Tuesday, November 25, 2014

‘শেখ মুজিব কথা রাখেননি বলেই জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক’

সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির কেন্দীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেছেন, শেখ মুজিব যদি সেদিন চার খলিফার কথামত টেপ রেকর্ডারের মধ্যেও স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যেতেন, তাহলে জিয়াউর রহমানকে কষ্ট করে চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হতো না। শুধু চার খলিফার কথাই তিনি উপেক্ষা করেছেন তা নয়, রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে গ্রেফতার হবার ভয়ে তিনি তাজউদ্দিন আহমদের কথাও রাখেননি। গত বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৫০তম জন্মদিন পালন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন নোমান। যুক্তরাষ্ট্রস্থ তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পরিষদ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। খবর বার্তা সংস্থা বাংলা প্রেস’র। জ্যাকসন হাইটসের একটি রেস্তোরাঁয় তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পরিষদের সভাপতি পারভেজ সাজ্জাদের সভাপতিত্বে এবং সা. সম্পাদক জাকির এইচ হাওলাদার ও যুগ্ম সা.সম্পাদক বদরুল হক আজাদের যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত উক্ত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতা ইলিয়াস আহমেদ মাষ্টার, অধ্যাপক দেলাওয়ার হোসেন, চেয়ারপারসনের বিশেষ উপদেষ্টা ও বৈদেশিক দূত জাহিদ এফ সরদার সাদী, কেন্দ্রিয় জাসাসের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট কন্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, বিএনপি নেতা আজহারুল হক মিলন, শরাফত হোসেন বাবু,শামসুল ইসলাম মজনু,আব্দুস সবুর, আব্বাস উদ্দিন দুলাল, রফিকুল মাওলা, কাজী আজম, সৈয়দা মাহমুদা শিরীন, এমদাদুল হক কামাল, আজাদ বাকির ও মাওলানা আতিকুর রহমান। প্রধান অতিথি নোমান আরো বলেন, “কীভাবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন হয়েছিল এইচটি ইমাম তা পরিষ্কার করে দিয়েছেন। ওই অগণতান্ত্রিক নির্বাচন যেমন বিএনপি মেনে নেয়নি, বাংলার মানুষও মেনে নেয়নি। সম্পূর্ণ অবৈধ এই নির্বাচনে জয়ী বর্তমান সংসদ অবৈধভাবে দেশ চালাচ্ছে। অন্যদিকে জেল-জুলুমের মাধ্যমে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর চালাচ্ছে নির্যাতন।” বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের কথা উল্লেখ করে নোমান বলেন, “তারেক রহমান যে তরুণ বয়সে রাজনীতি শুরু করে দেশের মানুষের ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন সেই বয়সে শেখ হাসিয়ান রাজনীতি শুরুই করেননি। তাই তার ওপর আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের এত হিংসা ও ক্ষোভ। তার জনপ্রিয়তা ঠেকাতেই মরিয়া হয়ে উঠেছে আওয়ামীলীগসহ বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা। তাই আজকে  ‘এক জিয়া লোকান্তরে লক্ষ জিয়া ঘরে ঘরে’ স্লোগানের পাশাপাশি বিএনপি কর্মীদের আরেকটি স্লোগান বলত হবে ‘এক তারেক বিদেশে, লক্ষ তারেক বাংলাদেশে’।” অনুষ্ঠানে তিনি এইচটি ইমাম ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিচার দাবি করেন। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন বিএনপি নেতা তোফায়েল আহমেদ লিটন, সফিক রহমান দুলাল, রফিকুল মাওলা, মুক্তিযোদ্ধা সুরুজ্জামান, ফারুক হোসেন মজুমদার, ওমর ফারুক, এবি সিদ্দিক, হাজী আবুল খায়ের খালেক, সৈয়দুল হক, জাহিদ দেওয়ান শামীম, আবু তাহের, তরিকুল ইসলাম দিপু,মহিদুল হাসান মুহিদ, আব্দুল খালেক আকন্দ, শাহাদত হোসেন রাজু, মোশারফ হোসেন সবুজ, মতিউর রহমান লিটু, নীরা রব্বানী, মোহা. মনির হোসেন, আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, রাশেদ আহমেদ চৌধুরী ও ছাত্রনেতা মনিরুল ইসলাম মনির।

ঢাকায় আর কোনো যুদ্ধাপরাধীর জানাজা নয়: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী

(ছবি: চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলায় আজ মঙ্গলবার বিজয় মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। ছবি: আলম পলাশ) রাজধানী ঢাকার মাটিতে এখন থেকে আর কোনো যুদ্ধপরাধীর জানাজা করতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। আজ মঙ্গলবার চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলায় ২১ দিনব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অনেক মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যুবরণ করেছেন, শহীদ হয়েছেন। তাঁদের শতকরা ১ ভাগও জানাজা পাননি। শকুন, কুকুর ও শিয়াল তাঁদের লাশ খেয়েছে। নদীতে, খাল-বিলে বা বাগানে এই লাশ পচেছে। তাই ঢাকায় কোনো যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পর সেখানে জানাজা করতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, ‘আজকে যদি মানবতার কথা আসে, ধর্মের কথা আসে, ১৯৭১ সালে যখন আমাদের সহযোদ্ধারা মুসলমান ছিল তারা কেন জানাজা পায়নি? তার আগে কৈফিয়ত দেওয়া হোক, বিচার করা হোক। তারপর আমরা তাদের বিষয়টি বিবেচনা করব, এর আগে নয়।’
আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, আগামীতে বিসিএস পরীক্ষায় মুক্তিযুদ্ধ–সম্পর্কিত ১০০ নম্বরের প্রশ্ন থাকবে। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া আগামী বছরের জুলাই মাস থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য বিনা মূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা হবে। এজন্য মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে ওষুধ পাঠানো হবে। ওষুধ শেষ হয়ে গেলে আবারও বরাদ্দ দেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে এখন থেকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আরও বলেন, প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর সরকারিভাবে তাঁদের কবরের ব্যবস্থা করা হবে। যেসব মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত্যুর পর কবর দেওয়া হবে, তাঁদের কবরস্থান এমনভাবে তৈরি করা হবে, যাতে যে কেউ কবরস্থান দেখে বুঝতে পারে এটি ‘মুক্তিযোদ্ধার কবর’।
মন্ত্রী বলেন, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশন করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে ৩০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত রয়েছে। এসব কোটায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের প্রাধান্য দেওয়া হয় কি না, বিষয়টি এখন থেকে যাচাইবাছাই করা হবে।

সর্বক্ষেত্রে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে হবে : শিবির সভাপতি

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি আবদুল জব্বার বলেছেন, ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে চতুর্মূখি ষড়যন্ত্র বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে তারা যেমন রাষ্ট্র শক্তিকে অপব্যবহার করছে তেমনি অপকর্ম ঢাকতে ও অপপ্রচার করতে প্রযু্িক্তকে অপব্যবহার করছে। সুতরাং ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রযুক্তিসহ সার্বিক ক্ষেত্রে যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে বাতিলের মোকাবেলা করতে হবে। বিজয়ী করতে হবে ইসলামকে।
তিনি আজ অনলাইনে ছাত্রশিবিরের সদস্যদের মেধা যাচাই পরীক্ষার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। আজ সকাল ১১টায় রাজধানীর এক মিলনায়তনে সেক্রেটারী জেনারেল আতিকুর রহমানের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক নাভিদ আনোয়ার, সাহিত্য সম্পাদক ইয়াছিন আরাফাত, শিক্ষা সম্পাদক মোবারক হোসেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলাম, এইচআরডি সম্পাদক আহমেদ সালমান প্রমূখ।         
শিবির সভাপতি বলেন, দেশ থেকে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনকে নির্মূল করতে সর্বগ্রাসী অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বাতিল শক্তি। ছাত্রশিবির একটি জ্ঞানভিত্তিক সংগঠন যা বাতিল শক্তির হিংসার একটি অন্যতম কারণ। ছাত্রশিবিরের এ সুনামকে নষ্ট করতে তারা নেতাকর্মীদের যেমন জুলুম নির্যাতন করছে তেমনি তথ্য, প্রযুক্তি ও দলীয় মিডিয়া ব্যবহার করে অপপ্রচার করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের এ অপচেষ্টা সফল হয়নি। ছাত্রশিবির শত বাধা বিপত্তির মোকাবেলা করেই দেশ ও ইসলাম রক্ষার জন্য নিজেদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। যারা ছাত্রশিবিরের সুনামকে নষ্ট করতে চেয়েছিল আজকের এই উদ্যোগ তাদের গালে চটোপঘাত।
তিনি বলেন, অন্য ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা যখন নিজেদের মধ্যে রক্ত ঝরাতে ব্যস্ত তখন ছাত্রশিবির ব্যস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান ভিত্তিক সমাজ গঠনে উপযুক্ত জনশক্তি তৈরীতে। জনগণ চোখ বন্ধ করে নেই। কে কী করছে সবই তারা দেখছে। ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনকে বিজয়ী করতে এবং সকল অপপ্রচারের জবাব দিতে ছাত্রশিবিরের প্রতিটি নেতাকর্মীকে প্রযুক্তিসহ সর্ব ক্ষেত্রে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে হবে। অনলাইনে মেধা যাচাই পরীক্ষা একদিকে যেমন সদস্যদের জ্ঞানের পরিধিকে সমৃদ্ধ করবে তেমনি আগামী দিনে সঠিক ভাবে প্রযুক্তির ব্যবহারের মাত্রাকে তীব্র করবে।  
প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

কেউ লতিফের জানাযা পড়বে না, ইমামতি করবে না : সংসদে নজিবুল বশর

বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী বলেছেন, শরীয়তের দৃষ্টিকোন থেকে ইসলামের একটি বিষয়কেও অস্বীকার করলে তিনি মুসলমান থাকবেন না। লতিফ সিদ্দিকী আবার মুসলমানা হতে হলে কালেমা পড়ে তওবা করে মুসলমান হতে হবে। এই মূহূর্তে তিনি মারা গেলে কেউ তার জানাজা পড়বেনা, ইমামতি করবেনা। ফলে তাকে নিয়ে পানি  ঘোলা করার কিছু নেই।
সংসদে আজ সন্ধ্যায় পয়েন্ট অব অর্ডারে ফোর নিয়ে নজিবুর বশর মাইজভান্ডারী এই কথা বলেন। এই সময় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বৈঠকে সভাপতিত্ব করছিলেন।
নজিবুল বশর বলেন, সরকারের আশ্রয় প্রশ্রয় সাহায্য না পেয়ে লতিফ সিদ্দিকী আত্মসমর্পন করেছেন। তাকে গ্রেফতার করে জেলে পাটানো হয়েছে। ফলে  এখন আর হরতালের দরকার নেই। সরকারের ভূমিকা পরিস্কার। তিনি অন্যান্য ধর্মীয় সংগঠনকে কর্মসূচী প্রত্যাহারের আহবান জানান।

‘২০১৯ সালের আগে নির্বাচনের ট্রেন আসবে না’ -নাসিম

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন না হলে দেশে এখন মার্শাল ‘ল’ হতো। আমরা নেতাকর্মীরা জেলে থাকতাম। নির্বাচন হওয়ার কারনেই দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। খালেদা জিয়া আন্দোলনের মাঠে যাই বলুক তাকে মনে রাখতে হবে। নির্বাচনের ট্রেন ছেড়ে গেছে। আগামী ২০১৯ সালের আগে সেই ট্রেন আর আসবে না। মঙ্গলবার দুপুরে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সন্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন বলেই দেশের জঙ্গী দমন হয়েছে। দেশে আর ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা, রমনার বটমুলে বোমাবাজি, দেশজুড়ে বোমাবাজির মতো ঘটনা ঘটেনা। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অপরাধ করলেও আইনের আওতায় আসতে হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যে ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামীতে বিএনপি-জামায়াত জোটের ডাকে মানুষ আর সারা দেবে না। তাই তারা সরকারের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারে ব্যস্ত রয়েছে। এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট আব্দুল খালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জেলা পরিষদ প্রশাসক আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, প্রফেসর ডা. হাবিবে মিল্লাত মুন্না এমপি, আব্দুল মজিদ মন্ডল এমপি, রায়গঞ্জ-তাড়াশ আসনে এমপি হিসাবে জয়ের পথে থাকা গাজী, আমজাদ হোসেন মিলন, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক এড. কে, এম হোসেন আলী হাসান, সহ-সভাপতি এড. আব্দুর রহমান পিপি, সিরাজুল ইসলাম খান, আবু ইউসূফ সূর্য্য, আবু মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া, মোস্তফা কামাল খান ও এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাসেদুল ইসলাম সিরাজ বক্তব্য রাখেন। পরে কেজি মোড়ে সন্মেলনের ২য় অধিবেশন শুরু হয়।

লতিফ সিদ্দিকী কারাগারে

সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আজ দুপুরে ঢাকা মহানগর হাকিম আতিকুর রহমান এ আদেশ দেন। এর আগে রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় আত্মসমর্পণ করেন লতিফ সিদ্দিকী। পরে তাকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে লতিফ সিদ্দিকীর পক্ষে কোন আইনজীবী ছিলেন না। তিনি জামিন আবেদনও করেননি। এদিকে লতিফ সিদ্দিকীকে আদালতে নেয়া হলে সেখানে বিক্ষোভ করেন আইনজীবীরা। আদালত থেকে কারাগারে নেয়ার পথে লতিফ সিদ্দিকীকে বহনকারী প্রিজনভ্যান লক্ষ্য করে ঝাড়– এবং জুতা প্রদর্শণ করেন বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা। এর আগে কয়েকটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে গত রবিবার রাতে ভারত থেকে দেশে ফেরেন লতিফ সিদ্দিকী। গত ২৮শে সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এক আলোচনা সভায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.), হজ এবং তাবলিগ জামায়াত নিয়ে কটুক্তি করেন লতিফ সিদ্দিকী। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়েও বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করেন তিনি। লতিফ সিদ্দিকীর এ মন্তব্যে সমালোচনার ঝড় উঠে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠে সব মহল থেকে। প্রধানমন্ত্রী তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কার করেন। পরে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম এবং সাধারণ সদস্য পদ থেকেও তাকে বহিষ্কার করা হয়। যদিও সংসদ সদস্য হিসেবে এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি।
মাথা নিচু করতে আপত্তি লতিফের
আদালত থেকে কারাগারে নেয়ার সময় সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে ঝাড়– ও জুতা প্রদর্শন করেছেন ক্ষুব্ধ আইনজীবীরা। আইনজীবী ও উপস্থিত সাধারণ লোকজন এসময় লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে মিছিলও করেন। দুপুরের পর ধানমন্ডি থানা পুলিশ লতিফ সিদ্দিকীকে সিএমএম আদালতে নিয়ে যায়। আদালতে তার পক্ষে কোন আইনজীবী না থাকায় তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। আদালতে নেয়ার আগে লতিফ সিদ্দিকীকে সাংবাদিকরা বিভিন্ন প্রশ্ন করলেও তিনি এর কোন জবাব দেননি। তাকে ঘিরে থাকা সাংবাদিকদের প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে একপর্যায়ে হাত জোড় করে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এদিকে কারাগারে নেয়ার সময় পুলিশের সঙ্গে বিতন্ডায় জড়ান লতিফ সিদ্দিকী। কারাগারে প্রবেশে পকেট গেট দিয়ে মাথা নিচু করে প্রবেশে আপত্তি তুলেন তিনি। তিনি উপস্থিত কর্মকর্তাদের বলেন, প্রধান ফটক খুলে তাকে ভেতরে নিতে হবে। এ নিয়ে কিছু সময় আলোচনার পর প্রধান ফটক দিয়েই তাকে ভেতরে নেয়া হয়।

১৮র আগে বিয়ে নয়, ২০ হলে ভালো হয় by রঞ্জন কর্মকার

প্রতি বছর ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পৃথিবীর দেশে দেশে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিবাদ পক্ষ হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর ল্যাটিন আমেরিকার ডমিনিকান রিপাবলিকের স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত বিদ্রোহ করার জন্য প্যাট্রিয়া, মারিয়া তেরেসা ও মিনারভা মিরাবেল- এ তিন বোনকে হত্যা করা হয়। ১৯৮১ সাল থেকে এ দিনটি আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিবাদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। ১৯৯৩ সালে মানবাধিকার সম্মেলনে দিবসটি স্বীকৃতি পায়। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন বিলোপ দিবস এবং ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিবাদ পক্ষ হিসেবে ঘোষণা করে। তারপর থেকে বাংলাদেশেও ১৬ দিনের প্রচারাভিযান নামে এ প্রতিবাদ পক্ষ পালিত হয়ে আসছে। এবারও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন বিলোপ দিবস এবং আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিবাদ পক্ষ পালন করা হবে। কতগুলো কারণে এবার আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিবাদ পক্ষ পালন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা, কষ্ট, যন্ত্রণা ও ক্ষতি যথাযথভাবে পরিমাপ করা কখনোই সম্ভব নয়। এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতির দিক অনেক। নির্যাতনের প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতির মধ্যে রয়েছে নির্যাতনের ফলে শারীরিক বা মানসিক আঘাতজনিত চিকিৎসা ব্যয়, স্বাস্থ্যহানিজনিত চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষেত্রে যেতে না পারার ক্ষতি, আইন ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত খরচ, বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যয়, সন্তানের জন্য ব্যয়ভার ইত্যাদি। পরোক্ষ ক্ষতির দিক তার চেয়েও বেশি। এর কুফল ওই পরিবারের শিশু থেকে শুরু করে অন্য সদস্যরাও ভোগ করে। দেখা গেছে, যেসব পরিবারে নারীরা অধিক হারে নির্যাতিত, সেখানে সন্তানদের পরিপূর্ণ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে না। নির্যাতনের ফলে নারীর শরীর ও মনে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, তার ফলে নারী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে না। জাতি বঞ্চিত হয় প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মূল্যবান অবদান থেকে। এভাবে এটি একাধারে নারী, শিশু, পরিবার ও সমাজের স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। সামগ্রিক বিচারে তাই নারীর প্রতি সহিংসতা জাতীয় উন্নয়নের একটি অন্যতম অন্তরায়। অথচ নারী নির্যাতনের ব্যাপারে আমাদের দেশে এক ধরনের নীরবতার সংস্কৃতি লক্ষ্য করা যায়। আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন বিলোপ দিবস ও প্রতিবাদ পক্ষে সেজন্যই আমাদের স্লোগান- ‘নীরবতা ভেঙে জাগো-জাগাও, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও।’
বাল্যবিয়ে নারী নির্যাতনের একটি অন্যতম কারণ হলেও আমাদের দেশে বাল্যবিয়ে কমানোর উদ্যোগ সফল হচ্ছে না। গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই শতকরা ৩৯ শতাংশ মেয়ের এবং ১৮ বছরের মধ্যে ৭৪ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। এখানে বাল্যবিয়ের গড় হার ৬৫ শতাংশ। ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের এ হার বিশ্বে সর্বোচ্চ। এ বিবেচনায় বাল্যবিয়ের হারে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু ২০১২ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল তৃতীয়। এ প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতে বাল্যবিয়ের গড় হার ৪৩ শতাংশ, নেপালে ৪১ শতাংশ, আফগানিস্তানে ৪০ শতাংশ, ভুটানে ২৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৪ শতাংশ, শ্রীলংকায় ১২ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ৪ শতাংশ। ভারতে ব্রিটিশ-ভারতের আইন অনুযায়ী ছেলেদের বিয়ের বয়স ২১ এবং মেয়েদের ১৮। এ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে ১৫ বছরের কম বয়সী বিবাহিত মেয়েদের ২০ শতাংশ ২৪ বছর বয়স হওয়ার আগেই দুই বা ততধিক সন্তানের মা হচ্ছেন। এর ফলে প্রসূতি মৃত্যুর হার এবং অপুষ্টিজনিত সমস্যাও তাদের ক্ষেত্রে বেশি হচ্ছে। গর্ভধারণকালীন এবং প্রসবের সময় এসব কিশোরী মায়ের উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবাও নিশ্চিত করা হচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে বর্তমানে ৭০ কোটি নারী বাল্যবিয়ের শিকার, যার মধ্যে প্রতি তিনজনের একজনেরই বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের নিচে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক দশক ধরে বাংলাদেশে ৬৬ শতাংশ ক্ষেত্রে ১৯ বছর বয়সের আগেই বাল্যবিয়ের শিকার নারীরা গর্ভবতী হচ্ছে। এ বয়সসীমার মা হওয়া ৩০ শতাংশ নারী এবং ৪১ শতাংশ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে।
বাল্যবিয়ের এ উদ্বেগজনক চিত্র যখন সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে, তখন সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ২০১৪-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত খসড়া আইনে নারীর বিয়ের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ এবং পুরুষের জন্য ২১ থেকে কমিয়ে ১৮ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বাল্যবিয়ের অপরাধের জন্য সাজার পরিমাণ বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ২ বছর ও জরিমানা বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। বর্তমানে বাল্যবিয়ের সর্বোচ্চ সাজা তিন মাস এবং জরিমানা ১ হাজার টাকা। প্রস্তাবিত আইনের সাজাসংক্রান্ত অংশটি যথার্থ হলেও বিয়ের বয়স কমানোর প্রস্তাবটি কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার গত মেয়াদে শিশু আইন- ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। এ আইনের চতুর্থ ধারায় বলা হয়েছে, ‘বিদ্যমান অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সব ব্যক্তি শিশু হিসেবে গণ্য হইবে।’ জাতীয় শিশুনীতি ২০১১-তে শিশুর সংজ্ঞা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘শিশু বলতে ১৮ বছরের কম বয়সী বাংলাদেশের সব ব্যক্তিকে বুঝাবে। দেশের প্রচলিত কোনো আইনে এর ভিন্নতা থাকলে এ নীতির আলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে সামঞ্জস্য বিধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে’। এছাড়া জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘শিশু বলতে ১৮ বছরের কম বয়সী যে কোনো মানুষকে বুঝাবে’। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ সনদ গৃহীত হয়। বিশ্বের প্রথম যে ২২টি দেশ সনদটি অনুমোদন করে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। তাই মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ থেকে কমালে সেটা একদিকে যেমন সরকারের বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে হবে অসঙ্গতিপূর্ণ, তেমনি হবে প্রচলিত আইন ও নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিয়ের বয়স কমানো হলে বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যে সামাজিক আন্দোলন ও প্রচারণা চলছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যাহত হবে এবং বাল্যবিয়ের পরিমাণ আরও আশংকাজনকভাবে বাড়বে। নারীর স্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়নের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সামাজিক অগ্রগতির সূচকে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকবে না। ১৮ বছরের কম বয়সে একটি ছেলে বা মেয়ে কখনোই পরিবারের গুরুদায়িত্ব নেয়ার মতো পরিপক্বতা লাভ করে না। কিশোরীর প্রজনন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য বাল্যবিয়ে একটি হুমকি। বাল্যবিয়ে নারী নির্যাতনকেও বাড়িয়ে দিতে সহায়তা করে। এছাড়া মেয়েদের বিয়ের বয়স কমালে কিশোরী মায়ের সংখ্যা বাড়বে। এর সুদূরপ্রসারী খারাপ প্রভাব পড়বে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর। ফলে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যে নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য, নারীশিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে সাফল্য অর্জন করেছে তা খর্ব হবে।
১৮ বছরের আগে মেয়েরা সন্তান জন্মদানের জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত হয় না। চিকিৎসকদের মতে, যেসব মেয়ে ১৮ বছরের আগে সন্তান ধারণ করে, তাদের নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। শুধু প্রসবকালীন নয়, প্রসবের পরও নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়। কিশোরী মায়েরা বাচ্চার ঠিকমতো দেখভাল করতে পারে না। বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা যায়। অনেক বাচ্চা পর্যাপ্ত দুধ পায় না। প্রতিটি অঙ্গের পরিপূর্ণতা লাভের জন্য নির্দিষ্ট সময় প্রয়োজন। ১৬ বছরের মেয়েদের অনেক অঙ্গই পরিপূর্ণতা পায় না। হরমোনের বিবেচনায় ১৬ বছরে নারী মা হতে পারে সত্যি, কিন্তু তার পরিপূর্ণ শারীরিক সক্ষমতা থাকে না। অনেক কিশোরী মানসিকভাবে যৌন সম্পর্কের জন্য তৈরি থাকে না। এ ক্ষেত্রে তাদের ওপর বলপ্রয়োগ হলে বাকি জীবন যৌনতা নিয়ে তারা একটি নেতিবাচক ধারণা বয়ে বেড়ায়।
বাল্যবিয়ে কমানোর জন্য বয়স না কমিয়ে দারিদ্র্য ও নিরাপত্তার অভাবসহ যেসব কারণে বাল্যবিয়ে কমছে না, সেসব কারণ দূর করতে সচেষ্ট হতে হবে। একই সঙ্গে এ সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে ঐক্যবদ্ধ ও দুর্ভেদ্য সামাজিক আন্দোলন। ছেলেমেয়ে উভয়কে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাদের জীবন বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করার দিকে সরকারকে অধিক মনোযোগী হতে হবে, যাতে তারা জাতীয় উন্নয়নে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। বিয়ের বয়স কমলে সেটা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উন্নয়নের ধারাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বয়স কমিয়ে বাল্যবিয়ের সংখ্যা হ্রাসের শর্টকাট পথ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আমরা আশা করব, সরকার বিয়ের বয়স কমানোর প্রস্তাবটির সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনা করে জাতীয় স্বার্থেই তা প্রত্যাহার করবে। এবার আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন বিলোপ দিবস ও প্রতিবাদ পক্ষে আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে আওয়াজ তুলি- ‘১৮-র আগে মেয়েদের বিয়ে নয়, ২০ হলে ভালো হয়’।
রঞ্জন কর্মকার : একটি বেসরকারি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক

ধর্ম, সেক্যুলারিজম ও রাজনীতি by ড. মাহবুব উল্লাহ্

সমাজের মধ্যে ধর্মের প্রভাবকে বিবেচনায় নিয়েই উন্নয়নের চিন্তা ও পরিকল্পনা করতে হবে। বিশ্বজুড়ে ধর্ম নিয়ে যে উত্তেজনা এবং মৌলবাদী তৎপরতা চলছে, তা বন্ধ করতেও ধর্মের নানা দিক বুঝতে হবে। ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে ধর্মকে বাদ দেয়া ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি- এ দুই পথকেই সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। গত ২২ নভেম্বর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জর্জটাওন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলে ধর্ম, শান্তি এবং আন্তর্জাতিক বিষয় কেন্দ্র এবং ওয়ার্ল্ড ফেইথ্স ডেভেলপমেন্ট ডায়ালগের উদ্যোগে এক আন্তর্জাতিক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সেক্যুলারিজম অ্যান্ড ফেইথ ইন্সপায়ার ডেভেলপমেন্ট : আন্ডারস্ট্যান্ডিং কনটেস্টেশন অ্যান্ড কোলাবেরেশন শিরোনামে দিনব্যাপী এই কর্মশালাটি ব্র্যাক ইন-এ অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় উন্নতির হাতিয়ার হিসেবে ধর্মের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের উন্নয়নে ধর্মের প্রভাব নিয়ে এ রকম একটি কর্মশালা প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হল। বিষয়টি নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। ইতিমধ্যে ধর্ম সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি এমন চরম পন্থার দিকে গড়িয়ে গেছে, যদি কেউ ধর্মের গুরুত্ব তুলে ধরেন অথবা ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলেন তাহলে তাকে এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী রাজাকার আখ্যা দিতে কসুর করেন না। অন্যদিকে ধর্মের বিষয়ে আলোকিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কেউ কিছু বলার চেষ্টা করার সময় তার বক্তব্যে ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা না থাকলেও তাকে কোনো কোনো মহল থেকে মুরতাদ ঘোষণা করার দাবি ওঠে। কার্যত এ উভয় প্রবণতাই সমাজের জন্য ক্ষতিকর। ধর্মকে অবজ্ঞা করলে কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানলে দেশের আমজনতা সেটাকে গ্রহণ করে না বরং ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। সেটা এতদিন অনেকে বুঝতে না চাইলেও লতিফ সিদ্দিকীর ঘটনার পর নিশ্চয়ই তারা বুঝতে পারছেন। এর পরও যদি তারা বুঝে না থাকেন তাহলে বলতে হবে তারা জনবিচ্ছিন্ন মানসিকতারই চর্চা করছেন। সরকার যদি লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিত তাহলে সরকারের অস্তিত্বই বিপন্ন হতো। বাংলাদেশের মানুষের মানসিকতা সম্পর্কে প্রায়ই বলা হয়, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। একসময়কার সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সংবিধানে ধর্ম বিশ্বাস করার এবং না করার অধিকার সংযোজিত হয়েছিল। নাস্তিক্যবাদের পক্ষে এসব দেশে প্রচারণাও কম হয়নি। আলবেনিয়ার আনভার হোক্সার কমিউনিস্ট শাসনামলে আলবেনিয়াকে Godless stateঘোষণা করা হয়েছিল। আলবেনিয়া একটি মুসলিমপ্রধান দেশ। কমিউনিজমের পতনের পর এসব দেশে ধর্মচর্চা প্রবলভাবে ফিরে এসেছে। আলবেনিয়াতে এখন ইসলামের চর্চা হচ্ছে। সুতরাং আমাদের দেশে ধর্মের কথা শুনলে যাদের এলার্জি হয়, তাদের অবশ্যই গভীরভাবে ভাবতে হবে ধর্মের অন্তর্গত শক্তির উৎস কোথায়। মানবসৃষ্ট জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরিসমাপ্তির বিন্দুতে ধর্মীয় চিন্তার উদ্ভব হয়। দুর্জ্ঞায়কে জানার জন্য সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে মানুষ অবিরাম চেষ্টা করেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার ফলে মানুষ অনেক রহস্যের গ্রন্থিও ছিন্ন করেছে। কিন্তু মানুষ এখনও জানে না সে কোথা থেকে এসেছে এবং জীবনাবসানের পর তার পরিণতি কী হবে।
এই প্রশ্ন মানুষকে চিন্তানিমগ্ন করে তুলেছে। এ পর্যায়ে এসেই মানুষ ধর্ম চিন্তার আশ্রয় নেয়। এর মাধ্যমে মানুষ এক রকম মানসিক প্রশান্তিও খুঁজে পায়। তাহলে ধর্ম বিশ্বাসের জন্য কাউকে অপাঙ্ক্তেয় মনে করার কোনো যুক্তি আছে কি? বরং যারা ধর্মচিন্তাকে অবজ্ঞা করেন, তারা মানুষের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অনুভূতিকেই আঘাত করেন। ফলে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় সেটা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ব্যক্তি হিসেবে কেউ নাস্তিক হতে পারেন, কিন্তু অপরের বিশ্বাসকে নিয়ে বিদ্রুপ কিংবা মসকরা করা গ্রহণযোগ্য নয়।
মোতাহার হোসেন চৌধুরী বলেছিলেন, ধর্ম সাধারণ মানুষের কালচার, কালচার সাধারণ মানুষের ধর্ম।
ধর্মীয় চৈতন্য সামাজিক শক্তি হিসেবে আবির্র্ভূত হতে পারে। মধ্যযুগে ক্যাথলিক খ্রিস্টীয় অর্থনৈতিক নৈতিকতার দৃষ্টিতে পুঁজিবাদী ভাবাদর্শ এবং উন্নয়ন ছিল অবাঞ্ছিত। তখনকার খ্রিস্টীয় ধর্মগুরুরা বস্তুগত সম্পদ আহরণের বিরোধিতা করতে গিয়ে যেমন লোভের বিরোধিতা করেছিল। সেন্ট জেরোমে বলেছিলেন, একজন ধনী মানুষ হয় একজন তস্কর অথবা তস্করের সন্তান। সেন্ট অগাস্টিন মনে করতেন ব্যবসা-বাণিজ্য খারাপ, কেননা এর ফলে মানুষ ইশ্বরের অনুসন্ধান থেকে দূরে সরে যায়। পুরো মধ্যযুগজুড়ে বাণিজ্য এবং ব্যাংকিংকে বড় জোর Necessary evil হিসেবে দেখা হতো। খ্রিস্টানরা মনে করত, টাকা ধার দেয়ার ব্যবসা একজন খ্রিস্টানের জন্য অসম্মানজনক। চার্চ ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের আইন অনুযায়ী টাকা ধার দিয়ে সুদ নেয়া ছিল বেআইনি। মধ্যযুগে ফটকা কারবার এবং মুনাফাখোরি ন্যায্য দামের অর্থনৈতিক চিন্তার পরিপন্থী বলে বিবেচিত হতো। মধ্যযুগের শেষদিকে বাণিজ্যের বিস্তারের ফলে এক বিতর্কের সূত্রপাত হয়। এ বিতর্কের মধ্য দিয়েই অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ধর্মীয় মতবাদের সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। প্রটেস্টান্ট রিফর্মেশনের প্রাক্কালে যখন লোভকে পাপ বলে বিবেচনা করা হতো, ততদিনে পুঁজিবাদ শাসক এবং সাধারণ মানুষের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। কারণ সাধারণ মানুষ তাদের কর্মসংস্থানের জন্য পুঁজিবাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল এবং এভাবেই ক্যাথলিক ধর্মমতের কঠোরতার বন্ধন শিথিল হতে থাকে।
প্রটেস্টান্ট রিফর্মেশন দানা বাঁধতে শুরু করে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন পরিস্থিতি ছিল না। উত্তর ইউরোপে বিশেষ করে নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডে পুঁজিবাদী উত্থানের সহায়ক হিসেবে প্রটেস্টান্ট ধর্মমত এক শক্তিশালী সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এ ক্ষেত্রে আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ধর্মীয় চিন্তার ক্ষেত্রে পরিবর্তনের সূচনা করেছিল কিনা অথবা ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন আর্থসামাজিক পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছিল- এটি একটি বিতর্কিত বিষয় হিসেবে থেকে যাবে। তবে ম্যাক্সওয়েবারসহ অন্যান্য সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন, প্রটেস্টান্ট মতবাদ পুঁজিবাদী মনস্তত্বের জন্ম দিয়েছিল। যার ফলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এক নতুন ধরনের ইহজাগতিকতাবোধের জন্ম হয়। এ চেতনা হল কঠোর শ্রম, মিতব্যয়িতা, পরিমিতিবোধ এবং দক্ষতা। বাজারব্যবস্থার সঙ্গে এর যেমন সঙ্গতি রয়েছে একই ধরনের সঙ্গতি রয়েছে ধর্মীয় শিক্ষালয়ের সঙ্গে। সম্প্রসারণশীল শিল্প ও বাণিজ্যের পরিবশে প্রটেস্টান্ট ধর্মমত এই শিক্ষাই দিল যে, সঞ্চিত সম্পদকে ব্যবহার করতে হবে উত্তরোত্তর সম্পদ সৃষ্টির জন্য। প্রটেস্টান্ট নৈতিকতা থেকে শ্রমের মুক্ত বাজারেরও উদ্ভব হল। মুক্ত শ্রমিককে এখন আর কেউ বল প্রয়োগ করে নিজের সেবার জন্য খাটাতে পারবে না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন পাশ্চাত্য জগতে পুঁজিবাদী উন্নয়নের পথকে সুগম করে দিয়েছিল।
বর্তমান যুগের বাস্তবতাকে তুলে ধরতে গিয়ে মার্ক যুয়েরজেন্সনিয়ার তার রিলিজিয়াস ন্যাশনালিজম কনফ্রন্টস্ দ্য সেক্যুলার স্টেইট গ্রন্থে বলেছেন, আমি কয়েক ডজন গোলযোগপূর্ণ দেশে ১৯৮০ এবং ৯০-এর দশকে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে গিয়ে দেখেছি, তার (ড. মোহাম্মদ ইব্রাহিম আল গিয়সী, ডিন আলআজহার বিশ্ববিদ্যালয়) মতবাদ সাজুয্যহীন নয়। এ শতাব্দীতে যেসব দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, কেবল মিসর নয়, মধ্য এশিয়া ও অন্যান্য মুসলিম দেশ যেগুলো আলজেরিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এবং ইউক্রেনীয়, শ্রীলংকান, ভরতীয়, ইসরাইলি, মঙ্গোলিয়ান এবং গভীরভাবে ধর্মানুরাগী ব্যক্তিরা এমন এক ধরনের দেশীয়, ধর্মীয়, রাজনীতি চান, যা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির দ্বারা কলুষিত হয়নি। বস্তুত ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছিল। কারণ এ বিপ্লব পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আধিপত্য এবং এর ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকে ১৯৭৯ সালে চ্যালেঞ্জ করেছিল। বিষয়টি ১৯৯০-এর দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি মুখ্য আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। দ্বিমেরুবিশিষ্ট শীতল যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে যে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা প্রতিস্থাপিত হয় এর বৈশিষ্ট্য শুধু নতুন অর্থনৈতিক শক্তির অভ্যুদয় নয়, পুরনো সাম্রাজ্যের ভেঙে পড়া নয়, কমিউনিজমের গৌরব ক্ষুণ্ন হওয়া নয় বরং এর মধ্য দিয়ে বর্ণগোষ্ঠী ও ধর্মীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে সংকীর্ণ পরিচিতির উত্থান ঘটেছে। যদিও অন্যদের মধ্যে ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা দাবি করেছেন, শীতল যুদ্ধের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটেছে এবং বিশ্বজুড়ে সেক্যুলার, লিবারেল গণতন্ত্রের পক্ষে আদর্শিক সহমত সৃষ্টি হয়েছে। তদসত্ত্বেও ধর্মীয় এবং এথনিক জাতীয়তাবাদ সেই দাবিকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে। এ ছাড়াও নব্য জাতীয়তাবাদগুলোর প্রবক্তারা মনে করেন, সেক্যুলার পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থান গ্রহণের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে- এ থেকেই নতুন ধরনের শীতল যুদ্ধের সূচনা হতে পারে। এ গবেষক আরও মনে করেন, Like the old cold war, the confrontation between these new forms of culture- based politics and the secular state is global in its scope, binary in its opposition, occasionally violent, and essentially a difference of ideologies; and, like the old cold war, each side tends to stereotype the other. সুতরাং আমাদের দেশে যেসব পণ্ডিত মনে করেন সেক্যুলারিজম নিয়ে শেষ কথা বলা হয়ে গেছে এবং এর পর আর পর নেই, তারা আসলে সময়ের বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন। এরা আসলে ফুকুইয়ামারই অনুসারী। ফুকুইয়ামার মতোই তারা ইতিহাসের আর কোনো পরিবর্তন বা বিবর্তন দেখতে পান না। এরা বস্তুত চক্ষুহীন। এরা শ্রুতিশক্তিহীনও বটে। কারণ সাধারণ মানুষের অভিব্যক্তিও তারা শুনতে পান না। এরা কার্যত অপরিণামদর্শী। নতুন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জাতিগঠন এবং গণতন্ত্র চর্চার জন্য যে ধরনের নীতি-কৌশল অবলম্বন করা দরকার সে সম্পর্কে তাদের কোনো সৃজনশীল ধ্যান-ধারণা নেই। এরা মানব জাতির ইতিহাসও ভালোভাবে পাঠ করে দেখেননি। এরা ইউরোপের ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে আটকা পড়ে আছেন। কিন্তু ইতিমধ্যে পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। বিশ্ব-শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে কী করণীয় সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই।
ক্রিস্টোফার পাইপার এবং মাইকেল পি ইয়াং তাদের রিলিজিয়ান অ্যান্ড পোস্ট সেক্যুলার পলিটিক্স প্রবন্ধে মোয়াড্ডেলের যুক্তি উল্লেখ করে বলেছেন, ভাবাদর্শের পরিগঠন প্রাধান্য বিস্তারকারী সমাজ কাঠামোর মধ্যে পাওয়া যাবে না কিন্তু এর সূত্র পাওয়া যেতে পারে অসংলগ্ন প্রেক্ষাপটে এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের মধ্যে। প্রতিটি ক্ষেত্রে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, একটি আগ্রাসী সেক্যুলার রাষ্ট্র স্বৈরতান্ত্রিক হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে ধর্মের রাজনীতিকরণ করেছে, ফলত মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াবাদের জন্ম হয়েছে। এ ফলাফল অপ্রয়োজনীয় ছিল। মোয়াড্ডেল বলতে চান, ধর্ম এবং রাষ্ট্রকে পৃথক করা সম্ভব, সমগ্র সমাজ জীবনকে সেক্যুলার বিশ্ববীক্ষায় উপনিবেশিকরণ না করেও। দৃষ্টান্তস্বরূপ শিক্ষা, লিঙ্গ সম্পর্ক, আইন এবং ধর্মকে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য না করে। এরকম অনেক দেশে রাষ্ট্র ধর্মকে তাদের নিজস্ব সেক্যুলার প্রকল্পের অধীনস্ত করতে চেয়েছে। ফলে ধর্মগুরুরা ক্ষিপ্ত হয়েছেন এবং সাধারণ মানুষও ক্ষিপ্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতি মৌলবাদকে উসকে দিয়েছে। এ ধরনের সরকারগুলোর অধীনে আংশিক বিরোধিতা কিংবা সীমিত বিরোধিতার কোনো সুযোগ থাকে না। কারণ এর অর্থ হয়ে দাঁড়ায় সম্পূর্ণ বিরোধিতা। অর্থাৎ হয় কোনো বিরোধিতা থাকবে না, নয়তো সর্বাত্মক বিরোধিতা গড়ে উঠবে। এভাবে বিরোধী মতাদর্শ অনিচ্ছুকভাবে পরিণত হয় বিপ্লবী মতাদর্শে। ফলে রাষ্ট্রের মূল তাৎপর্যটি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। আজকের বাংলাদেশে যে রাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হচ্ছে, তার ফলে এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটছে কিনা সেটা রাষ্ট্র পরিচালকদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে সম্পর্কের বিষয়। এ ব্যাপারে গোয়ার্তুমির ফলাফল হিতে বিপরীত হতে পারে।
ড. মাহবুব উল্লাহ : বসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সার্কের অগ্রগতি ও জনপ্রত্যাশা by সালমা ইসলাম

দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) সংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনায় এ সংস্থার সার্বিক অগ্রগতির বিষয়ে অনেকেই যে হতাশা প্রকাশ করেন, এটি নতুন কিছু নয়। এর অন্যতম কারণ সার্কের প্রতি এ অঞ্চলের মানুষের যে বিপুল প্রত্যাশা রয়েছে, তা পূরণ হয়নি। এ অঞ্চলের মানুষের এমন কিছু প্রত্যাশা রয়েছে, যা সার্কের বিভিন্ন সম্মেলনে আলোচনা হলেও বিষয়গুলো আলোচনার পর্যায়েই রয়ে গেছে। এতে এ সংস্থার প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন কমছে। এ অবস্থায় সার্কের কর্মপদ্ধতি এমনভাবে ঢেলে সাজানো উচিত যাতে এ সংস্থার প্রতি বিশ্ববাসীর আগ্রহ আরও বাড়ে। ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলের মানুষ পরস্পরকে সহযোগিতা করতেই পছন্দ করে। কিন্তু ব্যাপক দারিদ্র্যের কারণে এ সহযোগিতার ক্ষেত্রে যে ছন্দপতন ঘটছে এটাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সার্কভুক্ত দেশগুলোতে বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় খনিজসম্পদ কম থাকলেও এ অঞ্চলের দেশগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হল মানবসম্পদ। এ সম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হলে সার্ক সদস্যভুক্ত দেশগুলোর উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। বিশ্বে খনিজসম্পদ একসময় ফুরিয়ে যাবে। এতে খনিজ সম্পদনির্ভর যে কোনো দেশের অর্থনীতিতে যে কোনো সময় অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। কিন্তু মানবসম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে উল্লিখিত সমস্যার মতো কোনো সমস্যার কারণে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ার আশংকা থাকে না।
বর্তমানে যে কোনো দেশের দ্রুত উন্নতির ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, সেসব এককভাবে মোকাবেলা করার চেয়ে যৌথভাবে মোকাবেলা করা অনেক সহজ। কোনো কোনো চ্যালেঞ্জ এককভাবে মোকাবেলা করতে গেলে অর্থনীতিতে কী অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে, ইবোলা ভাইরাসের দ্রুত বিস্তৃতিতে তা নতুন করে স্পষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যেখানে বিভিন্ন আঞ্চলিক জোটের সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে, সেখানে আঞ্চলিক জোটকে প্রকৃতপক্ষে কার্যকর করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোই সবচেয়ে লাভজনক। সার্কের বিভিন্ন সম্মেলনে নেয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। এ সংস্থার যে কোনো পর্যায়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে নেতৃবৃন্দ দূরদর্শিতার পরিচয় দেবেন, এটাই সবার প্রত্যাশা। এতে সার্ক সদস্যভুক্ত দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
সার্কের কর্মকাণ্ডকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে সবার মনে রাখা দরকার, সার্ক ও ইইউর গঠনতন্ত্র আলাদা। কাজেই এ দুই সংস্থার কর্মপদ্ধতিও আলাদা হবে এটাই স্বাভাবিক। ইইউর সঙ্গে সার্কের তুলনা করার ক্ষেত্রে এটাও মনে রাখা দরকার, অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ইইউকে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে। ইইউভুক্ত দেশগুলোয় একসময় যুদ্ধ লেগেই থাকত। সেসব যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির কথা ইউরোপবাসী আজও ভুলতে পারেনি। অনেক রক্ত ঝরার পর তারা বুঝতে পেরেছে, সহযোগিতার মূল্যই সবচেয়ে বেশি। এ নতুন উপলব্ধিই ইউরোপবাসীর চলার গতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলাদা সচিবালয় ও সংসদ রয়েছে। ইইউর অধীনে বর্তমানে যে ব্যাপক কর্মকাণ্ড চলছে তার মাধ্যমে ইইউভুক্ত সব দেশই উপকৃত হচ্ছে। ইইউ এখন ইউরোপের বাইরেও বিভিন্ন দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনগণের দক্ষতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক ভূমিকা রাখার বিষয়েও সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। এটা এখন সবার কাছেই স্পষ্ট, সার্ককে গতিশীল করতে এ সংস্থার শীর্ষ বৈঠকগুলো যাতে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় তা নিশ্চিত করা দরকার। নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি অল্প সময়ের নোটিশেও যাতে সার্কের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, এ ধারা চালু হলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গতি আসবে।
মিডিয়ায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিভিন্ন নিবন্ধ থেকে বোঝা যায়, কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন সামনে রেখে এ সংস্থার প্রতি এ অঞ্চলের মানুষের আগ্রহে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। সার্ক শীর্ষ সম্মেলনকে সামনে রেখে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিভিন্ন তৎপরতা থেকে এটাই স্পষ্ট হয়, এ সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চুক্তি সই হবে, যা এ অঞ্চলের বিনিয়োগ ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে যোগাযোগ ও জ্বালানি খাতের চুক্তিগুলো সার্কভুক্ত দেশগুলোর উন্নয়নে দীর্র্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
২.
সমগ্র বিশ্বে যেভাবে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চলছে, এতে আগামীতে জ্বালানি সংকট কতটা তীব্র আকার ধারণ করতে পারে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যে বহুবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তাই আগামীতে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করলেও সার্কভুক্ত দেশগুলো যাতে ওই সংকট সফলভাবে মোকাবেলা করতে পারে, এ বিষয়েও এ অঞ্চলের দেশগুলোর সব ধরনের প্রস্তুতি থাকা দরকার। সম্প্রতি বাংলাদেশে যে ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল- জ্বালানি নিরাপত্তাবিষয়ক চুক্তি এ ধরনের যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় আঞ্চলিক গ্রিডলাইন স্থাপনের বিষয়টি অনেক দিন ধরে আলোচিত হলেও এ ইস্যুতে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। জ্বালানি নিরাপত্তাবিষয়ক এ চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের দেশগুলোতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়বে। জ্বালানি নিরাপত্তাবিষয়ক আঞ্চলিক সহযোগিতা অক্ষুণ্ন থাকলে পাইপলাইনের মাধ্যমে হাজার মাইল দূরের দেশ থেকেও যৌক্তিক দামে গ্যাস আমদানি করা যায়, যা শিল্প খাতে ব্যবহার করাও লাভজনক হবে। এককভাবে কোনো দেশ এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা চিন্তাও করবে না। কারণ এতে বিপুল অর্থের অপচয় হবে। ফলে পণ্যের উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাবে।
সম্প্রতি মিডিয়ায় প্রকাশিত নেপালের বাণিজ্যমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার থেকেও স্পষ্ট হচ্ছে, এবারের সার্ক সম্মেলনে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হবে। এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি আনুষঙ্গিক আরও অনেক বিষয়ের সঙ্গে জড়িত। সম্প্রতি সার্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও বিভিন্ন আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। সার্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মতো এ ধরনের অন্য প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে তা সার্কভুক্ত দেশগুলোর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
যোগাযোগ খাতের চুক্তি নিয়ে বর্তমানে যেসব আলোচনা চলছে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে সার্কভুক্ত দেশগুলোতে পর্যটনের সম্ভাবনা আরও বাড়বে। কেবল অবকাঠামোগত বাধার কারণে হিমালয় থেকে বাংলাদেশের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত পর্যটনের বিশেষ সম্ভাবনাটি আলোর মুখ দেখছে না। ১৯৮৫ সালের শেনজেন চুক্তির (Schengen Agreement) মাধ্যমে ইইউর কয়েকটি রাষ্ট্রে পাসপোর্টবিহীন সীমান্তের নতুন ধারণা সৃষ্টি হয়। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে যেমন নতুন গতি এসেছে, তেমনি পর্যটন খাতে বিভিন্ন দেশের উপকৃত হওয়ার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ১৯৯২ সালে নেদারল্যান্ডসে ম্যাসট্রিখটে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির মাধ্যমে ইইউর সদস্য দেশগুলো একক মুদ্রার আওতায় বিশেষভাবে উপকৃত হচ্ছে। বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আসিয়ানের (The Association of Southeast Asian Nation) নামও গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে। ১৯৮৫ সালে সার্ক গঠনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সদস্য দেশগুলোর জনগণের জীবন মানের উন্নয়নের পাশাপাশি এ অঞ্চলের জনগণের পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ককে দৃঢ় করা। সার্কের প্রতিটি সম্মেলনে বিভিন্ন ইস্যুতে সহযোগিতা সুদৃঢ় করার ঘোষণা এলেও প্রকৃতপক্ষে সার্কের ধীরগতির বিষয়টি দুঃখজনক।
৩.
সার্কের অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে যত হতাশাই ব্যক্ত করা হোক না কেন- এ অঞ্চলের দেশগুলোর মানুষের সার্বিক জীবনমানের দ্রুত উন্নয়নে এ সংস্থা যে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইইউর সঙ্গে তুলনা করে সার্ক সনদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে যেসব সমালোচনা রয়েছে- সেসব বিবেচনায় নিয়ে সার্ক সনদ পরিবর্তনের বিষয়ে সার্কভুক্ত দেশগুলোর নেতৃবৃন্দকে নতুন করে ভাবতে হবে। এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের জনগণের জীবনমান উন্নয়নের প্রধান বাধা দারিদ্র্য। এ সমস্যা দূর করার জন্য প্রতিটি দেশেই চলছে বহুমুখী তৎপরতা। এর পাশাপাশি সার্কের আওতায় এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে বাকি বিশ্বের তুলনায় এ অঞ্চলের কোনো দেশের মানুষ পিছিয়ে না থাকে। মাত্র কয়েক দশক আগেও সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল আমাদের মতোই। সিঙ্গাপুরের দ্রুত অগ্রগতির পেছনে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতা।
বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক কার্যক্রমের পরিধি বেড়েই চলেছে। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার তুলনায় বহুপক্ষীয় সহযোগিতার সুফলের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতামূলক সংস্থার কার্যক্রমের পরিধিও দ্রুত বাড়ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন নতুন প্রযুক্তি যেমন মানুষের সামনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করছে, একই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহারের আশংকাও বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে অপরাধীরা যাতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে সক্রিয় হতে না পারে এ ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যকার বহুমুখী সম্পর্ক যত জোরদার হবে, অপরাধীদের অপতৎপরতার সুযোগ তত কমবে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সার্কভুক্ত দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার সব সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য যথাযথ উদ্যোগ নেবে, এটাই সবার প্রত্যাশা।
৪.
কোনো একটি অঞ্চলের কিছু দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কাক্সিক্ষত গতির অভাব স্পষ্ট হলে এ নিয়ে সমগ্র বিশ্ববাসীর উদ্বেগ বাড়ে। ইবোলা ভাইরাসের মতো যে কোনো নতুন চ্যালেঞ্জ বিশ্ববাসীর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া সফলভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এ প্রেক্ষাপটে বিশ্বের প্রত্যেক সচেতন মানুষেরই প্রত্যাশা- বিশ্বের সব অঞ্চলের মানুষ সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনের আওতায় আসুক। পিছিয়ে পড়া যে কোনো মানুষের দ্রুত উন্নয়নের জন্য মানসম্মত শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। কাজেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সার্কভুক্ত দেশগুলো বিশেষ উদ্যোগ নেবে- এটাও সবার প্রত্যাশা। মানসম্মত শিক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হলে বয়স্ক ব্যক্তিদের মাঝেও ব্যাপক উৎসাহের সঞ্চার হবে, যা প্রতিটি দেশের উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
১৭ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে বিবিসিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বে সব ধরনের ক্যান্সারে যত মানুষ মারা যায় তার ২৭ শতাংশ চীনের। অথচ চীনে বসবাস করে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনে ২০১৩ সালে মাথাপিছু আয় ছিল নয় হাজার মার্কিন ডলারের বেশি- যা সার্কভুক্ত সব দেশের মাথাপিছু আয় থেকে বেশি। চীনে ক্যান্সারে মৃত্যুর সংখ্যাটি বিবেচনায় নিলেই স্পষ্ট হয়- স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন জটিল সমস্যা সফলভাবে মোকাবেলার জন্য এ অঞ্চলের দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা কত জরুরি। ক্যান্সারসহ অন্যান্য জটিল রোগের বিরুদ্ধে সার্কভুক্ত দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস অব্যাহত থাকলে এ অঞ্চলের কোনো রোগীকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যেতে হবে না।
৫.
যে কোনো ফসলের উচ্চফলনশীল জাতের প্রতি সমগ্র বিশ্বে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে শস্যের পুরনো অনেক জাত ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে। আগামীতে যে কোনো সময় কোনো অনিবার্য কারণে নতুন জাতের পাশাপাশি পুরনো জাতের আবাদও জরুরি হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু
ততদিনে দু-একটি জাত ছাড়া পুরনো জাতগুলো যে হারিয়ে যাবে এটা জোর দিয়েই বলা যায়। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায়ও সার্ককে উদ্যোগ নিতে হতে পারে। অপ্রচলিত জাতের শস্যের বীজ সংরক্ষণের মতো আপাতদৃষ্টিতে কম গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডকেও সার্কের আওতাভুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ সার্কের কর্মকাণ্ডকে এমনভাবে বিস্তৃত করতে হবে যাতে আগামীতে সম্ভাব্য সব ধরনের পরিস্থিতি এ অঞ্চলের দেশগুলো সফলভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়। বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষণের মতো কাজগুলোকেও সার্কের আওতাভুক্ত করা দরকার।
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ সামুদ্রিক ঝড়-পরবর্তী পরিস্থিতি কী করে মোকাবেলা করবে, তা নিয়ে এখনও আতংকে থাকে। সিডর, আইলায় যারা সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছে- সেই মানুষগুলোর ক্ষতিপূরণের উপায় কী? বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ প্রত্যাশিত হারে কমছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে আগামী দিনগুলোতে জলবায়ু উদ্বাস্তুসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে বিশ্ব সম্প্রদায় অনেক প্রতিশ্র“তি দিলেও সেসব প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগই আলোর মুখ দেখেনি। এ প্রেক্ষাপটে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে সার্কের পক্ষ থেকে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এ অঞ্চলের কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে সার্কের উদ্যোগে কৃষি খাতের গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। প্রাণিসম্পদ সুরক্ষার জন্যও বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়নে এমন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে যাতে তাদের সরাসরি উপকৃত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়।
৬.
১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে সড়ক ও রেলপথে বহুমাত্রিক যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে যে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে- এ চুক্তির মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর বহুমাত্রিকভাবে উপকৃত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হবে। ইতিমধ্যে মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, উল্লিখিত চুক্তির আওতায় এক দেশের পণ্য ও যাত্রীবাহী বাহন অন্য দেশে যাবে এবং অন্য দেশের মধ্য দিয়ে তৃতীয় দেশের পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে পণ্য আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে যে সুবিধা সৃষ্টি হবে, তাতে এ অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে।
আমরা জেনেছি, নেপাল ও ভুটান বাংলাদেশের মংলা বন্দর ব্যবহারের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে আমদানিকৃত কয়লার ওপর ভিত্তি করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে পরিকল্পনা করা হয়েছে- তার বাস্তবায়ন শুরু হলে নেপাল ও ভুটান মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পাবে কিনা তা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে এবং সেই সমুদ্রবন্দর ব্যবহারে কোন কোন দেশের আগ্রহ রয়েছে তা যাচাই করে দেখতে হবে। সড়ক ও রেলপথে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য আনা-নেয়া শুরু করার আগে অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করতে হবে।
৭.
পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য সারা বিশ্বে নানারকম পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের দেশগুলো অনেক
পিছিয়ে আছে। কেবল ভারতেই প্রতি বছর বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ পর্যটক আসে। সমন্বিত উদ্যোগ নিলে সার্কভুক্ত অন্য দেশগুলোতেও পর্যটন খাতে আয়ের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর জনগণ সার্কের সদস্য রাষ্ট্রগুলোয় যে কোনো উপলক্ষে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা না পেলে নিু আয়ের মানুষ দেশ ভ্রমণের কথা ভাবতেও পারবে না। তাই সীমিত আয়ের মানুষের সামর্থ্যরে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সার্কের আওতায় এমন পদক্ষেপ নেয়া দরকার যাতে তারা কম খরচে সার্কভুক্ত দেশগুলোতে ভ্রমণ করতে পারে।
এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য সার্কের আওতায় ইতিমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সেসব পদক্ষেপ সার্কভুক্ত দেশের জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে কী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে তা যাচাই করে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিভিন্ন লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও প্রকৃতপক্ষে সেসব কয়েকদিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত থাকে এবং সেসব সম্মেলনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা থাকে নগণ্য। এসব সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনায় রেখে সার্কের আওতায় যে কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের কর্মসূচি এমনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে যাতে এসব কর্মসূচির প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ অব্যাহত থাকে। বর্তমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে কী ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হলে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে- এ বিষয়ে গবেষণাও অব্যাহত রাখতে হবে।
৮.
সার্কভুক্ত দেশগুলোর বিপুলসংখ্যক শিশু অপুষ্টির শিকার, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এখনও মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত; একেকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর বিদ্যমান উদ্বাস্তুদের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন অনেক উদ্বাস্তু। এসব মৌলিক সমস্যা দ্রুত সমাধানের ক্ষেত্রে সার্কের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বাজেট স্বল্পতার কারণে বড় ধরনের উদ্যোগ নেয়া সম্ভব না হলে প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে সার্কের আওতায় প্রতীকী উদ্যোগ অব্যাহত থাকলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হবে। তবে সেসব উদ্যোগ যেন দীর্ঘসময় প্রতীকী উদ্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে তার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর টেকসই উন্নয়নের বাধা দূর করতে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় তা বাস্তবায়নে ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়। এ অঞ্চলের দেশগুলোর সক্ষমতা দ্রুত না বাড়লে সার্কভুক্ত দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। শিক্ষা ও গবেষণার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমে এসব খাতে দ্রুত উন্নতি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে তা এ অঞ্চলের দেশগুলোর সার্বিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। কাজেই শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন খাতে এ অঞ্চলের দেশগুলো যাতে পিছিয়ে না পড়ে সেদিকে সবাইকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। মহাকাশ গবেষণায় ভারত যে সাফল্যের পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছে- এ অঞ্চলের সব দেশ যাতে সে রকম ব্যতিক্রম সাফল্যের পরিচয় দিতে সক্ষম হয়, সেই লক্ষ সামনে রেখে বহুমুখী তৎপরতাও অব্যাহত রাখতে হবে।
প্রতি বছর এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার জন্য প্রচুর মানুষ সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে যায়। এখন মালয়েশিয়ায়ও আধুনিক চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আধুনিক হাসপাতাল চালু হয়েছে। এসব হাসপাতালে রোগীরা কী কী আধুনিক সুবিধা পাবে সেসব তথ্য দেশটির বিভিন্ন হাসপাতালের পক্ষ থেকে সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক স্বাস্থ্য প্রদর্শনীতে তুলে ধরা হয়। এসব তথ্য থেকে এটাই স্পষ্ট হয়- মালয়েশিয়ার বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করা মধ্যবিত্তের পক্ষে সম্ভব হবে না। কাজেই মধ্য ও নিু আয়ের মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হলে কম ব্যয়ে সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা জরুরি। সার্কভুক্ত দেশগুলোর যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে কম খরচে চিকিৎসাসেবা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভবপর হয়ে উঠবে। এ অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আধুনিক চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সার্কের আওতায় অত্যাধুনিক হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হবে- এটাই সবার প্রত্যাশা।
সার্কভুক্ত দেশগুলো বিনিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশেষভাবে উপকৃত হওয়ার পথ খুঁজছে। তাদের মধ্যকার আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে কোনো কোনো পর্যবেক্ষক যত হতাশাই ব্যক্ত করুন- আশা করা যায়, আগামী দিনগুলোতে এ ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। বিভিন্ন সম্মেলনে সার্কভুক্ত দেশগুলোর নেতৃবৃন্দ যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন তা বাস্তবায়নে কেন দেরি হয়- তা চিহ্নিত করে সমস্যাগুলোর সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আগামী দিনগুলোয় সার্কভুক্ত দেশগুলোতে বহুমাত্রিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পরিবেশ বিপর্যয় রোধে সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।
৯.
শিল্প বিপ্লবের পর থেকে সমগ্র বিশ্বের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। বর্তমানে দূষণ পরিস্থিতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। পরিবেশ দূষণ রোধে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অব্যাহত না রাখলে বিশ্ববাসীকে আগামীতে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে, বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে সার্কভুক্ত দেশগুলো এ অঞ্চলের পরিবেশ সুরক্ষায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনাসহ পানিসম্পদের সর্বোচ্চ ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সার্কভুক্ত দেশগুলোকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। কোনো নদীর উজানে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে যদি নদীর স্বাভাবিক স্রোত হারিয়ে যায়- এতে উজানের দেশটি সাময়িকভাবে উপকৃত হলেও একটি অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে প্রকৃতপক্ষে উজানের দেশও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সম্প্রতি কয়েকটি দেশের একদল বিজ্ঞানী পৃথিবীজুড়ে সমুদ্রের বিভিন্ন এলাকায় বহুমাত্রিক পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে এবং এক হাজার বছরের ইতিহাসের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে এ আশংকা প্রকাশ করেছেন, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সমুদ্র মাছের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থার অতিরিক্ত হারে মাছ ধরার বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৪৮ সালের মধ্যে পৃথিবীর সব সমুদ্র মৎস্যশূন্য হতে পারে। অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারে মিঠা পানির বিস্তীর্ণ অঞ্চল ইতিমধ্যে মৎস্যশূন্য হয়ে পড়েছে। আবাদি জমি বাড়ানোর ফলে স্বাভাবিকভাবেই মাছের বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। মাছের বিকল্প হিসেবে অন্য উৎস থেকে আমিষের চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থা করা হলেও বিভিন্ন প্রজাতির মাছের অনুপস্থিতিতে পরিবেশের যে বিপর্যয় হবে তা ঠেকানোর উপায় কী?
১০.
বিনিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সার্কভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উপায় খোঁজার পাশাপাশি পৃথিবীতে বিভিন্ন উপকারী প্রাণীর সংখ্যা কত কমেছে এবং বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষণে কী করণীয়- এসব ব্যতিক্রমী বিষয়েও সার্কের গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে। জীববৈচিত্র্য নষ্ট হলে আগামীতে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে এবং তা মানবসভ্যতার জন্য কী হুমকি হয়ে দেখা দেবে- এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বহুবার সতর্ক করেছেন। বিজ্ঞানের এত অগ্রগতির পরও ইবোলা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের কেন এত দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা করতে হচ্ছে, সার্কের আওতায় এসব বিষয়েও মৌলিক গবেষণার পরিধি বাড়াতে হবে। উন্নত কোনো দেশও যখন এসব বিষয়ে এককভাবে গবেষণা করে কাক্সিক্ষত সুফল পায় না, তখন স্পষ্ট হয় এ অঞ্চলের দেশগুলোর যৌথভাবে কাজ করা কত জরুরি। উন্নয়নশীল কোনো দেশে ইবোলা ভাইরাসের মতো সমস্যা সৃষ্টি হলে তা দেশটির অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং তা থেকে যে বহুমুখী সংকট সৃষ্টি হবে তাও সহজেই অনুমান করা যায়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এ অঞ্চলের দেশগুলোর বিভিন্ন সম্পদ কাজে লাগানোর পরিবেশবান্ধব উপায় খুঁজে বের করতে হবে। সার্ক সম্মেলনে এসব জরুরি বিষয়সহ বহুমুখী আলোচনা হলে এবং এ অঞ্চলের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সার্ক কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হলে এ সংস্থার প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বাড়বে।
অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি : প্রকাশক, যুগান্তর

শ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হবেন হিলারি : ওবামা

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্টলেডি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন (৬৭) ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হলে তিনিই জিতবেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেরা প্রেসিডেন্ট হবেন বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। রোববার সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ওবামা বলেন, সবকিছুতেই আমার সঙ্গে একমত নিয়ে চলেননি হিলারি। তবে আট বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর তার (হিলারি) পক্ষে ভোট টানতে কাজ করবেন তিনি। ডেমোক্রেটিক নেতা হিলারি ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিক বাছাইয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে ওবামা কাছে হেরে যান। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন কি-না, সেই বিষয়টি ২০১৫ সালের প্রথম দিকে ঘোষণা দেবেন হিলারি। হিলারিকে বন্ধু উল্লেখ করে ওবামা বলেন, তার সঙ্গে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলি।
দেশের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হতে ডেমোক্রেটিক পার্টির অনেকেই প্রতিযোগিতায় নামতে পারেন। কিন্তু তার পছন্দের তালিকায় একমাত্র নাম হিলারি ক্লিনটনই। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের দুর্দান্ত ও শ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হবেন। ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারির দায়িত্ব পালনকালে তাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল বলে স্বীকার করেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি এও স্বীকার করেন, আগামী নির্বাচনে জনগণ নতুন কোনো স্বাদ পেতে চাইবেন। এছাড়া নির্বাচনের সময় ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে জোরালো সভা-সমাবেশে যোগ দেবেন না বলে ইঙ্গিত দেন তিনি। বর্তমানে ওবামার জনপ্রিয়তা একবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে।
তাই বর্তমানে দেশটির পার্লামেন্ট কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিুকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিরোধী রিপাবলিকান পার্টি। ফলে আগামী নির্বাচনে জিততে হলে ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ব্যাপক কাঠখড় পোহাতে হবে। বিবিসি, এবিসি নিউজ।

ভারতে বিচারের মুখোমুখি ৩০০ বিচারক

ভারতে এবার স্বয়ং বিচারকদের বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দিল্লির নিু আদালতের প্রায় ৩০০ বিচারককে নজরদারির আওতায় এনেছেন হাইকোর্ট। এসব বিচারকের বিরুদ্ধে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে অর্থের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
সোমবার টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়, ২০১৩ সালে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ কেনার জন্য দিল্লি সরকার ও দিল্লি হাইকোর্ট একটি তহবিল গড়েছিলেন। এই কর্মসূচির আওতায় নিু আদালতের প্রত্যেক বিচারক কম্পিউটার সুবিধাদি উন্নীতকরণে এক লাখ ১০ হাজার রুপি করে বরাদ্দ পান। এই অর্থ দিয়ে তাদের কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা আইপ্যাডের মধ্যে নিজের পছন্দমতো যে কোনোটি বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দেয়া হয়। দিল্লির উচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি জি রোহিনী হাইকোর্টের তিনজন বিচারপতির নেতৃত্বে অনিয়ম তদন্ত করতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠন করেছেন। এই কমিটি নিু আদালতের বিচারকদের জমা দেয়া কম্পিউটার ও ল্যাপটপ কেনা-সংক্রান্ত কাগজপত্র খতিয়ে দেখবে। বিচারকরা এই অর্থ কোথায়, কীভাবে ব্যয় করেছেন- তদন্ত কমিটি তার ব্যাখ্যা ও রসিদ চেয়েছে।

১৩ বছরে গড়াল ইরান ছয় জাতি আলোচনা

বিশ্বের ছয় ক্ষমতাধর দেশ ও ইরানের মধ্যকার পরমাণু আলোচনা ২০১৫ সালে গড়াল। গত এক যুগ ধরে উত্তেজনা বৃদ্ধি ও নানা আলোচনার মধ্যে সর্বশেষ ডেডলাইন শেষ হয় সোমবার মধ্য রাতে। এবার তা ১৩ বছরে পড়ল। সময়সীমা পুনরায় বাড়িয়ে আগামী বছরের মধ্য জুলাইয়ে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরমাণু আলোচনায় সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা এসব কথা জানান। খবর আল জাজিরার। কূটনীতিকরা নির্ধারিত সময়সীমা সোমবার গ্রিনিচমান ২৩টার আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে ভিয়েনায় শেষবারের মতো চেষ্টা চালিয়ে যান। একজন পশ্চিমা কূটনীতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু অনেক বিষয় আছে যেগুলো নিজেদের সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। আগামী বছর আমরা আবার বসবো। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। তিনি আরও বলেন, আগামী বছরের মার্চের মধ্যে দুই পক্ষ একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় আসবে। এরপর মধ্য জুলাইকে সময়সীমা ধরে তার আগেই চূড়ান্ত চুক্তি করা হবে। কূটনীতিকরা জানান, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এর আগে যে মতপার্থক্য ছিল তা এখনও রয়েছে। ফলে ভিয়েনা বৈঠকে চুক্তি নিয়ে আলোচনার সময়সীমা বাড়ানোর ব্যাপারে ঐকমত্য হতে পারে।
জাতিসংঘের স্থায়ী পরিষদের পাঁচ সদস্য যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানি চায়, জাতিসংঘ আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জবাবে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি কাটছাঁট করুক। পশ্চিমাদের অভিযোগ, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচির আড়ালে আণবিক বোমা তৈরি করছে। তবে ইরান এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরানের দাবি, তারা বেসামরিক কাজে পারমাণবিক কর্মসূচি চালাচ্ছে। এর আগে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড বলেন, এই মুহূর্তে আমরা একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার শেষ চেষ্টা চালাচ্ছি। তিনি জানিয়েছিলেন, অবশ্য চুক্তিতে উপনীত হতে না পারলে, তখন আমরা কোন দিকে যাব তা নিয়ে আলোচনা হবে। এএফপি।

পুরুষ কমছে বাড়ছে নারী

দ.কোরিয়ায় আগামী বছর জনসংখ্যার দিক থেকে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। জন্ম-মৃত্যুর আনুপাতিক হার অনুযায়ী দেশটিতে পুরুষের সংখ্যা কমছে, নারীর সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এই প্রথমবারের মতো দেশটিতে নারীর সংখ্যা পুরুষের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে। বয়স্ক লোকের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ফলেই এমনটা ঘটতে যাচ্ছে। খবর এএফপির। রাষ্ট্রীয় উপাত্ত সংস্থা স্ট্যাটিস্টিকস কোরিয়ার মতে, ২০১৫ সালে দেশটিতে ২ কোটি ৫৩ লাখ পুরুষের বিপরীতে নারীর সংখ্যা দাঁড়াবে ২ কোটি ৫৩ লাখ ১০ হাজারে। দক্ষিণ কোরিয়ায় কম জন্মহার ও নারীদের আয়ু বৃদ্ধি পাওয়াই এর কারণ। দক্ষিণ কোরিয়া ২০০০ সালে বয়স্কদের সমাজে পরিণত হয়েছে এবং ২০২৬ সাল নাগাদ ‘সুপার-এজড সোসাইটি’তে পরিণত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কোনো দেশের ২০ শতাংশের বেশি লোকের বয়স ৬৫ বছর হলে তাকে ‘সুপার-এজড সোসাইটি’ বলা হয়। স্ট্যাটিস্টিকস কোরিয়া জানায়, দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে ২০১৬ সালে। ওই বছর ১৫ বছর থেকে ৬৪ বছর বয়সী লোকের সংখ্যা হবে ৩ কোটি ৭০ লাখ ৪০ হাজার। এর পরের বছরই কর্মক্ষম মানুষের এই সংখ্যা হ্রাস পেতে শুরু করবে। এএফপি।

মহাকাশে ইতিহাস গড়লেন প্রথম ইতালীয় নারী

ইতালির প্রথম নারী নভোচারী বহনকারী রাশিয়ার সয়ুজ মহাকাশযান নিরাপদে আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে ভিড়েছে। নাসা এ কথা জানিয়ে বলেছে, সয়ুজে ইতালির সামান্থা ক্রিস্তোফোর্ত্তি ছাড়াও রুশ নভোচারী অ্যান্তন শাখাপ্লেরভ ও আমেরিকান টেরি ভার্টস রয়েছেন। রাশিয়ার কাজাখস্তানের বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকে উড্ডয়নের ছয় ঘণ্টা পর নভোযানটি সোমবার আইএসএসে পৌঁছে। এ তিন নভোচারী ২০১৫ সালের মে মাস পর্যন্ত মহাকাশে অবস্থান করবেন। যাওয়ার সময়ে তারা প্রায় এক কিলো কেভিয়ারসহ আপেল, কমলা, টমেটো, হিমায়িত শুকনো দুধ এবং চিনি ছাড়া ব্ল্যাক -টি নিয়ে গেছেন। এছাড়া তারা প্রথমবারের মতো ইতালীয় কোম্পানি লাভাজ্জার তৈরি কফি তৈরির মেশিনও নিয়ে গেছেন। ইতালীয় বিমান বাহিনীর ক্যাপ্টেন ক্রিস্তোফোর্ত্তি (৩৭) মহাকাশে যাওয়া প্রথম নারীই নন, তিনি ইতালির কফি তৈরির মেশিনটি কক্ষপথে নিয়ে গিয়ে ইতিহাসও সৃষ্টি করেছেন। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ১৬টি দেশ আইএসএসে কাজ করছে।

২০ সালে পাকিস্তানে ২০০ পরমাণু অস্ত্র

বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচি। দেশটির পরমাণু উপাদান মজুদের এই হার অব্যাহত থাকলে ২০২০ সালের মধ্যে অন্তত ২০০ পরমাণু বোমা তৈরি করতে সক্ষম হবে ইসলামাবাদ। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক একটি শীর্ষ থিংক ট্যাংকের গবেষকরা এ তথ্য জানিয়েছেন। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার। যুক্তরাষ্ট্রের ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন’ (সিএফআর) প্রকাশিত ‘স্ট্র্যাটিজিক স্ট্যাবিলিটি ইন দ্য সেকেন্ড নিউক্লিয়ার এজ’ নামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অনেক রাষ্ট্র তাদের পরমাণু মজুদ হ্রাস করলেও, এশিয়ায় মজুদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল পরমাণু কর্মসূচি পাকিস্তানের। ২০২০ সালের মধ্যে এদের কাছে এত পরিমাণ ফিশনযোগ্য উপাদান থাকবে, যা দিয়ে অস্ত্র তৈরি করলে ২০০ পরমাণু বোমা তৈরি করতে পারবে।’ জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জর্জ কোবলেন্টৎজ এ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন। পাকিস্তানের পরমাণু মজুদ থামাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সেনা অভিযান পরিচালনা করা উচিত বলেও মন্তব্য করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
বিশ্বে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় পরমাণু ক্ষমতাধর দেশ। মোট পরমাণু অস্ত্রের ৯০ ভাগই এই দেশ দুটির দখলে। পরমাণু অস্ত্র মজুদের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় পাকিস্তান ৬ষ্ঠ। এরপরই আছে ভারত। সামরিক অস্ত্রবিষয়ক সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (এসআইপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীতে এখন ১৬,৩০০ পরমাণু অস্ত্রের মজুদ রয়েছে, যা ২০১৩ সালে ছিল ১৭,২৭০। ২০১২ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৯,০০০। তবে এর মধ্যে সক্রিয় পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা চার হাজার। পৃথিবীব্যাপী পরমাণু অস্ত্রের মজুদ কমানোর কথা বলা হচ্ছে। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এই সংখ্যা হ্রাস করলেও এশিয়ায় তা বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্রের পরিমাণ ৮,০০০ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৭,৩১৫। এরপর রয়েছে ফ্রান্স, চীন, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, ভারত, ইসরাইল ও উত্তর কোরিয়া। তাদের অস্ত্রের পরিমাণ যথাক্রমে ৩০০, ২৫০, ১০০-১২০, ৯০-১০০, ৮০ এবং উত্তর কোরিয়ার পরমাণু ১০টির কম। পৃথিবীর দশম দেশ হিসেবে বর্তমানে পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে ইরান।
সিএফআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পাকিস্তান ১১টি পরমাণু অস্ত্র-উৎক্ষেপণ-ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এখান থেকে পরমাণু বোমা, বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করা সম্ভব। পাকিস্তান কোন পরিস্থিতিতে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করবে তা সহজেই অনুমেয়। ভারতের হুমকি-ধামকি থেকে নিজের ভূখণ্ড রক্ষার লক্ষ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত করছে দেশটি।

সরকারের সমর্থনেই লতিফ সিদ্দিকী দেশে

সরকারের ইন্ধন ও সমর্থন আছে বলেই আবদুল লতিফ সিদ্দিকী গ্রেফতার এড়িয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন। এ অভিযোগ বিএনপির। দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিমানবন্দর থেকে লতিফ সিদ্দিকীর নিরাপদে বের হয়ে যাওয়াই প্রমাণ করে সরকারের সমর্থনে তিনি দেশে এসেছেন। এটা পরিষ্কার যে, লতিফ সিদ্দিকীর সঙ্গে সরকারের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। তা না হলে এতগুলো মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকারও পরও তিনি কিভাবে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে গেলেন।
সোমবার বাংলাদেশ সফররত সুইডেনের উন্নয়নবিষয়কমন্ত্রী ইসাবেল্লা লোপিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডিশ রাষ্ট্রদূতের গুলশান-২ নম্বরের ৬১ নম্বর রোডের ২৬ নম্বর বাড়িতে দেড় ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, রিয়াজ রহমান, সাবিহউদ্দিন আহমেদও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, মিস ইসাবেল্লা সুইডিস সরকারের উন্নয়নবিষয়কমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাজনীতি, মানবাধিকার, মিডিয়ার স্বাধীনতার বিষয়ে তাদের কাছে জানতে চেয়েছেন। তারা এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন, যে কোনো দেশেই উন্নয়নের প্রথম শর্ত হচ্ছে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার না থাকলে কোনো সুষ্ঠু উন্নয়ন হতে পারে না।
তিনি জানান, সুইডিস মন্ত্রী ইসাবেল্লা লোপিন বলেছেন, যে কোনো উন্নয়নের প্রধান শর্তই হচ্ছে গণতন্ত্র। বাংলাদেশের উন্নয়নেও গণতন্ত্র অপরিহার্য। এদেশে যে কোনো উন্নয়নে সুইডেন পাশে থাকবে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করারও অঙ্গীকার করেন তিনি।
বিমানের চেয়ারম্যানের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এত দুর্বলতা কেন-রিজভী : বিমানের পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান জামালউদ্দিনের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এত দুর্বলতা কেন, দেশবাসী তা জানতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হচ্ছেন বিমানের বর্তমান চেয়ারম্যান ও স্বর্ণ চোরাচালানের আলোচিত ব্যক্তি জামালউদ্দিন। তিনি ছিলেন মিগ-২৯ ক্রয়ে দুর্নীতির অন্যতম হোতা। তার পুরস্কারস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে বিমানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিমানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সোচ্চার হলেও প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় তিনি বহাল তবিয়তেই রয়ে গেছেন। উল্টো তিন তিনজন মন্ত্রী পরিবর্তন হয়েছে। সোমবার নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, অর্থনৈতিক সম্পাদক আবদুস সালাম, শিক্ষা সম্পাদক খায়রুল কবীর খোকন, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এক প্রশ্নের জবাবে রিজভী আহমেদ বলেন, ওয়ারেন্ট থাকা সত্ত্বেও বিমানবন্দরে লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেফতার না করে সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ নাটক সাজিয়ে ছিল। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলা বিষয়ে লিভ টু আপিল খারিজ হওয়া সম্পর্কে রিজভী বলেন, সরকার সব জায়গায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বিচার বিভাগের ওপরও তারা হস্তক্ষেপ করছে।
সরকার নতুন খেলা শুরু করেছে-রফিকুল ইসলাম মিয়া : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেছেন, সরকারের কনসান্স ছাড়া লতিফ সিদ্দিকী দেশে আসেনি। লতিফ সিদ্দিকী বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর পুলিশ তাকে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহর আইনকে আঘাত করা লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে সরকার নতুন খেলা শুরু করেছে। এ খেলার মাসুল তাদেরই (সরকার) দিতে হবে। সোমবার বিকালে প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে জাসাস ঢাকা মহানগর দক্ষিণ। জাসাস দক্ষিণের সভাপতি জাহাঙ্গীর শিকদারের সভাপতিত্বে এতে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির যুগ্ম সহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, জাসাস সভাপতি এমএ মালেক, সহসভাপতি বাবুল আহাম্মেদ, রফিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মনির খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক খালেদ এনাম মুন্না প্রমুখ।

শেখ হাসিনাকে পশ্চিমবঙ্গে আমন্ত্রণ জানালেন মমতা

মানব সূচক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সাফল্যকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ভারতীয় কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী। কিভাবে বাংলাদেশ সরকার এমন সাফল্য পেল তা নিয়ে যথেষ্ট কৌতূহলও দেখিয়েছেন রাহুল। সোমবার নয়াদিল্লিতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ ও ওয়ার্কার্স পার্টির দশ সংসদ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) ফারুখ খান এমপি। দিল্লি আসার একদিন আগেই কলকাতার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে দেখা করেন ফারুখ খানরা। সেখানে মমতাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তরফ থেকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। পাল্টা মুখ্যমন্ত্রীও শেখ হাসিনাকে পশ্চিমবঙ্গে আসার জন্য নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মমতা আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেও কবে তিনি ঢাকা আসবেন বা আদৌ আসবেন কিনা এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। এদিন কলকাতায় সারদা টিকফা কেলেংকারি নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল করে মমতা বলেছেন, বাংলাদেশ আমাদের বন্ধু দেশ। ওই দেশের সঙ্গে আমাদের বহুদিনের বন্ধুত্ব। ওই দেশ থেকে সীমান্ত পেরিয়ে এসে দুই একজন লোক জঙ্গি কাজকর্ম করা মানে সবাই খারাপ নয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে যারা এসেছেন, আইনি স্বীকৃতি নিয়ে ভারতের নাগরিক হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে বিজেপির সন্ত্রাস মানা হবে না। এদিন নরেন্দ্র মোদিকেও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন মমতা।
রাহুল গান্ধীর ২৪ আকবর রোডের অফিসে প্রায় ৫০ মিনিট ধরে ছিটমহল থেকে সন্ত্রাসবাদ দমন-সহ নানা ইস্যুতে ভারত-বাংলাদেশের পারস্পরিক বোঝাপড়া নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশী প্রতিনিধি দলের। বিশেষ করে ছিটমহল চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন নিয়ে রাহুলের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন তারা। এদিনই দিল্লিতে ভারতের যুগ্ম নির্বাচন কমিশনার ভিএস সম্পতের সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল। কিভাবে নির্বাচনী খরচ কমানো যায় এবং ইডিএম মেশিন বসানো যায় তা নিয়ে বিস্তারিত খুঁটিয়ে আলোচনা করা হয়। আজ দিল্লিতে ভারতীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটির প্রধান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শশী থারুরের সঙ্গেও বৈঠক করবে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদি বা রাজনাথ সিং দূরের কথা বিজেপির কোনো সর্বভারতীয় নেতার অ্যাপয়েনমেন্ট পাননি ফারুখ খানরা। শুধু বিজেপির রাজ্যসভার সংসদ সদস্য চন্দন মিত্র দেখা করেছেন। তবে আজ বিপেপির যুবমোর্চার সভাপতি অনুরাগ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের কোনো সন্ত্রাসবাদীকেই পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে থাকতে দেয়া হবে না বলে একদিন আগেই ফারুখ খানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশী প্রতিনিধি দলকে জানিয়ে দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। প্রতিনিধি দলকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিদের কোনো এলাকা নেই। সন্ত্রাসীরা যেখানেই থাকে, তাদের কাজ সন্ত্রাস করা। কিন্তু আইনের হাত অনেক প্রশস্ত। তাই জঙ্গিদের আইনের জালে ধরা পড়তেই হবে। পশ্চিমবঙ্গে অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে না। জঙ্গিদের গ্রেফতার করে আইন অনুযায়ী কড়া ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাংলাদেশী প্রতিনিধিরা নবান্নে গিয়ে মমতার সঙ্গে দেখা করেন। এদিকে কলকাতার বাংলাদেশ উপদূতাবাসের তরফে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশী স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রচারের বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার জকি আহাদ। ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থসম্পর্কিত বিষয় নিয়ে মমতার সঙ্গে আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যদের অত্যন্ত হৃদ্যতার পরিবেশে কথা হয়েছে। আলোচনার শুরুতেই বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, শোন একটি মুজিবরের কণ্ঠ থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি... গানটির কিছু অংশ গেয়ে শোনান মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে উভয় দেশের সংস্কৃতি, বাণিজ্য এবং সামাজিক নানা বিষয় নিয়ে বিস্তারিত ও খোলোমেলা আলোচনা হয়। মুখ্যমন্ত্রীর আপ্যায়ন এবং সারল্যে মুগ্ধ হয়ে বাংলাদেশী প্রতিনিধি দল বলে, এমন আন্তরিক ও অমায়িক প্রশাসক সত্যিই বিরল।

কারও দিকে না তাকিয়ে ব্যবস্থা নিন : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারও মুখের দিকে না তাকিয়ে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ভিডিও কনফারেন্সে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার সাজ্জাদুল হাসান ও পুলিশ কমিশনার কামরুল আহসানকে তিনি এ নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছুদিন আগে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সমস্যা হয়েছে, সে সম্পর্কে পুলিশ কমিশনারের কাছ থেকে জানতে চাই। এখানে একটা নির্দেশ আমি দিতে চাই, যারাই এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করবে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস করবে, যে দলের হোক, কে কোন দলের সেটা দেখার কথা না, যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড করবে, সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে হবে। এ সময় সিলেটের পুলিশ কমিশনার প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, গত ২০ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। মারামারিতে একজন ছেলে নিহত হয়। ঘটনার সময় নিয়ন্ত্রণ করেছি। তা না হলে হয়তো আরও ক্ষয়ক্ষতি হতে পারত। তিনি জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। বিশেষ অভিযানে ৩৩ জনকে গ্রেফতার করার পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও বেশকিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এই অভিযান অব্যাহত আছে। তারা আশা করছেন যারা এই ঘটনায় জড়িত তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পারবেন।
বৃহস্পতিবার সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রতিপক্ষের গুলিতে সুমন চন্দ্র দাস (২২) নামে এক বহিরাগত ছাত্র নিহত হন। নিহত সুমনও ছাত্রলীগ কর্মী। ওই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরের দিন ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ দাবি করেন, সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহিরাগতরা সংঘর্ষে জড়িয়েছে, তাতে ছাত্রলীগ জড়িত নয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সে বলেন, আমি জানি যে, যারাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণ্ডগোল করুক, একটা পর্যায়ে দেখা গেছে সেখানে ছাত্রের চেয়ে অছাত্র বেশি, কিছু বহিরাগত, তারাও এর সঙ্গে জড়িত থাকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হত্যার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, দোষীদের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার ও উপযুক্ত শাস্তি দিলে তাৎক্ষণিকভাবে এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশ কমিশনারকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে (ছাত্র হত্যা) কোনো দিকে না তাকিয়ে, কারও মুখের দিকে না তাকিয়ে যথাযথভাবে ব্যবস্থা নিবেন এটাই আমরা চাই। সিলেটের সঙ্গে আরেক দিন ভিডিও কনফারেন্স করবেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি চলমান থাকবে, ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন স্বপ্ন নয়, বাস্তব। প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করারও আহ্বান জানান তিনি। সিলেট ছাড়াও রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশ কমিশনার এবং মৌলভীবাজার ও পাবনা জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সঙ্গেও ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তৈরি থাকবেন, যে কোনো সময় বসব : মৌলভীবাজার জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ শুরু করলাম, এরপর অন্যান্য বিষয় নিয়ে সবাই সব সময় তৈরি থাকবেন। আপনারা কে কী কাজ করছেন, সমস্ত ডাটা নিয়ে রেডি থাকবেন। যে কোনো সময় বসব, কথা বলব এবং জিজ্ঞাস করব- যার যার এলাকায় কী কী কাজ হচ্ছে।
প্রতি মাসে দুবার ভিডিও কনফারেন্স : মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, এখন থেকে মাসে দুই দিন জেলা উন্নয়ন কমিটির সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কথা বলবেন প্রধানমন্ত্রী। সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে বসবেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই (অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন) প্রকল্প থেকে এ বিষয়ে সহায়তা দেয়া হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রত্যেক জেলায় জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি রয়েছে। তাতে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা রয়েছেন। এটা একটা ভালো ফোরাম, এখানে জেলার উন্নয়নে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী যদি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সরাসরি কথা বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যাগুলো তিনি জেনে যাবেন। প্রধানমন্ত্রী চাইলে তাৎক্ষণিক নির্দেশনাও দিতে পারেন।

প্রতিভা পরীক্ষায় রোবট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ দিতে গ্রহণযোগ্য কবিতা, গল্প বা ছবি আঁকার পরীক্ষা দিতে হবে রোবটকে। রোবটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সমপর্যায়ে পৌঁছেছে কিনা তা পরীক্ষা করতেই এ প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির অধ্যাপক মার্ক রিডল। অধ্যাপক রিডল জানিয়েছেন, কৃত্রিম এজেন্ট যদি কোনো প্রকার শৈল্পিক ধরন অনুযায়ী নিজ হাতে মননশীল কিছু সৃষ্টি করতে পারে এবং তা যদি মানবীয় বুদ্ধিমত্তায় সৃষ্ট কিছুর মতো হয়, তাহলেই কৃত্রিম এজেন্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে বলে ধরে নেয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন বিশেষজ্ঞরা। লন্ডন ফিউচারিস্টসের চেয়ারম্যান ডেভিড উড জানিয়েছেন, বিষয়টিতে ভুল হচ্ছে। কারণ ইতিমধ্যেই এমন রোবট রয়েছে যা প্রাথমিক অনুভূতি সুস্পষ্ট বুঝতে পারে এবং এমন কম্পিউটার রয়েছে যা গান লিখতে সক্ষম। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষার জন্য বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার বিজ্ঞানী অ্যালান টিউরিংয়ের নামে নামকরণকরা টিউরিং টেস্ট ব্যবহার করে থাকেন। বিবিসি।

নতুন চার্জশিটেও নাম নেই সব ষড়যন্ত্রকারীর

‘নতুন চার্জশিটেও কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের দু’একজন ষড়যন্ত্রকারীর নাম আসেনি। আমি দীর্ঘদিন অপেক্ষায় ছিলাম। চেয়েছিলাম আমার স্বামীর প্রকৃত হত্যাকারীদের বিচার হোক প্রকাশ্যে আদালতে। মনে করেছিলাম হত্যার মদদদাতা ও সহায়তাকারীরা চিহ্নিত হবে। কিন্তু ঘটনার প্রায় ১০ বছর পর দেয়া নতুন চার্জশিটেও দু’একজন গুরুত্বপূর্ণ ষড়যন্ত্রকারীর নাম আসেনি। তাদের মধ্যে অন্যতম হবিগঞ্জের সাবেক ডিসি মো. এমদাদুল হক। তবে এবারের চার্জশিটে কয়েক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম রয়েছে। মামলার বাদী আবদুল মজিদ খান এমপি ভুল চার্জশিটের মাধ্যমে আসল অপরাধীদের পাশ কাটিয়ে বিচার চেয়েছিলেন। অসম্পূর্ণ চার্জশিটে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি কাদের বাঁচাতে চেয়েছিলেন?’ এই কথাগুলো গ্রেনেড হামলায় নিহত সাবেক অর্থমন্ত্রী, বরেণ্য কূটনীতিক শাহ এএমএস কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়ার। সম্প্রতি আদালতে জমা দেয়া কিবরিয়া হত্যা মামলার চার্জশিট নিয়ে সোমবার এক বিবৃতিতে তিনি এই মন্তব্য করেছেন। আমেরিকায় চিকিৎসাধীন আসমা কিবরিয়া চার্জশিট প্রদানের খবর পেয়ে দেশে ফেরেন। অসুস্থ আসমা কিবরিয়াকে দেশে নিয়ে আসেন ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া। দেশে ফেরার পর কিবরিয়া হত্যার বহুল আলোচিত চার্জশিট নিয়ে এই প্রথম কোনো মন্তব্য করলেন আসমা কিবরিয়া। তিনি বিবৃতিতে দাবি করেছেন, এবারের চার্জশিটে মোটামুটি প্রকৃত হত্যাকারী ও মদদদাতা, সহায়তাকারীদের নাম চলে এসেছে। এজন্য সিআইডির এএসপি মেহেরুন্নেছা, আইনজীবী আলমগীর ভুইয়া বাবুলের সাহসিকতার প্রশংসা করেন তিনি।
তিনি বলেন, আমার স্বামীর হত্যা মামলাটির তদন্ত বারবার বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। প্রকৃত অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছিল। দ্বিতীয় দফার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি রফিকুল ইসলাম প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করেছিলেন চার্জশিটে। ফলে তার দেয়া চার্জশিট মেনে নিতে পারিনি। মামলার বাদী আবদুল মজিদ খান এমপিকে অনুরোধ করেছিলাম চার্জশিটের বিরুদ্ধে নারাজি দেয়ার। তিনি তা করেননি। ভুল চার্জশিটের মাধ্যমে আসল অপরাধীদের পাশ কাটিয়ে বিচার চেয়েছিলেন তিনি। এ কারণেই অসম্পূর্ণ চার্জশিট সর্ম্পকে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তখন আমি নিজেই বাদী হয়ে নারাজি দেই। মামলাটি নিয়ে কি দুর্নীতি হয়েছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আসমা কিবরিয়ার মতে, সম্পূর্ণ না হলেও মোটমুটি গ্রহণযোগ্য হয়েছে প্রায় ১০ বছর পর দেয়া নতুন চার্জশিট। তিনি বলেন, দশ বছরে একটি মোটামুটি চার্জশিট আমরা পেলাম। এখন একটা প্রশ্ন- বিচার শেষ হতে আর কত বছর লাগবে? শেষ বয়সে আমার স্বামীর হত্যার সুষ্ঠুবিচার হয়েছে এবং প্রকৃত অপরাধীরা সাজা পেয়েছে সেটা দেখে যেতে পারলে শান্তি পেতাম।
সম্প্রতি সিলেট সিটি মেয়র, হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়রসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি। সিআইডি কর্মকর্তা মেহেরুন্নেছা পারুল এই চার্জশিট প্রদান করেন। এই চার্জশিট প্রদানের পর তোলপাড় শুরু হয়। হরতাল পালনের পর এখনও নানা কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে সিলেটে। এটা কিবরিয়া হত্যা মামলার তৃতীয় দফা চার্জশিট। কিবরিয়া হত্যা মামলার প্রথম চার্জশিট দিয়েছিলেন সিআইডির তৎকালীন সিনিয়র এসএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান। ওই চার্জশিটে জিয়া স্মৃতি ও গবেষণা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবদুল কাইউম, জেলা বিএনপির কর্মী ও ব্যাংক কর্মকর্তা আয়াত আলী, কাজল মিয়া, জেলা ছাত্রদলের সহ-দফতর সম্পাদক সেলিম আহমেদ, জিয়া স্মৃতি গবেষণা পরিষদ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাহেদ আলী, কর্মী তাজুল ইসলাম, বিএনপির কর্মী জয়নাল আবেদীন, জালাল, ইউনিয়ন বিএনপির নেতা জমির আলী, ওয়ার্ড বিএনপির নেতা জয়নাল আবেদীন মোমিন ও ছাত্রদলের কর্মী মহিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। তৎকালীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও তাদের অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এই প্রতিবেদন বাদীপক্ষ প্রত্যাখ্যান করে। অধিকতর তদন্তের পর কিবরিয়া হত্যা মামলার দ্বিতীয় দফার চার্জশিট দেন সিআইডির তৎকালীন সিনিয়র এসএসপি রফিকুল ইসলাম। ওই চার্জশিটে সাবেক জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এই চার্জশিটও প্রত্যাখ্যাত হলে তৃতীয় দফা অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত।
সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার এএসপি মেহেরুন্নেছা পারুল এ চার্জশিট দাখিল করেন। নতুন চার্জশিটে ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। নতুন অভিযুক্তরা হলেন- বিএনপির পলাতক নেতা হারিছ চৌধুরী, সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জিকে গউছ, মাওলানা তাজ উদ্দিন আহমেদ, মুফতি সফিকুর রহমান, আবদুল হাই, মোহাম্মদ আলী, বদরুল ইসলাম, মহিবুর রহমান, কাজল আহমেদ ও হাফেজ ইয়াহিয়া। একই সঙ্গে পূর্বের চার্জশিটভুক্ত ইউসুফ বিন শরীফ, আবু বক্কর আবদুল করিম ও মরহুম আহছান উল্লাহকে চার্জশিট থেকে অব্যাহতির আবেদন জানানো হয়েছে।

যুবকের সম্পত্তি রাষ্ট্রের দখলে নেয়ার সুপারিশ

স্থায়ী একটি কমিশন গঠনের মাধ্যমে যুবকের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের হেফাজতে নেয়াসহ ২৬ দফা সুপারিশ করেছে সরকারি কমিটি। একই সঙ্গে মানি লন্ডারিং আইনে বেসরকারি সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। বাতিল করতে বলা হয়েছে যুবক ও তার অন্যসব সংস্থার লাইসেন্স। যুবকের ব্যাপারে গঠিত সরকারের কমিটি তাদের রিপোর্ট চূড়ান্ত করেছে। আজ বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে এ রিপোর্ট জমা দেয়া হবে।
রিপোর্টে যুবকের মতো অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান যাতে জনগণের অর্থ ও সম্পদ হাতিয়ে নিতে না পারে সেজন্য কঠোর আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়। একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করে কোম্পানি আইন, সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধনের প্রস্তাব দেয়া হয় ওই রিপোর্টে। এ ধরনের সংগঠনের কোনো অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা যাতে না যান সে বিষয়েও সুপারিশ করা হয়।
যুবকের তিন লাখ গ্রাহকের আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও সব সম্পত্তির ব্যাপারে সুরাহা করতে ২১ আগস্ট ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পরিচালক বাণিজ্য সংগঠন) মো. আবদুল মান্নানকে প্রধান করে এ কমিটি গঠিত হয়। টানা তিন মাস কাজ করে ওই কমিটি তাদের রিপোর্ট চূড়ান্ত করেছে। চলতি সপ্তাহে এটি জমা দেয়ার সম্ভাবনা আছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কমিটির প্রধান মো. আবদুল মান্নান যুগান্তরকে বলেন, যুবকের ব্যাপারে এর আগে দুটি অস্থায়ী কমিশন রিপোর্ট দিয়েছে। ওই রিপোর্ট পর্যালোচনা করে এ কমিটি তাদের সুপারিশ তৈরি করেছে। সুপারিশ তৈরির সময় গ্রাহকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় মাথায় রেখেই কাজ করেছেন কমিটির সদস্যরা। তিনি বলেন, আজ বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে কমিটির সদস্যরা রিপোর্ট জমা দেবেন।
কমিটির রিপোর্টে বলা হয়, পৃথক আইন দিয়ে একটি স্থায়ী কমিশন বা সংস্থা তৈরি করা যেতে পারে। ওই কমিশন যুবকের সম্পত্তি সরকারের হেফাজতে নেয়া, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালনা ও বিক্রি করে অর্থ প্রকৃত গ্রাহকদের মূল পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে বিদ্যমান কোম্পানি আইনে এ নতুন ধারা সংযোজন বা নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রশাসক নিয়োগের জন্য আইন ও নীতিমালা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
গ্রাহকদের হয়রানি ও অর্থ আত্মসাতের জন্য দায়ী শনাক্তকৃত ৪০ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা এবং গ্রাহকদের দায়ের করা মামলা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন জেলায় আইনি সহায়তা কমিটি গঠন ও বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদানের ব্যাপারে কাজ করবে।
স্থায়ী কমিশন বিভিন্ন স্থানে যুবকের বেদখল বা বেহাত হওয়া সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য সরকার কর্তৃক নিয়োজিত প্রশাসককে কাজ করার ক্ষমতা দেবে। যাতে প্রশাসক উদ্ধারকৃত লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করতে পারে সে বিষয়ে সহায়তা করবে। যুবক সংস্থার অবশিষ্ট সম্পদ যাতে বেহাত হতে না পারে সেজন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষমতা থাকবে প্রশাসকের হাতে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়, মামলাধীন জমি, বিকে টাওয়ার নির্মাণ, আরটিভির শেয়ার বিক্রি ও টাকা লেনদেন, ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শেয়ারের টাকা লেনদেন, অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়ের বকেয়া ভাড়া নিয়ে দ্বিপাক্ষিক বিরোধ চলছে। এক্ষেত্রে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে কমিশন এ বিরোধগুলো নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে পারে। তবে এক্ষেত্রে বিচারাধীন মামলা বাধা হবে না। এ উদ্দেশ্যে অবসরপ্রাপ্ত বিচারক বা খ্যাতনামা ব্যক্তিদের দিয়ে বোর্ড অব অরবিট্রেশন গঠন করতে পারে। এতে পাওনাদার গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের একটি ব্যবস্থা হবে।
যুবক বেআইনিভাবে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় ভবিষ্যতে গ্রাহকদের দায় পরিশোধের মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সুদবিহীন শুধু আসল টাকাই পরিশোধ করবে। যুবকের মতো প্রতারণামূলক প্রতিষ্ঠানের অপকৌশল থেকে নিরীহ মানুষকে সুরক্ষার জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রচার মাধ্যমে নিয়মিত সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করার জন্য কমিশন কাজ করবে।
কমিটির রিপোর্টে যুবকের মতো অপরাধকে কোনো নতুন আইন দিয়ে সংজ্ঞায়িত করে বিচারের জন্য উচ্চ আদালতে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধের দ্রুত বিচারের জন্য মানি লন্ডারিং আইনে বিচার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে আইনের ২১ ধারা সংশোধনের প্রয়োজন হবে। কারণ ওই ধারায় শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগের বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে আইন সংশোধন করে জেলা প্রশাসক, উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বা আদালত, ট্রাইব্যুনাল উপযুক্ত মনে করে সরকারি কর্মকর্তা ও সংস্থাকে দায়িত্ব দিতে পারে।
কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক থেকে নিবন্ধন নিয়ে এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে অনেক কোম্পানি। তাই সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন আইন ১৮৬০, কোম্পানি আইন ১৯৯৪ সংশোধন করা যেতে পারে। এজন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও লেজিসলেটিভ বিভাগের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়।
জানা গেছে, যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক) প্র্রতারণার মাধ্যমে ২৫৮৮ কোটি টাকা গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে। বিপুল পরিমাণ ওই অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয় ৩ লাখ ৩৭শ’ গ্রাহকের কাছ থেকে। বর্তমান যুবকের সারা দেশে ৯১টি জমি, ১৮টি বাড়ি ও ১৮টি কোম্পানি রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি টিভি চ্যানেল আরটিভির ৫৭ শতাংশ শেয়ার কেনা হয় গ্রাহকের টাকায়। কাঁচপুরে ৮৭৮ শতক জমি, রাজধানীর পল্টনে সাড়ে ১৮ শতাংশ জমিতে নির্মিত টাওয়ার, পল্টনের ৫৩/১ ঠিকানায় সাড়ে ২১ শতক জমি ও ৪৩০ তেজগাঁও ঠিকানায় সাড়ে ৪৯ শতক জমি, চট্টগ্রাম পতেঙ্গা বিমানবন্দরের পাশে প্রায় ৪০ বিঘা, সাভার মডেল টাউন এক ও দুই নম্বর, মাদারীপুর চক্ষু হাসপাতালের সামনেও সম্পত্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম মেঘনা সি ফুড মিল এবং পিরোজপুরেও জমির সন্ধান পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে সদস্যদের মধ্যে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে নিবন্ধন নিয়ে প্রায় ২০ ধরনের ব্যবসা শুরু করে। ২০০৬ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পৃথক তদন্তে গ্রাহকদের প্রতারণার ঘটনা বেরিয়ে আসে। ওই সময় যুবকের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে আসে। পরে ২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময়সীমা ২০০৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে যুবক তা করেনি। পরে যুবকের গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থ পরিশোধ ও হয়রানি বন্ধ, সম্পত্তি হস্তান্তর স্থগিতাদেশ ও প্রশাসক নিয়োগ করে স্থায়ী সমাধানের জন্য ২০১০ সালের ২৬ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন আহমেদকে চেয়ারম্যান করে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিশনের রিপোর্টে স্থায়ী কমিশন গঠনের সুপারিশ ছিল। পরে সরকার নতুন করে ২০১১ সালে দুই বছর মেয়াদে কমিশন গঠন করে।

এমপি গ্রেফতারে স্পিকারের অনুমতি লাগে না

মন্ত্রিসভা ও আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দেশে ফেরার পর তাকে গ্রেফতার না করার বিষয়ে পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন স্পিকার ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তাদের এ বক্তব্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। কোনো সংসদ সদস্যকে গ্রেফতার করার জন্য স্পিকারের অনুমতির প্রয়োজন নেই বলে দাবি করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তিনি বলেন, যারা এ ধরনের কথা বলছেন, তারা না জেনে বলছেন। কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী শুধু সংসদ লবি, সংসদ গ্যালারি, স্পিকারের কার্যালয় কিংবা স্পিকার ঘোষিত সুনির্দিস্ট কোনো এলাকা থেকে সংসদ সদস্যকে গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে স্পিকারের অনুমতির প্রয়োজন। এছাড়া অন্য কোনো স্থান থেকে সংসদ সদস্যদের গ্রেফতারে স্পিকারের অনুমতি লাগে না। তবে কোনো সংসদ সদস্যকে গ্রেফতার করা হলে তা স্পিকারকে অবহিত করার বিধান রয়েছে।
সোমবার জাতীয় সংসদ ভবন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এর আগে রোববার রাতে গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে আওয়ামী লীগ ও মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কৃত আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দেশে ফেরেন। এদিকে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে কেন গ্রেফতার করা হল না- এমন প্রশ্নের জবাবে সোমবার সচিবালয়ের নিজ কার্যালয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও স্পিকারের অনুমতি না থাকায় আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেফতার করতে পারছে না আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলছে, আর আবদুল লতিফ সিদ্দিকী সংসদ সদস্য পদে এখনও বহাল রয়েছেন। তাই তাকে গ্রেফতার করার আগে স্পিকারের অনুমতি প্রয়োজন। স্পিকার ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এমন বিপরীতমুখী বক্তব্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, তিনি যা বলেছেন তা ভুল। শুধু তিনি একা নন, পত্রিকায় দেখলাম দেশের একজন খ্যাতনামা আইনজীবীও তার লেখায় একই কথা বলেছেন। তিনিও ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে স্পিকারের অনুমতির কিছুই নেই। তবে ১৯৬৩ এবং ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান আমলের প্রণীত দুটি আইনে বলা আছে- সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার ১৪ দিন আগে ও সংসদ অধিবেশন শেষ হওয়ার ১৪ দিন পর্যন্ত সময়ে কোনো সংসদ সদস্যকে গ্রেফতার করা যাবে না।
স্পিকার বলেন, নবম জাতীয় সংসদে তিনি স্পিকার থাকার সময়েও কয়েকজন সংসদ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বিষয়টি তাকে অবহিত করার পর তিনি তা জাতীয় সংসদে পাঠ করে শুনিয়েছেন। এটাই বিধান। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা প্রসঙ্গে কোনো চিঠি দেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে স্পিকার বলেন, এ বিষয়ে এখনও তাকে কিছুই জানানো হয়নি। আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দেশে ফেরার আগে তাকে (স্পিকারকে) অবহতি করা হয়েছে কিনা এ বিষয়ে ড. শিরীর শারমিন চৌধুরী বলেন, না।
আগেও অনেক সংসদ সদস্য গ্রেফতার হয়েছেন : সংসদ সদস্যদের অনেকেই অতীতে গ্রেফতার হয়েছেন। এক্ষেত্রে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কারও কোনো অনুমতি নেয়নি। বিগত নবম জাতীয় সংসদে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এমকে আনোয়ার, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদীন ফারুক, সংসদ সদস্য শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, নিলোফার চৌধুরী মনি, রেহানা আক্তার রানু এবং সৈয়দা আশিফা আশরাফী পাপিয়াকে আইনশৃংখলা বাহিনী গ্রেফতার করে। এনিয়ে তখন বিতর্ক ওঠে। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়- গ্রেফতারে স্পিকারের অনুমতি প্রয়োজন। তখনও এ দাবির সত্যতা নেই বলে দাবি করেন তৎকালীন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এরও আগে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় মুহিবুর রহমান মানিককে গ্রেফতার করে পুলিশ। সংসদে আসছেন লতিফ সিদ্দিকী, বিকাল থেকে গুঞ্জন : মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ এবং দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদ এখনও বহাল আছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের জন্য স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে চিঠি দেয়া হবে বলে জানানো হলেও গত দুই সপ্তাহে এ বিষয়ে আর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বিষয়টি অনেকটা ধামাচাপাই পড়ে ছিল। কিন্তু আবার বিষয়টি সামনে উঠে আসে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দেশে ফেরায়। খবর রটে, সোমবার বিকালে সংসদ অধিবেশনেও যোগ দিচ্ছেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। সংসদের ভেতরেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর অধিবেশনে যোগদান ইস্যু। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবদুল লতিফ সিদ্দিকী সংসদমুখী হননি।
গ্রেফতার না করায় এরশাদ ও বাবলুর প্রতিবাদ : ইসলামের অবমাননাকারী সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরেই তাকে গ্রেফতার না করায় জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে তাকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, লতিফ সিদ্দিকী শুধুমাত্র মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেননি- তিনি বাংলাদেশের সংবিধানকেও অবজ্ঞা করেছেন। লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও কি করে পুলিশের সামনে দিয়ে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে গেলেন- তা বোধগম্য নয়। তিনি কি আইনেরও ঊর্ধ্বে? বিবৃতিতে তারা বলেন, অবিলম্বে লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেফতার করা না হলে জাতীয় পার্টি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলবে।

বিদ্যুৎ সহযোগিতা চুক্তির সম্ভাবনা

সার্ক বিদ্যুৎ সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও পাকিস্তানের আপত্তির কারণে আরও দুই চুক্তির সঙ্গে এই চুক্তিও অনিশ্চিত বলে রোববার সন্ধ্যায় জানানো হয়েছিল সার্ক স্ট্যান্ডিং কমিটির ৪১তম বৈঠকের প্রথম দিন শেষে। কিন্তু সোমবার দ্বিতীয় দিনের বৈঠক শুরুর পর এই চুক্তি হতে পারে বলে আশার বাণী শোনান পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের এই বৈঠকে অংশ নেয়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। এদিকে আগামীকাল নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে শুরু হচ্ছে ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। দু’দিনব্যাপী এ সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- ‘শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।’ তার আগে আজ সার্কভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা কাউন্সিল অব মিনিস্টার্স বৈঠকে বসবেন।
সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ কাঠমান্ডু যাচ্ছেন। বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে বিকাল ৩টায় তিনি ঢাকা ত্যাগ করবেন।
গতকাল পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া ও সার্ক) নাফিস জাকারিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিদ্যুৎ সহযোগিতা চুক্তি বিষয়ে আমাদের সামান্য আপত্তি ছিল। আমরা সহজ কিছু শর্ত তুলে ধরেছিলাম। সেগুলোর সমাধান হচ্ছে। এ চুক্তি হতে পারে।’ এ চুক্তির আওতায় সার্কভুক্ত দেশগুলো বিদ্যুৎ বিষয়ে যে কোনো সহযোগিতা ও আলোচনার সুযোগ পাবে। তবে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য সার্ক আঞ্চলিক রেল সহযোগিতা চুক্তি এবং সার্ক পণ্য ও যাত্রীবাহী মোটরযান চলাচল বিষয়ক চুক্তি এখনও অনিশ্চিতই রয়েছে বলে জানান জাকারিয়া। তিনি বলেন, ওই দুই চুক্তির বিষয়ে একাধিক দেশের আপত্তি ছাড়াও এ সংক্রান্ত প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে।
রোববার কাঠমান্ডুর হোটেল সল্টিতে সার্ক স্ট্যান্ডিং কমিটির দু’দিনব্যাপী বৈঠক শুরু হয়। গতকাল বৈঠকের দ্বিতীয় দিনে কাঠমান্ডু ঘোষণার খসড়া বিষয়ে সমঝোতাই ছিল অন্যতম আলোচ্য বিষয়। এ বৈঠকে চূড়ান্ত হওয়া কাঠমান্ডু ঘোষণার খসড়া আগামী ২৭ নভেম্বর শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিন প্রকাশ করা হবে। তার আগে এ খসড়া পর্যায়ক্রমে মন্ত্রী পর্যায়ের ও সরকারপ্রধান পর্যায়ের বৈঠকে উঠবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক জানান, এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ সামনে রেখে কাঠমান্ডু ঘোষণার সমঝোতা চলছে। ২৬ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া সরকারপ্রধানদের দু’দিনব্যাপী সম্মেলনে যোগ দিতে আজ কাঠমান্ডু পৌঁছবেন সার্কভুক্ত দেশের সরকারপ্রধানরা। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মহড়া গতকাল দেখা গেল কাঠমান্ডুর রাস্তায়। ডামি গাড়ির সামনে পেছনে সাঁজোয়া যানের বহর দেখা গেল সাইরেন বাজিয়ে ছুটছে।
প্রথম দিন স্ট্যান্ডিং কমিটির বিদায়ী চেয়ারম্যান মালদ্বীপের আলী নাসির মোহাম্মদ বৈঠকের শুরুতেই নেপালের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব শংকর দাস বৈরাগীর কাছে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। সার্কের রীতি অনুযায়ী বৈঠক যে দেশে অনুষ্ঠিত হয় সে দেশের প্রতিনিধি দলের প্রধানই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তী সার্ক সম্মেলন পর্যন্ত তিনিই এ পদে বহাল থাকবেন।
আগামীকাল সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে প্রত্যেক সদস্য দেশের সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানরা বক্তব্য রাখবেন। সেখানে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেবেন।
সার্ক নেতারা একটি অবকাশ যাপনে বিভিন্ন ইস্যুতে খোলামেলা আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে সার্কে সদস্য দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানো, দক্ষিণ এশীয় ইউনিয়ন গড়ে তোলা, অভিন্ন মুদ্রা প্রচলন প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারপর আট জাতির শীর্ষ নেতারা পৃথকভাবে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অপরাপর দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
হাসিনা-মোদি বৈঠকে প্রধান এজেন্ডা জঙ্গি ইস্যু : ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাঈদ আকবর উদ্দিন জানান, নেপালে সার্ক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে আলোচনায় পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিস্ফোরণ, দুই দেশে জঙ্গি ইস্যু এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয় গুরুত্ব পাবে। নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাঈদ আকবর উদ্দিনের বক্তব্যের বরাত দিয়ে ভারতীয় পত্রিকা এ খবর জানিয়েছে।
আকবর উদ্দিন বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে নরেন্দ্র মোদি অনুপ চেটিয়ার প্রত্যর্পণ বিষয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করবেন। এদিকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কটূক্তির কারণে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠক হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

লতিফের সব ফাইল যাচ্ছে দুদকে

অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে জোরেশোরে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে এ মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত ক্ষমতার অপব্যবহার সংশ্লিষ্ট সব নথি দুদকে পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়সহ এর দফতর সংস্থায় রক্ষিত সন্দেহভাজন সব ধরনের নথির অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। যারা ইতিপূর্বে বেআইনিভাবে সরকারের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিক্রি করে হস্তান্তর কিংবা লিজ দিয়েছেন তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, দুর্নীতি রোধে ও শক্তভাবে সরকারের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে শিগগির মন্ত্রণালয়ে আইন সেল ও আইটি শাখা খোলা হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, যা শুনেছেন সঠিক। অনিয়ম-দুর্নীতির প্রশ্নে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। জিরো টলারেন্স জারি থাকবে। যেসব বিষয়ে নথিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে তা নিয়ে আপনাদের ভূমিকা কী হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী যা যা করার তাই করা হবে। লতিফ সিদ্দিকীর এ সংক্রান্ত কোনো ফাইল দুদকে পাঠানো হচ্ছে কিনা- জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অফিসিয়ালি প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। তবে কাজ চলছে।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, তিনি সম্প্রতি এ মন্ত্রণালয়ে যোগ দিয়েছেন। সব ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও কাজে ফাঁকি দেয়ার মানসিকতা শক্তভাবে দূর করতে ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তবে তিনি কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাসী। তাই এ নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে চান না।
সূত্র জানায়, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সদ্যবিদায়ী মেয়াদে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। এ সময় তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বিজেএমসি, বিটিএমসি, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড ও বিজেসির (বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশন) অধীনে থাকা ৪৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ/হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পিপিআর (সরকারি ক্রয় নীতিমালা) মানা হয়নি। টেন্ডার ছাড়া জমিসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠান হস্তান্তর, যথাযথ মূল্য নির্ধারণ না করা, মন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে বিনা মূল্যে স্থায়ী বন্দোবস্ত দেয়া, বিক্রির পূর্বে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন না নেয়া, সরকারের অনুমোদন ছাড়া মন্ত্রীর নিজের অনুমোদিত নীতিমালায় হস্তান্তর করা, শর্তসাপেক্ষে হস্তান্তরিত প্রতিষ্ঠানসমূহ শর্তানুযায়ী পরিচালিত না হওয়া এবং ক্ষেত্র বিশেষে আইনগত জটিলতা নিরসন না করেই হস্তান্তর করা হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রামের ঈগল স্টার টেক্সটাইল মিলের ঋণের সুদ মওকুফ করার ক্ষেত্রেও ক্ষমতা অপব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন মহাপরিচালকের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির রিপোর্টে সুনির্দিষ্টভাবে এসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। রিপোর্টটি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে জমা হয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য রিপোর্টের অনুলিপি বস্ত্র ও পাট সচিবের কাছে ১০ সেপ্টেম্বর পাঠানো হয়। সূত্র বলছে, গত আড়াই মাস ধরে রিপোর্টটি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এখন ব্যবস্থা নেয়ার পালা। সে ক্ষেত্রে সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীসহ সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা এসব অভিযোগে ফেঁসে যাচ্ছেন। তবে অভিযোগের তীর সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত সাবেক এ মন্ত্রীর দিকে। যিনি উসকানিমূলক বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে ইতিমধ্যে মন্ত্রিত্বসহ সব কূল হারিয়েছেন। ভারত থেকে রোববার তিনি ঢাকায় ফিরলেও এখন তার জন্য গ্রেফতারপর্ব অপেক্ষা করছে। মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, উল্লিখিত অনিয়ম ও ক্ষমতা অপব্যবহারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি দুর্নীতি দমন আইনে মামলা করা হবে। লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষে দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা দায়ের করবে। এ জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।
জানা গেছে, ইতিমধ্যে এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে কয়েকজন কর্মকর্তা লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত চেয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করেছেন। তবে অফিসিয়ালি চিঠি দিয়ে কোনো তথ্য চাওয়া হয়নি। দুদকের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি সিদ্ধান্ত হয়েছে, অনিয়ম দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট ফাইলগুলো ফটোকপি করে পার্ট ফাইল খোলা হবে। এরপর মূল ফাইল দুদুকে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
এদিকে সূত্র জানায়, কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিক্রিসংক্রান্ত মামলায় সময়মতো আপিল করা হয়নি। বছরের পর বছর আপিল না করে ফাইল ফেলে রাখা হয়েছে। সংঘবদ্ধ চক্র সময়মতো আপিল না করে সরকারের বিপক্ষ গ্রুপকে মামলায় জিতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এতে করে শেষ পর্যায়ে এসে সরকারের হেরে যাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় এসব মামলা শক্তভাবে ফেস করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিশেষ আইনজীবী নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই সঙ্গে শিগগির মন্ত্রণালয়ে একটি আইন সেল খেলা হবে। যেখানে একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে একটি টিম কাজ করবে। যাদের কাজ হবে, সরকারের স্বার্থ ও সম্পদ রক্ষায় যথাযথভাবে প্রতিটি মামলা পরিচালনা করা। অপরদিকে মন্ত্রণালয়ে একটি আইটি শাখা খোলা হবে। যেখানে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সব দফতর সংস্থার হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। কেননা হালনাগাদ তথ্য হাতের কাছে না থাকলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সঠিক পন্থায় নেয়া সম্ভব হয় না।
জানা গেছে, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ দফতর সংস্থাগুলোতে দীর্ঘদিন থেকে একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। যারা পাট কেনা, পাটপণ্য উৎপাদন ও বিক্রি, মিলের যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় শুরু করে ঘাটে ঘাটে দুর্নীতির ফাঁদ তৈরি করে রেখেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পের কেনাকাটা ও নিয়োগে দুর্নীতি চলে সারা বছর। এখানে সরকারি সম্পত্তি লুটেপুটে খাওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে মাঠপর্যায়ে বিস্তীর্ণ একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে। যারা মিলেমিশে দুর্নীতি করে। এদের মধ্যে কোনো কোনো উচ্চপদস্থ সাবেক কর্মকর্তা এখন নিজেরাই গার্মেন্টসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক বনে গেছেন। এসব দুর্নীতিবাজসহ পুরো চক্রকে চিহ্নিত করতে বিভিন্ন স্থানে সোর্স নিয়োগ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক মহলের হাতে অনেকের বিষয়ে বিস্তর তথ্য-প্রমাণ চলে এসেছে। যাদের নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়সহ এর কয়েকটি দফতরে কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা ইচ্ছামতো অফিস করতেন। ইচ্ছা হলে অফিসে আসতেন, না হলে আসতেন না। বেশিরভাগ সময় দুপুর ১২টায় অফিসে আসতেন। এই শ্রেণীর ফাঁকিবাজ কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যে চিহ্নিত করে সতর্ক করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ফাঁকিবাজ ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অচিরেই শক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ছাড়া প্রতি সপ্তাহে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতর ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে একটি চৌকস, সৎ ও সাহসী কর্মকর্তার টিম আকস্মিক পরিদর্শনে যাবে। কাক্সিক্ষত সাফল্য আসা না পর্যন্ত এ ধরনের সারপ্রাইজ ভিজিট অব্যাহত থাকবে।

রাজাকার কমান্ডার মোবারকের ফাঁসি

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজাকার কমান্ডার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা মোবারক হোসেনের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। সোমবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন-বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। মোবারকের বিরুদ্ধে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আনা ৫টি অভিযোগের মধ্যে দুটি (প্রথম ও তৃতীয়) প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে এক নম্বর অভিযোগটি ছিল গণহত্যার। এ অপরাধে ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আবদুল খালেক নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার তৃতীয় অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে। বাকি তিনটি (দ্বিতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম) অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। প্রথম অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২২ আগস্ট মোবারক হোসেনসহ অন্য রাজাকাররা আখাউড়ার টানমান্দাইল গ্রামে হাজী নূর বকশের বাড়িতে সভা ডাকেন। বেলা দুইটা-আড়াইটার দিকে ১৩০-১৩২ জন গ্রামবাসীকে ওই বাড়িতে জড়ো করা হয়। তখন মোবারক ও তার সহযোগীরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে অভিযান চালিয়ে ওই গ্রামবাসীদের আটক করে গঙ্গাসাগর দীঘির কাছে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে আটকে রাখেন। মোবারক ও তার সহযোগীরা আটক গ্রামবাসীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন করেন। তিনি টানমান্দাইল গ্রামের ২৬ জন ও জাঙ্গাইল গ্রামের সাতজনসহ ৩৩ জনকে বাছাই করে তেরোঝুড়ি হাজতখানায় নিয়ে যান। ২৩ আগস্ট পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা ওই ৩৩ জনকে দিয়ে গঙ্গাসাগর দীঘির পশ্চিম পাড়ে একটি গর্ত খোঁড়ায়। পরে তাদের গুলি করে হত্যার পর ওই গর্তেই মাটিচাপা দেয়া হয়। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
তৃতীয় অভিযোগটি ছিল আবদুল খালেক হত্যার। এ অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ১১ নভেম্বর রাত ৮টা-৯টার দিকে মোবারক তার সশস্ত্র রাজাকার সহযোগীদের নিয়ে ছাতিয়ান গ্রামের আবদুল খালেককে অপহরণ করে সুহিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যান ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। ওই রাতেই খালেককে তিতাস নদীর পশ্চিম পাড়ে বাকাইল ঘাটে নিয়ে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এ অভিযোগটিও প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। বাকি অভিযোগগুলো প্রমাণ না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল মোবারককে খালাস দিয়েছেন।
মোবারকের বিরুদ্ধে আনা দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ও অন্য স্বাধীনতাবিরোধীরা মিলে ‘আনন্দময়ী কালীবাড়ী’ নামের একটি হিন্দু মন্দিরের মূর্তি ভাঙচুর ও মালামাল লুটের পর সেটি দখল করেন। পরে মন্দিরটির নাম রাখেন ‘রাজাকার মঞ্জিল’। ২৪ অক্টোবর মোবারক শিমরাইল গ্রামের আশুরঞ্জনকে অপহরণ করে আহতাবস্থায় চার দিন রাজাকার মঞ্জিলে আটকে রাখেন এবং ২৮ অক্টোবর তাকে কুড়লিয়া খালের পাড়ে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেন। চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৪-২৫ নভেম্বর বেলা দুইটা-আড়াইটার দিকে মোবারকের নেতৃত্বে রাজাকারের একটি দল খরমপুর গ্রামের খাদেম হোসেন খানকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার স্টেশন রোড থেকে অপহরণ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে স্থাপিত সেনাক্যাম্পে আটকে রেখে নির্যাতন করে। ৬ ডিসেম্বর অন্য কয়েকজন বন্দির সঙ্গে তাকেও কুড়লিয়া খালের পাড়ে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৮-২৯ নভেম্বর রাত ১১টার দিকে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে মোবারক খড়মপুর গ্রামের আবদুল মালেক ও আমিরপাড়া গ্রামের মো. সিরাজকে অপহরণ করেন। ৬ ডিসেম্বর সিরাজকে কুড়লিয়া খালের পাড়ে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ তিনটি অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনীত এক ও তিন নম্বর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এক নম্বর অভিযোগে আনীত গণহত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মোবারকের সংশ্লিষ্টতা ছিল। এ গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে অপহরণ, নির্যাতন ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। অপরাধের মাত্রা ও তীব্রতা বিবেচনায় এক নম্বর অভিযোগে তার সর্বোচ্চ শাস্তি প্রাপ্য। রায়ে বলা হয়েছে, যখন তার ‘মৃত্যুদণ্ডের আদেশ’ কার্যকর হয়ে যাবে তখন যাবজ্জীবন দণ্ডের আদেশটি ওই মৃত্যুদণ্ডের আদেশের সঙ্গে একীভূত হয়ে যাবে।
ন্যায়বিচার পাননি দাবি করে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছেন মোবারকের আইনজীবী তাজুল ইসলাম। রায় ঘোষণার পর তিনি বলেন, ‘যে তথ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে, আমরা মনে করি সেটি বিশ্লেষণে ট্রাইব্যুনাল ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো কোনো অপরাধ করেননি। এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা হবে।’
তবে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী সাহিদুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। দুুটি অভিযোগে মোবারক দোষী প্রমাণিত হয়েছেন। আমরা সন্তুষ্ট। তিনি যে রাজাকার ছিলেন- এটি আমরা সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে বোঝাতে পেরেছি।’ প্রসিকিউশনের ব্যর্থতায় তিনটি অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছে কিনা জানতে চাইলে সাহিদুর রহমান বলেন, ‘তিনটি অভিযোগে কেন তাকে খালাস দেয়া হল তা পূর্ণাঙ্গ রায় বিশ্লেষণ করে বোঝা যাবে।’
২০০৯ সালের ৩ মে মোবারকের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থানায় মামলা করেন একাত্তরের শহীদ আবদুল খালেকের মেয়ে খোদেজা বেগম? মোবারক হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান? পরে স্থানীয় আদালত এ মামলা ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করেন। মোবারকের বিরুদ্ধে যখন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত চলছিল, তখন এ ট্রাইব্যুনাল তাকে জামিন দিয়েছিলেন। গত বছরের ২৫ ফেব্র“য়ারি রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে? একই বছরের ১২ মার্চ ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়ে মোবারকের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠান?
যুদ্ধাপরাধের পাঁচ ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল মোবারকের বিচার শুরু হয়। একই বছর ২০ মে তার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রসিকিউশনের মোট ১২ জন সাক্ষী এ মামলায় সাক্ষ্য দেন। গত বছরের ২৫ নভেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং আসামিপক্ষের জেরা শেষ হয়।
এ মামলায় আসামিপক্ষে সাফাই সাক্ষী দিয়েছেন মোবারক হোসেন নিজে ও তার বড় ছেলে মোহাম্মদ আসাদ উদ্দিন। সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ট্রাইব্যুনাল-১ ২ জুন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। দীর্ঘ পাঁচ মাস পর সোমবার এ মামলার রায় ঘোষণা করা হল। এটি একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে ট্রাইব্যুনালের দেয়া ১৩তম মামলার রায়। গতকাল বেলা ১১টার দিকে মোবারককে নেয়া হয় ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায়। বিচারপতিরা এর কিছুক্ষণ পরেই রায় ঘোষণা করেন। ৯২ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পড়ে শোনানো হয়।
যুদ্ধের পর ভোল পাল্টান মোবারক : একাত্তরে স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার হলেও পরে তিনি ভিড়ে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগে। জানা যায়, মো. মোবারক হোসেন ওরফে মোবারক আলীর জন্ম ১৯৫০ সালের ১০ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার নয়াদিল গ্রামে। তার বাবার নাম শাহাদত আলী, মা নজিবুর নেসা। ট্রাইব্যুনালের নথিপত্র অনুযায়ী, মোবারক অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও এলাকার মানুষ তাকে একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর দালাল হিসেবেই চেনেন। স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর নেতৃত্বের বিশদ বর্ণনা উঠে এসেছে ট্রাইব্যুনালের রায়েও।
প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দিনগুলোতে মোবারক জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। তার নেতৃত্বেই রাজাকার বাহিনী সে সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অপহরণ, লুটপাট, আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটায়। স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল জামায়াত আবার রাজনীতি করার সুযোগ পেলে মোবারক ইউনিয়ন জামায়াতের রুকনের দায়িত্ব পান। পরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়ান এবং একপর্যায়ে আখাউড়ার মোগড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হন। তিন বছর আগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
আখাউড়ায় আনন্দ মিছিল, মিষ্টি বিতরণ : আখাউড়া প্রতিনিধি জানান, রায় শুনেই আনন্দে ফেটে পড়েন আখাউড়া পৌরশহরের খরমপুর সড়কে অবস্থিত উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তারা জনসাধারণের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেন। আখাউড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মো. আবু সাঈদ মিয়া, মুক্তিযোদ্ধা শাহাদৎ হোসেন পাখি, মিজানুর রহমান, ইসমাইল হোসেন, ইদ্রিস মিয়া, আবদুল হাফিজ ভূঁইয়া, মীর মোশারফ হোসেন, আ. রাজ্জাক প্রমুখ দ্রুত রায় কার্যকরের আহ্বান জানান। সরেজমিন গতকাল দুপুরে নয়াদিল গ্রামে মোবারক হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িজুড়ে স্তব্ধ পরিবেশ। বাড়ির সব দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতরে পরিবারের সবাই অবস্থান করছেন। সংবাদকর্মী বা এলাকাবাসী কারও সঙ্গে পরিবারের কোনো সদস্য কথা বলেননি। কেবল একটি ঘরের ভেতর থেকে একটু পর পর কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, রাজাকার মোবারকের ফাঁসির রায়ের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেছে যুবলীগ। দুপুরে সদর উপজেলা যুবলীগের আয়োজনে শহরের লোকনাথ ট্যাংকের পাড় থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহর প্রদক্ষিণ শেষে স্থানীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক সমাবেশ করে।