Sunday, August 23, 2015

বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যুর ঘটনা আইন সম্মতভাবেই হচ্ছে : আইজিপি

বন্দুকযুদ্ধে যেসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে তা আইন সম্মতভাবেই হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক। তিনি বলেছেন, অত্মরক্ষার অধিকার পুলিশের আছে। পুলিশ যখন আক্রান্ত হয়, তখন আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়।
আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর মিরপুর পুলিশ স্টাফ কলেজে ‘ইন্টিলিজেন্স এনালাইসিস ফর টাইগার রেঞ্জ কান্ট্রি’ বিষয়ক এক প্রশিক্ষণ কোর্সে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সাথে এ কথা বলেন তিনি।
দেশে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে দাবি করে আইজিপি বলেন, আমরা ব্যাপক কর্মসূচি নিয়েছি। যেখানে সন্ত্রাসী পাওয়া যাবে, যেখানে আইন অমান্য হবে, সেখানেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের কারণে আমাদের নানা রকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। সে যে দলেরই হোক, যত প্রভাবশালীই হোক তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়। ব্যবস্থা নিতে গিয়ে যদি পুলিশ হুমকির মুখে পড়ে, পুলিশের জীবননাশের আশঙ্কা থাকে সেখানে অনেক সময় গানফাইটের (বন্দুকযুদ্ধ) ঘটনা ঘটে। গানফাইটে যদি কারো মৃত্যু হয় সেটিও আইনের প্রক্রিয়ার মধ্যে আমাদের ইনক্যুয়ারি ফেস করতে হয়, জবাবদিহিতা করতে হয়। দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের সব রকম প্রচেষ্টা অব্যহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শহীদুল হক বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিমাসেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে।
ব্লগার হত্যায় নেপথ্যের শক্তি বা গডফাদারেরা ধরা পড়ছে না কেন? সাংবাদিকরা জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষ ব্লগার হত্যার সাথে জড়িত অনেককে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে। পুলিশও অনেককে আটক করেছে। ব্লগার হত্যাকারীদের খোঁজে পুলিশ কাজ করছে। একদিন না একদিন তারা অবশ্যই ধরা পড়বে।
পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর ফাতেমা বেগমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ইন্টারপোলের ক্রিমিনাল ইন্টেলিজেন্স এনালিস্ট দারিয়ো গালাসো (Dario Galasso)। স্বাগত বক্তব্য রাখেন এমডিএস (প্রশিক্ষণ) গোলাম রসুল। ইন্টারপোলের সহায়তায় কোর্সটিতে বাংলাদেশ, ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, নেপাল, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এ নয়টি দেশের ২০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশগ্রহণ করছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাগণ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কে এম শহীদুল হক বলেন, সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার আমাদের জাতীয় পশু। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুন্দরবনের বাঘ ও অন্যান্য বন্য প্রাণী রক্ষায় বাংলাদেশ পুলিশ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে সুন্দরবনে বাঘ শিকারী, বনদস্যু ও ডাকাতদের সাথে পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে ৭১ জন নিহত হয়েছে। পুলিশ ২২৩ জনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের কাছ থেকে বাঘের চামড়া ও হাড়সহ বিপুল পরিমান অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৮৭টি।
বাঘ রক্ষায় সরকারের আন্তরিক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, আমরা বন্য প্রাণী সংরক্ষণে ২০১২ সালে ‘বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ এবং নিরপত্তা) আইন’ প্রণয়ন করেছি। তিনি এ ধরনের একটি সময়োপয়োগী কোর্সের আয়োজন করায় ইন্টারপোল, টাইগার রেঞ্জ দেশসমূহের সরকার এবং পুলিশ স্টাফ কলেজ কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।
দারিয়ো গালাসো বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এখন একটি সংঘবদ্ধ এবং আন্তঃদেশীয় কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। টাইগার রেঞ্জ দেশগুলোর মধ্যে কার্যকরভাবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা বাঘ রক্ষায় অবদান রাখতে আরো বেশি সক্ষম হবো। পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর ফাতেমা বেগম এ ধরনের কোর্স আয়োজন এবং বাংলাদেশকে ভেন্যু হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্য ইন্টারপোল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান। তিনি টাইগার রেঞ্জ দেশগুলো থেকে প্রতিনিধি প্রেরণের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
দুই সপ্তাহব্যাপী ওই প্রশিক্ষণ কোর্সে ১০টি দেশের ২০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণে অংশ নেয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ, ভুটান, কম্বোডিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, নেপাল, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম।
প্রশিক্ষণ কোর্সে বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী পাচার রোধ, বাঘ সংরক্ষণ সংক্রান্ত উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ইত্যাদি বিষয়েও আলোচনা করা হয়।

‘বৈষম্য নিরসনকারী প্রবৃদ্ধি কৌশল’ নয় কেন? by মইনুল ইসলাম

৪ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করার পর গত ২৪ দিনে পত্রপত্রিকায় বাজেটের ওপর নানা ধরনের সমীক্ষা ও মূল্যায়ন উপস্থাপিত হয়ে চলেছে। বাজেটের সমালোচনার মূল সুরটাই হলো এটা বাস্তবায়ন-অযোগ্য রকমের উচ্চাভিলাষী বাজেট, যার রাজস্ব-টার্গেট এবং ঘাটতি-অর্থায়ন টার্গেট দুটোই অর্জনের যৌক্তিক ভিত্তি নেই। এগুলো যেহেতু প্রাক্কলন, তাই বছরের শেষে শতভাগ ঘোষিত লক্ষ্য পূরণের তেমন দায় থাকে না অর্থমন্ত্রীর কিংবা সরকারি রাজস্ব-আহরণকারী বিভাগগুলোর, আর সেটারই সুযোগ নিয়ে বাজেট বক্তৃতায় অতি উচ্চাভিলাষী টার্গেট ঘোষণার অভ্যাসটা ছাড়েন না আমাদের অর্থমন্ত্রীরা। আলোচনার খোরাক জোগায় এ ধরনের বাগাড়ম্বরপূর্ণ বাজেট বক্তৃতা। এখনকার সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি যেহেতু সরকারের অংশীদার, সেহেতু এবারের বাজেট অধিবেশন অতিশয় নিষ্প্রাণ হচ্ছে। আজকের কলামে আমি বাজেটের ব্যয়-বরাদ্দ, ঘাটতি অর্থায়ন বা রাজস্বের উৎসের খঁুটিনাটি নিয়ে আলোচনা করব না, বাজেটের মাধ্যমে প্রতিফলিত ক্ষমতাসীন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের মূল গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করব।
বাংলাদেশ বেশ কয়েক বছর ধরে ৬ শতাংশের বেশি হারে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ বছর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ৮ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হলেও তা অর্জিত হয়নি, এমনকি ৭ শতাংশেও পৌঁছানো যায়নি। বিএনপি এটাকে সরকারের ব্যর্থতা বলে গলাবাজি করলেও এ জন্য তাদের কৃতিত্বটাও (?) কম নয়। ২০১৩ সালে ও ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসে বিএনপি-জামায়াতের যে প্রাণঘাতী তাণ্ডব পুরো দেশকে একটি ভয়ংকর পরিস্থিতিতে নিক্ষেপ করেছিল, তার মূল শিকার ছিল সাধারণ জনমানুষের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি। সরকারকে তারা হটাতে ব্যর্থ হলেও অর্থনীতিতে গতিসঞ্চারের পথে ওই জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর ও অবরোধ-হরতালের অভূতপূর্ব সন্ত্রাসী তাণ্ডব নিঃসন্দেহে বড়সড় বাধা সৃষ্টি করেছে। এতত্সত্ত্বেও দেশে যে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, তাকে মোটেও খাটো করে দেখা যাবে না। তবে যে কথাটি জোর দিয়ে বলা প্রয়োজন তাহলো দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের তাণ্ডব যদি কমানো যেত তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমপক্ষে আরও ১ শতাংশ বেশি হতো। ২০০৯ সালে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগটা অনায়াসে করা যায় তাহলো দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠন কমানোর ব্যাপারে তাঁদের কোনো সদিচ্ছা কিংবা কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তাঁকে কেনা যায় না।’ কিন্তু তাঁর দলের মন্ত্রী, সাংসদ, অন্যান্য নেতা-কর্মী বা তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত আমলা ও ঠিকাদার-ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের দায়ও তিনি এড়াতে পারেন না। অতএব, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে তাঁকেই।
কিন্তু আজকের কলামে আমি আলোকপাত করতে চাই দেশে আয়বৈষম্য নিরসনের বিষয়টা যথাযোগ্য গুরুত্বের সঙ্গে বাজেটে উপস্থাপিত না হওয়ার ওপর। বিশ্বব্যাংকের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উন্নয়ন-দর্শন ঘোষিত হয়েছিল ‘দরিদ্রবান্ধব প্রবৃদ্ধি কৌশল’ অবলম্বনে। ওই পরিকল্পনা প্রণয়নে দিকনির্দেশনা প্রদানের জন্য গঠিত ‘প্যানেল অব ইকোনমিস্টস’-এর অন্যতম সদস্য ছিলাম আমি। আমার অবস্থান ছিল, ওই কৌশল ফাঁকিবাজির নামান্তর, ওতে হবে না। সরাসরি বৈষম্য নিরসনকে উন্নয়নের দর্শন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, কারণ ১৯৭৫ সাল থেকে এ দেশের সরকারগুলো ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির’ ডামাডোলে শরিক হয়ে ব্যক্তি খাত ও বাজারীকরণকে আঁকড়ে ধরার ফলে এ দেশে আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য বেড়ে বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে গেছে। ওয়াকিবহাল মহলের অজানা থাকার কথা নয় যে হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিসার সার্ভে বা খানা আয় ও ব্যয় জরিপ মোতাবেক এ দেশের আয়বৈষম্য পরিমাপক গিনি সহগ (কো–ইফিশিয়েন্ট) ২০০৫ সালে ০.৪৬৭ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল, এবং ২০১০ সালের একই জরিপে ওই সহগ ০.৪৬৫-এ রয়ে গেছে। তার মানে, ওই পাঁচ বছরে আয়বৈষম্য আর না বাড়লেও কমানো যায়নি। কোনো দেশের গিনি সহগ ০.৫ অতিক্রম করলে ওই দেশকে ‘উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আমরা তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।
১৯৭০ সালের পাকিস্তানে ২২টি কোটিপতি পরিবারের কথা বলা হতো, যারা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের শিল্প-বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ওই ২২ পরিবারের মধ্যে দুটো পরিবার ছিল পূর্ব পাকিস্তানের, তা-ও একটি অবাঙালি। এই বাংলাদেশেই ২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মোতাবেক ২৩,২১২ জন কোটিপতি ছিল। ২০১৪ সালে ওই সংখ্যা ৫০ হাজার অতিক্রম করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোটিপতির এ ধরনের নাটকীয় প্রবৃদ্ধির হারকে কৃতিত্বপূর্ণ সাফল্য মনে করতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যে এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়ে পুঞ্জীভূত হয়ে যাওয়ার বিপৎসংকেত পাওয়া যাচ্ছে, সে ব্যাপারে ক্ষমতাসীন সরকারের কি কোনো করণীয় নেই?
জনগণের কাছে বোধগম্য যেসব বিষয় এই বিপদটার জানান দিচ্ছে সেগুলো হলো: ১. ব্যাংকের ঋণ সমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশে কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে এবং ঋণখেলাপি বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে; ২. দেশের জায়গা-জমি, অ্যাপার্টমেন্ট, প্লট, ফ্ল্যাট, মানে রিয়াল এস্টেটের দাম প্রচণ্ডভাবে বেড়েছে; ৩. বিদেশে পঁুজি পাচার ব্যাপক হারে বাড়ছে; ৪. দেশে গাড়ি, বিশেষত বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে; ৫. বিদেশে বাড়িঘর কেনা ও ব্যবসা–বাণিজ্য করার হিড়িক পড়েছে; ৬. ধনাঢ্য পরিবারগুলোর বিদেশ ভ্রমণ বাড়ছে; ৭. উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের বিদেশে পড়তে যাওয়ার খায়েশ বাড়ছে; ৮. উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য ঘন ঘন বিদেশে যাওয়ার অভ্যাস বাড়ছে; ৯. প্রাইভেট হাসপাতাল ও বিলাসবহুল ক্লিনিক দ্রুত বাড়ছে; ১০. প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার হিড়িক পড়েছে; এবং ১১. প্রধানত প্রাইভেট কারের কারণে সৃষ্ট ঢাকা ও চট্টগ্রামের ট্রাফিক জ্যাম নাগরিক জীবনকে বিপর্যস্ত করছে।
বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে একটি ‘গণপ্রজাতন্ত্র’, এবং ২০১০ সালের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রসহ রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অতএব, ২০১০-১৫ মেয়াদের জন্য প্রণীত ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আমি বৈষম্য নিরসনকে উন্নয়ন কৌশলের প্রধান ফোকাস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানিয়েছিলাম আমি। ‘প্যানেল অব ইকোনমিস্ট’-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদসহ প্রায় সব সদস্য আমাকে সমর্থন দিলেন। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, প্যানেলের আর কোনো সভা না ডেকেই পরিকল্পনার খসড়া মন্ত্রিসভায় পেশ করে পাস করে ফেলা হলো। ওখানে ‘দরিদ্রবান্ধব প্রবৃদ্ধি’ কৌশল ঠিকই বহাল রয়ে গেল। (যেটা খুবই অবাক কাণ্ড তাহলো, পরিকল্পনা দলিলের একটা কপি পর্যন্ত আমাকে পৌঁছানোর সৌজন্যটুকুও দেখানো হলো না)। অবশ্য, এ দেশের নীতিপ্রণেতারা আদতে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় পরিকল্পনা অনুসরণের রেওয়াজ কখনো মেনে চলেন না।
কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী যখন দাবি করলেন যে বর্তমান সরকার আয়বৈষম্যকে আর বাড়তে দেয়নি তখন ইস্যুটাকে আবার ফোকাসে নিয়ে আসা সমীচীন মনে করেছি আমি: বৈষম্য নিরসনকারী প্রবৃদ্ধিকেই এ দেশের উন্নয়নের মূল দর্শন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, এবং প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় এবং বাজেটে সুস্পষ্ট নীতি ও কর্ম-কৌশল ঘোষণা করতে হবে প্রতিবছর গিনি সহগকে কতখানি কমিয়ে আনা হবে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও চিলি এখন এ পথেই এগোচ্ছে। সাধারণ পাঠকেরা যেহেতু গিনি সহগের ব্যাপারটা ভালো বুঝবেন না, তাই তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, সরকারকে ওই সব দেশে আয় পুনর্বণ্টনের মূল এজেন্টের ভূমিকা পালনে এখন বাধ্য করা হচ্ছে। ২০১৪ সালে ব্রাজিল ফুটবল বিশ্বকাপ চলার সময় ব্রাজিলের বিভিন্ন বড় বড় শহরে লাখ লাখ মানুষের বিক্ষোভ মিছিল প্রশমিত করার জন্য সে দেশের সরকারকে ঘোষণা দিতে হয়েছিল, পেট্রোলিয়াম রপ্তানি থেকে অর্জিত সমুদয় আয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হবে। কারণ, বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য খাতের বাজারীকরণ হলো আয়বৈষম্য বৃদ্ধির সবচেয়ে ক্ষতিকর ব্যবস্থা। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের পর এই দুটো ব্যবস্থাকেই এগিয়ে নিয়ে গেছে সরকারগুলো। তৃতীয় ডাইমেনশনটি হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং চতুর্থটি হলো সরকারি রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থা। এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয়কে জিডিপির ২ শতাংশেরও নিচে নামানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। স্বাস্থ্য খাতের সরকারি ব্যয়ও জিডিপির শতাংশ হিসাবে কমে যাবে। আর এ দেশের দারিদ্র্য সৃষ্টির সবচেয়ে বড় যে কারখানা সে কৃষি খাতেও সরকারি ব্যয় বরাদ্দ কমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী ব্যস্ত মানুষ। জানি না, তাঁর সময় হয়েছে কি না, সম্প্রতি বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ফরাসি অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটির বেস্ট সেলার ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি–ফার্স্ট সেঞ্চুরি বইটি পড়ার। ওই বইয়ে যে হাইপোথিসিসটি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে তাহলো, রাষ্ট্র যদি অত্যন্ত কঠোরভাবে আয় ও সম্পদ পুনর্বণ্টনকারীর ভূমিকা পালন না করে তাহলে উন্নত-অনুন্নতনির্বিশেষে বিশ্বের সব দেশে আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য বাড়তে বাড়তে অতি দ্রুত বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে যাবে। সাইমন কুজনেৎস যে একপর্যায়ে উন্নত দেশগুলোতে বৈষম্য আর বাড়বে না বলে তত্ত্ব দিয়েছিলেন, সেটাকে পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে পিকেটির বইয়ে। তিনি মনে করেন, অত্যন্ত প্রগতিশীল আয়কর ব্যবস্থা, সম্পত্তি কর ব্যবস্থা এবং বিশ্বব্যাপী পুঁজির ওপর ‘গ্লোবাল ট্যাক্স’ বসানোর মাধ্যমে এই আসন্ন মহাবিপদকে ঠেকানোর প্রয়োজনকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। পিকেটি অবশ্য ইউরোপীয় কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোকে এ ব্যাপারে তাঁর আদর্শ মনে করেন। টমাস পিকেটি তাঁর বইয়ে কার্ল মার্ক্সের কঠোর সমালোচনা করেছেন, কিন্তু তৎসত্ত্বেও বৈষম্য নিরসনকারী প্রবৃদ্ধি কৌশল অবলম্বনের জন্য তাঁর আকুতি ফুটে উঠেছে বইয়ের উপসংহারে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে ‘বৈষম্য নিরসনকারী প্রবৃদ্ধি কৌশল’ কেন আমরা গ্রহণযোগ্য মনে করছি না, তার ব্যাখ্যা কী?
মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মালয়েশিয়ায় নতুন গণকবর থেকে ২৪ লাশ উদ্ধার

থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী মালয়েশিয়ার জঙ্গলে আবারো গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। মালয়েশিয়ান পুলিশ এই গণকবর থেকে ২৪টি লাশ উদ্ধার করেছে। পুলিশ ধারণা করছে, এসব লোক আদমব্যাপারিদের শিকার হয়েছে।
এর আগে গত এপ্রিলে গহীন জঙ্গলের বিভিন্ন কবর থেকে ১৩৯টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপির খবরে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ডের সঙ্গে মালয়েশিয়ান সীমান্তের বাকিত ওয়াং বার্মা এলাকায় এই গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই এলাকার কাছেই গত মে মাসে গণকবর পাওয়া গেছে, যেখান থেকে কয়েক শ' লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এখানে মানবপাচারকারীদের অবৈধ নির্যাতন শিবিরেরও সন্ধান পাওয়া গেছে।
পাচারের জন্য বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের নৌকা করে এনে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া সীমান্তের ঘন জঙ্গল এলাকায় আটকে রাখত পাচারকারীরা। পাচারকারীদের কাছ থেকে পালিয়ে আসাদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, এখানে অভিবাসীদের আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা হতো।
মালয়েশিয়ার পারলিস পুলিশপ্রধান জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার শাফি ইসমাইল বলেন, গণকবর থেকে ২৪টি লাশ উত্তোলনের পর ময়নাতদন্তের জন্য সুলতানাহ বাহিয়াহ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, গণকবরে উদ্ধার হওয়া লাশগুলো অবৈধ অভিবাসীদের। তবে লাশগুলো মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক না কি বাংলাদেশিদের তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত মে মাসে থাইল্যান্ড সরকার অভিযান চালানোর পর হাজার হাজার অভিবাসীকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রে নৌকায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায় মানবপাচারকারীরা। এতে আঞ্চলিক মানবিক সংকট দেখা দেয়। স্থানীয় জেলেরা এদের অনেককে উদ্ধার করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া উপকূলে পৌঁছে দেয়।

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার দুই আবেদন খারিজ

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার করা দুটি আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত।
নিম্ন আদালত থেকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলার নথি তলব এবং ২০০৮ সালে দুদকের দেয়া অব্যাহতিপত্র তলব করতে খালেদা জিয়া পৃথক দুটি আবেদন করেন।
হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান ও বিচারপতি আবদুর রবের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ আজ রোববার এ আদেশ দেন। ১৯ আগস্ট এ বেঞ্চে আবেদন দুটির উপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
আদালতে খালেদা জিয়ার আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন ভূঁইয়া। দুদকের পক্ষে ছিলেন খুরশীদ আলম খান।
একই আদালতে মামলাটি বাতিল সংক্রান্ত বিষয়ে প্রায় সাত বছর আগে জারি করা রুলের ওপর শুনানি চলছে। খালেদা জিয়া মামলাটি বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন ২০০৮ সালে।
খালেদা জিয়ার পক্ষে মঙ্গলবার আবেদন দু’টি করেন ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন।
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি উত্তোলন, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম এবং রাষ্ট্রের ১৫৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা ক্ষতি ও আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ থানায় মামলাটি দায়ের করে দুদক।
মামলায় একই বছরের ৫ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক। এরপর মামলাটি বাতিল চেয়ে ওই বছরই হাইকোর্টে আবেদন করেন খালেদা জিয়া। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেন। একই সাথে মামলাটি কেন বাতিল করা হবে না এর কারণ জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।
ওই রুলের ওপর বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান ও বিচারপতি আবদুর রবের হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানি চলছে। এ অবস্থায় মামলার নথি তলব চেয়ে আবেদন করা হয়।
মামলায় খালেদা জিয়া ছাড়াও অপরাপর আসামিরা হলেন— সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান (মৃত), সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁইয়া (মৃত), সাবেক শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক সমাজ কল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, এম কে আনোয়ার, এম শামসুল ইসলাম (মৃত), আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ব্যারিস্টার আমিনুল হক, এ কে এম মোশাররফ হোসেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব নজরুল ইসলাম, পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান এস আর ওসমানী, সাবেক পরিচালক মঈনুল আহসান, বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম ও খনির কাজ পাওয়া কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট হোসাফ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন।

অবশেষে পদত্যাগের ঘোষণা লতিফ সিদ্দিকীর

লতিফ সিদ্দিকী আজ রোববার সকালে রাজধানীর
আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনে শুনানি শেষে
বেরিয়ে আসছেন। ছবি: সাজিদ হোসেন
সংসদ সদস্যপদ রক্ষার জন্য আর আইনি লড়াই করবেন না সাংসদ ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। নিজেই সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এ জন্য স্পিকারের কাছে পদত্যাগ পত্র জমা দেবেন।
আজ রোববার সকালে তাঁর সংসদ সদস্যপদ বাতিল করা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) শুনানি শেষে লতিফ সিদ্দিকী সাংবাদিকদের কাছে এ কথা বলেন। এর আগে নির্বাচন কমিশনে শুনানি স্থগিত চেয়ে লতিফ সিদ্দিকীর করা আবেদন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ খারিজ করে দেন। সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে নির্বাচন কমিশনে যেতে বলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সকাল ১১টার দিকে ইসির শুনানিতে হাজির হন তিনি।
শুনানি শুরু হলে লতিফ সিদ্দিকী নির্বাচন কমিশনকে বলেন, তিনি নিজেই পদত্যাগ করবেন। তাই শুনানির আর প্রয়োজন নেই। এরপর নির্বাচন কমিশন দুই সপ্তাহের জন্য এ বিষয়ের সকল কার্যক্রম স্থগিত করেন।
ইসি থেকে বেরিয়ে লতিফ সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, ‘যেহেতু আমার নেত্রী চান না আমি সংসদে থাকি তাই আমি নিজেই পদত্যাগ করব। এ নিয়ে আর শুনানির প্রয়োজন নেই বলে আমি কমিশনকে বলে এসেছি।’ হজ ও তাবলিগ জামাত নিয়ে তাঁর মন্তব্য খণ্ডিত ভাবে এসেছে বলেও দাবি করেন আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত লতিফ সিদ্দিকী।
দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কারের পর লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের জন্য আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন কমিশনের চিঠি দেওয়া হয়। এ জন্যই বিষয়টি নিয়ে শুনানির জন্য ইসিতে আজ তাঁকে ডাকা হয়। দলের পক্ষ থেকে শুনানিতে অংশ নিতে সেখানে আসেন দলের দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ। শুনানিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদসহ পাঁচ কমিশনারই উপস্থিত ছিলেন।
ইসির এই শুনানির এখতিয়ার চ্যালেঞ্জ করে লতিফ সিদ্দিকী রিট করলে গত বৃহস্পতিবার তা খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। পরে ওই দিনই লতিফ সিদ্দিকী হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল নিয়ে চেম্বার আদালতে যান। চেম্বার আদালত আজ শুনানি শেষে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে এক অনুষ্ঠানে হজ ও তাবলীগ জামায়াত নিয়ে কটূক্তি করায় লতিফ সিদ্দিকীর মন্ত্রিত্ব যায়। একই সঙ্গে নিজ দল আওয়ামী লীগ থেকে তিনি বহিষ্কৃত হন। দল থেকে বহিষ্কারের পর লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা মীমাংসার জন্য গত ১৩ জুলাই প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।

তৃতীয় পক্ষ টানলে কোনো আলোচনা হবে না : সুষমা

সন্ত্রাসবাদ এজেন্ডা থেকে সরে গেলে কোনো আলোচনা হবে না বলে পাকিস্তানকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ভারত। পাক-ভারত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠকে কোনো তৃতীয় পক্ষ সহ্য করা হবে না। নো কাশ্মীর, নো হুরিয়াত। এ শর্তে রাজি হলে ইসলামাবাদকে নয়াদিল্লি সফরের আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। ইসলামাবাদে সাংবাদিক সম্মেলনে পাক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সরতাজ আজিজ জানান,
আগাম কোনো শর্ত ছাড়াই দিল্লিতে এনএসএ পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে প্রস্তুত তিনি। কিন্তু সঙ্গে এটাও ইঙ্গিত দিলেন, কাশ্মীর ছাড়া দু’দেশের মধ্যে আলোচনা কখনোই সম্ভব না। সরতাজকে এদিন প্রথমেই প্রশ্ন করা হয়, বৈঠক বাতিল হচ্ছে কি-না, উত্তরে কৌশলী সরতাজ বল ঠেললেন ভারতের কোটেই। বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই বৈঠক বাতিল ঘোষণা করেনি। আমিও খোলা মনে বিনা শর্তেই দিল্লি যাচ্ছি। এবার ভারতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ দিল্লি গেলেই যে তার সঙ্গে হুরিয়াত নেতাদের কথা হয়, তা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘হুরিয়াতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। যেভাবে হুরিয়াত নেতাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, তা ঠিক নয়।’ বিকালে সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের দাবি উড়িয়ে দিয়ে সুষমা স্বরাজ জানিয়ে দিলেন, আলোচ্যসূচিতে নতুন কিছু যোগ হওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, ‘উফায় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীরা আলোচনা করে বৈঠকের সূচি ঠিক করেছেন। তাতে সায় দিয়েছে দুই দেশই এবং এ সূচি অনুযায়ী কোথাও কাশ্মীর প্রসঙ্গ নেই। শুধু সন্ত্রাসবাদ নিয়েই আলোচনা হওয়ার কথা। এ কথা মাথায় রেখেই যেন আলোচনায় আসেন সরতাজ আজিজ।’ কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা শুধু পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক হওয়া সম্ভব বলে জানিয়ে সুষমার দাবি, ‘সিমলা চুক্তি অনুযায়ী কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা শুধু দুই দেশের মধ্যেই হবে। এর মধ্যে তৃতীয় কোনো পক্ষ থাকবে না। হুরিয়াত কখনোই তাই তৃতীয় পক্ষ হতে পারে না।’ ভারত যে কোনোভাবেই এনএসএ পর্যায়ের বৈঠক বাতিল করতে চায় না, তা জানিয়ে সুষমা বলেন, ‘উফার বৈঠকের পর ৯১ বার সংঘর্ষবিরতি চুক্তি লংঘন করেছে পাকিস্তান। এর পর ঘটেছে উধমপুর, গুরদাসপুরের মতো সন্ত্রাসবাদী হামলা। যাতে সরাসরি পাকিস্তানের যোগ প্রমাণিত হয়েছে। এত কিছুর পরও ভারত বৈঠক বাতিল করেনি।’ ইসলামাবাদকে ভারত কড়া বার্তা দিলেও এখনও কিন্তু স্পষ্ট হল না বৈঠক আদৌ হবে কি-না। কাশ্মীর প্রসঙ্গ রাখার শর্তে পাকিস্তান অনড় থাকলে হয়তো বাতিলই হবে এ বৈঠক। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে,
রোববার ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠকের আগে বিচ্ছিন্নতাবাদী হুরিয়াত প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করা সরতাজ আজিজের পক্ষে যথাযথ হবে না। গত বছর একই ধরনের একটি বৈঠক হওয়ার ঘটনায় যুদ্ধ করতে পাকিস্তানের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক বাতিল করেছিল। এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার টানাপোড়েন সম্পর্কে আরও খানিকটা ভাটা পড়ে। সরতাজ আজিজ আজ সকালে ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় মিডিয়ার বিরুদ্ধে বিনা কারণে বিতর্ক সৃষ্টির অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার পক্ষ থেকে আমি এখনও এনএসএ আলোচনার জন্য বিনা শর্তে দিল্লি যেতে প্রস্তুত আছি।’ ভারত রোববারের বৈঠক ‘কার্যত বাতিল করেছে’ উল্লেখ করে বলেন, ‘সব সময়ের মতো ভারত তার মিডিয়ার মাধ্যমে তার কূটনীতির একটি দিক পরিচালনা করছে।’ শুক্রবার ভারত পাকিস্তানকে বিরল এ নিরাপত্তা বৈঠকের প্রাক্কালে কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক না করার আহ্বান জানায়। এতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের শনিবার শেষ বেলা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করার কথা রয়েছে। পাক-ভারত নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের আলোচনা সিমলা চুক্তি অনুযায়ী কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা শুধু দুই দেশের মধ্যেই হবে। এর মধ্যে তৃতীয় কোনো পক্ষ থাকবে না। হুরিয়াত কখনোই তাই তৃতীয় পক্ষ হতে পারে না

যুদ্ধাবস্থা ঠেকাতে দুই কোরিয়ার বৈঠক

সীমান্তে সৃষ্ট উত্তেজনা কমাতে শনিবার সন্ধ্যায় বৈঠক করেছে দক্ষিণ ও উত্তর কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্সিয়াল কার্যালয় থেকে এ কথা জানানো হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, কোরীয় সীমান্তের পানমুনজম ট্রুস গ্রামে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচিওনে স্থানীয় সময় বিকাল ৩ টা ৫২ মিনিটে রকেট হামলা চালায় উত্তর কোরিয়া। এর জবাবে বেশ কয়েকটি ১৫৫এমএম গোলাবর্ষণ করে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী।
এ ঘটনার পরপরই সীমান্ত অঞ্চল থেকে লোকজনকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয় দক্ষিণ কোরিয়া। বিষয়টি নিয়ে সীমান্ত অঞ্চলে লাউড স্পিকারের মাধ্যমে প্রচারণা অব্যাহত রাখে দেশটি। উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে এ প্রচারনা বন্ধে শনিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত ডেডলাইন দেয়া হয়। একই সঙ্গে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং-উন শুক্রবার সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। ওদিকে দক্ষিণ কোরিয়াও সীমান্ত সংলগ্ন স্থানে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক অবস্থানে রয়েছে। এ অবস্থায় দুই কোরিয়াকে সংঘর্ষ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন।

মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রথম নারী গ্রাজুয়েট

মার্কিন সেনাবাহিনীর চৌকস রেঞ্জার স্কুল থেকে কঠিন প্রশিক্ষণ শেষে প্রথমবারের মতো গ্রাজুয়েট হচ্ছেন দুই নারী। তারা বৃহস্পতিবার বলেছেন, তারা আশা করেন, তাদের সফলতায় সম্মুখ সমরে নারীদের চাকরির দরজা উন্মুক্ত হবে। লেফটেন্যান্ট শ্যায়ে হ্যাভার ও ক্যাপ্টেন ক্রিস্টেন গ্রিস্ট শুক্রবার রেঞ্জার স্কুল থেকে øাতক হয়ে বের হলেন। তারা প্রথম নারী কমবেট নেতা হিসেবে তাদের ইউনিফরমে প্রবল ইপ্সিত ট্যাগ সংযুক্ত করেন। মার্কিন সেনাবাহিনী বর্তমানে কিছু সম্মুখ পদাতিক বাহিনী ও বিশেষ বাহিনীসহ বেশকিছু সেনা ইউনিটে নারীদের ভূমিকা উন্মুক্ত রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এসেছে। দুই তরুণ কর্মকর্তা কয়েক মাস প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো সংবাদমাধ্যমকে বলেন,
তারা আশা করেন, তাদের উদাহরণ নারীদের এ অবস্থানে আসার ব্যাপারে প্রভাবিত করবে। গ্রিস্ট (২৬) বলেন, আমার আশা যে, সামরিক বাহিনীতে নারীদের কাছ থেকে যা প্রত্যাশা করা হয় সে ব্যাপারটি অবগত করতে আমরা সমর্থ হয়েছি। তিনি বলেন, একইভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে সমস্যার সমাধানে আমরা সমর্থ হব পুরুষদের মতোই। রেঞ্জার স্কুলে কমপক্ষে ৬১ দিনের প্রশিক্ষণ হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের মেয়াদ বাড়ানো হয়। গ্রিস্ট ৪ মাস দৈনিক ৪ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তিনি ৯০ পাউন্ড (৪১ কিলোগ্রাম) বোঝা ও অস্ত্র বহন করতে সক্ষম। অ্যাপাচে হেলিকপ্টারের পাইলট হ্যাভার স্বীকার করেন, প্রশিক্ষণ ছেড়ে দেয়ার কথা ভেবেছেন। এ দুই নারীর সঙ্গে ৯৪ জন পুরুষ রেঞ্জার স্কুল থেকে øাতক হচ্ছেন। এএফপি।

মারা গেছেন খেমাররুজ ফার্স্টলেডি

জীবনাবসান হয়েছে কম্বোডিয়ায় খেমাররুজ শাসনামলে বর্বর হত্যাযজ্ঞের অন্যতম হোতা সাবেক ফার্স্টলেডি ইয়াং থ্রিথ। শনিবার সকাল ১০টায় থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী একটি দুর্গে ৮৩ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শনিবার এ খবর প্রকাশ করেছে এএফপি। মৃত্যুর শেষ সময় পর্যন্ত মানবাধিকার লংঘনের দায়ে অভিযুক্ত আসামি ছিলেন তিনি। কিন্তু জাতিসংঘ-সমর্থিত কম্বোডিয়ার যুদ্ধাপরাধ আদালতে বিচার চলাকালে স্মৃতিভ্রম, ফুসফুস ক্যান্সার ও হৃদরোগে ভুগছিলেন তিনি। অসুস্থতার কারণে ২০১২ সালে জাতিসংঘ-সমর্থিত ট্রাইব্যুনাল তার বিচার কাজ স্থগিত করেন। আদালত, তিনি স্মৃতিশক্তি হারিয়েছেন বলে ঘোষণা করেন। তিনি বিচারের অযোগ্য হওয়ায় তার বিরুদ্ধে করা মামলা স্থগিত করা হয়। কম্বোডিয়ায় কমিউনিস্ট আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি।

‘আমাদের মাকে মুক্তি দিন’

মায়ের মুক্তি চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সৈয়দা আসিফা আশারাফী পাপিয়ার সন্তানরা। একইসঙ্গে তারা সরকারের কাছে স্বাভাবিক জীবন-যাপনের গ্যারান্টি চেয়েছেন।
রোববার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘আমাদের মা কারাগারে কেন’ শিরোনামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা আয়োজিত এ দাবি জানান।
পাপিয়ার ছেলে রুবাইয়েত ইবনে হারুন রাফি বলেন, ‘অবিলম্বে মায়ের মুক্তি চাই। আমরা সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে চাই। আমাদের মায়ের মুক্তির বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি এবং মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেয়া জামিনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সরকার আমাদের মাকে মুক্তি দেবন-আমরা এই প্রত্যাশাই করছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মা সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া রাজনীতি করেন। রাজনীতি করা প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। তাহলে কোন অপরাধে আমাদের মাকে সর্বোচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও বন্দি করে রাখা হয়েছে, দেশবাসীর কাছে সেই প্রশ্ন রাখতে চাই।’
আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করার পরও সনদে উল্লেখিত সেই অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগি করেন তিনি।
পাপিয়ার বড় মেয়ে, নিশাত সাদিয়া রশিদ সূচনা বলেন, ‘আমাদের বাবা সাবেক সংসদ সদস্য হারুন অর রশিদ একজন সমাজসেবক এবং রাজনীতিবিদ। তিনি বর্তমানে শারিরীকভাবে ভীষণ অসুস্থ। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকরা তাকে দেশের বাইরে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন। অপরদিকে আমাদের মা কারাগারে বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। আমি সরকারকে মানবিক দিক বিবেচনা করে আমাদের মাকে মুক্তি দেয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘এবার আমি এইচএসসি পাশ করেছি। কিন্তু মার অনুপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য কোনো লেখাপড়া বা প্রস্তুতি নিতে পারছি না। এই পরিস্থিতিতে আমার এবং আমার ছোট ভাইবোনের পাশে আমাদের মায়ের থাকা খুবই প্রয়োজন।’
সংবাদ সম্মেলনে আসিফা আশরাফী পাপিয়ার ছোট মেয়ে রিফাত রাইদা রশিদ অনন্যাও উপস্থিত ছিলেন।

সিপ্রাস কি প্রতারণা করলেন? by ডেভিড প্যাট্রিকারাকোস

গ্রিক প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপ্রাস গত বছরের শেষের দিকে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে ক্রিটি দ্বীপে প্রচারণার সময় দ্বীপটির ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র আর নাচের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘আমরা ঢোল বাজাব, আর ওরা নাচবে। আর যেহেতু আমরা ক্রিটিতে, তাই আমরা লাইরা বাজাব, আর বাজার পেনদোজালি নাচবে।’
তার ছয় মাস পর বাজার না নাচলেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে। আর সিপ্রাস যদি কোনো ড্রাম বাজিয়ে থাকেন, তবে তা বাজাচ্ছেন ধীরে, তাতে শোকের আবহ আছে।
কদিন আগে সিপ্রাস জনগণকে বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাঁর সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি ত্যাগ করবে, যার জন্য গ্রিস পঙ্গু হতে বসেছে। কিন্তু সেই তিনিই এমন একগুচ্ছ প্রস্তাব পেশ করলেন, তাতে আরও কৃচ্ছ্রসাধন করতে হবে, কর বাড়াতে হবে আর দুর্ভোগ আরও বাড়বে। সংসদে ঋণদাতাদের প্রস্তাব পাসও হয়ে গেছে, যদিও সিরিজা পার্টির অনেক সদস্যই তাতে ‘না’ ভোট দিয়েছেন। গ্রিস সরকারের জ্বালানিমন্ত্রী পানাইয়োতিস লাফাজানিস বলেছিলেন, তিনি এই প্রস্তাবে ভোট দেবেন না। কিন্তু তিনি পদত্যাগ করবেন কি না, সে বিষয়ে কিছু বলেননি। আমরাও সে সম্পর্কে এখনো কিছু জানতে পারিনি। আবার সিরিজা পার্টির জোটের সদস্য ইনডিপেনডেন্ট গ্রিকস পার্টির প্রধান পানোস কামেনোস বলেছিলেন, তাঁর দল ভোটে অংশ নেবে না। কিন্তু লাফাজানিসের মতো তিনিও বলেননি, এই প্রস্তাব পাস হলে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করবেন বা তাঁর দল জোট থেকে বেরিয়ে যাবে।
আমার কোনো সন্দেহ নেই যে সিপ্রাস এখন এগিয়েই যাবেন। নিজের দলের অকুণ্ঠ সমর্থন না পেলেও অন্য দলের সমর্থন তিনি পেয়েছেন। এর কারণ খুবই সাধারণ, তাঁর ও দলের কাছে এর চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প নেই।
এদিকে গ্রিসের রাজধানীর পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। অনেক সাধারণ গ্রিক নাগরিক খুব পরিষ্কারভাবেই বিরক্ত, যাঁদের বেতন মন্ত্রীর সমান নয় বা যাঁদের নিশ্চিত পেনশন নেই।
একজারশিয়া স্কয়ারে গ্রিক তরুণদের জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঋণদাতাদের প্রস্তাব পাসের ব্যাপারে কী মনে করছেন?’ উত্তরে তাঁরা সবাই একচোট হাসলেন।
তরুণদের মধ্যে সবার আগে কথা বললেন টেরি। যা কিছু ঘটেছে, তাতে তিনি বিরক্ত। ‘সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হচ্ছে, সিরিজা পার্টি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃচ্ছ্রসাধনের নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিল, আর তারা সেটা স্রেফ শেষ করে দিল। আমার মনে হয়, গণভোটের পর কিছু হয়েছে, সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিয়েছে, আমি আসলে বুঝতে পারছি না।’ তিনি আরও বললেন, গ্রিসের যে ৬১ শতাংশ জনগণ ‘না’ ভোট দিয়েছিলেন, তারা তাঁদের বোকা বানাল।
তরুণদের একজন বললেন, ‘তারা আমাদের “না” ভোটকে “হ্যাঁ” ভোটে পরিণত করেছে। তারা গ্রিক জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, আর তার জন্য রাজনৈতিক মূল্যও দিতে হবে। তারা গরিব মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, আগামী পাঁচ বছরে কোনো সমাধান আসবে না।’
সে সময় আরেক তরুণ মাঝখানে বললেন, ‘পাঁচ বছর? তুমি কি ৫০ বছর বলতে চাইছ।’ আরেকজন তরুণ বলে উঠলেন, ‘আমি মনে করি, সমাধান হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে নতুন করে সব শুরু করা।’
সিপ্রাসের সামনে এখন দুটি সমস্যা। একটি হচ্ছে, সামনের বেদনাদায়ক দিনগুলোয় তাঁকে গ্রিসের নেতৃত্ব দিতে হবে। আর দ্বিতীয় সমস্যাটি হচ্ছে, যাঁরা তাঁর ওপর আস্থা স্থাপন করেছিলেন, তাঁদের আস্থা আবারও তাঁকে অর্জন করতে হবে। কাজটা সহজ হবে না।
আসলে তাঁদের হতাশার গভীরতা অনুভব করা সম্ভব। বহু বছর ধরে গ্রিসে দুটি দল শাসন করে আসছিল। দল দুটি হচ্ছে নিউ ডেমোক্র্যাসি ও পাসক। এই জানুয়ারিতে সিরিজা পার্টি যখন নির্বাচিত হলো, তারা তখন দেশটির অর্ধশতকের দ্বিদলীয় বৃত্ত ভেঙে ফেলে। টেরি বললেন, সিরিজা শুধু দল ছিল না, এটা ছিল এক আন্দোলন। তাঁর কথায় মনে হচ্ছিল, তিনি এসব ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ‘আমরা সত্যিই বিশ্বাস করেছিলাম, তারা ভিন্ন কিছু করবে। কিন্তু পাঁচ মাস আলোচনা চালানোর পর তারা ১৭ ঘণ্টার মধ্যে সব শেষ ছেড়ে দিল, ব্যাপারটা অনেকটা এ রকমই।’
টেরি আরও বললেন, ‘আর তিনি (সিপ্রাস) এখন আশা করেন, আমরা তাঁর কথা অনুসরণ করব। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ তরুণের কাছেই জীবন চালানোর মতো টাকা নেই। ১৬ বছর বয়সে আমি হাই স্কুলের ক্যাফেটেরিয়ায় কাজ করতাম। তখন আমি মাসে ৮০০ ইউরো আয় করতাম। তারপর এখন আমার কাছে কিছুই নেই। আমি ইতিহাসে ডিগ্রি লাভ করা থেকে স্রেফ এক কদম দূরে। কিন্তু এতে কিছু হবে না, গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে ডিগ্রি না থাকলে আজকাল আর কিছু হয় না।’
তাঁদের মধ্যকার এক তরুণী আরেক তরুণীকে দেখিয়ে বললেন, ‘আমরা গ্রাফিকস ডিজাইনার, কিন্তু আমরা কোনো দোকান খুলতে পারব না। কারণ, তার জন্য অনেক টাকা কর দিতে হবে। আপনি কঠোর পরিশ্রম করুন বা না-ই করুন, তাতে কিছু আসে-যায় না। গত চার বছরের মধ্যে আমি মাত্র তিন মাসের জন্য একটি বার্গারের দোকানে কাজ করেছি। আবার তারা এর জন্য আমাকে টাকাও দেয়নি।’ গ্রিসে ও গ্রিসের বাইরে কোটি কোটি মানুষ এই তরুণদের হতাশা ও বেদনার সমব্যথী।
অন্যদিকে, গ্রিসের বামপন্থীদের জন্য সন্তোষের কারণ হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে তারা বলতে পারবে সিপ্রাস ঋণদাতাদের কাছে কতটা অসহায়। এই ঋণদাতারা সব সময় সিপ্রাস ও তাঁরা দলের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছে। কিন্তু তিনি টিকে যাবেন। তাঁর সামনে এখন দুটি সমস্যা। একটি হচ্ছে, সামনের বেদনাদায়ক দিনগুলোয় তাঁকে গ্রিসের নেতৃত্ব দিতে হবে। আর দ্বিতীয় সমস্যাটি হচ্ছে, যাঁরা তাঁর ওপর আস্থা স্থাপন করেছিলেন, তাঁদের আস্থা আবারও তাঁকে অর্জন করতে হবে। কাজটা সহজ হবে না।
ওই তরুণদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় টেরি শেষ কথাটা বললেন, ‘আপনি যখন সিপ্রাস সম্বন্ধে লিখবেন, তখন যেন তাঁকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর আগে যে রাজনীতিকেরা এসেছেন, আমরা জানতাম, তাঁরা সবাই একই রকম। আমরা সত্যিই ভেবেছিলাম, তিনি আলাদা।’
ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া
ডেভিড প্যাট্রিকারাকোস: লেখক ও সাংবাদিক।

শান্তিকামী জাপানে যুদ্ধংদেহী আইন by জ্যারেড জেনসার ও মিশেল বিগ্রনোন

সেই ১৯৩০-এর দশকের মধ্যভাগে জাপানের তৎকালীন জেনারেল ও যুদ্ধমন্ত্রী সাদাও আরাকি বলেছিলেন, ‘জাপানের লক্ষ্য হচ্ছে এশিয়া, দক্ষিণ সাগর ও চূড়ান্ত পর্যায়ে সারা পৃথিবীর সর্বপ্রধান শক্তি হওয়া।’ ১৯৪৫ সালে টোকিও উপসাগরে ইউএসএস মিজৌরি যুদ্ধজাহাজে আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে জাপানের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার অবসান ঘটে। তারপর তারা মেইজি সংবিধানের জায়গায় এক শান্তিকামী সংবিধান প্রণয়ন করলে দেশটি গণতন্ত্র, শান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক অদৃষ্টপূর্ব যুগে প্রবেশ করে।
আর আজ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির ৭০ বছর পর জাপানের হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে যে নিরাপত্তা বিল পাস হয়েছে, তাতে দেশটির শান্তির যুগের অবসান ঘটার ইঙ্গিত রয়েছে। এর মাধ্যমে শিনজো আবে ও তাঁর ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) বিদ্যমান আইন সংশোধন করেছে, এর ফলে জাপানের সেনাবাহিনী বিদেশে যুদ্ধ করতে যেতে পারবে যদি:
১) জাপান বা তার কোনো ঘনিষ্ঠ মিত্র আক্রমণের মুখে পড়ে, আর এর ফলে জাপানের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে বা সেটা তার জনগণের জন্য পরিষ্কার হুমকি হয়ে দাঁড়ায়;
২) সেই আক্রমণ প্রতিহত করার এবং জাপানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ও তার জনগণের সুরক্ষার আর কোনো যথাযথ উপায় না থাকে।
এতে আরও বলা হয়েছে, ‘শক্তি প্রয়োগের মাত্রা প্রয়োজনীয় ন্যূনতমের মধ্যে সীমিত রাখা হবে’।
যে আইনের কারণে সেনাবাহিনী আরও শক্তিশালী হবে, জনগণের রুষ্ট প্রতিবাদের মুখেও তার সমর্থনে আবে বলেছেন, এই আইন ‘যুদ্ধে যাওয়ার জন্য’ প্রণয়ন করা হয়নি, এটা করা হয়েছে ‘যুদ্ধ প্রতিরোধের’ ক্ষেত্রে নিরোধক হিসেবে। তাঁর যুক্তি হচ্ছে, এই আইনের কারণে জাতিসংঘের সম্মিলিত আত্মরক্ষার মতবাদের আলোকে জাপান তার মিত্রদের আরও ভালোভাবে সমর্থন দিতে পারবে। জাতিসংঘের এই মতবাদে সশস্ত্র আক্রমণ হলে ‘একক বা যৌথভাবে আত্মরক্ষার’ বিধান আছে। কিন্তু তিনি এটা ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষায় জাপানের সহায়ক ভূমিকা কেন যুদ্ধ রোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে গণ্য হবে না।
দেশের ভেতরে এই আইনের বিরোধিতাকারীদের মধ্যে আছেন ১০ হাজারেরও বেশি বিদ্বজ্জন। তাঁরা জোর গলায় বলছেন, এই আইনটি অসাংবিধানিক। জাপানের সংবিধানের ৯ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘যুদ্ধ করা জাতির সার্বভৌম অধিকার—এ ব্যাপারটি জাপানের জনগণ চিরকালের জন্য পরিত্যাগ করেছে। আন্তর্জাতিক বিরোধ নিরসনে শক্তি প্রয়োগ ও তার হুমকির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য...স্থল, জল, আকাশ বা যুদ্ধের কোনো রকম মাধ্যমকেই অর্থায়ন করা হবে না।’ দেশটির সংবিধানের ৯৬ ধারায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সংবিধানে সংশোধনী আনতে হলে অধিকাংশ জনগণের অনুসমর্থনের আগে সংবিধানের দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে তা পাস হতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় গেলে আবে অবশ্যই ব্যর্থ হবেন, তিনি তা জানেন। কারণ, জাপানের ৬১ শতাংশ মানুষ এই আইনের বিপক্ষে।
উপরন্তু এই বিধানের অস্পষ্টতার জন্য গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধীদের যুক্তি হচ্ছে, এই আইনে এমন কিছু অস্পষ্ট ব্যাপার আছে, যার কারণে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকার আক্রমণের উদ্দেশ্যে সৈন্য নামালে আইনটি ব্যাখ্যায় অতিরিক্ত স্বাধীনতা ভোগ করবে। জাপানের ইতিহাসের আলোকে জাপানি জনগণের এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে প্রজ্ঞা আছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির ৭০ বছর পর জাপানের হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে যে নিরাপত্তা বিল পাস হয়েছে, তাতে দেশটির শান্তির যুগের অবসান ঘটার ইঙ্গিত রয়েছে শেষবার যখন জাপানের সেনাবাহিনী বিদেশের মাটিতে পা দিয়েছে, তখন তারা জমি দখল করেছে, নিজ দেশের সঙ্গে অন্য দেশকে সংযুক্ত করেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হানা দিয়েছে, প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন করেছে এবং বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে। সরকারের নির্দেশনায় জাপানি সামরিক বাহিনী ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি চীনা, ইন্দোনেশীয়, কোরীয়, ফিলিপিনো ও ইন্দো চীনা মানুষ হত্যা করেছে। পুরো এশিয়াতেই জাপান মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, তারা লাখ লাখ নারীকে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করেছে। দেশটির সেনাবাহিনীর ৭৩১ ইউনিট হারবিন ও মাঞ্চুকুয়োতে অবর্ণনীয় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। সেখানে দেশটির বিজ্ঞানীরা জীবিত কারাবন্দীদের শরীর চিরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাসহ তাঁদের ওপর আরও অবর্ণনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। এসব নৃশংসতার নথিপত্র সংরক্ষিত আছে। কিন্তু জার্মানদের মতো তারা অতীতের পাপ থেকে শিক্ষা নেওয়া বা তার দণ্ড দিতে শেখেনি। আধুনিক জাপানিরা তা স্বীকার করতে, তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে বা সেখান থেকে শিখতে অনাগ্রহী।
জাপানের যুদ্ধাপরাধ আড়াল করার দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে বিশেষ করে আবে ও এলডিপির পক্ষে এই পরিবর্তনের জন্য চাপাচাপি করাটা বিব্রতকর ব্যাপার হবে। ১৯৯৫ সালে হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভের একটি প্রস্তাবে এলডিপির ২২১ জন সদস্য জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘প্যাসিফিক যুদ্ধটা ছিল আসলে উপনিবেশায়িত এশিয়াকে স্বাধীন করার জন্য।’ বিচারমন্ত্রী নাগানো শিগেটো দাবি করেছিলেন, ‘নানজিং হত্যাকাণ্ড এক মিথ্যা কাহিনি’, বেশ চমৎকার দাবিই ছিল এটা। এরপর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ওদিকে ২০০৭ সালে আবে দাবি করেছিলেন, ‘কমফোর্ট উইমেনদের’ জোর করে জাপানি সাম্রাজ্যবাদী সেনাবাহিনীর যৌনদাসী বানানো হয়নি। এ বছরের শুরুর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে আবে সে জায়গা থেকে সরে এসে কমফোর্ট উইমেনদের ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি শুধু বলেন, তিনি তাদের দুঃখ-কষ্টের জন্য ‘গভীরভাবে দুঃখিত’।
ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে এই আইনটি এখন জাপানের হাউস অব কাউন্সিলরসে যাবে। জাপানের সংসদের এই কক্ষকে ‘কাণ্ডজ্ঞানের পীঠ’ বলা হয়, আবার তাকে ‘যৌক্তিক রাজনীতির’ ক্ষেত্র হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়, কারণ এর সদস্যরা ছয় বছরের মেয়াদে নির্বাচিত হন। ডায়েটের উচ্চকক্ষে এলডিপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এমন নজিরও আছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আসা আইন হাউস অব কাউন্সিলর্স বাতিল করে দিয়েছে। ২০০৫ সালে এলডিপির বিদ্রোহী সদস্যরা ডাক যোগাযোগ বেসরকারীকরণের বিরুদ্ধে ভোট দিতে বিরোধী জোটে যোগ দিয়েছিলেন। জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো কোইজুমি এলডিপির বিদ্রোহী সদস্যদের বহিষ্কার করার পর আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন, আর তাতে তিনি বিপুল বিজয়ও লাভ করেন।
এবারের পরিস্থিতি কিন্তু নাটকীয়ভাবেই ভিন্ন। এমনকি আবে যদি তাঁর জোট ধরে রাখেন এবং হাউস অব কাউন্সিলরসের বাধা পেরিয়েও যান, তাহলেও তিনি রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অথবা পরবর্তীকালে জাপানের সুপ্রিম কোর্ট আইনটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে পারেন। ব্যাপক জনরোষের মুখে এলডিপির ঐক্য টেকে কি না, সেটাই দেখার বিষয়, কারণ জাপানের মানুষেরা এই আইনটিকে রাজনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক মনে করছে। এ মুহূর্তে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে বিজ্ঞোচিত যে কাজটি করতে পারেন, সেটি হচ্ছে জনগণের প্রজ্ঞার কাছে নতি স্বীকার করা।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে নেওয়া
জ্যারেড জেনসার: কলামিস্ট; মিশেল বিগ্রনোন: জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক।

জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ‘ক্রসফায়ার’

‘ক্রসফায়ার’ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ একপক্ষের মানুষ মারা যায় কেন এমন প্রশ্ন উঠেছে বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে। তবে নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান বলেছেন, জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবেই ‘ক্রসফায়ার’ হচ্ছে। শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে টিসিবি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে প্যানেল আলোচক ছিলেন নৌ-পরিবহণমন্ত্রী শাজাহান খান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, লন্ডনভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা আর্টিকেল নাইনটিনের বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক তাহমিনা রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এম এম আকাশ।   অনুষ্ঠানে এক দর্শক জানতে চান, ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধই কি বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমনের একমাত্র পথ হয়ে উঠছে?’ জবাবে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, “কেউ গ্রেফতার হওয়ার পর পালাবার চেষ্টা করলে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আক্রমণ করতে চাইলে এ ধরনের ঘটনা (ক্রসফায়ার) ঘটতেই পারে।” তিনি বলেন, “কঠোরভাবে সন্ত্রাস দমন করা সরকারের দায়িত্ব। এ জন্য বিভিন্ন সময় বন্দুকযুদ্ধে নিহতের ঘটনা ঘটে।” আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা শাস্তি না পাওয়ার উদাহরণ তুলে ধরে শাজাহান খান বলেন, “বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আদালতের বিচারের মাধ্যমে মাত্র একজনের শাস্তি হয়েছে। তিনি হলেন এরশাদ শিকদার। আর কারো হয়নি।” জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবেই ‘ক্রসফায়ার’ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন, “বিচারবহির্ভুত হত্যা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু দেশে এটি চলছে। সরকার থেকেই এটির পক্ষে বলা হচ্ছে। আগে বিরোধী দল টার্গেট ছিল। এখন সরকারের নেতাকর্মীরাও মারা যাচ্ছে ক্রসফায়ারে।” বিএনপি শাসনামলে র্যা ব গঠন হয়েছে এবং তখন থেকেই ক্রসফায়ারের ঘটনা শুরু হয়েছে, এমন প্রশ্নে বিএনপির এই শীর্ষনেতা বলেন, “তখনকার প্রেক্ষাপটে দরকার ছিল, তাই হয়েছে। এখন দরকার নেই।” অনুষ্ঠানে দর্শকদের মধ্য থেকে এক তরুণী বলেন, আসলে বন্দুকযুদ্ধের নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। মূলত যাকে মারা হয়, তার হাতে তো কোনো অস্ত্র থাকে না। অন্যদিকে দুই তরুণ বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজের স্বার্থে সন্ত্রাসীদের এভাবে বন্দুকযুদ্ধে মেরে ফেলাই উচিত। অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, “বন্দুকযুদ্ধ মানে হলো দুই পক্ষের মধ্যে বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ হওয়া। কিন্তু গ্রেফতারের পর আসামির হাতে তো কোনো বন্দুক থাকে না।” নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সাত বা ১১ জন খুনের ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে এ বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে এখন সরকার যাকে ইচ্ছা তাকে মারবে। এরপর বলবে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে।” এ পদ্ধতিতে সন্ত্রাসীদের দমনের চেষ্টা করা হলে একদিন এটি সরকারকেই গ্রাস করবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি। তাহমিনা রহমান বলেন, আইনের মাধ্যমেই দোষীদের বিচার করতে হবে। একজন নারী দর্শক বলেন, “আগে বিচারের মাধ্যমে আসামির দোষ প্রমাণ করা হোক। তারপর ক্রসফায়ারে দেয়া হোক।” আরেকজন তরুণী বলেন, “অপরাধ দমনে ব্যর্থ হয়েই প্রশাসন বন্দুকযুদ্ধের আশ্রয় নিয়েছে।”   অনুষ্ঠানে আরেকজন দর্শকের প্রশ্ন ছিল- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা কি ভিন্নমত দমনের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে?   উত্তরে এম এম আকাশ বলেন, “হ্যাঁ, এটি ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হতে পারে। সরকারেরই উচিত নিজেদের সমালোচনা শোনা। এ ধারায় উল্লেখিত বিষয়গুলো অনেক বিস্তৃত। কিসে অপরাধ হবে বা হবে না, সেটি সুনির্দিষ্ট করা উচিত।” তাহমিনা রহমানও তার সঙ্গে একমত প্রকাশ করেন। বিএনপির নেতা মাহবুবুর রহমান বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল করা উচিত। শাজাহান খান বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার মাধ্যমে আইনের অপব্যবহার হবে না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবেই। এম এম আকাশ বলেন, অবশ্যই আইনের অপব্যবহার হতে পারে। তাহমিনা রহমান বলেন, “এ ধারা (৫৭) অবশ্যই রিভিউ করা প্রয়োজন।”   বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন ও বিবিসি বাংলার যৌথ আয়োজনে পরিচালিত অনুষ্ঠানটি প্রযোজনা করেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ এবং উপস্থাপনা করেন আকবর হোসেন।

খুনির প্রেমে উতলা যে তরুণী

ভিকতোরিয়া তাঁর মনের মানুষটিকে আদর করে ‘আন্দার্স’ বলে ডাকেন। এটি নামের প্রথম অংশ। প্রতি সপ্তাহে চিঠি দেন তাঁকে। প্রেমিকের জন্য অপেক্ষা করবেন, এ প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। অন্য দশটি প্রেমকাহিনির মতো এটি স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারত, ব্যতিক্রম এখানে প্রেমিক। তিনি নরওয়ের সেই কুখ্যাত গণহত্যার খলনায়ক আন্দার্স বেরিং ব্রেইভিক।
২০১১ সালের ১২ জুলাই নরওয়ের উতয়া দ্বীপে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে ৭৭ জনকে হত্যা করেন ব্রেইভিক। এ ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হলে ব্রেইভিকের ২১ বছরের কারাদণ্ড হয়। বর্তমানে কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা কারাগারে সাজা ভোগ করছেন তিনি।
এমন এক ঘৃণ্য খুনিকে ২০ বছরের এক তরুণী মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসলে কৌতূহল জাগাটা স্বাভাবিক। ভিকতোরিয়া সুইডেনের নাগরিক। প্রকৃত নাম প্রকাশ করেননি তিনি। স্টকহোমের এক হোটেলের লবিতে বসে তিনি যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন মুখে বারবার ‘প্রিয়তম আন্দার্স’ উচ্চারিত হয়।
সুইডেনের এক ছোট্ট শহরের মেয়ে ভিকতোরিয়া। অনেক সাহস। ব্রেইভিকের সাজা কমাতে প্রয়োজনীয় যেকোনো কিছু করতে তিনি প্রস্তুত। প্রেমিকের বন্দিদশা তাঁর কিছুতেই ভালো লাগছে না।
প্রেমিককে এভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা নিয়ে ঘোর আপত্তি আছে ভিকতোরিয়ার। তাঁর ভাষায়, এটা নির্যাতন। ভিকতোরিয়ার দাবি, আন্দার্স অসহায় অবস্থায় আছেন বলে তাঁর প্রতি ভালোবাসা আরও বেড়ে গেছে।
শারীরিক কারণে বর্তমানে বেকার ভিকতোরিয়া তাঁর প্রেমিকের মনোবল বাড়াতে চিঠি লিখেন। জানালেন, আন্দার্সের কাছে ১৫০ টির মতো চিঠি লিখেছেন তিনি। এ ছাড়া গাঢ় নীল রঙের একটি টাইসহ ছোট ছোট উপহারও পাঠিয়েছেন। বিচারকাজ চলার সময় ব্রেইভিক মাঝে মাঝে টাইটি পরে আদালতে গেছেন।
ভিকতোরিয়ার কাছে ব্রেইভিক দুটি চিঠি পাঠিয়েছেন। অন্য চিঠিগুলো কর্মকর্তারা কাটছাঁট করার নাম করে আটকে দিয়েছে বলে ভিকতোরিয়ার অভিযোগ।
ভিকতোরিয়ার দাবি, ২০০৭ সালে অনলাইন গেম খেলার সময় আন্দার্স বেরিং ব্রেইভিকের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। দুই বছর পর তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সম্ভবত ওই সময় আন্দার্স হামলার ফন্দি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তবে ভিকতোরিয়ার তরফ থেকে প্রেমময় আবেগটি ছিল বলেই তাঁর দাবি।
তবে ব্রেইভিকের জন্য পাগল তরুণীর তালিকায় আরও অনেকে আছেন। এক সাপ্তাহিক পত্রিকার খবরে জানানো হয়, গত বছর ব্রেইভিক কমপক্ষে ৮০০ চিঠি পেয়েছেন তাঁর নারী অনুরাগীদের কাছ থেকে। ২০১২ সালে তখন তাঁর বিচার চলছিল, তখন ১৬ বছরের এক মেয়ে তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়।
একজন খুনির জন্য ভিকতোরিয়ার কেন এমন প্রেম?
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক আমান্ডা ভিকেরি বলেন, অনেক মেয়ে ভয়ংকর অপরাধী এমন ছেলেদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে নিজেদের পাদপ্রদীপের আলোয় আনতে চায়। মানুষ তাঁকে নিয়ে আলোচনা করবে, এটাই তাঁর জন্য ভালো লাগা আর আনন্দের বিষয়।
ভিকতোরিয়ার মত, তিনি নামের জন্য বা মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য আন্দার্সকে ভালোবাসেন না। এই সম্পর্কের জন্য তিনি চড়া মূল্যও দিয়েছেন। বোন তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বলেছেন, ‘তুমি আমার কাছে মৃত।’ বন্ধুদের সঙ্গেও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে ভিকতোরিয়ার। তবে এসব নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা নেই।
ভালোবেসে যাওয়ার প্রত্যয়ে ভিকতোরিয়া বলেন, ‘আমার মনে হয় আন্দার্স আর ব্রেইভিক—দুটি সত্তাকে আমার আলাদা করে ফেলতে হবে। আন্দার্স আমার সেই পুরোনো বন্ধু। আর ব্রেইভিক সেই ব্যক্তি যিনি ওই সব কাজগুলো করেছেন।’ প্রিয়তম আন্দার্সকে নিয়ে ভিকতোরিয়ার শেষ কথা, ‘আমি প্রতিদিন তাঁকে আরও বেশি মিস করছি। আমার ধারণা, আমার আবেগ আরও প্রগাঢ় হবে।’

সরকারের শত্রু সন্ত্রাস by মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু ও আবদুল্লাহ আল মামুন

নিজ দলের নেতাকর্মীদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপকে এখন প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করছে সরকার। সম্প্রতি সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের খুনাখুনিতে অতিষ্ঠ আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড সন্ত্রাস দমনে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের চিন্তাভাবনা করছে। গুটিকয়েক সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ সমর্থক-নেতাকর্মীর অপকর্মে সরকারের বিশাল অর্জন যাতে ম্লান হয়ে না যায়, সে জন্য জেলা ও থানা পর্যায়ে পুলিশকে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে তিন ক্যাটাগরিতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নামের তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের কাছে সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
সম্প্রতি কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের পাঁচ নেতা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই দলীয় নেতাকর্মীদের নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটি নেয়া হয়নি। ফলে তারা এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে র‌্যাব-পুলিশকে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হতো না। ঘটত না কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহতের ঘটনা।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সড়ক পরিবহন এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শনিবার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, সরকারের ভাবমূর্তিকে যারা ক্ষতিগ্রস্ত করবে তাদের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল নিজ দলের সন্ত্রাসীরা এখন খুনাখুনিতে যুক্ত, মাঠের বিরোধী দল বিএনপির অনুপস্থিতিতে এখন তারা (নিজ দলের সন্ত্রাসীরা) সরকারের মূল প্রতিপক্ষ কিনা? জবাবে সেতুমন্ত্রী বলেন, যারা অপকর্ম করবে তারাই আমাদের প্রতিপক্ষ, এরা জনগণেরও প্রতিপক্ষ। এদের কোনো দল নেই। তবে বিরোধী দল মাঠে অনুপস্থিত, সেটা মানতে নারাজ শাসক দলের প্রভাবশালী এ নেতা।
সাবেক আইজিপি এমএ কাইয়ুম শনিবার রাতে যুুগান্তরকে বলেন, আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন এবং এ বিষয়টিকে যে গুরুত্ব দিচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে। তিনি বলেন, আইনশৃংখলা পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় তা আমাদের পুলিশ জানে। পুলিশকে স্বাধীনতা দিলে আগেই তারা এ কাজ করতে পারত। পুলিশ নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে পারলে আজ এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের (কথিত বন্দুকযুদ্ধ) বিরোধিতা করে সাবেক এ পুলিশ-প্রধান বলেন, ধরে নিয়ে কাউকে মেরে ফেলা হবে এটা কেনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। পুলিশ বিভাগকে দলীয়করণ না করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া উচিত। আর এটার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
পুলিশ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পুলিশকে জেলা ও থানা পর্যায়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের তিন ক্যাটাগরিতে নামের তালিকা তৈরি করতে উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- টেন্ডার, চাঁদা ও দখলবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের একটি তালিকা। শাসক দলের যেসব নেতাকর্মী বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মামলা আছে, সেসব মামলার বিস্তারিত অর্থাৎ কোন ধরনের মামলা রয়েছে সে তথ্য ও দলীয় পদবিসহ তাদের নাম এবং ক্লিন ইমেজের নেতাকর্মীদের নামের তালিকা পুলিশ সদর দফতরে পাঠাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জেলা ও থানা পুলিশের সহায়তায় এসবি (বিশেষ শাখা) এ তালিকা তৈরি করছে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ আল মাহমুদ স্বপন শনিবার যুগান্তরকে বলেন, আমরা সারা দেশে বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের নেতাদের সতর্ক করছি। তাদের বলছি, যারা নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা রাখেন তাদের অধিকতর ‘অ্যাকোমেটেড’ করতে। যাতে তারা কোনোভাবেই বঞ্চিত না মনে করেন এবং হতাশ না হন। একই সঙ্গে সংগঠনে যাতে কোনো ধরনের কোটারি সৃষ্টি না হয়- সে ব্যাপারেও সতর্ক করা হচ্ছে। সারা দেশে নিজেদের মধ্যে খুন-খারাবি বেড়ে যাওয়ায় সাংগঠনিকভাবে কি পদক্ষেপ নিচ্ছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে স্বপন আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সব স্তরের নেতাকর্মীকে এই বার্তা দেয়া হচ্ছে, ‘জনগণই সব ক্ষমতার উৎস।’ ফলে নিজেদের সংযম ও সহনশীলতা প্রদর্শন করতে হবে।
মাগুরা, কুষ্টিয়া, ঢাকার হাজারিবাগ ও বাড্ডায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের খুনাখুনির পর সোমবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি সন্ত্রাস দমনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কঠোর নির্দেশনা দেয়ার পাশাপাশি মন্ত্রিসভার সদস্যদের হুশিয়ার করে দেন এই বলে যে, তারা যেন অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষে কোনো ধরনের অনুকম্পা প্রদর্শন এবং তাদের ছাড়িয়ে নিতে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তদবির না করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শনিবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, যারা প্রকৃত অপরাধী তারা কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী হতে পারে না। তারা নিজেদের প্রয়োজনে দলকে ব্যবহার করে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসী যে রাজনৈতিক দলেরই হোক আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণে কাউকে একবিন্দু ছাড় দেয়া হবে না। এ ব্যাপারে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর সোমবার রাতে সন্ত্রাসী পাকড়াওয়ে র‌্যাব ও পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেন। এতে কুষ্টিয়া ও মাগুরায় শাসক দলের দুই নেতা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। ওই অভিযানে ছাত্রলীগের দুই নেতা নিহত হওয়ায় শাসক দলের অভ্যন্তরে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য ও ঢাকার সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস এ ঘটনায় প্রকাশ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। অবশ্য তাপস এখন চুপচাপ রয়েছেন। সরকারের হাইকমান্ড থেকে তাপসকে সন্ত্রাস দমনে কঠোর অবস্থানের বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনার পর গাজীপুরের সালনায় রাজধানীর বাড্ডার স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাইদুল ইসলাম এবং কুষ্টিয়ায় জাকির হোসেন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। শাসক দলের এ দুই নেতার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ নানা অভিযোগ ছিল। বর্তমানে সন্ত্রাস দমনে আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কুষ্টিয়ায় শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে বলা হয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আখতারুজ্জামান লাবু ও সাধারণ সম্পাদক শেখ সাজ্জাদ হোসেন সবুজকে গাজীপুর থেকে আটক করেছে র‌্যাব। তবে র‌্যাব এ অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সবুজের অনুসারী নেতাকর্মীদের গুলিতে ১৫ আগস্ট সবুজ নামের এক আওয়ামী লীগকর্মী নিহত হন। এ ঘটনায় শেখ সাজ্জাদ হোসেন সবুজকে প্রধান আসামি করে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ সাজ্জাদ হোসেন সবুজ কুষ্টিয়ায় মাদক ব্যবসা, স্বর্ণ, চোরাচালানসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। তার বিক্রি করা বিষাক্ত মদ খেয়ে ২০০৫ সালে বেশ কয়েকজন মারা গেলে একটি মামলা হয়। ওই মামলার কারণে দীর্ঘ সময় তিনি আত্মগোপনে থাকেন। এরপর ক্ষমতায় আসার আগ মুহূর্তে মামলা থেকে বাঁচতে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং কেন্দ্রীয় কমিটির পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। র‌্যাবের হাতে শেখ সাজ্জাদ হোসেন সবুজ আটকের সংবাদে সেখানকার মানুষের মধ্যে স্বস্তি এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সবুজের মতো আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
গত জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতিতে কুষ্টিয়ার সবুজের মতো শাসক দলের জেলা ও থানা পর্যায়ের নেতাদের আপত্তিকর কর্মকাণ্ডের বিষয় তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রুদ্ধদ্বার ওই বৈঠকে ডিসিরা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, তদবিরসহ নানা অপকর্ম সম্পর্কে সরকারপ্রধানকে অবহিত করেন। গত সপ্তাহে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে আইনশৃংখলা সংক্রান্ত কমিটির ত্রৈমাসিক সভাতেও একই ধরনের অভিযোগ করেন পুলিশ সুপাররা (এসপি)। তারাও শাসক দলের এসব সন্ত্রাসী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন।
ডিসি ও এসপিদের আশংকার মধ্যেই ২৩ জুলাই মাগুরায় ছাত্রলীগের দু’পক্ষের গোলাগুলিতে নাজমা খাতুন ও তার পেটের শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। এরপর সিলেট, মদন মোহন কলেজে ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ গ্রুপের ছুরিকাঘাতে আবু আলী, রাজধানীর বাড্ডায় হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মাহবুবুর রহমান গামা, আওয়ামী লীগ নেতা শামসু মোল্লা এবং চাকরিজীবী ফিরোজ আহমেদ মানিককে, নিজ দলীয় প্রতিপক্ষের হাতে কুষ্টিয়ায় সবুজ হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে রবিউল ইসলাম নামের দুই আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হন। এছাড়া কালিয়াকৈরে স্থানীয় যুবলীগ সভাপতি রফিকুল ইসলাম এবং ঢাকায় যুবলীগের ওয়ার্ড নেতা আবদুল মান্নানকে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে রাজধানীর হাজারীবাগে রাজা মিয়া নামের এক যুবককে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয় ছাত্রলীগের সভাপতি। তারও আগে চাঁদপুরের কচুয়ায় জাতীয় শোক দিবসের চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে ভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় যুবলীগ নেতাকর্মীরা।
ড. শাহদীন মালিক যুগান্তরকে বলেন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত ৫-৭ বছরে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে বহু হতাহত হয়েছেন। এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে র‌্যাবসহ আইনশৃংখলা বাহিনীকে তখন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। বিএনপি আমলে বলেছিলাম, র‌্যাব বিএনপির জন্য ফ্রাঙ্কেইনস্টাইন হয়ে উঠবে, অনেক দেরিতে হলেও খালেদা জিয়া গত বছর র‌্যাবের বিলুপ্তি চেয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব এখন আওয়ামী লীগের জন্যও ফ্রাঙ্কেইনস্টাইন হয়ে উঠছে।
তিনি আরও বলেন, যে দেশেই আইনশৃংখলা বাহিনীকে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য রাজনৈতিক অনুমতি দেয়া হয়েছে, সেই দেশেই আগে হোক, পরে হোক এরা রাজনীতিবিদদের জন্য ফ্রাঙ্কেইনস্টাইন হয়ে উঠেছে। আগে হোক পরে হোক এরা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আমরা এখন সেই জিনিসটাই দেখছি। বিএনপি এখন র‌্যাবের বিলুপ্তি চাইছে, আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা এখন এ ব্যাপারে প্রতিবাদ করছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হলে এ পরিণতি হয় উল্লেখ করে শাহদীন মালিক বলেন, ‘আপনি যখন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে যাচ্ছেন, তার মানে হল, নিয়মতান্ত্রিক পথে আপনি যাচ্ছেন না।’

জাহিদ হাসানের আবিষ্কার ও কোটি হৃদয়ের কণা by আনিসুল হক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ গবেষণাগারে
পদার্থবিজ্ঞানী জাহিদ হাসান l ছবি: সংগৃহীত
এম জাহিদ হাসান এই ঢাকার ধানমন্ডি গভ. বয়েজ স্কুলে পড়েছেন। ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন। ভালো ছাত্র। স্ট্যান্ড করা। এরপর জাহিদ হাসানের পিএইচডি স্টানফোর্ডে। এ সময় কাজ করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কেলে ল্যাবেও কাজ করেছেন। তারপর আইনস্টাইনের স্মৃতিধন্য প্রিন্সটনে গবেষণা আর শিক্ষকতা। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে যাবে তাঁর নেতৃত্বাধীন গবেষকদলের আবিষ্কারের পর। ১৯২৯ সালে হারম্যান ভাইল নামের এক বিজ্ঞানী প্রথম জানিয়েছিলেন এ রকম একটা কণার অস্তিত্বের কথা। ৮৫ বছর পর আমাদের জাহিদ হাসান, ঢাকার, বাংলার, আমেরিকার এবং পৃথিবীর জাহিদ হাসান সেই কণাকে বাস্তবে পরীক্ষাগারে শনাক্ত করে দিয়েছেন। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেছেন যে সত্যেন বসু (১৮৯৪-১৯৭৪), যাঁর নামে একদিন একটা গ্রুপের নামকরণ করা হয় ‘বোসন’। সব মৌলিক কণা হয় "বোসন" গ্রুপে পড়ে, না হয় ‘ফার্মিয়ন’ গ্রুপে পড়ে। তাঁর আবিষ্কারের ৯১ বছর পর আরেক বাঙালি/বাংলাদেশির নেতৃত্বে আবিষ্কৃত হলো আরেক গ্রুপের একটি কণা, যা আবিষ্কারের পর কেবল তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান পাল্টে যাবে না, বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে ইলেকট্রনিক ও কম্পিউটারের বাস্তব জগতে। ইলেকট্রনিক আর কম্পিউটারের জগৎটা এমনিতেই বদলে যাচ্ছে দ্রুত, প্রতিনিয়ত উন্নতি হচ্ছে এ ক্ষেত্রে, কিন্তু এম জাহিদ হাসানদের আবিষ্কার এটাকে কী যে গতি দেবে, মসৃণতা দেবে, তা কল্পনা করতে গিয়ে হইচই পড়ে গেছে বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে। জাহিদ হাসানদের এই বৈজ্ঞানিক সাফল্য নিয়ে গর্ব করতে পারে পুরো পৃথিবী, উপকার ভোগ করবে সমগ্র মানবসভ্যতা, আর তিনি যে ঢাকার ছেলে, তা নিয়ে আমরাও তো গর্ব করব উজ্জ্বল মুখে, তিনি যে দেশ ও দশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। অভিনন্দন জাহিদ হাসান আর তাঁর দলকে। আজকের এই আনন্দের দিনে সেই পুরোনো কথাটাই আবার বলতে হবে, আবার তাতে নতুন করে আস্থা রাখতে হবে-আমরাও পারি। বাংলাদেশের মানুষ মেধায়, সম্ভাবনায়, কৃতিতে কারও চেয়ে কম নয়। সুযোগ পেলে আমাদের ছেলেমেয়েরাও পারে। ঢাকার ছেলে, আরমানিটোলা স্কুলের ফজলুর রহমান খানকে (১৯২৯-১৯৮২) বলা হয় স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আইনস্টাইন। টিউবলার ডিজাইনের জনক তিনি, যার ফলে গগনচুম্বী ভবন নির্মাণ করা সম্ভবপর হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের আরেক বিজ্ঞানী এম আতাউল করিম, ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস ডারটমাউথের নির্বাহী উপাচার্য, মৌলভীবাজারের বড়লেখায় বড় হয়েছেন, গ্রামের স্কুলে থেকে লেখাপড়া করেছেন। গণিত অলিম্পিয়াড করতে তাঁর সঙ্গে একবার কুমিল্লা যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল, তিনি ছাত্রদের বলছিলেন, যে স্কুলে তিনি পড়েছেন, সেখানে বসার জন্য বেঞ্চ ছিল না, ক্লাসে তারা পিঁড়িতে বসতেন, মাদুরে বসতেন। কিন্তু তাঁর ছিল নানা রকমের বই পড়ার নেশা। তার বইপড়ার ক্ষুধা মেটাতে ওই ভাঙা স্কুলে একটা লাইব্রেরি বানাতে হয়েছিল। আর প্রকৌশলী এফ আর খানের একটা উক্তি তো শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ারের (এখন উইলিস টাওয়ার) নিচে তাঁর নামের সড়কটিতে খোদাই করেই লেখা আছে, এফ আর খান বলেছেন, ‘একজন প্রযুক্তিবিদের আপন প্রযুক্তিতে হারিয়ে যাওয়া উচিত নয় একেবারেই, তাকে অবশ্যই জীবনকে তারিফ করতে পারতে হবে, আর জীবন হলো, শিল্প, সংগীত, নাটক এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ।’ আসলে প্রতিটি মানুষের মধ্যেই আছে সম্ভাবনা। শিক্ষা হলো একটা পরশমণি। তার ছোঁয়ায় পাথর হোক, কাঠ হোক সোনা হতে পারে। চাই প্রতিভার যথাযথ পরিচর্যা। বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে বলতে গিয়ে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ লিখেছে, বাংলাদেশে প্রতিভার কোহিনূরের ছড়াছড়ি। শুধু ক্রিকেটে নয়, বিভিন্ন মাধ্যমেই বাংলাদেশিরা, বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভালো করছেন। একেবারে শীর্ষছোঁয়া সাফল্য অর্জন করছেন তাঁরা। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী এম জাহিদ হাসানের সাফল্যকে শুধু বাংলাদেশের সাফল্য বলে আমরা কুক্ষিগত করতে চাই না; তা সংগত নয়, যথাযথও নয়। কিন্তু বাংলাদেশের যে ৬০ ভাগ মানুষ এখনো তারুণ্যের ঘরে, তাদের কাছে এই বার্তা নিশ্চয়ই পৌঁছে যাচ্ছে একটার পর একটা সাফল্যের সংবাদে যে, আমাদের হারানোর আর কিছু নাই, আমাদের জয় করার জন্য সামনে পড়ে আছে সমস্ত পৃথিবী। আমাদের সাফল্যগুলো এখন আর উইয়ের ঢিবির সমান হবে না, হবে এভারেস্টের চেয়েও বড়, সমগ্র বিশ্ব এখন আমাদের কর্মক্ষেত্রে, আকাশ হলো আমাদের সীমারেখা। যে কোটি কোটি ছেলেমেয়ে যাচ্ছে স্কুলে-কলেজে, যাদের হৃদয় একবারের জন্য হলেও স্পর্শ পাচ্ছে শিক্ষা নামের পরশমণির, তাদের ব্যক্তিগত এবং সম্মিলিত আলোয় এই বাংলাদেশ আলোকিত হয়ে উঠবেই। আমাদের পড়তে হবে, সব ধরনের বই, আমাদের প্রিয় বিষয়টা নিয়ে কাজ করতে হবে খুব মন দিয়ে, প্রতিভা আর কিছুই নয়, সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে, সবচেয়ে বেশি একাগ্রতা দিয়ে, ঐকান্তিকতা নিয়ে কোনো কাজ করার ক্ষমতা, তাকেই বলে সাধনা, আর সাধনাই সিদ্ধি দেবে যেকোনো ক্ষেত্রে। সেটা হতে পারে বৈজ্ঞানিক গবেষণায়, সেটা হতে পারে দারিদ্র্য কমাতে, সেটা হতে পারে ক্রিকেটের মাঠে। চারদিকে এক নতুন বাংলাদেশের জয়ধ্বনি, যে বাংলাদেশ অজেয়, যে বাংলাদেশ দুর্বার, অপ্রতিরোধ্য। চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই, বাংলাদেশের কোটি কোটি হৃদয়ে আলোর কণা জ্বলছে, দূর থেকে বাংলাদেশকে দেখে মনে হচ্ছে একটা আলোর হাট।
প্যালেস রিসোর্ট, বাহুবল, হবিগঞ্জ থেকে

ভারত-পাকিস্তান প্রস্তাবিত বৈঠক নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া

অজিত দোভাল, সারতাজ আজিজ
ভারত-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের দিন যত এগোচ্ছে, ততই চড়তে শুরু করেছে উত্তেজনার পারদ। কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার প্রস্তাবিত বৈঠক নিয়ে শুরু হয়েছে দুই দেশের মধ্যে টানাহ্যাঁচড়া। বৈঠক আরও একবার বাতিল হতে যাচ্ছে কি না তা নিয়ে শুরু হয়েছে সংশয়। এবারও বিতর্কের কেন্দ্রে কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী হুরিয়ত নেতারা। গত জুলাইয়ে এই নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কারণেই ভারত পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের আলোচনা বাতিল করে দেয়। এবারও বৈঠকের ঠিক আগে ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার আবদুল বাসিত তিন হুরিয়ত নেতাকে দিল্লি আসার আমন্ত্রণ জানান। উপলক্ষ্য, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সারতাজ আজিজের সঙ্গে বৈঠক। ক্ষুব্ধ ভারত গত বৃহস্পতিবার জানিয়ে দেয়, দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠকের আগে অথবা পরে কাশ্মীরের হুরিয়ত নেতাদের সঙ্গে কোনো বৈঠক ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ এ হুঁশিয়ারির কথা গতকাল শুক্রবার জানিয়ে দেন। পাকিস্তান কিন্তু তা গায়ে মাখেনি। গতকালই পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। এর পরপরই পাকিস্তান জানিয়ে দেয়, কাশ্মীর নিয়ে ভারতের চোখ রাঙানিতে তাদের কিছু যায় আসে না। হুরিয়ত নেতা সাবির শাহও জানিয়ে দেন, সারতাজ আজিজের সঙ্গে তাঁদের বৈঠক ২৩ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় হচ্ছে।
সারতাজ আজিজ কাল রোববার দিল্লি আসছেন। সোমবার ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা। কিন্তু বারবার বলা সত্ত্বেও গতকাল পর্যন্ত আজিজের কর্মসূচি সম্পর্কে পাকিস্তান কিছুই জানায়নি। তবে তা না জানালেও ভারতের চাহিদা মেনে তারা যে শুধু সন্ত্রাসের মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবে না, তা জানিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলায় পাকিস্তানের যোগসাজশের প্রমাণ নিয়ে ভারতও প্রস্তুত। সম্প্রতি উধমপুরে বিএসএফের ওপর হামলায় ধরা পড়া পাকিস্তানি সন্ত্রাসী মহম্মদ নাভেদকে জেরা করে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তা অজিত দোভাল সারতাজ আজিজকে দেবেন। নাভেদ যে পাকিস্তানি নাগরিক, পাকিস্তান এখনো তা স্বীকার করেনি। হুরিয়তদের নিয়ে জটিলতায় এখনো স্পষ্ট নয় বৈঠক আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না। ইয়াসিন মালিক দিল্লি আসছেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু অন্যরা এলে এবং বৈঠক নিয়ে পাকিস্তান অটল থাকলে হুরিয়ত নেতাদের দিল্লিতেই আটকে দেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে ২৪ আগস্ট পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি বাতিল করবে কি না, সংশয় রয়েছে তা নিয়েও। কমনওয়েলথ সম্মেলন বাতিল: ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি কনফারেন্স বাতিল করে দিয়েছে পাকিস্তান। ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পার্লামেন্টের স্পিকারকে আমন্ত্রণ জানাতে সংস্থার সদস্যদেশগুলোর চাপে নাখোশ হয়ে পাকিস্তান বৃহস্পতিবার এ সিদ্ধান্ত জানায়।

মানুষই বড় শিকারি?

‘অতি শক্তিশালী শিকারি প্রাণী’ হিসেবে মানুষ অতুলনীয়। মানুষের শিকারের ধরন নির্মম। আধুনিক নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ নিজেদের সর্বনিম্ন ঝুঁকিতে রেখেই বেশি বেশি শিকার সম্পন্ন করতে পারছে। মানুষের এই আধিপত্যের কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অন্যান্য প্রাণী প্রজাতির ওপর। শিকারি হিসেবে মানুষের নিষ্ঠুরতা এবং বিভিন্ন প্রাণীর ওপর তার প্রভাব নিয়ে সারা বিশ্বের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কানাডার একদল বিজ্ঞানী এসব কথা জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার এ গবেষণা প্রতিবেদন সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়, সামুদ্রিক প্রাণীদের শিকার হয়ে পূর্ণবয়স্ক মাছের সংখ্যা যত কমেছে, মানুষের কারণে কমেছে তার চেয়ে ১৪ গুণ বেশি। আর স্থলে ভালুক, নেকড়ে ও সিংহের মতো বিভিন্ন শিকারি প্রাণী হত্যা করছে মানুষ।
এসব প্রাণী পরস্পরকে যে হারে শিকার করে, সেই তুলনায় তারা নিজেরাই মানুষের শিকার হচ্ছে নয় গুণ বেশি। গবেষণায় নেতৃত্ব দেন কানাডার ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষণবিদ ক্রিস ড্যারিমন্ট। তাঁরা দেখতে পান, শিকারি মানুষের আগ্রাসন জলে-স্থলে অন্যান্য প্রজাতির জন্য এতটাই বিপর্যয়কর যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব প্রাণীর ক্রমবিকাশের ধারাই বদলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যান্য শিকারি প্রাণীর চেয়ে মানুষের শিকারের ধরন আলাদা। ড্যারিমন্ট বলেন, আগে মানুষ বিপজ্জনক নানা উপায়ে শিকার করত। এখন অত্যাধুনিক বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাণী হত্যা করা হচ্ছে। স্তন্যপায়ী প্রাণী হত্যায় বন্দুকের গুলি এবং মাছ শিকারে জাল ও হুক ব্যবহার করা হচ্ছে। নিজেদের নিরাপদে রেখেই শিকার করার এই সুবিধাটা অন্য কোনো শিকারি প্রাণী পায় না।
সূত্র: বিবিসি ও লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস

বন্যায় ফসলের সর্বনাশ by সৈকত দেওয়ান ও পলাশ বড়ুয়া

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে খাগড়াছড়ি জেলার চারটি উপজেলার নিচু এলাকা। ২১ আগস্ট বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অনেক জায়গায় ফসলের খেত এখনো পানির নিচে। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা না গেলেও পাহাড়ি ঢলে বহু এলাকার আমন খেত নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা।
২১ আগস্ট সকালে সদর উপজেলার বিজিতলা, গড়গর্য্যাছড়ি ও ঘাটপাড়া গ্রামে ঘুরে বন্যার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি চোখে পড়েছে। চেঙ্গী নদীর তীরবর্তী এসব এলাকার বেশির ভাগ ফসলের খেত পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। এ কারণে প্রবল বর্ষণে সময় সৃষ্ট হয়েছে পাহাড়ি ঢল। পাশাপাশি আছড়ে পড়েছে চেঙ্গী নদীর স্রোত। ফলে এখানকার বেশির ভাগ আমনের খেত পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও জমির চারা ভেসে গেছে, আবার কোথাও পলি পড়ে ঢেকে গেছে জমি। এ মৌসুমে আর আমন চাষ করতে পারবেন না, এমন আশঙ্কা করছেন এখানকার কৃষকেরা।
কথা হয় গড়গর্য্যাছড়ি গ্রামের কৃষক দিলীপ কুমার চাকমার (৪৫) সঙ্গে। তিনি জানান, এবার তিন কানি পরিমাণ জমিতে আমনের চাষ করেছিলেন তিনি। বন্যায় তাঁর ফসলের খেত পলিতে সম্পূর্ণ ঢেকে গেছে। এতে খেতে লাগানো চারা নষ্ট হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
বন্যায় জেলার ক্ষয়-ক্ষতির হিসাব পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেছেন। সদর উপজেলার পাশাপাশি দীঘিনালা, মহালছড়ি ও মাটিরাঙ্গার অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার আমন খেতের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তাঁরা।
খাগড়াছড়ি পৌরসভার মেয়র রফিকুল আলম জানান, বন্যায় খাগড়াছড়ি পৌরসভার অধিকাংশ নিচু এলাকা তলিয়ে গেছে। দুর্গত মানুষের আশ্রয় দানের জন্য তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় খুলে দেওয়া হয়েছে। আশ্রয় নেওয়া দুর্গত মানুষের জন্য গত বৃহস্পতিবার রাতে খাবারেরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তিনি আরও জানান, একটানা বর্ষণে ২০ আগস্ট সকালে চেঙ্গী নদীর পানি নদীর পাড়ের সমান্তরালে প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে বহু স্থানে ফসলের খেত ভেসে গেছে। শহরের মুসলিমপাড়া, বাঙ্গালকাটি, খবংপুড়িয়া ও রাজ্যমনি এলাকা কোমরপানিতে ডুবে গেছে। গত শুক্রবার বৃষ্টি থামার পর পানি নেমে গেলেও নিচু এলাকাগুলো এখনো জলমগ্ন হয়ে আছে।
সদর উপজেলার বইরে দীঘিনালা, মহালছড়ি ও মাটিরাঙ্গা থেকেও বন্যায় ক্ষয়-ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় বহু গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। ডুবে গেছে ঘরবাড়ি ও ফসলের খেত।
দীঘিনালা উপজেলায় কয়েক হাজার ঘরবাড়ি ও ফসলের খেত বন্যায় ডুবে গেছে। উপজেলার মেরুং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বলেন, কেবল মেরুং ইউনিয়নের এক হাজার পরিবার বন্যাকবলিত হয়েছে। হাজার খানেক ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। মাইনী নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
দীঘিনালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহিনুর ইসলাম জানান, উপজেলার ৫৭০ হেক্টর আমন, ৪৮ হেক্টর আউশ ও ১৮ হেক্টর সবজির খেত বন্যায় নষ্ট হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে।
জেলার মহালছড়ি উপজেলা থেকেও বন্যায় ক্ষয়-ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। উপজেলার মাইসছড়ি ইউপির চেয়ারম্যান শান্তশীল চাকমা জানান, এই ইউনিয়নের অন্তত শ খানেক ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে যায়। কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যার পানি ধীরে ধীরে নামছে। ফলে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে। এতে আমন চাষে ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
মাটিরাঙ্গা উপজেলার তবলছড়ি, তাইন্দং ও বর্নাল—এই তিন ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে বলে জানান বর্নাল ইউপির চেয়ারম্যান আলী আকবর। বন্যার কারণে মাটিরাঙ্গা-তানাক্কাপাড়া সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে পানি নেমে গেলেও বন্যায় খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের আমন খেতের ক্ষতি হয়েছে। সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান চঞ্চুমনি চাকমা জানান, বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত বিভিন্ন দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখেছেন তিনি। উপজেলার কৃষিজমির পাশাপাশি বহু পুকুরও বন্যায় তলিয়ে গেছে বলে জানান তিনি। এসব এলাকার আমনের জমি দুদিন ধরে পানির নিচে রয়েছে।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান প্রথম আলোকে জানান, বন্যাদুর্গত লোকজনকে সহায়তা করার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে চাল, ডাল ও চিড়া বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রশাসনকে।
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে খাগড়াছড়ির বেশ কয়েকটি উপজেলার ফসলের খেত। ​ভেসে গেছে খেতে লাগানো আমনের চারা। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পাকা আউশ ধানের ছড়া দেখছেন দুই কৃষক। ছবিটি গতকাল খাগড়াছড়ি শহরের কালাডেবা এলাকা থেকে তোলা l নীরব চৌধুরী

পাক-ভারত বৈঠক নিয়ে সংশয়: দিল্লিতে কাশ্মিরী নেতা গ্রেফতার

দিল্লি যাওয়ার আগে শ্রীনগর বিমানবন্দরে সমর্থকদের উদ্দেশে
বিজয় চিহ্ন প্রদর্শন করেন শাবির আহমদ শাহ। দিল্লিতে
অবতরণের পর তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ : ইন্টারনেট
ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের শীর্ষ স্বাধীনতাকামী নেতা শাবির আহমদ শাহকে গতকাল ভারতীয় পুলিশ গ্রেফতার করেছে। পাকিস্তান ও ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠানের আগে গতকাল দিল্লি বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর তাকে ভারতীয় পুলিশ গ্রেফতার করে। পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপীয় বৈঠকের দিন যতই সামনে আসছে ততই যেন অস্থিরতা ও উত্তেজনা বাড়ছে। কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের পাক হাইকমিশনে আমন্ত্রণ জানানোকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে আদৌ বৈঠক হবে কি না তা নিয়ে শুরু হয়েছে সংশয়। বিতর্কের কেন্দ্রে কাশ্মিরের হুরিয়ত নেতারা। কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামী জামিল আহমদ জানান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নিরাপত্তা উপদেষ্টা সারতাজ আজিজের সাথে বৈঠক করতে শাবির আহমদ শাহ গতকাল ভারত অধিকৃত কাশ্মির থেকে বিমানে নয়াদিল্লি আসেন। শাবির শাহ ও তার দুই সহকর্মীকে নয়াদিল্লির পুলিশ বিমানবন্দর থেকে আটক করে গাড়িতে করে নিয়ে যায়। জামিল আহমদকেও পুলিশ আটক করেছে। সারতাজ আজিজের আজ রোববার দিল্লি আসার কথা।
ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামী নেতাদের সাথে পাকিস্তানিদের নেতাদের বৈঠক করার বিরোধী নয়াদিল্লি। ভারতের পুলিশ নয়াদিল্লিতে কাশ্মিরি নেতা শাবির শাহের গ্রেফতারের কথা নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার তিনজন কাশ্মিরি স্বাধীনতাকামী নেতাকে গৃহবন্দী করে ভারত। পরে অবশ্য তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র কাজী খালিলুল্লাহ জানান, ‘ভারতের সাথে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আড়ে হুররিয়াত নেতাদের সাথে পাকিস্তানের আলোচনা করা একটি স্বাভাবিক নিয়ম, এতে অস্বাভাবিক কিছুই নেই।’ গত শুক্রবার ভারত বলে, পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ তার ভারতীয় প্রতিপক্ষ অজিত দোভালের সাথে বৈঠক করতে নয়াদিল্লি সফরকালে কাশ্মিরের সর্বদলীয় হুররিয়াত কনফারেন্সের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করা উচিত হবে না। তারা এ ধরনের বৈঠক করা সঠিক নয় বলে উল্লেখ করে। তবে পাকিস্তান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এ ভারতীয় পরামর্শকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আজিজ-দোভাল বৈঠক নিয়ে সংশয়
এ দিকে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপীয় বৈঠকের দিন যতই সামনে আসছে ততই যেন অস্থিরতা ও উত্তেজনা বাড়ছে। কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের পাক হাইকমিশনে আমন্ত্রণ জানানোকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে আদৌ বৈঠক হবে কি না তা নিয়ে শুরু হয়েছে সংশয়। বিতর্কের কেন্দ্রে কাশ্মিরের হুরিয়ত নেতারা।
সীমান্তে গোলাগুলি ও কাশ্মির নিয়ে কূটনৈতিক অচলাবস্থা উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আগে পাক-ভারত উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। গত জুলাই মাসে রাশিয়ায় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার বৈঠককে সম্পর্ক উন্নয়নের পথে বিরাট অগ্রগতি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু তার পর থেকেই দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
গত বছরের জুলাইয়ে স্বাধীনতাকামী নেতাদের সাথে বৈঠক করার কারণেই ভারত পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের আলোচনা বাতিল করে দিয়েছিল। এবারো বৈঠকের ঠিক আগে ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার আবদুল বাসিত তিন হুরিয়ত নেতাকে দিল্লি আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সারতাজ আজিজের সাথে বৈঠকের জন্যই এ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফলে দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠকের আগে অথবা পরে কাশ্মিরের স্বাাধীনতাকামী নেতাদের সাথে কোনো বৈঠক ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে ুব্ধ ভারত সরকার। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ গত শুক্রবার এ হুঁশিয়ারি জানান। তবে পাকিস্তান সে কথার কোনো পাত্তাই দেয়নি। শুক্রবার পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসেন। ওই আলোচনার পরই পাকিস্তান জানায়, কাশ্মির নিয়ে ভারতের চোখ রাঙানিতে তাদের কিছু যায় আসে না। হুরিয়ত নেতা শাবির শাহও জানিয়েছেন, ২৩ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় সারতাজ আজিজের সাথে তাদের বৈঠক হবে। সারতাজ আজিজ আজ দিল্লি আসবেন। সোমবার ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে তার বৈঠক হওয়ার কথা। কিন্তু বারবার বলা সত্ত্বেও গতকাল পর্যন্ত আজিজের কর্মসূচি সম্পর্কে কিছুই জানায়নি পাকিস্তান সরকার।
আমি দিল্লি যেতে প্রস্তুত : সারতাজ আজিজ
পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ গতকাল শনিবার বলেন, হুররিয়াত নেতাদের সাথে তার পরিকল্পিত বৈঠক নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ সত্ত্বেও তিনি তার ভারতীয় প্রতিপক্ষের সাথে আলোচনার জন্য দিল্লি যেতে প্রস্তুত রয়েছেন। সরতাজ আজিজ গতকাল সকালে ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় মিডিয়ার বিরুদ্ধে বিনা কারণে বিতর্ক সৃষ্টির অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার পক্ষ থেকে আমি এখনো এনএসএ আলোচনার জন্য বিনা শর্তে দিল্লি যেতে প্রস্তুত আছি।’ ভারত রোববারের বৈঠকটি ‘কার্যত বাতিল করেছে’ উল্লেখ করে বলেন, ‘সবসময়ের মতো ভারত তার মিডিয়ার মাধ্যমে তার কূটনীতির একটি দিক পরিচালনা করছে।’ গত শুক্রবার ভারত পাকিস্তানকে বিরল এ নিরাপত্তা বৈঠকের প্রাক্কালে কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামী নেতাদের সাথে বৈঠক না করার আহ্বান জানায়। এতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।

শামসুন্নাহার নিজামীর জবাব

‘কামারুজ্জামানের চিঠি এবং জামায়াতের সংস্কার প্রসঙ্গ’ শীর্ষক বইটির সম্পাদনা করেছেন সমাজ ও সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান পরিচালক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। সমাজ ও সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র থেকেই বইটি প্রকাশিত হয়েছে। এ বইয়ে ঠাঁই পেয়েছে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের লেখা সেই বহুল আলোচিত চিঠি। দীর্ঘ যে চিঠিতে তিনি জামায়াতে সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ওই প্রস্তাবের জবাব হিসেবে সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় দুই পর্বের একটি নিবন্ধ লেখেন জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি শামসুন্নাহার নিজামী।
দ্বিতীয় পর্বে তিনি লিখেছেন, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের মাধ্যমে মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্বের অবসান ঘটানোর লক্ষ্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কাজ করে যাচ্ছে। এ কাজ কোনো মনগড়া বা আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে জামায়াতে ইসলামী নির্ধারণ করেনি। বরং কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ কাজের কথা পরিস্কার করে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে তৈরি করেছেন এ দায়িত্ব পালনের জন্য। যা কুরআনে কালামে পাকে আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি দুনিয়াতে আমার প্রতিনিধি পাঠাব’।
এই প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন, ফেরেশতাদেরকে দেননি। ফেরেশতারা আল্লাহর কর্মচারি। আল্লাহ যে হুকুম তাদের দেন তার বাইরে কিছু করার ক্ষমতা বা এখতিয়ার আল্লাহ তাদেরকে দেননি। কিন্তু মানুষকে এ ক্ষমতা আল্লাহ দিয়েছেন। এ দায়িত্ব পালনের জন্য যুগে যুগে নবী-রসুল পাঠিয়েছেন। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মানবতার পারফেক্ট মডেল।
যেহেতু এ কাজের জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাই এ কাজ মানুষের জন্য ফরজ। দুনিয়ার মানুষের সকল রকমের অশান্তি ও বিপর্যয় থেকে বাঁচানোর এটাই একমাত্র পথ। মানুষকে জুলুম-নির্যাতন ও যাবতীয় শোষণ থেকে মুক্তিদানের জন্য আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.) কাজ করেছেন। মানুষ মানুষের দাস হবে না। সবাই একমাত্র আল্লাহর হুকুম মেনে চলবে। দাসত্ব বন্দেগী করবে একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহপাক বলেছেন ‘হে মানুষ আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার কর। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ নেই।’ (সূরা হুদ-৮৪)
‘তাদেরকে সবকিছু ছেড়ে, সকল দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার করা এবং তারই আনুগত্য করে চলার আদেশ করা হয়েছে মাত্র।‘ (সূরা আল বাইয়্যেনাহ-৫)
নবী-রসুলগণের মাধ্যমে আল্লাহপাক যে জীবন বিধান পাঠিয়েছেন তার মূল কথাই হলো, আইন রচনা, নির্দেশ দান ও বিধান প্রণয়নের কোন অধিকার মানুষের নেই। এ অধিকার একমাত্র আল্লাহর। ‘আল্লাহ ছাড়া আর কারো নির্দেশ দান ও আইন রচনার অধিকার নেই। তাঁর আদেশ এই যে, আল্লাহ ছাড়া কারো বন্দেগী বা দাসত্ব কবুল করো না। বস্তুত এটাই সঠিক ও নির্ভুল জীবন ব্যবস্থা।’ (সূরা ইউসুফ-৪০) আইন রচনা করার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। এ অধিকার কোন মানুষের নেই, এমনকি নবীদেরও নেই। নবী নিজেও একমাত্র আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলেছেন। নবীর অনুসরণ করা ছাড়া আল্লাহর হুকুম পালনও সম্ভব নয়। কুরআনের এ আয়াতগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি কোনো ব্যক্তি, বংশ পরিবার, শ্রেণী বা দল, এমনকি রাষ্ট্রও প্রভুত্বের অধিকারী নয়। আইন রচনা ও বিধান প্রণয়নের অধিকার আল্লাহ ছাড়া আর কোরো নেই। আল্লাহর দেয়া আইনের কোনোরূপ পরিবর্তন বা সংশোধন করার অধিকারও কারও নেই।
আল্লাহপাক নবী (সা.)-এর মাধ্যমে যে বিধান দুনিয়ায় পেশ করেছেন তাই ইসলামী রাষ্ট্রের চিরন্তন ভিত্তিগত আইন। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যও আল্লাহপাক নির্ধারণ করে দিয়েছেন: ‘আমি আমার নবীদেরকে সুস্পষ্ট বিধানসহ প্রেরণ করেছি। কিতাব ও ‘মিযান’ তাদেরকে আমি দান করেছি। এর সাহায্যে মানুষ সুবিচার ও ইনসাফ কায়েম করতে পারবে। আমি ‘লৌহ’ও দিয়েছি। এতে বিরাট শক্তি ও মানবতার অশেষ কল্যাণ নিহিত রয়েছে।’ (হাদীদ-২৫) এ আয়াতে ‘মিযান’ শব্দটিতে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থার কথা বোঝানো হয়েছে। এ অনুযায়ী সমাজে সামাজিক সুবিচার কায়েমই এর লক্ষ্য, যা ছিল আম্বিয়ায়ে কেরামের একমাত্র কাজ। ‘এদেরকে আমি যদি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা এবং জনশক্তি দান করি তাহলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দিবে, ভাল ও কল্যাণকর কাজ করবে এবং অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখবে।’ (সূরা আল হাজ্ব-৪১)
কুরআনে কালামে পাকের এ আয়াতগুলো থেকে এ কথা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য শুধু মানুষকে জুলুম-নিপীড়ন থেকে মুক্তি দেয়া ও দেশকে বহিরাক্রমণ থেকে রক্ষা করাই নয় বরং কুরআন অনুযায়ী সামাজিক সুবিচারের সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা। আল্লাহর বিধান অনযায়ী পাপ কাজের সমস্ত উৎস বন্ধ করা এবং পুণ্য ও কল্যাণের সমস্ত পথ খুলে দেয়া। সমাজ ও সংস্কৃতির প্রত্যেকটি দিক ও বিভাগকে এটি স্বীয় বিশিষ্ট নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংস্কারমূলক কর্মসূচি অনুযায়ী গঠন করে। অর্থাৎ মানুষের গোটা জীবনকে এর প্রভাবাধীন করে নেয় এবং এ ধরনের সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধান আল্লাহ ছাড়া আর কারও পক্ষেই দেয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের ভূমিকায় এ কথাগুলো পরিস্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
মূলত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রচলিত অর্থে কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী আন্দোলন। কুরআন এবং সুন্নাহর আলোকে এবং নির্দিষ্ট গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে এ দল পরিচালিত হয়। বিরোধী কোন শক্তির পক্ষ থেকে কেউ আক্রমণ করল কি না তার মোটেও পরোয়া করে না জামায়াতে ইসলামী। অতীতে নবী-রাসুলগণও এ পরোয়া করেননি। বরং তাদের অবস্থা এমন ছিল যেন মৌচাকে ঢিল মেরে সেইখানে দাঁড়িয়ে থাকা, যেন সমস্ত মৌমাছিকে আক্রমণ করার জন্যে আমন্ত্রণ জানানো। এ কাজ সবার পক্ষে করা সম্ভব নয়। যারা এ উদ্দেশ্যকে নিজেদের জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে তারাই এ কাজের উপযুক্ত। এ আন্দোলনের কর্মী বা নেতা হলেই চলবে না বরং এর আদর্শের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। তাদেরকে হতে হবে কুরআন সুন্নাহর অন্তর্নিহিত ভাবধারা এবং এর খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অভিজ্ঞ। এ ব্যাপারে কোন বিশিষ্ট নাগরিক, প্রবীণ আলেম বা পণ্ডিত ব্যক্তির প্রাধান্য দেওয়া যাবে না।