Monday, February 15, 2021

ফড়িংবন্ধু by অরণ্য প্রভা

স্কুলে যাবার সময় আম্মু তালহাকে অনেক বুঝিয়েছেন, কিচ্ছুতেই গলে নি সে। তার একটাই কথা—আগে কাশবনে বেড়াতে যাবে তারপর...।

দিন গড়িয়ে বিকেল এলে তালহার আনন্দ দেখে কে? বাড়ির অদূরেই কাশবন। কাশবন তো নয় এটা গড়। এটা ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়েরই অংশবিশেষ। এই গড়ের নিচ দিয়েই বয়ে গেছে করতোয়া নদীপুত্র। স্থানীয়রা তার নাম দিয়েছে সুবিল। এই সুবিল এসেছে শিলাদেবীর ঘাট থেকে। শিলাদেবী ছিলেন পরশুরামের বোন। যাকগে সেসব, আজ এখানে এমন ইতিহাস জানতে আসে নি তালহা।

তালহা যখন আম্মুর সঙ্গে গড়ের ওপর এসে দাঁড়াল, তখন আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ প্যাঁচানো তুলার মতো। আর অদূরের কাশফুলগুলো যেন মেঘের সঙ্গে মিশে গেছে। এমন দৃশ্যে তালহার প্রবল ইচ্ছে জাগে ছবি আঁকবার। পশ্চিম আকাশে সূর্যের আলো ফিকে হয়ে এলে তালহা বলে, আম্মু দেখ দেখ, গঙ্গাফড়িং আর ঘাসফড়িং কীভাবে খেলা করছে। ফড়িং নাকি খুব বুদ্ধিমান। আম্মু ফড়িং আমার বন্ধু হতে পারে না?

আম্মু বলেন, পশুপাখিকে পোষ মানানো যায়, কিন্তু পোকামাকড়, কীটপতঙ্গকে পোষ মানানো যায় কি-না আমার জানা নেই।

কাশবনে দুলে ওঠা হাওয়ায় দুজনেরই মন ভরে ওঠে। এরই মধ্যে তালহা এক পা, দু পা করে এগিয়ে যায় গঙ্গাফড়িং ধরতে। খুব ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে যেই-না ফড়িংয়ের ল্যাজটা ধরবে—অমনি ফড়িংটা ফুড়ুত করে উড়ে গিয়ে বসে অন্য কাশফুলে।

ফড়িং ধরার নেশায় চিত্কার দিয়ে পড়ে যেতে থাকে নিচে। অল্পের জন্য সুবিলের পানি থেকে রক্ষা পায়। চিত্কার শুনে আম্মু দ্রুত নিচে নেমে তালহাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। তালহা আলতো করে আম্মুর বাহুডোর  থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, তুমি ঠিকই বলেছ আম্মু। আর যা-ই হোক কীটপতঙ্গের সঙ্গে বন্ধু হয় না। ওই ফড়িংটার জন্যেই তো আমাকে পড়তে হলো।

-----২.-----

সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে এসে বাম হাঁটুতে ব্যথার সঙ্গে জেগে উঠেছে ফড়িংটাকে না-ধরতে পারার কষ্ট। ক্ষোভের সঙ্গে তালহা বলে, ফড়িংয়ের বাচ্চা, ধরতে পারলে বুঝিয়ে দিতাম, আর কেমন মজা দেখাতাম। আজ না হোক অন্য কোনোদিন তোকে নিশ্চয় ধরে ফেলব।

আম্মু তালহার পড়ার টেবিল হরলিক্স দিয়ে যাবার পরপরই কোত্থেকে একটা ফড়িং এসে ভ..র..র... ভ...র...র... ভ...র...র... করে উড়তে থাকে। তখন তার কী আনন্দ! আম্মু আম্মু দেখে যাও, তাড়াতাড়ি আসো, আবার বেরিয়ে যাবে।...

আম্মু দৌড়ে এলে তালহা বলে, আজ বিকেলে কাশবনে যে ফড়িংটাকে ধরতে গিয়ে গড় থেকে পড়ে গিয়েছিলাম ঠিক সেই ফড়িংটাই এসেছে।

ফড়িং আবার বাল্বের চারপাশ দিয়ে উড়তে থাকে ভ..র..র... ভ...র...র... ভ...র...র...।

ফড়িংটা এই মুহূর্তে পড়ে আছে লাইটের ওপরে ঝুলে থাকা হাওয়া চুপসে যাওয়া বেলুনে—বেশ ক’দিন আগে জন্মদিনের জন্য যে বেলুনগুলো ঝোলানো হয়েছিল।

ফড়িংটা পড়ামাত্র দেয়ালের অন্যপাশ থেকে টিকটিকি দ্রুত এগিয়ে আসে বেলুনের দিকে। ক্যা..ট.. ক্যা..ট.. করতে করতে টিকটিকি দুটো বেলুনের কাছাকাছি এলেই ফড়িংটা আবার উড়াল দেয়—ভ..র..র... ভ...র...র... ভ...র...র...।

তালহা ফড়িংটা ধরবার ফন্দি আঁটে। নখ দিয়ে ল্যাজটাকে ধরলে কামড়ে দিলে কেমন ব্যাথা পাবে? ফড়িংয়ের দাঁত কেমন তাও সে জানে না। ভয় পেয়ে নখ দিয়ে না ধরে সুতা দিয়ে ল্যাজটা বাঁধবার পরিকল্পনা করে।

টিকটিকিটা এবার ফড়িংয়ের খুব কাছে চলে এসেছে। তালহা তখন আফসোস করে বলতে থাকে—এই বুঝি ধরেই ফেলল। তাহলে কি ফড়িংটাকে ধরেই ফেলবে?

আবার ফড়িংটা ভ..র..র... ভ...র...র... ভ...র...র... করতে করতে তালহার সাদা খাতার ওপর টপাস করে পড়ে। তালহা ধরতে চায়, সাহস পায় না। ফড়িংটার নড়াচড়া আস্তে করে বন্ধ হয়ে গেলে তার মনটাও ভারী হয়ে ওঠে। সে কারণে বলে—ইস! ফড়িংটা মরে গেল।

আবার চিত্কার করতে থাকে। এবার আম্মু এসে ধমক দিয়ে তালহাকে অন্যঘরে নিয়ে যান। এ মুহূর্তে ফড়িং নিয়ে কোনো কথাই শুনতে চান না আম্মু। শাসনের সুরে বলেন—এমনিতে আজ স্কুলে যাও নি, স্কুল আছে, কাল সকালে উঠতে হবে, ঘুমিয়ে পড়ো।

------৩.------

ঘুমের মধ্যে চিত্কার দিয়ে লাফিয়ে ওঠে তালহা। আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বলে, আম্মু তুমি তো বলেছ পশুপাখিকে পোষ মানিয়ে বন্ধু বানানো যায়, কিন্তু কীটপতঙ্গ পোষা যায় না। যে ফড়িংটা আমাদের বাসায় এসেছে সেটা বলল, আমি তোমার বন্ধু হতে এসেছি, বিকেলে কাশবনে আমাকে ধরতে গিয়ে তুমি যে ব্যথা পেয়েছ তার জন্য অনুতাপ প্রকাশ করতে এসেছি। বন্ধুত্ব গড়ার আরো অনেক সব কথা, স্বপ্নে কি এত কথা মনে থাকে!

তালহা যেখানে পড়ছিল সেখানে আম্মুকে টেনে নিয়ে যায়। আম্মু লাইটের সুইচ অন করলে তালহা দেখতে পায় দেয়ালে শত শত পিপড়ার সারি। কতকগুলো পিপড়া ফড়িংয়ের মস্তক, আবার কতকগুলো পাখা, কতকগুলো আবার ফড়িংয়ের ল্যাজ নিয়ে সারিবেঁধে যাচ্ছে। এমন দৃশ্যে কী এক অবর্ণনীয় ব্যথায় তালহার চোখ দুটো টলমল করে, আর ঠোঁট দুটোও থির থির করে কাঁপতে থাকে।

‘গল্পটা আসতে হবে ভেতর থেকে’ by জিয়া উস সালাম

উজমা আসলাম খান
উজমা আসলাম খানের দি মিরাকুলাস ট্রু হিস্টরি অব নমি আলি পড়তে হলে ভালোবাসার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এই পাকিস্তানি লেখক নিজে বলেছেন: ভালোবাসা হলো ঘৃণার বিপরীত। তুমি যাকে ভালোবাসবে, সে তোমাকে ভালোবাসবে। তিনি শব্দ নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন কিংবা বলা যায় শব্দের জীবন ভালোবাসেন। সেগুলোই তার কাজে ফুটে ওঠে। তার থিনার দ্যান স্কিন ম্যান ছিল এশিয়ান লিটারেরি প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায়, কমনওয়েলথ প্রাইজের জন্য মনোনীত হয়েছিল ট্রেসপাসিং। থিনার দ্যান স্কিন ২০১৪ সালের করাচি লিটারেচারি ফেস্টিভ্যালে সেরা ফিকশনের জন্য ফ্রেঞ্জ প্রাইজ পেয়েছিল। তিনি জিওমেট্রি অব গডসের জন্য স্বাধীন পাবলিশার বুক অ্যাওয়ার্ডসে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন।
দি মিরাকুলাস ট্রু হিস্টরি অব নমি আলিকে কোনো গণ্ডিতেই ফেলা যায় না এবং এ কারণেই লেখক একে ‘ঐতিহাসিক ফিকশন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রেক্ষাপটে লেখা গ্রন্থটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ঘটনা বলেছে, ওই সময় সেখানে বন্দীদের লড়াই, উপনিবেশ প্রভুদের আচরণের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
একদিকে আমরা এমনসব ব্রিটিশের দেখা পাই, যারা মেয়াদ কাটিয়ে দেয়া বা নির্দোষ ঘোষিত বন্দীদের ব্যাপারে তেমন যত্নবান ছিল না। কেবল তাদেরকে এক টুকরা জমি মঞ্জুর করেই দায়িত্ব শেষ করত। অন্য দিকে ছিল জাপানিরা। তারা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মিকে (আইএনএ) সমর্থন করত। এমন অবস্থাতেই নমি ও তার ভাই জি এবং তাদের বন্ধু আইয়ের কথা সামনে এসেছে। বিশ্ব শক্তিগুলোর দাবার ঘুঁটি ছিল তারা। এসব লোকের মধ্য দিয়েই উজমা ইংল্যান্ড, জাপান, ফিলিপাইন ও ওশেনিয়ার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
ফিকশনটির প্লট এতই জটিল যে কাহিনী শেষ করতে তার লেগেছে ২৬ বছর। তিনি এর মধ্যে চারটি উপন্যাস লিখে ফেলেছেন, তবে এর মধ্যে নমি আলির কাহিনী শেষ করার কথা ভোলেননি।
অনেক বছর আগে উজমা আসলাম খান পছন্দের পছন্দের বই পাওয়ার জন্য লাইব্রেরির তাকগুলোতে হাতরাচ্ছিলেন। এই সময়েই সেলফ থেকে একটি বই পড়ে যায়। তিনি বইটি কুড়িয়ে নাম দেখে তথ্যটি জ্যাকেটে টুকে রাখেন। বইটি নিয়ে তার আগ্রহের সৃষ্টি হলো। এটি ছিল আন্দামান নিয়ে। আর তখনই তার মাথায় নমি আলির কাহিনী ভর করে। এখানে ফ্রন্টলাইনে দেয়া তার সাক্ষাতকার প্রকাশিত হলো।
প্রশ্ন: ভারতে ইতিহাস নিয়ে নতুন আঙ্গিকে লেখা হচ্ছে। অনেকে এমনকি একে কৌতুকের মতো করে বলে, ঐতিহাসিক ফিকশন। দি মিরাকুলাস ট্রু হিস্টরি অব নমি আলির লেখক হিসেবে ঐতিহাসিক ফিকশন বলতে আপনি কী বোঝেন? এতে কি ফিকশনের আড়ালে চলে যায় ইতিহাস?
উজমা: যারা ক্ষমতায় থাকে, তারাই পুনঃলেখনের কাজটি করছে। তারা ক্ষমতাহীন লোকদের কথা মুছে ফেলার জন্য এমনটি করে। ক্ষমতার মাধ্যমে ইতিহাস নির্মাণ করা অবস্থায় বেড়ে ওঠা পাকিস্তানের একজন নারীর জন্য ঐতিহাসিক ফিকশন আলাদা উদ্দেশ্য বহন করে। এটা নীরব থাকা বা ঘৃণার জন্য নয়, বরং সমৃদ্ধ করার জন্য, সহানুভূতি প্রকাশ করার জন্য। আমাদের সামনে যে ইতিহাস রয়েছে, সেটাই একমাত্র ইতিহাস, তা আমরা সবসময় প্রত্যাখ্যান করে আসছি। ঐতিহাসিক ফিকশনের উদ্দেশ্য হলো অস্তিত্বহীন কাহিনীগুলোতে মূর্ত করা।
প্রশ্ন: আপনি কোথা থেকে শুরু করলেন?
উজমা: আমি গবেষণার জন্য অনেক সময় ব্যয় করেছি। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইতিহাসকে পেছনের দিকে যেতে দিয়েছি। ঐতিহাসিক বা সমসাময়িক, যে ঘটনাই হোক না কেন, কাহিনীটি অনুভূত হতে হবে। আর তা হতে হবে নিজের ভেতর থেকে। আমার কাছে কোনো রূপরেখা থাকে না, কোনো সংক্ষিপ্ত ধারণা থাকে না। কাহিনী এগিয়ে যায় নিজের গতিতে। চরিত্রগুলো থাকে প্রধান অবস্থানে, ইতিহাস হয়ে পড়ে গৌণ।
প্রশ্ন: অনেক ইতিহাস আছে এবং ইতিহাস দেখার পদ্ধতিও অনেক। কিন্তু তারপরও নারীদের ভূমিকা, তাদের অর্জন, তাদের দুর্ভোগ প্রান্তিক করার একটি অভিন্ন অবস্থানও আছে। ইতিহাস প্রায়ই পুরুষদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়। ঐতিহাসিক ফিকশন নিয়ে কাজ করার সময় এসব বৈষম্য সমাধানের চ্যালেঞ্জ কিভাবে নিয়েছেন?
উজমা: শুরুতে যতটা হতাশাজনক ছিল, ততটা চ্যালেঞ্জিং ছিল না। আমি স্বাধীনতা আন্দোলনের দুই ধরনের নারীর সামনে পড়েছি। এক ধরনের নারী ছিলেন নারী আদর্শ। তাদেরকে কর্তব্যপরায়ণ, সামাজিক কাজের মাধ্যমে পুরুষদের প্রয়াসের প্রতি সমর্থক সতী বোন ও স্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অপর ধরনের নারীরা পুরুষদের মতোই শক্তিশালী হিসেবে ছিলেন। পুরুষদের লিখিত গ্রন্থে তাদের নাম কেবল উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন: নিশ্চিতভাবেই তা হতাশা হওয়ার কথা?
উজমা: উপন্যাস লেখার একপর্যায়ে কী বলা হয়েছে, কী বলা হয়নি, তা নিয়ে চিন্তা করা বন্ধ করে দিয়েছি। আমি অন্য জগতে প্রবেশ করেছি, ভাষা ও চরিত্রের ওপর নির্ভর করেছি। আমি ২৬ বছর ধরে যে উপন্যাসটি লিখেছি, তাতে প্রথম চরিত্রটিই ছিল পরিচয় অজানা এক রাজবন্দী। শুরু থেকেই আমার লক্ষ্য ছিল ওই নারীর দৈনিক ও অন্তর্মুখী জীবন। আমি তাকে স্রেফ বন্দী হিসেবে দেখেছি। আমি তাকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছি।
প্রশ্ন: আপনি কারাগার হিসেবে আন্দামানের কথা বলেছেন। এখানে ইতিহাস আছে সামান্য। আমরা ভারতে জানি যে এক বন্দী ব্রিটিশদের কাছে ক্ষমার পত্র লিখেছিলেন এবং উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন স্থায়ী করার জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। গবেষক হিসেবে এ ধরনের চিঠিপত্রকে কি আপনি কাপুরোষিত আত্মসমর্পণ হিসেবে বিবেচনা করেন?
উজমা: অবশ্যই, আমি জানি না কে বলছে। তবে আমার বইতে আমি ওই ধরনের লোকদের নিয়ে কাজ করিনি। তাদের নিয়ে তো লেখা হয়েই গেছে।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, আপনার চরিত্রগুলো ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে বাস করে। এটা কি আপনার কাজকে জটিলতার দিকে নিয়ে গেছে?
উজমা: মনে হয় নিয়েছে।
প্রশ্ন: ভারতে আপনার বেশ কিছু নিবেদিতপ্রাণ পাঠক আছে। পাকিস্তানি লেখক হিসেবে তাদের মানসিকতা এবং তাদের কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতাকে কিভাবে দেখেন?
উজমা: আগের চারটি উপন্যাসে আমি ভিন্ন কিছুর সামনে পড়িনি। এটা নির্ভর করে যিনি রিভিউ করেন, তার ওপর। এই বইটির জন্য এখন পর্যন্ত ভারত থেকেই বেশি চাপ এসেছে। সম্ভবত শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি।