Showing posts with label নুরুজ্জামান লাবু. Show all posts
Showing posts with label নুরুজ্জামান লাবু. Show all posts

Thursday, August 22, 2019

বাড়ির কাজ বন্ধ, ৯০ লাখ টাকায় মীমাংসার প্রস্তাব পুলিশ কর্মকর্তার! by নুরুজ্জামান লাবু

পুলিশ কমিশনার এস এম শামীম
৯০ লাখ টাকার বিনিময়ে দুই পক্ষের বিবাদ মীমাংসা করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। সে অনুযায়ী টাকা না পেয়ে তিনি রাজধানীর ভাষানটেক এলাকায় ৩১ জনের যৌথ মালিকানার একটি প্লটে ভবন নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি মালিকদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাও দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় একটি চক্রের যোগসাজশে এ কাজ করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার এস এম শামীম।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে পুলিশ সদর দফতর ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে নড়েচড়ে বসেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। অভিযোগকারীসহ অন্যদের ডেকে নিয়ে অভিযোগ তুলে নিতে চাপও দিয়েছেন তিনি। কিন্তু ডিএমপি কমিশনার বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইতোমধ্যে পুলিশের মিরপুর বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহেন শাহ তদন্ত শুরু করেছেন।
যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পল্লবী জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার এস এম শামীম বলেন, ‘আমার কাছে জহিরুল নামে একজন আবেদন করেছিলেন। আমি বলেছিলাম জমি সংক্রান্ত বিষয় সমাধানের কাজ আমার নয়। তবু আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে বলে আমি দুই পক্ষকে ডেকেছিলাম।’ তিনি বাড়ির নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেননি বা তাদের কাছে কোনও টাকাও চাননি বলে দাবি করেন।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, “যিনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন তিনি আমাকে বিষয়টি সমাধান করে দেওয়ার জন্য বলেছেন। আমি তাকে বলেছি জমির মালিককে ‘কম্পেনসেশন’ দিয়ে আপনারাই এটা সমাধান করেন।” পরে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
পুলিশ সদর দফতর (স্মারক নং ১০৫৬) ও ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সে দেওয়া অভিযোগ থেকে জানা গেছে, ভাষানটেক থানার টোনারটেক মসজিদের পাশে ৫৮৫-সি নম্বর প্লটে একটি ভবনের নির্মাণকাজ চলছিল। ২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যৌথভাবে ওই জমি কেনেন ৩১ জন। গত বছরের ১৬ জুলাই তারা নির্মাণকাজ শুরু করেন। এ বছরের ১৮ এপ্রিল হঠাৎ পল্লবী জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার এস এম শামীম বাড়ির মালিকদের কাছে একটি চিঠি [স্মারক নং ২১৯(২)এসি (পল্লবী জোন)] পাঠান। ওই চিঠিতে তিনি বলেন, জহরিুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি জমির মালিক পরিচয় দিয়ে অভিযোগ করেছেন। এ জন্য বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বাদী ও বিবাদীদের কাগজপত্র নিয়ে ২২ এপ্রিল হাজির হতে বলেন এস এম শামীম। তবে এ চিঠি ইস্যুর একদিন পরই নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
জমির ৩১ মালিকের একজন নটরডেম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক শহীদুল হাসান পাঠান। তিনি পুলিশ সদর দফতরে করা আবেদনে বলেন, বাড়ির কাজ বন্ধ না করলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাদের ‘ক্রসফায়ার’-এ দেওয়ার হুমকিও দেন। এ সময় তারা রাজউকের অনুমোদিত নকশা নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ভূমি কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ভূমি কমিশনার জমিতে কোনও সমস্যা নেই বলে জানান। পরে আবারও তারা কাজ শুরু করতে গেলে পুলিশ কর্মকর্তা শামীম ক্ষিপ্ত হন। গত ১৪ জুন তাদের ৭ জনের বিরুদ্ধে একটি জিডি (নং ৪৯৮) করা হয়।
ওই অভিযোগে বলা হয়, গত ২৭ জুলাই পল্লবীর ৯৫ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সভাপতি হাফিজুর রহমান সরদার, এসএম সাদিকুরসহ ৩০-৩৫ জন তাদের সাইনবোর্ড ফেলে দিয়ে নতুন সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেন। বাড়ির কাজ করলে মেরে ফেলা হবে বলে হুমকি দেন তারা। মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলহাজতে পাঠানোরও হমকি দেওয়া হয়। ওই দিনই মালিকদের কয়েকজন বিষয়টি এসি শামীমকে জানালে তিনি হাফিজুর রহমানের সঙ্গে টাকা-পয়সা দিয়ে মীমাংসা করতে বলেন। তা না হলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হবে বলে হুমকি দেন। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় জানতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা শামীম বলেন, আপনারা ৩১ মালিকের প্রত্যেকে ৩ লাখ টাকা করে মোট ৯০ লাখ টাকা হাফিজকে দিয়ে দিন। এতে রাজি না হওয়ায় পরদিনই মোস্তাফিজুর রহমান নামে স্থানীয় এক ব্যক্তিকে দিয়ে মালিকদের মধ্যে ৫ জনের নামের একটি মামলা দায়ের করানো হয়।
অভিযোগে বলা হয়, পুলিশ কর্মকর্তা শামীম এবং স্থানীয় কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হাফিজের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। এসি শামীম নিজেই হাফিজের মাধ্যমে জহিরকে দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে কাজ বন্ধ করে রেখেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তদন্ত শুরু হওয়ার পর পুলিশ কর্মকর্তা এস এম শামীম বিষয়টি সমাধানের জন্য বাদী শহীদুল হাসান পাঠানসহ অন্য মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিষয়টি যাতে গণমাধ্যমে প্রকাশ করা না হয় সেজন্যও তদবির শুরু করেন তিনি।
যোগাযোগ করা হলে অভিযোগকারী শহীদুল হাসান পাঠান পুলিশ মহাপরিদর্শক ও ডিএমপি কমিশনার বরাবর অভিযোগ করার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি সমাধানের প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশ সদর দফতর ও ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে জমি সংক্রান্ত যেকোনও ঘটনায় পুলিশের হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে নিষেধ রয়েছে। দেওয়ানি মামলা সম্পর্কিত সব ঘটনা আদালতের মাধ্যমে সমাধানের নির্দেশনা রয়েছে।
এদিকে ডিএমপি কমিশনার অভিযোগটি আমলে নিয়ে মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনারকে বিষয়টি তদন্ত করে দেখার নির্দেশ দেন। মিরপুর বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহেন শাহকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে অভিযোগকারী শহীদুল হাসান পাঠানকে গত ১৯ আগস্ট একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) তার বক্তব্য রেকর্ড করা হবে বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহেন শাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে বিষয়টি আমি তদন্ত করছি। উভয় পক্ষকে ডাকা হয়েছে। এছাড়া এসি তো আমার এখানেই রয়েছে।’ তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

Monday, July 29, 2019

জঙ্গি নাকি সন্ত্রাসীদের কাছে যাচ্ছে এসব অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র? by নুরুজ্জামান লাবু

রাজধানী ঢাকায় অত্যাধুনিক ও ভারী অস্ত্রের যোগান বাড়ছে। গত কয়েকদিনে একাধিক অভিযানে একে টুয়েন্টি-টু অটোমেটিক রাইফেলসহ বিদেশি অত্যাধুনিক অস্ত্র উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব অস্ত্রের গন্তব্য নিয়ে চিন্তিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। পেশাদার অপরাধী নাকি জঙ্গিদের কাছে যাচ্ছে এসব অস্ত্র? যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির ঈদ কেন্দ্রীক চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য এসব অস্ত্র সংগ্রহ করছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা। সন্ত্রাসী বা জঙ্গিদের হাতে এসব অস্ত্র যাওয়ার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে অস্ত্র দিয়ে খুনোখুনির পরিমাণ কমে এসেছে। এমনকি আগের মতো এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের যেসব গ্রুপগুলো ছিল, সেসবের শীর্ষ নেতারা গ্রেফতার হয়েছে। কেউ কেউ পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতও হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি নতুন করে রাজধানীতে অবৈধ অস্ত্রের বিকিকিনি ও মজুদ বাড়ছে বলে তথ্য পাচ্ছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। আগে জঙ্গিরা শুধু বিস্ফোরক বা হাতে তৈরি বোমা ব্যবহার করলেও গত কয়েক বছর ধরে তাদের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। টার্গেট কিলিংয়ের জন্য জঙ্গিরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতো।
সম্প্রতি রাজধানীর ওয়ারী এলাকা থেকে একসঙ্গে ছয়টি অত্যাধুনিক ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১২৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ সময় রাজু গাজী, সাখাওয়াত ও মিনহাজুল নামে তিনজনকে গ্রেফতার করা হলেও তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা কেউ অস্ত্রের মালিক নয়। তারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেছে। মিরপুর থেকে তারা অস্ত্রগুলো যার নির্দেশে শ্যামপুর নিয়েছিল এবং যার কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিল, পুলিশ তাদের শনাক্তের পর গ্রেফতারের চেষ্টা করছে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, এই অস্ত্রগুলো রাজনৈতিক ক্যাডারদের কাছে যাচ্ছিল বলে তারা ধারণা করছেন।

অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শ্যামপুর থানার এসআই মীর মোজাহারুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতার হওয়া তিন আসামিকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে বাকি আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
শ্যামপুরের অস্ত্র উদ্ধারের আগে গত মাসের শুরুতে পুরান ঢাকা থেকে একটি একে ২২ অটোমেটিক রাইফেল হাত বদলের সময় তা উদ্ধার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট- সিটিটিসি। এসময় হাতেনাতে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়া কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, অস্ত্রটি চট্টগ্রামের বাবুল ও সাদেক নামে দুই সন্ত্রাসীর কাছ থেকে হাত বদল হয়ে কুমিল্লার হাসিব ও কিবরিয়া নামে দুই ব্যক্তিকে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। একইভাবে গত ছয় মাসে আরও তিনটি একে ২২ অটোমেটিক রাইফেল হাত বদল হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান বেকারিতে যে একে ২২ রাইফেল ব্যবহার করেছিল জঙ্গিরা, পুরান ঢাকা থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রটি একই। এছাড়া ওই বছরের ২৬ জুলাই কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানাতেও অভিযানের পর পুলিশ কর্মকর্তারা জানতে পারেন, একটি একে ২২ অটোমেটিক রাইফেল নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল এক জঙ্গি।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের মার্চ মাসেই একটি ডাকাত চক্রের ১২ সদস্যকে গ্রেফতারের পর তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে রামপুরায় অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে হাফিজ ওরফে খালিদ ওরফে ইব্রাহীম গাজী এবং মামুনুর রশিদ ওরফে বাচ্চু মোল্লা নামে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী- বাংলাদেশ (হুজিবি) এর দুই সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে গোয়েন্দা পুলিশ একটি অত্যাধুনিক একে ২২ অটোমেটিক রাইফেল, একটি পাইপগান, ৪১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছিল।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত যেসব একে ২২ অটোমেটিক রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে, সেগুলোর সব প্রায় একই রকম। এসব রাইফেল থেকে একসঙ্গে ৩০ রাউন্ড গুলি বের হয়। ব্রাশ ফায়ারের পাশাপাশি একটি করে গুলিও বের হয়। ডাকাতি বা চাঁদাবাজি কাজে সাধারণ অপরাধীদের এসব অস্ত্র ব্যবহার করার কথা নয়।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, একে ২২ রাইফেলগুলো সাধারণত পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। পাহাড়ের সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর হাতেও এসব অস্ত্র হরহামেশাই দেখা যায়। আর ছোট অস্ত্রগুলো ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে আগে অহরহ বিস্ফোরক ও আগ্নেয়াস্ত্র আসতো। ২০১৬ সালের পর থেকে সীমান্তগুলোতে কড়াকড়ির কারণে অস্ত্র-বিস্ফোরকের চালান কম আসতো। এখন আবার যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার কয়েকটি স্পট দিয়ে এসব অস্ত্র আসছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ও এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে গরুর হাটের ইজারা নিয়ে পেশিশক্তির প্রদর্শন হয়ে থাকে। এ কারণেও সন্ত্রাসীরা অস্ত্র মজুদ করে থাকতে পারে। এছাড়া আগের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আধিপত্য না থাকলেও এখন রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের উৎপাত রয়েছে। এদের অনেকেই নিজ নিজ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়। তবে অটোমেটিক রাইফেলগুলো উদ্ধার করা নিয়ে তারা কিছুটা চিন্তিত। এসব অস্ত্র কোনওভাবেই রাজনৈতিক ক্যাডারদের ব্যবহার করার কথা নয়।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘একে টুয়েন্টি টু রাইফেলগুলোর উৎস এবং হাত বদল হয়ে যাদের কাছে যাওয়ার কথা ছিল তাদের আমরা শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। এসব অস্ত্র পেশাদার সন্ত্রাসী নাকি জঙ্গিরা সংগ্রহ করছে তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

Sunday, June 30, 2019

কেন এই নৃশংসতা by নুরুজ্জামান লাবু

যেন সিনেমার কোনও মারামারির দৃশ্য। প্রকাশ্য দিবালোকে শত মানুষের সামনে কোপানো হচ্ছে এক তরুণকে। রক্তে ভিজে যাচ্ছে তার পোশাক। কণ্ঠে বাঁচার আকুতি। তবু কারও কোনও বিকার নেই! একমাত্র আক্রান্ত তরুণের স্ত্রী প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছেন রামদা হাতে উন্মত্ত সন্ত্রাসীদের থামাতে। কিন্তু তিনি একা পরাস্ত করতে পারেননি সন্ত্রাসীদের। কুপিয়ে মারাত্মক আহত করে ‘বীরদর্পে’ চলে যায় সন্ত্রাসীরা। সিসিটিভির ক্যামেরায় ধারণ হওয়া এই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে তোলপাড় সারাদেশ। বুধবার (২৬ জুন) বরগুনা সরকারি কলজের সামনে সংঘটিত নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড নাড়া দিয়েছে অসংখ্য মানুষকে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, মানুষ কেন এত নৃশংস হয়ে উঠছে? আর চোখের সামনে নৃশংসতা দেখেও কেন এগিয়ে আসছে না কেউ?
অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমাজে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু রয়েছে। মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা বা অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা—এসব নানা কারণে অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। একই সঙ্গে মানুষের প্রতিবাদের যে নৈতিক ভিত্তি তা দিনকেদিন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এছাড়া পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের মধ্যে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ বেড়েছে। অহেতুক ঝামেলা এড়াতে চোখের সামনে নৃশংস ঘটনা ঘটলেও তাদের বোধ কাজ করছে না। ফলে কেউ প্রতিবাদও করছে না। আধুনিক সমাজব্যবস্থার কারণেও মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছেন। কেউ কারও বিপদে এগিয়ে আসছেন না।

অপরাধ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস বিভাগের প্রধান ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘মানুষের মধ্যে দুই ধরনের প্রবৃত্তি থাকে, তার একটি পশুপ্রবৃত্তি। আমাদের মতো সমাজে মানুষের মধ্যে এই ধরনের পশুপ্রবৃত্তি বেশি কার্যকর। যদিও ফ্রয়েডিয়ান থিওরি মতে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই সেটা রয়েছে। এখন এই পশুপ্রবৃত্তি সিভিলাইজড করা বা নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘ওয়েস্টার্ন সোসাইটিতে কিছুটা হয়েছে। তাদের রাষ্ট্রে নীতি এবং রাষ্ট্রের যে আইন তা পরিবর্তন সাপেক্ষে কার্যকর করা এবং একই সঙ্গে সোসাইটির ভেতরের অনুশাসনগুলো ধরে রাখায় তারা মোটামুটি একটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। আমাদের মতো ট্র্যাডিশনাল সোসাইটিতে এই ধরনের নিয়ন্ত্রণের অভাব থাকায় সবসময় মানুষের মধ্যে পশুপ্রবৃত্তির রিফ্লেকশনটা বেশি দেখা যায়।’

অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, ‘এখন সোসাইটির ডাইমেনশন চেঞ্জ হচ্ছে। সোসাইটি ট্রান্সফরমেশনের দিকে যাচ্ছে বা আমরা এখন ট্রানজিশনাল ফেসের মধ্যে আছি। ফলে ধরনটা চেঞ্জ হয়েছে। এখন যে অস্থিরতা, কারণ সমাজের মধ্যে এত বেশি নেগেটিভ এলিমেন্ট ঢুকে গেছে; রাষ্ট্রের ভেতর থেকে এসব নিয়ন্ত্রণের নিয়ামক যদি না তৈরি করা হয় তাহলে সমাজে তা থাকবেই। এসব কিছু নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে ফ্রম দ্য স্টেট লেভেল ও সোসাইটি লেভেল থেকে।’

এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, ‘আগে যদিও এক ধরনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পেরেছিলাম, এখন তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যাচ্ছে না। বিকজ অব ট্র্যাডিশনাল ল, বিকজ অব ট্র্যাডিশনাল পুলিশ, বিকজ অব ট্র্যাডিশনাল কোর্ট, বিকজ অব ট্র্যাডিশনাল প্রিজন সিস্টেম এবং বিকজ অব ট্র্যাডিশনাল কারেকশন সিস্টেম। আমরা তো আমাদের ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে যে অস্থিরতা দেখছি, সেই অনুযায়ী কিশোর অপরাধ সেন্টার কি বেড়েছে? কিশোর অপরাধীদের কাউন্সেলিং করতে কতটুকু মেকানিজম আমরা তৈরি করতে পেরেছি? কাজেই আমি বলবো যে, টোটাল রিফ্লেকশন যে একজনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা বা একজন নারীকে রেপ করা বা বাবা-ছেলেকে মেরে ফেলা—এগুলো একই সূত্রে গাঁথা।’
ড. জিয়া রহমান, নূর খান লিটন ও অধ্যাপক রাশেদা ইরশাদ নাসির
অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের নৃশংসতা যে এবারই প্রথম, তা কিন্তু নয়। কিংবা এটা যে নতুন করে বেড়ে গেছে, তা-ও নয়। একটা সময়ে জমি দখল বা চর দখলের জন্য প্রকাশ্যে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের ওপর এমন নৃশংসতা চালাতো। সেসব এখন হয়তো নেই। তবে ধরন পাল্টেছে। সমাজব্যবস্থাও একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক কারণে সমাজে অস্থিরতা বেড়েছে। সেই সঙ্গে অপরাধের ধরনও পাল্টাচ্ছে। সমাজে নানারকম নেগেটিভ এলিমেন্ট ঢুকে পড়েছে। এ কারণে নৃশংস অপরাধের মাত্রাও বাড়ছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘আমরা যদি খেয়াল করি, দেখবো, সিলেটে এ ধরনের একটি ঘটনা যখন ঘটলো, যদিও সেই মেয়েটি জীবনে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু এভাবেই কোপের পর কোপ দিয়েছে দুর্বৃত্ত। একটি মানুষও এগিয়ে আসেনি তাকে রক্ষা করতে। ঠিক একই ঘটনা আমরা বরগুনায় দেখতে পেলাম।’
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এবং গণতন্ত্র সংকুচিত হওয়ায় মানুষের যে নৈতিক প্রতিবাদ করার সাহস, সেটি কিন্তু ভোঁতা হয়ে গেছে।’
নূর খান বলেন, ‘সমাজে দুর্বৃত্তরা অনেক অপরাধ সংঘটিত করে, সেটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এটির মাত্রা এবং প্রকাশ্য দিবালোকে যখন প্রতিবাদহীনতা থাকে, অর্থাৎ কোনও প্রতিবাদ হয় না, প্রতিরোধ হয় না, সেটি হচ্ছে ভয়াবহ। দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক চর্চার অনুপস্থিতি, প্রতিবাদ ও যৌক্তিক সমালোচনার অগ্রহণযোগ্যতা সমাজে বা রাষ্ট্রে এ ধরনের অবস্থা তৈরি করেছে। সাধারণের ভেতরে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের যে ক্ষমতা তা ক্রমান্বয়ে কমছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংস এমন ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক একটা যোগসাজশ থাকে। ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে অনেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একের পর এক ক্ষমতার অপব্যবহার করে পার পেয়ে যাওয়া কোনও একজন ব্যক্তিকে ভয়ঙ্কর করে তোলে। অতীতেও এরকম ঘটনা দেখা গেছে। সেসবের পুনরাবৃত্তি চলছেই। এসবের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিচার প্রক্রিয়া ও সব ক্ষেত্রেই রাজনীতিকরণ সবচেয়ে বেশি দায়ী।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনীতি এখন দুর্বৃত্তদের দখলে। ফলে এই ধরনের মানসিকতাসম্পন্ন মানুষেরাই কিন্তু কোনও না কোনোভাবে রাজনৈতিক আনুকূল্য পেয়ে থাকে, রাজনৈতিক দলের আনুকূল্য পেয়ে থাকে। রাজনীতিতে আদর্শিক চর্চা অনুপস্থিত থাকার কারণে এই ধরনের ঘটনা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ অপরাধীকে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করলে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার কারণে মানুষের মাঝে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ বেড়েছে। আগের মতো ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ নীতিবাক্য মেনে চলার প্রবণতা নেই। এর কারণ হিসেবে অপরাধবিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করছেন, ‘নগরায়ণ বাড়ছে। মানুষের কাছে টাকা আসছে। প্রতিযোগিতা বাড়ছে। মানুষ নিজেকে বেশি ভালোবাসছে। পুরোপুরি না হলেও সমাজের বড় একটি অংশ এসবের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এছাড়া কারও বিপদে এগিয়ে যাওয়ার পর পুলিশি বা আদালতে গিয়ে হ্যারাস হওয়ার উদাহরণও রয়েছে। কিংবা কেউ একটা ভালো কাজ করলে তাকে যথাযথ মূল্যায়ন না করার কারণেও কেউ কারও বিপদে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করে না। অপরাধের রুট জানার জন্য গবেষণা নেই। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যারা কাজ করেন তাদের সঙ্গে একাডেমিক ব্যক্তিবর্গের কোনও যোগাযোগ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক রাশেদা ইরশাদ নাসির বলেন, ‘সমাজে হিংস্রতা বেড়েছে। হিংস্রতা মানুষের তখনই বাড়ে যখন মানুষের মধ্যে ইমোশন বা ভ্যালুজ কমতে থাকে। মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশের সমাজ একসময় ঐতিহ্যবাহী আবেগপ্রবণ ছিল। কিন্তু সেই সমাজ এখন রুটলেস হয়ে গেছে। আমাদের এখন মায়া-মমতা কমে গেছে, আবেগ কমে গেছে। সমাজে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বেড়েছে। অসুস্থ মানসিকতায় যেকোনও মূল্যে যেকোনও কিছু পাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এসব কারণেই হিংস্রতা বা নৃশংস উপায় বেছে নিচ্ছে মানুষ।’
মানুষের মধ্যে সামাজিক কোনও শিক্ষা নেই মন্তব্য করে এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, ‘মডার্ন সোসাইটিতে মানুষের ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তার প্রবণতা বাড়ে। আমাদের এখানে সমাজ পুরোপুরি আধুনিক হওয়ার আগেই আত্মকেন্দ্রিকতার চরমে গিয়ে ঠেকেছে। এজন্য মানুষ মানুষের জন্য কিছু আর করতে চায় না।’

Saturday, February 23, 2019

নিমতলী থেকে চকবাজার: মৃত্যুর সঙ্গে বসবাস! by নুরুজ্জামান লাবু

নয় বছর আগে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মারা গিয়েছিলেন ১২৪ জন। বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সেই নিমতলী থেকে দেড় কিলোমিটারের দূরত্বে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুনে মারা গেলেন ৬৭ জন। আগুনের সূত্রপাত ভিন্ন হলেও দুটি ঘটনায় মিল অনেক। ২০১০ সালের ৩ জুনের আগুন অবৈধভাবে পরিচালিত কেমিক্যালের গুদামের কারণে তীব্রতা পেয়েছিল বেশি আর সেজন্য ক্ষয়ক্ষতিও হয় ব্যাপক। বুধবারের আগুনের ভয়াবহতাও বাড়ায় বসতবাড়িতে অবৈধভাবে পরিচালিত হওয়া কেমিক্যাল গুদাম।
২০১০ সালের অগ্নিকাণ্ডের পর সরকারের পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল, তার কিছুই শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। আগের মতোই পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে চলছে কেমিক্যাল কারখানা ও গুদামজাতকরণ। এই এলাকার বাসিন্দারা যেন মৃত্যুর সঙ্গেই বসবাস করছেন প্রতিটি মুহূর্ত।
বুধবার রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টার সর্বনাশা আগুনের পর আবারও আলোচনায় এসেছে সেই কেমিক্যাল কারখানা ও গুদাম। রাত সাড়ে দশটার দিকে একটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত বলে জানা গেছে। পাশেই দাহ্য পদার্থের মজুদ থাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তে। আগুনের লেলিহান শিখায় সড়কের যানজটে আটকে থাকা লোকজনসহ আশেপাশের দোকানপাট ও বসতবাড়ির বাসিন্দারা দিগ্বিদিক নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকেন। নারী ও শিশুসহ ৬৭ জন ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। আগুনে পুড়ে ও আগুন থেকে বাঁচতে ছোটাছুটির সময় নানাভাবে আহত হন ৪১ জন। যাদের মধ্যে নয়জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। আর শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নিহত ৬৭ জনের মধ্যে ৩৯ জনের মরদেহ শনাক্তের পর তাদের পরিবারের সদস্যরা নিয়ে গেছেন। বাকিদের ডিএনএ ম্যাচিং করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, বুধবার রাত ১০টা ৩৮ মিনিটে আগুনের সূত্রপাতের খবর পেয়ে প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের লালবাগ স্টেশনের একটি গাড়ি ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। আগুনের ভয়াবহতা দেখে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানালে সদর দফতর ও সদরঘাট স্টেশন থেকে আরও কয়েকটি ইউনিট পাঠানো হয় ঘটনাস্থলে। কিন্তু আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে রাতে ঢাকা ও এর আশেপাশের সব ফায়ার স্টেশনের ইউনিটগুলোকে মুভ করতে বলা হয় চকবাজারের উদ্দেশে। শেষ পর্যন্ত ৩৯টি ইউনিট ভোর (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত টানা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। যদিও বৃহস্পতিবার দিনভর থেমে থেমে ছোট ছোট আগুনের কুণ্ডলী ও ধোঁয়া দেখা যায়, এমনকি বিকেলের দিকে স্প্রে ক্যানগুলো শব্দ করে ফুটতে থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোর থেকেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা একের পর এক লাশ উদ্ধার করতে শুরু করেন। লাশের সংখ্যা বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে স্বজনদেরও ভিড়। ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। মধ্যরাতেই ঘটনাস্থলে যান ঢাকা দক্ষিণের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন। সকাল সাড়ে আটটার দিকে পুলিশের মহাপরিদর্শক ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের ৬৭টি লাশ উদ্ধারের খবর জানান।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান বলেন, ‘আগুন নেভানোর কাজ শুরুর পর পানিস্বল্পতা হয়েছিল। পরে অবশ্য সেটার সমাধান করা হয়। এছাড়া ওই সময় রাস্তায় যানজট ছিল। তাই আগুন লাগার পর কেউ বের হতে পারেননি। আগুনে ঘটনাস্থলেই তারা মারা যান। আমরা খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কাজ করেছি।’
তিনি বলেন, ‘স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, একটি গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটেই দ্রুত চারপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পাশে প্রচুর দাহ্য পদার্থ থাকায় দ্রুত আগুন বড় আকার ধারণ করে। বিস্ফোরণের পর ফায়ার সার্ভিসের কেউ ধারেকাছেও আসতে পারছিলেন না। গলিগুলোও খুব সরু। এ কারণে কাছে এসে কাজ করা কঠিন ছিল।’
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এটা খুব জনবহুল এলাকা, প্রচুর মানুষ থাকে। তবে আমরা চেষ্টা করি এ ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রাখার। মানুষ সচেতন না হলে যেকোনও বড় ধরনের ঘটনা ঘটে যায়। এ ধরনের এলাকার বিষয়ে এখনই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।’
সরেজমিন দেখা গেছে, সকাল সাড়ে দশটার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজী সেলিম। ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে এসেছি। আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছি। সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থেকে সব ধরনের সহায়তা করবে।’ বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তদন্তের পর সরকার পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল কারখানা পুরোপুরি উচ্ছেদ কার্যক্রমে (এভিকশন ড্রাইভ) যাবে।’ এসময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সঙ্গে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘নিমতলীর ঘটনার পর থেকে আমরা বলে আসছি, ওখান থেকে কেমিক্যাল গুদাম সরিয়ে নিতে। এরপর আবার চলে আসছে। তাই এখন মেয়র মহোদয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি আর লাইসেন্স রিনিউ করছেন না। এখন পর্যন্ত আমি যতটুকু জানি, তিনি একটা পদক্ষেপ নেবেন এগুলো সরিয়ে দেওয়ার জন্য।’
ধ্বংসস্তূপে পরিণত চুড়িহাট্টা
ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর চকবাজারের চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের মোড় পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। সাড়ে চারতলা হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই ভবনের নিচতলায় ছিল মার্কেট। দোতালায় ছিল পারফিউম, অ্যারোসোল ও আফটার শেভ লোশন ক্যানের গুদাম। তিনতলার অর্ধেক ছিল বসতবাড়ি আর বাকি অর্ধেক ব্যবহৃত হতো গুদাম হিসেবে। চারতলায় থাকতেন বাড়ির মালিক। ওয়াহেদ ম্যানশনের পাশের ভবনের নিচতলার রাজমহল রেস্টুরেন্ট, দোতালায় রেস্টুরেন্ট কর্মচারীদের মেস, তিনতলায় বসতবাড়ি— সব পুড়ে গেছে। ওয়াহেদ ম্যানশনের বিপরীতে দুটি ভবন ও পশ্চিম দিকের সামনের ভবনের দোকানপাট ও বসতবাড়িও ছাই হয়ে গেছে আগুনে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সড়কে প্লাস্টিকের দানা পড়ে আছে ছড়িয়েছিটিয়ে। মসজিদের সামনের অংশে পুড়ে কঙ্কালসার অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে দুটি প্রাইভেটকার। ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে দুটি পিকাপ ভ্যান। এছাড়া বাইসাইকেল, রিকশা, ভ্যান, মটরসাইকেল, ঠেলাগাড়ি— সব পুড়ে ছাই। চারদিকের ভবনের দেয়ালগুলো ভেঙে পড়েছে রাস্তায়। এই ধ্বংসস্তূপ ভারী হয়ে ওঠে স্বজনহারাদের আকুতি, আহাজারিতে। কৌতূহলী হাজারো মানুষের ভীড় সামলাতেও রীতিমতো বেগ পেতে হয় পুলিশের।
সরেজমিন দেখা যায়, দুপুরে ধ্বংসস্তূপ থেকে আলামত সংগ্রহ করেন সিআইডির ক্রাইম সিনের সদস্যরা। পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্য, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআই ও থানা পুলিশ সদস্যদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। আগুনের কারণ, নানা উপকরণ সংগ্রহ, নাশকতা কিনা, তা যাচাই-বাছাই করতে তথ্য সংগ্রহ করতে ব্যস্ত ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। দুপুর একটার দিকে জনগণের চলাচল উন্মুক্ত করে দিলে মুহূর্তে ঘটনাস্থলসহ আশপাশ পরিণত হয় জনসমুদ্রে। বিকেলে মানুষের চলাচল আবার নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ। সন্ধ্যায় সিটি করপোরেশনের কর্মচারীরা রাস্তা থেকে সবকিছু সরিয়ে ফেলেন।
হাসপাতালে কান্না-আহাজারির রোল
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে সারি সারি লাশ। বাইরে স্বজনদের কান্না, আহাজারি। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে স্বজনদের করুণ অপেক্ষা। নিখোঁজ স্বজনের ছবি নিয়ে অনেকে ঘোরাঘুরি করছেন। কেউ কাঁদছেন প্রিয় সন্তান হারিয়ে আবার কেউ স্বামী কিংবা ভাই। পিতৃহারা হয়ে কেউ কেউ চোখের জলে ভেসেছেন পুরোটা সময়।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই নিহতদের শনাক্তের জন্য ব্যাপক তৎপর ছিল পুলিশ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে দেওয়া হয়েছে বিশ হাজার টাকা করে দাফন বা সৎকারের খরচ। লাশবাহী কফিন বক্স নিয়ে এসে অপেক্ষা করছিলেন স্বজনরা। দুপুর দুইটার পর কামলা নামে একজনের লাশ স্বজনদের হাতে তুলে দিয়ে শুরু হয় হস্তান্তর প্রক্রিয়া। এরপর তা চলে রাত পর্যন্ত। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সগুলো সাইরেন বাজিয়ে একটি করে লাশ নিয়ে ছুটে যাচ্ছিল গন্তব্যে।
জানা গেছে, জেলা প্রশাসনের বিশ হাজার টাকা করে জানাজা বা সৎকারের খরচের বাইরে নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের জন্য এক লাখ এবং যেসব শ্রমিক আহত হয়েছেন তাদের প্রত্যেকের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান।
আবারও একাধিক কমিটি, আশ্বাস!
নয় বছর আগের নিমতলী ট্রাজেডির পর এবারও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর একাধিক তদন্ত কমিটি করা হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার পক্ষ থেকে। সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা শুনিয়েছেন বিভিন্ন আশ্বাসবাণী। পুরান ঢাকার অলিগলিতে বাসিন্দারা যেভাবে দিনের পর দিন মৃত্যুর সঙ্গে বসবাস করছেন তা নিরসন করতে নানা উদ্যোগের কথা বলেছেন তারা। দুপুরে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশনস) মেজর শাকিল নেওয়াজ জানান, তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা। উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধনের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তারা আগুনের সূত্রপাতের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করবেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মফিজুল হককে কমিটির আহ্বায়ক এবং বিসিকের পরিচালক (প্রকল্প) আব্দুল মান্নানকে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে বলে পিআইডি’র এক তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়েছে। আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থল ও বিকেলে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিট পরিদর্শন শেষে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন সাংবাদিকদের বলেন, ‘চকবাজার এলাকার রাজ্জাক (হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন) ভবনে সংঘটিত আগুনের ঘটনা গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ থেকে হয়েছে। এরপরও এ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং আগুন দুর্ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে সুপারিশ দেওয়ার জন্য এরই মধ্যে ১২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে।’
সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “রাজধানীর পুরনো ঢাকার কেমিক্যাল ও প্লাস্টিক কারখানাগুলো পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তরের লক্ষ্যে শিল্প মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে দুটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে কেমিক্যাল কারখানা স্থানান্তরের জন্য কেরানীগঞ্জে ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ৫০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা এ প্রকল্পে ৯৩৬টি প্লট থাকছে। ২০১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।’
যদিও নয় বছর আগে নিমতলী ট্রাজেডির পর এরকম একাধিক উদ্যোগ ও সুপারিশের কথা জানানো হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু নয় বছরেও পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল কারখানা ও গুদাম সরেনি। উল্টো ২০১৭ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন একবার এসব অবৈধ কারখানা ও গুদামের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেও অজানা কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটির (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন অবশ্য বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, সম্প্রতি তারা আবার সেই অভিযান শুরু করেছিলেন। কিন্তু এর মধ্যেই মর্মান্তিক এই ঘটনা ঘটে গেছে। এই অভিযান এখন আরও জোরদারভাবে পরিচালনা করা হবে।
রাতে ঢাকা মেডিক্যালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুরান ঢাকা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে একই ভবনে ব্যবসা, দোকান আর মানুষজন থাকেন। এর মধ্যে ছোট ছোট কারখানার থাকে। এই দুঃখজনক ঘটনার পর সবার টনক নড়বে।’ তিনি বলেন, ‘এখানে হয় মানুষ বসবাস করবে, না হয় শিল্পকারখানা থাকবে। যেকোনও একটা সিদ্ধান্তে যেতে হবে।’

Friday, February 22, 2019

চুড়িহাট্টা মোড়ের যানজট কাল হয়ে এসেছিল ওদের জন্য by নুরুজ্জামান লাবু

দুই সন্তান রামিম ও শাহিরকে নিয়ে রিকশায় চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড় পার হচ্ছিলেন রাশিদুল ইসলাম মিঠু ও সোনিয়া আক্তার দম্পতি। চুড়িহাট্টার পাশেই রামিমের স্কুলবন্ধুর বোনের কান ফোঁড়ানোর দাওয়াত খেতে যাচ্ছিলেন তারা। রিকশাটি চুড়িহাট্টার মোড়ে যানজটে যখন আটকে ছিল, তখনই সিলিন্ডারে ভয়াবহ বিস্ফোরণটি হয়। মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা, সঙ্গে আগুনের লেলিহান শিখা। আগুনের ঝাটকা এসে লাগে সবার গায়ে। রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে রামিম কোনোমতে দৌড়ে কিছুটা দূরে সরে আসে। কিন্তু শাহিরসহ মিঠু-সোনিয়া দম্পতি সেই জট থেকে আর বের হয়ে আসতে পারেননি। সেখানেই করুণ মৃত্যু হয় তাদের। রামিমকে ভর্তি করা হয়েছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। শরীরের ছয় ভাগ ঝলসে গেছে তার।
মিঠু-সোনিয়া দম্পতির মতো আরও অনেকেরই করুণ মৃত্যু হয়েছে বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে, চুড়িহাট্টার মোড়ের সেই যানজটে। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরাও জানিয়েছেন, সড়ক থেকে তারা অন্তত ১৪-১৫ জনের লাশ উদ্ধার করেছেন। পোড়া যানবাহনের আশপাশে ও নিচে পড়েছিল এসব লাশ। ভোর থেকে লাশগুলো উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চকবাজারের চুড়িহাট্টার শাহী মসজিদের মোড়টিতে এমনিতেই ভিড় লেগে থাকে। রাস্তার দুইপাশে মার্কেট, দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ। রাস্তাটি সরু হওয়ায় কোনও রকমে ওভারটেক করতে পারে দুটি প্রাইভেটকার। বুধবার রাতে শহীদ মিনারে ‘ভিভিআইপি মুভমেন্ট’ থাকায় পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পেছনের সড়কে যানচলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। সে কারণে চুড়িহাট্টা সড়কে যানজট কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। আর সেটাই যেন কাল হলো যানজটে আটকে থাকা লোকজনের। সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর মুহূর্তের আগুনে সড়কের জটে আটকে থাকা লোকজন পুড়ে মারা যায় অত্যন্ত অসহায় ও করুণভাবে।
কামরাঙ্গীরচরের ইসহাক বেপারী ছিলেন ভ্যানচালক। ভ্যানে মালামাল নিয়ে হয়তো কোথাও যাচ্ছিলেন তিনি। চুড়িহাট্টার মোড়ে যানজটে আটকে থাকা অবস্থায় পুড়ে যায় মালামালসহ ভ্যানটি। আগুনের ছোবল থেকে রেহাই মেলেনি ইসহাকের। রাস্তায়ই পুড়ে মারা যান তিনিও। ইসহাক বেপারীর বোন হাসিনা বেগম জানান, কামরাঙ্গীরচরের মতবর বাজারে স্ত্রী চম্পা বেগম ও দুই সন্তান আলিফ (৫) ও আরাফাত (৩)-কে নিয়ে থাকতেন ইসহাক। গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইসহাকের স্ত্রী চম্পা বেগম জানান, সকালে যে গামছা নিয়ে ইসহাক বের হয়েছিলেন, সেই গামছা দেখেই তাকে শনাক্ত করেছেন তারা। চম্পা বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। স্বামী ভ্যানচালক। তার আয় দিয়েই আমাদের সংসার চলতো। আমরা এখন কী করবো? আমরা দুই সন্তানের কী হবে?’ একথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
সরেজমিন চুড়িহাট্টার ভয়াবহ আগুনের সেই জায়গাটি ঘুরে দেখা গেছে, সাইকেল, মোটরবাইকের পাশাপাশি একাধিক ঠেলাগাড়ি, রিকশা, ভ্যান পুড়ে অঙ্গার হয়ে পড়েছিল। কোনও কোনও স্থানে ভ্যান-ঠেলাগাড়িতে বহন করা বিভিন্ন পণ্যের কিছু কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাস্তায় পড়েছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এসব পরিষ্কার করেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের কর্মীরা।
বৃহস্পতিবার বিকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে কথা হয় রিনা বেগমের সঙ্গে। আরও কয়েকজন নারীসহ তিনি সড়কের পাশে বসে আছেন ভাবলেশহীন হয়ে। জানালেন, মজিবর হাওলাদার নামে তার এক স্বজন পুড়ে মারা গেছেন। মজিবর ঠেলাগাড়ি চালাতেন, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলে টালিগাড়ি। বেশিরভাগ সময় প্লাস্টিকের ‘দানা’ আনা-নেওয়া করতেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে রিনা বেগম জানান, ঠেলাগাড়িতে মজিবরসহ চারজন ছিলেন। চুড়িহাট্টা মোড়ে যানজটে আটকে ছিল ঠেলাগাড়িটি। গাড়ির মালামাল ছিল তার ভাইয়ের ছেলে যে গোডাউনের ম্যানেজার, সেখানকার। এজন্য আগুন লাগার পর অন্যরা দৌড়ে প্রাণ বাঁচালেও মালামাল সরাতে গিয়ে আগুনের মধ্যে পড়ে মারা যান পাঁচ সন্তানের জনক মজিবর। রিনা বলেন, ‘আমরা পা আর গায়ের গেঞ্জি দেখে মজিবরকে শনাক্ত করেছি। লাশ নিয়ে গিয়ে গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর রহমতগঞ্জে দাফন করবো।’
চকবাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরছিলেন তিন বছরের ছেলে আরাফাতকে নিয়ে। সঙ্গে ছিল ছোট ভাই অপু রায়হানও। চুড়িহাট্টা সড়ক ধরে যানজট ঠেলে পাশের রহমতগঞ্জের ছাতা মসজিদ এলাকা দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন তারা। কিন্তু হঠাৎ সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর ভয়াবহ সেই আগুনে তিনজনই পুড়ে মারা যান।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের পাশে বসে বিলাপ করছিলেন আলী ও অপুর বোন জরিনা বেগম। মাঝে মাঝে চিৎকার করে কাঁদছিলেন তিনি। তাকে সান্ত্বনা দেওয়া আলীর বন্ধু জুবায়ের জানালেন, ‘চাচা অপুর সঙ্গে বড় ছেলে আরাফাত বাবার দোকানে গিয়েছিল। একসঙ্গে বাসায় ফিরছিল তারা। কিন্তু আগুন একসঙ্গে কেড়ে নিলো তাদের।’ একথা বলেই তিনি নিজেও কান্নায় ভেঙে পড়েন। জুবায়ের জানান, আলীর স্ত্রী ইতি আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামী ও সন্তানের মৃত্যুর খবরে সেও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আর অপুর চার মাসের একটি সন্তান রয়েছে। পরিবার দুটি পুরোপুরি পথে বসে গেলো, সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়লো।’
বুধবার রাত ১০টা ২১ মিনিটে চা খেতে বের হয়েছিলেন জয়নাল আবেদীন বাবুল। আগুনের পর থেকে তার মোবাইল বন্ধ। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না তার। ঢাকা মেডিক্যালের মর্গেও তার লাশ শনাক্ত করতে পারেননি স্বজনরা। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর চুড়িহাট্টা সড়কে তার ছবি নিয়ে আহাজারি করছিলেন বাবুলের মেয়ে নাসরিন আক্তার। নাসরিন জানান, কোনও এক বন্ধুর ফোন পেয়ে রাত ১০টা ২১ মিনিটে ২৬ নম্বর আজগর লেনের বাসা থেকে বের হন তার বাবা। হাজী বালুঘাটে যাওয়ার কথা ছিল তার। চুড়িহাট্টা সড়ক দিয়েই যেতে হয়। নাসরিন জানান, আগুনে তার বাবা পুড়ে মারা গেছেন কিনা নিশ্চিত হতে পারছেন না। লাশ দেখে শনাক্তও করতে পারেননি। রেডক্রসের কাছে বাবার নিখোঁজ থাকার বিষয়টি জানিয়েছেন তিনি।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সদর দফতরের পরিদর্শক শরীফুল ইসলাম জানান, তারা রাস্তা থেকে অন্তত ১৪-১৫ জনের লাশ উদ্ধার করেছেন। এছাড়া, হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে নিচতলার মার্কেটের করিডোর থেকে একসঙ্গে থাকা ২৪টি লাশ উদ্ধার করেছেন। হায়দার ফার্মেসি থেকেও ৫-৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যান্য দোকান থেকেও একাধিক লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

Monday, August 6, 2018

সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেছে কারা? by নুরুজ্জামান লাবু

পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় রাজধানীর সাইন্সল্যাব এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলায় আহত ও দায়িত্বপালনকারী সংবাদকর্মীরা জানান, রবিবার দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত সায়েন্সল্যাব, সিটি কলেজ, ধানমন্ডি ২ নম্বর ও জিগাতলা এলাকায় তাদের ওপর চড়াও হয়ে ক্যামেরা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। কারো কারো ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাদের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়া হয়েছে। হুমকি-ধমকি দিয়ে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি ছবি তুললে মারধর করা হবে বলে শাসানো হয়েছে। এতে আতঙ্কগ্রস্ত সংবাদকর্মীরা নিরাপত্তার স্বার্থে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ-যুবলীগের চড়াও হওয়ার ছবি তুলতে পারেননি।
প্রত্যক্ষদর্শী সংবাকর্মীদের ভাষ্য, ঢাকা কলেজ থেকে আসা ছাত্রলীগের একটি মিছিলের সামনে থাকা সাত যুবক প্রথম সংবাদকর্মীদের ওপর হামলা চালান। তাদের সবার মাথায় হেলমেট ছিল। হাতে ছিল রড, লাঠি ও চাপাতি। তারা যাকেই ছবি তুলতে দেখেছেন তাদের ওপরই হামলা করেছেন। হামলাকারীদের নেপথ্যে থেকে মদদ দিয়েছেন ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ শাখার সাবেক আহ্বায়ক শিহাবুজ্জামান শিহাব ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন।
যোগাযোগ করা হলে শিহাবুজ্জামান শিহাব অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আজ এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি। আপনি দেখেন, কোথাও সাংবাদিকদের ওপর হামলায় আমাকে পাবেন না। আমার ছেলেপেলেরা কেউ করেনি। আমি থাকা অবস্থায় আমার সামনে কেউ সাংবাদিকদের গায়ে হাত তোলেনি।’
কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক এই সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ‘আজ দুপুরে সেন্ট্রাল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী গণভবন থেকে ফিরছিলেন। ল্যাবএইড হাসপাতালের উল্টো দিকে তার সঙ্গে থাকা একটি মোটরবাইক পুড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অন্যদের মারধর করো হয়েছে। এই মেসেজ কলেজে (ঢাকা) যাওয়ার পর কলেজের নেতাকর্মীরা ল্যাবএইড পর্যন্ত মহড়া দিয়েছে। কিন্তু কারো গায়ে হাত তোলেনি।’
রবিবার দুপুরে সায়েন্সল্যাব থেকে ধানমন্ডি ২ নম্বর হয়ে জিগাতলা পর্যন্ত অন্তত দশজন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়ে আহত হন। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকজন হামলার শিকার হলেও তাদের অবস্থা ততটা গুরুতর নয়। হামলায় আহত হয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এপি’র (অ্যাসোসিয়েট প্রেস) ফটোসাংবাদিক এ এম আহাদ, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আহমেদ দীপ্ত, পাঠশালার দুই শিক্ষার্থী রাহাত করীম ও এনামুল কবীর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
এছাড়া আহত অন্য সাংবাদিকরা হলেনন দৈনিক বণিকবার্তার পলাশ শিকদার, অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিমর্নিংয়ের আবু সুফিয়ান জুয়েল, দৈনিক জনকণ্ঠের জাওয়াদ, প্রথম আলোর সিনিয়র ফটোগ্রাফার সাজিদ হোসেন, চ্যানেল আইয়ের সামিয়া রহমান, মারজুক হাসান, হাসান জুবায়ের ও এন কায়ের হাসিন।
এ এম আহাদের সঙ্গে হামালার শিকার হন দৈনিক বণিকবার্তার ফটোসাংবাদিক পলাশ শিকদার। তিনি বলেন, ‘দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে আমি, আহাদ ভাই ও একটি অনলাইনের ফটোসাংবাদিক সায়েন্সল্যাব ওভারব্রিজের নিচে ছিলাম। এসময় ঢাকা কলেজের দিক থেকে ছাত্রলীগের একটি মিছিল আসে। মিছিলের সামনে ছয়-সাতজন ছাত্র হাতে জিআই পাইপ নিয়ে প্রথমে আমাদের ওপর চড়াও হয়। এসময় আহাদ ভাইয়ের মাথা ফেটে যায়। আমরা দৌঁড়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে দুজন নার্স রাস্তাতেই আমাদের সহযোগিতা করছিল। এসময় ছাত্রলীগের ছেলেরা আরেক দফা এসে আহাদ ভাইকে পেটাতে থাকে। আমাকেও টেনে নিয়ে পেটানো শুরু করলে আমি দৌঁড়ে রাস্তার ওপারে চলে যাই।’
পলাশ শিকদার বলেন, ‘মাথা হেলমেট পড়া যুবকরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আহাদ ভাইয়ের কোমড় থেকে বেল্ট কেটে নিয়ে ক্যামরো ভেঙে ফেলে। তাকে মারধরের পর একজন রিকশাওয়ালা আহাদকে তুলে নিয়ে এগিয়ে আসলে আমিসহ চিৎকার করে মানুষের সহযোগিতা চাই। কিন্তু কেউ আমাদের সহযোগিতা করেনি। এমনকি পুলিশও আমাদের ডাকে এগিয়ে আসেনি।’
তিনি বলেন, ‘আহাদ ভাইকে নিয়ে ল্যাবএইডে নিয়ে গেলে তারা প্রথমে ভর্তি করাতে চায়নি। এসময় আমি কান্নাকাটি করি।এরপরও হাসপাতালে ঢুকতে দিতে চায়নি।পরে ঢাকা ট্রিবিউনের ফটোসাংবাদিক মেহেদী এগিয়ে এসে জোর করে ল্যাবএইডের জরুরি বিভাগে ঢোকায়।’
প্রায় একই সময়ে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আহমেদ দীপ্ত। হামলার পরপরই তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দুপুর ২টার দিকে তিনি সায়েন্সল্যাব ফুটওভার ব্রিজের নিচে শিক্ষার্থীদের অবস্থান দেখতে এগিয়ে যান। এসময় অতর্কিতে ব্রিজের নিচে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে তার ওপর চড়াও হয়। বেধড়ক পেটানোর পর অন্য সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আহমেদ দীপ্তর পিঠ ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে তার অবস্থা আশঙ্কামুক্ত। এ এম আহাদের মাথা ফেটে গেছে। তার মাথায় বেশ কয়েকটি সেলাই দিতে হয়েছে। তিনিও এখন আশঙ্কামুক্ত।
ছাত্রলীগের বেধড়ক মারধরের শিকার হয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন ফটোগ্রাফি বিষয়ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাঠশালার শিক্ষার্থী ও ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার রাহাত করীম। দুপুর ২টার দিকে সায়েন্সল্যাবের ফুটওভার ব্রিজের নিচে তাকে মারধর করা হয়। এ ঘট্নার একটি ভিডিও ফুটেজ রয়েছে বাংলা ট্রিবিউনের হাতে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ফটোসাংবাদিক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দুপুর ২টার পরপরই ঢাকা কলেজের দিক থেকে আসা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা যখন সায়েন্সল্যাবের দিকে আসে, তখন রাহাত করীম ফুটওভার ব্রিজের দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন। এসময় লাঠি হাতে যুবকরা প্রথমে তার দিকে ইট-পাটকেল ছোড়ে। এসময় ফুটওভার ব্রিজের ওপরে আরও অন্তত ১০-১২ জন ফটোগ্রাফার ছিলেন। রাহাত নিচে নেমে আসলে তার ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রাহাত ক্যামেরা না ছাড়ায় তাকে মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তাকে মারতে মারতে গেঞ্জি ছিঁড়ে ফেলা হয়। তার মাথা ফেটে রক্ত বের হলে নেতাকর্মীদের কয়েকজন এগিয়ে এসে অন্যদের থামায়।
পাঠশালার প্রিন্সিপাল আবীর আব্দুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাহাত করীমসহ মোট পাঁচজন শিক্ষার্থী ও ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে রাহাতের অবস্থা একটু গুরুতর। তার মাথায় সেলাই দিতে হয়েছে। এনামুল করীম নামে আরেকজনের পা পিটিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। তাকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখান থেকে তাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
ছাত্রলীগের বেপরোয়া হামলার সময় ল্যাবএইডের উল্টো দিকে ধানমন্ডি ৩ নম্বর সড়কের পাশে হ্যাপি আর্কেডের সামনে অবস্থান নেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। দুপুর ২টার একটু পর ঘটনাস্থলে থাকা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অপরাধ বিষয়ক প্রধান প্রতিবেদক লিটন হায়দার বলেন, ‘ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সায়েন্সল্যাবের দিক থেকে ধাওয়া দিলে আমরা দৌঁড়ে এসে হ্যাপি আর্কেডের সামনে এসে অবস্থান নিই। এসময় ছাত্রলীগের ছেলেরা আমাদের ওপর চড়াও হয়। তারা দূর থেকে আমাদের ওপর বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেলও নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে ওরা লাঠিসোঁটা ও চাপাতি হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে। আমাদের সেখান থেকে চলে যেতে বলে এবং কোনও ছবি তুলতে নিষেধ করে।’
ঘটনাস্থলে উপস্থিত দৈনিক সমকালের স্টাফ রিপোর্টার বকুল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের ওখানে একাত্তর টিভি, যমুনা ও বৈশাখী টেলিভিশনের সংবাদকর্মীরাও ছিলেন। তারা (ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা) আমাদের ছবি তোলার জন্য শাসাচ্ছিল। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে লাঠির পাশাপাশি ধারালো অস্ত্রও ছিল। অবস্থা এমন ছিল ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতে গেলেই তেড়ে আসছিল। অনেকের মোবাইল-ক্যামেরাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।’
ধানমন্ডি ২ নম্বর সড়কে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে হেনস্তার শিকার হন চ্যানেল আইয়ের রিপোর্টার সামিয়া রহমান। সেখানে বেশ কয়েকজন ফটোসাংবাদিক ও রিপোর্টার উপস্থিত ছিলেন। এই প্রতিবেদক নিজেও সেখানে অবস্থান করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হুমকি-ধমকি প্রত্যক্ষ করেন। ঘটনাস্থলে থাকা ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের স্টাফ রিপোর্টার মুক্তাদির রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “হেলমেট পরিহিত ছাত্রলীগ পরিচয়ধারীরা এসে বলে, ‘আজকের সব কিছুর সমস্যার মূলে সাংবাদিকরা।’ তারা ধারালো অস্ত্র নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে এসে বলে, ‘কেউ ছবি তুলবি না।’ ‘সব ক্যামেরা ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেল’ বলে ধমকাচ্ছিল। যেসব ছাত্রলীগ নেতারা আশপাশ দিয়ে যাচ্ছিল তারা সবাই তেড়ে আসার পাশাপাশি অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করছিল এবং ধমকাচ্ছিল। তারা বলছিল, ‘কালকে যদি কোনও ছবি দেখি কাউকে ছাড়বো না।’ এর ভেতরে একজন বলে ওঠে, ‘একজন যদি ছবি তোলে সবাইকে কোপাবো।’ তবে পুলিশের খুব কাছাকাছি হওয়ায় তারা জিগাতলার দিকে যেতে থাকে। উপায়ন্তর না দেখে পুলিশ সাংবাদিকদের সরে যেতে অনুরোধ করে।”
হামলার শিকার হওয়া অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডি মর্নিংয়ের আবু সুফিয়ান জুয়েল বলেন, ‘হামলাকারীরা সবাই ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মী বলে আমারা জানতে পেরেছি। তাদের অনেকের মাথায় হেলমেট ছিল।’
নাগরিক টিভির গাড়ি ভাঙচুর করেছে আন্দোলনকারীরা
দুপুর ১টার দিকে ঢাকা সিটি কলেজের সামনে নাগরিক টিভির একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। নাগরিক টিভির ক্যামেরাম্যান রিপন হাসান জানান, দুপুর ১টার দিকে তারা ঢাকা সিটি কলেজের সামনে অবস্থান করছিলেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যখন মিছিল নিয়ে জিগাতলার দিকে যাচ্ছিল, তখন একদল যুবক আমাদের গাড়িটিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। আমরা সঠিক তথ্য প্রকাশ করছি না— এই অভিযোগে হামলা করে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব সোহেল হায়দার চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ। সমাজের যা কিছু ভালো-মন্দ বা শুদ্ধ-অশুদ্ধ তা তুলে ধরে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা কখনও কাম্য হতে পারে না। এটি গণতন্ত্র ও সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে।’
তিনি বলেন, ‘সব সরকারের সময়েই সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হয়। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সাংবাদিকবান্ধব। সেই আওয়ামী লীগের আমলে যখন এ ধরনের ঘটনা দেখি এবং হামলার সুষ্ঠু বিচার না হতে দেখি, তখন মর্মাহত হই। হামলাকারীরা যে দেলেরই হোক তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানাই।’
সাংবাদিকদের মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের কাছে কেউ এমন কোনও অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই আমরা মামলা নেবো এবং আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’

Sunday, June 3, 2018

ঢাকার ২৫ ‘মাদক সম্রাজ্ঞী’র তালিকা নিয়ে অভিযানে পুলিশ by নুরুজ্জামান লাবু

রাজধানী ঢাকায় ২৫ ‘মাদক সম্রাজ্ঞী’র তালিকা হাতে নিয়ে তাদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। ইতোমধ্যে এই তালিকায় থাকা ৩ জনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। বাকি ২২ জনকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ।
এই ‘মাদক সম্রাজ্ঞী’রা কয়েক বছর ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা করে আসছে। মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হওয়ার পর তারা সবাই আত্মগোপনে চলে গেছে। তবে থেমে নেই তাদের মাদক ব্যবসা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার শীর্ষ এই ‘মাদক সম্রাজ্ঞী’রা মাদক ব্যবসা করে কেউ কেউ কোটিপতি বনে গেছে। ঢাকায় তাদের একাধিক বহুতল ভবনও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং সরেজমিন খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। চিহ্নিত যেসব মাদক স্পট রয়েছে সেগুলোতে অভিযানের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতেও অভিযান চালানো হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশের হাতে থাকা ‘মাদক সম্রাজ্ঞী’দের তালিকার এক নম্বরে রয়েছে যাত্রাবাড়ী থানার ৩ নম্বর পার গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা রহিমা বেগম (৪৮)। তার স্বামীর নাম হজরত আলী। তার বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় ৫টি ও গেন্ডারিয়া থানায় একটি মামলা রয়েছে।
জানা গেছে, রহিমা একজন কোটিপতি মাদক ব্যবসায়ী। ঢাকায় তার অন্তত দশটি বাড়ি রয়েছে। অন্তত বিশ বছর ধরে মাদক ব্যবসা করে আসা রহিমা একসময় গাঁজা বিক্রি করত। এখন ইয়াবা ব্যবসা করে। টেকনাফ থেকে সরাসরি ইয়াবা এনে ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করে সে। নিজে চলাফেরা করে বিলাসবহুল গাড়িতে।
তালিকার দুই নম্বরে রয়েছে সুফিয়া আক্তার ওরফে সুফি (৪৫)। তার বাবার নাম মৃত আব্দুর রহমান, স্বামীর নাম আক্তার হোসেন। যাত্রাবাড়ী থানার সায়েদাবাদের ১০১ ওয়াসা কলোনির বাসিন্দা সুফির বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় ৫টি ও শ্যামপুর থানায় একটি মামলা রয়েছে।
যাত্রাবাড়ী এলাকার অন্যতম মাদক ব্যবসায়ী সে। সুফিও একসময় গাঁজা বিক্রি করত। বর্তমানে ইয়াবা ব্যবসা করে কোটিপতি বনে গেছে। ঢাকা শহরে তারও একাধিক বাড়ি রয়েছে বলে জানা গেছে।
কমলাপুর রেলওয়ে এলাকার জমিলা খাতুনের (৫০) নাম রয়েছে তালিকার তিন নম্বরে। তার বিরুদ্ধে শাহাজাহানপুর থানায় তিনটি, মতিঝিল থানায় একটি, মুগদা ও ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থানায় একটি এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় একটি মামলা রয়েছে। জমিলা সম্পর্কে তেমন তথ্য জানা যায়নি। তবে কমলাপুর রেলওয়ে থানার একটি সূত্র জানিয়েছে, জমিলা কমলাপুর এলাকায় ভাসমান হিসেবে মাদক বিক্রি করে।
সবুজবাগ থানার ৪৬ নম্বর ওহাব কলোনির বাসিন্দা শামসুন্নাহার চম্পা (৪০)। তার বাবার নাম মৃত নুরু উদ্দিন, স্বামী বাবুল ওরফে ফর্মা বাবুল। তার বিরুদ্ধে সবুজবাগ থানায় মাদকসহ ১৪টি এবং মতিঝিল থানায় একটি মামলা রয়েছে।
চম্পার মেয়ে তানিয়া বেগমও (৩০) এলাকায় মাদক সম্রাজ্ঞী হিসেবে পরিচিত। তানিয়ার স্বামীর নাম আরমান। তার বিরুদ্ধে সবুজবাগ থানায় ছয়টি ও খিলগাঁও থানায় একটি মামলা রয়েছে। শামসুন্নাহার চম্পা ও তানিয়া রাজধানীর উত্তরা এলাকায় বসবাস করে। দক্ষিণখান এলাকায় তাদের ছয়তলা বাড়ি রয়েছে বলে জানা গেছে। সবুজবাগের ওহাব কলোনির আরেক ‘মাদক সম্রাজ্ঞী’র নাম সুফিয়া আক্তার শোভা (৫০)। তার স্বামীর নাম আইয়ুব আলী, বাবার নাম সুলতান। ১২১নং ওহাব কলোনির বাসিন্দা শোভার বিরুদ্ধে সবুজবাগ থানায় ১০টি মাদকদ্রব্য আইনে মামলা রয়েছে।
গত বুধবার রাতে পুলিশ সবুজবাগের ওহাব কলোনিতে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছিল। কিন্তু তালিকাভুক্ত এই তিন নারী মাদক ব্যবসায়ীর কাউকে ধরতে পারেনি। স্থানীয়রা জানান, তারা কেউ কলোনিতে থাকে না। বাইরে থেকেই লোকজন দিয়ে কলোনির মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে।
পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের ‘মাদক সম্রাজ্ঞী’ হলো ফারহানা আক্তার পাপিয়া ওরফে ইয়াবা পাপিয়া। ক্যাম্পের বি-ব্লকের ২৩৯ নম্বর বাসায় থাকে সে। তার স্বামীর নাম জয়নাল আবেদীন পাচু। তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় চারটি মাদক ও অস্ত্র মামলা রয়েছে।
জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাপিয়া মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকার মাদক সম্রাজ্ঞী হিসেবে সুপরিচিত। স্বামী পাচুর মাধ্যমে মাদক ব্যবসায় হাতেখড়ি তার। সুন্দরী তরুণীদের ব্যবহার করে ইয়াবা ব্যবসা চালায় পাপিয়া।
মাদক ব্যবসা করে পাপিয়াও কোটিপতি বনে গেছে। এর আগে একাধিকবার গ্রেফতারও হয়েছিল সে। কিন্তু গ্রেফতারের কিছুদিন পরই জামিনে বেরিয়ে এসে আগের মতো মাদক ব্যবসায় ফিরে যায়।
তালিকা অনুযায়ী, মিরপুরের ভাসানটেক এলাকার মাদক সম্রাজ্ঞী মোর্শেদা (৩৩)। ভাসানটেকের ১নং বস্তিতে তার বাস। তার স্বামীর নাম সোহরাব হোসেন আর বাবার নাম আব্দুল হক। ভাসানটেক থানায় তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে। ভাসানটেক এলাকার আরেক মাদক সম্রাজ্ঞী হলো স্বপ্না (৩১)। তার স্বামীর নাম বাচ্চু মিয়া। ভাসানটেক এলাকার ৩নং ধামালকোটের পাশে রহিমের বাড়ির ভাড়াটিয়া সে। বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। রূপনগর এলাকার মাদক সম্রাজ্ঞী হলো সালেহা বেগম (৪৮)। তার স্বামীর নাম আলেকচাঁন। রূপনগর থানার দুয়ারীপাড়ার ৮ নম্বর সেকশনের ১ নম্বর রোডের ৮ নম্বর বাসায় থাকে সে। তার বিরুদ্ধে রূপনগর থানায় ২১টি ও পল্লবী থানায় একটি মামলা রয়েছে।
কামরাঙ্গীরচর এলাকার মাদক সম্রাজ্ঞী হলো শাহিনুর বেগম ওরফে দিনারা ওরফে মিনারা ওরফে শাহনাজ বেগম ওরফে শাহিনুর (৪২)। তার স্বামীর নাম বাবু ওরফে মোবাইল বাবু আর বাবার নাম আবুল হোসেন ওরফে সেলিম ওরফে জালাল। কামরাঙ্গীরচরের পশ্চিম রসুলপুরের বি-ব্লকের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ১৬ নম্বর বাসায় থাকে সে। তার বিরুদ্ধে নিউমার্কেট থানায় ১৫টি মাদক মামলা রয়েছে।
কাওরানবাজার এলাকার মাদক সম্রাজ্ঞী হলো শিল্পী (৩০)। তার স্বামীর নাম মাসুদ। তেজগাঁও থানায় তার বিরুদ্ধে ৭টি মামলা রয়েছে। বর্তমানে সে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছে। কাওরানবাজার এলাকার আরেক মাদক সম্রাজ্ঞী হলো আকলিমা আক্তার (২৫)। তার বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় ৫টি মামলা রয়েছে। শেরেবাংলা নগর থানার মাদক সম্রাজ্ঞী জোৎস্না বেগম (৩১) থাকে পশ্চিম কাফরুলের ২২৮/এ তালতলার রতন মিয়ার টিনশেড বাড়িতে। তার বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় ৪টি মাদক মামলা রয়েছে। কাওরানবাজার রেলওয়ে বস্তির আরেক মাদক সম্রাজ্ঞীর নাম মিনা (৩৫)। তার স্বামীর নাম বাদশা বেপারী। তার বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় ৪টি মামলা রয়েছে।
মরিয়ম বেগম কুট্টি (৩৪) নামে আরেক মাদক সম্রাজ্ঞীর স্বামীর নাম আকতার হোসেন। তেজগাঁও রেলওয়ে বস্তির বাসিন্দা কুট্টির বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে দুটি। একই এলাকার মাহমুদা নামে আরেক মাদক সম্রাজ্ঞীর বিরুদ্ধেও তেজগাঁও থানায় মামলা রয়েছে দুটি।
কাঁঠালবাগান এলাকার মাদক সম্রাজ্ঞী হলো শাহনাজ (২৫)। তার স্বামীর নাম শাহজাহান সরদার। ১৬০/১ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, কাঁঠালবাগান বাজার মসজিদের গলিতে থাকে সে। তার বিরুদ্ধে কলাবাগান থানায় ৭টি মাদক সংক্রান্ত মামলা রয়েছে।
মাদক সম্রাজ্ঞী খুরশিদা বেগম ওরফে খুশি (৩১) মাদক ব্যবসা করে মিরপুর, নিউমার্কেট ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায়। মিরপুরের কালাপানি বস্তি, নিউমার্কেট ১ নম্বর গেটে ভাসমান অবস্থায় আর কামরাঙ্গীরচরের নয়াগাঁও ২৫২ নম্বর মুড়ির ফ্যাক্টরির পাশে থাকার পাশাপাশি মাদক ব্যবসা করে সে। তার বিরুদ্ধে নিউমার্কেট থানাতেই ১৫টি মাদক মামলা রয়েছে।
নিউমার্কেট এলাকার আরেক মাদক সম্রাজ্ঞী হলো হাসি বেগম (৩৫)। তার স্বামীর নাম ওমর আলী। বাবার নাম মৃত জব্বর হাবিলদার। মিউমার্কেট ১ নম্বর গেটের সামনে ভাসমান অবস্থায় মাদক ব্যবসা করে সে। তার বিরুদ্ধে নিউমার্কেট থানায় ১২টি মাদক মামলা রয়েছে।
হাজারীবাগ এলাকার মাদক সম্রাজ্ঞী বীনা। তার স্বামীর নাম নুর হোসেন। হাজারীবাগ থানাধীন বৌবাজার এলাকার ১৮/বি রানা বেকারির গলিতে থাকে সে। তার বিরুদ্ধে হাজারীবাগ থানায় ১১টি মামলা রয়েছে।
মাদকসহ আটক হওয়ার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করে সে। হাজারীবাগ এলাকার আরেক মাদক সম্রাজ্ঞীর নাম নূর নাহার নুন্নী। তার বাবার নাম খোরশেদ আর স্বামীর নাম ইউনূস। হাজারীরবাগ থানাধীন ১৬নং চড়কঘাটা রহমানের বাড়ির ভাড়াটিয়া। তার বিরুদ্ধে হাজারীবাগ থানায় ৯টি মাদক সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। নুন্নীও মাদকসহ আটকের পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করেছে। এই এলাকার আরেক মাদক সম্রাজ্ঞী জমিলা ওরফে জামিলা ওরফে জামেলা বেগম (৪৭)। তার স্বামীর নাম সুরেশ লাল। হাজারীবাগ থানার গণকটুলী সুইপার কলোনিতে থাকে সে। তার বিরুদ্ধে হাজারীবাগ থানায় তিনটি মামলা রয়েছে।
পুরান ঢাকার মাদক সম্রাজ্ঞীর নাম পারুলী রানী (৩৮)। তার স্বামীর নাম সুরেশ লাল। রাজধানীর কোতোয়ালি থানার ১০/১ কৈলাশ ঘোষ (বুড়িরবাগান) এলাকায় তার বাস। তার বিরুদ্ধে কোতয়ালী থানায় ৫টি মাদক সংক্রান্ত মামলা রয়েছে।
খিলক্ষেত এলাকার মাদক সম্রাজ্ঞী হলো নাজমা বেগম (৪৮)। তার স্বামীর নাম রবিউল ইসলাম রুবেল। বাবার নাম হযরত আলী। খিলক্ষেত থানাধীন বেপারী পাড়ার খ-২১ নম্বর বাসায় থাকে সে। তার বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানায় ১৮টি ও কদমতলী থানায় একটি মাদক সংক্রান্ত মামলা রয়েছে।

Monday, April 9, 2018

‘তাণ্ডবের প্রতিটি মুহূর্তে বারবার মৃত্যু ভয়ে আঁতকে উঠেছি’ by নুরুজ্জামান লাবু

উপাচার্যের স্ত্রী সালমা জামান
রাতভর তাণ্ডবের প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যু ভয়ে কেটেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের স্ত্রী সালমা জামান। তিনি বলেন, ‘হামলার সময় মেয়েকে নিয়ে বাসার মধ্যেই লুকিয়ে ছিলাম। মেয়ে ভয়ে কাঁদছিল। তখন মেয়ের হাত শক্ত করে ধরেছিলাম। তাণ্ডবের প্রতিটি মুহূর্তে বারবার মৃত্যু ভয়ে আঁতকে উঠেছি।’
রবিবার দুপুর থেকে শুরু হওয়া ‘সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে’ আন্দোলনের একপর্যায়ে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের বাসভবনে হামলা চালায় আন্দোলনকারীর। এ সময় উপাচার্যের বাসার ফ্রিজ, আলমারি থেকে  শুরু করে সব ধরনের আসবাবপত্র ভেঙে ফেলা হয়। ঘণ্টাব্যাপী তাণ্ডবের সময় বাসার মধ্যেই লুকিয়ে ছিলেন উপাচার্যের পরিবারের সদস্যরা। হামলার সময় বাসায় ছিলেন উপাচার্যসহ তার স্ত্রী সালমা জামান, ছেলে আশিক খান, মেয়ে আফিয়া খান। 
ঘটনা প্রসঙ্গে উপাচার্যের স্ত্রী সালমা জামান বলেন, ‘রাত একটায় বাসায় হামলা হয়, সে সময় বাসভবনের প্রধান ফটক ভেঙে কয়েকশ’ ছেলে ও মেয়ে আন্দোলনকারী ভেতরে ঢুকে পড়ে। তখন পুলিশ ডাকতে বললেও উপাচার্য পুলিশ ডাকতে চাননি। তখন তিনি (উপাচার্য) বারবার বলেছেন, পুলিশ ডাকলে ওরা ছাত্রদের ওপর হামলা করবে। ছাত্রদের মেরে ফেলবে। তখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আমাদের ওপর হামলা হবে না। আমি ওদের বোঝাচ্ছি।’
সালমা জামান আরও বলেন, ‘তারা (আন্দোলনকারীরা) ভাঙচুর করতে শুরু করলে তিনি (উপাচার্য) তাদের নিবৃত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। স্যার (উপাচার্য) ছেলেকে নিয়ে নিচে নেমে যান, আমি মেয়েকে নিয়ে লুকিয়ে থাকি। এ সময় তারা বাসার সবকিছু ভেঙে লুটপাট করে নিয়ে গেছে। তখন চোখে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।’
এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘সন্ধ্যা থেকেই আন্দোলন চলছিল। সন্ধ্যায় একবার বাসার সামনে বসেছিল আন্দোলনকারীরা। পরে তারা চলে গেছে। এরপর বাসার কেউ ঘুমায় নাই। কারণ, উত্তেজনা চলছিল। স্যারের (উপাচার্যের) ফোনে বারবার ফোন আসছিল। তিনি বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। রাত ৯টার দিকে বাসা ছেড়ে রাতের জন্য অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে চাইলেও স্যার বাসা ছেড়ে যেতে চাননি।’ 
সরেজমিনে দেখা যায়, উপাচার্যের বাসার আসবাবপত্র থেকে শুরু করে ব্যবহার্য এমন কোনও জিনিসপত্র নাই যা ভাঙেনি। টিভি-ফ্রিজ সব ভাঙা। বিভিন্ন জিনিসপত্র এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে।
উপাচার্যের ভবনে হামলার ব্যাপারে শিক্ষক ও স্বজনদের বক্তব্য: 
সোমবার সকালে উপাচার্যের বাসভবন ঘুরে দেখার পরে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক শামীম রেজা বলেন, ‘আমরা অনেক আন্দোলন দেখেছি, এরশাদের সময়কার আন্দোলনও দেখেছি, কিন্তু কখনও এমন দৃশ্য দেখিনি। এমন ভয়াবহ তাণ্ডব কারা করেছে, তাদের খুঁজে বের করা জরুরি।’
সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হামলার সময় মুখোশধারী লোকজন ছিল। আমরা শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে চাই বৃহত্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে এই হামলাকারীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হোক।’
উপাচার্যের স্ত্রী সালমা জামানের বোন খাদিজা খুশবু বলেন, ‘রাতে আমার ভাগ্নি আফিয়া খান ফোন করে আমাকে বলে, খালামনি, আমরা বোধহয় আর বাঁচবো না, আমাদের ভবনে ভাঙচুর-লুটপাট চলছে। আমরা লুকিয়ে আছি। আমাদের পেলে হয়তো মেরে ফেলবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ও ফিসফিসিয়ে কথা বলছিল। ওরা মা-মেয়ে এক জায়গায় লুকিয়ে ছিল, ফলে জোরে কথাও বলতে পারছিল না। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মতো বর্বর হামলা চালানো হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম পরিবারের সবাইকে শেষ করে ফেলা হয়েছে। এখন আল্লাহর কাছে হাজার শোকর, ওদের প্রাণে মারেনি। জীবনটা বেঁচেছে এই আমাদের বড় পাওয়া।’
হামলার পর ভিসির বাসার সামনের দৃশ্য

Sunday, March 6, 2016

দুই শিশু হত্যা: রিমান্ডে একই কথা বলছেন জেসমিন by নুরুজ্জামান লাবু ও রুদ্র মিজান

পুলিশের কাছেও একই কথা বলছেন দুই সন্তানকে হত্যার পর নিজেই স্বীকারোক্তি দেয়া মা মাহফুজা মালেক জেসমিন। তিনি বলছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণেই তাদের হত্যা করেছেন তিনি। বর্ণনাও দিচ্ছেন একই। কিন্তু র‌্যাবের মতো তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরাও এই যুক্তি মেনে নিতে পারছে না। রিমান্ডে নিয়ে নানা কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করছে তারা। জানার চেষ্টা করছে দুই শিশু হত্যার নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না। কিংবা জেসমিনের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে আর কেউ সম্পৃক্ত ছিল কি না।
এদিকে দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন স্বজনরা। তারা মনে করেন, অন্য কেউ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু এতে ফেঁসে গেছেন দুই সন্তানের মা মাহফুজা মালেক জেসমিন। এ ঘটনায় দুই গৃহশিক্ষকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। কিন্তু দুই গৃহশিক্ষক কেন তাদের হত্যা করবে বা তাদের লাভ কী- এ বিষয়ে কোনো উত্তর নেই তাদের কাছে। কিংবা জেসমিন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত না থাকলে কারা হত্যা করলো? শয়নকক্ষে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে জেসমিনও ছিলেন। তার সামনেই যদি  অন্য কেউ হত্যা করে তবে তাদের নাম তিনি বলছেন না কেন? এসব কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি স্বজনরা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। মা নিজেই বারবার স্বীকার করছে সে নিজেই দুই সন্তানকে হত্যা করেছে। হত্যার কারণও বলছে আগের মতোই। এর নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না তা জানার চেষ্টা চলছে।
তদন্ত সূত্র জানায়, গতকাল ছিল জেসমিনের পাঁচ দিনের রিমান্ডের প্রথম দিন। তাকে থানার মহিলা হাজতখানায় রাখা হয়েছে। দুজন নারী পুলিশ সদস্য সর্বদা তার সঙ্গে থাকেন। গতকাল সকালে, দুপুরে ও রাতে তিনি স্বাভাবিকভাবে খাবার খেয়েছেন। রাতে ও দিনের বিভিন্ন সময়ে কৌশলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশের মতিঝিল বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। কিন্তু প্রতিবার জিজ্ঞাসাবাদেই তিনি একই কথা বলছেন। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ নেই বলেও পুলিশ কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন তিনি। সূত্র জানায়, তদন্তের প্রয়োজনে ঘটনার পারিপার্শ্বিকতার বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ কারণে হত্যাকাণ্ডের সময় ওই বাসায় থাকা দুই ভাইবোনের দাদি হাসিনা বেগম, তাদের তিন গৃহশিক্ষক, ঘটনাস্থলে প্রথম উপস্থিত হওয়া খালা আফরোজা মালেক নীলা, দুই শিশুর বাবা আমানের বন্ধু জাহিদ, আজিম ও তাদের গাড়িচালকসহ সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
নিহত দুই শিশুর খালা আফরোজা মালেক নীলা জানিয়েছেন, বোনের ফোন পেয়ে তিনি যখন ওই বাসায় যান তখন বাসার দরজা খোলা ছিল। তিনি শয়নকক্ষে গিয়ে অরণীকে মেঝেতে ও আলভীকে খাটে দেখতে পান। অথচ বন্ধু জাহিদ জানিয়েছেন, তিনি ওই কক্ষে গিয়ে দুজনকেই খাটে দেখেছেন। কিন্তু ঘটনার বিহ্বলতায় তারা ঘুর্ণাক্ষরেও টের পাননি এটি হত্যাকাণ্ড হতে পারে। তাহলে হাসপাতালে নেয়ার আগে তারা পুলিশকে খবর দিতেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টার কারণে অনেক আলামত নষ্ট হয়ে গেছে। দুই শিশুকে বাসা থেকে প্রথমে স্থানীয় আল-রাজী হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেলে নেয়া হয়। এ কারণে দুই শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যায় ব্যবহৃত আঙুলের ছাপ পাওয়া দুষ্কর হয়ে যাবে। তার পরও পুলিশ অন্তত ৮টি নমুন সংগ্রহ করে আদালতের অনুমতি নিয়ে সিআইডির  ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশ সূত্র জানায়, এসব পরীক্ষা শেষ হতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগবে।
এদিকে জেসমিনের বরাত দিয়ে তার চাচাতো ভাই জামালপুরের চর পলিশা জেএল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সোলায়মান সরকার জানান, ঘটনার দিন ২৯শে ফেব্রুয়ারি গৃহশিক্ষক শিউলি অরণীকে পড়াচ্ছিলেন। আরেক গৃহশিক্ষকের আসার কথা সন্ধ্যার পরে। কিন্তু ওই গৃহশিক্ষক বেলা ৩টার পরেই বাসায় গিয়ে উপস্থিত হন। একপর্যায়ে জোহরের নামাজ পড়ার অজুহাতে ভেতরে যান ওই গৃহশিক্ষক। নামাজ পড়ার সময়ে ভেতরের কক্ষে ঘুমিয়েছিলেন জেসমিন। ঘুম থেকে জেগে দুই শিশুর নিস্তেজ দেহ দেখতে পান তিনি। সোলায়মান মনে করেন, এখানে রহস্য রয়েছে। এজন্য ওই দুই মহিলা গৃহশিক্ষককে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত জেসমিন নিজেই র‌্যাবের কাছে যে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তা বিশ্বাসযোগ্য না বলে মনে করেন তিনি। একইভাবে স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল জলিল বলেন, আমানউল্লাহ আমান উদীয়মান ভালো একজন ব্যবসায়ী। আমান-জেসমিন দম্পতির দুই সন্তানও ভালো স্কুলে লেখাপড়া করতো। সেখানে হত্যাকাণ্ডের যে কারণের কথা বলা হয়েছে, তা অবিশ্বাস্য। এছাড়া তাদের পরিবারের কারও মানসিক সমস্যা ছিল বলেও জানা নেই কারও। জামালপুরের ইকবালপুরের শহীদ আবদুল হামিদ সড়কের জেসমিনদের শান্তি নীড় নামক বাড়িতে গেলে কথা হয় জেসমিনের একমাত্র ভাই জাকির হোসনে সরকার বুলবুলের সঙ্গে। বুলবুল জানান, তার বোন জেসমনি ও ভগ্নিপতি আমানের মধ্যে সুন্দর দাম্পত্য সম্পর্ক ছিল। জেসমিনের কোনো মানসিক সমস্যা ছিল না। তবে ২০০০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় তার পিতা আবদুল মালেক সরকারের মৃত্যুর পর থেকে রাতে কম ঘুম হয় তার মায়ের। এছাড়া তেমন কোনো সমস্যা নেই বলে জানান তিনি। জেসমিন তার সন্তানদের হত্যা করতে পারে তা বিশ্বাস করেন না বুলবুল। তিনি মনে করেন, অন্য কেউ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তবে কারা ঘটাতে পারে এ সম্পর্কেও কোনো ধারণা নেই তার।
বুলবুল জানান, প্রথম দিকে জেসমিন ও আমানের মায়েরও মনে হয়েছে একদিন আগে বাসায় আনা চাইনিজ খেয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। জেসমিনের ছোট বোন মিলি যখন ঘটনার পরপর বাসায় যায় তখন আমানের মা তাকে এ কথা বলেন বলে জানান বুলবুল। যে কারণে সন্তানদের ময়নাতদন্তেও অনীহা প্রকাশে করেন জেসমিন।
অর্থ-সম্পত্তি সম্পর্কে আমানের স্বজনরা জানিয়েছেন, আমান-জেসমিনের পরিবার স্বচ্ছল ছিল। কিন্তু জামালপুর সদরে এবং গ্রামের বাড়িতে তেমন কোনো সম্পত্তি নেই তার। কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই কারও। তবে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে, দুই সন্তান নুসরাত আমান অরণি ও আলভী আমান হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার মাহফুজা মালেক জেসমিনের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য প্রকাশের পর তোলপাড় শুরু হয়েছে। গতকাল সকাল থেকেই সাংবাদিক ও স্বজনরা জামালপুরের ইকবালপুরের জেসমিনদের বাড়িতে ভিড় করেন। কিন্তু কারও সঙ্গেই কথা বলতে চাননি পরিবারের সদস্যরা।
প্রসঙ্গত, গত ২৯শে ফেব্রুয়ারি রামপুরা বনশ্রীর বি ব্লকের চার নম্বর সড়কের নয় নম্বর বাড়িতে হত্যা করা হয় অরণী ও আলভীকে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রথমে রেস্টুরেন্টের খাবারের বিষক্রিয়ার কারণের কথা বলা হয় পরিবারের পক্ষ থেকে। তবে ময়নাতদন্ত শেষে ১লা মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস জানান, তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। পরে জামালপুর থেকে দুই শিশুর পিতা আমানুল্লাহ, মা জেসমিন ও খালা আফরোজা মিলাকে আটক করে র‌্যাব। ৩রা মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাব জানায় জেসমনি নিজেই তার দুই সন্তানকে হত্যা করেছে বলে স্বীকার করেছে। নিহত আলভী আমান বনশ্রীর ওই বাসার পাশের হলি ক্রিসেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা বিভাগের নার্সারির ছাত্র। স্কুলের প্রভাতী (গোলাপ) শাখায় পড়তো সে। আলভীর বোন নুসরাত আমান ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

Saturday, March 5, 2016

দুই সন্তানকে হত্যা: জেসমিনের স্বীকারোক্তি বিশ্বাস করেন না পরিবার by নুরুজ্জামান লাবু ও রুদ্র মিজান

রামপুরার বনশ্রীতে দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করলেও মাহফুজা মালেক জেসমিনের স্বীকারোক্তি বিশ্বাস করেন না তার পরিবার। তাকে ফাঁসানো হচ্ছে বলেই মনে করেন তারা। হত্যার কারণ হিসেবে যে বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে তাও মানতে চান না তারা। পরিবারের দাবি, জেসমিনের মধ্যে মানসিক কোনো সমস্যা ছিল না। এমনকি তাদের পরিবারের কারও মধ্যে মানসিক কোনো সমস্যা নেই। প্রেম করে বিয়ে করলেও বেশ সুখেই ছিলেন আমান উল্লাহ আমান ও মাহফুজা মালেক জেসমিন দম্পতি। গতকাল সরজমিন ঢাকায় খালার বাসা ও জামালপুরের ইকবালপুরে গেলে আমান-জেসমিনের পরিবার, প্রতিবেশী ও স্বজনরা জানান এসব তথ্য। এদিকে গতকাল আদালতে সোপর্দ করে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে নিহত দুই সন্তানের মা মাহফুজা মালেক জেসমিনকে।
জামালপুরের ইকবালপুর ঘুরে দেখা যায়, ঘটনার পর র‌্যাবের কাছে জেসমিনের স্বীকারোক্তির বিষয়টি প্রকাশের পর থেকে বাড়ির গেইটটি বন্ধ রয়েছে। দুই শিশুর শোকে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে ওই এলাকার। পাশের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সর্বত্র একই আলোচনা। সবার চোখে মুখে বিস্ময়। এটা কিভাবে সম্ভব? যথেষ্ট রক্ষণশীল ঘরানার, ভদ্র, মার্জিত হিসেবে পরিচিত জেসমিন নিজ হাতে তার দুই সন্তানকে হত্যা করেছে এটা মানতে নারাজ তারা। এই পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়েছেন জেসমিনের পরিবারের সদস্যরা। কারও সঙ্গেই কথা বলতে চান না তারা। প্রতিবেশীরাও ওই বাড়ির ভেতরে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছেন না। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির গেইট খোলা হয় না। গতকাল দিনভর কয়েক দফা চেষ্টা করে ওই বাড়িতে ঢোকার সুযোগ পাওয়া যায়। টিনশেড পাকা ঘরের আঙ্গিনায় এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে জিনিসপত্র। একই অবস্থা ঘরের ভেতরের। ওই বাড়িতে জেসমিনের মা জুলেখা খাতুন, ভাই বুলবুল, তার স্ত্রী ও সন্তান থাকেন। জেসমিন ও তার দুই সন্তান হত্যার বিষয়ে তারা কেউ কোনো কথা বলতে চান না। ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শোনা যায়। কাঁদছিলেন জেসমিনের অসুস্থ বৃদ্ধা মা জুলেখা খাতুন। তিনি বলেন, আমার মেয়ে খুন করতে পারে না। নিজের বাচ্চাকে সে খুন করবে কেন। এগুলো সাজানো নাটক। অন্য কেউ দুই বাচ্চাকে খুন করেছে। জোর করে এখন তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে কারা খুন করতে পারে আমান-জেসমিন দম্পতির সন্তান নুসরাত আমান অরণি ও আলভী আমানকে এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারেননি তিনি।
কথা হয় জেসমিনের চাচাতো ভাই চর পলিশা জেএল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সোলায়মান সরকারের সঙ্গে। তিনি মনে করেন, আমান উল্লাহ আমানের ব্যবসায়িক কোনো শত্রু এটা ঘটাতে পারে। এছাড়া, হত্যাকাণ্ডের আগে ঢাকার বনশ্রীর ওই বাসায় দুই গৃহশিক্ষক ছিল। তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। সোলায়মান সরকার বলেন, জেসমিনের মানসিক কোনো সমস্যা ছিল না। এমনকি আমাদের পরিবারে কারও মানসিক সমস্যা নেই। এমন কী ঘটেছে যে, দুই সন্তানকে হত্যা করবে মা। জেসমিনের দুই বাচ্চা ভালো প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করতো। অর্থনৈতিকভাবেও তাদের কোনো সমস্যা ছিল না। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জেসমিন হতাশায় ভুগবে কেন? তিনি জানান, আমান-জেসমিন দম্পতি সুখি ছিল। আমান-জেসমিন পরস্পর চাচাতো ভাই-বোন। এই দম্পতির চাচাতো ভাই সোলায়মান সরকার জানান, ১৯৭৬ সাল থেকে জামালপুর সদরের ইকবালপুরে বাস করছেন তারা। পাশাপাশি তাদের বাবা-চাচা চারজনের বাসা। তবে আমানের পরিবারের লোকজন থাকতেন গ্রামে। চাচা আবদুল মালেক সরকারের বাসায় থেকে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে লেখাপড়া করতেন আমান। ওই সময় চাচাতো বোন জেসমিনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে আমানের। এ বিষয়ে আমানের বন্ধু রিলেশন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের প্রশাসনিক পরিচালক মাহবুব এ খোদা বলেন, ১৯৯৪ সালের দিকে আমানের সঙ্গে জেসমিনের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। দীর্ঘদিন প্রেম করার পর ২০০২ সালে তাদের বিয়ে হয় পারিবারিকভাবে। বিয়ের পর থেকেই গার্মেন্ট সরঞ্জামের ব্যবসায় যুক্ত হয়ে বেশ ভালো করছিলো আমান। ২০০৯ সালে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। মাহবুব এ খোদা মনি বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো সমস্যা ছিল বলে জানা নেই। তবে নিজ বাচ্চাদের হত্যার যে কারণ প্রকাশ করা হয়েছে তাও বিশ্বাস করেন না তিনি। প্রতিবেশীরা জানান, জেসমিনের কাছে দুই সন্তান ছিল প্রাণের চেয়ে প্রিয়। জেসমিনদের বাসায় অগ্রণী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা কয়েক বছর ভাড়ায় থেকেছেন। তার স্ত্রী জানান, প্রতি বছরের ডিসেম্বর মাসে বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ হলে তাদের নিয়ে জামালপুরের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন আমান-জেসমিন। বাচ্চাদের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল। আলভী আমানকে নিজের কোলে ঘুম পাড়িয়ে তবেই ঘুমাতেন তিনি। কিন্তু এ বছরের ডিসেম্বরে তিনি বাড়িতে আসেননি। কেন আসেননি এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেসমিন ও আমানের চাচাতো ভাই সোলায়মান সরকার জানান, গত ২১শে ডিসেম্বর ঢাকা থেকে জামালপুরের উদ্দেশে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে যাত্রা করেন আমান। ময়মনসিংহ আসার পর হঠাৎ আলভী আমানের শরীরে বেশ ঠাণ্ডা অনুভূত হয়। জেসমিন তখন বিচলিত হয়ে যান। পরে ঢাকায় ফিরে যান তারা। সেই জেসমিন নিজ হাতে তার দুই সন্তানকে হত্যা করবেন? এটা বিশ্বাস হয় না। ২৯শে ফেব্রুয়ারি দুই শিশু হত্যার পর গত ১লা মার্চ আমান-জেসমিন জামালপুরের বাসায় পৌঁছান। আশপাশের লোকজন তখন ভিড় জমান চারপাশে। সেখানে সেদিন উপস্থিত ছিলেন কামরুন নাহার কুয়াশা। প্রতিবেশী এই গৃহবধূ জানান, গাড়ি থেকে নামতেই চিৎকার করে কাঁদছিলেন জেসমিন। তারপর তাকে ধরে বাসার ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছু সময় পরপর মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। প্রতিবেশী ও স্বজনরা জানান, মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তখনও চাইনিজ খাবার খেয়ে বাচ্চা দুটির মৃত্যু হয়েছে বলে জানান জেসমিন। কামরুন নাহার জানান, পরবর্তীতে সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারেন বাচ্চা দুটিকে হত্যা করা হয়েছে। কামরুন নাহার জানান, বাড়িতে এলে অরণি তাদের বাসায় বেড়াতে যেতো। ঐশী নামে তাদের বোনঝির সঙ্গে খেলা করতো। সেই নিষ্পাপ অরণির মুখ আর কোনোদিন দেখা হবে না তা ভাবতেই পারছেন না তারা।
এদিকে আমানউল্লাহ আমানের বড় ভাইয়ের স্ত্রী মেলান্দহ ঝাউগড়ার বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক ফাতেমা বিনতে মনসুর বলেন, আমানদের গ্রামের বাড়ি জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানার উলিয়াবাহার রায়েরপাড়ায়। যমুনার ভাঙনে তা বিলীন প্রায়। যে কারণে ১৯৭৬ সাল থেকেই তাদের বাবা-চাচা চার জনের তিন জনই জামালপুরে বসবাস করছেন। ’৭৬ সালেই জন্ম হয় জেসমিনের। বাবা মৃত আবদুল মালেক সরকার ও মা জুলেখা খাতুনের এক পুত্র  ও তিন কন্যার মধ্যে জেসমিন সবার বড়।
বিশ্বাস করতে পারছে না বোন নীলাও: মাহফুজা মালেক জেসমিন তার নিজের সন্তানকে হত্যা করতে পারে, এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে- তা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না ছোট বোন আফরোজা মালেক নীলাও। বনশ্রীর বড় বোনের বাসার পাশের গলিতেই দুই সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে থাকেন নীলা। গতকাল ওই বাসায় গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। নীলা বলছিলেন, আমার বোনের কথা আমরাও বিশ্বাস করতে পারছি না। এটা কি করে সম্ভব? পাশাপাশি বাসা হওয়ায় আমি প্রায় প্রতিদিনই ওই বাসায় যেতাম। বোন কোনোদিন বলেনি এসব কথা। নীলা বলেন, ঘটনার দিন মাগরিবের নামাজের সময় আমাকে ফোন করে বড় আপা। দুই বাচ্চা অসুস্থ হওয়ার কথা জানায়। আমি দ্রুত গিয়ে একজন বিছানায়, একজন ফ্লোরে পড়ে আছে দেখতে পাই। আমি তাদের ডাকাডাকি করি। কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। পরে বোনকে জিজ্ঞাসা করি কিভাবে এমনটা হলো? সে বলে আমি ঘুম থেকে উঠে এই অবস্থায় দেখি। দুই বাচ্চা বাসি চাইনিজ খাবার খেয়েছিল বলেও জানায় বড় আপা। কিছুক্ষণের মধ্যে জাহিদ ভাই ও হ্যাপী ভাই আসে। পরে আমি আলভীকে ও ওরা অরণিকে ধরে নিচে নামায়। নিয়ে যায় আল-রাজী হাসপাতালে। সঙ্গে আমার বোনও ছিল। সে তখন কান্নাকাটি করছিল। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাই। সেখানে মৃত্যুর খবর পেয়ে আমার বোন মাটিতে গড়াগড়ি করে কাঁদছিল। সেখান থেকে স্বজনরা আমাদের আবার বাসায় নিয়ে আসে। নীলা বলেন, সারারাত আমি ওই বাসায় ছিলাম। এসময় আমার বোন বলেছিল যে ছেলে-মেয়েগুলোকে কাটা ছেঁড়া (ময়নাতদন্ত) করার দরকার নাই। আমার চোখের মণিদের আমি কাটতে দেবো না। কেন এই কথা বলেছিল আমার জানা নেই। সবাই তাকে বোঝায় যে, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীকে ধরতে হলে পোস্টমর্টেম করতেই হবে। পরদিন সকালে আমরা জামালপুর চলে যাই। স্বজনরা বলছিল, অরণি ও আলভীর লাশ মেডিকেল থেকে সোজা জামালপুরে নেয়া হবে। একারণে আমরা এদিক থেকে আগেই জামালপুরে রওনা দেই। নীলা বলেন, আমার বোন হত্যা করতে পারে এটা আমাদের ধারণাতেও ছিল না। আমরা এমনটা চিন্তাও করি নাই। বোনের স্বীকারোক্তি বিষয়ে জানতে চাইলে নীলা বলেন, এখন কেন সে এই কথা বলছে তা বুঝতে পারছি না। এমন সামান্য কারণে নিজ সন্তানদের হত্যা করবে এমনটা ভাবতেই পারছি না। এসময় কান্নায় ভেঙে পড়েন নীলা।
৫ দিনের রিমান্ডে মা: ঢাকার রামপুরায় দুই শিশু খুনের ঘটনায় তাদের বাবার করা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মা মাহফুজা মালেক জেসমিনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুস্তাফিজুর রহমান জেসমিনকে ঢাকার হাকিম আদালতে হাজির করে দশ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। এসময়  আসামি পক্ষের আইনজীবী সাফায়েত আলী জামিনের বিরোধিতা করেন। এসময় তিনি বলেন,  মাহফুজা মালেক জেসমিনের মানসিক চিকিৎসা দরকার। রিমান্ডে নিলে তা হবে না। এসময় এজলাসে উপস্থিত কয়েকজন আইনজীবী সাফায়েত আলীকে শুনানিতে বাধা দেন। তাকে এই মামলা থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান তারা। এই হট্টগোলের মধ্যেই মহানগর হাকিম স্নিগ্ধা রানী চক্রবর্তী জামিন আবেদন নাকচ করে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আদালত সূত্র জানায়, রিমান্ড শুনানির আগে ঢাকার হাকিম আদালতে দুই শিশুর হত্যাকারী হিসেবে স্বীকার করা মা মাহফুজা মালেক জেসমিন চুপচাপ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাকে এসময় ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। ভাবলেশহীন অবস্থায় এক পলকে তাকিয়ে ছিলেন। এজলাসে আনা-নেয়ার সময় সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাবও দেননি তিনি। বিকালে রামপুরা থানার পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর তিনি একটু বমি করেন। কয়েকদিনের ধকলে তিনি অনেকটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
‘আমার সব শেষ হয়ে গেলো’: নিজের দুই সন্তানকে মা হত্যা করেছে এই তথ্য জানতে পেরে পাগলপ্রায় হয়ে গেছেন গার্মেন্ট এক্সেসরিজ ব্যবসায়ী আমানউল্লাহ আমান। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে র‌্যাব হেফাজত থেকে ছেড়ে দেয়ার পর থানায় গিয়ে স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন তিনি। তারপর থেকে নানারকম বিলাপ করছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে মামলা দায়েরের আগে রামপুরা থানার যেই পুলিশ কর্মকর্তা আমানের সঙ্গে ছিলেন, তিনি বলেন, আমান শুধু বলছিল- আমার সব শেষ হয়ে গেলো। আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম। মামলা দায়ের শেষে দুই বন্ধু ও বড় ভাই আবুল ও চাচাত ভাই জাকিরসহ রামপুরায় নিজ বাসায় যান। সেখানে গিয়ে আবারো কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। প্রায় ২০ মিনিট অবস্থান করার পর সেখান থেকে বেড়িয়ে এক বন্ধুর বাসায় যান। অসুস্থ হয়ে পড়ায় মোবাইল ফোন বন্ধ রেখে স্বজনরা তার শুশ্রূষা করছেন। বনশ্রীর ওই বাসার দারোয়ান আব্দুর রশিদ জানায়, আমান বাসায় ঢুকেই চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। ছেলেমেয়েদের পড়ার টেবিল, জামা-কাপড় বুকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করতে থাকেন। পরে বন্ধু ও স্বজনরা তাকে বাসা থেকে বের করে নিয়ে যায়। আমানের বন্ধু অ্যাডভোকেট দীপু জানান, আমান শুধু বলছে তার ঘর ফাঁকা হয়ে গেলো। তার স্ত্রী যে সন্তানদের খুন করতে পারে প্রথমে সে বিশ্বাসই করতে পারেনি। কিন্তু স্ত্রীর নিজমুখে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ ও কারণ শুনে নিজেই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন।
পুলিশের কাছেও একই কথা বলছে জেসমিন: সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে তাদের হত্যা করেছে বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করছে মাহফুজা মালেক জেসমিন। বৃহস্পতিবার র‌্যাবের কাছ থেকে তাকে হস্তান্তর করা হয় রামপুরা থানার কাছে। রাতেই বাবা আমান বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলার এজাহারে আমান বলেছেন, দুই সন্তানকে হত্যার পর জেসমিন নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করে মর্মে আমার সামনে র‌্যাবের নিকট প্রকাশ করে। এজাহারে আমান বলেন, ঘটনার দিন বিকাল আনুমানিক সোয়া ৫টার দিকে গৃহ শিক্ষিকারা বাসা থেকে চলে যাওয়ার পর মেয়ে অরণি ভেতর থেকে মূল দরজা বন্ধ করে দেয়। পরে তার স্ত্রী জেসমিনের সঙ্গে খাটে গিয়ে শুয়ে পড়ে। জেসমিন ছেলেমেয়ের স্কুলের পড়ালেখার রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় মানসিক টেনশন করে। টেনশন নিয়ে তার মাথায় যন্ত্রণা হয়। সে আরও প্রকাশ করে, ছেলেমেয়ে না থাকলে টেনশন হতো না। এই যন্ত্রণার কারণে ছেলেমেয়েকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, র‌্যাব তাদের কাছে হস্তান্তরের পর তারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। কিন্তু একই কথা বলছে জেসমিন। তাকে রিমান্ডে আনা হয়েছে। এখন সময় নিয়ে তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

Tuesday, March 1, 2016

প্রথম দেখাতেই পিটার টার্গেট করে মেরিনাকে by নুরুজ্জামান লাবু

এটিএম জালিয়াতির পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকায় এসেছিল পোলিশ নাগরিক পিটার। লন্ডন প্রবাসী নাবির ছিল তার পথপ্রদর্শক। নাবিরের সঙ্গেই গুলশানের হোটেল হলিডে প্লানেটে উঠে পিটার। সেখানেই পিটারের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় মেরিনার মেরিনা তখন হলিডে প্লানেট হোটেলের অভ্যর্থনাকারী হিসেবে কর্মরত। প্রতিদিন টুকটাক কথা বলতে বলতেই দু’জনেই একে অপরের প্রেমে পড়ে যায়। পিটারের উদ্দেশ্য ছিল মেরিনাকে বিয়ে করতে পারলে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে আপাতত এদেশেই স্থায়ী আবাস গড়া। আর মেরিনার উদ্দেশ্য ছিল ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও ইউরোপিয়ান নাগরিক পিটারকে প্রেমের জালে আটকাতে পারলে একদিকে যেমন অর্থকষ্ট দূর হবে, অন্যদিকে ইউরোপেও পাড়ি জমানো যাবে। ধীরে ধীরে দুজনেই জড়িয়ে পড়ে প্রেমে, তারপর একসঙ্গে থাকা।
সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড জালিয়াতি চক্রের হোতা পিটারের স্ত্রী হিসেবে মেরিনা এখন আলোচনার তুঙ্গে। তবে মেরিনাই তার আসল নাম কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। রোজিনা ওরফে রোমানা নামেও অনেকেই চেনেন তাকে। গুলশানের হোটেল হলিডে প্লানেটে জমা থাকা পাসপোর্টে রোজিনার নাম উল্লেখ রয়েছে। কেরানীগঞ্জে মায়ের সঙ্গেই থাকতেন তিনি। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা মেরিনা ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ-ইউডা থেকে পড়াশুনা করেছেন। পড়াশুনা শেষ না হতেই পার্টটাইম চাকরি করেছেন একটি ট্র্যাভেল এজেন্সিতে। পারিবারিকভাবে বিয়েও হয় এক যুবকের সঙ্গে। কিন্তু কিছুটা বেপরোয়া জীবনযাপন করতেন মেরিনা। এ কারণে এক কন্যা সন্তানের মা হলেও বিচ্ছেদ হয়ে যায় স্বামীর সঙ্গে। তারপর থেকে মায়ের সঙ্গেই থাকতেন তিনি। ট্রাভেল এজেন্সি ছেড়ে যোগ দেন হোটেল হলিডে প্লানেটের অভ্যর্থনাকারী হিসেবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ১৩ই ডিসেম্বর ঢাকায় এসে হোটেল হলিডে প্লানেটে উঠে আন্তর্জাতিক ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি চক্রের অন্যতম হোতা পিটার। নিজেকে পরিচয় দেয় ব্যবসায়ী হিসেবে। সেখানেই অভ্যর্থনাকারী হিসেবে কর্মরত রোজিনা ওরফে রোমানা ওরফে মেরিনার সঙ্গে পরিচয় হয় তার। কয়েক মাসের মধ্যেই জড়িয়ে পড়ে প্রেমের সম্পর্কে। জালিয়াতির টাকায় পিটার দু’হাতে খরচ করতো। এসব দেখে সত্যি ব্যবসায়ী এবং অঢেল টাকার মালিক হিসেবে পিটারকে প্রেমের জালে আটকাতে চান মেরিনা। পিটারও ঢাকায় একজন ‘পার্টনার’ খুঁজছিলো। রোজিনা ওরফে মেরিনার সঙ্গে লং ড্রাইভে যেতো নিয়মিত। রোজিনা ওরফে মেরিনাও কাজ শেষে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে ও বারে পার্টিতে যেতো পিটারের সঙ্গে। ঢাকায় আসার চার মাসের মাথায় পিটারের সঙ্গে থাকা শুরু করেন রোজিনা ওরফে মেরিনা। মাস তিনেক হলিডে প্লানেটের পাঁচ তলার ৫০৫ নম্বর স্যুটে থাকতেন। ওই কক্ষের প্রতি দিনের ভাড়া ছিল ৪ হাজার টাকা করে। প্রায় মাস তিনেক তারা ওই কক্ষেই থেকেছেন। হলিডে প্লানেট হোটেলের এক কর্মকর্তা জানান, পিটার ও মেরিনা তাদের জানিয়েছিল তারা বিয়ে করেছে। তারপরও হোটেলে একসঙ্গে দিনের পর দিন থাকাটা অশোভনীয় মনে হওয়ায় তাদের হোটেল ছেড়ে কোনো বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে বলা হয়। গত অক্টোবর মাসে তারা হোটেল ছেড়ে গুলশানের ২ নম্বর এভিনিউর ১১২ নম্বর সড়কের ১২ নম্বর প্লটের একটি বাসা ভাড়া নেয়। প্রায় দেড় লাখ টাকা ভাড়া দিয়ে আলিশান ওই বাসায় থাকতো পিটার ও রোজিনা ওরফে রোমানা। গতকাল ওই বাসায় গিয়ে পিটারের বাসাটি তালাবদ্ধ দেখা যায়। ওই ভবনের বাসিন্দারা কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
সূত্র জানায়, একসঙ্গে থাকার সময়ই গর্ভধারণ করেন রোজিনা ওরফে রোমানা। সন্তানের বিষয়টি প্রথমে জানতো না পিটার। পরে সন্তান সম্ভবা হওয়ার কারণে তারা নিজেরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ওই বাসায় ওঠে। চলতি মাসের প্রথমদিকেই সন্তান প্রসব করেন রোজিনা ওরফে মেরিনা। গুলশানের একটি হাসপাতালে সন্তান প্রসব হয় তার। ছেলে সন্তানের নাম রাখেন আলেকজান্ডার ওরফে অ্যালেক্স। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পিটার জানিয়েছে, তারা কেউ ধর্মান্তরিত হয়নি। পিটার শুধু স্ত্রীর নাম পরিবর্তন করে রোজিনার জায়গায় মেরিনা করে দিয়েছিলো। ডাকতো মেরি বলে। সূত্র জানায়, রোজিনা ওরফে মেরিনার লিভটুগেদার ও পিটারের সঙ্গে বিয়ের সবকিছুই জানতো তার পরিবার। কিন্তু বিপুল অর্থের মোহে তারা বিষয়টি মেনে নিয়েছিলো সহজেই। জালিয়াতি করে আয় করা পিটারের বিপুল পরিমাণ অর্থ রোজিনা ওরফে মেরিনা তার মায়ের বাসায় দিয়েছেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পিটার জানিয়েছে, কার্ড জালিয়াতির ঘটনা গণমাধ্যমে আসার পরপরই তার দুই বন্ধু বুলগেরিয়ান রোমিও ও ইউক্রেনিয়ান অ্যান্ডারসন ওরফে অ্যান্ডি দেশ ছেড়ে চলে যায়। পিটারও চলে যেতে চেয়েছিলো। কিন্তু নিজের নবজাতক সন্তানকে ফেলে যেতে মন চায়নি তার। আর তার পাসপোর্টের ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে গিয়েছিল। ভিসা বাড়ানোর আবেদন করেছিলো, কিন্তু সেই কাগজপত্র হাতে পায়নি বিধায়  সে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতেই গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়তে হয়েছে তাকে। পিটার বলেছে, তার জালিয়াতির সঙ্গে তার স্ত্রীর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সে জানতোও না এসব কথা। তবে গোয়েন্দারা রোজিনা ওরফে মেরিনাকে নজরদারির মধ্যে রেখেছে। সদ্য সন্তান প্রসব করায় তাকে গোয়েন্দা হেফাজতে নেয়া হয়নি। কিন্তু তাকে কয়েকদফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে রোজিনা ওরফে মেরিনা এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, পিটারের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তারা খুঁজে পাননি। তার স্ত্রীর কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কিনা তা খোঁজ করে দেখা হচ্ছে। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে রোজিনা ওরফে মেরিনা সাংবাদিক পরিচয় শুনেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে আরও কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে আর পাওয়া যায়নি।
এদিকে এটিএম বুথ থেকে টাকা জালিয়াতির ঘটনায় থমাস পিটারসহ তিন ব্যাংক কর্মকর্তার প্রথম দফার ছয় দিনের রিমান্ড শেষ হয়েছে গতকাল। আজ তাদের আদালতে সোপর্দ করে আবারও রিমান্ডের আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পিটারের সহযোগীদের নাম-ঠিকানা যাচাই বাছাই করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে পিটারের এই কাজে যারা সহযোগিতা করেছে তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারেরও চেষ্টা চলছে। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, পিটারের কাছ থেকে আরও তথ্য জানার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে পিটারের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য যাচাই বাছাইয়ের কাজ চলছে।
উল্লেখ্য, গত ৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর বনানী ও মিরপুর এলাকার বিভিন্ন বুথ থেকে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের টাকা খোয়া যায়। গ্রাহকের কাছে ডেবিট কার্ড ও পাসওয়ার্ড গচ্ছিত থাকলেও তাদের মোবাইল ম্যাসেজে টাকা উত্তোলন হওয়ার নোটিফিকেশন আসে। বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা নিজ নিজ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানালে বিষয়টি সবার নজরে আসে। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পায়। এর প্রেক্ষিতে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল)-এর পক্ষ থেকে বনানী থানায় তথ্য-প্রযুক্তি আইন ও পেনালকোডের ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়া, সিটি ব্যাংকের পক্ষ থেকেও পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুটো মামলাই তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ- ডিবি। গত ২২শে ফেব্রুয়ারি পুলিশ গুলশান এলাকার বাসা থেকে থমাস পিটার ও সিটি ব্যাংকের তিন কর্মকর্তা মকসেদ আলী ওরফে মাকসুদ, রেজাউল করিম ওরফে শাহীন ও রেফাজ আহমেদ ওরফে রনিকে গ্রেপ্তার করে।

Wednesday, December 23, 2015

জঙ্গিবাদ- বাংলাদেশ কতটা নিরাপদ? by নুরুজ্জামান লাবু

দেশে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে জঙ্গিবাদ। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলো শুরু করেছে তাদের গোপন সাংগঠনিক কার্যক্রম। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কর্মী সংগ্রহ করছে তারা। বিভিন্ন উপায়ে সমৃদ্ধ করছে অর্থ-তহবিলও। গত কয়েক মাসে জঙ্গিরা একাধিক হামলায় নিজেদের অস্তিত্ব নতুন করে জানান দিয়েছে। চলতি বছরেই অন্তত ৫ জন ব্লগার, লেখক-প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে। হামলা চলছে ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপরও। রাজধানী ঢাকায় শিয়াদের তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। বগুড়ায় শিয়া মসজিদে বোমা হামলা হয়েছে। রাজধানীর গাবতলী ও আশুলিয়ায় পুলিশের চেকপোস্টে হামলা চালিয়ে দুই পুলিশ হত্যা করা হয়েছে। বেশির ভাগ ঘটনাতেই পাওয়া গেছে জঙ্গি সম্পৃক্ততা। ঢাকার গুলশানে ইতালিয়ান নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত জঙ্গি সম্পৃক্ততার কথা না বললেও রংপুরের জাপানি নাগরিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জঙ্গিরা সম্পৃক্ত বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া পাবনায় গির্জার যাজকের ওপর হামলায় জঙ্গিরা জড়িত বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। জঙ্গি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে দিনাজপুরের ইসক্‌ন মন্দিরে হামলার ঘটনাতেও। এ ছাড়া একের পর এক হামলা ও হুমকি দেয়ার ঘটনা ঘটেই চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েক মাসে অন্তত ১০টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। সবগুলো ঘটনার সঙ্গে জঙ্গি সম্পৃক্ততা পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব হামলার বেশ কয়েকটির দায় স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। এমনকি তাদের প্রকাশনা ‘দাবিক’ বাংলাদেশে কার্যক্রম এসব নিয়ে বিশেষ ‘আর্টিকেল’ও ছাপা হয়েছে।
জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো প্রধানত আল-কায়েদার অনুসারী ছিল; কিন্তু আল-কায়েদার প্রভাব কমে যাওয়া এবং আইএসের তৎ?পরতা দৃশ্যমান হওয়ায় এখানকার জঙ্গিরা আইএসমুখী হওয়ার চেষ্টা করছে।’ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, সিরিয়া এবং ইরাকে আইএসের তৎ?পরতা এখানকার জঙ্গিদের উদ্বুদ্ধ করছে। এখন ‘লিডার লেস’ জিহাদ শুরু হয়েছে। ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে জঙ্গি কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে।’ তিনি বলেন, ‘শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মাধ্যমে জঙ্গিবাদ নিরসন সম্ভব নয়। সামাজিকভাবে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ করতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বাড়াতে হবে।’ পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশে শুধু জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করবে এমন কোনো ইউনিট নেই। বহুদিন ধরে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কথা বলা হলেও তা হয়নি। যার ফলে জঙ্গিবাদ নির্মূল করা যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট হলে সেখানে যারা থাকবে তারা মাসের পর মাস শুধু জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করবে এবং জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভের কারণগুলোও অনুসন্ধান করবে। এতে কিছু সফল পাওয়া যাবে বলেও মনে করেন তিনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে জঙ্গিদের তৎ?পরতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে জঙ্গিবাদের নতুন ছক গড়ে ওঠায় বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ছে। ইসলামিক স্টেট বা আইএসের সঙ্গে এখানকার জঙ্গিরা নতুনভাবে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। আগে আল-কায়েদার অনুসারী ছিল জঙ্গিরা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের জঙ্গিদের সঙ্গেও বাংলাদেশের জঙ্গিদের সম্পর্ক অনেক পাকাপোক্ত। গত বছরের শেষদিকে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের খাগড়াগড়ে এক বিস্ফোরণের পর বাংলাদেশের জেএমবির অনেক সদস্য পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পালিয়ে থেকে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানা যায়। এ ঘটনার পর কয়েক দফা ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনআইএ) কর্মকর্তারা বাংলাদেশে এসে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে জঙ্গিদের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্যবিনিময় করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশি জঙ্গিদের ভারতীয় জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এখন অস্বীকার করা হলেও এর আগে অন্তত ১৪ জঙ্গি ধরা পড়েছে, যারা কোনো না কোনোভাবে আইএসের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। তারা বিভিন্ন উপায়ে সিরিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছিল। এ ছাড়া কয়েকজন এরই মধ্যে আইএসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলেও গোয়েন্দা তথ্য বলছে। এমনকি কয়েকজনকে তুরস্ক বা সিরিয়া থেকে ফেরত আনা হয়েছে। মাস ছয়েক আগে ঢাকায় সামিউন ওরফে ইবনে হামদান নামে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক বৃটিশ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। যে আইএসের জন্য জিহাদি রিক্রুট করতে বাংলাদেশে এসেছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ থেকে ১০০ জিহাদি সিরিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল তার। এর আগে আসিফ আদনান ও ফজলে এলাহী তানজিল নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়, যারা ‘জিহাদে’ অংশ নিতে তুরস্ক ও সিরিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে মূলত ৯০ দশকের শুরুতে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেয়া বেশ কয়েকজন ব্যক্তির হাত ধরে জঙ্গি তৎপরতা শুরু হয়। এরাই পরে হরকাতুল জিহাদ অব বাংলাদেশ (হুজিবি) নামে জঙ্গি তৎপরতা শুরু করে। এরপর হুজির নেতারাই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে জঙ্গি তৎপরতা শুরু করে। ১৯৯৯ সালে যশোরের উদীচীর সমাবেশে বোমা হামলা হয়। ওই ঘটনাটিই মূলত জঙ্গি হামলার প্রথম ঘটনা বলে বিবেচিত হয়। যদিও রাজনৈতিক টানাপড়েনে এ মামলার তদন্ত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিকে মোড় ঘুরে গেছে। এরপর ২০০১ সালের ১৪ই এপ্রিল রমনার বটমূলে বোমা হামলার ঘটনা ঘটিয়ে হুজি জঙ্গি তৎপরতার জানান দেয়। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে একাধিক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশেও গ্রেনেড হামলা করা হয়। ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্ট একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা হামলা চালিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয় জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এর পরেও সারা দেশে একের পর এক আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ, সরকারি, বেসরকারি কর্মকর্তাসহ অন্তত ৩৩ জন জনকে হত্যা করে জেএমবি। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশে অর্ধশত জঙ্গি গ্রুপ নানাভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে হিযবুত তাহ্‌রীর, শাহাদাত-ই-আল হিকমা, জামা’আতে মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি) ও জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি)- এ পাঁচটি সংগঠনকে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত থাকায় নিষিদ্ধ করেছে সরকার। সর্বশেষ আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) নামে একটি জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
নিরাপত্তা-বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন বলছিলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ যেভাবে বিস্তৃতি লাভ করছে তা ভবিষ্যতের জন্য খুবই ‘অ্যালার্মিং’। এক কথায় বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের উর্বর-ভূমিতে পরিণত হচ্ছে। জঙ্গিবাদ বিস্তৃত হওয়ার বিষয়টি সার্বিকভাবে উদ্যোগ নিয়ে এখনই থামাতে হবে।’ তিনি বলেন, মাঝখানে কিছুদিন জঙ্গিবাদ একটু কমে এসেছিল। এখন আবার তারা রি-অর্গানাইজড হয়ে মাঠে নেমেছে। নতুন নতুন রিক্রুট হচ্ছে, নতুন কৌশল নিয়ে কাজ করছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেলে জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করছে। এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জঙ্গিরা এখন ‘রিফরমেটিভ’ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে। অর্থাৎ নতুন করে ছোট ছোট ঘটনা ঘটিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। ভবিষ্যতে যে তারা বড় ঘটনা ঘটাবে না তা বলা যাবে না।
নিরাপত্তা বিষয়ে খোঁজখবর রাখা এ বিশ্লেষক বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে জঙ্গিবাদ ঠেকানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐক্য। রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে সন্ত্রাসবাদের উদ্ভব হয়। সেজন্য রাজনৈতিক ঐক্য জরুরি। একই সঙ্গে ইন্টেলেকচুয়াল ব্যক্তিবর্গ ও সিভিল সোসাইটিকে এক করে লংটার্ম পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে শুধু তাৎক্ষণিক ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু গোপনে গোপনে জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করবেই। এম সাখাওয়াত মনে করেন, এখন মাদরাসার ছাত্রদের চেয়ে অনেক উচ্চশিক্ষিত আধুনিক তরুণ জঙ্গিবাদে ঝুঁকে পড়ছে। টেকনোলজি জানা তরুণরা জঙ্গিবাদে ঝুঁকে পড়ছে। কেন তারা জঙ্গিবাদে ঝুঁকছে তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে এবং কারণগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। তবেই জঙ্গিবাদ ঠেকানো যাবে।

Saturday, December 19, 2015

‘মাসুদ গলায় দড়ি প্যাঁচিয়ে ধরে আমরা দুজন টান দেই’ by নুরুজ্জামান লাবু

‘আমি ঘুমাইয়্যা ছিলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়। দেখি অচেনা রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাইতেছে। আমি মাসুদরে বলি, এইটা কোন রাস্তা। মাসুদ বলে, আমি চিনি। একটু পর মাসুদ গাড়ি থামাইতে কয়। গাড়ি থামা মাত্রই পেছন থিকা ড্রাইভারের গলায় প্লাস্টিকের একটা দড়ি প্যাঁচাইয়া ধরে। আমি আর মোফাজ্জল সেই রশি ধইরা টান দেই। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ড্রাইভার নীরব হইয়া যায়। পরে তারে রাস্তার পাশে একটা বাঁশঝাড়ে ফেইলা দেই।’ এভাবেই নৃশংস এক খুনের আদ্যোপান্তর বর্ণনা দেয় ১৯ বছরের তরুণ আজহার। তিন বন্ধু আজহার, মোফাজ্জল ও মাসুদ মিলে খুন করে জাহাঙ্গীর নামে প্রাইভেটকার চালককে। যিনি ওই প্রাইভেটকারের মালিকও। ঢাকার ডেমরা থেকে ভাড়ায় নেত্রকোনা নিয়ে যাওয়ার নামে তাকে হত্যা করা হয়। পরে গাড়িটি ছিনিয়ে নিয়ে যায় এই তিন দুর্বৃত্ত। এদের মধ্যে আজহার ও মোফাজ্জলকে নেত্রকোনা থেকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ- ডিবি। কিন্তু মাসুদ পালিয়ে গেছে। মাসুদকে ধরতে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন ডিবির কর্মকর্তারা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে এই প্রতিবেদকের কথা হয় গ্রেপ্তারকৃত দুই খুনির সঙ্গে। তাদের দাবি অনুযায়ী, গত ৩০শে নভেম্বর ঢাকায় আসে এই তিন বন্ধু। পরে যায় নারায়ণগঞ্জের তারাবতে। সেখানে তিন জন একটি গার্মেন্ট কারখানায় কাজ নেয়। কিন্তু গার্মেন্ট কর্তৃপক্ষ আজহার ও মোফাজ্জলকে মাসে ৪ হাজার টাকা বেতন দিতে চায়। কাজের পূর্বাভিজ্ঞতা থাকায় মাসুদের বেতন একটু বেশি দিতে চেয়েছিল। ১লা ডিসেম্বর কাজও করে তারা। কিন্তু ৪ হাজার টাকায় পোষাবে না বলে কাজ ছেড়ে দেয় তিন জনই। গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার কমলাকান্দায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পকেটে গাড়ি ভাড়া নেই। তিন জন মিলে বুদ্ধি আঁটে প্রাইভেটকার ভাড়া করে গ্রামে যাবে। এলাকায় গিয়ে প্রাইভেটকারের ভাড়া না দিয়েই পালিয়ে যাবে। এই উদ্দেশ্যে ভাড়ায় চলা প্রাইভেটকার খুঁজতে থাকে এই তিন জন। এক সিএনজি চালকের মাধ্যমে জাহাঙ্গীর নামে এক প্রাইভেটাকারচালকের খোঁজ পায় তারা। তাকে ফোন দিয়ে বিভিন্ন রকম মিথ্যা কথা বলে। বলে- বাসায় অসুস্থ স্বজন। দ্রুত তাদের দেখতে যেতে হবে। তাদের পকেটে টাকা নেই। কিন্তু ভাড়া যা হয় সব বাড়িতে গিয়ে দিয়ে দিবে। রাজধানীর বাসাবো কদমতলার বাসিন্দা প্রাইভেটকারের মালিক ও চালক জাহাঙ্গীরের মন গলে যায় তাদের কথায়। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে ডেমরা থেকে তাদের গাড়িতে তুলে নেন জাহাঙ্গীর। তারপর শুরু হয় নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে যাত্রা।
তিন কিলারের একজন আজহার জানায়, সে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছিল। পেছনের সিটে বসেছিল মাসুদ ও মোফাজ্জল। নেত্রকোনার কমলাকান্দা থানাধীন গোড়গাঁও এলাকায় তাদের বাড়ি। বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে তারা প্রাইভেটকার থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাবে- এরকমই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত। কিন্তু গাড়িতে ঘুমিয়ে যায় আজহার। ঘুম থেকে উঠে দেখে তারা কমলাকান্দার রাস্তায় না গিয়ে পূর্বধলার হুগলা এলাকার দিকে যাচ্ছে। আজহার এ নিয়ে প্রশ্ন করলে মাসুদ জানায় এটা শর্ট রাস্তা। প্রাইভেটকারটি পাকা রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোয়। এরপর কাঁচারাস্তায় যায় আরও কিছুদূর। তখন ভোর হয়ে আসছিল। হঠাৎ মাসুদ প্রাইভেটকার  চালককে গাড়ি থামাতে বলে। বলে- এসে গেছি। গাড়ি থামা মাত্রই পেছন থেকে লুকিয়ে রাখা প্লাস্টিকের দড়ি দিয়ে ড্রাইভারের গলায় প্যাঁচিয়ে ধরে মাসুদ। মাসুদের কথায় আজহার ও মোফাজ্জলও সেই দড়ি ধরে টান দেয়। চেপে ধরে গলা। মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে চালক জাহাঙ্গীর। তারপর তিন জন মিলে জাহাঙ্গীরের লাশ টেনে পাশের বাঁশঝাড়ে নিয়ে ফেলে দেয়।
আজাহার জানায়, দুই মাস আগে সে গাড়ি চালানো শিখেছিল। তাই নিজেই সেই গাড়িটি চালিয়ে পাশের জাড়িয়া বাজারে যায়। বাজারের পাশের একটি মাঠে গাড়িটি লক করে রাখে। হাতে কোন টাকা না থাকায় তারা শাহীন নামে পরিচিত এক বড় ভাইকে ফোন করে। পরে তার কাছ থেকে দেড় শ’ টাকা নিয়ে তিন জনই নিজ নিজ বাড়িতে চলে যায়। আরেক কিলার মোফাজ্জল দাবি করে, প্রাইভেটকার ছিনিয়ে নেয়া কিংবা হত্যাকাণ্ডের কোন পরিকল্পনা ছিল না তাদের। তারা শুধু টাকা না থাকায় প্রাইভেটকার থেকে দৌড়ে নেমে যেতে চেয়েছিল। সকল পরিকল্পনা ছিল মাসুদের। মাসুদই সবকিছু করেছে। আজহার ও মোফাজ্জল জানায়, মাসুদ অনেকদিন গাজীপুরের মাওনায় ছিল। মাসুদের পরামর্শেই তারা ঢাকায় এসেছিল। সে হয়তো গাড়ি ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতও থাকতে পারে। তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, দুই খুনি সব দোষ মাসুদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করছে। টাকা না থাকায় শুধু পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য থাকলে চালককে খুন করতো না। এমনিতেই গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে পালাতে পারতো। আবার খুনের পর গাড়িটিও নিজেরা নিয়ে যেত না। গ্রেপ্তারকৃতরা আসলে সংঘবদ্ধ গাড়ি ছিনতাই চক্রের সদস্য। পরিকল্পনা করে গাড়ি ভাড়া নিয়ে চালককে হত্যা করে গাড়িটি ছিনতাই করেছে তারা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) ইকবাল হোছাইন জানান, সবুজবাগ থানার একটি মামলার সূত্র ধরে এই দুই কিলারকে তারা নেত্রকোনা থেকে গ্রেপ্তার করেছে। পূর্বধলা থানার জাড়িয়া বাজার থেকে চালককে হত্যার পর ছিনিয়ে নেয়া প্রাইভেটকারটিও উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা বড় কোন গাড়ি চুরি দলের সদস্য কিনা তা খতিয়ে দেখতে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলেও জানান তিনি। গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, শনিবার এই দু’জনকে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ড চাওয়া হবে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত ২রা ডিসেম্বর রাতে জাহাঙ্গীর নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে যাওয়ার পর ভোর থেকে তার মোবাইল নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর জাহাঙ্গীরের স্ত্রী শিখা আক্তার বিষয়টি জানিয়ে রাজধানীর সবুজবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি দায়ের করেন। পরে বিষয়টি আমলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিম অনুসন্ধান শুরু করে। পরে প্রযুক্তির সহযোগিতায় যারা গাড়িটি ভাড়া নিয়েছিল তাদের অবস্থান শনাক্ত করে গতকাল তিন জনের মধ্যে দুজনকে আটক করে। নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী শিখা আক্তার জানান, মাস দুয়েক আগে তার স্বামী আড়াই লাখ টাকা দিয়ে প্রাইভেটকারটি কেনে। আরও  লাখ খানেক টাকা খরচ করে সেটি ঠিকঠাক করে ভাড়ায় চালানো শুরু করে। এর আগে তার স্বামী সিএনজি চালাতো। শিখা আক্তার জানান, কয়েক মাস আগে তাদের সিএনজিটি ছিনতাই হয়েছিল। পরে ছিনতাইকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে সেটি ফেরত এনেছিল। এরপর সিএনজি বিক্রি করে প্রাইভেটকারটি কেনে। শিখা জানান, তার স্বামী খুব সহজ-সরল ছিল। রাতে সাধারণত ঢাকার বাইরে কোথাও গাড়ি নিয়ে যেত না। কিন্তু সেদিন তারা এত অনুনয়-বিনয় করে যে সে উপকার করতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়ে দিল। শিখা জানান, তাদের জোনায়েদ নামে ছয় বছরের একটি সন্তান রয়েছে। তাদের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর পলাশ থানার ডাঙ্গায়। বাসাবোর কদমতলার ৬৯/৪/সি/৩ নম্বর বাসায় স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন।