Tuesday, August 6, 2013

স্যার, সামনে ঈদ, জামিন দেন by পলাশ কুমার রায়

অভিযুক্ত ব্যক্তি বিচারাধীন মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে অথবা গ্রেফতার হওয়ার পর আদালতে তার নিযুক্ত আইনজীবীর মাধ্যমে জামিন চাইতে পারেন। আগাম জামিনের ব্যবস্থাও রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি বিচারাধীন মামলার যে কোনো পর্যায়েই জামিন চাওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে তার নিযুক্ত আইনজীবী কর্তৃক আদালতে উপস্থাপিত জামিনের দরখাস্ত শুনানি অন্তে আদালত জামিন মঞ্জুর করতেও পারেন, নাও পারেন- এটা আদালতের এখতিয়ার। আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনজীবী ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর (ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ক্ষেত্র বিশেষে জিআরও কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা) বক্তব্য শ্রবণান্তে অভিযুক্ত ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর করলে আইনি নিয়মনীতি অনুসরণ করে অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পাবেন। আদালত জামিন মঞ্জুর না করলে নিু আদালতের আদেশে সংক্ষুব্ধ (অভিযুক্ত) ব্যক্তি উচ্চ আদালতে জামিনের জন্য আবার দরখাস্ত করতে পারেন।
আদালতে বছরজুড়েই চলে জামিন দেয়া-নেয়ার প্রক্রিয়া। তবে ঈদের আগে জেলে বন্দি অথবা আত্মসমর্পণপূর্বক অভিযুক্তের পক্ষে জামিন চাওয়ার প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। অভিযুক্তের পক্ষে তার নিযুক্ত আইনজীবী ঈদের আনন্দ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভোগ করার সুযোগদানের জন্য যে কোনো শর্তে জামিনের দরখাস্ত করে থাকেন। ঈদের আগে প্রায় প্রত্যেক আইনজীবীই অভিযুক্তের জামিন চাওয়ার সময় বলেন, স্যার, সামনে ঈদ যে কোনো শর্তে জামিন দেন। ঈদের আগে এভাবে জামিন চাওয়া একটা প্রথায় পরিণত হয়েছে। এ ধরনের আবেগাপ্লুুত আবেদন অনেক সময় আদালত সংশ্লিষ্ট অনেকের হƒদয়কে স্পর্শ করে বলে আইনজীবীদের চিকন গলার আওয়াজে এ প্রক্রিয়ায় জামিন চাওয়ার কৌশল কাজেও লাগে হয়তো!
এ প্রসঙ্গে একজন পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলায় অভিযুক্তদের জামিন শুনানির সময় উচ্চ আদালতে পুলিশের কোনো প্রতিনিধি থাকেন না। তাই গাড়ি চুরি, অপহরণ, ডাকাতি ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত আদালতের নজরে আনার সুযোগ হয় না। উচ্চ আদালতে যদি পুলিশের প্রতিনিধি রাখা সম্ভব হতো, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তির অভিযোগের বর্ণনা তুলে ধরে জামিনের ঘোর বিরোধিতা করা যেত। উচ্চ আদালতে এ কাজটি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় দেখভাল করে। মামলার আধিক্য অথবা সময় স্বল্পতায় প্রস্তুতি নিতে না পারার কারণে হয়তো অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তারা (সহকারী/ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল) প্রতিটি চাঞ্চল্যকর মামলায় অভিযুক্তদের জামিনের বিরোধিতা করতে পারেন না বলে অভিযুক্তরা উচ্চ আদালতের আদেশে জামিনে মুক্তি পান। এমনকি যারা নিু আদালতে আত্মস্বীকৃত খুনি অথবা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, তারাও জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, জামিনে মুক্তি পেয়েই অভিযুক্ত ব্যক্তি মামলার অভিযোগকারীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। অন্যথায় ওই পরিবারের অপর কোনো সদস্যকে খুন অথবা অন্য কোনো গুরুতর ক্ষতি করার হুমকি দিয়ে বসে। সাক্ষীকেও আদালতে দাঁড়িয়ে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দেয়ার জন্য হুমকি-ধামকি দেয়। এভাবে মামলার অভিযোগকারী ও সাক্ষী ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে আপস-মীমাংসা বা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির আশংকা থেকে রক্ষার জন্য অভিযোগকারী নিজে থেকে মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। তবে একথাও সত্যি, সব অভিযুক্ত ব্যক্তিই জামিনে মুক্তি পেয়ে অভিযোগকারী কিংবা সাক্ষীকে ভয়ভীতি, হুমকি-ধামকি দেয় না। অনেক সময় অভিযোগকারী মামলায় সাময়িক সুবিধা এবং অভিযুক্তের জামিন বাতিলের জন্য কাছের থানায় সাধারণ ডায়েরিতে উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়ে তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। এতে হয়তো বিচারাধীন মামলায় পরবর্তী ধার্য তারিখে অভিযুক্তের জামিন বাতিল করে আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেবেন। এতে ন্যায়বিচার ও জামিনে মুক্ত থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নির্দোষ ও নিরপরাধ অভিযুক্তরা। আবার এমন ঘটনাও মাঝেমধ্যে শোনা যায় যে, তুচ্ছ বা কাল্পনিক কোনো ঘটনায় জেলে বন্দি নিরপরাধ অভিযুক্তরা আর্থিক সামর্থ্য না থাকার কারণে বছরের পর বছর ধরে জেলের ঘানি টানছে। ঈদের আগে জামিন নিয়ে অনেক রসালো খবর শোনা যায়। একশ্রেণীর দালাল অভিযুক্তের জামিন করিয়ে দেয়ার পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। আত্মীয়স্বজন ও অভিভাবকরা জেলে বন্দি স্বজনের সঙ্গে ঈদের দিন একত্রে উপভোগ করার জন্য দালাল চক্রের চাহিদা মতো টাকা দিতেও কার্পণ্য করেন না। এভাবে আদালতপাড়ার প্রতারক দালাল চক্র এবং তাদের সহযোগী কতিপয় আইনজীবী, আদালতপাড়ায় কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা, আদালতে কর্মরত স্টাফসহ অনেকেই সহজ সরল বিচারপ্রার্থীদের নয়ছয় বুঝিয়ে ঈদ মৌসুমের জামিনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিচারপ্রার্থীদের আত্মীয়স্বজনের বিভ্রান্ত করার কাজে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। এসবের মূল উদ্দেশ্য আটক অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনের কাছে যেনতেনভাবে ফুসলিয়ে জামিন পাইয়ে দেয়ার কথা বলে মোটা অংকের টাকা আদায় করা।
আদালতে কর্মরত অনেকেই মনে করেন, অন্য সময়ের তুলনায় ঈদের আগে প্রায় দ্বিগুণ অভিযুক্তের জামিন মঞ্জুর করা হয়। ঈদের অজুহাত ও নানা ধরনের আবেদনময়ী বক্তব্যে আইনজীবীরা আদালতের দয়া ও করুণা চেয়ে অভিযুক্তের জামিন প্রার্থনা করেন। অনেকের জামিন হয়ও। ছিনতাই, ডাকাতি, গাড়ি চুরি, খুনি, ধর্ষক, অপহরণকারীর জামিন মঞ্জুর করাতে বড় বড় আইনজীবীর অভাব নেই। কিন্তু আর্থিকভাবে অসচ্ছল অভিযুক্তদের (বিচারপ্রার্থীদের) কী হবে? তারা আর কতদিন অর্থাভাবে উকিল সাহেব ধরতে না পারার কারণে জেলে বসে পচবে? তাদের আÍীয়স্বজন জানেন না, ঈদের আগে ঈদের অজুহাতেও জামিন পাওয়ার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকে। আর্থিকভাবে সচ্ছল না হওয়ার কারণে বছরের পর বছর, হয়তো যুগের পর যুগ তাদের উঁচু দেয়াল বেষ্টিত জেলখানায় বসে হালুয়া-রুটি-সেমাই আর এক বাটি মাংস খেয়েই ঈদের দিনটি কাটাতে হবে। পরিবার-সমাজ থেকে অনেক দূরে থাকা এসব বন্দির ঈদের দিনটি কেমন কাটে- আমাদের মাননীয় আইনমন্ত্রী তার খোঁজ রাখেন কি? বেসরকারি সংবাদ মাধ্যমগুলোও এ ব্যাপারে তৎপর নয় কেন?
পলাশ কুমার রায় : আইনজীবী; আহ্বায়ক, সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন (সুপ্রা)

যে প্রশ্নের জবাব অজানা by তারেক শামসুর রেহমান

মাত্র চব্বিশ বছর বয়স ফারহিনের। ফার্মেসিতে পিএইচডি করেছে। সম্পর্কে আমার ভাগ্নি, আমার বড় বোনের মেয়ে। আদবে-চালচলনে বাঙালি হলেও ফারহিন মার্কিন নাগরিক। জন্ম ওর কুয়েতে আর বেড়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রে। বাংলাদেশে ও গেছে যখন ছোট ছিল। এই অক্টোবরে ও দেশে যাবে। অনেক প্রস্তুতি। কিন্তু আপত্তি আমার- দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। দেশে যাওয়াটা ঠিক হবে না। আমি জানি ঈদের পর বড় ধরনের আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোট। এরই মধ্যে ঘটে গেছে আরও একটি ঘটনা- হাইকোর্টের দ্বিধাবিভক্ত রায়ে ইসিতে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এটা নিয়ে দাবি ছিল এবং কানাঘুষাও ছিল, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একটা পর্যবেক্ষণও ছিল। উচ্চ আদালতে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। এখন জামায়াতের ভবিষ্যৎ কী, এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু জামায়াত এরই মাঝে ১২ ও ১৩ আগস্ট হরতাল আহ্বান করেছে। সুতরাং রাজনীতির ময়দান আবার উত্তপ্ত। এ পরিস্থিতিতে ফারহিনের ঢাকা যাওয়া কতটুকু সঙ্গত হবে, এটা নিয়ে আমরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি। কিন্তু বাচ্চাটাকে আমরা বোঝাতে পারি না। ওর কথা, বাংলাদেশ আমার দেশ। দেশে যাওয়া আমার অধিকার। আমি কেন আমার মায়ের দেশে যেতে পারব না? আমরা ওকে বোঝাতে পারি না- রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল ডাকে, লাগাতার হরতাল। এ হরতালে সাধারণ মানুষ থাকে ঝুঁকির মুখে। হরতালে যে সংঘর্ষ হয়, তাতে পড়ে মানুষ মারা যায়।
রক্তে যার বাঙালিত্ব, বাংলাদেশ যাকে টানে, নাড়ির টানে যে দেশটিকে দেখতে চায়, ‘রাজনীতি’ আজ এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, এ দেশ তার এক নাগরিককে দেশে যাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। ফারহিনের মতো অনেক ‘শিশু’ এ দেশের আবহাওয়ায় বড় হয়েছে। কিন্তু নিজের দেশটাকে দেখতে চায়। ছুটি কাটাতে চায় আÍীয়স্বজনের কাছে। ফারহিনের অনেক প্রশ্নের জবাব আমার জানা নেই।
দুই
নিউইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি। একটু পরে আমাকে নিয়ে যাওয়া হবে ‘ক্যাথ ল্যাবে’, হৃদযন্ত্রে অপারেশন হবে। ব্লক ধরা পড়েছে। রিং লাগাতে হবে। একের পর এক নার্স আসছে। হাজারটা প্রশ্ন। অতীত ইতিহাস জেনে নিচ্ছে। এমনি এক পুরুষ নার্স জানতে চাইল আমি কোন দেশের। ওর নাম জর্জ। কৃষ্ণাঙ্গ। বিশ থেকে ত্রিশের ঘরে বয়স। বললাম, বাংলাদেশী। ও অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, তোমার দেশে নাকি অনেক মানুষ! তোমরা নাকি সারাবছরই মারামারি কর! একজন কৃষ্ণাঙ্গ যুবক, যার কাছে বাংলাদেশ পরিচিত নয়, সে জেনেছে বাংলাদেশে শুধু মারামারি হয়! বললাম, এই নিউইয়র্কে প্রতিদিন যত সহিংস ঘটনা ঘটে, ঢাকা শহরে তা ঘটে না। জর্জ হাসল। কোনো কথা বলল না। আমাকে নিয়ে গেল ক্যাথ ল্যাবের দিকে। অপারেশনের পর ম্যানহাটনের এ হাসপাতালের ‘পোস্ট-অপারেটিভ’ ইউনিটে একদিন ছিলাম। জর্জ আমাকে দেখতে এসেছিল। আমাকে শুভ কামনা জানিয়েছিল। কিন্তু কেন জানি আমার মনে হচ্ছিল, জর্জ বলতে চাচ্ছে আমরা বাংলাদেশীরা খুব মারামারি করি! তাহলে কি জর্জ আমাকে বলতে চাচ্ছিল আমি সভ্য দেশের নাগরিক নই!
তিন
যারা রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেন, তাদের কাছে নিউইয়র্কের ‘কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশন্স’ (সিএফআর) কোনো অপরিচিত নাম নয়। এই থিংক ট্যাংকটি মার্কিন নীতিনির্ধারকদের পরামর্শ দিয়ে থাকে। বেশ কিছু বিষয় নিয়ে এরা গবেষণা করে থাকে। এর একটি হচ্ছে ধর্মীয় উগ্রবাদ। আল-কায়দার উত্থান এবং লাদেন পরবর্তী আল-কায়দার রাজনীতি ও বিস্তার নিয়ে বেশ ক’জন গবেষক কাজ করছেন এখানে। তবে শুধু আল-কায়দা কিংবা সন্ত্রাসবাদ নিয়েই যে এরা কাজ করেন, তা নয়। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ইত্যাদি নানা বিষয়ে এরা কাজ করে ও মনোগ্রাম প্রকাশ করে থাকে। বিখ্যাত ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনটি এদের সংস্থা থেকেই প্রকাশিত হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র হিসেবে সিএফআর বিষয়ে আমার আগ্রহ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আমাকে সপ্তাহে একবার ৬নং ট্রেনে চড়ে হান্টার কলেজে নামতে হয়। তারপর খানিক বাসে চড়ে ম্যানহাটনের ৭০নং স্ট্রিটে আমার ডাক্তার ও হাসপাতাল। আর এ হান্টার কলেজের পাশেই ৬৮নং স্ট্রিটে হ্যারল্ড প্রাট হাউস। সেখানেই সিএফআরের অফিস। লিজা শিল্ডসের সঙ্গে কথা বলে ওখানে যখন গেলাম, তখন দুপুরের রোদ। ম্যানহাটন যেন হাসছে। কোন দেশের মানুষ নেই এই ম্যানহাটনে? দশ বছর আগেও ম্যানহাটনে হেঁটেছি। সেই একই ছবি। উঁচু উঁচু ভবন। একটার সঙ্গে অপরটির যেন প্রতিযোগিতা!
বাংলাদেশ সিএফআরের গবেষকদের কাছে গুরুত্ব পাবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ওরা বাংলাদেশ সম্পর্কে যে জানে না, তা নয়। বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান সম্পর্কে ওদের গবেষকদের ধারণা কম, কিন্তু জানে। বললাম, বাংলাদেশে কোনো ধর্মীয় মৌলবাদ নেই। হেফাজতে ইসলামকে কোনো ধর্মীয় উগ্র সংগঠন হিসেবে গণ্য করা ঠিক হবে না। তবে এটা ঠিক, আফগানিস্তানকে ওরা যেভাবে দেখে, সেভাবে বাংলাদেশকে দেখে না। বাংলাদেশকে ওরা একটি মডারেট মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে চিন্তা করে, যেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে! এই মার্কিন মুল্লুকে এসে দেখলাম আমাদের কেউ কেউ দেশেই বাংলাদেশকে পরিচিতি করাতে চান একটি ‘উগ্র ধর্মীয় রাষ্ট্র’ হিসেবে! যদিও এতে সরকার কিংবা বিরোধী দলেরও কোনো ভূমিকা নেই। যারা এ ধরনের কথা বলছেন, তারা সমাজের নামিদামি ব্যক্তি। অনেকেরই মনে থাকার কথা, মাত্র সপ্তাহ দু-এক আগে একজন শীর্ষস্থানীয় অ্যাক্টিভিস্ট প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, বাংলাদেশে আল-কায়দার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের অস্তিত্ব রয়েছে (?)। তার এ মন্তব্যটি একটি অনলাইন পত্রিকায় ছাপাও হয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে, তিনি হেফাজতে ইসলামের ভেতরে আল-কায়দার এলিমেন্ট রয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি স্টেটমেন্ট। আমি জানি না সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এ স্টেটমেন্টকে কীভাবে নিয়েছে। এর পেছনে যদি কোনো সত্যতা থেকে থাকে, তাহলে তা আমাদের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ। তবে মনে রাখতে হবে, এ ধরনের কোনো মন্তব্য মার্কিন কর্মকর্তাদের আশংকাকে উসকে দিতে পারে। তারা ‘গন্ধ’ খুঁজতে পারেন। এতে করে বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়তে পারেন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী বাংলাদেশীরা। এর আগে দু’দুটো ঘটনায় দু’জন বাংলাদেশী এখানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে তথ্য অধিকার আইন বলে সব মুসলমানের তথ্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার হাতে। সুতরাং আল-কায়দার সঙ্গে আদৌ কোনো বাংলাদেশী সংগঠনের যোগাযোগ রয়েছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আল-কায়দার তৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে আরব বিশ্বে বেড়েছে। লিবিয়াতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে হত্যা করেছিল আল-কায়দার সদস্যরা। বাগদাদে সাম্প্রতিক বোমাবাজির সঙ্গে আল-কায়দা জড়িত। তিউনিসিয়ায় সম্প্রতি ৯ জন সৈন্য জঙ্গিদের হাতে মারা গেছে। সিরিয়ায় সন্ত্রাসী সংগঠন ‘জাবহাত আল নুসরা’র তৎপরতা বেড়েছে। সিরিয়া ও ইরাক সীমান্তে আল-কায়দার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘ইসলামিক স্টেট অব ইরাক’ শক্ত আস্তানা গেড়েছে- এ সংবাদ পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সুতরাং আল-কায়দার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের তৎপরতা বেড়েছে। আমাদের আতংকের কারণ সেখানেই। বাংলাদেশ একটি মডারেট মুসলিম দেশ। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত এ ইমেজকে বহির্বিশ্বে প্রচার করা।
চার
একটা প্রশ্ন এখানে আমাকে অনেকেই করেছেন- জামায়াতে ইসলামীর ভবিষ্যৎ এখন কী? উচ্চ আদালতের দ্বিধাবিভক্ত রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। এর অর্থ কি জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হচ্ছে? আদালতের এই রায়ের ফলে জামায়াতকে ঘিরে যে হাজারটা প্রশ্ন উঠবে, সেটাই স্বাভাবিক। বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে ভয়েস অব আমেরিকার (ভোয়া) বাংলা বিভাগ একটি দীর্ঘ সংলাপের আয়োজন করেছিল গেল সপ্তাহে। ওই টেলিকনফারেন্সে ঢাকা থেকে অংশ নিয়েছিলেন সুলতানা কামাল, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় থেকে ড. আলী রিয়াজ, আর নিউইয়র্ক থেকে আমি। সঞ্চালন করেছিলেন ভোয়ার আনিছ আহমেদ। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী ওই টেলিকনফারেন্সে যারা ঢাকা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের সবার জিজ্ঞাসা ছিল, জামায়াত কি শেষ পর্যন্ত তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলবে? এমন প্রশ্নও কেউ কেউ করেছেন, এটা সরকারের এক ধরনের কৌশল কি-না?
হাইকোর্টের রায় নিয়ে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। সেটা ঠিকও নয়। রায়টি সর্বসম্মতিক্রমে হয়নি, এটাও বিবেচনায় নিতে হবে। দু’জন বিচারপতি জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের পক্ষে অভিমত দিয়েছেন। একজন তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। নিয়মমাফিক এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হবে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে। জামায়াত আপিল করেছেও। কিন্তু অতঃপর? আপিল বিভাগ কি হাইকোর্টের দ্বিধাবিভক্ত রায় বহাল রাখবেন? আর চার-পাঁচ মাস পর দেশে নির্বাচন হতে হবে। সুতরাং এ ধরনের একটি রায়ের গুরুত্ব যে অনেক বেশি, তা তো দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তবে কতগুলো বাস্তবতাকে আমরা অস্বীকার করতে পারব না। এক, জামায়াতের একটা ‘ভোট ব্যাংক’ আছে, হোক না তা ৪ থেকে ৫ ভাগ। এই ভোট ব্যাংকের ব্যাপারে বিএনপির যেমনি আগ্রহ রয়েছে, ঠিক তেমনি আগ্রহ রয়েছে আওয়ামী লীগেরও। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ড. গওহর রিজভীর ‘গোপন সংলাপ’ এর বড় প্রমাণ। দুই, জামায়াতের তরুণ প্রজন্মকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। এরা আধুনিক মনস্ক ও আধুনিক ইসলামিক ধ্যান-ধারণার অধিকারী। তিন, জামায়াত একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের বাংলাদেশী শাখা। রাজনীতিগতভাবে এরা মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের বাংলাদেশী সংস্করণ। দলটি নিষিদ্ধ হলে আন্তর্জাতিকভাবে একটা প্রতিক্রিয়া হবে। চার, সংবিধান ও আইনগতভাবে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ অনুসরণ করে সরকার নির্বাহী আদেশে দলটি নিষিদ্ধ ঘোঘণা করতে পারে। পাঁচ, দলটি নিষিদ্ধ হলেও দলটি অন্য নামে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে অথবা বিএনপির ব্যানারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। সরকার পরিবর্তন হলে পুরনো নামে তাদের আত্মপ্রকাশ হবে সময়ের ব্যাপার। দল নিষিদ্ধের ব্যাপারটি তাই কোনো সমাধান নয়। ছয়, অতীতেও জামায়াত নিষিদ্ধ হয়েছিল। আবার স্বনামে ফিরে এসেছে। অন্যান্য দেশের ইতিহাস বলে, কোনো দল নিষিদ্ধ হলেও তাদের নেতা-কর্মীরা নতুন নামে ফিরে এসেছে। সাত, এটা তো অস্বীকার করা যাবে না যে ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮- প্রতিটি সংসদীয় নির্বাচনে জামায়াত অংশ নিয়েছে। ১৯৭৯ সালে তারা ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ নামে আত্মপ্রকাশ করেছিল। আর ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, যে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। আট, যুদ্ধাপরাধীর বিষয়টি ভিন্ন। যারা অপরাধ করেছে, তাদের সবারই শাস্তি হোক- এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই।
এখন দশম নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের একটি রায়, রায়ের আগে ‘গওহর-রাজ্জাক গোপন সংলাপ’ কিংবা ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ-জামায়াত যৌথ আন্দোলন ইত্যাদি নানা ইস্যু চলমান রাজনীতিতে যে প্রভাব ফেলবে, তা স্পষ্ট। জামায়াত যদি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে, তাহলে তারা সাধারণ মানুষের সমর্থন পাবে। আর যদি সহিংস প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে, সমর্থন তারা হারাবে। আদালতের এ রায় আরও একবার প্রমাণ করল, আমরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে আদালতের মাধ্যমে সমাধান করতে চাচ্ছি। এ প্রবণতা ভালো নয়। আদালতকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জড়ানো ভালো নয়। তাই জামায়াতকে নিয়ে অনেক প্রশ্নের জবাবই আমার জানা নেই।
পাঁচ
দিন যতই যাচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা ততই বাড়ছে। ফারহিনের মতো শত শত বাংলাদেশী দেশে আসতে চান। তাদের দেশে আসা অনিশ্চিত হবে যদি একটা ‘সমঝোতা’ না হয়। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও নির্দিষ্ট সময়েই নির্বাচন হবে- এ ব্যাপারেও আমি আস্থা রাখতে পারছি না। বাংলাদেশকে নিয়ে তাই সংশয় থেকেই গেল।
নিউইয়র্ক, ৩ আগস্ট ২০১৩
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

উচ্চ মাধ্যমিকের ফল এবং আমাদের রাজনীতি by মাছুম বিল্লাহ

২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে আসছিল এইচএসসির পাসের হার। কিন্তু এ বছর সাধারণ ৮টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার গতবারের চেয়ে ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন মহল এর কারণ বিশ্লেষণের চেষ্টা করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিজ্ঞান বিভাগের রসায়ন ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ব্যবসায় নীতি ও প্রয়োগ বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছে। ভালোভাবে না বুঝেই শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতাও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ওপর প্রভাব ফেলেছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, রাজনৈতিক অস্থিরতা শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে ৩২টি পরীক্ষা পেছাতে হয়েছিল। দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি কাউকেই রেহাই দেয় না। লক্ষণীয়, আমাদের রাজনীতিকদের রাজনীতি থেমে নেই এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও। তারা একে অপরকে দোষারোপ করছেন ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য। তবে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার সময় যে বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই এবং এজন্য যে শুধু বিরোধী দল দায়ী তাও নয়। আবার সরকারি দল যখন বিরোধী দলে ছিল তখন যদি তারা এমন ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারত যে, তারা হরতাল করে জনগণকে বিপাকে ফেলেনি, তাহলে সরকারি দল আজ বিরোধী দলকে এভাবে কথা বলতে পারত। আবার বিরোধী দল যে ভূমিকা রেখেছে, তাও সমালোচনার বাইরে নয়। আমাদের বুঝতে বাকি নেই যে, কোনো দলই ভবিষ্যৎ বংশধরদের কথা খুব একটা চিন্তা করে না। তারা চিন্তা করেন ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়া নিয়ে। দেশের জন্য রাজনীতি করলে বিরোধী দল আর সরকারি দল যারাই হোক, জাতির জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা একই হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের কি তা হচ্ছে? সরকারে থাকাকালীন জনগণের জন্য চিৎকার করব আর বিরোধী দলে গেলে জনগণ ভোট দেয়নি এজন্য তাদের ওপর প্রতিশোধ নেব- তাদের এ ভূমিকা তো সবার কাছেই স্পষ্ট। জনগণ বলির পাঁঠা, শিক্ষার্থীরা তা থেকে বাদ যাবে কেন?
এবার পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ১ এপ্রিল, শেষ হয়েছে ২৩ জুন। হরতালের কারণে ৯ দিন নতুন করে পরীক্ষা নিতে হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অংশে আংশিক হরতালের কারণে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন বিষয়ের পরীক্ষা ঝুঁকির মধ্যে নিতে হয়েছে। চট্টগ্রাম বোর্ডের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা হরতালের কারণে চারবার পেছাতে হয়েছে। বিরোধী দলের জন্য নয়, সরকারের ব্যর্থতার কারণে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে বিএনপি। সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়ার সমালোচনা করে বিশ্লেষক ও বিরোধী রাজনীতিকরা বলছেন, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে পরীক্ষা পদ্ধতি অপরিচিত ছিল, তাই ফলাফল ভালো হয়নি। সরকারের ভুল শিক্ষানীতির কারণে ফল বিপর্যয় হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন, বিরোধী দল কি এ দায় এড়াতে পারে?
প্রায় প্রতিবছরের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছে নটর ডেম কলেজ- ১ হাজার ৭৬৬ জন। তবে সেরা কলেজ নির্ধারণে ৫টি মানদণ্ড থাকায় সেরাদের তালিকায় গতবারের মতো প্রথম হয়েছে রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ। নটর ডেম হয়েছে ৬ষ্ঠ, গতবার ছিল ৫ম। দ্বিতীয়বারের মতো সেরাদের তালিকায় দ্বিতীয় হয়েছে নরসিংদীর আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। তারপর যথাক্রমে রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজ, ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ, নটর ডেম কলেজ, ক্যামব্রিয়ান কলেজ, মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, হলিক্রস কলেজ ও দশম অবস্থানে ঢাকা কলেজ। অন্যান্য পদক্ষেপের মধ্যে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ হল, সেরা প্রতিষ্ঠান নির্ধারণের ক্ষেত্রে মানদণ্ড নির্ধারণে কিছুটা পরিবর্তন আনা। শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা বা জিপিএ-৫ পাওয়াই সেরা প্রতিষ্ঠান হওয়ার শর্ত হতে পারে না। কতজন শিক্ষার্থী প্রথম বর্ষে ভর্তি হল এবং কতজন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করল ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এবার পাসের হার এবং জিপিএ-৫-এর সংখ্যা কমার পাশাপাশি শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে, বেড়েছে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। গতবার শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৬। এবার এ সংখ্যা ৮৪৯। শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গতবার ছিল ২৪, এবার এ সংখ্যা ২৫।
পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা এক ধরনের যুদ্ধ। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া আরেক ধরনের যুদ্ধ। তবে এবার উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে ভর্তিতে কোনো আসন সংকট হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। গত বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ প্রায় তিন হাজার কম হলেও পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হবে। গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দশ বোর্ড থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছিল মোট ৬১ হাজার ১৬২ জন, এবার পেয়েছে ৫৮ হাজার ১৯৭ জন। আর এবার এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৮৯১ জন এবং গত বছর পাস করেছিল ৭ লাখ ২১ হাজার ৯৭৯ জন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে মেধাবীরা এবার বেশি প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। গতবারের চেয়ে ২৩ হাজার শিক্ষার্থী বেশি উত্তীর্ণ হলেও এ বছর উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে আসন সংখ্যাও বেড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। ইউজিসি ও ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবার ভর্তিযোগ্য আসন হচ্ছে ৫০ হাজার। এর মধ্যে এক হাজারের ওপর আসন আছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার, বুয়েটের এক হাজার, ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রায় তিন হাজার, জাহাঙ্গীরনগরে প্রায় তিন হাজার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন হাজার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় তিন হাজার, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় এক হাজার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চার হাজার, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে দেড় হাজার, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই হাজার আসন আছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসন সংখ্যা বাড়ানো সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আমরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
এবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫শ’। যেখানে ২ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও আসন খালি থাকবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বদরুজ্জামান বলেন, এবার ডিগ্রি পাস কোর্সেও ভর্তি হয়েছে ৩ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। আগামী বছরও এই সুযোগ থাকছে। এছাড়া লেদার টেকনোলজিতে আসন আছে প্রায় ৪শ’। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বেড়ে যাওয়ায় ভর্তির সুযোগ এখানেও বেড়েছে। সরকার অনুমোদিত ৭১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার এক লাখের বেশি আসন আছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনের কোনো সীমানা নেই। যত শিক্ষার্থী তত আসন সংকুলান করা সম্ভব। এছাড়া ২২টি সরকারি মেডিকেল, ৫৩টি বেসরকারি মেডিকেল ও ৯টি ডেন্টাল কলেজে এবার আসন আছে সাড়ে ৮ হাজার। ইন্সটিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে আছে বেশ কিছু আসন। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে আসন সংখ্যা নিয়ে এবার উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের খুব একটা চিন্তিত হতে হবে না বা দেশের বাইরে ভর্তি হওয়ার চিন্তা করতে হবে না। এটি একটি ভালো দিক। এদিকে একই ধরনের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের মতো ক্লাস্টার বা গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এবার হচ্ছে না। ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। কারণ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের বিড়ম্বনা, অর্থ ও সময়ের অপচয়। এটি যত দ্রুত সম্ভব সমাধান করা উচিত।
এই রেজাল্টই কি আসল রেজাল্ট? প্রতিটি কলেজে যতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, সবাই কিন্তু এই পাবলিক পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পায় না। কলেজেই টেস্ট পরীক্ষার মাধ্যমে অনেককে ছাঁটাই করে পরীক্ষায় পাঠানো হয়। তারপরও পাসের এই হার। যেসব শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয় না, তাদের দায়-দায়িত্ব কে নেবে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, শিক্ষার্থী না দেশ? আমরা কেউ কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে ভাবছি না। বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখার উপযুক্ত সময় এখনই। সবশেষে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানাচ্ছি। অনেক প্রতিকূলতার মাঝে তারা পরীক্ষা দিয়েছে। দেশের বিরাজমান রাজনীতি থেকে তাদের শিক্ষা নিতে হবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তারা কি দুষ্ট রাজনীতির শিকার হবে, নাকি যে রাজনীতি দেশের মঙ্গল আনবে সেই দিকে পা বাড়াবে?
মাছুম বিল্লাহ : প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেল্টা)

রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে সংলাপের বিকল্প নেই by ড. মাহবুব উল্লাহ্

৪২ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশ নিরবচ্ছিন্ন স্থিতিশীলতার মুখ খুব কমই দেখেছে। অথচ এই নবীন রাষ্ট্রটির উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য স্থিতিশীলতা ছিল খুব প্রয়োজনীয়। এই ৪২ বছর সময়ে বাংলাদেশ যেসব অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হয়েছে, সেগুলো পাঠকদের কমবেশি জানা আছে। সেসব ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এ লেখার কলেবর বৃদ্ধি করা সঙ্গত হবে না। প্রশ্ন হল, কেন এসব অস্থিতিশীলতার ঘটনা ঘটছে? এ বিষয়ে একাধিক তাত্ত্বিক বা একাডেমিক ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমত, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির উদ্ভব হয়, তখন দেশে কোনো বড় বুর্জোয়ার অস্তিত্ব ছিল না। হাতেগোনা দু’-একজনের নাম করা যায়। কিন্তু তাদেরও পুঁজির পরিমাণ আহামরি তেমন কিছু ছিল না। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর আমার সঙ্গে বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের কথা হয়েছিল। তিনি পরবর্তীকালে দেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তান যদি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তাহলে এখানে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কার্যত বিনা বাধায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। কারণ পূর্ব পাকিস্তানে বড় ভূস্বামী কিংবা বড় পুঁজিপতি নেই, যারা সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে রয়েছে শক্তিশালী পুঁজিপতি ও ভূস্বামী শ্রেণী। এরা সমাজতন্ত্রের জন্য বড় রকমের বাধা। কাজেই পূর্ব পাকিস্তানে অর্থাৎ যে ভূখণ্ড পরবর্তীকালে বাংলাদেশ হয়েছে সেই ভূখণ্ডে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা।
সেদিন আমি তার সঙ্গে একমত হতে পারিনি। আমার বক্তব্য ছিল, পুঁজির ধর্ম রক্তবীজের মতো। ক্ষুদ্র অবস্থা থেকে পুঁজি বিশাল আকার ধারণ করে এবং এর পরিসরও হয় বিস্তৃত। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জšে§র অব্যবহিত পর আমরা লক্ষ্য করেছি, কলকারখানা জাতীয়করণ করা সত্ত্বেও একে আশ্রয় করে বহু ব্যক্তি অর্থবিত্তের মালিক হয়েছে। কলকারখানাগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকা সত্ত্বেও এগুলোর কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করে এবং উৎপাদিত সামগ্রী বাজারজাতকরণের মাধ্যমে একশ্রেণীর সুযোগসন্ধানী প্রচুর অর্থবিত্ত কামাই করে নিয়েছে। সোজা কথায়, রাষ্ট্রীয় খাতকে ফোকলা করে একদল মানুষ বিত্তশালী হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের প্রথম ক’বছরে জিনিসপত্রের দুষ্প্রাপ্যতার সুযোগ গ্রহণ করে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। এছাড়াও ছিল চোরাচালান, ফটকা কারবারি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির তৎপরতা। সবকিছু মিলিয়ে রাষ্ট্রের বয়স যখন তিন কি সাড়ে তিন বছর, তখন এদেশে বহু কোটিপতির উদ্ভব ঘটে গেছে। এরা বিত্তবৈভব অর্জনের জন্য রাষ্ট্রকে ব্যবহার করেছে। অথবা রাষ্ট্রের আনুকূল্য পেয়েছে। লাইসেন্স পারমিটের ব্যবস্থা থাকার ফলে অনেকেই লাইসেন্স পারমিট ব্যবহার করে রেন্ট সিকিং করেছে। এভাবেও অনেকে বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছে। ওই সময় সরকারের সমাজতান্ত্রিক নীতির ফলে ব্যক্তিগত বিনিয়োগের ওপর যে ঊর্ধ্বসীমা ছিল, তা শিথিল করার জন্য ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করা হয়। ততদিনে এই শ্রেণীটি কোটি কোটি টাকার পুঁজির মালিক। সরকারও এই চাপের কাছে ১৯৭৫ সালের আগেই নতি স্বীকার করে। তখন থেকে বোঝা গেল, সময়ের দাবিতে শাসক দল সমাজতন্ত্রের কথা বললেও কার্যত তারা ছিল ব্যক্তি পুঁজিরই ধারক-বাহক।
রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ব্যবহার করে পুঁজি ও অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার ধারা আজও অব্যাহত আছে। বৈদেশিক সাহায্যের অর্থ লুণ্ঠন, দুর্নীতি, ঋণখেলাপ, কর ফাঁকি, আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভার ইনভয়েসিং, আদম ব্যবসা, চোরাচালান ও নারী পাচারের মাধ্যমে পুঁজির আদিম বিকাশের ধারা আজও অব্যাহত। কিন্তু এই বিকাশের জন্য রাষ্ট্রীয় সমর্থন ও সহযোগিতা অপরিহার্য শর্ত। এ কারণে রাষ্ট্রক্ষমতা করায়ত্ত করার জন্য প্রতিযোগিতা এবং খেয়খেয়ীও অব্যাহতভাবে চলছে। এই প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ কারণে একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নানা কলাকৌশল করে। অন্যদিকে ক্ষমতাবহির্ভূতরা ক্ষমতা লাভের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এভাবে রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ ধরনের ব্যাখ্যা প্রধানত যারা বামপন্থী মতবাদে বিশ্বাসী, তারাই দিয়ে থাকেন। তবে একথা স্বীকার করতেই হবে, আদিম পন্থায় অর্জিত পুঁজির একটি অংশ বিনিয়োগ ও উৎপাদনের চক্রে প্রবেশ করেছে। কিন্তু যারা বিনিয়োগ ও উৎপাদনে অন্যায় পথে অর্জিত পুঁজি খাটিয়েছে, তারা শ্রেণীগতভাবে এখনও শক্তি-সামর্থ্য অর্জন করতে পারেনি। ফলে সমাজ ও রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা নিয়ামকের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এখনও বিশাল অংকের অবৈধ পুঁজি অবৈধই থেকে গেছে। যাকে আমরা বলি কালো টাকা। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় যখন বিনিয়োগ ও উৎপাদনমুখী পুঁজি প্রাধান্য বিস্তার করে কর্তৃত্বের অবস্থানে আসবে, তখন রাজনীতিতে বর্তমানের মতো অস্থিরতা থাকবে না। পণ্ডিত প্রবর ব্যারিংটন মুর বলেছেন, বুর্জোয়া না থাকলে গণতন্ত্রও থাকে না। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দুর্বলতার মূলে রয়েছে বিনিয়োগ ও উৎপাদনমুখী বুর্জোয়া না থাকা। ভারতে টাটা, বিড়লা ও ডালমিয়াদের মতো বুর্জোয়া গোড়ার কাল থেকে থাকার ফলে সেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শত দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও টেকসই হয়েছে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি হচ্ছে, এলিটদের মধ্যে বাংলাদেশের আত্মপরিচয় নিয়ে সহমত না থাকা, বাঙালি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নিয়ে যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব, সেই দ্বন্দ্বের ফলে এক পক্ষ অপর পক্ষকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এক্ষেত্রে বিবদমান পক্ষদ্বয় একে অপরকে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিনাশী বলে মনে করে। কিন্তু এ প্রশ্নে একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত বিভেদ ও দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকবে। এই দ্বন্দ্বের ফয়সালার জন্য যে ধরনের যুক্তিনির্ভর ও বাস্তবধর্মী বিতর্কের প্রয়োজন, সেটি খুব কমই হচ্ছে। গণতন্ত্রের মর্মকথা হচ্ছে Reasoned argument. কিন্তু এ ধরনের Reasoned argument-এর জন্য যে ধরনের একাডেমিক আলোচনা ও গবেষণা হওয়া উচিত তার সামান্যই আমরা লক্ষ্য করি। এছাড়া পালাক্রমে এই দুই বিরোধী মতাদর্শের রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার ফলে কার অবস্থান সঠিক এবং জনগণ ও বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য সহায়ক, সেটিও কিন্তু স্পষ্ট হচ্ছে না। কখনও মনে হয় জনগণ একটি অবস্থানের পক্ষে, আবার কখনও মনে হয় জনগণ অন্য একটি অবস্থানের পক্ষে। যতদিন এই অস্পষ্টতা বিদ্যমান থাকবে, ততদিন আমাদের সমাজদেহ থেকে অস্থিরতা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত লোপ পাবে না। আমার ব্যক্তিগত অবস্থান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের পক্ষে। এই অবস্থানের পক্ষে আমি আমার সীমিত সাধ্যমতো লেখালেখি করেছি। যারা এই অবস্থানের বিপক্ষে, তাদের সঙ্গে আমি Reasoned argument-এ লিপ্ত হতে প্রস্তুত আছি। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকেও আমরা আমাদের আত্মপরিচয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সংগ্রহ করতে পারি। এখন মিডিয়া অত্যন্ত শক্তিশালী। মানুষকে সচেতন করার ব্যাপারে মিডিয়া জোরালো ভূমিকা পালন করার ক্ষমতা রাখে। মিডিয়া যদি বাংলাদেশের আত্মপরিচয় সংক্রান্ত বিতর্ক সমানভাবে তুলে ধরে, তাহলে এর ফয়সালাও অনেক সহজ হতে পারে। বাংলাদেশও অস্থিরতার কবল থেকে মুক্তি পেতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মূলে প্রতিবেশী ভারতের হাত রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ভারতীয় সাহায্য ও সমর্থনের বিষয়টি এদেশের সব নাগরিকই স্বীকার করে। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবের পর এই রাষ্ট্রটি কিভাবে ভারতের স্ট্র্যাটেজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে রক্ষা করবে, সে ব্যাপারটি ভারতীয় শাসককুলের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে কাজ করছে। এ কারণে অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ৭ দফা গোপন চুক্তি করেছিল। পরবর্তীকালে ২৫ বছর মেয়াদি ভারত-বাংলাদেশ শান্তি-মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত অস্থিরতা, সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহী শান্তি বাহিনীকে সহযোগিতা প্রদান প্রভৃতি চাপ প্রয়োগ করে ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে নতজানু অবস্থান নিশ্চিত করতে চেয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধে ভারত অনভিপ্রেতভাবে নাক গলিয়েছে। এর সাম্প্রতিকতম দৃষ্টান্ত হল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির দিল্লি সফরের সময় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী শক্তির সাফল্য কামনা করেন। সর্বোপরি ভারত হয়তো জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে শক্তিশালীরূপে দেখতে চায় না। কারণ জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সাফল্য বহুজাতিভিত্তিক ভারতেও একাধিক জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভবের জন্য মনোস্তাত্ত্বিক ও বাস্তব অবস্থা তৈরি করবে। এ কারণে ভারতীয় শাসকদের কাছে শক্তিশালী বাংলাদেশের চেয়ে দুর্বল বাংলাদেশই কাম্য। এজন্য প্রচ্ছন্ন ও অপ্রচ্ছন্নভাবে ভারতকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে দেখা যায়।
বাংলাদেশের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের জন্য এ মুহূর্তে ৬ মাস সময়ও হাতে নেই। অথচ এই নির্বাচন কী পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে সে ব্যাপারে শাসক দল ও বিরোধী দলের মধ্যে কোনো সমঝোতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। প্রধান বিরোধী দল ও তার মিত্ররা চাইছে নির্বাচনটি হতে হবে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। অন্যদিকে শাসক দল আওয়ামী লীগ ও তার মহাজোটের মিত্ররা বলছে, নির্বাচন হবে সংবিধানে বর্ণিত ব্যবস্থায়। অর্থাৎ দলীয় সরকারের অধীনে। অথচ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৫-৯৬ সালে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তুমুল আন্দোলন করেছিলেন। পরিণতিতে বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনে। এর ফলে যে নির্বাচন হয়, সেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছিল। আজ আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ছেঁটে ফেলা হয়েছে। সংবিধানের এই পরিবর্তন যখন আনা হয়, তখন আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ও প্রকাশিত হয়নি। পূর্ণাঙ্গ রায়টি লেখা হল সংক্ষিপ্ত রায়ের ১৬ মাস পর। সাবেক বিচারপতি খায়রুল হক রায়টি লিখলেন অবসর গ্রহণের দীর্ঘ সময় পর। অনেকে বলেন, বিচারালয়ের ইতিহাসে এটি অভূতপূর্ব। সে যাই হোক, রায়ে পরবর্তী ২ মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদের সম্মতিতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করারও নির্দেশনা ছিল। এই নির্দেশনার কারণ ছিল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য। রায়ের এই অংশটিকে শাসক দল আমলেই নিচ্ছে না। এমনকি তারা বিদ্যমান এই সংকট নিয়ে কোনো আলোচনার সুযোগ নেই বলে বক্তব্য, বিবৃতি দিচ্ছেন। প্রধান বিরোধী দল তার স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। গত বাজেট অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। অতি সম্প্রতিও তিনি আলোচনার কথা বলেছেন। কিন্তু শাসক দলের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। দেশে যখন কোনো রাজনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি হয় তখন আলোচনার মাধ্যমে তার নিষ্পত্তি করাই যুক্তিসঙ্গত। দেশের মানুষের জন্যও আলোচনার পথে সমাধান খোঁজা কল্যাণকর। একবার যদি আলোচনার সূত্রপাত হয়, তখন দেশের সুধী মহল নানারকম ফর্মুলা দিয়ে আলোচনাকে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু আলোচনা না হওয়ার ফলে তারাও কোনো কার্যকর ভূমিকা নিতে পারছেন না। এই বিরোধ-সংঘাতের সুযোগে কিছু লোক বলার চেষ্টা করছে দুটি দলই নষ্ট। এই নষ্টদের বাদ দিয়ে তৃতীয় ধারা সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু যারা এই বক্তব্য হাজির করছেন, তারা এই মুহূর্তে দেশ চালানোর জন্য ন্যূনতমও শক্তি-সামর্থ্য রাখেন না। তাদের যদি আশু ক্ষমতার স্বাদ পেতে হয়, তাহলে কোনো অসাংবিধানিক ছত্রছায়ার অধীনেই সেই স্বাদ পেতে হবে। দেশের জন্য এটি হবে মারাÍক বিপর্যয়কর। সুতরাং দেশের জন্য সামান্যতম দরদ থাকলে দুটি পক্ষেরই উচিত আলাপ-আলোচনা করে সমস্যার সমাধান খোঁজা। জনগণ রক্তপাত ও সংঘাত দেখতে চায় না। শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিদ্যমান বিরোধের সমাধান হলে দেশবাসী দুটি পক্ষকেই সাধুবাদ জানাবে। সেই সুদিনের অপেক্ষায় আছি।
ড. মাহবুব উল্লাহ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক