Thursday, July 23, 2026

ইরানের স্কুলে ভয়াবহ মার্কিন হামলার হৃদয়বিদারক গল্প

শ্রেণিকক্ষ থেকে কবরস্থানে ১২০ শিশু। দক্ষিণ ইরানের ছোট শহর মিনাবের শাজারে তাইয়্যেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কয়েক মাস পরও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে সেদিনের বিভীষিকা ভুলতে পারছেন না শিক্ষক আমিনেহ নাদেমি।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের এই হামলায় ১২০ শিশুসহ মোট ১৫৬ জন নিহত হয়েছেন। মিনাব প্রসিকিউটরের কার্যালয় হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেছে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের দাবি, বিদ্যালয়ের পাশের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একটি স্থাপনায় হামলা চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী স্কুলটিতে আঘাত হানে।
যদিও ওয়াশিংটন এ হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সামরিক তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা- পুরোনো গোয়েন্দা তথ্যের কারণে ভুলবশত স্কুলটিকে সামরিক স্থাপনার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় স্কুল
৩৩ বছর বয়সী শিক্ষক আমিনেহ নাদেমি বলেন, সেদিনও অন্য দিনের মতোই ক্লাস শুরু হয়েছিল। রমজান মাস হওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রথমে নামাজকক্ষে কোরআন তিলাওয়াত করে। এরপর তিনি প্রথম শ্রেণির ছাত্রীদের ফারসি বর্ণমালার নতুন একটি অক্ষর শেখাতে শুরু করেন। ঠিক তখনই ইরানের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের প্রথম হামলা শুরু হয়।
স্কুল কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে এবং অভিভাবকদের সন্তানদের নিয়ে যেতে বলা হয়। আমিনেহ জানান, তার ১৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে তখন মাত্র পাঁচজন শ্রেণিকক্ষে ছিল। হঠাৎ একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর তিনি শিশুদের নিতে ফিরে যান।

তিনি বলেন, আমি বের হওয়ার ঠিক মুহূর্তেই একটি ক্ষেপণাস্ত্র স্কুলে আঘাত হানে। আমার মাথায় এবং শিশুদের মাথায় আঘাত লাগে। আমরা সবাই ছিটকে পড়ি।
এরপর পুরো শ্রেণিকক্ষ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। শ্বাস নেয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর পুরো ভবন ধসে পড়ে। আমার আর শিশুদের শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল, বলেন তিনি।
ধোঁয়া কিছুটা সরে গেলে আহত শিশুদের নিচে থাকা লোকজনের কাছে নামিয়ে দেন তিনি। পরে ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে স্কুলের ফটকে গিয়ে দেখেন, অসংখ্য অভিভাবক খালি পায়ে ছুটে এসেছেন। তখনও তিনি বুঝতে পারেননি যে অধিকাংশ মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন।

নিহতদের মধ্যে শিক্ষক ও বহু শিক্ষার্থী
ছয় বছর ধরে ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা আমিনেহ জানান, হামলায় তার প্রথম শ্রেণির ছাত্রী আদ্রিনা, দ্বিতীয় শ্রেণির ফাতেমেহ, ষষ্ঠ শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থী, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক এবং কোরআনের শিক্ষক নিহত হন।

উদ্ধারকর্মীদের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উদ্ধারকর্মী রেজা বাশারাতি বলেন, হামলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি জানান, আমরা ভেবেছিলাম হয়তো কাউকে জীবিত পাওয়া যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কাউকেই জীবিত পাইনি।

রেজার ভাষ্য, অনেক মরদেহ এতটাই বিকৃত ছিল যে শুধু হাত, পা বা শরীরের খণ্ডিত অংশ পাওয়া গেছে। অনেক পরিবার সন্তানদের জুতা বা পোশাক দেখে তাদের শনাক্ত করেছে।
তিনি বলেন, আমার এক আত্মীয় বারবার বলছিলেন, আমার ছেলেকে খুঁজে দাও। কিন্তু আমি বলতে পারিনি যে তার ছেলে আর বেঁচে নেই। আমরা সবাই কাঁদছিলাম।

তদন্তে কী উঠে এলো
হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই প্রথমে এ ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে এবং মার্কিন বাহিনী কখনও ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় না।

তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে যে মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার পুরোনো তথ্যের কারণে স্কুলটিকে আইআরজিসির সামরিক স্থাপনার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্কুলের পাশের আইআরজিসি কমপ্লেক্সে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল। একই সঙ্গে স্যাটেলাইট চিত্রে স্কুল এবং পাশের কয়েকটি ভবনেও হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ঐতিহাসিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ২০১৬ সাল থেকে স্কুলটি আইআরজিসি কমপ্লেক্স থেকে আলাদা দেয়াল দিয়ে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং এর নিজস্ব প্রবেশপথ ও খেলার মাঠ ছিল। এছাড়া এটি একটি স্কুল- এ তথ্যও হামলার আগেই অনলাইনে প্রকাশ্যে ছিল।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ জানায়, তদন্ত এখনও চলমান এবং এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

মোজা দেখে শনাক্ত করা হয় ৯ বছরের শিশুকে
ধ্বংসপ্রাপ্ত ওই বিদ্যালয় থেকে অল্প দূরেই রয়েছে কবরস্থান, যেখানে নিহত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অনেককে দাফন করা হয়েছে। প্রতিদিন সেখানে যান মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদি। তার নয় বছরের মেয়ে সেতায়েশ ওই হামলায় নিহত হয়।
তিনি বলেন, স্কুল বলে কিছুই আর ছিল না। চারদিকে শুধু ধোঁয়া, শিশুদের চুল, একদিকে হাত, অন্যদিকে পা পড়ে ছিল। সবাই টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল।

মাসুমেহ জানান, পরদিন ভোর পর্যন্ত মেয়ের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে মেয়ের ক্রিম রঙের মোজা দেখে তার মরদেহ শনাক্ত করা হয়। তিনি বলেন, সেতায়েশ বড় হয়ে শিক্ষক হতে চেয়েছিল। সে ঘরে পুতুল সাজিয়ে বলত- ‘আমি তোমাদের শিক্ষক।’

শোকের সঙ্গে ক্ষোভ
এই হামলাকে ইরান সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বারবার তুলে ধরছে। এমনকি আলোচক বহনকারী একটি বিমানের নামও রাখা হয়েছিল ‘মিনাব-১৬৮’, যা নিহতের আগের সরকারি সংখ্যার প্রতি ইঙ্গিত।
স্থানীয়দের মতে, এ হামলা ইরানের মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এটি যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক ট্র্যাজেডিগুলোর একটি।
মেয়ের কবরের পাশে বসে মাসুমেহ বলেন, এই শিশুদের অপরাধ কী ছিল? তাদের হাতে কি অস্ত্র ছিল? তাদের হাতে ছিল শুধু পেন্সিল, বই, খাতা আর স্কুলব্যাগ। তারা যুদ্ধ করতে যায়নি, তারা শুধু শিখতে গিয়েছিল।

ইরানের স্কুলে ভয়াবহ মার্কিন হামলার হৃদয়বিদারক গল্প

আল-আকসায় মন্ত্রী-এমপিসহ হাজারো ইহুদির ‘হানা’, নাচ-গানে উত্তেজনা

ইহুদিদের ধর্মীয় উপবাস দিবস তিশা বি’আভ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে ইসরাইলের উগ্র জাতীয়তাবাদী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নেতৃত্বে বৃহৎ অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে।

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এদিন কড়া নিরাপত্তার মধ্যে হাজারো ইসরাইলি মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

ফিলিস্তিনি ওয়াক্ফ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৩ হাজার ২০০ জনের বেশি ইসরাইলি আল-আকসা মসজিদের চত্বরে প্রবেশ করেন। বিকেলেও এই অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকার কথা।
এই অভিযানে অংশ নেয়াদের মধ্যে ছিলেন ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির, নেগেভ, গ্যালিলি ও জাতীয় স্থিতিশীলতাবিষয়ক মন্ত্রী ইৎজহাক ওয়াসারলাউফ এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সংসদ সদস্য আমিত হালেভি।

এদিন মসজিদ প্রাঙ্গণে গিয়ে বেন গভির বলেন, দেখুন এখানে কী হচ্ছে- ইহুদিরা এখানে প্রার্থনা করছে এবং নিজেদের এ জায়গার মালিক মনে করছে। আগে কখনও এমনটা ঘটেনি।

ফজরের নামাজে বাধা
অভিযানের আগে ইসরাইলি বাহিনী বহু ফিলিস্তিনিকে আল-আকসা মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় করতে বাধা দেয়। ফলে অনেক মুসল্লিকে আশপাশের সড়কেই নামাজ আদায় করতে বাধ্য হন।
ফিলিস্তিনের ধর্মীয় বিষয় ও ওয়াক্ফ মন্ত্রণালয় ইসরাইলি কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অনুপ্রবেশকে “স্পষ্ট ও গুরুতর আগ্রাসন” বলে উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, এই অভিযান ইসলামি পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আল-আকসা মসজিদের ঐতিহাসিক ও আইনি অবস্থান পরিবর্তনের গুরুতর প্রচেষ্টা।

এতে আরও বলা হয়, ১৪৪ দুনাম আয়তনের পুরো আল-আকসা মসজিদ কেবল মুসলমানদের একচ্ছত্র অধিকার। এটি অবিভাজ্য এবং কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করা যাবে না। দখলদার সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই উসকানিমূলক পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলে ধর্মীয় যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে।

নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে জড়ালেন অংশগ্রহণকারীরা
বৃহৎ এই অনুপ্রবেশে অংশ নেয়া অনেককে আল-আকসা প্রাঙ্গণে ইসরাইলের পতাকা ওড়াতে, গান গাইতে, নাচতে, সেজদা দিয়ে প্রার্থনা করতে এবং ছাউনি টাঙাতে দেখা যায়।
দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা ‘স্ট্যাটাস কু’ অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। এনিয়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জেরুজালেম গভর্নরেট জানায়, সাধারণত একেকটি দলে প্রায় ৩০ জন করে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হলেও বৃহস্পতিবার একেকটি দলে প্রায় ১৫০ জন করে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হয়েছে।
এছাড়া আগে যেখানে ইহুদিদের প্রার্থনা মূলত প্রাঙ্গণের পূর্বাংশে সীমাবদ্ধ ছিল, এবার ডোম অব দ্য রকের আশপাশসহ পুরো এলাকাতেই তাদের প্রার্থনা ও ধর্মীয় সংগীত গাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

ধর্মীয় যুদ্ধের উসকানি
ইসরাইলি শান্তিকামী সংগঠন পিস নাউ সতর্ক করে বলেছে, আল-আকসায় এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড একটি ধর্মীয় যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, আজ সকালে টেম্পল মাউন্টে অত্যন্ত বিপজ্জনক উসকানি দেয়া হয়েছে। মসজিদগুলোর সামনে ব্যাপক ইহুদি প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের স্ট্যাটাস কু সরাসরি লঙ্ঘন করেছে।
তাদের ভাষ্য, যারা ধর্মীয় সংঘাত উসকে দিতে চায়, তাদের কর্মকাণ্ড এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

স্ট্যাটাস কু কী?
স্ট্যাটাস কু হলো আল-আকসা মসজিদ পরিচালনার বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দীর্ঘদিনের একটি ব্যবস্থা।
এই ব্যবস্থার অধীনে ১৪৪ দুনামজুড়ে পুরো আল-আকসা কমপ্লেক্সকে ইসলামি পবিত্র স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সেখানে প্রবেশ, নামাজ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক খননের দায়িত্ব জেরুজালেমের ইসলামিক ওয়াক্ফের হাতে।
তবে ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকে ইসরাইল ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থাকে দুর্বল করে আসছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইল ওয়াক্ফের কাছ থেকে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নেয় এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী ইসরাইলিদের প্রতিদিন আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব অভিযানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ আল-আকসা প্রাঙ্গণের ভেতরে ইহুদিদের প্রার্থনা এবং পতাকা ওড়ানোরও অনুমতি দিয়েছে।
আল-আকসা মসজিদের জ্যেষ্ঠ খতিব ও জেরুজালেমের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শেখ ইকরিমা সাবরি বুধবার সতর্ক করে বলেন, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ইহুদিদের ধর্মীয় দিবসগুলোকে কাজে লাগিয়ে আল-আকসায় অনুপ্রবেশ বাড়াচ্ছে এবং মসজিদের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।

তিনি অভিযোগ করেন, মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা ও নেসেট সদস্যদের অংশগ্রহণে বড় ধরনের এসব অভিযান আয়োজনের মাধ্যমে ইসরাইল সরকার এ কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিক বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে।

আল-আকসায় মন্ত্রী-এমপিসহ হাজারো ইহুদির ‘হানা’, নাচ-গানে উত্তেজনা

ফিলিস্তিনি বন্দি রাখা কারাগারের চারপাশে কুমিরের পরিখা খনন শুরু করেছে ইসরায়েল

ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে একটি উচ্চ নিরাপত্তার কারাগারের বিশেষ অংশ ঘিরে কুমির রাখার উদ্দেশ্যে পরিখা খননের কাজ শুরু হয়েছে। এ কারগারটিতে হামাস সদস্যদের রাখা হয়েছে। দেশটির একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ দাবি করা হয়েছে।

বুধবার ইয়েদিওথ আহরোনোথ পত্রিকা এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ বরাতে মিডল ইস্ট মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়, কেতজিওত কারাগারের একটি বিশেষ নিরাপত্তা উইং ঘিরে প্রায় ১৭০ মিটার দীর্ঘ পরিখা খনন করা হচ্ছে।

কারাগারটি যে রামাত নেগেভ আঞ্চলিক কাউন্সিলের অধীনে অবস্থিত, সেখানকার এক স্থানীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পরিখাগুলো কারাগারের ভেতরে বিশেষ উইংয়ের চারপাশে খনন করা হচ্ছে এবং বাইরে থেকে সেগুলো দেখা যায় না।

তিনি বলেন, সেখানে সত্যিই কুমির রাখা হবে কি না, তা কেউ নিশ্চিত নয়। তবে সে ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ও কুমির রাখার জন্য নির্ধারিত খালের কাজ শুরু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

তবে এ বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কুমির আনার সময়সূচি বা পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

এর আগে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের ‍জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির পরিবেশমন্ত্রী ইদিত সিলম্যান একটি অধ্যাদেশে সই করেন। এর ফলে নীল নদের কুমিরকে নতুন একটি আইনি শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই আইনের আওতায় নিরাপত্তার প্রয়োজনে রাষ্ট্র কুমির নিজেদের হেফাজতে রাখতে পারবে।

পরিবেশমন্ত্রী বলেন, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে নিরাপত্তা বাহিনী কুমির ব্যবহার করতে পারবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আইনি উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মূলত জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভিরের প্রস্তাবের পরই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য চারপাশে কুমির দিয়ে ঘেরা একটি কারাগার তৈরির প্রস্তাব দেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ ডিটেনশন সেন্টার থেকে তিনি এ ধারণা পেয়েছেন।

তবে ইসরায়েল প্রকৃতি ও উদ্যান কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলেছেন, কুমিরকে শুধু শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহার করা উচিত। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আইনি উপদেষ্টা নেটা ডোরি বলেন, এ পরিকল্পনার পক্ষে যথেষ্ট আইনি বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

অন্যদিকে কারা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, আক্রমণাত্মক কুকুর সামলানোর অভিজ্ঞতা থাকায় তারা কুমিরও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তবে এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে নেটা ডোরি বলেন, কুমিরের মতো বিপজ্জনক বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনায় কারা কর্তৃপক্ষের কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

পরিকল্পনাটি অনুমোদনের পর বেন গাভির ফেসবুকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি একটি ছবি প্রকাশ করেন। সেখানে তাকে শিকলে বাঁধা একটি কুমির টেনে নিয়ে যেতে দেখা যায়। ছবির ক্যাপশনে তিনি লেখেন, সন্ত্রাসীরা পালানোর কথা ভাবার আগে আরেকবার ভাবুক।

এদিকে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, পাহারার কাজে বন্যপ্রাণী ব্যবহার করা অনৈতিক এবং এতে কুমির ও মানুষের নিরাপত্তা, দুই-ই ঝুঁকিতে পড়বে। 

কুমির। ভিন্ন ঘটনার ছবি
কুমির। ভিন্ন ঘটনার ছবি

ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেই সৌদির সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি কার্যকর হবে: ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি কার্যকর হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও দেশটিকে স্বীকৃতি দেওয়া। যদিও চুক্তি ঘোষণার সময় এই শর্তের কথা প্রকাশ করা হয়নি। খবর এনবিসি নিউজের।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, চুক্তির আওতায় কোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ থাকবে না। এটি কেবল বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য এবং সামরিক ব্যবহারের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।


তিনি আরও বলেন, সৌদি আরব আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিলেই কেবল এই পারমাণবিক চুক্তি কার্যকর হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান ও মরক্কো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল।

তবে বুধবার মার্কিন জ্বালানি বিভাগ চুক্তির ঘোষণা দিলেও সেখানে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া বা আব্রাহাম চুক্তিতে যোগদানের কোনো শর্তের উল্লেখ ছিল না। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠও এখনো প্রকাশ করা হয়নি এবং ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে এর বিস্তারিত জানায়নি।

মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট ও সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান চুক্তিতে সই করলেও এটি এখনো কংগ্রেসের অনুমোদন পায়নি।

চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের আশঙ্কা বাড়াতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।

সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শর্ত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হলেও সৌদি নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি না হলে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না।

মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এই চুক্তি কয়েক দশকব্যাপী বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বের আইনি ভিত্তি তৈরি করবে এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের লক্ষ্যও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

তবে চুক্তি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, এতে জাতিসংঘের সবচেয়ে কঠোর পরিদর্শন ব্যবস্থা বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়নি। বরং যৌথ সমীক্ষার ভিত্তিতে সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ পেতে পারে। 

সৌদি প্রিন্স সালমান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
সৌদি প্রিন্স সালমান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত

আল-আকসায় বেন-গভিরসহ শত শত ইহুদীর অনুপ্রবেশ, জর্ডান ও হামাসের তীব্র নিন্দা

ইহুদি ধর্মীয় উৎসব ‘তিশা বি’আভ’ শুরু হওয়ার পর থেকেই আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে শত শত বসতি স্থাপনকারী অবৈধভাবে প্রবেশ করতে শুরু করে। বুধবার সন্ধ্যায় ইহুদিদের অনুষ্ঠান শুরু হয়। এসময় ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির নিজেও মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন।

জেরুজালেমের ইসলামিক ওয়াকফ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বসতি স্থাপনকারীদের সংখ্যা ২,৩০০ ছাড়িয়েছে। তারা ইসরাইলি বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার অধীনে মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে।

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানান, ইসরাইলি বাহিনী আল-আকসার প্রবেশদ্বারগুলোতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে; ফলে বহুসংখ্যক ফিলিস্তিনি মুসুল্লিকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন মুসুল্লির ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

জেরুজালেম গভর্নরেটের ফিলিস্তিনি প্রশাসন বেন-গভিরের আল-আকসায় প্রবেশকে একটি ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা জানায়, এটি প্রমাণ করে অতীতে চরমপন্থী ডানপন্থীদের করা এসব কাজের পেছনে এখন ইসরাইল সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থন রয়েছে।

জর্ডান ও হামাসের তীব্র নিন্দা

এদিকে আল-আকসা প্রাঙ্গণে ইসরাইলিদের অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জর্ডান ও ফিলিস্তিনের গাজার সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাস।

জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ মাজালি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ঐতিহাসিক ও আইনি ‘স্ট্যাটাস কো’ (বিদ্যমান অবস্থা) লঙ্ঘন করে। জেরুজালেমে অবস্থিত ইসলামিক ও খ্রিস্টানদের পবিত্র স্থানগুলোতে ইসরাইলের এমন ধারাবাহিক লঙ্ঘন বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চাপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আম্মান।

একইভাবে নিন্দা জানিয়ে হামাস বলেছে যে, এই প্রকাশ্য আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়া দখলদার বাহিনী ও তার বসতি স্থাপনকারীদের ওপরেই গিয়ে পড়বে।

এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি জানায়, আমাদের দেশের মানুষ এবং প্রতিরোধ বাহিনী আমাদের পবিত্র স্থানগুলোর এই অবমাননার মুখে নিশ্চুপ বসে থাকবে না।

সূত্র: আলজাজিরা।

আল-আকসায় বেন-গভিরসহ শত শত ইহুদীর অনুপ্রবেশ, জর্ডান ও হামাসের তীব্র নিন্দা

দর্শকের ভালোবাসায় মুগ্ধ কনা

সংগীতশিল্পী দিলশাদ নাহার কনার নতুন গান ‘সোনা জান’ এরই মধ্যে ইউটিউবে প্রকাশিত হয়েছে। রবিউল ইসলাম জীবনের লেখা ও আদিব কবিরের সুর সংগীতে বিগ বাজেটের এ মিউজিক ভিডিওতে মডেল হয়েছেন কলকাতার অলিভিয়া সরকার। গানটি এরই মধ্যে দর্শকের মাঝে সাড়া ফেলেছে।

গানটি নিয়ে কনা বলেন, ‘গানের কথা ও সুর খুব ভালো লেগেছিল বিধায় গানটি গেয়েছিলাম। আমার ভীষণ পছন্দের তালিকায় থাকবে এই সোনা জান গান। গানটি তৈরির শুরু থেকেই আমি এর প্রতিটি কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। মিউজিক ভিডিওতে এবার নিজে থেকেই না থাকা। কারণ, এর আগে বহু গানেই তো আমি মিউজিক ভিডিওতে থেকেছি। এবার না হয় অলিভিয়াই থাকুক। তবে এটা সত্যি, মোহন অনেক শ্রম দিয়ে মিউজিক ভিডিওটি নির্মাণ করেছেন। অলিভিয়া এবং অমিত পাল দুজনেই ভীষণ ভালো করেছেন।

গানটি প্রকাশের পর থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। আমার বিশ্বাস এ গানের রেশ আরও বাড়বে। এরই মধ্যে স্টেজ শোতে এই গান আমাকে গাইতে হচ্ছে। কারণ, দর্শক-শ্রোতার কাছ থেকে অনুরোধ আসছে। দর্শক-শ্রোতাদের এমন ভালোবাসা নিয়েই আগামীর পথে আরও ভালো ভালো গান করার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।’ কনার কণ্ঠে সর্বশেষ তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়া গান হচ্ছে ‘দুষ্টু কোকিল’। এ গানের পর দেশ-বিদেশে স্টেজ শোতেও তার ব্যস্ততা বেড়ে যায় অনেক বেশি। সেই ধারাবাহিকতায় এরই মধ্যে সিঙ্গাপুর মাতিয়ে এলেন কনা। 
সংগীতশিল্পী দিলশাদ নাহার কনা। ছবি: সংগৃহীত
সংগীতশিল্পী দিলশাদ নাহার কনা। ছবি: সংগৃহীত

শতবর্ষে মাহাথির: বললেন দীর্ঘায়ু হওয়ার মন্ত্র

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ঃ মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ এবার ১০০ বছরে পা রাখলেন। এ সময়ে তিনি তার আজীবনের অভ্যাস বজায় রাখলেন। অল্প খাবার খাওয়া, বেশি কাজ করা এবং বিশ্রামের লোভে না পড়ার মধ্য দিয়ে। জন্মশতবর্ষে তিনি আল জাজিরাকে বললেন, প্রধান বিষয় হলো আমি সব সময় কাজ করি। আমি নিজেকে বিশ্রাম দিই না। আমি সব সময় শরীর ও মস্তিষ্ক ব্যবহার করি। মন আর শরীরকে সক্রিয় রাখো, তাহলেই দীর্ঘায়ু হওয়া যায়।

রাজধানী কুয়ালালামপুরের দক্ষিণে পুত্রজয়ায় তার দপ্তরের ডেস্কে বসেই তিনি শতবর্ষের দিন কাটালেন অন্য দিনের মতোই- মালয়েশিয়ার অর্থনীতি, রাজনীতি ও বিশ্ব ঘটনাবলি, বিশেষত গাজার পরিস্থিতি নিয়ে লিখে। জন্মদিনের সময়ে সামান্য শারীরিক অবসাদ কাটিয়ে উঠে আল জাজিরার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মাহাথির ভবিষ্যদ্বাণী করলেন। বললেন, ইসরাইলের ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্মমতা বিশ্ব ইতিহাসে চিরস্থায়ীভাবে খোদাই হয়ে থাকবে। তিনি বললেন, গাজায় প্রায় ৬৬ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। গাজা ভয়াবহ। তারা গর্ভবতী মা, সদ্যোজাত শিশু, তরুণ-তরুণী, পুরুষ-মহিলা, অসুস্থ ও দরিদ্রদের হত্যা করছে। এটা কি ভোলা সম্ভব? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি ভোলা যাবে না।

গাজার যুদ্ধকে তিনি গণহত্যা আখ্যা দিয়ে এর তুলনা টানলেন ১৯৯০-এর দশকের বসনিয়ায় মুসলিম হত্যাকাণ্ড এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির হাতে ইহুদি নিধনের সঙ্গে। তিনি অবাক হলেন, ইসরাইলিরা নিজেরা গণহত্যার শিকার হয়েও অন্যদের ওপর একই বর্বরতা চালাচ্ছে। মাহাথির বলেন, আমি ভেবেছিলাম যারা এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তারা চাইবে না অন্য কারও সঙ্গে একই আচরণ করতে। কিন্তু ইসরাইলের ক্ষেত্রে আমি ভুল ছিলাম। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা অবস্থায় মাহাথির ছিলেন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর শোষণের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর।

তিনি আজীবন ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যদিও এ কারণে তাকে প্রায়ই ইহুদিবিদ্বেষী মন্তব্যের অভিযোগে সমালোচিত হতে হয়েছে। তিনি বলেন, ইসরাইলিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু শেখেনি। তারা চায় যা তাদের সঙ্গে ঘটেছে, সেটাই আরবদের ওপর চাপিয়ে দিতে। সমাধান প্রসঙ্গে মাহাথির বলেন, একমাত্র যুক্তিসঙ্গত পথ হলো দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান। তবে বাস্তবে তা কার্যকর হতে অনেক দেরি এবং তিনি নিজ জীবদ্দশায় তা দেখবেন না।

তিন দফা হার্ট অ্যাটাকের পরও বেঁচে থাকা মাহাথির মালয়েশিয়ার দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা নেতা। তার ক্ষমতার মোট মেয়াদ ২৪ বছর। তার জন্ম ১০ জুলাই ১৯২৫ সালে, মালয়েশিয়ার কেদাহ প্রদেশে। তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ১৯৮১ থেকে ২০০৩। চমকপ্রদ প্রত্যাবর্তন হয় তার ২০১৮ সালে, ৯২ বছর বয়সে।  সর্বশেষ পদত্যাগ করেন ২০২০ সালে। ডাক্তারি পেশা থেকে রাজনীতিতে আসা এই নেতা মালয়েশিয়াকে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে আধুনিক শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে রূপ দেন। মাহাথির ১৯৭০-এর দশকে চীন সফরের স্মৃতি মনে করলেন- তখন দেশটি ছিল দরিদ্র, গাড়িও ছিল হাতেগোনা। অথচ আজ চীন বৈশ্বিক শক্তি, বিশেষত বৈদ্যুতিক গাড়িতে পশ্চিমকে টক্কর দিচ্ছে।

তিনি বলেন, চীন ১০ বছরের মধ্যে আমেরিকার সমান হবে। তারপর আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে। চীন একাই ইউরোপ ও আমেরিকার চেয়ে বড় বাজার। চীনারা পরিশ্রমী এবং ব্যবসায় খুবই দক্ষ। অন্যদিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নীতি নিয়ে সমালোচনা করেন। বলেন,  আমেরিকায় উৎপাদন ফিরিয়ে আনতে চাইলে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। ফলে আমেরিকা আর বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না।

১০০ বছর বয়সেও মাহাথির প্রতিদিন হাঁটেন, ব্যায়াম করেন, অফিসে যান, অতিথিকে অভিবাদন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন এবং বিদেশ ভ্রমণ করেন। দীর্ঘায়ুর রহস্য সম্পর্কে তিনি বলেন, শরীর-মন সক্রিয় রাখো, আর বেশি খেও না। আমার মায়ের সেরা উপদেশ ছিল- ‘খাবার যখন সবচেয়ে সুস্বাদু লাগে, তখন খাওয়া বন্ধ করো।’