Saturday, September 28, 2013

পরীক্ষার ফল নিয়ে বিষোদ্গার নয় by বিমল সরকার

চাটুকারিতা ও তোষামোদী যে একটি জাতিকে দিনে দিনে কী অন্ধকার ও গভীর অতলে নিয়ে যেতে পারে, এর প্রচুর দৃষ্টান্ত আমাদের চারপাশে রয়েছে। চাটুকার ও তোষামোদকারীদের কাজই হচ্ছে কারও বা কোনো কিছুর আসল রূপ, চিত্র, পরিবেশ বা পরিস্থিতিকে আড়াল করে রেখে সবাইকে বিভ্রান্ত করা। যে কোনোভাবেই হোক কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করাই তাদের আসল লক্ষ্য। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর ওই ফলাফলকে কেন্দ্র করে সরকারের একেবারে উচ্চমহল থেকে শুরু করে বিরোধী দল এবং বলতে গেলে সর্বত্র এবার যত আলোচনা, সমালোচনা, মন্তব্য ও অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে অতীতে কোনো পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে এমনটা লক্ষ্য করা যায়নি। ফলাফলের ব্যাপারে রাজনীতিকদের পরস্পরবিরোধী মন্তব্য রাজনীতির ক্ষেত্রে সাময়িক কিছুটা প্রভাব ফেললে ফেলতেও পারে, তবে তা ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো সুফল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না।
প্রধানমন্ত্রী এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার এবং জিপিএ-৫ কমার জন্য সরাসরি বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করেছেন। গত ৩ আগস্ট এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন নিজের সরকারি কার্যালয় গণভবনে ফলাফলের কপি গ্রহণকালে তিনি বলেন, পরীক্ষা চলাকালে বিরোধী দলের হরতালের কারণে ৩২টি বিষয়ের পরীক্ষার সূচি পরিবর্তন করতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, ফলাফল খারাপের জন্য পরীক্ষার্থী ও শিক্ষকরা দায়ী নন। এর জন্য বিএনপি ও জামায়াত-শিবির দায়ী। যাদের ফলাফল খারাপ হয়েছে, তারা আগামীতে ভালো করবে বলেও প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। পরবর্তী সময়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিবসহ দায়িত্বশীল আরও অনেকেই। এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে এসব মন্তব্যের রেশ ধরে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষস্তরের বেশ কয়েকজন নেতা পৃথকভাবে এবারের ফল বিপর্যয়ের জন্য সরকারের নতুন শিক্ষানীতি, সৃজনশীল পদ্ধতির ব্যাপারে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব এবং ক্ষমতাসীন দলকে দায়ী করে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছেন। বিরোধী শিবিরের নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতির বিপরীতে শিক্ষামন্ত্রী এ নিয়ে পাল্টা বিবৃতিও দিয়েছেন।
এদিকে এইচএসসির ফলাফল নিয়ে ফেল করা এবং কাক্সিক্ষত ফলাফল থেকে বঞ্চিত দাবিদার পাস করা পরীক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা, অসন্তোষ ও ক্ষোভের অন্ত নেই। এসব পরীক্ষার্থী ফলাফল পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এবং দেশের আরও কয়েকটি স্থানে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে। বিক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরা তাদের দাবি-দাওয়ার কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও শিক্ষামন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছে। এসব বিক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীর কর্মকাণ্ড এতদিনে অবশ্য অনেকটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, উপর্যুপরি হরতালের যাঁতাকলে গোটা জাতির একেবারে নাভিশ্বাস উঠলেও উল্লিখিত পরীক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছে, হরতাল নয়, তাদের পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ার আসল কারণ তড়িঘড়ি করে খাতা দেখা।
আসলে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে এ পর্যন্ত যারা বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন কিংবা মন্তব্য বা অভিমত ব্যক্ত করেছেন, তারা অনেকটাই আবেগপ্রবণ অথবা কারও না কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তা করেছেন বলে মনে হয়েছে। যার ফলে এসবের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় সামান্যই। আমাদের দেশে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল সার্বিকভাবে কখনও সুখকর ছিল না, এখনও নেই। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এক একটি পরীক্ষা এবং এগুলোর ফলাফলের দিক দিয়ে গত ৪২ বছরে আমরা খুবই দুঃসময় অতিক্রম করে এসেছি। আর এসব কিছুর জন্য প্রধানত দায়ী শিক্ষার সঙ্গে জড়িত নানা স্তরের কর্তাব্যক্তিরা। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব কর্তাব্যক্তি নিজেরা কখনও কোনো কিছুর দায় স্বীকার করতে চান না। বছরের পর বছর তাদের অবহেলা, উদাসীনতা, খামখেয়ালিপনা ও দায়িত্বহীনতার মাশুল গুনতে হয় হাজার হাজার, লাখ লাখ শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের। নিজেদের কৃতকর্ম, বিশেষ করে দুর্বলতা, ব্যর্থতা ও ত্র“টি-বিচ্যুতিগুলোকে আড়াল করে রাখার জন্য অতিউৎসাহী ওই কর্তাব্যক্তিরাই দেশে চালু করেছেন পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার আগে সরকার প্রধানের হাতে ফলাফলের কপি তুলে দেয়ার রীতি- যা বিশ্বের ইতিহাসে একেবারেই নজিরবিহীন! ভাবটা এমন যে, আমরা কেন ফলাফলের ব্যাপারে বলব (যেখানে সাধারণত নেতিবাচক বিষয়ই বেশি থাকে), যা বলার প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলুন।
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত স্বল্পকালীন রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এখন তারা সবাই মহাব্যস্ত আসল রাজনীতি নিয়ে। আর একটি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে হয়তো এ নিয়ে রাজনীতিকদের কেউ মুখ খুলবেন না। তবে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা যদি বরাবরের মতো কেবল চুপ করে বসেই থাকেন, তাহলে আমাদের এগোনোর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ফলাফল প্রকাশের দিন তারা যা বুঝিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবে প্রধানমন্ত্রী তাই বলেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে অব্যক্ত ও অপ্রিয় কথাগুলোও তো কাউকে না কাউকে বলতে হবে। হরতাল নয়, পরীক্ষার ফলাফল খারাপের কারণ হিসেবে যারা তড়িঘড়ি করে খাতা দেখাকে বড় করে দেখেছেন, তাদের ব্যাপারে আমার কিছুই বলার নেই। উপর্যুপরি হরতালের কারণে মোট ৫৮ দিনের পরীক্ষাসূচির মধ্যে ৩২টি বিষয় বা পত্রের পরীক্ষা যেখানে পেছাতে হয়েছে কিংবা ইংরেজির মতো একটি বিষয়ের পরীক্ষা পরপর চারবার পিছিয়ে শেষ পর্যন্ত টানা দেড় মাস পর অনুষ্ঠিত হলেও হরতালকে যারা গৌণ করে দেখেন, তাদের ব্যাপারে মন্তব্য করে কোনো ধরনের বিতর্কে জড়ানোর ইচ্ছাও আমার নেই। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর ডাকা হরতালকেই যারা ফলাফল খারাপের বড় কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন তারাও বোধ করি বিস্মৃত হয়ে পড়েছেন, হরতালের মধ্যেই পরীক্ষা দিয়ে এবার কোনো কোনো সাধারণ শিক্ষা বোর্ড ৭৯.১৩ ভাগ বা ৭৭.৬৯ ভাগ সফলতা লাভের গৌরব অর্জন করেছে। আরও স্মরণযোগ্য, এবারের পরীক্ষাতেই মাদ্রাসা বোর্ডে ৯১.৪৬ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৮৫.০৩ ভাগে গিয়ে পৌঁছেছে।। প্রধানমন্ত্রীর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে, ফলাফল খারাপের জন্য পরীক্ষার্থী ও শিক্ষকরা দায়ী নন, এবার যাদের ফলাফল খারাপ হয়েছে আগামীতে তারা ভালো করবে। কিন্তু কথা হল, আগামীতে পরীক্ষা দিয়ে আসলেই কি তারা সবাই ভালো করবে, ভালো করতে পারবে? আমার তো মনে হয় অকৃতকার্য পরীক্ষার্থী কেবল হাজার হাজার নয়, অঙ্কটি একেবারে লাখের কাছাকাছি উঠে যেতে পারে, সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে কোনো দিনই যাদের পাস করা সম্ভব হবে না। প্রশ্ন অবশ্য থেকেই যায়, তাহলে এরা এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় অবতীর্ণ হল কেন এবং কীভাবে? এসব প্রশ্নের যথার্থ উত্তর কাউকে না কাউকে তো দিতে হবে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, হরতালের ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ফলাফল খারাপের জন্য পরীক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একেবারে দায়মুক্ত করে দিলেন! ফলে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের যে মোটামুটি একটি রেওয়াজ রয়েছে, তার মধ্যেও নাকি দেখা দিয়েছে অনেকাংশে ভাটা। অন্য সব বিষয়ের মতো শিক্ষাক্ষেত্রে যদি আস্থা ও বিশ্বাসে চিড় ধরে, তাহলে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছু হতে পারে না। অথচ দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এমনকি যুগের পর যুগ আমরা এরূপ সংশয়, সন্দেহ, অনাস্থা, অবিশ্বাস ও অস্বাচ্ছন্দ্যের মধ্য দিয়ে পথ হেঁটে চলেছি। এসব থেকে কোনোভাবেই যেমন মুক্ত নয় খোদ সরকার, তেমনি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ আরও অনেকেই সহজে এর দায় এড়াতে পারবেন না। তবে পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, অবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য, শিখিয়ে দেয়া বুলি- যা গোটা জাতিকেই বিভ্রান্ত করতে পারে- এসব ব্যাপারে সবাইকে সব সময় সচেতন থাকতে হবে।
বিমল সরকার : কলেজ শিক্ষক

মোদিকে কেন ভয় by আসফি রশীদ

ভারতে আগামী বছরের মে মাসে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি তার প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদির নাম ঘোষণা করার পর দেশটির মুসলমান সম্প্রদায় এবং বিপুলসংখ্যক সেক্যুলার হিন্দু, খ্রিস্টান ও শিখ নাগরিক উদ্বিগ্ন। যদিও এ নির্বাচনে বিজেপির জয়লাভ এখনও নিশ্চিত নয়। নির্বাচনে কোনো দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের সম্ভাবনা প্রায় নেই। কোয়ালিশন সরকার হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কোয়ালিশন বিজেপির নেতৃত্বে হলে তবেই প্রধানমন্ত্রী হবেন নরেন্দ্র মোদি। তারপরও তাকে নিয়ে দেশে-বিদেশে উৎকণ্ঠার শেষ নেই। মোদিকে বিজেপি ও দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর একজন কট্টর নেতার প্রতিকৃতি হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। ২০০২ সালে গুজরাটে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জড়িত থাকার অভিযোগ এখনও তাড়া করে ফিরছে তাকে। ওই ঘটনায় হাজারের ওপর নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হয়, যাদের সিংহভাগই ছিল মুসলমান। নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি হল, ওই ঘটনায় তার প্রশাসন জড়িয়ে পড়েছিল অথবা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। নিরীহ মানুষদের হত্যার দায়ে প্রায় ৩০ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবল এখনও কারাভোগ করছেন। সম্প্রতি একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, ওই বিচারবহির্ভূত গণহত্যা ছিল নরেন্দ্র মোদিকে একজন শক্তিশালী হিন্দু নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে গুজরাট সরকারের একটি পরিকল্পিত নীতির বাস্তবায়ন।
স্বভাবতই ভারতের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশে এমন একজন সাম্প্রদায়িক নেতার সরকারের শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার আশংকায় দেশটির মুক্তবুদ্ধি ও উদারপন্থী মানুষ উদ্বিগ্ন। যে বহু মত, পথ, ভাষা, ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের ওপর ভিত্তি করে ভারত রাষ্ট্রটি দাঁড়িয়ে আছে- সেই আদর্শের বিরুদ্ধপথের একজন যাত্রী প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি দেশটিকে কোথায় নিয়ে যাবেন- এ প্রশ্ন অনেকেরই। প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে মোদির নাম ঘোষিত হওয়ার পর নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, তিনি মনে করেন না নরেন্দ্র মোদি একজন ভালো প্রধানমন্ত্রী হবেন। তার সেক্যুলার ইমেজ না থাকায় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হোন তা তিনি (অমর্ত্য সেন) চান না। ভারতের কন্নড়ভাষী প্রখ্যাত লেখক ড. ইউ আর আনানথামুরথি বলেছেন, নরেন্দ্র মোদি যে দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেই দেশে তিনি (আনানথামুরথি) থাকবেন না। ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। লক্ষেèৗয়ের দারুল উলুম নাদওয়াতুল শিক্ষায়তনের ইসলামবিষয়ক পণ্ডিত সালমান আল নাদভি বলেছেন, নরেন্দ্র মোদি ভারতের মুসলমানদের এক নম্বর শত্র“।
কেবল নিজ দেশে নয়, নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলে তার সঙ্গে বহির্বিশ্ব বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ক কী হবে, সে প্রশ্নও উঠছে। মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বিপর্যয়ের মুখে পড়ার আশংকা করছেন অনেকেই। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতের বৈদেশিক নীতি প্রণয়নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বড় ধরনের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মোদির বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্বের মনোভাব বরাবরই নেতিবাচক। ২০০২ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ (অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি) ঘোষণা করে গুজরাটে তাদের কূটনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র মোদির ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। তবে এটিও সত্য, যুক্তরাষ্ট্র তার নিজ স্বার্থেই বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যে পাঁচ ব্যক্তিকে তিনি তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করেন, তাদের একজন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। কিন্তু ডেমোক্র্যাট বারাক ওবামা রক্ষণশীল হিন্দু জাতীয়তাবাদী নরেন্দ্র মোদিকেও কি বন্ধু মনে করবেন? মোদিই বা কিভাবে ভুলে যাবেন তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অতীত আচরণের কথা?
মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের নাটকীয় উন্নতি হতে পারে। ইসরাইল ইতিমধ্যেই ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদার। ১৯৯২ সালে কংগ্রেস সরকার ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করলেও পরবর্তী সময়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়েই ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, সে সম্পর্ক শুধুই নিরাপত্তাবিষয়ক অংশীদারভিত্তিক ছিল না, বরং এর সঙ্গে একধরনের ধর্মীয় ও আদর্শগত অনুভূতিও কাজ করেছিল উভয় সরকারের মধ্যে। ২০০৩ সালে ওয়াশিংটনে মার্কিন ইহুদি সম্প্রদায়ের এক সমাবেশে বক্তৃতাদানকালে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ইসরাইলের সমন্বয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, ‘বর্তমান সময়ের কুৎসিৎ দর্শন সন্ত্রাসবাদ যৌথভাবে মোকাবেলা করা।’ ওই বক্তৃতায় ব্রজেশ মিত্র বলেছিলেন, মারাত্মক সন্ত্রাসবাদী প্ররোচনার ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের রাজনৈতিক ও নৈতিক ক্ষমতা থাকবে প্রস্তাবিত এ জোটের। সে বছরেরই সেপ্টেম্বরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন ভারত সফর করেন। সেটাই ছিল কোনো ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর।
সাধারণত ভারতীয় রাজনীতিকরা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভোট হারানোর ভয়ে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক এড়িয়ে চলেন। সে দেশে সফরে যান না অথবা কোনো ইসরাইলি নেতাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানান না। তবে মোদি হলেন মুষ্টিমেয় ভারতীয় রাজনীতিকদের একজন, যিনি ইসরাইল সফরে গিয়েছিলেন। কাজেই তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়াটাই স্বাভাবিক, যার পরিণামে মুসলমান প্রধান দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শীতল হয়ে উঠতে পারে। মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারতের প্রধান বৈরী প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশংকা প্রবল। আগের বিজেপি শাসনামলে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত দু’দফা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মোদির তুলনায় অনেক বেশি উদারপন্থী অটল বিহারি বাজপেয়ি। তার সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে কূটনৈতিক উদ্যোগও নিয়েছিল, যে নীতি বর্তমান কংগ্রেস সরকারের সময়েও অব্যাহত আছে। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে এ পরিস্থিতি কি পাল্টে যাবে?
ভারতে যেমন বিজেপির ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশে একই সম্ভাবনা রয়েছে বিএনপির। এর আগে বিএনপি (২০০১-০৬) ও বিজেপি (১৯৯৯-২০০৪) ক্ষমতায় থাকার সময়ে দু’দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত শীতল পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের এত অবনতি আর হয়নি। এ সময় ভারতের একটি বড় অভিযোগ ছিল, সে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশ আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়। তৎকালীন বিএনপি সরকার এ অভিযোগ বারবার অস্বীকার করলেও ভারতের বিজেপি সরকার তা বিশ্বাস করেনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভারতের মাথাব্যথার সবচেয়ে বড় এ কারণটি দূর করে এবং ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করে ভারতের হাতে তুলে দেয় বলেও খবর রয়েছে। বস্তুত বর্তমানে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এবং ভারতে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকায় মনে করা হয়েছিল, এটি দু’দেশের সম্পর্কোন্নয়নের জন্য সবচেয়ে অনুকূল সময়। দুর্ভাগ্যজনক যে, তা সত্ত্বেও দু’দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হয়নি। এজন্য ভারত সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বিরোধী দল বিজেপিও অনেক ক্ষেত্রে বাগড়া দিয়েছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ ভারতের পার্লামেন্টে সীমান্ত চুক্তি বিল পাসে বাধা দেয়া। নরেন্দ্র মোদি ইতিপূর্বে একাধিকবার তার ভাষায় ‘অবৈধ বাংলাদেশীদের প্রবেশে বিএসএফ কঠোর ব্যবস্থা না নেয়ায়’ ভারত সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সীমান্তে বাংলাদেশীদের প্রতি বিএসএফের আচরণের কথা সবাই জানেন- যা শুধু বাংলাদেশের নয়, ভারতের নাগরিকদের কাছেও সমালোচিত ও নিন্দিত হয়েছে। তারপরও সেটা যদি ‘কঠোর ব্যবস্থা’ না হয়ে থাকে, তাহলে মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের আচরণ কী হবে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে- এসব নিয়ে বাংলাদেশেরও উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে বৈকি। আগামীতে যিনিই ভারতের প্রধানমন্ত্রী হোন না কেন, আমরা তার কাছ থেকে সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ প্রত্যাশা করি।
আসিফ রশীদ : সাংবাদিক ও লেখক

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা বলতে কী বোঝায় by ড. হারুন রশীদ

শৃংখলমুক্ত স্বাধীন গণমাধ্যম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, দেশে গণমাধ্যম এখন অনেকটাই স্বাধীনতা ভোগ করছে। গণমাধ্যমের বর্তমান কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে একটি বড় পরিবর্তন আসে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি থাকাকালে মুদ্রণ এবং প্রকাশনা আইন সংশোধন করেন। ফলে কোনো সরকার চাইলেও এখন আর পত্রিকার প্রকাশনা (ডিক্লারেশন) বন্ধ করতে পারে না। এটা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বহুলাংশে নিশ্চিত করেছে। আর যে সমাজে গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম অনেকাংশেই হ্রাস পায় এবং একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের গুরুদায়িত্ব হচ্ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের গণমাধ্যম দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার এ কথা বলা যায় নির্দ্বিধায়। সরকারি দল, বিরোধী দলের নেতাকর্মী কিংবা যত বড় শক্তিশালী ব্যক্তিই হোন না কেন, তাদের হাঁড়ির খবর বের করে আনতে গণমাধ্যম বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়। এর কারণ গণমাধ্যমকে প্রতিনিয়ত পাঠকের কাছে জবাবদিহি করে টিকে থাকতে হয়। তাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে তার স্বাধীন সত্তার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা ব্যতিরেকে বিকল্প কিছু নেই। যারা এ দৌড়ে শামিল হবেন না, তারা পিছিয়ে পড়বেন, প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না এবং এক সময় সেসব গণমাধ্যমের অপমৃত্যু হবে। এটাই তাদের নিয়তি।
বলতে গেলে এক্ষেত্রে এক ধরনের নীরব কিংবা প্রকাশ্য প্রতিযোগিতাও আছে। কারা কোন খবরটি কত তাড়াতাড়ি পাঠকের কাছে কতটা নির্ভুলভাবে পৌঁছাতে পারে- এই মানসিকতা তাদের নিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। এ প্রতিযোগিতা পেশাদারিত্বেরই একটি অংশ। পেশাদারি মনোভাব না থাকলে গণমাধ্যম তার সঠিক চরিত্র বজায় রাখতে পারবে না। এই পেশাদারিত্ব হচ্ছে আসলে পাঠকের কাছে দায়বদ্ধতা। প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে অনেক সময় সঠিকভাবে সঠিক সংবাদ উপস্থাপন সম্ভব হয় না। এখানেই দায়বদ্ধতার ঘাটতির বিষয়টি চলে আসে। এছাড়া অনেক বিষয় আছে যা জনসম্মুখে (পাবলিকলি) আসা উচিত নয়। কিন্তু প্রতিযোগিতার দৌড় কখনও কখনও পরিবেশকে অসুস্থ করে তোলে। ফলে গণমাধ্যম কখনও সমাজে ক্ষতির কারণ হয়। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে গণমাধ্যমকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক এবং বাহক হতে হবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তিতে বিভাজিত সমাজ ব্যবস্থায় এর অন্যথা দেখা যায় এখানে। কোনো কোনো গণমাধ্যম দল ও গোষ্ঠীর পক্ষ হয়ে কাজ করে স্বার্থসিদ্ধির জন্য। দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রেও কোনো কোনো গণমাধ্যম পক্ষপাতমূলক আচরণ করে কখনও কখনও। বিশেষ করে গণমাধ্যমের মালিক যে নীতি ও আদর্শ দ্বারা পরিচালিত, সেই গণমাধ্যমে সেই নীতি-আদর্শের প্রতিফলন দেখা যায়। এটা গণমাধ্যমের নীতি-আদর্শের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অবশ্যই সেই দেশের সংবিধান এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের আলোকেই প্রতিষ্ঠিত।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে। কিন্তু আদালতের কার্যক্রম গণমাধ্যমে বিশেষভাবে উঠে আসছে না। কোনো কোনো গণমাধ্যম বরং উল্টো অবস্থান নিয়েছে, যা স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা এবং নীতি-আদর্শের বলিদান ছাড়া আর কিছুই নয়। বিচারাধীন যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধগুলো সাক্ষ্য-প্রমাণে যেভাবে উঠে আসছে, অনেক গণমাধ্যমই সেগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরছে না। একাত্তরে ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগসহ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের চরিত্র নতুন প্রজন্মর কাছে তুলে ধরা গণমাধ্যমের অন্যতম দায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত একটি দেশ সঠিক ইতিহাস আশ্রয়ী হয়ে না চলতে পারলে তার কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছানো কখনোই সম্ভব নয়।
আমাদের দেশে গণমাধ্যমের আরেকটি প্রধান চরিত্র হল সরকারবিরোধিতা। কোনো কোনো সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম অকারণে সরকার বিরোধিতায় এতটাই মেতে উঠে যে, সরকারকে তারা জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে চায়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণার জন্ম নেয়, যা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দেখা দেয়। গণমাধ্যমে অবশ্যই সরকারের সমালোচনা থাকবে। বিশেষ করে বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের রাজনীতি যেখানে কালচারে পরিণত হয়েছে, সেখানে গণমাধ্যম কার্যত রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিরোধী দলের ভূমিকায়ই পালন করছে। বস্তুত গঠনমূলক সমালোচনা গণতন্ত্রের ভিতকে আরও মজবুত করতে পারে। গণমাধ্যমকে এমন আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে যাতে বিশেষ কোনো দল বা গোষ্ঠী অন্যায়ভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ না পায়। অনেক সময় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এমন সংবাদ পরিবেশন করা হয় যা বিদ্বেষপূর্ণ, চরিত্রহনন ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে এই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হন। পরে যদি ভুল স্বীকার করা হয়, তাহলেও কিন্তু ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ মাধ্যমে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যায়।
দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখা হওয়া উচিত গণমাধ্যমের মূল নীতি। কিন্তু অনেক সময় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থই বড় হয়ে ওঠে। কোনো কোনো গণমাধ্যম মালিকের স্বার্থকেই বড় করে দেখে। কারণ মালিকের বিপুল অর্থলগ্নির কারণেই তো ওই গণমাধ্যমটি আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছে। তাই টিকে থাকার স্বার্থে তাকে আপস করতে হয়। মালিক যদি ঋণখেলাপি হন তাহলে ওই গণমাধ্যমে ঋণখেলাপি সম্পর্কে কোনো সংবাদ প্রকাশিত হবে না। যদি হাউজিং ব্যবসায়ী হন, তাহলেও ওই সম্পর্কে নেতিবাচক কোনো সংবাদ প্রকাশিত হবে না। যদি কালো টাকার মালিক হন, কর ফাঁকি দেন তাহলেও এ সংক্রান্ত কোনো সংবাদ প্রকাশিত হবে না। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে এক রকম জিম্মি অবস্থায় আছে গণমাধ্যম। বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান যত অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গেই জড়িত থাকুক না কেন, প্রচার সংখ্যার জোর না থাকলে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একটি শব্দও প্রকাশিত হবে না। স্বাধীনতা বলি আর দায়বদ্ধতা বলি দুটোই এক্ষেত্রে অচল। পেশাদারি উৎকর্ষ এবং দক্ষতাও একটি প্রধান বিষয়। গণমাধ্যমের একটি ভুল শব্দ অনেক বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। শুধু তাই নয়, কোনটি খবর নয় আর কোনটি খবর, কোন খবরের কতটা গুরুত্ব দেয়া উচিত এ ব্যাপারেও গণমাধ্যমের সচেতনতার অভাব লক্ষ্য করা যায়।
কুকুর মানুষকে কামড়ালে তা কোনো খবর হবে না, কিন্তু মানুষ কুকুরকে কামড়ালে সেটা খবর। কিন্তু এখন প্রায় সবই খবর। কোনো গণমাধ্যমের মালিক জেলখানা থেকে মুক্তি পেলে সেটাও ওই গণমাধ্যমে ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে দেখানো হয়। অথচ সার্বিকভাবে ওই ঘটনাটির কোনো সংবাদমূল্য আছে কি-না, সেটি বিবেচনায় নেয়া হয় না। বলা হয়ে থাকে ‘তোমার স্বাধীনতা আমার নাকের ডগা পর্যন্ত। এ পর্যন্ত তুমি ছড়ি ঘোরাতে পার। কিন্তু তোমার ছড়ি আমার নাক বা শরীর স্পর্শ করলে সেখানেই স্বাধীনতা বিপন্ন হয়।’ ভলতেয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তিও স্মরণযোগ্য- ‘তোমার মতের সঙ্গে আমি একমত নাও হতে পারি কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের অধিকারের জন্য আমি জীবনও দিতে পারি।’
এই স্বাধীনতা তখনই সার্থক হবে যখন তাতে জনকল্যাণের বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। প্রসঙ্গত নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের একটি নিবন্ধের শরণ নেয়া যায়। সম্প্রতি দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ভারতীয় মিডিয়ার গৌরব ও কলঙ্ক’ শিরোনামাঙ্কিত নিবন্ধে তিনি বলেছেন- ‘এখানকার সমস্যা অবশ্য মিডিয়ায় তেমন স্থান পায় না। কেননা সামাজিক বিভাজনই সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রে এই পক্ষপাতিত্ব জোগায়। অথচ ভারতের বাস্তবতা অবিরত জনগণের দৃষ্টিগোচরে রাখার জন্য মিডিয়া অধিকতর গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে। সংবাদ পরিবেশনায় এই পক্ষপাতিত্ব পাঠকের কাছে কোনোভাবে অপ্রীতিকর মনে না হলেও তা ভারতের সুবিধাবঞ্চিতদের চরম বঞ্চনার প্রতিকার সাধনে রাজনৈতিক অনীহা সৃষ্টিতে প্রভূত অবদান রেখে থাকে। ভাগ্যবান গোষ্ঠীর মধ্যে যেহেতু শুধু ব্যবসায়ী নেতারা ও পেশাজীবী শ্রেণীগুলোই নয়, দেশের বুদ্ধিজীবীদেরও এক বিরাট অংশ রয়েছে, তাই জাতির ব্যতিক্রমধর্মী অগ্রগতির খবর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে খুব বেশি প্রচার লাভ করে থাকে এবং যা কিনা বড়জোর অতি পক্ষপাতদুষ্ট এক কাহিনীমাত্র। সেটাকেই কথিত বাস্তবতায় রূপ দেয়া হয়।’ এখানে ‘ভারতের’ জায়গায় ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করলে অবস্থাটি কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে একই থেকে যায়। অমর্ত্য সেনের আরও একটি উক্তি স্মরণযোগ্য। তার মতে, গণমাধ্যম থাকলে দুর্ভিক্ষও দূর করা সম্ভব। কেননা কোথাও দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সেটা যদি গণমাধ্যমে উঠে আসে, তাহলে সরকার বা রাষ্ট্র সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। ফলে কেউ না খেয়ে মরবে না। একদিকে মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করে তাকে বিকশিত করা, অন্যদিকে শুধু ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে পাঠককে খদ্দেরে পরিণত করা- গণমাধ্যম যদি এই ধরনের দ্বিচারিতায় লিপ্ত হয়, তাহলে তার স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতার জায়গাটি ভীষণভাবে নষ্ট হয়। এতে আর যাই হোক, সাধারণ মানুষের কোনো কল্যাণ হয় না।
ড. হারুন রশীদ : সাংবাদিক, কলামিস্ট

রাষ্ট্রপতির ক্ষমার আইনসিদ্ধতা by ইকতেদার আহমেদ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আনীত ৬টি অভিযোগের মধ্যে ১, ২ ও ৩নং অভিযোগের প্রতিটিতে ১৫ বছরের কারাদণ্ড, ৪নং অভিযোগে অব্যাহতি এবং ৫ ও ৬নং অভিযোগে পৃথকভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনটি প্রণীত হয় ২০ জুলাই, ১৯৭৩ এবং এ আইনটি প্রণয়নকালে ধারা নং ২১-এ এ আইনের অধীনে দণ্ডিত ব্যক্তিকে দণ্ডের বিরুদ্ধে দণ্ড প্রদানের তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়েরের অধিকার দেয়া হয়েছিল। আইনটিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের দ্বারা রাষ্ট্র বা সরকার পক্ষ সংক্ষুব্ধ হলে প্রতিকার প্রার্থনার কোনো সুযোগ না থাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক কাদের মোল্লাকে ৪নং অভিযোগ থেকে অব্যাহতি এবং ৬নং অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ায় সরকার পক্ষ সংক্ষুব্ধ হয়। সরকার পক্ষের সংক্ষুব্ধতার প্রতিকার প্রদানে রায় ঘোষণা পরবর্তী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধনী এনে অব্যাহতি বা খালাসের বিরুদ্ধে এবং সাজা বৃদ্ধিকল্পে সরকার পক্ষের আপিল দায়েরের বিধান প্রণয়ন করে আইনটিতে সংশোধনী এনে ২০০৯ সাল থেকে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া হয়।
রায় ঘোষণা পরবর্তী ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনী এ আইনের অধীনে দণ্ডিত আসামি কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি-না এ বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়ের পরবর্তী প্রশ্নটি উত্থাপিত হলে আপিল বিভাগ সুপ্রিমকোর্টের সাতজন প্রবীণ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) হিসেবে নিয়োগ দেন। আপিল বিভাগে এ সাতজন অ্যামিকাস কিউরির বক্তব্য বিবেচনায় প্রতীয়মান হয়, প্রযোজ্য হওয়া বা না হওয়া বিষয়ে তাদের মতামতে ভিন্নতা রয়েছে যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত প্রযোজ্য হওয়ার পক্ষেই দেয়া হয়েছে।
অ্যামিকাস কিউরিদের কাছে আরও একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছিল আর সেটি হল- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে বিচারের ক্ষেত্রে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন (Customary International Law) প্রযোজ্য হবে কি-না? এ বিষয়টিতেও দেখা যায় অ্যামিকাস কিউরিদের মতামত অভিন্ন নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ প্রণয়ন পূর্ববর্তী সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ৪৭নং অনুচ্ছেদে দফা নং (৩) এবং ৪৭ক অনুচ্ছেদ সন্নিবেশ
করা হয়।
৪৭নং অনুচ্ছেদের দফা নং (৩)-এ বলা হয়েছে, এ সংবিধানে যা বলা হয়েছে তা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোনো সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য বা অন্য কোনো ব্যক্তি, ব্যক্তি সমষ্টি বা সংগঠন কিংবা যুদ্ধবন্দিকে আটক, ফৌজদারিতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করার বিধান সংবলিত কোনো আইন বা আইনের বিধান এ সংবিধানের কোনো বিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্য বা তার পরিপন্থী- এ কারণে বাতিল বা বেআইনি বলে গণ্য হবে না কিংবা কখনও বাতিল বা বেআইনি হয়েছে বলে গণ্য হবে না।
দৃশ্যত ৪৭নং অনুচ্ছেদে দফা নং(৩) সন্নিবেশনে প্রতীয়মান হয় সামরিক বা বেসামরিক যে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে প্রণীত কোনো আইন এবং ওই আইনের অধীন বিচার ও দণ্ডের বিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও তার প্রাধান্য অক্ষুণ থাকবে।
সংবিধানে ১ম সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত ৪৭ক অনুচ্ছেদে দুটি দফা রয়েছে। (১) নং দফায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোনো আইন প্রযোজ্য হয়, সে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ, ৩৫ অনুচ্ছেদের (১) ও (৩) দফা এবং ৪৪ অনুচ্ছেদের অধীন নিশ্চয়কৃত অধিকারগুলো প্রযোজ্য হবে না।
সংবিধানের ৪৪নং অনুচ্ছেদ পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, এ অনুচ্ছেদটির মাধ্যমে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকারসমূহ বলবৎ করার জন্য এ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে মামলা দায়ের করার অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হলেও ৪৭ক (১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ব্যক্তি এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচিত হবে।
৪৭ক (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এ সংবিধানে যা বলা হয়েছে, তা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোনো আইন প্রযোজ্য হয়, এ সংবিধানের অধীন কোনো প্রতিকারের জন্য সুপ্রিমকোর্টে আবেদন করার কোনো অধিকার সে ব্যক্তির থাকবে না।
দফা নং (২) অনুধাবনে প্রতিভাত হয়, যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফা প্রযোজ্য হবে, তিনি এ সংবিধানের অধীনে প্রতিকার প্রাপ্তির নিমিত্ত আবেদন করার অধিকারী হবেন না, যদিও ৪৭(৩) দফায় বর্ণিত কোনো আইনের অধীনে প্রতিকার প্রার্থনা এ উপদফার বিধান দ্বারা বারিত নয়।
উল্লেখ্য, সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তৃতীয় ভাগে প্রদত্ত অধিকারগুলো বলবৎ করার জন্য ১০২ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী রিট মামলা দায়েরের পরিবর্তে ৪৪নং অনুচ্ছেদে সাংবিধানিক আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কমিশন প্রতিষ্ঠা বিষয়ে বিধান প্রণয়ন করা হয়েছিল। যদিও উক্তরূপ আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কমিশন প্রতিষ্ঠা পূর্ববর্তী দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশ বলে ৭২-এর সংবিধানের ৪৪নং অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপনপূর্বক সাংবিধানিক আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কমিশন প্রতিষ্ঠার বিধান রহিত করা হয়।
সংবিধানে যদিও উল্লেখ রয়েছে, সংবিধানের সঙ্গে অপর কোনো আইন সাংঘর্ষিক হলে সে আইন বাতিল হবে কিন্তু কোন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এবং কী পদ্ধতি অবলম্বনপূর্বক সে আইন বাতিল বিষয়ে কার্যক্রম বা পদক্ষেপ নেয়া হবে সে বিষয়ে সংবিধান নিশ্চুপ বিধায় প্রায়ই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, সংবিধান ও আইন রক্ষণ, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ নিয়ে শপথের ব্যত্যয়ে শপথ গ্রহণ করাকালীন সংবিধান ও আইনের বিধানাবলীর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণযোগ্য কি-না? এ ধরনের বিতর্ক অবসানে ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত ৪৪নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত সাংবিধানিক আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কমিশন যে কার্যকর সমাধান, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে অনাহুত ও অযাচিত পরিস্থিতি পরিহার সম্ভব- এমনই অভিমত সৎ, যোগ্য, দক্ষ, মেধাবী ও অভিজ্ঞ আইনজ্ঞদের। আমাদের প্রচলিত আইনে কোনো ব্যক্তি সাজা বা খালাসপ্রাপ্ত হলে অথবা সাজা অপ্রতুল বিবেচিত হলে সংক্ষুব্ধ পক্ষ সাজা বা খালাস বা অপ্রতুল সাজার বিরুদ্ধে নিকটবর্তী আপিল আদালতে আপিল দায়ের করতে পারেন। কিন্তু সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে বর্ণিত আইনে কোনো ব্যক্তি সাজা বা খালাসপ্রাপ্ত বা সাজা অপ্রতুল হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা পক্ষ আইনে বর্ণিত বিধানাবলীর আলোকে প্রতিকার প্রার্থনা করতে পারেন। এক্ষেত্রে স্পষ্টত সাধারণ আদালতে যে বিধানাবলী অনুসৃত হয়, তা অনুসরণের সুযোগ অনুপস্থিত।
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ শুনানি পরবর্তী ৪-১ বিভক্ত রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশে ১, ২, ৩ ও ৫নং অভিযোগের সাজার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে একমত পোষণ করলেও ৪নং অভিযোগের অব্যাহতির আদেশকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর এবং ৬নং অভিযোগের খালাসের আদেশের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজাকে মৃত্যুদণ্ডে বর্ধিত করেন। আপিল শুনানিকালে আসামি পক্ষের আইনজীবীদের পূর্বাপর সাজার সপক্ষে অপ্রতুল সাক্ষ্যের যুক্তি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় পরবর্তী আইনের পরিবর্তনের মাধ্যমে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতার বক্তব্য আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যর্থ হয়। স্পষ্টত সর্বোচ্চ আদালতের সর্বোচ্চ সাজার আদেশটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও বিভক্ত আদেশ হওয়ায় যেসব বিতর্কের সূত্রপাত করেছে, সে বিভক্তির প্রতিফলন জাতীয় জীবনে ঘটলে তা আমাদের অগ্রযাত্রা ও স্থিতিশীলতা ব্যাহত করবে- এ কথা ভেবে দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর অনেকেই শংকিত।
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা বৃদ্ধি করে তাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়ায় অনেকের মধ্যে অনুসন্ধিৎসু প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে- সর্বোচ্চ আদালত সর্বোচ্চ দণ্ড দেয়ায় আইনগত বা বিচারিক প্রতিকারের ব্যবস্থা না থাকলে সংক্ষুব্ধতা নিরসনের কোনো পথ কি থাকবে না? এ প্রশ্নের জবাবে অনেকের অভিমত- সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারেন। আবার অনেকের অভিমত- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কর্তৃক শুধু আপিল দায়েরের অধিকার থাকায় ৪৭ক (২) অনুচ্ছেদ পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দেখা দেবে। সংবিধানের ১০৫নং অনুচ্ছেদে পুনর্বিবেচনা সংক্রান্ত যে বিধান রয়েছে তাতে বলা হয়েছে, সংসদের যে কোনো আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে এবং আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রণীত যে কোনো বিধি সাপেক্ষে আপিল বিভাগের কোনো ঘোষিত রায় বা প্রদত্ত আদেশ পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা ওই বিভাগের থাকবে।
দেওয়ানি কার্যবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, প্রথমোক্ত বিধিতে দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে একই আদালত কর্তৃক রায় পুনর্বিবেচনার অধিকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কর্তৃক আদালতকে সন্তুষ্ট করতে হবে যে, কোনো নতুন বিষয়ের উদ্ঘাটন হয়েছে যা আদালতে বিচার চলাকালীন জ্ঞানের সীমায় ছিল না এবং এমন কোনো ভ্রান্তি বা ভুল হয়েছে যা নথিদৃষ্টে প্রতিভাত। এ দুটি কারণের যে কোনো একটির অস্তিত্ব যখন বিদ্যমান শুধু তখনই পুনর্বিবেচনার অবকাশ সৃষ্টি হয়। পুনর্বিবেচনার এ সুযোগটি ফৌজদারি কার্যবিধিতে অনুপস্থিত থাকলেও আপিল বিভাগ রুলে দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় ধরনের মামলার ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনার অধিকার প্রদান করা হয়েছে এবং সেটি আইন ও আদালতে অনুসৃত প্রথা সাপেক্ষে যদিও ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে নথিদৃষ্টে প্রতিভাত ভ্রান্তি বা ভুলকেই পুনর্বিবেচনার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
আইন মানুষের জন্য, আইনের জন্য মানুষ নয়। তাই সংক্ষুব্ধ পক্ষের প্রতিকার না থাকার কারণে আইন সংশোধন করে যদি ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া যায়, তবে সেক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনায় আগের সিদ্ধান্তের যে কোনো ধরনের পরিবর্তন অত্যন্ত সীমিত হলেও পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই- এ ধরনের বিতর্ক পরিহার উত্তম। এরপর আরও একটি প্রশ্ন আসে আর সেটি হল রাষ্ট্রপতির ক্ষমা, যা সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ দ্বারা স্বীকৃত। এ বিষয়ে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। এর একটি হল- রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা চাইতে হলে দোষ স্বীকার করে তা চাইতে হবে। আর অপরটি হল- আইনের ভুল অনুধাবনের জন্য সাজার কারণ ঘটেছে। ইতিপূর্বে যারা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে অনুকম্পা পেয়েছেন, তাদের সবাই কি দোষ স্বীকার করেছিল? আর যদি আইনের অপপ্রয়োগ বা ভুল ব্যাখ্যার কারণে সাজা হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে দোষ স্বীকারের অবকাশ কোথায়? তাই পুনর্বিবেচনা ও রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা উভয় বিষয়ে আইনগত সিদ্ধান্ত যে কোনো ধরনের বিতর্ক নিরসনে আশ্বস্ত হওয়ার পথ উন্মুক্ত করতে পারে।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ ও কলামিস্ট