Friday, March 21, 2025

কাওরান বাজারের চিঠি: আছিয়া, আমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছি by সাজেদুল হক

২০ বছর পেশায় আছি। লিখেছি বিচিত্র সব বিষয়ে। আনন্দ-বেদনার এক মহাকাব্য। কখনো কখনো খুব ক্লান্তি লাগে। সব ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছা করে। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বের হওয়া লাশের পা এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়। এই তো সেদিন জুলাই-আগস্টে আমাদের সন্তানদের, ভাই-বোনদের খুন হতে দেখেছি। অনেক দিন ঠিকঠাক ঘুমাতে পারিনি। এখনো মাঝে মাঝে আঁতকে উঠি।

স্থিতিশীলতা বলতে যা বুঝায় দেশে আজও তা ফেরেনি। প্রতিবেশী দেশের মিডিয়া প্রতি মুহূর্তে গুজব উৎপাদন করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা। এরই মধ্যে আছিয়ার ভয়ঙ্কর খবর নজরে আসে। পুরো খবরটা পড়ি না। হৃদয় থেকে প্রার্থনা করি মেয়েটা অন্তত বেঁচে যাক। কিন্তু আঁচ করতে পারি, খুব একটা আশা নেই।

বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে সে ভয়ঙ্কর খবর পাওয়া যায়। আছিয়া নেই। নেই মানে আর নেই। সেনা হেলিকপ্টারে শেষবারের মতো তার নিথর দেহ বাড়ি ফেরে। আমি পালিয়ে থাকি। এ নিয়ে কিছু লিখতে, বলতে ইচ্ছা করে না। মানুষ কী করে এত বর্বর হয়? প্রশ্নটা অনেকবারই মনে আসে। কল্পনাতেও উত্তর পাই না। কোনো সমাধানও পাই না। আট বছরের এক ছোট্ট শিশু। তার ওপর কী করে এমন বর্বর, অমানবিক নির্যাতন চালাতে পারলো। এরা কি সেই মানুষ যারা পশুর চেয়েও নিষ্ঠুর।

মানবজমিনের জন্য হেডলাইন ভাবতে থাকি। সাংবাদিকতায় নিষ্ঠুর কাজ। শেষ পর্যন্ত একটা স্থির করি, ‘দুঃখ ভারাক্রান্ত বাংলাদেশ।’ সন্ধ্যায় মতি ভাইর (মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রধান সম্পাদক, মানবজমিন) সঙ্গে আলাপ করি। মতি ভাই জানতে চান, ‘এটা নিয়ে কি আপনি লিখছেন?’ আমি তেমন কিছু বলি না। আসলে লিখতে ইচ্ছা করে না। কিছুক্ষণ পর কাজল দা (কাজল ঘোষ, নির্বাহী সম্পাদক জনতার চোখ, বার্তা সম্পাদক মানবজমিন) জনতার চোখ-এর জন্য আছিয়াকে নিয়ে লিখতে বলেন। আমি আবার আঁতকে উঠি। রাতের একটা বড় অংশ ভাবি কী লিখা যায়।
নজরে আসে কবি ফারুক ওয়াসিফের লেখা। তিনি লিখেছেন-   

আছিয়ার আজান শোনো
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা  দেখি, পাখি দেখি, প্লেন দেখি।
আছিয়াকে দেখি না। কেবল ভালুকের  খোলস পরা রোমশ রাজনীতি দেখি। আমি আর আকাশের আশ্বাসে বিশ্বাস রাখি না।
আমি বিশ্বাস করি না, শিশুরা তারা বা পাখি হয়ে যায়। সামরিক হেলিকপ্টারের শব্দ কি তাদের ভালো লাগে? এভাবে কি কেউ বাড়ি ফেরে?
আমার বুকটা খুব ফাঁকা লাগছে। সর সর করে বালি সরে যাচ্ছে পায়ের তলে। আমি আমার মেয়েটাকে বুকে জড়াই, তবু ভয় কাটে না।
তোমার জরায়ুতে একটা শোকের পাথর বসে যাচ্ছে দেখে, আমি তাকাতে পারি না। যদি আমার দৃষ্টি পড়া মাত্রই সব নারীর চোখ পাথর হয়ে যায়!
আমিও পিতা, আমার বুকেও জমে  বেদনার নিকষিত দুধ। কালো দুধের অশ্রু উঠে আসে আমার চোখে। আমার  চোখ আজ তিস্তা নদীর মতো পাহাড়ি রাগ হয়ে বাজছে। আজ আর কথা হবে না। আজ আমরা আছিয়ার আজানে শামিল জানাজায়।

আজ মা আছিয়া একটু ঘুমাবে। কেবল মাটি, কেবল মাটি ছাড়া আমার  মেয়েটার কোনো মা নাই আজ।  
ফেসবুকেই ইসলামী বক্তা মাওলানা আবদুল হাই মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ লিখেছেন, ‘আম্মু, আছিয়া, তুমি এমনভাবে ‘বেঁচে গেলে আজ’ যে আমরা হাজারবার মরেও তার দায়  শোধ করতে পারবো না। আমি তোমার জন্য অঝোরে কাঁদছি, মা’রে! জানি, পুরো দুনিয়ার সবার চোখের সব পানিও  তোমার এ দুঃখের ভারের কাছে এক  ফোঁটারও সমান হতে পারে না। ওহহ! ভুলে গেছি বলতে আমরা কিন্তু সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার করবো, হুঁ! কত্ত বিচার আগেও আমরা করেছি!’
এই সব লেখা পড়ি আর ভাবি কী লেখা যায়! আছিয়া আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বাংলাদেশকে সে তাড়িয়ে বেড়ায়। এমনকি কেন যেন মনে হয় পুরো মানব সভ্যতাকে সে তাড়িয়ে বেড়ায়।
আবার বলি? আট বছরের একটি শিশু। তার সঙ্গে যখন এ বর্বরতা চলছিল কী ভাবছিল সে! অবিশ্বাস্য, অমানবিক। কোনো শব্দ দিয়েই তো এর ব্যাখ্যা করা যায় না। পৃথিবীতে সেই শব্দ আজও আবিষ্কার হয়নি।

কেন কিছু মানুষ নামধারী লোক এতটা অমানুষ হয়ে গেল? আইনের শাসন এখানে একটি বড় প্রশ্ন। সমাজে যখন দেখা যায় অপরাধীরা অর্থের জোরে, প্রতিপত্তির জোরে আইনকে অবজ্ঞা করতে পারে, অপরাধ আড়াল করতে পারে তখন এ ধরনের ঘটনা বেড়ে যায়। বাংলাদেশে আইনের শাসনের ক্ষেত্রে একটি বিরাট বিপর্যয় ঘটে গেছে। আমরা এখানে দেখছি বড় বড় অভিযুক্তরা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। আছিয়ার মর্মান্তিক ধর্ষণ, হত্যার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম আইনের সঠিক এবং নিরপেক্ষ প্রয়োগ করতে হবে। অপরাধীকে সর্বোচ্চ সাজা দিতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত দ্রুত এ মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। বড় কোনো ঘটনা ঘটলে আমাদের রাষ্ট্র নানা রকম উদ্যোগ নেয়, বাৎচিত করে। আবার সোশ্যাল মিডিয়া যখন চুপ হয়ে যায়, রাষ্ট্রও চুপ হয়ে যায়। যে কারণে অপরাধীরা সবসময় বিচারের মুখোমুখি হয় না। সবক্ষেত্রেই অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

সমাজে নৈতিকতার স্খলন হয়েছে ভয়ঙ্কর। শুধু আইন দিয়ে এসব অপরাধ বন্ধ করা যাবে না। এক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যক্তিদের আরও সোচ্চার হতে হবে।
আছিয়াকে নিয়ে লেখা সত্যি কঠিন। সান্ত্বনা জান্নাতে সে ভালো থাকবে। আর ধর্ষক আর খুনিদের জন্য নিশ্চয় অপেক্ষা করছে কঠিন শাস্তি।
পবিত্র গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘আমার কথাই সত্যে পরিণত হবে যে, নিশ্চয় আমি জাহান্নাম পূর্ণ করবো মানুষ ও জীন উভয় দ্বারা।’ সূরা আস সাজদাহ।

সূত্র- জনতার চোখ

mzamin


সংস্কারপ্রক্রিয়াকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে: আলী রীয়াজ

বিভিন্নভাবে সংস্কারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ। তিনি বলেছেন, সংস্কারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা বাইরে থেকে হচ্ছে, ভেতর থেকেও হচ্ছে।

‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে আলী রীয়াজ এ কথা বলেন। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আজ বৃহস্পতিবার এই বৈঠকের আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

এই গোলটেবিল আলোচনায় বক্তাদের কথায় উঠে আসে, দেশের শাসনব্যবস্থার বিদ্যমান কাঠামো স্বৈরাচার তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক, কাঠামোগত সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে সংস্কারের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো বিরোধ নেই। এটা একসঙ্গেই চলতে পারে। কিছু জরুরি সংস্কার করে নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। কেউ কেউ বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনতার এত বছরে প্রয়োজনীয় সংস্কার করেনি। তাই সংস্কার না করে কোনোভাবেই নির্বাচন দেওয়া যাবে না।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেন, বিভিন্নভাবে সংস্কারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। বাইরে থেকে হচ্ছে, ভেতর থেকেও হচ্ছে। যারা মনে করে, বর্তমান কাঠামো অব্যাহত রাখা দরকার। বিশেষ করে যারা পরাজিত শক্তি, তারা এটা মনে করে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

আলী রীয়াজ আরও বলেন, নাগরিকদের অংশগ্রহণ, চাপ ও অন্তর্ভুক্তি ছাড়া কোনোভাবেই সংস্কারপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর পর নাগরিকদেরও মতামত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘যে অভাবনীয় রক্তপাতের মধ্য দিয়ে এ জায়গায় এসেছি, সেখান থেকে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

আলী রীয়াজ বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই দুর্বল ও ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোকে গত ১৬ বছরের ব‍্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন ধ্বংস করে দিয়েছে। সংস্কারের প্রশ্ন উঠেছে সে কারণেই। বিচার বিভাগ কার্যত ধ্বংস করে দিয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার। জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করা না গেলে নির্বাচন হলেও আগের পরিস্থিতি হবে। তাই কাঠামোগত সংস্কারের আর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান কাঠামোগত ব্যবস্থায় স্বৈরতন্ত্রের মোকাবিলা করা যাবে না।

সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবিত সুপারিশে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দিয়ে বহুত্ববাদ ও রাষ্ট্রধর্ম রাখার মধ্যে স্ববিরোধিতা আছে, বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশে মতপার্থক্য আছে; এ নিয়ে এক বক্তার প্রশ্নের উত্তরে আলী রীয়াজ বলেন, সব কমিশন স্বাধীন সুপারিশ করেছে। রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে এটি চূড়ান্ত হবে। আর বিদ্যমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেও বিভিন্ন সময় সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়েছে। বহুত্ববাদ সবার প্রতিনিধিত্ব করবে। বিভিন্ন সময় প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেও রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করেনি। এর একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা আছে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্যরা সব বিষয়ে ঐকমত্য হলেও রাষ্ট্রধর্ম রাখার বিষয়ে সবাই একমত হননি।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মূলত তিনটি দায়িত্ব। স্বৈরাচার যাতে আর ফিরতে না পারে, তাই গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার করা। যারা অন্যায় করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের বিচার করা। আর নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এ তিনটা একটা আরেকটার প্রতিবন্ধকতা নয়, একসঙ্গে সমান্তরালে চলতে পারে। নির্বাচনের জন্য কিছু সংস্কার এখনই করতে হবে। কিছু নির্বাচনের পরে করলেও হবে। নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও দায়বদ্ধ করতে হবে। নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষ সরকার দরকার।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ সংস্কার চায়। রাজনৈতিক দলগুলোও চায়। তারা প্রস্তাব দিচ্ছে। এটা জাতীয় দাবি। স্বৈরাচার জন্ম নেয় ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্র হবে না। এগুলো ঠিক করতে হবে। না হলে সংকটে থাকা রাষ্ট্র আরও গভীর সংকটে পড়বে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের অনেক দোষ আছে, কিন্তু রাজনৈতিক দল ছাড়া দেশ চালানো যাবে না। দলে সংস্কার করতে হবে। তবে নির্বাচনের দিকে না গিয়ে সংস্কারের দিকে গেলে, তা হবে বিরাজনীতিকরণ। যৌক্তিক কিছু সংস্কার করে নির্বাচনের দিকে যেতে হবে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বিচারপতি এমদাদুল হক বলেন, বিচার বিভাগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলো সংস্কারে কমিশনের সুপারিশে এসেছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। নাগরিকদের মতামত পেলে এটি আরও সমৃদ্ধ হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, ২০০৭-০৮ সালের পর সংস্কার শব্দটা গালিতে পরিণত হয়েছিল, এখন আর সেটা মনে করা হচ্ছে না। অনেক কমিশন করা হয়েছে, সহস্র সুপারিশ এসেছে। তবে সাংবিধানিক সংস্কারটাই আসলে মূল সংস্কার। পাকিস্তান সরকারের সময়কার নির্বাচনে বিজয়ী সদস‍্যদের নিয়ে গণপরিষদ গঠন করে ১৯৭২ সালে সংবিধান করা হয়েছিল, যা বাংলাদেশের উপযোগী হয়নি। এরপর সংবিধান সংশোধন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থে হয়েছে।

সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান নিয়ে ওই সময় কোনো বিতর্ক হয়নি, শুধু বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এম এন লারমা। সংবিধানে সব জাতিগোষ্ঠীকে রাখা দরকার। সংবিধানে পরে কালাকানুন ঢুকে গেছে, এটার সংশোধন দরকার, পুনর্লিখন নয়। তিনি বলেন, লাখো শহীদের বিনিময়ে পাওয়া সংবিধান কলমের খোঁচায় কেউ বদলে দিতে পারে না। সংস্কার প্রস্তাবে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দিয়ে রাষ্ট্রধর্ম রেখে দেওয়া যৌক্তিক হয়নি। ধর্মনিরপেক্ষতা আওয়ামী লীগের বিষয় নয়। এটা সবার আন্দোলন ছিল। প্রজাতন্ত্রের জায়গায় নাগরিকতন্ত্র নিয়ে আসাটাও অযৌক্তিক।

রাজনৈতিক দলকে সংস্কারে বাধ্য করতে হবে

গোলটেবিলে অংশ নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির নাগরিক প্রতিনিধিরা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো অতীতে সংস্কার করেনি। এ কারণেই আন্দোলন হয়েছে। ঐকমত্য কমিশন রদ করে গণভোটের ব্যবস্থা করা হোক, জনগণ সিদ্ধান্ত দেবে। রাজনৈতিক দল কখনো ঐকমত্যে আসবে না, তবু সংস্কার করতে হবে। নির্বাচন হলে একদল গেছে আরেক দল আসবে, কোনো কিছু বদলাবে না। তাই দলগুলোকে বাধ্য করতে হবে সংস্কার মানতে।

২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলেন, সংস্কার করেই এ সরকার গদি ছাড়ার কথা বলুক। জীবনের বিনিময়ে এ সরকার এসেছে। তবে একটি সুপারিশের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ২১ বছরে একজনের লেখাপড়া শেষ হয় না, তিনি কীভাবে সংসদ সদস্য হয়ে দেশ চালাবেন!

কেউ কেউ বলেন, এখন যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে নাগরিক সমাজের ভূমিকা রাখতে হবে। এ সরকারের শুরুর দিকে শোনা গেলেও দায় ও দরদের কথা এখন শোনা যাচ্ছে না। যাঁরা বলেছেন, তাঁরা কি নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন! এই অস্বস্তিকর পরিবেশ কেউ চায়নি। ঘাত–প্রতিঘাত ও প্রতিহিংসার কথা বেশি শুনতে থাকলে পরের ধাপে যাওয়া কঠিন। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের কথা ভাবতে হবে।

ঢাবির সহযোগী অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ সাহান বলেন, নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে চাপ অব্যাহত না থাকলে সংস্কার কমিশনও একসময় চুপ হয়ে যাবে।

রাষ্ট্র সংস্কারের বিকল্প নেই

গোলটেবিল আলোচনার শুরুতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। এতে বলা হয়, ১১টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে ৬টি কমিশন পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সংক্ষেপে ছয়টি কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশ তুলে ধরা হয়। রাজনৈতিক দলসহ সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে স্বল্প সময়ের মধ্যে সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ঐকমত্যে আসবে বলে বিশ্বাস করে সুজন।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে আশা সৃষ্টি হয়েছে, আর যেন কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী শাসনের উদ্ভব না হয়। গণতন্ত্র যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সর্বোপরি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রে যাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়। আর এ স্বপ্নকে বাস্তব রূপায়ণ ঘটাতে হলে রাষ্ট্র সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। বিকল্প নেই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ ‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন। সিরডাপ মিলনায়তন, ঢাকা, ২০ মার্চ
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ ‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন। সিরডাপ মিলনায়তন, ঢাকা, ২০ মার্চ। ছবি: দীপু মালাকার

সংস্কার না হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরও ফ্যাসিবাদ ফিরতে পারে: আলী রীয়াজ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম# সংস্কার শুধু সরকারের ইচ্ছার বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক দল এবং নাগরিকদের বহুল আকাঙ্ক্ষিত বিষয়। তাই সংস্কারের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা ও নাগরিক সনদ প্রণয়ন করতে হলে নাগরিকদের সোচ্চার হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ।

বৃহস্পতিবার (২০ মার্চ) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর উদ্যোগে ‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বিচারপতি এমদাদুল হক, সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আসিফ মোহাম্মদ সাহান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান প্রমুখ। লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন সুজন-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।

ড. আলী রিয়াজ বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নটি ওঠার কারণ হলো, বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশে ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও ভঙ্গুর করে ফেলা হয়েছে। স্বাধীনতার পর বিগত ৫৪ বছরে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমরা দেখেছি, বিগত ১৫ বছরে বিচার বিভাগকে কীভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন না হলে, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে পুনগর্ঠিত করা না হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত হলেও ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা ফিরে আসতে পারে। তাই বাংলাদেশে ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের পুনরুত্থান ঠেকাতে হলে কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, শেখ হাসিনা দেশে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই ব্যবস্থায় পৌঁছাতে তার ১৫ বছর লেগেছে। তিনি নির্বাচন ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছিলেন। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে কারণে শেখ হাসিনার পলায়নের পর আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্য এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কাজ করছে, যাতে একটি ‘নাগরিক সনদ’ তৈরি করা যায়।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের তিনটি ম্যান্ডেট। একটি হলো, স্বৈরাচারী ব্যবস্থা যাতে আবার ফিরে আসতে না পারে সেজন্য কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করা; দ্বিতীয়ত মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা; তৃতীয়ত একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজন করা। এগুলো একইসঙ্গে হতে পারে, কোনোটি অপরের সঙ্গে সংঘর্ষিক নয়।

বিচারপতি এমদাদুল হক বলেন, বিচার বিভাগ নিয়ে অতীতে বিভিন্ন প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন তার প্রতিবেদনে এসব বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করেছে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ তুলে ধরেছে। আমি মনে করি, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু এখন সময় এসেছে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের।

ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ সত্যিকার অর্থেই ধর্মনিরপেক্ষ। এখানে সুফিবাদের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার ও প্রসার হয়েছে। কিন্তু তারপর সংস্কার কমিশনের জরিপে ৮৫ শতাংশ মানুষ ধর্মনিরপেক্ষতার বিপক্ষে মতামত দিয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়ে শুরু হওয়া ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিচিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনেক সমস্যা থাকলেও রাজনৈতিক দলের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালিত হতে হবে। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার ও দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাই যৌক্তিক কতগুলো সংস্কার করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, অতীতে সংস্কার একটি গালিতে পরিণত হলেও সংস্কার এখন বহুল আকাঙ্ক্ষিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আমি মনে করি, সংস্কারের পূর্বে আমাদের রাষ্ট্র ভাবনা কেমন হবে, তা পরিষ্কার করা উচিত। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বাংলাদেশে কখনই রাষ্ট্র ভাবনা ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে সুচিন্তিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রবর্তনের অল্প কিছু কাল পরেই এতে নানান সমস্যা পরিলক্ষিত হয়েছে। ফলে সংবিধানে অনেকগুলো সংশোধনী আনতে হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ সংশোধনী আনা হয়েছে ব্যক্তি স্বার্থে।

বিগত ১৬ বছরের অভিজ্ঞতার ফলে সংস্কার একটি অনিবার্য বাস্তবতা এবং এক্ষেত্রে একটি স্ট্যান্ড তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মূল প্রবন্ধ পাঠকালে দিলীপ কুমার সরকার ৫টি সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশসমূহ সংক্ষেপে তুলে ধরে বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বিশ্বাস জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোসহ সকল অংশীজনের সঙ্গে বসে স্বল্প সময়ের মধ্যেই সংস্কারের ব্যাপারে ঐকমত্যে আসতে পারবে এবং সেই ঐকমত্যের সূত্র ধরেই আমরা সংস্কার প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করব। এক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক রাজনৈতিক দলসহ অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর একটি তালিকা তৈরি করা; ঐকমত্যের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক সরকারের উদ্যোগে যে সকল সংস্কার প্রস্তাব কার্যকর করা হবে তা বিভাজিত করা; জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি জাতীয় সনদ প্রস্তুত করা; একটি জাতীয় সংলাপ আয়োজন করে জাতীয় সনদে সকল রাজনৈতিক দলসহ অন্যান্য অংশীজনের স্বাক্ষর গ্রহণের মধ্য দিয়ে সংস্কারের বিষয়ে তাদের অঙ্গীকারাবদ্ধ করা; অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য নির্ধারিত সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ সৃষ্টি করা; একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ তথা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা; বিজয়ী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা এবং নবগঠিত সরকারের নেতৃত্বে জাতীয় সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাগুলো বাস্তবায়নের করা এবং পরবর্তীতেও তা চলমান রাখার প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় সনদে এই মর্মে উল্লেখ থাকবে, ‘যে রাজনৈতিক দল বা জোটই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করুক না কেন, সেই দল বা জোট জাতীয় সনদে বর্ণিত সংস্কার প্রক্রিয়া আবশ্যিকভাবে সম্পন্ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং যে সকল দল বা জোট বিরোধী দলের আসনে বসবে, তারা আবশ্যিকভাবে তা সমর্থন করবে। জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকল রাজনৈতিক দলসহ সকলের জন্য অবশ্য পালনীয় একটি আচরণবিধি প্রণীত হবে। সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নসহ আচরণবিধি সংশ্লিষ্ট সকলে যথাযথভাবে মেনে চলছেন কি না, তা দেখার জন্য রাজনৈতিক দলসহ সকল অংশীজনের সমন্বয়ে একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠিত হবে। পাশাপাশি জাতীয় সনদের বিষয়গুলোকে সংবিধানে সন্নিবেশনের জন্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে একটি বিল আনা যেতে পারে। এক্ষেত্রে একটি বিকল্প ধারণা হতে পারে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে উচ্চ আদালতের পরামর্শ (গাইডেন্স) সাপেক্ষে একটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে জাতীয় সনদে বর্ণিত বিষয়সমূহকে সংবিধানের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।’ >>বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

সংস্কার না হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরও ফ্যাসিবাদ ফিরতে পারে: আলী রীয়াজ
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর উদ্যোগে ‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক

ইসরায়েলের নৃশংসতা নিয়ে যদি সবাই মুখ খুলত by ওয়েন জোন্স

ইসরায়েলের গণহত্যা কিছুদিনের জন্য থেমে ছিল, কিন্তু গত সোমবার রাতের ভয়াবহ বিমান হামলায় ফিলিস্তিনিরা আবারও সেই নৃশংসতার শিকার হলো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চার শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেক শিশু ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার অনুমতি দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলার পরপরই এলাকাবাসীকে দ্রুত এলাকা ছাড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়, যা মূলত জোরপূর্বক উচ্ছেদ। এতে নতুন করে স্থল অভিযান শুরুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, হামাস যুদ্ধবিরতির শর্ত মানেনি; যদিও ইসরায়েল নিজেই বারবার সেই শর্ত লঙ্ঘন করেছে।

এ হামলার পর সিএনএন জানায়, ইসরায়েলের আগ্রাসন যুদ্ধবিরতিকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। কিন্তু সত্য হলো, যদি অস্ত্রবিরতিকেই যুদ্ধবিরতি ধরা হয়, তাহলে এখানে আদৌ কোনো যুদ্ধবিরতি ছিল না। তথাকথিত যুদ্ধবিরতির সময় গাজায় মাত্র একজন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন, সেটাও ইসরায়েলি সেনাদের ভুলে। অন্যদিকে এই সময়ের মধ্যে গাজায় ১৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আর পশ্চিম তীরেও বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

এই বাস্তবতা দেখায়, কীভাবে ইসরায়েলের সহিংসতাকে সহজভাবে মেনে নেওয়া হয়, আর ফিলিস্তিনিদের জীবনকে মূল্যহীন করে তোলা হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একদিন নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবে, ‘এত বড় অপরাধ এত দিন ধরে চলতে দেওয়া হলো কীভাবে?’

আজকের যুগে মুঠোফোন আর ইন্টারনেট থাকার সুবাদে গাজায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের এত স্পষ্ট প্রমাণ আছে, যা অতীতের অপরাধের ক্ষেত্রে কখনো ছিল না। গাজার মানুষ ৫২৯ দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের ওপর চালানো ধ্বংসযজ্ঞের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করছেন এই আশায় যে বিশ্ব একদিন জেগে উঠবে এবং এই গণহত্যা বন্ধ হবে।

রঙিন পোশাক পরা একটি শিশুর নিথর দেহ পড়ে আছে; এক বাবা শেষবারের মতো মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন; সাদা কাপড়ে মোড়ানো পুরো পরিবার পড়ে আছে—এ ধরনের অগণিত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। হতভাগ্য এসব মানুষের নাম কোনো সরকারি নথিতে থাকবে না। অথচ এর আগে কখনো কোনো যুদ্ধাপরাধ এত স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়নি।

গত সপ্তাহে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইসরায়েল কীভাবে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের হত্যা করেছে, বন্দীদের ওপর ভয়াবহ যৌন নির্যাতন চালিয়েছে—যেখানে সবজি থেকে শুরু করে ঝাড়ুর কাঠি পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি তারা একটি আইভিএফ ক্লিনিক ধ্বংস করেছে, যেখানে চার হাজার ভ্রূণ সংরক্ষিত ছিল। ফিলিস্তিনিদের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা নষ্ট করাকে এই গণহত্যার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমন নৃশংসতার অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। একের পর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইসরায়েল কীভাবে গাজার ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ ও গির্জা ধ্বংস করেছে। পুরো গাজার ৮৩ শতাংশ গাছপালা, ৮০ শতাংশের বেশি কৃষিজমি ও ৯৫ শতাংশ গবাদিপশু নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে ৮০ শতাংশের বেশি পানি ও পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে, যাতে গাজায় মানুষের জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইসরায়েল সুপরিকল্পিতভাবে গাজাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে। এ কারণেই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইসরায়েল এখনো গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে।

যদি পৃথিবী ন্যায়ের পথে চলত, তাহলে এই গণহত্যার সমর্থকেরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কেউ যদি রুয়ান্ডার গণহত্যাকে সমর্থন করত, তাহলে সে সমাজের প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তি হয়ে যেত। অথচ এখন ইসরায়েলের এই ভয়াবহ সহিংসতার বিরোধিতা করাই অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা ইসরায়েলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, তাদের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে, সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে, এমনকি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক মাহমুদ খলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁকে নিজ দেশ থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্বে বাক্‌স্বাধীনতার ওপর ভয়াবহ ও পরিকল্পিত আঘাত এসেছে। অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা সব সময়ই ভুল, আর যখন কোনো সরকার গণহত্যা চালাচ্ছে, তখন এই নীরবতা আরেকটি গুরুতর অপরাধ। ইতিহাসের প্রতিটি ভয়ংকর অপরাধের সময় নীরব দর্শকেরাই অপরাধীদের বড় সহায়তা করেছে।

যদি সবাই মুখ খুলত, তাহলে কী হতো? সবাই মুখ খুললে অনেক মন্ত্রী সরকার থেকে পদত্যাগ করতেন। সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলো ইসরায়েলের অপরাধ নিয়ে প্রতিদিন শিরোনাম করত এবং এটিকে ভয়াবহ অপরাধ বলে তুলে ধরত। মানুষ জোরালোভাবে দাবি তুলত, এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে হবে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার দাবি এত প্রবল হতো যে কেউ তা উপেক্ষা করতে পারত না।

যাঁরা চুপ আছেন, তাঁদের অনেকেই মনে মনে অপরাধবোধে ভুগছেন। আর সেটাই স্বাভাবিক। তবে তাঁদের এই ভয় আর নীরবতা একুশ শতকের অন্যতম ভয়ংকর অপরাধকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। নীরবতা ভাঙার মানে শুধু সহানুভূতি দেখানো বা সাধারণ মানুষের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করা নয়; বরং অপরাধকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং যারা এটি চালাচ্ছে ও সমর্থন দিচ্ছে, তাদের জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো।

ওয়েন জোন্স গার্ডিয়ান পত্রিকার কলাম লেখক

দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

গাজায় নতুন করে ইসরায়েলি হামলায় ৪০০–এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন
গাজায় নতুন করে ইসরায়েলি হামলায় ৪০০–এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন। ছবি: রয়টার্স

‘মা, আমি ক্লান্ত, মরে যেতে চাই’: ইসরায়েলি আগ্রাসনে মানসিক বিপর্যয়ে শিশুরা

আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে চুল আঁচড়ানোর মতো করে মাথায় একটি ব্রাশ বোলাতে বোলাতে কাঁদতে শুরু করল শামা তুবাইলি।

মাথায় হাত রেখে শামা সিএনএনকে বলল, ‘ব্রাশ দিয়ে আঁচড়ানোর জন্য আমার এক চিলতে চুলও অবশিষ্ট নেই। এ জন্য আমার মন ভীষণ খারাপ। আমি আয়না ধরে থাকি। কারণ, আমি আমার চুল আঁচড়াতে চাই। আমি সত্যিই আবার আমার চুল আঁচড়াতে চাই।’

মাথায় চিরুনি বোলালে আট বছরের এ শিশুর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগের স্মৃতি মনে পড়ে যায়। সে পরিবারের সঙ্গে উত্তর গাজার জাবালিয়ায় থাকত। তখন তার মাথায় লম্বা চুল ছিল। বাড়ির বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যেত। কিন্তু ৭ অক্টোবরের পর থেকে শামা ও তার পরিবার প্রায় ১৯ লাখ মানুষের কাতারে শামিল হয়েছেন, যাঁরা তাঁদের বাড়ি এক বা একাধিকবার ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নির্দেশে শামার পরিবার প্রথমবারের মতো জাবালিয়া ছেড়ে দক্ষিণে রাফায় চলে যায়। সহিংসতা বাড়তে থাকলে তারা সেখান থেকে আবার তল্পিতল্পা গুঁটিয়ে মধ্য গাজার খান ইউনিসে একটি শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নেয়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালায়। এতে ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন বলে দাবি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের। এ ছাড়া জিম্মি করা হয় ২৫০ জনের বেশি মানুষকে। প্রতিশোধ নিতে সেদিনই গাজায় তাণ্ডব শুরু করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। তাদের বেপরোয়া বোমা হামলা ও স্থল অভিযানে সেখানে ৪৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী ও শিশু। এ যুদ্ধ বন্ধে সম্প্রতি একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীন প্রায় দুই মাসের জন্য ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ ছিল।

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ গত বছরের জুনে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, গাজার ১২ লাখ শিশুর প্রায় সবারই মানসিক সহায়তা প্রয়োজন; বিশেষ করে যারা বারবার যুদ্ধের বিভীষিকার সম্মুখীন হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান টম ফ্লেচার গত জানুয়ারিতে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার এক সপ্তাহ পর নিরাপত্তা পরিষদে বলেন, ‘একটি প্রজন্ম মানসিক আঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। শিশুদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের অনেকে অনাহারে কিংবা ঠান্ডায় জমে মারা গেছে। কিছু শিশু প্রথম শ্বাস নেওয়ার আগেই মারা গেছে—ভূমিষ্ঠ হওয়াকালে।’

‘কেন আমার চুল গজাচ্ছে না’

গত বছর চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন, শামা তুবাইলির চুল পড়ার কারণ, নার্ভাস শক (বিভীষিকাময় কোনো ঘটনায় মানসিক আঘাত পাওয়া); বিশেষ করে গত বছরের আগস্টে রাফায় তার প্রতিবেশীর বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর। ৭ অক্টোবরের পর থেকে তার দৈনন্দিন জীবন ভীষণভাবে ওলট-পালট হয়ে গেছে। এটিও সম্ভবত তার ‘অ্যালোপেসিয়া’তে ভূমিকা রেখেছে। অ্যালোপেসিয়া এমন একটি অবস্থা, যার কারণে মানুষের চুল পড়ে বা টাক হয়ে যায়।

গত বছরের শেষের দিকে ওয়ার চাইল্ড অ্যালায়েন্স ও গাজাভিত্তিক কমিউনিটি ট্রেনিং সেন্টার ফর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের একটি প্রতিবেদনে গাজায় ইসরায়েলি আক্রমণের ফলে শিশুদের ওপর যে মারাত্মক মানসিক আঘাত নেমে এসেছে, সে বিষয়ে তুলে ধরা হয়েছে। সংকটাপন্ন শিশুদের পরিচর্যাকারী পাঁচ শতাধিক লোকের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে এ–সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ওই পরিস্থিতিতে ৯৬ শতাংশ শিশু মনে করেছে, তাদের মৃত্যু অত্যাসন্ন। প্রায় অর্ধেক (৪৯ শতাংশ) শিশু আক্রমণের কারণে ‘মরে যাওয়ার ইচ্ছা’ প্রকাশ করেছে।

চুল পড়া নিয়ে অন্য শিশুদের কটাক্ষের শিকার হয়ে শামার মানসিক যন্ত্রণা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে সে ঘর থেকে বের হয় না বললেই চলে। বের হলেও মাথায় গোলাপি রঙের ব্যান্ডানা (রুমালবিশেষ) পড়ে থাকে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সিএনএন যখন শামার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে, তখন সে তার মা ওম-মোহাম্মদের কাছে অনুনয় করে বলে, ‘মা, আমি ক্লান্ত, মরে যেতে চাই। আমার চুল কেন গজাচ্ছে না?’ এরপর জিজ্ঞাসা করে, সে কি আজীবন টাক থাকবে? শামা আরও বলে, ‘আমি মরে যেতে চাই এবং চাই স্বর্গে গিয়ে আমার চুল গজাক।’

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাখো বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি উত্তর গাজায় তাঁদের বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেন (যদিও বাড়িঘরের অধিকাংশই ধ্বংসস্তূপে পরিণত)। ইসরায়েলের ছোড়া বোমায় শামা তুবাইলিদের বাড়িও মাটিতে মিশে গেছে। এ কারণে সে আর তার পরিবার খান ইউনিসেই থেকে যায়। বাড়ি ফেরার জন্য তাঁদের কাছে পরিবহন খরচও পর্যন্ত ছিল না।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সিএনএন এই শিশুর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। তখন সে বলেছিল, ‘আমাদের বাড়ি বোমা হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছে। বাড়িতে আমার অনেক ছবি ছিল, সার্টিফিকেট ছিল, ছিল অনেক স্মৃতি। আমার জামাকাপড় ও অনেক জিনিসপত্র ছিল। কিন্তু বাড়িটি ধ্বংস হয়ে গেছে। এর পর থেকে আমি বাড়িটি কখনো দেখিনি।’ সে আরও বলেছে, ‘পরিবহন খরচ অনেক বেশি। এ ছাড়া আমরা গেলেও কোথায় থাকব, জানি না। সেখানে কোনো পানি নেই।’

স্বাস্থ্যকর্মীরাও মানসিক আঘাতের শিকার

গাজায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কাজটি সব সময়ই চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু গাজা কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রামের (জিসিএমএইচপি) পরিচালক ডা. ইয়াসের আবু জামেই বলেছেন, ১৫ মাস ধরে চলা ইসরায়েলি আক্রমণে তাঁর কর্মীরাও মানসিক আঘাতের শিকার হয়েছেন। এ অবস্থায় অন্যদের চিকিৎসা করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

আবু জামেই জানুয়ারিতে যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগে সিএনএনকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার বেশির ভাগ কর্মী বাস্তুচ্যুত এলাকায় থেকে কাজ করছেন। ১০ জনেরও কম এখনো নিজেদের বাড়িতে আছেন। তাঁরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে কাজ করার সময় পরিবারগুলোর মনে আশা জাগানোর ও তাদের সহায়তা করার চেষ্টা করছেন।’

জিসিএমএইচপি অঙ্কন থেরাপি নামের একটি কৌশল ব্যবহার করে জানিয়ে আবু জামেই বলেন, অ-মৌখিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ থেরাপিতে শিশুদের অনুভূতি প্রকাশ করতে দেওয়া হয়। তিনি একটি ঘটনা স্মরণ করে বলেন, একটি শিশুকে আঁকার জন্য একটি জায়গা দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে সে তার মানসিক আঘাত সম্পর্কে একজন মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম হয়।

আবু জামেই বলেন, ‘(শিশুটি বলেছে) আমার বন্ধুরা এখন স্বর্গে। তবে তাদের মধ্যে একজনের মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল মস্তকবিহীন। তার মাথা যদি না থাকে, সে কীভাবে স্বর্গে যাবে? বলতে বলতে (শিশুটি) কেঁদে ফেলে।’

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার খান ইউনিস এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় আহত এক শিশুকে উদ্ধার করে ছুটছেন এক ব্যক্তি
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার খান ইউনিস এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় আহত এক শিশুকে উদ্ধার করে ছুটছেন এক ব্যক্তি। ফাইল ছবি রয়টার্স

জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ড: নতুন নথিতে খুনি ও দেশে দেশে সিআইএর চক্রান্ত নিয়ে যা জানা গেল

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির গুপ্তহত্যা নিয়ে গত মঙ্গলবার দুই হাজারের বেশি গোপন নথি প্রকাশ করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এসব নথি প্রকাশে ছয় দশক পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড। জে এফ কে নামে পরিচিত সাবেক এ প্রেসিডেন্টকে হত্যার ঘটনা ঘিরে ছয় দশকের বেশি সময় ধরে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়েছে। এখনো এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

কেনেডি নিহত হওয়ার পর মার্কিন সরকার এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিয়েছিল, তা যে সঠিক নয়, নতুন প্রকাশিত নথিতে এর পক্ষে তেমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেসব গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছিল মঙ্গলবার প্রকাশিত নথিতে নতুন করে তা আলো ফেলেছে। এসব নথিতে কেনেডির হত্যাকারী সম্পর্কে বিস্তারিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনও পাওয়া গেছে।

১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর টেক্সাসের ডালাস শহরে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা কেনেডিকে হত্যা করা হয়। ঘাতক ছিলেন লি হার্ভে ওসওয়াল্ড নামে ২৪ বছরের এক তরুণ, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক একজন মেরিন সদস্য। টেক্সাস স্কুল বুক ডিপোজিটরির ষষ্ঠ তলা থেকে কেনেডিকে নিশানা করে গুলি ছোড়েন ওসওয়াল্ড। এর দুদিন পরের ঘটনা। ওসওয়াল্ডসহ বন্দীদের অন্য একটি কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এ সময় জ্যাক রুবি নামে এক নৈশক্লাব মালিকের গুলিতে নিহত হন ওসওয়াল্ড।

কেনেডির মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট হন লিন্ডন বি জনসন। এই হত্যাকাণ্ড তদন্তে একটি কমিশন গঠন করে দেন। এই কমিশনের প্রধান করা হয় সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আর্ল ওয়ারেনকে। তদন্তে নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৬৪ সালে কমিশন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে ওসওয়াল্ড একাই কেনেডিকে হত্যা করেছেন। তাঁর সঙ্গে আর কারও জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নতুন করে যেসব নথি প্রকাশিত হয়েছে তাতে কি ওয়ারেন কমিশন এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে যে উপসংহারে উপনীত হয়েছিল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ তৈরি করেছে? ট্রাম্প প্রশাসন থেকে প্রকাশিত এসব নথিতে নতুন কি তথ্য উন্মোচিত হয়েছে? এমন সময়ে এসে এসব নথি উন্মুক্ত করা কি কোনো গুরুত্ব বহন করে? এসব প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা।

এসব নথি কি হত্যা নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এনেছে?


কেনেডি হত্যাকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের যে ব্যাখ্যা বা বয়ান, তা কয়েক দশক পরেও বেশির ভাগ আমেরিকান বিশ্বাস করেননি। এ নিয়ে ২০২৩ সালে একটি জরিপ চালায় জরিপকারী প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ। তাতে উঠে আসে, ওয়ারেন কমিশনের উপসংহার সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ৬৫ শতাংশ আমেরিকান।

মঙ্গলবার ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে হাজারো নথি প্রকাশ করার পর এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে আল-জাজিরা। এসব বিশেষজ্ঞ বলছেন, নতুন নথিতেও ওয়ারেন কমিশনের টানা উপসংহার ছাড়া তেমন নতুন কিছু সামনে আনেনি।

ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার প্রেসিডেনশিয়াল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মার্ক সেলভারস্টোন বলেন, ‘ওসওয়াল্ড একাই গুলি করে জন এফ কেনেডিকে হত্যা করেন এবং এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র ছিল না— দীর্ঘদিনের যে এই বয়ান নতুন প্রকাশিত নথি তাতে কোনো পরিবর্তন এনেছে বলে আমার মনে হয় না।’

ঘাতক সম্পর্কে নতুন কিছু কি জানা গেল?

নতুন প্রকাশিত নথির মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে, কেনেডিকে হত্যার আগে মেক্সিকো সিটিতে (মেক্সিকোর রাজধানী) অবস্থিত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কিউবার দূতাবাসে গিয়েছিলেন ঘাতক ওসওয়াল্ড।

একটি নথিতে কিছু গোয়েন্দা প্রতিবেদন রয়েছে। সেসব প্রতিবেদনে ওসওয়াল্ড কখন সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। সেই নথি অনুযায়ী, চাকরি ও মার্কিন নাগরিকত্ব ছেড়ে ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে পাড়ি জমান ওসওয়াল্ড। তিন বছর পর ১৯৬২ সালে আবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন।

ওই নথিতে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির নিকোনভ নামে একজন গুপ্তচরের নাম রয়েছে। তিনি সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থায় থাকা নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখেছেন, ওসওয়াল্ড কখনো কেজিবির গুপ্তচর ছিলেন কি না।

মার্কিন সরকারের নজরদারিবিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ওসওয়াল্ড যুক্তরাষ্ট্রে আবার ফিরে আসার পর তাঁর গতিবিধি নিবিড়ভাবে নজরদারি করেছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওসওয়াল্ড গুলি চালানোর ক্ষেত্রে তেমন দক্ষ ছিলেন না বলে ধারণা করা হয়।

এসব নথি থেকে সিআইএর অভিযান সম্পর্কে কি বিস্তারিত কিছু জানা গেছে?

স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে বিস্তারিত উঠে এসেছে সম্প্রতি প্রকাশ হওয়া এসব নথিতে। এর মধ্যে ‘অপারেশন মোঙ্গুজ’ নামে একটি অতি গোপন অভিযানও রয়েছে। কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে অস্থিতিশীলতার মধ্যে ফেলে দেওয়ার লক্ষ্যে গোপনে এই অভিযান চালায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

আরেকটি নথিতে দেখা গেছে, সিআইএ বিভিন্ন দেশে দেড় হাজার গুপ্তচর পাঠিয়েছিল। এর মধ্যে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের মার্কিন দূতাবাসেই পাঠানো হয়েছিল ১২৮ জন গুপ্তচর। এসব গুপ্তচর নিজেদের মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা–কর্মচারী হিসেবে পরিচয় দিতেন। জন এফ কেনেডির একজন শীর্ষ উপদেষ্টা আর্থার শেলিসিঙ্গার জুনিয়র সতর্ক করে বলেছিলেন, এভাবে কর্মকর্তা সাজিয়ে গুপ্তচর পাঠানোর চর্চা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাকে খর্ব করবে।

বিভিন্ন দেশে সরকার উৎখাতের ক্ষেত্রে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে এসব নথি থেকে। যেমন ১৯৬৩ সালে সিআইএর পরিচালকের কার্যালয়ের সঙ্গে কিউবায় থাকা মার্কিন গুপ্তচরদের যোগাযোগের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে এসব নথিতে। কিউবায় থাকা এসব মার্কিন গুপ্তচর ১৯৫৯ সালে ক্ষমতায় আসা ফিদেল কাস্ত্রোর সরকারকে উৎখাতের চক্রান্ত করছিল।

পেনসিলভানিয়ার ভিয়ানোভা ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড ব্যারেট আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, (মার্কিন সরকার ও গুপ্তচরেরা) কিউবার ফিদেল কাস্ত্রোর মতো অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে গুপ্তহত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল।’

প্রকাশ হওয়া নথির মধ্যে সিআইএর একটি মেমো রয়েছে। তাতে ই৪ডিইইডি নামে একটি গোপন অভিযানের বিস্তারিত জানা গেছে। ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট রাফায়েল ট্রুজিলোর সরকারকে উৎখাতের জন্য এই অভিযান চালিয়েছিল সিআইএ।

১৯৬১ সালের মে মাসে গুপ্তহত্যার শিকার হন রাফায়েল ট্রুজিলো। গাড়িতে করে সান ক্রিস্তোবাল যাওয়ার পথে ট্রুজিলোকে গুলি করে হত্যা করেন এক বন্দুকধারী। এর এক বছর আগেই ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র।

কেনেডি হত্যা নিয়ে কতটি নথি প্রকাশিত হয়েছে?

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল আর্কাইভসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবারের আগে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ১৯৯২ সালের জেএফকে রেকর্ডস অ্যাক্ট নামের একটি আইনের অধীনে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে ৯৯ শতাংশ নথি পর্যালোচনা করেছিল। এই সংখ্যাটা প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার।

ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত সব নথি প্রকাশ করা হবে। কিন্তু সিআইএ ও এফবিআইয়ের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত প্রকাশ করতে পেরেছিলেন মাত্র ২ হাজার ৮০০টি নথি।

ট্রাম্পের পর জো বাইডেনের প্রশাসন আরও প্রায় ১৭ হাজার নথি প্রকাশ করে। এরপর প্রকাশ হতে বাকি থাকে মাত্র ৪ হাজার ৭০০টি নথি। গত মাসে এফবিআই জানায়, অতিরিক্ত আরও ২ হাজার ৪০০টি নথি পাওয়া গেছে।

সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এসব নথির জন্য লোকজন দশকের পর পর দশক অপেক্ষায় আছেন। তবে দেখা গেছে, নতুন করে যেসব নথি প্রকাশ করা হয়েছে, তার মধ্যে অনেক নথির অনুলিপি রয়েছে, যা আগেই প্রকাশিত হয়েছে এবং এসব সম্পর্কে মানুষ জানে।

জেএফকে হত্যাকাণ্ড নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এই প্রেসিডেন্টের হত্যাকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যেসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব চালু আছে, নতুন প্রকাশিত নথির কারণে সেসব যে ভিত্তি পেয়েছে, এমনটা মনে হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডেভিড ব্যারেট বলেন, ‘আমি এখন পর্যন্ত চমক তৈরি করার মতো কোনো কিছু সম্পর্কে কিছু শুনিনি।’

২০২৩ সালে পরিচালিত গ্যালাপের জরিপ অনুযায়ী, আমেরিকানদের ২০ শতাংশ বিশ্বাস করেন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কেনেডিকে হত্যা করেন ওসওয়াল্ড। আর ১৬ শতাংশের ধারণা, ওসওয়াল্ড সিআইএর লোক ছিলেন। তবে মঙ্গলবার প্রকাশিত নথিতে এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কেনেডি হত্যাকাণ্ড নিয়ে আরও কিছু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো বিদেশি শত্রুরা এই হত্যার চক্রান্ত করেছিল। কারও এমন দাবি, প্রেসিডেন্ট হওয়ার খায়েশ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের চক্রান্তে জড়িয়ে পড়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জনসন। কেউ কেউ মনে করেন, এটা কোনো মাফিয়া চক্রের কাজ। নতুন করে প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখেছিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জানা যায়, সবই অন্তঃসারশূন্য।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর টেক্সাসের ডালাস শহরে গুপ্তহত্যার শিকার হন
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর টেক্সাসের ডালাস শহরে গুপ্তহত্যার শিকার হন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধেই জন্ম শিশুর, যুদ্ধেই শহীদ

যুদ্ধেই জন্ম, যুদ্ধেই শহীদ শিশুটি। ১৩ মাস আগে যুদ্ধের মধ্যেই প্রথম সন্তানের জন্ম দেন আফনান আল-গানাম। তখন তাঁর পরিবার গাজা উপত্যকায় নিজেদের বাড়িতে বসবাস করত।

চলতি বসন্তে আফনান দ্বিতীয়বার সন্তানসম্ভবা হয়েছেন। এ সময় তাঁরা একটি দারিদ্র্যপীড়িত তাঁবুতে বাস করতেন। ১৫ মাস যুদ্ধের পর একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি তাঁদের মনে কিছুটা প্রশান্তি এনেছিল।

কিন্তু গত মঙ্গলবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) নির্বিচার বিমান হামলায় তাঁদের তাঁবুটি মাটিতে মিশে যায়। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা আফনান আল-গানাম ও তাঁদের প্রথম সন্তান মোহাম্মদ দুজনই নিহত হয়েছে।

সেদিন সাহরির সময় অকস্মাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে যুদ্ধবিমান এসে গাজায় বোমা ফেলতে শুরু করে। এতে চার শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাঁদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। ভূখণ্ডটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে। জিম্মিদের ছেড়ে দিতে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসকে বাধ্য করতে গাজায় হামলা করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল।

আফনানের স্বামী আলা আবু হেলাল বলেন, ‘তারা আমাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।’ দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসে নাসের হাসপাতালে দাঁড়িয়ে যখন তিনি কথা বলছিলেন, তখন কাপড় দিয়ে ঢাকা ছোট্ট মোহাম্মদের মরদেহ তাঁর কোলে।

ছোট্ট সন্তানের দিকে তাকিয়ে আবু হেলাল বলেন, যুদ্ধের এক কঠিন সময়ে সে জন্ম নিয়েছে, যুদ্ধেই শহীদ হয়েছে।

কথা বলার সময় চোখের পানি ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছিল এই ফিলিস্তিনি তরুণের। তিনি বলেন, তাদের (ইসরায়েল) লক্ষ্যবস্তু নিষ্পাপেরা। তারা খুব কমই জীবন দেখেছে।

গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফায় পারিবারিক বসতি দেখতে গিয়েছিলেন আবু হেলাল। ঠিক তখনই মাওসিতে তাদের তাঁবুতে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। খান ইউনিসের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর তাঁবু এই মাওসি এলাকায় অবস্থিত।

যুদ্ধের সময় রাফায় আবু হেলালের ঘরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন সেখান থেকে কোনো কিছু লুট হয়েছে কি না; তা দেখতে যান তিনি। ২০ বছর বয়সী এই তরুণ বলেন, ‘আমাকে একা রেখে তারা সবাই চলে গেছে। অনাগত শিশুটিও নিহত হয়েছে।’

গেল বছরের মে মাসে আবু হেলালের পরিবারকে রাফা ছাড়তে বাধ্য করে ইসরায়েলি বাহিনী। তার কিছুদিন আগে জন্ম নেয় তাঁর প্রথম সন্তান মোহাম্মদ। যুদ্ধে রাফা অঞ্চলের বেশির ভাগ বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই ফিলিস্তিনি তরুণ বলেন, ‘পরিবার ও শিশুদের নিরাপদ রাখতে আপনি পালিয়ে গেলেন। কিন্তু তারপরও তারা নিহত হলো। তাদের সবাই নিহত।’

গাজা উপত্যকার নেতজারিম করিডরের একটি অংশ আবার দখলে নেওয়ার পর ভয়াবহ হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। গাজায় এমন তীব্র হামলা চালানো হবে ‘যা আগে কেউ কখনো দেখেনি’ বলেও হুমকি দিয়েছেন তিনি।

স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার উত্তর ও দক্ষিণ গাজাকে বিভক্তকারী কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটিতে সেনা মোতায়নের তথ্য নিশ্চিত করেছে ইসরায়েল প্রশাসন। নেতজারিম করিডর ইসরায়েলি সীমান্ত থেকে উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত।

করিডরটি দখলে নেওয়ার পর বুধবার এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি বাহিনী জানায়, জানুয়ারিতে যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপ কার্যকর হলে এই অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তবে আবার সেখানে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে যুদ্ধে প্রায় ৪ মাইল (৬ কিলোমিটার) দীর্ঘ এই করিডরকে সামরিক অঞ্চল হিসেবে ব্যবহার করেছে ইসরায়েল।

নৃশংস ইসরায়েলি হামলায় উত্তর গাজার অনেকেই পালিয়ে দক্ষিণ গাজায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। ১৫ মাসের সংঘাত শেষে করিডর থেকে ইসরায়েলি সেনারা সরে গেলে অনেকেই উত্তর গাজায় ফিরেছিলেন।

নেতজারিম করিডর দখলের পর অঞ্চলটি থেকে সব ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ইসরায়েল কাৎজ। তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, মঙ্গলবারের বিমান হামলা তো কেবল ইসরায়েলি পরিকল্পনার শুরু।

কাৎজ বলেন, হামাস জিম্মিদের মুক্তি না দিলে এমন ভয়াবহ হামলা চালানো হবে, যা আগে কেউ কখনো দেখেনি।

গাজার একটি হাসপাতালের বাইরে ছোট্ট শিশুসন্তান মোহাম্মদের মরদেহ হাতে আবু হেলাল
গাজার একটি হাসপাতালের বাইরে ছোট্ট শিশুসন্তান মোহাম্মদের মরদেহ হাতে আবু হেলাল। ছবি: এপির ভিডিও থেকে নেওয়া

নির্বাচন করতেই দল গড়েছি, তবে এই নির্বাচন হতে হবে গণপরিষদ নির্বাচন: নাহিদ ইসলাম

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও গণহত্যাকারীদের দৃশ্যমান বিচার এবং রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের ভিত্তিতেই নির্বাচন হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচন করতেই আমরা রাজনৈতিক দল গড়ে তুলেছি। তবে এই নির্বাচন হতে হবে গণপরিষদ নির্বাচন। কারণ, গণপরিষদ নির্বাচন ছাড়া নতুন সংবিধান বা সংবিধানের মৌলিক সংস্কার সম্ভব নয়।’

বরিশালে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা-কর্মী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় নাহিদ ইসলাম এ কথা বলেন। নগরের ক্লাব রোডে বরিশাল ক্লাবের অমৃতলাল দে মিলনায়তনে এই সভার আয়োজন করা হয়।

সভায় নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘অনেকেই ন্যূনতম সংস্কারের কথা বলছেন; কিন্তু আমরা বলতে চাই, ন্যূনতম সংস্কার বলে কিছু নেই। এই সরকারের সময়েই সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করতে হবে। দেশের ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়ে এই সরকারকে এনেছে পরিবর্তন ও বিচারের আশায়। জনগণের প্রতি সেই ওয়াদা সরকারকে পূরণ করতে হবে।’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় ঐক্য অটুট রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক আরও বলেন, ‘সরকার যে সময়সীমা নির্ধারণ করেছে, সেই সময়ের মধ্যেই দৃশ্যমান সংস্কার এবং বিচারের মাধ্যমে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা আমরা অটুট রাখব। গণ–অভ্যুত্থানের সঙ্গে আপস করে, এমন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা হবে না। আমাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি হলো, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান, শহীদদের আকাঙ্ক্ষা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা।’

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদীরা পিছু হটলেও পুরোনো বন্দোবস্তের অনেক উপাদান আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর চিন্তা-চেতনার মধ্যে রয়েছে। আমরা আহ্বান জানাব, নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করতে সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের দিকে যেতে যাচ্ছি, সেই দিকে যেন আমরা যাই। কেননা, যারা পরিবর্তন চায়নি, তারা বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে। পরিবর্তনের সঙ্গে যারা তাল মেলাতে পারবে না তারা হারিয়ে যাবে।’

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে জড়িত অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘পরিবর্তন সংস্কারের মধ্য দিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সেই পুরোনো রাজনীতি আমরা চাই না। আমরা সত্যিকার অর্থে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বরিশালের শিক্ষার্থীদের সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বরিশালে আপনারা যেভাবে গণ-অভ্যুত্থানের সময় গুলির সামনে বুক পেতে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছেন, সেভাবেই দলকে সুসংগঠিত করতে কাজ করতে হবে। বরিশালকে দলের শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত করতে হবে।’

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পাটির মুখ্য সংগঠক হান্নান মাসুদ, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা, যুগ্ম সদস্যসচিব মুজাহিদুল ইসলাম, গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসচিব জাহিদ আহসান প্রমুখ। পরে নাহিদ ইসলাম জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা-কর্মীদের নিয়ে মতবিমিনয় সভায় অংশ নেন।

পটুয়াখালীতে জুলাই আন্দোলনে শহীদ হওয়া এক ব্যক্তির কলেজপড়ুয়া মেয়ে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। ওই কলেজছাত্রী ও তাঁর পরিবারের খোঁজ নিতে পটুয়াখালীতে আসেন নাহিদ ইসলামসহ জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারা। পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই ছাত্রীর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে দুপুরে সেখানে যান নাহিদ ইসলামসহ নেতারা। বিকেলে নাহিদ ইসলাম ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবার কবর জিয়ারতের জন্য গ্রামের বাড়িতে যান। সেখানে বেশ কিছু সময় অবস্থান করেন। ইফতারের পর তিনি বরিশালে মতবিনিময় সভায় যোগ দেন।

মতবিনিময় সভায় দুপক্ষের হট্টগোল

এদিকে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পরে বরিশাল নগর ও জেলার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। এতে নাহিদ ইসলাম ও কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেন। সভা চলাকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও নাগরিক কমিটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা ও হাতাহাতি শুরু হয়। এ সময় মঞ্চ থেকে একজন কেন্দ্রীয় নেতাকে মাইকে দুপক্ষকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা শান্ত হোন, না হয় আপনারা বহিষ্কার হবেন।’ পরে মিলনায়তনের দ্বিতীয় তলা থেকে নিচে নেমে দুপক্ষ একে অপরের দিকে তেড়ে আসতে দেখা যায়।

সভা সূত্র জানায়, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভাটি শুরুর প্রায় আধা ঘণ্টা পর এই হট্টগোল শুরু হয়। এ সময় সভাস্থলে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ। তাঁরা নাহিদ ইসলামের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলা এবং বৈঠকের দাবি জানান। তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত নেতারা শিক্ষার্থীদের ওই অংশকে শান্ত করলেও কর্মসূচি শেষে নাহিদ ইসলাম চলে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে তাঁরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। এরপর আবার তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় সভাকক্ষে। এ সময় মিলনায়তনে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ায় দুটি পক্ষ। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি, হাতাহাতিও হয়। সেখানে বরিশালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলার চেষ্টা করা হয়। ৩০-৪০ মিনিট ধরে উত্তেজনা চলার পর আবারও সভাস্থল ত্যাগ করার চেষ্টা চালান নাহিদ। এ সময় বিক্ষুব্ধরা তাঁর গাড়ি আটকে দেন। একপর্যায়ে বাধা পেরিয়ে নাহিদ ইসলামকে গাড়িতে তুলে দেওয়া হলে তাঁরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।

ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে এনসিপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা কেউ নাম উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিতে চাননি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল মহানগর কমিটির আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিস্টের দোসররা আমাদের কর্মসূচিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে আজকের এই ঘটনা ঘটিয়েছে। আমরা তাদের চিহ্নিত করে রেখেছি। পরিকল্পনা করেই তারা আজ এই অনুষ্ঠান বানচালের জন্য এখানে এসেছিল।’

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। ঘটনার বিষয়ে জানার জন্য তাঁকে বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।

সভায় আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বরিশাল ক্লাবের অমৃতলাল দে মিলনায়তনে
সভায় আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বরিশাল ক্লাবের অমৃতলাল দে মিলনায়তনে। ছবি: প্রথম আলো

গাজায় লাশের মিছিল

আবার লাশের সারি। থরে থরে সাজানো লাশ। দেশপ্রেমী ফিলিস্তিনিদের লাশ। রক্তে ভিজে আছে লাশ বহনকারী ব্যাগ বা কাফনের কাপড়। এমন লাশের সারির মাঝে হতবিহ্বল, কিংকর্তব্যবিমূঢ় শিশু। অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গেছে তার। মানবিক অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছে তারা। অনেক শিশু এখন এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুকেই স্বাগত জানাতে চায়। গাজার নিরীহ মানুষের ওপর ইসরাইলের নতুন করে নৃশংস, বর্বর হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। কিন্তু তাতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কিছু এসে যায় না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেয়ে পূর্ণোদ্যমে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র খলিল আল দাকরান জানিয়েছেন ১৮ই মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ইসরাইলের এই বর্বরতায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭১০ জন ফিলিস্তিনি। এ সংখ্যা শুধু যাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তাদের। এর বাইরে বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

নিহতদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। তাদের শতকরা হার প্রায় ৭০ ভাগ। এ সময়ে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৯০০ ফিলিস্তিনি। বহু মানুষ আহত হওয়ার পর জরুরি চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে মৌলিক সরঞ্জাম ও ওষুধের ভয়াবহ সংকট চলছে। এর ওপর গাজায় সব রকম সহায়তা বা ত্রাণ সরবরাহ নিষিদ্ধ করেছে ইসরাইল। গাজা থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক বলছেন, গাজার উত্তর ও দক্ষিণে বৃহস্পতিবার খুব ভোরে ইসরাইল ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। এতে কমপক্ষে ৭১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই হামলায় বিমান বাহিনীর সঙ্গে অংশ নেয় ইসরাইলের পদাতিক বাহিনী। গাজা উপত্যকায় হামাসের বিরুদ্ধে ভয়াবহ ও তীব্র যুদ্ধ শুরুর পাশাপাশি দখলীকৃত পশ্চিমতীরে বৃহত্তর এবং শক্তিশালী হামলার সতর্কতা দিয়েছেন নেতানিয়াহু। এ অবস্থায় গাজার দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তরাঞ্চলের দিকে অধিবাসীদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। তাদের এক মুখপাত্র আভিচাই আড্রাই গাজার সালাহ আল-দিন সড়কে ফিলিস্তিনিদের সফর করতে বারণ করেছেন। বলা হয়েছে, সেখানে ইসরাইলি সেনাবাহিনী স্থল অভিযান শুরু করেছে। তবে উপকূলবর্তী আল রশিদ সড়ক দিয়ে তারা চলাচল করতে পারে। এমন অবস্থায় নতুন করে বেসামরিক নিরস্ত্র লোকজনের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করায় জয়েন্ট আরব-ইসলামিক এক্সট্রা অর্ডিনারি সামিট অন গাজার মিনিস্টেরিয়াল কমিটি কড়া নিন্দা জানিয়েছে।

ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত এক বিবৃতি অনুযায়ী, এই কমিটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের নৈতিক, আইনগত দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আগ্রাসন ও নিয়ম ভঙ্গ বন্ধ করতে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে তারা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে এই কমিটি গঠিত হয়েছে। এর সদস্য কাতার, সৌদি আরব, মিশর, জর্ডান, বাহরাইন, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, ফিলিস্তিনি, আরব লীগ ও ওআইসি। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার এবং জাতিসংঘের কর্মকর্তারা এই ভয়াবহতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, অসহনীয় পর্যায়ের দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন গাজায় অবস্থানকারী ফিলিস্তিনিরা। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক জাতিসংঘের এজেন্সির প্রধান ফিলিপ্পে লাজারিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই যুদ্ধ পৃথিবীকে নরক বানিয়ে দিতে পারে। ইসরাইলের হামলাকে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করে তা অবিলম্বে অবশ্যই বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক। ফিলিস্তিনের দখলীকৃত অঞ্চলে জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয়ক মুহান্নাদ হাদি ইসরাইলের এই নতুন হামলাকে কাণ্ডজ্ঞানহীনের কাজ বলে অভিহিত করেছেন।  বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড লেমি সোমবার বলেছেন, গাজায় ত্রাণ বন্ধ করে দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে ইসরাইল। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের মুখপাত্র হামলায় বেসামরিক জনগণের হতাহত হওয়াকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ত্রাণ বিষয়ক কমিশনার হাদজা লাহবিব বলেন, গাজায় উত্তেজনা বৃদ্ধি ভয়াবহ। বেসামরিক জনগণ অকল্পনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এটা অবশ্যই বন্ধ হতে হবে।

এমন অবস্থায় হামাস বলেছে, ইসরাইলের হামলা বন্ধ করার জন্য মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। হামাসের মুখপাত্র আবদুল লতিফ আল-কানৌ বলেন, আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধ করতে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কাজ করছি। গাজা থেকে ইসরাইলিদের প্রত্যাহার নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। ফিলিস্তিনিদের অনাহারে রাখা বন্ধ করতে এবং অবরোধ তুলে নেয়ার জন্য আরব লীগ ও ওআইসিকে জরুরি পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। ওদিকে হামাসের হাতে যেসব জিম্মি এখন আছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা ইসরাইলের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নেতানিয়াহু সরকার সেই বৈঠক মুলতবি করে। ফলে জিম্মিদের পরিণতি নিয়ে আত্মীয়দের মধ্যে হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

mzamin

৫৫ হাজার রোহিঙ্গাকে এনআইডি, দুদকের জালে হেলালুদ্দীন by মারুফ কিবরিয়া

সাবেক সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে ব্যাপক তৎপর ছিলেন তিনি। দায়িত্ব পালন করেন নির্বাচন কমিশন সচিব হিসেবে। পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব থাকা অবস্থায় ২০২২ সালে অবসরে যান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের অক্টোবরে গ্রেপ্তার হন হেলালুদ্দীন। এবার তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে ৫৫ হাজার ৩১০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার। অভিযোগটি অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চলতি মাসের শুরুর দিকে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত দিয়েছে ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। গত সপ্তাহেই অনুসন্ধানের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দুদকের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র মানবজমিনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানিয়েছে, হেলালুদ্দীন আহমদের অনিয়ম খুঁজতে দুদকের সহকারী পরিচালক খোরশেদ আলমকে অনুসন্ধানী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। কমিশনের তরফ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাবেক নির্বাচন কমিশনের এই সচিবের সব দুর্নীতির প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। সেই হিসেবে গত সপ্তাহেই হেলালুদ্দীন আহমদ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য দিতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই চিঠি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়েও পাঠিয়েছে দুদক।

দুদকের পরিচালক পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচন কমিশনে দায়িত্বপালনকালে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে হেলালুদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করে ৫৫ হাজারেরও বেশিসংখ্যক রোহিঙ্গাকে এনআইডি দেয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে রাতের ভোট আয়োজনেও তার সংশ্লিষ্টতা থাকার কিছু তথ্য দুদকের হাতে এসেছে।

দুদকের এই কর্মকর্তা বলেন, মোটাদাগে রোহিঙ্গাদের ভোটার করার অভিযোগটি সামনে রেখে আমাদের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এরসঙ্গে নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিয়মগুলো নিয়েও এই অনুসন্ধানের আওতায় আনা হতে পারে। তবে এ বিষয়টি নির্ভর করছে সময়ের ওপর। কমিশনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযোগ অনুসন্ধান করে সেটার প্রতিবেদন জমা দেয়ার নিয়ম রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি তার আগেই অনুসন্ধানটি শেষ করার।   

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন রোহিঙ্গা ডাকাত নুর আলম। এ সময় তার কাছ থেকে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্রের স্মার্টকার্ড পায় পুলিশ, যা ইস্যু করা হয় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয় থেকে। ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে নুর ওই এনআইডি সংগ্রহ করে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে অনুসন্ধানে নামে দুদক। তবে সে সময় অবধি ভয়াবহ এই অনিয়মের সঙ্গে সাবেক সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের নাম আসেনি। তৎকালীন দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা তথ্য ঘাঁটতে গিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের আমলাসহ একাধিক কর্মকর্তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পান। এবং রোহিঙ্গাদের জালজালিয়াতির মাধ্যমে এনআইডি প্রদানে তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণও পান ওই কর্মকর্তা। কিন্তু সে সময় অদৃশ্য শক্তি দুদকের সেই অনুসন্ধানটির আলোর মুখ দেখাতে দেয়নি।

দুদক সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে অবসরের পর কক্সবাজারের ঈদগাঁও, ইসলামাবাদ ও ইসলামপুর এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচনের অংশ নেয়ার ইচ্ছা থেকেই হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে নাগরিকত্ব দিয়ে ভোটার বানান হেলালুদ্দীন। এই প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা, জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বড় একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি।

সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, এই চক্র শুধু ঈদগাঁও, ইসলামাবাদেই নয়, বরং কক্সবাজার সদর, টেকনাফ, লামা, আলীকদমে আশ্রয় নেয়া আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা নাগরিককে ভোটার বানিয়েছে। আর এই প্রক্রিয়ায় লেনদেন হয়েছে কোটি কোটি টাকা। পরে নির্বাচন কমিশনও আলাদা একটি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পায়। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের সচিব ছিলেন কক্সবাজারের ঈদগাঁও এলাকার বাসিন্দা আওয়ামী আমলা হিসেবে পরিচিত হেলালুদ্দীন আহমদ।

দুদক বলছে, অবসরের পর নির্বাচন করার মনোবাসনা থেকে ওই এলাকায় আশ্রিত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নাগরিকদের ভোটার বানাতে শুরু করেন তিনি। ফলে একদিকে যেমন এলাকায় তার ভোটার তৈরি হয়। অন্যদিকে প্রতিটি এনআইডি কার্ড দেয়ার জন্য সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।

দুদক  সংশ্লিষ্টরা জানান, হেলালুদ্দীনের গড়ে তোলা সিন্ডিকেটটি শুধু তার নির্বাচনী এলাকাতেই থেমে থাকেনি; বরং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া রোহিঙ্গাদের টাকার বিনিময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া ও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি করেছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালীদের বাধায় অনুসন্ধান গভীরভাবে শেষ করা সম্ভব হয়নি।

দুদক আরও জানায়, ২০১৯ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর তদন্তের স্বার্থে দুদকের একটি অনুসন্ধানী টিম চট্টগ্রাম নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে অভিযান চালায়। এ সময় ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার কাজে ব্যবহৃত আটটি ল্যাপটপ হারিয়ে যাওয়ার তথ্য পায় দুদক। তবে সাতটি ল্যাপটপের ব্যাপারে জিডি ও মামলা রেকর্ড করাসহ আইডি ব্লক করার কথা জানানো হলেও ইসির দাবি করা মিরসরাই থেকে হারিয়ে যাওয়া একটি ল্যাপটপের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ৪৩৯১ আইডি নম্বরের ল্যাপটপটির আইডিও ব্লক করা হয়নি তখনো। ওই একটি ল্যাপটপ দিয়েই ২০১৬ সাল থেকে টানা ৩ বছর ধরে ৫৫ হাজার ৩১০ জন রোহিঙ্গাকে ভোটার বানানো হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় ৪৫ হাজারই কক্সবাজারের ঈদগাঁও এলাকার বাসিন্দা। অনুসন্ধানী দল ইসি’র সার্ভারে ঢুকে দেখতে পায়, ভোটার হওয়ার জন্য যে নিবন্ধন ফরম ব্যবহার করা হয় তার সিরিয়াল নম্বর ৪১৮৬৬৩০১ হতে ৪১৮৬৬৪০০ পর্যন্ত ১০০টি ফরমের একটি বই একটি অফিসের নামে ইস্যু করার নিয়ম থাকলেও এর ৬৩টি ফরম ব্যবহার করা হয়েছে দেশের ভিন্ন ভিন্ন এলাকা থেকে।
এ ছাড়া ২৩৯১ নম্বরের ল্যাপটপ থেকে যে ৫৫ হাজার ৩১০ জনকে ভোটার বানানো হয়েছে তাদের কারোর ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গ কাগজপত্র আপলোড করা হয়নি নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে। অনুসন্ধান চলাকালেই সে সময়ের নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুউদ্দীন ফোন করে দুদকের অনুসন্ধানী টিমকে অভিযান অসমাপ্ত রেখেই ফিরে আসতে চাপ দেন। এতেই হেলালের নাম সন্দেহের তালিকায় আসে দুদকের।

দুদক জানায়, রোহিঙ্গা ইস্যু থাকায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকার ৩২ উপজেলাকে বিশেষ এলাকা ঘোষণা করে খাতা-কলমে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের তৈরি করা নিবন্ধন ফরমের ৪১টি কলাম যথাযথভাবে পূরণ করাসহ পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন অফিসের প্রত্যয়নপত্র, বিদ্যালয়ের সনদ, জাতীয়তা সনদ, জন্মনিবন্ধন, ভূমিসনদ, উদ্যোক্তা সনদের প্রয়োজন হয়। এসব তথ্যের কোনোটির ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির সত্যায়নপত্রসহ সব ডকুমেন্টের সফটকপি নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে আপলোড করতে হয়। কিন্তু এই ৫৫ হাজার ৩১০ জনের একজনের ক্ষেত্রেও পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্ট নেই ইসিতে।

দুদক বলছে, বর্তমানে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের হাতে থাকা তথ্য নিয়ে দ্রুতগতিতে এগুচ্ছে অনুসন্ধান দল। তাদের ধারণা, এই অনুসন্ধানে নেমে তৎকালীন বেশ কিছু জনপ্রতিনিধি, পাসপোর্টের কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে।

ইসি ও স্থানীয় সরকারে যেসব তথ্য চেয়েছে দুদক:
সাবেক সচিব হেলালুদ্দীনের আমলনামা যাচাই-বাছাই করতে ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে রেকর্ডপত্র চেয়েছে দুদক। চাহিত এসব রেকর্ডপত্রের মধ্যে রয়েছে- ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ৫৫ হাজার ৩১০ রোহিঙ্গা নাগরিকের নাম, পিতার নাম, স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা; উক্ত রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তিকরণ সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশন সচিবালয় বা অন্য কোনো সংস্থা থেকে কোনো তদন্ত হয়ে থাকলে তার প্রতিবেদনের সত্যায়িত কপি; হেলালুদ্দীন আহমদের নির্বাচন কমিশনে দায়িত্বপালনের বিস্তারিত তথ্য এবং তার  স্ত্রী, সন্তানদের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ অন্যান্য তথ্য।

অনুসন্ধানের বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, হেলালুদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের বিষয়ে শুনেছি। কিন্তু এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আমার কাছে নেই।
উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে গত বছরের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আড়াই মাস পর সাবেক সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।  ২৩শে অক্টোবর সন্ধ্যায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের খুলশীর একটি বাসা থেকে কোতোয়ালি থানা পুলিশ আটক করে। পরে তাকে বিএনপি নেতা মকবুলকে মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
হেলালুদ্দীন আহমদ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ইসি সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় নির্বাচন সংক্রান্ত বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে নিয়মিত গণমাধ্যমের সামনে হাজির হতেন তিনি। ওই নির্বাচনের আগে তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপন বৈঠকে অংশ নেয়ার অভিযোগ তুলেছিল বিএনপি। ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের চার তলার পেছনের কনফারেন্স রুমে ২০১৮ সালের ২০শে নভেম্বর রাতে ওই গোপন বৈঠক হয় বলে গণমাধ্যমে খবর হয়েছিল। সে সময় বিএনপি‘র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী অভিযোগ করেছিলেন, হেলালুদ্দীনসহ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সচিব সাজ্জাদুল হাসান, সাবেক জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহমদ, সাবেক পানিসম্পদ সচিব কবির বিন আনোয়ার, সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন সচিব মহিবুল হক, সাবেক ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার আলী আজম, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এপিএস-১ কাজী নিশাত রসুল ওই বৈঠকে অংশ নেন। পরে হেলালুদ্দীন আহমদ চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজেও একই ধরনের গোপন বৈঠক করেন বলে অভিযোগ ওঠে। তবে ওই বছরের ২৪শে নভেম্বর সন্ধ্যায় ইসিতে সংবাদ সম্মেলন করে হেলালুদ্দীন আহমদ তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে গোপন বৈঠকের খবরকে প্রপাগান্ডা বলে উড়িয়ে দেন। তিনি দাবি করেছিলেন, তাকে বিতর্কিত ও হেয় করার জন্য এ ধরনের প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে।

ইসি থেকে বদলি হয়ে হেলালুদ্দীন আহমদ স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হন। পরে একই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০২২ সালের ১৯শে মে ওই পদ থেকে তিনি অবসরে যান। পরে তাকে সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) সদস্য করে নেয় তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার। ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যে গত বছরের ৯ই অক্টোবর পিএসসি চেয়ারম্যান সোহরাব হোসাইনসহ অন্য সদস্যদের সঙ্গে হেলালুদ্দীনও পদত্যাগ করেন।

mzamin

মুক্তিপণের ২৫ লাখ পেয়েও মিলনকে হত্যা করলো অপহরণকারীরা

ঠাকুরগাঁওয়ে অনলাইনে প্রেমের ফাঁদে পড়ে অপহরণের শিকার মিলন হোসেনের (২২) মরদেহ ২৬ দিন পর উদ্ধার করেছে পুলিশ। জমি-জায়গা বিক্রি করে মুক্তিপণের ২৫ লাখ টাকা দিয়েও ছেলেকে জীবিত না পেয়ে নিহতের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে পীরগঞ্জের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। নিহত মিলন ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার খনগাঁও ইউনিয়নের চাপাপাড়া এলাকার পানজাব আলীর ছেলে। মিলন দিনাজপুর পলিটেকনিক কলেজের ছাত্র ছিলেন। বুধবার ১৯শে মার্চ  রাত ১০টার দিকে সন্দেহভাজন তিনজনকে আটক করে ঠাকুরগাঁও ডিবি পুলিশ। এরা হলেন- ঠাকুরগাঁও সদরের মহেশপুর বিটবাজার এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে সিজান আলী (২৮), আরাজি পাইকপাড়া এলাকার সাইফুল ইসলামের ছেলে মুরাদ (২৫) ও সালন্দর ইউনিয়নের শাহীনগর তেলিপাড়া এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে রত্না আক্তার রিভা (১৯)। এ সময় মুরাদের হেফাজত থেকে ৪ লাখ ৯৭ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। এদিকে, গতকাল দুপুরে মিলন হোসেনের হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করেন এলাকাবাসী। পরে জেলা প্রশাসক ইসরাত ফারজানা মিলন হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে সুষ্ঠু বিচার করা হবে বলে স্বজনদের আশ্বস্ত করেন। পরে জেলা প্রশাসক কার্যালয় ছেড়ে চৌরাস্তায় অবস্থান নেন তারা। এতে প্রায় দেড় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। এর আগে বিক্ষুব্ধ জনতা আটক সিজান আলীর বসতবাড়ি ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেন।

গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি মিলন হোসেনের সঙ্গে ফেসবুকে অজ্ঞাত একজনের যোগাযোগ হয়। একপর্যায়ে সেই ব্যক্তি মিলন হোসেনকে দেখা করার কথা বলেন।

একইদিন দুপুরে দেখা করার জন্য পীরগঞ্জ থেকে জেলা শহরের মুন্সিরহাট পলিটেকনিক্যালের পেছনে লিচু বাগানে যান মিলন। এরপর রাতে মিলন বাড়িতে না এলে তার বড় ভাই হামিদুর রহমান মিলনের মুঠোফোনে কল করলে বন্ধ পান। মিলনকে ফোনে না পেয়ে তার ভাই পরিবার ও এলাকার লোকজনকে অবগত করলে সবাই মিলে মিলনকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে কোথাও সন্ধান পায়নি। ওইদিন রাত ১টার দিকে মিলনের বাবাকে ফোন করে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি জানান যে, মিলন তাদের হেফাজতে রয়েছে। তারা ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। পরে সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে তার পরিবার। অপহরণের তিনদিন পর ২৬শে ফেব্রুয়ারি মিলনকে হত্যা করে অপহরণকারীরা। এরপরও মিলনকে ফিরিয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে পরিবারের কাছ থেকে কয়েক ধাপে ২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ বাগিয়ে নেয় চক্রটি।

পরবর্তীতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সিজান ও মুরাদকে আটক করে। আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসামি সিজানের বাড়ির পেছনের অব্যবহৃত টয়লেটের স্লাবের ভেতর থেকে বুধবার রাত ৩টার দিকে মাটি খুঁড়ে মিলনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে আরেক আসামি রত্না আক্তার ইভাকে আটক করে। ধারণা করা হচ্ছে, অপহৃত মিলন অপহরণকারী চক্রকে চিনে ফেলায় তারা হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা অনেকদিন ধরে এই বিষয়ে কাজ করছিলাম কিন্তু কোনো ক্লু পাচ্ছিলাম না। প্রযুক্তির সহযোগিতায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তারা স্বীকার করে তারা মিলনকে খুন করেছে ও তাদের দেয়া তথ্যমতে, মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।

mzamin


সরগরম ইফতার রাজনীতি by কিরণ শেখ

পবিত্র রমজান মাস হওয়ায় রাজনৈতিক কর্মসূচি খুব একটা নেই দলগুলোর। এই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয় ইফতার আয়োজন নিয়ে। বিগত বছরগুলোতে বিএনপি-জামায়াতসহ অনেক দল ইফতার কর্মসূচিও পালন করতে পারেনি ইচ্ছামতো। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে এবার ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট হাজির হয়েছে। ইফতার কর্মসূচিতে সমমনা দলগুলোর নেতাদের পরস্পরের সাক্ষাৎ-আলোচনা হচ্ছে। রমজানের শুরু থেকে রাজনৈতিক দল ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো ধারাবাহিকভাবে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে আসছে। কেন্দ্র থেকে সারা দেশে চলছে এই আয়োজন। এবারের রমজানে ব্যতিক্রম হলো গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটসঙ্গী দলগুলো। এসব দল এবার প্রকাশ্যে ইফতার মাহফিল করার মতো অবস্থায় নেই।

রমজান মাসের শুরু থেকেই ইফতার মাহফিল আয়োজন করে আসছে বিএনপি, জামায়াত, নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এই আয়োজনের মধ্যদিয়ে রমজান মাসকে তারা গণসংযোগের মাস হিসেবে বেছে নিয়েছে। ইফতার মাহফিল ঘিরে মাঠে সরব ইসলামী দলগুলো। ইফতার আয়োজন যেন হয়ে উঠছে নেতাদের মিলনমেলা। ওদিকে সামনে জাতীয় নির্বাচন। যদিও নির্বাচনের তারিখ এখনো ঘোষণা হয়নি। এরপরও নির্বাচনের প্রস্তুতি রাখতে চাইছে দলগুলো। এজন্য রমজান মাসেও ইফতার মাহফিলের মধ্যদিয়ে গণসংযোগ করছে নেতারা। রাজনৈতিক দলগুলো ঢাকায় ইফতার মাহফিলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ও মহল্লায় ইফতার আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ইফতার মাহফিলগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নানা ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মতের মিল এবং অমিলের বিষয়টি প্রকাশ পাচ্ছে দল দু’টির নেতাদের বক্তৃতা এবং বিবৃতিতে। এরপরও বিএনপি’র ইফতারে জামায়াতের নেতাদের এবং জামায়াতের ইফতারে বিএনপি’র নেতাদের দেখা যাচ্ছে। একই টেবিলে বসে ইফতার করেন নেতারা। চলে কুশল বিনিময় ও রাজনৈতিক কথোপকথন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। এসব আয়োজনে নেতারা দিচ্ছেন ঐক্যের ডাক। পাশাপাশি দ্রুত নির্বাচনের বার্তাও দেয়া হচ্ছে।

গত ৩রা মার্চ রমজানে ইফতার মাহফিল আয়োজনে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণসহ দেশব্যাপী জেলা ও মহানগরে দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একটি নোটিশ পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় বিএনপি। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত নোটিশে বলা হয়, রমজান মাসে দলের পক্ষ থেকে তৃণমূল স্তর থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী, বাহুল্য পরিত্যাগ করে অনাড়ম্বরপূর্ণভাবে ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠান করতে হবে, এক্ষেত্রে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণসহ সারা দেশে ওয়ার্ড পর্যায়ে মসজিদ কিংবা বাজার সংলগ্ন খোলা জায়গায় ইফতার ও দোয়া মাহফিলের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, ইফতার ও দোয়া মাহফিলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে, ব্যানারে শুধুমাত্র ‘ইফতার ও দোয়া মাহফিল’ লেখা থাকবে। ২০ রমজানের মধ্যে ইফতার ও দোয়া মাহফিলের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করারও নির্দেশনা দেয়া হয়।

বিএনপি: প্রথম রোজায় রাজধানীর ইস্কাটনে লেডিস ক্লাবে এতিম-ওলামা-মাশায়েখদের নিয়ে ইফতার করে বিএনপি। এরপরে গত ৬ই মার্চ হোটেল ওয়েস্টিনে ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের নিয়ে ইফতার করে বিএনপি। এতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং মানবতা সমুন্নত রাখার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্য কেবল তার জনগণই নির্ধারণ করবে। সামনের পথ স্পষ্ট, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে দ্রুত প্রত্যাবর্তন।

ওদিকে গতকাল রাজধানীর ইস্কাটনে লেডিস ক্লাবে রাজনীতিবিদদের নিয়ে ইফতার করে বিএনপি। আগামীকাল পেশাজীবীদের সম্মানে ইফতারের আয়োজন করবে দলটি। এছাড়া প্রায় প্রতিদিনই ঢাকা মহানগরের বিএনপি বা দলের অঙ্গ-সংগঠনের উদ্যোগে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হচ্ছে। একইসঙ্গে সারা দেশে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা এবং থানায়ও ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে। এসব কর্মসূচি থেকে বিএনপি’র রাজনীতি জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের বার্তাও দিচ্ছে দলটি।

বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মানবজমিনকে বলেন, দলকে সংগঠিত করা, দাবি, সজাগ থাকা এবং গণতন্ত্রের প্রতি যাতে নিবেদিত হয়, এই বার্তাগুলো ইফতার মাহফিলে নেতাকর্মীদের দেয়া হচ্ছে।

জামায়াত: দীর্ঘ এক দশক পর গত ৯ই মার্চ গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে ঢাকায় কর্মরত কূটনীতিকদের নিয়ে ইফতার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এরপর ১৫ই মার্চ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, কবি-সাহিত্যিক, ডাক্তার, সাংবাদিক, গবেষক, ব্যবসায়ী ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিকে নিয়ে ইফতার করে জামায়াত। এ ছাড়া দলটি প্রতিদিনই ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও থানায় ইফতার মাহফিলের আয়োজন করছে। এসব কর্মসূচিতে দলটি নির্বাচনের বার্তা দিচ্ছে। বলছে, আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, এরপরে জাতীয় নির্বাচন করা উচিত। স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ করে সব রাজনৈতিক দলের নেতারা বসে আলোচনার মধ্যদিয়ে একটি সমাধানে পৌঁছে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া উচিত বলেও মনে করছে দলটি।

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর  ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের মানবজমিনকে বলেন, রমজানের শিক্ষা, গুরুত্ব, শবে বরাত সম্পর্কে এবং সম-সাময়িক ইস্যুতে আমাদের কথা জনগণকে জানানো হচ্ছে।

ওদিকে গত ১১ই মার্চ রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুমে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক, ছাত্র-শ্রমিক, ওলামায়ে কেরাম এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে ইফতার মাহফিল করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। এতে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, হেফাজতে ইসলামসহ রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। এছাড়া এবি পার্টি, হেফাজতে ইসলাম, নাগরিক ঐক্য, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোও ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছে। মূলত তার কথা, কিছু উদ্দেশ্যে এসব ইফতার মাহফিলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে দলগুলো। এর মধ্যদিয়ে নেতা-কর্মীদের চাঙা  ও সমবেত করা এবং সাধারণ মানুষ যারা ইফতারে আসবেন তাদেরকে নির্বাচনের বার্তা দেয়া।

mzamin

সিলেটে অলিউরের ওপর এবার রাজন স্টাইলে নির্মমতা by ওয়েছ খছরু

সিলেটে শিশু রাজনকে নির্যাতন ও খুনের ঘটনা খুব বেশি দিন আগের নয়। ‘চোর অপবাদ’ দিয়ে শহরতলীর টুকেরবাজারে রাজনকে প্রকাশ্য পিটিয়ে খুন করে লাশ গুমের চেষ্টা চালানো হয়। রাজনের মতো দেখতে শিশু অলিউরও। বাড়ি রাজনের উপজেলা বিশ্বনাথেই। দোকান কর্মচারী সে। রোববার একইভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৪ বছর বয়সী অলিউর রহমান। ৩৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ভাসছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এতে দেখা গেছে, এক কিশোরকে হাতের লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে একজন যুবক। তাকে ধরে আছে আরেকজন। গোল হয়ে দাঁড়িয়ে নারী-পুরুষ সেটি দেখছেন আর হাসছেন। অন্যদিকে, নির্মমতার শিকার কিশোর অলিউর গগণবিদারী আর্তনাদ করছেন। বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছে। অঝোরে কাঁদছে। কিন্তু তার আর্তনাদ শুনছে না নির্যাতনকারীরা। নির্যাতনে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেতলে যায় অলিউরের। রক্ত ঝরছিল। এমন ভিডিও যারা দেখছেন তারা ধিক্কার জানাচ্ছেন। ঘটনায় ক্ষোভ বাড়ছে বিশ্বনাথে।

ঘটনাস্থল বিশ্বনাথের মটুকোনা গ্রামের দেওকলস গ্রামের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লায়েক আহমদের বাড়ি। পার্শ্ববর্তী মজিপুর গ্রামের বাসিন্দা রুহেল মিয়ার ছেলে কিশোর অলিউর রহমান রোববার বিকালে বিশ্বনাথ থেকে বাড়ি ফিরছিল। সে বিশ্বনাথে একটি নিত্যপণ্যের কোম্পানির সেলসম্যান হিসেবে কাজ করে। মটুকোনা গ্রামে পৌঁছামাত্র গরু চোর অপবাদ দিয়ে তাকে আটক করে এলাকার নানু মিয়া, লোকমান, সুমন, বারীকসহ কয়েকজন। গ্রামের রাস্তাতেই অলিউর রহমানকে বেধড়ক পেটানো হয়। এরপর তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লায়েকের বাড়িতে। একটি ভিডিওতে দেখা গেছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লায়েক আহমদ সেখানে উপস্থিত রয়েছেন। এ সময় কয়েকজন যুবক তাকে মারধর করছে। একইসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদও করছে। এতে ক্ষোভ ঝাড়েন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। গালিগালাজ করেন উপস্থিত থাকা উত্তেজিত যুবকদের। বলেন, তোমরা মেম্বার না আমি। এরপর তিনি হাত-পা বেঁধে রাখা কিশোর অলিউরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে বলেন, তার অভিভাবককে ডেকে এনে তাকে ছেড়ে দিতে। চেয়ারম্যানের এই ভিডিও এখানে শেষ হলেও অপর এক ভিডিওতে দেখা গেছে; মটুকোনা গ্রামের আব্দুল বারীক নামে এক যুবক হাতে লাঠি নিয়ে বেধড়ক পেটাচ্ছেন অলিউরকে। লাঠির আঘাতে চিৎকার করছিল সে। কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। বরং এ সময় উপস্থিত থাকা কয়েকজন যুবক অলিউরকে টেনে-হিচড়ে লাঠির সামনে নিয়ে যেতে চায়।

এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভ দেখা দেয়। এমনভাবে কেউ কাউকে নির্যাতন করতে পারে- এমন প্রশ্ন করেন বিশ্বনাথের মানুষ। খবর শুনে তাৎক্ষণিক লায়েকের বাড়িতে ছুটে যান কিশোর অলিউরের পিতা রুহেল মিয়া। এ সময় তিনি দেখতে পান তার ছেলের হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করা হচ্ছে। পরে সাদা কাগজে দস্তগত দিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। নিয়ে আসার পর অলিউরের শারীরিক অবস্থার বিবরণ দিয়ে আরেকটি ভিডিও করা হয়। সেখানে নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন কিশোর অলিউর। এতে দেখা গেছে, লাঠির আঘাতে অলিউরের গোটা শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। বিভিন্ন স্থানে শরীর ফেটে যায়। এসব স্থান দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরে। কিশোর অলিউর রহমান জানায়, তাকে সবচেয়ে বেশি নির্যাতন করে ওই গ্রামের নানু মিয়া। সে তার বুকের ওপর বসে গলায় হাত টিপনি দিয়ে ধরে। এ সময় তার মনে হয়েছিল মারাই যাবে। একপর্যায়ে গলা থেকে হাত সরালেও বুকের উপর্যুপরি কিলঘুষি মারে। আর লাঠি দিয়ে নির্যাতন করে আব্দুল বারীক।

উপস্থিত লোকজনও তাকে দমাতে পারছিলেন না। এদিকে, নির্মম নির্যাতনে গুরুতর আহত অলিউর রহমানকে সন্ধ্যার পর সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় ভর্তি করা হয়। তাকে জরুরি বিভাগে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে নেয়ার পর দু’দিন রেখে বাড়ি নেয়া হয়েছে। তবে এখনো ভালোভাবে হাঁটতে পারছে না অলিউর রহমান। তার শরীরের অভ্যন্তরীণ অংশে জখম হয়েছে। এ কারণে সেরে উঠতে সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। রুহেল জানান, তার ছেলেকে দল বেঁধে নির্যাতন করা হয়েছে। সে নির্দোষ। অথচ তাকে নির্দয়ভাবে পেটানো হয়েছে। এদিকে, ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ঘটনার গভীরতা আঁচ করতে পেরে সরব হয় বিশ্বনাথ থানা পুলিশ। এ ঘটনায় সোমবার অলিউরের মা জলি বেগম বিশ্বনাথ থানায় দেওকলস ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’সহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন। মঙ্গলবার বিশ্বনাথ থানা পুলিশ মামলা রেকর্ড করেছে। আসামি ধরতে থানা পুলিশ অভিযানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন থানার ওসি এনামুল হক চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, এটি একটি অমানবিক ঘটনা। এ ঘটনায় মামলা নেয়া হয়েছে।’ মামলায় আসামি করা হয়েছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও কালিজুড়ি মটুকোনা গ্রামের মৃত আব্দুল আহাদের পুত্র লায়েক আহমদ মেম্বার একই গ্রামের রুস্তুম আলীর পুত্র নানু মিয়া, সদরপুর মটুকোনা গ্রামের কাহানুর মিয়ার পুত্র লোকমান মিয়া, কালিজুরি মটুকোনা গ্রামের জলিল মিয়ার পুত্র সুমন আহমদ ও কমসির আলীর পুত্র আব্দুল বারীককে। সিলেট জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা, সিনিয়র এএসপি সম্রাট হোসেন জানিয়েছেন, পুলিশ আসামি ধরতে অভিযান চালাচ্ছে। কয়েকটি টিম একসঙ্গে মাঠে কাজ করছে। 

mzamin