Sunday, January 13, 2019

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন তুলসি গাব্বার

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত তুলসি গাব্বার। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। সেই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তুলসি। যদি সেটা হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের প্রথম হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন তিনি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া। এতে বলা হয়, এর আগে ডেমোক্রেট দল থেকে সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন একই আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তারপর তুলসি গাব্বারের এ ঘোষণায় তিনি হলেন দ্বিতীয় নারী। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেট দল থেকে আরো কমপক্ষে ১২ জন প্রার্থী আসতে পারেন।
তার মধ্যে রয়েছেন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নির্বাচিত ভারতীয় বংশোদ্ভূত আরেক সিনেটর কমলা হারিস। তবে তুলসি গাব্বার হলেন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে চার বার নির্বাচিত সদস্য। তিনি শুক্রবার সিএনএন টেলিভিশনকে বলেছেন, আমি (প্রেসিডেন্ট পদে) নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবো। তুলসি গাব্বার তার জীবনের প্রথম দিকে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিনিদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। যদি তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একসঙ্গে চারটি রেকর্ড গড়বেন। এক হলো সবচেয়ে কম বয়সী প্রেসিডেন্ট। দ্বিতীয়ত যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। তৃতীয়ত তিনি হবেন খ্রিস্টান নন, এমন প্রেসিডেন্ট। চতুর্থত প্রথম হিন্দু হিসেবে প্রেসিডেন্ট। তবে তিনি কতদূর যেতে পারবেন তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য তার সামনে খুব বেশি সম্ভাবনা দেখছেন না।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার শতকরা এক ভাগেরও কম হিন্দু সম্প্রদায়। তাদের বেশির ভাগই ভারতীয় বংশোদ্ভূত। সেখানে তুলসি গাব্বারকে নিয়ে তারা গর্ব করেন। তুলসি প্রতিনিধি পরিষদের শক্তিশালী হাউস ইন্ডিয়া ককাসের কো-চেয়ার। তিনি সম্প্রতি চতুর্থ বার হাওয়াই থেকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার ঘোষণামতে, এখন তার সামনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জটিল হিসাব নিকাশের পালা। ২০২০ সালের শুরুতে অর্থাৎ আগামী বছরের শুরুতেই শুরু হয়ে যাবে সেখানকার প্রাইমারি নির্বাচন। ওই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাই করবেন ডেমোক্রেটরা। তারপর ২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে সেই প্রার্থী মুখোমুখি হবেন রিপাবলিকান দলের প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে। ট্রাম্প এরই মধ্যে ঘোষণা করেছেন তিনি আবার নির্বাচন করতে চান। ফলে ডেমোক্রেট প্রার্থীকে তার বিরুদ্ধে কঠিন এক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে হবে।
২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। দল থেকে মনোনয়নের ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। তুলসি গাব্বার তখন বার্নি স্যান্ডার্সকে সমর্থন করেছিলেন। ২০১৬ সালে স্যান্ডার্সের প্রচারণা বিষয়ক ডেপুটি ম্যানেজার ছিলেন রানিয়া বেট্রিস। তিনি এখন তুলসি গাব্বারের শীর্ষ পরামর্শক। তিনিই হবেন তার নির্বাচনী ম্যানেজার। তুলসি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট পদে তার নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়ার অনেক কারণ রয়েছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ বিপুল পরিমাণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ বিষয়টি আমি অবগত। এসব চ্যালেঞ্জ আমি সমাধান করতে চাই। এক্ষেত্রে তার প্রধান ইস্যুগুলো হলো স্বাস্থ্যসেবা, অপরাধ বিষয়ক বিচার ব্যবস্থায় সংস্থার ও জলবায়ু পরিবর্তন। তবে প্রধান ইস্যু হবে যুদ্ধ ও শান্তি সংক্রান্ত।
শিডিউল অনুযায়ী, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রাইমারি নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হবে ওই বছরের ৩রা ফেব্রুয়ারি আইওয়া ককাস থেকে। এরপরে প্রাইমারি নির্বাচন হওয়ার কথা ১১ই ফেব্রুয়ারি নিউ হ্যাম্পশায়ারে। নেভাদা ককাসে নির্বাচন হওয়ার কথা ১৫ই ফেব্রুয়ারি। সাউথ ক্যারোলাইনাতে ২২ শে ফেব্রুয়ারি।

আজ রাতে তোমার সঙ্গে মাতাল হতে চাই: প্রেমিকাকে জেফ বেজোসের রগরগে ছবি ও বার্তা

অ্যামাজন প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের প্রেমিকা লরাঁ সানচেজ (৪৯) সব ফাঁস করে দিয়েছেন বন্ধুদের কাছে। বলে দিয়েছেন কীভাবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী জেফ বেজোসের সঙ্গে তার প্রেম গড়ে উঠেছে। আর এ সময়ে জেফ বেজোস তাকে তার নিজের এক্স-রেটেড বা অশালীন সেলফি পাঠিয়েছেন। আট মাসের প্রেমের সম্পর্কে জেফ বেজোস তাকে পাঠিয়েছেন অশালীন ছবি। সানচেজ আবার ওই ছবি পাঠিয়েছেন তার এক বন্ধুকে। বলা হচ্ছে, ইনি সেই বন্ধু যিনি যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ন্যাশনাল এনকুইরারকে ওই ছবিগুলো সরবরাহ করেছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী এবং হ্যান্ডসাম বেজোসের সঙ্গে এমন প্রেমে পড়ে লরাঁ সানচেজ তো চাঁদের দেশে পৌঁছে গেছেন। আর তাই আট মাসের মধ্যে তারা দুজনে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে মিলিত হয়েছেন একাধিকবার।
কখনো তাদের বাড়িতে, কখনো বেজোসের ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের গালফ স্ট্রিম জেটের ভেতরে আবার কখনো বেভারলি হিলস হোটেলে। এমন খবর লুফে নিয়েছে বিশ্ব। প্রায় সব মিডিয়ায় তা প্রকাশ হচ্ছে জোরালোভাবে।
বলা হচ্ছে, সম্পর্কের এই সময়ে লরাঁ সানচেজকে অসংখ্য অশালীন ছবিই শুধু নয়, খুদে বার্তা দিয়েছেন। তার কোনো কোনোটিতে রয়েছে রোমান্স বা প্রেম। এসব বিষয় যখন আর ঢেকে রাখতে পারছিলেন না বেজোস, তারা তাদের সম্পর্কের কথা প্রকাশ করার পথে তখনই তিনি তার স্ত্রী ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে বিচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছেন। এমন ঘোষণা বেজোস দিয়েছেন বুধবার। তাতে বলেছেন, স্ত্রী ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে বেশ কিছু সময় তিনি আলাদা থাকছেন। ওদিকে সানচেজ হলিউডের সাবেক অভিনেত্রী। তিনি ২০০৫ সালে বিয়ে করেছেন হলিউডের শক্তিধর এজেন্ট প্যাট্রিক হোয়াইটসেলকে। কিন্তু তিনিও বিচ্ছেদে যাচ্ছেন। এ জন্য লরাঁ সানচেজ ও তার স্বামী হোয়াইটসেল সেলিব্রেটিদের বিচ্ছেদ সংক্রান্ত আইনজীবী লরাঁ ওয়াসারকে নিয়োগ করেছেন। এই আইনজীবী হলিউড তারকা অ্যানজেলিনা জোলি ও সেলিব্রেটি-রিয়েলিটি তারকা কিম কারদাশিয়ানের বিচ্ছেদের বিষয়ে কাজ করেছেন বা করছেন। লরাঁ সানচেজ ও হোয়াইটসেল তাদের মধ্যকার বিচ্ছেদ খুব চুপিচুপি সেরে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা মিডিয়ায় বিশাল করে এখন প্রচার হচ্ছে। এসব বিষয়ে লন্ডনের ডেইলি মেইল শুক্রবার সানচেজের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দেননি তাতে। এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে খবরের শিরোনাম হয়েছে, সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকার বিচ্ছেদ হচ্ছে বেজোস ও ম্যাকেঞ্জির মধ্যে। ওদিকে, বুধবার যখন জেফ বেজোসের সঙ্গে সানচেজের প্রেমের কাহিনী ফাঁস হয় তারপর থেকে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেন নি সানচেজ।
জেফ বেজোসের বয়স ৫৪ বছর। সানচেজের ৪৯। তাদেরকে অনেক স্থানে একসঙ্গে দেখা গেছে। এ সময়ে তারা অন্তরঙ্গভাবে একসঙ্গে নৈশভোজ করেন। একজন আরেকজনের বাসায় এক বিছানায় ঘুমিয়েছেন। জেট বিমানের ভেতরে মেতে উঠেছেন উদ্দামতায়। অক্টোবরে জেফ বেজোসের ব্যক্তিগত জেট বিমান থেকে বেরিয়ে আসেন সানচেজ ও তার এক বোন। এরপরই বিষয়টি অনুসন্ধানে নামে দ্য ন্যাশনাল এনকুইরার ম্যাগাজিন। এতে বলা হয়, ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে জেফ বেজোসের দাম্পত্য ২৫ বছরের। এক পর্যায়ে তিনি সানচেজ ও বেজোসের মধ্যকার গোপন সম্পর্ক আবিষ্কার করে ফেলেন। তিনি দেখতে পান বেজোসের বিমানের একমাত্র যাত্রী সানচেজ। সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে এনকুইরার লিখেছে, ওই সময় সানচেজের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন বেজোস। একটি টেক্সটে তাকে বেজোস লিখেছিলেন, আমরা যেহেতু একই সঙ্গে লাফিয়ে পড়ছি তখন প্যারাস্যুট উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে আমাদের ভীত হলে চলবে না। আমরা প্যারাসুট শেয়ার করছি। তাই আমরা নিরাপদে গন্তব্যে নামবো। আমরা একে অন্যের খুব কাছাকাছি আসাকে বেছে নিয়েছি।
আরেকটি মেসেজে তিনি লিখেছেন, আমি তোমাকে ভালোবাসি তরতাজা মেয়ে হিসেবে। আমার শরীর, আমার ঠোঁট, আমার চোখ খুব সহসাই তোমাকে দেখাবো। আমি তোমাকে মিস করছি। ঠিক এখনই তোমাকে চুমু খেতে চাই। ঠিক এখনই তোমাকে আস্তে করে, আদর করে কাছে টানতে চাই। যখন সকালে জাগবো তখন তোমার সঙ্গে এতটা ভদ্র আচরণ করবো না।
আরেক মেসেজে তিনি লিখেছেন, তোমার এনার্জি, ধারণা, কর্মদক্ষতা ও উদ্যম আমাকে উত্তেজিত করে তোলে। তুমি আমাকে আরো উত্তেজিত করে তোলো। তুমি আমার জন্যই। আমি তোমার পূর্ণ প্রেমে মশগুল। আমার হৃদয়টা বড় হয়ে যাচ্ছে তোমার জন্য। এটা আরো বড় হচ্ছে। আরো স্ফীত হচ্ছে। জেফ বেজোস আরেক মেসেজে লিখেছেন, আমি তোমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে চাই। তোমার ঠোঁটে চুমু খেতে চাই। আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি তোমার সঙ্গে প্রেমে পড়ে গিয়েছি। তুমি জানো আমি কি চাই। আজ রাতে তোমার সঙ্গে আমি সামান্য মাতাল হতে চাই। অল্প মদ্যপ হতে চাই। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই। পরিকল্পনা করতে চাই। শুনতে চাই। হাসতে চাই। আমি আসলে তোমার সঙ্গ চাই। তারপর তোমার সঙ্গে একসঙ্গে গভীর ঘুমে যেতে চাই। তারপর আগামীকাল ঘুম থেকে উঠতে চাই। তোমার সঙ্গে পত্রিকা পড়তে চাই এবং একসঙ্গে কফি পান করতে চাই।

প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন বরিস জনসন

প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন বৃটেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন (৫৪)। তার থেকে ২৩ বছরের ছোট প্রেমিকা ক্যারি সায়মন্ড (৩০)কে যেকোনো সময় বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসতে পারেন চার সন্তানের জনক জনসন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রেমের কাহিনী বৃটিশ মিডিয়ায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এর কারণ, বরিস জনসন যদি সায়মন্ডকে বিয়ে করেন তাহলে তিনি হবেন তার তৃতীয় স্ত্রী। শুধু তাই নয়, বরিস জনসনের বড় মেয়ে লরার চেয়ে মাত্র ৫ বছরের বড় হবেন তার এই ভবিষ্যৎ সৎমা। এ নিয়ে বৃটিশ মিডিয়ায় মাঝে মধ্যেই রিপোর্ট প্রকাশ হচ্ছে। এবার অনলাইন ডেইলি মিরর লিখেছে, বরিস জনসনের এই প্রেমিকা মেরুদণ্ডের একজন ডাক্তার। তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার পরিকল্পনা করছেন জনসন।
একজন বন্ধুকে উদ্ধৃত করে এ খবর দেয়া হয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে, ক্যারি সায়মন্ডের পাশাপাশি সারাক্ষণ পোষা প্রাণীর মতো ঘুর ঘুর করেন জনসন।
ওদিকে জনসনের ঘরে দ্বিতীয় স্ত্রী মেরিনা। তার সঙ্গে তার ২৫ বছরের দাম্পত্য। তাদের বিচ্ছেদের বিষয়ে আবেদন করা হয়েছে। এখনো তা চূড়ান্ত হয় নি। মধ্যপথে রয়েছে। এ অবস্থায় ক্যারি সায়মন্ডকে তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে কাছে পাওয়ার পরিকল্পনা করছেন জনসন। এ বিষয়ে তিনি লেজেগোবরে হয় এমন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে বদ্ধপরিকর।
চার সন্তানের জনক বরিস জনসনের এক বন্ধু বলেছেন, তিনি এনগেজটা করে ফেলতে চাইছেন। কারণ, তিনি ক্যারি সায়মন্ডের প্রতি পুরোপুরি অনুগত। তার প্রেমে মজেছেন। ওই বন্ধু বলেছেন, এমন ঘটনা দেখতে খুবই চমৎকার। বরিস জনসনের আরেকজন ঘনিষ্ঠ মিত্র বলেছেন, ক্যারি সায়মন্ড তো বরিসের একেবারে পারফেক্ট গার্লফ্রেন্ড।
ক্যারি সায়মন্ড ব্লুমবার্গের একজন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তিনি এখনো পর্যন্ত বরিস জনসনের কোনো সন্তানের মুখোমুখি হন নি। তবে গ্রিসের একটি ভিলায় নতুন বছর একসঙ্গে উদ্‌যাপন করেছেন বরিস জনসন ও ক্যারি সায়মন্ড। সেখানে তাদেরকে উপভোগ করতে দেখা গেছে সুস্বাদু সব স্থানীয় খাবার। সেখানে তারা অবস্থান করছিলেন বরিস জনসনের পিতা স্ট্যানলির অবকাশ যাপন কেন্দ্র ভিলা আইরিনে। গত গ্রীষ্মে স্ত্রী মেরিনাকে বাদে চার সন্তানকে নিয়ে গিয়েছিলেন জনসন।
গত মার্চ থেকে আলাদা থাকলেও সেপ্টেম্বরে নিজেদের মধ্যে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন বরিস জনসন ও মেরিনা। ওই সময় এক বিবৃতিতে জনসন বলেছিলেন, তারা কিছুদিন ধরে আলাদা সময় কাটাচ্ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর কয়েক মাস আগে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য আলাদা হওয়া উচিত। ‘তাই আমরা নিজেরাই বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং তা প্রক্রিয়াধীন আছে। বন্ধু হিসেবে আমরা সামনের দিনগুলোতে আমাদের চার সন্তানকে সাপোর্ট দিয়ে যাবো।

আত্মহত্যা সমাধান নয় by মরিয়ম চম্পা

জীবন অনেক সুন্দর। সেই জীবনকে উপভোগ করতে হবে। দিনের পরে রাত। রাতের পরে দিন। একইভাবে জীবনে ভালো সময় আসে। খারাপ সময়ও আসে। রাত যত গভীর হয় ভোর তত কাছে আসে। এ বিষয়গুলো সবাই কম বেশি জানেন।
কিন্তু আবেগের কাছে সবই যেন ফিকে। ধোঁয়াশা। জীবন দিয়ে সেটা প্রমাণ করে গেছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারী, সাভারে গণধর্ষণের শিকার এক নারীসহ আরো অনেকে।
গত ৩রা ডিসেম্বর পরীক্ষায় নকল করার অভিযোগে বাবাকে ডেকে অপমান করায় তা সহ্য করতে না পেরে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অরিত্রি অধিকারী (১৫) আত্মহত্যা করে। ঘটনার দিন দুপুরে অরিত্রি গলায় ফাঁস দেয়। অরিত্রি নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। অরিত্রির বাবা দিলীপ অধিকারী একজন কাস্টসম (সিঅ্যান্ডএফ) ব্যবসায়ী। পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর শান্তিনগরে থাকতো। অরিত্রির বাবা দিলীপ অধিকারী জানান, শিক্ষকদের অভিযোগ অরিত্রি ক্লাস পরীক্ষায় মোবাইলে উত্তর লিখে নিয়ে গিয়েছিল। শিক্ষকের কাছে তার নকল ধরা পড়ে। এরপর তাকে পরীক্ষায় অংশ নিতে না দিয়ে স্কুল থেকে আমাদের ডেকে পাঠানো হয়। আমি স্কুলের প্রিন্সিপালের রুমে দুঃখ প্রকাশ করতে গেলে তারা অরিত্রিকে টিসি দিয়ে দেবে বলে জানায়। মেয়ের সামনেই আমাকে অনেক কথা শোনায়। মেয়ের সামনেই কেঁদে ফেলি। অরিত্রি হয়তো আমার ওই কান্না-অপমান সহ্য করতে পারেনি। এরপর বাসায় ফিরেই সে তার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে।
চলতি বছরের ৮ই জানুয়ারি গণধর্ষণের বিচার না পেয়ে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় এক নারী পোশাক শ্রমিক আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। মাহফুজা নামে ১৬ বছরের এই কিশোরী যে গার্মেন্টে কাজ করতেন সেই প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজারসহ কয়েকজন মিলে রাতের আঁধারে তাকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। ঘটনার দিন সকালে জামগড়া রূপায়ণ গেট এলাকায় রবিউলের ভাড়া বাড়ি থেকে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় কিশোরীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতের বোন আফরোজা জানান, রহিম নামের একজন সুপারভাইজার মাহফুজাকে বেশ কিছুদিন ধরে বিরক্ত করছিল। শনিবার রাতে বাসায় ফেরার সময় ওই কারখানার সুপারভাইজার রহিম, লাইন চিপ রিপন, স্বপন ও হৃদয় তার বোনকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। এরপর রূপায়ণ মাঠে রাতভর নির্যাতন করে ভোররাতে ছেড়ে দেয়।
ঘটনার পর তার বোন আশুলিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পুলিশ ঘটনার সত্যতাও খুঁজে পায়। ধর্ষণের ঘটনা শুনে তাৎক্ষণিকভাবে এলাকার নাজমুল নামের এক লম্পটের নেতৃত্বে ঘটনার বিচার করে ধর্ষকদের ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। পুরো টাকা আত্মসাৎ করতে সালিশকারীরা উল্টো ধর্ষিতার বোন, বাবা ও ধর্ষিতাকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছিলেন। এ নিয়ে আর বাড়াবাড়ি না করতে শাসিয়ে দেন। এসব নিয়ে সে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ছিলেন। থানা থেকে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন মাহফুজা। একপর্যায়ে বড় বোন বাসার বাইরে গেলে মাহফুজা আত্মহত্যা করে।
৭ই জানুয়ারি পাবনার চাটমোহরে মাদকসেবী স্বামীর ওপর অভিমান করে ফরিদা খাতুন (২৮) নামে এক গৃহবধূ গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছে। সকাল ১০টার দিকে উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের ভাদড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। তিনি ওই গ্রামের মাদকসেবী খোকন হোসেনের স্ত্রী ও তিন সন্তানের জননী। গৃহবধূ ফরিদা খাতুনের স্বামী একজন মাদকসেবী। এর আগে সে মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করার জন্য ঘরের আসবাবপত্র বিক্রি করে। খোকন আবারো মাদক সেবনের টাকা জোগাড়ের জন্য ঘরের আসবাবপত্র বিক্রি করতে চাইলে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া হয়। পরে অভিমান করে গলায় রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে ফরিদা খাতুন।
এদিকে ২০১৮ সালে প্রথম ১১ মাসে ঢাবিতে ৯ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৭ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। শুধু গত বছরের ১২ থেকে ১৬ই নভেম্বরের মধ্যেই আত্মহত্যা করেছেন ৩ শিক্ষার্থী। এ ছাড়াও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন একজন। প্রেমঘটিত কারণ, পারিবারিক অভাব-অনটন, বেকারত্ব, একাডেমিক চাপসহ বিভিন্ন বিষণ্নতার কারণে আত্মহননের মতো জঘন্য পথ বেছে নিয়েছেন তারা। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তরকে আরো কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। এ ছাড়া হল ও বিভাগসমূহে হতাশাগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের প্রতি বাড়তি নজর দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
বিশ্ব পরিসংখ্যান বলছে, পৃথিবীতে বছরে ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতিদিন আত্মহত্যার চেষ্টা করে ৬০ হাজার জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আশঙ্কা ২০২০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে আত্মহত্যার সংখ্যা হবে বছরে সাড়ে ১৫ লাখ। পৃথিবীতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যু দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ হচ্ছে আত্মহত্যা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি (বছরে প্রতি লাখে ২৯ জন)। ২০১৮ সালে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব মেন্টাল হেলথের এক প্রতিবেদনে দেখা  গেছে, সব মানসিক রোগের ৫০ শতাংশ শুরু হয় ১৪ বছর বয়সের আগে আর ৭৫ শতাংশই শুরু হয় ২৫ বছর বয়সের আগে! অর্থাৎ বিষণ্নতা থেকে শুরু করে আত্মহত্যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ রোগগুলো এই বয়সেই বেশি হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যার শিকার হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রতি লাখে ৭ দশমিক ৮ জন আত্মহত্যা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট আত্মহত্যাকারীদের দুই-তৃতীয়াংশই নারী। তাদের বেশির ভাগের বয়স ১১ থেকে ২৫ বছর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘মেন্টাল হেলথ স্ট্যাটাস অব অ্যাডলসেনস ইন সাউথ-ইস্ট এশিয়া: এভিডেন্স ফর অ্যাকশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৭ শতাংশ কিশোর-কিশোরী এক বা একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে ৭ শতাংশ ছেলে ও ৬ শতাংশ মেয়ে। বাংলাদেশে আগে থেকে আত্মহত্যার কল্পনা করে ৮ শতাংশ কিশোর-কিশোরী। কল্পনায় আত্মহত্যার বিষয়টি ঘুরপাক খায় ৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর মধ্যে।
আত্মহত্যা বিষয়ে সংবাদকর্মীদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন
আত্মহত্যার খারাপ দিক সম্পর্কে জনগণকে জানান। আত্মহত্যা কোনো সমাধান ‘নয়’ লেখার সময় তা মাথায় রাখুন। একই সঙ্গে আত্মহত্যাকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করে, এমন ভাষা পরিহার করুন। পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশে আত্মহত্যার খবর ছাপাবেন না। আবার ঘটনার অযৌক্তিক পুনরাবৃত্তি অনাবশ্যক। লেখায় আত্মহত্যা কিংবা আত্মহত্যার চেষ্টার রগরগে বর্ণনা দেবেন না। যে স্থানে আত্মহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার বর্ণনা দেয়া থেকেও বিরত থাকুন। বুঝেশুনে শিরোনাম দিন। স্থির বা ভিডিওচিত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করুন। তারকাদের আত্মহত্যার খবর উপস্থাপনার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিন। আত্মহত্যায় মৃতের স্বজনদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখুন। কোথায় ও কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে, সে তথ্য দিন। খোদ সংবাদকর্মীরা আত্মহত্যার খবর থেকে প্রভাবিত হতে পারেন। তা-ও মাথায় রাখুন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আত্মহত্যা করছেন ২১-৩০ বছর বয়সীরা। এর মধ্যেও নারীর সংখ্যা বেশি।
বাংলাদেশ পুলিশের হিসাবে, প্রতিবছর ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষ খেয়ে গড়ে ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছেন। এর বাইরে আছে ঘুমের ওষুধ খাওয়া, ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়া, রেললাইনে ঝাঁপ দেয়া। তাদের হিসাবে, এর বাইরে দেশের বড় বড় হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে যত রোগী ভর্তি হয়, তার সর্বোচ্চ ২০ ভাগ আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া লোকজন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ আত্মহত্যার ৯৭০টি ঘটনা পর্যালোচনা করে নারীদের বেশি আত্মহত্যার কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছে। তাদের মতে, বাংলাদেশে নারীদের ওপর শারীরিক, যৌন ও মানসিক নির্যাতন এবং ইভটিজিং-এর ঘটনা বাড়ায় অনেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন।
বাংলাদেশে মানসিক রোগের চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ২০০। জেলা পর্যায়েই মানসিক রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। শুধু ২২টি মেডিকেল কলেজ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পাবনার হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে যত লোক আত্মহত্যা করেন, তার অন্তত ১০ গুণ লোক আত্মহত্যার চেষ্টা করে বেঁচে যান। কিন্তু তারা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন। সঠিক মানসিক চিকিৎসা না হলে তাদের বড় একটি অংশ আবারো আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, কিছু লোক থাকে প্রকৃতিগতভাবেই তাদের মধ্যে আত্মহত্যা করার প্রবণতা বা মনোভাব থাকে। এটা হতে পারে শিক্ষা জীবনের কোনো অপ্রাপ্তি, কিশোর জীবনে তার প্রতি কোনো অন্যায় আচরণ করা হলে, কোনো বঞ্চনার শিকার হওয়া থেকে শুরু করে নানান কারণে। এ ছাড়া সমাজ জীবনে আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণেও হতে পারে। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে সকল সংস্থাকে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। একক মাত্র ব্যক্তি দ্বারা এর সমাধান সম্ভব নয়। চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, এলাকার মাতব্বর, মসজিদের ইমাম, সাংবাদিক, পুলিশ প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো ভূমিকা আছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা আত্মহত্যার দিকে বেশি ঝোঁকে। তারা যেন কোনোভাবে এদিকে ধাবিত না হয় বা সুযোগ না পায় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে যারা আত্মহত্যা করে তারা তাদের জীবনের সামনে কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না বলেই হতাশা থেকে আত্মহত্যা করে। এরমধ্যে মাত্রাগত এবং ধরনগত পার্থক্য আছে। বিশেষ করে আমাদের দেশে যাদের আত্মসম্মানবোধ খুব প্রখর তারা আত্মহত্যা করে। কারণ একজন নারী ধর্ষিত হয়ে বিচার পাবে না। বাইরে মুখ দেখাতে পারবে না। ছোট ভাইবোন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিসে তারা মুখ দেখাতে পারবে না বলেই জীবনের আশা ছেড়ে দিয়ে আত্মসম্মানের ভয়ে আত্মহত্যা করে।
আমাদের প্রত্যেকের জীবন এক রকম নয়। তারা এমন একটি পর্যায়ে যায় যে জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে স্বস্তি পাবে তাই এটা করে। তারা যে এটা খুব খুশি মনে করছে তা কিন্তু নয়। এটা যার যার প্রয়োজনে সে সে করছে। আত্মহত্যা বন্ধে প্রথম কথা হচ্ছে আইনের শাসন থাকতে হবে। আমাদের দেশে সব আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। একজন ধর্ষিতা কেনো আত্মহত্যা করছে? কারণ সে দেশের প্রচলিত আইনের কাছে সঠিক বিচার পাচ্ছে না তাই। যদি সে বিচারিক প্রশাসনের কাছে বিচার পেতেন তাহলে আত্মহত্যা করতেন না।

টানা সপ্তম দিনের শ্রমিক বিক্ষোভ চলছে: আশুলিয়ায় অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা, আহত ২০

সাভারের আশুলিয়ায় টানা সপ্তম দিনের মতো বিক্ষোভ করেছে তৈরি পোশাক শ্রমিকরা। আজ সকালে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানার তৈরি পোশাক শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করলেও কাজ না করে কার্ড পাঞ্চ করে বের হয়ে যায়। পরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বাইপাইল আবদুল্লাহপুর মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে। এসময় পুলিশ সদস্যরা শ্রমিকদেরকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ রাবার বুলেট টিয়ারশেল ও জলকামান ব্যবহার করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা মহাসড়কের বিভিন্ন শাখা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় কমপক্ষে ২০ শ্রমিক আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প কারখানাগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হলে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে চলে যায়।
আশুলিয়ার  বেরন এলাকার শারমিন গ্রুপের এম ডিজাইন কারখানার এইচ আর এডমিন ম্যানেজার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের কারখানার কোন শ্রমিক বিক্ষোভ করেনি। সকালে কারখানার শ্রমিকরা শান্তভাবে ভেতরে প্রবেশ করে কাজে যোগ দেয়। কিছুক্ষণ পর বহিরাগত একটি গ্রুপ এসে আমাদের কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালায়। এ সময় আমরা বাধ্য হয়ে কারখানাটি ছুটি দিলে শ্রমিকরা বের হয়ে চলে যায়।
তৈরি পোশাক কারখানার এই কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, আমাদের কারখানার শ্রমিকরা শান্তি মতো কাজ করে আসছে। কিন্তু তারা দুপুরে খাবারের সময় বা কোন প্রয়োজনীয় কাজে বাইরে গেলে একটি অপরিচিত গ্রুপের লোকজন তাদের কে বিভিন্নভাবে মারধর করে এবং কারখানায় কাজ করতে নিষেধ করে। তিনি বলেন কিছু কিছু ভুঁইফোড় শ্রমিক সংগঠনের নামে একটি গ্রুপ দেশের পোশাকশিল্প কে অস্থিতিশীল করার লক্ষে পরিকল্পিতভাবে এই ধরনের শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। আমরা প্রতিদিনই শ্রমিকদের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদেরকে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু এই সব শ্রমিকরা কারখানার বাইরে গেলে ওই সব শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাদেরকে বিভিন্নভাবে ভুল বুঝিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ এর দিকে নিয়ে যায়। যার ফলে আমরা বোঝানো সত্ত্বেও তা কোন কাজে আসছে না। এ বিষয়ে তিনি সরকার ও প্রশাসনের কাছে বিষয়টি সঠিক ভাবে অনুসন্ধান করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। তা না হলে ভবিষ্যতে তৈরি পোশাকশিল্পকে এই দেশে টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়বে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক কারখানা মালিকদের এমন অভিযোগকে উড়িয়ে দিয়ে পোশাক শ্রমিকরা জানান, আমরা কারো প্ররোচনায় নয়, নিজেদের স্বার্থে যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছি।  সোলাইমান নামে একজন পোশাক শ্রমিক জানান, নতুন ঘোষিত মজুরি কাঠামোতে আমার বেতন বেড়েছে এক হাজার টাকার মতো এর বিপরীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৫০০ টাকা। অন্যদিকে একজন হেলপারের মজুরি বেড়েছে তিন হাজার টাকা। তাহলে যে শ্রমিক টি কালকে গ্রাম থেকে এসে কাজে যোগদান করেই আট হাজার টাকা মজুরি পাবে আর আমরা পাঁচ বছর ধরে কাজ করে বেতন পাচ্ছি দশ হাজার টাকা। তাই অবিলম্বে তিনি এই মজুরি বৈষম্য সংশোধনের দাবি জানান।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি শেখ রেজাউল হক দিপু বলেন,  শ্রমিকরা সকালে কারখানা থেকে একযোগে বের হয়ে বাইপাইল আবদুল্লাহপুর সড়ক জিরাবো বিশ মাইল সড়কসহ বিভিন্ন শাখা সড়কে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ভাঙচুরের চেষ্টা করলে আমরা তাদেরকে প্রতিহত করি। এসময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের কিছুটা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পক্ষ থেকে টিয়ার শেল জলকামান ব্যবহার করে তাদেরকে সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর তারা বিভিন্ন শাখা সড়কে অবস্থান নিলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে তারা  চলে যায়। বর্তমানে শিল্প এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এছাড়া শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনায় অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি বিজিবির টহল অব্যাহত রয়েছে।

চট্টগ্রামে পরিবহণ ধর্মঘট নিয়ে শ্রমিক-মালিক গ্রুপ মুখোমুখি by ইব্রাহিম খলিল

চট্টগ্রাম-৪ সীতাকুন্ড আসনের এমপি দিদারুল আলম দিদারের চাঁদা দাবি ও মারধরের প্রতিবাদে বৃহত্তর চট্টগ্রামের ৫ জেলায় ডাকা পরিবহণ ধর্মঘট নিয়ে বিভক্ত শ্রমিক ও মালিক গ্রুপ মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। ধর্মঘটের পক্ষে-বিপক্ষে একের পর এক সভা-সমাবেশ করছেন তারা।  
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন আগামীকাল ১৪ জানুয়ারি থেকে ৪৮ ঘন্টা ধর্মঘটের ডাক দিলেও তার বিরোধিতা করে শনিবার রাতে ডাকা পৃথক সভায় ধর্মঘট বর্জনের ঘোষণা দেন জাতীয় সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম পরিবহণ শ্রমিক ঐক্য পরিষদের একটি অংশ।
ঐক্য পরিষদের শ্রমিক নেতাদের দাবি, শ্রমিক ফেডারেশনের নামে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় চাঁদাবাজির বৈধতা নিতে এবং সংসদ সদস্য দিদারুল আলম দিদারের মান ক্ষুন্ন করার উদ্দেশ্যে বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নে বেআইনি এই পরিবহণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। বেআইনি এই ধর্মঘট আহ্বান রাষ্ট্রদ্রোহিতা কর্মকান্ডের সামিল।
ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক এম জসিম রানা বলেন, ধর্মঘট আহ্বানকারীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী। জাতীয় ভিত্তিক একটি শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃত্বকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দীর্ঘকাল যাবৎ নিরীহ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক-মালিকদের জিম্মি করে সড়ক পরিবহণে নৈরাজ্য সৃষ্টি, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্মে জড়িত। তাদের অনৈতিক কর্মকান্ডে সড়ক পরিবহণ শ্রমিকদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
সদস্য সচিব উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, ধর্মঘট ডাক দেওয়ার প্রেক্ষিতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম পরিবহণ শ্রমিক ঐক্য পরিষদ এনায়েত বাজারস্থ কার্যালয়ে শনিবার রাতে জরুরি সভার আয়োজন করে।
এতে এই পরিবহণ ধর্মঘট বর্জনের পক্ষে মত দেন শ্রমিকরা। এ সময় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধের অভিযোগে ধর্মঘট আহ্বানকারী ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা প্রদানেরও হুঁশিয়ারি দেন।
একই সময়ে পৃথক সভায় ধর্মঘট বর্জনের ঘোষণা দেন জাতীয় সড়ক পরিবহণ শ্রমিক লীগও। নগরীর দারুল ফজল মার্কেট কার্যালয়ে সংগঠনের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব পরিবহণ ধর্মঘট প্রত্যাখান করে বলেন, শ্রমিক নেতার সাথে সংসদ সদস্যের ভিত্তিহীন ঘটনার অজুহাতে ধর্মঘটের নামে বৃহত্তর চট্টগ্রামের সাধারন মানুষকে জিম্মি করার অধিকার ফেডারেশন নেতৃবৃন্দের নেই। তারা বলেছেন, এ ধর্মঘট সম্পূর্ণ শ্রম আইন পরিপন্থী।
অন্যদিকে পরিবহণ ধর্মঘট পালনে অনড় অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন। এই ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহণ মালিক গ্রুপ। তারাও ধর্মঘটের সমর্থনে শনিবার রাতে জরুরি সভায় মিলিত হন।
এতে জেলা সড়ক পরিবহণ মালিক গ্রুপের মহাসচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, গত ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক অলি আহমদ ও মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক খোরশেদ আলমের উপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। আমরা মালিক গ্রুপের পক্ষ থেকে ওই সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। পাশাপাশি আগামী ১৪ জানুয়ারি হতে শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকা ৪৮ ঘন্টার ধর্মঘটে আমরা পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের জরুরি সভায় আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা শ্রমিক-মালিক নেতৃবৃন্দের উপর হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবিও জানাচ্ছি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক অলি আহমদ ও মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক খোরশেদ আলমকে মারধর ও চাঁদা দাবির প্রতিবাদে আগামীকাল ১৪ জানুয়ারি সোমবার ভোর হতে ১৭ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত বৃহত্তর চট্টগ্রামের ৫টি জেলায় (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন ৪৮ ঘন্টার লাগাতার ধর্মঘটে ডাক দেয়।
শ্রমিক ফেডারেশনের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ মুছার ভাষ্য, সীতাকুন্ড আসনের এমপি দিদারুল আলম দিদার বৃহ¯পতিবার রাত সাড়ে ১০টায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অলি আহমদ ও নগরীর অলংকার মোড় থেকে সীতাকুন্ড রুটে চলাচলকারী ৮নং রুটের মালিক সমিতির নেতাদের বাসায় ডাকেন।
এ সময় অলঙ্কার থেকে সীতাকুন্ড রুটে গাড়ি চলাচলের নিয়ন্ত্রণ তাকে ছেড়ে দিতে বলেন তিনি। মালিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ট্রেড ইউনিয়নের আইন ও শ্রমিকদের অর্পিত দায়িত্ব শ্রমিকের মতামত ছাড়া ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানালে তিনি তাকে প্রতিমাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে বলে চাপ সৃষ্টি করেন।
তাতে সম্মত না হওয়ায় এমপি দিদার এক পর্যায়ে ৮নং রুটে মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক খোরশেদ আলমকে নিজ হাতে মারধর শুরু করেন। এই ঘটনার কারণ জানতে চাইলে এমপি দিদারুল আলম উত্তেজিত হয়ে শ্রমিক নেতা অলি আহমদের দিকে তেড়ে গিয়ে তাকেও মারধর করেন। প্রয়োজনে রিভলবার দিয়ে গুলি করে হত্যার হুমকি দিয়ে বেরিয়ে যেতে বলেন।

ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় মার্কিন সরকার

মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ নিয়ে দ্বন্দ্বের মুখে মার্কিন সরকারে টানা ২২ দিন ধরে আংশিক অচলাবস্থা চলছে। এত দীর্ঘ মেয়াদে অচলাবস্থা যুক্তরাষ্ট্র এর আগে কখনো দেখেনি। গত ২১শে ডিসেম্বর শুরু হওয়া এ অচলাবস্থা নিরসনে দফায় দফায় সমঝোতার চেষ্টা করা হলেও তা কোনই কাজে আসেনি। মূলত, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অনড় অবস্থানের ফলেই এ পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। সরকারে অচলাবস্থা সৃষ্টির কারণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রায় ৮ লাখেরও বেশি সরকারি কর্মকর্তার বড় একটি অংশের বেতনভাতা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে, পরবর্তীতে তাদের এই বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে একমত হয়েছে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট। বেতনভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে অচলাবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন তারা। ওয়াশিংটনে বিক্ষোভ করেছে সরকারি কর্মকর্তাদের সংগঠন এএফএল-সিআইও। সংগঠনটির সভাপতি রিচার্ড ট্রুমকা অচলাবস্থার জন্য কংগ্রেস ও ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘শেইম অন সিনেট, শেইম অন হোয়াইট হাউস।’ অবিলম্বে অচলাবস্থা নিরসনের দাবি জানান তিনি। ডেট্রোয়েটের সরকারি কর্মকর্তা গ্রেগরি সিম্পকিনস বলেন, আগামী সপ্তাহে এটি আতঙ্কজনক রূপ নিতে যাচ্ছে। আমরা কীভাবে বাড়িভাড়া পরিশোধ করবো? কীভাবে আমরা অন্যান্য বিল দেবো?
এদিকে, সরকারে অচলাবস্থা নিয়ে অনেকটাই উদাসীন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, সীমান্তে দেয়াল নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ না দেয়া পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদে অচলাবস্থার জন্য প্রস্তুত আছেন তিনি। এটা কয়েক মাস বা বছরও হতে পারে। অর্থাৎ কোনো অবস্থাতেই তিনি সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবেন না। এই অচলাবস্থার পরেও কংগ্রেসকে এড়িয়ে দেয়াল নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে ট্রাম্পের হাতে। আর তা হলো জরুরি অবস্থা জারি। তিনি ইতিমধ্যে এ পথ অনুসরণের হুমকিও দিয়েছেন। কিন্তু নিজ দলের মধ্যে ওই হুমকির তীব্র সমালোচনার মুখে ট্রাম্প চূড়ান্তভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন নি। তিনি কংগ্রেসকে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন। ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘এখনই আমরা ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি দিতে চাই না’। জরুরি অবস্থা জারি করার সক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ট্রাম্প আরো জানান, এত তাড়াতাড়ি এটা করতে চান না। কেননা এখনো তিনি যেকোনো বিষয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করাকেই বেশি পছন্দ করেন।
জনমত জরিপে দেখা গেছে, সরকারে অচলাবস্থার জন্য বেশিরভাগ মানুষ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দোষারোপ করছেন। তারা মনে করেন, প্রেসিডেন্টের একগুয়েমির কারণেই এ পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসন অন্যান্য সরকারি তহবিলের অর্থ দিয়ে দেয়াল নির্মাণ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে হোয়াইট হাউস কর্তৃপক্ষের নজর পড়েছে দুর্যোগ তহবিলের দিকে। গত বছরের প্রাণঘাতি হারিকেন ও বন্যার পর আর্মি কর্পস অব ইঞ্জিনিয়ার্স এর জন্য যে ১৩.৯ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসন তা দেয়াল নির্মাণের কাজে লাগানোর কথা ভাবছে। তবে, পুয়ের্তোরিকোসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্য ইতিমধ্যেই দুর্যোগ তহবিলের অর্থ সরিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এক বিবৃতিতে বলেন, দেয়াল নির্মাণে অর্থায়নের জন্য জরুরি অবস্থা জারির ক্ষমতা ব্যবহার করার এখনই উপযুক্ত সময়। তবে অন্য রিপাবলিকানরা সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন, প্রেসিডেন্টের জন্য এটা সহজ হবে না। কারণ এই পদক্ষেপ আইনি জটিলতার মুখে পড়তে পারে।

নয়া সুপার পাওয়ার? by অনিম আরাফাত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে শুধু তিনটি বিশ্বশক্তিকেই সুপার পাওয়ার বা পরাশক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। দেশগুলো হচ্ছে- সোভিয়েত ইউনিয়ন, বৃটিশ সাম্রাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। এদের মধ্যে প্রথম দেশ দুটি কোনো না কোনোভাবে তাদের এই শ্রেষ্ঠত্ব হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রই এখন সত্যিকার অর্থে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি। কী কী বৈশিষ্ট্য থাকলে একটা রাষ্ট্রকে সুপার পাওয়ার হিসেবে গণ্য করা হবে তার কোনো ধরা-বাঁধা নিয়ম নেই। তবে ধরে নেয়া হয় যে, পরাশক্তি হয়ে উঠতে হলে একটি রাষ্ট্রকে অবশ্যই অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে সেরা হয়ে উঠতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এরকম একটি রাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকতে হবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের সামরিক বাহিনীর বিচরণ থাকতে হবে। ১৯৮০ সালে বিশ্বাস করা হতো জাপানই হতে চলেছে বিশ্বের পরবর্তী পরাশক্তি।
কিন্তু নানা কারণে সেটা কখনোই আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এ মুহূর্তে বিশ্বে আরেকটি রাষ্ট্রের পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। খুব বেশি দ্বিমত ছাড়াই সকলেই মেনে নেবে রাষ্ট্রটি হচ্ছে চীন।
কিন্তু পরাশক্তি হয়ে ওঠা কী এতই সহজ? যুক্তরাষ্ট্রই সব থেকে ভালো করে জানবে পরাশক্তি হওয়ার জন্য অতিরিক্ত কত কিছু করতে হয়। একটা বিশাল সেনাবাহিনীর ব্যয় বহন, আধুনিকতম অস্ত্র উৎপাদন ও ক্রয়, বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক মিশন পরিচালনা ও বিদেশি বিভিন্ন রাষ্ট্রকে সাহায্য প্রেরণসহ ব্যাপক অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয় একটি পরাশক্তিকে। তাই পরাশক্তি হওয়ার যুদ্ধে নামার আগে চীনের মনে রাখা উচিত আড়াই হাজার বছর আগে চৈনিক জেনারেল সান জুর লেখা বিখ্যাত দ্য আর্ট অব ওয়্যার বইয়ের কথা। সেখানে যুদ্ধের বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রথমেই খরচ সম্পর্কে ভাব। অর্থাৎ পরাশক্তি হিসেবে আত্ম প্রকাশের পূর্বে চীনের কমিউনিস্ট সরকারকে মিলাতে হবে অনেক হিসাব- নিকাশ।
সব থেকে বড় প্রশ্ন হলো চীন আসলে কোন ধরনের পরাশক্তি হতে চায়। নিশ্চিতভাবেই চীন সবার আগে এশিয়া মহাদেশে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। এটি চীনের জন্য সহজ ও তারা সেপথে খুব দ্রুততার সঙ্গেই এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আঞ্চলিক পরাশক্তি আর বৈশ্বিক পরাশক্তির মধ্যে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। যেটা বৃটিশ সাম্রাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র করতে পেরেছে সেই অর্থে চীনের এখনো অনেক দূর যাওয়ার বাকি। পরাশক্তি হতে হলে তার বিশ্বের যে কোনো স্থানে প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা থাকতে হবে। এ জন্য বিশ্বজুড়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, সামরিক ঘাঁটি, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব থাকা জরুরি। চীন এসব ক্ষেত্রে কতখানি এগিয়েছে?
ঝাং উইনিং একজন চীনা ব্যবসায়ী ও প্রফেসর। কিন্তু তিনি তার জীবনের বেশিরভাগ সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি যখন চীন যাই সেখানকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের কথা শোনার চেষ্টা করি। তাদের আলোচনার বিষয়গুলো হলো- প্রযুক্তি, ব্যবসার মডেল। কিন্তু যখন আমি টেক্সাসে ফিরে আসি, সেখানকার আলোচনাগুলো হয় অনেক ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা সরকার, আইন ও নানা রাজনৈতিক আলাপ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। প্রফেসর ঝাং বলেন, চীনের মানুষ শুধু চিন্তা করে কীভাবে আরো বেশি ধনী হওয়া যাবে। তারা নতুন নতুন ব্যবসায় আগ্রহী, নতুন প্রযুক্তিতে আগ্রহী। যখন কেউ শুধু রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামায় সেটা তার জীবনে কোনো কাজে আসে না। এর জন্য কেউ তাকে টাকা দিচ্ছে না। চীনের সরকার কাজের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়াটাকেই উৎসাহিত করছে।
আর এসব কারণে অর্থনৈতিক দিক থেকে নিশ্চিতভাবেই চীন ইতিমধ্যে পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। দেশটির অর্থনীতি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম। তাদের ক্রয়-সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চীনের মানুষ প্রতি দিন আগের দিন থেকে ধনী হয়ে উঠছে। এ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে চীনাদের মাথাপিছু আয় দ্রুত বাড়তে শুরু করে। গত ২০ বছরে দেশটির মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৮ গুনেরও বেশি! পাশাপাশি দেশটিতে দীর্ঘদিন এক সন্তান নীতি থাকায় চীনের জনসংখ্যা এখন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে এসেছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ২০২৩ সালের পর থেকে চীনের জনসংখ্যা কমতে শুরু করবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এ সফলতা চীনকে পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশে সাহায্য করবে।
পরাশক্তি হয়ে ওঠার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি। বাস্তবতা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এ দিক থেকে চীন এখনো অনেক পেছনে রয়েছে। কিন্তু সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে চীন বদ্ধপরিকর। ইতিমধ্যে দেশটি তার প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হয় রাশিয়াকে। চীনের প্রতিরক্ষা বাজেট রাশিয়ার তিন গুনেরও বেশি। ১৯৮৯ সালে যেখানে চীনের প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল মাত্র ১৯ বিলিয়ন ডলার ২০১৬-তে এসে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ২২৮ বিলিয়ন ডলারে। প্রতি বছর এই বাজেট বেড়েই চলেছে। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিকতম সমরাস্ত্র কিনে নিজের সেনাবাহিনীকে যেকোনো দেশের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করছে দেশটি। চীন সর্বশেষ যুদ্ধ করেছিল ১৯৭৯ সালে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভিয়েতনামের সঙ্গে। কিন্তু এরপর দেশটির সেনাবাহিনীকে পৃথিবীর অন্যতম সেরা করে তোলা হয়েছে। চীন নিজেই তার প্রয়োজনের ৮৫ ভাগেরও বেশি অস্ত্র উৎপাদনে সক্ষম। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের প্রভাব বিস্তার তার আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। চীনের নৌবাহিনীও এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সাবমেরিন ও ক্ষেপণাস্ত্রের দিক থেকে দেশটি এ অঞ্চলে সেরা হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের থেকে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের সংখ্যায় পিছিয়ে থাকলেও থেমে নেই চীন। বিশ্বজয়ের জন্য সবার আগে শক্তিশালী নৌবাহিনী দরকার, সেটি মাথায় রেখেই নিজ দেশে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার তৈরি করছে চীন।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীন যেদিকে বেশি পিছিয়ে আছে সেটি হলো পরমাণু বোমা। যেখানে রাশিয়ার ও যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমার সংখ্যা যথাক্রমে ৭৮০০ ও ৭৫০০, সেখানে চীনের পরমাণু বোমা মাত্র সাড়ে চারশর মতো। দেশটি মূলত নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। এর মধ্যে রয়েছে, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
পৃথিবীর ৪২ দেশে কমপক্ষে ৫১৬টি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তি হয়ে উঠতে যা অনেক বেশি সাহায্য করেছে। সেই একই পথে হাঁটতে থাকা চীনও প্রথমবারের মতো জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। দক্ষিণ চীন সাগরে দেশটি নিজ এলাকা থেকেই প্রভাব বিস্তারে সক্ষম। পাশাপাশি, ভারতীয় মহাসাগরেও নিজের প্রভাব বাড়িয়ে তুলেছে চীন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে চীনের প্রভাব এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশগুলো নানা কারণে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। এশিয়া ছাড়িয়ে আফ্রিকা এমনকি লাতিন আমেরিকাতেও চীনের প্রভাব বেড়ে চলেছে। পরাশক্তিতে পরিণত হতে যেসব দিকে নজর দেয়া দরকার, তার সবগুলোতেই এগিয়ে যাচ্ছে চীন। প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যাগুলোকে যেভাবে জয় করে এসেছে এবং এখনো লড়াই করে চলেছে, দেশটি তাতে অদূর ভবিষ্যতেই নিজ লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। নিশ্চিতভাবেই বিশ্বের আরেকটি শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে চীন।

শ্রমিকরা যা চান by মরিয়ম চম্পা

সন্তুষ্ট নন পোশাক শ্রমিকরা। অব্যাহত রয়েছে তাদের আন্দোলন। আন্দোলনকারীদের কেউ বলছেন, তাদের বর্ধিত বেতন দেয়া হচ্ছে না। আবার কেউ বলছেন, মজুরি বাড়ানোর ঘোষণা এলেও কার্যত তাদের মজুরি বাড়েনি। কেউ কেউ বলছেন, মজুরি বাড়ানোর বদলে কমিয়ে দেয়া হয়েছে। আসলে কেন তারা আন্দোলন করছেন, দাবিই বা কী? গতকাল আন্দোলনরত শ্রমিকদের কাছে এমন প্রশ্ন ছিল মানবজমিনেরমিরপুর টেকনিক্যাল এলাকায় আন্দোলনরত শ্রমিক সালমা বলেন, নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে আমাদের বেতন বাড়ানোর কথা বলা হলেও মালিক পক্ষ তা বাড়ায়নি। আমরা চাই সরকারের নির্ধারিত বেতন কাঠামোর পুরোটাই যেন আমাদের দেয়া হয়। আমরা তো অফিসে কাজে কোনো ফাঁকি দেই না।
তাহলে গার্মেন্টস মালিকরা আমাদের সঙ্গে ইঁদুর-বিড়াল খেলা খেলছে কেনো। ন্যায্য মজুরির বাইরে আমরা বাড়তি এক টাকাও চাইনি। সুইং অপারেটর নাসিমা বলেন, একজন হেলপারের বেতন ৮ হাজার টাকা। আবার অপারেটরের বেতনও তাই।
বেতন- ভাতার এই বৈষম্যের কারণে আমরা আন্দোলন করছি। আমরা মনে করি একজন হেলপারের যা বেতন তার দ্বিগুণ দিতে হবে অপারেটরকে। হেলপার শাহনাজ বলেন, আমরা চাই অন্য দশটা গার্মেন্টস যেমন চলে আমাদের গার্মেন্টসও তেমন চলুক। গত শুক্রবার মিরপুরের টেকনিক্যালে এ্যাপারেল এক্সপোর্ট নামে একটি গার্মেন্টসের এক নারী শ্রমিককে আন্দোলন করার অভিযোগে মালিক পক্ষের লোকেরা অফিসের ভেতরে আটকে মারধর করেছে। তারা আমাদের ন্যায্য মজুরিও দেবেন না আবার অত্যাচারও করবেন- এটা তো মেনে নেয়া যায় না। অপারেটর সালেহা বলেন, আমাদের সকল দাবি-দাওয়া মেনে না নেয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলতে থাকবে। মিরপুরে বেবিলন, কেয়ার, হাইপয়েন্টসহ অনেকগুলো গার্মেন্টস আছে যারা শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন- মজুরি দিচ্ছে। আমাদেরও একই কাঠামোতে দেয়া হলে ঝামেলা মিটে যায়।
কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর শাহিদা আক্তার বলেন, আমাদের দাবি একটাই। সরকার যে বেতন নির্ধারণ করেছে সে অনুযায়ী আমরা বেতন চাই। বিএ পাস করে চাকরি করছি। সরকারি চাকরির বয়সও শেষ। মালিকরা আমাদের বোকা বানাতে আগের বেতনের সঙ্গে মাত্র ৪ থেকে ৫শ’ টাকা বাড়িয়েছে। সাজিদা খানম বলেন, এই মাসে আমাদের বাসা ভাড়া বাড়িয়েছে বাড়িওয়ালা। বাজারের জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। কিন্তু আমাদের বেতন তো বাড়েনি।
ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়। তিনবেলা অন্তত ডাল-ভাত খেয়ে থাকতে হয়। মাসে একবার, কোনো মাসে অতিরিক্ত দুইবার মাংস কিনি। অথচ আমাদের কষ্টগুলো বোঝার মানুষ নেই। আমাদের দিয়ে মালিকরা ঠিকই প্রডাকশন বাড়িয়ে টার্গেট পূরণ করছে। না পারলে গালিগালাজ করে। এমনকি গায়ে পর্যন্ত হাত তুলতে দ্বিধা করে না। অপারেটর সোহাগ বলেন, আমাদের বেতন পর্যাপ্ত পরিমাণে করা হয়নি বলেই আজ আমরা আন্দোলনে নেমেছি। আমরা চাই মালিক- শ্রমিকদের সকল ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বেতন দেয়া হোক। তাহলেই আমরা রাজপথ ছেড়ে পুনরায় কাজে যোগ দেবো। অপারেটর মানিক বলেন, সরকার আমাদের বেতন করেছে ৮ হাজার ৩শ’ টাকা। কিন্তু মালিকরা সেখানে দিচ্ছে ৬ হাজার বা তার থেকে সামান্য কম-বেশি। যেটা আগের বেতনের তুলনায় মাত্র ৫ থেকে ৬শ’ টাকা বেশি। আমাদের দাবি যতদিন পর্যন্ত না মেনে নেয়া হবে আমরা ততদিন পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবো।
রাসেল রহমান বলেন, হেলপার- অপারেটরের বেতন সমান হলে সেটা কীভাবে মেনে নেই বলেন। যদিও আমরা একই সঙ্গে কাজ করি। হেলপারদের সঙ্গে আমাদের কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু গার্মেন্ট মালিকরা চালাকি করে আমাদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করছে। অথচ আন্দোলনে আমরা সবাই অংশ নিয়েছি। আমরা সবাই শ্রমিক। আমরা একে অন্যের কষ্ট বুঝি। অপারেটর চাঁদনী বেগম বলেন, গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে গার্মেন্টসে সিনিয়র অপারেটর হিসেবে কাজ করছি। অথচ মাত্র দুই বছর আগে যে হেলপার কাজ করছে তার বেতন আর আমার বেতন একই। নতুন হেলপার আর সিনিয়র অপারেটরের বেতন যদি একই হয় তাহলে এত বছর একই অফিসে কাজ করে কি লাভ হলো।

৩ গ্রেড সমন্বয় করে বেতন কাঠামো হচ্ছে

পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরির আলোচিত তিন গ্রেড ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেড সমন্বয় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের অব্যাহত আন্দোলন চলাকালে গতকাল শ্রম মন্ত্রণালয়ে পোশাক শ্রমিকদের বেতন বৈষম্য নিরসনে গঠিত পর্যালোচনা কমিটির জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, পোশাক কারখানার মালিক, শ্রমিক ও সরকার, ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে শনাক্ত করা সমস্যাগুলো নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
আজ রোববার কমিটির নির্ধারিত বৈঠক আছে। সেখানে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ও কমিটির আহ্বায়ক আফরোজা খানের সভাপতিত্বে বৈঠকে এফবিসিসিআই’র সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সালাম মুর্শেদী, বাণিজ্য সচিব মফিজুল ইসলাম, বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিনসহ কমিটির ১২ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। পোশাক শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো পর্যালোচনার জন্য গঠিত ১২ সদস্যের কমিটির দ্বিতীয় সভা এটি। এর আগে ১০ই জানুয়ারি পোশাক শ্রমিকদের বেতন বৈষম্য নিরসনে পর্যালোচনা কমিটির প্রথম সভা হয়।
বৈঠক থেকে বের হয়ে এফবিসিসিআই’র সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, এই সভাটি ছিল জনগুরুত্বপূর্ণ।
সভায় মালিক ও শ্রমিক দুই পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশষে করে ৩, ৪ ও ৫ নং গ্রেডে যে সমস্যা ছিল সেটা নিয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। এগুলো নিয়ে সমন্বয় করা হবে। এর মধ্যে বেশকিছু সিদ্ধান্তে একমত হয়েছে দুই পক্ষই। আশা করছি রোববার নির্ধারিত বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। এ ছাড়া সভায় শ্রমিকরা যেন রাস্তায় আবারো না নেমে কাজে যোগ দেয় এর জন্য বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে তিনি বলেন।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, জরুরি বৈঠকে শ্রমিকদের ‘পর্যালোচনা কমিটি’র ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন কমিটির আহ্বায়ক আফরোজা খান। বৈঠকে সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের ব্যাপারে সবাই একমত হয়েছেন। দ্রুত সমাধান করার লক্ষ্যেই এই মিটিং ডাকা হয়েছে বলেও জানান এই শ্রমিক নেতা। তিনি বলেন, আজ কমিটির নির্ধারিত বৈঠক আছে। সেখানে একটা ভালো ফল পাওয়া যাবে। আমিরুল হক বলেন, শ্রমিকদের অন্যান্য সুযোগ বাড়াতে গিয়ে মূল বেতন কমে গেছে। ফলে বেসিক বেতন বাড়ানোর বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। তবে কত টাকা বাড়বে সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ছাড়া মজুরি কাঠামোর ৭টা গ্রেডের মধ্যে ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেডে গ্রস বেতন আরো বাড়ানোর বিষয়ে কথা হয়েছে।
জানা গেছে, বৈঠকে আগের মিটিংয়ের সূত্র ধরেই এ মিটিংয়েও পোশাক শ্রমিকদের কাজে যোগ দেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন শ্রম সচিব আফরোজা খান। তিনি বলেছেন, যেহেতু মজুরি কাঠামোর মূল সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে, সেহেতু খুব দ্রুত এর সমাধান করা হবে। আপনারা (পোশাক শ্রমিক) সরকারের প্রতি আস্থা রাখুন, কমিটির প্রতি আস্থা রাখুন, প্রত্যেকে কাজে যোগ দিন।
এর আগে ১০ই জানুয়ারি কমিটি প্রথম সভা করে শ্রম মন্ত্রণালয়ে। কমিটির প্রথম বৈঠকেই মজুরি কাঠামোর মূল সমস্যা চিহ্নিত করা হয়। সেখানে মজুরি কাঠামোর সাতটা গ্রেডের মধ্যে ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেডে মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বেতন কাঠামোতে বৈষম্য দূর করাসহ বিভিন্ন দাবিতে গত ৬ই জানুয়ারি থেকে আন্দোলন করছেন পোশাক শ্রমিকরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১২ সদস্যের পোশাক শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন করা হয়।
মজুরি কাঠামোর গ্রেড পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পোশাক খাতের মজুরি কাঠামোর মোট ৭টি গ্রেডের চারটিতে (৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর গ্রেড) মূল মজুরি বেড়েছে। তবে ৩ নং গ্রেডে মূল মজুরি না বেড়ে ৪০ টাকা কমেছে। ২ নং গ্রেডে কমেছে ৪১২ ও ১ নং গ্রেডে ৪০৫ টাকা। নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ মূলত ৩, ৪ ও ৫ নং গ্রেডের শ্রমিকদের। এর মধ্যে ৩ নম্বর গ্রেডের শ্রমিকদের অসন্তোষ মূল মজুরি কমে যাওয়ায়। আর ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেডের শ্রমিকরা অসন্তোষ প্রকাশ করছেন মূল মজুরি তুলনামূলক কম বাড়ায়। প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি হওয়ায় ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেডের পুরনো অনেক শ্রমিক ঘোষিত নতুন মজুরি কাঠামোর সমপরিমাণ মূল মজুরি এখনই পাচ্ছেন। প্রায় প্রতিটি কারখানায় এই তিন গ্রেডেই সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করেন।

ঢাকা-সাভারে শ্রমিক বিক্ষোভ, সংঘর্ষ

সরকার নির্ধারিত নতুন বেতন কাঠামো সমন্বয় ও বাস্তবায়নের দাবিতে পোশাক শ্রমিকরা বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন। গতকাল ঢাকার মিরপুরের দারুস সালাম, টেকনিক্যাল মোড়, বাঙলা কলেজ, শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১৪,  সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। এসময় বিক্ষুব্ধ পোশাক শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ এবং যানবাহন ভাঙচুর করেন। শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আশেপাশের এলাকাগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের সরাতে পুলিশ বাধা দিলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে ১৫ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন শ্রমিকরা। পরে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান থেকে গরম পানি ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
এক পর্যায়ে পুলিশ, গার্মেন্টস মালিকদের আশ্বাস ও মিরপুর এলাকায় ছাত্রলীগের অবস্থানের কারণে শ্রমিকরা বিক্ষোভ ছেড়ে কাজে যোগ দেন।
গতকাল সকাল ১০টা থেকে রাজধানীর টেকনিক্যাল মোড়ে অবস্থান নেয় অ্যাপারেল এক্সপোর্ট লিমিটেডের পোশাক শ্রমিকরা। বেতন-ভাতার সমন্বয় ও সহকর্মীকে মারধরের প্রতিবাদে প্রায় ১ হাজার ২০০ শ্রমিক বিক্ষোভে নামে। এসময় তাদের সঙ্গে আশেপাশের আরো কয়েকটি কারখানার শ্রমিক যোগ দেয়। এসময় তারা গাবতলী সড়কের টেকনিক্যাল মোড়ে অবস্থান নেয়। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিরপুর টোলারবাগ সড়ক, বাঙলা কলেজের সামনে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ছড়িয়ে পড়েন। শ্রমিক বিক্ষোভের কয়েক ঘণ্টা পরও এসব গার্মেন্টসের মালিক পক্ষ বা পুলিশের কোনো তৎপরতা ছিল না। শ্রমিকরা তখন সেখানে দুটি যানবাহন ভাঙচুর করেছে। ফলে এসব সড়ক দিয়ে অন্যান্য যানবাহন চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে সেখানে বাঙলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সহ-সভাপতি নাছির নঈম মুহিম, সাংগঠনিক সম্পাদক সাদ্দাম, সহ-সম্পাদক লাবু, ছাত্রলীগ কর্মী মানিক চৌধুরীসহ অন্তত ৪০/৫০ জন নেতাকর্মী উপস্থিত হন।
এসময় দু’পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে দুপুর ১টার দিকে শ্রমিকরা প্রধান সড়ক থেকে সরে অ্যাপারেল কারখানার সামনে অবস্থান নেয়। দুপুর ২টার দিকে মালিক পক্ষের আশ্বাসে শ্রমিকরা কাজে ফিরে যায়। অ্যাপারেল কারখানার শ্রমিক রিনা বলেন, প্রতিদিনের মতো সকালে এসে আমরা কাজে যোগ দেই। এসময় বেতন বাড়ানোর কথা বলাতে আমাদের এক সহকর্মীকে মালিক পক্ষের লোকজন মারধর করে মাথা ফাটিয়ে দেয়। এ খবর সবাই জানাজানির পর আমরা কাজ ছেড়ে বিক্ষোভে নামি। আহমেদ ফ্যাশন ইউনিট-২ এর শ্রমিক দীন ইসলাম বলেন, মালিক পক্ষের জসিম নামের এক কর্মকর্তা চন্দন নামে এক শ্রমিককে মারধর করার প্রতিবাদ ও বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবিতে সকালে আমরা টেকনিক্যাল মোড়ে অবস্থান নিয়েছিলাম। পরে মালিক পক্ষের আশ্বাসে আমরা সেখান থেকে সরে দাঁড়িয়েছি। মো. মনির নামের আরেক শ্রমিক বলেন, আমাদের বেতন বাড়ানো  তো দূরের কথা যা সুযোগ-সুবিধা পেতাম সেটাও এখন কমানো হয়েছে। মিলন নামের এক শ্রমিক বলেন, আলাদা আলাদা বেতনের শিট তৈরি করা হয়। শিটে যে বেতনের কথা উল্লেখ থাকে সে বেতন আমাদের দেয়া হয় না।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দাদন ফকির বলেন, সরকার নির্ধারিত বেতন বাস্তবায়নের দাবিতে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে। রাস্তায় নামার কারণে সড়কে যানবাহন চলাচল করতে পারছিলো না। পুলিশ তাদেরকে পরে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
আশুলিয়ায় বিক্ষোভ- সড়ক অবরোধ, আহত ৩০
সাভারের আশুলিয়ায় মজুরি বৈষম্যের অভিযোগ তুলে তা সংশোধন এবং সমহারে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন গার্মেন্ট শ্রমিকরা। এসময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল, জলকামান ব্যবহার ও লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পুলিশ ও বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা জানান, গতকাল সকাল ৯টায় আশুলিয়ার বেরন এলাকার ইয়াগী বাংলাদেশ লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা প্রথমে মজুরি বৈষ্যমের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেন। এসময় তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন পার্শ্ববর্তী স্টারলিংক ক্রিয়েশন, উইন্ডি গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি কারখানার কয়েক হাজার শ্রমিক। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের জামগড়া ও বেরন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে। এসময় পুলিশ প্রথমে শ্রমিকদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা দাবি আদায়ে অনড় হয়ে রাস্তায় অবস্থান নিলে পুলিশ জলকামান, টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জ করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে। পরে দুই ঘণ্টাব্যাপী দফায় দফায় সড়ক অবরোধ করে প্রায় ২০টি গাড়ি ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলা সংঘর্ষে প্রায় ৩০ জন শ্রমিক আহত হন।
এদিকে বেরন এলাকার শারমিন গ্রুপের এএম ডিজাইন কারখানার শ্রমিকরা দুপুরের খাবার খেতে বাসায় যাওয়ার পথে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা স্থানীয় বিভিন্ন শাখা সড়কে অবস্থান নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালান। কেউ আবার কারখানায় ফিরে এসে কাজে যোগদান করেন। এএম ডিজাইন কারখানার শ্রমিক আলামিন বলেন, বেতন কম হওয়ার পরও আমরা আন্দোলন না করে কাজ করায় দুপুরে খাবার খেতে বাসায় যাওয়ার পথে পার্শ্ববর্তী স্টারলিংক কারখানার আন্দোলনকারী শ্রমিকরা আমাদেরকে মারধর করেন। কারখানাটির মালিক ইসমাইল হোসেন বলেন, আমাদের কারখানায় কোনো সমস্যা নেই। সবাই কাজ করছেন। কিন্তু বহিরাগত শ্রমিকরা তাদেরকে মারধর করে আন্দোলনে অংশ নিতে বাধ্য করছেন। অন্য একটি কারখানার শ্রমিক শারমিন, পারভিন ও নাজমা আক্তার জানান, বেতন বৈষম্যের অভিযোগে সাধারণ শ্রমিকরা আন্দোলন করায় কারখানার স্টাফ ও ভাড়াটে লোকজন আমাদেরকে মারধর করে আটকে রাখেন।
এসময় তারা বেশ কয়েকজন শ্রমিককে মারধর করেন। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা জাকির হোসেন নামে এক স্টাফকে মারধর করে কারখানার ভেতরে পুকুরে ফেলে দেন। পরে কারখানার লোকজন তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করেন। নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে জাকির হোসেন, বাবু মিয়াসহ আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিককে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। সব মিলিয়ে দিনব্যাপী চলা সংঘর্ষে কমপক্ষে ৩০ শ্রমিক আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন আন্দোলনকারী শ্রমিকরা। শিল্প পুলিশের পরিচালক সানা শামীনুর রহমান বলেন, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা দাবি আদায়ে সড়ক অবরোধ করে প্রায় ২০টি গাড়ি ভাঙচুর করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে জলকামান, টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জ করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিই। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে শিল্প এলাকায় ৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রস্তুত রয়েছেন।
গাজীপুরে শ্রমিক অসন্তোষ
গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় গতকালও শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। শ্রমিকরা সড়কে নেমে আসলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয় কয়েক দফা। শ্রমিক আন্দোলনের জেরে অন্তত ২০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
পুলিশ ও আন্দোলনরত শ্রমিকরা জানান, পোশাক শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবির আন্দোলনে শনিবার সকালে গাজীপুর মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার টার্গেট ফ্যাশন কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-গাজীপুর সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ ধাওয়া দিয়ে, লাঠিপেটা করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
এছাড়া মোগরখাল এলাকায় বিসিএল কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিলে তাদের সঙ্গে মালিকপক্ষের লোকজনের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। নগরের কোনাবাড়ী বিসিক এলাকায় কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ সৃষ্টি করতে চাইলে পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয়। শ্রমিক আন্দোলনের কারণে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া, কোনাবাড়ী, মোগরখাল এলাকাসহ আশেপাশের এলাকার অন্তত ২০টি কারখানা ছুটি দেয়া হয়। গাজীপুরের শিল্প এলাকাগুলোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

১০ লাখ অভিবাসী নেবে কানাডা, সুযোগ নিতে পারেন বাংলাদেশিরা

পশ্চিমা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ যখন শরণার্থী ও অভিবাসীদের জন্য দরজা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে সেই সময়ে বাস্তুচ্যুত বা উন্নত জীবন-জীবিকার আশায় স্থানচ্যুত  ব্যক্তিদের আশ্রয় দেবে কানাডা। আগামী তিন বছরে সারা বিশ্ব থেকে ১০ লাখ অভিবাসী নেবে কানাডা। সিএনএন জানিয়েছে, ১০ লাখ অভিবাসী নেয়ার এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কানাডার পার্লামেন্টে, যা প্রতি বছর দেশটির মোট জনসংখ্যার এক শতাংশ। এর আগে ২০১৭ সালে কানাডা সারা বিশ্ব থেকে ২ লাখ ৮৬ হাজার অভিবাসী নিয়েছে। এ বছর সংখ্যাটা সাড়ে ৩ লাখ ছুঁয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আর ২০২০ ও ২১ সালে তা দাঁড়াবে যথাক্রমে-৩ লাখ ৬০ হাজার ও ৩ লাখ ৭০ হাজারে। এ বিষয়ে কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী ও নাগরিকত্ববিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ হুসেন বলেন, বিভিন্ন সময়ে যারা কানাডায় অভিবাসী হিসেবে এসেছেন তাদের ধন্যবাদ। দেশের নাগরিকরা একটি শক্তিশালী ও গতিশীল কানাডা উপভোগ করেন।
আহমেদ নিজেও কানাডায় অভিবাসী হিসেবে সোমালিয়া থেকে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, পার্লামেন্টের এই সিদ্ধান্ত কানাডার বেড়ে যাওয়া বয়োবৃদ্ধ নাগরিক ও হ্রাস পাওয়া জন্মহারের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করবে। কানাডার এমন সিদ্ধান্তে খুশি বাংলাদেশিরা। বৈধভাবে অনেক বাংলাদেশি কানাডায় স্থায়ী হয়েছে। অনেকে যেতে আগ্রহী। দেশটির রিকুয়ারমেন্ট বা প্রয়োজন মিটিয়ে বাংলাদেশিরাও এ সুযোগ নিতে পারেন। বিশেষত বৈধভাবে অভিবাসনে আগ্রহী বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের জন্য এটি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে বলে মনে করছে ঢাকা।

ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬ ভাগ -ক্যাবের প্রতিবেদন

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) রাজধানী ঢাকার খুচরা বাজার ও বিভিন্ন সেবার দাম বিশ্লেষণ করে বলেছে, ২০১৮ সালে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬ শতাংশ। পণ্যমূল্য ও সেবা সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৫.১৯ শতাংশ। এর আগে ২০১৭ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছিল ৮.৪৪ শতাংশ, পণ্যমূল্য ও সেবা সার্ভিসের মূল্য বেড়েছিল ৭.১৭ শতাংশ। অর্থাৎ আগের বছরের চেয়ে গত বছর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, প্রবৃদ্ধির হার কমেছে ২.৪৪ শতাংশ। আর সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে প্রসাধনী পণ্য সাবানের। পণ্যটির মূল্য গড়ে বেড়েছে ২০ শতাংশ।
গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব এ তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বাদ দিয়ে জীবনযাপনের ব্যয় সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে সংগঠনটি।
এ সময় ক্যাবের উপদেষ্টা এম শামসুল আলম, সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন।
ক্যাবের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান জানান, ঢাকা শহরের ১৫টি খুচরা বাজারের ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২২টি নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী এবং ১৪টি সেবা সংস্থার তথ্য নিয়ে এই পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করেছেন তারা। ভোক্তার ঝুলিতে যেসব পণ্য ও সেবা রয়েছে সেসব পণ্য ও সেবা পরিবারের মোট ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে পণ্য ও সেবার ওজনের ভিত্তিতে শহুরে জীবনযাত্রার ব্যয়ের এই হিসাব বের করেছে ক্যাব।
দেশের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ গ্রামে থাকলেও নিজেদের সামর্থ্যের অভাবে ব্যয়ের সার্বিক চিত্র তুলে আনা সম্ভব হয়নি জানিয়ে ক্যাব চেয়ারম্যান বলেন, শহুরে এই হিসাব সার্বিক চিত্র সম্পর্কে একটি আংশিক ধারণা দেবে।
ক্যাব সভাপতি বলেন, আমাদের আয় বৈষম্য বাড়ছে। এটা শুভ লক্ষণ নয়। তবে, আমাদের আয় বাড়ছে। সেক্ষেত্রে কারো আয় বেড়েছে কোটি টাকা, কারো শত টাকা। তবে, মানুষের মধ্যে আয় বাড়ায় একটু স্বস্তির ভাব রয়েছে। যেভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে সেভাবে যদি আয় বাড়ার বিষয়ে সরকার নজর দেয় তাহলে ব্যয় নিয়ে মানুষ স্বস্তিবোধ করবে।
তিনি বলেন- ক্যাবের পর্যবেক্ষণ, ২০১৮ সালে অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল ছিল। মোটা চালের দাম ১৫ শতাংশ, ডালের দাম গড়ে ১৭ শতাংশ, তেলের দাম ২ শতাংশ, মসলার দাম ২২ শতাংশ, শাক-সবজির দাম প্রায় ১১ শতাংশ এবং চিনির দাম ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমেছে।
২০১৮ সালে দাম বেড়েছে: ক্যাবের হিসাবে ২০১৮ সালে এর আগের বছরের তুলনায় সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে সাবানের। এই পণ্যটির দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়া চালের গড় মূল্য ৮.৯১ শতাংশ, মাছের দাম ১৩.৫০ শতাংশ, শাক-সবজিতে ৯.৩৮ শতাংশ, পান-সুপারিতে ৭.১৮ শতাংশ, তরল দুধে ১৩.৩৩ শতাংশ দাম বেড়েছে।
২০১৮ সালে দাম কমেছে: ২০১৮ সালে এর আগের বছরের তুলনায় ডাল, লবণ, মসলা, চিনির দাম কিছুটা কমেছে। দেশি মসুর ডালে ১২.৪৩ শতাংশ, আমদানি করা মসুর ডালে ১০.৮৪ শতাংশ, আস্ত ছোলার দাম ৩.৩৭ শতাংশ, দেশি রসুন ২০.৫৩ শতাংশ, আমদানি রসুন ৩২.৩৭ শতাংশ কমেছে। ভোজ্য তেল, গুঁড়ো দুধ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও রেলের ভাড়া এই বছর ছিল অপরিবর্তিত।
এই ব্যয়বৃদ্ধি যৌক্তিক কী না- এ প্রশ্নের জবাবে গোলাম রহমান বলেন, ব্যয় বৃদ্ধির এই হার ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ভিন্ন রকম ফল বয়ে আনতে পারে। ব্যয় অনুপাতে একজন ব্যক্তির আয় বৃদ্ধি না পেলে তো সেটা স্বস্তিদায়ক হবে না। আয় বৃদ্ধির ওপর আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। যদি ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় মানুষের আয় বৃদ্ধি হয় তাহলে সেটাই হবে স্বস্তিদায়ক।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, গত বছর আমদানি শুল্ক বাবদ এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা দিতে হয়েছে ভোক্তাদের। এটি প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের তুলনায় অনেক বেশি। ভোক্তাদের উপর থেকে এই শুল্কের হার কমাতে হবে।
বাংলাদেশে আমদানি পণ্যের ওপর ২০১৭ সালে গড়ে ২৫.৬৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। ২০১৬ সালে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে গড়ে শুল্ক ছিল ৪.৭৩ শতাংশ, কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় এর হার ছিল ১২.১৯ শতাংশ।
ক্যাবের সুপারিশ: ক্যাবের প্রস্তাব অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংস্কার এবং ‘প্রাইস স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’ গঠন করে দেশে জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা। এলএনজি আমদানি সকল প্রকার শুল্ক-কর মুক্ত রেখে গ্যাসের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা। চিকিৎসকদের ফিসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ, ওষুধের মান ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সুলভে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা প্রদান নিশ্চিত করা। শিক্ষা খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করার লক্ষ্যে অবিলম্বে শিক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। শিক্ষার মান উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তা-স্বার্থ সংরক্ষণে প্রণীত আইন ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯, প্রতিযোগিতা আইন ২০১২, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫ এর বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

বাণিজ্যমেলা: কারাপণ্যে ক্রেতাদের আগ্রহ by মোহাম্মদ ওমর ফারুক

সারা দেশের সব কারাগারের কয়েদিদের দিয়ে তৈরি প্রায় দুইশ’টি পণ্য নিয়ে বাংলাদেশ জেলা কারাগার পণ্য প্যাভিলিয়নটি শোভা পাচ্ছে। এবারের ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার অন্যতম আকর্ষণ এই প্যাভিলিয়নটি। পুঁতি, তাঁত, পাট, বাঁশ, কাঠ ও প্লাস্টিকের তৈরি প্রায় ২শ’ ধরনের কারাপণ্য পাওয়া যাচ্ছে এই প্যাভিলিয়নে। এসব পণ্য ক্রেতাদের দারুণ আকৃষ্ট করছে। মেলায় দায়িত্বরত টাঙ্গাইল জেলা কারাগারের জেলার আবুল বাশার বলেন, শুরু থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। বিশেষ করে এখানে অনেক ধরনের পণ্য আছে, তাই ক্রেতারা এখানে এসে কিছু না কিছু তো পছন্দ করছেনই। তাছাড়া পণ্যগুলো বেশ সাশ্রই দামেও পাওয়া যাচ্ছে। এজন্যই মূলত এখানে ক্রেতারা ভিড় জমাচ্ছেন।
প্যাভিলিয়নে গিয়ে দেখা যায়, মেলার চতুর্থ দিনেই ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের দারুণ ভিড়। কয়েদিদের হাতে তৈরি পণ্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন সবাই। জানা যায়, এসব পণ্য বিক্রির একটি অংশ পাবেন কয়েদি শ্রমিকরা।
কথা হয় মিরপুর থেকে আসা শান্তা নওরীন নামের এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, কারাপণ্য প্যাভিলিয়নটিতে এসে কনফিউশনের মধ্যে পড়ে গেছি। এখানে এত পণ্য, যেখানে এলে সবারই আমার মতো অবস্থা হবে। তবে স্বল্প দাম হওয়ায় আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষদের জন্য খুব ভালো হয়েছে।
মেলা ঘুরে দেখা যায়, বাঁশ ও বেতের তৈরি মোড়া ৬০০ থেকে ৮৫০ টাকা, সিংহাসন চেয়ার আড়াই হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা, কুলা ও চালনি ১০০ থকে ৩০০ টাকা, ফুল ও ফলের ঝুড়ি ১০০ থেকে ২৫০ টাকা, পানদানি, কলমদানি ও ফুড কভার আকার ভেদে ২০০-৩০০ টাকায়, প্লাস্টিকের টেবিল ৪ হাজার, বিভিন্ন শো-পিস ১০০-৫০০ টাকা, কাঠের ফোল্ডিং চেয়ার ২২শ, কিচেন মোড়া ৭৫০, জুতার র‌্যাক ৭৫০, নকশী কাঁথা আড়াই হাজার থেকে চার হাজার, বুটিক ও বাটিকের থ্রিপিস ৫০০ থেকে হাজার টাকা, গামছা ও লুঙ্গি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, হস্তশিল্পের পুঁথিদানার ব্যাগ, পার্স ব্যাগ, নৌকা, ফুলদানি টিস্যু বক্স, শো-পিসসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে এ প্যাভিলিয়নে। ওয়ারড্রফ ২০ হাজার টাকাসহ এখানে কমদামে নানান পণ্য মিলছে।
তাছাড়া নারী কয়েদিদের দিয়ে তৈরি জলপাইয়ের আচার পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮৫ টাকায়। মেলার সংশ্লিষ্টরা জানান, এখানে প্রায় দুশ’টি পণ্যই পুরুষ কয়েদিরা তৈরি করেন আর শুধু মাত্র আচার বা খাবার জাতীয় পণ্যগুলো মহিলারা তৈরি করেন। কারণ মহিলা কয়েদিদের জায়গা স্বল্পতার কারণে তারা পণ্য তৈরি করতে পারেন না। প্যাভিলিয়নটিতে নারী ও পুরুষ বিক্রেতা রয়েছে প্রায় পঁচিশজনের মতো। যারা প্রতিনিয়ত ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন, তাদের পণ্য দেখাচ্ছেন। কারা-উপ-পরিদর্শক বজলুল রশীদ বলেন, এখানে মূলত কারাগারে কয়েদিদের দিয়ে যেসব পণ্য বানানো হয়, সেসব পণ্য দিয়েই আমাদের এই আয়োজন।
তাছাড়া পণ্যগুলোকে ব্র্যান্ডিং করাই এর মূল উদ্দেশ্য। কয়েদিরা যেসব পণ্য তৈরি করে সেগুলো জেলাপর্যায়ে কারাগারের বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্যাভিলিয়নটির জন্য বাংলাদেশ জেলা কারা সংশ্লিষ্টদের গুনতে হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেলা জমে উঠলে প্রতিদিন এখানে প্রায় লাখ তিনেক টাকার পণ্য বিক্রি হয়।

জামায়াতের সঙ্গে রাজনীতি করছি না, করবো না -ড. কামাল

জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করছেন না, ভবিষ্যতেও করবেন না বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। গতকাল গণফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক শেষে বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান। ড. কামাল বলেন, জামায়াত নিয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত একদম পরিষ্কার। তাদের নিয়ে আমরা রাজনীতি করার কথা কোনদিন চিন্তাও করিনি। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছে আমরা তাদের সঙ্গে ঐক্য করেছি। কিন্তু আমি সঙ্গে সঙ্গে বলেছি- ঐক্য করার সময় আমাকে বলা হয়নি যে তারা এর মধ্যে থাকবে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে একদম পরিষ্কার।
জামায়াতকে নিয়ে আমরা রাজনীতি করবো না। এক প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল বলেন,  তাড়াতাড়ি ঐক্য করতে গিয়ে যে ভুলগুলো হয়েছে তার মধ্যে জামায়াত ইস্যুটাও একটা ভালো উদাহরণ।
ইতিমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় বলেছি, আমি যখন ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছি তখন আমাকে জানানো হয়নি যে জামায়াতকেও ধানের শীষ প্রতীক দেয়া হবে। আমার মতে এটাও একটা ভুল। এ সময় গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু বলেন, আমরা ঐক্য করেছি বিএনপির সঙ্গে। জামায়াত বা ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে ঐক্য করিনি। তারপরও যেহেতু জামায়াতের ২২ জনের কথা চলে এসেছে।
সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিএনপিকে জানিয়েছি। তারা তাদের মিটিংয়ে উত্থাপন করেছে। সেখানে তারা এটার প্রতিবাদ দিয়েছে। বিএনপি বলেছে, জামায়াত হিসেবে কাউকে প্রতীক দেয়নি। তারা বিএনপি হিসেবেই প্রতীক দিয়েছে। তার পর আমরা জানিয়েছি অবিলম্বে জামায়াতের ব্যাপারটা সুরাহা করা হোক। অবশ্যই আমরা জামায়াতের ব্যাপারটা সুরাহা চাই। আমরা পরিষ্কার বলেই দিয়েছি জামায়াতকে নিয়ে আমাদের রাজনীতি করার ইচ্ছা নেই। আগেও করিনি। এখনো করি না। ভবিষ্যতেও করবো না। বিএনপি যদি জামায়াতকে ছেড়ে না দেয় তাহলে কি আপনারা ঐক্যফ্রন্টে থাকবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল বলেন, যদি বলে কোনো উত্তর হয় না। যখন হবে তখন আমরা সিদ্ধান্ত জানাবো। গণফোরামের দুই বিজয়ী এমপির শপথ নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের ব্যাপারে আরো আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আমরা ইতিবাচকভাবে সিদ্ধান্ত নেব এটা বলেছি। তার মানে এই নয় যে, তারা শপথ গ্রহণ করবেন।
ট্রাইব্যুনালে মামলা করার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে। তবে মামলা করবে প্রত্যেক প্রার্থী। তিনি যদি মনে করেন এটা কোনো নির্বাচন হয়নি তাহলে তিনি মামলা করতে পারেন। ৩০ দিনের মধ্যে মামলা করার নিয়ম রয়েছে। এর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ সময় গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে কেন্দ্র ভিত্তিক ফলাফল চেয়েছি। কিন্তু এখনো পাইনি। তিনি বলেন, আমরা নিজেরাও বিভিন্ন রিপোর্ট  সংগ্রহ করেছি। আমি নিজে ঢাকা-৭ আসনের কোথায় কি অনিয়ম হয়েছে সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে রিপোর্ট দিয়েছি।
এর আগে লিখিত বক্তব্যে মোস্তফা মোহসীন মন্টু বলেন, ক্ষমতাসীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণের মত প্রকাশের অধিকার ও ভোটাধিকারকে খর্ব করেছে। প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ফলে জনগণ এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় নেতৃবৃন্দ দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করেছেন- গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
তবে তাড়াতাড়ি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত যেসব ভুল-ত্রুটি সংঘটিত হয়েছে, তা সংশোধন করে ভবিষ্যতের জন্য সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, গণফোরামের সংগঠনকে আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গণফোরামের নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আগামী ২৩ ও ২৪শে মার্চ ঢাকায় গণফোরামের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন- গণফোরাম নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা ড. রেজা কিবরিয়া, মুকাব্বির হোসেন, আ ও ম শফিক উল্লাহ প্রমুখ।

এত বড় জয় কারচুপিতে সম্ভব না -সজীব ওয়াজেদ জয়

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অভিযোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, এত বড় ব্যবধানের জয় কখনোই কারচুপির মাধ্যমে আদায় করা সম্ভব না। দিন শেষে মানুষ তাকেই বেছে নেয় যে তাকে উন্নত জীবন দিতে পারবে। গতকাল নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ থেকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে মন্তব্য করেন তিনি। সজীব ওয়াজেদ জয় লিখেছেন, সামপ্রতিক নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টকে বাংলাদেশের মানুষ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই তারা এখন তাদের বিদেশি প্রভুদের কাছে নালিশ করছে ও সাহায্য চাইছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যোগাযোগ ও লবিংয়ের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করতে চাইছে যে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে, যা পরিসংখ্যান মোতাবেক একেবারেই অসম্ভব। আওয়ামী লীগ বিএনপি থেকে প্রায় ৪ কোটি  ৯০ লাখ বেশি ভোট পেয়েছে।
এত বড় ব্যবধানের জয় কখনোই কারচুপির মাধ্যমে আদায় করা সম্ভব না। তারা বলছে, ভয় ভীতির কথা, কিন্তু যদি আমরা ধরেও নেই আওয়ামী লীগের বাইরের সব ভোট বিএনপি-জামায়াতের পক্ষেই যেত, তাহলেও ২ কোটি ২০ লাখ ভোটের ব্যবধান থাকতো বিএনপি আর আওয়ামী লীগের মধ্যে।
তারপরেও আমাদের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা কেউ কেউ বিএনপির এই আন্তর্জাতিক লবিংয়ের সঙ্গে সমান তালে গলা মিলিয়ে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। তাদের অভিযোগগুলোর উত্তর দেয়ার পাশাপাশি আমি নিজেও কিছু কথা বলতে চাই। তিনি লেখেন, তাদের প্রথম অভিযোগ, ভোটার সংখ্যা ছিল অত্যধিক, তার মানে ভুয়া ভোট দেয়া হয়েছে। এবার ভোট দেয়ার হার ছিল ৮০ শতাংশ, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ নয়। ২০০৮ সালের ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ অধীনে নির্বাচনে ভোট দেয়ার হার ছিল ৮৭ শতাংশ, যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড। সেই নির্বাচনটিতেও আওয়ামী লীগ ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ব্যাপক ব্যবধানে জয় পেয়েছিল। ২০০১ সালে ভোট দেয়ার হার ছিল ৭৫.৬ শতাংশ আর ১৯৯৬ সালে ছিল ৭৫ শতাংশ। ওই দুইটি নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোট দেয়ার হার সামান্য বেশি ছিল।
কারণ এক দশকে এটাই ছিল প্রথম অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন। দ্বিতীয় অপপ্রচার হচ্ছে-আওয়ামী লীগ নাকি এবার ৯০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এই কথাটি পুরোপুরি মিথ্যা। আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছে ৭২ শতাংশ। মহাজোটের অন্য শরিকরা পেয়েছে ৫ শতাংশের কম ভোট। এই ৭২ শতাংশও আওয়ামী লীগের জন্য সর্বোচ্চ না। কারণ ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৭৩.২ শতাংশ ভোট। সেইবার যেমন স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে আওয়ামী লীগ বিশাল বিজয় পেয়েছিল, এবারের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের ভোট বাড়ার পেছনে আছে দুটি সুনির্দিষ্ট কারণ। প্রথম কারণটি খুবই পরিষ্কার। আওয়ামী লীগ আমলে মানুষের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে যেকোনো সময়ের থেকে বেশি। আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হয়েছি, মাথাপিছু আয় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে, দারিদ্র্যের হার অর্ধেক করা হয়েছে, মোটামুটি সবাই এখন শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের জন্য যে উন্নয়ন আওয়ামী লীগ সরকার করেছে তা এখন দৃশ্যমান। আমাদের সুশীল সমাজ সব সময়ই বলার চেষ্টা করে বাংলাদেশের ভোটাররা নাকি পরিবর্তন চায়। এইসব ঢালাও কথাবার্তা, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এ থেকেই বোঝা যায় আসলে তারা কতটা জনসম্পৃক্ততাহীন।
আপনি যদি একজন সাধারণ মানুষ হন, এমনকি ধনী ব্যবসায়ীও হন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার সুফল আপনিও পাচ্ছেন। কেউ কেন এমন একটি সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিতে চাইবে যাদের আমলে তার জীবন বা ব্যবসার উন্নতি ঘটেছে? দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে আমাদের নির্বাচনী প্রচার কিন্তু গত বছর শুরু হয়নি। আমরা ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে আমাদের প্রচারণা শুরু করে দিয়েছিলাম। জনগণের কাছে আমাদের উন্নয়নের বার্তা পৌঁছে দেয়ার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করিনি। আমরা তাদেরকে বুঝিয়েছি যে, উন্নয়ন ও অগ্রগতি হচ্ছে তা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার কারণেই হচ্ছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক যত উন্নয়ন দেখা যাচ্ছে তার পেছনে আছে আমাদের দলের ভিশন, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পরিশ্রম। যার কৃতিত্ব আমাদের দলীয় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, কাউন্সিলরসহ সবার। যখন আমাদের বিরোধী পক্ষ ও সুশীল সমাজ ব্যস্ত ছিল সমস্যা ও নালিশ নিয়ে, আমরা ব্যস্ত ছিলাম জনগণকে সমস্যার সমাধান দিতে।
সুশীল সমাজের একটি বড় অপপ্রচার হচ্ছে নতুন ভোটাররা রাজনৈতিক দল নিয়ে মাথা ঘামায় না ও তাদের বেশিরভাগই নাকি পরিবর্তন চায়। তারা বুঝতে পারেনি যে, এই নতুন ভোটাররা আমাদের আমলের উন্নয়নের মধ্যে বড় হয়েছে যা তাদের জীবনকে করেছে আরো সহজ ও উন্নত। তারা কেন আমাদের ভোট দেবে না? ২০১৩ সাল থেকেই আওয়ামী লীগের জন্য আমি জনমত জরিপ করাই। আপনারা হয়তো খেয়াল করেছেন যে, এবার কিন্তু সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে কোনো জরিপ আসেনি। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে কিন্তু তারা ঠিকই একের পর এক জরিপ প্রকাশ করছিল দেখানোর জন্য আওয়ামী লীগের অবস্থা কত খারাপ। আসলে বাংলাদেশে খুব কম ব্যক্তি বা সংগঠনই সঠিকভাবে জনমত জরিপ করতে পারে। হার্ভার্ডে থাকতে আমি জনমত জরিপের ওপর পড়াশুনা করি। জরিপ করতে আমরা যাদের ব্যবহার করি তাদের বাছাই করার আগে আমি নিজে একাধিক গবেষণা সংগঠনের সঙ্গে বসে আলাপ করি। ভুয়া জরিপ করে নিজেদের জনপ্রিয়তা দেখানোর কাজ আমরা করি না। কারণ আমাদের জন্যই সঠিক তথ্যটি পাওয়া খুবই জরুরি। আমরা জানতে চেষ্টা করি নির্বাচনী লড়াইয়ে আমাদের অবস্থান ও সক্ষমতা, তাই জরিপের ব্যাপারে আমরা খুবই সতর্ক থাকি। নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে আমাদের জরিপ থেকে আমরা জানতে পারি আওয়ামী লীগ পাবে ৫৭ থেকে ৬৩ শতাংশ ভোট আর বিএনপি পাবে ১৯ থেকে ২৫ শতাংশ ভোট।
তাহলে আমরা ৭২ শতাংশ ভোট কীভাবে পেলাম? আমাদের জরিপের জন্য স্যাম্পল নেয়া হয় ৩০০ আসন থেকে, অর্থাৎ ১০ কোটি ৪০ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে থেকে। কিন্তু ভোট দেয়ার হার কখনোই ১০০ শতাংশ হয় না আর ৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচন হয়েছিল ২৯৮টি আসনে। ২৯৮টি আসনে ১০ কোটি ৩৫ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ৮ কোটি ২৮ লাখ মানুষ ভোট দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ পেয়েছে প্রায় ৬ কোটি ভোট। ১০ কোটি ৩৫ লাখ ভোটারের মধ্যে ৬ কোটি মানে ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ, আমাদের জরিপের সঙ্গে এই বিষয়টি মিলে যায়। কিন্তু বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট কেন এত কম ভোট পেলো? কিছু যৌক্তিক কারণে। বিএনপির চেয়ারপারসন দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়ে জেলে আছেন। তাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনও দণ্ডিত আসামি, আছেন দেশের বাইরে পালিয়ে। তাদের সংগঠনের অবস্থা করুণ। তার থেকেও বড় আরেকটি কারণ আছে যা আমাদের সুশীল সমাজ সহজে বলতে চায় না। যেই কারণটি বিএনপির জনপ্রিয়তায় ধসের পেছনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর বলে আমি মনে করি। জনমত জরিপগুলো থেকে খেয়াল করেছি যে, বিএনপি ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত যে অগ্নিসন্ত্রাস চালায় তার পর থেকেই তাদের জনপ্রিয়তায় ব্যাপক ধস নামে। পেট্রল বোমা সন্ত্রাসের আগে জরিপগুলোতে বিএনপি আওয়ামী লীগ থেকে জনপ্রিয়তায় ১০ শতাংশ পিছিয়ে থাকতো।
কিন্তু রাজনীতির নামের সন্ত্রাসবাদের কারণে তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ব্যবধান ৩০ শংতাংশ হয়ে যায় আর তারপর থেকেই বাড়তেই থাকে। এ ছাড়া তাদের আত্মঘাতী নির্বাচনী প্রচারণার বিষয়টিও আমাদের আমলে নিতে হবে। নির্বাচনী প্রচারণায় কমতি ছিল পরিষ্কারভাবেই। তার ওপর তারা তারেক রহমানের মাধ্যমে নিজেদের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেয়া। আর মানুষের মনে ভেসে ওঠে হাওয়া ভবন আমলের দুর্নীতি ও সহিংসতার দুঃসহ সব স্মৃতি। তারেক রহমান আবার মনোনয়ন দেন একাধিক চিহ্নিত অপরাধী ও যুদ্ধাপরাধীদের। এর মাধ্যমে কি তাদের জনপ্রিয়তা বাড়বে না কমবে? নির্বাচনের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের সমর্থকদের তারা ইঙ্গিত দেয় যে, তারা নির্বাচন থেকে সরে আসবে। আপনি যদি মনে করেন আপনার দল নির্বাচনেই আসবে না, তাহলে কি আপনি ভোট দেয়ার জন্য প্রস্তুত হবেন? এই কারণে তাদের নিজেদের সমর্থকদেরও ভোট দেয়ার হার কম ছিল। যার ফলশ্রুতিতে তারা ভোট পায়ও কম। বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের বার্তাই ছিল আওয়ামী লীগ খারাপ। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সেই বার্তা গ্রহণ করেনি। কারণ তারা নিজেরাই দেখেছে কীভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের নেতা কামাল হোসেন নিজে নির্বাচনই করেন নি।
কারণ উনি জানতেন উনি কোনো আসন থেকেই জিততে পারবেন না। কিন্তু তারা আমাদের কিছুটা অবাকও করেছেন। ভোটের লড়াইয়ে প্রথমবারের মতো কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম একটি নয়, দুইটি আসন থেকে জয়লাভ করে। কারচুপি যদি হতোই তাহলে যে দল আগে কোনো নির্বাচনেই কোনো আসন পায়নি তারা কীভাবে দুইটি আসনে জিতে? সত্য আসলে বেশি জটিল না। বাংলাদেশের জনগণ, বিশেষ করে তরুণরা, দেখছে কীভাবে শেখ হাসিনার মতো একজন ডাইনামিক নেত্রী দেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাই বিরোধীপক্ষের শত অপবাদ, অপপ্রচার ও কাদা ছোড়াছুড়ি কোনো কাজে আসেনি। কারণ দিন শেষে মানুষ তাকেই বেছে নেয় যে তাকে উন্নত জীবন দিতে পারে।

হেফাজত আমীরের ফরমান নিয়ে বিতর্ক

>>সংবিধান ও ইসলামসম্মত নয়: বিশেষজ্ঞদের মত, বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, দাবি আল্লামা শফীর>>
মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ফরমান নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে সর্বত্র। বিভিন্ন মহল থেকে এসেছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেছেন, এ বক্তব্য শফীর ব্যক্তি মতামত। এ বক্তব্য রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদরাও এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তারা বলছেন, ইসলাম কারও শিক্ষায় বাধা দেয় না। বরং নারীদের শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দিয়েছে। তাই নারীদের শিক্ষা গ্রহণে বাধা না দিয়ে তাদের শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
শুক্রবার এক মাহফিলে আল্লামা শফী বলেন, মেয়েদের স্কুল-কলেজে না পড়াতে এবং পড়ালেও সর্বোচ্চ ক্লাস ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত পড়াতে। মাহফিলে উপস্থিত শ্রোতাদের তিনি এ বিষয়ে হাত তুলে সমর্থনও নেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন ফরজ। হাদিসে আছে, নবীজী বলেছেন জ্ঞান শিক্ষার জন্য সুদূর চীন দেশেও যেতে হবে। চীনে ইসলাম শিক্ষা দেয়া হতো না তখন, চীনে ধর্ম-সংস্কৃতি শিখানো হতো; কিন্তু নবীজী তা-ও শিখতে বলেছিলেন। অর্থাৎ ইসলাম মুসলমানদেরকে বিশ্বের তাবৎ জ্ঞানরাজ্যে বিচরণের নির্দেশ দিয়েছে। বলা বাহুল্য, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা উচ্চতর না হলে জ্ঞানরাজ্যে বিচরণ করা যায় না। সুতরাং জ্ঞানের অন্বেষণের জন্য তাগিদ দেয়া হচ্ছে শুধু পুরুষদেরকে নয় বরং নারীদেরকেও।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বলেন, আল্লামা শফীর দেয়া বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে ইসলাম বিরুদ্ধ।
ইসলাম সকল নারী-পুরুষের ওপর জ্ঞান শিক্ষা ফরজ করেছে। সেখানে বলেনি যে, কাউকে ফোর পর্যন্ত বা কাউকে সিক্স পর্যন্ত পড়তে হবে।’ তিনি বলেন, ‘পরিবেশের জন্য যদি কোনো ছেলে-মেয়ের জীবন, চরিত্র নষ্ট হয়, সেগুলো হলো পরিবেশের কারণে। কিন্তু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে না- এ কথাটা সম্পূর্ণ ইসলাম বিরুদ্ধ কথা। ইসলাম তো প্রত্যেক নারী-পুরুষকে জ্ঞান শিক্ষা ফরজ করেছে, যেটি নবীজী বলেছেন।  কোরআনের প্রথম বাণীই ছিল ‘পড়’। অধ্যাপক আব্দুর রশীদ বলেন, আমাদেরকে পরিবেশ দিতে হবে। উনি যে কথাগুলো বললেন আমার মনে হয়েছে মাথা ব্যথা করে, তা কেটে ফেলো। হ্যাঁ আমাদের সমাজে দুই-একটা ঘটনা ঘটছে।
তার সংখ্যা হয়তোবা ক্রমান্বয়ে বাড়ছেও। আমার প্রশ্ন আল্লামা শফীরা এত বড় জ্ঞানী-গুণীরা এ সমাজে থাকতে এ সমাজে এসব হবে কেন? রাসূল তো বলেছেন আমার প্রচারিত ইসলাম দ্বারা একজন যুবতী নারী দুনিয়ার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে বেড়াবে কিন্তু তার সম্পদ ও সম্ভ্রম কোনোটারই আশংকা থাকবে না। এবং এটাই রাসূলের জীবন থেকে শুরু করে চার শ’ বছর পর্যন্ত ইসলামী বিশ্বে নিশ্চিত ছিল। তিনি বলেন, সমাজে এখন যে সমস্যা হচ্ছে এটার জন্য তো মুসলমানরাই দায়ী। আমরা তো এদেরকে (নারী) রক্ষা করতে পারছি না। যে সমাজে আল্লামা শফীরা আছেন, সে সমাজে এমনটা কেন হবে যে একটা মেয়ের হাত ধরে টান দিবে, অসম্মান করবে। এ জন্য বলছি যে, পরিবেশের কারণে আমরা তাদের শিক্ষা বন্ধ করে দিতে পারি না। কারণ মাথা ব্যথা হলে আমরা মাথাটাকে কেটে দিতে পারি না, মাথায় ওষুধ দিতে হয়।
তিনি বলেন, আমাদের পড়াশোনা ইসলামিক শিক্ষায় কাউকে নিষেধ করেনি। সবাইকে শিখতে হবে। শিখলেই কেবল দ্বীন-ধর্ম শিখা যাবে। মানুষ সুন্দর হবে, সামাজিক হবে। আল্লাহকে, আল্লাহর রাসূলকে জানতে পারবে। কিন্তু পরিবেশ আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। যে পরিবেশের কারণে আমাদের মেয়েরা লাঞ্ছিত না হয়, নির্যাতিত না হয়, নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয় সে পরিবেশ আমাদের তৈরি করতে হবে।
আল্লামা শফীর বক্তব্যের বিষয়ে শিক্ষাবিদ ড. এম শমসের আলী বলেন, আমি আজকেও (শনিবার) ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের একটা সম্মেলনে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি বলেছি, বিজ্ঞান দরকার, ধর্মও দরকার। ধর্ম দরকার ভালো পথে থাকার জন্য আর বিজ্ঞান দরকার মানুষের সেবা করার জন্য, যেসব সৃজনশীল জিনিস, জ্ঞানকে কাজে লাগাবার জন্য। ওষুধ বানাতে হবে, গার্মেন্টসও বানাতে হবে।
বসুন্ধরাস্থ ইসলামী রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক মুফতি শাহেদ রাহমানী বলেন, ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের শিক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছে। সেক্ষেত্রে পড়াশোনা বা উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীকে বিধি-নিষেধের কোনো প্রশ্নই আসে না। তিনি বলেন, আল্লামা শফী সাহেব কি বলেছেন সরাসরি সেটা আমি শুনিনি। কারো কোনো বক্তব্য নিজের কানে না শুনে কোনো মন্তব্য করাটা খুবই কঠিন।
নারীদের শিক্ষার বিষয়ে ইসলাম কি বলে এমন প্রশ্ন করলে মুফতি শাহেদ রাহমানী বলেন, ইসলাম তো নারীদের শিক্ষার বিষয়ে কোনো বিধি-নিষেধ দেয়নি। নারী-পুরুষ সবার জন্য শিক্ষার অধিকার সমান করে দিয়েছে ইসলাম। ইসলাম নারীকে অশিক্ষিত রাখতে বলেছে, এমন কথা বললে ইসলামের প্রতি কোনো সুবিচার করা হয় বলে আমি মনে করি না। এটা তো একটা সর্বজনীন বিষয় যে, ইসলাম শিক্ষার ব্যাপারে সবাইকে উৎসাহিত করেছে। নারী শিক্ষিত হোক, পুরুষ শিক্ষিত হোক সেটাও চায়। দুটো দুই বিষয়, তবে আমি এ ব্যাপারে ইসলামের যে বক্তব্য তার সঙ্গে একমত।

হাকালুকি হাওরের গরু-মহিষের বাথান by ইমাদ উদ দীন

শুষ্ক মৌসুমে হাওরের ঐতিহ্য বাথান।  হাকালুকি হাওরের বিশাল এলাকায় গড়ে উঠে একাধিক বাথান বা রাখালি ব্যবসা। ওই সময় মাছ আর পরিযায়ী পাখির সঙ্গে দেখা মেলে গরু-মহিষেরও। একদল লোক হাওরজুড়ে চরায় হাজার হাজার গরু ও মহিষের দল। সবুজ ঘাসের রাজ্যে তাদের নিরাপদ খাদ্য ও বাসস্থান। এমন দৃশ্য যেন গ্রামবাংলার এক অন্যরকম রূপ। খাদ্য সংকটের এসময়টায় গরু-মহিষ ওইসব বাথানে দিয়ে অনেকটা নিরাপদ হন মালিকরা।
নানা সংকট ও সমস্যায় এই রেওয়াজি ঐতিহ্য এখনো ধরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন হাওর পাড়ের বাসিন্দারা। কিন্তু নানা কারণে দুর্দশায় পড়েছে হাওরের চিরচেনা এই ঐতিহ্য। এমনটি অভিযোগ স্থানীয় বাথান আয়োজকদের।
জানা গেল রাখালির টাকা, দুধ আর গোবর সংগ্রহে জমে উঠে বাথান ব্যবসা। হাওরের বুকে শুষ্ক মৌসুমের উৎকৃষ্ট সেবামূলক ব্যবসা এটি। পুঁজিহীন কায়িক পরিশ্রমের অনেকটাই লাভজনক এই ব্যবসার নামই বাথান। শুষ্ক মৌসুমে হাওর অঞ্চলের এই বাথান বা রাখালি ব্যবসার সুনাম কিংবা কদর রয়েছে গো-মহিষের মালিকদের কাছে। সংশ্লিষ্টরা জানালেন এখন পুরো হাকালুকি হাওরে ছোট বড় মিলে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক বাথান। যাতে আশ্রয় হয়েছে কয়েক হাজার দেশীয় জাতের গরু ও মহিষের। দেশের বিখ্যাত হাকালুকি হাওরে এখন ঠাঁই নিয়েছে অতিথি পাখি আর গরু ও মহিষ।
খাদ্য সংকটে থাকা এসকল ক্ষণস্থায়ী অতিথিরা জীবনের তাগিদে হাওরে ঠাঁই নেওয়ায় বেড়েছে হাওরের সৌন্দর্য। একেক বাতানে জমায়েত গরু কিংবা মহিষ একশ কিংবা ২০০ মালিকের। হাওরের বুকে ঠাঁই নিয়েছে  বিভিন্ন এলাকার নানা রং ও আকৃতির গরু কিংবা মহিষ। খাদ্য সংকট এলাকার এসকল গরু ও মহিষের ৪ থেকে ৫ মাস ওখানেই হয় নিরাপদ আশ্রয়। হাওরের সবুজ ঘাস খেয়েই তারা হৃষ্ট পুষ্ট হবে। ৪০০-৫০০ কিংবা তারো অধিক গরু কিংবা মহিষ বিশাল দলের দেখভাল করছেন ১০-১৫ জন লোক। কেউবা দুধ দোহন করেন কেউবা রাখালি করছেন আর কেউ কেউ পানি খাওয়াচ্ছেন বা তাদের গোসল দিচ্ছেন। হঠাৎ এক সঙ্গে এতসব গরু মহিষ অবাক করে যে কাউকে। প্রশ্নও জাগে এতগুলো গরু মহিষ দেখভাল করেন কিভাবে। আর কার দেওয়া কোনো গরু কিংবা মহিষ কোনটি তা চিনেন কিভাবে। সব কৌতূহল নিবারণ হয় পাশ থেকে তাদের কাজ দেখলে। এ কাজে অভ্যস্থ মানুষগুলো শৃঙ্খলিতভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত রাত দিন।
বিস্তৃত হাকালুকি হাওর এখন শুধু সবুজ ঘাসের মাঠে গরু আর মহিষের অবাধ বিচরণ। হাওরজুড়ে ২৩৮ বিলের অনেক বিলেই এখন নেই পানি। হাওরের মাঝখান অনেকটা মরুভূমির মতো। বিলের পাড়গুলোতে সবুজ ঘাস জীবন বাচ্চাছে গরু-মহিষদের। এখন ভর শুস্ক মৌসুম তাই হাওর ছাড়া অন্য এলাকায় গুরু মহিষের খাদ্য সংকট। এমনিতে এসময়টায় হাল চাষ না থাকায় অনেকটা কাজ ছাড়াই অলস সময় কাঠে চাষিদের  গরু মহিষের। একদিকে কাজ নেই অন্যদিকে  গো-মহিষের খাদ্য সংকট। সব মিলে গো-মহিষের খাদ্যের দুঃসময় চলছে এখন। বর্ষা মৌসুম শুরু না হলে নতুন ঘাসও গজাবে না। হাওর এলাকা ছাড়া অন্য (উজান) এলাকাতে পানি অভাবে আগের ঘাসগুলোও মরে গেছে। তাই এলাকার গো-মহিষের মালিকরা আগের জমিয়ে রাখা আউশ কিংবা আমন ধানের শুকনো খড়কুট খাইয়ে কোনোরকম ওদের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন। এমন খাদ্যহীনতায় আর এই দুর্যোগপূর্ণ সময় কাঠিয়ে উঠতে মালিকদের তাই বিকল্প চিন্তা। আর এনিয়ে চিন্তিত মালিকদের গো-মহিষের খাদ্যসংকট দূর করে তাদের বাঁচিয়ে রাখতে হাওর এলাকায় খোলা হয়ে অভিনব এই রাখালি ব্যবসা।
পন্থাটা অনেক পুরনো হলেও এখনো নতুনের মতো করে এ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন স্থানীয় কিছু মানুষ। গতকাল হাকালুকি হাওরের নাগুয়া, হাওর খাল ও চৌকিয়া বিল এলাকায় কথা হয় বাথান মালিক কামলা মিয়া, সাইফ মিয়া, মন্তাজ উল্লাহ, নানু মিয়া, আনজিব মিয়া, ফারুক মিয়াসহ অনেকের সঙ্গে। তারা জানালেন বাথান ব্যবসার আদ্যোপান্ত। তারা কয়েকজন মিলে আলাদাভাবে গরু ও মহিষের বাথান করেছেন। তারা ৫ জন  প্রায় সাড়ে ছয় শতাধিক গরু-মহিষের দেখভাল করছেন। অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে এসব গরু-মহিষের মালিকরা তাদের গরু-মহিষ দেখভাল করা জন্য তাদের কাছে রেখে যান আর বৈশাখ মাসে নিতে আসেন। তারা জানালেন টাকা-পয়সার জন্য নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম না থাকলেও এটা অনেকটা আন্তরিকতা বিবেক থেকেই চলে।
প্রতিটি গরু কিংবা মহিষ তাদের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় মালিকরা খুশি হয়ে ৫০০ থেকে হাজার পনের শত টাকা  দিয়ে যান এ নিয়ে  নির্দিষ্ট করে চাওয়া পাওয়া নেই তাদের। আর দুধের গাভী (মহিষ কিংবা গরু) থাকলে মালিকরা টাকা দেনওনা আর তারাও চাননা। মূলত তাদের ব্যবসা হলো প্রতিদিনের দুধ ও গোবর। একেকটি বাথান থেকে কয়েক শ’ লিটার দুধ পাওয়া য়ায় এদিয়েই তাদের বাথান ব্যবসার মূল আয়। দুধ আর গোবর বিক্রি করে  প্রতিদিনই নগদ আয় হয়। দুধের পাইকাররা তাদের বাথান থেকেই দুধ কিনে নেন। এছাড়া মালিকরা তাদের গরু মহিষ নেওয়ার সময় দিয়ে যান নগদ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিদিনের খরচ পরে বাথান শেষ হলে লাখ টাকার উপরে তাদের ভাগে ঠিকে। খাওয়া দাওয়া আর ঘুমানোর কষ্ট ছাড়া অন্য কোনো সমস্যা না থাকলেও পানি সংকট প্রকট। গরু মহিষের গোসল আর পানি খাওয়াতে তাদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। যে সকল বিলে পানি আছে সেগুলো ইজারা নেওয়া।
এসব  বিল থেকে পানি নিতে বাধা দেন ইজারাদাররা। যে সমস্যাটি কয়েক বছর আগে খুব কম ছিল এখন তা বড় সমস্যা হয়ে তাদের দুর্ভোগে ফেলেছে। গরু মহিষের নানা রোগবালাইয়ে হাওর এলাকায় ডাক্তার পাওয়া কষ্টকর। স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের লোকজনকে ডাকলেও তারা হাওর আসতে চান না। রোগাক্রান্ত হয়ে অনেক গরু মহিষ মারা যায় সঠিক চিকিৎসার অভাবে। তাছাড়া নাব্যহ্রাসে এখন হাওরেরও বেহাল। এখন নানা কারণে অস্থিত সংকটে হাকালুকি হাওর। তাই আগের মতো নেই বাথান বা রাখালি ব্যবসা। আর এমন সংকটে পড়ে অনেকটাই কমে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির গরু মহিষের লালন পালন। তাদের দাবি এই হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সরকার উদ্যোগী হলে বাথান ব্যবসাসহ ঠিকবে সকল উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণীর ঐতিহ্য।

বিএনপির উচিত সংসদে আসা -প্রধানমন্ত্রী

গণতন্ত্রের স্বার্থে বিএনপিকে সংসদে এসে কথা বলা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের উপদেষ্টা পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের যৌথসভার সূচনা বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। আওয়ামী লীগ সভাপতির সূচনা বক্তব্যের পরে সভা শুরু হয়। সভায় সাংগঠনিক কর্মসূচি এবং দলের পরবর্তী কাউন্সিল নিয়ে আলোচনা করেন নেতারা। বৈঠক সূত্র জানায়, সভানেত্রী যথাসময়ে কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেন। এছাড়া সারা দেশে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কর্মসূচি হাতে নেয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতির আগমন উপলক্ষে দলীয় নেতা-কর্মীরা দুপুর থেকেই জিরো পয়েন্টে রাস্তার পাশে অবস্থান নেন। এর আগে সকাল থেকে ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্তক অবস্থানে ছিল।
সভার সূচনা বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, এবারের নির্বাচনে সব থেকে লক্ষণীয় বিষয় ছিল, মানুষের মধ্যে একটা স্বতঃস্ফূর্ততা এবং ভোট দেয়ার জন্য আগ্রহ। বিশেষ করে এদেশের তরুণ সমাজ, যারা প্রথম ভোটার এবং নারী সমাজের। এবারের নির্বাচনটা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে হলেও কিছু কিছু জায়গায় বিএনপি-জামায়াত জোট মিলে ব্যালটবাক্স ছিনতাই করতে গেছে। কোথাও তারা নির্বাচনকে বানচাল করার চেষ্টা করেছে এবং তাদের এই অপকর্মের কারণে বেশ কিছু প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে আমাদের দলীয় নেতাকর্মী অনেক আছেন। আমার কাছে সমস্ত ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করা আছে। তিনি বলেন, আপনারা মাঠে ঘাটে দেখেছেন, টেলিভিশনে দেখেছেন কীভাবে তারা প্রচেষ্টা চালিয়েছিল।
কোনো মতে নির্বাচনটা যেন বানচাল করা যায় কিন্তু তা তারা পারে নাই। এখন বিএনপি নির্বাচনে হেরেছে, এই দোষটা তারা কাকে দেবে? দোষ দিলে তাদের নিজেদেরকে দিতে হয়। কারণ, একটি রাজনৈতিক দলের যদি নেতৃত্ব না থাকে, মাথাই না থাকে, তাহলে সেই রাজনৈতিক দল কীভাবে নির্বাচনে জয়ের কথা চিন্তা করতে পারে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াসহ তারেক রহমানের বিভিন্ন দুর্নীতি অপকর্মের কথা তুলেন ধরেন শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দল পলাতক আসামিকে দিয়ে রাজনীতি করতে গেলে সেখানে কী রেজাল্ট হয়- সেটাই তারা পেয়েছে। তাও হতো না, যদি তারা নির্বাচনে যে প্রার্থী দিয়েছে, সেই প্রার্থী নিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্যটা না করতো। তাহলে আরও ভালো ফল তারা করতে পারত। মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে বিএনপির মধ্যে বিশৃঙ্খলার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তা থেকে তো মানুষ জানতেই পেরেছে এদের চরিত্রটা কী? এদের চরিত্র শোধরায়নি। তাই বাংলার জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। তার পরও যে কয়টা সিটে তারা জিতেছে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, তাদের পার্লামেন্টে আসা প্রয়োজন।
কারণ, আমরা এইটুকু বলতে পারি যে, আমরা যখন সরকারে এসেছি, আমরা দেশের জন্য কাজ করেছি। জনগণের জন্য কাজ করেছি। আমরা কিন্তু কাউকে কোনো হয়রানি করতে যাইনি। বিএনপি-জামায়াত জোট শাসনামলে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে দেয়া মামলার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা প্রত্যেকটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এসেছি। আমরা অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে এসেছি। জনগণের বিশ্বাস-আস্থাটা যে কারণে আমাদের ওপরে এসেছে। আমরা রাষ্ট্র পরিচালনা করি জনগণের কল্যাণে, জনগণের স্বার্থে। আর জনগণ আজকে তারা উপলব্ধি করতে পারে এবং আমাদের উন্নয়নের যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি আমরা সবসময় লক্ষ্য করি, গ্রামের মানুষ তৃণমূলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা। তারা একটু সুন্দর জীবন পাবে। তারা একটু উন্নত জীবন পাবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে যেন তাদের জীবনমান উন্নত হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা প্রতিটি কর্মসূচি নিয়েছি।
তিনি বলেন, ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ যখন ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করে, আমি অন্তত এইটুকু দাবি করতে পারি তখনই কিন্তু এদেশের মানুষ প্রথম উপলব্ধি করে সরকার জনগণের সেবক হতে পারে, সরকার জনগণের জন্য কাজ করতে পারে। আর সরকার কাজ করলে জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নতি হয়, এটা তখনই আমরা প্রমাণ করতে পারলাম। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটা স্বর্ণযুগ ছিল দাবি করে তিনি আরও বলেন, কিন্তু ষড়যন্ত্র কখনো থেমে যায় না। ২০০১ সালে চক্রান্ত করে আমাদেরকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়নি। আমরা ভোট বেশি পেলাম কিন্তু সরকার গঠন করতে পারলাম না।
২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষের জীবনে যে দুর্বিষহ অবস্থা ছিল, সেটা আমরা সবাই জানি। সেটা নিয়ে আর আমার বেশি বলার প্রয়োজন নেই। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটগভাবে জয়ী হওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে কিন্তু ভোটের হার ২০১৮ সালের নির্বাচন থেকে অনেক বেশি পড়েছিল। আমরা সরকার গঠন করার পর থেকে লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে তুলবো এবং দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে স্বাধীনতার সুফলটা পৌঁছাতে পারি, সেইভাবে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছি বলেই মানুষের এই উপলব্ধিটা এসে গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার থাকলে তারা ভালো থাকে, তাদের জীবনমান উন্নত হয়। তাদের দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হতে হয় না। তারা শান্তিতে থাকতে পারে। তাদের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়, এটা তারা উপলব্ধি করতে পারে।
২০১৩ থেকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠেকানোর নামে বিএনপি-জামায়াত জোট অগ্নি সন্ত্রাস করে মানুষ হত্যা করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা দেশের মানুষ কখনো মেনে নিতে পারেনি। ২০১৪ সালে আবার আমরা সরকার গঠন করি। আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা একটানা দশ বছর হাতে সময় পেয়েছিলাম, যার ফলে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে একটা উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় আমরা জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে পেরেছি তার ফলে ২০১৮ সালের নির্বাচনেও জয়লাভ করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে যারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল? কী করবে? তারাও কিন্তু সকলে এগিয়ে এসেছিল আমাদের এই নির্বাচনে সমর্থন দেয়ার জন্য। বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয়ার জন্য। এখানে ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-শ্রমিক, কামার-কুমার জেলে-তাঁতী মেহনতি মানুষ থেকে ব্যবসায়ী সমপ্রদায় থেকে শুরু করে প্রত্যেকের মাঝে একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, আওয়ামী লীগ আসলে তারা ভালো থাকবে, আওয়ামী লীগ আসলে দেশটা ভালো চলবে। আওয়ামী লীগ আসলে দেশের উন্নতি হবে- এই উপলব্ধিটা তাদের মাঝে ব্যাপকভাবে দানা বেঁধে যায়। তাই টানা তৃতীয় মেয়াদে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দিতে দেশের সকল স্তরের মানুষের সমর্থনের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ এবং ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতে প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোক প্রকাশ করেন। বক্তব্য শেষে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন দলের দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। আওয়ামী লীগ সভাপতির আসনের দুই পাশে দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, এইচ টি ইমাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফরউল্লাহ, মতিয়া চৌধুরী, ড. আব্দুর রাজ্জাক, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যরা অংশ নেন।

গ্যাস সংকটে চট্টগ্রামবাসী! by ইব্রাহিম খলিল

সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলো প্রায় অচল। কাফকো-সিউএফএলসহ সবগুলো শিল্প-কারখানায় নেমে এসেছে স্থবিরতা। জ্বলছে না চুলা। চারদিকে শুধু এক আওয়াজ-গ্যাস নেই, গ্যাস নেই।
কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি  (কেজিডিসিএল) এলএনজি সরবরাহ ও শীতে গ্যাসের প্রবাহ কমে যাওয়ার কথা বলেছেন।
নগরবাসী বলছেন, এলএনজিআসলে গ্যাসের কোনো সংকট থাকবে না বলে আমাদের শোনানো হয়েছিল। অথচ এখন কি হচ্ছে? 
নগরবাসী জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে চট্টগ্রামের বেশিরভাগ আবাসিক এলাকায় দিনের বেলা গ্যাসের চুলা জ্বলেনি। দুপুরের পর গ্যাস এলেও মধ্যরাতের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না। সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
সকাল ১০টার পর থেকেই গ্যাসের প্রেসার একেবারে কমে আসছে। আবার তা স্বাভাবিক হচ্ছে মধ্যরাতে। ফলে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে গ্যাসনির্ভর সব কাজই বন্ধ থাকে।
নগরীর ইপিজেড ও হালিশহরের মতো ঘনবসতি এলাকায় গ্যাসের অভাব চরম আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন পোশাক কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক ভোরে উঠে রান্না করেন। কিন্তু ভোর থেকে চুলা না জ্বলায় তারা পড়েছেন সমস্যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর রহমতগঞ্জ, আসকার দীঘিরপাড়, বাকলিয়া, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, ফরিদের পাড়া, সমশের পাড়া, পাথরঘাটা, ঘাটফরহাদাবেগ, খুলশী, নাসিরাবাদ, মুরাদপুর, লালখান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাস থাকছে না।
মৌসুমী আবাসিক এলাকার গৃহিণী মমতাজ বেগম বলেন, সকাল ৬টা থেকে তার বাসায় গ্যাস থাকে না। আসে দুপুর দেড়টা-দুটার দিকে। এই সময়ে চুলায় গ্যাস একেবারেই থাকে না। ভাত রান্না তো দূরের কথা পানিও গরম করা যায় না।
তিনি বলেন, গ্যাস যেহেতু থাকেই না তাই বিকল্প উপায়ে রান্নার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। এলএনজি আসলে গ্যাসের কোনো সংকট থাকবে না বলেও আমাদের শোনানো হয়েছিল। অথচ এখন কী দেখছি।
কেবল আবাসিক এলাকায় নয়, শিল্প এলাকায়ও চাপ কম। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানি শিল্পে এর প্রভাব প্রত্যক্ষভাবে পড়েছে। অনেক কারখানায় বয়লার ঠিকমতো কাজ করছে না।
সিইউএফএলের উৎপাদন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কারখানা প্রায় অচল। সার উৎপাদনের ভর মৌসুমে গ্যাসের অভাবে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে চাষাবাদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
আবদুল আলী নামের একজন সিএনজি চালক দামপাড়াস্থ সিটি করপোরেশনের সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে বলেন, গাড়ির গ্যাস দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আগে যে গ্যাস দিয়ে গাড়ি ১২০ কিলোমিটার চলতে পারতো এখন তা ৮০-৯০ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। এতে দফায় দফায় গ্যাস স্টেশনে গিয়ে লাইন ধরতে হচ্ছে। আবার বিকাল তিনটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন বন্ধ থাকায় গ্যাস নেয়া সম্ভব হয় না। ফলে অসহায়ভাবে বসে থাকা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই।
ইউসুফ অ্যান্ড সন্স রিফুয়েলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক আনিসুল হক জানান, গ্যাসের প্রেসার ২০০ বার-এর কমে গেলে প্রবাহ কমে যায়। এতে করে সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। প্রেসার না থাকায় কোনো কোনো সিএনজি স্টেশনে গ্যাসই থাকছে না। কোনো কোনোটিতে থাকলেও প্রেসার কম থাকায় গাড়িতে পর্যাপ্ত গ্যাস ঢুকছে না। ফলে কমে গেছে গাড়ির মাইলেজ।
কেজিডিসিএল কর্মকর্তা মোহময় দত্ত বলেন, শীতকালে এমনিতেই গ্যাসের ব্যবহার একটু বেড়ে যায়। তার ওপর কমেছে এলএনজি সরবরাহ। চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। এখানে গ্যাস দেয়া হচ্ছে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কম।
এরমধ্যে আমদানিকৃত এলএনজি রয়েছে ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। বাকিটুকু ন্যাশনাল গ্রিড থেকে দেয়া হয়। এই গ্যাসের প্রায় অর্ধেকটাই চলে যাচ্ছে দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, কাফকো ও সিইউএফএলে এবং কর্ণফুলী পেপার মিলে। তাই রেশনিং করেও গ্যাস সংকট কাটানো যাচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন, সামনের কৃষি মৌসুমকে সামনে রেখে কাফকো এবং সিইউএফএল একই সঙ্গে উৎপাদনে গেছে। ফলে আমদানিকৃত এলএনজির একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে সার উৎপাদনে। কাফকো এবং সিইউএফএল বর্তমানে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করে সার উৎপাদন করছে। তাতেও চাপ কম। 
এ ছাড়া রাউজান তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলী পেপার মিলে একশ’ মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি গ্যাস ব্যবহার করে। হাতে থাকা বাকি ১০০ মিলিয়নেরও কম গ্যাস দিয়ে চট্টগ্রামের শিল্পখাত, বাণিজ্যিক খাত, ৬০টিরও বেশি সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, ছয় লাখেরও বেশি আবাসিক গ্রাহকের গ্যাসের যোগান দিতে হচ্ছে। এতে করে গ্যাসের স্বাভাবিক প্রেসার অত্যন্ত কমে গেছে। প্রয়োজনীয় গ্যাসের সংস্থান করাটা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে কেজিডিসিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার খায়ের আহমদ মজুমদার বলেন, এলএনজি সরবরাহ না থাকায় এ সংকট চলছে। শুধু কাতার থেকে এলএনজি আসছে। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এলএনজি নিয়ে চতুর্থ জাহাজটি আসলে এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো যাবে। কাতার থেকে প্রয়োজনীয় এলএনজি না আসা পর্যন্ত এই সংকট চলবে। তবে আমাদের প্রকৌশলীরা চেষ্টা করছেন প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে। এ ছাড়া শীতের সময় গ্যাসের প্রবাহে কিছুটা সমস্যা হয়। শীত চলে গেলে সংকট এত থাকবে না।