Showing posts with label ফেসবুক. Show all posts
Showing posts with label ফেসবুক. Show all posts

Saturday, February 7, 2026

গুলতেকিন খানের লেখা: কোনো মেয়ে যেন আমার মতো ভুল না করে

গুলতেকিন খান ফেসবুকে একটা পাবলিক পোস্ট দিয়েছেন। ৩ অক্টোবর ২০২৫ বেলা তিনটার দিকে এটি প্রকাশিত হয়। চার ঘণ্টায় এটি শেয়ার হয়েছে সাড়ে চার হাজার। প্রতিক্রিয়া বা রিঅ্যাকশনে স্যাড বা দুঃখের ইমোজি সাড়ে ১৫ হাজার, লাইক ৬ হাজারের বেশি, লাভ আড়াই হাজার, কেয়ার ৯২৮ (সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে)।

লেখাটার গুরুত্ব বিবেচনা করে গুলতেকিন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করে এটি প্রথম আলোয় প্রকাশের অনুমতি চাওয়া হলে তিনি অনুমতি দেন।
ওই সময় তিনি বলেন, এটি হয়তো লিখতে ১০ মিনিট লাগত, কিন্তু দুই দিন ধরে এই লেখাটা তিনি লিখেছেন এবং লেখার সময় টপটপ করে অশ্রু ঝরছিল।
গুলতেকিন খান একজন স্বনামধন্য কবি। তাঁর বেশ কটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘আজও কেউ হাঁটে অবিরাম’, ‘আজ তবে উপনিবেশের কথা বলি’, ‘বালি-ঘড়ি উল্টে যেতে থাকে’ ও ‘দূর দ্রাঘিমায়’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।
গুলতেকিন খানের পুরো ফেসবুক স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো—

এই লেখাতে আমার সম্পর্কে একটিও খারাপ মন্তব্য দেখতে চাই না!
এই সত্যি কথাগুলো আমি লিখেছি শুধুমাত্র কিশোরী, তরুণী এবং তাদের অভিভাবকদের জন্যে।
এত ব‍্যক্তিগত ঘটনা লিখেছি, কারণ আর কোনো মেয়ে আমার (পুরো বিয়েটাতে আমার চেয়ে অভিভাবকদের বেশি ভুল ছিল) মতো ভুল যেন না করে।
জুন মাসের ৬ তারিখ ছিল রোববার। শীলাকে যেমন হাসতে হাসতে বলেছিলাম, প্রায় একইভাবে ইকবাল ভাইকেও জানালাম।
ড. ইয়াসমীন হক তাঁর পরিচিত কয়েকজন lawyer আমার বাসায় পাঠান। তাঁদের একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ব‍্যাংকে টাকাপয়সা কেমন আছে?
আমি বলি, কার ব‍্যাংকে?
আপনাদের জয়েন্ট account–এ?
আমাদের তো কোনো জয়েন্ট account নেই!
ব‍্যাংকে হুমায়ূন আহমেদের কত টাকা আছে?
সেটা তো আমি জানি না
তখন উনি upset হয়ে বলেন, কিছু একটা বলেন?
আমি বলি, একজন মেয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আছে!
কী ধরনের সম্পর্ক?
: যত দূর জানি সব ধরনের সম্পর্ক। উনি নিজেই আমাকে জানিয়েছেন! আমি বাকি কারও নাম বললাম না! তারা এখন বিয়ে করে শান্তিতে আছেন। কী দরকার তাদের নাম বলার!#

Lawyer–রা দখিন হাওয়ায় (আমার ফ্ল্যাটে যেখানে আমার মৌখিক agreement নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ থাকছিলেন) সেখানে যান। এবং চলেও আসেন আমার কাছে। একজন বলেন, তিনি তো কয়েকটি বই দেখান, যেখানে আগে থেকেই আন্ডার লাইন করা ছিল।
: হোটেল গ্রেভারিন, মেফ্লাওয়ার আরও কিছু বই। আপনি নাকি অনেক আগে থেকেই ডিভোর্স চাচ্ছিলেন?
: ওগুলো সত্যি না। ডিভোর্সের নিয়ম আমি এখনো জানি না! আমেরিকাতে কী ভাবে জানব? ‘হোটেল গ্রেভারিনে’ ওসব বানিয়ে লেখা! তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই এ অনেক কিছুই তাঁর কল্পনা থেকে লেখা। ওই সব বই লেখার সময় আমি তাঁকে বারবার বলেছিলাম ওসব না লিখতে! কিন্তু উনি আমাকে তখন বলেছিলেন, একদম সত্যি হচ্ছে জলের মতো, কোনো স্বাধহীন, তাই কিছু মিথ‍্যা থাকলে লোকজন পড়ে মজা পাবে!

আমি শুধু তাঁর পায়ে ধরে বাকি রেখেছিলাম। বারবার বলেছি, আমার সম্পর্কে কিছু না লিখতে। আমি বাসা থেকে বের হয়ে যাইনি! ওর তখন খারাপ একটি সময় যাচ্ছিল, নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডির জন্য একটি পরীক্ষা হয়, যার নাম কিউমিলিয়েটিভ, সেখানে দশ নম্বর থাকে। পরীক্ষার জন‍্য সম্ভবত দুই বছর সময় থাকে। সেখানে অনেকগুলো পরীক্ষা হয় এবং দশের মধ‍্যে তিনটি ২ নম্বর পেতে হয়, বাকিগুলো ১ নম্বর পেলেই হয়। কিন্তু সে অনেকগুলো পরীক্ষা দিয়েও একটিতেও ২ নম্বর পাননি তখনো। এটা নিয়ে তাঁর মধ্যে ফ্রাসটেশন কাজ করছিল। তা ছাড়া তিনি রেগে গেলেই বলতেন, বাসা থেকে বের হয়ে যাও। সেদিনও পরীক্ষায় ১ পেয়ে মেজাজ খুব খারাপ ছিল। বাসায় এসেই অকারণে রাগারাগি শুরু করেন এবং একপর্যায়ে কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে বলেন, বাসা থেকে বের হয়ে যাও!

: আমি বলি কোথায় যাব?
: উনি বলেন, যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাও! আমাকে চুপচাপ কাঁদতে দেখে আরও রেগে যান এবং আমাকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দেন। আমার গায়ে তখন একটি শার্ট এবং প‍্যান্ট, পায়ে স্পন্জের স‍্যান্ডেল ছিল। আর বাইরে ডিসেম্বর মাসের প্রচণ্ড ঠান্ডা! আমি শীতে কাঁপতে কাঁপতে দরজা ধাক্কা দিই আর বলি, দরজা খোলো প্লিজ, কলিংবেল বাজাতে থাকি কিন্তু দরজা খুলে না। বেশ কিছুক্ষণ পরে আমার হাত–পা প্রায়  জমে যায়! তখন দৌড়াতে থাকি। আমাদের বাসার কাছে একটি দোকান ছিল। একজন আমেরিকান বৃদ্ধা মহিলা তাঁর বিশাল ড্রয়িং রুমকে নানা রকম মসলা, আচার, হারবাল জিনিস দিয়ে দোকান বানিয়েছিলেন। নাম ছিল ‘টচি’। আমরাও ওখান থেকে মসলা কিনতাম এবং প্রায়ই যেতাম নতুন কোনো মসলার খোঁজে! এমনিতে কাছেই মনে হতো কিন্তু সে শীতের সন্ধ্যায় যেন দোকানটি বাসার কাছে ছিল, সেটি মনে হলো বহু দূরে চলে গেছে! শেষ পর্যন্ত টচি পৌঁছেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। মনে হলো স্বর্গে ঢুকেছি! বয়স্ক ভদ্রমহিলাকে অনুরোধ করলাম, আমি একটি ফোন করতে পারি কি না! টাকা পরে দেব! উনি বললেন, টাকা লাগবে না, তুমি ফোন করো। তিনি আমার প্রাইভেসির জন‍্যে একটু দূরে সরে গেলেন। আমার একমাত্র মুখস্থ নম্বরে ফোন করলাম।

: এ্যান, আমি টিংকু বলছি।
: কী হয়েছে টিংকু, এমনভাবে কথা বলছ কেন?
: এ‍্যান, তুমি কি আমাকে একটু তুলে নিতে পারবে?
আমি (এ‍্যানের ছেলে, এ‍্যারোনকে আমি বেবিসিট করি। কিন্তু আমরা ভালো বন্ধুও)
ওকে ঠিকানা বলি।
এ‍্যান চলে আসে। আমি টচির বয়স্ক ভদ্রমহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়িতে উঠি। ও আমাকে একটি জ‍্যাকেট দেয়। আমি ভাবি, ও কেমন করে জানলো যে আমার গায়ে জ‍্যাকেট নেই?
ওর বাড়িতে যেতে যেতে সবকিছু বলি ওকে।
বাসায় পৌঁছে এ‍্যান আমাকে একটি রুম দেখিয়ে বলে, এখন তুমি
ঘুমাওতো!
সারা দিন কাজ করার ক্লান্তি, বাসা পরিষ্কার, রান্না কত কী করেছি! কোনো কিছুতেই ঘুম আসে না! ভয়ে, উৎকণ্ঠায়
এতক্ষণ কাঁদতেও পারিনি! বালিশে মাথা রাখতেই ঝর্ণার মতো দুচোখের জলে বালিশ ভিজে গেল! নোভার কথা ভেবে কষ্ট গলার ভেতর আটকে গেল! এখানে আমার মা-বাবা, ভাইবোন, কোনো আত্মীয়স্বজন নেই! কী করে সে পারল এমন করতে? সারা রাত কাঁদতে কাঁদতে কাটল।
বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে আমি বসে থাকি।

এ‍্যান আর স্টেইনলি নাশতার টেবিলে এসে  বসে।
আমিও বসি ওদের সাথে।
টেবিলে এ‍্যান বলে, কী ঠিক করলে?
: কী বলছ, এ‍্যান?
: লয়‍্যারের সাথে কথা বলব না? একবারে ডিভোর্স পাঠাতে বলবে?
আমি ভয়ে আঁতকে উঠি!
না, না। হুমায়ূন আমাকে অনেক ভালোবাসে! রাগের মাথায় ওসব করেছে!
তুমি আমাকে একটু বাসায় দিয়ে আসতে পারবে? নোভার জন‍্য খুব মন খারাপ লাগছে!
ওরা দুজন অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থাকে।
বাসায় ঢুকেই আমি নোভাকে কোলে নিয়ে দোতলায় যাই। বিছানায় বসে নোভাকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কাঁদতে থাকি।
আর বলি, নোভাকে আমার বোকামি করতে দেব না। ওর হাজব্যান্ডের যেন সাহস না হয় ওকে ধাক্কা দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেবার!
আমার চোখের সামনে অসংখ‍্য ছবি দেখতে পাই, যেখানে একটি ১৮–১৯ বয়েসের তরুণী চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে এবং একজন হুমায়ূন আহমেদ তাকে যা ইচ্ছে তা বলে বকছে।
আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ইয়াসমীনের পাঠানো ওই লয়ারকে জিজ্ঞেস করতে, ‘আসলে তখনই নোভাকে নিয়ে দেশে ফিরে ওই ভদ্রলোককে ডিভোর্স দেওয়া উচিত ছিল, তাই না?’ কিন্তু পারিনি!

গুলতেকিন খান। ফেসবুক স্ট্যাটাসের সঙ্গে এই ছবি ব্যবহার করেছেন তিনি
গুলতেকিন খান। ফেসবুক স্ট্যাটাসের সঙ্গে এই ছবি ব্যবহার করেছেন তিনি। ছবি: গুলতেকিন খানের ফেসবুক থেকে

Wednesday, July 23, 2025

বিমান দুর্ঘটনা: অপসাংবাদিকতা, অপতথ্য ও ফেসবুকে গুজবের গজব by রিজওয়ান-উল-আলম

গত সোমবার উত্তরায় একটি স্কুলভবনে একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ঘন কালো ধোঁয়া, মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা আর প্রিয়জন হারানো পরিবারের কান্না দেখে পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমন দুঃসময়ে মনে হয় যেন সব থেমে গেছে, অথচ কাজ না করলে বিপদ আরও বাড়ে। পুরো পরিস্থিতি বুঝে উঠতে সময় লাগছে, কিন্তু একটা কথা সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা গেল: এমন বিপদে কী বলতে হবে বা কী করতে হবে, তার জন্য আমাদের সংস্থাগুলো তৈরি ছিল না। আমরাও কি নাগরিক হিসেবে তৈরি ছিলাম?

ঘটনার পরের কয়েক ঘণ্টা বোঝা গেল, বাংলাদেশে বিপদ সামলানোর ব্যবস্থায় অনেক ঘাটতি আছে। আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে একটা এক্স পোস্ট (টুইট) দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে, অথচ বিপদ নিয়ে কথা বলার আমাদের পদ্ধতি এখনো অনেক পুরোনো। এই দুঃখজনক ঘটনাটা আমাদের জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশের এখনই দরকার ভালো পরিকল্পনা করে কথা বলা এবং বিপদ কমানোর ব্যবস্থা তৈরি করা। বিপদ হওয়ার পর তা নিয়ে ভাবলে হবে না, বরং এগুলো দেশ পরিচালনার এবং নাগরিকের দায়িত্বের মূল অংশ হতে হবে।

সময়মতো সুনির্দিষ্ট সরকারি তথ্যের আদান-প্রদানে না হওয়ায় ভুল তথ্য ছড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। যাচাই না করা ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশি ষড়যন্ত্র, পাইলটের আত্মহত্যা, এমনকি অদ্ভুত সব গুজবও মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, ভালো মানুষ আর সুযোগসন্ধানী—সবাই মিলে তা ছড়াচ্ছিল। যখন সত্যি খবর দ্রুত পাওয়ার সুযোগ থাকে না, তখন মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে, মানুষ আতঙ্কিত হয়। যখন বিপদ আসে, তখন সবার আগে বিশ্বাস ভেঙে যায় না—তথ্য না থাকলেই বিশ্বাস মরে যায়।

একটা খুবই খারাপ বিষয় ছিল মৃতদের ছবি—যাদের মধ্যে কিছু শিশুও ছিল—ফেসবুক, টিকটক ও হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়া। কিছু ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার জায়গায় শোকাহত পরিবারের মুখের ওপর জুম করে ছবি তোলা হয়েছিল, যেন তাদের কষ্ট দেখানো একটা খেলা। এটা সাংবাদিকতা নয়। এটা কৌতূহলের আড়ালে নিষ্ঠুরতা।

ইউনিসেফের নিয়ম খুব স্পষ্ট: শিশুদের ছবি কোনো দুঃখজনক ঘটনার প্রতীক হিসেবে খুব সাবধানে, তাদের সম্মান বজায় রেখে এবং তাদের অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করতে হবে। তাদের পরিচয় গোপন রাখতে হবে, তাদের গল্প সাবধানে বলতে হবে। অথচ টিকটকারদের ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় এই সাধারণ নিয়মগুলো মানা হয়নি। পরিবারের মানসিক কষ্ট শুধু তোলা হয়নি; তা সারা দুনিয়ায় দেখানো হয়েছে, শেয়ার করা হয়েছে, মন্তব্য করা হয়েছে এবং টাকা আয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

আমাদের এটা নিয়ে কথা বলতে হবে, রাগ করে নয়, বরং দায়িত্ব নিয়ে। সম্পাদকদের তাঁদের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে খারাপ ছবি বা তথ্য সরিয়ে দিতে হবে, আর নাগরিকদের পোস্ট করার আগে ভাবতে হবে। একটা ছবি শেয়ার করা হয়তো সচেতনতা বাড়াচ্ছে মনে হতে পারে, কিন্তু যখন তা কারও সম্মান নষ্ট করে, তখন তা একধরনের শোষণ হয়ে যায়।

এখানে সমস্যাটা শুধু একটা প্রতিষ্ঠানের নয়। উত্তরার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, বিশেষ করে যখন সামরিক বিষয় জড়িত থাকে, তখন দ্রুত, স্বচ্ছ ও মানবিক যোগাযোগ জরুরি। চুপ থাকলে তদন্ত সুরক্ষিত থাকে না, বরং সন্দেহ বাড়ে। সংবাদমাধ্যমগুলো, যদিও কিছু সংবাদমাধ্যম সংযম দেখিয়েছিল, কিন্তু চাঞ্চল্যকর খবরের পেছনে ছুটেছিল। শোকাহত বাড়ি থেকে সরাসরি দেখানো, অনুমানভিত্তিক খবর এবং একে অপরের উল্টো খবর শুধু বিভ্রান্তি বাড়িয়েছিল।

বিপদে সাংবাদিকতার প্রথম কাজ হলো খবর যাচাই করা, ভাইরাল হওয়া নয়। অনেক সংস্থারই আগে থেকে তৈরি যোগাযোগ পরিকল্পনা ছিল না। কী প্রশ্ন আসতে পারে, কী উত্তর দিতে হবে—এমন মৌলিক কোনো প্রস্তুতি ছিল না। ২০২৫ সালে এটা মানা যায় না। নাগরিক ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা, যদিও তাঁদের উদ্দেশ্য ভালো ছিল, কিন্তু তাঁরা অনেক ভুল তথ্য ছড়িয়েছেন। খারাপ ছবি, ভুল খবর, ভুয়া উদ্ধারের খবর এবং মনগড়া হতাহতের তালিকা অবাধে ছড়িয়ে পড়েছে।

আগুন লাগলে কী করতে হয় বা ভূমিকম্প হলে কী করতে হয়, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণের মতোই সংকটকালে কী করে যোগাযোগ করতে হয়, সে বিষয়ে মানুষের শিক্ষা দরকার। কখন কিছু শেয়ার করা উচিত নয়, তা জানা, কী শেয়ার করা উচিত, তার মতোই জরুরি।

পরিকল্পিত যোগাযোগ (স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন) মানে মিথ্যা বলা বা শুধু প্রচার করা নয়। এটি হলো একটি বিপদের আগে, চলাকালীন ও পরে তথ্য ব্যবস্থাপনার একটি চিন্তাভাবনা করে করা, স্বচ্ছ ও মানুষের জন্য তৈরি পদ্ধতি।

যদি বাংলাদেশের এমন একটি ব্যবস্থা থাকত, তাহলে আমরা দেখতাম যে ৬০ মিনিটের মধ্যে একজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমকে বলছেন, যাচাই করা খবরসহ একটি লাইভ তথ্য বোর্ড থাকছে, বাংলা ও ইংরেজিতে নিয়মিত খবর দেওয়া হচ্ছে, সঠিক খবর ছড়ানোর জন্য সবার সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে এবং গুজব বন্ধ করার জন্য প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে।

ঝুঁকি কমানো শুধু একটি ফাইলে রাখা কাগজপত্রের মতো নয়। এর মানে হলো আবাসিক এলাকার খুব কাছে থাকা প্রশিক্ষণের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা, উড়োজাহাজের পথের নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা করা, শুধু উদ্ধারের জন্য নয়, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্যও নকল মহড়া দেওয়া এবং বিমান দুর্ঘটনা সম্পর্কে কীভাবে দায়িত্বের সঙ্গে খবর প্রকাশ করতে হয়, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। এর মানে হলো বিপদ মোকাবিলার প্রস্তুতিতে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করা। উত্তরার মানুষ যদি বিমান দুর্ঘটনার সময় কী করতে হবে, সে বিষয়ে আগে থেকে প্রশিক্ষণ পেত, তাহলে হয়তো সেখানকার অনেক বিশৃঙ্খলা কমানো যেত।

১৮ কোটি ডিজিটাল নাগরিকের একটি সাধারণ নীতিবোধ থাকা উচিত। ডিজিটাল সহানুভূতির ওপর একটি দেশের নীতি অনেক আগেই দরকার ছিল। স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্র—সব জায়গায় অনলাইনে দায়িত্বশীল আচরণ শেখাতে হবে। শেয়ার করার আগে ভাবুন।

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: এটা কি সত্যি? এটা কি সাহায্য করবে? এটা কি সম্মান বাড়াবে না ক্ষতি করবে? যদি আমার পরিবার কষ্টে থাকত, তাহলে কি আমি এটা শেয়ার করতাম? ভুল তথ্য মানুষকে মারে। মিথ্যা তথ্য কষ্ট দেয়। কিন্তু চুপ থাকলে দুটোই বাড়ে। ইন্টারনেট সবাইকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছে। এখন সময় এসেছে, আমরা যেন বিবেক দিয়ে তা ব্যবহার করতে শিখি।

এই লেখা কোনো অভিযোগ নয়, এটা একটা অনুরোধ। আমাদের সম্মিলিত কষ্টকে সংকল্পে পরিণত করার একটা অনুরোধ। উত্তরায় যা ঘটেছে, তা আমরা পাল্টাতে পারব না।

কিন্তু আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে পরেরবার যখন কোনো বিপদ আসবে, তখন আমরা বিশৃঙ্খলা নয়, বরং স্পষ্টতা দিয়ে তার মোকাবিলা করব। আমরা সরকারকে বলছি দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য একটি জাতীয় কৌশলগত যোগাযোগ ইউনিট তৈরি করতে, কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষকে বিপৎকালে যোগাযোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে এবং শিশু-কিশোরদের ছবি প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তথ্য সুরক্ষা ও নৈতিক নিয়মকানুন মেনে চলতে।

আমরা সংবাদমাধ্যমকে অনুরোধ করছি অনলাইনে মানুষের কষ্টের কথা ভেবে তাদের নৈতিক নিয়মগুলো আবার দেখতে এবং যাচাই না করা খবর বা মানুষের কষ্টকে কাজে লাগানো থেকে বিরত থাকতে। আর আমরা নাগরিকদের বলছি, অনলাইনে সম্মান বজায় রাখতে, ভুয়া খবর রিপোর্ট করতে এবং মনে রাখতে যে প্রতিটি ছবির পেছনে একটি পরিবার আছে, যারা বাঁচার চেষ্টা করছে।

একটি জাতিকে কোনো দুঃখজনক ঘটনা দিয়ে চেনা যায় না। এর প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়াই আমাদের পরিচয় তুলে ধরে। কৌশলগত যোগাযোগ এবং বিপদ কমানো শুধু কিছু কাজের অংশ নয়, এগুলো আমাদের সবার দায়িত্ব। আমাদের আকাশ ভরে দেওয়ার জন্য যেন আরেকটা সাইরেনের অপেক্ষা করতে না হয়।

* রিজওয়ান-উল-আলম, সহযোগী অধ্যাপক, মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

স্কুলে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় হতাহত সন্তানের খোঁজে হাসপাতালে ছুটে আসেন অভিভাবকেরা। উত্তরা, ২১ জুলাই
স্কুলে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় হতাহত সন্তানের খোঁজে হাসপাতালে ছুটে আসেন অভিভাবকেরা। উত্তরা, ২১ জুলাই। ছবি: সাজিদ হোসেন

Friday, June 6, 2025

৫৪ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসা যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়: লেখক মহিউদ্দিন আহমদের ফেসবুক স্ট্যাটাস

‘৫৪ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসা যথেষ্ট হয়েছে, এটি আর নয়’- বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ। বুধবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে নিজের লেখা বই ‘এই দেশে একদিন যুদ্ধ হয়েছিল’-এর একটা ছবি জুড়ে দিয়ে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক স্ট্যাটাসে এ মন্তব্য করেন তিনি।

এতে তিনি লিখেন, ‘অনেক সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। আমিও তাদের একজন। আমি একাত্তরের ৩১ জুলাই অস্ত্র নিয়ে দেশে ঢুকেছিলাম। অথচ ডিসেম্বরের ১৬ তারিখের পরে ভারত থেকে আসা লোকেরা রাইফেল হাতে পোজ নিয়ে ছবি তুলে দিব্বি ভাতা খেয়ে বেড়াচ্ছে। একটা সার্টিফিকেটের জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে হবে, এটা কখনো মাথায় আসেনি।’

মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বন্ধে কয়েকটি প্রস্তাব জানিয়ে তিনি ওই স্ট্যাটাসে আরও লিখেন, ‘অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বছরের পর বছর গরিবের ট্যাক্সের টাকায় পেনশন নিচ্ছে। কয়েক বছর পরপর সরকার বদল হয় আর দলীয় বিবেচনায় মুক্তিযোদ্ধার তালিকা বদলায়। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।
  আমার প্রস্তাব:
  ১. মুক্তিযোদ্ধা ভাতা অবিলম্বে বন্ধ করুন। কারণ এই ভাতার গন্ধেই ধান্দাবাজেরা জুটেছে।
  ২. জামুকা এবং মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় বিলুপ্ত করুন। এরা টাকা খেয়ে অনেককে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে।
  ৩. দুর্নীতির আখড়া মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ভেঙে দিন এবং এই সংস্থার আয়ত্বে থাকা সকল বাণিজ্যিক স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান নিলাম ডেকে বেচে দিন।

তিনি আরও লিখেন, ‘আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিরোধযুদ্ধ করেছি বিবেকের তাড়নায়। ব্যক্তিগত লাভালাভের জন্য নয়। যারা বেতন-ভাতা, পদ-পদোন্নতির জন্য যুদ্ধ করে, তাদের আমরা মার্সেনারি বা ভাড়াটে যোদ্ধা বলি। ৫৪ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসায় যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়।’

Monday, May 12, 2025

মাহফুজের দুই স্ট্যাটাস নিয়ে ব্যাপক আলোচনা

আবারো আলোচনায় সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। ‘একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের সহযোগীদের ক্ষমা চাওয়া’ সংক্রান্ত তার এক স্ট্যাটাস নিয়ে যখন পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হচ্ছে, ঠিক তখনই তিনি আরেকটি স্ট্যাটাস দেন। যেখানে শিবিরের ওপর নিজের ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। বলেছেন, পাকিস্তানপন্থিরা যেখানেই থাকবে, সেখানেই আঘাত করা হবে। এ ছাড়াও কয়েকটি আপত্তিকর শব্দও ব্যবহার করেন স্ট্যাটাসে। যদিও সমালোচনার মুখে তাৎক্ষণিক স্ট্যাটাসটি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে নেন তিনি। শনিবার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পর সব আন্দোলনকারী যখন ঘরে ফিরে যায় তখন মাহফুজ আলম তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একাত্তর ও মুজিববাদী বাম ইস্যুতে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘একাত্তরের প্রশ্ন মীমাংসা করতেই হবে। যুদ্ধাপরাধের সহযোগীদের ক্ষমা চাইতে হবে। বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে পাকিস্তানপন্থা বাদ দিতে হবে। পাকিস্তান এদেশে গণহত্যা চালিয়েছে। সহযোগীদের ইনিয়ে বিনিয়ে গণহত্যার পক্ষে বয়ান উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। জুলাইয়ের শক্তির মধ্যে ঢুকে স্যাবোটাজ করা বন্ধ করতে হবে। সাফ দিলে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘মুজিববাদী বামদের ক্ষমা নেই। লীগের গুম-খুন আর শাপলায় মোদিবিরোধী আন্দোলনে হত্যাযজ্ঞের মস্তিষ্ক এরা। এরা থার্টি সিক্সথ ডিভিশন। জুলাইয়ের সময়ে এরা নিকৃষ্ট দালালি করেও এখন বহাল তবিয়তে আছে। আজ পর্যন্ত মুজিববাদী বামেরা কালচারালি ও ইন্টেলেকচুয়ালি জুলাইয়ের সঙ্গে গাদ্দারি করে যাচ্ছে। দেশে বসে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে এরা চক্রান্ত করেই যাচ্ছে। লীগের এসব বি-টিমও শিগগিরই পরাজিত হবে। অন্য কারও কাঁধে ভর করে লাভ নেই।’ এ স্ট্যাটাসে একাত্তর ইস্যু টানায় অনেকে তার পক্ষে-বিপক্ষে সমালোচনা করেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মাদ্রাসা জীবনের বেশ কিছু ছবি ভাইরাল হয়। পাঞ্জাবি পরিহিত ওসব ছবি মূলত শিবিরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বলেও প্রচার করে কেউ কেউ। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হন উপদেষ্টা মাহফুজ। গতকাল সন্ধ্যায় পাল্টা স্ট্যাটাস দেন তিনি। মুহূর্তেই স্ট্যাটাসটি সরিয়ে নেন তিনি। ততক্ষণে স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়ে যায়। সে স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘আমাকে নিয়ে নোংরামি করতেসো, ঝামেলা নাই। ফ্যামিলি টাইনো না, যুদ্ধাপরাধের সহযোগী রাজাকারেরা। এটা লাস্ট ওয়ার্নিং। আর, যে চুপা শিবিররা এ সরকারে পদ বাগাইসো আর বিভিন্ন সুশীল ব্যানার খুলে পাকিস্তানপন্থা জারি রাখসো, তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষ রাজাকার আর দালালদের তুলনায় আরও অধিক ভুগবা। যারা বিতর্কের এবং গালাগালির লিমিট জানে না, তাদের আমি সহ-নাগরিক মনে করি না। পাকিস্তানপন্থিরা যেখানেই থাকবে, সেখানেই আঘাত করা হবে। আমৃত্যু! ঢাবিতে এ রাজাকারদের আগে ঠেকানো হবে, যারা এদের স্পেস দিসে তাদের জন্য গত পঞ্চাশ বছরের তুলনায় অধিক জিল্লতি অপেক্ষা করসে!’।

মাহফুজের দুই স্ট্যাটাস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে- বিপক্ষে আলোচনা- সমালোচনা চলছে। প্রথম স্ট্যাটাসে অধিকাংশ ফেসবুক ব্যবহারকারী যখন মাহফুজের পক্ষে অবস্থান নেন ঠিক দ্বিতীয় স্ট্যাটাসের কারণে তার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন অনেকে। কেউ কেউ জামায়াত-শিবিরের যেমন সমালোচনা করছেন ঠিক তেমনই মাহফুজের আক্রমণাত্মক বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। এমন কি মাহফুজ কোনো গোষ্ঠীকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেয়ার মাধ্যমে উপদেষ্টা পদে নেয়া তার শপথ ভঙ্গ করেছেন বলেও মন্তব্য করেন অনেকে। মীর আরশাদুল হক নামে এনসিপি’র এক নেতা লেখেন, ‘বাংলাদেশে সব দলের বিপক্ষে বলা যাবে কিন্তু জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে বলা যাবে না, বললেই সবাই মিলে হামলে পড়বে। আর যদি কখনো তাদের খারাপ সময় আসে তখন হয়তো এই দলে- সেই দলে ঘাপটি মেরে থাকবে, আবার একটু সুযোগ পেলেই সেই আগের রূপে ফেরত যাবে। বিএনপি’র সমালোচনা করলে কিন্তু এইটা হয় না, কিংবা অন্য যেকোনো দলের। খুবই অদ্ভুত ব্যাপার মুক্তিযুদ্ধের টপিক উঠলেই একদম দিশাহারা হয়ে যায় এরা। যেখানে তাদেরই অনেক সিনিয়র নেতা মুক্তিযুদ্ধের ভুল অবস্থানের সমালোচনা নিজেরাই করেন।’ তাজওয়ার মাহমিদ সিয়াম নামে একজন লেখেন, ‘উপদেষ্টা মাহফুজ আলম গতকাল রাতে ’৭১-এর পাকিস্তানপন্থি এবং মুজিববাদী বাম সম্পর্কিত একটা পোস্ট দেয়ার পর থেকে গত ১৫-২০ ঘণ্টায় নজিরবিহীন নোংরামির শিকার হইতে হইছে। একটা অর্কেস্ট্রেটেড মিথ্যাচার করা হইছে মাহফুজ নাকি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিছে। সরকারে একমাত্র সমস্যা না কি মাহফুজ আলম। সম্ভবত সেই আক্রমণ মাহফুজের পরিবার পর্যন্ত পৌঁছাইছে। এর প্রেক্ষিতে কিছুক্ষণ আগে একটা পোস্ট দিয়ে দুই মিনিটের মাথায় ডিলেট করে দিছে।’

mzamin

Thursday, April 24, 2025

কাশ্মীরে হামলা নিয়ে মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণের শিকার সিপিআইএমের মহম্মদ সেলিম by শুভজিৎ বাগচী

কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভারতজুড়ে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতারা আরও জাতীয়তাবাদী ও শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থার দাবি তুলেছেন। এর মধ্যে খানিকটা স্রোতের বিপরীতে হাঁটলেন পশ্চিমবঙ্গ সিপিআইএমের (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-মার্ক্সবাদী) সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তিনি সাধারণ মানুষকে সাবধান করেছেন, যাতে এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে কোনো পক্ষ সাম্প্রদায়িক উসকানি ও বিভাজন বাড়াতে না পারে। কাশ্মীরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতে অনেকটা জাতীয়তাবাদের সুনামি তৈরির মধ্যে তাঁর এই মন্তব্যকে ভালোভাবে দেখেননি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা। মহম্মদ সেলিমের তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষত ফেসবুকে।

বুধবার দুপুরে সিপিআইএমের প্রচার বিভাগ ফেসবুকে রাজ্য সম্পাদকের একটি ছবি দিয়ে তাঁর একটি মন্তব্য প্রকাশ করে। সেখানে মহম্মদ সেলিম বলছেন, ‘কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল করে বিজেপি সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছিল, তাতে সন্ত্রাসবাদকে আরও উসকে দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যটকদের ওপর এই হামলা ঘিরে সারা দেশে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানো ও বিভাজনের চেষ্টা হবে। অমরনাথ যাত্রার প্রাক্কালে হামলা বলে দেখিয়ে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপরে হামলা বলে প্রচার করা হবে। আমরা কাশ্মীরের ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি এবং কোনোরকম সাম্প্রদায়িক উসকানিতে সাড়া না দেওয়ার আবেদন করছি।’

সিপিআইএমের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ পলিটব্যুরোও একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে, কিন্তু এখানেও তারা এই ধরনের ‘সাহসী’ মন্তব্য করেনি বলে মনে করছেন সিপিআইএম দলের সদস্যদের একাংশ। বিবৃতিতে ভুক্তভোগীদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে পলিটব্যুরো বলেছে, ‘এই জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে। এই নৃশংস হামলার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে কেন্দ্রীয় সরকারকে সর্বতোভাবে চেষ্টা করতে হবে। অপরাধকারীরা জাতির ও কাশ্মীরের জনগণের শত্রু। জনাকীর্ণ পর্যটন স্থানগুলোতে নিরাপত্তার অভাবসহ হামলার সমস্ত বিষয় নিয়ে তদন্ত চালানো কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব। চরমপন্থী মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এই ট্র্যাজেডির মুহূর্তে সিপিআই-মার্ক্সবাদী ভারতের জনগণের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ।’

অর্থাৎ যে কথা মহম্মদ সেলিম বলেছেন, এই ঘটনার জেরে ভারতে আগামী দিনে সাম্প্রদায়িকতা ও বিভাজনের রাজনীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেই ধরনের কোনো মন্তব্য করেনি দলের শীর্ষ পর্ষদ।

মহম্মদ সেলিমের মন্তব্যের জন্য তাঁকে প্রবল আক্রমণ করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা। একজন লিখেছেন, ‘সিপিআইএমের আজ এই অবস্থা আপনাদের এই মতামতের জন্যই।’ সিপিআইএমের প্রচার বিভাগের ওই ফেসবকু পোস্টে রাত পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মন্তব্য করা হয়েছে এবং এর প্রায় প্রতিটিই মহম্মদ সেলিমকে আক্রমণ করে। আরেক ব্যক্তি লিখেছেন, ‘সেলিম বিষয়টিকে নিয়ে রাজনীতি করছেন, যা কাম্য নয়।’ ফেসবুকে সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদককে ব্যক্তিগত আক্রমণও করেছেন অনেকে।

তবে সিপিআইএম দলের সদস্যদের একাংশ মনে করছেন, এই মন্তব্যের প্রয়োজন ছিল। দক্ষিণ কলকাতার কসবায় সিপিআইএমের স্থানীয় কমিটির সাবেক সদস্য ও বর্তমানে পার্টির সাধারণ সদস্য কৌশিক রায় এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে আমি যেটা মনে করি সেটা হলো “পপুলিস্ট” চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে গিয়ে পাল্টা ন্যারেটিভ (আখ্যান) আমরা দিতে পারছি না। মানুষ বাম রাজনীতি থেকে সব সময় অন্য কিছু শুনতে চান। অন্য একটা ন্যারেটিভ চান। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা মূলস্রোতের ন্যারেটিভই অনুমোদন করি এবং সেটাই বলি। এই যে রাজ্য সম্পাদক কথাটা বললেন যে, এই ঘটনাকে ব্যবহার করে কিছু সংগঠন সম্প্রদায়িক রাজনীতি করার চেষ্টা করবে, এটা একটা বিকল্প ন্যারেটিভ। কাশ্মীরের ঘটনার ফলে সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং মেরুকরণের রাজনীতি বাড়তে পারে, এটা একটা বাস্তব সত্য এবং বিকল্প ন্যারেটিভও, যেটা এই মুহূর্তে অন্য রাজনৈতিক দল বলছে না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অনেক মানুষই সেটা মনে করেন। মূলস্রোতের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাদের কথা বলাটা এই সময় খুব জরুরি।’

রাজ্য সম্পাদকের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে আগামী শুক্রবার (এপ্রিল ২৫) কাশ্মীরের সহিংসতা এবং সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতায় পথে নামবে পশ্চিমবঙ্গ সিপিআইএম।

মোহাম্মদ সেলিম
মোহাম্মদ সেলিম। ফাইল ছবি

Monday, March 17, 2025

আমাকে হত্যা করতে কর্নেল জিয়াকে নির্দেশ দেয়া হয়: সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া

জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। সাবেক এই সেনাপ্রধান গত ৫ই আগস্টের আগে ও পরে আলোচনার সামনের সারিতে চলে আসেন। এর আগে সমসাময়িক ঘটনাবলি নিয়ে স্ট্যাটাস দেন। যা নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় হয়। সম্প্রতি তিনি ‘বিজিবি, র‍্যাব, এসএসএফ ও আনসার নিয়ে আমার যত অভিজ্ঞতা’  শিরোনামে ছয় পর্বে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেছেন। এসব পর্বের একটি অংশে তিনি বলেন, ‘একদিন সেনাপ্রধানের কার্যালয়ে বোমা আতঙ্ক দেখা দেয়। অফিসে কার্যরত সবাইকে তাদের অফিস থেকে বের করে দেয়া হয়। ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল বোমা-নির্ণয় যন্ত্রপাতিসহ তার টিম নিয়ে দৌড়ে আসেন। পরবর্তী আধা ঘণ্টা অফিসটিতে তন্ন তন্ন করে বোমা খোঁজা হয়। আমাদের ভাগ্য প্রসন্ন যে কোনো বোমার অস্তিত্ব মেলেনি এবং একটা লম্বা অপেক্ষার পর বিল্ডিংটিকে বোমা মুক্ত ঘোষণা করা হয়। আমি জগলুলকে জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে? জগলুল জানালেন তিনি তার এক অফিসার মেজর সুমনের কাছে জানতে পেরেছেন যে, কর্নেল জিয়াকে আমাকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শুনে আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটি শীতল স্রোত বয়ে যায়’...

মানবজমিন পাঠকদের জন্য সাবেক এই সেনাপ্রধানের পোস্টগুলো হুবুহু তুলে ধরা হলো-

প্রথম অংশ
বিজিবিতে ডেপুটেশনে যাওয়া অনেক অফিসার শেষ পর্যন্ত অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়েন। তবে সৌভাগ্যক্রমে বেশিরভাগ অফিসার এখনো তাঁদের নীতিবোধ অটুট রেখে চলেন। আগে সাধারণত পদোন্নতি-বঞ্চিত বা কম গুরুত্বপূর্ণ অফিসারদেরই সেখানে পাঠানো হতো। কিন্তু একসময় সবাই বুঝে যায়, বাহিনীটিকে ভালোভাবে চালাতে যোগ্য অফিসারও দরকার। কিছুদিন সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। তবে মেজর জেনারেল (পরে জেনারেল ও সেনাপ্রধান) আজিজ দায়িত্ব নেওয়ার পর এবং পরবর্তীতে মেজর জেনারেল শাফিন আসায় এসব অফিসার সত্যিকারের চাপের মুখে পড়েন।
তাছাড়া আনসারে কিছু সিনিয়র অফিসার পাঠানো হয় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য, কিন্তু মূল আনসার ক্যাডাররা এ নিয়ে প্রবল অসন্তোষ দেখায়। আগে সেখানে একটি বিদ্রোহ হয়েছিল, যেটি ৯ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন কঠোর হস্তে দমন করে। অফিসারদের বিরুদ্ধে সাধারণত কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি—শুধু একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। আমি যখন সেনাপ্রধান ছিলাম, তখন জানতে পারি যে ওই সময়ের ডিজির বিরুদ্ধে আনসারের নারী সদস্যদের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক এবং অত্যধিক দামে শটগান কেনার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু আমি কিছু করতে পারিনি, কারণ নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি কার্যত “আমার এখতিয়ারের বাইরে” ছিলেন।

দ্বিতীয় অংশ
যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দিত, তা ছিল র‍্যাব-এ প্রেষণে থাকা আমাদের অফিসারদের দ্বারা সাধারণ নাগরিক, রাজনৈতিক কর্মী বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের অপহরণ ও হত্যা। তরুণ, ক্যারিয়ারমুখী অফিসারদের র‍্যাবে পাঠানো হতো, সেখানে কিছুদিন কাজ করে তারা এমন এক চরিত্র নিয়ে ফিরত যেন তারা পেশাদার খুনি। একই প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছিল জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার (জেসিও), নন-কমিশন্ড অফিসার (এনসিও) এবং সৈনিকদের মধ্যেও। আমি সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই প্রধানমন্ত্রীকে জানাই যে, পুলিশের সাথে মিশে কাজ করতে গিয়ে আমাদের অফিসাররা কীভাবে নৈতিক বিচ্যুতির শিকার হচ্ছেন। আমি চাইছিলাম তাদের সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে আনা হোক। প্রধানমন্ত্রী আমার কথায় সম্মতিসূচক ইঙ্গিত দিলেন, এমনকি বললেন র‍্যাব জাতীয় রক্ষীবাহিনী থেকেও খারাপ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই বাস্তবে রূপ নেয়নি।

কয়েক দিন পর আমি কর্নেল (পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ও ডিজি এসএসএফ) মুজিবকে—যিনি তখন র‍্যাব এডিজি (ADG) ছিলেন—ডেকে বলি যেন তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল (এখন মেজর জেনারেল) জিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন এবং আর যেন কোনো “ক্রসফায়ার” না ঘটে। কর্নেল মুজিব এ ব্যাপারে আমাকে কথা দেন এবং বিদায় নেওয়ার সময় তাঁকে বেশ উদ্বিগ্ন মনে হয়। পরের কয়েক দিন পত্রপত্রিকা লক্ষ করলাম, নতুন কোনো ক্রসফায়ারের খবর নেই—এতে মানসিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। এরপর কর্নেল মুজিব একাধিকবার আমাকে এসে জানিয়েছিলেন, সত্যিই ক্রসফায়ারের ঘটনা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর আমি বুঝতে পারি ঘটনা ঠিকই ঘটছে, কিন্তু সেগুলোর খবর চাপা দেয়া হচ্ছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে যখন কর্নেল মুজিব র‍্যাব ছেড়ে অন্যত্র বদলি হয়ে যান, আর কর্নেল জিয়া—যিনি আগে র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার দায়িত্বে ছিলেন—নতুন ডিজি বেনজীর আসার সঙ্গে সঙ্গেই এডিজি র‍্যাব হিসেবে দায়িত্ব নেন।

এরপর আর্মি নিরাপত্তা ইউনিট (ASU) সূত্রে খবর পাই যে, কর্নেল জিয়া নিজের আবাসিক টাওয়ারে একজন গার্ড রেখেছেন, বাসায় অস্ত্র রাখছেন এবং পুরো ফ্ল্যাটে সিসিটিভি বসিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে বলা হয় গার্ড সরিয়ে নিতে, ক্যামেরাগুলো খুলে ফেলতে, বাসায় অস্ত্র রাখা থেকে বিরত থাকতে এবং অফিসিয়াল কোয়ার্টারে যে সামরিক নিয়ম-কানুন আছে, সেগুলো মেনে চলতে। পরবর্তীতে তাঁর আচরণ আরও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠে। ডাইরেক্টার মিলিটারি ইন্টালিজেন্স (DMI) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তাতে কর্নেল জিয়া কোনো কর্ণপাত করেননি। পরে আর্মি নিরাপত্তা ইউনিটের (ASU) কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল তাঁকে আলাপের জন্য ডাকেন। পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল আমাকে জানান, জিয়ার সাথে কথা বলতে গিয়ে মনে হয়েছে যেন সে এমন একজনের সাথে কথা বলছে যার মস্তিষ্ক পাথর বা ইটের টুকরো দিয়ে ঠাসা —বোঝানোর কোনো উপায় নেই।

তৃতীয় অংশ
এক পর্যায়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল তারেক সিদ্দিকী, এমএসপিএম (MSPM), আর তাঁর কোর্সমেট এএমএসপিএম(AMSPM) কর্নেল (এখন মেজর জেনারেল) মাহবুবের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে কর্নেল জিয়া আমার নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা শুরু করেন। আমার আর কোনো উপায় ছিল না—আমি তাঁকে রেললাইনের পশ্চিম পাশের ক্যান্টনমেন্টে “পারসোনা নন গ্রাটা” (PNG)/অবাঞ্চিত ঘোষণা করি। তবে পূর্ব পাশের আবাসনটিতে উনাকে থাকতে তাঁকে ছাড় দিয়েছিলাম। লজিস্টিকস এরিয়া কমান্ডার (LOG AREA COMD)মেজর জেনারেল মিজানকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে বলি (যার ফলস্বরূপ, আগে জানানো হয়নি বলে তাঁকেও নিরাপত্তা উপদেষ্টার বিরাগভাজন হতে হয়েছিল)।

কর্নেল জিয়া পরিস্থিতির গুরুত্ব তখনই পুরোপুরি বুঝলেন, যখন মিলিটারি পুলিশ তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে সেনানিবাসের ভেতরে সিএমএইচে যাওয়ার পথে চেকপোস্টে আটকে দেয়। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই এমএসপিএম আমাকে ফোন করে জানতে চাইলেন, একজন চাকুরিরত অফিসারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা স্বাভাবিক নিয়মের মধ্যে পড়ে কিনা, না এটা বিশেষ কোনো পদক্ষেপ। আমি বললাম, “এটা ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। যদি তুমিও চিফের আদেশ অমান্য কর, তাহলে তোমাকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।” পরদিন তিনি আবার ফোন করে জিয়ার ওপর থেকে এই বিধি তুলে নেওয়ার অনুরোধ করলেন। এ ঘটনার পর কর্নেল জিয়া কিছুটা নিয়মের মধ্যে আসেন, বুঝতে পারেন তিনি এখনো সেনাবাহিনীর অধীনে আছেন। তবু আমি তাঁকে আমার অফিসে ঢুকতে দিইনি, কারণ জানতাম, তিনি শুধু এসে নিজের কাজের স্বপক্ষে ব্যাখ্যা দিয়ে আমার সময় নষ্ট করবেন।

চতুর্থ অংশ
সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর, আমি নির্দেশ দিলাম—ডিজিএফআই, বিজিবি, কিংবা র‍্যাবে বদলি পেয়ে যারা যাচ্ছেন অথবা সেখান থেকে ফিরে আসছেন, সবাই যেন নতুন জায়গায় যোগ দেওয়ার আগে কিংবা সেখান থেকে ফেরার পর আমার সঙ্গে দেখা করে। মেজর জেনারেল আনোয়ার (এম এস - মিলিটারি সেক্রেটারি), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল (ডি এম আই - ডাইরেক্টর অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স) আর আমার পিএস লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাজ্জাদও তাঁদের ব্রিফ বা ডিব্রিফ করতেন। আমি বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করলাম, মাত্র বিশ-একুশ বছরের অফিসারদের এমন সব দায়িত্বে টেনে নেওয়া হয়েছে, যার সঙ্গে তাঁদের আসল সামরিক সেবার কোনোই মিল নেই। তাঁরা কী করছেন বা কেন করছেন—তা নিজেরাও স্পষ্ট জানতেন না। এটি ছিল বিএমএ(বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি) কর্তৃক ক্যাডেটদের ‘থিংকিং লিডার’ হিসাবে গড়ে তোলার সম্পূর্ণ ব্যর্থতা। এসব অফিসারের কাছে যখন নানান হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা শোনা শুরু করলাম, তখন সেনাবাহিনীর সামগ্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার মনে সংশয় জন্ম নিলো।

নতুনভাবে বদলি পাওয়া অফিসারদের আমি যথাসাধ্য বোঝানোর চেষ্টা করতাম, যেন তারা অমানবিক অপরাধে না জড়ায়। বলতাম—যারা শেখ মুজিব বা জিয়াকে হত্যা করেছে, কিংবা অস্ত্র পাচারে জড়িত ছিল, শেষ পর্যন্ত তারা ভয়াবহ পরিণাম ভোগ করেছে। কারও হাত-পা বেঁধে তাকে হত্যা করাটা চরম কাপুরুষতা। সত্যিকারের সাহসিকতা হল শত্রুর হাতে অস্ত্র ধরিয়ে দিয়ে সামনাসামনি মোকাবিলা করা। কিন্তু কয়েক দিন পর ডিএমআই জানালেন, আমাদের এই চেষ্টা কোনো কাজে আসছে না। অফিসাররা র‍্যাবে নুতন কর্মস্থলে আসামাত্র জিয়া নাকি কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে তাদের ‘হত্যা করতে’ উৎসাহ দিচ্ছেন।

তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম যে ছিল না তাও নয়। দুজন অফিসার, র‍্যাবে যোগ দেওয়ার প্রথম রাতেই হত্যার নির্দেশ পেয়ে তা অস্বীকার করেন এবং আদেশ না মেনে এমপি (মিলিটারি পুলিশ) চেকপোস্টে চলে আসেন। ডিএমআই বিষয়টি জানালে আমি তাঁদের সেনাবাহিনীতে সম্মানের সাথে পুনর্বাসিত করি।
একজন মেজর , যিনি আমি এসআই অ্যান্ড টিতে (SI&T) কমান্ডান্ট থাকাকালে স্পেশাল ওয়ারফেয়ার উইংয়ে প্রশিক্ষক ছিলেন, র‍্যাবে যোগ দেওয়ার পর সেনাভবনে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। জানতে পারি, তিনি রেডিসন হোটেলের এক কর্মীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে সন্দেহভাজনদের ‘বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে’ জড়িয়ে পড়েছেন। আমি তাঁকে সাবধান করে দিই, যেন তিনি নিজ হাতে “বিচার” তুলে না নেন। তিনি বললেন, আর করবেন না। কিন্তু কিছুদিন পরেই দেখি, তিনি নিজেই ফেসবুকে একটা ছবি পোস্ট করেছেন—সেখানে তিনি শাপলা চত্বরের ধোঁয়াটে পটভূমিতে জিয়ার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন।

পঞ্চম অংশ

একদিন সেনাপ্রধানের কার্যালয়ে বোমা আতঙ্ক দেখা দেয়। অফিসে কার্যরত সবাইকে তাদের অফিস থেকে বের করে দেয়া হয়। ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল বোমা-নির্ণয় যন্ত্রপাতিসহ তার টিম নিয়ে দৌড়ে আসেন। পরবর্তী আধা ঘণ্টা অফিসটিতে তন্ন তন্ন করে বোমা খোঁজা হয়। আমাদের ভাগ্য প্রসন্ন যে কোনো বোমার অস্তিত্ব মেলেনি এবং একটা লম্বা অপেক্ষার পর বিল্ডিংটিকে বোমা মুক্ত ঘোষণা করা হয়। আমি জগলুলকে জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে? জগলুল জানালেন তিনি তার এক অফিসার মেজর সুমনের কাছে জানতে পেরেছেন যে, কর্নেল জিয়াকে আমাকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শুনে আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটি শীতল স্রোত বয়ে যায় এবং সিদ্ধান্ত নেই যে, এখন থেকে আমাকে আরো বেশি সতর্ক থাকতে হবে- বিশেষ করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার সময়। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুলও আমার নিরাপত্তার জন্য অন্যান্য আনুসাঙ্গিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বিশেষ করে প্রতি সকালে আমার অফিস ও বাসা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সার্চ করার ব্যবস্থা করা হয় ।

আমি এরপর ফরমেশন অফিসারদের এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে এসব “অপারেশন বা ক্রসফায়ার”-এর বর্বরতা ও এতে জড়িতদের সম্ভাব্য পরিণাম সম্পর্কে সরাসরি বলতে শুরু করি। বিশেষ করে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে কোর্সে আসা অনেক অফিসারকে একসঙ্গে সতর্ক করার সুযোগ পাই। তবু দেশজুড়ে পত্রিকায় ক্রসফায়ারের খবর আসতে থাকায় আমি বিরক্ত হয়ে উঠি। এক পর্যায়ে সিদ্বান্ত নেই র‍্যাব , ডিজিএফআই আর বিজিবিতে আর কোনো অফিসারকে Posting দেব না।

ডিজি বিজিবি মেজর জেনারেল আজিজ ও কর্নেল জিয়া প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে অভিযোগ করেন এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে বলেন। ডিজি ডিজিএফআই মেজর জেনারেল আকবর বারবার অনুরোধ করলে শেষ পর্যন্ত আমি নিজে একটি ১০-১২ জনের অফিসার দলের তালিকা তৈরি করে তাঁকে দিই। এদিকে কর্নেল জিয়া আরও ‘লবিং’ চালিয়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টা, এমএসপিএম (MSPM), আর নিজের কোর্সমেট এএমএসপিএমের (AMSPM) সহায়তায় আমার ডিএমআইকে (DMI) অপসারণ করেন। কারণ তিনি ভাবতেন, ডিএমআই-ই আমাকে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছে। স্বাভাবিক নিয়মে সেনাপ্রধানই (CAS) ডিএমআই আর সিও এএসইউ (CO ASU) নিয়োগ দেন। কিন্তু আমার আপত্তি সত্ত্বেও ডিএমআইকে সরিয়ে দেওয়া হয়—যা আমাকে যথেষ্ট অপমানিত করে। তবে সিও এএসইউ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলকে (বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার) আমার তীব্র বিরোধিতার মুখে সরাতে ব্যর্থ হয়।

পরবর্তিতে মিস্টার বেনজীর স্বয়ং আমার কাছে আসেন এবং র‍্যাব চালাতে আমার সহায়তা চান। কিন্তু আমি তাকে অফিসার দেয়ার কোনো নিশ্চয়তা দিইনি। এমএসপিএম আমাকে কয়েকবার ফোন করে জানান যে প্রধানমন্ত্রী র‍্যাব, বিজিবি আর ডিজিএফআইতে আরও অফিসার চাচ্ছেন। আমি আমার সিদ্বান্তে অনড় থাকি। চট্টগ্রামের হোটেল রেডিসন উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে আমাকে ডেকে বলেন, র‍্যাবে আরও জুনিয়র অফিসার বদলি দিতে। আমি বুঝিয়ে বলি, পিজিআর (PGR), এসএসএফ (SSF), ডিজিএফআই, বিজিবি—সবখানেই ইতিমধ্যে এত অফিসার দেয়া হয়েছে যে, এ মুহূর্তে অতিরিক্ত অফিসার দেওয়ার মতো অবস্থা সেনাবাহিনীর নেই। তিনি জোরাজুরি করলেও আমি আমার অবস্থানে শেষ পর্যন্ত অটল থাকি।

আজকে আমরা এমন একটা অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছি যে র‍্যাব সম্পর্কে জরুরি সিদ্ধান্ত নেয়া বাঞ্ছনীয়। আমি সেনাপ্রধানকে অনুরোধ করবো যেন তিনি এই প্রতিষ্ঠানটিকে ভেঙে দেয়ার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করেন। সেটি সম্ভব না হলে সামরিক অফিসারদের র‍্যাব থেকে যেন স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করে নিয়ে আসেন। এটি করার জন্য বর্তমান সেনাপ্রধানের যে স্বাধীনতা তৈরি হয়েছে আগের কোনো সেনাপ্রধানের তা ছিল না। তার এই নতুন লব্ধ অবস্থানের জন্যই তাকে অনুরোধ করছি তিনি যেন আমরা যে কাজটি করতে পারিনি সেটি সম্পন্ন করেন।

ষষ্ট অংশ (শেষ)
গাড়িতে ভ্রমণ করার সময়, আমার এডিসি (ADC) পাশের সিটে বসতেন। একবার আমার প্রথম এডিসি, ক্যাপ্টেন (এখন কর্নেল) তৌহিদ জানালেন—এখনকার অনেক তরুণ অফিসার ইচ্ছে করে কোর্সে বেশি নম্বর পেতে চান না। কারণ শীর্ষস্থান (A বা A+) পেলে তাঁদের পোস্টিং হয় এডিসি হিসেবে, অথবা ব্রিগেড/ডিভিশন সদর দপ্তরে স্টাফ অফিসার হিসেবে বা বিএমএ/এসআইঅ্যান্ডটি-তে প্রশিক্ষক হিসেবে—যেগুলোতে ভবিষ্যতের উন্নতির তেমন সুযোগ থাকে না। কিন্তু একটা “ভালো মানের বি” পেলে এসএসএফ, র‍্যাব, ডিজিএফআই বা এ-জাতীয় সংস্থায় পদ পাওয়া যায়, যেখানে পদোন্নতির সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল। আমি এই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সেই উচ্চ-প্রোফাইল পোস্টিংগুলোর চাকচিক্য, তুলনামূলক স্বাধীনতা এবং ক্যারিয়ারের সুযোগ অনেককে আকর্ষণ করতো। এসএসএফ-ই এত বেশি জুনিয়র অফিসার নিয়ে নিত যে এমএস শাখা (MS Branch) অন্যান্যদের চাহিদা মেটাতে গলদঘর্ম হত। SSF-এ কাজ করার সময় তাঁরা নানা বিতর্কিত লোকজনের সংস্পর্শে আসত এবং এতে তাঁদের রেজিমেন্টাল মানসিকতার কিছুটা হলেও ক্ষয় হতো।

আমার দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেল, যখন শুনলাম এসএসএফের একজন অফিসার—মেজর রবি—এসএসএফ আর পিজিআরের অফিসারদের উৎসাহ দিচ্ছেন একজন “মিস্টার নবি”-র কাছে টাকা বিনিয়োগ করতে, যিনি শেয়ারবাজারে লাভজনক মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলেন। এতে ডিজি এসএসএফ মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিন যুক্ত ছিলেন বলে কানে আসে এবং মনে হয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাও বিষয়টি জানতেন। পরে আমার পুরনো ইউনিটের একজন অফিসার, আমাকে জানান, যাঁরা এই বিনিয়োগ করেছিলেন, তাঁরা মুনাফা বা লভ্যাংশ দূরের কথা, আসল টাকাও ফেরত পাচ্ছেন না—কারণ শেয়ারবাজারে ধ্বস নেমেছে। তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা তাঁকে ডিজিএফআই আর র‍্যাব ব্যবহার করে এই টাকা উদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছেন। আমি তাঁকে সাবধানে ও নিজের বিবেচনা অনুযায়ী এগোতে বললাম। অল্প কিছুদিন পর মিস্টার নবি-র সন্দেহজনক মৃত্যু সারা দেশের সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়।

ডিজি-রা তাঁদের ক্ষমতা ব্যবহার করে বেনিফিট পেতেন। একজনের স্ত্রী একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন, যিনি ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করতেন ওখানে বিনিয়োগ করতে। আরেকজন প্রধানমন্ত্রীর সচিবালেয় থেকেই অবৈধ ভিওআইপি (VOIP) চালাতেন। প্রধানমন্ত্রীকে আমি দেখালাম, কী পরিমাণ ফোনকল—মাসে প্রায় এক মিলিয়ন—এসএসএফ লাইনের মাধ্যমে বেরিয়ে যাচ্ছে। তিনি খুব অবাক হয়ে প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদকে তদন্ত করতে বলেন। পরেরবার ওনার সাথে দেখা হলে তিনি আমাকে জানান, তদন্তে অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

mzamin

Sunday, December 15, 2024

রাশিয়া-চীনের কৌশলে হিন্দু নির্যাতনের অপপ্রচার

রাশিয়া ও চীনের  কৌশল অবলম্বন করে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কথিত নির্যাতনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে, বাংলাদেশে ইসলামী শাসন কায়েম ও নিপীড়ন শুরু হয়েছে। অসংখ্য নতুন নতুন একাউন্ট খুলে তার মাধ্যমে এমন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। প্রযুক্তিগত অধিকার-বিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। ১০ই ডিসেম্বর প্রকাশ করা হয়েছে এই প্রতিবেদন। এতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘দ্য অ্যানাটমি অব ডিজইনফরমেশন অব এক্স’। ২৪ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব একাউন্ট থেকে ভুয়া পোস্ট দেয়া হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ভারতভিত্তিক বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবহারকারী। একই সঙ্গে আছে ভারতীয় নন এমন মানুষ। তারা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এক্সে বাংলাদেশকে নিয়ে অপতথ্য ছড়ানোর এসব একাউন্ট রাশিয়া, ইসরাইল ও চীনের ট্রল ফার্ম এবং কি-বোর্ড আর্মি’র (অর্থের বিনিময়ে নিয়োগকর্তা বা সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের স্বার্থরক্ষাকারী গোষ্ঠী) কৌশল অনুসরণ করে সমন্বিতভাবে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সম্প্রতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে। এরপর বিদেশে বাংলাদেশ নিয়ে তথ্যের কারসাজি করে তা প্রচার করা হচ্ছে।  যেমন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরিতে এক্স ব্যবহারকারীরা কীভাবে অপতথ্য ছড়াচ্ছেন, তা দেখানো হয়েছে এ প্রতিবেদনে। ২৬শে জুলাই থেকে ২৬শে নভেম্বর পর্যন্ত ক্ষুদ্র বার্তার সামাজিক মাধ্যম এক্সে বাংলাদেশ নিয়ে রাজনীতিবিষয়ক পোস্ট থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে এক হাজারের বেশি বিষয়বস্তু সংগ্রহ করা হয়। এগুলো থেকে ১০০টি একক ‘ডেটাসেট’ (সংগঠিত ও সংরক্ষিত তথ্য-উপাত্তের কাঠামোগত সংগ্রহ) পেয়েছে টেক গ্লোবাল। এসব স্থানে বিকৃত তথ্য প্রচার করা হয়েছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার যথেষ্ট ঝুঁকি তৈরি করে- এমন উপাদান রয়েছে এসব তথ্যে। এ ডেটাসেট বিশ্লেষণ করেই প্রতিবেদনটি করা হয়েছে। টেক গ্লোবাল বলেছে, অপতথ্য যাচাইয়ের  ক্ষেত্রে সাধারণভাবে মেটার থার্ড পার্টি ফ্যাক্টচেক রেটিং ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়। তবে এ পদ্ধতি এক্স বা ইউটিউবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না-ও হতে পারে। টেক গ্লোবালের মতে, সবচেয়ে বেশি অপপ্রচার চালানো হয়েছে এই নভেম্বরে। এর  মধ্যে শতকরা ৭৭ ভাগই ছড়ানো হয়েছে এক্সের মাধ্যমে। শতকরা ৩৫ ভাগ অপপ্রচারমূলক তথ্য একসঙ্গে পোস্ট করা হয়েছে এক্স, ফেসবুক ও ইউটিউবে। শতকরা ৭১ ভাগ কন্টেন্ট শেয়ার করা হয়েছে ভাইবার, ম্যাসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে। এরপরে আছে আগস্ট মাস। এই দু’মাসে নতুন একাউন্ট করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এসব একাউন্টের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে অপতথ্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য। টেক গ্লোবালের মতে, অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মধ্যে শতকরা ২১৪ ভাগ নতুন একাউন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক একাউন্ট ভেরিফায়েড। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এ একাউন্টগুলো একই হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে। একে- অন্যের পোস্ট রিপোস্টও করে। এমনকি তথ্য যাচাইকারী বা ফ্যাক্টচেকারদের কাছে এগুলো বারবার অপতথ্য ছড়ানোয় যুক্ত একাউন্ট হিসেবেও চিহ্নিত। স্বাভাবিকভাবে এ ধরনের কাজ সংঘটিত নেটওয়ার্কভুক্ত গোষ্ঠীর বলে ধারণা দেয়। এ একাউন্টগুলোর ৭৪ শতাংশ ভুল তথ্যসংবলিত পোস্ট করেছে। অপ্রাসঙ্গিক তথ্য প্রকাশ করেছে ২৪ শতাংশ। আর পরিবর্তন ও সহিংসতার ডাক দেয়া পোস্ট ছিল ১ শতাংশ।

এতে আরও বলা হয়, ১০০ দিনে বর্তমান অন্তর্র্বর্তী সরকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এসব পোস্টের শীর্ষ হ্যাশট্যাগের মধ্যে রয়েছে, #সেভহিন্দুসইনবাংলাদেশ, #বাংলাদেশিহিন্দুজেনোসাইড। এই হ্যাশট্যাগের সঙ্গে থাকা কনটেন্টগুলোর বেশির ভাগই ভুয়া। বিশ্লেষণ বলছে, পোস্ট করা অপতথ্যের বিষয়বস্তুর একটি এমন, ‘বাংলাদেশে হিন্দুদের গণহত্যা চলছে’। এটি মোট অপতথ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ। এ ছাড়া সাম্প্রদায়িক বিষয়ে বিকৃত তথ্য উপস্থাপনের পরিমাণ ২১ শতাংশ। শেয়ার করা কনটেন্টের অন্যতম বিষয়, ‘ধর্মের কারণে হিন্দুরা বৈষম্য বা আক্রমণের মুখে পড়ছে’।
একাউন্টগুলোর উৎপত্তি বোঝার জন্য কিছু সংকেত বিশ্লেষণ করেছে টেক গ্লোবাল। এতে দেখা যায়, এগুলো সম্ভবত বাংলাদেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হচ্ছে বা তাদের বিষয়বস্তুগুলো ভারতীয় অতি জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মিলে যায়। এসব অপতথ্য ভারত ও ভারতের বাইরের ব্যবহারকারীদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে প্রচার করা হচ্ছে।

mzamin

Tuesday, September 3, 2024

ডিবি কর্মকর্তা আরাফাতকাণ্ডে লজ্জিত এলাকাবাসী

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও নিয়ে সারা দেশের ন্যায় বরিশালেও ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাস্তায় পরে থাকা লাশ একটি ভ্যানে স্তূপ করছে পুলিশ সদস্য।

লাশের স্তূপ করতে ব্যস্ত পুলিশ সদস্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি হলেন ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক (তদন্ত) আরাফাত হোসেন। তিনি বরিশালের হিজলা উপজেলার হরিনাথপুর ইউনিয়নের পূর্বকান্দি গ্রামের মুন্সি বাড়ির বাসিন্দা আরিফ সিকদারের বড় ছেলে।

প্রায় দুই বছর আগে ঢাকা জেলার গোয়েন্দা বিভাগে যোগ দেন। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে পড়াশোনা করেন।

তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আরাফাত সবার বড়। আরাফাত হোসেন গ্রামের সবার কাছে আরজু নামে বেশি পরিচিত। আরাফাতের বাবা আরিফ সিকদার বদরটুনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তিনি হিজলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি।

গণমাধ্যম সূত্রে মানুষ জানতে পারেন, ঢাকার সাভারের আশুলিয়া থানায় গত ৫ আগস্ট এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং ভ্যানে তোলা ওই লাশগুলোর পরিচয় যেন নিশ্চিত না যায়, সে কারণে লাশগুলো পুড়িয়ে বীভৎস করে দেওয়া হয়েছে। এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও লাশ পোড়ানোর ঘটনায় পুলিশ সদস্য আরাফাত হোসেনের জড়িত থাকায় বিস্মিত ও লজ্জিত তার (আরাফাত) উপজেলা ও গ্রাম থেকে শুরু করে পুরো জেলার বাসিন্দারা।

আরাফাতের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, টিনশেডের দোতলা ঘরটি তালাবদ্ধ। তালাবদ্ধ ঘরের বিষয়ে একই বাড়ির বাসিন্দা ও আরাফাতের মামাতো ভাইয়ের স্ত্রী সানজিদা বেগম বলেন, আরাফাতের ভাইয়ের স্ত্রী এক সঙ্গে তিন কন্যাসন্তান প্রসব করেছেন। তাদের দেখাশোনার জন্য প্রায় চারমাস আগে থেকে পরিবারের সবাই ঢাকায় আছেন।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওর বিষয়ে তিনি বলেন, ভিডিওটি আমি দেখেছি। হেলমেট হাতে পুলিশের ভেস্ট পরা লোকটি হলেন আমাদের আরজু (আরাফাত) ভাই। এই বাড়িতে বউ হয়ে এসেছি ১৬ বছর। এর মধ্যে আরজু ভাইকে হাতেগোনা কয়েকবার বাড়িতে আসতে দেখেছি। গত বছরও তিনি বাড়িতে এসেছিলেন। তার সম্পর্কে এলাকার কেউ খারাপ মন্তব্য করতে পারবেন না। তবে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে যা দেখলাম, তাতে পুরো বিষয়টিতে আরও মানবিক হওয়া যেত।

আরাফাতের গ্রামের বাড়ি সংলগ্ন মেমনিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের দপ্তরি আব্বাস উদ্দিন বলেন, আরাফাত হোসেন আমাদের সিনিয়র বড় ভাই। এইচএসসি পাসের পরে তিনি ঢাকায় পড়াশোনা করেছেন। তাই এলাকায় যাতায়াত অনেকটা কম ছিল। তিনি কোনোদিন এলাকার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তবে তার বাবা আরিফ উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে।

তিনি বলেন, ভিডিও দেখার পর মন ভেঙে গেছে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যাই হোক না কেন, মৃত ব্যক্তির লাশ নিয়ে এভাবে তাচ্ছিল্য করা ঠিক হয়নি। এ ঘটনা দেখে তার ওপর এলাকাবাসীর শ্রদ্ধাবোধ কমে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা নুর মোহম্মদ সরদার বলেন, পুলিশের চাকরি নেওয়ার পর আরাফাত গ্রামের বাড়িতে কম আসত। আরাফাতকে জড়িয়ে আশুলিয়া থানায় এলাকায় ভ্যানে লাশ উঠানো নিয়ে নানা কথাশুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। পরে ভিডিও দেখে নিজের কাছেই খুব খারাপ লেগেছে।

তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষকের ছেলে হয়ে এমন কাজটি সে করতে পারেন না। তার এ কর্মকাণ্ডে শুধু হরিনাথপুর কিংবা হিজলা উপজেলার মানুষই নয় পুরো বরিশালবাসী এ ঘটনায় লজ্জিত।

Friday, August 30, 2024

গণ-অভ্যুত্থানের গণচরিত্র ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ! by মাহফুজ আব্দুল্লাহ

গণ-অভ্যুত্থানের গণচরিত্র ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ! ব্যক্তির বদলে সামষ্টিক চিন্তা মোকাবেলা গুরুত্বপূর্ণ! গণ-অভ্যুত্থানের অংশীজন কারা? নির্দিষ্ট করে বললে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিক অংশ। এ নাগরিক বা জনতা যদি বলতে চান- তাদের রূপ আর রঙ বহুত। সব শ্রেণি পেশার দল-মতের লোকেরাই এ অভ্যুত্থানের অংশীজন। এখনই কাউকে বড় করে তোলা কিংবা কাউকে খাটো করে দেখার সময় নয়।

কিন্তু, মনে রাখতে হবে এ গণ অভ্যুত্থানের গাঁথুনিতে আছে আন্দোলনের সমন্বয়কেরা এবং আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের পূর্বেকার অভিজ্ঞতাপ্রসূত চিন্তা। সে চিন্তা সামষ্টিক, কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা সেটার প্রতিনিধিত্ব করছেন। এতটুকু বুঝেন। আন্দোলন ছিল ভ্যানগার্ড পার্টির মতন- এ কথাটাও বুঝেন।

বাঙ্গালি ভক্তি অথবা ঘৃণার মাঝামাঝি থাকতে চায় না বোধহয়। Idea বা চিন্তার বদলে Idolization কি ক্ষতিকর, আমরা বিগত ফ্যাসিবাদে দেখেছি। ফলে, চিন্তা নিয়ে কথা বললে ব্যক্তি কম গুরুত্ব পাবে এবং চিন্তাকে কেন্দ্র করেই বিতর্ক চলবে। এর মাধ্যমেই একটা সৃজনশীল রূপান্তর সম্ভব। সবাই এর মাধ্যমেই উপকৃত হবে।

আমরা চাই, এত দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের ভেতরে গড়ে ওঠা সব চিন্তাকে প্রতিনিধিত্ব করতে। সেটা দুরূহ কাজ। কিন্তু, এরকম না হলে পুরাতন ইডিওলজিকাল ফেসাদে আমরা খাবি খাব। আর, সবাই নিজস্ব খোপে বেহুদা তর্কে ও ব্যক্তি আক্রমণে নিজেদের ক্লান্ত করে তুলবেন।

গণ-অভ্যুত্থান ব্যখ্যার স্বাধীনতা সবার আছে। সেটাই কাম্য। কিন্তু, গণ-অভ্যুত্থানের ভেতরকার চিন্তাগত ডিনামিজম যে গুটিকয় জানবেন, সেটা তো অস্বাভাবিক না। এ গুটিকয় লোক সামষ্টিক চিন্তার প্রতিনিধিত্ব না করলে এবং সবাইকে ধারণের বিশালতা না রাখলে, প্রতিবাদ ন্যায্য। কিন্তু, এ অন্তর্গত ডিনামিজিম যে গণ-অভ্যুত্থানের জন্য ক্যাটালিস্ট ভূমিকা রাখছে, সেটা ভুলে গেলে মবোক্রেসিই চলবে, তর্ক আর সংলাপ সুদূর পরাহত। আপনাকে তো একটা বিন্দু থেকে শুরু করতে হবে!

আমরা কেবল ভবিষ্যত বাংলাদেশ নিয়ে নোকতা দিয়েছি, শুরুর বিন্দুগুলো বলেছি। এখন আবার আমরা জনগণের কাছে যাব, আরো বিচিত্র চিন্তাকে একোমডেইট করে কিভাবে সেটাকে রাষ্ট্রকল্পে রিপ্রেজেন্টেড করে তোলা যায়, সে চেষ্টা করব। আমরা ভুলতে চাইনা যে, আমরা নেতৃত্ব ও চিন্তার জায়গাতে ছিলাম, নিজেদের শক্তিতে নয় বরং আপনাদের প্রতিনিধিত্বের শক্তিতে।

আমরা ব্যক্তিমানুষ নশ্বর, এই আছি এই নেই।

কিন্তু চিন্তা ও গণচেতনা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটাই আমাদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের জীবনীশক্তি তথা আবেহায়াত!

পুনশ্চ: একজন বলছিলেন, যদি রাজনৈতিক শক্তি আকারে সংঘটিত হয়ে নির্দিষ্ট রূপকল্পের ভিত্তিতে এ গণ-অভ্যুত্থান হত, তাইলে এটা বিপ্লবী সরকারে গিয়ে ঠেকত! ফলত, এখানে মাস্টারমাইন্ড জাতীয় কিছু নেই। হইলে আমরাই খুশি হইতাম এবং ঘোষণা দিয়ে সরকার গঠন করে নিজেদের জানান দিতাম। কিন্তু, আমরা আজীবন লড়াই করব, সে পরিপূর্ণ বিজয়ের জন্য। সেদিন এ মুকুট আমরা নিজেরাই ধারণ কিরব। অদ্য নয়!

এ গণ-অভ্যুত্থান বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে বলে আপনারা আমোদিত, বিহবল- সত্য। কিন্তু, এত দ্রুতই কাল্টিজমের দিকে যাইয়েন না। তাইলে আমাদের দীর্ঘ লড়াই বাধাগ্রস্ত হবে। এখন সময় জনগণকে সাথে নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান করার! জনগণই আমাদের মাস্টারপ্ল্যানার!

(ফেসবুক থেকে নেয়া)

Thursday, August 29, 2024

মানুষ নয়, আওয়ামী লীগের পক্ষে ফেসবুকে মন্তব্য করেছিল ‘বট’ by সামছুর রহমান

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে আওয়ামী লীগের পক্ষে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিরোধী দলের ফেসবুক পেজে নানান মন্তব্য করা হয়েছে ভুয়া বা ফেক ফেসবুক প্রোফাইল থেকে।

আর এসব ফেসবুক প্রোফাইল পরিচালিত হয়েছে বট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এমন ১ হাজার ৩৬৯টি ফেসবুক প্রোফাইলের একটি বট নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলেছে গবেষণায়।

তথ্যব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ ডিসমিসল্যাব গবেষণাটি করেছে। গবেষণা প্রতিবেদনটি আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশ করার কথা।

গবেষণায় দেখা গেছে, ফেসবুক প্রোফাইলগুলো থেকে আওয়ামী লীগের পক্ষে ১৯৭টি পোস্টে সমন্বিতভাবে ২১ হাজারের বেশি মন্তব্য করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন পোস্টে একই মন্তব্য করেছে। একই মন্তব্য বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে পোস্ট করা হয়েছে।

বট অ্যাকাউন্ট ও এর করা মন্তব্যের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ এই গবেষণাটি করা হয়েছে মোট ১৯৭টি পোস্টে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।

বট নেটওয়ার্ক মূলত একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, যেখানে বিশেষ সফটওয়্যারের (বট) মাধ্যমে কাজ করা হয়। বট নেটওয়ার্কের কার্যক্রম পুরোপুরি না হলেও অন্তত আংশিকভাবে কম্পিউটারভিত্তিক বা স্বয়ংক্রিয়। তারা একটি তালিকা থেকে নির্দিষ্ট ‘কি-ওয়ার্ড’ বা শব্দ ধরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পোস্ট বাছাই করে। আরেকটি তালিকা থেকে বেছে নিয়ে মন্তব্য পোস্ট করে। এই প্রক্রিয়ায় কোথায় কী মন্তব্য পোস্ট করা হচ্ছে, সেখানে মানুষের নজরদারি নেই বললেই চলে।

গবেষণায় দেখা যায়, বট নেটওয়ার্কটি সক্রিয় হয় গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ দিয়ে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বট নেটওয়ার্কটি ঘুরেফিরে ৪৭৪টি একই ধরনের রাজনৈতিক মন্তব্য করেছে।

মন্তব্যগুলো নির্বাচনের আগে তৈরি করা। কিন্তু বট নেটওয়ার্কটি নির্বাচনের পরেও একই মন্তব্য পোস্ট করে গেছে। বট নেটওয়ার্কটি লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে দেশের প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম ও তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পেজগুলোকে।

গবেষণায় ভুয়া প্রোফাইলগুলোর মধ্যে একধরনের সংযোগ থাকার চিত্র পাওয়া যায় দুটি নির্দিষ্ট পেজে লাইক দেওয়ার প্রবণতা থেকে।

প্রোফাইল ‘লকড’ নেই—এমন ১ হাজার ১২৪টি অ্যাকাউন্টের ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সেগুলো ‘বাংলার খবর’ ও ‘আওয়ামী লীগ মিডিয়া সেল’—এই দুটি পেজের কোনো একটিকে বা দুটিকেই অনুসরণ (ফলো) করে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর থেকে আওয়ামী লীগ মিডিয়া সেল পেজটি আর পাওয়া যাচ্ছে না।
বট নেটওয়ার্কের খোঁজ

গত ২১ জুন ‘কালার প্রিন্টারে ছাপানো প্রতিটি পৃষ্ঠায় থাকে অদৃশ্য কোড?’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয় অনলাইন গণমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও এর ফেসবুক পেজে। উভয় ক্ষেত্রে পোস্টের নিচে একটি মন্তব্য ছিল—‘এবারের নির্বাচন স্বচ্ছ হবে। আগামী নির্বাচনে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে। আর এবার ভোট চুরি করতে পারবে না বলেই বিএনপি নির্বাচনে আসতে ভয় পাচ্ছে আর এত কাহিনি করছে।’

নির্বাচনের প্রায় ছয় মাস পরে এসেও ‘ব্যবহারকারীরা’ এই পোস্টের নিচে বিএনপির সমালোচনা, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফল ও সুষ্ঠুভাবে হওয়ার আশাবাদ, ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবিসহ নানান রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে একের পর এক মন্তব্য করে।

এমন মন্তব্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে ১ হাজার ৩৬৯টি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের একটি বট নেটওয়ার্কের সন্ধান পায় ডিসমিসল্যাব। নেটওয়ার্কটি মাত্র ছয় মাসে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের পক্ষে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিরোধী দলের ফেসবুক পেজের ১৯৭টি পোস্টে সমন্বিতভাবে ২১ হাজারের বেশি মন্তব্য করেছে।

গবেষণার জন্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সেই ফেসবুক পোস্ট থেকে প্রতিটি মন্তব্য সংগ্রহ করে ডিসমিসল্যাব। সেই তালিকা ধরে গুগলে সার্চ দিয়ে একই মন্তব্য রয়েছে—এমন আরও ১৯৬টি পোস্ট বের করা হয়। সেসব পোস্ট থেকে আবার প্রতিটি মন্তব্য নিয়ে ৩৫ হাজার মন্তব্যের একটি ডেটাবেস তৈরি করা হয়। এই ডেটাবেস থেকে বট অ্যাকাউন্ট ও এর করা ২১ হাজারের বেশি রাজনৈতিক মন্তব্য আলাদা করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, বট নেটওয়ার্কটি সাধারণত রাজনৈতিক পোস্টেই মন্তব্য করে। ফেসবুক পোস্টে নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক ‘কি-ওয়ার্ড’ বা শব্দ পেলে তারা সেই পোস্টে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু কখনো কখনো তাদের ভুল হয়। যেমনটি হয়েছে ‘ইসি’ (নির্বাচন কমিশন) শব্দের ক্ষেত্রে। কালার প্রিন্টার-সংক্রান্ত খবরটির সারাংশে ‘মেশিন আইডেনটিফিকেশন কোড (এমআইসি) ’-এর উল্লেখ ছিল। সেখানে ‘ইসি’ শব্দাংশ দেখেই বট নেটওয়ার্কটি শ খানেক মন্তব্য করে।

প্রোফাইলগুলো কেন ভুয়া

ফেসবুকের একটি প্রোফাইল আসল নাকি নকল, তা যাচাইয়ের জন্য সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বট প্রোফাইলে অতিরিক্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। নিজের সম্পর্কে (অ্যাবাউট সেকশন) পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয় না। প্রোফাইলে পোস্টসংখ্যা হয় খুব কম, নয়তো খুব বেশি। প্রোফাইল ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা হয়। বন্ধুসংখ্যা সচরাচর কম হয়।

ডিসমিসল্যাব ১ হাজার ৩৬৯টি প্রোফাইলের প্রাইভেসি সেটিংস, বন্ধুসংখ্যা, পোস্ট করার প্রবণতা, পরিচিতি তথ্য ও প্রোফাইল ছবি পর্যালোচনা করেছে। দেখা গেছে, বেশির ভাগের প্রোফাইল ‘লকড’ বা ‘প্রাইভেট’ করা। সেগুলো সক্রিয় হয়েছে নির্বাচনের আগে। প্রোফাইল ছবি নেই অথবা চুরি করা। তাদের বন্ধুসংখ্যা খুব কম বা নেই। বেশির ভাগ অ্যাকাউন্ট দুটি নির্দিষ্ট পেজকে ফলো করে। আর এই বৈশিষ্ট্যগুলো রাজনৈতিক বটের প্রচলিত সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে যায়।

প্রোফাইলগুলোর মধ্যে ২৪৭টি ‘লকড’ অবস্থায় ছিল। বাকি ১ হাজার ১২২টি অ্যাকাউন্টের মধ্যে ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে প্রোফাইল ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা। অর্থাৎ, ছবিগুলো অন্যের। কোথাও কোথাও একই ছবি বিভিন্ন প্রোফাইলে ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণার ১ হাজার ৩৬৯টি প্রোফাইলের ৭৭ শতাংশ নারীদের নামে। এই নামেও রয়েছে অদ্ভুত মিল। নারীদের প্রোফাইলের ২৪ শতাংশের নাম ‘আক্তার’ দিয়ে শেষ হয়েছে। যেমন—দিয়া আক্তার, রিয়া আক্তার, লিজা আক্তার, লিমা আক্তার, লিসা আক্তার ইত্যাদি।

পুরুষদের প্রোফাইলগুলোর একটি বড় অংশের শেষ নাম হিসেবে ব্যবহার হয়েছে ‘আহমেদ’। যেমন—নাঈম আহমেদ, নাদিম আহমেদ, কামিল আহমেদ, মাহিন আহমেদ, সামির আহমেদ ইত্যাদি।

নারী-পুরুষ উভয় ধরনের প্রোফাইলের ৯০ শতাংশ নামই দুই শব্দের। কিছু ক্ষেত্রে একটি নামকেই ভেঙে দুই শব্দ করা হয়েছে। যেমন—রি পা, মি না, লি জা, যু থি, লাম ইয়া, মু না, নে হা, জোস না ইত্যাদি।
নির্বাচনের আগে সক্রিয় হয় অ্যাকাউন্টগুলো

কোনো বট প্রোফাইল প্রথম কবে কনটেন্ট বা আধেয় পোস্ট করেছে, সেই সময়কে সক্রিয়তার নির্দেশক হিসেবে ধরা হয় গবেষণায়।

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় গত ৭ জানুয়ারি। আর ফেক প্রোফাইলগুলো সক্রিয় হয়েছে মূলত গত বছরের জুন থেকে নভেম্বরের মধ্যে।

ফেক প্রোফাইলগুলোর অর্ধেকই সক্রিয় হয়ে ওঠে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে। শুধু নভেম্বরের ২৩ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে প্রথমবারের মতো পোস্ট করে ৩৪৪টি অ্যাকাউন্ট। এর আগে ২ থেকে ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৪০টি প্রোফাইল সক্রিয় হয়।
কোথায় কী মন্তব্য

গবেষণায় রাজনৈতিক মন্তব্য পাওয়া গেছে ২১ হাজার ২২১ টি। কিন্তু এগুলোর মধ্যে স্বতন্ত্র বা ইউনিক মন্তব্য ছিল মাত্র ৪৭৪ টি। অর্থাৎ বটগুলো বিভিন্ন পোস্টে ঘুরে ফিরে এই ৪৭৪টি মন্তব্যই করেছে। বটগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

যেমন—রিয়া আক্তার নামের একটি প্রোফাইল থেকে গত ছয় মাসে বিভিন্ন পোস্টে ১৩৮টি মন্তব্য করা হয়েছে। নির্বাচনের অনেক পর গত ১৮ মে এই প্রোফাইল থেকে একটি মন্তব্য করা হয়।

বিভিন্ন সময় মোট ৯৬টি পোস্টে একই মন্তব্য করা হয়েছে দিয়া আক্তার, রাইসা, রাফিয়া আক্তার, নাহিদ ও নিপাসহ মোট ১০৯টি বট প্রোফাইল থেকে।

বট নেটওয়ার্কটি মূলত ৪২টি ফেসবুক পেজকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, যেগুলো মূলত বিভিন্ন গণমাধ্যম ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের। এর মধ্যে ৬৮ শতাংশ পেজ প্রথম সারির ও পরিচিত গণমাধ্যমের। এককভাবে ৩১ শতাংশ পেজ হলো বিএনপির বা বিএনপি-সংশ্লিষ্ট। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণসংহতি আন্দোলনের পেজকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়।

আধেয় পর্যালোচনায় দেখা যায়, বট মন্তব্যগুলোর ৮৬ শতাংশেই বিএনপি ও দলটির নেতা-নেত্রীদের সমালোচনা বা তাদের প্রতি আক্রমণ করা হয়েছে। যেমন—‘আগুন-সন্ত্রাসী সংগঠন বিএনপি। এদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি’ বা ‘আত্মসাৎ, অর্থপাচার করে বাংলাদেশকে লুটপাট করার হাওয়া ভবন করার চক্রান্ত করছে বিএনপি’। বাকি ১৪ শতাংশ মন্তব্যের বিষয়বস্তু ছিল সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রশংসা এবং নির্বাচন শান্তিপূর্ণ বা সুষ্ঠু করার আহ্বান।

বটের বোকামি

নির্বাচন হয় গত ৭ জানুয়ারি। কিন্তু ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল, মে বা জুন মাসেও বট প্রোফাইলগুলো থেকে ‘আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন’, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, মন্তব্যগুলো নির্বাচনের আগে তৈরি করা। কিন্তু তা নির্বাচনের পরেও নির্বিচারে পোস্ট করা হয়েছে।

বট প্রোফাইল থেকে অপ্রাসঙ্গিক পোস্টেও রাজনৈতিক মন্তব্য করা হয়েছে। এসব পোস্টের প্রতিটির বিবরণেই কোনো না কোনোভাবে ‘ইসি’ শব্দটি আছে। যেমন—আইসিইউ, আইসিসি, রইসি, আইএফআইসি, ওআইসি, আইসিটি, ডায়ালাইসিস বা ক্রাইসিস।

বট নেটওয়ার্কটি তার লক্ষ্যবস্তু পেজে যেখানেই ‘ইসি’ শব্দাংশ পেয়েছে, সেটি প্রাসঙ্গিক হোক আর না হোক, সেখানেই সমন্বিতভাবে রাজনৈতিক মন্তব্য করেছে। গবেষণায় বলা হয়, এটি ইঙ্গিত করে, নেটওয়ার্কটি কোন পোস্টে মন্তব্য করবে, সেটি বাছাইয়ের জন্য কি-ওয়ার্ড-নির্ভর একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
সংঘবদ্ধ অপপ্রচারের উদাহরণ

ডিসমিসল্যাবের গবেষণা দেখাচ্ছে, বট নেটওয়ার্কের বিস্তার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও নির্ভুল তথ্য ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এই ধরনের নেটওয়ার্ক অন্যান্য দৃষ্টিভঙ্গিকে দমন করতে পারে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রচার করার মাধ্যমে জনসাধারণের আলোচনাকে বিকৃত করতে পারে। এই কারসাজি জনমতের মেরুকরণ করতে পারে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা নষ্ট করতে পারে।

বট নেটওয়ার্কটি কম্পিউটারভিত্তিক অপপ্রচারের একটি উদাহরণ বলে মন্তব্য করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের ফিলিপ মেরিল কলেজ অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইনফরমেশন স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক নাঈমুল হাসান। তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ ও কম্পিউটারভিত্তিক টুলের সাহায্যে সংঘবদ্ধভাবে মূলত এই কাজগুলো করা হচ্ছে।

নাঈমুল হাসান আরও বলেন, ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগুলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে আরও উন্নত হবে। ফলে একই প্রোফাইল ছবি বিভিন্ন ভুয়া অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়বে না। এআই দিয়ে নিমেষেই অনেকগুলো প্রোফাইল ছবি তৈরি হয়ে যাবে, যাতে সংঘবদ্ধ অপপ্রচারমূলক আক্রমণগুলো চিহ্নিত করা কঠিন হয়। তাই এখন থেকেই এই বিষয়গুলো নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।

Friday, August 16, 2024

তাসরিফের পোস্ট নিয়ে যা বললেন আব্দুল্লাহ আল ইমরান

নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুলেছেন জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার তাসরিফ খান। এরপর একই বিষয়ে আরও ভয়াবহ তথ্য জানিয়েছেন তার টিম সদস্য ও সোশ্যাল মিডিয়া এক্সপার্ট আব্দুল্লাহ আল ইমরান। শুক্রবার (১৬ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি।

নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আব্দুল্লাহ আল ইমরান লেখেন, গতকাল Tasrif Khan ভাইয়ের পোস্ট দেখেছি। আমি পোস্ট দেওয়ার আগে থেকেই জানি ওনার সঙ্গে ঘটা ওই ভয়াবহ ঘটনার কথা। এমনকি তাসরিফ ভাই আন্দোলনে যখন সশরীরে অংশগ্রহণ করেন তখন তার পেইজের অ্যাডমিন আমাকে রেখে নিজে রিমুভ হয়ে যান, যাতে ওনাকে ধরে ফেললেও, ওনাকে দিয়ে প্রাক্তন সরকারি দোষরেরা কোনো পোস্ট দেওয়াতে না পারে!

এসব আড়ালের গল্প! আমি বলতাম না, তবে অনেকেই উনাকেও ট্রল করেছেন, এগুলো দেখে বিরক্ত হয়ে জাস্ট এটুকু বললাম। একইভাবে পুরো আন্দোলনজুড়ে আমার টিম কাজ করে গেছে অনলাইন-অফলাইন দুভাবে! অনলাইনে আইটি সাপোর্ট, অফলাইনে ফাইন্যান্সিয়ালি হেল্প এবং মাঠে নেমে আন্দোলন- সব-ই করেছে। আপনারা দেখেছেন।

এর বাইরেও যেটা করেছে সেটা হচ্ছে ‘প্রতিশ্রুতি’ রক্ষা। আমরা বলেছিলাম, এমন কারো কাজ করব না যারা স্টুডেন্টদের বিপক্ষে কাজ করছে। প্রাক্তন সরকারি বহু পেইজ, অ্যাকাউন্ট চলে যাওয়া পুনরুদ্ধারের জন্য আসলেও আমরা কাজগুলো করিনি।

আবার প্রতিবাদ করে ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে পোস্ট করায় ‘এক আইনপ্রয়োগকারী গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান’ থেকে ফোনকল-ও আসে, পোস্ট ডিলেটের জন্য। আসল ঘটনাটা একটু বলি-

ঘটনা-১: আমি আন্দোলন শুরুর দিকে আফ্রিদির পেইজে অ্যাডমিন হই ওর পেইজের ইস্যু সলভের জন্য। আন্দোলন শুরুর পর হুট করে ওর পেইজের অ্যাডমিন থেকে আমার আইডি রিমুভ করে এবং কিছুক্ষণ পরই সে পেইজ আনপাবলিশড করে ফেলে!!

একটু পর ইন্সটাগ্রামে পোস্ট দেয়, তার পেইজ এবং অ্যাকাউন্ট হ্যাক, কেউ পারলে হেল্প করেন! আমি তখন-ই নাটকের কাহিনি ধরে ফেলি! আমাকে কয়েকজন মেসেজ দিয়ে ওর ইন্সটাগ্রামের স্টোরি দেখালে সবাইকেই বলি এটা নাটক! আমি একটু আগেও অ্যাডমিন ছিলাম!

ঘটনা-২: এর দুইদিন পর মেবি হাউন আংকেলের টুনটুনির ভিডিও ভাইরাল হয়। রাতের বেলায় আফ্রিদির কল আসে আমার কাছে। ফোন দিয়ে বলে হাউন আংকেলের ওই ভিডিও ফেসবুকের সব জায়গা থেকে রিমুভ করতে হবে যত টাকাই লাগুক। আমি বললাম ১০ মিনিট পর কল দেন, টিমের সঙ্গে কথা বলি। আমি প্রথমে থতমত খেয়ে গেছি, এই ছেলে কি বলে এই সময় এটা ভেবে!! যাই হোক, ১০ মিনিট পর কল দিলে তা আমিসহ আমার টিম মেম্বার সবাই শুনে এপাশ থেকে এবং আমি বলে দেই আমার টিম রিমুভ করতে পারবে না।

ঘটনা-৩: এর-ও এক/দুই দিন পর আমি খবর পাই ২৩ জন ইনফ্লুয়েন্সার নিয়ে আফ্রিদি, শেখ তন্ময় অ্যান্ড আরও অনেকে একটা ইনফ্লুয়েন্সার ক্যাম্পেইন করার মিটিং করবে। পরেরদিন বিস্তারিত শুনি যে মিটিংয়ে কি কি হয়েছে এবং কে ওই ক্যাম্পেইন লিড দিয়েছে। এমনকি যারা যারা ক্যাম্পেইনে আসেনি তাদের পরবর্তীতে দেখে নিবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। এগুলো শুনে আমি প্রচণ্ড বিরক্ত হয় এবং একটা পোস্ট দেই ইনফ্লুয়েন্সার আর ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে!!

ব্যাস পোস্টটা একটু ভাইরাল হতেই আমাকে আফ্রিদি কয়েকবার কল দেয়, আমি ধরতে পারিনি পরে দেখি একটি সংস্থা থেকে ফোন আসে। ‘আমাকে ঠাণ্ডা মাথায় বলা হয়, যেন পোস্ট ডিলেট করি। আমি বললাম, আমি পোস্টে কারো নাম বলিনি এই সেই, উনি বল্লো যেটাই হোক, উনি আমাকে ফোর্স করছেন না তবে আমি যেন পোস্টটা ডিলেট করি। আর অনেকেই তো পোস্ট করতেছে আমাকেই কেন ফোন দিল, নিশ্চয়ই অনেক জায়গায় আমার ব্যাপারটা মনিটরিং করা হচ্ছে। আরও বললো, উনি আফ্রিদিকে বলে দিবে যাতে পরবর্তীতে আমার সঙ্গে ঝামেলা না করে।’

সো, এতোকিছু সহ্য করতে হইসে আমাদের তবুও মানুষ ওদের মায়াকান্নায় সব ভুলে যাবে! আফ্রিদি তাও চুনোপুঁটি, সোলায়মান শকুন তো বিগ ফিশ! তাশরিফ ভাইকে ভয় দেখিয়ে ডাকাসহ ক্যাম্পেইনের বিরাট অংশ ম্যানেজ করেছে সে। যদি ওরা টিকে যেত হয়তো এই পোস্ট করা লাগত না আমার, আয়নাঘরের এক কোণায় পড়ে থাকতাম। এদের মাফ করে দিয়েন না এটাই অনুরোধ। সবাইকে মাফ করা যায়, বেইমানদের না।

সেই রাতে তাসরিফের সঙ্গে যা ঘটেছিল

সম্প্রতি নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার তাসরিফ খান। বৃহস্পতিবার (১৫ আগস্ট) নিজের ফেসবুক পেজে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।

নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তাসরিফ খান শুরুতে লেখেন, কিছু নির্মম ইতিহাস টাইমলাইনে থাকুক। তার স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।

শুরুতে তাসরিফ খান লিখেন, ‘২৩ জুলাই রাত রাত ১টার কথা বলছি। একজন সিনিয়র ইনফ্লুয়েন্সার কল দিয়ে বললো, ‘তাসরিফ, তোর বাসার নিচে নাম, চা খাইতে আসতেছি, গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আছে।’ ৫ জুলাই থেকে ছাত্রদের পক্ষে বিভিন্ন পোস্ট করা, কবিতা লিখতে থাকা এবং ‘রাজার রাজ্যে সবাই গোলাম’ গানটা ফেসবুকে চলতে থাকায় সরকারি গুন্ডা বাহিনীর থ্রেটে আমি তখন বাসার বাইরে অবস্থান করছিলাম। ওই সিনিয়র ইনফ্লুয়েন্সারের কথায় বিশ্বাস করে আমি তখন বাসার সামনে আসি উনার সঙ্গে দেখা করতে। গাড়ি থেকে ৬-৭ জনের মতো নেমে আসে। ইনফ্লুয়েন্সার সাহেব আমাকে একটু সাইডে নিয়ে আস্তে করে বুঝিয়ে বলে, ‘সঙ্গে যারা আছে তারা একটা এজেন্সির লোক এবং আইন প্রয়োগ সংস্থার বাহিনীর কয়েকজনও আছে এখানে।’ আমি তখন উনার কাছে জানতে চাই যে, উনারা কেন এসেছেন, কী চাচ্ছেন মূলত!

উনি তখন বুঝিয়ে বলেন, ‘সরকারি একটা কাজ আছে, এই সরকার আরও ৭-৮ বছর ক্ষমতায় থাকব। আমরা ঠিকমতো বাঁচতে চাইলে সরকারের পক্ষে কাজ করতে হইবো, এর বাইরে কোনো রাস্তা নেই।’ এ কথা বলে উনি আবার আমাকে গাড়ির কাছে নিয়ে যান। সেই ৬-৭ জনের মধ্য থেকে একজন আমাকে বলে, ‘তাসরিফ, তোমাকে আমরা চিনি। আমরা তোমাকে একটা স্ক্রিপ্ট দিতেছি, ছোট্ট একটা ভিডিও করতে হবে। এ ভিডিওটা আমাদের কালকের মধ্যে লাগবে। পরশু সরাসরি প্রধানমন্ত্রী এই ভিডিওটা দেখবে এবং তারপর তুমি আপলোড করবা।’

সেই ইনফ্লুরেন্সার তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমাকে বলে, ‘দেখ তাসরিফ, পিএমের চোখে পড়ার এটাই সুবর্ণ সুযোগ, ভিডিওটা ভালো করে কর, সরকার যতদিন আছে সুবিধা পাবি।’ কথা শেষ করার আগেই উনি পকেট থেকে এক লাখ টাকার তিনটা বান্ডেল, মোট তিন লাখ টাকা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘এটা সামান্য ছোট একটা গিফট! টাকা যত চাস, তত দেওয়া হবে, ভিডিওটা সুন্দর কইরা কর।’

ঠিক এ সময় আমার ফোনে আমার ব্যান্ডের ড্রামার শান্তর নাম্বার থেকে একটা কল আসে। ফোন রিসিভ করতেই শান্ত আমাকে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘তাসরিফ! পাঁচ ছয়জন পুলিশ এবং সিভিল ড্রেসের কয়েকজন মিলিয়ে আমাকে রোল দিয়া সারা শরীরে মারছে!’ শান্তর কথা শুনে আমার হাত-পা একরকম কাঁপতে থাকে। আমি বোঝার চেষ্টা করি, এই মাইর খাওয়াটা কি আমাকে এদিকে রাজি করানোর জন্য ভয় দেখানো? নাকি শুধু একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা? শান্তর লাইন কেটে যায়।

আমি আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয় দেওয়া তাদের বলি, ‘ভাই, এইমাত্র কয়েকজন মিলে আমার ভাই, আমার ব্র্যান্ডের ড্রামার শান্তকে প্রচুর মারছে!’ ওরা জাস্ট আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ‘আরেহ! দেশের যে অবস্থা, এটা এখন কিছু করা যাবে না। ওরে বলো বাসায় চলে যাইতে।’

আমার তখন মাথায় আসে, এখন যদি আমি ওদের টাকা ফেরাই দেই অথবা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাই, তবে তারা আমাকে চাইলেই গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে ভিডিও করে জোরপূর্বক আপলোড করাতে পারে। আমি তাই মাথা ঠাণ্ডা করে ওদের বলি ঠিক আছে আমি দেখতেছি কি করতে পারি, কালকের মধ্যে জানাচ্ছি। ওরা আমাকে তখনো একরকম থ্রেট দিয়ে বলে, ‘ভাই জানাচ্ছির সুযোগ নাই! সিচুয়েশন তো বুঝেনই। ভিডিও কালকেই লাগবে।’ সঙ্গে ওই ইনফ্লুয়েন্সারও আমাকে বলে, ‘তাসরিফ, ভিডিওটা তো পিএম দেখবে সো বুইঝা শুইনা সুন্দর কইরা করিস।’

ওদের সঙ্গে কথা শেষ করে আমি বাসায় ফেরত যাই। বাসায় সবাইকে সব সিচুয়েশন জানিয়ে আমি আমার ম্যানেজার আয়মান সাবিতকে ফোন দিয়ে বলি, ‘আয়মান, আমি বাসা ছেড়ে দিচ্ছি, এই এই ঘটনা ঘটছে। আমি তোকে নাম্বার দিচ্ছি, তুই ওই এজেন্সিকে আমার বাসা থেকে তিন লাখ টাকা নিয়ে ওদের দিয়ে দিবি কালকেই। আমি আপাতত বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছি, কারণ আমি বাসায় থাকলে ওরা আমাকে তুলে নিয়ে যাবে।’

ওই সময় আমার মনের অবস্থা আমি জানি। আমার বাসার অবস্থা, ডায়াবেটিসের রোগী আমার আম্মুর অবস্থা, আব্বুর টেনশন, গুম হয়ে যাওয়ার চিন্তা এবং দেশের সঙ্গে বেইমানি করতে ওরা আমাকে বাধ্য করতে চাচ্ছে, সবকিছুই আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সঙ্গে বারবার আমার কানে বাজছে শান্তর ওই কান্না ভরা আর্তনাদ।

কষ্টের ব্যাপার কি জানেন? এ ঘটনার ঘণ্টাখানেক আগে শান্ত আমাকে ফোন দিয়ে বলছিল, ‘খান, আমার বাসায় আম্মা নাই। এদিকে কারফিউ চলছে, দুপুরবেলা খাওয়া হয় নাই, একটা দোকানও খোলা নাই- আমার প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগছে, কি করব?’ আমি শান্তকে বলছিলাম, ‘এক বড় ভাই ফোন দিছে, আমার বাসার সামনে যাওয়া লাগতেছে, তো তুমি আমার বাসায় চইলা আসো, দুই ভাই একসাথে খাব।’ ছেলেটা চাইছিল আমার বাসায় এসে ভাত খাইতে অথচ তাকে রাস্তায় বেধড়কভাবে মাইর খাইতে হইল। মার খাওয়ার পরে ফোনকলে ও আমাকে এটাও বলছিল যে, ‘খান! সবাই আমারে একসাথে রোল দিয়ে মারতেছিল আর একজন বন্দুক তাক করে চিল্লায়ে বলছিল, চুপচাপ মাইর খা অমুকের পোলা নাইলে গুলি কইরা মাইরা ফালামু, লাশ খুঁজে পাইব না তোর পরিবার!’

শান্ত এই কথাটা বলতে বলতে কাঁদতেছিল যে, ‘আমাকে ছাত্র বইলা বইলা ওরা মারছে আর বারবার বলতেছিল যে, এই অমুকের পোলা ছাত্র! ওরে মার!’ ওই রাতে আমি বাসা থেকে পালিয়ে যাই।

আমি জানি কয়েকটা পোস্ট, কবিতা লেখা আর ‘রাজার রাজ্যে সবাই গোলাম’-এর মতো কিছু গান করা ছাড়া দেশের জন্য তেমন কিছুই করতে পারি নাই। আমি জানি, আমি আবু সাঈদের মতো পথে গিয়ে বুক পেতে দিতে পারিনি। হয়তোবা এতটুকু সাহস আমার তখন হয়নি নাই। তবে, আল্লাহ জানেন আর আমি জানি, আমি টাকার কাছে বিক্রি হয় নাই আর দেশের সাথে বেইমানি করি নাই।

এই পোস্ট, পোস্টে শান্তর ছবিগুলা এবং ওদের নির্মমতার কথাগুলো আমি লিখে পোস্ট করছি এই কারণে, যেন ভবিষ্যতে কখনো এই স্বৈরাচারের প্রতি আমার ঘৃণা এতটুকু পরিমাণও কমে না যায়।

Friday, August 2, 2024

নিজের ফেসবুক লাল করলেন ড. ইউনূস by তারিক চয়ন

‘রক্ত লাল’ প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার সরব হয়েছিল সমগ্র বাংলাদেশ। মুখে আর মাথায় লাল কাপড় বেঁধে মিছিল-র‌্যালি হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যুক্ত হয়েছিলেন এসব কর্মসূচিতে, শিল্পী-সংস্কৃতিসেবীরাও যোগ দেন। চোখে-মুখে লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ করতে দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীরা। এরপর প্রতিবাদ চলে অনলাইন ও অফলাইনে। যা কিনা এখনও চলছে।

ওইদিন থেকে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক লাল রক্তে ছেয়ে যায়। কারো আইডিতে প্রবেশ করলে যেমন লাল রঙ দেখা যায়, তেমনি কারো পোস্ট দেখতে গেলেও চোখে পড়ে লাল রঙ। শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে কোটি কোটি নেটিজেন নিজেদের ফেসবুক 'প্রোফাইল পিকচার' কিংবা 'কাভার ফটো' পরিবর্তন করে লাল রঙ সেঁটে দেন। বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে খ্যাতনামা অনেক ব্যক্তি, প্রবাসী বাংলাদেশি, এমনকি বিদেশিরাও এমনটা করেছেন। অনেকে এখনও করছেন।

এবার সে তালিকায় যুক্ত হলেন বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী, অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। বৃহস্পতিবার (০১ আগস্ট) ফেসবুকে নিজের অফিসিয়াল এবং ভেরিফাইড (ব্লু টিক যুক্ত) পেইজের প্রোফাইল পিকচার লাল করেন প্রফেসর ইউনূস। তার ওই পেইজে দেশ-বিদেশের প্রায় ২৫ লাখ ফলোয়ার রয়েছেন। মূহুর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার শীর্ষে উঠে আসে বিষয়টি। আধা ঘন্টা যেতেই আড়াই হাজার বার শেয়ার করা হয় তার প্রোফাইল পিকচার। লাইকের বন্যার পাশাপাশি কমেন্ট সেকশনে প্রায় সবাই ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন।

হেফাজত থেকে মুক্ত হয়ে যা বললেন সারজিস আলম

গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে হেফাজত থেকে মুক্ত হওয়ার পর ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম। নিজের ফেসবুক পেজে তিনি আন্দোলন নিয়ে তার অবস্থান প্রকাশ করেছেন। এতে তিনি লিখেন, ‘কথা দিয়েছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের থেকে কাউকে গ্রেফতার করবেন না, মামলা দিয়ে হয়রানি করবেন না। আপনারা কথা রাখেননি।

আপনারা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর আঘাত করেছেন। সারাদেশে আমার স্কুল কলেজের ভাইবোনদের উপর লাঠিচার্জ করেছেন। যাকে ইচ্ছা তাকে জেলে পাঠিয়েছেন। আন্দোলনকারীকে খুঁজে না পেলে বাসা থেকে ভাইকে তুলে নিয়েছেন, বাবা'কে হুমকি দিয়েছেন ! মাশরুর তার উদাহরণ।

যারা একটিবারের জন্যও এই আন্দোলনে এসেছে তারা শান্তিতে ঘুমাতে পারে না, গ্রেপ্তারের ভয়ে থাকে। এমন অনেকে আছে যাদের পরিবার এখনো তাদের খোঁজ পায়নি। এমন তো হওয়া উচিৎ ছিল না!

কোথায় মহাখালীর সেতু ভবন আর কোথায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ! অথচ আপনারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক আরিফ সোহেলকে মহাখালীর সেতুভবনে হামলার জন্য গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিলেন। সাথে আছে আসিফ মাহতাব স্যার, মাশরুরসহ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী অসংখ্য শিক্ষার্থী।

রিক্সা থেকে নামিয়ে প্রিজন ভ্যানে তুলছেন, বাসা থেকে তুলে নিয়ে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন। আমার বোনদের রাস্তায় ফেলে পিটিয়েছেন। কি ভাবছেন? এভাবেই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে?

৬ দিনের ডিবি হেফাজত দিয়ে ৬ জনকে আটকে রাখা যায় কিন্তু এই বাংলাদেশের পুরো তরুণ প্রজন্মকে কিভাবে আটকে রাখবেন? দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছেন প্রতিনিয়ত সেগুলো কিভাবে নিবৃত করবেন ?

পুলিশ ভাইদের উদ্দেশ্যে একটা বলি, এ দেশের মানুষের ক্ষোভ আপনাদের উপর নয়, পুলিশের উপর নয়। এই ক্ষোভ আপনার গায়ের ওই পোশাকটার উপর। যে পোশাকটাকে ইউজ করে বছরের পর বছর আপনাদের দিয়ে এ দেশের অসংখ্য মানুষকে দমন-পীড়ন করা হয়েছে, অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়েছে, জেল আর আদালতের প্রাঙ্গণে চক্কর কাটানো হয়েছে, সেই পোশাকটার উপর। ওই পোশাকটা ছেড়ে আসুন আমাদের সাথে, বুকে টেনে নিব।

এ পথ যেহেতু সত্যের পথ, ন্যায়ের পথ, তাই যেকোনো কিছু মোকাবেলা করতে আমরা বিন্দুমাত্র বিচলিত নই। যতদিন না এ বাংলাদেশ আন্দোলনকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে ; গণগ্রেপ্তার, জুলুম, নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে ; ততদিন এ লড়াই চলবে।’

Thursday, October 24, 2019

ফেসবুকে ধর্ম বা নবীর অবমাননার গুজব তুলে বারবার সাম্প্রদায়িক হামলা, কৌশল একই by রাকিব হাসনাত

রামুর হামলার পর তোলা ছবি
বাংলাদেশে গত আট বছরে কয়েকটি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রায় একই ধরণের কৌশল ব্যবহার করে এসব হামলার পটভূমি তৈরি করা হয়েছে।
এর মধ্যে এবারই প্রথম পুলিশ শুরুতেই জানিয়েছে, তারা এটি উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে যে ভোলার বোরহানউদ্দিনে একজন হিন্দু ব্যক্তির বিরুদ্ধে মুসলমানদের নবী মোহাম্মদকে অবমাননার অভিযোগ তোলা হলেও এটি করেছেন দুজন মুসলিম।
ওই হিন্দু ব্যক্তি আগেই তার আইডি হ্যাকের কথা পুলিশকে জানিয়েছিলেন।
পুলিশ বলছে যে দুই মুসলিম ব্যক্তি একজন হিন্দু ব্যক্তির ফেসবুক হ্যাক করে নবী অবমাননাকর বার্তা দিয়েছিলেন তাদের আটক করা হয়েছে।
তবে হিন্দু বা বৌদ্ধদের ওপর এ ধরণের ভুয়া খবর প্রচার করে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয়।
২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধদের বাড়িঘর ও বৌদ্ধবিহারে হামলার ঘটনা পুরো দেশকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিলো।
তখনও ফেসবুকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একজনের নামকে যুক্ত করে দেয়া হয়েছিলো।
এবার সর্বশেষ ভোলাতেও সেই একই কৌশল দেখা গেছে। তবে এবার পুলিশ শুরুতেই জড়িত দুজনকে আটক করেছে।
বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য নামে একজনের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ঐ বার্তাটি বিভিন্নজনকে পাঠানো হয় বলে জানাচ্ছে পুলিশ।
কিন্তু এরই মধ্যে এর জের ধরে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে চার জন এবং ইসলামপন্থীরা ফাঁসি দাবি করছে মি. বৈদ্যের।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে ভোলার বোরহানউদ্দিনের ঘটনার জন্য যে দুজন দায়ী তাদের আটক করা হয়েছে তারাই বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ম্যাসেঞ্জারে নবী অবমাননাকর বার্তা দিয়েছে যেগুলো পরে স্ক্রিনশট নিয়ে বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের বলে প্রচার করে।
মিস্টার বৈদ্য এর আগে থানায় উপস্থিত হয়ে তার আইডি হ্যাক করার কথা জানান ও তিনি এখনো পুলিশ হেফাজতেই আছেন।
এরপর তৌহিদী জনতার ব্যানার নিয়ে মাঠে নামে একদল ব্যক্তি ও যা পরে রূপ নেয় সংঘর্ষে।
ফেসবুক ব্যবহার করে ধর্ম বা নবী অবমাননার অভিযোগ তুলে একই কৌশলে হিন্দু বা বৌদ্ধদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছে আগেও।

কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ পল্লির হামলা

সমুদ্র সৈকতের শহর কক্সবাজার জেলার রামুতে ২০১২ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর ফেসবুকে একটি ছবি ট্যাগ করার ঘটনা নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যায়।
উত্তম বড়ুয়া নামে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক যুবকের ফেসবুকে কোরান অবমাননার ছবি কেউ ট্যাগ করে দেয়। এর জের ধরে রামুতে বৌদ্ধ স্থাপনা ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়িঘরে হামলা করা হয়। দশটিরও বেশি বৌদ্ধ বিহার ও প্রায় ২৫টি বাড়িতে হামলা হয়েছিলো।
এর আগে প্রচার করা হয়েছিলো যে একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে উত্তম বড়ুয়া নামে এক বৌদ্ধ তরুণের ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট থেকে ইসলাম ধর্ম, কোরান বা নবীকে অবমাননা করা হয়েছে।
কিন্তু যেই তরুণের নাম প্রচার করা হয়েছে তার খোঁজ পাওয়া যায়নি আর এবং এসব ঘটনায় কারও তেমন কোনো শাস্তির খবরও পাওয়া যায়নি।

ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার নাসিরনগরে আক্রান্ত হিন্দুরা

২০১৬ সালের ৩০শে অক্টোবর।
রামুর কায়দাতেই হামলাটি হয়, তবে এখানে আক্রান্ত হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। অভিযোগও সেই পুরনো—ফেসবুকে ইসলাম বিদ্বেষী ছবি।
এজন্য প্রচার করা হয় রসরাজ নামে এক হিন্দু ব্যক্তির নাম।
অভিযোগ তোলা হয়েছিলো যে মুসলমানদের কাবা ঘরের সঙ্গে হিন্দুদের দেবতা শিবের একটি ছবি জুড়ে দিয়েছিলেন রসরাজ।
এ ঘটনার জের ধরে তাকে পিটিয়ে পুলিশে দেয় স্থানীয়রা।
তবে ঘটনা তাতে থেমে যায়নি।
পরে ইসলামপন্থী কয়েকটি সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ ডাকে ও সেখান থেকেই হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা শুরু হয়।
প্রায় তিনশো বাড়ি ভাংচুর করা হয়।
অথচ আড়াই মাস পর জেল থেকে বের হয়ে রসরাজ জানান তিনি ফেসবুক চালাতে পারেননা। এমনকি এর যে পাসওয়ার্ড বলে একটি বিষয় আছে তা নিয়ে তার কোনা ধারণাই নেই।

রংপুরেও নাসিরনগর মডেল

নাসিরনগরে হামলার এক বছর পর ২০১৭ সালের ১০ই নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়াতে ফেসবুক থেকে ছড়ানো গুজবের জের ধরে এক জনের মৃত্যু হয়।
অভিযোগ সেই একই—হিন্দু তরুণের ফেসবুকে থেকে নবীকে অবমাননার অভিযোগ।
পুলিশ তখন বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন, টিটু রায় নামে যে ব্যক্তির ফেসবুক পোষ্ট ঘিরে এই ঘটনা সেই টিটু রায়ের বাড়ি গঙ্গাচড়ায় হলেও তিনি নারায়ণগঞ্জে বসবাস করেন।
গঙ্গাচড়ায় কয়েকদিন মাইকিং করে হামলা হয়েছিলো হিন্দুদের বাড়িঘরে।
পর টিটু রায়কে গ্রেফতারও করা হয়েছিলো।

সিলেটের ওসমানীনগরেও সেই ফেসবুক স্ট্যাটাস

চলতি বছরের জুনে ইদের নামাজের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে সিলেটের ওসমানীনগরে।
সনাতন ধর্মের এক নারীর মৃত্যুর পর সৎকার নিয়ে হিন্দু ও মুসলিমদের কয়েক ব্যক্তির মধ্যে মত বিরোধ হয়।
পরে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির নামে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলে এমন কিছু পোস্ট দেয়া হয় যা নিয়ে মুসলিমদের একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ শুরু করে। এর জের ধরে কয়েকটি বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে।

Wednesday, October 23, 2019

ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলা করব? by গোলাম মোর্তোজা

রাজনীতি বা সমাজকে যেভাবে দেখি সেভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি। ক্ষমতার কেন্দ্রকে প্রশ্ন করতে পছন্দ করি। বিশ্বাস করি, একজন ক্ষুদ্র সংবাদকর্মী হিসেবে এটাই দায়িত্ব। আমার বিশ্লেষণের সঙ্গে সবাই একমত হবেন, তা মনে করি না। প্রশ্ন করলেই উত্তর পাওয়া যাবে, তেমন ধারণা নিয়েও বসে থাকি না। আমাদের বিশ্লেষণ বা প্রশ্ন ক্ষমতাসীনরা বিবেচনায় নিবেন বা নেন, বিষয়টি মোটেই তেমন নয়। এতে তারা বিরক্ত হন, ক্ষুব্ধতারও প্রকাশ ঘটান। তবুও নিজের কাজ করে যাওয়ার চেষ্টা করি।
গত প্রায় ২৫ বছর এভাবেই কাজ করছি, কথা বলছি, লিখছি। ক্ষমতায় যেই থাকুক, আমার কলমের ভাষা একই রকম থেকেছে। তা গোপনীয় কিছু নয়, সবই দৃশ্যমান। প্রিন্ট মিডিয়াতে হাতে খড়ি। পরবর্তীতে নানা আঙ্গিকে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে জড়ালেও এখন পর্যন্ত  সনাতন গণমাধ্যমই আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজের জায়গা।
যে কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলনামূলক অনেক দেরিতে নাম লেখানো। যে মাধ্যমে রাতারাতি মানুষ তারকা বনে যায়, সে মাধ্যমে ভরসা করতে একটু সময় নিয়েছি। কিন্তু এক পর্যায়ে শুধু যোগাযোগের সহজতম মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক ব্যবহার করতে শুরু করি ২০১৩’র মাঝামাঝি সময় থেকে। অল্পদিনেই ফলোয়ারের সংখ্যা যখন লাখ খানেক ছাড়িয়ে গেল, বুঝলাম সনাতন মিডিয়ায় কাজের কারণে এতোদিনে যে পাঠক শ্রেণী তৈরি হয়েছে, তাদের মতামত জানার দ্বিপাক্ষিক প্লাটফরমটা দুই পক্ষের জন্যই উপযোগী। আস্তে আস্তে একটা অভ্যস্ততায় পরিণত হলো ফেসবুক। 
অথচ আমার এই ফেসবুক ব্যবহার কখনোই খুব স্বাচ্ছন্দ্যদায়ক ছিলো না। ব্যবহার শুরুর পর থেকেই নানাবিধ সমস্যায় পড়ছিলাম। রিপোর্ট করে আইডি ডিজেবল করে দেয়ার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে চলছিল। গত প্রায় ৫ মাস যাবৎ আমার ফেসবুক ব্যবহার একেবারেই বন্ধ।
এর আগে ২০১৮ সালে আইডি টানা প্রায় দুই মাস বন্ধ ছিল। প্রথমে আইডি হ্যাকড করা হয়েছে, তারপর ফেসবুক ডিজেবল করে দিয়েছে। পরিচিতজন, শুভানুধ্যায়ীরা এগিয়ে এসেছেন। তাদের সহায়তায় ফেসবুকের হেড কোয়ার্টারের এক বড় কর্তার সঙ্গে যোগাযোগ হলো। আনঅফিসিয়ালি জানলাম যা লিখি তা যাদের পছন্দ নয়, তাদের চাওয়ায় আইডি ব্লক করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ফেসবুক নির্দিষ্ট করে কোনো কারণ দেখাতে পারেনি, যার প্রেক্ষিতে তারা আইডি ব্লক করে দিয়েছিল। আইডি আবার খুলে দিল। ছোটখাটো ঝামেলার মধ্য দিয়ে চলছিল। গত মে মাসের ২০ তারিখে আইডি আবার ডিজেবল করে দিল ফেসবুক। এবারও ডিজেবল করার ক্ষেত্রে কোনো কারণ দেখায়নি। শুধু ইমেল দিয়ে জানিয়েছে, আইডি যে আমারই- ফেক নয়, তা প্রমাণ করতে হবে।
পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, সাংবাদিকতার অফিসিয়াল পরিচয়পত্রসহ ফেসবুককে চার থেকে পাঁচ বার ইমেল করে প্রমাণ দিলাম। ফেসবুক একবারও জবাব দিল না। এরপর ইউরোপের একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আমার হয়ে ফেসবুকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ফেসবুক তাদের জানায়, এই আইডিটি আর খুলে দেয়া সম্ভব নয়। সম্ভবত: ফেসবুক কর্তৃপক্ষ আমার আইডি ডিলিট করে দিয়েছে। ফেসবুক আমাকে কোনো কারণ জানায়নি। ফেসবুককে বারবার চ্যালেঞ্জ করে লিখেছি, নিয়মবহির্ভূত একটি শব্দও কখনো পোস্ট করিনি। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ইতিপূর্বে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন ব্যক্তির আইডি ও পেজ ডিলিট করে দিয়েছিল, গুজব ও অসত্য প্রপাগান্ডা চালানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে। যাদের আইডি ও পেজ ডিলিট করে দিয়েছিল, তারা ফেসবুককে চ্যালেঞ্জ করা তো দূরে থাকুক প্রকাশ্যে বলতেও পারেনি যে, তাদের আইডি ডিলিট করে দিয়েছে। কারণ তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ শতভাগ সত্য ছিল, তথ্য-প্রমাণ ছিল। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সত্য বা অর্ধসত্য বা অসত্য কোনো তথ্য-প্রমাণ ফেসবুক কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। কারণ আমি অসত্য বা প্রপাগান্ডামূলক কর্মকাণ্ড কখনো ফেসবুকে পোস্ট করিনি।
বর্তমান পৃথিবীতে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফেসবুক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। ফেসবুক আইডি না থাকায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছিলাম। এমন অবস্থায় কয়েকদিন আগে একজন শুভাকাক্ষীর বুদ্ধি ও পরামর্শে ফেসবুকে একটি পেজ খুলেছি। নতুন একটি আইডিও খুলতে হয়েছিল পেজে প্রবেশের জন্যে। নতুন আইডিতে কোনো লেখা পোস্ট করিনি। আইডিটি সবার দেখার জন্যে উন্মুক্ত ছিল না। শুধু পেজে চার পাঁচটি লেখা পোস্ট করেছি। হঠাৎ করে দেখলাম ফেসবুক আমার নতুন আইডিও ডিজেবল করে দিয়েছে। কোনো কিছুই লিখলাম না! তবুও আইডি ডিজেবল? ক্লান্ত লাগছে। ফেসবুককে আর কিছু লিখিনি।
এখন প্রশ্ন হলো, আমি কেন ফেসবুক ব্যবহার করতে পারব না? কেন আমি মতপ্রকাশ করতে পারব না? এর জন্যে কাকে দায়ী করব?
‘সরকার কারও ফেসবুক আইডি বন্ধ করতে পারে না’- জোর প্রচারণা বা প্রপাগান্ডা চলছে। আবার সরকারের মন্ত্রীরা বারবার বলেছেন, ‘ফেসবুক এখন আমাদের কথা শুনতে শুরু করেছে।’
গত ২৯শে জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছিলেন, ‘চলতি বছরের শেষ দিকে এসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবে বাংলাদেশ৷’ (ডয়চে ভেলে, ১৮ই অক্টোবর ২০১৯)।
সেই নিয়ন্ত্রণ কি ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে?
সরকার আইডি বন্ধ করিয়েছে, এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ আমার কাছে নেই। সুতরাং সরকারকে দায়ী করতে পারছি না। ‘ফেসবুক সরকারের কথা শুনছে’- কী কথা শুনছে? কারও আইডি বন্ধ বা ডিলিট করে দিতে বললে, ফেসবুক কি সে ‘কথা শুনছে’? জানিনা, মন্ত্রীর ওই বক্তব্য ছাড়া কোনো প্রমাণ হাতে নেই।
আমার লেখা অন্য যে কারও কাছে গুরুত্বহীন হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৯ সালের মে মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত ফেসবুকে যা লিখেছি, সবকিছু ডিলিট করে দিয়েছে ফেসবুক। কোনো কারণ জানায়নি। লেখা ও বহু ছবি সংগ্রহে নেই। ছিল শুধু ফেসবুকে।
এখন করণীয় কী? আমি কি আইনের আশ্রয় নিতে পারি? ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারি? পারলে কোথায় করতে পারি, দেশে না বিদেশে? দেশে বা বিদেশে আইন ব্যবসার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত আছেন, তাদের কেউ কি বুদ্ধি বা পরামর্শ দিতে পারেন? করতে পারেন সক্রিয় কোনো সহায়তা?
কয়েকদিন আগে নিউইয়র্কে কথা হচ্ছিল একজন সংবাদকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্টের সঙ্গে। তার আইডি বারবার ব্লক করে দেয়ায় তিনি ফেসবুকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তারপর অতি অল্প সময়ের মধ্যে ফেসবুক তার আইডি খুলে দেয়। যার কথা বলছি, তিনি একজন বাংলাদেশি আমেরিকান। তার ক্ষেত্রে ফেসবুক যা করেছে, আমার ক্ষেত্রেও কি তা করবে? আমার নামের আগে তো ‘আমেরিকান’ শব্দটি নেই। আমি তো বাংলাদেশের অতি সাধারণ একজন সংবাদকর্মী। আমার গায়ের রঙ কালো, আমি বাংলাদেশের নাগরিক, এ কারণেই কি ফেসবুক কর্তৃপক্ষ এসব নির্দয়-অগ্রহণযোগ্য ও বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারছে?
মুক্তচিন্তা-বাক স্বাধীনতা-মতপ্রকাশ, কত কথাই না বলে ফেসবুক! অথচ আমার মতপ্রকাশে বাধা  তৈরি করছে। যারা মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়, ফেসবুক তাদের সহায়তা করছে?
একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কি কোনো অধিকার আছে এ ধরণের বৈষম্যমূলক আচরণ করার?

Thursday, August 15, 2019

লাগবে না ব্যাংক, ফেসবুকের মুদ্রাতেই হবে লেনদেন!

দীর্ঘ জল্পনার পরে অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রার কথা ঘোষণা করল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। এই নাম দেয়া হয়েছে 'লিব্রা'। শুরুতেই ভিসা ও মাস্টারকার্ড-সহ বিশ্বের দু'ডজনের বেশি সংস্থার সঙ্গে এই ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে মার্ক জাকারবার্গের সংস্থা।
এখনো বিশ্বের ১৭০ কোটি মানুষের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। অথচ এদের একটা বড় অংশের কাছে স্মার্টফোন আছে। এই বিপুল অংশের মানুষের কাছে আর্থিক লেনদেনের পথ হিসেবে লিব্রাকে তুলে ধরার টার্গেট নিয়েছে ফেসবুক। এই ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থায় আর্থিক লেনদেনের জন্য কোনো ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। স্মার্টফোন থেকে সঙ্গেসঙ্গে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে প্রায় নিখরচায় অর্থ পাঠানো সম্ভব। ফেসবুকের এই ডিজিটাল মুদ্রা সারা বিশ্বের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তন আনতে চলেছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
আগামী বছরে লিব্রা লঞ্চ করা হবে বলে জানিয়েছে ফেসবুক। কিন্তু এর মধ্যেই ২৮টি সংস্থা এনিয়ে ফেসবুকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে পেমেন্ট কোম্পানি, বাণিজ্যিক গোষ্ঠী এবং ভেনচার ক্যাপিটার কোম্পানি রয়েছে। তারা এই মুদ্রার পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তা ব্যবহারে সম্মত হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে লঞ্চ হওয়ার আগে লিব্রা নিয়ে অন্তত ১০০টি সংস্থার সঙ্গে তাদের চুক্তি হবে আশাবাদী ফেসবুক।
লাগবে না ব্যাংক, ফেসবুকের মুদ্রাতেই হবে লেনদেন!

Sunday, July 28, 2019

ফেসবুকে ১২ হাজার নারী ব্যবসায়ী by মো. মিন্টু হোসেন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নারী উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি বাড়ছে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) তথ্য বলছে, এখন দেশে প্রায় ২০ হাজার ফেসবুক পেজে কেনাকাটা চলছে। এর মধ্যে ১২ হাজার পেজ চালাচ্ছেন নারীরা।
ফেসবুককে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে স্বল্প পুঁজিতেই উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন নারীরা। ই-ক্যাবের তথ্যমতে, গত এক বছরে ই-কমার্স খাতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ঈদসহ যেকোনো উৎসবে এ লেনদেন বাড়ে।
নারী উদ্যোক্তাদের কেউ পোশাক, কেউ গয়না, কেউ হাতে তৈরি জিনিস, কেউ তৈরি খাবারসহ নানা পণ্য বিক্রি করছেন। অনেকে দেশীয় সংস্কৃতিকে তুলে ধরার কাজ করছেন। কেউ শৌখিন পণ্য নিয়ে ব্যবসায় নেমেছেন। এই নারীরা শিক্ষিত। সংসারের চাপসহ নানা সমস্যায় অনেকের পক্ষে চাকরি করা সম্ভব হয়নি। অনেকে নিজে কিছু করবেন বলে বদ্ধপরিকর। ফলে সংসার সামলানোর পাশাপাশি স্বাধীন এ ব্যবসায় আগ্রহ বাড়ছে নারীদের।
ইসলামপুরের সরু গলি থেকে শুরু করে এখন লন্ডনসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই সুনাম কুড়িয়েছে আঁখি’স কালেকশন। আঁখি’স কালেকশনের উদ্যোক্তা সালমা রহমান আঁখি বললেন, ‘কলেজে পড়া অবস্থায় বুটিক হাউস দিই। ইসলামপুর, মিরপুর, মোহাম্মদপুর থেকে পোশাক এনে বিক্রি করি। এখন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি বলেই মনে করি।’
মা-মেয়ে মিলে ফেসবুকে ‘সাবেরেং’ নামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর খাবারের ব্যবসা শুরু করেছেন পারাহিতা চাকমা ও তাঁর মা দেবলক্ষী চাকমা (৫৫)। মা খাবার রান্নার বিষয়টি দেখভাল করেন। একটি কলেজের প্রশাসনিক বিভাগে কর্মরত পারাহিতা বললেন, ‘মায়ের ইচ্ছাতে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে মিরপুরের নিজের বাসায় বসে ফেসবুকে নতুন এই উদ্যোগ চালু করে বেশ সাড়া পাচ্ছি।’
উদ্যোক্তারা ঘরে বসে ব্যবসা করছেন, একইভাবে ক্রেতারাও ঘরে বসে পণ্য পছন্দ করে কল করে অথবা খুদে বার্তা পাঠিয়ে পছন্দের পণ্যটি হাতে পাচ্ছেন। তবে অনলাইনে এ ধরনের ব্যবসায় ক্রেতারা ঠকছেন বলেও অভিযোগ আছে। ফেসবুকে এক পণ্য দেখিয়ে ক্রেতার কাছে অন্য পণ্য পাঠিয়ে দেওয়ার পর ক্রেতারা কোনো প্রতিকারও পাচ্ছেন না।
কিছু অভিযোগ থাকলেও ই-কমার্সে নারী উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করছেন ই–কমার্সের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে প্রযুক্তির সুবিধায় নারীদের ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এফ-কমার্স বা ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা। অনলাইনভিত্তিক ক্রেতা হিসেবেও নারীর সংখ্যাই বেশি।
দেশে প্রায় ২০ হাজার ফেসবুক পেজে কেনাকাটা চলছে।
১২ হাজার পেজ চালাচ্ছেন নারীরা।
এক বছরে ই-কমার্স খাতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
ঈদসহ যেকোনো উৎসবে এই লেনদেন বাড়ে।

অনলাইন উদ্যোগে আরেক সফল নারী তোহফাতুল জান্নাত। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যবিদ্যা বিষয়ে পড়াশোনা করার সময়ই যুক্ত হন অনলাইন ব্যবসায়। তারপর চাকরি করলেও ব্যবসা বন্ধ করেননি। গৃহসজ্জার (এনটেরিয়র) ফার্ম দেওয়ার পাশাপাশি শোরুম দিয়েছেন রাজধানীর অভিজাত শপিং মলে। অনলাইনে তাঁর পেজের নাম ‘ক্যারিড অ্যাওয়ে বাংলাদেশ’। একজন সহকারী নিয়ে নিজের নকশা করা পোশাক বিক্রি করেন। তাঁর মতে, ক্রেতার চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকা বা ঢাকার বাইরের ক্রেতার সন্তুষ্টি ও বিশ্বাস অর্জন করতে না পারলে এ ব্যবসায় ভালো করা যায় না।
হুর নুসরাত নামের ব্যবসার উদ্যোক্তা নুসরাত আক্তার জানালেন, শুধু চার বোন হওয়ায় চলার পথে অনেক বাধাবিপত্তি এসেছে। ২০১৪ সালে ব্যবসা শুরুর আগে ডিজিটাল মার্কেটিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেসবুকে পেজ তৈরি করেন। হাতে থাকা ১ হাজার ২০০ টাকা নিয়ে শুরু করা ব্যবসায় এখন ১৫০ জন তাঁতীর কাছ থেকে পোশাক নিয়ে দেশে–বিদেশে দিনে প্রায় ২০০ পোশাক বিক্রি করা হচ্ছে। গয়নাও বিক্রি করেন তিনি।
বিক্রয় ডটকমের বিপণন প্রধান ঈশিতা শারমিন বললেন, অনলাইন শপিং সাইটসহ ফেসবুক পেজের মাধ্যমে এখন অনেক নারী উদ্যোক্তা ব্যবসা করছেন। ইলেকট্রনিকস, লাইফ স্টাইল পণ্য আবার কেউ জমি ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছেন। অল্প পুঁজিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াই ব্যবসা করা যাচ্ছে।
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মাহমুদা সুলতানা নিয়মিত অনলাইনে কেনাকাটা করেন। তিনি বলেন, ‘অনলাইনে কেনাকাটা নিয়ে অনেকে প্রতারণার শিকার হলেও নিজে কখনো সমস্যায় পড়িনি।’
তবে মিরপুর ১০ নম্বরের ইলিয়াস কবির তাঁর স্ত্রীর জন্য ফেসবুকে থ্রিপিস কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। সঠিক পণ্য মেলেনি, পণ্যের দাম নিয়েও মনে সংশয় ছিল।
ই-ক্যাবের যুগ্ম সম্পাদক নাসিমা আক্তার বললেন, ই-ক্যাবের ফেসবুক গ্রুপে অভিযোগ দিলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কেউ প্রতারিত হলে প্রথমে ই-ক্যাবের পক্ষ থেকে ক্রেতা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলা হয়। এ ছাড়া কেনাকাটায় প্রতারণার শিকার হলে থানায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও সুযোগ আছে। নারী উদ্যোক্তাদের নিজেদের ব্যবসার স্বার্থেই এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে, যাতে কোনো ক্রেতা প্রতারণার শিকার না হন।

৫০০ কোটি ডলার জরিমানা ফেসবুকের -গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থ

ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে ফেসবুক। এই অভিযোগ নিষপত্তি করতে ফেসবুককে ৫০০ কোটি ডলার জরিমানা করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি)। এর আগে, ১২ই জুলাই প্রাক্তন বৃটিশ রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার কাছে অনৈতিকভাবে ৮ কোটি ৭০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য চলে যাওয়ার অভিযোগের তদন্ত শেষে এই জরিমানার অনুমোদন দেয় এফটিসি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

খবরে বলা হয়, জরিমানা ছাড়াও ফেসবুককে একটি স্বাধীন ‘প্রাইভেসি কমিটি’ গঠন করতে বলা হয়েছে। এই কমিটির ওপর ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ কোনো খবরদারি করতে পারবেন না।

গত বছর ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা অনৈতিকভাবে তাদের লাখ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করেছে ও  গত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রামেপর শিবিরকে নির্বাচনী পরামর্শ দিতে ওই তথ্য কাজে লাগিয়েছে। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের তাদের ব্যক্তিত্বের ধরন বিষয়ক একটি ‘কুইজ অ্যাপে’ অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা। এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী ও তাদের বন্ধুদের তথ্য অনৈতিকভাবে লুটে নেয় তারা।
পরবর্তীতে এই কেলেঙ্কারি নিয়ে বিশ্বজুড়ে একাধিক তদন্ত শুরু হয়। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৫ লাখ ইউরো জরিমানার শিকার হয় ফেসবুক।   

ভোক্তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করার জন্য কোনো কোম্পানিকে এর আগে কখনো এত বড় অঙ্কের জরিমানা করার নজির আর নেই। এফটিসির তদন্তের মূল লক্ষ্য ছিল, ফেসবুক ২০১১ সালে স্বাক্ষর করা ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা বিষয়ক একটি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে কিনা তা খুঁজে বের করা। ওই চুক্তি অনুসারে, ফেসবুক কোনো ব্যবহারকারীর তথ্য তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে শেয়ার করতে হলে ব্যবহারকারীকে এ বিষয়ে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে তার অনুমতি নিতে হবে।

এফটিসি’র চেয়ারম্যান জো সিমন্স বলেছেন,  কোটি কোটি ব্যবহারকারীকে ফেসবুক বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তাদের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে শেয়ার করা হবে সে বিষয়টা তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। কিন্তু তারা এই অঙ্গীকার রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

অনেকে মনে করছেন এফটিসি ফেসবুকের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তা যথেষ্ট নয়। ১২ই জুলাই ফেসবুকের বিরুদ্ধে ৩-২ ভোটে ৫০০ কোটি ডলার জরিমানা নির্ধারণ করে এফটিসি। এর মধ্যে এই জরিমানার পক্ষে ছিলেন রিপাবলিকান কমিশনাররা ও বিপক্ষে ছিলেন ডেমোক্রেটরা। ডেমোক্রেটদের দাবি ছিল, এই জরিমানা অপর্যাপ্ত। তবে এখনো জরিমানাটি চূড়ান্ত হয়নি।

এদিকে, ফেসবুকের সাবেক প্রধান সিকিউরিটি অফিসার অ্যালেক্স স্টামোস বলেন, এই আপসরফার ফলে ফেসবুকই আসলে লাভবান হলো। ধারণা করা হচ্ছে, এই জরিমানায় ফেসবুকের বাণিজ্যে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। চলতি বছরের এপ্রিলে ফেসবুক তাদের বিনিয়োগকারীদের বলেছিল, তারা ৫০০ কোটি ডলার জরিমানা প্রত্যাশা করছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক লাভের এক-চতুর্থাংশ এই জরিমানার পরিমাণ। এ বিষয়ে আগ থেকে সতর্ক করে রাখায় ঘাবড়ে যাননি বিনিয়োগকারীরা। বিনিয়োগকারীদের ফেসবুক বলেছিল, ওই অর্থ তারা আগে থেকেই প্রস্তুত রেখেছে।

Saturday, June 29, 2019

নয়ন ‘বন্ড ০০৭’

বরগুনায় প্রকাশ্যে রাস্তায় শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার তদন্তের মধ্যেই আলোচনায় এসেছে ফেইসবুক মেসেঞ্জারে নয়ন ‘বন্ড ০০৭’ নামে একটি গ্রুপের কিছু কথোপকথন। নয়নের পারিবারিক নাম সাব্বির আহম্মেদ, ডাক নাম নয়ন। নয়নের সঙ্গে নিজেই জুড়ে দিয়েছেন বন্ড।
নিজেকে জেমস বন্ড ভাবতে ভালোবাসেন বলে ২৫ বছর বয়সী ওই যুবক। তাই নামের সঙ্গে যুক্ত করেন বন্ড। ওই নামেই তিনি বরগুনা শহরে পরিচিতও পেয়ে যান। তার মোটর সাইকেলে, বাড়ির দেয়ালে- নানা জায়গায় লেখা রয়েছে বন্ডের ০০৭ কোড নামটি।
বলা হচ্ছে, ওই ফেইসবুক গ্রুপেই রিফাতকে হত্যার পরিকল্পনা সাজানো হয়। আর এই গ্রুপের নেতা হলেন রিফাত হত্যার হোতা নয়ন বন্ড, যাকে পুলিশ দুই দিনেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
বরগুনা সদর থানার ওসি আবির মোহাম্মদ হোসেন জানান, পৌর শহরের বিকেবি রোডের ধানসিঁড়ি এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকীর ছেলে নয়নের বিরুদ্ধে মাদক কেনাবেচা, চুরি, ছিনতাই, হামলা, সন্ত্রাস সৃষ্টিসহ নানা অভিযোগে অন্তত আটটি মামলা রয়েছে। নয়নের গড়ে তোলা গ্যাং ০০৭ শহরের কলেজ রোড, ডিকেপি, দীঘির পাড়, কেজিস্কুল ও ধানসিঁড়ি এলাকায় নানা ধরনের অপরাধ চালিয়ে আসছিল বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
তারা বলছেন, ওই গ্রুপে নয়নের প্রধান সহযোগী হলেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে রিফাত ফরাজী।
রিফাত ফরাজীর পাশাপাশি তার ভাই রিশান ফরাজীকেও পুলিশ খুঁজছে বলে ওসি আবির মোহাম্মদ হোসেন জানান।