Showing posts with label ফারুক চৌধুরী. Show all posts
Showing posts with label ফারুক চৌধুরী. Show all posts

Friday, June 13, 2014

শান্তি, সমৃদ্ধি ও মৈত্রীর সন্ধানে চীন by ফারুক চৌধুরী

গত মে মাসের মাঝামাঝিতে চীনা কর্তৃপক্ষ একটি সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশের লক্ষ্য ছিল, চীনের পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর ফ্রেন্ডশিপ উইথ ফরেন কান্ট্রিসের ষষ্ঠ দশক পূর্তি উদ্‌যাপন করা। প্রতিটি দশক পূর্তিতে এই সংস্থাটি এই উৎসবের আয়োজন করে থাকে। এই বছরের এই উদ্‌যাপন উৎসবে বিশ্বের প্রায় ১৬০টি দেশ অংশ নিয়েছিল। সম্মেলনে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনওয়ারুল আমিন আর আমি আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। আনওয়ারুল আমিন প্রায় সাত বছর একজন ব্যাংকার হিসেবে চীনে অবস্থান করেন এবং তার পর থেকেই চীন বাংলাদেশ মৈত্রীর উন্নয়নে পরিশ্রম করছেন।

আমার ৩৬ বছরের কর্মজীবনের একটি বিরাট অংশ কেটেছে চীনে এবং চীন-সম্পর্কিত বিষয়াদিতে৷ সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর আমি চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বকে প্রসারতর করার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত রয়েছি। তাই আমরা দুজনই এই আমন্ত্রণটি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলাম। বিদেশি প্রতিনিধিদের মধ্যে ভারতীয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা একটি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখেন। ভারতীয় প্রতিনিধিদলের মধ্যে ছিল ইতিহাসখ্যাত ভারতীয় চিকিৎ​সক কুটনিসের পরিবারের অর্থাৎ পরবর্তী প্রজন্মের ছয়জন সদস্য। তাঁদের মধ্যে একজন ডা. কুটনিসের ভাতিজা, ৯১ বছর বয়সে আমাকে বয়োজ্যেষ্ঠতার প্রতিযোগিতায় অনায়াসে পরাজিত করেন। শুধু তা-ই নয়। চীনের ‘গ্রেট হল অব ফি পিপলসের’ সুদীর্ঘ বারান্দা ও করিডর অতিক্রম করতে তাঁর জন্য রক্ষিত হুইলচেয়ারটি আমার সুবিধার্থে আমার জন্য ছেড়ে দেন! বয়স্ক পাঠকদের কাছে ভারতীয় চিকিৎ​সক কুটনিস সুপরিচিত হওয়ার কথা। চীন-জাপান যুদ্ধে তিনি চীনের পক্ষে বিশেষ অবদান রাখেন এবং চীনাদের সেবারত অবস্থায় সেখানেই চল্লিশের দশকে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তাঁর জীবনের ওপর ভি. শান্তারাম ডা. কুটনিসকি অমর কাহানি শীর্ষক একটি জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্র তৈরি করেন। অতএব ভারতীয় প্রতিনিধিদলে ছিলেন কুটনিস পরিবারেরই ছয়জন সদস্য। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদলের নেতা ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের নাতি, ক্রিস্টোফার কক্স নিক্সন। বলাই বাহুল্য যে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কোন্নয়নে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বিশাল অবদানের স্বীকৃতি ছিল অনুষ্ঠানটিতে তাঁর নাতির উপস্থিতি।

এই সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, তাঁর অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ১৫ মিনিটের ভাষণ। ২০১৪ সালের ১৫ মে এই ভাষণটি এই অর্থে গুরুত্বপূর্ণ যে বিশ্বসম্পর্ক, বিশ্বশান্তি ও চীনের উন্নয়ন নিয়ে চীনের বর্তমান চিন্তাধারা তাতে প্রতিফলিত হয়েছে। চীনের নেতাদের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে, শব্দের বিন্যাস এবং চয়ন কোনো বিষয় তুলে ধরতে উপমার প্রয়োগ এবং ভাবনার অলংকরণ চিত্তাকর্ষক। এই ভাষণটি তার ব্যতিক্রম ছিল না।

চীনের দুই হাজার বছরের দার্শনিক গুরু কনফুসিয়াসের (যদিও ষাট ও সত্তরের দশকের কট্টর কমিউনিস্ট শাসনের সময়ে তাঁর নাম উচ্চারিত হতো না) উদ্ধৃতি দিয়েই শুরু হয় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভাষণ। দুই হাজার বছর আগে কনফুসিয়াস বলেছিলেন, ‘সুদূরের বন্ধুদের আগমন সদাই আনন্দদায়ক।’ এই কথাটি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্মরণ করলেন। তারপর বললেন, ‘জাতি হিসেবে চীন একফোঁটা পরিমাণ পানির দয়ারও প্রতিদান দিতে চায় কৃতজ্ঞতার ঝরনাধারায়। চীনারা তাদের বন্ধুদের কখনো ভুলবে না।’ তিনি কৃতজ্ঞতা জানালেন সেসব আন্তর্জাতিক বন্ধুকে, যারা চীনের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বের মূল্য প্রদানে চীনের বিপ্লব, সংস্কার আর উন্নয়নের প্রতি সহানুভূতি এবং সমর্থন জানিয়েছে৷’ তিনি বললেন, ‘বিশ্বাস ও সমতাই হচ্ছে পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্কের পূর্বশর্ত।’

তাঁর কথায় আমরা যতই ‘বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব, অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন ও তথ্যবিপ্লবের প্রয়োগের পানে ধাবিত হচ্ছি; জাতীয় স্বার্থ, ভাগ্য ও নিরাপত্তার নিরিখে পৃথিবীর দেশগুলো পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা এবং একে অন্যের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। তারা আজ সম্মিলিত ভাগ্যোন্নয়নে একটি সুসংঘবদ্ধ পরিবারের সদস্য’।

চীনের কথা বলতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বললেন, চীন এখন ‘উন্নয়ন সংস্কার ও প্রগতির’ সংগ্রামে লিপ্ত। চীনের শতাব্দীর লক্ষ্য দুটি—যথা একটি উন্নয়নশীল সমাজ নির্মাণের

সম্পূর্ণকরণ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ২০১০ সালের তুলনায় চীনের শহর ও গ্রামাঞ্চলে মানুষের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করা৷ এভাবেই চীন এই শতাব্দীর মাঝামাঝিতে একটি আধুনিক সমাজবাদী দেশে পরিণত হবে; যা বিত্তশীল, ক্ষমতাবান, গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আগুয়ান দেশ হিসেবে চীনের জাতীয় নবায়নের স্বপ্ন সার্থক করবে।

এই স্বপ্ন শুধু চীনাদের নয়, অন্যান্য দেশের মানুষের স্বপ্নেরই প্রতিফলন। তাদের স্বপ্নের বাস্তবায়নে চীন তাদের হাতে হাত রেখে এগিয়ে যাবে। চীনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন পৃথিবীতে একটি বিশাল সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে। শি জিনপিং বলেন, ‘শত শত নদনদী বরণ করেই সাগর বিশাল আকার ধারণ করে।’ চীন নিজেকে বহির্বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করবে, পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে এবং ‘সিল্ক রোডের’ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং একবিংশ শতাব্দীর জলপথের ‘সিল্ক রোডের’ উন্নয়ন করবে, যাতে দেশগুলো তাদের উন্নয়ন সম্ভাবনা ভাগ করে নিতে পারে। অধিকতর উন্মুক্ততা নিয়ে চীন সাংস্কৃতিক দেওয়া-নেওয়া করবে, যাতে বিশ্বসভ্যতা পারস্পরিক শিক্ষালাভের ভিত্তিতে এগিয়ে যায়।

তারপর শি জিনপিংয়ের কথা হলো চীনের সাম্প্রতিক দ্রুত অগ্রগতিতে কিছু মানুষ চীনের আধিপত্য বিস্তারের ভীতি পোষণ করছেন। তাঁদের এই মনোভাব ভ্রান্ত ধারণা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে চীনের প্রতি বিরূপ মনোভাবেরই প্রতিফলন। কিন্তু চীন মনে করে, শান্তি হচ্ছে সবচেয়ে মূল্যবান এবং অন্যদের প্রতি প্রীতি ও বন্ধুত্ব প্রদর্শন করা এবং ‘কারও বিরুদ্ধে এমন কিছু না করা, যা চীনারা চাইবে না যে তারা চীনের বিরুদ্ধে করুক। এই ধারণাটি চীনের মানুষের এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বিদ্যমান রয়েছে এবং চীনের ব্যবহার আর মানসিকতায় তারই প্রতিফলন ঘটে। চীনের পূর্ববর্তী প্রজন্ম বিশ্বাস করত যে যুদ্ধভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলো ক্রমে ক্রমে বিলীন হয়ে যাবে, তা যত বড় রাষ্ট্রই হোক না কেন।

আদিকাল থেকেই চীন বাণিজ্য আর যোগাযোগ বাড়ানোতে বিশ্বাসী, আক্রমণ আর আধিপত্য বিস্তারে নয়। চীন নিজের দেশকে দেশপ্রেমের মাধ্যমে রক্ষা করার প্রয়াস নিয়েছে, সাম্রাজ্যবাদ বিস্তার করতে চায়নি।

দুই হাজার ১০০ বছর আগে চীনারা সিল্ক রোড সৃষ্টি করেছিল, যার মাধ্যমে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতার লেনদেন হয়েছে এবং যা সেই অঞ্চলের মানুষকে গভীরভাবে লাভবান করেছে। ৬০০ বছর আগে চীনের নাবিক জেংহি প্রশান্ত মহাসাগর আর পশ্চিম ভারত সাগরে একটি শক্তিশালী নৌবহর নিয়ে সাতবার সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন। তিনি যে ৩০টি দেশ সফর করেছিলেন, তার এক ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও তিনি দখল করেননি। তাঁরা শান্তি ও বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন এবং সেসব দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক বিনিময়েরই বীজ বপন করে এসেছিলেন। শি জিনপিংয়ের কথায় গণচীন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত চীনের আধুনিক কালের ইতিহাস ছিল অবমাননা, পরাজয় আর বিপর্যয়ের। কিন্তু তা চীনের মানুষের বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং জাতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামেরও মহান ইতিহাস। চীনের মানুষ, যারা বহু বাধাবিপত্তির অভিজ্ঞতা অতিক্রম করেছে, তারা শান্তির কামনা করে এবং তাদের দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা তারা কোনো দেশের ওপর চাপিয়ে দেবে না।

শি জিনপিং তাঁর ভাষণের সমাপনী অংশে বললেন যে চীন শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের প্রচেষ্টায় লিপ্ত রইবে এবং অন্যান্য দেশকেও সেই পথ অনুসরণ করতে উৎসাহিত করবে। চীন অধিকতর আন্তর্জাতিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে, মানবতা ও আন্তর্জাতিক সুবিচারের জন্য অন্যদের সঙ্গে কাজ করে যাবে, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়াদিতে ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখবে এবং বিরোধ সমাধানে অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা নেবে। বিশ্বশান্তি বজায় রেখে চীন উন্নয়নে লিপ্ত রইবে এবং উন্নয়নের মাধ্যমেই বিশ্বশান্তি আনয়নের পক্ষে রইবে। চীন সমতার ভিত্তিতে, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা ও মতানৈক্য সমাধানে সচেষ্টা রইবে এবং তাতে আন্তরিকতা ও ধৈর্যের পরিচয় দেবে।

শি জিনপিং বলেন, চীনে একটি কথা আছে যে মানুষের মধ্যে সম্পর্কই আন্তরাষ্ট্র সম্পর্কের চাবিকাঠি এবং পারস্পরিক সমঝোতাই হলো মানুষের মধ্যে সম্পর্কের চালিকাশক্তি। তিনি বলেন, ইউনেসকোর সদর দপ্তরে বিভিন্ন ভাষায় লিখিত একটি বাণী তিনি পাঠ করেছেন। তা হলো, যেহেতু সংঘাতের সূচনা মানুষের মনে ঘটে, মানুষের মনেই নির্মাণ করতে হবে শান্তিরক্ষার কবচ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এই ভাষণটি প্রাসঙ্গিক মনে হলো। এখানে অবশ্য বলার প্রয়োজন রয়েছে, চীনা ভাষা থেকে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে বাংলায় আমার ভাষান্তরের প্রচেষ্টায় অনেক ভুলভ্রান্তি ও অসম্পূর্ণতা নিশ্চয় রয়েছে—তবে এই ভাষণটি থেকে যেকোনো দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে চীনের চিন্তাধারার একটি আভাস পাওয়া যায়। আমার এই দুর্বল প্রচেষ্টার কৈফিয়ত সেখানেই।

ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব। কলাম লেখক।

zaaf@bdmail.net

Tuesday, January 21, 2014

‘নির্বাচন বৈধ হলেও অসম্পূর্ণ’ : ফারুক চৌধুরী by জাকারিয়া পলাশ

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ফারুক চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের সামনে এখন সময় এসেছে একথা প্রমাণ করার যে, আমরা গণতন্ত্র বলতে শুধু নির্বাচনই মনে করি না। গণতন্ত্র বলতে আমরা মানুষের মতামতের সার্বিক গুরুত্বকেও বুঝি।

‘নির্বাচন বৈধ হলেও অসম্পূর্ণ’ : ফারুক চৌধুরী by জাকারিয়া পলাশ

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ফারুক চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের সামনে এখন সময় এসেছে একথা প্রমাণ করার যে, আমরা গণতন্ত্র বলতে শুধু নির্বাচনই মনে করি না। গণতন্ত্র বলতে আমরা মানুষের মতামতের সার্বিক গুরুত্বকেও বুঝি।
বাংলাদেশের মনে রাখা উচিত যে, আমরা একটি ক্রমাগত ছোট হয়ে আসা পৃথিবীতে বাস করছি এবং আমরা এই পৃথিবীতে একা দাঁড়িয়ে নেই। আমরা জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র। আমাদের দেশে যাতে এমন কিছু না ঘটে যা বিদেশীদের সমালোচনায় উৎসাহিত করে। তিনি বলেছেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে বৈধ হলেও তা অসম্পূর্ণ। মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সরকার সাংবিধানিক ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। কিন্তু, এটা একটা বড় ‘কিন্তু’, বৃহত্তম বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। অতএব, নির্বাচন বৈধ হলেও ‘অসম্পূর্ণ’ রয়ে গেছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য এটা কাম্য নয়। এ জন্য আমি মনে করি যে, সরকার পক্ষ ও বিরোধী দলের (বিএনপি) সংলাপে বসা উচিত। একটি জাতির ইতিহাসে দুই-চার-পাঁচ বছর বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, দেশে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করা। নির্বাচন কিন্তু গণতন্ত্রের শেষ নয়, শুরু। গণতন্ত্র হচ্ছে দেশের মানুষের চিন্তাধারায় অবগাহনের নিমন্ত্রণ ও প্রতিফলন। ফারুক চৌধুরী বলেন, আমি খুবই আশাবাদী, দুই দলের মধ্যে সংলাপের সুষ্ঠু একটি পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজন হলে দুই দলকেই ছাড় দিয়ে প্রত্যেকের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই পরিবেশ সৃষ্টির জন্য দুই দলের রাজনীতিবিদদেরই এগোতে হবে। হারি জিতি নাহি ভয়- এমন চিন্তা রাখতে হবে। যে দল হেরে গেল সে দল যে সবকিছু হারিয়ে ফেললো তা তো নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে এক অর্থে বিরোধী দল নেই। যা গণতন্ত্রের জন্য খুবই হানিকর। কারণ বিরোধী দলের যদি লক্ষ্য হয় সরকারে প্রবেশ করা তাহলে তো আর বিরোধী দলে থাকা হলো না। তারা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হবে। বিরোধী দলের ভূমিকা কি- তা মনে রাখতে হবে। তারা যদি মনে করে, সরকার ভুল পথে রয়েছে তাহলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া তাদের কাজ। কখনও বা জাতীয় স্বার্থে সরকারকে সহায়তা করবে তারা। যেমন ভারত বা অন্য কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে দেশের স্বার্থের প্রশ্ন রয়েছে। সেখানে সরকার ও বিরোধী দল একজোট হয়ে কাজ করবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশীদের ভূমিকা প্রসঙ্গে বললেন, বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। এখানে ১৬ কোটি মানুষের বাস। এর ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে পৃথিবীর বড় রাষ্ট্রগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া, ভারতসহ প্রতিবেশী এবং বিভিন্ন দেশের ব্যাপক ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অতএব এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, অন্যান্য দেশ অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করবে। তারা আমাদের দেশে স্থিতিশীলতা চায়, সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ চায়। কিন্তু আগ্রহ প্রদর্শন আর হস্তক্ষেপ এই দুয়ের মধ্যে ফারাক আছে। আমরা নিশ্চয়ই চাইবো না যে কেউ আমাদের ওপর হস্তক্ষেপ করুন। প্রতিবেশী দেশের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আজকে এখানে একটি সরকার আছে। কাল একটি সরকার হবে। আমি আশা করবো, ভারত তার দেশের স্বার্থেই সবার সঙ্গে, রাজনৈতিক সব গোষ্ঠীর সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখবে। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা ভারতের স্বার্থ হতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি দেশে সমঝোতার একটি আবহ সৃষ্টি হয়, তাহলে আমাদের রাজনীতিতে বহির্বিশ্বের কোন প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের কারণ থাকবে না।
তিনি নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা প্রসঙ্গে বলেন, যারা সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে, তারা বাংলাদেশে বিশ্বাসী না। কারণ, অসাম্প্রদায়িকতা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের একটি স্তম্ভ; গণতন্ত্র যেমন, ন্যায়বিচার যেমন। দেশে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হওয়া উচিত যাতে রাজনীতির নিরিখে বা অন্য কোন মাপকাঠিতে কোন একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু বলে বিবেচনা করা হবে না। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সমতা রইবে। কোন একটি গোষ্ঠী নিজেকে সংখ্যাগুরু বলে বিবেচনা করবে না। তা ভাষাভিত্তিক হোক, ধর্মভিত্তিক হোক, সমাজভিত্তিক হোক। কারণ যখনই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিতে আমরা বাংলাদেশকে দেখি তখনই আমরা বাংলাদেশকে দুর্বল করে ফেলি।

Monday, January 20, 2014

শ্রদ্ধাঞ্জলি- একজন আদর্শ সরকারি কর্মকর্তা by ফারুক চৌধুরী

এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা স্বল্প পরিচয়েই মনে দাগ কাটেন। এম মুজিবুল হক—বাংলাদেশের সাবেক কেবিনেট সেক্রেটারি, যিনি ১২ জানুয়ারি, ২০১৪ সালে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন—ছিলেন তাঁদের একজন।

শ্রদ্ধাঞ্জলি- একজন আদর্শ সরকারি কর্মকর্তা by ফারুক চৌধুরী

এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা স্বল্প পরিচয়েই মনে দাগ কাটেন। এম মুজিবুল হক—বাংলাদেশের সাবেক কেবিনেট সেক্রেটারি, যিনি ১২ জানুয়ারি, ২০১৪ সালে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন—ছিলেন তাঁদের একজন।
তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ১৯৫২ সালে, যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হল ছাত্র ইউনিয়নের ভিপি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন নামকরা ছাত্র। তিনি হলের ভিপি হয়েছেন, হল নির্বাচনে, পরবর্তীকালের প্রখ্যাত আওয়ামী লীগের নেতা আবদুস সামাদ আজাদকে পরাজিত করে। ১৯৫২ সালেরই কোনো একসময়ে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় সলিমুল্লাহ্ হলের চায়ের দোকানে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাগত হিসেবে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হলাম এবং আমার এখনো মনে আছে, সুদর্শন এই মানুষটির গভীর গলার আওয়াজ, স্পষ্ট বাচনভঙ্গি আর ব্যবহারের উষ্ণতা আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। পরের বছরগুলোতে, তাঁর সঙ্গে জীবনের চলার পথে, বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা হয়েছে এবং যতই তাঁকে জেনেছি, ততই তিনি মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছেন।

১৯৩০ সালে বরিশালের বানারীপাড়ায় জন্ম নেওয়া মুজিবুল হক ছিলেন আমার চেয়ে মাত্র চার বছরের বড়; কিন্তু তবু কিছুদিনের জন্য হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন আমার সরাসরি শিক্ষক। তাঁর প্রয়াণে কি স্কুল কি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সরাসরি আর কোনো শিক্ষক বেঁচে নেই। ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে (সিএসপি) যোগদানের আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। আমার মনে পড়ে, ক্লাসে আমরা ইংরেজিতে কথা বলে যেন ইংরেজি বলার জড়তা কাটিয়ে উঠি, সেটাই ছিল তাঁর প্রচেষ্টা। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন ভাষাসৈনিক, কারাবাসেও ছিলেন কিছু সময়ের জন্য এবং ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে বহু বছর পরে হলেও সোহ্রাওয়ার্দী পুরস্কারে পুরস্কৃত করে স্বীকৃতি জানানো হয়েছিল।
মুজিবুল হক ছিলেন একজন আদর্শ সরকারি কর্মকর্তা, যিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন স্থানে, এসডিও এবং ডিসির পদ অলংকৃত করেছিলেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর এতই সুনাম ছিল যে তখন অনেক কনিষ্ঠ কর্মকর্তাই তাঁর সঙ্গে কাজ করতে চাইতেন। আমার ছোট ভাই ইনাম আহমদ চৌধুরী ছিল তাঁদের একজন, যে ১৯৬১ সালে শিক্ষানবিশ সিএসপি কর্মকর্তা হিসেবে অনেক চেষ্টা করে রাজশাহীতে পোস্টিং নিয়েছিল। কারণ, মুজিবুল হক রাজশাহীর ডিসি ছিলেন। তার চাকরিজীবনের প্রথমেই মুজিবুল হকের সান্নিধ্য ছিল এক প্রীতিদায়ক অভিজ্ঞতা, এই কথাটি ইনাম প্রায়ই বলে থাকে।
আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় মুজিবুল হক ছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রসচিব। সেই সময়ে তাঁর ভূমিকার জন্য তিনি টিক্কা খানের রোষানলে পড়েন। কথিত যে টিক্কা খান তাঁকে বলেছিলেন, বাঙালি কর্মকর্তাদের ‘শুদ্ধি’ অভিযান কি তিনি স্বরাষ্ট্রসচিব মুজিবুল হককে দিয়েই শুরু করবেন। যা-ই হোক একাত্তরের মার্চ/এপ্রিল মাসেই তাঁকে ইসলামাবাদে বদলি করে দেওয়া হয়। নামকাওয়াস্তে তাঁকে কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও কোনো অর্থপূর্ণ দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়নি। সেই সময়ে পাকিস্তান সরকার দ্য বিট্রেয়েল অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতকতা শীর্ষক একটি প্রোপাগান্ডা ছবি তৈরি করে, যাতে উল্লেখ ছিল, পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে কিছু বাঙালি সামরিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তার ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ নজির। এই ছবিটি দেখতে বাঙালি কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করা হতো। ছবিটি দেখতে গিয়েছিলেন মুজিবুল হক। তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েরই তদানীন্তন উপসচিব নুরুল হোসেন খান। ছবিটি দেখার পর বেরিয়ে এসে মুজিবুল হক একটি বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন, ‘বাপ কা বেটা’! ‘কে তিনি’, তাঁকে প্রশ্ন নুরুল হোসেন খানের। ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’, দৃপ্তকণ্ঠে ছিল মুজিবুল হকের উত্তর।
পাকিস্তান থেকে ১৯৭৩ সালে আফগানিস্তান আর দিল্লি হয়ে গোপনে বাংলাদেশে পাড়ি জমালেন মুজিবুল হক। বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাসচিব হিসেবে নিযুক্তি দিলেন। তার পর থেকে একজন আদর্শ এবং দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে মুজিবুল হক অধিষ্ঠিত ছিলেন বিভিন্ন পদে। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশের কেবিনেট সেক্রেটারি হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। প্রশাসনিক বিষয়াদিতে তাঁর ছিল গভীর অভিজ্ঞতা। যখন বাংলাদেশে মাত্র ১৬টি জেলা ছিল, তখনো তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নগরায়ণ ত্বরান্বিত করে সেগুলোকে ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ভাবনা পোষণ করতেন। দেশের সব মহকুমাকে জেলা হিসেবে পরিণত করার আদি ভাবনাটি বোধ করি তাতেই নিহিত ছিল।
মুজিবুল হকের একটি বিশেষ গুণ ছিল তাঁর স্পষ্টবাদিতা এবং তিনি যা বলতে অথবা বোঝাতে চাইতেন তা অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায়, বাংলা অথবা ইংরেজিতে প্রকাশ করার ক্ষমতা তাঁর ছিল।
১৯৮৯ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে বসে থাকেননি মুজিবুল হক। স্বাস্থ্য উন্নয়ন ক্ষেত্রে তাঁর ছিল বিপুল আগ্রহ এবং ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ছিলেন। সম্পৃক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সঙ্গে।
জনপ্রশাসন ট্রেনিং কেন্দ্র, বাংলাদেশ জাতীয় পে-কমিশন এবং পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে সরকারি কর্মকাণ্ডে সহায়ক ভূমিকা পালনের জন্য তিনি সচেষ্ট ছিলেন। ইউনিসেফের ঢাকা অফিসের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্বন্ধে তাঁর আগ্রহ আমি প্রত্যক্ষ করেছি, যখন আমি ব্র্যাকের উপদেষ্টা ছিলাম। তিনি ২০০৫ সালে বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতা পদক’ লাভ করেন।
তাঁর জীবনের শেষ দু-তিনটি বছর তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে নিজেকে সক্রিয় কর্মকাণ্ড থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করেছেন। কিছুটা লোকচক্ষুর অন্তরালে।
তাঁর তিরোধানে বাংলাদেশ একজন মূল্যবান নাগরিককে হারাল আর আমরা যারা তাঁর নৈকট্য লাভে ভাগ্যবান ছিলাম, হারিয়েছি একজন উদার, উষ্ণ হূদয় মানুষকে, যাঁর অনুপস্থিতি আমরা নিবিড়ভাবে অনুভব করি।
ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব।

Tuesday, December 31, 2013

বাংলাদেশ এখন কালো অধ্যায় পার করছে by ফারুক চৌধুরী

বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কী প্রভাব ফেলতে পারে, কীভাবে দেশে একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসতে পারে, সে বিষয়ে প্রথম আলো মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক চৌধুরী
প্রথম আলো  আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে কি বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল?
ফারুক চৌধুরী  আমি তো মনে করি, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যে অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, এতটা নিচে আর কখনো নামেনি। ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ এবং ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত আমি কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্য দেশের বাইরে ছিলাম। বিদেশে বসে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওঠানামা লক্ষ করেছি। অনেকটা শ্রাবণের মেঘের মতো। কিন্তু এবার যা হলো, সম্ভবত আর কখনোই তা হয়নি।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল এক বিস্ময়। আমাদের স্বাধীনতার দুটি মাইলফলক ঘটনা আছে—২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। পৃথিবীর আর কোনো দেশের বিজয় দিবস নেই। অর্থাৎ, আমরা একটি দখলদার বিদেশি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। সেই দ্বিমেরু বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম বিশ্বসম্প্রদায়ের ব্যাপক সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। ভারত বা তৎকালীন সোভিয়েত শিবির তো আমাদের সাহায্য করেছেই, কিন্তু যে পশ্চিমা বিশ্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থন করেনি; সেসব দেশের জনগণ নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে।
প্রথম আলো  গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো সুষ্ঠু নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। গত ৪২ বছরেও আমরা সেটি করতে পারলাম না কেন?
ফারুক চৌধুরী  এটি রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা। তাঁরা ঠিক করতে পারেননি নির্বাচনটি কীভাবে করবেন। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে ক্ষমতা দখলের। ক্ষমতায় আসা মানে রাজনীতিবিদদের কাছে শুধু সরকার গঠন নয়; যা খুশি তাই করা। সরকারপ্রধানেরা হয়ে ওঠেন আইনকানুনের ঊর্ধ্বে। তাঁরা কাউকেই পরোয়া করেন না। দেশের বর্তমান সংকটের মূলেও এই মানসিকতা কাজ করেছে।
প্রথম আলো  বিশ্বের যেসব রাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তারাও তো একসময় সামরিক শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে?
ফারুক চৌধুরী  নিশ্চয়ই দিয়েছে। পাকিস্তানে, ফিলিপাইনে, ইরানেও তারা স্বৈরশাসকদের মদদ জুগিয়েছে। এ কারণেই আমি বলব, আমাদের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে। এই যে কূটনীতিক দেবযানীকে নিয়ে ভারত আমেরিকার সঙ্গে একটি অবস্থান নিতে পেরেছে, তা তার নিজের সামর্থ্যবলেই। একই সঙ্গে এ নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ঐকমত্যও এই অবস্থান নিতে সহায়তা করেছে।
প্রথম আলো  ভারত প্রথম দিকে শক্ত অবস্থান নিলেও পরে মনে হয় কিছুটা সরে এসেছে, নমনীয় হয়েছে।
ফারুক চৌধুরী  দুটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তিও কিন্তু এক নয়। অধিকতর শক্তিধরের বিরুদ্ধে লড়তে নানা হিসাব-নিকাশ করতে হয়। কিন্তু যেটুকু তারা নিতে পেরেছে, সেটি জাতীয় ঐকমত্যের কারণেই। আর আমাদের এখানে ঠিক তার বিপরীতটি ঘটেছে।
প্রথম আলো  কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার বিষয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নেওয়া প্রস্তাবকে কীভাবে দেখছেন?
ফারুক চৌধুরী  এটি তাদের চরম নির্বুদ্ধিতা। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের বলার কিছু নেই। এর মাধ্যমে পাকিস্তান আবারও প্রমাণ করল, তারা একাত্তরের দৃষ্টিভঙ্গিতেই আচ্ছন্ন। কাদের মোল্লাকে তারা তাদের লোক বলে দাবি করেছে। এটাই হলো পাকিস্তানি মানসিকতা। আর ইমরান খানের রাজনীতি হলো তালেবানি রাজনীতি। তবে পাকিস্তানে এর প্রতিবাদও হয়েছে।
প্রথম আলো  কিন্তু এ নিয়ে বাংলাদেশে যে পাল্টাপাল্টি রাজনীতি হচ্ছে?
ফারুক চৌধুরী  যেখানে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন, সেখানে পাল্টাপাল্টি মোটেই কাম্য নয়। কিন্তু কোনো কোনো মহল থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের যে দাবি করা হয়েছে। আমি মনে করি, সেই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে পাকিস্তানের অন্যায়ের প্রতিবাদ আমরা অবশ্যই করব।
প্রথম আলো  পাকিস্তানের ব্যাপারে আমরা যতটা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি, তুরস্কের ব্যাপারে সেটি দেখাতে পারিনি। তারা আরও নগ্নভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচারে হস্তক্ষেপ করেছে। সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসে হামলা হয়েছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা নীরব থেকেছি।
ফারুক চৌধুরী  আমি মনে করি তুরস্কের ব্যাপারে আমাদের নমনীয় থাকার কোনো কারণ নেই। সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্য থাকা উচিত।
প্রথম আলো  ৪০ বছর পর আমরা যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করেছি। এ ব্যাপারে বহির্বিশ্বে নানা অপপ্রচারও চলছে। এসব বন্ধে এবং বিচারের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে সরকারের যা যা করণীয় ছিল তা কি তারা করতে পেরেছে?
ফারুক চৌধুরী  সরকার করতে পারেনি। আমি বলব, এটি কূটনৈতিক দুর্বলতা।
প্রথম আলো  বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক সংকট চলছে, তার পেছনে দুটি ঘটনা কাজ করছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও নির্বাচন।
ফারুক চৌধুরী  দুটি আলাদা বিষয়। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। যে বিচার শুরু হয়েছে, তা শেষ করতে হবে। কিন্তু সরকার ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন করে ফেললে তার ফল খুব নেতিবাচক হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, তার বিশ্বাসযোগ্যতাও থাকবে না। দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলতেন, দুই পক্ষের ঝগড়ায় কে হারবে, কে জিতবে—সেটি বড় কথা নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষের ওপর এর প্রতিক্রিয়া কী হবে?
ইকোনমিস্ট-এর সঙ্গে আমি একমত নই যে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলে বাংলাদেশ হারবে। বাংলাদেশ হারবে না। আমি বলব, বাংলাদেশ একটি কালো অধ্যায় অতিক্রম করছে। এমনকি পুরোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগও কিন্তু কঠিন সময়ের মুখোমুখি। কীভাবে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসবে, সেটাই দেখার বিষয়।
প্রথম আলো  এ অবস্থার জন্য বিরোধী দলেরও কি দায় নেই?
ফারুক চৌধুরী  অবশ্যই দায় আছে। বিরোধী দলের যে দায়িত্ব, তা কি তারা গত পাঁচ বছরে পালন করতে পারেনি? তারা সংসদে গরহাজির থেকেছে। বিএনপি এখন বসে বসে বিবৃতি দেয় এবং তাদের একটি কর্মসূচি পালনের জন্য আরেকটি বাহু আছে, তার নাম জামায়াত-শিবির। তারা দেশের ভয়াবহ ক্ষতি করেছে, তারা মানুষ মেরেছে, সরকারি স্থাপনায় হামলা করছে, পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছে। এগুলো আন্দোলন নয়, সন্ত্রাস। আর জামায়াত-শিবিরই তা করতে পারে। কেননা, দেশের প্রতি তাদের দরদ নেই। থাইল্যান্ডেও সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। সেখানে তো সরকারি কোনো স্থাপনায় হামলা হচ্ছে না।
প্রথম আলো  বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে বলেই তারা এসব করতে বাধ্য হচ্ছে।
ফারুক চৌধুরী  বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়া অন্যায় ও অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে জামায়াত-শিবিরকে দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে হবে। শান্তিপূর্ণ উপায়েই তারা সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতে পারে।
তবে আবারও ম্যান্ডেলার কথায় ফিরে যেতে হয়। ১৯৯৭ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা বাংলাদেশে এসে বলেছিলেন, ‘আমি দেশের প্রেসিডেন্ট। অতএব দেশটিতে যা কিছু ঘটুক না কেন, তার দায় আমাকেই নিতে হবে।’ বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদেরও আমি সে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।
দেশে বর্তমানে জনজীবনে যে দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার দায় এড়াতে পারে না। দুই দলে মুষ্টিমেয় লোক রাজনীতি করেন। আর সেই রাজনীতির জন্য গোটা দেশের মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।
প্রথম আলো  বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আমাদের বন্ধু ও উন্নয়ন-সহযোগী রাষ্ট্রগুলো বলা যায় মুখোমুখি অবস্থানে। এর কারণ কী?
ফারুক চৌধুরী  আমার মতে, কোনো রাষ্ট্রই স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়। সবাই নিজের স্বার্থ দেখবে। প্রশ্ন হলো, আমরা আমাদের স্বার্থ কতটা দেখছি।
প্রথম আলো  ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। আরও কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে?
ফারুক চৌধুরী  হ্যাঁ, তারা অবরোধ আরোপ করতে পারে। যেমন, অনেক দেশে করেছে। জিএসপি সুবিধা বাতিলও একধরনের অবরোধ। কিন্তু বাংলাদেশে চূড়ান্ত অবরোধ আরোপ করার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়েছে বলে মনে করি না।
প্রথম আলো  যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা জাতিসংঘ যদি শেষ পর্যন্ত কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়, বাংলাদেশ কি তা বহন করতে পারবে?
ফারুক চৌধুরী  বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ পড়বে। আমাদের রপ্তানি কমবে, বিনিয়োগ কমলে মানুষের কর্মসংস্থানও কমবে, বেকারত্ব বাড়বে। ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশের পক্ষে এসব দায় বহন করা কঠিন হবে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ যে সুনাম অর্জন করেছিল, তা ধুলায় মিশে যাবে।
প্রথম আলো  আপনাকে ধন্যবাদ।
ফারুক চৌধুরী  ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন  সোহরাব হাসান ও রাহীদ এজাজ

বাংলাদেশ এখন কালো অধ্যায় পার করছে by ফারুক চৌধুরী

বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কী প্রভাব ফেলতে পারে, কীভাবে দেশে একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসতে পারে, সে বিষয়ে প্রথম আলো মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক চৌধুরী

Sunday, November 25, 2012

বিশ্বজুড়ে বাংলা বিশ্বজুড়ে প্রথম আলো- আমার কাগজ প্রথম আলো by ফারুক চৌধুরী

১৪ বছর পূর্ণ করে ১৫ বছরে পা দেওয়ার এই শুভ মুহূর্তে প্রথম আলোকে আমি আমার আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। জন্মমুহূর্তে যখন পত্রিকাটির নাম নির্বাচনের তোড়জোড় চলছিল, তখনকার কথা আমার খুব মনে পড়ে।

Saturday, October 20, 2012

গতকাল সমকাল- ‘বংশমরো’—ফিলিপাইনের আগামীর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল by ফারুক চৌধুরী

বাংলাদেশে আমরা নিজেদের সমস্যা নিয়ে এতটা জর্জরিত রয়েছি যে চারপাশের ঘটনাগুলোর অনিচ্ছাকৃতভাবেই আমরা অবজ্ঞা করে যাই। আমাদের সংবাদমাধ্যম হয়তো বা তাকে প্রাপ্য গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু ঘটনা তো ঘটেই যাচ্ছে পৃথিবীতে। বিশ্বের কোনো বিবর্তনই আমাদের জন্য থেমে নেই।

Wednesday, June 27, 2012

গতকাল সমকাল-মুরসি—মিসরের প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি by ফারুক চৌধুরী

২০১২ সালের ২৪ জুন মিসরের সুপ্রাচীন এবং সুদীর্ঘ ইতিহাসের একটি বিশেষ দিন হয়ে রইবে। এই দিনে মিসরের জনগণ তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ‘মুসলিম ব্রাদারহুডের’ রাজনৈতিক বাহু ‘ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির’ মোহাম্মদ মুরসিকে ৫১ দশমিক ৭৩ শতাংশ ভোটে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচন করল।

Friday, June 22, 2012

স্মরণ-সিদ্ধার্থ শংকর রায়: মহৎ মানুষের মহাপ্রস্থানে by ফারুক চৌধুরী

আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রয়াত সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের যথার্থ মূল্যায়ন দুরূহ। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, দিগ্বিজয়ী আইনজ্ঞ, সার্থক সংগঠক এবং সফল কূটনীতিবিদ; যাঁর কাছ থেকে আমার শুধু পাওয়ারই ছিল, দেওয়ার কিছুই ছিল না। ভাগ্যগুণে তাঁর স্নেহধন্য ছিলাম এবং কখনো কখনো তাঁকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ

Thursday, June 21, 2012

গতকাল সমকাল-মার্শাল চেন ই-র কবিতা আর বাংলাদেশের আঞ্চলিক বিদেশনীতি by ফারুক চৌধুরী

পঞ্চাশের দশকের শেষ দুটি বছর আর ষাটের দশকে (সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তাণ্ডবের সময়টি বাদ দিলে) মার্শাল চেন ই ছিলেন চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী। চীনের লংমার্চখ্যাত এই সেনাপতির অন্য একটি পরিচয়ও রয়েছে। চীনের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃকুলের মধ্যে কবি হিসেবে চেয়ারম্যান মাও সেতুয়ের পরেই তাঁর স্থান।

Monday, June 18, 2012

গতকাল সমকাল-অযোধ্যার আট বিঘা জমি by ফারুক চৌধুরী

যে জমিটি নিয়ে ১৯৪৯ সাল থেকে অযোধ্যার রামজন্মভূমি আর বাবরি মসজিদের মামলার ঝামেলা চলছে, তার আয়তন ২ দশমিক ৭৭ একর, অর্থাৎ প্রায় আট বিঘা। কিন্তু আজ রবিঠাকুরের হূদয়ছোঁয়া কাল্পনিক ‘দুই বিঘা জমি’র চিরন্তন নিষ্ঠুরতার চেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করছে অযোধ্যার সেই আট বিঘা জমির সাময়িক রূঢ় বাস্তবতা।

Sunday, June 17, 2012

শ্রদ্ধাঞ্জলি-এক নিভৃতচারী উন্নয়নকর্মী by ফারুক চৌধুরী

মো. আমিনুল আলম দেশের প্রতিটি গৃহস্থালিতে উচ্চারিত কোনো নাম নয়, যে ধরনের মানুষকে বলা হয় স্বনামেই ধন্য, এ রকম কোনো মানুষও তিনি নন। তবে এ কথা না বললেই নয় যে এ দেশের প্রত্যন্ত জনপদে এবং বহির্বিশ্বে পৃথিবীর অনেক দেশে কোটি কোটি মানুষের মনের গভীরে তিনি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন।

Friday, June 15, 2012

গতকাল সমকাল-কবরনামা by ফারুক চৌধুরী

জীবনের সঙ্গে মৃত্যু তথা সমাধির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। আমরা সবাই মৃত্যুপথযাত্রী কাফেলায় এগিয়ে চলেছি অভিন্ন গন্তব্যের পানে। আর বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু সম্বন্ধে ঔৎসুক্য বাড়ছে। মৃত্যুকে নিয়ে সুফি-সাধক আর গুণীজনের অমৃত বচনের নিগূঢ় তাৎপর্য সাগ্রহে অনুসন্ধান করি।

Monday, June 4, 2012

গতকাল সমকাল-আফগানিস্তান সমস্যার গোলকধাঁধা by ফারুক চৌধুরী

যেকোনো সমস্যারই বিভিন্ন মাত্রার সৃষ্টি হতে পারে। নিরাময়হীন শারীরিক ব্যাধির মতো, সমাধানের অভাবে দীর্ঘায়িত কোনো রাজনৈতিক সমস্যায়, নতুন উপসর্গের উদ্ভব ঘটতে পারে। আফগানিস্তান সমস্যা মন্তব্যটির যথার্থতার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

Friday, June 1, 2012

সময়ের আবর্তে-আফগানিস্তান সমস্যা by ফারুক চৌধুরী

যুক্তরাষ্ট্রে দুই মাস অবস্থানের পর ফিরে এসেই জানলাম, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র তথা ন্যাটো বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল ম্যাকক্রিস্টেলকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সংগত কারণেই তাঁকে বরখাস্ত করা ছাড়া উপায় ছিল না প্রেসিডেন্ট ওবামার।

Thursday, May 17, 2012

গতকাল সমকাল-ওবামা ও আফগানিস্তানের হালহকিকত by ফারুক চৌধুরী

২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম আলোয় ‘আফগানিস্তানের চোরাবালিতে ওবামা?’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। এখন, তার সাত মাস পর, আফগানিস্তানের অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, উপরিউক্ত সেই শিরোনামে প্রশ্নবোধক চিহ্নটি এখনো রয়ে গেছে। গত সাত মাসে প্রেসিডেন্ট ওবামা আফগানিস্তানে বেশ কয়েকটি উদ্যোগই তো নিলেন।

Tuesday, May 15, 2012

গতকাল সমকাল-প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর—একটি মূল্যায়ন by ফারুক চৌধুরী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৭ থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত চীনে পাঁচ দিনের একটি সরকারি সফর করলেন। সফরে তাঁর প্রতিনিধি দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি। এই নিবন্ধটিতে চীনের সঙ্গে কীসব চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো, কী সমঝোতাপত্র চূড়ান্ত হলো অথবা চীন থেকে আমরা কী পেলাম বা কী পেলাম না, সে বর্ণনা অথবা হিসাবে যাব না।

Tuesday, May 8, 2012

সময়ের আবর্তে-শ্রীলঙ্কার নির্বাচন-উত্তর রাজনীতি by ফারুক চৌধুরী

যেকোনো যুদ্ধের পর যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় না কখনো। তার প্রমাণ আমরা পাই পৃথিবীর যেকোনো স্থানে ঘটা যুদ্ধোত্তর অবস্থা থেকে। একটি সশস্ত্র সংঘাত নতুন একটি অবস্থার সৃষ্টি করে, যা নতুন আঙ্গিকে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। শ্রীলঙ্কায় এলটিটিইর বিরুদ্ধে যে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটল গত বছরের মে মাসে, তা এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়।