Thursday, November 28, 2013

আমরা কবে পৌঁছাব গণতন্ত্রের অভীষ্ট লক্ষ্যে? by কারার মাহমুদুল হাসান

গত ১৮ নভেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকালীন রুটিন কাজ পরিচালনার লক্ষ্যে ৮ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন। এ ৮ জনের মধ্যে ৫ জনই এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য। দু’জন আওয়ামী লীগের, যারা গত পাঁচ বছর দৃশ্যমানভাবে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে কমবেশি অবহেলা-অনাদরে দিন কাটিয়েছেন এবং অন্যজন ওয়ার্কার্স পার্টির। ইতিমধ্যে এ মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত হয়েছে। তাদের সবাইকে নিয়েই এ আপৎকালীন মন্ত্রিসভা। এ মন্ত্রিসভাকে বর্তমান সরকারি মহল অন্তবর্তীকালীন মন্ত্রিসভা নামে অভিহিত করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। আর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এ নতুন মন্ত্রিসভাকে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার না বলে একে সদ্য বিদায়ী মহাজোট সরকারেরই নতুন সংস্করণ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বিগত কয়েকটি সাধারণ নির্বাচনের ভোটচিত্র দেখা যেতে পারে। ২০০১ সালে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া প্রার্থীদের দলগত অবস্থান ছিল এরকম : ক. আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৩০০ প্রার্থীর মধ্যে ২ জন, খ. বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ২৫২ জন প্রার্থীর মধ্যে ৭ জন, গ. আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জেপি’র ১৪০ জনের মধ্যে ১৩৬ জন, ঘ. জামায়াতে ইসলামীর ৩১ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪ জন, ঙ. ওয়ার্কার্স পার্টির ৩২ জনের মধ্যে ৩২ জনই, চ. গণফোরামের ১৭ জনের মধ্যে ১৭ জনই এবং ছ. বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের ত্রিধা বিভক্ত বিভিন্ন ‘ফেরকা’র মোট ৪৬ জন প্রার্থীর সবারই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। অন্য আরও প্রায় চার ডজন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ (স্বতন্ত্র ৪৮৬ জন প্রার্থীসহ) করেছিল এবং সেসব দলের ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ৯৫ থেকে ১০০ ভাগ প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। ওই নির্বাচনে এরশাদ সাহেবের দল (জাপা) অংশ নিলেও দলগতভাবে দেয় ভোটের ১.১২ ভাগ ভোট লাভ করেছিল এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জেপির প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছিল ০.৪৪ ভাগ। ওই নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়।
৭ম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১২ জুন ১৯৯৬ সালে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মোট দেয় ভোটের ৩৭.৪৪ ভাগ ভোট পেয়ে ১৪৬টি সদস্যপদে জয়ী হয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হয়। এ নির্বাচনে (যা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়) বিএনপি মোট দেয় ভোটের ৩৩.৬০ ভাগ (১১৬ সংসদ সদস্যপদে জয়ী), জাতীয় পার্টি মোট দেয় ভোটের ১৬.৪০ ভাগ (প্রাপ্ত সংসদ সদস্যপদ ৩২), জামায়াতে ইসলামী মোট দেয় ভোটের ৮.৬১ ভাগ (প্রাপ্ত সংসদ সদস্যপদ ৩টি) ভোট লাভ করে।
১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ৩০০ আসনের মধ্যে ২ জন, বিএনপির ৩৬ জন, ওয়ার্কার্স পার্টির ৩৪ জনের মধ্যে ৩৩ জন, জাসদের (ইনু) ৩০ জনের মধ্যে ২৯ জন এবং বাংলাদেশ সাম্যবাদী দলের ৪ জনের সবারই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় অতিশয় নিরপেক্ষ ও কঠোরভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বজন শ্রদ্ধেয় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অধীনে। সে নির্বাচনে বিএনপি ৩০০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোট ১৪০টি সংসদীয় আসনে বিজয়ী হয় এবং বিএনপির মোট প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫ লাখ ৭ হাজার ৫৪৯, যা মোট দেয় ভোটের ৩০.৮১ ভাগ। দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ও পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে মোট ২৬৪টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৮৮টি আসনে বিজয়ী হয় এবং দলটির মোট প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৬৬, যা মোট দেয় ভোটের ৩০.০৮ ভাগ। এছাড়া হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের (তিনি তখন কারাগারে অন্তরীণ) জাতীয় পার্টি ২৭২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৪০ লাখ ৬৩ হাজার ৫৩৭ ভোট পায় (শতকরা হারে প্রাপ্ত ভোট ১১.৯২ ভাগ) এবং ৩৫টি আসন লাভে সক্ষম হয়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ২২২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ দলের মোট প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬১। দলটি জাতীয় পার্টি থেকে বেশি ভোট পেয়েও (শতকরা হারে প্রাপ্ত ভোট ১২.১৩ ভাগ) মাত্র ১৮টি আসন লাভে সক্ষম হয়।
ওই নির্বাচনে বিগত মহাজোটের অংশীদার জাসদ (ইনু) ৬৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাকুল্যে ভোট পেয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ১১টি। তবে কোনো আসন লাভ করতে পারেনি। বিগত মহাজোটের আরেক অংশীদার ওয়ার্কার্স পার্টি (তখন দলটি ভাগ হয়নি) ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাকুল্যে ভোট পেয়েছিল ৬৩ হাজার ৪৩৪টি, যদিও ওই নির্বাচনে তারা একটি আসন লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। একইভাবে জোটের অংশ বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল মোট ৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাকুল্যে ১১ হাজার ২৭৫টি ভোট লাভ করেছিল। সে দলের এক কাণ্ডারি দিলীপ বড়–য়া ছিলেন সদ্য বিদায়ী মহাজোট সরকারের শিল্পমন্ত্রী। ওই নির্বাচনে সিপিবিও অংশ নিয়েছিল জোটের দল হিসেবে। তাদের প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৭ হাজার ৫১৫ এবং প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ছিল পাঁচ।
এখানে উল্লেখ করার বিষয় হল, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শতকরা হারে বিএনপির প্রায় সমান ভোট লাভ করলেও বিএনপির তুলনায় অর্ধশতাধিক আসন কম পায়। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট গবেষক ও চিন্তাবিদরা কোনো গবেষণা করেছেন কি-না জানা নেই।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সেনা সমর্থিত সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা করতে চাই। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ছিল ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়, ‘ঘরে ঘরে চাকরি’ প্রদানের ঘোষণাসহ বড় বড় ওয়াদা। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসনে জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোটের অংশ হিসেবে জাসদ (ইনু) হাসানুল হক ইনুসহ ৩টি আসনে এবং ওয়ার্কার্স পার্টি (মেনন) সাকুল্যে ২টি আসনে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়। দল দুটি এ নির্বাচনে সাকুল্যে ৭ লাখ ৬৮ হাজার ৫৩৭টি ভোট লাভ করেছিল। দিলীপ বড়–য়ার সাম্যবাদী দল পেয়েছিল ২৯৭ ভোট।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত ওয়াদাগুলোর কতভাগ গত পাঁচ বছরে বাস্তবায়ন করতে পেরেছে, তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত বড় বড় বিলবোর্ডে দৃষ্টিনন্দন অক্ষরে লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তবে শেয়ার মার্কেট, হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ্ গ্র“প, রেলওয়ের কালো বিড়াল এবং পদ্মা সেতু সংশ্লিষ্ট কথিত দুর্নীতি ইত্যাদি ঘটনা মহাজোট সরকারকে জনসমর্থনে এগিয়ে নিতে পারেনি, যার আলামত পাওয়া গেছে সদ্য সমাপ্ত পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ২২ বছর পেরিয়ে গেছে। আমরা বাংলাদেশের জনগণ অতি আশা নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃযাত্রা শুরু করেছিলাম। এ দুই দশকে এবং তার আগের দশকেও দেশে অর্থনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, সন্দেহ নেই। তবে ‘গণতন্ত্রে’র ধারণা আমাদের রাজনীতিকদের কাছে একটি নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা এবং কমবেশি পাঁচ বছর পরপর এ কাজটি সম্পন্ন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। দেশের জনগণ পাঁচ বছর পরপর নির্বাচনের দিন কয়েক ঘণ্টার জন্য নিজেদের সবকিছুর ‘মালিক’ মনে করে উৎফুল্ল ও আনন্দবোধ করেন। নির্বাচনের পর তাদের কথা ভাবার সময় পান না ক্ষমতাসীনরা। সংসদ সদস্য, মন্ত্রিসভার সদস্য, সরকারি দলের নব্য ও পুরনো সমর্থকরা তখন নির্বাচন-পরবর্তী সব ভাবনা, সময় ও শক্তি নিয়োজিত করেন নতুন টেলিভিশনের লাইসেন্স, রাজউকের প্লট বরাদ্দ, নতুন ব্যাংক-ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, মেডিকেল কলেজ খোলার ও সমুদ্রে মাছ ধরার ট্রলার ক্রয়ের পারমিট, সেই সঙ্গে ক্ষেত্র বিশেষে বিদেশে লোক পাঠানো ও দেশে চাকরি প্রদানের নামে মাথাপিছু ৩ থেকে ১০ লাখ টাকা ডাউন পেমেন্ট নেয়ার কাজগুলো সূচারুভাবে সম্পন্ন করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে। এ অবস্থায় তাদের আমজনতার কথা ভাবার ফুরসত কোথায়! উদ্বেগের সঙ্গে অনুমান করা যায়, নাদান দেশবাসী আরও কয়েক বছর এভাবেই ‘গণতন্ত্র’ বিষয়ে ধাক্কাধাক্কির সুমহান কাজগুলো সহিসালামতে সম্পন্ন করে সংসদীয় গণতন্ত্রের অভীষ্ট লক্ষ্যে তথা মনজিল মক্সুদে একদিন না একদিন পৌঁছে যেতেও পারে।
কারার মাহমুুদুল হাসান : সাবেক সচিব; ’৬২-এর শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা কলেজ থেকে রাস্টিকেটকৃত ১১ জনের একজন

দলনিরপেক্ষতা প্রমাণেই সংকটের সমাধান by মোঃ আবু সালেহ সেকেন্দার

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকদের বহু প্রতীক্ষিত তফসিল ঘোষিত হয়েছে। তাদের ঘরে ঘরে এখন ঈদ উৎসবের আমেজ। নির্বাচন কমিশনের এমন করিতকর্মা উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে তাদের আনন্দ মিছিল আমরা টেলিভিশনে দেখেছি। বিরোধী দলও বসে নেই। তারা তফসিল ঘোষিত হওয়ার অল্প সময় পরেই তা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এখন ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ চলছে। এ সপ্তাহের প্রথমদিকে হরতাল-অবরোধের কোনো চিহ্ন মাত্র ছিল না। বিদেশী অতিথির কল্যাণে জাতি কিছুদিনের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পেয়েছিল বটে। কিন্তু ক্ষণিকের সেই শান্তি তফসিল ঘোষিত হওয়ার পর এক ফুৎকারে উড়ে গেছে। জনগণের একটু শান্তিতে দিন যাপন শুধু বিরোধী দল নয়; মনে হয়, নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সইছিল না! না হয়, এখনই তফসিল ঘোষণা করে বিরোধী দলের হাতে নতুন একটা হাতিয়ার তুলে দেয়ার অর্থ কী? প্রধান নির্বাচন কমিশনার তফসিল ঘোষণার আগের দিনইতো বলেছেন, তারা দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা চান। তফসিল ঘোষণার সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি। হঠাৎ এমন কী ঘটল যে, একদিন পরই তিনি তার মত পাল্টে তফসিল ঘোষণা করলেন? সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৯ দিন আগে ভোট গ্রহণের তারিখ ঘোষণা করলেন! দুই দলের সমঝোতার জন্য আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করলে ক্ষতি কী ছিল? আরও সপ্তাহ খানেক পর তফসিল ঘোষণা করা যেতে পারত। প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সংলাপের মাধ্যমে যে সমঝোতার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তার ফলাফল পাওয়ার জন্য কয়েক দিন অপেক্ষা করলে গণতন্ত্র বা সংবিধানের অন্তত কোনো লংঘন হতো না।
তবে এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। যদিও এ পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা একেবারে ক্ষীণ।
শেষ মুহূর্তে কাকতালীয় কিছু না ঘটলে প্রধান বিরোধী দল ছাড়াই হয়তো বর্তমান সরকারকে নির্বাচনে যেতে হতে পারে। তবে পুনঃতফসিলের সুযোগ থাকায় বর্তমান তফসিল ঘোষণা রাজনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে হয়তো অন্তরায় হবে না। এখন নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে তাদের আন্তরিকতা, নিরপেক্ষতা ও সদিচ্ছার পরীক্ষা দিয়ে এ সংকটের সমাধান করতে হবে। সরকার এতদিন বলে এসেছে, তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বর্তমান সরকার নির্বাচনকালীন সরকারে রূপ নেবে। তফসিল ঘোষিত হয়েছে। এখন তাই সরকারের প্রতিশ্র“তি রক্ষার সময় এসেছে। সরকারকে কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে। আর এ প্রমাণ শুরু হবে বিটিভির নিরপেক্ষতা প্রমাণের মাধ্যমে। বিটিভিকে সংবাদ ও অনুষ্ঠানে সরকারের গুণগান প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিটিভির এমন নিরপেক্ষ ভূমিকাই বিরোধী দল ও জনগণের কাছে এই বার্তা দেবে যে, নির্বাচনকালীন সরকার সত্যিকার অর্থেই সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে চায়।
নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় নির্বাচন কমিশন নিজেই। বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিজেদের ক্ষমতা খর্ব করার জন্য যে আত্মঘাতী তৎপরতা চালিয়েছে তা ইতিহাসের নির্লজ্জ প্রহসন। বিএনএফের মতো একটি ভুঁইফোড় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রদান নিয়ে যে নাটক মঞ্চস্থ হয়, তা অতীতের সব রেকর্ডকে হার মানিয়েছে। ওই নাম-সর্বস্ব রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন না দিলে এদেশের গণতন্ত্রের কোনো আহামরি ক্ষতি হতো না। বরং ওই নিবন্ধন প্রদানের প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের নগ্ন পক্ষপাতিত্ব এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবে যাই হোক, অতীতকে পেছনে ফেলে বিরোধী দলকে আস্থায় আনতে নির্বাচন কমিশনকে এখন কিছু বাস্তবধর্মী নিরপেক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানকে তফসিল প্রত্যাখ্যানকারী দলগুলো ও জনগণের কাছে প্রমাণ করার সময় এসেছে যে, তারা কোনোভাবেই ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ নয়; প্রয়োজনে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পিছপা হবে না। তাদের কাছে নির্বাচনী আচরণবিধি প্রয়োগে সরকারি দল, বিরোধী দল ভেদাভেদ নেই। সরকারি দলকে বাড়তি সুবিধা দেয়া আচরণবিধির এমন কয়েকটি ধারাকে প্রয়োজনবোধে সংশোধন করা যেতে পারে।
নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্বও কম নয়। তারা এতদিন ছিল দলীয় সরকার। তফসিল ঘোষিত হওয়ার পর তারা অন্তর্বর্তী সরকার বা নির্বাচনকালীন সরকারে রূপ নিয়েছে। তবে শুধু কাগজে-কলমে নির্বাচনকালীন সরকার হলে চলবে না। এ সরকারকে তাদের আচার-আচরণ, কথাবার্তা, কাজকর্মে তার প্রমাণ দিতে হবে। পুলিশ ও আইন-শৃংখলার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর সদস্য এবং প্রশাসনকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা কোনো বিশেষ দলের প্রতি অনুগত নয়। তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রতি সমান আচরণ করবে। বিরোধী দলের মিছিলে লাঠিপেটা, গুলি, টিয়ারশেল নিক্ষেপ এবং সরকারি দলের মিছিলে নিরাপত্তা প্রদানের যে রেওয়াজ তারা এতদিন চর্চা করেছে তা পরিত্যাগ করতে হবে। নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য দলীয় লোক যতটা না অন্তরায় তার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায় দলবাজ বা দলকানারা। ওইসব ব্যক্তি নিজেদের শতভাগ দলীয় লোক প্রমাণ করতে গিয়ে এমন কিছু কাজ করে যা সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই নির্বাচনকালীন সরকারকে এখনই ওইসব দলকানাকে প্রশাসন, পুলিশ বা নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা বাঞ্ছনীয়।
নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারের হর্তাকর্তাদের বহুবার আমরা বলতে শুনেছি, এখন মিডিয়া এত শক্তিশালী যে, কোনোভাবেই নির্বাচনে কারচুপি করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে দেখেছি সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের দুর্নীতি, অপকর্মের ফিরিস্তি সম্পর্কে সংবাদ পরিবেশনের জেরে বহু সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছে। বিগত সময়ে ওইসব সাংবাদিক নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচনকালীন সরকার দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে আমরা আশা করি।
জেলে বন্দি বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের রেখে বিরোধী দল কখনও নির্বাচনে আসবে না সে কথা হলফ করে বলা যায়। এমন আশা করাও অগণতান্ত্রিক। তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতারের ঘটনাও সরকারের দায়িত্বহীনতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ওই ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে সরকারের নিরপেক্ষতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেফতারকৃত নেতাদের ছাড়া রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার হওয়া সব বন্দিকে মুক্তি প্রদানের বিকল্প নেই। বিলবোর্ডে সরকারের সাফল্য প্রচার এ সরকারের শেষ সময়ে এসে জোরেশোরেই শুরু হয়েছিল। গত ঈদের আগে এক রাতেই ঢাকা শহরের সব বিলবোর্ড দখল হয়ে গিয়েছিল। ওই বিলবোর্ডগুলোতে শুধু সরকারের গুণকীর্তনই প্রচারিত হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এখনও মহাজোট সরকারের সাফল্যের ফিরিস্তি সংবলিত ওইসব রঙিন বিলবোর্ড দেখা যাচ্ছে। এতে নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এখনই ওই বিলবোর্ডগুলোর অপসারণ জরুরি।
গত সংসদ নির্বাচনে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মীদের আমরা সংযম প্রদর্শন করতে দেখেছি। শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখতে তারা ঢাকঢোল পিটিয়ে আন্দন মিছিল করা থেকে বিরত ছিল। কিন্তু বর্তমানে তাদের এ আচার-আচরণে পরিবর্তন হয়েছে। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর তারা প্রায় সারা দেশে আনন্দ মিছিল করেছে।

শুধু বেতন বাড়ালেই চলবে না by ধীরাজ কুমার নাথ

অবশেষে অর্থমন্ত্রী তার প্রতিশ্র“তি রাখলেন। তিনি ২০১৩-২০১৪ সালে বাজেট বক্তৃতার ১৮৯ অনুচ্ছেদে একটি স্থায়ী বেতন কমিশন গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, আমরা উল্লেখযোগ্যভাবে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ২০০৯ সাল থেকে বৃদ্ধি করে আসছি। কিন্তু এভাবে ঘন ঘন কমিশন না করে একটি স্থায়ী বেতন কমিশন গঠন করলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন-ভাতাদি সমন্বয় করা যাবে এবং তা বেতন বৈষম্য দূরীকরণে সহায়ক হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ নভেম্বর বাজেট ঘোষণার ৫ মাস পর তিনি মাত্র ৬ মাসের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দীনকে চেয়ারম্যান করে ১৭ সদস্যের একটি বেতন ও চাকরি কমিশন গঠন করলেন। এ ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন উঠেছে, যা নিতান্তই সঙ্গত ও স্বাভাবিক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যার মেয়াদ মাত্র দুই মাস, তাদের এ ধরনের নীতিনির্ধারণীমূলক কমিশন গঠনের ক্ষমতা আছে কি? মাত্র এক মাস আগে সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা বাড়ানো হয়েছে ২০ শতাংশ হারে, যার জন্য খরচ হবে প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকা। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, ১৩ লাখ সরকারি কর্মচারীর জন্য বছরে রাজস্ব খাতে ব্যয় হয় প্রায় ২৭,৫০০ কোটি টাকা। কী কারণে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের খুশি করতে সরকার উঠে পড়ে লাগল, এ ব্যাপারে সুশীল সমাজের অনেকের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে কি সরকারি কর্মচারীরা নির্বাচনের প্রাক্কালে রিটার্নিং অফিসার, প্রিসাইডিং অফিসার বা পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করবেন বলে এ সুযোগ? তারা এ সময়ে স্বপক্ষে থাকলে সুবিধা হবে- এ ধরনের ভাবনা মাথায় রেখে অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণে উৎসাহিত হয়েছে সরকার? যদি তাই হতো তবে সরকারি কর্মচারীরা সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধাচরণ করতেন না কোনোদিন, কারণ তিনিই ১৯৮৫ সালে তাদের বেতন-ভাতা দ্বিগুণ করেছিলেন এবং এনাম কমিটি গঠন করে সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক অসামান্য অবদান রেখেছিলেন।
বর্তমান কমিশন হচ্ছে অষ্টম বেতন কমিশন। এর আগে বেতন কমিশন গঠিত হয়েছিল ১৯৭৩, ১৯৭৬, ১৯৮৪, ১৯৯০, ১৯৯৭, ২০০৪ ও ২০০৭ সালে। প্রতিটি কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করেছে এবং মহার্ঘ ভাতা মূল বেতনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তবে এবারের কমিশনকে বলা হচ্ছে বেতন ও চাকরি কমিশন, যার অর্থ হচ্ছে- এ কমিশন বেতন-ভাতা ছাড়াও চাকরির বিষয়টি দেখবে, যা হবে অনেক বেশি জটিল ও সময়সাপেক্ষ। সপ্তম বেতন কমিশন তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ প্রদানে ১৪ মাস সময় নিয়েছিল। তাই বর্তমান কমিশন কিভাবে ৬ মাসের মধ্যে তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করবে? অবশ্যই সময় বাড়াতে হবে।
এছাড়া এরূপ মৌলিক সংস্কারমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলে জনপ্রিয় ও সদিচ্ছাসম্পন্ন সরকারের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার প্রয়োজন আছে। সরকার যে তার আমলাতন্ত্রকে নিরপেক্ষ, দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত দেখতে চায়, এ ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার থাকতে হবে। সরকার ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গৃহীত সিভিল সার্ভিস অ্যাক্টকে ২০১৩ সালের নভেম্বর অবধি অনুমোদন দেয়নি। তাহলে তারা কি আমলাতন্ত্রকে শক্তিশালী দেখতে চাইবে? এমন প্রশ্ন অনেকের। এ কথা মনে রেখেই সম্ভবত নবগঠিত কমিশনকে কাজ শুরু করতে হবে।
তবে আরও অনেক বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে, যেমন- সপ্তম বেতন কমিশন পরিবারের সদস্য সংখ্যা ধরেছে ৪ জন, এবার ধরা হবে ৬ জন, কারণ পরিবারের দু’সন্তানের সঙ্গে মাতা ও পিতাকে যুক্ত করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ও সর্বনিু বেতনের অনুপাত কত হবে- এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। সপ্তম বেতন কমিশন সচিবের বেতন ধরেছিল ৪৫ হাজার টাকা এবং একজন এমএলএসএসের বেতন ধরেছিল ৪০০০ টাকা। অনুপাতটি দাঁড়ায় ১১:১, যার বিরুদ্ধে নিুপদস্থ কর্মচারীরা প্রতিবাদ করেছিল। এবার এ সমস্যার একটি অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান দিতে হবে। এছাড়াও বর্তমান বেতন স্কেল বা গ্রেড আছে ২০টি, যার সংশোধন হওয়া উচিত বলে অনেকে মনে করেন। অনেকের ধারণা, এর সংখ্যা হতে পারে ঊর্ধ্বে ১১টি। এসব জটিল বিষয় নিয়ে শুধু কমিশনকে এককভাবে ভাবলে চলবে না; উপকারভোগী, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং বিভিন্ন স্তরের মানুষের অভিমত নিতে হবে। এছাড়াও দেশ-বিদেশে অনুসৃত ও সফল কর্মসূচি দেখে এবং সরকারের আর্থিক ক্ষমতা বিশ্লেষণ করে সুপারিশ প্রণয়ন করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে।
অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বেতন-ভাতা বাড়িয়ে বাজারমূল্যকে প্রভাবিত করা কোনো টেকসই ও বিধিসম্মত সমাধান নয়। আবার অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সরকার কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানে দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি’র প্রায় ৩ শতাংশ ব্যয় করে। কর্মচারীদের খুশি করার জন্য আরও বেশি ব্যয় করা হলে তা উন্নয়নের গতিধারাকে মন্থর করে দেবে, যা অবশ্যই অনভিপ্রেত।
এছাড়াও অনেক বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ মনে করে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হলে ব্যবসায়ী ও বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব পড়ে, যার দায়ভার বহনের ক্ষমতা কোম্পানির মুনাফার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। যেমন দেখা যায়, তৈরি পোশাক শিল্পে এবার সর্বনিু ৫৩০০ টাকা বেতন নির্ধারণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল বিজিএমইএ। ওয়েজ বোর্ডের বিনির্ণয় বা রোয়েদাদ তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।
অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন, সরকারি কর্মচারীদের প্রতিপালনের জন্য বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা ছাড়াও এর মৌলিক দর্শন বা লক্ষ্য হতে হবে, সচ্ছল জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা প্রদান করে তাদের দুর্নীতি থেকে বিরত রাখার পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং শুদ্ধাচারের পথে চলতে অনুপ্রাণিত করা। এমনটি করতে পারাই হচ্ছে সরকারের দূরদর্শিতা এবং দেশবাসীর অভিপ্রায়।
জনগণের সেবক ও দেশের উন্নয়নকর্মী হিসেবে সরকারি কর্মচারীদের অবদান রাখার সুযোগ দেবে সরকার। নীতিমালা অনুসারে আইন ও ন্যায়ের পক্ষে তাদের অবস্থান হবে সুদৃঢ় এবং তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর নিদর্শন রাখবে তাদের আচরণ ও দায়িত্ব পালনে- এটাই জনগণের প্রত্যাশা। যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে বেতন ও মর্যাদা বৃদ্ধি কোনো কাজে না লাগে বা দৃশ্যমান না হয়, তাহলে এ খাতে অর্থব্যয় শুধু অপব্যয় হিসেবেই চিহ্নিত হতে পারে বলে অনেকের অভিমত।
আবার অপর একশ্রেণীর অর্থনীতিবিদ মনে করেন, নগদ বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পরিবর্তে সরকার অধিগম্য বা বাস্তবমুখী সুযোগ প্রদান করে সরকারি কর্মচারীদের যাপিত জীবনে অবদান রাখতে পারে। চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি, শিক্ষা ভাতা প্রদান, যানবাহনের সুবিধা, বিশ্রাম ও বিনোদন ভাতা বৃদ্ধি, মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান, গৃহ ঋণের অর্থিক সুবিধা, ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের ওপর অধিক সুদ প্রদান, যৌথ বীমা ছাড়াও জীবন বীমার প্রিমিয়াম প্রদানে সহযোগিতা দান করে সরকারি কর্মচারীদের জীবনে স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। কমিশনকে অবশ্যই এসব বিষয় পর্যালোচনা করতে হবে নিবিড়ভাবে।
তবে এ কমিশনকে চাকরির বিষয়গুলোও সম্ভবত দেখতে হবে। কমিশনের কর্মপরিধি যদিও এখনও পরিষ্কার নয়, তা সত্ত্বেও বলা যায়, বেতন-ভাতার সঙ্গে কর্মীর মর্যাদা ও অবস্থানকে অবশ্যই বিবেচ্য বিষয় হিসেবে আমলে নিতে হবে। বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একটি অর্থবহ ও দক্ষ আমলাতন্ত্র সৃষ্টি করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হবে। এ কাজটি আরও বেশি জটিল এবং সরকারের বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। কোনো দুর্বল ও দলবাজিতে বিশ্বাসী সরকারের পক্ষে এক্ষেত্রে যুগান্তকারী কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে অতীতে অনেক কমিশন হয়েছে এবং তারা অনেক ভালো ভালো সুপারিশ দিয়েছে, যার কিছু কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে আবার অনেক কিছু ইচ্ছাকৃতভাবে বিবেচনায় আনা হয়নি। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এ কমিশন কর্মচারীদের বেতন-ভাতার বিষয়টি ছাড়াও বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র যাতে সততা ও দক্ষতার নিদর্শন রেখে জনগণের কাছে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে এমন সব সুপারিশ রাখবে, যা যে কোনো সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
ধীরাজ কুমার নাথ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সাবেক সচিব, কলাম লেখক

রাজনীতিতে সংখ্যালঘু ইস্যু by মেজর সুধীর সাহা (অব.)

বাংলাদেশের স্বাধীনতায় এদেশের সংখ্যালঘুদের বিশেষ একটি স্থান ছিল। পাকিস্তানের তৎকালীন কর্তৃপক্ষ সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের শত্র“ভাবাপন্ন দৃষ্টিতে দেখতে অভ্যস্ত ছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রথমদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোকদের ভুল ধারণা দেয়া হয়েছিল যে, এদেশের হিন্দু এবং পার্শ্ববর্তী শত্র“দেশ ভারতের অনুচররাই মুক্তিযুদ্ধ করছে। পাকিস্তান সেনা সদস্যরা তাদের নিধনে তাই বেছে বেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের হত্যা করতে চেয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাদের অবশ্য এই ভুল ভেঙেছিল এবং তারা বুঝতে পেরেছিল, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব মানুষই মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল। তারপরও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন নিগৃহীত হয়েছে অধিক হারে। রাস্তায় রাস্তায় মানুষকে থামিয়ে প্যান্ট খুলে পরীক্ষা করা হতো তারা হিন্দু কি-না। কলেমা পড়তে বলা হতো বোঝার জন্য যে তারা সত্যি সত্যি মুসলমান কি-না। ইসলাম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তাই পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখতে হবে- এই ছিল তাদের যুক্তি। তাই সংখ্যালঘু হিন্দুদের তারা সহজেই টার্গেট করতে পেরেছিল। সংখ্যালঘুরা বেশিরভাগই ছিল বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, ভক্ত, সমর্থক। ’৭৫-এর আগে গুটিকয়েক বাম দলের নেতাকর্মী ছাড়া অবশিষ্ট হিন্দুরা ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বিএনপির জন্ম হলে হাতেগোনা কিছু সংখ্যালঘু সেই দলে ভিড়লেও সংখ্যালঘুদের মূলধারাটি রয়ে যায় আওয়ামী লীগের সমর্থনেই। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে যতদিন বিএনপি ছিল, ততদিন তিনি চেষ্টা করেছিলেন সংখ্যালঘুদের এক অংশকে তার রাজনৈতিক বিশ্বাসে শামিল করতে। কিছুটা কাজ হলেও খুব বেশি সফলতা লাভ করতে পারেননি জেনারেল জিয়া। পরবর্তী সময়ে বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আসার পর তার দলে সংখ্যালঘুর সংখ্যা কমে প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছে। একসময় এরশাদের জাতীয় পার্টিও সংখ্যালঘুদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে। কিছু সংখ্যালঘু এরশাদের সঙ্গে এখনও আছে। তবে সংখ্যার বিচারে তা উল্লেখ করার মতো নয়। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পটভূমিকায় বিভিন্ন বাম দল সংখ্যালঘুদের একটি অংশকে ধরে রাখলেও সংখ্যালঘুদের মূল অংশটি আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবেই এখনও আছে। খালেদা জিয়ার বিএনপিতে হাতেগোনা কয়েকজন নেতা থাকলেও ওই নেতাদের পরিবারের নিকটতম আত্মীয় ছাড়া আর বিশেষ কেউ তাদের সঙ্গে নেই বলেই মনে হয়। বিএনপি সংখ্যালঘুদের সমর্থনের বিষয়ে কখনও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারেনি। অদৃশ্য কারণে এবং ধর্মীয় রাজনীতির কারণে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সংখ্যালঘুদের ভোট বা সমর্থনের চেষ্টা কখনও করতে পারেনি। জামায়াত পুরোপুরিভাবেই মৌলবাদভিত্তিক রাজনীতি করে বিধায় মহিলা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা তাদের দল থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেছে সবসময়। জামায়াত তার দলে একজন সংখ্যালঘুকেও নিয়ে দেখাতে পারেনি যে, তাদের সঙ্গে অন্তত একজন সংখ্যালঘু আছে।
রাজনৈতিক দলে সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব থাকুক আর নাই থাকুক, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সব দলেই সংখ্যালঘু ইস্যু নিয়ে একটি রাজনীতি সব সময়ই চলেছে এবং এখনও আছে। জামায়াতের মতো দলেও সংখ্যালঘু ইস্যু নানাভাবে গবেষণার উপাদান হয়ে ওঠে। রাজনীতির মাঠে তাণ্ডব অথবা আলোড়ন সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করলে জামায়াত সবার আগে টার্গেট করে সংখ্যালঘুদের জানমাল আর মন্দিরকে। মন্দির ভেঙে দিয়ে, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে সংখ্যালঘুদের বিপদে ফেলে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায় জামায়াত। সংখ্যালঘুরা দেশ ছাড়লে জামায়াতের মতো মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর দু’দিক থেকে লাভ। প্রথমত, ভোটের হিসাবে যারা নিশ্চিত বিপক্ষে অবস্থান করবে, তারা দেশ ছাড়লে ভোটের হিসাবে লাভ হয়। দ্বিতীয়ত, হিন্দুরা দেশ ছাড়া মানেই বাড়িঘর-সম্পত্তি ছেড়ে যাওয়া। আর সেখানে বিনা অর্থে অথবা কম মূল্যে নতুন সম্পত্তি অর্জনের সুযোগ। সংখ্যালঘু ইস্যুতে উল্লিখিত দুটি সুবিধার সুযোগ যে শুধু জামায়াতের মতো কট্টর মৌলবাদী দলই গ্রহণ করছে তাই নয়, বরং এর সুবিধা নিয়েছে অন্যান্য দলও। এমনকি হিন্দুদের বাড়িঘর অবৈধভাবে দখল করার তালিকায় আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দলেরও অনেকে আছে। কাজেই ঘুরেফিরে সংখ্যালঘুরা রাজনীতির সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব নিয়ে বসবাস করছে। সংখ্যালঘুদের এমন গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি যে শুধু বাংলাদেশেই রয়েছে তা নয়, সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক ইস্যুটি নানা দেশেই দৃশ্যমান। সংখ্যালঘুদের বিষয়ে বিশ্ব সমাজও সতর্ক ও সোচ্চার। তাই যখন ভারতের গুজরাটে সংখ্যালঘু মুসলমানদের হত্যা করা হয়েছিল, তখন সারা বিশ্ব এর নিন্দায় সুর মিলিয়েছিল। গুজরাটের সংখ্যালঘু নিধনের হোতা মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ মোদি তাই আজও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের মধ্যে আছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মিয়ানমার সফরে এসে সবার আগে সে দেশে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা নিধনের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন। বাংলাদেশে যখন বিএনপি ক্ষমতায় এসে সংখ্যালঘুদের ওপর ব্যাপকভাবে অত্যাচার করেছিল, তখনও বিশ্ব সমাজ তার নিন্দায় সোচ্চার ছিল।
হিন্দু হলেই যে কারও সঙ্গে ভারতের কাল্পনিক সম্পর্ক খুঁজে বেড়ানো একশ্রেণীর রাজনৈতিক দলের পুরনো অভ্যাস। এভাবে অপরাজনীতির চর্চা করে তারা দেশপ্রেমিক সংখ্যালঘুদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ করেছে বারবার। মনের কষ্টে সহায়-সম্পত্তি ত্যাগ করে অনেক সংখ্যালঘুই দেশ ছেড়েছে ইতিমধ্যে। পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, অধিকতর শিক্ষিত ও সম্পদশালী সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশ ছেড়ে শুধু ভারতেই নয় বরং বেশি মাত্রায় গিয়েছে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে।
সংখ্যালঘু সংখ্যায় কম হলেও একটি দেশের রাজনৈতিক বিচারে তাদের অস্তিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যালঘুদের অত্যাচার করা, তাদের ঘরবাড়ি দখল করা, দেশ ত্যাগে বাধ্য করা- এসব কাজ খুব সহজ মনে হলেও বিশ্ব দরবারে এর ক্ষতিকর দিকটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্র ও সরকার যে কোনো দেশের সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার বিষয়টিতে গুরুত্ব না দিলে আজকের বিশ্বে সেই সরকার ও রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সমাজের সমালোচনার সম্মুখীন হয়। বিশ্বায়নের যুগে আজ কোনো দেশই বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে না। তাই বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের গণতন্ত্রমনা রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি লাভের আশায় সংখ্যালঘুদের আস্থার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
মেজর সুধীর সাহা (অব.) : কলামিস্ট

আলোচনায় বসলে জট খুলে যাবে

প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ১৮-দলীয় জোট আন্দোলনের নামে দেশজুড়ে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তা যেমন জনগণের জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে চলেছে, তেমনি দেশকেও ঠেলে দিচ্ছে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে। তাদের এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতি জনসমর্থন নেই। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, যেই দলটির নিবন্ধন নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বাতিল হয়ে গেছে, তাদের উদ্দেশ্য কোনোভাবেই নির্বাচন নয়।
তারা দেশে একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে চাইছে। আমার ধারণা, বিএনপি নেতৃত্ব মৌলবাদী দলটির খপ্পরে পড়ে ধবংসাত্মক কর্মসূচির নামে জুলুম চলাচ্ছে। ৪৮ ঘণ্টা অবরোধের নামে ১৮-দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা নির্বিচারে বোমা মেরে মানুষ হত্যা করছেন, জাতীয় সম্পদ ধ্বংস করছেন, ট্রেনে আগুন দিয়েছেন। এটি তো আন্দোলন হতে পারে না। নির্বাচন নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, আলোচনার মাধ্যমেই তা সমাধান করতে হবে। কিন্তু বিরোধী দল যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে গোঁ ধরে বসে থাকে, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না। নির্বাচনও ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। আওয়ামী লীগ সব দলকে নিয়েই নির্বাচন করতে চায় এবং এই উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছেন, যদিও পঞ্চদশ সংশোধনী বলে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করার কথা।
ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি দল নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দিয়েছে। প্রধান বিরোধী দল এলে এটি পূর্ণতা পাবে। বিরোধী দলের উচিত রাস্তায় জ্বালাও-পোড়াও না করে, আন্দোলনের নামে জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি না করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকালও বলেছেন, আলোচনার দরজা খোলা আছে। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দলকে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে যোগদানেরও আহ্বান জানিয়েছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে অবরোধ পালন করছে বিরোধী দল। এর প্রয়োজন ছিল না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদও বলেছেন, দুই পক্ষের সমঝোতা হলে তফসিল পুনর্নির্ধারণ করা হবে। নির্বাচনই যদি বিরোধী দলের উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তাদের বলতে হবে আপত্তি কোথায়? কোথায় কোথায় সমস্যা আছে, তারা বলুক। আলোচনার মাধ্যমে সেগুলোর সমাধান করা যাবে। সর্বদলীয় সরকারে যোগ দিলে তারাও প্রশাসনের অংশ হয়ে যাবে, সে ক্ষেত্রে তারা এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। আর যদি তাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকে, সেটি ভিন্ন কথা। সবাইকে মনে রাখতে হবে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনসংক্রান্ত সবকিছু নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে।
এখন তারাই ঠিক করবে, কবে ও কোথায় কাকে নিয়োগ করতে হবে, কাকে বদলি করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে। এত দিন বিরোধী দলই নির্বাচনে সেনাবাহিনী নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন যখন সেনা মোতায়েনের কথা বলছে তখন বিরোধী দলের সুর পাল্টে গেছে। এটি স্ববিরোধিতা। ছয়জন বিশিষ্ট নাগরিক সমস্যা সমাধানে গত মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে সংকট সমাধানে তাঁর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। তাঁরা কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। আমরা যতটুকু জানতে পারছি, তাতে বিশিষ্ট নাগরিকেরা সংবিধানের ভেতরেই একটি সমাধান বের করতে চাইছেন। এ ব্যাপারে তাঁরা রাষ্ট্রপতিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। আমরা ছয় বিশিষ্ট নাগরিকের এই প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানাই। আমরাও এত দিন বলেছি, যা করার সংবিধানের মধ্যেই করতে হবে, সংবিধানের বাইরে যাওয়া যাবে না। কিন্তু বিরোধী দল বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে, এখনো করছে। আমরা ছয় নাগরিকের এই প্রস্তাব ইতিবাচক বলেই মনে করি।
কিন্তু এটি বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করছে বিরোধী দলের মনোভাবের ওপর। তারা যদি বরাবরের মতো নির্দলীয় বা তত্ত্বাধায়ক সরকারের দাবিতে অনড় থাকে, তাহলে সমস্যার সমাধান কঠিন হবে। ছয় বিশিষ্ট নাগরিকের আলোচনায় নির্বাচনকালীন সরকারের রুলস অব বিজনেস পরিবর্তনের কথা এসেছে। বিরোধী দল থেকেও প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতার ব্যাপারে আপত্তির কথা জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই একক ক্ষমতার বিষয়টি কিন্তু বিএনপিই সংযুক্ত করে দ্বাদশ সংশোধনীতে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। তারপর আমরা মনে করি, বিরোধী দল নীতিগতভাবে সংবিধানের আলোকে সমস্যার সমাধান চাইলে রুলস অব বিজনেস নিয়ে আলোচনা হতে পারে। জট খুলে যাবে। দুই দলের মহাসচিব পর্যায়েও যোগাযোগের কথা আমরা গণমাধ্যমে জেনেছি। সবকিছুই ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে বলে আমাদের ধারণা। সে ক্ষেত্রে ছয় বিশিষ্ট নাগরিকের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
আমাদের সদিচ্ছার অভাব নেই। এখন বিরোধী দলকেও এগিয়ে আসতে হবে। হরতাল-অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করে আলোচনায় বসতে হবে। আর আলোচনায় বসলে বিরোধী দলের যে প্রধান দাবি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি, সে ক্ষেত্রে কোথায় কোথায় ঘাটতি আছে সেটি সহজেই সমাধান হয়ে যাবে। মৌলিক বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হলে এসব খুঁটিনাটি আলোচনার টেবিলে সমাধান হবে। বিরোধী দলের নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, তাঁরা যা-ই ভাবুন না কেন, বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা এখন নির্বাচনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। তাঁদের মতামত উপেক্ষা করে নেতারা নির্বাচন বর্জন করলে তা তাঁরা মানবেন না। জনগণও তাঁদের কর্মসূচির প্রতি সমর্থন দেবে না। ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন: উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

প্রধানমন্ত্রীর অনড় অবস্থানই বাধা

একতরফাভাবে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন নিয়ে সংঘাতময় অবস্থা আরও ঘনীভূত হয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার নির্বাচনকালীন ‘সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা’ও গঠন করেছে। অথচ সেখানে প্রধান বিরোধী দল অনুপস্থিত। মূল সমস্যা, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন, তা নিয়ে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী সর্বসময় ক্ষমতার অধিকারী।
সব দলের সব মন্ত্রী যদি কোনো সিদ্ধান্তও নেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া তা বাস্তবায়িত হবে না। এ কারণেই প্রধান বিরোধী দল প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে নির্দলীয় সরকারের দাবি জানাচ্ছে, যাতে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা যেতে পারে। স্পষ্টতই প্রধানমন্ত্রীর এই ক্ষমতা এবং তা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সেই ক্ষমতা ত্যাগ না করাই সংকটের গোড়ার কারণ। একজন আইনজীবী হিসেবে আমি মনে করি, আমাদের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর যে একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত দেওয়ার ও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেওয়া না-দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে, সবার আগে তার মীমাংসা হতে হবে। নির্বাচনের সময়ের জন্য যদি এই ক্ষমতা স্থগিত করে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়, যা নির্বাচন কমিশনসহ নির্বাচনকালীন ব্যবস্থা পরিবর্তন ও পুনর্গঠন করে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতার অধিকারী থাকবে, তাহলে বিরোধী দলের নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি অনেকটা পূরণ হবে।
কেননা, প্রধানমন্ত্রীকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী রেখে গঠিত মন্ত্রিসভা আসলে ক্ষমতাবিহীন মন্ত্রিসভা, প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রীই একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী থাকবেন। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী কেবল দেশের প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি আওয়ামী লীগেরও সভাপতি, সেহেতু তাঁকে স্বপদে বহাল রেখে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, এমন বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ নেই। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই নির্বাচনের সময় একচ্ছত্র নির্বাহী ক্ষমতা ত্যাগ করে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। যে সরকারের মন্ত্রিসভা মতৈক্যের ভিত্তিতে প্রশাসনিক অদলবদলসহ নির্বাচন কমিশনেরও পুনর্গঠনের অধিকারী থাকবে। এ ছাড়া সংঘাতময় অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় নেই। এই অনিশ্চয়তা অনির্দিষ্ট সময় ধরে চললে জানমালের ক্ষতি হবে, অর্থনীতি ধ্বংস হবে এবং বহু কষ্টে অর্জিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্ক দেখা দেবে। এ অবস্থা তৈরির দায় সরকারকেই বহন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের বিধান জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে করা হয়নি। উচ্চ আদালতেরও নির্দেশনা ছিল: রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সংসদ ইচ্ছা করলে দেশের স্বার্থে আগামী দুই-তিনটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। এই নির্দেশনার আলোকে সরকারের উচিত ছিল বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করে গ্রহণযোগ্য অবস্থান নেওয়া।
অথচ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার আগেই সরকার সংবিধান সংশোধন করে ফেলল! সুপ্রিম কোর্টের আপিলাত ডিভিশনের সংক্ষিপ্ত রায়ের ওপর তাদের এতই যদি আস্থা থাকত, তাহলে রায়ে উল্লিখিত ওই পর্যবেক্ষণে কর্ণপাত না করে হঠাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তুলে দিত না। আজকের এই সংঘাতময় অবস্থার জন্য দায়ী এই একতরফা রদবদল। আমাদের নির্বাচন কমিশনেরও উচিত ছিল রায়ের দিকনির্দেশনা আমলে নেওয়া। ওই রায়ে লেখা ছিল, নির্বাচনের ৪২ দিন আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে সরকারও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, নির্বাচন কমিশনও ভ্রুক্ষেপ করেনি। আইনজ্ঞদের কেউ কেউ বলেন, এই রায় বাইন্ডিং কিছু নয়। যদি রায়ের ওপর এতই সমীহ থাকে, তাহলে গণতন্ত্রের স্বার্থে এই পর্যবেক্ষণ তো পালনীয় ছিল।আমরা আশা করব, সাংবিধানিকভাবে যে অবস্থানেই থাকুন না কেন, রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতি দেশ ও দেশবাসীর স্বার্থে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সমঝোতার ভিত্তিতে দেশকে এই সংঘাতময় অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য বলবেন। তিনি একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও অভিজ্ঞ আইনজ্ঞ। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবার থেকে এসেছেন।
তাঁরও উচিত হবে একগুঁয়েমি করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার পথ থেকে সরে আসা। বর্তমান নির্বাচন কমিশন নির্বাচনকালীন বিধি তথা আরপিও পরিবর্তন করে মনোনয়ন-বাণিজ্যের পথ খুলে দিয়েছে। আগে কমপক্ষে তিন বছর কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য না থাকলে কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারতেন না। কিন্তু এখন যেকোনো দলের যেকোনো ব্যক্তি বহিষ্কৃত হলে বা পদত্যাগ করে অন্য দলে যোগ দিয়ে নির্বাচন করতে পারবেন। এটা প্রকারান্তরে দল ভাঙার প্ররোচনা এবং টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন কেনার সুযোগ করে দেওয়া। ফলে দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। যে রাজনীতিবিদ কোনো দল থেকে মনোনয়ন পাবেন না, অর্থের বিনিময়ে তিনি অন্য দল থেকে নির্বাচনের প্রচেষ্টা চালাবেন। নির্বাচন কমিশন এর মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গনকে কলুষিত করছে।
এসব কারণে নির্বাচন কমিশনের ওপর বিরোধী দলের আস্থা নেই। এ রকম এক সংঘাতময় অবস্থায় নির্বাচন কমিশন সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব করেছে। এটা হবে হঠকারী। এই একদলীয় নির্বাচনে সংঘাতের মুহূর্তে, যখন নির্বাচন নিয়ে জনমনে বিভক্তি বিরাজ করছে, তখন সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করা যাবে না। পরিহাস হলো, আমরা যখন নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে সেনাবাহিনী থাকার প্রস্তাব করেছিলাম, তখন নির্বাচন কমিশন বলেছে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন নেই। এমনকি আরপিওতেও তারা সেনাবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করেনি। কিন্তু এখন জনরোষের কবল থেকে রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীকে ঢাল করা হচ্ছে। এতে সেনাবাহিনী কেবল দেশের মধ্যেই বিতর্কিত হবে না, আন্তর্জাতিকভাবেও তাদের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। খোন্দকার মাহবুব হোসেন: আইনজীবী ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা।

সীতাকুণ্ডে কী হচ্ছে!

ভীতি-আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে সীতাকুণ্ড। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এ এলাকায় হেন কোনো অপকর্ম নেই, যা ঘটেনি। অথচ প্রশাসন যেন কিছুতেই কিছু করতে পারছে না। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অস্থায়ী ক্যাম্প করেও সামাল দেওয়া যাচ্ছে না পরিস্থিতি। তুচ্ছ যেকোনো অজুহাতে মহাসড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, যাত্রীদের ওপর হামলা, তাদের মালপত্র লুটপাট ইত্যাদি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আশ্বাসবাণী শোনানো হচ্ছে, কিন্তু আশ্বস্ত হতে পারছে না সাধারণ মানুষ। একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে এই এলাকার কিছু দুর্বৃত্ত যেন ঘোষণা করেছে, এটি তাদের অভয়ারণ্য। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটি জিম্মি হয়ে পড়ায় সাধারণ যাত্রীরা যেমন পোহাচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগ, তেমনি বন্দর থেকে আমদানি-রপ্তানিপণ্যের আনা-নেওয়ায় প্রতিবন্ধকতার কারণে বিরাট অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়ছে দেশ। এই নৈরাজ্যের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের এক সভায় চেম্বারের একজন পরিচালক বলেছেন, ‘যেসব রাজনৈতিক নেতা মহাসড়কে গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন, তাঁদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করার জন্য পরিবহনশ্রমিকদের আহ্বান জানাচ্ছি।
প্রয়োজনে আমরা পরিকল্পনাকারীদের ঠিকানা শ্রমিকদের হাতে তুলে দেব।’ কতটা হতাশা থেকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কতটা আস্থাহীনতা থেকে একজন ব্যবসায়ী নেতা শ্রমিকদের প্রতি আইন হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানাতে পারেন, তা সহজেই অনুমেয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ও পুলিশ কমিশনার। তাঁরাও গলা মিলিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতার সঙ্গে। ডিআইজি সাহেব গাড়িতে লাঠি রাখার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, দুষ্কৃতকারীদের সংখ্যা সাত-আটজনের বেশি হবে না। লাঠি হাতে শ্রমিকেরা প্রতিরোধ করলে কেউ গাড়িতে আগুন দেওয়ার বা ভাঙচুর করার সাহস পাবে না। খোদ ডিআইজি বলছেন, দুষ্কৃতকারীরা মাত্র সাত-আটজন, লাঠি হাতে প্রতিরোধ করলেই হবে, ব্যাপারটা এতই সাধারণ? তাহলে এই প্রশ্ন আমাদের মনে জাগবে না, এত জনবল নিয়েও কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা এই অরাজকতার নিরসন করতে পারল না? ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড এলাকায় শত শত গাড়ি আটকা পড়েছে, রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কাচের টুকরা, দাউ দাউ করে পুড়ছে গাড়ি। এসব দৃশ্য নিয়মিত উঠে আসছে পত্রিকার পাতায়। কিন্তু প্রতিকার কিছুই হয়নি।
কয়েক দিন আগে ছুটির দিন শুক্রবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসার পথে সীতাকুণ্ডে এ রকম এক অবরোধের কবলে পড়ে পথে দুঃসহ রাত কাটাতে হয়েছে কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রীকে। অবরোধ তুলে নেওয়ার পর বিশাল যানজটের কবলে পড়ে নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি প্রায় আড়াই হাজার ছাত্রছাত্রী। সেই ছাত্রছাত্রী ও তাঁদের অভিভাবকদের কান্নায় সেদিন অবর্ণনীয় এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল ক্যাম্পাসে। যেসব ছাত্রছাত্রী (প্রায় দেড় হাজার) বাড়তি দেড় ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছাতে পেরেছিলেন কেন্দ্রে, তাঁরা পাননি পরীক্ষা দেওয়ার বাড়তি সময়। তাহলে এই চার হাজার ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাজীবনের এত বড় বিপর্যয়ের দায় কার? গত ঈদের সময় বাড়ি ফেরার পথে সীতাকুণ্ড এলাকায় এ রকম সহিংসতার কবলে পড়া এক নারী সাংবাদিক তাঁর বীভৎস অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছিলেন। যে গাড়িতে তিনি ছিলেন, দুর্বৃত্তরা সেই গাড়ির চালকের গায়ে আগুন দিতে গেলে লাফিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়েছিলেন ওই সাংবাদিক। সেখানে সম্মুখীন হয়েছিলেন আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির। কিছু লোক যাত্রীদের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে মালামাল, টাকাপয়সা। এমনকি মেয়েদের গায়ে হাত দিতেও দ্বিধা করছে না এই দুর্বৃত্তরা। কারা এরা? মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় ঘোষণা শুরু হওয়ার পর থেকেই সীতাকুণ্ডের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নাশকতার ঘটনা ঘটতে থাকে। তবে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে বিরোধী দলের টানা হরতাল কর্মসূচি শুরু হলে নাশকতার মাত্রা বেড়ে যায়। তিন দফায় ১০ দিনের হরতালের সময় প্রায় প্রতিদিন অবরোধ,
গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সুতরাং, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা যে এর সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিএনপির এক স্থানীয় নেতা ও শিল্পপতি এ কর্মকাণ্ডে অর্থের জোগান দিচ্ছেন এবং তাঁর মালিকানাধীন শিপইয়ার্ডের বহিরাগত শ্রমিকেরা ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহূত হচ্ছেন, এমন তথ্য ছাপা হয়েছে সংবাদপত্রে। কিন্তু মাঠে বিএনপির চেয়ে জামায়াতের উৎসাহ যে এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি, এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন সাংবাদিকসহ প্রত্যক্ষদর্শী সবাই। এমনকি বিরোধী দলের কর্মসূচিতে যোগ দিতে সীতাকুণ্ড জামায়াতের এই গ্রুপ চট্টগ্রাম শহরে এসেও ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াওয়ে অংশ নিয়েছে বলে অভিযোগ। সীতাকুণ্ডের সাংসদ বা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান—সবাই আওয়ামী লীগের। এমনকি পার্শ্ববর্তী মিরসরাই এলাকার সাংসদ ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও আওয়ামী লীগের। এ এলাকার সাংসদ দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোশাররফ হোসেন। কিন্তু তাঁরা নিজেদের এলাকায় এমন দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারছেন না। কোন্দলে জর্জরিত স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়তে যতটা উৎসাহী, ততটা আর কিছুতেই নয়। অবশেষে গতকাল শনিবার সীতাকুণ্ড আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এক সভায় মিলিত হয়েছেন করণীয় নির্ধারণ করতে। নেতা-কর্মীদের মধ্যে কিছুটা মান-অভিমান আছে বলে জানিয়েছেন মোশাররফ হোসেন। জানি না মাঠে নামানোর কাজে কতটা সফল হবেন তাঁরা।
তবে এ রকম অরাজক পরিস্থিতিতে যে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা ‘অভিমান’ করে ঘরে বসে থাকতে পারেন, তাঁদের পক্ষে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করা কঠিন। সীতাকুণ্ডের ছোট কুমিরা থেকে বটতল এলাকা পর্যন্ত ১৫টি পয়েন্টকে ‘বিপজ্জনক এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। বিপদ চিহ্নিত করা গেছে, কিন্তু এর প্রতিকার করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ডিআইজি বলেছেন, দুষ্কৃতকারীরা সাত-আটজনের বেশি হবে না। প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করে এ কথা বলেছেন বলে মনে হয় না, কিংবা সাধারণ মানুষ যাতে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে না পড়ে, এ জন্যও বলে থাকতে পারেন। কিন্তু অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? আমাদের ধারণা, এ ধরনের ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলে দুর্বৃত্তদের (কিংবা বিক্ষোভকারী) সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে আগেভাগেই তাদের চিহ্নিত করা ও আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পথটিই অধিকতর কার্যকর। গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন কাজটি যথাযথভাবে করতে পারেননি, অন্তত মাসাধিককাল ধরে চলতে থাকা নৈরাজ্য সেই ইঙ্গিতই দেয়। ভবিষ্যতে পারবেন কি না, তা-ও জানি না। পত্রপত্রিকার খবর থেকে জানা যায়, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সীতাকুণ্ডের ঘটনায় উদ্বিগ্ন। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য চট্টগ্রামের সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত হওয়ায় উদ্বেগটা আরও বেশি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী। এই উদ্বেগের চাপে মাঠপর্যায়ের প্রশাসন কতটা সক্রিয়হয়, দেখার বিষয় সেটাই!
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

আন্দোলন কোথায়?

থাইল্যান্ডে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে। আন্দোলনকারীদের দাবি প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগ। তিনি নাকি তাঁর দুর্নীতিবাজ ভাইকে বাঁচাতে পার্লামেন্টে আইন পাস করেছেন। আন্দোলন ঠেকাতে জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা। গত রোববার শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এর পরও চলছে। রাস্তায় নেমেছেন আন্দোলনকারীরা। বেশ কিছু সরকারি মন্ত্রণালয় অবরুদ্ধ অবস্থায় আছে চার দিন ধরে। এই বিক্ষোভে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। বিবিসি, সিএনএন ও আল-জাজিরার পর্দায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়েনি। বাংলাদেশে বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়েছিল মঙ্গলবার সকালে। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৮+৬=১৪। এই দুর্ভাগাদের মধ্যে নারী-পুরুষ, বিরোধী-সরকারি, শ্রমজীবী মানুষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য থেকে শুরু করে সব শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। কীভাবে মারা গেলেন এঁরা? আগুনে পুড়ে, ককটেল হামলায়, গুলিতে, কোপাকুপিতে! এখানে আন্দোলন কোথায়? এসব তো দুর্বৃত্তদের কাজ। ফৌজদারি অপরাধ। সোমবার সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশনের ‘তফসিল’ ঘোষণার পর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় এর নাম ‘অবরোধ’।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজপথ, রেলপথ ও নৌপথ। ব্যস, বিরোধী দলের দায়িত্ব শেষ! আর দেশের মানুষের উদ্বেগের শুরু। অবরোধে গাড়ি চলবে তো? অবরোধ কি নির্দিষ্ট কিছু জায়গায়? স্কুল খোলা থাকবে তো? দোকানপাটেরই বা কী হবে? হরতাল আর অবরোধের মধ্যে পার্থক্যটাই বা কী? কারও তরফে এর কোনো জবাব নেই। ভয়ে পরদিন গাড়ি বের করেননি অনেকে। অনেক স্কুল খোলা হয়েছে, আবার অনেক স্কুল ছিল বন্ধ। কেউ কেউ বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে গিয়ে ফেরত এসেছেন। কেউ সেই ঝুঁকিই নেননি কিন্তু স্কুল ছিল খোলা। একই পরিবারের দুটি শিশু—একজনের স্কুল ছিল খোলা, অন্যজনের বন্ধ! ‘অবরোধ’ নামের আন্দোলনটি এ দেশে নতুন নয়। এর আগে এ ধরনের কর্মসূচিগুলোর কিছু নির্দিষ্ট দিক ছিল। কোন কোন জায়গায় রাজপথ, রেলপথ বা নৌপথ অবরোধ হবে বা কোন নেতারা কোন কোন স্পটে থাকবেন, সেটাও বলা হতো। এখন এসবের কোনো বালাই নেই। সাংবাদিকদের ডেকে বলে দিলেই হলো কাল থেকে অবরোধ! এর কোনো ব্যাখ্যা, কর্মসূচির বিস্তারিত কিছু—এসবের দরকারই নেই। দরকার থাকবেই বা কেন, কর্মসূচি বলতে যা বোঝায় সে ধরনের কিছুতে তো আর আন্দোলন নেই। বলা হচ্ছে রাজপথ, রেলপথ ও নৌপথ অবরোধ, কিন্তু অবরোধকারী বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা কই? তাঁরা নিরাপদে বাসায় বসে কিছু দুর্বৃত্তকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছেন।
এই দুর্বৃত্তরা নিজেদের সুবিধামতো জায়গা বেছে নিয়ে বাস, গাড়ি ও সিএনজিতে আগুন দিচ্ছে, লোকজন পুড়িয়ে মারছে। ককটেল ছুড়ে পালিয়ে যাচ্ছে, উপড়াচ্ছে রেলপথ। অবরোধ সফলের ভালো পথই বেছেছে বিরোধী দল! রাস্তায় বিরোধী দলের কেউ নেই, এর পরও এর নাম নাকি আন্দোলন! অবরোধ ডাকা হয়েছে কিন্তু অবরোধ করার কেউ নেই। বিরোধী দলের নেতারা বেশ কিছুদিন ধরেই বলে আসছেন সরকার তাঁদের মাঠে নামতে দিচ্ছে না, আটক করছে, জেলে ভরছে। ঘটনা সত্যি, কিন্তু জেল-জুলুমের এত ভয় থাকলে আন্দোলনের দরকার কী! নিজেরা ঘরে বসে থাকবেন আর দুর্বৃত্তরা মাথায় ককটেল ফুটিয়ে মারবে আনোয়ারা বেগমের মতো এক চতুর্থ শ্রেণীর ব্যাংক কর্মচারীকে! আগুনে পোড়ানো হবে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সাবেদ আলীকে। রাস্তা অবরোধ করতে হলে তো রাস্তায় নামতে হবে। রেলগাড়ি থামাতে হলে রেলপথের ওপর শুয়ে পড়তে হবে। রাতের অন্ধকারে রেললাইনের নাটবল্টু খুলে ট্রেন ফেলে দেওয়া যায়, কিন্তু সেটা কি আন্দোলন হলো? ‘অবরোধ’ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে সাংবাদিকেরা অনেক কষ্ট করে এর একটি ব্যাখ্যা বের করতে সক্ষম হলেন বিএনপি নেতাদের কাছ থেকে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিএনপির এক নেতা। বলেছেন, হরতাল আর অবরোধের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো হরতালে সবকিছুই বন্ধ রাখা হয়।
যেমন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যান চলাচল, দোকানপাট, অফিস-আদালত—সব। কিন্তু অবরোধে শুধু যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। অর্থাৎ অবরোধ হলে ওই সড়কে যান চলাচল করতে পারবে না। নৌপথ ও রেলপথের ক্ষেত্রেও নাকি একই কথা প্রযোজ্য। বাহ, বেশ! যেদিন রাতে কর্মসূচি দেওয়া হলো তখনই কি এটা বলা যেত না? আর এই ব্যাখ্যাতে কি বিষয়টি পুরো পরিষ্কার হলো? অবরোধ হলে নাকি ‘শুধু যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়’। প্রতিবন্ধকতা তৈরির তেমন কোনো নমুনা তো আমার দেখলাম না। যা হলো তা তো বিভিন্ন স্থানে যানবাহনের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা, ককটেল ছোড়া, গাড়িতে আগুন দেওয়া। প্রতিবন্ধকতা বা অবরোধ হলো কোথায়? আর এই পরিস্থিতিতে নাকি স্কুল অবরোধের আওতামুক্ত! সত্যিই বড় এক তামাশা! যানবাহন চলবে না, চললে ককটেল পড়বে, আগুন দেওয়া হবে—বাচ্চারা স্কুলে যাবে কিসে করে? আমাদের দেশটা তো ইংল্যান্ড বা ইউরোপ হয়ে যায়নি যে বাচ্চারা নিজ নিজ এলাকার স্কুলেই পড়ে। ধানমন্ডির যে বাচ্চাটি উত্তরায় স্কুল করে তার যাওয়ার উপায় কী? আগে প্রতি হরতালের সময় পত্রিকায় ‘হরতালের আওতামুক্ত’ বলে একটি ঘোষণা থাকত। রাজনৈতিক দলগুলো থেকে এ নিয়ে একটি প্রেস রিলিজ দেওয়া হতো। এখন দলগুলো আর এর মধ্যে নেই। দলগুলো আর আন্দোলনে নেই। নিজেরা ঘরে বসে ‘আন্দোলন’ নামক কাজটি এখন সারা হচ্ছে দুর্বৃত্তদের দিয়ে।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

ইরান কী পাবে?

সমঝোতার পর দুই ‘শত্রু’ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
গত রোববার ভোররাতে জেনেভায় ইরান ও বিশ্বের শক্তিধর ছয়টি রাষ্ট্রের মধ্যে এক সমঝোতা চুক্তি সই হয়েছে, যেটিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। চুক্তিটিকে বলা হচ্ছে অস্থায়ী বা অন্তর্বর্তীকালীন। কারণ, তা কার্যকর থাকবে ছয় মাস। এ ছয় মাস ইরান চুক্তির শর্তগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ মেনে চলছে কি না, তা অপর পক্ষ পর্যবেক্ষণ করবে। ইরান তাদের সন্তুষ্ট করতে পারলে পরে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
রোববার স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটির মূল বিষয় হলো, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ আগামী ছয় মাস স্থগিত রাখবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৫ শতাংশ সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়ামই যথেষ্ট। পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে হলে আরও অধিক মাত্রায় সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন হয়। ইরান এ পর্যন্ত তাদের কয়েকটি পারমাণবিক কেন্দ্রে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে দেশটি পরমাণু অস্ত্র তৈরির উদ্দেশ্যেই অধিক মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে চলেছে। সদ্য স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ইরানের কাছে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকৃত যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম মজুত হয়েছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ আগামী ছয় মাসে তার অর্ধেকটা ডাইলুট করে সমৃদ্ধির মাত্রা ৫ শতাংশে নামাবে। ইরান আগামী ছয় মাস ৫ শতাংশের বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে না এবং নতুন কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকেন্দ্র স্থাপন করবে না। ব্যবহূত ইউরেনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াকরণেরও চেষ্টা করবে না ইরান। এসব শর্ত পালনের বিনিময়ে ইরান কী পাবে? এ বিষয়ে বলতে গেলে আগে সংক্ষেপে বলা প্রয়োজন যে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে আসছে বলে তার বিরুদ্ধে অনেকগুলো অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে বছরের পর বছর ধরে। এ কারণে ইরানের অর্থনীতি অত্যন্ত রুগ্ণ হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলের আগ্রাসী আচরণ ও সৌদি আরবের তিক্ত বৈরিতার কারণে ইরানের অনেক মানুষ যদিও মনে করে, তাদের পরমাণু অস্ত্রের মালিক হওয়া জরুরি, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক নানা অবরোধের ফলে ইরানের অর্থনীতির যে করুণ দশা হয়েছে, সেটাও ইরানি জনগণের জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এ রকম একটা মরিয়া পরিস্থিতিতে ইরান দৃশ্যত তাদের পরমাণু প্রকল্প আপাতত স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছে, যেন দেশটির বিরুদ্ধে বহাল বহুপক্ষীয় অবরোধগুলো শিথিল করা হয়। অন্ততপক্ষে ইরান তার বিপুল তেলভান্ডার ও সোনাসহ মূল্যবান ধাতুর কিছু অংশ বিক্রি করে অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরাবে।  স্বাক্ষরিত চুক্তিতে বলা হয়েছে, ইরানের তেল বিক্রি আরও কমে যায়, এমন সব প্রয়াসে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো বিরতি দেবে (পজ এফোর্টস টু ফারদার রিডিউস ইরানস ক্রুড অয়েল সেল)। বিভিন্ন দেশে তেল রপ্তানি বাবদ ইরানের প্রাপ্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া রয়েছে, অবরোধের কারণে ক্রেতা দেশগুলো সেই অর্থ ইরানের কাছে এত দিন পাঠাতে পারেনি। সদ্য স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ইরানের সেই অর্থ পাওয়ার পথে বাধা থাকবে না (যদিও কী পরিমাণ অর্থ হস্তান্তরিত হবে, সেটাও চুক্তির দুই পক্ষ আলোচনা করে স্থির করবে)।
বহির্বিশ্বের সঙ্গে ইরানের আর্থিক লেনদেনে অনেক নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিবন্ধকতা আছে। যেমন বহুজাতিক অনেক ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ও ব্যাংক ইরানকে সেবা দেয় না, ইরানের যেসব শিক্ষার্থী ইউরোপ-আমেরিকায় পড়াশোনা করে, তারাও বৈধ পন্থায় টিউশন ফির অর্থ ইরান থেকে নিতে পারে না। খাদ্য, ওষুধপথ্য, চিকিৎসার সরঞ্জামসহ অনেক মানবিক সেবাপণ্যও ইরান আমদানি করতে পারে না। এমনকি জাতিসংঘের চাঁদা বাবদ ইরানের প্রদেয় যে অর্থ বকেয়া রয়েছে, সেটা হস্তান্তরেরও কোনো বৈধ আর্থিক চ্যানেল নেই। রোববারের চুক্তিতে বলা হয়েছে: ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেটাতে মানবিক সেবাপণ্যের ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা দিতে বহির্বিশ্বের সঙ্গে ইরানের আর্থিক লেনদেনের জন্য একটি ‘ফাইন্যান্সিয়াল চ্যানেল’ সৃষ্টি হবে; নির্দিষ্ট কিছু বিদেশি ব্যাংক ও ইরানি ব্যাংকগুলোকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল, সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা ছয় মাসের জন্য স্থগিত রাখবে। এ রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইনস্যুরেন্স ও পরিবহনসেবার ওপরে নিষেধাজ্ঞাও স্থগিত হবে। ইরানের ওপর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পরমাণুসংক্রান্ত যে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ আছে তা থাকবে, তবে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও এ রকম নিষেধাজ্ঞা আছে, সেটাও থাকবে। তবে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে না। ইরানের ওপর একপক্ষীয় অবরোধ সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় জারি করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র; চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের আলোচনা সাপেক্ষে পরমাণুসংক্রান্ত আর নতুন কোনো অবরোধ আরোপ করা হবে না। এ চুক্তি অনুযায়ী আগামী ছয় মাস ইরান বাড়তি কিছু পাবে না; তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে তেল রপ্তানি বাবদ বিভিন্ন দেশের কাছে তার যে অর্থ প্রাপ্য আছে, এখন সে তা পেতে যাচ্ছে।
এ অর্থের পরিমাণ ৪২০ কোটি মার্কিন ডলার। আর বিভিন্ন অবরোধ স্থগিত রাখা হলে আগামী ছয় মাসে ইরানের আয় হতে পারে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু অবরোধ যদি তুলে নেওয়া হতো, তাহলে আগামী ছয় মাসে তেল বিক্রি থেকেই ইরানের আয় হতে পারত তিন হাজার কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু তা করা হয়নি, আগের মতোই নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি অপরিশোধিত তেল আগামী ছয় মাসও রপ্তানি করতে পারবে না। ইরান আসলে অ্যাটম বোমা চায়; কিন্তু সেটা বানাতে গেলে শক্তিধর বৈরীবিশ্ব তাকে ফতুর, ভুখা-নাঙ্গা বানিয়ে দিতে পারে। তাই ইরান আপাতত অ্যাটম বোমার স্বপ্ন সরিয়ে রাখতে বাধ্য হলো। কিন্তু তাতেও তার বিপদ যাবে না। প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ ইসরায়েল ফুঁসছে হাসান রুহানি বারাক ওবামাকে বোকা বানালেন ভেবে। মাথা খারাপ করে সে ইরানের দিকে মিসাইল না ছুড়ে দেয়! সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের নাকি গোপনে কথা হয়েছে, ইরানকে শায়েস্তা করতে ইসরায়েলকে সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে। কিন্তু এ রকম সম্ভাবনা বোধ হয় কম। ইরানের বিপদ বরং কূটনৈতিক; ওবামা প্রশাসনের লোকজন নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, ইরান যদি আগামী ছয় মাস চুক্তি মেনে না চলে, যদি লুকোছাপা করে, চোখে ধুলা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে এ অস্থায়ী চুক্তি তো বাতিল করবেই, উপরন্তু নতুন করে আরও অনেক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। এমনকি ইরানের প্রকল্পগুলোর ওপর তখন সামরিক আক্রমণও যে হবে না, এটা কে নিশ্চিত বলতে পারে?
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

স্বৈরশাসকের কালো ছায়া

শহীদ শামসুল আলম খান মিলন
আজ ২৭ নভেম্বর, শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলনের ২৩তম শাহাদাৎ বার্ষিকী। ১৯৯০-এর এ দিনে সামরিক স্বৈরশাসকের ভাড়াটিয়া গুন্ডাবাহিনীর বুলেট মিলনের প্রাণপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছিল। সেদিন আমার জীবন, আমার পরিবারের প্রতিটি মানুষের জীবন ওলটপালট হয়ে গেল মিলনের অন্তর্ধানের পর। মিলন কিশোর বয়স থেকেই সমাজসচেতন, দেশপ্রেমিক ও অত্যন্ত কর্তব্যপরায়ণ ছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ছাত্রাবস্থায় মিলন ছাত্রলীগ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়।
বিভিন্ন সময়ে মিলন ছাত্রলীগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ শাখার সাহিত্য সম্পাদক, ক্রীড়া সম্পাদক ও সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৮৫ সালে মিলন তৎকালীন পিজি হাসপাতালে বায়োকেমিস্ট্রিতে এমফিল কোর্সে ভর্তি হয়। সে বছরই দেশে তিন পেশার অর্থাৎ চিকিৎসক, কৃষিবিদ ও প্রকৌশলীদের আন্দোলন গড়ে ওঠে। মিলন এ তিন পেশা আন্দোলনের সমন্বয় কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিল। এ সময় মিলনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। কিন্তু পেশাজীবীদের সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে সরকার ওকে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে বাধ্য হয়। অবশ্য তার পরই শাস্তিস্বরূপ রৌমারী উপজেলায় বদলি করা হয়। মিলন তার সমগ্র সত্তা দিয়ে দেশকে ভালোবেসেছিল। অথচ আজ, শহীদ মিলনের উত্তরসূরিরা, নিজের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য পরস্পর হানাহানিতে লিপ্ত হতেও দ্বিধাবোধ করছেন না। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশ সংকটময় মুহূর্ত অতিক্রম করছে। কতিপয় রাজনীতিবিদের আচার-আচরণে মনে হয়, বাংলাদেশটা তাঁদের ইচ্ছানুযায়ী চলবে। এখানে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা বা মতামত মূল্যহীন। তাঁরাই যেন জনগণের ভাগ্যনিয়ন্ত্রক। তাঁরা ভুলে যান, জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে ২২ বছর ধরে পতিত স্বৈরাচার এরশাদকে নিয়ে দেশে রাজনৈতিক খেলা চলছে। জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও এ সেনাশাসক রাজনীতির জন্য,
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে, আমাদের নেতা-নেত্রীদের কাছে অপরিহার্য শক্তিরূপে বিবেচিত হচ্ছেন কেন? শিল্পী কামরুল হাসান যাঁর কার্টুন এঁকেছিলেন ‘বিশ্ববেহায়া’ আখ্যায়িত করে। নব্বইয়ের পরে দেশের দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল যাঁর বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিল, সেই স্বৈরশাসক আজ এ দুটি দলের কাছেই নির্বাচনের আগে জামাই-আদরে আদৃত হচ্ছেন। ‘ক্ষমতায় যাওয়া আর ক্ষমতায় থাকার নীতিহীন রাজনীতির’ খেলায় বাংলাদেশের রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে বলেই এমনটা সম্ভব হচ্ছে। মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের পর ‘সংসদীয় রীতিনীতি যেন এক ব্যক্তির ইচ্ছার কাছে পরাস্ত হলো’। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারব্যবস্থা নেই। তথ্যমন্ত্রী বর্ণিত ‘বহুদলীয় সরকারব্যবস্থাও’ নেই। বাংলাদেশের সংবিধানেও নেই। তাই ‘সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে’ বলে যাঁরা জোর গলায় দাবি করছেন, তাঁরা কি সত্যের অপলাপ করছেন না? নির্বাচনে কৌশলগত কারণে এবং সামরিক সরকারপ্রধান জেনারেল এরশাদকে তুষ্ট রাখার উদ্দেশ্যে সর্বদলীয় সরকারের মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টি পাঁচজনকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং আর একজনকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছে। স্বৈরশাসক এরশাদের জাতীয় পার্টি ছয়টি আসন পেয়ে ‘সর্বদলীয় মন্ত্রিসভায়’ সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। এমনকি স্বৈরাচারী আমলের ফার্স্ট লেডি সর্বদলীয় সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন। এ সংবাদ বাংলাদেশ চিকিৎসকসমাজের জন্য লজ্জাজনক। বহুরূপী জেনারেল এরশাদ,
সম্প্রতি ‘হেফাজতে ইসলামের’ প্রধান মাওলানা শফীর সঙ্গে ঐক্যজোট বেঁধে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন বলে পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে। তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য তাঁর দোয়া কামনা করেছেন। এতে নারীবিদ্বেষী মৌলবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হবে ভণ্ডামির রাজনীতি। দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে সাবেক স্বৈরশাসকের পুনরুত্থান দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কোন অশুভ ছায়াপাত করবে, তা ভেবে দেশবাসী আতঙ্কিত ও শঙ্কিত। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু সুবিধাবাদী ব্যবসায়ী, আমলা ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তার অনুপ্রবেশ, রাজনীতিকে করেছে বিপথগামী, কলুষিত ও আদর্শচ্যুত। রাজনীতিবিদদের মধ্যে এখনো যাঁরা আদর্শের রাজনীতি করেন এবং আদর্শিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তাঁদের প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ, বাংলাদেশে ২২ বছর ধরে ক্ষমতাবদলের যে নীতিহীন রাজনীতি চলছে, তা থেকে দেশকে রক্ষা করতে ঐক্যবদ্ধভাবে সচেষ্ট হোন। নতুবা এ দেশে সুষ্ঠু রাজনীতি করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও দুরূহ হয়ে উঠবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে দেশে সুষ্ঠু, সুন্দর রাজনৈতিক ধারা ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের তরুণসমাজকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হলে নতুন নেতৃত্বকে জায়গা দিতে হবে রাজনীতিতে। তবেই শহীদেরা যে আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে এ দেশের জন্য জীবন দিয়েছিলেন, তা সার্থক হবে।
সেলিনা আখতার: শহীদ মিলনের জননী।

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যখন নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার হুমকি দিয়ে চলেছে, তখন নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সোমবার সন্ধ্যায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলেন। ফলে আগামী ৫ জানুয়ারি ঘোষিত নির্বাচনটি একতরফাভাবেই সম্পন্ন করার প্রয়াস স্পষ্টতর হলো। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় এটি বাড়তি উদ্বেগ যোগ করেছে। কেননা তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (প্রনিক) কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী ৫ জানুয়ারি ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ‘আনন্দঘন পরিবেশে’। যেকোনো জাতীয় নির্বাচন ঘিরে গোটা জাতির আশাবাদ এমনটাই হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু এখন বাস্তবতা উল্টো। বিএনপিসহ ১৮-দলীয় জোট এই ‘একতরফা’ নির্বাচন প্রতিহত করতে পূর্ণ মাত্রায় তৎপর হলে কী বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা ভেবে আমরা যারপরনাই উদ্বিগ্ন। কিন্তু সত্যিই আনন্দঘন পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হতো, যদি প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিত। যদিও নির্বাচন কমিশনের এমন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই যে সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি করানোর পরেই কেবল নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হয়, তবু অবস্থাদৃষ্টে আমাদের বিবেচনায় নির্বাচন কমিশন আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে পারত। নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রথম বিবেচনা হওয়া উচিত একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য নির্বাচন।
যে নির্বাচনে দুই প্রধান প্রতিযোগী দলের একটি অনুপস্থিত থাকে, সেটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিশ্বের ইতিহাসে তো নয়ই, বাংলাদেশের ইতিহাসেও এমন নজির নেই। আওয়ামী লীগের বর্জনের মুখে বিএনপি সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য একতরফা নির্বাচনের একটি বড় দৃষ্টান্ত। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মনে রাখা উচিত, তাদের যেকোনো পদক্ষেপের সাংবিধানিক ও আইনি বৈধতার (লিগ্যালিটি) চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের জনগণের কাছে এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা (লেজিটিমেসি)। স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের এমন আচরণ করা উচিত নয়, যার ফলে মনে হতে পারে যে প্রতিষ্ঠানটি কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে তাদের হাতে এখনো সপ্তাহ দুই সময় আছে। সময় আছে সরকারের হাতেও, এবং আমরা বিশ্বাস করি, সরকার আন্তরিকভাবে চাইলে এই সময়ের মধ্যে ইতিবাচক পদক্ষেপ অবশ্যই নিতে পারে। সরকারকে প্রথমে এই আন্তরিকতা দৃশ্যমান করে তুলতে হবে যে তারা সব দলের অংশগ্রহণে একটি সবর্জনগ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়; আওয়ামী লীগ সত্যিই চায় যে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। এই চাওয়া প্রকৃত চাওয়া হলে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে অনিষ্পন্ন বিরোধের একটা মীমাংসা খুঁজে পাওয়া এখনো সম্ভব। শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, সরকারেরও বোঝা উচিত যে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন দেশে-বিদেশে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য হওয়া সম্ভব নয়।

লোমহর্ষক সেই পাঁচ দিন

২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর দিনটি আর পাঁচটা দিনের মতোই শুরু হয়। সন্ধ্যায় অসংখ্য মানুষ ঘরে ফিরছিলেন। শহরের কেন্দ্রস্থলে হোটেলে-রেস্তোরাঁয় দেশী-বিদেশী মানুষের ভিড়। তারপর শুরু হয় সেই ভয়ংকর ঘটনা, যা ‘২৬/১১’ হিসেবে সারা ভারতে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সন্ত্রাসবাদীরা গুলি চালিয়ে, বোমা ও গ্রেনেড নিক্ষেপ করে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে। ভয়াল উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা শেষে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযানে ২৬ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া সেই লোমহর্ষক হামলায় সমাপ্তি ঘটে ২৯ নভেম্বর। প্রতিবছর এই দিনে রুদ্ধশ্বাস সেই পাঁচ দিনের স্মৃতিকে শোক মৌনতার মধ্য দিয়ে স্মরণ করে ভারতীয়রা। সন্ত্রাসীরা হোটেল-রেস্তোরাঁয় মানুষকে পনবন্দি করে। এক ইহুদি স্থাপনার ওপর হামলা চালায়। ভারতের সংবাদমাধ্যম কোনো রাখঢাক না করেই গোটা ঘটনার খুঁটিনাটি ছবি তুলে ধরে। মৃতদেহ ও মৃতপ্রায় মানুষদেরও দেখানো হয়। সন্ত্রাসবাদী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ গড়ায় ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত নয় জন সন্ত্রাসবাদী প্রাণ হারায়। আজমল কাসাভ নামের এক পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদীকে আটক করা সম্ভব হয়।
মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬৬ জনে। এদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যাই বেশি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সূত্র অনুযায়ী আহতের সংখ্যা প্রায় ৩০০। ভয়াবহ হামলার সেই ক্ষত, সেই রক্ত, সেই শোক পাঁচ বছর পরও মুছে যায়নি ভারতীয় নাগরিকদের মন থেকে- সন্ত্রাসবিরোধী শান্তিপ্রিয় মানুষের মন থেকে। মঙ্গলবার হোটেল তাজে হামলার শোক দিবস উপলক্ষে ফেসবুক থেকে শুরু করে সবগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমজুড়ে সবাই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধেই ঘৃণা ঝেড়েছেন, কামনা করেছেন শান্তি। সবাই বলছেন, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ পদদলিত করে এগিয়ে যাক মানবতার বিশ্ব। মঙ্গলবার সকাল থেকেই হোটেল তাজ ও মুম্বাইয়ের অন্যান্যস্থলে হামলায় নিহতদের শ্রদ্ধা জানাতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। চোখের জলে নিকটজনদের স্মরণ করেন নিহতদের স্বজনরা। উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর সন্ত্রাসী আজমল কাসাভ সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়ে হোটেল তাজ ও মুম্বাইয়ের নিরীহ মানুষজনের ওপর। তিন দিন ধরে সন্ত্রাসীদের নির্বিচার গুলি ও বোমাবাজিতে প্রাণ হারান ১৫৬ জন মানুষ। সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযানে নিহত হয় ১০ হামলাকারীও। এই হামলায় আহত হন আরও অন্তত ৬০০ জন। অনেক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পর সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযানে গ্রেফতার হয় একমাত্র জীবিত সন্ত্রাসী আজমল কাসাভ। আটক কাসাভকে গণহত্যা, নির্যাতনসহ ৮৪টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ২০১০ সালের ৬ মে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এরপর ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর পুনের ইয়ারদা জেলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় কাসাভের।

প্রধানমন্ত্রী ইংলাক পতন বিক্ষোভে থাইল্যান্ডে সরকারের অচলাবস্থা

থাইল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার সরকার পতনের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। সোমবার বিক্ষোভকারীরা দুটি মন্ত্রণালয় অবরুদ্ধ করলেও মঙ্গলবার এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরও তিনটি মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার বিক্ষোভকারীরা পর্যটন, পরিবহন ও কৃষি মন্ত্রণালয় ঘিরে ফেলেছে বিক্ষোভকারীরা। এর আগের দিন অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভকারীদের অনেকে অর্থমন্ত্রণালয়ে প্রবেশ করে সেখানে অবস্থ?ান নেন। এদিকে. প্রধান প্রধান মন্ত্রণালয়গুলো ঘিরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের অবস্থানের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা মঙ্গলবার বিক্ষোভকারীদের প্রতি চলমান বিশৃংখল পরিস্থিতি অবসানের আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে তার বিরুদ্ধে এক অনাস্থা বিতর্ক মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইংলাক সিনাওয়াত্রা ও তার ভাই ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে বিক্ষোভ করছে। ২০১০ সালের পর এই বিক্ষোভকে সবচেয়ে বড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০১০ সালে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানে ৯০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীলতাপূর্ণ দেশটিতে নতুন করে গোলযোগ সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দেশটিতে নতুন করে অশান্তি বিরাজ করবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার সকালে পার্লামেন্টে পৌঁছে ইংলাক সিনাওয়াত্রা সাংবাদিকদের বলেন, ‘সবাইকেই আইন মেনে চলা উচিত এবং আইনের শাসনের পরিবর্তে ‘মব রুল’ বা উন্মত্ত জনতার নৈরাজ্য সৃষ্টি করা উচিত নয়।’ এ সময় তিনি কর্তৃপক্ষের সম্পূর্ণভাবে সহিংসতা অবলম্বন না করার প্রতিশ্র“তি পুনর্ব্যক্ত করেন। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পার্লামেন্ট সদস্যরা গত সপ্তাহে বিরোধী দলের উত্থাপিত একটি অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর বিতর্ক শুরু করেছেন। এদিকে, পর্যটন মন্ত্রী সোমসাক পুরিসি সাক বলেছেন, আমাদের (মন্ত্রণালয়) ছাড়তে হবে কেননা বিক্ষোভকারীরা সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এএফপির খবরে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদেরও কার্যালয় ছাড়তে এক ঘণ্টা সময় দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভকারীদের দাবি,
ইংলাক সিনাওয়াত্রার ওপর তার ভাই ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সোমবার কর্মকর্তাদের কারফিউ ও রাস্তা চলাচল সাময়িক নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ইংলাক সিনাওয়াত্রা বলেছেন, বিক্ষোভ দমনে তিনি সহিংসতার পথ বেছে নেবেন না। পদত্যাগের দাবি নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক সংকট সমাধানের জন্য সমঝোতায় আসা ও আলোচনা করা উচিত। গত মাসে বিতর্কিত সাধারণ ক্ষমা বিল আনার পর থেকেই শুরু হয় সরকারবিরোধী আন্দোলন। বিলটি পার্লামেন্টের নিুকক্ষে পাস হলেও বিক্ষোভকারীদের বিরোধের মুখে উচ্চকক্ষ সিনেটে প্রত্যাখ্যাত হয়। বিক্ষোভকারীরা বলেছে, ওই বিলের মাধ্যমে দুর্নীতির দায়ে জেলে না খেটেই থাইল্যান্ডে ফিরে আসবেন থাকসিন। ২০০৬ সালে সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর স্বেচ্ছায় নির্বাসনে রয়েছেন থাকসিন। ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনজীবী সুথেপ থাউগসুবানের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভকারীরা সারারাত ধরে অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাইরে শিবির গেড়ে অবস্থান নেন।