Showing posts with label তেল-গ্যাস. Show all posts
Showing posts with label তেল-গ্যাস. Show all posts

Sunday, January 18, 2026

এলপিজি–সংকট: সরকারি পর্যায়েও আমদানির পথ খোলা জরুরি

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সাম্প্রতিক সংকট, ভোক্তাদের দুর্ভোগ ও বাড়তি ব্যয় আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল কৌশলগত পণ্যে একক উৎসে নির্ভরতা মোটেই টেকসই নীতি নয়। ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারঘোষিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা হলেও বাস্তবে বিক্রি হয়েছে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায়। বেশি টাকা দিয়েও অনেকে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে পারেননি। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ডিসেম্বরে চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৪০ শতাংশ কম আমদানি হওয়ায় এই সংকটের মূল উৎস। এ বাস্তবতায় এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ নিয়ে সরকারের নীতিমালায় পরিবর্তন আনা জরুরি বলেই আমরা মনে করি।

দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন। এর মধ্যে বিপিসি উৎপাদন করে মাত্র ১৯ হাজার টন। ফলে এ খাত পুরোটাই বেসরকারি খাতের আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ২৩টি কোম্পানির আমদানির সক্ষমতা থাকলেও ৫ থেকে ৬টি কোম্পানি মূলত আমদানি করে। ফলে বাজারে সব সময়ই চাহিদা ও জোগানের যেমন একটা ঘাটতি থেকে যায়, আবার বিভিন্ন পর্যায়ে সিন্ডিকেট তৈরির মাধ্যমে কারসাজি করে মূল্যবৃদ্ধির ঘটনাও ঘটে। প্রতি মাসে বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে ভোক্তাদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়েই পণ্যটি কিনতে হয়।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জিটুজি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির অনুমতি চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বিপিসি বলেছে, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজার স্থিতিশীল করার হাতিয়ার সরকারের নেই। আমরাও মনে করি, এলপিজিকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক খাতে পরিণত করার খেসারত দিতে হচ্ছে নাগরিকদের। এলপিজির বাজারে ভারসাম্য আনতে গেলে সরকারি পর্যায়েও আমদানির অনুমোদন দেওয়া প্রয়োজন।

দেশে এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় রান্নার কাজে, বাকি ২০ শতাংশ শিল্পকারখানায়। একসময় শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার করলেও বর্তমানে গ্রামীণ পরিবারগুলোও এলপিজির ওপর অনেক মাত্রায় নির্ভরশীল। এ ছাড়া রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে ফুটপাতের খাবারের দোকানগুলোয়ও এলপিজি ব্যবহৃত হয়। ফলে এলপিজির মাত্রাতিরিক্ত দাম পরিবারগুলোর ওপর যেমন বাড়তি চাপ তৈরি করছে, একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়াচ্ছে। এমনিতেই টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে নানা কায়দা করে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছে, এর ওপর এলপিজির দাম তাদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উঠেছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সরকারি পর্যায়ে এলপিজি আমদানির ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। বর্তমান সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে এলপিজি নিয়ে বড় সংকটে পড়তে না হয় এবং ভোক্তারা যাতে সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি না হন, তার জন্য এলপিজি আমদানির নীতিমালা পরিবর্তন জরুরি।

আমরা মনে করি, সরকারি পর্যায়ে শুধু এলপিজি আমদানি করাটাই যথেষ্ট নয়, সরবরাহের জন্য অবকাঠামো তৈরি করাটাও জরুরি। কেননা, আমদানি করে সরবরাহের দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে তাতে সিন্ডিকেটের কারসাজি কতটা বন্ধ হবে, তা নিয়ে বড় সংশয় থেকে যায়। এলপিজি আমদানি করে বিপিসি যাতে সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারে, সেই অবকাঠোমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়াটাও জরুরি।

এলপিজি
এলপিজি। প্রতীকী ছবি

Saturday, January 17, 2026

জ্বালানি খাত: সংকট কাটাতে এলপিজি আমদানি করতে চায় বিপিসি by সুজয় চৌধুরী

সংকট কাটাতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি করতে চায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এ জন্য অনুমতি চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। চিঠিতে বলা হয়েছে, এলপিজির পুরো বাজার বেসরকারি খাতনির্ভর হওয়ায় সংকটে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত।

এলপিজি আমদানির অনুমতি চেয়ে ১০ জানুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি দেন বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান। চিঠিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের এলপিজি বাজারে সরবরাহ–ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। তাতে কোথাও কোথাও নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডারই পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজার স্থিতিশীল করার সরকারি কোনো হাতিয়ার নেই। এ বাস্তবতায় নীতিগত অনুমোদন পেলে বিপিসি জিটুজি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানি করে বেসরকারি অপারেটরদের মাধ্যমে দ্রুত বাজারে সরবরাহ করবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এলপিজির বাজারটা কার্যত বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে। সরকারিভাবে কিছু আমদানি করা গেলে বাজারে ভারসাম্য আসবে। তাই আমরা আমদানির অনুমতি চেয়েছি।’ মো. আমিন উল আহসান জানান, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নানা জটিলতায় এলপিজি আমদানি করতে পারছে না। বিপিসি আমদানি করে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরবরাহ করতে চায়। এতে সংকট দূর হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছে, বেসরকারি খাতকে সরবরাহ করলে একই পরিস্থিতি থাকবে। বেসরকারি খাতে এলপিজির দাম প্রতি মাসে নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। তবে সেই দামে এলপিজি বিক্রি হয় না বাজারে। তাই আমদানি করে বিপিসি সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি না করলে বাজারে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। আগেও এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার, তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘দেশে সরকারিভাবে এখনো এলপিজি আমদানি হয় না। তবে আমরা সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই করছি। আমদানি করা গেলে বাজারে ভারসাম্য আসবে। সংকট দূর হবে। ভবিষ্যতে গ্রাহকেরা জিম্মি হবেন না। তবে এখন সরকার কেবল আমদানি করবে। সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ ও বিতরণে আপাতত জড়িত হবে না।’

বিপিসির চিঠিতে বলা হয়, দেশের এলপিজি আমদানির জন্য বিপিসির নিজস্ব পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এ মুহূর্তে নেই। তবে বেসরকারি অপারেটররা কুতুবদিয়া গভীর সমুদ্র এলাকায় এলপিজিবাহী বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস করে নিজেদের টার্মিনালে নিয়ে গিয়ে সংরক্ষণ ও বিতরণ করে থাকে। বিপিসিও একই পদ্ধতিতে বেসরকারি অপারেটরদের সুবিধা ব্যবহার করে আমদানি করা এলপিজি খালাস ও বণ্টন করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সঙ্গে আলোচনা করে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের তালিকা, আমদানির পরিমাণ, মূল্য পরিশোধ পদ্ধতি, খালাস ও বণ্টনপ্রক্রিয়া—এসব নির্ধারণের প্রস্তাবও রয়েছে চিঠিতে।

বিপিসির আমদানির সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নানা কারণে এলপিজিখাতে সংকট চলছে। এখন বিপিসি আমদানি করে পরিস্থিতি ভালো করতে পারলে ভোক্তারা উপকৃত হবেন।

সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি

দেশে সরকারি ও বেসরকারি—দুভাবে এলপিজি বাজারে আসে। সরকারি পর্যায়ে সীমিত এলপিজি সরবরাহ করে বিপিসির তিনটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান—পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারিভাবে এলপিজি বিক্রি হয়েছে ১৯ হাজার টন।

সরকারি এই বিক্রির বিপরীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই চাহিদার বড় অংশ জোগান দেয়। লোয়াব ও বিপিসি সূত্র বলছে, দেশে ২৩টি কোম্পানির আমদানি সক্ষমতা আছে। তবে বড় পরিসরে আমদানি করে মূলত পাঁচ–ছয়টি কোম্পানি। গত বছর আমদানি হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টন। বেসরকারি পর্যায়ে ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের ঘোষিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা। তবে বাজারে এ দামে সিলিন্ডার বিক্রি হয় না। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় সংকট ও সরবরাহের চাপে বাজারে সিলিন্ডারের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত এলপি গ্যাস ও বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন। ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশ খরচ হয় রান্নায়, বাকি ২০ শতাংশ শিল্পকারখানা ও যানবাহনে। প্রতিবছর এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এলপি গ্যাস লিমিটেডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালে দেশে এলপিজির চাহিদা বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন ছাড়াতে পারে। সরকারি উৎস থেকে জোগান দাঁড়াতে পারে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টন, যা চাহিদার তুলনায় অতি সামান্য।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, বিগত সরকারগুলো এলপিজি খাতকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক করে ফেলেছে। তাই ভোক্তাবান্ধব সিদ্ধান্ত দরকার। প্রয়োজনে সরকারিভাবে আমদানি করে সরবরাহ বাড়াতে হবে।

এলপিজি
এলপিজি। প্রতীকী ছবি

Tuesday, October 14, 2025

ফুরিয়ে যাচ্ছে গ্যাসের মজুত by মহিউদ্দিন

দেশে গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন কমছে ধারাবাহিকভাবে। নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান না পেলে এবং নতুন খনি থেকে উত্তোলন শুরু না হলে আগামী আট বছরেই দেশীয় মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দিনে ১৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়। ২০১৭ সালে তা ছিল ২৭০ কোটি ঘনফুটের আশপাশে। অর্থাৎ দেশীয় গ্যাসের উত্তোলন ৩৩ শতাংশ কমেছে।

দেশের খনি থেকে উৎপাদন কমে গেলে গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা বাড়ে। সে জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। ফলে চাপ বাড়ে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভে।

২০১৮ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস আমদানি শুরু করে। এখন যে ডলারের দাম বেড়ে ১২৩ টাকা হয়েছে, সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে, তার পেছনে বড় একটি কারণ গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা। আমদানি করতে গিয়েই রিজার্ভ কমেছে। ডলারের দাম বেড়েছে। সঙ্গে দফায় দফায় গ্যাসের দাম বাড়াতে হয়েছে।

এর মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ভোজ্যতেল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, রান্নার প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং তার ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এতটা বাড়ত না, যদি দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রয়োজনীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত।

দেশীয় গ্যাসের প্রতি ইউনিট (ঘনমিটার) দাম পড়ে তিন টাকার আশপাশে। আর বিদেশ থেকে আমদানিতে খরচ ৫৫ টাকার মতো। তা–ও এখন গ্যাসের দাম কম বলে খরচ কম পড়ছে।

অর্থনীতিবিদ ও শিল্পমালিকেরা বলছেন, বিভিন্ন দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কারোপের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত ও বিনিয়োগে একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাবনা ধরার ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং তা সাশ্রয়ী দামে। সে জন্য দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো জরুরি।

সরকারও সেটা বোঝে। এ জন্য দেশে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, দেশীয় গ্যাসের মজুত বিবেচনায় তিনটি কৌশল নেওয়া হয়েছে—কূপ খনন করে উৎপাদন বাড়ানো, দেশে গ্যাসের নতুন মজুত আবিষ্কারে স্থলে ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে স্থলভাগে একটি টার্মিনাল নির্মাণ করা। পাশাপাশি গ্যাস চুরি ও অপচয় রোধ করে গ্যাসের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

মজুত কতটা আছে

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দেশে গ্যাসের মজুত নিয়ে সর্বশেষ সমীক্ষা চালানো হয় ২০১০ সালে। ওই সময় বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে মজুতের হিসাব করা হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ২৮ দশমিক ৭৯ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন বা লাখ কোটি ঘনফুট)। ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ২০ দশমিক ৩৩ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়ে যায়। এতে মজুত বাকি থাকে সাড়ে ৮ টিসিএফের মতো।

২০২৩ সালে পেট্রোবাংলা গ্যাস উত্তোলনকারী কোম্পানিগুলোকে দিয়ে মজুত কত আছে, তা নতুন করে পর্যালোচনা করায়। এতে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মজুত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ টিসিএফ। অবশ্য সে পর্যন্ত উৎপাদন করা হয়েছে প্রায় ২২ টিসিএফ গ্যাস। ফলে মজুত রয়েছে ৮ টিসিএফের মতো।

দেশে এখন বছরে গড়ে গ্যাস উৎপাদন করা হয় পৌনে এক টিসিএফ গ্যাস। এ হিসাবে মজুত গ্যাস দিয়ে আরও বর্তমান হারে প্রায় ১১ বছর উৎপাদন চলার কথা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খনিতে শেষ দিকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গ্যাস রেখে উত্তোলন বন্ধ করে দিতে হয়। কারণ, সেই গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য থাকে না, কিন্তু মজুতের হিসাবে ধরা হয়। বিশেষজ্ঞরা এসব বিবেচনায় নিয়ে মজুত গ্যাস দিয়ে আর আট বছরের মতো চলতে পারে বলে প্রাক্কলন করছেন, তা–ও বর্তমান হারে উত্তোলন ধরে।

কোন খনিতে কত মজুত

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদনে আছে ২০টি। বাকিগুলোর মধ্যে চারটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করা হলেও উত্তোলন করা হচ্ছে না। সেগুলো হলো ভোলার ইলিশা ও ভোলা নর্থ, সিলেটের জকিগঞ্জ এবং কুতুবদিয়া। এসব খনি থেকে গ্যাস উত্তোলনের জন্য পাইপলাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি হয়নি।

বাকি পাঁচটি খনিতে ৬৬১ বিসিএফ গ্যাস থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সময় উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ, ওই গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য নয়। খনিগুলো হলো নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, সিলেটের ছাতক, গাজীপুরের কামতা, ফেনী ও সাংগু (চট্টগ্রাম)।

২০২৪ সালের ১ জুলাইয়ের হিসাবে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাসে অবশিষ্ট মজুত আছে প্রায় ২ টিসিএফ। হবিগঞ্জের বিবিয়ানায় আছে ১ দশমিক ৬৬ টিসিএফ। সিলেটের মৌলভীবাজারে আছে প্রায় ২০ বিসিএফ (বিলিয়ন বা শতকোটি ঘনফুট) গ্যাস। ৭০০ বিসিএফের কম মজুত আছে জালালাবাদে। সিলেটের বাখরাবাদ, কৈলাসটিলা, রশিদপুরসহ বাকি গ্যাসগুলোতেও মোটামুটি পরিমাণে গ্যাসের মজুত আছে।

আমদানিতে ঝোঁক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস অনুসন্ধান বাদ দিয়ে আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। তখন কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়, যেখানে জাহাজে করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এনে তা আবার রূপান্তর করে পাইপলাইনে দেওয়া হয়।

২০১৮ সালে শুরু হয় গ্যাস আমদানি। তখন বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম কম ছিল, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত যথেষ্ট ছিল। কিন্তু অনেকে তখনই সতর্ক করে বলেছিলেন, বিদেশে দাম বেড়ে গেলে অর্থনীতি সংকটে পড়তে পারে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে যায়। বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রতি এমএমবিটিইউ (ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) গ্যাস কিনেছিল ৪ ডলার ধরে। ২০২২ সালে তা দাঁড়ায় ৬০ ডলার। গ্যাসের সঙ্গে অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে আমদানি খরচ বেড়ে যায়। কমে যায় ডলারের মজুত, বাড়তে থাকে দাম। ডলার–সংকটে ২০২২ সালে টানা ৭ মাস খোলাবাজার থেকে গ্যাস আমদানি বন্ধ রাখতে হয়েছিল। বিগত সরকার বিপুল দেনাও তৈরি করেছিল, যা বর্তমান সরকার শোধ করেছে। এখন অবশ্য এলএনজির দাম বিশ্ববাজারে ১৫ ডলারের নিচে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, আগের সরকারের ভ্রান্ত নীতি ও পরিকল্পনার জেরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলা করতে হচ্ছে বর্তমান সরকারকে। তবে এ সরকারেরও অনুসন্ধানের চেয়ে এলএনজি আমদানির দিকে ঝোঁকটা বেশি দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমায় বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির বিলাসিতা দেখানোর সুযোগ নেই। অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব সবার জানা। এখন দরকার বিকল্প সমাধানের উদ্যোগ।

কূপ খননের উদ্যোগ

চাপে পড়ে ২০২২ সালেই আওয়ামী লীগ সরকার দেশে উত্তোলন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। পেট্রোবাংলা বলছে, তখন অনুসন্ধান, সংস্কার ও উন্নয়ন মিলিয়ে ৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তা করা গেলে জাতীয় গ্রিডে দিনে প্রায় ৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার কথা। যদিও এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কূপ খননে জোর দিয়েছে। নতুন করে আরও ১০০ কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে অগ্রাধিকার বিবেচনায় ৩১টি পুরোনো কূপ সংস্কারে জোর দিয়েছে সরকার। সংস্কার করলে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ থাকে।

সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্রে কূপ খননের মাধ্যমে গ্যাস আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়। পাওয়া গেলে কূপের মাধ্যমেই উত্তোলন শুরু হয়।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ে ফল পাওয়া কঠিন। গ্যাস উৎপাদনে অধিকাংশ কূপের চুক্তি হয়ে গেছে। বেশ কিছু কূপের কাজ শেষ পর্যায়ে। আগামী নভেম্বর থেকে প্রতি মাসেই নতুন কিছু গ্যাস যুক্ত হবে। এ ছাড়া আগামী বছর থেকে আরও ১০০ কূপ খননের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, এখন সংস্কার, উন্নয়ন ও নতুন খনন মিলিয়ে ৫০টি কূপের প্রকল্প চলমান আছে। সব মিলিয়ে আগামী দুই থেকে তিন বছরে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নতুন গ্যাসক্ষেত্রের খোঁজ কত দূর

দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৬২ সালে। সর্বশেষ বড় গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল ১৯৯৮ সালে, সেটি সিলেটের বিবিয়ানা। বিবিয়ানা থেকেই এখন সবচেয়ে বেশি গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। এরপর আর কোনো বড় গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ ২০২১ সালে সিলেটের জকিগঞ্জে একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। যদিও সেখানে মজুত মাত্র ৫২ বিসিএফ।

বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বহুমাত্রিক জরিপেও সে সম্ভাবনা দেখা গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সমুদ্রে গ্যাস আবিষ্কার করা যায়নি। যদিও ভারত ও মিয়ানমার বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল গ্যাস উত্তোলন করছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তির (পিএসসি) খসড়া তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পেট্রোবাংলা। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে ভারতের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়।

ভূতত্ত্ববিদ বদরূল ইমাম প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাসের জন্য বাংলাদেশ খুবই সম্ভাবনাময়। সম্ভাবনার খুবই ক্ষুদ্র অংশ আবিষ্কৃত হয়েছে। একটা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে আরেকটা পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। নীতিনির্ধারকেরা এটি করতে চান না। কোনো সরকার অনুসন্ধানে জোর দেয় না। তিনি বলেন, ব্যাপক হারে অনুসন্ধান চালাতে হবে। সরকারের উচিত দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া।

‘আমরা সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস চাই’

কারখানা চালাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ দরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দরকার গ্যাস। নতুন বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান বাড়বে না, তরুণেরা কাজ পাবে না। ফলে মানুষের জীবিকা ও দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অনেকটা নির্ভর করে গ্যাসের ওপর। শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখতে দরকার সাশ্রয়ী মূল্যের গ্যাস।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শিল্পে গ্যাসের দাম ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, আমদানি বাড়ানো হবে। তাই দাম বাড়ানো দরকার। কিন্তু দাম বাড়িয়ে আমদানি আর বাড়াতে পারেনি তৎকালীন সরকার। বর্তমান সরকার নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে ৩৩ শতাংশ। এখন আমদানি কিছুটা বেড়েছে।

বাংলাদেশ নিট পোশাক রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নিজেদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এখন বড় ইস্যু নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। তিনি বলেন, ‘আমরা সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস চাই। এ জন্য আমদানির ওপর নির্ভর না করে দেশে উত্তোলন জরুরি। এ ক্ষেত্রে অনেক আগেই জোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-24%2Fllsi49oa%2F5483bbc2-6798-4d1c-b9d0-1934ee2bfa31.jfif?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

Tuesday, July 22, 2025

রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেলে বিতর্কিত গ্যাস সম্পদের মালিকানা পাবে ফিলিস্তিন

ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে গাজা উপকূলবর্তী গ্যাসক্ষেত্র ‘গাজা মেরিন’-এর মালিকানা এবং সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলনের পূর্ণ অধিকার পাবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। এমনটাই বলছেন খনিজ সম্পদ বিশেষজ্ঞ মাইকেল ব্যারন।

ব্যারনের দাবি, বর্তমান বাজারদরে গাজা মেরিন গ্যাসক্ষেত্র থেকে অন্তত ৪০০ কোটি ডলার পর্যন্ত আয়ের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর গড়ে ১০ কোটি ডলার রাজস্ব পেতে পারে, যা ১৫ বছর ধরে চলতে পারে।

ব্যারন বলেন, ‘এ আয়ে ফিলিস্তিন কাতার বা সিঙ্গাপুরে পরিণত হবে না ঠিক, কিন্তু এটা হবে তাদের নিজেদের আয়। এতে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি পাবে তারা।’

গাজা উপকূলবর্তী গাজা মেরিন গ্যাসক্ষেত্রের মালিকানা নিয়ে প্রায় ৩০ বছর ধরে বিতর্ক চলছে। মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতার কারণে অনুসন্ধান কাজ দীর্ঘ সময় ধরে থেমে আছে।

ফিলিস্তিনপন্থী মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ইতালির রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ইএনআইকে একটি সতর্কীকরণ চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি জ্বালানি মন্ত্রণালয় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য যে অঞ্চলটিকে ‘জোন জি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার প্রায় ৬২ শতাংশই ফিলিস্তিনের দাবিকৃত সামুদ্রিক জলসীমায় পড়ে। ইসরায়েলের জ্বালানি মন্ত্রণালয় সেখানে গ্যাস অনুসন্ধানের ছয়টি লাইসেন্স দিয়েছিল।

চিঠিতে আইনজীবীরা দাবি করেছেন, ইসরায়েল সেখানে গ্যাস অনুসন্ধানের কোনো বৈধ লাইসেন্স দিতে পারে না।

২০১৫ সালে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশনে (আনক্লজ) স্বাক্ষর করে ফিলিস্তিন। ২০১৯ সালে তারা তাদের সমুদ্রসীমা ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করে এবং এ–সংক্রান্ত বিস্তারিত দাবি উপস্থাপন করে। ইসরায়েল এ কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি।

ব্যারন বলেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেলে, বিশেষ করে যেসব দেশের এখতিয়ারে বড় তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো নিবন্ধিত, সেসব দেশ যদি স্বীকৃত দেয়, তবে আইনি অনিশ্চয়তা কার্যত শেষ হয়ে যাবে। এতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ একটি নিরাপদ নতুন আয়ের উৎস পাবে এবং নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে। এ জন্য তাদের ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না।

ওই আইনি চিঠির পর ইএনআই ইতালিতে চাপ প্রয়োগকারী গোষ্ঠীগুলোর কাছে জানিয়েছে, এখনো কোনো লাইসেন্স ইস্যু করা হয়নি। কোনো অনুসন্ধান কাজও চলছে না।

গাজা উপকূলসংলগ্ন সমুদ্রসীমা বরাবর প্রায় ৯০ কিলোমিটার (৫৬ মাইল) দৈর্ঘ্যের একটি সামুদ্রিক গ্যাস পাইপলাইন ইসরায়েলের আশকেলন থেকে মিসরের আরিশ পর্যন্ত বিস্তৃত। সেখানে (আরিশ) গ্যাস তরলীকরণ করে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।

গ্লোবাল উইটনেস নামের একটি সংস্থা দাবি করেছে, বেআইনিভাবে ফিলিস্তিনের জলসীমার ওপর পাইপলাইন তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এটি থেকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কোনো রাজস্ব পায় না।

ব্যারন বলেন, ‘১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কারভাবে তাদের জলসীমা, ভূগর্ভস্থ সম্পদ, আইন প্রণয়ন এবং তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও লাইসেন্স প্রদানের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল। প্রাকৃতিক সম্পদে নিয়ন্ত্রণ ছিল ইয়াসির আরাফাতের রাষ্ট্র বিনির্মাণ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফিলিস্তিনি সম্পদে ইসরায়েলি শোষণ ছিল দুই অঞ্চলের মধ্যে চলমান সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

২০০০ সালে গাজা উপকূলে প্রথম প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এটি ছিল ব্রিটিশ গ্যাসের অংশীদারত্বে পরিচালিত একটি প্রকল্প। পরিকল্পনা ছিল গাজা উপত্যকার একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রে এ গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ–সংকট দূর করা হবে।

২০ বছরের বেশি সময় ধরে গাজা মেরিন থেকে ফিলিস্তিনিরা এক ফোঁটা গ্যাসও তুলতে পারেননি। ব্যারন বলেন, এ প্রকল্পের ভাগ্যই আসলে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের নীতির প্রতিচ্ছবি। একদিকে তারা চায় ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল থাকুক, একই সঙ্গে চেষ্টা করে তাদের আলাদা করে রাখতে।

প্রকল্পের প্রথম বড় সমস্যা ছিল, কারা এই গ্যাস উত্তোলনের লাইসেন্স দিতে পারবে, সে বিষয়। ফিলিস্তিন কোনো পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র নয়। তাই তাদের হাতে স্পষ্ট কোনো আইনি অধিকার ছিল না। ইসরায়েলি আদালত বলেছিল, গাজার উপকূলীয় জলসীমা আসলে ‘নো-ম্যানস ওয়াটার’ অর্থাৎ এটির মালিকানা কারও নয়।

অসলো চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের জলসীমার অধিকার স্বীকার করা হলেও সেখানে স্পষ্টভাবে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের উল্লেখ ছিল না; যা সাধারণত উপকূল থেকে ২০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। চুক্তিটি ছিল শুধু একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। ফলে সমুদ্রসীমার স্পষ্ট সীমানা নির্ধারিত হয়নি।

সাধারণভাবে উপকূল থেকে ১২ বা ২০ মাইল পর্যন্তকে বলা হয় ‘টেরিটরিয়াল ওয়াটার’। গাজা মেরিন গ্যাসক্ষেত্র গাজার উপকূল থেকে ২০ মাইল দূরে অবস্থিত। ইসরায়েলের দাবি, গ্যাসক্ষেত্রটি ফিলিস্তিনের অধিকার নয়; বরং তাদের দেওয়া ইসরায়েলের ‘উপহার’।

পরিস্থিতির অবনতি ঘটে ২০০৭ সালে হামাস গাজা দখল করার পর। এরপর ইসরায়েল প্রকল্পটি আটকে দেয় এবং ব্রিটিশ গ্যাস কোম্পানি প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়।
২০২৩ সালে ইসরায়েল মিসরের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ইগ্যাসকে গাজা মেরিন উন্নয়নের অনুমতি দিলেও গাজায় যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় প্রকল্পটি আবার থেমে যায়।

সম্প্রতি জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদন উপস্থাপনকারী ফ্রানচেসকা আলবানিজ বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতের মতে ইসরায়েলের ফিলিস্তিন দখল অবৈধ। ফলে যেকোনো বেসরকারি বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এ দখলকৃত অঞ্চলে বিনিয়োগ করলে বা ব্যবসা চালিয়ে গেলে তা বৈশ্বিক অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

আলবানিজ বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে ও ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে এমন পদক্ষেপে অংশ নিতে হবে। ইসরায়েল অবশ্য এই দাবিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

গাজায় একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র
গাজায় একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Friday, April 11, 2025

সৌদিতে বিপুল গ্যাস ও তেলের খনির সন্ধান

সৌদিতে বিপুল গ্যাস ও তেলের খনির সন্ধান সন্ধান মিলেছে। দেশটির পূর্বাঞ্চল এবং এম্পটি কোয়ার্টার এলাকায় এসব খনির খোঁজ পাওয়া গেছে।

সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বুধবার (৯ এপ্রিল) সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আব্দুল আজিজ বিন সালমান এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, পূর্বাঞ্চল এবং এম্পটি কোয়ার্টার এলাকায় সৌদি আরামকো তেল ও গ্যাসের একাধিক নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। এসব আবিষ্কার দেশটির হাইড্রোকার্বন সম্ভাবনার পরিধি আরও বিস্তৃত করেছে এবং সৌদি আরবের বৈশ্বিক জ্বালানি নেতৃত্বকে আরও সুদৃঢ় করেছে।

পূর্বাঞ্চলের জাবু তেলের খনি জাবু-১ কূপ থেকে প্রতিদিন ৮০০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করার সম্ভাবনা রয়েছে। আরেক খনি সায়াহিদের সায়াহিদ-২ কূপ থেকে ৬৩০ ব্যারেল তেল উত্তোলন সম্ভব। এছাড়া আইফান খনির আইফান-২ কূপ থেকে প্রতিদিন ২,৮৪০ ব্যারেল অপরিশোধিত এবং প্রায় ০.৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

অনুসন্থানে আরও বলা হয়েছে, বেরি ফিল্ডের বেরি-৯০৭ কূপ থেকে দৈনিক ৫২০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং দৈনিক ০.২ এমএমএসসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব। এছাড়া মাজালিজ ফিল্ডের মাজালিজ-৬৪ কূপ থেকে দৈনিক ১,০১১ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং দৈনিক ০.৯২ এমএমএসসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব।

অন্যদিকে এম্পটি কোয়ার্টারের নুওয়াইর ফিল্ডের নুওয়াইর-১ কূপ থেকে দৈনিক ১,৮০০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং ০.৫৫ এমএমএসসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব। দামদাহ ফিল্ডের একটি কূপ থেকে দৈনিক ২০০ ব্যারেল তেল ও অপর কূপ থেকে দৈনিক ১১৫ ব্যারেল তেল উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া কুরকাস ফিল্ডের একটি কূপ থেকে দৈনিক ২১০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। এরমধ্যে গিজলান ফিল্ডের একটি কূপ থেকে প্রতিদিন ৩২ এমএমএসসিএফ গ্যাস এবং ২,৫২৫ ব্যারেল কনডেনসেট উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। আরাম ফিল্ড থেকে প্রতিদিন ২৪ এমএমএসসিএফ গ্যাস এবং ৩,০০০ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যেতে পারে। আর মিহওয়াজ ফিল্ডের প্রতিদিন ৩.৫ এমএমএসসিএফ এবং ৪৮৫ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যেতে পারে।

এছাড়া এম্পটি কোয়ার্টারের মারজুক ফিল্ডের দুটি কূপ থেকে প্রতিদিন ৯.৫ এমএমএসসিএফ এবং ১০ এমএমএসসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর বাইরে জুবাইলার একটি কূপ থেকে প্রতিদিন ১.৫ এমএমএসসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জ্বালানিমন্ত্রী আব্দুল আজিজ বলেন, এই আবিষ্কারগুলো কেবল সৌদি আরবের জ্বালানি খাতে নেতৃত্বকে দৃঢ় করছে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

সৌদিতে আবিষ্কৃত হওয়া একটি খনি। ছবি : সংগৃহীত
সৌদিতে আবিষ্কৃত হওয়া একটি খনি। ছবি : সংগৃহীত



Sunday, September 8, 2024

তেল-গ্যাসের বিশাল মজুতের সন্ধান, পাল্টে যাবে পাকিস্তানের অর্থনীতি!

পাকিস্তানের জলসীমায়  তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল ভাণ্ডারের সন্ধান মিলেছে। এর পরিমাণ এত বেশি যে, যদি তা উত্তোলন করতে পারে তাহলে পাকিস্তানের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। বন্ধুপ্রতিম একটি দেশের সহযোগিতায় তিন বছর ধরে অনুসন্ধান কাজ চালানোর পর পর ওই বিপুল মজুতের সন্ধান মিলেছে বলে পাকিস্তানের একজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে খবর দিয়েছে ডন নিউজ টিভি।  ভৌগোলিক জরিপে পাকিস্তান ওই বিপুল সম্পদের মজুতের স্থানটি শনাক্ত করে। পাকিস্তানি জলসীমায় পাওয়া এ সম্পদের কথা এরই মধ্যে সরকারকে অবহিত করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। ডনকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য হিন্দু। পাকিস্তানি ওই কর্মকর্তা এই সুবিধা পাওয়ার প্রচেষ্টাকে ‘ব্লু ওয়াটার ইকোনমি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই তেল ও গ্যাস উত্তোলন সংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণার জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তা পর্যালোচনাও করা হচ্ছে। ফলে নিকট ভবিষ্যতে সেখান থেকে এই খনিজ সম্পদ উত্তোলন কাজ শুরু হতে পারে। তিনি আরও বলেন, সেখানে কূপ খনন এবং প্রকৃতপক্ষে তেল পেতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। এই ‘ব্লু ওয়াটার ইকোনমি’ শুধু তেল ও গ্যাসের চেয়ে বেশি কিছু হতে পারে। সমুদ্রে এই বিশাল ভাণ্ডার থেকে এর পাশাপাশি বিভিন্ন মূল্যবান খনিজ পদার্থ ও উপাদান পাওয়া যাবে বলে তারা আশা করছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়ে এবং দ্রুততার সঙ্গে সক্রিয় হলে দেশের অর্থনীতি দ্রুত পাল্টে যাবে। কিছু পর্যবেক্ষণে বলা হচ্ছে এই অনুসন্ধানে যে তেল-গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান মিলেছে তা হতে যাচ্ছে বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ তেল ও গ্যাসের মজুদাগার। বর্তমানে প্রায় ৩৪০ কোটি ব্যারেলের তেল রিজার্ভ হিসেবে ভেনিজুয়েলাকে নেতৃস্থানীয় হিসেবে ভাবা হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে বেশি অব্যবহৃত শেল তেলের মজুত আছে। শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে আছে সৌদি আরব, ইরান, কানাডা ও ইরাক। ডন নিউজ টিভিকে অয়েল অ্যান্ড গ্যাস রেগুলেটরি অথরিটির (ওগরা) সাবেক সদস্য মুহাম্মদ আরিফ বলেন, যদিও দেশকে আশাবাদী হওয়া উচিত, তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী মজুতের বিষয়ে শতভাগ নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। এই জ্বালানি দিয়ে কি দেশের মোট চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা নির্ভর করবে মজুদাগারের আকার এবং সেখান থেকে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের হারের ওপর। যদি এটা গ্যাসের মজুদাগার হয়, তাহলে পাকিস্তান তার আমদানি করা এলএনজি বাদ দিতে পারে। অন্যদিকে যদি এটা হয় তেলের মজুদাগার তাহলে আমরা আমদানি করা তেল বাদ দেবো। তবে ড্রিলিং প্রক্রিয়া বা খনন কাজ শুরু না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, এই উত্তোলন কাজ শুরু করতে বিপুল পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। অফসোর লোকেশন থেকে এসব আহরণ করতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যাবে।
mzamin

Tuesday, September 29, 2009

তেল গ্যাস উত্তোলন-সাত বোনের না বদলানোর কেচ্ছা

সাত ভাই চম্পা জাগো রে জাগো রে’ কথাগুলো দিয়ে বেশ অনেক বছর ধরেই জনপ্রিয় গানটা অনেকেই নিশ্চয় শুনেছেন। শুনতে শুনতে গুনগুনানিও হয়তো হয়েছে। কিন্তু সাত বোন নিয়ে গান মনে পড়ছে না। সাত বোন একটা বইয়ের নাম, বছর পঁয়ত্রিশেক আগের।
দিনবদলের হাওয়ায় গত সাত-আট মাসে বিশেষ কিছু বদলিয়েছে বলে চোখে পড়ছে না। তাই সেই প্রসঙ্গ আপাতত থাক। তবে দিন বদলাচ্ছে আর গত কয়েক মাসে না হলেও নিকট-অতীতে হয়তো অনেক কিছু বদলে গেছে, যা আমার চোখে পড়েনি। এমনিতেই ইদানীং দৃষ্টিশক্তি কমে গেছে, তাই হয়তো চোখে পড়েনি। দিন হয়তো বদলাচ্ছে, আমি দেখতে পাচ্ছি না।
যেমন বিজেএমইর কোনো নেতা বা বিরাট গার্মেন্টের কোনো মালিক হয়তো ঈদের আগে ঘোষণা দিয়েছেন যে এবার ঈদে তিনি দেড় কোটি টাকার গাড়ি না কিনে সেই টাকায় শ্রমিকদের জন্য দুটো বাস কিনে দেবেন। হাজার হলেও গত দু-তিন বছরে একটা ২০, আরেকটা ৩০ আর তৃতীয়টা ৭০ লাখ টাকায় তিনটি গাড়ি কেনা হয়েছে। বাসার সবাই ধরেছে—এবার একটা মার্সিডিজ বা বিএমডব্লিউ চাই। দরকার হলে দুই বছর আগে কেনা একটি গাড়ি বিক্রি করে দিতেও বাসায় কারও আপত্তি নেই। তা ছাড়া নিজেরই চারটি গাড়ি থাকলে বাসায় গাড়ি রাখার জায়গার সংকুলান হচ্ছে না। আরেকটু বড় বাড়িও দরকার। সেটা পরে। আপাতত এই ঈদে দেড় কোটি টাকার একটা গাড়ি হলেই চলবে। দু-চারটা গাড়ির শোরুমে যাওয়া-আসাও হয়েছে।
এমন অবস্থায় গাড়ি কেনার প্ল্যান বাদ দিয়ে নিজের শ্রমিকদের জন্য বাস কেনার ঘোষণাটা চোখে পড়েনি কোনো পত্রিকার খবর হিসেবে।
দিন বদলায়নি। তবে একটা বিষয়ে নিশ্চয়ই বদলিয়েছে। বিজেএমইর পক্ষ থেকে চান্স পেলেই জাহির করা হয় যে গার্মেন্টস খাত থেকে আমাদের রপ্তানি আয়ের শতকরা ৭৬ বা ৭৭ শতাংশ আসে প্রতিবছর। আমরাও তাই এটাই ভাবি—তাই তো। আমাদের পাউন্ড, ডলার, ইউরোর কমবেশি তিন-চতুর্থাংশই যখন এ খাত থেকে আসে, তখন এ খাতকে রক্ষা করা সবার জাতীয় দায়িত্ব। এই খাত থেকে আমাদের সব ডলার, পাউন্ড, ইউরোই যখন আসে, আর তা আসলে এই ঈদ মৌসুমে যে চিনি, আলু, ভোজ্যতেলসহ সবকিছুই বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করতে হয়, সে আমদানির বৈদেশিক মুদ্রা কোথায় পেতাম।
হক কথা। যদি সত্যি হতো। শতকরা ৭৫ ভাগের হিসাব ডাহা মিথ্যা। যেমন মিথ্যা ব্যবসায়ীদের ঈদের আগে চাল, ডাল, তেল, চিনির দাম না বাড়নোর পঞ্চাশ বারের প্রতিশ্রুতি। কিছু জিনিস বদলায় না। দিনবদলের কথা আমরা যতই জপি না কেন।
২.
সাত বোনের কেচ্ছা এই না-বদলানোর কেচ্ছা। বছর পঁয়ত্রিশেক আগে বইটি বাজারে এসেছিল। এন্থনি স্যামসনের বই, নাম দি সেভেন সিস্টারস। ওই বইয়ের সাত বোন ছিল সে সময়ের সাতটা সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানি। ওই সাতটা তেল কোম্পানি সারা বিশ্বের বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল তার রোমাঞ্চকর কাহিনী। রোমাঞ্চকর এ জন্য যে বইটি না পড়লে সহজে বিশ্বাসই হবে না যে তখন ওই তেল কোম্পানিগুলো কীভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ওপর তেল উত্তোলন আর রপ্তানির নামে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।
গত শতাব্দীর পঞ্চাশ-ষাটের দশকে তেলসমৃদ্ধ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো স্বাধীন হয়ে পড়ায় বড় তেল কোম্পানিগুলো কিছুটা বিপাকে পড়েছিল। সেই বিপাকটা ছিল অল্পস্থায়ী। বইটির পুরো টাইটেল ছিল দি সেভেন সিস্টারস: দি গ্রেট ওয়েল কোম্পানিজ অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড দে শেইপড।
১৯৭৭ সালে প্রকাশিত এন্থনি স্যামসনের আরেকটি বই দি আর্মস বায়ার এ স্টাডি অব ইন্টারন্যাশনাল আর্মস ট্রেডার অর্থাত্ অস্ত্র প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো তাদের উত্পাদিত অস্ত্র বিক্রির জন্য কীভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ বাধিয়ে দেয় তার বিশ্লেষণ।
স্যামসনের সাত বোন-এর ফিরিস্তির পুরোটাই এখন অত প্রয়োজনীয় নয়। তাও দু-চারটার নাম পরিবর্তিত, কারণ এখনো তারা বহাল তবিয়তে তেল ব্যবসা করছে। তখন ছিল এশো (Esso)। এখন হয়েছে অ্যাকশন মবিল রয়েল ডাচ শেল; স্টান্ডার্ড অয়েল অব ক্যালিফোর্নিয়া, এখন হয়েছে শেভরন। ওই সময়ের সাত বোনের এক বোন— গালফ ওয়েল এখন শেভরনের অংশ অর্থাত্ ১৯৮৫ সালে শেভরন গালফ ওয়েলের বেশির ভাগ শেয়ার কিনে নিয়েছিল। আরেক বোন, টেক্সাকোকেও শেভরন হজম করে ফেলেছে।
আর আমরা বাংলাদেশে বসে সেই শেভরনের সঙ্গে দেন-দরবার করছি। নিজের জন্য কোটি টাকার গাড়ি কেনার বদলে শ্রমিকদের জন্য বাস কেনার মতো আমরাও ভাবছি, শেভরনের মতো তেল কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। দিন বদলেছে!!
৩.
সাত বোন নিছক একটা বই যে না তার প্রমাণ—১১ মার্চ ২০০৭ সালের লন্ডনের অন্যতম প্রভাবশালী পত্রিকা দি ফাইনানশিয়াল টাইমস, ‘দি নিউ সেভেন সিস্টারস’ নামে একটি প্রতিবেদন ছাপে। মুখ্য প্রতিপাদ্য ছিল সেই পুরোনো সাত বোন আর নেই। তাদের জায়গায় নতুন সাতটা বড় তেল কোম্পানির উত্থান হয়েছে, যাদের মধ্যে এখন আছে সৌদি কোম্পানি আরামকো রাশিয়ার গ্যাজস্প্রম, নিওক (ইরান), পেট্রোনাস (মালয়েশিয়া) ইত্যাদি। অর্থাত্ তেল আছে এমন অনেক দেশ নিজের তেল-গ্যাস উত্তোলনের জন্য দেশের সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় নিজেদের কোম্পানি গড়ে তুলেছে। আর এসব কোম্পানি এখন তাদের স্ব-স্ব দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য দেশেও তেল-গ্যাস আবিষ্কার আর উত্তোলনের ব্যবসায় পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।
আর আমরা আমাদের পেট্রোবাংলাকে প্রায় ৪০ বছরেও কেন আঁতুড় ঘরে রেখে দিয়েছি, সেটা কি খুলে বলতে হবে? এখন খোদ আমেরিকার কেচ্ছা। সারা পেলিনের নাম আমরা ইতিমধ্যে বোধ হয় ভুলতে বসেছি। ওবামা-জো বাইডেনের বিরুদ্ধে এই মাত্র গত বছরের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন জন ম্যাককেইনের সঙ্গে। সারা পেলিন তখন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র আলাস্কার গভর্নর অর্থাত্ পাশের ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা আগের জ্যোতি বসুর মতো নির্বাচিত প্রধান নির্বাহী। খবরে দেখলাম, সপ্তাহ দুয়েক আগে সারা গভর্নরের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
আলাস্কা তেল-গ্যাসে ভরপুর স্থান। সেই আলাস্কার সারা পেলিন নিয়ে ২০০৭-এ বই বেরিয়ে ছিল, সারা টেকস অন বিগ ওয়েল বই। বইয়ের এই ইংরেজি নামটির বাংলা অনুবাদ করা আমার জন্য কষ্টসাধ্য। ভাবার্থ অনেকটা এ রকম—বড় তেল কোম্পানিকে সারা কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। তেল-গ্যাস বিশারদ দুই সাংবাদিক বইটি লিখেছিলেন সারা পেলিনের কার্যাবলির ওপর ভিত্তি করে। খোদ আমেরিকায় বসে সারাকে দেখতে হয়েছিল যে তিনি কীভাবে বড় তেল কোম্পানিকে বাগে রাখতে হয়েছিল। স্বীকার করছি অকপটে যে বইটি পড়িনি, ইন্টারনেটে পুস্তক সমালোচনা পড়েছি। কিন্তু মর্ম আন্দাজ করেছি।
তাই ১৪ সেপ্টেম্বরের তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির হরতালের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন টক শোতে সরকারি দলের হর্তাকর্তা ব্যক্তিদের তেল কোম্পানিগুলোর ব্যাপারে উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশ দেখতে বেশ মজাই লাগছিল।
একটা পুরোনো কথা আমার মনের মাধুরী মিশিয়ে বলি, সৃষ্টিকর্তা যখন কোনো জাতির ওপর থেকে তার অনুকম্পা হ্রাস করেন, তখন জাতি, বিশেষত জাতির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা প্রথমে এবং ক্রমান্বয়ে জাতিটা বোকা হয়ে যায়।

৪.
গার্মেন্টসের মালিকেরা নিজেদের জন্য গাড়ি না কিনে শ্রমিকদের জন্য বাস ক্রয় করেছেন—খবরটা একটার পর একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থেকে যখন পেতে শুরু করব, তখন ভাবতে শুরু করব যে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি আর আমাদের কর্মকর্তারা আমাদের জাতীয় সম্পদ রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ হয়ে গেছেন। নিদেনপক্ষে তাঁরা যৌক্তিক চুক্তি করছেন।
বিদেশি তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান আর পরে আবিষ্কৃত তেল-গ্যাস ভাগাভাগি, বিক্রি আর রপ্তানি-সংক্রান্ত চুক্তিগুলো যদি যৌক্তিক এবং আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই থাকে, তাহলে চুক্তিগুলো এখনো কেন গোপনীয়।
লেখা শেষ হওয়ার আগে মাঝপথেই একটা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে রাখি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আব্দুল্লাহ ফারুক ইংল্যান্ডের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয় তেল-গ্যাস চুক্তি এবং এ সংশ্লিষ্ট আইনের বিষয়ে তার পিএইচডি থিসিস লিখেছে। তেল-গ্যাস সংক্রান্ত আইন নিয়ে চর্চার জন্য ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ফারুক বলছিল যে তার থিসিসের গবেষণার জন্য সে প্রচুর খোঁজাখুঁজি করেছিল। আমাদের জাতির পক্ষে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে যেসব চুক্তি হয়েছে, এর সবটাই ‘অতি গোপনীয়’।
একটা চুক্তি নিয়ে দুই পক্ষ আলাপ-আলোচনা করে, দরদাম করে তখন সেটা গোপনীয় থাকতেই পারে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তারপর সংবিধানকে মাঠে নামাই। সংবিধানের ১৪৩ অনুষদে বলা আছে ক) দেশের ভূমি এবং খ) সমুদ্র সীমানার অন্তর্গত সকল খনিজ ও মূল্যবান সামগ্রীর মালিক প্রজাতন্ত্র। আর সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। অর্থাত্ সকল খনিজ সম্পত্তির মালিক জনগণ।
আমাদের খনিজ সম্পদ কে, কোথায়, কীভাবে, কী শর্তে, কত দামে বিক্রি করছে, সেটা আমরা-জনগণ জানতে পারব না, এটা তো হতেই পারে না। আমাদের সম্পদ আমাদের কাছ থেকে ‘গোপন’ রাখবে—এ কেমন কথা, এটা কি মগের মুল্লুক।
মোদ্দাকথা, চুক্তি নিয়ে আলাপ-আলোচনা সরকারের দায়িত্ব। সে পর্যায়ে আমাদের না জানালেও চলবে। তবে ২০, ৩০, ৪০ বছর মেয়াদি চুক্তি, স্বাক্ষরিত হওয়ার পর জানার আধিকার দেশের জনগণের আছে।
ড. ফারুক জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশে এ গোছের চুক্তি এখন তথ্য জানার অধিকারের আওতাভুক্ত।
জানতে চাই। জানাতে হবে। অবিলম্বে!
ড. শাহদীন মালিক। অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট, ডাইরেক্টর, স্কুল অব ল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়