Showing posts with label অর্থনীতি. Show all posts
Showing posts with label অর্থনীতি. Show all posts

Monday, August 24, 2026

ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দিলে তিন ধাপে ব্যবস্থা নেবে তেহরান

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ কোনো দেশ যোগ দিলে তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা শত্রু হিসেবে বিবেচিত হবে তাদের বিরুদ্ধে ‘ভূমিকম্পসম’ পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে তেহরান তিনটি ধাপ অনুসরণ করবে।

গত শনিবার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব রেজাই এ হুঁশিয়ারি দেন।

তিনি বিশ্বের সব দেশ, বিশেষ করে ইরানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানান। রেজাই বলেন, কোনো দেশ ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপে অংশ নিলে তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে তেহরান।

ইরানের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে কোনো প্রতিবেশী দেশ যুক্ত হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ‘এক ফোঁটা তেলও’ বের হতে দেওয়া হবে না। এমনকি হরমুজ প্রণালির বিকল্প রপ্তানি পথও এর আওতায় আসতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

তিন ধাপে পাল্টা ব্যবস্থা

ইরানের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কৌশল তিন ধাপে এগোবে বলে জানিয়েছেন রেজাই। প্রথম ধাপে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতাকারী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে তেহরান।

তিনি বলেন, প্রথমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে আসার আহ্বান জানানো হবে। তারা এতে সাড়া না দিলে পরবর্তী ধাপে হামলা চালিয়ে ওই দেশের স্বার্থে আঘাত করা হবে।

রেজাইয়ের বক্তব্যে বিকল্প রপ্তানি পথের কথা উল্লেখ করায় বিশ্লেষকদের ধারণা, এর মধ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। লোহিত সাগরে প্রবেশের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ এবং এর ওপর আরোপিত অবরোধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে, যার ফলে দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ক্লিঙ্গেনডেল ইনস্টিটিউটের ইরানবিষয়ক গবেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, তেহরান আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক বার্তা দিতে চাইছে। তার ভাষ্য, কোনো সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতিকেও ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

আজিজির মতে, ইরানের নতুন সামরিক কৌশলে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একটি হলো সম্ভাব্য হুমকি বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই তা ঠেকাতে আগাম পদক্ষেপ নেওয়া। অন্যটি হলো হামলা হলে তার চেয়ে বেশি মাত্রায় পাল্টা আঘাত করে প্রতিপক্ষের জন্য ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া।

তার ভাষায়, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দিলে ইরানের হুঁশিয়ারি মূলত একটি ‘চূড়ান্ত সতর্কবার্তা’। ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো আরও এক দফা সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন।

চাপে উপসাগরীয় দেশগুলো

ইরানের প্রতিবেশী এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলো এই সংঘাতের কারণে ক্রমেই কঠিন অবস্থার মুখে পড়ছে। তারা একদিকে ইরানের হামলার নিন্দা করছে, অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করতেও চাইছে না।

কারণ ভৌগোলিক বাস্তবতায় ইরানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিও হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিচালিত হয়।

গত সপ্তাহে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলে সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে ওই হামলার দায় অস্বীকার করেছে ইরান। এর আগে ২০২২ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছিল।

অন্যদিকে চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করে। স্থায়ী সংঘাতের চেয়ে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় রাখাই নিরাপদ, এমন হিসাব থেকেই ওই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন মাবন বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে ভৌগোলিক বাস্তবতা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। ইরানের সঙ্গে তাদের পাশাপাশি বসবাস ও কাজ করতেই হবে।

তার মতে, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন হলে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে, উপসাগরীয় দেশগুলো তা চায় না। বরং তারা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কট্টরপন্থী অংশকে দুর্বল করতে কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে থাকতে পারে।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, সংকট সমাধানে কূটনীতির ওপর আস্থা কম থাকলেও এ অঞ্চলের কোনো দেশই আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ব্যয় বহন করতে পারবে না।

তার মতে, এই বাস্তবতাই সংঘাতকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া থেকে ঠেকাবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক তেল মজুতের পরিমাণও কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কারও জন্যই আকর্ষণীয় নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি

ইরানের হুঁশিয়ারির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ‘ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর ঘোষণা দেন। ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা বা ‘লাইফলাইন’ দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতির হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

পরদিন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও একই সুরে বলেন, ‘আপনি হয় আমাদের সঙ্গে, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে।’

ইরানের অন্যতম বড় তেল ক্রেতা চীনের প্রতিও সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি চীন কিনে থাকে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান রোববার বলেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধে’ রয়েছে।

তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছিল, মার্কিন হামলার মুখে ইরানের সরকার ভেঙে পড়বে এবং দেশটি ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতিতে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং ইরানের প্রতিরোধ, সংহতি ও ঐক্য বিশ্বকে বিস্মিত করেছে বলে দাবি করেন তিনি।

কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে ইরান। জাতিসংঘও বিভিন্ন সময়ে তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

ইরানি বিপ্লবের পর মার্কিন দূতাবাসে মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি করার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে প্রথম বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সঙ্গে ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ এবং দেশটির প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ইরানি পণ্য আমদানিও নিষিদ্ধ করা হয়।

১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইরানের তেল ও গ্যাস খাতে মার্কিন বিনিয়োগ এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। পরের বছর মার্কিন কংগ্রেস এমন আইন পাস করে, যাতে ইরানের জ্বালানি খাতে বছরে ২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রাখা হয়।

২০০৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপকরণ ও প্রযুক্তি বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদও জব্দ করা হয়। পরবর্তী বছরগুলোয় জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

২০১৫ সালে ইরান যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি বা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) সই করে। চুক্তির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আরোপের বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ছিল।

তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং ইরানের ওপর আবারও সব নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনেন। তেহরানের বিরুদ্ধে শুরু করেন ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি।

২০১৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামা খাত এবং দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

২০২০ সালে বাগদাদে ড্রোন হামলায় আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ইরানের বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জো বাইডেনের প্রশাসনও ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত অধিকাংশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে।

গত সেপ্টেম্বরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাও পুনর্বহাল করা হয়। এর ফলে দীর্ঘ কয়েক দশকের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বর্তমান সামরিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা।

এ পরিস্থিতিতে ইরানের সর্বশেষ হুঁশিয়ারি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নতুন করে বড় ধরনের কৌশলগত চাপ তৈরি করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কতটা অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হবে এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ধরে রাখবে, সেটিই এখন আঞ্চলিক উত্তেজনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সূত্র: আল জাজিরা

ছবি: আলজাজিরা থেকে নেওয়া।
ছবি: আল জাজিরা থেকে নেওয়া।

ট্রাম্পের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দিলে প্রতিবেশীদের শত্রু গণ্য করবে ইরান, ইউরোপের মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলার ভাবনা

যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী অর্থনৈতিক অবরোধে যোগ দিলে প্রতিবেশী দেশগুলোকে শত্রু হিসেবে গণ্য করে তাদের স্বার্থে আঘাত হানার হুমকি দিয়েছে তেহরান। তারা বলেছে, ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু করার মার্কিন চেষ্টায় কোনো আঞ্চলিক দেশ অংশ নিলে তাদের পরিণতি ভোগ করতে হবে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই গতকাল শনিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ হুঁশিয়ারি দেন।

আইআরআইবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেজাই বলেন, ‘আমরা সব প্রতিবেশী দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার জন্য বলছি। অন্যথায়, আমরা তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করব।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানবিরোধী অর্থনৈতিক হুমকি ক্রমাগত বাড়তে থাকার মুখে রেজাই এ মন্তব্য করলেন।

দুই দেশের মধ্যে চলমান শত্রুতার অংশ হিসেবে গত বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তাঁর সরকার ইরানের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের ‘সবচেয়ে বিধ্বংসী অর্থনৈতিক অভিযান’ শুরু করতে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ওই দিন এ দুই মিত্রদেশ যৌথভাবে তেহরানের বিরুদ্ধে প্রথম দফায় হামলা চালায়।

চলতি সপ্তাহে ইরানের অর্থনীতিকে বিপদে ফেলার হুমকির পাশাপাশি ট্রাম্প এক নতুন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইরানকে যেকোনো ধরনের ‘লাইফলাইন’ বা সহায়তা দেওয়া দেশগুলোকে ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’র শিকার হওয়ার হুমকি দেন তিনি।

এর পরের দিনই ট্রাম্পের সঙ্গে সুর মেলান মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। অন্য দেশগুলোর উদ্দেশ্যে তাঁর স্পষ্ট বার্তা ছিল, ‘আপনারা হয় আমাদের সঙ্গে আছেন, না হয় আমাদের বিরুদ্ধে।’

গতকাল দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহসেন রেজাই ইরানের আঞ্চলিক কৌশলকে তিন পর্যায়ের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন। এ কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা কমানো।

রেজাই বলেন, ‘প্রথমত আমরা আলোচনা করব। তারপর সুন্দর ভাষায় তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করব। কারণ, আমরা আসলে যুদ্ধ ছড়াতে চাই না। এরপরও যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়া বজায় রাখবে, তাদের পুনর্বিবেচনার জন্য কিছুটা সময় দেব। তবে তৃতীয় পর্যায়ে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ না করলেও রেজাই মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন প্রকৃতপক্ষে ইরানের সমাজব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক চাপের মুখে ভেঙে ফেলার বাজি ধরেছে। এর উদ্দেশ্য, (ইরানিদের) বিক্ষোভের মুখে যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটানো।

একটি বিশেষ যুদ্ধবিমানের প্রসঙ্গ টেনে রেজাই বলেন, ‘তারা আশা করছে যে অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে আমাদের ঐক্য ভেঙে দেওয়া সম্ভব হলে একদল বিক্ষোভকারী রাস্তায় নামবে। এতে তারা প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের কাজটাই সহজ করে দেবে।’

গত ১৭ জুনের একটি সমঝোতা স্মারক ব্যর্থ হওয়ার পর সাম্প্রতিক মাসগুলোয় যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে। ওই সমঝোতায় ‘অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের’ আহ্বান জানানো হয়েছিল।

বিশ্বের অন্যতম প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরান দ্রুত এ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে বিশ্ববাজারে তেল, সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ আগে রপ্তানির জন্য এ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা বিকল্প বাণিজ্য পথ খুঁজতে শুরু করে।

কিন্তু রেজাই সতর্ক করে দিয়েছেন, আঞ্চলিক দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধের পরিকল্পনায় অংশ নেয়, তবে পারস্য উপসাগরের বাইরের বিকল্প তেল পরিবহন পথগুলোও লক্ষ্যবস্তু করবে ইরান।

এদিকে মার্কিন এ নতুন পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জাতিসংঘভুক্ত সদস্যদেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এ নীতিকে ‘বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব’ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বলে গতকাল মন্তব্য করেছে তারা।

তেহরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বাড়ানোর কথা ভাবছে বলে জানা গেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের অভিযানকে সমর্থন দেওয়া ইউরোপের মার্কিন মিত্রদের ওপরও আঘাত হানতে পারে ইরান।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাই সম্প্রতি দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাই সম্প্রতি দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

Friday, August 21, 2026

ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু করতে ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা: কতটা অবিচল থাকবেন তিনি?

সিএনএনের বিশ্লেষণঃ চরম অর্থনৈতিক অভিযানের হুমকি দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধকৌশল ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে রাজনৈতিক চাপ ও ব্যয় বাড়তে থাকলে তিনি এই সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত অবিচল থাকবেন নাকি পিছিয়ে যাবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বুধবার ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তবে এমন অঙ্গীকার এবারই প্রথম নয়। এর আগেও ট্রাম্প নানান কঠোর পদক্ষেপের কথা বলেছিলেন, যাতে তিনি শেষ পর্যন্ত অবিচল থাকেননি। তাই এবারের সিদ্ধান্ত তিনি কতদিন ধরে রাখেন সেটিই দেখার বিষয়।

বোমাবর্ষণ করে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে কিংবা সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে তাদের সাথে পারমাণবিক আলোচনায় বসতে ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্পের এই নতুন কৌশলকে নিজেদের মুখ রক্ষার একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক মিত্রদের জানানো হয়েছে যে, ইরানের সাথে সব ধরনের আলোচনা বন্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি যাতে সম্পূর্ণ নতি স্বীকার করে, সেজন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক যুদ্ধের পথ বেছে নেয়া হয়েছে। এক বিবৃতিতে ট্রাম্প জানান, যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থা ইরানকে যেকোনো ধরণের সুবিধা দেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। একই সাথে তেল চোরাচালান, অর্থ স্থানান্তর, ভুয়া কোম্পানি ও জাহাজের নিবন্ধনের মতো সমস্ত পথ অবিলম্বে বন্ধ করার তাগিদ দেন তিনি।

ইসরাইল ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্সের গবেষণা ও বিশ্লেষণ বিভাগের প্রাক্তন ইরান বিষয়ক প্রধান ড্যানিয়েল সিট্রিনোভিচ জানান, তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও ইরান ভেঙে পড়বে এমনটি ভাবা হবে চরম ভুল। আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার যে কৌশল তেহরান নিয়েছে, তা পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ইরানের মূল রাজনৈতিক অবস্থানের কোনো পরিবর্তন আসবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা কার্যকর করতে হলে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ধৈর্যের প্রয়োজন হবে। এছাড়া ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড করপসের (আইআরজিসি) রাজস্ব এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সমন্বয়ে একটি বড় কূটনৈতিক পদক্ষেপ দরকার। হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লুদোভিক হুড মনে করেন, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের উচিত ইরানের তেলের বড় ক্রেতা চীনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো। তবে আগামী সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে ওয়াশিংটন এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা, তা নিয়ে বড় সংশয় রয়েছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র দুই মাস আগে ইরানেরও পাল্টা জবাব দেয়ার রাজনৈতিক সুযোগ রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে নতুন ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে মার্কিন ভোটারদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে পারে তেহরান। ডেমোক্রেট প্রতিনিধি জেমস ওয়াকিনশ এই বিষয়ে বলেন, তিনি এমন কোনো অর্থনৈতিক ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে আগ্রহী নন, যেখানে মার্কিন জনগণকে গ্যাস স্টেশন ও মুদি দোকানে এর চূড়ান্ত মূল্য দিতে হয়। ফলে ট্রাম্পের এই নতুন অর্থনৈতিক যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কার্যকর কোনো সমাধান আনবে, নাকি রাজনৈতিক চাপে তিনি পিছু হটবেন, তা এখনও একটি বড় প্রশ্ন।

ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু করতে ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা: কতটা অবিচল থাকবেন তিনি?

Friday, June 19, 2026

বাংলাদেশের পাটপণ্যে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক বহাল রাখছে ভারত by প্রতীক বর্ধন

বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যে আরোপিত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আপাতত প্রত্যাহারের পক্ষে নয় ভারত। দেশটি এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলেছে, এই শুল্ক বহাল রাখা বা প্রয়োজন হলে সংশোধন করা হবে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যের ওপর আরোপিত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের মধ্যবর্তী পর্যালোচনা করেছে ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ (ডিজিটিআর)। ১৭ জুন প্রকাশিত ৮৮ পৃষ্ঠার ডিসক্লোজার স্টেটমেন্টে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া না হলেও তদন্তকারী সংস্থা তাদের প্রাথমিক অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে পাটপণ্য রপ্তানিতে এখনো ডাম্পিং অব্যাহত আছে। স্বাভাবিক মূল্যের তুলনায় কম দামে এসব পণ্য ভারতে বিক্রি হচ্ছে। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ শিল্পে চাপ তৈরি হচ্ছে।

মধ্যবর্তী পর্যালোচনায় ভারতীয় পাটশিল্পের ক্ষতির কয়েকটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়, ভারতীয় উৎপাদকদের বাজার অংশীদারত্ব কমেছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানির অংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে মুনাফা ও নগদ মুনাফা কমেছে, বেড়েছে মজুত। এতে উন্মুক্ত বাজারে ভারতীয় উৎপাদকেরা আরও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন। বাংলাদেশের অতিরিক্ত উৎপাদনসক্ষমতা ঝুঁকি হিসেবে দেখছে ভারত।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের পাটকলগুলোর বার্ষিক উৎপাদনসক্ষমতা প্রায় ৬ লাখ ৩৬ হাজার টন হলেও প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৬৯ হাজার টন। অর্থাৎ প্রায় ২ লাখ ৬৭ হাজার টন সক্ষমতা অব্যবহৃত আছে।

ভারতের আশঙ্কা, এই অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে ভবিষ্যতে ভারতে বাংলাদেশি পাটপণ্য রপ্তানির চাপ আরও বাড়তে পারে। ডিজিটিআরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক তুলে দিলে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে কম দামে আরও বেশি পাটপণ্য ভারতে প্রবেশ করতে পারে। এতে ভারতীয় উৎপাদকেরা দাম কমাতে বাধ্য হবেন। অর্থাৎ তাঁরা আরও বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির আজ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আমি এখনো অবহিত নই। তবে আমরা আশা করি না যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন কোনো পদক্ষেপ ভারত সরকার নেবে। ভারত যদি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকে আমরা তাদের অনুরোধ করব, তারা যেন সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসে’।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ভারত যদি এই নীতিতে অটল থাকে, তাহলে আরও দেশ আছে; আমাদের ব্যবসায়ীরা সেই সব দেশের বাজারে পণ্য বিক্রির সম্ভবনা খতিয়ে দেখতে পারেন। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরকারি ভর্তুকির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তকারী সংস্থার মতে, পাট খাতে দেওয়া নগদ সহায়তা বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় তাদের এগিয়ে রেখেছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) সভাপতি তাপস প্রামাণিক প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক। ৯ বছর ধরে ভারত বাংলাদেশের পাট পণ্যে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে রেখেছে। এটা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম মেনে করা হচ্ছে কি না বা এত দিন ধরে তা করা যায় কি না, তা আমরা জানি না। সরকারের উচিত, বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করা।

ভারতের অভিযোগ অমূলক আখ্যা দিয়ে তাপস প্রামাণিক আরও বলেন, দেশের পাট পণ্য রপ্তানিতে ভর্তুকি অনেকটা কমে গেছে। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাংলাদেশের ঘাটতি অনেক বেশি। এই অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক না থাকলে ব্যবসা আরও বাড়ত, কিন্তু এই বাস্তবতায় তা সম্ভব হচ্ছে না।

তবে ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়। বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন ও সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকেরা ২৪ জুন পর্যন্ত মতামত দিতে পারবেন। সেই মতামত বিবেচনায় নিয়েই ভারত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।

তবে বর্তমান ডিসক্লোজার স্টেটমেন্ট বলছে, আপাতত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক বহাল রাখার সম্ভাবনাই বেশি।

২০১৭ সাল থেকে চলছে

উৎপাদন মূল্যের তুলনায় কম দামে বাংলাদেশের পাটকলমালিকেরা ভারতে পাটপণ্য রপ্তানি করছেন—ভারতীয় ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে ভারত সরকার প্রথম অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে। ওই সময় প্রতি টন পাটপণ্য রপ্তানিতে ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত শুল্ক নির্ধারণ করা হয়।

এরপর ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কারোপের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বৃদ্ধি করে ভারত। নতুন ঘোষণায় ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যে ভিন্ন ভিন্ন হারে অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা হয়। সেবার প্রতি টনে ৬ ডলার থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত অ্যান্টিং ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা হয়। ২০২৭ সালের আগে এবার মধ্যবর্তী পর্যালোচনা করল তারা।

রপ্তানির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ যায় ভারতে। ২০১৭ সাল থেকে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপের পর থেকে রপ্তানি কমতে শুরু করে।
পাটকলে কাজ করছেন শ্রমিকেরা।
পাটকলে কাজ করছেন শ্রমিকেরা। ফাইল ছবি

Saturday, June 13, 2026

মাস্কের ট্রিলিয়ন ডলার আসলে কত টাকা, চাঁদে ২০০ বার যাতায়াতসহ তাতে আর কী কী সম্ভব

মার্কিন রকেট নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স শেয়ারবাজারে যাত্রা শুরুর পরপরই বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার বা লাখ কোটিপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন ইলন মাস্ক।

মাত্র একজনের হাতে এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকতে পারে, তা একসময় ভাবাই যেত না।

গতকাল শুক্রবারের আগপর্যন্ত ‘ট্রিলিয়ন’ বা এক লাখ কোটি ডলারের এ হিসাবটি শুধু বিশ্বের গুটিকয় বড় অর্থনীতির জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) বা বিশাল ঋণের ক্ষেত্রেই শোনা যেত। এ ছাড়া গত এক দশকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কিছু কোম্পানির মোট মূল্যের ক্ষেত্রে এ সংখ্যার ব্যবহার দেখা গেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ যেভাবে লাফিয়ে বাড়ছে, তারই ধারাবাহিকতায় মাস্ক এ নতুন খেতাব পেলেন।

বছর বছর বিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতি ব্যক্তিদের ক্লাবে নতুন সদস্য যুক্ত হচ্ছেন। আবার এ শতকোটিপতিদের মধ্যে কেউ কেউ আরও ধনী হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে নামী তারকারাও রয়েছেন। অথচ ঠিক একই সময় বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে প্রথম কোনো ব্যক্তির ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার এ ঘটনা অনেকে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্যের সবচেয়ে উদ্বেগজনক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

‘এক লাখ কোটি’ বা ওয়ান ট্রিলিয়ন সংখ্যাটি মানুষের পক্ষে সহজে কল্পনা করাও কঠিন। ১ লাখ কোটি ডলার হলো ১ বিলিয়নের (১০০ কোটি) ১ হাজার গুণ বেশি। আর ১ মিলিয়নের (১০ লাখ) ১ মিলিয়ন বা ১০ লাখ গুণ বেশি। ১ ট্রিলিয়ন লিখতে ১–এর পর ১২টি শূন্য (১,০০০,০০০,০০০,০০০) দিতে হয়।

প্রসঙ্গত, ইলন মাস্কের এক লাখ কোটি (এক ট্রিলিয়ন) ডলার বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর করলে তা এত বিশাল একটি অঙ্কে দাঁড়াবে, যা সাধারণ হিসাবের বাইরে। বর্তমানে (২০২৬ সালের জুনের হিসাব অনুযায়ী) এক মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য প্রায় ১২৩ টাকা। এ দর ধরে এক লাখ কোটি ডলার সমান ১২৩ লাখ কোটি (১২৩ ট্রিলিয়ন) টাকা! সহজ কথায় ও দেশীয় সংখ্যা গণনার পদ্ধতিতে এটি হলো—১২৩,০০০,০০০,০০০,০০০ টাকা।

মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল শেয়ারবাজারে স্পেসএক্সের দুর্দান্ত অভিষেকের পর মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ আসলে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি (১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন) ডলারে পৌঁছেছে। তাঁর এ সম্পদের বেশির ভাগই রয়েছে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার বা স্টক হিসেবে।

এই এক লাখ কোটি ডলার দিয়ে কী কী করা সম্ভব, তা বোঝার জন্য কিছু উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

২০০ বারের বেশি চাঁদে যাওয়া ও ফিরে আসা

এক ট্রিলিয়ন ডলার আসলে কত বড় অঙ্কের টাকা, সেটা কল্পনা করা সত্যিই কঠিন। ঠিক যেমন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স মহাকাশ জয়ের এক বিশাল স্বপ্ন দেখছে, আর তা এখনো বাস্তব হওয়ার অনেক বাকি।

এক ট্রিলিয়ন ডলার কাগজের নোট যদি একটার পর একটা লম্বালম্বিভাবে সাজানো হয়, তবে তা প্রায় ৯ কোটি ৭০ লাখ মাইল (প্রায় ১৫ কোটি ৬০ লাখ কিলোমিটার) পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এটি পৃথিবী থেকে চাঁদে ২০০ বারের বেশি যাতায়াতের সমান দূরত্ব। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মতে পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫৫ মাইল (প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার)। এ ছাড়া ডলারের নোটের ওই বিস্তৃতি পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যকার প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ মাইলের (প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার) দূরত্বকেও ছাড়িয়ে যাবে।

পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের জন্য ১২২ ডলার

ইউএস সেনসাস ব্যুরোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আজ পৃথিবীতে প্রায় ৮২০ কোটি (৮ দশমিক ২ বিলিয়ন) মানুষ বাস করছে। যদি এক ট্রিলিয়ন ডলার এ পুরো মানবগোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়, তবে প্রত্যেকে প্রায় ১২২ ডলার (প্রায় ১৫ হাজার টাকা) পাবে।

দক্ষিণ আফ্রিকার জিডিপির দ্বিগুণ

এক ট্রিলিয়ন ডলার হলো দক্ষিণ আফ্রিকার বার্ষিক জিডিপির দ্বিগুণের বেশি, যে দেশে ইলন মাস্ক জন্মগ্রহণ করেছেন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্য ও পরিষেবার মোট উৎপাদন মূল্য প্রায় ৪৮০ বিলিয়ন (৪৮ হাজার কোটি) ডলার।

আজ বিশ্বের মাত্র ২১টি দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পার করতে পেরেছে। এ তালিকায় যথাক্রমে ৩২ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার ও ২০ দশমিক ৮৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জিডিপি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সবার আগে রয়েছে, যা অন্যান্য দেশের অর্থনীতির চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ লাখ বাড়ি কেনা সম্ভব

ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব সেন্ট লুইসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া একটি মাঝারি মানের বাড়ির গড় দাম প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার ২০০ ডলার। এ হিসাবে মাস্কের এক ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে প্রায় ২৫ লাখ বাড়ি একবারে কিনে নেওয়া সম্ভব।

২৪ হাজার ৩০০ কোটি গ্যালন জ্বালানি তেল

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) হিসাবমতে, গতকাল যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন জ্বালানি তেলের দাম ছিল প্রায় ৪ দশমিক ১১ ডলার। এক ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে এ চড়া দামেও ২৪ হাজার ৩০০ কোটি (২৪৩ বিলিয়ন) গ্যালনের বেশি তেল কেনা সম্ভব।

সহজে বোঝার জন্য বলা যায়, পুরো গত এক বছরে সব মার্কিন মিলে যত গাড়ি চালিয়েছেন, তাতে খরচ হয়েছিল মোটে ১৩ হাজার ৭০০ কোটি গ্যালন তেল। অর্থাৎ এক ট্রিলিয়ন ডলারের তেল দিয়ে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের সব গাড়ি প্রায় দুই বছর চালানো যাবে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে তেলের দাম বেশ কম ছিল। কিন্তু ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্র এতে জড়িয়ে পড়ায় তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে আগুন লাগায় দীর্ঘ চার বছর পর এবারই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন তেলের দাম চার ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়েছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনীর চেয়ে ৭০০ বিলিয়ন ডলার এগিয়ে

ফোর্বসের তালিকায় এ মুহূর্তে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ব্যক্তি হলেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ। গতকাল দুপুরের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৯ হাজার ৪০০ কোটি (২৯৪ বিলিয়ন) ডলার। এ বিশাল অঙ্কও কিন্তু এক ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে পুরো ৭০ হাজার ৬০০ কোটি (৭০৬ বিলিয়ন) ডলার কম।

পরিসংখ্যানটি আরও চমকপ্রদ করতে বলা যায়, ফোর্বসের তালিকায় মাস্কের ঠিক পেছনে থাকা পরবর্তী চার ধনীর পুরো সম্পদ যদি একসঙ্গে যোগ করা হয়, তবেই শুধু তা এক ট্রিলিয়নের কাছাকাছি পৌঁছাবে।

ল্যারি পেজ ছাড়া এ চারজনের অন্য তিনজন হলেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন (২৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার), অ্যামাজনের জেফ বেজোস (২৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলার) ও ওরাকলের ল্যারি এলিসন (২৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার)। এই চারজনের সম্পত্তি যোগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ১ দশমিক শূন্য ৫ ট্রিলিয়ন ডলার।

অবশ্য, শেয়ারবাজারের ওঠানামার কারণে ধনকুবেরদের এ সম্পত্তি প্রতিদিন, এমনকি কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেও শত শত কোটি ডলার বদলে যেতে পারে, যেমন মাস্কের কথাই ধরা যাক, ২০২৪ সালে তাঁর সম্পত্তি ছিল ১৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার, যা গত বছর বেড়ে হয়েছিল ৩৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার। আর স্পেসএক্সের আইপিও শেয়ারবাজারে আসার সুবাদে তা এখন রকেটের গতিতে বেড়ে এক ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে!

ধনকুবের ইলন মাস্ক
ধনকুবের ইলন মাস্ক। ছবি: এপির ভিডিও থেকে নেওয়া ছবির স্ক্রিনশট

Sunday, February 15, 2026

হাসিনার লুটপাটতন্ত্র যেভাবে সুশাসন ও অর্থনীতিকে তছনছ করে দিল by মইনুল ইসলাম

প্রকাশ ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ঃ স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আগস্টের ২৯ তারিখে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন।

কমিটিকে সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনে বাংলাদেশের অর্থনীতির হালহকিকত গভীরভাবে পর্যালোচনা করে তিন মাসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

কমিটি ১ ডিসেম্বর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের শ্বেতপত্রটির খসড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। শ্বেতপত্রটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘উন্নয়ন বয়ানের ব্যবচ্ছেদ’ (ডিসসেকশান অব আ ডেভেলপমেন্ট ন্যারেটিভ)। প্রায় ৩৯৬ পৃষ্ঠার খসড়া প্রতিবেদনে রয়েছে ২৪টি অধ্যায়। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দাবি করেছেন যে হাসিনার শাসনামলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ‘চামচা পুঁজিবাদ’ (ক্রনি ক্যাপিটালিজম) থেকে সরাসরি ‘চোরতন্ত্রে’ (ক্লেপ্টোক্রেসি) রূপান্তরিত হয়েছে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা ভূমিধস বিজয় অর্জন করেন। ক্ষমতাসীন হওয়ার পরই দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের লাগামহীন তৎপরতা শুরু করেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়স্বজন। কেউ কেউ বলেন যে এই প্রক্রিয়ায় সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী উৎসাহিত করতেন। এই শ্বেতপত্র হাসিনার কথিত উন্নয়ন বয়ানের আড়ালে লুকানো ‘অবিশ্বাস্য লুটপাটতন্ত্রের একটি নির্মোহ ব্যবচ্ছেদের দলিল’ হিসেবে টিকে থাকবে। শ্বেতপত্রের একটি নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ করলে নিচের বিষয়গুলো প্রধানভাবে উঠে আসবে। 

এক.

শ্বেতপত্র কমিটির গবেষণায় উঠে এসেছে, স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের লুটপাটতন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার হিসেবে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুণ্ঠিত হয়ে বিদেশে পাচার হয়েছে। সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সিয়াল, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, ভৌত অবকাঠামো এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত। শ্বেতপত্রে খাতওয়ারি লুণ্ঠনের তথ্য-উপাত্ত উদ্‌ঘাটন করে লুণ্ঠিত অর্থের প্রাক্কলন প্রকাশ করা হয়েছে।

শ্বেতপত্রে মোট ২৮টি দুর্নীতির পদ্ধতির মাধ্যমে লুণ্ঠন প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণে নিয়ে আসা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, ভারত ও কয়েকটি ‘ট্যাক্স হেভেন’ সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচারের সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। লুটেরা রাজনীতিবিদদের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় অলিগার্ক ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের খেলোয়াড়, দুর্নীতিবাজ আমলা, ঠিকাদার ও মধ্যস্বত্বভোগী, হাসিনার আত্মীয়স্বজন এবং ‘ইনফ্লুয়েন্স প্যাডলার’ ও ‘হুইলার-ডিলাররা’ এই লুটপাটতন্ত্রের প্রধান চরিত্র।

এই লুটেরারা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে দেশের নির্বাহী বিভাগ, সিভিল প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ, আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো, সরকারি রাজস্ব আহরণ বিভাগগুলো ও বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণকারী বিভাগগুলোকে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফায়দা হাসিলের অংশীদার করে ফেলেছে। দেশের বিনিয়োগ ও রাজস্ব আহরণকে তারা দুর্বল করে ফেলেছে। ধস নামিয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনকে তছনছ করে দিয়েছে।

দুই.

কানাডায় ৪৭ বিলিয়ন থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। দুবাইয়ে ৯৭২ জন বাংলাদেশির রিয়েল এস্টেট সম্পত্তি রয়েছে। মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ কার্যক্রমে ঘরবাড়ি কিনেছেন ন্যূনতম ৩ হাজার ৬০০ বাংলাদেশি। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে প্রতিবছর গড়ে ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

তিন.

সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী মুস্তফা কামালের নির্দেশে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০১৪ সাল থেকে ‘উপাত্ত কারসাজি’–এর কেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রতিবছর জিডিপি বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে মাথাপিছু জিডিপি বাড়িয়ে দেখানোর জন্য দেশের মোট জনসংখ্যাকে কমিয়ে দেখানো হয়েছে।

বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে দেশের রপ্তানি আয়কে। মূল্যস্ফীতির হারকে সব সময় কমিয়ে দেখানো হয়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী জনসংখ্যাকে কম দেখানো হয়েছে, যাতে দারিদ্র্য নিরসনে সরকারের সাফল্যকে বাড়িয়ে দেখানো যায়।

দেশের জনগণের জন্মহার ও মৃত্যুহারকে কমিয়ে দেখানো হয়েছে, যাতে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হারকে কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেখানো যায়। একই সঙ্গে দেশের ‘টোটাল ফার্টিলিটি রেট’কে কম দেখানো হয়েছে, যাতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হচ্ছে বলে প্রচার করা যায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় আগের বছরে সাবেক সরকার যতখানি দেখিয়েছিল, তার চেয়ে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার কমে গেছে।

চার.

দেশের সাতটি মেগা প্রকল্পের ব্যয় প্রাথমিক প্রাক্কলনের চেয়ে ৭০ শতাংশ বাড়িয়ে অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। এর আনুমানিক পরিমাণ ৮০ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। এই মেগা প্রকল্পগুলো হচ্ছে পদ্মা সেতু প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প, ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-মাওয়া-যশোর-পায়রা রেলপথ প্রকল্প, চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্প, পায়রা বন্দর প্রকল্প ও মাতারবাড়ী কয়লাচালিত বিদ্যুৎ প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলোর যথাযথ ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ ও ‘কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস’ না করার কারণে এই ৭০ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাত সৃষ্টি হয়েছে।

পাঁচ.

দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ পৌনে সাত লাখ কোটি টাকা। শ্বেতপত্র কমিটি প্রকৃত খেলাপি ঋণকে ‘ডিসট্রেসড অ্যাসেট’ নামে অভিহিত করেছে। শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়েছে যে এই ডিসট্রেসড অ্যাসেট দিয়ে সাড়ে ১৩টি মেট্রোরেল কিংবা সাড়ে ২২টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত। অবৈধ হুন্ডি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৪ লাখ কোটি টাকা। ১০টি ব্যাংক ‘টেকনিক্যালি দেউলিয়া’ হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে দুটি ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত আর বাকি আটটা ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। এগুলোতে তারল্যসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

বড় ধরনের ঋণ লুটপাটের শিকার হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও বেসিক ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংক ও অন্য শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো থেকে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংকঋণ, প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে লুটেরারা।

ছয়.

দেশের শেয়ারবাজার থেকে কমপক্ষে ২৭ বিলিয়ন ডলার সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে। নানা রকম কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে এক ট্রিলিয়ন টাকার (এক লাখ কোটি) বেশি লুটপাট করেছে কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তি। ২০১০-১১ সালের শেয়ারবাজারের পরিকল্পিত ধসের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত কমিটির রিপোর্টকে কোনো পাত্তা দেওয়া হয়নি। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে হারিয়ে ফেলেছে।

সাত.

দেশের জনগণের আয়বৈষম্য-পরিমাপক জিনি সহগ ২০২২ সালে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে। বিশ্বব্যাংকের জরিপে যে ৭২টি দেশ তাদের আয়বৈষম্য রিপোর্ট করেছে, তার মধ্যে এর চেয়ে বেশি জিনি সহগের মান ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও পানামা—এই তিন দেশে বিদ্যমান। তার চেয়েও ভয়াবহ অবস্থানে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের সম্পদবৈষম্যের পরিমাপক জিনি সহগ, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালে যেটা শূন্য দশমিক ৮২ থেকে শূন্য দশমিক ৮৪–এ পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ এখন একটি মারাত্মক উচ্চ আয়বৈষম্য ও সম্পদবৈষম্যের দেশ।

আট.

দেশের মাথাপিছু প্রবৃদ্ধির হারকে ১৯৯৫ সাল থেকে কয়েক শতাংশ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। এ জন্য উন্নয়ন অর্থনীতিবিদদের অনেকে বাংলাদেশের এই জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ‘প্যারাডক্স’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। স্বৈরশাসকের পতনের পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সাবেক সরকারের প্রক্ষেপিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে কমে ৫ দশমিক ৮ শতাংশে এসে দাঁড়াবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে।

নয়.

আনুমানিক ৭৭ হাজার কোটি থেকে ৯৮ হাজার কোটি টাকা ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের কবজায় চলে গেছে বলে শ্বেতপত্রে জানানো হয়েছে। ৭০ হাজার কোটি টাকা থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজনীতিবিদদের করায়ত্ত হয়েছে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই আমলা ও রাজনীতিবিদদের স্ত্রী-সন্তানেরা পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে।

ড. মইনুল ইসলাম, অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক

হাসিনার লুটপাটতন্ত্র যেভাবে সুশাসন ও অর্থনীতিকে তছনছ করে দিল

Saturday, February 7, 2026

ক্ষুদ্রঋণ: পরিসংখ্যানের চেয়ে মানুষের গল্পটা শক্তিশালী by মুর্শেদ আলম সরকার

‘ক্ষুদ্রঋণ শুধু ঋণ নয়, এটি মর্যাদা ও স্বপ্নের বিষয়’—বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই কথাটিই সবচেয়ে গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয়। ক্ষুদ্রঋণ শুধু সামান্য ঋণ কার্যক্রম নয়, এটি কোটি মানুষের জন্য আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও উন্নয়নের একটি চলমান প্রক্রিয়া।

প্রাচীন ভারতের প্রাজ্ঞ গণিতবিদ ‘সিসা বেন দাহির’ রাজাকে বলেছিলেন, দাবার বোর্ডের প্রথম ঘরে এক দানা গম, পরের ঘরে দ্বিগুণ, এভাবে ৬৪তম ঘর পর্যন্ত শস্য দিলেই তিনি খুশি। রাজা হেসে বললেন, এ আর এমন কি? কিন্তু শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে রাজ্যের গণিতবিদ বোঝালেন, এ প্রক্রিয়ায় শস্য দিতে গেলে শস্যের পরিমাণ এত বেশি হবে যে রাজ্যের সব শস্য দিলেও তা পূরণ করা সম্ভব নয়! আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও, ৬৪তম ঘরে পৌঁছাতে শস্যের পরিমাণ এতটাই বিশাল হয়ে দাঁড়ায় যে তা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব।

ঠিক এই বহুগুণ বৃদ্ধির ধারণাটিই ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একইভাবে, অর্থনীতিতে ছোট ছোট অসংখ্য বিনিয়োগ সময়ের সঙ্গে বহুগুণে বেড়ে সামষ্টিক অর্থনীতির চালিকা শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দেওয়া ছোট অর্থ সাহায্যগুলো বিশাল পরিবর্তনের তরঙ্গ সৃষ্টি করে, যা সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনে। যখন একজন নারী উদ্যোক্তা একটি ছোট ঋণ নিয়ে একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেন, সেটি শুধু তাঁর আয় বৃদ্ধি করে না—তাঁর পরিবার, স্থানীয় বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল, কর্মসংস্থান ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্য দিয়ে পুরো সমাজ ও অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক তরঙ্গ সৃষ্টি করে।

১৯৩০-এর মহামন্দার সময় ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনসের দেওয়া ধারণা—টাকার প্রবাহ সচল রাখতে টাকা মানুষের হাতে পৌঁছাতে হবে। এটাই আজকের মাইক্রোফাইন্যান্স বা ক্ষুদ্রঋণের নীতিগত ভিত্তি। কেইনস মহামন্দার সময় বলেছিলেন, যদি টাকার প্রবাহ থেমে যায়, তবে সমাজও থেমে যায়। অর্থনীতি বাঁচাতে টাকা মানুষের হাতে পৌঁছাতে হবে, উৎপাদন ও ব্যয় বাড়াতে হবে।

১৯৭০-এর দশকের আগে বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষ ঋণের জন্য নির্ভর করত স্থানীয় মহাজনের ওপর, যাদের সুদের হার ছিল বছরে ১০০ শতাংশের বেশি। জমি, ঘর, মর্যাদা সব হারাত অনেক পরিবার।

এই বাস্তবতায় মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো এক নীরব বিপ্লবের সূচনা করে। জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ মানুষের হাতে তুলে দেয় স্বাধীনতার চাবিকাঠি। বিশেষ করে নারীর জীবনে এর প্রভাব অপরিসীম। নিজের উপার্জনের পর একজন নারী যখন তার সন্তানের স্কুলে যাওয়া, নতুন কাপড় কেনা বা বাড়িতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সিদ্ধান্ত নেন, তখন বোঝা যায়—ক্ষুদ্র-অর্থায়ন কেবল আর্থিক নয়, আচরণগত পরিবর্তনেরও মূল চালিকা শক্তি। অনেক গ্রামীণ নারী, যাঁরা একসময় ক্ষুদ্রঋণ গ্রুপের সদস্য ছিলেন, পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকারের সদস্য বা চেয়ারম্যান হয়ে সামাজিক নেতৃত্বেও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ছোট শুরু, বড় রূপান্তর

১৯৯২-৯৩ সালে পপি কেয়ারের সহায়তায় ভৈরবে ২০টি গ্রুপকে সেলাই ও জুতা তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এটি পিকেএসএফ ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারিত হয়। ২০২৫ সালে ভৈরব দেশের অন্যতম বৃহৎ জুতা উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ৫ থেকে ৬ হাজার ছোট-বড় উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, ক্ষুদ্রঋণ কেবল ‘মাছ দেওয়া’ নয়, বরং মানুষকে ‘কীভাবে মাছ ধরতে হয়’ তা শেখানোর প্রক্রিয়া।

পরিসংখ্যানের চেয়ে শক্তিশালী মানুষের গল্প

২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলারিটি অথরিটির (এমআরএ) নিবন্ধনপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর (গ্রামীণ ব্যাংক বাদে) মধ্যে প্রায় সাড়ে চার কোটি সদস্য এবং তিন কোটি ২০ লাখের বেশি সক্রিয় ঋণগ্রহীতাকে সেবা দিচ্ছে। তারা ২৬ হাজার ৭১টি শাখা পরিচালনা করছে এবং প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন টাকা ঋণ বিতরণ করেছে।

কিন্তু পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হলো মানুষের গল্প। রংপুরের বয়নশিল্পী আয়েশা বেগম একসময় ৬০ শতাংশ সুদে মহাজনের কাছ থেকে সুতা কিনতেন। বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ২৫,০০০ টাকা ঋণ নিয়ে ও ডিজিটাল মার্কেটিং শিখে তিনি অনলাইনে শাড়ি বিক্রি করেন এবং তিনজন নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। সুনামগঞ্জের কৃষক রহিম মিয়া জলবায়ু-সহনশীল বীজ ও সোলার পাম্প কিনে এই বছর প্লাবনের মধ্যেও ফসল রক্ষা করেছেন এবং মেয়ের শিক্ষার খরচ চালাতে পারছেন।

এই গল্পগুলো প্রমাণ করে—মাইক্রোফাইন্যান্স মানে জীবন, কর্মসংস্থান, সহনশীলতা এবং ভবিষ্যতের আশার বীজ বপন করা। এই খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ফিল্ড অফিসারদের ‘মানবিক সংযোগ’—এই বিশ্বাসে যে সদস্যদের সাফল্যই প্রতিষ্ঠানের সাফল্য।

চ্যালেঞ্জ ও নীতি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা

বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পোর্টফোলিও খরচ। অধিকাংশ ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে (সাড়ে ১৩ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ হারে) ঋণ নেয়, পাশাপাশি মোটা অঙ্কের জামানত রাখতে হয়। এই কারণে সদস্যদের কাছে ঋণসেবা পৌঁছে দেওয়ার খরচ ও ঋণের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, দূরবর্তী এলাকায় যাতায়াত, কাগজপত্র ও ডিজিটাল রিপোর্টিংয়ের জন্য পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ শুধু নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ না রেখে এই খাতকে গতিশীল করার জন্য আরও জোরালো ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কিছু সুপারিশ আছে:

১. রিফাইন্যান্সিং সুবিধা: বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৫ থেকে ৭ শতাংশ সুদে রিফাইন্যান্সিং উইন্ডো চালু করা গেলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো কম সুদে ঋণ দিতে পারবে।

২. ডিজিটাল লেনদেন খরচ: ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাল লেনদেনের চার্জ বহন করতে হয়—এই নীতিগত খরচ সমন্বয় করা দরকার।

৩. প্রযুক্তিগত প্রণোদনা: মোবাইল ব্যাংকিং, এআইভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরিং ও গ্রামীণ ইন্টারনেট সংযোগে ভর্তুকি দেওয়া।

৪. দুর্যোগ সুরক্ষা: প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে আইনি সুরক্ষা জোরদার করতে দুর্যোগকালে সেবা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আলাদা ফান্ড প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন ঋণ আদায় শিথিল করে, একইভাবে ব্যাংকগুলোও যাতে ওই সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোয় সহায়তা দেয় এবং নিয়মিত ইনস্টলমেন্টে শৈথিল্য আনে, তার ব্যবস্থা করা উচিত।

সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সক্রিয় ও ফলপ্রসূ সংলাপ জোরদার করে এমন একটি নীতিগত পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি, যা এই খাতের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা কেবল তদারকি বা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে—এই সেক্টরের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকেও দৃষ্টি দেওয়া উচিত। অর্থাৎ, উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে ‘আইনের কঠিন শিকল’ নয়, বরং আরও উৎসাহব্যঞ্জক ও সহায়ক নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে ক্ষেত্রটিকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

ভবিষ্যতের ক্ষুদ্রঋণ হবে ডিজিটাল, পরিবেশবান্ধব ও জেন্ডার–সহিষ্ণু। বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে সামাজিক উদ্যোক্তা , ডিজিটাল সাক্ষরতা ও জলবায়ু–সহনশীলতায় পথিকৃৎ ভূমিকা রাখছে।

বিশ্ব ক্ষুদ্রঋণ দিবসে আমাদের এই উপলব্ধি হওয়া উচিত যে ক্ষুদ্রঋণের সাফল্য শুধু টাকার অঙ্কে নয়, বরং মানুষের জীবনের মানে মাপা উচিত। এটি সেই হাতিয়ার, যা একজন নারীকে প্রথমবার নিজের নামেই স্বাক্ষর করতে শেখায়, একজন কৃষককে দুর্যোগে টিকে থাকতে সহায়তা করে এবং একজন তরুণকে উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস দেয়।

* মুর্শেদ আলম সরকার, নির্বাহী পরিচালক, পপি এবং চেয়ারম্যান, ক্রেডিট ডেভেলপমেন্ট ফোরাম-সিডিএফ (বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ খাতের প্রতিনিধিত্বকারী বৃহত্তম এবং একমাত্র ফোরাম)
- (মতামত লেখকের নিজস্ব)

ক্ষুদ্রঋণ: পরিসংখ্যানের চেয়ে মানুষের গল্পটা শক্তিশালী

Tuesday, January 13, 2026

ভারতবিরোধী ‘রেটরিক’ নয়, চাই জাতীয় সক্ষমতা by মাহা মির্জা

নির্বাচনী জোট আর ভারতবিরোধী রাজনীতির ডামাডোলে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক ইস্যু বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পায়নি। গত ২৭ ডিসেম্বর দেশের সুতা মিলের মালিকেরা জরুরি মিটিং ডেকেছিলেন। তাঁরা সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন দেশের সুতা মিলগুলোকে ভারতীয় আমদানির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য।

আমাদের পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশের বেশি সুতা আসে ভারত থেকে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো কাঁচামালের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এর মানে কি এই যে আমাদের সুতা নেই, ভারতের সুতাই ভরসা? মোটেও তা নয়। আমাদের শিল্প অঞ্চলগুলোয় প্রায় ৫০০ সুতা কারখানা আছে। অথচ ভারতীয় সস্তা সুতা আমদানিতে দেশের সুতা কারখানাগুলো ধ্বংসের পথে। গত অর্থবছরে ভারতীয় সুতা আমদানি বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ!

ভারতের সুতা আমাদের দেশীয় কারখানার সুতার চেয়ে সস্তা। কেজিতে ২ দশমিক ৭ ডলার। এদিকে লোকাল সুতা কেজিতে ৩ ডলার। যখন ‘ইনসেনটিভ’ ছিল, দামের পার্থক্য ছিল মাত্র ৫ সেন্ট। এখন পার্থক্য ৩০ সেন্ট। খুব স্বাভাবিকভাবেই গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা খরচ বাঁচাতে ‘ঢাকা’র সুতা বাদ দিয়ে ‘দিল্লি’র সুতাই কিনছেন। বিটিএমএ বলছে, এক বছরে বন্ধ হয়েছে ৫০টির বেশি সুতা কারখানা। চাকরি হারিয়েছেন দেড়-দুই লাখ শ্রমিক। অর্থাৎ ভারতীয় সস্তা সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারছে না দেশের সুতা মিল।

এখন যদি প্রশ্ন করি, দেশীয় সুতার উৎপাদন খরচ বেশি কেন? ভারতের খরচ কম কেন? আমরা অদক্ষ, অপদার্থ, আর ভারত দক্ষ, তাই? তা এই দক্ষতা, এই ‘এফিশিয়েন্সি’ কি আকাশ থেকে পড়ে, নাকি তৈরি করতে হয়? ভারতের আছে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা, বিনিয়োগ আর ভর্তুকির ধারাবাহিক ইতিহাস। ভারতের সুতা মিলগুলো ১৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা পায়, প্রযুক্তি আধুনিকায়নে তহবিল পায়। কিন্তু ভারতীয় সুতার হাত থেকে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো বাঁচাতে কী করেছে আমাদের ‘আধিপত্যবাদবিরোধী’ সরকার?

আগে স্থানীয় সুতা উৎপাদনে নগদ প্রণোদনা ছিল ৫ শতাংশ। সেটা কমিয়ে করা হলো ১ দশমিক ৫ শতাংশ। স্বভাবতই উৎপাদন খরচ বাড়ল, দামও বাড়ল। গার্মেন্টসের মালিক বেশি দামের দেশি সুতা কিনবে কেন? গার্মেন্টসওয়ালাদের ‘ভারতীয় দালাল’ বলে গালি দিয়ে আসতে পারেন, কিন্তু গার্মেন্টসের মালিক দিন শেষে ব্যবসায়ী, সস্তা ভারতীয় সুতাটাই সে কিনবে।

‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ তৈরি করার দায়িত্ব পোশাকশিল্পের মালিকের নয়। যে তরুণ শাহবাগে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে, এটা তার কাজও না। এটা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকের কাজ। তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকে সরকারি ‘ইন্টারভেনশনে’। অথচ কী ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক, একদিকে ইন্টেরিম আমলেই ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ২ বিলিয়ন ডলারের সুতা আর অন্যদিকে ১২ হাজার কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ স্থানীয় সুতার স্টক অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে! বিটিএমএ বলছে, সুতা মিলগুলো বাঁচাতে আমদানি করা সুতায় অন্তত ৩০ সেন্ট শুল্ক বসাতে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের সাড়াশব্দ নেই।

অর্থাৎ একদিকে আমরা ভারতীয় আধিপত্যবাদ ঠেকাতে চাই, আরেক দিকে হাজার হাজার কোটি টাকার দেশীয় সুতার স্টক ফেলে ভারতীয় সুতা আমদানি করি। এটা কি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা, নাকি নিজেদের কৌশলগত সক্ষমতা তৈরিতে চরম ব্যর্থতা ও অদূরদর্শিতা? শুধু সুতাশিল্প নয়, আরও বহু শিল্পের ক্ষেত্রেই একই অবস্থা।

বিয়ের মৌসুমে ঢাকা না দিল্লি?

দেশে এখন বিয়ের মৌসুম চলছে। প্রতিদিন শত শত বিয়ে হচ্ছে শুধু রাজধানীতেই। খোঁজ নিন, বিয়েবাড়ির লোকেরা কোন দেশের শাড়ি বা লেহেঙ্গা বা কুর্তা পরছে? ঢাকার না দিল্লির? এখানে ঢাকা ঢাকা স্লোগান দিয়ে লাভ নেই। মিরপুর বেনারসিপল্লিতে গিয়ে খোঁজ নিলেই ঢাকাই শাড়ির করুণ অবস্থাটা টের পাওয়া যায়।

বেনারসিপল্লি করাই হয়েছিল দেশীয় তাঁতিদের সুরক্ষা দিতে। অথচ ঢাকার এই পল্লির ৬০ শতাংশ শাড়ি আসে ভারত থেকে। অর্থাৎ ঢাকাই তাঁতিদের প্রাণকেন্দ্রেই ঢাকাই কাতানের বদলে বিক্রি হচ্ছে ভারতীয় কাঞ্জিভরম, ভারতীয় বেনারসি। ধনীরা যেমন কিনছে, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তরাও কিনছে। মূল কারণ ওই একটাই, ভারতীয় শাড়ির উৎপাদন খরচ কম। দামও কম। কিন্তু ভারতীয় সুতা ও শাড়ির উৎপাদন খরচ কি এমনি এমনি কমেছে, নাকি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের ধারাবাহিক পলিসির কারণে কমেছে?

ভারত নিজেদের ‘হ্যান্ডলুম’ ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করেছে, প্রণোদনা দিয়েছে, প্রযুক্তি আধুনিকায়নে সহজ শর্তে ঋণ দিয়েছে। আর আমরা কী করেছি? ১০ লাখ কারিগরের রুটিরুজির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা অমিত সম্ভাবনাময় শিল্পকে বাজারের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। দেশের মার্কেট ছেয়ে গেছে ভারতীয় শাড়িতে। কয়েক দশকের সুনিপুণ কারুকার্যের দক্ষতা নিয়ে ৭ লাখ তাঁতি কাজ হারিয়েছেন, কেউ হকারি করছেন, কেউ অটোরিকশা কিনেছেন।

আরও পরিহাসের বিষয় হলো অটোরিকশার পার্টসগুলো পর্যন্ত আমদানি হচ্ছে ভারত থেকে! ইঞ্জিন, বিয়ারিং, শকার, জয়েন্ট—সবই আসছে ভারতীয় ব্র্যান্ড বাজাজ এবং লুম্যাক্স থেকে। স্থানীয় মেকানিকরা কম দামি ভারতীয় যন্ত্রাংশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারে না। এখানেও সেই একই কারণ। ভারতে অটোরিকশাশিল্পের বিকাশই হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রণোদনায় (ডিজেলচালিত যানবাহনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বাহনের প্রসার ঘটাতে)। এদিকে আমরা লাখে লাখে ভারতীয় পার্টস আমদানি করছি ঠিকই, কিন্তু দরিদ্র মানুষ অটোরিকশা কিনে রাস্তায় নামলে বুলডোজার চালাচ্ছি!

দেশের পাটকল বন্ধ, ভারতে পাটশিল্পের বিকাশ

আমাদের কাঁচা পাটের বৃহত্তম বাজার ভারত। ভারত পাটশিল্পের এমন প্রসার ঘটিয়েছে যে নিজেরা উৎপাদক হলেও বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচা পাট কিনছে। অথচ এই দেশের পাটচাষিদের কষ্টে ফলানো পাট এই দেশের শিল্পায়নে কাজে লাগার কথা ছিল না? আমরা ভুলিনি, আমাদের একশ্রেণির মিডিয়া, অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী ভর্তুকির ধুয়া তুলে রাষ্ট্রীয় ২৬টি কারখানা বন্ধ করার পক্ষে জনমত তৈরি করেছিলেন। অথচ এখন খুলনা, যশোর ও ডেমরার বৃহত্তম পাটকলগুলো পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করে দিয়ে কাঁচা পাট বিক্রির জন্য সেই ভারতের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।

এদিকে ভারত এ দেশের কাঁচা পাট কিনে নিজেদের পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছে, ‘ভ্যালু এডিশনে’ বিনিয়োগ করেছে, সরকারি করপোরেশনগুলোয় দেশীয় পাটপণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে এবং পাশাপাশি ‘হাই-এন্ড’ পাটপণ্যের বৈশ্বিক বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। বলা বাহুল্য, এগুলো বিচ্ছিন্ন পলিসি নয়; বরং জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করা নেহরুর আমল থেকেই প্রতিটি ভারত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

অন্যদিকে আমাদের রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলোয় ৫০ বছরে কোনো নতুন বিনিয়োগ হয়নি। অথচ কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের মূল শক্তির জায়গা ছিল কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন। পাট, চিনি, ডেইরি, পোলট্রি, ফিশারি এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ। কিন্তু আমরা আমাদের সচল কারখানাগুলো বন্ধ করে দিয়ে হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সের দরে বেচে দিয়েছি (ঘুরে আসুন, খালিশপুর, প্লাটিনাম ও ক্রিসেন্ট জুটমিল)।

একদিকে আমাদের লাখ লাখ চাকরির গল্প শোনানো হয়েছে; অন্যদিকে আমাদের মাটি, পানি, জলবায়ু ও স্থানীয় দক্ষতায় তৈরি হওয়া লাখো শ্রমিকের ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে, যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো, সক্ষমতাসহ এমন কিছু ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যাঁদের ১০০ লোকের কাজ তৈরি করার সক্ষমতা নেই। ফল—ধসে পড়েছে দক্ষিণের গোটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্ট।

রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদ ঠেকানো যায়?

ভারতীয় আধিপত্যবাদ ঠেকাতে চাইলে লাখো শ্রমিকের পাটকল, চিনিকল বাঁচানোর আন্দোলন করা দরকার ছিল না? স্কপ ও বিজিএমসি থেকে ক্রমাগত সুপারিশ গেছে, মাত্র ১ হাজার ২০০ কোটি বিনিয়োগ করুন, প্রযুক্তি ‘আপগ্রেড’ করুন, সেকিং/হেসিয়ান তাঁতের বদলে আধুনিক তাঁত বসান, স্পিনিং-ব্যাচিং বিভাগে আধুনিক যন্ত্র বসান, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ান, পাট ক্রয়ে মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি কমান; মোটকথা সংস্কার করুন।

রাষ্ট্র বিনিয়োগ না করলে ‘মডার্ন’ ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়ায় না—এটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা নয়? যারা মনে করে বাজার একটি অরাজনৈতিক ‘ম্যাজিক’, ‘ফ্রি মার্কেটের’ হাতে ছেড়ে দিলে এমনি এমনিই ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হয়ে যায়, তারা কি ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া বা ভারতের শিল্পায়নের ইতিহাসটা একটু ঘেঁটে দেখবেন?

ভর্তুকির দোহাই তুলে ভারতের হাতে চলে গেল বাংলাদেশের কাঁচা পাট। অথচ সেই ভারতের পাটকল, কাগজকল, টেক্সটাইলশিল্প, ওষুধশিল্প, জাহাজশিল্প, ইস্পাতশিল্প, পেট্রোকেমিক্যাল, সার কারখানা, বিমান, টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি—এই সবকিছুর পেছনেই আছে দীর্ঘ কয়েক দশকের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও ভর্তুকির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। মার্কিন মুলুকে একটিও ফুড চেইন, ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প বা ব্যাংক-বিমা নেই, যারা ধারাবাহিকভাবে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পায়নি। ওয়াল-মার্ট, জেপি মরগান, ফেডেক্স, নাইকি, নেস্‌লে, আইবিএম, ইন্টেল, ম্যাকডোনাল্ডস, পিৎজা হাট, কেএফসি, বার্গার কিং, ডোমিনোস পিৎজা—কে পায় না ফেডারেল সরকারের ভর্তুকি?

এই যে আমরা স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশে অ্যামাজন আসবে, অ্যাপল আসবে, ডেল-এইচপি-স্যামসাং-লেনোভা-গুগল আসবে। একটু গুগল করেই দেখুন না, এই কোম্পানিগুলো ঠিক কী পরিমাণ রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পায়? বোয়িং থেকে ১৪টি বিমান কিনবে বাংলাদেশ, তো বোয়িং বা এয়ারবাস কি এমনি এমনি লাভ করে? নাকি এদের টিকে থাকার পেছনে আছে বিলিয়ন ডলারের ফেডারেল ভর্তুকি? জেনারেল মোটর, ফোর্ড কিংবা বিএমডব্লিউ তাদের ‘এসেম্বলি লাইন’ বসাতে ভর্তুকি পায় না? বৈদ্যুতিক গাড়িকে উৎসাহিত করতে টেসলাকে ভর্তুকি দেওয়া হয়নি (টেসলা তো স্বীকারও করে যে ফেডারেল ভর্তুকি ছাড়া টেসলার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হতো না)?

ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, নরওয়ে, দক্ষিণ কোরিয়া বা দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো পাবলিকের ট্যাক্সের টাকাতেই শিল্পায়ন করেছে। গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে টানা ভর্তুকি দিয়েছে, স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণ দিয়েছে, আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়েছে, প্রযুক্তি খাতে বাজেট বাড়িয়েছে, ‘কৌশলগত’ খাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ লাভ-লোকসানের হিসাব নয়, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত কৌশলগত শিল্পগুলোকে গড়ে তোলা, টেনে তোলা বা টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই এসব ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তাবৎ শিল্পোন্নত দেশের ইতিহাস ‘ফ্রি মার্কেটের’ অরাজনৈতিক ইতিহাস নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও বিনিয়োগের রাজনৈতিক ইতিহাস।

অন্যদিকে আমরা আধিপত্য মোকাবিলার কথা বলে বাজার ছেড়ে দিয়েছি তথাকথিত ‘ফ্রি মার্কেটের’ হাতে। ভারতীয় হোক, চীনা হোক আর মার্কিন হোক, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া শক্তিশালী আধিপত্যবাদ মোকাবিলা করা কি সম্ভব? ভারতের বাজার, ভারতের কাঁচামাল আর ভারতের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি নিয়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা রেখে দাঁড়ানো সম্ভব?

আমাদের হাজার কোটি টাকার সুতার মজুত পড়ে থাকবে আর আমরা পোশাকশিল্পের সুতা আনব ভারত থেকে? আমাদের চিনিকলগুলো বন্ধ থাকবে, আর আমাদের রিফাইনারিগুলো কাঁচা চিনি আনবে ভারত থেকে? আমাদের বেনারসিপল্লি চলবে ভারতের বেনারসি দিয়ে, অটোরিকশার পার্টস আর ট্রাক্টর আসবে ভারত থেকে, আমাদের ৮০ শতাংশ পাটের বীজ আসবে ভারত থেকে, আমরা স্বনির্ভর হওয়ার পথে একটা আলাপও দেব না; কিন্তু মুখে মুখে শুধু ভারতবিরোধিতা করব?

আমাদের লাখো শ্রমিক দেশের ইন্ডাস্ট্রিগুলো বাঁচানোর জন্য প্রাণপণে লড়াই করেছেন, কাজ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, জেলে গেছেন, কিন্তু সেই দীর্ঘ লড়াইয়ে আমরা ভুলেও শরিক হইনি। দেশের সুতা মিল বাঁচাতে টুঁ শব্দ করিনি, অথচ এখন ভারতনির্ভর একটা অর্থনীতি জিইয়ে রেখে শুধু স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতি দিয়ে আমরা ভারতকে ঠেকাব?

‘ঢাকা না দিল্লি’ একটি শক্তিশালী স্লোগান। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘ সময় ধরে এই স্লোগান আমরা দিয়েছি। আমরা বরাবর বলেছি, ভারতের সঙ্গে হাসিনার নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, বিএসএফের সীমান্ত হত্যা, ফেলানী হত্যা, জ্বালানি খাতে আদানির আধিপত্যবাদী চুক্তি, তিস্তার পানির বণ্টন, অন্যায্য ট্রানজিট চুক্তি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ভারতের নিম্নমানের কয়লার ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ডে’ পরিণত করা—এসব অন্যায্য বন্দোবস্ত মোকাবিলা করতে হলে অর্থনীতির একটা স্বনির্ভর ভিত্তি লাগে। জাতীয় সক্ষমতা লাগে। ভারতনির্ভরশীলতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পলিসি লাগে। অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিল্লির হাতে তুলে দিয়ে মুখে ‘ঢাকা ঢাকা’ বললে জনতুষ্টিবাদের রাজনীতি হয়, আধিপত্যবাদ ঠেকানো যায় না।

* মাহা মির্জা, শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Sunday, December 28, 2025

পুতিন কীভাবে অর্থনৈতিক সংকট সামলে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন

সংকটের মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি, বাজেট–ঘাটতিসহ দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা। কমে যাচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এর কারণ হিসেবে একদিকে যেমন রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মস্কোর ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, অপর দিকে রয়েছে যুদ্ধ চালাতে বিপুল ব্যয়। এরপরও শিগগিরই যুদ্ধ বন্ধের জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রাজি হবেন বলে মনে হচ্ছে না।

রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার পরও বর্তমান গতিতে আরও বেশ কয়েক বছর ধরে দেশটি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক মারিয়া স্নেগোভায়া বলেন, রাশিয়ার অর্থনীতিতে যে আঘাত এসেছে, তা বিপর্যয়কর নয়। এটি এখন পর্যন্ত ক্রেমলিনের জন্য মানিয়ে নেওয়া সম্ভব।

একই কথা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক রিচার্ড কনোলির। তিনি বলেন, ‘যত দিন রাশিয়া জ্বালানি তেল উত্তোলন করতে পারবে এবং মানানসই একটি দামে তা বিক্রি করতে পারবে, তত দিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য দেশটির হাতে যথেষ্ট অর্থ থাকবে। যদিও রাশিয়ার অর্থনীতির বর্তমানে যে অবস্থা, তা দেশটির জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।’

ইতিহাসের দিকে তাকালে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে রাশিয়াকে প্রতিকূল চুক্তি করতে দেখা যায় বলে উল্লেখ করেন গবেষক স্নেগোভায়া। যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও আফগানিস্তান যুদ্ধের পর। তিনি বলেন, তবে রাশিয়া এখনো সেই পর্যায়ের সংকটের মধ্যে পড়েনি। এটা ইউক্রেনের জন্য খারাপ একটি খবর, এমনকি যুদ্ধ থামানোর জন্য তৎপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্যমতে, এ বছর রাশিয়ার মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। আর এ মাসের শুরুর দিকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মহাসচিব বলেছিলেন, যুদ্ধ চালাতে জাতীয় বাজেটের ৪০ শতাংশ খরচ করছে মস্কো। ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে রুশ সেনাদের সবচেয়ে বেশি বেতন দেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছেন গবেষক রিচার্ড কনোলি।

এ ছাড়া যুদ্ধ হতাহত সেনাদের পরিবারগুলোকে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে রুশ সরকার। এর লক্ষ্য হতাহত নিয়ে রাশিয়ার ভেতরে ক্ষোভ কমানো। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গত জুনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার প্রায় ১০ লাখ জন হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজার জন নিহত হয়েছেন।

কিয়েভ স্কুল অব ইকোনমিকস ইনস্টিটিউটের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার জাতীয় কল্যাণ তহবিলের আকার ৫৭ শতাংশ কমেছে। সম্প্রতি রাশিয়ার বড় তেল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান লুকঅয়েল ও রসনেফটের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এতে রাশিয়ায় ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে বলে জানান গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের কিম্বারলি ডোনোভ্যান।

এই গবেষক বলেন, এ নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়ার বড় বড় তেল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকা ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তেল রপ্তানি করছে। এতে করে খরচ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত ও চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যদি তাদের মস্কো থেকে তেল কেনা বন্ধ করা যায়, তাহলে যুদ্ধের মোড় বদলে যেতে পারে। তখন একটি সমঝোতায় রাজি হওয়া ছাড়া পুতিনের সামনে হয়তো খুব কম পথই খোলা থাকবে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-22%2F2rflw8n8%2Fputin-b.jpg?rect=0%2C0%2C620%2C413&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Thursday, December 11, 2025

চীনের ‘ইলেকট্রো-রাষ্ট্রের’ ভবিষ্যৎ কী by লুদোভিক সুবরাঁ

চীনে এখন আরেকটি বড় রূপান্তর চলছে। বিশ্বের কারখানা হিসেবে পরিচিত চীন দ্রুত একটি ‘ইলেকট্রো-রাষ্ট্রে’ পরিণত হচ্ছে। এর অর্থনীতি দিন দিন কার্বনমুক্ত জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। এই নতুন মডেলে অনেক সম্ভাবনা আছে। তবে বড় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

কার্বনমুক্ত প্রযুক্তির উৎপাদনে চীন এখন বিশ্বের একক নেতা। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও ব্যাটারির যন্ত্রপাতি উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চীন। শুধু সৌর প্যানেলের ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক উৎপাদনের ৮০ শতাংশের বেশি চীনেই হয়। এ বিশাল উৎপাদনের কারণে খরচ অনেক কমে গেছে। যেমন গত ১০ বছরে সৌর প্যানেলের দাম প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে।

চীন বিরল মৃত্তিকা খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’-এর দখলও অনেকটা নিজের হাতে নিয়েছে। এসব খনিজ বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ু টারবাইন ও এআই সেন্সর তৈরিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বের রেয়ার আর্থ মজুতের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং উৎপাদন ও পরিশোধনের প্রায় ৭০ শতাংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে।

এদিকে গবেষণা ও উদ্ভাবনে, বিশেষ করে এআই খাতে চীনের বিনিয়োগও বড় ফল দিচ্ছে। এখন বিশ্বের মোট এআই গবেষকদের অর্ধেকের বেশি চীনে কাজ করেন। বিশ্বজুড়ে নিবন্ধিত এআই পেটেন্টের প্রায় ৭০ শতাংশ চীনের। বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থার উদ্ভাবন সূচকেও চীন এখন শীর্ষ দশে। এই সবকিছু মিলিয়ে ওপর নির্ভরশীল।

কাঁচামাল, উচ্চ প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদন, নতুন শিল্প ও জ্বালানিব্যবস্থার নকশা এবং অর্থায়ন—সবকিছুতেই চীনের বড় ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি রেয়ার আর্থ চায় বা কোনো উন্নয়নশীল দেশের যদি পরিষ্কার জ্বালানি অবকাঠামো দরকার হয়, তাকেও চীনের দিকে তাকাতে হচ্ছে। কিন্তু এখানেই একটি বড় ঝুঁকি আছে। চীন যতই শক্তিশালী রপ্তানিকারক হোক, তবু তার অর্থনীতি এখনো বাইরের চাহিদার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। অথচ চীন সেই নির্ভরতা কমাতে চাইছে। বিশ্বে যখন সুরক্ষাবাদ বাড়ছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে সরবরাহব্যবস্থা চীন থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তখন এ নির্ভরতা চীনের জন্য দুর্বলতা হয়ে উঠতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনসংখ্যাগত সংকট। চীনের শ্রমক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। জন্মহার কমে গেছে প্রয়োজনীয় মাত্রার অনেক নিচে। ফলে শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আয় ও ভোগ কম বাড়তে পারে। এতে ভোগনির্ভর অর্থনীতিতে যাওয়ার যে পরিকল্পনা, তা বাধাগ্রস্ত হবে। আবাসন খাতও বড় সমস্যা তৈরি করছে।

এ অবস্থায় চীন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তারা একটি উদ্ভাবনী, কম কার্বননির্ভর শিল্প অর্থনীতির কাঠামো তৈরি করেছে। এ অর্থনীতি বিশ্বকে নেট জিরো এবং এআই বিপ্লবের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই ‘ইলেকট্রো-রাষ্ট্র’ টেকসই করতে হলে চীনকে তিনটি বিষয়ে অগ্রগতি আনতে হবে।

প্রথমত, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। শুধু আরও রোবট বা কারখানা দিয়ে নয়; বরং উদ্ভাবন, দক্ষতা বৃদ্ধি, ভালো ব্যবস্থাপনা এবং সেবা খাত উন্নয়নের মাধ্যমে। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। জিডিপির তুলনায় গবেষণায় ১০ শতাংশ বেশি ব্যয় করলে উৎপাদনশীলতা ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

দ্বিতীয়ত, দেশীয় চাহিদা বাড়াতে হবে। মানুষের আয় ও সম্পদ বাড়াতে হবে। ভোক্তার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে সেবা খাত, যেমন প্রবীণদের যত্ন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি শিল্প ও আবাসন খাত থেকে শ্রমিক সরিয়ে ভোক্তানির্ভর খাতে আনতে হবে।

তৃতীয়ত, বাইরের নির্ভরতা সামলাতে হবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। আত্মনির্ভরশীলতা জরুরি। তবে পাশাপাশি কৌশলগত অংশীদার, স্থিতিশীল বাণিজ্য সম্পর্ক ও স্বচ্ছ সহযোগিতার কাঠামোও দরকার।

* লুদোভিক সুবরাঁ, জার্মানিভিত্তিক বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আলিয়াঞ্জের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা (সিআইও) ও প্রধান অর্থনীতিবিদ
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

চীনের অর্থনীতি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে
চীনের অর্থনীতি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এএফপি

Wednesday, December 3, 2025

বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া কি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়া সম্ভব by সুবাইল বিন আলম

চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন নেই; বরং প্রয়োজন আলোচনাকে বাস্তব সমাধানের দিকে নেওয়া।

কিছুদিন আগে একটা গোলটেবিল প্রোগ্রামের কি–নোট উপস্থাপন করি এবং আলোচনায় উপস্থিত সবাই মোটামুটি একমত যে, বাংলাদেশ যদি ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে যেতে চায়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ ও চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নের বিলম্ব করার সুযোগ নেই; যদিও কিছু ব্যাপারে মানুষের মনে প্রশ্ন আছে।

এখন এ কথা শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটা নয়। কারণ, বন্দর শুধু একটা অবকাঠামো নয়, বরং এটা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, লজিস্টিকস, মুদ্রানীতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু।

চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের ৯২ শতাংশ সমুদ্র–বাণিজ্য ও ৯৮ শতাংশ কনটেইনার কার্গো এখান দিয়ে ওঠানো নামানো হয়।

২০২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন টিইইউ হ্যান্ডল করা হয়েছে। কিন্তু এই বৃদ্ধির মধ্যেও বন্দরের কার্যকারিতা এক জায়গায় আটকে আছে।

সিঙ্গাপুর বন্দর বছরে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন টিইইউ হ্যান্ডল করে, কলম্বো ৭ দশমিক ২ মিলিয়ন টিইইউ। তার তুলনায় চট্টগ্রামের ৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন টিইইউ এখনো আঞ্চলিক মানের অনেক নিচে।

বিশ্বব্যাংকের কনটেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স অনুযায়ী চট্টগ্রামের অবস্থান ৩৩৭তম/৪০৫। টার্মিনালের ক্রেন উৎপাদনশীলতা মাত্র ১৮-২১ মুভ/ঘণ্টায়, যেখানে আন্তর্জাতিক মান ৩৫-৪৫।

বিশ্বব্যাংক তার অক্টোবরের প্রতিবেদনেও এ কথা তুলে ধরেছে। এনসিটিতে ব্যবহৃত বেশির ভাগ গ্যান্ট্রি ক্রেন ২০ থেকে ৩০ বছরের পুরোনো।

প্রায়ই ব্রেকডাউন হয়, স্পেয়ার পার্টসের অভাবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অচল থাকে। একটি আধুনিক টার্মিনালে যেখানে ৯৫ শতাংশের বেশি আপটাইম থাকে, সেখানে এনসিটির আপটাইম ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ।

এর মানে হলো, বিদ্যমান অবকাঠামোই আমাদের অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়।

২০২৫ সালের আগস্টে এনসিটি একাই রেকর্ড ১ লাখ ২২ হাজার ৫১৭ টিইইউ হ্যান্ডল করেছে (+ ২৮% আগের একই সময়ে বছরের তুলনায়)।

জুলাই-সেপ্টেম্বরে এনসিটির ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি দেখা গেছে। কিন্তু সিডিডিএলের মধ্যস্থতা সত্ত্বেও অপেক্ষার সময় এখনো ৭ দিনের ওপর।

ফলাফল একটাই—জাহাজকে বহির্নোঙরে ৭ থেকে ১০ দিন অপেক্ষা করতে হয়, প্রতিদিন অতিরিক্ত খরচ ১২ থেকে ২০ হাজার ডলার।

প্রতিবছর এ বিলম্বে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ১ দশমিক ৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ বহন করেন।

এ খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে, রপ্তানির সময়সীমায় এবং দেশের লজিস্টিক খরচে উঠে আসে। সোজা কথায়, বন্দর জ্যাম মানেই জাতীয় অর্থনীতির জ্যাম।

যাঁরা বন্দর পরিচালনা, মেশিনারি রক্ষণাবেক্ষণ, অটোমেশন কিংবা ডিজিটাল টিওএস বোঝেন, তাঁরা জানেন, একটা টার্মিনালের দক্ষতা বাড়ানো মানে শুধু নতুন ক্রেন বসানো নয়।

এটা হলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা, প্রশিক্ষিত জনবল, ডিজিটালাইজেশন, গ্লোবাল শিপিং নেটওয়ার্কে প্রবেশ এবং দৃঢ় ম্যানেজমেন্ট শৃঙ্খলা।

সে জন্যই সরকার এনসিটি ও এলসিটিতে জিটুজি ও পিপিপি মডেলে বিদেশি অপারেটর আনার উদ্যোগ নিয়েছে।

লালদিয়া টার্মিনালে এপিএম টার্মিনাল (মারসেক গ্রুপ) এবং নিউমুরিং টার্মিনালে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে।

লালদিয়া টার্মিনালের চুক্তি নিয়ে প্রথম আলোয় একটা বিশ্লেষণ আসার পর দেখা যায়, দেশের এখানে একটাই রিস্ক, সেটা হচ্ছে যদি হরতাল–অবরোধে পোর্ট বন্ধ থাকে, তাহলে দেশকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

রাজনীতিবিদেরা কি এ ব্যাপারে গ্যারান্টি দেবেন? আশার কথা, দেশের এত হরতাল–অবরোধে সাধারণত পোর্ট বন্ধ থাকে না।

দুই প্রকল্পে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আসবে, যেখানে সরকারের নিজেদের বাজেট থেকে কোনো খরচ লাগবে না। আমাদের আর্থিক চাপও আসবে না।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, তারা সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, জাহাজের অপেক্ষার সময় ৪০ শতাংশ কমাতে পারে, ডুয়েল টাইম কমিয়ে আনে এবং পুরো টার্মিনালকে তথ্যভিত্তিক করে তোলে।

এ ব্যাপারে ২০২৫ সালের ২৩ জুন প্রথম আলো অনলাইনে  প্রকাশিত আমার লেখা ‘যে কারণে চট্টগ্রামে বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ দরকার’ শীর্ষক কলামে বিস্তারিত বলা আছে।

বর্তমানে ভিয়েতনাম, ভারত, এমনকি শ্রীলঙ্কার বন্দরগুলোও দ্রুতগতিতে আধুনিক হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর যদি এখনই র‍্যাডিকেল সংস্কার না করে, তাহলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সরবরাহশৃঙ্খলে আমরা মার্জিনালাইজড হয়ে পড়ব।

শিপিং লাইনগুলো সরাসরি কলম্বো বা ক্ল্যাংয়ে যাবে, সেখান থেকে ফিডার করে ছোট জাহাজে পণ্য বাংলাদেশে আসবে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য সময় ও খরচ—দুটিই বাড়িয়ে দেবে।

বন্দরের দক্ষতা বাড়লে শুধু জাহাজ দ্রুত লোড-আনলোড হবে না; এর তরঙ্গের প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রতিবছর ৫ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে।

তৈরি পোশাক, কৃষি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং—সব খাতেই অপেক্ষার সময় কমে যাবে। লজিস্টিক খরচ জিডিপির শূন্য দশমিক ৮ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

আজ বাংলাদেশে রপ্তানিকারকদের লজিস্টিক খরচ ভিয়েতনাম ও ভারতের চেয়ে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি। এই অদক্ষতা যত দিন থাকবে, এফডিআই আসবে না।

দক্ষ বন্দর শুধু অর্থনৈতিক নয়, পরিবেশগতভাবেও টেকসই। জাহাজগুলো যদি ১০ দিনের বদলে ২ দিনে টার্ন অ্যারাউন্ড করতে পারে, তবে জ্বালানি খরচ ও কার্বন নিঃসরণ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

এটি আমাদের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান লক্ষ্য (এনডিসি) অর্জনেও সহায়ক হবে।
সরকারি রাজস্ব বাড়বে। টিইইউ থ্রুপুট বাড়লে পোর্ট ফি, কাস্টমসের রেভিনিউ, অন্যান্য ডিউটি সবই বাড়ে।

সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা, বিদেশি অপারেটর আসলে চাকরি কমবে; বরং টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়লে কাজ বাড়ে, আর শ্রমিকদের আরও দক্ষ করে তোলে।

স্বল্প মেয়াদে (১-২ বছর) জাহাজের অপেক্ষার সময় কমবে, মধ্য মেয়াদে (৩-৫ বছর) থ্রুপুট ও রাজস্ব বাড়বে, আর দীর্ঘ মেয়াদে (৫-১০ বছর) রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও ক্রেডিট রেটিং উন্নত হবে।

পিপিপি বা জিটুজিতে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কারণ, এতে বাণিজ্যিক গোপনীয়তা থাকে। কিন্তু কিছু তথ্য জনগণের জানার অধিকার আছে। যেমন দেশ কী পরিমাণ লাভ করবে?

স্থানীয় পেশাদারদের ভূমিকা কতটা নিশ্চিত? অপারেটরের কেপিআই কী? মোট বিনিয়োগ কত? চট্টগ্রাম পোর্টের সঙ্গে রেভিনিউ শেয়ার কী?

এ সরকারের সময় যেহেতু তিন মাসেরও কম, তাদের তাই প্রধান রাজনৈতিক দল ও স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া দরকার।

এখন যতগুলো আলোচনা হচ্ছে, এর মধ্যে চুক্তির স্বচ্ছতায় আসলে একমাত্র প্রশ্ন—যার উত্তর সরকারে দেওয়া উচিত। কারণ, দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংস্কার তখনই সফল হয়, যখন বিষয়টি কারও এজেন্ডা না হয়ে সবাই সহরাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়।

যদিও হাইকোর্টে এনসিটি হস্তান্তরের বৈধতা নিয়ে পিটিশন চলছে। সরকার আশ্বাস দিয়েছে কোর্টের রায় ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।

এটা প্রমাণ করে যে প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার দিকে এগোচ্ছে, জনগণের উদ্বেগ উপেক্ষা করা হচ্ছে না।

আরেকটি বাস্তবতা হচ্ছে, চুক্তির মালিকানা ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ শতভাগ সিপিএ ও নৌবাহিনীর হাতেই থাকবে। বিদেশি অপারেটরের এখতিয়ার শুধুই ‘টার্মিনাল ম্যানেজমেন্ট’।

বন্দর বা রাষ্ট্রের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না। এটি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা যে সার্বভৌমত্ব মানে শুধু শতভাগ মালিকানা নয়, বরং নিজের সম্পদ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছি, সেটাও।

অদক্ষ, লোকসানি বন্দরের মালিকানা রাখার চেয়ে একটি দক্ষ, আয়বর্ধক বন্দরে অংশীদারি গ্রহণ করা অনেক বেশি সার্বভৌমত্ববান সিদ্ধান্ত।

গ্লোবালাইজেশনের যুগে ‘মালিকানা’ নয়, ‘নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘মূল্য সৃষ্টির ক্ষমতা’ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার জমি, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবে থেকে গেলে সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকে।

আরেকটি নিরাপত্তার জামানত হলো, বাংলাদেশ আলাদা দেশের অপারেটর নিচ্ছে। এক দেশের ওপর নির্ভরতা নেই, প্রতিযোগিতা থাকবে, বেস্ট প্র্যাকটিস আসবে। এই দেশগুলা নিজেদের স্বার্থেই নিরাপত্তা দেবে।

সমস্যা শুধু কনটেইনার হ্যান্ডলিং নয়, সমস্যা পুরো লজিস্টিকস ইকোসিস্টেমে। যদি শুধুই ক্রেনের স্পিড বাড়ানো হয় আর কাস্টমস, আইসিডি গেট, সড়ক লাইন, কনটেইনার বহির্গমনের জন্য রাস্তা যদি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে বন্দরের উন্নতির অর্ধেকই অপচয় হবে।

চট্টগ্রামের ড্রাফট কম, তাই বড় জাহাজ ঢোকে না। সারা দেশের রাস্তার অবস্থাই খারাপ, তাই বন্দরের কনটেইনার বের হতে দেরি হয়।

বে টার্মিনাল দ্রুত বাস্তবায়িত না হলে ড্রাফট সীমাবদ্ধতার কারণে ৬ থেকে ৮ হাজার টিইইউ জাহাজ কখনোই চট্টগ্রামে আসতে পারবে না, লজিস্টিক খরচ কমার পথও আটকে যাবে। বে টার্মিনাল ছাড়া চট্টগ্রাম কখনোই মাদার ভেসেলভিত্তিক বন্দর হতে পারবে না।

আমাদের কাস্টমস আধুনিক তো নয়, বরং ধীর এবং অনেক অনৈতিক কাজের অভিযোগ আছে। বাংলাদেশে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে যেখানে ৩০ থেকে ৪০ ঘণ্টা লাগে, সেখানে ভিয়েতনামে লাগে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা।

এই ব্যবধান কমানো ছাড়া বন্দর যতই উন্নত হোক, পুরো সাপ্লাই চেইনে গতি আসবে না। ফলে ডুয়েল টাইম বাড়ে। অর্থাৎ বন্দর উন্নয়ন মানে শুধু বন্দর উন্নয়ন নয়, পুরো সাপ্লাই চেইনের আধুনিকায়ন।

তবে বিশ্লেষকদের একটি বড় উদ্বেগ হলো ‘পায়রা সিনড্রোম’। সবার চিন্তা একটাই, যেন পায়রা বন্দরের মতো দুর্নীতি না হয়। একটা বড় অবকাঠামো বানিয়ে রেখে যদি তা ব্যবহারই না হয়, তাহলে সেটা ‘শ্বেতহস্তী’ প্রকল্প ছাড়া আর কিছুই হবে না।

তাই বাস্তব চাহিদা, ড্রাফট ডেপথ ও শিপিং গতিশীলতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

পায়রা বন্দরের শিক্ষা হলো, ‘যদি বানাও, তারা আসবে না’, যদি না সঠিক অপারেটর, সঠিক ড্রাফট ও সঠিক মার্কেট কানেকটিভিটি থাকে। এলসিটি ও এনসিটির জন্য প্রস্তাবিত অপারেটররা তাদের গ্লোবাল নেটওয়ার্ক থেকে শিপিং লাইন নিয়ে আসবে।

অর্থাৎ তাদের নিজস্ব কার্গো ফ্লো নিশ্চিত থাকে। এটি পায়রা মডেল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, যেখানে বন্দরটি তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু বিশ্বস্ত অপারেটর বা নিশ্চিত কার্গো ফ্লো ছাড়া।

দেশ যদি আগে হয়, তবে সিদ্ধান্তও হতে হবে দেশের স্বার্থকে কেন্দ্র করে। সরকারের হাতে এখন একটি শক্ত কার্ড রয়েছে। এলসিটি ও এনসিটি উভয়ই উচ্চমূল্যের সম্পদ।

এটি আমাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ায়। আমরা সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে পারি, যদি আমাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকে।

আমরা যদি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে অবশ্যই আমাদের আরব আমিরাতের ভিসা–সংক্রান্ত জটিলতা দূর করিয়ে নিতে হবে।

আল জাবেল বন্দর ব্যবহার করে আমরা যাতে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করতে পারি, সে সুযোগও নিতে হবে। এখন সময় সস্তা রাজনীতির নয়, বরং দূরদর্শী অর্থনৈতিক নীতির।

চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটা বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু। আমরা যদি এফডিআই-জিডিপি অনুপাতকে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশে না নিতে পারি, তাহলে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি স্বপ্ন হিসেবেই থাকবে।

আমরা কি তথ্যকে ভিত্তি করে এগোব, নাকি শোরগোলকে? তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, শোরগোল নয়। ডেটাই হবে নীতির ভিত্তি।

চট্টগ্রাম বন্দরের এই রূপান্তর কেবল একটি প্রকল্প নয়; এটি আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি মহা অভিযান। তথ্য-উপাত্তের আলোকে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে থেকে এগিয়ে গেলেই কেবল আমরা এ লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হব এবং এই বিদেশি অংশীদারত্ব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে বহুদূর এগিয়ে নিতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দর সংস্কার মানে শুধু বন্দর নয়, পুরো অর্থনীতির রূপান্তর।

* সুবাইল বিন আলম, টেকসই উন্নয়নবিষয়ক কলামিস্ট।
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-30%2Fz95l455t%2FScreenshot-2025-11-30-131646.jpg?rect=25%2C0%2C1082%2C721&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার। ছবি: প্রথম আলো

Saturday, October 25, 2025

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সার্বভৌম ঋণ সংকট by বিজ্ঞান বাবু রেগমি ও শিশির ভাণ্ডারি

কাঠমান্ডু পোস্টের নিবন্ধঃ দক্ষিণ এশিয়া এখন সার্বভৌম ঋণ (সোভারিন ডেবট) এবং রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে। এ অঞ্চলের সরকারি ঋণ অন্যান্য উদীয়মান অর্থনৈতিক অঞ্চলের তুলনায় অনেক দ্রুত বেড়েছে। এর মূল কারণ ধারাবাহিক বাজেট ঘাটতি। ২০২৩ সালের মধ্যে সরকারি ঋণের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৭৭ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা সার্বভৌম ঋণ খেলাপি হয়ে যায়। আর ২০২৩ সালে পাকিস্তান অল্পের জন্য একই পরিস্থিতি এড়ায়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তা চাইতে বাধ্য হয়, যা ক্রমহ্রাসমান বৈদেশিক মজুদের সংকটের গভীরতাকে প্রকাশ করে। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ভারতও ৮০ শতাংশ সরকারি ঋণের ভার বহন করছে। আর নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের মতো ছোট অর্থনীতিগুলো টিকে আছে মূলত রেয়াতি (কনসেশনাল) অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে।

এই উচ্চ ঋণস্তর এবং এর দুর্বলতা কেবল এর পরিমাণে নয়, কাঠামোগত দিকেও নিহিত। একদিকে সীমিত কর-ভিত্তি, অদক্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ও পণ্যের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রাজস্ব ব্যবস্থাকে সংকুচিত করছে। অন্যদিকে সীমিত বাণিজ্য সংহতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার অভাব দক্ষিণ এশিয়াকে বহিঃনির্ভরশীল করে তুলছে। এর ফলে উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য অর্থ বরাদ্দ কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের আর্থিক অগ্রাধিকার পুনর্গঠিত হচ্ছে, আর জনঅর্থায়ন নাগরিকদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বহিরাগত ধাক্কা
কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার সমৃদ্ধির নড়বড়ে ভিত্তিকে উন্মোচিত করেছে।

২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যায়। রিজার্ভ সংকট সামাল দিতে সরকারগুলো আরও ঋণ নেয়, যাতে দেশ চালু রাখা যায় এবং মৌলিক প্রয়োজন (জ্বালানি ও পণ্য) আমদানি অব্যাহত থাকে। ফলে দ্রুত মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়- যা সরবরাহ আধিক্যের কারণে নয়, বরং আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্নের কারণে।

উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ভোক্তা পণ্যের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়, ২০২৩ সালে পাকিস্তানে ৩০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। এমনকি ‘এশিয়ার বাঘ অর্থনীতি’ নামে পরিচিত বাংলাদেশেও ২০২৫ সালে মুদ্রাস্ফীতি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বহুমুখী ও স্থিতিশীল হলেও, রাশিয়ার সঙ্গে ছাড়মূল্যের জ্বালানি চুক্তি সত্ত্বেও ৩ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি ধরে রাখতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার লাখো মানুষ এখন প্রতিটি বৈশ্বিক সংকটের অভিঘাত প্রথমে টের পায় জ্বালানি পাম্পে বা বাজারের দোকানে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে নতুন বাণিজ্য বাস্তবতা।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র, যা দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ টেক্সটাইল ক্রেতা, ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসায় পোশাক ও শ্রমনির্ভর পণ্যের ওপর। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, শ্রীলঙ্কার অ্যাপারেল ও ভারতের টেক্সটাইল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই শুল্ক আরোপ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর জন্য বড় আঘাত। কারণ তারা ঋণ শোধের জন্য রপ্তানি আয়ের ওপর নির্ভর করে। ফলে প্রতিযোগিতার ক্ষমতা কমে যায় এবং বিদ্যমান কাঠামোগত সমস্যাগুলো আরও ঘনীভূত হয়।

কাঠামোগত সমস্যা
দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হলেও অকার্যকর ভর্তুকি নীতির কারণে সরকারগুলো বহিরাগত ধাক্কা সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, পাকিস্তানে কৃত্রিমভাবে কম বিদ্যুৎ ট্যারিফ নির্ধারণ ‘চক্রাকার ঋণ’ তৈরি করেছে, যা বারবার সরকারি হিসাবপত্রে ফিরে আসে। রাজস্ব কম থাকায় সরকারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অবকাঠামোর মতো খাত থেকে অর্থ সরিয়ে এই ভর্তুকি বহন করতে হয়। এ ধরনের ভর্তুকি অর্থনৈতিক দক্ষতার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দুর্বল করভিত্তিও বড় সমস্যা। ২০২৪ সালে পাকিস্তানে মাত্র ৩ শতাংশ নাগরিক আয়কর দিয়েছে, বাংলাদেশে ২০২২ সালে ১.৪ শতাংশ, আর ভারতে ৭ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলো নিয়মিতভাবে সরকারকে ক্ষতির মুখে ফেলছে। এসব কেবল অর্থনৈতিক অদক্ষতা নয়, বরং নীতিগত ব্যর্থতার ফল। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি প্রায়ই স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তার পেছনে ছোটে। ফলে রাজস্ব শৃঙ্খলা দুর্বল হয়, সংকটে সরকারের প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা কমে এবং পুনরুদ্ধার বিলম্বিত হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন: নতুন চ্যালেঞ্জ
জলবায়ু পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার নাজুক রাজস্ব অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলছে। এই অঞ্চল বন্যা, তাপপ্রবাহ ও অস্বাভাবিক মৌসুমি বৃষ্টিপাতের মতো জলবায়ুগত বিপর্যয়ের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব দুর্যোগ ফসল, জীবিকা, বসতি ও অবকাঠামো ধ্বংস করছে। ২০২২ সালে পাকিস্তানের ভয়াবহ বন্যায়ই শুধু ৩০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয় এবং লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে বাড়তি তাপমাত্রার কারণে বছরে প্রায় ২.৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়, যার অর্থমূল্য ১.৮ বিলিয়ন ডলার। ভারত, নেপাল ও ভুটানে জলবিদ্যুৎ ব্যাহত হচ্ছে। আর শীতলীকরণ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি আমদানি ও সরকারি ব্যয় বাড়ছে। এই জলবায়ু আঘাত নতুন ঋণ সৃষ্টি করছে। কারণ অভিযোজন অর্থায়ন প্রায়ই ঋণভিত্তিক। ফলে দেশগুলো টিকে থাকার জন্য আরও ঋণ নিচ্ছে, যা আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে- অথচ ঝুঁকি হ্রাস খুব সামান্যই হচ্ছে। এই ‘জলবায়ু-ঋণ ফাঁদে’ দেশগুলো দুইবার শাস্তি পায়। প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে, পরে ঋণের বোঝা টেনে। পর্যাপ্ত রেয়াতি অর্থায়নের অভাবে রাজস্ব স্থিতিশীলতা জলবায়ু চক্রের হাতে বন্দি থাকবে। ‘ঋণ-বিনিময়ে জলবায়ু রেহাই’ বা ‘ঝুঁকি-তহবিল’-এর মতো পদক্ষেপ এর সময়োপযোগী সমাধান দিতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বাধার কারণে আঞ্চলিক সহযোগিতা ধীরগতির।

সংকট ব্যবস্থাপনা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ডিফল্ট এড়াতে বারবার আইএমএফের দ্বারস্থ হয়েছে। ভারত শ্রীলঙ্কাকে ৪ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয় এবং নিজেও ২০২৩ সালে ১.৭ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পায়, যা মুদ্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে, কিন্তু ঋণ এখনও অস্থিতিশীল। পাকিস্তান ২০২৩ সালে ৩ বিলিয়ন এবং ২০২৪ সালে আরও ৭ বিলিয়ন ডলার সহায়তা পায়, যা মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু ঋণ পরিশোধেই সরকারের রাজস্বের ৬০ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশ ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি নিয়েছে বৈদেশিক ঘাটতি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু পুনরুদ্ধার ধীরগতির। ছোট অর্থনীতির দেশ নেপাল ও ভুটান রেমিট্যান্স, সাহায্য ও রেয়াতি ঋণের ওপর নির্ভর করছে। এর ফলে আইএমএফ কর্মসূচিগুলো সময় কিনে দিয়েছে, সংকটের সবচেয়ে খারাপ সময়গুলো সামাল দিয়েছে। কিন্তু এখন দেশগুলোর উচিত এই সুযোগে আর্থিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠন করা এবং ঋণনির্ভরতা কমানো।

পথচলার দিকনির্দেশ
মধ্য মেয়াদে দক্ষিণ এশিয়াকে এমন একটি আঞ্চলিক সহযোগিতামূলক কাঠামো তৈরি করতে হবে যা পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে তোলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- ভুটান, নেপাল ও ভারতের মধ্যে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য বাড়ানো গেলে ২০৪০ সালের মধ্যে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। ২০২২ সালে আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৩ বিলিয়ন ডলার, যেখানে সম্ভাবনা ছিল অন্তত ৬৭ বিলিয়ন পর্যন্ত। এছাড়া ক্যারিবীয় অঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকি বীমা তহবিলের আদলে দক্ষিণ এশিয়াও একটি যৌথ ঝুঁকি বীমা তহবিল গঠন করতে পারে, যা দুর্যোগের পর নতুন ঋণ ছাড়াই দ্রুত নগদ সহায়তা দিতে পারবে। স্বল্প মেয়াদে, দেশগুলোকে নিজস্ব সংস্কার আনতে হবে-  করভিত্তি প্রসারিত করা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেয়া ভর্তুকি বন্ধ করা এবং লোকসানি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করা। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাজার দরে সমন্বয় করা। তবে নিম্ন-আয়ের জনগণের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা, এটি আর্থিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে বাজেট পরিকল্পনা, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করে স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা জরুরি। নতুন ঋণ যেন রাজনৈতিক খরচে নয়, বরং উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়- এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

(লেখক- বিজ্ঞান বাবু রেগমি, একজন অর্থনীতিবিদ, এটিএইচ জুরিখ, সুইজারল্যান্ড এবং শিশির ভাণ্ডারি, একজন অর্থনীতিবিদ, নিউইয়র্ক; জলবায়ু অর্থায়ন ও সার্বভৌম ঋণ বিশেষজ্ঞ। তাদের এ লেখাটি কাঠমাণ্ডু পোস্ট থেকে অনুবাদ)

mzamin

Wednesday, October 22, 2025

নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা: যেভাবে বিশ্ব অর্থনীতি বদলে দিচ্ছে চীন

নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা পাকাপোক্ত করতে রাজধানী বেইজিংয়ে জড়ো হয়েছেন চীনের শীর্ষ নেতারা। সেখানে তারা ২০২৬-২০৩০ সালের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করবেন। বিশেষ করে আগামী পাঁচ বছর অর্থনৈতিকভাবে চীন নিজেদের কোন কোন লক্ষ্য পূরণ করতে চায় তার রূপরেখা এবং কর্মপদ্ধতি ঠিক হবে এই বৈঠকে। চীনে প্রতিবছরই এমন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বেইজিংয়ে সপ্তাহব্যাপী চলে এসব বৈঠক। সেখান থেকে তারা পরবর্তী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা নির্ধারণ করেন এবং লক্ষ্য পূরণে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ শুরু করেন। কাগজে কলমে চীনের এই পদ্ধতি সাদামাটা মনে হলেও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। চীনের এসব পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বিশ্বের অর্থনৈতিক গতিপথ বদলে দেয়ার নজিরও রয়েছে। এ ছাড়া এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের ফেলো নীল থমাস বলেন, পশ্চিমা নীতি নির্বাচনী চক্রে পরিচালিত হয়। আর চীনের নীতিনির্ধারণ চলে পরিকল্পনা চক্রে। চীনের এসব পরিকল্পনা দেশটির লক্ষ্য সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা দেয়। বিশেষ করে দেশটির নেতৃত্বের অভিমুখ কোন পথে তা জানা যায়। অতীতের তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা কীভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে, তার সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।

সেখানে বলা হয়, চীনের উত্থান-পর্ব হিসেবে ধরা হয় ১৯৮১-৮৪ সালকে। কমিউনিস্ট নেতা মাও সেতুংয়ের বিধ্বংসী শাসন ও সোভিয়েত-শৈলীর কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি যখন দেশের সমৃদ্ধি আনতে ব্যর্থ হয়, তখন নতুন নেতা দেং জিয়াও পিং মুক্তবাজার অর্থনীতির কিছু উপাদানকে গ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে শুরু হওয়া ওই পরিকল্পনায় সংস্কার ও উন্মুক্তকরণকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি এবং তাতে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার মধ্যদিয়ে চীনের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তিত হয়।

এর বৈশ্বিক প্রভাব ছিল ব্যাপক। একবিংশ শতাব্দীতে পশ্চিমা দেশগুলোর উৎপাদন খাতের বহু কাজ চীনের উপকূলীয় অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়। যা ইতিহাসে চায়না শক নামে পরিচিত। এর পেছনে রয়েছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক শিল্পাঞ্চলে জনপ্রিয়তাবাদী দলগুলোর উত্থান। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ এবং শুল্কনীতির প্রধান লক্ষ্য চীন। এর মাধ্যমে চীনের দখলে চলে যাওয়া হারানো সেই আমেরিকান শিল্প ফিরিয়ে আনতে চান ট্রাম্প।

২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগ দিয়ে চীন নিজেদের অবস্থান পাকা করেছে। এরপরই কম মজুরি আর সস্তা উৎপাদনের গণ্ডি পেরিয়ে এবার নিজেদের প্রয়োজন অনুসারে উচ্চ-প্রযুক্তিগত পণ্য ও পরিষেবা তৈরির উদ্ভাবনী ক্ষমতা আয়ত্ত করার পরিকল্পনা করে চীন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীন কৌশলগত উদীয়মান শিল্পের ওপর মনোযোগ দেয়। যার মধ্যে প্রধান ছিল সবুজ প্রযুক্তি। যেমন ইলেকট্রিক যান এবং সৌর প্যানেল। জলবায়ু পরিবর্তন যখন পশ্চিমা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো, চীন তখন এই শিল্পগুলোতে অভূতপূর্ব সম্পদ বিনিয়োগ শুরু করে। এর ফলস্বরূপ, আজ চীন কেবল নবায়নযোগ্য শক্তি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে সবার উপরে নয় বরং এই প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর (চিপ) তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিরল খনিজ সরবরাহেও প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে বেইজিং। কৌশলগত এই সম্পদগুলোর ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব জুড়ে তাদের ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। নীল থমাসের মতে, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে চীনের এই আত্মনির্ভরশীলতার আকাক্সক্ষা কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শের মূলে প্রোথিত।

বর্তমান পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শি জিনপিং প্রবর্তিত ‘উচ্চমানের উন্নয়ন’ স্লোগানটি প্রযুক্তি খাতে আমেরিকান আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার দিকে মনোনিবেশ করেছে। টিকটক, হুয়াওয়ে এবং ডিপসিক-এর মতো ঘরোয়া সাফল্যের গল্পগুলো চীনের এই প্রযুক্তিগত উত্থানের প্রমাণ। তবে পশ্চিমাদের এই প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রাকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে চীনা প্রযুক্তির ওপর বিশ্ব জুড়ে নিষেধাজ্ঞা বা নিষেধাজ্ঞার প্রচেষ্টা কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বর্তমান পরিকল্পনা  বৈঠক চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চীন এখন নতুন স্লোগানের দিকে ঝুঁকছে। যার প্রধান লক্ষ্য হলো প্রযুক্তি খাতে স্বনির্ভর হওয়া। বিশেষ করে চিপ তৈরি, কম্পিউটিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় উদ্ভাবনী ক্ষেত্রগুলোতে পশ্চিমা প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই পরবর্তী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য হবে বলে মনে করা হচ্ছে। নীল থমাসের বলছেন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা এখন চীনের অর্থনৈতিক নীতির সংজ্ঞায়িত মিশন। আগামী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বিশ্বকে কোন নতুন পথে নিয়ে যায় সেটাই এখন দেখার বিষয় বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

mzamin

Thursday, October 16, 2025

তরুণদের ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে by ফারহানা আলম

সিলেটের খাসিয়া সম্প্রদায়ের ২০ বছর বয়সী মিং সাং নতুন জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পান, যখন তিনি ট্যুর গাইড প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। আজ তাঁর গ্রামে তিনি হোম–স্টে পর্যটনকে সক্রিয়ভাবে প্রচার করছেন, অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছেন, গর্বের সঙ্গে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরছেন এবং একই সঙ্গে উপার্জনও করছেন।

২৭ বছর বয়সী আইনুল হক জুবেল শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক সংকটের কারণে একসময় জীবনকে অচল মনে করতেন। নিজেকে বোঝা মনে হতো—যতক্ষণ না একটি স্বল্পমেয়াদি গ্রাফিক ডিজাইন প্রশিক্ষণ তাঁর জন্য নতুন দ্বার উন্মুক্ত করে।

আজ জুবেল সচেতনতামূলক প্রচারে নিজের জীবনের গল্প শোনাচ্ছেন, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী তরুণদের অভিভাবকদের সঙ্গে। তাঁর বার্তা সহজ, কিন্তু শক্তিশালী—‘হাল ছেড়ো না, দক্ষতা জীবন বদলে দিতে পারে’।

১২ আগস্ট, বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক যুব দিবস ২০২৫—তরুণদের শক্তি, সম্ভাবনা ও প্রতিশ্রুতি উদ্‌যাপনের দিন। এ বছর দিবসটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে, কারণ, আমরা উদ্‌যাপন করছি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০-এর দশম বার্ষিকী—একটি ন্যায্য, সমৃদ্ধ ও পরিবেশ সংরক্ষণকারী বিশ্ব তৈরির প্রচেষ্টায়।

তবে এই স্বপ্ন তখনই বাস্তবায়িত হবে, যদি তরুণদের জাতীয় উন্নয়ন প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা যায়।

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স ১৫ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। উদ্বেগের বিষয়, তাঁদের মধ্যে ৩০ দশমিক ৯% তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে (সূত্র: এনইইটি) এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের ১২% বেকার (সূত্র: বিবিএস)। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, যাঁদের অনেকেই উচ্চ বেকারত্ব, মানসম্মত দক্ষতা প্রশিক্ষণের সীমিত সুযোগ, শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে অসামঞ্জস্য এবং শোভন কাজের অভাবের মতো স্থায়ী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বিশ্বের শ্রমবিষয়ক জাতিসংঘ সংস্থা হিসেবে তরুণদের এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রমে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডা সরকারের অর্থায়নে, আইএলও তরুণদের জন্য দক্ষতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং পরিসর দিয়ে সহায়তা করছে, যা তাঁদের ক্রমবর্ধমান কর্মজগতে সাফল্যের পথে এগিয়ে নেবে।

আমাদের কাজ শুধু শ্রেণিকক্ষের প্রশিক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। আইএলও বাস্তবায়িত কর্মসূচিগুলো চাহিদাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা থেকে শুরু করে এর বিস্তার ডিজিটাল জ্ঞান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিল্প খাতের সঙ্গে পরিচিতি এবং জীবনব্যাপী দক্ষতা উন্নয়ন পর্যন্ত। দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে তরুণদের অভিযোজন, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের জন্য এগুলো অপরিহার্য।

তবে তরুণেরা কেবল সুবিধাভোগী নন, তাঁরা নিজেরাই পরিবর্তনসাধক, উদ্ভাবক ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এ জন্য আমরা তাঁদের নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করি, যেমন যুব পরামর্শ, স্কিলস ফেয়ার, ক্যাম্পেইন ও উদ্ভাবনী ল্যাবের মাধ্যমে। আমরা তাঁদের নেতৃত্বকে উৎসাহিত করি, উদ্যোক্তা হিসেবে ও সচেতন কর্মী হিসেবে যাঁরা নিজেদের অধিকার বোঝে ও রক্ষা করে।

বিশেষ করে তরুণ নারীদের জন্য শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে যাত্রার পথটি মসৃণ হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা। আইএলও মানসম্পন্ন শিক্ষানবিশ ও শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বকে উৎসাহিত করে, যা তত্ত্ব ও তার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধান কমায়। এসব সহযোগিতা তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করে এবং আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদার সঙ্গে কর্মজগতে প্রবেশের প্রস্তুতি দেয়।

তবু বিপুলসংখ্যক তরুণ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে কাজ করেন, যেখানে কাজ অনিরাপদ, কম বেতনের এবং শ্রম সুরক্ষার বাইরে। এসব কাজকে আনুষ্ঠানিক করা এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রসারিত করা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সংগত ও টেকসই অর্থনীতি গঠনের জন্য অপরিহার্য। তরুণদের জন্য শোভন কাজ কেবল অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়।

গত এক দশকে, বাংলাদেশি তরুণেরা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসংকট, জলবায়ু বিপর্যয় ও ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে টিকে থাকার অসীম সম্ভাবনা দেখিয়েছে। তাঁদের সৃজনশীলতা ও দৃঢ়তা আমাদের আশা জোগায়। কিন্তু কেবল আশা যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে থাকতে হবে বিনিয়োগ, নীতিগত প্রতিশ্রুতি ও সহায়ক পরিবেশের সৃষ্টি। কারণ, তরুণেরা সমৃদ্ধ হলে সমৃদ্ধ হয় পুরো জাতি।

* ফারহানা আলম, যোগাযোগ কর্মকর্তা, স্কিলস প্রোগ্রাম, আইএলও বাংলাদেশ

তরুণদের ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে

Saturday, September 20, 2025

দুর্নীতি দূর না করতে পারলে দারিদ্র্য হটবে না by মামুন রশীদ

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে দারিদ্র্য দূরীকরণে বেশ সাফল্য দেখালেও সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাসের হার টেকসই করা যাচ্ছে না। প্রবৃদ্ধির সাফল্য যেমন সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না, তেমনি বিভিন্ন দুর্যোগে দারিদ্র্য আবার বেড়েও যায়। শুধু তা-ই নয়, অতি দরিদ্রের সংখ্যাও বেড়ে যায় বা নতুন করে লোকেরা দরিদ্র, এমনকি অতিদরিদ্রও হয়ে যাচ্ছে।

এটির কারণ হিসেবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভূরাজনৈতিক কারণকে দায়ী করা হলেও অনেকেই জোরেশোরে বলছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য না এলে দারিদ্র্য হ্রাসের প্রক্রিয়া টেকসই হবে না। সরকারের সাহায্য বা সুযোগ বণ্টনে বৈষম্য বরং দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

সংগত কারণেই গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে অনেক সরকার এসেছে, অনেক সরকার বিদায় নিয়েছে। এঁদের মধ্যে কেউ বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, কেউবা এশিয়ার উদীয়মান শক্তি হওয়ার বাসনা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মৌলিক যে অধিকার—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়নি।

দেশের ব্যক্তি খাতের আপাতবিকাশ ও সাফল্যে শহর-নগরে কোথাও কোথাও গতি, প্রবৃদ্ধি আর সেবার মান বাড়লেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষণীয় নয়। তদুপরি অধিক জনসংখ্যা, দুর্বল সড়ক-জনপথ পরিকল্পনা, জমির ব্যবহার নীতির দুর্বলতা আর বিচার না পাওয়ার সংস্কৃতি মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়তই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এখনো দেশের এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন। একটি বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে এখন দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক ৯৩ বা প্রায় ২৮ শতাংশ। সরকারি হিসাবেই ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭। দারিদ্র্য বৃদ্ধির এই িচত্র আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। সম্প্রতি পিপিআরসি পরিচালিত ‘ইকোনমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউসহোল্ড লেভেল ইন মিড ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, দারিদ্র্যের পাশাপাশি অতিদারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। সরকারি হিসাবে ২০২২ সালে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬। তিন বছর পর এসে অতিদারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫-এ।

গবেষণামতে, মূলত ২০২০-২০২২ সালের করোনা মহামারি, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। করোনার প্রভাব অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির হার এখনো অনেক বেশি। অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। বিনিয়োগ না বাড়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে, অথচ প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন। শিক্ষার মানের অধোগমনও এখানে প্রভাব ফেলছে।

বিগত সরকারের শেষ সময়ে অর্থনীতিতে যে বিশৃঙ্খল অবস্থা ও লুটপাট চলছিল, তা জনজীবনে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলেও সার্বিক পরিস্থিতি এখনো ভালো বলা যাবে না। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ মূল্যস্ফীতি কমাতে পারলেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি। যেখানে সাধারণ মানুষকে খাদ্যপণ্যের পেছনে আয়ের ৫৫ শতাংশ ব্যয় করতে হয়, সেখানে তাঁদের পক্ষে বেঁচে থাকার অন্যান্য উপকরণের জোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। খাদ্যপণ্যের মতো পরিবহন, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে; যদিও সেই অনুপাতে আয় বাড়েনি।

স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার দারিদ্র্যের হার কমাতে টেকসই পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু গত এক বছরে তাদের নীতি-পরিকল্পনায় সে রকম ছাপ দেখা যায়নি। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো গতানুগতিকভাবে চলছে। জুলাই অভ্যুত্থানের আগে থেকে চলে আসা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা পুরোপুরি চলে গেছে, তা বলার মোটেই সুযোগ নেই।

অনেকেই বলেছেন, দারিদ্র্য বৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারের উদ্যোগ কম কিংবা উদ্যোগ থাকলেও সাধ্য নেই। তদুপরি সামাজিক সুরক্ষায় যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা-ও সব সময় উপযুক্ত ব্যক্তি পান না। স্বার্থান্বেষী মহল হাতিয়ে নেয়। প্রচুর দুর্নীতি হয়। গরিবের হক ধনীরা মেরে খায়।

অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করেছে। এ অবস্থায় তাদের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া কতটা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে সংশয় আছে। কিন্তু সরকার অন্তত স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারত, যাতে দারিদ্র্যের হার কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।

এ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে। দলগুলোর নেতৃত্ব রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা নিয়ে মাসের পর মাস দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলেও জনগণের অর্থনৈতিক সমস্যার বিষয়ে সীমাহীন উদাসীনতা দেখিয়ে আসছেন। রয়েছে চিন্তার সক্ষমতার বিষয়টিও। দারিদ্র্য বিমোচনে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি ও নীতি-পরিকল্পনা কী, সেটা জানার অধিকার নিশ্চয়ই নাগরিকদের আছে।

সেই সঙ্গে আরও দুঃখজনক হলো দুর্নীতি দূরীকরণে কাউকে এখন পর্যন্ত জোরে শব্দ করতে শোনা যায়নি। বাংলাদেশে দুর্নীতি কমানো সম্ভব—এটা অনেকে সম্ভবত বিশ্বাসও করেন না। সাঁড়াশি অভিযানের জোর সম্ভবত ভোঁতা হয়ে গেছে কিংবা কাজ করানোতে কারও উৎসাহ নেই। অথচ আমরা জানি, দুর্নীতিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র জনগোষ্ঠী।

উপরিউক্ত গবেষণাতেই বলা হয়েছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য তথা পুষ্টিতে পিছিয়ে পড়ছে দরিদ্র মানুষ। তাদের জন্য বরাদ্দ অর্থের অনেকটাই তাদের কাছে পৌঁছায় না। অন্যদিকে সরকারের আয় কম বলে বরাদ্দও কম। রাজনৈতিক বন্দোবস্তও তাদের পক্ষে নয় বা থাকে না। অধিকতর আয়বৈষম্য তাদের ওপর করালগ্রাস হিসেবে কাজ করে। তাই বলাই যায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই টেকসই না হলে দারিদ্র্য হ্রাসও দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

* মামুন রশীদ, অর্থনীতি বিশ্লেষক

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-07%2Fxx79zimv%2FMasukart06092025.jpg?rect=0%2C9%2C2000%2C1333&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

Tuesday, July 22, 2025

রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেলে বিতর্কিত গ্যাস সম্পদের মালিকানা পাবে ফিলিস্তিন

ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে গাজা উপকূলবর্তী গ্যাসক্ষেত্র ‘গাজা মেরিন’-এর মালিকানা এবং সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলনের পূর্ণ অধিকার পাবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। এমনটাই বলছেন খনিজ সম্পদ বিশেষজ্ঞ মাইকেল ব্যারন।

ব্যারনের দাবি, বর্তমান বাজারদরে গাজা মেরিন গ্যাসক্ষেত্র থেকে অন্তত ৪০০ কোটি ডলার পর্যন্ত আয়ের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর গড়ে ১০ কোটি ডলার রাজস্ব পেতে পারে, যা ১৫ বছর ধরে চলতে পারে।

ব্যারন বলেন, ‘এ আয়ে ফিলিস্তিন কাতার বা সিঙ্গাপুরে পরিণত হবে না ঠিক, কিন্তু এটা হবে তাদের নিজেদের আয়। এতে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি পাবে তারা।’

গাজা উপকূলবর্তী গাজা মেরিন গ্যাসক্ষেত্রের মালিকানা নিয়ে প্রায় ৩০ বছর ধরে বিতর্ক চলছে। মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতার কারণে অনুসন্ধান কাজ দীর্ঘ সময় ধরে থেমে আছে।

ফিলিস্তিনপন্থী মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ইতালির রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ইএনআইকে একটি সতর্কীকরণ চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি জ্বালানি মন্ত্রণালয় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য যে অঞ্চলটিকে ‘জোন জি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার প্রায় ৬২ শতাংশই ফিলিস্তিনের দাবিকৃত সামুদ্রিক জলসীমায় পড়ে। ইসরায়েলের জ্বালানি মন্ত্রণালয় সেখানে গ্যাস অনুসন্ধানের ছয়টি লাইসেন্স দিয়েছিল।

চিঠিতে আইনজীবীরা দাবি করেছেন, ইসরায়েল সেখানে গ্যাস অনুসন্ধানের কোনো বৈধ লাইসেন্স দিতে পারে না।

২০১৫ সালে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশনে (আনক্লজ) স্বাক্ষর করে ফিলিস্তিন। ২০১৯ সালে তারা তাদের সমুদ্রসীমা ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করে এবং এ–সংক্রান্ত বিস্তারিত দাবি উপস্থাপন করে। ইসরায়েল এ কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি।

ব্যারন বলেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেলে, বিশেষ করে যেসব দেশের এখতিয়ারে বড় তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো নিবন্ধিত, সেসব দেশ যদি স্বীকৃত দেয়, তবে আইনি অনিশ্চয়তা কার্যত শেষ হয়ে যাবে। এতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ একটি নিরাপদ নতুন আয়ের উৎস পাবে এবং নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে। এ জন্য তাদের ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না।

ওই আইনি চিঠির পর ইএনআই ইতালিতে চাপ প্রয়োগকারী গোষ্ঠীগুলোর কাছে জানিয়েছে, এখনো কোনো লাইসেন্স ইস্যু করা হয়নি। কোনো অনুসন্ধান কাজও চলছে না।

গাজা উপকূলসংলগ্ন সমুদ্রসীমা বরাবর প্রায় ৯০ কিলোমিটার (৫৬ মাইল) দৈর্ঘ্যের একটি সামুদ্রিক গ্যাস পাইপলাইন ইসরায়েলের আশকেলন থেকে মিসরের আরিশ পর্যন্ত বিস্তৃত। সেখানে (আরিশ) গ্যাস তরলীকরণ করে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।

গ্লোবাল উইটনেস নামের একটি সংস্থা দাবি করেছে, বেআইনিভাবে ফিলিস্তিনের জলসীমার ওপর পাইপলাইন তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এটি থেকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কোনো রাজস্ব পায় না।

ব্যারন বলেন, ‘১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কারভাবে তাদের জলসীমা, ভূগর্ভস্থ সম্পদ, আইন প্রণয়ন এবং তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও লাইসেন্স প্রদানের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল। প্রাকৃতিক সম্পদে নিয়ন্ত্রণ ছিল ইয়াসির আরাফাতের রাষ্ট্র বিনির্মাণ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফিলিস্তিনি সম্পদে ইসরায়েলি শোষণ ছিল দুই অঞ্চলের মধ্যে চলমান সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

২০০০ সালে গাজা উপকূলে প্রথম প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এটি ছিল ব্রিটিশ গ্যাসের অংশীদারত্বে পরিচালিত একটি প্রকল্প। পরিকল্পনা ছিল গাজা উপত্যকার একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রে এ গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ–সংকট দূর করা হবে।

২০ বছরের বেশি সময় ধরে গাজা মেরিন থেকে ফিলিস্তিনিরা এক ফোঁটা গ্যাসও তুলতে পারেননি। ব্যারন বলেন, এ প্রকল্পের ভাগ্যই আসলে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের নীতির প্রতিচ্ছবি। একদিকে তারা চায় ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল থাকুক, একই সঙ্গে চেষ্টা করে তাদের আলাদা করে রাখতে।

প্রকল্পের প্রথম বড় সমস্যা ছিল, কারা এই গ্যাস উত্তোলনের লাইসেন্স দিতে পারবে, সে বিষয়। ফিলিস্তিন কোনো পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র নয়। তাই তাদের হাতে স্পষ্ট কোনো আইনি অধিকার ছিল না। ইসরায়েলি আদালত বলেছিল, গাজার উপকূলীয় জলসীমা আসলে ‘নো-ম্যানস ওয়াটার’ অর্থাৎ এটির মালিকানা কারও নয়।

অসলো চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের জলসীমার অধিকার স্বীকার করা হলেও সেখানে স্পষ্টভাবে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের উল্লেখ ছিল না; যা সাধারণত উপকূল থেকে ২০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। চুক্তিটি ছিল শুধু একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। ফলে সমুদ্রসীমার স্পষ্ট সীমানা নির্ধারিত হয়নি।

সাধারণভাবে উপকূল থেকে ১২ বা ২০ মাইল পর্যন্তকে বলা হয় ‘টেরিটরিয়াল ওয়াটার’। গাজা মেরিন গ্যাসক্ষেত্র গাজার উপকূল থেকে ২০ মাইল দূরে অবস্থিত। ইসরায়েলের দাবি, গ্যাসক্ষেত্রটি ফিলিস্তিনের অধিকার নয়; বরং তাদের দেওয়া ইসরায়েলের ‘উপহার’।

পরিস্থিতির অবনতি ঘটে ২০০৭ সালে হামাস গাজা দখল করার পর। এরপর ইসরায়েল প্রকল্পটি আটকে দেয় এবং ব্রিটিশ গ্যাস কোম্পানি প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়।
২০২৩ সালে ইসরায়েল মিসরের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ইগ্যাসকে গাজা মেরিন উন্নয়নের অনুমতি দিলেও গাজায় যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় প্রকল্পটি আবার থেমে যায়।

সম্প্রতি জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদন উপস্থাপনকারী ফ্রানচেসকা আলবানিজ বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতের মতে ইসরায়েলের ফিলিস্তিন দখল অবৈধ। ফলে যেকোনো বেসরকারি বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এ দখলকৃত অঞ্চলে বিনিয়োগ করলে বা ব্যবসা চালিয়ে গেলে তা বৈশ্বিক অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

আলবানিজ বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে ও ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে এমন পদক্ষেপে অংশ নিতে হবে। ইসরায়েল অবশ্য এই দাবিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

গাজায় একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র
গাজায় একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Monday, June 9, 2025

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম টাকা ভারতে ছাপা নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণার মুখে পড়েন তাজউদ্দীন

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম টাকা ছাপানো হয় ভারতে। কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় আসার আগে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের মহারাষ্ট্রের নাসিক শহরে অবস্থিত নাসিক সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে ৮০ কোটি এক টাকার নোট ছাপানোর উদ্যোগ নেন। উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশে প্রচলিত সব পাকিস্তানি নোট ধাপে ধাপে সরিয়ে নিজস্ব মুদ্রা চালু করা। কারণ, পাকিস্তান সরকার তখন এক টাকা ও উচ্চ মূল্যমানের নোট বাতিলের পরিকল্পনা করছিল। তাই সময়ক্ষেপণ করলে দেশের অর্থনীতিতে হঠাৎ ধস নামার আশঙ্কাও ছিল।

তবে ভারতে নোট ছাপানোর উদ্যোগ নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণার মুখে পড়েন তাজউদ্দীন আহমদ। তাঁর বিরুদ্ধে সদ্য স্বাধীন দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের মিথ্যা অভিযোগ তোলে তাঁর নিজ দল আওয়ামী লীগেরই একটি গোষ্ঠী। তারা গুজব ছড়িয়ে দেয়, ভারতের প্রিন্টিং প্রেসে এক টাকার মুদ্রা ছাপানোর যে সিদ্ধান্ত তাজউদ্দীন নিয়েছেন, তাতে ভারতের জন্য বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করার দরজা খুলে গেছে।

এ নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম স্ক্রল ডট ইন গত শুক্রবার ‘স্বাধীন বাংলাদেশ যেভাবে প্রথম পাকিস্তানি মুদ্রার অবসানে ভারতে তৈরি টাকার প্রচলন করেছিল’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সে দেশেরই স্টেটসমেন পত্রিকার সংবাদদাতা মানস ঘোষের লেখা ‘মুজিব’স ব্লান্ডার্স: দ্য পাওয়ার অ্যান্ড দ্য প্লট বিহাইন্ড হিজ কিলিং’ শিরোনামের বই অবলম্বনে এ প্রতিবেদন করা হয়।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, স্বাধীনতার পরপরই পাকিস্তানি মুদ্রা পরিবর্তনে তাড়াহুড়ার একটি বিষয় ছিল। কারণ, তখন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক টাকার নোটসহ উচ্চ মূল্যমানের অন্যান্য নোট বাতিলের চিন্তা করছিল। তাই তাজউদ্দীন আহমদ সিদ্ধান্ত নেন, পাকিস্তানের মুদ্রা বাতিলের পরিকল্পনা কার্যকর করার আগেই তাঁর সরকার ধাপে ধাপে নিজেদের মুদ্রা বাজারে ছাড়বে; যাতে সদ্য স্বাধীন দেশের ওপর হঠাৎ কোনো অর্থনৈতিক সংকট এসে না পড়ে। এই পরিকল্পনার শুরুটা তিনি করতে চেয়েছিলেন বাজারে এক টাকার নোট ছাড়ার মাধ্যমে।

তাজউদ্দীন আহমদ সিদ্ধান্ত নেন, তাঁর সরকার পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে বাজার থেকে পাকিস্তানের সর্বনিম্ন মূল্যমানের নোট তুলে নেবে। এর পরিবর্তে নতুন এক টাকার নোট চালু করবে। এই এক টাকার নোট যে ভারতে ছাপা হয়েছিল, তা প্রবাসী সরকারের অনেকেই জানতেন না।

১৯৭২ সালের মার্চে নতুন এক টাকার নোট বাজারে ছাড়া হয়। এ নোটগুলোতে পাকিস্তানের উর্দু হরফের পরিবর্তে সুন্দর বাংলা ফন্ট স্থান পায়। তখন ব্যবসায়ী মহল ও সাধারণ মানুষ এ উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। ঢাকার কিছু দৈনিক পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয়তে এ বিষয়ে সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দূরদর্শিতার প্রশংসা করে।

কিন্তু হঠাৎ করেই ঢাকা থেকে প্রকাশিত কিছু দৈনিকে খবর ছাপা হয়, দেশের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে নকল এক টাকার নোটের বস্তা ঢুকছে। যদিও ‘গুজব’ আকারে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদনে তাজউদ্দীনের নাম সরাসরি বলা হয়নি। তবে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল, নোট ছাপার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের হাতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করার সুযোগ তুলে দিয়েছেন, ভারত যাতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তাজউদ্দীন স্বেচ্ছায় সেই সুযোগ করে দিয়েছেন এবং ভারতীয় ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছেন। সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পত্রিকায় একই নম্বরের দুটি ভিন্ন নোটের (জাল নোট হিসেবে) ছবিও ছাপানো হয়।

মূলত তৎকালীন কয়েকজন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতাদের কেউ কেউ টাকার বিষয়টি নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন সংবাদ ফাঁস করতেন। যেমন তাঁরা একবার সংবাদকর্মীদের জানান যে ভারত থেকে টাকা ছাপানো নিয়ে যে প্রচারণা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও উদ্বিগ্ন। সেই সূত্র ধরে কিছু সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশ হয় এভাবে, প্রতিদিন ভারত থেকে বাংলাদেশে কোটি কোটি এক টাকার নকল নোট পাচার হচ্ছে। এই খবর শুনে বঙ্গবন্ধু সত্যতা যাচাই করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিজ দপ্তরে তলব করেন। এ ঘটনায় তাজউদ্দীন আহমদ মর্মাহত হন। কারণ, বঙ্গবন্ধু তাঁকে ডাকার পরিবর্তে তাঁর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ডেকে নিয়েছিলেন। অথচ তাঁকে (তাজউদ্দীন) কিছুই জানানো হয়নি।

ওই সময় সাংবাদিক বজলুর রহমান (প্রয়াত) পূর্বদেশের তৎকালীন সম্পাদক এহতেশাম হায়দার চৌধুরীকে (তিনি জাল ভারতীয় মুদ্রার ছবি ছাপিয়েছিলেন) জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার কাছে যাঁরা ছবিগুলো দিয়েছেন তাঁরা কি নকল নোট বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছেন? পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন?’ এহতেশাম হায়দার এ বিষয়ে জানাতে কোনো আগ্রহ দেখাননি।

দৈনিক সংবাদে কর্মরত বজলুর রহমান তখন এহতেশাম হায়দার চৌধুরীকে বলেন, ‘আপনার কি একবারও মনে হয়নি যে যাঁরা আপনাকে এসব ছবি ও খবর দিয়েছেন তাঁরা অসৎ উদ্দেশ্যে আপনার পত্রিকাকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছেন? আমরা এটি খুব ভালোভাবেই জানতাম যে আওয়ামী লীগের কারা এই নোংরা চক্রান্তে লিপ্ত; তাঁরা কার বিরুদ্ধে এবং কী উদ্দেশ্যে এই কাজ করছেন। তাই আমরা এ খবরটিকে গুরুত্ব দিইনি। সীমান্তবর্তী কোনো জেলা থেকে আমাদের কোনো সংবাদদাতা ভারত থেকে জাল বাংলাদেশি নোটের ব্যাপক চোরাচালানের খবর দেয়নি। ওই সব জেলার পুলিশ কিংবা সীমান্তে নিয়োজিত বাংলাদেশ রাইফেলসও (বর্তমান বিজিবি) জাল নোট জব্দের কোনো তথ্য দেয়নি। পুরো প্রচারণাটিই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—তাজউদ্দীনকে ফাঁসানোর জন্য।’

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সেসব প্রতিবেদন দেশে একধরনের ভীতিকর ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। গুজব এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে ঢাকার রিকশাওয়ালারা ভারতে ছাপানো এক টাকার নোট নিতে অস্বীকৃতি জানান। বরং তাঁরা পাকিস্তানি নোট ও কয়েনে (ধাতব মুদ্রা) ভাড়া নিতে চাইতেন। আর দোকানিরা বলতেন, এই নোট বৈধ নয়। যদিও কেউ কেউ নতুন নোটের পক্ষে যুক্তি দিতেন। তাঁরা বলতেন, সরকার এখনো এসব নোটকে অবৈধ ঘোষণা করেনি। তবে ব্যবসায়ীরা পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলতেন, দেশের জনগণ এই নোটে আস্থা রাখেন না।

ভারতে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের টাকা ছাপা
ভারতে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের টাকা ছাপা