Wednesday, June 11, 2014

জাপানের বহুল আলোচিত লিঙ্গ-উৎসব

প্রতি বছর এপ্রিলের প্রথম রোববার জাপানের কাওয়াসাকি অঞ্চলের লোকেরা সাড়ম্বরে পালন করে একটি ধর্ম অনুষ্ঠান যার নাম কানামারা মাৎসুরি (Kanamara Matsuri)। জাপানের কাওয়াসাকির একটি মন্দিরে এটি অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসবটি প্রধানত ধর্ম বিশ্বাসের অনুষ্ঠান যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পুরুষাঙ্গসদৃশ উত্থিত লিঙ্গ। পৃথিবীব্যাপী এটি Penis Festival বা লিঙ্গ উৎসব নামে পরিচিত।
লিঙ্গ উৎসব অনুষ্ঠিত হয় জাপানের কাওয়াসাকির কানাইয়ামা মন্দিরে, যা ইতিমধ্যেই লিঙ্গ মন্দির হিসেবে পরিচিত হয়ে গেছে। এই মন্দিরের বয়স ৭০০ বছরেরও বেশী। মন্দিরে একসময় যৌনকর্মী মেয়েরা আসতো প্রার্থনার জন্য, যাতে এসটিডি (Sexually Transmitted Diseases) থেকে মুক্ত থাকতে পারে, এরপর উৎপাদনে (বাচ্চা), এমনকি শস্য উৎপাদনের জন্য এই মন্দিরে ভক্তরা প্রার্থনার জন্য আসে।
ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতকে প্রথম প্রচলন হয় এই বিচিত্র উৎসবের, যখন স্থানীয় বারবনিতারা বসন্তের শেষে বিশাল পুরুষাঙ্গের রেপ্লিকা নিয়ে মিছিল করে যেত কাওয়াসাকি কানামারা মঠে প্রার্থনা করতে, যেন তারা সারা বছর যে কোনো ধরনের যৌন সংক্রমণ বা রোগ থেকে বাঁচতে পারে।
মূলত এটি একটি শিন্তো ধর্মীয় উৎসব, যার মাধ্যমে প্রজনন শক্তিবৃদ্ধির জন্য বন্দনা করা হয়। জানা যায়, ১৬০৩ থেকে ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বারবণিতারা যৌণব্যাধি বিশেষ করে সিফিলিস থেকে রক্ষা পাবার জন্য ঘটা করে এই মেলা উদযাপন করতো। অবশ্য বর্তমানে এই উৎসব ভিন্ন মর্যাদা পেয়েছে। বর্তমানে এটি পালিত হয় নিরাপদ যৌনতা, এইডস সংক্রমণ রোধ ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সচেতনতার অংশ হিসেবে।
উৎসবে হাজার হাজার লোক জড়ো হয়। সব থেকে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে লিঙ্গ র‍্যালি। মন্দিরের কাঠের লিঙ্গটি নিয়ে র‍্যালিতে বের হয় ভক্তরা। সাথে থাকে আরো বড় বড় লিঙ্গ এবং সবার হাতে হাতে পুরুষদের লিঙ্গ সদৃশ খেলনা বা বস্তু । উৎসবের সময়ে সেখানে লিঙ্গাকৃতির বিভিন্ন আইসক্রিম, ফাষ্টফুড, খেলনা বিক্রি হয়, কেউ ইচ্ছে করে সেগুলো কিনে খেতে পারে, লিঙ্গের ওপর বসতে পারে, লিঙ্গের সাথে ছবি ওঠাতে পারে, লিঙ্গের মাথায় চুমুও খেতে পারে।
এ বছরও জাপানের কাওয়াসাকি অঞ্চলের সিন্টো ধর্মালম্বী লোকেরা বিশাল পুরুষাঙ্গের রেপ্লিকা নিয়ে নেচে গেয়ে মিছিল করে আনন্দ প্রকাশ করেছে। রাস্তায় রাস্তায় ছোট থেকে বড় সবাইকে দেখা গেছে পুরুষাঙ্গের আদলে তৈরি চকলেট আর আইসক্রিম চুষতে। অনেককেই ছবির জন্য পোজ দিতে দেখা গেছে বিশালাকৃতির পুরুষাঙ্গের পাশে। মাথায় লিঙ্গ-টুপি পরিধান করে নাচগান করেছেন অনেকেই।
গত ৬ এপ্রিল ২০১৪ মরণব্যাধি এইডস প্রতিরোধ কার্যক্রমের ফান্ড রেইজিং ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে আয়োজিত হয়েছে এই মেলা। ৬ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে এই উৎসব চলে টানা ৭ এপ্রিল রাত পর্যন্ত। বর্তমানে প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা লাভ করেছে মেলাটি। শুধু জাপান নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও আলোচিত হচ্ছে কানামারা মাৎসুরি। ২০১৫ সালে ৫ এপ্রিল উৎসবটি আবার পালিত হবে। এই উৎসবে আয় হওয়া টাকা এইডস গবেষণার কাজে দান করা হয়, যেহেতু এককালে এখানে যৌনকর্মীরা আসতেন এসটিডি যাতে না হয় সেই প্রার্থনার জন্য।
জাপানের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর বৈচিত্র্য। যেমন, খাদ্যাভ্যাসে কাঁচা থেকে পোড়া, সব ধরনের মাছই রয়েছে মেন্যুতে। তেমনি সংস্কৃতি চর্চায় প্রচণ্ড রক্ষনশীলতার পাশাপাশি রয়েছে অবারিত উন্মোচন। লিঙ্গ উৎসব এই রকম অবারিত উন্মোচনের একটি অন্যতম উদাহরণ।
dhormockery.com থেকে

ইরাকে জরুরি অবস্থা জারি

ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী মসুল দখল করে নিয়েছে বন্দুকধারীরা। এ সময় সেনা সদস্যরা তাদের উর্দি খুলে নিরাপত্তা চৌকিগুলো থেকে পালিয়ে যান। মঙ্গলবার এ খবর প্রকাশ করেছে বিবিসি, আলজাজিরা। এদিকে, মুসল দখলেপর সারাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মুরি আল মালিক। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইরাককে জঙ্গি মুক্ত করতে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সহায়তা চাইব।
নিনেভা প্রদেশের রাজধানী মসুল বাগদাদের সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। এখানে সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। নগরীটি জঙ্গিদের একটি শক্ত ঘাঁটি এবং দেশের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকা। চলতি বছর বাগদাদের পশ্চিমাঞ্চলের ফালুজার পর মসুল নগরীতে সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণ হারাল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপি’কে বলেন, মসুল নগরী সরকারের হাতছাড়া হয়ে গেছে এবং জঙ্গিরা এখন এটি নিয়ন্ত্রণ করছে। আর সৈন্যরা তাদের উর্দি ফেলে পালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, বন্দুকধারীরা সুন্নি মুসলিম। তারা লাউড স্পিকারে ঘোষণা দেয়, আমরা মসুল ‘মুক্ত’ করতে এসেছি। আমাদের ওপর যারা হামলা করবে তাদের বিরুদ্ধেই শুধু যুদ্ধ করব। নিনেভা প্রদেশে সামরিক কমান্ডের এক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বলেন, জিহাদিস্ট ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড লিভান্টের (আইএসআইএল) শত শত জঙ্গির সঙ্গে সোমবার বিকাল থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়ে রাতভর যুদ্ধ চলে। তিনি বলেন, নগরীর পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত বিভিন্ন সামরিক ইউনিট প্রত্যাহার করা হয়। এরপর সেনাসদস্যরা নগরী ছাড়তে শুরু করে। জঙ্গিরা এখন নগরী নিয়ন্ত্রণ করছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি’র এক সাংবাদিক নিজেও তার পরিবার-পরিজন নিয়ে নগরী ছেড়েছেন। তিনি বলেন, দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী তাদের যানবাহন ছেড়ে পালিয়েছে এবং একটি পুলিশ স্টেশনে আগুন দেয়া হয়েছে। জঙ্গিরা নিনেভা, আনবার, দিয়ালা, সালেহেদ্দিন ও বাগদাদ প্রদেশে বৃহস্পতিবার থেকে ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে। এ সময় তারা বহু লোককে হত্যা করেছে। এর আগে গত জানুয়ারিতে সরকার ফালুজা নগরীর নিয়ন্ত্রণ হারায়। ইরাকে ২০০৬-২০০৭ সাল থেকে সহিংসতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ সময়ের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া ও সংখ্যালঘু সুন্নিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে হাজার হাজার লোক নিহত হয়। এএফপির তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৬০০’র বেশি লোক নিহত হয়েছে। ইরাকের সরকারি কর্মকর্তারা দেশটিতে ক্রমবর্ধমান রক্তপাতের জন্য বহির্বিশ্বের বিভিন্ন প্রসঙ্গ বিশেষত সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধকে দায়ী করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিয়া নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে সুন্নি আরবদের ব্যাপক ক্ষোভ রক্তপাতের একটা বড় কারণ।
* আমরা মসুল মুক্ত করতে এসেছি। আমাদের ওপর যারা হামলা করবে তাদের বিরুদ্ধেই শুধু যুদ্ধ করব।
* জানুয়ারিতে সরকার ফালুজা নগরীর নিয়ন্ত্রণ হারায়

থাই সুন্দরীর খেতাব ত্যাগ

থাইল্যান্ডের ‘বিউটি কুইন’ ওয়েলুরি দিতসাইয়াবুত (২২) দেশটির লাল শার্ট বিক্ষোভকারীদের নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্য করে তীব্র জনরোষের মুখে পড়েন। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায়, সাধারণ মানুষের সমালোচনার মুখে তিনি তার সুন্দরীর খেতাব ছাড়তে বাধ্য হন। কয়েক মাস আগে ফেসবুকে পোস্ট করা এক মন্তব্যে ওই তরুণী সিনাওয়াত্রা-সমর্থক লাল শার্ট বিক্ষোভকারীদের ব্যাপারে তার ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ‘এই বেয়াদব কর্মীদের ওপর আমি বেজায় ক্ষুব্ধ। ওদের নিপাত করতে হবে।
রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি আরও লেখেন, ‘তোমরা যারা রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করতে চাও, তোমাদের কারণেই থাইল্যান্ড দূষিত হচ্ছে। তোমরা পাজি। তোমরা শান্তিতে মরতে পারবে না।’ ওয়েলুরির এই মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় তোলে। অনেক সমালোচক বলেন, এই তরুণী বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতায় থাইল্যান্ডকে প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্য নন। এভাবে কয়েক মাস ধরে চলা তীব্র সমালোচনার পর অবশেষে খেতাব ফিরিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেন ওয়েলুরি। এএএপি।

বাড়িতে মমতার পছন্দের রঙ করলেই কর মওকুফ

পশ্চিমবঙ্গে বাড়িতে নীল-সাদা রঙ করালেই এক বছরের জন্য করছাড়। সোমবার কলকাতা পৌরসভার মেয়র পরিষদের বৈঠকে এমন সিদ্ধান্তই নিয়েছেন পৌর কর্তৃপক্ষ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রিয় রঙে শহর সাজাতেই পৌরসভা উদ্যোগী হয়েছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। পৌরসভা সূত্রের খবর, এই সুবিধা পাওয়া যাবে শুধু আবাসিক বাড়ির ক্ষেত্রে। এ সিদ্ধান্তের পরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, আর্থিক সংকটের জন্য পৌরসভার বিভিন্ন প্রকল্প যেখানে আটকে রয়েছে, সেখানে এই করছাড় কেন।
বিরোধীদের প্রশ্ন, আর্থিকভাবে সচ্ছল যারা, তারা বাড়িতে রঙ করিয়ে এক বছরের জন্য কর মওকুফ করাবেন। কিন্তু যাদের ক্ষমতা নেই, তারা তো করছাড় পাবেন না। যদিও মেয়র দেবাশিষ কুমার বলেন, ‘শহরকে সুন্দর করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’ কংগ্রেস কাউন্সিলর মালা রায় বলেন, ‘রঙ করানোর খরচ কি পৌরসভা দেবে, শহরের মানুষ এটাও জানতে চাইছেন। কারণ, যারা রঙ করাতে পারবেন না, তারা তো এই করছাড় পাবেন না। ফলে একটা বিশৃংখল পরিস্থিতি তৈরি হবে।’ পৌরসভা সূত্রের খবর, কেউ বাড়িতে নীল-সাদা রঙ করাতে গেলে প্রথমে পৌরসভার কাছে দরখাস্ত করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিক নীল-সাদা রঙ আদৌ করিয়েছেন কি-না, তা দেখার জন্য পৌরসভার একটি ‘ইন্সপেকশন টিম’ যাবে। করদাতাদের ‘অ্যাসেসি’ বা নির্ধারিত নম্বর পৌরসভায় নথিভুক্ত রয়েছে। রঙ করালে সেই অনুযায়ী করছাড় দেয়া হবে। তবে করছাড় দেয়ার ক্ষমতা আদৌ পৌরসভার রয়েছে কি-না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে বিধানসভায় আইন পাস করাতে হবে। পৌর অফিসাররা জানিয়েছেন, ১ থেকে ১০০ নম্বর ওয়ার্ড পর্যন্ত এলাকা থেকে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা কর আদায় হয়। সংযুক্ত এলাকা থেকে আরও ১০০ কোটি টাকা কর বাবদ আসে। কিন্তু শহরের অধিকাংশ বাসিন্দাই যদি করছাড়ের জন্য নীল-সাদা রং করান, তা হলে পৌরসভার আয় কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে। পিটিআই।

বাইরে ঠিকঠাক ভেতরটা ফাঁপা

একটি ছোট খবরে চোখ পড়ল। দেশ ছাড়ছেন উচ্চশিক্ষিত ও মেধাবী তরুণেরা। গত পাঁচ বছরে এক হাজার ৫৮৩ জন বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে ২০১২-১৩ অর্থবছরেই ত্যাগ করেছেন ২৯৯ জন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত বিশেষ করে চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও আইটি দক্ষতাসম্পন্ন বাংলাদেশিরা দেশ ত্যাগ করছেন। নাগরিকত্ব ত্যাগের হার দিন দিন বাড়ছে। [বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৭ জুন] একজন মানুষের কাছে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় দু-তিনটি জিনিসের একটি তাঁর জন্মভূমি। অতীতের বাঙালি মনীষীরা বলেছেন: জননী জন্ম ভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। মা ও মাতৃভূমির মর্যাদা স্বর্গের চেয়েও বেশি। সেই জন্মভূমি যখন কেউ চিরদিনের জন্য ছেড়ে যান, তখন তিনি সুখের হাতছানিতেই যে যান তা-ই নয়—গভীরতর দুঃখ ও হতাশা থেকেই যান। অনেক দিন আগে আমি এক হতভাগিনী মাকে তাঁর এক সন্তান বিক্রি করতে দেখেছিলাম। কিছু টাকার বিনিময়ে—ছেলে খেয়ে-পরে ভালো থাকবে, এই আশায়—এক অবস্থাপন্ন নিঃসন্তানের কাছে তিনি ছেলেকে বিক্রি করেছিলেন। মা সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে নৌকায় তুলে দেন। নৌকা কিছু দূর মাঝনদীতে যেতেই মা হঠাৎ চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠেন। তাঁকে আমরা সান্ত্বনা দিয়ে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিই। আজ যে প্রায় ষোলো শ মানুষ তাঁদের মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে অন্য দেশে চলে গেছেন, বাংলা মায়ের যদি ওই দুঃখিনী মায়ের মতো মুখ ও ভাষা থাকত,
তাঁদের বিমান আকাশে উড়াল দেওয়ার পরই আর্তনাদ করে উঠত। ওই প্রতিবেদনে আরও জানা গেছে, বহু বছর ধরে যাঁরা বাংলাদেশে চাকরি করছেন বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এবং এ দেশেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান, এমন ৩৯ জনকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে গত পাঁচ বছরে। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ ও এশিয়ার টাইগার হওয়ার আশায় রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। নাগরিকত্ব ত্যাগ ও প্রদানসংক্রান্ত ফি হিসেবে গত পাঁচ বছরে দুই কোটি ৯৭ লাখ ৪৬ হাজার ৮৫০ টাকা রাজস্ব আয় করেছে। প্রায় ষোলো শ যাওয়াতেই যখন এত আয়, লাখ পঞ্চাশেক বাদে বাংলাদেশ থেকে যদি ১৬ কোটি মানুষ নাগরিকত্ব ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয় , তাহলে এই খাত থেকে যে রাজস্ব পাওয়া যাবে তাতে বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর সর্বকালের সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্র। তখন একটি নয়, ১০টি পদ্মা সেতুও নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, নাগরিকত্ব ত্যাগের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। যাঁরা গেছেন এবং যাঁরা যাবেন—হতে পারেন তাঁরা স্বার্থপর। তাঁরা তাঁদের নিজেদের এবং তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে দেশ ছেড়েছেন। কিন্তু যে সাড়ে ১৬ কোটি নাগরিক জন্মভূমি ত্যাগ করেননি এবং করবেন না, তাঁদের উপায় কী? আড়াই লাখ কোটি টাকার মস্তবড় একখানা বাজেট কি একটি দেশের জনগণকে সুখ, শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা দিতে পারে? মাথাপিছু আয় বাড়াই কি একটি দেশের চরম প্রাপ্তি? গ্রস ডোমেস্টিক হ্যাপিনেসের ওপরে আর কী আছে? গ্রস ডোমেস্টিক হ্যাপিনেসের বিপরীতে হলো গ্রস ডোমেস্টিক আনহ্যাপিনেস—সমষ্টিগত জাতীয় অশান্তি। যাঁরা দেশ ত্যাগ করেছেন, তাঁরা ভেবে দেখেছেন এ দেশে থাকলে তাঁদের সন্তানদের মেধার কোনো মূল্যায়ন হবে না। যাদের ফেল করার কথা তারাও পাবে জিপিএ–৫; তার সন্তান গোল্ডেন জিপিএ–৫ পাওয়ার উপযুক্ত, সে পাবে কোনোরকমে জিপিএ–৫।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় তাঁর ছেলেমেয়ে ৭৭ ভাগ নম্বর পেয়ে ভালো বিষয়ে ভর্তি হতে পারবে না। ৪৪ বছর আগের কোনো কৃতীর নাতি-নাতনি অথবা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক-কর্মচারীর অমেধাবী পোষ্য ৪২ ভাগ নম্বর পেয়ে বাগিয়ে নেবে একটি ভালো বিষয়। এমন সামাজিক অবস্থায় কেন কেউ দেশ ছাড়বে না? খুব বেশি রকম শারীরিক প্রতিবন্ধী ছাড়া আর যে কারও ক্ষেত্রে কোটার সুবিধা দেওয়া সংবিধান ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। পরীক্ষায় ভালো করে পাস করলেই যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে, সে নিশ্চয়তা নেই। চাকরিবাকরির ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের সন্তানসন্ততি, আত্মীয়স্বজন এবং দলীয় ক্যাডাররা পাবে অগ্রাধিকার। তাদের যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক। ক্ষমতাসীনদের পদলেহনকারী না হলে পদোন্নতির সম্ভাবনা নেই। তার নিচের লোকটি তরতর করে ওপরে উঠে যাবে, তাকে বহন করতে হবে তার ব্যাগ। অপমানের চেয়ে বড় শাস্তি আর হয় না। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হচ্ছে অপমান করা। কত কর্মকর্তা, কত হেডমাস্টার, অধ্যক্ষ, উপাচার্য যে লাঞ্ছিত হয়েছেন যুবনেতা বা ছাত্রনেতাদের হাতে! ছাত্রের ঘুষিতে কতজন খুইয়েছেন তাঁদের দাঁত। ছাত্রনেতার পদাঘাতে কারও পাঁজরের হাড় চূর্ণ হয়েছে। কত সম্মানিতকে তাঁর অফিসকক্ষে তালা দিয়ে না-খাইয়ে রাখা হয়েছে কত দিন ও কত রাত। তবে এসব অসদাচরণ ও অপরাধ তো নস্যি। শুধু দিনদুপুরে কেউ নিহত হলে সাময়িক বহিষ্কার অথবা অতি অল্প সময়ের জন্য লোক দেখানো গ্রেপ্তার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুষ, দুর্নীতির দায়ে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীরা জেল খাটেন। ইসরায়েল হোক, ইতালি হোক, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া হোক,
রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদেরও মাফ নেই। উচ্চশিক্ষার ডিগ্রির তথ্য নিয়ে সামান্য কারচুপিতে এক প্রধানমন্ত্রীর সাজা হয়েছে পূর্ব ইউরোপে কিছুদিন আগে। বাংলাদেশে যে ঘুষ-দুর্নীতি আছে তার কোনো প্রমাণ নেই। সরকারি অফিসের কর্মকর্তাদের চেয়ার-টেবিলের যদি প্রাণ থাকত, তারা বিদ্রোহ করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেত চুরির মাত্রা দেখে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি ইটে দুর্নীতির চিহ্ন। কিন্তু কতজন মন্ত্রী, সাংসদ, পদস্থ কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান আজ জেল খাটছেন? আজ যদি ৭১ জন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা জেলের ভাত খেতেন, একাত্তরের শহীদদের আত্মা শান্তি পেত। মাঝেমধ্যে ভিন্নমতাবলম্বী সাবেক মন্ত্রী বা আমলার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়, তদন্ত শুরু হয়ে শেষ হয় না, হলেও গোঁজামিল দেওয়া হয়, কোমরে দড়ি পড়ে না কারও। যত বড় দুর্নীতিই হোক বা অপরাধ হোক, যদি ব্যক্তিটি কোনো চেতনাপন্থী হন বা কোনো প্রয়াত নেতার আদর্শের সৈনিক হন, তাঁর বিচার করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। অপরাধীর পাশে থাকে রাষ্ট্র। বিদেিশদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদক দেওয়া হলো। অতি ভালো কাজ। তাঁদের মেডেলে সোনার বদলে তামা, পিতল, দস্তা, কাঁসা কি সব দেওয়া হলো। কোটি কোটি টাকা চুরি। সেই চুরি যাঁরা ধরলেন, গালাগাল খাচ্ছেন তাঁরা। যেন দেশদ্রোহিতামূলক কাজ করেছেন। অপরাধীদের বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা। কত ফিকির চলছে। অথচ এই হাতেনাতে ধরা অপকর্মটিতে অপরাধীদের শাস্তি দিতে রাষ্ট্রের সাত কর্মদিবসের বেশি লাগার কথা নয়।
একাত্তর—যা একদিন ছিল আমাদের কাছে একটি চেতনার নাম, আজ তা একশ্রেণির কপটের কাছে বিশাল পুঁজি। কোনো দেশে যখন কোনো মুক্তিসংগ্রাম হয়, তা হয় সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বয়ম্ভর হওয়ার জন্য। আরও বেশি আর্থসামাজিকভাবে সমৃদ্ধি ও উন্নতির জন্য। ক্ষমতাসীন ও তাদের অনুগ্রহভাজনদের বিরামহীন ও সীমাহীন লুটপাটের জন্য নয়। মনে আছে, একাত্তরের সেপ্টেম্বরে একটি গ্রামের হাটে গ্যান্ডারি কিনে আমরা কয়েকজন চিবোচ্ছিলাম। ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরী বললেন, আমাদের দেশের ইন্ডিয়ান ভ্যারাইটি আখ উন্নতমানের। এর রসে শর্করার পরিমাণ বেশি। প্রতি ১০ টন ইক্ষুতে এক টন চিনি হয়। দেশ স্বাধীন হলে আমরা চিনিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হব। রপ্তানিও করতে পারব। দানা বাঁধে না যে গুড়ের অংশ তা থেকে হবে অ্যালকোহল। তাও রপ্তানি করতে পারব। ক্যাপ্টেন চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের অল্প আগে কুষ্টিয়ার একটি চিনিকলের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন। এই শিল্প সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল। আখের ছোবড়া থেকে কাগজ হতে পারে। আমার আরও মনে পড়ে, সেদিন তিনি বলছিলেন স্বাধীন হলে বাংলাদেশ নিউজপ্রিন্ট ও সাধারণ ব্যবহারের কাগজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। এমনকি আমরা পশ্চিমবঙ্গে নিউজপ্রিন্ট রপ্তানি করতে পারব। সেখানে নিউজপ্রিন্টের ঘাটতি আছে। স্বাধীনতার পরে পাটকল গেছে, বস্ত্রকল গেছে, কাগজকল গেছে, চিনিকলের উৎপাদিত চিনি মিলের গুদামে পড়ে থাকে। শত শত কোটি টাকার এলসি খুলে ব্রাজিল থেকে বা অন্য কোনো দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে চিনি। একাত্তরের শহীদের আত্মা আমাদের অভিশাপ দেবে না তো কাকে অভিসম্পাত করবে? সত্তরের দশকে নয়া সাম্রাজ্যবাদীরা নতুন স্বাধীন দেশগুলোতে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সামরিক জেনারেলদের ক্ষমতায় বসাত। একুশ শতকে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।
তারা কৌশল বদলেছে। এখন কারচুপি অথবা ভোটবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে কোনো গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসানো হয়। তাতে গণতন্ত্রের একটা গন্ধ (দুর্গন্ধ বটে) থাকে। নামকাওয়াস্তে একটা পার্লামেন্ট থাকে। সেই সংসদের সদস্যদের দেওয়া হয় সীমাহীন সুযোগসুবিধা শুধু নয়, দুর্নীতি করার অপার সুযোগ। এই ধরনের সাক্ষীগোপাল সরকার ও সংসদের মাধ্যমে দেশের কয়লা, গ্যাস প্রভৃতি খনিজ সম্পদ, বন্দর ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়াই উদ্দেশ্য। কোন দেশে কে ক্ষমতায় রইলেন না রইলেন, তাঁরা জনসমর্থিত কি না—তা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। স্বার্থসিদ্ধি যাঁকে দিয়ে হবে, তাঁকেই ক্ষমতায় রাখা হবে। যেসব রাষ্ট্র মহাজিন কারবার করে উন্নয়নশীল দেশে সুদে টাকা খাটায়, সেসব দেশের কাছে সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্র-টনতন্ত্র কোনো ব্যাপার নয়। তারা দেখতে চায় কোনো রকম একটি সরকার। সে সরকার জনপ্রিয় না জনবিচ্ছিন্ন, গণতান্ত্রিক না স্বৈরাচারী—তা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। কোন দেশে প্রতি আড়াই ঘণ্টায় একজন রাজনৈতিক কোন্দলে খুন হয়, সেটা সে দেশের ব্যাপার। মহাজনি দেশগুলো ঋণচুক্তি করে দেশের সঙ্গে—সরকারি দল বা জোটের সঙ্গে নয়। রাষ্ট্রকে কঠিন চুক্তির মাধ্যমে ঋণ দিলে টাকাটা মারা যাবে না, কারণ, কোনো দেশই মালয়েশিয়ার বিমানের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না। গত ৪৩ বছরে মহাজনি দেশগুলো বাংলাদেশকে যেসব ঋণ দিয়েছে, তা কোনো ক্ষমতাসীন দল বা জোটকে দেয়নি। দেশকে দিয়েছে। সুদে-আসলে সে টাকা তুলেও নিয়েছে।
আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ১৪ দলীয় মহাজোট বা ১৮-১৯-২০ দলীয় কোনো জোটকে চীন-জাপান একটি পয়সাও হাওলাত দেবে না, কারণ, তারা জানে ওই টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না। কিন্তু সরকার যদি চরমোনাইয়ের পীর সাহেবের বা শফিউল আলম প্রধান বা জুনায়েদ বাবুনগরী বা মাইজভান্ডারীরও হয়, তার সঙ্গে চুক্তি করতে মহাজনি দেশের বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। বরং অজনপ্রিয় সরকারকে দিয়ে তারা এমন কিছু কাজ করিয়ে নেয়, যা কোনো শক্ত গণতান্ত্রিক সরকারকে দিয়ে সম্ভব নয়। aঅনেক দেশকেই কোনো কোনো সময় বাইরে থেকে দেখে মনে হয় সব ঠিকঠাক আছে, স্থিতিশীল। কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম নেই; রাস্তায় বিরোধী দলের অফিসের বিড়ালটিও বেরোতে পারে না। আসলে সেটা ভুল। যখন ভেতর থেকে দেশটা ফাঁপা হয়ে যায়, অন্তরাত্মা বলে কিছুই থাকে না, তখন শুভশক্তি হোক বা অপশক্তি হোক, শূন্যতার মধ্যেই একটা কিছু তৈরি হতে থাকে। শিগগির হোক, দেরিতে হোক, সেই শক্তি আত্মপ্রকাশ করবেই। তখন সবচেয়ে বিপন্ন হন অব্যবহিত আগের সরকারের লোকেরা। উনসত্তরে আমি কালো শেরওয়ানি পরে খালি গায়ে খেতের আল দিয়ে দৌড়াতে দেখেছি লীগের এক নেতাকে। বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাসের একটি বিশেষ পর্যায় অতিক্রম করছে। এই পর্যায়টির সমাপ্তি শান্তিপূর্ণভাবে ঘটুক, সেটাই আশা করে সাধারণ মানুষ।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

উত্তপ্ত নগরে চাই স্বস্তির সবুজ

সূর্যোদয়ের সময় ঢাকাকে দুচোখ মেলে দেখার জন্য নির্বিঘ্নেই ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম যানজটমুক্ত রাস্তার পর রাস্তা দিয়ে। ধানমন্ডির ল্যাবএইড হাসপাতালের পাশেই সায়েন্স ল্যাবরেটরির সীমানাপ্রাচীরের বিপরীতের সড়কদ্বীপে এক চিলতে উদ্যান দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এত পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিনন্দন একটি সড়কদ্বীপ ঢাকা শহরে আছে, ভাবতেই মনটা ভালো হয়ে গেল। উদ্যানে পরিচর্যারত ধানমন্ডি নিবাসী রাফেয়া আবেদিন আমাকে ভেতরে ডেকে নিয়ে যত্ন করে ছাঁটা নরম ঘাসের চাদরে খানিকক্ষণ বসে থাকার অনুমতি দিলেন। কত যে দেশি-বিদেশি গাছ আর ফুলের সমাহার এই ছোট্ট ছিমছাম জায়গাটার ভেতরে, না বসলে কোনো দিন জানাই হতো না। ভেতরে কৃত্রিম লেক ও দুটি ছোট্ট জলাধারও আছে। সেখানে ফুটে আছে পদ্ম, শাপলা, ওয়াটার লিলিসহ নানান জলজ উদ্ভিদ। কৃত্রিম লেকে কিলবিল করছে ব্যাঙ, ব্যাঙাচি, শামুক, ঝিনুকসহ ছোট ছোট দেশি মাছ। উদ্যানের মাথায় কৃত্রিম পাহাড়সারির একদিকে কবুতরের ঘর বানিয়ে দেওয়া। কোথা থেকে যে একের পর এক কবুতর সেখানে এসে বসছে, আবার কোথায় যে চলে যাচ্ছে! পাহাড়ের পাথরের ওপরে বসে পাখনায় মুখ ঘষছে কয়েকটা হাঁস। পাহাড়ের পেছনে বিরাট এক জামগাছ। সেখানে শত পাখির কিচিরমিচির। ঢাকার মতো অপরিকল্পিত নগরে পাখির ডাকে ভোর হয়! ঘুঘু, শালিক, চড়ুই, দোয়েল আর ফিঙ্গেদের চিনতে পারলাম। ঘাসের ওপর থেকে উঠে গিয়ে কৃত্রিম পাহাড়ের নিচে যখন বসলাম, গায়ে লাগল পরম শািন্তর শীতল বাতাস। এই শািন্তর পরশ কোনো দিন দিতে পারবে না শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। এখানে কাঞ্চন, জাপানি কাশিয়া, চেরি, গোল্ডেন শাওয়ার, টাইগার লিলিসহ নানা প্রজাতির দেশি-বিদেশি লিলি, বাগানবিলাস, রক্তকরবী, দোপাটি, বকুল, রঙ্গন, জবা, টগর, হাসনাহেনা, কয়েক জাতের কাঠগোলাপ, লাউ, চিচিঙ্গা ইত্যাদি গাছের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ফুটে থাকা বর্ণিল আভাময় ফুলের সমাহার এক মুহূর্তেই মনের স্বাস্থ্য চাঙা করে দিতে পারে। উদ্যানের চারদিকের ফুটপাতও সাজানো হয়েছে টবের গাছ দিয়ে।
ঢাকার মতো জনাকীর্ণ নগরের ফুটপাত তো তাহলে চাইলেই পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব। চাই কেবল একটুখানি যত্নশীল নজরদারি। উদ্যানের ভেতরে কালো টাইলসে নির্মিত ভাস্কর্য ছাড়াও আছে ছোট ছোট কয়েকটি ভাস্কর্য। রাফেয়া আবেদিন জানালেন, এ রকম আরেকটি উদ্যান তিনি রচনা করেছেন পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে; সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিয়ে সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে। রাফেয়ার উদ্যানের পাশেই আরেকটি উদ্যান করার চেষ্টা করেছে ল্যাবএইড কর্তৃপক্ষÿ। গাছগুলো ধূলিমলিন। ভেতরে ছড়িয়ে আছে পথচারীদের ছুড়ে ফেলা অপাচ্য বর্জ্য। একটি ডেরাও দেখা গেল, কোনো এক গৃহহীন নারীর আশ্রয়। কেবল উদ্যান তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, যত্নও নিতে হবে নিয়মিত। রাফেয়া অভিজ্ঞতা থেকে বললেন, দেশের সব নগরের সব সড়কদ্বীপে এ রকম উদ্যান তৈরি করা অনায়াসেই যায়, কিন্তু যত্ন না নিলে তা কোনোভাবেই টিকে থাকবে না। এর পেছনে খরচও কম নয়। রাফেয়া নিজের খরচেই করছিলেন যত্ন নেওয়ার কাজ। একসময় অপারগ হয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সহায়তা কামনা করেন। অবশেষে এনসিসি ব্যাংক ব্যয় বহন করতে রাজি হয়। ঢাকা শহরে পার্ক বলতে রমনা পার্ক আর চন্দ্রিমা উদ্যান। নগরে সুস্থ জীবনমানের জন্যই অন্তত ২৫ ভাগ জায়গায় সবুজায়ন থাকতে হবে। ঢাকা শহরের ১০ ভাগেরও কম জায়গা সবুজ, যা বর্ধিত জনসংখ্যা ও নীতিহীনতার আগ্রাসনে ক্রমহ্রাসমাণ। অন্যদিকে লেক, নদী দখল করেও তৈরি হচ্ছে ন্যাড়া অবকাঠামো। তদুপরি বাড়ছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের অবাধ ব্যবহার। কেবল জলবায়ু পরিবর্তনকে দুষলেই চলবে কেন, নগরে কেন্দ্রীভূত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গাছপালার বিলুপ্তি আর বাড়িতে-গাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার ঢাকার বাতাসকে উত্তপ্ততর করে তুলছে।
স্বল্প আয়ের মানুষ বাধ্য হচ্ছে অস্বস্তির জীবন কাটাতে। বিশ্বের বসবাস-অযোগ্য নগরের তালিকায় ঢাকা ইতিমধ্যেই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকার জাতীয় নগর নীতিমালা, ২০১৪ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এই নীতিমালায় অবশ্যই সবুজায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। এমনকি বিল্ডিং কোডে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ভবন সবুজায়নের বাধ্যবাধকতা। সুস্থ নগরের ভবন যেমন পরিকল্পিত হওয়া দরকার, তেমনি উন্মুক্ত স্থানও অত্যাবশ্যক। কিন্তু যে নগরের প্রতি বর্গকিলোমিটারে কুড়ি হাজার মানুষের বাস, সেখানে উন্মুক্ত স্থান নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে মনে হয় না। কর্মসংস্থানের বিকেন্দ্রীকরণ তাই হতে হবে অন্যতম নগরনীতি। এ দেশে নগরায়ণ যেভাবে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, তাতে আগামী ৫০ বছরে গ্রামবাংলা বলে কিছু থাকবে না। সে ক্ষেত্রে নগর নীতিমালায় অদূর ভবিষ্যতের কৃষি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে দিকনির্দেশনা থাকা জরুরি৷ রাফেয়া আবেদিনের মতো অভিজ্ঞ মানুষেরা থাকতে এ রাষ্ট্রের নগর কেন বৃক্ষশূন্য, পাখিশূন্য হবে! রাফেয়া বলেন, রাস্তার পাশে বা সড়ক বিভাজকে সব ধরনের গাছ লাগানো যাবে না। উপযুক্ততা বিবেচনা করেই লাগাতে হবে। তবে গাছ লাগানো অনেক সহজ, রক্ষা করার জন্য চাই নিরন্তর যত্ন। এ রকম সক্ষম ব্যক্তি-উদ্যোক্তাদের সরকার নগরের সবুজায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে সম্পৃক্ত করতে পারে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে রাফেয়া বলেন, নীতিমালাই যথেষ্ট নয়, সবুজ স্বস্তিদায়ক নগর গড়তে হলে নগর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণকে সম্পৃক্ত করতেই হবে। প্রচারাভিযানের মাধ্যমে জনগণের শিক্ষা, সচেতনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারলে নগরবাসী নিজেরাই নিজেদের চারপাশ সাজিয়ে নেবে, সিটি করপোরেশনের কেবল দিকনির্দেশনা প্রদান ও তত্ত্বাবধান করলেই চলবে।
শান্ত নূরুন্নবী: উন্নয়নকর্মী।
shantonabi@gmail.com