Thursday, March 3, 2016

খালাসের রায়ের ১৩ বছর পর কারামুক্ত হলেন জবেদ আলী

জবেদ আলী বিশ্বাস
উচ্চ আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর গতকাল বুধবার কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন সাতক্ষীরার জবেদ আলী বিশ্বাস (৫৯)। তবে এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে এক যুগেরও বেশি সময়। খালাসের আদেশ আদালত থেকে কারাগারে পৌঁছাতে ১৩ বছর সময় লেগেছে।
বিনা দোষে জবেদ আলীর ১৩ বছর কারাবন্দী থাকার ঘটনাকে ‘অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ ও দুঃখজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে তদন্ত করা হবে।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কয়লা গ্রামের মৃত আমজেল বিশ্বাসের ছেলে জবেদ আলী বিশ্বাস। স্ত্রী ফরিদা খাতুন মারা যাওয়ার পর তাঁর দুই মেয়ে লিলি (৮) ও রেক্সোনা (৫) জেলার তালা উপজেলার মানিকহার গ্রামে মামা আবুল কাসেমের বাড়িতে থাকত। ১৯৯৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জবেদ আলী শ্যালকের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। ওই দিন লিলি মারা যায়। এ ঘটনায় শ্যালক আবুল কাসেম বিষ খাইয়ে লিলিকে হত্যার অভিযোগ এনে জবেদ আলীর বিরুদ্ধে তালা থানায় হত্যা মামলা করেন। পরদিন পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এরপর ওই মামলায় জবেদ আলীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।
সাতক্ষীরা জেলা আদালতের আইনজীবী জিল্লুর রহমান বলেন, সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সিরাজুল ইসলাম ২০০১ সালের ১ মার্চ জবেদ আলীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও দুই বছরের কারাদণ্ড দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে জবেদ আলী হাইকোর্টে জেল আপিল করেন। ওই বছরের ১১ মে জবেদ আলীকে সাতক্ষীরা কারাগার থেকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
নথি থেকে আরও জানা যায়, ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্ট জবেদ আলীকে নির্দোষ ঘোষণা করে বেকসুর খালাস দেন। ২৬ মার্চ হাইকোর্ট থেকে খালাসের আদেশ সাতক্ষীরা অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-২-এ পৌঁছায়। সাতক্ষীরার তৎকালীন অতিরিক্ত দায়রা জজ হাইকোর্টের আদেশ কারাগারে না পাঠিয়ে তা আদালতের রের্কডরুমে সংরক্ষণের নির্দেশ দেন।
জবেদ আলী বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৫ সালে তিনি হাইকোর্ট থেকে খালাস পাওয়ার খবর পেয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে জানান। জেল আপিলের অবস্থা জানতে চেয়ে তিনি ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সাতক্ষীরা অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে আটটি চিঠি পাঠান। কিন্তু একটি চিঠিরও জবাব মেলেনি।
জবেদ আলী বলেন, সম্প্রতি একই কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় তিনি সাতক্ষীরার অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) জিল্লুর রহমানকে একটি চিঠির মাধ্যমে জানান, ২০০৩ সালে মামলা থেকে খালাস পাওয়ার পরও ১৩ বছর ধরে তিনি কারাবন্দী। জিল্লুর রহমান খোঁজখবর নিয়ে এ তথ্যের সত্যতা পান।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি জিল্লুর রহমান ও আরেক অতিরিক্ত পিপি ফাহিমুল হক সাতক্ষীরার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে জবেদ আলীর মুক্তির জন্য আবেদন করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি আবেদনটির ওপর শুনানি হয়। আদালতের নির্দেশে ২৯ ফেব্রুয়ারি জবেদ আলীকে যশোর থেকে সাতক্ষীরা কারাগারে নিয়ে আসা হয়। এরপর গতকাল মাথায় হেলমেট পরিয়ে তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক মো. আশরাফুল ইসলাম মুক্তির আদেশ দেন।
কারাগার সূত্র জানায়, গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জবেদ আলীকে মুক্তির আদেশ সাতক্ষীরা কারাগারে পৌঁছায়। বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
পরে জবেদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, গত পাঁচ বছর ক্ষোভে-দুঃখে তিনি কোথাও মুক্তির জন্য আবেদন করেননি। তিনি বলেন, ‘আমাকে ১৩ বছর যাঁরা অন্যায়ভাবে জেল খাটিয়েছেন, তাঁদের বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলাম।’ পরে কারাফটকে অপেক্ষায় থাকা জামাতা আবদুল হামিদের সঙ্গে তিনি কলারোয়ার গ্রামের বাড়িতে চলে যান।
সাতক্ষীরা জজ আদালতের পিপি ওসমান গণি দাবি করেছেন, যাঁদের অবহেলায় জবেদ আলীকে ১৩ বছর অন্যায়ভাবে কারাগারে থাকতে হয়েছে, তদন্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
যোগাযোগ করা হলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি অবশ্যই এ ঘটনার তদন্ত করাব। যদি আদালতের কারও গাফিলতি থাকে তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারাগারের বিষয়টি তদন্তের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলব।’

এক বছর পর পৃথিবীতে ফিরলেন দুই নভোচারী

সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মহাকাশে কাটানো দুই নভোচারী পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন। মহাকাশে ৩৪০ দিন অবস্থানের পর মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় ১১টা ২৬ মিনিটে পৃথিবীতে ফিরলেন নাসার ৪৬তম অভিযান কমান্ডার স্কট কেলি ও রুশ মহাকাশচারী মিখাইল কোরনিয়েনকো নামের দুই নভোচারী। তাদের সঙ্গে পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন সারজে ভলকভ নামের আরও এক রুশ মহাকাশচারী। মঙ্গলবার রাতে তাদের বহনকারী মহাকাশযানটি কাজাখিস্তানে সফল অবতরণ করে। মহাকাশ স্টেশনে ৩৪০ দিন কাটিয়েছেন কেলি ও কোরনিয়েনকো। আর এটি মহাকাশে স্বাভাবিক বসবাসের তুলনায় দ্বিগুণ। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পক্ষ থেকে এত দিন যারা মহাকাশে গিয়েছেন তার মধ্যে স্কট কেলি ও কোরনিয়েনকোই সবচেয়ে বেশি দিন মহাকাশে কাটালেন।
নাসার এ দুই বিজ্ঞানী মহাকাশে গত এক বছরে ১৪৪ মিলিয়ন মাইল ভ্রমণ করেছেন, পৃথিবীর চারপাশে ঘুরেছেন মোট ৫ হাজার ৪৪০ বার। এছাড়া এই দীর্ঘ সফরে ১০ হাজার ৮৮০ বার সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় দেখেছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন অভিযানে কেলি মহাকাশে মোট ৫২০ দিন, কোরনিয়েনকো ৫১৬ দিন ও ভলকভ ৫৪৮ দিন কাটান। গত বছর ২৭ মার্চ মহাকাশে পাড়ি দেন তারা। পরে ৪ সেপ্টেম্বর তাদের সঙ্গী হন ভলকভ। মঙ্গলে মানুষ পাঠানো নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে কেলিদের এই দীর্ঘ মহাকাশযাপনকে বড় অর্জন বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও মহাকাশ স্টেশন এবং মঙ্গলের পরিবেশ এক রকম নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন পৃথিবীর থেকে বহুদূরে মাধ্যাকর্ষণের বাইরে থাকলে মানুষের শরীরে কী কী পরিবর্তন আসতে পারে, তা মহাকাশ স্টেশনে এক বছর কাটিয়ে আসা কেলি ও কোরনিয়েনকোকে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অনেক সহজে জানা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দিল্লি সরকারের টার্গেটে চার তারকা পত্নী

পান-মশলার ব্যবহার রুখতে এবার বলিউডের চার তারকা-পত্নীকে টার্গেট করেছে দিল্লি সরকার। সেই মতে চিঠিও দিয়েছে এই চার তারকা-পত্নীকে। তাদের চিঠি দিয়ে দিল্লি সরকার অনুরোধ জানায়, তারা যেন পান-মশলার বিজ্ঞাপন থেকে অভিনেতা স্বামীদের বিরত রাখে। সরকারের এই অভিনব উদ্যোগে তারকা-পত্নীরা কতটা সাড়া দিয়েছেন, তা জানা যায়নি। বুধবার এ খবর প্রকাশ করেছে দ্য হিন্দু। জানা যায়, এর আগে পান-মশলার বিজ্ঞাপন না দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে অজয় দেবগন, শাহরুখ খান,
আরবাজ খান ও গোবিন্দকে নোটিশ পাঠায় দিল্লি সরকার। সাড়া না মেলায় শেষ পর্যন্ত তারকা পত্নীদের টার্গেট করা হয়। অজয়ের স্ত্রী কাজল, শাহরুখের স্ত্রী গৌরী, আরবাজের স্ত্রী মালাইকা ও গোবিন্দার স্ত্রী সুনীতাকে চিঠি পাঠিয়েছেন দিল্লির অতিরিক্ত স্বাস্থ্য অধিকর্তা। চিঠিতে বলা হয়েছে, যে সব পান মশলায় সুপারি থাকে, তার ব্যবহার ক্যান্সারের মতো মরণ রোগের কারণ হতে পারে। তাই তারা যেন তাদের অভিনেতা স্বামীদের অনুরোধ করেন, জনস্বার্থে তারা যেন এ ধরনের বিজ্ঞাপন না করেন।

ইংল্যান্ড ডাকছে মুস্তাফিজকে

ইংল্যান্ডে খেলার স্বপ্ন ছিল মুস্তাফিজুরের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু হয়েছে এক বছর হয়নি। অথচ এরই মধ্যে পাকিস্তান সুপার লীগ (পিএসএল) ও আইপিএলে ডাক পেয়েছেন। এবার ইংল্যান্ডে খেলার স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে তার। ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী কাউন্টি ক্লাব সাসেক্সে ডাক পেলেন মুস্তাফিজ। ইংলিশ কাউন্টি দলের হয়ে বাংলাদেশের এই তরুণ পেস সেনসেশন খেলবেন আগামী মৌসুমের ন্যাটওয়েস্ট টি ২০ ব্লাস্ট প্রতিযোগিতা ও রয়্যাল লন্ডন ওয়ানডে কাপে। টুর্নামেন্টে খেলতে পারলে সাসেক্সে বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হবেন ২০ বছর বয়সী মুস্তাফিজ।
ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছে স্বপ্নের মতো। পাকিস্তানের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক টি ২০ অভিষেকে দারুণ বোলিংয়ে নেন মোহাম্মদ হাফিজ ও শহীদ আফ্রিদির উইকেট। এরপর ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকেই পাঁচ উইকেট। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকে ৩৭ রান দিয়ে নেন চার উইকেট। অভিষেকের পর একের পর এক মুগ্ধতা ছড়ানো পারফরম্যান্সে ক্রিকেটবিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছেন মুস্তাফিজ। এরই ধারাবাহিকতায় পিএসলে সুযোগ পেয়ে যান। কিন্তু ইনজুরির কারণে খেলতে পারেননি পিএসএলে। পরে আইপিএলের নিলামেও সানরাইজার্স হায়দরাবাদ তাকে কিনে নেয়। ডাক এসেছে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লীগ থেকেও। এবার মুস্তাফিজকে ডাকছে ইংল্যান্ড। কাউন্টি দলে খেলার সুযোগ পেয়ে দারুণ খুশি মুস্তাফিজ। তিনি বলেন, ‘কাউন্টি ক্রিকেটে খেলার সুযোগ পেয়ে আমি রোমাঞ্চিত। ইংল্যান্ডে খেলা সব সময়ই আমার লক্ষ্য ছিল। সাসেক্স আমাকে সেই সুযোগটা করে দেয়ায় তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’ মুস্তাফিজ বলেন, ‘তারা (সাসেক্স) আমার ওপর যে আস্থা রেখেছে, আশা করি মাঠের পারফরম্যান্সেই আমি তার প্রতিদান দিতে পারব।’
২০ মে থেকে শুরু হবে টি ২০ ব্লাস্ট। ফিট থাকলে প্রথম ম্যাচেই ব্রিস্টলে গ্লস্টারশায়ারের বিপক্ষে মাঠে নামতে পারেন মুস্তাফিজ। ওয়ানডে টুর্নামেন্ট শুরু হবে ৫ জুন। সাসেক্সের প্রথম ম্যাচ ৬ জুন এসেক্সের বিপক্ষে। তবে টানা ক্রিকেটের মধ্যে থাকা মুস্তাফিজের খেলা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চোট পাওয়ার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তাকে নিয়ে সতর্ক। এশিয়া কাপেও তিনি ইনজুরির কারণে ছিটকে গেছেন। সামনেই টি ২০ বিশ্বকাপের ব্যস্ততা। এরপর আইপিএল শুরু হবে। এত ব্যস্ত সূচির মধ্যে তিনি কতটা সুস্থ থাকবেন, তার ওপরই কাউন্টিতে খেলা নির্ভর করবে। এদিকে মুস্তাফিজকে দলে পেয়ে উচ্ছ্বসিত সাসেক্স কোচ মার্ক ডেভিস। স্কাই স্পোর্টসকে তিনি বলেন, ‘মুস্তাফিজকে সাসেক্স ক্রিকেটে পেয়ে আমি রোমাঞ্চিত। সে অবিশ্বাস্য সামর্থ্যরে এক ক্রিকেটার এবং এ মুহূর্তে বিশ্ব ক্রিকেটের উজ্জ্বল তরুণ প্রতিভাদের একজন। অপ্রথাগত বোলিং বৈচিত্র্যের কারণে ওর বিপক্ষে ব্যাট করা খুব কঠিন। আমাদের দলের জন্য সে হবে দারুণ এক সংযোজন।’ বাংলাদেশের হয়ে এর আগে মাত্র দু’জন ক্রিকেটার ইংল্যান্ডের ঘরোয়া টি ২০ ক্রিকেটে খেলেছেন। তামিম ইকবাল নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে টি ২০তে খেলেছেন। আর সাকিব আল হাসান উস্টারশায়ারের হয়ে ওয়ানডে কাপ, টি ২০ ও কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেছেন।

সুপার টুয়েসডের চ্যালেঞ্জ

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লড়াইয়ে তীব্র উত্তেজনাকর মুহূর্তে ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান পার্টি। সুপার টুয়েসডে-তে গতকাল কমপক্ষে ১১টি রাজ্যে ও একটি টেরিটরিতে প্রাইমারি অথবা ককাস নির্বাচন হয়েছে। এ নির্বাচনকে বলা হয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ইভেন্ট। কারণ, এ নির্বাচনে প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে থাকে। দলীয় মনোনয়নের জন্য রিপাবলিকান দলের প্রার্থীকে পেতে হবে ১২৩৭ জন ডেলিগেট। এসব রাজ্যে আছে তার অর্ধেক সংখ্যক ডেলিগেট। ফলে এখান থেকে যতটা বেশি সম্ভব ডেলিগেট যে প্রার্থী বাগিয়ে নিতে পারবেন মনোনয়নের পাল্লা তার জন্য ভারি হবে। অন্যদিকে এসব রাজ্যে ডেমোক্রেট দলের রয়েছে প্রায় ৮৮০ জন ডেলিগেটস। মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তাদের যতগুলো ডেলিগেট প্রয়োজন এ সংখ্যা তার এক-তৃতীয়াংশ। তবে সুপার টুয়েসডেতে প্রাইমারি বা ককাস নির্বাচন হয়ে থাকে যেসব রাজ্যে ও টেরিটরিতে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত। এগুলো হলো আলাবামা, আরকানসাস, কলোরাডো, জর্জিয়া, ম্যাসাচুসেটস, মিনেসোটা, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওকলাহোমা, টিনেসি, টেক্সা, ভারমন্ট, ভার্জিনিয়া, ওয়োমিং ও আমেরিকান সামোয়া। এসব এলাকায় রয়েছে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মার্কিনিদের বসবাস। তারা ডেমোক্রেট দলের হিলারি ক্লিনটনের প্রতি রায় দেবেন বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে। যদি তা-ই হয় তাহলে হিলারি ক্লিনটন মনোনয়ন লড়াইয়ে বার্নি স্যান্ডার্সকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারেন অনেকটাই। অন্যদিকে এর মধ্যে রয়েছে বার্নি স্যান্ডার্সের নিজের রাজ্য ভারমন্ট। সেখানে তিনি প্রবল সমর্থন আদায় করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
সুপার টুয়েসডে কি?
সুপার টুয়েসডে নির্বাচন হয়েছে ১লা মার্চ। বেশির ভাগ রাজ্যে ভোটকেন্দ্র খোলা ছিল স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত। আজ সকাল থেকে ফল আসা শুরু হবে। আলাস্কায় রিপাবলিকানদের ককাসের ভোট চলতে পারে মধ্যরাত অবধি। এ নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি কলেজ অ্যাথলেটিক কনফারেন্স, যার নাম সাউথইস্ট কনফারেন্স (এসইসি)। এর সঙ্গে জড়িত আলাবামা, আরকানসান, জর্জিয়া, ওকলাহোমা, টিনেসি, টেক্সাস ও ভার্জিনিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের এতগুলো রাজ্যে একযোগে নির্বাচন রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক দলের কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। রিপাবলিকান দলের সিনেটর টেড ক্রুজের রয়েছে এখানে সংরক্ষণবাদী ও ইভাঞ্জেলিক্যালদের সমর্থন। তিনি এসইসি প্রাইমারিকে ‘ফায়ারওয়াল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এরই মধ্যে ফ্লোরিডার গভর্নর জেব বুশ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। ফলে এসইসি নির্বাচনে টেড ক্রুজকে সমর্থন দিয়ে ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার খরচে বিজ্ঞাপন প্রচার করেছে পিএসি রাইট টু রাইজ। অন্যদিকে ডেমোক্রেট শিবিরের প্রার্থী হিলারি দক্ষিণাঞ্চলে অনেক বেশি ডেলিগেট বাগিয়ে নেবেন বলে বলা হচ্ছে। কারণ, আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মার্কিনিরা বসবাস করেন ওই অঞ্চলে। তাদের মধ্যে হিলারির রয়েছে ব্যাপক জন সমর্থন।
সুপার টুয়েসডে কিভাবে কাজ করে?
প্রতিটি রাজ্যে আলাদা আলাদা ব্যবস্থায় ভোট হয়। কিছু রাজ্যে হয় প্রাইমারি। এগুলো পরিচালনা করে রাজ্য। বাকিগুলোতে হয় ককাস। এগুলো রাজ্যের দলগুলো আয়োজন করে থাকে। সুপার টুয়েসেডেতে একই সঙ্গে আলাবামা, আরকানসান, জর্জিয়া, ম্যাসাচুসেটস, ওকলাহোমা, টিনেসি, টেক্সাস, ভারমন্ট ও ভার্জিনিয়ায় প্রাইমারি নির্বাচন হচ্ছে ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকানদের। অন্যদিকে দুদলেরই ককাস নির্বাচন হচ্ছে কলোরাডো ও মিনেসোটায়। রিপাবলিকানরা আলাদাভাবে আলাস্কা ও ওয়োমিংয়ে আয়োজন করেছে ককাস। ডেমোক্রেটরা আমেরিকান সামোয়াতে আয়োজন করেছে ককাস। এ দিনটি ফ্রন্ট রানার হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। তারা কি পরিমাণ ডেলিগেট সংগ্রহ করতে পারেন তা নির্ধারিত হবে এ নির্বাচন। এর ওপর নির্ভর করে বাকি রাজ্যগুলোর পরিণতি। অন্যদিকে এ নির্বাচনে যারা ছিটকে পড়বেন ধরে নেয়া যায় তাদের নির্বাচনী দৌড়ের ইতি ঘটতে পারে। রিপাবলিকান দল থেকে এখনও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন বিলিয়নিয়ার ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফ্লোরিডার সিনেটর মারকো রুবিও, টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ, ওহাইওর গভর্নর জন কাসিচ ও অবসরপ্রাপ্ত নিউরোসার্জন বেন কারসন। এ লড়াইয়ে ডেমোক্রেট শিবিরের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। রাজ্য থেকে রাজ্যে ভোটের ধরন ও ভোটারের ধরনে পরিবর্তন আছে। তবে ট্রাম্প ও হিলারি এতে প্রাধান্য বিস্তার করবেন। ট্রাম্পের  জন্য বড় সমর্থন আসতে পারে ভার্জিনিয়া, জর্জিয়া, ওকলাহোমা, ভারমন্ট থেকে। অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক শিবিরে বেশির ভাগ রাজ্যেই হিলারি প্রাধান্য বিস্তার করবেন বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে বিভিন্ন বিশ্লেষণ। বলা হচ্ছে টেক্সাস, ভার্জিনিয়া, জর্জিয়া, আরকানসান ও আলাবামায় তিনি ডবল ডিজিটে এগিয়ে থাকতে পারেন। তবে স্যান্ডার্স এগিয়ে থাকবেন নিজের রাজ্য ভারমন্টে। এতগুলো রাজ্যের মধ্যে টেক্সাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে রয়েছে রিপাবলিকানদের ১৫৫ জন ডেলিগেট। ডেমোক্রেটদের আছে ২৫২ জন ডেলিগেট। এ জন্য তাদের অর্জন করার জন্য দুদলের প্রার্থীরাই এ রাজ্যে অনেকটা বেশি সময় প্রচারণায় কাটিয়েছেন। ব্যয় করেছেন প্রচুর অর্থ। অন্য রাজ্যগুলোতে ডেলিগেটদের বিন্যাস এরকম আলাবামায় ডেমোক্রেটদের আছে ৬০ জন ও রিপাবলিকানদের আছে ৫০ জন ডেলিগেট। জর্জিয়ায় রিপাবলিকানদের ডেলিগেট ৭৬ জন, ডেমোক্রেটদের ১১৬ জন। টিনেটিসে ডেমোক্রেটদের ৭৬ ও রিপাবলিকানদের ৫৮ জন ডেলিগেট আছে। ভার্জিনিয়ায় ডেমোক্রেটদের আছে ১১০ জন ডেলিগেট। রিপাবলিকানদের আছে ৪৯ জন ডেলিগেট।
এরপরই আগামী ৫ই মার্চ শনিবার বেশ কতগুলো রাজ্যে ভোট হবে। এর মধ্যে কানসাস ও লুইজিয়ানায় দুদলই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। কেনটাকি, মেইনেতে অনুষ্ঠিত হবে রিপাবলিকানদের ককাস। নেব্রাস্কায় হবে ডেমোক্রেটদের ককাস। ৮ই মার্চ মিশিগান ও মিসিসিপিতে হবে প্রাইমারি, হাওয়াই ও ইডাহোতে হবে ককাস নির্বাচন। এর পরে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের চোখ থাকবে ফ্লোরিডা ও ওহাইর দিকে। সেখানে নির্বাচন হবে ১৫ই মার্চ।

আমরা পতাকাটি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যাই by কামরুল আলম খান খসরু

একটি জাতীয় পতাকা মানে একটি জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদ্বয়, একটি জাতির স্বীকৃতি। একটি জাতীয় পতাকা মানে একটি জাতির আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা, ভাষা, সংস্কৃতি তথা তার সাংস্কৃতিক পরিচয়। জাতীয় পতাকা সার্বভৌমত্বের প্রতীক আর জাতীয় সংগীত সংস্কৃতির প্রতীক। জাতীয় পতাকা আর জাতীয় সংগীত নিয়েই রাষ্ট্রস্থিতি লাভ করে এগিয়ে যায়। বাঙালি জাতি তার প্রাণপ্রিয় পতাকা অর্জনে অবর্ণনীয় অকল্পনীয় দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করেছে। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। জাতীয় পতাকা অর্জনে বাঙালি জাতির বীরত্বগাথা ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
বাংলাদেশের পতাকা তৈরির পর্বটি খুবই আকর্ষণীয় এবং উত্তেজনাময়। এটি একটি টিম স্পিরিটের ফলাফল। এ পতাকাটি তৎকালীন ছাত্রলীগের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের উর্বর মস্তিষ্কের বহিঃপ্রকাশ। এ পতাকা তৈরিতে আমি সেদিন আদ্যোপান্ত জড়িত ছিলাম। তাই আমার স্মৃতিতে যতটুকু মনে আছে তা জাতির সামনে তুলে ধরছি।
পতাকার ভাবনাটি হঠাৎ করে কারও মাথায় উদয় হয়নি। এটি অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছিল। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘সিচুয়েশন ডিমান্ডস’। অর্থাৎ একটি পতাকা অতি জরুরি হয়ে পড়েছিল পরিস্থিতির কারণে। আর এটি তৈরি হয়েছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে এক কর্মদিবসের প্রচেষ্টায়। ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ এই পতাকাটি প্রথমবারের মতো উত্তোলন করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গণে। সেদিন উত্তোলন অনুষ্ঠানে আগত ছাত্র-জনতার মধ্যে বাঁধভাঙা জোয়ার বয়ে যায়।
১৯৬২ সালে আমি ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হই। তখন আমি কলেজছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি ছিল তখন ভয়াবহ। সামরিক সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফ্রন্ট (এনএসএফ)-র দৌরাত্ম্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা তখন মিছিল করার সাহস পাচ্ছিল না। ছাত্রলীগের বহু ত্যাগী নেতা প্রকাশ্যে এনএসএফের ক্যাডারদের হাতে নিয়মিত প্রহৃত হচ্ছিলেন। এরকম পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের জন্য বঙ্গবন্ধু ডেকে পাঠান বিশিষ্ট ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানকে। তিনি সিরাজ ভাইকে সারা দেশ চষে কিছু অকুতোভয় তরুণ সংগ্রহ করে দিতে বলেন। সিরাজ ভাই বঙ্গবন্ধুর কথামতো ৮-১০ জন তরুণ সংগ্রহ করে একদিন বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে নিয়ে যান। আমি ছিলাম এ দলের অন্যতম সদস্য। বঙ্গবন্ধু আমাদের উদ্দেশে নাতিদীর্ঘ এক বক্তৃতা করেন। আমরা তার চেহারা, ব্যক্তিত্ব, সাহস, বাচনভঙ্গি দেখে মুগ্ধ হয় যাই। পরে সিরাজ ভাই আমাদের কানে কানে বীজমন্ত্র দেন। এরপর থেকে আমরা নিয়মিত ইকবাল হলে থাকা শুরু করি। ক্রমে এ হলকে ছাত্রলীগের ঘাঁটিতে পরিণত করি। পরিকল্পনা মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে এনএসএফকে উৎখাত করে আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখি।
১৯৬২ সালে বঙ্গবন্ধুর সম্মতিতে এবং সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে সশস্ত্র সংগ্রামের লক্ষ্যে গঠিত হয় নিউক্লিয়াস বা স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ। এর সঙ্গে প্রথম থেকে যুক্ত ছিলেন বিশিষ্ট ছাত্রলীগ নেতা কাজী আরেফ আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক, শেখ মণি এবং আমি। ১৯৬৪ সালে গঠিত হয় বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট। এর সঙ্গে যুক্ত হন কাজী আরেফ আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক, আ স ম আবদুর রব প্রমুখ। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর অভিপ্রায় অনুযায়ী বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টকে পুনর্বিন্যাস করে গঠন করা হয় ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’। সিরাজুল আলম খানের পাশাপাশি এ পর্যায়ে নেতৃত্বে আসেন কাজী আরেফ আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক, আ স ম আবদুর রব, শেখ ফজলুল হক মণি, মার্শাল মণি প্রমুখ ছাত্রলীগ নেতা। ১৯৭০ সালে গঠিত হয় ‘জয় বাংলা বাহিনী’। আমি ছিলাম এর ডেপুটি কমান্ডার। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত হয় মুজিব বাহিনী যার ঢাকা সিটি গেরিলা কমান্ডার ছিলাম আমি। মোস্তফা মোহসীন মন্টু ছিল ঢাকা জেলা কমান্ডার। শেখ মণি ছিলেন আমাদের সুপ্রিম কামান্ডার।
সেদিন ৭০-র ৬ই জুন। সন্ধ্যা হওয়ার পরপরই ইকবাল হলের ১১৬ নং কক্ষে বিশিষ্ট ছাত্রলীগ নেতাদের ভিড় লেগে যায়। সে সময়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, মার্শাল মণি প্রমুখ। রুমের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন চিশতি হেলালুর রহমান, ইকরামুল হক, নজরুল, শিব নারায়ণ দাস, রেজা শাহজাহান প্রমুখ ছাত্রনেতা। প্রথমে একটি পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। উপস্থিত সভার মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়, পতাকার জমিন হবে বাংলার চিরচেনা সবুজ রঙের। তার মাঝখানে থাকবে বৃত্তকার লাল রঙের সূর্যের প্রতীক। এ প্রতীকের মাঝখানে থাকবে সোনালি রঙের বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ছবি। বিষয়টির ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার পরপরই এর ট্রেসিংয়ের দায়িত্ব দেয়া হয় ছাত্রলীগকর্মী শিব নারায়ণ দাসকে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই ট্রেসিংয়ের উপর ড্রয়িং করে তা আরও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করার জন্য শিব নারায়ণ দাসকে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (বর্তমানে বুয়েটে) শেরেবাংলা হলের ৪১০ নম্বর কক্ষে পাঠানো হয়। সেখানে থাকতেন ছাত্রলীগ নেতা হাসানুল হক ইনু (তথ্যমন্ত্রী) এবং সালাউদ্দিন আহম্মেদ। ইনু ভাই এবং শাজাহান ভাই ট্রেসিংটি দেখে একটি সাদা কাগজের উপর চমৎকারভাবে পতাকাটির ড্রয়িং করে দেন। শিব নারায়ণ দাস অতি বিশ্বস্তার সঙ্গে ড্রইংটি মধ্যরাতে এনে সিরাজ ভাইয়ের হাতে পৌঁছে দেন। এখন প্রয়োজন পড়ে দর্জি এবং কাপড়ের। পতাকাটি তৈরি করে এনে দেয়ার জন্য দরকার পড়ে অত্যন্ত সাহসী, দক্ষ এবং বিচক্ষণ এক কর্মীর। ছাত্রলীগের মধ্যে এমন কোন কর্মী আছে, এ গুরু দায়িত্ব সুচারুরূপে বিশ্বস্ততা ও সাহসের সঙ্গে পালন করতে পারবে।
সেদিন মধ্যরাতে আমাকে ডেকে আনা হয় ইকবাল হলের ১১৬নং কক্ষে। আমি ও মোস্তফা মোহসীন মন্টু তখন অপেক্ষা করছিলাম ১৫১নং কক্ষে। তখন রাত আনুমানিক ২টা। সিরাজ ভাই আমাকে কাপড় সংগ্রহ করে দর্জি দিয়ে সেলাই করে ড্রইং মতো পতাকা তৈরি করার গুরু দায়িত্ব অর্পণ করেন। আমি তখন মার্শাল কোর্ট কর্তৃক ১৪ বছরের দণ্ডাদেশ মাথায় নিয়ে খুবই সাবধানতার সঙ্গে চলাফেরা করছি। বঙ্গবন্ধু বহু চেষ্টা করেও আমাদের (আমি, মন্টু ও সেলিম) দণ্ডাদেশ বাতিল করতে পারছিলেন না। এখানে বলে রাখি ১৯৬৯ সালে নেতৃত্বের ইঙ্গিতে আমি, মন্টু ও সেলিম নিউ মার্কেটের ভেতর ৪ পাকিস্তানি সৈন্যকে ঘায়েল করি। আমাদের অনুপস্থিতিতে মার্শাল কোর্ট ১৪ বছর কারাদণ্ড দেয়। এ ১৪ বছরের দণ্ডাদেশ মাথায় নিয়ে স্বাধীনতা পর্যন্ত সংগ্রাম করে যাই। স্বাধীনতার পর এই দণ্ডাদেশ মওকুফ হয়। যাক সে কথা সিরাজ ভাই আমাকে বলেন, যেখান থেকে পারিস এ ড্রইং অনুযায়ী একটি পতাকা তৈরি করে নিয়ে আয় রাত ফুরাবার পূর্বেই। আমার বিশ্বাস আছে এই কাজটি একমাত্র তুই পারবি।’
সিরাজ ভাই থেকে আমি পতাকা তৈরির দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই মনে মনে ছক কষি। কাকে দিয়ে কোথায় গিয়ে এই পতাকা তৈরি করতে হবে তা নিশ্চিত করি। তারপর ড্রাইং হাতে নিয়ে আমার স্কেপ রুট দিয়ে দ্রুত অগ্রসর হই। প্রথমে নীলক্ষেত বস্তি সংলগ্ন রেললাইন পার হয়ে হোম ইকোনমিক্স কলেজ, আজিমপুর কলোনি এবং আজিমপুর কবরস্থানের প্রাচীর টপকে নিউ মার্কেটের উত্তর পাশ দিয়ে কাঁচাবাজারে চলে আসি। তখন নিউ মার্কেটের ভেতরে ছিল একটি মসজিদ এবং কাঁচা বাজারের পাশেও ছিল একটি টিনের তৈরি মসজিদ। এখন সেখানে নিউ সুপার মার্কেট। এ মসজিদের পাশে ছিল কয়েকটি দোকান ঘর যার একটির মালিক ছিল এক অবাঙালি ব্যক্তি। সে দর্জির কাজ করতো এবং রাতে দোকানেই ঘুমাতো।
আমি সেখানে গিয়ে তার ঘরের দরজা নক করি। সে চিৎকার দিয়ে বলে এতো রাত্রে কে, আমি তখন নিজ পরিচয় দিয়ে বলি, ‘মুঝে এক ঝান্ডা (পতাকা) বানানা হায়, দরওজা খোলো (আমার একটি পতাকা তৈরি করতে হবে, দরজা খোলো)।’ দর্জি ভেতর থেকে বলে, ‘ঝান্ডা তো গুলিস্তান মে মিলতা হ্যায়, উদার যাইয়ে (পতাকা তো গুলিস্তানে পাওয়া যায় সেখানে যান)’। আমি বলি, ‘মুঝে আলাগ এক ঝান্ডা চাইয়ে, দরওজা খোলো’ (আমার একটি ভিন্ন পতাকা দরকার) দরজা খোলো। এই পর্যায়ে আমি দ্রুত দরজা খুলতে বলি। না খুলতে তার পরিণতির কথা বলি। সে দরজা খুলে আমাকে দেখে বলে, খসরু ভাই ‘আপ বহুত তাকলিফ মে হ্যায়’ (আপনি বড় বিচলিত আছেন)।’ আমি অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বলি, জ্যায়সা জ্যায়সা ম্যায় চাহুঙ্গা ওয়াসা ওয়াসা ক্যারো।
আমি তখন উত্তেজিত ও ঘর্মাক্ত। সামান্য সময় নষ্ট করার কোন সুযোগ নেই। আমি তাকে ড্রইংটি বের করে খুলে দেখিয়ে বলি, মুঝে এয়স্রা ঝান্ডা বানানা হায়, আভি চাইয়ে’ (আমার এমন একটি পতাকা তৈরি করে দিতে হবে, তাড়াতাড়ি চাই)। আমি তার দোকানে রাখা লাল সবুজ রঙের কাপড়ের বান্ডিল খুঁজতে থাকি। কিন্তু লাল সবুজ রঙের কাপড় খুঁজে পেলাম না। অবাঙালি দর্জি বলে, এই রঙের কাপড় পাওয়া যেতে পারে খালেক দর্জির দোকানে। খালেক দর্জির দোকানটি আবার বলাকা ভবনের তিন তলায় ছাত্রলীগের অফিসের পাশে অবস্থিত। সে দোকানের নাম ‘পাক ফ্যাশান টেইলার্স’। খালেকও দোকানেই রাতযাপন করতো। আমি অবাঙালি দর্জিকে খালেকের দোকানে গিয়ে আমার কথা বলে ড্রইং মতো পতাকা তৈরি করে আনতে বলি। দর্জি শার্টার টেনে সেখানে রওনা হয়। আমি তার দোকানের সামনে একটি টুলে বসে অপেক্ষা করার ভান করি।
অবাঙালি দর্জি রওনা হওয়ার সামান্য পরই আমি চোখের নিমিশে নিউ মার্কেটের ছাদে উঠে মাথা নিচু করে দৌড়ে এসে অদূরে বলাকা ভবনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। আমি ভাবছিলাম ড্রইং হাতে নিয়ে দর্জি গিয়ে পাকিস্তানি আর্মিদের আবার ডেকে না আনে। কারণ তখনকার পরিস্থিতি এমন ছিল, কাউকে বিশ্বাস করা যেত না। সর্বত্রই পাকিস্তানিদের চর অবস্থান করছিল। একটু পরই তার প্রমাণ পাই।
আমি নিউ মার্কেটের ছাদে উঠে উপুড় হয়ে বসে দেখি পাক ফ্যাশন টেইলার্সের দোকানের লাইট জ্বলেছে। এর কয়েক মিনিট পর মেশিনে কাপড় সেলাই করার আওয়াজ ভেসে আসে। এরপর মেশিনের আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়, লাইট নিভে যায়। আমি দ্রুত আবার পূর্বের জায়গায় ফিরে এসে পতাকার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। দর্জি এসে বলে ‘লিজিয়ে খসরু ভাই, খালেক কা পাছ কাপড়া মিলা, ওহী বানাকে দিয়া’ (নেন খসরু ভাই খালেকের কাছে কাপড় ছিল ও বানিয়েও দিল)।
আমি পতাকাটি খুলে এক ঝলক দেখে তা ভাঁজ করে গেঞ্জির মধ্যে ঢুকিয়ে গন্তব্যে রওনা হই। আমি নিউ মার্কেটের পশ্চিম পাশ দিয়ে এসে আজিমপুর কবরস্থানের প্রাচীরের কাছাকাছি চলে আসি। দেখি নীলক্ষেত-নিউ মার্কেটের মোড় থেকে কয়েকটি গাড়ি হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরে ধীরে ইপিআর গেটের দিকে আসছে। প্রথমে গাড়িগুলোকে ইপিআরের ভেবেছিলাম। আমি টুক করে কবরস্থানের প্রাচীর টপকে ওপারে গিয়ে মাথা উঁচু করে দেখি, গাড়ি থেকে নেমে পাকিস্তানি সৈন্যরা দ্রুত এলাকাটি ঘিরে ফেলেছে। আমি বুঝতে পারি তারা কোথাও থেকে ইনফরমেশন পেয়েছে। এভাবে দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে অসংখ্যবার প্রায় ধরা পড়তে বেঁচে গেছি। ১১ বার নিশ্চিত মৃত্যুর থেকে রক্ষা পেয়েছি। ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে এ বিষয় নিয়ে লিখব।
আমি শৈশবে বড় হয়েছি আজিমপুর নিউ পল্টন লাইন এলাকায়। সমস্ত এলাকাটি আমার নখ দর্পণে। তখন আজিমপুর কবরস্থান ছিল জঙ্গলে ভর্তি। সন্ধ্যা হলে সেখানে শেয়াল ডাকত। মানুষ দিনের বেলায়ও এ কবরস্থানের ভেতরে যেতে ভয় পেত। আমি দ্রুত গন্তব্যে রওনা হই। কবরস্থানের প্রাচীর টপকে চলে আসি আজিমপুর কলোনির ভিতর। এরপর ওই কলোনির প্রাচীর টপকে বানরের মতো দৌড়ে দৌড়ে চলে আসি হোম ইকোনমিক্স কলেজের প্রাচীরের কাছে। প্রাচীর টপকে চলে আসি কলেজের ভেতরে। তারপর আবার হোম ইকোনমিক্স কলেজের প্রাচীর টপকে চলে আসি নীলক্ষেত বস্তিতে। রেললাইন এবং হলের প্রাচীর টপকে পৌঁছাই ইকবাল হলের পশ্চিম দিকের গেটের কাছে (এখন সেখানে এক্সটেনশন বিল্ডিং)। ওই গেটের ডুপ্লিকেট চাবি থাকতো আমার কাছে। আমি চাবি বের করে তালা খুলে হলে প্রবেশ করি। উল্লেখ্য, ইকবাল হল থেকে নিরাপদে বের হতে (এক্সিট) এবং নিরাপদে প্রবেশ করতে (ইন্টার) আমি বিশেষ বিশেষ সময় বিশেষ বিশেষ রুট ব্যবহার করতাম যা কেউ জানতো না।
রাত তখন শেষ প্রহর। আমি হলে প্রবেশ করে সিরাজ ভাইয়ের কাছে আসি। দেখি, ছাত্রলীগ নেতারা জড়ো হয়ে বসে ঊর্ধ্বশ্বাসে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। সিরাজ ভাইয়ের হাতে পতাকাটি তুলে দিলে তিনি আমায় জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘আমি জানি তুই পারবি। তখন সবাই বলল খসরুর নামও ইতিহাসে লেখা থাকবে। আমি এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করি। এরপর ছাত্রলীগ নেতারা পতাকাটি কবে কখন ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় বসেন।
তার কিছুদিন পর সিরাজ ভাই বলেন, পতাকাটি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আয়। আমরা (আমি, হোসেন, মুরাদ, রুমি, নাজিম, ভলকু প্রমুখ) একটি জিপে চড়ে পতাকাটি সংগোপনে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গিয়ে উপস্থিত হই। বঙ্গবন্ধুকে আমরা স্বপ্নের সেই পতাকাটি দেখাই। পতাকাটি দেখে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেন। তার চোখে মুখে যেন আনন্দ ধরে না। বঙ্গবন্ধুর পেছনে দাঁড়ানো ছিলেন সিরাজ ভাই, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। তারা করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানান। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘কবে কখন প্রকাশ্যে পতাকাটি উড়াবি আমি বলে দিব এখন তা খুব গোপনে রেখে দে’। আমরা পতাকাটি নিয়ে আবার হলে ফিরে আসি।
’৭১-র ১লা মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা দিলে ঢাকায় সর্বস্তরের জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সেদিন বিকালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্বাধীন বাংলা ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত মতে পরদিন ২র মার্চ সারা দেশে হরতাল আহ্বান করা হয়। ওই দিন বিকালে স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের এক প্রতিবাদ সভা কলাভবনের সামনে বটতলায় অনুষ্ঠিত হয়। সিরাজ ভাইয়ের নির্দেশে ছাত্রলীগ নেতা শেখ মো. জাহিদ হোসেন ওই পতাকাটি একটি বাঁশের আগায় বেঁধে ইকবাল হল থেকে মিছিল নিয়ে এসে বটতলায় জড়ো হয়। জয় বাংলা বাহিনীর এ পতাকাটি হাতে নিয়ে রব ভাই তা কলাভবনের গাড়ি বারান্দার ছাদে ওঠে উত্তোলন করেন এবং ডানে বাঁয়ে বারবার নেড়ে সেখানে বেঁধে দেন। উপস্থিত বিপুল সংখ্যক ছাত্রজনতা করতালি দিয়ে পতাকাটিকে শুভেচ্ছা জানায়। তৈরি হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথে প্রথম মাইলফলক। এভাবে আমরা একটির পর একটি মাইলফলক নির্মাণ করে এগিয়ে গেছি চূড়ান্ত বিজয়ের পথে।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা কামরুল আলম খান খসরু
(মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা সিটি গেরিলা কামান্ডার এবং বিএলএফের অন্যতম সদস্য)