Wednesday, February 8, 2017

মোদির নোট বাতিল এবার আসল পরীক্ষার মুখে

গোটা রাজ্যে ভোটযুদ্ধটা ত্রিমুখী হলেও পশ্চিম উত্তর প্রদেশের এই জাঠভূমিতে চতুর্থ একটা শক্তিকে আজ পর্যন্ত কেউ কোনো দিন উপেক্ষা করতে পারেনি। এবারও তেমন করার ক্ষমতা কারও নেই। চতুর্থ সেই শক্তিকে এখনো যিনি চালিয়ে আসছেন, অদৃশ্য তিনি আজ বহুদিন। কৃষকনেতা চরণ সিং। ৩০ বছর আগে তিনি পরপারে চলে যান। যাওয়ার দুই বছর আগে অনেক বুঝিয়ে একমাত্র পুত্র অজিতকে মার্কিন মুলুক থেকে দেশে ফিরিয়ে আনেন।
কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ছেলেকে বলেছিলেন, তুমি না দেখলে এই সাম্রাজ্যের দেখভাল করবেটা কে? খড়্গপুর আইআইটি থেকে পাস করে বিদেশ চলে যাওয়া ছেলে অজিত সিং দেশে ফিরে লোকদলের হাল ধরার পর একদিন এই কাহিনি শুনিয়ে বলেছিলেন, ‘রাজনীতি করব না বলেই দেশ ছেড়েছিলাম। অথচ সেই রাজনীতি আমায় দেশে টেনে আনল! বাবার ডাক ফেরাতে পারলাম না।’ বাবা যা করেছিলেন, একমাত্র পুত্র জয়ন্তর সঙ্গেও ঠিক সেটাই করেন অজিত সিং। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে পড়িয়ে ছেলেকে দেশে এনে অজিত রাজ্যপাট তাঁরই হাতে সঁপে দিয়েছেন। এবার উত্তর প্রদেশের ভোটের প্রধান আকর্ষণ যদি হয় রাহুল-অখিলেশের যুব নেতৃত্ব, ৩৮ বছরের জয়ন্ত তাহলে সেই চরিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই। ৭৭ বছরের বাবার কাঁধ থেকে জোয়াল নিয়ে রাষ্ট্রীয় লোকদলকে প্রাসঙ্গিক রাখার দায়িত্বটা মথুরার এই সাবেক সাংসদই নিয়েছেন। একটা সময় ছিল যখন চরণ সিংয়ের ইশারা না পেলে এই তল্লাটের গাছের পাতাও নড়ত না। সেই সুদিন অজিত সিংও তাঁর আমলে কিছুকাল দেখেছেন। কিন্তু আজ বহুদিন হলো সেই বোলবোলা উধাও। ২০১২ সালে পশ্চিম উত্তর প্রদেশে ৪৬টা আসনে লড়ে অজিত-জয়ন্ত মাত্র নয়টায় জিততে পেরেছিলেন। আর তার দুই বছর পর লোকসভা ভোটে তো ঝাড়েবংশে শেষ।
সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে এবার মাথা তুলে তাঁরা দাঁড়াতে চাইছেন দুটি রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে গেছে বলেই। মিরাটে চরণ সিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ফতে সিং রানা ও বাগপতের সম্পন্ন চাষি নিশান্ত সিং সেই দুই রাজনৈতিক ঘটনার ব্যাখ্যা দিলেন এক ঢঙে। প্রথম ঘটনা মজফফরনগরের দাঙ্গা, যা জাঠ ও মুসলমানদের মধ্যে ঘটেছিল, দ্বিতীয় ঘটনা একেবারে লাগোয়া রাজ্য হরিয়ানায় জাঠদের জন্য সংরক্ষণের আন্দোলন। দুটি ক্ষেত্রেই জাঠদের রাগ শাসক দল বিজেপির ওপর। ফতে সিং রানার কথায়, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদিকে ঢালাও সমর্থন দেওয়া সত্ত্বেও রাজ্যের বিজেপি জনপ্রতিনিধিরা দাঙ্গা থামাতে এবং জাঠদের বিরুদ্ধে আক্রমণ রুখতে ব্যর্থ হন। একইভাবে সংরক্ষণের প্রশ্নে হরিয়ানার বিজেপি সরকারকে দিল্লির মোদি সরকার বিন্দুমাত্র সহায়তা করেনি। ফলে ভোটের মুখে হরিয়ানার জাঠেরা নতুন করে যে আন্দোলনে শামিল হয়েছে, তার ঢেউ পশ্চিম উত্তর প্রদেশের জাঠমননেও ছায়া ফেলেছে। বিজেপির পক্ষে এটা ভালো লক্ষণ নয়। দাঙ্গা ও সংরক্ষণের পাশাপাশি সর্বজনীন হয়ে গেছে যে সমস্যা, তার দায়ও পুরোপুরি নরেন্দ্র মোদির। সেই সমস্যা হলো নোটবন্দী, অর্থাৎ ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত। নোটবন্দীর মার কী রকম, বাগপতের রাষ্ট্রীয় লোকদল প্রার্থী কারতার সিং ভারানা তার একটা ছবি এঁকে দিলেন। তাঁর কথায়, ‘পরপর দুবছরের অসময়ের বৃষ্টিতে চাষবাসের যে ক্ষতিটা এবার পুষিয়ে নেওয়ার কথা চাষিরা ভেবেছিল, নোটবন্দী সেই গুড়ে বালি ঢেলে দেয়। অবস্থাটা একবার ভাবুন। মাঠে কাটার অপেক্ষায় খরিফ শস্য, আর বোনার অপেক্ষায় রবি ফসল। ঠিক এই মোক্ষম মুহূর্তটাতেই এল নোটবন্দী। না পারা গেল কৃষিশ্রমিকদের মজুরি দিতে, না পারা গেল খেতের ফসল মান্ডিতে নিয়ে যাওয়া। মান্ডির আড়তদারেরা চেক পেমেন্ট করল। ব্যাংকে হত্যে দিয়ে পড়ে থেকেও সময়মতো সেই চেক ভাঙানো গেল না। মজুরেরা বিহার ফিরে গেল। বলে গেল, হাল ফিরলে আসবে। জমি পড়েই থাকল। রবি ফসল বোনাই গেল না।’ কারতার সিং ভারানা জাতে গুজ্জর। অর্থাৎ গোয়ালা। অজিত-জয়ন্ত এই জাঠভূমিতে তাঁকে প্রার্থী করেছেন বাড়তি হিসেবে গুজ্জর ভোটের পাশাপাশি কিছু মুসলমান সমর্থনের আশায়। ঢালাও জাঠ সমর্থনে এবার সন্দেহ আছে বলেই বিজেপির প্রচারে ব্যাপকভাবে উঠে আসছে দাঙ্গাবৃত্তান্ত।
গোরক্ষপুরের সাংসদ যোগী আদিত্যনাথ, উন্নাওয়ের সাক্ষী মহারাজ ও পশ্চিম উত্তর প্রদেশের সারধানার বিধায়ক সংগীত সোমদের রেকর্ড করা ভাষণ দেদার বাজছে। সেই ভাষণের বাক্যে বাক্যে মুসলমানদের মোকাবিলায় হিন্দু জাগরণের সংকল্প ঝরে পড়ছে। আর্যাবর্তের ভোটে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রচেষ্টায় এ এক অতিপরিচিত দৃশ্য। বিজেপির রাজ্য নেতাদের এই রাজনীতি মুসলমান মেরুকরণের সহায়ক। বারবার সেটাই দেখে আসছে এই রাজ্য। ২০ শতাংশ সেই মুসলমানের মন জিততে একদিকে মায়াবতী অন্যদিকে অখিলেশ-রাহুল জুটি রাজ্য চষে ফেলছেন। কী করবে মুসলমান সমাজ? বাগপত থেকে মুজফফরনগর যেতে খাতৌলি থানার বাঙ্গেলা গ্রামের রহমত মসজিদের ইমাম মকসুদ আহমেদ সেই প্রশ্নের চমৎকার জবাব দিলেন। ‘আমাদের প্রথম পছন্দ অখিলেশ। রাহুল হাত বাড়াতে সেই পছন্দ আরও বেড়েছে। যেখানে জোটের প্রার্থী দুর্বল অথবা বদনামি, সেখানে মায়াবতীর প্রার্থী দ্বিতীয় পছন্দ।’ কিন্তু মায়াবতী তো মুসলমান মন জিততে উঠেপড়ে লেগেছেন? ইমাম সাহেব প্রশ্নটা শুনে একটু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘‘আর যাই হোক অখিলেশ ও রাহুল কখনো বিজেপির সঙ্গে হাত মেলাবেন না। বহেনজি মায়াবতী সম্পর্কে জোর দিয়ে এই কথাটা বলা যায় না। ওঁর অতীতটা একটু দেখে নিন।’ বিধানসভা ত্রিশঙ্কু হলে কী করবেন মায়াবতী, মুসলমান সমাজে রীতিমতো চর্চা তা নিয়েও। অতীতে তিনি বারবার বলেছেন, ক্ষমতালাভের জন্য কেউই অচ্ছ্যুত নয়। মায়াবতীর অতীতও তাঁর পরিচয়। সেই পরিচয়ই মুসলমান হৃদয়ে কিছুটা হলেও অখিলেশদের এগিয়ে রেখেছে।

প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ‘আইনসম্মত প্রয়োগ’

ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আইনি লড়াইয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আদালতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ‘আইনসম্মত প্রয়োগের’ পক্ষে যুক্তি দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতাবলে জারি করা বিতর্কিত ওই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আপিল আদালতে গতকাল মঙ্গলবারই (বাংলাদেশ সময় গভীর রাতে) শুনানি হওয়ার কথা ছিল।
জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থের যুক্তি দিয়ে হোয়াইট হাউস গত সোমবার ওই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করতে আদালতের প্রতি আবেদন জানায়। এর তিন দিন আগে ওয়াশিংটনের সিয়াটলের ফেডারেল আদালতের একজন বিচারক প্রথম স্থগিতাদেশ দিয়ে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা আটকে দেন। আলোচিত মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ লাগবে বলে মনে হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশের ওপর দেশব্যাপী আরোপিত স্থগিতাদেশকে ‘অতিমাত্রায় অসহযোগিতা’ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগের আইনজীবীরা চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। নতুন দুটি জনমত জরিপের ফল বলছে, বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিক শরণার্থী এবং মুসলিমপ্রধান সাতটি দেশের মানুষের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বিরোধী। এ নিষেধাজ্ঞার ফলে বিভিন্ন বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা ও অভিবাসন কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে নিন্দা শুরু হয়। তবে ট্রাম্প নিজ অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তিনি টুইটারে সোমবার লিখেছেন, ‘কট্টর ইসলামি সন্ত্রাসের হুমকি খুবই সত্যি, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলির দিকে তাকান। আদালতকে অবশ্যই দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে হবে!’ ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে সব ধরনের শরণার্থীর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ১২০ দিনের জন্য বন্ধ হয়ে পড়েছিল। পাশাপাশি ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ ৯০ দিনের জন্য আটকে যায়।
সমালোচকেরা বলছেন, এ রকম নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতিসহ মার্কিন স্বার্থেরই ক্ষতি হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুক্তি, বিদেশি সন্ত্রাসীদের হুমকি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বাঁচাতে নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য এই নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন। এ বিষয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার উদাহরণ দেন। যদিও ওই ঘটনায় নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত নয়টি দেশের কোনোটিরই সম্পর্ক ছিল না। সিয়াটলের আদালত গত শুক্রবার ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার পর বহু মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, ভিসাধারী ব্যক্তিরা ওই সাত দেশের নাগরিক হলেও যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত করতে পারবেন। তাঁদের কাগজপত্র ঠিক থাকলেই চলবে। ফেডারেল আদালতের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসন আপিল করেছিল। কিন্তু আপিল আদালত তা গত রোববার খারিজ করে দিয়েছেন। ওয়াশিংটন ও মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলরাও ওই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সাময়িক স্থগিতাদেশের আবেদন করে সফল হয়েছেন। পরে আরও ১৬টি অঙ্গরাজ্য এতে যোগ দিয়েছে। বেশ কয়েকটি আইনি ও অধিকার সংগঠন ওই অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

ইসরায়েলি বসতি স্থাপনে বৈধতা দিয়ে আইন পাস

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট গত সোমবার পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন নিয়ে একটি বিতর্কিত আইন পাস করেছে। এর ফলে সেখানকার অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলিদের জন্য নির্মিত মোট ৩ হাজার ৮০০ বাড়ি আইনি বৈধতা পেয়ে গেল। তবে আইনটি আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। নতুন আইন অনুযায়ী বসতি এলাকাগুলোর ফিলিস্তিনি জমির মালিকেরা আর্থিক ক্ষতিপূরণ অথবা বিকল্প জমি পাবেন। ইসরায়েল সরকার কয়েক সপ্তাহ ধরে বসতি স্থাপনের কার্যক্রমে বেশ জোর দিয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটেই বিতর্কিত আইনটি পার্লামেন্টে অনুমোদিত হলো। নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সমর্থন পেয়ে ইসরায়েল বসতি কার্যক্রম নতুন করে এগিয়ে নিতে চাইছে। তারা কয়েক হাজার নতুন বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। ট্রাম্প ইসরায়েলি বসতির ব্যাপারে তাঁর পূর্বসূরি বারাক ওবামার তুলনায় অনেক নমনীয় ভূমিকা নিয়েছেন। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের কড়া সমালোচক ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা। ফিলিস্তিনিদের মতে,
বিতর্কিত নতুন আইনটি শান্তির পরিপন্থী এবং তা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ ব্যাহত করবে। তবে ইসরায়েলি আইনটি বাস্তবায়ন সহজ হবে না। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেলই ইতিমধ্যে বলে দিয়েছেন, আইনটি অসাংবিধানিক এবং তিনি এর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে লড়বেন না। বসতিবিরোধী ইসরায়েলি পর্যবেক্ষক সংস্থা পিস নাও জানায়, নতুন আইন অনুযায়ী পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের সব বসতি এবং আনুষ্ঠানিক অনুমোদনবিহীন প্রায় ৫৩টি ঘাঁটি এলাকার বসতিগুলো বৈধতা পাবে। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইৎসহাক হেরজগ ওই আইনের নিন্দা জানিয়ে একে ‘ইসরায়েলের জন্য মারাত্মক বিপদ’ আখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, এই আইনের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফিলিস্তিনিরাও আইনটির নিন্দা জানিয়েছে। ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাসের মুখপাত্র নাবিল আবু রুদেইনেহ্ বলেন, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ আরও অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। নতুন আইনটি অগ্রহণযোগ্য। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেছেন, আইনটি আরব-ইসরায়েল শান্তির সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। ১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেওয়ার পর থেকে ইসরায়েলিরা সেখানে প্রায় ১৪০টি বসতি তৈরি করেছে।

‘কোনো শত্রুই ইরানকে অচল করতে পারবে না’

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, কোনো শত্রুই তাঁর দেশকে অচল করে দিতে পারবে না। সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাজধানী তেহরানে গতকাল মঙ্গলবার এক বৈঠকে এ কথা বলেন খামেনি। পরে তাঁর ওয়েবসাইট ওই বক্তব্য প্রকাশ করে। ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা খামেনি আরও বলেন, ট্রাম্প মার্কিন দুর্নীতির ‘আসল চেহারা’ দেখিয়ে দিয়েছেন।
এ জন্য তাঁকে ধন্যবাদ। নির্বাচনী প্রচারের সময় এবং পরে তিনি মার্কিন শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক এবং সামাজিক দুর্নীতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ইরান অন্তত ৩০ বছর ধরে এ কথা বলে আসছে। ট্রাম্প তেহরানকে ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা বন্ধ করতে বলেছেন। খামেনি তাঁর ‘হুমকির’ জবাব দিতে ইরানি জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইরানিরা আগামী শুক্রবার ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাব দেবে। ওই দিন দেশটির ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের বার্ষিকী। সাত মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর মার্কিন বিমানবন্দরে এক ইরানি শিশুর হাতকড়া পরানো ছবি প্রকাশিত হয়েছে। সে ঘটনার উল্লেখ করে খামেনি বলেন, তিনি (ট্রাম্প) পাঁচ বছর বয়সী একটা ছেলেকে হাতকড়া পরিয়ে মার্কিন মানবাধিকারের প্রকৃত তাৎপর্য প্রকাশ করে দিয়েছেন।
ইরান গত ২৯ জানুয়ারি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানোর পর ট্রাম্প একে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ আখ্যা দিয়ে দেশটির ওপর নতুন কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি গতকাল বলেছেন, ছয় পরাশক্তির সঙ্গে তেহরানের পারমাণবিক চুক্তি দুই পক্ষের স্বার্থই নিশ্চিত করে। ট্রাম্প একে যেভাবে বিশ্বশক্তির পরাজয় হিসেবে দেখছেন, তা ঠিক নয়। ওই চুক্তিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে রুহানি বলেন, নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওই চুক্তি পড়লেও তা মানতে পারছেন না। তিনি এটাকে ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ চুক্তি বলেছেন। উল্লেখ্য, নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি বাতিলের সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন।

‘আমার ছোট ছেলে একটা নির্বোধ’

গত সপ্তাহে কোনোভাবেই খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের ছোট ছেলে সেবাস্তিয়ান দুতার্তের। এতে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে প্রেসিডেন্ট দুতার্তে জনসমক্ষে দেওয়া ভাষণেই ছেলেকে ‘নির্বোধ’, ‘প্রেমিক পুরুষ’ আখ্যা দিয়ে ভর্ৎসনা করেছেন। আর তাতে ফিলিপাইনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা রীতিমত বিস্মিত। কয়েক দিন নিখোঁজ থাকার পর ফেসবুকে প্রেসিডেন্টপুত্র সেবাস্তিয়ান দুতার্তে লেখেন, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি একজনের বাসায় রয়েছেন। ‘নিখোঁজ’ ছেলেকে লজ্জা দিতে প্রেসিডেন্ট দুতার্তে যে উপায় বেছে নিয়েছেন তা দৃশ্যত পছন্দ হয়নি ফিলিপাইনের অনেক মানুষের। বেফাঁস কথাবার্তার জন্য তিনি এরই মধ্যে সুপরিচিত। কিন্তু ছেলের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে দেশের প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্যে এ ধরনের কথাবার্তা কতটা সংগত, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনায় মেতে উঠেছে অনেকেই। ফিলিপাইনের নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২৯ বছর বয়সী সেবাস্তিয়ান দুতার্তে গত সপ্তাহে ‘যোগাযোগের বাইরে’ ছিলেন। এর জের ধরে গত বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট দুতার্তে এক ভাষণে বলেন, ‘আমার ছোট ছেলে একটা নির্বোধ। সে এখন আর নিজের বাড়িতে ফেরে না।’ বড় দুই ভাইবোন সারা ও পাওলোর সঙ্গে তাঁর তুলনা করে দুতার্তে বলেন, 
অন্য সন্তানদের নিয়ে আমার কখনো অসুবিধা হয়নি। ওরা ঠিক আছে।’ উল্লেখ্য, সেবাস্তিয়ানের বড় ভাই ও বোন দুজনই পারিবারিক ‘শক্ত ঘাঁটি’ দাভাও শহরে রাজনীতি করেন। দুতার্তে দাভাও শহরেরই সাবেক মেয়র। তৃতীয় সন্তান সেবাস্তিয়ান দুতার্তের সঙ্গে বাবা রদ্রিগো দুতার্তের খারাপ সম্পর্কের খবর ফিলিপাইনিদের কাছে একদম নতুন নয়। কিন্তু তাঁরা অনলাইনে প্রশ্ন তুলছেন এই বলে যে, ব্যক্তিগত বিষয়ের ফয়সালা করতে প্রেসিডেন্ট কেন জনগণের উদ্দেশে দেওয়া বক্তৃতাকে বেছে নিলেন। প্রেসিডেন্ট দুতার্তে গতকাল মঙ্গলবারই পুলিশ নিয়ে এক বক্তব্য দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। তিনি বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মীদের বাসিলান দ্বীপের জঙ্গিবাদী সহিংসতাপ্রবণ এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে পাঠানো হবে। সেখানে না গেলে তাঁদের পদত্যাগ করতে হবে। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের প্রাঙ্গণে সার বেঁধে দাঁড় করানো ৪০০ পুলিশকে শুনিয়ে এ হুঁশিয়ারি দেন দুতার্তে। প্রেসিডেন্ট তাঁদের ‘বোকা’ ও ‘নির্বোধ’সহ অশিষ্টভাষায় গালি দেন। ওই ৪০০ পুলিশের সবাই অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত।

কৈলাস সত্যার্থীর নোবেল পুরস্কারের রেপ্লিকা চুরি

শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী ভারতীয় সমাজকর্মী কৈলাস সত্যার্থীর নোবেল পুরস্কারের রেপ্লিকা চুরি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে তাঁর নয়াদিল্লির বাসায় চুরি হয়। পুলিশের বরাতে অনলাইনের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। চোর বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসের সঙ্গে নোবেল পুরস্কারের প্রতিলিপিও নিয়ে যায়।
পুলিশ জানিয়েছে, বিধি অনুযায়ী কৈলাস সত্যার্থীর আসল নোবেল পুরস্কারটি রাষ্ট্রপতি ভবনে রাখা আছে। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। পুলিশের ধারণা, সত্যার্থীর নোবেল পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টি চোর হয়তো জানত। তবে তা যে প্রতিলিপি মাত্র, তা হয়তো বুঝতে পারেনি। আর ‘নোবেল পুরস্কার’ চুরির উদ্দেশ্যেই চোর ওই বাসায় হানা দিয়েছিল কি না, তাও নিশ্চিত নয় পুলিশ। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ। ইতিমধ্যে স্থানীয় অপরাধীসহ বেশ কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছে। ২০১৪ সালে পাকিস্তানের নারী শিক্ষা আন্দোলনকর্মী মালালা ইউসুফজাইয়ের সঙ্গে শান্তিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান ভারতের শিশু অধিকারকর্মী কৈলাস সত্যার্থী।

খোলা ম্যানহোলে ২২ বছরের সংসার

পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে। একদল সব পেয়েও অসুখী। আর আরেক দল কিছু না পেয়েও সুখী। দ্বিতীয় দলের মধ্যে পড়েন ‘কলম্বিয়ার এক দম্পতি’। এই দম্পতি ২২টি বছর ধরে ম্যানহোলে বসবাস করছেন। কিন্তু এরপরও জীবন নিয়ে তাঁদের নেই কোনো অভিযোগ! এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, কলম্বিয়ার মেডেলিনের রাস্তায় সাড়ে চার ফুট বাই ১০ ফুটের একটি ম্যানহোল। এর গভীরতা সাড়ে ছয় ফুট।
ম্যানহোলের ঢাকনাটা সারা বছরই থাকে খোলা। গত ২২ বছর ধরেই নর্দমার এই ম্যানহোলে বাস করে আসছেন মারিয়া গার্সিয়া ও তাঁর স্বামী মিগুয়েল রেস্ট্রেপো। পথচারীরাও জানেন, ওটা মারিয়া-মিগুয়েলের বাড়ি। বিলাসী জীবনযাপনের সামর্থ্য তাঁদের নেই, স্বপ্নও নেই। আর স্বপ্ন না থাকায় বছরের পর বছর এভাবে কাটিয়েও বেঁচে থাকা নিয়ে সন্তুষ্ট এই দম্পতি। ম্যানহোলের নিচেই এক জোড়া দম্পতির সুখ-স্বপ্নের সংসার। ঘুম থেকে উঠেই চোখ খুলে দেখেন গোল ছোট্ট আকাশ। আর শুরু হয় ম্যানহোলের নিচে তাঁদের সংসারের কাজ। এটাই দম্পতির ভালোবাসার ঠিকানা। ইন্টারনেট দুনিয়ায় এই দম্পতির খবর প্রকাশের পর রীতিমতো হইচই পড়ে যায়। মেডেলিনেই প্রথম পরিচয় হয় মারিয়া ও মিগুয়েলের। ওই সময় দুজনই ছিলেন মাদকাসক্ত। যে এলাকায় এ দুটো মানুষের ভালোবাসার শুরু হয়, ওই এলাকাটা সংঘর্ষ-সংঘাত ও মাদক পাচারের জন্য কুখ্যাত। ওই সময় রাস্তায় থাকতেন তাঁরা এবং মাদকের ছোবলে ধ্বংস হচ্ছিল তাঁদের জীবন। এরই মধ্যে পরস্পরের সান্নিধ্যে ভিন্নভাবে বাঁচার প্রেরণা খুঁজে পান দুজন এবং সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা মাদক ছেড়ে দেবেন। কিন্তু আশ্রয় দেওয়ার মতো দুজনের পরিবার-পরিজন কেউ ছিল না।
তাই ঘর বাঁধার জায়গা হিসেবে নর্দমার ম্যানহোলই বেছে নেন মারিয়া ও মিগুয়েল। এখানেই তাঁরা সম্পূর্ণভাবে মাদকের মরণ-নেশা থেকে বেরিয়ে আসেন। পেয়ে যান নতুন জীবনের সন্ধান। যাতায়াতের পথে শুকনো পরিত্যক্ত ম্যানহোলটা দেখেই পছন্দ হয়ে যায় দুজনের। মনে মনে ঠিক করে ফেলেন এই ম্যানহোলেই গড়ে তুলবেন নিজেদের সংসার। ম্যানহোলের ভেতরটা পরিষ্কার করে সেটাকেই থাকার উপযোগী করে তোলেন মারিয়া ও মিগুয়েল। ওই ম্যানহোলে মোটামুটি ভালোভাবে থাকার ব্যবস্থা করে নিয়েছেন মারিয়া-মিগুয়েল। জায়গা অনেক ছোট হলেও খুব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে বেশ আরাম-আয়েশেই আছেন তাঁরা। সেখানেই এই দম্পতির বিদ্যুৎ, টিভি, এমনকি ছোট্ট একটি রান্নাঘরও রয়েছে। উৎসব ও ছুটির দিনগুলোতে সুন্দর করে ঘরও সাজান তাঁরা। ওই ম্যানহোলেই তাঁদের সঙ্গেই থাকে পরিবারের আরও এক সদস্য—‘ব্ল্যাকি’ নামের পোষা এক কুকুর। মারিয়া বা মিগুয়েল কেউ না থাকলে ঘর পাহারা দেয় ‘ব্ল্যাকি’। এ ভাবেই বাকি জীবনটাও কাটিয়ে দিতে চান এই দম্পতি।

‘ডেট’ করছেন অ্যাসাঞ্জ-পামেলা

‘বেওয়াচ’ তারকা হিসেবেই সবাই চেনেন পামেলা অ্যান্ডারসনকে। বিনোদন জগতের নামীদামি এই তারকা আবারও আলোচনায় এসেছেন প্রেমের কারণে। সম্প্রতি গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, তিনি এখন প্রেম করছেন উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে। এরই মধ্যে গত চার মাসে পাঁচ পাঁচবার নাকি ডেট হয়েছে অ্যাসাঞ্জ ও পামেলার মধ্যে। কিছু ছবিও ছড়িয়ে পড়েছে টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। ডেইলি মেইল, মিররের খবরে বলা হয়েছে, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসে আছেন পাঁচ বছর ধরে। সম্প্রতি পামেলা অ্যান্ডারসন সেখানে গিয়ে দেখা করেছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে। খবরে দাবি করা হয়েছে, প্রেমের কারণেই নাকি পামেলা সেখানে গেছেন।
গত বছরের অক্টোবরের ১৫ তারিখ, নভেম্বরের ১৩ এবং ডিসেম্বরের ৭ ও ১২ তারিখ পামেলা ইকুয়েডর দূতাবাসে যান জুলিয়ানের সঙ্গে দেখা করতে। এ বছরের ২১ জানুয়ারি যখন পামেলা অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে দেখা করতে যান, তখন দুহাতের ব্যাগ ভর্তি ছিল খাদ্য ও উপহার সামগ্রীতে। এরপরই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে যে দুজনের মন দেওয়া-নেওয়া চলছে। বসয়ের চার বছরে ছোট জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ (৪৫) এবং পামেলার (৪৯) প্রেম নিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলো বেশ কিছু রসালো খবরও করেছে। এর আগে এ বছরের প্রথম দিকে অ্যাসাঞ্জকে ক্ষমা করার অনুরোধ জানিয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে চিঠি লেখেন পামেলা। কোনো কোনো গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পামেলা বলেছেন, উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা যা করেছেন, তা সত্যিই ভালো কাজ। একজন রাজনৈতিক ভাষ্যকার পেজ সিক্স ডটকম নামের একটি ওয়েবসাইটকে বলেন, ‘অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় পামেলাকে আবেদনময়ী পোশাক পরতে দেখা গেছে।’ মার্কিন টিভি সিরিজ ‘বেওয়াচ’-এ ‘সি জে পার্কার’ চরিত্রে অভিনয় করে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ওঠা পামেলা অ্যান্ডারসন টানা পাঁচ বছর ছিলেন ‘বেওয়াচ’ সিরিজের সঙ্গে।
২০০৭ সালের অক্টোবরে রিকের সঙ্গে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছিল পামেলার। কিন্তু মাত্র দুই মাস পর বিচ্ছেদের আবেদন করেন আবেদনময়ী এ তারকা অভিনেত্রী। ২০০৮ সালের মার্চে কাগজে-কলমে তাঁদের বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়। রিকের আগে মার্কিন সংগীতশিল্পী ও ড্রামার টমি লি এবং মার্কিন গায়ক ও অভিনেতা কিড রককে বিয়ে করেছিলেন পামেলা। এদিকে ২০১০ সালে কয়েক লাখ মার্কিন গোপন নথি ফাঁস করে সারা দুনিয়ায় হইচই ফেলে দেয় উইকিলিকস। কিছুদিন পর সুইডেনে অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে এক নারী ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। ওই মামলায় বিচারের জন্য যুক্তরাজ্য সরকার ২০১০ সালে তাঁকে সুইডেনের কাছে হস্তান্তর করতে যাচ্ছিল। প্রত্যর্পণ এড়াতে ২০১২ সালের জুনে লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় নেন অ্যাসাঞ্জ। সেই সময় থেকে অ্যাসাঞ্জ সেখানেই আছেন।

নূর হোসেন-আরিফের আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ

নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলায় দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন ও র‍্যাব-১১-এর সাবেক কর্মকর্তা আরিফ হোসেনের করা চারটি আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বুধবার এই আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। পাশাপাশি নূর হোসেন ও আরিফের জরিমানার আদেশ স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁদের আইনজীবী এস আর এম লুৎফর রহমান আকন্দ। পরে লুৎফর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শুনানির জন্য আপিল গ্রহণ করেছেন আদালত।
আদালত বলেছেন, আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের ওপর একসঙ্গে শুনানি হবে। আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দুজনের জরিমানার আদেশ আদালত স্থগিত করেছেন বলে উল্লেখ করেন আইনজীবী লুৎফর রহমান। ১৬ জানুয়ারি সাত খুন মামলার রায় ঘোষণা করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ। রায়ে ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। আর নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাত খুনের ঘটনায় করা দুই মামলার বিচারিক আদালতের রায়ের কপি ও নথিপত্র হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।

সোনারগাঁয়ে ট্রাক খাদে, নিহত ৪

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ট্রাক খাদে পড়ে গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাতে চারজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছে। উপজেলার আষাঢ়িয়ারচর গ্রামে মালবাহী ট্রাকের চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাকটি পার্শ্ববর্তী খাদে পড়ে হতাহত হওয়ার এই ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,
আল মোস্তফা প্যাকেজিং নামের একটি শিল্পকারখানার কাগজবোঝাই ট্রাক দিবাগত রাত তিনটার দিকে আষাঢ়িয়ারচর গ্রামের ভেতরের নির্মাণাধীন সরু সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় পার্শ্ববর্তী খাদে পড়ে যায়। এ সময় মালামালের ভেতরে আটকা পড়ে ট্রাকের শ্রমিক মাদারীপুরের কেন্দুয়া গ্রামের অপু হাওলাদার (২২) ও ওবায়দুল্লাহ (৩৬), পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার ওলানিয়া গ্রামের আবু তাহের (২০) ও রাঙাবালী গ্রামের মোশারফ হোসেন (৩০) ঘটনাস্থলেই মারা যান। রাতেই পুলিশের সহযোগিতায় গ্রামবাসী মালের ভেতর থেকে লাশ টেনে বের করে আনেন। পরে লাশের ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ওবায়দুল হক বলেন, ট্রাকটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। ট্রাকের চালক পলাতক রয়েছেন। এ ব্যাপারে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

চিংড়ি ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় শেখ ফজলুর রহমান (৪২) নামের এক চিংড়ি ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। আজ বুধবার সকাল আটটার দিকে উপজেলার ভুরুলিয়া ইউনিয়নের মাজাট গ্রামে নিজ বাড়ির পাশের একটি গাছ থেকে ফজলুর রহমানের ঝুলন্ত লাশটি উদ্ধার করা হয়। তিনি ওই ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য শেখ আবদুল আজিজের ছেলে। নিহত ব্যক্তির স্ত্রী হাবিবা সিদ্দিকা বলেন, গত শনিবার স্বামী শেখ ফজলুর রহমানকে কে বা কারা হত্যার হুমকি দিয়ে বাড়িতে একটি চিরকুট পাঠিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। আজ ভোরে বাড়ির পাশে চিংড়িঘের এলাকার একটি নিমগাছে তাঁর ঝুলন্ত লাশ দেখতে পাওয়া যায়। পরে স্থানীয় লোকজন খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে। শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চিংড়ি ব্যবসায়ী শেখ ফজলুর রহমানের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এটা আত্মহত্যা, না হত্যা, তদন্তের পর এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

আমি জনতার মঞ্চে ছিলাম না: নুরুল হুদা

নবনিযুক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মোহাম্মদ নুরুল হুদাকে ২০০১ সালে বিএনপি বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছিল। বিএনপি সূত্র যদিও বলেছে, জনতার মঞ্চের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। প্রথম আলোকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে এই কর্মকর্তা সেই অভিযোগ খণ্ডন করেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘আমি তখন কুমিল্লার ডিসি ছিলাম। আমি জনতার মঞ্চে যোগ দিইনি এবং বিএনপিও সেই অভিযোগ আনেনি। চাকরিতে ২৫ বছর হলে কোনো কারণ না দেখিয়ে কাউকে অবসর দেওয়া যায়। কিন্তু আমি তার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করেছি। আদালতের রায়ে চাকরি ফিরে পেয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি পেছনের দিকে তাকাতে চাই না। কারও প্রতি রাগ বা অনুরাগের বশবর্তী হব না। আমি নিরপেক্ষভাবে আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকব।’
প্রথম আলো: জনতার মঞ্চ এবং বিএনপির প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী? বিএনপির একটি সূত্র বলেছে, জনতার মঞ্চে আপনার সম্পৃক্ততা ছিল।
খান মোহাম্মদ নুরুল হুদা: বিএনপি কিছু বলেছে? আমি শুনিনি।
প্রথম আলো: সাবেক সচিব ও প্রাক্তন বিএনপি নেতা মোফাজ্জল করিম দাবি করেছেন, জনতার মঞ্চের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণেই তাঁরা আপনার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।
নুরুল হুদা: জনতার মঞ্চে আমি ছিলাম না। আমি ছিলাম কুমিল্লার ডেপুটি কমিশনার (ডিসি)। আর জনতা মঞ্চ ছিল ঢাকায়। সুতরাং, কুমিল্লার ডিসি হয়ে ঢাকায় অংশগ্রহণের প্রশ্ন আসে না।
প্রথম আলো: জনতার মঞ্চ যখন ঢাকায় চলছিল, তখন কুমিল্লায় ডিসি অফিস থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছবি নামানোর ঘটনা ঘটেছিল। সেটা ঠিক?
নুরুল হুদা: এ রকমের একটি ঘটনা ঘটেছিল বলে আমি শুনেছিলাম। ডিসি চলে আসার পরে রাতে একটি দপ্তরে যদি কিছু ঘটে, তা ডিসির জানার কথা নয়। কারণ, ডিসি রাতে অফিসে থাকেন না। তখনকার দিনে কে নামিয়েছে বা নামায়নি, তা আমি জানি না।
প্রথম আলো: বিএনপি আপনাকে কী অভিযোগে চাকরিচ্যুত করেছিল?
নুরুল হুদা: চাকরিচ্যুত নয়, তারা আমাকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছিল। তার আমি কোনো কারণ জানি না। কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ যদি ২৫ বছর পূর্ণ হয়, তাহলে তাঁকে অবসর দিতে পারে। এ জন্য কারণ দেখাতে হয় না।
প্রথম আলো: আপনি তখন কী পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন?
নুরুল হুদা: তখন ছিলাম ঢাকা সিটি করপোরেশনের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার।
প্রথম আলো: ওই পদ থাকার আগে আপনি ঢাকায় আর কী পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন?
নুরুল হুদা: নন-ফরমাল এডুকেশনে পরিচালক ছিলাম প্রায় দুই বছর। দুই বছরের বেশি সংসদ সচিবালয়ে যুগ্ম সচিব ছিলাম। এরপর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব ছিলাম অনেক দিন, স্থানীয় সরকারের একটি প্রকল্পে ঢাকা ডেপুটি ডিরেক্টর অব লোকাল গভর্নমেন্ট, ঢাকা বিভাগের ১৬ জেলার পরিচালক ছিলাম।
প্রথম আলো: যখন আপনি বাধ্যতামূলক অবসরে আসেন, তখন আপনার পদবি কী ছিল?
নুরুল হুদা: যুগ্ম সচিব।
প্রথম আলো: আপনি কোন সালে চাকরিতে পুনর্বহাল হয়েছিলেন?
নুরুল হুদা: ২০০৮-০৯ সালে।
প্রথম আলো: তাহলে কি আওয়ামী লীগ সরকার এসে আপনাকে পুনর্বহাল করেছে?
নুরুল হুদা: ঠিক সেভাবে বলা যাবে না। কারণ, আদালতের রায়ের কারণে আমি চাকরি ফিরে পেয়েছি। আদালতের রায় ছিল, ভূতাপেক্ষভাবে সব সুযোগ-সুবিধা, পদমর্যাদাসহ আমাকে চাকরি ফিরিয়ে দিতে হবে।
প্রথম আলো: আপনি কি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন?
নুরুল হুদা: না।
প্রথম আলো: তাহলে কি অতিরিক্ত সচিব ও সচিব এই দুই পদমর্যাদাই ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর হয়েছিল?
নুরুল হুদা: ঠিক তাই।
প্রথম আলো: ২০০১ সালের পর আপনি আর নিয়মিত চাকরিতে ফেরেননি?
নুরুল হুদা: না, আর ফিরে যাইনি।
প্রথম আলো: অবসরজীবনে এসে কিছু করেছেন কি? বর্তমান সরকারের সময়ে আপনি কী কাজ করেছেন?
নুরুল হুদা: অনেক কিছু করেছি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলাম পাঁচ বছর। এর আগে প্রায় তিন বছর বেসরকারি জেমকন গ্রুপের পরিচালক ছিলাম। কাজী শাহেদ আহমেদের জেমকন গ্রুপে। নর্থ ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির চেয়ারম্যান ছিলাম। এটাও সরকারি—২০১০ পর্যন্ত ছিলাম।
প্রথম আলো: সর্বশেষ কী করছিলেন?
নুরুল হুদা: কনসালট্যান্সি করছিলাম ২০১৫ সাল থেকে। আরবান ডেভেলপমেন্ট, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে।
প্রথম আলো: আপনি কি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন? ৭১-এর ১৮ নভেম্বর পটুয়াখালীর গলাচিপার পানপট্টিতে?
নুরুল হুদা: হ্যাঁ, আমি ওই যুদ্ধের কমান্ডার ছিলাম। হতাহতের সংখ্যা সঠিক মনে নেই। তবে কেউ কেউ বলেন, পাঁচ-ছয়জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছিল।
প্রথম আলো: আরেকটি বিষয়, আপনি যে ভূতাপেক্ষভাবে চাকরি পেলেন, সেটা কি প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল না সুপ্রিম কোর্টের রায়ে?
নুরুল হুদা: এখানে দুই আদালতেরই সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে আমার মামলাটি নির্দিষ্ট করে বললে, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে নিষ্পত্তি হয়েছে। আমার আগে হাতেম আলী খান নামের এক ভদ্রলোকের মামলার রায়, যেটা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল দিয়েছিলেন, তা সুপ্রিম কোর্ট বহাল রাখেন। সে কারণেই আমাদেরগুলো যেহেতু একই মেরিটের (বৈশিষ্ট্যপূর্ণ) মামলা, তাই আমাদেরগুলো আর সুপ্রিম কোর্টে যায়নি।
প্রথম আলো: তাহলে হাতেম আলী খান বনাম সরকার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, তার আলোকে আপনি চাকরি ফিরে পেয়েছেন?
নুরুল হুদা: হ্যাঁ। এই মামলার রায়ের পর আমার মামলার রায়ের বিষয়ে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে সরকার আপিলে যায়নি। ওই রায়ের আলোকেই আমাদের চাকরি ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
প্রথম আলো: এ রায় কোন সালে হয়েছিল? হাতেম আলী খান কি বেঁচে আছেন?
নুরুল হুদা: সম্ভবত ২০০৯ সালে। না, তিনি মারা গেছেন। তিনিও যুগ্ম সচিব ছিলেন। এবং সচিব হিসেবে অবসরে এসেছেন।
প্রথম আলো: তিনি কি জনতার মঞ্চের কারণে বাধ্যতামূলক অবসরে গিয়েছিলেন?
নুরুল হুদা: আমি ঠিক তাঁর বিষয়টি জানি না। এ রকমই হয়তো ‘পলিটিক্যালি মোটিভেটেড’ ম্যাটার ছিল।
প্রথম আলো: তাহলে জনতার মঞ্চে আপনার উপস্থিতির তথ্য সম্পূর্ণ অসত্য?
নুরুল হুদা: অবশ্যই। (হেসে) কীভাবে তা সম্ভব? আমি তো তখন কুমিল্লার ফুলটাইম ডিসি ছিলাম। আমি ফরিদপুরের ডিসি ছিলাম ১৯৯২-৯৫ সময়ে। কুমিল্লায় ছিলাম ১৯৯৫-৯৭ পর্যন্ত।
প্রথম আলো: আওয়ামী লীগ বা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আপনার জীবনে কখনো কি কোনো সংশ্লিষ্টতা ঘটেছিল?
নুরুল হুদা: না। আমি কোনো পার্টির কোনো সদস্য নই। দলের সঙ্গে কোনো অ্যাফিলিয়েশন নেই। কোনো দলের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
প্রথম আলো: আপনার পড়াশোনা? ছাত্ররাজনীতি?
নুরুল হুদা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানে। অনার্সে ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৬৬ সালে। মাস্টার্স শেষ হয়েছিল ১৯৭২ সালে। ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ছিল। তখন কোনো না কোনো ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সবাই যুক্ত থাকতেন। আমি ছিলাম ফজলুল হক হল ইউনিয়নের ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচিত নাট্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক।
প্রথম আলো: এরপর?
নুরুল হুদা: ১৯৭২ সালে আমি পিএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হই। ১৯৭৩ সালে চাকরি হয়। এরপর আর রাজনীতিতে আসার সুযোগ কোথায়?
প্রথম আলো: সর্বশেষ মন্তব্য?
নুরুল হুদা: আমি অতীত ভুলে যেতে চাই। নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে চাই। বিএনপি কী করেছে বা করবে? আওয়ামী লীগ কী করবে বা করবে না, তা আমার কাছে একেবারেই বিবেচ্য বিষয় নয়। একটা বিষয় খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই, কোনো দলের ওপরই আমার কোনো মান-অভিমান বা ক্ষোভ কোনো কিছুই নেই।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
নুরুল হুদা: ধন্যবাদ।

নতুন কমিশন কতটা নতুন?

নির্ধারিত সময়ের আগেই অনুসন্ধান কমিটি নির্বাচন কমিশনের জন্য ১০টি নাম রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দিয়েছে এবং রাষ্ট্রপতি তাঁদের মধ্য থেকে পাঁচজনকে নিয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এই প্রথমবারের মতো কমিশনার পদে একজন নারী নিয়োগ পেয়েছেন। এটাই অনুসন্ধান কমিটির একমাত্র কৃতিত্ব নয়। তারা আমাদের রাজনীতিতে যে বিদ্বেষ-বৈরিতা ও অসুস্থ বাদানুবাদ চলে আসছিল, তাকে আপাতত আলোচনার সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। যদিও রাষ্ট্রপতির উদ্যোগেই এই আলোচনার সূচনা হয়। অনুসন্ধান কমিটি নির্বাচন কমিশনের ৫টি পদের বিপরীতে যে ১০ জন নাগরিকের নাম প্রস্তাব করেছে; তাঁরাই শ্রেষ্ঠ—সে কথা বলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কেউ কেউ নিক্তি মেপে তাঁদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নাগরিক খুঁজেও পেতে পারেন। তবে একটি আস্থাভাজন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ তথা সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন জরুরি, সেই বিষয়টি অনুসন্ধান কমিটি যে উপলব্ধি করেছিল, সে জন্য তারা ধন্যবাদ পেতে পারে। প্রথমে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি কমিটি সম্পর্কে বিরাগভাজন থাকলেও পরে সীমিত আস্থা রাখার কথা বলেছে। অনুসন্ধান কমিটি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নাম চাওয়ার পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। ব্যক্তিগতভাবেও অনেকের মতামত নিয়েছে। শুরু থেকে অনুসন্ধান কমিটি তাদের প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রমাণের চেষ্টা করলেও শেষ মুহূর্তে কিছুটা তড়িঘড়ি করেছে বলেই অনেকের ধারণা।
অনুসন্ধান কমিটি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত আলোচনা চালাতে পারত এবং রাষ্ট্রপতির কাছে নাম জমা দেওয়ার আগে গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে পারত। কিন্তু এ ব্যাপারে অনুসন্ধান কমিটির যুক্তি হলো, যত বিলম্ব হতো, বিতর্ক বাড়ত। আর যেহেতু রাষ্ট্রপতির কাছে নাম জমা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের প্রস্তাবিত এবং রাষ্ট্রপতির গৃহীত নাম প্রকাশ করা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে আগেভাগে না জানানোর মধ্যে দোষের কিছু দেখছে না। তাদের আরেকটি যুক্তি হলো, আগেভাগে নাম প্রকাশ করা হলে শত তদবিরের দেশে কোনো না কোনো পক্ষ থেকে যে তদবির চালানো হতো না, তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। পক্ষে-বিপক্ষে দুই যুক্তিই আছে। অনুসন্ধান কমিটির পুরো প্রক্রিয়ায় সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মন্ত্রিপরিষদ সচিব গণমাধ্যমকে বলেছেন, কমিটি রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া তালিকা থেকেই ১০টি নাম বাছাই করেছে। সেটি ভালো হয়েছে না মন্দ হয়েছে, সেই বিচার না করেও এর পক্ষে যুক্তি হলো, যেহেতু রাজনৈতিক দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই আলোচনার উদ্যোগ এবং আইনের বিকল্প হিসেবে অনুসন্ধান কমিটি গঠন, সেহেতু দলগুলোর আস্থা অর্জন ছিল জরুরি। এমনকি যেসব রাজনৈতিক দল নাম দিয়েছে, তারাও নিজ নিজ জোটে কথাবার্তা বলে সমতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের তালিকা থেকে একজন ও বিএনপির তালিকা থেকে একজন করে কমিশনার নেওয়া হয়েছে। সিইসি পদে বড় দুই দলের কারও নাম না নেওয়াটা সার্চ কমিটির জন্য খুবই বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছে। তারা যদি দুই প্রধান দলের দেওয়া দুটি নামই রাষ্ট্রপতির কাছে দাখিল করত এবং রাষ্ট্রপতি যেকোনো একটি গ্রহণ করতেন, তখন আরও বেশি বিতর্ক হতো।  অনুসন্ধান কমিটির কাজ নিয়ে আমরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে পারি। কঠিন সমালোচনাও তুলতে পারি। কিন্তু দেখার বিষয় তারা যা করেছে, এর বাইরে কী করত পারত? অনেকেই বলেছিলেন, অনুসন্ধান বা যে কমিটিই গঠন করা হোক না কেন, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত নেবেন এবং সরকার যাঁদের পছন্দ করে, তাঁরাই নিয়োগ পাবেন। তর্কের খাতিরে যদি তাঁদের যুক্তি সঠিক ধরে নিই এবং সার্চ কমিটির সদস্যদের প্রতি ন্যূনতম আস্থা থাকে, তাহলে মেনে নিতে হবে যে সার্চ কমিটি সরকারের সেই ইচ্ছেকে ১০টি নামের মধ্যে সীমিত করতে পেরেছে। বিএনপির দেওয়া তালিকা থেকে একজন কমিশনার নেওয়াও প্রমাণ করে না যে সবকিছু সরকারের ইচ্ছেমাফিক হয়েছে। অনেকেই সংবিধানের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নেই বলে সবক দিচ্ছেন। ক্ষমতা না থাকার পরও কিন্তু তিনি অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমেই নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন, সার্চ কমিটির পরামর্শ নিয়েই নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। অনুসন্ধান কমিটির দায়িত্ব ছিল নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য ১০টি নাম পাঠানো। সেই কাজ তারা করেছে। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছিল নির্বাচন কমিশন গঠন করার। তিনিও তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন সরকারের যে দায়িত্ব সেই কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কর্তব্য আইনের সীমারেখা মেনে চলা।  সে ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। না করলে পাঁচজন ‘দেবদূত’  দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করলেও তারা একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারবে না।
একই নির্বাচন কমিশনের অধীনে কিন্তু নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়েছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ওপর সব দায় না চাপিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে একবার আয়নায় নিজেদের মুখ দেখতে বলব। এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে গত পাঁচ বছরে রকিব কমিশন যত অন্যায় ও অপকর্ম করেছে, তা অগ্রাহ্য করব। তাদের ভুল ও অন্যায় থেকে নতুন নির্বাচন কমিশনকে শিক্ষা নিতে হবে। একটি নির্বাচন কমিশন যতই সৎ ও শক্তিশালী হোক না কেন, রাজনৈতিক দল ও সরকার না চাইলে তারা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবে না। অতীতে পারেনি। ভবিষ্যতেও না। দুই অনুসন্ধান কমিটির গঠন প্রক্রিয়া এক হলেও দ্বিতীয়টি অনেকটা স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করেছে। তাদের প্রতিটি বৈঠক ও পদক্ষেপের কথা জনগণকে জানানো হয়েছে। জনগণের কাছ থেকেও তারা মতামত নিয়েছে। আগের মতো বিরোধী দল অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশে গঠিত নির্বাচন কমিশনকে সরাসরি নাকচ করেনি। আশা করি, তারা এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না, যাতে এই কমিশনের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার পথটিই রুদ্ধ হয়ে যায়। একইভাবে সরকারি দলকেও নিজের দায়িত্বের কথা ভুললে চলবে না। নির্বাচন কমিশন নিজে বিতর্কিত হয় না, তাকে বিতর্কিত করে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল। অতীতে একটি মাগুরা উপনির্বাচন যদি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা অনিবার্য করে তুলতে পারে,
ভবিষ্যতে এক বা একাধিক মাগুরা করে পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব না–ও হতে পারে। এবারে যাঁদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন হলো তাঁদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগামী নির্বাচন। সেই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে বলে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব জানিয়েছেন। কিন্তু অংশগ্রহণমূলক হলেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় না। আর ৫ জানুয়ারির কিংবা ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো একতরফা নির্বাচন হলে তো নির্বাচন কমিশনেরই প্রয়োজন হবে না। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে হলে সরকার, প্রশাসন, সেই নৈতিক দল ও প্রার্থীদের নিজ নিজ সীমারেখার মধ্য থেকে কাজ করতে হবে, যেমনটি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হয়েছে। তার আগে উপজেলা পরিষদ কিংবা পৌরসভা নির্বাচনগুলোও অংশগ্রহণমূলক ছিল। কিন্তু শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ছিল না। নির্বাচনের প্রধান নিয়ামক জনগণ, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী নন। প্রশ্ন হলো সেই জনগণকে তার অধিকার প্রয়োগ করতে দেওয়া হবে কি না। দেওয়া হলে কী হয়, তা আমরা ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেখেছি। রাজনৈতিক নেতারা সভামঞ্চে জোরগলায় বলেও থাকেন, জনগণই ক্ষমতার মালিক। কিন্তু তাঁরা সেটি মানেন না। তাঁদের কথা ও কাজে প্রায়ই মিল পাওয়া যায়নি। বিরোধী দলে থাকতে যাঁরা নিরপেক্ষ ও স্বাধীন কমিশনের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত, ক্ষমতায় গেলে তাঁরাই সেই কমিশনকে ‘গৃহপালিত’ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। আইনকে নিজের স্বার্থে ও সুবিধায় ব্যবহার করেন।
৪৫ বছর ধরেই গণতন্ত্রের নামে এই অপসংস্কৃতি চলে আসছে। অনুসন্ধান কমিটির দেওয়া ১০টি নামের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি ৫টি নাম বাছাই করেছেন। তাঁদের মধ্যে দু-একজনের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ও জানাশোনা সূত্রে বলতে পারি, অনুসন্ধান কমিটি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। আর রাষ্ট্রপতিও এ তালিকার বাইরে যাননি। তাঁদের অতীত ভূমিকা নিয়ে কেউ কেউ ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, তবে সেই বিতর্ক বাদ দিয়ে আমাদের কর্তব্য হবে, তাঁরা কী করেন, সেটি দেখা। এখনই চূড়ান্ত রায় না দেওয়া। রাজনৈতিক দলগুলো এক-দেড় মাস ধরে যেভাবে ধৈর্য ও বিচক্ষণতার প্রমাণ দিয়েছে, সমালোচনা করলেও মাত্রা ছাড়ায়নি; ভবিষ্যতেও সেই ধারা বজায় রাখবে আশা করি। তারা এত দিন রাষ্ট্রপতির ওপর যে আস্থা রেখেছে, এখন থেকে নির্বাচন কমিশনের ওপরও অনুরূপ আস্থা রাখবে আশা করি। আর নির্বাচন কমিশন যাতে সেই আস্থা ও বিশ্বাসের আমানত খেয়ানত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সজাগ থাকতে হবে। বিদায়ী নির্বাচন কমিশন আলোচনাকে ভয় পেত বলেই তাদের ওপর রাজনৈতিক দল ও জনগণের আস্থা শূন্যে নেমে এসেছিল। নতুন নির্বাচন কমিশন আলোচনার দরজাটি বন্ধ করবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

মুক্ত বিশ্বের নেতা নিজেকে আবদ্ধ করছেন কেন?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক ক্ষেত্রেই মুক্ত বিশ্বের নেতা বলা হয়। দেশটির আয়তন, জনসংখ্যা, প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ, সমরশক্তি ও সর্বোপরি বিশাল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য এ নেতৃত্ব দেশটির ওপর বর্তায়। সে দেশে নতুন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নিয়ে তাঁর নিকট প্রতিবেশী মেক্সিকো সীমান্তে উঁচু ও দুর্ভেদ্য দেয়াল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে তিনি অবগুণ্ঠনের আড়াল করে ফেলছেন তাঁর নিজ দেশটিকেও। আকাশে দেয়াল দেওয়া যায় না। বিমানযোগে আসা যাত্রীদেরও সে দেশের ইমিগ্রেশনের বেড়াজাল আটকে দিচ্ছে। ভিসা নিষিদ্ধ করেছেন কয়েকটি বিশেষ দেশের নাগরিকদের। এমনকি সে দেশগুলোতে ইতিপূর্বে যাঁদের ভিসা দেওয়া হয়েছিল, তা-ও বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন। গ্রিন কার্ডধারী ব্যক্তিরাও অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে প্রবল বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। অবশ্য আদালতের নির্দেশে এসব বাধা কিছুটা কাটছে।
তবে প্রেসিডেন্ট আদালতকেও সমালোচনা করে নতুন ব্যবস্থার ফন্দি আঁটছেন। শরণার্থী প্রবেশ করা নিষিদ্ধ হয়েছে। অবশ্য বলছেন, সেটা সাময়িক। অভিবাসীদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ভুলে গেছেন তাঁর পূর্বপুরুষও ছিলেন অভিবাসী। আর বর্তমান ফার্স্ট লেডিও তা-ই। জন্ম স্লোভেনিয়ায়। ট্রাম্পের সঙ্গে বিয়ের এক বছর পর ২০০৬ সালে পান নাগরিকত্ব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত ছিল রেড ইন্ডিয়ানদের দেশ। ইউরোপীয় অভিবাসীরা তাদের মেরে-কেটে এক কোণে তাড়িয়ে নিজেরা বসতি স্থাপন করেছেন। পরে আফ্রিকা থেকে লোক ধরে এনে কৃষি ও শিল্পে শ্রমিকের কাজে লাগান। আরও পরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অভিবাসীরা গিয়ে সে দেশের সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে করেছেন সমৃদ্ধ। ওই দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হবে সারা পৃথিবীর ভাগ্যহত মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। অবশ্য ধীরে ধীরে অভিবাসীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আসতে থাকে। তবে অতীতে এরূপ বিভেদের দেয়াল তোলা হয়নি জলে, স্থলে ও অন্তরিক্ষে। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে বিশ্বের দেশগুলো মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন ছিল এ বিভক্তির ভিত্তি। অবশ্য জোটনিরপেক্ষ বলে একটি তৃতীয় ধারা থাকলেও কার্যত তাদের অনেকেই এ দুটো মূল ধারায় কোনো কোনোটির সঙ্গে বিশেষ সংযোগ ছিল। পুঁজিবাদী শিবির বলত, প্রণোদনা না থাকলে উৎপাদন ও সমৃদ্ধি হয় না। অন্যদিকে বাক্‌স্বাধীনতাসহ মৌলিক অধিকারের প্রতি তারা বিশ্বস্ত এবং প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চর্চা করে।
পুঁজিবাদী শিবির নিজদের পরিচয় দেয় মুক্ত বিশ্ব বলে। ওই সব দেশে বাক্‌স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশের অধিকারসহ বিতর্কহীন ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে বলে তারা এমনটা দাবি করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সমাজ মানবাধিকার প্রশ্নে সচেতন। তবে ভিন্ন চরিত্রের লোকও সেখানে কম নয়। কৃষ্ণাঙ্গদের সমান অধিকার পেতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। অবশ্য সে পথযাত্রায় সজ্জন শ্বেতাঙ্গরাও সহযাত্রী ছিলেন। দাসপ্রথা উচ্ছেদ করতে গৃহযুদ্ধ মোকাবিলা করে দেশটি। সে অমানবিক ব্যবস্থা রদ করার অল্প পরেই এর উদ্যোক্তা প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন নিহত হন আততায়ীর গুলিতে। তবে সেখানে সরকার সময়ে-সময়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের পক্ষাবলম্বন করে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়েও এমনটা হয়েছিল। তবে বলতে গেলে সে দেশটির গণমাধ্যম, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিরতিহীন সমর্থন জানাতে থাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রতি। কখনো কখনো সে দেশের সরকার অন্য দেশে সরকারের পতন ঘটায়, উসকানি দেয় গৃহযুদ্ধের, সংশ্লিষ্ট থাকে কোনো কোনো নেতাকে হত্যায়—এমন অভিযোগ রয়েছে। আবার এ দেশটির মানবতাবাদী মানুষগুলো প্রতিবাদী হন এ ধরনের অনাচারে।
অন্য দেশেও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে সোচ্চার হন তাঁরা। ক্ষেত্রবিশেষে মার্কিন সরকারও এরূপ ভূমিকায় থাকে। তবে দেশ ও কালভেদে তাদের সরকারকে অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী ভূমিকায় দেখা যায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণাতেই মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য দিচ্ছিলেন। নির্বাচিত হয়েও ওই অবস্থান আরও কঠোর করেছেন। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী এই ধর্মমতে বিশ্বাসী। মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও বসবাস করেন ৩৩ লাখ মুসলমান। অর্থাৎ তাদের জনসংখ্যার ১ শতাংশ। কোনো কোনো মুসলিম দেশে কিছুসংখ্যক বিভ্রান্ত লোক সন্ত্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত থাকার অভিযোগ অমূলক নয়। তবে মূলধারা সর্বতোভাবে এর বিপক্ষে। আর এ ধরনের মৌলবাদ সৃষ্টিতে ক্ষেত্রবিশেষে মার্কিন ভূমিকার কথাও বহুলভাবে আলোচিত। ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন মানবাধিকার লঙ্ঘনবিষয়ক বিতর্কিত ভূমিকায় ছিলেন। তবে  মৌলবাদী ছিলেন না। সেই সাদ্দামকে ভুল অপবাদ দিয়ে মার্কিন শক্তি প্রয়োগে উৎখাত করা হয়েছে। অস্থিতিশীল হয়েছে দেশটি। ঠাঁই নিয়েছে মৌলবাদ। আফগানিস্তানে পাকিস্তানের মাধ্যমে তালেবান গঠনে মার্কিন ভূমিকা ছিল একরূপ প্রকাশ্য। আইএস-সংক্রান্ত বিষয়েও অনুরূপ রটনা রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প কারণে-অকারণে মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত করে চলছেন। ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিব। আর জেরুজালেম মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদি—এই তিন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্থান। মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেম স্থানান্তরের ঘোষণা দিয়ে তিনি ইসরায়েলকে আশকারা দিলেন। সেখানকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের একজন সক্রিয় দোসর পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে ফিলিস্তিনবিরোধী অভিযান চালাচ্ছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প নারীদের সম্ভ্রমহানি ও তাঁদের বিরুদ্ধে চরম অবমাননাকর বক্তব্য দিয়ে সমালোচিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। তাঁর শপথ গ্রহণের দিন পৃথিবীর ৬০টি দেশে নারীরা প্রতিবাদী মিছিল করেন। যুক্তরাষ্ট্রে সেদিনটিতে নারী-পুরুষের সম্মিলিত বিক্ষোভ ছিল নজিরবিহীন।
আর তা অব্যাহত আছে। তাঁর ঘোষিত অবস্থান মূলত শরণার্থী, অভিবাসী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে। আর এ অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার চেতনা ও সে সমাজের মূল্যবোধের পরিপন্থী। অবশ্য তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এসব বিষয়ে অবস্থান সুস্পষ্ট করেই। আর বিজয়ী হয়েছেন ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে। সাধারণ ভোট তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ৩০ লাখ বেশি পেয়েছেন। ট্রাম্প আবার এগুলোকে বলছেন ভুয়া ভোট। তাহলে কি আমরা ধরে নেব, সে দেশেও ভুয়া ভোট হয়। তাহলে তো সে ধরনের ভোট তাঁর পক্ষেও পড়তে পারে। কথাটি বলে তিনি মার্কিন গণতন্ত্রের বনিয়াদকে আঘাত করেছেন। অন্য দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে যাঁরা ছোটাছুটি করেন, তাঁদের দেশে আজকের অবস্থা অবশ্যই বেদনাদায়ক। মেক্সিকোর বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান মূলত বাণিজ্যিক। সেটিও একটি সমৃদ্ধ দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি রয়েছে সে দেশের সঙ্গে। শিল্পজাত পণ্য ছাড়াও তাজা সবজি ও ফলমূল যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হয় মেক্সিকো থেকে। অতিরিক্ত কর বসালে এর দায় পড়বে মার্কিন জনগণের ওপর। তাদের শ্রমিক না এলে মার্কিন কৃষিব্যবস্থাও হুমকির মুখে পড়তে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ ধরনের কার্যক্রমে ক্ষুব্ধ হয়ে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট বাতিল করেছেন তাঁর যুক্তরাষ্ট্র সফরসূচি।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলতে। কিছু বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়ায় নিজ দেশে ব্যাপকভাবে সমালোচনার মুখে পরিবর্তন করেছেন অবস্থান। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তাঁর দেশে রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অথচ বিস্ময়করভাবে এ সফরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠছে সে দেশের জনগণ। ইতিমধ্যে ১০ লাখের বেশি লোক স্বাক্ষর করে প্রতিবাদলিপি দিয়েছেন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও সরকারের কাছে। নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে একটি অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে ইউরোপের অন্যান্য দেশে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোন আলাপে ট্রাম্প যথোচিত সৌজন্য দেখাননি। পক্ষ-বিপক্ষের অনেককেই তিনি এরই মাঝে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছেন। বিষয়গুলো সচেতন মার্কিন জনগণের জন্যও চরম হতাশা ও বেদনার। তাঁরা অবশ্য আইন, আদালত ও রাজপথে সংগ্রাম করছেন। গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভ, ঘৃণার পর্যায়ে চলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে এমনটি হবে, এ কথা কেউ ভেবেছেন বলে মনে হয় না। গণমাধ্যমের প্রচুর ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা দিন দিন জোরদার হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এগুলোও তিনি ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চান। তাহলে বলা যায়, সবকিছু মিলে তিনি তাঁর দেশটিকে মুক্ত বিশ্বের চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে ওই দেশ কী করে নেতৃত্ব করবে মুক্ত বিশ্বের?
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com