুন। তার আগে বিশ্বকাপ ফুটবলের মৌসুমেও ডাম্বুলায় ছড়াতে পারে ক্রিকেট উত্তাপ। আজ যে সেখানে মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তান!

মেসি কেন গোল পাচ্ছেন না

কেন? এটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। পুরোদস্তুর স্ট্রাইকার না হয়েও এবার বার্সেলোনার হয়ে ৫৩ ম্যাচে ৪৭ গোল করেছেন যিনি, প্রায় প্রতি ম্যাচেই গোল করাটা যাঁর অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল; সেই লিওনেল মেসি পরপর দুই ম্যাচে গোল পেলেন না। প্রথম ম্যাচে গোলে শট নিয়েছিলেন চারটি। সেবার নাইজেরিয়ান গোলরক্ষক এনাইয়ামা বাধার দেয়াল তুলে দাঁড়ালেন। পরশু ম্যাচেও গোলে শট নিলেন তিনটি। এবার গোলরক্ষক তো বটেই প্রবঞ্চক ভাগ্যও গোল পেতে দিল না তাঁকে। একবার তো বল গিয়ে লাগল বাঁ দিকের পোস্টে।
ম্যাচের পর মেসি আবারও সেই পুরোনো কথাটাই বলছেন, ‘গোল নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। গোল আসবে এমনিতেই। এটা বড় কোনো সমস্যা নয়। আবারও সুযোগ পেয়েছিলাম, কিন্তু বলটা তো জালেই গেল না!’
পরিসংখ্যান কিন্তু আভাস দিচ্ছে, মেসিকে তাড়া করছে অপয়া একটি সংখ্যা—১০! মেসির জার্সি নম্বর এটাই। আর্জেন্টিনার সেরা খেলোয়াড়টির এটি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি। কিন্তু এই জার্সির বিষম জ্বালাও আছে। ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হওয়ার চাপ। সেই চাপেই কিনা, দশ নম্বর জার্সি পরে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা গোল পান না ১২ বছর হতে চলল! সর্বশেষ আর্জেন্টিনার দশ নম্বর পরে বিশ্বকাপে গোল করেছিলেন অ্যারিয়েল ওর্তেগা, ১৯৯৮ বিশ্বকাপে জ্যামাইকার বিপক্ষে। ৯ নম্বর জার্সিটা আবার খুবই পয়মন্ত। এই জার্সিতেই বিশ্বকাপে তিনটি হ্যাটট্রিক এসেছে আর্জেন্টিনার ঘরে!
মেসি জাতীয় দলের হয়ে সর্বশেষ গোল করেছিলেন ২০০৯ সালের নভেম্বরে, স্পেনের বিপক্ষে। যেটি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তাঁর ১৩তম গোল।

লাতিন আমেরিকান ফুটবলের জয়জয়কার

এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে গোলের খরায় দর্শকদের প্রাণবায়ু যখন ওষ্ঠে আগত প্রায়, তখন পৃথিবীর কোটি কোটি ফুটবলপাগল দর্শকের মনঃকষ্টের দিকটা বিবেচনায় নিয়ে এই গোলখরা থেকে বেরিয়ে আসার পথ সন্ধানে ফুটবলের নিয়মকানুনের মধ্যে কিছু পরিবর্তন আনার জন্য ফিফাকে পরামর্শ দিয়ে চলমান রচনার তৃতীয় কিস্তিটি তৈরি করেছিলাম। লেখাটি ১৮ জুন, শুক্রবার প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকালে আনিসুল হক ফোন করে আমাকে বিনয়ের সঙ্গে জানাল যে আমার লেখাটি আজ ছাপা সম্ভব হয়নি, আগামীকালের কাগজে যাবে। আমি যেন রাগ না করি। সাধারণত এ রকম ক্ষেত্রে আমি রাগ করে থাকি। না করলেও, করা উচিত বলে মনে করি। আনিস তা জানে। কিন্তু লেখাটি ছাপা হয়নি জেনে আজ আমার রাগ তো হলোই না, আমি বরং খুশি হলাম। স্বস্তি পেলাম মনে। ভাবলাম, যাক ভালোই হলো। মানীর মান আল্লাহ বাঁচান। ১৭ জুন তিন খেলায় ১০টি গোল হয়েছে। আর্জেন্টিনা ৪-১ গোলে দক্ষিণ কোরিয়াকে, মেক্সিকো ২-০ গোলে ফ্রান্সকে এবং গ্রিস ২-১ গোলে নাইজেরিয়াকে পরাজিত করেছে। সেই গোলের বন্যা যাঁরা চাক্ষুস করেছেন, গোলের খরা কাটানোর জন্য ফুটবলের নিয়মকানুন পরিবর্তনের প্রস্তাবটি তাঁদের কাছে কিছুটা হাস্যকর বলেই মনে হতো। গতকাল যদি সব মিলিয়ে তিনটি কি চারটি গোল হতো, তাহলে আমার প্রস্তাবটি পাঠক হয়তো পছন্দ করতেও পারতেন। ওই রচনায় আমার উদ্বেগের পক্ষে আমি একটি পরিসংখ্যান দিয়েছিলাম। ২০০৬ বিশ্বকাপে গোল হয়েছিল মোট ১৪৭টি। খেলাপ্রতি ২ দশমিক ৩ গোল। আমি যখন নিয়ম বদলের প্রস্তাব করেছিলাম, তখন এবারের বিশ্বকাপে হয়ে যাওয়া ১৬ খেলায়, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া জার্মানির চার গোলসহ মোট গোল হয়েছিল মাত্র ২২টি। অর্থাৎ খেলাপ্রতি ১ দশমিক ৩৭ গোল। এ অবস্থায় পাঠক আপনিই বলুন, মাথা ঠিক রাখা কি সম্ভব? কাজ ফেলে, রাত জেগে খেলা দেখা কিসের জন্য? যে তিন বছরে একটি ফুটবল ম্যাচ দেখে না, সে কিনা দিনে তিন ম্যাচ দেখছে! গোল ছাড়া আমাদের আর পাওয়ার কী আছে বলুন? আমরা তো আর কাপ পাব না, আমরা পাব গোল। আমরা গোলের বন্যায় ভেসে যেতে চাই। ওটাই আমাদের লাভ। এই যে আমি জার্মানিকে এবারের বিশ্বকাপটি অলরেডি দিয়ে বসে আছি, সে তো ওই গোলের জন্যই। এখন পর্যন্ত চার গোলের ব্যবধানে জেতা দল তো জার্মানিই। নাক উঁচু অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সে আমাকে চার-চারবার পরম আনন্দ দিয়েছে। তাই সেই আনন্দের বিনিময়ে আমি তাকে বিশ্বকাপটি দিয়ে দিয়েছি। নইলে জার্মানি আমার কে? অস্ট্রেলিয়াকে দেওয়া চার গোলের সুবাদে জার্মানিকে বিশ্বকাপ দিয়ে দেওয়ার অধিকার আমার আছে কি না—এ প্রশ্ন যদি কেউ তোলেন, তবে বলব, আছে। প্রিয়ার গালের একটি তিলের জন্য পারস্যের কবি যদি সমরখন্দ দিয়ে দিতে পারেন, তো আমিও পারি। আমি পরিষ্কার ভাষায় বলে দিতে চাই, ৪-০ গোলের ব্যবধানে যে পর্যন্ত না অন্য কোনো দল প্রতিপক্ষকে পরাভূত করছে, তখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ জার্মানির কাছেই থাকবে।
১৭ জুনের খেলা দেখার পর, আমার নিজেরও মনে হচ্ছে—না, ঠিকই আছে। ক্রিকেটের রানের খরা কাটানোর জন্য ক্রিকেটে যেমন রানবান্ধব নিয়ম তৈরি হয়েছে—সেই আদলে ফুটবলের নিয়মকানুন পরিবর্তন করার কোনো দরকার নেই। প্রথম সাত খেলায় নয় গোল দিয়ে যে বিশ্বকাপের শুরু—সেই বিশ্বকাপেই এক দিনের তিন খেলায় ১০-১০টি গোল হবে, ভাবিনি। সেই অভাবিত ঘটনাটি যখন ঘটেছেই, তখন তাকে যথেষ্ট বলেই ভাবছি। অফসাইডের নিয়ম শিথিল করে গোলের সংখ্যা বাড়ানোর আর দরকার পড়বে না। অফসাইড-নিয়ম শিথিল করে গোলের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাবটি (যদিও সেটি ছাপা হয়নি, তবু আনিসুল হক তো জানে) আমি প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। আমরা জানি, অনাবৃষ্টির মতো অতিবৃষ্টিও আপদবিশেষ। অনেক গোল যাঁরা দেখতে চান, তাঁদের জন্য তো রাগবি, বাস্কেটবল, হ্যান্ডবল ইত্যাদি খেলা রয়েছেই। চার-পাঁচ গোলের বেশি হলে ফুটবল আর ফুটবল থাকবে না। ফুটবলের জনপ্রিয়তায় ভাগ বসানোর লোভে প্রচলিত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বিশ্বকাপ চালু হওয়ার পর যেমন ক্রিকেট আর ক্রিকেট থাকছে না। সে এক উত্তেজক বাণিজ্যের মাধ্যম হয়ে উঠছে। ফুটবলেরও তা-ই হবে। এমনিতেই বিশ্বজুড়ে ফুটবল-বাণিজ্যের যে রমরমা ভাব, তার মধ্যে গোলের মসলা আরও বেশি করে যুক্ত না করাটাই শ্রেয় হবে।
গত দুই দিন ছিল লাতিন আমেরিকার দিন। ঈশ্বর নিজের হাতে তৈরি করে দিন দুটি লাতিন আমেরিকাকে উপহার দিয়েছেন বলেই মনে হয়। ১৬ জুন দীর্ঘ ৪৮ বছর অপেক্ষার পর পাবলো নেরুদার দেশ চিলি (১-০) জিতল হন্ডুরাসের বিরুদ্ধে; উরুগুয়ে (২-০) গোলে জিতল দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে। আর ১৭ জুন লাতিন আমেরিকার অন্য দুই ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ৪-১ গোলে দক্ষিণ কোরিয়াকে এবং মেক্সিকো ২-০ গোলে হারাল বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সকে। ১৫ জুন রাতের খেলায় ব্রাজিল হারিয়েছিল উত্তর কোরিয়াকে। তার মানে হচ্ছে, ১৫ জুনের মধ্যরাত থেকে শুরু করে ১৭ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত প্রসারিত সময়টা লাতিন আমেরিকান ফুটবলের জন্য ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে সুবর্ণ সময়। এই সময়ের মধ্যে তারা তাদের প্রতিটি ম্যাচে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেছে। এর ভেতর দিয়ে যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো এই যে, লাতিন আমেরিকান ফুটবলাররাই দক্ষিণ আফ্রিকার মাটি-হাওয়ার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে বলে মনে হয়। তা ছাড়া আরও একটি গূঢ় কারণ আছে বলে আমি ধারণা করি। আফ্রিকার মাটিতে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর কোনো লিগেসি নেই, যা আফ্রিকার মুক্ত পায়ে লোহার শিকল পরানো ইউরোপের অনেক দেশেরই রয়েছে। তুলনামূলকভাবে জার্মানির তা কম বলেই চলতি বিশ্বকাপে জার্মানি এ পর্যন্ত ভালো করেছে, পরেও হয়তো করবে। আফ্রিকার মাটি ও মানুষের সমর্থন লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর প্রতিই বেশি থাকবে। শত্রুর শত্রু মানে বন্ধু—এই তত্ত্বে ভর করে আফ্রিকার মাটি ও মানুষের সমর্থন নিয়ে হয়তো এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বেও উঠে যাবে জার্মানি। তবে লাতিন আমেরিকান ফুটবলকে (আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল) চূড়ান্ত যুদ্ধে হারানোর মতো শক্তি, শৈলী, জল-মাটি-হাওয়া ও মানুষের সমর্থন সে পাবে কি না, তা দেখার জন্যই আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করব।
(জার্মানি-সার্বিয়া ম্যাচ দেখার আগে এ কলামটি লেখা)
কামরাঙ্গীরচর
১৮ জুন, ২০১০

মারউইকের কাছে জয়টাই আসল

হল্যান্ড প্রথম ম্যাচে ডেনমার্ককে হারিয়েছে ২-০ গোলে। ক্যামেরুনের বিপক্ষে জাপানের জয় ১-০ গোলে। আজ ডারবানে হল্যান্ড-জাপান ম্যাচের পরই ‘ই’ গ্রুপের বাকি দুই দল কামেরুন-ডেনমার্ক মুখোমুখি হবে প্রিটোরিয়ায়। এই ম্যাচ ড্র হলে হল্যান্ড-জাপান ম্যাচের জয়ী দল আজই উঠে যাবে শেষ ষোলোতে।
বার্ট ফন মারউইকের চোখ এখন শেষ ষোলোতে। ডাচ কোচ জাপানকে হারানোর ব্যাপারে খুবই আশাবাদী, ‘প্রথম ম্যাচ জেতার পর খেলোয়াড়েরা অনেকটা নির্ভার। জাপানের বিপক্ষে তারা আরও ভালো খেলবে আশা করি।’
আগের ম্যাচে ক্যামেরুনের বিপক্ষে পাওয়া জয়টা দেশের বাইরে জাপানের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ জয়। জাপান কোচ তাকেশি ওকাদা হল্যান্ডকে মোটেও ভয় পাচ্ছেন না, ‘আমার ছেলেরা এখন খুবই উজ্জীবিত। এই ম্যাচের গুরুত্বটা তারা বুঝতে পারছে। আমরা ৩ পয়েন্টের জন্যই খেলব।’
হল্যান্ডকে সহজে ছাড়বে না জাপান—এটা ডাচদের ভালোই জানা। কোচ তো খেলোয়াড়দের বলে দিয়েছেন, জাপান ম্যাচটা কঠিন হবে তাদের জন্য। দলের অন্যতম তারকা ওয়েসলি স্নাইডার জানাচ্ছেন, ‘আমাদের কোচ বলেছেন, গ্রুপে জাপান একমাত্র দল যারা আমাদের জন্য ম্যাচটা কঠিন করে তুলতে পারে।’
জাপানের কোচের কথা শুনলে সাবধান তো হতেই হচ্ছে হল্যান্ডকে। ‘আমাদের নিয়ে কে কী ভাবে ভাবুক, আমি দল মাঠে নামাব তিন পয়েন্টের জন্যই’—বলেছেন ওকাদা।
ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে জাপান ৪৫, হল্যান্ড ৪। শুধু কাগজে-কলমে নয় এখন পর্যন্ত এশিয়ান দলের বিপক্ষে তিন ম্যাচ খেলে তিনটিই জিতছে হল্যান্ড। বাছাইপর্বে ৮ ম্যাচ জিতে সবার আগে উঠেছে চূড়ান্ত পর্বে। প্রস্তুতি ম্যাচে ঘানার বিপক্ষে ৪-১, হাঙ্গেরির বিপক্ষে পেয়েছে ৬-১-এর বড় জয়। তবে ডেনমার্কের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে স্বপ্রতিভ ছিল না হল্যান্ড। প্রথম গোলটা তো ডেনমার্ক নিজেরাই করল!
আর তাই হল্যান্ডের খেলা নিয়ে কথা উঠছে। জয়ই শেষ কথা ঠিক আছে, তবে ‘টোটাল ফুটবলের প্রবর্তক’, ১৯৭৪ আর ’৭৮ সালে রানার্সআপ, ১৯৮৮ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নরা নিজেদের হারিয়ে খুঁজলেও এখনো মানুষ ডাচ ফুটবলারদের পায়ে সৃজনশীল ফুটবল দেখতে চায়।
কিন্তু ‘সুন্দর’ ফুটবলের চেয়ে ফলনির্ভর ফুটবলই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন হল্যান্ডের কোচ মারউইক। তাঁর দর্শনটাই এমন, ‘সুন্দর ফুটবল সব সময় “কার্যকর ফুটবল” হয় না।’ ডাচ স্ট্রাইকার ফন ডার ভার্ট বলছেন, ‘এটা ঠিক, আমরা কিছুটা জার্মানির মতো খেলেছি। কোচ আমাদের মাঠে একটা কার্যকর দল হিসেবেই গড়ে তুলেছেন।’
মজার ব্যাপার, মারউইকের অধীনে ২২ ম্যাচ খেলেছে হল্যান্ড। ডাচ কোচ হিসেবে তাঁর রেকর্ডটাই সবচেয়ে উজ্জ্বল।

হল্যান্ড-জাপান
রবিন ফন পার্সি
ইনজুরিতে ক্লাব মৌসুমের প্রায় পুরোটাই বাইরে থেকে তরতাজা ফন পার্সি হল্যান্ডকে শিরোপা জেতাবেন, ডাচ গ্রেট রুদ খুলিতের প্রত্যাশা এমনটাই। আর্সেনাল স্ট্রাইকার গোল করতে পারেন দুরূহ সব কোণ থেকে, ফ্রি-কিকে তাঁর বাঁ পা থেকে বের হয় গোলা। প্রথম ম্যাচে প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে পারেননি, আজ তাই মুখিয়ে থাকবেন গোলের জন্য।

মার্কাস তুলিও তানাকা
জন্ম-বেড়ে ওঠা ব্রাজিলে বলেই হয়তো বল পায়ে তানাকা অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয়, ডিফেন্ডার হলেও প্রায়ই ঘোরাফেরা করেন প্রতিপক্ষের সীমানায়। বিশ্বকাপের আগে আলোচনা এসেছেন প্রস্তুতি ম্যাচে দুটি আত্মঘাতী গোল করে এবং দ্রগবার হাত ভেঙে। তবে রক্ষণকাজটা তিনি ভালোই করেন, ডাচদের আক্রমণ সামলাতে আজ বড় ভূমিকা রাখতে হবে তাঁকে।a

কোথায় হারালআফ্রিকা

দক্ষিণ আফ্রিকা: বিদায় প্রায় নিশ্চিত।
নাইজেরিয়া: ভাগ্য ঝুলে আছে আর্জেন্টিনার হাতে।
আলজেরিয়া: কাল রাতে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে গিয়ে থাকলে তাদের বাজছে বিদায়-ঘণ্টা।
আইভরিকোস্ট: অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে আগামীকাল তাদের প্রতিপক্ষের নাম ব্রাজিল!
ক্যামেরুন: জাপানের কাছে প্রথম ম্যাচে হেরে যাওয়া ইতোর দলের প্রতিপক্ষ আজ ডেনমার্ক।
ঘানা: সুখবর দিয়েছে কেবল তারাই। আজ সার্বিয়া হেরে গেলে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জিতলেই দ্বিতীয় রাউন্ড তাদের নিশ্চিত।
বিশ্বকাপে ছয় আফ্রিকান দেশের এই হলো পরিস্থিতি। আফ্রিকায় চলমান ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত একমাত্র জয়টি পেয়েছে ঘানা। সেটিও এসেছে পেনাল্টি থেকে। সব দেখেশুনে দক্ষিণ আফ্রিকার এক পত্রিকার শিরোনাম: ‘আফ্রিকা কি তবে অভিশপ্ত?’
আফ্রিকার পেছনে আদৌ কোনো অভিশপ্ত অপয়া ভূত যদি থেকেই থাকে, তবে আজই সুযোগ থাকছে, সেই ভূত তাড়ানোর। দুই আফ্রিকান দেশ মাঠে নামছে আজ। নিজ দেশের দাবি মেটানোর দায় তো আছেই, আফ্রিকার দলগুলো প্রথম রাউন্ডেই এভাবে হুড়মুড়িয়ে পড়লে বিশ্বকাপই না শেষ পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে রং!
ইতো তাঁর সোনালি দিন পেছনে ফেলে এসেছেন। ২০০০ আর ২০০২ সালে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন হওয়া, ২০০০ অলিম্পিক ফুটবলে সোনা জেতা ক্যামেরুনও এখন আর দাঁত বসাতে পারছে না। ইতো অবশ্য প্রথম ম্যাচে তাঁর সেভাবে জ্বলে না ওঠার পেছনে কোচকেই দায়ী করছেন। কোচের নির্দেশে নিজের পছন্দমতো জায়গায় খেলতে না পারার কারণে একটু ক্ষুব্ধও মনে হলো তাঁকে।
‘আমি সেখানেই খেলেছি, কোচ যেখানে বলেছেন। আমি সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করেছি সতীর্থদের জায়গামতো বল বানিয়ে দিতে। তবে ক্যামেরুনের সর্বোচ্চ গোলদাতা আমি হয়েছি কিন্তু নির্দিষ্ট একটা জায়গায় খেলে। এখন কোচ যদি বলেন, “স্যামুয়েল, তুমি এই পজিশনে খেললেই দলের সবচেয়ে ভালো হয়”, আমাকে তো তাঁর কথা শুনতেই হবে।’

অবশেষে রোবেনের সাড়া

আরিয়েন রোবেনও তাহলে বিশ্বকাপে আছেন! দলে থেকেও যেন নাই হয়েই ছিলেন। চোটমুক্তির দাওয়াই নিতে নিতেই তো ক্লান্ত ছিলেন তিনি। মুখ খুলে নিজের উপস্থিতিটা জানান দেবেন কখন? অবশেষে মুখ খুললেন রোবেন। ওয়েবসাইট।
আর মুখ খুলে প্রথম ছবকেই প্রত্যাশার যে ছবিটা আঁকলেন বায়ার্ন মিউনিখের তারকা, তাতে নতুন করে স্বপ্ন সাজাতে পারেন ডাচরা। কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ, খুলিত, বাস্তেন, বার্গক্যাম্পরা যা পারেননি; রোবেনের স্বপ্ন সেই বিশ্বকাপ জয়ের, ‘প্রত্যাশা উঁচুতেই আমাদের।’ তবে বাস্তবতাকেও মানতে কার্পণ্য নেই ইনজুরি মাথায় নিয়ে মাঠে নামার দিন গুনতে থাকা এই উইঙ্গারের, ‘শিরোপা জিততেই বিশ্বকাপে যাবেন আপনি, কিন্তু বাস্তবতাও আপনার জানা থাকবে হবে যে, এটা খুবই কঠিন।’
কেন কঠিন, দিয়েছেন সেই ব্যাখ্যাও, ‘অনেকগুলো বড় দল আছে। তাদের মানও ভালো। তবে আমাদেরও একদল ভালো ফুটবলার আছে, যারা সাফল্যের সঙ্গে বিশ্বকাপ শেষ করতে পারে।’
১৪ জুন ডেনমার্কের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলেছে হল্যান্ড। রোবেনকে ছাড়াই ওই ম্যাচে ২-০ গোলে জিতে দুর্দান্ত শুরু করেছে বিশ্বকাপের চির-হতভাগা দল হল্যান্ড। আজ জাপানের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচটিও তাঁকে দেখতে হবে দর্শক হয়ে। ২৪ জুন ক্যামেরুনের বিপক্ষে হল্যান্ডের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ। রোবেন তাকিয়ে আছেন এই ম্যাচের দিকেই।
দল বিশ্বকাপ খেলছে। এ সময় সাইড বেঞ্চে বসে করতালি দেওয়াটা ক্লাব ফুটবল দাপিয়ে বেড়ানো রোবেনের মতো তারকার জন্য শুধু হতাশারই না, কষ্টেরও। তাই দ্রুত মাঠে নামার আশায় ইনজুরির মধ্যেই অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মাঠে না নামতে পারার কষ্ট থাকতে পারে, তবে কোচ মারউইকের সঙ্গে কাজ করাটা উপভোগই করছেন, ‘তিনি (কোচ) প্রথমেই আমাদের পরিষ্কার করে দিয়েছেন, আমাদের কাছে কী তাঁর চাওয়া। তিনি এমন একজন কোচ, যিনি ঠান্ডা মাথায় সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেন। আর মানুষ হিসেবেও দারুণ।’

কথামালা

সাংবাদিকদের মাধ্যমেই আমি প্লাতিনির কাছে ক্ষমা চাচ্ছি, তবে পেলের কাছে কিন্তু না।’
মিশেল প্লাতিনির কাছ থেকে
চিঠি পাওয়ার পর মন গলেছে ডিয়েগো ম্যারাডোনার

‘গোল নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। গোল এমনিতেই আসবে। এটা বড় কোনো সমস্যা নয়।’
দক্ষিণ কোরিয়া ম্যাচের পর
লিওনেল মেসি

‘তুমি মাঠে নামলে খুব
খুশি হতাম।’
ডেভিড বেকহামকে শান্তিতে নোবেলজয়ী ডেসমন্ড টুটু

‘এবার জীবন-মরণ খেলা
শুরু হয়ে গেছে।’
দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার প্রত্যয় নিয়ে প্যারাগুয়ের কোচ জেরার্দো মার্টিনো

‘আমি এখনো পর্যন্ত গোলরক্ষক হিসেবে খেলতে পছন্দ
করি না।’
নিজের ভূমিকাটা পছন্দ নয় যুক্তরাষ্ট্রের তারকা গোলরক্ষক
টিম হাওয়ার্ডের

‘এরপর আর ফুটবল নিয়ে ভাবারই কিছু বাকী নেই।’
মেক্সিকোর কাছে হারার
পর ফ্রান্স অধিনায়ক
প্যাট্রিক এভরা

‘এখন অলৌকিক কিছু
একটা প্রয়োজন।’
অলৌকিক কিছুর আশায় ফরাসি কোচ রেমন্ড ডমেনেখ

‘আমি খুবই হতাশ। ফ্রান্স
তো গোলে একটাও শট
নিতে পারল না।’
ফ্রান্সের হতাশাজনক পারফরম্যান্সে ক্ষুব্ধ-হতাশ জিনেদিন জিদান

‘ও গ্রেট খেলোয়াড়। নিজের দিনে ও যেকোনো ম্যাচ জিতিয়ে দিতে পারে।’
সতীর্থ কাকা সম্পর্কে ব্রাজিলিয়ান তারকা রবিনহো

ঘানা-ক্যামেরুনের দিকে তাকিয়ে আফ্রিকা

হারলেই সব সম্ভাবনা প্রায় শেষ—এমন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়া আজ তাদের দ্বিতীয় ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে ঘানার। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে তারা দলে পাচ্ছে না টিম কাহিলকে। গোলের জন্য ওরা কাহিলের দিকেই তাকিয়ে থাকত। এখন মনে হচ্ছে, সেই শূন্যস্থানটা পূরণের ভার থাকবে হ্যারি কেউয়েলের কাঁধে।
সব ধরনের খেলাতেই অস্ট্রেলীয় মানসিকতার আলাদা কদর আছে। দৃঢ়চেতা স্বভাবের জন্য ওরা পরিচিত। প্রথম ম্যাচে জার্মানির কাছে নাস্তানাবুদ হওয়ার পরও আমার ধারণা, এই ম্যাচে ওরা ভালো করবে। ঘানার বিপক্ষে ওদের রেকর্ডও ভালো। ঘানা অবশ্য প্রথম ম্যাচে সার্বিয়াকে হারিয়ে দিয়ে ভালো শুরু করেছে।
আফ্রিকার এ দলটি শারীরিকভাবে বেশ শক্তপোক্ত। মাঝমাঠে মুনতারি আর আপিয়াহর মতো ভালো মানের অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছে ওদের। গোলপোস্টে কিংসন, রক্ষণে জন মেনশাহ আর পান্টসিল ওদের ডিফেন্সকে বেশ শক্তিশালী করেছে। ঘানার দুর্বলতা আসলে গোল করায়। দুটি ম্যাচ ড্র করলেই ওরা পরের রাউন্ডে যাবে। ফলে আজকের ম্যাচে ওরা ড্রয়ের মানসিকতা নিয়েই খেলবে। অন্যদিকে আক্রমণের বিকল্প নেই অস্ট্রেলীয়দের। অস্ট্রেলীয়রা কাহিলকে হারিয়ে আক্রমণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। রক্ষণটাই এখন ওদের বড় ভরসা। আর তাই একটা গোলও এই ম্যাচের ফলনির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।
হল্যান্ডের এই দলটার সবকিছুই আছে। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ভাস্বর খেলোয়াড়, সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা। আছে টানা ২০ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ডও। রক্ষণটাও অটুট। মাঝমাঠে আছে ফন বোমেল, স্নাইডার আর ফন ডার ভার্টের মতো খেলোয়াড়। ফন পার্সি আর ডির্ক কিউটকে নিয়ে গড়া আক্রমণভাগও তীক্ষ। ডেনমার্ক ম্যাচে ওরা খাপ খাইয়ে নিতে সময় নিয়েছে। কিন্তু দারুণ খেলেছে দ্বিতীয়ার্ধে। যোগ্যতর দল হিসেবেই পেয়েছে ২-০ গোলের জয়। তারা দল হিসেবে অদম্য।
ক্যামেরুনকে হারিয়ে আসা জাপান দেখিয়ে দিয়েছে, শারীরিকভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গেও ওরা ভালোই লড়তে পারে। আজকের ম্যাচে ওদের নির্ভরতার প্রতীক হয়ে থাকবে অধিনায়ক ইয়োজি নাকাজাওয়া এবং সুসংগঠিত রক্ষণ। প্লে-মেকার সানসুকে নাকামুরা আর মিডফিল্ডার কিউসুকে হোন্ডাও আজ নজর কাড়বে। হোন্ডা তো ডাচ ক্লাব ভিভিভি ফেনলোতেই খেলেছে। গত ম্যাচের জয়ের নায়কও ছিল সে। এই ম্যাচে ড্র পেলেও বর্তে যাবে জাপান। ওরা তাই প্রতিপক্ষকে বেশি জায়গা দিয়ে খেলতে চাইবে না আজ। ডাচদের হতাশ করে পাল্টা-আক্রমণে যতটা সম্ভব সুবিধা তুলে নিতে চাইবে ওরা। হল্যান্ড আজ জিতলে পরের রাউন্ড নিশ্চিত করে ফেলবে। কাজটা নিশ্চয়ই পরের ম্যাচের জন্য ওরা জমা করে রাখতে চাইবে না।
ক্যামেরুন ও ডেনমার্ক দুই দলই প্রথম ম্যাচটা হেরে গেছে। ফলে আজকের ম্যাচটা তাদের জন্য অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। ক্যামেরুন নিশ্চয়ই তাদের খেলা নিয়ে হতাশ। সং, জেরেমি, মাকুন, স্টেফানে এমবিয়াদের নিয়ে গড়া ওদের রক্ষণ অনেক অভিজ্ঞ। মাঝমাঠে আলেক্স সং অনেক সৃষ্টিশীল। অধিনায়ক ইতো তো স্ট্রাইকার হিসেবে অদম্য। তাদের সক্ষমতা আছে। কিন্তু ধারাবাহিকতার বড্ড অভাব। মাঝেমধ্যেই ভুল করে ফেলে। জাপান ম্যাচে এটা বেশ বোঝা গেছে। ডেনমার্ক সেদিক দিয়ে বেশ সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খলিত, পরিশ্রমী। টমাসন, বেন্টনার ও অভিজ্ঞ সোরেন লারসেনের মতো ফরোয়ার্ড আছে ওদের। সিমন কায়ের, সিমন পোলসেন আর ড্যানিয়েল অ্যাগারের মতো ডিফেন্ডারও আছে যারা বেশ অভিজ্ঞ আর সংগঠিত। মাঝমাঠ চষে বেড়ায় ড্যানিয়েল ইয়েনসেন, ক্রিশ্চিয়ান পোলসেনরা।
গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দলের কাছে হেরে যাওয়া এক কথা। গ্রুপের দুর্বল দলের কাছে হেরে যাওয়া আরেক কথা। এই দুই দলের মানসিক অবস্থা তাই আজকের ম্যাচে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। সমান লড়াইয়ের একটা ম্যাচই আমি আশা করছি। যদিও আমার ধারণা, ম্যাচটা ডেনমার্ক ২-১ গোলেই জিতবে।

ফরাসিরা শুধু মাঠেই ছিল

এমন ছন্নছাড়া ফুটবল খেলার দল তো ওরা নয়! প্রথম ম্যাচে বাজে খেলার পরও প্রত্যাশা ছিল দ্বিতীয় ম্যাচে ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু উল্টো আরও নুয়ে পড়ল। উঠে দাঁড়ানোর শক্তিই যেন হারিয়ে ফেলেছে ফ্রান্স। এরই পরিণতি—গ্রুপ থেকে দলটির বিদায় আসন্ন।
জিদানের ফ্রান্স আর এভরার ফ্রান্স, আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এই ফ্রান্সে দলীয় গাঁথুনির ছিটেফোঁটা নেই। একটা বড় দল মাঠে নামলে তো বোঝাতে হবে তাদের উপস্থিতি। ফ্রান্স মাঠে আছে বোঝার উপায়ই ছিল না।
প্রতিপক্ষকে চিন্তায় ফেলতে চাই আতঙ্ক তৈরি। ১৯৯৮ চ্যাম্পিয়নদের খেলায় সেটি কোথায়? ১১ জন ফরাসি মাঠে ছিল শুধু। সবাই ‘এক’ হতে পারেনি। ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ছিল না কারোরই। শুরুর দিকে ফ্রাঙ্ক রিবেরির বিচ্ছিন্ন কিছু চেষ্টা চোখে পড়লেও একটা সময় সেও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মালুদা, আনেলকা—যাদের ওপর ফ্রান্সের আশা ছিল তারা দলকে বেশি কিছুই দিতে পারেনি। ফরাসিদের জন্য যা খুবই হতাশার।
অন্য বিভাগগুলো যেমন-তেমন, রক্ষণই তো ঠিক নেই দলটির! দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার গালাস আর আবিদালের মধ্যে বিন্দুমাত্র বোঝাপড়া ছিল না। আবিদালকে মনে হয়েছে ও বুঝি দলের বোঝা হয়ে গেছে। গালাসেরও একই দশা। তাদের বুঝতে হবে, কার কী দায়িত্ব। কে কখন বলে যাবে। কে কার সাপোর্টে থাকবে? কিন্তু ওরা কখনো দাঁড়িয়ে ছিল, কখনো ধুমধাম বল সামনে মেরেছে। গালাস তো মনে হয় অপেক্ষা করছিল কখন খেলাটা শেষ হয়। খেলার মধ্যেই সে ছিল না। এত কিছুর পরও গোলরক্ষক হতে পারত দলের শেষ ভরসা। সেও গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েছে। নিজের ওপর তার আস্থা ছিল না।
রক্ষণের সঙ্গে মাঝমাঠের সেতুবন্ধ গড়ে ওঠেনি। মাঝখানে অনেকটা ফাঁকা জায়গা মেক্সিকোকে ছেড়ে দিয়েছে ফ্রান্স। তাদের পাস ঠিকমতো হচ্ছিল না। লম্বা পাসগুলো তো এত বাজে ছিল যে এই পর্যায়ের ফুটবলে বেমানান। সবকিছু মিলিয়ে ফ্রান্সকে অসহায় লাগছিল। এটা শুধু শেষ দিকে নয়, খেলা শুরুর পর থেকেই বোঝা গেছে এই দল নুয়ে পড়বে।
মেক্সিকোর কৃতিত্ব প্রাপ্য। উজ্জীবিত হয়ে খেলার ফল তারা পেয়েছে। মানসিকভাবে চাঙা থেকে খেলার কোনো বিকল্প নেই। নতজানু দল কখনো দাঁড়াতে পারে না।
ফ্রান্সের কেন এই হাল? আমি বলতে পারব না। পত্রিকায় পড়েছি, কোচের সঙ্গে খেলোয়াড়দের দূরত্ব আছে। অনুশীলনে মালুদার সঙ্গে কী নিয়ে নাকি ঝামেলাও হয়েছে। কোচ রেমন্ড ডমেনেখ অনেক দিন ধরে এই দলটার সঙ্গে আছেন। সম্ভবত দলটাকে তিনি উজ্জীবিত করতে পারেননি। যেটা খুব দরকার ছিল। আসলে সুর-লয়-তাল কেটে গেলে ভালো গান তো হবে না।
ফ্রান্স যদি উত্তর মেরুর দল হয়, তাহলে দক্ষিণ মেরুর দল আর্জেন্টিনা। একই দিনে দুই বড় দলের পারফরম্যান্সে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। আর্জেন্টিনা দারুণ ফুটবল খেলেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ‘মুক্ত ও সাবলীল’ ছিল ম্যারাডোনার দল।

মেক্সিকান ওয়েভ তোলার সময়

সুসময় খুব কম আসে। তবে যখন আসে, প্রশংসা আর পিঠ চাপড়ে দেওয়ার লোকের অভাব হয় না! আপনজনদের সঙ্গে বাইরের লোকজনও মিলে যায় পাশে। দৃষ্টান্ত স্থাপনে জিনেদিন জিদানকেই তো পেয়ে গেছেন মেক্সিকানরা। ম্যাচ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় স্বয়ং মেক্সিকান কোচ হাভিয়ের আগুরি বলেছেন, ‘খুবই ভারসাম্যপূর্ণ ম্যাচ ছিল এটি।’ অথচ ফরাসি মহানায়ক জিদান বলেছেন, মাঠে ফ্রান্সের চেয়ে মেক্সিকোই নাকি ছিল ভালো দল!
জিদানের এই প্রশংসাটুকুর কোনোই দরকার ছিল না। ফ্রান্সকে হারিয়ে উজ্জ্বল হয়েছে প্রথম লক্ষ্য দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলার স্বপ্ন। ৬৪ মিনিটে প্রথম গোল করা হাভিয়ের হার্নান্দেজ যেমন বলেই দিয়েছেন, এই জয় মেক্সিকোকে গর্বিত করেছে। প্রথম গোল করেছেন, ম্যাচ শেষে হয়েছেন প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ। কিন্তু এসব নয়, দলের জয়টাই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই তরুণ স্ট্রাইকারকে বেশি খুশি করেছে, ‘গোল কিংবা ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ার চেয়ে আমি বেশি খুশি আমরা জিতেছি বলে। আমি খুশি, আমরা দেশের মানুষকে জয় উপহার দিতে পেরেছি।’
জয়ে আনন্দ কার না হয়? কিন্তু তিনি তো কোচ! মেক্সিকান কোচ তাই রয়েসয়ে বলেছেন, ‘এটা ছিল খুবই ভারসাম্যপূর্ণ একটি ম্যাচ। প্রথম গোলটি যারা করত, জিতে যেতে তারাই। আমাদের জন্য কঠিন এক জয় ছিল এটা।’ প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষ ফ্রান্স কিছুটা হলেও উজ্জ্বল ছিল। এই সত্যটাও স্বীকার করেছেন আগুরি, ‘শুরুতেই ফ্রান্স চাপ প্রয়োগ করে খেলতে থাকায় প্রথমার্ধ ছিল আমাদের জন্য কঠিন। তবে দ্বিতীয়ার্ধে ব্যাপারটি সহজ হয়ে যায়।’ অন্য দলগুলো যেখানে দুই সপ্তাহও একত্রে অনুশীলনের সুযোগ পায়নি, সেখানে আগুরি দলকে একত্রে অনুশীলন করাতে পেরেছেন টানা তিন মাস, বিশ্বকাপে দলের প্রত্যাশিত পারফরম্যান্সের পেছনে এটাকেই বড় করে দেখছেন মেক্সিকান কোচ, ‘আমরা টানা তিন মাস একত্রে কাজ করেছি। ফলে দল একটা ভালো প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রথম লক্ষ্যে (দ্বিতীয় রাউন্ড) পৌঁছাতে আমাদের এখনো উরুগুয়ের বিপক্ষে ৯০ মিনিট সময় আছে।’
হার্নান্দেজের দৃষ্টিটা কোচের চেয়েও সুদূরে প্রসারিত, ‘আমরা অনেক দূরে যেতে চাই। এই জয় তার প্রথম পদক্ষেপ। তবে এখন আমরা উরুগুয়ের ম্যাচ নিয়েও চিন্তা করছি না। আমরা চাই মুহূর্তটি উপভোগ করতে।’

গতকালের ফল

সার্বিয়া ১: ০ জার্মানি
স্লোভেনিয়া ২: ২ যুক্তরাষ্ট্র

মেসিডোনার ‘বিপ্লব’

৭৫ মিনিটে সার্জিও আগুয়েরো নামলেন, উঠে এলেন কার্লোস তেভেজ। তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা।
৩৩, ৭৬ ও ৮০ মিনিটের তিন গোলে হ্যাটট্রিক করে ৮২ মিনিটে উঠে গেলেন গঞ্জালো হিগুয়েইন। ডাগ-আউট থেকে কয়েক পা দৌড়ে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন ম্যারাডোনা।
খেলার শেষ বাঁশি বাজল, মাঝবৃত্তে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে জয় উদ্যাপন করছেন খেলোয়াড়েরা। তাঁদের কোচও যেন তখন ফিরে গেছেন খেলোয়াড়ি জীবনে। ধূসর রঙের স্যুট পরা লোকটা লাফাতে লাফাতে গিয়ে যোগ দিলেন উদ্যাপনে। একে একে জড়িয়ে ধরলেন সবাইকে। আনন্দোৎসব চলল মিনিট কয়েক। তবে ম্যারাডোনার আবেগ যেন বাঁধ মানতে চাইছিল না কিছুতেই। ড্রেসিং রুমে ঢোকার পথেও কোচ কারও চুল নেড়ে দিলেন আদর করে। কারও পিঠে বুলিয়ে দিলেন স্নেহস্পর্শ।
কিন্তু মেসির জন্য তো ওটুকু করলেই চলে না। দু গালে চুমু খেলেন। চুলে হাত বুলিয়ে পিঠে চাপড় দিলেন বারকয়েক। আর মেসি হাত তুললেন করতালিমুখর সমর্থকদের দিকে। এই অভিবাদনটুকু না জানালে সেটি যে অকৃতজ্ঞতা হয়। এদের ভালোবাসাই বার্সেলোনার মেসিকে আড়ালে ঠেলে আর্জেন্টিনার মেসিকে বের করে এনেছে। এই মেসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের পাশাপাশি একজন পরিপূর্ণ নেতারও ভূমিকায়। সারা মাঠে তাঁর খেলায় আর নেতৃত্বে বিধ্বস্ত দক্ষিণ কোরিয়া।
মিক্সড জোনে গিয়ে মেসি এই বড় জয়ের জন্য সবার অবদানকে নতমস্তকে শ্রদ্ধা জানান। আবার শিশুতোষ ভুল করে গোল খাওয়ানোর দায়ে অভিযুক্ত ডেমিচেলিসের পাশে দাঁড়ান, ‘আসলে “মিচো”কে (ডেমিচেলিস) দোষ দেওয়াটা ঠিক হবে না। লি চুং-ইয়ং যে বক্সে ঢুকে গোলটা পেয়ে গেল, তা ওই ভুভুজেলার কারণে। আমরা চিৎকার করছিলাম। কিন্তু ও কিছুই শুনতে পাচ্ছিল না, এটা সে দেখেইনি, তাই বলের দখল হারিয়ে ফেলেছে। ভুভুজেলার শব্দের কারণে আমিও তো বারদুয়েক বল হারিয়ে ফেলেছিলাম।’
সংবাদ সম্মেলনে ম্যারাডোনাকেও ডেমিচেলিসের ভুল নিয়ে কথা বলতে হয়েছে। কথা বলতে হয়েছে রক্ষণ দুর্বলতা নিয়ে। তবে জয়ের আনন্দে উদ্বেল আর্জেন্টিনা কোচও মেসির মতোই ডেমিচেলিসকে কাঠগড়ায় তুলছেন না, ‘ও (ডেমিচেলিস) একটু অমনোযোগী হয়ে পড়েই বলের দখল হারিয়ে ফেলেছে। খেলায় একটু-আধটু ভুল হতেই পারে। ওকে নিশ্চয়ই ভুলটা চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দিতে হবে না, নিজেই বুঝতে পারছে। আর রক্ষণ নিয়েও আমি চিন্তিত নই। একেকটা করে ম্যাচ যাবে, আর সব গুছিয়ে ফেলব। আমি খুশি যে ছেলেরা বল পায়ে রাখতে পারছে, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে।’
স্পেনের এক নারী সাংবাদিকের প্রশ্নে হো হো করে একচোট হেসে নিলেন আর্জেন্টিনা কোচ, যাঁকে প্রথম ম্যাচের পরই মিডিয়ার বড় একটা অংশ ‘স্যার’ উপাধি দিয়ে দিয়েছে। প্রশ্নটা ছিল, নিজের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ম্যাচে স্যার ম্যারাডোনাকে কি আরও বেশি উজ্জ্বল মনে হলো? স্যার ম্যারাডোনা হাসি থামিয়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যান, ‘সে তো আমি বলতে পারব না। আমি শুধু জানি আর্জেন্টিনাকে ভালো খেলতে হবে, বিশ্বকাপটা জিততে হবে।’
একটা দল প্রত্যাশামতো ভালো খেলে তখনই, যখন কোচের রণকৌশল খেটে যায়। ম্যারাডোনা এ ম্যাচে দেখিয়েছেন রণকৌশলটা তিনি বোঝেন। হিগুয়েইনের পেছনে তেভেজ দ্বিতীয় স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেছেন অনেকটা মুক্ত থেকে। ডান প্রান্ত থেকে দৌড়ে বাঁয়ে গেছেন, মেসির জোগান দেওয়া বল দিয়েছেন হিগুয়েইনকে, নতুবা অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়াকে পাস দিয়েছেন। প্রথমার্ধে গোলার মতো এক শটে দক্ষিণ কোরিয়াকে কাঁপিয়েও দিয়েছেন। তার পরও ৭৫ মিনিটে তাঁকে তুলে জামাই আগুয়েরোকে নামালেন কেন ম্যারাডোনা?
কারণ তিনি দেখেছেন, তেভেজ তাঁর গতি দিয়ে যেন ঠিকমতো কোরিয়ার রক্ষণ চিরে ফেলতে পারছেন না। তাই প্রয়োজন বোধ করেছেন একজন গতিসমৃদ্ধ ফরোয়ার্ডের, যে শেষ পাসটিও ভালো দিতে পারবে। মেসির সঙ্গে কার বোঝাপড়াটা বেশি হবে, সেটি ভেবেই নামিয়েছেন আগুয়েরোকে। কাজ হলো ম্যাজিকের মতো। মেসির কাছ থেকে বল পেয়ে আগুয়েরোর কয়েকটা টানেই কোরীয় রক্ষণ এলোমেলো হয়ে গেল। এল আরও দুটি গোল। কোচ ম্যারাডোনার এই বিচক্ষণতাকে আপনি কী বলবেন?
ওদিকে মেসিও যেন তাঁর ২২ বছর বয়সকে ছাপিয়ে পরিণত হয়ে উঠছেন আরও। গত বিশ্বকাপে সার্বিয়া-মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে মাত্রই ১৬ মিনিট খেলে আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছিলেন ষষ্ঠ গোল। ওই টুর্নামেন্টের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা এই বিশ্বকাপে ১৮০ মিনিট খেলে ফেললেন, গোল পেলেন না। অথচ তাঁর রিয়াল মাদ্রিদ প্রতিদ্বন্দ্বী হিগুয়েইন গত দুই বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিকের মালিক হয়ে গেলেন তাঁর সৌজন্যেই। কখন গোল পাবেন মেসি? একটু আক্ষেপ নেই মনে? মেসির মুখে সেই নেতার মতো উত্তর, ‘গোল আসবে। এটা বিরাট কোনো সমস্যা নয়। আমি এ ম্যাচেও সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু বল জালে গেল না, এই আর কি! আমি জয় পেয়েই খুশি। আসল কথা হলো আমরা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি। এটা অবশ্যই আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ হবে।’
আর্জেন্টিনার ম্যাচ থাকলেই গ্যালারিগুলোকে আকাশি-সাদা সমুদ্রে ভরিয়ে তোলা আর্জেন্টাইন সমর্থকদের হাতে অনেক ব্যানার দেখা যায়। এ ম্যাচে ম্যারাডোনার ছবি আঁকা ব্যানার ছিল, ছিল মেসির ছবি আঁকা ব্যানারও। আর ছিল সর্বকালের অন্যতম সেরা বিপ্লবী চে গুয়েভারার ছবি, পাশে চে-ভক্ত ম্যারাডোনা। দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, ম্যারাডোনা-মেসি যুগলবন্দী তো বিশ্বকাপে নতুন বিপ্লবের অঙ্গীকারই বয়ে এনেছে!

পাকিস্তান ২৬৭ রানে অলআউট

ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচ চলছে। এর পরও যেন নিষ্প্রাণ ক্রিকেটপ্রেমীরা। কারণ সবার দৃষ্টিজুড়ে কেবল বিশ্বকাপ ফুটবল। ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরের আগ্রাসনে উত্তেজনা হারিয়ে গেছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যকার ম্যাচেরও। বিশ্বকাপ ফুটবলের ডামাডোলের মধ্যে এশিয়া কাপের চতুর্থ ম্যাচে আজ শনিবার প্রথমে ব্যাট করে তিন বল বাকি থাকতেই ২৬৭ রানে অলআউট হয়ে গেছে পাকিস্তান।
শুরু থেকে ব্যাটিং ভালোই হয়েছিল পাকিস্তানের। উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান সালমান বাট ৭৪ রানে করে রানআউটের শিকার হন। ৩ উইকেটে পাকিস্তানের রান ছিল ১৪৬ রান। পাকিস্তানের সংগ্রহ আরাও বড় হতে পারত। কিন্তু প্রাভিন কুমার ও জহির খানের কারণে তা সম্ভব হয়নি। শেষের দিকে এই দুই বোলার দ্রুত উইকেট নিতে থাকলে তিন বল বাকি থাকতেই গুটিয়ে যায় পাকিস্তানের ইনিংস। দলের হয়ে কামরান আকমল ৫১, শোয়েব মালিক ৩৯ ও শহিদ আফ্রিদি ৩২ রান করেন। ভারতের পক্ষে প্রাভিন কুমার তিনটি এবং জহির খান ও হরভজন সিং দুটি করে উইকেট পান।

ড্রয়ের বৃত্তে ইংল্যান্ড

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোলরক্ষক গ্রিনের ভুলে ১-১। কাল দ্বিতীয় ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ০-০। ইংল্যান্ড যেন ঘুরপাক খাচ্ছে ড্রয়ের বৃত্তে। দুই ম্যাচে দুই পয়েন্ট—ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ-তরী শুরুতেই ঝড়ের কবলে। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত সব খেলোয়াড়ের সাধ্যে কুলোয়নি আলজেরিয়ার পোস্টে বল পাঠাতে। স্লোভেনিয়ার কাছে হেরে বিশ্বকাপ শুরু করা আলজেরিয়া সুযোগ পেলেই আক্রমণে উঠেছে। আবার চাপের মুখে সংগঠিত রক্ষণ আর গোলরক্ষক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে ল্যাম্পার্ড-রুনিদের সামনে। ইংল্যান্ড তাহলে সত্যিই ‘কাগুজে বাঘ’!