Thursday, January 16, 2014

গণতন্ত্র- কোন ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছি? by শেখ হাফিজুর রহমান

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে যতটা ‘স্পেস’ নিয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সেটি বিরল এক ঘটনা।
নির্বাচনের পরে ১২ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমস-এ যে প্রতিবেদন ছাপা হয়, সেই প্রতিবেদনের একটি জায়গায় বলা হয়েছে, ‘বিজয়ীই সব ক্ষমতার অধিকারী হবে—এটাই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এ জন্য বিজয়ী হতে নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য সব ধরনের বাজি ধরেন দুই নেত্রী। এবার নির্বাচন বয়কট এবং রাজপথে সহিংস বিক্ষোভের মাধ্যমে লক্ষ্যপূরণের বাজি ধরেছিলেন খালেদা জিয়া। আর শেখ হাসিনা বাজি ধরেছিলেন প্রধান বিরোধী দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন করার। ধরে নিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা এতটা কঠোর হবে না, যাতে তাকে পিছু হটে নতুন করে নির্বাচন করতে হয়। এখন মনে হচ্ছে, বাজিতে জিতে শেখ হাসিনা সব পাওনা কুড়িয়ে নিয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতে নতুন নির্বাচনের বিষয়ে কেউ আর তেমন জোর দিয়ে কিছু বলছে না...’ (প্রথম আলো, ১৩ জানুয়ারি ২০১৪।)
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস-এর ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘একদলীয় শাসনের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ’। নির্বাচনের পর যে সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা হয়েছে এবং সেই মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টির কয়েকজন নেতৃবৃন্দকে অন্তর্ভুক্ত করায় যে অভূতপূর্ব অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে এ রকম মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কেননা পশ্চিমা ধরনের গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার কোনো ভুলত্রুটি করলে আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে চাপ তৈরি করে সরকারকে সঠিক পথে পরিচালনার দায়িত্ব যেমন বিরোধী দলের, তেমনি রাষ্ট্র ও সমাজের ভারসাম্য রক্ষায়ও বিরোধী দলের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ওই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে নবগঠিত মন্ত্রিসভা ও সংসদের সামনে রয়েছে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের সামনে যেমন সুশাসন নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি রয়েছে গণতন্ত্রকে কার্যকর করার চ্যালেঞ্জ। তবে পশ্চিমা ধরনের গণতন্ত্রই সর্বরোগহর এবং সকল সমস্যার সমাধান করে দেবে এমন কথা নেই। ২০২৫ সালের মধ্যে যদি বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশ হতে হয়, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, কর্মসংস্থানসহ দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করে ২০৫০ সালের মধ্যে যদি বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলোর নিকটবর্তী হতে চায়, তাহলে বাংলাদেশের দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
যে ধরনের সরকার আমাদের সেই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে, তাদের সমর্থন জানাতে আমাদের আপত্তি কোথায়? বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও পশ্চিমা দেশগুলো উন্নয়নের যে মডেল দিয়েছে, তা অনেক দিন আগে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এশিয়ান টাইগারদের উন্নয়নেও ওই মডেলগুলো কোনো কাজে আসেনি। মালয়েশিয়ার উন্নয়নের সময়ে সেখানে ছিল সেমি ডেমোক্রেসি, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়াতেও নির্ভেজাল গণতন্ত্র ছিল না। তাদের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে উপকারী কর্তৃত্ববাদ। আর এশিয়াসহ সারা বিশ্বের বিস্ময় হচ্ছে চীন। চীন শাসন করছে একদলীয় সমাজতান্ত্রিক সরকার, আর ‘কমান্ড ইকোনমি’ (কিছু পুঁজিবাদী সংস্কারসহ) চালাচ্ছে চীনের অর্থনীতি। সেই চীনের অর্থনীতি, শিক্ষা ও প্রযুক্তির কাছে নাকাল হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো পশ্চিমা বিশ্ব।
কোন সরকারব্যবস্থা বা রাষ্ট্রব্যবস্থা ভালো, এককথায় বোধ হয় তার উত্তর দেওয়া যাবে না। দেশ-কালভেদে এ ব্যাপারে নানা রকম তারতম্য দেখা গেছে। গণতন্ত্র অনেক দেশে সফল হয়েছে, অনেক দেশে তা হয়নি। সমাজতন্ত্র অধিকাংশ দেশে ব্যর্থ হয়েছে, কোনো কোনো দেশে সফল হয়েছে। উপকারী কর্তৃত্ববাদ এশিয়ান টাইগারদের উন্নতির শিখরে নিয়ে গেছে। ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’-এর নানা উদ্যোগ আয়োজনের ফলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কান্ট্রিগুলো শিক্ষা-দীক্ষায় যেমন উন্নত, সামাজিক উন্নয়নের সূচকে যেমন তারা শীর্ষে, তেমনি ওই সকল দেশে অপরাধের হারও খুব কম।
বাংলাদেশে যে ধরনের সরকারই হোক তাদেরকে যে বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে তা হচ্ছে—সুশাসন, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, সকল নাগরিকের কর্মসংস্থানসহ দেশের সার্বিক উন্নয়ন। সম্ভাবনাময় অর্থনীতি, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং ১৬ কোটি মানুষের ‘মার্কেট’ হওয়ার কারণে বিভিন্ন দেশের কাছে বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল দুটি ভিন্ন মেরুতে অবস্থান নিয়েছে। তাদের সমর্থন দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক মহলও অনেকটা দ্বিধাবিভক্ত মনে হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে যে পরিমাণ সহিংসতা ও নাশকতা বাংলাদেশে হয়েছে, তাতে করে আমার বারবার মনে হচ্ছে, আমরা কি কোনো ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছি?
আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের প্রাচীন গণতান্ত্রিক দল। সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন। ওই গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে। ২০১৩ সালে এসে সেই গণতন্ত্র এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হলো। বিএনপিসহ ১৮ দলের বর্জন এবং লাগাতার অবরোধের মধ্য দিয়ে ৫ জানুয়ারির নিরুত্তাপ ও একতরফা নির্বাচন হয়ে গেল। তারপর গঠিত হলো মন্ত্রিসভা। আওয়ামী লীগের মতো একটা গণসংশ্লিষ্ট গণতান্ত্রিক দলের জন্য তা কতটা ইতিবাচক হলো, সেটি এক বড় প্রশ্ন? ওদিকে মধ্যপন্থা বাদ দিয়ে বিএনপি ঝুঁকে পড়েছে চরমপন্থী জামায়াত ও হেফাজতের দিকে। বিএনপি পরিচালিত হচ্ছে দুটি কেন্দ্র থেকে—লন্ডন থেকে তারেক রহমান দ্বারা আর ঢাকা থেকে বেগম খালেদা জিয়া দ্বারা। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ভারত, চীন, রাশিয়াসহ অনেকগুলো দেশের সমর্থন পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য নির্বাচন নিয়ে তাদের ‘ক্ষোভ ও অসন্তোষ’ থাকা সত্ত্বেও নতুন সরকারকে ১৪ জানুয়ারি সমর্থন জানিয়েছে।
ওদিকে পশ্চিমা দেশগুলো বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রতি তাদের শক্তিশালী সমর্থন জানিয়েছে এবং তারা মনে করে, এদের মধ্য দিয়েই তাদের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে। ১৮ দলের অবরোধ তুলে নেওয়ায় আপাতত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও প্রধান দুটি দলের পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও আন্তর্জাতিক মহলের দ্বিধাবিভক্তির কারণে যেকোনো সময় পরিস্থিতি আবারও সহিংস হয়ে উঠতে পারে। তবু আমরা শান্তিই কামনা করি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তিতে বড় দুই দলসহ সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংলাপই পারে ওই শান্তি নিশ্চিত করতে। আর ওই সংলাপের মাধ্যমেই আমরা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সব শক্তিকে ‘না’ বলে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য ৫০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা করতে চাই।

শেখ হাফিজুর রহমান: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
hrkarzon@yahoo.com

গণতন্ত্র- কোন ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছি? by শেখ হাফিজুর রহমান

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে যতটা ‘স্পেস’ নিয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সেটি বিরল এক ঘটনা।

খোলা হাওয়া- সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শেষ কোথায়? by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

বাংলাদেশে গত দুই-আড়াই দশকে যেসব নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোতে হয় আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি জিতেছে। একটি দল একবার হারলে আরেকবার জেতার সুযোগ পেয়েছে।
কিন্তু প্রতিটি নির্বাচনেই একটি পক্ষ বারে বারে হেরেছে—সেই পক্ষটি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তারা ভোট দিতে গেলে জামায়াত-বিএনপির কোপানলে পড়ে, না দিতে গেলে আওয়ামী লীগের রোষের শিকার হয়। বিএনপি-জামায়াত বিশ্বাস করে, সংখ্যালঘুরা আওয়ামীপন্থী; আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে, তাদের ভোট না দিয়ে সংখ্যালঘুদের উপায় নেই। ফলে নির্বাচনের মৌসুম শুরু হলে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানেরা আতঙ্কে থাকেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর হিন্দুদের ওপর যে বর্বর নির্যাতন করা হয়েছিল রামসাগর ও অন্যান্য জায়গায়, তার তুলনা দেখা গেছে শুধু একাত্তর সালে। দেশের মানুষ এই বর্বরতার প্রতিবাদ জানিয়েছিল, সরকার একটি কমিটি করে তদন্তও করেছিল। কমিটি একপ্রস্থ সুপারিশও তৈরি করেছিল। কিন্তু সে অনুযায়ী কোনো কাজ হয়নি। গত ১৩ বছরে বরং যা হয়েছে, তাকে বলা যায় নিরবচ্ছিন্ন ঠোঁটসেবা।

যে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার ‘অপরাধে’ হিন্দুসহ অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর এত নির্যাতন, ঠোঁটসেবাটা তারাই বেশি দিয়েছে। কথা অনেক হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। বিচ্ছিন্ন কিছু ধরপাকড় এবং দু-এক অপরাধীর জেল-জরিমানা হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ অপরাধী রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করা, অপরাধীদের শাস্তির বিধান করা, নির্যাতনের কারণগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিকারের ব্যবস্থা করা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এসব কিছুই হয়নি। রাষ্ট্র তার জনগণের একটি অংশকে কার্যত অবহেলাই করে গেছে।
ফলে এবারও নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনের পরে সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের খড়্গ নেমে এসেছে। ওই নির্বাচনটি নিয়ে এমনিতেই প্রবল শঙ্কা ছিল মানুষের মনে। ১৮-দলীয় জোট যেকোনো মূল্যে নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল, সরকারও বদ্ধপরিকর ছিল যেকোনো মূল্যে নির্বাচন করার। তবে বরাবরের মতো এই ‘মূল্য’টা কোনো নেতা-নেত্রীকে দিতে হয়নি, দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের। নির্বাচনের আগে সরকার আরও ঘোষণা দিয়েছিল, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে—সে লক্ষ্যে সেনাবাহিনীকেও মাঠে নামানো হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনও ভোটারদের সুরক্ষা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। সাধারণ মানুষের মনে কোনো সন্দেহ ছিল না যে সন্ত্রাস হবে এবং ব্যাপক আকারে হবে। কিন্তু ভোটকেন্দ্র হওয়ার অপরাধে ৫৩১টি স্কুল যখন পুড়িয়ে দেওয়া হলো, তখন মনে হয়েছিল, এ দেশে সবই সম্ভব। যারা স্কুলে আগুন দিতে পারে, তারা যে মানুষের ঘরবাড়িতেও আগুন দিতে পারে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপই নিল না। আমাদের সরকারগুলো এমনিতেই পা-ভারী, চলে পা টানতে টানতে। এক দিনের রাস্তা যায় এক মাসে। সরকারের প্রস্তুতিহীনতা ও উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে ১৮-দলীয় মাঠকর্মীরা নেমে পড়ল সংখ্যালঘু নির্যাতনে। সাতক্ষীরা, যশোর, দিনাজপুরসহ নানা জায়গায় নারকীয় তাণ্ডব হলো, তাদের মন্দির পুড়ল, প্রতিমা ভাঙচুর হলো, বাড়িতে আগুন দেওয়া হলো, মেয়েরা ধর্ষিত হলো। এই সহিংসতা চলল অব্যাহতভাবে এবং এই তাণ্ডবে কোনো কোনো জায়গায় অংশ নিল আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকেরাও। ১৩ জানুয়ারির কাগজেও পড়লাম, দেশের তিন জায়গায় মন্দির ভাঙচুর হয়েছে, লুটপাট হয়েছে। অথচ ১০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় জানালেন, সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে তিনি এবার কঠোর হবেন।
নতুন সরকারের অনেক মন্ত্রী ও সচিবালয়ে তাঁদের প্রথম দিনটিতে সাংবাদিকদের জানালেন, হ্যাঁ, সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ করতে সরকার কঠোর হবে। কিন্তু এই ‘হবে’টা ঠিক কবে, তা বোঝা গেল না। যেকোনো ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ‘কবে’টা যত দ্রুত হয়, ততই মঙ্গল এবং সেটি গতকাল হলেই ভালো। অর্থাৎ এসব উদ্যোগে এক দিন দেরি করাটাই অপরাধীদের অনেকটা জায়গা ছেড়ে দেওয়া। ১০ জানুয়ারি এবং ১৩ জানুয়ারির মধ্যে যে শুধু অনেকগুলো হামলার ঘটনা ঘটল, তা নয়, অনেক মানুষের জীবনের স্বপ্ন ভেঙে গেল; তাঁরা চোখের সামনে উপাসনালয় পুড়তে দেখলেন, রাষ্ট্রের ওপর বিশ্বাস হারালেন; মনুষ্যত্ব আরেকবার রক্তক্ষরণের শিকার হলো। সরকারের উচ্চপর্যায়ের লোকজন যে কথা বলতে পছন্দ করেন এবং কথার পেছনে কাজ করার প্রতিজ্ঞাটা যে প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে, তা প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের ব্যক্তিরা যেমন জানেন, অপরাধীরাও জানে। ফলে সহিংসতা চলতে থাকে, থানা-পুলিশ কিছু ধরপাকড় করে। কিন্তু মূল হোতারা থেকে যায় পর্দার আড়ালে।
অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে এখন দুটি ফরিয়াদ নিয়ে সরকার ও দেশবাসীর কাছে উপস্থিত হয়েছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কেউ কেউ। তাঁরা বলছেন, ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম কেটে দেওয়া হোক, যাতে নির্বাচন এলে তাঁদের টার্গেট না করা হয়; অথবা তাঁদের জন্য আলাদা নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হোক। এসব শুনে আর এখন কেউ এ কথাটি জোর গলায় বলতে পারবে না, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। বস্তুত, ২০১২ সালে রামুতে বৌদ্ধদের ওপর যখন নৃশংস হামলা হয়, তখনই একটি কাগজে লেখা হয়েছিল, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, তা-ও পুড়িয়ে ফেলা হলো।
সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের কারণ খুঁজতে পরিশ্রম করতে হয় না—এসব এখন সবার কাছেই স্পষ্ট। প্রথম কারণটি হচ্ছে ভূমিদস্যুতা, দ্বিতীয়টি তাদের গায়ে আওয়ামী ভোটব্যাংকের সিল পড়ে যাওয়া এবং তৃতীয় হচ্ছে জঙ্গিবাদপ্রসূত অসহিষ্ণুতা, যা ভিন্ন ধর্মের মানুষ ও তাদের মন্দির-প্যাগোডা-গির্জার ওপর আক্রমণকে ন্যায্যতা দিচ্ছে। মুসলমানদের চেয়ে সংখ্যালঘুদের জমি দখল করাটা সহজ—তাদের ওপর আক্রমণটা তীব্র করলে তারা ভিটেমাটি ফেলে জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পার হয়ে চলে যাবে, এ রকম প্রত্যয় থেকে হামলা হয়। এই হামলায় থাকে সব দলের ভূমিদখলদার। এই তিন কারণের ত্রিশূল থেকে বাঁচার উপায় সংখ্যালঘুদের জানা নেই। ফলে জীবন বাঁচাতে সত্যিই তাঁরা দেশান্তরিত হচ্ছেন। ১৯৭৮ সালে যেখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ ছিল সংখ্যালঘু, ২০১১ সালে এসে সেই সংখ্যা নেমে গেছে ৯ শতাংশের নিচে। এই পরিসংখ্যান আমাদের লজ্জিত করে, মর্মাহত করে। যাঁরা বাংলাদেশকে ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ’ বলে বিশ্বসভায় পরিচয় করিয়ে দিতে চান, তাঁদের এই পরিসংখ্যান পরিহাস করে।
২০১৩ সাল ছিল অব্যাহত সন্ত্রাসের বছর, সে বছর বাংলাদেশ ধর্মীয় উগ্রতার যে চেহারা দেখেছে, তার পুনরাবৃত্তি কখনো ঘটুক, কোনো বিবেকবান মানুষ তা চাইবেন না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই দেশে বিবেক নামের বস্তুটি এখন দুষপ্রাপ্য। গত ৫ মে ঢাকা শহর ছিল হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের দখলে, সেদিন বায়তুল মোকাররম এলাকায় আগুনের হাত থেকে রক্ষা পেল না কোরআন শরিফও। পুড়তে থাকা কোরআন শরিফের ছবি টিভিতে দেখে চোখের পানি ফেলেছেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। কিন্তু তা নিয়ে ধর্মীয় দলগুলো কোনো উচ্চবাচ্য করল না। এত ধর্মীয় দল-গোষ্ঠী-সংগঠন দেশজুড়ে, অথচ এ রকম একটি বর্বর ঘটনার কোনো প্রতিবাদ করা হলো না। এই নীরবতা আমাদের মনে করিয়ে দিল, বিবেক বিদায় নিয়েছে; এখন মতলব হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান। ফলে উগ্রবাদীরা যদি ভিন্ন ধর্মের মানুষকে নির্যাতন করে, তাদের উপাসনালয়ে আগুন দেয়, তার প্রতিবাদও জোরেশোরে হয় না। দলগুলো ব্যস্ত থাকে ভোটের এবং ক্ষমতার চিন্তায়, প্রশাসন ব্যস্ত থাকে সরকারের মতলব বুঝে কাজ করতে। কোনটা আন্তরিকতা, কোনটা ঠোঁটসেবা, তা তো প্রশাসনের মানুষ বোঝে। সে জন্য আইনের হাতটাও আর লম্বা হয় না। আইনের হাতটা দিন দিন ছোটই হচ্ছে বরং, বিশেষ করে প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষ এবং সংখ্যালঘুদের জন্য।
কিন্তু এই অবস্থা তো চলতে দেওয়া যায় না। ১৯৬৪ সালে সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন রুখে দাঁড়ানোর জন্য। রুখে এবারও দাঁড়াতে হবে। নতুন সরকার নিয়ে এখনো বিতর্ক চলছে—বৈধ না অবৈধ, এ নিয়ে প্রচুর বাগ্যুদ্ধ হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এই বিতর্কে যায় না। ভোট দিতে না পেরে মানুষ হতাশ হয়েছে, কিন্তু বেশির ভাগ মানুষকেই এখন নজর দিতে হচ্ছে জীবনসংগ্রামে। এখন সরকার যদি সত্যিকার অর্থে কঠোরতা দেখায়, সব ধরনের সন্ত্রাস-সহিংসতাকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করে, নিজের দলের অপরাধীদেরও রেহাই না দেয় এবং জনজীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনে, তাহলে মানুষ বৈধ-অবৈধ বিতর্কটি নিয়ে মাথা ঘামাবে না। দেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক হানাহানি চায় না। ফলে এই হানাহানি বন্ধ করতে সরকার যে উদ্যোগ নেবে, তাতে মানুষের সমর্থন থাকবে।
একই সঙ্গে বিবেকবান প্রত্যেক মানুষকে এখন এগিয়ে আসতে হবে। ২০১৪ সালে আমরা সত্যিকার অর্থে একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে দেখতে চাই। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শেষ আমরা চাই, তার শুরুটা এখনই হোক।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম:
কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সরল গরল- খালেদা জিয়ার ভ্রান্তিবিলাস by মিজানুর রহমান খান

খালেদা জিয়ার গতকালের বক্তব্যের নতুন ইঙ্গিত হচ্ছে বিদ্যমান নির্বাচনী ও সংসদ গঠনব্যবস্থা পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করা।
বলেছেন, সংসদে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ আনবেন। তিনি নির্বাচনকালীন সরকার চান। তবে তিনি তাঁর প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংসদ ও নির্বাচনপদ্ধতির যুগোপযোগী সংস্কার নিয়ে আলোচনা চান না। মনে হচ্ছে, বিধ্বস্ত বিএনপির নেতা-কর্মীদের চাঙা রাখতে ভাষণটিকে একটি ক্ষমতামুখী মেজাজ দিতে চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু নিজেকে কিংবা দলকে বদলানোর ইঙ্গিত দিলেন না। তাঁর দলের গণতন্ত্র যে মৃত, তা তিনি দেখেননি। এই ভাষণ তাই ভীষণ হতাশ করেছে।

খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘নির্বাচনের নামে গত ৫ জানুয়ারির আওয়ামী প্রহসন হাতে-কলমে প্রমাণ করেছে, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি কতটা যৌক্তিক। প্রমাণ হয়েছে, দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ হতে পারে না।’ তাঁর এ বক্তব্যে নতুনত্ব নেই।
কুড়ি দফা সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সকলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের একটা অস্থায়ী রূপরেখা নির্ণয় করা হবে।’
আমরা জানতে চাই, এটা তিনি ক্ষমতায় গিয়ে করবেন, নাকি আগামী নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের সঙ্গে ‘স্থায়ী রূপরেখা’ নিয়ে কথা বলবেন। যদি তিনি নিজে ক্ষমতায় গিয়ে ‘স্থায়ী রূপরেখা’ দিতে চান, তাহলে তাকে ‘অস্থায়ী রূপরেখা’ দিতে হবে। তবে স্থায়ী বা অস্থায়ী যে ধরনের রূপরেখাই হোক না কেন, তিনি মানবেন যে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সমঝোতা হতেই হবে।
তাঁর সংক্ষিপ্ত রূপরেখার কিছু বিষয় তিন জোটের রূপরেখায় ছিল। লক্ষণীয় যে, তিনি এরশাদ ও গৃহপালিত বিরোধী দল সম্পর্কে টুঁ-শব্দটি উচ্চারণ করেননি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ‘ত্যাগ-তিতিক্ষা’র কবর তাঁরা দুজনে মিলে কীভাবে রচনা করেছেন, সেদিকে তিনি যাননি। তাঁর সুলিখিত ভাষণ সরকারে গিয়ে কী করবেন, তার একটি ফিরিস্তি মনে হয়েছে।
তাঁর ৫ নম্বর ঘোষণা: ‘নির্বাচনপদ্ধতির যুগোপযোগী এবং সংসদে শ্রেণী ও পেশার প্রতিনিধিত্ব এবং মেধাবী, যোগ্য ও দক্ষ নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ ৯ নম্বরে বলা হয়েছে, ‘দেশের সকল মতের কৃতী ও মেধাবী নাগরিকদের রাজনীতি, সরকার পরিচালনা ও জাতীয় ক্ষেত্রে অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি ও এর জন্য উপযুক্ত কাঠামো গড়ে তোলা হবে।’
বিএনপির চেয়ারপারসন যদি এর মধ্য দিয়ে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন, প্রত্যক্ষ ভোটে নারীদের সংসদে আনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ, ‘টক শোওয়ালা’ কিংবা ‘সিঁধেল চোরদের’ সংসদের উভয় কক্ষে আনার দিকে ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন, তাহলে তাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু তিনি সম্ভবত ভুলে গেছেন, এই বাস্তবতা বাংলাদেশে এখন অনুপস্থিত যে শুধু এই কথায় চিঁড়ে ভিজবে। তিনি যখন রাজনীতিতে এসেছিলেন তখনকার তাঁর লিখিত বক্তৃতা খুঁজলেও পাওয়া যাবে ‘বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা হবে কিংবা স্থানীয় সংবাদব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালী করা হবে।’
মনে হচ্ছে, তিনি প্রায় পাঁচ বছর ধরে নবম সংসদ বয়কট করে চলার পরে তাঁকে বাদ দিয়ে দশম সংসদ গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার মতো বাংলাদেশের পরিবর্তিত বাস্তবতা তিনি বিবেচনায় নিতে বেশ খানিকটা অপারগ থেকেছেন।
তিনি আগের মতোই অলংকারবহুল বাণী, যাকে সস্তা রাজনৈতিক বুলি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, তেমন পরিভাষা ব্যবহার করার প্রবণতা পরিহার করতে পারেননি। যেমন বলেছেন, ‘নির্ভেজাল গণতন্ত্রই হবে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি।’
তিনি স্বীকার করবেন যে বর্তমান সরকারকে ‘সংবিধানের অপব্যাখ্যাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর নিজের লোকসান হ্রাস করা যাবে না। যদি স্বীকার করতে হয় যে, ‘৫ জানুয়ারি বাংলাদেশে গণতন্ত্র আরেকবার নিহত হয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন মৃত।’ তাহলে তাঁকেও স্বীকার করতে হবে যে তাঁর ভন্ডুল হওয়া ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ সফল হলেও তাতে আমাদের কাঙ্ক্ষিত ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ ঘটত না।
আজকের বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যে শবযাত্রা চলছে তার দায় কমবেশি প্রধানত উভয়কেই গ্রহণ করতে হবে। লন্ডনের দি ইকোনমিস্ট এবং ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস উভয়ে বলেছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশ হেরে গেছে। সেই অর্থে বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিশ্চয় এখন মৃত কিংবা কোমায়। কিন্তু সেটা অবশ্যই খালেদা জিয়ার ব্যাখ্যা ও তাঁর সংকীর্ণ দর্শন অনুযায়ী নয়। তাঁর মন্তব্য, ‘এ দেশের মানুষ তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি হিসেবে গণতন্ত্রকে বেছে নিলেও বারবার এখানে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি এর ব্যাখ্যা দেননি। তবে আমরা বেশ বুঝতে পারি, এর মাধ্যমে তিনি বস্তুত চতুর্থ ও পঞ্চদশ সংশোধনীকে ইঙ্গিত করেছেন। গণতন্ত্রের চলতি শবযাত্রায় তাঁর নিজের বা তাঁর দলের কোনো দায় তিনি স্বীকার করেননি। এবং এ-ও বুঝতে পারি, বিএনপির কেউ এত বড় শোচনীয় পরাজয়ের পরও পদত্যাগ করবেন না। তাঁর পুরো লিখিত বক্তৃতা পাঠ এবং সেখানে ঢুকে পড়া দলীয় কর্মীদের করতালি মুখরিত সংবাদ সম্মেলনে তাঁর উৎফুল্ল উপস্থিতি মনে হয়েছে, তিনি নিজেকে অভ্রান্ত মনে করেন। কোনো কিছুর জন্যই যেন অনুশোচনা নেই।
২০০১ সালের নির্বাচনের পরও তিনি আভাস দিয়েছিলেন, তিনি অতীতের দিকে তাকাবেন না। রিকনসিলিয়েশন করবেন। সে চেষ্টাও তিনি করেননি। সুযোগ পেলে, সুযোগ সৃষ্টি করে তিনি বঙ্গবন্ধুর নিন্দা করেন, শ্রদ্ধা জানান না। প্রতিপক্ষের কাছে যেসব বিষয় সন্দেহাতীতভাবে স্পর্শকাতর, সেসব বিষয়ে তিনি সতর্ক হন না।
তাঁকে অবশ্যই ১৫ ও ২১ আগস্ট সম্পর্কে তাঁর দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে। প্রতিপক্ষের জন্য কেবল নয়, নতুন প্রজন্মকে দূষণমুক্ত রাখতেও। তাঁর টুঙ্গিপাড়ায় যাওয়ার দিনে যে শিশু জন্মেছিল, সে ২৩ পেরিয়েছে। খালেদা জিয়া যথার্থ বলেছেন, ‘বিরোধী দলকে যথাযথ গুরুত্ব ও মর্যাদা দেওয়া হবে। ক্ষমা, ঔদার্য, মহানুভবতা, যুক্তিশীলতা দিয়ে নির্ধারিত হবে বিরোধী দলের প্রতি আচরণ। সমঝোতার ভিত্তিতে হানাহানি ও সংঘাতের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারা ফিরিয়ে আনা হবে।’ এসব কথা ভোট টানতেই কি? আওয়ামী লীগকে জয় করতে চাইলে ১০ জানুয়ারির আগের অবিসংবাদিত মহান নেতার প্রতি যথাশ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো পূর্বশর্ত। ২০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘মহান স্বাধীনতার ঘোষকের’ জন্মদিনে অনুষ্ঠান করবেন। ভালো কথা। সেখানেই নির্বাচনোত্তর সংকল্প অনুযায়ী ক্ষমা, ঔদার্য, মহানুভবতা, যুক্তিশীলতার প্রথম নজির স্থাপন করুন।
মসনদে গিয়েই কেবল আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঔদার্য ও মহানুভবতা দেখাবেন, সেটা কেবল প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকেই সম্ভব, এই বিভ্রান্তিমূলক চটকদার কথাবার্তা আর কাম্য নয়। তাঁকে ও তাঁর দলকে এখনই প্রমাণ দিতে হবে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে তিনি আগে কী করেছেন আর কী করবেন।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে তিনি এবারই প্রথম একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘এখন যদি এসব পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামীতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং প্রয়োজনবোধে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে সকল অপরাধীকে চিহ্নিতকরণ ও শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।’ এটা যদি তাঁর সত্যিকারের অবস্থান হয়ে থাকে তাহলে বর্তমান নিয়মরক্ষার সরকারকে বলব, খালেদা জিয়ার এ মডেল এখনই গ্রহণ করতে। ২০০১ সালে নির্বাচনের পরে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলার ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের ওই মডেল প্রয়োগ করুন।
বর্তমান সরকার খালেদা জিয়ার কথায় বিপজ্জনক সরকার। কিন্তু তাঁকে এটাও মানতে হবে, গণতন্ত্রের জন্য বিএনপিও বিপজ্জনক। ‘৫ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ আবার পিছিয়ে পড়ল। পুরোপুরি গণতন্ত্রহীন হয়ে পড়ল।’ এই কথা যদি সত্যি হয় তাহলে তিনি নিশ্চয় মনে করবেন যে, ৫ জানুয়ারির আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছিল। আর সেই অগ্রসরমাণ বাংলাদেশে তাঁর ভূমিকাও জানা জরুরি। কেন তিনি জনগণের নির্বাচিত সংসদকে বয়কট করেছিলেন?
বাস্তবতা হলো দুই দল ও তার নেতা-নেত্রীরা আইনের শাসন ও সুশাসন দিতে পদ্ধতিগতভাবে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নির্বাচন নির্বাচন খেলা খেলছিলেন। সেই খেলায় বিএনপি এবার যোগ দিতে না পারার পরিণতি হলো বাংলাদেশের পুরোপুরি গণতন্ত্রহীন হয়ে পড়া। অনেকেই মানবেন, ‘একটি অবৈধ সরকারের কোনো দায়িত্ববোধ থাকে না জনগণের প্রতি। এমন একটি সরকার দীর্ঘায়িত হওয়া খুবই বিপজ্জনক।’ কিন্তু অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চাবিমুখ বিরোধী দলের অস্তিত্ব দীর্ঘায়িত হওয়াটাও কম বিপজ্জনক নয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম নির্বাচনসর্বস্ব দেখাটা এক বিরাট ভ্রান্তিবিলাস।

মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

সহিংসতা- ‘ত্রাণ চাই না, চাই নিরাপত্তা’ by ইলিরা দেওয়ান

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সারা দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির একটি পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিল।

নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনড় ইংলাক

ইংলাক সিনাওয়াত্রা
থাইল্যান্ডে বিরোধীদের রাজধানী ‘ব্যাংকক অচল’ কর্মসূচি সত্ত্বেও ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী আগামী ২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হবে। নির্বাচন পেছানোর প্রস্তাব নিয়ে গতকাল বুধবার বিরোধীরা বৈঠক বর্জনের পর ইংলাক সরকারের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা গতকাল বলেন, ‘নির্বাচনই চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের সবচেয়ে ভালো পথ। সরকারের প্রতি কারও ক্ষোভ থাকলে তা ব্যালটের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন।’ থাইল্যান্ডের নির্বাচন কমিশন ২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পেছানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। এ নিয়ে গতকাল বৈঠক ডেকেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক। কিন্তু বিরোধীরা বৈঠক বর্জন করে। এদিকে আন্দোলনকারীদের প্রধান নেতা সুথেপ থাগসুবানকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপপ্রধানমন্ত্রী সুরাপং টোভিচাকচাইকুল। গতকাল তিনি টেলিভিশন ভাষণে বলেন, আন্দোলনকারীদের প্রধান নেতা সুথেপকে যত দ্রুত সম্ভব গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হলে দেশে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়বে। ইংলাকের পদত্যাগের দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে থাইল্যান্ডে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। গত সোমবার থেকে দুই দিন আন্দোলনকারীরা রাজধানী ‘ব্যাংকক অচল’ কর্মসূচি পালন করেন। গত মঙ্গলবার তাঁদের কর্মসূচি শেষ হলেও এখনো তাঁরা ব্যাংককের রাজপথে অবস্থান করছেন। ইংলাককে পদত্যাগে বাধ্য করতে বিক্ষোভকারীরা ‘ব্যাংকক অচল’ কর্মসূচির চাপ বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছেন।
গতকাল টানা তৃতীয় দিনের মতো রাজধানী ব্যাংককের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কগুলোতে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। তবে আগের দুই দিনের চেয়ে গতকাল রাজধানীর বেশ কিছু সড়কে যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়। সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান নেতা সুথেপ থাগসুবান গতকাল নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘জনগণের বিপ্লব প্রায় সফল হয়েছে।’ বিরোধীদের ‘ব্যাংকক অচল’ কর্মসূচির মধ্যেই গতকাল নির্বাচন স্থগিতের জন্য থাই নির্বাচন কমিশনের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার জন্য ইংলাক বৈঠক ডেকেছিলেন। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সরকারবিরোধী নেতারা সেই বৈঠকে যাননি। ইতিপূর্বে ইংলাক বলেছিলেন, ২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন না হলে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, ‘জনগণ যদি সরকারকে না চায়, তাহলে ভোটের মাধ্যমেই সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে হবে।’ কিন্তু সরকারবিরোধীরা ও থাই রাজপরিবার ফেব্রুয়ারির নির্বাচন চায় না। তারা মনে করে, এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অর্থ ইংলাক ও তাঁর ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠদেরই ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা। থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা আপিসিত ভেজ্জাজিওয়ার এক আত্মীয়ের বাসায় গত মঙ্গলবার রাতে ছোট আকারের বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। গতকাল ব্যাংককে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে বন্দুকধারীরা গুলি চালালে দুজন সামান্য আহত হন। তাঁদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এএফপি ও বিবিসি।

‘ডেভিলস অ্যাডভোকেট’

শরিফউদ্দিন পীরজাদা
১৯৯৭ সালের হলিউড চলচ্চিত্র দ্য ডেভিলস অ্যাডভোকেট বা ‘শয়তানের আইনজীবী’। এখানে ডেভিল বা শয়তানের আইনজীবী আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে অপরাধীদের নির্দোষ প্রমাণ করেন। পাকিস্তানের অন্যতম জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরিফউদ্দিন পীরজাদাও (৯০) সেই রকম খেতাব পেয়েছেন অনেক আগে। কারণ, সুদীর্ঘ পেশাজীবনে তিনি দেশটির সামরিক বাহিনীর সমর্থিত প্রতিটি সরকারের উল্লেখযোগ্য পদে ছিলেন অথবা আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন।
সর্বশেষ তিনি পারভেজ মোশাররফের প্রধান আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পীরজাদা সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ও আইয়ুব খানের সময় অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। ছিলেন আইয়ুবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও। জিয়া-উল-হক এবং মোশাররফের জরুরি অবস্থার বৈধতা প্রমাণে কাগজপত্র তৈরিতে কাজ করেন। এএফপি।

খরগোশকে হারাল কচ্ছপ

স্কি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সেই খরগোশ ও কচ্ছপ
খরগোশ আর কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতার গল্প কারও অজানা নয়। কচ্ছপকে অবহেলা করে সেই প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত হেরেছিল খরগোশ। তবে সেটি ছিল বইয়ের গল্প। এবার গল্প নয়, বাস্তবে কচ্ছপের কাছে হেরেছে খরগোশ। তবে দৌড় নয়, হেরেছে স্কি প্রতিযোগিতায়। চীনের হেনান প্রদেশে ওই স্কি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। গত মঙ্গলবার চায়না নিউজ সার্ভিসের খবরে বলা হয়, হেনান প্রদেশে বরফাচ্ছাদিত পাহাড়ি এলাকায় ওই স্কি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
এতে ৪০টি প্রাণী অংশ নেয়। গ্রিক পুরানের সেই গল্পের মতোই তাক লাগিয়ে দেয় একটি পোষা কচ্ছপ। খরগোশকে পেছনে ফেলে শেষ রেখা স্পর্শ করে কচ্ছপ। প্রতিযোগিতায় কচ্ছপটি তৃতীয় স্থান দখল করে। খবরে বলা হয়, খরগোশটি গ্রিক পুরানের সেই খরগোশের মতো পথে ঘুমিয়ে পড়ে না। তবে কিনা মনিবের নির্দেশনা মেনে চলার চেয়ে লাফালাফিতেই ব্যস্ত ছিল। আর কচ্ছপটি ছিল লক্ষ্যের দিকে অবিচল। প্রতিযোগীদের দলে কুকুর, বিড়াল, হাঁস ও মোরগও ছিল। গলায় টাই পরা একটি হাঁসও চমকের সৃষ্টি করেছে। নিরলস প্রচেষ্টায় তার স্কি যন্ত্রটিকে শেষ সীমানায় নিয়ে যেতে সমর্থ হয়। আয়োজকেরা এতেই খুশি। হাঁসের মালিকের হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মানজনক পুরস্কার। যদিও তাঁর হাঁসটি সব শেষে গন্তব্যে পৌঁছায়। তবে হাঁসটির নিরলস পরিশ্রম ও অধ্যবসায় ছিল অনুপ্রেরণা জাগানোর মতো। এ জন্যই তাকে পুরস্কৃত করা হয়। এএফপি।

বিশেষ দূত হয়েও খুশি নন এরশাদ by রাজীব আহাম্মদ

জাপার চাহিদার শেষ নেই
প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা এবং সরকারে শরিকানা পেয়েও সন্তুষ্ট নন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। দলটির চাওয়া আরও অনেক বেশি। দলের চেয়ারম্যান এরশাদ থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতারা পর্যন্ত যে যার মতো তদবিরে ব্যস্ত। এ নিয়ে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূলেও বিভেদ ছড়িয়ে পড়েছে। এরশাদকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করা হলেও তার চাওয়া পদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা হোক। অন্তত স্পিকারের সমমর্যাদা চান সাবেক এ রাষ্ট্রপতি। বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ সরকারে আরও অংশীদারিত্ব চান। ডেপুটি স্পিকার এবং আরও তিনটি মন্ত্রিত্ব চান। দলটির কয়েক নেতা ডেপুটি স্পিকার পদ পেতে রওশনের কাছে তদবির করছেন। বিরোধী দলের উপনেতা ও চিফ হুইপ হতে তদবির চলছে বলে জানা গেছে। সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমপি হতে এরশাদ এবং রওশন এরশাদ দু'জনের কাছেই তদবির করছেন দলের নারী নেত্রীরা। এরশাদের নির্দেশে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন অনেকে। সে 'বঞ্চিতদের' কেউ কেউ 'ক্ষতিপূরণ' হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে পদ চান। কেউ কেউ আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান হতে চান। ১২ জানুয়ারি এরশাদকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। জাতীয় পার্টির এরশাদপন্থি নেতারা জানান, মন্ত্রী পদমর্যাদার কারণে ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করছেন সাবেক এ রাষ্ট্রপতি। সে কারণে গত চারদিন পদ পেলেও গাড়িতে পতাকা ব্যবহার করছেন না। পদমর্যাদা-সংক্রান্ত বিধান 'ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্স' অনুযায়ী সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে এরশাদ রাষ্ট্রের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে পড়েন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির পরই তার অবস্থান। মন্ত্রীদের অবস্থান পাঁচ নম্বরে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে থাকার পরও মন্ত্রী পদমর্যাদায় দূত করাকে অপমান হিসেবেই দেখছেন এরশাদ। সাবেক এ সামরিক শাসক অন্তত স্পিকারের পদমর্যাদায় মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত হতে আগ্রহী। স্পিকারের পদ সাংবিধানিক। নির্বাহী আদেশে এ মর্যাদা দেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। জাতীয় পার্টির সূত্রগুলো জানায়, পদমর্যাদা বৃদ্ধির জন্য এরশাদ সংসদ থেকে পদত্যাগের হুমকি দিতে পারেন। বিশেষ দূতের পদও ছাড়তে পারেন। তার দাবি মেনে নিতে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগও করছেন। বুধবার তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দনও জানান।
সাম্প্রতিক সময়ে এরশাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আবদুস সবুর আসুদ সমকালকে বলেন, 'হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমনিতেই মন্ত্রীর ওপরের পদমর্যাদায় রয়েছেন। সরকার তাকে মন্ত্রী পদমর্যাদা দেওয়ার নাম করে ডিমোশন দিয়েছে।'
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদেরকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেড়ে দেওয়া রংপুর-৬ আসন থেকে নির্বাচিত করে সংসদে আনতে চান এরশাদ। লালমনিরহাট-৩ আসনে প্রার্থিতা বহাল থাকলেও এরশাদের নির্দেশে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন জিএম কাদের। স্ত্রী রওশনের নেতৃত্বে দলের একটি অংশ এরশাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ছোট ভাই জিএম কাদেরকে সংসদে চান এরশাদ। রংপুর-৬ আসন আওয়ামী লীগ ছাড় না দিলে পদত্যাগের হুমকি 'অস্ত্র' হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন এরশাদ। জিএম কাদেরের স্ত্রী শেরিফা কাদেরকে সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমপি বানানোর সিদ্ধান্তেও এরশাদ অনড়। তবে দেবর জিএম কাদেরের সঙ্গে পুরনো বিরোধের কারণে শেরিফা কাদেরকে সংসদে আনতে রাজি নন রওশন।
ডেপুটি স্পিকার এবং আরও তিনটি মন্ত্রিত্ব চান রওশন। পানিসম্পদমন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ প্রকাশ্যেই এ চাওয়ার কথা জানান। এর জন্য সরকারের সঙ্গে আলোচনাও চলছে। মন্ত্রিত্ব পাওয়ার বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে বলেও জাতীয় পার্টির নেতারা জানান।
জাতীয় পার্টির সূত্রগুলো জানায়, দলের মহাসচিব এবিএম রহুল আমীন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, তাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং সালমা ইসলাম মন্ত্রিত্ব পেতে জোর তদবির করছেন। শেষের দু'জন রওশনের কাছে জোর তদবির চালাচ্ছেন। আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত জিয়াউদ্দিন বাবলু প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের কাছে মন্ত্রিত্ব পেতে তদবির করছেন বলে জানা গেছে।
রুহুল আমীন হাওলাদার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও সালমা ইসলাম মন্ত্রিত্ব পাওয়ার চেষ্টার কথা স্বীকার করেছেন। তাজুল ইসলাম সরাসরি অস্বীকার না করে বলেন, 'নিজ নিজ অবস্থার উন্নয়নের চেষ্টা সবাই করে। এটা দোষনীয় নয়।' রুহুল আমীন হাওলাদার এরশাদের মারফতে তদবির চালাচ্ছেন বলে এরশাদপন্থিরা জানান। প্রধানমন্ত্রীর বিরূপ মনোভাব থাকায় রুহুল আমীন হাওলাদার ও সালমা ইসলামের পক্ষে মন্ত্রিত্ব পাওয়া কঠিন বলেই সূত্র মনে করছে।
বিরোধী দলের উপনেতা প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার। বিরোধী দলের নেতার ডান পাশের আসনে বসার সুযোগ পান উপনেতা। জাতীয় পার্টির এমপিদের অনেকেই উপনেতা হওয়ার তদবিরে আছেন। কাজী ফিরোজ রশিদ, তাজুল ইসলাম, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, জিয়াউল হক মৃধা এ পদের দাবিদার। ফিরোজ রশিদ সাবেক মন্ত্রী ছিলেন। তবু প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার বিরোধীদলীয় উপনেতা হতে আগ্রহী। তাজুল ইসলাম মন্ত্রিত্ব না পেলে কমপক্ষে উপনেতার পদ চান। ফিরোজ রশিদ স্বীকার না করলেও রওশনপন্থি নেতারা জানান, মন্ত্রিত্ব না পেয়ে উপনেতা হওয়ার দৌড়ে নেমেছেন তিনি।
বিরোধী দলের চিফ হুইপের সরকারি কোনো মর্যাদা নেই। তবে সামাজিক মর্যাদা ও গণমাধ্যমের কাছে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এ পদে রুহুল আমীন হাওলাদারের নাম শোনা গেলেও তিনি আগ্রহী নন। জাতীয় পার্টির এমপি ফখরুল ইমাম সমকালকে বলেন, আগ্রহী অনেকেই আছেন। সবাই নিজের মতো করে চেষ্টা করছেন। সময় হলেই দেখতে পারবেন। পীর ফজলুর রহমান, নাসিম ওসমান, শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের পদ পেতে। রওশনের কাছে নিয়মিত তদবির করে চলেছেন তারা।
মহিলা এমপি হতেও তদবির কম নয়। এ নিয়ে আবার বিরোধও আছে। খোদ এরশাদ ও রওশন এরশাদ বিরোধে জড়িয়েছেন মহিলা এমপি পদ নিয়ে। ৩৩ আসন পেয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশকারী জাতীয় পার্টি ৬টি মহিলা আসন পেতে পারে। শেরিফা কাদের, ব্যারিস্টার দিলারা খন্দকার, পালক কন্যা মৌসুমী আক্তার, জাতীয় মহিলা পার্টির সাধারণ সম্পাদিকা নাজমা আক্তার এবং মেহজাবিন মোরশেদকে এমপি বানাতে চান এরশাদ। প্রথম তিনজনের কেউই রওশনের পছন্দের নয়। রওশন তাদের এমপি বানাতে রাজি নন। মহিলা পার্টির সভানেত্রী নূরে হাসনা চৌধুরী লিলি, আনোয়ারা বেগম, দলের যুগ্ম মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়ার স্ত্রীসহ আরও কয়েক নেত্রী এমপি হতে রওশনের কাছে তদবির করছেন।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

আজ পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল। ইসলাম ধর্মের সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জন্ম ও ওফাতের পুণ্য স্মৃতিময় দিন, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে বর্তমান সৌদি আরবের মক্কা নগরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের একই দিনে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। তাই এই দিনটি মুসলমানদের কাছে বিশেষ গুরুত্ববহ। এই দিনটিকে মনে করা হয় অশেষ পুণ্যময়, আশীর্বাদধন্য একটি দিন হিসেবে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন ‘আল-আমিন’ নামে। এই খ্যাতি ছিল তাঁর ন্যায়নিষ্ঠা, সততা ও সত্যবাদিতার ফল। এসব সদ্গুণ ধর্ম-সম্প্রদায়নির্বিশেষে সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক গুণাবলি হিসেবে সব কালে, সব দেশেই স্বীকৃত। এসব ছাড়াও তাঁর মধ্যে সম্মিলন ঘটেছিল সমুদয় মানবীয় সদ্গুণের: করুণা, ক্ষমাশীলতা, বিনয়, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা, শান্তিবাদিতা। আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি কর্মময়তাও ছিল তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে তিনি ইসলামের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে বিশ্বমানবতার মুক্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হয়েছিলেন। অসাধারণ চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন তিনি এবং চিন্তাকে কাজে রূপ দিতে তাঁর সমগ্র জীবন হয়ে উঠেছিল বিপুল কর্মময়।
আরব ভূখণ্ডে তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল এমন এক যুগে, যখন পুরো অঞ্চলটি নিমজ্জিত ছিল অশিক্ষা, কুসংস্কার, গোষ্ঠীগত হানাহানি, নির্মম দাসপ্রথা, নারীর প্রতি চরম বৈষম্যসহ নানা রকম সামাজিক অনাচারে। সেই নৈরাজ্যকর অমানিশায় হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাব ঘটে আলোর দিশারি রূপে। অন্যায়-অবিচার-অজ্ঞানতার আঁধার থেকে মানুষকে তিনি চালিত করেন সত্য ও ন্যায়ের আলোকিত পথে। ইসলামের সেই আলোর দিশা ক্রমে ব্যাপ্ত হয়ে পড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন কোণে। সার্বিক অর্থে মানবজাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্যই আবির্ভাব ঘটেছিল এই মহামানবের। হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মুসলমানদের রাসুল; কিন্তু অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মানুষকেও তিনি ভালোবাসতেন সমানভাবে। তাঁর সত্য ও ন্যায়ের আদর্শ ছিল সর্বমানবিক। মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকে মানবিক মঙ্গল সাধিত হয়; করুণা ও ভালোবাসা মানবজাতিকে হিংসা ও হানাহানি থেকে মুক্ত রাখতে পারে। আজকের পৃথিবীতে যে হিংস্র হানাহানি চলছে, তা থেকে পরিত্রাণের পথ রয়েছে এই মহান ব্যক্তিত্বের প্রদর্শিত শান্তি ও সমঝোতার পথে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও করুণার অনন্য দৃষ্টান্ত। শুধু কথায় নয়, প্রতিটি বাস্তব কাজের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের মনে এই শুভবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন যে, মানুষ হলো আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব।

নিয়মরক্ষার মন্ত্রিসভা

নিয়মরক্ষার নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত মন্ত্রিসভাকে নিয়মরক্ষার হিসেবেই গণ্য করতে হবে। গত রোববার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হলো, সেটি নানা কারণে আলোচনার দাবি রাখে। এই মন্ত্রিসভায় নবীন ও প্রবীণের সমন্বয় ঘটেছে, যা ভারসাম্যমূলক। দ্বিতীয়ত, এতে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি কয়েকটি ছোট দলের প্রতিনিধিত্ব আছে। এটি সরকারদলীয় ও তার মিত্রদের রাজনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হলেও জাতীয় সংসদে সত্যিকারের বিরোধীদলীয় প্রতিনিধিত্ব অমীমাংসিত থাকছে। উপরন্তু সরকারে ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ জাতীয় পার্টির প্রতিনিধিত্ব থাকায় সরকার ও বিরোধী দলের বিভাজনরেখা মুছে যাওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। তবে শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, গত মন্ত্রিসভার বিতর্কিত ও সমালোচিত সদস্যদের বাদ পড়া। বিগত মন্ত্রিসভার ৫১ জন সদস্যের মধ্যে ৩৫ জনের বাদ দেওয়াকে সামান্য ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এঁদের প্রায় সবার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অদক্ষতা, অযোগ্যতা ও অতিকথনের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বাদ পড়া এসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর হলফনামায় দেখা যায়, মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে কারও কারও সম্পত্তি বেড়েছে শতগুণ বা তারও বেশি। কয়েকজন মন্ত্রীর অযোগ্যতা ও গোঁয়ার্তুমির কারণে বিদেশেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। শুধু মন্ত্রী না থাকা যথেষ্ট নয়, আইনকেও তার পথে চলতে দিতে হবে।
দুদকীয় নীরবতা ভাঙতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি এসব সমালোচনা বিবেচনায় নিয়ে অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজদের ঝেড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, সেটি প্রাথমিক ভালো কাজ হিসেবেই বিবেচিত হবে। তবে এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে, বিগত মন্ত্রিসভার সব বিতর্কিত ব্যক্তি যেমন বাদ পড়েননি, তেমনি নতুনদের মধ্যেও কারও কারও নেতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর এখন সরকারের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হবে প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে নতুন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু করা এবং একই সঙ্গে সুশাসনে ব্রতী হওয়া। সাম্প্রতিক আন্দোলনে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবহনব্যবস্থা প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, যার বিরূপ প্রভাব দেখা দিয়েছে অর্থনীতি ও জনজীবনে। তাই, অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে সরকারকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। মহাজোট আমলের পুরো সময়টা জুড়ে যেভাবে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের দৌরাত্ম্য চলছিল, এবারে যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়েও সরকারের কঠোর নজরদারি দরকার। পাশাপাশি বিরোধী দল যাতে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কর্মসূচি পালন করতে পারে, সে জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করতে না পারলে রাজনীতির অনিয়মতান্ত্রিক পথে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে। নতুন সরকারের জন্য সেই ঝুঁকি নেওয়া মোটেই সমীচীন হবে না।

পনের স্থানে ১৫ জন খুন

পৃথক ঘটনায় বিভিন্ন স্থানে ১৫ জন খুন হয়েছেন। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
খুলনা :মেহেদী হাসান ওলি নামের এক ইজিবাইক চালককে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার সকালে নগরীর দৌলতপুর থানার বণিকপাড়া এলাকার একটি ড্রেন থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশা বণিকপাড়া এলাকার হাশেম শেখের ছেলে।
নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) :উপজেলার কচাকাটা থানার সুবলপার সবদেরমোড়ের মৃত নঈমুদ্দিনের ছেলে কথিত জিনের বাদশা সাবু কবিরাজকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার সকালে ভূরুঙ্গামারীর আন্ধারীঝাড় হ্যালোডাঙ্গা এলাকায় রাস্তার পাশে তার লাশ পাওয়া যায়। নিহত সাবু দীর্ঘদিন থেকে মোবাইল ফোনে জিনের বাদশার পরিচয়ে প্রতারণা করে আসছিল।
জয়পুরহাট :পাঁচবিবি উপজেলার হাবিবপুর আশ্রয়ণের পশ্চিমে তুলসীগঙ্গার নদীপাড় থেকে জয়পুরহাট সদরের তুলট গ্রামের আমেনা বিবি নামে এক বৃদ্ধার লাশ উদ্ধার করেছে। উদ্ধারকৃত লাশ মঙ্গলবার ময়নাতদন্তের পর জয়পুরহাট আনজুমান মুফিদুল কবরস্থানে দাফন করা হয়।
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) :আন্ধারমানিক নদীর ওপর নির্মাণাধীন শেখ কামাল ব্রিজের নীলগঞ্জ খেয়াঘাট থেকে নগ্ন এক কিশোরীর অর্ধগলিত লাশ মঙ্গলবার উদ্ধার করেছে পুলিশ।
রামগঞ্জ (লক্ষ্মীপুর) :পুলিশ সোমবার সন্ধ্যায় পৌর বাঁশঘর গ্রামের হাজী বাড়ির বাগান থেকে স্কুলছাত্রী রহিমা আক্তারের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে। লাশ ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলবার বিকেলে দাফন করা হয়।
মাদারীপুর :রাজৈর উপজেলার হৃদয়নন্দী আদর্শ গ্রামে পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে আবদুর রহমান নামের এক বৃদ্ধ খুন হয়েছেন। আবদুর রহমান রোববার বিকেলে পাওনা টাকা চাইতে একই গ্রামের ছত্তার মোল্লার ছেলে শাহা মোল্লার কাছে যান। এতে শাহা মোল্লা ক্ষিপ্ত হয়ে আবদুর রহমানের সঙ্গে প্রথমে কথা কাটাকাটি পরে তার অণ্ডকোষ চেপে ধরে। এতে আবদুর রহমান অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে মঙ্গলবার দুপুরে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।
কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) :পৌর এলাকার বগাবাড়ি গ্রামের পুকুর থেকে মো. হাবিব মিয়া নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে।
সিরাজগঞ্জ :কামারখন্দ উপজেলার ঝাঔল এলাকায় ঢাকা-সিরাজগঞ্জ-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে রেললাইনের ওপর থেকে অজ্ঞাত পরিচয় এক যুবকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সিরাজগঞ্জ জিআরপি থানার পুলিশ বুধবার সকালে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড়ের ওই স্থান থেকে লাশটি উদ্ধার করে সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে।
ঠাকুরগাঁও :বালিয়াডাঙ্গীতে অজ্ঞাত পরিচয় এক তরুণীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ভানোর নেংটিহারা গ্রামে। মঙ্গলবার বিকেলে ওই এলাকার একটি মাঠ থেকে তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ভাঙ্গা (ফরিদপুর) :উপজেলার কাউলিবেড়া ইউনিয়নের নিচিন্তপুর গ্রামের একটি ফসলি জমির মধ্য থেকে মঙ্গলবার পুলিশ অজ্ঞাত পরিচয় কিশোরীর লাশ উদ্ধার করেছে।
নীলফামারী :তিস্তা নদীর চরে বালুতে পুঁতে রাখা অবস্থায় অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের উত্তর খড়িবাড়ি থেকে এই লাশ উদ্ধার করা হয়।
কাঁঠালিয়া (ঝালকাঠি) :আম্বিয়া বেগম নামের এক নারীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার সকালে উপজেলার চেঁচরী রামপুর উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন ধানক্ষেতে এক নারীর লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঝালকাঠি সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
ডুমুরিয়া (খুলনা) :নিখোঁজ দিনমজুর সঞ্জয় দাসের লাশ চারদিন পর মঙ্গলবার সকালে উপজেলার শিঙ্গার নদী থেকে ভাসমান আবস্থায় গ্রামবাসী উদ্ধার করে।
লক্ষ্মীপুর :কমলনগর উপজেলার চরকাদিরা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর কাদিরা গ্রামের নুরনবীর বাড়ি থেকে তিন সন্তানের জননী গৃহবধূ নাছিমা বেগমের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে স্বামী জসিম উদ্দিন ও শ্বশুর-শাশুড়ি পলাতক। মঙ্গলবার দুপুরের দিকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এদিকে অভিযোগ উঠেছে, নিহতের স্বামী জসিম উদ্দিন স্ত্রী নাছিমাকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ বসতঘরের একটি আড়ার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখে।
কুড়িগ্রাম :ভুরুঙ্গামারী উপজেলার আন্ধারীরঝাড় ইউনিয়নের হেলোডাঙ্গা এলাকার দুদকুমোর নদীর বালু চর থেকে মোনাব্বেরুল হক সাবু নামে এক ব্যক্তির লাশ বুধবার উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ব্যাপারে নিহতের ভাই লেবু মিয়া দুই জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৮ জনকে আসামী করে মামলা করেছে।

এসব দেখি কানার হাটবাজার

বরিশালের রসুলপুর চরে চকবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন মাঠ দখল করে 'মার্কেট' নির্মাণের যে আয়োজন চলছে তা কতটা অবিমৃষ্যকারী, মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত সচিত্র প্রতিবেদনেই তা স্পষ্ট। দেখা যাচ্ছে, বিদ্যালয় ভবনের কয়েক ফুট সামনে চলছে তথাকথিত মার্কেটের দেয়াল নির্মাণের কাজ। এই অপতৎপরতা আমাদের যেমন বিস্মিত তেমনই ক্ষুব্ধ করেছে। আধুনিক সমাজেও এভাবে স্কুলমাঠ দখল চলতে পারে_ না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এতে স্কুলের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার সুযোগই কেবল বন্ধ হয়ে যাবে না, বাজারের হট্টগোলে পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশও বিঘি্নত হতে বাধ্য। সমকালের প্রতিবেদনসূত্রে জানা যাচ্ছে, এই অপকর্মের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় ভূমি দফতর সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি এবং তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। মাঠ দখলের যৌক্তিকতা হিসেবে তারা খাস জমি ইজারা নেওয়ার নথিপত্র প্রদর্শন করেছে। তারা যে কেবল লোভী দখলদার তা নয়, কাণ্ডজ্ঞানও খুইয়েছে দেখা যাচ্ছে। আমরা মনে করি, খাস জমি তো নয়ই, স্কুল সংলগ্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমিতেও এভাবে বাজার বসানোর নৈতিক অধিকার কারও নেই। স্থানীয় ভূমি অফিসও স্পষ্টতই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিদ্যালয় মাঠে বাজার বসানোর সম্পূর্ণ আয়োজন এক বিকট সামাজিক অপরাধ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। আমরা চাই, কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। খাস জমিটি যদি বরাদ্দ হয়েও থাকে, যে কোনো মূল্যেই তা বাতিল করার বিকল্প নেই। কয়েক বছর আগে বিদ্যালয়টি যখন বর্তমান অবস্থানে স্থানান্তর হয়, তখন এর সঙ্গে ৩৩ শতাংশ ভূমি বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তা কেন প্রতিপালিত হয়নি_ খতিয়ে দেখতে হবে সেটাও। যত দ্রুত সম্ভব মাঠের জায়গাটি স্কুলের নামে বরাদ্দ দিয়ে বিলম্বে হলেও সেই ভুল শোধরানো হবে বলে প্রত্যাশা। একই সঙ্গে বাজারটি বসানোর সঙ্গে যারা জড়িত_ ভূমি অফিসের উচ্ছিষ্টভোগী বা স্থানীয় প্রভাবশালী, তাদের একত্র হওয়ার পেছনে কী পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়েছে, তা উদ্ঘাটন করা জরুরি। জরুরি অবিমৃষ্যকারিতার দণ্ডও। অন্যথায় এ ধরনের অঘটন আরও দেখার আশঙ্কা রয়েই যাবে।

প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি হোক

গত বছরের ফেব্রুয়ারির শেষদিক থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়েতে আড়াইশ'র মতো নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মামলা হয় দুই শতাধিক। কিন্তু মঙ্গলবার সমকাল খবর দিয়েছে, 'রেলে নাশকতার তদন্তে গতি নেই'। প্রতিবেদনে বলা হয়, এখন পর্যন্ত কোনো মামলার জন্য অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করেনি রেলওয়ে পুলিশ। রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে গত কয়েক বছরে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছিল। এ খাতের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়েছে। সরকার বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। কিন্তু একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী রেলপথ ও গাড়িগুলোতে নাশকতা চালাতে শুরু করে। স্টেশনে স্থির থাকা বগি ও ইঞ্জিনে আগুন দেওয়া, স্টেশন ভাংচুর ও অগি্নসংযোগ, লাইন তুলে ফেলা এমনকি চলন্ত গাড়িকে দুর্ঘটনায় ফেলা_ এসবই তারা করেছে পরিকল্পিতভাবে। অতীতে কোনো সময়েই রেলওয়ে খাত এমন সহিংসতার শিকার হয়নি। সরকারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপির কর্মীরাও রেলওয়ে খাতকে বিপর্যস্ত করার কর্মকাণ্ডে শামিল হয়েছে। সরকার-বিরোধিতার নামে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা সম্পূর্ণ অনুচিত। বাস্তবে দেখা গেল, নাশকতা ও হিংসার আগুনে রেল পুড়লেও সরকার নির্বাচন প্রক্রিয়া ঠিকই সম্পন্ন করেছে। এখন খেসারত দিচ্ছে রেল মন্ত্রণালয়। তাদের নতুন করে অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে এবং এর জোগান সহজ হওয়ার কথা নয়। আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলন একেবারে হিংসামুক্ত থাকে না। তাই বলে এ ধরনের পরিকল্পিত নাশকতা কেন? সংশ্লিষ্ট সবাইকেই এ বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। দেশের স্বার্থ এভাবে উপেক্ষার পরিণতি কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। রেল পুলিশ নাশকতা ও ধ্বংসাত্মক ঘটনাগুলোর তদন্ত করেছে বলে জানিয়েছে। এ তদন্তের গতি কেন মন্থর_ সেটা স্পষ্ট নয়। মামলা সংখ্যা অনেক এবং বিষয়টি রাজনীতি সংশ্লিষ্ট_ এটি একটি কারণ হতে পারে। জামায়াতে ইসলামী এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিএনপি সুপরিকল্পিতভাবেই এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। এ জন্য ঢালাওভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী নেতাকর্মীদের নামে মামলা দায়েরের কোনো যুক্তি নেই। সন্দেহভাজন হিসেবে কিছু লোকের নামে মামলা দায়ের করাও ঠিক নয়। অভিজ্ঞতা বলে যে, এভাবে মামলা দায়েরকে জনগণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা হিসেবে দেখে থাকে এবং বিরক্ত হয়। এ ধরনের মামলার ভিতও দুর্বল হয়ে থাকে। আমরা আশা করব, রেল পুলিশ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনী প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করায় সক্রিয় হবে। দেখা গেছে, কোনো কোনো স্থানে এক থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত রেললাইন দুর্বৃত্তরা তুলে ফেলেছে। এ ধরনের কাজ করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। গোয়েন্দারা যদি এর সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করতে না পারে, তাহলে তাদের এ দায়িত্বে রাখার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। এ ব্যর্থতার দায় এড়াতে ঢালাওভাবে মামলা দায়ের মেনে নেওয়া যায় না। পরিকল্পিতভাবে রেলের ক্ষতি করার সঙ্গে যুক্তদের অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে এবং এর প্রধান শর্ত হচ্ছে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা। যে ব্যাপকতায় নাশকতা হয়েছে, তাতে অপরাধীদের খুঁজে বের করা কঠিন হওয়ার কথা নয়। সংশ্লিষ্টরা এ কাজে সফল হবে_ এটাই প্রত্যাশা।

নির্বাচনের মাধ্যমে সংকটের সমাধান হবে :ইংলাক

বিরোধীদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা। চলমান সংকট নিরসনে নির্বাচনই সর্বোত্তম পন্থা বলেও গতকাল বুধবার মন্তব্য করেন তিনি। এদিকে, প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী অভিজিত ভেজ্জাজিভার বাসভবনে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। খবর :এএফপি, রয়টার্স ও এপি। চলমান সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে থাইল্যান্ডের নির্বাচন কমিশন নির্বাচন স্থগিতের পরামর্শ দেয়। তাদের এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে গতকাল বৈঠক ডেকেছিলেন নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা। তবে বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও স্বাধীনচেতা নির্বাচন কমিশনাররা এতে অংশ নেননি। ইংলাকের বৈঠকে তার মন্ত্রিসভার সদস্য, নিবন্ধিত প্রার্থী ও শীর্ষ নির্বাচনী কর্মকর্তারা যোগ দেন। এ বৈঠকে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের জন্য নির্বাচন পেছানোর কোনো আইনি উপায় নেই। ২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি স্থগিতকরণ সংবিধান সমর্থন করবে না বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। ইংলাক বলেন, 'জনগণ যদি এই সরকারকে না চায় তবে তাদের ভোটে যাওয়া উচিত।' মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর প্রধান অর্থনৈতিক এলাকায় সরকারবিরোধী র‌্যালিতে অজ্ঞাত বন্দুকধারীর গুলিতে দুই ব্যক্তি আহত হয়েছেন। এ ছাড়া অভিজিত ভেজ্জাজিভার বাসভবনে ছোট আকারের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে অবশ্য কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ জানিয়েছে, বিস্ফোরণে বাসার ছাদের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সময় বাসায় কেউ ছিলেন না।
ইংলাকের বিরোধীরা ফেব্রুয়ারির এ নির্বাচনটি চায় না। কারণ এতে ইংলাকেরই সহজ জয়লাভের সম্ভাবনা খুব বেশি। বিগত সময়ের নির্বাচনগুলোয় তাই-ই দেখা গেছে। প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টিসহ সরকারবিরোধীরা চাচ্ছে ইংলাক সরকারের পরিবর্তে অনির্বাচিত একটি গণপরিষদকে ক্ষমতায় আনতে। তাদের দাবি, কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে রাজনৈতিক সংস্কার করতে হবে এবং এজন্য ইংলাক সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। ইংলাক পদত্যাগে অস্বীকার করে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করেন। কিন্তু নির্বাচনে অংশ নিতেও আপত্তি জানিয়েছে বিরোধীরা। থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে ইংলাকের ভাই ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার প্রভাব কমানোই বিরোধীদের প্রধান লক্ষ্য।
গতকাল তৃতীয় দিনের মতো 'ব্যাংকক অচল' কর্মসূচি পালন করে বিরোধীরা। তবে রাস্তায় আগের দু'দিনের তুলনায় অনেক বেশি গাড়ি চলতে দেখা যায়। এতে আন্দোলন গতি হারাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। গতকালও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা সুথেপ থাউগসুবান। এদিকে, গতকালই এক টেলিভিশন বক্তব্যে থাই উপপ্রধানমন্ত্রী সুরাপং তোভিচাকচাইকুল অবিলম্বে সুথেপ ও সহযোগীদের গ্রেফতারে পুলিশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অভিজিত, সুথেপসহ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ২০১০ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সেনাবাহিনী অভিযান চালালে শতাধিক লোক নিহত হয়। সে সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন অভিজিত এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন সুথেপ।

সূর্যোদয়ের দেশে by অদিতি ঢালী ও তনুশ্রী দত্ত

জাপানিরা প্রতিদিন পৃথিবীর প্রথম সূর্য দেখে। তারপর অন্যরা। প্রশান্ত মহাসাগরের পারে জাপানের অবস্থান। শুনেছি জাপানের অনেক কথা। পড়েছি রবীন্দ্রনাথের 'জাপানযাত্রী'। মনে মনে ভাবতাম, যদি ওদের কাছে যেতে পারতাম, ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারতাম, ওদের দেশটা দেখতে পারতাম! সৃষ্টিকর্তা আমাদের চাওয়াটা খুব তাড়াতাড়ি পূরণ করে দিয়েছেন। জেনেসিস ২.০ প্রোগ্রামের কল্যাণে ৯ দিনের জন্য ঘুরে এলাম জাপান। আমাদের টিমে ছিল দু'জন সুপারভাইজারসহ ৩৩ জন। এ টিমে ঢাকা ছাড়াও নড়াইল, রাজশাহী, বরগুনা, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রামের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী বন্ধুরা ছিল। ৯ ডিসেম্বর ভোর আমাদের জীবনে এসেছিল এক অনাবিল আনন্দ নিয়ে। প্লেনে বসেই দেখলাম প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য থেকে পৃথিবীর প্রথম সূর্য উঠছে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে মন ভরে তা দেখেছি। বারবার মনে হয়েছে আজ আমরাই সূর্যকে প্রথম আহ্বান জানাতে পেরেছি। বিমানবন্দরের আনুষঙ্গিকতা শেষ করে বাসে করে হোটেল স্প্রিংস মাকুহারি যেতে যেতে আমরা মুগ্ধ চোখে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাস্তা, রাস্তার পাশের সুন্দর বৃক্ষরাজি দেখছিলাম। কেউ ট্রাফিক নিয়ম লঙ্ঘন করছে না। তৃতীয় দিনে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে গড়ে ওঠা শান্ত শহর মিয়াজাকিতে। দেখলাম জাপান কীভাবে পরিত্যক্ত বর্জ্য পদার্থ যেমন_ কোকের ক্যান, পানির বোতল, পরিত্যক্ত জামা-কাপড় ইত্যাদি থেকে ব্যবহার উপযোগী দ্রব্যাদি (চায়ের কাপ, থালা-বাটি, ডাইনিং টেবিল, চেয়ার, পুতুল, শোপিস ইত্যাদি) উৎপাদন করে সেই পদ্ধতি। সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। অল্প সূর্যের আলো পেলেই তা দিয়ে অনেক সৌরবিদ্যুৎ উৎপন্ন করছে। তাদের প্রযুক্তি উন্নত।
আমাদের নেওয়া হলো মিয়াজাকি নিশি হাইস্কুলে। সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল। এখানে ৩০টি ক্লাব আছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একাধিক ক্লাবের সদস্য হতে হয়। পাঠ্য বিষয়ের পাশাপাশি বাস্তব জ্ঞান অর্জনের ওপর বেশ জোর দেওয়া হয়। তাদের বিভিন্ন জাদুঘর, শিল্প-কারখানা, মন্দির পরিদর্শন করানো হয়। স্কুল ক্যাম্পাস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। শিক্ষার্থীরা টিফিন টাইমের পরে নিজ উদ্যোগে স্কুল ক্যাম্পাস পরিষ্কার করে। জাপানিদের জীবনযাত্রা ভালোভাবে বোঝার জন্য আমাদের দু'জন করে শিক্ষার্থীকে একেকটি পরিবারের সঙ্গে প্রায় দু'দিন থাকার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। আমরা দু'জন ছিলাম দুটি ভিন্ন পরিবারের সঙ্গে। দুটিই সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবার। দুই পরিবারেই আমাদের সমবয়সী দুটি মেয়ে ছিল। বড় বোন কিছু বললেই ছোট ভাইবোনেরা ছোটাছুটি করতে থাকে আমাদের প্রয়োজন মেটাতে। ওদের আতিথেয়তা, সৌজন্য, সৌহার্দ্য, ভদ্রতা ও আন্তরিকতায় আমরা মুগ্ধ।
জাপানিদের আবাসিক এলাকা হাইওয়ে থেকে দূরে। বাড়িগুলো প্রায়ই কাঠের। একতলা-দোতলা। প্রতিটি বাড়ির আকার-আকৃতি ও নকশা প্রায় একই রকম। সামনে ফুলের বাগান। পার্ক, স্কুল আছে কাছাকাছি। ছেলেমেয়েরা নিজস্ব সাইকেল অথবা গাড়িতে করে স্কুলে যায়। জাপানিদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পরিচয় মেলে ওদের নিজস্ব স্টাইলের বাথরুম ও ওয়াশরুমে। পুরো পৃথিবী যখন কাঁটাচামচ দিয়ে খায়, জাপানিরা এখনও তাদের চপস্টিক (কাঠি) দিয়ে খাওয়ার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। ঠিক যেমন বাঙালিরা হাত দিয়ে খেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
দু'দিনেই পরিবারের সবার সঙ্গে এক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। হোটেলে ফেরার সময় ভাইবোনের চোখগুলো ছলছল করছে। ১৬ ডিসেম্বর টোকিওতে আমাদের প্রেজেন্টেশন দিতে হয়েছে। এখানে আমরা আমাদের জাপান ভ্রমণ থেকে অর্জিত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে আমাদের মতামত তুলে ধরেছিলাম। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন ছিল আমাদের মহান বিজয় দিবস। আমরা সেখানে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত পরম শ্রদ্ধায় গেয়েছিলাম। আরও গেয়েছিলাম পল্লীগীতি ও রণসঙ্গীত। বিদেশের মাটিতে নিজের দেশকে এভাবে তুলে ধরতে পেরে নিজেদের খুব গর্বিত মনে হচ্ছিল। জাপানে কেটে গেল নয়টি দিন। কখন যে শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। সারাদিনের ব্যস্ততা, রাতের আড্ডা, পরের দিনের মানসিক প্রস্তুতি আমাদের একটি ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল। নতুন দেশ, নতুন বন্ধু, অনেক স্মৃতি। জাপান ভ্রমণের এসব স্মৃতি আমাদের হৃদয়পটে চিরজাগরূক হয়ে থাকবে।
শিক্ষার্থী, একাদশ শ্রেণী, ভিকারুনিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ

নতুন মন্ত্রিসভার কাছে প্রত্যাশা by মো. শরিফুল ইসলাম খান

নির্বাচন বিতর্কিত হলেও নতুন মন্ত্রিসভা যে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। দলের প্রভাবশালী নেতাদের ও ডজন তিনেক মন্ত্রীকে একসঙ্গে ছুড়ে ফেলার এমন দৃষ্টান্ত এই প্রথমই দেখেছি বলা চলে। আগের রেকর্ড বলছে, কোনো সরকার বা মন্ত্রিসভাই বিতর্কের ঊধর্ে্ব ছিল না। তবে সরকার নিশ্চয়ই চেষ্টা করে। আমাদের বর্তমান মন্ত্রিসভা বলা চলে প্রধানমন্ত্রীর উপহার। বিগত প্রায় ৭০ শতাংশ মন্ত্রীকে বাদ দিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন, তাও আবার এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে_ এতেই বোঝা যায় আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান মনেপ্রাণে চান দেশকে সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে। দেশের গণমানুষের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ওপর প্রত্যাশা একটু বেশিই। বিশেষ করে যেখানে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। যেখানে আমাদের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি বিপর্যস্ত সেখানে মানুষের প্রত্যাশা একদিকে যেমন দেশটিকে অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ করা, একইভাবে রাজনৈতিকভাবে বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনাও জরুরি। দেশের মানুষ তাই চেয়ে আছে নতুন সরকারের দিকে। নতুন মন্ত্রিসভা তথা সরকার দেশকে অনেক বড় বড় উপহার দেবে। নতুন মন্ত্রিসভায় বিতর্কিত এবং কম পারফরম্যান্স দেখানো মন্ত্রীদের বাদ দিয়ে বলা চলে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। স্বাভাবিকভাবেই মন্ত্রীরা তাদের ওপর দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করবেন, সবার প্রত্যাশা তা-ই। নতুন সরকার দেশের মানুষকে এমন কিছু উপহার দেবে, যাতে অন্তত তাদের কলঙ্ক মোছে। তারা যেন এটা মনে না করেন, তারা পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় বসেছেন। বরং মানুষ চায় যত দ্রুত সম্ভব একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে একটা স্থায়ী ব্যবস্থা দরকার। এটা দেশের সব দলের ঐকমত্যে হওয়া প্রয়োজন।
বাঙালি শান্তিপ্রিয় জাতি। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমাদের প্রত্যাশা। আর এ জন্য বিতর্কিত নির্বাচনের কালিমা মুছে পুনরায় নির্বাচনের ব্যবস্থা করা এবং প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির সংস্কৃতি পরিহার করে একটি সুখী-সমৃদ্ধ শান্তির দেশ গঠনের লক্ষ্যে এগিয়ে চলাই এখন জরুরি। গত কয়েক মাসে দেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা পূরণে মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করতে হবে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি অর্থবহ সংলাপের আয়োজন করাটাও সরকারের আবশ্যিক দায়িত্ব। দেশবাসী এই প্রত্যাশার দিকে চেয়ে আছে উন্মুখ হয়ে।  শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
usharif33@gmail.com

আ'লীগের নারী নেত্রীদের জোর লবিং-তদবির by অমরেশ রায়

আওয়ামী লীগ থেকে সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য শতাধিক নারী নেত্রী তদবির ও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। সিনিয়র নেতাদের বাসায়ও ধরনা দিচ্ছেন অনেকেই। তফসিল ঘোষণার আগেই নারী এমপি পদে প্রার্থী মনোনয়নের কাজ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। মঙ্গলবার দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে দলের সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুধবার থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও জমা নেওয়া শুরু হয়েছে। আগামীকাল শুক্রবার পর্যন্ত মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ধানমণ্ডির কার্যালয় থেকে ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ফরম সংগ্রহ ও জমা দিতে পারবেন। আগামী রোববার বিকেল ৩টায় গণভবনে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। সংবিধানে তিন মাসের মধ্যে নারী এমপি নির্বাচনের কথা থাকলেও ২৯ জানুয়ারি সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর আগেই এ নির্বাচনের কাজ শেষ করতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী। স্পিকার ড. শিরীন
শারমিন চৌধুরীকে নারী এমপি নির্বাচিত করে তাকে প্রথম অধিবেশনেই আবারও স্পিকারের দায়িত্ব দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে নবম সংসদের দলীয় নারী এমপি ছাড়াও নেত্রীরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। বিভিন্ন জেলার নারী নেত্রীরাও ঢাকায় এসেছেন। চালাচ্ছেন জোর তদবিরও। কয়েকদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনেও তাদের ভিড় লেগেই আছে। দলের নীতিনির্ধারকদের কাছেও ধরনা দিচ্ছেন অনেকে। নবম সংসদের নারী এমপিদের কেউ কেউ আবারও দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন। এর মধ্যে যারা গত পাঁচ বছরে বিশেষ দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় কিংবা সংসদ ও সংসদের বাইরে এবং নিজ এলাকায় দলীয় কর্মীদের আস্থাভাজন হতে পেরেছেন তারাই অগ্রাধিকার পাবেন। বিতর্কিতরা মনোনয়ন পাবেন না। নতুনদের মধ্যে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন সংগঠন ও পেশাজীবী মেধাবী নারীদের সংসদে আনতে চাইছেন।
মনোনয়ন দৌড়ে যারা রয়েছেন : আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার পত্নীরা এবার এমপি হতে পারেন। এর মধ্যে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহর স্ত্রী নিলুফার জাফর উল্যাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনের স্ত্রী জাকিয়া সুলতানা মনি ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য একেএম এনামুল হক শামীমের স্ত্রী শিলুর নাম আলোচনায় রয়েছে। প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশাররফের মেয়ে রীনা, সিরাজগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা লতিফ মির্জার মেয়ে মুক্তি মির্জা, ফজিলাতুন নেছা বাপ্পি, নাজমা আক্তার, অপু উকিল, ফরিদুন নাহার লাইলী, অ্যাডভোকেট সানজিদা খানম, ফজিলাতুন্নেছা ইন্দিরা, আশরাফুন নেসা মোশাররফ ও পিনু খান বেশ এগিয়ে রয়েছেন।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী আবারও সংরক্ষিত কোটায় মনোনয়ন পাচ্ছেন_ এটা এক রকম নিশ্চিত। নারী এমপি নির্বাচিত হলে তিনি স্পিকার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানা গেছে। ন্যাপের আমেনা আহমেদ এবং গণতন্ত্রী পার্টির রুবী রহমানের আবারও নারী এমপি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়াও নারী এমপি পদে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছেন বেবী মওদুদ, অধ্যক্ষা খাদিজা খাতুন শেফালী, আসমা জেরীন ঝুমু, আহমেদ নাজনীন সুলতানা নাজলী, এখিনব রাখাইন, অ্যাডভোকেট তারানা হালিম, চেমন আরা তৈয়ব, জাহানারা বেগম, অধ্যাপিকা জিন্নাতুন নেসা তালুকদার, জোবেদা খাতুন পারুল, নূর আফরোজ আলী, নূরজাহান বেগম, পারভীন তালুকদার মায়া, ফরিদা রহমান, তহুরা আলী, সালেহা মোশাররফ, অধ্যাপিকা মাহফুজা রহমান মণ্ডল রিমা, শেফালী মমতাজ, ফরিদা আখতার হীরা, রওশন জাহান সাথী, শওকত আরা বেগম, শাহিদা তারেখ দীপ্তি, শাহিন মনোয়ারা হক, সাধনা হালদার, শাফিয়া খাতুন, সুলতানা বুলবুল, সৈয়দা জেবুন্নেছা হক, ড. হামিদা বানু শোভা, হাসিনা মান্নান, এন মাহফুজা খাতুন মতি শিউলী, অ্যাডভোকেট নূরজাহান মুক্তা, আখতার জাহান, উম্মে কুলসুম স্মৃতি, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, আয়শা খানম, রোকেয়া রফিক বেবী, অধ্যাপিকা পান্না কায়সার, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর, অভিনেত্রী শমী কায়সার, ভারতী নন্দী, জান্নাত আরা হেনরী, মমতাহিনা হাসনাত ঋতু, সাধনা দাশগুপ্তা, ফরিদা আখতার সাকী, অঞ্জলী সরকার, সাবিহা খাতুন, শাহীন লস্কর, মাহমুদা ক্রিক, নাসিমা মন্টু, অ্যাডভোকেট মোর্শেদা বেগম লিপি, কামরুন্নেছা মান্নান, সৈয়দা আফছানা, অ্যাডভোকেট আনোয়ারা শাহজাহান, রিটা কে আফজাল, মর্জিনা বেগম, রিফাত আমিন, মিনারা আলম, ফাতেমা জোহরা রানী, অ্যাডভোকেট হালিমা খাতুন, জাহানারা বেগম, নূরজাহান বেগম, শিরীন আকতার মুন্না, আইভি মাসুদ, কামরুন্নেছা চৌধুরী লাভলী, নাসিমা আকতার রুবেল, দিলরুবা বেগম, ইসমত আরা সিদ্দিকী, কানিজ সুলতানা, নাহারিন মুন্নী, শিরীনা নাহার লিপি, জিন্নাত আরা রোজী, আদিবা আনজুম মিতা, আফরোজা মনছুর লিপি, ডেইজি সারোয়ার, ইয়াসমিন রাব্বী গোর্কি, শারমিন ওয়াদুদ নিপা, মারসাদ আক্তার খুকি, সেলিনা আখতার সেলু, হোসনে আরা বেগম, পারভিন হক সিকদার, মারুফা আখতার পপি, অ্যাডভোকেট মনজু নাজনীন, অ্যাডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল, জোবায়দা হক অজন্তা প্রমুখ।
প্রথম দিনে অর্ধকোটি টাকার ফরম বিক্রি
সংরক্ষিত নারী এমপি আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে ফরম বিতরণ ও জমাদানের প্রথম দিন গতকাল বুধবার ২১০টি ফরম বিক্রি হয়েছে। জমা পড়েছে দুটি। ফরম বিক্রি বাবদ আয় হয়েছে ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে ফরম বিতরণ ও জমা নেওয়ার কাজ শুরু হয়। এ কার্যক্রম চলবে আগামীকাল শুক্রবার পর্যন্ত। আগামী রোববার বিকেল ৩টায় গণভবনে আগ্রহী প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হবে।

অর্থঋণ আদালত আইন ফের সংশোধন হচ্ছে by আবু সালেহ রনি

ব্যাংক ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ আদায়ে আইন থাকলেও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় এর যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। আইনের নানা ফাঁকফোকর ও দুর্বলতায় প্রকৃত অপরাধীরা যেমন পার পেয়ে যাচ্ছে, তেমনি হয়রানির শিকার হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। দেশের বহুল আলোচিত সর্ববৃহৎ ব্যাংকঋণ কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ঋণ জালিয়াতির বিরুদ্ধে ঋণ আদায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জনগণের অর্থ লুণ্ঠন রুখতে ফের অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আইন কমিশন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার পর অর্থঋণ আদালত আইনের ৯০টি সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধান প্রস্তাব করে খসড়া একটি আইন (সংশোধিত) প্রস্তুত করেছে। এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এ বিষয়ে মতামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর পর চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই শেষে শিগগিরই খসড়া আইনটি জাতীয় সংসদে পাসের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞরা বলেন, অর্থঋণ আদালত আইন ফের সংশোধন করা না হলে আর্থিক দুর্নীতি রুখতে আইনটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না। ২০০৩ সালে এ আইন প্রণয়নের পর ২০১০ সালেও একবার সংশোধন করা হয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে আইনটি ফের সংশোধনের প্রয়োজন। আইনের দুর্বলতায় হলমার্কসহ সম্প্রতি বড় ধরনের যে ক'টি ঋণ জালিয়াতির ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে, তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না। কত বছরে ঋণের টাকা আদায় করা যাবে, আদৌ যাবে কি-না অথবা বিচার প্রক্রিয়া এক যুগেও শেষ হবে কি-না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সোনালীসহ ১৪টি ব্যাংক আইনটি সংশোধনের বিষয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
ব্যাংকের মতামত :আইন কমিশনের সিনিয়র গবেষণা কর্মকর্তা মাকসুদুর রহমান সমকালকে বলেন, সোনালী, অগ্রণী, জনতা, এবি, ইসলামী, ঢাকা, আইএফআইসি, কমার্সসহ দেশের ১৪টি ব্যাংক অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের বিষয়ে মতামত পাঠিয়েছে। কমিশন দীর্ঘ গবেষণার পর ৯০টি সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধানও চূড়ান্ত করেছে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকঋণ জালিয়াতি ও খেলাপি আদায়ে আইনে ঋণ ও বিচার প্রক্রিয়া, ব্যাংকের কার্যক্রম সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে, যাতে দুর্নীতিতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রোধ করা সম্ভব হয়। ব্যাংকগুলোর মতামত পর্যালোচনায় দেখা যায়, অর্থঋণ আদালত আইনের আওতায় সারাদেশে প্রায় দুই লাখ মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া ৮০ হাজার মামলা থেকে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা আদায় করাও সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আইনে সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকের অনুপস্থিতিতে বিকল্প বিচারকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সুযোগ না থাকা, উচ্চ আদালতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রিট দায়ের, সমন জারি, ডিক্রি, আপসের বিষয়ে আইনের ত্রুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব ক্ষেত্রে সংশোধিত আইনে সুনির্দিষ্ট বিধান উল্লেখ করার জন্য প্রস্তাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
মতামতে আরও বলা হয়, বর্তমান আইনে শুধু ব্যাংক ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ আদায়ের জন্য মোকদ্দমা দায়ের করতে পারে। বিনিয়োগ সুবিধা ও ঋণগ্রহীতা কোনো ব্যক্তি অথবা কোনো কোম্পানি এ আইনের বিধানবলে ঋণদাতা ব্যাংক বা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গজনিত বিষয়ে বা অনিয়ম ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিকার চেয়ে কোনো দাবি উত্থাপন করতে পারে না। এ জন্য তাকে (বিবাদীকে) উচ্চ আদালতে রিট বা দেওয়ানি আদালতে পৃথক ঘোষণার মামলাসহ প্রাসঙ্গিক আবেদন দায়ের করতে হয়। এ ছাড়া ২০১০ সালে সর্বশেষ সংশোধিত আইনে সেটেলমেন্ট কনফারেন্সের পরিবর্তে এডিআর (বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) নিষ্পত্তির বিধান রাখা হলেও তা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। এতে একদিকে যেমন মামলার আধিক্য বাড়ছে, অন্যদিকে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে অর্থঋণ আদালতে মামলার দ্রুত বিচার স্থবির হয়ে পড়েছে। ২০০৩ সালের ওই আইনে বিভিন্ন সময়ে কিছু পরিবর্তন আনা হলেও বাদী ব্যাংকের মামলা যদি আইন দ্বারা বারিত, অচল ও অরক্ষণীয় হয়, তা খারিজের কোনো ক্ষমতাও বিচারিক আদালতকে প্রদান করা হয়নি। ফলে ভুক্তভোগীদের ভোগান্তির সীমা-পরিসীমা থাকে না।
সমাধান :আইন কমিশনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট আদালতের যুগ্ম জেলা জজ যদি কোনো কারণে অবর্তমান থাকেন, তা হলে জেলা জজ নিজে কিংবা যে কোনো অতিরিক্ত জেলা জজকে নিজ দায়িত্বে অতিরিক্ত হিসেবে দায়িত্ব দিতে পারবেন। ঋণ আদায়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত সার্ভেয়ার বা তদন্তের মাধ্যমে বন্ধকী সম্পত্তি সরেজমিন পরির্দশন ও যাচাই-বাছাই করে দলিল-তথ্যাদি সঠিক প্রমাণিত হলে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে মামলা করতে পারবেন। উচ্চ আদালতে রিট দায়ের প্রসঙ্গে বলা হয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে রিটে পক্ষভুক্ত করা হলে রুল ইস্যু/শুনানিকালে ব্যাংকের প্রতিনিধি/আইনজীবী উপস্থিতি বাধ্যতামূলক থাকতে হবে। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশনা অনুসারে সংশ্লিষ্টরা ছয় মাসের মধ্যে রুল শুনানি করতে ব্যর্থ হলে মূল রিট খারিজ হয়ে যাবে। ফলে উচ্চ আদালতে মামলাজট যেমন কমবে, তেমনি ভুক্তভোগীরাও হয়রানি থেকে রেহাই পাবেন। এ ছাড়া প্রস্তাবিত খসড়ায় মামলা নিষ্পত্তিতে সমন জারি, রেজিস্ট্রি, ডিক্রি, তদন্ত প্রক্রিয়া, রুগ্ণ শিল্পের জন্য বিচার প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

বিগ ব্রাদারদের এত মাথাব্যথা কেন? by সুভাষ সাহা

বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিগ ব্রাদারদের কখনও শীতল আবার কখনও উষ্ণ কথার লড়াই দেখে অনেক বিদগ্ধজনই শঙ্কিত ছিলেন। তাদের কারও কারও মধ্যে এখনও স্বস্তি ফেরেনি। সবার শঙ্কা, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কোনো স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ এবং প্রতিযোগিতা কি বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মঞ্চায়িত হচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ মিশনের রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আলোচনার জন্য নয়াদিলি্ল সফর করে ঢাকায় ফিরে আসার পর থেকে ভারতীয় কর্মকর্তাদের কথাবার্তা, এমনকি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় নয়াদিলি্ল ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার মতদ্বৈধতা স্পষ্ট হয়ে পড়ে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিএনপির পক্ষে ওকালতি করে গেছেন_ এমন একটা ধারণাও ভারতের পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। ভারত যেখানে জামায়াতকে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ব্রিডিং লিডার মনে করে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে সম্পর্কছেদে নারাজ। ভারত মনে করে, বিএনপির সঙ্গে ইসলামপন্থিরা আবার জোট বেঁধে ক্ষমতায় এলে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতো এখানেও জঙ্গিবাদ দ্রুত বিস্তার লাভ করবে। জামায়াত ছাড়াও হেফাজতের উত্থান নয়াদিলি্লর শঙ্কাটা আরও বাড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিক থেকে বলতে গেলে তালেবানদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ও আপস করা এবং বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অতি উৎসাহ ভারতকে ভাবিয়ে তুলে থাকতে পারে। তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে নিয়ে তার শক্তিবলয় সৃষ্টির চেষ্টা করছে? এখানে কি অদূর ভবিষ্যতে মার্কিন সামরিক বা রাজনৈতিক অ্যাসেট নিয়োজিত হতে পারে? যুক্তরাষ্ট্র যতই তার এসব অভিসন্ধি নেই বলে প্রকাশ্যে প্রচার করুক না কেন, নয়াদিলি্ল খুব কমই এটা বিশ্বাস করে। নয়াদিলি্ল মনে করে থাকতে পারে যে, এ ধরনের একটি পরিস্থিতি যদি আদৌ উদ্ভব হয় তাহলে তার পূর্বাঞ্চলে স্থায়ীভাবে অশান্তি বাসা বাঁধবে। তখন তার বিরাট শক্তি উত্তরাঞ্চলের শান্তি ও বিচ্ছিন্নতাবাদ রুখতে ব্যয় করতে হবে। সে কারণে ভারত বরাবরই বলে আসছিল, নির্বাচন কীভাবে বাংলাদেশে হবে সেটা তারা নিজেরাই ঠিক করবে। এ ব্যাপারে বাইরের কারও হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। কিন্তু ওয়াশিংটন এরপরও তাদের নিজস্ব প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে নয়াদিলি্ল তখন রাশিয়া, চীনসহ অপরাপর দেশের সঙ্গে নিজের অবস্থানটা পরিষ্কার করে থাকতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা, এমনকি জাতিসংঘে বিষয়টি উঠতে পারে এবং বাংলাদেশ সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে_ এ ধরনের একটা আশঙ্কাজনক খবর নির্বাচনের পরপরই চাউর হয়ে গিয়েছিল।
আমাদের দেশীয় অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং সাবেক কূটনীতিকরা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারির বিপদের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। এ ব্যাপারে টেলিভিশনের একটি টক শোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের একজন অধ্যাপক এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশে এক সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী একজনের বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। তারা দু'জনই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বলেছেন, অতি শিগগিরই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণের ভিত্তিতে নতুন নির্বাচন দিতে না পারলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে পড়তে পারে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই পথ ধরতে পারে। বাংলাদেশের গার্মেন্টের অধিকাংশ রফতানিই যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউতে যায়, তাই এ অবরোধের পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ। আবার মধ্যপ্রাচ্যেও বাংলাদেশের মানবসম্পদ পাঠানো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলতেও তারা ভুললেন না। তাদের প্রশ্ন, এ ব্যাপারে সরকারকে ভারত বা রাশিয়া কতটুকুই-বা সাহায্য করতে পারবে? আলোচকদ্বয় হয়তো মনে করেছিলেন, উলি্লখিত দুটি দেশের বাইরে আর কেউ হাসিনার নতুন সরকারকে সমর্থন করতে যাবে না, সরকারের সঙ্গে কাজও করবে না। কিন্তু এখন চীনসহ বিশ্বের দেশগুলোর অব্যাহত সমর্থন দেখে তারা নিশ্চয়ই আশ্বস্ত হয়েছেন যে, সরকার নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েনি। সরকার এভাবে দাঁড়িয়ে গেল কী করে? আমাদের দেশে তো অফুরন্ত খনিজসম্পদ বা মহামূল্যবান ধাতু নেই যে, বিগ ব্রাদারদের মধ্যে টনাটানি শুরু হয়ে যেতে পারে! কিন্তু ভবিষ্যৎ পরাশক্তি চীন এবং উদীয়মান শক্তি ভারতের মধ্যখানে বাংলাদেশের অবস্থান আবার বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে চমৎকার সংযোগ একে অনেকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। অন্যদিকে ভারতের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে মিয়ানমার ছুঁয়ে চীনের চিয়াংমাই এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে রেল ও সড়কপথে যোগাযোগ (উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার লক্ষ্য) প্রতিষ্ঠা করা গেলে বিশাল জনগোষ্ঠীর বাজারকে ধরা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশকে নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত দৌড়ঝাঁপ চীন ও ভারতকে শঙ্কিত করে থাকবে। কয়েক মাস আগে চীনের সঙ্গে ভারতের স্ট্র্যাটেজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে দু'দিনে ৩৭টি চুক্তি সম্পাদন নজিরবিহীন। এতেই বোঝা যায়, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে থাকলেও নিজের স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রশ্নে সে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে চলেছে। তদুপরি ওয়াশিংটন ও নয়াদিলি্লর মধ্যে ২০১০ সালের পর থেকে সম্পর্কে তলে তলে টানাপড়েন চলছে। এটা আমার এক বন্ধুরও দৃষ্টি এড়ায়নি এবং এ নিয়ে আমাদের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ে কিনা সে জন্য তিনি শঙ্কিত ছিলেন। বিশেষত মার্কিন অস্ত্র ক্রয়, প্রপার্টি রাইট, ভারতীয় পেশাজীবীদের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাজ করার সময় সোস্যাল সিকিউরিটির নামে প্রতি বছর ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি ট্যাক্স কর্তনসহ আরও বিষয়ে বিরোধ চলে আসছিল। ভরতীয় কূটনীতিক দেবযানীকে গ্রেফতার করার মাধ্যমে আমেরিকা ভারতকে শাসানির চেষ্টা করে। কিন্তু এ ব্যাপারে ভারতের প্রতিক্রিয়াটা হয়েছিল মারাত্মক। তারা দেবযানীকে দেশে ফিরিয়ে এনেই ক্ষান্ত হয়নি, পাল্টা দিলি্লতে নিযুক্ত দুই মার্কিন কূটনীতিককে বহিষ্কার করে এর প্রতিশোধ নেয় এবং এখন দেবযানীর ওপর থেকে মামলা প্রত্যাহারে চাপ অব্যাহত রেখেছে। এভাবে ভারত কার্যত যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝিয়ে দিল, আমি তোমার ক্লায়ান্ট স্টেট নই, সম্পর্ক রাখতে হলে সমঅংশীদারি বা পার্টনারের মর্যাদা থাকতে হবে।
আমাদের আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এবারের নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর তৎপরতাকে অনেক হালকাভাবে নিয়েছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে কিন্তু শঙ্কাটা ষোলআনা ছিল। কী জানি কী হয় এমন একটা ভাব ছিল। তাই নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর সারাদেশ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। বিরোধী দল বিএনপি কিন্তু নির্বাচন হবে না ধরে নিয়েই এগিয়েছিল। তারা নিজেদের স্ট্র্যাটেজিতে এতটাই আস্থাবান ছিল যে, চরম ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অনুমোদন করতেও তাদের বাধেনি। নির্বাচন না হলে যে দেশ এক অশুভ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে ছারখার হয়ে যেতে পারে, সে বোধটুকুও তাদের নেতৃত্বের ছিল না।
এ ক্ষেত্রে বিশ্বে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিকতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের প্রধান মাতবর হলেও অচিরেই যে তার জায়গাটি আর ঠিক থাকছে না, সে বিষয়টিও অনুধাবন করা প্রয়োজন। বিশ্ব পরিস্থিতি সত্যি সত্যিই বহুমেরুর দিকে ধাবিত হয়েছে এবং এ রূপটি দ্রুতই বিশ্বের কাছে স্পষ্ট হতে থাকবে। সিরিয়ায় এক সময়ের যুদ্ধংদেহী আমেরিকাকে রাশিয়ার সঙ্গে মিলে আপস-রফার বৈঠক ডাকতে হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ মিটিয়ে ফেলার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে, আফগানিস্তানের বশংবদ কারজাই সরকার ওবামা প্রশাসনের ডিকটেশন অনুযায়ী মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সীমিত রাখার ব্যাপারে চুক্তি সম্পাদনের এখনও রাজি হয়নি। চীন-ভারত আর মার্কিন আদেশ-নির্দেশে চলছে না। চীন তো বহু পূর্বেই সেটা পরিষ্কার করেছে। আর ভারতের অবস্থান তো বাংলাদেশের নির্বাচনের ব্যাপারে আমরা দেখলাম। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অন্ধ আনুগত্যের মাধ্যমে যারা মোক্ষ লাভ করতে চান, তাদের ভবিষ্যতে আরও হতাশ হতে হবে। তাই বলে এখানে কি যুক্তরাষ্ট্র প্রাসঙ্গিক নয়। অবশ্যই তাদের প্রাসঙ্গিকতা আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তারা আমাদের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার। তাদেরও যে সমঝে চলতে হবে, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যেনতেন একটি নির্বাচন হলেও হাসিনার করে ফেলা এবং সেই সরকারের পক্ষে বিশ্বের শক্তিধরদের অব্যাহত সমর্থন সেটাই প্রমাণ করে।
সাংবাদিক

সাম্প্রতিক বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তির মত ও পথ by আবু সাঈদ খান

বিভক্তির ছুরিতে দেশের রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে শ্রেণী-পেশার সংগঠন আজ ক্ষত-বিক্ষত। তবে এতে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তেমন আক্রান্ত হয়নি। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাম দলগুলো। বিভক্তির ঘাত-প্রতিঘাতে তারা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র হয়ে পড়েছে। এসব বিভাজন যতটা না আদর্শকেন্দ্রিক, তার চেয়ে বেশি ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বা কোটারির স্বার্থে সংঘটিত। সাংবাদিক-শিক্ষক-চিকিৎসক-প্রকৌশলী-আইনজীবীরাও আজ বিভক্ত। এসব পেশাজীবী বিভক্ত হয়ে এক দল হয়েছে আওয়ামী লীগপন্থি, অপর দল বিএনপিপন্থি। এ বিভাজনে লাভবান হচ্ছেন বিভাজিত সংগঠনের নেতারা। দল ক্ষমতায় গেলে সে দলের সমর্থকদের ভাগ্য খুলে যায়। তাদের পদোন্নতি হয়, বড় বড় দায়িত্ব মিলে, সুযোগ-সুবিধা বাড়ে, অর্থযোগ ঘটে। আর দলাদলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কর্মপরিবেশ, নিম্নগামী হয় সেবার মান।
প্রশ্ন উঠতে পারে, পেশাজীবীদের কি মতাদর্শ থাকবে না? নিশ্চয়ই থাকবে। এমনকি চাকরিবিধি বাধা নেই_ এমন সব পেশাজীবী প্রত্যক্ষ রাজনীতিও করতে পারেন। কিন্তু পেশার সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক লেজুড়ে পরিণত করা মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। তবে তার চেয়ে ভয়াবহ বুদ্ধিবৃত্তিক লেজুড়বৃত্তি। বুদ্ধিজীবীদের বলা হয় জাতির বিবেক। সেই বুদ্ধিজীবীরা যখন হীন স্বার্থে সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে বিরত থাকেন কিংবা মিথ্যার বেসাতি করেন, তখন জাতি হয়ে পড়ে দিশাহীন।
বুদ্ধিজীবী বা সিভিল সোসাইটির কর্ণধররাও পেশাজীবীদের মতোই দুটি বলয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। তাদের ভূমিকা পক্ষপাতদুষ্ট। তারাও এখন আওয়ামীপন্থি বা বিএনপিপন্থি। এ ক্ষেত্রে বিশ্বাসের চেয়ে স্বার্থের ব্যাপারটা বেশি ক্রিয়াশীল। বুদ্ধিজীবীদের প্রত্যক্ষ রাজনীতি করার বিরোধী নই আমি। সেক্ষেত্রে কথা হচ্ছে_ রাজনৈতিক দলভুক্ত বুদ্ধিজীবীদেরও হতে হবে দলের যৌক্তিক সমালোচনায় দ্বিধাহীন। বুদ্ধিজীবীদের এই দুই পন্থার বাইরেও আরও একটি পন্থার সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এনজিও কর্মকর্তা, এনজিও প্রকল্পের গবেষক, অবসরপ্রাপ্ত বেসামরিক-সামরিক আমলাদের নিয়ে গড়ে ওঠা শক্তি_ যারা সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজের লোক বলে অধিক পরিচিত। সিভিল সোসাইটির প্রচলিত বাংলা 'নাগরিক সমাজের' স্থলে 'সুশীল সমাজ' শব্দটি এখন বহুল ব্যবহৃত।
ইউরোপ-আমেরিকার নাগরিক সমাজের সঙ্গে তাদের ভূমিকা তুলনীয় নয়, এমনকি তুলনীয় নয় ভারতের নাগরিক সমাজের সঙ্গেও। ভারতে নাগরিক সমাজের শিকড় আম আদমি বা আমজনতার মধ্যে প্রোথিত। ফলে সেখানে গড়ে উঠছে শক্তিশালী নাগরিক আন্দোলন। বাংলাদেশেও নাগরিক আন্দোলন হচ্ছে। তবে সিভিল সোসাইটি বলে পরিচিত এলিটরা সে আন্দোলনে শরিক নন। সাম্প্রতিক সময়ে চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও তেল-গ্যাস-বন্দর রক্ষা আন্দোলন থেকে নিরাপদ দূরত্বে তাদের অবস্থান। তবে পরিবেশ বা মানবাধিকার রক্ষার কোনো কোনো আন্দোলনে এনজিও কর্মীরা শরিক থাকছেন। এনজিও-আমলাকেন্দ্রিক সিভিল সোসাইটিও দুই পন্থার থাবা থেকে একেবারে মুক্ত নয়। তবে এর বাইরে বড় অংশের অবস্থান। সিভিল সোসাইটির বড় অংশ গণতন্ত্রের প্রশ্নে সোচ্চার। অর্থবহ নির্বাচনের কথা বলছেন তারা, সে কারণে বিএনপি তাদের ওপর সন্তুষ্ট। ক্ষুব্ধ হয়েছে আওয়ামী লীগ। তাদের ১/১১-এর কুশীলব বলে অভিহিত করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদের প্রতি সমালোচনার তীর ছুড়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও। তবে এটি সত্য যে, সিভিল সোসাইটির মূলধারা অর্থবহ নির্বাচনের প্রশ্নে সোচ্চার হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে মৌন। তাদের কণ্ঠ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূখপাত্রদের সঙ্গে একাকার। ১/১১-এর প্রাক্কালে তারা একইভাবে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে কথা বলেছিলেন বলে তাদের ১/১১-এর অনুঘটক বলে চিহ্নিত হতে হচ্ছে। সে যাই হোক, ১/১১-এর পেছনে রাজনৈতিক দলের সংযত ও ব্যর্থতাই ছিল মূল কারণ। তবে ১/১১-এর পেছনে সিভিল সোসাইটির একাংশের সংশ্লিষ্টতা ছিল না বলা যাবে না।
এবার আওয়ামী লীগপন্থি ও বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবীদের কথায় আসা যাক। আওয়ামী লীগ ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, 'দেশ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে, অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে। আবার বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের কাছেও দেশ দু'ভাগে বিভাজিত। সেটি গণতন্ত্রের পক্ষ-বিপক্ষ। তাদের কথা_ আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র হত্যা করছে আর বিএনপি তা উদ্ধারের চেষ্টা করছে। এ অংশের কাছে জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ কোনো বড় সমস্যা নয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে 'মাতামাতি'ও ঠিক নয়। আসল কাজ হচ্ছে_ অর্থপূর্ণ- অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের কথা, নির্বাচন কেমন হলো তা বিচারের সময় এখন নয়। আসল কাজ হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের দমন।
দুই দলের কথার মধ্যেই সত্যতা আছে। তবে তা অর্ধসত্য। দেশের সামগ্রিক কল্যাণেই জঙ্গিবাদ-মৌলবাদের বিচার করতে হবে; একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদেরও বিচারের মধ্য দিয়ে কলঙ্কমোচন করতে হবে_ এ নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ বা ১৪ দলের অবস্থান অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু ইতিবাচক অবস্থানের কারণে একতরফা ও ভোটারবিহীন নির্বাচনকে জায়েজ করতে পারে না। পক্ষান্তরে অর্থবহ নির্বাচনের জন্য বিএনপির দাবি সমর্থনযোগ্য। এ দাবিতে তাদের আন্দোলন করার অধিকার আছে। কিন্তু আন্দোলনের নামে সহিংসতা কিংবা যুদ্ধাপরাধী সংগঠনের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে দেশে অরাজক অবস্থা সৃষ্টির অধিকার নেই। আমাদের মনে রাখা দরকার, গণতন্ত্রের সংগ্রাম, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জঙ্গিবাদ-মৌলবাদের দমন_ একই সূত্রে গাঁথা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়তে হলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জঙ্গিবাদ-মৌলবাদের দমন যেমনি প্রয়োজন, তেমনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াও সচল রাখা প্রয়োজন।
জাতির সামনে এখন দুটি বড় এজেন্ডা। একটি অর্থবহ নির্বাচন, অপরটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ জঙ্গিবাদ-মৌলবাদের অবসান। একটি অন্যটির বিকল্প নয়। দেশের সামগ্রিক কল্যাণে এই দুটি ইস্যুর নিষ্পত্তি করতে হবে।
প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, তা কে করবে_ রাজনৈতিক দল না বুদ্ধিজীবীরা? দেশের পরিবর্তন বা অগ্রগতির চালিকাশক্তি রাজনীতি। বুদ্ধিজীবীরা পথ দেখাতে পারেন, মতামত দিতে পারেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক দলকে নিতে হবে এবং তাদেরই তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তাই বুদ্ধিজীবী বা সিভিল সোসাইটিকে গালি না দিয়ে বরং তাদের মতামত প্রদানের সুযোগ অবারিত রাখাই হচ্ছে রাজনৈতিক কর্তব্য।
মানুষ লেখক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে যৌক্তিক ভূমিকা আশা করে। সেক্ষেত্রে বাধা হয়ে আছে সুবিধাবাদিতা। স্বার্থের মোহে বুদ্ধিজীবী সমাজ দিকভ্রান্ত। বুদ্ধিবৃত্তিক সুবিধাবাদ অতীতেও ছিল। তা সত্ত্বেও ব্রিটিশ ভারত ও পাকিস্তান আমলে বুদ্ধিজীবীদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা লক্ষণীয়। ইসলাম ও পাকিস্তানের ডামাডোলে ড. মুুহম্মদ শহীদুল্লাহর সাহসী উচ্চারণ, 'আমরা হিন্দু-মুসলমান সত্য। তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। প্রকৃতি মাতা আমাদের এমনভাবে গড়েছেন যে, টুপি-টিকি পরে তা আলাদা করার জোঁ নেই।' আমাদের জাতীয় চেতনা বিকাশে ড. মুুহম্মদ শহীদুল্লাহ থেকে আহমদ শরীফ পর্যন্ত এক ঝাঁক বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে স্বাধীনতা-উত্তর বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া করেছিলেন সে সময়ের তরুণ লেখক আহমদ ছফা। তার প্রত্যাশা ছিল আরও বেশি। এমন বুদ্ধিজীবী সমাজ চেয়েছিলেন যারা হবেন যুগের দিশারি। গ্রামসির ভাষায়, 'বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী'। সে আকাঙ্ক্ষা থেকে প্রচলিত ধারার বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা, 'বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। এখন যা বলছেন শুনলে বাংলাদেশে সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না। আগে বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানি ছিলেন বিশ্বাসের কারণে নয়_ প্রয়োজনে। এখন অধিকাংশ বাঙালি হয়েছেন_ সেও ঠেলায় পড়ে।' স্বাধীনতার ৪২ বছর পর বুদ্ধিবৃত্তিক দীনতা আরও প্রকট, সুবিধাবাদিতাই আজ বড় প্রতিবন্ধকতা। তবে এসব কিছুর মাঝে কিছু সাহসী কণ্ঠে সত্য প্রকাশমান।
সুবিধাবাদিতা ও আপসকামিতা রুখে বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ, নাগরিক সমাজ কবে, কখন মাথা তুলে দাঁড়াবে_ সেটিই আজ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ask_bangla71@yahoo.com
www.abusayeedkhan.com
সাংবাদিক

প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৭

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৫ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের এই প্রক্ষেপণ সঠিক হলে প্রবৃদ্ধি হবে গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বাংলাদেশ গত এক দশকে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) গড়ে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ শতাংশ এবং তার আগের অর্থবছরে ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। বুধবার ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের 'গ্গ্নোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা' রিপোর্টে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনুমান রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতি, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় ২০১৪ সালে বাড়বে বলা হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা কমবে। এর প্রধান কারণ, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতায় উৎপাদন ও রফতানি খাতে ধীরগতি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করছে আগামী ছয় মাসের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা না থাকলে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সমকালকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের এই প্রক্ষেপণ চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এর পরের তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রাজনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়, যার প্রতিফলন বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনায় আসেনি। আগামী ছয় মাসে পরিস্থিতির উন্নতি বা অবনতির ওপর চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি নির্ভর করছে। আগামী ছয় মাসে যদি বিনিয়োগ বাড়ে, উদ্যোক্তাদের মধ্যে যদি অনিশ্চয়তা কেটে যায়, তাহলে একরকম হবে। অন্যদিকে, এখনকার চেয়ে পরিস্থিতি খারাপ হলে ফলাফল অন্য রকম হবে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশে যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে না আসে, তাহলে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনও কঠিন হবে। সমকালকে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিল্প ও সেবা খাত বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রফতানিভিত্তিক বিশেষত, তৈরি পোশাকশিল্প তাজরীন ও রানা প্লাজার মতো দুর্ঘটনার কারণে আগে থেকেই চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা যোগ হয়েছে। সেবা খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে পরিবহন ব্যবস্থা। জিডিপির ১০ শতাংশ আসে পরিবহন উপ-খাত থেকে। বাণিজ্য উপ-খাতও ক্ষতির শিকার হয়েছে। এসব বিবেচনায় বিশ্বব্যাংক ওই প্রক্ষেপণ করেছে।
বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের নিরাপত্তা সমস্যার সঙ্গে সামাজিক অস্থিরতা যোগ হয়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থা ফেরানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ইতিমধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি দেখা গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব মূল্যস্ফীতি ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপরও পড়েছে। এদিকে, দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্ব অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধি চলতি বছর বাড়বে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির ধারণা, ২০১৪ সালে দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির সার্বিক প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে। ২০১৩ সালে দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্ব অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ ও ২ দশমিক ৪ শতাংশ।

রক্ত দিয়ে সৌরশক্তি

অব্যবহৃত রক্তের উপাদান থেকে সৌরকোষ তৈরি করলেন বাঙালি বিজ্ঞানী সমীর কুমার পাল। এই সৌরকোষ কাজে লাগিয়েই এবার তৈরি করা যাবে বিদ্যুৎ। কলকাতার এসএন বোস ন্যাশনাল সেন্টারের বাঙালি বিজ্ঞানী ও তার ছাত্রদের এ আবিষ্কার সাড়া ফেলেছে বিদেশেও। তার আবিষ্কৃত সোলার সেল দিয়ে তৈরি জিনিসের দামও কম হবে বলে দাবি করেন তিনি। তবে হিমোগ্গ্নোবিন দিয়ে সোলার সেল_ শুনলে একটু চমকে উঠতে হয়। রক্ত দিয়ে কীভাবে তৈরি হবে সৌরশক্তি। অসম্ভব এ কাজকেই সত্যি করেছেন বাঙালি বিজ্ঞানী সমীর কুমার পাল। কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এই আবিষ্কার? রক্তের অতি পরিচিত উপাদান হিমোগ্গ্নোবিন। হিমোগ্গ্নোবিনে থাকে হেমাটোপর ফাইলিং। হিমোগ্গ্নোবিনের এই উপাদান সৌরশক্তি শোষণ করতে পারে। হেমাটোপরফাইলিং দিয়েই তৈরি হয়েছে সৌরকোষ। বাজারে যেসব সোলার সিস্টেম দেখতে পাওয়া যায়, তা তৈরি হয় সিলিকন দিয়ে। কিন্তু বাঙালি বিজ্ঞানীর নতুন এই আবিষ্কারে সিলিকনের পরিবর্তে ব্যবহার করা যাবে অব্যবহৃত হিমোগ্গ্নোবিনের এই উপাদান। সিলিকন থেকে শতগুণ বেশি সৌরশক্তি শোষণ করতে পারবে হেমাটোপরফাইলিং। পশুদের রক্তের হিমোগ্গ্নোবিন থেকেও সৌরকোষ তৈরি করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন এই বিজ্ঞানী।

এই সরকার দীর্ঘায়িত হওয়া বিপজ্জনক

বুধবার সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
(সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া) বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, 'একতরফা' নির্বাচনের মাধ্যমে ৫ জানুয়ারি দেশে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, বর্তমান সংসদ জনপ্রতিনিধিত্বহীন এবং সরকার 'অবৈধ'। তার মতে, এই অবৈধ সরকার দীর্ঘায়িত হওয়া খুবই বিপজ্জনক। দেশ এখন গণতন্ত্রবিহীন অবস্থায় রয়েছে দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, তাই এখন শুরু হবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। একটি অবৈধ সরকারের জনগণের প্রতি কোনো দায়িত্ববোধ থাকে না। শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য অবিলম্বে 'বিপজ্জনক সরকার'কে সরিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলনের পাশাপাশি সমঝোতা ও সংলাপের আহ্বানও জানান তিনি। খালেদা জিয়া হরতাল-অবরোধ বাদ দিয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে দশম সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া বক্তব্য রাখেন। শিগগির বেশ কিছু অঞ্চলও সফর করবেন বলে জানান খালেদা জিয়া। নবগঠিত সংসদের প্রথম অধিবেশনের দিন ২৯ জানুয়ারি 'গণতন্ত্র হত্যা ও জনগণের ভোটাধিকার হরণে'র প্রতিবাদে সারাদেশে বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেন বিএনপিপ্রধান। রাজধানীসহ সারাদেশে ওই দিন কালো পতাকা মিছিল করবেন তারা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে 'বর্জন' করার জন্য দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানাতে ২০ জানুয়ারি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গণসমাবেশ ও শোভাযাত্রার কর্মসূচি দেন তিনি। কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশ করবে বিরোধী জোট। এর আগে ১৮ জানুয়ারি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী পালনে সারাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজন করা হবে আলোচনা সভা। সংবাদ সম্মেলনের আগে ৫ জানুয়ারির 'একতরফা' নির্বাচনের ভোটচিত্র নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র সাংবাদিকদের দেখানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সাধারণত প্রশ্নোত্তর না দিলেও গতকাল লিখিত বক্তব্যের পর কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। খালেদা জিয়া বলেন, প্রহসনের নির্বাচনে গণতন্ত্রের হত্যাকারী এই সরকারের বিরুদ্ধে জনগণ নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছে। অন্যায়, অবিচার, ভোটাধিকার হরণ ও গণতন্ত্র হত্যাকারী সরকারের বিরুদ্ধে গত ৫ জানুয়ারি নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই ভোটে জনগণের মতের প্রতিফলন ঘটেনি। এই 'প্রহসন' দেশের মানুষ বর্জন করেছে। সারাদেশে কোথাও মানুষ ভোটকেন্দ্রে যায়নি।
গড়ে ৫ শতাংশ ভোটও পড়েনি দাবি করে তিনি বলেন, আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন 'জালিয়াতি' করে ৪০ শতাংশ ভোটের হিসাব দিয়েছে। এভাবে প্রতারণা করে, সন্ত্রাস করে, জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে তারা বেশিদিন গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। এখন তাদের আচরণ ও ভাষা অরাজনৈতিক, অশালীন ও বেসামাল হয়ে পড়েছে। তারা রাজনীতিকে কলুষিত করে ফেলেছে। খালেদা জিয়া বলেন, সমঝোতার জন্য তারা তাদের বারবার আহ্বান জানিয়েছেন। রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার কথা বলেছেন। তারা সে আহ্বানে সাড়া দেননি। তারা আবারও সমঝোতার আহ্বান জানাচ্ছেন। তারা সহিংসতা, হানাহানিতে বিশ্বাস করেন না; শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনীতি করতে চান। সে পথ বন্ধ করলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তার দায় ক্ষমতাসীন ছাড়া আর কারও নয়।
খালেদা জিয়া বলেন, নির্বাচনের নামে ৫ জানুয়ারির প্রহসন প্রমাণ করেছে, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি কতটা যৌক্তিক ছিল। প্রমাণ হয়েছে, দলীয় সরকারের অধীনে ভোট সুষ্ঠু হতে পারে না। ৫ জানুয়ারির ভোটে অংশ না নেওয়ার জন্য কোনো আক্ষেপ নেই জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ১৫৩ আসনে তারা কোনো নির্বাচনই করতে পারেনি। বাকি আসনগুলোতে জঘন্য কারসাজি ও জালিয়াতি করেছে। এটা গায়ের জোরে এক অবৈধ সরকার। এটাই আমাদের আন্দোলনের এক বিরাট সাফল্য। আন্দোলনের পাশাপাশি চলবে সংলাপের প্রচেষ্টা : খালেদা জিয়া বলেন, মানুষ গণতন্ত্রের জন্য, ভোটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছে। এই সংগ্রামের পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনে তাদের আহ্বান অব্যাহত রয়েছে। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়া দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তিনি আবারও অবিলম্বে সে লক্ষ্যে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সংলাপ ও সমাঝোতার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অবিলম্বে সব রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার; গ্রেফতার, নির্যাতন, হামলা, মামলা বন্ধ; বিএনপি সদর দফতরসহ বিরোধী দলের সব অফিস খুলে দিয়ে স্বাভাবিক তৎপরতার সুযোগ দেওয়া; শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ওপর থেকে অলিখিত বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে সভা-সমাবেশ, মিছিল-শোভাযাত্রা ও প্রচারাভিযানে হামলা, হুমকি, বাধা দেওয়া বন্ধ করা এবং সব বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান বিএনপি চেয়ারপারসন।
খালেদা জিয়া বলেন, সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ওপর এই হামলার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, 'এর জন্য বিরোধী দলকে দায়ী করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। নিরপরাধ নেতাদের ওপর অত্যাচার বাড়ানো হয়েছে। অথচ সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি, এ ঘটনার সঙ্গে শাসক দলের লোকজনই জড়িত।'
খালেদা জিয়া এও বলেন, এখন যদি এসব পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে আগামীতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং প্রয়োজনবোধে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে সব অপরাধীকে চিহ্নিত ও শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। কোনো কুল হারাইনি : নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন দুই কুলই হারিয়েছেন বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে খালেদা জিয়া বলেন, 'আমরা কোনো কুল হারাইনি। কুল হারিয়েছে তারা। জনগণ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।'
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সহিংসতা নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিএনপি কখনোই সহিংসতা করেনি। আমাদের আন্দোলন জনগণকেন্দ্রিক। আমাদের আন্দোলন সব সময়ই সঠিক ছিল। কারণ আমরা উন্নয়ন আর গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়বেন কি-না, জানতে চাইলে সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের একসঙ্গে আন্দোলন করার বিষয়টি তুলে ধরেন বিএনপি নেত্রী। তিনি বলেন, '৮৬ সালের স্বৈরাচার আমলে সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি চুক্তি ছিল যে, কেউই নির্বাচনে অংশ নেবে না। সে সময় আওয়ামী লীগ চুক্তি ভঙ্গ করে জামায়াতের সঙ্গে ওই নির্বাচনে অংশ নেয়। এই যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা উঠছে, এর জন্য আন্দোলন কে করেছে। আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি একত্রে আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি চালু করে।
পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে খালেদা জিয়া বলেন, প্রতিবেশীসহ সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কারও হস্তক্ষেপ বিএনপি সমর্থন করে না।
সরকারে গেলে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হবে : খালেদা জিয়া বলেন, তারা সরকারে গেলে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেবেন। পদক্ষেপগুলো হলো_ সবার অংশগ্রহণে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা; সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা কঠোরভাবে দমন করা; সব দেশের সঙ্গে সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব আরও জোরদার করা; মেধা ও যোগ্যতাই হবে মূল্যায়নের মাপকাঠি, বিরোধী দলকে যথাযথ মর্যাদা; অখ জাতিসত্তা গড়ে তোলা; সংঘাতের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সুস্থ রাজনীতি ফিরিয়ে আনা; বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা; সুশাসন ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা; নারী শিক্ষা, নারী অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নকে প্রসারিত করা হবে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা নির্বাচনী ইশতেহারে বিশদভাবে তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি। বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাশাপাশি নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে 'যথাযথ' মর্যাদা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ভোট নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র : খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের আগে ৫ জানুয়ারির 'একতরফা' নির্বাচনের ভোটের চিত্র নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র সাংবাদিকদের দেখানো হয়। ৪৫ মিনিট স্থায়ী এই তথ্যচিত্রে ভোটকেন্দ্রের ভোটারশূন্য অবস্থা, প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারসহ স্থানীয় জনসাধারণের বক্তব্য রয়েছে। পরে সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্যচিত্রের একটি সিডিও দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতাদের মধ্যে ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আর এ গনি, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, সারোয়ারী রহমান, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সহসভাপতি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, আবদুল্লাহ আল নোমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, শমসের মবিন চৌধুরী, বিএনপি নেতা মাহমুদুল হাসান, ওসমান ফারুক, রিয়াজ রহমান, ফজলুর রহমান পটল, আবদুল মান্নান, মুশফিকুর রহমান, সাবিহউদ্দিন আহমেদ, শওকত মাহমুদ, এজেডএম জাহিদ হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলী, হায়দার আলী, আহমেদ আজম খান, আবদুল কাইয়ুম, মোহাম্মদ শাহজাহান, জয়নুল আবদিন ফারুক, শিরিন সুলতানা, চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান।
১৮ দলীয় জোট নেতাদের মধ্যে ছিলেন এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ, বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান, জামায়াতের রেদোয়ান উল্লাহ শাহেদী, ইসলামী ঐক্যজোটের আবদুল লতিফ নেজামী, কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাগপার শফিউল আলম প্রধান, এনডিপির খন্দকার গোলাম মর্তুজা, বাংলাদেশ ন্যাপের জেবেল রহমান গানি, মুসলিম লীগের এএইচএম কামরুজ্জামান খান, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ন্যাপ ভাসানীর শেখ আনোয়ারুল হক, ইসলামিক পার্টির আবদুল মোবিন, খেলাফত মজলিসের আহমেদ আবদুল কাদের, ডিএলের সাইফুদ্দিন মনি প্রমুখ। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, 'একতরফা' নির্বাচনের মাধ্যমে ৫ জানুয়ারি দেশে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, বর্তমান সংসদ জনপ্রতিনিধিত্বহীন এবং সরকার 'অবৈধ'। তার মতে, এই অবৈধ সরকার দীর্ঘায়িত হওয়া খুবই বিপজ্জনক। দেশ এখন গণতন্ত্রবিহীন অবস্থায় রয়েছে দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, তাই এখন শুরু হবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। একটি অবৈধ সরকারের জনগণের প্রতি কোনো দায়িত্ববোধ থাকে না। শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য অবিলম্বে 'বিপজ্জনক সরকার'কে সরিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলনের পাশাপাশি সমঝোতা ও সংলাপের আহ্বানও জানান তিনি। খালেদা জিয়া হরতাল-অবরোধ বাদ দিয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে দশম সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া বক্তব্য রাখেন। শিগগির বেশ কিছু অঞ্চলও সফর করবেন বলে জানান খালেদা জিয়া। নবগঠিত সংসদের প্রথম অধিবেশনের দিন ২৯ জানুয়ারি 'গণতন্ত্র হত্যা ও জনগণের ভোটাধিকার হরণে'র প্রতিবাদে সারাদেশে বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি
ঘোষণা করেন বিএনপিপ্রধান। রাজধানীসহ সারাদেশে ওই দিন কালো পতাকা মিছিল করবেন তারা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে 'বর্জন' করার জন্য দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানাতে ২০ জানুয়ারি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গণসমাবেশ ও শোভাযাত্রার কর্মসূচি দেন তিনি। কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশ করবে বিরোধী জোট। এর আগে ১৮ জানুয়ারি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী পালনে সারাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজন করা হবে আলোচনা সভা।
সংবাদ সম্মেলনের আগে ৫ জানুয়ারির 'একতরফা' নির্বাচনের ভোটচিত্র নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র সাংবাদিকদের দেখানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সাধারণত প্রশ্নোত্তর না দিলেও গতকাল লিখিত বক্তব্যের পর কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
খালেদা জিয়া বলেন, প্রহসনের নির্বাচনে গণতন্ত্রের হত্যাকারী এই সরকারের বিরুদ্ধে জনগণ নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছে। অন্যায়, অবিচার, ভোটাধিকার হরণ ও গণতন্ত্র হত্যাকারী সরকারের বিরুদ্ধে গত ৫ জানুয়ারি নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই ভোটে জনগণের মতের প্রতিফলন ঘটেনি। এই 'প্রহসন' দেশের মানুষ বর্জন করেছে। সারাদেশে কোথাও মানুষ ভোটকেন্দ্রে যায়নি।
গড়ে ৫ শতাংশ ভোটও পড়েনি দাবি করে তিনি বলেন, আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন 'জালিয়াতি' করে ৪০ শতাংশ ভোটের হিসাব দিয়েছে। এভাবে প্রতারণা করে, সন্ত্রাস করে, জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে তারা বেশিদিন গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। এখন তাদের আচরণ ও ভাষা অরাজনৈতিক, অশালীন ও বেসামাল হয়ে পড়েছে। তারা রাজনীতিকে কলুষিত করে ফেলেছে।
খালেদা জিয়া বলেন, সমঝোতার জন্য তারা তাদের বারবার আহ্বান জানিয়েছেন। রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার কথা বলেছেন। তারা সে আহ্বানে সাড়া দেননি। তারা আবারও সমঝোতার আহ্বান জানাচ্ছেন। তারা সহিংসতা, হানাহানিতে বিশ্বাস করেন না; শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনীতি করতে চান। সে পথ বন্ধ করলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তার দায় ক্ষমতাসীন ছাড়া আর কারও নয়।
খালেদা জিয়া বলেন, নির্বাচনের নামে ৫ জানুয়ারির প্রহসন প্রমাণ করেছে, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি কতটা যৌক্তিক ছিল। প্রমাণ হয়েছে, দলীয় সরকারের অধীনে ভোট সুষ্ঠু হতে পারে না।
৫ জানুয়ারির ভোটে অংশ না নেওয়ার জন্য কোনো আক্ষেপ নেই জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ১৫৩ আসনে তারা কোনো নির্বাচনই করতে পারেনি। বাকি আসনগুলোতে জঘন্য কারসাজি ও জালিয়াতি করেছে। এটা গায়ের জোরে এক অবৈধ সরকার। এটাই আমাদের আন্দোলনের এক বিরাট সাফল্য।
আন্দোলনের পাশাপাশি চলবে সংলাপের প্রচেষ্টা : খালেদা জিয়া বলেন, মানুষ গণতন্ত্রের জন্য, ভোটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছে। এই সংগ্রামের পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনে তাদের আহ্বান অব্যাহত রয়েছে। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়া দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তিনি আবারও অবিলম্বে সে লক্ষ্যে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সংলাপ ও সমাঝোতার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অবিলম্বে সব রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার; গ্রেফতার, নির্যাতন, হামলা, মামলা বন্ধ; বিএনপি সদর দফতরসহ বিরোধী দলের সব অফিস খুলে দিয়ে স্বাভাবিক তৎপরতার সুযোগ দেওয়া; শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ওপর থেকে অলিখিত বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে সভা-সমাবেশ, মিছিল-শোভাযাত্রা ও প্রচারাভিযানে হামলা, হুমকি, বাধা দেওয়া বন্ধ করা এবং সব বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান বিএনপি চেয়ারপারসন।
খালেদা জিয়া বলেন, সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ওপর এই হামলার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, 'এর জন্য বিরোধী দলকে দায়ী করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। নিরপরাধ নেতাদের ওপর অত্যাচার বাড়ানো হয়েছে। অথচ সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি, এ ঘটনার সঙ্গে শাসক দলের লোকজনই জড়িত।'
খালেদা জিয়া এও বলেন, এখন যদি এসব পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে আগামীতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং প্রয়োজনবোধে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে সব অপরাধীকে চিহ্নিত ও শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।
কোনো কুল হারাইনি : নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন দুই কুলই হারিয়েছেন বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে খালেদা জিয়া বলেন, 'আমরা কোনো কুল হারাইনি। কুল হারিয়েছে তারা। জনগণ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।'
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সহিংসতা নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিএনপি কখনোই সহিংসতা করেনি। আমাদের আন্দোলন জনগণকেন্দ্রিক। আমাদের আন্দোলন সব সময়ই সঠিক ছিল। কারণ আমরা উন্নয়ন আর গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়বেন কি-না, জানতে চাইলে সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের একসঙ্গে আন্দোলন করার বিষয়টি তুলে ধরেন বিএনপি নেত্রী। তিনি বলেন, '৮৬ সালের স্বৈরাচার আমলে সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি চুক্তি ছিল যে, কেউই নির্বাচনে অংশ নেবে না। সে সময় আওয়ামী লীগ চুক্তি ভঙ্গ করে জামায়াতের সঙ্গে ওই নির্বাচনে অংশ নেয়। এই যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা উঠছে, এর জন্য আন্দোলন কে করেছে। আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি একত্রে আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি চালু করে।
পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে খালেদা জিয়া বলেন, প্রতিবেশীসহ সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কারও হস্তক্ষেপ বিএনপি সমর্থন করে না।
সরকারে গেলে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হবে : খালেদা জিয়া বলেন, তারা সরকারে গেলে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেবেন। পদক্ষেপগুলো হলো_ সবার অংশগ্রহণে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা; সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা কঠোরভাবে দমন করা; সব দেশের সঙ্গে সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব আরও জোরদার করা; মেধা ও যোগ্যতাই হবে মূল্যায়নের মাপকাঠি, বিরোধী দলকে যথাযথ মর্যাদা; অখ জাতিসত্তা গড়ে তোলা; সংঘাতের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সুস্থ রাজনীতি ফিরিয়ে আনা; বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা; সুশাসন ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা; নারী শিক্ষা, নারী অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নকে প্রসারিত করা হবে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা নির্বাচনী ইশতেহারে বিশদভাবে তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি। বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাশাপাশি নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে 'যথাযথ' মর্যাদা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ভোট নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র : খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের আগে ৫ জানুয়ারির 'একতরফা' নির্বাচনের ভোটের চিত্র নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র সাংবাদিকদের দেখানো হয়। ৪৫ মিনিট স্থায়ী এই তথ্যচিত্রে ভোটকেন্দ্রের ভোটারশূন্য অবস্থা, প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারসহ স্থানীয় জনসাধারণের বক্তব্য রয়েছে। পরে সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্যচিত্রের একটি সিডিও দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতাদের মধ্যে ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আর এ গনি, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, সারোয়ারী রহমান, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সহসভাপতি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, আবদুল্লাহ আল নোমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, শমসের মবিন চৌধুরী, বিএনপি নেতা মাহমুদুল হাসান, ওসমান ফারুক, রিয়াজ রহমান, ফজলুর রহমান পটল, আবদুল মান্নান, মুশফিকুর রহমান, সাবিহউদ্দিন আহমেদ, শওকত মাহমুদ, এজেডএম জাহিদ হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলী, হায়দার আলী, আহমেদ আজম খান, আবদুল কাইয়ুম, মোহাম্মদ শাহজাহান, জয়নুল আবদিন ফারুক, শিরিন সুলতানা, চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান। ১৮ দলীয় জোট নেতাদের মধ্যে ছিলেন এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ, বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান, জামায়াতের রেদোয়ান উল্লাহ শাহেদী, ইসলামী ঐক্যজোটের আবদুল লতিফ নেজামী, কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাগপার শফিউল আলম প্রধান, এনডিপির খন্দকার গোলাম মর্তুজা, বাংলাদেশ ন্যাপের জেবেল রহমান গানি, মুসলিম লীগের এএইচএম কামরুজ্জামান খান, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ন্যাপ ভাসানীর শেখ আনোয়ারুল হক, ইসলামিক পার্টির আবদুল মোবিন, খেলাফত মজলিসের আহমেদ আবদুল কাদের, ডিএলের সাইফুদ্দিন মনি প্রমুখ।