Wednesday, November 20, 2013

নারী আন্দোলন ও সুফিয়া কামাল

সুফিয়া কামাল
সুফিয়া কামাল (১৯১১-১৯৯৯) অধ্যয়ন করলে শত বছরের নারী আন্দোলনের ইতিহাস উন্মোচিত হয়। নারীর অধিকার অর্জনের আন্দোলন সামগ্রিকভাবে পরিচালিত হয় পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের নানাবিধ বৈষম্য-অসাম্যের বিরুদ্ধে। তুলনামূলকভাবে নারীর ওপর এই বৈষম্য-অসাম্য চলে আসছে বেশি হারে। যুগ যুগ ধরে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় নারীকে অধস্তনতায় ফেলে দেওয়া হয়েছে, ইতিহাসে নারীর অবদান উপেক্ষিত হয়েছে, নারীর মানবাধিকার স্বীকৃতি পায়নি, অর্জিত হয়নি। নারী সংগঠন, আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে, নেতৃত্ব দিয়ে ৭২ বছর সুফিয়া কামাল উল্লিখিত দর্শন-চেতনা ও আদর্শ বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করেছেন। বরিশালের শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারের অবরোধবাসিনী হয়েও তিনি দেশের ও পরিবারের স্বদেশি পরিমণ্ডলের অনুপ্রেরণায় প্রভাবিত হয়েছেন, সে সময়ের নারী আন্দোলনের কাজে যুক্ত হয়েছিলেন।
১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সাপ্তাহিক বেগম প্রকাশ করেন সুফিয়া কামালকে প্রধান সম্পাদিকা ও নূরজাহান বেগমকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদিকার দায়িত্ব দিয়ে। সে বছরেরই আগস্ট মাসে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত স্বাধীন দেশ পাওয়ার আনন্দ পরিণত হলো নিরানন্দে। দেশ ভাগ হয়ে গেল হিন্দু-মুসলিম ধর্মভিত্তিতে। কলকাতার কর্মস্থল, নারী আন্দোলনের কর্মকাণ্ড ত্যাগ করে সুফিয়া কামালকে ঢাকায় চলে আসতে হলো সপরিবারে। তারপর ঢাকায় স্থায়ীভাবে বাস করতে এসে তিনি একেবারেই নতুন রাজনৈতিক ও বিপ্লবী ধারার নারী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল-ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক চেতনায় বিশ্বাসী বিপ্লবী ধারার নারীনেত্রী ও সংগঠকেরা তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানের নারী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আকুল আহ্বান জানাতে থাকলেন। পূর্ব পাকিস্তানে লীগ সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দমননীতির প্রতিবাদে জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো গুটি কয়েক নারীনেত্রীর মধ্যে সুফিয়া কামাল ছিলেন সর্বজন-সমর্থিত। সমাজতান্ত্রিক আদর্শের শ্রেণী-শোষণহীন সমাজব্যবস্থার প্রতি সুফিয়া কামালের কুণ্ঠাহীন একাত্মতাবোধ তাঁকে দ্ব্যর্থহীনভাবে যুক্ত করেছে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের উদ্যোগে পরিচালিত মহিলা সমিতির সভানেত্রীর দায়িত্ব পালনে। নিবেদিতা নাগ, যুঁইফুল রায় ও অন্যান্য কমিউনিস্ট নারীর আহ্বানে ‘পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি’র সভানেত্রী হন ১৯৪৮ সালে। তার পরপরই লীলা নাগের প্রচেষ্টায় সুফিয়া কামালকে সভানেত্রী ও লায়লা সামাদকে সাধারণ সম্পাদক করে প্রতিষ্ঠিত হয় ওয়ারী মহিলা সমিতি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময়কালে জাতীয় সকল সংকটে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক বিবেকের মতো দায়িত্ব পালন করেছেন সুফিয়া কামাল।
সামরিক শাসনের গণবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে, রাজবন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে, রবীন্দ্রশতবর্ষ উদ্যাপনের দাবিতে, দাঙ্গা প্রতিরোধে সুফিয়া কামাল সামাজিক গণমানুষের সর্বাধিনায়কের ভূমিকায় একাধারে ছায়ানট, কচি-কাঁচার মেলা, পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সংসদ প্রতিষ্ঠা ও নারী আন্দোলনের মহিলা সংগ্রাম পরিষদ পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। জাতীয় স্বাধিকার আন্দোলনের মূলধারায় নারী আন্দোলনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন সুফিয়া কামাল। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, জরুরি আইন প্রত্যাহার, দমননীতি বন্ধ, রাজবন্দীর মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে দেশব্যাপী চলতে থাকা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি নারীসমাজের বৃহত্তর আন্দোলন অব্যাহত ধারায় সক্রিয় ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকাসহ সব জেলা শহরে নারীসমাজ সভা-সমিতিতে সংগঠিত হয়ে, মিছিল-স্লোগানে, প্রতিবাদ-প্রতিরোধে সোচ্চার হয়ে আন্দোলন সংঘটিত করতে থাকেন। ১৯৬৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি নারীসমাজের বিরাট মিছিল ঢাকার রাজপথ প্রকম্পিত করে ছাত্রনেতা আসাদ হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। এই নারী আন্দোলন দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কার্যকর প্রভাব রেখেছিল। এই সময়ের নারী আন্দোলন রাজনৈতিক গণতন্ত্রের দাবিতে, স্বাধীনতার দাবিতে যেমন সোচ্চার ছিল, তেমনি নারী স্বাধীনতা ও নারী অধিকার অর্জনে বদ্ধপরিকর ছিল। ‘মহিলা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে সুফিয়া কামাল সারা দেশে সর্বস্তরের নারীসমাজকে মানবতার মুক্তিতে একযোগে জাতি গঠনের কাজে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-ছাত্রসংগঠনের সচেতন নারীরা তাঁর নেতৃত্বে সম্মিলিতভাবে সংগ্রাম পরিষদের নারী আন্দোলনের কাজ অব্যাহত চলার পর সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় কাজ করার লক্ষ্যে ‘পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদ’ গঠিত হয় ১৯৭০ সালের ৪ এপ্রিল।
এই সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতার প্রস্তুতি পর্বে এ দেশের নারী আন্দোলনের রূপায়ণ সাধনে সচেষ্ট ছিল সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে। বাংলাদেশের সমাজে নারীর বিরুদ্ধে রক্ষণশীলতা, যৌতুক, নির্যাতন, বহুবিবাহ, যথেচ্ছ তালাক, ফতোয়া, নির্যাতন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতনের নিষ্ঠুরতা, পাশবিকতা বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও অন্যান্য নারী সংগঠন সম্মিলিতভাবে এসব সামাজিক-পারিবারিক-রাজনৈতিক-আইনি শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্য ও নির্যাতন থেকে নারীসমাজের মুক্তির আন্দোলন করতে থাকে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে। বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকে স্বৈরতন্ত্র উচ্ছেদের জন্য, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সাধারণ নির্বাচনে নারীসমাজকে সক্রিয় হওয়ার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সুফিয়া কামাল। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার যখন নারীর সম-অধিকার আন্দোলনের দাবি উপেক্ষা করতে থাকে, তখনো নারী আন্দোলনের সোচ্চার মিছিলে সুফিয়া কামাল অতন্দ্র প্রহরীর মতো নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর ইহজীবন অবসানের আগ পর্যন্ত সচেতনভাবে নারীর মানবাধিকার অর্জনের দাবি জানিয়ে নারী আন্দোলনকে আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-বৈষম্য-অসাম্য-নির্যাতনের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে সোচ্চার থাকা এবং অসহায়, দরিদ্র, নির্যাতিত নারীর শিক্ষা-কর্মসংস্থান-ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করার পথ-নির্দেশ দিয়ে গেছেন তিনি।
এই মহীয়সী নারীর প্রয়াণ দিবসে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি।
মালেকা বেগম: নারীনেত্রী। অধ্যাপক, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

নির্বাচনী সংকট নিরসনে একটি প্রস্তাব

চলমান রাজনৈতিক সংকট বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে। পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব নিয়ে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে কত দূর ছাড় দিতে পারে, এর মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ। এর বদলে বরং দেশের কল্যাণে ও গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতার বিচারে উভয় পক্ষের এককভাবে কী করণীয় আছে, সেদিকে দৃষ্টি ফেরানোর সময় এসেছে। এতে করে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বিচারে কোন পক্ষের আচরণ কতখানি গ্রহণযোগ্য, তা জনগণের কাছে স্পষ্ট হবে এবং একটি সমাধানের পথও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে।
ক্ষমতাসীন প্রধান দলের করণীয়
সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দল এক কঠিন দায়িত্বের বোঝা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তাঁদের একক প্রাধান্যের দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনে সব দলের জন্য সমান সুযোগ কী করে তৈরি করা যায়, তা দৃশ্যমান করার চ্যালেঞ্জ প্রকারান্তরে তাঁরা গ্রহণ করেছেন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাঁরা কতখানি সফলতা অর্জন করতে পারেন, জনগণ এখন তা পরখ করার সুযোগ পাবে। নির্বাচনের জন্য একটি সমতল খেলার মাঠ কী করে তৈরি করতে হয়, তা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর সময় সবাই দেখেছে। লক্ষ করার মতো পদক্ষেপগুলোর মধ্যে আছে: চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সরকার পরিচালিত অন্যান্য গণমাধ্যমকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির কাজে ব্যবহার করা, দলীয়ভাবে চিহ্নিত কর্মকর্তারা জনপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলে তাঁদের অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া, স্থানীয় পর্যায়ের প্রশাসনে কিছু রদবদলের মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন-প্রক্রিয়ার সপক্ষে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে দলনিরপেক্ষভাবে কাজ করার লক্ষ্যে কার্যকর প্রকাশ্য নির্দেশনা প্রদান এবং সর্বোপরি প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠিত করা। ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের কাছে এতখানি আশা করা না গেলেও অন্তত ন্যূনতম কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ তো জনগণ অবশ্যই আশা করবে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াও সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব—ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই বারবার এই অঙ্গীকার করেছেন। এ ছাড়া দলীয় সরকারের মন্ত্রী ও নির্বাচনের সময় স্বপদে অধিষ্ঠিত থাকলে সাংসদদের আচরণবিধি কী হবে, তা নির্ধারণ করার বাড়তি দায়িত্বও আছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় যার দরকার ছিল না। প্রধানমন্ত্রী একাধারে সরকার ও দলের প্রধান বলে তাঁকে একদিকে দলীয় নির্বাচনী প্রচারণার নেতৃত্ব দিতে হবে এবং অন্যদিকে নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনাকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার কাজটিও করতে হবে, যা মোটেই সহজসাধ্য হবে না। উন্নত গণতন্ত্রে প্রশাসনসহ রাষ্ট্রীয় স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণ হয় না বলে এ সমস্যা হয় না। এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা তাঁর বিবেচনায় একান্তই অসম্ভব হলে নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব তিনি আর কারও ওপর ন্যস্ত করে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন।
প্রধান বিরোধী দলের করণীয়
প্রধান বিরোধী দল এটা মনে করতেই পারে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের কারণে তাদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। কিন্তু এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সামনে যেসব বিকল্প আছে, তার মধ্য থেকেই মন্দের ভালো হিসেবে একটিকে বেছে নিতে হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়ে তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করার অঙ্গীকার পালনের জন্য সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। নির্বাচন প্রতিহত করার নেতিবাচক আন্দোলনের বদলে তারা নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করতে পারে। বৈরী পরিবেশেও নির্বাচনমুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে তারা অবদান রাখতে পারে এবং সে জন্য তাদের প্রতি জনগণের সমবেদনা থাকবে। অন্যদিকে নির্বাচন প্রতিহত করার আন্দোলন থেকে যে সহিংসতা দেখা দিতে পারে, তা কারও জন্য মঙ্গলজনক হবে না। বরং বিরোধী দলের ন্যায্য দাবির প্রতিও মানুষের বীতশ্রদ্ধা দেখা দিতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকারে বিরোধী দল যোগদান না করলে এ সরকারের দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার দায়ভার তাদের নিতে হবে না। অথবা এ সরকারে যোগ দিলেও নির্বাচনের পরিবেশ গ্রহণযোগ্য না করা গেলে বিরোধী দলের সামনে সরকার থেকে পদত্যাগ ও নির্বাচন বর্জন করার বিকল্প খোলা থাকবে। আর ভোট কারচুপির মাধ্যমে তাদের পরাজিত করা হলে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ জনসমক্ষে প্রকাশ করে তারা গণ-আন্দোলনও গড়ে তুলতে পারবে। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলে যে, নির্বাচন বর্জনের চেয়ে বরং নির্বাচনের ব্যাপক কারচুপির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তুলে ধরতে পারলে সরকারবিরোধী আন্দোলন বেশি ফলপ্রসূ হয়।
নাগরিক সমাজের করণীয়
প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিলে নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। দলবিশেষের প্রতি সমর্থন ও মতাদর্শের কারণে তাদের মধ্যে বিভাজন থাকলেও এ দায়িত্ব পালনে কোনো মতানৈক্য থাকার অবকাশ নেই। কাজেই এটি নাগরিক সমাজের জন্যও একটি পরীক্ষা। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির অঙ্গীকারের বিষয়ে সরকার যদি আন্তরিক হয়, তবে নির্দলীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও একটি উপদেষ্টা পরিষদ নিয়োগ করতে পারে। দলীয় অনুগত উপদেষ্টাদের দিয়ে এ কাজ হবে না। উল্লেখ্য, বিগত সব তত্ত্বাবধায়ক সরকারই এ ধরনের নির্দলীয় বিশিষ্ট নাগরিকদের কাছ থেকে নানা বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ নিয়েছিল। দলীয় সরকারের জন্য এ ধরনের পরামর্শ গ্রহণ তো আরও জরুরি।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ: অর্থনীতিবিদ, ইউনাইটেড নেশনস কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির সদস্য।

স্নোডেন কত দিন রাশিয়ায় থাকবেন?

এডওয়ার্ড স্নোডেন
আমেরিকান হুইসলব্লোয়ার এডওয়ার্ড স্নোডেনের বাবা লনি স্নোডেন গত মাসে রাশিয়ায় ছেলের সঙ্গে এক সপ্তাহ কাটানোর পর আমেরিকা ফিরে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁর ছেলের কাছে আরও অনেক গোপন তথ্য আছে, সেগুলোর প্রকাশ নিশ্চিত করতে তাকে আরও কিছুদিন রাশিয়াতেই থাকতে হবে। কিন্তু রাশিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার সময় স্নোডেন বলেছিলেন, তিনি রাশিয়ায় কোনো গোপনীয় তথ্য নিয়ে যাননি। হাওয়াই থেকে হংকংয়ে চলে যাওয়ার সময় তিনি তাঁর ব্যবহূত চারটি ল্যাপটপের সব কটি সঙ্গে নিয়েছিলেন কি না, এ বিষয়ে তিনি পরিষ্কার করে কিছু বলেননি। ধারণা করা হয়, মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) গোয়েন্দা-তথ্যের ভান্ডার থেকে তিনি যে বিপুল পরিমাণ অতি-গোপনীয় নথিপত্র ‘চুরি’ করেছিলেন, সেগুলো সংরক্ষিত ছিল ওই চারটি ল্যাপটপেই। তিনি নিজে সেগুলো ইন্টারনেটে প্রকাশ না করে প্রথমে যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার সাংবাদিকদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তথ্যভান্ডারটি এতই বিশাল যে, কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম হিসাব করে বলেছে, সেগুলোর পুরোটা প্রকাশ করতে ৩০ বছর লেগে যাবে। বর্তমানে ২৯ বছরের যুবক স্নোডেন ৫৯ বছরের প্রৌঢ় হয়েও দেখতে পাবেন, তাঁর দেওয়া গোপনীয় নথিপত্রের ভিত্তিতে সাংবাদিকেরা চাঞ্চল্যকর একেকটা সংবাদ পরিবেশন করছেন। সর্বশেষ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো অস্ট্রেলিয়ায়: স্নোডেনের দেওয়া গোপনীয় নথিপত্রের ভিত্তিতে লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (এবিসি) ফাঁস করে দিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দারা ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ আটজন নেতার টেলিফোনে আড়ি পেতেছিল। 
এই খবরে ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে ইন্দোনেশিয়ার সরকার ক্যানবেরায় নিয়োজিত তাদের রাষ্ট্রদূতকে দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে এবং অস্ট্রেলীয় সরকারকে এই বলে হুমকি দিয়েছে যে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব সহযোগিতার সম্পর্ক আছে, সেগুলো তারা রাখবে কি না, তা পর্যালোচনা করবে। এর আগে স্নোডেনের দেওয়া নথিপত্রের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যম খবর পরিবেশন করেছে যে মার্কিন এনএসএর গোয়েন্দারা তাদের গোয়েন্দা নজরদারি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নিয়মিতভাবে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, ব্রাজিল, মেক্সিকো, ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশের সাধারণ নাগরিক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকারপ্রধান ও রাজনৈতিক নেতাদের মোবাইল ফোনে গোপনে আড়ি পেতেছে, কথোপকথন রেকর্ড করেছে, টেক্সট মেসেজ কপি করেছে এবং ইন্টারনেটে আদান-প্রদান হয়েছে, এমন অনেক তথ্য গোপনে সংগ্রহ করেছে। মাত্র ৩০ দিনে তারা ফ্রান্সের নাগরিকদের সাত কোটি ফোনকল রেকর্ড করেছে—এমন খবর প্রকাশের পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ প্রেসিডেন্ট ওবামাকে ফোন করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ঠিক তার পরপরই জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল ওবামাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনারা কি আমার মোবাইল ফোনে আড়ি পেতে রেখেছেন?’ ম্যার্কেল নিজের গোয়েন্দা বাহিনীকে হুকুম দিয়েছিলেন পরীক্ষা করে দেখতে, সত্যিই তাঁর মোবাইলে মার্কিন গোয়েন্দারা আড়ি পেতেছিল কি না। তারা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছে যে ঘটনা সত্য।
সে কথা চ্যান্সেলরকে জানানোর পরই ম্যার্কেল ওবামাকে ফোন করেছিলেন। ওবামাকে তিনি প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেছিলেন উত্তর পাওয়ার জন্য নয়, কারণ উত্তর তো তিনি জেনেই গেছেন। তিনি ওবামাকে ফোন করেছিলেন তাঁকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে। ওবামা প্রশাসনের জন্য সত্যিই এক বিরাট অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে স্নোডেনের কারণে। একের পর এক তথ্য ফাঁসের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হচ্ছে যে আমেরিকা তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশগুলোকেও বিশ্বাস করে না, সেসব দেশের সরকারপ্রধানদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনের কথোপকথনও আমেরিকান গোয়েন্দারা সিস্টেম্যাটিক্যালি রেকর্ড করে। মিত্রদের প্রতি এই অনাস্থা ও অবিশ্বাস আমেরিকান গোয়েন্দাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মার্কিন সেনাসদস্য ব্র্যাডলি ম্যানিং আর উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের কারণে ওবামা প্রশাসন যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিল, তার থেকে অনেক বেশি বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এনএসএর সাবেক কন্ট্রাক্টর এডওয়ার্ড স্নোডেনের কারণে। উইকিলিকসের কেবলগেটের নথিপত্রগুলো ছিল মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তারবার্তা, যার মধ্যে টপ-সিক্রেট বা অতি-গোপনীয় তথ্য একটিও ছিল না। কিন্তু স্নোডেনের চুরি করা নথিভান্ডারের অধিকাংশই ‘টপ-সিক্রেট’ শ্রেণীর গোয়েন্দা তথ্য। স্নোডেন সেগুলো নিজের কম্পিউটারে ডাউনলোড করেছিলেন,
যখন তিনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর কর্মী ছিলেন। সিআইএর গোপনীয় নথিপত্রে সিংহভাগ কখনোই ‘ডিক্ল্যাসিফাই’ বা প্রকাশ করা হয় না। স্নোডেন এগুলো সংবাদমাধ্যমকে না দিলে এবং ভবিষ্যতে আর কোনো হুইসলব্লোয়ার এমন সুযোগ না পেলে আমরা এখন মার্কিন গোয়েন্দাবৃত্তির অন্যায়-অবৈধ অনুশীলনের যেসব প্রমাণের কথা জানতে পারছি, কখনোই তা জানা সম্ভব হতো না। আঙ্গেলা ম্যার্কেলও জানতে পারতেন না যে তাঁর বন্ধু বারাক ওবামার গোয়েন্দা গোপনে তাঁর মোবাইল ফোনের সব কথোপকথন রেকর্ড করে আসছিল (এখন বন্ধ করেছে। কিন্তু গার্ডিয়ান-এর সূত্রে পাওয়া আরও গুরুতর তথ্য হলো, ম্যার্কেলের ফোনে মার্কিন গোয়েন্দা আড়ি পেতে আসছিল এক দশক ধরে)। স্নোডেনের বাবা আমেরিকায় ফিরে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁর ছেলে রাশিয়ায় বেশ ভালো আছে। সংবাদমাধ্যম থেকে আমরা জানি, স্নোডেন রাশিয়ায় একটি ওয়েবসাইটে কাজ শুরু করেছেন। রাশিয়ার লোকজন তাঁকে আপন করে নিয়েছেন। কিন্তু যে মুক্ত-স্বাধীন জীবন তাঁর ছিল, সে তুলনায় এখন তাঁর অবস্থা অনেক কষ্টকর।
দুই লাখ ডলার বেতনের একটা চাকরি ছিল তাঁর, ছিল সুন্দর এক মেয়েবন্ধু। আর আমেরিকা-ইউরোপজুড়ে ছিল এক ঝাঁক বন্ধুবান্ধব। স্নোডেনের জন্য সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এখন তাঁর চলাফেরা হয়ে পড়েছে ভীষণভাবে সীমাবদ্ধ; নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি প্রবল। দ্বিতীয়ত, আমেরিকান গোয়েন্দাদের নজরদারির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে যে দেশটিতে তিনি আশ্রয় পেয়েছেন, সেই রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের গোয়েন্দারা যে তাঁকে সর্বক্ষণ চোখে-চোখে রাখছে—এই মর্মান্তিক সত্য কথাটা তাঁর চেয়ে ভালো করে আর কে জানেন? আমেরিকান সংবিধান নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি নামের পবিত্র অধিকারটি যে দৃঢ়তার সঙ্গে রক্ষা করার কথা বলে, রাশিয়ার সংবিধান মোটেও তা করে না। ক্লিনটন-বুশ-ওবামার সরকারেরা জাতীয় নিরাপত্তা আর সন্ত্রাসবাদ দমনের ধুয়া দিয়ে নাগরিকদের মুক্তি, স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার সংকুচিত করতে চায় কিন্তু রাশিয়ার শাসকদের মতো অনায়াসে তা করতে পারে না। বরং তাদেরকে নানা রকমের জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়। স্নোডেন এনএসএর গোয়েন্দাবৃত্তি সম্পর্কে তথ্য ফাঁস করার পর আমেরিকান কংগ্রেসে মার্কিন গোয়েন্দাব্যবস্থার সংস্কার সাধনের দাবিতে আলোচনা শুরু হয়েছে। হুইসলব্লোয়ার হিসেবে স্নোডেন যা করেছেন, তা করা সম্ভব আমেরিকায়, রাশিয়ায় কারও পক্ষে কোনোভাবেই নয়। রাশিয়া ব্র্যাডলি ম্যানিং, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ কিংবা এডওয়ার্ড স্নোডেন তৈরি করতে পারে না।
স্নোডেন এসব কথা বেশ ভালোভাবে জানেন। পুতিন রাশিয়ার সের্গেই নাভালনিসহ কতজন উদারপন্থী ব্লগারকে কারাগারে বন্দী করে রেখেছেন, সে হিসাবও স্নোডেনের কাছে আছে। স্নোডেন স্বভাবত এক প্রতিষ্ঠানবিরোধী স্বাধীনচেতা যুবক; কেজিবির উত্তরসূরিদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে তাঁর রুশ-জীবন হয়েছে সত্যিকারের এক সোনার খাঁচা। তিনি জানেন, রাশিয়ায় তাঁকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে কোনো নৈতিক বা আদর্শিক কারণে নয়, স্রেফ কৌশলগত কারণে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির মতিগতিরও যে ঠিকঠিকানা থাকে না, সেটাও তিনি ভালোই বোঝেন। এই সোনার খাঁচা থেকে বেরিয়ে স্নোডেন বরং জার্মানি চলে যেতে চান: খোদ আঙ্গেলা ম্যার্কেলের কাছে চিঠি লিখে তিনি সে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। এআরডি নামে জার্মান এক টিভি স্টেশন জনমত জরিপ করে দেখেছে, দেশটির ৬০ শতাংশ মানুষ মনে করে, স্নোডেন একজন বীর বা নায়ক। জার্মান পার্লামেন্টের সদস্যসহ গ্রিন পার্টির দুই নেতা রাশিয়া গিয়েছিলেন স্নোডেনের সঙ্গে দেখা করতে। তাঁরা দেশে ফিরে নিউইয়র্ক টাইমস-এ একটি যৌথ নিবন্ধ লিখেছেন; সেখানে জার্মান সরকারের প্রতি তাঁরা আহ্বান জানিয়েছেন, স্নোডেনকে জার্মানিতে আশ্রয় দেওয়া হোক। তিনি জার্মান পার্লামেন্টে গিয়ে এনএসএর গোয়েন্দাবৃত্তি সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবেন। কিন্তু আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সরকার ওবামার গোয়েন্দার ওপর যতই ক্ষুব্ধ হোক, আমেরিকার দাগি ফেরারি আসামি স্নোডেনকে জার্মানিতে আশ্রয় দেবে—এমন আভাসও কোথাও নেই।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।

আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে বাংলাদেশ!

বাইরের দুনিয়ার কাছে বাংলাদেশ বুঝি ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। তা অবশ্য একধরনের লেনদেনের আকর্ষণ। এ লেনদেনে প্রকৃত প্রাপ্তির নিক্তিতে বাংলাদেশ বঞ্চিতই হয়। বিশ্বের কিছু উন্নত দেশের পাশাপাশি অপরিচিত কোনো কোনো দেশের সঙ্গে এ লেনদেনে জড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কিছু মানুষ। এসব মানুষ বেশ ধনী ও সম্পদশালী। তাঁরা তাঁদের অর্জিত কোটি কোটি টাকার ধনসম্পদ নিরাপদে রাখার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে কিছু মানুষ আক্ষরিকভাবেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। তাঁদের জন্য বাইরে নিয়ে যাওয়ার তাড়াটা অনেক বেশি। আবার অনেকে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী-শিল্পপতি। তাঁরাও চান, বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা অর্থবিত্তের একটা বড় অংশ যদি অন্যত্র নিরাপদে রাখা যায়, মন্দ কী? এভাবে বাংলাদেশের কিছু মানুষের কাছে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ আছে এবং তাঁরা যে তা দেশে রাখতে সাহস পান না, স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না, সেটা আমরা যতটা জানি, তার চেয়েও বেশি জানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। সে কারণেই এসব দেশে সম্পদ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ থেকেই নয়, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশ থেকেই অর্থসম্পদ নিয়ে যাওয়ার জন্য ধনী দেশগুলো সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। অর্থসম্পদ নিয়ে যাওয়ার বিনিময়ে ওই সব দেশে সপরিবারে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে,
দেওয়া হচ্ছে নাগরিকত্বও। কিছুদিন আগেই দুবাইতে জমি-বাড়ি কেনার সুযোগ দিতে ঢাকায় এক অভিজাত হোটেলে রীতিমতো মেলা বসেছিল। দুটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে প্রায় এক পাতাজুড়ে একাধিক দিন রঙিন বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয় সম্ভাব্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে। তবে একটি দৈনিক পুরো বিষয়টির অবৈধ দিক তুলে ধরে শীর্ষ প্রতিবেদন করে। তাতে টনক নড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। যেহেতু বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বাড়ি-জমি কিনতে অর্থ নেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই, সেহেতু এ ধরনের বিজ্ঞাপন ও মেলা সম্পর্কে হুঁশিয়ারি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তারপরই বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়, আয়োজকেরা মেলা গুটিয়ে ফেলে। কিন্তু এ ঘটনা সুস্পষ্টভাবে এটাই নির্দেশ করে যে দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বাইরে অর্থসম্পদ নিয়ে যেতে আগ্রহী এবং প্রচুর মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার মতো অর্থসম্পদ আছে। অবশ্যই তা বৈধ পথে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তাই বলে বিদেশে টাকা নিয়ে যাওয়া থেমে নেই। নানা কৌশলে অবৈধ পথে অর্থ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। সোজা কথায়, টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে, উড়ে যাচ্ছে ডলার। ধনী বাংলাদেশিরা টাকা নিয়ে যাচ্ছেন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও মরিশাসে। এর বাইরে এমন কিছু দেশের নাম এখন পাওয়া যাচ্ছে, যা আগে কখনো সেভাবে জানা যায়নি। লাটভিয়া, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের সেইন্ট ক্রিস্টোফার (কিটস নামেও পরিচিত) ও নেভিস ফেডারেশন, বাহামা এবং ডমিনিকায় টাকা নিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
বিনিময়ে এসব দেশে স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্বের সুবিধা প্রদানের কথা বলা হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে দেশের একাধিক বহুল প্রচারিত পত্রিকায় এসব দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের বিনিময়ে সেখানে স্থায়ী আবাসন বা নাগরিকত্ব প্রদানের সুযোগসংবলিত বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। দুবাইতে সম্পত্তি ক্রয়ের জন্য বিশালাকারে রঙিন বিজ্ঞাপন নয়, সাদা-কালো ও ছোট আকারের বিজ্ঞাপন। এসব বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে একাধিক দেশের সরকারি ওয়েবসাইট ঘেঁটে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে দেশগুলো সত্যিই এ ধরনের সুযোগ দিচ্ছে। লাটভিয়ার কথাই ধরা যাক। আগামী বছর থেকে দেশটি প্রবেশ করতে যাচ্ছে ইউরো অঞ্চলে। অর্থাত্, বর্তমানে ইউরোপের ১৭টি দেশ যে অভিন্ন মুদ্রা হিসেবে ইউরো ব্যবহার করছে, লাটভিয়া আগামী বছর থেকে তাতে যুক্ত হবে। ফলে, দেশটির নিজস্ব মুদ্রা বলতে কিছু থাকবে না। লাটভিয়ায় রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাতে বাংলাদেশি কেউ যদি দেড় লাখ ইউরো বা দেড় কোটি টাকার কিছু বেশি পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেন, তাহলে তিনি দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুবিধা পেতে পারেন।
লাটভিয়াকে এখন ইউরোপের নতুন করের স্বর্গ (ট্যাক্স হেভেন) হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। কিংবা ধরা যাক দ্বীপদেশগুলোর কথা। সেইন্ট কিটস ও নেভিসে জমি-বাড়ি তথা সম্পত্তি কিনতে চার লাখ ডলার (প্রায় তিন কোটি সাত লাখ টাকা) বিনিয়োগ করলে কিংবা দেশটির চিনিশিল্প বৈচিত্র্যকরণ ফাউন্ডেশনে নগদ দুই লাখ ৫০ হাজার ডলার (এক কোটি ৯২ লাখ টাকা) অনুদান দিলে ৮ থেকে ১২ মাসের মধ্যে সেখানকার নাগরিক হিসেবে পাসপোর্ট মিলবে। ডমিনিকায় সরকারি তহবিলে এক লাখ ৭৫ হাজার ডলার অনুদান দিলে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পাওয়া যাবে। বাহামা ও মরিশাসের আবাসন খাতে পাঁচ লাখ ডলার (তিন কোটি ৮৪ লাখ টাকা) বিনিয়োগ করলে দেওয়া হবে একই ধরনের সুবিধা। এ পথ দেখাচ্ছে বড় উন্নত কয়েকটি দেশ। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের পল্লি এলাকায় নতুন বাণিজ্যিক কার্যক্রমে পাঁচ লাখ ডলার বিনিয়োগ করলে এবং এর মাধ্যমে ১০ জন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলে প্রাথমিকভাবে দুই বছরের ও পরে স্থায়ী আবাসন-সুবিধা (গ্রিন কার্ড) দেওয়া হয়। এটি ইবিএ-৫ অভিবাসন কর্মসূচি নামে পরিচিত।
কানাডার কুইবেক অঙ্গরাজ্যে ন্যূনতম আট লাখ কানাডীয় ডলার (তিন কোটি ৬৬ লাখ টাকা) পাঁচ বছর সুদমুক্তভাবে ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ করা হলে স্থায়ী আবাসনের সুযোগ দেওয়া হয়। সরকার এ ঋণের নিশ্চয়তা দেয়। অস্ট্রেলিয়ায় ৫০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার (প্রায় ৩৬ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করলে অভিবাসনপ্রাপ্তির পথ প্রশস্ত হয়। এসব দেশের কাছে মুখ্য বিবেচনা হলো ধনসম্পদ। কীভাবে তা অর্জিত, সেটা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আর কীভাবে অন্য দেশ থেকে তাদের দেশে এ অর্থ পাঠানো হচ্ছে, সেটা নিয়েও বিশেষ কোনো উদ্বেগ নেই। এ বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ একেবারে শর্তহীন নয়। ছোটখাটো আরও কিছু বিষয় রয়েছে, যা অবশ্যপালনীয়। সংশ্লিষ্ট দেশের আইনকানুন ও রীতিনীতি মেনে চলার অঙ্গীকারনামাসহ বাংলাদেশে কোনো অপরাধে যুক্ত না থাকার প্রত্যয়ন এর মধ্যে অন্যতম। আর এটা তো সবারই জানা যে বাংলাদেশের ধনাঢ্য-প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পক্ষে পুলিশি ছাড়পত্র পাওয়া খুব কঠিন কিছু নয়।
একইভাবে বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র তৈরি করারও ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে সেগুলো সত্যায়নের ব্যবস্থা। আসলে বিশ্বজুড়েই এখন পুঁজি পাচারের বা পুঁজি স্থানান্তরের বিরাট কর্মযজ্ঞ চলছে, যার বৈধতা দিচ্ছে বিভিন্ন উন্নত দেশ। এ ক্ষেত্রে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো হয়ে উঠেছে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ ধারাতেই বাংলাদেশও হয়ে উঠেছে অন্যতম বড় আকর্ষণ। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই বড় হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে পুঁজিপতি ও কোটিপতির সংখ্যা। বাড়ছে রাজনৈতিক প্রভাব আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা শক্তিশালী গোষ্ঠী। এরাই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠিয়ে দিচ্ছে বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। আর বাংলাদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ অসহায়ভাবে চেয়ে চেয়ে দেখছে।
আসজাদুল কিবরিয়া: লেখক ও সাংবাদিক
asjadulk@gmail.com

প্রতিটি বিদ্যালয়ে চাই গ্রন্থাগার

শিশুদের জন্য আয়োজিত এক কর্মশালার সাক্ষাৎকার পর্ব চলছে। মোট ১৫৩ জন প্রতিযোগী, বয়স ১২ থেকে ১৬। সবাই খুব সিরিয়াস। যে করেই হোক, এই বৈতরণী পার হতেই হবে। অবশ্য ওদের চেয়ে মায়েদের দুশ্চিন্তাই বেশি। কর্মশালার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করা। ১৫৩ জন শিশু-কিশোরের মধ্যে দুজন বাদে বাকিরা পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোন বইটি সর্বশেষ পড়েছে বা কবে পড়েছে মনে করতে পারেনি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য সম্পর্কে অধিকাংশেরই কোনো ধারণা নেই। সবারই প্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। কিন্তু প্রিয় লেখকের বইয়ের নাম তারা বলতে পারেনি। জাতি হিসেবে আমাদের রয়েছে অনেক সুমহান অর্জন, রয়েছে গর্ব করার মতো বহু সাফল্য। মেধা ও মননে আমরা কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে আমাদের ঘাটতি রয়েছে, রয়েছে পরিপক্বতার অভাবও। একটা সময় ছিল উৎসবে উপহার হিসেবে বইয়ের কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। মধ্যবিত্ত পরিবারে এক আলমারি বই ড্রয়িং রুমের শোভা বর্ধন করত। মা-বাবারাও কোনো উৎসব অথবা জন্মদিনে তাঁদের সন্তানদের বই উপহার দিতেন। এতে করে ছোটবেলা থেকেই শিশুরা পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বই পড়ার ব্যাপারেও আগ্রহী হয়ে উঠত। এখন আর তেমনটি চোখে পড়ে না। তার জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে নতুন নতুন ডিজাইনের মোবাইল ফোন, আইপ্যাড, ল্যাপটপ, নিনটেনডো, প্লে-স্টেশনসহ আরও অনেক কিছু। তারা যেহেতু খোলা মাঠে গিয়ে খেলতে পারছে না, তাদের জন্য যথার্থ বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। সেহেতু ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের মধ্যেই তারা খুঁজে নিচ্ছে আনন্দ। ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব আর ভার্চুয়াল জগতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে কোমলমতি শিশু-কিশোরেরা। ফলে শৈশব থেকেই তারা যন্ত্রে পরিণত হয়ে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে তাদের সংবেদনশীলতা, সহমর্মিতা ও সহনশীলতা। কী ভয়াবহ এক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। উন্নত বিশ্বে গেলে দেখা যায়, ট্রেনে, বাসে, স্টেশনে যেখানেই সময় পাচ্ছে, বই পড়ছে তারা। বড় বড় শপিং মলে নানা রকম শোরুমের পাশাপাশি বইয়েরও মনকাড়া শোরুম থাকে। অথচ আমাদের দেশে যাও দু-একটা ছিল, তা-ও যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ঢাকার শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলো এখন প্রায় অতীত। বেশির ভাগই এখন জামাকাপড়ের দোকানে পরিণত হয়েছে। আমরা পড়ার অভ্যাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমাদের উন্নয়ন ভাবনায় শুধু বড় বড় শপিং মল, নতুন নতুন টিভি চ্যানেল বা দালানকোঠা! ক্রমাগত জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে মানুষ উন্নত হয় এবং তার চিন্তাশক্তিকে শাণিত করে।
শিশু-কিশোরদের পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণ হলো অভিভাবকেরা। পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোনো বই-ই তাঁরা সন্তানকে পড়তে দিতে রাজি নন। ৫০০ টাকা দিয়ে ফাস্টফুড কিনে দিতে কোনো আপত্তি না থাকলেও বই কেনার ব্যাপারে রয়েছে প্রবল আপত্তি! পড়াশোনার ক্ষতির দোহাই দিয়ে বই কেনা থেকে নিবৃত্ত করা হয় সন্তানকে। বহু শিক্ষকও আছেন, যাঁরা পাঠ্যবই-বহির্ভূত বই পড়াকে সমর্থন করেন না। এ ছাড়া রয়েছে যথাযথ পাঠসামগ্রীর অভাব ও দেশি বইয়ের অপর্যাপ্ত মান। বিদেশি ভালো বইয়ের অতিরিক্ত দামের ফলে সেটাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। গ্রন্থাগারসমূহের জন্য অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দ হতাশারই উদ্রেক করে মাত্র। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতি অতিমাত্রায় আগ্রহের কারণে প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতি আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। শিশু সাহিত্যিকের স্বল্পতার পাশাপাশি শিশু সাহিত্য সম্পর্কেও রয়েছে যথাযথ ধারণার অভাব। প্রকাশনা শিল্পের নানা রকম সীমাবদ্ধতা এবং কাগজের ক্রমেই মূল্যবৃদ্ধিসহ আরও অন্যান্য কারণেই পাঠাভ্যাস কমে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য দরকার ছোটবেলায়ই বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। পরিবারকে সবার আগে সচেতন হতে হবে, বিশেষত মাকে। কারণ, পরিবারই হচ্ছে শিশুর প্রথম বিশ্ব তথা শিক্ষালয়ও বটে এবং মা হচ্ছেন তার কেন্দ্রবিন্দু। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণত দুই বছর বয়স থেকেই শিশুরা রংচঙে ছবির বইয়ের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে, যাতে মানুষ, পশুপাখি, বাড়ির নানা রকম আসবাবের ছবি আছে, তা দেখে শিশু ঝাঁপিয়ে পড়ে। যদিও এই বয়সের শিশুর পড়ার প্রশ্ন আসে না, তবু অন্যের পড়ার সুর শুনতে এবং পাঠরত মানুষের মুখের ভাবভঙ্গি উপভোগ করতে ভালোবাসে। অর্থাৎ তখন থেকেই পাঠের প্রতি তার একটা ভালোবাসা জন্ম নেয়। কিন্তু আমাদের বড়দের কারণেই ক্রমে ক্রমে তা হারিয়ে যায়।
এ ছাড়া শিক্ষকদেরও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্য বই পড়ার ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তোলা যায়। এ লক্ষ্যে প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা; স্কুল ম্যাগাজিন, দেয়াল পত্রিকা প্রকাশনা; তাতে বিভিন্ন প্রকারের রচনা প্রকাশের মাধ্যমে প্রকারান্তরে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে অবহিত হওয়া এবং তা প্রকাশ করার ক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করে।
প্রতিটি স্কুলে যদি গ্রন্থাগার স্থাপন এবং বই ইস্যু বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়, তাহলে অভ্যাসটা তৈরি হবে শুরু থেকেই। একজন শিশুকে যদি বছরে অন্তত ৪০-৫০টা বই পড়ানো যায়, তাহলে বইয়ের বিশাল জ্ঞানভান্ডারের সঙ্গে তার একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে যদি গ্রন্থাগার এবং একজন যোগ্য গ্রন্থাগারিক থাকেন, তবে শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।
পাশাপাশি পাঠ্যসামগ্রীরও মান উন্নয়ন করতে হবে, বই পাঠের গুরুত্ব সম্পর্ক প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সহায়তায় প্রচারণামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। শিশুদের উৎসাহী ও অনুসন্ধিৎসু করে তোলে—এমন সব কর্মসূচি নিতে হবে সরকারি ও বেসরকারি উভয়ভাবেই। প্রতিযোগিতামূলক এই বিশ্বে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান, তথ্য ও সৃজনশীলতার সমন্বয় দরকার। উন্নত প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে কীভাবে পাঠাভ্যাস বাড়ানো যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে সবাইকে।
রেজিনা আখতার: প্রধান গ্রন্থাগারিক, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী।

হাইয়ান মোকাবেলার সমালোচনায় একুইনো

টাইফুন হাইয়ান মোকাবেলায় পূর্ণ প্রস্তুতি না নেয়ায় কয়েকটি এলাকার কর্তৃপক্ষের কড়া সমালোচনা করেছেন ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট বেনিগনো একুইনো। উপকূলীয় শহর গুইউয়ান সফরের সময় একুইনো দক্ষতার সঙ্গে উদ্ধার কাজ পরিচালনার জন্য স্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রশংসা করেন। তিনি সেইসঙ্গে এও বলেন, অন্য শহরের অবস্থা এর মতো ভালো নয়। যদিও ঝড়ের প্রস্তুতি নিয়ে একুইনো সরকারকেও সমালোচিত হতে হয়েছে। হাইয়ানের আঘাতে দেশটিতে অন্ততপক্ষে ৩ হাজার ৯৭৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক তালিকা অনুযায়ী আরও ১ হাজার ১৮৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। টাইফুনপরবর্তী উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক বিশ্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যুক্তরাজ্যের রণতরী প্রচুর ত্রাণসামগ্রী নিয়ে উদ্ধার কাজে সহায়তা করছে। মার্কিন রণতরীও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় কাজ করছে। বিশ্বের অন্যতম প্রলয়ংকারী এই ঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার। সেইসঙ্গে উঠে এসেছিল বিশাল বিশাল ঢেউ।
ঝড়ে পাঁচ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। ৮ নভেম্বর সামার প্রদেশের শহর গুইউয়ানে টাইফুনটি প্রথম আঘাত হানে। একুইনো বলেন, ‘কিন্তু পূর্ণ প্রস্তুতি থাকায় এখানে একশ’ জনের কম মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যদিও অন্যান্য এলাকার কর্মকর্তারা এত ভালোভাবে প্রস্তুতি নেয়নি। একুইনো জনগণকে ধৈর্যধারণ করার আহ্বান জানিয়ে আরও বলেন, ‘ঝড়ে সবকিছু হারানো ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের প্রতিদিনের খাবারের ব্যবস্থা করাই এখন আমাদের প্রধান সমস্যা। কিন্তু আমাদের যথেষ্ট সম্পদ রয়েছে এবং আমরা দ্রুত এগুচ্ছি।’ একুইনো লেইতে প্রদেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ত্যাকলোবানেও যান এবং সেখানকার জনগণকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সাহায্য তার সরকার দেবে বলে আশ্বাস দেন। ফিলিপিন্সে ত্রাণ কার্যক্রম ধীরগতিতে চলছে এমন সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম দ্বিগুণ করার ব্যবস্থা করব কারণ আমরা অভিযোগটি শুনেছি।’ যুক্তরাষ্ট্রের হেলিকপ্টার থেকে দুর্গত এলাকায় খাদ্য, পানি এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সামগ্রী ফেলা হচ্ছে। এরপরও পাহাড়ি অঞ্চলে এখনও অনেক মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন পার করছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। জতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ১ কোটি ১০ লাখেরও বেশি মানুষ টাইফুন হাইয়ানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাশিয়ায় বিমান দুর্ঘটনা নিহত ৫০

পূর্ব-মধ্যাঞ্চলীয় রাশিয়ার কাজান শহরে একটি বোয়িং ৭৩৭ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৫০ আরোহীর সবাই মারা গেছেন।
বিমানটি রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। রোববার সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে (রাশিয়ার স্থানীয় সময়) তাতারস্তান এয়ারলাইন্সের ভাড়া করা এই বিমানটি কাজান বিমানবন্দরে নামার সময় দুর্ঘটনায় পড়ে। বিমানটিতে ৪৪ জন যাত্রী ও ৬ জন ক্রু ছিলেন বলে জরুরি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যাত্রীদের মধ্যে দুটি শিশুও ছিল। নিহত যাত্রীদের মধ্যে তাতারস্তানের প্রেসিডেন্ট রুস্তম মিন্নিখানভের ছেলে ইরেক মিন্নিখানভ ও রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার প্রাদেশিক প্রধান আলেকজান্ডার আন্তোনভ রয়েছেন বলে তাতারস্তান সরকার জানিয়েছে। প্রায় শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রা ও বৃষ্টির মধ্যে বিমানটি একবার রানওয়েতে নামার চেষ্টা করেছিল। এপি।