Sunday, October 5, 2014

স্মরণ- লোকসঙ্গীত শিল্পী বিদিতলাল দাস

বিশিষ্ট লোকসঙ্গীত শিল্পী বিদিতলাল দাস (পটল বাবু) সিলেট শহরের শেখ ঘাটে ১৫ জুন ১৯৩৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম বিনোদলাল দাশ। মায়ের নাম প্রভারানী দাশ। গোলগাল মুখমণ্ডল। তীè সতর্ক চোখ। রম্যস্ফুরিত হাসি, বদান্য ব্যক্তিত্ব, সজীব প্রফুল্ল মেজাজের লোক ছিলেন পটল বাবু। সিলেটের প্রাচীন বনেদি পরিবারগুলোর মধ্যে তাদের পরিবার অন্যতম। ব্যবসায়, ভূমি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাদের খ্যাতি ছিল। সিলেটের বন্দরবাজারের দক্ষিণ-পশ্চিমে দেশী পণ্য ও কাঁচামালের আড়তপট্টির নাম ব্রহ্মময়ী বাজার। এই ব্রহ্মময়ী বিদিতলাল দাসের প্রপিতামহী মালিকানাধীন। সিলেটের ‘লালকুঠি সিনেমা হল’ তাদের পরিবারের, বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশক থেকে এখনো আছে। বিদিতলাল শৈশব-কৈশোরে শিলংয়ের ইংলিশমাধ্যম স্কুলে লেখাপড়া করেছেন।  ‘সাধের লাউ বানাইল মোরে বৈরাগী’, সিলেটের প্রাচীন এই বাউলগানটি গেয়ে বিগত শতাব্দীর ষাট দশকে বিপুল সাড়া জাগিয়েছিলেন। পদ্ধতিগতভাবে সঙ্গীতচর্চা তেমন করেননি। তার প্রতিভা প্রকৃতির স্বাভাবিক দান ছিল। তবে সিলেটের বিশিষ্ট সুরকার ও গায়ক গুরু প্রাণেশ দাশের কাছে গানের তালিম নেন। ঢাকা বেতারকেন্দ্রে তিনি লোকগীতি শিল্পী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হলে ‘সাধের লাউ বানাইল মোরে বৈরাগী’ গানটি বাণীবদ্ধ হয়ে সম্প্রচারিত হয়ে শ্রোতৃসমাজে খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করে।
বিদিতলাল দাস বাংলাদেশের বাউলের সুরে তার নিজস্ব প্রতিভা বলে বাউলগানের ইম্প্রভাইজেশন ঘটিয়েছিলেন, যা তাকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল।
বিদিতলাল দাসের কণ্ঠে আরেকটি প্রাচীন লোকগান জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, সেটিÑ ‘কাউয়ায় ধান খাইলোরে, খাইবার বেলায় আছে মানুষ, তাড়াইবার বেলায় নাই’। গানের কথার মাঝে লোকজজীবনের চিত্র রূপায়িত হয়েছে বাংলাদেশের সাধারণ বাউল সুরে।
‘হিন্দু আছে লাখে লাখে নাইরে মুসলমান।/সিলেটের মোকামে আসি কে দিল আজান।’ হজরত শাহজালাল র:-এর সিলেটে বিজয়ের পর এখানে মারফতি ও মুর্শিদি গানের প্রবর্তন হয় সুফিদের মাধ্যমে। ‘শ্রীহট্টের সুফিদের মারফতি গানে প্রায় পশ্চিমবঙ্গের বাউলের ছন্দ, শ্রীহট্ট মারিফতিদের পীঠস্থান। শ্রীহট্ট শ্রীগৌরাঙ্গের দেশ। ...তিন শো ষাট আউলিয়ার দেশ’ বলে শ্রীহট্টের খ্যাতি। শ্রীহট্ট জেলায় বৈষ্ণবের আখড়ার চেয়ে পীরের ‘মোকাম’ বা ‘দরগা’ অনেক বেশি... [শ্রীহট্টের লোকসঙ্গীতের সুরবিচার : গ্রন্থ-লোকসঙ্গীত সমীক্ষা বাংলা ও অসাম : হেমাঙ্গ বিশ্বাস : পৃ: ১৮৩]।’ বিদিতলাল ওই বৈষ্ণব আখড়া ও পীরের মোকাম মরমি প্রসুন শিল্পী। বিদিতলাল দাসের কণ্ঠে ‘সিলেট প্রথম আজানধ্বনি বাবায় দিয়াছে...’ বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের মুর্শিদি লোকগানে বাউলের ছন্দ দোলায়িত। সিলেটের লোকসঙ্গীতে বৈষ্ণব ধারা ও সুফি ধারা প্রগতিশীল সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছে। বিদিতলাল বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত প্রবাহে নিজ প্রতিভাগুণে বাউলতরঙ্গে বিশেষত্ব রেখে গেছেন। তিনি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনেক পুরস্কারে পুরস্কৃত শিল্পী। তিনি ৮ অক্টোবর ২০১২ সালে পরলোক গমন করেন।
আহমদ-উজ-জামান

অভিমত -গণতন্ত্র বনাম জনগণ by বেগ মাহতাব উদ্দীন

গণতন্ত্রে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা হলো, জনগণের সরকার, জনগণ দ্বারা গঠিত সরকার, জনগণের জন্য সরকার। এর কোনটি আমাদের জনগণের জন্য বা রাজনৈতিক নেতাদের জন্য বর্তমানে প্রযোজ্য, তা বলা কঠিন। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের মানে হলো দলীয়প্রধানদের আদেশ-নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা, হরতাল ডাকা, সংসদ বর্জন করে বেতনভাতা নেয়া, সরকারি দলের লুটপাট ও সন্ত্রাস, সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে বোবা বানিয়ে দেয়া ইত্যাদি। একটি গল্প মনে পড়ে গেলÑ এক অন্ধকে তার এক বন্ধু হাইকোর্ট দেখাতে নদীর পাড়ে নিয়ে গেল, নদীর পাড়ে গিয়ে বলল, দেখ বন্ধু, হাইকোর্ট কত সুন্দর। তখন নদী দিয়ে একটি নৌকা যাচ্ছিল। নৌকার পানির শব্দ অন্ধের কানে গেলে অন্ধ বন্ধুর কাছে জানতে চাইল হাইকোর্টের সামনে পানির শব্দ কেন? বন্ধু অন্ধকে বলল, আরে বোকা, বিচারপতি বিচার করতে করতে কান্ত হয়ে পানি পান করছেন। সহজ-সরল অন্ধ সে কথা বিশ্বাস করে ধরে নিলো, সে হাইকোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। খুশিও হলো, কারণ অন্ধ হয়েও হাইকোর্ট দেখতে পেল ভেবে। বর্তমানে আমাদের দেশের নেতানেত্রীরা ১৬ কোটি মানুষকে নদীর পাড়ে নিয়ে গণতন্ত্রের হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন। আর আমরা কেউ কেউ বাধ্য হয়ে, আবার কেউ স্নেহধন্য হয়ে সব কিছু মেনে নিচ্ছি। যারা মেনে নিতে পারছি না, তাদের ‘রেললাইন ধরে দৌড়াতে হচ্ছে’। পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ৩০-৪০ ভাগ লোক সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়িত, বাকি ৪০ ভাগ গণজোয়ারে ভোট দেয়। বাকি ২০ ভাগ কোনো ঝামেলায় জড়াতে চান না, এমনকি ভোটও দিতে চান না। তার পরও ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাউকে না কাউকে ভোট দিতে হয়। একশ্রেণীর লোক আছেন, যাদের বলা হয় সুশীলসমাজ। এই শ্রেণীর সম্মানিত সুধীজনেরা রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে থাকেন; তারা রাজনীতির নোংরা নর্দমা পরিষ্কার করার জন্য এগিয়ে আসেন না। ফলে রাজনীতি আরো কলুষিত হচ্ছে, ধ্বংস হতে বসেছে সামাজিক ব্যবস্থা। ভালো মানুষেরা রাজনীতির অঙ্গন থেকে দূরে থাকায় অসৎ ব্যক্তি ও অসাধু ব্যবসায়ীরা রাজনীতিকে ব্যবহার করে আখের গোছাচ্ছেন। ফলে অধঃপতিত হচ্ছে দেশের রাজনীতি, ভেঙে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, ধ্বংস হচ্ছে অর্থনীতি। আর এর সুযোগ নিচ্ছে আমলাতন্ত্র। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলার কাজে নিয়োজিত বাহিনীকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে। সরকারের বিপক্ষে কথা বললে মিডিয়ার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে। এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য সুশীলসমাজসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্ণধারেরা যদি এক হয়ে একই মঞ্চে এসে প্রতিবাদ না করেন, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যে দেশ রাজনৈতিকভাবে শূন্য হয়ে যাবে। যখন দেখি অবসরপ্রাপ্ত আমলা, শিক্ষাবিদ, প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বিতর্কিত ব্যক্তিদের পক্ষে কথা বলেন তখন মনে হয় কালো টাকা ও ক্ষমতার কাছে আমরা সবাই জিম্মি। অথচ আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনের সূরা আল ইমরানের ১০৪ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে একদল লোক থাকা দরকার যারা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেয়।’ একই সূরার ১১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সেই জাতি, তোমাদের সৃষ্টি করেছি। কারণ, তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবে আর অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য নিষেধ করবে, তাহলেই তুমি মুমিন।’
দু’টি রাজনৈতিক জোট দেশের মানুষকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে, এক দল স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে ঘোলাপানিতে মাছ শিকারে ব্যস্ত। আরেক দল আছে, যারা স্বাধীনতার ঘোষক ইস্যু এবং নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যস্ত। দেশের কথা কেউ ভাবছেন বলে মনে হয় না। দুই দলই পারিবারিক প্রাধান্য এবং পরিবারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করে যাচ্ছেন। এ দিকে প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ মানুষের, ওষ্ঠাগত হচ্ছে জনজীবন। দুই জোটে যারা আছেন তাদের অবস্থা, ধরি মাছ না ছুঁই পানি। স্বার্থে আঘাত লাগলেই জোটের বদনাম, কিছু পেলে জোটের সুনাম। একদল ক্ষমতায় এলে অন্য দল দেশ ছেড়ে পালায়। নিরীহ জনগণ যেহেতু পালাতে পারে না, তাই তাদের সরকারদলীয় ক্যাডারদের অত্যাচার নীরবে সহ্য করতে হয়। আদেশ-নির্দেশই হলো গণতন্ত্র। দেশের রাজনীতি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এ জন্য নির্বাচনের আগে খোঁজা হয়, কে কত টাকা দিয়ে দলীয় মনোনয়ন কিনতে পারবে। দর-দামে মিললে নেত্রীর সামনে বসে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মাজারে ফুল দিয়ে টেলিভিশনের পর্দায় এলেই সব ঠিক। এরপর নির্বাচন এবং এমপি। তারপর শুরু হয় রাজনৈতিক বাণিজ্য। আর আমলারা ওইসব অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত, ক্যাডার ও কালো টাকার মালিকদের ধুয়ে-মুছে পূতপবিত্র করে সমাজের মধ্যমণি বানিয়ে দেন। এরপর এক দল সংসদে যায় আরেক দল রাজপথে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে জনজীবনকে অশান্ত করে তোলে। এর শিকার হয় সাধারণ জনগণ। ভারতে কিছু দিন আগে নির্বাচন হয়ে গেল, কংগ্রেসের মতো ঐতিহ্যবাহী দল হেরে গেল। তারা সাথে সাথে পরাজয় শিকার করে নিলো, এটাই গণতন্ত্র। কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় রাহুলকে পুলিশ আটক করল এবং পরে ছেড়ে দিলো। আমাদের দেশের নামীদামি রাজনীতিবিদদের কাছে জানতে চাই, আমাদের দেশের কোনো ‘যুবরাজ’কে পুলিশে ধরলে আপনারা কী করতেন? কমপক্ষে ১০০ গাড়ি আগুনে পুড়ত, কমপক্ষে সাত দিন হরতাল হতো, শতাধিক টোকাইয়ের জীবনহানি হতো (যাদের বলা হতো শহীদ); সর্বোপরি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতো হাজার কোটি টাকা।
গণতন্ত্রে সমালোচনা থাকতে হবে। কোনো মানুষই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কেউ সমালোচনা করলে স্বাগত জানাতে হবেÑ এটাই গণতন্ত্রের মূল কথা। যে নিজের সমালোচনা করতে পারে, সেই সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান। আত্মসমালোচনা করতে শিখুন, দেশ ও জাতিকে কিছু দিতে পারবেন। ভুল শিকার করলে কেউ ছোট হয় না বরং বড় হয়, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। মানুষ সত্যবাদীকে পছন্দ করে। একজন রাজনীতিবিদের সত্য কথা বলার সাহস থাকতে হবে এবং সত্য কথা শোনার মানসিকতা ও ধৈর্য থাকতে হবে। রাজনীতিবিদের উচিত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করা। গণতন্ত্রে প্রকৃত কথা হলো, জনগণের স্বাধীন মত প্রকাশ। রাষ্ট্র এবং জনগণ একে অপরের পরিপূরক। আমরা স্বাধীনতার চার দশক পূর্ণ করেছি। একটা দেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর বেশি হলে ১০ বছর কিছু বিশৃঙ্খলা থাকে, তারপর আস্তে আস্তে সব স্বাভাবিক অবস্থায় আসে। কিন্তু আমাদের দেশে দিন যত যাচ্ছে ততই যেন আমরা পেছনের দিকে চলছি।
এক দল ক্ষমতায় এলে আরেক দল ক্ষিপ্ত হয়। নির্বাচনের আগে জনগণকে অনেক কিছু দিয়ে থাকে, নির্বাচনের পরে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষ এ অবস্থার পরিবর্তন চায়। নেতানেত্রীরা যখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তখন তারা যা বলেন, এর প্রতিবাদ করার সুযোগ যদি সাধারণ মানুষের থাকত, তাহলে দেখা যেত ‘কত ধানে কত চাল’।
দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মানুষ এই দুই জোটের পাশাপাশি তৃতীয় জোট চায় বলে অনেকের ধারণা; কিন্তু তা-ও সম্ভব হচ্ছে না। এর কারণ আমার যেটা মনে হয়েছে, তা হলো দুই জোটের বাইরে যারা আছেন তাদের প্রত্যেকে নিজের মতের প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। তারা নিজের ইচ্ছাকে জনগণের কাছে তুলে ধরে বিখ্যাত হতে চান। তারা জনগণের ভাষা বোঝেন না, আর বুঝলেও গুরুত্ব দেন না। কে নেতৃত্ব দেবেন তা নিয়েও রয়েছে মতপার্থক্য। কেউ কারো ওপর আস্থাশীল নন। জনগণের সুখ-দুঃখ মাথায় নিয়ে নিজেদের বিলিয়ে দিতে পারলে জনগণের নেতা হওয়া যায়; এ কথা কেউ বুঝতে চান না। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের অবস্থা অর্জনের মাধ্যমে সুশীলসমাজসহ বিবেকবানেরা একই মঞ্চে এসে শক্তিশালী একটি জোট প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে কায়েমি স্বার্থবাদী নেতানেত্রীরা আমাদের নদীর পাড়ে নিয়ে হাইকোর্ট দেখাতেই থাকবেন, আর আমরা দেখতেই থাকব।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উপক্রমণিকা by সাদেক খান

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা রূপান্তরের দিগবলয় ক্ষীণ রেখাপাতে দৃষ্টিগোচর হতে শুরু করেছে, যাকে ইংরেজিতে বলা যায় সিলভার লাইনিং বা রুপালি রোশনাই। বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা নাগরিকদের জন্য সেটা আশার আলো, এ দেশের জনমনে সেটা নাগরিক নিরাপত্তার আশ্বাস এবং অকল্যাণের অবসানের দিশা হয়ে উঠতে পারে। তবে রাষ্ট্রনৈতিকভাবে এখনো তার কোনো সঙ্কেত আসেনি, সরকারিপর্যায়ে বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের পর্যায়েও তার কোনো প্রতিভাত ঘটেনি। এসেছে আধা সরকারিভাবে কিংবা নিমরাজনৈতিক পর্যায়ে। এখনো সমানে বহাল বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর কাঁটাতারের বেড়ার পাশে যথেচ্ছ গুলি চালিয়ে বাংলাদেশী শিকারের বধ্যভূমি, ‘কিলিং ফিল্ডস’ বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যার নামডাক হয়েছে। এখনো ৪০ বছর আগে দুই রাষ্ট্রের শীর্ষপর্যায়ে সই করা স্থলসীমা চুক্তির বাস্তবায়ন ঘটেনি, ভারতীয় লোকসভার ছাড়পত্র মেলেনি। তিস্তা চুক্তি নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার বয়সও একই মাপের। জাতিসঙ্ঘের ৬৯তম সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশ-ভারত প্রধানমন্ত্রী-পর্যায়ে বৈঠকের যে আয়োজন করা হয়েছিল, তার আলোচ্যসূচি নির্ধারণের প্রস্তুতিপর্বে দিল্লিতে ভারত ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নেতৃত্বে যৌথ পরামর্শক কমিটির বৈঠক বসেছিল ২০ সেপ্টেম্বর। ওই বৈঠক সম্পর্কে বিবিসির খোলামেলা রিপোর্ট ছিল : আশার বাণী শোনাতে পারেনি ভারত। দিল্লি বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দীর্ঘ দিনের তিক্ততার দুটো বিষয় তিস্তার পানি বণ্টন ও সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়নে ভারতের তরফে কোনো অগ্রগতি হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের তরফে ভারতীয় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার দেয়া হয়েছে। বৈঠক শেষে ভারত জানিয়েছে, তিস্তা ও স্থলসীমান্ত চুক্তি দুটোর ব্যাপারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। দ্রুত সেই ঐকমত্য তৈরি হবে বলে বর্তমান ভারত সরকার আশা করছে। তবে এখনই বাংলাদেশকে কোনো আশার কথা ভারত শোনাতে অপারগ। কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তিনি হতাশ নন। শেখ হাসিনার সরকার এ কথা বোঝেন যে, ভারতের কিছু রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা আছে; সমঝোতার জন্য অপেক্ষা করতে প্রস্তুত বাংলাদেশ সরকার।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাধ্যবাধকতার ধুয়া মেনে নিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে ভারতের ‘ধীরে চলো’ নীতির কাছে মাথানত করলেন শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি তার প্রশ্নবিদ্ধ সরকার ভারতকে যেভাবে আগবাড়িয়ে একের পর এক ‘কনশেসন’ বা সুবিধা দিয়ে চলেছে, সেটা দিল্লিকে খুশি রেখে ঢাকায় দমননীতির স্টিমরোলার চালিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার তাড়না থেকেই ঘটছেÑ এমন ধারণা করছেন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। একজন সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সময় যিনি সংগ্রামী ছাত্রনেতৃত্বের এক ‘খলিফা’ ছিলেন, টেলিটকে তিনি প্রকারান্তরে বলেই ফেললেন, ক্ষমতাসীনেরা গদি রক্ষায় বাংলাদেশকে ভারতের ‘অঙ্গরাজ্য’ বানাতেও দ্বিধাবোধ করবে না। তবে সান্ত্বনার কথা, ক্ষমতাসীনদের কথিত দেশ বিক্রির এমন তাড়নার ওপর আর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নির্ভরশীল নয়। বস্তুত দেশ ‘কেনাবেচার’ ধ্যানধারণা ২১ শতকে এসে তামাদি হয়ে গেছে। ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞীও আমলে না নিয়ে পারেননি যে, তার অবশিষ্ট রাজ্য গ্রেট ব্রিটেনের অঙ্গরাজ্য স্কটল্যান্ড নিয়মতান্ত্রিকভাবেই বিচ্ছিন্নতার নোটিশ দিয়েছিল, ভোটাভুটির সময় জোর প্রচার চালিয়ে তাদের নিবৃত্ত করতে হয়েছে। ইউরোপে একইভাবে নিয়মতান্ত্রিক বিচ্ছিন্নতাবাদের ঢেউ উঠেছে কয়েকটি রাষ্ট্রে। আর অনিয়মিত বিচ্ছিন্নতাবাদ তো ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর বিন্যাস কিংবা ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকারজাত সীমারেখাগুলোকে পাল্টাতে কোথাও সশস্ত্র সংগ্রাম, কোথাও শক্তিদ্বন্দ্বের মহড়া, কোথাও সন্ত্রাসী হিংসা-প্রতিহিংসার আগুন জ্বেলেছে। বিশ্বজুড়ে তারা ঘোর অস্থিরতা পাকিয়ে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘জেনারেশনাল ওয়ার’ বা প্রজন্মব্যাপৃত যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে একক পরাশক্তি। ওদিকে পাশ্চাত্যের মারণাস্ত্র শক্তি এবং বিশ্বপুঁজি ও মুদ্রা ব্যবসায় একাধিপত্যের মোকাবেলায় প্রতিশক্তি হিসেবে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে বিকল্প ইউরোশিয়ার সাংহাই সহযোগিতা এবং চীন-রাশিয়া-ভারত-ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা সহযোগে ব্রিকস সমমনা পুঁজি ও বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা। এক কথায়, বিশ্বব্যবস্থা একটি বহুমুখী রূপান্তরের প্রক্রিয়াধীন। আর খোদ ভারতের ভূখণ্ড বিদারিত করে বিদ্রোহী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী বিচরণ ও অনিয়মিত যুদ্ধ এখনো সমানে চলেছে।
নিয়মতান্ত্রিক ভারত যেমন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কথা বলছে, ভূরাজনৈতিক বিশ্ব পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের স্রোতধারা তেমনি ভারতের জন্য একটি বহির্দেশীয় বাধ্যবাধকতারও আগমন ঘটিয়েছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিদ্বন্দ্ব ও সহযোগিতার তাগিদ এখন ছোটবড় সব দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব বিস্তার করছে। অতীতে উদীয়মান বৃহৎ শক্তি ভারত যেভাবে অভ্যন্তরীণ বা আঞ্চলিক বিরোধে ‘হাতির মতো’ ওজন নিয়ে চেপে বসে থেকে অমীমাংসায় ুদ্রশক্তিকে কাতর করতে পারত, এখন সেই কৌশল বুমেরাং হওয়ার সম্ভাবনার কথা ভাবতে হচ্ছে ভারতশক্তিকে। কারণ যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির জন্য সামান্য হলেও যে বাধার সৃষ্টি করতে পারে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সাফল্যের জন্য তার তাৎক্ষণিক মোকাবেলা প্রয়োজন হয়ে পড়ছে।
ভারতে নব্য ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ কথা বুঝেছে বলেই হয়তো ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতেই প্রতিবেশীদের সাথে শুধু বাহ্যিক সুসম্পর্ক নয়, ‘হার্মনি’ বা ঐকতানের সম্পর্ক স্থাপনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে; বৃহৎ শক্তির দরবারভুক্ত হতে প্রতিবেশীদের মাথার ওপর দিয়ে দূরের বাণিজ্যযাত্রায় কতটা ফললাভ হবে তা নিয়ে হিসাব কষছে ভারতের নব্য নেতৃত্ব।
অন্য দিকে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণ করেছে, ভারতের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই বাংলাদেশের শ্রমশক্তি ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ এ দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে সক্ষম হয়েছে, ভারত ও চীন দুই বড় প্রতিবেশীর জন্য ক্রয়ক্ষমতাসম্পন্ন একটি মুক্তবাজার দিচ্ছে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা উভয়েরই কাম্য হয়ে পড়েছে। ধোঁকাবাজ চাঁদাবাজদের পুতুল সরকার আর ‘পছন্দের রাজনৈতিক দল’কে প্রতিবেশী দেশে ক্ষমতা কব্জা করে রাখতে সহায়তা দিয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা হবে না, এমন একটা উপলব্ধি ভারতের নব্য রাজনৈতিক নেতৃত্বে ঘটেছে বলে ইঙ্গিত এসেছে। দিল্লির বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতাসীন হওয়ার আগেই ভারতের ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার একটা সম্পাদকীয় মন্তব্যে এই উপলব্ধির প্রতিফলন ঘটেছিল। বেসরকারিভাবে হলেও ভারতীয় জনতা পার্টির জাতীয় মুখপাত্র সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে বাংলাদেশ সফরে এসে এমন বার্তা দিয়েছেন টেলিভিশনে, ভারতীয় দূতাবাসেরই সহায়তায় বৈঠক করেছিলেন মূলধারার বিরোধী জোটের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সাথে। কিন্তু বাদ সাধলো, সাঁকো নাড়াল নিরাপত্তারাষ্ট্রমনা ভারতশক্তির আমলাতান্ত্রিক উত্তরাধিকার। বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র দলের নেতাদের অপরিবর্তিত এবং সেটা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে পূর্ণ সমর্থন দানের নীতি, এই মর্মে দিল্লির গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে খবর ‘ফাঁস’ ও প্রচারযুদ্ধের মহড়া চলল বাংলাদেশে ও ভারতীয় কিছু কিছু সংবাদপত্রে। দেখা গেল, ওই ‘গোয়েন্দা সূত্রে’ও বিভ্রান্তি বা বিভক্তি দেখা দিয়েছে। দিল্লিতে সীমান্ত নিরাপত্তায় নিযুক্ত দুই দেশের বিজিবি-বিএসএফ বাহিনীর পর্যায়ে একটি নিয়মিত বৈঠকের পর একটি বিশেষ ধরনের ‘সংবাদ ভাষ্যে’ একাধিক ভারতীয় পত্রিকায় কথা উঠল : বিজেপির দীর্ঘ দিনের ব্যক্ত উদ্বেগ বাংলাদেশ থেকে আসাম-পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ অনুপ্রবেশের কথা শেখ হাসিনা অস্বীকার করছেন, তাকে বিশ্বাস করা যায় না, তার ৫ জানুয়ারির বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন পাশ্চাত্য বিশ্বে অগ্রহণযোগ্য ইত্যাদি। এরপর ক’দিন যেতে না যেতেই পাল্টা সুর উঠল : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি মহল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত; পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে ওই মহল প্রচুর অর্থ ব্যয়ে তৃণমূল নেত্রী মমতাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে, তেমনি বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াত নেত্রী খালেদাকে ক্ষমতায় বসাতে ওই মহল তৎপর। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি শেখ হাসিনাকে এ নিয়ে  হয়তো সতর্ক আভাস দিয়েছেন। প্রতিদানে শেখ হাসিনা পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল নেতা ও ভারতের রাজসভা সদস্য আহমেদ হাসান ইমরানের তরফে সারদা কেলেঙ্কারির কালো টাকা বিএনপি-জামায়াতের কাছে পাচার করার ‘প্রামাণ্য তথ্যাদি’ মোদির হাতে তুলে দিতে আগ্রহী হবেন।  বিভিন্নভাবে পল্লবিত হয়ে বাংলাদেশে মার্কিন মদদে ক্যুদেতা ঘটানোর কাহিনীকল্প বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পত্রপত্রিকায় ক’দিন ধরেই শোরগোল পাকাল। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথাটা এড়িয়ে শুধু বললেন, সারদা কেলেঙ্কারির জের ধরে ইমরানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, তবে আইন আইনের পথে চলবে। তথা, দিল্লির রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোনো মাথাব্যথা নেই এ নিয়ে।
নিউ ইয়র্কে মোদি-হাসিনা সাক্ষাৎকার ঘটেছে। ভারতের বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সরকারপ্রধান যারা মোদির সাক্ষাৎকার চেয়েছেন, তাদের সবাইকেই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময় দিয়েছেন মোদি। এমন সাক্ষাৎকার চেয়েছেন বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের সরকারপ্রধান, চাননি পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা মালদ্বীপের নেতারা কেউ। সাক্ষাৎপ্রার্থী তিন সরকারপ্রধানকে সব মিলিয়ে এক ঘণ্টার মতো তথা কমবেশি ২০ মিনিট করে সময় দিয়েছেন মোদি’ জি। শেখ হাসিনার সাথে বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ পরামর্শক সভায় ভারতের প্রকাশ্য অবস্থানগুলোরই পুনরাবৃত্তি করেছেন তিনি। শেখ হাসিনাকে উৎখাতের কোনো ষড়যন্ত্রের আভাস তিনি দেননি কিংবা আসামে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশের কথাও তিনি তোলেননি। কার্যত মোদি নিউ ইয়র্কে ও ওয়াশিংটনে যারপরনাই ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেছেন প্রবাসী ভারতীয় সমাজে সাড়া জাগিয়ে ভারতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে, মার্কিন ব্যবসায়ী সমাজে ভারতীয় আমলাতন্ত্রভীতি দূর করতে, আর প্রবৃদ্ধিতে ভাটা পড়া ভারতের নব্য নেতৃত্বে বিশ্বসমাজের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে। সে কাজ তিনি সুনিপুণভাবেই করেছেন। বাংলাদেশের জন্য সান্ত্বনার কথা, এ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পানি ঘোলা করে শখের মাছ শিকারের প্রবৃত্তি থেকে আপাতত তিনি বিরত থাকছেন।
লেখক : বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট

লতিফ সিদ্দিকীর বিচার কেন জরুরি by মাহমুদ সাজ্জাদ

মহানবী সা: ও পবিত্র হজ নিয়ে ডাক টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য যে ধর্মবিরোধী ও মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে, এ নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই। তিনি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসে আক্রমণ করে অনেক কথা বলেছেন। প্রথমে তিনি আঘাত করেন ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি হজকে। তার ভাষায় ‘এই হজে যে কত ম্যানপাওয়ার নষ্ট হয়! হজের জন্য ২০ লাখ লোক আজ সৌদি আরবে গিয়েছে। এদের কোনো কাম নেই। এদের কোনো প্রডাকশন নেই। শুধু রিডাকশন দিচ্ছে। শুধু খাচ্ছে আর দেশের টাকা দিয়ে আসছে। অ্যাভারেজে যদি বাংলাদেশ থেকে এক লাখ লোক হজে যায় প্রত্যেকের পাঁচ লাখ টাকা করে ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়।’
এরপর তিনি আক্রমণ করেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:কে। তিনি নিজেই হজের এক কাল্পনিক ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায় ‘আবদুল্লাহর পুত্র মোহাম্মদ চিন্তা করল এ জাজিরাতুল আরবের লোকেরা কিভাবে চলবে। তারা তো ছিল ডাকাত। তখন একটি ব্যবস্থা করল যে আমার অনুসারীরা প্রতি বছর একবার একসাথে মিলিত হবে। এর মধ্য দিয়ে একটি আয়-ইনকামের ব্যবস্থা হবে।’ এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট আবেগতাড়িত হয়ে বা কথা প্রসঙ্গে নয় সুস্পষ্টভাবে তিনি ইসলামের মৌলিক বিষয়কে অবমাননার চেষ্টা করেছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এ মানুষের ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দিয়ে বক্তব্য রাখার জন্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী কী ধরনের অপরাধ করেছেন? আর তার শাস্তিই বা কী? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও বলেছেন তার এই বক্তব্যের জন্য তাকে খেসারত দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী নিউ ইয়র্কে গিয়ে এসব মন্তব্য করেছিলেন। নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলনে লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা ও দল থেকে অপসারণের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন। লতিফ সিদ্দিকীর এ মন্তব্যের পর তিনি সরকারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাকে দিয়ে মন্ত্রিত্ব চালানো সম্ভব হবে না এটা বোঝা খুব কঠিন বিষয় নয়। তাকে মন্ত্রিপরিষদ বা দল থেকে সরানো সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। মহানবী সা: ও হজ নিয়ে এমন মন্তব্য করার পরও তাকে যদি মন্ত্রিপরিষদে রাখা হতো তাহলে তার খেসারত সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে দিতে হতো। প্রধানমন্ত্রী তা উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলে তাকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ সিদ্ধান্ত নিতান্তই সরকারের ইমেজ রক্ষার সিদ্ধান্ত।
মানুষের ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দিয়ে এই বক্তব্য রাখার পর দেশের মানুষ চেয়েছে এই অপরাধের শাস্তি। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে তার শাস্তি সম্ভব বলে মত দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের নেতারাও তার শাস্তি দাবি করেছেন।
আজকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। রাষ্ট্র কার? দেশের মানুষকে নিয়ে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র দেশের মানুষের আকাক্সার প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকে। গুটি কয়েক লোক ছাড়া দেশের সব মানুষ এমন ধর্মদ্রোহীদের শাস্তি দেয়ার পক্ষে। কিন্তু আমরা লক্ষ করলাম প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে দেশের মানুষের মূল দাবি লতিফ সিদ্দিকীর শাস্তির বিষয়ে কোনো বক্তব্য রাখেননি। একজন সাংবাদিক তার শাস্তির দাবি উঠেছে বলে প্রশ্ন করলেও সে বিষয়ে তিনি কোনো জবাব দেননি।
প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে শুধু মন্ত্রিপরিষদ ও দল থেকে অব্যাহতির প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন; কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত তো কোনো শাস্তি হতে পারে না। এগুলো একান্তই ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশে এর আগে একাধিক রাজনৈতিক নেতাকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগ এনে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীও রয়েছেন।
 ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ এনে গ্রেফতারের অনেক পর তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়; কিন্তু নিজামী বা সাঈদী নবী রাসূল বা ইসলাম প্রসঙ্গে কোনো বিরূপ মন্তব্য করেছেন এমন অভিযোগ তখন কেউ তোলেনি। তাদের যদি গ্রেফতার করা যায় তাহলে লতিফ সিদ্দিকীকে কেন আইনের আওতায় আনা যাবে না?
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন তিনি তো এখন দেশে নেই। সরকার তাহলে কাকে গ্রেফতার করবে। এখানেই সরকারের সদিচ্ছার প্রশ্ন রয়েছে। সরকার তার বিরুদ্ধে আসলে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না সেটি এখনো স্পষ্ট করেনি। এ ছাড়া সরকার চাইলে তাকে বিদেশ থেকে ফেরত আনার প্রক্রিয়াও শুরু করতে পারে। এর আগে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের বিদেশ থেকে ফেরত আনার নজির রয়েছে। লতিফ সিদ্দিকীর বিচারের ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও হেফাজতে ইসলামের একাধিক নেতা প্রশ্ন তুলেছেনÑ প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করায় সাত বছরের জেল হয় আর মহানবীকে অবমাননা করলে কিছুই হয় না। এসব প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে। লতিফ সিদ্দিকীকে যদি আইনের আওতায় আনা না হয় তাহলে এসব প্রশ্ন সামনে আরো বড় হয়ে আসবে। আসলে দেশের মানুষ চায় এ ধরনের ধর্মদ্রোহী যারা প্রকাশ্যে মানুষের বিশ্বাসের অনুভূতিতে আঘাত হানেন তাদের বিচার। সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিচার খুবই জরুরি। মানুষ যখন দেখবে অপরাধ করলে বিচার ও শাস্তি হয় তখনই শুধু অপরাধ বন্ধ হয়। শাস্তি না হলে এ ধরনের অপরাধ চলতে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী তাকে মন্ত্রিপরিষদ ও দল থেকে অব্যাহতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেও স্বীকার করেছেন যে তিনি অপরাধ করেছেন। তাহলে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে সমস্যা কোথায়? ক্ষমতাসীন দলের আইনমন্ত্রী ও বুদ্ধিজীবীরা একটা কথা প্রায়ই বলেন দেশে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তা থেকে তারা বেরিয়ে আসতে চান। এ জন্য তার অতীতে যারা অপরাধ করেছেন তাদের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছেন। তাহলে বর্তমানে যারা অপরাধ করছে তাদের বিচার হবে না কেন? বর্তমানের অপরাধের বিচার না হলে তো সমাজ ও রাষ্ট্র ভেঙে পড়বে। এখন দেশের মানুষ ধর্মদ্রোহিতার বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান চায়।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন লতিফ সিদ্দিকীর এই বক্তব্যের দায় সরকার বা দল নেবে না। আমরা লক্ষ করছি আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের কোনো নেতা যখন অপরাধ করেন তখন বলেন এর দায় দল বা সরকার নেবে না। তারা শুধু ব্যক্তির ওপর দায় চাপান; কিন্তু এই ব্যক্তিকে তৈরি করেছে কে? লতিফ সিদ্দিকী যদি আওয়ামী লীগের নেতা না হতেন তাহলে তিনি কি রাষ্ট্র পরিচালনার এই পর্যায়ে যেতে পারতেন? তার মধ্যে যে ঔদ্ধত্য চলে এসেছে তাতে কি ক্ষমতার বড়াই নেই? এই ক্ষমতা তো দল ও সরকারের। এখন গণমাধ্যমে খবর এসেছে তিনি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে থাকা অবস্থায় নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন। এর আগেও বিভিন্ন সময় তিনি অশোভন বক্তব্য রেখেছেন। সরকারি কর্মচারীদের মারধর করেছেন।
আমরা দেখলাম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ ধরনের অভিযোগ জমা থাকার পরও বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে তাকে আরো বড় মন্ত্রণালয় ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী করা হয়। দুর্নীতি আর খারাপ আচরণের জন্য কি তিনি পদোন্নতি পেয়েছিলেন? এ পদোন্নতির দায় তো প্রধানমন্ত্রীর ওপরও বর্তায়। বাস্তবতা হচ্ছে, তিনি মন্ত্রী হয়েছিলেন বলে দুর্নীতি অনিয়ম এবং ধর্মবিরোধী বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই নিজে নিজে মন্ত্রী হননি? দল বা সরকার তাকে মন্ত্রী না করলে তো তিনি মন্ত্রী হতে পারতেন না, এ রকম মন্তব্যও করতে পারতেন না। এ কারণে লতিফ সিদ্দিকীর দায় সরকার বা দল নেবে না বলে পার পাওয়া যাবে না। অবশ্যই এর দায় সরকারের ওপর বর্তায় এবং তাকে বিচারের মুখোমুখি করার দায়িত্ব সরকারের।

জাতিসঙ্ঘের কী পরিণতি by জসিম উদ্দিন

লিগ অব নেশনস বিশ্বপর্যায়ে জাতিরাষ্ট্রগুলোর প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সংগঠন। যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে যুদ্ধ রোধ করে আন্তর্জাতিক পরিসরে শান্তি রক্ষা ছিল এর প্রধান লক্ষ্য। তিন বছরের মাথায় ১৯২৩ সালে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের মিলিত বাহিনী জার্মানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে আক্রমণ করে বসে। ব্রিটেন এ আক্রমণকে সমর্থন করে। ব্রিটেনের পাশাপাশি লিগের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ছিল ফ্রান্স। জার্মানদের বিরুদ্ধে দেশ দু’টির ছিল শত্রুতা। লিগের উদ্যোক্তা দেশ ব্রিটেন-ফ্রান্স আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষার বদলে নিজেদের শত্রু দমনে ইউরোপজুড়ে জার্মানবিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগাতে বেশি উৎসাহিত হয়। সরাসরি নিয়ম ভঙ্গ করলেও সদস্য দেশ দু’টির বিরুদ্ধে লিগ অব নেশনস কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ব্যবস্থা নেবে কারা, হর্তাকর্তারাই এ কর্মের কর্তা।
অন্য সদস্যদের মধ্যে এ বার্তা পৌঁছাল যে, চাইলে লিগের নিয়মকানুন ভঙ্গ করা যায়। তখন জার্মান বিরোধিতা পুরো ইউরোপে জোরালো ছিল। সদস্যদের মধ্যে তাই অল্প কয়েকটি দেশ জার্মান আক্রমণের সমালোচনা করে। কিন্তু দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো ভবিষ্যতের জন্য। একই বছর ইতালি-আলবেনিয়ার বিতর্কিত এলাকায় জনমত জরিপের জন্য নিজেরা একটি যৌথ টিম পাঠায়। টিমের পাঁচ ইতালীয় সদস্যকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার জন্য গ্রিসকে দায়ী করে ইতালি বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করে। গ্রিস ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করে। জবাবে ইতালি তার নৌবাহিনীকে গ্রিক দ্বীপ কর্ফুতে পাঠায়। এরা উপকূলে বোমা বর্ষণ করে। লিগ অব নেশনসের কাছে সাহায্য চেয়ে গ্রিস ব্যর্থ হয়। এবার বেনিতো মুসোলিনি লিগকে নিজের পক্ষে প্রভাবিত করে। গ্রিসকে বাধ্য করা হয় পাঁচ কোটি লিরা ক্ষতিপূরণ দিতে।
রাশিয়ার ফিনল্যান্ড আক্রমণ লিগের বারোটা বাজিয়ে দেয়। ইউরোপের কিছু দেশের স্বেচ্ছাচারিতার দায় তখন নিজেদের ঘাড়ে চেপে বসে। এরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে কিছু করার নৈতিক অধিকার হারায়। রাশিয়াকে যদিও এর সদস্যপদ পাওয়ার এক বছরের মধ্যে বহিষ্কার করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর মধ্য দিয়ে লিগ পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে। লিগের দুর্বলতা ও ব্যর্থতা মাথায় রেখে ২৪ অক্টোবর ১৯৪৫ সালে গঠিত হয় জাতিসঙ্ঘ। এর প্রধান উদ্যোক্তা রাষ্ট্র আমেরিকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটি রাশিয়ার সাথে শীতল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাপী আরো বেশ কিছু আঞ্চলিক যুদ্ধ হয়েছে এর পর। কোনোটি ঠেকাতে পারেনি জাতিসঙ্ঘ। তবে দু’টি বড় রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা বিশ্বে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি করে। এর ফলে একচেটিয়া কোনো দেশকে একেবারে নিঃশেষ করে দখল করার মতো ঘটনা ঘটেনি। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত রাশিয়ার ভাঙনের মাধ্যমে আমেরিকার একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়। জাতিসঙ্ঘের আশ্রয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন বৈষম্যের জন্ম দেয় এবং স্বেচ্ছাচারিতা করে। লিগ অব নেশনসের বৈষম্যমূলক নীতি যেমন ইউরোপে অনাচার সৃষ্টি করে, একইভাবে জাতিসঙ্ঘ বিশ্বব্যাপী এমন অনেক অনাচারে সহযোগিতা করে চলেছে।
বিশ্বসংস্থা হিসেবে জাতিসঙ্ঘ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে দেখা যাচ্ছে। লিগ অব নেশনসের মতো বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠা জাতিসঙ্ঘের প্রধান লক্ষ্য হলেও ঠিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ ছড়িয়ে দেয়ার জন্যই যেন এটি ব্যবহার হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দেশ ইরাকের আজকের করুণ পরিণতি রোধে জাতিসঙ্ঘ কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি। মানববিধ্বংসী অস্ত্রের সম্ভার রয়েছে এমন অজুহাতে জাতিসঙ্ঘকে ব্যবহার করে আমেরিকা দেশটিতে হামলা চালায়। সাদ্দামকে প্রহসনের বিচারের নামে হত্যা এবং সার্বভৌম দেশ ইরাকের পতন হওয়ার পর এটা প্রমাণ হয়েছে দেশটিতে মানববিধ্বংসী অস্ত্রের সম্ভার ছিল না। ২০১৪ সালে সেখানে নিহত মানুষের সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
পরিস্থিতি উন্নতির পরিবর্তে ইরাকে নতুন একটি অবৈধ শক্তির উদ্ভব হয়েছে। আইসিস নামে সংগঠিত এ শক্তি নিষ্ঠুর সব ঘটনা ঘটাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী তাদের বর্বর সব কর্মকাণ্ডের ছবি ও খবর প্রচারিত হচ্ছে জোরেশোরে। এরা হত্যা করছে সাংবাদিক, এনজিওকর্মী এমনকি নিরীহ সাধারণ মানুষকে। ইসলামের নামে এমন নিষ্ঠুর কাজ এরা চালালেও এর কোনোটি ইসলাম অনুমোদন করে না। সংগঠনটির এসব কাজ ইসলামের ওপর অপবাদ তৈরির প্রচারণা হিসেবে বিশ্বব্যাপী ব্যবহার হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র্র দীর্ঘ দিন দেশটি দখল করে রাখার পর কিভাবে আরো খারাপ একটি গোষ্ঠীর হাতে চলে গেল ইরাক? বিশ্ববাসীর সামনে সে প্রশ্নটি বড় করে দেখা দিয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সেখানে বিমান হামলা শুরু হয়েছে। এরা পূর্বাভাস দিচ্ছে সংগঠিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে পরাস্ত করতে কয়েক বছর লেগে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে নতুন আরো একটি গোষ্ঠীর কথাও। ‘খোরাসান’ নামে এ গোষ্ঠী আরো ভয়ানক বলে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করছে। আলাকায়েদার সদস্যারা এটি সংঘটিত করছে। মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ভূমি ইরাক যে নাগরিকশূন্য করে ফেলা হবে, এই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইরাকিরা পুরো ব্যাপারটিকে একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে। উদ্ভূত গোষ্ঠীকে সামনে আনা হয়েছে চিরতরে ইরাককে দখলে নেয়ার জন্য। সেখানে আরব বসতিশূন্য করে ইসরাইলের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার কাজ মূলত এগিয়ে চলছে। বিশ্ববাসী দেখছে খেলাফত কায়েমকারী মুসলমানেরা বর্বর!
আফগানিস্তানে ইরাকের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ওসামা বিন লাদেনকে হস্তান্তর এবং আলকায়েদাকে বহিষ্কার করার দাবি জানানোর মধ্য দিয়ে বুশের অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম শুরু হয়। জবাবে লাদেনকে দেশ ত্যাগ করার অনুরোধ করে তালেবান সরকার। তবে নাইন-ইলেভেন আক্রমণের জন্য তিনি দায়ী, এ ধরনের তথ্যপ্রমাণ ছাড়া তাকে তাড়িয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায় তালেবান। ৭ অক্টোবর যুক্তরাজ্যকে সাথে নিয়ে আক্রমণ সূচনা করে এরা। দীর্ঘ যুদ্ধে আফগানিস্তান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। তালেবান, আলকায়েদা, ওসামা বিন লাদেন রহস্যই থেকে গেছে। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে এক সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে আমেরিকা দাবি করেছে, লাদেনকে হত্যা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সেখানে মে মাসের ২ তারিখে কী ঘটেছিল, বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হয়নি। আফগান যুদ্ধ থেকে আমেরিকার প্রকৃত অর্জন কী বা মানবতার জন্য কী শিক্ষা অর্জিত হলো, সঠিকভাবে নিরূপণ করার কেউ নেই। তবে একটি দেশ এরা তছনছ করে দিয়েছে। আমেরিকার এ যুদ্ধে সহযোগিতা করতে গিয়ে পাকিস্তানের অবস্থা এখন সঙ্কটাপন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘শত্রু’ আলকায়েদা নিঃশেষ হয়ে যায়নি, আফগানিস্তানে শান্তি নেমে আসেনি। আফগানিস্তানের সামনে এখন দীর্ঘ অনিশ্চয়তা আর অন্ধকার দেখা যাচ্ছে।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে মার্কিন কংগ্রেস একটি বিল পাস করে। ২০০১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর এটি পাস হয় আর প্রেসিডেন্ট বুশ তাতে সই করেন ১৮ সেপ্টেম্বর। নাইন-ইলেভেন আক্রমণের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহারের আইনগত ভিত্তি এটি। বেশ চাতুর্যের সাথে এর মাধ্যমে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার দায় এড়ায় বুশ প্রশাসন। তালেবান সৈন্যকে একটি জাতীয় সেনাবাহিনীর পরিবর্তে গণ্য করা হয় সন্ত্রাসীদের সমর্থক হিসেবে। এর মাধ্যমে জেনেভা কনভেনশন এবং আইনের প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষার দায়িত্বে নিযুক্ত জাতিসঙ্ঘ অবৈধ যুদ্ধ প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।
জাতিসঙ্ঘ আর ইসরাইলের উত্থান হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের হত্যা ও তাদের বাড়িঘর দখল করে ইহুদি বসতি স্থাপনের কার্যক্রম জাতিসঙ্ঘের আশ্রয়ে থেকে করে যাচ্ছে ইসরাইল। যুক্তরাষ্ট্র এ কর্মে প্রধান আনুকূল্যদাতা। আগ্রাসন বন্ধে ইসরাইলের ওপর চাপ প্রয়োগ করে একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা বেঁধে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া তার ভাষণে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি তিনি এ আহ্বান জানান। আলোচনা পুনরায় সচল করা অন্যথায় অসম্ভব হবে বলে জোর দিয়ে বলেন আব্বাস।
জাতিসঙ্ঘে দেয়া মাহমুদ আব্বাসের ভাষণকে আমেরিকা যেভাবে সমালোচনা করেছে, তা ন্যক্কারজনক। নিজেদের বসতবাড়িতে অবস্থান বজায় রাখা যেন ফিলিস্তিনিদের অপরাধ। অন্য দিকে ইসরাইলের জোরপূর্বক বসতি স্থাপনকে সমর্থন করা হচ্ছে এর মাধ্যমে। এরা আব্বাসের এ ভাষণকে ‘আক্রমণাত্মক’ বলে অভিহিত করেছে। এরা বলেছে, এ ভাষণ ইসরাইলকে উসকে দেবে। প্রকৃত ব্যাপার হলো, ইসরাইলকে উসকানি দেয়ার প্রয়োজন হয় না। এরা নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের যখন তখন হত্যা করার অধিকার সংরক্ষণ করে। কারণ, জাতিসঙ্ঘ সব সময় প্রস্তুত হয়ে থাকে তাদের দায়মুক্ত করার জন্য। আমেরিকার এ অবস্থান খোলাসা করে বললে বলতে হয়, ইসরাইলি সন্ত্রাসের পক্ষে, অন্য দিকে ফিলিস্তিনিদের বেঁচে থাকার অধিকারের বিপক্ষে।
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সম্মেলনের ঠিক আগে মানবাধিকার কর্মীকে ফিলিস্তিনে ঢুকতে দেয়নি ইসরাইল। জাতিসঙ্ঘের স্পেশাল রেপোটিয়ার সেই মানবাধিকার কর্মী মাকারিম ইউবিসোনো বলেন, ‘আমি গভীরভাবে মর্মাহত পশ্চিম তীরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আক্রান্ত ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে সাক্ষাতের জন্য সেখানে আমার যাওয়ার প্রয়োজন।’ এর আগেও তার পূর্বসূরি রিচার্ড ফককে ২০০৮ সালে ২০ ঘণ্টা আটক রাখার পর বেন গুরিয়ান বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়। ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুরকে স্বাধীনতার প্রশ্নে জাতিসঙ্ঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর বিপরীতে কাশ্মির, মিন্দানাও, উইঘুর, রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার আদায়ে জাতিসঙ্ঘ কোনো ভূমিকা রাখেনি। এ চারটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় গণহত্যা ঘটলেও কোনো আওয়াজ নেই জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে। পূর্ব তিমুরের অধিবাসীরা খ্রিষ্টান, অন্য যে জাতিগোষ্ঠীগুলো চরম নিপীড়নের শিকার তারা সবাই মুসলিম। জাতিসঙ্ঘ চরম সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিজেদের এজেন্ডা নির্ধারণ করছে, এমন প্রমাণ মিলছে। পরমাণু প্রযুক্তির আবিষ্কার, উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ে জাতিসঙ্ঘ নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে পারেনি। পরমাণু অস্ত্র উৎপাদনের অভিযোগ এনে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাখা হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের এ অস্ত্রটি সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে আমেরিকার শত্রুরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধেও।
উগ্র জাতীয়তাবাদী পুতিনের নেতৃত্বে নতুন করে উত্থান ঘটছে রাশিয়ার। এরা জোর করে দখল করে নিয়েছে ইউক্রেনের অংশ ক্রিমিয়াকে। এখন অভিযান চলছে খোদ ইউক্রেন অভিমুখে। জাতিসঙ্ঘ এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। স্বাধীন দেশ ইউক্রেন সার্বভৌমত্ব হারাতে বসেছে। রাশিয়ার এ আগ্রাসনকে নিরাপত্তা পরিষদের অন্য সদস্য চীন নীরবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার পতনের পর জাতিসঙ্ঘকে দাবার ঘুঁটির মতো একক ব্যবহারকারী যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। চীন-রাশিয়ার যৌথ আকাক্সা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে খর্ব করছে। বিশ্বক্ষমতার লড়াইয়ে শান্তিরক্ষায় ব্যর্থ জাতিসঙ্ঘ লিগ অব নেশনের পরিণতি পেতে যাচ্ছে। জাতিসঙ্ঘের ৬৯তম সাধারণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে সদর দফতর নিউ ইয়র্কে। এ উপলক্ষে গরিব দেশগুলোর শাসকেরা বেশি তৎপর। তাদের মধ্যে অনেকটা পিকনিক মুড। বিশাল বহর নিয়ে সেখানে বেড়ানোর একটা সুযোগ নিচ্ছে তারা। জাতিসঙ্ঘের কার্যকর বডি হচ্ছে নিরাপত্তা পরিষদ। এর প্রতিনিধিত্বকারী রাষ্ট্রগুলো বিশ্বের অর্ধেক মানুষেরও প্রতিনিধিত্ব করে না। ইউরোপ ও আমেরিকার মাত্র ৫০ কোটির কম মানুষের জন্য তিনটি সদস্যপদ। অন্য দিকে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এর কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। এ ধরনের বৈষম্যমূলক বিশ্বসংস্থা অবশ্যম্ভাবীরূপে ভেঙে পড়বে।
নিরস্ত্রীকরণ এবং পারস্পরিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে সমঝোতার ওপর জোর দেয়া হয় লিগ অব নেশনসে। শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের প্রতি সমান দৃষ্টি নিবদ্ধ করা এর কর্মসূচির মধ্যে ছিল। মানব পাচার, অস্ত্র কেনাবেচা, বিশ্বস্বাস্থ্য ও যুদ্ধবন্দীর মতো বিষয়গুলোকে এজেন্ডার মধ্যে রাখা হয়েছিল। জাতিসঙ্ঘেও একই এজেন্ডা গুরুত্ব পায়। এবার আফ্রিকায় ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাস নিয়ে খুব গুরুত্ব দিয়ে মহাসচিব বান কি মুন সাধারণ পরিষদের সূচনা বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু আসল কাজ শান্তিরক্ষায় ব্যর্থতা জাতিসঙ্ঘকে অচিরেই মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
jjshim146@yahoo.com

কারখানা ফেরত চায় রেশম বোর্ড by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

বিক্রির জন্য সাত বছর আগে রাজশাহী রেশম কারখানা প্রাইভেটাইজেশন কমিশনকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, বিক্রি হয়নি। এখন পুনর্গঠিত রেশম বোর্ড কারখানাটি চালু করার জন্য ফেরত চেয়ে কমিশনকে চিঠি দিয়েছে। তবে প্রাইভেটাইজেশন কমিশন এর আগে ফেরত দিতে চায়নি। তার পরও রেশম বোর্ড আবারও ফেরত চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী নগরের শিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকায় ১৯৬১ সালে সাড়ে ১৫ বিঘা জমির ওপর কারখানাটি স্থাপিত হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় ১০ কোটি টাকার নতুন যন্ত্রপাতি কিনে দিয়ে কারখানাটিকে আধুনিকায়ন করে। লোকসান থাকলেও কোম্পানিটি তখন ভালোই চলছিল, কিন্তু বিএনপি সরকার ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর মূলধন না থাকার অজুহাতে কারখানাটি বন্ধ করে দেয়। ৪১ বছর পর কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় এই কারখানায় কর্মরত প্রায় ৩০০ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন। পাশাপাশি রেশমকে ঘিরে আরও প্রায় ৫০ হাজার পলু চাষিরা বিপাকে পড়েন। সে সময় আন্দোলন করেও কারখানাটি চালু করতে পারেনি রাজশাহীবাসী। ফলে হতাশা থেকে এ অঞ্চলের পলুচাষিরাও চাষ কমিয়ে দেন। 
২০০২ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী রেশম কারখানাটিকে বর্তমান সরকার চালুর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের কাছে চলে যাওয়ায় এখন নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। গত মার্চ মাসে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় রাজশাহী রেশম কারখানাটিকে ফেরত চেয়ে প্রাইভেটাইজেশন কমিশনে চিঠি দেয়। প্রাইভেটাইজেশন কমিশন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে পাল্টা চিঠি দিয়ে বলেছে, এটা যেহেতু একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান এবং প্রাইভেটাইজেশন কমিশন একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা তাই এ বিষয়ে তারাই ব্যবস্থা নেবে।
রাজশাহী সদর আসনের সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশার নির্বাচনী ইশতেহারে রেশম কারখানাটি খুলে দেওয়ার ঘোষণা ছিল। তিনি এবার দ্বিতীয় মেয়াদেও সাংসদ রয়েছেন। এবার তিনি রেশম উন্নয়ন বোর্ড পরিচালনা পর্ষদের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, প্রাইভেটাইজেশন কমিশনকে এর আগেও চিঠি দিয়ে কারখানাটি ফেরত চাওয়া হয়েছে। আবারও ৪ সেপ্টেম্বর রেশম বোর্ডের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফেরত চেয়ে চিঠি দেওয়া হবে। নিয়ম অনুযায়ী তারা ফেরত দেবে। তিনি বলেন, ফেরত পেলে রেশম বোর্ডের উদ্যোগে এই কারখানা চালু করা হবে। এ বিষয়ে আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। জাপান ও চীন এদিক দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা প্রযুক্তি এবং শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেবে।
সাংসদ আরও বলেন, রেশমচাষিদেরও এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হবে। চেষ্টা করা হবে নিজেদের উৎপাদিত সুতা দিয়েই কারখানা চালানোর। যত দিন না হয় তত দিন বাইরে থেকে সুতা আমদানি করা হবে। কারখানাটি চালু হলে রাজশাহী অঞ্চলের বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তিনি বলেন, একই সঙ্গে রেশম গবেষণা কেন্দ্রেও একটি মডেল কারখানা ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে। যাতে করে বাইরের মানুষ এসে সত্যিকারের রাজশাহী সিল্ক সম্পর্কে অবহিত হতে পারে। 
এর আগে ২০১১ সালের ১৮ আগস্ট তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত রাজশাহী রেশম কারখানাটি পরিদর্শন করে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে রেশম কারখানাটি চালু করার বিষয়ে মত দেন। কিন্তু প্রাইভেটাইজেশন কমিশন কারখানাটি ফিরিয়ে না দিয়ে বেসরকারি খাতে ইজারা দিয়ে চালানোর জন্য পাল্টা প্রস্তাব দেয়। তাতে ব্যর্থ হয়ে নিলামে বিক্রির জন্য চারবার বিজ্ঞপ্তি দেয়। তাতেও সাড়া মেলেনি। ২০১১ সালের জুন মাসে রাজশাহীতে এক সেমিনারে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন বন্ধ কারখানাটি চালুর আশ্বাস দেন। 
এর পর গত বছরের মার্চ মাসে রেশম বোর্ড, রেশম গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ সিল্ক ফাউন্ডেশনকে একত্র করে ‘বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড’ নামে পুনর্গঠন করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় কারখানাটি ফেরত চাইলে মন্ত্রণালয় এবং প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের মধ্যে আবারও রশি টানাটানি শুরু হয়। গত মার্চে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় কারখানাটি ফেরত চেয়ে চিঠি দেয়। এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে প্রাইভেটাইজেশন কমিশন পাল্টা চিঠি দিয়ে কারখানাটি ফেরত না দেওয়ার কথা সাফ জানিয়ে দেয়।

খুলনায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১৩ বনদস্যু নিহত

খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১৩ জন নিহত হয়েছেন। আজ রোববার   ভোরে ও দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ দাবি করেছে, নিহতরা সবাই সুন্দরবনের ‘বনদস্যু’। এ ঘটনায় পুলিশের ছয় সদস্য আহত হন বলে দাবি করা হয়েছে।

নিহতরা হলেন পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়ানের মাগুরা গ্রামের মৃত শরিফ মোড়লের ছেলে সবুর শেখ (৪০), দাকোপ উপজেলার কালাবগির বাসিন্দা মৃত সুলতান গাজীর ছেলে হানিফ গাজী (৩০), বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলার নান্নু মোল্লার ছেলে আলম মোল্লা (২০), ডুমুরিয়া থানার টিপনা গ্রামের আজিজ শেখের ছেলে আমিরুল শেখ (২৬), আবদুল আজিজের ছেলে আফজাল শেখ (২০), ছাত্তার মোল্লার ছেলে মফিজুল শেখ (৪১), জলিল শেখের ছেলে মাফরুল শেখ (২৪), শরাফপুর গ্রামের ছাত্তার মোল্লার ছেলে মাহবুব মোল্লা (৩৮) ও মফিজুল মোল্লা (৩৪), গোলনা গ্রামের আব্দুল গফফারের ছেলে রুবেল শেখ (২৩), ইউসুফ আলীর ছেলে জয়দেব খান (৩৫), তেলিখালি গ্রামের তাহেম সরদারের পুত্র হাবিবুর (৪০) ও কারিমুল (৪২)। কারিমুলের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। নিহতদের মাথায় ও বুকে গুলি লেগেছে।

খুলনার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমানের ভাষ্য, আজ ভোরে উপজেলার দেলুটি ইউনিয়ানের জিরবুনিয়া গ্রামে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ কারিমুল (৪০) ও হবি (৪২) নামের দু জন বনদস্যু নিহত হন। ঘটনাস্থল থেকে ১১ জনকে আটক করা হয়। আটক হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে সুন্দরবনে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান নামে পুলিশ। পুলিশ তাঁদের নিয়ে পাইকগাছার গড়ইখালি গাংরক্ষী এলাকায় পৌঁছালে কাশেম বাহিনীর সদস্যরা ওই ১১ জনকে ছিনিয়ে নিতে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। দু পক্ষের মধ্যে প্রায় ঘণ্টা খানেক গুলিবিনিময় হওয়ার একপর্যায়ে কাশেম বাহিনীর সদস্যরা পিছু হটে যায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ১১ জন বনদস্যুর লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় পুলিশের ছয় সদস্য আহত হন বলে দাবি করেন পুলিশ সুপার। এ সময় প্রায় দু শটি গুলি বিনিময় হয় বলে তিনি জানান।

দেলুটি ইউনিয়নের মানুষের সঙ্গে ফোনে কথা বলে জানা গেছে, রাত (শনিবার দিবাগত রাত) সাড়ে তিনটার দিকে ওই একদল লোক জিরবুনিয়া গ্রামের কলেজ শিক্ষক প্রশান্ত কুমার ঢালীকে অপহরণ করে একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে শিবসা নদীর শাখা নদী হাঙ্গরখানার দিকে যাচ্ছিল। এ সময় গ্রামের মানুষ একজোট হয়ে তাদের ধাওয়া করে। অপহরণকারীদের নৌকা বিকল হয়ে গেলে অপহরণকারীরা চরে নেমে পড়ে। এ সময় গ্রামবাসীর সঙ্গে পুলিশ যোগ দেয়। পুলিশ ও অপহরণকারীদের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। ঘটনাস্থলে দু জন নিহত হয়। এ ছাড়া পুলিশ ও গ্রমাবাসী ১১ জনকে ধরে ফেলে। পুলিশ ছয়টি বন্দুক ও ২৯টি গুলিও উদ্ধার করে।

পাইকগাছার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কবির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবনের কাশেম বাহিনীর সদস্যরা মাঝেমধ্যে লোকজন অপহরণ করে টাকা দাবি করে আসছিল। কিছু দিন আগে গড়ইখালি গ্রাম থেকে একজনকে অপহরণ করে নিয়ে যায় তারা। পরে মুক্তিপন দেওয়ার পর ওই ব্যক্তি ছাড়া পান। দেলুটি ইউনিয়নের কলেজ শিক্ষক প্রশান্ত কুমার ঢালীকে অপহরণের পরপরই এলাকাবাসী উপজেলা কর্মকর্তাকে তা জানায়। খবর পাওয়ার পরপর পাইকগাছা থানা পুলিশ ও স্থানীয় ক্যাম্পের পুলিশ ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থল থেকে ১১ জনকে আটক করা হয়। তারা পুলিশকে তথ্য দেয় কাশেম বাহিনীর আরও অস্ত্র রয়েছে। তখন পুলিশ সেগুলো উদ্ধারের জন্য সুন্দরবনের দিকে যায়।

ঘটনা সম্পর্কে দেলুটি ইউনিয়ানের চেয়ারম্যান সমরেশ হালদার বলেন, ‘বার আড়িয়া কলেজের শিক্ষক প্রশান্ত বাবুকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার সময় জনগণের ধাওয়া খেয়ে অপহরণকারীরা গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়ে।’ তিনি বলেন, এক পর্যায়ে পুলিশ যোগ দেয় জনগণের সঙ্গে। পুলিশ গুলি চালালে দুই অপহরণকারী গুলিবিদ্ধ হয়। আরও ১০-১১ জনকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয় স্থানীয় লোকজন। 

পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার প্রভাত কুমার দাস বলেন, ‘চার জন পুলিশ সদস্য ভর্তি আছেন। আর দু জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যাঁরা ভর্তি আছেন তাঁদের শরীরের বিভিন্ন জায়গা ছিলে গেছে, কালো দাগ পড়েছে। তবে অবস্থা তেমন গুরুতর নয়। দুই-এক দিন রেখে তাঁদেরও ছেড়ে দেওয়া হবে।’

‘বন্দুকযুদ্ধে’ শুধু পুলিশের হাতে আটক ব্যক্তিরা নিহত হওয়ার ঘটনায় এলাকার মানুষ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। এ ব্যাপারে পাইকগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিকদার আক্কাজ আলীর সাথে বার বার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

চার ধাপ এগিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বে ৮৬তম by মাসুদ মিলাদ

চার ধাপ এগিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর এখন বিশ্বের ৮৬তম অবস্থানে। ২০১৩ সালে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সংখ্যা হিসাব করে এই অবস্থান নির্ধারণ করেছে শিপিংবিষয়ক বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো সংবাদমাধ্যম ‘লয়েডস লিস্ট’। সম্প্রতি তালিকা প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি।
মূলত কনটেইনার পরিবহনের অব্যাহত বৃদ্ধির কারণে সেরা ১০০ বন্দরের তালিকায় এগিয়েছে চট্টগ্রাম। তবে এই তালিকায় বন্দরের সেবার মান এবং তুলনামূলক দক্ষতা বিবেচনা করা হয় না। এর পরও তালিকায় এগিয়ে থাকার অর্থ কনটেইনার পরিবহনের হার বাড়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বন্দরের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।   

বাংলাদেশের মংলা বন্দর বিশ্বের সেরা ১০০ বন্দরের তালিকায় নেই। এই বন্দরে বছরে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সংখ্যা অর্ধ লাখেরও কম। সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিহনের মাত্র ৩ শতাংশ আনা-নেওয়া হয় মংলার মাধ্যমে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘চার ধাপ এগিয়ে যাওয়া দেশের জন্য সুখবর। তবে একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জও। কারণ সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিবহন ক্রমাগতই বাড়ছে, যার ৯৭ শতাংশ একাই পরিবহন হচ্ছে এ বন্দরের মাধ্যমে। এই চাপ সামলে নিয়ে কনটেইনার পরিবহনের গতিশীলতা ঠিক রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ।’

বন্দরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এই বন্দর দিয়ে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৩০ লাখে (প্রতিটি ২০ ফুট দীর্ঘ কনটেইনার হিসেবে)। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পুরোদমে চালু করলে এই ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে চট্টগ্রাম। তবে ২০২০ সালের মধ্যে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ না হলে সমস্যায় পড়তে হবে। এটি স্বীকার করেছেন বন্দর চেয়ারম্যানও। তিনি বলেন, ২০২০ সালের পর নতুন একটি টার্মিনাল নির্মাণ করে পুরোদমে চালু করার বিকল্প নেই। নতুন উদ্বোধন হওয়া পায়রা সমুদ্রবন্দরে ২০১৮ সালে কনটেইনার টার্মিনাল চালুর চিন্তাভাবনা আছে আমাদের। সে জন্য এখনই প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, কনটেইনার পরিবহনের হার বৃদ্ধি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নির্দেশ করে। কারণ, রপ্তানিপণ্যের প্রায় পুরোটাই পরিবহন হয় কনটেইনারে করে। আবার কনটেইনারে আমদানিপণ্যের সিংহভাগই শিল্পের কাঁচামাল। পোশাক রপ্তানির পরিমাণ বাড়ার কারণে বন্দরে কনটেইনার পরিবহনেও অগ্রগতি হচ্ছে। কনটেইনার আমদানি-রপ্তানির বড় অংশই পোশাকশিল্পের কাঁচামাল এবং তৈরি পোশাক।

কনটেইনার পরিবহনের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ব্যবস্থাপক এনামুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, এ বছর শেষে কনটেইনার পরিবহনের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রতিবছর বাড়তে থাকা কনটেইনার পরিবহনের জন্য এত দিন শুধু বন্দরই কনটেইনার ইয়ার্ড, যন্ত্রপাতিসহ অভ্যন্তরীণ সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে। এখন ব্যবহারকারীরাও বিশেষ করে আমদানিকারকেরা আগের চেয়ে কম সময়ে কনটেইনার ছাড় করে নিচ্ছে বন্দর থেকে। ফলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ছে।

সেরা ১০০:  সেরা তালিকার এক নম্বরে চীনের সাংহাই। ২০১৩ সালে এই বন্দর দিয়ে পরিবহন হয় তিন কোটি ৩৬ লাখ একক কনটেইনার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সিঙ্গাপুর বন্দরে ওঠানো-নামানো হয় তিন কোটি ২২ লাখ একক কনটেইনার। সেরা ১০০ বন্দর মিলে গত বছর কনটেইনার পরিবহন করেছে ৫১ কোটি ৩২ লাখ একক। সেরার মধ্যে প্রতিবেশী ভারতের তিনটি, পাকিস্তানের একটি ও চীনের ২০টি বন্দরের নাম রয়েছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর চট্টগ্রামে কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয় ১৫ লাখ ৪১ হাজার ৫১৭টি। ২০১২ সালের তুলনায় কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে নয় দশমিক ৬০ শতাংশ। নিয়মিত চলাচলকারী প্রায় ৪০টি ফিডার জাহাজে (ছোট আকারের জাহাজ) করে এসব কনটেইনার আনা-নেওয়া হয়। বিশ্বের বিভিন্ন বন্দর থেকে আমদানি-রপ্তানিপণ্য এ বন্দরে আনা-নেওয়া হয় সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো এবং মালয়েশিয়ার তানজুম পালাপাস ও কেলাং বন্দরের মাধ্যমে। ২০১৩ সালে সিঙ্গাপুর বন্দরের মাধ্যমে ৫৪ শতাংশ কনটেইনারের আনা-নেওয়া হয়। 

ওয়ার্ল্ড পোর্ট সোর্স ওয়েব পোর্টাল অনুযায়ী, বিশ্বে আনুমানিক চার হাজার সক্রিয় বন্দর রয়েছে। কনটেইনারাইজেশন ইন্টারন্যাশন ইয়ারবুক ২০১০ বইতে ৩৬৫টি বন্দরের তথ্য তালিকভুক্ত করা হয়। যেখানে সর্বশেষ ৩৬৫তম বন্দরের কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়েছিল ৪৩ হাজার একক। তবে এক হাজারের চেয়ে বেশি কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয় এমন বন্দরের সংখ্যা প্রায় ৫০০টি।

ত্বকীর জন্মদিনে শুভকামনা by রওনক রেহানা

আ জ ত্ব কী র জ ন্ম দি ন
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি’ ত্বকী ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন অকালপ্রয়াত কিশোর কবি সুকান্তের মতো এ অঙ্গীকার আমিও করেছিলাম। কিন্তু না, আমি আমার এ জনপদকে শিশুর বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে পারিনি। সুকা‌ন্তের মৃত্যু হয়েছে যক্ষ্মা রোগে আর ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছে নিষ্ঠুরভাবে। হায়, আমি চলে যাইনি! ত্বকীর মতো, বিশ্বজিতের মতো সন্তানদের জন্য কোনো সৎ, কার্যকর প্রশাসনিক নিরাপত্তায় বা দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন হয় এমন স্বদেশ, জনপদের নাগরিকও আমি নই! এখানে প্রতিনিয়ত শিষ্টের দমন আর দুষ্টের পালনই চলছে। নয়তো ত্বকীর মৃত্যুর দেড় বছর অতিবাহিত হলো, অপরাধীরা চিহ্নিত হলো, তার পরেও অপরাধীরা ধরা পড়ল না, অভিযোগপত্র দেওয়া হলো না! সবকিছু জানার পরেও সরকার অপরাধীদের পক্ষ নেয়; এটা কী করে সম্ভব? আমরা কি এমনই রাষ্ট্র চেয়েছিলাম? এটাই কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ?
আজ তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর জন্মদিন। ১৯তম জন্মদিন। জন্মদিন হয় আনন্দের; ফুল, কেক, বিভিন্ন বিষয় এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। কিন্তু না, ত্বকীর জন্মদিন আমাদের জন্য কোনো আনন্দের বার্তা বয়ে আনেনি; একরাশ বেদনা আমাদের নিমজ্জিত করে।
ত্বকী বেঁচে থাকতে একটা ছড়া প্রায়ই শুনতে চাইত, ‘মন্দরা ছিল মন্দরা আছে, থাকবেও চিরকাল। তবুও ভালোর ছোঁয়া লেগে শুভ হোক আগামীকাল।’ এখন আমার কণ্ঠ থেকে কোনো ছড়া, কবিতা বা গান বেরোতে চায় না, কণ্ঠ যেন রুদ্ধ হয়ে আসে। কিন্তু আমার চোখের জলে কোনো স্মৃতি মুছে যায়নি। ত্বকীর সঙ্গের প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি মুহূর্ত থেকে আমি ফিরে পেতে চাই বর্তমান ও ভবিষ্যতে ত্বকীর সঙ্গে আমার জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষায়, অথচ যা আর কোনো দিন হওয়ার নয়।
এখন পরবর্তী প্রজন্মের অবস্থা এমন হয়েছে যে ‘বালক জানে না কতটা হেঁটে এলে ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।’ ঠিক এ কারণেই ত্বকীর আর পথ হাঁটা হলো না। ত্বকী ডেইলি স্টার পুরস্কার নিতে গিয়ে পরিচিতি প্রকাশে জীবনের লক্ষ্য জানাতে গিয়ে লিখেছিল, ‘সততাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে লালন করব।’ যে জীবনের পরিসীমা এতই ছোট যে আঠারোর আগেই পথ ছেড়ে চলে যেতে হয়, সেখানে লক্ষ্য মুখ থুবড়ে পড়ে।
আমি যখনই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘মানুষ’ কবিতা থেকে আবৃত্তি করতাম—‘মানুষ বড় কাঁদছে তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও’—তখন প্রতিবারই আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার শিশুসন্তান আপন মনেই বলে চলত, ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, তোমাকে দাঁড়াতেই হবে’। এই ছোট ছোট সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্নার জীবন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম রক্ষার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের, সমাজের। ত্বকী তার একটি কবিতায় লিখেছিল, ‘সমগ্র মানবজাতি আজ এক কাতারে দাঁড়াবে,/ হিংসা-বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে,/ জলাঞ্জলি দিয়ে হিসেব কষা,/ ছড়িয়ে দেবে ভালোবাসার গান—/ বলবে মানুষ চাই সমানে সমান।’ একটি সমতার সমাজের স্বপ্ন দেখেছিল ত্বকী। কিন্তু কতটা বিরুদ্ধ সমাজে বসে সে এ স্বপ্ন দেখছে, এ ধারণা হয়তো তার ছিল না।
মহাভারতে সন্তানহারা দ্রৌপদী বলে, ‘ধর্ম তার সন্তানকে যতই সুরক্ষা প্রদান করুক, মানুষের নিজের পাপ তার দুর্বলতা হয়েই পড়ে, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পাপ অবশ্যই মানুষের দুর্বলতা’। কোনো শিশুই খুনি বা কারও শত্রু হয়ে জন্মায় না। সন্তানকে সত্য-অসত্য, শুভ-অশুভ, ভালো-মন্দ শিক্ষার মধ্য দিয়েই তাকে সমাজের, দেশের ও মানুষের করে তুলতে হয়। আর তা না হলে সমাজ ও দেশ মানুষের হয়ে ওঠে না, পশুতে ছেয়ে থাকে।
না, আজ ত্বকীর এ জন্মদিনে কোনো সরকারের কাছে, কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে আমি কোনো আবেদন জানাব না; শুধু এ সত্যই উচ্চারণ করব যে কোনো অন্যায়, অবিচারই শেষ কথা নয়, ন্যায় আর সত্যই শেষ কথা। ক্ষমতার মোহে আজ যারা অন্ধ; যঁারা পিতা, পুত্র, ভাই, নিজস্ব পরিজন ছাড়া অন্য কাউকেই আপন ভাবতে কুণ্ঠা বোধ করেন, যাঁরা আইন-প্রশাসন-রাষ্ট্র—সবকিছুকে নিজেদের প্রয়োজনে মনে করেন আমাদের কাছে আর যা-ই হোক সুবিচার আশা করা যায় না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, আল্লাহ তাঁদের সুমতি দিন, সত্য উপলব্ধি করার ক্ষমতা দিন।  
কোনো অবিচারই শেষ কথা নয়। সব মানুষের ভেতরেই অন্তর্যামী বিবেক আর চেতনা রয়েছে। আমাদের আগামী দিনের সন্তানেরা সে চেতনাকে ধারণ করেই নদী বা বৃক্ষের মতো মহৎ ব্রত নিয়ে এই দেশকে শিশুর বাসযোগ্য করে তুলবে, এ আমার বিশ্বাস। এ বিশ্বাস একদিন অবশ্যই সূর্যের মুখ দেখবে।

রওনক রেহানা: নিহত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর মা।

ভারতীয়রা পরকীয়াকে পাপ মনে করে না

সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, ফরাসিরা বিয়েকে সামান্যই কেয়ার করে। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, ভারতীয়রাই বরং এক্ষেত্রে তাদের চেয়ে এককাঠি সরেস। ৭৬ ভাগ ভারতীয় নারী ও ৬১ ভাগ ভারতীয় পুরুষ বিবাহ-বহির্ভূত দৈহিক সম্পর্ককে পাপ বা অনৈতিক মনে করে না।
জরিপটি পরিচালনা করেছে বৈশ্বিক ডেটিং ওয়েবসাইট অ্যাশলে ম্যাডিসন। তারা ভারতের ১০টি নগরীতে ৭৫,৩২১ জন জবাবদাতার প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। জবাবদাতাদের ৮০ ভাগই ছিলেন বিবাহিত। জরিপে অংশ নেয়া পুরুষদের গড় বয়স ছিল ৪৫ এবং নারীদের ৩১।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৮১ ভাগ পুরুষ এবং ৬৮ ভাগ নারী জানিয়েছেন, পরকীয়া তাদের বিয়েটা টিকে থাকতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। মজার ব্যাপার হলো, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৮০ ভাগই পারিবারিক মধ্যস্ততায় বিয়ে করেছেন।

উত্তরদাতাদের মধ্যে ৩৬ ভাগ পুরুষ জানিয়েছেন, স্ত্রীর কাছ থেকে তৃপ্তি না পেয়ে তারা অন্যত্র ঝুঁকেছেন। আর ৪৮ ভাগ নারী জানিয়েছেন তারা অন্যান্য কারণে সেদিকে পা বাড়িয়েছেন।

৮১ ভাগ পুরুষ ও ৯২ ভাগ নারী জানিয়েছেন, তারা অন্যদের সাথে সম্পর্কে জড়ালেও কখনো ধরা পড়েননি। আর যারা ধরা খেয়েছেন, ৭৭ ভাগ পুরুষ ও ৬২ ভাগ নারী জানিয়েছেন, ওই ঘটনার কারণে তাদের বিয়ে ভাঙেনি।
সূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া।

লাকসামে অপহরণের ঘটনা -এ কেমন পুলিশ প্রতিবেদন?

গত বছরের নভেম্বরে নিখোঁজ লাকসাম বিএনপির দুই নেতার ব্যাপারে পুলিশ আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে এ বছরের সেপ্টেম্বরে। এত দীর্ঘ সময় তদন্তের পর যা বের করতে পেরেছে তা হচ্ছে ‘হয়তো বা’ দুষ্কৃতকারীদের হাতে অপহরণ হয়েছেন এই দুজন। অথচ এই মামলার সাক্ষীরা বলছেন, এই দুজনকে অপহরণ করেছে র‍্যাব। যারাই এই দুজনকে অপহরণ করে থাকুক, তাদের বাঁচাতে বা মামলাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার অপচেষ্টাটি এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট।
এ ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এত দিন পরও পুলিশ কেন নিশ্চিত হতে পারছে না যে লাকসাম বিএনপির দুই নেতা সাবেক সাংসদ সাইফুল ইসলাম ও হুমায়ুন কবিরকে অপহরণ করেছে কারা? তারা কী তদন্ত করল যে কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না, ‘হয়তো বা’ শব্দটি ব্যবহার করতে হয়েছে। যদি দুষ্কৃতকারীরা এই ঘটনা ঘটিয়ে থাকে, তবে তাদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না কেন?
এসব প্রশ্নের জবাব মিলবে বলে মনে হয় না। কারণ, তদন্তকারী কর্মকর্তা নিজেই জানিয়েছেন, এই মামলার প্রতিবেদন দেওয়া নিয়ে তিনি ‘বিপদে’ আছেন। ফলে এটা স্পষ্ট যে আদালতে তিনি যে প্রতিবেদন দিয়েছেন তা যথাযথ তদন্তনির্ভর নয়।
অপহরণের শিকার বিএনপির দুই নেতার পরিবারের পক্ষ থেকে এই তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। নিহত হুমায়ুন কবিরের বাবা নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর কুমিল্লা র‍্যাবের তৎকালীন কয়েকজন কর্মকর্তাকে আসামি করে মামলা করেছেন। অভিযোগটি যেহেতু গুরুতর, তাই পুলিশের এ ধরনের মামুলি তদন্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় যেহেতু এই আসামিরা রয়েছেন, তাই লাকসাম বিএনপির দুই নেতা খুনের মামলায় তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে সমস্যা কোথায়? এই মামলার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত জরুরি।

ঢাকা বিমানবন্দরের এতিম দশা by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

যোগাযোগ বিশ্বে এ রকম একটি কথা চালু আছে যে একটি বিমানবন্দরে পা রাখলেই সেই দেশ সম্বন্ধে ভালো ধারণা হয়ে যায়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কথা বাদ দিলাম, কাছের দেশ ভুটান অথবা শ্রীলঙ্কার কথাই ধরুন। ভুটানের পারো বিমানবন্দরে নামলে আপনি ঠিক বুঝবেন, দেশটিতে কোনো কোলাহল নেই, হুড়োহুড়ি নেই, অকারণ উত্তেজনা নেই। বিমানবন্দরটি অন্তরঙ্গ, একটা সুন্দর হাসি দিয়ে যেন আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে। কলম্বোতে নামুন, দেখবেন বিমানবন্দরটি কী পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম। টয়লেটগুলো পরিষ্কার, নিয়ম-শৃঙ্খলামতো চলছে সবকিছু। প্রি-পেইড ট্যাক্সিতে চড়ে রাত একটায়ও আপনি যেকোনো গন্তব্যে যেতে পারবেন নিরাপদে, একটি টাকা অতিরিক্ত খরচ না করে। দেশটি যে উন্নতির পথে এগোচ্ছে—শিক্ষায়, খেলাধুলায়, সামাজিক সব সূচকে—বিমানবন্দরে আধা ঘণ্টা কাটিয়েই আপনার তা জানা হয়ে যাবে। এই যে কলকাতার নেতাজি বিমানবন্দর, একসময় যা ছিল লিভিং, ভিড়াক্রান্ত, ঠ্যাসাঠেসি; এখন তো একটি বিশাল স্থাপনা—প্রচুর জায়গা, সব চলে ঘড়ির কাঁটার মতো। ইমিগ্রেশন শেষ করে মালসামানের খোঁজে নেমে দেখবেন, সব পৌঁছে গেছে।
এবার একটু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে তাকান, ভীতিকর সব চিত্র ধরা পড়বে আপনার চোখে। আর যদি যাত্রী হয়ে আপনি কখনো এটিকে ব্যবহার করেন, আপনার অভিজ্ঞতা হবে এমনি যে তা ভুলে যেতে পারলেই আপনি স্বস্তি পাবেন। বিমানবন্দরের বাইরে যে প্রাণান্তকর ভিড় হয়, যা দেখে মনে হবে যেন ছুটির দিনের কোনো বিনোদনকেন্দ্র (যদিও মানুষের মধ্যে নির্ভার আনন্দের পরিবর্তে থাকে উদ্বেগ আর উত্তেজনা)—তার কথা নাহয় না-ই বলা হলো। যেহেতু এটি যখন চালু হয়, সেই ৩০-৩৫ বছর আগে, সেই সময়ের তুলনায় এখন এর ওপর চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ বেশি। কিন্তু এর ভেতরে চলে যে অব্যবস্থা, তা দেখে মনে হবে ব্যবস্থাপনা বলে যে একটি বিষয় আছে, পেশাদারি ও যাত্রীসেবা বলে যে কিছু বিষয় আছে, সেগুলোর সঙ্গে আমাদের যেন চিরকালের আড়ি। বিমানবন্দরের টয়লেটগুলো অপরিচ্ছন্ন, দুর্গন্ধময়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অব্যবহারযোগ্য। একটি তিনতলা পার্কিং লট আছে; সেখানে চলে পরিবহন সিন্ডিকেটের প্রতাপ। আপনি একটি গাড়ি চালিয়ে সেটিতে ঢুকে স্বচ্ছন্দে জায়গা পাবেন গাড়িটি রাখার, সেটি—বিশেষ করে দিনের বেলায়—হবে অবাস্তব চিন্তা। আপনি যদি বাইরে থেকে আসেন এবং আপনাকে নিয়ে যেতে বাহনসহ কেউ না আসে, তাহলে কোনো ট্যাক্সি বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়াটা হবে লটারিতে টাকা পাওয়ার মতো। যদি ভাগ্যগুণে পেয়েও যান, যে পথ পাড়ি দিতে এমনিতে আপনার লাগবে ৪০০ টাকা, সেই বাহনওয়ালাকে দিতে হবে এর কয়েক গুণ বেশি।
যে পার্কিং দালানটির কথা বললাম, তার ভেতরে একবার পা ফেলুন। ময়লা-আবর্জনা সর্বত্র। সেখান থেকে টার্মিনালে যাওয়ার পথে ডানে-বাঁয়ে দেখা যাবে আবর্জনার স্তূপ, দেয়ালে কালিঝুলি। এই বিমানবন্দর যাঁরা চালান, তাঁদের কাছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কথাটার গুরুত্ব নেই। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেন এ রকম হবে? শীতের সময় এখানে দেখা যায় মশার প্রকোপ। দুই বছর আগে এক যাত্রীকে নিতে এসে মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে আমি ওই সময়ের বিমান ও পর্যটনসচিবকে একটি চিঠি লিখেছিলাম। এর পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বিমানবন্দর যেহেতু, ওতে ওড়াউড়িটা হয়তো মশাদের অধিকারে পড়ে, কে জানে!
গত ২৭ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে রাত ১০টা ২০ মিনিটে এসে বিমানবন্দরে নামলাম। এখন কম্পিউটার যথাযথ কাজ করলে ইমিগ্রেশনে তেমন সময় লাগে না, এটি একটি বড় অর্জন। যদিও যাত্রীপ্রতি খরচ করা সময় আরও কমানো যায় (সিঙ্গাপুরে গড়ে তা এক মিনিট), তার পরও ব্যাপারটা স্বস্তির। কিন্তু মালসামান আসার বেল্টের সামনে গিয়ে চোখ কপালে উঠল। পাশের বেল্টের ধারে-কাছে বাক্স-পেঁটরা-পোঁটলার একটা পাহাড়! খোঁজ নিয়ে জানা গেল, একটি ফ্লাইটে যাত্রীরা আসার কয়েক ঘণ্টা পর এসব মালসামান খালাস হয়েছে। যাত্রীরা অপেক্ষা করে করে চলে গেছেন। আমাদের মালসামান আসতে শুরু করল আধা ঘণ্টা পর। শেষ বাক্সটি যখন পেলাম, ততক্ষণে দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। ওই যে মালসামান পেতে দু-তিন ঘণ্টা দেরি হয়, এটি এখন নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগের দিন কলকাতা থেকে বিমানে ৪০ মিনিটে উড়ে এসে যাত্রীরা দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে বাক্সটাক্স পেলেন। মাস খানেক আগে সকালে এমিরেটসে চড়ে আসা স্ত্রীকে আনতে গিয়ে আমাকে দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। দয়ালু এক পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে তাঁর অফিসে নিয়ে বসতে না দিলে আরও আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। মালসামান পেতে দেরি হওয়া যদি একটা বিপর্যয় হয় (কর্তাদের জন্য না, যাত্রীদের জন্য), আরও বড় বিপর্যয় ট্রলি জোগাড় করা। ২৭ তারিখে ট্রলির জন্য আমাকে বিমানবন্দরের বাইরে দৌঁড়াতে হয়েছিল।
একবার মনে হয়েছিল, বাসায় চলে যাই, বেরিয়েই যখন এসেছি। এ রকম অনেকেই ভাবছিলেন, আমাকে জানালেন।
একটা যুক্তি শোনা যায় এই অব্যবস্থার পক্ষে: একসঙ্গে চার-পাঁচটা ফ্লাইট নামলে চাপ পড়ে, তাতে দেরি তো হতেই পারে। এটি কোনো যুক্তি তো নয়ই, খোঁড়া যুক্তিও নয়। এটি স্রেফ অযুক্তি। বিমানবন্দরটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক কথাটা তাহলে জুড়ে দেওয়া কেন? এটি কি সৈয়দপুর যে সপ্তাহে দুটি উড়াল চলবে এ দিয়ে? কলম্বোতেও তো দেখেছি; একসঙ্গে পাঁচটি বিমান নামলেও বাক্স-পেঁটরা নিয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হতে আধা ঘণ্টার বেশি লাগে না। তাহলে? ঢাকা বিমানবন্দরে কাস্টমস কর্মকর্তাদের দেখলাম যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন যাত্রীদের বেরোনোটা সহজ করতে। তাঁরা জানালেন, মালপত্র পেতে দেরি হওয়ায় ক্ষুব্ধ যাত্রীরা তাঁদের কাছে কারণ জানতে চান, কখনো কখনো রাগ দেখান। স্বাভাবিক। কারণ, অভিযোগ জানানোর কোনো জায়গা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কোথাও চোখে পড়বে না। রাত ১২টায় কোনো কর্তাব্যক্তি অভিযোগ শোনা এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বসে আছেন—এমনটি ভাবাও অসম্ভব।
শোনা গেল, ‘লাগেজ হ্যান্ডলিং’, অর্থাৎ বিমান থেকে মালপত্র নামিয়ে বেল্টে তোলার কাজ করে বিমান কর্তৃপক্ষ। যদি তা-ই হয়, তাহলে তো প্রমাদ গোনা ছাড়া যাত্রীদের কিছু করার নেই। ৩০ সেপ্টেম্বর একটি দৈনিক প্রথম পৃষ্ঠার প্রধান খবর হিসেবে বিমানের অব্যাহত লোকসানের বিষয়টি তুলে ধরেছে। ‘শান্তির নীড় বিমান এখন ডানাভাঙা বলাকা’—এ হচ্ছে খবরের শিরোনাম। বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠার ৪২ বছরে লোকসান হয়েছে ৩৫ বছরই। কাগজটি এই ডানাভাঙার পেছনে যেসব কারণ আছে, সেগুলোর মধ্যে ‘সীমাহীন দুর্নীতি ও রাজনৈতিকীকরণ’ ও ‘অদক্ষ ব্যবস্থাপনা’কে চিহ্নিত করেছে। বিমানে জাহাজপ্রতি কর্মচারীদের অনুপাত বিশ্বের ছোট-বড় যেকোনো বিমান সংস্থা থেকে বেশি। তার পরও অব্যবস্থাপনা।
বিমান যদি ‘লাগেজ হ্যান্ডেলিং’-এ ব্যর্থ হয় এত লোকবল নিয়ে, তাহলে এই কাজ এর হাত থেকে নিয়ে নিলেই তো হয়। কিন্তু কাজটি কোনো প্রাইভেট সংস্থাকে দিতে গেলে ইউনিয়ন যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে, এক অভিজ্ঞ যাত্রী আমাকে তা-ই বললেন। কিন্তু একজন যাত্রীকে (এবং তাঁকে নিতে আসা আত্মীয়স্বজনকে) ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখে শাস্তি দেওয়ার অধিকার এই লাগেজ-হ্যান্ডলারদের কে দিল? তারা যে-ই হোক। এবং এই অব্যবস্থাপনা যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন? একটা ঝাঁকি লাগানো পরিবর্তন কি এখনই আনা উচিত নয়?
আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে মার্কিন ব্যবসায়ীদের বলেছেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে। বাণিজ্যমন্ত্রীও এশিয়ার ব্যবসায়ীদের এ রকম আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু বিনিয়োগ করার আগে তাঁরা যখন ঢাকায় নামবেন এবং তাঁদের বাক্স-পেঁটরা যখন আসবে দু-তিন ঘণ্টা তীর্থের কাকের মতো দাঁড়িয়ে থাকার পর, তখন বিনিয়োগ মাথায় থাক, রাগ সামলে ফেরতযাত্রার টিকিটটা তাঁরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়বেন।
২৭ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের যাত্রী হিসেবে সে দেশের কিছু নাগরিকও এসেছিলেন। একজনকে দেখলাম ঘণ্টা দেড়েক দাঁড়িয়ে থেকে লোকজনকে এটা-সেটা জিজ্ঞেস করে তাঁর এক সহযাত্রীকে প্রশ্ন করছেন, ‘হু রানস দিস এয়ারপোর্ট?’ তাঁর প্রশ্নটা হতাশার, ক্ষোভের। তিনি রাস্তায় বেরিয়ে হয়তো আরও বড় কোনো প্রশ্ন করে বসবেন, ঢাকা কে চালায় অথবা দেশটা কে চালায়?
স্বাভাবিক। ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে, সেখানে দু-তিন ঘণ্টা কাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে ভয়াবহ ভিড়-চেঁচামেচি, ঠেলাঠেলির অভিজ্ঞতা সহ্য করার পর কেউ ভুলেও বলবে না, দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ আছে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

হাসপাতালে তিন দিন by অরুণ বসু

শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো, দেশের বড় বড় সরকারি হাসপাতালে​ নানা অনিয়ম-দুর্নীতি সত্ত্বেও বিশাল কর্মযজ্ঞ চালু রয়েছে বলেই কিছু চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। সুতরাং, নিন্দামন্দ এ লেখার লক্ষ্য নয়। তিন দিন হাসপাতালে থাকাকালে কিছু বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথাই বলছি।
২৪ তারিখ শুক্রবার রাত থেকে রাম-কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসতে লাগল। ১, ২, ৩, ৪, ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। টেলিফোনে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাপোজিটরি দিয়ে জ্বর নামানো হলো। পরদিন আমি নেতিয়ে পড়ি। ফলে, আমাকে বাংলাদেশ মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার তোড়জোড় চলতে থাকে। দুপুর থেকে রাত প্রায় ১২টা পর্যন্ত চলল এভাবেই।
এমন সময় হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ ডাক্তার এলেন আমার কেবিনে। বললেন, আপনার প্রেশার ৯০/৪০। আপনি সিএবিজির (বাইপাস) রোগী। সুতরাং, আমরা আপনাকে এখানে রাখতে পারব না। আপনি হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে (এনআইসিভিডি) চলে যান অথবা আমাদের সিসিইউতে ভর্তি হোন। আমরা সঙ্গে সঙ্গে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে যাওয়ার জন্য তৈরি হই। সব ঠিকঠাক, কিন্তু দেখা গেল আমরা হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে যে ওষুধগুলো কিনেছি, তার পেস্লিপ হারিয়ে ফেলেছি। এখন তারা ওষুধগুলো ফেরত নেবে না। তো আমাদের দরজার সামনে একজন তরুণ ডাক্তার দাঁড়িয়ে ছিলেন। সম্ভবত আমাদের বিদায় দেওয়ার জন্যই। তাঁকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে অনুরোধ করি। চশমা পরা, স্কুলের ভালো ছাত্রের মতো নিপাট চেহারার এই ডাক্তার ভদ্রলোক একটি জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে বললেন, আমি কর্তৃপক্ষকে বলব। আমি বলি, আপনি এখন বলেন। তিনি বললেন, আপনাদের জন্য আমি কিছু করতে পারব না। তবে ভবিষ্যতে যাতে কেউ আর এমন ভোগান্তিতে না পড়েন, সে চেষ্টা করব। তাঁকে বললাম, তাহলে আপনি দরজা ছেড়ে দাঁড়ান, আমরা চলে যাই।
রাত ১২টার পর আমরা হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে পৌঁছাই। আমাদের প্রধান বার্তা সম্পাদক হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালককে আগেই বলে রেখেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সিসিইউতে চলে যাই। কোনো কোনো ডাক্তার আছেন, তাঁদের আচরণে রোগ হয়তো সারে না, কিন্তু মন ভালো হয়ে যায়। সিসিইউর ওই ডাক্তার সাহেব ঠিক এ রকমের মানুষ। খুব যত্ন করে দেখলেন। বললেন, আপনার কোনো হার্টের সমস্যা মনে হচ্ছে না। সুতরাং, সিসিইউর সংকটাপন্ন রোগীর স্বজনদের কান্নাকাটির মধ্যে রাতে ঘুমাতে পারবেন না। বরং আপনি একটি পেয়িং বেডে ভর্তি হয়ে রাতে ঘুমান। সকালে ডাক্তার দেখবেন। তাঁর পরামর্শমতো, গভীর রাতে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ১৪ নম্বর বেডে ভর্তি হলাম।
পরদিন সকালে আমি সিস্টারকে আমার প্রেশার মাপতে অনুরোধ করি। সিস্টার জানালেন, তাঁদের প্রেশার মাপার যন্ত্র নেই। আমি বলি, প্রেশারের সমস্যার কারণেই আমি এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। অন্য ওয়ার্ড থেকে একটি মেশিন এনে আমার প্রেশারটা মেপে দিন। তিনি পাত্তা দিলেন না। বললেন, আপনার প্রেসার মাপবেন ডাক্তার। ইতিমধ্যে একজন তরুণ ডাক্তার এই ওয়ার্ডে এলেন অন্য রোগী দেখতে। আমার এক স্বজন তাঁকে আমার প্রেশার মেপে দিতে অনুরোধ করে। তিনি বললেন, আমি পারব না। পায়ে পায়ে আমি সিস্টারদের ডেস্কের দিকে এগিয়ে যাই। সবিনয়ে ওই ডাক্তারকে বলি, আমি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই। তিনি বললেন, আমি বলব না। আমি আবারও বলি, ডাক্তার সাহেব আমি একজন রোগী। আমার একটি কথা দয়া করে শুনুন। তিনি দাঁত খিঁচিয়ে জবাব দিলেন, আমি শুনব না। আপনার ডাক্তার আপনাকে দেখবে। আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি না, তুমুল উত্তেজিত হই। এতেও তাঁর কোনো ভাবান্তর হলো না। লোকটা চলে যান, ফিরেও তাকান না। তবে কি মানুষের কিছুতেই কিছু আসে-যায় না? আমার ছেলে আমাকে জড়িয়ে ধরে বেডে এনে শুইয়ে দেয়। আমি হাঁপাতে থাকি।
আমি যে অধ্যাপকের অধীনে ভর্তি হয়েছি, তাঁর সহকারী এসে আমাকে এক্স-রে করার নির্দেশ দিয়ে যান। একটি ট্রলিতে করে আমাকে এক্স-রে বিভাগে নেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে। ট্রলিটা যেতে যেতে দু-এক গজ পর পর বিগড়ে যায়। ঝাঁকুনিতে আমার পুরো শরীর-কোমর ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। ৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকে এক্স-রে বিভাগের দূরত্ব যাঁরা জানেন, তাঁরা এ জ্বালা কিছুটা বুঝবেন। এক্স-রে বিভাগে যাই, সেখানকার কর্ণধার সেলিম মোল্লা সর্বকাজের কাজি। তিনি যত্ন করে তাঁর ঘরে বসান। কিন্তু বিধি বাম, অর্থাৎ এক্স-রে মেশিন গরম। আধঘণ্টা বসে থেকে ওই অচল ট্রলিতেই ক্লান্ত হয়ে বিছানায় ফিরে আসি। কিছুক্ষণ পর আমার এক্স-রে বিভাগে যাওয়ার খবর আসে। আবার সেই নড়বড়ে ট্রলি। সেই ট্রলিতে যেতে যেতে দেখি মাঝবয়সী এক মহিলা (হাসপাতালের স্টাফ নন) একটা ঝকমকে ট্রলি নিয়ে তাঁর রোগীকে আনতে হুটহাট চলে যাচ্ছেন। ভদ্রমহিলাকে অনুরোধ করি, আপনার ট্রলিতে আমাকে একটু পৌঁছে দিন। আমরা তো একই দিকে যাচ্ছি। তিনি পারব না বলে মুখ ঝামটা দিয়ে আরও দ্রুত চলে গেলেন।
এক্স-রে করে ফেরত আসি। অচল ট্রলিতে যে ছেলেটি দু-দুবার আমাকে ঠেলেঠুলে আনা-নেওয়া করেছে, তার নাম মনে না থাকার জন্য খুবই অনুতাপ হচ্ছে। ট্রলির ওই বিষম চলনের মধ্যে ছেলেটি মাঝেমধ্যেই আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। ট্রলি থেমে গেলে জামার কলার ঠিক করে, গলায় হাত দিয়ে মমতা জানান দিচ্ছিল। আমি একটু জোরে কথা বললেই, আমার কানে কানে বলছিল, স্যার, জোরে কথা কইয়েন না, বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বেন। ছেলেটির বয়স হবে বড়জোর ২৫। কবির ভাষা ধার করে বলতে ইচ্ছে করে, ‘এই হলো এক রকমের মানুষ। মানুষ, মানুষ যে রকম হবার কথা ছিল। তা না হয়ে আমরা এ রকম হলাম কেন?’
বেডে এসে শুনি, আমার অধ্যাপক সাহেব ফিরে গেছেন। তিনি আজ আর আসবেন না। কী করি? ঠিক করলাম, যেহেতু হার্টের সমস্যা নেই। সুতরাং, নিজ দায়িত্বে বাড়ি ফিরে যাব। সেভাবেই কাগজপত্র লিখে নার্সের কাছে জমা দিলাম। হাসপাতালের পরিচালক সাহেব এ খবর জেনে আমাকে ১৫ মিনিট দেরি করতে অনুরোধ পাঠালেন। কিছুক্ষণ পরেই একজন ডাক্তার এসে বললেন, আপনার হার্ট আবার ব্লক হয়েছে। আপনার যাওয়া চলবে না।
রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম। আমি বাইপাস রোগী, তার ওপর আবার ব্লক! আমার স্ত্রী-পুত্র, স্বজন-পরিজন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তাঁদের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। রাতে ঘুম হলো না আমার। সকালবেলা আমার ডাক্তার অমর চৌধুরী এলেন। বললেন, আপনার হার্টের কোনো সমস্যা নেই। আপনার লাংয়ে পানি জমেছে। সিভিয়ার নিউমোনিয়া। এখনই কোনো বক্ষব্যাধির বড় ডাক্তারের
কাছে চলে যান।
আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। আমি আমার ডাক্তারের কাছে বক্ষব্যাধির কাকে দেখাব, সেই পরামর্শ চাই। তিনি দুজন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের নাম বললেন। তারপর আমার ঠাঁই হলো একটি বেসরকারি হাসপাতালে।

অরুণ বসু: সাংবাদিক।

আনন্দের ঈদ, নিরানন্দের ঈদ by সোহরাব হাসান

ঈদ আসে। ঈদ চলে যায়। কারও কাছে ঈদ আসে আনন্দের সওগাত নিয়ে। কারও কাছে বেদনার বার্তা নিয়ে। ঈদ অনেকের কাছে মুনাফা অর্জনের মোক্ষম অস্ত্র। আবার অনেকে ঈদকে দেখেন আত্মশুদ্ধির ও আত্মোপলব্ধির মাধ্যম হিসেবে।  ঈদকে সামনে রেখে প্রতিবারই একশ্রেণির চাঁদাবাজ, মাস্তান সক্রিয় হয়ে ওঠে। পশুর হাটে গরু নিয়ে আসতে গিয়ে যে ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজ ও মলম পার্টির খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হলেন, তাঁদের সান্ত্বনার কোনো জায়গাই থাকল না। তাঁরা এসেছিলেন আশা নিয়ে, ফিরে যাবেন একবুক বেদনা নিয়ে। রাষ্ট্র বা সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর জবাব কী? ঈদ উপলক্ষে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আপত্তি সত্ত্বেও বিভিন্ন হাসপাতালের সামনে পশুর হাট বসানো হয়েছে। পশুর হাট বসবে, বেচা-কেনা হবে। কিন্তু তা হাসপাতালের কাছেই হতে হবে কেন? কারা এসব অন্যায় করেন, তা নিবৃত্ত করার দায়িত্ব কি সরকারের নয়?
২.
এবারে যেসব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ঈদের আগে বেতন বোনাস পেয়েছেন, তাঁরা স্বজনদের সঙ্গে খুশি মনে ঈদ করতে পারবেন। কিন্তু যাঁরা ঈদের আগে বেতন-বোনাস পাননি, তাঁদের ঈদ হবে নিরানন্দ। যাঁরা বাড়ি যাওয়ার টিকিট পেয়েছেন, রাস্তায় যত ভোগান্তিই হোক স্বজনদের সান্নিধ্য তাঁদের বেশুমার আনন্দ দেবে। কিন্তু যাঁরা টিকিট পাননি, তাঁরা স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ থেকে অনেকটাই বঞ্চিত হবেন। ঈদের পুরো সময়টাই মন খারাপ থাকবে।
গত ঈদের মতো এবারও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত তোবা গ্রুপের ১৬০০ শ্রমিক, যাঁরা বোনাস দূরের কথা, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বেতনও পাননি। গত ঈদের আগে তাঁদের কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন মালিক দেলোয়ার হোসেন। কারখানার শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দেওয়ার নাম করে জামিন নেওয়া এই ভদ্রলোক জেলখানা থেকে বেরিয়ে এসে কারখানাই বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দেননি। তোবা গ্রুপের ১৬০০ শ্রমিক কয়েক মাস ধরে তাঁদের বকেয়া মজুরি ও বোনাসের জন্য আন্দোলন করেছেন, অনশন করেছেন, মন্ত্রী ও বিজিএমইএর নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। গত শনিবারও তাঁরা বিজিএমইএ ভবনে ধরনা দিয়েছেন বেতন-বোনাসের দাবিতে। শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু তাঁদের কাছে কাকুতি মিনতি করে বলেছেন, অন্তত এক মাসের বেতন দেওয়া হোক। কিন্তু শ্রমিক নেত্রীর এই আকুতি কিংবা শ্রমিকদের আহাজারি বিজিএমইএর নেতাদের মন গলাতে পারেনি।
তাই, তোবা গ্রুপের ১৬০০ শ্রমিকের জন্য এবারের ঈদ কোনো আনন্দের বার্তা দিতে পারেনি। তাঁরা কবে বকেয়া বেতন-বোনাস পাবেন, তা-ও জানাননি। কেবল তোবা গ্রুপ নয়, আরও অনেক কারখানার শ্রমিক বেতন-বোনাস পাননি। শ্রমিকনেতাদের দাবি, ৭০ শতাংশ কারখানায় শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দেওয়া হলেও ৩০ শতাংশ কারখানার মালিক তাঁদের বঞ্চিত রেখেছেন। কোথাও অর্ধেক বোনাস, কোথাও বা ১০/১৫ দিনের বেতন দেওয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় তাঁরা কী করে স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেবেন? তৈরি পোশাক খাতে ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করে থাকলে ১০ লাখই পুরো বেতন-বোনাস পাননি।
৩.
তৈরি পোশাক খাতের বাইরেও হাজারো শিল্পকারখানা ও প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে শ্রমিক-কর্মচারীদের ঠিকমতো বেতন-বোনাস দেওয়া হয় না। ঈদের আগেই মালিকদের নানা বাহানা শুরু হয়। তাঁরা ব্যাংকক-সিঙ্গাপুরে ঈদের মার্কেট করলেও শ্রমিকদের বেতন দেন না।
ঈদের সময়ে যে পরিবহন খাত নিয়ে এত আলোচনা, সে খাতের শ্রমিকেরা দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেও বোনাস পান না। অনেকেই ঘণ্টা ঠিকা কাজ করতে বাধ্য হন। একজন বাস বা ট্রাকচালককে দিনে ১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হলে তার মেজাজ ও শরীর দুটোই বিগড়ে যেতে বাধ্য। সড়কপথে অনেক দুর্ঘটনার কারণও চালকদের এই অতিরিক্ত পরিশ্রম। একবার পত্রিকায় পড়েছিলাম, এক চালক বাসটিকে গন্তব্যে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে আসনের পাশে ঢলে পড়েন। তখনও তাঁর হাতে স্টিয়ারিং ধরা। কখন যে তিনি হূদেরাগে আক্রান্ত হয়েছেন, জানতেও পারেননি।
লঞ্চের কর্মচারীদের বেতন আরও কম। সেখানে কোনো বেতন স্কেল নেই। বোনাস নেই। চাকরির নিশ্চয়তা নেই। মালিকের মর্জির ওপরই তাদের বেতন-ভাতা নির্ধারিত হয়।
ঈদের দিনটিতে আমরা যেন এই স্বল্প বেতনের কর্মীদের কথা ভুলে না যাই। যেন ভুলে না যাই বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী, গাড়ির চালক কিংবা বাসার গৃহকর্মীদের কথা, যাঁরা অহরাত্র আমাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পরিশ্রম করেন। আমরা যেন ভুলে না যাই ফুটপাতে, টার্মিনালে ও রেলস্টেশনে থাকা মানুষগুলোর কথা; যাঁরা সারা দিন পরিশ্রম করে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান। তাঁরাও আমাদের মতো এই আলো ঝলমলে শহরে এসেছিলেন নিজেদের ভাগ্য বদলাতে। পারেননি। যাঁরা পেরেছেন, তাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে।
ঈদের দিনে আমরা যেন ভুলে না যাই রাস্তার পাশের উলঙ্গ শিশুটির কথা। আমার আপনার সন্তানের মতো সে-ও মানবসন্তান। আশরাফুল মখলুকাত। এই পৃথিবীতে তারও অধিকার আছে বেঁচে থাকার।

‘এক সময়ে যৌনতার রাণী ছিলাম’—তসলিমা নাসরিন

নির্বাসিত নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন বলেছেন, “এক সময় আমি ব্যক্তিত্ববানদের পেছনে ঘুরেছি। ব্যক্তিত্বহীনরা আমার পেছনে ঘুরেছে। আমি দৈহিক সম্পর্কে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। বুড়ো, মাঝ বয়সী ও প্রবীণ বন্ধুদের নিয়ে দেহজ খেলায় মেতে উঠি। কিন্তু এখন দেহজ খেলায় মত্ত থাকার বয়স নেই। সুখের পায়রারা আজ কেউ আমার পাশে নেই।”
তসলিমা আরো বলেন, প্রায় দেড় যুগ ধরে তিনি নির্বাসনে দিনযাপন করছেন। মৌলবাদীদের আর্শীবাদপুষ্ট বিএনপি সরকারও তাকে দেশে ফিরতে দেননি। স্বাধীনতা পক্ষের শক্তি হিসাবে দাবী করা আওয়ামী লীগ সরকারও তাকে দেশে ফেরার সুযোগ দেননি। তিনি এখন ক্লান্ত। দেশে ফিরতে চান। দেশেই বাকিটা জীবন কাটাতে চান।
তসলিমা নাসরিন আগের মতো এখন আর লিখতেও পারছেন না বা লিখছেন না। ‘উতল হাওয়া, ‘আমার মেয়ে বেলা’, ‘ভ্রমর কইও যাইয়া’, বা ‘ক’ -এর মতো বই আর আসছে না। আগের মতো কাব্যও নেই, কবিতাও না। একাধিক স্বামী ও একাধিক পুরুষের সাথে তার দেহজ সম্পর্কের কথা তিনি বেশ রসিয়ে রসিয়ে লিখেছেন। কিন্তু আজকাল বয়সের কারণে নারী হিসেবে আর এই সম্পর্ক অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
তসলিমা এখন হতাশ, চোখের নিচে কালি পড়েছে, চামড়ায় বয়সের চাপ, শরীরের মধ্যে নানারকম ব্যথাতো আছেই। একাকিত্ব তাকে আরও পঙ্গু করে দিচ্ছে। এমনি অবস্থায় বিদেশের কোথাও থিতু হতেও পারছেন না। দেশে ফেরাও তার জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে গেছে। যেই মৌলবাদীদের ভয়ে তিনি দেশ ছেড়ে ছিলেন, সেই ভয় এখনও তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে তিনি তুলে ধরলেন তার এখনকার বিস্তারিত জীবনানুভুতি। সাক্ষাতকারটি সার-সংবাদ পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-
প্রশ্ন: আপনার কাছে একটা প্রশ্ন। এই যে লেখালেখি করলেন, এর মূল উদ্দেশ্য কি ছিল, দেহের স্বাধীনতা না চিন্তার স্বাধীনতা?
তসলিমা: প্রশ্নটা আপেক্ষিক। আসলে আমিতো পেশায় ছিলাম চিকিৎসক। আমার বাবা চেয়েছিলেন তার মতো হতে। আমিও অধ্যাপক ডা. রজব আলীর মতো একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক হই। শৈশবে, কৈশোর এবং যৌবনে আমি অনুভব করি, নারীরা আমাদের সমাজে ক্রীতদাসীর মতো। পুরুষরা তাদের ভোগ্যপণ্যের মতো ব্যবহার করে। এ কারণেই বিষয়গুলো নিয়ে প্রথমে লেখালেখির কথা ভাবি।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার দাবিতে কি আপনার এই লড়াই?
তাসলিমা: আমি প্রথমত নারীর জরায়ুর স্বাধীনতার দাবি তুলি। একজন পুরুষ যখন চাইবে, তখনই তার মনোস্কামনা পূর্ণ করতে ছুটে যেতে হবে। এটা তো হতে পারে না। অথচ তখন ছুটে না গেলে জীবনের সব পূণ্য নাকি শেষ হয়ে যাবে। চিন্তার স্বাধীনতা না থাকলে ভালো লেখক হওয়া যায় না।
দেহের স্বাধীনতার বিষয়টা গৌণ। তবে একেবারে ফেলনা নয়। পুরুষই একচেটিয়া মজা লুটবে, নারী শুধু ভোগবাদীদের কাছে পুতুলের মতো হয়ে থাকবে, এটা মেনে নিতে পারিনি।
প্রশ্ন: আপনি পরিকল্পিতভাবে নিজেকে আলোচিত করে তোলেন। আজ বাংলা সাহিত্যে বা বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে আপনি তো চরমভাবে অবহেলিত।
তাসলিমা: আমি একটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছি। সত্য কথা সাহিত্যে অনেকের জন্য কষ্টদায়ক হয়। আমি আমার বহু স্বামী ও ভোগ্য পুরুষদের নামধাম প্রকাশ করে দেয়ায় অনেক বন্ধু আমাকে এড়িয়ে চলেন।
বাংলা সাহিত্যের অনেক দামি দামি পুরুষও চান না যে আমি দেশে ফিরি। এক সময় আমার বিপক্ষে ছিল কট্টর মৌলবাদীরা। এখন প্রগতিশীল অনেক সাহিত্যিকও বিপক্ষে। কারণ এদের নষ্ট মুখোশ আমি খুলে দিয়েছি।
প্রশ্ন: আপনি চিকিৎসক থাকলেই ভালো করতেন। মিডিয়াতে কেন এলেন? সাহিত্যেই বা কেন?
তাসলিমা: আমি নারীর অধিকার নিয়ে ভেবেছি। কিন্তু এখন মনে হয় আমি মানবিকভাবে আশ্রয়হীন। আর এ কারণেই আমি অন্য স্রোতে সুখ খুঁজেছি। পরিবার হারালাম, স্বামী সন্তান হলো না, ঘর-সংসার হলো না। তখন দৈহিক সম্পর্কে নেশাগ্রস্ত না থেকে আর কোনো পথ খোলা ছিলো না।
প্রশ্ন: এখন আপনি কী চান?
তাসলিমা: অনেক কিছু। আমার হারিয়ে যাওয়া জীবন, যৌবন, ভোগ-উপভোগ, স্বামী-সন্তান, পরিবার-পরিজন। কিন্তু দিতে পারবেন কি?  আজ আমি নিজ দেশের কাউকে দেখলে কুণ্ঠিত ও লজ্জিত হই। খ্যাতি, অর্থ, পুরস্কার সবই আছে, তবুও মনে হয় আমি ভীষণ পরাজিত। দিনে হইচই করে কাটাই, রাত হলে একাকিত্ব পেয়ে বসে। আগের মতো পুরুষদের নিয়ে রাতকে উপভোগ করার মতো শরীর মন কোনোটাই নেই।
প্রশ্ন: এখন কেমন পুরুষ বন্ধু আছে?
তাসলিমা: এক সময় অনেক ব্যক্তিত্ববানদের পেছনে আমি ঘুরেছি। ব্যক্তিত্বহীনরা আমার পেছনে পেছনে ঘুরেছে। আজকাল আর সুখের পায়রাদের দেখি না। মনে হয় নিজেই নিজেকে নষ্ট করেছি।
পরিচিত হয়েছি নষ্ট নারী, নষ্টা চরিত্রের মেয়ে হিসেবে। লেখালেখি করে তাই এসব পুরুষদের উপর আমার রাগ, ঘৃণা ও অবহেলাকে প্রকাশ করেছি। যৌনতার রানী হিসেবে প্রকাশিত হলাম, অথচ এই রানীর কোনো রাজাও নেই প্রজাও নেই। এই জন্য আজ হতাশায় নিমজ্জিত আমি।
প্রশ্ন: ধর্ম-কর্ম করেন?
তাসলিমা: মাঝেমধ্যে মনে হয় সব ছেড়ে নামাজ-রোজা করি, তাওবা করে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করি। কম্যুনিস্টরাও তো এক সময় বদলে যায়। আমার জন্ম ১২ ই রবিউল আউয়াল, মহানবীর জন্মদিনে। নানী বলেছিলেন, আমার নাতনী হবে পরহেজগার। সেই আমি হলাম বহু পুরুষভোগ্য একজন ধর্মকর্মহীন নারী। বলা তো যায় না, মানুষ আর কত দিন বাঁচে। আমার মা ছিলেন পীরের মুরীদ। আমিও হয়ত একদিন বদলে যাবো।
প্রশ্ন: বিয়ে-টিয়ে করবার ইচ্ছে আছে কি?
তাসলিমা: এখন বিয়ে করে কি করবো? পুরুষটিই বা আমার মধ্যে কি পাবে? সবই পড়ন্ত বেলায়। যে বিয়ে করবে, সে যদি আমার মধ্যে যৌন সুখ না চায়, সন্তান না চায়, এমন মানব পেলে হয়ত একজনকে সঙ্গী করার কথা ভাবতেও পারি।
প্রশ্ন: আপনি কি একেবারে ফুরিয়ে গেছেন?
তাসলিমা: না, তা ঠিক নয়। তবে পুরুষতো শত বছরেও নারীকে সন্তান দেয়। মেয়েরা তো পারে না। আমার এখনও রজস্রাব বন্ধ হয়নি। মেশিনারি ঠিক আছে। তবে নতুন বা আনকোরাতো নয়, লক্কর ঝক্কর মেশিনারির মতো আরকি? পুরুষদেরও বয়স বাড়লে খাই খাই বেড়ে যায়। এতটা মেটানো তো আর এই বয়সে সম্ভব হবে না।
প্রশ্ন: বয়স বাড়লে পুরুষেদের সেক্স বাড়ে এটা কিভাবে বুঝলেন?
তাসলিমা: কত বুড়ো, মাঝ বয়সী ও প্রবীণ বন্ধুদের নিয়ে দেহজ খেলায় মেতেছি, এটা আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।
প্রশ্ন: রাত যখন বিশ্বকে গ্রাস করে, আপনার ঘুম আসছে না- তখন আপনার বেশি করে কি মনে পড়ে?
তাসলিমা: খুব বেশি মনে পড়ে আমার প্রথম প্রেম, প্রথম স্বামী, প্রয়াত কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে। অনেক কাঁদি তার জন্য। পেয়েও হারালাম তাকে। রাগ হয়েছিল বিয়ের রাতেই। আমি তো ডাক্তার তার পুরুষদণ্ডে ক্ষত দেখি। বুঝতে পেরেছিলাম যাকে জীবন দিয়ে ভালবাসি, সে বেশ্যাবাড়ি যায়। সিপিলিস-গনোরিয়ায় আক্রান্ত সে। তবু তাকে বলি, আজ বাসর রাতে যৌনকেলি হবে না। তোমার শরীরে রোগ। এখন আমার শরীরে তুমি ঢুকলে আমিও এ রোগে আক্রান্ত হবো। তোমাকে সুস্থ করে তুলবো, তারপর হবে আমাদের আনন্দ বাসর।
কিন্তু পুরুষতো জোর করতে চাইলো, ব্যর্থ হয়ে চলে গেলো পতিতার বুকেই।
প্রশ্ন: অন্য স্বামীদের কথা মনে পড়ে না?
তাসলিমা: তারা এমন উল্লেখযোগ্য কেউ নন। তাদের মুরোদ আমি দেখেছি। তার চেয়ে বহু বন্ধুর মধ্যে আমি দেখেছি, কেমন উন্মত্ত তেজ। ওদের স্মৃতি মনে পড়ে মাঝে মধ্যে।
প্রশ্ন: দেশে ফিরবেন না?
তাসলিমা: দেশই আমাকে ফিরতে দেবে না। আর কোথায় যাবো? বাবা-মা-ভাই-বোন সবাইকে আমি লেখাতে জবাই করে দিয়েছি। আসলে নেশাগ্রস্তই ছিলাম, অনেক কিছু বুঝিনি। আজ আত্মীয়-স্বজনও আমাকে ঘৃণা করে। মরার পর লাশ নিয়ে চিন্তা থাকে, আমার নেই। যে কোন পরীক্ষাগারে দেহটা ঝুলবে। ছাত্রদের কাজে লাগবে।
সৌজন্যেঃ হ্যালোটুডে

কোরবানির গরুর হাটে খুঁটির ভাড়া ১০,০০০

আজ বাদে কাল ঈদ। জমে উঠেছে গাবতলীর কোরবানির পশুর হাট। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যাপ্ত গরু এসেছে। ভিড়ও বাড়ছে ক্রেতাদের। ক্রেতাদের অভিযোগ, গরুর দাম আগের বছরের অনুপাতে খুব বেশি। এদিকে বিক্রেতারা বলছেন, হাটের বাড়তি খরচ মেটাতে তারা বেশি দাম চাইতে বাধ্য হচ্ছেন। বেচাকেনা কম থাকলেও হাটে সক্রিয় দালালরা। গতকাল গাবতলীর হাট ঘুরে দেখা যায় গরুর দীর্ঘ লাইন। হাসিল বাবদ হাট কর্তৃপক্ষ গরুর দামের ৫ শতাংশ আদায় করছেন। এর বাইরেও বিক্রেতাকে জায়গা ভাড়া বাবদ বাড়তি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। সামনের দিকের ভাড়া ১০ হাজার টাকা। মাঝখানে আট হাজার টাকা। আর পেছনের দিকের ভাড়া তিন থেকে ছয় হাজার টাকা। হাটের বাইরে গড়ে উঠেছে আরেক হাট। স্থায়ী হাটের পূর্ব পাশে বেড়িবাঁধের পাশ দিয়ে দ্বীপনগর পর্যন্ত লাল-হলুদ রঙের শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। এসব সামিয়ানার ভেতরের জায়গাভেদে খুঁটি ভাড়া দেয়া হচ্ছে। এখানে একটি গরু রাখতে ১ হাজার  থেকে ১০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে গরুর মালিককে। স্থানীয়রা জানান, বালুর ব্যবসায়ীরা কোরবানির পশুর হাটের কয়েকদিন ব্যবসা বন্ধ করে শামিয়ানা টাঙিয়ে অস্থায়ী ঘর করে জায়গা ভাড়া দিয়েছেন। বাইরের জায়গার ভাড়া বেশি। ভেতরের জায়গার ভাড়া কম। প্রকাশ্যে বেড়িবাঁধে এভাবে শ’ শ’ শামিয়ানা টাঙিয়ে অবৈধভাবে হাট বর্ধিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে হাটে অবস্থানরত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। ক্রেতার পরিমাণ কম থাকলেও দালালের অভাব নেই। ক্রেতারা হাটের গেটের কাছাকাছি পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু হয়ে যায়। দালালের শরণাপন্ন না হতে ইজারাদারের পক্ষ থেকে মাইকে ঘোষণা দিয়ে সতর্ক করা হচ্ছে। তারপরও দালালদের দাপটের কাছে অসহায় ক্রেতা-বিক্রেতারা। বাংলামোটর থেকে গরু কিনতে গিয়েছেন বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম। প্রায় দুই ঘণ্টা হাটে ঘুরেছেন। বলেন, ঢাকার সবচেয়ে বড় হাট শুনেই এখানে এসেছি। কিন্তু দাম অত্যধিক হওয়ায় গরু পছন্দ হচ্ছে না। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বড় গরুর বিক্রি কম। ৫০ হাজার টাকার নিচে যে সব গরুর দাম সেগুলো সহজেই বিক্রি হচ্ছে। পাবনা থেকে ৩টি গরু নিয়ে গাবতলীর হাটে এসেছেন সেলিম মিয়া। পথে নানারকম ভোগান্তি মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে। ট্রাক ভাড়া দিতে হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। তার সঙ্গে আরও ৪ জন লোক এসেছেন। তাদের দৈনিক ৫০০ টাকা দিতে হবে। হাটে গরু রাখার জন্য প্রতি গরু বাবদ ইজারাদারকে দিতে হবে ৮ হাজার টাকা। গরুর খাবার কিনতে প্রতিদিনের খরচ এক হাজার টাকা। ক্রেতার অপেক্ষায় ২ দিন থেকে অপেক্ষা করছেন তিনি। কিন্তু ক্রেতারা শুধু দেখেই চলে যাচ্ছেন। আজ পর্যন্ত কেউ দাম করেননি। গরু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। কুমারখালী থেকে জাকাত উদ্দিন এসেছেন তার আদরের ‘পাগলু’-কে নিয়ে। পাগলু ফ্রিজিয়ান জাতের। সাড়ে চার বছর থেকে পাগলুকে লালন-পালন করেছেন জাকাত উদ্দিন। গত ৩০শে সেপ্টেম্বর এসেছেন গাবতলীর হাটে। এক সপ্তাহ আগেই হাটের জায়গা বুকিং দিতে হয়েছে। কিন্তু গতকাল বিকাল পর্যন্ত একজন ক্রেতাও দাম করেননি। জাকাত উদ্দিন আশা করেছিলেন, ৯ লাখ টাকায় পাগলুকে বিক্রি করবেন। বহুদূর পথ পাড়ি দিয়ে তাই ঢাকায় এসেছেন। কিন্তু এখন গরু বিক্রি করতে না পারলে অনেক টাকা লোকসান দিতে হবে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে সামনের বছর থেকে ঢাকায় আর কেউ গরু বিক্রি করতে আসবেন না। হাট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বছর গাবতলী পশুর হাটে ক্রেতা খুবই কম। শুক্রবার তারা আশা করেছিলেন প্রচুর ক্রেতা আসবেন। কিন্তু বিকাল পর্যন্ত আশানুরূপ ক্রেতা পাওয়া যায়নি। গাবতলী হাট পরিচালক রাকিব ইমরান বলেন, শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত গাবতলীর হাটে প্রায় ২০-২৫ হাজার গরু উঠেছে। ক্রেতা না থাকায় গরুর মালিকরা চিন্তিত। লোকসানের আশঙ্কায় কম দামেই গরু বিক্রি করে ফেলছেন অনেকেই। ফলে হাসিলের পরিমাণও কমে যাচ্ছে। হাটের ভেতরে খুঁটি ভাড়া আদায় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাটের বাইরের লোকজন খুঁটি ভাড়া আদায় করছে। এগুলো তাদের নিজস্ব জায়গা।

মুদিখানার পেছনে কথিত ব্রিটিশ জঙ্গীর আস্তানায়

গ্রামের একটা বাজারের মুদি দোকানের পেছনে একটা গুদাম ঘর। এক পাশে সার করে সাজিয়ে রাখা বড় বড় তেলের টিন। নোংরা, স্যাঁতস্যাঁতে, আলো-বাতাসহীন এই গুদাম ঘরের আরেক পাশে একটা খাট, ছোট জরাজীর্ণ একটি কাঠের টেবিল এবং একটি আলনা।

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে গোপলার বাজারের এই গুদাম ঘরটিই ছিল বাংলাদেশ থেকে গ্রেফতার হওয়া কথিত ইসলামিক স্টেট জঙ্গী সামিউন রহমানের আস্তানা। লন্ডন থেকে আসা এই ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণ গত সাত মাস এখানেই থাকতেন। ব্রিটেন থেকে বেশ কিছু বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত তরুণ সিরিয়া বা ইরাকে ইসলামিক স্টেট জঙ্গীদের হয়ে লড়াই করতে গেছেন। এদের কেউ কেউ সেখানে লড়াইয়ে নিহত হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে এই জঙ্গী গোষ্ঠীর সদস্যদের তৎপরতা সামিউন রহমানের গ্রেফতারের আগে পর্যন্ত পুলিশের কাছেও ছিল অজানা।

বাংলাদেশের পুলিশের ধারণা, সামিউন রহমান বাংলাদেশে আসেন ইসলামিক স্টেটের জন্য জঙ্গী রিক্রুট করার জন্য। এর আগে গ্রেফতার হওয়া দুই বাংলাদেশি তরুণ তাদের সেই তথ্যই দিয়েছে। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তারা সামিউন রহমানকে গ্রেফতার করে।
তবে জঙ্গী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সামিউনের যোগাযোগের কথা শুনে গোপলার বাজারের মানুষ বিস্মিত।
যে মুদি দোকানের গুদাম ঘরে সামিউন থাকতেন, সেই দোকানেরই একজন কর্মচারি ফয়সাল আহমেদ।
“ আমি তো দেখছি তাইনের চলাফেরা বালা”, বলছিলেন তিনি। নিয়মিত তাকে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার তাগাদা দিতেন সামিউন।
কিন্তু লন্ডন থেকে হবিগঞ্জের এক গ্রামে এসে এরকম একটি জায়গা কেন থাকার জন্য বেছে নিলেন সামিউন?
তার ভাইপো ফয়জুর রহমান জানান আতœীয়দের সাথে সম্পত্তির বিরোধ নিস্পত্তি করতেই তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন প্রায় সাত মাস আগে । কিন্তু বিরোধ নিস্পত্তিতে কোন অগ্রগতি হচ্ছিল না ।
লন্ডনে জন্ম ও বেড়ে উঠলেও তিনি সেখানকার সংস্কৃতিকে পছ্ন্দ করতেন না । হবিগঞ্জে সামিউনের একজন আতœীয় সে কথাই জানালেন । লণ্ডনের জীবনের চেয়ে বিভিন্ন আরব দেশে ঘুরে বেড়ানোই পছন্দ ছিল তার । সামিউনের ভাইপো ফয়জুর রহমান জানালেন কয়েকবার তিনি মরক্কো সফর করেছিলেন ।
গুদাম ঘরে বসবাস
প্রশ্ন উঠছে কেন তিনি বাজারের একটি মুদি দোকানের গুদামে থাকতেন?
সামিউন বাংলাদেশে আসার পর তার ভাইপো বাড়িতেই থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন । কিন্তু সেখানে থাকতে গেলে বাড়ির মহিলাদের সাথে দেখা হবে – এ কারনেই তিনি সেখানে থাকতে চাননি । ইসলামের প্রতি সামিউনের প্রবল ঝোঁক পরিবারকেও খানিকটা ভাবিয়ে তুলেছিল ।
ফয়জুর রহামন বলেন , “ অনেক সময় ওর মায় ফোন দিয়া কইত, এরে নিয়া তো সমস্যায় পড়ছি । খালি ইসলাম – ইসলাম দেখায়। ”
ইসলামের প্রতি প্রবল ঝোঁক থাকলেও সামিউনের চলাফেরায় এবং আচার –আচরন সন্দেহজনক মনে হয়নি ফয়জুর রহমানের । তিনি জানান সামিউন কোথাও যেতেন না কিংবা তার কাছেও কেউ কখনো আসেনি ।
গ্রামের যে মসজিদে সামিউন নামাজ পড়তে যেতেন, সেখানকার মুসল্লিরাও বিস্মিত তার জঙ্গী সম্পৃক্ততার কথা শুনে।
“ সামিউন নামও আমি জানতাম না । এটা পত্রিকায় দেখে জানলাম । তারে তো মসজিদে দেখতাম আমরা। আমরা তো আশ্চর্য অইলাম তার ব্যাপারটা দেইখা ”, বলছিলেন আবু সুফিয়ান নামে একজন।
বিল্লাল আহমেদ নামে আরেকজন বলেন , “ প্রশাসনের কাছে আমার অনুরোধ – যদি তিনি জড়িত থাকেন তাহলে সুষ্ঠু বিচার হোক । আর যদি জড়িত না থাকেন তাহলে প্রবাসী ব্যক্তিকে এভাবে হয়রানি করা ঠিক হবে না । ”

বিবিসি বাংলা

আলোচনা বাতিল করল বিক্ষোভকারীরা

হংকংয়ের মংকোক বিপণিবিতান এলাকায় মুখোমুখি গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারী
(বাঁয়ে) ও বিক্ষোভের বিপক্ষের কর্মীরা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দৈনন্দিন
জীবনের ওপর টানা এক সপ্তাহের এ বিক্ষোভের নেতিবাচক প্রভাবে
অনেকেই ক্ষুব্ধ। তাঁদের কেউ কেউ এখন বিক্ষোভের বিপক্ষে
অবস্থান নিচ্ছেন। গতকাল তোলা ছবি রয়টার্স
হংকংয়ে গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারীরা গতকাল শুক্রবার রাতে সরকারের সঙ্গে আলোচনা বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে। চীনপন্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে তারা এ ঘোষণা দেয়। এর আগে চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী লিউং চুন-ইং বিক্ষোভকারী ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছিলেন। তবে তিনি পদত্যাগ করতে আবারও অস্বীকৃতি জানান। আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা গত রাতে অভিযোগ করেন, সরকার বিক্ষোভকারীদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে হংকংয়ের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় কয়েক শ চীনপন্থী বিক্ষোভকারীদের তাঁবু ছিঁড়ে ফেলে এবং ব্যানার নামিয়ে ফেলে। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি বেধে যায়। বিক্ষোভকারী এবং চীনপন্থীরা পরস্পরের দিকে পানির বোতল ছুড়ে মারে। পুলিশ মাঝখানে অবস্থান নিয়ে দুই পক্ষকে আলাদা করতে চেষ্টা করে। হংকং ছাত্র ফেডারেশন গতকাল রাতে এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা আলোচনা বাতিল করছে। বিবৃতিতে বলা হয়, শান্তিপূর্ণ অকুপাই আন্দোলনকারীদের ওপর সরকার মাফিয়াদের হামলা চালাতে দিয়েছে। তারা আলোচনার পথ বন্ধ করে দিয়েছে এবং পরিণতির জন্য তারাই দায়ী হবে। এর আগে হংকং সরকার বুধবার বিক্ষোভকারীদের আলোচনার আমন্ত্রণ জানায়। তবে তখন আলোচনার সময় বা স্থান ঠিক করা হয়নি। আন্দোলনকারী অন্য গোষ্ঠীগুলো আলোচনা বাতিল করার ব্যাপারে গতকাল রাতে একমত হয়েছিল কি না, তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায়নি। গতকাল বৃষ্টি হওয়ায় এবং দুই দিনের সরকারি ছুটির শেষে লোকজন কাজে যোগ দেওয়ায় বিক্ষোভস্থলে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কিছু কমে যায়। চীনপন্থী শিক্ষক ভিক্টর ম্যা (৪২) বলেন, ‘আমরা খুবই বিরক্ত। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আপনি হংকংয়ের বাসিন্দাদের জিম্মি হিসেবে আটকে রাখতে পারেন না। কারণ, লোকে কাজ করতে পারছে না। তাই আমরা বিক্ষোভকারীদের ওপর ক্ষুব্ধ।’
চীনের সরকারি সংবাদপত্র পিপলস ডেইলি গতকাল এক ভাষ্যে বলেছে, আন্দোলনকারীরা ব্যর্থ হবে। প্রথম পাতায় প্রকাশিত ভাষ্যে লেখা হয়, ‘কয়েক দিন ধরে কিছু মানুষ হংকংয়ে সমস্যা সৃষ্টি করছে। তারা সর্বজনীন ভোটাধিকারের দাবিতে অবৈধ সমাবেশের আয়োজন করছে। এ ধরনের আচরণ স্পষ্টতই মৌলিক আইন এবং আইনের শাসনের লঙ্ঘন। তারা ব্যর্থ হবে।’ হংকংয়ের অর্থসচিব জন সাং সতর্ক করে দিয়ে গতকাল বলেন, বাণিজ্যিক কেন্দ্রে বিক্ষোভ চলতে থাকলে এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হংকংয়ের অর্থনীতি স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী লিউং চুন-ইং তাঁর পদত্যাগের জন্য বিক্ষোভকারী ছাত্রদের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শেষ হওয়ার ঠিক আগে বলেন, তাঁর প্রধান সচিব ক্যারি লাম ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনার জন্য সাক্ষাৎ করবেন। বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ সন্দেহ করছেন, কর্তৃপক্ষ আলোচনার প্রস্তাবের মাধ্যমে সময়ক্ষেপণ করে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা কমে আসার জন্য অপেক্ষা করছে। চীনের তিব্বতে এবং শিনজিয়াংয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আন্দোলন করে আসছে। হংকংয়ের আন্দোলন সেগুলোর মতো নয়। তার পরও এই আন্দোলন সফল হলে মূল ভূখণ্ডেও অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে এ নিয়ে চীন উদ্বিগ্ন।
গণতন্ত্রের পথে হংকং
১৯৯৭: ১৯৮৪ সালের এক চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাজ্য হংকংকে চীনের কাছে ফিরিয়ে দেয়। চুক্তিতে ৫০ বছরের জন্য সেখানে ‘উচ্চমাত্রার স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রাখার কথা বলা হয়।
২০০৪ : চীন বলে, হংকংয়ের নির্বাচনী আইনে কোনো পরিবর্তন অবশ্যই তার অনুমোদন পেতে হবে৷
২০১৪ : জুলাই–আগস্ট মাসে গণতন্ত্রপন্থীরা একটি বেসরকারি গণভোটের আয়োজন করে। পক্ষ ও বিপক্ষ উভয় দলই বড় ধরনের সমাবেশের আয়োজন করে। ৩১ আগস্ট চীন ঘোষণা করে, ২০১৭ সালে হংকংয়ে প্রত্যক্ষ নির্বাচন করতে দেওয়া হবে। তবে প্রার্থীদের চীন অনুমোদন করবে।  ২২ সেপ্টেম্বর চীনের ঘোষণার প্রতিবাদে ছাত্রছাত্রীরা সপ্তাহব্যাপী ক্লাস বর্জন কর্মসূচি ঘোষণা করে। ২৮ সেপ্টেম্বর ২৮ ‘অকুপাই সেন্ট্রাল’ আন্দোলনকারী এবং ছাত্ররা যৌথভাবে হংকংয়ের কেন্দ্রস্থল দখল করে নেয়।
২০৪৭ :  হংকং নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে করা চীনের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে।

সর্বশেষ জনমত জরিপে এগিয়ে দিলমা রুসেফ

দিলমা রুসেফ ও মারিনা সিলভা
দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের প্রধান অর্থনীতির দেশ ব্রাজিলে আগামীকাল রোববার নির্বাচন। অর্থনৈতিক মন্দা ও সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও সর্বশেষ জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ। খবর এএফপির। গত বৃহস্পতিবারের জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রথম দফা ভোটে রুসেফ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী পরিবেশবাদী মারিনা সিলভার চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি ভোট পেতে যাচ্ছেন। এর আগে ডেটাফোলহা নামের একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা যায়, রুসেফ ৪৭ শতাংশ ও সিলভা ৪৩ শতাংশ ভোট পেতে যাচ্ছেন। এমনটি হলে নিয়ম অনুযায়ী ২৬ অক্টোবর দ্বিতীয় দফা ভোট হবে। বৃহস্পতিবারের জরিপে বলা হয়, দ্বিতীয় দফা ভোটেও রুসেফের জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি। কালকের ভোটে প্রেসিডেন্ট ছাড়াও ২৭ রাজ্যের গভর্নর ও ৫১৩ জন কংগ্রেসম্যান এবং এক হাজার ৬৯ জন আঞ্চলিক আইনপ্রণেতাকে নির্বাচিত করবেন ব্রাজিলের জনগণ। দিলমা রুসেফ ব্রাজিলের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট।
তিনি একজন সাবেক গেরিলা যোদ্ধা। ১৯৬৫-৮৫ সালে সামরিক শাসন চলাকালে তাঁকে কারাবন্দী রাখা হয়। এ কারণে জনগণের একটা বিরাট অংশ তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল। রুসেফের ওয়ার্কার্স পার্টির (পিটি) পূর্বসূরি সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচির কারণে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত পর্বের টেলিভিশন বিতর্কে রুসেফ দেশ পরিচালনায় সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা এবং সংস্কারের ব্যাপারে নিজের প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দেন। অন্যদিকে, সরকারের দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সিলভা। রুসেফের প্রতিদ্বন্দ্বী সিলভার জন্ম আমাজনের এক হতদরিদ্র পরিবারে। তিনি লুলার সরকারের পরিবেশমন্ত্রী ছিলেন। তখন দিলমা রুসেফ জ্বালানিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রেসিডেন্ট লুলা পরে তাঁকে উত্তরসূরি ঘোষণা করেন। লুলার জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন রুসেফ। তবে সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর জন্য বড় বাধা বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

এইডসের শুরু কিনশাসায়?

এইচআইভি-এইডস রোগীর প্রথম সন্ধান মেলে আফ্রিকার বর্তমান কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের রাজধানী কিনশাসা শহরে। আর ঘটনাটি ঘটে গত শতাব্দীর বিশের দশকে। বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল এ দাবি করেছেন। তাঁরা বলছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শারীরিক সম্পর্ক ও রেলপথের বিস্তারের কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতী রোগটি। খবর বিবিসির। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ও বেলজিয়ামের লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের দলটি সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এইডসের উৎপত্তি নিয়ে এ নতুন তথ্য তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, এইচআইভি-এইডসের সূত্রপাত হওয়ার এলাকা চিহ্নিত করতে বিজ্ঞানীরা ‘ভাইরাসের প্রত্নতত্ত্ব’ ব্যবহার করেন। তাঁরা আর্কাইভে রাখা এইচআইভির নানা নমুনার জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে এর উৎস খুঁজে পান। এইচআইভির ‘বংশলতিকা’ পুনর্গঠন করে এর ‘পূর্বপুরুষ’ খোঁজার চেষ্টা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা এইচআইভি-এইডস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণও খোঁজার চেষ্টা করেছেন। প্রতিবেদনে তাঁরা বলেছেন, যৌন-বাণিজ্য বেড়ে যাওয়া, দ্রুতগতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং হাসপাতাল-ক্লিনিকে একই সিরিঞ্জ দিয়ে একাধিক রোগীকে ইনজেকশন দেওয়াই সম্ভবত এইচআইভি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ। তাঁদের মতে, আরেকটি সম্ভাব্য কারণ ঔপনিবেশিক শাসক বেলজিয়ামের সহায়তায় স্থাপিত রেলপথ। ট্রেনে কিনশাসা শহর দিয়ে বিশের দশকে বছরে অন্তত ১০ লাখ মানুষ যাতায়াত করতেন। এটি আশপাশের অঞ্চলে এইচআইভি দ্রুত ছড়াতে ভূমিকা রেখেছে। আফ্রিকা মহাদেশে এইচআইভির দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও ঠিক কোথায় এর উৎপত্তি তা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। এ ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টা এখনো সফল হয়নি। তবে চিকিৎসায় উন্নতির কারণে এইডস রোগীদের তুলনামূলক সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময়সীমা অনেক বেড়েছে।