Friday, July 13, 2018

‘মুজিবরকে বাঁচাতেই ৯৩০০০ পাক বন্দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ইন্দিরা’

১৯৭২-এর ২রা আগস্ট। ঠিক আট মাস আগেই শেষ হয়েছে ১৩ দিনের ভারত-পাক যুদ্ধ। এদিন দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় সিমলা চুক্তি। এর ফলে ভারত ৯৩০০০ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিকে ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়। ৭১-এর যুদ্ধ চলাকালীন এদের বন্দি করা হয়েছিল ভারতে। এটা ছিল ভারতের অত্যন্ত বিতর্কিত একটি সিদ্ধান্ত। কেন এই সময় ওই বন্দিদের হাতের তাস করে কাশ্মীর নিয়ে দরাদরি করেননি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী? হয়তো মিটে যেত সমস্যা!
কিসের জন্য পাক বন্দিদের ছেড়ে দিতে রাজি হয়ে যান ইন্দিরা? এর পিছনে আসল গল্প কি ছিল? সেটা জানলে হয়তো বিতর্কের সমাধান হতো। কিন্তু সেই গল্প রয়ে গিয়েছিল গোপনেই। কোনোদিন তা প্রকাশ্যে আনা হয়নি। ৪০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে সেই যুদ্ধের। সেদিন কেন পাক বন্দিদের ছেড়ে দেয়া হয়েছিল, সেই রহস্য উদঘাটন করেছেন এক অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিবিদ শশাঙ্ক বন্দ্যোপাধ্যায়।
THE WAR পত্রিকায় তিনি লিখেছেন সেই ইতিহাস। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর পাক যোদ্ধারা আত্মসমর্পণ করে ঢাকায়। ভারতীয় সেনা ও বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে তারা। ভারত আর বাংলাদেশের জন্য সে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু সেইসময় ইন্দিরা গান্ধী তথা ভারত অন্য এক বিপদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। একদিকে যুদ্ধের বিপুল খরচ, তার উপরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা প্রায় ১ কোটি শরণার্থী, যারা পাক সেনার অত্যাচারে সীমান্ত পার করে চলে এসেছিল তাদের খরচ। তার মধ্যে বাড়তি খরচ এই ৯৩০০০ পাক সেনা।
ইন্দিরা গান্ধীর মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল, কিভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিরাপদে দেশে ফেরানো যায়। তার জন্য যে কোনও মূল্য দিতে রাজি ছিলেন তিনি। সেকথা তিনি একজনকেই বলেছিলেন। তিনি হলেন তৎকালীন জঅড প্রধান রাম নাথ কাও। পাকিস্তানের মিলিটারি কোর্টে ফাঁসির সাজা দেয়া হয়েছিল তাঁকে, নৃশংসভাবে হত্যা করার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। সেটাই ছিল ইন্দিরা গান্ধীর সব থেকে বড় দুঃস্বপ্ন। হৃদয় দিয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন করেছিল ভারত। তাই মুজিবর রহমানকে হত্যা করা হলে, ভারতের স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে। এটাই ছিল ভয়। বাংলাদেশকে ‘অনাথ’ দেখতে চাননি তিনি।
এদিকে, পরাজয়ের অপমান সহ্য করতে না পেরে পদত্যাগ করেন তৎকালীন পাক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান। আমেরিকায় থাকা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফোন করে সে কথা জানান। দায়িত্ব দিয়ে যান ভুট্টোকেই। তড়িঘড়ি রাওয়ালপিন্ডির বিমান ধরেন ভুট্টো।
ইন্দিরার ঐতিহাসিক কূটনীতি
ভুট্টোর ফেরার খবর পেয়েই জরুরি মিটিং ডাকেন ইন্দিরা গান্ধী। ভুট্টোর বিমান রিফুয়েলিং-এর জন্য থামার কথা ছিল হিথরো বিমানবন্দরে। ইন্দিরা গান্ধী চেয়েছিলেন, সেইসময় সেখানে উপস্থিত থাকুক কোনও ভারতীয় প্রতিনিধি। যাতে তিনি জানতে পারেন, মুজিবর রহমানকে নিয়ে কি ভাবছেন তিনি? সেই বৈঠকে ছিলেন বিদেশমন্ত্রকের উপদেষ্টা দুর্গা প্রসাদ ধর, জঅড প্রধান রাম নাথ কাও, প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি পিএন হাসকার, বিদেশ সচিব টিএন কাউল।
মুজফ্‌ফর হোসেন, পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি ভারতে যুদ্ধবন্দি হন এবং ডিপি ধরের বাড়িতে অতিথির মর্যাদায় ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন লন্ডনে। ফলে সেইসময় কূটনীতিকদের মাধ্যমেই যোগাযোগ করতেন স্বামী-স্ত্রী। অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিবিদ শশাঙ্ক বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিনিই দু’জনের মাধ্যম হয়ে উঠেছিলেন ফলে দু’জনের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। লায়লা ছিলেন ভুট্টোর একসময়ের বান্ধবী। সেই লায়লাকেই কাজে লাগান ইন্দিরা। ভুট্টোর সঙ্গে কথা বলতে পাঠান লায়লাকে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই।
মুজিবরকে নিয়ে কি ভাবছেন সেটা জানা। এই শশাঙ্ক বন্দ্যোপাধ্যায়ই লায়লাকে জানান, তিনি যাতে হিথরো বিমানবন্দরে গিয়ে একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভুট্টোকে বলেন, তাঁর স্বামীকে ভারত থেকে ছাড়ার ব্যবস্থা করতে। সেইমত এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে দেখা হয় দু’জনের। কথাবার্তা শেষে লায়লাকে কাছে টেনে তাঁর কানে কানে একটা বার্তা দেন ভুট্টো। বলেন, ‘লায়লা আমি জানি, তুমি কি জানতে এসেছ। একটা মেসেজ দিও ইন্দিরা গান্ধীকে। বোলো, আমি মুজিবর রহমানকে মুক্তি দেবো। কিন্তু বদলে কি চাইব? সেটা পরে জানাব।’
বার্তা জানান লায়লা। তবুও সন্দেহ দূর হয় না। ভারতকে ভুল পথে চালিত করছেন না তো ভুট্টো? কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই সন্দেহের অবসান হলো। খবরটা সত্যি সেটাই জানা গেল। বদলে চাওয়া হলো ৯৩০০০ যুদ্ধবন্দিকে। ১৯৭২-এর ৮ জানুয়ারি ছেড়ে দেয়া হলো মুজিবর রহমানকে। ফিরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন তিনি। এর ঠিক আট মাস পরে ছেড়ে দেয়া হয় ওইসব পাক যুদ্ধবন্দিকে।
সূত্র: কলকাতা ২৪ক্ম৭

মায়ের করজোড় হাত, পিতার কান্না by সাজেদুল হক

একটি পা। ছবি। এক্সরে রিপোর্ট। হাতুড়ির পিটুনি। শিক্ষকের পা ধরে ছাত্রের বাঁচার আকুতি। এক মায়ের করজোড়  হাত। দরিদ্র, অসহায় পিতা-মাতার কান্না। অভিশাপ। কারো সন্তান রিমান্ডে। কেউ হাসপাতালে। যদিও সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা তাদের জন্য নিষিদ্ধ।
বিশ্বাস হচ্ছে না! এটাই সমকালের চিত্র। আলাদা। তবে বিচ্ছিন্ন নয়। প্রতিটি কাহিনীই এক। ওরা কোটা সংস্কার চেয়েছিল; যা আজ বিপন্ন করে তুলেছে ওদের বর্তমান, ভবিষ্যৎ। গরিব, নিম্নবিত্ত। এরা অবশ্য বাংলাদেশে এমনিতে তেমন খবর হয় না। কখনো দুই বাসের মাঝখানে ওদের হাত আটকা পড়ে। পত্রিকায় বড় করে ছবি ছাপা হয়। রানা প্লাজার মেয়েটির কথা মনে আছে। মুখ দেখা যায়নি। শরীরের অন্য কোনো অংশও নয়। শুধু দেখা গেছে একটি পা। হয়তো যা উদ্ধত ছিল সভ্যতার দিকে।
গত কয়দিনে ফেসবুকের দেয়ালে আরেকটি পায়ের ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। তরিকুল ইসলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র। কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ছিলেন নেতার ভূমিকায়। এত বড় অন্যায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মেনে নেননি। হাতুড়ি আর রড দিয়ে তার পা ভেঙে দিয়েছেন তারা। ছেলেটি প্রথমে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়। সেখানে অবশ্য বেশি দিন থাকার সুযোগ হয়নি। এখন অনেকটা গোপনে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। দুই ভাই ও এক বোন লেখাপড়ে করে। বাবা কৃষক। তরিকুলের স্বপ্ন ছিল। আশা ছিল দুঃস্বপ্নের দিন শেষ হবে। কিন্তু না, তা আর হলো কই! হাতুড়ি সন্ত্রাসের কাছ থেকে নিজেকে রক্ষায় আকুতি জানিয়েছিলেন। তার ভাষায়- ওদেরকে বলেছিলাম আর যেন না মারে। কেউ কথা শুনলো না। কোনো মানুষ মানুষকে এভাবে পেটাতে পারে কল্পনাও করিনি। একপর্যায়ে জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম।
তরিকুল প্রাণে বেঁচে গেছেন। কিন্তু কি নিদারুণ অনিশ্চয়তায়ই না পড়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন। ছেলেটি কি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? এই রাষ্ট্র কী তা হতে দেবে। তরিকুলের মতোই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে পিটুনির শিকার হন কোটা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল হক নুরু। এক কৃষকের সন্তান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র নুরু হয়তো এমনিতেই একটি ভালো চাকরি পেতেন। এখন জীবন আর স্বপ্ন দুটোই হুমকির মুখে। নুরুর ভাবি বর্ণনা দিচ্ছিলেন, কী কষ্টেই না পরিবারটির জীবন কাটে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলেও সেখানে তার চিকিৎসা জোটেনি। পরে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেতেও মুখোমুখি হতে হয়েছে নানা বিড়ম্বনার। বাবা জমি বন্ধক দিয়ে কিছু টাকা নিয়ে এসেছেন ছেলের চিকিৎসা করাতে। কিন্তু জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এই অসহায় পিতার মুখেই শোনা যায় এক অসাধারণ উচ্চারণ। হয়তো তিনি অভিশাপও দেন। নুরুর পিতা ইদরিস হাওলাদার বলেন, সচেতন নাগরিক হিসেবেই আমার ছেলে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। তাকে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পেটানো হয়েছে। আজকে আমার ছেলে, কালকে আপনার ছেলে, পরশু দিন তার ছেলে-এভাবেই দেশটা চলবে। আমরা মরে যাবো তারাই বেঁচে থাকবে।
রাশেদ খান। কোটা আন্দোলনের আরেক নেতা। পাঁচ দিন রিমান্ড শেষে এখন রয়েছেন ১০ দিনের রিমান্ডে। তার অসহায় পিতা-মাতা ঘুরে বেড়াচ্ছেন ঢাকায়। রাশেদের মা সালেহা বেগমের আর্তি রাষ্ট্রের দরবারে পৌঁছাবে কি-না কে জানে? তার আহাজারি এরই মধ্যে ভাইরাল হয়েছে- ‘আমার মণিকে তোমরা মাফ করে দাও। ভিক্ষা দাও। আমার মণিকে আমি ঢাকায় আর রাখব না গো। গ্রামে নিয়ে চলে যাব। শুধু মুক্তি দাও। সেও বাঁচুক। আমিও বাঁচি।’ এক মায়ের করজোড় হাত- এর চেয়ে অসহায় আর যন্ত্রণার ছবি আর হয় না।
বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। বড় বড় সেতু, ইমারত হচ্ছে। মানুষের ভাগ্য বদলাচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না চাকরি। কান পাতলেই শিক্ষিত তরুণদের হাহাকার শোনা যায়। অনেক অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা হয়তো কখনো শোনাও হয় না। দুর্নীতি আর ক্ষমতার প্রভাবের কারণে বহু ক্ষেত্রে ইনসাফ বঞ্চনার শিকার হন মানুষ। যে নামেই ডাকা হোক না কেন মূলত চাকরি আর বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতেই হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নেমে এসেছিল। তারা তাদের কথা বলতে এসেছিল। তাদের সব কথাই হয়তো ন্যায্য নয়, সব কথাই হয়তো অন্যায্য নয়। কিন্তু দাবি জানাতে এসে এখন কী নিদারুণ যন্ত্রণারই না শিকার হচ্ছে তারা। তাদের বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবই অন্ধকার। এ দুঃসহ সময় তাদের কোনো দিন শেষ হবে কি না কে জানে? কিন্তু রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয় হয়তো তাদের সন্তানদের প্রতি আরো সদয় হতে পারে। এতটা হয়তো এই তরুণদের পাওনা নয়।

তরিকুলের লড়াই by মরিয়ম চম্পা

কোটা সংস্কার আন্দোলনে গিয়ে ছাত্রলীগ নেতার হাতুড়িপেটার শিকার হওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলামের সামনে অনিশ্চিত জীবন। শরীরজুড়ে ব্যথা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠছেন মাঝে মাঝেই। ওষুধ খেতে পারছেন না। ওষুধ খেতে গেলেই বমি করছেন। এর বাইরে রয়েছে দরিদ্র্যতার ছোবল। হতভাগা তরিকুলের দরিদ্র পরিবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে। বাকিতেই চলছে চিকিৎসা। তবে কতদিন এভাবে চলবে তা জানা নেই তাদের। অন্যদিকে রয়েছে নিরাপত্তাহীনতা। নিরাপদে নেই পরিবারের লোকজনও। লেখাপড়া শেষ করে এই মেধাবী শিক্ষার্থী হতে চেয়েছিলেন পরিবারের অবলম্বন। কিন্তু এখন সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তার। এই অবস্থায় তরিকুল ও তার পরিবারের সামনে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তরিকুল ইসলামের এক বন্ধু জানান, গত ৯ই জুলাই সোমবার ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তরিকুলের পায়ের সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা দুই বন্ধু সার্বক্ষণিকভাবে হাসপাতালে তরিকুলের সঙ্গে রয়েছি। এই হাসপাতালের চিকিৎসকরা খুবই আন্তরিক। উন্নত চিকিৎসার জন্য গত রোববার অ্যাম্বুলেন্সযোগে রাজশাহী থেকে ঢাকায় আনা হয়েছে। পরদিন দুপুর আড়াইটার দিকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়। ওইদিন বিকাল পৌনে ৫টার দিকে অপারেশন সম্পন্ন হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, আপাতত ঝুঁকিমুক্ত হলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে কমপক্ষে ৬ মাস সময় লাগবে। বর্তমান শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। কোমরে আঘাতের স্থানে এখনো অনেক ব্যথা ও জ্বালা যন্ত্রণা হয়। সারা শরীরে মারের ব্যথা তো আছেই। ডাক্তার বলেছেন, শরীরের ব্যথা কমতে ১ থেকে দেড় সপ্তাহ সময় লাগবে। এর মধ্যে নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। ওষুধ খাওয়াতে গেলেই বমি করছে।
তরিকুলের বন্ধু বলেন, পরিবারের সদস্যরা ওর অবস্থা দেখে নার্ভাস হয়ে গেছে। তাই তাদেরকে হাসপাতাল থেকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, তরিকুলরা দুই ভাই এক বোন। সে মেজো। ছোট বোন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে পড়ছে। আর্থিক সংকটে বড় ভাই পড়াশুনায় একটু পিছিয়ে আছে। তিনি মার্কেটিংয়ে  অনার্স করছেন। বাবা মো. খোরশেদ আলম কৃষি কাজ করেন। মা তাহমিনা বেগম গৃহিণী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হচ্ছেন তাদের বাবা। এ ছাড়া বন্ধু-বান্ধব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক মিলে সবাই তরিকুলের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত পরিমাণে সাহায্য করছেন। বর্তমানে যে হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে তার পুরো টাকাই বাকি রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরে বাকি পরিশোধের সুযোগ দিয়েছে। কিছু কিছু ওষুধ আছে যেগুলো খুবই দামি ও ব্যয়বহুল। এ ছাড়া হাসপাতালের কেবিন ও বেড ভাড়াসহ দৈনিক সাড়ে ৩ হাজার টাকা বিল আসে। সঙ্গে রয়েছে আনুষঙ্গিক খরচ। তরিকুলের বন্ধু আরো জানান, তার পায়ের ভেতর রড দিয়ে প্লাস্টার করা হয়েছে। মাথার আঘাত গুরুতর হওয়ায় ফোনে কথা বলা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে ডাক্তার। হাসপাতালের বেডে শুয়ে তরিকুল বন্ধুদের বলেছেন, আমি আহত হয়েছি, মার খেয়েছি, তাতে কোনো দুঃখ নাই। কিন্তু যে উদ্দেশে আন্দোলনে গিয়েছি সেটা যেন সফল হয়। এটাই আমার চাওয়া।
রাবি’র ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম গ্রাজুয়েশন শেষ করে সরকারি চাকরি নয়, আইটি সেক্টরে কাজ করতে চেয়েছিলেন। ভালোলাগার জায়গা থেকে সম্প্রতি ওয়েব ডিজাইনের ওপর ৩ মাসের একটি কোর্স সম্পন্ন করেছে। অনার্স-মাস্টার্স করলেই যে সরকারি চাকরি করতে হবে এমনটা মনে করতেন না তরিকুল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেই আন্দোলন করেছেন তিনি। তরিকুলের হামলার স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে এই সহপাঠী বলেন, ওকে যখন এলোপাথাড়িভাবে মারা শুরু করে, তখন দাঁড়িয়ে থাকা এক হামলাকারীর দিকে মাথা হেলে দিয়েছিল। আর বলছিল, আমাকে আর মাইরেন না, আমারতো মাথা ফেটে গেছে, রক্ত বের হচ্ছে। তখন সে তার কথা শোনেনি। আরেকজনর হাতে থাকা লাঠি নিয়ে দ্বিতীয়বার আঘাত করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও করার ৩-৪ মিনিট আগে থেকে তাকে হামলাকারীরা বেধড়ক পেটাতে থাকে। এ সময় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন তরিকুলকে নিরাপত্তা না দিয়ে উল্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে মানববন্ধনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল। এরপর গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সহায়তায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে জোর করে ছাড়পত্র দেয়ার পর বেসরকারি হাসপাতাল রয়্যালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৮ই জুলাই রোববার ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সেখানেও নিরাপত্তাজনিত কারণে হাসপাতালের ইউনিট বদল করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, কোটা সংস্কারের দাবিতে পতাকা মিছিলের সময় ৪ঠা জুলাই তরিকুলকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের সামনে রাস্তায় ঘিরে ধরে পেটায় ছাত্রলীগের কয়েক নেতাকর্মী। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন মিলে যখন লাঠি নিয়ে তরিকুলকে পেটাচ্ছিল তখন আবদুল্লাহ আল মামুন লোহার হাতুড়ি দিয়ে তার পিঠে ও পায়ে আঘাত করে। তরিকুল এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক। এখন ডান পায়ের ভাঙা দুই হাড়, মাথায় আটটি সেলাই ও সারা শরীরে আঘাতের ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণায় দিন যাচ্ছে তার।

রাশিয়া বিশ্বকাপ একজন ‘হিরো’ দেখলো না

আর দুদিন পরেই শেষ হয়ে যাবে রাশিয়া বিশ্বকাপ। ফুটবলের মিলনমেলা ভেঙে যাবে। হয় ফ্রান্স জিতবে, নয়তো ইতিহাস সৃষ্টির অপেক্ষায় থাকা ক্রোয়েশিয়া প্রথমবার শিরোপা ঘরে তুলবে। কিন্তু এ বিশ্বকাপ আসলে ফুটবলপ্রেমীদের অনেক দিক থেকেই মন ভরাতে পারেনি। একে একে বড় দলগুলোর (আর্জেন্টিনা, জার্মানি, স্পেন, ব্রাজিল) বাদ পড়া অন্যতম। লাতিনরা তো তাদের ফুটবলের ছন্দই খুঁজে পায়নি। অঘটনের এ আসরে আরো দুটি বিষয় আমার কাছে বড় অভাব মনে হয়েছে। একটি হলো রেফারিং, আরেকটি এখন পর্যন্ত এ বিশ্বকাপ থেকে উঠে আসেনি কোন তারকা। প্রতিটি আসরে কেউ না কেউ নিজেকে চিনিয়েছে, হয়েছেন তারকা। যেমনটা আগে দেখা যেত সেই পেলে, ম্যারাডোনা থেকে শুরু করে সবশেষ তারকা বনে যান হামেস রদ্রিগেজ ও পল পগবারা। এবার এমন একজনকেও পেলাম না। বিষয়টি খুবই হতাশ করেছে আমাকে। তবে একজন নিজের নামের প্রতি এখন পর্যন্ত ঠিকই সুবিচার করে যাচ্ছে। সে হলো ফ্রান্সের তরুণ তুর্কী কিলিয়ান এমবাপ্পে। ভালো লেগেছে ওর খেলা।
প্রতিবারই লাতিনদের কেউ না কেউ সেমিফাইনালে খেলে। এবার স্পেন আর্জেন্টিনার বিদায়ের পর এক মাত্র ভরসা ছিল ব্রাজিল। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত পারেনি। আমার কাছে মনে হয়েছে ছোট দলগুলো বিশেষ করে ইউরোপের দলগুলো প্রচণ্ড রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলেছে। আর তারা সুযোগের অপেক্ষায় থেকে এমন সময় গোলগুলো করেছে যখন আর তা শোধ করতে পারেনি বড় দলগুলো। আর্জেন্টিনা বলেন আর ব্রাজিল ওরা কিন্তু জেতার জন্যই খেলে। তাই দেখবেন ওরা ডিফেন্সের চেয়ে আক্রমণভাগকে গুরুত্ব দেয় বেশি। আক্রমণ করে গোল দিয়েই জিততে পছন্দ করে। আবার বড় দল হলেও বেলজিয়ামের বিপক্ষে ফ্রান্স কিন্তু ভালো ফুটবল খেলেনি। তারা ১৯৯৮-এ ট্রফি জিতেছে এবারো তারা সুযোগ পেয়ে ভেবেছে, যে কোনোভাবে জিততে হবে। ফাইনালে যেতে হবে। অন্যদিকে আমি কিন্তু সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের সেরা রূপটি একেবারেই দেখিনি। মনে হয়েছে, ওরা খেলতে খেলতে খেই হারিয়ে ফেলছে। হ্যাঁ, আক্রমণে গেছে কিন্তু সেখানেও মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারেনি। শেষ ম্যাচে তাদের সেই ধার ছিল না।
অন্যদিকে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল ফুটবল ভক্তরা। কিন্তু ইংলিশ তারুণ্যও ক্রোয়েশিয়ার সামনে দাঁড়াতে পারেনি। আমি এ ম্যাচে ভেবেছিলাম যত তরুণরা আছে ইংল্যান্ডে ওরা তেড়ে ফুঁড়ে খেলবে। ম্যাচটা এক তরফা হতে দেবে না। কিন্তু ক্রোয়েশিয়া দেখেন ওদের অভিজ্ঞতার দারুণ প্রমাণ রেখেছে। যেমন আক্রমণ ভাগ ঠিক রেখেছে। তেমনি মাঝ মাঠ ও রক্ষণ ভাগ। তাই পিছিয়ে পড়েও খেই হারায়নি। শেষ পর্যন্ত ঠিকই অভিজ্ঞতা দিয়ে ম্যাচ বের করে নিয়ে গেছে। যা রুখতে ব্যর্থ হয়েছে ইংল্যান্ডের তরুণ ফুটবলাররা। আরো একটা বিষয়, ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার জন্য ছিল আলাদা শক্তি হলো এ দুই দেশের প্রেসিডেন্টই মাঠে উপস্থিত থাকেন। একটি দেশের প্রেসিডেন্ট যখন মাঠে থাকেন তখন কিন্তু দলের মধ্যেও একটা অন্যরকম শক্তি কাজ করে।
ফ্রান্সকে এগিয়ে রাখবো তবে ক্রোয়েশিয়াও পারে...
ফাইনালে কে জিতবে তা নিয়ে তো অনেক জল্পনা-কল্পনা হচ্ছে। আমি মনে করি ফ্রান্স শিরোপা জয়ের দৌড়ে এগিয়ে থাকবে। মাঠের ফুটবল ছাড়াও তাদের জন্য অনুপ্রেরণা আরো একবার বিশ্বকাপ জিতেছে তারা। এটি ওদের আলাদাভাবে এগিয়ে রাখবে। খুব বেশি দিনও কিন্তু হয়নি, ১৯৯৮-এ। আবার ক্রোয়েশিয়াকে যদি তারা দুর্বল টিমভাবে সেটিও ভুল হবে। এ পর্যন্ত সেরা ফুটবল উপহার দিয়েই ওরা ফাইনালে এসেছে। ওদের সামনে বড় অনুপ্রেরণা হলো নতুন ইতিহাস রচনা করা। ওরা পারে সেটি দেখিয়েছে এখন ফাইনালে সেই গতি ও শক্তি ধরে রাখতে পারলেই হয়। তবে আমি যেটি আশা করছি ফাইনাল ম্যাড়মেড়ে হবে না।
‘প্রযুক্তি নষ্ট করেছে রেফারিংয়ের মান’
এমনিতেই রাশিয়া বিশ্বকাপকে অঘটনের আসর হিসেবে বলা যেতে পারে। ফুটবলের সৌন্দর্য ছিল না। যতটা জমজমাট আশা করেছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা, তা অনেকটাই পায়নি তারা। ছোট দলগুলো খেলেছে রক্ষণাত্মক নেতিবাচক ফুটবল। তার ওপর রেফারিং ছিল অনেকটা বাজে। প্রযুক্তির ব্যবহার করতে গিয়ে রেফারিংয়ের মান নষ্ট হয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো ছিল এলোমেলো। সব মিলিয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপের সবচেয়ে বাজে দিক ছিল রেফারিং। প্রতিটি দলেরই কম বেশি অভিযোগ রয়েছে। এমন আসরে যদি রেফারিং ভালো না হয় তাহলে মান থাকে না। যদি প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হয় তাহলে রেফারিদের মাঠে থাকার দরকার কি! তারা তো রুমে বসেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
অনুলিখন: ইশতিয়াক পারভেজ

নিয়োগে দীর্ঘ বিলম্ব, হতাশা by হাফিজ মুহাম্মদ

৩৬তম বিসিএস পরীক্ষা। প্রাক-বাছাই পরীক্ষা থেকে এখন পর্যন্ত কেটে গেছে ৩৭ মাস। চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে তাও ৮ মাস আগে। এরপরেও নিয়োগ প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হয়নি। পিএসসি থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা এসব ক্যাডার নিয়োগের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। কবে প্রজ্ঞাপন জারি হবে তা বলতে পারছে না পিএসসি কিংবা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। দীর্ঘসূত্রতার কোনো কারণ জানতে চান না সুপারিশপ্রাপ্ত এ প্রার্থীরা। তারা চান দ্রুত নিয়োগের প্রজ্ঞাপন। বিভিন্ন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত এসব প্রার্থী অনেকেই আগের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ বেকার বসে থেকে হতাশা ও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। আগের কর্মস্থল থেকে অব্যাহতি চেয়ে অনেকে আবেদন করে পড়েছেন বিপাকে। কবে নাগাদ কাঙ্ক্ষিত এ চাকরিতে যোগদান করতে পারবেন, সে পথে চেয়ে রয়েছেন। তবে ক্যাডারে পর্যাপ্ত আসন না থাকায় যারা নন-ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছিলেন তারা ইতিমধ্যেই কর্মস্থলে যোগদান করেছেন।
৩৬তম বিসিএসে বিভিন্ন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত কয়েকজন প্রার্থী মানবজমিনের কাছে তাদের হতাশা ব্যক্ত করেন। এদের প্রত্যেকেই সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে তাদের নিয়োগ প্রজ্ঞাপন দেয়া হয়। পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশকৃত এক প্রার্থী বলেন, আমি আগে একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করতাম। সেটি ছেড়ে দিয়েছি। স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পরে ভাবছিলাম কয়েকদিনের মধ্যেই নিয়োগ পেয়ে যাবো। কিন্তু পাঁচ মাসের বেশি হয়ে গেল এখনো নিয়োগের খবর নেই। আগের কোনো বিসিএসে সুপারিশের পরে এত সময় কখনো লাগেনি। ৩৬তম বিসিএসে এমন কেনো হলো সেটা বুঝতে পারছি না।
পররাষ্ট্র ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত আরেক প্রার্থী বলেন, একটি পরীক্ষার জন্য এতটা দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়েও চাকরিতে যোগদান করতে এত সময়ক্ষেপণ কেন। ৮-৯ মাস হলো চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হয়েছে, তার পরেও সরকার গেজেট দিচ্ছে না। আশাকরি আমাদের বিষয়টা সরকার দ্রুত বিবেচনা করবেন। ৩৬তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত অনেক ক্যাডার প্রার্থী ফেসবুকসহ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হতাশা ব্যক্ত করে লেখালেখি করেন। কেন তাদের নিয়োগ হচ্ছে না সে বিষয়ে জানতে চান সরাকরের কাছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, পিএসসি বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য যাদের তালিকা সুপারিশ করে তাদেরকে গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রশাসন যাচাই-বাছাই করে দেখে। ৩৬তম বিসিএসের প্রার্থীদের তথ্য যাচাই-বাছাই শেষও হয়েছে। তবে ওই তালিকার কিছু প্রার্থীর ব্যাপারে বিভিন্ন অভিযোগ থাকায় তাদের তথ্য পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে ৩৫তম বিসিএসের ৫৫ জন প্রার্থীর নিয়োগে প্রজ্ঞাপন হলেও তাদের পদায়ন করা হয়নি। এদের ব্যাপারেও গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদন ছিল। ভুক্তভোগী এসব ক্যাডারের একটি প্রতিনিধি দল সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণাল সচিবের সঙ্গে দেখা করেছেন। সচিব তাদের কথা শুনে বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেন। একটি সূত্র জানায়, পদায়ন না পাওয়া ৫৫ জন ক্যাডারের মধ্যে ২৮ জনের ব্যাপারে নতুন করে আবার তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিপিএসসি) ৩৬তম বিসিএসে ২১৮০টি পদের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করে ২০১৫ সালের ৩১শে মে। এরপরে ৮ই জানুয়ারি, ২০১৬ প্রাক-বাছাই পরীক্ষা, ২০১৬ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে ৭ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লিখিত পরীক্ষা এবং সর্বশেষ ১২ই মার্চ ২০১৭ থেকে ৭ই জুন অনুষ্ঠিত হয় মৌখিক পরীক্ষা। আর ২০১৭ সালের ১৭ই অক্টোবর ২ হাজার ৩২৩ জনকে চূড়ান্তভাবে ক্যাডার পদে সুপারিশ করে তালিকাটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠায় পিএসসি। এরপরে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত চলে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া। সুপারিশপ্রাপ্ত ক্যাডারদের স্বাস্থ্য পরীক্ষাও শেষ হয়েছে ২০১৮ এর ১৮ই মার্চের মধ্যে। এরপরেও কেন তারা নিয়োগ পাচ্ছেন না- এটাই তাদের প্রশ্ন। তবে ভিন্নচিত্র দেখা গেছে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগে সুপারিশ করা প্রার্থীদের ক্ষেত্রে। পর্যাপ্ত ক্যাডার পদ না থাকায় ৩৬তম বিসিএসের ৩ হাজার ৩০৮ জনকে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগে সুপারিশের জন্য রাখা হয় উত্তীর্ণদের তালিকায়। ক্যাডার প্রার্থীদের গেজেট না হলেও নন-ক্যাডার পদের প্রার্থীদের নিয়োগে ১৭ই মে, ২০১৮ প্রজ্ঞাপন হয় এবং তারা নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগদান করেছেন গত ২১শে মে। সমাজসেবা অফিসার পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিলো তাদের।
বিসিএস নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. সাদাত হোসেন বলেন, নিয়োগ প্রজ্ঞাপনের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। পিএসসি মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে নিয়োগের সুপারিশ করে তালিকা তাদের কাছে পাঠায়। এরপরে যে সময় লাগে সেটা পিএসসির কিছু করার নেই। তবে বারবার বিসিএস পরীক্ষার সবগুলো ধাপের সময় কমানোর কথা বলা হলেও এটা সম্ভব নয়। বিভিন্ন কারণেই সময় লেগে যায়।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার মানবজমিনকে বলেন, একটি বিসিএস নিয়োগে এত দীর্ঘসময় কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিসিএস পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনা অতীব জরুরি। আমি বারবার বলেছি এবং লিখেছি একটি বিসিএস পরীক্ষায় সকল প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসতে হবে।

হ্যাকিং করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র

হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বিদেশি চক্র। তাদের টার্গেট এখন বাংলাদেশ। ভ্রমণ ভিসায় এই দেশে এসে বসবাস করছে চক্রের সদস্যরা। স্থানীয় অপরাধীদের সঙ্গে মিশে তৈরি করছে ভয়ঙ্কর অপরাধ সিন্ডিকেট। প্রকৃত পরিচয় গোপন করে একেক সময় একেক স্থানে বসবাস করে তারা। নানা কৌশলে এই অপকর্ম  করে যাচ্ছে চক্রটি। প্রায়ই বিভিন্ন ব্যক্তি ও কোম্পানির টাকা লুটে নিচ্ছে তারা। সর্বস্ব হারিয়ে অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারস্থ হচ্ছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হ্যাকাররা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা ভিনদেশি হওয়ায় হ্যাক করার পর দ্রুত দেশত্যাগ করে অনেকে। অনেকে দেশের বাইরে থেকে দেশে অবস্থান করা চক্রের সদস্যদের তথ্যানুসারে ই-মেইল, ফেসবুক ইত্যাদি হ্যাক করে। এছাড়া প্রায়ই একই নামে ই-মেইল তৈরি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভুয়া মালিক সেজে যোগাযোগ করে। অন্যের একাউন্টের টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রতারক চক্রের সদস্যরা কখনও কখনও গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপকর্মে লিপ্ত হয়।
গত জানুয়ারিতে ইমদাদুল হক নামে ঢাকার একজন ব্যবসায়ীর প্রায় অর্ধ কোটি টাকা লুটে নিয়েছে হ্যাকিং চক্রের সদস্যরা। এ বিষয়ে থানায় মামলা করতে গেলে তা গ্রহণ না করে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেয় পুলিশ। গত ৬ই এপ্রিল সাইবার ট্রাইব্যুনালে পিটিশন মামলা করেন ইমদাদুল হক। মামলা সূত্রে জানা গেছে, তার এশিয়ান ওভারসেজ ট্রেডিং কোম্পানি একটি অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের ই-মেইল ব্যবহার করে নেদারল্যান্ডভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘আনসালড তমাসেন বিভি’র সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছিলেন ইমদাদুল হক। ঘটনাটি ঘটে ১৬ই জানুয়ারি। ইমদাদুল হকের ই-মেইল হ্যাক করে একই নামে নতুন ই-মেইল করে শুধু মেইল শব্দ সংযোজন করে হ্যাকার চক্র। তারপর প্রতিষ্ঠানের লেটার হেড পরিবর্তন করে। সিল সাক্ষর জাল করে হ্যাকারদের প্রতিষ্ঠান ‘এএলসি এন্টারপ্রাইজ আসিয়ানা’র নামে আমেরিকান ব্যাংকে ই-মেইল পাঠায়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইমদাদুল হক সেজে ই-মেইলের মাধ্যমে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নতুন হিসাব নম্বরে ডলার পাঠাতে অনুরোধ করা হয়। যথারীতি অনুসারে ব্যাংক ডলার ট্রান্সপার করে দেয়। এতে প্রায় অর্ধকোটি টাকা লুটে নেয় হ্যাকাররা।
একইভাবে হ্যাকারদের প্রতারণার শিকার হয়েছেন ব্যবসায়ী নবাব আলী। তিনি রাজধানীর বারিধারার ডিওএইচএস এলাকার ১২ নম্বর সড়কের ৫৪২ নম্বর বাড়ির মৃত চাঁদ আলীর পুত্র। নবাব আলী দীর্ঘদিন ধরে ‘সকপো করপোরেশন ইউএসএ’র সঙ্গে ব্যবসা করছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, তার ই-মেইল হ্যাক করে সকপো করপোরেশনে ভুয়া ই-মেইল পাঠিয়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকা লুটে নেয় চক্রটি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নাইজেরিয়ান এক নাগরিক ও বাংলাদেশি এক নারী ও পুরুষ মিলে হ্যাক করে প্রতারণার মাধ্যমে এই টাকা লুট করে। আমেরিকা থেকে তারা টাকা  আনে দেশের একটি ব্যাংকের গুলশান শাখায়। ‘রয়েল এসকট ভেনসারস লিমিটেড’ নামে প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ব্যাংকে একাউন্ট করা হয়েছে। এতে রামপুরা বনশ্রীর ই ব্লকের পাঁচ নম্বর সড়কের ৪০ নম্বর বাড়িতে তাদের অফিস রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে চক্রটি।
সূত্রমতে, এটিএম কার্ড জালিয়াতি, ই-মেইল হ্যাকিং, বিদেশি জাল মুদ্রা তৈরি, মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িত এই চক্রের সদস্যরা। তাদের বেশিরভাগই ঘানা ও নাইজেরিয়ার নাগরিক। এরমধ্যে কিংসলে লিভিং স্টোন নামে এক নাইজেরিয়ান রয়েছেন। বারিধারা এলাকার একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতো কিংসলে। ওই সময়ে বাংলাদেশি নাগরিক সোনিয়া শারমিনের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। ওই এলাকাতেই একটি বাসায় থাকে তারা। ইতোমধ্যে প্রতারণার অভিযোগে কিংসলে ও সোনিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কিংসলের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে দেশের বাইরের ও ঢাকার কিছু অপরাধীর। মেইল হ্যাক ও রাতারাতি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে এই চক্র। এছাড়াও ই-মেইলের তথ্য চুরি করে ব্যাংক একাউন্ট থেকে ব্যালেন্স ট্রান্সপার করে চক্রটি। তারা ঢাকার শীর্ষ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে অপতৎপরতা চালায়। 
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসিয়ে এটিএম কার্ড জালিয়াতির অভিযোগে ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত জার্মান নাগরিক, প্রাইম ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে জালিয়াতি করে অর্থ উত্তোলনের দায়ে চীনা নগরিক, জাল টাকা তৈরির মেশিনসহ কোরিয়ান নাগরিকসহ প্রায়ই নানা অপরাধে বিদেশিরা গ্রেপ্তার হচ্ছে। হ্যাকিং সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিটিটিসির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের রফিকুল ইসলাম বলেন, হ্যাকিং করে অর্থ আত্মসাৎকারীরা আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্য। তারা দেশে-বিদেশে অবস্থান করে। যে কারণে অনেক সময় তাদের গ্রেপ্তার করা দুস্কর হয়ে যায়। তারপরও আমরা এই চক্রের কিছু সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছি। এ বিষয়ে এনসিআই ইন্টারপোল আরও সক্রিয় হলে চক্রটির অপতৎপরতা রোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

কী ঘটেছে জানালেন কার্লাইল: ৩ দেশের সম্পর্কে তোলপাড়

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বৃটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইলকে দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানোর পর এ নিয়ে বিতর্ক চলছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, সফরের উদ্দেশ্য গোপন করায় কার্লাইলের ভিসা বাতিল করা হয়েছে। তবে লন্ডন  ফিরে ভারতের সাংবাদিকদের কাছে স্কাইপে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় কার্লাইল দাবি করেছেন, সত্তর বছর বয়সী একজন পার্লামেন্টারিয়ানের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে এর জন্য তাদের লজ্জিত হওয়া উচিত, কৈফিয়ত দেয়া উচিত। পুরো বিষয় নিয়ে লন্ডনে বিস্তারিত সংবাদ সম্মেলন করার কথাও জানিয়েছেন বৃটিশ এ আইনজীবী। এদিকে কার্লাইলকে ফেরত পাঠানোর ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, কার্লাইলকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত দেয়ার ঘটনায় আমরা বিস্মিত ও মর্মাহত হয়েছি। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে মুক্তচিন্তা অনুশীলনের সঙ্গে এই ঘটনা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে আমরা মনে করি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে করে বুধবার দিল্লি এসেছিলেন লর্ড কার্লাইল। দিল্লি বিমানবন্দরে নামার পর তাকে জানানো হয় তার ভিসা বাতিল করা হয়েছে। বিমানবন্দরে তিন ঘণ্টা অবস্থান করে তিনি লন্ডন ফিরে যান। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভিসা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করার কারণে কার্লাইলকে বুধবার নয়াদিল্লিতে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবিশ কুমার বলেন, লর্ড কার্লাইল যে কারণ দেখিয়ে ভিসার আবেদন করেছিলেন, তার সঙ্গে তার সফরের উদ্দেশ্যের কোনো সামঞ্জস্য নেই। এজন্য তাকে ভারতে প্রবেশ না করতে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। খালেদা জিয়ার মামলায় আইনজীবী হিসেবে কার্লাইল বাংলাদেশে আসতে চাইলেও সরকারের অনুমতি পাননি। পরে তিনি দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করার কথা জানান। ১৩ই জুলাই দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্স ক্লাবে (এফসিসি) তার সংবাদ সম্মেলন করার কথা ছিল। তবে একই দিনে এফসিসি’তে কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত আসবেন, এমন যুক্তি দেখিয়ে সেখানে লর্ড কার্লাইলের বুকিং বাতিল করে দেয়া হয়।
ওদিকে বৃটিশ আইনজীবী ও জনপ্রতিনিধি লর্ড কার্লাইলকে দিল্লি থেকে ফেরত পাঠানোর ঘটনার বিশ্লেষণ করেছে বিবিসি বাংলা। সংবাদ মাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এয়ার ইন্ডিয়ার হিথরো টু দিল্লি ফ্লাইট ১৬২ বুধবার রাতে ল্যান্ড করেছিল মিনিট কুড়ি দেরিতে। রাত এগারোটারও একটু পরে যে ফ্লাইটটি লন্ডন থেকে নামলো, সেখানে ছিলেন এমন একজন যাত্রী- যিনি দিল্লিতে পা রাখুন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তা একেবারেই চাইছিল না। অথচ তার কাছে ভারতের বিজনেস ভিসা ছিল। যে কারণে ভারতের ফ্ল্যাগশিপ ক্যারিয়ার এয়ার ইন্ডিয়াও তাকে বিমানে উঠতে দিয়েছিল বিনা বাধাতেই। প্রবীণ, সত্তরোর্ধ্ব ওই ভদ্রলোকের নাম লর্ড অ্যালেক্সান্ডার কার্লাইল। বৃটেনের হাউস অব লর্ডসের প্রবীণ সদস্য তিনি, বিশিষ্ট আইনজীবীও। তবে তার আর একটি পরিচয়, বাংলাদেশে কারাবন্দি বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী হিসেবেও নিযুক্ত হয়েছেন সমপ্রতি, আর সে কাজের সূত্রেই তার দিল্লিতে পা রাখা। আসার দিনকয়েক আগেই তিনি বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন, খালেদা জিয়াকে কীভাবে ‘সাজানো মামলা’য় ও ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে’ হেনস্থা করা হচ্ছে, দিল্লিতে এসে সংবাদমাধ্যমের কাছে সেসব তুলে ধরাই তার উদ্দেশ্য।
তার বাংলাদেশের ভিসার আবেদন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলেই তিনি ঢাকার পরিবর্তে দিল্লিতে এসে ওই সংবাদ সম্মেলন করতে চান- এমনটাও জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এ খবর জানাজানি হওয়ার পর থেকেই দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে যে ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছিল, তাও ছিল নজিরবিহীন। বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য ছিল, লর্ড কার্লাইল যদি দিল্লিতে এসে খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে কথা বলেন তাহলে সেটা হবে দিল্লির মাটিতে দাঁড়িয়ে একটা ‘পেইড পলিটিক্যাল ক্যামেপন’- অর্থাৎ পয়সা নিয়ে চালানো রাজনৈতিক প্রচারণার শামিল। ভারত যে এভাবে ‘তাদের মাটিকে বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারে’ কাজে লাগাতে দিতে পারে না, ঢাকার সেই মনোভাবও দিল্লির কাছে সপষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। ভারতে ঢুকতে না পেরে লর্ড কার্লাইল লন্ডনে ফিরে গিয়ে সেখান থেকে একটি ভিডিও কনফারেন্সিং করেছেন। সেখানে তিনি দিল্লির সংবাদমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে এ ব্যাপারে তাদের তীব্র আপত্তির কথাও জানিয়ে দিয়েছিলেন।
সেটা সত্যি হোক বা না হোক, ঘটনা হলো দিল্লিতে লর্ড কার্লাইলের পরিকল্পিত কর্মসূচি প্রায় প্রথম থেকেই বাধার মুখে পড়ে। যেমন প্রথমে স্থির ছিল, ১৩ই জুলাই দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে (এফসিসি) তিনি সংবাদ সম্মেলন করবেন। কিন্তু ওই একই দিনে কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত এফসিসি-তে আসছেন, এই যুক্তি দেখিয়ে তারা লর্ড কার্লাইলের বুকিং বাতিল করে দেয়। বাধ্য হয়ে তিনি দিল্লির একটি পাঁচতারা হোটেলে বিকল্প ভেন্যুর ব্যবস্থা করেন- সংবাদ সম্মেলনও একদিন এগিয়ে আনা হয়। কিন্তু বুধবার রাতে দিল্লি বিমানবন্দরে আরো নাটকীয়তা বাকি ছিল। লর্ড কার্লাইলের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আমি যখন দিল্লিতে নেমে আমার ফোন অন করলাম, দেখি আমার ভিসা বাতিল করা হচ্ছে বলে আমাকে মেসেজ পাঠানো হয়েছে। ইমিগ্রেশন কাউন্টারে আমাকে জানানো হলো আমাকে ভারতে ঢুকতে দেয়া যাবে না। সত্যি কথা বলতে কি, ইমিগ্রেশনের কর্মীরা খুবই ভদ্র ও বিনীত ছিলেন, তারা আমার সঙ্গে এমনিতে খুবই সুন্দর আচরণ করেছেন। কিন্তু তাদের কাছে কোনো জবাবই ছিল না যে কেন আমাকে ঢুকতে দেয়া যাবে না। ভিডিও সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলছিলেন লর্ড কার্লাইল। ভারতের জবাব অবশ্য এসে যায় এর কিছুক্ষণের মধ্যেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার জানিয়ে দেন, ‘লর্ড কার্লাইল যে কারণ দেখিয়ে ভিসার আবেদন করেছিলেন- আর তার সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য- এসবের মধ্যে কোনো সাযুজ্য নেই বলেই আমরা তার ভিসা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
পরে বিকালে তিনি আরো যোগ করেন, ‘লর্ড কার্লাইল ভারত ও বাংলাদেশের সমপর্কের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন- এমন সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে।’ এমন কী তিনি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধী দলের (বিএনপি) সমপর্কেও সন্দেহ তৈরি করতে চাইছেন বলে রবীশ কুমার দাবি করেন। ওই মুখপাত্র আরো জানান, লর্ড কার্লাইল খুব ভালো করেই জানতেন তাকে ফিরে যেতে হবে- সে কারণেই তিনি বৃটিশ এয়ারওয়েজের বিমানের ‘রিটার্ন বোর্ডিং পাস’ নিয়েই এসেছিলেন। যদিও এই যুক্তির সঙ্গে বৃটিশ আইনসভার প্রবীণ সদস্য একেবারেই একমত নন। লন্ডন থেকে বৃহসপতিবার সকালে তিনি বলছিলেন, হিথরোতে তার ভারতীয় ভিসা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অন্তত দুবার চেক করা হয়েছিল- কিন্তু তাতে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি। ভারত সরকারকে রাজি করিয়ে দিল্লিতে ঢোকার ব্যবস্থা করা যায় কি-না, সে জন্য লর্ড কার্লাইল দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ভারতে নিযুক্ত বৃটিশ ডেপুটি হাইকমিশনারকেও ফোন করেছিলেন। কিন্তু লর্ড কার্লাইলের দাবি অনুযায়ী, তিনিও এ ব্যাপারে তার অসহায়ত্ব ব্যক্ত করেন এবং পরিষ্কার জানিয়ে দেন ভারতের সিদ্ধান্ত নড়চড় হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এর কিছুক্ষণ পরই তাকে বৃটিশ এয়ারওয়েজের লন্ডনগামী ফিরতি বিমানে উঠিয়ে দেয়া হয়। লন্ডনে নামার মাত্র দু’ঘণ্টার মধ্যেই স্কাইপ কলে তিনি দিল্লির মিডিয়ার সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে মিলিত হন। লর্ড কার্লাইল সেখানে বলেন, ‘ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রতি আমার শ্রদ্ধা চুরমার হয়ে গেছে। রাজনৈতিক চাপের মুখে তারা যেভাবে নতি স্বীকার করলো এবং সত্তর বছর বয়সী একজন পার্লামেন্টারিয়ানের সঙ্গে যে আচরণ করলো তাতে তাদের লজ্জিত হওয়া উচিত, কৈফিয়ত দেয়া উচিত।’ তিনি পুরো বিষয়টি লন্ডনে খুব শিগগিরই বিস্তারিত সংবাদ সম্মেলন করে জানাবেন বলেও জানান। ভারতের বিমানবন্দরে যে অল্প কিছুক্ষণ তিনি ছিলেন, সেখানে শুধুমাত্র একজন তরুণ পোর্টার তাকে অসম্ভব সাহায্য করেছিল বলেও যোগ করেন লর্ড কার্লাইল। ‘ভারতে ওই একজন মাত্র লোকের ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে। সাকুল্যে তিনি দিল্লির মাটিতে ছিলেন তিন ঘণ্টা। কিন্তু ওই তিনটি ঘণ্টাকে ঘিরে ভারত, বাংলাদেশ এবং সম্ভবত যুক্তরাজ্যের সমপর্কেও যে পরিমাণ তোলপাড় হয়ে গেল- তেমন নজির খুব কমই আছে!

রাজনাথের সফরে তিন ইস্যু

তিন দিনের সফরে আজ ঢাকা আসছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। নির্বাচনী বছরে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের  শীর্ষ পর্যায়ের ওই রাজনীতিকের হাই প্রোফাইল ঢাকা সফরে নিরাপত্তা বিশেষত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সহযোগিতা বাড়ানো এবং আন্তঃসীমান্ত ব্যবস্থাপনা- এ ৩ ইস্যুই প্রাধান্য পাচ্ছে। দুই দেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিও থাকছে আলোচনার সূচিতে। তিনি আগামী ১৫ই জুলাই সারদা পুলিশ একাডেমি পরিদর্শন করবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তার সঙ্গী হবেন। সারদায় দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথ্য প্রযুক্তি ও ফরেনসিক ল্যাবের উদ্বোধন করবেন। ল্যাবটি ভারতের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে দুই মন্ত্রীর উপস্থিতিতে ভারতের প্যাটেল ন্যাশনাল পুলিশ একাডেমি ও বাংলাদেশের সারদা পুলিশ একাডেমির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বিষয়ক একটি চুক্তিও সই হবে। পৃথক আয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশন (এসিসি) এবং ভারতের সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)-এর মধ্যে সমঝোতা স্মারক এবং বাংলাদেশ-ভারত রিভাইজড  ট্রাভেল অ্যাগ্রিমেন্ট সই হওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে। সফরকালে ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যাবেন। তিনি বিজিবি সদর দপ্তরও পরিদর্শন করবেন। তবে এবারের সফরে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাচ্ছেন না বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আমন্ত্রণে শুক্রবার বিকালে ঢাকায় পৌঁছাচ্ছেন ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। সফরকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং তার সম্মানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর দেয়া নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি। ওই সব বৈঠকে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রচরমপন্থা মোকাবিলা বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে ঢাকা-দিল্লি বিদ্যমান সহযোগিতা আরো বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যকার সম্পর্ক ও সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হবে। সেই আলোচনার ধারাবাহিকতায় দুই দেশের পুলিশ একাডেমির মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগে চুক্তি সই হবে। সূত্র মতে, দুই দেশ গত এক দশক ধরেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ  প্রতিরোধে জোর দিয়ে আসছে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে জঙ্গিবাদ  মোকাবিলায় দুই দেশই সমন্বিত ভাবে কাজ করে চলেছে। রাজনাথ সিংহের এবারের সফরে এ সহযোগিতাকে আরো টেকসই করতে এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হবে। সূত্র মতে, তরুণ সমাজ সব সময় জঙ্গিদের টার্গেট হয়ে থাকে। তরুণদের মধ্য  থেকেই জঙ্গিরা কর্মী রিক্রুট করে চলেছে। সে কারণে দুই দেশই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তরুণদের সচেতন করতে চায়। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তরুণদের সচেতন করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার থেকে ইতিমধ্যেই নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেসব উদ্যোগ জানার বিষয়ে ভারতের আগ্রহও কম নয়। দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে বিষয়টি আলোচনার এজেন্ডায় থাকছে। এছাড়া দুই দেশের সীমান্ত পরিস্থিতি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে উভয় পক্ষ আলোচনার প্রস্তুতি নিয়েছে। যদিও সীমান্ত পরিস্থিতির উন্নয়ন হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশিদের হত্যার হার খানিক কমেছে। তবে সীমান্তে সন্ত্রাসী ও চোরাচালান কার্যক্রম অব্যাহত রয়ে গেছে। এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে উভয়পক্ষেরই। দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে বিষয়টিতে জোর  দেয়া হচ্ছে। জাল রুপির প্রতিরোধে ভারত বাংলাদেশের কাছে সহযোগিতা চাইতে পারে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে এমন ধারণা করে এক কর্মকর্তা বলেন- বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় জাল রুপি যাচ্ছে বলে দিল্লি দাবি করে আসছে। গত বছর সীমান্তে প্রায় ৬৯ লাখ ভারতীয় জাল রুপি ধরা পড়েছে। সীমান্ত এলাকায় সন্ত্রাসী ও চোরাকারবারিরা এই জাল জালিয়াতির কারবারে জড়িত বলে প্রতিবেশী দেশটির দাবি। এছাড়া ভারতীয় জাল টাকা তৈরিতে তৃতীয় একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার ইন্ধন রয়েছে বলেও মনে করে ভারত।
নতুন ভিসা সেন্টার উদ্বোধন: ঢাকা সফরের দ্বিতীয় দিন রাজনাথ সিং আগামী ১৪ই জুলাই রাজধানীর বারিধারায় যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা আবেদনকেন্দ্র উদ্বোধন করবেন। এই ভিসা আবেদনকেন্দ্রে কোনো ধরনের ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই ভিসা আবেদন জমা নেয়া হবে। রাজধানীর বেশ কয়েকটি আইভ্যাক  সেন্টারে ভারতীয় ভিসা আবেদন জমা নেয়া হয়ে থাকে। তবে যমুনা ফিউচার পার্কের নতুন ভিসা আবেদন সেন্টারই হবে সবচেয়ে বড় সেন্টার। এখানে প্রায় ৫০টি ভিসা আবেদন কাউন্টারও থাকবে। এছাড়া সাতশ’র বেশি ভিসাপ্রার্থী একসঙ্গে বসতে পারবেন।
উল্লেখ্য, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সেক্রেটারি (বিএম) বারজ রাজশর্মা,  অতিরিক্ত সচিব একে মিসরা,  যুগ্মসচিব সাতিনদিয়া গর্গসহ ১২ জন প্রতিনিধি ঢাকা আসছেন।

মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল থাকবে

উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণ করা হবে বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আদালতের রায় অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা কোটা পরিবর্তনের সুযোগ নেই। গতকাল সংসদের চলতি বাজেট  অধিবেশনের সমাপনী দিনে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর সবাই অংশ নেবে বলেও আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কোটা নিয়ে আন্দোলন প্রসঙ্গে বলেন, আন্দোলনকারীরা যে কী চায় বারবার জিজ্ঞাসা করা হলেও সঠিকভাবে তারা বলতে পারে না। এ বিষয়ে সরকার থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে দিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাহলে এদের (আন্দোলনকারী) অসুবিধাটা কোথায় আমার সেটাই প্রশ্ন? তবে আন্দোলনের নামে যারা ভিসি’র বাড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করেছে তাদের তো ছাড়া হবে না। তাদের ছাড়া যায় না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোটা নিয়ে যারা আন্দোলন করছে তারা যে কি চায় বারবার জিজ্ঞেস করা হয়েছে সেটা কিন্তু সঠিকভাবে তারা বলতে পারে না। আমাদের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বুধবারই বলেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের রায় রয়েছে। যেখানে হাইকোর্টের রায় আছে যে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা ওইভাবে সংরক্ষণ থাকবে। আমরা হাইকোর্টের রায় কীভাবে লঙ্ঘন করবো। কীভাবে হাইকোর্টের রায় বাদ দেবো? সেটা তো আমরা করতে পারছি না। তবে তো হাইকোর্টের রায় অবমাননা হবে। তবে কোটা যেটাই থাকুক, কোটা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে যে জায়গায় খালি থাকবে সেখানে মেধাতালিকা থেকে পূরণ করা হবে এবং সেটাই করা হচ্ছে। কোটা আন্দোলনের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি’র বাসভবনে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোটা নিয়ে আন্দোলন করছে ভালো কথা, কিন্তু ভিসি’র বাড়িতে আক্রমণ করে জ্বালিয়ে দেয়া, গাড়িতে আগুন দেয়া, বাড়িতে আগুন দেয়া, ভাঙচুর এবং লুটপাট করা, এমনকি ভিসি’র পরিবার আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন। এটা কী কোনো শিক্ষার্থীর কাজ? এটা কী কোনো শিক্ষার্থী করতে পারে? তিনি বলেন, আজকে তারা কথায় কথায় আন্দোলনের নামে ক্লাসে তালা দেয়, ক্লাস করবে না, পরীক্ষা দেবে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে? সেশন জট আগে অনেক ছিল, অন্তত আমরা ক্ষমতায় আসার পর সেশন জট দূর করেছি। সেশন জট ছিল না। কিন্তু এখন তাদের (আন্দোলনকারী) কারণেই আজকে আবার সেশনজট সৃষ্টি হচ্ছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদ নেতা বলেন, মাত্র ১৫ টাকা হলের সিট ভাড়া, আর ৩০ টাকার খাবার পৃথিবীর কোথায় আছে? আজকে যারা হলে থাকে, তাদের জন্য নতুন নতুন হল বানিয়েছি। ১৫ টাকার সিট ভাড়া দিয়ে আর ৩০ টাকার খাবার খেয়ে যারা লাফালাফি করে, তাহলে সিট ভাড়া আর খাবার যে বাজার দর আছে সেইভাবেই দিতে হবে তাদের। সেটা না করে তারা হলের গেট ভেঙে ফেলবে, মধ্য রাতে ছাত্রীরা বের হয়ে যাবে- এটা কী আন্দোলন? মধ্য রাতে ছাত্রীরা বের হয়ে যাবে। আমি চিন্তায় বাঁচি না। ভোর সাড়ে ৬ টা পর্যন্ত তাদের সবার হলে পৌঁছে দিয়ে আমি ঘুমিয়েছি। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ভিসি’র বাড়িতে সিসি ক্যামেরা ছিল, হামলার সময় সেটা ভেঙে ফেলেছে। চিপটা পর্যন্ত নিয়ে গেছে যেন হামলাকারীদের দেখা না যায়। কিন্তু তারা জানতো না আশে পাশে আরও অনেক ক্যামেরা ছিল। বৃটিশ কাউন্সিল থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় ক্যামেরা ছিল, সেই  ক্যামেরার ফুটেজ দেখে একটা একটা করে হামলাকারীকে খুঁজে বের করা হচ্ছে। এখানে যারা ভাঙচুর করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে- তাদের তো ছাড়া হবে না। তাদের ছাড়া যায় না। জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তদন্ত করা হচ্ছে। অনেকে স্বীকারও করেছে। যেখানেই যারা থাকবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে, তারা যতই আন্দোলর করুক। তিনি বলেন, শিক্ষার নীতিমালা তো সরকার করবে। সেটা আমাদের দেখার বিষয়, শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করবে। অনেক জায়গায় চাকরি খালি আছে, যারা মেধা তালিকায় থাকছে, কেউই বাদ যাচ্ছে না। যারাই মেধাবী তারা কোন কোনোভাবে চাকরি পাচ্ছে।
এবারের সংসদ সুন্দর ও সহনশীল পরিবেশ ছিল
বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারের সংসদে ভদ্র, সুন্দর, সহনশীল পরিবেশ ছিল। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে যেটা হওয়ার কথা ছিল মূলত সেটাই হয়েছে। অতীতে সংসদে খিস্তিখেউর, জনপ্রতিনিধি হলেও ফাইল ছোড়াছুড়ি, টেলিভিশনের ক্যামেরা ভাঙচুর, অভদ্র কথাবার্তায় এমন বিব্রত পরিস্থিতিতে পড়ে যেতাম, যাতে জাতির কাছে লজ্জিত হতাম। এবারের সংসদ ২০১৪ সালের নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে গঠন হয়েছে। সংসদ অধিবেশনে কোনো অশালীন ঘটনা হয়নি। বিরোধী দল সংসদে থেকে প্রত্যেকটা বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, বাজেট অধিবেশনে দেশের ইতিহাসে সবচাইতে বড় বাজেট আমরা দিয়েছি। কারণ আমাদের একটাই লক্ষ্য তা হচ্ছে- দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। আমরা প্রতিটি বছর প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ ভাগে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উপনীত হয়েছি। বিশ্বের কেউ বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করতে পারবে না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, মাত্র অল্প সময়ের মধ্যে আমরা সবচেয়ে বেশি কাজ করেছি। আমরা জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করার লক্ষ্য নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। অতীতে অনেক ঝড়-ঝঞ্ছা মোকাবিলা করে আজ বাংলাদেশ শুধু উন্নয়ন করছে না, স্থায়ী উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
অনেক মানুষই এখন ভিক্ষার চাল নিতে চায় না
বর্তমান সরকারের আমলে গ্রামীণ অর্থনীতির ব্যাপক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন আর কোনোদিক থেকে পিছিয়ে নেই। আমরা ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি। বিশ্বব্যাপী আজ বাংলাদেশ সমাদৃত। আমাদের লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ করা। তিনি বলেন, আমরা সারা দেশে খাদ্য নিরাপত্তা গড়ে তুলেছি। রোজার সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলে খাদ্যশস্য পাঠাই। কিন্তু অনেক স্থানে এখন খাদ্য নেয়ার মতো লোক নেই। সবাই বলে আমাদের ঘরে খাবার আছে, ভিক্ষার চাল নিব না। কারণ তাদের ঘরে খাদ্য আছে, ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে। তিনি বলেন, আমরা যেমন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি, পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করেছি। শুধু খাদ্য নয়, মাছ, তরিতরকারি ও মাংস উৎপাদনেও আমরা প্রায় স্বয়ংসম্পন্ন হয়েছি। আমরা পুষ্টি ও আমিষ দিতে পেরেছি বলেই মানুষের আয়ুষ্কাল বেড়েছে। পুরুষদের ৭১ এবং মেয়েদের আয়ুস্কাল ৭২ থেকে ৭৩ হয়েছে। তিনি বলেন, আজ দেশের কোথাও মানুষের মধ্যে হাহাকার নাই। বরং মানুষ আমাকে গালি দেয় কাজের লোক পায় না বলে। আমাদের ৯৩ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে। আমরা শতভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবো। তিনি বলেন, বিদেশে চিকিৎসা করতে যাওয়া এখন অনেকের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। যাদের সামর্থ্য নাই তাদের চিকিৎসা করিয়ে দিচ্ছি। তিনি বলেন, বেসরকারিখাতকে আমরা উন্মুক্ত করে দিয়েছি। বিদ্যুৎ, বিমান, ব্যাংক, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সব উন্মুক্ত করে দিয়েছি। এতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিলিটারি ডিক্টেরররা ক্ষমতা দখল করে উপকারের বদলে দেশের সর্বনাশ করে গেছে। মতিঝিলে একসময় ঝিল ছিল। আইয়ুব খান তা বন্ধ করে দেয়। সেগুনবাগিচা ও পান্থপথে আগে খাল ছিল। জেনারেল এরশাদ সাহেব এসে সেই খাল বন্ধ করে দিয়ে বক্সকালভার্ট নির্মাণ করেন। এতে করে পানি এখন আরা নামতে পারে না। জিয়া এয়ারপোর্ট থেকে দীর্ঘরাস্তায় দু’ধারে থাকা সকল কৃষ্ণচুড়া গাছ কেটে ফেলে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হলে ক্ষমতায় আসতে পারলে আমরা সকল বক্স কালভার্ট ভেঙে ফেলে নিচে খাল এবং উপর দিয়ে এলিভেটেড রাস্তা করে দেবো। সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বৃদ্ধির সমালোচনাকারীদের উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের কারণে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বৃদ্ধি করতে সংসদে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। এতে করে কোনো নারীর সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হয়ে আসার পথে কোনো বাধা হবে না। কিন্তু এটা নিয়েও নারী আন্দোলনের অনেকে সমালোচনা করেন। তাদের বলবো এতো কথা না বলে আগামী নির্বাচনে সরাসরি অংশ নিন, জনগণের কাছে যান, ভোট নিয়ে সংসদে আসুন। কিন্তু ভালো একটা কাজ করার পরও কেন জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন? ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর শতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ হিসেবে পালনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কৃষক-শ্রমিক-কামার-কুমার-বেদে-হিজড়া-নৃ-গোষ্ঠীসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের ভাগ্যের পরির্তনের কাজ করে যাচ্ছি। আগামীতে দেশের একটি মানুষ দরিদ্র থাকবে না, একটি মানুষও অবহেলিত ও গৃহহারা থাকবে না। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলবোই।

বাংলাদেশে এখন কী হচ্ছে, নোট করুন: কুটনীতিকদের প্রতি ফখরুল

বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও সংস্থার প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অনুরোধ জানাব, বাংলাদেশে এখন কী হচ্ছে, তা নোট করুন। আমরা একটি গণতান্ত্রিক জাতি। বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল, আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী করি। আমি মনে করি, বিএনপিকে ছাড়া কোনো নির্বাচন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।’
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। ২০০৯ সালের জুন থেকে চলতি ২০১৮ সালের এখন পর্যন্ত দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরতে এই গোলটেবিলের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর ‘রাইট টু লাইফ : এ ফার ক্রাই ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে ১৫ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র উপস্থাপন করা হয়। যেখানে বিভিন্ন সময় বিএনপির গুম-খুন-হত্যা ও নির্যাতনের শিকার পরিবারের সদস্যদের আহাজারি ও বক্তব্য দেখানো হয়।
বিরোধী দলের ওপর সরকারি ‘নিপীড়নের’ পরিসংখ্যান তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজকে শুধু এনফোর্স ডিজএপিয়ারেন্স (গুম) নয়, আমাদের হিসেবে পাঁচ শতাধিক নেতৃবৃন্দ হারিয়ে গেছেন, খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের হিসেবে ১০ হাজারের অধিক নেতা-কর্মীকে রাজনৈতিকভাবে হত্যা করা হয়েছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত সারা দেশে আমাদের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে ৭৮ হাজার মামলা করা হয়েছে। ১৮ লাখ মানুষকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।’
বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, এসব সরকারের কানে ঢুকছে না। এই সরকার ক্ষমতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ কারণে নিয়মকানুন কোনো কিছু খেয়াল করছে না। সংবিধান লঙ্ঘন করছে। গতকালও একটি সংবাদ সম্মেলন করে বলা হয়েছে, গত ১১ দিন থেকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্য ও দলের কাউকে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। এটি স্পষ্টত সংবিধানের লঙ্ঘন।’
সরকারের কড়া সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন বাংলাদেশে এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এই বিষয়গুলো অনেকবার বলেছি কিন্তু সরকারের কর্নগোচর হয়নি। বরং সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে মরিয়া। তাই তারা সবিংধান, আইন কানুন উপেক্ষা করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করছে চাইছে। ’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। এ জন্য জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা গেলে ‘দানবীয় শক্তি’ প্রতিহত করা সম্ভব হবে। এই সরকার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নষ্ট করেছে। জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করে এই সরকারকে বিদায় করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বর্তমান সরকার স্বৈরশাসকের মতো নির্মম হয়ে উঠেছে। জনগণ এই স্বৈরাচার থেকে মুক্তি চায়। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। আইনের শাসন নেই। এ অবস্থায় জনগণ তাদের সরকার চায়। জনগণ একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। জনগণ এমন স্বৈরাচার সরকার চায় না। এই দুঃশাসনের অবসান চায় জনগণ।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিষয়ে সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। জামিন পাওয়া একজন মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। অথচ খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন নাকচ করা হচ্ছে এবং বাতিল করা হচ্ছে। এভাবে দেশে দিনের পর দিন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে চলেছে।’
গোলটেবিল আলোচনায় জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি, মার্কিন দূতাবাসের মানবাধিকারবিষয়ক সেক্রেটারি মাইক ক্রেমার, ফ্রান্স দূতাবাসের উপপ্রধান জ্যঁ-পিয়েরে পঁশে, ভারতীয় কূটনীতিক শান্তনু মুখার্জিসহ কানাডা, ব্রিটেন, জার্মানি, সুইডেন, পাকিস্তান, ইরানের কূটনীতিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

ইতিহাস by সামন হোসেন

ইতিহাস রচনা করলো ক্রোয়েশিয়ার ‘গোল্ডেন জেনারেশন’। প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছালো ক্রোয়েশিয়া। গত রাতে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে ২-১ গোলে জয় কুড়ায় ক্রোয়াটরা। আর ক্রোয়েশিয়া দেখায় দারুণ প্রত্যাবর্তনও। মস্কোর লুঝনিকি ভেন্যুতে আগে গোল খেয়ে শেষে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে মদ্রিচ বাহিনী। আগামী রোববার একই মাঠে ফ্রান্সের বিপক্ষে শিরোপা লড়াইয়ে মাঠে নামবে ক্রোয়েশিয়া।
রাশিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইানালে গোল করে আপত্তিকর উদযাপনে ডোমাগো ভিদার উপর ক্ষেপে ছিল ফিফা। সেমিফাইনালের আগে ফিফার কাছে মাফ চেয়ে পার পেলেও রাশিয়ানদের ক্ষমা মেলেনি। লুঝনিকিতে যতবার তার পায়ে বল গেছে, ততবারই পুরো স্টেডিয়াম তাকে কটাক্ষ করে চিৎকার করেছে। তবে আমুদে ও উৎসব প্রিয় রাশিয়ানরা তাই বলে কিন্তু ইংল্যান্ডকে সমর্থন করেনি! এই ক্রোয়েশিয়ার কাছে হরে উৎসব ম্লান হয়েছে স্বাগতিকদের। এর পরেও অধিকাংশ রাশান ক্রোয়েশিয়ার পতাকা হাতে লুঝনিকি স্টেডিয়ামে হাজির হয়েছেন। রাশিয়ার মাটিতে ইংল্যান্ড ফাইনাল খেলবে এটা অনেকেই তারা চান না। ২০১৮ বিশ্বকাপ আয়োজকের বিডিংয়ে রাশিয়ার বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ইংল্যান্ড। আয়োজক নিশ্চিত হওয়ার পরও ইংল্যান্ড অনেক সমালোচনা করেছে রাশিয়া নিয়ে। পিটার্সবার্গ থেকে মস্কোর সেমিফাইনাল দেখতে আসা মধ্য বয়সী চামরিচ বলেন,‘ ইচ্ছে ছিল লুঝনিকি (মস্কো ) নিজ দেশের খেলা দেখব। সেটা হচ্ছে না। বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মাঠ থেকে দেখাও খুবই সৌভাগ্যের। ক্রোয়েশিয়ার কাছে আমরা হারলেও আমরা ক্রোয়েশিয়ার সমর্থনই করব।’ এমনই মন্তব্য আরেক রুশ সুন্দরীর,‘রাশিয়া বিশ্বকাপ অনেক ভালো হচ্ছে। রাশিয়া বিশ্বকাপে নতুন ফাইনালিস্ট ও নতুন চ্যাম্পিয়ন দেখতে চাই। সেক্ষেত্রে আমার পছন্দ ক্রোয়েশিয়া। মদ্রিচ, রাকেটিচদের নিয়ে দারুণ মিডফিল্ড তাদের।’ রাশানরা ক্রোয়োশিয়াকে সমর্থন যোগালেও গ্যালারিতে ইংলিশ সমর্থকের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারেনি। মাঠেও তাদের কোনঠাসা করে রাখে হ্যারি কেইনের দল। ম্যাচের পাঁচ মিনিটেই কিয়েরান ট্রিপিয়ারের দারুণ এক ফ্রি কিক দেয়ালের উপর দিয়ে আশ্রয় নেয় জালে (১-০)। এতে লিড পায় ইংল্যান্ড। ডি বক্সের বাইরে ডেলে আলিকে ফেলে দিয়েই বিপদ ডেকে আনেন ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক লুকা মদ্রিচ। ২০০৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে ফ্রি কিক থেকে গোল পায় ইংল্যান্ড। এছাড়া চলতি বিশ্বকাপে ১২ গোলের মধ্যে সেট পিসে করা তাদের নবম গোল ছিল এটি। ম্যাচের শুরুতেই গোল করে মানসিকভাবে এগিয়ে যায় থ্রি লায়নরা। প্রথম গোলের ধাক্কায় ক্রোয়েশিয়ার গুছিয়ে উঠতে চলে যায় আরো কিছু সময়। এই সুযোগে বারবার ক্রোয়াটদের রক্ষণ কাঁপিয়ে তোলেন হ্যারি কেইন, ডেলে আলিরা। ম্যাচের ২২তম মিনিটে বাজে এক ভুল করে বসেন ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক দানিয়েল সুবাসিচ। বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তিনি দিয়ে দেন রাহিম স্টার্লিংয়ের পায়ে। স্টার্লিং দুর্দান্ত চতুরতায় তা কেইনকে দিলেও, অফসাইডের ফাঁদে ধরা পড়েন ইংলিশ অধিনায়ক। সেই যাত্রায় বেঁচে যান সুবাসিচ। এর খানিক বাদে উইং দিয়ে ইংল্যান্ডের রক্ষণে আক্রমণ সাজায় ক্রোয়েশিয়া। ছোট ছোট পাসে সামনে এগিয়ে হুট করেই বুলেট গতির শট নেন আন্তে রেবিচ। তবে ইংলিশ গোলরক্ষক পিকফোর্ড সতর্ক থাকায় গোলবঞ্চিত হয় ক্রোয়েশিয়া।
পুরো প্রথর্মাধে পরিচ্ছন্ন ফুটবলের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দুই দল। এসময় ইংল্যান্ডের ২টি শটের বিপরীতে ক্রোয়েশিয়া গোলমুখে করে ৩টি শট। দ্বিতীয়ার্ধে গোল পরিশোধে মরিয়া ক্রোয়েশিয়ান ফরোয়ার্ডদের আক্রমণ বারবার মুখ থুবড়ে পরেছে ইংল্যান্ডের রক্ষণের সামনে। বিশেষ করে  কাইল ওয়াকার, জন স্টোনস, হ্যারি ম্যাগুয়ের রক্ষণে ছিলেন দুর্দান্ত। এই দুর্দান্ত রক্ষণের ফাঁক দিয়ে সিমে ভ্রাসালকোর ক্রসে কাইল ওয়াকারের মাথার উপর দিয়ে আলতো টোকায় গোল নিয়ে দলকে ১-১ সমতায় ফেরান ইভান পেরেসিচ। এর পরের পাঁচ মিনিটে ইংল্যান্ডের রক্ষণের উপর দিয়ে ঝড় বইয়ে দেয় ক্রোয়েশিয়া। স্টারলিংয়ের পরিবর্তে রাশফোর্ড মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে খেলার ধারায় পরিবর্তন আনে ইংল্যান্ড। দুই উইং বাদ দিয়ে মাঝমাঠ দিয়েই আক্রমণে যেতে থাকে ইংলিশরা। কিন্তু তাতেও ফায়দা হচ্ছিল না। অভিজ্ঞ লুকা মদ্রিচ , মানজুকিচের ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠ দখলে নিতে পারছিল না। উল্টো এক কাউন্টার অ্যাটাক থেকে ম্যাচের ৮২তম মিনিটে গোল খেতে বসেছিলো ইংল্যান্ড। তবে পেরেসিচের শট পোস্টে প্রতিহত হয়। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে পেরেসিচের ক্রসে গোলবারের কাছ থেকে নেয়া মানজুকিচের শট রুখে দেন পিকফোর্ড। আর ম্যাচের ১০৯তম মিনিটে ক্রোয়েশিয়াকে জয়সূচক গোল এনে দেন মানজুকিচই।
১৯৯৩-এ স্বাধীন হওয়ার পর ক্রোয়েশিয়া প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছে ১৯৯৮ সালে। প্রথমবারেই বাজিমাত করেছিল তারা। ডেভর সুকারের অসাধারণ  নৈপুণ্যে ক্রোয়েশিয়া সেবার পৌঁছেছিল সেমিফাইনালে। স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল। পরে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে হয়েছিল তৃতীয়। ডেভর সুকার ৬ গোল করে জিতেছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার, গোল্ডেন বুট। সেই ডেভর সুকার এবার ক্রোয়েশিয়া ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি। আর ক্রোয়াটরাও পেয়ে গেছে তাদের ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা দলটিকে। সোনালি প্রজন্ম বলতে যাদের বোঝায়। মদ্রিচ, রাকিতিচ, মানজুকিচ, পেরিসিচ, কোভাচিচ, রেবিক, সুবাসিচ, লভরেন তারকার অভাব নেই। প্রত্যাশা মতোই সেমিফাইনালে উঠে আসা ক্রোয়েশিয়া। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে তারা স্বপ্নের ফাইনালে। এরপর তো আর মাত্র একটি বাধা। সেটা পার হতে পারলেই নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়ে যাবে। ফুটবল বিশ্বও পেয়ে যাবে ৯মতম নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। ক্রোয়েশিয়ার জয়জয়কার ছড়িয়ে পড়বে তখন দিগ থেকে দিগন্তে। লুকা মদ্রিচ কিংবা রাকিতিচরা হয়ে যাবে মেসি-নেইমার-রোনালদোর চেয়েও বড় তারকা।