Friday, September 25, 2020

কী হয়েছিল ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে?

গোল্ডা মেয়ারকে বলা হতো ইসরাইলের দাদিমা। পুরনো আমলের যেরকম স্কার্ট আর কোট পরতেন নারীরা, গোল্ডা মেয়ারেরও পছন্দ ছিল সেরকমটাই। সবসময়ে কালো জুতো পরতেন তিনি। আর সঙ্গে থাকত পুরনো একটা হ্যান্ড ব্যাগ। 'চেইন স্মোকার' ছিলেন গোল্ডা মেয়ার। ফিল্টার ছাড়া সিগারেট খেতেন একের পর এক।
রান্নাঘরে চা পান করতে করতে মানুষের সঙ্গে দেখা করতেন। চা-টাও নিজে হাতে বানাতেই পছন্দ করতেন তিনি। তবে হাতে কখনও লেডিজ ঘড়ি পরতেন না - সবসময়ে পুরুষদের ঘড়িই দেখা যেত কব্জিতে।
ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুড়িয়োঁ মন্তব্য করতেন গোল্ডা মেয়ার তার মন্ত্রিসভায় একমাত্র 'পুরুষ'। অন্য নারীদের হয়তো এরকম একটা কমপ্লিমেন্ট শুনতে ভালোই লাগত, তবে গোল্ডা মেয়ার প্রধানমন্ত্রীর এই কথাটা শুনলেই দাঁতে দাঁত পিষতেন। তিনি সবসময়ে বিশ্বাস করতেন যেকোনো কাজের ব্যাপারে সে নারী না পুরুষ এটা কখনই বিবেচ্য হতে পারে না।
১৯৪৮ সালে ইসরাইলের স্বাধীনতা ঘোষণা পত্রে যারা সই করেছিলেন, গোল্ডা মেয়ার ছিলেন তাদের অন্যতম। ১৯৫৬ সালে ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। তবে ১৯৬৫ তে সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।
তবে বছর চারেক পরে ৬৯ সালে ইসরাইলের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী লেওয়াই এশ্কালের মৃত্যুর পরে তাকে রাজনৈতিক সন্ন্যাস থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে প্রধানমন্ত্রী করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী হিসাবেই ১৯৭১ সালে তিনি প্রথমবার আমেরিকায় গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে বৈঠক করতে।
পরে, আত্মকথা 'আর এন: দা মেমরিজ অফ রিচার্ড নিক্সন'-এ তিনি লিখেছিলেন, "আমার খুব ভালোই মনে আছে যখন আমরা ওভাল অফিসের সোফায় বসেছিলাম আর ফটোগ্রাফার ছবি তুলতে এসেছিলেন, তখন গোল্ডা মেয়ার হেসে হেসে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছিলেন। যেই ফটোগ্রাফার ছবি তুলে বেরিয়ে গেলেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাঁ পায়ের ওপরে ডান পা-টা তুলে দিয়ে সিগারেট ধরালেন। বললেন, 'তো মিস্টার প্রেসিডেন্ট, এবার বলুন ওই বিমানের ব্যাপারে আপনি কী ঠিক করলেন? আমাদের বিমানগুলোর খুব প্রয়োজন। গোল্ডা মেয়ারের ব্যবহার অনেকটা পুরুষোচিত ছিল। তিনি চাইতেন যে তাঁর সঙ্গে একজন পুরুষের মতোই যেন সবাই ব্যবহার করে।"
৭১-এর যুদ্ধে ভারতকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য
১৯৭১-এ যখন পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে নামল ভারত, তখন ইসরাইল আর ভারতের মধ্যে কোনো রকম রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল না।
উল্টো দিকে ইসরাইলের সবথেকে কাছের মিত্র রাষ্ট্র আমেরিকা সাহায্য করছিল পাকিস্তানকে।
আমেরিকার সাংবাদিক গ্যারি জে বাস যুদ্ধের অনেক পরে দিল্লির নেহরু লাইব্রেরিতে রাখা 'হকসার পেপার্স' নামে পরিচিত নথি ঘাঁটতে গিয়ে উদ্ধার করেন তখনও পর্যন্ত না জানা কিছু তথ্য।
বাস পরে নিজের বই 'ব্লাড টেলিগ্রাম'-এ লিখেছেন, "ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার গোপনে কিছু অস্ত্র আর মর্টার পাঠিয়েছিলেন ভারতের কাছে। ইসরাইলি অস্ত্র বিক্রেতা শ্লোমো জবলুদোউইক্সের মাধ্যমে গোটা প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন হয়েছিল। ওই অস্ত্র সম্ভারের সঙ্গে ইসরাইলের কিছু অস্ত্র প্রশিক্ষকও ভারতে এসেছিলেন সেই সময়ে। ইন্দিরা গান্ধীর প্রধান সচিব পি এন হাকসার আরো অস্ত্র পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। গোল্ডা মেয়ার তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে ওই সাহায্য জারি থাকবে।"
"ইসরাইল এরকম একটা ইঙ্গিত দিয়েছিল যে ওই অস্ত্র সহায়তার পরিবর্তে ভারত ইসরাইলের সঙ্গে কূটনীতিক সম্পর্ক স্থাপন করুক। সেই অনুরোধ অবশ্য ভারত বিনম্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এটা পছন্দ করবে না - এমনটাই কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছিল," নিজের বইতে লিখেছেন গ্যারি জে বাস।
সেই ঘটনার প্রায় কুড়ি বছর পরে যখন নরসিমহা রাও ভারতের প্রধানমন্ত্রী, তখন ইসরাইলের সঙ্গে কূটনীতিক সম্পর্ক তৈরী হয় ভারতের।
মোসাদের অপারেশন 'রীথ অফ গড'
১৯৭২ সালে মিউনিখ অলিম্পিক চলাকালীন গেমস ভিলেজের ভেতরে ঢুকে আরব উগ্রপন্থীরা এগারো জন ইসরাইলি অলিম্পিয়ানকে হত্যা করে।
গোল্ডা মেয়ার ইসরাযইলি গুপ্তচর বাহিনী 'মোসাদ'-এর এজেন্টদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন ওই হত্যাকান্ডের সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বার করতে। দুনিয়ার যেকোনোও প্রান্তেই থাকুক না কেন, ওই অলিম্পিয়ানদের হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে যেন মেরে দেয়া হয়।
এই অপারেশনের নাম দেয়া হয়েছিল 'রিথ অফ গড'।
এ নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন সাইমন রিভস। বইটির নাম 'ওয়ান ডে ইন সেপ্টেম্বর'।
সেখানে রিভস লিখেছেন, "গোল্ডা মেয়ার নিজের কামরায় ডেকে পাঠালেন জেনারেল ওহারোন ইয়ারেভ আর যিভি যামিরকে। ওই বৈঠকে গোল্ডা মেয়ার ইহুদিদের ওপরে জার্মানিতে কী অত্যাচার হয়েছে, সেই প্রসঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ বললেন। তারপরে বললেন মিউনিখ অলিম্পিকে এগারোজন অলিম্পিয়ানের হত্যাকান্ড। হঠাৎই মেরুদন্ড সোজা করে ইয়ারেভ আর জামিরের চোখে চোখ রেখে স্পষ্ট গলায় আদেশ দিলেন, 'সেন্ড ফর্থ দা বয়েজ' [তোমার ছেলেদের কাজে নামাও]।
ইসরাইলের ওপরে মিশর আর সিরিয়ার হামলার খবর ছিল তার কাছে।
ইসরাইলের সবচেয়ে পবিত্র ইয়োম কীপ্পুরের দিনে, ১৯৭৩ সালে মিসর আর সিরিয়া হামলা চালায় ইসরাইলের ওপরে।
তবে এই হামলা যে হতে পারে, সেই আভাস পেয়েছিলেন গোল্ডা মেয়ার।
২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩ সকালে তেল আভিভের উত্তরে হর্জলিয়াতে মোসাদের একটি সেফ হাউসে নেমেছিল একটা 'বেল ২০৬' হেলিকপ্টার।
সেটি ল্যান্ড করতেই ইসরাইলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। কারণ রোজ রোজ তো আর জর্ডনের শাহ হুসেইন সীমানা পেরিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতে আসেন না!
সেদিন শাহ হুসেইন একটা গোপন খবর পৌঁছিয়ে দিতে এসেছিলেন গোল্ডা মেয়ারের কাছে।
গোল্ডা মেয়ারের জীবনীকার এলিনোর বার্কেট লিখছেন, "শাহ হুসেইনকে গোল্ডা প্রথমেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন মিসরকে ছাড়াই সিরিয়া কী একাই হামলা চালাবে? হুসেইন জবাব দিয়েছিলেন, 'আমার ধারণা মিসর সিরিয়াকে সাহায্য করবে।' যখন এই খবরটা ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোশো দায়ানকে বলা হলো, তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেই চাননি। বলেছিলেন, জর্ডনের সঙ্গে মিসরের এমন সম্পর্ক নয় যে তারা এরকম একটা হামলার কথা জানতে পারবে। তিনি গোল্ডাকে বলেছিলেন, 'আমরা সিরিয়ার ওপরে নজর রাখব। চিন্তার কোনো কারণ নেই।"
সুয়েজ খালের দিকে এগোচ্ছে মিসরের সেনা
ইসরাইলের গুপ্তচর বাহিনী মোসাদ এটাও জেনে গিয়েছিল যে মিসরীয় বাহিনীর এক ডিভিশন সেনা সুয়েজ খালের দিকে এগোচ্ছে। মিসরীয় সেনাবাহিনীর এক লক্ষ ২০ হাজার রিজার্ভ ফোর্সকে কাজে ডেকে নেয়া হয়েছিল।
এই খবর জেনেও প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশো দায়ান বলেছিলেন যে ওটা মিসরীয় বাহিনীর 'রুটিন এক্সারসাইজ'।
তারপরে যখন সত্যিই হামলা হলো, তখন অনেকেই বলেছিলেন এই হামলা আটকাতে না পারাটা গোল্ডা মেয়ারের একটা বড় ব্যর্থতা।
লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধ অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক ড. এরিক ব্র্যাগম্যান একসময়ে ইসরাইল সেনাবাহিনীতেও কাজ করেছেন।
তিনি বলছেন, "গোল্ডা বিশ্বাস করতেন ইসরাইল যদি কিছুটা সময় দেয়, অপেক্ষা করে, তাহলে কিছুদিনের মধ্যেই আরব দেশগুলো মেনে নেবে যে সাইনাই আসলে ইসরাইলেরই অংশ। গোলান হাইটস আর পশ্চিম তীরও যে ইসরাইলেরই ভাগ, সেটাও তারা মেনে নেবে এমনটাই ধারণা ছিল গোল্ডা মেয়ারের।"
"আমার মতে গোল্ডার এই চিন্তাধারা ভুল ছিল। একজন নেতার থেকে আমি তো এটাই আশা করব যে তার নজর এমন বিষয়গুলোর ওপরে পড়বে, যেগুলো আমার মতো সাধারণ মানুষের নজর এড়িয়ে যাবে। আমার মনে হয় ১৯৭১ সালে আরব দেশগুলোর প্রস্তাব মেনে নেয়া উচিত ছিল গোল্ডা মেয়ারের। তাহলে হয়তো আর ইয়োম কীপ্পুরের যুদ্ধটাই হতো না, যাতে ইসরাইলকে ৩ হাজার সৈনিক নিহত হয়েছিলেন।"
ইয়োম কীপ্পুরের যুদ্ধ এবং গোল্ডা মেয়ারের পদত্যাগ
মিসর যে তাদের ওপরে হামলা চালাতে চলেছে, তা যুদ্ধের প্রায় ৬ ঘন্টা আগেই কায়রো থেকে এক গোপন সূত্রে জানতে পেরেছিল ইসরাইল। কিন্তু ওই হামলার জবাব কীভাবে দেয়া হবে, তা নিয়ে ইসরাইলের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ ছিল।
গোল্ডা মেয়ার তার আত্মজীবনী 'মাই লাইফ'এ লিখেছিলেন, "ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ডাডো প্রথমে মিসরের ওপরে বিমান হামলার পক্ষপাতী ছিলেন। ততক্ষণে এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন যে বিমানবাহিনী দুপুরের মধ্যে হামলার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। তবে তার জন্য ওই মুহূর্তেই আমাকে বিমান হানার নির্দেশ দিতে হতো। কিন্তু আমি আগেই মনস্থির করে ফেলেছিলাম। ডাডোকে বলেছিলাম আমি এর পক্ষপাতী নই। ভবিষ্যতে কী হবে, তা অনিশ্চিত। হতে পারে আমাদের বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সাহায্য নিতে হবে। কিন্তু আমরা যদি প্রথমে হামলা চালাই, তাহলে কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে না। যতই আমি মনেপ্রাণে হামলা করতে চাইছি, কিন্তু তোমাকে 'না' বলতে বাধ্য হচ্ছি।"
সেই কয়েক দিনের ঘটনাবলীর আরেকটা ছবি পাওয়া যায় এলিনোর বার্কেটের লেখা থেকে।
গোল্ডার আরেক জীবনীকার বার্কেট লিখেছেন, "মোশো দায়ান গোল্ডার দপ্তরে দৌড়তে দৌড়তে ঢুকলেন। বললেন, গোল্ডা, আমি ভুল করেছি। আমরা ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছি। আপনি চাইলে আমার পদত্যাগ গ্রহণ করুন। কিন্তু গোল্ডা পদত্যাগ নেননি। কিন্তু যেই মুহূর্তে মোশো ঘরের বাইরে চলে গেলেন, গোল্ডা একটা হলে চলে যান। তার সহযোগী লু কাডর দেখেছিলেন গোল্ডা কাঁদছেন।"
বার্কেট আরো লিখেছেন, "দায়ান আত্মসমর্পণের কথা ভাবছে। তুমি আমার এক বন্ধুর বাড়িতে চলে যাও। আমি তাকে বলে দিচ্ছি সে তোমাকে কয়েকটা ওষুধের বড়ি দেবে। আরব দেশগুলোর হাতে আমি জীবিত অবস্থায় ধরা পড়ার থেকে আত্মহত্যাই শ্রেয়।"
ইয়োম কীপ্পুরের যুদ্ধে শেষ অবধি ইসরায়েলই জিতেছিল। কিন্তু তার জন্য ৩ হাজার সৈনিককে প্রাণ দিতে হয়েছিল।
গোল্ডা মেয়ার সময়ের আগেই পদত্যাগ করেন।
সূত্র : বিবিসি

নিজের পুরো বাড়ি যারা ছেড়ে দিয়েছেন কুকুর বেড়ালদের জন্য by সানজানা চৌধুরী

ঢাকার উত্তর কাফরুলের বাড়িটিতে প্রবেশ করতেই আমাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে ৫/৬টি কুকুর । তবে অভয় দেন বাড়ির মালিক মিথিলা শারমিন চৈতি।
রাস্তা থেকে এনে আশ্রয় দেয়া এই কুকুরগুলোকে তিনিই দেখাশোনা করেন।
তেমনি বাড়ির বাইরে এমন আরও ৫০টিরও বেশি কুকুর রয়েছে যাদের তিনি নিয়মিত খাবার খাওয়ান, গোসল করান এমনকি চিকিৎসারও ব্যবস্থা করেন। আবার বাড়ির ভেতরে তিনি পালছেন একটি দুটি নয়, মোট আটটি বেড়াল।
ছোটবেলা থেকে এই প্রাণীদের জন্য কিছু করার কথা ভাবতেন তিনি।
প্রতিদিন ৫০টিরও বেশি কুকুরের দেখাশোনা করেন মিথিলা শারমিন চৈতি
"রাস্তায় যাওয়া আসার সময় যখন দেখতাম ওরা ইনজুরড হয়ে পড়ে আছে, খুব খারাপ লাগতো। ইচ্ছা হতো যদি আমি কিছু করতে পারতাম। সেই ইচ্ছা থেকেই আমার চেষ্টার শুরু।"
"কখনও ভেটের (পশু চিকিৎসক) কাছে নিয়ে যেতাম। আমি এখন এদের রেগুলার খাওয়াই। মাসে একবার গোসল করাই, ট্রিটমেন্ট করাই।"-বলেন শারমিন চৈতি
এই কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ দুটি স্কুলের চাকরির থেকে ইস্তফাও দিয়েছেন তিনি।
"আগে আমি একটা স্কুলে টিচিং করতাম। কিন্তু আমার এই কাজ করে পেরে উঠছিলাম না। তাই চাকরি ছেড়ে এখন কয়েকটা টিউশনি করছি। সেখান থেকে যা টাকা পাই সেটা দিয়েই এদের খাবার চিকিৎসা চলছে।"
তবে মিস শারমিনের এই পথচলা এতোটাও সহজ ছিল না। একবার স্থানীয় এক প্রভাবশালীর তোপের মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে।
কেয়ার ফর পজের চেয়ারম্যান সৌরভ শামীম।
"সেই লোক এই এলাকার প্রভাবশালী। আসলে ওই লোকটার ইনটেনশন ছিল আমাকে রাস্তায় হ্যারাস করা। তার কথা হল, আমার জন্য কুকুর তাকে জ্বালাচ্ছে। তার প্রশ্ন আমি যে কুকুরদের খাওয়াই, এই টাকা আমি কোথা থেকে পাই।"
"কেউ কেউ বলে কোরিয়ায় কুকুর সাপ্লাই দেই, কেউ বলে এনজিও থেকে আসে, কেউ বল সরকার টাকা দেয়। একদিন তো রাস্তায় লোক জড়ো করে ফেলেছিল। আসলে মানবতা থেকেও যে মানুষ কিছু করতে পারে, এটা এখনও কেউ ভাবতে পারেনা।"- অনেকটা আক্ষেপের স্বরেই বলেন মিস শারমিন।

প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সংগঠন

বাংলাদেশের রাস্তায় বিচরণ করা পশুদের ওপর মানুষের নিষ্ঠুরতার বেশ কয়েকটি খবর সম্প্রতি সংবাদের শিরোনামে হয়ে উঠেছে। নাহলে ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার একদল তরুণ সংগঠন এই বিষয়গুলোকে সামনে আনে।
রাস্তার এসব প্রাণীর প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে এখন এগিয়ে এসেছে এমন বেশ কয়েকটি সংগঠন।
যার মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠান এরিমধ্যে সরকারিভাবে নিবন্ধিত হয়েছে, সেগুলো হল অভয়ারণ্য, কেয়ার ফর পজ, এনিমেল লাভার্স অব বাংলাদেশ এবং পিপল ফর অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন।
এছাড়া ফেসবুকভিত্তিক আরও কয়েকটি সংগঠন স্বাধীনভাবে কাজ করছে।
এই সংগঠনগুলো মূলত এসব প্রাণীদের ওপর নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। যেমনটি বলছিলেন কেয়ার ফর পজের চেয়ারম্যান সৌরভ শামীম।
কেরানিগঞ্জের একটি শেল্টার হোমে আশ্রিত কুকুর ও বেড়াল
"কোন প্রাণীকে আহত অবস্থায় পাওয়া গেলে আমরা প্রথমে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করি, কোথাও প্রাণীদের ওপর নিষ্ঠুরতার খবর পেলে সেখানে ছুটে যাই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করি। কিংবা যেসব প্রাণীর জরুরি আশ্রয়ের প্রয়োজন, রাস্তায় ছাড়া যাচ্ছেনা। তাদেরকে শেল্টারে নিয়ে যাই না'হলে অ্যাডপশনের ব্যবস্থা করি।"
এই এই কাজগুলোর বেশিরভাগ পরিচালিত হয় কর্মীদের নিজেদের অর্থায়নে। সরকারি নিবন্ধিত সংস্থা হিসেবে সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার কথা থাকলেও, এমনটা না হওয়ায় অনেকটা হতাশা প্রকাশ করেন মিস্টার শামীম।
"আমার কেরানীগঞ্জের শেল্টারে এখন ৬০টা কুকুর আর ৫০টা বেড়াল আছে, এগুলোর পেছনে মাসে খরচই হয় দুই লাখ টাকা। আমার ব্যক্তিগত যে রেস্টুরেন্টটা আছে সেটার লাভের পুরো টাকাটা এসবের পেছনে চলে যায়।"
"কিছু ডোনেশন আসে, হাসপাতাল থেকে কিছু আসে। এভাবে সংস্থাটা কতদিন চালাতে পারবো জানিনা। সরকার যদি আমাদের কিছু অনুদান দিতো, শেল্টারের একটা জায়গা দিতো, যেখানে প্রাণীগুলো থাকবে। তাহলে তো আমাদের ভাড়াটা অন্তত বেঁচে যায়। তাছাড়া বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানিও সাহায্য করতে পারে।"

নিজের পুরো বাড়িটাই ছেড়ে দিয়েছেন কুকুর বেড়ালদের জন্য

এনিমেল লাভার্স অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান দীপান্বিতা হৃদি নারায়ণগঞ্জে নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাড়িটিতেই কুকুর বেড়ালের থাকার ব্যবস্থা করেছেন।
এছাড়া ঢাকার টিএসসি এলাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকার কুকুর বেড়ালদের স্বেচ্ছায় দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি।
দীপান্বিতা হৃদি নারায়ণগঞ্জে নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাড়িতেই কুকুর বেড়ালের থাকার ব্যবস্থা করেছেন।
প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রচারণাও চালিয়ে আসছেন গত কয়েকবছর ধরে।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আমার পক্ষে যদি সম্ভব হতো তাহলে আমি পৃথিবীর সব স্ট্রে ডগ আর ক্যাটদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতাম, কিন্তু আমারও লিমিটেশনস আছে। তাই নিজের দ্বারা যেটুকু সম্ভব সেটুকুই করি।"
"এই যে রাস্তায় অনেক কুকুর বেড়াল পড়ে থাকে যাদের শেল্টার দরকার কিন্তু যাওয়ার জায়গা নাই। তাদের কথা ভেবেই আমার এই শেল্টারটা বানানো।"
এতো কাজ করতে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ারকে বিসর্জন দিতে হয়েছে মিস হৃদিকে। এক্ষেত্রে তিনি সবসময় তার পরিবারকে কাছে পেয়েছেন।
এসব প্রাণীর লালন পালনের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ খরচ বহন করছে তার পরিবারই।
তবে বাংলাদেশের মানুষ যদি বিদেশি কুকুর বিড়ালের পরিবর্তে আমাদের দেশি প্রাণীগুলোকে অ্যাডপ্ট করে তাহলে, এই সমস্যা অনেকটাই সমাধান হয়ে যাবে বলে মিস হৃদি আশা করেন।

প্রাণী নিষ্ঠুরতা চলছেই

প্রাণীর প্রতি মানুষের আচরণ কেমন হওয়া উচিত এসব বিষয়েও এক ধরণের বড় ভূমিকা রাখছে এই বেসরকারি সংগঠনগুলো।
আর সেই কাজে তাদের মূল শক্তি হিসেবে অর্থাৎ প্রতিবাদ থেকে শুরু করে তাদের সচেতনতামূলক প্রচারণা-প্রতিটি ক্ষেত্রে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
ফেসবুকে তাদের পোস্টগুলো ঘেঁটে দেখা যায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রাণী নিষ্ঠুরতার ঘটনা উঠে আসছে। এমনই এক নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিল সিথি রহমানের কুকুর।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান তার সেই বিরূপ অভিজ্ঞতার কথা।
কেয়ার ফর পজের ক্লিনিকে নিজেদের পোষা বেড়াল বা কুকুরের চিকি'সা করাতে ভীড়
"আমার কুকুর কিন্তু তার কোন ক্ষতি করেনি। কারণ আমরা তাকে ট্রেনিং দিয়ে রেখেছি যেন সে কাউকে ডিস্টার্ব না করে। খুব ফ্রেন্ডলি ছিল। কিন্তু মানুষের ওকে নিয়ে এতো সমস্যা যে এলাকাই ছাড়তে হয়। কিন্তু লাভ হয়নি। একদিন আমাদের দারোয়ান ডেকে বলল যে আমাদের কুকুরের চিৎকার আওয়াজ পেয়েছে। আমরা গিয়ে দেখি কেউ কার মাথাটা ফাটিয়ে দিয়েছে। তারপর অনেক চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারিনি"
তবে প্রাণীদের ওপর নিষ্ঠুরতার প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ বলে জানান কেয়ার ফর পজের জেনারেল সেক্রেটারি জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব নির্যাতনকারীদের পরিচয় খুঁজে বের করা যায়না।
"আমাদের কাছে প্রতিদিন তিনটা থেকে ছয়টা অভিযোগ আসে। সেটাও আবার আমাদের গ্রুপের মেম্বারদের থেকে। সারা দেশব্যাপী এই এনিমেল ক্রয়েলটি হয় আরও অন্তত ১০গুণ বেশি।
"এই বিষয়ে কেউ মুখ খোলেনা, তেমন কোন এভিডেন্সও থাকেনা। তাও আমরা চেষ্টা করি আশেপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানতে, সিসিটিভি ক্যামেরা দেখতে।" বলছিলেন জাহিদ।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ২০১১ সালের আগ পর্যন্ত রাস্তার কুকুর নিধন করা আইনগতভাবে বৈধ ছিল। কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে সিটি কর্পোরেশন ঘাড় মটকে হত্যা করতো
প্রতি কুকুর হত্যা বাবদ অর্থও পেতেন এসব কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভেটরা।
পরে অভয়ারণ্যের প্রতিবাদের মুখে বন্ধ হয় রাস্তার কুকুর নিধন। কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি, নিউটারিংসহ অন্যান্য উপায় অবলম্বনের কথা জানান তারা।

প্রাণীদের প্রতি মানুষের এই বিদ্বেষের কারণ কি

সম্প্রতি রাস্তার এই কুকুর বেড়ালগুলোর প্রতি মানুষের বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের অভিযোগ উঠেছে, এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার।
তবে তারা সেই বক্তব্য মাইক্রোফোনে রেকর্ড করার অনুমতি দেননি। তাদের কেউ কেউ ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার কথা বলেছেন। 
কেয়ার ফর পজের জেনারেল সেক্রেটারি জাহিদ হোসেন
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী জান্নাতি শহীদ আশা মনে করেন এই প্রাণীগুলো হিংস্র এবং রোগজীবাণু ছড়ায়।
"আমার এই কুকুরগুলোকে দেখলেই গা ঘিন ঘিন করে। এগুলো তো রাস্তায় থাকে। এগুলো যে আমাকে দেখে কামড়াতে আসবে না তার কোন গ্যারেন্টি নাই। মানে এতো নোংরা একটা প্রাণী। আমার একদমই পছন্দ না।"
যদিও মিস্টার শামীম যিনি কিনা কেয়ার ফর পজের চেয়ারম্যান তিনি এই মনোভাবকে অযৌক্তিক বলে দাবি করছেন।
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানিয়েছেন যে মানুষ সাধারণত ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এ ধরণের কাজ করে থাকে। যার ভুক্তভোগী হয় অসহায় প্রাণীগুলো।
এই ধরণের নিষ্ঠুরতা বন্ধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
মিস্টার শামীম বলেন, "এই যে বাচ্চারা কুকুর বেড়াল দেখে ঢিল ছোড়ে, এটা যদি বাবা মায়েরা মানা করে, বোঝায় যে কোন প্রাণীকে কষ্ট দেয়াটা ঠিক না, সেটাও কিন্তু কাজে আসে।"
"স্কুলগুলো প্রাণীর প্রতি সদয় হওয়ার শিক্ষা দিতে পারে। তাছাড়া কোন ধর্মে প্রাণীদের কষ্ট দেয়ার কথা বলা হয়নি। ধর্মের প্রপার শিক্ষাটাও পৌঁছে দিতে হবে। আপনি এদের পছন্দ নাই করতে পারেন। তাই বলে আঘাত করবেন না।"

বাংলাদেশের আইন কি বলে?

সামাজিক সচেতনতার অভাব সেইসঙ্গে প্রাণী নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে দেশে যে একটি আইন আছে সেটা নিয়ে অজ্ঞতার কারণেই এ ধরণের ঘটনা ঘটছে বলে জানান আইনজীবী জান্নাতুল আরা তিথি।
প্রাণীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে প্রচলিত আইনটি যথেষ্ট নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশে প্রাণী নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে বর্তমানে যে আইনটি কার্যকর আছে, সেটি হল ১৯২০ সালের একটি আইন।
সেখানে কোন প্রাণীকে হত্যা করা হলে শাস্তি হিসেবে তিন থেকে ছয় মাসের জেল ও সবোর্চ্চ ২শ টাকা দণ্ড ধার্য করা হয়েছে। 
আইনজীবী জান্নাতুল আরা তিথি
"ওই ব্রিটিশ আমলের ২শটাকা অনেক টাকা। এখন এটা কিছুই না। তিন মাস, ছয় মাসের কারাদণ্ডেও তেমন কিছু হয়না।" বলেন জান্নাতুল আরা।
তার মতে শুধু আইন দিয়েই কিন্তু সমাধান হবেনা। এই যে একটা আইন আছে এটা মানুষ পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। যে প্রাণীদের নির্যাতন করলে পার পাওয়া যাবেনা।
এক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন জান্নাতুল আরা।
তবে প্রাণী নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে আইনকে আরও কঠোর করতে বেসরকারি সংগঠনগুলার জোরালো দাবির মুখে বর্তমানে প্রাণী কল্যাণ আইনের একটি খসড়া মন্ত্রীসভায় চূড়ান্ত হয়েছে।
তবে এটি এখনও গেজেট আকারে পাস হয়নি। সেখানে কোন প্রাণীকে হত্যার জরিমানা ৫০ হাজার টাকা এবং ২ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এই আইনটিকে যুগান্তকারী বলে মন্তব্য করেন জান্নাতুল আরা।
"বর্তমানে যে আইনটি আছে এটা যদি গেজেট আকারে আসে, তাহলে আশা করা যায় পরিস্থিতি অনেকটাই বদলাবে। যে পরিমাণ জরিমানা আর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে, শাস্তির পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে এতে কিন্তু মানুষের ভয়ভীতিও বেড়ে যাবে।"
"আগে যারা ভাবতো তিন মাসের সাজা, ছয় মাসের সাজা। ব্যাপারনা। এই ব্যাপার না সংস্কৃতি থেকে হয়তো এই প্রাণী কল্যাণের ক্ষেত্রটা বেরিয়ে আসতে পারবে।"

মামলা নাকি মুচলেকা

প্রাণী নিষ্ঠুরতার যে কটি অভিযোগ আসছে তার বেশিরভাগই মামলা পর্যন্ত গড়াতে পারছে না প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রমাণের অভাবে।
আবার যেগুলোর প্রমাণ মেলে সেগুলো মুচলেকার মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করা হয় বলে জানান অ্যাডভোকেট জান্নাতুল আরা। 
প্রাণীদের প্রতি সদয় হওয়ার আহ্বান জানান এই সংগঠকরা।
তার অভিযোগ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পর্যাপ্ত সহযোগিতা করছেনা।
যদিও এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ধানমন্ডি থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ।
তার দাবি, পুলিশ সব ধরণের অভিযোগ গ্রহণ করেন এবং অভিযোগের গুরুত্ব ও প্রমাণ সাপেক্ষে মামলা গ্রহণ করেন।
"আমাদের কাছে কেউ মামলা করতে চাইলে আমরা সেটা করি। আইনানুগ সহযোগিতা আছে আবার মানবিক কারণ। সবমিলিয়ে আমরা চেষ্টা করি। মানুষ যদি আসে, তাদের সহায়তা করার জন্য। পশুপ্রাণীর ইস্যু বলে এড়িয়ে যাই বিষয়টা তা না। আমরা আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করি।"

লালন পালনেও চাই সচেতনতা

পোষা প্রাণীদের যারা লালন পালন করেন তাদেরও যথেষ্ট সচেতনতার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন এই প্রাণী সংগঠকরা।
তার মতে, এমনভাবে প্রাণীদের পালতে হবে যেন সে অন্যের বিরক্তির কারণ না হয়।
এজন্য এসব প্রাণীকে, প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন দেয়া, নিয়মিত হাটাহাটি করানো, পটি ট্রেনিং দেয়া, পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার পরামর্শ দেন তারা।
তবে এসব বিষয়ে মানুষ আগের চাইতে অনেক সচেতন বলে তারা স্বীকার করেন। তাদের মতে মানুষ এখন এসব অবহেলিত প্রাণীর প্রতি আগের চাইতে অনেকটাই মানবিক।
পোষা প্রাণীকে ঠিকভাবে দেখভাল করাটাও জরুরি।

Thursday, September 24, 2020

যে বাড়িতে বেড়ে ওঠেন ইমাম খোমেনী (র.)

এই বাড়িতেই ইমাম খোমেনী (র.)-এর শৈশব-কৈশোর কাটে।
আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ মুসাভি খোমেনী ১৯০২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ইরানের খোমেন শহরের একটি সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সাইয়্যেদ মোস্তফা মুসাভি আল খোমেনী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উঁচুস্তরের আলেম। ইরাকের নাজাফ ও সামেরায় পড়াশোনা করে একজন বিশিষ্ট মুজতাহিদ হিসেবে পরিচিত হন তিনি।
খোমেন শহরের অত্যন্ত প্রভাবশালী ইসলামী নেতা ছিলেন তিনি। কিন্তু তৎকালীন অত্যাচারী জমিদার শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কারণে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আর এ সময়েই জন্ম হয় তাঁর তৃতীয় সন্তান সাইয়্যেদ রুহুল্লাহ আল মুসাভি আল খোমেনীর। খোমেন শহরের এই বাড়িতেই তিনি জন্মের পর থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত কাটান।

ইমামের শিক্ষাজীবন শুরু হয় পবিত্র কুরআন হেফ্‌জ করার মধ্যদিয়ে। এরপর তিনি ইরানের আরাক শহরে (১৯২০-২১) এবং পরবর্তীতে কোমে (১৯২৩) ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন।
১৯৩০ এর দশকে ইমাম খোমেনী (রহ.) কোমের ধর্মতত্ত্ব কেন্দ্রের ছাত্রদের ইসলামি আইনশাস্ত্র শিক্ষা দেন।
১৯৫০ এর দশকে তিনি ইসলামি ফিকাহশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করে মুজতাহিদ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। ১৯৬১ সালে ইমামের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।

১৯৬৩ সালে তিনি তৎকালীন শাহ সরকারের অত্যাচার, নিপীড়ন ও আমেরিকার পদলেহী নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। সে সময় মোহাম্মাদ-রেজা শাহ ইরানে কথিত স্বেতবিপ্লব শুরু করেছিলেন।
ইমামের নেতৃত্বে দেশে বসবাসরত ইরানি জনগণের পাশাপাশি সারাবিশ্বে অবস্থানরত ইরানিরা শাহ সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লবি তৎপরতা শুরু করে। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সে বিপ্লব চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে এবং  এর মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে একটি নজীরবিহীন বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন ইমাম খোমেনী (রহ.)। 

ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর ১০ বছর তিনি সব বিতর্কের উর্ধ্বে থেকে ১৯৮৯ সালে আল্লাহর সাক্ষাতে চলে যান। তাঁর জানাযার নামাজে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল।
১৯৮৯ সালের ২৩ মে মস্তিস্কের রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য ইমামকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং এর ১১ দিন পর ৪ জুন তিনি ৮৭ বছর বয়সে তেহরানের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

 
 
 
 
 
 

অকালে চুল পাকা রোধ করে তিলের তেল

চুলের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে তিলের তেল ব্যবহার করতে পারেন নিয়মিত। এটি চুল উজ্জ্বল ও ঝলমলে রাখার পাশাপাশি চুলের অকালে পেকে যাওয়া রোধ করতে কার্যকর।
যেসব কারণে তিলের তেল ব্যবহার করবেন চুলে
*অকালে চুল পাকা রোধ করে। এছাড়া চুল কালো রাখে এই তেল।
*চুলের গোড়ায় রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় তিলের তেল। ফলে চুল বাড়ে দ্রুত।
*সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে চুল রক্ষা করে।
*খুশকি দূর করে।
*শুষ্কতা দূর করে ঝলমলে করে চুল।
*চুলের ভেঙে যাওয়া রোধ করে।
*চুল পড়া বন্ধ করে।
যেভাবে ব্যবহার করবেন তিলের তেল
*সমপরিমাণ তিলের তেল ও আমন্ড অয়েল একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ম্যাসাজ করুন। তোয়ালে গরম পানিতে ডুবিয়ে চুল জড়িয়ে রাখুন। ৪০ মিনিট পর ভেষজ শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
*২ টেবিল চামচ তিলের তেলের সঙ্গে ২ টেবিল চামচ অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে সসপ্যানে গরম করে নিন। ঠাণ্ডা হলে মিশ্রণটি চুলের গোড়ায় ঘষে ঘষে লাগান। ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
*১ চা চামচ আদার রসের সঙ্গে ২ টেবিল চামচ তিলের তেল মিশিয়ে চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ভালো করে লাগান। ৩০ থেকে ৪০ মিনিট অপেক্ষা করে ধুয়ে ফেলুন।
*১টি ডিম ফেটিয়ে ২ টেবিল চামচ তিলের তেল মিশিয়ে নিন। মিশ্রণটি চুলে লাগিয়ে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন। মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
*৩ টেবিল চামচ তিলের তেলের সঙ্গে ১ চা চামচ মধু মিশিয়ে চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত লাগান। ৪০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন শ্যাম্পু দিয়ে। 
তথ্য: স্টাইল ক্রেজ 

সর্পদংশন: 'মনে হচ্ছিল আমার হাতটা যেন হাতুড়ির আঘাতে চুরমার হয়ে যাচ্ছে'

ড. ডেভিড উইলিয়ামস
ডেভিড উইলিয়ামসকে সাপে কামড়িয়েছে পাঁ-চ-বা-র।
"প্রথমবার খুবই ভয়ংকর ছিল কারণ আমি জানতাম না ঠিক কী হতে পারে। মনে হচ্ছিল আমার হাতটা হাতুড়ির আঘাতে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে," বলেন তিনি।
"শেষবারের কামড়টি প্রাণঘাতী হতে পারতো। কিন্তু আমি যেহেতু কিছু ওষুধ বহন করছিলাম তাই আমার জীবনটা বেঁচে গেছে।"
ড. উইলিয়াম বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন কর্মকর্তা। সর্প-দংশনের বিষয়ে গবেষণা করেন তিনি।
তার উদ্দেশ্য সাপের কামড়ের চিকিৎসার ওষুধ উদ্ভাবন করা।

চার মিনিটে একজনের মৃত্যু

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সাপের কামড় একটি মারাত্মক ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা। কিন্তু এবিষয়ে কেউ গুরুত্ব না দেওয়ায় এনিয়ে তেমন আলোচনা হয় না।
তাদের হিসেবে সারা বিশ্বে প্রতি চার মিনিটে একজন সাপের কামড়ে মারা যাচ্ছেন।
হাজার হাজার মানুষ সাপের কামড় খাওয়ার পরেও হয়তো বেঁচে আছেন। কিন্তু তাদের শরীর বিকৃত হয়ে গেছে কিম্বা শরীরের কোন একটি অঙ্গ কেটে ফেলে দিতে হয়েছে।
সাধারণত দরিদ্র মানুষেরা সর্প-দংশনের শিকার হন সবচেয়ে বেশি। এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি প্রকট আফ্রিকা, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার দরিদ্র দেশগুলোর দরিদ্র এলাকাগুলোতে।
কৃষকরা যখন প্রতিদিন তাদের ফসল ফলাতে মাঠে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই তারা সর্প-দংশনের শিকার হচ্ছেন। শিশুদের সাপে-কাটার হারও খুব বেশি।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে এসেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাজ্যের ওয়েলকাম ট্রাস্ট।
সাপের বিষের চিকিৎসায় ওষুধ আবিষ্কারের লক্ষ্যে ওয়েলকাম ট্রাস্ট আট কোটি পাউন্ড বিনিয়োগ করেছে।
আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে নতুন একটি পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করতে যাচ্ছে।

সাপে কামড়ালে যা হয়

ড. উইলিয়ামস বলেছেন, "যাদেরকে সাপে কাটে তারা এমনিতেই দরিদ্র এলাকার মানুষ। আর সাপে কাটার পর, যদি তারা বেঁচে থাকার মতো সৌভাগ্যবান হন, তাদের অবস্থা হয় আরো শোচনীয়।"
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সারা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২৭ লাখ মানুষ সাপের বিষে আক্রান্ত হন।
এই বিষ সাপের কামড়ের কারণে রক্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে, আবার সাপ কারো চোখেও তার বিষ মুখ থেকে নিক্ষেপ করতে পারে।
সর্প-দংশনে প্রতি বছর ৮১ হাজার থেকে এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
এছাড়াও সাপের কামড়ের কারণে চার লাখের মতো মানুষ স্থায়ীভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে।
সাপের বিষের কারণে মানুষ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে, কিডনি অকার্যকর হয়ে যেতে পারে, প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে পারে অথবা শরীরের কোন একটি অঙ্গও হয়তো কেটে ফেলতে হতে পারে।
অনেক সময় সাপের কামড়ে মানুষের মৃত্যু হয়। আবার কেউ প্রাণে বেঁচে গেলেও এই অভিজ্ঞতা ভয়াবহ।
ওয়েলকাম ট্রাস্টের পরিচালক ও বিজ্ঞানী অধ্যাপক মাইক টার্নার বলছেন, "বিষ-নিরোধী সঠিক ওষুধটি থাকলে জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনাও বেশি থাকে। ফলে এতো এতো মানুষের মৃত্যুর পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।"
এই চিকিৎসা ব্যয়বহুল। যাদের এটা দরকার তারা এটা সময়মতো পায় না। সাপের কামড় খাওয়ার পর লোকজন দ্রুত হাসপাতালেও যেতে পারে না।
কখনও কখনও তারা যদি হাসপাতালে পৌঁছাতেও পারে, সেখানে প্রশিক্ষিত ডাক্তার থাকে না, আবার কখনো কখনো সেখানে দরকারি ওষুধ কিম্বা জিনিসপত্র থাকে না।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সাপের কামড় খাওয়ার পর লোকজন ওঝার মতো স্থানীয় বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে হাজির হয়।
সর্প-দংশনের চিকিৎসার ব্যাপারে তাদের আধুনিক কোন ধারণা নেই।

কীভাবে তৈরি হয় ওষুধ

সর্পবিষ-নিরোধী চিকিৎসা গত একশো বছর ধরে প্রায় একই রকমের।
এই ওষুধ তৈরি করা ব্যয়সাপেক্ষ। ঘোড়ার রক্ত থেকে সংগৃহীত এন্টিবডি থেকে এই ওষুধ তৈরি করা হয়।
সারা বিশ্বে এধরনের ওষুধ যতো প্রয়োজন তার মাত্র এক তৃতীয়াংশ তৈরি করা হয়ে থাকে।
ঘোড়ার শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে অল্প অল্প পরিমাণে সাপের বিষ দেওয়া হয়। ফলে ঘোড়ার তেমন কোন ক্ষতি হয় না।
ওয়েলকাম ট্রাস্টের বিজ্ঞানী ড. ফিলিপ প্রাইস বলেন, "পরে ঘোড়ার শরীর থেকে রক্ত নেওয়া হয়। সেখান থেকে সংগৃহীত এন্টিবডিকে বিশুদ্ধ করা হয়। ওই এন্টিবডি সাপের বিষকে নির্বিষ করে দেয়।"
তিনি বলেন, কোনো মানুষের শরীরে এটা সরাসরি ঢুকিয়ে দেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এই ঝুঁকির অর্থ হলো যে ব্যক্তিকে সাপে কেটেছে তাকে হাসপাতালে গিয়ে এই চিকিৎসা নিতে হবে। এজন্যে হয়তো অনেক সময় লেগে যেতে পারে। আর তখন মানুষের জীবন কিম্বা শরীরের কোন অঙ্গ রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো এসব ওষুধের অনেকগুলো কার্যকর নাও হতে পারে।
কারণ একেক ধরনের সাপের জন্য কাজ করে একেক ধরনের এন্টি-ভেনম ওষুধ।
যেমন আফ্রিকাতে যেসব ওষুধ পাওয়া যায় সেগুলোর ৯০ শতাংশই অকার্যকর বলে ধারণা করা হয়।
সাপের কামড়ের চিকিৎসার জন্যে কী কী ওষুধ কার্যকর আছে তার কোন আন্তর্জাতিক ও স্বীকৃত তালিকাও নেই কোথাও।
কিন্তু তারপরেও ড. উইলিয়ামস মনে করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাপের কামড় মোকাবেলায় যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সেটা পূরণ করা খুব কঠিন কাজ নয়।
তিনি নিজেও এনিয়ে পাপুয়া নিউগিনিতে বহু বছর কাজ করেছেন।
"পাপুয়া নিউগিনিতে ২০০৩ সালে প্রত্যেক চারটি শিশুর একটি শিশু সাপের কামড়ে মারা যেত। আর এখন প্রত্যেক ৫০ জনের মধ্যে একজনেরও কম মারা যায়।"
ড. উইলিয়ামস বলেন, প্রচুর মানুষ সাপের কামড়ে মারা যায় ঠিকই, কিন্তু এটা ঠেকানো রকেট বিজ্ঞানের মতো কঠিন কিছু নয়।
"এজন্যে দরকার নিরাপদ ও কার্যকরী এন্টি-ভেনম, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী।"
সাপের কামড়ের ফলে অনেকের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলতে হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সাপের কামড় মারাত্মক একটি স্বাস্থ্য সমস্যা।
সব সাপের বিষের জন্যে সব ওষুধ কাজ করে না।

Wednesday, September 23, 2020

এইচ এম এরশাদের অনন্য আখ্যান by আফসান চৌধুরী

সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ. এম. এরশাদ দীর্ঘদিন ধরে রোগে ভুগছিলেন এবং তার মৃত্যুর বিষয়টি কোন আকস্মিক বিষয় ছিল না। তার মৃত্যুতে শোকের উচ্ছ্বাসও তেমন ছিল না, কারণ সেই অর্থে কোন জনপ্রিয় নেতা তিনি ছিলেন না। সময় বদলেছে, মিডিয়া তার কীর্তিগাথা প্রচার না করলেও তার শেষকৃত্যের খবর প্রচার করেছে। শেষ বিচারে তিনি যদি নাও জিতে থাকেন, তার শত্রুতাও সে ক্ষেত্রে জেতেনি এবং যে সড়কগুলো তাকে পদচ্যুত করার জন্য জ্বলে উঠেছিল একদিন, সেটা অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে মৃতপ্রায় পড়ে আছে এখন।

বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণী তাকে স্বৈরাচার, দুর্নীতিগ্রস্ত, নারীঘেঁষা বিভিন্ন বিশেষণে ডেকেছেন, যেগুলোর এখন আর তেমন মূল্য নেই কারণ বহু ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাই এখন একই রকম, সবাই সেটা জানেন। ইতিহাসে এরশাদের একটা জায়গা রয়েছে। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন তিনি, যে সময়টাতে বিশেষ করে রাজনীতিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা স্বল্পমেয়াদি উত্থান ও পতনও দেখা গেছে।

এরশাদ বিচারপতি সাত্তারের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করেছিলেন যখন প্রেসিডেন্ট জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর একটা টালমাটাল অবস্থা চলছিল। এরশাদ ক্যু দমন করেছিলেন যদিও বিএনপি পরে জিয়া হত্যার জন্য এরশাদকে দায়ি করেছিল।

কিন্তু বিএনপি এরপরে খুব বেশি স্থায়ী হয়নি এবং শিগগিরই এরশাদ প্রথম রক্তপাতহীন ক্যু-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসেন। তাকে ক্ষমতা থেকে চলে যেতে হয় নাটকীয় একটা পরিস্থিতির মধ্যে যখন মূলত শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নেতৃত্বে মহাসড়কে আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছিল। যে দশকটাকে তিনি শাসন করেছেন, তখন অভিজাত শ্রেণীর ক্ষমতা ভাগাভাগির একটা ফর্মূলাও তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যেটা আজ পর্যন্ত টিকে আছে।
এই বিনিময়ের একটা অংশ ছিলেন তিনি।

এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের রাজনীতির শুরুতে বেসামরিক রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বাধীন শাসন ব্যবস্থা ছিল, ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে যেটার পরিবর্তন শুরু হয়। এই পদক্ষেপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বেসামরিক ও সামরিক আমলাদের রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করা।

পরবর্তী ধাপের সূচনা হয় ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরে, শেখ মুজিবের হত্যা এবং সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের পরে। এটা শুধু তার নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ছিল না, বরং রাজনৈতিক সিস্টেমের বাইরের খোলসের আড়ালে যে সহিংসতার বীজ লুকিয়ে ছিল, সেটারই প্রকাশ হয়েছিল এই সময়।

জিয়ার আমলে বেশ কিছু সামরিক ক্যু প্রচেষ্টা এবং কতিপয় রাজনৈতিক গ্রুপকে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। এই সময়টাতেই রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক সিস্টেমকে ব্যবহার করে সম্পদ তৈরির যুগ শুরু হয়। এই সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হলো প্রাইভেট ব্যাংকের উত্থান। ১৯৭১ সালের এক দশকের মধ্যে, বহু মানুষের একটা প্রাইভেট ব্যাংক চালুর মতো অর্থ জমে গিয়েছিল, যাদের অধিকাংশেরই অবস্থা ছিল করুণ।

ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল বিশাল এবং উদারভাবে সেটা দেয়া হয়েছে এবং সেটা আসলে শোধ দেয়ার কথা ভাবাও হয়নি। যারা আওয়ামী লীগের সময় এই যাত্রায় অংশ নিতে পারেনি, তারা দ্রুত পরের ট্রেনে সওয়ার হয়ে গেছেন। উচ্চবিত্ত শ্রেণী ততদিনে প্রধান জায়গাগুলোতে নিজেদের ক্ষমতা সংহত করতে শুরু করেছে। কিন্তু ক্ষমতার আধিপত্য সেভাবে বেসামরিক ব্যক্তিদের হাতে ছিল না, তা বেসামরিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যতই বিকাশ ঘটুক। জিয়ার আমলে সামরিক বাহিনীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব জোরালো ছিল এবং ক্ষমতার লড়াইও যথারীতি বজায় ছিল।

একটি বাদে এই সব বাধাগুলোই পার করেছিলেন জিয়া, কিন্তু তার সেনা সহকর্মীদের একটি গ্রুপের হাতে পতন হয় তার। হঠাৎই সবদিক ভেঙে পড়তে শুরু করে। দুর্বল প্রেসিডেন্ট সাত্তারের অধীনস্ত বিএনপি সরকারকে নিয়ন্ত্রণহীন মনে হতে থাকে। যতই দিন যাচ্ছিল, চারপাশের বলশালী ব্যক্তিদের মধ্যে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এরশাদের অবস্থান তত জোরালো হয়ে উঠছিল।

রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় নিপতিত বিএনপি – যারা তাদের ক্যারিশম্যাটিক নেতা জিয়ার অভাব বোধ করছিল তীব্রভাবে – তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করেন জেনারেল এরশাদ, যিনি জিয়া হত্যার ঘটনাটি সামলে একটা নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে এনেছিলেন। ক্যু-এর নেতা জিয়ার নেতৃত্বে একটা বেসামরিক শাসনামলের অবসানের পর ব্যারাক থেকে আরেকজন নেতা উঠে এসে দেশের দায়িত্ব নিলেন। পরে তিনিও অনেকটা বেসামরিক রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছিলেন।

সরকার ও প্রতিরোধ

বহু প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন এরশাদ। এর মধ্যে কিছু তিনি পূর্ণ করেছিলেন, বহু কিছু পূর্ণ করতে পারেননি, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের অধীনে ধনিক শ্রেণীর উত্থান অব্যাহত থাকে। তবে, এরশাদের মিত্রদের সম্পদ বৃদ্ধির সাথে সাথে এরশাদ তার বেসামরিক রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি (জেপি) গঠন করেন। তবে বেসামরিক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষ থেকে তখন রাজনৈতিক প্রতিরোধ বাড়তে থাকে, যারা তখন ক্ষমতা থেকে বহু দূরে ছিলেন। এর অর্থ হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণীরও উত্থান হচ্ছিল।

এরশাদ বল প্রয়োগে বিএনপিকে সরিয়ে দিয়েছিলেন এবং তার ক্ষমতা গ্রহণকে হালাল করতে তিনি তাদেরকে ছুড়ে ফেলেছিলেন। বিএনপি তাদের শক্তি ফিরিয়ে আনে এবং একটা আন্দোলন গড়ে তোলে যেটা ছিল অনমনীয় এবং ক্রমেই সেটার শক্তি বাড়তে থাকে। অনেকেই বলেছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট জিয়ার বিধবা স্ত্রী হিসেবে সেনাবাহিনীতে খালেদা জিয়ার সমর্থক ছিল কিন্তু যে দিন তিনি এরশাদের বিরোধিতা শুরু করলেন, সেদিন থেকে তার জনসমর্থনও বাড়তে শুরু করলো।

আওয়ামী লীগ সতর্কভাবে বিরোধিতা করেছিল এবং মেপে মেপে পদক্ষেপ নিয়েছিলো তারা কারণ তারা চায়নি যে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসুক। এরশাদ আর বিএনপি উভয়কেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিবেচনা করেছিল তারা।

রাজনৈতিকভাবে জিয়ার অনুকরণ করেছিলেন এরশাদ – জেপি থেকে বিএনপি – কিন্তু সময় বদলে গিয়েছিল। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বিএনপি বয়কট করলেও আওয়ামী লীগ তাতে অংশ নিয়েছিল এবং সেখানেই বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতাটা উঠে এসেছিল। এর অর্থ হলো কারো না কারো সাথে জোট গড়তে হবে। এর আরেকটা অর্থ হলো বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ যদি একজোট না হতো, জাতীয় পার্টি এবং এরশাদ তাহলে দীর্ঘসময় টিকে যেতেন।

মধ্যবিত্তের উত্থান?

এই সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আকাঙ্ক্ষার উত্থান, যারা বিপুল অর্থের উপর নির্ভর করে এসেছিল, যেটা ততদিনে যথেষ্ট বেড়ে গেছে। এর একটা সূচক হলো প্রাইভেট মিডিয়ার উত্থান, যার অর্থ হলো বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ভাড়া করার মতো অর্থ জমে গেছে ততদিনে। এই গ্রুপ আকারে বিশাল নয় এবং তারা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণও করে না কিন্তু তারা সরব এবং তাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। তারা রাস্তায় নামার সাহস অর্জন করেছিল এবং সেটাই ছিল মূল বিষয়। শিক্ষিত ও সাহসী, অনেকেই এসেছিলেন ঢাকার বাইরে থেকে, তারা এমন একটা স্টাইল তুলে ধরলেন, যেটা নতুন আগ্রাসী শ্রেণীর জানান দিচ্ছিল।

এটা সত্যি যে বহু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংস্কৃতিবাদী একটা নির্ভরশীলতার চরিত্র গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে তারা নিজেদের প্রকল্পের জন্য নব্য ধনিক শ্রেণীর উপর নির্ভর করতেন, কিন্তু এরশাদ এই দুই পক্ষের সাথেই খেলেছেন। তিনি কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে শুরু করেন, বিশেষ করে প্রথাগত অভিজাত প্রভাবের বাইরে, কিন্তু তিনি বাংলাদেশী ধারাটা ভালোই বুঝতেন বলে মনে হয়। তিনি সব পক্ষকেই প্রশ্রয় দিতেন।

একদিকে যখন তিনি কবিদের পিঠ চাপড়াচ্ছেন, অন্যদিকে তখন তাকে ঘন ঘন ওয়াজ মাহফিলে দেখা যাচ্ছিল এবং তিনি মাওলানাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ইসলামকে এমনকি রাষ্ট্রীয় ধর্মও ঘোষণা দিয়ে দিলেন। উভয় পক্ষেই তার বন্ধু ও শত্রু জন্মালো কিন্তু তিনি সজিবভাবে টিকে থাকলেন। আর এরপর আসলো আটরশির পীরের প্রসঙ্গ।

আটরশির পীর + ঢাকার সুন্দরী রমনীরা

আটরশির পীর তার ‘অলৌকিক শক্তি’ দিয়ে বাংলাদেশের বহু মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিলেন, যখনই এটা জানা গেলো যে এরশাদ তার একজন ‘মুরিদ’। হাজার হাজার মানুষ তখন আটরশির কাছে যেতে শুরু করলো। এরশাদের পদক্ষেপ ছিল অসাধারণ, সচেতনে হোক বা অচেতনে, তিনি জানতেন যে, বাংলাদেশের মানুষ পীরদের ভালোবাসেন এবং সে কারণে তাকেও সবাই ‘শ্রদ্ধা’ করবে, এমনকি মুরিদ হিসেবে তাকে হয়তো ভক্তিও করবে।

অবশ্যই, কিছু লোক আটরশির কাছে এ কারণে যেতেন যে, ওখানে এরশাদ (পড়ুন ক্ষমতা) যান এবং এ কারণে সেটা প্রভাব বিস্তারের একটা বিশাল নেটওয়ার্ক হয়ে ওঠে। কিন্তু পীরের অনুসারীরা সবাই সুবিধাবাদী ছিল না। অনেকেই ছিলেন শুদ্ধবাদী এবং এদের মধ্যে অনেক সাংবাদিকও ছিলেন, তা যে ভাবনা থেকেই সেখানে তারা যান না কেন। এরশাদ যখন সরে গেলেন, তখন পীরের প্রভাবও কমে গেলো যদিও তার তখনও বহু অনুসারী ছিল।

এরশাদের আশেপাশে বহু নারীও ছিল, তা নিজে তিনি যতবার বিয়েই করুন না কেন। যেটা মূল বিষয়, সেটা হলো তার আশেপাশে বহু নারী ছিল যারা তাকে ভালোবাসতো, এদের প্রায় সবাই সুন্দরী ও বিবাহিতা। ক্ষমতা নিঃসন্দেহে একটা শক্তিশালী আসক্তির বিষয় এবং এর বাইরে তিনি কবিতাও লিখতেন। যদিও কবিতাগুলো অত ভালো ছিল না তবে গুজব শোনা গেছে যে, অনেক ভালো কবি তার হয়ে কবিতা লিখে দিতেন।

তাই সেনাবাহিনীর সাথে সাথে ধনী এবং নারীরাও তার পেছনে ছিল এবং কবিদের একটা অংশও তার সাথে ছিল। এরশাদের আর উদ্বিগ্ন হওয়ার কি ছিল? একটা ভুল তিনি করেছিলেন। সেটা হলো দুই নারীর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শ্রেণীকে তাদের গণআন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষমতাকে তিনি যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি।

দুই নারীর সম্মিলন

এরশাদ বহু শিক্ষার্থীদের প্রলুব্ধ করেছিলেন – যেটা মধ্যবিত্তের শক্তির আঁতুরঘর, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এই মানুষেরা খালেদা এবং হাসিনার মধ্যে শক্তি দেখতে পেয়েছিলেন – এই দুই রাজনীতিবিদের সেই ক্ষমতা ছিল যার শক্তিতে তারা সড়কে আশাবাদী তরুণদের দিয়ে ভর্তি করে দিতে পারতেন। তাদের সেই ক্যারিশমা ছিল যার বলে তারা আন্দোলনের রাজপথে সবাইকে নিয়ে আসতে পারতেন। প্রাথমিক অনীহার পর, হাসিনা খালেদার সাথে জোট গড়তে সম্মত হন, যার নিজেরও একই রকম অনীহা ছিল। কিন্তু রাজনীতিতে যখন দুজন এক হলেন, তাদের সাথে প্রায় ৮০% মানুষের জনসমর্থন ছিল, তখন এরশাদের তাসের ঘর টলতে শুরু করলো।

অবশ্যই, এরশাদ তার সবচেয়ে বড় শক্তি সেনাবাহিনীর উপর নির্ভর করতে চেষ্টা করলো কিন্তু সেনাবাহিনী তাকে সমর্থন দিতে অস্বীকার করলো। তারা তখন একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা রাখছিল এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে আগ্রহী ছিল না। এরশাদ একসময় তাদের প্রতিনিধিত্ব করতেন ঠিক কিন্তু তখন তিনি আরেকজন রাজনীতিবিদ মাত্র। জনগণের বা প্রাতিষ্ঠানিক কোন সমর্থন না থাকায়, সবাই যখন তার পতনের জন্য একত্রিত হলো, এরশাদের তখন পতন হলো। ১৯৯০ সালের শেষটা তার জন্য সবচেয়ে নিষ্প্রভ সময় এর এরপর তাকে জেলে যেতে হলো।

পালাবদলের ধারা?

তার শাসনামলের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা কি?
ক্ষমতার ভিত্তিতে বেসামরিক ও সামরিক শক্তির মধ্যে সঙ্ঘাতের তীব্রতাও কমে গেছে। বরং সেনাবাহিনী যখন এরশাদের পক্ষে ভূমিকা রাখতে অস্বীকার করলো, তখন উভয় শক্তির মধ্যে একটা জোট গঠন প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে গেলো। এরশাদ বা জিয়া যখন ক্ষমতায় আসেন, ১৯৯০ সালের পরিস্থিতি ছিল তার চেয়ে আলাদা। এই শিক্ষাটা ২০০৬ সালে সাময়িকভাবে ভুলে যাওয়া হয়েছিল কিন্তু যখন লক্ষণগুলো বোঝা গেলো যে এক পক্ষে থাকলেই সেটা ভালো কাজ করবে, তখন সামরিক বাহিনী নির্বাচন দিয়ে ২০০৮ সালে সরে গেলো।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগ – এই দুই দলের হাতে ছিল ক্ষমতার চাবিকাঠি এবং তারা একত্র হলো তারা অন্য যে কোন বেসামরিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারতো। পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। বিএনপি ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন শ্রেণীর সব পক্ষের মতামত নিয়ে ক্ষমতা চালানোর একটা নীতি মেনে চলছে। বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে যে অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত ছিল, সেটা অধিকাংশই চলে গেছে।

রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে একত্র হতে পারতেন কিন্তু তারা রাজনৈতিক কাঠামোটাকে বদলাতে চাননি, যেটা করতে হলে পরিবর্তিত রাজনীতির সাথে মিল রেখে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের প্রয়োজন হতো। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হলো নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, যেটা ২০০৬ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল, কিন্তু বিএনপি যখন এটাকে ব্যবহারের চেষ্টা করলো, তখন আন্দোলন ও সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তাদের পতন হলো। পরে আওয়ামী লীগ এটাকে বাতিল করে অন্যদের চাপ দেয়ার শক্তিকে কঠিন করে দিলো কারণ জোটগুলো কোন সঙ্ঘাত চায়নি।

সামরিক বাহিনীও এটা শিখেছে যে, একতরফা সেনা শাসনের সময় চলে গেছে। তারা জিয়া-এরশাদ মডেলের বাইরেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বেসামরিক সরকারের সহায়তা নিয়ে বিকশিত হওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। সামরিক বাহিনীর ভেতর থেকে এসে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মতো দল গঠনের সময়ও চলে গেছে। মইন-ফখরু সরকার যে দল গঠনের চেষ্টা করেছিল, সেটা কখনই কাজ করেনি।

আর মধ্যবিত্তের কি হলো?

১৯৯০ সালে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সবচেয়ে উজ্জ্বল সময় ছিল যখন তারা এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং ২০০৬-০৮ সালে এরাই সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে, কিন্তু আর কখনই তারা আলোচনায় আসতে পারেনি। এখন তারা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে শক্তিহীন এবং ক্ষমতাসীন শ্রেণী এখন খুব ভালো করে বুঝে গেছে, কিভাবে তাদের ক্ষমতা ও আকাঙ্ক্ষাকে টিকিয়ে রাখতে হয়।

রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং আওয়ামী লীগ নিজেকে ক্ষমতাসীন আরও আস্থাশীল প্রতিনিধি হিসেবে গড়ে তুলেছে, যতটা বিএনপি পারেনি। ক্ষমতাসীন শাসকশ্রেণী এখন একটা জোটের সমন্বয় যাদের শীর্ষে রয়েছে সশস্ত্র বাহিনী, এর পরেই রয়েছে ব্যবসায়ী শ্রেণী, এরপরে বেসামরিক আমলা এবং সবশেষে রাজনীতিবিদরা। এই সমীকরণে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কোন স্থান নেই।

এরশাদ কি শেষ হাসি হেসেছেন

এক হিসেবে দেখলে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীই এক দশক ধরে জেগে উঠেছিল এবং এরশাদ পতনে নেতৃত্ব দিয়ে আবার নিজেরাই হারিয়ে গেছে। কবি, চিত্রশিল্পী এবং অধিকার কর্মীরা তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। এখন তাদের আর গুরুত্ব নেই এবং কেবল দলীয় ক্যাডারদের গুরুত্ব রয়েছে। এরশাদের সময় যেমনটা ছিল, সমাজ এখন তার চেয়েও বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং বিশৃঙ্খল, কিন্তু তাতে আর কিছু যায় আসে না। মানুষ এখন যেভাবে বাস করে, ভালোবাসে এবং অর্থ উপার্জন করে, সেটাতে মানুষ আর হতবাক হয় না।

এরশাদ বহু বছর জেলে কাটিয়েছেন, কখনই পূর্ণ ক্ষমতা ফিরে পাননি কিন্তু আওয়ালী লীগের সাথে জোট করে ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেছেন এবং আওয়ামী লীগের প্রকল্পে সহযোগির ভূমিকা পালন করেছেন। কেউ কেউ এখনও তাকে ‘স্বৈরাচার এরশাদ’ বলে থাকেন কিন্তু এটা এখন অর্থহীন হয়ে গেছে। প্রায় এক দশক ক্ষমতাসীন দলের মিত্র ছিলেন তিনি এবং তারা তাকে ব্যবহার করেছে।

শেষ পর্যন্ত এরশাদ তার প্রতিশোধটা নিতে পেরেছেন বা শেষ হাসি হেসেছেন। তিনি আসলে কখনই হারিয়ে যাননি এবং তার মৃত্যুর সময় প্রধানমন্ত্রী শোকবার্তা দিয়েছেন যিনি তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলন করেছিলেন। আর এদিকে মধ্যবিত্তি শ্রেণী বিশেষ করে এর শহুরে অংশটি আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি চাপে আছে। তাই সব মিলিয়ে একটা রূপকথার পরিণতি বা অপরিণতি ঘটলো, তা যেটাই বলুন না কেন।

কলকাতায় ইহুদিদের তৈরি ঊনবিংশ শতকের সিনাগগগুলো দেখভাল করেছে মুসলমানরা by গৌরবিন্দর সিং

কলকাতার জনাকীর্ণ ও ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা ব্রাবোর্ন রোডে অবস্থিত নেভ শালোম সিনাগগটিকে খুঁজে পেতে কয়েক মিনিটের বেশি লাগবে না।
মুসলমানদের যত্নের মধ্যে থাকা এই সিনাগগ যেন মরিয়া হয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়ার জন্য লড়াই করছে। এর আশপাশের ফুটপাথগুলো দখল করে নিয়েছে ঘিঞ্জি দোকানপাট ও সারি সারি হকার। তার মাঝ দিয়ে একটি পায়ে চলা পথ গিয়ে পৌছেছে এই জমকালো পরিকাঠামোর দোড়গোড়ায়। সারি সারি দোকানের কালো পলিথিনে মোড়া চালাগুলোর কারণে কোন নবাগত দর্শকের পক্ষে এই ঐতিহ্যবাহী ভবনটির সৌন্দর্য কল্পনা করা দ্বিগুণ কষ্টকর হয়ে পড়ে।
কলকাতায় ইহুদিদের যে তিনটি উপাসনালয় রয়েছে নেভ শালোম তার একটি। একই কমপ্লেক্সের মধ্যে মাজেন ডেভিড (১৮৮৪ সালে নির্মিত) ও একটি দূরে বেথ এল (১৮৫৬ সালে নির্মিত) সিনাগগ রয়েছে। দূর থেকে মাজেন ডেভিডকে কোন ক্লক টাওয়ার বলে ভুল হতে পারে। তিনটির মধ্যে এটিকেই সেরা মনে হবে এবং এর অভ্যন্তরভাগ পরিপাটি করে সাজানো।
সিনাগগটিকে মহাদেশীয় রূপ দিতে প্যারিস থেকে ছককাটা মার্বেলের তৈরি মেঝে, ঝিলিক দেয়া ঝাড়বাতি, স্টেইনড গ্লাসের জানালা ও ফুলের অলংকৃত স্তম্ভ নিয়ে আসা হয়েছে। সিনাগগের বেদিটির উপরে রয়েছে একটি তারকাখচিত অর্ধগম্বুজ। এটি স্বর্গের প্রতীক। মাঝে একটি বড় ফলকে ‘টেন কমান্ডমেন্টস’ উৎকীর্ণ।
সিনাগগটিতে ইহুদি আইকনোগ্রাফির বিভিন্ন প্রতীকের সঙ্গে কিছু হিব্রু লিপিও উৎকীর্ণ রয়েছে। এর মধ্যে আছে মেনোরাহ’র সাত শাখাওয়ালা বাতিদানি। বেদির উল্টোদিকে দেয়ালের উপরের ভাগটি চমৎকার গোলাকার স্টেইনড গ্লাসে মোড়া। হলঘরের দুদিক থেকে দুটি সিড়ি উপরের বেলকনির দিকে উঠে গেছে। এই জায়গাটি শুধু মহিলাদের জন্য। অন্য দুটি সিনাগগও একইরকম মনোমুগ্ধকর।
মজার বিষয় হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইহুদিদের এই উপাসনালয়গুলো দেখভাল করছে মুসলমানরা। অনেকটা গর্বের সঙ্গে সিরাজ খান (৫০) বলেন, অনেক প্রজন্ম ধরে আমার পরিবার এখানে আছে। আমার বাবা, দাদাও এই সিনাগগের দেখভাল করেছে। দুই দশকের বেশি সময় আমি এখানে কাজ করছি। ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করতে পারা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। আমরা মানি আল্লাহ এক এবং কাজের মাধ্যমে আমরা তার এবাদত করছি।
এই নগরীর সঙ্গে ইহুদিদের সম্পর্ক দুই শতকের পুরনো। রঞ্জন দত্ত নামে এক ইতিহাসপ্রেমী ও ব্লগার কোলকাতায় ইহুদিদের আগমনের উপর আলোকপাত করেছেন। কলকাতার ইহুদিদের উপর তার লেখা বেশ কিছু ব্লগ রয়েছে। তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমলে এই শহর ছিলো রাজধানী এবং দেশের বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ইহুদিসহ বহু বনিক গোষ্ঠী এখানে বাণিজ্য সুযোগের অনুসন্ধান করতে এসেছে। রেকর্ডে দেখা যায়, কলকাতায় প্রথম ইহুদি অভিবাসী হিসেবে আগমন ঘটে শালোম আহারন ওবাদিয়াহ কোহেন নামে আলেপ্পোর এক অধিবাসীর। ১৭৬২ সালে বর্তমান সিরিয়া অঞ্চলে তার জন্ম। ১৭৯৩ সালে সুরাট বন্দরে এসে নিজেকে একজন বনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরে ১৭৯৮ সালে কলকাতায় চলে আসেন। শালোমকে কলকাতায় ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা বলা যেতে পারে।
দত্ত বলেন, ইরাক থেকে এখানে এসে বসতিস্থাপনকারী ইহুদিদের বাগদাদি ইহুদি বলা হতো। ব্রিটিশ শাসনামলে তারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করতে শুরু করে। শেরিফ ও মেজিস্ট্রেট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে। তাদের অনেকে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। ইহুদি নারীরাও শিক্ষিত ছিলো এবং কর্মক্ষেত্রে ছিলো উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তাদের অনেকে ডাক্তার ও শিক্ষক ছিলো। ইহুদি সম্প্রদায় বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সিনাগগ ও অন্যান্য চোখে পড়ার মতো ভবন তৈরি করে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে থাকে।
অল্প দিনের মধ্যেই ইহুদিরা নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে সক্ষম হয়। যদিও কলকাতায় আসা বিদেশী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে তারা সবার শেষে আসে। একসময় কলকাতায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার ইহুদি ছিলো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এখন মাত্র ২০ জনে এসে ঠেকেছে। এদের বেশিরভাগ বৃদ্ধ ও অক্ষম।
বেশিরভাগ ইহুদি ইসরাইল বা অন্যান্য দেশে চলে গেছে। কিন্তু কলকাতাকেই নিজের আবাস বলে মনে করেন ৮৯ বছর বয়সী ফ্লাওয়ার সিলিম্যান। তিনি এখানেই থেকে গেছেন। অশিতিপর এই মানুষটি বলেন, এই শহরেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বহু বছর আমি শিক্ষকতা করেছি। কলকাতাই আমার বাড়ি এখানে আমার অনেক বন্ধু রয়েছে।
বয়স ছাড়া মনোবলের অভাব নেই তার, আন্তরিকতাও প্রচুর।
তার মেয়ে ড. জায়েল কলকাতার ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য নিবেদিত একটি ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করেছেন। (http://www.jewishcalcutta.in/) সাইটটিতে ইহুদিদের আগমন এবং এই নগরে তাদের অবদান নিয়ে চিত্তাকর্ষক সব বিবরণ। কলকাতার বর্তমান ইহুদিদের মধ্যে তার বয়সই সবেচেয়ে কম, ৬৩ বছর। তিনি বলেন, কলকাতার ঐতিহ্য সমৃদ্ধ করতে ইহুদিরা যে অবদান রেখেছে তা তুলে ধরা জরুরি ছিলো। এই আর্কাইভ গড়ে তোলার পেছনে আমার মায়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বিশ্বব্যাপী তার নেটওয়ার্ক কাজে লেগেছে।
কলকাতার অবশিষ্ট ইহুদিদের জন্য ‘মারা যাচ্ছে’ শব্দটি ব্যবহার করতে জায়েল নারাজ। তিনি বলেন, আমরা মরছি না, স্থানান্তরিত হচ্ছি। এই নগরিতে যারা ছিলেন তাদের হৃদয়ে সবসময় কলকাতার নাম থাকবে। আমরা অবস্থান পরিবর্তন করছি মাত্র।
ভারতের স্বাধীনতা ও ইসরাইল রাষ্ট্রের সৃষ্টিকে কলকাতা থেকে ইহুদিদের চলে যাওয়ার পেছনে কারণ বলে মনে করেন জায়েল। তার মতে, স্বাধীনতার পর কলকাতা থেকে ইহুদিদের চলে যাওয়ার পেছনে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অনেক কারণ রয়েছে। ব্রিটিশদের ভারত থেকে চলে যাওয়া যখন স্পষ্ট হয়ে উঠলো তখন অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এই দেশ কোন পথে এগিয়ে যায়, তা নিয়ে। একজন দুজন করে যখন যাওয়া শুরু করে তখন অন্যরাও দ্রুত তাদের পথ অনুসরণ করে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্মও ছিলো আরেকটি কারণ। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকেও ইহুদিরা সেখানে গিয়েছে।
কলকাতায় প্রতিবছরই ইহুদি জনসংখ্যা কমছে। ২০১৮ সালে এই সম্প্রদায়ের তিন সদস্য মারা যান। তাদেরকে কলকাতার ফুলবাগান এলাকায় নারকেলডাঙ্গা মেইন রোডের পাশে ইহুদি সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হয়েছে। এই সামধিক্ষেত্রটি ১৮১২ সালে তৈরি। এখানে সাত হাজারের বেশি গোর রয়েছে। এর কাছাকাছি থাকেন এমন এক রাজমিস্ত্রি নেফাজুদ্দিন (৪০) বলেন, এখানে ৭,৫৪৪টি গোর রয়েছে। এর মধ্যে ৮৪৪টি শিশুর। গত বছর তিন বৃদ্ধা মারা গেলে তাদেরকেও এখানে সমাহিত করা হয়। নিজেদের পূর্বপুরুষদের সমাধি দেখতে মাঝে মধ্যে বিদেশ থেকেও আসেন অনেকে ।
সিনাগগগুলোর পাশাপাশি ২০১৭ সালে এই সমাধিক্ষেত্রের সংস্কার কাজ শুরু হয়। এতে পাকা পায়েচলা পথ তৈরি ও নতুন করে চুনকাম করা হয়। নেফাজুদ্দিন বলেন, কয়েক বছর আগে তিনি যখন এখানে আসেন তখন সমাধিক্ষেত্রের চেহারা অন্যরকম ছিলো। পায়েচলা পথগুলো জঙ্গলে ঢাকা ছিলো। সেখানে প্রবেশের উপায় ছিলো না। বড় বড় গাছের শেকড় পুরনো কবরগুলো ভেঙ্গে ফেলে। সেগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। কবরের ফলকগুলো নতুন করা হয়েছে যেন মানুষ সহজে তা খুঁজে পায়।
সমাধিতে প্রবেশের জন্য ইহুদি সম্প্রদায়ের অফিস থেকে অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন হয়।
সিনাগগ ও সমাধি ছাড়াও পার্ক স্টিটে জিউস গার্লস স্কুল ও কোলকাতার কেন্দ্রস্থলে এসপ্লানেড ম্যানসন এই শহরে ইহুদিদের অবদানকে মনে করিয়ে দেয়। ইহুদি শিশুদের জন্য ১৮৮১ সালের ১৮ জানুয়ারি স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬০’র দশকে সব সম্প্রদায়ের জন্য স্কুলটি খুলে দেয়া হয়। এখন সেখানে কোন ইহুদি শিক্ষার্থী বা শিক্ষক নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্কুলের এক স্টাফ বলেন, এখানে ১,৫০০-এর মতো শিক্ষার্থী রয়েছে। এদের ৯৫% সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো থেকে আসা। কোন ইহুদি শিক্ষার্থী বা শিক্ষক নেই।
কলকাতায় ইহুদিরা যেসব ব্যবসা শুরু করেছিলো তার একটি ছিলো বেকারি। এসপ্লানেডের কাছে নিউ মার্কেটের নোহুম এন্ড সন্স বেকারি ১১৬ বছর ধরে সুস্বাদু খাবার তৈরি করছে। ১৯০২ সালে এক বাগদাদি ইহুদি নোহুম ইসরাইল মোরদেশাই এই বেকারি প্রতিষ্ঠা করেন। এই বেকারির সাজসজ্জা শুরু থেকে একই রকম রয়েছে। পুরনো দিনের স্মৃতিবাহী কাঠের ক্যাশবক্সটি এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট/ডেভিট কার্ড গ্রহণ করা শুরু করেছে।
কলকাতার ইহুদিদের তৈরি এসপ্লানেড ম্যানসন

Tuesday, September 22, 2020

আঁশজাতীয় খাবার কোনগুলো?

সুস্থতার জন্য ফাইবার বা আঁশ খুবই জরুরি। এটি যেমন কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে, তেমনি হজমের সমস্যা থেকেও দূরে রাখে এটি। কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে খাদ্য তালিকায় নিয়মিত আঁশ সমৃদ্ধ খাবার রাখার বিকল্প নেই। জেনে নিন কোন কোন খাবার খাদ্য তালিকায় রাখলে মিটবে ফাইবারের ঘাটতি।
  • বাদাম খেতে পারেন প্রতিদিন। ৯৫ গ্রাম বাদামে থাকে ১১.৬ গ্রাম ফাইবার। আঁশ ছাড়াও ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন ই পাওয়া যায় বাদাম থেকে।
  • ২৮ গ্রাম শুকনা নারকেলে থাকে ৪.৬ গ্রাম আঁশ। এছাড়া ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের উৎস এটি।
  • খেজুর খেতে পারেন প্রতিদিন। প্রতি ২৪ গ্রাম খেজুরে থাকে ১.৬ গ্রাম ফাইবার বা আঁশ।
  • মিষ্টি আলু রাখতে পারেন খাদ্য তালিকায়। প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকে এতে।
  • ২৪ গ্রাম টমেটোতে থাকে ৬.৬ গ্রাম ফাইবার। এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টেরও উৎস।
  • ফাইবারের চাহিদা মেটাতে খেতে পারেন গাজর।
  • ২০০ গ্রাম ছোলা থেকে ৩৪.৮ গ্রাম ফাইবার পাওয়া যায়। ছোলা দিয়ে তৈরি খাবার তাই রাখতে পারেন খাদ্য তালিকায়।
  • আঁশজাতীয় খাবারের অন্যতম উৎস মসুরের ডাল। ১৯২ গ্রাম ডাল থেকে পাওয়া যায় ৫৮.৬ গ্রাম ফাইবার।
  • ওট খেতে পারেন প্রতিদিন সকালের নাস্তায়। এতেও প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকে।
>>>তথ্য: স্টাইল ক্রেজ

বয়স বাড়লে শরীরে যে পরিবর্তন ঘটে

বয়স বেড়ে যাওয়া নিয়ে নারী পুরুষ সবার মধ্যেই কম-বেশী উৎকণ্ঠা রয়েছে। বয়স তো আটকানো যায় না। কিন্তু বয়স বাড়ার গতি যদি একটু কমিয়ে দেয়া যায়, অথবা শরীরে বয়সের ছাপ যাতে দেরিতে আসে, এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের নানা ধরণের গবেষণাও রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের এক গবেষণা বলছে, শরীরবৃত্তীয় নয়টি উপসর্গের মাধ্যমে বোঝা যায় যে আপনার বয়স হচ্ছে। স্পেনের বিজ্ঞানী ম্যানুয়েল সেরানো সেই দলে রয়েছেন।
তিনি বলছেন, একেকজন মানুষের বয়স বাড়ার লক্ষণ একেক রকম, কিন্তু সবারই তো বয়স বাড়ছেই।
গবেষণায় তারা দেখেছেন, মানুষসহ যেকোন স্তন্যপায়ী প্রাণীর বয়স বাড়ার লক্ষণ প্রায় একই, অর্থাৎ যে সব শরীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে তা প্রায় একই রকম।
১. ডিএনএ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে
আমাদের ডিএনএ শরীরের ভেতরকার কোষগুলোর মধ্যে প্রবাহিত এক ধরণের জেনেটিক কোড। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর মধ্যে ভুল হবার সুযোগ বাড়ে। সেই ভুলগুলো শরীরের কোষের মধ্যে জমা হতে থাকে। এ সময়ে জেনেটিক স্থায়িত্ব কমে যায়, যে কারণে স্টেম সেলের কার্যকারিতা কমে যায়।
২. ক্রোমোজোম ক্ষয়প্রাপ্ত হয়
আমরা যদি ডিএনএকে একটা সুতার মত ধরি, তাহলে সেটির মাথায় একটি ক্যাপ বা ঢাকনা থাকে যা আমাদের ক্রোমোজোমসমূহকে রক্ষা করে।
এটা অনেকটা জুতোর ফিতার মাথা যেমন প্লাস্টিক দিয়ে মোড়ানো থাকে তেমন হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঢাকনাগুলো আলগা হয়ে যেতে থাকে, ফলে আমাদের ক্রোমোজোমসমূহের কোন সুরক্ষা থাকে না।
মানে হলো তখন সেগুলো নিজেদের প্রতিলিপি বানাতে ভুল করে থাকে।
সন্তান উৎপাদন প্রক্রিয়া তখন কিছুটা জটিল হয়ে পড়ে।
৩. কোষের আচরণ বদলে যায়
আমাদের শরীরের অভ্যন্তরে ডিএনএ এক্সপ্রেশন নামে একটি প্রক্রিয়া আছে, যেখানে একটি কোষের মধ্যে থাকা হাজারো জিন নির্ধারণ করে ঐ কোষের কার্যক্ষমতা, অর্থাৎ ঐ নির্দিষ্ট কোষটি শরীরের ত্বক হিসেবে কাজ করবে না মস্তিষ্ক হিসেবে আচরণ করবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এবং জীবনযাপন পদ্ধতির কারণে সেই কোষের আচরণ বদলে যেতে শুরু করে।
৪. কোষ নবায়নের সক্ষমতা হারিয়ে যায়
ক্ষয় হয়ে যাওয়া কোষের পরিমাণ যাতে না বাড়ে, সেজন্য আমাদের শরীরের ক্রমাগত নতুন কোষ তৈরির ক্ষমতা আছে।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের সেসব দক্ষতা কমে যায়। তখন কোষসমূহ অপ্রয়োজনীয় অথবা বিষাক্ত প্রোটিন জমাতে শুরু করে, যেগুলো চোখের ছানি, আলঝেইমার বা পারকিনসন্স রোগের কারণ হয়ে ওঠে।
৫. কোষের পরিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ হারায়
সময়ের সাথে সাথে শরীরের কোষসমূহ চর্বি বা চিনি জাতীয় উপাদানকে প্রসেস বা পরিপাক করার ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে।
এজন্য বয়স বাড়ার পর বিভিন্ন রোগ যেমন ডায়াবেটিস হবার শঙ্কা বাড়ে, আর সেটি সারা পৃথিবীতেই একটি সাধারণ রোগ।
৬. মাইটোকন্ড্রিয়া কাজ বন্ধ করে দেয়
মাইটোকন্ড্রিয়া শরীরের কোষে শক্তি যোগান দেয়, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের কর্মক্ষমতা কমে যায়। আর মাইটোকন্ড্রিয়া যখন ঠিকমত কাজ করতে পারে না, সেটা ডিএনএ'র জন্য খারাপ।
তবে, কিছু গবেষণা বলছে, মাইটোকন্ড্রিয়ার কর্মদক্ষতা যদি নতুন করে বাড়ানো যায়, তাহলে সমস্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীর আয়ু বাড়ানো সম্ভব হবে।
৭. কোষ ভৌতিক হয়ে যায়
কোন কোষ যখন বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন সেটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু কাজ বন্ধ করলেই কোষের মৃত্যু হয় না।
এই কোষগুলো তখন ভৌতিক কোষে পরিণত হয়। এবং নিজের চারপাশের কোষগুলোকেও জোম্বি বা ভৌতিক কোষে পরিণত হতে সাহায্য করে। এর ফলে শরীরে জ্বালাপোড়ার মত উপসর্গ দেখা দেয়।
৮. স্টেম সেলের শক্তি কমে যায়
বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমে যায়, যে কারণে তার পুনরুৎপাদনের ক্ষমতা কমে যায়।
কিন্তু বিজ্ঞনীরা দেখেছেন, স্টেম সেলের এই শক্তি কমে যাওয়া ঠেকানো গেলে বয়স বাড়ার গতি কমিয়ে দেয়া যেত।
৯. নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় কোষ
শরীরের মধ্যে সারাক্ষণই কোষেরা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই যোগাযোগ কমতে থাকে।
এর ফলে শরীরে জ্বালাপোড়া, কথাবার্তা বলতে সমস্যা হতে পারে। এর ফলে শরীরের সতর্ক একটা ভাব হারিয়ে যেতে থাকে।
বয়স বাড়া যদিও একটি স্বাভাবিক এবং অনিবার্য প্রক্রিয়া।
বিজ্ঞানীরা বলছেন স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল বা জীবনযাপন পদ্ধতির মাধ্যমে বয়স বাড়ার গতিকে হয়তো কিছুটা দূরে রাখা যায়।
সূত্রঃ বিবিসি

Monday, September 21, 2020

দিনে দুই গ্লাস কোমল পানীয় পানে বাড়ে মৃত্যুঝুঁকি

দিনে দুই কিংবা তার বেশি বার কোমল পানীয় পান করলে কম বয়সে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায় বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, চিনি ও কৃত্রিমভাবে মিষ্টি করা কোমল পানীয় নিয়মিত পান করলে মৃত্যুর বহু আশঙ্কা ত্বরান্বিত হয়। আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।  উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্যান্য গবেষণাতেও এমন ফলাফল দেখা গেছে।
ইউরোপের ৪ লাখ ৫১ হাজার ৭৪৩ জন নারী-পুরুষের ওপর এই গবেষণা চালানো হয়। ৫০ জন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ এই গবেষণা পরিচালনা করেন। সেখানে দেখা যায়, দুই কিংবা এর বেশি গ্লাস কৃত্রিমভাবে মিষ্টি করা কোমল পানীয় পানে রক্তসংবহনজনিত রোগে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়। এক গ্লাস পানে হজমে সমস্যা হয়। এছাড়া যকৃত, অ্যাপেন্ডিক্স, অগ্ন্যাশয়  ও নাড়িজনিত রোগও হতে পারে।
১৯৯২ সাল থেকে ২০০০ সাল থেকে ইউরোপের ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের এই গবেষণায় যুক্ত করা হয়। তাদের খাবার ও পানীয় পানের বিষয় নজরে রাখা হয়। যাদের ক্যান্সার, হৃদরোগ কিংবা ডায়বেটিস ধরা পড়েছিলো তাদের বাদ দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছিলো ৫০.৮ এবং ৭১.১  শতাংশ  ছিলো নারী।
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারে নিল মার্ফি এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় আমরা কোমল পানীয় পানকারীদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ও তামাক সেবনের হার নিয়ে আলাদা কাজ করেছি।
গবেষকরা ধূমপায়ী ও অধূমপায়ীদের মধ্যেও একটি সংযোগ দেখতে পান। একইরকম পরিস্থিতি দেখা যায় চিকন ও অপেক্ষাকৃত মোটা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। এতে বোঝা যায় কোমল পানীয়ের কারণে বেড়ে যাওয়া মৃত্যু ঝুঁকি ওজন কিংবা ধূমপানের সঙ্গে সম্পর্কিত না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্য গবেষকরাও জানিয়েছেন কোমল পানীয় পানে জীবনযাত্রা অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে।   ইউনিয়ন অব কনসার্নড সাইন্টিস্ট  এর স্বাস্থ্য বিষয় বিশ্লেষক সারাহ রেইনহার্ড বলেন, এই গবেষণার ফল দারুণ।  তিনি বলেন, পুষ্টিখাতে কাজ করা কারও জন্যই এটা চমক নয়। কৃত্রিম খাদ্য উপাদান কখনোই স্বাস্থ্য ভালো করে না সেটা সুগারের পরিমাণ যতই কম হোক না কেন।
সেন্টার ফর সাইন্স এই গবেষণার প্রশংসা করলেও কোমল পানীয় পানকারীদের মৃত্যুঝুঁকির ক্ষেত্রে অন্যান্য নির্ধারকও আমলে নেওয়ার পক্ষপাতী। তাদের ধারণা, এতে গবেষণার ফলাফলে পরিবর্তন আসতে পারে। সিএসপিআর এর পুষ্টি বিষয়ক পরিচালক বনি লিবম্যান বলেন, ‘এই নতুন ইউরোপীয় গবেষণাটি পূর্বে প্রাপ্ত গবেষণা তথ্যের সঙ্গে ধারবাহিক নয়। এই গবেষণায় ডায়েট পানীয় পানকারীদের মৃত্যুঝুঁকি সুগার সম্বলিত পানীয় পানকারীদের চেয়ে বেশি দেখানো হয়েছে।
কৃত্রিমভাবে মিষ্টি করা পানীয়ের সঙ্গে অন্যান্য স্বাস্থ্য নির্ধারকের সংযোগ অবশ্য উড়িয়ে দেননি মারফি । তিনি বলেন, আমরা কৃত্রিমভাবে মিষ্টি করা পানীয় পানকারীদের ক্ষেত্রে কার্যকর সংযোগ দেখেছি। আমরা ধারণা করছি তারা ইতোমধ্যেই অন্য কোনও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আগে থেকেই ছিলেন। যেমন প্রিডায়বেটিস কিংবা অতিরিক্ত ওজন। তাই তারা কৃত্রিমভাবে মিষ্টি করা কোমল পানীয় পানে সুস্থ ছিলেন।
তবে এই কোমাল পানীয় ক্যান্সার কিংবা আলঝেইমার রোগে কোনও ভূমিকা রাখে না বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন জানায়, মিষ্টি পানীয় আমাদের খাদ্যভ্যাসে সবচেয়ে বেশি সুগার যোগ করে। মোটা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যা ১৯৭০ সালের তুলনায় এখন তিনগুণ। সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রল অ্যান্ড প্রিভেনশন এর তথ্য অনুযায়ী ৪০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কই এখন স্থুল।
কোকা কোলার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান অনেস্ট টি এর প্রধান নির্বাহী সেথ গোল্ডম্যান বলেন, এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত বিকল্প কোনও পানীয় উৎপাদন করা। তিনি বলেন,  কম চিনি কিংবা চিনিবিহিন পানীয় বাজারজাত করা প্রয়োজন। ক্রেতারাও পরিবর্তন হচ্ছে। কোম্পানিগুলো পরিবর্তন না হলে এই পরিবর্তিত ক্রেতা হারাবেন।

Wednesday, September 16, 2020

মাশরুম চাষে লাগে না বাড়তি যত্ন

মাশরুম কেবল খেতেই সুস্বাদু নয়, পুষ্টিগুণের দিক থেকেও এটি অনন্য। মাশরুম চাষ করে ফেলতে পারেন বাসায়ই। এর জন্য অতিরিক্ত যত্নও লাগবে না। স্যাঁতসেঁতে ও অন্ধকার আবহাওয়া পেলেই মাশরুম বাড়তে শুরু করে তরতর করে। জেনে নিন কীভাবে বাসায় ওয়েস্টার মাশরুম চাষ করবেন।
  • *চালের খড় জীবাণুমুক্ত করে নিন প্রথমেই। এজন্য খড় কুচি করে পানিতে ফুটিয়ে নিন ১০ মিনিট। ঠাণ্ডা নিংড়ে খড় আলাদা করুন।
  • *ভেজা খড় একটি পাটিতে ছড়িয়ে রেখে দিন সারারাত। এতে অতিরিক্ত পানি দূর হবে।
  • *বড় একটি পলিথিন ব্যাগে দুই ইঞ্চি পুরু করে খড় বিছিয়ে নিন। মাশরুমের বীজ ছড়িয়ে দিন খড়ের উপর। এই বীজ কিনতে পাবেন যেকোনও নার্সারিতে।
  • *বীজের উপর এক লেয়ারে খড় ছড়িয়ে উপরে আবার বীজ ছিটিয়ে দিন। এভাবে মোট চার লেয়ারে মাশরুমের বীজ ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রতি লেয়ারে ২ ইঞ্চি পুরু খড় দেবেন। খড় হাত দিয়ে চেপে চেপে দিতে হবে।
  • *ব্যাগের ভেতর থেকে সব বাতাস বের করে নিন। ব্যাগটি ঘুরিয়ে প্যাঁচ দিয়ে শক্ত করে মুখ আটকে ফেলুন। ব্যাগের মুখ শক্ত করে বেঁধে দিন সুতা দিয়ে। কলম বা সুচালো কিছু দিয়ে ৫ থেকে ৭টি ছিদ্র করুন ব্যাগে যেন অক্সিজেন পৌঁছতে পারে ভেতরে। ব্যাগটি রেখে দিন অন্ধকার কোনও স্থানে।
  • *৭ দিন পর দেখবেন ব্যাগটি সাদাটে হয়ে গেছে। ১০ দিনের মধ্যে বীজ থেকে মাথা তুলবে মাশরুম। কয়েক ইঞ্চি পর পর আরও অনেকগুলো ছিদ্র করে দিন ব্যাগে। ২৫ দিন পর দেখবেন ব্যাগের ছিদ্র দিয়ে ছোট-বড় মাশরুম মাথা বের করে দিয়েছে। প্রতিদিন সামান্য পানি স্প্রে করতে হবে মাশরুমে।
  • *রান্নার আগে তাজা মাশরুম তুলে নিন।
>>>তথ্য: ইনস্টিক ম্যাগাজিন

Tuesday, September 15, 2020

গল্প- রোহিঙ্গা জাতক by আহমেদ মুনির

কোনো এক বর্ষণমুখর সকাল। শ্রাবন্তী নগরে ঋষি আনন্দের আশ্রমে তরুণ শ্রমণদের ভিড় ঠেলে একজন আগন্তুক সামনে এগিয়ে যেতে চাইল। তার পিঠে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটা সোলার প্যানেল, এক হাতে আরএফএল কোম্পানির একটা বালতি, তার ভেতরে কাপড়ে জড়ানো একটা রাজহাঁস। হাঁসটা ভাঙা গলায় গাঁক গাঁক করে উপস্থিতি জানান দিলে আনন্দ ধ্যান ভেঙে তাকান। চোখের ইশারায় শ্রমণদের পথ করে দিতে নির্দেশ দেন তিনি। শ্রমণদের মাঝ দিয়ে যুবকটি এগিয়ে যায়। আনন্দের সামনে এসে দাঁড়ায়।

হাত জোড়া করে সে বলে, ‘হে মহান ঋষি, আঁর নাম মহম্মদ রশিদ, বাড়ি হাসুরাতা গ্রাম, জিলা মংডু, রাখাইন প্রদেশ, বার্মা। মঘেরা আঁর ঘর পোড়া দিয়ে, বউরে লই গিয়ে, ফোয়ারে খাডি ফালাইয়ে, অনে বিচার গরণ…’

আনন্দ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। অত্যাচারিতের এমন নিস্পৃহ বিবরণে তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে। এই যুবকের সন্তান, স্ত্রী, ঘর – সবই শেষ কিন্তু শোকসন্তপ্ত বা ক্রোধান্বিত হওয়ার মতো মানসিক শক্তিও যেন তার অবশিষ্ট নেই।

তিনি যুবকের মাথায় হাত রাখেন, তাকে বুকে টেনে নেন। পাশে বসিয়ে প্রশ্ন করেন, এমন ঘটনা আর কতজনের সঙ্গে হয়েছে? যুবক আঙুল তুলে দূরের এক ঢেউয়ের দিকে ইশারা করে। এই শুষ্ক প্রান্তরে এমন ঢেউ কখনো কেউ দেখেনি। মহাসাগরের ঢেউয়ের চেয়েও প্রচণ্ড আর প্রকা- এক মানবঢেউ। তাদের প্রত্যেকের হাতে প্লাস্টিকের বালতি, টিনের স্যুটকেস কিংবা কাপড়ের পুঁটলি। না, খালি হাতে কেউ আসেনি। জীবন থেকে কোনো-না-কোনো কিছু নিয়ে আসতে পেরেছে তারা বেঁচে থাকার চিহ্নস্বরূপ।

সাগরের গর্জনের মতো সবার মুখে একই কথা।

ঘর ফোড়া দিয়ে, খাডি ফালাইয়ে, গুলি মারি দিয়ে…’

আনন্দ দাঁড়িয়ে রইলেন সেই জনস্রোতের সামনে, তাঁর বুকে অসহ্য যন্ত্রণা, কিন্তু মুখ দিয়ে কথা সরছে না। কী বলে তিনি শুশ্রূষা দেবেন তাদের। কয়েক সহস্র বছর কেটে যাবে প্রত্যেক মানুষের ক্ষত সারাতে। তবু আনন্দ এগিয়ে গেলেন, আহত মানুষগুলোর মধ্য দিয়ে শুরু হলো তাঁর পথচলা। এক দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্ত ছুঁয়েছে সারিবদ্ধ মানুষেরা। যার শুরু নেই, শেষও নেই।

---দুই---

কক্সবাজার লিংক রোড পার হয়ে টেকনাফের রাস্তায় গাড়ি উঠেই দুবার হোঁচট খেয়ে থেমে গেছে। সামনের চাকাটা পাংচার হয়েছে। গাড়ি থেমে যেতেই আনন্দের ভাবনায় ছেদ পড়ল।

যেখানে গাড়িটা খারাপ হয়েছে সেখান থেকে উখিয়া সদর সাত থেকে আট কিলোমিটার। বিরান জায়গাটার দুপাশে বিল। দূরে আবছামতো ঘরবাড়ি জেগে আছে। লিভার লাগিয়ে গাড়িটার ডানপাশ উঁচু করা হয়েছে। দু-একজন ছাড়া সব যাত্রীই নেমে এসেছে। অনেকের ঠোঁটে সিগারেট জ্বলছে। পাশের একজন এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল, আপনে ত্রাণ দিতে আসছেন?

আনন্দ দুপাশে মাথা নাড়ল, না।

তবে?

দেখতে।

লোকটা যেন এ-কথায় সন্তুষ্ট হলো না।

কী করেন?

কিছু না, তেমন কিছু না।

ও, সাংবাদিক, রিপোর্ট করবেন, তাই বলেন…

লোকটা আবিষ্কারের আনন্দে ঝলমল করে ওঠে। তবে আনন্দ তাঁর উৎসাহে আবারো পানি ঢেলে দিয়ে বলে, রিপোর্ট করতে নয়, দেখতে। কেবলই দেখতে।

আনন্দ যে আসলেই নিউজ কাভার করতে কিংবা ত্রাণ দিতে আসেনি এটা আশপাশের মানুষকে বোঝানোর তেমন গরজ অনুভব করে না। সময় পরিভ্রমণ করে এতদূর এসেছে সে কেবল সত্য জানার জন্য।

আধঘণ্টার মধ্যে চাকা লেগে গেল। ভোরের নরম আলো মাড়িয়ে গাড়ি চলতে লাগল টেকনাফের দিকে। দুপাশে ছোট ছোট টিলা। তার পুরোটাই ঢেকে আছে পলিথিনের তাঁবুতে। এক ইঞ্চি পরিমাণ খালি জায়গা নেই কোথাও। হালকা বৃষ্টির মধ্যে ভিজে যাচ্ছে তাঁবুগুলো। পলিথিন পুড়িয়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে এক জায়গায়, সেই আগুনের দিকে একমনে তাকিয়ে আছে এক কিশোরী। চোখ বন্ধ হয়ে আসে তার। এই দৃশ্য দেখা সম্ভব নয়। চোখ খুলে সে আরো দূরে তাকাতে চেষ্টা করে। রাস্তার ওপর পাশে টেকনাফ রিজার্ভ ফরেস্টের পাহাড়সারির দিকে চোখ যায়। চোখের শুশ্রূষা হয়। এবার বাঁয়ে আর ক্যাম্পগুলো চোখে পড়ছে না। কেবল দু-এক জায়গায় বিচ্ছিন্ন কিছু বসতি, কয়েকটা সাইনবোর্ড, ইউএনএইচসিআর, ফাও, আশা এসব সংস্থার।

সড়কের পাশ দিয়ে রিলিফের বস্তা মাথায় নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। তাদের চোখ-মুখে ত্রস্ত ভাব নেই। বরং একটা রুটিন কাজের ভঙ্গি যেন ফুটে ওঠে।

বাঁদিকে হঠাৎই এসে পড়ে নাফ নদ। তার নীল জলরাশির ওপারে মেঘসমান উঁচু পাহাড়। সেখানে মেঘ আর আগুনের ধোঁয়া দুইয়ের রংই সাদা।

----তিন----

ঋষি আনন্দ এখন নিজেকে যেখানে হাজির করেছেন, সেখানে তাঁর নাম পালটায়নি বটে কিন্তু ঠিকুজি, কুলজি, বংশপরিচয় – সব বদলে গেছে। এখানে তাঁর দাদার নাম নতুন করে পড়তে হবে হাজি আসমত উল্লাহ। আর তাঁর দাদার বাবা শরিয়ত উল্লাহ সওদাগর। শরিয়ত উল্লাহ সওদাগর রেঙ্গুনে আরেকটা বিয়ে করে সংসার পেতেছিলেন। সে ব্রিটিশ আমলের কথা। সতেরো বছরের তরুণী স্ত্রী ফুলবানু আর এক মাসের শিশুসন্তানকে ঘরে রেখে এক বর্ষণমুখর সকালে চাক্তাইঘাট থেকে নৌকায় উঠে রেঙ্গুন পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। এরপর আর কখনো বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। পরিবারের সবাই সওদাগরের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করে একসময় হাল ছেড়ে দিয়েছিল। কেবল ফুলবানু তার ছেলে আসমত উল্লাহর বেয়াড়াপনায় লাগাম টানতে গিয়ে প্রায় সময় বলত, ‘তোর বাফে আইলে ব্যাক খইউম, ফিডর সাল তুলি ফালাইব, বুঝিবি মজা।’

কিন্তু পিঠের ছাল-চামড়া তোলার জন্য শরিয়ত উল্লাহ আর কখনো এমুখো হননি। আসমত শুনেছে এক মগ নারী নাকি তাঁর বাবাকে জাদু করে রেখেছে। বাড়ির নাম-ঠিকানাও ভুলে বসে আছে লোকটি। রেঙ্গুন কি আকিয়াব নিয়মিত যাতায়াত করেন এমনসব লোকজন তাঁর বাবাকে দেখেছে। কিন্তু শরিয়ত তাদের সঙ্গে খুব একটা আলাপ-সালাপে যায়নি। সওদাগরদের বর্মি স্ত্রী থাকবে সেটা দোষের কিছু নয়। লোকে বলে নৌকার সঙ্গে নৌকা জোড়া দিয়ে টেকনাফ থেকে মংডু যাতায়াত করা যত সহজ তার চেয়ে সহজ বার্মায় আরেকটা সংসার করা। কিন্তু তাই বলে বাড়ির কথা ভুলে যেতে হবে?

হাজি আসমত উল্লাহর বাবা শরিয়ত উল্লাহ সওদাগরকে একসময় সবাই ভুলে গিয়েছিল। এখানকার লোকজনের রেঙ্গুন যাওয়া-আসাও তখন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবু গ্রামের বাজারে যখন আসর জমিয়ে কেউ গাইত, ‘বানুরে, কী? ও বানু, কী, কী, কী? আই যাইয়ুম রেঙ্গুন শহর তোর লাই আইন্নুম কী?’ তখন আসমত উল্লাহর মনে হতো, তাঁর মা ফুলবানুকে নিয়ে সস্তা রসিকতা করতেই কেউ এমন গান বেঁধেছে।

আসমত উল্লাহ তবু ফিরিঙ্গিবাজারে বার্মা-রাজুর হোটেলে বসে সেই গান শুনত আর ভাবত শরিয়ত উল্লাহর বর্মি ছেলেরা দেখতে কি তার মতোই হয়েছে? তাদের নাক হয়তো একটু চাপা, গায়ের রং হলুদে কমলায় মাখানো। সেই বর্মি ভাইদের জন্য মন উচাটন হয়ে উঠত তাঁর। হোটেলবয় এসে তাঁর চিন্তায় ছেদ ঘটাত। ‘আজিয়া কি দিউম চাচা? খৈতরের রোস্ট খাইবা না?’ হোটেল বালকের কথায় অনিচ্ছায় সায় দিতে হতো তাকে। প্লেটভর্তি কবুতরের রোস্ট নিয়ে উদাস হয়ে বসে থাকত সে। মাঝে মাঝে ছিঁড়ে ছিঁড়ে দু-এক টুকরো মুখে পুরত।

ষাটের দশকে নে উইন যখন বাঙালি তাড়ানো শুরু করল, তখন আসমত আশায় বুক বেঁধেছিল। ভেবেছিল বৃদ্ধ বাবা হয়তো এবার দেশে ফিরবেন। কিন্তু এককাপড়ে অনেক বাঙালি সওদাগর ব্যবসাপাতি-দোকান আর ঘর ফেলে চলে এলেও শরিয়ত উল্লাহ আসেননি। এদেশের চেয়ে তিনগুণ বড় দেশটাকে নিজের দেশ মনে করে থেকে গিয়েছিলেন।

----চার----

শরিয়ত উল্লাহর এভাবে হারিয়ে যাওয়ার কাহিনি আনন্দ শুনেছিল তার দাদি বিলকিস বেগমের কাছ থেকে। ছোটবেলায় বেশ কিছুদিন ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রেলওয়ে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল আনন্দকে। বাবা কামাল উদ্দিন রেলওয়ে হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন বলে সিআরবিতে তাদের কোয়ার্টারের পাশের হাসপাতালেই তাকে ভর্তি করা হয়েছিল। ফেলসিফেরাম ম্যালেরিয়ায় জীবনহানির আশঙ্কা থেকেও তখন বড় হয়ে উঠেছিল কুইনাইনের তেতো অবসাদ আর দুর্বলতা। সে-সময় দাদি বিলকিস ছিলেন তার সঙ্গী। দাদির গল্পে সেই তেতো ভাব আর অবসাদ থেকে মুক্তি মিলত। বার্লি আর সাগুদানা মুখে তুলে দিতে দিতে দাদি গল্প বলতেন। স্বামী আসমত উল্লাহ আর তাঁর শ্বশুর শরিয়ত উল্লাহর গল্প। দুজনের একজনকেও দেখেনি আনন্দ। তবু শুনে শুনে আনন্দের মনে হতো আসমত উল্লাহ রোগা-পাতলা আর রুক্ষ মেজাজের মানুষ। তবে শরিয়ত উল্লাহর পেটানো শক্তপোক্ত শরীর, লম্বা দাঁড়ি নেমে এসেছে বুক পর্যন্ত।

শরিয়ত উল্লাহ কেন বার্মাতেই থেকে গেল দাদির কাছে সে-প্রশ্ন করেও কোনো উত্তর পায়নি সে। দাদি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলতেন, হয়তো লোকের কথাই ঠিক, বর্মি মেয়েরা বান-টোনা জানে। আসলে শরিয়ত উল্লাহর বংশেই নাকি এমন ধারা চলেছে। তার দাদাও নাকি বার্মা গিয়ে আর ফিরে আসেনি।

হাসপাতালের কেবিনের জানালা দিয়ে কাঠবাদাম গাছের কচি লাল পাতার দিকে তাকিয়ে দাদি বলে যান, সেই শাহ সুজার বার্মা যাওয়ার আগে থেকে তার পরদাদা, পরদাদার পরদাদাও নাকি বার্মা যেত-আসত। সে রাজা নরমিখলার আমল থেকে। দাদি সুর করে বলতেন :

কর্ণফুলী নদী পূর্বে আছে এক পুরী

রোসাঙ্গ নগরী নাম স্বর্গ অবতারী

‘সেই রোসাঙ্গ, জিন-পরিদের রাজ্য আছিল। সে বরাবরই মায়া নগর। এক হাতে মাইনষেরে ডাকে, অইন্য হাতে নিষেধ করে। কিন্তু যেবার জাপান-ব্রিটিশ যুদ্ধ লাগল, সেবার যে হাতে ডাকে, সেই হাতটা ভাইঙা গেল জাপানিগো বোমায়। আরাকানের সামনে গভীর সাগরে সেই মূর্তিআছে। এরপর থেইকা খালি মানা করে। রোসাঙ্গে যাওয়ার বিষয়ে

সবাইরে নিষেধ করে। কিন্তু লোকে তবু যায়। যেখানে নিষেধ, সেখানে যাওয়াই তো মাইনষের নিশা, কী কও ভাই!’

সেই চাঁদপুরের লদুয়া গ্রাম থেকে তেরো বছর বয়সে চট্টগ্রামে এসেও দাদি চট্টগ্রামের বুলি রপ্ত করেননি। দাদা নাকি তাঁকে ঠাট্টা করে বলত দারাইল্যা। দাদি বলতেন, ‘চট্টগ্রাম আসলে আরাকানের মইধ্যে আছিল। চাঁটগাইয়াদের আমরা তাই মগ বলতাম। তাদের বউ-ঝিরাও আরাকানিদের মতো থামি-ব্লাউজ পরত। আর আমরা পরতাম শাড়ি।’

----পাঁচ---

টেকনাফ বাসস্ট্যান্ডে সকাল ছয়টায় নেমে কোথাও এক কাপ চা পেল না। এত সকালে চায়ের ঝাঁপি খোলে না এখানে। যেখানে বাস দাঁড়িয়েছে তার পাশেই একটা পান-সিগারেটের দোকান। সিগারেট কিনে ধরিয়ে একটা টান দিতেই দেখল কয়েকজন তরম্নণ দলবেঁধে সামনের দিকে যাচ্ছে। তাদের একজন তারই বাসের যাত্রী। চিনতে পেরে এগিয়ে এলো তরুণটি। যে-পথ দিয়ে রোহিঙ্গারা আসছে তারা যাচ্ছে সেখানে। শাহপরীর দ্বীপের ভাঙা রাস্তার মাথায়। ছবি তুলবে। বিবিসি আর সিএনএনে দেখেছে এতদিন, আজ এই মহাঘটনা নিজের চোখে দেখবে।

ভাঙার বেশ খানিকটা আগেই অটো নামিয়ে দিলো তাদের। সারি সারি ত্রাণের গাড়ি আর দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের কার-জিপের লম্বা লাইন। সবাই ভীষণ ব্যস্ত। কারোই কথা বলার সময় নেই। গাড়িবহর পার হয়ে সামনে এগোতেই আস্ত সড়কটাই উধাও। ভাঙতে ভাঙতে সরু বল্লমের ফলার আকার নিয়ে রাস্তাটা সোজা গিয়ে ঢুকেছে সাগরের পেটে। আগে এ-পথ দিয়েই গাড়ি চালিয়ে সোজা শাহপরীর দ্বীপে যাওয়া যেত। এখন ভাঙনে নিশ্চিহ্ন। তাই জায়গাটার নাম হয়েছে ভাঙা। সরু রাস্তাটায় সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। কিন্তু এর মধ্যেই সরু বল্লমের ফলার মতো জায়গাটায় টিভি ক্যামেরার ভিড়। ক্যামেরা আর তার সামনে ভিকটিমদের অত্যাচারের বয়ান। সব বয়ানই একরকম। আঁরার ঘর ফোড়া দিইয়ে, গুলি মারি দিইয়ে…

২৪ আগস্ট থেকে টেলিভিশনে কথাগুলো প্রচার হচ্ছে। ঘটনাগুলো নৃশংসতার দিক থেকে অনন্য, কিন্তু ভয়ংকর একঘেয়ে আর পুনরাবৃত্তিময়। গ্রামের পর গ্রাম একই কায়দায় জ্বালিয়ে দিয়েছে ওরা। একই কায়দায় শিশুদের আছড়ে ফেলেছে। একই কায়দায় নারীদের ধর্ষণ করেছে। একই কায়দায় পুরুষদের দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করেছে। গুলি শেষ হয়ে গেলে জবাই করেছে। শুনতে শুনতে তার একসময় মনে হয় প্রত্যেকেরই গল্প এক। কারো সঙ্গে কারোর ভেদ রাখা হয়নি।

জোরে বৃষ্টি এলো। বাতাসও শুরু হলো একসঙ্গে। ত্রাণবহরের লোকজন আর সংবাদকর্মীদের মধ্যে হঠাৎই চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এইমাত্র সীমান্ত অতিক্রম করে কয়েকটা নতুন নৌকা এসে ভিড়েছে। ত্রাণ নিয়ে, ক্যামেরা নিয়ে সবাই সেদিকে ছুটে যায়। জটলা পার হয়ে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত মানুষগুলো আসতে থাকে সারি করে। কেউ একশ টাকা, কেউ পানি, জুস, কলা আর পাউরুটি গুঁজে দেয় হাতে। এসব নেওয়ারও শক্তি নেই অনেকের। বোরকা পরা এক নারী কোলে শিশু, এক হাতে একটা পুঁটলি নিয়ে এগিয়ে যায় সামনে।

স্বামী কোথায়, কে যেন প্রশ্ন করে ভিড়ের ভেতর থেকে।

শিশু কোলে তরুণী মা নির্বিকারভাবে জবাব দেয়, মিলিটারি গুলি মারি দিয়ে…।

আনন্দ যেন হৃদয়হীন এক নির্বিকার জগতের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে। সে কি মনের কোণে ক্ষীণ হলেও একটা আশা জাগিয়ে রেখেছিল? এখানে এসে সে-কারণেই বারবার বৃদ্ধ মানুষের মুখগুলো লক্ষ করছিল সে? কিন্তু তেমনটা ঘটল না। স্বাস্থ্যবান পেটানো শরীরের সাদা দাড়িওয়ালা কোনো বুড়ো মানুষ তার সামনে এসে দাঁড়ায়নি। বলেনি, তার নাম শরিয়ত উল্লাহ। এত বছর পর দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছে।

শরিয়ত উল্লাহর ছেলে হাজি আসমত উল্লাহ বহু বছর আগেই মারা গেছে। কিন্তু এই ভিড়ে তাঁর বর্মি ভাইদের কেউ কি আছে? নাকি তারা বাপ-দাদার নাম-পরিচয় সব বিসর্জন দিয়ে পুরোপুরি বর্মি হয়ে গেছে?

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শক্তপোক্ত এক যুবক তার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল। চোখের দৃষ্টি কোনোদিকেই নিবদ্ধ নয়। ত্রাণ দিতে চাইলেও সে ফিরে তাকাল না কারো দিকে।

আনন্দ তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, আপনার নাম?

ডা. হামিদ হোসেন।

আপনি ডাক্তার?

হ্যাঁ, পল্লি চিকিৎসক।

গ্রাম?

নলবইন্যা, বর্মিরা বলে পন্ডুভিয়ান।

আপনার কি একটা বর্মি নাম আছে?

অং সা থোয়ে, এটুকু বলে লোকটা ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।

আনন্দ জানে এমন বর্মি নাম প্রত্যেক রোহিঙ্গারই আছে। তবু সে লোকটার পেছন পেছন ছুটল।

কিন্তু ভিড়ের ভেতরে আর খুঁজে পেল না লোকটাকে। সে কি তার বর্মি ভাই? শুশুকের মতো একবার মুখ দেখিয়ে ভিড়ের গভীরে হারিয়ে যাওয়া ওই লোকটা? ওই পল্লি চিকিৎসক? এমন ভাবনায় মন আচ্ছন্ন হলেও তার গলার কাছে কিছু একটা এসে ঠেকল না। চোখটা ঝাপসা হয়ে এলো না। বরং অর্থহীন এক যাত্রায় নিজেকে আরো সামনের দিকে ঠেলে দিলো সে। এখানে সরু বল্লমের ফলার মতো সড়কটা শেষ। এক হাঁটুপানির নিচে ধারালো পাথর। বাঁয়ে মংডুর পাহাড় এসে মিশেছে তাতে, নীলাভ ছায়াময় সেই পাহাড়ের গা-বেয়ে নেমে আসছে মানুষ। এতদূর থেকে তাদের পিঁপড়ের মতো মনে হয়।

----ছয়----

পুরাকালে বোধিসত্ত্ব ব্রহ্মদেশের রোসাঙ্গের মংডু জেলার হাসুরাতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরিণত বয়সে এক রোসাঙ্গি কন্যার সঙ্গে তার বিবাহ হয়। বিবাহের পর তাদের তিন সন্তান হলো। দুই মেয়ে, এক ছেলে। দুই মেয়ে মরিয়ম ও জয়নব আর ছেলে মহম্মদ রশিদকে রেখে বোধিসত্ত্ব অকালে মারা যান। এরপর তাদের পরিবার ভীষণ অভাবে পড়ে যায়। অত্যন্ত দুঃখ-কষ্টে তাদের দিন কাটতে লাগল। বোধিসত্ত্বের স্ত্রী প্রতিবেশীদের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকমে দিন কাটাতে লাগল। ঠিক এই সময়ে ব্রহ্মদেশের সরকার নতুন করে নাগরিকত্ব আইন জারি করল। নতুন আইন অনুযায়ী রশিদ, তার দুই বোন ও মা বিদেশি বলে চিহ্নিত হলো। গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাওয়ার অনুমতি নেই তাদের। দুই-তিনদিন পরপর তাবেবদের নিয়ে গ্রামে সৈন্যরা আসে। এসে সব ঘরের লোক গণনা করে। আর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাদের দেখে। একবার তারা সঙ্গে করে ওজন মাপার যন্ত্রও নিয়ে আসে। রশিদ, তার দুই বোন ও মায়ের ওজন মাপে তারা। সবার ওজন দেখে তারা বিস্মিত হয়।
গ্রাম ছাড়ার উপায় নেই। ফসলের ক্ষেতে আগুন দেওয়া হয়েছে তবু সবার ওজন সুস্থ মানুষের মতোই। এমন বাড়বাড়ন্ত শরীর কীভাবে হলো?

তাবেব মানে দালালরা সৈন্যদের হয়ে তাদের জেরা করে। জেরার জবাবে তারা বলে, আমরা বোধিসত্ত্বের সন্তান, তিনিই আমাদের রক্ষা করেন। এ-কথা শুনে ব্রহ্মদেশের সৈন্যরা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। এমন ফাজলামির উচিত শিক্ষা দিতে তারা বোধিসত্ত্বের ঘর জ্বালিয়ে দেয়। রশিদের বোন আর মাকে ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। কীভাবে যেন সেখান থেকে পালিয়ে আসে রশিদ। পালিয়ে আসার সময় নিয়ে আসে একটা সোলার প্যানেল, আরএফএল কোম্পানির একটা বালতি, তার ভেতরে কাপড়ে জড়ানো একটা রাজহাঁস।

এমন কাহিনি বলে ঋষি আনন্দ আবার চোখ বন্ধ করেন। তাঁর পাশে বসা মহম্মদ রশিদকে শ্রমণরা আরেকবার ভালো করে দেখে। উপস্থিত শ্রমণদের একজন হঠাৎ প্রশ্ন করে, ঋষি এই গল্প জাতকে নেই। এই জাতকের নামই-বা কী। আনন্দ চোখ খোলেন। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে ওঠেন, রোহিঙ্গা জাতক।