Friday, March 4, 2016

‘বেকার’ শিক্ষা এবং প্রতিবন্ধী মাহাফুজারের প্রতিবাদ by সোহরাব হাসান

টেলিফোনে যখন মাহাফুজার রহমানের সঙ্গে কথা বলি, তখন তাঁকে আত্মপ্রত্যয়ী মনে হলো। তিনি একজন প্রতিবন্ধী। শৈশব থেকে তাঁর একটি হাত অকেজো। তিনি এক হাতেই দৈনন্দিন কাজকর্ম ও পড়াশোনা করে এসেছেন। এসএসসি ও এইচএসসিতে প্রথম বিভাগ পেয়েছেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে দ্বিতীয় বিভাগ। এরপর চাকরির পরীক্ষায় পাস করেও চূড়ান্ত নিয়োগ না হওয়ায় নিজের সব কটি মূল সনদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফিরিয়ে দিতে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি লালমনিরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দিয়েছেন। প্রশাসনিকভাবে রীতিসম্মত না হলেও মানবিক কারণে তাঁর আবেদনপত্রের সঙ্গে ওই সনদগুলো জমা নেওয়া হয় বলে প্রথম আলোর খবরে বলা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদনপত্রে মাহাফুজার রহমান উল্লেখ করেন, লালমনিরহাট সদর উপজেলার রতিপুর গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তিনি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। ২০১২ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। জেলার পাঁচটি উপজেলায় লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৪৫ জনের মধ্যে মাহাফুজার রহমান একমাত্র শারীরিক প্রতিবন্ধী হিসেবে মৌখিক পরীক্ষা দেন। এ সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৩ বছর। চূড়ান্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যান্য কোটা পূরণ করা হলেও প্রতিবন্ধী কোটা পূরণ করা হয়নি। এরপর সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের লিখিত পরীক্ষায় পাস করার পরও তাঁকে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তিনি জানান, ওপরের মামা, খালু বা অর্থ না থাকায় তিনি ও তাঁর স্ত্রী নাসরিন নাহার উচ্চশিক্ষিত হয়েও বেকার জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁদের সংসারে মোতাসসীম ফুয়াদ লামীম নামের ১ বছর ৮ মাসের একটি ছেলেশিশু রয়েছে।
মাহাফুজারের বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক মো. সৈয়দ আলী বলেন, ‘ছেলেটি বা তাঁর স্ত্রী একটি চাকরি পেলে আমি মরেও শান্তি পেতাম। কিন্তু কোথাও কোনো আলোর দেখা না পেয়ে সে তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সব মূল সনদ সরকারের কাছে হস্তান্তরের জন্য জেলা প্রশাসককে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
একজন মানুষ কতটা আশাহত হলে তাঁর শিক্ষাগত সনদগুলো ফেরত দিতে পারেন! নদীতে নৌকা ডুবে গেলেও মানুষ খড়কুটো ধরে পাড়ে উঠতে চায়। কিন্তু মাহাফুজার বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বনই খুঁজে পাচ্ছেন না। একজন প্রতিবন্ধী মানুষের এই আকুতি রাষ্ট্র শুনবে না?
২.
মাহাফুজারের ঘটনাটি আমাদের ‘বেকার’ শিক্ষাব্যবস্থার করুণ চিত্রই তুলে ধরে। তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি পাননি। কেননা, কর্তৃপক্ষ প্রতিবন্ধী কোটা পূরণকে গুরুত্ব দেয়নি এবং তাঁকে উপেক্ষা করেছে। কিন্তু হাজার হাজার সাধারণ উচ্চশিক্ষিত তরুণ একটি চাকরির জন্য বছরের পর বছর জুতোর সুকতলি ক্ষয় করছেন, তাঁদেরও কোনো সান্ত্বনা নেই। এই রাষ্ট্র, এই শিক্ষাব্যবস্থা অমিত সম্ভাবনাময় তরুণদের প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে আসছে। শিক্ষার অর্থ নিজেকে ও সমাজকে যোগ্য করে তোলা। যে শিক্ষা ব্যক্তি বা সমাজের কোনো কাজে আসছে না, সেই শিক্ষা নিয়ে কী লাভ? শিক্ষার নামে আর কত বেকার তৈরি করব আমরা?
সহযোগী একটি দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা সংগতিপূর্ণ না হওয়ায় দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। প্রতিবছরই উচ্চশিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে আসা শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক বেকার থাকছেন অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট-এর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার। ভারতে এ হার ৩৩ শতাংশ, নেপালে ২০ শতাংশের বেশি, পাকিস্তানে ২৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এই প্রতিবেদন দুই বছর আগের। বর্তমানে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আরও বেশি। বিশ্বব্যাংক মনে করে, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। এর ওপর এখন প্রতিবছর নতুন করে ১৩ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যোগ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন (আইএলও) বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান ১২তম। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ২০১২ সালের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশে প্রতিবছর ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু কাজ পায় মাত্র সাত লাখ। বেকারদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত, অর্থাৎ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যাঁরা শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন, তাঁরাও আছেন।’
একদিকে দেশে উচ্চশিক্ষার হার বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বেকারত্ব। এর কারণ আমরা যে শিক্ষা দিচ্ছি সেটি কাজের নয়। দ্বিতীয়ত, দেশের উন্নয়নের জন্য যে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন, সেটি আমরা দিতে পারছি না। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট যাকে বলেছে ‘হাই ইউনিভার্সিটি এনরোলমেন্ট, লো গ্র্যাজুয়েট এমপ্লয়মেন্ট’। ঊর্ধ্বমুখী উচ্চশিক্ষা, নিম্নমুখী কর্মসংস্থান। ২০০৪-১১ সালে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় যুক্ত হওয়ার সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। মাধ্যমিক উত্তীর্ণদের উচ্চশিক্ষায় যুক্ত হওয়ার হার ২০০৪ সালে ছিল ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১১ সালে হয়েছে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে নারীশিক্ষা। কিন্তু সেই অনুযায়ী শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বাড়েনি।
পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামোয় তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিজাত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ এবং তৈরি পোশাক খাত, পর্যটন ও পর্যটনসেবা, হালকা কারিগরি নির্মাণ খাতকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এসব খাতের জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত যথাযথ কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন (বিশেষায়িত ও সাধারণ) কর্মীর প্রচণ্ড অভাব রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র সেই অভাব পূরণে সচেষ্ট না থেকে এমন সব বিষয়ে উচ্চশিক্ষা দিচ্ছে, শ্রমবাজারে যার কোনো চাহিদা নেই। স্বাধীনতার পর গেল শতকের সত্তর ও আশির দশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই দেশের আনাচকানাচে বিদ্যালয় ও কলেজ করার হিড়িক পড়ে এবং বাছবিচারহীনভাবে এগুলো এমপিওভুক্ত হয়ে যায়। এসব প্রতিষ্ঠানের পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও তা জাতীয় উন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখছে, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যাঁরা ডিগ্রি নিয়ে বের হন, তাঁদের বেশির ভাগই চাকরি পান না। এমনকি গত দেড়-দুই দশকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে নতুন নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে, তার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দেশে আমরা যোগ্য কর্মী তৈরি করতে পারিনি বলেই পোশাক কারখানা, বায়িং হাউসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি কর্মীকে নিয়োগ করা হয়েছে। এমনকি আমরা বেসরকারি হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক নার্স তৈরি করতে পারিনি। ফলে বিদেশ থেকে নার্স আনতে হচ্ছে। আবার দেশে ডিগ্রি নেওয়া নার্সরা কাজ পাচ্ছেন না। গোটা শিক্ষাব্যবস্থাতেই চলছে এই বৈপরীত্য। বর্তমান সরকার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কৃতিত্ব দাবি করে। কিন্তু সেই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কোন খাতে কতজন দক্ষ কর্মী প্রয়োজন, কতজন কর্মী তৈরি করা হবে, তার রূপরেখা সেখানে নেই। যে শিক্ষা সময়ের চাহিদা মেটাতে পারে না, সেই শিক্ষা দিয়ে আমরা কী করব? জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেয়ে বেশি জরুরি অর্থনীতি ও মানুষের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি করা।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন মতে, ২০১৪ সালে ৩৪টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করেছেন ৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৮২ জন। ওই বছর ৭৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন ৬৫ হাজার ৩৬০ জন। সব মিলিয়ে ৫ লাখ ৫০ হাজার ৩০২ জন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করলেও বছরে এ পরিমাণ চাকরির সুযোগ নেই দেশে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিনিয়োগ বোর্ডে নিবন্ধিত শত ভাগ বিনিয়োগও যদি বাস্তবায়ন হয়, তাতেও মোট কর্মসংস্থান হওয়ার কথা ২ লাখ ২৬ হাজার ৪১১ জনের। আদতে নিবন্ধনের অর্ধেকও শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ হয় না।
বেসরকারি খাতের বাইরে শিক্ষিতদের চাকরি পাওয়ার দ্বিতীয় উপায় হলো সরকারি চাকরি। গত পাঁচ অর্থবছরে সরকারি খাতে কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে মোট নিয়োগ পেয়েছেন ২ লাখ ৬৬ হাজার ২৭৫ জন। এর মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫০ হাজার ৪৭৩ জন, ২০১৩-১৪-তে ৫৯ হাজার ১৩২ জন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৯ হাজার ৭৫২ জন, ২০১১-১২-তে ৫১ হাজার ০১৩ জন এবং ২০১০-১১ অর্থবছরে ৭৫ হাজার ৯০৫ জন। এই পাঁচ অর্থবছরে সরকারি চাকরিতে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ৬০ হাজার ২৯২ জন। তাঁদের সবাই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করা। এই পাঁচ বছরে কর্মচারী পদে নিয়োগ পেয়েছেন ২ লাখ ৫ হাজার ৯৮৩ জন। এঁদের প্রায় অর্ধেক স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস করা। বাকিরা অষ্টম শ্রেণি, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করা।
সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে প্রায় আড়াই লাখ পদ শূন্য থাকলেও পূরণের কোনো উদ্যোগ নেই। এমনকি বিসিএস পরীক্ষা দিয়েও মেধাবী তরুণদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। সম্প্রতি ৩৭তম বিসিএসের পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণরা এখনো নিয়োগ পাননি। ফলে বেকারত্ব, বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারত্বের বিষয়টি বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থায় এসে ঠেকেছে। দেশে কর্মসংস্থান নেই। তাই তরুণেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু বিদেশেও শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এই যে প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন, তাঁদের প্রতি কি রাষ্ট্রের কোনোই দায়িত্ব নেই?
৩.
লেখাটি শুরু করেছিলাম একজন প্রতিবন্ধী উচ্চশিক্ষিত মানুষের আকুতি ও প্রতিবাদের ঘটনা নিয়ে। মাহাফুজার রহমান প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিকার চেয়েছেন। চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর জন্য সংরক্ষিত কোটায় তাঁকে চাকরি দেননি। এর প্রতিবাদে তিনি তাঁর শিক্ষাগত সনদগুলো ফেরত দেওয়ার কথাও বলেছেন। একজন প্রতিবন্ধীর প্রতি এ কেমন নিষ্ঠুর আচরণ! বিষয়টির প্রতিকার হওয়া প্রয়োজন। প্রতিকার হওয়া প্রয়োজন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার স্তরে স্তরে যে খামখেয়ালিপনা রয়েছে, তারও।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

মায়ের স্বীকারোক্তি রহস্য রয়েই গেল

শুনলে যে কারো অবিশ্বাস্য মনে হবে। কিন্তু মায়ের নিজের স্বীকারোক্তি। নিজ হাতেই খুন করেছেন দুই সন্তানকে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন তিনি। এ কারণে হঠাৎ করেই তিনি নিজের সন্তানদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। মেয়ের কাছে থাকা নিজের ওড়না দিয়েই গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন নাড়ি ছেঁড়া ধনটিকে। মেয়েকে হত্যার পর ঘুমন্ত ছোট্ট ছেলেকেও হত্যা করেন একই কায়দায়। মায়ের এই স্বীকারোক্তি প্রথমে বিশ্বাস করতে চাননি র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তারাও। বিস্মিত হন সবাই। এ কি করে সম্ভব! নেপথ্য কারণ অন্য কিছু থাকতে পারে বলে ধারণা ছিল সবার। একারণে রাতভর চলে জোর প্রচেষ্টা। নানা কায়দায়, নানা কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে। কিন্তু মায়ের একই স্বীকারোক্তি। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, এটাই একমাত্র কারণ। পরে অবশ্য আফসোস করেছেন। বলেছেন, দুশ্চিন্তা উপশমের জন্য যদি মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতেন তবে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। দুই সন্তানকে হত্যার স্বীকারোক্তি মা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু রহস্য রয়েই গেল, সঙ্গে অনেক প্রশ্নও। ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কি মা তার সন্তানদের মেরে ফেলতে পারেন?
গত সোমবার রাজধানীর রামপুরা এলাকার বনশ্রীর বি ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলার একটি বাসা থেকে দুই ভাইবোনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নেয়া হয়। রাত ৮টার দিকে হাসপাতালে নেয়ার পরপরই কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। নিহত দুই শিশুর মধ্যে ১৪ বছর  বয়সী নুসরাত আমান অরণী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইস্কাটন শাখার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। আর তার ছোটভাই আলভী আমান (৬) পড়তো হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের নার্সারিতে। তাদের বাবা আমানুল্লাহ একজন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। আর যেই মায়ের বিরুদ্ধে শিশু সন্তানদের হত্যার অভিযোগ, তার নাম মাহফুজা মালেক জেসমিন। তিনি ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলেও ছিলেন সাধারণ গৃহিণী।
গতকাল দুপুরে সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘দুশ্চিন্তার একপর্যায়ে’ নিজের ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে ছেলে-মেয়েকে হত্যা করেন তাদের মা মাহফুজা মালেক জেসমিন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পরিকল্পিতভাবে সন্তানদের হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। পরে নিজে বাঁচতে চাইনিজ খাবার খেয়ে বিষক্রিয়ায় তারা মারা যায় বলে মা প্রচার করেন। জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘গত ২৯শে ফেব্রুয়ারি মেয়ে অরণী যখন গৃহ শিক্ষকের কাছে পড়ছিল, তার মা ও ভাই তখন শোবার ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন। গৃহ শিক্ষক চলে যাওয়ার পর মাহফুজা তার মেয়েকেও ঘুমাতে ডাকেন। অরণী বিছানায় যাওয়ার পর মাহফুজা তার ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে মেয়েকে শ্বাসরোধ করেন। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তিতে মেয়ে বিছানা থেকে পড়ে যায়। মেয়ের মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হওয়ার পর ছেলেকেও একইভাবে ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে হত্যা করেন।’ মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পর প্রথমে সে ঘটনা গোপন করার জন্য স্বামীকে ফোন করে ছেলেমেয়ের অসুস্থতার কথা বলে। আমানুল্লাহ তখন দুই বন্ধুকে বাসায় পাঠায়। বাচ্চাদের হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার পর পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে তাদের মনে হয়েছে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পরিবারের লোকজন জড়িত থাকতে পারে। একারণে ঘটনার পরপরই র‌্যাব বাসার দারোয়ান, দুই গৃহ শিক্ষক ও দুই আত্মীয়কে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বনশ্রীর বাসায় অবস্থানকারী অরণী ও আলভীর দাদি র‌্যাব কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তিনি বিকালে অরণীর গৃহ শিক্ষক চলে যাওয়ার পর ঘর থেকে কারও কান্নার শব্দ পান। এ সময় তিনি জেসমিনের ঘরের দরজা বন্ধ পান। কয়েক মিনিট পরে জেসমিন তাকে দুই সন্তান আর পৃথিবীতে নেই বলে জানায়।
যেভাবে স্বীকারোক্তি দেয় জেসমিন: বিষক্রিয়ায় নয় দুই শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা এমন ধারণা করার পর পরই পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সন্দেহ করা দুই শিশুর নিকটাত্মীয়দের। এ ছাড়া ঘটনার পরদিন বাবা-মা ও খালা হাসপাতালের মর্গে না গিয়ে জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ায় সন্দেহ আরও বাড়ে। একারণে বুধবার নিকটাত্মীয়দের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জামালপুরের বাসা থেকে নিহত দুই শিশুর বাবা আমানউল্লাহ, মা মাহফুজা মালেক জেসমিন, খালা আফরোজা মালেক নীলাকে ঢাকায় আনা হয়। উত্তরায় র‌্যাব-১ এর কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদে নিহত দুই শিশুর মা আগের অবস্থানে অনড় থাকেন। তবে বারবার বিভিন্ন কায়দায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে রাত ৯টার দিকে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারেননি তিনি। একপর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাদের কাছে সব খুলে বলেন তিনি। কীভাবে এবং কেন দুই সন্তানকে হত্যা করেছে খুলে বলেন তার বিস্তারিত বিবরণ। এই বিবরণ শুনে রীতিমতো চমকে ওঠেন র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তারা। হত্যাকাণ্ডের কারণ শুনে বিস্মিত হন সবাই। বিশ্বাসযোগ্য না হওয়ায় বারবার মূল কারণ জানতে চাওয়া হয় তার কাছে। কিন্তু ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ দুশ্চিন্তার কারণেই হত্যা করেছেন বলে বলতে থাকেন বারবার। মায়ের এই স্বীকারোক্তি শুনে ‘থ’ বনে যান দুই শিশুর বাবা আমানউল্লাহ। তিনি যেন বিশ্বাস করতেই পারছিলেন না। পরে তাদের মুখোমুখি করা হয়। আমানউল্লাহর কাছেও একই কথা স্বীকার করেন জেসমিন। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে.কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, মায়ের মুখে স্বীকারোক্তি শুনে আমরাই বিস্মিত হয়ে গিয়েছি। এখন এর নেপথ্যে আর কোনো কাহিনী আছে কিনা তা তদন্ত কর্মকর্তা খুঁজে বের করতে পারবেন।
জিজ্ঞাসাবাদে যা বলেছেন: দুই সন্তানের ঘাতক এই মাকে জিজ্ঞাসাবদ করার সময় রেকর্ড করা একটি অডিও রয়েছে এই প্রতিবেদকের কাছে। ওই অডিওতে শোনা যায়, হত্যার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদকারীরা জানতে চাইলে জেসমিন বলছেন, ‘অন্তত এই আমি সারাক্ষণ এরা পড়াশোনা পারবে না, কিচ্ছু করতে পারবে না, সব সময় খুব ভয় লাগতো আমার।’ ছেলেমেয়েদের পড়াশুনায় কি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন জানতে চাইলে জেসমিন বলেন, ‘তিন জন টিচার ছিল।’ কেন সন্তানদের মেরেছে আবারও জানতে চাওয়া তার কাছে। জেসমিনের উত্তর- ‘আমার মনের মধ্যে, মাথার ভেতর সবসময় এটা কাজ করতো যে ছেলেমেয়েগুলো বোধহয় পড়াশুনায় পারবে না, কিচ্ছু পারবে না। এদের দ্বারা কিচ্ছু হবে না।’ জেসমিনের পারিবারিক অবস্থার কথা জিজ্ঞাসাবাদকারীরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের সহায়-সম্পত্তি তেমন বেশি নাই, আমার হাজব্যান্ড ব্যবসা করে এই।’ গ্রামের বাড়ি সম্পর্কে বলেন, ‘আমার হাজব্যান্ডের মেইন বাড়ি ইসলামপুর। আমার বাড়ি জামালপুর সদরে।’ আবারও প্রশ্ন করা হয় তাকে কেন মারলা? কোনও মা কি সন্তানদের মারতে পারে? জেসমিনের উত্তর ছিল- ‘এইরকম কেউ মারে না। কিন্তু কষ্ট থেকে.. মানে.. ফেব্রুয়ারি মাসের ৪ তারিখ থেকে প্রতিদিন আমি ঘুমাতে পারতাম না। মানে রাত ৩টা বাজলে সারাক্ষণ ওদের পড়া নিয়ে টেনশন, ওরা কি করবে না করবে এই টেনশন করতাম।’ জানতে চাওয়া হয় বাচ্চা দুটো প্রকৃতই তার কি না। উত্তরে জেসমিন বলেন, ‘বাচ্চা দুটাই আমার। বাচ্চা দুটোই সিজার করে হয়েছে। আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। বাচ্চা দুটোকে মেরে ফেলার পর আমার অনেক অনুশোচনা হয়েছে। অনেক কান্না করছি। তারপর থেকে আমার মনে হয় চোখের পানি শুকায়া গেছে। এখন আমার মনে হয় আমি যদি বাচ্চা দুইটাকে কাছে পাইতাম, ওদের একটু জড়ায়া ধরতে পারতাম। তাহলে মনে হয় আমার চোখের পানিটা ফিরা আসতো।’ হত্যাকাণ্ডের পর কাউকে এ ঘটনা বলেছিল কিনা তা জানতে চাওয়া হয় জেসমিনের কাছে। জেসমিন বলেন, ‘মারার পর আমি কাউকে বলি নাই। আমি বাঁচতে চাইছিলাম আবার। বিপদ থিকা আবার বাঁচতে চাইছিলাম। মানে যা হবার তা তো হইছেই, এখন যদি আমি বলি তাহলে তো আমি ধরা পড়ে যাবো, আমার নির্ঘাত ফাঁসি হয়ে যাবে। আমি যদি বাঁচতে পারি তাহলে আমি নতুন করে আমার জীবনটাকে শুরু করতে পারবো। এই জন্য আমি কাউরে বলি নাই।’ স্বামীকে বলেছিল কিনা জানতে চাওয়া হয় আবার। জেসমিন বলেন, ‘আমার স্বামীকে আমি কখনই বলি নাই এই কথা। ও সারাদিন ব্যবসা নিয়ে তো ব্যস্ত থাকতো। আমি নিজে ভিতরে ভিতরেই অনেক ই হয়ে গেছিলাম। আসলে আমার মনে হয় তখনই যদি আমার স্বামীকে বলতাম, আমার বোনকে বলতাম, আমি যদি একটা ডাক্তারের কাছে যাইতাম, তাহলে আজকে এই এক্সিডেন্টটা...আমি জীবনে কোনদিন কল্পনা করি নাই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।’ জেসমিন বলতে থাকেন, ‘আমার মনের কষ্টটা, মনের কথাগুলা তার সঙ্গে শেয়ার করি নাই। আমি পড়াশুনা নিয়ে কথা বললে সে বলতো পড়াশুনা নিয়ে বেশি কথা বইলো না, যা হয় তাই হবে। কিন্তু আমার নিজের মনকে ই দিতে পারতাম না, সায় দিতে পারতাম না। আমার নিজের মনকে কখনই বুঝ দিতে পারতাম না, যে ওরা পারবে না, না ওরা কেন পারবে না? ওরা ভালো করবে।’ সে নিজে পড়াশুনায় কেমন ছিল জানতে চাইলে জেসমিন বলেন, ‘আমি পড়াশুনায় ভালো ছিলাম না। আমি হাউজ ওয়াইফ।’ হত্যাকাণ্ডের সময় ঘরে কে কে ছিল? জেসমিন বলেন, ‘আমি, আমার মেয়ে আর ছেলে। আর কোনও লোক ছিলো না। আর কোনও লোক ছিল না।’ কিভাবে মেরেছো জানতে চাইলে ঘাতক মা বলেন, ‘আমার মেয়ে আমার ওড়নাটা পরতো। আমি ওই ওড়নাটা গলায় পেঁচায়া ধরি। তারপর মেয়ে নিচে পড়ে যায়। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর মেয়ে নিস্তেজ হয়ে যায়। তারপর ছেলেটাকে ধরি। ছেলেটা তখন ঘুমানো ছিল। ঘুমন্ত অবস্থাতেই পেঁচায়া ধরি।’
মামলার বাদী হচ্ছেন বাবা: জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রামপুরার দুই শিশু হত্যার ঘটনায় আটককৃত মাহফুজা মালেক জেসমিন ও খালা আফরোজা মালেক নীলাকে গতকাল রামপুরা থানায় হস্তান্তর করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত দুই সন্তানের বাবা গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আমানউল্লাহর বাদী হয়ে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-পুলিশের কর্মকর্তারা। মামলায় মা মাহফুজা মালেক জেসমনিকেই একমাত্র আসামি করা হবে। খালাকে করা হবে সাক্ষী। বাকিদের যাচাই-বাছাই করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম রাত ৮টায় এই প্রতিবেদককে জানান, মামলা হয়নি। তবে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

কানাডায় একদিনের প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় তরুণ

রূপকথার গল্পকে বাস্তবে রূপ দিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। একদিনের জন্য প্রাবজ্যোতি লক্ষ্মণ পালকে প্রতীকী প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে নিজের চেয়ার ছেড়ে দিলেন তিনি। আর এর মধ্য দিয়েই কল্পনার এইম ইন লাইফ সত্যি হল ভারতীয় বংশোদ্ভূত তরুণ লক্ষ্মণ পালের। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, হডজকিন’স লিম্ফোমা নামের এক ধরনের জটিল ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রাভজোতি লক্ষ্মণ পাল। এ ধরনের ক্যান্সার আক্রান্তদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। প্রাভজোতি সুযোগ পেয়েছিলেন কানাডার ইচ্ছে পূরণ বা ‘মেক আ উইশ’ কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার।
সাধারণত কানাডায় মরণব্যাধিতে আক্রান্ত কিশোর-তরুণরা তাদের বিশেষ ইচ্ছে প্রকাশের সুযোগ পান। আর কর্মসূচির আয়োজকদের চেষ্টা থাকে সেই ইচ্ছে পূরণের। মেক আ উইশ ফাউন্ডেশন কানাডার পক্ষ থেকে যখন তার কাছে জানতে চাওয়া হয় তার ইচ্ছে সম্পর্কে। তখন প্রাভজোতি জানান, তিনি সে দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চান। মেক আ উইশ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রাভজোতের ওই ইচ্ছের কথা যখন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর কানে পৌঁছে তখন তিনি এটি সত্যি করতে চেষ্টা করেন। তার চেষ্টায় একদিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভূমিকা পালন করেন প্রাভোজতি। ১৭ ফেব্র“য়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ট্রুডোর চেয়ারে বসে গোটা দিন পার করেছেন প্রাভজোত। তখন জাস্টিন ট্রুডো একটি সাধারণ চেয়ারে আসন গ্রহণ করেন।

ট্রাম্পবিরোধী জোট করছে রিপাবলিকান!

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি থেকে পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা। রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রার্থী হিসেবে ট্রাম্প সাতটি অঙ্গরাজ্যে জয় পাওয়ার পরও এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। এরই মধ্যে রিপাবলিকানদের ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জোট করার আহ্বান জানিয়েছে এ দলেরই আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী টেড ক্রুজ। ট্রাম্প নিজেকে ‘সমন্বয়কারী’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে রিপাবলিকান পার্টির প্রবীণ নেতারা দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এগিয়ে যাওয়াকে ভালো চোখে দেখছেন না। তাদের মতে, ট্রাম্প ‘বিভাজনকারী’ এবং রিপাবলিকান পার্টি থেকে মনোনয়ন পেলেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক প্রার্থীর কাছে পরাজিত হবেন। হাউস স্পিকার পল রায়ানসহ রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজন শীর্ষ নেতা ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নানা নীতি ও অবস্থানের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। সাউথ ক্যারোলিনা থেকে রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বুধবার সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ট্রাম্প নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয় এড়াতে পারবেন না।
রিপাবলিকান পার্টির সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মিট রমনি জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার) তিনি একটি বিবৃতি দেবেন। সেখানে তিনি ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ জানাবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। মিট রমনি ট্রাম্পের ব্যাপক সমালোচনা করে বলেন, ট্রাম্প অভিবাসন ও অন্যান্য কয়েকটি ইস্যু নিয়ে যেভাবে কথা বলছেন, তাতে সবাই রিপাবলিকান পার্টিকে একটি গোড়াপন্থি দল হিসেবেই মনে করবে। মঙ্গলবার ডোনাল্ড ট্রাম্প তথাকথিত ‘সুপার টুইসডে’ নির্বাচনে জয়ী হয়ে রিপাবলিকান থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতা অনেকটা পাকাপোক্ত করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ভার্জিনিয়া এবং ম্যাসাচুসেটসসহ সাত রাজ্যে জয়ী ট্রাম্পের ধারে কাছেও কেউ নেই। তবে টেক্সাস, আলাস্কা ও ওকলাহোমাতে বিজয় অর্জন করেছেন সিনেটর টেড ক্রুজ। আর সিনেটর রুবিও, যাকে অধিকাংশ রিপাবলিকান নেতা সবচেয়ে ‘নির্বাচনযোগ্য প্রার্থী’ হিসেবে মনে করেছেন, তিনি সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে শুধু মিনেসোটায় সামান্য ব্যবধানে জয় লাভ করেছেন। রিপাবলিকান নেতৃত্ব ট্রাম্পের পরিবর্তে একজন বিকল্প প্রার্থী খুঁজছে বলে জানা গেছে। আর এ কথা তারও অজানা নয়। এই বিষয়টিকে খেয়াল করেই ট্রাম্প প্রথমবারের মতো রিপাবলিকান নেতৃত্বের প্রতি নিজের কণ্ঠ নরম করেছেন। তিনি নিজেকে একজন ‘সাধারণ রক্ষণশীল’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি একজন ঐক্যবদ্ধকারী।
এসবের শেষে আমি এক ব্যক্তির বিপরীতেই লড়ব, আর তিনি হিলারি ক্লিনটন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি রিপাবলিকান দলের ভিত্তি সম্প্রসারিত করতে পেরেছি। আমি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম, সবাই যদি আমার পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে নভেম্বরে আমাদের বিজয় অনিবার্য।’ টেক্সাসে বিজয় অর্জনের পর সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে টেড ক্রুজ দাবি করেন, রিপাবলিকান দলে একমাত্র তিনিই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরাস্ত করতে সক্ষম। রণে ভঙ্গ দিচ্ছেন বেন কার্সন : মার্কিন নির্বাচনের রণাঙ্গন থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন রিপাবলিকান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী বেন কার্সন। বুধবার অবসরপ্রাপ্ত এ শল্যচিকিৎসক বলেন, সুপার টুয়েসডের ফলাফলের পরে রাজনৈতিক মাঠে অগ্রসর হওয়ার আর কোনো সুযোগ আমি দেখছি না। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি অঙ্গরাজ্যের প্রাক-নির্বাচনী ভোটে মাত্র ৩ জন ডেলিগেট পেয়ে এ পর্যন্ত সর্বমোট ৮ জন ডেলিগেটের সমর্থন অর্জন করেন তিনি। খবর এএফপির। ডেট্রোয়েট শহরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বৃহস্পতিবারের রিপাবলিকান ডিবেটে তার অংশগ্রহণ না করার কথা রয়েছে। এমনটাই ঘোষণা দিয়েছিলেন কার্সন।

শেষ দৃশ্যের ‘মহানায়ক’ মাহমুদউল্লাহ

খুব বেশি দিন হয়নি, বাংলাদেশের টি ২০ দলে মাহমুদউল্লার জায়গা নিয়ে টুকটাক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। সেই মাহমুদউল্লাহ এখন দলের ‘এমভিপি’, ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার’!ছক্কা-কাহন পাকিস্তানের বিপক্ষে মাহমুদউল্লাহর জয়সূচক বাউন্ডারি হয়তো বাংলাদেশের ক্রিকেটগাথার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে। উইকেটে গিয়েই মাশরাফি মুর্তজার দুটি বাউন্ডারিও লোকের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে অনেক দিন। লোকে শেষটাই মনে রাখে। আরেকটু পেছনে যাওয়া যাক।
ম্যাচের সেটি ১৭তম ওভার, রান-বলের টানাপোড়েনে ম্যাচ পেন্ডুলামের মতো দুলছে- এই অবস্থা থেকে কত টি ২০ হেরেছে বাংলাদেশ। জমছে চাপ, বাড়ছে টেনশন। হঠাৎ একটি শট বদলে দিল আবহ। ধারাভাষ্য কক্ষে ‘প্রফেসর’ ডিন জোন্স বললেন, ‘সম্ভবত টুর্নামেন্টের সেরা শট’! ৭ ফুট ১ ইঞ্চি লম্বা মোহাম্মদ ইরফানের শট অফ লেংথ বল, অ্যাঙ্গেলে বেরিয়ে যাচ্ছে। চকিতে একটু জায়গা বানিয়ে সেটিকে ব্যাকফুট অফ ড্রাইভে লং অফের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দেয়া; পেশির শক্তি নয়, ব্যাটের মনোমুগ্ধকর ছোঁয়ায়। শুধু শটের ক্রিকেটীয় বিচারেই টুর্নামেন্টের সেরা শট মাহমুদউল্লাহর ওই ছক্কা। ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শটের ওজন বাড়ছে আরও। দুলতে থাকা ম্যাচ ওই শটেই বাংলাদেশের দিকে হেলে পড়া শুরু। তবে এই ছক্কার শট নিয়ে এত আলোচনা শুধু পাকিস্তান ম্যাচের প্রেক্ষাপটেও নয়। আগের ম্যাচে শ্রীলংকার বিপক্ষেও একটি ছক্কা মেরেছিলেন মাহমুদউল্লাহ, তার আগের ম্যাচে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুটি। টি ২০ ক্যারিয়ারে এই প্রথম, টানা তিন ইনিংসে ছক্কা মারলেন মাহমুদউল্লাহ। ছক্কা নিয়ে এত গুণগানের কারণ বুঝতে হলে যেতে হবে আরেকটু পেছনে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি, মিরপুর শেরেবাংলায় অনুশীলন শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ। টি ২০ ম্যাচ বা সিরিজ প্রসঙ্গে মাহমুদউল্লাহকে পাওয়া মানেই একটি প্রশ্ন প্রায় অবধারিত, টি ২০তে তার ভূমিকা বা সামর্থ্য জাতীয় কিছু।
এবার প্রশ্ন হল। মাহমুদউল্লাহ ঝটপট বললেন, ‘এবার প্রতি ম্যাচে গিয়েই প্রথম বলে ছক্কা মারার চেষ্টা করব।’ মাহমুদউল্লাহর মুখে ছিল হাসি, উচ্চারণে ছিল না ঝাঁঝ। তবে কে জানে, হয়তো ওই মিষ্টি হাসি আর নরম কথায় লুকিয়ে ছিল ক্ষোভ, ‘কেন এত প্রশ্ন’; হয়তো লুকিয়ে ছিল প্রতিজ্ঞা, ‘এবার দেখিয়ে দেব!’ আক্ষরিক অর্থেই প্রথম বলে পারেননি, তবে সবশেষ তিন ম্যাচেই উইকেটে যাওয়ার খানিক পরই মাহমুদউল্লাহর ব্যাট থেকে এসেছে ছক্কা। টি ২০ জয় ছক্কা মারার সবশেষ এই তিন ম্যাচেই তিনি অপরাজিত। ৩৬, ২৩, ২২... ছোট্ট কিন্তু দলের জন্য অমূল্য; তিনটি ইনিংসই যে জিতিয়েছে দলকে! টুর্নামেন্টে চার ইনিংসে রান ৮৮। গড়ও সেটিই ৮৮, কোনো মানদণ্ড বেঁধে না নিলেও এই গড় টুর্নামেন্টের সেরা! স্ট্রাইকরেট ১৪৬.৬৬, অন্তত ২৫ রান করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে টুর্নামেন্টসেরা। সেরা গড়, সেরা স্ট্রাইকরেট। পাশাপাশি বল হাতে চার উইকেটও। টি ২০-র আদর্শ প্যাকেজ। অথচ টি ২০তে তার উপযোগিতা-কার্যকারিতা নিয়ে সংশয়ে থাকার লোকের অভাব ছিল না। কঠোর অধ্যবসায়, পরিশ্রম, শেখার ক্ষুধা ও তাড়না দিয়ে ক্যারিয়ারের আরও চ্যালেঞ্জ জয় করেছেন মাহমুদউল্লাহ। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই মাহমুদউল্লাহকে দেখে আসছেন মাশরাফি মুর্তজা। খুব কাছ থেকে দেখেছেন মাহমুদউল্লার ক্যারিয়ারের নানা ধাপ। তার টি ২০ সামর্থ্য নিয়ে সংশয়বাদীদের দলে কখনোই ছিলেন না বাংলাদেশ অধিনায়ক। ‘কথাটি আমি অনেকবারই বলেছি, রিয়াদ যেখানে ব্যাট করে, কাজটি খুব কঠিন। হয়তো দ্রুত উইকেট পড়ে যায়, নয়তো দ্রুত রান করতে হয়। অনেক সময় উইকেট ধরে রাখতে হয়, দ্রুত রানও করতে হয়। বিশ্বের কত বড় বড় নাম এসব সামলাতে পারেনি। রিয়াদ বাংলাদেশের জন সেটি দিনের পর দিন করে আসছে,’ মন্তব্য মাশরাফির। তবু প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্নের বর্শার ফলা মাহমুদউল্লাহ আপন করে নিয়েছেন, সেই ফলা দিয়েই আরও শানিত করেছেন নিজেকে। এশিয়া কাপে তাই ঝড়ো সুন্দর মাহমুদউল্লাহ। মাশরাফির মতে, ঝড় তোলার সামর্থ্যও মাহমদুউল্লাহর বরাবরই ছিল। ‘দেখুন, মাহমুদউল্লাহ কিন্তু অপ্রথাগত কোনো শট খেলেনি! এমন নয় যে ব্যাটিংয়ে অনেক কিছু যোগ করেছে টি ২০তে। শুধু ‘মাইন্ড সেট’ বদলেছে। আগে যেটা করেছে, সেটাও দলের জন্য কার্যকর ছিল। এখন হয়তো ঠিক করেছে শুরু থেকেই শট খেলবে। এখানেও সফল। ক্রিকেটার হিসেবে ওর সামর্থ্য বুঝিয়ে দিচ্ছে এটিই,’ মাশরাফির কথা। একজন ‘বিশ্বসেরা’ সামর্থ্য নিয়ে সংশয় না থাকলেও মাহমুদউল্লাহ যে নিজের খেলার নতুন দিগন্ত ক্রিকেটবিশ্বে উন্মোচিত করেছেন, এতে উচ্ছ্বসিত মাশরাফি। বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে বারবার যেভাবে উদ্ধার করছেন দলকে, একটা জায়গায় মাহমুদউল্লাহকে বিশ্বসেরাই বললেন বাংলাদেশ অধিনায়ক, ‘রিয়াদ যে পজিশনে খেলে,
সেখানে ‘সেন্সিবল’ ব্যাটিংয়ের প্রয়োজন হয়। কাজটা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ভীষণ কঠিন। রিয়াদ ঠিকই পরিস্থিতির বিচারে পারফেক্ট ব্যাটিং করে। উইকেট ধরে রাখে, স্ট্রাইক বদলায়, একই সঙ্গে আবার ঝড়ও তোলে। যদি শুধু এই পরিস্থিতিতে ‘সেন্সিবল’ ব্যাটিংয়ের কথা বলি, শুধু বাংলাদেশ কেন, বিশ্বেই ওর মতো আর কাউকে আমি দেখি না।’ এবং দল অন্তঃপ্রাণ মাশরাফির এই দলের মূল দর্শন আর সাফল্যের রেসিপি, দুটিই একই- টিম স্পিরিট। দলীয় ঐক্য, পারস্পরিক সৌহার্দ্য, দলের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেয়া। সর্বোপরি দল অন্তঃপ্রাণ হওয়া। মাহমুদউল্লাহর এসব একদমই সহজাত, বরাবরই এই দর্শনের অনুসারী! এমনিতে তাকে সবাই অন্তর্মুখী বলে জানলেও আপন আঙিনায় তিনি উচ্ছল। ড্রেসিংরুমে প্রাণশক্তির অন্যতম উৎস। মাতিয়ে রাখেন, নিজেও উপভোগ করেন। টিম মিটিংয়ে, দলের কৌশল নির্ধারণে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রয়োজনের সময় মাঠের ভেতরে-বাইরে সাকিব-তামিম-মুশফিকের মতো মাহমুদউল্লাহকেও পাশে পান মাশরাফি, ‘রিয়াদ খুবই সক্রিয়। লিডারশিপ ব্যাপারটা ওর সহজাত, নিজেও উপভোগ করে। দারুণ সব আইডিয়া নিয়ে আসে। দলকে চাঙা রাখতে পারে দারুণ।’
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

টেলিফিল্মে একসঙ্গে মৌসুমী-রিয়াজ

রিয়াজ ও মৌসুমী দু’জনই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় মুখ। চলচ্চিত্রে আরআহে একসঙ্গে কাজ করলেও এবার প্রথমবারের মতো টেলিফিল্মে একসঙ্গে কাজ করেছেন তারা। টেলিফিল্মের নাম ‘মেঘের আড়ালে’। নির্মাণ করেছেন সিনেমাটোগ্রাফার জেড এইচ মিন্টু। টেলিফিল্মটির গল্প ভাবনা পরিচালকের হলেও এর কাহিনী বিন্যাস করেছেন হেলাল। এরইমধ্যে টেলিফিল্মটির শুটিং শেষে প্রচারের জন্য চ্যানেল আইতে জমা দেয়া হয়েছে। টেলিফিল্মটিতে অভিনয় প্রসঙ্গে মৌসুমী বলেন, ‘মিন্টু ভাইয়ের সিনেমাটোগ্রাফিতে আমি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। তবে নির্দেশনাতে এবারই প্রথম। বেশ গুছিয়ে কাজটি করেছেন। খুব ভালো একটি কাজ হয়েছে। রিয়াজের সঙ্গে আগেও সিনেমা এবং টিভিতে অভিনয় করেছি।
তার সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে নতুন কাজটি করতে গিয়ে মনে হয়েছে, আগের চেয়ে ও স্পীড অনেক গুন বেশি। আমাদের এই যৌথ কাজটি দর্শকদের ভালো লাগবে বলেই আমার বিশ্বাস।’ মৌসুমী প্রসঙ্গে রিয়াজ বলেন, ‘মৌসুমীর সঙ্গে কম দেখা হলেও আমাদের বন্ধুত্বটা বেশ ভালো। মানুষ হিসেবে মৌসুমী অসাধারণ। তার মাঝে মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। একসঙ্গে অভিনয় আগেও করেছি। তাই এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এটুকু বলতে পারি, সী ইজ এভারগ্রীন। আমান পছন্দের একজন অভিনেত্রী।’ প্রসঙ্গত, মৌসুমী ও রিয়াজ এর আগে তিনটি চলচ্চিত্রে একসঙ্গে অভিনয় করেছেন। এ ছাড়া মুশফিুকর রহমান গুলজারের পরিচালনায় একটি নাটকেও তাদের একসঙ্গে দেখা গেছে। তবে এবারই প্রথম মৌসুমী ও রিয়াজ কোনো টেলিফিল্মে একসঙ্গে অভিনয় করেছেন। শিগগিরই টেলিফিল্মটি চ্যানেল আইতে প্রচার হবে বলে নির্মাতা সূত্রে জানা গেছে।

নূর হোসেনের সহযোগিতায় র‌্যাব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে by বিল্লাল হোসেন রবিন

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সেভেন মার্ডারের আরেকটি মামলায়  সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। এ মামলার আসামি নূর হোসেনসহ কারাগারে আটক ২৩ আসামি গতকাল আদালতে উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার বাদী নিহত নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। সাক্ষ্য প্রদান ও জেরা চলাকালে বিবাদীপক্ষের আইনজীবীর সঙ্গে আদালতের পিপির দুই দফা বাকবিতণ্ডা হয়। এ সময় পিপিকে উদ্দেশ্য করে ওই আইনজীবী বলেন, আপনি যেভাবে বাদীর পক্ষ নিয়ে কথা বলছেন এবং বাদীকে বলে দিচ্ছেন, আপনার কাঠগড়ায় দাঁড়নো উচিত। সেখানে দাঁড়িয়েই কথা বলেন। দ্বিতীয়বারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে আদালত পিপিকে বলেন, আপনি চুপ থাকেন। সাক্ষ্যপ্রদানের শেষ অংশে বিউটি আদালতকে বলেন, আমি এই নির্মম হত্যার বিচার চাই। যারা আমার বাচ্চাদের এতিম করেছে, আমাকে বিধবা বানিয়েছে, আদালত আমি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা সাক্ষ্যপ্রদান শেষে একে একে ৩২ আসামির পক্ষের আইনজীবীরা বিউটিকে জেরা করেন। এর মধ্যে ১২ জন পলাতক আসামি রয়েছে। তবে অসমাপ্ত অবস্থায় জেরা শেষ হলে পরবর্তী তারিখ ১০ই মার্চ নির্ধারণ করেন আদালত।
বাদী সাক্ষ্যগ্রহণে আদালতকে যা বলেন: সকাল ১০টা ২০ মিনিটে বিচারক এজলাসে বসেন। ১০টা ৫০ মিনিটে মামলা বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দেয়া শুরু করেন। তিনি আদালতকে বলেন, আমার নাম সেলিনা ইসলাম বিউটি। আমার স্বামীর নাম প্রয়াত নজরুল ইসলাম। তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র-২ এবং ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন। দরপত্রের মাধ্যমে নাসিক থেকে ২নং ওয়ার্ডের মিজিমিজি এলাকায় রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের কাজ পায় তানভীর নামে এক ঠিকাদার। ২০১৪ সালের ১লা জানুয়ারি নাসিক মেয়র মিজমিজি এলাকায় আসেন এবং কীভাবে রাস্তা ও ড্রেনেজ নির্মাণ হবে তার রূপরেখা নির্ধারণ করে দেন। মেয়র নজরুল ইসলামকে ওই কাজের তদারকি করার নির্দেশ দিয়ে যান। রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের স্বার্থে এলাকার কিছু বাড়িঘর ও দোকানপাট নির্মাণাধীন রাস্তার আওতাধীন হওয়ায় এলাকার লোকজন নিজ দায়িত্বে তা সরিয়ে নেয়। একই এলাকার মৃত ইছহাকের ছেলে মোবারককে মানবিক কারণে নজরুল ইসলাম ১০ হাজার টাকা দেন তার দোকান সরিয়ে নেয়ার জন্য। পরবর্তীতে সে তার দোকানের সাটার সরিয়ে না নিয়ে তার খালাতো ভাই কুখ্যাত সন্ত্রাসী নূর হোসেনকে খবর দেয়। ১লা ফেব্রুয়ারি বেলা ১২টার সময় নূর হোসেন তার সহযোগী সেক্রেটারি ইয়াছিন মিয়া, আনোয়ার হোসেন, আমিনুল হক রাজু, হাসমত আলী হাসু, শাহজালাল বাদল ও তার অন্য সহযোগীদের নিয়ে ১০-১২টি হাইয়েস মাইক্রোবাসে করে ৭০-৮০ জন লোক এলাকায় আসে। তাদের হাতে পিস্তল, হকিস্টিক, রামদা, লাঠি, বোমা ছিল। চৌধুরীপাড়া এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তারা ত্রাস সৃষ্টি করে। ২০-২৫টি দোকান ভাঙচুর করে, ১০-১২ জনকে পিটিয়ে আঘাত করে টাকা পয়সা লুট করে চলে যায়। পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি নূর হোসেনের সহযোগিতায় তার খালাতো ভাই মোবারকের ছেলে আলী হোসেন আমার স্বামী নজরুল ইসলামসহ ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করে। মামলা নং-১(২)২০১৪। ২রা ফেব্রুয়ারি নূর হোসেন তার সহযোগী ইয়াছিন মিয়া, আনোয়ার হোসেন আশিক, আমিনুল হক রাজু ও শাহজালাল বাদলসহ অন্য সহযোগীরা ক্ষতিগ্রস্তদের কিছু টাকা পয়সা দিয়ে যায় এবং কৌশল অবলম্বন করে, যাতে তারা তাদের বিরুদ্ধে মামলা না করে। এবং প্রকাশ্যে চৌধুরীপাড়া নামক স্থানে হুমকি দিয়ে যায় আজ থেকে নজরুল ও তার পরিবার বাড়ির বাইরে বের হতে পারবে না। যদি বের হয় তবে তাদের গুলি চালিয়ে হত্যা করা হবে। যা করার আমি নূর হোসেন করবো। সেই আতঙ্কে আমার স্বামী নজরুল ইসলাম এলাকা ছেড়ে ঢাকায় আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে সেই মিথ্যা মামলায় নজরুল ইসলাম হাইকোর্ট থেকে অস্থায়ী জামিন নেন। এবং স্থায়ী জামিনের জন্য ৮-৪-২০১৪ নারায়ণগঞ্জ আদালতে কাগজপত্র জমা দেয়। ২৭শে এপ্রিল স্থায়ী জামিনের জন্য সকাল ১০টায় নারায়ণগঞ্জ আদালতে যান, এবং তার কেইস পার্টনারদের নিয়ে আদালতের কাজ শেষ করে। বেলা ১টা ৩৫ মিনিটের সময় তার কেইস পার্টনার তাজুল, লিটন, স্বপন ও ড্রাইভার জাহাঙ্গীরকে নিয়ে স্বপনের প্রাইভেটকারযোগে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। অন্য কেইস পার্টনাররা যে যার মতো সিএনজিযোগে বাসায় চলে যায়। আমার স্বামী নজরুল ইসলামকে বহনকারী প্রাইভেটকারটি আনুমানিক ১টা ৪৫ মিনিটের সময় ফতুল্লা খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে পৌঁছালে সেখানে ১৫-২০ জন দুষ্কৃতকারী নিজেদের র‌্যাব পরিচয় দিয়ে আমার স্বামী নজরুল ইসলাম ও তার কেইস পার্টনারদের অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টেনেহিঁচড়ে দুটি হাইয়েস মাইক্রোবাসে উঠিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। আমার স্বামী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইলে (০১৭৪৬-২৯৭৪৮০) আমার সর্বশেষ কথা হয়েছিল বেলা ১টা ৩০ মিনিটে। ১০-১৫ মিনিট পর আমার স্বামী ও অন্যদের মোবাইল বন্ধ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে আমার দেবর আবদুস সালাম ও আত্মীয়-স্বনজদের জানাই। খোঁজাখুঁজি করার জন্য আমরা বাড়ি থেকে বের হই। কোনো সন্ধান না পেয়ে ওইদিনই নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার ও র‌্যাব-১১-কে অবগত করি। তারপর ২৮শে এপ্রিল ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করি। যেহেতু নূর হোসেন প্রকাশ্যে আমার স্বামীকে হত্যার হুমকি দিয়েছে, সেহেতু নূর হোসেন, ইয়াছিন মিয়া, আমিনুল হক রাজু, ইকবাল হোসেন, আনোয়ার হোসেন আশিক, শাহজালাল বাদল, হাসমত আলী হাসু ও অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করি। পরবর্তীতে ৩০শে এপ্রিল বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে জানতে পারি শীতলক্ষ্যা নদীর শেষ মোহনায় বন্দর থানার শান্তিরচরে আমার স্বামীসহ ৭ জনের লাশ ভেসে উঠেছে। পরবর্তীতে আমি ও আত্মীয়স্বজনরা সেখানে গিয়ে আমার স্বামীর চেহারা ও পোশাক দেখে তাকে শনাক্ত করি। একই সঙ্গে তার কেস পার্টনারদেরও শনাক্ত করি। এছাড়া বাকি ২ জন ছিল একই সঙ্গে অপহরণ হওয়া অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম। এ নির্মম হত্যাকাণ্ড দেখে নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশের মানুষ আন্দোলন শুরু করে। ৩০ তারিখে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে ৩১ তারিখে জানাজা শেষে তাদের লাশ দাফন করি। তখন আমরা জানতে পারি নূর হোসেনের সহযোগিতায় র‌্যাব সদস্যরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পরবর্তীতে কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় উচ্চ আদালতে এ ব্যাপারে একটি রিট হলে উচ্চ আদালতের নির্দেশে র‌্যাব কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। লাশের শরীরে যে ইট, প্লাস্টিক, দড়ি ছিল তা র‌্যাবের। তদন্তের মধ্যে বেরিয়ে আসে নূর হোসেনের সহযোগিতায় তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন ও রানার নেতৃত্বে খুন ও গুম করা হয়। আর নূর হোসেনের সহযোগী চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, বাশার, রহম আলী, শাজাহান, মিজানূর রহমান দিপু, সানা উল্লাহ সানা লাশ গুম ও হত্যায় সহায়তা করে। এই নির্মম হত্যার আমি যেমন বিচার চাই, তেমনি সারাদেশও চায়। এ সময় আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটির পক্ষ নিয়ে কথা বলেন এবং তথ্য ভুল হলে সুধরে দেন। বলেও দেন। এতে বিবাদী নূর হোসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খোকন সাহা পিপিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের পিপিকে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে বলুক। পিপি বলেন, আপনারা তো দেখছেন কী হচ্ছে। এখানে বলে দেয়ার কী আছে। তখন বাদী বিউটি বিবাদীপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা খুনির জন্য কেন সুপারিশ করছেন?  তিনি বলেন, আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। যারা আমার বাচ্চাদের এতিম করেছে, আমাকে বিধবা বানিয়েছে, আদালতের কাছে আমি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। ন্যায় বিচার চাই। সাক্ষ্যগ্রহণের সময় আদালতে যে ২৩ আসামি উপস্থিত ছিলেন তারা হলেন নূর হোসেন, লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব.) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (অব.) এমএম রানা, হাবিলদার এমদাদুল হক, আরজিও-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া ও বিল্লাল হোসেন, সিপাহী আবু তৈয়ব, কনস্টেবল শিহাব উদ্দিন, এসআই পুর্ণেন্দু বালা, ল্যান্স কর্পোরাল রহুল আমীন, এএসআই বজলুর রহমান, হাবিলদার নাসির উদ্দিন, এএসআই আবুল কালাম আজাদ, সৈনিক নূরুজ্জামান, কনস্টেবল বাবুল হাসান, সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর, মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের সহযোগী মোস্তফা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, মিজানূর রহমান দিপু, রহম আলী ও আবুল বাশার।
৩২ আসামির পক্ষে বাদীকে জেরা: বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটির সাক্ষ্য প্রদান শেষে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে জেরা শুরু হয়। প্রথমে র‌্যাব-১১-এর মেজর (বরখাস্ত) আরিফ হোসেনের পক্ষে তার আইনজীবী আব্দুর রশিদ ভুইয়া বাদী বিউটিকে জেরা করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, এজাহারটা কী আপনি লিখেছেন? বিউটি বলেন, আমি লিখিয়েছি। থানার রাইটার দিয়ে। আমি বলেছি তিনি লিখেছেন। এজাহারে কাউকে সন্দেহ করেছেন, আবার কয়েকজনকে অজ্ঞাত রেখেছেন কেন? বিউটি বলেন, যেহেতু নূর হোসেন প্রকাশ্যে আমার স্বামীকে হত্যার হুমকি দিয়েছে তাই এজাহারে তার নাম দিয়েছি। এ সময় বিউটি আসামি নূর হোসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খোকন সাহার সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিউটি বলেন, খোকন সাহা আপনি খুনির পক্ষে যাচ্ছেন কেন? আপনি তো আমার বাসায় গিয়ে বলেছিলেন আপনি আমার পক্ষে থাকবেন, হত্যার বিচার হবে, নানা কথা বলেছেন। তখন খোকন সাহা বলেন, এটা কোর্ট, ল্যাংগুয়েজ ঠিক করেন। আবেগের জায়গা নয়। যা প্রশ্ন করা হচ্ছে তার উত্তর দেন। অ্যাডভোকেট আব্দুর রশিদ ভুইয়া বিউটিকে আবার প্রশ্ন করেন, ২০০০ সালের ১০ই মার্চ ধানমন্ডি থানার অ্যাডভোকেট বাবর আলী হত্যা মামলায় আপনার স্বামী নজরুল ইসলামের ফাঁসির আদেশ হয়েছিল, আপনি জানেন? বিউটি বলেন, ওই মামলা সম্পর্কে আমি জানি না। তবে পরে উচ্চ আদালত থেকে সে খালাস পেয়েছিল। আইনজীবী বলেন, আপনার ভাই শফিকুল ইসলাম জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ২০০৯ সালের ৮ই মার্চ জিডি করেছিল, আপনি জানেন? আপনার বাবা শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ চেয়ারম্যান নজরুলকে গ্রেপ্তার ও ফাঁসি দাবি করে মানববন্ধন করেছিল, আপনি জানেন? জানি না। বিভিন্ন থানায় নজরুলের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা ও ৬টি জিডি ছিল। জবাবে বিউটি বলেন, ওইগুলো রাজনৈতিক মামলা। ২০১৪ সালের ২৭শে এপ্রিল ঘটনার সময় আপনি প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন? ঘটনা দেখেছেন? তখন বিউটি বলেন, যদি দেখতাম তাহলে কী খুন হতো? আইনজীবী বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার কাছে ১৬১ ধারায় এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় আপনি জবানবন্দি দিয়ে আমার আসামির নাম বলেননি, আরিফ হোসেন নির্দোষ, তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে জড়ানো হয়েছে। জবাবে বিউটি বলেন, এটা মিথ্যা কথা। এরপর আসামি আবু তৈয়ব ও হাবিলদার এমদাদুল হকের পক্ষে জেরায় অ্যাডভোকেট মিজানূর রহমান জানতে চান, ঘটনার সময় আপনি কোথায় ছিলেন এবং আপনার স্বামীর সঙ্গে সর্বশেষ আপনার কখন কথা হয়? জবাবে বিউটি বলেন, আমি বাসায় ছিলাম।  দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে কথা হয়। আইনজীবী জানতে চান আপনি কীভাবে জানতে পারলেন আপনার স্বামীকে অপহরণ করা হয়েছে? জবাবে বিউটি বলেন, পাবলিকের কাছ থেকে। তাদের নাম বলেন, জবাবে বিউটি বলেন শহীদুল ইসলাম ও তার মেয়ে। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন। আসামি মিজানূর রহমান দিপুর পক্ষে জেরা করেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা। তিনি  বলেন, আপনি যাদের সন্দেহ করেছেন সেখানে আমার মক্কেল মিজানূর রহমান দিপুর নাম ছিল না। জবাবে বিউটি বলেন, তদন্তে তার নাম এসেছে। দিপুর সঙ্গে আপনার স্বামীর কোন গোলমাল বা ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না, আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া কোনো মামলা মোকাদ্দমার বাদী ছিল? এ সময় নিশ্চুপ থাকেন বিউটি। আপনার স্বামী বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ, দেবিদ্বার, ধানমন্ডি থানায় অনেক মামলা ছিল, আপনার ভাই নিরাপত্তা চেয়ে আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে জিডি করেন, আপনার বাবাও আপনার স্বামীকে গ্রেপ্তার ও ফাঁসি দাবি করে মানববন্ধন করেছিলেন, আপনি জানেন? জবাবে বিউটি বলেন আমার জানা নেই। আইনজীবী বলেন, দিপু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত না, আপনি মিথ্যা সাক্ষী দিচ্ছেন। জবাবে বিউটি বলেন, মিথ্যা কথা। আসামি রুহুল আমীন ও ল্যান্স নায়েক নাছিরের পক্ষে জেরা করেন আইনজীবী সুনীল মৃধা। তিনি জানতে চান, আমার আসামিদের আপনার স্বামী আগে পরে চিনতো? জবাবে বিউটি বলেন, না। এজাহারে তাদের নাম দিয়েছেন? জবাবে বিউটি বলেন, না। আইনজীবী বলেন, রুহুল আমীন ও নাছির উদ্দিন ঘটনার সঙ্গে জড়িত না। জবাবে বিউটি বলেন, তদন্তে এসেছে। আইনজীবী বলেন, তদন্ত কর্তকর্তা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে জড়িয়েছেন। জবাবে বিউটি বলেন, মিথ্যা কথা। নূর হোসেনের সহযোগী আলী আহাম্মদ, রহম আলী, মোর্তুজা জামান চার্চিল, আবুল বাশারের পক্ষে জেরা করেন আইনজীবী আশরাফুজ্জামান। জেরার একপর্যায়ে আবারো পিপিকে উদ্দেশ্য করে প্রতিবাদ জানান অ্যাডভোকেট খোকন সাহা। তখন বিচারক পিপিকে চুপ থাকতে বলেন। আইনজীবী জানতে চান আপনি এজাহারে আমার মক্কেলদের নাম দেননি। পুলিশ তাদের নাম চার্জশিটে ঢুকিয়েছে। জবাবে বিউটি বলেন, সত্য নয়, তদন্তে এসেছে। আসামি এস আই পুর্ণেন্দ্র বালার পক্ষে জেরা করেন অ্যাডভোকেট হরেন্দ্র পাল মণ্ডল। তিনি জানতে চান, আপনি আমার আসামিদের চেনেন? এজাহারে তাদের নাম দিয়েছেন? জবাবে বিউটি বলেন, না। আসামি আরজিও আরিফ হোসেনের পক্ষে জেরা করেন অ্যাডভোকেট রঞ্জিত রায়। আপনি আরিফ হোসেনকে চেনেন? জবাবে বিউটি বলেন, না। আরিফ মামলার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়। জবাবে বিউটি বলেন, মিথ্যা কথা। আসামি এএসআই কামাল হোসেন, কনস্টেবল হাবিব, এএসআই ফজলুর রহমানের পক্ষে আইনজীবী সুলতানুজ্জামান জানতে চান এই তিনজনকে আগে কখনো দেখেননি, চিনেননি। জবাবে বিউটি বলেন, সত্য। তারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল না। জবাবে বিউটি বলেন, এটা মিথ্যা। আসামি আল আমিন, তাজুল ইসলাম, এনামুল, বেলাল হোসেন ও সিহাব উদ্দিনের পক্ষে অ্যাডভোকেট এবি সিদ্দিক জেরায় বলেন, এজ ফ্লো অন। পলাতক আসামি মোখলেছুর রহমান, আব্দুল আলী, মহিউদ্দিন মুন্সি ও হাজতি হীরা মিয়ার পক্ষে জেরা করেন অ্যাডভোকেট সেলিনা ইয়াছমিন। তিনি বলেন, আপনি পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলেছেন। জবাবে বিউটি বলেন, সত্য নয়। আসামি সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর, শাজাহান, জামাল উদ্দিন ও বাহাদুল হাসানের পক্ষে আইনজীবী উম্মে হাবিবা জানতে চান, আপনার এজাহারে এই ৪ জনের নাম নেই। আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে যে কয়টা মামলা ছিল সবগুলোর বাদী ভিন্ন। এই ৪ জন বাদী ছিল না। জবাবে বিউটি বলেন, সত্য। আসামি সানাউল্লাহ সানা, সেলিম, এএসআই আবুল কালাম আজাদ, সৈনিক নূরুজ্জামানের পক্ষে জেরা করেন অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান মোল্লা। তিনি জানতে চান এজাহারে তাদের নাম ছিল? জবাবে বিউটি বলেন, না। এদিকে র‌্যাব কর্মকর্তা তারেক সাঈদ, এমএম রানা ও নূর হোসেনের পক্ষে  আইনজীবীরা জেরা করেননি। ফলে আদালত এই তিনজনের পক্ষে জেরার পরবর্তী তারিখ ১০ই মার্চ ধার্য করেন।

‘শিশুটি মরে গেছে, হায় আমার বাংলাদেশ!’ by ফারুক ওয়াসিফ

‘শিশুটি মরে গেছে’ বলে শিল্পী আজম খান চিৎকার করে উঠেছিলেন ‘হায় আমার বাংলাদেশ’ বলে। আমরা এখন কাকে ডাকব? লাগাতার শিশুহত্যার লানতের মুখে সমাধান নেই, হা–হুতাশ আছে। চিৎকার নেই, পরিসংখ্যান আছে। গত চার বছরে ১ হাজার ৮৫ জন শিশু হত্যার শিকার, আর এ বছরের প্রথম দুই মাসেই ৪৯ জন! এ যোগফল কেবল থানায় আসা ঘটনার। মধ্যবিত্তের নিচের ও ওপরের অনেক ঘটনাই পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যায়। তাহলেও এ নিষ্পাপ জীবনগুলো এভাবে সংখ্যা হয়ে যেতে পারে না। প্রতিটি মুখ, প্রতিটি নাম একেকটা করে ভােলাবাসার সিন্দুক, একেকটা স্মৃতির ঝলক। মাহমুদুল হকের একটি ছোট গল্পের নাম ‘প্রতিদিন একটি রুমাল’! প্রতিদিন প্রায় একটি করে শিশুহত্যা হচ্ছে দেশে!
এখনই ভাবার দরকার আছে, সমাজের গভীর গভীরতর অসুখের কারণটা কী? রাজধানীর বনশ্রীতে দুটি শিশুর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তাদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ বলছে, এ ঘটনায় বাবা-মাসহ কেউ সন্দেহের বাইরে নন। ডিসেম্বর মাসে নীলফামারীর এক মা দুই শিশুকন্যাকে হত্যা করে নিজেকেও শেষ করেছেন। ভোরবেলা স্বামী বাইরে থেকে এসে দেখেন, দুটি শিশুকন্যা মেঝেয় নিথর শুয়ে আর মা ঝুলছে কড়িকাঠ থেকে। তার কিছুদিন পরই কুষ্টিয়ায় এক যুবক প্রতিবেশী কলেজছাত্রকে হত্যা করে নিজের প্রাণও নিয়েছেন। অপরকে শিকার করে এঁরা নিজেদেরও রেহাই দিতে পারেননি। তাহলে বিচার হবে কার? ১ ফেব্রুয়ারি সকালে রমনার বেইলি রোডের একটি বাসার চারতলা থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতককে ফেলে দেয় শিশুটির মা গৃহকর্মী বিউটি। ২৪ দিন লড়াই করে সে-ও চলে গেছে জীবনের পরপারে।
সমাজ সমতলে কিছু একটা ঘটছে যা জীবনবিরোধী, যা সুস্থ নয়। যখন মা বা বাবা কিংবা নিকটাত্মীয়রা শিশুসন্তানকে হত্যা করে তার ব্যাখ্যা সরল চিন্তা দিয়ে হওয়ার নয়। প্রতিকার বের করা তো আরও পরের কথা। ঘটনাগুলোর ধরন বলে, এগুলো গড়পড়তা অপরাধমূলক হত্যা নয়। অনেক সময় ঘাতক ও নিহত উভয়ই জীবন দিয়ে কোনো না কোনো দুঃসহ যন্ত্রণার ইতি টানছেন। হিংসা, অসহায়ত্ব, হঠাৎ জেগে ওঠা রাগ এবং স্বার্থ থেকে হত্যা হচ্ছে। এগুলো একধরনের সামাজিক হত্যাকাণ্ড, যার কার্যকারণ ও প্রকাশ হয়তো বিচিত্র। কিন্তু এগুলোর মধ্যে আমাদের সময়ের গনগনে সামাজিক সহিংসতার আঁচ পাওয়া যায়।
কখন দুর্দশায় থাকা দুজন মানুষের মধ্যে পরস্পরকে হত্যার ইচ্ছা জেগে ওঠে, তা নিয়ে কাজ করেছিলেন আলজেরীয় বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক ফ্রান্জ ফ্যানো। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে দার্শনিক ও মনস্তত্ত্ববিদ। সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানসিক গন্ডগোলের সম্পর্ক দেখানোয় তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি ছিলেন আলজেরিয়ার একটি হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের প্রধান। আলজেরিয়ায় তখন চলছে ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক দুঃশাসন। তাঁর কাছে চিকিৎসার জন্য আসা ব্যক্তিদের ওপর গবেষণা থেকে তিনি একটি বই লেখেন, ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্ক (১৯৫২)। তাঁর বিখ্যাত রেচেড অব দ্য আর্থ বইতেও (১৯৬১ সালে প্রকাশিত বইটির বাংলা অনুবাদ পাওয়া যায়) প্রসঙ্গটা এসেছে। সেটা হলো দীর্ঘদিন চাপ, অবদমন, অসম্মান ও নির্যাতনের পরিবেশে থাকলে কোনো সমাজে পারস্পরিক হিংসা বেড়ে যায় বলে তিনি দেখিয়েছেন।
তারই একটা উদাহরণ: শ্রমিক হয়তো ১৬ ঘণ্টার হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ঘরে এসে কেবল শুয়েছে, অমনি বেড়ার অপর পাশ থেকে একটি শিশু এমন কান্না শুরু করল আর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া লোকটা ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। অথবা কর্মস্থলে গালি খেয়ে, রাস্তায় ছিনতাই হয়ে এক যুবক পাড়ার দোকানে বাকিতে চাল কিনতে গেলে দোকানদারের অপমানকর কথা শুনল। কিংবা রাজনৈতিক স্বাধীনতাহীন দেশে ভয়ের আবহে রাস্তার যানজটে কিংবা নিঃসঙ্গতা কিংবা মাস্তানের নির্যাতনে বিপর্যস্ত কোনো লোকের কথা ভাবুন। কিংবা ভাবুন আর্থসামাজিক কারণে হতাশ এক প্রজন্মের কথা—বেকারত্ব, হতাশা ও নিঃসঙ্গতায় মাদকই যাদের ‘দুদণ্ড শান্তি’। রাজনীতি, অর্থনীতি, ক্ষমতার চাপে যখন কোনো সমাজে দমবন্ধ অবস্থা তৈরি হয়, তখন ব্যাপক সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দেয়। আরও সরাসরি বললে, যখন অবস্থা আর সহ্য হচ্ছে না কিন্তু তাকে বদলানোর পথও পাওয়া যাচ্ছে না, তখন মানুষের ক্ষোভ-প্রতিবাদ ক্ষমতার দেয়ালে বাধা পেয়ে নিজেদের দিকেই ফিরে আসে।
ফ্যানো দেখিয়েছেন, যখন মনে হচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসনে আলজেরিয়া তুলনামূলক শান্ত, তখন জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক অপরাধপ্রবণতা দেখা দিচ্ছে। আবার যখন স্বাধীনতাযুদ্ধ এগিয়ে যাচ্ছে, তখন কমে যাচ্ছে সামাজিক অপরাধ। সমাজ মনস্ততত্ত্বের ভাষায় একে বলা যায় ট্রান্সফারড অ্যাগ্রেশন বা স্থানান্তরিত ক্রোধ। এটা এমন এক মানসিক দশা, যখন আপনি সমস্যার মূল কারণে হাত দিতে না পেরে বা তা খুঁজে না পেয়ে চারপাশের ওপর আক্রোশ বোধ করবেন। সাধারণত বিড়ালদের মধ্যে এমনটা দেখা যায়। হয়তো বাড়িতে অন্য কোনো বিড়াল আসায় সে ক্ষুব্ধ, কিন্তু দেখা গেল বাড়ির বিড়ালটা রেগেমেগে আঁচড়ে দিচ্ছে খোদ তার মালিককেই। মানুষের মধ্যেও এমন লক্ষণ দেখা যায়। সেগুলো এ রকম: বিনা কারণে বা ছোট কারণে রেগে যাওয়া, বন্ধুকে শত্রু ভাবা, ব্যক্তিত্ব ভেঙে পড়া, মনের মধ্যে ঘৃণা পুষে রাখা ইত্যাদি।
আমাদের প্রতিষ্ঠান ভেঙে যাচ্ছে, পারস্পরিক আস্থা তথা সামাজিক পুঁজি নিম্নমুখী, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কে নীরব ধস চলছে। তা ছাড়া কোনো সমাজের অনেক মানুষ যদি রাজনৈতিক অথবা অন্যান্য বাস্তব কারণে দীর্ঘদিন অবদমিত অবস্থায় থাকে, তখন সেই সমাজে বিচ্ছিন্নতা চলে আসে। সেটা হতে পারে মানুষে মানুষে ও মানুষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। এ অবস্থায় সেই সমাজ হয়ে ওঠে ক্ষোভ ও হিংসার মাইনফিল্ড। তখন কোথায় কার মধ্যে ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটবে এবং কে তার শিকার হবে, তা আগাম বলার কোনো উপায় থাকে না। এ ধরনের সামাজিক হিংসার পরিস্থিতিকে দারোগার চোখ দিয়ে দেখে বোঝা যাবে না। একে বুঝতে হলে গভীর দরদি সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনীতিমনস্ক মন চাই।
বাংলাদেশ একটা রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্র দুখানেই। পাশাপাশি যে ধরনের বাছবিচারহীন ‘উন্নয়ন’ চলছে, যেভাবে একদিকে লোভ অন্যদিকে বৈষম্য বাড়ছে, যেভাবে জনগণের স্বাধীন জীবন ও চিন্তার অধিকার সংকুচিত হচ্ছে, যেভাবে পরিবার-বন্ধুত্বে ফাটল জাগছে, এসবের নিশ্চয়ই খারাপ প্রতিক্রিয়া আছে। উন্নতি নামক মরীচিকার পেছনে ছুটছি সবাই। উন্নতির বাসনায় শিশুদের ওপর বাড়ানো হচ্ছে পড়ালেখার চাপ। অথচ মেলামেশা ও আনন্দ-বিনোদনের সুস্থ সুযোগ কত কম। প্রায়ই ঢাকার পথেঘাটে একা একা কথা বলা, অদৃশ্য কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে থাকা মানুষ দেখি। বেশভূষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্তই হবেন তাঁরা। এগুলো সমাজ-মনস্তত্ত্বে অস্থিরতার প্রকাশ নয়? দেশে মনের অসুখে ভুগতে থাকা লোকের সংখ্যাও ধাঁইধাঁই করে বাড়ছে।
মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, মায়া ও শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে। নিঃসঙ্গ মাকড়সার মতো যার যার জালে আমরা একা বসে থাকি। ঢাকা তো এখন ব্যয়বহুল এক খোলা ছাদের কারাগার। এ অবস্থায় মানুষে মানুষে সম্পর্কের বয়ন ফেঁসে যায়, কেউ সেই সামাজিক জালের ফোকর দিয়ে পড়েও যায়। তাদেরই কেউ কেউ খুনি, ধর্ষক, নির্যাতক কিংবা পেশাদার অপরাধী হয়ে ওঠে। এদের সংখ্যা যত কমই হোক, একেকটি সামাজিক হত্যাকাণ্ড গোটা সমাজকেই চমকে দেয়। টনক যদি কারও থেকে থাকে, তাহলে এসবের প্রতিক্রিয়ায় তার জাগরণ ঘটা উচিত।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আবেগ উথলানো সেই গানটা মনে আছে? সেই যে,
‘...যে নারীর মধু প্রেমেতে আমার রক্ত দোলে
যে শিশুর মায়া হাসিতে আমার বিশ্ব ভোলে
যে গৃহ কপোত সুখ স্বর্গের দুয়ার খোলে
সে শান্তির শিবির বাঁচাতে শপথ করি।’
সমাজে শান্তির শিবির বাঁচাতে আমাদের এখন খতিয়ে দেখা দরকার, যেভাবে সব চলছে সেভাবে চলতে পারে কি না!
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com