Showing posts with label আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী. Show all posts
Showing posts with label আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী. Show all posts

Wednesday, February 12, 2020

শেখ হাসিনার পর কে? by আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে এখন বিশ্ব পরিচিত নেতা এবং শুধু হাসিনা নামেই সবাই তাঁকে চিনে ফেলে, এটা বিদেশে বাস করি বলে স্পষ্ট বুঝতে পারি। তা ছাড়া তাঁর খ্যাতির পরিধিটাও বড়। লন্ডন শহর এখন টোরি দলের নতুন নেতা এবং টেরেসা মের স্থলাভিষিক্ত নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা নিয়ে বিতর্কে মুখর। দৌড়ে বরিস জনসন এগিয়ে আছেন। দেখতে, শুনতে এবং কেশবিন্যাসেও তিনি অনেকটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো।
ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাঁকে খুব পছন্দ করেন। এবার লন্ডন সফরে এসে প্রকাশ্যেই বলেছেন, বরিস ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি খুশি হন। ট্রাম্পের ভাবসাব, কথাবার্তায় মনে হয় তিনি সম্ভবত ব্রিটেনকে এখন আমেরিকার উপনিবেশ মনে করেন। সেভাবেই ব্রিটেনকে উপদেশের আড়ালে নানা নির্দেশ দেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ছাড়লে তিনি ব্রিটেনকে ব্যবসা-বাণিজ্যে আঁচল ভরিয়ে দেবেন, বরিসকে যেন প্রধানমন্ত্রী করা হয়। ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) যেন তাঁর হাতে (আমেরিকার) তুলে দেওয়া হয়। এই সার্ভিস তাঁর হাতে নিরাপদ থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
অন্যান্য দেশের মতো ব্রিটেনেও এখন বাম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল। তাই ইরাক যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট বুশ জুনিয়র লন্ডন সফরে এলে বিশাল জনবিক্ষোভের মুখে বাকিংহাম প্রাসাদ ছেড়ে লন্ডনের রাস্তায় নামতে পারেননি। এবার বুশের চেয়েও নিন্দিত ও বিতর্কিত ডোনাল্ড ট্রাম্প লন্ডনে এলে রাজপথে বিরাট বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে বটে, কিন্তু তাঁকে বুশের মতো গৃহবন্দি করে রাখা যায়নি, তাঁর লম্ফঝম্ফও বন্ধ করা যায়নি।
ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে লাভ নেই। শেখ হাসিনার প্রসঙ্গে আসি। বলছিলাম ছোট ও উন্নয়নশীল বাংলাদেশের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিশ্বের বিশাল পরিধিতে তাঁর পরিচিত ও আলোচিত হওয়ার কথা। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের রেস্টুরেন্টে এক লেবার দলীয় তরুণ এমপির সঙ্গে খেতে গেছি। উদ্দেশ্য ছিল টোরি দলের নতুন নেতা নির্বাচন সম্পর্কে উত্তপ্ত ঘরোয়া বিতর্ক উপভোগ করা এবং পার্লামেন্টের রেস্টুরেন্টে আজকাল ডাল-ভাত খাদ্য তালিকায় আসায় তার স্বাদ নেওয়া।
খেতে বসে বন্ধু এমপি একসময় জিজ্ঞেস করলেন, এবার বরিসই হয়তো টোরি দলের নেতৃত্বে বসবেন, তোমাদের দেশের খবর কী? শেখ হাসিনার বিকল্প কোনো নেতা তো শুধু আওয়ামী লীগে নয়, তোমাদের দেশেও দেখছি না, তাহলে দলের পরবর্তী নেতা কে হবেন, ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রীই বা কে হবেন? উপমহাদেশে এতকালের পরিবারতন্ত্রও অচল হতে চলেছে। ভারতে রাহুল গান্ধীর পরিণাম দেখলে তো।
বললাম, বাংলাদেশ নিয়ে এসব ভাবনা এখন কেউ ভাবছে না। সামনে আওয়ামী লীগের জন্য আরো পাঁচ বছর পড়ে আছে। শেখ হাসিনা এখনো দলের নেতৃত্বের হাল ধরে আছেন এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদেও আসীন। দেশের রাজনীতিও এখন মোটামুটি স্থিতিশীল। আশা করা যায়, অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন গতিশীল রাখতে পারলে আগামী নির্বাচনেও মানুষ শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় চাইবে।
বন্ধু এমপি বললেন, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে কী হবে তুমি তা জানো না। হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন পরবর্তী নির্বাচনে তিনি নেতৃত্ব দেবেন না। ক্ষমতায়ও থাকতে চান না। এ অবস্থায় শেখ হাসিনার এবং তাঁর দলেরই তো উচিত আওয়ামী লীগের জন্য এখনই একজন যোগ্য ও দক্ষ নেতা খুঁজে বের করা এবং সময় থাকতে তাঁকে জনগণের কাছে পরিচিত করে তোলা। না হলে খালেদাবিহীন বিএনপির যে দশা হয়েছে, হাসিনাবিহীন আওয়ামী লীগের কি সেই অবস্থা হবে না?
তাঁকে বললাম, বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর ধারণার সঙ্গে আমার ধারণার একটা পার্থক্য আছে। অবশ্য আমাদের দুজনের ধারণার মধ্যে কার ধারণা সফল হবে, তা বলতে পারি না। প্রথমে শেখ হাসিনার আগামী নির্বাচনে, যা এখনো পাঁচ বছর দূরে, তাতে নেতৃত্ব না দেওয়ার সম্পর্কে বলি? চার-চারবার দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকার পর শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই ক্লান্তিবোধ করছেন এবং যথার্থভাবেই রাজনীতির সম্মুখ সারি থেকে সরে যেতে চাইছেন। এটা অনেক দেশের জনপ্রিয় নেতাই চান।
কিন্তু জনগণের বিপুলভাবে আস্থাভাজন কোনো নেতা যদি দেখেন, দেশের কল্যাণের স্বার্থেই তাঁকে ক্ষমতায় রাখতে জনগণ উন্মুখ, তাহলে তাঁকে সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়। একবার ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয়ের পর জামাল নাসের মিসরের প্রেসিডেন্ট পদে ইস্তফা দিয়েছিলেন। কিন্তু কায়রোর রাজপথে উত্তাল জনগণের দাবিতে তাঁকে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করতে হয়েছিল।
এটা শেখ হাসিনার জীবনেও ঘটেছে। এরশাদের আমলে এক সাধারণ নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্বে ইস্তফা দিয়েছিলেন। দলের নেতাকর্মীরা শুধু নয়, সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করার দাবিতে। তাঁকে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। ভবিষ্যতেও শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্ব ছেড়ে রাজনীতির পেছনের সারিতে যেতে চাইলে একই অবস্থার উদ্ভব ঘটবে। তা ছাড়া তাঁর রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের বয়সও হয়নি। বর্তমানে তাঁর বয়স ৭২ বছর। পাঁচ বছর পরেও তিনি ৮০ বছর বয়সে পৌঁছাবেন না। দ্য গল, চার্চিল, রিগ্যান, মাহাথির প্রমুখ নেতা বয়সের তোয়াক্কা করে ক্ষমতায় থাকেননি। যদি দেশের স্বার্থে প্রয়োজন পড়ে তাহলে সক্ষমতা থাকা পর্যন্ত হাসিনা কেন ক্ষমতায় থাকবেন না? ইসরায়েলের নেতানিয়াহু এবার নিয়ে কত দফা ক্ষমতায় আছেন?
ব্রিটিশ এমপি বন্ধুকে বললাম, খালেদাবিহীন বিএনপির আজ যে অবস্থা, হাসিনাবিহীন আওয়ামী লীগের সেই অবস্থা হবে তা মনে করি না। বিএনপির জন্ম ক্যান্টনমেন্টে এবং নেতৃত্ব ব্যক্তি ও পরিবারভিত্তিক। জনগণের মধ্যে এই দলের কোনো শিকড় (root) নেই। এই দলের পরিণতি ঘটতে চলেছে মুসলিম লীগের মতো। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের জন্ম গণ-আন্দোলন থেকে। দলে নেতৃত্ব ও নীতির ক্রমবিবর্তন হয়েছে। নেতৃত্বেও বারবার বদল ঘটেছে। দলটির জন্ম মূলত মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবের নেতৃত্বে। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী এসে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বসেন। মওলানা ভাসানীর পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি হন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ।
শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বসেন। ছয় দফা আন্দোলনের সময় শেখ মুজিব কারাগারে বসে আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। তাঁর মৃত্যুর পর বেগম জোহরা তাজউদ্দীন ও আবদুল মালেক দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। লিখতে ভুলে গেছি, বঙ্গবন্ধু যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন দলের নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন কামারুজ্জামানের ওপর। সর্বশেষ শেখ হাসিনা দলের সভানেত্রী নির্বাচিত হন এবং এখনো আছেন। তাঁর নেতৃত্বেই দল আবার শাসন ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং এখনো শাসন ক্ষমতায় আছে।
দলের নেতৃত্বের মতো নীতিরও পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ছিল একটি মডারেট সাম্প্রদায়িক দল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে দলটি গড়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িক সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দল হিসেবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটি মডার্ন ও সেক্যুলার ডেমোক্র্যাট পার্টি। প্রতিটি সংকটে আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়াবার শক্তি আছে এবং নেতৃত্ববিহীন অবস্থায় নতুন নেতা তৈরির সক্ষমতা আছে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর চরম নেতৃত্বহীন অবস্থায় দলটি কি নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে সক্ষমতা দেখায়নি? হাসিনা-নেতৃত্ব কি উঠে আসেনি?
আমার বক্তব্য শেষ করে বন্ধু ব্রিটিশ এমপিকে বলেছি, অবশ্যই বাংলাদেশের গণতন্ত্র চিরকাল এক দল, এক নেতানির্ভর থাকুক তা দেশের মানুষ চায় না। কিন্তু বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত—এরা গণতান্ত্রিক দল নয় এবং আওয়ামী লীগের বিকল্প দলও নয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের বিকল্প একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক দল ও নেতৃত্ব গড়ে ওঠা দরকার। আজকের সুধীসমাজ নামক গোষ্ঠীর ছড়ানো বিভ্রান্তি থেকে দেশের মানুষ চূড়ান্তভাবে মুক্ত হলে জনগণের চাহিদা, আন্দোলন ও উদ্যোগ থেকে বিকল্প রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব গড়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস। পচা শামুকে বারবার জনগণের পা কাটবে না।
লন্ডন, ১৭ জুন, সোমবার ২০১৯

Monday, March 19, 2018

অর্জনের বিপরীতে গর্জন by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশের আরেকটি বড় অর্জন লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রির (এলডিসি) পর্যায় থেকে ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রি হিসেবে ঘোষিত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ। এই সরকার আরেক মেয়াদে শাসন ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশ যে কিছুকালের মধ্যে ডেভেলপড কান্ট্রিতে উন্নীত হবে, সে বিষয়ে অনেকেরই সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক দোষত্রুটি থাকতে পারে; কিন্তু তার অর্জনগুলো যে বিশাল, তা এখন জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংকও স্বীকার করে। একটা মজার ব্যাপার এই যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশের অর্জন বাড়ে। আর বিএনপি ক্ষমতায় অথবা বিরোধী দল হিসেবে থাকুক তার নেতাদের কণ্ঠে শুধু গর্জন শোনা যায়। বর্তমানে বিএনপি হঠাৎ পরম গণতন্ত্রপ্রেমী হয়ে উঠেছে। কিন্তু তার নেতাদের কণ্ঠে এখনও যে কথা শোনা যায়, তা গণতন্ত্র সম্মত কথা নয়। তা পতিত স্বৈরাচারের গর্জন। সম্প্রতি খুলনার জনসভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম যা বলেছেন, তা কোনো গণতান্ত্রিক বক্তব্য নয়। রীতিমতো হুঙ্কার অথবা গর্জন। দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরের প্রতিপক্ষ। বর্তমানে বিএনপি মাঠে বিরোধী দল। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে পরাজিত করে ক্ষমতায় যাওয়া। আওয়ামী লীগকে একেবারে দেশ ছাড়া করা নয়। প্রতিপক্ষকে দেশ ছাড়া করার রাজনীতি অবশ্যই গণতান্ত্রিক রাজনীতি নয়। ফ্যাসিবাদী রাজনীতি। বিএনপি এখনও এই ফ্যাসিবাদী রাজনীতির চর্চা করতে চায় বলেই মির্জা ফখরুলের খুলনা-বক্তৃতা থেকে অনুমিত হয়। খালেদা জিয়া এতদিন ছিলেন বিএনপির নেত্রী। এখন তাকে দলের জননী বানানো হয়েছে এবং মির্জা ফখরুলও তাকে ‘আমাদের মা’ ডেকে চোখের পানি ঝরিয়েছেন। তাতে কারও আপত্তি নেই। কিন্তু ‘মা জননীর’ রাজনীতি সম্পর্কে যা বলেছেন, তা গণতন্ত্রসম্মত কথা নয়। তারা ক্ষমতায় এলে কি ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি করবেন, তার প্রকাশ্য ঘোষণা রয়েছে মির্জা ফখরুলের ভাষণে। মির্জা ফখরুল খুলনার জনসভায় দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া যদি নির্বাচনের মাঠে নামেন, তিনি যদি আবার মাঠে মাঠে চারণ-কবির মতো রাজনীতি শুরু করেন, তাহলে এই স্বৈরাচারী সরকারকে, যারা জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, তাদের শুধু এই দেশ থেকে নয়, উপমহাদেশ থেকে চলে যেতে হবে।’ মির্জা ফখরুল এককালে চীনপন্থী বাম রাজনীতিক ছিলেন। শাখামৃগের মতো তিনি বাম ডাল থেকে ডান ডালে ঝম্প প্রদান করে তার অবস্থান পরিবর্তন করলেও দেশে বারবার কারা বন্দুকের জোরে জনগণের ভোটাধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছিলেন, তা কি তার জানা নেই? কোনো দল ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই যদি ঘোষণা দেয়, তাদের রাজনীতির ফলে প্রতিপক্ষকে দেশ ছাড়তে হবে, সেটা কোন ধরনের গণতান্ত্রিক রাজনীতি? অনেকেই আশঙ্কা করেন, বিএনপি এবার যে কোনো উপায়ে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসতে পারলে দেশে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে। প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি মাত্রা ছাড়াবে। শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নয়, সেক্যুলারপন্থী যে কোনো দল ও তাদের নেতাকর্মীদের দেশ ছেড়ে পালাতে হবে, নয় নির্যাতনের শিকার হতে হবে। বিএনপির ছত্রছায়ায় বসে প্রতিহিংসাপরায়ণ হিংস্র জামায়াত তাদের নেতা ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য দেশ রক্তে ভাসাবে। আবার হিংস্র মৌলবাদ মাথা তুলবে। সংখ্যালঘু ও নারী নির্যাতন অতীতের সব রেকর্ড ভাঙবে। দেশের এক বিরাটসংখ্যক মানুষ বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এই অবস্থার উদ্ভব হওয়ার আশঙ্কা করছেন। আমি তাতে বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু খুলনায় মির্জা ফখরুলের বক্তৃতা ঢাকার কাগজে পাঠ করে অনুমান হচ্ছে, বিএনপি আগামী নির্বাচনে জয়ী হলে মানুষের মনের এই আশঙ্কা সত্য হতে পারে। মির্জা ফখরুল হয়তো তার বক্তৃতায় সেই আভাসই দিচ্ছেন। গ্রেফতার হওয়ার আগে বেগম জিয়া বলেছিলেন, ‘দেশের প্রশাসন বিএনপির পক্ষে। কিন্তু এই প্রশাসনেরই বহু লোক তারেক রহমান দেশে ফিরে ক্ষমতায় বসলে কী করবেন, তা ভেবে শঙ্কিত। এই শঙ্কা কি অমূলক? আওয়ামী লীগকে দেশ ছাড়া করার হুমকি বিএনপি আজ যে নতুন দিল, তা নয়। কয়েক বছর আগে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতি অভ্যুত্থানের সময় বেগম জিয়া রুদ্রমূর্তি ধারণ করে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশত্যাগের আলটিমেটাম দিয়েছিলেন। শুধু হুমকি নয়, এই হুমকি কার্যকর করার জন্য অতীতে বহুবার চেষ্টা হয়েছে।
কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টারের মতো শীর্ষ পর্যায়ের বহু আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে অনেকবার। তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল গ্রেনেড হামলা। একদিনের হামলাতেই আইভী রহমানসহ অনেককে হত্যা এবং দেড় শতাধিক মানুষকে জখম করা হয়। তারপরও ২০১৪ সালের নির্যাতনের আগে ও পরে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার উচ্ছেদের আন্দোলনের নামে দেশব্যাপী যে পেট্রলবোমা হামলা চালিয়ে নিরীহ নর-নারী শিশুকে পর্যন্ত হত্যা করেছে, সেই সন্ত্রাসের কথা কি দেশের মানুষ এত শিগগির ভুলে গেছে? ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ২০১৪ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সন্ত্রাস পর্যন্ত বিএনপির প্রতিষ্ঠাতারা এবং বর্তমান নেতারা আওয়ামী লীগকে দেশের রাজনীতি থেকে নির্মূল করার জন্য যত চেষ্টা করেছেন, তা সফল হয়নি। বর্তমানে হুমকি দিয়ে কি তা সফল করা যাবে? কোনো রাজনৈতিক দল যত বড়ই হোক রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারে না, যদি তার পেছনে জনসমর্থন না থাকে। ভারতের হিন্দু মহাসভা, পাকিস্তানের কনভেনশন মুসলিম লীগ ও মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ইতিহাস সেকথাই বলে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বেলাতেও সেকথা সত্য হবে, যদি তারা জনসমর্থন হারায়। কেবল নির্বাচনে পরাজিত হলেই কি প্রতিপক্ষ দলকে দেশছাড়া করা যায়? তাহলে বিএনপি দলটি এখনও দেশে টিকে আছে কি করে? দলের বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান তো বহুকাল দেশছাড়া। তাতে দল তো দেশছাড়া হয়নি। ২০০১ সালের নির্বাচনে জিতে বিএনপি আওয়ামী লীগ সমর্থক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে, আওয়ামী লীগারদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে এই দলকে দেশছাড়া করতে পারেননি। তারা আবার ক্ষমতায় এসেছে এবং এখনও দেশ শাসন করছে। বরং বিএনপিই এখন আওয়ামী লীগ সরকার তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালাচ্ছে বলে মাতম জুড়ে দেশের মানুষের সহানুভূতি ও সমর্থন কুড়োবার চেষ্টা করছে। এসব নির্যাতনের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে বিএনপি তা জনগণের সামনে তুলে ধরে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে তার প্রতিকার করতে পারে। তার বদলে মাঠে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগকে দেশছাড়া করার আগাম ঘোষণা তো বিএনপির অতীতের প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতির পুনরাবৃত্তি করার আশঙ্কাই মানুষের মনে জাগিয়ে তুলবে। সেজন্যই বিএনপি-জোট আগামী নির্বাচনে জয়ী হলে দেশে কি ঘটতে পারে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের মধ্যে এত আশঙ্কা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে, এটা দলীয় গৌরব নয়, জাতীয় গৌরব। এজন্য বিএনপির উচিত দেশের এই গৌরবে নিজেরাও গর্বিত হওয়া এবং আওয়ামী লীগ সরকারকে অভিনন্দন জানানো। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারেরও উচিত, বিএনপি যাতে টালবাহানা না করে নির্বাচনে আসে তার পরিবেশ তৈরি করা। দলটির শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশে বাধা না দেয়া, তাদের কর্মী ও নেতাদের পুলিশের দ্বারা হেনস্তা না করা। বিএনপির উচিত হুমকি-ধমকি দেয়া ও সন্ত্রাসের পথ ত্যাগ করে গণতান্ত্রিক চরিত্র ধারণ করা এবং আগামী সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ দ্বারা দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। আওয়ামী লীগ জন্মাবধি রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার। এই নির্যাতন দ্বারা দলটিকে কেউ ধ্বংস করতে পারেনি, বরং দলটির জনসমর্থনের শিকড় আরও শক্ত হয়েছে। এই দলের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং বর্তমানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এমন দলের একটি নির্যাতক চেহারা দেশের মানুষ দেখতে চায় না। আওয়ামী লীগ যদি এ সম্পর্কে সতর্ক হয় এবং বিএনপিও হুমকি-ধমকির অতীতের অভ্যাস বর্জন করে, তাহলে সব দলের অংশগ্রহণে দেশে এবার একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আমার নিশ্চিত বিশ্বাস।

Monday, October 12, 2015

হাসিনা সরকারকে গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নেয়ার চেষ্টা by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

সন্ত্রাসের সমস্যা এখন একটি বিশ্ব সমস্যা। সন্ত্রাস নেই এমন একটি দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমন যে কমিউনিস্ট চীন এবং রাশিয়া তাও এখন সন্ত্রাসকবলিত। এ সন্ত্রাস নানা ধরনের। তার সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে তথাকথিত ইসলামী জঙ্গি সমস্যা। এ সমস্যা উপমহাদেশেও ছায়া ফেলেছে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার অনেকটা সাফল্যের সঙ্গেই এ সমস্যার মোকাবেলা করছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো তালেবান বা আল কায়দা বাংলাদেশে যুদ্ধ শুরু করতে পারেনি। কিংবা আইএস বাংলাদেশে ঘাঁটি গাড়তে পারেনি। তবে জামায়াত বা অন্য কোনো উগ্র মৌলবাদী দল আইএসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে কিংবা তাদের হয়ে বাংলাদেশে কাজ করতে পারে। কিন্তু দেশের গোয়েন্দারা অনেক খোঁজখবর নিয়েও আইএসের ঘাঁটির কোনো সন্ধান পায়নি।
সম্প্রতি বাংলাদেশে যে দু’জন বিদেশী নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও এ ঘটনা এমন কোনো বড় ঘটনা নয় যে তাতে প্রমাণ হয়ে গেছে, বাংলাদেশে আইএসের আবির্ভাব ঘটেছে কিংবা সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে আমেরিকা তিলকে তাল করে দেখাচ্ছে। এ দুটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো দেশ বাংলাদেশে ক্রিকেট টিম পাঠানো বাতিল করাসহ বাংলাদেশে বসবাসকারী তাদের নাগরিকদের সতর্ক করে দিচ্ছে। কোনো কোনো দেশ তাদের মন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছে। আমেরিকা তো এ বিদেশী হত্যার হোতা কারা তা নির্ধারিত হওয়ার আগেই বাংলাদেশে কল্পিত আইএস-সন্ত্রাস দমনের জন্য সরকারকে সাহায্য দানের প্রস্তাব দিয়েছে। এ প্রস্তাবের অর্থ জঙ্গি দমনে সাহায্যদানের নামে বাংলাদেশের মাটিতে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি কি?
একজন ইতালীয় এবং একজন জাপানি নাগরিক দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, এ হত্যাকারীদের অবিলম্বে ধরা হবে এবং শাস্তি দেয়া হবে। সামরিক ও অসামরিক গোয়েন্দারা সঙ্গে সঙ্গে তদন্তে নেমেছে এবং তদন্ত কার্যে যে অগ্রগতি ঘটেনি তাও নয়। ঢাকার কূটনীতিকপাড়াতেও বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আরও দু’চারদিন না গেলে বোঝা যাবে না, এ হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ কতটা সাফল্য অর্জন করবে।
ওই বিদেশী হত্যার পরপরই প্রাথমিকভাবে সন্দেহ পতিত হয়েছে বিএনপি-জামায়াতের দিকে। এ সন্দেহ দেখা দেয়ার সঙ্গত কারণও রয়েছে। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের কারও দণ্ডাদেশ ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীদের তৎপর হতে দেখা যায়। এবার যে দু’জন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ আপিল আদালত বহাল রেখেছেন তারা দু’জনেই বিএনপি ও জামায়াতের প্রভাবশালী নেতা। তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল থাকায় জামায়াত-শিবির তার হিংসাÍক প্রতিক্রিয়া দেখাবে এটা অনেকেই ধরে রেখেছিলেন। বাস্তবে ঘটেছেও তাই।
তবে বিএনপি-জামায়াতের আগের সন্ত্রাসের সঙ্গে এ সন্ত্রাসের পার্থক্য এই যে, আগে দেশের নিরীহ মানুষ এ সন্ত্রাসের শিকার হতো, এবার হয়েছেন দু’জন বিদেশী নাগরিক। তার কারণ হয়তো এই যে, দেশের মানুষ হত্যা করে বিদেশের বিশেষ করে প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশগুলোর টনক নড়ানো যায়নি। বিদেশী হত্যা দ্বারা তাদের টনক নড়ানো যাবে। বাংলাদেশের ব্যাপারে হাসিনা সরকারকে চাপে রাখার জন্য আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলো এক রকম তৈরি হয়েই বসে আছে, এখন এটা তাদের উদ্দেশ্য পূরণের সুযোগ এনে দিয়েছে।
অথচ এ পশ্চিমা দেশগুলো দু’দিন আগেও দেখেছে বাংলাদেশে নির্বাচন বানচাল এবং সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে বিএনপি-জামায়াতের দ্বারা পরিকল্পিতভাবে যে পেট্রলবোমা সন্ত্রাস শুরু হয়েছিল, হাসিনা সরকার তা সাফল্যের সঙ্গে দমন করেছে। তার পাশাপাশি উগ্র মৌলবাদী তৎপরতা বন্ধ করা এবং তাদের গ্রেফতার অভিযানেও সফল হয়েছে এই সরকার। প্রশংসা করেছেন পশ্চিমা দেশগুলোই, বিশেষ করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামা। তারা জানেন, এই বিদেশী হত্যার সন্ত্রাসও বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব উদ্যোগেই (অবশ্যই পশ্চিমা দেশগুলোর নৈতিক সমর্থনসহ) বন্ধ করার কাজে সক্ষমতা দেখাতে পারবে।
তাহলে মাত্র দুটি হত্যাকাণ্ডের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোজুড়ে এত হইচই কেন? সৌদি আরবে সরকারি অব্যবস্থাপনায় হাজারের ওপর বিদেশী হাজী পদপিষ্ট হয়ে মারা যাওয়া নিয়ে যত হইচই করা হয়নি, তার চেয়ে বেশি হইচই করা হচ্ছে বাংলাদেশে দু’জন বিদেশীকে হত্যা করা নিয়ে। এটা কি কোনো পরিকল্পিত হইচই? এর চেয়ে বড় এবং বেশি হত্যাকাণ্ড কোনো পশ্চিমা দেশে ঘটলেও তা নিয়ে এত হইচই করা হয় না। অবশ্যই বাংলাদেশে বিদেশী হত্যাকাণ্ডের দুটি ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত এবং বাংলাদেশ সরকার তা করেছেও। পশ্চিমা দেশগুলো সন্ত্রাস দমনে আন্তরিক হলে তাদের উচিত বাংলাদেশে সন্ত্রাসের ভীতি না ছড়িয়ে এ হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে দেশের সরকারকে নৈতিক সাহায্য ও সমর্থন দেয়া।
সে কাজটি তারা করছেন না। বরং বাংলাদেশে বিদেশীরা নিরাপদ নয় এই ধুয়া তুলে দেশটিকে আপাতত হলেও সামাজিক ও সমষ্টিগত বয়কটের ব্যবস্থা করে বর্তমান সরকারকে বিব্রত করছে এবং সম্ভবত কোনো উদ্দেশ্য পূরণের জন্য চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। আমেরিকা তো দাবি করে বসেছে, এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার আগে বাংলাদেশে বিদেশীদের ওপর হামলা হতে পারে বলে সরকারকে সতর্ক করা হয়েছিল। ওয়াশিংটনের গোয়েন্দারা যদি এই হামলার আগাম খবর পেয়ে থাকেন, তাহলে এই হামলাকারী কারা সে খবরও কি তারা পাননি? তাদের সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারকে ওয়াশিংটন তখনই সতর্ক করেনি কেন? নাকি তাদের উদ্দেশ্য, নিউইয়র্কের নাইন-ইলেভেনের হামলা চালানোর সুযোগ দিয়ে তারপর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার নামে ইরাক যুদ্ধের পটভূমি তৈরি করার মতো উপমহাদেশেও কোনো অঘটন ঘটানোর চেষ্টা?
সত্য অপ্রিয়। তবু আমার এই অনুমানটির কথা না লিখে পারলাম না। বাংলাদেশ সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি প্রকাশ্যেই বলেছেন, বিদেশীদের ওপর হামলার ব্যাপারে তারা আগে কারও কাছ থেকে হুশিয়ারি পাননি। কিন্তু এটা যে আইএসের দ্বারা সংঘটিত হয়নি, সেটা তারা জানেন। বাংলাদেশে আইএসের কোনো ঘাঁটি নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে আইএস এই দুই হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব সঙ্গে সঙ্গে স্বীকার করল কেন? এখন জানা গেছে, আইএসের এই দায়িত্ব স্বীকারের প্রচারটিও সঠিক নয়। এক ইহুদি মহিলা আইএসের নাম ভাঙিয়ে এই দায় স্বীকারের বিবৃতিটি ছড়িয়েছেন। সুতরাং এখন এই প্রশ্নও তোলা যায় এই ইহুদি মহিলা কি ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং সেই সূত্রে আমেরিকায় সিআইএ’র সঙ্গেও যুক্ত?
দু’জন বিদেশীর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে দেশটিতে আইএসের অস্তিত্ব আবিষ্কার (কোনো প্রকার তদন্ত হওয়ার আগেই) এবং তাদের দমনের জন্য সাহায্য-সহযোগিতা দানে এগিয়ে আসার মার্কিন প্রস্তাব তাৎপর্যপূর্ণ। এভাবেই তারা সন্ত্রাস দমন ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য সাহায্যদানের নামে কোনো দেশে ঢোকে এবং শেষ পর্যন্ত তা তাদের সামরিক উপস্থিতিতে পরিণত হয় এবং শান্তির বদলে অশান্তির আগুন জ্বলে দেশটিতে। দেশটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে দেশটিতে প্রতিষ্ঠিত হয় মার্কিন তাঁবেদার সরকার। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া তার প্রমাণ। সিরিয়ায় আইএস দমনের নামে আমেরিকা ও ন্যাটোর হস্তক্ষেপ সারা বিশ্বে ভয়াবহ শরণার্থী সমস্যা সৃষ্টি করেছে।
অতীতে বন্যাদুর্গতদের ত্রাণকার্যের নামে বাংলাদেশে ঢুকে আমেরিকা দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন সামরিক ও ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহ করে দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের ‘মিলিটারি জোন’ প্রতিষ্ঠার ছক এঁকেছিল বলে তখনই অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। পাঠকদের স্মরণ থাকতে পারে, এ সময় বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা হয়। এ বন্যাদুর্গতদের উদ্ধার কার্যে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর দক্ষতা দেখাতে পারছে না এই অজুহাতে সরকারের কোনো পূর্ব অনুমতি না নিয়েই মার্কিন মেরিন সেনা দল বাংলাদেশে ঢোকে এবং ত্রাণকার্যের দায়িত্ব সরাসরি নিজেদের হাতে তুলে নেয়। ত্রাণকার্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের সেনা দলকে তাদের খবরদারি মেনে নিতে হয়।
তারপর মিডিয়ায় এ নিয়ে কম লেখালেখিও হয়নি। অভিযোগ উঠেছিল, মার্কিন সেনারা ত্রাণকার্য চালিয়েছে বটে, কিন্তু তাদের গোপন সামরিক উদ্দেশ্যও পূরণ করে গেছে। আর ত্রাণকার্যে আমাদের সেনা টিম দক্ষ ছিল না, এ অভিযোগটিও ছিল অসত্য। উদ্দেশ্যমূলক বিদেশী প্রচারণা। ত্রাণকার্যে বা দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের সেনা টিম যে মোটেই অদক্ষ নয়, তার প্রমাণ মিলেছে হাসিনা সরকারের সময়ে বন্যাদুর্গতদের জন্য ত্রাণ অভিযান পরিচালনা এবং রানা প্লাজায় সংঘটিত ভয়াবহ ভবন ধসের সময় উদ্ধারকার্য এবং নিহতদের লাশ খোঁজার সময়। বাংলাদেশের মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং টিমের বিস্ময়কর দক্ষতার তখন উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন ব্রিটেনসহ বিদেশী বিশেষজ্ঞরাও।
ঢাকা এবং রংপুরে দু’জন বিদেশী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং হত্যাকারীদের শনাক্তকরণ দ্বারা এই সন্ত্রাস দমনেও বাংলাদেশ তার নিজস্ব উদ্যোগেই সফল হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আর সফল না হলে বিদেশীরা সাহায্যদানের উছিলায় এসে পানি ঘোলা করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারবেন না। কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের পরতো মার্কিন এফবিআই বাংলাদেশে ছুটে এসেছিল তদন্ত চালানোর জন্য। তাতে রহস্যের কোনো কিনারা হয়েছে কি? বর্তমান বিদেশী হত্যাকাণ্ডেও সন্ত্রাস দমনের নামে আমেরিকাকে বাংলাদেশে নাক গলানোর সুযোগ দেয়া বিপজ্জনক হতে পারে। তাতে খাল কেটে কুমির ডেকে আনা হবে। সন্ত্রাস তখন পাকিস্তানি ও আফগানিস্তানের মতো ভয়াবহ অবস্থায় চলে যেতে পারে। উপমহাদেশে মধ্যপ্রাচ্যের ধ্বংসযজ্ঞের সম্প্রসারণ ঘটতে পারে।
বর্তমানে হাসিনা সরকার পশ্চিমা শক্তিগুলোর কঠোর চাপের মধ্যে আছে। শেখ হাসিনাকে জাতিসংঘে ডেকে নিয়ে নানারকম স্তুতি ও খেতাবের উচ্চ গাছের মাথায় তুলে দিয়ে এখন মই কেড়ে নেয়ার চেষ্টা হচ্ছে মনে হয়। শেখ হাসিনার দৃঢ়তা ও মনোবলের ওপরই নির্ভর করে এবারের ক্রাইসিসও তিনি দক্ষতা ও ধৈর্যের সঙ্গে পার হতে পারবেন কিনা।
লন্ডন ১১ অক্টোবর, রবিবার, ২০১৫

Monday, July 13, 2015

‘আল্লাহর নাম কাবার প্রধান মূর্তির নাম থেকে এসেছে’ -আবদুল গাফফার চৌধুরী

আবদুল গাফফার চৌধুরী
লেখক ও কলামনিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী আল্লাহর নাম নিয়ে আবারও একই ধরণের বক্তব্য দিলেন। নিউইয়র্ক ভিত্তিক টেলিভিশন ‘টাইম টেলিভিশনে’ দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আগের দেয়া বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের সময় তিনি বলেছেন, আল্লাহ’র নাম কাবার প্রধান মূর্তির নাম থেকে এসেছে।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আল্লাহর যে ৯৯ নাম, সেগুলো কাবা শরীফের দেব-দেবীর নাম ছিল। এর একটি বড় প্রমাণ হলো, আমাদের মহানবী (সা.)-এর পিতার নাম ছিল আবদুল্লাহ। আল্লাহ শব্দটি এসেছে কাবা শরীফে ইলাত নামে প্রধান যে মূর্তিটি ছিল, সেখান থেকে। কেউ বলে ইলাত, কেউ বলে ইলাহ। আবদুল গাফফার চৌধুরী তার বক্তব্যের বিরোধিতাকারীদের সম্পর্কে বলেছে, তারা প্রমাণ দেখাক। আমি অন্তত এক ডজন আরবি কেতাব দেখাতে পারবো। যেখানে এই নাম, দ্বিতীয় প্রধান দেবতার নাম ছিল রহমান। তিনি বলেন, আমাদের রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন, তখন তার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী দেখা দিয়েছিল। সে নিজেকে আল্লাহ দাবি করে বলেছিল, প্রধান দেবতা হচ্ছেন রহমান। এদেশে বহুদিন আমাদের রাসুলুল্লাহ ও মুসলমানদের লড়াই করতে হয়েছে। এভাবে রহমানও অ্যাডাপ্টেড হয়ে যায় ইসলামের নামে।
এক প্রশ্নের জবাবে গাফফার চৌধুরী বলেন, আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে জামায়াত-হেফাজতীরা। জাতিসংঘ মিশনে আমার বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডায় নেমেছে। যোগ দিয়েছে কিছু সুবিধাবাদী। তিনি বলেন, অসত্য বেশিদিন টিকবে না।
গত ৩রা জুলাই শুক্রবার ম্যানহাটনে বাংলাদেশ মিশনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে একক বক্তব্যে অংশ নেন তিনি। সেখানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও পর্দা নিয়ে তার মন্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি ওই দিন যে বক্তব্য দিয়েছি, তা যথার্থ ছিল। এটা নিয়ে আমার বিরুদ্ধে জামায়াত ও হেফাজতীরা অপপ্রচার চালাচ্ছে।
গাফফার চৌধুরী তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলেন, আমাদের বাংলা ভাষাকে বলা হতো হিন্দুর ভাষা, এটা ঠিক নয়। বাংলায় ইসলাম প্রচার করা হয়েছে বাংলা ভাষাতেই। আরবে ইসলাম প্রচার করায় হয়েছে আরবি ভাষাতেই যদিও সে ভাষা এককালে কাফেরদের ভাষা ছিল। তাতে কিছু যায় আসে না। পরবর্তীতে, তা ইসলামের ভাষা হয়েছে। আমাদের নাম, আমাদের সংস্কৃতির কার্যকলাপ মিশ্রিত। কোনটাই ধর্মভিত্তিক নয়। আমাদের বিয়ে, আমাদের নামকরণ। আরবরাও তাই করেছে।

Tuesday, July 7, 2015

গাফফার চৌধুরী এবং লাত, উজ্জা আর মানাত দেবী by আরিফুর রহমান

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ছবি বানানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন গাফফার চৌধুরী, অমিতাভ বচ্চনকে কাস্ট করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি রাজী হচ্ছিলেন না । নিউ ইয়র্কের শামীম—এন আর বি সম্মেলনের উদ্যোক্তা, ঢাকাতে আমার সাথে গাফফার ভাইয়ের মিটিং করালো যাতে আমার ভারতীয় ব্যবসায়ী বন্ধুদের দিয়ে অমিতাভকে রাজী করানো যায়। অমিতাভের বিপদের দিনে যারা তার কাছে ছিলেন তার মধ্যে বিনয় মালো একজন। (Vinay Maloo, chairman ENSO group, India) গুজরাটি বিনয়দা কোলকাতা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেছেন, অনর্গল বাংলা বলেন। শামীম আমার সাথে বিনয়দার ঘনিষ্ট সম্পর্কের কথা জানতো। তাকে ব্যাপারটি জানালে উনি অমিতাভকে রাজী করিয়ে ফেললেন। কিনতু গাফফার ভাইয়ের তরফ থেকে আর যোগাযোগ হলোনা, শামীমও কিছু জানেনা। বিনয়্দার সাথে কথা হলেই জোক করেন, কি দাদা, আপনার বঙ্গবন্ধু ফিল্মের কি হলো, মুন্না ভাই (অমিতাভের ডাক নাম ) দো দফা পুছাথা, আমি বলেছি, বাঙালিকা বাত সিরিয়াসলি নেহি লেনা। হা হা হা হা— অট্টহাসি । আমি বোকার মতো চুপ করে থাকি।
কিন্তু নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশনের রাষ্ট্রদূত ডক্টর এ কে আব্দুল মোমেনের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে একমাত্র আলোচক আবদুল গাফফার চৌধুরী সাহেব যে কথাগুলি বলেছেন, তা সিরিয়াসলি নিয়েছেন সবাই। লতিফ সিদ্দিকী এই নিউইয়র্কেই ইসলাম সম্মন্ধে যে অজ্ঞতা প্রসূত সমালোচনা করেছিলেন তাতে শারিয়া মতে তিনি মুরতাদ, ইসলামী পণ্ডিতরা তাই মনে করেন। শাস্তিও পেয়েছেন, জেলে গিয়েছেন। এখনো উনি তওবা করেননি, এবং উনি একবার বলেছেন, উনি দুঃখিত নন, যা বলেছেন তা নিয়ে। দুনিয়াতে ওনার কি হবে জানিনা, কিন্তু আখরাতে কঠিন বিচারের সম্মুখীন ওনাকে হতেই হবে।
এই আলোচনাগুলি নিশ্চয়ই গাফফার ভাইয়ের চোখে পড়েছে, তারপরও উদ্ভট সব মন্তব্য করার কি দরকার ছিল? আবার সেই একই জায়গায়,— নিউ ইয়র্কেই?
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, ‘আজকের আরবি ভাষায় যেসব শব্দ এর সবই কাফেরদের ব্যবহৃত শব্দ। যেমন— আল্লাহর ৯৯ নাম, সবই কিন্তু কাফেরদের দেবতাদের নাম। তাদের ভাষা ছিল আর-রহমান, গাফফার, গফুর ইত্যাদি। সবই কিন্তু পরবর্তীতে ইসলাম এডাপ্ট করেছিল।’
আল্লাহ জাল্লাহ শানুহুর ৯৯ নামের কিছু নাম এসেছে আল্লাহর নিজের পছন্দে যা কোরআনুল করিমে আল্লাহ নিজেকে নিজে অভিহিত করেছেন, কিছু এসেছে জিব্রায়িল ফেরেশতার পরমর্শে। ৯৯ নামের হাদিসটি আবু হোরায়রা (রা) বর্ণিত, এর সনদ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
কাবা শরীফে ৩০০ এর উপরে যে মূর্তিগুলি ছিলো তাদের নামের সাথে আল্লাহর ৯৯ নামের কোনো মিল নেই, লাত, উজ্জা, মানাত, অবগাল, দুল খালসা, হুবাল, মালাকবেল, এল্লাহ, নেব, নের্গাল, সিন সুয়া, নুহা, সুয়া, রুভা ইত্যাদি। শুধু এল্লাহ নামটি আল্লাহর নামের কাছাকাছি, কিন্তু এল্লাহ দেবতার নাম হলেও কাফেররা আল্লাহকে আল্লাহই ডাকতো। কিনতু আল্লাহর গুনবাচকতায় বিভিন্নতা ছিলো।
হজরত আলী (রা)র পিতা আবু তালেব নবী মোহাম্মদ (সা )কে এতিম অবস্থা থেকে পেলেপুষে বড় করেছেন, বিপদের সময় সহায়তা করেছেন। আবু তালেবের মৃত্যুর সময় নবী (সা ) বললেন,— চাচা, এই শেষ সময়ে আপনি বলেন আমি মোহাম্মদের আল্লাহর ওপর ইমান রেখে মরলাম। আবু জাহেল তার দলবল নিয়ে পাশে ছিলো। সে বললো,— ভ্রাত: মরার সময় যদি আপনি আমাদের বাপ দাদার আল্লাহকে অস্বীকার করেন, আরবের মেয়েলোকরা পর্যন্ত হাসবে এই বলে যে, আপনি মরার সময় আসল আল্লাহকে ছাড়লেন। নবী (সা ) বললেন, আপনি আমার কানে কানে ফিস ফিস করে একবার বলেন, আমি মোহাম্মদের আল্লাহর ওপর ইমান রেখে মরলাম, আমি বিচার দিনে আপনার তদ্বির করব জান্নাতের জন্যে। আবু তালেব মরার আগে ঘোষণা করলেন, আমি আমার বাপ দাদার আল্লাহর ওপরে ইমান রেখেই মরলাম। নবী (সা ) জানালেন, আমার চাচা তার বাপ দাদার আল্লাহর ওপর বিশ্বাসের কারণে জাহান্নামে যাবেন, কিন্তু নবীকে সহায়তা করায় লঘু শাস্তি দেবেন আল্লাহ।
শাব্দিক উচ্চারণে একই আল্লাহ শব্দে আল্লাহকে ডাকতো কাফেররা এবং মুসলমানরা, কিন্তু ৯৯ বা ততোধিক নামের গুনবাচকতার অর্থে মুসলমানদের আল্লাহ আলাদা, দেবতাদের যে নামেই ডাকা হতনা কেন, সেগুলি আল্লাহর নাম ছিলনা। দেবতাদের নাম থেকে আল্লাহর নাম এডাপ্ট করা হয়নি। উনি কোথায় পেলেন এই তথ্য ?
নারীদের বোরকা ও হিজাব নিয়ে গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে এটা হচ্ছে ওহাবিদের লাস্ট কালচারাল ইনভলব। আমি অবাক হচ্ছি। ক্লাস টুয়ের মেয়েরা হায়েজ-নেফাজ পড়বে ! এটা আমাদের ধর্ম শিক্ষা হতে পারে?’ তিনি বলেন, ‘মুসলমান মেয়েরা মনে করে হিজাব, বোরকা হচ্ছে ইসলামের আইডেন্টিটি। আসলে কী তাই? বোরকা পরে যাচ্ছে কিন্তু প্রেম করছে। আবার ইন্টারনেটেও প্রেম করছে। আচরণ ওয়েস্টার্ন কিন্তু বেশভূষা ইসলামিক করে আত্মপ্রতারণা করছে তারা।’
গাফফার ভাই পর্দা আর বোরখাকে গুলিয়ে ফেলেছেন। আল কোরানে আল্লাহ বলেন, ‘‘তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের মুখের ওপর টেনে দেয়। তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে। তারা যা সাধারনত প্রকাশ করে থাকে তা ছাড়া তাদের আভরণ প্রদর্শন না করে, তাদের ঘাড় ও বুক যেন মাথার কাপড়ে ঢাকা থাকে।( ৩৩:৫৯, ২৪:৩০-৩১)।’’
যে হুকুম আল্লাহ দিয়েছেন তা ওহাবিদের ঘাড়ে চাপালেন তিনি অজ্ঞানতা বশত।
শুধু মুসলমান মেয়ে নয়, আসল আহলে কিতাব ইহুদি রমনী, পেনসিলভানিয়ার আমিষ গোত্রের মেয়েরা, ক্রিস্টান নান এরা সবাই বোরখা পরে, এদের কেউ কেউ হয়ত প্রেম করে ইন্টারনেটে, এরা অধিকাংশই ওয়েস্টার্ন দেশে থাকে, শুধু দোষ হলো বাঙালী মুসলমানদের? যে মুসলমান মেয়েরা হেজাব পরে তার অধিকাংশই আল্লাহর হুকুম হিসাবে এটি পালন করে।
গাফফার ভাই কি জানেন আমেরিকান কারিকুলামে সেভেন্থ গ্রেডে সেক্স এডুকেশন দেয়া হয় বাধ্যতামূলক, এবং বিস্তারিত ভাবে। সেই ক্লাসে থাকলে আপনি শরম পাবেন। সেখানে বাংলাদেশে ছাত্রীদের হায়েজ নেফাস পড়ালে ইসলামের দোষ হয়ে গেলো ?
উনি প্রশ্ন করেছেন, ‘‘সৌদি আরবের নাম কেন সৌদি আরব হলো, এর নাম হবে মোহাম্মদিয়া।’’ এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারতো মরহুম বাদশাহ আবদুল আজীজ যিনি যুদ্ধ করে হেজাজ নাজদ দখলে নিয়ে তার দাদার নামে দেশের নাম রেখেছিলেন। তার দাদা এই এলাকার বিতারিত রাজা ছিলেন। সৌদি আরবে বর্তমান রাজারা নিজেদের রাজা বলেন না, তারা পরিচয় দেন দুই হারাম মসজিদের খাদেম বলে, মোহাম্মদ (স) এর বর্ণিত পথেই তারা দেশের শাসন চালায়, কোরানের আইনে। নামে নয় তারা কামে আছেন কোনো না কোনো ধরনে।
গাফফার সাহেব বলেছেন, কাবা শরীফের দরজার নাম বাদশাহের নাম আছে সাহাবাদের নামে নয়। এ পর্যন্ত নাম ওয়ালা আর নাম্বার ওয়ালা গেট আছে ৯৫ + টির। এর মধ্যে দুইজন রাজার নামে দুটি ছিল এখন বাদশাহ আব্দুল্লাহর নামে এর একটি হয়েছে। কাবার সম্প্রসারণ হলে কতশত দরজা হবে, তা এখনো বোঝা যাচ্ছেনা। পৃথিবীর সবচেয়ে বিশাল স্থাপনায় ৩জন রাজার নাম আছে মাত্র, যারা এটির ঐতিহাসিক সম্প্রসারণ করেছেন। সাহাবীদের নাম কেন রাখা হয়নি জানিনা, কিন্তু করাচী গেট বলে একটি দরজা আছে। নবী (সা ) এর খালা উম্মে হানীর নাম একটি গেট আছে, উম্মে হানীর বাসা থেকে নবী (স) মেরাজে সফর করেছিলেন, পৃথিবীর সর্ব প্রথম এস্ট্রনট যিনি আলোর গতির চেয়ে বেশি বেগে অজানা ইউনিভার্স দেখে এসেছেন। আমরা অন্ধভাবে তা বিশ্বাস করি, তাই আমরা মুমিন।
গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, ‘রসুল মানে দূত, অ্যাম্বাসেডর। রসুলে সালাম মানে শান্তির দূত। রসুল বললেই আপনারা মনে করেন হযরত মুহম্মদ (সা), তা কিন্তু নয়। যখন রসুলুল্লাহ বলবেন তখন মনে করবেন আল্লাহর প্রতিনিধি। এখন মোমেন ভাই আমেরিকায় থেকে যদি বলেন কিংবা আমি নিজেকে রসুল দাবি করলে কল্লা যাবে।’
উনি কি জানেন, রসুল তাকে বলা হয়, যার ওপরে রেসালত বা আসমানী বা এলিয়েন গ্রন্থ নাজেল হয় জিব্রাইলের মাধ্যমে। রসুল মাত্র চারজন, দাউদ,মুসা, ইসা (আ) এবং মুহাম্মদ (সা), আর যারা শুধু আল্লাহর তরফ থেকে তার দিকে মানুষদের ডাকেন কোনো বই নাজেল ছাড়া তারা নবী, সব নবী রসুল নন। যেমন নূহ নবী, সালেহ নবী। গাফফার ভাই, আমরা রসুল বললে তাই মুহাম্মদ (সা )কেই বুঝি। আপনি কি ইসলাম বুঝলেন ?
তিনি বলেন, ‘পুরো দেশ এখন দাড়ি-টুপিতে ছেঁয়ে গেছে। সরকারি অফিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টুপি আর দাড়ির সমাহার। অথচ তারা ঘুষ খাচ্ছেন। এত বড় দাড়ি, এত বড় টুপি, কিন্তু ঘুষ না পেলে ফাইলে হাত দেন না- এটা কী ইসলামের শিক্ষা?’
গাফফার ভাই, আমার আপনার প্রিয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে ইউনিফর্ম পরা কতিপয় সেনা সদস্য। এখন কি এই অন্যায়ের জন্যে সামরিক উর্দির দোষ হয়ে যাবে? টুপি দাড়িওয়ালারা ঘুষ খেলে ইসলামের দোষ বা শিক্ষা কেমন করে হয়? কোনো ইউনিফর্মের নাম অথবা যে কেউ দাড়ি লন্বা করার নাম ইসলাম নয়,— টুপি, ক্যাপ, পাগড়ি, হেলমেট দিয়ে মাথা ঢাকলেই মুসলমান হয়না। আল্লাহর ওপর অন্ধ বিশ্বাস, আর আমলের ওপর থাকার নাম ইসলাম।
আপনি বলেছেন, "ফেইথ পরিবর্তনশীল, কিন্তু বাঙালিত্ব চিরস্থায়ী। আমি আব্দুল গাফফার চৌধুরী ধর্ম পরিবর্তন করে হয়ে যেতে পারি গওহর রঞ্জন চক্রবর্তী, কিন্তু বাঙালিত্ব পরবর্তন হতে পারেনা।এটি আমাদের পরিচয়।"
দাদা, এখানেও ভুল করলেন।জন্মগত ভাবে হিন্দু না হলে আপনি এই ধর্মের হতে পারবেন না। হিন্দু বা সনাতন ধর্মের আচার পালন করতে পারবেন, অনেক হিপ্পী আমেরিকানদের মতো, আর চক্রবর্তী ব্রাম্মন হওয়ার তো প্রশ্নই আসেনা। যাই হোক বাঙালিত্বকে মহিমা দিতে গিয়ে আপনার ধর্ম বদলানোর উদাহরণটি না দিলেও চলতো। বঙ্গবন্ধু তার পরিচয়ে কিন্তু বলতেন আমি বাঙালি, আমি একজন মুসলমান। তার চেয়ে বড় বাঙালি প্রেমিক আর কে হতে পারবে ?
আমার খারাপ লাগছে বড় ভাই ডক্টর মোমেনের জন্যে, বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রী দেওয়ান গাজী সাহেবের সঙ্গে যখন উনি চাকুরী করতেন তখন থেকে আমি আর বন্ধু ডাক্তার সাদেক ( প্রিন্সিপাল Drexel Medical School, USA) তার স্নেহ ধন্য। উনি নিশ্চয়ই বিব্রত বোধ করেছিলেন তার এই সভায়। আমি জানি উনি তার স্বভাব সুলভ অমায়িকতায় বলবেন, গাফফার ভাই যা বলতে চেয়েছেন তা হয়ত বোঝাতে পারেননি। কোনো ভুল হলে আল্লাহ আমাদের সবাইকে মাফ করবেন, আল্লাহ তো রহমানুর রাহীম।
লম্বা হয়ে যাচ্ছে, নাহয় আরো লিখতাম। আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো গান গাফফার চৌধুরীর কলম থেকে বেরিয়েছে। গনতন্ত্রের জন্যে, জাতির পিতার জন্যে আপনার ভালবাসার তুলনা হয়না। এক সময় মাদ্রাসায় পড়েছেন। বরিশালের উলানিয়ার জমিদার ছিলেন আপনার পূর্ব পুরুষ। আমার দাদার কাছে আপনাদের বাড়ির গয়না নৌকার গল্প শুনেছি। আল্লাহর নবীর সুন্নতের মতো আবু তালেবের মত আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছি, আল্লাহর কাছে মাফ চান, ইসলামকে বুঝে এর সমালোচনা করুন। কারণ আপনাকে কাছ থেকে দেখেছি, আপনাকে অনেক ভালোবাসি। কামনা করি আপনি তওবা করবেন, আপনার কলম থেকে আল্লাহর জন্যে এমন কথা বেরিয়ে আসুক যা পড়ে মানুষ ইসলামের দিকে চলে আসবে।

Sunday, July 5, 2015

আবু হোরায়রা মানে বিড়ালের বাবা, আবু বকর মানে ছাগলের বাবাঃ আব্দুল গাফফার চৌধুরী

এবার ধর্ম নিয়ে কথা বললেন সাংবাদিক ও কলামিস্ট আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। বললেন, আল্লাহর ৯৯ গুণবাচক নাম কাফেরদের দেবতাদের নাম ছিলো। এগুলো ইসলাম ‘এডপ্ট‘ করে, পরে বাংলা ভাষাও এডপ্ট করে। এগুলো এখন আরবি শব্দ। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেমন আবু হুরায়রা নামের অর্থ হচ্ছে বিড়ালের বাবা, আবু বকর নামের অর্থ হচ্ছে ছাগলের বাবা। এভাবে আমরা অনেকে নাম রাখি। তিনি বলেন, সাত শ' বছর ধরে আমরা ‘নামাজ’, ‘খোদা হাফেজ’ শব্দ বলেছি। এখন ‘সালাত’, ‘আল্লাহ হাফেজ’ শব্দে পরিণত হয়েছে। এগুলো ওহাবিদের সৃষ্টি। তিনি নিজে কিছুদিন মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন দাবি করে বলেন, এখন যে ইসলাম ধর্ম চলছে তা বাড়াবাড়ির ইসলাম। রসুলুল্লাহর (সা:) সময় মেয়েরা কাবা ও রওজা শরিফের মধ্যে প্রবেশ করতে পারতো। এখন পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে আব্দুল গাফ্ফার বলেন, আমেরিকানরা তালেবান সৃষ্টি করে এখন বিপদে পড়েছে। আর বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী দ্বীনে মোহাম্মদী নয়, তারা হচ্ছে দ্বীনে মওদুদী। হিজাব এবং বোরখা হচ্ছে মওদুদীর শেষ মতবাদ। আর জামায়াতে ইসলামী এক সময় কোরবানির গরুর চামড়া বিক্রির পয়সায় চলতো। আমেরিকার পতনের সাথে সাথে এদেরও পতন হবে। শুধু শুধু সাদ্দাম ও গাদ্দাফিকে হত্যা করা হলো ইসরাইলকে নিরাপদ করার জন্য।
তিনি বলেন, আল্লাহর রহমত বাংলাদেশ যদি পাকিস্তান থেকে আলাদা না হতো বাংলাদেশেও আজ তালেবান হামলা হতো। রক্তের গঙ্গা বয়ে যেতো।
সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লতিফ সিদ্দিকী এখানে (নিউ ইয়র্ক) কী বলে গেছে, এর জন্য আজও বাংলাদেশে বিক্ষোভ হচ্ছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসঙ্ঘ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ : অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত’ শীর্ষক লেকচার সিরিজে একমাত্র বক্তা হিসাবে এসব কথা বলেন আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত ড. এ কে আব্দুল মোমেন।
আব্দুল গাফফার চৌধুরী বলেন, হিন্দুদের মধ্যে যেমন গোরামি আছে, ইসলাম ধর্মেও মধ্যেও গোরামি আছে। ইসলাম ধর্মে আছে, বিধর্মীকে কতল করো। তাহলে তো রসুলুল্লাহ (সা:) মক্কা জয়ের পর একটি কাফেরকেও হত্যা করেননি। তিনি বলেন, অমুকে রসুলুল্লাহ (সা:)-এর বিষয়ে ব্লগে লিখেছে বলে তাকে কতল করতে হবে।
আমি বেঁচে থাকবো কি না জানি না, তবে আজকে একটা কথা বলতে পারি আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে পৃথিবীতে দুটি রাষ্ট্র বিলুপ্তি হবে। কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি এ দুটি রাষ্ট্র হচ্ছে পাকিস্তান ও ইসরাইল। একটি দেশ দক্ষিণ এশিয়াকে অশান্ত করে রেখেছে, আরেকটি দেশ মধ্যপ্রাচ্যকে অশান্তির মধ্যে রেখেছে। আমেরিকার পতনের সাথে সাথেই এদের পতন হবে। সৌদি আরবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এর নাম সৌদি আরব হবে কেন। তারা রসূলের (সা:) অনুসারী হলে এর নাম হবে মোহাম্মদিয়া। কাবা শরিফের দরজাগুলোর নাম বাদশাহদের নামে দেয়া হয়েছে। কোনো সাহবিদের নামে নয়।
বোরখা এবং হিজাব সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে আব্দুল গাফ্ফার বলেন, এটা হচ্ছে ওয়াহাবিদের সর্বশেষ মতবাদ। বাংলাদেশে ধর্মীয় উন্মাদনা ও আচার-আচরণ প্রসঙ্গে গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে একটা সময় ইরানের ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রভাব ছিল। সম্প্রতিকালে সৌদি আরবের আচার-আচরণ বইছে। আগে খোদা হাফেজ বলতাম, এখন বলা হয় আল্লাহ হাফেজ। নারীদের উৎসাহিত করা হয় হিজাব পরতে। হিজাব একটি আরব সংস্কৃতির পোশাক, বাঙালির নয়। বাংলাদেশে নারীদের শাড়ি-টিপ পরা - এগুলোর সবই হিন্দুত্ব উল্লেখ করে আব্দুল গাফফার চৌধুরী বলেন, একবার প্রেসক্লাবের সামনে কিছু নারী ভারতীয় পণ্য আমদানির বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালন করছিলেন। তাদের সবার পরনে ছিল ভারতীয় শাড়ি। তিনি বাংলাদেশে বিয়েতে হিন্দুত্বের প্রভাব প্রসঙ্গে বলেন, বিয়েতে সাত পকে বাঁধা ছাড়া সবই আমরা করে থাকি। বর্ষবরণ থেকে শুরু করে সর্বত্রই মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, গঙ্গার পানিতে আমরা ওজু করতে পারবো না, অথচ গঙ্গার পানির হিস্যা চাচ্ছি। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এরশাদ আগে আটরশি পীরের কাছে যেতেন। এখন সবাই মাজারে যান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এরপর আর কিছু থাকে না। মেজর জিয়া একটি বাণী পাঠ করলেই স্বাধীনতার ঘোষক হয়ে যেতে পারেন না। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ঘৃণা করেন উল্লেখ করে গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মেজর জিয়ার সঙ্গে এক মাস থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। জিয়া কখনো যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করেননি। তিনি শুধু পকেট থেকে চিরুনি বের করে চুল ঠিক করতেন আর খবর নিতেন কোনো রাষ্ট্রদূত আসছে কি না। আমি ওই সময় থেকেই জিয়াকে ঘৃণা করি। এছাড়া পরে তার জেড ফোর্সই ভেঙে দেয়া হলো।
মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং শিক্ষার প্রসার না ঘটলে জামায়াতসহ ইসলামী মৌলবাদী শক্তি বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও অসম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে পারে বলে আশংকা করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের দোষ-ত্রুটি আছে। তারপরও বর্তমান সরকার দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছে। দুর্নীতি রোধ করতে পারলে এবং শিক্ষা ও অর্থনীতিতে আরো উন্নয়ন ঘটালে দেশ একটি ঈর্ষণীয় গন্তব্যে পৌছতে পারবে। তিনি বলেন, যত দিন আমাদের ভাষা থাকবে, রবীন্দ্রনাথ থাকবে, বঙ্গবন্ধু থাকবে ততদিন বাংলাদেশকে তালেবান ধ্বংস করতে পারবে না। আমি বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, মৌলবাদী রাষ্ট্র আমরা চাই না, আমরা ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র চাই। বাংলাদেশে একবার স্বৈরাচার আইয়ুব এসে বলেছিলেন বাঙালিরা হচ্ছে দাসের জাতি, বুটের তলায় পৃষ্ঠ জাতি।
তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিকল্প নেতা সৃষ্টির কথা উল্লেখ করে বলেন, শেখ হাসিনার পর এই দলের নেতৃত্বে কে দেবেন এটা নির্ধারণ করা হয়নি। এটি নির্ধারণ না হলে বিরোধীরা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় চলে যেতে পারে। বর্তমান বিরোধী দলকে প্রয়োজনে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিএনপি সংসদ বর্জন করার কারণে এ বিরোধী দল তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সুস্থ বিরোধী দল তৈরি কঠিন বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তন করা যায়। একজন মুসলমান তার ধর্ম পরিবর্তন করে খ্রিস্টান হতে পারেন। কিন্তু জাতীয়তা পরিবর্তন করা যায় না। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী বক্তব্যের শুরুতে বাংলা ভাষার উৎপত্তি, এর ব্যবহার, হাজার বছর আগে ও পরে বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষা বর্জনের ইতিকথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অনেক ভাষার শব্দ এসে মিশে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। কাজী নজরুল ইসলাম তার অনেক কবিতায় আরবি ও ফার্সি শব্দ ব্যবহার করেছেন। এজন্য তাকে সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথও নজরুলের সমালোচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ চলিত বাংলার চেয়ে সাধু বাংলার প্রতি সমর্থন করেছিলেন। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের মুখের কথাই আজ বাংলা ভাষার সম্ভার। এই ভাষা বাংলাদেশ থেকে কখনও হারিয়ে যাবে না।
অনুষ্ঠানে আব্দুল গাফফার চৌধুরীকে জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিশনের পক্ষ থেকে আজীবন সম্মাননা স্মারক ও গ্রন্থ প্রদান করা হয়।

‘আল্লাহর ৯৯ নাম কাফেরদের দেবতাদের নাম ছিল’ -আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী

আল্লাহর ৯৯ নাম কাফেরদের দেবতাদের নাম ছিল বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট কলামিস্ট আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। গত শুক্রবার বিকালে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন আয়োজিত বাংলাদেশ: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন। বাংলাদেশ মিশনের প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত ড. এ কে আব্দুল মোমেনের পরিচালনায় এই অনুষ্ঠানে একমাত্র আলোচক ছিলেন আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশের অতীত এবং ভাষার বিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে বলেন, আল্লাহর ৯৯ নাম কাফেরদের দেবতাদের নাম ছিল। এগুলো আমরা বাংলা ভাষায় এডপ্ট করেছি। যেমন আবু হুয়রায়রা নামে অর্থ হচ্ছে বিড়ালের বাবা, আবু বকর নামের অর্থ হচ্ছে ছাগলের বাবা। এভাবে আমরা অনেক নাম রাখি। কাফেরদের মধ্যে যারা মুসলমান হয়েছিল তাদের নাম পরিবর্তন করা হয়নি। বোরখা এবং হেজাব সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা হচ্ছে ওয়াহাবীদের সর্বশেষ মতবাদ। তিনি বলেন, যত দিন আমাদের ভাষা থাকবে, রবীন্দ্র নাথ থাকবে, বঙ্গবন্ধু থাকবে ততদিন বাংলাদেশকে তালেবানরা ধ্বংস করতে পারবে না। তিনি বলেন, আমি বেঁচে থাকবো কি না জানি না, তবে আজকে একটা কথা বলতে পারি আগামী ১৫/২০ বছরের মধ্যে পৃথিবীতে দুটো রাষ্ট্রে বিলুপ্তি হবে। এ দুটো রাষ্ট্র হচ্ছে পাকিস্তান ও ইসরাইল। একটি দেশ দক্ষিণ এশিয়াকে অশান্ত করে রেখেছে, আরেকটি দেশ মধ্যপাচ্যকে অশান্তির মধ্যে রেখেছে। আমেরিকার পতনের সাথে সাথেই এদের পতন হবে। আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের অনেক ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। তারপরেও বাংলাদেশ শেখ হাসিনার মত ইস্পাতরূপী নেত্রী পেয়েছে। যিনি কিনা মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে সাহস নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে তাকে ৯ বার হত্যার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। আমি হলে ভয়ে চলেই যেতাম কিন্তু তিসি সাহসের সাথে লড়াই করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন যে বিরোধী দল রয়েছে এটাকে গণতান্ত্রিক বিরোধী দল বলা যায় না, এটা হচ্ছে প্রয়োজনের বিরোধী দল। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান থেকে বিভক্ত হয়ে আমাদের ভালই হয়েছে। তা নাহলে এতদিন আমাদের দেশে ড্রোন হামলা হতো। মাদ্রাসা এবং মসজিদগুলো তালেবানরা দখল করে নিতো। আমাদের সৌভাগ্য হচ্ছে আমরা আগে বাঙালি তারপরে মুসলমান। যে কারণেই বাংলাদেশ ধ্বংস হবে না, বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, আমার হয়ত ভুল হতে পারে। কিন্তু আমার একটি বিশ্বাস আছে। সেই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই আমি লিখছি। আমি বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, মৌলবাদী রাষ্ট্র আমরা চাই না, আমরা ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র চাই। তিনি বলেন, বাংলাদেশে একবার স্বৈরাচার আইয়ুব এসে বলেছিলেন বাঙালিরা হচ্ছে দাসের জাতি, বুটের তালায়পৃষ্ঠ জাতি। সেই সময় এই স্বৈরশাসকের কেউ বিরোধিতা করেনি। একজন বিরোধিতা করে বলেছিলেন বাঙালি সংগ্রামের জাতি আর পাঞ্জাবীরা হচ্ছে দাসের জাতি। এই কথাটি বলেছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি জটিল হলেও বাংলাদেশের ভবিষ্যত ভাল। বাঙালি জাতি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখবে। তিনি বাংলা ভাষার বিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে বলেন, আল্লাহর ৯৯ নাম কাফেরদের দেবতাদের নাম ছিলো। আমরা নামগুলোকে এডফপ্ট করে নিয়েছি। যেমন আবু হুরায়রা নামের অর্থ হচ্ছে বিড়ালের বাবা, আবু বকরের নামের অর্থ হচ্ছে ছাগলের বাবা। আমরা কী সেই নামগুলো পরিবর্তন করছি? কাফেরদের মধ্যে যারা মুসলামান হয়েছিলো তাদের নামগুলো কী পরিবর্তন করা হয়েছে?
তিনি বলেন, আমেরিকানরা তালেবান সৃষ্টি করে এখন বিপদে পড়েছে। আর বাংলাদেশের জামাত দ্বীনে মোহাম্মদী নয়, তারা হচ্ছে দ্বীনে মওদুদী। হিজাব এবং বোরখা হচ্ছে মওদুদীর শেষ মতবাদ। আর জামাত এক সময় কোরবানীর গোস্তের চালে (চামড়ার পয়সায়) চলতো।
তিনি বলেন, আমি জিয়াউর রহমানকে ঘৃণা করি। কারণ তাকে আমি দেখেছি যুদ্ধের সময়। সাবুরা সেক্টরে আমি তার সাথে ছিলাম। সে সারাক্ষণ মাথার চুল চিরুনী দিয়ে আচরাতো আর খবর নিতো কোন রাষ্ট্রদূত আসছে কি না? এখন কী না তাকেই বলা হচ্ছে স্বাধীনতার ঘোষক। অথচ সে একটি মাত্র বাণী পাঠ করেছিল। তিনি খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বেগম জিয়া আওয়ামী লীগের সমালোচনা করতে পারেন কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করেন কীভাবে? তিনি বঙ্গবন্ধুকে ধর্মের বাবা ডেকেছিলেন। তিনিই তার সংসার রক্ষা করেছিলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতি ও মৌলবাদ। মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী একটি মন্তব্য করে কি না বিপদে পড়েছেন। তিনি এমন কি বলেছেন?
তিনি বলেন, দুর্নীতি ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমাদের গণসচেতনা গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে দুর্নীতিবাজদের ফাঁসি দিতে হবে।

Tuesday, March 3, 2015

অভিজিৎ হত্যার পৌনঃপুনিকতা যদি রোধ করতে হয়- by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

অভিজিৎ রায় ছিলেন বিজ্ঞানের সাধক। তারুণ্যভরা জীবনটি তিনি বিজ্ঞানের সত্য সাধনায় কাটিয়েছেন। তিনি তার মরদেহও দান করে গেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সেবায়। তাকে শহীদ বলা হলে অত্যুক্তি হবে না। তিনি সত্যের সন্ধান ও সাধনায় জীবন দান করেছেন। কিন্তু সব সত্য সাধকের বেলাতেই যা হয় তার বেলাতেও অন্যথা হয়নি। তার পরিবারের ওপর থেকে বিপদটি এখনও কাটেনি। ঘাতকের দল এতই বিবেকবিহীন পশু যে, অভিজিৎকে হত্যার পর তার শোকার্ত পিতা অধ্যাপক অজিত রায়কেও জীবননাশের হুমকি দিতে দ্বিধা করছে না। আমি জানি না, এই সাহস তারা কোথা থেকে এবং কেমন করে পায়? অভিজিৎ হত্যায় বিক্ষুব্ধ মানুষ দেশে এবং বিদেশেও (লন্ডনে আজ রোববারেও ট্রাফালগার স্কোয়ারে প্রতিবাদ সমাবেশ হচ্ছে) দাবি তুলেছে এই নরপশুদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। সরকার যদি তা না পারে, তাহলে তা তাদের দুর্বলতা অথবা ব্যর্থতা বলে গণ্য হবে। আমি সব ব্যর্থতার দায়িত্ব সরকারের ওপর চাপাবো না। এই ঘাতকদের দেশ থেকে নির্মূল করার ব্যাপারে আমাদের একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে। সেটি আমরা পালন করছি না, অন্যদিকে এই ঘাতক দমনে সরকারের নীতিতেও যথেষ্ট দুর্বলতা ও ধীরে চলার কৌশল লক্ষণীয়।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সন্ত্রাস যে নির্মূল করা যাচ্ছে না, তার একটা বড় কারণ, এই সন্ত্রাসের পেছনে আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা, আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য রয়েছে। এই সন্ত্রাস এখন জিহাদিষ্ট নামে চিহ্নিত হয়ে একটি তথাকথিত আন্তর্জাতিক মতবাদে পরিণত হয়েছে। এই মতবাদে দীক্ষা নিচ্ছে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার যে তরুণরা, তাদের মধ্যে অমুসলিমও রয়েছে। তারা শিক্ষিত, কিন্তু ধর্মান্ধ। এই ধর্মান্ধতার কারণে তারা ইরাকে ও সিরিয়ায় ‘ইসলামিক স্টেটে’ যোগ দিয়ে জেহাদে অংশ গ্রহণের জন্য ছুটে যাচ্ছে। এদের নিরস্ত্র ও দমন করার কাজে ইউরোপীয় সরকারগুলোই হিমশিম খাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের কথা আলাদাভাবে চিন্তা করা বাতুলতা।
তবু বাংলাদেশেই সরকার পারত এই নিষ্ঠুর বুদ্ধিজীবী হত্যা রোধে আরও সফল হতে, যদি তারা মৌলবাদী ও তাদের আর্মড উইং- জেহাদিস্টদের সম্পর্কে আরও কঠোর হতে পারত। অন্যদিকে আমাদের সুশীল সমাজ এবং নাগরিক সমাজও এই ঘাতক চক্রকে প্রতিরোধ করার ব্যাপারে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে ততোটা সচেতন ও সক্রিয় নন। আওয়ামী লীগ সরকারের কবল থেকে তাদের কল্পিত গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য আমাদের সুশীল সমাজ যতটা সরব ও সক্রিয়; দেশের জনগণকে, সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী সমাজকে ভয়াবহ মৌলবাদী উত্থান এবং তাদের ঘাতক বাহিনীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচাতে তারা ততোটা সক্রিয় ও আগ্রহী নন। বরং তাদের একটি অংশ সম্ভবত মৌলবাদী হিংস্রতাকে তাদের গণতন্ত্রের আন্দোলনের সহায়ক শক্তি মনে করেন।
অন্যদিকে পাকিস্তান আমলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দমন ও দাঙ্গাবাজদের রুখে দাঁড়ানোর ব্যাপারে দেশের সুশীল সমাজ ও ছাত্রসমাজকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে দেখা গেছে। এবার সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার চেয়েও ভয়াবহ হিংস্র জিহাদিস্টদের রুখে দাঁড়ানোর ব্যাপারে দেশের সুশীল সমাজ ও ছাত্রসমাজের মধ্যে আগের সেই ঐক্য ও মিলিটেন্সি নেই। বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের আগের সংগ্রামী ভূমিকা নেই। নানা স্বার্থদ্বন্দ্বে তারা বহুধাবিভক্ত এবং নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত।
অন্যদিকে একটি সুশীল শ্রেণী এখন চরম সুবিধাভোগী সমাজে পরিণত হয়েছে। এখন আওয়ামী লীগকে গণতন্ত্রের জন্য বাঘ হিসেবে চিত্রণ করে মিথ্যাবাদী রাখাল বালকের মতো টকশোতে গিয়ে চিৎকার করা এবং দেশে অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে ওই সরকারকে মন্ত্রী, উপদেষ্টা জোগান দেয়াই তাদের প্রধান কাজ। আরও লক্ষ্য করার বিষয়, ধর্মান্ধ সন্ত্রাসী বা জিহাদিস্টরা এ সুশীল সমাজের বুদ্ধিজীবীদের গায়ে কখনও হাত দেয় না।
অভিজিৎরা নৃশংসভাবে মরবে, দেশ মেধাশূন্য হবে, আমরা শুধু প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন করব এবং সরকার শুধু তদন্তের আদেশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করবে। সেক্ষেত্রে এই পৌনঃপুনিক পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড কখনও বন্ধ হবে না। সরকারের পুলিশি তদন্ত দীর্ঘকাল ধরে চলে। তারপর দু’একজন দুষ্কৃতকারী ধরা পড়ে ও সাজা পায়; যেমন পেয়েছে রাজশাহীর অধ্যাপক ইউনুসের এবং অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের দু’এক ঘাতক। তাতে ঘাতক শ্রেণীর সংখ্যা কমে না, রিক্রুটমেন্ট বন্ধ হয় না। বরং তাদের সাহস ও তৎপরতা বাড়ে। যেমন বাড়তে দেখা গেছে অভিজিৎকে হত্যার পর তার পিতা অধ্যাপক অজিত রায়কে হত্যার হুমকি দেয়ার মধ্যে। ঘাতকদের এই সাহস বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এক, একাত্তরের দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড কার্যকর করা ক্রমাগত বিলম্বিত হওয়ায় এই ঘাতক ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের মনে এই ধারণাটি জন্ম নিয়েছে যে, সরকার এই দণ্ডদানে ভীত। সরকারের নীতি দুর্বল ও আপসবাদী। দুই, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ এই ঘাতক চক্রের সহায়ক এবং দেশের সুশীল সমাজও এই হিংস্র মৌলবাদীদের বদলে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বেশি সরব ও সক্রিয়। তিন, বিএনপির তথাকথিত রাজনৈতিক আন্দোলনও এই সন্ত্রাসীদের তৎপরতার সহায়ক।
বর্তমান সরকারের প্রশাসনের মধ্যেও ভ্রান্ত ধর্মীয় অনুভূতির দ্বারা প্রভাবিত, মৌলবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল একটি বড় অংশ আছে। পুলিশ প্রশাসনেও এদের সংখ্যা কম নয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যেও আছে মৌলবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল একটি অংশ। স্থানীয়ভাবে প্রভাব প্রতিপত্তি ও ভোটের বাক্স রক্ষার জন্য এরা মৌলবাদীদের তুষ্ট রাখতে চায়, এমনকি তাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যেও জড়িত তারা। ফলে এই ঘাতকদের ধরা সব সময় সহজ হয় না। অপরাধ অনুষ্ঠানের পর পালিয়ে গিয়ে তারা নিরাপত্তা ও আশ্রয় দুটোই পায়। পুলিশ তাদের নাগাল পায় না। অথবা নাগাল পেলেও ধরতে পারে না। নইলে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনীর হত্যাকাণ্ডের মীমাংসায় এত বিলম্ব ঘটে?
অভিজিতের হত্যাকারীদের ধরার ব্যাপারে সরকার এবার অন্তত কঠোর হোক। তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের খুঁজে বের করুন। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ এসব সন্ত্রাসীর রিক্রুটের ঘাঁটি, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। সন্ত্রাসীদের পিতামাতা ও অভিভাবকদের সতর্ক করুন। সুশীল সমাজ ও বৃহত্তর নাগরিক সমাজ কেবল মানববন্ধন না করে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। সর্বদলীয় ছাত্রসমাজ সন্ত্রাস রোধে রাজপথে নামুন। সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত ও প্রতিহত করার ব্যাপারে তারা ভিজিলেন্স কমিটি গঠন করুন।
বাংলাদেশে এই বুদ্ধিজীবী হত্যা ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক যোগসূত্র রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, এমনকি ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসএর সঙ্গে এই সন্ত্রাসী ও ঘাতকদের যোগাযোগ থাকার বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই যোগাযোগ ছিন্ন করার জন্য সরকারের আরও উদ্যোগী হওয়া দরকার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণও প্রয়োজন। হিংস্র মৌলবাদ ও সন্ত্রাস দমনে সরকার যদি সর্বাÍক নীতি গ্রহণ না করে এবং দেশের নাগরিকদের সব অংশকে এই নরপশুদের বিরুদ্ধে সজাগ ও সক্রিয় করে না তোলে, তাহলে দেশে পৌনঃপুনিক বুদ্ধিজীবী হত্যা, মেধা হত্যা অব্যাহত থাকবে এবং পরিণামে দেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হবে। এই ঘাতকরা বিভ্রান্ত তরুণ নয়; এরা শিক্ষিত, ট্রেনিংপ্রাপ্ত, রাজনৈতিক প্রভুদের দ্বারা আদিষ্ট ও পরিচালিত নিষ্ঠুর, বিবেকবর্জিত ঘাতক। এদের বিরুদ্ধে দেশের সম্মিলিত সামাজিক ক্রোধ ও প্রতিরোধ জাগ্রত করা প্রয়োজন।
দেশ যেন আরও অভিজিৎ না হারায়।
লন্ডন ১ মার্চ, রোববার, ২০১৫

Sunday, March 1, 2015

অভিজিৎ হত্যায় কেবল শোক নয়, আমাদের সম্মিলিত ক্রোধ জাগ্রত হোক by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

কী লিখব? দিনসাতেকের জন্য সৌদি আরবে গিয়েছিলাম। ১৮ ফেব্রুয়ারি জেদ্দায় পেঁৗছেছি। মক্কা ও মদিনা হয়ে ২৬ তারিখে লন্ডনে ফিরেছি। সকালে ফিরে এসেছি। সন্ধ্যাবেলাতেই খবর পেয়েছি, অধ্যাপক অজয় রায়ের তরুণ পুত্র অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রীকে ঢাকায় টিএসসির মোড়ে জঙ্গিরা নির্মমভাবে কুপিয়েছে এবং তার ফলে অভিজিৎ সঙ্গে সঙ্গে মারা গেছেন। তার স্ত্রী হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। একদিকে রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারা, অন্যদিকে ধর্মের নামে এভাবে অসাম্প্রদায়িক, মেধাবী তরুণ বুদ্ধিজীবী ও সেক্যুলার ব্লগার এবং লেখকদের কুপিয়ে হত্যা করা। দেশটা কি তাহলে ইরাকের কয়েকটি এলাকার মতো আইএসএসের রাজত্ব হয়ে গেল?
ইচ্ছা ছিল লন্ডনে ফিরে এসে জেদ্দা, মক্কা ও মদিনায় সাত দিনের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিখব। লেখার বিষয় ছিল বিস্তর। জেদ্দায় বাংলাদেশিদের পরিচালনাধীন দুটি আন্তর্জাতিক মানের ইংরেজি ও বাংলামাধ্যমের স্কুল ও কলেজ আছে। তাদের আমন্ত্রণে এবং জেদ্দায় নিযুক্ত আমাদের কনসাল জেনারেল শহিদুল করিম ও তার স্ত্রীর সৌজন্যে আমার এই সৌদি আরব ভ্রমণ। একুশে ফেব্রুয়ারি ভোরে, দুপুরে ও সন্ধ্যায় একই দিনে জেদ্দায় একুশের তিনটি অনুষ্ঠানে আমাকে অংশ নিতে হয়েছে। জেদ্দা, মক্কা ও মদিনায় অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। তাদের সুখ-দুঃখ সমস্যার কথা জেনেছি। ভেবেছিলাম সেসব নিয়েই লিখব। কিন্তু জেদ্দা থেকে লন্ডনে ফিরে আসতেই অভিজিৎ রায়ের ওপর এ পৈশাচিক হামলা এবং তার মৃত্যুর খবর! ফলে স্বাভাবিকভাবেই সৌদি ভ্রমণকথা আপাতত স্থগিত রইল। লেখার বিষয়বস্তু পাল্টাতে হলো।
অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ড নির্মম, কিন্তু নতুন বা আকস্মিক ঘটনা নয়। কয়েক বছর আগে বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের একই ধরনের হত্যা প্রচেষ্টা (পরিণতিতে মৃত্যু) আমরা দেখেছি। তারপর এই সেদিন বর্তমান আওয়ামী লীগ শামনামলেই আমরা দেখেছি, রাজীবসহ একাধিক তরুণ এবং সেক্যুলার ব্লগারকে এই পৈশাচসিদ্ধ জঙ্গিদের হাতে নির্মম মৃত্যুবরণ। হুমায়ুন আজাদের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উস্কানিদাতারা তখন চিহ্নিত হয়েও সাজা পায়নি। বর্তমান সময়ে সেক্যুলার ব্লগারদের হত্যার নায়করাও তেমন শাস্তি পায়নি; শাস্তি পেয়েছে একাধিক ব্লগার। ধর্মের অবমাননার দায়ে তাদের দু'একজনকে গুরুতর আহত (জঙ্গিদের দ্বারা আক্রান্ত) অবস্থাতেও জেলে পচতে হয়েছে। সেক্যুলার আওয়ামী লীগ সরকারও তাদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি এবং এখনও দিতে পারছে তা মনে হয় না।
ধর্মের অবমাননার সংজ্ঞাটা কী? আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে তা নির্ণীত হয়নি। সেক্যুলারিজমের পক্ষে কথা বলাই কি ধর্মের অবমাননা? সম্প্রতি প্যারিসে একটি কার্টুন পত্রিকা সরাসরি মহানবীকে (সা.) নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করায় জঙ্গিরা কার্টুনিস্টদের হত্যা করেছে। তার সঙ্গে বাংলাদেশে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের চরিত্র ও লক্ষ্য কি এক? অভিজিৎ লেখক বা ব্লগার হিসেবে কোনো ধর্মীয় মহাপুরুষকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেননি; কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেননি। তিনি বর্তমানের ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সন্ত্রাসের ঘোর বিরোধী ছিলেন। অর্থাৎ ছিলেন একজন সেক্যুলারিস্ট। একজন সেক্যুলারিস্ট হলেই কি তাকে হত্যা করার বিধান কোনো ধর্মের রয়েছে? তা যদি না থাকে, তাহলে ধর্মের নামে যারা এই বর্বরতা চালাচ্ছে তারা কে বা কারা? ধর্মের মুখোশের আড়ালে এরা তো আসলে ঘৃণ্য ঘাতক। এরা মানবতার শত্রু। এদের সম্পর্কে কোনো দেশের কোনো সরকারেরই নমনীয় নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়।
বাংলাদেশে জঙ্গিদের হত্যাকাণ্ডে এক বিপজ্জনক মাত্রা যোগ হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ডগুলোকে তারা ধর্মের আবরণে ঢাকছে। জামায়াত একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। তার নেতাদের সমালোচনা করাকেও ধর্মের অবমাননা বলে চালানো হয়। '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে যাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে, তারা যে যুদ্ধাপরাধ করেছে সে কথা গোপন রেখে ইউরোপে প্রচার করা হচ্ছে। এরা সবাই ইসলামিক স্কলার এবং ইসলামিক স্কলার হওয়াতেই হাসিনা সরকার তাদের মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে ধর্মের উচ্ছেদই এ সরকারের লক্ষ্য। সৌদি আরবে যে সাত দিন ছিলাম তখন দেখেছি, এই প্রচারণাটিই সেখানে প্রবল এবং চালাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত।
অভিজিৎ রায়কেও একজন ধর্মদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে বহির্বিশ্বে তার হত্যাকাণ্ডকে একজন ধর্মদ্রোহীর শাস্তি বলে চালানোর চেষ্টা হলে বিস্মিত হবো না। বাংলাদেশের জঙ্গি সমর্থক জামায়াতিরা এই চেষ্টা হুমায়ুন আজাদের বেলায় করেছে (তার 'পাক সার জমিন' উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল জামায়াতিদের ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় ব্যভিচারকে ব্যঙ্গ করে, ধর্মকে অবমাননা করে নয়), ব্লগার রাজীবের বেলায় করেছে, এখন অভিজিৎ রায়ের বেলাতেও করা হলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। এই আন্তর্জাতিক যোগসূত্রের সন্ত্রাস একা সরকারের পক্ষে দমন করা সম্ভব নয়। তবে সরকারের আরও কঠোর হওয়া উচিত। এই বর্বরতা উচ্ছেদের জন্য সংঘবদ্ধ সামাজিক প্রতিরোধ তৈরি করা দরকার।
মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে আমি ধর্ম বা ধর্মীয় মহাপুরুষদের নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করার অবাধ অধিকারের (যুক্তিসম্মত সমালোচনার নয়) সমর্থক নই। কিন্তু ধর্মের অবমাননার ধুয়া তুলে যারা বর্বর হত্যাকাণ্ড চালায়, তাদের ধর্ম এবং মানবতা দুয়েরই চরম শত্রু মনে করি। এই শত্রুদেরও মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচানোর জন্য ইউরোপে মানবতার নামে যে ধুয়া তোলা হয়েছে, তা প্রহসন ও ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। মানবতার শত্রুদেরও মৃত্যুদণ্ডদান যদি সমর্থনযোগ্য না হয়, তাহলে সন্ত্রাসীদের দমনের নামে মধ্যপ্রাচ্যে রোজ ড্রোন হামলা চালিয়ে শয়ে শয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করা হচ্ছে কেন? এই নিহতদের মধ্যে ক'জন সন্ত্রাসী মারা যাচ্ছে?
যেসব দেশ সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের জন্ম দিয়েছে ও বহুদিন লালন-পালন করেছে তারাই আজ নিজেদের সৃষ্ট ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দমনে হিমশিম খাচ্ছে। আমেরিকা যে আইএসএসকে তৈরি করেছে, এখন তারই সঙ্গে যুদ্ধরত। সৌদি আরব এতকাল মধ্যপ্রাচ্যে, পাকিস্তানে, এমনকি বাংলাদেশেও মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের মদদ জুগিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই মৌলবাদী জঙ্গিদের ভয়ে এখন তারাই শঙ্কিত।
আমি সৌদি আরবে থাকাকালীন অবস্থাতেই মক্কা শরিফে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগের উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী সম্মেলন। সম্মেলনটির নাম ছিল 'ইসলাম অ্যান্ড কমব্যাটিং টেরর বা ইসলাম ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। অনেক ইসলামিক স্কলার ও ওলামা এই সম্মেলনে হাজির হয়ে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস যে ইসলামবিরোধী এবং এই জঙ্গিবাদ দমনের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংঘবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন, সে সম্পর্কে একটি যুক্ত ইশতেহার প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, দরিদ্র দেশগুলোর বেকার ও অভাবী যুবকদের ধর্মের নামে বিভ্রান্ত করে সন্ত্রাসী হিসেবে রিত্রুক্রট করা হচ্ছে। এই সন্ত্রাস দমনের উপায় সম্পর্কেও এই আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনে আলোচনা করা হয়।
বাংলাদেশেও ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থান একদিনে ঘটেনি, আবার একদিনে তার উচ্ছেদ ঘটানো যাবে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার সাড়ে তিন বছর না যেতেই দেশের সেক্যুলার সরকার ও সংবিধান উচ্ছেদ করে জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার স্বাধীনতার শত্রু পলাতক মৌলবাদীদের এবং যুদ্ধাপরাধী ঘাতকদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিষবৃক্ষের চারা রোপণ করেছিল। পরবর্তীকালে তার দলের সাহায্য ও সহযোগিতা পেয়ে সেই বিষবৃক্ষ এখন মহীরুহে পরিণত হয়েছে। একে নির্মূল করা যে সহজ নয়, তার প্রমাণ হুমায়ুন আজাদ থেকে অভিজিৎ রায় পর্যন্ত অসংখ্য নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের কথা, আমাদের একটি সুশীল সমাজ বর্তমানে আওয়ামী লীগ বিদ্বেষে এবং তার বিরোধিতায় এতই অন্ধ যে, ভয়াবহ জঙ্গিবাদ সম্পর্কে তারা ততটা সংঘবদ্ধ ও সক্রিয় নয়। ফলে এই দানবের বিরুদ্ধে সামাজিক শক্তি ও ঐক্য দ্বিধাবিভক্ত। আমাদের সুশীল সমাজের সাম্প্রতিক কার্যকলাপ কতটা দেশ এবং গণস্বার্থবিরোধী তার প্রমাণ ড. কামাল হোসেন গ্রুপের নতুন পাণ্ডা মাহমুদুর রহমান মান্নার ভূমিকা থেকেও ফাঁস হয়ে গেছে। আমি মাত্র ক'দিন আগেই ঢাকার একটি দৈনিকে 'বিএনপির সুশীল সহযোগী' শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখেছি। তা যে শিগগির এত সত্য হয়ে দাঁড়াবে তা নিজেও ভাবিনি।
অভিজিৎ রায়ের নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবরে যতটা শোকাহত হয়েছি, তার চেয়ে বেশি হয়েছি ত্রুক্রদ্ধ। এই পশুদের নিষ্ঠুরতা এবং বর্বরতা আর কতকাল দেশের মানুষকে সহ্য করতে হবে? কতকাল, আর কতকাল এই অব্যাহত নির্মম হত্যাকাণ্ড আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হবে এবং কেবল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করে দায়িত্ব শেষ করতে হবে? বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ এবং সমাজ গরিব। এ দেশের সন্ত্রাসী রিত্রুক্রট করা এবং লালন করাও সহজ। দু'জন সন্ত্রাসীকে ধরে সাজা দিলেই সন্ত্রাস দমন হবে না; যতদিন তার নতুন রিত্রুক্রট বন্ধ না হয়, এই রিত্রুক্রটকারীদের চিহ্নিত করা ও ধরার ব্যাপারে সরকার কঠোর হোক এবং সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করুক। অভিজিৎ হত্যা কোনো শোক নয়, আমাদের সম্মিলিত সামাজিক ক্রোধকে জাগ্রত করুক। সেই ক্রোধের শক্তিতে যেন আমরা এই দানবচক্রকে নির্মূল করার জন্য সংঘবদ্ধ হই।
লন্ডন, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, শুক্রবার

Tuesday, February 17, 2015

ভাষা শহীদানের মাসে একজন মুক্তি সংগ্রামীর মৃত্যু এবং তা নিয়েও মিথ্যার বেসাতি by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদের মাস। এই স্মরণীয় মাসেই লন্ডনে মৃত্যু হল আমার অনুজপ্রতিম বন্ধু, বঙ্গবন্ধুর একজন অকৃত্রিম অনুসারী আমিনুল হক বাদশার। দীর্ঘকাল তিনি আমার জীবনের সুখে-দুঃখে ছায়াসঙ্গীর মতো ছিলেন। তার বিয়োগ-ব্যথা সহ্য করা সত্যই কঠিন। লন্ডনে গত শুক্রবার তার নামাজে জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। ওইদিন সন্ধ্যায় পূর্ব লন্ডনের মন্টিকিয়োরি সেন্টারে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব কর্তৃক আয়োজিত শোকসভাতেও তার অগুনতি শুভাকাক্সক্ষীর ভিড় জমেছিল। বাদশার মৃত্যুর পরই মাত্র বুঝতে পেরেছি, দেশে এবং বিদেশেও তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন।
বাদশা শুধু বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন না, তার পরিবারেরও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তার শেষ জীবনে যে কোনো কারণেই হোক এই ঘনিষ্ঠতা কিছু ক্ষুণ্ন হয়েছিল। তবু আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহানুভবতা দেখে অভিভূত হয়েছি। বাদশার মৃত্যুতে তিনি সঙ্গে সঙ্গে শোকবাণী দিয়েছেন এবং রাষ্ট্রপতিও দিয়েছেন। তখনই আমার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না যে, বাদশার মরদেহ ঢাকায় পৌঁছলে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেয়া হবে।
তবু বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমি ঢাকায় বন্ধুবর মোনায়েম সরকারকে প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব জানার জন্য অনুরোধ করি। মোনায়েম সরকার আমাকে জানান যে, বাদশার মরদেহ ঢাকায় পৌঁছলে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়া হবে। এমনকি মিরপুরের বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে তাকে সমাহিত করারও ব্যবস্থা হতে পারে।
আমি লন্ডনে তার পরিবারকে সে কথা জানাই। পরিবারের সদস্যদের কারও কারও ইচ্ছা ছিল, সরকারি তত্ত্বাবধানে বাদশার মরদেহ ঢাকায় নেয়া হোক এবং সমাহিত করা হোক। সেটা সম্ভব না হলে মরদেহ বাদশার ইচ্ছানুযায়ী কুষ্টিয়ায় তার মায়ের কবরের পাশে সমাহিত করা হবে। তাদের আরও ইচ্ছা ছিল আমি মৃতদেহের সঙ্গে ঢাকায় যাই এবং আমারও সে ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সৌদি আরবে বাঙালিদের একুশের অনুষ্ঠানে যাওয়ার আমন্ত্রণ আগেই গ্রহণ করায় আমার ঢাকায় আসা হয়নি। তবে এটুকু জেনেছি, তার পরিবার তাকে কুষ্টিয়াতে পারিবারিক গোরস্থানেই সমাহিত করার ব্যবস্থা নিয়েছেন।
এই নিবন্ধটি লেখার সময় (রোববার সকাল) খবর পেয়েছি, বাদশার মরদেহ ঢাকায় পৌঁছেছে এবং তার প্রতি মোটামুটি রাষ্ট্রীয় সম্মান দেখানো হয়েছে। এই খবরটি পেয়ে যেমন খুশি হয়েছি, তেমনি ঢাকার তথাকথিত একটি নিরপেক্ষ বাংলা দৈনিকে আমার সম্পর্কে একটি বানানো খবর দেখে বিস্মিত হয়েছি। ভাষা শহীদদের এই স্মৃতিপূত মাসে এবং দেশের সবার ভালোবাসার পাত্র এবং বঙ্গবন্ধুর এক ঘনিষ্ঠ অনুসারীর মৃত্যু সংবাদ নিয়েও যে উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যার বেসাতি করা যায়, তার একটা বড় প্রমাণ পেলাম।
আর কোনো দৈনিকে নয় (এমনকি লন্ডনের বাংলা কাগজগুলোতেও নয়), একমাত্র ঢাকার এই স্বঘোষিত নিরপেক্ষ দৈনিকটিতেই খবর ছাপা হয়েছে যে, লন্ডনের মন্টিকিয়োরি সেন্টারে বাদশার শোকসভায় আমি বলেছি, ‘বাদশাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দিয়ে সমাহিত করা হোক এটা আমারও ইচ্ছা ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার মন নরম করা গেল না।’ বাদশাহর মৃত্যুতে শেখ হাসিনার শোকবাণী পাঠের পরও আমি এই ধরনের মন্তব্য করব তা সুস্থ মস্তিষ্কে কেউ কি ধারণা করবেন? শোকসভায় আমার বক্তব্য বহু টিভি সাংবাদিক রেকর্ড করেছেন। তারা কেউ মন্তব্যটি জানতে পারলেন না, কেবল ‘নিরপেক্ষ’ দৈনিকটিই জানতে পারলেন?
এই মিথ্যার বেসাতির আসল কারণটি বুঝতে পেরেছি- যখন ‘নিরপেক্ষ’ দৈনিকটির খবরেই দেখেছি, তারা আমার কথিত মন্তব্যটি প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবকে জানিয়েছেন এবং তার অভিমত জানতে চেয়েছেন। প্রেস সচিব বলেছেন, তিনি এ সম্পর্কে অবহিত নন। যদি পত্রিকাটির অসাধু মতলব না থাকত, তাহলে উচিত ছিল এমন একটি বিতর্কিত উক্তি আমি করেছি কিনা লন্ডনে একটি মাত্র টেলিফোন কল দ্বারা আমার কাছে জানতে চাওয়া। তারা তা করেননি। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবকে জানিয়েছেন। উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট, প্রেস সচিব প্রধানমন্ত্রীকে জানাবেন এবং প্রধানমন্ত্রী আমার প্রতি রুষ্ট হবেন।
আমি এই তথাকথিত নিরপেক্ষ দৈনিকটির নিত্য অসাধু সাংবাদিকতার সমালোচক। সুতরাং আমাকে এই সুযোগে এক হাত দেখে নেয়ার লোভ তারা হয়তো সংবরণ করতে পারেননি। আমার কথা হল, আমি কোনো কোনো সময় হাসিনা সরকারের কোনো কোনো কাজের বিরূপ সমালোচনা করে থাকি। তাতে তিনি আমার ওপর অসন্তুষ্ট হলে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু তার সম্পর্কে যে কথা আমি বলিনি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সে কথা বানিয়ে প্রচার করে প্রধানমন্ত্রীর মনে আমার সম্পর্কে যদি তারা মিথ্যা ধারণার সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে অবশ্যই আমি প্রতিবাদ জানাব। দেশের মানুষ দেখুক, এই স্বঘোষিত নিরপেক্ষ পত্রিকার নিরপেক্ষতার নমুনা!
ফেব্রুয়ারি মাসে আমিনুল হক বাদশা চলে গেলেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি আমার কাছে এসেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তিনি একটি বই লিখেছিলেন ‘হৃদয়ে বিষাদ সিন্ধু’। বইটির ভূমিকা আমি লিখেছিলাম। তার ইচ্ছা তিনি বইটি আবার নতুন করে লিখবেন এবং আমি যেন তাকে নতুন করে একটি ভূমিকা লিখে দিই। এই সময় তিনি আমাকে জানান, বায়ান্নর ভাষা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা সম্পর্কে একশ্রেণীর তথাকথিত বামপন্থী লেখক নানা ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করে আসছেন। তিনি সেগুলো খণ্ডন করার মতো যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করেছেন এবং সেগুলো নিয়ে তিনি একটি বড় প্রবন্ধ লিখতে চান এবং এই ভাষার মাসেই প্রকাশ করতে চান। তবে বই আকারে বের করার আগে ঢাকার কোনো দৈনিকে ধারাবাহিকভাবে বের করা তার ইচ্ছা। কোন্ কাগজে পাঠাবেন সে সম্পর্কে আমার অভিমত জানতে চান।
আমি তাকে ইত্তেফাক, যুগান্তর অথবা জনকণ্ঠে পাঠানোর কথা বলি। তিনি যুগান্তরে পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন। আমি তাকে জানাই, যুগান্তরের সম্পাদকীয় বিভাগের মাহবুব কামাল নিজেও একজন কলামিস্ট। আমি তার সঙ্গে তোমার যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি। যুগান্তর অবশ্যই তোমার লেখা ছাপাবে। বাদশাহ বলেছিলেন, লেখাটা আগে শেষ করি, তারপর আপনাকে জানাব। এরপর যতদূর জানি, ‘ভাষা সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ নিবন্ধ অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় তার কাছে ছিল। নানা কারণে শেষ পর্যন্ত আর শেষ করা হয়নি।
ষাটের দশকের সংগ্রামী ছাত্রসমাজের একজন সামনের কাতারের নেতা ছিলেন আমিনুল হক বাদশা। স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে তার ছিল প্রত্যক্ষ যোগ। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের নিযুুক্তি পেয়ে আমি আর বাদশা একসঙ্গে বহু মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে ‘মোটিভেটর’ হিসেবে ঘুরেছি। এক শিবিরে এক আহত মুক্তিযোদ্ধার হাঁটু থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ হতে না দেখে বাদশা নিজের গায়ের শার্টের হাতা ছিঁড়ে তার ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছিলেন। মুজিবনগর সরকারের সাপ্তাহিক মুখপত্র ‘জয়বাংলা’র আমি ছিলাম নির্বাহী সম্পাদক। বাদশা রণাঙ্গনের খবর এই পত্রিকায় নিয়মিত জোগান দিতেন।
সাংবাদিক হিসেবেও বাদশার জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। ষাটের দশকে দৈনিক আজাদে রিপোর্টার থাকাকালে চিফ রিপোর্টার ফয়েজ আহমদের নির্দেশে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অনেক নেপথ্য কাহিনী আজাদে প্রকাশ করে তিনি সবার প্রশংসা অর্জন করেছিলেন।
সত্তরের নির্বাচনী সফরে বঙ্গবন্ধু তিনজন সাংবাদিককে তার সফরসঙ্গী করেছিলেন, একজন আজাদ থেকে আমিনুল হক বাদশা, অন্য দু’জন হচ্ছেন ইত্তেফাক থেকে তাহেরউদ্দিন ঠাকুর এবং অবজারভার থেকে শহীদুল হক। তাদের মধ্যে বাদশাই বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছিলেন। বাদশা সেতার বাজাতে জানতেন। বঙ্গবন্ধু নির্বাচন সফর শেষে ঢাকায় ফিরে বাদশাকে মাঝে মাঝে বলতেন, ‘বাদশা, তুই সেতার বাজা, আমি শুনি।’ বাদশা সেতার বাজাতেন।
বাদশা আজ নেই। তাকে নিয়ে আমার অজস্র স্মৃতি। লিখলে একটি বই হবে। ইচ্ছে আছে, ‘বাদশানামা’ নামে একটি বই লিখব।
লন্ডন ১৫ ফেব্রুয়ারি, রোববার, ২০১৫

Sunday, February 15, 2015

বাদশা: দেশ এক আপনজন হারাল by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বাদশার ওবিচুয়ারি আমাকে লিখতে হবে কোনো দিন ভাবিনি। ভেবেছিলাম সে-ই আমার ওবিচুয়ারি লিখবে। এটা নিয়ে প্রায়ই তার সঙ্গে আমার কথা হতো। যখন ৮০ বছরে পা দিই, তখন বাদশাকে বলেছিলাম, বয়সের দিক থেকে রবীনদ্রনাথকে ছুঁয়ে ফেলেছি। ক'দিন আর বাঁচব? তুমি আমার একটা ভালো ওবিচুয়ারি লিখো। বাদশা জিভ কামড়ে বলত, গাফ্ফার ভাই, এ কথা বলবেন না। আপনি চলে গেলে আমাদের কী হবে?
গত মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঘুম থেকে জেগে যখন খবর পেলাম বাদশা আর নেই; আগের রাত সাড়ে ১১টায় হাসপাতালে মারা গেছে, তখন প্রথমেই আমার মনে হয়েছে, এবার আমাদের, বিশেষ করে আমার কী হবে? বাদশাবিহীন জীবন তো আমি কল্পনা করতেও পারি না। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তার সঙ্গে আমার পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা, বন্ধুত্ব এবং সহমর্মিতা। বিলাতে আসার পর বহুকাল সে আমার ছায়াসঙ্গীর মতো ছিল। তাকে নিয়ে ইউরোপের বড় বড় শহর, আমেরিকা, জাপান, কানাডা ঘুরে বেড়িয়েছি। এমনকি ১৯৯৪ সালে একই সঙ্গে আমরা মক্কায় গিয়ে হজ সমাধা করেছি। রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতির সব কাজকর্মে সে ছিল আমার সহকর্মী, সহযোগী। শেষ দিকে আমাদের দেখাশোনাও কম হতো। কিন্তু যোগাযোগটা অক্ষুণ্ন ছিল। তার মৃত্যু সংবাদ শুনে মনে হলো, এটা নিজের কানে নিজের মৃত্যু সংবাদ শোনার মতো।
বাদশা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ছিল দীর্ঘদিন। জীবনে সে বহু ধাক্কা সামলেছে। হার্ট অপারেশন, ব্রেন অপারেশন, বুকে বসানো ছিল পেসমেকার। সঙ্গে আরও নানা রোগ। ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনায় সে অক্ষতভাবে বেঁচে গেছে। কিন্তু এবার দীর্ঘকাল হাসপাতালে অসুস্থ হয়ে থাকার সময় চিকিৎসকরাও তার জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। বাদশার বয়স হয়েছিল ৭৩-এর মতো। এবার মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সে আর জয়ী হয়নি। একটি কিংবদন্তির মতো মানুষ শেষ পর্যন্ত আমাদের ছেড়ে চলে গেল।
আমি তার পুরো নামটি বারবার লেখার দরকার মনে করছি না। এই নামটি সকলের জানা, খোন্দকার আমিনুল হক বাদশা। বাদশা তার ডাকনাম। এই বাদশা নামেই সে দেশ-বিদেশে পরিচিত। সে রাজনীতিতে জড়িত ছিল। সেতার বাজাত। নাটক ও ছায়াছবিতে অভিনয় করত। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সব পরিচয়ের ঊধর্ে্ব তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল, ছোট-বড় সকলের অকৃত্রিম বন্ধু। বাদশার সঙ্গে একবার যার বন্ধুত্ব হয়েছে, সেই বন্ধুত্বে আর কখনও চিড় ধরেনি। রাজনৈতিক মনান্তর ও মতান্তর সত্ত্বেও ধরেনি।
তার মৃত্যুতে সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা সব ক্ষেত্রেই যে শূন্যতাবোধ দেখা দেবে, তার চেয়ে বড় শূন্যতাবোধ দেখা দেবে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তার অসংখ্য বন্ধুর বুকে। আমি তার সঙ্গে পৃথিবীর যে কোনো স্থানেই গেছি, দেখেছি, তার অসংখ্য বন্ধু এসে তাকে ঘিরে ফেলেছে। একবার বাদশাকে নিয়ে লন্ডন থেকে কলকাতায় গেছি, ভোর না হতেই প্লেন নেতাজি সুভাষ বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। আমাকে রিসিভ করার জন্য যে বন্ধুর গাড়ি নিয়ে আসার কথা, তিনি তখনও এসে বিমানবন্দরে পেঁৗছাননি। আমরা বাইরের লাউঞ্জে বসে মশার কামড় খাচ্ছিলাম।
এ সময় দেখি একটা পিকআপ এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল। গাড়ির গায়ে লেখা দৈনিক 'আজকাল'। গাড়ি থেকে হৈ রৈ করে তিন-চারজন যুবক নামলেন। তারা সকলেই আজকালের সাংবাদিক। বাদশার বন্ধু। বাদশা কলকাতায় আসছে শুনে তাকে রিসিভ করতে দলবদ্ধ হয়ে ছুটে এসেছে। বাদশার এই অসংখ্য গুণগ্রাহী ও বন্ধুর দেখা আমি আমেরিকার আটলান্টা সিটি এবং কানাডার অটোয়া শহর, এমনকি জাপানের টোকিও শহরেও দেখেছি। বাদশা সঙ্গে থাকলে কোথাও গিয়ে কোনো সমস্যায় কোনোভাবে আটকে পড়েছি, তা মনে পড়ে না।
জীবনে বন্ধু-বিয়োগ ব্যথা বহুবার পেয়েছি। কিন্তু বাদশার বিয়োগ-ব্যথা এত বেশি করে বুকে বাজছে তার কারণ, বিলেতের প্রবাস জীবনে (এখন আর নিজেকে প্রবাসী ভাবি না) একটা সময় প্রাত্যহিক মেলামেশা ও কাজকর্মে আমরা প্রায় অভিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। আমি তাকে ছোট ভাই এবং বন্ধুর মতো দেখতাম। সে আমাকে দিয়েছিল বড় ভাইয়ের অবিমিশ্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। মাঝে মধ্যে তার কিছু বেহিসাবি কাজ আমার পছন্দ হতো না। ফলে এমন বকাঝকা করতাম, যা নিজের ভাইয়েরও সহ্য করার কথা নয়। কিন্তু বাদশা অম্লান বদনে আমার সব গালমন্দ সহ্য করত। হাসিমুখে বলত, আপনি আমাকে স্নেহ করেন বলেই বকাঝকাও করেন।
তার সঙ্গে আমার পরিচয় ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। আমি তখন অধুনালুপ্ত দৈনিক আজাদের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি। বাদশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, উদীয়মান ছাত্রনেতা (ছাত্রলীগের)। সুদর্শন তরুণ। আজাদের রিপোর্টিং সেকশনে এসে যোগ দিয়েছে। কুষ্টিয়াতে তার বাড়ি। তখনই জানতে পারি, পরিবারটি সংস্কৃতিমনা। লালন গান, বাউল সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত। আবার রবীন্দ্রনাথেরও স্নেহধন্য। বাদশার একটা আশ্চর্য গুণ ছিল অল্প সময়ে একজনকে অত্যন্ত আপন করে নেওয়ার। ফলে আমাদের মধ্যেও সম্পর্কটা দ্রুত গভীর হয়ে ওঠে।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে বাদশা ছিল সামনের সারির ছাত্রনেতা। তখনকার ছাত্রনেতা_ যেমন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমেদ, রাশেদ খান মেনন প্রমুখ সকলের সঙ্গেই তার ছিল সহযোদ্ধার সম্পর্ক। বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পরিকল্পনার জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে কয়েকজন বিপ্লবী যুব নেতা যে গোপন সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন, বাদশা তার সঙ্গেও ছিল জড়িত। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্বাধীন বাংলার পতাকা তৈরি গোষ্ঠীর সঙ্গেও বাদশা জড়িত ছিল ঘনিষ্ঠভাবে। এমনকি সে কারাবরণও করেছিল।
সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু কয়েকজন সাংবাদিককে তার সঙ্গে নেন নির্বাচনী সফরে। বাদশাও তাদের মধ্যে ছিল একজন। অতি অল্পদিনের মধ্যে সে বঙ্গবন্ধুর অগাধ আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করে। সে হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধু পরিবারের একজন। কিছুকাল বাদশা (সম্ভবত '৬৯ ও '৭০ সাল) বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সে মুজিবনগরে চলে যায় এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেয়। এ সময় কলকাতায় তার সঙ্গে আমার দেখা। আমি স্ত্রী, ছেলেমেয়ে নিয়ে বর্ডার ক্রস করে প্রথমে আগরতলায়, তারপর কলকাতায় চলে যাই। কলকাতায় সার্কাস এভিনিউতে তখনকার বাংলাদেশ ভবনে বাদশার সঙ্গে দেখা হতেই কপর্দকশূন্য অবস্থায় দেশ ছেড়ে এসেছি, সে কথা তাকে জানালাম। বাদশা আমাকে অভয় দিয়েছিল, বলেছিল আমরা থাকতে আপনার কোনো অসুবিধা হবে না গাফ্ফার ভাই।
বাদশা বন্দুক হাতে নিজে যুদ্ধ করেছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু আমারই মতো সে যুদ্ধের ফ্রন্টে ফ্রন্টে ঘুরেছে মুক্তিযোদ্ধাদের মনে সাহস ও উৎসাহ জোগাতে। আমাদের পরিচয় ছিল মোটিভেটর। বাদশা চমৎকারভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিশতে পারত। তাদের উৎসাহ জোগাতে পারত। আমি যখন মুজিবনগর সরকারের সাপ্তাহিক মুখপত্র 'জয়বাংলা' কাগজের নির্বাহী সম্পাদক, তখন যুদ্ধের বিভিন্ন ফ্রন্ট থেকে রিপোর্ট সংগ্রহ করে 'জয়বাংলা' অফিসে পেঁৗছে দেওয়া ছিল তার অন্যতম দায়িত্ব। এছাড়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য কথিকা রচনাতেও সে অংশ নিত। তার ছোট ভাই মান্না হক ছিল এ বেতারের সঙ্গীত বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাদশা বড় চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে ঝোঁকেনি। বঙ্গবন্ধুর অনুগত রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তার পাশে থাকতে চেয়েছে। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুই তাকে বিলাতে পাঠান ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য। একই সঙ্গে বাদশাকে লন্ডনে বাসসর প্রতিনিধি করা হয় এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সে সাপ্তাহিক প্রবাসী নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করে। বাংলাদেশের একটি ব্যাংকের লন্ডন শাখায় সে গণসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করে।
বাদশার কর্মজীবন বিচিত্র। সোস্যাল ওয়ার্কার থেকে মার্কস স্পেনসারের সেলসম্যান, কলকাতা, ঢাকা, লন্ডনের বহু কাগজের খণ্ডকালীন সাংবাদিকতা, নাটকে ও ছায়াছবিতে অভিনয় ইত্যাদি পেশায় তার দক্ষতার পরিচয় পাওয়া গেছে। তার সাহিত্যিক প্রতিভাও ছিল। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তার লেখা 'হৃদয়ে বিষাদসিন্ধু' বইয়ে তার এই পরিচয় পাওয়া যায়। আমি যখন ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের ওপর 'পলাশী থেকে ধানমণ্ডি' ছায়াছবিটি তৈরি করি, তখন বাদশা নিজের ভূমিকায় নিজেই অভিনয় করে। কলকাতায় অরোরা স্টুডিওতে এর চিত্রগ্রহণের সময় বাদশা রাতদিন জেগে ছবিটি শেষ করার জন্য সাহায্য করেছে।
বাদশাকে নিয়ে আমি দু'বার শান্তিনিকেতনে গেছি। একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে বাদশা সারারাত আমার বিছানার পাশে জেগে রয়েছে। ওষুধ খাইয়েছে। তাকে নিয়ে ১৯৯৪ সালে গেছি মক্কায় পবিত্র হজ করার জন্য। আমি তখন আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত। হাঁটুতে ব্যথা। বাদশা বলেছে, ঘাবড়াবেন না গাফ্ফার ভাই। কাবা শরিফ তাওয়াফের সময় আমার কাঁধে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটবেন। শুধু তাওয়াফের সময় নয়, শাফা-মারওয়া প্রদক্ষিণের সময়ও আমি তার কাঁধে ভর করে হেঁটেছি। তাকে ঠাট্টা করে বলেছি, বাদশা তুমি আমার সওয়াবের (পুণ্যের) অর্ধেকটা নিয়ে গেলে।
বাদশাকে নিয়ে কোথায় না গেছি, লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে সানফ্রান্সিসকো, ডালাস, লাসভেগাস_ সর্বত্র সে ছিল আমার ছায়াসঙ্গী। তাকে হারানোর বেদনা লিখে কাউকে বোঝানো যাবে না। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বাদশা ইচ্ছা করলেই জিয়াউর রহমান বা এরশাদ চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশের একজন কেউকেটা হতে পারত। তা সে হয়নি। লন্ডনে সাধারণ সোস্যাল সার্ভিসের কাজ করে অবসর নিয়েছে। শেষ বয়সে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে তার ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্যে কখনও চিড় ধরেনি, এটা আমি সবসময় লক্ষ্য করেছি।
বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সঙ্গে বাদশার যে ঘনিষ্ঠতা ছিল, তার সুবাদে সে মন্ত্রী হতে পারত, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা হতে পারত। তার সমসাময়িক অনেক ছাত্রনেতা এখন আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। বাদশাও তা হতে পারত। বাদশা তা হয়নি। সে অনেকটা বোহেমিয়ান টাইপের মানুষ ছিল। কিন্তু ক্ষমতা ও অর্থের লোভ তার ছিল না। এই আপনভোলা মানুষটি অনেক সময় রাজনৈতিক শত্রু এবং বঙ্গবন্ধুর শত্রু হিসেবে গণ্য কিছু লোকের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করত। ফলে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে। তাকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এখন এই মানুষটি সব বিতর্কের ঊধর্ে্ব চলে গেল।
বাংলাদেশে বর্তমানে যে সন্ত্রাসের রাজনীতি, হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় শুয়েও বাদশা তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করত। আমি যখন শেষবারের মতো তাকে দেখতে যাই, আমাকে হাত ধরে জিজ্ঞেস করেছে, 'গাফ্ফার ভাই, আমরা কি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ রক্ষা করতে পারব না?' নিজের জীবনের চেয়ে দেশের ভবিষ্যৎ তাকে বেশি বিচলিত করেছিল।
বাদশাকে আমি দু'বার অঝোরে কাঁদতে দেখেছি। একবার টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে দাঁড়িয়ে; আরেকবার হজ করার সময় কাবা শরিফের দেয়ালে প্রোথিত কালো পাথর ছুঁয়ে। আজ বাদশার জন্য আমরা কাঁদছি। তার শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন, বিশেষ করে তার ছোট ভাই খোন্দকার রাশেদুল হক নবাকে আন্তরিক সমবেদনা জানাই। নবাও বাদশার মতো সর্বজনপরিচিত এবং বন্ধুবৎসল। বিপদে-আপদে বন্ধুদের পাশে এসে দাঁড়ায়। বাদশা আজ চলে গেল বটে, কিন্তু একজন কিংবদন্তির মানুষের মতো সে বহুকাল মানুষের মনে বেঁচে থাকবে।
লন্ডন, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, শুক্রবার

Sunday, February 8, 2015

নাশকতা মোকাবেলায় দ্বিতীয় ফ্রন্ট অবশ্যই দরকার by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

গত বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) গণজাগরণ মঞ্চের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গণজাগরণ দিবস পালিত হলো। এবারের সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ বদ্ধমুষ্টি উঁচিয়ে শপথ গ্রহণ করেছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের নতুন যুদ্ধ_ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। ঢাকার রাজপথে তারা মিছিল করেছে; দেশের সর্বত্র সন্ত্রাসকে প্রতিহত করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিএনপি-জামায়াতের নাশকতামূলক কাজে যখন দেশ জর্জরিত, তখন তার বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের একটা অংশের মাথা তুলে দাঁড়ানো আশার লক্ষণ।
দু'বছর আগে যে প্রলয়োল্লাসের শক্তি নিয়ে শাহবাগ চত্বরে গণজাগরণ মঞ্চের আবির্ভাব, সেই শক্তি এখন অবশ্য তার নেই। কিন্তু মঞ্চের অস্তিত্ব এখনও রয়েছে এবং তার আবেদনও দেশের তরুণ প্রজন্মের এক বিশাল অংশের মধ্যে রয়ে গেছে। এটা দেশের মানুষের কাছে ভরসার কথা। আওয়ামী লীগ সরকার যদি গণজাগরণ মঞ্চের জনপ্রিয়তাকে ভয়ের চোখে না দেখত এবং মঞ্চের তরুণ নেতৃত্ব যদি প্রথম দিকে নীতিনির্ধারণে কিছু ভুল না করত, তাহলে সরকার ও তরুণ প্রজন্মের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে চূড়ান্ত পরাজয় থেকে মৌলবাদের হিংস্র দানব আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারত না এবং বিএনপির কাঁধে চড়ে সারাদেশে আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মারার এই বর্বর হত্যাযজ্ঞ শুরু করতেও সক্ষম হতো না।
এটা আমাদের গণতান্ত্রিক শিবিরের বহুবারের পদস্খলন। যখনই তারা ঐক্যবদ্ধ হয় এবং গণতন্ত্রবিরোধী চক্রকে চূড়ান্ত পরাজয়ের দিকে ঠেলে দেয়, ঠিক সেই মুহূর্তে কী এক জাদুযন্ত্রে যেন গণতান্ত্রিক শিবিরে ঐক্য ভেঙে যায়। তারা আত্মঘাতী বিবাদে লিপ্ত হন। ফলে হিংস্র ও ঘাতকচক্র সুযোগ পেয়ে নিজেদের পরাজয় ঠেকায় এবং গণতান্ত্রিক শিবিরের বিজয় সহজেই ছিনিয়ে নেয়। এটা আমরা '৫৪ সালে দেখেছি। '৫৭ সালে (আওয়ামী লীগে ভাঙন ও ন্যাপের জন্ম) দেখেছি। স্বাধীনতার পর '৭৫ সালে দেখেছি। '৯০ সালে দেখেছি এবং এখনও দেখছি।
২০১৩ সালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া চলার মুহূর্তে গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম। এই মঞ্চে নানা দলমতের তরুণদের সমাবেশ ঘটেছিল এবং ছিল যৌথ নেতৃত্ব। ফলে এই মঞ্চের কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছু ভুলভ্রান্তি হয়তো ছিল। তবু আওয়ামী লীগ সরকারের পরোক্ষ সমর্থন এই মঞ্চের পেছনে ছিল এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগও এই মঞ্চে এসে কাতারবন্দি হয়েছিল। তখন ঢাকায় মহাগণজাগরণের যে সমদ্রোচ্ছ্বাস জেগেছিল, তা অভূতপূর্ব। মনে হয়েছিল, স্বাধীনতা ও মানবতার শত্রুপক্ষ এবার চূড়ান্ত পরাজয় বরণ করতে যাচ্ছে, নিশ্চিহ্ন হতে যাচ্ছে।
কিন্তু তারা পরাজিত হলো না। নিশ্চিহ্ন হওয়া দূরের কথা, মঞ্চের ঐক্য বিভক্তির মুখে দাঁড়াল। ছাত্রলীগ সহসা মঞ্চ থেকে দূরে সরে গেল। পাল্টা মঞ্চ খাড়া করার প্রচেষ্টা শুরু হলো। মঞ্চের নেতৃত্বকে নানা অপবাদ দিয়ে তাদের ক্রেডিবিলিটি নষ্ট করা শুরু হলো। মঞ্চের নেতৃত্বও যে কিছু কিছু ভুল করেননি তা নয়। তারাও আওয়ামী লীগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলেন এবং এমন কিছু কর্মসূচি নিয়েছেন, যা ছিল স্বাধীনতার শত্রুশিবিরের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার শামিল। গণজাগরণ মঞ্চের ঐক্যে ভাঙন সৃষ্টি করার জন্য শত্রুশিবিরের চক্রান্ত তো ছিলই। এমনকি দেশের বিগ এনজিওর মুখপাত্রগুলোও নিজেদের স্বার্থে এই চক্রান্তে জড়িত হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার গণজাগরণ মঞ্চের জনপ্রিয়তাকে ভয় পেল আর গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বও হয়তো ভাবলেন, আওয়ামী লীগের সর্বগ্রাসী গ্রাস থেকে নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তাদের কাছ থেকে একটু দূরে সরে যাওয়া বুঝি প্রয়োজন। এ বুদ্ধিটা কেউ তাদের জুগিয়ে থাকলে কে জুগিয়েছে তা আমি জানি না। সিপিবির নেতারা? ড. কামাল হোসেন অথবা ইউনূস শিবিরের লোকেরা? আমি এবার ঢাকায় থাকার সময় প্রশ্নটা মঞ্চনেতা ডা. ইমরানকে করেছিলাম। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ড. কামাল হোসেন বা ইউনূস শিবিরের সঙ্গে কোনো প্রকার সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি এখনও আওয়ামী লীগকেই মিত্রপক্ষ ভাবেন। স্বাধীনতা ও মানবতার সন্ত্রাসী শত্রুপক্ষকে প্রতিহত করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সহযোগিতা চান।
তাহলে আওয়ামী লীগ ও গণজাগরণ মঞ্চের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ঘটেছিল কেন? যা দেশের গণতান্ত্রিক শিবিরের ঐক্য ও শক্তি খর্ব করেছে। পাল্টা হেফাজতি অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করেছে। সন্দেহ নেই, প্রতিবিপ্লবী ও প্রতিক্রিয়াশীল হেফাজতি অভ্যুত্থানের পেছনে ছিল বিএনপি ও জামায়াতের নীলনকশা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্বলতা এবং আপসবাদী ভূমিকাও যে তার পেছনে উৎসাহ জুগিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগের এই আপসবাদী ভূমিকা এবং পাল্টা গণজাগরণ মঞ্চ খাড়া করার পেছনে উৎসাহদান বিএনপি-জামায়াতকে আবার গত ৬ জানুয়ারির পর পশুশক্তি নিয়ে সন্ত্রাসে নামার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।
আমি আওয়ামী লীগ সরকারকে তাদের ভ্রান্তনীতি সম্পর্কে আগেই সতর্ক করেছি। গণজাগরণ মঞ্চের নেতাদেরও বলেছি, স্বাধীনতার শত্রু এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ। একইভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গেও সমদূরত্বের অবস্থান নিলে তারা ভুল করবেন। এটা সিপিবির মতো বর্তমানের গণবিচ্ছিন্ন ও তত্ত্বসর্বস্ব দলের নীতি হতে পারে; কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের মতো 'ব্রড চার্চের' নীতি হতে পারে না। আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো কোনো ভুল কাজের প্রতিবাদ তারা জানাতে পারেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান তারা নিতে পারেন না।
বিএনপি-জামায়াত তো গণজাগরণ মঞ্চের ঐক্য ভাঙার জন্য সতত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভেতরেও একটা কট্টর ডানপন্থি গ্রুপ আছে, মঞ্চের নাম ও কর্মসূচি যাদের কাছে অ্যালার্জি। তাদের গোপন উৎসাহেই পাল্টা মঞ্চ তৈরি হয় এবং মঞ্চের সভা-সমাবেশ নষ্ট করার জন্য এরা চেষ্টা চালায়। বিস্ময়ের কথা এই যে, মঞ্চ যখন স্বাধীনতার শত্রুদের বিরোধিতা করার জন্য সভা-সমাবেশ ডাকে, তখন আওয়ামী লীগের সমর্থিত বলে কথিত এই গ্রুপগুলোই তাতে বাধা দিতে পাল্টা সমাবেশ ডাকে, মাইক বাজায় এবং নানা উপদ্রব সৃষ্টি করে। এটা আত্মঘাতী নীতি। বিএনপি-জামায়াতের সমাবেশে যারা বাধা সৃষ্টি করার সাহস দেখায় না বা তাদের সন্ত্রাস রুখতে এগিয়ে যায় না; তারা স্বাধীনতার আদর্শে বিশ্বাসী গণজাগরণ মঞ্চের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে গিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসেই যে শক্তি জোগাচ্ছে তা কি তারা বুঝতে পারে না?
সুখের কথা, এবার ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গণজাগরণ দিবস পালনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সমর্থক গ্রুপ হিসেবে কথিত অথবা পরিচিত দল বা দলগুলো বাধা সষ্টি করার কাজে এগিয়ে আসেনি বা আসতে পারেনি। তাদের পেছনে জনসমর্থনের (নবজাগ্রত তরুণদের) অভাব আছে এবং শেখ হাসিনারও এবার নাকি শক্ত নির্দেশ ছিল, এরা যেন গণজাগরণ দিবসের সমাবেশে উৎপাত সৃষ্টি করতে না যায়। আমার ধারণা, অন্তত শেখ হাসিনা এ কথা উপলব্ধি করেন, বাংলাদেশকে হিংস্র মৌলবাদের ছোবল থেকে রক্ষা করে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে গণজাগরণ মঞ্চ তথা দেশের নবজাগ্রত তারুণ্যের সমর্থন তার দরকার। এরা আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ নয়; বরং আওয়ামী লীগের সম্পূরক শক্তি।
গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার সংগ্রামে যে একটি দ্বিতীয় ফ্রন্ট প্রয়োজন, এ কথা বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন গত শতকের ষাটের দশকে ছয় দফার আন্দোলনের সময়। ছয় দফা ঘোষিত হওয়ার পর বাম ছাত্রসমাজ থেকে ১১ দফা দাবি ঘোষিত হয়। তখনও আওয়ামী লীগের ভেতরের একটা কট্টর ডানপন্থি কোটারি বঙ্গবন্ধুকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল, ১১ দফা হচ্ছে ছয় দফার পাল্টা প্রস্তাব। ছয় দফার আন্দোলনকে নষ্ট করাই এর লক্ষ্য। সুতরাং ১১ দফার দাবিদারদের আগে মোকাবেলা করতে হবে।
বঙ্গবন্ধু তাদের সঙ্গে একমত হননি। তিনি বলেছেন, ১১ দফা হলো ছয় দফার সম্পূরক দাবি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি ১১ দফাকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানান ও বলেন, 'এই ছয় ও ১১ দফার ভিত্তিতে যৌথ আন্দোলন গড়ে উঠবে এবং তা হবে আমাদের দাবি আদায়ের অপরাজেয় শক্তি।' বঙ্গবন্ধুর কথা সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল। ছয় দফা ও ১১ দফার সম্মিলিত আন্দোলনেই দেশে সামরিক শাসনবিরোধী বিশাল গণঅভ্যুত্থান ঘটেছিল।
বর্তমান বাংলাদেশেও গণজাগরণ মঞ্চকে আওয়ামী লীগের উচিত হবে, স্বাধীনতার শত্রু ও সন্ত্রাস দমনের আন্দোলনে সহায়ক শক্তি হিসেবে গ্রহণ করা এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মঞ্চকে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার ব্যাপারে উৎসাহিত করা। গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সমাবেশে মঞ্চ সারাদেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের উচিত হবে, এই অভিযানে যাতে বাধা সৃষ্টি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা।
ছাত্রলীগ এখনও দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বড় ছাত্র প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তার ক্রেডিবিলিটি আত্মকলহ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও লাইসেন্সবাজির জন্য এখন অনেকটাই নষ্ট। ফলে জনজীবনে আন্দোলন করার আবেদন সে সৃষ্টি করতে পারছে না। গণজাগরণ মঞ্চের সন্ত্রাসবিরোধী কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়ে এবং সহায়তা দিয়ে ছাত্রলীগ তার নষ্ট ক্রেডিবিলিটি উদ্ধার করতে পারে। তাতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান আরও শক্তিশালী হবে। বিষয়টি ছাত্রলীগ নেতারা ভেবে দেখুন।
৫ ফেব্রুয়ারির গণজাগরণ দিবসের সমাবেশকে দুই বছর আগের বিশাল সমাবেশের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তুলনা করা উচিতও নয়। তখনকার রাজনৈতিক পরিবেশ এখন নেই। সেই গণঐক্য নেই। অবিরাম ব্যর্থ হরতাল, অবরোধের ডাক এবং অগি্নকাণ্ড ও বোমাবাজি দ্বারা নিরীহ মানুষ হত্যার তাণ্ডবে জনজীবনে একটা ভীতিকর ও বিভ্রান্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে। কিন্তু এই প্রতিকূল অবস্থা এবং ভেতরের ও বাইরের নানা বাধা সত্ত্বেও আমাদের প্রতিবাদী তরুণ প্রজন্মের সংগ্রামী ভূমিকা যে দমিত হয়নি, গত ৫ তারিখের সমাবেশ তার প্রমাণ। এই সমাবেশ দেশে বিরাজিত ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে একটি সাহস ও আশার আলো।
গণজাগরণ মঞ্চের বর্তমান নীতি ও নেতৃত্ব অপরিবর্তিত থাকলে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের যে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার কর্মসূচি তারা নিয়েছেন তা জনসমর্থন পাবে এবং সফল হওয়ার পথে অবশ্যই এগিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'বর্তমান সন্ত্রাস দমনে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় হয়নি।' আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সহমত পোষণ করি। ছিঁচকে সন্ত্রাস যত নৃশংস ও বর্বর হোক, তা দমনে কামান দাগানোর প্রয়োজন নেই। সরকার সন্ত্রাসীদের দমনে আরও কঠোর হোক এবং এই সন্ত্রাস মোকাবেলার জন্য তরুণ প্রজন্মের যে অংশ আজ উন্মুখ ও সক্রিয়, তাদের সহায়তা দিক। গণশত্রু দমনে গণজাগরণই হচ্ছে মোক্ষম দাওয়াই।
লন্ডন, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, শুক্রবার

Saturday, January 31, 2015

বিএনপির ভাগ্যে দিল্লিকা লাড্ডুও জুটল না by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

পৃথিবীটা ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। যার ফলে ইউরোপ বা আমেরিকায় যখন পরমাণু বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হতো, তখন তার বিষাক্ত তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ত সারাবিশ্বে। মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হতো। ফলমূল, শস্য, এমনকি গরুর দুধেও সেই তেজস্ক্রিয়ার বিষ ছড়িয়ে পড়ত। পৃথিবী ছোট হয়ে যাওয়ার দরুন এক দেশের রাজনীতির প্রভাবও শুধু একটি দেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না, দেশটি শক্তিশালী হলে তার রাজনীতির প্রভাব তেজস্ক্রিয়ার মতো সহজেই কাছে-দূরের দেশগুলোকেও প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত। আবার বড় দেশও। সুতরাং এই বিশ্বায়নের যুগে ভারতের রাজনীতির প্রভাব ছোট প্রতিবেশী বাংলাদেশসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশেও বর্তাবে, এটা স্বাভাবিক। তবে পরমাণু তেজস্ক্রিয়ার মতো এই প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া ক্ষতিকর না হলেই বাঁচোয়া। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মিত্র ভারত। সুতরাং ধরে নেওয়া গিয়েছিল, দুই দেশের মধ্যে নদীর পানি, স্থল সীমান্ত, ছিটমহল ও সীমান্ত বাণিজ্য নিয়ে নানা দ্বিপক্ষীয় সমস্যা থাকা সত্ত্বেও দিলি্ল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান গ্রহণ করবে না। এই আশাটায় বড় রকমের চিড় ধরানো হয়েছিল ভারতের গত সাধারণ নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির বিশাল জয়লাভের সম্ভাবনার মুহূর্তে। প্রচারণাটি চালিয়েছিল বাংলাদেশের বিএনপি ও জামায়াত চক্র। বিজেপি একটি সাম্প্রদায়িক দল। সুতরাং তারা ভারতে ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক হাসিনা সরকারের এবং কংগ্রেস দলের ট্রাডিশনাল মিত্র আওয়ামী লীগের প্রতি মিত্রতার হাত বাড়াবে না, বরং বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চাইবে_ এই প্রচারণায় বিএনপি বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস মুখর করে তুলেছিল। নরেন্দ্র মোদিকে অযাচিতভাবে অভিনন্দনবার্তা পাঠানো, বিজেপির নির্বাচন-জয়ে মিষ্টান্ন বিতরণ ইত্যাদি কাজ তারা করেছে, যা পরে তাদের জন্য বুমেরাং হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি তার পূর্ববর্তী বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন এবং ক্ষমতায় বসে এমন কিছু করতে চাননি, যা বিজেপি সরকার সম্পর্কে বিশ্বের সাধারণ মানুষের ধারণাকে মলিন করে ফেলবে এবং বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলো শঙ্কিত হতে পারে। বাংলাদেশের মন থেকে এই শঙ্কা দূর করার জন্য ঢাকার হাসিনা সরকারের দিকে প্রথমেই মৈত্রীর হাত বাড়িয়েছেন মোদি। যদিও বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের যে প্রতিশ্রুতি মোদি দিয়েছিলেন, সে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এখনও হয়নি; কিন্তু হাসিনা সরকারের প্রতি তার সরকারের মৈত্রীর নীতি পরিবর্তিত হয়েছে_ এমন ভাবারও কোনো কারণ নেই।
তথাপি দিলি্লতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর 'গভীর অন্তরঙ্গতার মধ্যে অনুষ্ঠিত' বৈঠক সম্পর্কে বিএনপির আশার দামামা আবার বেজে উঠেছিল। জামায়াতের সঙ্গে জোট পাকিয়ে দেশে আবার মানুষ পুড়িয়ে মারার সন্ত্রাস সৃষ্টি করে সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা সফল না হওয়ায় বিএনপি আবার আশায় বুক বেঁধেছিল, মোদি-ওবামা বৈঠকে বাংলাদেশ সম্পর্কে আলোচনা হবে এবং সেই আলোচনার সিদ্ধান্ত হাসিনা সরকারের অনুকূলে যাবে না। অর্থাৎ নিজেদের শক্তিতে ক্ষমতায় যেতে না পেরে বিএনপি আবার বিদেশি শক্তির সাহায্যপ্রার্থী। ঢাকার প্রথম আলো পত্রিকার ভাষ্যমতে, 'বিএনপি অতীতের মতোই বিদেশের দিকে তাকিয়ে আছে' (জানুয়ারি ২৪, ২০১৫)।
দিলি্লতে মোদি-ওবামা বৈঠক শুরু হওয়ার আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান তো বলেই ফেলেছেন, 'এই বৈঠকে বাংলাদেশ সম্পর্কে আলোচনা হবে এবং দুই নেতা যদি বাংলাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একমত হন, তাহলে বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়তে বাধ্য।' মাহবুবুর রহমানের অনুক্ত আশাটি ছিল দিলি্ল বৈঠকের সিদ্ধান্ত হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে যাবে। সম্ভবত এমন একটি আশা থেকেই বিএনপি নেত্রীর পুত্র কোকোর আকস্মিক মৃত্যু এবং তাদের মানুষ পুড়িয়ে মারার আন্দোলন সম্পর্কে জনমনে ধিক্কার দেখা দেওয়া সত্ত্বেও এই অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি বাতিল বা স্থগিত না করে দলটি ঘাপটি মেরে আছে। তাদের হয়তো মনের গভীরে আশা, এই সন্ত্রাস চালিয়ে গেলেই ওবামা ও মোদি বাংলাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার অজুহাতে হাসিনা সরকারের ওপর জোরালো চাপ সৃষ্টি করবেন; যার ফলে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম হবে।
কথায় বলে, 'ধন্য আশা কুহকিনী'। মোদি-ওবামা দিলি্ল বৈঠক সম্পর্কে বিএনপির মনের গোপন আশা সফল হয়নি এবং এ সম্পর্কিত তাদের প্রচারণাও সত্য প্রমাণিত হয়নি। বাংলাদেশ সম্পর্কে মোদি ও ওবামা কানে কানে কথা বলে থাকতে পারেন, কিন্তু প্রকাশ্যে কোনো আলোচনা হওয়ার কথা নেই এবং প্রকাশিত যুক্ত বিবৃতিতেও তার কোনো উল্লেখ নেই। তারা বাংলাদেশ সম্পর্কে যে বর্তমান স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চান, তা দুই সরকারের কার্যক্রম থেকেই স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট ওবামার হোয়াইট হাউসে বসবাসের মেয়াদ আর বেশিদিন নেই। যে বিশাল জনপ্রিয়তা নিয়ে তিনি হোয়াইট হাউসে এসেছিলেন, ততোধিক জনসমর্থনহীনতা ও ব্যর্থতার অপবাদ নিয়ে তাকে হোয়াইট হাউস ছাড়তে হচ্ছে। বাংলাদেশ নিয়ে বিব্রত থাকার সময় এটা তার নয়। তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে একটা শেষ চমক দেখিয়ে অর্থাৎ বিশ্বমুদ্রা হিসেবে ডলারের পতন আশঙ্কা, চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থান রোধে একটা সফল পদক্ষেপ নিয়ে তার প্রেসিডেন্সির কলঙ্ক দূর করা এবং আগামী প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলকে ভরাডুবির হাত থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করা। এই নীতি সফল করতে হলে তার প্রশাসনের নতুন এশীয় নীতির সাফল্য দরকার এবং তা একমাত্র সম্ভব ভারতের সহযোগিতা লাভ দ্বারা। ভারত সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রে চীনের প্রতিযোগী সুপার পাওয়ার হতে চায়। মোদি দিলি্লতে ক্ষমতায় আসার পর তার সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করা সত্ত্বেও (শিগগির আবার মোদি চীন সফরে যাবেন) দুই দেশের সীমান্ত সমস্যা, এশিয়ায় সামরিক ও অর্থনেতিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। আমেরিকা এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ভারতকে আরও কোলে টেনে নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে তার সামরিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ সৃষ্টির অঘোষিত পরিকল্পনা সফল করতে চায়। পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ায় মার্কিন রণনীতি ক্রমাগত মার খাচ্ছে। এখন দক্ষিণ এশিয়ায় পানি ঘোলা করে ওবামা প্রশাসন আমেরিকার মুখ রক্ষা করতে চায়। এ ক্ষেত্রে গোটা দক্ষিণ এশিয়া নিয়েই ওবামা প্রশাসনের মাথাব্যথা। এ অঞ্চলের একটি ছোট দেশ বাংলাদেশ এ মুহূর্তে স্বতন্ত্রভাবে তার প্রশাসনের চিন্তাভাবনায় আসা সম্ভব নয়। এ অসম্ভবকে নিয়ে বিএনপির মাথামোটা নেতা-নেত্রী অলীক সুখস্বপ্নে বিভোর হতে পারেন।
আমেরিকার মাথাব্যথা এখন বাংলাদেশ নয়। বরং মৌলবাদী জঙ্গি সন্ত্রাস দমনে হাসিনা সরকারের সাফল্যে তারা খুশি। আমেরিকার মাথাব্যথা এখন অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে চীনের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ এবং এশিয়া ও আফ্রিকায় তার দ্রুত প্রভাব বিস্তার নিয়ে। ওয়াশিংটনের ললাট এই ভেবে কুঞ্চিত, বিশ্বমুদ্রা হিসেবে আমেরিকান ডলারের দাপট এখন পর্যন্ত অব্যাহত থাকলেও চীন-ভারত-ব্রাজিল প্রভৃতি দেশ, বিশেষ করে চীনের উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের পাল্টা যে ব্রিকস ব্যাংক গড়ে উঠতে যাচ্ছে, তা অদূর বা দূরভবিষ্যতে ডলারের পতন ঘটায় কি-না! চীন এখন আমেরিকার অস্ত্র বিক্রির মার্কেটেও অনুপ্রবেশ করেছে এবং আমেরিকার কায়দায় হালকা থেকে ভারী মারণাস্ত্র তৈরি করছে। অস্ত্র বিক্রির বিশ্ববাণিজ্যেও যদি মার্কিন ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি মার খায়, তাহলে কোনোভাবেই বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্য ও প্রভুত্ব টিকিয়ে রাখা যাবে না। আমেরিকা তাই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সম্প্রসারণ চাইছে না। আফগানিস্তানে গুড তালেবানদের সঙ্গে আপস করতে চাইছে। ইসলামিক স্টেট বা আইসিসির সঙ্গে যুদ্ধেও জোরালোভাবে লিপ্ত হচ্ছে না। সে চাচ্ছে এশিয়া ও আফ্রিকায় চীনের ক্রমবর্ধিষ্ণু প্রভাব ঠেকাতে। অন্যদিকে ইউক্রেনে যুদ্ধ অব্যাহত রেখে পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় পুনর্জাগরণ ঠেকাতে।
স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতিতে আবার স্নায়ুযুদ্ধের যুগ ফিরে আসছে এবং নতুনভাবে সুপার পাওয়ার শক্তি শিবির তৈরি হতে যাচ্ছে। পঞ্চাশের দশকের দুই শক্তি শিবিরের একটিতে ছিল আমেরিকা, চীন, পাকিস্তানসহ কিছু দেশ; অন্যদিকে সোভিয়েত শক্তি শিবিরের সমর্থক ছিল ভারত, পূর্ব ইউরোপ এবং জোটনিরপেক্ষ বহু দেশ। বর্তমানে এই অবস্থানটা পাল্টেছে। সোভিয়েত পাওয়ার ব্লক এখন নেই। কিন্তু চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল প্রভৃতি কয়েকটি দেশ নিয়ে গড়ে উঠছে নতুন পাওয়ার ব্লক। চীন এখন আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে যে নতুন শক্তি শিবির গড়ে উঠছে, সেখানে ভারতের অবস্থান কোথায়? ওবামার সঙ্গে মোদির সাম্প্রতিক গলাগলি, ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নেহরু আমলের মতো রুশ অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল না রেখে আমেরিকা থেকে অস্ত্র আমদানি, এমনকি আমেরিকাকে ভারতে যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণের কারখানা প্রতিষ্ঠার সুযোগদান (যে অস্ত্র ভারত বিদেশেও বিক্রি করতে পারবে) ইত্যাদি পদক্ষেপ দেখে অনেক পর্যবেক্ষক অনুমান করছেন, মোদি সরকার আমেরিকার সঙ্গেই ভালোভাবে গাঁটছড়া বাঁধার দিকে এগোচ্ছে।
সম্ভবত ওবামার দিলি্ল সফর, ভারতের সঙ্গে পরমাণু সহযোগিতা এবং সামরিক সহযোগিতার বিভিন্ন চুক্তির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া দেখেই বেইজিং সতর্কতামূলক পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রুশ নেতা পুতিনকে তাদের একটি জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। হয়তো চীন চায় দিলি্ল ও ওয়াশিংটনকে এই মেসেজটা দিতে যে, 'ভারত এবং আমেরিকা যদি চীনবিরোধী জোট বাঁধে, তাহলে চীনেরও জোট বাঁধার শক্তিশালী জুটির অভাব হবে না। বিশ্ব রাজনীতির অনেক পর্যবেক্ষকই মনে করছেন, বিশ্ব আবার শক্তি শিবির বিভক্তির দিকে এগোচ্ছে ও মোদির ভারত সেক্ষেত্রে হয়তো আজ আর কাল হোক, মার্কিন শিবিরেই অবস্থান নেবে এবং প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীনকেই বেছে নিয়ে সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তার আধিপত্য বিস্তার ঠেকানোর পদক্ষেপ নেবে। আমেরিকা এই পথেই মোদি সরকারকে টানতে চাইছে। বিশ্ব রাজনীতির কিছু পর্যবেক্ষকের ধারণার সঙ্গে আমার ধারণাটি মেলে না। ওবামার সঙ্গে বৈঠকের পর মোদি আবার চীন সফরে যাবেন_ এই সম্ভাবনার খবরে মনে হয়, আমেরিকার সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দ্বারা মোদি সরকার ভারতকে এশিয়ার অদ্বিতীয় শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চায় (যেমন এক সময় চীনও তা চেয়েছিল); কিন্তু সরাসরি চীনের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত হওয়া তার পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হবে না।
মোদি সমর্থক সংঘ পরিবারগুলো যতই চীনবিরোধী হাঁকডাক শুরু করুক, মোদি চীন অথবা পাকিস্তান কোনো দেশের সঙ্গেই সহসা বিবাদে লিপ্ত হতে যাবেন মনে হয় না। চীনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যায় তিনি ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিচ্ছেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেও সংঘর্ষ সম্প্রসারণের নীতি পরিহার করে চলছেন। ভারতের মতো একটি বিরাট দেশ পরিচালনায় নরেন্দ্র মোদি যদি শেষ পর্যন্ত তার পূর্বসূরি অটল বিহারি বাজপেয়ির প্রাগমেটিজমের পরিচয় দেন, তাহলে আমি বিস্মিত হবো না। স্বাধীনতার পর ভারতে যে সেক্যুলার, গণতন্ত্রমনা ও পশ্চিমা নীতি সম্পর্কে সন্দিহান শক্তিশালী এস্টাবলিশমেন্ট গড়ে উঠেছে, সে এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রেখেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এগোতে হবে।
হোয়াইট হাউসে ওবামা ভারতের মোদির চেয়েও বিশাল জনপ্রিয়তা নিয়ে ঢুকেছিলেন। আজ তার পরিণতি তিনি দেখছেন। মোদি কুশলী ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক। আন্তর্জাতিক রাজনীতির কোনো ফাঁদেই সহসা পা দিয়ে তিনি নিজের বর্তমান ভাবমূর্তিকে এবং সব মহলের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতাকে এত শিগগিরই প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইবেন না। সম্ভবত ভারতের উন্নয়নের ব্যাপারে তার আগ্রহ আন্তরিক। মোদি সরকার বিএনপির সন্ত্রাসী রাজনীতির কর্মকাণ্ড দেখার পরও হাসিনা সরকারকে বিব্রত করতে চাইবে, তা আমি আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে ধারণা করি না। মোদি সরকার ভারতের স্বার্থেই এই মুহূর্তে এ ধরনের কোনো হঠকারী নীতি গ্রহণ করতে পারে না। বাংলাদেশে বিএনপি বা বিএনপি সমর্থক যে মহলটি দিলি্লতে মোদি-ওবামা বৈঠক সম্পর্কে অতি আশায় বুক বেঁধে দেশে সন্ত্রাস চালিয়ে এখনও সাধারণ মানুষকে আগুনে পোড়াচ্ছে, তারা শিগগিরই বুঝতে পারবে আগুনে পুড়িয়ে নিরীহ মানুষ মেরে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করা যায় না। তারা নিজেদের আগুনে নিজেরাই পুড়বে।
লন্ডন, ৩০ জানুয়ারি ২০১৫, শুক্রবার