Monday, July 7, 2014

কঠিন, অসাধ্য নয় by সাযযাদ কাদির

ঢাকা এখন যানজটের বিশ্বরাজধানী। কথাটা আমার নয়, আন্তর্জাতিক মিডিয়ার। বিশ্ববিখ্যাত শতবর্ষী মারকিন সাময়িকী ‘দ্য নিউ রিপাবলিক’-এর গত ২রা জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত সরজমিন প্রতিবেদনে বারলিনভিত্তিক সাংবাদিক-গবেষক মাইকেল হবস এভাবেই বর্ণনা করেছেন আমাদের রাজধানীকে। তাঁর প্রতিবেদনের  পুরো নাম ‘ওয়েলকাম টু দ্য ট্রাফিক ক্যাপিটাল অভ দ্য ওয়ার্ল্ড... হোয়াট আই লার্নড ফ্রম ক্রিপলিং গ্রিডলক ইন ঢাকা...’ (যানজটের বিশ্বরাজধানীতে স্বাগত... ঢাকার দুর্লঙ্ঘ্য যানজট থেকে যা কিছু জানলাম...)। তা কি জেনেছেন তিনি? নতুন কিছু নয়, যানজট নামের জানজটে যে চরম দুর্ভোগ আমাদের নিত্যসঙ্গী সে সবেরই বর্ণনা দিয়েছেন, তুলে ধরেছেন দুঃসহ পরিস্থিতির কিছু ভীতিচিত্র। ঢাকাবাসীর সময় ও কাজের বিপুল অপচয় এবং শক্তি ও সামর্থ্যের অপূরণীয় ক্ষয়ের এ নাগরিক দুঃস্বপ্ন তো প্রতিদিনের। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন মাইকেল। বলেছেন, ঢাকার অবয়ব কাঠামোর সঙ্গে সংগতি নেই জনসংখ্যার। পুরো শহরের মাত্র ৭ ভাগ রাস্তা। তুলনা করলে বলতে হয় প্যারিস ও ভিয়েনায় রাস্তার পরিমাণ ২৫ ভাগ, ওয়াশিংটন ও শিকাগোতে ৪০ ভাগ। ঢাকায় পরস্পর-সংযুক্ত রাস্তার সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় এমনিতেই কম, তার ওপর রয়েছে প্রধান-প্রধান রাস্তা সঙ্গে সংযোগ সড়কের অভাব। তিন-চার-পাঁচ রাস্তার বড়-বড় মোড় রয়েছে ৬৫০টি, কিন্তু ট্রাফিক লাইট আছে মাত্র ৬০টি- এর অধিকাংশই আবার অকেজো। ফলে যে অতি অল্প সংখ্যক পুলিশ আছে তাদের ওই মোড়ে-মোড়েই দায়িত্ব পালন করতে হয়- রাস্তায় চলাচল তদারক বা বিধিবিধান প্রয়োগ করা হয় না।
মাইকেল লিখেছেন, ঢাকার যানজটে ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করা হয়েছে বছরে ৩.৮ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাব বিলম্ব ও বায়ু দূষণ জনিত মাত্র, সামাজিক ক্রিয়াকর্ম ও জীবন মানের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখানে নেই। আর এই যে দুর্বল অবয়ব কাঠামো- একে আরও দুর্বল ও চাপাক্রান্ত করে ঢাকা বেড়েই চলেছে প্রতিদিন। কারণ প্রয়োজনীয় রাস্তা ও পরিবহনের অভাবে উপকণ্ঠ এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারছেন না কর্মজীবীরা। ঢাকায় যাঁরা কাজ করেন তাঁদের থাকতে হচ্ছে ঢাকাতেই, উপকণ্ঠ এলাকায় থেকে ডেইলি প্যাসেঞ্জার হতে পারছেন না। নানা গতির নানা রকম যানবাহনের কারণও যে বিশেষ ভাবে দায়ী তা-ও বলেছেন মাইকেল। সবশেষে উপসংহার টেনেছেন এই কথা বলে যে গোটা সমস্যার মূল কারণ রাজনৈতিক। আর এ জন্যই সমাধান হচ্ছে না এসব সমস্যার। আর অদূর ভবিষ্যতে হবে এমন আশা একেবারেই সুদূরপরাহত। কারণ রাস্তা ও পরিবহনের সঙ্গে যারা যুক্ত- মালিক, শ্রমিক, চালক, দোকানি, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী- সবাই কোন না কোন দলের সঙ্গে, বিশেষ করে যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িত। কাজেই কোন সংস্কার দূরে থাক আইনের তদারক বা প্রয়োগও সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় আইন দেখিয়ে টু পাইস কামানোটাই ভাল মনে করেন অনেকে। তারা তা করে থাকেন, করে চলেছেনও।
ঢাকার যানজট বুঝতে বেশি দূর যেতে হয় না আমার, প্রয়োজন পড়ে না তথ্য-গবেষণারও। আমার এই গ্রীন রোড (ফার্মগেট-ল্যাবএইড উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ)-এর অবস্থা দেখলেই বুঝতে পারি বেশ।  প্রশস্ত রাস্তা, সুমসৃণ। মাঝখানে আইল্যান্ড। প্রশস্ত ফুটপাত, পাকা। কিন্তু সকাল আটটার পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সময়ে যানজট লেগে প্রায়ই অচল থাকে, স্তব্ধ করে রাখে জনস্রোত। অথচ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক হিসেবে আশপাশের প্রধান রাস্তাগুলোর চাপ অনেকখানি সামলে দিতে পারতো গ্রীন রোড। তো এ রোডের যানজটের অবসান হতে পারে কিভাবে? এক, ফুটপাত থেকে দোকান ও বাজার সরাতে হবে। দুই, রাস্তার পাশের দোকান, গ্যারেজ, অবৈধ পার্কিং বন্ধ করতে হবে। তিন, কয়েকটি পুব-পশ্চিম রাস্তার ক্রসিংয়ে ঘুরপথ পরিবর্তন করতে হবে- এতে রং সাইড ধরে চলাচল বন্ধ হবে। তিনটি কাজই হয়তো কঠিন, কিন্তু অসাধ্য নয়। কিন্তু চেষ্টা করে দেখুন- সম্ভব হয় কিনা। যদি সম্ভব হয় তবে আরেকটি রাস্তা বেছে নিন এমন কাজের জন্য। তারপর নিন আরেকটা। তারপর আরেকটা। পাশাপাশি অন্যান্য যোগাড় যোগান চলুক। রাস্তার কমতি, বিশেষ করে পুবে পশ্চিমে, পূরণে করে চলুন একটি-একটি করে।

আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে আইএসআইএল

আবু বকর আল-বাগদাদি
ইরাকের সুন্নি বিদ্রোহী গোষ্ঠী আইএসআইএলের স্বঘোষিত ‘খলিফা’ আবু বকর আল-বাগদাদি শুক্রবার প্রথমবারের মতো ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে কিছুটা প্রকাশ্যে এসেছেন। এর মাধ্যমে ইসলামিক স্টেট অব দ্য ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্টের (এসআইএসএল) আত্মবিশ্বাসের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এমনই মনে করছেন। খবর এএফপির। ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় মসুল শহরের আল-নুরি মসজিদে গত শুক্রবার আইএসআইএলের প্রধান আবু বকর জুমার খুতবা দেওয়ার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেন। আবু বকর আল-বাগদাদির এই গোষ্ঠী ইরাক ও সিরিয়ায় সম্প্রতি সরকারবিরোধী অভিযানে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। উভয় দেশের বড় অংশের ওপর প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ। এমন পরিস্থিতিতে আকস্মিক বাগদাদির এই আত্মপ্রকাশের ঘটনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ওই মসজিদে গত জুমার নামাজে আবু বকরের দেওয়া খুতবা নিয়ে পরদিন শনিবার গোষ্ঠীটি এক ভিডিও প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, তিনি মুসলমানদের প্রতি তাঁকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা কোনো বিদ্রোহী কমান্ডারের এভাবে জনসমক্ষে হাজির হওয়া ও নিজেকে খলিফা বলে ঘোষণা দেওয়া প্রকৃতই বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। ইরাক সরকারের বিরুদ্ধে আইএসআইএলের অগ্রযাত্রা প্রথম সবার নজরে আসে গত মাসে।
এখন ‘খলিফা’ আবু বকরের এই আত্মপ্রকাশ গোষ্ঠীটির ধারাবাহিক সাফল্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্রুকিংস দোহা সেন্টারের ফেলো চার্লস লিস্টার বলেন, ‘সহজ কথায়, বিশ্বের শীর্ষ তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের অন্যতম একজন এখন মসুল শহরের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত জিহাদি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরাকের অন্যতম বৃহত্তম শহরের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মসজিদে আধা ঘণ্টা বক্তৃতাও দেন তিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃত বিষয় হলো, এ রকম কেন্দ্রীয় কোনো স্থান থেকে জনসমক্ষে বাগদাদির আত্মপ্রকাশ তাঁর সংগঠনের ভেতরের সুদৃঢ় অবস্থানকেই তুলে ধরেছে।’ সুন্নি আরব মিলিশিয়াদের সম্মুখ বাহিনী হিসেবে পরিচিত দ্য ইসলামিক স্টেট (আইএস) ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল গত ১০ জুন দখল করে। গত শনিবার প্রকাশিত ভিডিওতে দৃশ্যত বাগদাদিকে দেখা যায়, ঘন-ধূসর শ্মশ্রুমণ্ডিত, হৃষ্টপুষ্ট দেহের অধিকারী জমকালো পোশাকের একজন মানুষ হিসেবে। মসুল দখলের পর ২৯ জুন ইরাকে খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় আইএসআইএল। সে সময় তাদের নেতার পরিচিতি প্রকাশ করা হয় ‘খলিফা ইব্রাহিম’ হিসেবে। আবু বকর আল-বাগদাদিই যে সেই ব্যক্তি, শুক্রবার তাঁর এই আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হলো। আবু বকর যখন আইএসআইএলের দায়িত্ব নেন, তখন সেটি আল-কায়েদার একটি শাখা হিসেবে পরিচিত ছিল। পরে তিনি একে পুনর্গঠন করে আল-কায়েদার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সন্ত্রাস দমনবিষয়ক সাবেক পরামর্শদাতা ও সাবান সেন্টার ফর মিডলইস্ট পলিসির গবেষক উইল ম্যাকক্যানটস জানান, এই গোষ্ঠী সম্পর্ক যা জানা যায়, তার সবই ভয়ানক। আর তাই, এ রকম ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বাগদাদি তাঁর খোলস থেকে বেরিয়ে এসে স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হবেন। উইল ম্যাকক্যানটস আরও বলেন, বাগদাদির ওই বক্তৃতা থেকে নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয় নয় বরং আল-কায়েদার সঙ্গে বিশ্বব্যাপী জিহাদি নেতৃত্ব নিয়ে তাঁর প্রতিযোগিতার বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সুন্নিপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী আইএসআইএল হাজারো বিদেশি যোদ্ধাকে দলে ভিড়িয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এসব বিদেশি যোদ্ধার অনেকেই পশ্চিমা দেশ থেকে যোগ দিয়েছেন। গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হলেন বাগদাদি। ইরাকে ২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর তিনি জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হন বলে ধারণা করা হয়। ভিডিও খতিয়ে দেখছে সরকার: ইরাক আইএসআইএল-প্রধান আবু বকরের বক্তৃতার ভিডিও টেপ খতিয়ে দেখছে। সরকারের একজন মুখপাত্র গতকাল রোববার জানান, ভিডিওবার্তার বস্তুনিষ্ঠতা নিরূপণ করতে তাঁরা ভিডিওটি খতিয়ে দেখছেন।

খাদিরের ভাইকে পেটাল ইসরায়েলি পুলিশ

তারিক আবু খাদির
ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন কিশোর তারিক আবু খাদিরকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করেছে ইসরায়েলি পুলিশ। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। খবর বিবিসি ও আল-জাজিরার। তারিক আবু খাদির (১৫) নিহত ফিলিস্তিনি কিশোর মোহাম্মদ আবু খাদিরের জ্ঞাতি ভাই। খাদিরকে (১৬) অপহরণ করে হত্যার ঘটনায় ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ইসরায়েলি পুলিশ তারিককে আটক করে পূর্ব জেরুজালেমে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। পুলিশের অভিযোগ, ফিলিস্তিনি একদল তরুণ পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীদের দলে তারিকও ছিল। তবে তারিকের পরিবার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারিক কোনো ধরনের সন্ত্রাস-সহিংসতার সঙ্গে জড়িত নয়। প্যালেস্টাইন টিভিতে প্রচারিত একটি ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, ইসরায়েলি পুলিশের মুখোশধারী তিনজন কর্মকর্তা হ্যান্ডকাফ পরানো এক কিশোরকে পিটিয়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
ওই কিশোরই যে তারিক—ভিডিওবার্তায় তা স্পষ্ট বোঝা যায়নি। তবে গত শুক্রবার স্থানীয় একটি মানবাধিকার সংগঠন কিছু ছবি প্রকাশ করে। ওই ছবিতে দেখা যায়, পুলিশের পিটুনিতে তারিকের ঠোঁট ও মুখমণ্ডল জখম হয়েছে। তারিকের বাবা ওই ছবি ও ভিডিও দেখে তাঁর ছেলেকে শনাক্ত করেন। তারিক তাঁর মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বসবাস করেন। ছুটি কাটাতে জেরুজালেমে গিয়েছিল সে। ইসরায়েলি পুলিশের এক মুখপাত্র তারিককে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ অস্বীকার বলেন, পুলিশের ওপর হামলাকারী ফিলিস্তিনি তরুণদের দলে তারিকও ছিল। পুলিশের সঙ্গে তরুণদের সংঘর্ষের ভিডিওচিত্র সম্পাদনা করে ছবি ছাপিয়ে পুলিশের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে। তারিককে পিটিয়ে আহত করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জেন সাকি বলেন, ‘আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। একই সঙ্গে দ্রুত নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক তদন্তের আহ্বান জানাই।’ ইসরায়েলি বিচার মন্ত্রণালয় জানায়, পুলিশের তদন্ত বিভাগ ওই ঘটনা খতিয়ে দেখছে।

৭৯তম জন্মদিন

দালাই লামা
তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার ৭৯তম জন্মদিন গতকাল রোববার উদ্যাপিত হয়েছে। ১৯৩৫ সালের ৬ জুলাই তিব্বতের উত্তরাঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মাত্র দুই বছর বয়সে তিব্বতে বৌদ্ধদের ধর্মগুরুর পদে অধিষ্ঠিত হয়ে ছয় বছর বয়স থেকে সন্ন্যাসব্রত নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন দালাই লামা।
তিব্বতে চীনের হস্তক্ষেপের পর মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তিব্বতের রাজনৈতিক ক্ষমতা পান তিনি। ১৯৫৯ সাল থেকে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন দালাই লামা। ৭৯তম জন্মদিনে তিনি ছিলেন ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের লাদাখ অঞ্চলে। হাফিংটন পোস্ট।

‘সম্মানজনক’ বিদায় -বেসিক ব্যাংকের লোপাট হওয়া অর্থ উদ্ধার করুন

বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাইয়ের পদত্যাগের খবরটি তাঁর জন্য ‘সম্মানজনক’ হলেও সরকারের জন্য মোটেই সম্মানজনক হয়নি। সম্মানজনক হয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যও।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে লাভজনক এই ব্যাংকটিকে যে ব্যক্তি দায়িত্ব নেওয়ার পরই লোকসানি প্রতিষ্ঠানে ​পরিণত করেছেন, হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হতে দিয়েছেন, তাঁকে দ্বিতীয়বার নিয়োগ দিয়ে সরকার বড় ধরনের অন্যায় করেছিল। আর সেই অন্যায় ঢাকতে পরবর্তীকালে নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, যে কারণে ব্যাংকটিকে মারাত্মক খেসারত দিতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতার দোহাই দিয়ে তদারকি প্র​তিষ্ঠান হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও দায় এড়াতে পারে না।
২০১১ সাল থেকে প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বেসিক ব্যাংকের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হতে থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয় তথা সরকার সবকিছু না দেখার ভান করেছিল। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে ব্যাংকের তিনটি শাখায়ই সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লোপাট হওয়ার ঘটনা ধরা পড়ার পরও এত দিন পর্ষদ বহাল রেখে কিংবা চেয়ারম্যানকে না সরিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় দায়িত্বহীনতারই পরিচয় দিয়েছে। রোববার বেসিক ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে কি না, সেটি নির্ভর করবে সরকারের নীতি ও কৌশলের ওপর। সরকার যদি আগের ধারায়ই ব্যাংকটি চালাতে চায় সর্বনাশ ঠেকানো যাবে না। বর্তমান সরকারের আমলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সার্বিক অবস্থা নাজুক। সোনালী ব্যাংকে হল–মার্ক কেলেঙ্কারির পরও যে সরকারেরর চৈতন্যোদয় হয়নি, বেসিক ব্যাংকের ঘটনাই তার প্রমাণ।
তাই, বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেছেন, এ সংবাদে অর্থমন্ত্রী বা সরকারের আত্মসন্তুষ্টির সুযোগ নেই। এখন সরকারের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত ব্যাংকটির বেহাত হয়ে যাওয়া অর্থ উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি পদত্যাগী চেয়ারম্যানসহ দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। যে ব্যক্তিটি বেসিক ব্যাংকের সর্বনাশের মূলে, তিনি কোনোভাবেই ‘সম্মানজনক’ পদত্যাগ করে পার পেতে পারেন না। তাঁকে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা হোক।

মাঠে বেলজিয়াম, গ্যালারিতে লড়াই আর্জেন্টিনা–ব্রাজিলের by আনিসুল হক

গ্যালারি—অংশ সে তো খেলারই। এটা লিখেছিলাম বাংলাদেশের গ্যালারিতে বসে ক্রিকেট বিশ্বকাপের খেলা দেখার পর। ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়াতে ৫ জুলাইয়ের আর্জেন্টিনা বনাম বেলজিয়াম খেলা দেখতে গিয়ে সেটাই বারবার মনে পড়তে লাগল। আমরা বাংলাদেশের ছয়জন একসঙ্গে বসেছি গ্যালারিতে। কোকাকোলার আমন্ত্রণে আমাদের এই দলটিতে আছেন সব মিলিয়ে সার্ক দেশের ২৩ জন। বাংলাদেশের চারজন কোকাকোলার বিশ্বকাপ কুইজ বিজয়ী, একজন কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র দে আর আমি গুড ফর নাথিং। সাংবাদিক আরেকজন আছেন, শ্রীলঙ্কার। তিনি অবশ্য শ্রীলঙ্কার একমাত্র প্রতিনিধি এই দলে। তো আমরা ছয় বঙ্গপুঙ্গব সঙ্গে করে নিয়েছি তিনটা লাল-সবুজ পতাকা। আমার গায়ে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টির জার্সি। আমাদের দলের অন্তত দুজন, বগুড়ার মাহবুব আর সিলেটের শাফি—চরম আর্জেন্টিনাভক্ত। মাহবুব ইংরেজির শিক্ষক, বারবার বলছেন, ও মাই গড, ক্যান ইউ বিলিভ ইট, আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে উঠেছে, আর আমি সেই খেলা চর্মচক্ষে মাঠে বসে দেখছি! মাহবুবের অবশ্য আরেকটা আফসোস আছে, সাজানোগোছানো বানানো রাজধানী শহর ব্রাসিলিয়া দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে বলেন, এরা এত উন্নত, কিন্তু একটাই সমস্যা—এরা শিক্ষিত নয় কেন, এরা কেন ইংরেজি জানে না? আমি তাঁকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করি, বলি, ইংরেজি কেন জানবে? আপনারা ব্রিটিশ শাসনে ছিলেন, আপনারা ইংরেজি জানেন, আর এরা পর্তুিগজ উপনিবেশ ছিল, এরা পর্তুিগজ জানে। শুধু একটাই সমস্যা, উপনিবেশকেরা আসার আগে এখানকার ভাষা কী ছিল, তা হারিয়ে গেছে। কিংবা শাসকদের ভাষাই এদের ভাষা হয়ে গেছে।
আমাদের মনে ফুর্তি। আমরা খেলা শুরু হওয়ার দেড় ঘণ্টা আগে গ্যালারিতে আসন নিয়েছি। লাউডস্পিকারে গান হচ্ছে, তার সঙ্গে স্ফীত মধ্যভাগসমেত শরীরটা দুলে উঠতে চাইছে।
আর্জেন্টাইনরা এসেছে দলে দলে। সকালবেলা আটটা থেকে তারা দল বেঁধে স্টেডিয়ামে যাচ্ছে রাস্তায় প্রভাতফেরি গাইতে গাইতে, গগনবিদারী তাদের কণ্ঠ। আমি বারবার দৌড়ে নয়তলা হোটেল রুমের ব্যালকনিতে যাচ্ছি। এরা এত চিৎকার করতে পারে। গ্যালারির ৪০ ভাগ অন্তত আর্জেন্টাইন। নীল-সাদা পোশাক পরে হাতে পতাকা নিয়ে গান গাইছে, আর মাথার ওপরে পতাকা নাড়ছে। বাকি ৬০ ভাগ প্রধানত ব্রাজিলীয়রা, কেউ কেউ তাদের হলুদে উজ্জ্বল, কেউ কেউ বেলজিয়ামকে সমর্থন করতে লাল পরে এসেছে। এমনকি ব্রাজিলের পতাকার সবুজের জায়গায় লাল লাগিয়ে পতাকা বানিয়ে এনেছে এরা। যতক্ষণ খেলা চলল, ততক্ষণ একবার আর্জেন্টাইনরা গান ধরে, গানের সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে মাথার ওপরে পতাকা নাড়ানো চলে প্রবল বেগে। তখন ব্রাজিলীয়রা সিটি বাজিয়ে ব্রতচ্যুত চেষ্টা করে। তারপর গান ধরে ব্রাজিলীয়রা। একসঙ্গে, পুরো স্টেডিয়ামে গান গাওয়া চলেছে। পাশে বসা ব্রাজিলীয় তরুণীকে জিজ্ঞেস করি, ‘এটা কি তোমাদের জাতীয় সংগীত।’ মেয়েটি বলে, ‘না না, এটা আমাদের ফুটবল নিয়ে গান, আমরা বলছি, আমরা হলাম পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন।’ তাই তো বলি, এই গান গাইবার সময় ওরা পাঁচ আঙুল দেখায় কেন? আর ওদিকে আর্জেন্টিনারা গান বানিয়েছে, ‘তোমাদের আঙিনায় এসে আমরা বিশ্বকাপ নিয়ে যাচ্ছি, আমাদের ম্যারাডোনা তোমাদের পেলের চেয়ে ভালো।’ একজন ব্রাজিলিয়ানকে দেখলাম তাই পেলের মুখের কাটআউট নিয়ে এসেছেন, নিজের মুখে ধরে আর্জেন্টাইনদের দেখাচ্ছেন আর গাইছেন, পাঁচবার পাঁচবার।
তাহলে কেবল বাংলাদেশেই আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের রেষারেষি নয়, এটা আছে খোদ আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের নাগরিকদের মধ্যেও। তবুও হাজারে হাজারে আর্জেন্টাইন এসেছে ব্রাজিলে, গান গাইছে, রাস্তায় দল বেঁধে হল্লা করছে, স্টেডিয়ামে নাচানাচি করছে, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা তো ঘটেনি। ১-০ গোলে বেলজিয়ামকে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যাওয়ার আনন্দে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা দলের সমর্থকদের সঙ্গে হাত নেড়ে নিজেরাও সেসব গানে অংশ নিলেন।
গ্যালারিতে বসে খেলা দেখার আসল মজা হলো এখানে। আপনি নিজেও খেলবেন। ব্রাজিলের চিৎকার বেশি শোনা যাচ্ছে, এবার আর্জেন্টিনার চিৎকার চাই বেশি। সমর্থকেরা সংগঠিত হয়ে আবার শুরু করে দিল গান। ব্রাজিলীয়রা তখন শুরু করল সিটি বাজানো। একটা মিস হলো তো ব্রাজিলের ধ্বনি: বু... বাংলাদেশের গ্যালারিতে খেলা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, চিৎকার করে দিনের শেষে জয় এলে মনে হয়, আমিই তো জেতালাম। শুধু যে এই দুই দেশের মানুষ এই ম্যাচটাতে ছিল, তা তো নয়। আমার পাশে একজন ছিলেন মেক্সিকান। ওই পাশে একজন পেরুর। আমেরিকা থেকে এসেছে কতজন। সব দেশ থেকেই নাকি মানুষ এসেছে বিশ্বের কাপ দেখতে, শুধু সুদান ছাড়া।
খেলা শেষ হয়ে গেল বেলা তিনটার মধ্যেই, আর্জেন্টাইনরা তবু মাঠ ছাড়ে না। খেলা দেখে বেরোচ্ছে, এক আর্জেন্টাইন আমার কাছে এসে বলল, তোমার গায়ে এটা কী। বললাম, বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের জার্সি। সে বলল, আমার সঙ্গে বদলাবে? আমি সঙ্গে সঙ্গে ওটা খুলে দিয়ে মেসি ১০ লেখা একটা আজেন্টিনার জার্সি পেয়ে গেলাম। ওটা পেয়ে মনে হলো, স্বয়ং মেসি ওটা আমাকে দিয়েছেন উপহার হিসেবে।
ব্রাজিল সময় সন্ধ্যায় হলো হল্যান্ড-কোস্টারিকা ম্যাচ। উৎপল শুভ্রর সঙ্গে ব্রাসিলিয়ার এক সুপার মলে গিয়ে টিভির দোকানে দাঁড়িয়ে খেলাটা দেখলাম। ব্রাজিলীয়রা উৎকণ্ঠিত, কোস্টারিকা না আবার টাইব্রেকারে জিতে যায়। তাহলে তো আর্জেন্টিনার ফাইনাল নিশ্চিত। এমনিতেই আর্জেন্টিনাকে সেভাবে একটাও বড় দলের মুখোমুখি হতে হয়নি সেমিফাইনাল পর্যন্ত যেতে, এরপরে হল্যান্ডের বদলে যদি কোস্টারিকাকে তারা পায় সেমিফাইনালে, বুঝতে হবে, এটা নিয়তির ষড়যন্ত্র যে আর্জেন্টিনা এবার চ্যাম্পিয়ন হোক। নেইমারের পিঠের হাড় ভেঙে যাওয়া আর থিয়োগো সিলভার দুটো হলুদ কার্ড জার্মানির এক পা হয়তো ফাইনালে এনেই দিয়েছে।
সেইখানে ব্রাজিল কী করতে পারে? কোচ স্কলারি যেমনটা বলেছেন, এটা তাদের নতুন প্রেরণা দেবে। এবারের বিশ্বকাপ আমাদের খেলতে হবে নেইমারের জন্য। ২২ বছরের ওই ছেলেটার খেলা পরশু দেখতে পাব না বেলো হরিজন্তেতে, আমার জন্য এর চেয়ে বড় দুঃসংবাদ আর কী হতে পারে।
যেমন আমাদের বাংলাদেশি আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা খুব করে চাইছিলেন মেসি একটা গোল অন্তত করুন। মেসি গোল করেননি, খুব ভালো খেলেছেন, তাও বলা যাবে না, কিন্তু তার দেওয়া পাসগুলোও এমন নিখুঁত হয়, যেটা মাঠের গ্যালারিতে বসেই কেবল বোঝা যায়, টিভিতে দেখে কিছুই বোঝা যাবে না।
মেসি-সমর্থকেরা মেসিকে দেখবেন, অন্তত আরও দুটো খেলায়, সেমিতে। আর আল্লাহ না করুন, তৃতীয় স্থানে বা ফাইনালে। ব্রাজিলের সমর্থকেরা আর কবে নেইমারের খেলা দেখতে পাবেন? নাকি বিধাতা চাইছেন, নেইমার রাশিয়া বিশ্বকাপে আসুন সোনার কাপটা ঊর্ধ্বে তুলে ধরার জন্য। যেমন এসেছিলেন ম্যারাডোনা আর রোনালদো, তাঁদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে, কাপটা নিয়ে যাওয়ার জন্যই। মেসির এবার ২৭, নেইমারের যে মাত্র ২২।
কী হবে, কে বলতে পারে। নাকি হতে যাচ্ছে মহারণ, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফাইনাল? সিট বেল্ট বেঁধে তৈরি হোন। আমিও ব্রাসিলিয়া থেকে বেলো হরিজন্তেতে যাওয়ার জন্য ব্যাগ গোছাই।
৫ জুলাই, ব্রাসিলিয়া, ব্রাজিল থেকে

গুডবাই ডেমোক্রেসি by বদিউল আলম মজুমদার

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান রচনার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত ১৭৮৭ সালের ‘কনস্টিটিউশনাল কনভেনশন’ শেষে ডেলিগেটরা যখন ইনডিপেনডেন্ট হল থেকে বেরিয়ে আসছিলেন, তখন জনৈক মিসেস পাওয়েল বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনকে জিজ্ঞেস করেন, ‘মিস্টার ফ্রাংকলিন, আমরা কী পেয়েছি? একটি জনতন্ত্র (republic), না রাজতন্ত্র?’ বিনা দ্বিধায় ফ্রাংকলিন উত্তর দেন, ‘একটি জনতন্ত্র ম্যাম, যদি আমরা রাখতে পারি।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এবং ড. কামাল হোসেনের তত্ত্বাবধানে রচিত আমাদের সংবিধানের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকদেরও একটি জনতন্ত্র (যদিও সংবিধানে ‘রিপাবলিক’ শব্দের অনুবাদ হিসেবে ‘গণপ্রজাতন্ত্র’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে) উপহার দেওয়া হয়। বস্তুত, এটি ছিল আমাদের কাছে সংবিধানপ্রণেতাদের পক্ষ থেকে রেখে যাওয়া একটি পবিত্র আমানত। কিন্তু গত ৪২ বছরে এই আমানত শুধু খেয়ানতই করিনি, আমরা যেন গত ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে ‘গুডবাই’ও বলে দিয়েছি।

অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা যে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ‘জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের উইল বা সম্মতির তথা গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেই মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে রচিত সংবিধানে আরও সুস্পষ্টভাবে ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র’ (অনুচ্ছেদ ১১) মর্মে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
যেহেতু গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন তথা ভোটের প্রয়োজন হয়, তাই বঙ্গবন্ধুর আমলে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২’ (আরপিও) প্রণীত হয়। আরপিওর ১৯ ধারায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিধান রাখা হয়। এই বিধানের উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর মতো কোনো ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে কেউ যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী না হন, তাহলে তিনি যেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষিত হতে পারেন।এই বিধান আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় একটি বিশেষ বা ব্যতিক্রমী অবস্থার সুরাহার লক্ষ্যে, গণহারে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টির জন্য নয়। অর্থাৎ, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া একটি ‘এক্সসেপশন’ বা ব্যতিক্রম, ‘রুল’ বা নিয়ম নয়।
এ কথা প্রায় বিনা দ্বিধায় বলা যায়, আমাদের প্রথম সংসদের আইনপ্রণেতারা কল্পনাও করেন​নি যে ভবিষ্যতে কোনো দিন আমাদের ‘হাউস অব দ্য পিপল’ বা জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জনগণের ভোট ছাড়াই আইনপ্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।তাহলে হয়তো আরপিওতে এই বিধানই তাঁরা রাখতেন না, অথবা এর সঙ্গে এমন শর্ত জুড়ে দিতেন, যাতে বর্তমান পরিস্থিতির উদ্ভব এড়ানো যেত। বস্তুত, আরপিও প্রণীতই হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে। উদাহরণস্বরূপ, আরপিওর ১৭ ধারায় প্রার্থিতা প্রত্যাহারে সময়সীমা পার হওয়ার পরে কোনো চূড়ান্ত প্রার্থীর মৃত্যু ঘটলে এবং এরপর মাত্র একজন প্রার্থী অবশিষ্ট থাকলেও নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই আমাদের নির্বাচন কমিশন ৫ জানুয়ারি ১৫৩ জনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হওয়াকে অনুমোদন দিয়ে আরপিওর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের উদ্দেশ্যকেই ভণ্ডুল করে দিয়েছে। কমিশনের ও রাজনৈতিক দলগুলোর এমন হঠকারিতা ও কারসাজিমূলক কার্যক্রম সচেতন নাগরিকদের শঙ্কিত না করে পারে না।
গণহারে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তথা বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়া আমাদের সংবিধানেরও পরিপন্থী। আমাদের সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হইতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত তিন শত সদস্য লইয়া...সংসদ গঠিত হইবে; সদস্যগণ সংসদ সদস্য বলিয়া অভিহিত হইবেন।’ সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের বক্তব্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট এবং ৩০০ জন সংসদ সদস্যের একক নির্বাচনী এলাকা থেকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটেই নির্বাচিত হতে হবে—এ থেকে ব্যত্যয় ঘটার কোনো সুযোগ নেই। এ কারণেই সংরক্ষিত মহিলা আসন পূরণের জন্য, যাঁদের কোনো একক নির্বাচনী এলাকা নেই এবং যাঁরা পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন, আমাদের সংবিধানে ৬৫(৩) সংযুক্ত করতে হয়েছে। সুতরাং, ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনে বিনা ভোটে নির্বাচিত ১৫৩ জনকে সংসদ সদস্য হিসেবে আখ্যায়িত করা সমীচীন নয় বলেই অনেকের ধারণা। প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক কালে উচ্চ আদালত ভোট প্রদানকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন [(২০০২)৫এসসিসি] এবং নাগরিকদের সচরাচর তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। কিন্তু দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বসবাসকারী ৫২ শতাংশ ভোটারকে তাঁদের ভোট প্রদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
অন্য একটি বিবেচনায়ও আমরা ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে ‘গুডবাই’ বলে দিয়েছি। গণতন্ত্র হলো জনগণের সম্মতির শাসন। আর জনগণের সম্মতি অর্জিত হয় ভোটের মাধ্যমে। নির্বাচন কমিশনের চরম প্রশ্নবিদ্ধ হিসাবমতে, ৫ জানুয়ারি যে ১৪৭টি আসনে নির্বাচন হয়েছে, তাতে ভোট পড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ বা এক কোটি ৭২ লাখ, যা সর্বমোট প্রায় নয় কোটি ২০ লাখ ভোটারের মাত্র ১৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ। তাই কমিশনের হিসাব অনুযায়ীই দশম জাতীয় সংসদে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ১৯ শতাংশের কম। অন্যদিকে, ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের মতে, যা নিয়েও অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে, ১৪৭টি আসনে ভোট পড়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। এই হিসাব অনুযায়ী ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ১৫ শতাংশের কম। এ ধরনের ভোটার উপস্থিতি—১৫ বা ১৯ শতাংশ (অনেকের মতে তারও অনেক কম)—কোনোভাবেই জনগণের সম্মতির পরিচায়ক নয়। তাই ৫ জানুয়ারি আমাদের গণতন্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করার পরিবর্তে ধ্বংসের দিকেই ঠেলে দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বে আমাদের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেওয়া একটি রায় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এ এফ এম শাহ আলম বনাম মুজিবর রহমান [৪১ডিএলআর (এডি)১৯৮৯] মামলার রায়ে বিচারপতি চৌধুরী বলেন: ‘নির্বাচন নেই, গণতন্ত্রও নেই। গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে নির্বাচন প্রয়োজন এবং ভোটারবিহীন ও বিকৃত নির্বাচন গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে।’ আমাদের উচ্চ আদালতের এ রায় নিঃসন্দেহে ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন ও বিকৃত নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মনে রাখা প্রয়োজন যে গণতন্ত্র আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ, তাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ব্যাপারে আপস করার কোনো অবকাশ নেই।
এ ছাড়া কুলদীপ নায়ার বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া  [(২০০৬) ৭ এসসিসি ১] মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ‘সংসদীয় গণতন্ত্র ও বহুদলীয় গণতন্ত্র ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্তর্নিহিত অংশ’ বলে রায় দিয়েছেন। একই যুক্তি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র আমাদের সংবিধানেরও মৌলিক কাঠামোর অংশ। কিন্তু আমাদের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনোভাবেই ‘ইনক্লুসিভ’ বা অংশগ্রহণমূলক ছিল না এবং এতে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিফলনও ঘটেনি। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে ৪১টি রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিবন্ধিত। এর মধ্যে মাত্র ১২টি বা ২৯ শতাংশ দল, যার অধিকাংশই নামসর্বস্ব, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। এ নির্বাচনে মোট ৫৪৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন এবং এর মধ্য থেকে আবার ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এর বিপরীতে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা ছিল এক হাজার ৫৬৭ জন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির সংখ্যাও ছিল অতি নগণ্য। তাই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কোনোভাবেই অংশগ্রহণমূলক ছিল না, এমনকি এটিকে সত্যিকার অর্থে নির্বাচনও বলা যায় না।
পরিশেষে, ৫ জানুয়ারির কলঙ্কজনক নির্বাচনের তাৎপর্য অত্যন্ত ভয়াবহ। এবারের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ১৫৩ জন যদি ‘প্রিসিডেন্ট’ বা দৃষ্টান্ত হিসেবে থেকে যান, তাহলে আগামী নির্বাচনে এর চেয়ে বেশিসংখ্যক ব্যক্তি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে আর বাধা থাকবে না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ৩০০ জন সংসদ সদস্যই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হয়ে আসার আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই এটা প্রায় বিনা দ্বিধায় বলা যায় যে একতরফা ও প্রশ্নবিদ্ধ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই গুডবাই বলে দিয়েছি। আর এর ফলে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক নির্দেশনাই শুধু উপেক্ষিত হয়নি, এর মাধ্যমে ‘জেনুইন’ বা সঠিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা–সংবলিত আন্তর্জাতিক আইন (যেমন, সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ) ও চুক্তিও (যেমন: ইন্টারন্যাশনাল কভেনেন্ট অন সিভিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইট্স) আমরা লঙ্ঘন করেছি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

এখন দরকার একটি গণতান্ত্রিক মোর্চা by হাসান ফেরদৌস

শামসুর রাহমান একসময় ঠাট্টা করে লিখেছিলেন, অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ। উটের পিঠে নয়, আজকের বাংলাদেশ চলেছে গাধার পিঠে, তাও সম্ভবত উলটো পথে। গত ৪৫ বছরে অনেক রাজনৈতিক চড়াই–উতরাই পেরিয়ে তাকে যেতে হয়েছে, কিন্তু এমন অদ্ভুত স্থবিরতার মুখে তাকে পড়তে হয়নি কখনো। ক্ষমতার কেন্দ্রে যাঁরা, তাঁদের রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ। অন্যদিকে ক্ষমতার বাইরে যাঁরা বিরোধী রাজনীতিক, তাঁদের না আছে রাজনৈতিক কর্মসূচি, না আছে কোনো রণকৌশল। দেশের বাইরে বসে এক অপগণ্ড বালক যখন যা খুশি বলে বেড়াচ্ছে, আর তাকেই বেদবাক্য ভেবে দেশের ভেতরে দলের নেতা-কর্মীরা বগল বাজাচ্ছেন। ভালো কোনো প্রহসন লিখিয়ের হাতে পড়লে এই দুই অবস্থা নিয়ে নিঃসন্দেহে চমৎকার একটি ফার্স (প্রহসন) লেখা হতো!

দেশের এই রাজনৈতিক স্থবিরতার কারণে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা অনন্তকাল স্থায়ী হবে, এ কথা ভাবার কোনো কারণ নেই। বস্তুত, মূলধারার রাজনীতির ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে অতি-বাম বা অতি-ডান রাজনৈতিক তৎপরতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এই দুই ধারার রাজনীতির প্রধান লক্ষণ হলো সহিংসতা। বাংলাদেশ তার ইতিহাসের গোড়া থেকেই অতি-দক্ষিণপন্থী সহিংস ধর্মীয় রাজনীতির শিকার। জামায়াত-হুজি-হেফাজত–জাতীয় দলগুলো, যারা ধর্মের জামা পরে ক্ষমতার সহিংস রাজনীতি করতে অভ্যস্ত, এই মুহূর্তে সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে তাদের যতই কোণঠাসা ভাবি না কেন, ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তাদের ক্ষমতা এখনো বিপুল। কোনো কোনো মূলধারাভুক্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থনের ফলে এসব ধর্মীয় দলের একধরনের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ করুন বিদেশি অর্থ ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা পুলিশের অপেক্ষমাণ নখদন্ত।
অন্যদিকে, রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলেও মাওবাদী-নকশালবাদী অতি-বাম কখনোই পুরোপুরি মাঠ ছেড়ে যায়নি। আগে যেমন এখনো তেমনি মূলধারার রাজনীতির ব্যর্থতা তাদের পুনর্বাসনে মদদ জোগাবে। ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে মাওপন্থীদের উত্থান থেকে স্পষ্ট, এই আন্দোলনের প্রতি নাগরিক সমর্থনও সম্পূর্ণ বিলীন হয়নি। বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থবিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে অতি-বামের মধ্যমঞ্চে পুনঃপ্রবেশ অনিবার্য।

এই বেসামাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বিকল্প ব্যাপকভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল স্রোতোধারা নির্মাণ অতি জরুরি। প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক এই পূর্বশর্ত যুক্ত করার কারণ, এই মোর্চায় বিদেশি অর্থে মদদপুষ্ট ও পুঁজিবাদী এজেন্ডার অনুসারী দল-গ্রুপ স্বাগত নয়, সে কথা আগেভাগেই নিশ্চিত করা। গার্মেন্টসসহ সব শ্রমিক ইউনিয়ন, পরিবেশবাদী, নারী অধিকার আন্দোলন, আদিবাসীসহ সব সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, এমনকি দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক শক্তিসমূহও এই মোর্চার অন্তর্গত হতে পারে। ছাত্রদেরও এই মোর্চায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব, শাহবাগ আন্দোলন থেকে প্রমাণিত হয়েছে ছাত্রদের বৃহদংশই দলীয় আনুগত্যের বাইরে। বাংলাদেশে, যেখানে সুশীল সমাজভিত্তিক আন্দোলন খুবই দুর্বল, তাদেরও এই মোর্চায় স্থান দিতে হবে। এসব গ্রুপ বা দল স্বতন্ত্রভাবে পরিপূর্ণ আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। কিন্তু পাঁচ হাত এক হলে অবস্থা বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গঠন ও কর্মপদ্ধতিগত ভিন্নতা সত্ত্বেও এসব দল-গ্রুপ-গোষ্ঠীর ভেতর মৌলিক ঐক্য রয়েছে, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা ক্ষমতার অংশীদার নয়, তারা মালিকের স্বার্থ রক্ষা করে না, বিদে​শি এজেন্ডার অনুসারী নয়। ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুতে কাজ করলেও তাদের যা একত্র করতে পারে তা হলো, একদিকে প্রগতিশীল আশু কর্মসূচি, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক রণকৌশল। স্বল্পমেয়াদি কৌশল হিসেবে এই মোর্চা যদি ইস্যুভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে এগোতে চেষ্টা করে, তার সাফল্যের সম্ভাবনা অনেক বেশি।
বাংলাদেশের রাজনীতির সব এজেন্ডাই নির্ধারণ করে দেশের দুই প্রধান দল, তাও নীতিগত অবস্থান থেকে নয়—তাদের পারস্পরিক বিরো​ধিতার ভিত্তিতে। অথচ অধিকাংশ মৌল রাজনৈতিক ইস্যুর কোনো আওয়ামী বা বিএনপি চরিত্র নেই। আইনের শাসন ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, শ্রমিক-কর্মচারীর ন্যায্য পাওনা, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, দুর্নীতি, পরিবেশদূষণ ইত্যাদি প্রশ্নের কোনোটাই দলীয় নামাবলির ধার ধারে না। অতএব আওয়ামী-বিএনপি কাজিয়ার বাইরে এই ইস্যুগুলো জনসমক্ষে উপস্থিত করতে সক্ষম হলে প্রস্তাবিত গণতান্ত্রিক মোর্চ দ্রুত নাগরিক বৈধতা অর্জনে সক্ষম হবে।শুধু সমস্যা উত্থাপন নয়, তার সমাধানও এই মোর্চার পক্ষে সাধারণ সম্মতির ভিত্তিতে নির্ণয় সম্ভব।
পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই দুই বা তিনটি বড় দল জাতীয় রাজনীতিতে যেমন, স্থানীয় পর্যায়েও অপরিসীম ক্ষমতাধর মুখ্যত তাদের অর্থ ও পেশি বলের কারণেই। যতক্ষণ না এই অশুভ চক্রের অবসান ঘটছে, রাজনীতি তাদের কবজা মুক্ত হবে না। বলাই বাহুল্য, কাজটা সহজ নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে জাতীয় ইস্যুভিত্তিক পরিবর্তন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াও অর্জন সম্ভব। ভারতের আম আদমি পার্টির (আপ) উত্থান তার প্রমাণ। মুখ্যত সুশাসনের পক্ষে ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে এই দল নিজেদের জন্য জাতীয় স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে। ‘আপ’ যদি একা চলার বদলে সমমনা রাজনৈতিক-সামাজিক-নাগরিক অধিকারবাদী প্রতিষ্ঠানসমূহকে এক করতে সক্ষম হতো, তার শুভ ফল ভোগ করত সবাই। তারপরেও বলি, রাজনৈতিক অঙ্কের হিসাব ‘আপ’-এর সাফল্য সীমিত হলেও তারা দুর্নীতিকে একটি নির্বাচনী জাতীয় ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ভারতের জাতীয় নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয়ের প্রধান কারণই ছিল দুর্নীতি দমনে তাদের ব্যর্থতা।
ভারতের মতো বাংলাদেশেও একটি প্রধান সমস্যা সুশাসনের অভাব। প্রধান দলগুলোর সরাসরি বিরুদ্ধাচরণ না করেও সুশাসনের পক্ষে জনমত গঠনে নীতিগত অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের প্রস্তাবিত গণতান্ত্রিক মোর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই ভূমিকার লক্ষ্য হবে প্রধান দলগুলোর প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠা নয়, তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিবর্তন অর্জন। আমেরিকায় গত ১০ বছরে ‘টি-পার্টি’ নামে যে নতুন দক্ষিণপন্থী আন্দোলন আবির্ভূত হয়েছে, তা মূলধারাভুক্ত রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকেই উৎসারিত। রিপাবলিকান বা ডেমোক্রেটিক পার্টি—আমেরিকার দুই প্রধান দল—তাদের কোনোটিই ঠিক ‘মনোলিথিক’ বা একধারাবাহী নয়। নানা মত ও পথ সেখানে কাজ করে। যারা চলতি রিপাবলিকান নেতৃত্বে আস্থাহীন, যারা বিশ্বাস করে এই দল তার মৌল আদর্শ থেকে সরে এসেছে, তারা টি-পার্টির ঝান্ডার তলে জড়ো হয়েছে। ওপরের নানা মহল থেকে টাকা ছড়ানো হয়েছে। সে কথায় কোনো ভুল নেই, কিন্তু এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না, শ্বেত আমেরিকার একটি অংশের কাছে এই আন্দোলন জনপ্রিয় হয়েছে। ফলে শুধু অর্থ নয়, তৃণমূল পর্যায় থেকে জনসমর্থনও তারা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। আমরা নীতিগতভাবে ভিন্নমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে টি-পার্টির কারণে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। যে গণতান্ত্রিক মোর্চার প্রস্তাব এখানে করা হয়েছে, ‘ইলেকটোরাল’ রাজনীতিতে অংশ না নিয়েও তার পক্ষে দেশের রাজনৈতিক সংলাপে প্রভাব রাখা যে সম্ভব, তার আরও দুটি উদাহরণ নেওয়া যাক। একটি আমেরিকার, অন্যটি বাংলাদেশের। ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে আমেরিকাজুড়ে অব্যাহত মন্দাবস্থার প্রতিক্রিয়ায় ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, শিক্ষক, পরিবেশবাদী, নারী ইত্যাদি নানা মত ও পথের মানুষ এই আন্দোলনে যুক্ত হয়। এই আন্দোলনের ভেতর দিয়েই এই দেশে ধনী-দরিদ্রের অব্যাহত বৈষম্যের বিষয়টি নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়। অনেকেই মানেন, শেষ পর্যন্ত যে বারাক ওবামা রেকর্ড পরিমাণ ভোট পেয়ে জেতেন, তার একটা বড় কারণ ছিল অকুপাই আন্দোলন।
অন্যদিকে বাংলাদেশে গত বছর সম্পূর্ণ আকস্মিকভাবে শাহবাগ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মুখ্যত অরাজনৈতিক ও সরাসরি দলভুক্ত নয় এমন তরুণ ও যুবকদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই আন্দোলন ঘাতক-দালালদের বিচারের দাবিটি দেশের প্রধান জাতীয় দাবিতে পরিণত করে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সে আন্দোলন থেকে আসল ফায়দা পায় তা ঠিক, কিন্তু এই দাবি অস্বীকার করা দেশের মূলধারাভুক্ত কোনো দলের পক্ষে এখন আর সম্ভব নয়। এই কৃতিত্ব শাহবাগ আন্দোলনকে দিতেই হবে।
পরিবর্তন চাইলেই পরিবর্তন আসে না। সে জন্য দরকার লড়াই। আর সে লড়াই সংঘটিত করতে চাই রাজনৈতিক তত্ত্ব ও রাজনৈতিক দল। আসন্ন অথবা দূরাগত কোনো সময়ে বাংলাদেশে তেমন দল রাজনৈতিক নেতৃত্ব অবশ্যই প্রকাশিত হবে। কিন্তু আমরা কি সেই অনাগত ও অনিশ্চিত সময়ের অপেক্ষায় থাকব, না গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল কর্মসূচির ভিত্তিতে একত্র হওয়ার চেষ্টা করব?

নিউইয়র্ক
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷