Friday, November 24, 2017

রোহিঙ্গা সংকটের বোঝা বাংলাদেশের কাঁধে

সেলিমের বয়স কম হলেও তার গলার আওয়াজে সাহসের অভাব নেই। এক সময় সে মিয়ানমারের বাসিন্দা ছিল। সেখানে গরু চরাতে গিয়ে গান গাইতো সে। কিন্তু রাখাইন অঙ্গরাজ্যে আগস্টে শুরু হওয়া সহিংসতায় মিয়ানমার ছেড়ে সেলিম বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এখানে এসে অক্টোবরে নতুন একটি গান কমেপাজ করেছে এই ছোট্ট বালক। গানটা অনেকটা এরকম- ‘ওই দুর্বৃত্তরা কি করলো?- আমাদের প্রাণপ্রিয় মানুষদের কিভাবে হত্যা করতে পারলো?- ওই অপরাধীরা কি করলো?- সবাইকে হাঁটু গেড়ে বসা থাকা অবস্থায় পুড়িয়ে দিলো।’ সেলিমের ধারণা তার বয়স ১০।
বড় ভাইয়ের কাছ থেকে গান গাইতে শিখেছিল সে। এক বৌদ্ধ দুর্বৃত্তের হাতে খুন হয় তার ভাই। তার পরিবার পালিয়ে বাংলাদেশে আসে। বর্তমানে একটি জীর্ণ শিবিরে তাদের বসবাস। এখানে তার কিছুই করার নেই, কোথাও যাওয়ার নেই। এইখানে তার গানই তার একমাত্র সান্ত্বনা।
আগস্টের ২৫ তারিখ যখন সামপ্রতিক রোহিঙ্গা সংকটের শুরু হয়, তখন কেউ আন্দাজ করতে পারেনি এর পরিণতি এত ভয়ঙ্কর আর এত বিশাল হবে। কয়েক সপ্তাহে বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। যারা বেঁচে গেছেন তাদের সঙ্গে রয়ে গেছে নৃশংস, নির্মম স্মৃতি- প্রিয়জনদের হারানোর বেদনা। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র এই সহিংসতাকে জাতি নিধন বলে আখ্যায়িত করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি গণহত্যার সামিল। আন্তর্জাতিক নিয়মের অধীনে জাতি নিধন কোনো স্বতন্ত্র অপরাধ নয়, তবে এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শামিল। অন্যদিকে গণহত্যার সংজ্ঞা সমপূর্ণ আলাদা- একদল মানুষকে তাদের জাতীয়তা, জাত, বর্ণ বা বিশ্বাসের কারণে ধ্বংস করে দেয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে চালানো হয় গণহত্যা। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ এটি। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি ন্যায় বিচারের কোনো ঘটনা নয়। এইখানে, বেঁচে থাকাটাই মূল বিষয়।
এখন পর্যন্ত রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। রোউয়ান্ডা গণহত্যার পর এটাই সবচেয়ে বড় শরণার্থী মুভমেন্ট। ২৫শে আগস্ট রাতে রাখাইনের সেনাবাহিনী ও পুলিশ ক্যামেপ হামলা চালায় বিদ্রোহী দল আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা)। এরপর থেকেই সেখানে নিধনযজ্ঞ শুরু করে সামরিক বাহিনী। অনেকে সবকিছু ত্যাগ করে রাখাইন ছেড়েছে, সেনাবাহিনীর নৃশংসতা থেকে রেহাই পেতে। শিশুদের ঝুড়িতে ভরে, বৃদ্ধদের কাঁধে করে ও পশু পাখি সঙ্গে নিয়েও পালিয়েছে অনেকে। কখনো কয়েকদিন, কখনো কয়েক সপ্তাহ লেগেছে বাংলাদেশের সীমান্তে পৌঁছাতে। সেসব হেঁটে আসার রাস্তাগুলোতেও মরণফাঁদ হিসেবে সেনাবাহিনী পুঁতে রেখেছিল স্থলবোমা। কেউ কেউ সেসব ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে। কাওকে সেনাবাহিনী পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করেছে। আবার কেউ নদীপথে আসতে গিয়ে পানিতে ডুবে মরেছে।
বাংলাদেশে এসেও তেমন সুখে নেই তারা। সংকটের শুরুর দিকে যারা এসেছে তাদের অনেককে দিন যাপন করতে হয়েছে, খোলা আকাশের নিচে- রোদ, বৃষ্টি সহ্য করে। আগে থেকেই নির্মিত দুই শিবিরের মাঝখানে থাকা বন কেটে তাদের জন্য জায়গা করে দেয়া হয়। জাতিসংঘ এই অবস্থাকে জরুরি মানবিক সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছে। এখন রোহিঙ্গারা বাঁশ ও তারপুলিন দিয়ে তৈরি অস্থায়ী শিবিরে অবস্থান করছে। এসব শিবিরের অবস্থা প্রায় অবাসযোগ্য। এগুলোতে নেই, স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনের ব্যবস্থা- নেই পর্যাপ্ত খাবার, পানি, চিকিৎসা। কিন্তু রোহিঙ্গাদের আগমন থামছেই না। এভাবে চললে অচিরেই নতুন আগমনকারীদের আশ্রয় দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাব দেখা দেবে। এই বিশাল শিবিরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক পর্বত। সেখান থেকে যেদিকেই চোখ যায়- শুধু ছোট ছোট জীর্ণ কুটিরই নজরে পড়ে। এটা অনেকটা একটা শহরের মতো- কিন্তু এখানে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। কিন্তু জনসংখ্যা প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির সমান। আর এ জনসংখ্যার ৬০ ভাগই শিশু। ফরাসি এনজিও একশন এগেইন্সট হাঙ্গার (এসিএফ) এর সমপ্রতি করা এক জরিপে দেখা গেছে, এসব শিশুদের ৭.৫ শতাংশই ব্যাপক অপুষ্টিতে ভুগছে। অনাহারে থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় ৪০ হাজারের মতো শিশু। যাদের বয়স ৬ মাসের কম (সংখ্যায় বেশি) তাদের মৃত্যুর আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। বাকিরা রয়েছে ডায়রিয়া বা কলেরা বা হামের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে। অথবা বন্য হাতির আক্রমণেও প্রাণ হারানোর ঝুকিতো আছেই। চিকিৎসা সেবাদানিকারী বেসরকারি দাতব্য সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সের(এমএসএফ) জরুরি সমন্বয়ক রবার্ট অনুসের ভাষ্য মতে, এই অবস্থাকে মূলত জটিল সংকট বলা হয়। এটা সিরিয়ার মতো, মানসিক আঘাতের প্রতিক্রিয়া নয়। এটা কোন কলেরা মহামারীও নয়, যেখানে চিকিৎসকরা অসুস্থতা সারাতে কাজ করে। এটা কোন দুর্ভিক্ষও নয়। শুধু কোনো জাতিগত বা ধর্মগত বা রাজনৈতিক নিপীড়নও নয়। এটা সবকিছু, একসঙ্গে। তিনি বলেন, আপনি যদি একটি বিষয়ের প্রতি বেশি মনোযোগ দেন, তাহলে আপনাকে অন্য বিষয়গুলোতে কম মনোযোগ দিতে হবে- এটাই সবচেয়ে বেশি জটিল অংশ। প্রত্যেক দিনই কোন না কোন নতুন উদ্বেগ দেখা দেয়। এতগুলো শিশু না খেয়ে মারা যেতে পারে- এতগুলো মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছিল, এদের বিশেষ যত্নের দরকার আছে- কয়েকদিন পরেই কোনো ঝড় আঘাত হানবে ইত্যাদি। সবগুলোই আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ প্রধান এন্তোনিও গুতেরা এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন, বাংলাদেশ একটি মানবাধিকার দুঃস্বপ্ন মোকাবিলা করছে। কক্সবাজারে নিয়োজিত বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির জরুরি সমন্বয়ক মাইকেল ডানফোর্ড বলেন, আমরা এমন একতা সংকটের শুরুর দিকে আছি, যেটা সামপ্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকট হতে চলেছে। বাংলাদেশ সরকার হয়তো প্রথম দিকে তাদের আশ্রয় দেয়ার সময় বুঝতে পারেনি তারা কিসের সম্মুখীন হতে চলেছিল। তবে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে তারা দিয়েছে।
রোহিঙ্গা পরিস্থিতি আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে গণতান্ত্রিক উন্নতির ধারণাটা তাৎপর্যপূর্ণভাবে পাল্টে দিয়েছে। মিয়ানমারের কার্যত নেত্রী হওয়ার আগে অং সান সুচি বহু বছর গৃহবন্দি হিসেবে জীবন কাটিয়েছেন। পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার। এরপর ২০১৬ সালে তিনি মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর নির্বাচিত হন। তবে এই সংকট তার পেছনের সকল অর্জনকে মূল্যহীন করে তুলেছে। তার চোখের সামনে রোহিঙ্গাদের ঘর-বাড়ি ধ্বংস করে দেয়া হলেও, হত্যা করা হলেও তিনি এই ধ্বংসযজ্ঞ থামানোর চেষ্টা করেননি- এমনকি রোহিঙ্গারা যে অত্যাচারের শিকার তা-ও শিকার করেননি। তবে তার নিশ্চুপতার মধ্যে দিয়ে জেগে উঠেছেন আর এক নেত্রী- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশ কোনো ধনী দেশ নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি এটি। প্রায় ১৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই দেশটির আয়তন প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের সমান। বাংলাদেশিরা রোহিঙ্গাদের সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে এই আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। তাদের অপ্রতুল সমপদ অন্য কোনো জাতীয়তার মানুষদের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে- এই বিষয় রোহিঙ্গাদের প্রতি তাদের সহানুভূতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ১৫ই নভেম্বর শেখ হাসিনা আইনপ্রণেতাদের বলেন, বাংলাদেশ এক অতুলনীয় সংকটের সম্মুখীন। এই সমস্যার জন্য দায়ী মিয়ানমার। আর মিয়ানমারই এর সমাধান করবে। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিবেনা এমন সম্ভাবনা রয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে চায়। অন্যদিকে সুচি বলেছেন, তিনি আশা করেন খুব দ্রুতই ঢাকার সঙ্গে একটি স্মারকলিপিতে সম্মত হতে পারবেন- যে স্মারকলিপি অনুসারে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের যতদ্রুত সম্ভব মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার কার্যক্রম শুরু করা যায়। তবে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা দুই সরকারের এমন সমঝোতা পছন্দ করছেন না। তাদের মতে, মিয়ানমার-বাংলাদেশ ১৯৯০ সালের রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যেরকম সমঝোতায় পৌঁছেছিল আবারও তেমনটিই ঘটতে চলেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংগঠন এমন সমঝোতার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে। এইবার নিয়ে চতুর্থবারের মতো বিশাল সংখ্যার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে পালিয়েছে। তবে এর আগের কোন পলায়নই এত দ্রুত বা এত বিশাল আকারে ঘটেনি। বাংলাদেশে কুতুপালং শিবির নির্মিত হয় ১৯৭৮ সালে, সামপ্রতিক রোহিঙ্গা ঢলের মতো তৎকালীন সময়ে ঘটা এক ঢলে। এরপর ৯০ এর দশকে ওপর এক ঢলে আরো রোহিঙ্গা এসে জমা হয় সেখানে। ধীরে ধীরে বালুখালি, লেদা ও নয়াপয়াড়ার মতো শিবির স্থাপিত হয়। আগস্টে রাখাইনের সেনাবাহিনী ও পুলিশ ক্যামেপ হামলার পর থেকে অঞ্চলটিতে মানবাধিকার সহায়তা প্রায় পুরোপুরিভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আইসিআরসি হচ্ছে একমাত্র সংগঠন যেটির রাখাইনে প্রবেশাধিকার রয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা ধারণা করছেন সেখানে অচিরেই দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। এমনতি হলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আরো একটি ঢল নামতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার মুখে যা-ই বলুক না কেন, কর্মকর্তারা উপলব্ধি করেছেন যে, এই সংকট দ্রুত শেষ হচ্ছে না। বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, আমাদেরকে দীর্ঘ সময়ের জন্য (এই সংকট মোকাবিলা করতে) প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি আরো বলেন, আর যতদিনই লাগুক না কেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো উচিত।

রোহিঙ্গা ফেরাতে অ্যারেঞ্জমেন্ট- সময়সীমার ইঙ্গিত নেই

রাখাইনে বর্বর নির্যাতন থেকে প্রাণে বাঁচতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমে ফেরাতে মিয়ানমারের সঙ্গে একটি ‘অ্যারেঞ্জমেন্ট’ সই করেছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের প্রশাসনিক রাজধানী নেপি’ডতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও দেশটির স্টেট কাউন্সেলর দপ্তরের মন্ত্রী চাও থিন সোয়ে নিজ নিজ দেশের পক্ষে ওই দলিলে (ইন্সট্রুমেন্ট) সই করেন। ঢাকা ও নেপি’ডর তরফে প্রচারিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দ্বিপক্ষীয় ওই অ্যারেঞ্জমেন্ট বা ইন্সটু্রমেন্টে সইয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এতে রোহিঙ্গাদের কতদিনের মধ্যে ফেরানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে সে সংক্রান্ত কোনো সময়সীমা নেই। যদিও ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, একটি সময়সীমা নির্দিষ্ট করতে তারা তাদের সর্বোচ্চ অ্যাফোর্ট দিয়েছেন। কিন্তু মিয়ানমারকে রাজি করানো যায়নি।
দীর্ঘ দিনের পুঞ্জীভূত রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের এটি প্রথম পদক্ষেপ বা ফার্স্ট স্টেপ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রচারিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সই হওয়া দ্বিপক্ষীয় দলিল প্রশ্নে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে। তা হলো-রোহিঙ্গাদের ফেরানোর সংক্রান্ত বাস্তব পদক্ষেপের নিমিত্তে আগামী ৩ সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যৌথ কার্যকরী দল (জয়েন্ট ওয়ার্কিং) গ্রুপ গঠিত হবে। তবে এটির নেতৃত্বে কোনো লেভেল বা কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি থাকবেন তা জানানো হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে- রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর দ্বিপক্ষীয় ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হবে। বিজ্ঞপ্তিতে এ-ও বলা হয়েছে- আগামী দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দু’দিন ধরে নেপি’ডতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী-সচিবসহ সফররত বাংলাদেশের কর্মকর্তারা মিয়ানমারের মন্ত্রী, সচিবসহ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন। সেখানে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচির সঙ্গেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর দীর্ঘ বৈঠক হয়। সিরিজ সেই আলোচনা শেষে দ্বিপক্ষীয় দলিলটি স্বাক্ষরিত হয়। ওই দলিলের বিস্তারিত প্রকাশ না হলেও ঢাকা ও নেপি’ডর সূত্রে যে খবরাখবর বেরিয়েছে তাতে বলা হয়েছে- রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে বিশেষ করে সংস্থাটির শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন ইউএনএইচসিআরকে যুক্ত রাখার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু মিয়ানমার তাতে রাজি হয়নি। তারা ১৯৯২ সালে সই হওয়া দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার চেতনায় অনেকটা সেই আদলেই নতুন দলিলটি সই করেছে। সেখানে জাতিসংঘের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা রাখা হয়নি। তবে দুই দেশের কর্মকর্তা পর্যায়ের আলোচনায় ‘প্রয়োজনে ইউএনএইচসিআরকে কাজে লাগানো’র বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। এক বছরের মধ্যে সব রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়ার দাবি তুলেছিল বাংলাদেশ। ২০১৬ সালের অক্টোবরের পরে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে শুধু তাদের ফেরানোর কথা বলেছে মিয়ানমার। কিন্তু এখানে আগে থেকে যে ৪ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে তাদের কি হবে সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সংকট সমাধানে দ্বিপক্ষীয় যে ব্যবস্থা বা অ্যারেঞ্জমেন্ট সই হলো তা কোনো পক্ষ না মানলে কি হবে? বা এটি মানার বাধ্যবাধকতার বিষয়েও সেখানে স্পষ্ট কোনো ধারা নেই বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। সই হওয়া দলিল সংক্রান্ত রিপোর্টে বিবিসি বাংলা বলছে, দ্বিপক্ষীয় ওই অ্যারেঞ্জমেন্টের ফলে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন আগামী দু’মাসের মধ্যে শুরু হবে। রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে দুই দেশের মধ্যে গত কয়েক মাস ধরে যে আলোচনা চলছে এটি তারই ফল। ওই দলিলকে ঢাকা ‘অ্যারেঞ্জমেন্ট অন রিটার্ন অফ ডিসপ্লেসড পারসনস ফ্রম রাখাইন স্টেট’ বলে আখ্যা দিয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সহিংসতায় গত আড়াই মাসে ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এখানে আগে থেকে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে আরো কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাস করছে।
দ্বিপক্ষীয় দলিল সইয়ের বিষয়ে নেপি’ডর বিবৃতিতে বলা হয়- বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ঘটবে তাদের পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই করার পর। বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯৯২ সালে দুই দেশের তরফে যে যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়েছিল তার মধ্যে এই বিষয়ে দিকনির্দেশনা এবং নীতিমালা ছিল। রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিকীকরণের বিরোধিতা করে মিয়ানমারের গতকালের বিবৃতিতে বলা হয়েছে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সমস্যা শান্তিপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধান করতে হবে। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই দেশের মধ্যে সর্বশেষ সই হওয়া সমঝোতাকে ‘উইন-উইন সিচুয়েশন’ বা দু’পক্ষের বিজয় বলে বর্ণনা করেছে।
মন্ত্রী বললেন এখন পরের স্টেপে আমাদের যেতে হবে: দলিল সইয়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী নেপি’ডতে বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে বলেন, এটি আমাদের ফার্স্ট স্টেপ বা প্রথম পদক্ষেপ। এখন দুই দেশকে ‘পরের স্টেপে’ যেতে হবে। মন্ত্রী বলেন- কাজটা শুরু করতে হবে। বিস্তারিত ‘অ্যারেঞ্জমেন্ট’-এর মধ্যে আছে। আমরা ঢাকায় ফিরে বিস্তারিত জানাবো। কবে নাগাদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু ও শেষ হবে সেই সময়সীমা পাওয়া যায়নি মন্ত্রীর কথায়। তিনি বলেন, এখন কাজটা শুরু করতে হবে। ওখানে বাড়িঘরগুলো জ্বালিয়ে সমান করে দিয়েছে। সেখানে বাড়িঘর তৈরি করতে হবে।’ এদিকে মিয়ানমারের শ্রম, অভিবাসন ও জনসংখ্যা বিষয়ক দপ্তরের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি মিন্ট চিং বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “বাংলাদেশে ফরম (রোহিঙ্গাদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিবন্ধন ফরম) পূরণ করে আমাদের ফেরত পাঠালে যত দ্রুত সম্ভব আমরা তাদের (রোহিঙ্গা) ফিরিয়ে আনতে চাই।” মিয়ারমারের অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মিন্ট কিয়েংয়ের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত রয়েছে মিয়ানমার। তবে প্রত্যাবাসনের আগে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে নাম তালিকাসহ নিবন্ধন সম্পন্ন হতে হবে। ইয়াঙ্গুনস্থ আল জাজিজার সাংবাদিক স্কট হেইল্ডারের মতে, দ্বিপক্ষীয় ওই দলিলটি আন্তর্জাতিক চাপের কারণেই সই করেছে মিয়ানমার। যে চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ রোহিঙ্গা সমস্যার ক্ষেত্রে ‘কিছুটা উন্নতি’ প্রদর্শন করার এটিই সুযোগ। আল জাজিরার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী বাংলাদেশ পুরো বিষয়টি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। কারণ ঠিক কি পরিমাণ রোহিঙ্গা ফেরত নেয়া হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। রোহিঙ্গাদের কয়েকশ’ গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ওই সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে। এদিকে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উভয় দেশের সরকার বলছে, উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে মিয়ানমারের ক্ষমতাশালী সামরিক বাহিনী পাল্টা প্রমাণ হাজির করতে পারে।
রাখাইনের জন্য বাংলাদেশের ৩ অ্যাম্বুলেন্স উপহার: এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মন্ত্রী মাহমুদ আলীর দ্বিপক্ষীয় সফরে মিয়ানমারের সঙ্গে আরো ডকুমেন্ট সই ও হস্তান্তর হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে- ১৯৯৮ সালে সই হওয়া নাফ নদের উত্তরের বাংলাদেশ-মিয়ানমার স্থল সীমান্ত সংক্রান্ত চুক্তির অনুমোদন সংক্রান্ত ইন্সট্রুমেন্ট। দীর্ঘ দিন ধরে ঝুলে থাকা ওই ‘ইন্ট্রুমেন্ট অব রেটিফিকেশন’ মিয়ানমারের মন্ত্রী চাও থিন সোয়ের সঙ্গে বিনিময় করেন মন্ত্রী মাহমুদ আলী। সেখানে নাফ নদের সীমানা নির্দিষ্টকরণে ২০০৭ সালে সই হওয়া চুক্তির অধীন একটি প্রটোকলও সই হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে- ২৩শে নভেম্বর মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সুচির সঙ্গে মন্ত্রী মাহমুদ আলীর সাক্ষাৎ হয়েছে। যেখানে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী অন্যান্য ইস্যুর সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং বিসিআইএম’র আওতায় যোগাযোগ কানেকটিভিটি নিয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া ওই দিনের শুরুতে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের সমাজ কল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী উ উইন মিন্ট আয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাংলাদেশ সরকারের তরফে উপহার হিসেবে রাখাইন রাজ্যের জন্য ৩টি অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর করেন।

জমজমাট রোবট রেস্টুরেন্ট by সুদীপ অধিকারী

সাত দিনের মধ্যেই জমজমাট হয়ে উঠেছে ‘রোবট রেস্টুরেন্ট’। ভোজনবিলাসীদের পদচারণায় উৎসবমুখর রাজধানীর নতুন এই রেস্টুরেন্টটি। রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি করছে রোবটরা। রোবটের হাত থেকে খাবার গ্রহণ করে কাস্টমার যেমন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন এবং তেমনি নতুন এই খাবারের ঘরে বসে মজা করে খাচ্ছেন তারা। ফলে প্রতিদিনই উৎসুক মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন রোবট রেস্টুরেন্টে। উচ্চবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত সকলেই আসছেন রোবটের সেবা উপভোগ করতে।
আসাদ গেটের কাছে ফ্যামিলি ওয়ার্ল্ড কনভেনশন সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় গত ১৫ই নভেম্বর থেকে চালু হয় রেস্টুরেন্টটি। এটি বাংলাদেশের প্রথম ‘রোবট রেস্টুরেন্ট’ এটি। বাংলাদেশ ও চীন যৌথভাবে পরিচালনা করা রেস্টুরেন্টটির মূল আলোচ্য বিষয় বস্তু হচ্ছে দুটি রোবট। যারা খাবার পরিবেশনের কাজ করছে রেস্টুরেন্টিতে। চীনে তৈরি এই রোবট দুটির একটি নারী ও অন্যটি পুরুষের আদলে গড়া। যদিও তাদের দুটোর নামই এক, ‘ইয়োইদং’। যার মানে, চলমান সুখ বা মুভিং হ্যাপিনেস। সাদা-নিল রঙের রোবট দুটো ঘুরছে রেস্টুরেন্ট জুড়ে। কাস্টমারদের সঙ্গে কথা বলছে তারা। আবার কাস্টমাররা রোবটের পেছনে থাকা মনিটরের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা বাটন টিপে দিচ্ছেন খাবারের অর্ডার। শক্তিশালী ওয়াই-ফাইয়ের মাধ্যমে সে অর্ডার স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যাচ্ছে রান্নাঘরে থাকা শেফের কাছে। ঝটপট তৈরি হচ্ছে খাবার। দ্রুত সেই খাবার নিয়ে ওই রোবটই হাজির হচ্ছে নির্দিষ্ট টেবিলে। উন্নত দেশগুলোর এ যান্ত্রিক রোবটের কাছ থেকে ‘মানবিক’ সেবা এখন ঢাকাবাসীও উপভোগ করছেন। সরজমিন রেস্টুরেন্টিতে গেলে দেখা যায়, সেখানে বড়দের সঙ্গে শিশুদের সংখ্যাও কম ছিল না। উচ্চবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত সকলেই আসছে এই রোবটের সেবা উপভোগ করতে। এই রেস্টুরেন্টে আসা ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে আসন ব্যবস্থাতেও রয়েছে কিছু ভিন্নতা। পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে খেতে আসা মোহাম্মদপুরের সুমি আক্তার বলেন, এটা আমার এক নতুন অভিজ্ঞতা। মানুষের সামনে এই প্রথম রোবটে খাবার পরিবেশন করছে। বাংলাদেশ এখন আগের তুলনায় অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই রোবটগুলো কিভাবে খাবার পরিবেশন করে সেটা দেখতেই মূলত আসা এখানে। আমরা এখানে অনেক মজা করেছি। বিশেষ করে আমার বাচ্চাটা অনেক খুশি এই রোবটের সঙ্গে কথা বলে। রেস্টুরেন্টে খেতে আসা সাইদুর রহমান বলেন, এটা সত্যিই একটা চমৎকার বিষয়। ১ দশমিক ৬ মিটার উচ্চতার রোবট দুটি চীনা প্রকৌশলী ম্যাক্স সোয়াজ ও স্টিভেন তৈরি করেছেন। তবে, বর্তমানে রোবট দুটি ক্রেতাদের কাছ থেকে কোনো অর্ডার নেবে না। কেবল রান্নাঘর থেকে তৈরি করা খাবার নির্দিষ্ট টেবিলে পৌঁছে দেবে। প্রতিটি ৩০ কিলোগ্রাম ওজনের রোবট চলাচল করবে নির্দিষ্ট লাইন (ট্র্যাক) ধরে। সামনে বাধা পড়লে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই থেমে যাবে। ইংরেজিতে অনুরোধ করবে পথ ছেড়ে দেয়ার জন্য। একনাগাড়ে এক একটি রোবট ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে সক্ষম। প্রতিটি রোবট বানাতে খরচ হয়েছে প্রায় আট লাখ টাকা। চীনা সংস্থা এইচ জেড এক্স ইলেকট্রনিক টেকনোলজি কোম্পানির অধীনে তৈরি হয়েছে রোবট দুইটি। রেস্টুরেন্টটির পরিচালক রাহিন রাইয়ান নবী বলেন, আমরা শিশু-কিশোরদের বিনোদনের বিষয়টি মাথায় রেখেই এই বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছি। তবে, সব বয়সী মানুষের জন্য এই রোবট একটি রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে রোবটের মাধ্যমে খাবার পরিবেশন করা একটা বিশাল মাইলফলক। আমরা দেখেছি, অনেক সময় দেখা যায় ওয়েটাররা কয়েক ঘণ্টা কাজ করার পর ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সেই ক্লান্ত অবস্থায়ই তারা কাস্টমারদের খাবার সরবরাহ করতে বাধ্য হন। কিন্তু রোবট কখনোই ক্লান্ত হবে না। তাই যখন রোবট খাবার সরবরাহ করবে তখন এটি কাস্টমারকে আরও ভালো সেবা দিতে পারবে। ধীরে ধীরে অন্যান্য ক্ষেত্রেও রোবটের ব্যবহার বাড়বে বলে জানান তিনি।

রোহিঙ্গা জাতি নিধনের তুমুল সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের

মিয়ানমারের রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানকে ‘জাতি নিধন’ আখ্যা দিয়ে এর তুমুল সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি মিয়ানমারে সংঘটিত রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানকে- ভয়াবহ নৃশংসতা বলে উল্লেখ করেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করার হুমকিও দিয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন এক বিবৃতিতে বলেছেন, মিয়ানমারের উত্তর রাখাইনের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সেখানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতি নিধনের সপষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গা নিধনে সমপৃক্তদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দরকার হলে নির্দিষ্ট অবরোধ আরোপ করা হবে। ভয়াবহ এই নৃশংসতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গার মানবেতর জীবনের মুখে ঠেলে দেয়ার অপরাধে জড়িতরা সহজে পার পাবেন না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। টিলারসনের এমন বক্তব্য গুরুত্ববহ। কারণ, গত সপ্তাহে মিয়ানমার সফরে তিনি
রোহিঙ্গা সংকটকে জাতি নিধন বলে আখ্যায়িত করেন নি। যুক্তরাষ্ট্রের এমন বিবৃতি রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশটির অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে গত দুবছর ধরে গণতন্ত্র-উত্তর মিয়ানমারের শাসনে থাকা সেনাবাহিনী এবং বেসামরিক নেতাদের জোটের ওপর চাপ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বহুদিন ধরেই সে দেশের সেনাবাহিনী ভয়াবহ নৃশংসতা চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ তুলছে। ২৫শে আগস্টে মিয়ানমারের পুলিশ এবং আর্মি ব্যারাকে আরাকান সালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার পর থেকেই তাদের দমনের নামে এই প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এতে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী এবং উগ্র জনগোষ্ঠী। চলতে থাকে গণহত্যা, গণধর্ষণ, নিপীড়ন। জ্বালিয়ে দেয়া হয় রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি। ভয়াবহতা সহ্য করতে না পেরে ৬ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। রোহিঙ্গাদের ওপর এই সীমাহীন নির্যাতনের তীব্র সমালোচনা করেন টিলারসন। তিনি আরসার হামলার নিন্দা জানান। সেই সঙ্গে বলেন, ওই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে যে ভয়াবহ নৃশংসতা মিয়ানমারের সম্মিলিত বাহিনী এবং উগ্র জনগোষ্ঠী সে দেশের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালিয়েছে, তা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারের নোবেল জয়ী স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচির প্রচণ্ড সমালোচনা করে আসছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। বিশ্বনেতারাও এ ঘটনায় তার ভূমিকার নিন্দা জানিয়ে আসছেন। তবে সে দেশের সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডে যে সুচির খুব একটা নিয়ন্ত্রণ নেই তা উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, যদিও আমরা জানি যে, পরিস্থিতি তার (সুচির) সমপূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই, তবুও মিয়ানমারের নেত্রী হিসেবে তার কাছ থেকে আমাদের চাওয়া আরো বেশি। আমরা আশা করি তিনি এ ঘটনার সমাধানে সত্যিকারের নেতা সুলভ ভূমিকা পালন করবেন।

‘আমি হতবাক’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল তার বিরুদ্ধে হওয়া মানহানি মামলার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন নৌ-মন্ত্রী শাজাহান খানের বিরুদ্ধে বা তার সম্পর্কে কোনো রকম স্ট্যাটাস আমি দেই নাই। আমার নামে কিছু ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে সেখান থেকে এটা দেয়া হতে পারে। আমার যে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে সেখানে আমি বেশ কয়েকবার আমার নাম ও ছবি ব্যবহার করে যেসব ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে তা সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করেছি। সেখানে এও বলেছি যে এসব ভূয়া একাউন্টে প্রকাশিত কোনো কিছুর সঙ্গে আমার কোনোরকম সম্পর্ক নেই। বুধবার এবং গত ২৬শে জুনও এই সতর্কতামূলক স্ট্যাটাস আমার ফেসবুক ও আমার নিজের পরিচালিত একমাত্র ফ্যানপেজটিতে আমি দিয়েছি।
ভেবে অবাক হচ্ছি যে, আমার ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টটা উনাদের চোখে পড়লো আর আমার আসল ফেসবুক ও আমার ফ্যানপেইজ যেখানে সদস্য সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ সেখানে বহুবার ভুয়া অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে লেখা হয়েছে সেটা তাদের চোখে পড়লো না কেন? আরেকটা বিষয় হচ্ছে শাজাহান খানের ঐ সংবাদটা নিয়ে বহু মানুষ সংসদে এবং অনেক নামকরা মানুষ ফেসবুকে আজেবাজে কমেন্ট করেছে ।
এমন কি অনেকে নানা ধরনের অসত্য কমেন্ট করেছে উনার সম্পর্কে। আমার সবচেয়ে অবাক লাগেছে কোন কিছুতে উনার মানহানি হলো না। শুধু আমার ভূয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টটের স্ট্যাটাসে উনার মানহানি হয়ে গেল?
আমি হতবাক! এতো মিথ্যে তথ্যের ভিত্তিতে একজন মন্ত্রীর পক্ষে মানহানির মামলা করা যেতে পারে? দেশে যারা ক্ষমতাবান আছে তারা অন্যদের বিরুদ্ধে কি ভয়ংকর ভাবে আইন ও বিচার বিভাগকে ব্যবহার করার চিন্তা করতে পারেন এই ঘটনা এর একটি বড় প্রমান।
আমি এই মিথ্যা মামলার প্রতিবাদ করছি এবং মন্ত্রী শাজাহান খানকে আহ্বান জানাচ্ছি উনি তো ক্ষমতায় আছেন। উনি রাষ্ট্রের গোয়েন্দা কাজে লাগিয়ে খুঁজে বের করুন যে অ্যাকাউন্ট থেকে স্ট্যাটাসটা দেয়া হয়েছে সেটি আমি দিয়েছি নাকি। যদি আমি দিয়ে থাকি তাহলে আমার বিরুদ্ধে কোটি কোটি মামলা করুন, আমার এতে আপত্তি নেই। আর আমি যদি না দিয়ে থাকি তাহলে আমার বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছে এবং টেলিভিশনে আমার সম্পর্কে শাজাহান খান যেসব কথা বলেছেন আমি আশা করবো সেজন্য উনি দুঃখ প্রকাশ করবেন।

রোহিঙ্গা শব্দ ব্যবহার না করতে বলা হলো পোপকে

পোপ ফ্রান্সিসকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, তিনি যেন মিয়ানমারে অবস্থানের সময় রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার না করেন। ইয়াঙ্গুনের আর্চবিশপ পোপকে এ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটা এড়ানোই উত্তম হবে। মিয়ানামারে উত্তেজনা না ছড়ানোর জন্য পোপকে এমন পরামর্শ দিয়েছেন আর্চবিশপ। ভ্যাটিকানের মুখপাত্র গ্রেগ বার্ক গতকাল গণমাধ্যমকে জানান, পোপের সফর সূচীতে শেষ মুহুর্তে নতুন দুটি সাক্ষাত যোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইয়াঙ্গুনে বিশপের বাসভবনে পোপ মিয়ানমার সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হলেইং এর সঙ্গে দেখা করবেন।
আর ঢাকায় আন্ত-ধর্মীয় এক সভায় সাক্ষাত করবেন একদল রোহিঙ্গার সঙ্গে।
আগামী সপ্তাহে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফরে আসছেন পোপ ফ্রান্সিস। মিয়ানমারে অবস্থানকালীন পোপ যেন রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার না করেন তেমন পরামর্শের কথা গণমাধ্যমকে জানান মি. বার্ক। পোপ ফ্রান্সিস তার সফরে আসলেই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করবেন কিনা তা নিয়ে মন্তব্য করতে চান নি ভ্যাটিকান মুখপাত্র। তবে, বুধবারের প্রেস ব্রিফিংয়ে মি. বার্ক বলেছিলেন, এটা নিষিদ্ধ কোন শব্দ নয়।
পোপ ফ্রান্সিস এর আগে বেশ কয়েকবার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নিপিড়নের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাদের পূর্ণ অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের দূর্দশার কথা বলতে গিয়ে তিনি তাদের সম্বোধন করেছেন, ‘আমাদের রোহিঙ্গা ভাই’ বলে।
উল্লেখ্য, আগস্ট মাস থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারে সামরিক অভিযানে নিপিড়নের শিকার হয়ে ৬ লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। আজ ন্যাপিড’তে দু’দেশের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভ্যাটিকান মুখপাত্র বার্ক বলেন, দু’দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে সফর করতে যাচ্ছেন পোপ ফ্রান্সিস।

ডাক্তাররা বেশ প্রভাবশালী ও তদবিরে পাকা: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

ডাক্তাররা বেশ প্রভাবশালী ও তদবিরে পাকা বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জাহেদ মালেক স্বপন। আজ সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার না থাকা নিয়ে একাধিক সংসদ সদস্যদের ক্ষোভের জবাব দিতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
প্রশ্নোত্তর পর্বের এক পর্যায়ে ওয়ার্কার্স পার্টির সংসদ সদস্য মো. ইয়াসিন আলীর প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ডাক্তাররা প্রভাবশালী বলে তদবির করে বদলি হয়ে যায়। অনেকে তদবির করে উচ্চতর ডিগ্রী ও প্রশিক্ষণে চলে যায়। তিনি আরো বলেন, দেশে ডাক্তারের স্বল্পতা রয়েছে। যে কারণে অনেক হাসপাতালেই চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত ডাক্তার দেওয়া সম্ভব হয় না।
তবে যদি কোন হাসপাতালে বিশেষ কোন ডাক্তারের অভাব থাকে তাহলে অন্য হাসপাতাল থেকে নিয়ে হয়তো পূরণ করা যাবে।
আওয়ামী লীগের সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের ক্যান্সার চিকিৎসা আরো আধুনিকায়ণ ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকারের ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতি বছরই ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বৃদ্ধি ও দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ চিকিৎসক গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ক্যান্সার রোগীদের ওষুধ (কেমোথেরাপী) সহজলভ্য করা হয়েছে। প্রায় সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিনামূল্যে বা স্বল্প মূল্যে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। ক্যান্সার রোগ চিকিৎসার পরিধি বৃদ্ধি, সহজলভ্য ও মানোন্নয়নে সরকার ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
প্রতিমন্ত্রী আরো জানান, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকে এ সরকারের আমলেই ২০০৯ সালে ৫০ শয্যা থেকে ১৫০ শয্যায় এবং ২০১৫ সালে ১৫০ শয্যা থেকে ৩শ’ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যান্সার ইউনিটের শয্যা সংখ্যাও বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিনামূল্যে ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধ (কেমোথেরাপী) রোগীদের প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে বিশেষ অনুদান দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য অত্যাধুনিক রেডিওথেরাপী চিকিৎসার আধুনিক নতুন মেশিন ইতোমধ্যেই সংযোজন করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন হাসপাতালে মহিলাদের জরায়ুমুখ ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য কয়েকটি ব্রাকিথেরাপী মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসমূহে পর্যায়ক্রমে পুরাতন রেডিওথেরাপী মেশিন (কোবাল্ড-৬০)-এর স্থলে নতুন মেশিন প্রতিস্থাপনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। স্বতন্ত্র সদস্য মো. আব্দুল মতিনের অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ট্যানারীর বিষাক্ত বর্জ্য দিয়ে তৈরি পোল্ট্রি এবং ফিস ফিড দেশে ক্যান্সারসহ অনেক জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে জনগণকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।