Showing posts with label বরগুনা. Show all posts
Showing posts with label বরগুনা. Show all posts

Wednesday, April 8, 2026

বনে পাওয়া আহত ঈগলের বাচ্চা সুস্থ হয়ে উঠছে কিশোরের যত্নে

বরগুনায় আহত একটি ঈগলের বাচ্চাকে উদ্ধার করে স্থানীয় বন বিভোগের তত্ত্বাবধানে সেবা–শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তুলেছে হৃদয় নামের এক কিশোর। এক সপ্তাহ আগে ঈগলের বাচ্চাটিকে সামাজিক বন থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ঈগলের বাচ্চাটি এখন অল্প অল্প উড়তে পারে। বাচ্চাটি এখন সুস্থ। আগামী সপ্তাহে বিষখালী নদীতে জেগে ওঠা টুলুর চরে এটিকে অবমুক্ত করা হবে।

বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক সপ্তাহ আগে বরগুনা সদর উপজেলা ঢলুয়া এলাকার কয়েকজন কিশোর সামাজিক বনের মধ্যে ঘুরতে যায়। এ সময় তারা ঈগলের বাচ্চাটিকে বনের মধ্যে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। পরে হৃদয় নামের এক কিশোর ঈগলের বাচ্চাটিকে বাড়িতে নিয়ে আসে এবং এক সপ্তাহ ধরে খাবার ও চিকিৎসা দিয়ে সেটিকে সুস্থ করে তোলে। বিষয়টি হৃদয়ের পরিবার বন বিভাগের কর্মকর্তাদের জানায়।

ঈগলের বাচ্চাটি এখন অল্প অল্প করে উড়তে পারে। সারা দিন এটি বাড়ির আঙিনায় ছোটাছুটি করে। কখনো উড়ে গাছের ডালে গিয়ে বসে থাকে। যখন ক্ষুধা লাগে, তখন আবার ফিরে আসে। বন বিভাগের লোকজন ঈগলছানাটিকে হৃদয়ের কাছে রেখে সেবা দিচ্ছেন। এটিকে খাবার হিসেবে মাছ খেতে দেওয়া হয়। আরও একটু বড় হলে ঈগলছানাটিকে বনে অবমুক্ত করা হবে।

ঈগলের বাচ্চাকে সেবা দিয়ে সুস্থ করা হৃদয় বলে, ‘আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে জঙ্গলে ঘুরতে যাই। সেখানে ঈগলের বাচ্চাটিকে আহত অবস্থায় দেখতে পেয়ে আমি এটিকে বাড়িতে নিয়ে আসি। সেবা দিয়ে পাখিটিকে সুস্থ করা হয়েছে। প্রতিদিন এটিকে বিভিন্ন জাতের মাছ খেতে দেওয়া হয়। পাখিটা বাড়িতে ছাড়া অবস্থায়ই থাকে। কখনো গাছের ডালে, কখনো ঘরের চালায় উড়ে গিয়ে বসে থাকে। ভালো করে উড়তে পারলেই এটিকে আবার বনে ছেড়ে দেওয়া হবে। এটি আমাদের পরিবারের সদস্য এখন। বাবাও পাখিটির সেবা করে, খাবার এনে দেয়।’

বন বিভাগের বরগুনার সদর উপজেলা রেঞ্জ কার্যালয়ের রেঞ্জ সহকারী এম এ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আহত অবস্থায় স্থানীয় জঙ্গল থেকে ঈগলের বাচ্চাটিকে এক কিশোর উদ্ধার করে বাড়িতে এনে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। আমরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছি। পাখিটি এখন সুস্থ। ভালো করে উড়তে পারলে এটিকে বিষখালী নদীতে জেগে ওঠা টুলুর চরে অবমুক্ত করা হবে। বরগুনায় কোনো রেসকিউ সেন্টার না থাকার কারণে আহত, অসুস্থ বন্য প্রাণী ও পোষা প্রাণীদের উদ্ধার করে আনা হলেও চিকিৎসা, শুশ্রূষা দেওয়া সম্ভব হয় না।’

ঈগল পাখির বাচ্চা হাতে বাড়ি আঙিনায় হৃদয়
ঈগল পাখির বাচ্চা হাতে বাড়ি আঙিনায় হৃদয়। ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, November 20, 2024

যেভাবে বরগুনার অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতো এমপিপুত্র সুনাম

বরগুনা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী মাধবী দেবনাথের পুত্র এডভোকেট সুনাম দেবনাথ। সুনাম নিজেও ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক। অভিযোগ রয়েছে, সুনাম মাদকের বিনিময়ে স্থানীয় তরুণদের রাজনীতিতে ব্যবহার করতেন। একটি ফেনসিডিল আর দু’টি ইয়াবার বিনিময়ে তারা ফেসবুকে ফেক আইডি খুলে নেতাদের নামে প্রচার-অপপ্রচার চালাতো, মিছিলে অংশগ্রহণ করতো। খোদ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুবায়ের আদনান অনিক ও সম্পাদক তানভির হোসাইন বরগুনা  প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে লিখিত অভিযোগ করেন ২৮শে এপ্রিল ২০১৮ সালে।

বরগুনার গডফাদার, তিনিই ছিলেন এখানকার অপরাধ জগতের আসল নায়ক। বরগুনা জেলা জুড়ে বিশাল ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালীও ছিলেন সুনাম দেবনাথ। গত ১৫ বছরে বাবার ছত্রছায়া ও দাপটে সুনাম দেবনাথ হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজে গড়ে তুলেন বিশাল সাম্রাজ্য। তার এই সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করতো তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন। মাদক বাণিজ্য করে অবৈধভাবে কামাই করে বনে যান শত শত কোটি টাকার মালিক। ক্ষমতার দাপট আর ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পেতো না এলাকাবাসী।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরও প্রতি বিপ্লবের ষড়যন্ত্রে শহরে বিশাল মিছিল ও সমাবেশের নেতৃত্বে ছিলেন এই সুনাম দেবনাথ।  জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবিরের গ্রেপ্তারের পরই গাঢাকা দেন সুনাম।  গোয়েন্দা বিভাগ ও দুদক থেকে শম্ভু এবং সুনামের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অনুসন্ধানে নামলে বরগুনার এই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী পিতা-পুত্র আত্মগোপনে চলে যান। সম্প্রতি পিতা শম্ভু ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়। পুত্র সুনাম দেবনাথ এখনো রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে এক যুগ সময় ধরে বরগুনার উপকূল ও নদীপথে মাদকসহ বিভিন্ন চোরাচালানের রুট হিসেবে গড়ে ওঠে। কক্সবাজার, টেকনাফ, চট্টগ্রাম রুটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ি বেড়ে উঠলে নিরাপদ তালতলীর সমুদ্র সৈকত শুভ সন্ধ্যা, টেংরাগিরি সৈকত, মরানিদ্রা, নিদ্রা, ফকিরহাট মৎস্য বন্দর, বরগুনার সোনাতলা, বাবুগঞ্জ, নলী, পালের বালিয়াতলী, ছোনবুনিয়া, চালিতাতলী ও গোলবুনিয়াসহ নদী পাড়ের এলাকাগুলো রুট হিসেবে বেছে নেয় মাদক কারবারি ও চোরাকারবারিরা।

আর এ সুযোগে অপরাধ জগতের সব নিয়ন্ত্রণ নেয় সংসদ সদস্য শম্ভু ও তার পুত্র। মাদক ও চোরাকারবারিদের যুবরাজ সুনাম দেবনাথ কামিয়ে নেন শত শত কোটি টাকা। মাদক ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ করতেন তার বৌয়ের চাচাতো ভাই শাওন তালুকদার ও শীর্ষ সন্ত্রাসী অভিজিৎ তালুকদার এবং তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সিন্ডিকেটের অন্যতম ডান হাত ছিল। ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণে ছিল বৌয়ের আপন ভাই রনি তালুকদার। এ ছাড়া মাদক ব্যবসায় ও কিশোর গ্যাংয়ে ছিল সানি, ড্যাফোডিল প্রিন্স, কবি আসাদ, অয়ন মীর, তারাকান্দার রাজু, মাহাবুব, হিমেল, শিবা, প্রত্যয়, প্রান্ত, চোরা রাজীবের ভাই সোহেল, হাত কাটা জাহাঙ্গীর, শুভ খান, জিন্নাত খান, মনির, রাজা মেম্বার ও জাহিদুল ইসলাম সুমন।

বরগুনার মাদক ও চোরাচালানের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করতো সুনাম দেবনাথ। কিশোর গ্যাং ও ছাত্রলীগের একটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করতো সে। ২০১৯ সালে চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড ও কিশোর গ্যাং লিডার নয়ন বন্ডের ক্রসফায়ার ঘটনা ছিল মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। নিহত রিফাত শরীফ ও নয়ন বন্ড মূলত ছিল তার সাম্রাজ্যের অনুসারী। ক্রসফায়ারে নিহত নয়ন বন্ড তার ছত্রছায়ায় থেকেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতো আর রিফাত শরীফ তার ডান হাত মঞ্জুরুল আলম জনের হয়ে কাজ করতো। এ নিয়ে তৎকালীন বরগুনা জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি রুবাইয়াত আদনান অনিক সুনাম দেবনাথের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে গণমাধ্যমের কাছে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বরগুনায় মাদকটা চালায় কে? মাদকের পেছনে কে জড়িত? নয়ন বন্ড কার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এতদূর এসেছে? বরগুনার রাজনীতিতে শম্ভু ও তার পুত্রের প্রভাবশালী হতে তাদের মতাদর্শের বাইরের নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে দলের বাইরে ও কর্মকাণ্ডে বিচ্ছিন্ন করে রাখতো।

ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ও তার ছেলের এসব অপরাধের বিচার চেয়েছেন বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌশিকুর রহমান ইমরান। ইমরান বলেন, বরগুনার সব অন্যায়-অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ও তার ছেলে সুনাম জড়িত ছিল। তাদের কারণে আওয়ামী লীগ বরগুনায় কলঙ্কিত। বরগুনায় আওয়ামী লীগের দুর্গ হওয়া সত্ত্ব্বেও নৌকা পরাজিত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগসহ হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধাচারণ। দুর্নীতি আর লুটপাট করে শত শত কোটি টাকার মালিক হওয়ায় আমাদের মতন সাধারণ নেতাকর্মীদের আড়ালে থাকতে হচ্ছে এদের কারণে।

এ বিষয়ে বরগুনা জেলা বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হুমায়ুন হাসান শাহীন বলেন, সুনাম দেবনাথ ছিল মাদকের গডফাদার। তার বাবার ক্ষমতায় বরগুনার যুবসমাজের মধ্যে মাদক ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিশোর গ্যাং সৃষ্টি করে হত্যাকাণ্ডের মতো অনেক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন। বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড এই মাদক নিয়েই সংঘটিত হয়েছে। আমরা এ ধরনের সব অপরাধের জন্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ও তার ছেলে সুনাম দেবনাথসহ সব অপরাধীর বিচার দেখতে চাই।

mzamin

Friday, September 20, 2024

ঢাবিতে গণপিটুনিতে মৃত্যু: মা-বাবা-ভাইয়ের মৃত্যুতে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তোফাজ্জল

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল (৩২) নামে এক যুবককে আটক করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বাবা-মার মৃত্যুতে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই ভবঘুরের মতো বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। তার মৃত্যুর খবরে গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।

তোফাজ্জল বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের তালুকের চরদুয়ানী গ্রামের মৃত আবদুর রহমানের ছেলে এবং কাঁঠালতলী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ২০১১ সালে তোফাজ্জলের বাবা আবদুর রহমান, ২০১৩ সালে মা বিউটি বেগম এবং ২০২৩ সালে একমাত্র বড় ভাই পুলিশের এএসআই নাসির উদ্দিন মারা যান। প্রেম সংক্রান্ত বিষয়ে আরও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তোফাজ্জল। পরিবার ও অভিভাবকহীন হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেন তিনি। মানসিক ভারসাম্য হারানোর আগে তিনি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। তার এমন মৃত্যুর খবর শুনে উপজেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তোফাজ্জল বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বাংলা বিষয়ে অনার্স মাস্টার্স শেষ করে বঙ্গবন্ধু ’ল কলেজে অধ্যায়ণরত ছিলেন। এ অবস্থায়ই মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন।

বুধবার রাত ৮টার দিকে চোর সন্দেহে তোফাজ্জলকে আটক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফজলুল হক হলের শিক্ষার্থীরা। আনুমানিক রাত ১২টার দিকে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে রাত ২টার দিকে তার মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তোফাজ্জলের চাচা ফজলুর রহমান জানান, তোফাজ্জলের বাবা আবদুর রহমান প্রায় ১০ বছর আগে মারা যায়, এর তিন বছর পরে মারা যায় তার মা। এরপর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। বড় ভাই নাসিরের আশ্রয়ে থাকতে শুরু করে। ভাইও দুই বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এরপরেই অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করে থাকেন তিনি। ভাই মারা যাওয়ার কিছুদিন পরে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে মারধর করে বাজারের লোকজন। এরপরেই সে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। প্রশাসনের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

তোফাজ্জলের চাচাতো ভাই ফারুক হোসেন বলেন, আমরা গতকাল সকালে শুনেছি তোফাজ্জলকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এখন ঢাকা মেডিকেলে ময়নাতদন্তের জন্য নেয়া হয়েছে। চাচাতো ভাই শাহাদাত হোসেন থানার আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার লাশ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। মরদেহ আনার পর জানাজা শেষে বাবা মায়ের পাশে দাফন দেয়া হবে। তোফাজ্জলের বড় ভাই নাসিরের স্ত্রী শরীফা আক্তার বলেন, ভোররাতে অপরিচিত একটি ফোন নম্বর থেকে ফোন আসে আমার ফোনে। ফোনটা ধরার পরেই অপর প্রান্ত থেকে এক লোক তোফাজ্জল কি হয় সে কথা জানতে চায়। সে দেবর একথা বলার পরেই তিনি বলেন, সে চুরি করে ধরা পড়েছে। তাকে বাঁচাতে হলে ২ লাখ টাকা দিতে হবে। এরপর তারা ফোনে ধমক দিতে থাকে এবং বলে কোনো মিথ্যা কথা বলবেন না তাহলে সমস্যা হবে। তাদের সঙ্গে কথা বলার কয়েক ঘণ্টা পরে বিভিন্ন লোকজনে ফোন দিয়ে জানান তোফাজ্জল মারা গেছে। আমার দু’জন ছেলে রয়েছে। তারা বাবাহারা। তাদের একজন চাচা ছিল। তাও শেষ করে দিলো। আমরা আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।

পাথরঘাটা থানার ওসি মো. আল মামুন বলেন, আমাকে ঢাকা থেকে ফোন দিয়ে জানিয়েছে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চোর সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। এর পরে আমি নাম-ঠিকানা যাচাই করে জানতে পেরেছি তার বাড়ি কাঁঠালতলী এলাকার তালুক চরদুয়ানী গ্রামে। সে মানসিক ভারসাম্যহীন ছিল। তার পরিবারকে সংবাদ দিয়েছি। তারা ঢাকাতে যোগাযোগ করেছেন, সেখান থেকে তারা লাশ নিয়ে আসবেন। লাশের আইনি প্রক্রিয়া সেখান থেকেই শেষ করে পাঠাবেন তারা।

mzamin

Friday, August 2, 2024

বরগুনায় ৬ পরিবারে চলছে মাতম

দেশে চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে ৬ জনের বাড়ি বরগুনা জেলায়। এদের মধ্যে বরগুনা সদর উপজেলার ২, বেতাগী উপজেলার ২, তালতলী উপজেলার ১ এবং বামনা উপজেলার ১ জন। তারা সবাই গুলিতে নিহত হয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসন সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সবাই ছিলেন নিম্নআয়ের মানুষ। ঢাকায় কেউ দিনমজুর, অটোচালক, ঠেলাগাড়ির শ্রমিক, মোটর মেকানিক, ভ্যানচালক, প্রাইভেটকারচালক, কেউবা আবার টাইল্‌স মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। নিহতদের পরিবারে একদিকে মাতম চলছে, অন্যদিকে বিরাজ করছে চাপা আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। অনেকের পরিবারের আয়ের মাধ্যম একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন সূত্র ও নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা কেউই সংঘর্ষে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। কাজ থেকে বাসায় ফেরার পথে অথবা বাসা থেকে কাজে যাওয়ার পথে আর না হয় কাজ করার সময় সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে মারা গেছেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের তথ্যমতে, নিহতরা হলেন বরগুনা সদর উপজেলার ৮ নম্বর সদর ইউনিয়নের কালিরতবক গ্রামের দুলাল হাওলাদারের ছেলে মো. মিজানুর রহমান (৩০), সদর উপজেলার ২ নম্বর গৌরীচন্ন ইউনিয়নের দক্ষিণ মনসাতলী গ্রামের টিটু মৃধার ছেলে সায়েম মৃধা (২১), তালতলী উপজেলার মৌপাড়া গ্রামের আলতাফ হোসেনের ছেলে আমির হোসেন (২৬), বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের নীলখোলা এলাকার আবদুর রহিমের ছেলে মো. টিটু (৩৫), একই ইউনিয়নের উত্তর করুনা গ্রামের মো. তৈয়ব আলীর ছেলে মো. লিটন (২৮) ও বামনা উপজেলার লক্ষ্মীপুরা গ্রামের দুলাল মিয়ার ছেলে মো. শাকিল (২০)। জানা যায়, নিহত মিজানুর রহমান ঢাকার মানিকনগর এলাকায় দিনমজুরের কাজ করতেন।

গত ২০শে জুলাই সন্ধ্যায় কাজ থেকে বাসায় ফেরার পথে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করেন। সায়েম মৃধা আবদুল্লাপুর এলাকায় মোটর মেকানিকের কাজ করতেন। গত ১৯শে জুলাই সন্ধ্যায় আবদুল্লাপুর বাসস্ট্যান্ডে তার মাথায় গুলি লেগে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। স্বজনরা তাকে আবদুল্লাপুর গণকবরে দাফন করেন। আমির হোসেন শহরে অটোরিকশা চালাতেন। তিনি গত ১৯শে জুলাই দুপুর আড়াইটার দিকে রামপুরা টিভি সেন্টার এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। দুই সন্তানের জনক টিটু ছিলেন প্রাইভেটকার চালক।

গত ১৯শে জুলাই দুপুর ১টার দিকে ধানমণ্ডি গ্রিন রোডে মাথায় গুলি লেগে গুরুতর আহত হন। পরে গ্রিন লাইফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। লিটন টাইল্‌স মিস্ত্রির কাজ করতেন। তিনি গত ১৮ই জুলাই বেলা সাড়ে ১২টার দিকে মধ্য বাড্ডা এলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এ ছাড়া শাকিল চালাতেন ভ্যানগাড়ি। গত ২০শে জুলাই জুরাইন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ যায় তার। নিহত টিটুর স্ত্রী আয়েশা বেগম জানান, তার স্বামী সর্বশেষ গত ১১ই জুলাই বাড়ি থেকে কর্মস্থল ঢাকায় যান। বাড়িতে থাকা অবস্থাতেই ঘরে বাজার ছিল না। এরই মধ্যে গত শুক্রবার বিকালে ফোন করে তাদের এক নিকট আত্মীয় জানান, তোমার স্বামীর গায়ে গুলি লেগেছে। সে ধানমণ্ডির গ্রিন লাইফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আয়েশা বেগম আরও বলেন, আমার স্বামী একজন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। সে তো কোনো আন্দোলন করেনি। তারপরেও বিনা অপরাধে তাকে জীবন দিতে হলো। ছেলে সাইমুন বাবার জন্য পাগল ছিল। ওকে কিছুতেই থামাতে পারছি না। শুধু বাবাকেই খুঁজছে। মেয়ে তামান্না ঠিকমতো খাবার খাচ্ছে না। আমি অবুঝ সন্তানদের কী বুঝ দেবো? আমার সংসার কীভাবে চলবে?
নিহত মিজানুর রহমানের বাবা দুলাল হাওলাদার বলেন, আমার ছেলে কোরবানির ঈদের একদিন পরেই ঢাকা চলে গেছে। সে ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করতো। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় আমার ভায়রা ভাই ফোন দিয়ে বলে মিজানুর কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সেখানে থাকা লোকজনের সহযোগিতায় তাকে মুগদা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিসাধীন অবস্থায় মারা যায়। মিজানুর রহমান আরও বলেন, আমার সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। এর মধ্যে ছোট ছোট দু’টি ছেলেমেয়ে রেখে মারা গেছে মিজানুর। কীভাবে চলবে সংসার, কে দেখবে ওদের? অনেক অসহায় হয়ে পড়েছি আমরা।
বরগুনা সদর উপজেলার ৮ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুল কুদ্দুস আলো আকন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঘটনায় আমার ইউনিয়নের মিজানুর রহমান নামের একজন নিহত হয়েছেন। মিজানুরের পরিবার অনেক অসহায় ও ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করতো। ঘটনা শুনে আমরা মিজানুরের পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে মিজানুরের পরিবারকে কিছু সহযোগিতা করেছি। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করা হবে।

এ বিষয়ে বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফারুখ আহম্মেদ বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে বেতাগী উপজেলার ২ জন নিহত হয়েছে। আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছি এবং খাদ্যসামগ্রী দিয়েছি।
বরগুনা জেলা প্রশাসক মোহা. রফিকুল ইসলাম বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতায় এ জেলার যারা নিহত হয়েছেন তাদের প্রত্যেক পরিবারের খোঁজখবর আমরা নিয়েছি।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ সাহায্য দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে যেসকল অনুদান আসবে তা নিহতের পরিবারকে দেয়া হবে।

Thursday, October 17, 2019

মাকে গোয়াল ঘরে পাঁচ মাস বেঁধে রাখে সন্তানরা by মো. মিজানুর রহমান

বরগুনায় গর্ভধারিণী মাকে মানসিক রোগী আখ্যা দিয়ে কোমরে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখে সন্তানরা। বিগত পাঁচ মাস ধরে বরগুনা সদর উপজেলার গৌরিচন্না ইউনিয়নের চরধুপতি এলাকার ওই বৃদ্ধার দিন কেটেছে গোয়াল ঘরেই। সংবাদ পেয়ে মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) বরগুনা জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহর নির্দেশে খবিরুন্নেসা (৭৫) নামের ওই বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে তার মেয়ের জিম্মায় দেয়া হয়েছে।
জানা যায়, পৈতৃক সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা হওয়ায় পর ছেলেদের কেউ বৃদ্ধা মায়ের যত্ন নিতে রাজি হয়নি। এ কারণে তাকে অবহেলায় গোয়াল ঘরে ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও যেন যেতে না পারেন সে কারণে কোমরে লোহার শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ওই গোয়াল ঘরেই দিনে একবার তাকে খাবার দেয়া হতো।
স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানায়, বয়সের ভারে কানে একটু কম শুনলেও খবিরুন্নেসা মানসিকভাবে স্বাভাবিক। বিগত পাঁচ মাস ধরে মা খবিরুন্নেসাকে (৭৫) গোয়াল ঘরে বিছানা পেতে গরু বাঁধার দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। একদিন দড়ি খুলে তিনি মেয়ের বাড়িতে যাওয়ার পথে ফের তাকে ছেলেরা ধরে আনেন।
পরে একই স্থানে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। শেকল বাঁধা অবস্থায় প্রায় পাঁচ মাস ধরে তিনি গোয়াল ঘরেই জীবনযাপন করছেন। প্রতিবেশী হুমায়ুন কবীর জানান, খবিরুন্নেসা দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জননী। দুই বছর আগে স্বামী আবদুল হামিদ খান মারা যাওয়ার পর সহায় সম্পত্তি ছেলে-মেয়েরা ভাগ করে নেন। মা খবিরুন্নেসার ভরণপোষণ নিয়ে ছেলেদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে এক বৈঠকে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সহায়তায় দুই ছেলে মিলে ভরণপোষণ করবে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু ছেলেদের কেউই ঠিকমতো মায়ের যত্ন নেননি। এছাড়াও রোগে খবিরুন্নেসার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হতে থাকে। গত মঙ্গলবার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বরগুনা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওই বাড়িতে গিয়ে বৃদ্ধাকে উদ্ধার করেন। এসময় তাকে পোশাক ও টাকা দিয়ে মেয়ে তাসলিমার জিম্মায় দেয়া হয়। ছেলেরা তাকে গোয়ালঘরে রাখলেও এ বিষয়ে খবিরুন্নেসা বারবারই বলছিলেন, আমার পোলারা আপনাগো দোয়ায় মোরে ঠিকমত খাওন দাওন দেয়। হ্যারা অনেক ভালো। নানাভাবে জানতে চাইলেও ছেলেদের নিয়ে কোনো অভিযোগ করেননি ওই বৃদ্ধা মা। খবিরুন্নেসার ছোট ছেলে বাচ্চুকে এসময় ঘরে পাওয়া যায়। বাচ্চু জানান, তিনি মায়ের ঠিকমতই ভরণপোষণ করছেন। গোয়াল ঘরে কেন রাখলেন-জানতে চাইলে বাচ্চু বলেন, মায়ের মাথায় সমস্যা। আমি বাইরে কাজে ব্যস্ত থাকি। মা কোথায় কখন চলে যায় তাই বেঁধে রেখেছি। বড় ছেলে বাদলের স্ত্রী বেবি বলেন, তার শাশুড়ি মানসিক রোগী। সে কারণে তাকে ছেলেরা বেঁধে রেখেছেন। স্থানীয় গৌরিচন্না ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তানভীর হোসেন বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে বৃদ্ধা খবিরুন্নেসাকে যথাসাধ্য সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়াও তার ভরণপোষণ যাতে নিশ্চিত করা হয় সে বিষয়ে ছেলেদের ডেকে তিনি ব্যবস্থা নেবেন। বরগুনা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসেন বলেন, বিষয়টি চরম অমানবিক। এটি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ছাড়া কিছু না। আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে উদ্ধার করে মেয়ে তাসলিমার জিম্মায় দিয়ে ছেলেদের ভরণপোষণ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছি। এর ব্যত্যয় ঘটলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Saturday, October 5, 2019

ইলিশের বাড়ি আসলে কোথায়: চাঁদপুর না বরগুনায়? by সানজানা চৌধুরী

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার আলাদা ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সেইসঙ্গে স্বীকৃত পণ্য আছে। সে হিসাবে চাঁদপুর জেলা ব্যাপকভাবে সমাদৃত ইলিশ উৎপাদনের জন্য।
এজন্য এই জেলাকে "ইলিশের বাড়ি" বলা হয়ে থাকে।
তবে ইলিশের মোট উৎপাদনের হিসেবে এবার বরগুনা জেলা থেকে দাবি তোলা হয়েছে যেন তাদেরকে "ইলিশের জেলা" ঘোষণা করা হয়।
ইলিশের বাড়ি কোথায় এ নিয়ে হঠাৎ এই বিতর্কের কারণ কী?

বরগুনা কেন হতে চায় ইলিশের জেলা

বিতর্কের শুরু হয়েছিল গতকাল বুধবার বরগুনায় অনুষ্ঠিত এক ইলিশ উৎসবে।
সেখানে আয়োজকরা দাবি করেন যে বরগুনা জেলার ৬টি উপজেলায় প্রায় ৪০ হাজার মৎস্যজীবী রয়েছেন, এবং ইলিশ উৎপাদনেও তাদের অবস্থান চাঁদপুরের চাইতে কয়েক ধাপ এগিয়ে।
তারা বলছেন, সেকারণে বরগুনাই "ইলিশের জেলা" হওয়ার দাবিদার।
ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশের প্রায় ৮৫% উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ও সাগর থেকে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ করা হয়।
ইলিশ উৎপাদনের হিসেবে বরিশাল বিভাগের ভোলা জেলার স্থান শীর্ষে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই জেলায় মোট ইলিশ আহরণ হয় এক লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টনের মতো।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরগুনা। গত অর্থ বছরে এই জেলা থেকে আহরিত ইলিশের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন।
বরগুনার প্রধান তিনটি নদী বিষখালী, বুড়িশ্বর (পায়রা) ও বলেশ্বর নদী থেকে আহরণ করা হয় ৪৯০০ মেট্রিক টন। এবং সাগর থেকে ৯১,০০০ মেট্রিক টন।
অন্যদিকে, একই অর্থবছরে চাঁদপুর থেকে ইলিশ ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার মেট্রিক টন। ইলিশ আহরণের হিসাবে এই জেলার অবস্থান ষষ্ঠ স্থানে, এবং এই চাঁদপুর 'ইলিশের বাড়ি' বলে পরিচিত।
তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
চাঁদপুরকে ইলিশের বাড়ি কেন বলা হয় এটা নিয়ে কোন আপত্তি নেই বরগুনাবাসীর।
বরগুনা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা চাই বরগুনাকে ইলিশের জেলা হিসেবে দেখতে। কারণ আমরাই সবচেয়ে বেশি ইলিশ উৎপাদন করছি। দেশের প্রায় এক পঞ্চমাংশ ইলিশ এই বরগুনায় আহরিত হয়। এবং সারা দেশে যত ইলিশ পাওয়া যায় তার বেশিরভাগ যায় বরগুনা থেকে।"
এছাড়া বরগুনার নদী থেকে আহরিত ইলিশের স্বাদ পদ্মার ইলিশের চাইতে অনেক সুস্বাদু বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, "বরগুনার ইলিশ অন্য যেকোনো জেলার ইলিশের চাইতে সুস্বাদু। আর এই জেলার ইলিশ সাইজেও বড় থাকে। একেকটা ইলিশ প্রায় এক কেজির মতো। তেলও হয় প্রচুর। এখন উৎপাদন, স্বাদ, গড়ন সবদিক থেকে বরগুনা এগিয়ে আছে, আমরাই ইলিশের ভাণ্ডার, তাই ইলিশের জেলা হওয়ার দাবি আমরা করতেই পারি।"
জাতীয় মাছ ইলিশকে বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিং করার পেছনে বরগুনা সবচেয়ে বেশি ভূমিকার রেখেছে বলেও দাবি সেখানকার মানুষের।
বরগুনার পাথরঘাটায় রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য পাইকারি ও বাজারকেন্দ্র বিএফডিসি।
এরকম আরেকটি ইলিশ-বন্দর (যেখানে ইলিশ এনে রাখা হয়) স্থাপন এবং একটি ইলিশ গবেষণা কেন্দ্র নির্মাণের প্রচেষ্টা রয়েছে বলে ইলিশ উৎসবে আশ্বাস দিয়েছেন স্থানীয় একজন সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু।
মাছ ধরার নৌকা, ঘাটগুলোর আধুনিকায়নের মাধ্যমে বরগুনাকে ইলিশের জেলা হিসেবে ঘোষণা করার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ করবেন বলেও জানান।
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে: রগুনার এত অর্জন থাকা সত্ত্বেও এখনও চাঁদপুরকেই কেন ইলিশের বাড়ি বলা হয়।

চাঁদপুর কেন ইলিশের বাড়ি

চাঁদপুরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আসাদুল বাকি জানান, বরগুনা উপকূলের কাছাকাছি জেলা হওয়ায় সেখানকার জালে মাছ ধরা পড়ে বেশি তবে প্রজননের সময় মা ইলিশগুলো এই চাঁদপুরের আশেপাশের নদীতেই আসে। এ কারণেই এই জেলাকে ইলিশের বাড়ি বলা হয়।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "ইলিশ বিচরণ করে লোনা পানিতে, কিন্তু ডিম পাড়ার সময় তারা মিঠা পানির মোহনায় আসে। চাঁদপুরের পদ্মা নদীতে প্রচুর পরিমাণে প্ল্যাঙ্কটন আছে, যেটা মা ইলিশের প্রধান খাবার। এই প্ল্যাঙ্কটন আর অন্য কোন জেলায় নেই। পানির মান আর খাবার থাকায় মা ইলিশ এখানে ডিম ছাড়তে আসে। তার মানে এটা তাদের বাড়ি।"
মা ইলিশের ডিম ছাড়ার সময় ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় চাঁদপুরে ইলিশের আহরণ কম হয়।
অন্যদিকে ডিম ছাড়ার মৌসুম শেষে যখন আবার ইলিশ ধরা শুরু হয় ততদিনে এই ইলিশগুলো উপকূলীয় জেলাগুলোর দিকে চলে যাওয়ায় সেখানে স্বাভাবিকভাবে ইলিশ বেশি ধরা পড়ে বলে তিনি জানান।
এদিকে, চাঁদপুরে ইলিশ আহরণ তুলনামূলক কম হলেও ইলিশের সবচেয়ে বড় বাজার এই জেলাতেই।
স্থানীয় সাংবাদিক ফারুক আহম্মদ বলেন, " দেশের ৩০% ইলিশ চাঁদপুর থেকে আহরণ করা হয়। তাছাড়া ভোলা, বরিশাল, নোয়াখালিসহ অন্যান্য কয়েকটি জেলায় আহরণ করা সব ইলিশ আগে আনা হয় চাঁদপুরের বাজারে। এখান থেকেই সারা দেশে মাছ সরবরাহ করা হয়। দেশের মোট উৎপাদিত ইলিশের প্রায় অর্ধেক এই বাজারগুলো থেকেই সারাদেশে পাঠানো হয়।"
তাই চাঁদপুর অন্য যেকোন জেলার চাইতে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
২০১৫ সালে চাঁদপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুস সবুর মণ্ডল ইলিশের ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম শুরু করেন । চাঁদপুর জেলাকে 'ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর' নামে ব্র্যান্ডিং করেন তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকেও পরে এই দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

Sunday, September 22, 2019

আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির আলোচিত সেই জবানবন্দি

বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় পুলিশের অভিযোগপত্র দাখিলের ১৮ দিন পর বৃহস্পতিবার তার কপি বাইরে প্রকাশিত হয়েছে। গেল ২৬শে জুন হত্যাকাণ্ডের ৬৬ দিন পর ১লা সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বরগুনা থানার ওসি (তদন্ত) মো. হুমায়ুন কবির। তবে আদালতে চার্জশিট দাখিল করলেও মামলার আসামিপক্ষ অথবা মিডিয়াকর্মীরা চার্জশিটের কপি এতদিন হাতে পায়নি। ১৮ই সেপ্টেম্বর চার্জশিট আদালত গ্রহণ করার পর বৃহস্পতিবার কপি বাইরে প্রকাশ হয়েছে। আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির আইনজীবী মো. মাহাবুবুল বারী আসলামের কাছ থেকে চার্জশিটের কপি পাওয়া গেছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নিহত রিফাত শরীফ বরগুনা থানা এলাকায় ডিস লাইনের ব্যবসা করতেন। রিফাত শরীফ ও মামলার এক নম্বর আসামি বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়ন বন্ড অনেক আগে বরগুনা জিলা স্কুলে একসঙ্গে লেখাপড়া করেছেন। সে সুবাদে তাদের উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল।

মিন্নির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি তুলে ধরা হলো: ‘আমি বরগুনা সরকারি কলেজে ডিগ্রি প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করি। ২০১৮ সালে বরগুনা আইডিয়াল কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করি। আইডিয়াল কলেজে পড়াশোনা করাকালীন রিফাত শরীফের সঙ্গে ২০১৭ সালে আমার প্রেমের সম্পর্ক হয়। ওই সময় রিফাত শরীফ বামনা ডিগ্রি কলেজের ছাত্র ছিল। রিফাত শরীফ আমাকে তার কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তার মধ্যে নয়ন বন্ড একজন। কলেজে যাওয়া আসার পথে নয়ন বন্ড আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে জ্বালাতন করত। আমি তার প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ায় সে আমার বাবা ও ছোটভাইকে ক্ষতি করার ভয় দেখাত। বিষয়টি আমি রিফাত শরীফকে জানাই নি।

আমি রিফাত শরীফকে ভালোবাসতাম। কিন্তু রিফাত শরীফ অন্য মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক করার কিছু বিষয় আমি লক্ষ্য করি। এ কারণে রিফাতের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কিছুটা অবনতি ঘটে। আমি ধীরে ধীরে নয়ন বন্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং নয়ন বন্ডের সঙ্গে আমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমি নয়নের মোবাইল ফোন নম্বরে আমার মায়ের মোবাইল ফোন এবং নয়নের দেয়া নম্বর শেষে ৬১১৩ ও একটি নম্বর শেষে ৪৫ দিয়ে নয়নকে কল, মেসেজ এবং ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে কল দিতাম। বরগুনা সরকারি কলেজে পড়াকালীন ধীরে ধীরে রিফাত ফরাজী, রিফাত হাওলাদার ও রাব্বি আকনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। রিফাত ফরাজী ও নয়ন বন্ডের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রেমের সম্পর্কের কারণে নয়ন বন্ডের বাসায় আমার যাতায়াত ছিল। নয়নের বাসায় দু’জনের শারীরিক সম্পর্কের কিছু ছবি ও ভিডিও নয়ন গোপনে ধারণ করে। যা আমি প্রথমে জানতাম না। নয়নের বাসায় আমি প্রায়ই যেতাম এবং আমাদের শারীরিক সম্পর্ক চলতে থাকে।

এরপর গত ১৫.১০.১৮ আমি রোজী আন্টির বাসায় যাওয়ার পথে বিকাল বেলা ব্যাংক কলোনি থেকে নয়ন বন্ড রিকশাযোগে আমাকে তার বাসায় নিয়ে যায়। নয়নের বাসায় গিয়ে আমি শাওন, রাজু, রিফাত ফরাজী এবং আরো ৭-৮ জনকে দেখি। শাওন বাইরে গিয়ে কাজী ডেকে আনে এবং নয়নের বাসায় আমার ও নয়নের বিয়ে হয়। তারপর আমি বাসায় চলে যাই। বাসায় গিয়ে নয়নকে ফোন করে বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখতে বলি। তখন নয়ন বলে, ওইটা বালামে ওঠে নাই। বালামে না উঠলে বিয়ে হয় না। এরপরও আমি নয়নের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখি। নয়নের সঙ্গে বিয়ের বিষয়টি আমার পরিবারের কেউ জানে না। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে কলেজ থেকে পিকনিকে কুয়াকাটা যাওয়ার বাস আমি মিস করি। তখন নয়নের মোটরসাইকেলে কুয়াকাটা যাই এবং নয়নের সঙ্গে একটি হোটেলে রাত্রিযাপন করি। আমি নয়নের বাসায় আসা যাওয়ার সময় জানতে পারি নয়ন মাদকসেবী, ছিনতাই করে এবং তার নামে থানায় অনেক মামলা আছে। এ কারণে নয়নের সঙ্গে আমার সম্পর্কের অবনতি হয় এবং রিফাত শরীফের সঙ্গে আমার পূর্বের ভালোবাসার সম্পর্ক আবার শুরু হয়। গত ২৬শে এপ্রিল পারিবারিকভাবে রিফাত শরীফের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। রিফাত শরীফের সঙ্গে বিয়ের পরও নয়নের সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ শারীরিক সম্পর্ক, মোবাইলে কথা-বার্তা,  মেসেজ এবং ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে যোগাযোগ-সবই চলত।

বিয়ের পর জানতে পারি রিফাত শরীফও মাদকসেবী। সে মাদকসহ পুলিশের কাছে ধরা খায়। বিষয়টি জানতে পেরে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। আমি রিফাতসহ আমার বাবার বাসায় থাকতাম। মাঝে মাঝে তাদের বাসায় যেতাম। নয়ন বন্ডের বিষয় নিয়ে রিফাত শরীফের সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে কথাকাটাকাটি হতো এবং রিফাত শরীফ আমার গায়ে হাত তুলতো। গত ২৪শে এপ্রিল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নয়ন বন্ড আমাকে ফোন দিয়ে বলে, তোর স্বামী, হেলালের ফোন ছিনাইয়া নিয়েছে। পরে রিফাত ফরাজীও আমাকে ফোন দিয়ে বলে, হেলালের মোবাইলটি রিফাতের কাছ থেকে নিয়ে হেলালকে ফেরত দিতে। আমি রিফাত শরীফকে হেলালের ফোন ফেরত দিতে বললে রিফাত শরীফ আমাকে চড়-থাপ্পড় মারে এবং তলপেটে লাথি মারে। রাতে মোবাইল ফোনে বিষয়টি নয়নকে জানাই এবং কান্না করি।

পরেরদিন ২৫শে এপ্রিল আমি কলেজে গিয়ে নয়নের বাসায় যাই। রিফাত শরীফকে একটা শিক্ষা দিতে হবে এ কথা নয়নকে বললে নয়ন বলে, হেলালের ফোন নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে তাতে রিফাত ফরাজী তাকে মারবে। তারপর আমি বাসায় চলে আসি এবং এ বিষয়ে কয়েক বার নয়ন বন্ডের সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়। নয়ন বন্ডের সঙ্গে আমার স্বামী রিফাত শরীফকে মাইর দিয়া শিক্ষা দিতে হবে, এ পরিকল্পনা করি। গত ২৬শে এপ্রিল আমি কলেজে যাই এবং সায়েন্স বিল্ডিংয়ের পাশের বেঞ্চের উপর রিফাত ফরাজী, রাব্বি, আকনকে বসা পাই। রিফাত হাওলাদার পাশে দাঁড়ানো ছিল। তখন আমি রিফাত ফরাজীর পাশে বসি এবং রিফাত ফরাজীকে বলি, ওকি ভাইটু খালি হাতে আসছ কেন? এ কথার জবাবে রিফাত হাওলাদার বলে, ওকে মারার জন্য খালি হাত যথেষ্ট। এরপর রিফাত ফরাজীকে জিজ্ঞাসা করি, নয়ন বন্ড ও রিফাত শরীফ কলেজে এসেছে কীনা? তখন নয়ন বন্ড আমাকে ফোন দেয়। সে কোথায় জানতে চাইলে নতুন ভবনের দিকে যেতে বলে এবং ওই সময় নয়ন নতুন ভবনের পাশের দেয়াল টপকিয়ে ভেতরে আসে। আমি হেঁটে নতুন ভবনের দিকে যাই এবং নয়নের সঙ্গে রিফাত শরীফকে মারপিটের বিষয়ে কথা বলি। এরপর রিফাত শরীফ কলেজের ভেতরে আসে এবং আমাকে নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য কলেজ থেকে বের হয়ে মোটরসাইকেলের কাছে নিয়ে আসে। কিন্তু আমি মোটরসাইকেলে না উঠে সময় ক্ষেপণ করার জন্য পুনরায় কলেজ গেটে ফিরে আসি। রিফাত শরীফ আমার পেছন পেছন ফিরে আসে। তখন রিফাত ফরাজী কিছু পোলাপানসহ আসে। রিফাত ফরাজী রিফাত শরীফকে জিজ্ঞাসা করে, তুমি আমার বাবা-মাকে গালি দিয়েছ কেন? রিফাত শরীফ বলে, আমি গালি দেই নাই। ওই সময় রিফাত ফরাজী রিফাতের জামার কলার ধরে এবং রিফাত শরীফকে জাপটে ধরে।

রিফাত ফরাজী, টিকটক হৃদয়, রিফাত হাওলাদার এবং আরো অনেকে রিফাত শরীফকে পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মারধর করতে করতে এবং টেনে হেঁচড়ে ক্যালিক্সের দিকে নিয়ে যায়।
ক্যালিক্সের সামনে তারা রিফাত শরীফকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। আমি তখন সবার পেছনে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ওই সময় নয়ন বন্ড ক্যালিক্সের সামনে এসে রিফাত শরীফকে কিল ঘুষি মারতে থাকে। মারপিটের মধ্যেই রিফাত ফরাজী টিকটক হৃদয় ও রিফাত হাওলাদার দৌড়ে যায় এবং রিফাত ফরাজী দু’টি দা ও টিকটক হৃদয় এবং রিফাত হাওলাদার লাঠি নিয়ে আসে। একটি দা দিয়ে নয়ন বন্ড ও অন?্য দা দিয়ে রিফাত ফরাজী রিফাত শরীফকে কোপাচ্ছিল। রিফাত ফরাজী রিফাত শরীফকে জাপটে ধরে রাখে যাতে রিফাত শরীফ পালাতে না পারে। রিফাত শরীফকে কোপাইতে দেখে আমি নয়ন বন্ডকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করি। দায়ের কোপের আঘাতে রিফাত শরীফ রক্তাক্ত হয়। সে রক্তাক্ত অবস্থায় পূর্ব দিকে হেঁটে যায় এবং আমি রাস্তায় পড়ে থাকা জুতা পরি। উপস্থিত একজন আমার হাতে ব্যাগ তুলে দিলে আমি রিকশা করে তাকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসি। এরপর আমার বাবাকে ফোন করি। আমার বাবা ও চাচা হাসপাতালে আসে। এরপর রিফাত শরীফকে বরিশাল পাঠানো হয়। আমার কাপড়-চোপড়ে রক্ত লেগে থাকায় আমি বাসায় চলে যাই। পরে আমি জানতে পারি রিফাতের অবস্থা খারাপ। এরপর নয়নকে ফোনে বলি তোমরা ওকে যেভাবে কোপাইছো তাতে তো ও মারা যাবে এবং তুমি আসামি হবা। তারপর ওর অবস্থান জানতে চাই এবং পালাতে বলি। দুপুরের পর খবর পাই রিফাত শরীফ মারা গেছে।’

মিন্নির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পাঠ করে শোনানোর পর এ প্রসঙ্গে তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, মিন্নিকে সাক্ষী থেকে আসামি করা এবং রিমান্ড ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় সবকিছুই ছিল এই হত্যাকাণ্ডের দায় চাপিয়ে দেয়ার একটি বিশেষ পরিকল্পনার অংশ মাত্র। একটি বিশেষ মহলের ফোনে পুলিশের যেমন দরকার তেমনটাই লিখে মিন্নির স্বাক্ষর নিয়েছে। আমরা বরগুনা জেল সুপারের মাধ্যমে আদালতের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেছি। যা শুনানির জন্য অপেক্ষায় রয়েছে।

এই হত্যার দায় আমার মেয়ের ওপর চাপিয়ে দেয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তাকে বাসা থেকে ডেকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ড নেয়া হয়। পরবর্তীতে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়।

আদালতের কাছে দেয়া মিন্নির জবানবন্দি প্রসঙ্গে মিন্নির পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহবুবুল বারি আসলাম বলেন, এ মামলার এজাহারের বিবরণ, চার্জশিট, মিন্নির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি এবং ঘটনার ভিডিও ফুটেজে যথেষ্ট গরমিল রয়েছে। মিন্নি জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেছে, যা এখনো নথি সামিলে রয়েছে। আমরা এসব অসঙ্গতিগুলো পর্যালোচনা করে আদালতে উপস্থাপন করব।

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে তাকে আটক ও পরে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে জিজ্ঞাসবাদ করা হয়। সে সময় মিন্নি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় যে জবানবন্দি দিয়েছে, পুলিশ তাই এখানে উল্লেখ করেছে। আমরা রিফাত হত্যার মূল রহস্য উদঘাটনের চেষ্টায় আন্তরিক ছিলাম।

Wednesday, September 18, 2019

মৃত্যুর আগে রিকশাচালককে যা বলেছিলেন রিফাত

জীবনের শেষ কথাটি রিকশাচালক দুলালকেই বলেছিলেন রিফাত শরীফ। বরগুনায় দুর্বৃত্তদের হাতে গত ২৬শে জুন হত্যার শিকার হন রিফাত। ধারালো অস্ত্রের কোপে রক্তাক্ত রিফাতকে যে রিকশায় করে হাসপাতালে নেয়া হয়, সেই রিকশার চালক দুলাল সেদিনের ভয়াবহ ঘটনাটির বর্ণনা দিয়েছেন। দুলালের বাড়ি বরগুনা সদর ইউনিয়নের ফরাজীরপুল এলাকায়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয় তার। স্মৃতি হাতড়ে তিনি সেদিনের পুরো ঘটনাগুলো বলেন।

ঘটনার বিবরণে দুলাল বলেন, ‘সেদিন কলেজ সড়কে খ্যাপ নিয়ে গিয়েছিলাম। মানুষের ভিড়ের কারণে আর সামনের দিকে যাইতে পারি নাই। শুনলাম সামনে কারা যেন কারে মারতেছে। প্যাসেঞ্জারকে নামিয়ে দিয়ে আমি রিকশা ঘুরাইয়া কেবল দাঁড়াইছি, সে সময় একটা ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় হাইট্টা আইসা আমার রিকশায় উইঠাই কয়, চাচা আমারে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়া যান। সেটাই ছিল ছেলেটির শেষ কথা। আমি দেখলাম ছেলেটার গলা ও বুকের বামপাশ কাইট্টা রক্ত বাইর হইতেছে। হের জামাডা টাইন্না আমি গলা ও বুকে চাইপ্পা ধইরা হেরে কইলাম, আপনে চাইপ্পা ধরেন, আমি চালাই। আমি হাসপাতালে যাওনের জন্য কেবল সিটে বসছি, চালামু, সে সময় একটা মেয়ে দৌড়ে রিকশায় উইঠা ওই পোলাডারে ধইর‌্যা বসে। আমি তাড়াতাড়ি রিকশা চালাইয়া হাসপাতালের দিকে যাই।

এক মিনিটের মতো রিফাত ঘাড় সোজা করে বসেছিল। কিন্তু এরপর সে মেয়েটির কাঁধে ঢলে পড়ে যায়। আর ঘাড় সোজা করতে পারেনি। আমাদের রিকশার পাশাপাশি একটা লাল পালসার মোটরসাইকেলে দুইটা ছেলে যাচ্ছিল। মেয়েটি চিৎকার করে তাদের কাছে জখম চেপে ধরে রক্ত থামানোর জন্য কাপড় চাইছিল। ওরা সাড়া দেয়নি। আমার কাছে মেয়েটি ফোন চায় তার বাড়িতে জানানোর জন্য। কিন্তু আমার ফোন নাই। পরে ওই মোটরসাইকেলের ছেলেদের কাছেও সে ফোন চায়। বলে, ভাই আপনাদের একটা ফোন দেন, আমি একটু বাবার কাছে ফোন করবো। কিন্তু তারা বলে, আমাদের কাছে ফোন নাই, তুমি হাসপাতালে যাইতেছো যাও।

হাসপাতালের গেট দিয়ে ঢোকার সময় মেয়েটি একজন লোককে ডাক দেয়। রিকশা থামানোর সঙ্গে সঙ্গে ওই লোক দৌড়ে আসে। রিফাতের অবস্থা দেখেই আমাকে নিয়ে স্ট্রেচার আনতে যায়। আমি আর সেই লোক স্ট্রেচার নিয়ে আসি। রিফাতকে রিকশা থেকে নামিয়ে স্ট্রেচারে তুলে অপারেশন থিয়েটারে দিয়ে আসি।’

দুলাল আরো বলেন, ‘রিফাতকে এম্বুলেন্সে করে বরিশাল নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ আমার রিকশার ছবি তুলে নেয় আর কাগজপত্র নিয়ে যায়। আমার রিকশার কাগজপত্র এখনো পুলিশের কাছেই আছে।’
ঘটনার দিন মিন্নির ডাকে ছুটে এসেছিলেন যিনি: বরগুনা হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে ও রিকশাচালক দুলালের বর্ণনামতে রিকশা থামতেই সাদা গেঞ্জি পরা এক লোক দৌড়ে আসেন। রিকশা চালক দুলালকে সঙ্গে নিয়ে স্ট্রেচার নিয়ে আসেন তিনি। স্ট্রেচারে তুলে রিফাতকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারেও নিয়ে যান। ওই ব্যক্তির নাম আমিনুল ইসলাম মামুন। তিনি একজন এম্বুলেন্স ব্যবসায়ী।

সেই মামুনের সঙ্গেও কথা হয় এ প্রতিনিধির। মামুন বলেন, মিন্নির ডাক শুনেই আমি দ্রুত ছুটে যাই। রিফাতের অবস্থা দেখে দ্রুত রিকশাচালক ভাইকে নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে স্ট্রেচার নিয়ে আসি। সে সময় রিফাত রিকশায় মিন্নির কাঁধে ভর করে বসেছিল। আমি, রিকশাচালক ও মিন্নি তিনজন মিলে রিফাতকে ধরে স্ট্রেচারে তুলি। দ্রুত তাকে ওটিতে নিয়ে যাই।

ডাক্তারের লিখে দেয়া স্লিপ নিয়ে ফার্মেসিতে তিনবার ছুটে যাই। তিনবারে ১ হাজার ৪০০ টাকার ওষুধ কিনে আনি। রিফাতের প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। কিছুতেই রক্ত বন্ধ করা যাচ্ছিল না। চিকিৎসক কোপের ক্ষতস্থানে গজ ও তুলা দিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন। তারপর দ্রুত বরিশাল নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। আমি এম্বুলেন্স ঠিক করে গেটে নিয়ে আসি। এর মধ্যেই রিফাতের বন্ধু ও স্বজনসহ অন্যরা সেখানে আসেন। মিন্নির চাচা সালেহ ও পরে মিন্নির বাবা কিশোরও চলে আসেন। পরে রিফাতকে এম্বুলেন্সে করে বরিশাল নিয়ে যাওয়া হয়। মিন্নি যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করছিল। কিন্তু তার চাচা সালেহ ও বাবা কিশোর যেতে দেননি।

মামুন আরো বলেন, একজন মানুষকে বিপদে সহায়তা করা মানবিক দায়িত্ব। সে যেকোনো মানুষই হোক না কেন। আমিও সেই চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আফসোস, রিফাতকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

Monday, September 16, 2019

অন্তঃসত্বা কিশোরীকে বিয়ে, অতঃপর...

বরগুনার পাথরঘাটায় এক কিশোরীর বিয়ে নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিয়ের প্রথম রাতেই স্বামী জানতে পারেন তার স্ত্রী আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। গত ১৫ই জুলাই পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়ায় এ দম্পত্তির বিয়ে হয়।

জানা যায়, পাথরঘাটা উপজেলার শিংড়াবুনিয়া গ্রামের ওই কিশোরীর মা রেখা বেগম ও বাবা জালাল মুন্সি ঢাকায় চাকরি করেন। নিরাপত্তার কথা ভেবে ১৬ বছরের মেয়েকে মামা আবুল কালামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকার কারণে মামাতো ভাই সোলায়মানের সঙ্গে প্রেম হয় ওই কিশোরীর। পরে সে প্রেম রূপ নেয় শারীরিক সম্পর্কে। এতে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন ওই কিশোরী। কিশোরীর অন্তঃসত্বার খবর গোপন রেখেই গত ১৫ই জুলাই পাথরঘাটার কালমেঘা ইউনিয়নের বাসিন্দা লাল মিয়ার ছেলে মাজহার উদ্দিন টেকনিক্যাল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জহির উদ্দিনের সঙ্গে পারিবারিকভাবে ওই কিশোরীর বিয়ে হয়।

এর নেতৃত্ব দেন কাকচিড়া ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়ে চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন পল্টু। পরে কোরবানির ঈদের আগের দিন স্বামী জহির তার বাড়িতে নিয়ে যায় স্ত্রীকে। তখনও তিনি জানতেন না নববধূ অন্তঃসত্ত্বা। বাসর ঘরে ঢুকেই নববধূর অন্তঃসত্ত্বার বিষয়টি টের পেয়ে যান জহির। জহির তার ভাবিকে বিষয়টি জানালে কয়েকদিন পর চিকিৎসকের কাছে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রমাণ মেলে তার স্ত্রী ৩২ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা।

এ ঘটনায় শুক্রবার বিকেলে কিশোরীর মা পাথরঘাটা থানায় তার আপন ভাই আবুল কালাম আজাদ, ভাইয়ের ছেলে সোলায়মান ও ভাইয়ের বউকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। ডাক্তারি পরীক্ষায় কিশোরী ৩২ সপ্তাহ অন্তঃসত্ত্বা বলে জানা যায়। চলতি বছরের নভেম্বরের ৬ তারিখে সম্ভাব্য ডেলিভারি তারিখ। শুক্রবার রাতেই আবুল কালামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এ বিষয়ে জহির উদ্দিন বলেন, কাকচিড়ার চেয়ারম্যান পল্টু স্থানীয় কাজীকে ডেকে এনে বিয়ে পড়ান এবং কাবিন রেজিস্ট্রি করিয়ে দেন। তিনি ও মেয়ের অভিভাবকরা আমার সাথে প্রতরণা করে আমার জীবন নষ্ট করে দিয়েছে। আমি এর বিচার চাই।

কাকচিড়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন পল্টু বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমার কার্যালয়ে এমন কোন বিয়ে হয়নি।

পাথরঘাটা থানার ওসি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ওই কিশোরীর মামা আবুল কালামকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামীদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

Tuesday, September 3, 2019

এমপিপুত্র সুনাম রিফাত হত্যার নির্দেশদাতা: -রিশান ফরাজী

বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় ৬ কিশোরকে শিশু কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ সময় মামলার পরবর্তী তারিখ ১৮ই সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করে আদালত। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামিদের হাজির করা হলে আদালতের বিচারক মোহাম্মাদ সিরাজুল ইসলাম গাজী এ আদেশ দেন।
এ সময় আদালত চত্বরে আসামিদের ঢোকানো এবং গাড়িতে ওঠানোর সময় রিফাত হত্যার অন্যতম আসামি রিশান ফরাজী চিৎকার করে বলেন, সুনাম দেবনাথ আমাদের লিডার, সুনাম দেবনাথই আমাদের নির্দেশদাতা, সে কেন আসামি হয়নি, তাকে কেন আসামি করা হলো না।
রিশান ফরাজি আরও বলেন, মিন্নি কেন সাত নম্বর আসামি? রিশান ফরাজি বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক সাংসদ মো. দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে এবং চার্জশিটভুক্ত এক নম্বর আসামি রিফাত ফরাজীর ছোট ভাই। যে সুনাম দেবনাথের কথা রিশান ফরাজী চিৎকার করে বলেন, সেই সুনাম দেবনাথ হচ্ছেন বরগুনা-১ আসনের বর্তমান সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে ও জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক।
রিফাত হত্যাকান্ডের তদন্ত এবং এরপর রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা, সঙ্গে মাদক ব্যবসা জড়িত থাকার অভিযোগ পুরো ঘটনাকে ভিন্ন এক মাত্রা দেয়। অভিযোগ ওঠে, বড় কিছু আড়াল করতেই পেছন থেকে ক্ষমতাশালীরা কলকাঠি নাড়ছেন। আরও অভিযোগ রয়েছে, নয়ন বন্ড নামে বরগুনাবাসীর কাছে পরিচিত সেই সাব্বির আহম্মেদ ওই শহরে একটি গ্যাংয়ের নেতা, যাদের মদদ দেন এমপিপুত্র সুনাম দেবনাথ।
যদিও এর আগে গণমাধ্যমে দেয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে পিতা ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এবং পুত্র সুনাম দেবনাথ সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে সুনাম দেবনাথ বলেন, রিফাত হত্যাকান্ড এবং এ হত্যাকান্ডে জড়িতদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। কখনো ছিলও না। আমি এ হত্যাকান্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। এমন একটি আলোচিত হত্যাকান্ডে জড়িত থাকলে কারোরই রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। এ ঘটনায় জড়িত থাকলে আমিও রেহাই পেতাম না। সকল অভিযুক্তরাই রিমান্ড শেষে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এ হত্যাকান্ডে আমি জড়িত না থাকায় স্বীকারোক্তিতে আমার নাম কেউ বলেনি। কিন্তু চার্জশিট দাখিলের পর অভিযুক্তদের আমার বিরুদ্ধে এমন মন্তব্য ষড়যন্ত্রমূলক। একটি মহল আমার বাবা ও আমার সম্মান ক্ষুণ্ন ও হয়রানি করতে অভিযুক্তদের প্ররোচনা দিচ্ছেন।

রিফাত হত্যা : যা আছে ১২৩২ পৃষ্ঠার চার্জশিটে by মো. মিজানুর রহমান

দেশের আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী মিন্নি ও নয়ন বন্ড। নিজেদের প্রেমের সম্পর্কে বাধা দূর করার জন্যই মিন্নি নিজ স্বামী রিফাতকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে এই মামলার চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ২৪ জন আসামির বিরুদ্ধে পুলিশের দাখিল করা চার্জশিটে স্বাক্ষর করেছেন আদালত। বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক মো. সিরাজুল ইসলাম গাজী সোমবার বিকেলে ১২৩২ পৃষ্ঠার চার্জশিটে স্বাক্ষর করেন।

চার্জশিটে মিন্নির বিরুদ্ধে ‘হত্যার ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ আনা হয়েছে। চার্জশিটে রিফাত হত্যার আগে ও পরে মিন্নির সাথে ঘাতক নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজির সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও চার্জশিটে রিফাতকে নয়ন বন্ডরা কুপিয়ে জখম করার পরও নয়ন বন্ডের সঙ্গে ফোনে ও ক্ষুদে বার্তায় মিন্নির যোগাযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তার আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে মিন্নির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিপরীতে নয়ন বন্ডের মায়ের নামে নিবন্ধিত একটি সিম গোপনে মিন্নি ব্যবহার করত, এমন অভিযোগ এনে ওই নম্বরের সঙ্গে নয়ন বন্ডের বিভিন্ন সময়ে কল লিস্ট ও কল ডিটেইলস জমা দেয়া হয়েছে আদালতে।
এছাড়াও আলামত হিসেবে নিহত নয়ন বন্ডের বাসা থেকে জব্দ স্যালোয়ার কামিজ, আই ভ্রু, মিন্নির ছবি, মাথা আচড়ানো চিরুনি, চিরুনিতে পেচানো নারীদের চুল জমা দেয়া হয়েছে। চার্জশিটে বিবরণীতে অধিকাংশ জায়গায় মিন্নির বিরুদ্ধে রিফাত হত্যায় ষড়যন্ত্রের কথা বলা হয়েছে।

নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির সম্পর্কে সৃষ্ট বিরোধীতার জেরেই রিফাতকে হত্যার পরিকল্পনা করে মিন্নি ও নয়ন বন্ড এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে চার্জশিটে। বিবরণীতে বলা হয়, প্রথমে মিন্নি নয়নকে বিয়ে করে। বিষয়টি গোপন রেখে ফের রিফাত শরীফকে বিয়ে করে মিন্নি এবং নয়ন বন্ডের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ ও বাসায় যাতায়াত অব্যাহত রাখে। এ নিয়ে রিফাত শরীফের সঙ্গে মিন্নির দ্বন্ধের সৃষ্টি হয়। সবশেষ হেলাল নামের এক যুবকের কাছ থেকে রিফাত শরীফের মোবাইলফোন কেড়ে নেয়া থেকে নয়নের সঙ্গে রিফাতের দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত রূপ নেয়। সবমিলিয়ে মিন্নি ও নয়ন বন্ড মিলে রিফাত শরীফকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বরগুনার পাবলিক প্রসিকিউটর ভূবন চন্দ্র হাওলাদার দন্ডবিধি আইনের ১২০-বি (১) ধারা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধারায় কেউ অপরাধ সংগঠিত করলে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে মৃত্যুদন্ড, যাবজ্জীবন কারাবাস বা দুই বছর বা ততোধিক মেয়াদের সশ্রম কারাদণ্ডে দন্ডিত হতে পারেন। আদালত অপরাধ বিবেচনায় এর যে কোনো একটি শাস্তি দিতে পারেন।

মিন্নির আইনজীবী মো. মাহবুবুল বারি আসলাম বলেন, মামলার শুরু থেকে পুলিশের তদন্ত যে প্রক্রিয়ায় এগিয়েছিল, আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম। এই মামলার বাদীকে ভিকটিম রিফাত শরীফ মৃত্যুর আগে জবানবন্দিতে মিন্নিকে সাক্ষী করতে বলেছেন বলে আমরা জেনেছি। সেভাবেই মামলাটি দায়ের করা হয়। কিন্তু হঠাৎ করেই মাঝপথে নাটকীয় মোড় নিয়ে এখন যে পর্যায়ে এসে চার্জসীট হয়েছে, এটা সত্যি দুঃখজনক। উচ্চ আদালত মিন্নিকে জামিন দেওয়া এবং জামিনের আদেশ পরবর্তী চার পৃষ্ঠার রায়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য ও নির্দেশনার পরপরই হঠাৎ এ চার্জসীট দাখিল আমাদের অবাক করেছে। মূলত মিন্নির জামিন বাতিলে আপিলের গ্রাউন্ড তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য ছিল।

মামলার তদন্ত র্কমর্কতা মো. হুমায়ুন কবরি বলেন, মিন্নির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি এবং হত্যাকাণ্ডে সহায়তা, পরকিল্পনাসহ সুনর্দিষ্টি প্রমাণ পাওয়ায় মিন্নিকে মামলার সাত নম্বর আসামি করা হয়েছে। আমরা নিরবিচ্ছন্ন ও গভীর তদন্তরে পর রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের মামলায় চার্জসীট আদালতে দাখিল করেছি।

অন্যদিকে মিন্নির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে তার পরিবার। মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, একটি কুচক্রী মহলের ইন্ধনে পুলিশ এই মামলায় মিন্নিকে আসামি করেছে।

রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় পুলিশের দাখিল করা মূল চার্জসীট দুটি খণ্ডে মোট ৩৪ পৃষ্ঠার। এর প্রথম খণ্ডে মিন্নিসহ অন্য ১ জনের বিরুদ্ধে একটি খ- ১৬ পৃষ্ঠার এবং কিশোর অপরাধীদের অভিযোগ পত্র ১৮ পৃষ্ঠার। এছাড়াও ১৫ জন আসামির ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি জমা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও মামলায় ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ ধারায় বিভিন্ন সময়ে পুলিশের গ্রহণ করা ৭৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি, ৫০ টির বেশি আলামতের জব্দ তালিকা ও বিভিন্ন সময়ে আসামিদের ব্যবহৃত মুঠোফোনের কল ডিটেইলস চার্জশিটের সঙ্গে আদালতে জমা দেয়া হয়েছে।

আলামত হিসেবে একটি স্যামসাং ও একটি একটি ধূসর রঙের অ্যান্ড্রয়েড মুঠোফোন, হত্যায় ব্যবহৃত রামদা, বন্ড ০০৭ গ্রুপের সদস্যদের ম্যাসেঞ্জার গ্রুপের প্রোফাইল ছবির একটি স্ক্রিনশট, ঘটনার বিষয়ে বিভিন্ন স্ট্যাটাসের কপি ১২ কপি স্ক্রিনশট, বন্ড ০০৭ গ্রুপের ১১ জন সদস্যের প্রোফাইল ছবির ১১টি স্ক্রিনশট, বন্ড ০০৭ গ্রুপের ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে দেয়া ১১ জন সদস্যের ম্যাসেজের ১১ কপি স্ক্রিনশটের প্রিন্টেড কপি জমা দেয়া হয়েছে।

পুলিশের নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যমতে বয়সের ভিত্তিতে দাখিল করা দুই খণ্ডের চার্জশিটের প্রথম খন্ডে মিন্নিসহ ১০ জন আসামী রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে রিফাত ফরাজীকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে রয়েছে ১৪ জন কিশোরের নাম। এতে রিফাত ফরাজীর ছোট ভাই রিশান ফরাজীকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে।

মিন্নির জামিন শুনানীর জন্য বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এ মামলার মূল নথি রয়েছে। বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে থেকে মূল নথি আসার পর বরগুনা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগের উপর শুনানি শেষে আদালত ওই চার্জসীট গ্রহণ করলে পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে।

চার্জশিটে ২৪ আসামির মধ্যে ৯ জন পলাতক এবং বাকি ১৫ জন কারাগারে রয়েছেন। এদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিরা হলেন, মো. রাকিবুল হাসান ওরফে রিফাত ফরাজী (২৩), আল কাইয়ুম ওরফে রাব্বি আকন (২১), মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত (১৯), রেজোয়ান আলী খান হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় (২২), মো. হাসান (১৯), মো. মুসা (২২), আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি (১৯), রাফিউল ইসলাম রাব্বি (২০), মো. সাগর (১৯) ও কামরুল হাসান সায়মুন (২১)। অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামিরা হলেন, মো. রাশিদুল হাসান রিশান ওরফে রিশান ফরাজী (১৭), মো. রাকিবুল হাসান রিফাত হাওলাদার (১৫), মো. আবু আবদুল্লাহ্ ওরফে রায়হান (১৬), মো. ওলিউল্লাহ্ ওরফে অলি (১৬), জয় চন্দ্র সরকার ওরফে চন্দন (১৭), মো. নাইম (১৭), মো. তানভীর হোসেন (১৭), মো. নাজমুল হাসান (১৪), মো. রাকিবুল হাসান নিয়ামত (১৫), মো. সাইয়েদ মারুফ বিল্লাহ ওরফে মহিবুল্লাহ (১৭), মারুফ মল্লিক (১৭), প্রিন্স মোল্লা (১৫), রাতুল শিকদার জয় (১৬) ও মো. আরিয়ান হোসেন শ্রাবণ (১৬)।

শিশুর কোলে শিশু

এক কিশোরীকে প্রেম ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে আক্কাস বেপারী নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে। আক্কাসের বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার দক্ষিণ হোসনাবাদ গ্রামে। অভিযোগ রয়েছে বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের দক্ষিণ হোসনাবাদ গ্রামের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোরীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে একাধিক বার শারীরিক সম্পর্ক করেন একই গ্রামের মো. কালাম বেপারীর ছোট ছেলে আক্কাস বেপারী। ওই কিশোরী অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। এরপর চিকিৎসকেরা জানায় ওই কিশোরী চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে আক্কাসের পরিবারে ওই কিশোরীকে বিয়ে করার জন্য চাপ আসে। সমাজের প্রভাবশালী মহল থেকে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার জন্য নির্যাতিত ওই কিশোরীর পরিবারেও প্রস্তাব আসে। ওই কিশোরীর পরিবার এতে অসম্মতি জানিয়ে ন্যায়বিচারের জন্য বরগুনা নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে মামলা করে।
মামলার খবর পেয়ে আক্কাস ওই কিশোরীকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে এলাকা থেকে পালিয়ে যান। এমন পরিস্থিতিতে গত বুধবার (২৮শে আগস্ট) রাতে নির্যাতিত ওই কিশোরী একটি ছেলে সন্তানের মা হয়। জন্ম নেওয়ার চারদিন পার হয়ে গেলেও এখনো নাম রাখা হয়নি নবজাতকটির। এদিকে ওই নবজাতকের বাবা কে তা নিয়ে এলাকায় চলছে টানাহেঁচড়া। এ বিষয়ে নির্যাতিত ওই কিশোরী জানায়, আমি যে আমার পোলার একটা নাম রাখবো সেই সৌভাগ্যও আমার হয়নি। যেদিন আমি প্রসব বেদনায় ছটফট করেছিলাম সেদিনও আমাকে মারার জন্য আমার ঘরের দরজা কুপিয়ে গেছে আক্কাসের বাবা কালাম বেপারী। একটি প্রভাবশালী মহলের দাপটে তারা আমাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চলছে। ওই কিশোরী আরো জানায়, স্বামীর মর্যাদা না পেয়েও সন্তানের মা হয়েছি। আমার সন্তানের পরিচয় চাই।

Monday, August 26, 2019

নিজের বিয়ে নিজেই ভেঙ্গে দিলেন by আবু সাইদ খোকন

বরগুনার আমতলী পৌর শহরের নিজের বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছে ২য় শ্রেণীর ছাত্রী মনিকা (১০)। ঘটনাটি ঘটেছে ২৩ আগস্ট শুক্রবার রাতে। এ ঘটনায় বরের মা ও কনের মাকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা ও অনাদায়ে বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে।
জানাগেছে, আমতলী পৌর শহরের ৮নং ওয়ার্ডের বাসুগী এলাকার রিক্সা চালক জুয়েল প্যাদার মেয়ে আমতলী মফিজ উদ্দিন বালিকা বিদ্যালয় সংলগ্ন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২য় শ্রেণীর ছাত্রী মনিকার সাথে পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের রিক্সা চালক মোঃ তৌফিকের পুত্র পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মী সুমন (১৪) এর সাথে পারিবারিক ভাবে বিবাহের সিদ্ধান্ত হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। শিশু মনিকা তার বিয়ের কথা জানতে পেরে শুক্রবার বিকেলে কৌশলে বাসা থেকে বের হয়ে বান্ধবী কনিকা ও ফারজানাকে নিয়ে পরামর্শ করে বিয়ে বন্ধ করার জন্য প্রথমে তারা আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে যায়। কোর্ট বন্ধ দেখে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে মনিকা তার বান্ধবীদের নিয়ে আমতলী থানায় আসে। থানার ওসিকে সব ঘটনা খুলে বললে তাৎক্ষনিক এসআই নাসরিন সুলতানাকে দায়িত্ব দিয়ে বর সুমন, বরের মা ডলি বেগম ও কণ্যার মা শাহানাজ ওরফে শাহিনুরকে আটক করে। পরে পুলিশ আটককৃতদের ভ্রাম্যমান আদালতে সোপর্দ করে।
ভ্রাম্যমান আদালতের বিচারক সহকারী কমিশনার (ভূমি) কমলেশ মজুমদার বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের ২০১৭ এর ৮ ধারা মোতাবেক বরের মা ডলি বেগমকে ২ হাজার টাকা ও কনের মা শাহানাজ ওরফে শাহিনুরকে ১ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ২০ দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন।
সাহসী শিশু কণ্যা মনিকা জানান, আমি দুপুরে জানতে পারি শুক্রবার সন্ধ্যায় আমার বিবাহ হবে। আমি বিকেলে বান্ধবী কনিকা ও ফারজানার সাথে কোর্টে যাই। সেখানে কাউকে না পেয়ে আমতলী থানায় এসে বড় স্যারকে সব খুলে বলি। আমি লেখাপড়া করে অনেক বড় হতে চাই।
আমতলী থানার ওসি মোঃ আবুল বাশার বলেন, আমি সব ঘটনা শুনে পুলিশ পাঠিয়ে বর, বরের মা ও কনের মাকে আটক করে থানায় এনে ভ্রাম্যমান আদালতে সোপর্দ করি।
ভ্রাম্যমান আদালতের বিচারক সহকারী কমিশনার (ভূমি) কমলেশ মজুমদার বলেন, এর পূর্বে অনেক বাল্য বিবাহ রোধ করেছি। সার্বিক বিবেচনায় আমার নিকট এটি একটি হৃদয়বিদারক বাল্যবিয়ে। ধন্যবাদ জানাই সাহসী কণ্যা মনিকাকে। এত অল্প বয়সে নিজে নিজের বিয়ে ভেঙ্গে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো।
আমতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনিরা পারভীন বলেন, সাহসী কণ্যা মনিকা যতদূর লেখাপড়া করতে চায় আমরা তার জন্য সার্বিক সহযোগিতা করবো।

Thursday, August 8, 2019

বরগুনা হত্যাকাণ্ড: মাদক, রাজনৈতিক প্রভাব আর ক্ষমতার এক দুষ্ট চক্র - বিবিসি বাংলার সরেজমিন রিপোর্ট by আকবর হোসেন

এই কলেজের সামনেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে
লাস্ট আপডেট- ২২ জুলাই ২০১৯: বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বরগুনা শহরে দিনে-দুপুরে বহু মানুষের সামনে রিফাত শরীফ নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা এখন দেশজুড়ে আলোচনার বিষয়।
এই ঘটনার তদন্ত নাটকীয় মোড় নেয় যখন হত্যাকাণ্ডের ২১ দিন পরে রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে পুলিশ গ্রেফতার করে। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
ছোট এই জেলা শহরে একটি হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতায় বাংলাদেশের মানুষ স্তম্ভিত হয়ে যায়, যখন এর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
আর এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এবং এরপর রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা, সঙ্গে মাদক ব্যবসা জড়িত থাকার অভিযোগ, পুরো ঘটনাকে ভিন্ন এক মাত্রা দেয় - অভিযোগ ওঠে যে বড় কিছু আড়াল করতেই পেছন থেকে ক্ষমতাশালীরা কলকাঠি নাড়ছেন।
আমি বরগুনায় বিভিন্ন পেশার লোকজনের সাথে কথা বলেছি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা কিছু অভিযোগ তুলেছেন।
যে রাজনৈতিক মহলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো অভিযোগ উঠেছে, তাদের সামনে রয়েছেন বরগুনার একটি আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এবং তার আইনজীবী পুত্র সুনাম দেবনাথ।
এই হত্যা মামলার প্রধান আসামী পুলিশের সঙ্গে কথিত এক বন্দুকযুদ্ধে ঘটনার কয়েকদিন পরই নিহত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে নয়ন বন্ড নামে বরগুনাবাসীর কাছে পরিচিত এই সাব্বির আহম্মেদ ওই শহরে একটি গ্যাংয়ের নেতা, যাদের মদদ দেন মিঃ শম্ভুর পুত্র।
আমি বরগুনা শহরে থাকার সময়ে সুনাম দেবনাথের সঙ্গে কথা বলি, কিন্তু তিনি কোন সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি। আর তিনদিন চেষ্টা করেও তার পিতার কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে এর আগে বিবিসি বাংলার কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে পিতা-পুত্র দু'জনেই সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।

হত্যাকাণ্ডে মিন্নি ফ্যাক্টর?

মিন্নির সাথে রিফাত শরীফের প্রেমের সম্পর্ক ছিল দেড় থেকে দুই বছরের মতো - বিবিসি বাংলার কাছে এমনটা দাবি করেছেন মিন্নির বাবা মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন কিশোর।
দুই পরিবারের সূত্রেই বলা হয়েছে, রিফাত শরীফের মাধ্যমেই নয়ন বন্ডের সাথে মিন্নির পরিচয় হয়েছিল। নিহত রিফাত শরীফ এবং নয়ন বন্ড - দুজনেই স্কুল জীবন থেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এবং একসময় তারা দুজনেই একই গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়েন।
নয়ন বন্ড-এর মা শাহিদা বেগম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তার ছেলে প্রায় আটমাস আগে মিন্নিকে বিয়ে করে।
কথিত ওই বিয়ের একটি কাবিননামাও রয়েছে, কিন্তু বিয়েতে মিন্নির পরিবারের কেউ উপস্থিত ছিলেন না বলে তিনি জানান।
শাহিদা বেগম বলেন, বিয়ের পরে তাঁর ছেলে এবং পুত্রবধূ কুয়াকাটায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন যে মিন্নি কখনো তাদের বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস না করলেও নিয়মিত যাতায়াত করতো।
কিন্তু মাস দুয়েক আগে রিফাত শরীফের সাথে মিন্নির বিয়ে হয়। এই ঘটনা নয়ন বন্ডকে ক্ষিপ্ত করে বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে ধারণা দেয়া হয়।
বরগুনার এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, বেশ আয়োজন করেই রিফাত শরীফের সাথে মিন্নির বিয়ে হয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মিন্নি যদি নয়ন বন্ডের স্ত্রী হবেন, তাহলে রিফাত শরীফের সাথে মিন্নির বিয়ের সময় নয়ন আপত্তি তোলেননি কেন? কেন তিনি নিশ্চুপ ছিলেন? এই প্রশ্ন তুলেছেন মিন্নির মা মিলি আখতার।
মিন্নির পরিবার বলছে, নয়নের সঙ্গে কথিত বিয়ের বিষয়ে তারা কিছুই জানতেন না।
তবে এক পর্যায়ে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, নয়ন বন্ড জোর করে মিন্নিকে আটকে রেখে একটি কাবিননামায় স্বাক্ষর আদায় করে।
"ও একদিন ওর ছোট কাকার কাছে বলছে, আমার কাছে বলার সুযোগ হয় নাই ওর, এই রকম একটা কাহিনি করছে। আমি মনে করছি ও পোলাপান মানুষ, কী করছে, কী কয়, এটা আমরা তেমন একটা গুরুত্ব দেই নাই।"
এই কাবিননামাকে তিনি বানোয়াট বলে দাবি করেন।
মিন্নির বাবা প্রশ্ন তোলেন, "আমার কথা হইল, নয়ন বন্ডের সাথে যদি আমার মেয়ের বিবাহ হয়, তাহলে যেদিন আমার মেয়ের আনুষ্ঠানিক বিবাহ দিলাম সেদিন নয়ন বন্ড কোথায় ছিল?"
নয়ন বন্ডকে চেনেন এমন কয়েকজন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, মিন্নিকে পাওয়ার জন্য নয়ন বন্ড ব্যাকুল ছিল না। যদি তাই হতো, তাহলে মিন্নির বিয়েতে নয়ন বন্ড প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারতো, কিন্তু সেটি সে করেনি।
তবে নয়ন বন্ড এবং রিফাত শরীফের মধ্যে বন্ধুত্ব একসময় শত্রুতায় রূপ নেয় বলে জানাচ্ছেন বরগুনাবাসীরা। কারণ, নয়ন বন্ডের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রিফাত শরীফ ভিন্ন আরেকটি গ্রুপে যোগ দিয়েছিল।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মাস খানেক আগে একটি মাদকের মামলায় রিফাত শরীফকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিয়েছিলেন নয়ন বন্ড। এছাড়া, এই হত্যা মামলার আরেক আসামী রিফাত ফরাজীর সাথেও রিফাত শরীফের দ্বন্দ্ব ছিল।
কিছুদিন আগে রিফাত ফরাজীকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আহত করে রিফাত শরীফ - এমন কথা শোনা গেছে এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে।
বেশ কিছুদিন আগে বরগুনা শহরে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের বাড়ির সামনে একটি রেস্তোঁরায় খাবার খেতে যায় রিফাত শরীফ। তখন ওই বাড়ির সামনে মোটর সাইকেল পার্কিং করাকে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যানের স্ত্রীর সাথে রিফাত শরীফের বচসা হয়।
এই বিষয়টি হত্যা মামলার দুই আসামী রিফাত ফরাজী এবং রিশান ফরাজী - এই দুই ভাইকে ক্ষুব্ধ করে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। কারণ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের স্ত্রী তাদের খালা।
রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন আগে রিফাত শরীফ তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে কিনা - এমন প্রশ্নে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের স্ত্রী খুকি অবশ্য বিস্ময় প্রকাশ করেন।
তিনি বিবিসি বাংলার কাছে দাবি করেন, রিফাত শরীফকে তিনি কখনো দেখেননি, বাকবিতণ্ডা তো দূরের কথা।

মিন্নিকে গ্রেফতারের জন্য রাজনৈতিক চাপ

রিফাত শরীফকে যারা প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করেছে, তারা বরগুনা শহরে সংঘবদ্ধ অপরাধী হিসেবে পরিচিত।
বরগুনা শহরে ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদকের অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন নয়ন বন্ড এবং রিফাত ফরাজী - এমন অভিযোগ রয়েছে। মাদকের মামলায় এরা বেশ কয়েকবার কারাগারেও গিয়েছিলেন।
রিফাত হত্যাকাণ্ডের পর যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তাহলো এরা কার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এতোটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন?
কিন্তু এ আলোচনা আড়ালে চলে যেতে থাকে যখন নিহত রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ গত ১৩ই জুলাই, অর্থাৎ ঘটনার ১৮ দিন পরে পুত্রবধূ মিন্নির গ্রেফতারের দাবি তোলেন।
বরগুনায় কর্মরত একাধিক সাংবাদিক বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথ সংবাদ সম্মেলন করাতে দুলাল শরীফকে নিয়ে বরগুনা প্রেসক্লাবে এসেছিলেন।
দুলাল শরীফ যখন সংবাদ সম্মেলন করেন, তখন সুনাম দেবনাথ অন্য আরেকটি কক্ষে অবস্থান করেন।
তখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, রাজনৈতিক চাপে পড়ে দুলাল শরীফ সংবাদ সম্মেলনটি করেছেন কিনা। যদিও মিঃ শরীফ বিবিসি বাংলার কাছে দাবি করেন, তিনি কারো দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন না।

এমপি পুত্রের তৎপরতা

রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড এবং মিন্নির গ্রেফতারের পর বরগুনায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সুনাম দেবনাথ - অভিযোগ, তিনি তার পিতার রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে মামলার তদন্তে নানা রকম প্রভাব খাটাচ্ছেন।
এমন অভিযোগও রয়েছে যে মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে নিহতের বাবা দুলাল শরীফকে দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করিয়ে ক্ষান্ত হননি সুনাম দেবনাথ।
মিন্নির গ্রেফতারের দাবিতে বরগুনা শহরে তার উদ্যোগে সমাবেশও হয়েছে।
সুনাম দেবনাথ নিজেও সেখানে উপস্থিতি ছিলেন। মিঃ দেবনাথের অনুসারীরা ফেসবুক এবং ইউটিউবে এ হত্যাকাণ্ডকে নানাভাবে 'নারীঘটিত বিষয়' হিসেবে প্রমাণের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
যা সবাইকে বিস্মিত করেছে, তাহলো মিন্নিকে গ্রেফতারের পরদিন যখন আদালতে উপস্থাপন করা হয়, তখন তার পক্ষে বরগুনায় কোন আইনজীবী পাওয়া যায়নি।
মিন্নির পিতা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, মেয়ের পক্ষে আদালতে দাঁড়ানোর জন্য তিনি তিনজন আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। এদের মধ্যে একজনকে তিনি টাকাও দেন। কিন্তু তাদের সবাই শেষ মুহূর্তে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্যের পুত্র সুনাম দেবনাথ নিজে বরগুনার একজন আইনজীবী।
গত ২৭শে জুন তিনি তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, "আমরা বরগুনার আইনজীবীরা রিফাত শরীফ হত্যাকারীদের কোন আইনি সহায়তা দিব না, একজনকেও না। আশাকরি আমার এই প্রস্তাবের সাথে সকল আইনজীবীরা একমত হবেন।"
মিঃ দেবনাথের এই ফেসবুক পোস্ট আইনজীবীদের উপর এক ধরণের চাপ তৈরি করে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন আইনজীবী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরগুনার একজন সিনিয়র আইনজীবী বিবিসি বাংলাকে বলেন, মিন্নিকে যেদিন আদালতে উপস্থাপন করা হচ্ছিল সেদিন মিঃ দেবনাথের অনুসারীরা আইনজীবীদের ''অহেতুক ভিড় না করার'' পরামর্শ দেন।
"তখনই আমরা বুঝতে পারলাম যে বিষয়টা কোন দিকে যাচ্ছে," বলছিলেন ওই আইনজীবী। তার মতে, আইনজীবীদের অনেকেই নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
সম্প্রতি কুমিল্লায় আদালতের ভেতরে একটি হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন , "যে দেশে বিচারকের সামনে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, সেখানে আমার জীবনের নিরাপত্তা কোথায়?"

কেন রাজনৈতিক চাপ

রিফাত হত্যাকাণ্ডের পর আলোচনা জোরদার হতে থাকে যে এই অপরাধের মদদদাতা কারা?
রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার জন্য যারা প্রত্যক্ষভাবে দায়ী বলে অভিযোগ উঠেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজীসহ ১৬ জন। বরগুনা শহরে মাদকসহ নানা অপরাধ তৎপরতার সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
এই অপরাধী চক্রের পেছনে রাজনৈতিক মদদ ছিল।
এই অপরাধী চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্য মাদকের মামলায় কারাগারে গেলেও তাদের বেশি দিন আটকে রাখা সম্ভব হয়নি।
এবং রাজনৈতিক প্রভাবেই তারা জেল থেকে বের হয়ে দ্বিগুণ উদ্যমে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, বরগুনা শহরে এমন অভিযোগ বেশ জোরালো।
বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে, এমন আশংকা থেকেই মামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা।
বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুবায়ের আদনান অনিক প্রশ্ন তোলেন, "মাদকটা কে চালায়? মাদকের পিছনে কারা জড়িত? এই যে নয়ন কাদের প্রশ্রয়ে এতদূর এসেছে?"
বিষয়গুলো নিয়ে সুনাম দেবনাথের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি।
সাক্ষাৎকারের জন্য বিবিসির পক্ষ থেকে টেলিফোন করা হলে মিঃ দেবনাথ বলেন, "কয়েকটা মিডিয়া এরই মধ্যে এ ঘটনায় আমাকে ভিলেন বানিয়েছে। সেজন্য এই মুহূর্তে কোন সাক্ষাৎকার দিতে চাচ্ছি না।"
তবে গত ১৮ জুলাই বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছিলেন, "আমার বিরোধী পক্ষের কিছু লোক আর স্থানীয় কিছু সাংবাদিক, নির্বাচনের সময় থেকে আমার বিরুদ্ধে রীতিমত উঠেপড়ে লেগেছে। রিফাত আমার বন্ধুর মতো ছিল। তার মৃত্যুতে আমি সবার আগে, সুষ্ঠু বিচার চাই।"
"আমার ফেসবুকে আমি সবার বিচার চেয়ে পোস্ট দিয়েছি। আপনারা সবাই দেখেছেন। ষড়যন্ত্রে প্লিজ বিশ্বাস করবেন না," ওইদিন বলেছিলেন তিনি।

স্থানীয় রাজনীতি

বরগুনার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বেশ প্রভাবশালী ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু।
তবে দলটির নেতারা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের কিছুদিন পর থেকে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।
বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এখন মিঃ শম্ভুর বিপক্ষে। কয়েক বছর আগে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা একত্রিত হয়ে মিঃ শম্ভুর বিপক্ষে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে অভিযোগও দাখিল করেছেন।
একজন সংসদ সদস্য হিসেবে বরগুনার প্রশাসনে তাঁর প্রভাব থাকলেও বরগুনা আওয়ামী লীগে তিনি অনেকের কাছেই অপছন্দের পাত্র।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র নেতা বিবিসি বাংলাকে বলেন, দলের ভেতরে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে যাবার পর আধিপত্য ধরে রাখতে অপরাধী চক্র গড়ে তোলেন মিঃ শম্ভুর ছেলে।
সেজন্য এই সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ড আড়াল করতেই রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডকে নারীঘটিত বিষয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিজের নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে খুব কম মানুষই আগ্রহী বরগুনা শহরে। তবে তাদের ধারণা, রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে বন্দী হয়ে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
বিষয়গুলো নিয়ে সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর সাথে বারবার কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি টেলিফোন ধরেননি। সংসদ ওয়েবসাইটে তাঁর দুটো টেলিফোন নম্বর দেয়া আছে। এর একটি বন্ধ এবং অপরটি তাঁর স্ত্রী রিসিভ করে বলছেন যে তিনি বাড়িতে নেই।
অভিযোগের বিস্তারিত জানিয়ে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর দুটো মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি কোন উত্তর দেননি।
তবে তিনিও বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন গত ১৮ই জুলাই। তখন তিনি বলেছিলেন, "আমার এতো বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে কোন গুন্ডা বাহিনী নিয়ে চলিনি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের সঙ্গে আমার বা আমার দলের কোন সম্পৃক্ততা নেই। সবার মতো আমিও চাই এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হোক। এক্ষেত্রে আমি সব ধরণের সহযোগিতা দিতে রাজি আছি।"
অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলেও দাবি করেছেন ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু।
আর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির দাবি করেছেন, এই মামলার তদন্তে কোন রাজনৈতিক চাপ নেই।
আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি - ছিলেন মামলার প্রধান সাক্ষী, তবে এখন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত

Saturday, August 3, 2019

বরগুনায় শিকলবন্দি কিশোরী উদ্ধার

হাফছা আক্তার নামে ১৭ বছরের এক কিশোরীকে গত তিনদিন ধরে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে তার নানি, খালা ও মামাসহ অন্য আত্মীয়রা। ঘটনাটি ঘটেছে বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার ডৌয়াতলা ইউনিয়নের দক্ষিণ ভাইজোড়া গ্রামে। নির্যাতনের শিকার ওই কিশোরী পাথরঘাটা উপজেলার লেমুয়া গ্রামের আবুল হোসেনের মেয়ে। সে লেমুয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। বুধবার বিকালে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে পরিবারের লোকজন তাকে শিকলমুক্ত করে। নির্যাতনের শিকার ওই কিশোরী জানায়, স্থানীয় এক যুবকের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক হয়। এটা পরিবারের লোকজন মানতে রাজি নয়। রোববার ওই ছেলের সঙ্গে ঘর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করে সে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান তাদের বিবাহের আশ্বাস দিলে সে পালানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করে। মেয়েটির মা ও বাবা এলাকায় না থাকায় তিনি ওই কিশোরীকে দক্ষিণ ভাইজোড়া গ্রামের তার নানি হসিনা বেগম ও খালা হনুফা বেগমের জিম্মায় দেন। কিন্তু যাদের জিম্মায় ওই কিশোরীকে রাখা হয়েছে তারা রোববার থেকে বুধবার এই তিনদিন শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালায়। স্থানীয় সাংবাদিকরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে তার পায়ের শিকল খুলে দেয়া হয়। কিশোরীর মা নুর জাহান বেগম বলেন, আমার মেয়ে এখনো অবুঝ। ও যে ছেলেটিকে পছন্দ করেছে ওই ছেলেটি মাদক মামলার আসামি। ছেলেটি পূর্বে একটি বিয়েও করেছে। তাই ওর সঙ্গে আমার মেয়েকে কিছুতেই বিয়ে দেবো না। তাতে যদি ওকে কেটে ভাসিয়ে দিতে হয় তাই দেবো। এ বিষয়ে বামনা উপজেলার ডৌয়াতলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান বলেন, মেয়েটি অপ্রাপ্ত বয়স্ক। সে এক মাদক মামলার আসামির সঙ্গে ঘর ছেড়ে পালাতে চেয়েছিল। আমি তাকে উদ্ধার করে তার নানি ও খালার জিম্মায় দেই। তারা শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে অন্যায় করেছে। এটা করা তাদের ঠিক হয়নি। বামনা থানার ওসি এসএম মাসুদ্দুজ্জামান বলেন, বিষয়টি এখন পর্যন্ত আমাকে কেউ অবহিত করেনি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Monday, July 29, 2019

‘বন্ড ০০৭’ এখন ‘টিম ৬১’ by মো. মিজানুর রহমান

২রা জুলাই ভোররাতে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর নয়নের একটি ছবি ‘টিম ৬১’ গ্রুপে আপলোড করেন শাহরিয়ার। চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ‘বন্ড ০০৭’ গ্রুপের সদস্যরা ‘টিম ৬১’ নামের ভিন্ন একটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে সক্রিয় থেকে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছেন এবং ঘটনা প্রবাহে নজর রাখছেন বলে জানা যায়। রিফাত হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর ‘বন্ড ০০৭’ গ্রুপটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এর আগে রিফাত হত্যাকাণ্ডের পর অনেক সদস্যই গ্রুপ ত্যাগ করেন। অন্যদিকে রিফাত হত্যাকাণ্ডের পর ‘বন্ড ০০৭’ গ্রুপের নাম পরিবর্তন করে তৈরি করা হয় ‘টিম ৬১’ নামের নতুন গ্রুপ। প্রথমদিকে গ্রুপে অনেককে যোগ করা হলেও পরবর্তীতে শুধু বিশ্বস্তদের রেখে বাকিদের রিমুভ করা হয় নতুন এ গ্রুপ থেকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‘টিম ৬১’-এর একজন সদস্য বলেন, ‘বন্ড ০০৭’ গ্রুপটি নিষ্ক্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই নতুন এ গ্রুপটি তৈরি করা হয়। সেখানে ৬১ জন সদস্যকে যোগ করার কারণে গ্রুপের নামকরণ ‘টিম ৬১’ করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়।
সেই সদস্য জানান, ‘বন্ড ০০৭’ গ্রুপের সদস্য শাহরিয়ার ইমরান, সাদনাম পাপ্পু, আসিফ সৈকত, আব্দুল্লাহ রিফাত নতুন গ্রুপে সক্রিয় থেকে ঘটনার দিকে নজর রাখছেন এবং রিফাত হত্যাকাণ্ড ও নয়ন বন্ডের নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছেন।
ফেঁসে যাচ্ছেন সংসদ সদস্যপুত্র সুনাম দেবনাথ
রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা এখন দেশজুড়ে আলোচনার বিষয়। এই ঘটনার তদন্ত নাটকীয় মোড় নেয় যখন হত্যাকাণ্ডের ২১ দিন পরে রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার দিন যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বামীকে বাঁচাতে চেষ্টা চালিয়েছিলেন সেই মিন্নিকেই ফাঁসাতে তৎপর হয়ে ওঠেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথ।
তার লোকজনই মিন্নির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের কুৎসা রটায়। মিন্নির গ্রেপ্তারে চাপ তৈরিতে সুনাম দেবনাথ নিজে উপস্থিত থেকে রিফাত শরীফের বাবাকে দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করান। আবার বরগুনার সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে মানববন্ধনে তিনি নিজেও মিন্নির গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবি করেন।
বরগুনার স্থানীয়দের অভিযোগ, সুনাম দেবনাথের এমন তৎপরতায়ই পুলিশ তদন্তের রূপরেখা তৈরি করে। মূল আসামিকে বাদ দিয়ে মামলার প্রধান সাক্ষীকে আসামি করতে তারা তৎপর হয়ে ওঠে। মিন্নির পক্ষে না দাঁড়াতে আইনজীবীদেরও চাপ দেন সুনাম দেবনাথ। রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড এবং মিন্নির গ্রেপ্তারের পর বরগুনায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সুনাম দেবনাথ।
অভিযোগ রয়েছে, সুনাম দেবনাথ তার পিতার রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে মামলার তদন্তে নানা রকম প্রভাব খাটাচ্ছেন। তবে চাপের বিষয় মানতে নারাজ বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন।
পুলিশ সুপার বলেন, কেউ চাপ দিচ্ছে না। চাপ তো দূরে থাক কেউ মামলার বিষয়ে কোনো অনুরোধও করছে না।
আরো অভিযোগ রয়েছে, মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে রিফাতের বাবা দুলাল শরীফকে দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করিয়ে ক্ষান্ত হননি সুনাম দেবনাথ। মিন্নির গ্রেপ্তারের দাবিতে নিজে মানববন্ধন করার সঙ্গে নিজের অনুসারীদের দিয়ে ফেসবুক এবং ইউটিউবে এ হত্যাকাণ্ডকে নানাভাবে নারীঘটিত বিষয় হিসেবে প্রমাণের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।
এ বিষয়ে সুনাম দেবনাথের বক্তব্য জানতে গত কয়েক দিনে অসংখ্যবার তার মোবাইলফোনে কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
মিন্নি ভালো নেই, বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে: মিন্নির সঙ্গে কারাগারে দেখা করেছেন তার বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যরা। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে তারা বরগুনা জেলা কারাগারের সামনে এসেছিলেন। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তারা মিন্নির সঙ্গে দেখা করে মলিন মুখে চলে গেছেন।
এ সময় মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর অনেকটা ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি কোনো মতামত দিতে রাজি না হলেও রাগের সঙ্গে বলেছেন, তার মেয়ে ভালো নেই, বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন। সাদা পোশাকধারী পুলিশের প্রতি ক্ষোভ জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের জন্য মেয়ের সঙ্গে মন খুলে কথা বলতেও পারেন না। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলেও তারা কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন।

Sunday, July 28, 2019

‘কে হ্যারে বন্ড বানাইলো, তোমরা খুঁইজা বের করো’ -বন্ডের মা by আমানুর রহমান রনি ও সুমন সিকদার

শাহিদা বেগম ও তার ছেলে নয়ন বন্ড
বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যার মামলার প্রধান আসামি ‘বন্দুকযদ্ধে’ নিহত নয়ন বন্ডের মা শাহিদা বেগম বলেছেন, আমার ছেলেকে ষড়যন্ত্র করে ক্রসফায়ারে মারা হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়—এটা প্রভাবশালী মহলের চক্রান্ত। তিনি বলেন, ‘কে হ্যারে বন্ড বানাইলো, জিরো জিরো সেভেন বানাইলো, তোমরা খুঁইজা বের করো।’

শাহিদা বেগম বলেন, ‘আমি টিভির হেড লাইনে পাথরঘাটা বইসা দেখছি, কেউ একজন কইছে—আমার ছেলে সীমান্তের কাছে আছে। সেই ছেলে তিন দিন পর পুরাকাটা এসে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায় কীভাবে? তার সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন। তার হাতের নক ও কান নাই। ওরা আমার বাবারে (নয়ন) মাইরা হালাইছে।’

গত ২২ জুলাই রবিবার বিকালে বরগুনা শহরের ডিকেপি রোড এলাকায় নিহত সাব্বির আহমেদ নয়নের (নয়ন বন্ড) বাড়িতে গেলে দূর থেকেই তার মায়ের কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। বিলাপ করতে করতে এই প্রতিবেদকদের কাছে ছেলের মাদক ব্যবসায়ী হয়ে ওঠা থেকে শুরু করে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার জন্য প্রভাবশালী মহলকে দায়ী করেন শাহিদা বেগম।

মিন্নির সঙ্গে নয়ন বন্ডের বিয়ের বিষয়ে শাহিদা বেগম বলেন, ‘নয়ন মিন্নিকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। পরে শুনেছি, তারা নিজেরাই বিয়ে করেছে। আমি এই বিয়েতে রাজি ছিলাম না। আমি নয়নকে বলেছিলাম—মিন্নি ভালো না, ওরে বিয়ে করিস না।’

নয়ন বন্ডের মা অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ছেলে দোষী, এটা আমি জানি। কিন্তু সে তো একদিনে নয়ন বন্ড তৈরি হয়নি। তাকে তৈরি করা হয়েছে। প্রভাবশালী মহল তাকে ব্যবহার করার জন্য নয়ন বন্ড হিসেবে তৈরি করেছে।’

কোন প্রভাবশালী মহল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তা ঠিক বলতে পারবো না। তবে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ, তার মুখ থেকে যদি প্রভাবশালী মহলের সব অপকর্মের ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়, সেই জন্যই।’

এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলের বাপ নাই, তাই ওরে মাইরা ফ্যালা হইছে। যাতে আসল রহস্য আড়াল করা যায়। আমার ছেলে তো খুনি ছিল না। সে মাদকসেবী ছিল। নিশ্চয়ই এর পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে।’

সাব্বির আহমেদ নয়ন কীভাবে নয়ন বন্ড হয়ে গেল? এ প্রশ্নের জবাবে শাহিদা বেগম বলেন, ‘সে ভালো ছাত্র ছিল। কিন্তু ক্লাস টেন থেকে আস্তে আস্তে মাদকের জগতে প্রবেশ করে। কে হ্যারে বন্ড বানাইলো, জিরো জিরো সেভেন বানাইলো, তোমরা খুঁইজা বের করো। এর আগে নয়ন বন্ড ১২ লাখ টাকাসহ ধরা পড়েছিল। সে এত টাকা কোথায় পাইলো? কে দিলো? তোমরা খুঁইজা বের করো।’

উল্লেখ্য, গত ২৬ জুন সকালে প্রকাশ্যে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজির নেতৃত্বে দুর্বৃত্তরা নির্মমভাবে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। ওইদিন বিকালে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রিফাত শরীফ মারা যান। এ ঘটনায় পরদিন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি ছিল নয়ন বন্ড। এরপর গত ২ জুলাই ভোর রাতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় সে।

Saturday, July 27, 2019

রিফাতকে ফাঁসানোর পরিকল্পনায় ছিল পুলিশও, রিফাতের বাবার দাবি by আমানুর রহমান রনি

বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার আগে তাকে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর জন্য নয়ন বন্ড ফাঁদ তৈরি করেছিল এবং তাতে পুলিশের অংশগ্রহণ ছিল বলে দাবি করেছেন বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘মিন্নি, নয়ন ও তিনজন পুলিশ অফিসার ষড়যন্ত্র করে আমার ছেলেকে ধরিয়ে দিয়েছিল।’ সম্প্রতি পাওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রিফাতকে বাঁধার জন্য পুলিশ দড়ি খুঁজছে। এ সময় পাশ থেকে একজন গরুর দড়ি খোঁজার কথা বলে। রিফাত ও মিন্নির পরিবারের অভিযোগ, নয়ন ষড়যন্ত্র করে রিফাতকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়। তবে পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এ বছরের ২৬ এপ্রিল মিন্নির সঙ্গে বিয়ের ১৫ দিন পর ১১ মে রিফাতকে বরগুনার ৯ নম্বর ইউনিয়নের লাকুরতলা এলাকার একটি সড়ক থেকে গাঁজাসহ আটক করে বলে দাবি করে পুলিশ। এ ঘটনায় বরগুনা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা হয়। এতে ১৭ দিন কারাগারে ছিলেন রিফাত।

এ প্রসঙ্গে রিফাতের বাবা বলেন, ‘এটি অন্য একটি ষড়যন্ত্র ছিল। ষড়যন্ত্রে মিন্নি, নয়ন ও তিন পুলিশ অফিসার জড়িত ছিল। নয়ন তথ্য দিয়ে রিফাতকে ধরিয়ে দেয়।’ তিনি বরগুনা থানার তিন পুলিশ অফিসারের নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘এসআই (উপ-পরিদর্শক) আসাদুজ্জামান ও কাজী ওবায়দুর রহমান এবং সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মো. সোহেল খান সেখানে উপস্থিত ছিলেন।’

আসাদুজ্জামান বর্তমানে পিরোজপুর জেলা পুলিশে কর্মরত আছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি বদলি হন। তবে এস আই কাজী ওবায়দুর রহমান ও এএসআই মো. সোহেল খান বর্তমানে বরগুনা সদর থানাতেই কর্মরত রয়েছেন।

দুলাল শরীফ বলেন, ‘নয়ন বন্ড ও মিন্নি চলতি বছরের ১১ মে আমার ছেলেকে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে জেল হাজতে পাঠায়। রিফাত এই ১৭ দিন জেলে থাকার সময় নয়নের সঙ্গে মিন্নির যোগাযোগ ছিল।’

এ বিষয়ে এএসআই সোহেল খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেদিন রাত ১১টার দিকে রিফাত মোটরসাইকেলে আসছিল। আমাদের সিনিয়র অফিসাররা তাকে থামানোর ইঙ্গিত দিলেও সে থামছিল না। এরপর আমি তাকে থামাই। তার পেছনে যে ছেলেটি ছিল, সেই ছেলেটি তার পকেট থেকে এক পোটলা গাঁজা মাটিতে ফেলে দেয়। এরপর রিফাতের পকেট হাতড়ে আরও এক পোটলা গাঁজা পাওয়া যায়। সেখানে ৫০ থেকে ১০০ জন মানুষ ছিল। এতো মানুষের সামনে আমরা কীভাবে ষড়যন্ত্র করলাম? ওই রাতেই রিফাতের বাবা থানায় এসে আমাদের অনেক অনুরোধ করেছেন ছেড়ে দেওয়ার জন্য।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি কোনও ষড়যন্ত্র করতাম, তাহলে তো আমাদের থানা ঘেরাও দিতে পারতো। তা তখন দিলো না কেন?’
বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা
রিফাতকে গ্রেফতারের সময় যে ভিডিওটি করা হয়েছিল, সেটি নয়ন বন্ড করেছে বলে নিশ্চিত হয়েছেন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ। তিনি বলেন, ‘ভিডিওতে যার কথা শোনা যাচ্ছে সে নয়ন। এটা নয়নের কণ্ঠই। সে ভিডিও করেছে, ছড়িয়ে দিয়েছে। এটা পুলিশও জানতো।’

তবে এএসআই সোহেল খান বলেন, ‘সেখানে অনেক মানুষ ছিল, ভিডিও কে করছে, আমি জানি না। আমরা এখন ভিডিওর কথা শুনছি, আগে কখনও ভিডিওর কথা শুনিনি।’

রাতের ভিডিওতে দেখা যায়, এএসআই সোহেল রিফাতের প্যান্ট কোমরের দিকে ধরে বলছেন, ‘তোর বাপের মুখটা যখন দেখলি, তখন গাড়িটা থামাইলি না কেন?’ এরপর কিছু খারাপ ভাষায় বকা দেয় এএসআই সোহেল। এরমধ্যে কয়েকবার রিফাত শরীফের পায়ে লাথি দেয় পুলিশ। এ সময় রিফাত এএসআই সোহেলকে উদ্দেশ করে বলে, ‘পা-ডা ভাঙা।’ পাশ থেকে একজন বলে ওঠে, ‘পা ভাঙা হেতে কী হইছে, আবার ভাঙবে।’ এরপর পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘থানায় নিয়ে আবার ভাঙমু।’

এরপর এএসআই সোহেল রিফাতকে বাঁধার জন্য রশি চান। পাশের একজনকে জিজ্ঞাসা করেন– মোটা রশি আছে কিনা? এ সময় উৎসুক একজন (কণ্ঠ শোনা যায়, দেখা যায় না) বলে ওঠেন, ‘একটা গরুর রশি লইয়ান দেহি।’

এ সময় আরেক ব্যক্তি বলে ওঠেন, ‘পাপে ছাড়ে না বাপেরেও। তুই আসটোদিন আমারে ডিবি পাডাইছো, আজ তুই ধরা খাইছো।’ এ সময় রিফাত শরীফ তাকে বলে, ‘তোরডে জিগাই নাই।’

এসআই ওবায়দুর এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেদিন আমরা অন্য একটি অভিযানে গিয়েছিলাম। ১৫৬ পিস ইয়াবাসহ তিনজন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করি। আমাদের সঙ্গে মোটরসাইকেল ছিল দুটি। কিন্তু আসামিসহ লোক বেশি হওয়ায় আমরা একটা মোটরসাইকেলের জন্য লাকুরতলায় অপেক্ষা করছিলাম। এ সময় একটা মোটরসাইকেল দ্রুতগতিতে আসে। মোটরসাইকেলটিকে থামানোর নির্দেশ দেওয়ার পরও সামনে যায়। তখন এএসআই সোহেল মোটরসাইকেলটিকে আটক করে। এ সময় রিফাত মোটরসাইকেলের পেছনে ছিল, সাগর নামে একজন চালাচ্ছিল। তাদের তল্লাশি করে দুই পোটলা গাঁজা পাওয়া যায়। এরপর বিষয়টি ওসি স্যারকে জানাই। ওসি স্যার গাড়ি পাঠানোর পর তাকে থানায় নিয়ে আসি। এ সময় সেখানে ৫০/৮০ জন স্থানীয়রা ছিল। নয়ন ছিল কিনা জানি না, থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। তবে আমি দেখিনি। পরে আমি একটা ভিডিও দেখেছি। তবে ভিডিওটা নয়ন করেছে কিনা আমি জানি না।’

রিফাত হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ১৫ আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা সবাই ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। প্রধান আসামি নয়ন বন্ড ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। তবে মামলার এজাহারভুক্ত ১২ আসামির মধ্যে এখনও চারজন গ্রেফতার হয়নি।

প্রসঙ্গত, ২৬ জুন সকালে প্রকাশ্যে বরগুনা সরকারি কলেজ গেটের সামনে রিফাতকে কুপিয়ে আহত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় বরিশাল নেওয়ার পর তিনি মারা যান। এ ঘটনায় রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা থানায় হত্যা মামলা করেন।

Friday, July 26, 2019

বরগুনায় রিফাত হত্যাকাণ্ড: জবানবন্দি প্রত্যাহার করতে চান মিন্নি

পুলিশ নির্যাতন করে রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে বলে দাবি করেছেন মিন্নির পরিবার ও তার আইনজীবী। মিন্নি জবানবন্দি পরিবর্তন করতে চান বলেও জানান তারা। তবে এই জবানবন্দি পরিবর্তনের জন্য মিন্নিকে বেশ কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। নির্যাতন বা জোর করে জবানবন্দি নেয়ার বিষয়টি আদালতে প্রমাণও করতে হবে।

মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম জানান, বুধবার মিন্নির সঙ্গে দেখা করার সময় আমি জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদনপত্র নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ তা অনুমোদন করেনি। তারা বলেছে, এ ধরনের আবেদনপত্র বাইরে থেকে দেয়ার কোনো উপায় নেই। এই আবেদন মিন্নিকে নিজ হাতে লিখতে হবে।
এজন্য তাকে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে কাগজ ও কলম চাইতে হবে। আমি বলে এসেছি চাইতে। আমি মিন্নিকে সব বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি কীভাবে আবেদন করতে হবে।

এ বিষয়ে বরগুনার জেল সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত মিন্নি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে কাগজ-কলম চাননি। তবে তিনি যদি আবেদন করেন তবে কাগজ ও কলম সরবরাহ করা হবে। জবানবন্দি প্রত্যাহার ছাড়াও যেকোনো আবেদন আসামি যদি করতে চান, জেল সুপারের মাধ্যমেই করতে হবে। এটাই কারাবিধি। জেল কর্তৃপক্ষ সেটা কোর্টে পাঠাবে। আইনজীবীর কোনো ভূমিকা নেই। আর কোর্টে পাঠানোর আগে আমি চেক করবো আবেদন ঠিক আছে কিনা।

ঢাকা জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী প্রকাশ বিশ্বাস এ প্রসঙ্গে বলেন, যদি আসামি কারাগারে থাকেন, সেক্ষেত্রে জবানবন্দি প্রত্যাহারের জন্য তাকেই আবেদন করতে হবে। কারাবিধি অনুযায়ী এটাই নিয়ম। যদি আসামি লিখতে সমর্থ না হন, তাহলে আদালতের সম্মতি নিয়ে ও বিচারকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে আবেদন আদালতে গৃহীত হলেও বিচার শুরুর পর সাফাই সাক্ষীর মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে প্রথম জবানবন্দি জোর করে নেয়া হয়েছিল।

গত ১৯শে জুলাই শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মিন্নির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়া হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। তবে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর দাবি করেছেন, নির্যাতন ও জোর-জবরদস্তি করে তার মেয়ের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়া হয়েছে। তার আইনজীবী মাহবুবুল বারীও বলেছেন, জেল সুপারের সামনে মিন্নি বলেছেন, তার সঙ্গে জোর-জবরদস্তি হয়েছে। তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে।

মঙ্গলবার মিন্নির জামিন আবেদন গ্রহণ করেছেন বরগুনা জেলা দায়রা জজ আদালত। মঙ্গলবার বিচারক আসাদুজ্জামানের এজলাসে জামিন আবেদনের শুনানি হয়। পরে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে নথি তলব করেন এবং আদেশ দেয়ার জন্য ৩০শে জুলাই তারিখ নির্ধারণ করেন আদালত।

রিফাত হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত মিন্নিসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা সবাই ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। প্রধান আসামি নয়ন বন্ড ২রা জুলাই পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তবে মামলার এজাহারভুক্ত ১২ আসামির মধ্যে এখনো চারজন গ্রেপ্তার হয়নি। তারা হচ্ছেন মুসা, মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত, রায়হান ও রিফাত হাওলাদার। আগামী ৩১শে জুলাই মামলার চার্জ গঠনের তারিখ ধার্য রয়েছে।

Wednesday, July 24, 2019

নয়ন বন্ডকে ১২ লাখ টাকা কে দিয়েছিল? by মো. মিজানুর রহমান

রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির জামিন আবেদন গ্রহণ করেছেন বরগুনা জেলা দায়রা ও জজ আদালত। গতকাল বিচারক মো. আসাদুজ্জামানের এজলাসে জামিন আবেদনের শুনানি হয়। পরে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে নথি তলব করেন এবং আদেশ দেয়ার জন্য ৩০শে জুলাই তারিখ নির্ধারণ করেন। গতকাল সকালে বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মিন্নির জামিনের আবেদন করা হয়। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আদালত আবেদনটি গ্রহণ করে শুনানির তারিখ ধার্য করেন। রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে মিন্নি এখন কারাগারে আছেন।

সমপ্রতি মিন্নির শ্বশুর তার ছেলে হত্যাকাণ্ডে পুত্রবধূর জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করলে আলোচনা নতুন দিকে মোড় নেয়। ১৬ই জুলাই বরগুনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে মিন্নিকে ডেকে নিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। এই মামলায় এ পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ১৫ জনের সবাই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গত ২রা জুলাই এই মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। মামলার এজাহারভুক্ত ১২ আসামির মধ্যে এখনো চারজন গ্রেপ্তার হয়নি। তারা হচ্ছেন মুসা, মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত, রায়হান ও রিফাত হাওলাদার।

এদিকে রিফাত হত্যা মামলার অভিযুক্ত হয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া কামরুল আহসান সাইমুনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। সকালে আবেদনের পর দুপুরে সাইমুনের জামিন আবেদনের শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. ইয়াসিন আরাফাত সাইমুনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাইমুনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা কাদের।

নয়ন ও মিন্নির সম্পর্ক প্রমাণে ২০ আলামত জব্দ করেছে পুলিশ!
বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়নের বাড়ি থেকে অন্তত ২০ ধরনের আলামত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছে নয়নের সঙ্গে মিন্নির ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের বেশকিছু ছবি, মিন্নির ব্যবহৃত লিপস্টিক, চিরুনি, চিরুনিতে আটকে থাকা মিন্নির চুল, কামিজ, চুলের ক্লিপ, ফেসপাউডার, চোখের ভ্রুতে ব্যবহৃত আই ব্রো, সিমকার্ড এবং কয়েকটি মোবাইল ফোনসেট।
নয়নের বাড়ি থেকে আলামত সংগ্রহের বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা বেশকিছু আলামত নয়নের বাড়ি থেকে সংগ্রহ করেছি।

বরগুনা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নয়নের সঙ্গে মিন্নির ঘনিষ্ঠতা ও বিয়ে প্রমাণ করতেই এসব আলামত জব্দ করা হয়েছে। নয়নের বাড়ির চিরুনিতে আটকে থাকা মিন্নির চুল ও তার ব্যবহৃত কয়েকটি জিনিস ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তা আরো বলেন, মিন্নি যেহেতু বারবারই নয়নের সঙ্গে বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছেন তাই কিছু অকাট্য প্রমাণের প্রয়োজন। রিফাতের সঙ্গে বিয়ের পরও নয়নের সঙ্গে মিন্নির ঘনিষ্ঠতা প্রমাণ করা গেলে রিফাত হত্যার জট অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে। অকাট্য প্রমাণ হাতে এলে তখন প্রমাণ করা সহজ হবে ঘটনার পর নিজেকে আড়াল করতেই কীভাবে মিন্নি একের পর এক মিথ্যা কথা বলে গেছেন।

এগুলোর মধ্যে একটি কামিজ, মিন্নির লেমিনেটিং করা একটি ছবি, চুল পেঁচানো চিরুনি ও এম প্লাস, এন খোদাই করা সামুদ্রিক ঝিনুক রয়েছে। এই ঝিনুকটি মিন্নি ও নয়ন কুয়াকাটা বেড়াতে গিয়ে সংগ্রহ করেছিলেন। মামলার আলামত হিসেবে এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

নয়ন বন্ডকে ১২ লাখ টাকা কে দিয়েছিল, নয়নের মায়ের প্রশ্ন
রিফাত শরীফ হত্যার মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হলেও তাকে নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। এবার তার মা দাবি করেছেন তার ছেলেকে একটি প্রভাবশালী মহল ষড়যন্ত্র করে মেরে ফেলেছে। তিনি বলেন, কে হ্যারে বন্ড বানাইলো, জিরো জিরো সেভেন বানাইলো, তোমরা খুঁইজা বের করো। বরগুনা শহরের ডিকেপি রোড এলাকায় নিহত সাব্বির আহমেদ নয়নের (নয়ন বন্ড) বাড়িতে বসে এসব কথা বলেন তিনি।

নয়নের মা অভিযোগ করে বলেন, আমার ছেলে দোষী, এটা আমি জানি। কিন্তু সে তো একদিনে নয়ন বন্ড তৈরি হয়নি। তাকে তৈরি করা হয়েছে। প্রভাবশালী মহল তাকে ব্যবহার করার জন্য নয়ন বন্ড হিসেবে তৈরি করেছে।
কোন প্রভাবশালী মহল জানতে চাইলে শাহিদা বেগম বলেন, তা ঠিক বলতে পারবো না। তবে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ, তার মুখ থেকে যদি প্রভাবশালী মহলের সব অপকর্মের ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়, সেই জন্যই।
তিনি বলেন, আমি টিভির হেড লাইনে পাথরঘাটা বইসা দেখছি, কেউ একজন কইছে আমার ছেলে সীমান্তের কাছে আছে। সেই ছেলে তিন দিন পর কুয়াকাটা এসে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায় কীভাবে? তার সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন। তার হাতের নক ও কান নাই। ওরা আমার বাবারে (নয়ন) মাইরা হালাইছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহিদা বেগম বলেন, আসল রহস্য আড়াল করার জন্য আমার ছেলেকে মাইরা ফ্যালা হইছে। আমার ছেলে তো খুনি ছিল না। সে মাদকসেবী ছিল। নিশ্চয়ই এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

তিনি আরো বলেন, নয়ন ভালো ছাত্র ছিল। কিন্তু ক্লাস টেন থেকে আস্তে আস্তে মাদকের জগতে প্রবেশ করে। আগে নয়ন বন্ড ১২ লাখ টাকাসহ ধরা পড়েছিল। সে এত টাকা কোথায় পাইলো? কে দিলো? তোমরা খুঁইজা বের করো।