Showing posts with label কাজী সুমন. Show all posts
Showing posts with label কাজী সুমন. Show all posts

Wednesday, August 7, 2024

বাবাকে এখনো আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি: ইলিয়াসপুত্র আবরার by কাজী সুমন

সিলেট বিভাগীয় বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীকে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বিভিন্ন স্থানে খুঁজে বেড়াচ্ছেন বলে জানিয়েছেন পুত্র ব্যারিস্টার আবরার ইলিয়াস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইলিয়াস আলী ফিরে আসার খবরকে ‘গুজব’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। বুধবার মানবজমিনকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব তথ্য জানান। ব্যারিস্টার আবরার ইলিয়াস বলেন, স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের তিন আমলে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসংখ্য নেতাকর্মী গুম হয়েছেন। সোমবার ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গুম হওয়া  কয়েকজনকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বন্দিশালা ‘আয়নাঘরে’ বন্দি ছিলেন। এ ঘটনার পর আমরাও আশাবাদী হয়েছি- আমার বাবাকে ফিরে পাবো। আমরা এখনো আমার বাবাকে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজে বেড়াচ্ছি।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইলিয়াস আলী ফিরে আসার খবর বিষয়ে জানতে চাইলে আবরার বলেন, এ ধরনের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমি নতুন সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি- তারা যেন আমার বাবাকে খুঁজে বের করে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়। এ ঘটনাটি জাতিসংঘের মাধ্যমে তদন্ত করার দাবি জানাচ্ছি।

যেভাবে নিখোঁজ হন ইলিয়াস আলী
২০১২ সালের ১৭ই এপ্রিল। রাত তখন ১২টা। বনানী থানা থেকে একটি ফোন আসে জ্যেষ্ঠপুত্র আবরার ইলিয়াসের মোবাইলে। দৌড়ে মা তাহসিনা রুশদীর লুনার রুমে যান আবরার। কাঁচা ঘুমে আচ্ছন্ন মাকে ডেকে তোলেন। বলেন, পুলিশ জানিয়েছে আমাদের গাড়ি নাকি বনানী থানায়। তখনও স্বামী এম ইলিয়াস আলীর বিপদ আঁচ করতে পারেননি লুনা। অনেকটা স্বাভাবিক চিন্তা নিয়ে পুত্রকে বলেন, আমাদের ড্রাইভার আনসারকে ফোন দাও। পুত্র জানান, আনসারকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন লুনা বলেন, তাহলে তোমার বাবাকে ফোন দাও। উদ্বিগ্ন পুত্র জানান, বাবার ফোনও বন্ধ। পুত্রের জবাব পেয়ে দিশাহারা হয়ে যান লুনা। দু’জনের ফোন একসঙ্গে বন্ধ কেন? তখন থেকে নানা দুশ্চিন্তা তার মাথায় আসতে থাকে। লুনা বলেন, সঙ্গে সঙ্গেই বনানী থানার ঐ পুলিশ কর্মকর্তাকে ফোন করি। জিজ্ঞাসা করি, গাড়ি থানায় গেল কীভাবে? তখন ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, টহল পুলিশ আমাদের জানিয়েছে, বনানীর ২ নম্বর সড়কের সাউথ পয়েন্ট স্কুলের সামনে একটি গাড়ি পড়ে আছে। পরে আমরা গাড়ি থানায় নিয়ে আসি। কিছুক্ষণ পরই স্থানীয় একজন ছাত্রদল নেতা আসেন বাসায়। তিনি জানান, রাত পৌনে ১২টার দিকে গাড়িচালক আনসার আলী তাকে ফোন করে বলেন, তার মোবাইলে ব্যালেন্স নেই। দ্রুত কিছু টাকা পাঠানোর আকুতি জানান। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই লাইনটি কেটে যায়।
এদিকে ঘটনার চারদিন পর র‌্যাব সদর দপ্তরের মোশতাক নামে এক কর্মকর্তা যোগাযোগ করেন স্ত্রী লুনার সঙ্গে। ফোন করে শোনান আশার বাণী। ওই র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, আমাদের কাছে ইনফরমেশন আছে, উনাকে (ইলিয়াস আলী) পাওয়া যেতে পারে, আপনারা প্রিপারেশন রাখেন। এরপর ওই র‌্যাব কর্মকর্তা আরও একদিন ফোন করে একই কথা শোনান। এর কিছুদিন পর ইলিয়াস আলীকে পাওয়ার আশার বেলুন ফুটো করে দেন ওই র‌্যাব কর্মকর্তা। তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, আমাদের কাছে যে ইনফেরমেশনটা ছিল সেটা এখন আর নেই। এই বিষয়ে আমরা আর কিছু বলতে পারছি না।  কয়েকদিন পর আমাকে জনৈক এক ব্যক্তি ফোন করে বলেন, ইলিয়াস আলী জীবিত আছেন। আপনি ইচ্ছে করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন। কীভাবে সাক্ষাৎ করা যায় সেটাও তিনি বলে দিলেন।

স্বামীর সন্ধান পেতে পরদিনই প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের সুযোগ চেয়ে আবেদন করেন তিনি। দুই পুত্র ও শিশুকন্যাকে নিয়ে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় ইলিয়াসপত্নীকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অপেক্ষা করো, ধৈর্য ধরো, বিষয়টি দেখছি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের কিছুদিন পর গাজীপুরের পূবাইল থেকে লুনার মোবাইলে একটি ফোন আসে। এক নারী ফোন করে জানান, ইলিয়াস আলীকে পাওয়া যেতে পারে, দ্রুত পূবাইলে আসেন। বেশ কয়েকজন দলীয় নেতা ও র‌্যাব কর্মকর্তা মোশতাকসহ দ্রুত যান পূবাইলে। সেখানে যাওয়ার পর স্থানীয়রা জানান, একজন লোককে মাইক্রোবাসে করে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তবে ইলিয়াস আলীর সন্ধান আর পাননি।

ঘটনার সময় পাশের পার্কের বেঞ্চে ঘুমিয়ে ছিলেন ডাব বিক্রেতা সোহেল। চিৎকার চেঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার। এরপর তিনি দেখেন, একটি লোককে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করছে চার ব্যক্তি। গাড়িতে উঠতে না চাওয়ায় ওই ব্যক্তিকে কিলঘুষি মারা হচ্ছিল। দীর্ঘ সময় ধস্তাধস্তির পর জোর করে তাকে গাড়িতে তোলা হয়। এ সময় ওই ব্যক্তি ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিল। পরদিন সকালে জানতে পারি, বনানীর পার্কের পাশের সড়ক থেকে যে ব্যক্তিকে গাড়িতে তোলা হচ্ছিল, তিনিই বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী। গাড়িতে উঠিয়ে বনানী এক নম্বরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

ওই সময় ঘটনাস্থলের পাশের ভবনের একজন নির্মাণ শ্রমিক পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, ইলিয়াস আলীর গাড়ির পেছন দিকে কালো রঙের মাইক্রোটি ধাক্কা মারায় চালক ক্ষিপ্ত হয়ে নেমে যান এবং মাইক্রো চালকের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক ও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় মাইক্রো থেকে আরও ৪-৫ জন নেমে গিয়ে ইলিয়াস আলীর গাড়ির চালককে জোর করে ধরে মাইক্রোতে তুলে নিয়ে বেঁধে ফেলেন। পরক্ষণেই ৩-৪ জন নেমে গিয়ে প্রাইভেটকারে বসে থাকা ইলিয়াস আলীকেও ধরে গাড়িতে তোলার সময় ধস্তাধস্তির সৃষ্টি হয়। এরপর থেকে ইলিয়াস আলীর আর খোঁজ মেলেনি।

Saturday, March 5, 2016

যেভাবে সময় কাটছে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের by কাজী সুমন

গুলশান-২ এর ৬৯ নম্বর রোড। সুনসান নীরব পরিবেশ। ওই রোডের ১০ নম্বর বাড়িটির নাম ‘গ্রাউন্ড প্রেসিডেন্ট বিকন্ড’। বাড়ির চতুর্থতলার একটি ফ্ল্যাটে থাকেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। ঠিক একটি বাড়ির পশ্চিমেই মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবন। ফলে ওই রোডের নিরাপত্তাও নিশ্ছিদ্র। সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পাশাপাশি সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও থাকেন তৎপর। অনেকটা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়েই নীরবে-নিভৃতে অবসর সময় কাটছে আলোচিত সাবেক এই প্রেসিডেন্টের। একসময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও তিনি এখন বৃত্তের বাইরের মানুষ। অনেকটা নির্বাসন জীবনযাপন করছেন। রাষ্ট্রীয় কিংবা সামাজিক কোনো আচার-অনুষ্ঠানে দেখা যায় না। রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানের দাওয়াত পেলেও যোগ দেন না। থাকেন ছোট ছেলে সোহেল আহমদের ফ্ল্যাটেই।
৮৭ বছর বয়সী সাবেক এই প্রেসিডেন্ট ভুগছেন বার্ধক্যজনিত নানা রোগে। শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়লে বাসায় চিকিৎসা করান। প্রয়োজনে ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে ডাক্তার এসে চেকআপ করে ওষুধপত্র দিয়ে যান। আহারও গ্রহণ করেন খুবই অল্প। বেশির ভাগ সময় বিভিন্ন ফলের জুস ও তরল জাতীয় খাবার খেতেই বেশি পছন্দ করেন। ছেলের বউ ও কয়েকজন কাজের লোক তার সেবা-শুশ্রূষা করেন। তবে অসুস্থ হওয়ার আগে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত আধাঘণ্টা মর্নিংওয়াক করতেন। ৬৯ নম্বর রোড থেকে হাঁটা শুরু করে দক্ষিণ পাশের ৫৮ নম্বর হয়ে ৬২ নম্বর সড়ক ঘুরে বাসায় ফিরতেন। এসময় তার সঙ্গে একজন স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) সদস্য থাকতেন। খুবই ধীরপায়ে এই কয়েকশ’ গজ রাস্তা হাঁটতেন। ওইসময় কোনো পথচারী তাকে সালাম দিলে মাথা নেড়ে উত্তর দিতেন। কিন্তু গত তিন মাস ধরে তিনি মর্নিংওয়াকে বের না হওয়ায় এসবি’র ওই সদস্য মাঝেমধ্যে সাবেক এই প্রেসিডেন্টের খোঁজখবর নিতে যান। অবসরের পর সবাই ভেবেছিলেন- লেখালেখি করবেন কিংবা নিজের আত্মজীবনী বের করবেন। কিন্তু সেপথে হাঁটেননি তিনি। ১০ নম্বর ওই বাড়িটির নিরাপত্তা রক্ষী সোহাগ জানান, স্যার অ্যাপার্টমেন্টের চতুর্থতলায় তার ছেলের সঙ্গে থাকেন। অসুস্থ হওয়ার আগে সকাল বেলা নিয়মিত হাঁটতেন। তিনি কারও সঙ্গে দেখাও করেন না এবং কথাও বলেন না। তবে গত তিন মাস ধরে স্যারের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়েছে। তাই তিনি এখন আর সকালে হাঁটতে বের হন না। সময় কাটছে বাসাতেই।
দুইবার প্রেসিডেন্টের দায়িত্বপালনকারী সাহাবুদ্দীন আহমদের জন্ম ১৯৩০ সালের ১লা জানুয়ারি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার পেমই গ্রামে। পিতা তালুকদার রিসাত আহমদ ছিলেন একজন সমাজসেবী।  নেত্রকোনায় প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শেষে সাহাবুদ্দীন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনপ্রশাসনে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। প্রথমেই ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। এরপর গোপালগঞ্জ ও নাটোরের মহকুমা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি সহকারী জেলা প্রশাসক হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৬০ সালে প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগে বদলি হন তিনি। ঢাকা ও বরিশালের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে এবং কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। ১৯৭২ সালের ২০শে জানুয়ারি তাকে হাইকোর্টের বেঞ্চে বিচারক হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়। ১৯৭৩-১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর তাকে হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯৮০ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি তাকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। পরে হন প্রধান বিচারপতি। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে অনেকটা নাটকীয়ভাবে ক্ষমতায় আসেন সাহাবুদ্দীন আহমদ। ১৯৯০ সালের ৫ই ডিসেম্বর ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ উপ-রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করলে তাকে ওই পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। পরদিন প্রেসিডেন্ট এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়ে আস্থাহীনতা দেখা দেয়। পরে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনকারী সাহাবুদ্দীন আহমদকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করা হয়।  ১৯৯১ সালের ২৭শে জানুয়ারি তিনি একটি অবাধ, সুষ্ঠু পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেন। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ওই বছরের ২৩শে জুলাই তিনি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে  সততা ও প্রজ্ঞা দিয়ে দেশের সকল স্তরের মানুষের মন জয় করেন। ২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অবসর নেন অতি সাধারণ জীবনযাপন করা এই মানুষটি।

Tuesday, March 1, 2016

বিএনপি জামায়াত দূরত্ব by কাজী সুমন

ক্রমেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের যোগাযোগ এখন নেই বললেই চলে। গত কয়েক মাসে জোটের কোনো বৈঠকেই যোগ দেয়নি জামায়াত। পৌরসভা নির্বাচনের পর ইউপি নির্বাচনেও জামায়াতের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হয়নি বিএনপির।
বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কে গত দুই বছরের বেশি সময় ধরেই ভাটার টান চলছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি এক্ষেত্রে নিয়ামক ভূমিকা রেখেছে। তবে বিএনপি বা জামায়াত কোনো দলই আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ভাঙার দায় নিতে রাজি নয়। যে কারণে ঘোষণা দিয়ে হয়তো জামায়াত জোট ত্যাগ করবে না। বিএনপিও এ ব্যাপারে কোনো ঘোষণা দেবে না। তবে অস্তিত্বের সংকটে থাকা জামায়াত এরই মধ্যে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও বিকল্প চিন্তা করছে। দলের অনূর্ধ্ব ৬০ বছর বয়সী নেতাদের নিয়ে নতুন দল গঠনের আলোচনাও রয়েছে।
গত ১৯শে ফেব্রুয়ারি ইউপি নির্বাচন নিয়ে ২০ দলের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠক আহ্বান করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৈঠক শেষে মির্জা আলমগীর ইউপি নির্বাচনে ২০ দল ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু ওই বৈঠকে অংশ নেননি জোটের অন্যতম শরিক দল জামায়াত ও এলডিপির কোনো প্রতিনিধি। ওই দিনের সংবাদ সম্মেলনে জোটের দুই শরিক দলের যোগ না দেয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান মির্জা আলমগীর। এতে জামায়াতসহ কয়েকটি শরিক দলের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী নিয়ে বিএনপির সঙ্গে শরিক দলগুলোর এখনও কোনো সমঝোতা হয়নি। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান শরিকদের জন্য ২০টি ইউপিতে ছাড় দেয়ার কথা বললেও বাস্তবে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। একাধিক শরিক দলের শীর্ষ নেতা জানান, জামায়াত, এলডিপি, কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ নিজেদের মতো করে প্রার্থী দিয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি দল নিজেদের মতো করে প্রার্থী দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এদিকে ইউপি নির্বাচনে সমঝোতার বিষয়ে জোটের শরিক দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, নির্বাচন নিয়ে জোটের সমন্বয় সভায় আমাদের নামেমাত্র ডাকা হয়েছিল। মাত্র ১৫-২০ মিনিটের একটি বৈঠকের নামে ফটোসেশন করা হয়। বিএনপির সিদ্ধান্তগুলো শুধু আমাদের জানিয়ে দেয়া হয়। নির্বাচনে শরিক দলগুলোর কোনো প্রার্থী আছে কিনা তা নিয়ে আলোচনা করা হয়নি। এর আগে উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন সমন্বয় সভায়ও জামায়াতের কোনো প্রতিনিধি অংশ নেননি। এছাড়া উপজেলা ও পৌরসভায় ২০ দল জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিল। তখন এলডিপি ও জাতীয় পার্টিকে (জাফর) দুটি পৌরসভায় ছাড় দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে প্রথমদিকে সমঝোতা না হওয়ায় একপর্যায়ে মির্জা আলমগীর বলেছিলেন, স্থানীয়ভাবে জামায়াতের প্রার্থীদের সঙ্গে সমঝোতা করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি জামায়াতের সঙ্গে। দুটি উপজেলায় তাদের প্রার্থী জয়ও পায়। ২০ দলীয় জোটের শরিক দলের এক শীর্ষ নেতা জানান, ২০ দলীয় জোট একরকম মৃত অবস্থায় আছে। তেমন কোনো সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নেই। বিএনপির দরকার ‘২০’ সংখ্যাটিকে টিকিয়ে রাখা। তাই জোট থেকে ছোট কোনো দল বেরিয়ে গেলেও তাদের কিছু যায়-আসে না। বিএনপির কোনো কর্মীকে ওই দলের চেয়ারম্যান করে ২০ সংখ্যাটি তারা ঠিক রাখবে। কারণ, ২০ দলের মধ্যে কয়েকটি দল রয়েছে যাদের গুটি কয়েকজন নেতা ছাড়া আর কোনো কর্মী নেই।
দুটি বৈঠকে জামায়াতের অংশ না নেয়ার বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মানবজমিনকে বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন। জামায়াত নেতারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন না। এজন্যই হয়তো দলটির কোনো নেতা বৈঠকে যোগ দিতে পারেনি। তার মানে এই নয় জামায়াত ২০ দলীয় জোটে নেই। পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ার বিষয়ে অনেকটা একই যুক্তি তুলে ধরেন বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের এই নেতা।
এদিকে, জামায়াত নেতাদের নিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের আলোচনাও শোনা যাচ্ছে। দলটির নাম হতে পারে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। যুদ্ধাপরাধের অপবাদ ঘুচাতে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের দলটির নেতৃত্বে নিয়ে আসা হবে। তবে জামায়াত এক্ষেত্রে বিলুপ্ত করা হবে না। একটি অংশ জামায়াতেই থেকে যাবেন।

Tuesday, January 12, 2016

‘আগামীতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই বড় চ্যালেঞ্জ’ by কাজী সুমন

প্রধান বিরোধী জোটের ভোট বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর আজ পূর্ণ হচ্ছে সরকারের দুই বছর। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে সরকার। তবে প্রত্যাশিত বেসরকারি বিনিয়োগ না হওয়া এবং নতুন করে উত্থান হওয়া জঙ্গিবাদে সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ছাড়া আগামীতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে জানিয়েছেন তারা। সরকারের দুই বছর পূর্তির মূল্যায়নে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জে. (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন না করা ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। দেশে যদি সঠিক নির্বাচন না হয় তাহলে এক ধরনের অস্থিরতা থাকে। সুশাসনের অভাব থাকে। সরকারের আচরণ হয় স্বেচ্ছাচারীদের মতো। সরকারের সফলতার কথা তুলে ধরে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, শত বাধা সত্ত্বেও সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী দল। গণতন্ত্রের জন্য দলটির দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। মানুষের ভোটাধিকারের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনের অর্ধেক সময় জেলে কাটিয়েছেন। অথচ সেই দলটি ক্ষমতা যেভাবে ধরে রেখেছে বিশ্বব্যাপী সেটা ইতিহাস হয়ে থাকবে। সরকার যেদিকে এগুচ্ছে সেখান থেকে তাদের সহজে সরে আসা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- আগামীতে বিশ্বাসযোগ্য একটি জাতীয় নির্বাচন। ৫ বছর পরে হলেও সরকারকে একটি নির্বাচন করতে হবে। সরকার যে ধারায় নির্বাচন করছে তাতে মানুষের আস্থা থাকবে না। নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। এ ছাড়া বিচার বিভাগের ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার যে অভিযোগ করেছেন প্রধান বিচারপতি- সেটি খুবই উদ্বেগজনক। তিনি আরও বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের শীতল সম্পর্ক যাচ্ছে। সেই দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক কিভাবে উন্নয়ন করবে সেটা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এ ছাড়া প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা ও উত্থান হওয়া জঙ্গিবাদের মোকাবিলাও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, অর্থনৈতিক, কৃষি ও শিক্ষায় সরকারের সাফল্য রয়েছে। আইনের শাসন, সুশাসন, রাজনৈতিক অধিকার, বাক-স্বাধীনতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি নেই। নিঃসন্দেহে অবনতি হয়েছে। প্রখ্যাত এই সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলেন, দেশে নির্বাচন হচ্ছে কিন্তু জনপ্রিয়তা যাচাই হচ্ছে না। জনপ্রিয়তা আছে কি নেই- তা নিরূপণ করার একমাত্র উপায় হলো নির্বাচন। সেটাতে যদি ঘাটতি থাকে তাহলে অন্যান্য অর্জনগুলো ম্লান হয়ে যায়। অর্জনগুলো দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সরকারের কাছে প্রত্যাশার বিষয়ে তিনি বলেন, আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। সরকার দলের বাইরে যে জনসাধারণ রয়েছে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাই হবে চ্যালেঞ্জ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, গত দুই বছরে দেশে গণতন্ত্র নির্বাসনে চলে গেছে। আইনের শাসন বাক্সবন্দি হয়ে পড়েছে। নাগরিক অধিকার ও বোধকে অপমান করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজেদের দলীয় বাহিনীতে পরিণত করেছে সরকার। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর মামলা-হামলা নির্যাতনের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। পুরোপুরি একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছে। এভাবে সরকার বেশিদিন চালাতে পারবে না মন্তব্য করে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, আগামীতে সরকার দলের নেতাদের নিজেদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ বাড়বে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হবে। অতীতের অর্জনগুলো আরও নিম্নমুখী  হবে। সাধারণ মানুষ সরকার বিমুখ হবে। সঠিক নির্বাচন দিতে বাইরের চাপ বাড়বে মন্তব্য করে প্রফেসর এমাজউদ্দীন বলেন, ৫ই জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গ্রহণ করেনি। সঠিক নির্বাচন দিতে সরকারের ওপর বাইরের দেশগুলোর এখনও চাপ রয়েছে। আগামীতে এই চাপ আরও বাড়বে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর মিজানুর রহমান বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে সরকার একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল- বিদেশিরা ত্রুটিযুক্ত এই নির্বাচনটি কিভাবে নেয়। কিন্তু পরে দেখা গেছে- আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ সব দাতা সংস্থা বর্তমান সরকারের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কাজ করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে ২০১৫ সালটি ছিল সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। ৫ই জানুয়ারিকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী দলের আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াও এবং পেট্রলবোমায় দেশে এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়। তবে জনসম্পৃক্ততা না থাকায় সেই আন্দোলন সফল হয়নি। সরকারের সফলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই আন্দোলনের পর সরকার দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসে। কৃষি, শিক্ষা, অর্থনীতিতে ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে। নিজেদের অর্থায়নে পদ্মাসেতুসহ বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এরপর জনগণের মধ্যেও আস্থা ফিরে এসেছে। চ্যালেঞ্জের বিষয় তুলে ধরে মিজানুর রহমান বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সুবিধা দেয়ার পর প্রত্যাশিত বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি। এখানে একটু ব্যর্থতা রয়েছে। আগামীতে এই সেক্টরটিতে সরকারকে একটু নজর দিতে হবে। এ ছাড়া উত্থান হওয়া জঙ্গিবাদ কঠোর হাতে দমন না করতে পারলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের চ্যালেঞ্জের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের নির্বাচন কমিশনের আইন ভারতের চেয়েও শক্তিশালী। কিন্তু শ’ শ’ লোক নিয়ে কেন্দ্র দখল করলে তো পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের কিছু করার থাকে না। তাই আগামীতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে সমঝোতায় আসতে হবে। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, গত দুই বছরে সরকারের বেশ কিছু বড় সাফল্য রয়েছে। তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। জনসাধারণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। তিনি বলেন, আগামীতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জঙ্গিবাদ দমন, ধর্মান্ধতা দূরীকরণসহ সরকারকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এগুলো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই মন্তব্য করে আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রধান বিরোধী জোট আগাম নির্বাচনে দাবি জানালেও সরকারের ভাষা দেখে মনে হচ্ছে- ২০১৯ সালের আগে তাদের দাবি মেনে নেবে না।

Friday, December 25, 2015

কারাগারে স্বামীরা প্রচারণায় স্ত্রীরা by কাজী সুমন

রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন বেশ কয়েকজন মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় অনেকে রয়েছেন আত্মগোপনে। এলাকায় জনপ্রিয় হওয়ায় দল থেকেও মনোনয়ন পেয়েছেন তারা। তবে ভোটের আর এক সপ্তাহ বাকি থাকলেও মাঠে প্রচারণায় অংশ নিতে পারেননি এসব প্রার্থী। তাদের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন স্ত্রীরা। দিন-রাত চষে বেড়াচ্ছেন ভোটের মাঠ। ভোটারদের কাছে স্বামীর জন্য চাইছেন ভোট। জানা গেছে, দুজন মেয়র প্রার্থী ও ৭ জন কাউন্সিলর প্রার্থী এবার কারাগারে থেকে নির্বাচন করছেন। তারা সবাই বিএনপি ও জামায়াত নেতা। এ ছাড়া পরোয়ানা থাকায় একজন মেয়র প্রার্থী ও একডজন কাউন্সিলর প্রার্থী আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের পক্ষে কৌশলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। প্রার্থীরা মোবাইল ফোনে এলাকার ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। অনেকে রাতের আঁধারে চুপিসারে গণসংযোগ করছেন।
হবিগঞ্জে নির্বাচন অনুষ্ঠেয় ৫টি পৌরসভায় মধ্যে সদরের মেয়র প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জি কে গউছ কারাগারে থেকে নির্বাচন করছেন। বর্তমান এই মেয়রের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন স্ত্রী ফারহানা গউছ হ্যাপি, ছেলে মঞ্জুরুল কিবরিয়া প্রীতম ও পরিবারের সদস্যরা। প্রতিদিনই গণসংযোগ করছেন গউছপত্নী। ভোটারদের কাছে স্বামীর উন্নয়নমূলক কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরছেন তিনি। যশোরে অনুষ্ঠেয় ৬টি পৌরসভার মধ্যে চৌগাছায় স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী জামায়াত নেতা কামাল আহমেদ কারাগারে রয়েছেন। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে তার প্রচারণা চালাচ্ছেন কামাল আহমেদের স্ত্রী জাহানারা পারভীন জলি, পরিবারের সদস্য ও দলের নেতাকর্মীরা। কামাল আহমেদের নির্বাচনী এজেন্ট ও উপজেলা জামায়াতের আমীর গোলাম মোরশেদ মানবজমিনকে জানান, আমাদের দলের প্রার্থী দীর্ঘদিন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র ছিল। এছাড়া দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। এলাকায় জনপ্রিয় হওয়ায় প্রার্থিতা দাখিলের পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে ভোটারদের কাছ থেকে বেশ সাড়া পাচ্ছি। সু্‌ষ্ঠু নির্বাচন হলে বিপুল ভোটে জয়ী হবো। কারারুদ্ধ প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বগুড়ায়। ওই জেলার ৯টি পৌরসভার নির্বাচন হবে। কোন মেয়র প্রার্থী কারাগারে না থাকলেও ৪ জন কাউন্সিলর প্রার্থী কারান্তরীণ রয়েছেন। তারা হলেন- বগুড়া সদর পৌরসভার ১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শাহ মেহেদী হাসান হিমু, ৮নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার ও জামায়াত নেতা এরশাদুল বারী এরশাদ, ১১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও জেলা যুবদলের সভাপতি সিপার আল বখতিয়ার এবং ১৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও শহর যুবদলের সভাপতি মাসুদ রানা। কারাগারে থেকেই তারা নির্বাচনে মনোনয়ন দাখিল করেছেন। গত ১৪ই ডিসেম্বরের পর থেকে তাদের পক্ষে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছে তাদের স্ত্রীরা। সরকারদলীয় প্রার্থীদের হুমকি-ধামকি, ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে দিন-রাত স্বামীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন তারা। জামায়াত নেতা এরশাদুল বারী এরশাদের পক্ষে তার স্ত্রী শাহেদ আরা সুলতানা রোজী প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। এই পরিবেশ বজায় থাকলে এবং ভোটাররা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দেয়ার সুযোগ পেলে তার স্বামী অবশ্যই বিজয়ী হবেন। স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হিমুর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন তার স্ত্রী জিনাত পারভীন স্নিগ্ধা। তিনি বলেন, তার স্বামী মিথ্যা মামলায় কারাগারে। এলাকায় তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। এ কারণে কারাগারে থেকে আবারও প্রার্থী হয়েছেন। যুবদল নেতা মাসুদ রানার পক্ষে স্ত্রী রেহেনা বেগম প্রচারণা চালাচ্ছেন। যুবদল নেতা বখতিয়ারের পক্ষে মাঠে নেমেছেন তার স্ত্রী আয়েশা জামান বখতিয়ার। এছাড়া বিভিন্ন মামলায় আসামি হওয়ায় আত্মগোপনে থাকায় ৭নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর ও জাসাস জেলা সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন পশারী হিরুর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন তার স্ত্রী জেসমিন আক্তার। একইভাবে ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী হারুন উর রশিদ ও গোলাম মোস্তফার পক্ষে তাদের স্ত্রীরা দিনরাত মাঠে ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন। এদিকে মৌলভীবাজারে নির্বাচন অনুষ্ঠেয় ৪টি পৌরসভার মধ্যে কোন দলের মেয়র প্রার্থী কারাগারে নেই। তবে সদর পৌরসভার কাউন্সিলর প্রার্থী ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সরওয়ার মজুমদার ইমন কারাগারে থেকে মনোনয়ন দাখিল করেন। এরপর তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্য প্রচারণা চালান। সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন তিনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জে নির্বাচন অনুষ্ঠেয় ৪টি পৌরসভার মধ্যে কোন মেয়র প্রার্থী কারাগারে নেই। তবে সদর পৌরসভায় কাউন্সিলর প্রার্থী ছৈবুর রহমান কারাগারে থেকে নির্বাচন করছেন। তার প্রচারণা চালাচ্ছে পরিবারের সদস্যরা। কোন মেয়র প্রার্থী কারাগারে নেই। তবে কলারোয়ায় কাউন্সিলর প্রার্থী যুবদল নেতা আবদুল মুজিব কারাগারে থেকে নির্বাচন করছেন। তার প্রচারণা চালাচ্ছেন স্ত্রী ও ছোটভাই আবদুল আজিজসহ পরিবারের সদস্যরা। ওদিকে জয়পুরহাটের ৩টি পৌরসভার মধ্যে কোন মেয়র প্রার্থী কারাগারে না থাকলেও আত্মগোপনে রয়েছেন দুজন। তারা হলেন- সদরে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী হাসিবুল আলম ও কাউন্সিলর প্রার্থী বিএনপি নেতা গুলজার আহমেদ। মামলা থাকায় এখনও এলাকায় প্রকাশ্যে প্রচারণায় অংশ নিতে পারেননি। তাদের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন পরিবারের সদস্য ও দলের নেতাকর্মীরা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আত্মগোপনে থাকা প্রার্থীদের পক্ষে কৌশলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পোস্টার লাগানো হচ্ছে রাতের আঁধারে। গণসংযোগ করা হচ্ছে মোবাইল ফোনে। এদিকে ময়মনসিংহের গফরগাঁও পৌরসভায় নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় ৮টিতে নির্বাচন হচ্ছে। ওই জেলায় কোন মেয়র কিংবা কাউন্সিলর প্রার্থী কারাগারে নেই। সবাই নির্বাচনী মাঠে প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। রাজশাহীর ১৩টি পৌরসভায় কোন মেয়র প্রার্থী কারাগারে নেই। তবে কাটাখালী পৌরসভায় স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী জামায়াত নেতা মাজেদুর রহমান আত্মগোপনে থেকেই মনোনয়ন দাখিল করেছেন। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় এখনও তিনি এলাকায় প্রচারণা চালাতে পারেননি। তার প্রচারণা চালাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। গাইবান্ধার ৩টি পৌরসভার মধ্যে কোন প্রার্থী কারাগারে না থাকলেও গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী ফারুক আহমেদ আত্মগোপনে রয়েছেন। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় থানা বিএনপির এই সভাপতি নির্বাচনী প্রচারণায় এখনও অংশ নেননি। তার পক্ষে পরিবারের সদস্য ও দলের নেতাকর্মীরা এলাকায় গণসংযোগ করছেন। এদিকে কুমিল্লায় ৬টি, চাঁদপুর ৫টি, মুন্সীগঞ্জ দুটি, সিরাজগঞ্জে ৬টি, ঠাকুরগাঁওয়ে ২টি, বরিশালে ৬টি, চট্টগ্রামে ১০টি, পটুয়াখালীতে ২টিসহ ২৩৩টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব কোন মেয়র কিংবা কাউন্সিলর প্রার্থী কারাগারে নেই।

Saturday, December 5, 2015

এক সাংবাদিকের মায়ের কান্না by কাজী সুমন

জীবিকার তাগিদে পিরোজপুর ছেড়েছিলেন মাসুদুন্নবী খান মাসুদ। উঠেছিলেন নারায়ণগঞ্জের নানাবাড়িতে। স্থানীয় একটি পত্রিকায় চাকরি জুটিয়েছিলেন এই তরুণ। সাংবাদিক ভগ্নিপতির সৌজন্য জাতীয় একটি পত্রিকায় প্রতিনিধিও হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই তার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। স্থানীয় মহল্লায় সংঘটিত একটি ঝগড়ার প্রতিবাদ করাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ডাকাতির মামলা দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর একের এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে দফায় দফায় নেয়া হয় রিমান্ডে। এদিকে একমাত্র পুত্রের এমন করুণ পরিণতি থেকে মুক্ত করতে বৃদ্ধা মা হাফিজা খাতুন দৌড়ঝাঁপ করছেন কারাফটক থেকে আদালতের বারান্দায়। ধরনা দিচ্ছেন আইনজীবীদের দরজায়। কিন্তু কারও কাছ থেকে কোন আশার বাণী পাননি। বাধ্য হয়ে আসেন জাতীয় প্রেস ক্লাবে। উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে অসহায়ত্ব বর্ণনা করে তিনি বলেন, আমার স্বামী একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। গত বছর বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলে মাসুদই পরিবারের হাল ধরে। আমি স্বামীর ভিটা পিরোজপুর থাকলেও মাসুদ আমার বাবার বাড়ি নারায়ণগঞ্জে চলে যায়। সেখানে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়ে সে। নারায়ণগঞ্জের একটি স্থানীয় পত্রিকাসহ একটি জাতীয় পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে মাসুদ কাজ শুরু করে। কিন্তু কয়েক মাস আগে এলাকার একটি ঝগড়ার প্রতিবাদ করায় স্থানীয় কিছু ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। সোনারগাঁও থানায় ডাকাতির মিথ্যা মামলা দায়ের করে তারা। পরে ওই মামলায় মাসুদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে মাসুদের সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র ও কিডনি রোগে আক্রান্তের মেডিকেল সার্টিফিকেট দেখে আদালত তাকে জামিন দেন। কিন্তু এরপরও থেমে থাকেনি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানা পুলিশের সহযোগিতায় তাকে একের পর এক পেন্ডিং মামলায় জড়ানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে তাকে তিনটি মামলায় শোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে দুই দফায় পুলিশি রিমান্ডও নিয়েছে গজারিয়া থানা পুলিশ। এর মধ্যে গত বছরের ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসের একটি মামলা। অপরটি ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসের অজ্ঞাত আসামির মামলা। আরেকটি মামলায় শোন অ্যারেস্ট দেখানোর জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে। যার শুনানি গত রোববার হয়েছে। এদিন আবারও তৃতীয় দফায় মাসুদকে দু’দিনের রিমান্ড নেয়া হয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে অসহায় এই বৃদ্ধা বলেন, মাসুদকে গ্রেপ্তারের আগে তার বিরুদ্ধে একটি জিডিও ছিল না। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর একের পর এক পেন্ডিং মামলায় জড়ানো হচ্ছে। আমি গরিব মানুষ। মামলা চালানোর জন্য আইনজীবীদের টাকা জোগাড় করতে পারছি না। টাকার অভাবে একমাত্র ছেলেকে কারাগারে দেখতে যেতে পারছি না। তিনি আরও বলেন, বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দেয়ার পর একমাত্র ছেলেকে নিয়েই আমার সংসার। এ বিষয়ে পিরোজপুর জেলা সদর পৌরসভার মেয়র আবদুল মালেক জানান, এই পরিবারটিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। খুবই নিরীহ ও ভদ্র পরিবার বলে এলাকায় সুনাম রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে তাকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো সেটা বুঝতে পারছি না।

Monday, October 12, 2015

হাতকড়া নিয়েই চলছে গুলিবিদ্ধ নয়নের চিকিৎসা by কাজী সুমন

গুলিবিদ্ধ পায়ে ব্যান্ডেজ। এক হাতে হাতকড়া, অন্য হাতে স্যালাইনের ক্যানোলা। হাতকড়া পরিয়ে আনা-নেয়া করা হচ্ছে এক্স-রে কক্ষে। এভাবেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১০২ নম্বর ওয়ার্ডে চলছে গুলিবিদ্ধ ছাত্রদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নের চিকিৎসা। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নয়নের বাম পায়ের ঊরু থেকে শটগানের চারটি গুলি বের করা হয়েছে। তবে এখনও একটি গুলি বের করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া, ছররা গুলির খোসাও তার ঊরুর মাংসপেশিতে বিঁধে আছে। এদিকে গুলি বের করতে গিয়ে ঊরুর তিন থেকে চার ইঞ্চি ব্যাসার্ধের মাংসপিণ্ড কেটে ফেলে দেয়া হয়। এতে ওই স্থানে বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছে। একটু নড়াচড়া করতে গেলে টান পড়ছে মাংসপেশিতে। এতে দুজনের কাঁধে ভর করে বাথরুমে যেতে হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার আটকের পর মগবাজারের একটি হোটেলে নিয়ে তার পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে পুলিশ গুলি করেছে বলে অভিযোগ করেন নয়ন। এতে তার বাম পায়ের ঊরুতে কয়েকটি গুলি বিদ্ধ হয়। এরপর তাকে দ্রুত ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গতকাল সরজমিন ১০২ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, নয়নের বেডের চারপাশে ঘিরে আছেন চারজন পুলিশ সদস্য। পালাক্রমে নয়নকে পাহারা দিচ্ছেন তারা। তার এক হাতে হাতকড়া। অন্য হাতে লাগানো স্যালাইনের ক্যানোলা। বাম পায়ে ব্যান্ডেজ। কিছুক্ষণ পরই হাতকড়া পরানো অবস্থায় তাকে নেয়া হয় এক্স-রে রুমে। এরপর তার পায়ের ব্যান্ডেজ খুলে ড্রেসিং করে বেডে আনা হয়। খানিকক্ষণ পর ডিউটিরত এক ডাক্তারের সঙ্গে মৃদু বাকবিতণ্ডা হয় দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্যের। ওই ডাক্তার গুলিবিদ্ধ নয়নের হাত থেকে হাতকড়া খুলে দেয়ার আহ্বান জানান। জবাবে পুলিশ সদস্য বলেন, আপনাদের ওয়ার্ড থেকে একজন খুনের মামলার আসামি পালিয়ে গেছে। তাই ওই আসামির হাতে হাতকড়া পরানো হয়েছে। এর জবাবে চিকিৎসক বলেন, আপনাদের দায়িত্বপালনকারী পুলিশ সদস্যরা চা খেতে যাওয়ার সুযোগে ওই আসামি পালিয়েছে। এখানে আমাদের কোন গাফিলতি ছিল না। ঢামেকের সহযোগী প্রফেসর ডা. মহিউদ্দিনের অধীনে চিকিৎসা চলছে গুলিবিদ্ধ নয়নের। এদিকে চারদিন ধরে ঢামেকেই রাত কাটাচ্ছেন নয়নের বাবা আক্কাস শেখ ও মা শেফালী বেগম। আক্কাস শেখ বলেন, নয়ন গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর শুনেই আমরা মাগুরা থেকে চলে আসি। আজ চারদিন ধরে এখানে আছি। তার যাবতীয় ওষুধপত্র ও হাসপাতালের খরচ আমরাই বহন করছি। এ পর্যন্ত ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমার সুস্থ ছেলেকে পুলিশ গুলি করে পঙ্গু করে দিয়েছে। আমি সবার আগে আমার ছেলের দ্রুত সুস্থতার জন্য উন্নত চিকিৎসার দাবি জানাচ্ছি। মা শেফালী বেগম বলেন, নয়নকে যখন ড্রেসিং করানো হয় তখন তার চিৎকার আমি সহ্য করতে পারিনি। সারাক্ষণ সে ব্যথায় কাতরাচ্ছে। খাওয়া-দাওয়াও ঠিকমতো খেতে পারছে না। ওষুধ খাওয়ার আগে সামান্য জুস খেয়েছে।
জানা গেছে, ৮ই অক্টোবর গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ওইদিনই নয়নের ঊরু থেকে চারটি গুলি বের করা হয়। এরপর তাকে ১০২ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। তখন তার হাতে হাতকড়া ছিল না। কিন্তু গত শনিবার সকালে বাথরুমে যাওয়ার কথা বলে ওই ওয়ার্ড থেকে পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যায় হত্যা মামলার আসামি তাজুদ খাঁ। এরপর রোববার সকাল থেকে গুলিবিদ্ধ নয়নের হাতে হাতকড়া লাগানো হয়। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক মানবজমিনকে বলেন, সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের ৫ উপ-অনুচ্ছেদে বলা আছে, পুলিশি হেফাজতে অসুস্থ কাউকে নির্যাতন করা যাবে না, কারও সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা যাবে না। একজন রোগীকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা অমানবিক আচরণ। এছাড়া, এটা সম্পূর্ণ সংবিধান পরিপন্থি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। ২০১৩ সালে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নির্যাতন আইন-২০১৩) সংসদে পাস করা হয়েছে। ওই আইনেও বলা আছে, কাউকে নির্যাতন করা যাবে না এবং কারও সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা যাবে না। এটা করলে অপরাধ বলে গণ্য হবে। ওই অপরাধে শাস্তিরও বিধান রয়েছে।

Sunday, September 6, 2015

খাটে শুয়ে মানিক মিয়া বলতেন আর আমি লিখতাম by কাজী সুমন

প্রাথমিক শিক্ষা জীবন কাটে বরগুনায়। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তে চলে আসেন নারায়ণগঞ্জে। ওঠেন খান সাহেব ওসমান আলীর পরিবারে। ভর্তি হন নারায়ণগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে। ভাষা আন্দোলনে সারা দেশ তখন উত্তাল। প্রতিদিন শহরের অলিগলিতে মিছিল হয়। ভাষার প্রতি আবেগ সংবরণ করতে পারেননি উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র খন্দকার মাহবুব হোসেন। যোগ দেন ওই প্রতিবাদী মিছিলে। মিছিল থেকেই পুলিশ তাকে আটক করে। এরপর তিন রাত কাটান নারায়ণগঞ্জ থানাহাজতে। ছাত্রাবস্থায় প্রথম ভোগ করেন হাজতবাস। ওই স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী নটর ডেম কলেজে। তখনই জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। এতে পড়াশোনায় গ্যাপ পড়ে যায়। দুবছর পর আইএসসি পরীক্ষা দেন। ১৯৫৮ সালে পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ অ্যাসোসিয়েশনের ভিপি নির্বাচিত হন। তখন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করেন। ১০-১২ জন সহপাঠীর সঙ্গে ফের গ্রেপ্তার হন তিনি। তাদের বিচার শুরু হয় সামরিক আদালতে। নিজেই বিচারের মোকাবিলা করেন সাহসী তরুণ মাহবুব হোসেন। বিচারককে ছুড়ে দেন আইনি চ্যালেঞ্জ। ঘাবড়ে যান বিচারক। উর্দু ভাল বলতে পারার কারণে কিছুটা আনুকূল্যও পান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের পরিচয় পেয়ে তাকে খালাস দেন বিচারক। তবে ছাত্রনেতা হওয়ার কারণে আইয়ুব খান তাকে এমএ পরীক্ষায় অংশ নিতে দেননি। তাই ১৯৬৪ সালে ল’ পাস করে আইন পেশা শুরু করেন। তখন থেকেই রাজনীতিবিদ ও ছাত্রনেতাদের মামলা পরিচালনা করেন তিনি। ৬৬ সালে হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় নেপথ্যে থেকে সহায়তা করেন মুক্তিযোদ্ধাদের। ৭১ সালের মার্চের মাঝামাঝিতে হাইকোর্টে আইনজীবীদের একটি মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন দেয়ার। তখন তিনিও চাইছিলেন কিছু একটা করার। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানসহ আইনজীবীদের নিয়ে জেলা কোর্টে একটি সমাবেশের আয়োজন করেন। ওই সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বক্তব্য দেন তরুণ আইনজীবী মাহবুব হোসেন। পরদিন অবজারভার পত্রিকার প্রথম পাতায় তার ছবি প্রকাশিত হয়। ওই ছবি নিয়ে গোয়েন্দারা তল্লাশি শুরু করেন। তখন ওয়ারীর হেয়ার স্ট্রিট রোডের একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। ওই বাসায় থাকতেন প্রয়াত জিল্লুর রহমান ও আইভি রহমান। ২৫শে মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর ওই বাসা থেকে তাদের নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে যান তিনি। শুরু হয় স্বাধীনতার যুদ্ধ। তখন মুক্তিযোদ্ধারা তার ওই বাসাকে অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। আলমারিতে রাখা মোটা আইনি বইয়ের পেছনে লুকিয়ে রাখতেন গ্রেনেড। একদিন গ্রেনেড বহনকারী এক মুক্তিযোদ্ধা এসে বললেন, তাকে কবি জসীমউদ্‌দীনের কমলাপুরের বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার জন্য। ওই বাড়িটি মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল। নিজের ট্রাম্প গাড়িতে করে রওনা দেয়ামাত্রই পাক সেনারা তাদের গতিরোধ করে। পাক সেনাদের বোকা বানিয়ে ওই মুক্তিযোদ্ধাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন তিনি। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আদালতের চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগ দেয়া হয় খন্দকার মাহবুব হোসেনকে। তরুণ বয়সে এতবড় দায়িত্ব পেয়ে ভড়কে যান তিনি। ছুটে যান তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের কাছে। কামাল হোসেন তাকে জানান, এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না, আপনি বঙ্গবন্ধুর কাছে যান। বঙ্গবন্ধু তাকে পিঠ চাপড়ে অভয় দেন। এরপর থেকে সবুর খান, শাহ আজিজুর রহমান, ফজলুল কাদের চৌধুরীসহ প্রভাবশালী সব রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করেন। এদিকে ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার শ্যালক হওয়ায় ‘জাতীয় শ্যালকের’ পরিচিতি পান। মানিক মিয়ার কলাম লেখায় তিনি সহযোগিতা করেছেন। মানিক মিয়া নিজ হাতে লিখতেন না। প্রায় দিনই দুপুরের পর বাসায় খাটে শুয়ে থাকতেন। ইত্তেফাক থেকে লোক আসতো। তিনি যা বলতেন সেটা নোট করা হতো। যেদিন ইত্তেফাক থেকে লোক আসতো না সেদিন মাহবুব হোসেনকে ডাকতেন। খাটে শুয়ে মানিক মিয়া বলতেন আর তিনি লিখতেন। তবে বানান ভুল করলেই তার বকা খেতেন। কিংবদন্তি ওই সম্পাদকের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, মানিক মিয়ার লেখায় ম্যাজিক ছিল। রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে লিখে তাকে আবার ফোন দিতেন। রাজনীতির সেই সংস্কৃতি এখন আর নেই। আইনজীবী জীবনের অনেকটা সময় বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে কাটিয়েছেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তিনি বলেন, বিশাল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতার পর তিনি বাঙালি জাতিকে একত্রিত করতে চেয়েছিলেন। দেশে বিভাজন চাননি। কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে মুক্তিযুদ্ধ করেনি সে বিতর্কে না গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- দেখ, আমাদের দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল- ১৯৫ জন তালিকাভুক্ত যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপে তাদের বিচার আমরা করতে পারিনি। তাদের ছেড়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু সংবাদপত্রে বিবৃতি দিলেন- বাঙালি জাতি জানে কিভাবে ক্ষমা করতে হয়। এছাড়া শুধু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার হওয়ার কারণে ৩২ হাজার লোক কলাবরেটর অ্যাক্টে পিস কমিটির মেম্বার হয়েছিলেন। কয়েকটি ধাপে তাদের ক্ষমা করে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় ভুল হলো ক্ষমতায় যাওয়া। তিনি যদি ক্ষমতায় না যেতেন তাহলে সমগ্র জাতির কাছে আজ আরও উপরে থাকতেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন হচ্ছে না। যে বঙ্গবন্ধু জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন সেই আওয়ামী লীগ আজ জাতিকে বিভক্ত করেছে ফেলেছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকেও কাছ থেকে দেখেছেন মাহবুব হোসেন। একদিন গোয়েন্দা সংস্থার লোক দিয়ে তাকে বাসায় ডাকালেন। তখন প্রেসিডেন্ট জিয়া বলেন, খন্দকার সাহেব অনেক কিছুই করেছেন। আসুন, দেশের জন্য কাজ করি। এর জবাব দেয়ার জন্য কয়েক দিনের সময় চেয়ে চলে আসেন মাহবুব হোসেন। পরে অনেক দিন যাননি। ওদিকে গোপনে জিয়াউর রহমান তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির খোঁজ নিলেন। তার সাধারণ জীবনযাপনের তথ্য পেয়ে ফের তাকে ডাকলেন। বাসায় যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট জিয়া বলেন, খন্দকার সাহেব কি চিন্তা-ভাবনা করলেন। জবাবে তিনি রাজনীতিতে না আসতে মায়ের অনীহার কথা জানান এবং বলেন, আমি আইনজীবী মানুষ। আপনার মামলার কোন সহায়তা লাগলে আমাকে বলবেন। এ কথা শুনেই প্রেসিডেন্ট জিয়া দাঁড়িয়ে গেলেন। হেসে দিয়ে বলেন, আমার মামলা পরিচালনার সুযোগ আপনি পাবেন না। জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর তার ওই কথাটি চরমভাবে পীড়া দেয় তাকে। যা নিয়ে এখনও দুঃখ করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। ৫৫ বছরের আইন পেশায় দেশের প্রথম সারির সব রাজনীতিবিদের মামলা পরিচালনা করেছেন তিনি। কিন্তু সত্যি সত্যি জিয়াউর রহমানের মামলা পরিচালনার সুযোগ পাননি মাহবুব হোসেন। তবে আইনজীবী হিসেবে সারা জীবন কাটালেও পড়ন্ত বেলায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ২০০৮ সালে যোগ দেন বিএনপিতে।  বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির চার চারবার নির্বাচিত সভাপতি তিনি। ১৯৩৮ সালে ২০শে মার্চ বরগুনার বামনায় প্রখ্যাত এ আইনজীবীর জন্ম। পিতা খন্দকার আবুল হাসান শিক্ষাবিদ ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিয়ে করেছেন অধ্যাপিকা ফারহাত হোসেনকে। দুই ছেলে ও এক কন্যাসন্তানের জনক তিনি। সমাজসেবায় বহুমুখী অবদান রাখছেন। অন্ধ ও পঙ্গুদের জন্য ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (ভিটিসিবি)-এর ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি তিনি। শিশু সংগঠন কচিকাঁচার উপদেষ্টা এবং জসীমউদ্‌দীন পরিষদের সম্মানিত পৃষ্ঠপোষক। ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড ইউনিয়ন, এশিয়ান ব্লাইন্ড ইউনিয়ন ও ঢাকা রোটারি ক্লাবের সদস্য। এসব কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নানা পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন মেধাবী এই আইনজীবী। জসীমউদ্‌দীন স্বর্ণপদক (২০০৬), কবি নজরুল স্বর্ণপদক (২০০৭), ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্বর্ণপদক (২০০৮) পান তিনি।

Saturday, August 8, 2015

‘জীবনের ২০ বছরই কেটেছে কারাগারে’ by কাজী সুমন

প্রাথমিকে ফার্স্ট হতেন প্রতি ক্লাসেই। ভাল ছাত্র হওয়ায় বড়ভাই গ্রাম থেকে নিয়ে এলেন শহরে। তখনও কৈশোর পার হয়নি। ভর্তি করালেন ঐতিহ্যবাহী সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে। ভাষা আন্দোলনে তখন উত্তাল দেশ। আন্দোলনের রসদ যোগাতে ছাত্রলীগের দুই নেতা যান ওই স্কুলে। চোখ পড়ে নবম শ্রেণীর ছাত্র শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের ওপর। তাকে অফার দেন মিছিলে যাওয়ার। স্কুলের কঠোর বিধিও রুখতে পারেনি মাতৃভাষার প্রতি তার প্রেম। আবেগী মোয়াজ্জেম রাজি হয়ে যান সঙ্গে সঙ্গেই। পরদিন ২১শে ফেব্রুয়ারি। দুই বন্ধুকে নিয়ে জড়ো হন ঢাকা মেডিকেলে কলেজের আমতলায়। নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গেই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সহপাঠীদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েন রাজপথে। শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ। রক্তাক্ত আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার হন তিনি। দুই বন্ধুসহ পুলিশ তাকে নিয়ে যায় লালবাগ থানায়। সেখানে শুনতে পান গুলিতে মারা গেছেন বেশ কয়েকজন ছাত্র। এরপর গ্রেপ্তারকৃত আরও শতাধিক আন্দোলনকারীর সঙ্গে তাকে পাঠানো হয় কেন্দ্রীয় কারাগারে। বের হন মাসখানেক পর। সেই থেকে শুরু জেল ও রাজনৈতিক জীবন। ৭৮ বছরের জীবনের প্রায় ২০ বছর কাটিয়েছেন জেলে। বারবার জেলে যাওয়ার জন্য বন্ধুরা তাকে নাম দিয়েছিলেন ‘কারাগারের পাখি’।
দশম শ্রেণীতে পড়াকালে ছাত্রলীগের সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য হন শাহ মোয়াজ্জেম। ১৯৫৪ সালে মেট্রিক পাস করে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ওই বছরই ঢাকা কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৫৬ সালে আইএ পাস করে ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। ১৯৫৮ সালে জগন্নাথ কলেজ হতে ডিগ্রি পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ এবং এলএলবি পাস করেন। কলেজে পড়াকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুল মুবিন তালুকদার তাকে নিয়ে যান নওয়াবপুর রোডে তখনকার আওয়ামী লীগের অফিসে। সেখানেই পরিচয় করিয়ে দেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। এরপর তাকে গোপালগঞ্জে ছাত্রলীগের জেলা সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে পাঠানো হয়। ওই সম্মেলনে রাখা তার বক্তব্য প্রশংসিত হয়। বঙ্গবন্ধু তাকে ডেকে এনে পুরস্কৃত করেন। এরপরই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরপর দুইবার ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধেরও অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। যুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় পার্লামেন্টে তার আড়াই ঘণ্টার তুমুল বক্তৃতায় কেঁপে ওঠে আইয়ুব খানের মসনদ। এরপরই জ্বালিয়ে দেয়া হয় তার মুন্সিগঞ্জের  শ্রীনগর থানার দোগাছির পৈতৃক বাড়ি।
তবে কারাগারের পাশাপাশি মসনদের সঙ্গেও সখ্য ছিল শাহ মোয়াজ্জেমের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সরকারের আমলে চিফ হুইপ, মোশতাক সরকারের মন্ত্রিসভার একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মন্ত্রিসভার উপ-প্রধানমন্ত্রী ও খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম চিফ হুইপ নিযুক্ত হন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ফের এমপি হয়ে চিফ হুইপ হন। ১৯৭৫ সালে খোন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। ১৯৭৬ সালে নতুন রাজনৈতিক দল ডেমোক্রেটিক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৬ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হন এবং জেল থেকে বের হওয়ার পর পুনরায় ১৯৭৭ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জনদলের তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং দলের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালে তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে জনদল জাতীয় পার্টিতে রূপান্তরিত হলে তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রেসিডিয়ামের সদস্য নির্বাচিত হন। একই বৎসর তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সালে তিনি জাতীয় পার্টির মহাসচিব নির্বাচিত হন। সে বছরই তিনি সরকারের উপ-প্রধান মন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৮৮ সালে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী ও সংসদের উপনেতা নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের রংপুর পীরগঞ্জ থেকে উপ-নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে পদত্যাগ করে যোগ দেন বিএনপিতে। বর্তমানে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বয়সের ভারে অনেকটা ন্যুব্জ এই নেতাও মামলার শিকার হয়েছেন দেড় ডজন। জীবনের পড়ন্ত বেলায়  বিএনপিতেই থাকতে চান তিনি। দলটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, রাজনীতিতে উত্থান-পতন আছেই। আমি বিএনপিতে কোন ক্রাইসিস দেখি না। সরকারের এত অত্যাচার-নির্যাতনের পরও বিএনপি টিকে আছে। সরকারের উদ্দেশে সাবেক এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, এত উন্নয়ন করলে দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেন। জনগণ যাকে ভোট দেবে সেই ক্ষমতায় যাবে। জেলহত্যা মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ৬২ জন নেতা সাক্ষ্য দিয়েছেন। কেউ আমার বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি। আর্মিদের বন্দুকের নলের মুখে আমি মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলাম। দেশের অনেক জনহিতকর কাজও করেছেন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। ঢাকা-মাওয়া বিশ্বরোডের তিনিই উদ্যোক্তা এবং রূপকার। তার এলাকার ৬টি কলেজ ও  বেশ কয়েকটি স্কুল, মসজিদ, মন্দির, মাদরাসা, স্টেডিয়াম, হেলিপ্যাড, অসংখ্য রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং প্রতিষ্ঠা করেছেন। লেখালেখির জগতেও তার বিচরণ রয়েছে। জেল জীবনের প্রথম স্মৃতিকথা নিয়ে লেখেন ‘নিত্য কারাগার’। এছাড়া ‘বলেছি বলছি বলবো’, ‘ছাব্বিশ সেল’ ও ‘জেল হত্যা মামলা’, উপন্যাস ‘বিচলনে’ পাঠক মহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

Tuesday, July 28, 2015

সারা হোসেনের অন্য ভুবন by কাজী সুমন

১৯৮৮ সাল। বাংলাদেশে তখন ভয়াবহ বন্যা। সে সময় দেশে ফিরেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সারা হোসেন। কাছ থেকে বন্যার ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখার জন্য চলে যান মাদারীপুরে। সেখানে থাকেন তিন মাস। বন্যাপীড়িত মানুষদের সাহায্য-সহযোগিতা করেন। অসহায় মানুষদের করুণ অবস্থা তার মনের ভেতর প্রচ- রকম নাড়া দেয়। তখনই সিদ্ধান্ত নেন বিলাসী জীবন ছেড়ে কাজ করবেন বঞ্চিত মানুষের পক্ষে। সারা হোসেনের মা অক্সফোর্ড ডিগ্রিধারী ড. হামিদা হোসেনও ছিলেন একই পথের পথিক। স্বাধীনতার পর নির্যাতিত নারীদের পক্ষে কাজ করেছেন। আশির দশকে নারী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য গঠন করেছিলেন ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’। বিনা পারিশ্রমিকে সহায়তা দিতেন অসহায় মানুষদের। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে গবেষণার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে বের করে দিতেন। মায়ের মানবসেবার মহান পেশায় পথ চলতে শুরু করেন সারাহ হোসেন। ১৯৮৯ সালের শেষদিকে অক্সফোর্ডের পড়া শেষে নানা সুযোগ-সুবিধার মোহ ছেড়ে ফিরে আসেন নিজের দেশে। যোগ দেন ইশতিয়াক আহমেদ ল’ ফার্মে। দেশব্যাপী তখন স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। ৯০-এর দিকে এরশাদ সরকারের পতন হয়। এরপর শুরু হয় এরশাদের বিচার। ওই বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। ওই ল’ ফার্মে কাজ করার সময় বিভিন্ন আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হন তিনি। তখন তার ল’ ফার্মের সহকর্মীরা তাকে কাজ করার সুযোগ দেন। কেউ বলেননি কেন চেম্বার বড় করছো না। কেন টাকা নিচ্ছো না। এক পর্যায়ে যোগ দেন বাবা প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের ল’ ফার্মে। সেখানে প্র্যাকটিস শুরু করেন। ওই ফার্মে বড় বড় মামলা আসায় তার জন্য কাজ করা সহজ হয়ে যায়। তবে নিজের মেয়ে বলে কোন কিছুতে ছাড় দেননি বাংলাদেশের অন্যতম সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন। এরপর নিজের কাজের পরিধি ঠিক করে নেন তিনি। মানুষের পারিবারিক সমস্যা ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) গঠন হয়। মানুষের জনস্বার্থে মামলা করে সংগঠনটি। তখনই অনেক বড় সুযোগ তৈরি হলো। ব্লাস্টের মামলায় বিনা পারিশ্রমিকে আইনি সহায়তা দেয়া শুরু করেন তিনি। সেক্ষেত্রে আদালত থেকেও অনেক সহযোগিতা পান। তখন লিঙ্গবৈষম্য, ফতোয়া, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যৌন হয়রানির ঘটনা প্রকট ছিল। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০০-এর বেশি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলেও কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। এসব জনস্বার্থ বিষয় নিয়ে মামলা করেন তিনি। এছাড়া গার্মেন্ট শ্রমিকদের অধিকার নিয়েও কাজ করেন। রানা প্লাজা, তাজরিন ফ্যাশনসসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকদের আইনি সহায়তা দেন। শিশু, কয়েদি ও প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে মামলা করেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ও গুমের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন তিনি। ২৫ বছর আগের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সারাহ হোসেন বলেন, আগে ইন্টারনেট শব্দটির সঙ্গে মানুষ পরিচিত ছিল না। এখন ইন্টারনেট হওয়ায় নিত্যনতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কেউ ফেসবুকে লাইক দিলেও তার বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। আদালত থেকেও এসব বিষয় উসকে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ২৫ বছর আগে তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়া হলো। তার মু-ু নেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা দেয়া হলো। তখন আদালতে তার পক্ষে মামলা করে সহায়তা পেয়েছি। আদালত তাকে জামিনও দিয়েছেন। এরপর তিনি নিরাপদে দেশত্যাগ করতে পেরেছেন। এরপর ২০০৭ সালের দিকে কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে একইভাবে ফতোয়া দেয়া হলো। জেলখানায়ও তার ওপর হামলা হলো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাষ্ট্রপক্ষ থেকেও তার বিরুদ্ধে উসকানি দেয়া হলো। শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের পরে ব্লগারদের ওপর প্রতিনিয়ত হামলা হচ্ছে। এফআইআর লেখার সময় পুলিশের পক্ষ থেকে এমনভাবে বলা হচ্ছে যেন তারা নাস্তিক। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে নাস্তিক হওয়া অপরাধ নয়। তাই এখন নিরাপত্তার বিষয়টি বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রের কাছে এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করার প্রত্যাশা করেন তিনি। ভবিষ্যতে মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার ও মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করতে চান। এছাড়া সম্প্রতি যেসব ব্লগার খুন হয়েছেন তাদের পরিবারকে সহায়তা দিতে চান। পরমত সহিষ্ণুতা, মানুষের বাকস্বাধীনতা ও যুক্তিতর্কের স্বাধীনতা নিশ্চিতের জন্য কাজ করতে চান। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংগঠন থেকে নানা পুরস্কার ও সম্মাননাও পেয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ থেকে ‘অনন্যা টপটেন অ্যাওয়ার্ড’, হিউম্যান রাইটস অ্যাওয়ার্ড, এশিয়া ২১ ফেলো, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফেলো পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। নিজের কাজের সফলতা হিসেবে সারাহ হোসেন মনে করেন, ধারণা ছিল আইনজীবীরা শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখবেন সামাজিক সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারেন, এ ধারণা সাধারণ মানুষের ছিল না। বর্তমানে সেই জায়গায় কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক সংগঠন ও ব্যক্তি এ বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। অক্সফোর্ডে অধ্যয়নকালেই দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি সংগঠন করেছিলেন সারাহ হোসেন। তখন উপমহাদেশের শিক্ষার্থীদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন ওই সংগঠন থেকে। তাদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন। বর্তমানে তিনি আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী কমিটির সদস্য। এছাড়া ব্লাস্ট-এর অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। লিগ্যাল এইড অ্যান্ড মেডিটেশন সেন্টারের নির্বাহী কমিটির সদস্য, ইন্টারন্যাশনাল ল’ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য তিনি। ড. কামাল হোসেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসেরও অংশীদার তিনি। আইনজীবী বাবা তাকে সব সময় একটি শিক্ষা দিয়েছেন। কামাল হোসেনের কাছে কোন মামলা নিয়ে গেলে সূক্ষ্মভাবে বিষয়টি দেখেন এবং গভীরভাবে বুঝেন। তারপর কাজের সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়া বাবা কোনদিন কোন কিছুতে জোর করেননি। অগাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন মেয়েকে। ১৯৮৯ সালে অক্সফোর্ডে পড়াকালেই বৃটিশ বংশোদ্ভূত ডেভিড বার্গম্যানের সঙ্গে পরিচয় হয়। বার্গম্যান তখন লন্ডনের বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন। পরিচয়ের দীর্ঘ ১১ বছর পর তার সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন সারাহ হোসেন। বার্গম্যান ঢাকায় ইংরেজি দৈনিকে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। সারাহ হোসেনের এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তান রয়েছে। সন্তানরা রাজধানীর একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করছেন।

Wednesday, July 8, 2015

বি. চৌধুরীকে ঠেকাতে মরিয়া জামায়াত by কাজী সুমন

সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিকল্পধারার সভাপতি প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিএনপিতে যোগ দেয়া ঠেকাতে নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে জামায়াত। এমন কি বিকল্পধারাকে ২০ দলীয় জোটে ভেড়ানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে দলটি। জোটের কয়েকটি শরিক দলকে বাগে এনে তাদের প্রেসক্রিপশন দিচ্ছে। শরিক দলের নেতারা কাজ করছেন সেই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী। কাজী জাফর আহমদের জাতীয় পার্টি ছাড়া জোটের কোন শরিক দলের ইফতার পার্টিতেও বি. চৌধুরীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এছাড়া বিকল্পধারা আয়োজিত ইফতার পার্টিতে যোগ না দিতে প্ররোচনা দিয়েছে। ওদিকে ৬ই জুলাই রাজধানীর হোটেল লেকসোরে ইফতার পার্টির আয়োজন করে বিকল্পধারা। ওই ইফতার পার্টিতে জামায়াতসহ বেশ কয়েকটি শরিক দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এতে শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে বি. চৌধুরীর দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০০৪ সালে প্রেসিডেন্ট থাকাবস্থায় বি. চৌধুরীর সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসনের দূরত্ব তৈরি হয়। ওই সময় তিনি বিএনপি ছেড়ে গঠন করেন বিকল্পধারা। এর প্রায় একযুগ পর ২০১৪ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি বি. চৌধুরীর অভিমান ভাঙাতে তার বারিধারার বাসায় যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তখন থেকেই মূলত আলোচনা শুরু হয় বি. চৌধুরীর বিএনপিতে ফেরা নিয়ে। তবে তার দলের প্রভাবশালী এক নেতা বাধা হয়ে দাঁড়ান। তখনই আটকে যায় বিএনপিতে তার প্রত্যাবর্তন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে টানা তিন মাস আন্দোলনের পর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। মামলা-হামলা, পুলিশি গ্রেপ্তার-নির্যাতনে দলটির নীতি-নির্ধারণী ফোরামের নেতারা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েন। এরপর থেকেই বিএনপির বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বি. চৌধুরীর সরব উপস্থিতি দেখা যায়। গত ২৯শে মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদত বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় আবেগমাখা বক্তব্য রাখেন দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন এই মহাসচিব। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে দেয়া ওই বক্তব্যে বিএনপির জন্মের ইতিহাস, বিকাশ, জিয়াউর রহমানের ক্যারিশমেটিক নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ করণীয় বিশদভাবে তুলে ধরেন। এরপর বি. চৌধুরীকে নিয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একটি অংশ তাকে বিএনপিতে ভেড়াতে নেপথ্যে কাজ করেন। গত ১২ই জুন হোটেল সোনারগাঁওয়ে একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে দেয়া বক্তব্যে বি. চৌধুরী বলেন, বিএনপি রাজনীতির জামায়াতনির্ভর হয়ে উঠেছে। আর এ কারণে চারদিক থেকে চাপে রয়েছেন খালেদা জিয়া। এ ধাপটি বেশিদিন থাকবে বলে মনে হয় না। দলটিকে বাঁচতে হলে চতুর্থ ধাপে জিয়াউর রহমানের রাজনীতির আদর্শে ফিরে আসতে হবে। এছাড়া সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারেও বিএনপির পাশে দাঁড়াতে চান বলে জানান তিনি।  এরপর থেকে বি. চৌধুরীর বিএনপিতে ফেরা নিয়ে জোর গুঞ্জন শুরু হয়। বিএনপির ভেতর থেকেও একটি বড় অংশ তাকে ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেন। এছাড়া তারা জানান, এই মুহূর্তে বি. চৌধুরীর মতো ব্যক্তিসম্পন্ন ক্লিন ইমেজের রাজনীতিকের বিএনপিতে প্রয়োজন। একই বি. চৌধুরীর জামায়াত ছাড়ার বক্তব্যকে বিএনপির অনেকে সমর্থন করেন। ফাঁস হওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদের কথোপকথনেও সেটি স্পষ্ট হয়। কিন্তু বিষয়টি আঁচ করতে পেরে নেপথ্যে কলকাটি নাড়ে জামায়াত। সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতের পৃষ্টপোষকতায় জোটের যে কয়েকটি দল পরিচালিত হয় তাদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছে। জামায়াতের ইফতার পার্টিতে ২০ দলীয় জোটের সমমনা দল হিসেবে বিকল্পধারাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। একইভাবে জোটের অন্য শরিক জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) ও ইসলামী ঐক্যজোটের ইফতার পার্টিতেও বি. চৌধুরীকে দেখা যায়নি। অথচ বিএনপি আয়োজিত প্রায় প্রতিটি ইফতার পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন বি. চৌধুরী। এমনকি ড্যাবের ইফতার পার্টিতে পাঁচ মিনিট পরে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখেন। ওদিকে ৬ই জুলাই বিকল্পধারার ইফতার পার্টিতে জামায়াতসহ বেশ কয়েকটি দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ওই সূত্রটি জানিয়েছে, বি. চৌধুরী যাতে বিএনপিতে ভিড়তে না পারে সেজন্য নেপথ্যে কাজ করছে জামায়াত। শরিক দলের দ্বিতীয় সারির নেতাদের দিয়ে বিএনপি নেতাদের কাছে বি. চৌধুরীর বিরুদ্ধে বলানো হচ্ছে। জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মো. মোবারক হোসেন বলেন, বিকল্পধারার ইফতার পার্টির আমন্ত্রণের বিষয়ে আমার কাছে তথ্য নেই। এছাড়া অনেক ইফতার পার্টির আমন্ত্রণ পেলেও সবগুলোতে আমরা যাই না। তবে বিকল্পধারার সঙ্গে আমাদের কোন দূরত্ব নেই। এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদত হোসেন সেলিম বলেন, বি. চৌধুরী আমাদের সমমনা নয়। দাওয়াত দিলেও  উনার দলের ইফতার পার্টিতে যাবেন না বলে সরাসরি জানিয়ে দেন তিনি। বি. চৌধুরীকে নিয়ে জোট নেতাদের মধ্যে সামান্যতম আগ্রহ নেই। আর বিএনপি নেতাদেরও তাকে নিয়ে আগ্রহ আছে বলে আমার মনে হয় না। এখন বিএনপি বা জোটের খারাপ সময় বিদায় পাশে দাঁড়ানো কথা বলছেন। আবার সুবিধা মতো সময় হলে বেরিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বি. চৌধুরী প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পরে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। তখন তিনি জামায়াতের বিরুদ্ধে কোন বক্তব্য দেননি। এখন সুযোগ পেয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে বলছেন। এগুলো সুবিধাবাদী বক্তব্য। তবে তাকে যদি বিএনপি কিংবা জোটে ভেড়ানো হয় তাহলে আমরা ২০ দলীয় জোট নেতারা জোটে থাকব কিনা এনিয়ে ভাববো। জোটের আরেক শরিক বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা বলেন, বি. চৌধুরী হলেন ব্রাহ্মণ আর আমরা হলাম নমশূদ্র। তাই আমাদের দাওয়াত দেয়নি। তবে আমাদের দাওয়াত দিলেও আমরা যাব না। কারণ তিনি ইদানীং জোট ভেঙে দিতে নানাভাবে প্ররোচনা দিয়েছেন। এছাড়া জামায়াতের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য দিয়েছেন।

Wednesday, July 1, 2015

ভোগবাদে বামেরা by সাজেদুল হক ও কাজী সুমন

তাদের সবার পথ একদিকে যায়নি। কেতাবের সঙ্গে হয়তো মানুষের মিলও হয়নি শেষ পর্যন্ত। তবুও তারা ছিলেন আদর্শ। উপমহাদেশে বাম রাজনীতির ইতিহাস দীর্ঘ। যে ইতিহাস গৌরবের। পাকিস্তান শাসনামলে আদর্শিক রাজনীতির পতাকা বহন করতেন বামেরাই। মহান মুক্তিযুদ্ধেও স্বতন্ত্র ভূমিকা রেখেছিলেন তারা। মুক্তিযুদ্ধের পর নানা মত আর পথে বিভক্ত হয়েছে বাম রাজনীতি। কখনও কখনও হঠকারিতাও আশ্রয় নিয়েছে সেখানে। শ্রেণীশত্রু নিধনের নামে নানা বর্বরতাও দেখা গেছে। তবুও আদর্শিক রাজনীতি বলতে মানুষ বাম রাজনীতিকেই বুঝতো। ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীটিই হয়তো নিজেকে জড়াতেন বাম রাজনীতিতে। স্বপ্ন আর রোমান্টিসিজমের সেই রাজনীতি। একসময় স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। যন্ত্রণায় দগ্ধ হন লাখ লাখ তরুণ। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এর একটি প্রধান কারণ। ক্ষমতায় বসতে না পারলেও স্বতন্ত্র প্রতিবাদের ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বাম রাজনীতিবিদেরা ঠিক কখন ভোগবাদের রাজনীতিতে জড়িয়েছেন তা হয়তো একেবারে হলফ করে বলা যায় না। এ পতন হয়তো একদিনে হয়নি। ধীরে ধীরে পতনের পথ বিস্তৃত হয়েছে। যে হালুয়া-রুটির রাজনীতির তারা বিরোধিতা করে এসেছেন সারাজীবন একসময় নিজেরাও জড়িয়ে পড়েন এতে। আদর্শিক রাজনীতির পক্ষে বড় বড় বুলি ওড়ানো এক নেতাকে হঠাৎ দেখা গেলো ফুল হাতে জিয়াউর রহমানকে স্বাগত জানাতে। এখন অবশ্য তার স্থান হয়েছে একেবারে বিপরীত শিবিরে। বাম রাজনীতিবিদদের একটি বড় অংশ অবশ্য সরাসরিই জড়িয়ে পড়েন তাদের ভাষায় বুর্জোয়া রাজনীতিতে। তাদের কেউ যোগ দেন আওয়ামী লীগে, কেউ বিএনপিতে অথবা কেউবা জাতীয় পার্টিতে। একসময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো প্রধান রাজনৈতিক দলের নীতি নির্ধারণেও প্রভাবশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এই সাবেক বামেরা। যে ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে এ নিয়ে অনেকের মধ্যে ক্ষোভও রয়েছে। যদিও এতে সাবেক এই বাম রাজনীতিবিদদের প্রভাব কমেনি। কোন কোন ক্ষেত্রে হয়তো বেড়েছে। তবে বাম রাজনীতির সবচেয়ে বড় পতন হয় খুব সম্ভবত গত এক দশকে। দুই যুগ আগে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে ধীরে বাংলাদেশের রাজনীতি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক শিবিরের নেতৃত্বে দেয় আওয়ামী লীগ। অপরপক্ষের নেতৃত্ব দেয় বিএনপি। বিএনপির প্রথম জমানায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনের সময় অবশ্য রাজনীতিতে এক ভিন্ন মেরুকরণ দেখা যায়। সেসময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে যুগপৎ কর্মসূচি পালন করে জামায়াত। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ঐকমত্যের সে সরকারের জাতীয় পার্টির পাশাপাশি জাসদেরও অংশগ্রহণ ছিল। মন্ত্রিসভায় স্থান পান আ স ম আবদুর রব। ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয় বিএনপি তথা চারদলীয় জোট। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ দুটি সরকারেই বাম রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ রয়েছে। এর আগে তিনবার সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া। কিন্তু প্রতিবারই তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। ২০০৯ সালে টেকনোক্রেট কোটায় মহাজোট সরকারের শিল্পমন্ত্রী হয়েই ঘুরে যায় এই বাম রাজনীতিকের ভাগ্যের চাকা। মন্ত্রী হওয়ার আগে থাকতেন ভাড়াবাসায়। এখন তিনি রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লটের মালিক। সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত দিলীপ বড়ুয়া মন্ত্রী হওয়ার পর কিভাবে সম্পদশালী হয়েছেন তার বিবরণ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান মন্ত্রিসভায়ও বাম রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী অংশগ্রহণ রয়েছে। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাসদের (একাংশ) কার্যকরী সভাপতি মাঈনউদ্দিন খান বাদলও হয়েছেন এমপি। তাদের মতো অন্য বাম রাজনৈতিক নেতারাও নানাভাবে সুবিধা আদায় করছেন সরকারের কাছ থেকে। তবে অনেকে সে স্রোতে গা ভাসাননি। সিপিবি এবং বাসদ কোন জোটে নেই। দল দুটি বিগত ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এ ব্যাপারে সিপিবি’র সভাপতি মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম মানবজমিনকে বলেন, প্রতিকূল পরিবেশেও আমরা সমাজতান্ত্রিক আদর্শের রাজনীতি করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নসহ সব জাতীয় স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে বাম ছাত্র নেতারাই। আমরা আদর্শচ্যুত হইনি। কিন্তু অনেকেই বাম রাজনীতি থেকে আদর্শচ্যুত হয়ে ভোগবাদে জড়িয়ে পড়েছেন। এর কারণ তারাই ভাল বলতে পারবেন। আশা করছি, আগামীতে বাম আদর্শের ভিত্তিতেই তরুণ নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। একই মত পোষণ করেন বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান। তিনি বলেন, যারা সমাজতান্ত্রিক আদর্শ থেকে লক্ষ্যচ্যুত হয়ে বুর্জোয়া রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে লাভ নেই। তারা কোন জাতির আদর্শ হতে পারে না। তিনি বলেন, কিউবায় ৬০-৬৫ বছর অবরোধের মধ্যেও সমাজতন্ত্রের যে শ্রেষ্ঠত্ব তা বিশ্ববাসী দেখেছে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সমাজতন্ত্র ছাড়া গতি নেই। তাই ভবিষ্যতে সমাজতন্ত্রের আদর্শের রাজনীতি টিকে থাকবে। বামপন্থার রাজনীতির আদর্শই সত্যিকার মানুষের মুক্তির পথ দেখাবে। বাম রাজনীতিবিদ হায়দার আকবর খান রনো বলেন, বাম রাজনীতির অনেকেই ডিগবাজি খেয়ে সরকারের মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন। ব্যক্তিস্বার্থে যারা আদর্শচ্যুত হয়েছেন তাদের বাম বলা ঠিক হবে না। তারা বাম রাজনীতির আদর্শ হতে পারে না। তিনি বলেন, যুগে যুগে মীরজাফর ছিল। এখনও মীরজাফরের দোসররা আছে। তাদের আদর্শ অনুকরণীয় হতে পারে না। আমরা যারা ভুলভ্রান্তির মধ্যে বাম আদর্শ ধারণ করে আছি সেটা তরুণরা অনুকরণ করবে। জাসদের সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া বাম রাজনীতির আদর্শচ্যুতির বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, কমিউনিস্ট পার্টিসহ অন্য বাম রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় রাজনীতিতে কোন ভূমিকা নেই। ফলে তাদের পুরনো চিন্তা-ভাবনা বর্তমান রাজনীতিতে কোন প্রভাব ফেলবে না। তাই  আমরা আমাদের নিজের দলের আদর্শ নিয়ে পর্যালোচনা করি। অন্য বাম দল নিয়ে চিন্তা করি না।

যানজটে স্থবির: ঢাকার রাস্তায় হাজারো মানুষের ইফতার by কাজী সুমন

বিকাল ৫টা। গাবতলীয় বাসস্ট্যান্ড থেকে লাব্বাইক পরিবহনে ওঠেন সাব্বির। উদ্দেশ্য মালিবাগের বাসায় গিয়ে ইফতার করবেন। বাইরে ঝুম বৃষ্টিতে কিছুটা তন্দ্রাভাবও চলে এসেছিল তার। সোয়া ৬টার দিকে হঠাৎ তার ঘুম ভাঙে। চোখ মেলে দেখেন- গাড়িটি তখনও শ্যামলী শিশুমেলার সিগন্যালে দাঁড়িয়ে। জানালা সরু ফাঁক দিয়ে মাথা বের করে সামনের রাস্তার দিকে তাকান। দৃশ্য দেখে তার কপালে তখন চিন্তার ভাঁজ। যতদূর চোখের দৃষ্টি যায় ততদূর শুধু গাড়ি। সামনে-পেছনে সবই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। যানজটে বসে বারবার তাকাচ্ছিলেন ঘড়ির কাঁটার দিকে। আর হিসেব কষছিলেন ইফতারের সময়ের। ভাবছিলেন কোনরকম ফার্মগেট পৌঁছলেও নেমে অন্তত ১৭ ঘণ্টার উপস পেটে কিছু দানাপানি দিতে পারবেন। কিন্তু কচ্ছপ গতিতে গাড়িটি যখন গণভবনের সামনে এসে পৌঁছায় ততক্ষণে মাগরিবের আজান পড়ে গেছে। সারা দিনের রোজা ভাঙার জন্য সামান্য পানিটুকু সঙ্গে না থাকায় আশপাশের যাত্রীদের দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু সাব্বিরের মতো একই অবস্থা ছিল গাড়ির প্রায় সব যাত্রীরই। কারোই ইফতারের পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। এর মধ্যে দুই মহিলা যাত্রী ব্যাগ থেকে দেড় লিটারের দুটি মাম পানির বোতল বের করেন। নিজেরা রোজা ভেঙে বোতল দুটি দুইপাশে যাত্রীদের বাড়িয়ে দেন। কিন্তু তিন-চার সিট পেরুনোর পরই বোতলের পানি শেষ হয়ে যায়। পেছন থেকে বেশ কয়েকজন বলছিলেন- ভাই পানির বোতলটা এদিকে একটু দিয়েন। খালি বোতল দেখে হতাশায় তাদের মুখগুলো অন্ধকার হয়ে যায়। এরপর এক যাত্রী হেলপারকে একশ’ টাকার একটি নোট দেন আরও দুটি পানির বোতল আনার জন্য। বাকি যাত্রীরা ওই দুই বোতল পানি দিয়ে রোজা ভাঙেন। গণভবনের সামনে থেকে আসাদগেট পৌঁছতেই সাড়ে সাতটা বেজে যায়। আশপাশের হোটেল না থাকায় নামতেও পারছিলেন না যাত্রীরা। একদিকে পেটের ক্ষুধা আরেকদিকে যানজটের বিড়ম্বনায় তেতে উঠছিল প্রায় যাত্রীর মেজাজই। আর ক্ষোভ ঝাড়ছিলেন চালকের ওপর। প্রায় পৌনে ৮টার দিকে গাড়িটি যখন ফার্মগেটে পৌঁছায় প্রায় যাত্রীই নেমে হোটেলে গিয়ে ইফতার করেন। যানজটের কারণে প্রতিদিনই এ রকম বিড়ম্বনায় পড়ছেন রাজধানীর হাজারো যাত্রী। চলন্ত বাসে সামান্য পানি কিংবা কয়েক পিস খেজুর, পিয়াজু, বেগুনি খেয়েই ইফতার করছেন তারা। বাসে যারা বুট, ছোলা, মুড়ি যৎসামান্য যা নিয়েই ওঠেন সবাই তা ভাগাভাগি করে খান। ইফতারের সময় তাদের জেগে ওঠে ভ্রাতৃপ্রেম। বিকাল সাড়ে ৪টায় শাহবাগ মোড় থেকে ৮ নম্বর বাসে ওঠেন মুহিন। উদ্দেশ্য যাবেন মিরপুর-১। কিন্তু আসাদগেট পৌঁছাতেই তার ইফতারের সময় হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে হকার থেকে একটি পানির বোতল কিনে ইফতার করেন তিনি। এদিকে আরেক বিড়ম্বনায় পড়ছেন অফিস ফেরত মানুষ। প্রিয়জনদের জন্য ইফতার সামগ্রী কিনে যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকেন। ইফতারের সময় পেরিয়ে গেলেও বাসায় পৌঁছতে পারেন না তারা। ওদিকে বাসায় বাবার অপেক্ষায় থাকেন তার সন্তানরা। সময়মতো ফিরতে না পারায় বাবাকে ছাড়াই ইফতার করতে হয় সন্তানদের। বিকালে রাজধানীর অনেক রাস্তায় যানজটের ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে ল্যাবএইড হাসপাতাল-সায়েন্স ল্যাবরেটরি-বাটা সিগন্যাল হয়ে শাহবাগ মোড় পর্যন্ত প্রায় সময় তীব্র যানজট দেখা দেয় । একই চিত্র সায়েন্স ল্যাব থেকে আজিমপুর মোড় পর্যন্ত রাস্তায়। তবে বিপণীবিতানগুলোর আশপাশে যানজট আরও বেশি লক্ষ্য করা যায়।
এরই মধ্যে সাধারণ মানুষ ঈদের কেনাকাটা শুরু করে দেয়ায় বিপণীবিতানের আশপাশে ক্রেতাদের অবৈধ গাড়ি পার্কিং আরও বড় যানজটের কারণ হয়ে উঠেছে। যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মতিঝিল, গুলিস্তান এলাকায় তীব্র যানজট থাকে। গুলশান-বাড্ডা-মগবাজার-গুলিস্তান ও মহাখালী-প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় এবং ধানমন্ডি ২৭ নম্বর পর্যন্তও দেখা দেয় অসহনীয় যানজট। মৌচাক, মালিবাগ, বাসাবো-খিলগাঁও চৌধুরীপাড়া হয়ে রামপুরা টেলিভিশন সেন্টার, বাড্ডা লিংক রোড পর্যন্ত একই চিত্র থাকে।

Thursday, June 11, 2015

ফোনালাপ ফাঁস আতঙ্ক by কাজী সুমন

আতঙ্কের নাম ফোনালাপ ফাঁস। সবচেয়ে আতঙ্কে বিরোধী রাজনীতিবিদরা। একের পর এক ফাঁস হচ্ছে তাদের ফোনালাপ। ফাঁসকারীরা থেকে যাচ্ছে পর্দার আড়ালে। আর যাদের ফোনালাপ ফাঁস হচ্ছে তারা পড়ছেন বিপাকে। হুমকির মুখে পড়ছে তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। কাউকে কাউকে যেতে হয়েছে কারাগারেও। লঙ্ঘন হচ্ছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা।
সর্বশেষ ফোনালাপ ফাঁসের কারণে বিপাকে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির দু’সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এবং অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান। যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা রইস উদ্দিনের সঙ্গে মাহবুবুর রহমানের ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। এর আগে ছাত্রদলের সাবেক নেতা বজলুল করিম চৌধুরী আবেদের সঙ্গে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের ফোনালাপ ফাঁস হয়।
এমন করে গত দুই বছরে ধারাবাহিকভাবে বিএনপির অন্তত একডজন শীর্ষ নেতার ফোনালাপ ফাঁস করা হয়। এতে দলের মধ্যে তৈরি হচ্ছে সন্দেহ-অবিশ্বাস। বিভ্রান্ত হচ্ছেন কর্মীরা। বেকায়দায় পড়ছেন সিনিয়র নেতারা। এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কের কারণে বিএনপি নেতারা এখন ফোনালাপে খুবই সতর্ক। এমনকি সাংবাদিকদের সঙ্গেও অত্যন্ত সতর্ক হয়ে কথা বলছেন তারা। দলের বিরুদ্ধে যায় এমন কোন নেতিবাচক মন্তব্য মোবাইল ফোনে বলতে সাহস করছেন না। মন খুলে কথা বলছেন না দলের কর্মীদের সঙ্গেও। সবাইকে সামনাসামনি এসে কথা বলার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা। বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেছেন, দলের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে অনেক নেতাই আত্মসমালোচনা করেন। সরকার অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংস্থাগুলোকে দিয়ে এই ফোনালাপ ফাঁস করাচ্ছে।
বর্তমান সরকারের আগের মেয়াদের শেষদিকে ফোনালাপ ফাঁসের প্রথম ঘটনাটি ঘটে। ২০১৩ সালে ২৬শে অক্টোবর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ফোন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের প্রায় ৩৭ মিনিট কথোপকথন হয়। এর একদিন পরই একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে ওই কথোপকথন সম্প্রচারিত হয়। এ ঘটনার পর দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ২০১১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর রাজধানীতে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশের প্রস্তুতি হিসেবে দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে খালেদা জিয়া মোবাইল ফোনে নানা দিকনির্দেশনা দেন। পুরনো ওই ফোনালাপের পাঁচটি অডিও দীর্ঘদিন পর ফাঁস হয় বাংলালিক নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে। ফোনালাপ ফাঁসের শিকার হন বিএনপি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০১৪ সালের শুরুর দিকে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির শীর্ষ নেতা ফোন দিয়েছিলেন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীকে। প্রায় ১০ মিনিটের কথোপকথনে আন্দোলনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভূমিকার সমালোচনা করেছিলেন তারেক রহমান। এর কিছুদিন পরই বাংলালিক নামে ইউটিউব চ্যানেলে তাদের ফোনালাপটি ফাঁস হয়ে যায়। এই ফোনালাপটি ফাঁস হওয়ার পর দলের মধ্যে কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন মির্জা আলমগীর। ফোনালাপ ফাঁসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে প্রায় ২৩ মিনিট ফোনে কথা বলেন ডাকসুর সাবেক ভিপি এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। একই সময় আরেক ব্যক্তির সঙ্গেও ফোনে কথা বলেন তিনি। ফোনালাপে তৎকালীন সরকারবিরোধী আন্দোলন ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন তারা। কয়েকদিন পরই তাদের ফোনালাপ ফাঁস করে দেয়া হয়। ওই ফোনালাপে সেনাবাহিনীকে উসকানি দেয়ার অভিযোগ এনে গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয় মান্নাকে। ওই ঘটনায় এখনও কারাভোগ করছেন মান্না।
গত ২৮শে এপ্রিল সিটি নির্বাচন বর্জন নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের ফোনালাপ ফাঁস করে দেয়া হয়। ওই কথোপকথনে নির্বাচন বর্জনের বিষয়ে খালেদা জিয়ার মতামত আছে কিনা শিমুল বিশ্বাসের কাছে জানতে চেয়েছিলেন মওদুদ আহমদ। শিমুল বিশ্বাসও হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়েছিলেন। একদিন পরই ওই ফোনালাপ ফাঁস হয়ে যায়। এরপর ফের ফোনালাপ ফাঁসের শিকার হন মওদুদ আহমদ। গত ৮ই মে দুপুরে ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন তিনি। এরপর তাদের দুই মিনিট ৮ সেকেন্ডের কথোপকথনের একটি অডিও ফাঁস করে দেয়া হয়। ওই ফোনালাপে আবেদকে মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এই বিএনপিকে দিয়ে হবে না। দলকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে এখন জিয়ার বিএনপি লাগবে। জামায়াতের ব্যাপারেও বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলেন তিনি।’ এই কথোপকথন ফাঁসের পর জোটের শরিক দলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সর্বশেষ ফোনালাপ ফাঁসের শিকার হন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান। গত ৩রা জুন যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রইসউদ্দিনের সঙ্গে প্রায় ২২ মিনিট দলের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। ৫ই জুন তাদের ওই কথোপকথন ফাঁস  করে দেয় বাংলালিক ইউটিউব চ্যানেল। ওই ফোনালাপে খালেদা জিয়ার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন মাহবুবুর রহমান। ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ না করা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, হাসিনা-খালেদা টেলিফোন আলাপ, চীন, জামায়াত, সেনাবাহিনী, ২০১৯ সালের নির্বাচনেও বিএনপির ক্ষমতায় আসতে না পারা, সিনিয়র নেতাদের জামিনসহ নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেন তিনি। ফোনালাপটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তোপের মুখে পড়েন কর্মীদের। এরপর থেকে জেনারেল মাহবুব অনেকটা আড়ালে চলে গেছেন। সভা-সমাবেশ ও দলীয় কর্মসূচিগুলোতেও তাকে দেখা যাচ্ছে না। এদিকে ফোনালাপটির ব্যাপারে জানতে চাইলে লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি কিছু জানি না। অনেকের সঙ্গেই প্রতিদিন কথা হয়, খোলা মন নিয়েই কথা বলি। কিন্তু কে কখন ফোন রেকর্ড করে প্রকাশ করছে, এসব নিম্নশ্রেণীর আচরণ। ইদানীং তো চরিত্রহননে এসব করা হচ্ছে। এদিকে বিএনপি নেতাদের ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির দুজন নেতা ফোনে কথা বলতে রাজি হননি। সরাসরি বাসায় বা অফিসে গিয়ে কথা বলার আহ্বান জানান তারা।  এ ব্যাপারে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্ট বার কাউন্সিলের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আধুনিক যুগে প্রযুক্তির সাহায্যে টেলিফোনের কথাগুলো ট্র্যাপ করে সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী বানিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রকাশ করছে। বিএনপিতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা নেই- এমন কোন নেতা আছে বলে আমার মনে হয় না। যদি কোন ব্যতিক্রম থাকে তাহলে সাংগঠনিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে সরকারের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে বিএনপিতে কোন ধরনের প্রভাব পড়বে না।

Monday, April 27, 2015

চট্টগ্রামে ভোটের মাঠে ফ্যাক্টর by কাজী সুমন ও মহিউদ্দীন জুয়েল

এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। বর্তমান নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। একাধারে দীর্ঘ ১৭ বছর মেয়র ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের। গত নির্বাচনে রাজনৈতিক শিষ্য মনজুর আলমের কাছে হেরে যান তিনি। তবে এবারও মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন প্রবীণ এই নেতা। কিন্তু গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা মনোনয়ন দেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরউদ্দিনকে। এতে কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন হন মহিউদ্দিন চৌধুরী। জানা গেছে, শেষ মুহূর্তে ভোটের মাঠের হিসাব-নিকাশে আলোচনায় উঠে এসেছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। চট্টগ্রাম নগরীতেও তার নিজস্ব একটা ভোটব্যাংক রয়েছে। তার ভূমিকাও কিছুটা রহস্যাবৃত্ত। তিনি নীরব, নিশ্চুপ। তাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে শহরজুড়ে। চায়ের দোকান থেকে পাড়ার মোড়ে মোড়ে।  দলীয় প্রার্থী আ জ ম নাছিরের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় খুব কমই দেখা যাচ্ছে তাকে। নাছিরের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার দিনও চুপচাপ ছিলেন তিনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, নাছিরের নির্বাচনী প্রচারণায় না থাকার বিষয়টি রাজনৈতিক কৌশল। অবশ্য তার ছেলে চৌধুরী মহিবুল হাসান নওফেল সক্রিয় রয়েছেন দলীয় প্রার্থী নাছিরের প্রচারণায়। পুত্রকে নিয়মিত দেখা গেলেও পিতাকে রহস্যের শেষ নেই সর্বমহলে। কেন তিনি নীরব। তবে কি তিনি মনোনয়ন না পেয়ে অভিমান করে আছেন? নাকি দলীয় সিদ্ধান্ত মানতে পারছেন না বলে চুপচাপ হয়ে গেছেন-এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মাঝে।
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে বলেছেন, শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় এই মুহূর্তে কিছুটা বিশ্রামে রয়েছেন বাবা (মহিউদ্দিন চৌধুরী)। এর মধ্যে বিভিন্ন ওয়ার্ডে গণসংযোগও করেছেন। বাসায় থাকলেও নিয়মিতভাবে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছেন।
নগর আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানায়, টানা ১৭ বছর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন শেখ হাসিনার পছন্দের ব্যক্তি মহিউদ্দিন চৌধুরী। তবে রাজনৈতিকভাবে তিনি দুর্বল হতে শুরু করেন ২০১০ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর। ওই নির্বাচনে চমক দেখিয়ে তাকে পরাজিত করেছিলেন আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দেয়া বর্তমান মেয়র মনজুর আলম। সেই সময় আওয়ামী লীগের মহিউদ্দিন চৌধুরীর চেয়ে ৯৫ হাজার ৫২৮ ভোট বেশি পান তিনি। এরপর দলীয়ভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ার পর তার বিরোধী পক্ষ হিসেবে দলের অভ্যন্তরে দাঁড়িয়ে যায় সাবেক শিক্ষামন্ত্রী আফসারুল আমিন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালাম, সাবেক এমপি নুরুল ইসলাম বিএসসিসহ বেশ কয়েকজন।
পরবর্তীতে এই নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে উঠলে আ জ ম নাছিরকে কাছে টেনে নিয়ে নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক করেন মহিউদ্দিন। আগামী ২৮শে এপ্রিল অনুষ্ঠেয় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়া নিয়ে এই বিরোধ অনেকাংশে রয়েছে বলে জানা গেছে। গণভবনে শেখ হাসিনা মনোনয়ন দেয়ার আগে মহিউদ্দিন চৌধুরীর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। একই সঙ্গে নাছিরকে মনোনয়ন দেয়ার পর কারও কোন আপত্তি না থাকায় এই নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন নেত্রী। এই ঘটনার পর মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্বতন্ত্র নির্বাচন করার কথা শোনা গেলেও শেষদিকে তিনি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাবেন বলে ঘোষণা দেন। এতে টানা বেশ কয়েকদিন তার বাসার সামনে সক্রিয় নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন। তারা মহিউদ্দিন চৌধুরীকে নির্বাচন করার অনুরোধ জানান। কিন্তু তিনি নাছিরের পক্ষে কাজ করবেন বলে জানালে অনেকের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। মহিউদ্দিন চৌধুরী সবাইকে দ্বন্দ্ব ভুলে নাছিরের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দেন।
গত ১৫ দিনের নির্বাচনী কর্মকাণ্ড ঘেঁটে দেখা যায়, দলের শীর্ষ নেতারা আজম নাছিরের পাশে থেকে প্রচারণা চালালেও মহিউদ্দিন চৌধুরী রয়েছেন ব্যতিক্রম। ঢাকায় প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে সর্বশেষ ইশতেহার ঘোষণা পর্যন্ত নাছিরের পাশে তাকে খুব কমই দেখা গেছে। নগরীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নাছিরের পাশে মহিউদ্দিনকে দেখা গিয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে তাকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘আপনাকে নাছিরের প্রচারণায় কম দেখা যাচ্ছে কেন?’ জবাবে মহিউদ্দিন বলেন, বলতে পারেন এটা আমাদের একটা রাজনৈতিক কৌশল। এর আগে নাছিরের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে ইশতেহারটা দেখানো হয়নি। হলে ভালো হতো। নাছির ভালো ছেলে। সে কাজ করার জন্য উদগ্রীব। তাকে পেলে ভালো হবে নগরবাসীর। তার এই কথায় কিছুটা অভিমানের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে সর্বমহলে। এই গুঞ্জন আরো দানা বাঁধতে শুরু করে যখন মহিউদ্দিনের বাসায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনজুর যান কিংবা সিটি করপোরেশনের একটি প্রতিষ্ঠানে যখন একান্তে দুইজন ৩ ঘণ্টা বৈঠক করেন ভোটের আগে। রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের মহিউদ্দিন চৌধুরী ও বিএনপির মনজুর আলম গুরু-শিষ্য বলে পরিচিত। একসময় মনজুর মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে রাজনীতি করতেন। পরে সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে মহিউদ্দিন জেলে গেলে  মেয়র হন মনজুর। আর এর পরপরই মনজুর সঙ্গে মহিউদ্দিনের বিরোধ তুঙ্গে উঠে। একপর্যায়ে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়। সেই সময় মেয়র নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী সংকটে ভুগতে থাকলে মনজুর দলে যোগ দিয়ে জয়লাভ করেন। তার এই বুদ্ধিমত্তায় খুশি হয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাকে উপদেষ্টা করেন নিজের। এরপর মনজুর সঙ্গে মহিউদ্দিনের সম্পর্ক পুনরায় জোরালো হলে এই নিয়ে দলের বিরোধী পক্ষ ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। এদিকে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মহিউদ্দিন চৌধুরীর সমর্থক বলে পরিচিত কয়েকজন কাউন্সিলর প্রার্থীও কাজ করছেন মনজুর পক্ষে। মহিউদ্দিনের কর্মী-সমর্থকরা নাছিরের পক্ষে প্রচারণা থেকে দূরে রয়েছেন। তারা যদি ভোটের মাঠে না থাকেন তাহলে শেষ মুহূর্তে পাল্টে যেতে পারে ভোটের হিসাব। ফলে জয়-পরাজয়ে ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।

Sunday, April 26, 2015

চট্টগ্রামে খালেদার চিঠি দিনভর আলোচনা by কাজী সুমন ও মহিউদ্দীন জুয়েল

চট্টগ্রামের সাধারণ জনগণের উদ্দেশে আবেগমাখা চিঠি দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সিটি নির্বাচনের প্রচারণায় চট্টগ্রামে আসতে না পারায় চট্টলাবাসীর প্রতি দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে ২০ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়রপ্রার্থী মনজুর আলমকে কমলালেবু মার্কায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তার এই চিঠি পেয়ে নড়েচড়ে বসেছেন চট্টগ্রামের বিএনপি নেতারা। তারা বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের চিঠিতে দলের নেতাকর্মীরা আরও উৎসাহিত হবেন। তৃণমূল কর্মীরা মাঠে নামতে আরও সাহসী হবেন। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নতুন মাত্রা তৈরি হবে বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
শুক্রবার রাতে খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর করা একটি চিঠি চট্টগ্রাম বিএনপির শীর্ষনেতা ও কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের কাছে পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে খালেদা জিয়া বলেছেন, বীর চট্টলার সংগ্রামী জনগণের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ- শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম থেকে ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং ১৯৮১ সালের ৩০শে মে এই চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজেই তিনি শাহাদত বরণ করেছিলেন।
শহীদ জিয়ার পবিত্র রক্তে রঞ্জিত চট্টগ্রাম মহানগরীর সঙ্গে তাই আমার রয়েছে আত্মার সম্পর্ক। চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের সঙ্গে আমার সেই বিশেষ সম্পর্কের কারণেই চট্টগ্রামকে আমি দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী করেছি। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালে চট্টগ্রামে তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু, আমব্রেলা প্রজেক্টের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনকে ৯৩ কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ দিয়ে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, খাজা রোড, কে.বি. আমান আলী রোড, চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আধুনিক রেলওয়ে স্টেশন, ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়, বন্দরে গেন্ট্রিক্রেন সরবরাহ ও নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা, মেডিক্যাল কলেজে উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, চাক্তাই খাল খনন করে তলা পাকাকরণ করা, চিটাগাং ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার প্রতিষ্ঠার জন্য জমি বরাদ্দ, স্টেডিয়ামের উন্নয়ন, বন্দর হতে ফৌজদারহাট পর্যন্ত টোল রোড নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছিলাম। এগুলো ছাড়াও ছোট-বড় আরও অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করেছি। মহান আল্লাহতায়ালা ভবিষ্যতে সুযোগ দিলে আমরা চট্টগ্রাম মহানগরীর আরও উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নিবো ইনশাআল্লাহ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে মেয়র পদে মনজুর আলম মনজুকে আমি, আমাদের দল বিএনপি এবং ২০দলীয় জোটের পক্ষ থেকে সমর্থন দিয়েছি। মনজুর আলম বিগত দিনে মেয়র থাকাকালে আমি তাকে নগর ভবনকে দলমতের ঊর্ধ্বে রেখে নগরবাসীর সেবা ও উন্নয়ন করার জন্য উপদেশ দিয়েছিলাম এবং মনজুর আলম তা রক্ষা করেছেন। মনজুর আলম একজন সৎ, নির্লোভ, অমায়িক ও যোগ্য ব্যক্তি। তিনি মেয়র নির্বাচিত হলে অতীতের ধারাবাহিকতায় দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে মহানগরীর উন্নয়ন ও নগরবাসীর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখবেন। সময় স্বল্পতার কারণে আমি নির্বাচনী প্রচারণার জন্য চট্টগ্রাম আসতে পারিনি। আশাকরি, আপনারা আমার এই অনিচ্ছাকৃত অক্ষমতাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। শহীদ জিয়ার স্মৃতি বিজড়িত চট্টগ্রাম মহানগরীর সকল মুরব্বি, মা, ভাই ও বোনদেরকে আমার সালাম জানাচ্ছি এবং ২৮শে এপ্রিলের নির্বাচনে মেয়র পদে মনজুর আলম মনজুকে কমলালেবু মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। আল্লাহ আমাদেরকে লাখো শহীদের  রক্তে অর্জিত মাতৃভূমিকে একটি গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ার এবং চট্টগ্রাম মহানগরীকে একটি সুন্দর, স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও উন্নত মহানগরে পরিণত করার তৌফিক দিন।
চিঠি পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস মানবজমিনকে বলেন, চট্টগ্রামে বিএনপি চেয়ারপারসনের জনসভা করার কথা ছিল। কিন্তু সময়ের কারণে তিনি যেতে পারেননি। তাই চট্টগ্রামের নগরবাসীর উদ্দেশে তিনি একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চট্টগ্রাম বিএনপির অন্যতম কাণ্ডারি ও কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ম্যাডামের চিঠিটি পাঠানো হয়েছে শুক্রবার রাত একটায়। এই সময় তার সঙ্গে অনেক কথাও হয়েছে। তিনি চট্টগ্রামে মনজুর অবস্থানে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। নোমান আরো বলেন, খালেদা জিয়ার চিঠি নিয়ে শহরজুড়ে আলোচনা চলছে। নেতাকর্মীরাও যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। তবে আমরা শঙ্কিত সরকারদলীয় প্রার্থীর পক্ষে যেভাবে পুলিশ প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন কাজ করছে তাতে সুষ্ঠু ভোট আদৌ হবে কিনা। চট্টগ্রাম জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গাজী শাহাজান জুয়েল বলেন, চট্টগ্রামে বিএনপি নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে সিটি নির্বাচনে কাজ করছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের আহ্বানে দলের নেতাকর্মীরা আরও আনুপ্রাণিত হবেন। তৃণমূল কর্মীরা আরও উৎসাহিত হবেন। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি সরোয়ার হোসেন বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি চট্টগ্রামবাসীর একটা দুর্বলতা আছে। এখানে তিনি না এলে তার প্রতি দলের নেতাকর্মীরা সহানুভূতিশীল। খালেদা জিয়ার আহ্বানে তারা সক্রিয়ভাবে কাজ করতে উৎসাহিত হবেন।

‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিপুল ভোটে জিতবো’ -মনজুর আলম by কাজী সুমন

অসমাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন ও পরিচ্ছন্ন তিলোত্তমা নগরী গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চট্টগ্রামে মেয়র পদে লড়ছেন সাবেক মেয়র মনজুর আলম। আশা প্রকাশ করেছেন সুষ্ঠু ভোট হলে ফের মেয়র নির্বাচিত হবেন তিনি। মানবজমিনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি বলেন, এ শহরে সবাই মিলে একসঙ্গে বসবাস করার চেষ্টা করেছি। কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা হতে দিইনি। ওয়ার্ডগুলোতে যেসব সমস্যা ছিল সেগুলো নিরসনের জন্য প্রতি মাসে কাউন্সিলরদের নিয়ে বৈঠক করেছি। বারবার সেগুলোর ব্যাপারে কথা হয়েছে। যত দিন দায়িত্ব পালন করেছি সিটি করপোরেশনকে কোন দল বা ব্যক্তির হাতে জিম্মি হতে দিইনি। জনগণ কখনোই আমাকে নিরাশ করবেন না। তারা দেখেছেন, শত সমস্যার মধ্যেও আমি তাদের ভাল রাখার চেষ্টা করেছি। আশা করছি, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হবো।
সাবেক মেয়র হিসেবে নিজেকে সফল মনে করেন কিনা- এমন প্রশ্নে মনজুর বলেন, আমি পুরোপুরি সফল না হলেও ব্যর্থ হইনি। ৫ বছরে অনেক কাজ করতে পারি নি। আবার যেসব কাজ হাতে নিয়েছিলাম সেগুলো নানা প্রতিকূলতার কারণে শেষ হয়নি। সব মিলিয়ে নগরবাসীর জন্য পুরোপুরি কাজ করার আফসোসটা রয়েই গেছে। নির্বাচিত হলে অসমাপ্ত কাজগুলো করে নিজের পরিচয় দিতে চাই। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে এ শহর কেমন ছিল তা সবাই জানে। আমার ৫ বছরে সেই চিত্র অনেকখানি পাল্টে গেছে। আমার আগে যেসব মেয়র ছিলেন তারা সরকারিভাবে আর্থিক সাহায্য পেয়েছেন। অথচ আমাকে অনেকেই সহযোগিতা করতে চাননি। যতটুকু বরাদ্দ পেয়েছি তা দিয়ে অনেক কাজ করেছি। এর ভাল-মন্দের বিচারের ভার জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।
চট্টগ্রাম সিটির প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু গত পাঁচ বছরে সে সমস্যার কতটা সমাধান হয়েছে জানতে চাইলে বিএনপি সমর্থিত এ মেয়র প্রার্থী বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার পর দেখেছি, এ শহরের জলাবদ্ধতার যে সমস্যা তা অল্প সময়ে সমাধান করা যাবে না। কেননা দীর্ঘমেয়াদি কোন পরিকল্পনাই নেয়া হয়নি আমার আগের আমলে। শহরের অল্প পানি জমে থাকলে তা দূর করা যায় না। কারণ খালগুলো সরকারদলীয় নেতাদের দখলে। সেখানে পানি যাওয়ার মুখ বন্ধ করে দিয়ে ভবন তৈরি করা হয়েছে। আমি সব খাল দখলমুক্ত করেছি। সংস্কার করে পানি চলাচলের উদ্যোগ নিয়েছি। এবার নির্বাচিত হলে জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকখানি কেটে যাবে।
এ বিষয়ে এবার ভোটারদের কি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য জাইকার কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা এক হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দিয়েছে। এ ছাড়া ২৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প চালু রয়েছে। এ বরাদ্দগুলো দিয়ে স্থায়ীভাবে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ খনন ও ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। কর্ণফুলী খাল ৪ সেন্টিমিটার খনন করলে নগরীতে বৃষ্টির পানি আর জমবে না। নর্দমা ও খালগুলো খননের পাশাপাশি আবর্জনা পরিষ্কার করবো। তিনি আরও বলেন, চাক্তাই খালের পাড়ে মেরিনার্স বাইপাস সড়ক নির্মিত হলে শহরকে পরিপূর্ণ চেহারায় দেখতে পাবেন ভোটাররা। যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার ও ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করা হবে। কিছু কিছু জায়গায় স্কুল কাম সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ করা হবে। লালদীঘিতে ১০ তলা ডিজাস্টার সেন্টার নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উন্নয়নে ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। কোন কোন খাতে এত টাকা ব্যয় করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে মনজুর বলেন, এ ৯০০ কোটি টাকার মধ্যে ৫০০ কোটি টাকা এসেছে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে। বাকি ৪০০ কোটি টাকা সিটি করপোরেশনের নিজস্ব আয় থেকে এসেছে। এ টাকাগুলো নগরীর রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার, অবকাঠামোর উন্নয়ন, খাল খনন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আবর্জনা পরিষ্কার, স্টাফদের বেতনে খরচ হয়েছে। এ ছাড়া নগরীর স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদরাসায় উন্নয়নকাজে ব্যয় হয়েছে। তিনি বলেন, ডাস্টবিন থেকে ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য ১০০ কনটেইনার কিনেছি। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের জন্য ৬৩টি ডাম্প ট্রাক ও ১২টি কনটেইনার মুভার কিনেছি।
মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর বিপরীত স্রোতে থেকে কাজ করেছেন। দায়িত্ব পালনকালে সরকারের পক্ষ থেকে কোন ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারের কাছ থেকে তেমন অসহযোগিতা পাইনি। বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। বরাদ্দগুলো নগরীর উন্নয়নে ব্যয় করেছি।
নির্বাচনে ২০ দলের শরিক ও বিএনপির সবাইকে পাশে পাচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিএনপিসহ ২০ দলের সব নেতাকর্মীই আমার পক্ষে কাজ করছেন। কারও সঙ্গে আমার কোন বিরোধ নেই। এ ছাড়া জামায়াতের জন্য ১০টি কাউন্সিলর পদ ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার ব্যাপারে মন্তব্য জানতে চাইলে মনজুর বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে নির্বাচন কমিশন আমার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েক প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে সরকার দলের প্রার্থীরা প্রায়ই আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন।
এ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে আস্থা রাখছেন কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অনেক জায়গায় আমার নির্বাচনী প্রচারণায় দলের কর্মীদের বাধা দেয়া হচ্ছে। আমার পোস্টার, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। তবুও আমি নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা রাখতে চাই। আশা করবো- সব প্রার্থী নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলবেন। এ ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সেনা মোতায়েনের দাবি জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা অব্যাহতভাবে হুমকি দিচ্ছে। ছাত্রলীগের ছেলেরা ভোটকেন্দ্র পাহারা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন জানাবো। তার পরও আমার সুসংগঠিত নেতাকর্মীরা কাজ করে যাবে। নিরপেক্ষ ভোট হলে বেশির ভাগ রায় পড়বে আমার বাক্সে।
এক প্রশ্নের জবাবে মনজুর বলেন, ঢাকায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরে হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক। এ ঘটনার পর সবার মধ্যে একটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। আশা করি নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশের সৃষ্টির জন্য নির্বাচন কমিশন সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে।

Saturday, April 25, 2015

চট্টগ্রামে হামলা হুমকি, ভাঙচুর by কাজী সুমন ও জাহিদ হাসান

দুদিন পরেই প্রতীক্ষিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। নির্বাচিত হবেন দেশের অন্যতম বাণিজ্যিক এই শহরের নগরপিতা। কিন্তু শহরের সর্বত্রই বিরাজ করছে আতঙ্ক। প্রতিদিনই হামলা হচ্ছে বিরোধী প্রার্থীদের প্রচারণায়। ভাঙচুর করা হচ্ছে গণসংযোগের গাড়ি। ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে প্রচারণার মাইক। গত কয়েক দিনে নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন দুজন। আহত হয়েছেন অনেকে। এছাড়া বহিরাগত ক্যাডারদের আনাগোনাও দেখা যাচ্ছে নগরীতে। এতে নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে পৌঁছা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে সাধারণ ভোটারদের মাঝে। সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ২৪ ঘণ্টা পরই নির্বাচন কমিশনের ইউটার্নে তাদের এই শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে অব্যাহতভাবে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের গণসংযোগে হামলা চালানো হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার নগরীর বায়েজিদ এলাকায় মনজুর আলমের গণসংযোগে ব্যবহৃত ট্রাকে এক ছাত্রলীগ নেতার নেতৃত্বে ৩০ থেকে ৪০ জন হাতিমার্কার সমর্থক হামলা চালায়। এ সময় তারা ট্রাক ভাঙচুর ও ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে। বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে চালক, মাইকম্যানসহ কর্মীদের মারধর করা হয়। পরে তারা মাইক ব্যাটারিসহ অন্যান্য মালামাল নিয়ে যায়। এছাড়া ওই রাতেই বাকলিয়া ডিসি রোড এলাকায় মনজুর আলমের নির্বাচনী গণসংযোগের পর সন্ত্রাসী ফরিদ বাহিনীর প্রধান ফরিদের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জন সন্ত্রাসী অস্ত্র নিয়ে কালাম কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। তারা এলাকার শান্তিপ্রিয় লোকদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে। এর আগে ১১ই এপ্রিল শেরশাহ এলাকার ব্রিকফিল্ড রোডে সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের ওপর হামলা চালিয়ে নির্বাচনী কার্যালয় ভাঙচুর করে। ওই ঘটনায় আহত হন ১০ থেকে ১২ জন। ২১শে এপ্রিল পলিটেকনিক এলাকায় গণসংযোগকালে তার ওপর হামলা চালানো হয়। এতে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে অন্তত ১০ জন আহত হন। এ সময় গাড়ি, হ্যান্ডমাইক, লিফলেট ও ব্যানার ছিনিয়ে নিয়ে যায় তারা। ওদিকে ১৬ই এপ্রিল রাতে টাইগার পাস এলাকার মালিপাড়ায় আওয়ামী লীগের দুই কাউন্সিলর প্রার্থী শহীদুল ইসলাম শামীম ও এসআই কবির দ্বন্দ্বে খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী মো. সাদ্দাম। দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এর ২৪ ঘণ্টা না পেরুতেই নগরীর বাকলিয়ার মিয়াখান নগর এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল কর্মী নাছির উদ্দিনকে। দক্ষিণ বাকলিয়ার ১৯নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা নির্বাচনের দিন আমাদের ভোট দিতে পারব কি নাÑ এই নিয়ে শঙ্কিত। কারণ স্থানীয় প্রভাবশালী প্রার্থীরা কেন্দ্র দখলের নানা কৌশল করছেন। বস্তিগুলোর ভোটাররা যাতে কেন্দ্রে যেতে না পারে সেজন্য পথেই বাধা দেয়া হবে শোনা যাচ্ছে। তবে সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করলে আমরা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারতাম।  নগরীর হালিশহর এলাকার ২৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ভোটার নজরুল ইসলাম বলেন, এখন এলাকার পরিস্থিতি শান্ত হলেও ভোটের দিন গ-গোলের আশঙ্কা রয়েছে। তাই  ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত।  চকবাজার এলাকার ১৬ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার নিরাপত্তা চাই। শোনা যাচ্ছেÑ যারা সিদুর-শাঁখা পরে আসবেন তাদের জামাই আদরে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়া হবে। আর যারা বোরকা পরে আসবেন তাদের জামায়াত-শিবির বলে তাড়িয়ে দেয়া হবে। দক্ষিণ বাকলিয়া এলাকার ১৯ নং ওয়ার্ডের  বাসিন্দা মো. ইউনূস মিয়া বলেন, যারা সাধারণ ভোটার তাদের সবার মধ্যে একটা ভয়ভীতি ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। কিন্তু সুষ্ঠু ভোট হলে আসল চিত্র দেখা যাবে। একটি উদাহরণ দিয়ে ক্ষুদ্র এই ব্যবসায়ী বলেন, গ্রামে বৃষ্টি হলে ক্ষেতের আলু যেমন বেরিয়ে আসে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তেমন প্রকৃত জনপ্রতিনিধি বিজয়ী হয়ে আসবেন। পাহাড়তলী এলাকার ১৩ নং ওয়ার্ডের খাদিজা বেগম বলেন, আমরা নিরাপদে ভোট দিতেই চাই। নির্বাচন কমিশনের কাছে আমরা এই দাবি জানাচ্ছি। তবে যেভাবে চারদিকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে তাতে সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছি। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম সিটির ২০ দলীয় জোটের মেয়র প্রার্থী মনজুর আলম বলেন, গত বৃহস্পতিবার আমার গণসংযোগে ব্যবহৃত গাড়িটি হাতি মার্কার সমর্থকরা ভাঙচুর করেছে। প্রচারণার মাইক ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত পাড়া-মহল্লায় আমার কর্মী-সমর্থকদের হুমকি-ধামকি দেয়া হচ্ছে। তার ওপর সরকারের চাপে নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। এতে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। তাই অবিলম্বে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েনের দাবি জানাচ্ছি। সাধারণ ভোটারদের ভোটদানে নিরাপত্তা প্রদানের দাবি জানিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, আমার বিরোধী প্রার্থী মনজু সাহেব (মনজুর আলম) ভোটারদের নানা উসকানিমূলক কথাবার্তা বলে তাদের বিভ্রান্ত করছেন। আমি আশা করবোÑ এই ব্যাপারে কমিশন ব্যবস্থা নেবে। এবার নির্বাচনে প্রবীণ, বৃদ্ধদের পাশাপাশি নতুন ভোটারদের দেখা যাবে বলে আশা করছি। তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে পরিবেশ আমার অনুকূলে রয়েছে। ৪১টি ওয়ার্ডে আমার সব নেতাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছেন। মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে। তবে কেন্দ্র দখলের কোন ধরনের ষড়যন্ত্র হলে তা সাধারণ ভোটাররা তা প্রতিহত করবে। এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা জরুরি। সুষ্ঠু ভোট হলে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবো। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল বাতেন মানবজমিনকে বলেন,  ঢাকার চেয়ে চট্টগ্রামের নির্বাচনের পরিবেশ ভাল। তুলনামূলক সহিংসতার ঘটনাও কম ঘটছে। প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে।  এই পর্যন্ত ৭০টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে এসেছে। আমরা সঙ্গে সঙ্গে সবগুলো ঘটনার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিয়েছি এবং আমাদের নির্দেশনা প্রশাসনও বাস্তবায়ন করেছে। ভোটের দিন প্রভাবশালী প্রার্থীদের প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের ৪১টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতেই একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী রয়েছেন। এছাড়া সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলরও রয়েছেন। তারা কেউ কাউকে ছাড় দেবেন না। তবে আমাদের পর্যাপ্ত সংখ্যক র‌্যাব, পুলিশ মোতায়েন থাকবে। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী প্রস্তুত থাকবে। তিনি বলেন, আমরা ৫৯১টি  ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা করেছি। এই কেন্দ্রগুলোতে আলাদা নজর দেয়া হবে। সাধারণ কেন্দ্রগুলোর চেয়ে ওই কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হবে। এছাড়া ভোটারদের আসা-যাওয়ার পথে ও স্পর্শকাতর জায়গায় নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হবে।