Monday, October 20, 2014

‘সরকারকে আর সময় দেয়া হবে না’ -খালেদা জিয়া

সরকারকে আর সময় দেয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া। বলেছেন, ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর আমরা আন্দোলন করিনি। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য অপেক্ষা করেছি। সরকারকে ১০ মাস সময় দিয়েছি। কিন্তু আর নয়। সরকার মনে করেছে- বিএনপি তো আন্দোলন করে না, নির্বাচন দেয়ার কি দরকার। খালেদা জিয়া বলেন, সরকারকে আর সময় দেয়া হবে না। আমরা জেলায় জেলায় মতবিনিময়ের মাধ্যমে ফের বৃহত্তর আন্দোলনে যাব। আন্দোলন আমাদের করতেই হবে। রাজশাহী বিভাগীয় বিএনপি সমর্থিত মেয়র, পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ মন্তব্য করেন। রাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে এ মতবিনিময় হয়। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের অব্যাহত খুন-গুমের ঘটনায় সরকারের কড়া সমালোচনা করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ কথায় কথায় বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গুম-খুন করছে। আমাদের দলের দুইজন জনপ্রিয় নেতা বারবার নির্বাচিত এমপি ইলিয়াস আলী ও কুমিল্লার সাবেক এমপি হিরুকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে ১১জনকে গুমের পর হত্যা করা হয়েছে। খুনের ঘটনা দেখে ফেলায় নিরপরাধ নৌকার মাঝিকেও হত্যা করা হয়েছে। তাদের হত্যা করেছে র‌্যাব। কিন্তু এ র‌্যাবের ওপরও অভিযুক্ত আছে। এ দায় সরকারকে নিতে হবে। মৃত্যুর পর আল্লাহর কাছে যেমন জবাবদিহি করতে হবে, দুনিয়াতে জনগণের কাছেও জবাবদিহি করতে হবে। খালেদা জিয়া বলেন, এরা পাক আর্মি থেকেও খারাপ হয়ে গেছে। এরশাদের থেকেও খারাপ হয়ে গেছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, মানুষ এভাবে খুন করতে পারে, গুম করতে পারে? এরা কি মানুষ। এরা তো বিকৃত মস্তিষ্কের। বিকৃত মস্তিষ্কের লোক সঠিকভাবে দেশ চালাতে পারে না। আর এ বিকৃত মস্তিষ্কের কথা তো আদালতই বলেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, এ সরকার অবৈধ। ১৫১জন যদি বিনাভোটে নির্বাচিত হয়ে যায় তবে মানুষের ভোটাধিকার কই? তিনি বলেন, ৮৬ সালে তো আমরা হারিনি। সেদিনও আমরা আপস করিনি বলে পাতানো নির্বাচনে যাইনি। সেদিন এরশাদ ছিল, আওয়ামী লীগ ছিল, জামায়াতও ছিল। তারপরও তারা ৫ বছর সরকার চালাতে পারেনি। এরা তো অবৈধ, এরা কিভাবে চালাবে। খালেদা জিয়া বলেন, মানুষের জন্যই আমাদের আন্দোলন। আমরা আন্দোলন করবÑ মানুষের ভোটাধিকার আদায়ে, ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়। দেশের উন্নয়নের জন্য আমাদের আন্দোলন। খালেদা জিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও মেয়রদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা জনগণের প্রতিনিধি তাই জনগণের কাছে যাবেন। আপনারা জনগণকে সরকারের অনিয়মের কথা বুঝাবেন। যে সময়ে আমি আন্দোলনের আহ্বান জানাব, আপনারা হাজির হবেন। আন্দোলনের মাধ্যমেই এদের বিদায় করব। খুন-গুম থেকে মানুষকে রক্ষা করব। দেশের পরিবর্তন আনব। তিনি বলেন, দেশে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা পেলে বিদেশী বিনিয়োগ আসবে, দেশের উন্নয়ন হবে। আমরা দেখিয়ে দেবÑ আমরা পেরেছিলাম, আমরাই পারব।

এতে নির্বাচিত মেয়রদের মধ্যে- রাজশাহী সিটি মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, জয়পুরহাটের পৌর মেয়র আবদুল মান্নান, নওগাঁর মেয়র নাজমুল হক, সিরাজগঞ্জের মেয়র মোকসেদ আলী, নাটোরের সেকান্দার ইমদাদুল হক, পাবনার আমিনুল ইসলাম ও চাপাই নবাবগঞ্জের শামীম কবির, উপজেলা চেয়ারম্যানদের মধ্যে- বগুড়ার গাবতলী উপজেলা চেয়ারম্যান মুরশেদ মিল্টন, সদরের আলী আজগর হেনা, সারিয়াকান্দির মাহমুদুর রহমান, জয়পুরহাটের ফজলুর রহমান, নওগাঁর আবু বকর সিদ্দিকী, নাটোরের বড়াইগ্রামের একরামুল আলম, বাগাতীপাড়ার হাফিজুর রহমান, চৌহালীর মেজর (অব.) মামুন, রাজশাহীর পুটিয়ার আনোয়ার হোসেনসহ ৩২ জন উপজেলা চেয়রম্যান, ৫৭ জন পুরুষ ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২৫ জন পৌর মেয়র অংশ নেন। সভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সাবেক ডেপুটি স্পিকার আকতার হামিদ সিদ্দিকী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ফজলুর রহমান পটল, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ব্যারিস্টার আমিনুল হক, যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু, সাংগঠনিক সম্পাদক হারুন আর রশিদ, স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ও বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল উপস্থিত ছিলেন।

হৈমন্তী কদম by মৃত্যুঞ্জয় রায়

হেমন্তে যে কদম ফুটতে পারে সে ধারণা ছিল না। পাবনার মুলাডুলি রেলক্রসিংয়ের কাছে রাজপথের দুই ধারে লাগানো কয়েকটা শিশু ও কদম গাছে বছর চারেক আগে প্রথম হেমন্ত ঋতুতেও বর্ষাকালের মতো গাছ ভরে কদম ফুল ফুটতে দেখি। কদম বর্ষার ফুল, কবির ভাষায় বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল। হেমন্তে ফুটবে কেন, এ প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে শুরু করে। খোঁজ নিতে শুরু করি। ভাবলাম, জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। হেমন্তের কদম বোধ হয় তারই কিছু প্রভাবের ফল। কিন্তু তাই যদি হয়, তাহলে দেশের সব কদম গাছে হেমন্তে ফুল ফোটে না কেন? পরের বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরলেও সেভাবে আর কদমের অনুসন্ধান করা হয়নি। অবশেষে কাল হেমন্ত ঋতু আগমনের তিন দিন পরই হেমন্তের ফুল খুঁজতে গিয়ে আবার প্রথম দেখা পাই কদমের। বরিশাল বঙ্গবন্ধু উদ্যানের পূব পাশে একটা বাড়ির আঙিনায় অল্প বয়েসী একটা কদম গাছে ফুটেছে মনকাড়া কদম ফুল। হেমন্তে ফুটছে, তাই বললাম হৈমন্তী কদম। কিন্তু এবারো আরো কয়েকটা কদম ফুলের গাছ লক্ষ করলাম, সেসব গাছে ফুল নেই। হতে পারে এই গাছটি কদমের কোনো ভিন্ন জাত বা ভেরিয়েন্ট, যার ফুল বর্ষায় না ফুটে হেমন্তে ফোটে অথবা বছরে দুইবারই ফোটে। এ বিষয়ে আরো পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া যায়।

এই গাছ নিয়ে প্রাচীন সাহিত্যেও লেখালেখি হয়েছে বেশ। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছে, কদম লাগালে গ্রামের মঙ্গল হয়। গাছের উচ্চতা ১০ থেকে ২০ মিটার। আধা পর্ণমোচী বৃক্ষ। কাণ্ড খাড়া ও লম্বা। পাতা সরল ও বড়। ফুল হিসেবে আমরা যে কদম বলটা দেখি, সেটি আসলে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুলের সমষ্টি। চারা হয় বীজ দিয়ে। কদমের আদি নিবাস ভারত, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। কদম ফুলের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Anthocephalus chinensis ও পরিবার Rubiaceae.

ভালোবাসার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় by রাজীব মীর

আজ ২০ অক্টোবর, নবম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এর রয়েছে ১৫৬ বছরের বর্ণাঢ্য ইতিহাস। ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্ম স্কুলের নাম বদল করে বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল চৌধুরী তাঁর বাবার নামে ১৮৭২ সালে জগন্নাথ স্কুল নামকরণ করেন। ১৮৮৪ ও ১৯০৮ সালে যথাক্রমে এটি দ্বিতীয় ও প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হয়। এ সময় এটিই ছিল ঢাকার উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২০০৫ সালে জাতীয় সংসদে ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৫’ পাসের মাধ্যমে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২৭/৪ ধারার বাতিলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে। প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী এবং পাঁচ শতাধিক শিক্ষক বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি অনুষদের ৩১টি বিভাগ ও একটি ইনস্টিটিউট শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখছেন। অল্প কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি সবার নজর কেড়েছে। শিক্ষার্থীদের ভর্তির আগ্রহ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সামনে এগোতে আশাবাদী করে তুলেছে। শিক্ষকদের বেশির ভাগই তরুণ, মেধাবী ও পরিশ্রমী। এটিও অনেক বড় ভরসার জায়গা। সেমিস্টার সিস্টেমে পড়াশোনা ছাড়া পাসের বিকল্প নেই। শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট নেই বললেই চলে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেই সময় ও ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় সবাইকে। পুরান ঢাকার দীর্ঘ যানজট অসহনীয়। প্রচুর সময় ব্যয় হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতে। পর্যাপ্ত পরিবহনসুবিধার অভাব এবং একদমই আবাসিক সুবিধা না থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাইকেই সমস্যা পোহাতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক সুবিধা নেই অথচ এর ১২টি বেদখল হল রয়েছে। ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে দু-একটা হল উদ্ধার হলেও আমলাতান্ত্রিক ও আইনি জটিলতার কবলে পড়ে আবাসিক অসুবিধা নিরসনের গতি ততটা সচল হচ্ছে না। যদিও ইতিমধ্যে একটি ছাত্রীহলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিসরের আয়তন ছোট হওয়ায় ক্লাসরুমের সংকটও খুব বেশি। শিক্ষকদের বসার জায়গা স্থানাভাবে সংকুলান হচ্ছে না। বরাদ্দ কম থাকায় গবেষণা কার্যক্রমও পর্যাপ্ত হচ্ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হল, কলাভবন এবং ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে ওয়াই–ফাই সুবিধা থাকায় শিক্ষার্থীরা সহজেই ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে কিন্তু জগন্নাথে ওয়াই–ফাই-সুবিধা নামে থাকলেও কাজে আসছে না। তাই শিক্ষার্থীদের তথ্য মহাসড়কে অভিগম্যতার সুযোগ তুলনামূলক কম। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটি ক্লাসের সময়েই (অর্থাৎ সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা) পর্যন্ত খোলা থাকায় শিক্ষার্থীরা অধিকতর সময় ধরে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই ক্লাসের সময়ের বাইরেও গ্রন্থাগারটি খোলা রাখতে কর্তৃপক্ষ সচেষ্ট হবে, আশা করি। আবার ছাত্রদের জন্য কোনো জিমনেসিয়াম না থাকায় অভ্যন্তরীণ শরীরচর্চার অনুশীলন ব্যাহত হচ্ছে। উপরন্তু টিএসসি না থাকায় স্থায়ী সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বেগবান হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণতর হচ্ছে। যদিও সাম্প্রতিক হল উদ্ধার আন্দোলনের ফলে টিএসসি করার একটি স্থান আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে টিএসসি স্থাপন বিষয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিনের দশাও বেহাল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই। মাত্র একজন চিকিৎসক ও চিকিৎসা সহকারী নিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এত বিশাল চিকিৎসা-সুবিধা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি খেলার মাঠও রয়েছে। সেখানে খেলাধুলার আয়োজন হচ্ছে নিয়মিত। সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আছে বলা যাবে না। বর্তমান প্রশাসন এ বিষয়ে সজাগ ভূমিকা রাখছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম সোসাইটি সুনামের সঙ্গে নিয়মিত তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। যদিও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যানারে ছাত্রনেতাদের নাম না থাকলে বা তাঁদের অতিথি করা না হলে সে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে যায়। ভয়াবহ হলো শিক্ষক লাঞ্ছনা। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকদের বিব্রত করে, বিরক্ত করে। শ্রেণিতে উপস্থিতির নম্বর, পরীক্ষার খাতার নম্বর বাড়ানোর আবদার বা টেন্ডারসংক্রান্ত জটিলতায় শিক্ষক এবং শিক্ষক-প্রশাসকেরা অত্যন্ত আতঙ্কে থাকেন। একটি শিক্ষার্থী-শিক্ষক কেন্দ্র শিক্ষক-শিক্ষার্থী দূরত্ব কমাতে সহায়ক হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসংলগ্ন ঐতিহাসিক ভিক্টোরিয়া পার্ক, পরে যা বাহাদুর শাহ পার্ক নামে পরিচিত, সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বা বিনোদনের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। শিক্ষার্থীদের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র হতে পারে এটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাততলাবিশিষ্ট ভবনটির সামনে রয়েছে দেশের একমাত্র গুচ্ছ ভাস্কর্য। ভাস্কর রাশা নির্মিত ভাস্কর্যটির একপাশে চিত্রিত রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব। আর অপর পাশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম গণহত্যা। ভাস্কর্য থেকে সামনে এগোলেই দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনার। এর উত্তর দিকে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাশ ভবন। আর দক্ষিণ দিকে আছে পুরোনো বিজনেস স্টাডিজ ভবন, যা এখন ভাষাশহীদ রফিক ভবন। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ছয় দফা ও ১১ দফা ও মহান মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি আন্দোলনেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য। আজও আন্দোলন চলছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলেই ছাত্রাবাসের জন্য কেরানীগঞ্জে সরকারি ৬ দশমিক ৬৯ একর খাসজমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত ফাইল শিক্ষামন্ত্রীর সুপারিশসহ এখন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। আমরা আশাবাদী। বর্ণিল সাজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর আলোচনায় সমবেত হোক প্রাণ, জাগুক স্পন্দন—জ্ঞান ও গর্বের।
রাজীব মীর: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

গাছ কী কাজে লাগে by মুহাম্মদ রোকনুদ্দৌলাহ্

গাছ মহান আল্লাহর দেয়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। এটি বিভিন্নভাবে আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। এটি বেঁচে থাকার বিশেষ উপকরণ অক্সিজেনের জোগান দেয়।  মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত, রুটি, পাউরুটি আসে কোথা থেকে? প্রধান শস্য ধান, গম ইত্যাদি থেকে। তা ছাড়া নানা রকম তেলও আমরা পাই শস্য থেকে। এটি আমরা ব্যবহার করি ভোজ্যতেল হিসেবে, সাবান, রঙ, বার্নিশ প্রভৃতি তৈরির কাজে। মসলাপাতির সরবরাহ আসে কোথা থেকে? উদ্ভিদজগৎ থেকে। আমরা চিনি পাই আখ বা বিটজাতীয় গাছ থেকে। গাছ থেকে পাওয়া চা, কফি দিয়ে আমাদের কান্তি দূর হয়। কাঠ, বাঁশ, দড়ি সবই পাওয়া যায় গাছপালা থেকে। কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয় আসবাবপত্র, নৌকা, দরজা, এমনকি ঘরবাড়ি। পোশাক বা কাপড় তৈরির প্রয়োজনীয় তুলো আসে গাছ থেকে। নকল সিল্ক আর রেয়ন পাওয়া যায় কাঠ থেকে। নাইলন আর টেরিলিন তৈরি করা হয় গাছপালা থেকে উৎপন্ন জৈব রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে। গাছ থেকে পাওয়া যায় পাট এবং এজাতীয় আঁশ। এগুলোর রয়েছে বহুল ব্যবহার। চট, বস্তা, কাপড়, রশিÑ কত কী যে তৈরি হয়! বিভিন্ন ওষুধের জন্যও মানুষ গাছপালার ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক জমানার অদ্ভুত ক্ষমতার ওষুধ পেনিসিলিন, স্ট্রেপটোমাইসিন, অরিওমাইসিন ইত্যাদি তৈরি করা হয় নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদ থেকে।

অক্সিজেন যেকোনো প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। আর এটা জোগায় সবুজ গাছপালা। কী করে? সবুজ গাছপালা তাদের খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়ায় বাতাস থেকে অপকারী কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নেয়, আর পাতার সূক্ষ্ম ছিদ্রপথে ছেড়ে দেয় অক্সিজেন। এভাবে অনেক অক্সিজেনের জোগান আসে। বাতাসে কমে আসা অক্সিজেন গাছপালা ক্রমাগত পরিপূরণ না করলে পৃথিবীর অক্সিজেন অনেক আগেই নিঃশেষ হয়ে যেত। আকাশ ভরে উঠত অনিষ্টকর কার্বন ডাই-অক্সাইডে। এর ফলে সৃষ্টি হতো ধ্বংস। এ ছাড়া গাছপালা, মানুষ এবং সেই সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীর প্রধান খাদ্য। জ্বালানি কাঠ, কয়লা, লেখার কাগজ, রবার, কর্ক ইত্যাদি রাশি রাশি জিনিস আসে গাছপালা থেকে। মানুষ আর অন্যান্য প্রাণীর এই জগতে বেঁচে থাকার মূল চাবিকাঠিই যেন গাছপালার হাতে! তাই গাছ আমাদের বন্ধু।  মানুষের বেঁচে থাকার তাগিদেই গাছের প্রতি যত্নশীল হওয়া দরকার। আর অবশ্যই করতে হবে বৃক্ষরোপণ।
তথ্যসূত্র : ওয়েবসাইট

৫ বছরের শিশুর এভারেস্ট জয়!

ভারতের নয়াদিল্লির পাঁচ বছরের এক শিশু এভারেস্ট জয়ের দাবি করেছে। তার নাম হরষিত সওমিত্র। সে কাস ওয়ানে পড়ে। হিন্দুস্তান টাইমস জানায়, হরষিত গত শুক্রবার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ হাজার ৩৬৪ মিটার উচ্চতায় এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছার দাবি করেছে। তবে তার সাথে তার বাবাও ছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত কয়েকদিন ধরেই তো নেপালের হিমাচল প্রদেশে তুষার ঝড় হচ্ছে? তাহলে এতোটুকুন বাচ্চা ছেলে কিভাবে এভারেস্ট জয় করল?

>>ভারতের পতাকা হাতে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে হারশিত
এর জবাব দিয়েছেন হরষিতের বাবা রাজিব সওমিত্র। তিনি দাবি করেন, ওই সময় হরষিত তার সাথে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার হাজার ৩৭১ মিটার উচ্চতায় ফ্রেচি গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল। তারা এই ভেবে তখন হতাশ ছিল, শেষমেষ এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছাতে পারবেন তো। কিন্তু ভাগ্য ভালো যে, দুই দিন পরই আকাশ পরিস্কার হয়। আর বাবা-ছেলে তাদের গন্তব্যে হাঁটা ধরে। এক সময় পৌঁছে যায় লক্ষ্যে।
হরষিত সংবাদমাধ্যমকে জানায়, এভারেস্ট জয় করতে পেরে আমি খুব খুশি। সেখানে পৌঁছে দেশের পতাকা মেলে ধরেছি। হরষিত কেবল এভারেস্টই নয় এর পাশে কালাপাথর চূড়াও জয় করেছে। এর আগে ভারতের সাত বছর বয়সী আরিয়ান বালাজি ২০১২ সালে এভারেস্ট ও কালাপাথর জয় করে। হরষিতের পরিবার গিনেস ওয়াল্ড রেকর্ডস ও লিমকা বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে তার এ অর্জন প্রমাণাদিসহ রেজিস্ট্রার করার পরিকল্পনা করছে। যদি সব কিছু ঠিকঠাক থাকে তবে হরষিতই হবে বিশ্বের সবচেয়ে কনিষ্ঠ এভারেস্ট জয়ী।

নাটোরে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় নিহত ৩৩- আহত অর্ধশত by মোঃ শহীদুল হক সরকার ও অহিদুল হক

নাটোরের বড়াইগ্রামে দুই বাসের মুখোমুখি ভয়াবহ সংঘর্ষে ৩৩ জন নিহত ও অর্ধশত আহত হয়েছেন।
আজ সোমবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহীগামী যাত্রীবাহী কোচ কেয়া পরিবহন ও নাটোর থেকে নাটোরের গুরুদাসপুরগামী যাত্রীবাহী লোকাল বাস অথৈ পরিবহনের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। আহতদের চিকিৎসার জন্যে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নাটোর ফায়ার সার্ভিস, হাইওয়ে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের বড়াইগ্রাম মোড়ের আগে রেজুর মোড়ে কেয়া পরিবহনের বাসটি একই দিক থেকে আসা একটি ট্রাককে ওভারটেক করার সময় অথৈ পরিবহনের বাসটির সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

কেয়া পরিবহনের বাসের পিছনে প্রাইভেটকারে আসা বড়াইগ্রামের ব্যবসায়ী মাজেদুল ইসলাম নয়ন বলেন, বিকট শব্দে মুখোমুখি সংঘর্ষের পর মহাসড়কের দুই পাশের দুটি গর্তে বাস দুটি সিটকে পড়ে দুমড়ে মুচড়ে যায়। ঘটনার সময় রাস্তা ও আশে পাশে আহত ও নিহতরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে। এ সময় আহতদের আর্তচিৎকার ও দুর্ঘটনার শব্দে শত শত এলাকাবাসী ছুটে এসে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে।
খবর পেয়ে নাটোর, লালপুর ও দয়ারামপুর ফায়ার সার্ভিস ও থানা এবং হাইওয়ে পুলিশ এলাকাবাসীর সাথে উদ্ধার তৎপরতায় যোগ দেয়। সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই গাড়ির চালকসহ ২৮টি লাশ উদ্ধার করে ট্রাকে বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। আহতদের মধ্যে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের ভর্তি অজ্ঞাত আরো পাঁচজন বিকেলে মারা যান। আহতদের নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতাল, বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বনপাড়ার বেসরকারি আমিনা হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
এদিকে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডাঃ মোঃ আবুল কালাম আজাদের ওপর একই দিন সকালে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলার প্রতিবাদে কর্মবিরতিতে থাকা এসব হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্রশাসনের অনুরোধে তাৎক্ষনিক আহতদের চিকিৎসা সেবায় এগিয়ে আসেন।
ঘটনার পরপরই নাটোর জেলা প্রশাসক মশিউর রহমান, পুলিশ সুপার বাসদেব বনিক ও বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্য একরামুল আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
নিহতদের মধ্যে তাৎক্ষণিক কয়েকজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক আওয়ামী লীগ নেতা জামাল হোসেন (৪০), তার মেয়ে জান্নাতী (৫), একই উপজেলার বাজিতপুর গ্রামের আলাল উদ্দিন, সংগ্রামপুরের আব্দুর রহমানের স্ত্রী আতিকা বেগম, খোকসা গ্রামের কৃষ্ণ পদ সরকার (৫৫), ইন্দ্রাপাড়া গ্রামের জান মোহাম্মদ (৪৮), গুরুদাসপুর উপজেলার সিধুলী গ্রামের এবাদ আলী (৪৫), শরীফ উদ্দিন (৩০), লাবু (৩৫), আলাল (৫৫), সোহরাব হোসেন, আয়নাল হক (৩৫), সতের আলী প্রামণিকের দুই ছেলে রব্বেল আলী (৪৫) ও  আতাহার আলী (৫০), বৃচাপিলা গ্রামের বাবুল (৪০), আব্দুল আওয়াল (৩০), তেলটুপি গ্রামের আবু সাঈদের মেয়ে মোহনা খাতুন (৫) ও অথৈ পরিবহনের চালক আলম হোসেন (৪০)।
অথৈ পরিবহনের যাত্রীদের বেশিরভাগই সিধুলী গ্রামের ডাঃ ইয়ারুল ও আমিরুল ইসলাম জোড়া খুন মামলায় নাটোর কোর্টে হাজিরা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনায় অথৈ পরিবহনের বেশিরভাগ যাত্রীই মারা গেছেন।
নাটোর জেলা প্রশাসক মশিউর রহমান সন্ধ্যায় নয়া দিগন্তকে বলেন, ঘটনাস্থল থেকে ২২টি লাশ উদ্ধার করে বনপাড়া পুলিশ ফাঁড়িতে রাখা হয়েছে। একই সময়ে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের ভর্তি ২০ জনের মধ্যে পাঁচজন এবং গুরুদাসপুর হাসপাতালে আরো একজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
আরো যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে
নিহত আরো যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে তারা হলেন- গুরুদাসপুরের পাটপাড়া গ্রামের জকের আলী, সোনাবাজু গ্রামের আবু হানিফ, সিধুলী গ্রামের কহির (৩৫), তোফাজ্জল, চাঁচকৈড় বাজারের আবুল খায়ের (৬৫), বড়াইগ্রাম উপজেলার বাজিতপুর গ্রামের কিসমত আলী (৪৫), আব্দুল কুদ্দুস (৬৬), জোনাইলের আব্দুর রহমান, (৫৪), রহমত আ্লী (৫৫), জালশুকা গ্রামের মনিরুল ইসলাম (২৫), ফেনি জেলার ফুলগাজী থানার বড়াই এলাকার শৈলেন তিলক।
২০টি লাশ হস্তান্তর
বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ওসি ফুয়াদ রুহানী বলেন, দুর্ঘটনাস্থল থেকে ২২টি এবং বিভিন্ন হাসপাতাল ও কিনিকে আহত অবস্থায় ভর্তিকৃতদের মধ্যে পরে নিহত চারজনসহ মোট ২৬ জনের লাশ বনপাড়া হাইওয়ে  পুলিশ ফাঁড়িতে রাখা হয়। নাটোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরো পাঁচজন এবং বড়াইগ্রাম হাসপাতালে দুইজন মারা যান। দুর্ঘটনায় মোট মৃতের সংখ্যা ৩৩। নাটোরের পুলিশ সুপার বাসুদেব বণিক জানিয়েছেন, নিহতের স্বজনদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লাশগুলো হস্তান্তর করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২০টি লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে।
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
নাটোরের জেলা প্রশাসক মশিউর রহমান রাতে এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে নাটোর সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম ও বিআরটিএ সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামানকে সদস্য করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
ঘটনা পরিদর্শনে যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রী
নাটোরের বড়াইগ্রামে দুই বাসের মুখোমুখি ভয়াবহ সংঘর্ষে ৩৩জন নিহত ও অর্ধশত আহত হওয়ার ঘটনা পরিদর্শন করতে রাতেই যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের সন্ধ্যা সোয়া সাতটায় ঢাকা থেকে রওনা হয়েছেন। নাটোরের জেলা প্রশাসক মশিউর রহমান জানান, রাত ১১টার দিকে যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন।

সৎ বাবার অসৎ কাণ্ড

পাঁচ বছর বয়সি এক মেয়েকে হত্যার দায়ে সৎ বাবা এবং মাকে ৩১ বছর কারাদণ্ড দিয়েছে স্লোভাকিয়ার একটি আদালত। হত্যার পর লুকা নামের এ মেয়েটির মৃতদেহ তিন বছর লুকিয়ে রাখা হয় বলে জানায় মিরর। জানা গেছে, স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিসলাভার একটি এপার্টমেন্টে ভাড়া থাকতেন মেয়েটির মা আলেক্সান্দ্রা রোটাকোভা (৪৩) এবং সৎ বাবা জুরাজ রোটাক (৩৪)। ২০১২ সালে পুনঃনির্মাণের জন্য তাদেরকে এপার্টমেন্টটি ছাড়তে বলেন বাড়িওয়ালা। কিন্তু তারা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানায়। পরে পুলিশের সহযোগিতায় এ জুটিকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে গেলে একটি তালাবদ্ধ ঘরে লুকার মৃতদেহ পাওয়া যায়।
সৎ বাবা জুরাজ রোটাক আদালতে স্বীকার করেন, তিনি লুকা এবং তার মাকে মারপিট করতেন এবং মাঝে মাঝেই না খাইয়ে রাখতেন। আর এ নির্যাতনের কারণেই ২০০৯ সালে লুকা মারা যায়। মেয়েকে হত্যা করায় মা রোটাকোভার সহযোগিতা থাকলেও তিনি আদালতকে জানান, এ ছাড়া তার কোনো উপায় ছিলো না।
মেয়েটিকে নির্যাতন করে হত্যা করার দায়ে সৎ বাবাকে ১৭ বছর কারাদণ্ড দেয় ব্রাটিসলাভার আদালত। এবং বাড়িওয়ালার অনুমতি ছাড়া বাড়িতে থাকার জন্য আরো ১৮ মাসের দণ্ড দেয়া হয়। মাতৃত্বে অবহেলা এবং মেয়েকে ঠিকভাবে দেখভাল করতে না পারার দায়ে মা রোটাকোভাকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এ বিষয়ে দেশটির কোর্ট সিনেট চেয়ারম্যান মাইকেল ক্যাসানি বলেন, সৎ মেয়ে লুকাকে চরম নির্যাতন করে হত্যা করেছে রোটাক।
লুকার আসল বাবা ৪৩ বছর বয়সি মিলান লুকনার বলেন, রোটাকের মোহে আমাকে ত্যাগ করেছে আলেক্সান্দ্রা। তখন আমার মেয়েকে আমার কাছেই রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু সে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় লুকাকে। মামলাটি নিয়ে স্লোভাকিয়ায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে।  তিন বছরের মধ্যে শিশুটির খোঁজ না পাওয়ায় বিভিন্ন মহল থেকে সমাজকর্মীদের দোষারোপ করা হচ্ছে। বিশেষ করে লুকার স্কুলে আসা যাওয়া বন্ধ হওয়ার পরও তার ব্যাপারে কোনো খোঁজ না নেয়ায় তারা হতাশা ব্যক্ত করেছেন।
লোকা কোথায় আছে? প্রতিবেশীদের এমন প্রশ্নের জবাবে মা রোটাকোভা জানাতেন, সে তার নানীর কাছে রয়েছে। আবার কখনো বলতেন খালার কাছে। কয়েকজন প্রতিবেশি এ ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে এতদিন অনেকেরই ধারণা ছিলো শিশুটি হয়তো সমাজকর্মীদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
দেশটির শিশু কল্যাণ সংস্থার আইন উপদেষ্টা জেলিনস্কা বলেন, এ মামলার রায়টি শিশুদের ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি সতর্ক বার্তা। এর মাধ্যমে অন্য অনেক শিশু নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
মামলার রায়ের পর লুকার আসল বাবা স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আমি লুকাকে ২০১২ সালে শেষ বারের মতো দেখেছিলাম। তখন তার বয়স ছিলো দুই বছর। আমি তাদের দুই জনেরই যাবজ্জীন কারাদণ্ড আশা করেছিলাম।

বিষফোঁড়া সময় হলেই ফেটে বের হয় by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
এই ক’দিনে সাগরের পানি কতটা গড়ালো জানি না, তবে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার পানি অনেক গড়িয়েছে। অসংযত বক্তব্যের জন্য সারা জীবনের আওয়ামী লীগ তোমার লতিফ সিদ্দিকীকে ত্যাগ করেছে। তার মন্ত্রিত্ব গেছে, ’৭৫-এ তোমার কবর দেয়া আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের সদস্য পদ গেছে, আগামী সপ্তাহে দলীয় সদস্য পদও যাবে। বড় মজার ব্যাপার, ওয়াশিংটনে কী বলেছেন, কিভাবে বলেছেন তার বক্তব্য যেভাবে এসেছে, তাতেই বিরোধীরা বাজিমাত করেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ করলে তার যে কোনো বিরোধীর দরকার পড়ে না, আওয়ামী লীগাররাই আওয়ামী লীগারদের ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট- সেটা এবার লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রেও প্রমাণ হলো। তুমি তো ভালো করেই জানো, ১৫ বছর হয়ে গেল, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নামে একটা দল গঠন করে মনের কথা, বিবেকের কথা বলার চেষ্টা করছি। এত দিন লতিফ সিদ্দিকী ছিলেন আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী সরকারের মন্ত্রী। হজ নিয়ে আপত্তিকর কথা বলার কারণে রাতারাতি তিনি হয়ে গেলেন আমার বড় ভাই। আমার বিপদ চার দিকে। পরিবারের প থেকে তাকে আল্লাহর কাছে মা চাইতে এবং দেশবাসীর অনুভূতিতে আঘাত লাগায় দেশবাসীর কাছেও মাফ চাইতে অনুরোধ করেছিলাম। মনে হলো হজ নিয়ে, রাসূল সা: নিয়ে কথা বলে তিনি কোনো দোষ করেননি; আমি পরিবারের প থেকে মা চেয়ে যেন সব দোষ করে ফেলেছি। ১১ অক্টোবর শনিবার সংবাদ সম্মেলনে মা প্রার্থনা এবং তাকে আল্লাহর কাছে মা ও দেশবাসীর কাছে মাফ চাইবার কথা বলায় মনে হয় তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছেন। প্রথমেই বলেছেন, ‘ও বেটা মা চাইবার কে? ওকে কে মা চাইতে বলেছে? ও আমার পরিবারের কে? ও আমার পে মা চাইবার কে?’ আসলে আমি তার পে মা চাইনি, চেয়েছিলাম পরিবারের প থেকে। এটা সত্য যে, তার সাথে আমার এ ব্যাপারে কোনো কথা হয়নি। আমার বিবেকের নির্দেশেই কাজটি করেছি। তার নামের শেষে যদি সিদ্দিকী থাকে, তাহলে আশপাশে যারা আমরা সিদ্দিকী আছি তারা এবং তাদের পরিবার পারিবারিক ব্যয়ভার বহন না করলেও আমরা একই পরিবার। তিনি বড়; যেহেতু তার ওপর অভিযোগ, সে অভিযোগের বিষয়ে কিছু বলার ক্ষেত্রে তার পরেই আমার অবস্থান। তিনি বলতেই পারেন, ‘আমি তার পরিবারের কেউ না।’ কিন্তু ‘সিদ্দিকী পরিবারের কেউ না’Ñ এটা বলার তার কি এখতিয়ার আছে? কিন্তু তার পরও তিনি গায়ের জোরে চালিয়ে যাচ্ছেন। কেন যাচ্ছেন, তা তিনিই জানেন। আবার মাঝে মাঝেই এক মারাত্মক কথা বলে চলেছেন, তার নেত্রী প্রধানমন্ত্রী যা বলবেন, তিনি তাই করবেন। তার কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগের অসুবিধা হয়েছে বুঝতে পেরে অনুশোচনা করেছেন; কিন্তু হজের ব্যাপারে কথা বলে লাখ লাখ মুসলমানের মনে আঘাত দিয়েছেন, তা নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই। কেন যে, আমাকে আবার ধর্ম ব্যবসায়ী, ভণ্ড বলে গালাগাল করেছেন বুঝতে পারছি না। তিনি বড়, সারা জীবন গালাগাল করেছেন, এখনো না হয় করলেন; কিন্তু স্ত্রী কষ্ট পায়, ছেলেমেয়েরা মন খারাপ করে। আমার বুকের ধন কুশিমনি যখন তখন বলত, ‘আমার চাচ্চু কোলে নিয়েছে, আদর করেছে, চেয়ারে বসিয়েছে’Ñ আরো কত কী! সেও যখন শোনে তার বাবাকে গালমন্দ করেছে, তখন কেমন যেন তারও মুখটা ভার হয়ে যায়। তাই কিছুটা স্বস্তি বিঘœ তো হয়েছে। জানি আল্লাহই অসুবিধা দেন, তিনিই আবার দূর করেন; কিন্তু তুমিই বলো, ধর্ম ব্যবসায়ী হতে ধর্মের যে জ্ঞান থাকা দরকার, তা কি আমার আছে? ব্যবসায় করলে তো ওয়াজ-নসিহত করে দু-চার পয়সা উপার্জন করতাম। সারা জীবনে পেলাম কই, দিয়েই গেলাম। আমাদের পে ব্যবসায় করা সম্ভব? যেকোনো ব্যবসায় করতে যে চরিত্রের দরকার তা কি কখনো তৈরি করতে পেরেছি? আর যে ক’দিন বাঁচব, এ সময় অমন দুর্লভ শিা অর্জন করার সময় কি দয়াময় প্রভু আমায় দেবেন?
শরীরটা বেশি ভালো না। কেন যেন ৮-৯ বছর ধরে হয় ছোট ঈদে, না হয় কোরবানিতে একবার না একবার শরীর খারাপ হবেই। কেন যে হয়, বুঝতে পারি না। অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ, অধ্যাপক নাজির আহমেদ রঞ্জু, অধ্যাপক খাজা নাজিম উদ্দিন, অধ্যাপক প্রাণগোপাল দত্তÑ এদের পরামর্শ প্রায়ই নিই; কিন্তু তার পরও এমনটা কেন হয় বুঝতে পারি না। এবারো হয়েছে। এখনো অসুস্থতার রেশ কাটেনি। তার ওপর আগে নাই, পিছে নাই বড় ভাইকে নিয়ে টানাটানির উপরি চাপ সবার ওপর পড়েছে। আওয়ামী লীগের লোক তিনি। তাকে নিয়ে আওয়ামী লীগের যা করার তা করবে। এখন দেখি, আওয়ামী লীগের কোনো ব্যাপার নয়, এখন ছোট ভাই হয়ে বড় মাইনকার চিপায় পড়েছি। যতই বলি আওয়ামী লীগের ব্যাপার, তার পরও কেউ কেউ বলে, হাজার হলেও তো ভাই। হাজার কেন, আরো কম হলেও তিনি আমার ভাই, পিতার মতোÑ এটা অস্বীকার করার উপায় কী? কিন্তু তিনি যে বড় নোংরাভাবে অস্বীকার করে বসেছেনÑ তার কী হবে? তাই আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে বড় অবাক ও বিস্মিত হয়েছি। আওয়ামী লীগ ছেড়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠন করেছি ১৫ বছর, তবুও তারা পিছু ছাড়ছে না। এমন একটা মারাত্মক দল, তারা পারে না এমন কোনো কাজ নেই। চিহ্নিত রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধা বানাতে পারে, মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার। ছেলেদেরকে মেয়ে বানাতে পারে কি না জানি না, তবে পুরুষকে ভেড়া বানাতে পারে।
আমাদের এক ভাতিজা চিকিৎসার জন্য লন্ডনে থাকেন। তিনিও সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর মতো মহাপণ্ডিত। মাঝে মাঝেই তার গবেষণালব্ধ জ্ঞান বিতরণ করেন। ক’দিন আগে তিনি বলেছেন, ‘শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু নন, তিনি পাকিস্তানবন্ধু। তিনি ৭ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করলে অত লোক মারা যেত না। তার ব্যর্থতার কারণে বহু প্রাণহানির জন্য তিনিই দায়ী। শেখ মুজিব খুনি। তাকে জাতির পিতা বলা যায় না।’ আরো কত কী যে বলেছেন! তার ওসব খুব একটা মন দিয়ে পড়ি না, তাই মনেও থাকে না। আলোচনা করতে গেলে, লিখতে হলে সমালোচকের কথাও তুলে ধরতে হয় বলে ওসব মনের মধ্যেও আনার চেষ্টা করি না। যেমনÑ শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের ব্লগাররা প্রিয় রাসূল সা: সম্পর্কে এমন সব জঘন্য উক্তি করেছিল, যেগুলো আগে কখনো ভাবনায়ও আসেনি। কী কী তারা বলেছে বা বলেছিল, তা এখানে তুলে দিতে গেলে আবার মনে করতে হয়, লিখতে হয়, তাই সেসব জঘন্য শব্দ মনে করতেও চাই না, ভুলে যেতে চাই; কিন্তু আওয়ামী লীগ এত পারে, নিজের দলের নেতাকর্মীর কুশপুত্তলিকা পুড়তে পারে; কিন্তু এমন জঘন্য সমালোচনার কোনো জবাব দিতে পারে না, দেয়ও না। একবারও তারা জিয়াপুত্রকে বলল না, আপনার পিতা যদি স্বাধীনতার ঘোষক হয় তাহলে বঙ্গবন্ধু না হয় ব্যর্থ হয়েছিলেন, আপনার পিতা ঘোষণা দিয়ে স্বাধীন করে দিলেই পারতেন। আসলে বিনা ভোটে জবরদখলকারী সরকার অত্যন্ত দুর্বল প্রধান বিরোধী দলের কারণে মতায় টিকে আছে। এটা তারা নিজেরাও বোঝে না, বিরোধী দলও বোঝে না।
ধীরে ধীরে দেশ আরো অশান্ত হয়ে উঠছে। কয়েক বছর পর ছাত্রদলের এক নয়া কমিটি দেয়া হয়েছে। সে কমিটির বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ প্রতিবাদ শুরু হয়েছেÑ এর অর্ধেক সরকারের বিরুদ্ধে হলেও হয়তো সরকার নড়েচড়ে উঠত। মজার ব্যাপার, তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রকৃত নেতৃত্বের সৃষ্টি না হলে ঠাণ্ডা ঘর থেকে চাপিয়ে দেয়া নেতৃত্বে এক সময় না এক সময় বিষফোঁড়া ফেটে বেরোবেই বেরোবে। সেটা যে দলেই হোক, বিষফোঁড়া কোনো দল বিচার করে না। সময় হলেই ফেটে বের হয়।

মুক্তিযুদ্ধ ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ছাড়পত্র by ওয়ালিউল হক

আওয়ামী লীগের নেতারা অনেক দিন ধরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সমরনায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমানকে পাকিস্তানের চর হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছেন। মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব পালনকারী এ কে খন্দকারকেও এবার তারা পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার (আইএসআই) এজেন্ট হিসেবে চিত্রিত করা শুরু করেছেন। জিয়াউর রহমান যেহেতু একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন এবং সেই সাথে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন, সে কারণে আওয়ামী লীগ তাকে যে দু’চোখে দেখতে পারে না সেটা খুব অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু তার পরও দেশের বেশির ভাগ মানুষ ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাকারী মেজর জিয়াকে পাকিস্তানের চর বলে কোনোভাবেই মেনে নিতে রাজি নয়। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী সবচেয়ে সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা এবং পরে আওয়ামী লীগের এমপি ও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী এ কে খন্দকারকেও তারা আইএসআইয়ের এজেন্ট হিসেবে মেনে নিতে অপারগ। দেশের মানুষ মনে করে, মুক্তিযুদ্ধের এসব শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের যদি এভাবে পাকিস্তানের এজেন্ট বানানোর কাজ অব্যাহত থাকে, তাহলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গোটা ব্যাপারটিই একদিন খেলো হয়ে পড়বে। এবার দেখা যাক, মুক্তিযুদ্ধের সময় শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক কিংবা সামরিক নেতাদের পক্ষে পাকিস্তানি এজেন্ট হিসেবে কাজ করা সম্ভব ছিল কি না। যখন কোনো দেশ বা গেরিলা সংগঠন যুদ্ধে লিপ্ত থাকে তখন তারা বিপক্ষ দেশ বা শক্তির অন্তর্ঘাতমূলক চক্রান্তের ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ থাকেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন প্রবাসী সরকার ও এম এ জি ওসমানীর নেতৃত্বাধীন সামরিক কমান্ডাররাও এ ব্যাপারে অনেক সতর্ক ছিলেন। উদাহরণ হিসেবে প্রবাসী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক ও তার সহযোগীদের ওপর প্রবাসী সরকারের নজরদারির বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। ‘পূর্ব পাকিস্তান সমস্যার একটি রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার জন্য’ কলকাতার মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা যখন খন্দকার মোশতাকের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন, তখন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা তাজউদ্দীন আহমদকে বিষয়টি অবহিত করে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দেয়। তাজউদ্দীন আহমদ তাদের পরামর্শ অনুযায়ী খন্দকার মোশতাকের নিউ ইয়র্ক সফর বাতিল করে দেন (যদিও তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা Henry Kissinger তার White House Years বইয়ে লিখেছেন, ভারত সরকারের পরামর্শক্রমেই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সরকারের সাথে যোগাযোগের কাজ শুরু করেছিল। আবার ভারত সরকারই যুক্তরাষ্ট্রের সেই উদ্যোগকে ব্যর্থ করে দেয়)।
এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানের প্রখ্যাত সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইকরাম সেহগালের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারটিও উল্লেখ করা যায়। বাঙালি মা ও পাঞ্জাবি বাবার সন্তান ইকরাম সেহগাল ১৯৭১ সালে ছিলেন দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের তরুণ ক্যাপ্টেন। ৩১ মার্চ তিনি মেজর সফিউল্লাহর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও ৫ এপ্রিল মেজর খালেদ মোশাররফ তাকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে বিএসএফের হাতে তুলে দেন। Escape from Oblivion শীর্ষক গ্রন্থে ইকরাম সেহগাল তার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। মেজর সফিউল্লাহ তাকে বিশ্বাস করলেও খালেদ মোশাররফ তাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন।
জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন বলে যারা এখন প্রচারণা চালান, তাদের অবগতির জন্য একটি তথ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি। তথ্যটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র : একাদশ খণ্ডের ৫৪১ পৃষ্ঠায় ছাপানো হয়েছে। সেখানে দেখা যায় ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলাম (যিনি পরে আওয়ামী লীগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন) ১৯৭১ সালের ২৭ মে তার ডায়েরিতে লিখেছেনÑ In the evening, interrogated two EPR soldiers who confessed they have been sent by Major Salman of Pakistan Army to kill Major Ziaur Rahman and me. Salman is my coursemate, But today? (সন্ধ্যায় ইপিআরের দু’জন সৈন্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর সালমান তাদের ভারতে পাঠিয়েছে মেজর জিয়াউর রহমান ও আমাকে হত্যা করার জন্য। সালমান ও আমি সেনাবাহিনীতে একই সাথে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি। আর আজ?)। প্রশ্ন হলো : জিয়াউর রহমান যদি তাদের লোকই হয়ে থাকেন তাহলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করার জন্য ভারতে ঘাতক বাহিনী পাঠাবে কেন? ওপরের তথ্য থেকে এটাও বোঝা যায় যে, সামরিক কমান্ডাররা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার ব্যাপারে অনেক সতর্ক ছিলেন।
একই কথা প্রযোজ্য ভারত সরকার ও তাদের সেনাবাহিনীর ব্যাপারে। বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি ভারত সরকার ও তাদের সেনাবাহিনীও পাকিস্তানি অনুচরদের ভারতে অনুপ্রবেশ ও অন্তর্ঘাতকমূলক তৎপরতার ব্যাপারে বেশ সজাগ ছিলেন। যেহেতু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভারত ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল, সে কারণে ভারতীয়দের নজরদারি এড়িয়ে কোনো সামরিক কমান্ডারের পক্ষে পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে কাজ করা কোনোভাবে সম্ভব ছিল বলে মনে হয় না। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক সামরিক কর্মকর্তাদের অনেক যাচাই বাছাই করার পরই ভারত তাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিত। এ ব্যাপারে এ কে খন্দকার তার লেখা ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ বইয়ে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন এভাবেÑ ‘কলকাতায় দু’দিন থাকার পর কর্নেল ওসমানী বলেন, ভারতীয় বিভিন্ন বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত কিছু বিষয়ে আলোচনা করতে আমাকে দিল্লি যেতে হবে। আমি কলকাতায় আসার পর সম্ভবত আমার উপস্থিতি সম্পর্কে দিল্লিতে খবর পাঠানো হয়। গ্রুপ ক্যাপ্টেন বাদামি আমাকে দিল্লি নিয়ে যেতে কলকাতায় আসেন। ২০ কিংবা ২১ মে বাদামির সঙ্গে আমাকে দিল্লি পাঠানো হয়। গ্রুপ ক্যাপ্টেন বাদামি ভারতের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি তখন আমাকে কিছু বলেননি, আর আমিও আগ বাড়িয়ে তার পরিচয় জানতে চাইনি। তার পদবিটা আমি পরে জানতে পারি। দিল্লিতে গিয়ে বাদামি একটি বিরাট বাংলোয় আমার থাকার ব্যবস্থা করেন। সেখানে আমি একটি কামরায় একাই থাকতাম।’
‘দিল্লিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর ইন্টেলিজেন্স বিভাগের কর্মকর্তারা আমাকে অনেক প্রশ্ন করেন। তারা পাকিস্তান বিমানবাহিনী সম্পর্কে জানতে চান। আমার অগোচরে আগরতলা থেকে উইং কমান্ডার বাশার, স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ ও ফাইট লেফটেন্যান্ট নুরুল কাদেরকেও দিল্লিতে আনা হয়। তাদের প্রত্যেককে আলাদাভাবে প্রশ্ন করা হয়। সম্ভবত তারা আমার বিবৃতির সঙ্গে তাদের বিবৃতি মিলিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন। আমাদের আনুগত্য, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি পরীক্ষা এবং গোয়েন্দা-বিষয়ক সংবাদ গ্রহণের জন্য ভারতীয়রা এই কাজটি করে থাকতে পারে। তারা যখন দেখল, আমার বিবৃতির সঙ্গে তাদের বিবৃতির কোনো পার্থক্য নেই, তখন তারা আমাদের ওপর আস্থা আনতে পারল। আমি পাকিস্তান বিমানবাহিনী থেকে ভারতে এসেছি এবং তাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করব, তাই আমাদের যাচাই-বাছাই করে নেয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। মূলত এজন্যই আমাদের সবাইকে দিল্লি যেতে হয়েছিল’ (১৯৭১ : ভেতরে বাইরে, পৃষ্ঠা ৮২-৮৩)।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানা যায় মেজর রফিকুল ইসলামের লেখা থেকেও। মেজর রফিকুল ইসলামের বর্ণনা মতে, ‘২ এপ্রিল আমি আগরতলা পৌঁছালে সরাসরি আমাকে বিএসএফের সিনিয়র অফিসার কালিয়ার অফিসে নিয়ে যাওয়া হলো। আমি তার কাছে আমাদের লড়াইয়ের অবস্থা বর্ণনা করে সামরিক সাহায্যের অনুরোধ জানালাম। কালিয়া অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন বিধায় আমাকে অপেক্ষা করতে বললেন। অপেক্ষা করা ছাড়া আমার আর কোনো গত্যন্তর ছিল না। আমাকে আগরতলার এক অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হলো এবং সেখানেই এক কক্ষে আমি সারা দিন রইলাম। সেখানে সাদা পোশাক পরিহিত কয়েকজন ভারতীয় অফিসার পর্যায়ক্রমে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। তারা আমার কাছ থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবস্থান, তাদের শক্তি, কোন ধরনের অস্ত্র তারা ব্যবহার করছে ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করলেন। তারা আমার অতীত জীবন এবং কি কারণে আমি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছিলাম সেসব বিষয়েও প্রশ্ন করলেন, ঘটনাবলি সম্পর্কে আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, পাকবাহিনীর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং স্বাধীনতা অর্জনে আমরা কী কী উদ্যোগ নিয়েছি তা-ও জানতে চাইলেন। এদের সঙ্গে আমার আলোচনা অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ এবং আন্তরিকতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারা খুবই সহানুভূতিশীল ছিলেন। তবে এদের আলোচনার ধারা থেকে আমি বুঝতে পারি, এরা সবাই ভারতীয় সামরিক বাহিনী ও বিএসএফের গোয়েন্দা বিভাগের লোক’ (বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র : নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা৭৭)।
‘মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতীয় গোয়েন্দাদের ছাড়পত্রের বিষয়টি যে শুধুমাত্র সেনা কর্মকর্তাদের ব্যাপারে প্রযোজ্য ছিল তা নয়, এটা রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য ছিল। যে কারণে চীনপন্থী বাম রাজনীতিকরা ভারতে গেলেও তাদের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে দেয়া হয়নি। ভাসানী ন্যাপের নেতা কাজী জাফর আহমদ ১৯৭১ সালের ১ জুন এ ব্যাপারে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি (তাজউদ্দীন) তাকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন যে, বামপন্থীদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে তাকে গোয়েন্দা রিপোর্ট নিতে হবে এবং সে গোয়েন্দা রিপোর্ট দেবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা’ (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র : পঞ্চদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৬)।
কাজী জাফর আহমদের দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় মওলানা ভাসানীকে কাগজ-কলমে না হলেও পরোক্ষভাবে সুকৌশলে আটক রাখা হয়েছিল এবং জুনের মাঝামাঝি ভারতীয় গোয়েন্দা ‘র’ তাকেও (কাজী জাফর) আগরতলা থেকে আটক করে শিলং নিয়ে যায়। সেখানকার একটি ডাকবাংলোয় তাকে সাত দিন আটক রেখে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ করেন ‘র’-এর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান সুব্রামনিয়াম।
ওপরের সব তথ্য পাঠ করলে বোঝা যায়, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতীয় গোয়েন্দা ছাড়পত্রের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং ভারতীয় গোয়েন্দাদের নজরদারি এড়িয়ে পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে কাজ করাও কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না।

জাতির স্বপ্ন ও প্রেস কাবের দায়- প্রেস কাবের হীরক জয়ন্তী by শওকত মাহমুদ

“সাংবাদিকতা যেন এক অপ্রশম্য অনুরাগ যা কেবলমাত্র বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার মধ্য দিয়েই ধারণ ও আত্মস্থ করা সম্ভব। যার ধমনীতে এর শোণিত প্রবাহ নেই, যা শুধু অনিশ্চয়তায় জীবনকে তাড়িত করে, তার দ্বারা সাংবাদিকতার চুম্বকীয় আকর্ষণ উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। যার অভিজ্ঞানে সাংবাদিকতার পরিচিতি নেই, তার পক্ষে সংবাদকর্মের টানটান উত্তেজনা, প্রথম সফল প্রচেষ্টার শিহরিত আনন্দ কিংবা ব্যর্থ প্রয়াসের মানসিক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব নয়। যে সাংবাদিকতার জন্য জন্মায়নি অথবা এর জন্য জীবনপাত করতে প্রস্তুত নয়, সে এই বোধাতীত ও নিমগ্ন কাজে লেগে থাকতে পারে না Ñ যেখানে দিনান্তের সংবাদের পদযাত্রা এক্ষণ শেষ হতে না হতেই পরক্ষণে ঊর্ধ্বশ্বাস। এমনকি এক মুহূর্তের স্বস্তির অবকাশটুকুও নেই।”
কলাম্বিয়ার সাংবাদিক ও নোবেলবিজয়ী ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস-এর সাংবাদিক সম্বন্ধীয় এই নিখুঁত পর্যবেক্ষণকে উল্লেখপূর্বক বাংলাদেশের অগ্রগণ্য সাংবাদিক জাতীয় প্রেস কাবের ডাকসাইটে সাবেক সভাপতি মরহুম এ জেড এম এনায়েতুল্লাহ খান (মিন্টু ভাই) আরও এগিয়ে বলেছিলেনÑ “চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কেসের মূর্ত ভাষাশৈলীর বিস্তারের মতো অনুপম রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন হয়েছি, বেগবান অশ্বের মতো ধাবিত হয়েছি, যুধ্যমান সৈনিকের মতো শব্দের হাতিয়ার দিয়ে বৈরী শক্তিকে বিদ্ধ করেছি। আবার পরম মমত্ব দিয়ে তৈরি শব্দাবলীর ঝাঁপি দিয়ে অনুরাগের মিনার সোপানে অর্পণ করেছি।” মিন্টু ভাইয়ের অনুপম রোমান্টিকতার অর্থ সাংবাদিক নিজে স্বপ্ন দেখে, পাঠক-দর্শককে স্বপ্ন দেখায়। এর বাইরেও আরেক দায়িত্ব, সমাজে হস্তক্ষেপের। বিদ্ধ করা বৈরী শক্তিই অন্যায় অবিচার পরাধীনতা অগণতান্ত্রিকতা।
জন্ম থেকেই সাংবাদিকতা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রতিস্পর্ধী ভূমিকায়। এ সত্যটা আরও বেশি করে বাঙময় বঙ্গ-পাক-ভারত উপমহাদেশে তথা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এবং ধারাবাহিকভাবেই তাদের দিনলিপি নির্মিত হয়েছে শুধু সত্য-তথ্যের জ্ঞাপনে নয়, বরঞ্চ দ্রোহে এবং জাতি গঠনে, ভাষা-সংস্কৃতির সুস্থ বিকাশের বুনিয়াদে। বিশ্বের আর কোনো অঞ্চলে বা জাতিতে সাংবাদিকতা এমন প্রবলভাবে স্বাধীনতা-দেশমুখী, ফ্যাসিবাদবিরোধী, গণতন্ত্রকেন্দ্রিক, সত্য-ন্যায়ের নিশান-বরদার কি না জানি না। নইলে পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই কেন সাংবাদিকেরা স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য আওয়াজ দেবেন, চিন্তার রাজ্যের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য রেনেসাঁর উদ্যোগ নেবেন, বাংলাকে মাতৃভাষা করার জন্য ১৯৪২ থেকেই আন্দোলন শুরু করবেন এবং ’৪৭ সালে ‘পূর্ববঙ্গ সাংবাদিক সংঘ’ সরকারের কাছে স্মারকলিপি দেবে। কেন বায়ান্নর একুশেতে ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ‘আজাদ’ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রাদেশিক পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন? ২৬ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারের উদ্বোধক তিনি। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ ফেব্রুয়ারি’-অমর এই গানটির রচয়িতা সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী এবং একুশের প্রথম এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী সঙ্কলনটির সম্পাদক একজন সাংবাদিক হাসান হাফিজুর রহমান। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সম্মুখ-সৈনিক হয়েছেন এই সাংবাদিক সমাজ এবং বাংলাদেশের সকল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অনাপোস আন্দোলন করবেন এবং এসব আবর্তিত হয়েছে ‘জাতীয় প্রেস কাব’ নামক নিরন্তর সংগ্রামে অমলিন প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে।
১৯৫৪ সালে প্রেস কাবের আনুষ্ঠানিক জন্ম এবং এর গঠনতন্ত্রে ‘জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম’ শব্দত্রয়ের সন্নিবেশন কোনো রোমান্টিকতা ছিল না বরং গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য জাতীয় আত্মার আকুতি ধারণেরই পরিচয়। এক সংগ্রামী প্রয়াস ছিল সে পর্বটি। জীবনের নানাক্ষেত্রে কৃতী পুরুষ এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম উদযোগী পুরুষ এবং সংবাদ-এর সাবেক সম্পাদক মরহুম খায়রুল কবীর কী আবেগেই না বলেছিলেন Ñ “আমার জীবনের বড় সাফল্য ‘জাতীয় প্রেস কাব’ প্রতিষ্ঠা।” তারুণ্যে টগবগ খায়রুল কবীরের বয়স তখন সাতাশ-আটাশ। আরেক প্রবীণ সদস্য ও এক সময়ের চোস্ত রিপোর্টার আবদুর রহিমের মতে ‘প্রেস কাব বাংলাদেশের রাজনীতির সূতিকাগার’। দৈনিক বাংলার বরেণ্য রিপোর্টার, পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণে তীè মরহুম মাশির হোসেন এই সত্যই উচ্চারণ করেছিলেন Ñ ‘প্রেস কাব শুধু ভবনগত অবকাঠামোই নয়। এর মানসবিহার অনেক বিস্তৃত। বর্তমানের বারান্দায় দাঁড়িয়ে টের পাই অতীত ও ভাবীকালের করমর্দন। প্রেস কাবের ব্যাপ্তি ৫৬ হাজার বর্গমাইলজুড়েই।”
আমাদের সাংবাদিকতার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রাজনীতির ইতিহাস। ‘বাংলাদেশের দেড় শ’ বছরের সংবাদপত্র বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস, (সৈয়দ আবুল মকসুদ) ইতিহাসের এক পর্বে প্রাধান্য পেয়েছে কলকাতাকেন্দ্রিক স্বাধিকারমুখী সাংবাদিকতা। ’৪৭ সালের পর থেকে স্বকীয়তা নির্মাণের ও স্বাধীনতার সংগ্রামের অভিনিবেশে আরেক অধ্যায়। আর বাংলাদেশ আমলে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের লড়াইয়ে ঠাসা আরেক চলমান ইতিহাস। সংবাদচর্চার মূলে রয়েছে সামাজিক চর্চা। সময় ও সমাজ যেমন তার পশ্চাৎপট, তেমনই ইতিহাসসচেতনতা হলো তার অস্তিত্বের গুরুত্ব নিয়ামক (বিংশ শতাব্দীর সংবাদপত্র : বাংলা দৈনিক পত্রিকা : কৃষ্ণ ধর)। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে শ্রীরামপুরের মিশনারিদের উদ্যোগে ‘সমাচার দর্পণ’ (১৮১৮) ও দিগদর্শন (১৮১৮) এবং একই বছরের গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের ‘বঙ্গাল গেজেটি’ পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষায় মুদ্রণমাধ্যমের সূত্রপাত। ১৮৩১ সালের ৭ মার্চ বেরোয় মুসলমান সম্পাদিত প্রথম বাংলা পত্রিকা ‘সমাচার সভা রাজেন্দ্র’। খ্রিষ্টধর্ম বাংলাসহ স্থানীয় ভাষাগুলোতে প্রচারের জন্য শ্রীরামপুরে ছাপাখানা আমদানি এবং বাংলা গদ্যের প্রচলন করেন পাদ্রি উইলিয়াম কেরি। এর আগে সুলতান কুতুবউদ্দিনের আমল (১২০১) থেকে ইংরেজ গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিংক (১৮৩৬) পর্যন্ত সাড়ে ৬ শ’ বছর ফার্সি ভাষা উপমহাদেশে লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা, অফিস-আদালত ও শিক্ষার মাধ্যম ছিল। আর পল্লী অঞ্চলে পুঁথির ভাষা ছিল বহুলভাবে প্রচলিত। মধ্যযুগে গৌড়ের সুলতানি আমলে পুঁথিসাহিত্য অনুবাদ সাহিত্য এবং পরে গদ্যের মাধ্যমে বাংলা ভাষার বিবর্তনে যে বৈপ্লবিক বিকাশ সাধিত হয় তাতে কবি শাহ মুহম্মদ সগীর, সৈয়দ হামজা, সৈয়দ সুলতান, সৈয়দ আলাউদ্দিন আর সপ্তদশ শতকে কাব্য ও পুঁথিতে বাংলা ভাষা-বিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনি উচ্চারণকারী কবি আবদুল হাকিম রাখেন অসামান্য অবদান। আজও আবদুল হাকিমের এই পঙ্ক্তিগুলি রাষ্ট্রভাষা দিবসে আমরা স্মরণ করি : “যে জন বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি” (সানাউল্লাহ নূরী, সভ্যতার বিবর্তন এবং বাংলা সংবাদপত্র বিকাশের যুগ)। ‘যদি পলাশী ক্ষেত্রে বাংলার মুসলমানদের ভাগ্য বিপর্যয় না ঘটিত, তবে হয়ত এই পুঁথির ভাষাই বাংলার হিন্দু মুসলমানদের পুস্তকের ভাষা হইত।” (ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সংবর্ধনা গ্রন্থ)  বাংলাক্রমে সংস্কৃতপ্রধান হয়ে ওঠে।
বাঙালি মুসলমান কর্তৃক সংবাদপত্র প্রকাশের চেষ্টা সম্ভবত ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে। তখন কয়েকজন উদ্যমশীল মুসলমান সাহিত্যিকের আবির্ভাব হয় Ñ যাঁদের সমাজ হিতৈষণা মুসলিম বাংলার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই সমাজপ্রাণ সাহিত্যিক গোষ্ঠী হচ্ছে : মুন্সী মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিন আহমদ, পণ্ডিত রেয়াজউদ্দিন মাশহাদী, মৌলভী সেরাজুদ্দীন, মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ, মীর্জা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী, শেখ আবদুর রহীম, শান্তিপুরের কবি মোজাম্মেল হক, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ইসমাইল হোসেন সিরাজী,  মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, শেখ ফজলুল করিম, এয়াকুব আলী চৌধুরী, ডা. লুৎফর রহমান প্রমুখ। বাংলার মুসলমানের দুঃখ-দৈন্য, অভাব-অভিযোগ এদের প্রাণে তীব্র জ্বালার সৃষ্টি করেছিল। এঁরা বুঝতে পারেন বাংলার মুসলমানের অভাব-অভিযোগ দুঃখ-বেদনা ব্যক্ত করার জন্য চাই তার একটা বাংলা ভাষার সাপ্তাহিক মুখপত্র। ১৮৮৯ সালে বের হয় ‘সুধাকর’, বিষাদ সিন্ধু খ্যাত মীর মশাররফ হোসেন সে যুগের শুধু আদি সাহিত্যিকই নন, তিনি আমাদের আদি সাংবাদিকও। ‘হিতকরী’ নামে একটি বাংলা সাপ্তাহিক সংবাদপত্রের তিনি সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতা। (মুসলিম বাংলার সাংবাদিকতা ও আবুল কালাম শামসুদ্দীন, মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্)।
মূলত সাহিত্যিক-সাংবাদিক এবং সাংবাদিক-সাহিত্যিক এ দু’টি পরিচয় প্রায় অভিন্ন হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশবিরোধী সাংবাদিকতায়। আমাদের সাংবাদিকতার ইতিহাসে সাহিত্য সেবক ও সংবাদজীবীর যুগ্মসত্তাকে ধারণ করা গুণীজনের সংখ্যা অনেক বেশি। এখনও এবং তালিকাটা ঈর্ষণীয়ভাবেই দীর্ঘ। “তথ্যকে ন্যায্যভাবে যুক্তি দিয়ে বিন্যস্ত করাই সাংবাদিকতার ধর্ম। ভাষা তার কাঠকাঠ। সংবাদপত্র হচ্ছে এক সম্মিলিত স্বপ্ন, যা আমরা দেখি দিনের পর দিন। রচিত হয় Literature in hurry সাহিত্যও এক ধরনের স্বপ্ন। রোজ দিনজুড়ে রাতজুড়ে তৈরি হচ্ছে না বা প্রাতঃরাশের টেবিল থেকে সংক্রামকভাবে বিস্তারিত হচ্ছে না, তবে এক ব্যাপক বিস্তীর্ণ সূক্ষ্ম, অলক্ষ্য, চোরাগোপ্তা ধারায় ছেয়ে থাকছে আমাদের জীবনে। সংবাদপত্রের সাড়াজাগানো শিরোনামের তুলনায় সাহিত্যের এই প্রচার অনেক সীমিত, অনেক নির্জন, কিন্তু এর দ্বারা অঙ্কুরিত স্বপ্নের চরিত্র অনেক বেশি। সাহিত্যের জন্মই এক অদৃশ্য কিন্তু অপ্রতর্ক্য হস্তক্ষেপে, জীবন, সমাজ, ঘটনা ও ইতিহাসকে একেবারে নিজের মতো করে ভেঙে-গড়ে, ভেঙে-গড়ে, ভেঙে-গড়ে, ভেঙে-গড়ে, গড়ে-গড়ে, গড়ে একেবারে এক সমান্তরাল, বিকল্প সত্যে নির্মিত করায় (সাহিত্য ও সাংবাদিকতা : শংকরলাল ভট্টাচার্য)।”
আমাদের কিংবদন্তির পূর্বসূরিরা সংবাদ ও সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে জাতির মনোরাজ্যে এক বিপ্লব সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম একাধিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ১৮৮৯ সালের নবজাগ্রত স্বাধীনতাকে দমন করার লক্ষ্যে ইংরেজ সরকার কুখ্যাত সিডিশন বিল পাস করে। বিল পাস হওয়ার আগের দিনে কলকাতার টাউন হলে আহূত প্রতিবাদ সভায় ‘কণ্ঠরোধ’ শিরোনামের এক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদ প্রকাশের অধিকারকে ‘একটি পরশাসিত জাতির আত্মসম্মান প্রতিষ্ঠার একটি অপরিহার্য অবলম্বন’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। ইংরেজ শাসকদের উদ্দেশে বলেছিলেন “সিপাহী বিদ্রোহের পূর্বে হাতে হাতে যে রুটি বিলি হইয়াছিল তাহাতে একটি অক্ষরও লেখা ছিল না Ñ সেই নির্বাক নিরক্ষর সংবাদপত্র কি যথার্থ ভয়ঙ্কর নহে? সর্পের গতি গোপন এবং দংশন নিঃশব্দ। সেই জন্যই কি তাহা নিদারুণ নহে? সংবাদপত্র যতই অধিক এবং যতই অবাধ হইবে, স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে দেশ ততই আত্মগোপন করিতে পারিবে না।”
ষাট দশকে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধে প্রেস অর্ডিন্যান্স জারির প্রতিবাদে বরেণ্য জাতীয় সন্তান সাংবাদিক-সাহিত্যিক মওলানা আকরম খাঁর নেতৃত্বে আবদুস সালাম, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী প্রমুখের অংশগ্রহণে জাতীয় প্রেস কাব থেকে এক ঐতিহাসিক মিছিল বেরিয়েছিল। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর ভাষায় : আমার তো মনে হয় এত বড় মিছিল বোধহয় পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে আমলে আর বেরোয়নি (পঞ্চাশ বছরের সাংবাদিকতা : জাতীয় প্রেস কাব)।
যা হোক, ওই কুখ্যাত সিডিশন বা রাজদ্রোহ আইনে কারানির্যাতিত প্রথম সাংবাদিক ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেত’ু পত্রিকায় প্রকাশিত আনন্দময়ীর আগমনে (আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল) কবিতার জন্য এক বছরের কারাদণ্ড পান। নজরুলের সম্পাদকীয় রচনার ভাষা ছিল তেজোদৃপ্ত। উদ্ধৃতি দিচ্ছি একটি সম্পাদকীয় (নিশান-বরদার) থেকে : “আমাদের বিজয় পতাকা তুলে ধরবার জন্য এসো সৈনিক। পতাকার রং হবে লাল তাকে রং করতে হবে খুন দিয়ে। বল আমরা পেছোব না। বল আমরা সিংহ শাবক আমরা খুন দেখে ভয় করি না। আমরা খুন নিয়ে খেলা করি, খুন দিয়ে কাপড় ছোপাই, খুন নিয়ে নিশান রাঙাই। বল আমি আছি আমি পুরুষোত্তম জয়। বল মাভৈঃ জয় সত্যের জয়। আমি আছি বলে নিশান হাতে তুলে নাও। এসো দলে দলে নিশানধারী বীর সৈনিক ভাইরা আমরা। নিজেকে সৈনিক বলে প্রচার করি এসো। এসো শয়তানকে অর্ধেক পুঁতে ফেলে তার মাথার উপর তাদেরি মাথার মগজের চর্বি দিয়ে চেরাগ জ্বালাই। শয়তানকে দগ্ধ করে মারতে হবে। এই কথা বলে বেরিয়ে এসো Ñ আমি আছি আমাতে আমিত্ব আছে, আমি পশু নই, আমি মনুষ্য, আমি পুরুষ সিংহ। আমাদের বিজয়ী হতে হবে। বিজয় পতাকা ওড়াতে হলে খুন খোসরোজ খেলতে হবে। ধর ধর এক হাতে ভীম খড়গ সর্বনাশের ঝাণ্ডা Ñ আর এক হাতে ধর রক্তমাখা পতাকা। আমাদের এই বিজয় মঙ্গলের সময় যদি কেউ বাধা দিতে আসে তবে তাকে বড় থেকে অর্ধেক ছাড়িয়ে নিয়ে অর্ধেক সাগর জলে ভাসিয়ে দাঁড় আর অর্ধেক খানা সেখানে পড়ে দুপায়ের গিঁটে যেন ঠোকাঠুকি করে।”
সে সময় ইউরোপীয় বণিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য যেমন ইংরেজি পত্রিকা প্রকাশিত হতো তেমনি ভারতীয় হিন্দুরাও দ্য হিন্দু প্যাট্রিয়ট, দ্য বেঙ্গলি, ইন্ডিয়ান মিরর, অমৃতবাজার পত্রিকা, দ্য ট্রিবিউন, দ্য মারাঠা প্রকাশ করে। ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ তাদের সংবাদপত্র দ্বারা স্বদেশী আন্দোলন চাঙ্গা ও বঙ্গভঙ্গ রোধে উত্তপ্ত ভূমিকা রাখেন। প্রথম মহাযুদ্ধের শেষ (১৯১৯) এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরুর (১৯৩৯) মধ্যবর্তী দুই দশকে বাংলার সংবাদপত্রের চেহারা বদলে যায়। রাজনৈতিক দিক দিয়ে তিন ধরনের পত্রিকা ছিল। এক পক্ষ কংগ্রেসের সমর্থক, অন্যপক্ষ নবজাগ্রত মুসলিম লীগের অনুসারী (আজাদ, মোহাম্মদী, স্টার অব ইন্ডিয়া, মর্নিং নিউজ) আর তৃতীয় পথ বামধারার। সংবাদপত্র, সাময়িকপত্রের সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করে প্রেস কাবের সদস্য, পরিশ্রমী গবেষক মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া ‘হিস্টরি অব দ্য প্রেস ইন বাংলাদেশ’ প্রকাশ করে জাতির সশ্রদ্ধ সমীহা অর্জন করেছেন।
“১৯৩৫ এর ভারত শাসন আইন অনুযায়ী সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারার ভিত্তিতে ১৯৩৭ এর জানুয়ারিতে প্রাদেশিক আইনসভার প্রথম ভোট থেকে বাংলা কাগজগুলোর ভেতরের এসব রাজনীতির সূক্ষ্ম ভাগাভাগি মুছে গেল। সব কাগজই তারস্বরে সাম্প্রদায়িক হয়ে গেল। সাম্প্রদায়িকতার জিভ ছিল সাপের জিভের মতো কাটা। তার এক ডগা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষ ছড়াত, আর এক ডগা তপশিলি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। এই দুই শত্রুর কাছে ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদ এত তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল যে আগস্ট আন্দোলনের খবরও এসব কাগজে যথেষ্ট কম বেরোয়। হিন্দু কাগজগুলোর এই সাম্প্রদায়িকতার প্রতিক্রিয়া ও মুসলমান সমাজের রাজনৈতিক স্বাধিকারের আন্দোলনের প্রয়োজনে আজাদ ও ইত্তেফাক দুইটি মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার পোষকতা শুরু করে। বাংলা খবরের কাগজে বাঙালির যে বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছিল, তার জায়গায় নতুন এই বাঙালি বৈশিষ্ট্য এল চিৎকৃত সাম্প্রদায়িকতা। ১৯৪০ থেকে প্রায় ১৯৭০ পর্যন্ত এই বিদ্বিষ্ট, চিৎকৃত, বিকারগ্রস্ত ও অপ্রমাণিত সংবাদনির্ভর সাংবাদিকতা বাংলার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল (ঔপন্যাসিক দেবেশ রায় : খবর বলছি ..... সম্প্রচারের ভাষা ও ভঙ্গি)। “মুসলিম লীগ সমর্থক পত্রিকাগুলি” ৪৭-এর পর ঢাকায় চলে যায়। রাজনীতির প্রশ্নে এই পত্রিকাগুলির সঙ্গে কলকাতার অন্যান্য সংবাদপত্রগুলির নিয়মিত চাপান উতোর চলত। এমনকি আজাদ পত্রিকার আরবি ফারসি শব্দ মেশানো বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে নানা রকম ব্যঙ্গবিদ্রƒপও করা হতো। কিন্তু ইতিহাসের এমনই অনির্দেশ্য কুটিল গতি যে পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু চাপাবার ষড়যন্ত্র হলে আজাদ ও ইত্তেফাক তার বিরোধিতা করে। (কৃষ্ণ ধর : বিংশ শতাব্দীর সংবাদপত্র : বাংলা দৈনিক পত্রিকা, বাংলা আকাদেমী পত্রিকা)।
মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্র বয়ানে জানা যায়, মুসলিম বাংলার সাহিত্য-সাংবাদিকতার অগ্রনায়কদের উদ্যোগে এবং অকান্ত প্রচেষ্টায় প্রকাশিত পরিচালিত ও সম্পাদিত মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক পত্রপত্রিকার মাধ্যমেই বাংলার মুসলমানের সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতা ব্যাপকতা লাভ করে.... বিভাগপূর্বকালে যেমনি বিভাগ পরবর্তীকালেও তেমনি আমাদের অনেক সাংবাদিক-সাহিত্যিকের রচনাই সাংবাদিকতার প্রয়োজনে সৃষ্ট হলেও স্থানীয় আবেদনের অধিকার অর্জন করেছে।
স্বতন্ত্র জাতীয়তা
ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জাতীয় মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবির পটভূমি সম্পর্কে বলেছেন, কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা ১৮৮৫ সালে, মুসলমানরা কংগ্রেসের পাল্টা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকায়, ১৯০৬ সালে। শুরুতে কংগ্রেস ও লীগের ভেতর উদ্দেশ্যগতভাবে এক বিষয়ে মিলন ছিল উভয় প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, ছিল ভারতীয়দের ভেতর শাসকদের প্রতি আনুগত্য গড়ে তোলা। বিচিত্র অভিজ্ঞতা সমাকীর্ণ পতন বন্ধুর যাত্রাপথে সংগঠন দু’টি ক্রমান্বয়ে শাসকদের পরিবর্তে দেশের স্বাধীনতার নিকটবর্তী হতে চেয়েছে, কিন্তু কখনো সম্পূর্ণভাবে এক হয়ে যেতে পারেনি। তাদের প্রবাহ ছিল সময়েই কম-বেশি সমান্তরাল। তার কারণ স্পষ্টতই এই যে, মুসলিম সংখ্যালঘুরা হিন্দু সংখ্যাগুরুকে ভয় না করে পারেননি। কংগ্রেস যে স্বাধীনতার কথা বলতেন সেখানে ভারতীয় মুসলিম নিজের জন্য নতুন এক পরাধীনতার নিগড় দেখে শিউরে উঠেছেন। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনেও এই ভীতির কারণগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট ও বাস্তব (সাহিত্যে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবি : পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম সাহিত্য)।
রেনেসাঁ আন্দোলন
মুসলিম মানসে স্বকীয়তার উত্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কলকাতায় ১৯৪২ সালে সাংবাদিক-সাহিত্যিকেরা রেনেসাঁ আন্দোলনের সূচনা ঘটান। ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব পাসের পরবর্তী পর্যায়ে এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আন্দোলন সূচিত হলেও রাজনৈতিক স্বাধীনতা তথা মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে নবজাগরণ তথা রেনেসাঁ আনয়নই ছিল এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবে পাকিস্তান কথাটি ছিল না বটে, তবে তাতে ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে দু’টি স্বতন্ত্র স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। এ সূত্রেই রেনেসাঁ আন্দোলনের নায়করা ধরে নিয়েছিলেন যে, পাকিস্তান পরিকল্পনা অনুসারে ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে গঠিত পূর্বাঞ্চলীয় রাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তান হবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, কিন্তু পরবর্তীকালে বাস্তবে তা ঘটেনি এবং ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ ও (সাবেক) পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় লাহোর প্রস্তাবের মর্মবাণীকে অগ্রাহ্য করে; ১৯৪৬ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের কনভেনশনে অনুমোদিত দুই রাষ্ট্রের বদলে এক রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব অনুসারে। কিন্তু দেশ ভাগের আগেই ১৯৪২ এরও আগে, পূর্ব পাকিস্তান কথাটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও প্রতীক হিসেবে চালু হয়ে গিয়েছিল এবং বুদ্ধিজীবীদের মনোরাজ্যেও ঠাঁই করে নিয়েছিল। এ কারণেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে ১৯৪২ সালে কলকাতায় ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’ এবং ঢাকায় ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল। দু’টি সংস্থা গঠনেই ‘আজাদ’ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের অনুপ্রেরণা এবং মুজীবুর রহমান খাঁর উদ্যোগী ভূমিকা ছিল। বস্তুত দু’টি সংস্থাই মূলত সাংস্কৃতিক আন্দোলনের উদ্দেশ্যে গঠিত এবং পরিচালিত হলেও রাজনৈতিক লক্ষ্যও এতে অন্তরিত ছিল’। (মুসলিম বাংলার সাংবাদিকতা ও আবুল কালাম শামসুদ্দীন : মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্)
রাষ্ট্রভাষা বাংলা
রেনেসাঁর নায়কেরা ১৯৪২-৪৩ সাল থেকেই বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চিন্তা করেছেন। ‘পাকিস্তানের আন্দোলনকালে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবোধই প্রবল হয়। কিন্তু এ দেশের মুসলমান সমাজ যে বাঙালি পরিচয়কে গৌণ করে দেখেনি, তারও নানা প্রমাণ আছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই বাংলাভাষাকে নতুন রাষ্ট্রের, রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদানের দাবি উঠেছিল (জাতীয়তাবিষয়ক ভাবনা, ডক্টর আনিসুজ্জামান, এপিটাফ ১৯৮০)।
মওলানা আকরম খাঁ, মুজীবুর রহমান খাঁ, হবীবুল্লাহ বাহার, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবুল মনসুর আহমদ, তালেবুর রহমান, আবদুল হক, ফররুখ আহমদ তাঁদের নানা রচনায় এ বিষয়টি তুলে ধরেন।
সে সময় আরও তিনটি জাতীয় দৈনিকের উল্লেখ না করলে সাংবাদিকতা ও বাংলাদেশের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। পাকিস্তান অবজার্ভার, ইত্তেফাক ও সংবাদ আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামকে উচ্চশিখরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। এই তিনটি পত্রিকাকে বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য সরকার কয়েকবার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। মানিক মিয়া, আবদুস সালাম ও জহুর হোসেন চৌধুরী Ñ এই তিন সম্পাদক আইয়ুব-মোনেমের জন্য ছিলেন মস্ত শিরঃপীড়া। তাঁরা প্রেস কাবকে তরুণ সাংবাদিকদের মতো সম্পৃক্ত করে নিতে চেষ্টা করতেন। তখন থেকেই প্রেস কাবের ‘কাব চরিত্রের’ বুনিয়াদ (আমাদের পৃথিবী, সেলবিদ্ধ প্রেস কাব : ফয়েজ আহমদ)। পাকিস্তান অবজার্ভার বেরুল ১৯৪৯-এ। মালিক স্মরণীয় আইনজীবী ও মুসলিম লীগ নেতা হামিদুল হক চৌধুরী। পত্রিকাটি প্রথম রোটারি মেশিনে ছাপা উপলক্ষে সগর্বে ঘোষণা দিয়েছিল Ñ এখন থেকে অবজারভার ইংল্যান্ড থেকে আনা রোটারি মেশিনে, রাশিয়ান নিউজপ্রিন্টে ভারত থেকে আনা কালিতে ছাপা হয়ে পাঠকদের হাতে পৌঁছবে। কিংবদন্তি সাংবাদিক আবদুস সালাম পরের বছর এর সম্পাদক হিসেবে যোগ দিলেন। মাহবুব জামাল জাহেদী, এসএম আলী, ওবায়দুল হক, এবিএম মূসা, এজেডএম এনায়েতুল্লাহ খান, শহীদুল হক, আবদুল মতিন, বদরুল হক, আসাদুজ্জামান বাচ্চু, আবদুর রহিম, আতাউস সামাদ প্রমুখ উজ্জ্বল সাংবাদিকগণ পাকিস্তান অবজারভারকে বাঙালি জাতির অন্যতম দিশারিতে পরিণত করেন। মওলানা ভাসানীর তত্ত্বাবধানে ইয়ার মোহাম্মদ খানের অর্থানুকূল্যে ও সম্পাদনায় ১৯৪৯ সালে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক বেরোয়। আবু জাফর শামসুদ্দীন পরে সম্পাদক হন। ১৯৫১ তে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া (কলকাতার ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকা, যার সম্পাদক ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ) তার সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে তিনি ইত্তেফাক হাতে নেন। এমআর আখতার মুকুল, ফয়েজ ভাই। ১৯৫৩-তে তিনি এটিকে দৈনিকে রূপান্তরিত করেন। মানিক মিয়ার লেখনী আওয়ামী লীগের পক্ষে দেশবাসীকে উদ্বোধনী মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল। ১৯৬৯-এ তিনি মারা গেলে জ্যেষ্ঠপুত্র ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন দায়িত্ব নেন। প্রথিতযশা সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেন হন নির্বাহী সম্পাদক। মুসলিম লীগের মুখপত্র হয়ে বের হলেও পরে সংবাদ বামধারার শক্তিশালী দৈনিকে পরিণত হয়। সংবাদ-এ ছিলেন আহমদুল কবির, সৈয়দ নূরুদ্দীন, সরদার ফজলুল করিম, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, কাজী মোহাম্মদ ইদরিস, মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ, মন্টু লোহানী, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, সাদেক খান, আবু তাহের আওয়াল খান, শহীদুল্লাহ কায়সার, সন্তোষ গুপ্ত, বজলুর রহমান, ফয়েজ আহমদ, কে জি মুস্তফা, মোহাম্মদ তোহা খান, শহীদ সাবের, তোয়াব খান, আলী আকসাদ। অন্য দিকে মর্নিং নিউজে ছিলেন এসজিএম বদরুদ্দীন, ওয়াহিদুল হক, হাসানুজ্জামান খান।
সাংবাদিকদের সেই স্বাধিকার আন্দোলনে ফটো সাংবাদিকদের স্মরণে না আনলে গুনাহ হবে। মোজাম্মেল হোসেন, লাল ভাই, মোয়াজ্জেম হোসেন বুলু, রশীদ তালুকদার, আফতাব আহমেদ, গোলাম মাওলা, জহিরুল হক, কামরুজ্জামান, ওয়াসে আনসারী, মোকাদ্দাস ভাই, মানু মুন্সী, মোহাম্মদ আলম, আকিল খান, জালালউদ্দিন হায়দার, রফিকুর রহমান প্রমুখ আন্দোলনের এক ফটোগ্রাফিক কাব্য রচনা করে পাঠকদের উজ্জীবিত করেছেন।
জাতীয় প্রেস কাব গঠন ও বিকাশ আজকের জাতীয় প্রেস কাবের প্রতিষ্ঠার পেছনে মূল উদ্যোগী পুরুষ ছিলেন সংবাদ সম্পাদক খায়রুল কবীর। স্বাধীন রাষ্ট্রে সাংবাদিকদের একটা প্রতিষ্ঠান চাই। খায়রুল কবীরের টিকাটুলিস্থ নাহা ম্যানসনের বাড়িতে তখন সাংবাদিকদের আড্ডা হতো। ঢাকাস্থ ভারতীয় সাংবাদিক বালান (অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব ইন্ডিয়া), বিলাতের ডেইলি মেইল প্রতিনিধি উইলিয়াম ননী, ‘সংবাদ’-এর সৈয়দ নূরুদ্দীন, পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ডাইরেক্টর (ইনফরমশন) সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন, পাকিস্তান অবজারভার সম্পাদক আবদুল সালাম। সেস্টসম্যান পত্রিকা প্রতিনিধি এমএ ওহাব, এস জি এম বদরুদ্দীন আলোচনায় অংশ নিতেন। তাদের সঙ্গে নাজির আহমদ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসান, সুরশিল্পী আবদুল আহাদ  প্রেস কাব গঠনে উৎসাহী ছিলেন। বিবিসি খ্যাত যশস্বী সাংবাদিক, তৎকালীন দৈনিক মিল্লাত-এর বার্তা সম্পাদক সিরাজুর রহমান বলেছেন, ১৯৫২-এর গোড়ার দিকে সংবাদ-এর বার্তা সম্পাদক সৈয়দ নূরুদ্দীন, যুগ্ম সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরী ও আমাকে নিয়ে প্রেস কাব গঠনার্থে একটি কমিটি গঠিত হয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে সার্থক করার প্রক্রিয়ায় অগ্রসেনানি সাংবাদিক সমাজ একুশে ফেব্রুয়ারির পর নাব উদ্দীপনায় আরো সোৎসাহী হয়ে ওঠেন। নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সম্মেলন হল কার্জন হলে ৭ ডিসেম্বর ১৯৫২-তে। সেখানেই আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব গৃহীত হলো প্রেস কাব প্রতিষ্ঠার। বাড়ি খোঁজাখুঁজিও শুরু হলো। কিন্তু তদানীন্তন চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদ রাজি নন। জনাব খায়রুল কবীর ১৯৫৪ সালে তথ্য মন্ত্রণালয়ে স্পেশাল অফিসার হিসেবে যোগ দেয়ার পর তাঁর তদবির বেড়ে যায়।
তিনি জানাচ্ছেন, ১৯৫৪ সালে ৯২  ধারার অধীনে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক পরিবর্তন হয়ে যায়। প্রায় সামরিক শাসন। সব সামরিক শাসন বা গোত্রছাড়া কঠোর শাসন যখন প্রবর্তিত হয়, তার শুরুর দিকটাতে দুই রকম আধিক্য দেখা যায় Ñ কঠোরতার আধিক্য এবং উদারতার আধিক্য। প্রেস কাবের জন্য শহরের কেন্দ্রস্থলে অনেকখানি জায়গাজুড়ে একটি মনোরম বাড়ি বরাদ্দ করা হয় সম্ভবত শেষোক্ত কারণে। কারণ যা-ই হোক, ১৯৫৪ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম প্রেস কাব আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপিত হয়ে গেল ঢাকাতে।
জাতীয় প্রেস কাবকে ঘিরে জাতির অগ্রগণ্য সব সাংবাদিক, যাঁদেরকে জাতীয় সত্তা বললে অত্যুক্তি হবে না, তাঁদের সাংবাদিকতা ও জাতীয় দায়িত্বে আবর্তিত হয়েছেন। পুরনো সেই লাল বাড়িটার স্মৃতি মুছে ফেলা কঠিন। মরহুম ফয়েজ আহমদ তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ ‘সত্যবাবু মারা গেছেন’ জাতীয় প্রেস কাবকে উৎসর্গ করে লিখেছেন, যাকে কেন্দ্র করে সমস্ত সংবাদের উৎস সন্ধান ও পরিসমাপ্তি।
বাংলাদেশের সাংবাদিক-সাহিত্যিক ’৪৭-এর আগে ও পরে দু’টি ধারায় জাতির সেবায় নিয়োজিত থাকলেও (পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ  সোসাইটি ও পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ) ভাষা আন্দোলনে এক সুরে বাংলাভাষার পক্ষে থেকেছেন। একই সঙ্গে মিলেমিশে সাংবাদিক ইউনিয়ন গঠন করেছেন। আবার প্রেস কাবের প্রথম ব্যবস্থাপনা কমিটিতে রেনেসাঁর সভাপতি মুজীবুর রহমান খাঁকে সভাপতি এবং ‘সংবাদ’ এর যুগ্ম-সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরীকে সম্পাদক করেছেন। দু’ধারার অপূর্ব সম্মিলন। ফয়েজ ভাই লিখেছেন, কাব সদস্যগণ যে কোনো রাজনৈতিক মতের সাংবাদিক হতে পারেন, যে কোনো প্রতিক্রিয়াশীল বা বিপ্লবী পত্রিকার সাংবাদিক হলেও আপত্তি নেই। সহ-অবস্থানের এক আদর্শ বিচরণ ভূমি। সহাবস্থানের ভারসাম্য রক্ষা করার ঐতিহ্য প্রেস কাব প্রতিষ্ঠার সময় থেকে এবং সিনিয়র মেম্বার বা কয়েকজন সম্পাদকই এই পরিবেশ সৃষ্টির পথপ্রদর্শক। আর একই সঙ্গে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের অন্তঃজ বন্ধনকে ক্রমাগত পুষ্ট করেছেন। দেশের কোন একটি সংঘে এতো সাহিত্যিক, যাঁদের অনেকেই জাতীয়ভাবে সম্মানিত, আছে কি না জানা নেই। আমাদের পূর্বসূরিরা বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠায় পর্যন্ত উদযোগী ছিলেন। এর মধ্যে সেই আমলে সাংবাদিক ইউনিয়ন প্রেস কাবের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল। ষাটের দশকে গোটা পাকিস্তানে ১৭ দিনের ধর্মঘট করেছিল সাংবাদিক ইউনিয়ন।
জাতীয় প্রেস কাব নিয়ে এর সদস্যরা পর্বতপ্রমাণ গৌরব বোধ করেন। পাকিস্তান আমলে স্বৈরশাসক আইয়ুবের বশংবদ গভর্নর মোনায়েম খাঁকে প্রেস কাবে ঢুকতে দেয়া হয়নি। আমন্ত্রণ জানানো তো দূরের কথা, আরেক স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকেও কখনও দাওয়াত দেয়া হয়নি। এ নিয়ে তার যথেষ্ট আক্ষেপ। এরশাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে প্রেস কাব ছিল রাজনীতিকদের তীর্থকেন্দ্র, আশ্রয়স্থল।
এই প্রেস কাবের সঙ্গে প্রতিজন সদস্যের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। প্রেস কাব সবার কাছে সেকেন্ড হোম। কারো কারো ‘ফার্স্ট হোম’। জনাব ননী, খতিব সাহেব এই কাবেই থাকতেন। একবার বন্যার সময় আবদুস সালাম পরিবার অর্থাৎ জামাতা এবিএম মূসাসহ কাবেই আশ্রয় নেন। মূসা ভাইয়ের এক সন্তানের প্রজন্ম প্রেস কাবে এবং দুই মেয়ের বিয়ে সেখানেই। আর ব্যাচেলর সদস্যরা একে শ্বশুরালয়ের মতোই ব্যবহার করেছেন ও করছেন। মরহুম হুমায়ুন কবীর চৌধুরীর দুনিয়াটা ছিল প্রেস কাবেই।
প্রায় তিন একর জমির ওপর সেই ছোট্ট লাল দালানটুকু একবার হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। রমনা পার্কের বিপরীতে শিল্পকলা একাডেমি সংলগ্ন স্থান কাবকে সরিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর ছিল মুজিব সরকার। এ সংক্রান্ত ফাইলেও সরকারপ্রধান সই করেন ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। কিন্তু এর মধ্যে পটপরিবর্তন হয়ে গেলে কাব কর্তৃপক্ষ ও শিল্পকলা একাডেমির যৌথ সম্মতিতে জিয়াউর রহমানের সরকার কাবের বর্তমান স্থানে জমি বরাদ্দ, পুরাতন বিল্ডিংয়ের মূল্য পরিশোধ এবং নতুন কাব ভবন নির্মাণে সম্পূর্ণ খরচ বহনের সহযোগিতা প্রদান করেন। কাবের ৫ বার নির্বাচিত সম্পাদক এ এস এম হাবিবুল্লাহ জানিয়েছেন : “বর্তমান স্থানে নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়ার নাম কার্যনির্বাহী পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় (৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী স্মরণিকা)”। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কাবের অবরাদ্দকৃত আরো প্রায় ২ একর জমি বরাদ্দ দেন এবং পশ্চিম পাশে নতুন বহুতল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। জমি রেজিস্ট্রির ওই দলিলে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমার স্বাক্ষর থাকায় আমি অহঙ্কার বোধ করি।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র হওয়ার পর সংবাদপত্রকে অসভ্যতার আক্রোশে পড়তে হয়েছে বেশি। তাই সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেস কাবের পথ চলায় অনিশ্চয়তা ছিল বরাবরের মতোই। বাংলাভাষার অন্যতম প্রধান কবি ও গণকণ্ঠ সম্পাদক আল মাহমুদ, হলিডে সম্পাদক এ জেড এম এনায়েতুল্লাহ খান, রয়টার্স-এর আতিকুল আলম গ্রেফতার হন, অসংখ্য পত্রিকা বন্ধ ও সাংবাদিকের কর্মচ্যুত করা হয়। বিবিসির আতাউস সামাদ ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে কারাগারে নিক্ষেপ, চ্যানেল ওয়ান ও দিগন্ত টিভি বন্ধ, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ড, আইসিটি অ্যাক্ট এবং গণবিরোধী জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা প্রভৃতি নিয়ে এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন প্রেস কাব এখনো সাহসের জায়গা। এরশাদের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানটা প্রেস কাবকে সামনে রেখেই হয়েছে।
‘কিছু করার দায়িত্ব’ সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও প্রেস কাবকে জন্মদিন থেকেই ব্যস্ত রেখেছে। স্বপ্ন দেখা ও দেখানো ছাড়া সাংবাদিকতার লক্ষ্যে তৃতীয় ও শেষ স্বপ্ন যদি কিছু থেকে থাকে তবে সেটা সমাজ ও জীবনের প্রবাহে এক ধরনের হস্তক্ষেপের। জাতীয় জীবনে কালো মেঘের সঞ্চার হলেই আলোর জন্য মানুষ ধাবিত হয় তোপখানা রোডে প্রেস কাবের দিকে। এর পরও অন্তরঙ্গে কাব আমাদের জন্য এমন যে, দার্শনিক পাস্কালের সেই উচ্চারণেই আমরা আশ্রয় নিই Ñ ‘হৃদয়েরও কিছু যুক্তি আছে, যুক্তি যার কিছুই জানে না।’ ফয়েজ ভাইয়ের কথাটা এখনো কানে বাজে, “বুঝলা শওকত, প্রেস কাবটা সাংবাদিকদের কাছে একটা ছোটখাটো পৃথিবী। এই ধর আনন্দ উল্লাস, হাসি-কান্না, মিষ্টি-ঝাল খাবার, তাস-দাবা, বন্ধুতা-শত্রুতা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, রাজনৈতিক চেতনা, চিত্রকলা প্রদর্শনী, সুসময়-দুঃসময়, জ্ঞান বিকাশ, জ্ঞান প্রকাশ, স্ফূর্তিতে হাসাহাসি, বৈরিতায় হাতাহাতি, এমনকি গ্রেফতার, মুক্তি ঘোষণা এবং বুলেট-শেল পর্যন্ত।”
শওকত মাহমুদ : সাবেক সভাপতি
জাতীয় প্রেস কাব
সভাপতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন

স্মরণ- বাংলার শাসক মূসা খাঁ by মো: আবদুর রউফ

১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ সেপ্টেম্বর পিতা ঈশা খাঁর মৃত্যু হওয়ায় গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার বক্তারপুর গ্রামে সমাহিত করার পর মূসা খাঁ বাংলার সোনারগাঁও ও ভাটি অঞ্চলের অধিপতি হন বৃহত্তর ঢাকা ও কুমিল্লা জেলার প্রায় অর্ধেকের। তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা, রংপুর, বগুড়া ও পাবনা জেলার কিয়দংশ পান। তিনি তার বাবার মতো মসনদ-ই-আলা  এবং বারভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন। মূসা খাঁর জন্ম ১৫৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ মে।  বাবা তার মায়ের নাম অনুসারে বাংলার রাজধানীর সোনারগাঁও নাম দেন। মূসা খাঁ সোনারগাঁও জমিদারিতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্জন  হলের স্থানটিতে এবং খিজিরপুরে কাতরাবো নামক স্থানে প্রাসাদবাটি ও  দালানকোঠা নির্মাণ করেছিলেন। কার্জন হলের পশ্চিম পাশে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা তীরের লালবাগ, সদরঘাট, পুরান ঢাকা থেকে শাহবাগ পর্যন্ত বাগ-ই-মূসা বিস্তৃত ছিল। ভাইসরয় লর্ড কার্জন ১৯০৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সরকারি ভবন নির্মাণ করার সময় মূসা খাঁর প্রাসাদটি ধ্বংস করা হয়। মূসা খাঁর রাজ্য দক্ষিণে বর্তমান ঢাকা শহরের বুড়িগঙ্গা নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মূসা খাঁ শক্তিশালী সেনা ও নৌবাহিনীর অধিকারী ছিলেন। রাজধানী ছাড়াও খিজিরপুর, কাতরাবো, কদমরসুল, যাত্রাপুর, ডাকচর, শ্রীপুর ও বিক্রমপুর তার দুর্ভেদ্য সামরিক ঘাঁটি ছিল। অন্য বারভূঁইয়াদের সহায়তায় পূর্ববঙ্গে আধিপত্য অুণœ রাখার জন্য তিনি ১৫৯৯  থেকে ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অবিরাম যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত মূসা খাঁ ও জোটে অংশগ্রহণকারী মুসলমান জমিদারেরা মুঘল সুবাদার ইসলাম খাঁর কাছে আত্মসমর্পণ ও বশ্যতা স্বীকার করেন এবং মূসা খাঁর পরগনাগুলো ইসলাম খাঁ তাকে জায়গির হিসেবে প্রদান করেন।
মূসা খাঁ জনদরদি শাসক ছিলেন। তিনি সুগঠিত প্রশাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে মূসা খাঁ প্রভূত উন্নতি করেছিলেন। তার আমলে কৃষকসমাজ  উন্নতির শিখরে গিয়েছিল এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। মূসা খাঁ ১৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ অক্টোবর ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। ঢাকায় মূসা খাঁ মসজিদ ও কার্জন হলের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

দু’দশকে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনও নিম্ন আয়ের দেশ

গত দু’দশকে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনও একটি নিম্ন আয়ের দেশ। লক্ষাধিক মানুষ এখনও বসবাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে দুর্নীতি সবচেয়ে বড় সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অন্য দেশ ও বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য নির্মূলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু আন্তর্জাতিক চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বিশ্বের অনেক দেশের জনগণ অবস্থান করছে। মাথাপিছু আয় অনেক কম। এমন সব কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে চরম দারিদ্র্য দূর করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গতকাল যুক্তরাজ্য সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ: ইনক্লুসিভ গ্রোথ ডায়াগনোস্টিক জুন ২০১৪’ শীর্ষক ১৯৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, লক্ষাধিক মানুষের দারিদ্র্যবিমোচন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রসারের মাত্রা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশে। উল্লেখযোগ্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার একাধিক সময়কাল। রাষ্ট্র হিসেবে ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বছর ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্যে পৌঁছুতে হলে তাদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হার হতে হবে ৭.৫-৮ শতাংশ। বাংলাদেশ যদি আয়ের মাত্রা বৃদ্ধি ও চরম দারিদ্রতা বিমোচন করতে চায় তাহলে এ প্রবৃদ্ধিতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে দেশবাসী ও নারীদের উন্নয়ন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের গড় জাতীয় আয় বেড়েছে। ২০০০ সালে মাথাপিছু গড় আয় ৯৮৫ ডলার থেকে ২০১০ সালে ১৭৬৮ ডলারে উন্নীত হয়েছে। তথাপি বাংলাদেশ এখনও একটি নিম্ন আয়ের দেশ। লক্ষাধিক মানুষের বাস এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে। ২০১০ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী দারিদ্র্যসীমার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড দৈনিক ১.২৫ ডলারের নিচে আয় ৪৩ শতাংশ মানুষের। বাস্তবতার নিরিখে ২০১০ সালে প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ বাংলাদেশী চরম দরিদ্রতায় দিনাতিপাত করেছে, যা কিনা যুক্তরাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় সমান। এছাড়াও দারিদ্র্যসীমা থেকে কিছুটা উপরে এমন জনসংখ্যার হারও বাংলাদেশে অনেক বেশি। বাস্তবিক অর্থে এসব মানুষও আর্থিক টানাটানিতে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ২০১০ সালে ৫ কোটি বাংলাদেশীর আয় ছিল দিনপ্রতি ১.২৫ ডলারের উপরে, কিন্তু ২ ডলারের নিচে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশ এবং বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দরিদ্রতা বিমোচনে দৃঢ়সংকল্প নিয়েছে। বড় ধরনের কোন ধাক্কা না খেলে এবং ২০০০ সাল থেকে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে তা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দরিদ্রতার বিস্তার ২.৪ শতাংশ প্রতিহত করতে পারবে। একইসঙ্গে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, ‘চরম দরিদ্রতা’ নিয়ে যে আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা নিরুপণ করা হয় সেটা হলো বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর দরিদ্রসীমার গড়ের আপেক্ষিক দরিদ্রমাত্রা যা অত্যন্ত কম। অর্থাৎ দৈনিক আয় ১.২৫ ডলারের উপরে ওঠার অর্থ কোন ভাবেই দরিদ্রমুক্তি নয়। বরং সেটা হলো আগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম দরিদ্রের অবস্থায় যাওয়া। যদিও ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক ১.২৫ ডলার মানদণ্ডে বাংলাদেশ ২.৪ শতাংশ দরিদ্রতা কমিয়ে আনতে পারলে তা হবে বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক অর্জন। আর সেটা অর্জন করতে সক্ষম হলে পরেও দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের দৈনিক আয় থাকবে ৪ ডলারের কম। সংক্ষেপে দাতা দেশগুলোর নাগরিকরা যেভাবে দেখে থাকেন সে অর্থে বাংলাদেশীদের দরিদ্রমুক্তির জন্য প্রয়োজন হবে দশকের পর দশক ধরে অব্যাহত ও সমাজের সকল শ্রেণীর অংশগ্রহণমূলক প্রবৃদ্ধি। ফলে নীতিমালা ও কার্যক্রমগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের পাশাপাশি মধ্য মেয়াদি লক্ষ্য থাকতে হবে। এ বিশ্লেষণের লক্ষ্য হলো- ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিনিয়োগ ও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় আয় বৃদ্ধি হতে পারে এমন ঝুঁকি নেয়ার ক্ষেত্রে কি কি প্রতিবন্ধকতা কাজ করছে সেগুলো চিহ্নিত করা। সুনির্দিষ্ট হস্তক্ষেপের নির্দেশনা দেয়া এ বিশ্লেষণের লক্ষ্য নয়, বরং উন্নয়নের পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলোর ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করতে একটি কাঠামো দেয়াটাই এর উদ্দেশ্য। এ বিশ্লেষণকে কাজে লাগিয়ে নীতিনির্ধারকরা যথাযথ সংস্কার ও প্রকল্প চিহ্নিত করতে পারবেন যেখানে প্রতিবন্ধকতা সহজে অতিক্রম করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাঙ্গা করা সম্ভব। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ও গ্লোবাল কমপিটিটিভনেস ইনডেক্স তাদের ২০১৩-২০১৪ রিপোর্টে বলেছে, বাংলাদেশে বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় বাধা বা সমস্যা হলো দুর্নীতি। এতে দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর সুবিধা। রয়েছে সরকারি পর্যায়ে অকার্যকারিতা ও অর্থের অভাব। বাংলাদেশ ঘুষ, দুর্নীতিতে রয়েছে অনেকটা তলানিতে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো বিদ্যুৎ। এখানে বিদ্যুতের মূল্য অনেক বেশি। সুশাসনকেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের একটি বড় নিয়ামক হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু ব্যবসা করতে গিয়ে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মূল্য দিতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

দুই ঘণ্টার তাণ্ডবে ক্ষতি ২ কোটি টাকা

নির্বিচারে গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় সিলেটের পরিবহন সেক্টরে আতঙ্ক নেমে এসেছে। বিরাজ করছে টানটান উত্তেজনা। পরিবহন শ্রমিকদের বিভক্তির কারণে এক পক্ষ আরেক পক্ষের গাড়ি ভাঙচুর করছে। শনিবার মধ্যরাত পর্যন্ত থেমে থেমে চলে গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা। পরিবহন শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, দুই ঘণ্টার তাণ্ডবে সিলেটে পরিবহন সেক্টরে দুই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ঘটনার পর এ তাণ্ডবের দায়ভার নিচ্ছে না কেউ। ফলে মালিকরা আতঙ্কে গাড়ি রাস্তায় নামাচ্ছেন না। অন্যদিকে গতকাল সকাল থেকে সিলেটে শুরু হওয়া অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে অচল হয়ে পড়েছে সিলেট। দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় রাজধানী ঢাকা সহ গোটা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সিলেট। পরিবহন ধর্মঘট অব্যাহত থাকায় সিলেটে যাত্রী দুর্ভোগও চরম আকার ধারণ করেছে। সিলেট থেকে ঢাকাগামী বাস সার্ভিসগুলোর অগ্রিম টিকিট ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে যাত্রীদের। পরিবহন ধর্মঘট চলাকালে সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় লাঠি মিছিল করেছেন। ওদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল বিকেলে ধর্মঘট করা পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক। রাতে বৈঠকের প্রেক্ষিতে ৫ই নভেম্বর পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত করা হয়েছে। সিলেটের পরিবহন সেক্টরে বিভক্তি নতুন নয়। তবে চলমান সঙ্কটের সৃষ্টি বেশি দিন আগেও নয়। মূলত যাত্রী ওঠানামাকে কেন্দ্র করে সিলেটের বাস পরিবহন ইউনিয়ন ও সিএনজি অটোরিকশা পরিবহন ইউনিয়নের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। পরিবহন শ্রমিকরা জানান, সিলেটের নগরীর সঙ্গে সংযোগ বিভিন্ন উপজেলার সঙ্গে বাস সার্ভিসের পাশাপাশি সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করে। গত কয়েক বছর ধরে যাত্রী ওঠানামাকে কেন্দ্র করে বাস শ্রমিকদের সঙ্গে সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিকদের বিরোধ চলছে। এ বিরোধের কারণে কয়েক মাস আগে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিভক্তি। চলতি মাসের প্রথম দিকে উভয় সংগঠনের পক্ষ থেকে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সিএনজি অটোরিকশা সংগঠনের নেতারা নিজেদের শক্তি জানান দিতে ৭ দফা দাবি তুলে ধরে শনিবার রেজিস্টারি মাঠে মহাসমাবেশ করে। আর ৫ দফা দাবি উপস্থাপন করে গতকাল রোববার সিলেটে একদিনের পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন। পরিবহন শ্রমিকরা জানান, দুই সংগঠনের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই বিরাজ করার মুহূর্তে শনিবার মহাসমাবেশে আসার পথে হঠাৎ করে একদল সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। তাদের ঘণ্টাব্যাপী তাণ্ডবে সিলেটে বাস, মিনিবাস, মাইক্রোবাস, ট্রাক সহ শতাধিক যানবাহন ভাঙচুর করা হয় বলে জানিয়েছেন সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সেলিম আহমদ ফলিক। তিনি বলেন, নির্বিচারে ভাঙচুরের ফলে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আর সিলেট জেলা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাকারিয়া আহমদ জানিয়েছেন, বাস পরিবহন শ্রমিকরা তাদের ২০-২৫টি সিএনজি অটোরিকশা ভাঙচুরের পাশাপাশি বেশ কয়েকটিতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। এতে করে তাদের সংগঠনের নেতাদের কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া পুলিশ শ্রমিকদের নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে কয়েকজন শ্রমিককে আহত করেছে। উভয় সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলাপ জানা গেছে, মাত্র দুই ঘণ্টার তাণ্ডবে সিলেটে বিবদমান দু’দল শ্রমিকের দুই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আর তাণ্ডব-পাল্টা তাণ্ডবের পর পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নগরীর যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হলেও গুটিকয়েক যানবাহন ছাড়াও গণপরিবহন চলাচল করেনি। সিলেট জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের ব্যানারে মাইক্রোবাস, মিনিবাস, ট্রাক সহ বেশ কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতারা একাত্মতা প্রকাশ করে রাস্তায় গাড়ি নামাননি। তবে সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন নেতারা জানিয়েছেন, তারা রাস্তায় গাড়ি বের করেছেন। গাড়ি চলেছেও। তবে বাস্তবে রাস্তায় চলাচলকারী সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা ছিল খুবই কম।
ধর্মঘটে অচল সিলেট: শনিবারের তাণ্ডবের পর আকস্মিক সিলেট থেকে সব রুটে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষ থেকে প্রথমে বলা হয়েছিল ওই ধর্মঘট লাগাতার চলবে। কিন্তু রাতে পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকাল ৬টা পর্যন্ত ধর্মঘট শিথিল করা হয়েছিল। ভোর ৫টা থেকে পুনরায় শুরু করা হয় অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট। এ কারণে সকাল থেকে ফাঁকা ছিল সিলেটের রাজপথ। দূরপাল্লার কোন যানবাহন সিলেট থেকে ছেড়ে যায়নি কিংবা প্রবেশ করেনি। সকাল ৬টা কদমতলীস্থ গ্রিনলাইন, শ্যামলী, ইউনিক, হানিফ সহ বেশ কয়েকটি বাস সার্ভিসের কাউন্টার ছিল তালাবদ্ধ। ভাঙচুরের আশঙ্কায় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে সরিয়ে ফেলা হয় দূরপাল্লার যানবাহন। পরিবহন শ্রমিকরা জানান, শুধু বাস কিংবা মিনিবাস শ্রমিকদের ধর্মঘটে ট্রাক সহ পণ্যবাহী যানবাহনেও ধর্মঘট পালন করা হচ্ছে। এ কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পণ্যবাহী যানবাহন সিলেটে ঢোকেনি। পাশাপাশি জরুরি সার্ভিসের যানবাহনের চলাচল ছিল বন্ধ। ধর্মঘটের শুরু থেকে পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা সিলেট নগরীর প্রবেশপথ হুমায়ুন রশীদ চত্বর, চণ্ডিপুল সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় অবস্থান নেন। শ্রমিক নেতারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলেও কোন ধরনের ভাঙচুর চালাননি। তবে সকাল ১০টার দিকে পরিবহন শ্রমিকদের একটি অংশ দক্ষিণ সুরমায় এলাকায় ধর্মঘটের সমর্থনে লাঠি মিছিল বের করে। বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তেরা মিয়া, শ্রমিক নেতা মাখন মিয়ার নেতৃত্বে মিছিলটি কীন ব্রিজ এলাকা ঘুরে কদমতলীতে অবস্থান নেয়। এ সময় দক্ষিণ সুরমা এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল।
একদিনে ক্ষতি ১২ কোটি টাকা: সিলেটে ধর্মঘটে পরিবহন সেক্টরে একদিনে ক্ষতি হয় ১২ কোটি টাকা। যদি ধর্মঘট লাগাতার থাকে তাহলে ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণ হবে। পরিবহন শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, এবারের ধর্মঘটে কেবলমাত্র হালকা যান সিএনজি অটোরিকশা ও রিকশা ছাড়া সব শ্রমিক সংগঠনের নেতারা একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। এ কারণে এবার ক্ষতির পরিমাণ বেশি। তারা জানান, গাড়ি ভাঙচুরের প্রতিবাদস্বরূপ বিচার দাবিতে লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। বিচার না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে। এদিকে সিলেটের পরিবহন ধর্মঘট শুরু হওয়ার পর প্রশাসন শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক গতকাল বিকাল ৪টা থেকে তার কার্যালয়ে বৈঠক শুরু করেছেন। বৈঠকে উপস্থিত সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক মনির মিয়া জানিয়েছেন, সন্ধ্যা পর্যন্ত বৈঠকের আলোচনার প্রেক্ষিতে কোন সুরাহা হয়নি। এ বৈঠকে সিলেটে রাজনৈতিক দলের নেতারা রয়েছেন বলে জানান তিনি।
ওসি মুরসালিনসহ পুলিশ সদস্যদের অপসারণ দাবি: বিনা উস্কানিতে নিরীহ পরিবহন শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণকারী দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি মো. মুরসালিনসহ দোষী পুলিশ সদস্যদের অপসারণ ও সুষ্ঠু বিচার, নিরীহ বাস-মিনিবাস এবং ট্রাক শ্রমিকদের ওপর হামলাকারী শ্রমিক নামধারী কিছু দালাল ও গুণ্ডাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ ও সংগ্রাম কমিটি। বিনা কারণে রাতে কদমতলীস্থ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে পরিবহন শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ, অমানবিক জুলুম-নির্যাতন, মহাসমাবেশে যোগদানের নামে কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সহ সিলেটের বিভিন্ন স্থানে নিরীহ বাস-মিনিবাস ও ট্রাক শ্রমিকদের ওপর হামলা করে ৬৫ জন শ্রমিককে আহত করা, শতাধিক বাস ও ৪০টি ট্রাক ভাঙচুরসহ শ্রমিক নামধারী গুণ্ডাদের নৈরাজ্য ও অপকর্মের প্রতিবাদে টার্মিনাল রোডস্থ কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি বর্ধিত সভার প্রস্তাবে এ দাবি জানানো হয়। সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক আলহাজ জমির আহমদের সভাপতিত্বে এবং সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রকিব উদ্দিন রফিকের পরিচালনায় সভার শুরুতে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশদ বক্তব্য রাখেন কমিটির যুগ্ম আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা সেলিম আহমদ ফলিক। পরিস্থিতির আলোকে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন সংগ্রাম কমিটির অন্যতম উপদেষ্টা পরিবহন মালিক নেতা আলহাজ নুরুল ইসলাম ফলিক, অন্যতম সদস্য নাজিম উদ্দিন লস্কর, আবদুল মান্নান, তেরা মিয়া, হেলাল উদ্দিন, শাহনুর রহমান, আবদুল কাদির, হিরণ মিয়া, শাহ মো. জিয়াউল কবির, শামসুল হক মানিক, আবুল কাশেম, মঈনুল হক, হাজী আহাদ আলী, আমিনুজ্জামান জাহাঙ্গীর, মুক্তার আহমদ এবং বিশেষ আমন্ত্রিত হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিলেট ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি আবদুস সালাম ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল গফুর। এছাড়া সভায় আরও প্রায় ৩ শতাধিক পরিবহন মালিক-শ্রমিক অংশ নেন।
৫ নভেম্বর পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত: সিলেটের অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট ৫ই নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করেছে আন্দোলনকারী সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা। গতকাল সন্ধ্যায় পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে প্রশাসনের বৈঠকের পর ধর্মঘট স্থগিত করা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত থাকা সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক মনির মিয়া মানবজমিনকে জানিয়েছেন, তিন ঘণ্টা আলোচনার পর তাণ্ডবে অংশ নেয়া সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও দাবি দাওয়া পূরণের আশ্বাস প্রদান করায় ৫ই নভেম্বর পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত করা হয়েছে। বৈঠকে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. শহিদুল ইসলামসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলে জানান তিনি। এছাড়া বৈঠকে সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সেলিম আহমদ ফলিক, সাধারণ সম্পাদক রাকিব উদ্দিন রকিব উপস্থিত ছিলেন।

বাড়ছে নৃশংস খুনের ঘটনা by নুরুজ্জামান লাবু

পারিবারিক ও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নৃশংস খুনের ঘটনা বাড়ছে। একের পর এক এ ধরনের ঘটনায় উদ্বিগ্ন খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক অস্থিরতা, পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হওয়া ও অর্থনৈতিক কারণে এসব ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে বিচারহীনতার সংস্কৃতিও এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বাড়ার নেপথ্যে কাজ করছে। বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটছে যৌতুক, পরকীয়া, দাম্পত্য সমস্যা, পারিবারিক কলহ, জমিজমা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে। নৃশংস এসব ঘটনার শিকার হচ্ছে শিশুরাও। গত কয়েক মাসে যে সব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তাতে দেখা যায়, স্বামী খুন করছেন স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে, বাবা-মা খুন করছেন নিজের সন্তানকে, সন্তানের হাতেও খুন হতে হচ্ছে মা-বাবাকে, ভাইয়ের হাতে খুন হচ্ছে ভাই, আত্মীয়ের হাতে খুন হচ্ছেন আত্মীয়। সব খুনের ঘটনাই নৃশংস হলেও খুনের ধরন পাল্টেছে এখন। গলা কেটে হত্যার ঘটনা বাড়ছে দিনকে দিন। হাত-পায়ের রগ কেটেও নিশ্চিত করা হচ্ছে মৃত্যু। তুলে নেয়া হচ্ছে চোখ। পাওয়া যাচ্ছে লাশের খণ্ডিত অংশ। অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। সামাজিক বন্ধনেও ধরেছে চিড়। মানুষ হয়ে উঠছে ভোগবাদী। কমছে মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ। একারণে তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে একে অপরকে নৃশংস খুন করতে দ্বিধা করছে না।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী সামপ্রতিক সময়ে সারাদশে রাজনৈতিক কারণে খুনোখুনির ঘটনা কমলেও সামাজিক অস্থিরতার কারণে খুনের ঘটনা বাড়ছে। গত ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এ পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার ৬৮০ জন খুন হয়েছেন। শুধু চলতি বছরেই আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে সারাদেশে ৩ হাজার ৬১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় খুন হয়েছেন ১৭২ জন। এসব হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগই ঘটেছে সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতার কারণে। প্রতিদিন গড়ে ১৪-১৫ জন খুন হচ্ছেন। পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তদের হাতে খুন-খারাবির ঘটনা পুলিশ আগেভাগে ঠেকানোর উদ্যোগ নিতে পারে। সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক কলহের জের ধরে হওয়া খুন বন্ধ করতে হলে সামগ্রিকভাবে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এটা পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়, সাধারণ মানুষকেও সচেতনতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, সামাজিক অস্থিরতায় খুন-খারাবিসহ অপরাধের ঘটনা কমিয়ে আনতে পুলিশ সবসময় কাজ করে থাকে। ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ ও ‘ওপেন হাউজ ডে’র মাধ্যমে পুলিশ জনগণের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছে। পুলিশ যত সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যেতে পারবে তত এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। আইজিপি বলেন, সমাজে যে সব লোমহর্ষক অপরাধের ঘটনা ঘটছে সেগুলো চিহ্নিত করে এসব ঠেকাতে পুলিশ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে আরও বেশি উদ্যোগী হচ্ছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক ও পারিবারিক কারণে নৃশংস খুনের সংখ্যা বাড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ছে। একমাত্র আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেই এসব খুন-খারাবি ঠেকানো সম্ভব। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, খুনের ঘটনার পরও দায়ী ব্যক্তিরা রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতা আর অর্থ দিয়ে ‘ম্যানেজে’র মাধ্যমে পার পেয়ে যাচ্ছে। এরকম একটি ঘটনাও ঘটলে সেটি অন্যদের মধ্যে দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়। অন্যরা উৎসাহিত হয় যে, খুন করেও ‘শক্ত খুঁটি’ থাকলে পার পাওয়া যায়। এজন্য অপরাধ বিশেষজ্ঞরা খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দিয়েছেন। মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অভাবে এমন নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটছে। আমাদের সমাজে রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব অনেক বেশি। এ কারণে সমাজে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করলে সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতাও বেড়ে যায়। ইদানীং পরিবার ও সমাজের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ভেঙ্গে পড়েছে। পরিবার বা সামাজিক অনুশাসন এখন কেউ মানতে চায় না। তিনি বলেন, সমাজে নিপীড়িত মানুষ যখন আস্থাহীন হয়ে পড়ে তখন সমাজে ও পরিবারের মধ্যে হতাশাবোধ কাজ করে। এ হতাশা থেকে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। এসব বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজে একটা আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। অপরাধ বিজ্ঞানের এই অধ্যাপক বলেন, একই সঙ্গে অপরাধীদের অপরাধ বিবেচনা করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এমন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে যাতে একই অপরাধ অন্য কেউ করার সাহস না পায়। তাহলেই কেবল সমাজ থেকে অপরাধ দূর করা সম্ভব। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমাজে যে সব কারণে অস্থিরতা বাড়ছে সেসব বিষয়গুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ না নেয়া পর্যন্ত সামাজিক অপরাধ ও মানুষের মানসিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। মানুষের মনের খারাপ চিন্তাকে পাল্টে দিতে হবে। সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি মজবুত করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে উদ্যোগ নিতে হবে।
সম্প্রতি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নিজ বাসায় ঘুমন্ত অবস্থায় তিন মেয়েসহ মাকে পুড়িয়ে মারার ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। রাজধানীতে বিমাতার হাতে এক শিশুসন্তান নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। গতকাল একই দিনে গাজীপুরে এক স্বামী তার স্ত্রীকে বঁটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন। অপর ঘটনায় পারিবারিক কলহের জের ধরে এক স্ত্রী তার স্বামীর গোপনাঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে দেয়। শনিবার রাজধানীর জুরাইনের হাত-পায়ের রগ কেটে এক যুবককে হত্যা করা হয়। গত বুধবার একই দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুই ব্যক্তি তাদের স্ত্রীর হাতে খুন হয়েছেন। হত্যার পর তাদের একজনের লাশ ঘরের মাটি খুঁড়ে পুতে রাখা হয়েছিল। অপরজনের লাশ রাখা হয়েছিল ওয়্যারড্রোবে রাখা হয়েছিল। গত ১লা অক্টোবর এক ব্যক্তির তিন খণ্ড লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ২১শে সেপ্টেম্বের সন্তানের নাম রাখার অনুষ্ঠান নিয়ে তুচ্ছ বিতর্কে এক স্বামী তার স্ত্রীকে আঁতুড়ঘরেই পিটিয়ে হত্যা করে। গত ১২শে আগস্ট রাজধানীর ডেমরায় কামরুল নামে এক তরুণকে তার মায়ের পরিকল্পনাতেই খুন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ১লা আগস্ট তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে এক স্কুলছাত্রকে কয়েক প্রতিবেশী চোখ উৎপাটন ও গোপনাঙ্গ কেটে হত্যা করে।

বাংলাদেশের পুলিশকে অস্ত্র দেবে না যুক্তরাজ্য by দীন ইসলাম

বাংলাদেশের পুলিশের ব্যবহারে অস্ত্র বিক্রি করতে রাজি নয় যুক্তরাজ্য। সম্প্রতি মানবাধিকার প্রশ্নে এ দেশের পুলিশের জন্য গোলাবারুদ রপ্তানিতে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তারা। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-ভুক্ত কয়েকটি দেশও জারি করেছে একই ধরনের অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। এ নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর। বাধ্য হয়ে গোলাবারুদ কেনার বিকল্প বাজারের সন্ধানে নেমেছে সরকার। তবে ওই সব দেশের মতো মানসম্মত গোলাবারুদ সরবরাহকারী দেশ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগের মাধ্যমে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে বিষয়গুলো সুরাহার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ জন্য গত মাসের শেষদিকে পররাষ্ট্র সচিবের কাছে একটি চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই চিঠিতে পুলিশ অধিদপ্তরের গত ৪ঠা আগস্টের ইকুইপমেন্ট/৪৪.০১.০০০০.২২.০২.০১১.১৩ (অংশ-১)/১২০২৮ নং পত্রের মর্মানুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশন এবং ঢাকাস্থ বৃটিশ হাই কমিশনের কাছে পাঠাতে বলা হয়েছে। এখনও চিঠি’র কোন জবাব পায়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান মানবজমিনকে বলেন, আমি এ সম্পর্কে কিছু জানি না। জেনে তারপর বলতে পারবো। পুলিশের আইজি হাছান মাহমুদ খন্দকার বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত আইজিপি (অর্থ)-র সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ফাইল না দেখে কিছু বলা যাবে না। আপনি অতিরিক্ত আইজিপি (অর্থ)-র সঙ্গে কথা বলেন। তিনি আপনাকে এ বিষয়ে তথ্য দিতে পারবেন। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০০টি বুলেটপ্রুফ হেলমেটের সঙ্গে বুলেটপ্রুফ ভিসর এবং ১০০০টি বুলেট প্রুফ হেলমেটের সঙ্গে রায়ট ভিসর কেনার জন্য ‘ইউনাইটেড শিল্ড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানির সঙ্গে গত অর্থবছরের শেষদিকে চুক্তি করে সরকার। এর ধারাবাহিকতায় মূল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে এ সব জিনিস বাংলাদেশে রপ্তানি করতে ‘রপ্তানি লাইসেন্স’-এর জন্য আবেদন করে। যুক্তরাজ্য সরকারের ‘এক্সপোর্ট কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন, ডিপার্টমেন্ট ফর বিজনেস ইনোভেশন অ্যান্ড স্কিলস গভর্নড বাই দ্য বৃটিশ গভর্নমেন্ট’ রপ্তানি লাইসেন্স ইস্যুর বিষয়ে অসম্মতি জানিয়ে চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে তারা বলেছে, ‘মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মৌলিক স্বাধীনতা একটি দেশের চূড়ান্ত গন্তব্য হওয়া উচিত।’ যুক্তরাজ্য সরকারের এমন বক্তব্য সংক্রান্ত চিঠি পাওয়ার আগেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপটেনস টেস্ট (ফ্যাট) কার্যক্রমে অংশ নিতে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার জন্য সরকারি আদেশ (জিও) জারি করে। কিন্তু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইউনাইটেড শিল্ড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর কাছ থেকে রপ্তানি আদেশ ইস্যু না করার খবরটি জানার পর চুপসে যায় পুলিশ সদর দপ্তর। তারা নানা মাধ্যমে চেষ্টা করে। কিন্তু সব কিছুই ভেস্তে যায়। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত পাঁচটি চিঠি দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মূল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পুলিশের দু’টি আইটেম সরবরাহে পুনরায় এক্সপোর্ট লাইসেন্স চেয়েছে। এর আগেই লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশন এবং ঢাকাস্থ বৃটিশ হাই কমিশনকে অবহিত করে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওদিকে মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসার পর পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, বুলেটপ্রুফ হেলমেটের সঙ্গে বুলেটপ্রুফ ভিসর এবং বুলেটপ্রুফ হেলমেটের সঙ্গে রায়ট ভিসর পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার যন্ত্রপাতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের জন্য জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব পিসকিপিং অপারেশনস-এর ফর্মড পুলিশ ইউনিট’স স্ট্যান্ডার্ড ফোর্স রিকোয়ারমেন্ট অনুসারে আইটেম দু’টির প্রাধিকার ও চাহিদা রয়েছে। এসব আইটেম দেশের অভ্যন্তরে জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাসহ অন্যান্য অপারেশনাল কাজে এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তি নিরাপত্তায় ব্যবহার করা হবে। এ কারণে এক্সপোর্ট লাইসেন্স পাওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। ওদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশ পুলিশে গোলাবারুদ রপ্তানির জন্য এক্সপোর্ট লাইসেন্স দিচ্ছে না। ইইউভুক্ত দেশগুলো তাদের আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলছে, বাংলাদেশে রপ্তানিকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ মানবতাবিরোধী কাজে ব্যবহার করা হবে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পুলিশ সদর দপ্তরকে বিষয়গুলো জানানোর পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিষয়গুলো জানাচ্ছেন তারা। ওদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)কে দায়মুক্তি না দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এবিষয়ে গত মাসের শেষে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে।

‘শহীদ মিনার কোন দল বা গোষ্ঠির সম্পত্তি নয়’ -সুলতান মোহাম্মদ মনসুর

একটি ভূইফোঁড় সংগঠনের গুটি কয়েক কর্মী দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শহীদ মিনারে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ। তিনি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ও পরবর্তীতে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও দ্বিধা ভিবক্ত করার জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, কলামনিস্ট, আইনজীবীসহ নয় বুদ্ধিজীবীকে শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে বলে আমি মনে করি। যেখানে তাদের অনেকেই পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতন্ত্র মুক্তি সংগ্রাম, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সহ গণ মানুষের পক্ষে স্ব স্ব অবস্থান থেকে ভূমিকা রেখেছেন। ভাবতে অবাক লাগে যাদের হাত ধরে সেই ১৯৬৮ সালে আমার ছাত্রলীগের রাজনীতির হাতেখড়ি তাদের মধ্যে অন্যতম, সময়ের সাহসী সৈনিক দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক জনাব মতিউর রহমান চৌধুরী যিনি মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে ২৬শে মার্চ ৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তীতে সিলেটে কারাগার ভেঙ্গে তাকে নিয়ে আসে মুক্তিকামী জনতা। যে মতিউর রহমান চৌধুরী স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে মৌলভীবাজার মহাবিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন এবং আজকের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যখন ছাত্রলীগের সহ সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন সেই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ কমিটির তিনি তখন সহ গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন, এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নেতৃত্বদানকারি শেখ ফজলুল হক মনির সম্পাদিত বাংলার বাণীর মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনকারি মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠক কে অসম্মান করা বিগত ৪৫ বছরের ইতিহাস সম্পর্কে এ সরল প্রাণ প্রজন্মের কয়েক জনের অজ্ঞতা ও দৈন্যতা ছাড়া আর কিছু নয় বলে আমার বিশ্বাস। যে চক্রটি পিছন থেকে শহীদ মিনার,স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বীকৃত অবস্থান নিয়ে খেলছেন তারা প্রকৃত পক্ষে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের এই সময়ের প্রধান দাবি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কে আড়াল করার পাশাপাশি এই নয় ব্যক্তিত্ব কে যারা কিনা স্ব স্ব ক্ষেত্রে বাংলার গণ মানুষের পক্ষে নানা সময়ে ভুমিকা রেখেছেন তাদের কে কৃত্রিমভাবে ইস্যু বানিয়ে জাতিকে দ্বিধা বিভক্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত, তাদেরকে আগামীতে ইতিহাসের বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। পরিশেষে আমি দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সুস্থ রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষে সকলকে সহনশীল ও দেশপ্রেমিক ভূমিকা রাখার আহবান জানাচ্ছি।

৩৩ বছর পর ফিরলো দৃষ্টিশক্তি

কৃত্রিম চোখ প্রতিস্থাপনে ফের একবার সাফল্যের স্বাক্ষর রাখলেন মার্কিন চিকিৎসকরা। ৬৬ বছর বয়সী ল্যারি হেস্টার ৩৩ বছর পর তার হারানো দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন। ৩৩ বছরে প্রথমবারের মতো পৃথিবীর আলো দেখেছেন তিনি। আক্ষরিক অর্থে এ ডিভাইসটি ল্যারির দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ ফিরিয়ে দেবে না। তবে এর মাধ্যমে তিনি দরজা থেকে দেয়ালকে পৃথক করার মতো কাজ করতে পারবেন। রাস্তা পার হওয়ার সময় পথচারীর জন্য অঙ্কিত জেব্রা ক্রসিং চিহ্নিত করতে পারবেন। এরই মধ্যে পুকুরে সাদা হাঁসের সাঁতার কাটা, পূর্ণিমা, হলুদ ফুল দেখতে পেরে বেশ পুলকিত ল্যারি। এগুলো আর কোনদিন তিনি দেখতে পাবেন, সেটা স্বপ্নেও ভাবেননি। স্ত্রী জেরির সঙ্গেও দারুণ উপভোগ্য সময় কাটছে ল্যারির। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা পিটিআই। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে সবচেয়ে যুগান্তকারী ও নব-সংযোজিত চিকিৎসার একটি হচ্ছে, বায়োনিক চোখ প্রতিস্থাপন। জটিল ও সূক্ষ্ম এ চিকিৎসায় মানুষ তার হারানো দৃষ্টিশক্তি আংশিকভাবে ফিরে পেতে পারেন। একটি বস্তুর গঠনের সঙ্গে অন্য বস্তুর গঠনের ভিন্নতা শনাক্ত করতে পারেন। ৩০ বছর বয়সের গণ্ডি পেরোননি তখনও। ল্যারির চোখে ‘রেটিনাইটিস পিগমেনটোসা’ রোগ শনাক্ত করলেন বিশেষজ্ঞরা। সে সময় তারা বুঝতে পারেননি ল্যারি তার দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে বসবেন এবং এ রোগের কোন চিকিৎসাও তাদের জানা ছিল না। গত ১লা অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম ব্যক্তি হিসেবে বায়োনিক চোখে দৃষ্টি ফিরে পান সৌভাগ্যবান এ মার্কিনি। বায়োনিক চোখটির বৈজ্ঞানিক নাম আর্গাস ২ রেটিনাল প্রোসথেটিক ডিভাইস। মস্তিষ্কে আলোক সংকেতসমূহ ও সংবেদন প্রেরণে সাহায্য করে ডিভাইসটি। তারবিহীন প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি সেন্সর বসানো হয় চোখে। চোখে প্রতিস্থাপিত বিশেষ চশমায় বসানো থাকে অতি ক্ষুদ্র ক্যামেরা। ক্যামেরায় পাঠানো কোন বস্তু থেকে প্রতিফলিত আলোক সঙ্কেত মস্তিষ্কে প্রেরণ করে সেন্সর। এভাবে মস্তিষ্কে বস্তুটির গঠনের একটি ছবি তৈরি হয়। গত ১০ই সেপ্টেম্বর ল্যারির চোখে সেন্সর প্রতিস্থাপন করা হয় এবং ৩ সপ্তাহ পর সেটি সক্রিয় করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই ল্যারি, তার স্ত্রী ও পরিবারের বাকি সদস্যরা ভীষণ উচ্ছ্বসিত। বিশ্বে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিপ্লবে আমূল বদলে গেছে চিকিৎসা বিজ্ঞান। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় কৃত্রিম হাত-পা সংযোজনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্রতিস্থাপন আগের মতো অসাধ্য কোন ঘটনা নয়। বায়োনিক চোখ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে মানুষ যাতে তার হারানো দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণরূপে ফিরে পান, সেজন্য একের পর এক গবেষণা চলছে। অচিরেই বড় কোন সাফল্য ধরা দিতে পারে বিজ্ঞানীদের হাতে।

১০ বছরে ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ হজ করেছেন

দশ বছরে হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গেছেন প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ মানুষ। এর এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ হজ করতে সৌদি আরব যান ২০১২ সালে। সেবার প্রায় ৩১.৬ লাখ মানুষ হজ পালন করেছিলেন। আর সবচেয়ে কম মানুষ হজ পালন করেছিলেন ২০১৩ সালে। সেবার ১৯.৮ লাখ মানুষ হজ পালন করেছিলেন। এ খবর দিয়েছে সৌদি গেজেট। ২০১৩ সালে হজ পালনকারীদের সংখ্যা কম ছিল। কেননা তখন মক্কা ও মদিনার বর্ধিতকরণের কাজ চলায় সৌদি সরকার দেশীয় হজ পালনকারীদের সংখ্যা ৫০ ভাগ ও বিদেশী হজ পালনকারীদের সংখ্যা ২০ ভাগ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। এ বছর প্রায় ২১ লাখ লোক হজ পালন করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ৯৭ হাজার হচ্ছেন পুরুষ এবং ৮ লাখ ৪৩ হাজার হচ্ছেন নারী। বিদেশী হজযাত্রী ছিলেন প্রায় ১৩ লাখ ৯০ হাজার। বিদেশী হজযাত্রীদের মধ্যে এবার সবচেয়ে বেশি ছিলেন ইন্দোনেশিয়া থেকে। সে দেশ থেকে হজ পালনের নিমিত্তে সৌদি আরব গেছেন প্রায় ২ লাখ ৯৩ হাজার মানুষ, যা মোট বিদেশী হজযাত্রীর ২১ শতাংশ। এরপর পাকিস্তান থেকে ১ লাখ ৮৯ হাজার ও ভারত থেকে ১ লাখ ৫১ হাজার মানুষ হজ পালন করেছে। এ দু’টি দেশ রয়েছে বিদেশী হজযাত্রীদের মধ্যে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে। এরপর মিশর থেকে হজ পালন করতে গিয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৬০০ জন। দেশটি রয়েছে চতুর্থ স্থানে। আর বাংলাদেশ থেকে মোট হজযাত্রীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৯০০ জন। বাংলাদেশ রয়েছে তালিকার পঞ্চম স্থানে। আর সৌদি আরবে থাকা যেসব মানুষ হজ পালন করেছেন, তার মধ্যে সৌদি আরবের স্থানীয়দের বাইরে মিশরীয় রয়েছেন প্রায় ৬৭০০০, পাকিস্তানি রয়েছেন প্রায় ৪১৯০০ জন। হজযাত্রীদের বিভিন্ন সুবিধা দিতে সৌদি সরকার প্রায় ১০০০০ কোটি ডলার খরচ করেছে। আনুষ্ঠানিক তথ্যানুযায়ী ২০০৫ সালে মোট হজযাত্রীর সংখ্যা ছিল ২২ লাখ ৬০ হাজার, আর পরের বছরই এ সংখ্যা বেড়ে ২৩ লাখ ৮০ হাজারে গিয়ে দাঁড়ায়। এ সংখ্যা ২০০৭ সালে ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৪ লাখ ৫০ হাজারে। কিন্তু পরের বছরই ২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ২৪ লাখ ১০ হাজারে। এরপর ২০১২ সাল পর্যন্ত ক্রমেই বেড়েছে হজযাত্রীর সংখ্যা। ২০১৩ সালে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কমে যায় হজযাত্রীদের সংখ্যা। কিন্তু এ বছরই আবার বেড়েছে অনেকটা। গত প্রায় ১০০ বছর ধরে হজযাত্রীদের পরিসংখ্যান সংরক্ষিত রয়েছে সৌদি সরকারের কাছে। ১৯২০ সালে বিদেশী হজযাত্রীদের সংখ্যা ছিল ৬০ হাজারেরও কম।

রায়হানকে মেরে ফেলা হয়েছে -পরিবারের দাবি

ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম রায়হানের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছে নিহতের পরিবার। পরিবারে দাবি, রায়হান ওই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন ছাত্রাবাসের দুই পরিদর্শক; কিন্তু লজ্জায় সে পরিবারকে জানায়নি। তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। রায়হানের পিতা শাকের উল্লাহ এমন দাবি করেছেন। তবে পুলিশ বলছে, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে রায়হান আত্মহত্যা করেছে। শুক্রবার সকালে ভাটারা থানাধীন ৯৬৩, শাহজাদপুরের খিলবাড়ীটেকের ক্যামব্রিয়ানের ১৫ নম্বর ছাত্রাবাসে ষষ্ঠ তলায় ৬০৫ নম্বর কক্ষ থেকে আবাসিক শিক্ষার্থী রায়হানের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রায়হান ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিল। এ ঘটনায় নিহতের পরিবার থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে একটি মামলা করেছে। লাশ উদ্ধারের পর ছাত্রাবাসের পরিদর্শক ওমর ফারুক ও সহ-পরিদর্শক আশরাফ আলীকে আটক করে পুলিশ।

নিহতের পিতা শাকের উল্লাহ জানান, ‘তিন মাস আগে ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজে পৌনে ৪ চার লাখ টাকা দিয়ে ভর্তি হয় রায়হান। তার ভাইয়ের ছেলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। মিরপুর এলাকায় থাকেন; কিন্তু রায়হানকে তার ভাইয়ের ছেলের বাড়িতে না রেখে তাকে কলেজের ছাত্রাবাসে রাখা হয়- যেন সে ভাল পড়াশোনা করে। তিনি আরও বলেন, কলেজের ছাত্রাবাসে ওঠার পরেই সে মানসিক সমস্যায় ভুগতে থাকে। একদিন মোবাইল ফোনেও জানিয়েছে সে অনেক চাপের মধ্যে আছে। ছাত্রাবাসের পরিদর্শক ও সহ-পরিদর্শক তাকে অনেক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেন। কিন্তু আমরা তার কথাকে কোন গুরুত্ব দিইনি এ জন্য যে, কলেজ কর্তৃপক্ষের সঠিক শাসনেই রায়হান মানুষের মতো মানুষ হবে। কিন্তু তাকে যে এভাবে নির্যাতন করা হবে তা ভাবতেই পারিনি। রায়হানের ব্যাগ থেকে একটি সিগারেট পাওয়া গেছে এমন একটি ঠুনকো অভিযোগে ছাত্রাবাসের পরিদর্শক ওমর ফারুক তার ছেলেকে রাতের বেলায় মারধর করে শ্বাসরোধে হত্যা করে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, রায়হান যদি সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় কাপড় দিয়ে আত্মহত্যা করে তা হলে তার হাঁটু কিভাবে মেঝেতে ঠেকে থাকে। এটা একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তিনি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন। শাকের উল্লাহ আরও বলেন, আমি সাধারণ এক মাছ ব্যবাসায়ী। রায়হান এসএসসিতে এ-প্লাস পেয়েছিল। তার ইচ্ছা ছিল চিকিৎসক হয়ে গরিব-দুঃখীদের সেবা করবে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় জমি বিক্রি করে তাকে ঢাকায় পড়তে পাঠানো হয়েছিল।
নিহতের চাচাতো ভাই তারেক ইকবাল জানান, রায়হানের পক্ষে কথা বলার কারণে নিশান নামে এক সহপাঠীকে ছাত্রাবাসের পরিদর্শক ওমর ফারুক এমনভাবে থাপ্পড় ও ঘুষি মেরেছে, তার নাক ও গাল দিয়ে রক্ত ঝরছিল। তাহলেই বোঝা যায় যে, রায়হানকে কিভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল। তিনি জানান, শুক্রবার রাতে নিহতের লাশ কক্সবাজারের বাইতুশ শরফ স্কুল অ্যান্ড কলেজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। যোগাযোগ করা হলে ভাটারা থানার ওসি সরওয়ার হোসেন জানান, কলেজছাত্রের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় নিহতের চাচা আওয়াল হোসেন বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা করেছেন। মামলায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার মূল আসামি করা হয়েছে ছাত্রাবাসের পরিদর্শক ওমর ফারুককে। পুলিশ তাদের আদালতে পাঠালে আদালত তাদের জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেয়। তিনি আরও বলেন, পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে মনে হয়েছে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ওই কলেজছাত্র আত্মহত্যা করেছে। তবুও আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি।

ভয় দেখিয়ে ছাত্রের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক, কাঠগড়ায় শিক্ষিকা

অষ্টম শ্রেণির ছাত্রকে পড়ানোর ফাঁকে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়ে তাকে ব্ল্যাকমেল করার অভিযোগে কাঠগড়ায় ৩১বছর বয়সি মহিলা। ভারতের লুধিয়ানা রাজ্যে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, নাবালক ছেলেটি তার পরিবারের সঙ্গে অভিযুক্ত মহিলার বাবার একটি বাড়িতে ভাড়া থাকে সেখানে সে ওই মহিলার কাছে পড়তে যেত। আর তাকে পড়ানোর নাম করে তাকে যৌনক্ষুধা মেটাতে ব্যবহার করতেন ওই মহিলা, এমনই অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ। তারা জানিয়েছে, তিনি ১৪ বছরের ছেলেটিকে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়তে বাধ্য করেন। ছেলেটি রাজি না হলে তাকে খুনের হুমকি দেন তিনি। ভয়ে বাধ্য হয়ে তার কথা মানে ছেলেটি। এরপর আরও মারাত্মক কাজ করেন তিনি। ছেলেটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য ভিডিও করে রেখে তাকে ভয় দেখাতে থাকেন, ব্ল্যাকমেল করতে থাকেন এই বলে যে, কাউকে জানালে ভিডিওটি ফাঁস করে দেবেন। এভাবে বেশ কয়েক মাস চলে। তারপর একদিন ছেলেটি তার বাবাকে গোটা ব্যাপারটা জানালে তিনি পুলিশের কাছে যান। নাবালক যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের একাধিক ধারায় ওই মহিলাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ তিনি পলাতক বলে জানা গিয়েছে। পুলিশ আপত্তিকর ভিডিওটি হেফাজতে নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে।

নাকফুলটা বিক্রি করে আমার কাফনের কাপড় কিনে দিও.... -বিদ্ধাশ্রম থেকে একজন মায়ের চিঠি, আমার আদর ও ভালোবাসা নিও

অনেক দিন তোমাকে দেখি না, আমার খুব কষ্ট হয়। কান্নায় আমার বুক ভেঙে যায়। আমার জন্য তোমার কী অনুভূতি আমি জানি না। তবে ছোটবেলায় তুমি আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতে না। আমি যদি কখনও তোমার চোখের আড়াল হতাম মা মা বলে চিৎকার করতে। মাকে ছাড়া কারও কোলে তুমি যেতে না।
সাত বছর বয়সে তুমি আমগাছ থেকে পড়ে হাঁটুতে ব্যথা পেয়েছিলে। তোমার বাবা হালের বলদ বিক্রি করে তোমার চিকিৎসা করিয়েছেন। তখন তিন দিন, তিন রাত তোমার পাশে না ঘুমিয়ে, না খেয়ে, গোসল না করে কাটিয়েছিলাম।
এগুলো তোমার মনে থাকার কথা নয়। তুমি একমুহূর্ত আমাকে না দেখে থাকতে পারতে না।বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার বিয়ের গয়না বিক্রি করে তোমার পড়ার খরচ জুগিয়েছি।
হাঁটুর ব্যথাটা তোমার মাঝে মধ্যেই হতো। বাবা... এখনও কি তোমার সেই ব্যথাটা আছে?
রাতের বেলায় তোমার মাথায় হাত না বুলিয়ে দিলে তুমি ঘুমাতে না। এখন তোমার কেমন ঘুম হয়?
আমার কথা কি তোমার একবারও মনে হয় না?
তুমি দুধ না খেয়ে ঘুমাতে না। তোমার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমার কপালে যা লেখা আছে হবে। আমার জন্য তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমি খুব ভালো আছি। কেবল তোমার চাঁদ মুখখানি দেখতে আমার খুব মন চায়।

তুমি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করবে। তোমার বোন....তার খবরাখবর নিও। আমার কথা জিজ্ঞেস করলে বলো আমি ভালো আছি।
আমি দোয়া করি, তোমাকে যেন আমার মতো বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে না হয়। কোনো এক জ্যোস্না ভরা রাতে আকাশ পানে তাকিয়ে জীবনের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু ভেবে নিও। বিবেকের কাছে উত্তর পেয়ে যাবে। তোমার কাছে আমার শেষ একটা ইচ্ছা আছে।
আমি আশা করি তুমি আমার শেষ ইচ্ছাটা রাখবে। আমি মারা গেলে বৃদ্ধাশ্রম থেকে নিয়ে আমাকে তোমার বাবার কবরের পাশে কবর দিও। এজন্য তোমাকে কোনো টাকা খরচ করতে হবে না। তোমার বাবা বিয়ের সময় যে নাকফুলটা দিয়েছিল সেটা আমার কাপড়ের আঁচলে বেঁধে রেখেছি।
নাকফুলটা বিক্রি করে আমার কাফনের কাপড় কিনে নিও। তোমার ছোটবেলার একটি ছবি আমার কাছে রেখে দিয়েছি।ছবিটা দেখে দেখে মনে মনে ভাবি এটাই কি আমার সেই খোকা!’
এভাবে বেদনা ভরা একটি খোলা চিঠি ছেলের উদ্দেশে লিখেছেন মদিনা খাতুন (ছদ্মনাম),মদিনা খাতুনের বয়স এখন আশি। ছয় বছর আগে তার আশ্রয় জুটেছে বৃদ্ধাশ্রমে।


FaceBook/RadioMunna.com থেকে