Saturday, August 30, 2014

স্ত্রীকে এড়াতে!

গ্রেপ্তার চন্দ্র মোহন শর্মা
তিন মাস আগে দিল্লির কাছে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হয়েছেন বলেই সবাই জানত। চন্দ্র মোহন শর্মা (৩৮) নামে ভারতের তথ্য অধিকার আন্দোলনের সেই কর্মীকে দিব্যি জীবিত অবস্থায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিজের মৃত্যু নিয়ে জালিয়াতি ও খুনের অভিযোগ তোলা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পুলিশ বলছে,
স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে চন্দ্র মোহন গাড়ি দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়া এক ব্যক্তির লাশের পাশে নিজের মানিব্যাগসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ফেলে রেখে মৃত্যুর নাটক সাজান। এরপর প্রতিবেশী এক নারীকে নিয়ে দক্ষিণ ভারতের ব্যাঙ্গালুরু চলে যান। পুলিশ ওই নারীর মুঠোফোনের ওপর নজরদারি করে চন্দ্র মোহনকে গ্রেপ্তার করে। পিটিআই

পাকিস্তানে সেনা ‘হস্তক্ষেপ’ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি

রাহেল শরিফ,ইমরান খান
পাকিস্তানে চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সেনাবাহিনীর কথিত হস্তক্ষেপ নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এবং তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনরত বিরোধী রাজনৈতিক দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ও পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিকের (পিএটি) নেতারা পরস্পরবিরোধী অভিযোগ করছেন। বিরোধীরা বলছেন, রাজনৈতিকভাবে সংকট সমাধানে ব্যর্থ হয়ে সরকার নিজেই সামরিক বাহিনীকে ডেকে আনছে। অন্যদিকে নওয়াজ শরিফ গতকাল শুক্রবার পার্লামেন্টে বলেন, তিনি নিজে মধ্যস্থতার জন্য সেনাবাহিনীকে ডাকেননি। পিটিআই ও পিএটির অনুরোধেই সেনাপ্রধানকে দল দুটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে অনুরোধ করেছেন তিনি। এ অবস্থায় গতকাল সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরকারের নির্দেশেই তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। খবর ডন, এনডিটিভি ও এএফপির। গতকাল পার্লামেন্টে নওয়াজ শরিফ বলেন, ‘মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার জন্য আমরা সেনাবাহিনীকে বলিনি। কিন্তু সেনাবাহিনী এটি যেকোনোভাবেই করতে পারে। কারণ ইসলামাবাদের এ অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর।’ পিটিআই ও পিএটির নেতা-কর্মীরা ইসলামবাদে ‘মার্চ’ করে এসে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে অবস্থান করছেন। সরকার রাজধানীর কঠোর নিরাপত্তাধীন এলাকা ‘রেড জোনের’ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি কিছুসংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েন করে। পার্লামেন্টে নওয়াজের বক্তব্যের পরপরই পিএটির প্রধান তাহির-উল-কাদরি বলেন, ‘সরকার পুরো জাতির সঙ্গে মিথ্যাচার করেছে।
তারা জাতিকে ধোঁকা দিয়েছে।’ পিটিআইয়ের নেতা ইমরান খানও পিএটি নেতার বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় মধ্যস্থতা করার জন্য তাঁর দলও সেনাবাহিনীর সঙ্গে বৈঠক চায়নি। এর আগে বৃহস্পতিবার সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইমরান খান ও তাহির-উল-কাদরি। সংকট কাটাতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনে সেনাপ্রধানের দেওয়া প্রস্তাব এ দুই নেতা মেনে নেন। ইমরান ও কাদরির নেতৃত্বে তাঁদের অনুসারীরা ১৫ আগস্ট থেকে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে নওয়াজ ভোট জালিয়াতি করেছেন। সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকের পর অনুসারীদের উদ্দেশে ইমরান খান বলেন, ‘সরকার সেনাবাহিনীকে বলছে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে। এর অর্থ হলো, এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো রাজনৈতিক সমাধান আছে বলে সরকার মনে করে না।’ সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিম বাজওয়া বলেন, ইমরান ও কাদরি উভয়েই সেনাপ্রধানের সঙ্গে পৃথকভাবে দেখা করেছেন। তাঁরা দুজনই চলমান সংকট নিরসনে সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরুর ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণে রাজি। এদিকে আজ শনিবার রাজধানী ইসলামাবাদের বাইরে করাচি, লাহোর, মুলতান ও ফয়সালাবদ শহরে বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছেন ইমরান খান। গতকাল রাজধানীতে পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচিতে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি এ ঘোষণা দেন।

ইউক্রেনে হাজার রুশ সেনা

ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনাদের অনুপ্রবেশের খবর ‘অনুমাননির্ভর’ বলে গতকাল শুক্রবার উড়িয়ে দিয়েছে দেশটি। রাশিয়া সেনা পাঠিয়ে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে—ন্যাটোর এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা বলেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। এই প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন বলেছে, তারা জোটনিরপেক্ষ অবস্থান ত্যাগ করে ন্যাটোর সদস্যপদ অর্জনের পথে এগোতে চায়। খবর এএফপি, রয়টার্স, এপি ও বিবিসির। রুশপন্থী বিদ্রোহীরা ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়ে একটি উপকূলীয় শহর ঘিরে ফেলেছে বলে গত বৃহস্পতিবার খবর প্রকাশিত হয়। আরও খবর পাওয়া যায়, বিদ্রোহীদের সঙ্গে মিলে প্রকৃত রুশ সেনারাও ইউক্রেন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো এক জরুরি বৈঠক শেষে গত বৃহস্পতিবার বলেছে, ইউক্রেনের সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাশিয়ার অন্তত এক হাজার সেনা অংশ নিচ্ছে। ন্যাটো কৃত্রিম উপগ্রহের (স্যাটেলাইট) তোলা ছবি দেখিয়ে বলেছে,
এতে ইউক্রেনের অভ্যন্তরে রুশ সেনাদের উপস্থিতি দেখা গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, রাশিয়া উদ্দেশ্যমূলকভাবে এবং বারবার ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন করেছে। দেশটির অভ্যন্তরে চলমান আক্রমণের জন্য মস্কোকে আরও মাশুল দিতে হবে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে রুশ সেনাদের উপস্থিতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি কিয়েভ কর্তৃপক্ষকে রুশপন্থী বিদ্রোহীদের সঙ্গে ‘অর্থবহ’ আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া ইউক্রেনের কিছু সেনাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তিনি বিদ্রোহীদের প্রতি আহ্বান জানান। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী বলেছে, বিদ্রোহীদের প্রতি পুতিনের আহ্বান এটাই প্রমাণ করে যে ক্রেমলিন থেকেই ওই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

৩০০ সৈন্য হত্যা করেছে আইএস

ইরাকের পর এবার সিরিয়ার সৈন্যদের হত্যা করছে ইসলামি স্টেট (আইএস)। উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ আল-রাক্কা থেকে আটক ৩০০ সরকারি সেনাকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইন্টারনেটে প্রচারিত এক ভিডিওতে এসব সেনাকে হত্যার ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। তবে নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে এ দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, সম্প্রতি ইসলামি স্টেটের জঙ্গিরা আল-তাবাকা বিমানঘাঁটিটি দখলে নেয়। ওই সময় পলায়নরত সিরীয় সেনাদের আটক করে তারা।
একটি ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, জঙ্গিদের অস্ত্রের মুখে ১০ সিরীয় সেনা তাদের ইউনিফর্ম ছাড়া শুধু অন্তর্বাস পরিহিত অবস্থায় অজ্ঞাত স্থানের দিকে হেঁটে যাচ্ছে যেখানে তাদের হত্যা করা হয়। সিরিয়ান অবজারভেটরি হত্যার শিকার সেনার সংখ্যা ১৬০ জনের বেশি বললেও অন্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, নিহত সেনার সংখ্যা ৩০০। এর আগে ইরাকে শত শত সেনা সদস্যকে আটকের পর হত্যা করে আইএস জঙ্গিরা। ২৪ অগাস্ট আইএস জঙ্গিদের সঙ্গে প্রবল লড়াইয়ের মুখে আল-তাবাকা বিমানঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ হারায় সিরীয় সেনারা। একপর্যায়ে লড়াইয়ে পিছু হটে সিরীয় বাহিনী। আল-রাক্কায় এই বিমানঘাঁটিটিই ছিল ওই অঞ্চলে সিরীয় সেনাবাহিনীর সর্বশেষ শক্ত ঘাঁটি। তবে প্রায় বছরখানের আগে আইএস যোদ্ধাদের কাছে আল-রাক্কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল সিরীয় বাহিনী। ইসলামি স্টেট (আইএস) ইতিপূর্বে দি ইসলামিক স্টেট অ্যান্ড দ্য লেভান্ত (আইএসআইএল) নামে পরিচিত ছিল। সম্প্রতি এই উগ্রপন্থী গোষ্ঠীটি দাবি করেছে তারা সিরিয়া এবং ইরাকের বিশাল অংশ নিয়ে ‘ইসলামি খেলাফত’ প্রতিষ্ঠা করেছে, যা ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক মানচিত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। এই গোষ্ঠীটির ৭০ হাজার যোদ্ধা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এসব যোদ্ধা আবু বাকার আল-বাগদাদির নেতৃত্বে ‘ইসলামি খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বিচারে হত্যাসহ অন্যান্য অপরাধ ঘটিয়ে যাচ্ছে।

অপহরণের চার বছর পর ভিসি মুক্ত

পাকিস্তানের গোলযোগপূর্ণ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তালেবানের হাতে দীর্ঘ চার বছর ধরে বন্দি থাকার পর সৈন্যরা এক শিক্ষাবিদকে উদ্ধার করেছে। শুক্রবার সরকারি কর্মকর্তারা এ কথা জানান। এএফপি।
পাকিস্তানি তালেবান ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর পেশোয়ারের ইসলামিয়া কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আজমল খানকে অপহরণ করে। পেশোয়ারের এক সিনিয়র নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, উত্তর ওয়াজিরিস্তানের একটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে খানকে উদ্ধার করা হয়। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী গত মধ্য জুনের পর থেকে তালেবান জঙ্গিদের শক্তিশালী ঘাঁটি উত্তর ওয়াজিরিস্তানে তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালিয়ে আসছে।

এবার কুর্দি তরুণের গলা কেটে ভিডিও প্রকাশ

ইসলামিক স্টেটের সদস্যরা এবার এক কুর্দি তরুণের গলা কেটে ভিডিও প্রকাশ করেছে। ইরাকের উত্তরাঞ্চলে আইএসের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধের ব্যাপারে সতর্ক করতেই তারা এ ভিডিও প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে। রক্তের বার্তা (ম্যাসেজ ইন ব্লাড) শিরোনামে ওই ভিডিওটিতে দেখা গেছে, কমলা রংয়ের জ্যাম্পস্যুট পরা এক ব্যক্তি বলেছেন, বেশ কয়েকজন কুর্দি যোদ্ধাকে বন্দি করা হয়েছে। পরে ওই তরুণকে আইএসের দখল করা মসুল শহরের একটি মসজিদের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে দেখা যায়।
এর পর তাকে শিরশ্ছেদ করা হয়।ভিডিওতে আইএসের সদস্যরা জানান, কুর্দি নেতারা যদি যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেয়া অব্যাহত রাখে তাহলে বাকি বন্দি যোদ্ধাদেরও হত্যা করা হবে। ইরাকের উত্তরাঞ্চলে স্বশাসিত কুর্দিস্তানের যোদ্ধারা মার্কিন বিমান হামলার পাশাপাশি আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আইএস সদস্যরা হামা প্রদেশের তাবকা বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর পর কুর্দি যোদ্ধারা পালানোর সময় তাদের বন্দি করা হয় বলে সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে। এর আগে আইএস সদস্যরা সিরিয়ান সেনাদের গণহত্যার ভিডিও প্রকাশ করেছিল। সিরিয়ায় একটি সেনা ঘাঁটি দখলের পর ওই সেনাদের বন্দি করেছিল আইএস। বিবিসি।

রোনাল্ডোর মাথায় মুকুট

বছরের শুরুতেই পেয়েছেন বিশ্বসেরার স্বীকৃতি। এবার ইউরোপের বর্ষসেরা ফুটবলার নির্বাচিত হলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। বিশ্বকাপজয়ী জার্মান গোলকিপার ম্যানুয়েল নুয়ার ও ডাচ প্লেমেকার আর্জেন রবেনকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো উয়েফা অ্যাওয়ার্ড জিতলেন রিয়াল মাদ্রিদের পর্তুগিজ সুপারস্টার। বৃহস্পতিবার মোনাকোতে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের গ্র“পপর্বের ড্র অনুষ্ঠানে উয়েফার সদস্যভুক্ত দেশগুলোর ৫৪ জন সাংবাদিকের তাৎক্ষণিক ভোটে বিজয়ী হন রোনাল্ডো। পর্তুগাল অধিনায়কের হাতে ২০১৩-১৪ মৌসুমের সেরা ইউরোপিয়ান খেলোয়াড়ের পুরস্কার তুলে দেন উয়েফা প্রেসিডেন্ট মিশেল প্লাতিনি। মেয়েদের বিভাগে সেরার স্বীকৃতি পেয়েছেন জার্মান মিডফিল্ডার নাদিন কেসলার। ২০০৮ সালে ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পাশাপাশি ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন রোনাল্ডো। পুরস্কার দুটি একীভূত হয়ে যাওয়ার পর ২০১০-১১ মৌসুমে চালু হয় উয়েফা অ্যাওয়ার্ড। ইউরোপিয়ান ফুটবলের সেরা খেলোয়াড়ের এই নতুন পুরস্কার এতদিন অধরাই ছিল সিআর সেভেনের। প্রথমবার জিতেছিলেন লিওনেল মেসি। এরপর যথাক্রমে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও ফ্র্যাংক রিবেরির হাতে উঠেছে ইউরোপসেরার মুকুট। টানা চতুর্থবারের মতো প্রাথমিক মনোনয়ন পেলেও সেরা তিনে এবার জায়গা হয়নি মেসির। অথচ ব্রাজিল বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন বার্সেলোনার আর্জেন্টাইন জাদুকর।  আসলে উয়েফা তো আর ফিফা নয়। বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স নিয়ে ভাবতে তাদের বয়েই গেছে!
তাই চ্যাম্পিয়ন্স লীগের সেমিফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখকে যেভাবে হারিয়েছিল রিয়াল, ওয়েফা বর্ষসেরার লড়াইয়েও একইভাবে বায়ার্নের নুয়ার ও রবেনকে হারালেন রোনাল্ডো। বিশ্বকাপে রোনাল্ডোর পর্তুগালের ভরাডুবি হলেও ক্লাব ফুটবলে সোনায় মোড়ানো একটি মৌসুম কাটিয়েছেন পর্তুগিজ রাজপুত্র। রিয়ালকে বহু আরাধ্য লা ডেসিমা জেতানোর পথে চ্যাম্পিয়ন্স লীগে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ১৭ গোলের রেকর্ড গড়েছেন। স্প্যানিশ লীগে করেছেন সর্বোচ্চ ৩১ গোল। সব মিলিয়ে ৪৭ ম্যাচে ৫১ গোলের মৌসুমে সেরার স্বীকৃতি রোনাল্ডোরই প্রাপ্য। পর্তুগালের মেদেইরা দ্বীপে অবস্থিত ব্যক্তিগত জাদুঘরের শোভা বাড়াতে একটি নতুন স্মারক পেয়ে অভিভূত রোনাল্ডো বলেছেন, ‘আমার জাদুঘরে এই ট্রফিটি ছিল না। আমার ভাই নিশ্চয় এটার জন্য জায়গা ঠিক করে রেখেছে!’ সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাতেও ভুল করেননি রোনাল্ডো, ‘এই পুরস্কারের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। তাই সত্যিই খুব ভালো লাগছে। সবার আগে আমি আমার দল ও সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাই। ওদের সাহায্য ছাড়া এই ট্রফি জেতা অসম্ভব ছিল। দুর্দান্ত মৌসুম গেছে। চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, স্প্যানিশ কাপ ও উয়েফা সুপার কাপ জিতেছি আমরা। লা ডেসিমার জন্য বহু বছর ধরে অপেক্ষায় ছিল সমর্থকরা।’ চ্যাম্পিয়ন্স লীগে টানা দু’বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার নজির নেই কোনো দলের। এবার ইতিহাস গড়ার হাতছানি রিয়ালের সামনে। বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিচ্ছেন রোনাল্ডো, ‘কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। আমরা এবারও জিততে পারি।’ এবার রিয়ালের গ্র“পেই পড়েছে পুরনো শত্র“ লিভারপুল। ২০০৮-০৯ মৌসুমে সর্বশেষ সাক্ষাতে দু’লেগ মিলিয়ে ৫-০ গোলে হেরেছিল রিয়াল। রোনাল্ডো তখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলতেন। সেটা উল্লেখ করে লিভারপুলকে এবার দেখে নেয়ার হুমকি দিয়ে রাখলেন রোনাল্ডো, ‘৫-০? আমি তখন রিয়ালে ছিলাম না। এবারের গল্পটা অন্যরকম হবে। লিভারপুলের সঙ্গে খেলতে ভালোই লাগবে আমার। মাঠেই প্রমাণ হয়ে যাবে কে সেরা।’ ওয়েবসাইট।

গুঞ্জন শুনি

বিতর্কের কারণে ভারতীয় মডেল পুনম পান্ডের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে ফেসবুক ইন্ডিয়া- এটা পুরনো খবর। ফেসবুকে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ভক্ত হারিয়ে কিছুটা মন খারাপ হলেও পুনম এবার আসছেন ভিন্ন রূপে। ফেসবুক থেকে উধাও হয়েছেন তো কী হয়েছে? এবার ভক্তদের হাতের মুঠোয় আসতে চলেছেন বিতর্কিত এই মডেল ও অভিনেত্রী। তবে ঠিক মুঠোয় নয়, মুঠোফোনে বলাটাই ভালো। ‘স্ট্রিপ কুইন’ পুনম এবার হাজির হচ্ছেন মোবাইল অ্যাপসে।
সম্প্রতি এক টুইটার বার্তায় খোদ পুনমই এ কথা জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এবার সব থেকে হট অ্যাপস আসতে চলেছে আমার অনুগামীদের কাছে।’ এরই মধ্যে পুনমের মোবাইল অ্যাপস আসার খবরে বেশ গুঞ্জন ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ভক্তরা নতুনরূপে আবারও পুনমকে দেখতে পাওয়ার আশা জাগানিয়া গান শুনলেও সমালোচকরা কিন্তু মন্তব্য করতে পিছপা হননি। তারা বলেছেন, এটা পুনমের পাবলিসিটি স্ট্যান্ট। যদিও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হারানোর শোকে রীতিমতো মূহ্যমান পুনম এখন ফের অক্সিজেন খুঁজে পাচ্ছেন নয়া অ্যাপসের দৌলতে। এখন শুধু অপেক্ষার সময়।

অপরাধ ও অপরাধী নিয়ন্ত্রক by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

চাঞ্চল্যকর কোনো খুনের ঘটনা ঘটলে, গুরুত্বপূর্ণ কেউ অপহৃত হলে অথবা অন্য কোনো বড় অপরাধ সংঘটিত হলে মিডিয়া মুখর হয়, সরকারের সমালোচনা হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। সরকারও কিছুটা নড়েচড়ে বসে। মন্ত্রী-সাংসদেরা বিবৃতি দেন। পুলিশের কর্মকর্তারা দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করেন। খুনি যে-ই হোক অথবা অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। মিডিয়ার মনোযোগ, তা আমাদের দেশে হোক, বিদেশে হোক, একটা শিশুর মতো, খুবই স্বল্পস্থায়ী। একটা বড় ঘটনার পেছনে মিডিয়া যদি দিন কয়েক লেগে থাকে, আরেকটি বড় ঘটনা ঘটে, সেই মনোযোগ আর থাকে না। আর কোনো অপরাধের খবর মিডিয়া থেকে মিলিয়ে গেলে তার প্রতিকারও দূরের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অপরাধী আড়াল থেকে ফিরে আসে, অথবা ধরা পড়লেও জামিন নিয়ে বেরিয়ে যায়। নতুন করে অপরাধ ঘটায়, অথবা মিডিয়ায় বেশি শোরগোল হলে বিদেশে পালায়। ফলে অপরাধ চক্রের ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ পড়ে না।
কিন্তু অপরাধ কেন হয়, অপরাধের মাত্রা কেন বাড়ে, অপরাধী কেন বেপরোয়া হয়, সেই প্রশ্নে তেমন কোনো সময় দেওয়া হয় না। একটা সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখতে হলে কাকে কী করতে হবে, কোন দায়িত্ব পালন করতে হবে, কোন দিকে নজর দিতে হবে, এসব রকেট-বিজ্ঞানের মতো জটিল কোনো বিষয় নয়, একজন স্কুলছাত্রও উত্তরগুলো বলে দিতে পারে। একবার এক বিতর্ক অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল, যার বিষয়বস্তু ছিল অপরাধ নির্মূল। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছিল অনুষ্ঠানটি। বিতর্কের দুই পক্ষই এমন চমৎকার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করল প্রসঙ্গটির যে শ্রোতাদের বুঝতে বাকি থাকল না, কেন অপরাধ হয় এবং কেন এর মাত্রা ও বিস্তার বাড়ে। কিন্তু ওই শিক্ষার্থীরা যেসব কারণ উল্লেখ করেছিল অপরাধ সংঘটনের, যার কিছু আমি এই লেখায় উল্লেখ করব, সেগুলো নিয়ে দারুণ অস্বস্তিতে পড়ে সরকার, রাজনৈতিক দল, শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আমাদের সমাজ। সে জন্য কারণগুলো সামনে এলে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা না করে ঝাড়ু দিয়ে গালিচার নিচে ঢুকিয়ে দিতেই উদ্গ্রীব হয়ে পড়ে সবাই। এক বিতার্কিক সেদিনের এক খবরের কাগজ দেখিয়ে বলল, এক সচ্ছল পরিবারের ছেলে এক গুরুতর অপরাধের দায়ে প্রমাণসহ অভিযুক্ত হলেও সব দোষ চাপানো হলো তার নির্যাতনের শিকার কিশোরীর ওপর। অপরাধটা ছিল ধর্ষণের, যা ওই শিক্ষার্থী তার সৌজন্যের কারণে উল্লেখ করেনি। তার প্রশ্ন ছিল, এই ছেলেটি যে একটি দানব, তা তো পরিবার মেনে নিল, এবং তাকে যে লাইসেন্স দিয়ে দিল, এতে এরপর আরও বড় অপরাধ ঘটাতে সে কি উৎসাহ পেল না?
এ কয়দিন দেশে খুনের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো লোমহর্ষক, ঠান্ডা মাথায় করা। এক মসজিদের ইমাম, ইসলাম ধর্ম নিয়ে যিনি কথা বলতেন টিভি চ্যানেলে, তাঁকে গলা কেটে খুন করা হলো। এক বাড়িতে ঢুকে তিনজনকে গুলি করে মারা হলো। সারা দেশে এ কয়দিনে ঘটেছে আরও অনেক খুন, জখম ও অন্যান্য অপরাধের ঘটনা। মিডিয়াতে লেখালেখি ও কথা বলা হচ্ছে। সরকারের এক প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বিরোধী দল (অর্থাৎ বিএনপি) সরব হয়েছে, বলছে, সরকার খুনের রাজত্ব কায়েম করেছে। এ সরকার ব্যর্থ। তবে সরকার আগেও বলেছে, ঘরের ভেতর মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। এই কথার ভেতর যুক্তি আছে। যেমন যুক্তি আছে নৌমন্ত্রীর কথায় যে পিনাক-৬ উদ্ধার না করতে পারাটা সরকারের ব্যর্থতা নয়। মন্ত্রী একে সাফল্যও বলছেন না, তবে আন্দাজ করি, কিছুদিন হাঁকডাক করে একটা উদ্ধার তৎপরতা যে দেখানো হলো, তা-ই বোধ হয় প্রকৃত সাফল্য। খুনের ব্যাপারেও হাঁকডাক হয়েছে। বলা হয়েছে দ্রুততম সময়ে অপরাধীরা ধরা পড়বে। তবে একটা অপরাধের সুরাহা হলেও ১০টার হয় না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে নবজাতক চুরি হওয়ার সাত দিনের মধ্যে র্যাব তাকে উদ্ধার করেছে, কিন্তু গত পাঁচ মাসে যে আরও ছয় নবজাতক চুরি হলো, তাদের খবর কী? মিডিয়া সাগর-রুনি হত্যার প্রসঙ্গ তোলে। ইলিয়াস আলীর অপহরণের প্রসঙ্গ তোলে। আরও অনেক অপরাধের গল্প বলে। কেন সেগুলোর সমাধান হয় না? কেন অপরাধীরা ধরা পড়ে না?
সরকারের দায়টা এখানে আসে। অপরাধ অপ্রতিরোধ্যভাবে কেন হয়, সে প্রশ্নের উত্তরে ওই বিতার্কিকেরা যা বলেছিল, তার সঙ্গে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ যোগ করে বলতে পারি, এর কারণ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, দায়মুক্তির চর্চা, অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়া, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, লোভের সংস্কৃতির ব্যাপকতা (যার একটি প্রকাশ দুর্নীতি), উগ্রবাদ, মাদক এসবের প্রভাব ইত্যাদি। অপরাধ হয়, কিন্তু অপরাধীরা ধরা পড়ে না, ধরা পড়লেও তাদের শাস্তি হয় না। এই বিষয়টাই তো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূলের প্রধান অন্তরায়। কেন শাস্তি হয় না? কারণ, অপরাধীদের রাজনৈতিক অবস্থান অথবা সংশ্লিষ্টতা। যারা আইনের রক্ষক, তারাই যদি ভক্ষক হয়ে দাঁড়ায়—যেমন ঘটেছে নারায়ণগঞ্জে এবং অন্য অসংখ্য জায়গায়—তখন অপরাধ আর অপরাধী এক হয়ে যায়।
সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের ভেতরে চলছে মারামারি, সরকারি দল যেসব থামানোর বদলে সহ্য করছে। টেন্ডার-বাণিজ্য চলছে। চলছে নানা অপকর্ম। সরকারদলীয় এক সাংসদের বিরুদ্ধে কাগজে অভিযোগ উঠছে ইয়াবা-বাণিজ্যের। নদী দখল করছেন সরকারদলীয় সাংসদেরা, নদীর মাঝখান দিয়ে কংক্রিটের রাস্তা বানাচ্ছেন ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য। সরকার নিশ্চুপ। এই নিশ্চুপতা শতবর্ষের। বিএনপি আজ অভিযোগ করছে সরকারের বিরুদ্ধে, কিন্তু বিএনপি আমলেও চিত্রটা ছিল একই রকমের, কারণ, নিজের দলের অপকর্মের দিকে চোখ বন্ধ রাখাটা পুরোনো চর্চা, যার ধারাবাহিকতাই আমরা এখন দেখছি।
একটা আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কল্পনা করুন—যার ছবিটা ওই স্কুল-বিতার্কিকেরা নিখুঁতভাবে এঁকেছিল—যেখানে সরকার অপরাধের প্রতি শূন্য-সহ্যবোধ বা জিরো টলারেন্স নিয়ে কাজে নামল, যেখানে অপরাধীর একটাই পরিচয় সে অপরাধী এবং রাষ্ট্র পুরো সক্রিয়তা নিয়ে নেমে পড়ল অপরাধ নির্মূলে। সেই রাষ্ট্রে অপরাধের ডগায় নয়, দৃষ্টি যাবে গোড়ায়, যেখানে শিশুরা শিখবে অপরাধকে ঘৃণা করতে, দেখবে তার দৃষ্টান্ত, যেখানে সংস্কৃতির শিক্ষা, আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার শিক্ষা তাদের নিজেদের শক্তি খুঁজে নিতে উদ্বুদ্ধ করবে। তারা আপন শক্তিতে বিশ্বকে জয় করতে দাঁড়িয়ে যাবে। ওই সংস্কৃতির শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা, অগ্রসর চিন্তা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা সমাজটাকেই বদলে দেবে। সেই সমাজে কোনো ধর্ষক ছেলেকে বাবাই তুলে দেবেন পুলিশের হাতে।
সেই আদর্শ রাষ্ট্রে গণতন্ত্র হবে তৃণমূলের, সেখানে তরুণেরা কোনো দলের লেজ হয়ে দানবশক্তি নিয়ে সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না, বরং সৃজনের শক্তি নিয়ে দেশটা এগিয়ে নিতে পথে নামবে। সেই রাষ্ট্রে উগ্রবাদ কলকে পাবে না, মাদক হেরে যাবে সৃজনশীল আত্মবিকাশের কাছে। অপরাধ একটা এক মাথার দৈত্য না যে ওই মাথাটা কেটে ফেললে অপরাধ নির্মূল হবে। গ্রিক পুরাণের হাইড্রার মতো এর শত মাথা। এই দৈত্যকে শুরুতেই পরাস্ত করতে হবে। বিতর্কের সেই আসরে বসে আমি বুঝেছিলাম, তরুণেরা তা করতে প্রস্তুত, সেই শক্তি অর্জন করতেও তারা প্রস্তুত। প্রস্তুত নয়, ইচ্ছুক নয় শুধু আমাদের রাজনৈতিক প্রশাসনিক কাঠামো ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা, আইনের রক্ষকদের ও সমাজের একটি অংশ। এর একটি কারণ, অপরাধ এখন বাণিজ্যও বটে। এই বাণিজ্যে এখন অনেকেরই রমরমা অবস্থা।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

‘রাইত জাগি পাহারা দেই...’ by তুহিন ওয়াদুদ

গত কয়েক দিনের বন্যায় দেশের অনেক স্থানেই জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে। সরেজমিনে বন্যা-পরিস্থিতি দেখার জন্য বেসরকারি টিভি চ্যানেলের একজন প্রতিবেদকসহ গিয়েছিলাম রংপুর-নীলফামারী-লালমনিরহাটের বন্যাদুর্গত এলাকায়। লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার দহগ্রামের সরদারপাড়ায় গিয়ে যে দৃশ্য দেখলাম, তাতে অশ্রু সংবরণ করাÿ কঠিন। বেশ কিছু বাড়ি, একরের পর একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। টিন ও শণের কয়েকটি ঘর ঘেঁষে ভাঙনপ্রবণ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতেই ভয় হয়। যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। তারপরও টিন-শণের ঘরের মানুষগুলো শিশুদের নিয়ে আছে।
জিজ্ঞাসা করলাম তারা কেন এখনো অন্যত্র সরে যায়নি। আনোয়ারা নামের এক মধ্যবয়সী নারী জবাব দিলেন, ‘এই ছয় শতক জমি ছাড়া হামার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। রাস্তায় গিয়ে উঠমো সে রকম রাস্তাও নাই। সারা রাইত জাগি পাহারা দেই, কখন নদী ভাঙে। ঘুমাইলে যদি ছাওয়াল ডুবি যায়, সেই ভয়ে ঘুমাই না।’
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা জাহাঙ্গীর আঙুল তুলে দেখাচ্ছিলেন, ‘ওই-ই যে কী যেন একটা ভাসি যায়, ওইখানে হামার বাড়ি আছলো।’ ভাসমান বস্তু দেখে আর একজন বলে, ‘ও রকম করি হামার বাড়িও ভাসি গেইছে।’ একজন অশীতিপর বৃদ্ধ করুণ চোখে তাকাচ্ছিলেন, এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করছিলেন। তাঁর কাছে জানতে পারলাম তাঁদের সব জমিই নদীতে। ছেলেরাও অভাবী, তাঁদের ঠিকমতো খাবার জোটে না, বৃদ্ধের তো নয়ই। একজন গণমাধ্যমকর্মী তাঁর হাতে এক হাজার টাকা দিয়ে বললেন, কিছু যেন কিনে খান। বৃদ্ধের চোখে বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতার চিহ্ন লক্ষ করলাম। গ্রামের পর গ্রাম ভেঙে যাচ্ছে, মাইলের পর মাইল জমি বন্যায় ডুবে যাচ্ছে। বন্যা প্রতিরোধে না আছে ব্যবস্থা গ্রহণ, না আছে বন্যার্তদের পাশে পর্যাপ্ত সাহায্যের হাত।
বাংলাদেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে প্রতিবছর বন্যা হয়। তার মধ্যে তিস্তা ও যমুনার তীরবর্তী এলাকায় বেশি হয়। যে বন্যা প্রতিবছর হয়, সেই বন্যা প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা সরকারি পর্যায় থেকে গ্রহণ করা হয় না। অথচ এতে গ্রামের পর গ্রাম ডুবে যায়, ভেঙে যায় নদীগর্ভে। কৃষিনির্ভর মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত-বিত্তহীনেরা চরম অসহায় অবস্থায় পতিত হয়। স্থানীয় পর্যায়ে যারা দিনমজুরি খাটতে সংকোচ বোধ করে, তারা চলে যায় ঢাকা-সিলেট-কুমিল্লা-নারায়ণগঞ্জ। সেখানে রিকশা চালায়, দিনমজুরি খাটে। নদীভাঙনে প্রতিবছর কত লাখ মানুষ গৃহহীন হচ্ছে, তার হিসাব আমরা রাখি না। ২৭ আগস্ট বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচির করা মানচিত্রে দেখানো হয়েছে রংপুর বিভাগ সবচেয়ে বেশি দরিদ্র। এর অন্যতম কারণ, প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষের গৃহহীন হয়ে পড়া। কুড়িগ্রাম জেলায় দারিদ্র্যের হার বেশি হওয়ার প্রধান কারণ তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র-ধরলা-দুধকুমারসহ ১৬টি নদীর ভাঙন ও বন্যা। শুধু নদীগুলোর নাব্যতা বাড়ানো গেলে এই দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনা সম্ভব।
ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢল, অতিরিক্ত বৃষ্টি, বাংলাদেশে ঘনবর্ষণ ইত্যাদি ছাড়াও বন্যার কারণ নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস। তিস্তা ব্যারাজের গেজ রিডার মাহবুবুল ইসলাম বসুনিয়া জানালেন, ‘১৯৯০ সালে যখন তিস্তা ব্যারাজ চালু হয়, তখন ব্যারাজসংলগ্ন এলাকার গভীরতা ছিল ২০-২২ ফুট। এখন সেই গভীরতা অনেক স্থানে মাত্র দুই ফুট থেকে পাঁচ ফুট।’ নদী ভরাট হওয়ার কারণেই সামান্য পানিতেই তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
তিস্তা ব্যারাজের উপসহকারী প্রকৌশলী সুরতুজ্জামান বললেন, ‘এখন যে সামান্য পানির প্রবাহ তাতে নদীর গভীরতা ঠিক থাকলে বন্যা হতো না।’ নদীর প্রতি যত্ন না নেওয়ার কারণেই বন্যা হচ্ছে। খরস্রোতা নদী তিস্তায় প্রতিবছর লাখ লাখ টন বালু জমা হয়, সেই সঙ্গে গ্রামের পর গ্রাম ভেঙে গিয়ে সেই মাটি ভরাট করে নদীর বুক। নদী যদি নিয়মিত খনন করা হতো তাহলে সামান্য বর্ষণে বন্যা হতো না।
এখন পর্যন্ত বন্যাদুর্গত ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়নি। শরতে এবার বন্যা হওয়ার কারণে নতুন করে আর ধান লাগানোর কোনো উপায়ও থাকবে না। বন্যার সময়ে প্রচুর পানিবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। সে জন্য দুর্গত এলাকার জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দুর্গত মানুষগুলোর সহায়তার পাশাপাশি সরকারের উচিত বন্যার কারণ চিহ্নিত করে প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আনোয়ারার যাওয়ার জায়গা নেই। যদি তাঁর ঘরটি নদী কেড়ে নেয় তাহলে ছোট ছোট শিশুকে নিয়ে কোথায় উঠেছেন জানি না। এ রকম অসংখ্য পরিবার নদীভাঙনে শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে ফেলছে। চোখের সামনে বাড়িঘর যাদের ভেঙে পড়ে, যাদের জীবন-জীবিকার আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়, তাদের বাঁচার কোনো অবলম্বনই থাকে না। গত কয়েক দিনে খবরের কাগজে কিংবা টিভিতে বন্যাদুর্গত মানুষের ছবি দেখলেও তাদের দুরবস্থা কিছুটা অনুমান করা যায়। প্রথম আলোয় ২৫ আগস্ট আলোকচিত্রী মঈনুল ইসলামের তোলা সে রকম একটি ছবি প্রকাশিত হয়। ছবিতে এক কৃষকের লাগানো ধানখেত ডুবে গেছে। সেই কৃষক পানির নিচে হাত দিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন ধানগাছগুলো বেঁচে আছে না মারা গেছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা কি ওই কৃষকের ক্ষত উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন?
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

আন্তর্জাতিক গুম দিবস ও দেশের শাসনব্যবস্থা by শাহদীন মালিক

‘শাসন ব্যবস্থা’ শব্দ দুটো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো ষাটের দশকে গত শতাব্দীতে। তার আগেও ব্যবহৃত হতো, যেমন ব্রিটিশরা আমাদের শাসন করত। মোগল শাসন করত। সেসব আমলে আইনগুলোর নামও ছিল ‘শাসনমুখী’। যেমন ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫। পাকিস্তান আমলে দুটি শাসনতন্ত্র ছিল, ১৯৫৬ সালের যেটা পাকিস্তানের সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে ক্ষমতা দখলের পর বাতিল করেন। পরে ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান পাকিস্তানের জন্য নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করেন। ১৯৬২তে গণপরিষদ ছিল না, ছিল না সংসদ, তাই খোদ আইয়ুব সাহেব নিজে পাকিস্তানের জন্য একটা শাসনতন্ত্র রচনা করে বলে দিয়েছিলেন তিনি কীভাবে দেশ শাসন করবেন। তাঁর উৎখাত অর্থাৎ ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত সেই শাসনতন্ত্র বহাল ছিল। পূর্ব পাকিস্তানি হিসেবে আমরা যারা অর্থাৎ যাঁদের জন্ম হয়েছিল এ দেশে ১৯৭১-এর আগে, তাঁরা ওই সব শাসনতন্ত্র অনুযায়ী শাসিত হতাম।

বাংলাদেশ মুক্ত ও স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে আমরা বেছে নিলাম ‘সংবিধান’ শব্দটা শাসনতন্ত্রের পরিবর্তে। কথা ছিল নির্বাচনে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দল দেশ পরিচালনা করবে। তাও শুধু কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাপারে। স্থানীয়ভাবে প্রায় সবকিছু পরিচালনা করবে স্থানীয়ভাবে স্থানীয় জনগণ দ্বারা নির্বাচিত স্থানীয় সরকার। নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা আর কিছু সিটি করপোরেশন আছে। ঢাকায় অর্থাৎ দেশের এক-দশমাংশ নাগরিকের কোনো স্থানীয় সরকার নেই। জেলা পরিষদ নেই। পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো নেই। এসব নির্বাচন হয়নি। পাছে সরকারি দল আবার হেরে যায়।
যেসব নির্বাচিত স্থানীয় সরকার আছে অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ইত্যাদি—সেগুলো প্রায় ঠুঁটো জগন্নাথ। তারা তাদের এলাকা পরিচালনা করে না বা করতে পারে না বললেই চলে। শাসন করেন ইউএনও, ডিসি আর স্থানীয় সাংসদ।
তাই বলছিলাম, দেশ এখন শাসন করা হয়; পরিচালনা করা হয় না। শাসনটাও আরও পাকাপোক্ত করতে আসছে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী। পঞ্চদশ আর ষোড়শ সংশোধনী মিলিয়ে যে অবস্থা দাঁড়াবে, তাতে ভাবতে হবে যে আমরা এখন সংবিধান শব্দটা বাদ দিয়ে ‘শাসনতন্ত্র’তে ফিরে যাব কি না। এ প্রসঙ্গ আরেক দিনের জন্য।
আজকের বিষয় গুম। যাঁরা দেশ পরিচালনা করেন, তাঁদের গুম করতে হয় না। শাসন করতে হলে দেশে গুম হয়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়, হয় অপহরণ আর নির্যাতন। ৩০ আগস্ট হলো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ঘোষিত আন্তর্জাতিক গুম দিবস। ইংরেজিতে এই দিবসের পুরো নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর ভিকটিমস অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ অর্থাৎ গুমের শিকার ব্যক্তিবর্গের আন্তর্জাতিক দিবস। সাধারণ পরিষদ ২০১১ সাল থেকে এই দিবসটি পালনের জন্য আহ্বান জানিয়েছে সব দেশকে।
ঐতিহাসিকভাবে গুমের উৎপত্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে জার্মানির নাৎসি বাহিনী দ্বারা। প্রথমে খোদ জার্মানিতে গুম হওয়া থেকে বাঁচতে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মতো লোকেরা জার্মানি ছেড়ে আমেরিকায় আশ্রয় নিয়ে বেঁচে যান। আর তারপর ক্রমান্বয়ে পোল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়ার (তৎকালীন) মতো সব বিজিত দেশের লাখো মানুষকে গুম করে এবং পরে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সবচেয়ে বেশি গুমের শিকার হয় ইউরোপের ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা এবং হিটলার নিঃসন্দেহে সর্বকালের সবচেয়ে নিকৃষ্ট গণহত্যাকারী।
পরবর্তী সময়ে সেন্ট্রাল আমেরিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে, বিশেষত সামরিক শাসকেরা হাজার হাজার গুম ও গুপ্তহত্যার হোতারূপে আবির্ভূত হন। গুয়াতেমালা, এল সালভাদরের মতো অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট দেশ থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের মতো দক্ষিণ আমেরিকার বড় বড় দেশে—গুম, অপহরণ, হত্যা চলেছিল নির্বিচারে ১৯৭০ আর ১৯৮০ এর দশকগুলোতে। কলম্বিয়া, চিলি, নিকারাগুয়া, বলিভিয়া—প্রায় কোনো দেশই বাদ যায়নি শাসকগোষ্ঠীর গুম অভিযান থেকে।
গুম, অর্থাৎ কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মদদে-সহায়তায় ছোট ছোট দলের নাগরিকদের ধরে নিয়ে যাওয়া এবং গোপন স্থানে আটকে রাখা, কাউকে কোনো খবর না দেওয়া বা আটকের ঘটনা অস্বীকার করা এবং ক্ষেত্রবিশেষে অল্প দিন বা অনেক দিন পরে ধরে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ পাওয়া। বা কখনোই কোনো খোঁজ না পাওয়া—এসবই হলো বর্বরদের রাষ্ট্র শাসন করার বহুল প্রয়োগ করা পদ্ধতি।
অনেক ক্ষেত্রে গুমের শুরু যুদ্ধাবস্থায় (যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি), গৃহযুদ্ধ বা স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় (১৯৭১ এর বাংলাদেশ, ষাটের দশকের আলজেরিয়া, সত্তরের দশকের অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক—ফিরিস্তি অনেক লম্বা) এবং সামরিক শাসনামলে এবং সর্বশেষ সংস্করণ ‘গণতান্ত্রিক শাসন আমলে’—ভারত (কাশ্মীর, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ইত্যাদি), পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ, অতীতে এবং বর্তমানেও।
গুমের টার্গেট গোষ্ঠী বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন। কিন্তু সার্বিক যুক্তি একটাই—এরা দেশ ও সমাজের জন্য হুমকি, ক্ষতিকারক, ধ্বংসাত্মক। অতএব এদের নির্মূল করা ‘জাতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য’। এ ধরনের ‘শত্রুরা’ বিচারেরও অযোগ্য। তাদের খতম করলে দেশ ও জাতি বাঁচবে।
খতম করা—গুম, অপহরণ, নির্যাতন, হত্যা—হয়েছে ডজন ডজন দেশে লাখ লাখ মানুষ। দেশোদ্ধার হয়নি। দেশ-সমাজ বর্বর থেকে বর্বরতর হয়েছে। গুম, অপহরণ, হত্যার দশকের পর তিন-চার দশক পেরিয়ে গেছে এল সালভাদর, গুয়াতেমালার। এসব দেশে এখনো সবচেয়ে বেশি খুন হয়। যেখানে খুন বেশি, গুম বেশি।
সহিংসতা বেশি যেখানে, সেখানে (ব্যতিক্রম দু-একটা আছে) শাসকের স্থায়িত্ব তত বেশি। সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ মাস দুয়েক আগে তৃতীয়বারের মতো আরও সাত বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। সিরিয়ায় গত তিন বছরে প্রায় দুই লাখ লোক নিহত হয়েছে। জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবের শাসনামলের বয়স এখন প্রায় ৩০ বছর। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সফরে আসা কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন নির্বাচিত হচ্ছেন বিপুল ভোটে ক্রমাগতভাবে ১৯৮৫ থেকে।
৩.
সারা বিশ্বের গুমের প্রকোপে উদ্বিগ্ন হয়ে জাতিসংঘ ২০০২ থেকে কাজ শুরু করে ২০০৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ রচনা করে। ইংরেজিতে নাম—ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স। এই আন্তর্জাতিক সনদটা কার্যকর হয়েছে ২১ ডিসেম্বর ২০১০ থেকে আর ২০১১ থেকে ৩০ আগস্ট গুমের শিকার ব্যক্তিবর্গের জন্য আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।
এ পর্যন্ত ৪৩টি দেশ সনদটি গ্রহণ করেছে, ৯৩টি দেশ স্বাক্ষর করেছে। বলা বাহুল্য, যেসব রাষ্ট্র গুম করে তারা এই সনদ গ্রহণ করেনি। যেমন, বাংলাদেশ।

যাকে হত্যা করা হয় তার জীবননাশ হয়, তার প্রিয়জনেরা বিধ্বস্ত হয়, দুর্দশাগ্রস্ত হয়, হয় সংকটাপন্ন। ব্যথিত হয়। তবে সত্য হলো, জীবন থেমে থাকে না। রাষ্ট্র সদয় হলে হত্যাকারীর বিচার হয়। শাস্তি হয়।
কিন্তু যে গুম হচ্ছে শুধু সেই যে শিকার হচ্ছে, তা নয়। তার পরিবার-পরিজনও একইভাবে অপরাধের শিকার হয়। দিনের পর দিন মাসের পর মাস তারা জানতে পারে না যে তাদের প্রিয়জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে, মানত করে, বছরের পর বছর আশায় বুক বেঁধে থাকে—ছেলে, বাবা, স্বামী, ভাই এবং ক্ষেত্রবিশেষে বোন-স্ত্রী ফিরে আসবে। অনন্ত প্রতীক্ষা।
আন্তর্জাতিক সনদটিতে তাই গুমের শিকার শুধু গুম হওয়া ব্যক্তিটিই নয়, তার প্রিয়জনেরা গুমের শিকার হিসেবে স্বীকৃত।
৩০ আগস্ট—এই আন্তর্জাতিক গুম দিবসে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের অডিটোরিয়ামে আমরা গুমের শিকার আত্মীয়-পরিবারবর্গের কথা শুনব সকাল ১০টা থেকে, ‘স্বজনদের ব্যথা—গুম, খুন, নির্যাতন আর না’ ব্যানারে।

গুম আমাদের ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) বিভিন্ন ধারায় অপরাধ, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে অপরাধ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ১৯৯৫-এ অপরাধ, সন্ত্রাস দমন আইন, ২০০৯-এর অধীনেও অপরাধ, ঘাঁটাঘাঁটি না করে স্মৃতির ওপর ভর করে বলছি—আর্মি অ্যাক্টের ৫১ ধারা অনুযায়ী কোনো সেনাসদস্য যদি কোনো নাগরিককে আটক করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে সোপর্দ না করেন, সেটাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শত শত লোককে যেখানে নির্বিচারে হত্যা, গুম করা হচ্ছে, সেখানে অবশ্য এই ৫১ ধারার কথা বলা হাস্যকর, স্বীকার করছি।
গুম আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন, ২০০২ (রোম স্টাটুট)-এর অধীনেও অপরাধ। কোনো দেশে যদি এই রোম স্টাটুটের অধীন অপরাধের বিচার না হয়, তাহলে রোমে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তার বিচারের ব্যবস্থা করতে পারবেন।
কেনিয়ার প্রেসিডেন্টের নাম উহুরু মুগাই কেনিয়াত্তা। তাঁর বাবার নাম জমো কেনিয়াত্তা। বাবা ছিলেন কেনিয়ার স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা, জাতির জনক, প্রথম প্রেসিডেন্ট। জমো কেনিয়াত্তা প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত। ২০১৩ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে তাঁর সুযোগ্য পুত্র উহুরু এখন কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট।
তাঁর একটা ছোট্ট কিন্তু আছে। উহুরু এবং তাঁর নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট উভয়ে গণহত্যা, নির্যাতন ইত্যাদি অভিযোগে ২০১১ সাল থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারাধীন। বেচারা ভাইস প্রেসিডেন্ট বেশ কিছুদিন আন্তর্জাতিক আদালতের জেলে ছিলেন। এখন জামিনে থেকে ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন।
এই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান বিচারক বাংলাদেশে এসেছিলেন কয়েক মাস আগে। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়েছিল। রোমের সে আদালত কেনিয়া থেকে অনেক দূর, বাংলাদেশ থেকেও।
গুম, খুন আর অপহরণ আর না। মানুষ মেরে সমস্যার সমাধান হবে—এই চিন্তা শুধু পশুরাই করতে পারে। আমরা মানুষ।
পশুদের নিবৃত্ত করতে এই সনদটা আমাদের দরকার। সনদটা অনুস্বাক্ষর করে সংসদে অনুমোদন করে চলুন আমরা ঘোষণা দিই যে নাৎসি জার্মানি বা তার অনুসারীদের মতো আমরা দেশ শাসন করব না। আমরা সভ্য-গণতান্ত্রিক দেশ পরিচালনা করব। স্বজনদের ব্যথা শুনব আর উপলব্ধি করব কেন গুম, খুন, নির্যাতন আর না।
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট, অধ্যাপক ও পরিচালক স্কুল অব ল, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি।