Wednesday, April 30, 2025

পেহেলগামে হামলার পর প্রতিশোধের আশঙ্কায় দিন কাটছে ভারতীয় মুসলিমদের

কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলার পর কাশ্মীরের মুসলিমদের পাশাপাশি ভারতজুড়ে মুসলিমরা নানা হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে আটক করা হচ্ছে। ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি হত্যা করা হচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমসে লিখেছেন মুজিব মাশাল ও হরি কুমার। ৩০ এপ্রিল বুধবার লেখাটি অনলাইন সংস্করণে প্রকাশ করা হয়েছে।

ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে সম্প্রতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার পর মুসলিমদের ব্যাপকভাবে ধরপাকড় ও তাঁদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা পেহেলগামের হামলাকে ব্যবহার করে দেশের বৃহত্তম সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর দমন–পীড়ন আরও বৃদ্ধি করছে।

কাশ্মীরের পেহেলগাম শহরের কাছে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় ২৬ জন নিহত হয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে একজন বাদে বাকি প্রায় সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। পর্যটক হিসেবে তাঁরা ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে পেহেলগামে গিয়েছিলেন। ভারত এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছে, যদিও পাকিস্তান এই অভিযোগ জোরালোভাবে নাকচ করে দিয়েছে।

পেহেলগামে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার জবাবে ভারত সামরিকভাবে পাকিস্তানকে জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করে তাদের ঘাঁটি ধ্বংস করে দেওয়া হবে। পাকিস্তান সরকারের একজন মন্ত্রী জানিয়েছেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন ভারত শিগগিরই সামরিক হামলা চালাতে পারে।

এই মুহূর্তে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মূলত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। যেমন আন্তসীমান্ত নদীগুলোর পানিপ্রবাহ বন্ধের হুমকি দিচ্ছে। একই সঙ্গে বিজেপি সরকার ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের হয়রানি করছে। তারা এটিকে ‘অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান’ বলে দাবি করছে।

মোদির বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে কর্তৃপক্ষ এই সুযোগে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ এবং ‘রোহিঙ্গাদের’ বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। রোহিঙ্গারা মূলত মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছেন। ‘পাকিস্তানি’ বা ‘বাংলাদেশি’ তকমা অনেক সময়েই হিন্দুত্ববাদীরা ভারতের অভ্যন্তরীণ মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে থাকে।

উত্তর প্রদেশ ও কর্ণাটক—এই দুই রাজ্যে মুসলিমদের হত্যার খবর পাওয়া গেছে। গণমাধ্যমের খবরে সেগুলোকে বিদ্বেষমূলক অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী কাশ্মীরে ইতিমধ্যেই শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে যাঁদের সন্দেহ করা হচ্ছে, তাঁদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এক সরকারি কর্মকর্তার মতে, প্রায় দুই হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে, যা অনেকটা সমষ্টিগত শাস্তির মতো।

ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও কাশ্মীর রাজ্যের মানুষ হুমকি ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। কিছু হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী রাস্তায় কাশ্মীরি হকারদের মারধর করছে। রাজ্য ছেড়ে না গেলে কাশ্মীরিদের মারধর করা হবে বলে হুমকি দিচ্ছে তারা। এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলছেন, ‘পেহেলগামের হামলা ভয়ংকর ছিল। তবে সেই হামলাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে যেন সংখ্যালঘুদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। অবৈধ গ্রেপ্তার বা তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়া একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

মীনাক্ষী আরও বলেন, ‘চরম জাতীয়তাবাদী টিভি চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা ঘৃণামূলক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে সহিংসতা বাড়ছে।’

সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার পর প্রথমে কাশ্মীরের মানুষকে লক্ষ্য করে প্রতিক্রিয়া শুরু হলেও তা ধীরে ধীরে পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণায় রূপ নেয়। বিশ্লেষকদের মতে, মুসলিমদের খারাপভাবে উপস্থাপনে বিজেপি তাদের দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক কৌশল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে ব্যবহার করে আসছে।

পেহেলগামে হামলার পরপরই ভারতের বিভিন্ন শহরে অধ্যয়নরত কাশ্মীরের শিক্ষার্থীরা হুমকি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ সরকারের পক্ষ থেকে কাশ্মীরিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকারের মন্ত্রীদের বিভিন্ন শহরে পাঠিয়েছেন।

উত্তর প্রদেশ রাজ্যে ২৩ এপ্রিল এক মুসলিম রেস্তোরাঁকর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আরেকজন আহত হন। হামলাকারীরা নিজেদের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্য দাবি করে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে তারা বলেছে, ‘মা ভারতের নামে ২৬ জনের বদলে ২ হাজার ৬০০ জনকে মারব।’ অবশ্য উত্তর প্রদেশ পুলিশ দাবি করছে, খাবার নিয়ে বিরোধের জেরে ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কর্ণাটক রাজ্যে পাকিস্তানপন্থী স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ তুলে আরেক মুসলিমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ধরপাকড় চলছে গুজরাট রাজ্যে। গত সোমবার রাজ্যের পুলিশপ্রধান জানান, তাঁর কর্মকর্তারা ‘বাংলাদেশি সন্দেহে’ ৬ হাজার ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন। ভিডিওতে দেখা গেছে, পুরুষদের দড়ি দিয়ে বেঁধে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

পুলিশের এই ধরপাকড় যে কতটা নির্বিচারে চলছে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় পুলিশপ্রধানের বক্তব্যে। তিনি স্বীকার করেন, এ পর্যন্ত আটক ব্যক্তিদের মধ্য থেকে ৪৫০ জনকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করা গেছে।

গুজরাট সরকার হ্রদের কাছে মুসলিমদের বসবাসরত একটি বস্তিতে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। ড্রোনের মাধ্যমে নেওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সেখানে অভিযান চালাতে বেশ কয়েকটি বুলডোজার ও ময়লার ট্রাক সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। ওই বস্তিতে অভিযানে প্রায় দুই হাজার পুলিশ সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে।

গুজরাট রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হর্ষ সাঙ্গাভি বলেছেন, ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ বিরুদ্ধে অভিযানের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে বস্তির দুই হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

সমাজকর্মী হর্ষ মন্দার বলেন, ভারতের মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি’ বলাটা একটি পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল, যা মোদি সরকার ও তাঁদের দল বারবার ব্যবহার করছে।

বস্তির বাসিন্দারা উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ রাখতে আদালতে একটি পিটিশন করলেও আদালত তা নাকচ করে দেন। উচ্ছেদের পক্ষে সরকার আদালতে জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরেছে।

পিটিশনকারীরা যুক্তি দেখান, তাঁরা ভারতের নাগরিক ও তাঁদের কাছে প্রমাণপত্র আছে। তাঁরা আরও বলেন, জায়গাটি সরকারি হলেও উচ্ছেদের আগে কোনো নোটিশ বা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।

গুজরাটের শহর আহমেদাবাদের বাসিন্দারা বলেন, যাঁদের আটক করা হয়েছে, তাঁদের বেশির ভাগই ভারতীয় নাগরিক। তাঁরা ‘পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন, অপমান ও সহিংসতার’ শিকার হয়েছেন। পুলিশও শিগগিরই বুঝতে পেরেছে, আটক ব্যক্তিদের ৯০ শতাংশই ভারতের নাগরিক।

হর্ষ মন্দার বলেন, এসব ঘটনাই প্রমাণ করে, রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বেআইনি ও অসাংবিধানিক কাজ করছে বিজেপি সরকার।

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলাওয়ামার মুররান গ্রামে সন্দেহভাজন এক সন্ত্রাসীর বাড়ি ভেঙে ফেলার পর ধ্বংসস্তূপের ওপর লোকজন হাঁটছে
ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলাওয়ামার মুররান গ্রামে সন্দেহভাজন এক সন্ত্রাসীর বাড়ি ভেঙে ফেলার পর ধ্বংসস্তূপের ওপর লোকজন হাঁটছে। ছবি: রয়টার্স

কাশ্মীরে গ্রেপ্তার ও উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া

ভারতশাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে ২২ এপ্রিলের প্রাণঘাতী হামলার পর পাঁচ দিন পার হয়ে গেলেও প্রকৃত হামলাকারীদের চেয়ে বরং নিরীহ সাধারণ মানুষই যেন হয়ে উঠেছে প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তু।

হামলায় ২৬ জন পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় ভারত সরকার কাশ্মীরজুড়ে যে ধরপাকড় ও উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে ভারতীয় সেনারা, তা ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক ও তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) এএফপির বরাত দিয়ে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন তাদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি তথ্যমতে, সন্দেহভাজনদের খুঁজতে গিয়ে ভারতীয় সেনারা এখন পর্যন্ত প্রায় ২,০০০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ কার্যক্রমের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তি নেই। বরং ‘তথ্য সংগ্রহের নামে’ সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে।

রাতের আঁধারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ঘরবাড়ি ও তাদের স্বপ্ন

সন্দেহভাজনদের পরিবারের সদস্যদের কোনো অপরাধ প্রমাণ ছাড়াই রাতের অন্ধকারে তাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পলাতক আসিফ শেখের বোন ইয়াসমিনা বলেন, আমার ভাই যদি দোষীও হয়, তবে পুরো পরিবার কেন শাস্তি পাবে? আমরা তো তিন বছর ধরে ওকে দেখিইনি। এই বাড়ি শুধু ওর একার নয়।

এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল সম্পত্তি ধ্বংস নয়, বরং মানুষের জীবনের ওপর এক গভীর আঘাত। শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না, পরিবারগুলো আতঙ্কে রাতে ঘুমাতে পারছে না। এসব কর্মকাণ্ডে পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে ‘দোষী’ বানিয়ে দমন করা হচ্ছে বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

প্রমাণ ছাড়াই পাকিস্তানকে দায়, সিন্দু পানি চুক্তিও স্থগিত

হামলার ঘটনার পর ভারত সরকার প্রমাণ ছাড়াই পাকিস্তানকে দায়ী করেছে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় উসকানিমূলক নানা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো সিন্দু পানি চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা, যা দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের এক কূটনৈতিক সমঝোতা ছিল।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিবাদ : কাশ্মীরিদের দেওয়া হচ্ছে সম্মিলিত শাস্তি

কাশ্মীরের একজন ফেডারেল সংসদ সদস্য আগা রুহুল্লাহ বলেন, এই ধরনের প্রতিক্রিয়া কেবল হামলাকারীদের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো কাশ্মীর ও কাশ্মীরিদের সম্মিলিত শাস্তি। এতে করে আস্থা, স্থিতি এবং শান্তির পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

জিজ্ঞাসাবাদের নামে হয়রানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন

পুলিশ দাবি করছে, এসব গ্রেপ্তার আসলে ‘তথ্য সংগ্রহ’। কিন্তু স্থানীয়রা বলছেন, এভাবে আটক করে দিনের পর দিন রাখা হচ্ছে, পরিবারের সদস্যদের জানানো হচ্ছে না কোথায় রাখা হয়েছে, কেন রাখা হয়েছে।

একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, এগুলো গ্রেপ্তার নয়, কেবল জিজ্ঞাসাবাদ। অনেককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, আবার অনেককেই নতুন করে ডাকা হচ্ছে।

এই তথাকথিত জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়াটি কেবল আইনি প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন নয়, বরং মানবাধিকারের সরাসরি চরম লঙ্ঘন বলেই অভিহিত করছেন অধিকার সংগঠনগুলো।

সীমান্তে আতঙ্ক, ভবিষ্যতের শঙ্কা

কাশ্মীর সীমান্তবর্তী পাঞ্জাবের গ্রামগুলোতেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দাওকে ও রাজতাল গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে দারুণ শঙ্কিত।

৬৫ বছর বয়সী হারদেব সিং বলেন, যুদ্ধ হলে উভয় দেশই ধ্বংসের মুখে পড়বে। হামলায় যারা মারা গেছেন, তারা তো আর ফিরে আসবেন না। এখন আমাদের উচিত শান্তি ও সংলাপে ফিরে যাওয়া।

৭৭ বছর বয়সী সীমান্তবাসী সর্দার লাখা সিং বলেন, গ্রামের তরুণদের বলছি, যা হবার তা হবেই। আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে অনেক কিছু। কিন্তু ভয় পেলে চলবে না।

কাশ্মীরে হামলায় সন্দেহভাজনদের কোনো অপরাধ প্রমাণ ছাড়াই রাতের অন্ধকারে তাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ভারতীয় সেনারা। ছবি : সংগৃহীত
কাশ্মীরে হামলায় সন্দেহভাজনদের কোনো অপরাধ প্রমাণ ছাড়াই রাতের অন্ধকারে তাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ভারতীয় সেনারা। ছবি : সংগৃহীত


ভারত কি এবার সত্যিই আক্রমণ করবে? by পাপলু রহমান

পেহেলগামে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের এমন টানাপোড়েনে আবারও দক্ষিণ এশিয়ায় যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিধর রাষ্ট্র এ উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানালেও পরিস্থিতি ক্রমেই সংঘাতমুখী হয়ে উঠছে। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভারত এখন কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে নেই, বরং পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের সক্রিয় প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক ডজনেরও বেশি দেশের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং দিল্লিতে অবস্থিত শতাধিক কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করেছেন। যদিও এমন পদক্ষেপ সাধারণত আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইতে নেওয়া হয়, তবে চারজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ভারতের প্রচেষ্টা আসলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী মোদি ২৪ এপ্রিলের ভাষণে পাকিস্তানের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও সন্ত্রাসী আস্তানাগুলো ধ্বংস ও কঠোর শাস্তির হুমকি দিয়েছেন। সীমান্তবর্তী এলাকায় কয়েক রাত ধরে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী কাশ্মীরে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে এবং শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর পাশাপাশি পাকিস্তানের দিকে প্রবাহিত নদীগুলোর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা এবং পাকিস্তানি নাগরিকদের দেশত্যাগের নির্দেশ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান ভারতের সাথে কাশ্মীর সীমান্তের যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্থগিত করেছে এবং নানা কূটনৈতিক চুক্তি পর্যালোচনার ঘোষণা দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে এমন পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ অস্বাভাবিক নয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতির গুরুতর বেশি। বিশেষ করে যখন দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে কঠোর অবস্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে।

ভারতে মুসলিমবিরোধী মনোভাবও এই সময় বেড়েছে। কাশ্মীরি শিক্ষার্থীরা অন্যান্য শহরে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। হামলার পাঁচ দিন পরও ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও সন্ত্রাসী সংগঠনের নাম ঘোষণা করেনি এবং পাকিস্তানের সম্পৃক্ততারও খুব কম প্রমাণ প্রকাশ করেছে। তবে ভারতীয় কর্মকর্তারা পাকিস্তানের অতীতের সন্ত্রাসী সম্পৃক্ততার ইতিহাস তুলে ধরছেন এবং প্রযুক্তিগত কিছু প্রমাণের কথা বলছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শক্ত প্রমাণের অভাব ভারতীয় কৌশলের দুটি দিক দেখায়; হয় ভারত তদন্ত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছে, অথবা বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছাড়াই পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত হচ্ছে। ভারতের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির বৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক চাপের তোয়াক্কা কমেছে। বিশেষ করে এখন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্য বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংকটে ব্যস্ত থাকায় ভারত তুলনামূলক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে।

ইরান ও সৌদি আরব উভয় পক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছে এবং ইরান মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সংযমের আহ্বান জানালেও আন্তর্জাতিক মহলের সক্রিয়তা এখনো সীমিত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন জানালেও কৌশলগতভাবে তারা এখন দক্ষিণ এশিয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। উল্লেখযোগ্যভাবে, এখনও ভারতে কোনও মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেওয়া হয়নি, যা ট্রাম্প প্রশাসনের দক্ষিণ এশিয়া নীতির গুরুত্বহীনতার ইঙ্গিত দেয়।

২০১৯ সালের কাশ্মীরের বড় হামলার সময়ের মতোই এবারও যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া অনেকটা সতর্ক ও নিষ্ক্রিয়। তবে ২০১৯ সালে জইশ-ই-মুহাম্মদের নাম উঠে এসেছিল, যা এবার অনুপস্থিত। বর্তমানে হামলার দায় স্বীকার করেছে ‘রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ) নামে এক নতুন গোষ্ঠী, যাকে ভারতীয় কর্মকর্তারা লস্কর-ই-তৈয়বার ছায়া সংগঠন বলে সন্দেহ করছেন। হামলাকারীদের পরিচয় ও সংখ্যা নিয়েও এবার বেশ অনিশ্চয়তা রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। পরে এক বিবৃতিতে টিআরএফ জানিয়েছে, হামলাটিকে তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে টিআরএফের ডিজিটাল চ্যানেলে একটি হামলার দায় স্বীকারের পোস্ট প্রকাশিত হয়েছিল।সংগঠনটি দাবি করছে, সাইবার আক্রমণের ফলে এটি হয়েছে।

ভারতের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেননের মতে, মোদি সরকারের সামনে সামরিক পদক্ষেপ ছাড়া তেমন কোনো বিকল্প নেই। ২০১৬ ও ২০১৯ সালে কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত পাকিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছিল। ফলে এবারও জনগণের চাপ ও রাজনৈতিক প্রত্যাশার মুখে মোদি সরকার আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারে। বিশেষ করে তারা সম্প্রতি কাশ্মীরকে নিরাপদ ও পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করছিল, অথচ এই হামলা সেই প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সবশেষ নরেন্দ্র মোদি হামলার জবাব দিতে ভারতীয় বাহিনীকে ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’ দিয়েছেন। এ সিদ্ধান্তের ফলে সেনাবাহিনী এখন নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিতে পারবে। তবে পাকিস্তানও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটি ভারতের যেকোনো হামলার জবাবে বড় ধরনের প্রতিআক্রমণের হুমকি দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করছে, যা পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।

পাকিস্তানের রেলমন্ত্রী হানিফ আব্বাসী সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেন, ভারতের দিকে তাক করা আছে পাকিস্তানের ১৩০টি পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র। ঘোরি, শাহিন, গজনবি মিসাইল প্রস্তুত রয়েছে এবং যেকোনো ভারতীয় আগ্রাসনের জবাব দিতে তারা সর্বাত্মক প্রস্তুত। বিশেষ করে, যদি ভারত সিন্ধু নদের পানি বন্ধ করে দেয়, তাহলে পাকিস্তান যুদ্ধের পথে হাঁটবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এই বক্তব্য দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

মূল সমস্যা হলো, দুই দেশের অতীত ইতিহাস—কাশ্মীর নিয়ে তিনটি যুদ্ধ—দেখিয়েছে যে কাশ্মীর ইস্যুতে সংঘাত কখনোই ছোট পরিসরে আবদ্ধ থাকে না। উভয় দেশই কাশ্মীরের পুরো অংশ নিজেদের দাবি করে এবং পাকিস্তানের সাথে বিরোধকে ভারত দ্বিপাক্ষিক সমস্যা হিসেবেই দেখে এসেছে। সুতরাং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ সীমিতই থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

কৌশলগত জোটের দিক থেকে ভারত বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে রয়েছে রাশিয়া, ফ্রান্স ও ইসরায়েল। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ভারতের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রতি বেড়েছে। অপরদিকে পাকিস্তান ঐতিহ্যগতভাবে চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন সমর্থন পেলেও তা সীমিত।

চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) পাকিস্তানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ভারত কোয়াড জোটের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরি করছে।

সব মিলিয়ে, ভারতের সামরিক প্রস্তুতি এবং পাকিস্তানের পাল্টা হুমকি দক্ষিণ এশিয়ায় একটি বড় সংঘাতের সম্ভাবনাকে উসকে দিচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে একটি সামান্য ভুল হিসাব কিংবা ভুল বোঝাবুঝি বড় ধরনের যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হলো দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমিত করা, যাতে দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় না পড়ে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তা কতটা সম্ভব হবে, সেটি নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। 

কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের উত্তেজনা দ্রুতই সংঘাতমুখী হয়ে উঠছে । ছবি: সংগৃহীত
কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের উত্তেজনা দ্রুতই সংঘাতমুখী হয়ে উঠছে । ছবি: সংগৃহীত

গুজরাটে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশই ভারতীয় মুসলিম

ভারতের গুজরাট পুলিশ বলছে, শনিবার ভোররাত থেকে সোমবার রাত পর্যন্ত বাংলাদেশি নাগরিক সন্দেহে সাড়ে ৬ হাজার মানুষকে তারা আটক করেছে। তবে নিশ্চিতভাবে ৪৫০ জন বাংলাদেশিকে তারা চিহ্নিত করতে পেরেছে বলে সোমবার জানিয়েছেন রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশক বিকাশ সহায়।

সংবাদসংস্থা পিটিআই সোমবার রাতে বিকাশ সহায়কে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ‘নথির ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত এটা নিশ্চিত করা গেছে, ৪৫০ জন বাংলাদেশি নাগরিক বেআইনিভাবে এখানে থাকছিলেন। আটক হওয়া বাকিদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আমাদের মনে হচ্ছে, একটা বড় সংখ্যায় বেআইনি বাংলাদেশিদের পরিচয় আমরা নিশ্চিত করতে পারব।’

শনিবার ভোররাত থেকে প্রথমে আহমেদাবাদ ও সুরাটে এবং এরপরের দুদিনে পুরো গুজরাটেই ‘বেআইনি বাংলাদেশি’ আটক করার জন্য অভিযান চালাচ্ছে গুজরাট পুলিশ।

সুরাট থেকে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক হওয়া সুলতান মল্লিকের স্ত্রী সাহিনা বিবি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ‘রাত তিনটা নাগাদ পুলিশ আসে আমাদের বাসায়। আমার স্বামী, বাচ্চাদের—সবার আধার কার্ড দেখতে চায়। তারপর তারা আমার স্বামী আর দুই ভাগনেকে নিয়ে যায়। ওরা বলেছিল যে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবে আমার স্বামী। কিন্তু প্রায় তিন দিন হতে চলল, তিনি ফেরেননি।’

যেদিন প্রথম অভিযান শুরু হয়, সেদিনই আটক হন সুলতান মল্লিক ও তাঁর দুই কিশোর ভাগনে।

বাংলাদেশি সন্দেহেই তাঁদের আটক করা হয়। তবে বিবিসি বাংলার হাতে সুলতান মল্লিকের পাসপোর্ট ও ১৯৯৩ সালের একটি জমির দলিল হাতে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার লাভপুর অঞ্চলের বাসিন্দা।

পশ্চিমবঙ্গের সুলতান মল্লিক কেন আটক

সুলতান মল্লিক বছর ছয়েক ধরে সুরাটে এমব্রয়ডারির কাজ করেন।

সুলতান মল্লিকের স্ত্রীর কথায়, ‘প্রথমে তো জানতেই পারিনি যে কোন থানায় নিয়ে গেছে, কোথায় রেখেছে। শনিবার আমার স্বামী পুলিশের একটা নম্বর থেকেই ফোন করে জানায় যে তাঁদের কোনো একটা গুদামঘরে রাখা হয়েছে। সব নথি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে বলেন আমার স্বামী। পাসপোর্ট, জমির দলিল—যা যা প্রমাণ ছিল, সব পাঠিয়েছি। কিন্তু তার পর থেকে সোমবার রাত পর্যন্ত আর কোনো যোগাযোগ নেই। এদিকে আমার শাশুড়ি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তাঁর ছেলের এই দশা দেখে, আমার বড় মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। মাত্র এক বছর হলো আমি গুজরাটে এসেছি। এখন কোথায় স্বামীর খোঁজ করতে যাব, বুঝতে পারছি না।’

ভ্রাম্যমাণ শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠন ‘পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ’ গুজরাটের ধরপাকড় শুরু হওয়ার পরে একটি হেল্পলাইন খুলেছে। প্রিয়জনের খোঁজ পাওয়ার জন্য ওই হেল্পলাইনে গত দুদিনে প্রিয়জনের খোঁজ না পাওয়া এক শর বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানাচ্ছিলেন সংগঠনটির রাজ্য সম্পাদক আসিফ ফারুক।

‘গুজরাটে সংখ্যাটা বড়, তাই বিষয়টা ব্যাপক আলোচনায় উঠে এসেছে। কিন্তু উত্তর প্রদেশ, ওডিশা আর মহারাষ্ট্রেও পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে হেনস্তা করার ঘটনা সম্প্রতি খুব বেড়ে গেছে। এ রকম পরিস্থিতি হতে যাচ্ছে এই আশঙ্কা করেই আমরা গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে একটা চিঠিও দিয়েছিলাম। কিন্তু তাতে কাজ যে কিছু হয়নি, দেখাই যাচ্ছে’—বলছিলেন আসিফ ফারুক।

আসিফ ফারুকের কথায়, ‘আরও একটা গুরুতর বিষয় জানতে পারলাম মল্লিকের ব্যাপারে। আটক হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আদালতে পেশ করার কথা। কিন্তু তিন দিন হয়ে গেল তাঁদের আটক করা হয়েছে, আদালতে কেন পেশ করা হলো না এখনো!’

বরযাত্রীদের ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ

‘বাংলাদেশি’দের খোঁজে পুলিশের অভিযান শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে আহমেদাবাদ পুলিশের ‘ক্রাইম ব্রাঞ্চ’ দপ্তরের সামনে বিবিসি গুজরাটির সংবাদদাতা তেজস ভৈদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ফারজানার।

মেহেদি করা হাত দেখিয়ে ফারজানা একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে বিয়ের কার্ড বের করলেন।

বিবিসিকে ফারজানা বললেন, ‘বাড়িতে বিয়ে আছে। বরযাত্রীরা এসেছিল। আমাদের বাড়ি খুবই ছোট, তাই তাঁদের ঘুমানোর ব্যবস্থা করেছিলাম চান্দোলা এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে। সেখান থেকেই বাংলাদেশি সন্দেহ করে বরযাত্রীদের ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ।’

‘মহারাষ্ট্রের আকোলা থেকে এসেছিল আমার বড় ভাই আর ভাতিজা। তাঁরা না থাকলে কী করে বিয়ে হবে! ওই দিনই বাড়িতে হলদি (গায়ে হলুদ) অনুষ্ঠান ছিল। সেটাও পিছিয়ে দিতে হয়েছে।’ বলছিলেন ফারজানা।

তাঁদের বিয়েতেই সপরিবার এসেছিলেন জেবুন্নেসা। তাঁর ছেলে আর ভগ্নিপতিকে পুলিশ ধরে নিয়ে এসেছিল ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে।

জেবুন্নেসার কথায়, ‘আমরা মহারাষ্ট্রের আকোলা থেকে বিয়েতে যোগ দিতে এসেছিলাম বরযাত্রী হিসেবে। আমাদের কাছে জন্মের প্রশংসাপত্র থেকে শুরু করে আধার কার্ড সব আছে।’

বিয়ে বাড়ি ছেড়ে সারা দিন খাওয়াদাওয়া না করে তাঁরা বসে ছিলেন ক্রাইম ব্রাঞ্চের দপ্তরে। সব নথিপত্র জমা দেওয়ার পরে শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে সবাইকে ছাড়া হয়।

ফারজানা বা তাঁর আত্মীয়রা কেউ বাংলাদেশি নন, এমনকি বাংলাভাষীও নন। তাঁরা গুজরাট আর মহারাষ্ট্রের মুসলিম।

আহমেদাবাদের বাসিন্দাও আটক

ক্রাইম ব্রাঞ্চের দপ্তরেই বিবিসির তেজস ভৈদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আলম আরা পাঠান নামে এক নারীর।

আলম আরা বলছিলেন, ‘আমি তো সৈয়দবাড়ি মোহাম্মদী মসজিদ এলাকায় থাকি। ২৩ বছর ধরেই আহমেদাবাদে আছি। আমার ছেলে রিয়াজের শ্বশুরবাড়ি চান্দোলা ঝিল এলাকায়। রাতে শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিল ও, সেখান থেকে তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। আমার পুত্রবধূকেও আটক করা হয়েছে।’

‘আমাদের কাছে আধার কার্ড, রেশন কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র, আয়কর বিভাগের প্যান কার্ড, বিদ্যুতের বিল—সব নথিই আছে। পুলিশ আমাকে জানায়, সব নথি নিয়ে এখানে হাজির হলে ছেলে আর ওর বউকে ছেড়ে দেবে। সকাল ১০টা থেকে এখানে বসে আছি।’ বলছিলেন আলম আরা পাঠান।

রাত দশটা নাগাদ আলম আরা পাঠানের ছেলে ও পুত্রবধূকে ছেড়ে দেয় পুলিশ, তবে আবারও তাঁদের দেখা করতে বলা হয়েছে।

আলম আরা পাঠান বলছিলেন, ‘আমরা তো বাংলাদেশ থেকে আসিনি, অপরাধও করিনি। আমার সন্তানেরা এখানেই জন্মেছে। তবুও বুঝতে পারছি না ছেলে আর তাঁর স্ত্রীকে কেন আটক করা হলো।’

পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার এক বাসিন্দা আটক

‘বাংলাদেশি’ ধরার অভিযান প্রথমে আহমেদাবাদ আর সুরাটে শুরু হলেও গত দুদিনে তা ছড়িয়েছে পুরো গুজরাটেই। ভারুচেও চলেছে সেই অভিযান।

সোমবার কাপড়ের কারখানায় সারা দিন কাজ করার পরে বিকেলে চা খেতে বেরিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার সাঁকরাইলের বাসিন্দা নূর শেখ।

বিবিসি বাংলাকে নূর শেখ বলছিলেন, ‘কাজের পরে বিকেলে চা খেতে যাচ্ছিলাম বড় রাস্তায়। সেদিকে যেতেই এক বন্ধু বলল একটু আগে হাওড়ারই এক বাসিন্দাকে দোকানের সামনে থেকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে। আমি তখনো গলির ভেতরেই ছিলাম।’

‘বাংলাদেশিদের ধরবে ধরুক। কিন্তু আমরা তো ভারতীয়। দরকার হলে আধার চেক করে দেখুক। অন্য সব নথিও আছে। কিন্তু ধরে নিয়ে গিয়ে এ রকম হেনস্তা করার কী মানে?’ বলছিলেন নূর শেখ।

ভ্রাম্যমাণ শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক আসিফ ফারুক বলছিলেন, ‘নূর শেখ যে অঞ্চলে থাকেন, সেই ভারুচ জেলার কোটকপুর এলাকায় পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান ও হাওড়া জেলার প্রায় এক হাজারের বেশি শ্রমিক আছে। গুজরাট পুলিশ এসে এই শ্রমিকদের ডকুমেন্ট চেক করে গেছে।’

গুজরাট পুলিশের সন্দেহ আধার কার্ড বা ভোটার পরিচয়পত্রসহ নথি বাংলাদেশিরাও বানিয়ে নিতে পারে। তাই পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়সহ বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া কয়েকটি রাজ্যে গুজরাট পুলিশ তাদের দল পাঠাচ্ছে। যেসব পরিচয়পত্র জমা দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো আসল না কি নকল, সেটা সরেজমিন তদন্ত করে দেখবে গুজরাট পুলিশের দলগুলো।

অন্য রাজ্যেও বাঙালি মুসলমানদের হেনস্তা

ভ্রাম্যমাণ শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ বলছে তাদের কাছে সারা দেশ থেকে অন্তত ১০০ অভিযোগ জমা পড়েছে, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ অভিহিত করে হেনস্তা ও মারধর করা হয়েছে।

ওই সংগঠনটির কাছে অভিযোগ এসেছে, ১৮ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার ২৩ জন ফেরিওয়ালাকে উত্তর প্রদেশের কুশিনগরে বাংলাদেশি তকমা লাগিয়ে দেয় ও বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য মারধর করে স্থানীয় ব্যক্তিরা। এরপরে ওই আক্রান্ত ব্যক্তিদেরই পুলিশ তাদের হেফাজতে নেয়, এক দিন পরে তাঁরা ছাড়া পান।

আবার ২১ এপ্রিল মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ থেকে ৬০ জন ভ্রাম্যমাণ শ্রমিক বাসে করে কর্মক্ষেত্র ওডিশার কেওনঝড়ের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন বলে জানাচ্ছে ওই সংগঠনটি। ওডিশার ময়ূরভঞ্জ জেলার জসিপুরে সকালে বাসটি পৌঁছনোর পর স্থানীয় লোকজন তাঁদের বাংলাদেশি বলে হেনস্তা ও মারধর করে। পরে তাঁরা মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন।

ওই মুর্শিদাবাদেরই সামশেরগঞ্জের এক বাসিন্দা ঈদের পর ফেরিওয়ালা হিসেবে জিনিসপত্র বিক্রি করতে ওডিশার ভদ্রক টাউন থানা এলাকায় গেলে তাঁকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগ পেয়েছে ভ্রাম্যমাণ শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ।

সংগঠনটির প্রধান আসিফ ফারুক বলছিলেন, ‘এ রকম প্রচুর অভিযোগ পাচ্ছি আমরা। সেই ২০১৪ সাল থেকেই এগুলো চলছে আর দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। পেহেলগামের হত্যাকাণ্ডের পরে তো আরও বেড়েছে এটা। কোথাও স্থানীয় পুলিশ, কোথাও বা ছোটখাটো হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের লোকজন পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্তা করছে, মারধর করছে। সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশি তকমা লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’

আসিফ ফারুকের প্রশ্ন, ভারতের নাগরিক হিসেবে কি দেশের যেকোনো জায়গায় গিয়ে কাজ করার বা ব্যবসা করার অধিকার নেই বাংলাভাষী আর মুসলিম বলে?

বাংলাদেশি সন্দেহে গুজরাটের সুরাট থেকে শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ২৬ এপ্রিল, গুজরাট, ভারত
বাংলাদেশি সন্দেহে গুজরাটের সুরাট থেকে শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ২৬ এপ্রিল, গুজরাট, ভারত। ছবি: এএনআই

অভিনেতা সিদ্দিকের ওপর হামলা, লাঞ্ছিত করে থানায় সোপর্দ

অভিনেতা সিদ্দিককে মারধরের একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওতে দেখা যায়, জামাকাপড় ছেঁড়া অবস্থায় তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন একদল যুবক। নেওয়ার সময়ও কেউ তাঁর গায়ে হাত তুলছিলেন। আর কান্নাকাটি করছিলেন অভিনেতা সিদ্দিক। এই অভিনয়শিল্পীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় আওয়ামী লীগের দোসর বলে তাঁরা স্লোগান দিচ্ছিলেন। জামাকাপড় ছেঁড়া অবস্থায় রাস্তায় হাঁটিয়ে সিদ্দিককে রমনা থানা–পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই মুহূর্তে অভিনেতা সিদ্দিকের থানা হেফাজতে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রমনা থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) আতিকুল আলম।

আতিকুল আলম আজ মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে পাঁচটায় প্রথম আলোকে বললেন, ‘৪০ মিনিট আগে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা সিদ্দিককে আমাদের হাতে তুলে দিয়ে যায়। তাঁর জামাকাপড় ছেঁড়া ছিল। তিনি এখন পর্যন্ত আমাদের হেফাজতে আছেন।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার কাকরাইল এলাকায় আজ মঙ্গলবার বিকেলে ঘটনার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সিদ্দিককে মারধর করে প্রকাশ্যে স্লোগান দিতে দিতে থানার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে থানার ভেতরে নিয়ে গেলে পুলিশ বাইরে আসে। এরপর পুলিশের হাতে তাঁকে তুলে দেওয়া হয়।

অভিনেতা সিদ্দিককে যাঁরা মারধর করে থানায় সোপর্দ করেছেন তাঁরা কোনো দলের কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ভিডিওতে একজন ধারাবিবরণীতে বলছিলেন, ‘আমরা সিদ্দিককে, আওয়ামী লীগের একজন দালালকে পুলিশে হস্তান্তর করছি।’ সিদ্দিক অভিনয়ের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিকবার ঢাকার গুলশান ও টাঙ্গাইলের মধুপুর আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন।

অভিনেতা সিদ্দিকের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা মব ভায়োলেন্স: শিল্পী সংঘের সভাপতি
অভিনেতা সিদ্দিকের ওপর হামলা, লাঞ্ছিত করে থানায় সোপর্দের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপে মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অভিনয়শিল্পী এবং অভিনয়শিল্পী সংঘের সভাপতি আজাদ আবুল কালাম। মঙ্গলবার রাতে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ‘সিদ্দিকের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা মব ভায়োলেন্স। এই মব ভায়োলেন্সকে তো ঠেকাচ্ছে না। কেন জানি মনে হচ্ছে, মব ভায়োলেন্সকে নীরবে বলা হচ্ছে, করে যাও। আমাদের কিছুই করার নেই!’

অভিনয়শিল্পী সংঘের সদ্য নির্বাচিত সভাপতি আজাদ আবুল কালাম বললেন, ‘একজনের রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা থাকতে পারে। অভিনেতা হিসেবে সিদ্দিক সবার কাছে পরিচিত। তাকে এভাবে রাস্তায় ধরে মেরে দেবে কিছু লোক! দলবদ্ধভাবে এসে শারীরিকভাবে আঘাত করছে, আক্রমণ করছে, গায়ে থেকে জামাকাপড় খুলে ফেলছে, এরপর থানায় নিয়ে সোপর্দ করছে। থানায় নিয়ে সোপর্দ করতেই যদি হয়, তাহলে প্রথম থেকে তারা আইন হাতে তুলে নিল কেন! তাকে হেনস্তা করে আইনের হাতে তুলে দেবে—এই মব জাস্টিস, মব ভায়োলেন্স সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। এটা তো একটা সময় আরও নানান স্তরে হবে। এসব কর্মকাণ্ড সরকারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে, যেখানে মব ভায়োলেন্স, সেখানে কঠোর হাতে দমন করবে সরকার বলে আমার বিশ্বাস।’

আজাদ আবুল কালামের ভাষ্যে, ‘কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটা জানানোর একটা প্রক্রিয়া আছে। শুধু শিল্পী না, একজন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধেও যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে আপনি তার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগপর্যন্ত তাকে অপরাধী বলতে পারেন না। তাকে সামাজিকভাবে হেয় করতে পারেন না। মামলা করে দিলেন এবং তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা শুরু করলেন—এই প্রক্রিয়া যদি চলতে থাকে, এটাই যদি আমাদের মনস্তত্ত্ব হয়, তাহলে বিভক্তি আরও বাড়বে। আমরা যে ইনক্লুসিভ সমাজের কথা বলছি বা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান মানুষকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছে, যে আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছে, সেই একটা ইনক্লুসিভ সমাজে বিভেদ থাকবে না, সমঝোতার জায়গা তৈরি হবে সমাজে; এমনটা চলতে থাকলে সেটা কীভাবে হবে? এভাবে চলতে থাকলে তো বিভক্তি আরও বাড়বে। চলতে থাকবে, চলতে থাকবে। যা ঘটছে, প্রতিটি কাজই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী।’

অভিনেতা সিদ্দিককে মারধরের একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে
অভিনেতা সিদ্দিককে মারধরের একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোলাজ

রাখাইনের রাজ্যের জন্য করিডর: যে হিসাব-নিকাশগুলো জরুরি by মারুফ মল্লিক

অন্তর্বর্তী সরকারের সম্প্রতিক কিছু কাজকর্ম বা সিদ্ধান্ত দেখে অনেকের মনে হতে পারে, তারা একা একা চলতে চাইছে। রাজনৈতিক সরকারগুলো অনেক সময় বিভিন্ন স্বার্থের কারণে অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে না জানিয়ে বা আলাপ-আলোচনা না করে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। রাজনৈতিক সরকারগুলো মনে করে তাদের প্রতি জনসমর্থন আছে। ফলে যে সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করবে, তার পক্ষে নিজ নিজ কর্মীদের মাঠে নামাতে পারবে এবং এই কর্মীদের জনগণ বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে।

কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যারা একটি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছে, তারা কেন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সব বিষয়ে আলাপ করবে না। এমন না যে রাজনৈতিক দলগুলোর সব সময় এই সরকারের বিরোধিতা করছে। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক বিষয়েই একমত হবে সরকারের সঙ্গে, আবার কিছু বিষয়ে হবে না, এটাই স্বাভাবিক। যদি দ্বিমতও পোষণ করে তারপরও ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত সরকারের। এ বিষয় সরকারের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের জন্য মানবিক করিডর সুবিধা দেওয়াসংক্রান্ত সরকারের এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করার দরকার ছিল।

কিছু দিন ধরে রাখাইনদের জন্য একটি মানবিক করিডর দেওয়ার বিষয়ে কথা হচ্ছিল। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এই করিডরের জন্য আগেই অনুরোধ করা হয়েছে। জাতিসংঘ মনে করছে এখনই রাখাইনে মানবিক সহায়তা না পাঠাতে পারলে সেখানে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। রাখাইনে মিয়ানমারের জান্তা শাসক ও আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান যুদ্ধে মানবিক বিপর্যয় থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষার জন্য এই সহায়তা পাঠানো জরুরি।

জাতিসংঘের এমন মতামতের পর আমাদের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও বিভিন্ন আলোচনায় করিডরের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এসব আলাপ-আলোচনার মধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়টি প্রকাশ্যে এল।

রোববার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘এতটুকু আপনাদের বলতে পারি, নীতিগতভাবে আমরা এতে সম্মত। কারণ, এটি একটি হিউম্যানিটেরিয়ান প্যাসেজ (মানবিক সহায়তা সরবরাহের পথ) হবে। কিন্তু আমাদের কিছু শর্তাবলি রয়েছে, সেই বিস্তারিততে যাচ্ছি না। সেই শর্তাবলি যদি পালিত হয়, আমরা অবশ্যই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সহযোগিতা করব।’

এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, মানবিক বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূরাজনৈতিক, সামরিক, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিষয়গুলো আমাদের গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। রাখাইন পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে চাইলে প্রথমেই আমাদের একটি প্রশ্ন করতে হবে। তা হচ্ছে, রাখাইনের ভবিষ্যৎ কোন দিতে যাচ্ছে এবং রাখাইনের যুদ্ধের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে। এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর কেউই এখন দিতে পারবে না। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ওপর নির্ভর করবে কে কি ধরনের কৌশল গ্রহণ ও প্রয়োগ করবে।

তাই বাংলাদেশের প্রথম কৌশল হবে, রাখাইনের যেকোনো ধরনের পরিণতি থেকে আমরা কী ধরনের সুবিধা আদায় করে নিতে পারব, তার হদিস করা। এরই সঙ্গে আমাদের ঝুঁকির বিষয়গুলোও বিবেচনা করতে হবে।

রাখাইন পরিস্থিতির সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে বাংলাদেশে দলে দলে প্রবেশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমার জান্তার হাত থেকে আরাকান আর্মি রাখাইনের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা দখলে নিলেও রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করা বন্ধ হয়নি। তাই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসাও বন্ধ হয়নি। ফলে বোঝাই যাচ্ছে মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীর পাশাপাশি আরাকান আর্মির মধ্যেও রোহিঙ্গাবিদ্বেষ রয়েছে। এ কারণে রাখাইনদের জন্য মানবিক করিডর দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথ খুঁজতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করতে পারে। এটা হবে বাংলাদেশের আলোচনা শুরু করার প্রথম শর্ত।

রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়াও এই মানবিক করিডর প্রদানের সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতি, আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা, আর্থিক ও সামরিক বিষয়াদি জড়িত। রাখাইনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নানা ধরনের মেরুকরণের সূচনা হতে পারে। তাই বিষয়টি আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কৌশল সাজাতে হবে।

আগেই বলেছি রাখাইনের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে। এখানে দুটি সম্ভাবনাই আছে। এক, রাখাইন মিয়ানমার থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীন দেশ বা বিশেষ ব্যবস্থায় পরিচালিত একটি ভূখণ্ডে পরিণত হতে পারে। অথবা মিয়ানমারের জান্তা সরকার রাখাইন পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিবে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বা আলোচনার ভিত্তিতে।

প্রথম সম্ভাবনাকে ধরে যদি আলোচনা করি তবে আমাদের করিডর প্রদান এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। এ অবস্থায় রাখাইনে নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি বা নতুন ব্যবস্থার উদ্ভব ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে গ্রহণ করবে, তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। প্রথমত রাখাইনে রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিবর্তন ভারতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হবে। ভারত মিয়ানমারে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারাবে। ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো বাংলাদেশকে এড়িয়ে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের প্রবেশের সুযোগ হারাবে। তখন অনেক ঘুরে ইয়াঙ্গুন হয়ে সমুদ্রে প্রবেশ করতে হবে। এর পাশাপাশি কুকি-চিনদের যুদ্ধের প্রভাব ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তাই ভারত চাইবে না মিয়ানমারে এমন কিছু হোক, যাতে তার রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা বিঘ্নিত হতে পারে।

মিয়ানমার নিয়ে চীনের অবস্থান খুবই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। কখন জান্তা সরকারকে সমর্থন দেয়, কখন কোনো বিদ্রোহীদের সহায়তা করে বলা মুশকিল। এর কারণ হচ্ছে চীনের কুমনিং থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি রুট হচ্ছে রাখাইনের বন্দরগুলো। তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি অংশ হচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইনের বন্দর। তাই মিয়ানমার হাতছাড়া হয়ে গেলে রাখাইন নিয়ে চীনকে নতুন করে কূটনীতি শুরু করতে হবে। কুমনিং থেকে রাখাইন হয়ে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা চীনের জন্য কঠিন হয়ে যাবে।

এখানে আরেকটি পক্ষ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সালে বার্মা অ্যাক্ট পাস করেছে। বার্মা অ্যাক্টে মোটাদাগে সাতটি ভাগ আছে। বার্মা অ্যাক্টে মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রদানের বিষয়টি ছাড়াও জাতিসংঘের অধিকতর উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে উদ্যোগ গ্রহণে সহায়তা করতে হবে।

এখন জাতিসংঘের বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে মানবিক করিডর সৃষ্টির প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের বার্মা অ্যাক্টের দুটি ধারার সঙ্গে মিলে যায়। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে এই মানবিক করিডরের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকবে। কারণ, এমন একটি মানবিক সহায়তা বা অধিকতর উদ্যোগের কথা যুক্তরাষ্ট্র অনেক আগেই বলে রেখেছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে একটি নিজস্ব বলয় তৈরির চেষ্টা করছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এ ক্ষেত্রে তারা ভারতকে সঙ্গে নিয়ে এমন একটি বলয় সৃষ্টি করছে চাইছে, যেখানে ভারতের গুরুত্ব কম থাকবে। কারণ, বর্তমান পরিস্থিতিকে ভারতের পক্ষে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করা সম্ভব নয়। ফলে মিয়ানমার ইস্যুতে ভারত খুব বেশি কথাবার্তা বলতে পারছে না। কৌশলগতভাবে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে রাখাইনের জন্য একটি করিডর সৃষ্টি করা ভারতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু ভারত প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে দ্বন্দ্বে জড়াবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চলে প্রভাব সৃষ্টির প্রচেষ্টাকে চীন কীভাবে বিবেচনা ও মোকাবিলা করবে, তা আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।

এবার দ্বিতীয় সম্ভাবনা নিয়ে বলি। যদি শেষ পর্যন্ত রাখাইন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যায়, রাখাইন আর্মি পিছু হটে তবে মিয়ানমারের জান্তা সরকার আমাদের করিডর প্রদানের বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সময় কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, সেটাও আমাদের চিন্তা ও পরিকল্পনার মধ্যে রাখতে হবে।

রাখাইনে দুই ধরনের পরিণতির কথা বিবেচনা করেই আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। এই পরিকল্পনার সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থও জড়িত আছে এবং মনে রাখতে হবে মিয়ানমারে দীর্ঘ সময় জান্তা শাসকের উপস্থিতি, রাখাইন, চিন প্রদেশের যুদ্ধ, সবকিছু মিলিয়ে সেখানে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এর অবসান হতে পারে হুট করে। আবার দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, আলাপ-আলোচনা, সমঝোতার মাধ্যমেও হতে পারে। মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করা মুশকিল ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয়।

এই ধরনের একটি স্পর্শকাতর, জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা সরকারের উচিত ছিল। প্রয়োজনে আলাপ-আলোচনার বিষয় কৌশলগত কারণে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো গোপন রাখতে পারত। আমার ধারণা, সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করলে তারা হয়তো মানবিক করিডরের বিরোধিতা করত না। বরং তারা দেশের জন্য কিছু সুবিধাজনক কৌশল আলোচনার টেবিলে তুলে ধরতে পারত।

বাংলাদেশ এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে আছে যে তাকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতকে হাতে রাখতে হবে রাখাইন ইস্যুতে। ভারতকে খুব বেশি গুরুত্ব না দিলেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে রাখাইন ইস্যুতে ভারসাম্যের মধ্যে আনতে হবে। তাই এ বিষয়ে সরকার এককভাবে সিদ্ধান্ত না নিয়ে রাজনৈতিক শক্তিকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করলেই ভালো করত।

এ লেখা প্রকাশের আগ মুহুর্তে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের একটি বক্তব্য সামনে এল। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই যে সরকার তথাকথিত “মানবিক করিডর” নিয়ে জাতিসংঘ বা অন্য কোনো সংস্থার সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি।’

তিনি বলেন, সরকার মনে করে, যদি জাতিসংঘের নেতৃত্বে রাখাইনে মানবিক সহায়তা পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ লজিস্টিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকবে। সেই সহায়তার বিষয়ে বাংলাদেশ নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে রাখাইনে সহায়তা পাঠানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যের পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের এ বক্তব্য রাখাইন রাজ্যের জন্য করিডর নিয়ে আরও ধোঁয়াশা তৈরি করল কি? বিষয়টি নিয়ে আরও তর্ক–বিতর্ক বা আলোচনা–সমালোচনা চলবে নিশ্চয়ই। এর মধ্য দিয়ে আশা করি, এ বিষয়ে আমরা একটি যৌক্তিক অবস্থানে যেতে পারব। সরকারও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে।

* ড. মারুফ মল্লিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মিয়ানমার সীমান্তে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) সতর্ক অবস্থান
মিয়ানমার সীমান্তে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) সতর্ক অবস্থান। ফাইল ছবি

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাঁধলে ক্ষতি হবে কার by বি জে সাদিক

গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তান সরকারের মধ্যে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছিল।

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সভাপতিত্বে জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকে উপস্থিত সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের পরিশ্রান্ত, হতাশ ও ক্ষুব্ধ দেখাচ্ছিল। তাঁদের অস্বস্তির উৎস ছিল ভারত।

দুই দিন আগে ভারতশাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে পাইনবন ও বরফে আচ্ছাদিত তৃণভূমি থেকে রক্তক্ষয়ী হামলার খবর আসে। একদল সশস্ত্র ব্যক্তি সেখানে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের ওপর গুলি চালায়। ২৬ জন নিহত হন, আহত হন আরও কয়েক ডজন।

ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো খুব দ্রুত এ হামলার সঙ্গে পাকিস্তানের যোগসূত্র আছে বলে দাবি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আহত পর্যটকেরা মাটিতে লুটিয়ে কাতরাচ্ছে, তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সাহায্যের জন্য আবেদন জানাচ্ছেন। সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় আহতদের উদ্ধার করতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়।

কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে বেসরকারি নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো হামলার মধ্যে এটা সবচেয়ে বড়।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘এই জঘন্য হামলার পেছনে যারা জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে...তাদের রেহাই দেওয়া হবে না। তাদের অশুভ এজেন্ডা কখনোই সফল হবে না। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ের সংকল্প অটুট থাকবে এবং শুধু শক্তিশালী হবে।’

একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী যারা নিজেদের ‘কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স’ (মনে করা হয়, এই গোষ্ঠীটি লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে যুক্ত) বলে পরিচয় দেয়, তারা হামলার দায় স্বীকার করে।

কাশ্মীরের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক এসপি বৈদ অভিযোগ করেন, ‘এটা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ঘটেছে।’ তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের বিশেষ বাহিনী, ‘সন্ত্রাসবাদের ছদ্মবেশে এই হামলাগুলো চালানো হচ্ছে।’

ভারত সরকার খুব দ্রুত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ শাস্তিমূলক পদক্ষেপ ঘোষণা করে। এর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত, ভিসা বাতিল ও কূটনৈতিক সম্পর্ক অবনমন। পাকিস্তানের সঙ্গে প্রধান সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। পাকিস্তান মঙ্গলবারের হামলায় তাদের কোনো ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করেছে। ভারতের দাবিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলেছে।

সিন্ধুর পানিপ্রবাহে ওপর ভারতের অবরোধের ঘোষণা পাকিস্তানজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কেননা এই নদীগুলোর পানির ওপরেই পাকিস্তানের বেশির ভাগ অংশের কৃষির উৎপাদন নির্ভর করে।

১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত হওয়া চুক্তিটি নানা সময়ের সামরিক সংঘাত ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরও অক্ষত ছিল। এটা স্থগিতের ঘোষণা অভূতপূর্ব। এটি পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশীর মধ্যে বিরাজমান ভঙ্গুর সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি প্রধান এক বাঁকবদল।

নদীর পানিপ্রবাহে ভারত যদি কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করে, তবে সেটা পাকিস্তানের জন্য অপরিসীম অভিঘাত সৃষ্টি করবে। ফসলের কম ফলন ও কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়া—দুটি ঘটনায় ঘটবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিজ্ঞানী পারভেজ হুদভয় মিডল ইস্ট আইয়ের কাছে, ভীষণ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘চুক্তি থেকে বের হয়ে আসা মানে যুদ্ধের আহ্বান জানানো। পারমাণবিক শক্তিধর দুটি দেশের মধ্যকার সেই যুদ্ধে কেউই জিততে পারবে না।’

বৃহস্পতিবার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তান কঠোর ভাষায় পাল্টা পদক্ষেপ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে ভিসা ও বাণিজ্য বন্ধ, কূটনীতিকদের বহিষ্কার ও ভারতের বিমানের জন্য পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়।

পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক আতা মুনিম শহীদ বলেছেন, ‘সম্পূর্ণভাবে নিজেদের দেশে তৈরি হওয়া বিদ্রোহীদের ব্যাপারে পাকিস্তানকে এই প্রথম দোষারোপ করল না ভারত। আমরা সব সময় সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করি, যেহেতু আমরা এর ভুক্তভোগী।’

যদিও পাকিস্তান বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয়, দীর্ঘদিন ধরে করে আসা ভারতের এ অভিযোগের কিছু বৈধতা আছে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির অতিডানপন্থী রাজনীতিও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ।

মোদির গত এক দশকের শাসনামলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী পদক্ষেপগুলোর কারণে ভারতীয় সমাজ মারাত্মকভাবে বিভাজিত হয়েছে। অতিডানপন্থী হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক কর্মীরা মুসলমানদের বিদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে ঠাট্টা করেছে এবং ভারতীয় সমাজের সৌহার্দ্যের মূলে আঘাত করেছে।

সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি ভারতে এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে কাশ্মীরের আধা স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করে কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়। কাশ্মীরের নেতাদের ও স্বাধীন আন্দোলনকারীদের কারাগারে পাঠানো হয় এবং কারফিউ জারি করা হয়।

পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের জন্য দোষারোপ করা মোদির রাজনীতির একটি অন্যতম বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানি বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী সফলভাবে পাকিস্তানবিরোধী মনোভাবকে তার নির্বাচনী প্রচারণার হাতিয়ার করে তুলতে পেরেছেন।

২০১৯ সালে কাশ্মীরের পুলওয়ামায় নিরাপত্তাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ হামলার প্রতিক্রিয়ায় ভারত পাকিস্তানে বিমান হামলা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও আরব দেশগুলোর মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ বাঁধেনি। এর কয়েক বছর আগে, কাশ্মীরে ভারতের সেনাঘাঁটিতে হামলাকে কেন্দ্র করে আরেক দফা বৈরিতা তৈরি হয়েছিল।

সর্বশেষ হামলাটি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ভারত সফরের সময়। ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়াতে এবং চীনের বিরুদ্ধে প্রধান মিত্র হিসেবে ভারতকে সাধুবাদ জানানোর উদ্দেশ্য থেকেই তাঁর এ সফর। ঐতিহাসিকভাবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বৈরিতার লাগাম টেনে ধরার প্রধান কারিগর হিসেবে ভূমিকার রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এবারে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের কাছ থেকে ভারত পুরোপুরি সমর্থন পাবে বলে মনে হচ্ছে।

বিচক্ষণতাকে অবশ্যই জিততে হবে। দুই দেশেই বিপুলসংখ্যক গরিব মানুষ বাস করে। যুদ্ধ বেধে গেলে তাদের নিজেদের রক্ষা করার মতো সম্বল সামান্যই আছে।

* বি জে সাদিক ব্রিটিশ-পাকিস্তানি লেখক, সাংবাদিক ও কবি

- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

বিচক্ষণতাকে অবশ্যই জিততে হবে। দুই দেশেই বিপুলসংখ্যক গরিব মানুষ বাস করে। যুদ্ধ বেধে গেলে তাদের নিজেদের রক্ষা করার মতো সম্বল সামান্যই আছে।
বিচক্ষণতাকে অবশ্যই জিততে হবে। দুই দেশেই বিপুলসংখ্যক গরিব মানুষ বাস করে। যুদ্ধ বেধে গেলে তাদের নিজেদের রক্ষা করার মতো সম্বল সামান্যই আছে। ছবি : এএফপি

সিন্ধু পানিচুক্তি বাতিল: ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে যাওয়ার পরিকল্পনা পাকিস্তানের

কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর পাল্টাপাল্টি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। এরই অংশ হিসেবে সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিত করেছে ভারত সরকার। এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে ইসলামাবাদ। এবার বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) যাওয়ার কথা বলেছে দেশটি।

বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর এই চুক্তিতে সই করে ভারত ও পাকিস্তানের সরকার। এই চুক্তির কারণে পাকিস্তানের ৮০ শতাংশ কৃষি খামারের জন্য পানি পাওয়ার পথ নিশ্চিত হয়েছিল। পানিচুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তের পর এখন আতঙ্কে রয়েছেন পাকিস্তানের সিন্ধু নদ এলাকার বাসিন্দারা।

ভারতের একতরফাভাবে এই চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে পাকিস্তানের আইন ও বিচারমন্ত্রী আকিল মালিক জানিয়েছেন। সোমবার রাতে তিনি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ভিন্ন তিনটি আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

পাকিস্তানের এই মন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে যেতে পারেন তাঁরা। ভারত ১৯৬০ সালের ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করছে বলে সেখানে অভিযোগ করা হবে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও বিষয়টি তোলা হতে পারে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকেও বিষয়টি জানানো হতে পারে।

আকিল মালিক বলেন, এ বিষয়ে আইনি কৌশল নিয়ে পরামর্শ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কোন পথে এগোনো হবে, সে বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলা হয়। ওই হামলায় ২৬ জন নিহত হন। নৃশংস এই হামলার পেছনে পাকিস্তানের হাত রয়েছে বলে দাবি করেছে নয়াদিল্লি। হামলায় জড়িত সন্দেহভাজন তিনজনের মধ্যে দুজন পাকিস্তানি বলেও দাবি তাদের। তবে এসব অভিযোগ নাকচ করেছে পাকিস্তান।

সিন্ধু নদের পাকিস্তান অংশ। গত ২৪ এপ্রিলের চিত্র
সিন্ধু নদের পাকিস্তান অংশ। গত ২৪ এপ্রিলের চিত্র। ছবি: রয়টার্স

বন্ধুকে ছাত্রলীগ সাজিয়ে পুলিশে দিয়ে তার প্রেমিকাকে ধর্ষণ ছাত্রদল নেতার!

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় বন্ধুর হবু বউকে (১৭) ধর্ষণের সময় ফয়সাল আহমেদ দুর্জয় (২৬) নামে এক ছাত্রদল নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযুক্ত ফয়সাল আহমেদ দুর্জয় দূর্গাপুর উপজেলার চন্ডিগর গ্রামের মজিবর রহমানের ছেলে। তিনি উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক।

মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) রাতে দূর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

ওসি জানান, মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার বিরিশিরি এলাকার এক রিসোর্ট থেকে অনৈতিক কাজে (ধর্ষণ) লিপ্ত থাকা অবস্থায় দুর্জয়কে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় রিসোর্টে দায়িত্বরত দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। এ ছাড়া ভুক্তভোগীর হবু স্বামী ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী মো. মুন্না মিয়া ও ভুক্তভোগী সবাই থানা হেফাজতে আছেন।’

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নিজে বাদী হয়ে ফয়সাল আহমেদ দুর্জয়ের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণের মামলা দায়ের করেছেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, সোমবার (২৮ এপ্রিল) বিকেলে ভুক্তভোগীর হবু স্বামী মুন্না মিয়া দূর্গাপুর ঘুরতে নিয়ে যান। পরে সন্ধ্যা হয়ে গেলে বিরিশিরি রিসোর্টে রুম ভাড়া নিয়ে রাত্রযাপন করেন। মঙ্গলবার দুপুরে মুন্না ব্যক্তিগত কাজে শহরে যান। কিছুক্ষণ পর দরজায় শব্দ পেয়ে ভুক্তভোগী তার স্বামী এসেছেন ভেবে দরজা খুলেন। তখন তিনি ফয়সাল আহমেদ দুর্জয়কে দেখতে পান। দুর্জয় তার হবু স্বামী মুন্নার বন্ধু হওয়ায় ভুক্তভোগীর পরিচিত ছিল। পরে কথা বলার জন্য তখন দুর্জয় রুমের ভেতরে যান। কথা বলার এক পর্যায়ে দুর্জয় তাকে ঝাপটে ধরেন এবং জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। এ সময় তার ডাক চিৎকারে আশপাশের লোকজন ও পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

ধর্ষণ ও আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বাদী ধর্ষণের মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বুধবার (৩০ এপ্রিল) সকালে দুর্জয়কে আদালতে সোপর্দ করা হবে। অন্য আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নেত্রকোনা জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক অনিক মাহবুব জানান, কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশে অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকায় দুর্গাপুর উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ন-আহ্বায়ক ফয়সাল আহমেদ দুর্জয়কে বহিষ্কার করা হয়েছে। ছাত্রদল কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না। 

অভিযুক্ত উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ফয়সাল আহমেদ দুর্জয়। ছবি : সংগৃহীত
অভিযুক্ত উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ফয়সাল আহমেদ দুর্জয়। ছবি : সংগৃহীত

রাতে সীমান্তে গুলিবিনিময়, ভারতের গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করেছে পাকিস্তান

ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে পঞ্চম রাতেও উভয়পক্ষে গুলিবিনিময় হয়েছে। এর জন্য ভারত যখন পাকিস্তানকে দোষারোপ করছে তখন নিয়ন্ত্রণরেখায় আকাশসীমা লঙ্ঘনের কারণে ভারতের একটি কোয়াডকপ্টার গুলি করে ভূপাতিত করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। পাকিস্তান বলছে, ভারতের আগ্রাসনের ফলে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ওয়াগা সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় নাগরিকরা দেশে ফিরে যাচ্ছেন এবং পাকিস্তানিরাও তাদের দেশে ফিরে যাচ্ছেন। ওয়াগা সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানি একজন কূটনীতিক ও সাতজন স্টাফ দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে আছেন কূটনীতিক সোহেল কামার। অন্য চার স্টাফের সঙ্গে তিনি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ওয়াগা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে লাহোর পৌঁছেছেন। একই দিন বিকালে দিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের অন্য তিনজন সদস্য তাদের পরিবারের ২৬ জন সদস্যকে নিয়ে একই রুটে দেশে ফিরেছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডয়েচে ভেলে, জিও নিউজ। পেহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে পাকিস্তান যতই আন্তর্জাতিক পক্ষপাতিত্বহীন, স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করছে, ভারত ততই ওই ঘটনার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করছে। এ নিয়ে দুই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের মধ্যে ভয়াবহ উত্তেজনা চলছে। পাল্টাপাল্টি যুদ্ধ প্রস্তুতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে আরব সাগরে ভারতের নৌবাহিনী মহড়া চালিয়েছে। তা থেকে বলা হয়েছে, দূরবর্তী সুনির্দিষ্ট টার্গেটে হামলা চালাতে সক্ষম তারা। এর মধ্যদিয়ে যে পাকিস্তানের দিকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হচ্ছে ভারত তার সেনাদের প্রস্তুত করেছে। পাকিস্তানের সেনাদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুই দেশের এমন যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে সংযমের আহ্বান জানিয়েছেন। অনলাইন জিও নিউজ নিরাপত্তা সূত্রগুলোকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ভারতের একটি কোয়াডকপ্টার নিয়ন্ত্রণরেখায় আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। এ জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী তা গুলি করে ভূপাতিত করেছে। ওই সূত্র আরও জানিয়েছেন কোয়াডকপ্টারটি দিয়ে ভিমবারের মানাবার সেক্টরে গোপন নজরদারি করার চেষ্টা করছিল শত্রুপক্ষ। ফলে সময় উপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান সেনারা। তারা শত্রুদের অশুভ উদ্দেশ্য ভণ্ডুল করে দিয়েছে। নিরাপত্তা সূত্রগুলো আরও নিশ্চিত করেছে যে, যেকোনো আগ্রাসনের তাৎক্ষণিক ও কার্যকর জবাব দেয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত পাকিস্তানি সেনারা। ওদিকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলমান এই উত্তেজনার মধ্যে ভারতের মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশে আটকা পড়েছেন প্রায় দুই হাজার কাশ্মীরি। কাশ্মীরি একজন ছাত্র জিও নিউজকে বলেছেন, তারা শ্রীনগরে পৌঁছার চেষ্টা করছেন। নিজেদের বাসায় ফিরতে না পেরে তারা বিভিন্ন অফিসে ঘুমাচ্ছেন। এ ছাড়া ভারতশাসিত কাশ্মীরের শিক্ষার্থী, কর্মজীবী এবং ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকারে পরিণত হচ্ছেন।

ডয়েচে ভেলে বলছে, দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি গুলি চললেও তার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছে ভারত। তাদের অভিযোগ, পাকিস্তানের সেনারা গুলি চালাতে শুরু করে। ভারত তার জবাব দিয়েছে। পাল্টা ভারতকে দায়ী করছে পাকিস্তান। তারাও একই রকম বক্তব্য দিচ্ছে। ফলে নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে বলা সম্ভব নয় যে, কে বা কোন পক্ষ আগে গুলি চালিয়েছে। ভারতীয় সেনার তরফে বিবৃতিতে বলা হয়েছে,  কোনোরকম উস্কানি ছাড়াই পাকিস্তানের সেনা ‘স্মল আর্মস ফায়ারিং’ শুরু করে। কুপওয়ারা ও বারামুলায় নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর এই গুলি চলে। আখনুরেরও গুলি চলে। ভারতীয় সেনা তার প্রত্যুত্তর দিয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে প্রতি রাতেই কাশ্মীর সীমান্তে গুলি চলছে। পেহেলগামে ২৬ জনের মৃত্যুর পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একাধিক ব্যবস্থা নেয়ার কথা ঘোষণা করেছে ভারত। পাকিস্তানও জানিয়েছে, তারা সিমলা চুক্তি-সহ ভারতের সঙ্গে সব চুক্তি স্থগিত করছে। তারপর থেকেই জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখে প্রতিরাতে গুলির লড়াই চলছে। কাশ্মীর  থেকে ডয়েচে ভেলের প্রতিনিধি স্যমন্তক ঘোষ জানিয়েছেন, প্রতিদিন রাত বারোটার পর গুলি চলছে। ভোরে থেমে যাচ্ছে। তবে শুধু গুলিই চলেছে। এ ছাড়া সীমান্তে প্রচুর সেনা মোতায়েন করছে ভারত। ব্যাপক মুভমেন্ট হচ্ছে।

পাকিস্তানে কী কী ওষুধ রপ্তানি করে ভারত এক্সপোর্ট কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার কাছ থেকে তার তালিকা চেয়েছে ভারত সরকার। জরুরিভিত্তিতে তাদের এই তালিকা পাঠাতে বলা হয়েছে। নিউজ-১৮’র রিপোর্ট বলছে, ২১৯টি দেশের মধ্যে ভারত থেকে ওষুধ নেয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তান ৩৮তম স্থানে আছে। ২০২৪ সালে ১৭ কোটি ৬৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারের ওষুধ কিনেছে পাকিস্তান। তবে পাকিস্তান এই ওষুধ সরাসরি  কেনে না। ভারত থেকে আমিরাতে ওষুধ যায়।  সেখান থেকে তারা এই ওষুধ কেনে। ভারতীয় কর্মকর্তারা মনে করেন, পাকিস্তানে ওষুধ বিক্রি বন্ধ হলে ভারতীয় ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদের খুব একটা ক্ষতি হবে না। কিন্তু পাকিস্তানে তার প্রভাব পড়বে। তাদের অনেক বেশি দাম দিয়ে ওষুধ কিনতে হবে।

জাতিসংঘে ভারতীয় দূতের প্রতিক্রিয়া: জাতিসংঘে ভারতের সহকারী স্থায়ী প্রতিনিধি  যোজনা প্যাটেল বলেছেন, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তার দেশ গত এক দশক ধরে সন্ত্রাসবাদীদের সমর্থন করে। এই স্বীকারোক্তিতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে তার এই কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে, পাকিস্তান একটি দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র এবং তারা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহ দিচ্ছে। গোটা বিশ্ব শুনেছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কী বলেছেন। এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি থেকে বোঝা যাচ্ছে, পাকিস্তান আঞ্চলিক স্থিতি নষ্ট করতে চাইছে। বিশ্ব এখন চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে পারে না।

mzamin

মানবিক করিডোর নিয়ে বিতর্ক

মিয়ানমারের রাখাইনে খাদ্য সহায়তা পৌঁছাতে বাংলাদেশ থেকে ‘মানবিক করিডোর’ দেয়ার বিষয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত ব্রিফিং-এ উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন রাখাইনের জন্য মানবিক করিডোর দিতে সরকার নীতিগত সম্মত হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর রাজনৈতিক দল ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সব দলের সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দিয়েছে। দলগুলোর মধ্যে বিতর্ক চলার মধ্যেই গতকাল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, এ বিষয়ে কোনো সংস্থার সঙ্গে সরকারের আলাপ-আলোচনা হয়নি। সাহায্য প্রদানের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও তিনি জানিয়েছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা বিএসএসকে তিনি বলেন, আমাদের অবস্থান হলো, জাতিসংঘের নেতৃত্বে রাখাইনে যদি মানবিক সহায়তা প্রদান করা হয়, তবে বাংলাদেশ লজিস্টিক সহায়তা দিতে আগ্রহী থাকবে। শফিকুল আলম বলেন, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য অনুযায়ী রাখাইন রাজ্যে তীব্র মানবিক সংকট চলছে। দুর্যোগকালীন সময়ে বিভিন্ন দেশকে সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। যার সামপ্রতিক উদাহরণ ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে মিয়ানমারকে সহায়তা প্রদান করা। আমরা উদ্বিগ্ন যে এ ধরনের মানবিক সংকট দীর্ঘ হলে রাখাইন থেকে আরও মানুষের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে, যা আমরা সামাল দিতে পারবো না। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশ্বাস করে যে জাতিসংঘ-সমর্থিত মানবিক সহায়তা রাখাইনকে স্থিতিশীল করতে এবং শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করবে। প্রেস সচিব বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখাইনে সহায়তা পাঠানোর বাস্তবসম্মত একমাত্র পথ হলো বাংলাদেশ। এই রুট ব্যবহার করে সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নীতিগতভাবে লজিস্টিক সহায়তা প্রদানে সম্মত রয়েছে। তিনি বলেন, রাখাইনে সহায়তা প্রদানের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। এ বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। যথাসময়ে আমরা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করবো। বাংলাদেশের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বিশ্বের বড় কোনো শক্তি এই করিডোরের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে যে প্রতিবেদন করা হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও  প্রোপাগান্ডা বলে তিনি দাবি করেন। প্রেস সচিব বলেন, বিগত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে একের পর এক বিদ্বেষপূর্ণ বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে আমরা দেখেছি, যা এখনো চলছে। এ ধরনের প্রচারণাও তার ব্যতিক্রম নয়।

বিএনপি বলছে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার নেই:
ওদিকে মিয়ানমারের রাখাইনে মানবিক করিডোর দেয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে বিএনপি। দলটি বলছে, দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন একটি অনির্বাচিত সরকারের এই এখতিয়ার নেই। এই সিদ্ধান্তে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে বলেও মনে করছেন নেতারা। বলছেন, মানবিক করিডোর একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এই ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং রাজনৈতিক মতৈক্য ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। গত সোমবার রাতে রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপি’র সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয় বলে দলটির সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এতে লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাখাইনে মানবিক করিডোর দেয়ার ব্যাপারে যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা করেন নেতারা। বলেন, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল হিসেবে রাখাইনে অন্তর্বর্তী সরকারের মানবিক করিডোর দেয়া বিষয়ে সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে বিএনপি। এ ছাড়া রাখাইনের বাস্তব পরিস্থিতি এবং এটা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কী করছে সেটার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করবে। পরে সংবাদ সম্মেলন করে যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে জাতির সামনে পুরো বিষয়টি তুলে ধরবে দলটি।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাখাইন রাজ্য থেকে ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তা ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈঠকে নেতারা তা উল্লেখ করেন। তারা বলেন, জাতিসংঘ রাখাইনে যে মানবিক বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষের কথা বলছে, সেটি নিয়ে বিএনপিও উদ্বিগ্ন। কিন্তু করিডোর দেয়ার আগে রাখাইন রাজ্য নিয়ে প্রতিবেশী দেশ চীন ও ভারতের অবস্থান কী, সেটা নিয়েও ভাবার যথেষ্ট প্রয়োজন আছে।

জাতির সামনে স্পষ্ট করার দাবি জামায়াতের: ওদিকে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান রাখাইনের মানবিক করিডোর দেয়ার বিষয়টি পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, রাখাইনের সঙ্গে মানবিক করিডোরের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। এ বিষয়টি জাতির সামনে স্পষ্ট করা দরকার। কারণ এর সঙ্গে অনেক নিরাপত্তা বিষয় জড়িত থাকতে পারে।

হেফাজতের প্রতিবাদ:
জাতিসংঘের অনুরোধে শর্ত সাপেক্ষে মিয়ানমারের বেসামরিক লোকজনের জন্য মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে রাখাইনে করিডোর দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মামুনুল হক।

মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর খিলগাঁওয়ে জামিয়া ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের করা প্রশ্নের জবাবে মামুনুল হক এ কথা বলেন। মামুনুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে, দেশপ্রেমিক শক্তি হিসেবে হেফাজতে ইসলাম কোনোভাবেই এটি সমর্থন করে না। এর নিন্দা জানায়। আমরা এর প্রতিবাদ জানাবো।

দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চায় গণসংহতি: রোহিঙ্গা সমস্যা, মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি ও মানবিক সহায়তা করিডোর বিষয়ে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে গণসংহতি আন্দোলন। মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল এ আহ্বান জানান।

নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি জটিল আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই সংকটের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এ বিষয়ে বিশদ আলাপ-আলোচনা ও ঐকমত্য প্রয়োজন। কারণ এর সঙ্গে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুতর বিষয় জড়িত। এ প্রসঙ্গে তারা আরও বলেন, এরকম জাতীয় বিষয়ে ‘জাতীয় ঐকমত্য’ অত্যন্ত জরুরি। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অবিলম্বে রোহিঙ্গা সমস্যায় মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতি ও মানবিক করিডোর বিষয়ে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা এবং সেই আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।

mzamin

দাউদ আমার বন্ধু by মতিউর রহমান চৌধুরী

চলে গেল দাউদ। বলছি- কবি-সাহিত্যিক দাউদ হায়দারের কথা। আমার ৫৪ বছরের বন্ধু। প্রায় কাছাকাছি সময়ে সাংবাদিকতায় এসেছিলাম। পাতা উল্টালে জন্ম তারিখও দূরে নয়। দাউদ সংবাদে, আমি বাংলার বাণী হয়ে পূর্বদেশে। দাউদ মারা গেল প্রবাসে। ইচ্ছা ছিল বাকি জীবনটা দেশে কাটাতে। তার শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়নি। রাষ্ট্র নামক যন্ত্র তাকে সে সুযোগ দেয়নি। একটি কবিতার জন্য ৫১ বছর নির্বাসনে। এটা বোধ করি ইতিহাসে বিরল। একটি কবিতা লিখেছিল দৈনিক সংবাদে। ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। বঙ্গবন্ধুর প্রশাসন ঝুঁকি না নিয়ে তাকে ভারতে পাঠিয়ে দেয়। তের বছর কেটেছে ভারতে। বাকি জীবন জার্মানিতে। কবি হিসেবে তার নাম-ডাক ছিল। আড্ডাবাজ দাউদ কথা বলতো জমিয়ে। কখনো কারও মুখের দিকে তাকিয়ে নয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! নীরবে-নিভৃতে এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেল। দাউদ আমার পরম বন্ধু। প্রেস ক্লাবের আড্ডায় মাঝেমধ্যেই মতপার্থক্য প্রকট হতো। কিন্তু ঝগড়ায় রূপ নেয়নি কখনো। তার সঙ্গে আসলেই আমার  মতের কোনো মিল ছিল না। বিস্তর ফারাক ছিল তার নীতি-আদর্শের প্রতি। ধর্ম নিয়ে লেখার কারণেই নির্বাসনে যেতে হয়েছিল তাকে। বিশ্বাস করুন, কোনোদিন কোনো আড্ডায় তার সঙ্গে ধর্ম নিয়ে কোনো বিতর্ক হয়নি। এটা তার ব্যক্তিগত মত। সংবাদ কর্তৃপক্ষ কবিতাটি প্রত্যাহার করেছিলেন। সে নিজেও দুঃখ প্রকাশ করেছিল। ৫১ বছরে বাংলাদেশে অনেক সরকার এসেছে। পরিণতি সবার জানা। দাউদ যখন দেশ ছাড়ে তখন ছিল তার পছন্দের সরকার। মাঝখানে বৈরী। এরপর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যখন সরকার এলো তখন একদিন ফোন করে বললো, এবার মনে হয় আমার দেশে ফেরা হবে। কিন্তু এবারো নিয়তি তার পক্ষে নয়। হাসিনার সরকার তাকে জানিয়ে দিলো-ফেরানো সম্ভব নয়। ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল দাউদ। বলেছিল, আসলে ওদের চরিত্র একই। কলকাতা থাকাকালীন তিনবার তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে অন্নদাশঙ্কর রায়ের বাসায়। তখন আমি কলকাতার যুগান্তর পত্রিকায় কাজ করতাম।  অন্নদাশঙ্কর ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক। দাউদকে পছন্দ করতেন। ছেলের মতো দেখতেন। একদিন আমাদের কলকাতা প্রতিনিধি পরিতোষ পালকে নিয়ে অন্নদাশঙ্কর রায়ের বাসায় আড্ডায় যোগ দিয়েছিলাম। সে আড্ডায় সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও ছিলেন। বাইরে থেকে শুধু দাউদের কণ্ঠই শুনছিলাম। যেকোনো আড্ডা সে মাতিয়ে রাখতো। বার্লিনেও দেখা হয়েছে তিনবার। বিশ্বকাপ ফুটবল কাভার করতে গিয়েছিলাম জার্মানিতে। খবর পেয়ে আগেই বলে রেখেছিল- এবার কিন্তু আমার বাসায় আসবি। আমার হাতেগোনা তিন-চারটা বন্ধু আছে যাদের সঙ্গে তুই-তুই সম্পর্ক। দাউদ এর মধ্যে অন্যতম। কৌতূহল থাকবে বাকিরা কারা। শফিক করিম সাবু, আশরাফ খান ও কলকাতার জয়ন্ত চক্রবর্তী। আমি অনেকের সঙ্গেই তুমি বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। এ নিয়ে আমার স্ত্রী সবসময় বলে, তোমার ছেলের সমান বয়স যাদের তাদেরকেও আপনি বলো কেন? এই প্রশ্নে আমার জবাব নেই। যাই হোক, দাউদের বাসায় যেতে হলো। নিজ হাতে রান্না করে খাইয়েছিল। গল্প করতে করতেই রাত বাজে ৪টা। পরদিন আর্জেন্টিনার খেলা। কী আর করবো। হোটেলে ফিরলাম না। রাতটা কাটিয়ে দিলাম ওর বাসায়। আরেকবার দেখা হলো প্রফেসর ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা সম্মেলনে। সেবার সে আমার হোটেলে এসেছিল। একসঙ্গে খেয়েছিলাম বাইরে। আরেকবার দেখা হয় ডয়চে ভেলেতে। সে তখন ডয়চে ভেলেতে কাজ করে। তাকে নিয়ে কতো কিছুই না লেখা যায়! চার/পাঁচ বছর আগে এক সন্ধ্যায় অফিসে বসে আছি। এমন সময় চলিশোর্ধ্ব এক মহিলা এসে হাজির। পরিচয় দিয়ে বললেন, আমি শুনেছি দাউদ হায়দার আপনার বন্ধু। জানেন আমি তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফোন করলাম। বললাম, এক মহিলা তোকে বিয়ে করতে চান। অট্টহাসি, কতো মেয়েই তো আমাকে বিয়ে করতে চায়। এটা সেরকমই। ভদ্র মহিলাকে বললাম, আপনি দাউদের সঙ্গেই কথা বলুন। সপ্তাহে দাউদের সঙ্গে আমার একদিন-দু’দিন ফোনে কথা হতো। ঈদসংখ্যা এলেই তাকে স্মরণ করতো কাজল ঘোষ। বহু লেখা তার ছাপা হয়েছে আমাদের কাগজে। যখন তার কোনো লেখা ঢাকার কাগজে ছাপা হতো না তখন আমরা ছেপেছি। শুধু বন্ধুত্বের টানে নয়, লেখার মানে। চমৎকার লিখতো সে। ভাষার প্রতি প্রচণ্ড দখল ছিল। হাসপাতালে অনেকদিন নির্বাক ছিল। ভাবা যায় যে মানুষটি যেকোনো আড্ডার মধ্যমণি সে মানুষটি কাউকে কিছু না বলেই চলে গেল! এটাই কি নিয়তি! আমাদের কলকাতার আরেক বন্ধু রুপায়ণ ভট্টাচার্য এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছে- একটি কবিতার জন্য আজীবন নির্বাসনে যায় যে কবি, সার্থক তার কবিজন্ম। আর একটি কবিতা লিখে যে দেখে না জন্মভূমি তার মতো হতভাগ্য কে রয়েছে! কোথায় তার মৃত্যুস্থল বার্লিন, কোথায় জন্মস্থান পাবনার দোহারপাড়া!
mzamin

স্বৈরাচারী শাসনের অবৈধ আদেশ মানতে গিয়ে পুলিশ জনরোষের শিকার হয়েছে

পুলিশ ও জনগণের মধ্যে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা কমিয়ে এনে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, স্বৈরাচারী শাসনের অবৈধ আদেশ পালন করতে গিয়ে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা জনরোষের শিকার হয়েছেন। পুলিশ জনগণের বন্ধু। পুলিশ বাহিনীকে সেই ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গতকাল রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৫ উদ্বোধনকালে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভোটাররা যেন নির্ভয়ে-নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে দেশে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই নির্বাচন যেন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে অনুষ্ঠিত হয় সেজন্য পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা অনেক। নির্বাচনে সব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রতি সমান আচরণ ও ভোটাররা যেন নির্ভয়ে-নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখবেন, কোনো ব্যক্তি যদি অন্যায় বা অনিয়মের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়, সেই ব্যক্তির দ্বারা ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সুতরাং কারও দ্বারা ব্যবহৃত হবেন না। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ব্রত হিসেবে নির্বাচনে নিজেদের নিয়োজিত করবেন। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে যেন পুলিশ বাহিনীকে দলীয় বাহিনী বা অন্যায় কাজে ব্যবহার না করা যায় সেজন্য একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনের আগের এই সময়টা অনেক কঠিন। আপনাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, পরাজিত শক্তি যেন কোনোভাবেই দেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে। প্রফেসর ইউনূস বলেন, আমি আগেও বলেছি, আমরা একটা যুদ্ধাবস্থায় আছি। অশুভ চক্র আমাদের স্বপ্নকে, আমাদের ঐক্যকে ভেঙে দিতে সব শক্তি নিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে। একে প্রতিহত করার জন্য আপনাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আমরা অনেক ন্যায্য, অন্যায্য আন্দোলনে মানুষকে রাস্তায় নেমে আসতে দেখেছি। এসব পরিস্থিতিতে আপনারা অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। আশা করি একই রকম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে আগামী দিনগুলোতেও আপনারা কাজ করে যাবেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, পুলিশ মানুষের বন্ধু। পুলিশ বাহিনীকে সেই ইমেজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রথমবারের মতো এবার পুলিশ সপ্তাহে ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক ও বিভিন্ন সমপ্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে আমি জানতে পেরেছি। এ বৈঠকে পুলিশের ওপর জনসাধারণের প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনা হবে। আমার প্রত্যাশা হলো- এটি যেন চলমান থাকে। প্রতি বছর পুলিশ সপ্তাহে যেন এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে সরকারপ্রধান বলেন, সর্বস্তরের মানুষের অধিকার, মর্যাদা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, কোনো বৈষম্য থাকবে না- যুগ যুগ ধরে এটি ছিল মানুষের আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষা পূরণে জোর ভূমিকা রাখতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। তিনি বলেন, গত আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে সে সময় এ দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। পুলিশের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। সরকার পরিস্থিতি উন্নতির জন্য যা কিছু প্রয়োজন সব রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সড়ক-মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা ও জনদুর্ভোগ নিরসন, বিশেষ অভিযান পরিচালনা, অংশীজনদের সঙ্গে পুলিশের আন্তঃযোগাযোগ জোরদার করা, পুলিশ সদস্যদের মনোবল বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, আপনাদের সর্বাত্মক চেষ্টা ও পরিশ্রমে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা, বিশ্ব ইজতেমা, ঈদুল ফিতর ও বাংলা নববর্ষসহ বিভিন্ন উৎসব সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশে যতগুলো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে সবগুলো ঘটনায় ব্যবস্থা গ্রহণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, খুব ভালো লাগছে সবার সঙ্গে দেখা করতে পেরে, এই পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে দেখা হলো। আপনাদের কাছ থেকে কিছু প্রাথমিক বক্তব্য শুনলাম। শুনে বুঝতে পারলাম যে, অনেকগুলো কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। যেটা আমাদের পক্ষ থেকে করার কথা ছিল, তা হয়নি। এর আগে আমরা একবার নিজেদের মধ্যে বসেছিলাম। আমার কাছে খুবই খারাপ লাগছিল। কী রকম পরিস্থিতিতে আপনাদের কাজ করতে হয়, তা আমার জানা ছিল না। আপনাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন কতো কঠিন, সেটার মাত্রা কতো গভীর। ড. ইউনূস বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে আমরা কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আশা করি তা বাস্তবায়িত হয়েছে। কতোদূর হয়েছে, সেটা আবার খোঁজ নেবো। আমরা আজকে আবার বসবো যাতে করে আপনাদের কাজের সহায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যায়। আপনারা যেন কাজে উৎসাহ পান এবং পরিস্থিতি সহায়ক হয়। ভালো লাগছে যারা প্রযুক্তির মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। আশা করছি, ভবিষ্যতে একসঙ্গে বসে আলাপ করার সুযোগ হবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ’৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ২৫শে মার্চ কালরাতে রাজারবাগ এই পুলিশ লাইনে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই ইতিহাস ভোলার নয়। বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর গৌরবময় ইতিহাসে এটি মহাগৌরবের। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পুলিশ সদস্যদের তিনি স্মরণ করে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পুলিশের সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের কল্যাণে দ্রুত কয়েকটি বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ সময় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখস চৌধুরী, আইজিপি বাহারুল আলমসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তিনদিনব্যাপী এই আয়োজনে উদ্বোধনী দিনেই এবার পদকের জন্য ঘোষিত ৬২ জন কৃতী পুলিশ সদস্যকে পদক পরিয়ে দেন প্রধান উপদেষ্টা। এবারের পুলিশ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’। অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত আইজি, সকল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপারসহ সব পদবির পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
mzamin

কানাডায় কার্নি ও লিবারেল পার্টির অসাধারণ জয়

কানাডার জাতীয় নির্বাচনে জয় পেয়েছে মার্ক কার্নি নেতৃত্বাধীন লিবারেল পার্টি। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শুল্ক আলোচনায় জোরালো ভূমিকা রাখতে দলটির যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন তা পূরণ হয়নি। ভিন্ন এক রাজনৈতিক পরিবেশে ২৮শে এপ্রিল ভোট দিয়েছে কানাডার জনগণ। জয় পাওয়ার পর মার্ক কার্নি প্রথম ভাষণে সমর্থকদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, (যুক্তরাষ্ট্রের) প্রেসিডেন্ট (ডনাল্ড) ট্রাম্প আমাদেরকে (কানাডা) ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছেন, যাতে আমাদেরকে (কানাডা) নিজেদের বলে দাবি করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তা কখনো হতে দেবো না। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স, অনলাইন বিবিসি। নির্বাচনে আগে ধারণা করা হচ্ছিল, কানাডার পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন রক্ষণশীল দলের পিয়েরে পোইলিভরে। কিন্তু তিনি নিজের আসনে পরাজিত হওয়ার পথে আছেন বলে প্রক্ষেপণে বলা হচ্ছে। ওদিকে মার্ক কার্নির জয়কে কানাডার রাজনীতির ইতিহাসে অসাধারণ জয় বলে অভিহিত করেছেন বিবিসির সাংবাদিক লিসি ডচেট। কানাডার হাউস অব কমন্সের জন্য মোট নির্বাচনী আসনের সংখ্যা ৩৪৩টি। এর মধ্যে কোনো দল যদি ১৭২টি আসনে জয় পায় তাহলে তারা হাউস কমন্সে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এক্ষেত্রে ছোট ছোট দলগুলোর সমর্থন ছাড়াই তারা দেশ শাসনের সুযোগ পায়। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বুথ ফেরত ফলাফল থেকে জানা গেছে- লিবারেলরা ১৬১টি আসনে জয় পেয়েছে। অন্যদিকে কনজারভেটিভরা পেয়েছে ১৫০টি আসন। কানাডার সর্বপশ্চিমের প্রদেশ হচ্ছে বৃটিশ কলাম্বিয়া। সবচেয়ে বেশি সময় ধরে এখানে ভোট গ্রহণ হয়েছে। এই প্রদেশের ওপরই লিবারেলদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ভাগ্য ঝুলে আছে। এখানে বলে রাখা ভালো, কানাডার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কোনো সরকারই আড়াই বছরের বেশি স্থায়ী হয় না। জরিপকারী সংস্থা অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউটের  প্রেসিডেন্ট শচি কুর্ল রয়টার্সকে বলেছেন, লিবারেলদের জয়ের পেছনে তিনটি বিষয় কাজ করেছে। সেগুলো হচ্ছে বিরোধী কনজারভেটিভ দল, ট্রাম্পের শুল্ক এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ট্রুডোর সরে যাওয়া। এসব কারণেই অনেক বামপন্থি ও ঐতিহ্যবাহী উদারপন্থি ভোটারদের দলে ধরে রাখতে পেরেছে লিবারেলরা। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকরী বিষয় ছিল দিন দিন অজনপ্রিয় হয়ে পড়ায় প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে জাস্টিন ট্রুডোর পদত্যাগ। এ বছরের শুরুতে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেশ কিছু মন্তব্য কানাডার জনগণের মধ্যে দেশপ্রেমের গতি বাড়িয়ে দেয়। তার মধ্যে একটি ছিল- কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার প্রস্তাব। সেসময় এর কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন কার্নি। পাশাপাশি তিনি কানাডার ওপর ট্রাম্পের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের বিষয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন এবং তা মোকাবিলা করার অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে কানাডাকে বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ ব্যয় করতে হবে। তবে সেসময় টানা নয় বছরের উদারপন্থি শাসনের অবসানের জন্য কার্নির কিছুটা বিরোধিতা করেছিলেন রক্ষণশীলরা। মার্ক কার্নি এর আগে ব্যাংক অব কানাডা ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর ছিলেন এবং সমপ্রতি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। লিবারেলদের মধ্যমপন্থি অবস্থানকে সামনে এনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নির্বাচনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ, শুল্ক বৃদ্ধি এবং কৌশলগত হুমকিকে কাজে লাগিয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন তিনি। 

লিবারেল দল এবং মার্ক কার্নির এই জয়কে অকল্পনীয় বলে মন্তব্য করেছেন বিবিসির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক প্রধান প্রতিবেদক লিসি ডচেট। তিনি একে কানাডার রাজনীতির ইতিহাসে অসাধারণ মুহূর্ত বলে অভিহিত করেছেন। ওদিকে মার্ক কার্নির জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। রাশিয়ার পরেই কানাডায় ইউক্রেনের সবচেয়ে বেশি অভিবাসী অবস্থান করেন। তিনি এক্সে দ্ব্যর্থহীন সমর্থন দেয়ার জন্য কানাডা ও এর জনগণকে স্মরণ করেন। তিনি কানাডার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী চীন। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে কানাডার ছিল টান টান সম্পর্ক। তারপরও পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে কানাডার সঙ্গে এমন সম্পর্কের কথা জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে কার্নির জয়ে তারা সরাসরি অভিনন্দন জানানো থেকে বিরত থেকেছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং সুযোগ সুবিধার নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে এই সম্পর্ক। মার্ক কার্নির জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার, ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন, আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিকায়েল মার্টিন, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। উরসুলা ভন ডার লিয়েন কানাডা ও ইউরোপের শক্তিশালী বন্ধনের উল্লেখ করেন। কার্নির সমর্থনে তিনি মুক্ত ও সুষ্ঠু বাণিজ্যের আশা প্রকাশ করেন। ইমানুয়েল ম্যাক্রন তার আচরিত শব্দ ‘এলবো-টু-এলবো’ অর্থাৎ কনুইয়ের সঙ্গে কনুই মিশিয়ে আপনার সঙ্গে কাজ করতে চাই বলে মন্তব্য করেছেন। আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আয়ারল্যান্ড ও কানাডার সম্পর্ক অনেক গভীর ও শক্তিশালী। এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে। অ্যান্থনি আলবানিজ তার কমনওয়েলথ অংশীদার মার্ক কার্নির প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, বৈশ্বিক এক অনিশ্চিত সময়ে আপনার সঙ্গে টেকসই বন্ধুত্বের ভিত্তিতে অব্যাহতভাবে কাজ করতে চাই।

mzamin

শিক্ষার্থী ও পিএসসি’র মাঝে ব্রিজ হয়ে সমস্যা সমাধানই ছিল লক্ষ্য

পিএসসি নিয়ে মানবজমিনে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। গতকাল নিজের ফেসবুক পেজে এই প্রতিক্রিয়া পোস্ট করেন তিনি। এতে তিনি লেখেন, পিএসসি সংস্কারের দাবিতে প্রায় ৮০ ঘণ্টা অনশন করে ৪ জন চাকরিপ্রার্থী ঝুঁকিপূর্ণ শারীরিক অবস্থায় পৌঁছালে পিএসসি এবং তাদের মধ্যে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিই। রাজু ভাস্কর্যে বসেও বারবার বলেছি ‘পিএসসি সাংবিধানিক, স্বাধীন ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। আমি পিএসসি এবং আপনাদের মধ্যে ব্রিজ হতে পারি, সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার আমার নেই’। প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি সুরাহা না করে লিখিত পরীক্ষা নেয়ার বিরুদ্ধে ছিলেন আন্দোলনকারীরা। পিএসসি সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে রাজু ভাস্কর্যে বসেই ফোনে কথা বলেছি। পিএসসি’র চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম স্যার তিনজন সদস্য পাঠান আলোচনার জন্য। টিএসসিতে সাংবাদিক সমিতির অফিসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি এবং পিএসসি’র সদস্যদের মধ্যকার দীর্ঘ আলোচনার পর পিএসসি লিখিত পরীক্ষা আপাতত স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তা ঘোষণা করেন পিএসসি’র একজন সদস্য। এই প্রক্রিয়ার কোনো অংশেই পিএসসিকে আমি কোনো প্রকার চাপ প্রয়োগ করিনি। পিএসসি এবং ছাত্রদের মধ্যে ব্রিজ হিসেবে সমস্যার সমাধান করাই ছিল আমার লক্ষ্য। তাছাড়া অনশনরত চাকরিপ্রার্থীদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছিল দ্রুত। অথচ মানবজমিনের একটি রিপোর্টে আমার বিরুদ্ধে পিএসসিকে চাপ দেয়ার মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়। তারপর সেটাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে টার্গেটেড প্রোপাগান্ডা। গণ-অভ্যুত্থানের একজন ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে সরকারে দায়িত্ব পালন করছি। ফলে শিক্ষার্থীদের যেকোনো যৌক্তিক দাবি কিংবা সমস্যায় এগিয়ে যাওয়াটা আমার দায়িত্ব। আমি সে দায়িত্ব পালন করছি এবং ভবিষ্যতেও করবো। মানবজমিনের এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত,  অপেশাদারি এবং মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের প্রতিবাদ জানিয়ে রাখলাম।

ওদিকে মানবজমিনে প্রকাশিত ‘কঠিন চাপে পিএসসি’ শিরোনামে সংবাদটির কিছু বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন ‘পিএসসি’র সংস্কারপ্রত্যাশী’ ব্যানারের শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংস্কারপ্রত্যাশীরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা। ঢাবি শিক্ষার্থী শাহ আলম স্নেহ লিখিত বক্তব্যে বলেন- ২৯শে এপ্রিল মানবজমিনে প্রকাশিত ‘কঠিন চাপে পিএসসি’ শীর্ষক শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যা ‘পিএসসি সংস্কার আন্দোলন’ অংশীজনের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদে ‘পিএসসি সংস্কার আন্দোলন’ সম্পর্কে নানাবিধ মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। যা বিসিএস প্রত্যাশীদের যৌক্তিক ও ন্যায্য আন্দোলনের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরির সুযোগ দিবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন’-এর স্বাধীনতা বজায় রেখেই কমিশনের প্রতিনিধি হয়ে সদস্য জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া ৪৬তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেন। উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া পিএসসি’র চেয়ারম্যান ও সদস্যের পরীক্ষা পেছানোর বিষয়ে অনুরোধ করেছেন এবং সার্বিক পরিস্থিতি পিএসসি’র নিকট তুলে ধরেছিলেন। এবং সদস্যের সিদ্ধান্ত তিনি প্রেসের সামনে উপস্থাপন করেন।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা সিরাজুস সালেহীন সিয়ন, তিনি ১০ বছর আগেই ছাত্রলীগ ত্যাগ করেছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। এ ছাড়া এনসিপি’র মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সার্জিস আলম রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অনশনকারীদের সঙ্গে সংহতি জানান। তার এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ৮ই এপ্রিল ১০-১২ জন পরীক্ষার্থী নয় বরং ২০০ পরীক্ষার্থী পিএসসি’র সামনে উপস্থিত ছিল। পরীক্ষার্থীরা কেউ গেট ভাঙেনি। বরং গেট খুলে পিএসসি’র ভেতরে অবস্থান নেন। পিএসসি’র মূল কার্যালয়ে প্রবেশের কেউ চেষ্টা করেনি। পিএসসি’র চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম এদিন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করেননি। তিনি সেনাবাহিনীর সহায়তায় একটা প্রতিনিধি টিমের সঙ্গে দেখা করেন। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বার বার ১০-১২ জন আন্দোলনকারী উল্লেখ করে ‘পিএসসি সংস্কার আন্দোলন’কে হেয় করা হয়েছে। আন্দোলনে প্রত্যেকবারই ৫০০ প্লাস বিসিএস প্রত্যাশীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। এটা ৪৬ পেছানো বা স্থগিতের আন্দোলন না। এটা বিসিএস প্রত্যাশীদের ‘পিএসসি সংস্কার আন্দোলন’। 

mzamin
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া

‘বাবা-মায়ের জন্য এতদূর আসতে পেরেছি’

প্রথম ম্যাচে হাত খুললেও ইনিংসটা বড় হয়নি বৈভব সূর্যবংশীর। কাঁদতে কাঁদতে ছেড়েছেন মাঠ। পরের ম্যাচেও জ্বলে উঠতে পারেননি। তবে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগে (আইপিএল) তৃতীয় ম্যাচে রেকর্ড বুক তোলপাড় করে ফিরলেন এই ১৪ বছর বয়সী বিস্ময়বালক। সোমবার গুজরাট টাইটানসের বিপক্ষে ৩৮ বলে ১১ ছক্কায় খেলেছেন ১০১ রানের ইনিংস। ৩৫ বলে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে চোখ কপালে তুলেছেন গোটা ক্রিকেট বিশ্বের। ছেলেকে ক্রিকেটার বানাতে যেসব ত্যাগ করেছেন তার বাবা-মা, রেকর্ড গড়া ম্যাচের পর সেই গল্পই শোনালেন বৈভব।

লখনৌ সুপার জায়ান্টসের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে নেমে প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকান বৈভব, খেলেন ২০ বলে ৩৪ রানের ইনিংস। সেদিন আউট হয়ে যাওয়ায় পর চোখে পানি নিয়ে ছাড়েন মাঠ। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছুটা আলোচনাও হয়। গুজরাটের বিপক্ষে বৈভব দেখালেন কেনো সেদিন তার চোখে পানি ছিল। যোগ্যতা যখন আকাঙ্ক্ষা পর্যন্ত ডানা না মেলতে পারে, তবে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হওয়াটা স্বাভাবিক। বৈভব হয়তো জানতেন তিনি কী করতে পারেন। এবার তো করেই দেখালেন। ৩৫ বলে বৈভবের হাঁকানো সেঞ্চুরিটি আইপিএলে দ্বিতীয় ও ভারতীয়দের মধ্যে দ্রুততম। ইন্ডিয়ান ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টটির তো বটেই, স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসেই সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরির মালিক এখন এই বাঁহাতি ব্যাটার। সোমবার আইপিএলে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি করার দিন তার বয়স ছিল ১৪ বছর ৩২ দিন। ধারাভাষ্যকাররা তো তার নামই রেখে দিয়েছেন ‘বস বেবি’। স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনেও ভেসে ওঠে সে নাম। সবচেয়ে কম বয়সে সেঞ্চুরিয়ানদের তালিকার তিনে আছে বাংলাদেশের পারভেজ হোসেন ইমন (১৮ বছর ১৭৯ দিন)। আইপিএলে সবচেয়ে কম বয়সে এবং সবচেয়ে কম ১৭ বলে ফিফটির রেকর্ডও এখন বৈভবের খাতায়। দু’টি রেকর্ডের আগের মালিক ছিলেন যথাক্রমে রিয়ান পরাগ (১৭ বছর ১৭৫ দিন) ও যশস্বী জয়সওয়াল (১৯ বল)। এক ইনিংসে ১১টি ছক্কা হাঁকানোর কীর্তি মুরালি বিজয় ছাড়া নেই আর কোনো ভারতীয়র। এদিন আগে ব্যাট করে ৪ উইকেটে নির্ধারিত ওভারে গুজরাট পুঁজি গড়ে ২০৯ রানের। জবাবে ২ উইকেটে ২৬ বল হাতে রেখে জিতে যায় রাজস্থান রয়্যালস। ব্যাট হাতে বৈভব যতটা না বিধ্বংসী, মাইক্রোফোনের সামনে ততটাই নম্র। ম্যাচ শেষে প্রতিক্রিয়া জানাতেও গিয়েও খুব একটা উচ্ছ্বাস নেই। বললেন, ‘খুব ভালো লাগছে, আইপিএলে তৃতীয় ইনিংসেই আমার প্রথম সেঞ্চুরি। খুব ভালো লাগছে। এতদিন ধরে, গত তিন-চার মাস ধরে আইপিএলের জন্য যে অনুশীলন করে আসছি, সেটিরই ফল মাঠে দেখা যাচ্ছে। আইপিএলে সেঞ্চুরি করা স্বপ্নের মতোই।’ বৈভবকে নিয়ে আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে তার বাবার নাম। ছেলেকে ক্রিকেটার বানাতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন বাবা সঞ্জীব। সে প্রসঙ্গে ছেলে বৈভব বললেন, ‘আমি এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি বাবা-মায়ের জন্য। ভোরে আমার অনুশীলন করতে হবে, সে জন্য মা রাত দুটোয় ঘুম থেকে উঠে যেতেন। ঘুমাতেন স্রেফ ঘণ্টা তিনেক। উঠে আমাদের জন্য খাবার বানাতেন। বাবা আমার জন্য কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেটা বড় ভাই সামলাতেন। সংসার অনেক কষ্টে চলছিল। তবে বাবা আমার পেছনে লেগেই ছিল।’

mzamin

কালীগঞ্জে সাবেক চেয়ারম্যান নজরুলের ত্রাসের রাজত্ব by আমিনুল ইসলাম লিটন

নজরুল ইসলাম মোল্ল্যা। সব সময় সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে তিনি সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে থাকেন। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার জামাল ইউনিয়নের বিএনপি’র টিকিটে নির্বাচিত সাবেক চেয়ারম্যান। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি ডিগবাজি দিয়ে এমপি মান্নান গ্রুপে যোগ দেন। তখন আওয়ামী লীগের মধ্যে আনার কমিশনার আর মান্নান এমপি’র  বিরোধ ছিল তুঙ্গে। ওই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সাবেক চেয়ারম্যান মোদাচ্ছের হোসেন মণ্ডলের নেতৃত্বেই চলতো দলটি। কিন্তু তিনি আনারের পক্ষের লোক হওয়ায় তাকে ঠেকাতে নজরুল মোল্ল্যাকে কাজে লাগান মান্নান এমপি। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মান্নান এমপি’র  হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে রাতারাতি আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে যান। এরপর শুরু হয় নজরুল মোল্ল্যার সন্ত্রাসী তাণ্ডব।

জানা যায়, সামাজিকতার নাম ভাঙিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে তিনি আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। যা সাবেক চেয়ারম্যান মোদাচ্ছের হোসেন মণ্ডলের নেতৃত্বাধীন নেতারাও মানতে পারেননি। ফলে মূল আওয়ামী লীগের সঙ্গে নজরুল মোল্ল্যার বিরোধ স্পষ্ট রূপ নেয়। তৎকালীন এমপি’র শক্তি কাজে লাগিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের মূলধারার লোকজনের ওপর অপ্রতিরোধ্য নির্যাতন চালানো শুরু করেন। হামলা, মামলা আর সন্ত্রাসী তাণ্ডবে এক সময়ে ত্যাগীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। পরে ২০১৪ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে আনোয়ারুল আজিম আনার এমপি হন। তিনি তখন আরেক ডিগবাজি দিয়ে আনারের সঙ্গে সখ্যতা তৈরি করে রাজনৈতিক মাঠে ফেরা মোদাচ্ছেরের সঙ্গে আপস করেন। এ তরফায় তিনি নির্বাচন না করে বসে পড়েন। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলের শেষ নির্বাচনে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে দলটির মান্নান গ্রুপের প্রার্থী আব্দুর রশিদ খোকনের ট্রাকের পক্ষে ভোটে নামেন। এ নির্বাচনে আনোয়ারুল আজিম আনার এমপি নির্বাচিত হলে কোণঠাসা হয়ে পড়ে নজরুল। পরে কোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলাউদ্দীন আলার ঘাড়ে ভর করে রক্ষা পান তিনি। সুযোগ বুঝে সখ্যতা গড়ে তুলে আবারো ডিগবাজির মাধ্যমে হয়ে যান এমপি আনার গ্রুপের। একজন ভদ্র ও শান্ত প্রকৃতির নেতা হিসেবে সে সময়ে জনপ্রিয়তায় চেয়ারম্যান হয়ে যান মোদাচ্ছের হোসেন মণ্ডল। এরপর থেকে মোল্ল্যার তাণ্ডব কিছুটা থেমে যায়। আপস করে ফেলেন জামাল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোদাচ্ছের মণ্ডল ও কোলা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা ও চেয়ারম্যান আলাউদ্দীন আলার সঙ্গে। জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় ধীরগতিতে দিন কাটছিল তার। ৫ই আগস্টে আওয়ামী লীগের পতনের পর পুনরায় ডিগবাজি মারে নজরুল। খোলস পাল্টে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে হয়ে যান বিএনপি’র কাতারবন্দি। অথচ বিগত ১৭ বছর কোলা জামালপুর ইউনিয়নের বিএনপি’র নেতাকর্মীরা হামলা মামলার শিকার হলেও তিনি ছিলেন আনার এমপি’র পাওয়ারের গা গরম গডফাদার। আওয়ামী লীগের পতনের পর কালীগঞ্জে বিএনপি’র ৩টি গ্রুপ পৃথকভাবে রাজনীতির মাঠে ময়দানে কাজ করছে।

নতুন করে বিএনপি’র নেতা সাজতে তিনি প্রথমে মাথা গুঁজে দেন সাবেক এমপি শহিদুজ্জামান বেল্টুর স্ত্রী মুরশিদা জামান বেল্টু গ্রুপে। সেখান থেকে আরও বেশি সুবিধা নেয়ার জন্য আবারো ডিগবাজি মেরে চলে যান আরেক গ্রুপ হামিদুল ইসলাম হামিদ গ্রুপে। এরপর এলাকায় শুরু করেন পুরনো বন্ধু আওয়ামী লীগের আলা চেয়ারম্যানের সন্ত্রাসী গ্রুপ দিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার। ডিগবাজির ওস্তাদ এই নেতা তার এই সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে কোলা ইউনিয়নের দীর্ঘ সময়ের দুর্দিনের নেতা ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি গোলাম সরোয়ার হোসেন মোল্যাকে কোলা বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে জখম করেন। এর পরের দিন একই ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শুকুর আলীকেও একইভাবে কুপিয়ে জখম করেন। ওই ইউনিয়নের ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের আহম্মেদ বনির বাড়িতেও ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। তার হয়ে বর্তমানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর মদতদাতা যেন নেতৃত্ব পর্যায়ের বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারাই। প্রায়ই দুই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের পুরনো বন্ধুদের নিয়ে কোলা বাজারে রামদা, ঢাল, সড়কি ও দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে এলাকায় এখন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। অথচ বর্তমানে বিএনপি’র নেতাদের মধ্যে চরম গ্রুপিং থাকায় পার পেয়ে যাচ্ছে নজরুল। এ বিষয়ে নজরুল মোল্লা মানবজমিনকে বলেন, আপনি আমার এলাকায় এসে দেখে যান। আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট।

mzamin


লন্ডন সফরে গিয়ে ‘বিস্ফোরক’ মন্তব্য আরিফুল হকের by ওয়েছ খছরু

কয়েকদিনের সফরে হঠাৎ করে লন্ডন গেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তার এই সফরকে ঘিরে সিলেট ও লন্ডনে নানা জল্পনা চলছে। যাওয়ার আগে নগরে নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রক্রিয়াও চালিয়েছেন তিনি। তবে কোথায় নির্বাচন করবেন সেটি এখনো স্পষ্ট জানাননি। এজন্যই তাকে ঘিরে সিলেটে রহস্যের অন্ত নেই। তবে তার ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, সার্বিক বিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শ নিতে তিনি লন্ডনে গেছেন। তার পরামর্শ নিয়ে এসে সিলেটে দল ও নির্বাচনী মাঠে কাজ শুরু করবেন। তারা জানিয়েছেন; রোববার লন্ডনের উদ্দেশ্যে সিলেট ছাড়েন আরিফুল হক চৌধুরী। সোমবার গিয়ে সেখানে পৌঁছেন। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাকে এয়ারপোর্টে বরণ করেন। এয়ারপোর্টে উপস্থিত থাকা বিএনপি নেতা ও সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনাদের দেখতে আমি লন্ডনে এসেছি। ৪-৫টি দিন লন্ডনে থাকবো। তারপর সিলেটে ফিরে যাবো।’ সরকারের তরফ থেকে সিলেট সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র দেয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। এক্ষেত্রে পছন্দের তালিকায় এগিয়ে আছেন সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে সাবেক এই মেয়রকে নিয়ে সিলেটে নানা আলোচনা ডালপালা মেলেছে। আরিফুল হকের ঘনিষ্ঠ বিএনপি নেতারা মানবজমিনকে জানিয়েছেন- দুটি মিশনকে সামনে রেখে আরিফুল হক চৌধুরী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পরামর্শ নিতে লন্ডনে গেছেন। এর মধ্যে একটি; প্রস্তাব পেলে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হবেন কিনা। অপরটি হচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবেন কিনা। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনার পর তিনি সিলেটে ফিরে পুরোদমে কাজ শুরু করবেন। তার এই সিদ্ধান্ত এখনই নেয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ওই নেতারা। তবে লন্ডনে সোমবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আরিফ বলেন, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত আমরা বলতে পারবো না নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচনের দাবি বিএনপি’র সব পর্যায় থেকে করা হচ্ছে। বিএনপি’র মূল টার্গেট হচ্ছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এদিকে, সোমবার রাতে লন্ডনে আরিফুল হক চৌধুরী তার একান্ত ঘনিষ্ঠ শতাধিক নেতাকর্মীকে নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে তিনি বর্তমানে মাঠে থাকা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি মুখে ওই রাজনৈতিক দলের নাম বলেননি। নতুন রাজনৈতিক সংগঠনের কথা সরাসরি বলেছেন। তার বক্তব্যকে ঘিরে সিলেটে জামায়াত ঘরানার রাজনৈতিক নেতারা স্যোশাল মিডিয়ায় সরব হয়ে উঠেছেন। কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন, অন্য পার্টি বলতে সাবেক মেয়র আরিফ কি জামায়াতকে  বোঝাতে চেয়েছেন? ভার্চ্যুয়াল মিডিয়ায় প্রচারিত হওয়া ভিডিওতে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দু-একটা তুচ্ছ ঘটনাকে আমাদের কিছু রাজনৈতিক অন্য পার্টি, অন্য প্ল্যাটফরমে যা আপনারা ভালোভাবেই বুজতেছেন যারা এখনই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি, বিভিন্ন ইনস্টিটিউশন, বিভিন্ন হাই-অফিসিয়াল পোস্টে তারা কিন্তু তাদের মানুষগুলোদের সেটআপ করে ফেলছে। সেখানে আমাদের মানুষগুলো নেই। আমাদের দু-চার জন অ্যাটর্নি জেনারেল, আর দু-চারটা পোস্ট দেখলেই মনে করবেন না সব আমাদের। প্রশাসনের ‘কি’ পোস্টগুলোতে তারা বেছে বেছে ওই সংগঠনের মানুষ সেটআপ করে ফেলছে। তারা ভালো করে জানে ভোটে গেলে বিএনপি’র সঙ্গে কোনোভাবেই রিটার্ন করতে পারবে না। কাজেই তারা ওই ম্যাকানিজম শুরু করেছে সেখানে নির্বাচনকে একটু দূরে ঠেলে দিয়ে বিভিন্ন প্রশাসনে তাদের লোকগুলোকে সেটআপ করা।’ আরিফুল হক বলেন, ‘যেমন নতুন দল এবং আরেকটি দল সবাই বুঝতে পারতেছেন। তারা কখনো আমাদের সঙ্গে, কখনো ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে। কখন যে কার সঙ্গে হাত মেলায় তারাই জানে। এরা কিন্তু আমাদের তুচ্ছ ছোটো ঘটনাকে তারা স্যোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সারা বিশ্বে আমাদের অপপ্রচার চালাচ্ছে যে, আমাদের ছেলেরা এসব করছে। হয়তো দু’একজনে করছে, এদের বিরুদ্ধে কিন্তু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আরও পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা এটাকে এমনভাবে প্রোপাগান্ডা করতেছে যেন বিএনপি সব করছে।’ বক্তৃতায় আরিফুল হক চৌধুরী প্রবাসী নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের যেসব ছেলে-মেয়েরা দেশের বাইরে আছে কিংবা দেশে আছে। তাদেরকে স্যোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দিতে হবে। রিপ্লাই না দিলে বিএনপিকে তারা বিভিন্নভাবে নষ্ট করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে।’ সিলেটের রাজনীতিতে আরিফুল হক চৌধুরী এখন বলতে গেলে সিনিয়র নেতা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সময় প্রশাসনসহ মাঠে থাকা বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে নানা মন্তব্য করছেন। দলীয় নেতারা জানিয়েছেন- আরিফুল হক চৌধুরী বর্তমান সময়ের মন্তব্য খুবই যৌক্তিক। এই সময়ে ভয়ে অনেকেই সত্য উচ্চারণ করছেন না। কিন্তু আরিফ যখন যার প্রশংসা, আবার যখন যার সমালোচনা সবই করে যাচ্ছেন। 
mzamin

Tuesday, April 29, 2025

পাক-ভারত বিরোধের মূল কারণ ও সংঘাতের ইতিহাস

দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ইতিহাস মূলত বিরোধ, যুদ্ধ এবং অবিশ্বাসের গল্প। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভাজনের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভাবের পর থেকেই এই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘাত একাধিকবার চরমে পৌঁছেছে। কাশ্মীর সমস্যা থেকে শুরু করে ধর্মীয় বিভাজন, সন্ত্রাসবাদ ইত্যাদি নানা ইস্যু এই দ্বন্দ্বকে আরও জটিল করে তুলেছে।

প্রধান বিরোধের কারণসমূহ: ১. কাশ্মীর সংকট ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর কাশ্মীরের অধিভুক্তি নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। তৎকালীন মহারাজা হরি সিং কাশ্মীরকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করেন, যা পাকিস্তানের জন্য ছিল অগ্রহণযোগ্য। এর ফলেই ১৯৪৭-৪৮ সালে প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। কাশ্মীর আজও উভয় দেশের জাতীয় গর্ব ও রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতীকে পরিণত হয়েছে, এবং এ অঞ্চল ঘিরেই বারবার সংঘাত ছড়িয়েছে।

২. ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজন ভারত ও পাকিস্তান—দুটি রাষ্ট্রই গড়ে উঠেছিল আলাদা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে। পাকিস্তান নিজেকে মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই ভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বৈরিতাকে আরও গভীর করেছে।

৩. সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তা ইস্যু ভারত দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদে সহায়তার অভিযোগ করে আসছে, বিশেষ করে কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে। অন্যদিকে, পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। এই পারস্পরিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

৪. পানি বণ্টন সংকট সিন্ধু নদী ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের পানি বিরোধ রয়েছে। যদিও ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি কিছুটা শান্তি এনেছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদী ব্যবস্থাপনা ও নতুন প্রকল্প নিয়ে উত্তেজনা পুনরায় বাড়ছে।

৫. পারমাণবিক প্রতিযোগিতা ১৯৭৪ সালে ভারতের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষার পর ১৯৯৮ সালে পাকিস্তানও পারমাণবিক শক্তি অর্জনের ঘোষণা দেয়। উভয় দেশের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন এবং তা ঘিরে প্রতিযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তাকে নাজুক করে তুলেছে।

কালপঞ্জি:

১৯৪৭

১৪ ও ১৫ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা।

কাশ্মীরের দখল নিয়ে প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সূচনা।

১৯৪৯

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি; লাইন অব কন্ট্রোল প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৬৫

কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বিতীয় পাক-ভারত যুদ্ধ।

তাসখন্দ চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান।

১৯৭১

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ।

পাকিস্তানের পূর্বাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ।

১৯৯৮

উভয় দেশের পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা; দক্ষিণ এশিয়ায় পরমাণু উত্তেজনা বৃদ্ধি।

১৯৯৯

কারগিল যুদ্ধ; পাকিস্তানি সেনা ও জঙ্গিরা লাইন অব কন্ট্রোল অতিক্রম করে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে।

ভারত সেনা অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করে।

২০০১

ভারতের সংসদ ভবনে হামলা; দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধপরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

২০০৮

মুম্বাইতে ধারাবাহিক জঙ্গি হামলা; ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জঙ্গি মদদের অভিযোগ তোলে।

২০১৬

উরি সেনাঘাঁটিতে হামলার পর ভারত ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ চালানোর দাবি করে।

২০১৯

পুলওয়ামা হামলায় ৪০ জন ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য নিহত হন।

পাল্টা ভারতীয় বিমান হামলা; বালাকোটে কথিত জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করে আঘাত।

একই বছরে ভারত সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা তুলে দেয়; পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মহলে কাশ্মির ইস্যু উত্থাপন করে।

উভয় দেশের মধ্যে ট্র্যাক-টু কূটনীতি ও জনগণ-জনগণ যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

২০২৫

২২ এপ্রিল: জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার পহেলগামে বৈসরান উপত্যকায় সশস্ত্র ব্যক্তিদের একটি দল পর্যটকদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এই হামলায় অন্তত ২৮ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে পর্যটক ও সরকারি কর্মচারী—উভয়ই ছিলেন। আরও কয়েকজন আহত হন।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে অভিহিত করে এবং ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকেই দায়ী করে। একাধিক গণমাধ্যম দাবি করেছে যে, পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লশকর-ই-তৈয়বার সংগঠন দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট এই হামলার দায় স্বীকার করে।

তবে পাকিস্তান সরকার এ দাবিকে অস্বীকার করেছে এবং কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে যে দায় স্বীকারের বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো হামলায় জড়িত তিন সন্দেহভাজনের স্কেচ প্রকাশ করেছে। গোয়েন্দা সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে ‘পিটিআই’ জানিয়েছে, হামলাকারীদের সবাই লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের মধ্যে কমপক্ষে দু’জন ‘বিদেশি’ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বিরোধ মূলত আস্থা সংকট ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। কাশ্মীর প্রশ্নের ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান ছাড়া স্থায়ী শান্তি অর্জন প্রায় অসম্ভব বলেও তারা মনে করেন।

পাশাপাশি দুই দেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি প্রায়শই সম্পর্ক উন্নয়নের পথে অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে। ভবিষ্যতে পারস্পরিক স্বার্থে উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগই বিরোধ নিরসনের একমাত্র পথ হতে পারে।

পহেলগাম হামলা আবারও প্রমাণ করেছে, কাশ্মীর ইস্যুতে স্থায়ী সমাধান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি সুদূরপরাহত। উভয় দেশের উচিত পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এই দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান ঘটানো।

ভারত-পাকিস্তান বিরোধের ইতিহাস। ছবি : সংগৃহীত
ভারত-পাকিস্তান বিরোধের ইতিহাস। ছবি : সংগৃহীত



ইসরায়েলি চাপ তোয়াক্কা না করেই পারমাণবিক কর্মসূচির পথে ইরান

ওয়াশিংটনের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের অভ্যন্তরীণ ও সার্বভৌম বিষয়। একইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা ও অবৈধ নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে প্রত্যাহারের দাবিও তুলেছে তেহরান।

সোমবার (২৮ এপ্রিল) এক সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং অর্থবহ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ইরানের ‘রেড লাইন’, যা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা আমাদের মূল নীতিগুলোর প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগোব। এসব নীতির প্রতি সম্মান না দেখানো হলে কোনো চুক্তি হবে না।

ওমানের মধ্যস্থতায় সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তিন দফা পরোক্ষ আলোচনা করেছে। তেহরান স্পষ্ট করেছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ একটি সার্বভৌম অধিকার, যেখানে কোনো আপসের সুযোগ নেই।

ইরানের রাজনৈতিক বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তখত-রাভানচিও দেশটির দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি মজলিসের সামনে বলেন, শূন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব—এই তিনটি বিষয় আলোচনার বাইরে।

অন্যদিকে, ইসরায়েল তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলছে, ইরানকে অবিলম্বে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে, নতুবা তারা যে কোনো সময় পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে এগিয়ে যেতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। ওয়াশিংটন শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার অধিকার ইরানকে দিতে প্রস্তুত বলে আভাস মিলেছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি জিউইশ নিউজ সিন্ডিকেট আয়োজিত এক সম্মেলনে বলেন, যে কোনো উপায়ে হোক, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সব পথ বন্ধ করতে হবে। ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলাপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ইসরায়েল নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে।

ওমানের মাধ্যমে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় আংশিক অগ্রগতি হলেও নেতানিয়াহু তা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি লিবিয়ার উদাহরণ টেনে বলেন, ‘যদি ইরান লিবিয়ার মতো সমস্ত পারমাণবিক ও রাসায়নিক কর্মসূচি বাতিল না করে, তাহলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকি সোমবার (২৮ এপ্রিল) জানান, ইরান তাদের অভ্যন্তরীণ নীতি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ওপর বাইরের চাপ বরদাশত করবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন হলে এর জবাব হবে অত্যন্ত কঠোর।

আরাকি আরও বলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর ইসরায়েলের অস্বাভাবিক প্রভাব খুবই দৃষ্টিকটু এবং তা কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য শুভ লক্ষণ নয়।

উল্লেখ্য, ইসরায়েল একদিকে যেমন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সামরিক হামলার ইঙ্গিত দিয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পথেই থাকতে চায় বলে জানিয়েছে।

সূত্র : ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স ও প্রেস টিভি

প্রতীকী ছবি।