Monday, August 6, 2018

সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেছে কারা? by নুরুজ্জামান লাবু

পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় রাজধানীর সাইন্সল্যাব এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলায় আহত ও দায়িত্বপালনকারী সংবাদকর্মীরা জানান, রবিবার দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত সায়েন্সল্যাব, সিটি কলেজ, ধানমন্ডি ২ নম্বর ও জিগাতলা এলাকায় তাদের ওপর চড়াও হয়ে ক্যামেরা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। কারো কারো ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাদের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়া হয়েছে। হুমকি-ধমকি দিয়ে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি ছবি তুললে মারধর করা হবে বলে শাসানো হয়েছে। এতে আতঙ্কগ্রস্ত সংবাদকর্মীরা নিরাপত্তার স্বার্থে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ-যুবলীগের চড়াও হওয়ার ছবি তুলতে পারেননি।
প্রত্যক্ষদর্শী সংবাকর্মীদের ভাষ্য, ঢাকা কলেজ থেকে আসা ছাত্রলীগের একটি মিছিলের সামনে থাকা সাত যুবক প্রথম সংবাদকর্মীদের ওপর হামলা চালান। তাদের সবার মাথায় হেলমেট ছিল। হাতে ছিল রড, লাঠি ও চাপাতি। তারা যাকেই ছবি তুলতে দেখেছেন তাদের ওপরই হামলা করেছেন। হামলাকারীদের নেপথ্যে থেকে মদদ দিয়েছেন ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ শাখার সাবেক আহ্বায়ক শিহাবুজ্জামান শিহাব ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন।
যোগাযোগ করা হলে শিহাবুজ্জামান শিহাব অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আজ এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি। আপনি দেখেন, কোথাও সাংবাদিকদের ওপর হামলায় আমাকে পাবেন না। আমার ছেলেপেলেরা কেউ করেনি। আমি থাকা অবস্থায় আমার সামনে কেউ সাংবাদিকদের গায়ে হাত তোলেনি।’
কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক এই সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ‘আজ দুপুরে সেন্ট্রাল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী গণভবন থেকে ফিরছিলেন। ল্যাবএইড হাসপাতালের উল্টো দিকে তার সঙ্গে থাকা একটি মোটরবাইক পুড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অন্যদের মারধর করো হয়েছে। এই মেসেজ কলেজে (ঢাকা) যাওয়ার পর কলেজের নেতাকর্মীরা ল্যাবএইড পর্যন্ত মহড়া দিয়েছে। কিন্তু কারো গায়ে হাত তোলেনি।’
রবিবার দুপুরে সায়েন্সল্যাব থেকে ধানমন্ডি ২ নম্বর হয়ে জিগাতলা পর্যন্ত অন্তত দশজন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়ে আহত হন। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকজন হামলার শিকার হলেও তাদের অবস্থা ততটা গুরুতর নয়। হামলায় আহত হয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এপি’র (অ্যাসোসিয়েট প্রেস) ফটোসাংবাদিক এ এম আহাদ, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আহমেদ দীপ্ত, পাঠশালার দুই শিক্ষার্থী রাহাত করীম ও এনামুল কবীর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
এছাড়া আহত অন্য সাংবাদিকরা হলেনন দৈনিক বণিকবার্তার পলাশ শিকদার, অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিমর্নিংয়ের আবু সুফিয়ান জুয়েল, দৈনিক জনকণ্ঠের জাওয়াদ, প্রথম আলোর সিনিয়র ফটোগ্রাফার সাজিদ হোসেন, চ্যানেল আইয়ের সামিয়া রহমান, মারজুক হাসান, হাসান জুবায়ের ও এন কায়ের হাসিন।
এ এম আহাদের সঙ্গে হামালার শিকার হন দৈনিক বণিকবার্তার ফটোসাংবাদিক পলাশ শিকদার। তিনি বলেন, ‘দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে আমি, আহাদ ভাই ও একটি অনলাইনের ফটোসাংবাদিক সায়েন্সল্যাব ওভারব্রিজের নিচে ছিলাম। এসময় ঢাকা কলেজের দিক থেকে ছাত্রলীগের একটি মিছিল আসে। মিছিলের সামনে ছয়-সাতজন ছাত্র হাতে জিআই পাইপ নিয়ে প্রথমে আমাদের ওপর চড়াও হয়। এসময় আহাদ ভাইয়ের মাথা ফেটে যায়। আমরা দৌঁড়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে দুজন নার্স রাস্তাতেই আমাদের সহযোগিতা করছিল। এসময় ছাত্রলীগের ছেলেরা আরেক দফা এসে আহাদ ভাইকে পেটাতে থাকে। আমাকেও টেনে নিয়ে পেটানো শুরু করলে আমি দৌঁড়ে রাস্তার ওপারে চলে যাই।’
পলাশ শিকদার বলেন, ‘মাথা হেলমেট পড়া যুবকরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আহাদ ভাইয়ের কোমড় থেকে বেল্ট কেটে নিয়ে ক্যামরো ভেঙে ফেলে। তাকে মারধরের পর একজন রিকশাওয়ালা আহাদকে তুলে নিয়ে এগিয়ে আসলে আমিসহ চিৎকার করে মানুষের সহযোগিতা চাই। কিন্তু কেউ আমাদের সহযোগিতা করেনি। এমনকি পুলিশও আমাদের ডাকে এগিয়ে আসেনি।’
তিনি বলেন, ‘আহাদ ভাইকে নিয়ে ল্যাবএইডে নিয়ে গেলে তারা প্রথমে ভর্তি করাতে চায়নি। এসময় আমি কান্নাকাটি করি।এরপরও হাসপাতালে ঢুকতে দিতে চায়নি।পরে ঢাকা ট্রিবিউনের ফটোসাংবাদিক মেহেদী এগিয়ে এসে জোর করে ল্যাবএইডের জরুরি বিভাগে ঢোকায়।’
প্রায় একই সময়ে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আহমেদ দীপ্ত। হামলার পরপরই তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দুপুর ২টার দিকে তিনি সায়েন্সল্যাব ফুটওভার ব্রিজের নিচে শিক্ষার্থীদের অবস্থান দেখতে এগিয়ে যান। এসময় অতর্কিতে ব্রিজের নিচে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে তার ওপর চড়াও হয়। বেধড়ক পেটানোর পর অন্য সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আহমেদ দীপ্তর পিঠ ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে তার অবস্থা আশঙ্কামুক্ত। এ এম আহাদের মাথা ফেটে গেছে। তার মাথায় বেশ কয়েকটি সেলাই দিতে হয়েছে। তিনিও এখন আশঙ্কামুক্ত।
ছাত্রলীগের বেধড়ক মারধরের শিকার হয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন ফটোগ্রাফি বিষয়ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাঠশালার শিক্ষার্থী ও ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার রাহাত করীম। দুপুর ২টার দিকে সায়েন্সল্যাবের ফুটওভার ব্রিজের নিচে তাকে মারধর করা হয়। এ ঘট্নার একটি ভিডিও ফুটেজ রয়েছে বাংলা ট্রিবিউনের হাতে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ফটোসাংবাদিক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দুপুর ২টার পরপরই ঢাকা কলেজের দিক থেকে আসা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা যখন সায়েন্সল্যাবের দিকে আসে, তখন রাহাত করীম ফুটওভার ব্রিজের দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন। এসময় লাঠি হাতে যুবকরা প্রথমে তার দিকে ইট-পাটকেল ছোড়ে। এসময় ফুটওভার ব্রিজের ওপরে আরও অন্তত ১০-১২ জন ফটোগ্রাফার ছিলেন। রাহাত নিচে নেমে আসলে তার ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রাহাত ক্যামেরা না ছাড়ায় তাকে মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তাকে মারতে মারতে গেঞ্জি ছিঁড়ে ফেলা হয়। তার মাথা ফেটে রক্ত বের হলে নেতাকর্মীদের কয়েকজন এগিয়ে এসে অন্যদের থামায়।
পাঠশালার প্রিন্সিপাল আবীর আব্দুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাহাত করীমসহ মোট পাঁচজন শিক্ষার্থী ও ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে রাহাতের অবস্থা একটু গুরুতর। তার মাথায় সেলাই দিতে হয়েছে। এনামুল করীম নামে আরেকজনের পা পিটিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। তাকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখান থেকে তাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
ছাত্রলীগের বেপরোয়া হামলার সময় ল্যাবএইডের উল্টো দিকে ধানমন্ডি ৩ নম্বর সড়কের পাশে হ্যাপি আর্কেডের সামনে অবস্থান নেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। দুপুর ২টার একটু পর ঘটনাস্থলে থাকা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অপরাধ বিষয়ক প্রধান প্রতিবেদক লিটন হায়দার বলেন, ‘ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সায়েন্সল্যাবের দিক থেকে ধাওয়া দিলে আমরা দৌঁড়ে এসে হ্যাপি আর্কেডের সামনে এসে অবস্থান নিই। এসময় ছাত্রলীগের ছেলেরা আমাদের ওপর চড়াও হয়। তারা দূর থেকে আমাদের ওপর বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেলও নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে ওরা লাঠিসোঁটা ও চাপাতি হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে। আমাদের সেখান থেকে চলে যেতে বলে এবং কোনও ছবি তুলতে নিষেধ করে।’
ঘটনাস্থলে উপস্থিত দৈনিক সমকালের স্টাফ রিপোর্টার বকুল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের ওখানে একাত্তর টিভি, যমুনা ও বৈশাখী টেলিভিশনের সংবাদকর্মীরাও ছিলেন। তারা (ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা) আমাদের ছবি তোলার জন্য শাসাচ্ছিল। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে লাঠির পাশাপাশি ধারালো অস্ত্রও ছিল। অবস্থা এমন ছিল ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতে গেলেই তেড়ে আসছিল। অনেকের মোবাইল-ক্যামেরাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।’
ধানমন্ডি ২ নম্বর সড়কে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে হেনস্তার শিকার হন চ্যানেল আইয়ের রিপোর্টার সামিয়া রহমান। সেখানে বেশ কয়েকজন ফটোসাংবাদিক ও রিপোর্টার উপস্থিত ছিলেন। এই প্রতিবেদক নিজেও সেখানে অবস্থান করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হুমকি-ধমকি প্রত্যক্ষ করেন। ঘটনাস্থলে থাকা ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের স্টাফ রিপোর্টার মুক্তাদির রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “হেলমেট পরিহিত ছাত্রলীগ পরিচয়ধারীরা এসে বলে, ‘আজকের সব কিছুর সমস্যার মূলে সাংবাদিকরা।’ তারা ধারালো অস্ত্র নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে এসে বলে, ‘কেউ ছবি তুলবি না।’ ‘সব ক্যামেরা ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেল’ বলে ধমকাচ্ছিল। যেসব ছাত্রলীগ নেতারা আশপাশ দিয়ে যাচ্ছিল তারা সবাই তেড়ে আসার পাশাপাশি অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করছিল এবং ধমকাচ্ছিল। তারা বলছিল, ‘কালকে যদি কোনও ছবি দেখি কাউকে ছাড়বো না।’ এর ভেতরে একজন বলে ওঠে, ‘একজন যদি ছবি তোলে সবাইকে কোপাবো।’ তবে পুলিশের খুব কাছাকাছি হওয়ায় তারা জিগাতলার দিকে যেতে থাকে। উপায়ন্তর না দেখে পুলিশ সাংবাদিকদের সরে যেতে অনুরোধ করে।”
হামলার শিকার হওয়া অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডি মর্নিংয়ের আবু সুফিয়ান জুয়েল বলেন, ‘হামলাকারীরা সবাই ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মী বলে আমারা জানতে পেরেছি। তাদের অনেকের মাথায় হেলমেট ছিল।’
নাগরিক টিভির গাড়ি ভাঙচুর করেছে আন্দোলনকারীরা
দুপুর ১টার দিকে ঢাকা সিটি কলেজের সামনে নাগরিক টিভির একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। নাগরিক টিভির ক্যামেরাম্যান রিপন হাসান জানান, দুপুর ১টার দিকে তারা ঢাকা সিটি কলেজের সামনে অবস্থান করছিলেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যখন মিছিল নিয়ে জিগাতলার দিকে যাচ্ছিল, তখন একদল যুবক আমাদের গাড়িটিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। আমরা সঠিক তথ্য প্রকাশ করছি না— এই অভিযোগে হামলা করে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব সোহেল হায়দার চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ। সমাজের যা কিছু ভালো-মন্দ বা শুদ্ধ-অশুদ্ধ তা তুলে ধরে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা কখনও কাম্য হতে পারে না। এটি গণতন্ত্র ও সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে।’
তিনি বলেন, ‘সব সরকারের সময়েই সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হয়। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সাংবাদিকবান্ধব। সেই আওয়ামী লীগের আমলে যখন এ ধরনের ঘটনা দেখি এবং হামলার সুষ্ঠু বিচার না হতে দেখি, তখন মর্মাহত হই। হামলাকারীরা যে দেলেরই হোক তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানাই।’
সাংবাদিকদের মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের কাছে কেউ এমন কোনও অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই আমরা মামলা নেবো এবং আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’

বিজ্ঞানের মার্কিন অপপ্রয়োগ: ইতিহাসের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও গণহত্যা

৭৩বছর আগে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট মার্কিন সরকার ঘটিয়েছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহতম নৃশংসতা। মার্কিন সরকারের মাধ্যমে বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং বিজ্ঞানের নৃশংসতম অপব্যবহারের ফলে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে নিহত হয় লাখ লাখ নিরপরাধ বেসামরিক মানুষ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন প্রায় শেষ এবং জাপান যখন আত্মসমর্পণের জন্য আলোচনায় বসতে চাচ্ছিল পশ্চিমা প্রতিপক্ষ শক্তিগুলোর সঙ্গে তখন রণক্ষেত্র থেকে বহুদূরে অবস্থিত জাপানের হিরোশিমা শহরে মার্কিন পরমাণু বোমার হামলায় মুহূর্তের মধ্যে নিহত হয় প্রায় এক লাখ নিরপরাধ ও বেসামরিক জাপানি নাগরিক।  আরো কয়েক লাখ মানুষ হয় আহত।
ওই বোমার ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে পরবর্তী বছরগুলোতে নিহত হয়েছে আরো হাজার হাজার জাপানি নাগরিক।
এ ছাড়া, বোমার তেজষ্ক্রিয়তায় বহু বছর ধরে হিরোশিমার অধিবাসীরা ক্যান্সারসহ নানা ধরনের রোগব্যধিতে ভুগেছে। বোমার প্রতিক্রিয়ায় পঙ্গু হয়ে জন্ম নিয়েছে হাজার হাজার শিশু। আজো ওই অঞ্চলে জন্ম হচ্ছে  বিকলাঙ্গ বা পঙ্গু শিশু। 
হিরোশিমাতে নিক্ষিপ্ত মার্কিন পরমাণু বোমাটির নাম ছিল 'লিটল বয়'। এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ছিল বিশ হাজার টন টিএন্ডটি'র সমান। 
হিরোশিমায় হামলার তিন দিন পর আমেরিকা আরো একটি পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করেছিল জাপানের নাগাসাকি শহরে। এ বোমা হামলায় নিহত হয় অন্তত ৭০ হাজার বেসামরিক জাপানি নাগরিক। 
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ যখন প্রায় শেষ হওয়ার পথে এবং বিভিন্ন রণাঙ্গনে পরাজয়ের মুখে জাপান যখন এমনিতেই আত্মসমর্পণ বা যুদ্ধ থামানোর কথা ভাবছিল তখন এইসব পরমাণু বোমা ব্যবহার করে আমেরিকা। এর মাধ্যমে তৎকালীন মার্কিন সরকার বিশ্বের সরকারগুলো ও জনগণের মধ্যে এ আতঙ্ক বদ্ধমূল করার চেষ্টা করেছে যে আমেরিকাই বিশ্বে সবচেয়ে বড় সামরিক ও অপরাজেয় শক্তি এবং এই বলদর্পী শক্তিকেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় মোড়ল বা পুলিশি সরকার হিসেবে সবাইকে মেনে নিতে হবে।
কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার লজ্জাজনক পরাজয় এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে আমেরিকার বিপর্যয় এটাই প্রমাণ করেছে যে পরমাণু বোমার অধিকারী হওয়াসহ সামরিক অস্ত্রশস্ত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দখলদারিত্বকে স্থায়ী করা বা কোনো দেশের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে নিশ্চিত করে না।  
বিশ্বের মধ্যে আমেরিকাই একমাত্র দেশ যে পরমাণু বোমা ব্যবহার করেছে। জাপানে পরমাণু বোমা ব্যবহারের জন্য  মার্কিন সরকারগুলো কখনও ক্ষমা  চায়নি এবং ওবামার সরকারও ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণহত্যা চালানোর দায়ে বিচারেরও মুখোমুখি হয়নি মার্কিন সরকার জাতিসংঘের মত সংস্থা বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোয়। মানবতার বিরুদ্ধে মহাঅপরাধে জড়িত মার্কিন নেতাদের বিচারের জন্য জাপানি নেতারাও কোনো উদ্যোগ নেননি পরাজিত শক্তি হিসেবে অধীনতামূলক চুক্তি বা দাস-খত মেনে নেয়ায়।
বিশ্বব্যাপী পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধ করার জন্য দাবি জোরদার হওয়া সত্ত্বেও আজো আমেরিকা আরো মারাত্মক ও শক্তিশালী পরমাণু অস্ত্রসহ গণ-বিধ্বংসী নানা অস্ত্র উৎপাদন করছে। অন্যদিকে আমেরিকা স্বাধীনচেতা দেশগুলোকে শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তিরও অধিকারী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দিচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা পরমাণু বোমা তৈরি করা ও সংরক্ষণ করাকে হারাম বলে ফতোয়া দেয়া সত্ত্বেও তেহরানের বিরুদ্ধে পরমাণু বোমা তৈরির চেষ্টার কাল্পনিক অভিযোগ তুলে মার্কিন সরকার ও তার সহযোগী পশ্চিমা সরকারগুলো ইরানের ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়েছে বছরের পর বছর ধরে। পরমাণু সমঝোতার আলোকে তারা এইসব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে বলে কথা দেয়া সত্ত্বেও এখনও তা বাস্তবায়নে নানা গড়িমসি করছে। 
অন্যদিকে ফিলিস্তিন দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলকে শত শত পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হওয়ার সুযোগ দিয়েছে আমেরিকাসহ তার সাম্রাজ্যবাদী মিত্র শক্তিগুলো। পরমাণু শক্তি হওয়ার কারণে বর্ণবাদী ইসরাইল ধরাকে সরা জ্ঞান করছে এবং গত প্রায় ৫০ বছরের লাখ লাখ আরব ও ফিলিস্তিনি মুসলমানকে হতাহত করেছে।

কেন এত গুজব? by মরিয়ম চম্পা

গুজবে ভাসছে দেশ। একের পর এক ছড়িয়ে পড়ছে গুজব। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়াচ্ছে গুজবের ডালপালা। কেন এত গুজব? কেউ হয়তো গুজব তৈরি করছেন বিশেষ উদ্দেশ্যে। কেউবা গুজব ছড়াচ্ছেন অজ্ঞতাবশত। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলধারার মিডিয়ার ওপর  নিয়ন্ত্রণের কারণেই এত বেশি গুজব ছড়াচ্ছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ফেসবুক হচ্ছে নতুন একটি প্রযুক্তি। যার সঠিক ব্যবহার আমরা শিখিনি। এখানে চাইলেই ব্যক্তিগত জিনিস শেয়ার দিতে পারছি। কোনো নিউজফিড চেক বা ক্রস চেক করছি না। বা প্রয়োজন মনে করছি না। সচেতনতা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত মানুষ অনেক বেশি গুজবমুখী হবে। প্রযুক্তির প্রতি ধারণা এবং অন্যকে সম্মান করার যথযথ শিক্ষা নেই বলে আমরা খুব সহজেই যেকোনো একটা মেয়ের ছবি কিংবা মিথ্যা তথ্য ভাইরাল করে দিতে পারি। শুধুমাত্র অ্যাথিকাল স্টান্ডার্ডের অভাবে এ কাজ করা হয়।
এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা এবং একটি রুচিবোধ তৈরি করা। কাউকে আঘাত বা ছোট না করা। একটা গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজ নির্মাণ করতে পারিনি বলেই এসব তৈরি হচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে গুজবের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়ে যাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে দায়িত্বশীল ব্যবহারটা অনেক বেশি। আর একটি বিষয় হচ্ছে একটা তথ্য যখন আটকে দেয়া হবে তখনই কিন্তু গুজব তৈরি হবে।
বাংলাদেশের অনেক ঘটনার আসল তথ্য এখনো আমরা জানি না। তাই অতীতে এক সংঘর্ষের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেউ বলবে আড়াই হাজার কেউ ৫শ’ কেউবা বলবে ৪০ জন। আসলে কোনটা মানুষ বিশ্বাস করবে। আমরা হচ্ছি গুজব তথ্যপরায়ণ। আঙ্গুর গাছের লতায় পাতায় কোনটা আগা কোনটা মাথা সেটা খুঁজে পাওয়া যায় না। গুজবও ঠিক এভাবেই ছড়ায়। এ ছাড়া গুজব ঠিক তখনই হবে যখন সঠিক তথ্যদাতা মিডিয়ার উপর বাধাবাধ্যকতা সৃষ্টি করা হবে। ফলে ফেসবুকসহ অন্যান্য মাধ্যমগুলোতে তখন গুজব তৈরির ক্ষেত্র বা জায়গা তৈরি হয়। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া বা গণমাধ্যমগুলো যদি স্বাধীনভাবে চর্চা করতে পারে তাহলে কিন্তু গুজবের জায়গাটা থাকে না। এক্ষেত্রে সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি বরাবরই মানুষের টানটা বেশি থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, গুজব সবসময়ই একটি সমস্যা। যেটা সোশ্যাল মিডিয়াতে বেশি হয়। এক্ষেত্রে যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে তাদের অনেক বেশি দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে। এখানে নানা রকম মতামত আসবে। সব মতামতকে আমরা গ্রহণ করব না। কোনো একটা তথ্য পাওয়ার পর সেটাকে যাচাই বাছাই না করে বিশ্বাস করা যাবে না। এক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যমে যখন কোনো সমস্যা হবে তখনই মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্য নিয়ে গুজব ছড়াবে এবং যারা এই গুজব ছড়াচ্ছে তারা এটা নিজেদের স্বার্থেই করবে জনস্বার্থে নয়। এ ছাড়া গুজবকারীরা সুযোগ পেলে মেইনস্ট্রিম ও সোশ্যাল মিডিয়া সব ক্ষেত্রেই এটা করবে। এগুলো তাদের রুচির বহিঃপ্রকাশ। তবে, গুজবের কার্যকারিতা বা প্রভাব বেশিক্ষণ থাকে না। এটা তৎক্ষণিকভাবে একটি প্রভাব সৃষ্টি করে।
সমাজবিজ্ঞানী নেহাল করিম বলেন, পৃথিবীতে প্রত্যেক সমাজে কিছু সুবিধাভোগী শ্রেণি আছে। সম্প্রতি বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে এই যে গুজব ছড়াচ্ছে তারা হচ্ছেন সেই সুবিধাভোগী। যারা গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতিকে আরো বেশি অস্থিতিশীল ও জট পাকানোর চেষ্টা করে। এদের আমরা স্বার্থান্বেষী মহলও বলতে পারি। এই মহল গুজবগুলো ছড়াচ্ছে যাতে তারা বেনিফিটেড হয়। এককভাবে যখন কিছু করতে পারে না তখনই তারা এটাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়। সম্প্রতি এক অভিনেত্রীকে গুজব ছড়ানোকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যেটা আমাদের সমাজের জন্য খুবই উদ্বেগজনক।
গবেষক অধ্যাপক আফসান চৌধুরী বলেন, মানুষের মুখে মুখে যে কথাটা ছড়ায় সেটা যখন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পরে সেটাকেই তখন গুজব বলে। গুজবকে মানুষ সবসময় গুজব হিসেবেই দেখে। মানুষ হিসেবে গুজব যারা বিশ্বাস করার তারা করবেই। সোশ্যাল মিডিয়ার উপর নির্ভর করে কেউ তার মতামত প্রকাশ করলে গুজবতো হবেই। তাই কোনো বিষয়ে মতামত প্রদানের আগে সেটা মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলোতে যাচাই বাছাই করে দেখতে হবে তারা কি বলে। তবে, না জেনে কিছু করাটা বাঙালির স্বভাব। আমরা কি খুব একটা তথ্যভিত্তিক। আমরাতো তথ্য জানতেই চাই না। তথ্য নিয়ে আমাদের অস্বস্তি আছে।
সেই কারণেই তথ্যের চেয়ে যেটা আমরা শুনতে চাই বা জানতে চাই ওইটার দিকে আমাদের আগ্রহ বেশি। এক্ষেত্রে সরকার যখন ফেসবুক বন্ধ করে দিয়েছিল তখনো কিন্তু গুজব থেমে থাকেনি। অর্থাৎ এটা কোনো না কোনোভাবে হবেই। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে আমাদের দেশে কম্পিউটারের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হচ্ছে মোবাইল ফোন। এটাকে ভালো মন্দ দুটো কাজেই ব্যবহার করা হচ্ছে। কাজেই আমাদের দেশের মানুষের যে পরিপক্বতার দরকার সেটা নাই। গণমাধ্যম, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সাধারণ জনগণ কোনোটারই পরিপক্বতা নেই। একইসঙ্গে ফেসবুকে যারা আছে তারাও অপরিপক্ব। তাই এই অপরিপক্বতা দূর করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি নিয়ন্ত্রণ তৈরি করার কোনো বিকল্প নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ফাহমিদুল হক বলেন, একটা দেশের ক্রাইসিস মোমেন্টে গুজব ছড়ানোটা খুব একটা আশ্চর্যজনক কিছু না। গুজব সবসময়ই অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে নিয়ে আসে। অতীত ইতিহাসে দেখা গেছে ক্রাইসিস মোমেন্টে এ রকম ঘটনা ঘটেছে। দেশে এখন একটা কনফ্লিক্ট চলছে তাই গুজবের বিষয়টা এত বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আরেকটা দিক হলে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার কাভারেজটা আমরা ওভাবে পাচ্ছি না বলেই গুজব জায়গা করে নিচ্ছে।
কারণ গণমাধ্যম চাইলেও অনেক কিছুই কাভার করতে পারছে না। ক্রাইসিস মোমেন্টে টেলিভিশনের লাইভ টেলিকাস্ট বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। তাই গুজবের সম্ভাবনা খুব বেড়ে যাচ্ছে। মিডিয়া যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে তাহলে গুজবের সংখ্যা কমে আসবে। একইসঙ্গে কোনো বিষয়ে না বুঝে শুনে হুটহাট নিউজ শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যথায় নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনতে পারে। নিউজ শেয়ার করার আগে এটা কোন মিডিয়ার, তাদের ব্রান্ডের নাম কি, এটা কি প্রথম দেখলাম। না কি আগেও অনেকবার দেখেছি সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

আমেরিকার হাতিয়ার ইরানবিরোধী সন্ত্রাসী 'মোনাফেকিন গোষ্ঠী': পর্ব-দুই

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আইনজীবী রুদি জুলিয়ানি
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে গত ৩০ জুন ইরান বিরোধী সন্ত্রাসী মোনাফেকিন গোষ্ঠী 'এমকেও''র বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকা এবং কয়েকটি আরব মিত্র দেশের সমর্থনে প্রতি বছর রাজধানী প্যারিসের উপকণ্ঠে ইরান বিরোধী সন্ত্রাসী মোনাফেকিন গোষ্ঠী 'এমকেও''র বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এমকেও'র গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য প্রতি বছর এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
গত বছর সৌদি আরবের সাবেক গোয়েন্দামন্ত্রী তুর্কি ফয়সাল এমকেও'র বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। এবারের বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আইনজীবী ও নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র রুদি জুলিয়ানি বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি ইরান বিরোধী বক্তব্য দেয়ার পাশাপাশি দেশটির ইসলামি শাসন ব্যবস্থা উৎখাতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সফল হবেন।
মার্কিন টিভি চ্যানেল সিবিএস কিছুদিন আগে আলবেনিয়ায় অবস্থিত এমকেও'র ঘাঁটির আশেপাশের ভিডিও চিত্র প্রকাশ করে। এতে হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বুল্টন ও নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র ও প্রেসিডেন্টের বর্তমান আইনজীবী রুদি জুলিয়ানিকে এমকেও'র সদস্যদের সঙ্গে দেখা গেছে এবং এমকেও'র সমাবেশে তাদের পক্ষে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে।
এনবিসি'র প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে রুদি জুলিয়ানি স্বীকার করেছেন, ২০০৮ সাল থেকে এমকেও'র সঙ্গে তার সম্পর্ক ও যোগাযোগ রয়েছে। তিনি আরো বলেছেন, মার্কিন সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর তালিকায় এমকেওকে অন্তর্ভুক্ত করা ভুল ছিল। তিনি বলেন, এমকেও'র কাছ থেকে কি পরিমাণে অর্থ নেয়া হয়েছে তা তিনি মনে করতে পারছেননা।
যাইহোক, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আইনজীবী রুদি জুলিয়ানি ছাড়াও কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার ও সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী ও নিউমেক্সিক প্রদেশের সাবেক গভর্নর বিল রিচার্ডসন, মার্কিন এফবিআইএ'র সাবেক প্রধান লুইস ফারাও, সাবেক ডেমোক্রেট দলের সিনেটর রবার্ট তুরিচলি, সৌদি বংশোদ্ভূত মার্কিন প্রশাসনিক কমিটির প্রধান সালমান আল আনসারি, প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক প্রধান নিউত গিনগিরিচ, ইউনেস্কোতে নিযুক্ত সাবেক ফরাসি রাষ্ট্রদূত রামা ইয়াদ, মার্কিন স্থলবাহিনীর সাবেক কমান্ডার জর্জ কেইসি, কানাডার আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন বার্ড, ফ্রান্সের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুশনার, ইয়েমেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী রায়াদ ইয়াসিন, আলবেনিয়ার রিপাবলিকান দলের নেতা মাদিউ ও জার্মানির একজন প্রতিনিধি প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইরান বিরোধী সন্ত্রাসী মোনাফেকিন গোষ্ঠী এমকেও'র সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। এ থেকে বোঝা যায়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে কুখ্যাতি অর্জনকারী এমকেও'র প্রতি পাশ্চাত্য ও তাদের মিত্র দেশগুলোর ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। এমকেও'র অতীত কর্মকাণ্ডের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় ১৯৮০'র দশকে ইরানে এবং ১৯৯০এর দশকে ইরাকে তারা ভয়াবহ অপরাধযজ্ঞ চালিয়েছিল।
ইরান বিরোধী সন্ত্রাসী মোনাফেকিন গোষ্ঠী এমকেও'র একটি বড় সমস্যা হচ্ছে তাদের প্রতি জনসমর্থন নেই। এ কারণে তারা বিপুল অর্থ দিয়ে লোক ভাড়া করে প্রতি বছর সমাবেশের আয়োজন করে থাকে। দৈনিক গার্ডিয়ান গত ৩০ জুন প্যারিসে অনুষ্ঠিত এমকেও'র সমাবেশ সম্পর্কে এক প্রতিবেদনে লিখেছে, সমাবেশে যোগদানকারীদের অর্ধেকের বেশি এসেছে চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভেনিয়া, পোল্যান্ড ও জার্মানি থেকে। এদের মধ্যে একটি বিরাট সংখ্যক ছিল সিরিয়ান অভিবাসীরা যাদেরকে খাদ্য ও প্যারিসে থাকার জায়গার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডেকে আনা হয়েছিল। জার্মানিতে আশ্রয় নেয়া সিরিয়ান শরণার্থীদেরকেও কিছু সুবিধার বিনিময়ে প্যারিস সম্মেলনে নিয়ে আসা হয়েছিল। দুই সন্তানের মা একজন সিরিয়ান অভিবাসী গার্ডিয়ানকে বলেছেন, "ফেইসবুকে আমন্ত্রণ পেয়ে আমরা ছুটি কাটানোর জন্য প্যারিসে এসেছি। এর আগে কখনো আমি প্যারিস শহর দেখিনি এবং এমকেও সম্পর্কেও আমার কোনা ধারণা নেই।"
আমেরিকা ইরানের ব্যাপারে তার অশুভ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ইরান বিরোধী এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এমকেওকে ব্যবহার করে। যদিও ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ দেখা দিয়েছে বলে কোনো কোনো খবরে জানা গেছে। আমেরিকার কোনো কোনো কর্মকর্তা ইরানের ইসলামি সরকার ব্যবস্থা উৎখাত করার জন্য দেশটির ওপর প্রবল চাপ বাড়ানোর পক্ষপাতী। আবার কেউ কেউ এমন একটি সমঝোতার মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার কথা বলছেন যেখানে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির কর্মকাণ্ডের বিষয়টি স্থান পাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন হচ্ছেন ইরানের বর্তমান সরকার ব্যবস্থা উৎখাতের কট্টর সমর্থক। তিনি বেশ ক'বার এমকেও'র সমাবেশে অংশ নিয়েছেন এবং ইরানের ইসলামি সরকার ব্যবস্থা উৎখাতের জন্য এমকেও'র লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও কর্মপরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। দৈনিক ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর লিখেছে, জন বোল্টনও এমকেও'র সমাবেশে এই গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন এবং ইরান বিরোধী বক্তৃতা দিয়ে প্রচুর অর্থ পেয়েছেন।
আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তালিকা থেকে এমকেও'র নাম বাতিল করার জন্য যারা চেষ্টা চালিয়েছিলেন জন বোল্টন হচ্ছেন তাদের অন্যতম। তিনি বলেছেন, ইরানের ইসলামি শাসন ব্যবস্থাকে উৎখাতের জন্য মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এমকেও হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ডিফেন্ড পোস্ট সাময়িকীর সম্পাদক জুয়ান স্টুকার বলেছেন, জন বোল্টন ইরান বিরোধী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এমকেও'র পক্ষে প্রচার চালিয়ে এ পর্যন্ত এক লাখ ৮০ হাজার ডলার পেয়েছেন।
যাইহোক, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে রুদি জুলিয়ানি ও জন বোল্টনের মতো উগ্র ব্যক্তিদের মতামতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ট্রাম্পের ওপর রুদি জুলিয়ানি ও জন বোল্টনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। রুদি জুলিয়ানি প্যারিসে ইরান বিরোধী সন্ত্রাসী মোনাফেকিন গোষ্ঠীর সমাবেশে বলেছেন, "ইরানের বর্তমান সরকার ব্যবস্থাকে উৎখাত করাই দেশটির ওপর ফের নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রধান উদ্দেশ্য।" তিনি দাবি করেন, "ইরান সরকারের পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র এবং যতদিন পতন না ঘটছে ততদিন দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবত থাকবে।"      
আমেরিকা বছরের পর বছর ধরে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা থেকে শুরু করে নানা ষড়যন্ত্র ও সাদ্দামকে সহযোগিতার মাধ্যমে এবং জোট গঠন করে ইরানের ইসলামি সরকার ব্যবস্থা উৎখাতের চেষ্টা চালিয়ে এসেছে। কিন্তু বিপ্লবের প্রতি ইরানের জনগণের সমর্থন এবং সরকার ও জনগণের মধ্যে ঐক্যের কারণে আমেরিকার কোনো প্রচেষ্টাই সফল হয়নি। অন্যদিকে জনসমর্থনের অভাবে ইরান বিরোধী সন্ত্রাসী মোনাফেকিন গোষ্ঠী এমকেও দুর্বল ও হতাশ হয়ে পড়েছে এবং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তারা এখন পাশ্চাত্য ও ইসরাইলের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। আর পাশ্চাত্য ও ইসরাইলও ইরানের ব্যাপারে লক্ষ্য অর্জনের জন্য এমকেওকে ব্যবহার করছে।

ছাত্র বিক্ষোভ সরকারের জন্য বিব্রতকর -নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

সামনে জাতীয় নির্বাচন। এ সময়ে ছাত্রবিক্ষোভ সরকারের জন্য একটি বিব্রতকর অবস্থা। আগামী ডিসেম্বরের দিকে হওয়ার কথা ওই নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল ছাত্রদের এই বিক্ষোভের জন্য প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও এর প্রধান মিত্র জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করছে। বলা হচ্ছে, এ দুটি দল তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ছাত্রদের ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঢাকায় হাজারো ছাত্রদের বিক্ষোভকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে। তাদেরকে লাঠিপেটা করেছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় মিডিয়ার রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারী ছাত্রদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায় পুলিশ ও ‘গভর্নমেন্ট অফিসিয়ালস’।
এ সময় এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এতে অনেকে আহত হয়েছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা বলেছেন, স্কুলের পোশাক পরে কিছু ‘ক্রিমিনাল’ সহিংসতায় যোগ দিয়েছে। তবে হামলার জন্য ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনকে দায়ী করেছে বেশির ভাগ বিক্ষোভকারী। এসব সংঘর্ষের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে টেলিভিশন স্টেশনগুলো। তাতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারী ছাত্ররা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছুড়ছে।
দেশের অন্য এলাকা থেকে বাস কোম্পানিগুলো ঢাকায় প্রবেশ করতে অনীহা প্রকাশ করেছে। এতে রাজধানী ঢাকা ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের অন্য এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে বাস হলো মূল চলাচলের মাধ্যম। এখানে রেলে প্রচণ্ড ভিড় হয়। আর বেশির ভাগ মানুষের প্রাইভেট কার কেনার সামর্থ্য নেই। বাস কোম্পানিগুলোর মালিক ও শ্রমিকরা বলেছেন, কয়েক ডজন বাস ভাঙচুর করা হয়েছে ঢাকা ও অন্যান্য স্থানে। আগুন দেয়া হয়েছে। তাই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা বাস চালাবেন না।
শনিবারের সংঘর্ষকালে ঘটনাস্থলে ছিলেন এপি’র এক সাংবাদিক। তিনি বলেছেন, কিছু সাংবাদিক সহ অনেক মানুষ ওই সংঘর্ষকালে আহত হয়েছেন। দ্য ডেইলি স্টার খবর প্রকাশ করেছে যে, এতে আহত হয়েছে ২৫ জন। তবে অন্য সংবাদ মাধ্যম এ সংখ্যা আরো বেশি বলে উল্লেখ করেছে।
দুটি বাসের বেপরোয়া গতির কারণে কলেজপড়ুয়া দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। এরপরই গত সপ্তাহের রোববার থেকে বিক্ষোভ প্রতিবাদে উন্মাতাল হয়ে ওঠে ঢাকা। তারা প্রায় এক কোটি মানুষের শহর ঢাকাকে অচল করে দেয়। যে দুটি বাস যাত্রী ধরার জন্য ওই সময় পাল্লা দিচ্ছিল, তাতেই ওই দুই শিক্ষার্থী মারা যান। এমন প্রতিযোগিতা ও মৃত্যুর ঘটনা ঢাকা শহরে নিয়মিতই ঘটে থাকে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দল বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রদের এই বিক্ষোভে সমর্থন দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের দাবি যাচাই বাছাই করে দেখা হচ্ছে এবং তা দফায় দফায় পূরণ করা হবে।
বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক দাবি করছে। এ খাতটি দুর্নীতিতে সয়লাব। এ খাতে রয়েছে লাইসেন্সবিহীন চালক ও রেজিস্ট্রিবিহীন যানবাহন। এ চিত্র ঢাকার একটি সাধারণ ঘটনা। প্রতি বছর দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১২০০০ মানুষ মারা যান। এর জন্য দায়ী ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়াগতিতে গাড়ি চালানো ও ট্রাফিক আইন প্রয়োগে শিথিলতা।
ছাত্ররা কয়েক হাজার গাড়ি থামিয়ে তাদের রেজিস্ট্রেশন ও চালকের লাইসেন্স দেখতে চেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারের শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিচারক পর্যন্ত।

টার্গেট যখন সাংবাদিক

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বর্বর হামলার শিকার হয়েছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। শনিবার শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ছবি তুলতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছিলেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো শিক্ষার্থীদের  ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
এ হামলার ছবি তুলতে গিয়ে ছাত্রলীগের রোষানলে পড়েন সাংবাদিকরা। এমনকি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে গিয়েও অনেকে হামলার শিকার হন। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হামলাকারীদের টার্গেট ছিলেন গণমাধ্যমকর্মীরা। মাথায় হেলমেট ও মুখে কাপড় বেঁধে রামদা, রড, লাঠিসোঁটা নিয়ে সাংবাদিকদের আক্রমণ করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর সিটি কলেজের সামনে সাংবাদিকদের ওপর এ হামলা চালায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এতে বার্তাসংস্থা এপির ফটোসাংবাদিক এএম আহাদ, জুমা প্রেসের রিমন, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আহমেদ দীপ্ত, জনকণ্ঠের জাওয়াদ, বণিক বার্তার পলাশ, সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী এবং ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক রাহাত করিম ও এনামুল হাসানসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
গুরুতর আহত আহাদ, আহমেদ দীপ্ত ও রাহাত করিমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর ২টার দিকে ফটোসাংবাদিকরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ছবি তুলছিল। এ সময় ছাত্রলীগের কর্মীরা রড, লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রায় ৩০ জন সাংবাদিকদের একটি গ্রুপকে ধাওয়া দেয়। ধাওয়ার মধ্যেই প্রায় ৭ জন ফটোসাংবাদিক ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন। এ হামলায় এপির ফটোসাংবাদিক এএম আহাদ গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করতে ঘটনাস্থলে সহকর্মীরা গেলে হামলাকারীরা তাদের ওপরও ইটপাটকেল ছুড়ে।
এতে আরো কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন। প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আহমেদ দীপ্ত জানান, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ছিলেন ধানমন্ডির ১ নম্বর সড়কে। সেখানে তিনিসহ কয়েকজন সংবাদকর্মী দাঁড়িয়েছিলেন। এ সময় ঢাকা কলেজের দিক থেকে লাঠিসোঁটা হাতে আসা ছাত্রলীগের একটি মিছিল শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করে। ধাওয়ায় সেখানে কর্মরত সংবাদকর্মীরা দৌড় দিলে হামলাকারীদের একজন তার পায়ে রড দিয়ে আঘাত করলে তিনি পড়ে যান। এরপর ২০-২৫ জন মিলে লাঠিসোঁটা ও রড নিয়ে ব্যাপক মারধর করে তাকে। মারের কারণে দীপ্তর মাথার হেলমেট ভেঙে যায়। মাথা বাঁচাতে গিয়ে হাতে আঘাত পান দীপ্ত।
তার পুরো শরীর রক্তাক্ত। আহাদের ওপর হামলার সময়ের একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আহাদকে বেধড়ক পিটিয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়েছে একদল যুবক। যাদের দুজনের মাথায় হেলমেট পরা। আর একজনের মুখে গামছা বাঁধা। এ সময় ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন অপর ফটোসাংবাদিক রাহাত। তিনি সায়েন্সল্যাবের মোড়ে অবস্থিত ফুটওভার ব্রিজ থেকে হামলার ছবি তুলছিলেন। ছাত্রলীগ কর্মীরা তাকে দেখতে পেয়ে নেমে আসতে বলে। নিচে নামার পর পরই তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়।
পরে রড ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ওই ফটোসাংবাকিকে প্রহার করা হয়। আক্রান্ত সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন, ছবি তুললেই মারধর করা হয়েছে, মোবাইল নিয়ে নিচ্ছে এবং তা পুলিশের উপস্থিতিতেই। এমনকি ফোনে কথা বললেও লাঠি নিয়ে ছাত্রলীগকর্মীরা তেড়ে আসে। শুধু সাংবাদিক নয়, সাধারণ মানুষ ছবি তুললেও তাদের পেটানো হয়েছে। পুলিশের সামনে হামলার ঘটনা ঘটলেও পুলিশ তাদের বাধা দেয়নি বলে আক্রান্ত সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশের রমনা জোনের উপ-কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার সাংবাদিকদের তোপের মুখে পড়েন। দেশীয় অস্ত্রে কারা হামলা করছে- জানতে চাইলে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আমি কোনো অস্ত্র দেখিনি।
কোনো সাংবাদিক যদি আহত হয়ে থাকে, আমার কাছে কোনো সাংবাদিক অভিযোগ করেনি। কেউ অভিযোগ করলে সঙ্গে সঙ্গে আমরা দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তার করতাম। পুলিশ সামনে থাকার পরেও অভিযোগ করতে হবে কেন?- এমন প্রশ্নে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, কে ছাত্র, কে সাংবাদিক আমরা এটা বের করতে পারছি না। মাঝে মাঝে আমরা নিজেরাই বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, আমরা কোনো লাঠিচার্জ করিনি। শুধু কয়েকটি টিয়ারশেল মেরেছি।
যারা জিগাতলার দিকে আটকা পড়েছিল তাদের বের হয়ে আসার সুযোগ দিয়েছি। মারুফ হোসেন সরদার কথা বলার সময় ঠিক ২০০ গজ দূরেই সিটি কলেজের সামনে ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা অবস্থান করছিল। এই বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কোনো জবাব দেননি। লাঠিসোঁটা নিয়ে যারা অবস্থান করছে তাদের কেন ছত্রভঙ্গ করা হলো না জানতে চাইলে পুলিশের উপ-কমিশনার বলেন, যারা আমাদের দিকে ঢিল ছুড়েছে আমরা তাদের ছত্রভঙ্গ করছি।
এর বাইরে আমরা কোনো অ্যাকশন নিচ্ছি না। হামলার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাংবাদিকরা। তারা প্রশ্ন রাখছেন, গণমাধ্যমকে কেন টার্গেট করা হচ্ছে? গেল দুই-তিনদিন ধরে গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে। ভেঙে ফেলা হচ্ছে ক্যামেরা, গাড়ি। করা হচ্ছে মারধরও। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা শুরু হয় শুক্রবার থেকে। ওইদিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে ধানমন্ডিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউল্যাবের মানববন্ধনে বাধা দেয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। এ সময় প্রিয় ডটকমের রিপোর্টার প্রদীপ দাস ঘটনার ছবি তুলতে গেলে ছাত্রলীগ তার ওপর হামলা করে।
ঘটনাটি দেখতে পেয়ে প্রিয় ডটকমের হেড অব নিউজ রফিকুল রঞ্জু প্রদীপকে উদ্ধার করতে যান। তখন দুর্বৃত্তরা তাকেও ধাওয়া দেন। রফিকুল রঞ্জু ও প্রদীপ দাস দৌড়ে অফিসে প্রবেশ করেন। তখন ছাত্রলীগ প্রিয় ডটকমের অফিসে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। রঞ্জু অভিযোগ করেন, হামলার পর পর ধানমন্ডি থানায় ফোন করে জানালেও থানা থেকে ঘটনার ৪০ মিনিট পার হয়ে গেলেও কোনো পুলিশ আসেনি। শনিবার জিগাতলায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষের ছবি তুলতে গেলে সাংবাদিকরা ছাত্রলীগ যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হন।
সংঘাতের ছবি তোলার সময় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের অন্যান্য সংগঠনের নেতা কর্মীরা সাংবাদিকদের বাধা দেয়। যারা গোপনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ যুবলীগের হামলার ছবি ক্যামেরা বা মোবাইলের মাধ্যমে ধারণ করে ছাত্রলীগ ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের মোবাইল থেকে ছবি মুছে দেয়। কারও কারও ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। অনেককে মারধর করে। কোনো কোনো সাংবাদিক ছাত্রলীগের হামলায় আহত হন। কেউ কেউ হাসপাতালেও চিকিৎসা নেয়।
জানা গেছে, ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয় দৈনিক যুগান্তরের সাংবাদিক আরমান ভূঁইয়া, দৈনিক আমার সংবাদের সিনিয়র ফটো সাংবাদিক খোকন সিকদার, পরিবর্তন ডটকমের স্টাফ রিপোর্টার ফররুখ বাবু, মানবজমিনের ফটো সাংবাদিক শাহীন কাওসার, রিপোর্টার সুদীপ অধিকারী। রাজধানীর ধানমন্ডির রাইফেলস স্কয়ারের সামনে আক্রান্ত হন ডেইলি স্টারের শায়ের রিয়াজ, রাফি হোসেন, সুস্মিতা এস পৃথা, বিডিমর্নিং এর ফটোসাংবাদিক আবু সুফিয়ান জুয়েল, কালেরকণ্ঠের ফটোসাংবাদিক নিশক তারেক আজিজ, টাইমস বিডি জার্নালের ফটোসাংবাদিক অরণ্য জিয়া ও একাত্তর টেলিভিশনের সাংবাদিক।
আক্রান্তরা অভিযোগ করেন, সাংবাদিক পরিচয় দিলে তার ওপর আরো বেশি হামলা হয় এবং নানা ধরনের গালাগালি করা হয়। ছাত্রলীগ কর্মীরা মারধরের পর অনেকের ক্যামেরা ভাঙচুর করে। মোবাইলে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ছবি ধারণ করলেও মোবাইল কেড়ে নিয়ে ছাত্রলীগ তা মুছে ফেলে। শনিবার বেলা সোয়া তিনটার দিকে সেখানে দায়িত্বপালনরত প্রথম আলোর প্রতিবেদকের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় হামলাকারী যুবকেরা। ফোন ফেরত চাইতে গেলে কয়েকজন যুবক প্রথম আলোর প্রতিবেদককে বলেন, আওয়ামী লীগের স্থানীয় কার্যালয়ে গিয়ে তিনি নিয়ে আসতে পারেন। অবশ্য আধা ঘণ্টা পর তারা ফোনটি ফেরত দিয়ে দেয়। সাংবাদিকদের হেলমেট ও মোটরসাইকেলের চাবিও নিয়ে যায় তারা। আক্রান্ত এক সাংবাদিক অভিযোগ করেন, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তাকে মিথ্যা লাইভ দিতে বাধ্য করে।

পরিবহন মালিকদের কাছে জিম্মি জনগণ

অযৌক্তিক কারণে টানা চার দিন ধরে পুরো দেশকে জিম্মি করে রেখেছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে নিরাপত্তাহীনতার কারণ দেখিয়ে তারা বাস চলাচল বন্ধ রাখায়   চরম দুর্ভোগ চলছে দেশজুড়ে। পরিবহন মালিক- শ্রমিকদের এমন স্বেচ্ছাচারী অবস্থান পুরনো হলেও এমন ঠুনকো অজুহাতে পরিবহন বন্ধ রাখার ঘটনা এর আগে ঘটেনি। পরিবহন খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, মালিক-শ্রমিকরা অস্ত্র হিসেবেই এমন অবস্থান নিয়েছে। তাদের এই স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করতে হলে সরকারকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিনা কারণে মানুষকে জিম্মি করলে গাড়ির লাইসেন্স ও রুট পারমিট বাতিলের মতো ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের পদ থেকে সরাতে হবে। তাদের কলকাঠিতেই মালিক-শ্রমিকরা দেশবাসীকে শাস্তি দেয়ার কর্মসূচিতে নামে বলে মনে করেন তারা। বিশ্লেষকরা বলছেন ক্রমাগত আইন ভঙ্গের ধারাবাহিকতা থেকে তারা যে বের হতে চায় না অঘোষিত ধর্মঘট এর বড় প্রমাণ।
গত ৪ঠা আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশন মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, পরিবহন শ্রমিকদের কাছে দেশ জিম্মি। রাস্তায় না চলুক বাস, ওদের কাছে জিম্মি থাকতে পারি না। জ্বালা যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছি না। কয়টা মানুষের কাছে দেশ জিম্মি থাকতে পারে না। আজ কতগুলো বাসের মালিক  দেশকে অচল করে দিয়েছে।
নিরাপত্তার অজুহাতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অঘোষিত গতকাল চতুর্থ দিনের মতো ধর্মঘটে মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। ধর্মঘটের কারণে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। বাস না পেয়ে নগরবাসীকে গন্তব্যে যেতে রিকশা, অটোরিকশায় দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় এসব পরিবহনও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া গতকাল থেকে শুরু হওয়া ট্রাফিক সপ্তাহের কারণেও কাগজপত্র না থাকায় রাস্তায় থাকা যানবাহন আটকে রাখা হয়েছে। গত ২৯শে জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। এরপর বৃহস্পতিবার অঘোষিত ধর্মঘট শুরু করেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। এর আগে রাতে দূরপাল্লার যানবাহন চললেও শনিবার রাত থেকে তাও বন্ধ করে দেয়া হয়। পরিবহন মালিকরা বলছেন, গাড়ি ভাঙচুরের কারণে ও নিরাপত্তা না থাকায় চালকরা বাস চালাতে চাচ্ছেন না। রোববার সরকারি অফিস-আদালত খোলা থাকায় সকাল থেকে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় থাকলেও গণপরিবহন ছিল না। স্বল্পসংখ্যক বিআরটিসি বাস থাকলেও তাতে ওঠার কোনো উপায় ছিল না। বাধ্য হয়ে যাত্রীরা প্রাইভেটকার, বাইকে চেপে গন্তব্যে রওনা হন। সকালে রাজধানীর উত্তরা, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর-১০ মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, বাহন বলতে শুধু রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ভ্যানগাড়ি। তাও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ভাড়া নেয়া হচ্ছে চার-পাঁচগুণ বেশি। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক, পিকআপ ভ্যানে করে যাচ্ছিলেন গন্তব্যে।
এদিকে ভুক্তভোগীরা বলছেন, রাজনৈতিক নেতাদের কব্জায় জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের পরিবহন সেক্টর। পরিবহন খাতে ক্রমবর্ধমান নৈরাজ্যের নৈপথ্যে রাজনৈতিক মালিকানার এই অশুভ প্রভাব। সরকারের মন্ত্রী, এমপি এবং সরকারদলীয় নেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মালিকানায় থাকা পরিবহনগুলোর কারণে নগর পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরছে না। মানা হচ্ছে না সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়মনীতি। যাত্রীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। জানা গেছে, রুট নির্ধারণ, সিটি সার্ভিসে ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানিরও অন্যতম কারণ পরিবহন মালিকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। সরকারের দু-একজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপিসহ অন্য দলের নেতারাও পরিবহন সেক্টরে তৎপরতায় রয়েছেন।  অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারের মন্ত্রী, এমপি, প্রভাবশালী নেতা ও সরকারি দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মালিকানাধীন বাস কোম্পানিগুলোই এখন রাজধানীতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে।
জেলা-উপজেলার সড়ক পরিবহনেও তাদের দৌরাত্ম্য। রাজনৈতিক নেতাদের তৎপরতায় মিলছে যানবাহনের সহজ রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও রুট পারমিট। বিভিন্ন রুটে আধিপত্য বিস্তারের কাজ তারাই করছেন। সূত্র জানায়, নিয়ন্ত্রকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে কোনো সরকারই পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্য এখন পর্যন্ত  দূর করতে পারেনি। ফলে জনদুর্ভোগ-চাঁদাবাজি-ভাড়া সন্ত্রাস অব্যাহত রয়েছে। একজন প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির নেতার গাড়ি চলে ঢাকার বাইরে। সূত্র জানায়, বর্তমানে পরিবহন সেক্টরে রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব বাড়লেও এ প্রক্রিয়া চলে আসছে অনেক দিন থেকে। খোন্দকার এনায়েত উল্লাহ বর্তমান সরকারের আমলে পরিবহন সেক্টরের অন্যতম নিয়ন্ত্রক ও বাস মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব। পরিবহন খাতের ভাড়া নির্ধারণ থেকে শুরু করে এ খাতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত  গ্রহণ, আইন প্রণয়ন ও সংশোধনসহ সরকারি সব বৈঠকে তার উপস্থিতি দেখা যায়। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে তার ‘এনা পরিবহন’ নামের বাস চলে। সাধারণ পরিবহন ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন সেক্টরের রাজনৈতিক নেতাদের কারণে সরকারই এ খাতটি সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত বিপক্ষে গেলেই এ খাতকে জিম্মি করছেন তারা। এমনকি পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিচ্ছেন। এ অবস্থায় পরিবহন খাতে নেয়া সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, আমরা এখনো গাড়ি চালানোর সিদ্ধান্ত নেইনি। রাস্তায় এখনো গণ্ডগোল আছে। আন্দোলনকারীরা তো কোনো গাড়িকে বাধা দিচ্ছে না এবং আপনারা কি তাহলে জনগণকে জিম্মি করে ফেলেছেন- এমন প্রশ্নে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশের গণপরিবহনগুলো আইনকানুনের কিছুই তোয়াক্কা করে না। আর এখানে মালিকদের এমন একটা শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে যারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়ে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পরিবহন মালিকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে এ সেক্টরে অনিয়ম বাড়ছে। রাজনৈতিক নেতারা পরিবহন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ায় এ খাতে নিয়মনীতি কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনে জনপ্রতিনিধিত্ব নেই। ফলে ভবিষ্যতেও পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য থাকবে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের নেতাও মন্ত্রী, মালিকদের নেতাও মন্ত্রী এবং আমাদের নেতা তো মালিকদের পকেটে ঢুকে গেছে। এখান থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই।

বিক্ষোভে উত্তাল দেশ

নিরাপদ সড়কের দাবি ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে সারা দেশে বিক্ষোভ, অবস্থান ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর উত্তরা, রামপুরা, মহাখালী, বাড্ডা, শাহবাগ, বনানী, আসাদগেট, কুড়িল বিশ্বরোড, ধানমন্ডি, এলিফ্যান্ট রোড, গ্রিন রোড ও মালিবাগ এলাকায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। গতকাল  সকাল সাড়ে ১০টায় উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকায় ছয় শতাধিক ছাত্র ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান দিতে দিতে সড়কে অবস্থান নেন। ওই মিছিলে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রী ছাড়াও উত্তরার একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছিলেন। শিক্ষার্থীদের সমাবেশ  হাউজ বিল্ডিং থেকে  জসিমউদ্দিন রোডে ছড়িয়ে পড়ে। তারা সড়কের মধ্যেখানে বসে পড়েন। প্রায় ৩০ মিনিট পর তারা গাড়িগুলোকে লেন মেনে চলার জন্য নিদের্শনা দেন। গাড়ি ও চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করেন। উত্তরার রাজউক মডেল কলেজ, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, স্কলাস্টিকা, উত্তরা কমার্স কলেজ, বিজিএমই ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থীরা মিছিলে অংশ নেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরাই তাদের মধ্যে যাতে কোনো বহিরাগত ঢুকতে না পারে সেজন্য সবাইকে আইডি কার্ড বুকে ঝুলানোর আহ্বান জানান। হাউজ বিল্ডিংয়ের ফুট ওভার ব্রিজের ওপর থেকে একাধিক সাংবাদিক চিত্র ধারণ করতে গেলে তাদের বাধা দেন তারা। পুলিশ শিক্ষার্থীদের একাধিকবার সড়ক থেকে পাশে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলে তারা কেউ কথা শোনেন নি। বরং কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে সড়কের মধ্যেখানে শুয়ে যেতে দেখা গেছে।
রাজউক মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, গতকাল দুই শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। ঢাকাসহ দেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলের সড়ক এখন প্রাণঘাতী সড়কে পরিণত হয়েছে। দুর্ভাগ্যক্রমে আমিও এর শিকার হতে পারি। নৌ-মন্ত্রীর পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলতে থাকবে। সকাল ১১টার দিকে, খিলক্ষেত কুড়িল বিশ্বরোডে খিলক্ষেত মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪শ’ শিক্ষার্থী সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রর্দশন করে।
তারা তাদের দাবি আদায়ের জন্য বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। সেখানেও তারা গাড়ির লাইসেন্স পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এ বিষয়ে পুলিশের উত্তরা জোনের এসি শহিদুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করছে। উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ।
এদিকে, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মহাখালী আমতলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী মহাখালীর মোড়ে গিয়ে সড়কে বসে পড়ে। তারা অবিলম্বে নৌ-মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। এ সময় তারা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। সেখানে তারা বাস, পিকঅ্যাপ, মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে সব ধরনের গাড়ির লাইসেন্স পরীক্ষা করে।
আমতলী থেকে কিছুটা দূরে জাতীয় শ্রমিক লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সেখানে সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে পুলিশকে। জানা গেছে, সকাল ১১টার দিকে মোহাম্মদপুরের আসাদ গেটের আড়ংয়ের সামনের সড়কে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভ শুরু করে। তারা সেখানে গাড়ির লাইসেন্স পরীক্ষা করেন। দুপুরের পর ওই এলাকায় তারা সেখানে ছিলেন না। দুপুরের পর তারা মিছিল নিয়ে শুক্রাবাদ এলাকার দিকে চলে যায়। এদিকে, দুপুর ১২টার দিকে মালিবাগ মোড়ে মগবাজারসহ আশপাশের একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী সড়কে নেমে বিক্ষোভ করলে সেখানে একদল যুবক হামলা চালায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। সেখানে থেকে শিক্ষার্থী ও হামলাকারী যুবকদের সরিয়ে দেয়া হয়।
সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত মেরুল বাড্ডা থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তাটিতে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। এদিকে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীদের রাস্তা অবরোধের কারণে ওই এলাকায় দিনভর কোনো যানবাহন চলেনি। তাছাড়া, গণপরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে টঙ্গী থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত চলাচল করা কোনো বাস চলাচল করতে দেখা যায়নি। 
দুপুর ১২টার দিকে রামপুরা ব্রিজের ওপর অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীদের দিকে লাঠিসোঁটা হাতে এগিয়ে আসে ৩০-৪০ জনের একদল যুবক। এ সময় ছাত্ররাও লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া করে। তবে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, বাড্ডার স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাদের হামলা করতে এসেছিল। তাদের সঙ্গে ছাত্রলীগ যুবলীগের নেতাকর্মীরাও ছিল। এ সময় তাদের হাতে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ছিল বলে দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থী জানান, আমরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান করছিলাম।
হঠাৎ ছাত্রলীগ যুবলীগের লোকজন এসে ধাওয়া করে। এজন্য আমরাও ধাওয়া দিলে তারা পালিয়ে যায়। দুুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে দু’জন  অনুপ্রবেশকারী ঢুকে পড়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। রামপুরা ব্রিজের ওপর তারা শিক্ষার্থীদের মাঝে মিছিল স্লোগান দিয়ে কিছুটা দূরে গিয়ে গল্প করার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। এ সময় পুলিশ ওই দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা সঠিক উত্তর দিতে পারেনি।
তাদের কাছে কোনো পরিচয়পত্রও পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ জানায়, এই দু’জন তাদের পরিচয়পত্র দেখাতে পারেনি। কোন কলেজে পড়ে সেটাও ঠিক করে বলতে পারে না। তাই তাদের ওই স্থান ত্যাগ করে বাসায় চলে যেতে বলা হয়েছে।
বিকাল ৩টার দিকে আবারো ছাত্রলীগ হামলার উদ্দেশ্যে ছাত্রদের দিকে এগিয়ে আসছে খবর চাউর হলে পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে উঠে রামপুরা ব্রিজে। শিক্ষার্থীরা লাটিসোঁটা নিয়ে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে থাকে। সকাল থেকে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইমপিরিয়াল কলেজ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিসহ আশপাশের প্রায় ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী জমায়েত হয় রামপুরা ব্রিজে। কিছুক্ষণ পরপরই তারা মিছিল দিতে থাকেন। এ সময় নিরাপদ সড়ক ও মন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন। পাশাপাশি শনিবার বিকালে জিগাতলায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদও জানান।
অন্যদিকে, রামপুরা ব্রিজে শিক্ষার্থীদের এ অবস্থানে প্রায় অর্ধশত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সেখানে রামপুরা থানার ওসি প্রলয় কুমার জানান, শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন।
আমাদের পুলিশবাহিনীও এখানে সতর্ক অবস্থানে ছিল। কোনো ঝামেলা হয়নি রামপুরায়। এদিকে, রামপুরার পরিস্থিতি ছাড়াও উত্তর বাড্ডা, মধ্যবাড্ডা ও নতুন বাজারসহ চারপাশের সড়কগুলোর পরিস্থিতি বেশ শান্ত ছিল। তবে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রধান ফটকের সামনে নিরাপদ সড়কের দাবিতে সকাল থেকে অবস্থান নিয়েছিলেন নর্থ সাউথ ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। এদিকে, সকালে মিরপুর ১০নম্বরে কিছু শিক্ষার্থী অবস্থান নিলেও পরে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতাদের পরামর্শে তারা রাস্তা ছেড়ে দেন। ফার্মগেট এলাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে সড়কে নামলে কিছু যুবক লাঠি হাতে তাদের ওপর হামলা করে। পরে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান।

দুই মন্ত্রী পদত্যাগ করলে আস্থার জায়গা তৈরি হবে: জিল্লুর

চলমান সংকট নিরসনে শিক্ষার্থীদের অবিশ্বাস দূর করতে হবে। এজন্য সরকারকে দুই পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে তত্তা¡বধায়ক সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, নৌ পরিবহনমন্ত্রী ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ ও আইনের বিষয়গুলো মেনে চলার চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি হবে। তখন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরে যাবে।
শনিবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আই পরিবেশিত ‘তৃতীয় মাত্রা’ শীর্ষক টকশোতে এসব পরামর্শ দেন তিনি। জিল্লুর রহমানের উপস্থাপনায় টক শোতে আরো অংশ নেন ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজ সম্পাদক নূরুল কবীর। সরকারকে পরামর্শ দিয়ে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সড়কে নিরাপত্তার জন্য গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর করতে হবে। গণপরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সমস্যা তুলে ধরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাক্তন এ উপদেষ্টা বলেন, বিআরটিএ-এর অধীনে রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কাউন্সিল (আরটিসি) নামে একটি কমিটি রয়েছে। এই কমিটি নির্ধারণ করে দেয় কোন সড়কে কী পরিমাণ গাড়ি চলবে। আরটিসি ব্যবস্থাপনাটি রাজনৈতিক কুশাসনের আখড়া হিসেবে আছে। তিনি বলেন, গণপরিবহনের এই ব্যবস্থাপনাটি দুই মন্ত্রী নৌ পরিবহন ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রীর কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট (স্বার্থের দ্বন্দ্ব) এর অবস্থানে আছে। দু’জনই মন্ত্রী পরিষদের সদস্য। একজন শ্রমিকদের নেতা। আরেকজন বাস মালিকদের নেতা। এই দুই মন্ত্রী পদত্যাগ করলে সড়কপথে নিরাপত্তা ফিরে আসবে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ।
অন্য আরেক পদক্ষেপের বিষয়ে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আইনে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি সংযুক্তির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে পুলিশের সহায়তায় একবার সারা দেশে গাড়ির লাইসেন্স চেক করার দায়িত্ব দিতে হবে। একইভাবে মন্ত্রী, সচিব ও উচ্চ পদস্থদেরকে মাসে একদিন গণপরিবহনে চলাচল করার পরামর্শ দেন তিনি। সড়ক ব্যবস্থাপনায় মনিটরিংয়ের বিষয়ে জোর দিয়ে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ পৃষ্ঠা ১৭ কলাম ৪
বলেন, মনিটরিং বিষয়টি কোনো কারিগরি বিষয় না যে একটি সেমিনারের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব না। এটা একটি অব্যাহত সার্বিক ব্যবস্থাপনার বিষয়। তাই এই কিশোর আন্দোলনের ফলে সাধারণ মানুষকে শাসন প্রক্রিয়ায় আনার এক ধরনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কিশোর আন্দোলনের পুরো ঘটনাকে অভূতর্পূব উল্লেখ করে অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ক্ষমতাসীন সরকার নৈতিক পরাজয়ের জায়গায় রয়েছে। কেননা কোমলমতি সেকশন যাদের ঘরে থাকার কথা তারা জনগণের চাহিদা পূরণ করছে। সরকারকে হ্যান্ডল করছে। আমরা সঙ্গীন অবস্থায় আছি এবং একটা সম্ভাবনার জায়গায় রয়েছি। এমতাবস্থায় সরকারকে লক্ষ্য করে টকশোতে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলতে পারলাম এমন যেন না হয়। যদিও অতীতে বাংলাদেশে মানুষের অবস্থান নেই। কে ক্ষমতায় আসবে কে যাবে, তারা কী করবেÑ তারাই সব। আমাদের এখানে না থেকে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিলেও কিছু হতো না। কিন্তু এখন জোরালোভাবে জনগণ ফিরে এসেছে, আলোচনায় এসেছে শিশু কিশোরদের হাত ধরে। তাই আশ্বাস ও হুমকি এই দুই অকার্যকর কৌশল বাদ দিয়ে সরকারকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
দৃশ্যমান পদক্ষেপের বিষয়ে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দৃশ্যমান পদক্ষেপ শুধুÑ যারা প্রাণ হারালো তাদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ বা কয়েকটি বাস দেয়া নয়। বরং গভর্নেন্স এঙ্গেলে পদক্ষেপের বিষয় রয়েছে। দু’দিন ধরে যে অঘোষিত গণপরিবহন ধর্মঘট চলছে নিরাপত্তার অজুহাতে একে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হলো সম্পূর্ণ অহিংস। তারা শুধু লাইসেন্স চাইছে। এ ধর্মঘট এক অর্থে জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। সার্বিকভাবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা। গণপরিবহন ব্যবস্থায় অযৌক্তিক অঘোষিত ধর্মঘট প্রতিকারের জন্য সরকারকে আইনের ঘাটতি, ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও অব্যাহত মনিটরিংয়ের ঘাটতি দূরীকরণের পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।

শিক্ষার্থীদের ওপর ফের হামলা, আহত অর্ধশতাধিক

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ফের হামলার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রাজধানীর ঝিগাতলা এলাকায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এ হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে সাংবাদিকসহ অন্তত অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। আহতরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। আগের দিন একই স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল শাহবাগ থেকে জড়ো হয়ে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে ঝিগাতলার দিকে গেলে প্রথমে পুলিশ ও পরে ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের দফায় দফায় হামলার শিকার হন তারা।
ঝিগাতলা থেকে সায়েন্সল্যাব হয়ে বাটা সিগন্যাল পর্যন্ত এলাকায় দুপুর থেকে থেমে থেমে এ সংঘর্ষ চলে। সংঘর্ষে আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ মুহুর্মুহু টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে। পাশাপাশি হেলমেট পরে গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে দেশীয় অস্ত্র লাঠিসোটা, রড, রামদা নিয়ে একদল যুবককে হামলা করতে দেখা গেছে। তারা ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মী বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। হামলাকারীরা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নামে স্লোগানও দিচ্ছিলেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হামলার সময় দু’পক্ষের মধ্যেই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ হয়েছে একাধিকবার। হামলা ও সংঘর্ষ চলাকালে সাধারণ পথচারী ও নারীরাও ছাত্রলীগের হাতে হেনস্থার শিকার হন।
প্রথম দফা সংঘর্ষের পর সায়েন্সল্যাব এলাকায়  দোকানপাটে ভাঙচুর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরে তারা সায়েন্সল্যাব থেকে বাটা সিগন্যাল এলাকায় লাঠিসোটা নিয়ে দফায় দফায় মহড়া দেন। এসময় আশেপাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রলীগের হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দর্শকের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে পুলিশ ও ছাত্রলীগ নেতারা সায়েন্সল্যাব, গ্রিনরোড, ঝিগাতলা, এলিফেন্ট রোডসহ আশেপাশের এলাকার অলিগলিতে ছড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করে তাড়িয়ে দেয়। বিকাল তিনটার দিকে ওই এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
সরজমিন দেখা যায়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শাহবাগ চত্বর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সিটি কলেজ, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, কবি নজরুল কলেজসহ আরো বেশ কয়েকটি কলেজের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে ঝিগাতলার দিকে এগিয়ে যায়। এসময় শিক্ষার্থীরা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ ‘আমার ভাই কবরে খুনি কেন বাহিরে’, ‘নিরাপদ সড়ক চাই, নৌ-মন্ত্রীর পদত্যাগ চাই, ভুয়া ভুয়াসহ বিভিন্ন স্লোগান দেয়। দুপুর ১টার দিকে মিছিলটি ঝিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে পৌঁছায়। তখনও শিক্ষার্থীরা নানান স্লোগান দিতে থাকে। পরে মিছিলটি ঝিগাতলা বাসস্ট্যান্ড ঘুরে ফের সায়েন্সল্যাবমুখো হয়। এসময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে থাকা পুলিশ  হঠাৎ করেই শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ারশেল নিক্ষেপ শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় ৪/৫ হাজার শিক্ষার্থীর মিছিল। টিয়ালশেল নিক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীরা আশেপাশের বাসাবাড়ি, রেস্তরাঁ, ব্যাংকসহ বিভিন্ন অলিগলিতে ঢুকে পড়ে।
তাদের কেউ কেউ ধানমন্ডি লেকের পানিতে ঝাঁপ দেয়। সেখানে গিয়েও টিয়ালশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। তাদের লাঠিপেটা করে পুলিশ। পানিতে পড়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের দিকে পুলিশকে ঢিল ছুড়তেও দেখা যায়। আবার অনেকেই সিটি কলেজ হয়ে সায়েন্সল্যাব, এলিফ্যান্ট রোডের দিকে দৌড়ে চলে যায়। পরে পুলিশ বিভিন্ন অলিগলিতে গিয়ে লাঠি হাতে ধাওয়া করে। এসময় বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা পাল্টা ধাওয়া করে, সঙ্গে ইটপাটকেলও নিক্ষেপ করে। এসময় বিজিবি সদর দপ্তরের সামনের সড়ক, ঝিগাতলা মোড়, ২ নম্বর সড়কে শিক্ষার্থীদের পায়ের জুতাসহ অনেক সামগ্রী ও ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
দুপুর দেড়টার দিকে বিজিবি সদর দপ্তরের সামনে শতাধিক বিজিবি সদস্য অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ, বিজিবি ও সাংবাদিকদের সহযোগিতায় আশেপাশের বিভিন্ন অফিস, রেস্তরাঁ ও বাসাবাড়িতে আটকে পড়া শিক্ষার্থীরা বের হয়ে সায়েন্সল্যাবের দিকে যায়। তখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ ছিল। ধাওয়া খেয়ে যখন শিক্ষার্থীরা পাল্টা ধাওয়া করতে থাকে তখন পেছন থেকে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র, লাঠি, রড, রামদা, লোহার পাইপ, এলুমিনিয়ামের পাইপ, গ্রিলের পাইপ হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।
ছাত্রলীগের হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয় বেশকিছু শিক্ষার্থী। সায়েন্সল্যাব মোড় হতে ছাত্রলীগের এই হামলা থেকে বাদ যায়নি সাংবাদিক, পথচারীসহ সাধারণ মানুষ। গুরুতর আহত অনেককে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে ছাত্রলীগের হামলার সময় পুলিশের অবস্থান ২০০ গজের মধ্যে ছিল। পুলিশের চোখের সামনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এই হামলা চালালেও পুলিশ নীরব ভূমিকায় ছিল। প্রত্যক্ষদর্শী পথচারী আহমেদ আলী বলেন, এ কোন আজব দেশে বাস করছি। পুলিশের সামনে ছাত্রলীগের নেতারা গণহারে মানুষকে পেটাচ্ছে। কিন্তু তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুটিং দেখছে। কোমলমতি এই শিক্ষার্থীরা যে দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে সেটা সবার জন্যই উপকার হবে। তাদের ওপর এমন নির্মম আক্রমণ মোটেও কাম্য নয়। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের এমন বেপরোয়া মনোভাব অনেক দিন দেখা যায়নি। সড়কে আজ তারা যে তাণ্ডব চালালো তা জাতি অনেকদিন মনে রাখবে।
এদিকে শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব এলাকা ছেড়ে দিলে ওই এলাকায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লাঠিসোটা হাতে মহড়া দিতে শুরু করেন। তারা সায়েন্সল্যাব থেকে বাটা সিগন্যাল পর্যন্ত সড়কে দফায় দফায় মিছিল করে। এসময় আশেপাশে বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীদের তারা ধাওয়া করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল থেকেই ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। সেখানে সতর্কতা হিসেবে পুলিশের সাঁজোয়া যানও রাখা ছিল।
সকাল ১১টা থেকে শাহবাগ চত্বরে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে জড়ো হন। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে তারা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। দুপুর সাড়ে ১২টার সময় শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাবের দিকে রওয়ানা দেয়। এরপর থেকে শাহবাগে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবস্থান ছিল না। দুুপুরে ঝিগাতলায় পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়ে বিচ্ছিন্ন শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড়ে  ফের জড়ো হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশি বাধার কারণে তারা সেখানে দাঁড়াতে পারেনি।
বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে পরিবাগ থেকে শতাধিক শিক্ষার্থীর একটি দল শাহবাগমুখী হতে চায়। এসময় পুলিশ তাদের উদ্দেশে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এসময় ওই শিক্ষার্থীরা পাশের ব্যাংক এশিয়া গলিতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। শাহবাগ থেকে মিছিলে অংশ নেয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী হামলার পর বলেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি ছাত্রদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদ, নৌ-মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ সমাবেশ করতে চেয়েছিলাম। সেজন্য আমরা একটি মিছিল নিয়ে ঘটনাস্থল ঝিগাতলার দিকে যাই।
সেখানে গিয়েই আমরা পুলিশের বাধার সম্মুখীন হই। পরে আমরা পুনরায় মিছিল নিয়ে সায়েন্সল্যাবের দিকে রওয়ানা হই। ঠিক তখনই পুলিশ হঠাৎ করে আমাদের ওপর টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। তাড়াহুড়ো করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে গিয়ে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। পুলিশের রমনা জোনের উপ-কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছিল। পুলিশ বাধা দিলেও তারা শোনেনি। বাধ্য হয়ে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়।