Showing posts with label ঈদ বিশেষ সংখ্যা. Show all posts
Showing posts with label ঈদ বিশেষ সংখ্যা. Show all posts

Wednesday, September 18, 2013

গ্রানাদায় আধাবেলা by ফারুক মঈনউদ্দীন

আলহামরার দেখতে গিয়ে সকালের খেপে টিকিট মেলে না বলে গ্রানাদার ট্যুরিস্ট ম্যাপে ‘পালাসিও দে দার-আল-হোররা’ দেখে ওটা দেখতে যাওয়া মনস্থ করি। ট্যাক্সিওয়ালাকে ম্যাপে জায়গাটা দেখিয়ে দিলে বিনা বাক্যব্যয়ে দরজা খুলে দেয় আমাদের। আলহামরার আসসাবিকা পাহাড় থেকে নেমে কিছুদূর পর আবার একটা পাহাড়ে চড়তে থাকে ট্যাক্সি। যত উঠতে থাকি তত সরু হয়ে আসে রাস্তা, এখান দিয়ে যে গাড়ি চলে এবড়োথেবড়ো পাথুরে রাস্তার হাল দেখে সেটা গলা কেটে ফেললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। একপর্যায়ে দুটো পাহাড়ের পাথুরে দেয়ালের মাঝখানের সরু ফাঁক দিয়ে দুপাশের রিয়ার ভিউ মিরর গুটিয়ে অনেকটা সার্কাসের রুদ্ধশ্বাস ভঙ্গিতে গাড়ি পার করে নিয়ে যায় ড্রাইভার। তারপর একসময় একটা জনহীন জায়গায় গাড়ি থামিয়ে বলে, এবার নামো। চারপাশের নির্জনতা দেখে ঢোঁক গিলে বলি, পালাসিওটা কোথায়? লোকটা ভাড়ার ফেরত ভাংতি টাকা গুনে দিতে দিতে ‘ছুটি’ গল্পের ফটিকের মতো সামনের দিকে অস্পষ্ট ইঙ্গিত করে বলে, ওই হোথা। কিন্তু সামনের দিকে চোখে পড়ার মতো কোনো বাড়ির চিহ্ন দেখা যায় না। দূরে আরেক পাহাড়ের মাথায় আলহামরা প্রাসাদের পূর্ণ অবয়ব দেখা যায়। তার পেছনে সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালার সফেদ শৃঙ্গ ভেসে আছে নীল আকাশের গায়ে। আমাদের সামনে একটা বাগানমতো জায়গায় দুজন মালী কাজ করছিল, জানতাম লাভ নেই, তবুও জানতে চাইলাম, পালাসিওটা কোথায়? ওরা দুর্বোধ্য ভাষায় যা বলল তার বাংলা অর্থ এরকম হতে পারে, সায়েব আমরা মুখ্যু-সুখ্যু মানুষ, কী করে জানব প্রাসাদের হদিস। এদিকে এমন কিছু আছে বলে তো মনে হয় না।

আমরা বিভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক তাকাই, কয়েকটা অতি সাধারণ ঘর-বাড়ি চোখে পড়ে, একটা উঁচু বাড়ির উন্নত মস্তক দেখা যাচ্ছে বটে, কিন্তু ওটার দরজা কোথায়? হঠাৎ চোখে পড়ে পাশ দিয়ে একটা সরু পথ নেমে গেছে, সেই জনহীন পথে এগিয়ে যাই। অবিকল ঢাকার নারিন্দার ভূতের গলির মতো দুপাশে পলেস্তরা খসা প্রাচীন পাতলা ইটের দেয়ালের মাঝখান দিয়ে আরও এগিয়ে গেলে এক লোককে দেখা যায় মোটরসাইকেল স্ট্যান্ডের ওপর দাঁড় করাচ্ছে, তার কাছে গিয়ে ম্যাপটা দেখিয়ে আল হোররা নামের ম্যানশনটির হদিস জানতে চাই। লোকটা বলে সামনে গেলেই পাওয়া যাবে, তবে আজ খোলা আছে কিনা কে জানে। রাস্তার ওপর বহু পুরনো একটা জরাজীর্ণ অর্ধচন্দ াকার ফটক, ওটা পেরিয়ে প্রায় ভুতুড়ে গলির একটা বাঁকের পর চোখে পড়ে সাদামাটা কাঠের একটা দরজা, ভেতর থেকে বন্ধ। বৈশিষ্ট্যহীন দরজাটির পাশে কলিংবেলের বোতামও আছে, ওটা টিপে টিপে আঙুল ব্যথা করে ফেলার পর ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই।
দরজার ওপর ছোট একটা বোর্ডে ‘পালাসিও দার আল হোররা’ লেখা না থাকলে কেউই বিশ্বাস করত না যে এটি কোনো দর্শনীয় বাড়ি। তার নিচে লেখা ‘প্রবেশের সময়সূচি মঙ্গলবার এবং বৃহস্পতিবার ১০টা থেকে ২টা।’ আমরা যখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বেল টেপাটেপি করছিলাম, সে সময় আরেক বিদেশী দর্শনার্থী উপস্থিত হয়, স্প্যানিশ ভাষা না জানার কারণে আমরা কেউই সপ্তাহে মাত্র দুদিনের বিষয়টা তখন বুঝতে পারিনি। প্রাসাদোপম এই বাড়িটি মুসলমান আমীরদের শাসনামলের শেষভাগে পঞ্চদশ শতাব্দীতে তৈরি হয়েছিল। আরবি ‘দার-আল-হোররা’ অর্থ সৎ রমণীর বাড়ি (হাউস অব দ্য অনেস্ট লেডি)। ধারণা করা হয়, গ্রানাদার শেষ মুসলমান সম্রাট বোয়াবদিল বা আবু আবদুলার মায়ের জন্যই বাড়িটির এই নামকরণ। ১৪৯২ সালে খ্রিস্টান পুনর্বিজয়ের পর রানী ইসাবেলা এটিকে সান্টা ইসাবেলা লা রিয়েল কনভেন্ট নামে মঠে পরিণত করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে সরকার বাড়িটি অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণ করেছে, সেই সরকারি অধিগ্রহণ এবং সংরক্ষণের নমুনা তো দেখতেই পেলাম, সপ্তাহে দুদিন মিলে মাত্র আট ঘণ্টা খোলা থাকে দর্শনার্থীদের জন্য।
হাতে আরও সময় থাকায় বহু কসরত করে একটা ট্যাক্সি জোগাড় করে চলে যাই আলকায়সারিয়া বা আরব মার্কেট। বিশাল এক পাঁচরাস্তার মোড়, পুয়ের্তা রিয়েল বা রয়াল গেট থেকে উত্তরের রাস্তা ধরে এগিয়ে কিছুদূর গেলেই ঘিঞ্জি এই বাজারটি মুসলমান আমলে ছিল রেশম বাজার। আন্দালুসিয়াতে খ্রিস্টান পুনর্বিজয়ের আগে থেকেই গ্রানাদার আলপুখারাস ছিল সমৃদ্ধ রেশম উৎপাদনকারী অঞ্চল। কায়ে সাকাতিন বা সাকাতিন স্ট্রিট থেকে হাতের বাঁয়ে ঢাকার ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেটের মতো পরপর কিছু সরু গলির জটাজালে জমজমাট বাজারটাই আলকায়সারিয়া। সাকাতিন শব্দের অর্থ কাপড়ের বাজার। আলকায়সারিয়ার রেশম বাজার থেকেই এই কাপড়ের বাজার কিংবা এই সাকাতিন থেকেই আলকায়সারিয়া। মুরীয় আমল থেকেই কাপড়ের পাশাপাশি গয়নার কারিগর, দর্জি, জুতোর সেলাইকারী, বোতাম-সুঁই-লেসফিতাওয়ালারা তাদের পসরা সাজাত এখানে।
বাইরের সূর্যের আলো থেকে সরু গলির ছায়ায় ঢুকলেই চোখে পড়ে ছোট ছোট দোকানগুলো ট্যুরিস্ট-পছন্দ জিনিসপত্রে ঠাসা। কাপড়ের দোকানগুলোর দরজার বাইরে ঝোলানো উজ্জ্বল রঙের বান ডেকে যাওয়া পরিবেশ অনেকটা আমাদের গাউসিয়া মার্কেটের মতো। রেশম বাজার না হলেও এটির একটা বড় অংশে কাপড়ের পসরা সাজানো। এসব দোকানের বহুমুখী উজ্জ্বল বর্ণচ্ছটা দেখে জিপসি তরুণীর সাজ পোশাকের তুলনা মাথার ভেতর গেঁথে যায়। মেয়েদের সব ধরনের জামা-কাপড়, শাল, মাথায় বাঁধার হিজাব বা স্কার্ফ থেকে শুরু করে স্কার্ট, টপস, বিছানার চাদর এবং নাম না জানা আরও বহু ধরনের তৈরি পোশাক নিয়ে ভিনদেশী মহিলা ট্যুরিস্টরা কোমর বেঁধে দরকষাকষি করছে। ট্যুরিস্ট অফিসের মেয়েটি অবশ্য বলে দিয়েছিল যে, এই বাজার আদর্শ ট্যুরিস্ট বাজার, দরকষাকষি না করলে ঠকতে হবে। আমার মেয়েটিকে নিয়ে ওর মা দেখলাম পৃথুলা বিদেশিনীদের কনুইর তলা দিয়ে ঢুকে দিব্যি এটা ওটা ঘাঁটাঘাঁটি করছে, দোকানদারের সঙ্গে দরাদরি করছে সমানতালে। আমি ওদিকে না তাকিয়ে বাজারটির বৈশিষ্ট্য আবিষ্কারের চেষ্টায় ওদের সঙ্গে নৈকট্য পরিহার করার কৌশল অবলম্বন করি। লক্ষ্য করলাম দোকানে সাজানো পণ্যসামগ্রীর মধ্যে মুরীয় প্রভাব যে রকম অপ্রচ্ছন্ন, নিচতলার দৃষ্টিকাড়া পণ্যসম্ভার থেকে চোখ তুলে ওপরের দিকে তাকালে শতাব্দী প্রাচীন ভবনগুলোর খিলানের ধনুকাকৃতি স্থাপত্যের কারুকাজ এবং নকশায়ও তার ছাপ স্পষ্ট।
কাপড়চোপড় বাদ দিলে বাজারটির ছোট-বড় বিভিন্ন মানের দোকানে থরে থরে সাজানো হস্তশিল্প, কাঠের কারুকাজ করা নানা সামগ্রী, পাথরের গহনা, গৃহসজ্জার উপকরণ, গালিচা, তৈজস এবং এখানকার বিখ্যাত ফাহালাউজার চিত্রিত চিনামাটির মৃৎশিল্পের অপূর্ব সুন্দর থালা পাত্র ইত্যাদি। মুরীয় যুগ থেকেই গ্রানাদার উপকণ্ঠের ফাহালাউজা ছিল উন্নত চিনামাটির তৈজস শিল্পের জন্য বিখ্যাত। খ্রিস্টান পুনর্বিজয়ের পর মুসলমানদের ধর্মান্তরিত করার প্রবল চাপ ও হুমকির মুখে ফাহালাউজার প্রধান কারখানাটির মালিক ধর্মান্তরিত হয়ে নতুন নাম গ্রহণ করেন ‘আলোনসো দে মোরালিস।’ ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হলেও নীলপ্রধান মুরীয় নকশার ঐতিহ্য এখনও সমুন্নত দেখা যায় সব ফাহালাউজা সামগ্রীতে। নীল বা ময়ুরকণ্ঠি রঙের সঙ্গে সবুজ এবং বেগুনির সমাহারে চিত্রিত হয় লতাপাতা ফুল পাখি এবং বিচিত্র চোখ ধাঁধানো জ্যামিতিক নকশা। হাফপ্যান্ট পরা বিশালবপু ট্যুরিস্টরা নানান ভঙ্গিতে সেসব উল্টেপাল্টে দেখে অবলীলায় কিনে নিচ্ছে।
আলকায়সারিয়ার দোকানগুলোয় ঘুরতে চাইলে পুরো দিনের অর্ধেকটাই কাটিয়ে দেয়া যায়, কিন্তু লাঞ্চের জন্য সান মাতিয়াসে ঢুকে দুপুরের খাবারের জন্য যাই রেস্তোরাঁ-পট্টি কায়ে নাভাস, অর্থাৎ নাভাস স্ট্রিট। কায়ে নাভাস হচ্ছে গ্রানাদার এক বিখ্যাত রেস্তোরাঁ পাড়া। রাস্তাজুড়ে একের পর এক রেস্তোরাঁ, কোনটা ছেড়ে কোনটায় ঢুকব বাছাই করা মুশকিল হয়ে পড়ে। রাস্তায় অস্থায়ীভাবে টানানো রঙবেরঙের চাদোয়ার নিচে বিয়ারের মগ আর ‘তাপাস’ নিয়ে বসে থাকা আয়েশি লোকজন দেখে একটার সামনে খালি চেয়ার দেখে বসে পড়ি। দীর্ঘাঙ্গী বলশালী দেখতে সুশ্রী একটি মেয়ে এসে টেবিলে মেন্যুকার্ড রেখে বলে, বিয়ার? আমি বলি, অলসো তাপাস। মেয়েটি তার হাত দিয়ে স্বভাবজাত মেয়েলি ভঙ্গিতে এমন একটি মুদ্রা তৈরি করে যার অর্থ, কোনো ব্যাপার না, এটা বলে না দিলেও চলত।
এখানে বলে রাখা উচিত আন্দালুসিয়াতে ড্রিংকসের অর্ডার দিলে ‘তাপাস’ আপনিই আসবে ফ্রি। সাদামাটাভাবে বললে ‘তাপাস’ হচ্ছে অ্যাপেটাইজার, শব্দটা এসেছে স্প্যানিশ ক্রিয়াপদ ‘তাপার’ থেকে, অর্থ ঢাকা দেয়া। এটির একাধিক ইতিহাস আছে। একসময় তাপাস বলতে বোঝাত আন্দালুসিয়ার সরাইখানাগুলোতে চুমুক দেয়ার পর শেরীর গাস ঢেকে রাখার জন্য পাউরুটি অথবা মাংসের স্পাইস। কারণ শেরীর মিষ্টি গন্ধে বড় বড় ডুমো মাছি এসে হাজির হতো। সেই মাছির হাত থেকে শেরীর গাসকে ঢেকে রাখার জন্য ব্যবহার হতো এই তাপার। সালামি অথবা চরিসো নামের নোনতা স্মোকড শূকরের মাংস দিয়ে এই তাপার তৈরি হতো যা খদ্দেরের পানের তৃষ্ণাকে আরও বাড়িয়ে দিত। এই কারণে মদ বিক্রি বাড়ানোর জন্য পানশালাগুলোতে শেরী কিংবা অন্য পানীয়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের তাপার সার্ভ করা শুরু করে মালিকরা এবং সেটি একসময় রেওয়াজে পরিণত হয়।
অন্য এক ভাষ্যমতে রাজা দশম আলফনসো (১২২১-১২৮৪) অসুস্থ হয়ে পড়লে রাজবৈদ্যরা তাকে সেরে ওঠার জন্য ওয়াইনের সঙ্গে অল্প অল্প করে কিছু খাবার খেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। রোগমুক্তির পর রাজা নাকি এই পথ্যের গুণে মুগ্ধ হয়ে ফরমান জারি করেছিলেন, সব পানশালায় ড্রিংকসের সঙ্গে যাতে বাধ্যতামূলক হালকা খাবার পরিবেশন করা হয়। গাসের ওপর পাউরুটি, অন্য খাবার কিংবা তার পেট রেখে দিলে মাছির উৎপাত থেকে যেমন রেহাই পাওয়া যেত, তেমনি খালি পেটে মদ গেলার কুফল থেকেও রক্ষা পেত পানবিলাসীরা। যেভাবেই হোক এই ‘তাপার’ পরবর্তী কালে ‘তাপাস’ হয়ে যায়। আন্দালুসিয়াতে ‘তাপাস বার’ কথাটা খুব চালু এবং গ্রানাদার সান মাতিয়াসের কায়ে নাভাস নামের গলিটি রেস্তোরাঁ এবং তাপাস বারের জন্য বিখ্যাত কয়েকটি ঠেকের একটি। আমরা যখন উঠি কায়ে নাভাসে তখনও টেবিলে টেবিলে হোয়াইট ওয়াইন, রেড ওয়াইন, বিয়ার আর টাপাসের মোচ্ছব চলছে। গলির এক পাশে বসে নিবিষ্ট মনে বেহালায় ছড় বোলাচ্ছে এক বাজনদার। তার কম্প্রমান ছড়সৃষ্ট সুর মাঝে মাঝে তলিয়ে যাচ্ছে পাশের টেবিল থেকে উছলে ওঠা অট্টহাস্যে।
ইমেইল: fmainuddin@hotmail.com

Tuesday, September 17, 2013

নাইউজি মসজিদ ও রেডগার্ড by মঈনুস সুলতান

সাড়ে তিন বছরের কন্যা কাজরিকে নিয়ে আমরা সন্ধ্যের পর বসেছি বেইজিং শহরের একটি রেস্তোরাঁয়। এখানকার অত্যন্ত আন্তরিক বাবুর্চি আজ পরিবেশন করেছেন কুজয়াও ইউ বলে শির্কায় জারিত গোলমরিচের ফোঁড়ন দেয়া আস্ত একটি মাছ। কাজরির জননী হলেন চপস্টিকে এক টুকরা মাছ উঠাতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে চেয়ে আছে কাচের জানালায় লাগানো চীনের সিয়ন অঞ্চলের সপ্তম শতাব্দীতে কায়েম ঐতিহাসিক মসজিদের ছবির দিকে। সম্পূর্ণ চীনা স্থাপত্য রীতিতে টালির ঘেরা কার্নিশ দেয়া মসজিদটির ছবি সে অনেকবার দেখেছে, কারণ আমরা বেইজিংয়ে আছি সপ্তাহ দুয়েক হল এবং প্রায় প্রতিদিনই সপ্তায় ডিনার করছি এ রেস্তোরাঁয়। এখানকার বাবুর্চি (তিনিই একমাত্র কর্মচারী সম্ভবত মালিকও), সিয়ান থেকে আগত হুই সম্প্রদায়ের মুসলিম। সাদামাটা এ রেস্তোরাঁর বাইরের দিকের কাচে লাগানো আছে কাবা শরিফ ও মদিনা মনওয়ারার দুটি স্টিকার। হুই গোত্রের এ কুক দেখতে অনেকটা মিনিয়েচার চিত্রে আঁকা ছোট ছোট চোখের যৎসামান্য দাড়িওয়ালা মোগল সিপাহির মতো। চোখজোড়া আকারে বেজায় ছোট্ট হলেও তার হৃদয় অত্যন্ত দরাজ। স্টিকার দেখে তার ধর্ম নির্ণয় করে আমরা প্রথম যেদিন এখানে ঢুকি; স্লামালেকুম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হাত বাড়িয়ে মোসাফা করে আমাদের বসতে দেন। কাজরি দুষ্টুমিতে বেসামাল হয়ে সয়-সসের কৌটা উল্টে দিলে তাকে টেনে নেন তার প্রশস্থ বুকে। তারপর তার সংকীর্ণ দুই চোখ আরেক প্রস্থ ছোট করে তার সঙ্গে খুনসুটিতে মাতলে এবং পরে তার খাবারের দাম চার্জ না করলে আমরা বুঝতে পারি তার আন্তরিকতা অশেষ এবং আমাদেরও এখানে আসতে হবে অনেকবার।

আজকের পারিবারিক ডিনার কিছুতেই জমে উঠছে না। আমরা বসেছি লেডি সুজান নামে পরিচিত একটি গোলটেবিলে, যাতে আলগা কাচের চাকতির উপর খাবারের বাটিগুলো রাখা। তার জননী হলেন নিশ্চুপ হয়ে আছে বলে সে চাকতি ঘোরালে তাতে রাখা সুয়ানালা টাং বা হট এন্ড সাওয়ার স্যুপের বাটি উপচে টেবিলক্লথ ছলকে পড়ে উষ্ণ তরল। হলেন তাতে ভ্রুকুটি করে কাঁধ হেলালে তার তাম্রবর্ণের ব্র“নেট চুলের বাঁকানো কার্লে এসে পড়ে লোহিত ট্যাসেল ঝোলা চীনা লণ্ঠনের আলো। বিকালের দিকে একটা বিষয়ে আমাদের দ্বন্দ্ব হয়েছে, সে থেকে বাতচিত প্রায় বন্ধ। আজকের সকাল কিন্তু আমাদের মোটমির্যা ভালোই কেটেছে। ৯টার দিকে বাজার বাও আরও ১০ জন পর্যটকের মতো আমরা ঢুকে পড়ি। নিষিদ্ধ নগরীর ঈশান কোনে ৬৯ হেক্টরে বিস্তৃত চীন সম্রাটদের দশম শতাব্দীতে তৈরি বাগিচা বিলাস বেইহাই পার্কে। এখানে সরোবরের ভেতর একটি কৃত্রিম দ্বীপে পাহাড়ের চূড়ায় অমিতাভ গৌতমের শ্বেত মর্মরের প্যাগোডা। সরোবরের পাড় ঘেঁষে জলের উপর ভাসমান জোড়া প্যাভেলিয়ন। আমরা তার চাতালে বসে ঘুরে তাকালে একটি ব্রিজের তিনটি দৃষ্টিনন্দন বৃত্ত ও পাহাড়ে মন্দিরের আকৃতি চলে আসে সমান্তরাল রেখায়। কাজরি অন্য চীনা বাচ্চাদের সঙ্গে ছোটাছুটি করে। তাদের মা-বাবা শ্বেতাঙ্গিনী রমণীর সঙ্গে জুটে যাওয়া বাঙালি পুরুষের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে আমাদের অত্যন্ত মশলাদার কুড়মুড়ে খাবার অফার করলে; তার সর্ষে-মরিচময় ঝাঁঝ শুঁকে আমাদের মেজাজ খুশ হয়ে যায়। হলেন সরোবরে ফোটা পদ্মের দিকে তাকিয়ে ইম্পিরিয়েল গার্ডেনের ম্যাজেস্টিক বিউটিতে মুগ্ধ হয়ে প্রিন্সেস অব চায়নার বিশুদ্ধ সুর শিস দিয়ে ভাঁজে।
বিকালের দিকে বেইজিং রেলওয়ে স্টেশনে যাই ট্রেনে চড়ে মঙ্গোলিয়ার উলানবাটরে যাওয়ার খোঁজ নিতে। আমাদের আরও সপ্তাহ দুয়েকের সাবকাশ আছে সুতরাং অবকাশ যাপনের জন্য উলানবাটরে যাওয়া যায়। কিন্তু হলেন সহসা সাড়ে তিন বছরের বাচ্চা নিয়ে মঙ্গোলিয়ায় যেতে চায় না। হঠাৎ মতান্তর দেখা দিলে আমি বেজায় আতান্তরে পড়ি। উলানবাটরে যাওয়ার আইডিয়া আদিতে তারই ছিল। এমনিতেই বেইজিংয়ের অলিগলিতে চীনা জবান বুঝতে আমাদের লবেজান হওয়ার দশা, তার উপর উলানবাটরে চলে মঙ্গোলিয়ান আর অল্পবিস্তর রুশ; দুটোই আমাদের আজানা। সুতরাং সে আরেকটি স্রেফ বেগানা ভাষা নিয়ে ডিল করতে চায় না। কিন্তু ভাষা না জেনে কি মানুষজন ভিন্ন দেশে যাচ্ছে না? পর্যটকরা তো ভাষাতত্ত্বের পয়লোয়ান না, তারা তো কেউ লবেজান হচ্ছে না, দিব্যি ট্রেন চড়ে পাড়ি দিচ্ছে মঙ্গোলিয়ার দিকে?
এ দ্বন্দ্ব বিস্তৃত হতে হতে এখন কথা বন্ধে দাঁড়িয়েছে। রেস্তোরাঁর গোলটেবিলে খাবার সামনে নিয়ে আমরা ডিনারের ভান করছি, এমন সময় বাবুর্চি এসে কিছু বলার চেষ্টা করেন। তার বাচনিকে আমরা কিছু না বুঝে আরও দ্বন্দ্বে পড়ে যাই। তিনি কাজরিকে চীনা মিষ্টান্নের একটি প্যাকেট দিয়ে ডেসপারেট হয়ে কানে আঙ্গুল দিয়ে আজানের ভঙ্গি করে রুকু সেজদায় রীতিমতো নামাজের নিশানা করেন। বিষয় কি? মূকাভিনয়ে তার যে কিছু প্রতিভা আছে তার পরিচয় তিনি আগেও দিয়েছেন। প্রথম দিন আমাদের মাংস পরিবেশন করলে তা কীসের মাংস আমরা জানতে চাই। তার বক্তব্য, আমাদের বোধগম্য না হলে তিনি কুকরুকু ধ্বনিতে মোরগার মতো পাখা ঝাপটিয়ে তথ্য পরিবেশন করেন। এবার তার রুকু সেজদার সঙ্গে লা ঈদ লা ঈদ ধ্বনিত হলে হলেনের মুখে হাসি ফোটে। সে বাবুর্চির আচরণ থেকে আবিষ্কার করে আগামীকাল ঈদ। তিনি একটি চিরকুটে বেইজিংয়ের নাইউজি মসজিদের ঠিকানা লিখে দেন।
রেস্তোরাঁ থেকে অল্প দূরে বেইজিংয়ে ডংচেং ডিস্ট্রিক্টের একটি সস্তা হোটেলে আমরা বাস করছি। ওখানে ফেরার পথে বুঝতে পারি ঈদ শব্দটি সিসিম ফাঁকের ম্যাজিকের মতো খুলে দিয়েছে আমাদের মনের সিন্ধুক। নানা দেশে পারিবারিকভাবে ঈদ উদযাপনের কিছু মুখরোচক মেমোরি আমাদের আছে। সুতরাং হোটেলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বেইজিংয়ে কীভাবে ঈদ পালন করা যায় তা নিয়ে হলেন পরিকল্পনা করতে শুরু করে। হোটেলে ঢুকতেই আমার মাথায় সংশয় চাগিয়ে ওঠে। বাবুর্চি তো লা ঈদ বলে সংবাদ দিলেন। শব্দটা আমরা সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছি তো? সব কিছুতে থরোভাবে জেনেশুনে কাজে নামার প্রবণতা হলেনের আছে। তাই বিষয়টি কনফার্ম করার জন্য হোটেলের ম্যানেজারের সঙ্গে সে কথা বলতে চায়। এ হোটেলে ম্যানেজারই একমাত্র ব্যক্তি যার চল্লিশটি মতান্তরে পচপান্নটি ইংরেজি শব্দের উপর দখল আছে। বেশ রাত হয়েছে, তার কামরার সামনের দুয়ার বন্ধ। হলেন ঠেলে পেছনের দুয়ার দিয়ে ঢুকে পড়ে। ভেতরে ভদ্রলোক তাড়তাড়া নোট ছড়িয়ে বসেছেন। রিসিপশনিস্ট তরুণী ডেক্সের উপর পা ঝুলিয়ে বসে গুনছে ভাংতি পয়সা। খোলা ক্যাশবক্সের পাশে রাখা তার সিল্কের স্টার্কিংস ও কাওলিয়াং জু বলে সরগম ওয়াইনের খোলা শিশি। মনে হয় আমরা তাদের প্রাইভেট মুহূর্তে ঢুকে পড়েছি। হলেনের মুখে ঈদ শব্দটি শুনে ম্যানেজার এমন তেড়ে ওঠেন যেন আমরা সিঁদ কেটে ঢুকে পড়েছি তার কক্ষে।
শেষ রাতের দিকে কাজরি জেগে উঠে-বাপি হোয়েন ইজ ঈদ... ঈদ করলে আমাদের ঘুমনিদ তেমন ভালো হয় না। মসজিদে যাওয়ার জন্য কি পরব তা নিয়েও একটু বিভ্রান্তি হয়। হলেন আমাকে মাও-জ্যাকেট বের করে দেয়। এ ছাড়া মসজিদে পরে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত পোশাক-আশাকও পাই না। বেইজিংয়ে আগমনের প্রথম সপ্তাহে আমি একটি পঞ্চতারকা হোটেলে অনুষ্ঠিত সেমিনারে যোগ দেই। ক্যাজুয়েল পোশাকে ওখানে ঢুকতে গেলে দুয়ারে দাঁড়ানো মিলিটারি পোশাকের এক চৌকিদার পথ আটকে ফর্মাল ড্রেসকোড তথা স্যুট পরে আসতে বলে। উপায়ান্তর না দেখে হোটেলের শপিং আর্কেডের দোকান থেকে রেডিমেড স্যুট কেনার চেষ্টা করি। কিন্তু অনভ্যাসবশত টাই পরতে গিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ গলবন্ধ বাঁধাকে ধাঁধার চেয়েও জটিল মনে হয়। সুতরাং স্যুটের পরিবর্তে মাও-জ্যাকেট খরিদ করে তার সঙ্গে মাথায় কমরেড লিনপিয়াও স্টাইলের হ্যাট পরে রেডগার্ডের মতো বীরদর্পে সেমিনার কক্ষে প্রবেশ করি। মাও-জ্যাকেট দিয়ে সেমিনার জয় করলেও তা পরে মসজিদে যেতে কেমন যেন খুঁতখুঁত করে। আয়নায় তাকালে নিজের চেহারাকে কিরকম সাবেক আমলের ব্যর্থ বিপ্লবীর মতো দেখায়।
ট্যাক্সিতে নাইউজি মসজিদে আসতে আমাদের বিশেষ কোনো অসুবিধা হয় না। সম্পূর্ণ চীনা স্থাপত্য রীতিতে তৈরি এ মসজিদের লোহিত নীলে রঙিন কাঠের কাঠামোতে নানা কোনবিশিষ্ট টালির কাজ দেখে ভাবি- উপাসনার এ ইমারতটি তৈরি হয়েছে চীনা সংস্কৃতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ইসলামী বিশ্বের মসজিদ স্থাপত্যের সনাতনী ধারার ব্যতিক্রম হিসেবে। তার সামনে ততক্ষণে মুসল্লিরা জমায়েত হতে শুরু করেছেন। রোয়াকে বিক্রি হচ্ছে টুপি, তসবিহ, হেজাব, মেয়েলি শাল ও ঊর্ণা। আমি চট করে কাজরিদের জন্য দুটি ঊর্ণার সঙ্গে জরির কাজ করা একটি টুপি কিনে নিলে আমাকে চীনা ভাষায় নামাজের নিওত ও তকবির লেখা ফ্রি প্যাম্ফলেট দেয়া হয়।
তোরণের পাশে ছোট্ট মিনারের তিন স্তরে পর পর রাখা মস্ত ঢাক, ঘণ্টা ও একদম উপরের থাকে ছোটখাটো বৃক্ষের মতো ডালপালায় প্রসারিত বিশাল মোমদান। নিচে মাও-জ্যাকেট পরে দাঁড়িয়ে জনা চারেক প্রৌঢ়। তাদের লেবাস দেখতে পেয়ে আমার বদখত পোশাকের জন্য আর কোনো খেদ থাকে না। একজন এগিয়ে এসে আমাদের অভ্যর্থনা করেন। চীনা এ মুরব্বি গোছের বান্দার থুঁতনিতে আঙ্গুলে গোনা যায় এরকম তেরো কিংবা চৌদ্দটি দাড়ি। তিনি তা চুমরিয়ে পরিষ্কার ইংরেজিতে বলেন, লিয়াও বংশের সম্রাটদের আমলে ৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মিত হয়। সে আমলে ইমামের পুত্র নজরুদ্দীন স্থপতি হিসেবে কাজ করেন। তখন তাবৎ চীন দেশে মুসলমানরা ছিলেন হাজার দশেকের মতো। হালফিল তাদের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৮ মিলিওন বা এক কোটি আশি লাখ। তিনি মিনারের পেছন দিকে রঙিন টাইলস বসানো কিছু পাথরের ভাঙা টুকরা ও একটি মিনারের অগ্রভাগ দেখিয়ে বলেন, এসব চেংগিস খানের কীর্তি। হলেন বিদ্রুপ করে বলে, গ্রেইট খান, যেখানে যা পান তা চুরমার করাই তো কারবার ছিল উনার। এগুলোর পাশেই একটি শিলালিপিতে চিইং বংশের সম্রাটের ১৬৯৪ সালে দেয়া ডিক্রি।
এ সনদের মর্মার্থ বোঝার আগে মসজিদের আঙিনায় এসে দাঁড়ান মাও-জ্যাকেটের সঙ্গে মাথায় পাগড়ি পরা এক দল বৃদ্ধ। সবাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন কানজোকা লাঠি। হলেন জানতে চায় এদের হাতে লাঠি কেন? মুসল্লিদের ভিড় বাড়ছে, ইংরেজিতে যিনি সব বুঝিয়ে বলছিলেন তিনি সরে গেছেন। ভিন দেশে রীতিনীতি ভিন্ন, চীনারা কেন কাঠি দিয়ে ভাত খায়, কেন লাঠি নিয়ে মসজিদে আসে, এসব ব্যাখ্যা করা কঠিন। হেজাব পরা এক মহিলা এসে কাজরি ও হলেনকে নিয়ে যান মহিলাদের জন্য নির্ধারিত জায়গায়।
মসজিদের ভেতরে কাঠের দেয়াল ও ছাদে লালনীলের জ্যামিতিক প্যাটার্নে হাল্কা সোনালি মেশানো চীনা নকশার সঙ্গে সুচারুভাবে মিশেছে ইসলামী ক্যালিওগ্রাফের আরবি বর্ণমালা। বারান্দায় কাগজের স্ক্রলে খাগের কলম দিয়ে চীনা ক্যালিওগ্রাফিতে কিছু লেখছেন চশমা চোখে সফেদ দাড়িওয়ালা এক অশীতিপর বৃদ্ধ। মুসল্লিদের একে তাকে জিজ্ঞেস করি, কি লিখছেন এ বুজুর্গ? খানিক খুঁজতেই একটু আগে ইংরেজি কথা বলনেওয়ালা মুরব্বিকে পেয়ে যাই। তিনি ব্যাখ্যা করেন- সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় রেডগার্ডদের হাতে মৃত্যু হয়েছিল বেশ কিছু মুসলমানের। তখন নিগৃহীত হয়েছিলেন এ বৃদ্ধ। তিনি এখন স্ক্রলে ক্যালিওগ্রাফ করে লিখছেন তাদের মাগফিরাতের জন্য প্রার্থনা। তার বক্তব্য থেকে আরও বুঝতে পারি, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের উল্লেখ করে মাইক্রোফোনে মোনাজাত করা বা ছাপিয়ে কিছু প্রকাশ করা আজ ইস্তক বেআইনি। কিন্তু খাগের কলম দিয়ে স্ক্রলে লেখাজোকাতে আইনি কোনো বাধানিষেধ নেই। নামাজিদের সংখ্যা বেড়ে যেতে থাকলে অনেকেই আঙিনায় জায়নামাজ বিছিয়ে কাতার বাঁধেন। খুতবার পর পর বড়সড় এক টুপির ভেতর স্ক্রল রেখে তা নামাজিদের হাতে হাতে চলে যায় কাতারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। তারা হাত দিয়ে স্ক্রল স্পর্শ করে মৃদু আওয়াজে উচ্চারণ করেন আমিন।
নামাজ শেষ হতেই আঙ্গিনাতে বেরিয়ে আসি। কাজরি চমৎকার ঝালর দেয়া কালো পোশাকের ছোট্ট একটি চীনা বাচ্চার সঙ্গে মিনারের আশপাশে ছোটাছুটি করে খেলছে। ওখানে চেয়ার-টেবিল পেতে বসেছেন আমাদের অভ্যর্থনা করা মাও-জ্যাকেট পরা চার প্রৌঢ়। তাদের সামনে মস্ত মস্ত লেজার বুক, দোয়াতদানী ও কলম। লোকজন সারি বেঁধে সম্ভবত ফিতরা বা জাকাত জমা দিচ্ছে। তারা টাকা ক্যাশবাক্সে রেখে সিরিয়াসলি সিলছাপ্পড় মেরে রসিদ দিচ্ছেন। পুরো ব্যাপারটিকে তহসিল অফিসে খাজনা দেয়ার মতো দেখায়। কাজরি চীনা মেয়েটির সঙ্গে ছুটে যাচ্ছে তোরণ পেরিয়ে । আমরা পিছু পিছু ফুটপাতে এসে দেখি এক লোক নিয়ে এসেছেন ভাত, আলু, চানা ও মটরশুঁটির পাশে বৃত্তাকারে ডিম দিয়ে সাজানো খাবারের খুঞ্চা। তিনি ইশারায় ডেকে বাটিতে ধনেপাতা ছড়িয়ে তা ধরিয়ে দেন আমাদের হাতে। ঠিক তখনই অন্য মেয়েটির হাত ধরে কাজরি এসে বলে-বাপি, মিষ্টি... মিষ্টি। কী সৃষ্টি ছাড়া আবদার, চীনে মিষ্টি পাব কোথায়?
তখন মিনারের ঢোলে চাটি পড়লে রীতিমতো গোল বেঁধে যায়। নামাজিরা বড় বড় ঝাঁটা, শাবল, নিড়ানি, খন্তা, ঝাঁঝরি ও পানি দেয়ার হুজপাইপ নিয়ে সাজসাজ রবে কাতার বাঁধেন। তাদের সামনে মস্ত ডালায় তাজা ফুল নিয়ে সিল্কের সিয়োংসাম বা সনাতনী কেতার ফুলতোলা কামিজ পরা কয়েকটি তরুণী। জানা যায় যে, ঈদের নামাজের পর রীতি হচ্ছে গোরস্থানে গিয়ে পূর্বপুরুষদের কবর ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে তাতে ফুল ছড়িয়ে আগরবাতি জ্বালানো। কাজরি ততক্ষণে ছোট্ট মেয়েটির সঙ্গে চেপে বসেছে একটি রিকশায়। আমরা তাকে নামিয়ে আনতে গেলে মেয়েটি তাকে জিজি বা বড় বোন বলে জড়িয়ে ধরে। মেয়েটির মা-বাবা আরেকটি রিকশা ডাকেন। পুরুষটি ইংরেজি বলেন মোটামুটি ভালোই। তারা বাস করেন পাশের একটি গলিতে। তো আমরা রিকশা চড়ে চলে আসি তাদের বাসায়।
তাদের বাসাবাড়ির অবস্থান নাইউজি মসজিদের পাশেই সিচিয়েং ডিস্ট্রিকটে। এ মহল্লায় প্রায় হাজার দশেক মুসলমান বাস করেন সনাতনী কেতার ঘরদুয়ারে। আমরা যে পরিবারে আজ ঈদের মেহমান হয়েছি তাদের পুরনো ধাঁচের বাড়িটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভেতরের স্কোয়ার শেইপের আঙ্গিনা। তা লতানো কুঞ্জে ঝুলানো পাখির পিঞ্জিরায় সজ্জিত। চারদিকে একাধিক কক্ষের টানা বারান্দা ঘেরা এ উঠানে সিরামিকের টবে রাখা বনসাই, সংগৃহীত পাথরে ঝরঝর করে ঝরছে জল, কাচের চৌবাচ্চায় রাখা গোল্ডফিস, পাশে বসে রোদ পোহাচ্ছে তুলতুলে পশমি বিড়াল। আমরা অর্কিডকুঞ্জের জালের চাঁদোয়ার নিচে বেতের চেয়ারে বসি। পাশেই ইজিচেয়ারে বসেছেন ছোট্ট মেয়েটির পিতামহ। তাকে আমরা মসজিদে কানজোকা লাঠি হাতে অন্য বৃদ্ধদের সঙ্গে দেখেছি। তিনি এখন তার হাঁটুতে পাগড়ি খুলে রেখে ফোকলা দাঁতে হেসে তসবিহ টিপেন। একটু দূরেই এ পরিবারের আরেক সদস্য গ্রিলে শিককাবাব চাপিয়ে পাখা দিয়ে অঙ্গারে বাতাস করছেন।
গ্রীন-টি পরিবেশিত হলে গোলটুপি মাথায় দিয়ে গৃহকর্তা আমাদের সঙ্গে চা-পানে যোগ দেন। আমি তাদের পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজ থেকে ৩২ বছর আগে তারা কোয়ানঝু অঞ্চলের লিয়াংসান পার্বত্য এলাকা থেকে বেইজিংয়ে আসেন। অনেক বছর আগে তাদের কোনো এক পূর্বপুরুষ, পেশায় জাহাজি আরব, বাণিজ্য করতে চীন দেশে এসে স্থানীয় নারীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থিতু হন এখানে। তার পিতা মাথায় পাগড়ি দিয়ে পুত্রকে চীনা ভাষায় কিছু বলেন। ছেলে উঠে ঘর থেকে নিয়ে আসেন বাঁধানো একটি ফটোগ্রাফ ও রেশমি কাপড়ে ঢাকা বেতের ঝুড়ি। ছবিতে গিলাফ মোড়া পাশাপাশি দুটি কবর। এ মাজার দুটির একটি হচ্ছে ইমাম হাশিম ও অন্যটি হচ্ছে ইমাম জাফর সাদেকের। এ ইমাম দুজন ইসলাম প্রচারে চীন দেশে এসেছিলেন। চীনা ভাষায় মুসলিম সম্প্রদায়ে তারা যথাক্রমে সা কে ঝু ও উ কো শান নামে পরিচিত। লিয়াংসান পর্বতের পাদদেশে যুগল-মাজারের পাশেই এ বৃদ্ধের ছিল আদি বসতবাড়ি।
১৯৬৫ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় রেডগার্ডের অত্যাচার তীব্র হলে পরিবারটি কোয়ানঝু এলাকা ছেড়ে বেইজিংয়ে চলে আসে স্থায়ীভাবে। পুত্র রেশমী ঢাকনা সরিয়ে ঝুড়ি খুলে একটি সিরামিকের আগরদানের ভাঙ্গাচোরা টুকরা দেখান। ঝুড়িতে আরো আছে একটি জায়নামাজের পোড়া অংশবিশেষ। পরিবারে রসুম ছিল ঈদেচান্দে যুগল-মাজারে গিয়ে আগরবাতি জ্বালানো। রেডগার্ডের ছেলেমেয়েরা ঈদের দিন তার বাড়িতে ঢুকে এসব জিনিস ভেঙেচুরে পুড়িয়ে তছনছ করে দেয়। তবে একটি জিনিস তারা পুড়াতে পারেনি। পুত্র এবার ঝুড়ি থেকে বের করেন সিরামিকের বয়াম। তার ভেতরে রাখা হাতে লেখা মিনিয়েচার অজিফা। রেডগার্ডরা যখন মুসলমান প্রতিবেশীদের ঘরদুয়ারের উপর তুলতবিল চালাচ্ছিল তখন তিনি বুদ্ধি করে তার আরব পূর্বপুরুষের স্মৃতি বয়ামের ভেতর ঢুকিয়ে তা পুঁতে ফেলেন মাটির নিচে। অনেক বছর পর বেইজিং থেকে কোয়ানঝু এলাকায় ফিরে গিয়ে তা উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।
রেডগার্ডের নিপীড়নের স্মৃতিতে বিষণ্নতা ও ক্ষোভ থাকলেও পরিবারের অন্য সদস্য রঙিন ফুলে ছাওয়া পিওনি গাছের পাশে টেবিল পাতলে কথাবার্তায় আবার ঈদের আমেজ ফিরে আসে। ছোট্ট মেয়েটির মা খাবার সাজান। কাজরি সিল্কের সিয়োংসাম পরে চীনা বাচ্চা সেজে ছোট্ট মেয়েটির সঙ্গে ডেক ডেকচি দিয়ে পুতুলের জন্য খাবার রাঁধছে। বৃদ্ধ বাটিতে ভিজিয়ে রাখা দাঁত ব্রাশ দিয়ে মেজে মুখে দিয়ে হাসলে তার হাবভাবে মনে হয় তিনি কাবাব খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমরা টেবিলের চারপাশে টুলে বসি। পরিবেশিত হয় লামিয়ান বলে হাতে তৈরি নোডুলসের সঙ্গে শির্কায় জারিত সবজি। এ খাবারটির নাম সোয়ানচি, স্বাদে অপূর্ব। খানিক পর আরেক প্রস্ত সবুজ-চা খেয়ে আমরা সেসমি সিড ছড়ানো রুটির সঙ্গে কাবাব খাই। পিওনি ফুলের পুষ্পিত কুঞ্জের পাশেই ঝুলছে পোশা পাখিদের বেশ ক’টি পিঞ্জিরা। তাতে মৃদুমন্দ কাকলি ধ্বনিত হচ্ছে। আঙিনার সবুজ বাতাবরণে কুজন শুনতে শুনতে আমাদের ঈদের ভোজন মোটমির্যা ভালোই হয়। তবে সমস্যা বাঁধে এ পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময়। কাজরি কিছুতেই ছোট্ট মেয়েটিকে ছেড়ে আমাদের সঙ্গে আসতে চায় না। আর ছোট্ট মেয়েটিও জিজি বলে তাকে জড়িয়ে ধরে। Mainussultan@hotmail.com

Thursday, August 22, 2013

হেমিংওয়ের বাড়ি by শাহাবুদ্দীন নাগরী

১৮ জুন, ২০১৩।
আমরা যখন কী-ওয়েস্টে পৌঁছুই তখন মধ্যদুপুর। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণপূর্বের সর্বশেষ প্রান্তসীমা কী-ওয়েস্ট, ফ্লোরিডা রাজ্যের মনরো কাউন্টির বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র। মায়ামি থেকে আমরা রওনা দিয়েছিলাম সকাল সাড়ে ন’টায়। প্রায় ১৬০ মাইল পথ পেরিয়ে আমাদের পৌঁছুতে সময় লেগে গেল ৪ ঘণ্টা। যাওয়ার পথের সরু যে ভূখণ্ডটি ফ্লোরিডা রাজ্য থেকে বেরিয়ে ঢুকে গেছে সমুদ্রের মধ্যে, তার একপাশে মেক্সিকো উপসাগর, অন্যপাশে আটলান্টিক মহাসাগর। কী ওয়েস্টে দাঁড়ালে কিউবা দেখা যায়, মাইলের হিসেবে ৯০ মাইল পেরুতে হবে আটলান্টিক।
কী-ওয়েস্টের বিশাল শহরটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান, অন্তত আমার কাছে, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে’র (১৮৯৯-১৯৬১) বাড়ি ও জাদুঘর। ৯০৭ হোয়াইটহেড স্ট্রিটের বাড়িটিতে হেমিংওয়ে তার জীবনের নয়টি বছর (১৯৩১-৩৯) কাটিয়েছিলেন। চমৎকার দোতলা বাড়ি, পেছনে সুন্দর একটি সুইমিংপুল। ১৮৫১ সালে নির্মিত এ বাড়িটি হেমিংওয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী পলিন ফেইফার ১৯৩০ সালের শেষদিকে চাচার কাছ থেকে উপহার পাওয়ার পর ২০ হাজার মার্কিন ডলার খরচ করে এই সুইমিংপুলটি নির্মাণ করেছিলেন, যার নীল জল এখনও পর্যটকদের চোখ আটকে রাখে। এই বাড়িতে এখনও আছে হেমিংওয়ের পোষা সেই বিড়ালগুলো, যাদের থাবায় রয়েছে পাঁচটির পরিবর্তে ছয়/সাত আঙুল। হেমিংওয়ের দ্বিতীয় পুত্র প্যাট্রিক ১৯৯৪ সালে মায়ামি হেরাল্ড-এ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কী-ওয়েস্টের এই বাড়িতে তার বাবা ময়ূর পুষতেন, বিড়াল পুষতেন কিউবাতে, যদিও হেমিংওয়ের চতুর্থ স্ত্রী মেরি এই বক্তব্যকে খণ্ডন করে বলেছেন, বিড়ালগুলো এই বাড়িরই এবং কেউ তা বিক্রয় করেনি, বরঞ্চ বছর বছর প্রজননের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার অব্যাহত আছে।

বিংশ শতাব্দীর ইংরেজি কথাসাহিত্যে একটি ব্যতিক্রমী নাম আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। তার ভূমিকার জন্য পরবর্তী প্রজন্মর ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলেছিলেন মার্কিন এই লেখক ও সাংবাদিক। তার রোমাঞ্চকর জীবনধারণ এবং জনসমক্ষে প্রচারিত প্রতিচ্ছবি বিশ শতকীয় তরুণদের আগ্রহের বিষয়বস্তু হয়েছিল। তিনি তার জীবদ্দশায় মাত্র নয়টি উপন্যাস এবং ছয়টি ছোটগল্পের সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। এছাড়াও, অন্যান্য বিষয়ের বই ছিল মাত্র দুটি। এত অল্প লিখেও সাহিত্যে বিশাল ভূমিকা রাখার বিষয়টি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ছিল সে সময়ে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখার সময়কাল মোটামুটিভাবে ১৯২৫ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত। এ সময়ে বিচিত্র জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তার। কর্মজীবন পরিবর্তন করেছেন সময়ে সময়ে, জীবনসঙ্গীও পরিবর্তিত হয়েছে তার জীবনধারায়। তার মৃত্যুর পর তিনটি উপন্যাস, বহু ছোটগল্পের সংকলন এবং অনেক মননশীল লেখার সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, যা তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত গ্রন্থের চেয়েও অধিক। মার্কিন সাহিত্য তথা বিশ্বসাহিত্যে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের প্রতিটি রচনাই ক্লাসিক হিসেবে খ্যাত হয়ে আছে। অনেকে বলে থাকেন, প্যারিসে বসবাসকালীন সময়ে যেসব লেখা হেমিংওয়ে লিখেছিলেন, সেসব লেখাই তাকে অধিক পরিচিতি দিয়েছে ও খ্যাতিমান করেছে।
১৯২০ সালের প্রেক্ষাপটে হেমিংওয়ে রচনা করেছিলেন ‘দি মুভেবল ফিস্ট’, তার প্যারিস জীবনের কথাকাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে উপন্যাসটি। একে উপন্যাস না বলে আত্মজৈবনিক রচনা বলাই শ্রেয়। এটি তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। ১৯৬৪ সালে, তার মৃত্যুর তিন বছর পর, যে সংস্করণটি প্রকাশিত হয় তাও পূর্ণাঙ্গ ছিল না। আড়ালে লুকোনো ছিল এর আরেকটি পাণ্ডুলিপি, যা ২০০৯ সালে প্রকাশিত হলে বিশ্বসাহিত্যে তুমুল আলোড়ন হয়। একটি ক্লাসিক রচনার পুনর্লিখন! তাও আবার হেমিংওয়ের হাতেই! ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত সংস্করণের সঙ্গে যোগ করা
হয় আরও নয়টি অনুচ্ছেদ এবং সংযুক্ত হয় নতুনভাবে লিখিত সমাপ্তি।
এক বিস্ময়কর জীবনযাপন হেমিংওয়ের। তার স্ত্রী ছিলেন চারজন, যারা তার জীবনের একেক সময়ে প্রবেশ করেছেন এলিজাবেথ রিচার্ডসন (১৯২১-২৭), পলিন ফেইফার (১৯২৭-৪০), মার্থা গেলহর্ন (১৯৪০-৪৫) এবং তার মৃত্যু পর্যন্ত মেরি ওয়েলস (১৯৬৪-৬১)। তিন সন্তান জ্যাক, প্যাট্রিক এবং গ্রেগরি- বেঁচে আছেন শুধু প্যাট্রিক, যিনি ‘দি মুভেবল ফিস্ট’-এর নবতর সংস্করণের ভূমিকা লিখেছেন। এলিজাবেথ এবং পলিন ছিলেন দুই বান্ধবী, হেমিংওয়ে এলিজাবেথকে ত্যাগ করে বিয়ে করেন স্ত্রীর বান্ধবী পলিনকে, যেই পলিন কী-ওয়েস্টে রেখে যাওয়া হেমিংওয়ের বাড়ির ক্রেতা এবং এই বাড়িতে থাকার পুরোটা সময় হেমিংওয়ের সঙ্গেই ছিলেন।
১৮৯৯ সালে ইলিনয়েসে জন্ম হয়েছিল হেমিংওয়ের, ১৯৬১ সালে নিজের শটগানের গুলিতে আÍহত্যা করেছিলেন আইদহ’তে। কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিডেল ক্যাস্ট্রো তার বন্ধু ছিলেন, তার সাংবাদিকতা জীবনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, স্পেনের গৃহযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ গভীর ছায়াপাত করেছিল, তিনি বুর্জোয়া ধনতান্ত্রিক রীতির চেয়ে পছন্দ করেছিলেন সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে। এ কারণেই জীবনের শেষদিকে এসে তিনি তার অর্থ এবং নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত হয়ে পড়েছিলেন, তার ধারণা হয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই তাকে ক্রমাগত অনুসরণ করে চলেছে।
১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘দি টরেন্টস অব স্প্রিং’ এবং জীবদ্দশায় তার সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ (১৯৫২)। এছাড়া, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। জীবনের বিভীষিকাময় এবং অসম্ভব মানসিক বিপর্যয়ের কালে যখন তার লেখক বন্ধুরা একে একে মৃত্যুবরণ করতে থাকেন, ১৯৩৯ সালে ইয়েটস এবং ফোর্ড ম্যাডক্স ফোর্ড, ১৯৪০ সালে স্কট ফিটজিরাল্ড, ১৯৪১ সালে শেরউড অ্যান্ডারসন ও জেমস জয়েস, ১৯৪৬ সালে গ্রার্ট্রুড স্টেইন এবং ১৯৪৭ সালে দীর্ঘদিনের বন্ধু ম্যাক্স পার্কিনস, তখন হেমিংওয়ে গভীর বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এই সময়ে তার প্রচণ্ড মাথাব্যথা, উচ্চরক্তচাপ, ওজনজনিত সমস্যা দেখা দেয় এবং এর পরিণতিতে তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন।
জীবনে বেশ কয়েকবার দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন হেমিংওয়ে। স্কুলপড়া শেষ করে তিনি কয়েক মাস ‘দি কানসাস সিটি স্টার’ পত্রিকায় রিপোর্টিংয়ের কাজ করেন এবং এরপর রেডক্রসের মনোনয়ন নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইটালি ফ্রন্টে যোগদান করেন (১৮১৮)। এখানে তিনি প্রথম আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং যুদ্ধ বাদ দিয়ে ফিরে আসেন বাড়িতে। এই দুর্ঘটনায় তিনি মিলানের রেডক্রস হাসপাতালে ছয় মাস শয্যাশায়ী ছিলেন। ১৯২৮ সালে প্যারিসে বসবাসকালীন সময়ে হেমিংওয়ে বাথরুমে ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। তিনি কমোডের চেইন ভেবে জানালা ধরে মাথার ওপর টান দিয়েছিলেন, যা ভেঙে পড়েছিল মাথার ওপর। কপালের ওপর ক্ষতটি আমৃত্যু চিহ্ন হয়েছিল তার, এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যেতেন। প্যারিস ত্যাগের সময় আর বড় শহরে বাস করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। ১৯৩৩ সালের দিকে হেমিংওয়ে সপরিবারে পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি সাফারি ভ্রমণ করেন। মোমবাসা, নাইরোবি, ম্যাকাকোস, তাঙ্গানিকা, লেক মনিয়ারা এবং তারাঙ্গির ন্যাশনাল পার্ক পরিদর্শন করেন। এ সময়ও তিনি দুর্ঘটনায় পড়েন, তার অ্যামিবা ঘটিত আমাশয় হয়, যা তার আন্ত্রিক স্থানচ্যুতি ঘটায় এবং তাকে বিমানে করে নাইরোবিতে স্থানান্তর করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই অভিজ্ঞতা তার ‘দি øোজ অব কিলিমানজারো’ গ্রন্থে প্রতিফলিত হয়েছে। এরপর হেমিংওয়ে যে দুর্ঘটনাটির শিকার হন তা ঘটে ১৯৪৫ সালে। তার গাড়িটি দুর্ঘটনায় পতিত হলে তার হাঁটু ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং কপালে মারাÍকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। ক্রমে ক্রমে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং নানা বিষাদ তাকে গ্রাস করে ফেলে।
এর ভেতরেই ১৯৫১ সালে মাত্র আট সপ্তাহে তিনি লিখে ফেলেন তার ক্লাসিক উপন্যাস ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ এবং লেখা শেষ করে বন্ধুদের বলেছিলেন, সারাজীবনে এটিই আমার শ্রেষ্ঠতম লেখা। এই গ্রন্থটির জন্য তিনি ১৯৫২ সালে লাভ করেন পুলিৎজার পুরস্কার। বইটি মাসের পর মাস সেরা গ্রন্থের তালিকায় শ্রেষ্ঠ স্থান দখল করে রেখেছিল। ১৯৫৪ সালে পরপর দুটি বিমান দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন হেমিংওয়ে, প্রথমটিতে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান তিনি, দ্বিতীয়টিতে তার মগজ থেকে তরল পদার্থ নির্গত হতে থাকে। এ দুটি দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে উড়োখবর প্রচারিত হলেও শেষপর্যন্ত বেঁচে যান তিনি। পরবর্তীতে শারীরিক নানা সমস্যায় জড়িয়ে গেলে মদ্যপান বাড়িয়ে দেন, যা তাকে ক্রমে ক্রমে মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যায়। এসবের মধ্যেই ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসে হেমিংওয়ে লাভ করেন নোবেল পুরস্কার। শারীরিক দুরবস্থা এবং বিমানভ্রমণ আতংকে তিনি স্টকহোমে তার নোবেল পুরস্কার সশরীরে উপস্থিত থেকে গ্রহণ করতে পারেননি। এটাও হেমিংওয়ের জীবনে একটা ট্র্যাজেডি হিসেবেই থাকবে।
হেমিংওয়ের সব লেখালেখির মূল চালিকাশক্তি ছিল প্রেম, যুদ্ধ, বন্যতা এবং হারানো। একদা মার্কিন সাহিত্য এসবের ওপর ভর দিয়ে অনেকটা চলেছিল, কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে, কিন্তু যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া রোমান্টিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে’র ভেতর সবকিছু যেন একসঙ্গে মাথা তুলে দাঁড়ায়। হয়তো এ কারণেই মার্কিন সাহিত্যের এই ধারাটির প্রতি পরবর্তী প্রজন্মর আগ্রহ বেড়ে যায়, সমসাময়িক সাহিত্যিকরা থমকে দাঁড়ায় এই বিষয় এবং ভাষার ক্ষিপ্রতা দেখে। হেমিংওয়ের ভাষায় ছিল নতুনত্ব, তার সাহিত্য ও ব্যক্তিগত রচনায় তিনি ‘কমা’র পরিবর্তে ‘অ্যান্ড’ শব্দটি ব্যবহার করতেন, এতে পরবর্তী বাক্যটির অনিবার্যতা নিশ্চিত হয়ে যেত। চরিত্রের ইমেজ তৈরিতে তিনি গ্রহণ করেছিলেন নিজস্ব রীতি। একটি ‘রিয়াল থিং’ সৃষ্টিতে তিনি অনেক চরিত্রের কোলাজ আঁকতেন তার ভাষা দিয়ে, যা ক্রমে পৌঁছে যেত তার গন্তব্যে। এজরা পাউন্ড (১৮৮৫-১৯৭২), টিএস এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫), জেমস জয়েস (১৮৮২-১৯৪১) প্রমুখের রচনায় এই ইমেজের একটা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত চরিত্র খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি, তার গবেষকদের মতে, যে কোনো বই অন্তত দু’বার পড়তেন হেমিংওয়ে, খুঁজতেন সেসব বইয়ের ভেতর লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যের লালিমা।
খুব যতœ করে সাজানো হেমিংওয়ের কী-ওয়েস্টের বাড়িটি। কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই নিচতলার ডান দিকে তার লিভিং রুম, বাম দিকে ডাইনিং রুম। হেমিংওয়ে যখন ১৯৩১ সালে এই বাড়িটিতে ওঠেন তখন এটির অবস্থা ছিল ভঙ্গুর। দ্বিতীয় স্ত্রী পলিন প্রথমেই প্রতিটি ঘরের ছাদ থেকে ফ্যানগুলো অপসারণ করেন এবং সেখানে মোমদানি স্থাপন করেন। লিভিং রুমের ভেতর ক্রিস্টালের দু’টো বিড়ালের মূর্তি ছিল, হেমিংওয়ে বিড়াল খুব পছন্দ করতেন বলে পলিন ওই দু’টো বিড়াল হেমিংওয়েকে উপহার দেন তার জন্মদিনে। বিড়াল ছিল হেমিংওয়ের প্রিয় প্রাণী, ৩০ বছরে সেখানে ৬০টি বিড়াল বড় হয়ে ওঠে। এখনও বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় বিড়ালগুলোকে। দোতলায় শোবার ঘরে শাদা ধবধবে বিছানায়, যে বিছানায় হেমিংওয়ে ঘুমোতেন, আমরা দেখলাম একটি বিড়াল শুয়ে আছে। তার লেখার টেবিলে শুয়ে আছে আরেকটি বিড়াল। এই ছয়-সাত আঙুলের বিড়ালগুলো এখনও বংশবিস্তার করে চলেছে এবং কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা ঝুলছে দেয়ালে, বিড়ালগুলোকে বিরক্ত না করার জন্য। তার চেয়ার-টেবিল-বেঞ্চি পলিশ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং প্রতিটি আইটেমের ওপর ট্যাগ বসানো আছে তাতে না বসার জন্য।
ডাইনিং রুমের দেয়ালে অনেক ছবি দেখা গেল। এগুলো সবই হেমিংওয়ের জীবনের ছবি। ওক-পার্কে তোলা তার ছোটবেলার ছবি থেকে শুরু করে জীবনের বিভিন্ন সময়ের ছবি দেয়ালে আটকানো। তার প্রথম স্ত্রী এলিজাবেথ রিচার্ডসনের ছবি উপরে বাঁ দিকে, তার ডান দিকে দ্বিতীয় স্ত্রী পলিন ফেইফারের ফটোফ্রেম এবং সর্বডানে তাদের দুই পুত্র গ্রেগরি এবং প্যাট্রিকের ছবি। নিচে বাঁ দিকে তার তৃতীয় স্ত্রী মার্থা গেলহর্নের ছবি, আর তার ডানেই চতুর্থ স্ত্রী মেরি ওয়েলস’-এর ছবি। এই ঘরটির সঙ্গেই সংযুক্ত তাদের রান্নাঘর, যেটির নাম ছিল ‘দ্য কুকহাউস’। মাছ কাটাকুটার পর হেমিংওয়ে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে এর বর্জ্য অংশগুলো ছুঁড়ে ফেলতেন খোলা জায়গায় তার পোষা বিড়ালগুলোর জন্য। লিভিং রুমে এখন সাজানো আছে হেমিংওয়েকে নিয়ে লেখা বই, তার ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ চলচ্চিত্রের বিশালাকার পোস্টারসহ নানা জিনিসপত্র, যা ধারণ করে আছে এই মহৎ কথাশিল্পীকে।
বাড়ির পেছন দিকটায় গড়ে তোলা হয়েছে একটি স্যুভেনির শপ। এখানে হেমিংওয়েকে নিয়ে তৈরি টি-শার্ট, মগ, চাবির রিং, বাড়ির রেপ্লিকা থেকে শুরু করে তার রচিত বইগুলোর কপি পাওয়া যায়। এই বাড়িটি এখন প্রধানত জাদুঘর, যদিও কোথাও সেটি লেখা নেই, যেমন লেখা নেই শিলাইদহ বা পতিসরে আমাদের রবীন্দ্রনাথের বাড়িগুলোতে। প্রধান গেটে যে সাইনবোর্ডটি দেখলাম তাতেও লেখা ‘আর্নেস্ট হেমিংওয়ে হোম’। ১৩ ডলারের টিকিট কেটে ঢুকতে হয় এই বাড়িটিতে। মিজ জ্যাকি স্যান্ডস এই হোমের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমি ঢাকা থেকে অনুবাদক-কথাসাহিত্যিক ফখরুজ্জামান চৌধুরীর ‘দূরাগত ধ্বনি’ (সূচিপত্র, ২০১০) বইটির একটি কপি নিয়ে গিয়েছিলাম, যে বইয়ের একটি অংশে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে সম্পর্কে একটি ছোট নিবন্ধ আছে। আমি বইটি হেমিংওয়ে হোমকে উপহার দেয়ার জন্য মিজ জ্যাকি স্যান্ড্স’-এর হাতে তুলে দিই। তিনি পরম আগ্রহভরে বইটি নিয়ে জানান, এটি যত্নসহকারে এখানে প্রদর্শন করা হবে (বই হস্তান্তরের ছবিটিসহ)। আমার বন্ধুর ক্যামেরায় তখন আমি বন্দি হয়ে চলেছি। বাড়িটি ঘুরে দেখে যখন বাইরে বেরিয়ে এলাম তখন এক অদ্ভূত অনুভূতি মনের ভেতর দোলা দিতে শুরু করল। মাথার ওপর সূর্যটা জানান দিয়ে গেল এটা কী-ওয়েস্ট, এখানেই হেমিংওয়ের বাড়ি। আটলান্টিকের ওপর দিয়ে উড়ে আসা ঠাণ্ডা বাতাসের স্পর্শে আমি কিছুক্ষণের জন্য বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম হোয়াইটহেড স্ট্রিটের ওপর। আর কখনও কি আসা হবে এই বাড়িটিতে?
e-mail: snagari55@gmail.com

Thursday, August 15, 2013

রক্তাক্ত বলকানে শান্তির সন্ধানে by মোশাররফ হোসেন ভূঞা

যুদ্ধবিধ্বস্ত বলকান রাজ্যে জাতিসংঘ শান্তি বাহিনীতে আমার অংশগ্রহণ ছিল সিভিলিয়ান পুলিশ মনিটর হিসেবে। সময় ১৯৯২-৯৩ সাল। তখন সার্ব ও ক্রোয়াটদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে সাবেক যুগোশ্লাভিয়া ভেঙে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে ক্রোয়েশিয়া স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তদুপরি ক্রোয়েশিয়ার সার্ব অধ্যুষিত কয়েকটি অঞ্চলে জাতিগত দ্বন্দ্বের সূত্র ধরে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান ছিল। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। সার্ব ও ক্রোয়াটদের মধ্যকার জাতিগত দ্বন্দ্বের ইতিহাস বেশ পুরনো হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে যুগোস্লাভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্শাল যোশেফ ব্রোশ টিটু জাতে ক্রোয়াট হওয়ার কারণে সার্বদের প্রতি ক্রোয়াটদের ক্ষোভের প্রকাশ কিছুটা অবধমিত ছিল। মার্শাল টিটুর মৃত্যুর পর অর্থ ও সম্পদের অসম বণ্টন, সামরিক বিভাগে সার্বদের একচ্ছত্র আধিপত্য ইত্যাদি পুরনো ক্ষতের যন্ত্রণা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে ১৯৯১ সালের গোড়ার দিকে সার্ব ও ক্রোয়াটদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূচনা হয়। এ সংঘর্ষের লক্ষ্য ছিল জাতীয় জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে সার্বদের অনভিপ্রেত ও অশুভ নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম ক্রোয়েশিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করে পারছি না। আমার অভিজ্ঞতায় মনে হচ্ছে, সার্ব ও ক্রোয়াটদের দীর্ঘদিনের জাতিগত দ্বন্দ্ব অনেকটা বাঙালিদের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের স্বার্থ সুরক্ষায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক চরম বৈষম্যমূলক আচরণের মতো। যতটা জানা যায়, সার্ব ও ক্রোয়াটদের জাতিগত দ্বন্দ্বের সূত্রপাতের প্রধান কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রোয়াটদের তুলনায় সার্বদের প্রাধিকার প্রদান। ক্রোয়াটরা দাবি করে, আড্রিয়াটিক সাগর পাড়ে অবস্থিত প্রকৃতির অপরূপ লীলাময় সাগর সৈকত হতে পর্যটন খাতে প্রতিবছর যে আয় হয় তা জাতীয় আয়ের ৮০ শতাংশ। এ আয় থেকে ক্রোয়েশিয়া প্রাদেশিক সরকারের হাতে ২০ শতাংশ রেখে বাকি সমূদয় অর্থ চলে যেত কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে। আবার সেই অর্থের বিশাল অংশ ব্যয় হতো সামরিক খাতে। যেহেতু সামরিক বাহিনীতে সার্ব সদস্যরা ৮০ শতাংশ স্থান দখল করে আছে, তাই ওই ধরনের অর্থনৈতিক বণ্টন ব্যবস্থা ক্রোয়াটদের প্রচণ্ডভাবে যন্ত্রণা দিয়ে আসছিল যুগ যুগ ধরে। মাঝখানে মার্শাল টিটুর শাসনকাল পর্যন্ত সময়টুকুতে তাদের সান্ত্বনা ও প্রাপ্তি ছিল তাদের প্রেসিডেন্ট ক্রোয়াট বংশোদ্ভূত- এতটুকুই। মার্শাল টিটুর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় শাসনযন্ত্রে সার্বদের পুনরায় নিরঙ্কুশ প্রাধান্য সূচিত হলে পুরনো ক্ষতের যন্ত্রণা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা করে।

সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় ক্রোয়েশিয়া ব্যতিরেকে অন্যান্য প্রদেশ যেমন স্লোভেনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভেনিয়া, মন্টিনিগ্রো ও মেসেডোনিয়া ইত্যাদি জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে সার্বদের প্রতি নানাবিধ কারণে ক্ষোভ বিরাজমান থাকলেও সার্ব তথা সার্বিয়ানদের ধারাবাহিক খবরদারি প্রতিহত করার মতো শক্তি বা সার্বদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার মতো শক্তি ও সামর্থ্য কোনোটাই তাদের ছিল না। তদুপরি সার্ব ও ক্রোয়াটরা যখন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত, যুগোস্লাভিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ স্লোভেনিয়া অনায়াসে স্বাধীনতা ঘোষণাক্রমে বলতে গেলে বিনা রক্তপাতে তা অর্জন করে নেয়। তখন সেনাবাহিনীর ক্রোয়াট সদস্য ও জনতা মিলে সার্বদের বিরুদ্ধে অর্থাৎ সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। একপর্যায়ে ক্রোয়াটরা যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ক্রোয়েশিয়া প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলে বসনিয়া ও হার্জেগোভেনিয়াও স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ফলে সার্ব বা সরকারি বাহিনী রক্তক্ষয়ী আক্রমণ করে দুর্বল বসনিয়া ও হার্জেগোভেনিয়ার জনসাধারণের ওপর নির্বিচারে হত্যা, জ্বালাও-পোড়াওসহ নারীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে সে অঞ্চলকে এক ধ্বংসপুরীতে রূপান্তরিত করে। উল্লেখ্য, বসনিয়া ও হার্জেগোভেনিয়ার অধিকাংশ জনগণ মুসলিম হওয়ার কারণে সেনাবাহিনীতে তাদের অংশগ্রহণের অধিকার ছিল খুবই সীমিত। তা ছাড়া সে অঞ্চলের জনগণের একটা বিরাট অংশ ছিল যাযাবর জাতি। যে কারণে যুদ্ধের শুরুতে সে অঞ্চলের জনগণের মৃত্যু ও পলায়নকে মেনে নেয়া ছাড়া উপায় ছিল না। পরবর্তীতে তারা মাথা উঁচু করে আক্রমণ প্রতিহত করার শক্তি ও সাহস অর্জন করে এবং এক সময় তারাও স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।
কেনিনে আমার অবস্থানকালে গোটা বসনিয়া ও হার্জেগোভেনিয়ায় সার্বদের সঙ্গে মুসলমানদের প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছিল। কেনিনে আমরা যে বাড়িতে থাকতাম, তাদের রেডিওযোগে বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদে প্রতিনিয়তই ওখানকার ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ আমরা জানতে পারতাম। এদিকে ক্রোয়েশিয়া স্বাধীনতা অর্জন করলেও এর অভ্যন্তরে কেনিন, টুপোস্কো ও ব্যালিমানাস্তিসহ চারটি সার্ব অধ্যুষিক্ত অঞ্চল ক্রোয়াটদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে যায়। ক্রোয়েশিয়া থেকে সার্বরা অর্থাৎ সার্বিয়ান বাহিনী পশ্চাৎ গমনকালে বর্ণিত সার্ব অধ্যুষিত অঞ্চলে তারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও যুদ্ধসামগ্রী রেখে যায়। এসব অস্ত্রশস্ত্রে বলীয়ান হয়ে বর্ণিত চারটি অঞ্চলের সার্বরা ‘সার্বস্কা ক্রাইনা’ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে, যা পরবর্তী বছরের অর্থাৎ ১৯৯৩ সালের জানুয়ারির মধ্যে ক্রোয়াট বাহিনী অনায়াসে দখল করে ক্রোয়েশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। যুদ্ধকালীন ওই সব স্থানে মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত জাতিসংঘ বাহিনীকে অস্থায়ীভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়।
ওই সময় পর্যন্ত সার্ব অধ্যুষিত এলাকা কেনিনস্থ সেক্টর সাউথ এ চার মাস পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে কর্ম সম্পাদন করি। আমার দায়িত্ব ছিল রেডক্রস সোসাইটি এবং জাতিসংঘ উদ্বাস্তু কমিশনের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে দুই অঞ্চলের বন্দিবিনিময় কাজে সহযোগিতা করা। বন্দিবিনিময় কাজটি মূলত আমাদের মধ্যস্থতায় দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হতো। তবে বন্দিদের তালিকা ও নির্ধারিত ফরমে বন্দির আত্মীয়স্বজনের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত আবেদনপত্র আমার তত্ত্বাবধানে প্রেরণ করা হতো। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সিদ্ধান্ত মোতাবেক বন্দিবিনিময়ের দিন আমাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বন্দির একজন আত্মীয় বর্ডার এলাকায় যেতে পারতেন। বিষয়টি খুবই আবেগাশ্র“ত থাকায় বন্দিদের আত্মীয়স্বজন তাকে গ্রহণের উদ্দেশ্যে হাতে করে শোভনীয় ফুলের তোড়া নিয়ে উপস্থিত হতো। অনেক সময় দেখা যেত ১০-১২ জন আত্মীয় বন্দিকে গ্রহণ করার জন্য আমাদের সঙ্গে সমসংখ্যক আত্মীয়স্বজন যেত। সে ক্ষেত্রে প্রায় সময়ই হঠাৎ করে উড়ে আসা রাজনৈতিক অনাকাক্সিক্ষত অশুভ সিদ্ধান্তের পালাবদলের কারণে বন্দি বিনিময় কম হতো। এমন কি কখনো কখনো দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হঠাৎ করে ভেস্তে যাওয়ার কারণে বন্দিবিনিময় স্থগিত করা হয়ে যেত। তখন আত্মীয়স্বজনের কান্না, বিলাপ, আহাজারী এবং বুকে ও কপালে হাত চাপড়ানো ইত্যাদি হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে চোখের জল সম্বরণ করতে পারতাম না। আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বন্দির আত্মীয়স্বজনরা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যেত। কোনো কোনো সময়ে সে রকম পরিস্থিতিতে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কার উদ্ভব হলে তাদেরকে অজ্ঞান অবস্থাতেই গাড়িতে করে নিয়ে এসে বাড়িতে পৌঁছে দিতাম। গাড়িতে তুলে চোখে-মুখে ঠাণ্ডা পানির ছিটা দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনার কাজটি আমিই করতাম। আমার এ চিকিৎসা পদ্ধটির কারণে আমি সেখানে কিছুটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলাম। খুব মনে পড়ে দ্রাগা নামের এক সপ্তাদশী ওই সংঘর্ষকালে বাবা-মা ও একমাত্র ভাইকে হারিয়ে সে একদম একা হয়ে যায়। তার প্রেমিক ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেভে তখন অধ্যয়নরত ছিল। ওই মেয়েটির প্রেমিককে ফিরিয়ে আনার জন্য আমি চারবার আবেদনপত্র প্রেরণ করি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে চারবারই গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া গেলেও প্রতিবারই দ্রাগাকে অজ্ঞান অবস্থায় নিয়ে আসতে হয়েছিল।
দ্রাগাদের বাড়ি কেনিন শহরের উত্তর-পূর্ব সন্নিকটে ভারপলি গ্রামে। গ্রামটি ক্রোয়াট অধ্যুষিত। যতটুকু মনে পড়ে গোটা বিশেক সার্ব পরিবারের বসতি সেখানে ছিল। প্রথমদিকে ওদের মধ্যে নির্ভরশীল সহাবস্থান থাকলেও ’৯১ সালের শেষের দিকে ক্রোয়েশিয়ার বন্দর নগরী স্পি­ট থেকে গোরান অবোটাসহ ৬-৭ জন যুবক কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে ভারপলি আসতে সক্ষম হয়। ওরা প্রত্যেকেই স্বজনহারা। দুঃখজনক ঘটনা ছিল গোরান অবোটার দুই বোনকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সে প্রায় উন্মাদ হয়ে যায়। তারা ফিরে এসে গ্রামের ও এলাকার লোকজনদের ওসব বলে ক্ষেপিয়ে তুললে ওই গ্রামের সার্ব ও ক্রোয়াটদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে গ্রামের প্রায় সবাই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। ফলে অনেক প্রাণহানি সংঘটিত হয়। যেহেতু গ্রামটি বিশাল এবং ক্রোয়াট অধ্যুষিত, তাই ক্রোয়াটদের কাছে তারা পরাজিত হয়ে গ্রাম ত্যাগ করে। ফলে গ্রামের প্রত্যেকটি সার্ব পরিবারের বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সেই ধ্বংসযজ্ঞে দ্রাগার বাবা ও ছোট ভাইকে হত্যা করা হয় এবং তার মাকে অপহরণ করে কোথায় নিয়ে যায় তার সন্ধান তারা কোনো দিন পায়নি। তারা অনুমান করছে হয়তো তাকে ধর্ষণ করে লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে।
দ্রাগাদের বাড়িটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। সে তখন বাড়িতে ছিল না বলে প্রাণে বেঁচে গেছে। সেখানে তার মাতৃপক্ষীয় কেউ না থাকায় ওই ঘটনার পর সে আর বাড়ি ফেরেনি। দ্রাগা প্রথমে গির্জায় আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানে এক রাত কাটিয়ে চলে যায় তার বয়ফ্রেন্ড ইভানস্কোভিসের বাবা-মার কাছে। দ্রাগার কাছে শুনেছি, তার মা তুর্কি বংশোদ্ভূত অনন্য সাধারণ এক সুন্দরী রমণী। তার মা-বাবা বেলগ্রেডে একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে চাকরি করতেন। সেখান থেকে তার মাকে নিয়ে তার বাবা পালিয়ে কেনিন এসে বিয়ে করে। বিয়ের সময় তার মায়ের বয়স ছিল ১৮ বছর। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুন্দরী। তার ছিল ঘন কালো লম্বা চুল। তার মাকে প্রথম কেউ দেখলে ২০ বছরের বেশি বয়স হয়েছে মনেই করতে পারবে না। দ্রাগা তার মায়ের চেহারা, টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকা নাক, দুধে আলতা রঙের শরীর ও ঘন কালো চুল পুরোটাই পেয়েছে। তার ভাই ঈগরের চেহারা ও শারীরিক গড়ন তার বাবার মতো। তাদের কথা দ্রাগা প্রায়ই বলত আর অজোর ধারায় চোখের জল ফেলত। আমি নিজে থেকে প্রথম একবার ছাড়া কেনিন অবস্থানকালীন পরবর্তী চার মাসে ওর বাবা-মার প্রসঙ্গে কোনো কথা বলিনি। ক্রোয়েশিয়ার ভেতরের সার্ব অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো ক্রোয়েশিয়ার দখলে চলে যাওয়ার পর দ্রাগা ও ইভানস্কোভিসের মিলন দুরাশায় পরিণত হয়। কেনিন থেকে জাগরেভ আসার বিভিন্ন সময়ে দ্রাগা আমাকে জেলখানায় খোঁজখবর নিয়ে ইভানস্কোভিসের সন্ধান করতে বলত। কিন্তু কাজটা খুবই দুরূহ এবং সন্দেহজনক ছিল বলে আমি চেষ্টা করিনি। কিন্তু পরবর্তীতে জাগরেভে বদলি হয়ে আসার পর ইভানস্কোভিসের সন্ধান আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু ছবিতে যে ইভানস্কোভিসকে আমি দেখেছিলাম তার সঙ্গে বন্দি ইভানস্কোভিসের তফাৎ ছিল আকাশ-পাতাল। দ্রাগার প্রসঙ্গ তুললে তার চোখ বেয়ে অজোর ধারায় পানি বেয়ে পড়তে দেখেছিলাম। সে কোনো কথা বলতে পারেনি। শুধু জানিয়েছিলাম তার বাবা-মার সঙ্গে দ্রাগা অবস্থান করছে। তারপর ইচ্ছা করে দ্রুত চলে আসি। এ ব্যাপারে দ্রাগাকে কোনো কিছু জানাতে বা যোগাযোগের কোনো চেষ্টা আমি করিনি।
এত বছর পর দ্রাগার পরিপূর্ণ অবয়ব আমার পরিষ্কার মনে নেই। লেখার প্রয়োজনে স্মৃতির পাথর খুঁড়ে খুঁড়ে টুকরো টুকরো কথা বের করার চেষ্টা করছি। সত্যি কথা বলতে কি, চেহারা, গায়ের বর্ণ ও শারীরিক দর্শনীয় শৈলী মিলিয়ে দ্রাগার মতো মেয়ে দ্বিতীয়টি আমার চোখে পড়েনি। দ্রাগা নামটি ওদের কোনো পৌরাণিক চরিত্রের রূপকার্থক কিনা জানা নেই। তবে তার নামের অর্থের চেয়েও সে বেশি অপরূপ ও মোহনীয়। সে যখন কাঁদত, মনে হতো তার কান্নার সময়, নিজে কেঁদে তাকে সমবেদনা জানাতে পারলে হয়তো যথার্থ হতো।

Thursday, November 8, 2012

চোখ by হুমায়ূন আহমেদ

ভোর ছটায় কেউ কলিং বেল টিপতে থাকলে মেজাজ বিগড়ে যাবার কথা। মিসির আলির মেজাজ তেমন বিগড়াল না। সকাল দশটা পর্যন্ত কেন জানি তাঁর মেজাজ বেশ ভালো থাকে। দশটা থেকে খারাপ হতে থাকে, চূড়ান্ত রকমের খারাপ হয় দুটার দিকে। তারপর আবার ভালো হতে থাকে। সন্ধ্যার দিকে অসম্ভব ভালো থাকে।

আত্মজা ও একটি করবী গাছ by হাসান আজিজুল হক

এখন নির্দয় শীতকাল, ঠাণ্ডা নামছে হিম, চাঁদ ফুটে আছে নারকেল গাছের মাথায়। অল্প বাতাসে একটা বড় কলার পাতা একবার বুক দেখায়, একবার পিঠ দেখায়। ওদিকে বড় গঞ্জের রাস্তার মোড়ে রাহাত খানের বাড়ির টিনের চাল হিম ঝক ঝক করে। একসময় কানুর মায়ের কুঁড়েঘরের পৈঠায় সামনের পা তুলে দিয়ে শিয়াল ডেকে ওঠে।

কবি by সৈয়দ শামসুল হক

কবি আবদুর রব মুনশী ১৩৭০ সনের ২রা বৈশাখ তাঁর জন্মগ্রাম তামাই, পাবনায়, পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র আটচলি্লশ বৎসর।
আজ সাহিত্যের দরবারে তাঁর কাব্য সংগ্রহ পেশ করবার মুহূর্তে কয়েকটি কথা বলতে আগ্রহ বোধ করছি।

রানীরঘাটের বৃত্তান্ত by সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

রানীরঘাট যাচ্ছি শুনে মফস্বলের বাসে এক ভদ্রলোক বলেছিলেন_রানীরঘাট যাবেন? দেখবেন মশাই, মহা ত্যাঁদোড় জায়গা। সাবধানে থাকবেন। _কেন বলুন তো?
_প্রবাদ শোনেননি 'রানীরঘাটে কে কার বাবা?' শুনিনি। তবে আমাদের গাঁয়ের পাশে এক বড় গাঁ গোকর্ণ।

পাদটীকা by সৈয়দ মুজতবা আলী

গত শতকের শেষ আর এই শতকের গোড়ার দিকে আমাদের দেশের টোলগুলো মড়ক লেগে প্রায় সম্পূর্ণ উজাড় হয়ে যায়। পাঠান-মোগল আমলে যে দুর্দৈব ঘটেনি ইংরাজ রাজত্বে সেটা প্রায় আমাদেরই চোখের সামনে ঘটল। অর্থনৈতিক চাপে পড়ে দেশের কর্তাব্যক্তিরা ছেলে-ভাইপোকে টোলে না পাঠিয়ে ইংরেজি ইস্কুলে পাঠাতে আরম্ভ করলেন।

ডিডেলাসের ঘুড়ি by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

ইমানের হাতে ঘুড়ি আর লাটাই দেখে হোসেন মিয়া রাগ দেখালেন খুব, যদিও তার রাগার কোনো কারণ নেই, এমনকি (পৃথিবীতে সত্যধর্ম আছে এটা ধরে নিলেও) রাগার তার অধিকারও নেই। কারণ ইমান তার গ্যারেজের কর্মচারী হলেও আজ ছুটির দিন, তদুপরি সময়টা বিকাল।

সুখের পিঠে সুখ by সেলিনা হোসেন

অনেকক্ষণ ধরে লোকটা বসে আছে। বসে আছে পথের মোড়ে। অর্থাৎ আড়েপাথালে পথটি যেখানে শেষ হয়ে বাঁক নিয়েছে। সে বাঁকের দিকচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাকুড় গাছের ছায়া লোকটা বাপের ভিটের মতো দখল করেছে। কেউ জানে না কোথা থেকে এসেছে। তবে কেউ কেউ দেখেছে অনেক দূর থেকে লিরলিরা শরীরটা টানতে টানতে এসেছে লোকটা।

রাজা আসেনি বাদ্য বাজাও by সুশান্ত মজুমদার

মাইল নিঃশ্বাসে রেখে অবিরাম দৌড়ে সে মুক্তাঞ্চলে এসে পড়ে। তার বুকের কলকব্জা তরুণ, জং পড়ার মতো কলঙ্ক ধারণ করেনি বলে অমন সুদীর্ঘ দৌড়ে সে কয়েক মাইল পেরে যায়। এই দূরপাল্লার দৌড়ে কোথা থেকে কোথায় এলো তা-ও জানে না। তার সচল পা ফসলহীন মাঠের পর মাঠ পার হয়েছে।

অযান্ত্রিক by সুবোধ ঘোষ

বিমলের একগুঁয়েমি যেমন অব্যয়, তেমনি অক্ষয় তার ঐ ট্যাঙ্টিার পরমায়ু। সাবেক আমলের একটা ফোর্ড, প্রাগৈতিহাসিক গঠন, সর্বাঙ্গে একটা কদর্য দীনতার ছাপ। যে নেহাত দায়ে পড়েছে বা জীবনে মোটর দেখেনি, সে ছাড়া আর কেউ ভুলেও বিমলের ট্যাঙ্রি ছায়া মাড়ায় না।

নদীতীরে by সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

তারপর আমি ইন্দিরা গান্ধীকে জিজ্ঞেস করলুম, আপনি বই পড়তে ভালোবাসেন? উনি একটু হেসে বললেন, ছেলেবেলায় আমি বইয়ের পোকা ছিলুম। _এখন বই-টই পড়ার সময় পান না বোধ হয়? সে রকম সময় পাই না, তা ঠিকই। তবে, যেটুকু সময় বাঁচানো যায়... যেমন ধরো, যখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হয়_এ রকম প্রায়ই যেতে হয়, বিমানে বসে আমি কারোর সঙ্গে কথা বলি না, শুধু বই পড়ি।

নয়ান ঢুলি by সরদার জয়েনউদ্দীন

ঠুক-ঠুক-ঠুক। ঢোল সারে নয়ান ঢুলি। ছোট হাতুড়ি দিয়ে পেটে, আর একগাছা করে তোয়াল টানে খুব সতর্কতার সাথে। পাঞ্জার চারটি আঙুল দিয়ে মাঝে মাঝে তাল ঠোকে, কান পেতে শোনে, ঠিক আওয়াজ উঠছে কি না। ডুং-ডুং-ডগ-ডুং। অনেক দিন পর নয়ানের কাছে একটা ঢোল মেরামতের বায়না এসেছে।

আত্মজ by সুচিত্রা ভট্টাচার্য

মা আজ চলে গেল। একটু আগে বৈদ্যুতিক চুলি্লর গহ্বরে ঢুকে গেছে মা। পুড়ছে। পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। আমার যেন এখনো ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। সকালে যখন অফিসে বেরোই, তখনো তো সব ঠিকঠাক ছিল। যেমন থাকে। দিনটাও আজ শুরু হয়েছিল আর পাঁচটা দিনের মতোই।

বড় পাপ হে by সমরেশ মজুমদার

দুচোখ কুঁচকে সে দূর মাঠের দিকে তাকালো। এখন ভর দুপুর। সেই সকাল থেকে মাছ ধরার চেষ্টায় সময়টা গেছে ফালতু। শুধু চুনো পুঁটি আর পাথরঠোকরা। কদিন থেকে তক্কে তক্কে ছিল সেই মোটকা বাণমাছটাকে ধরবেই, হারামীটা আজও সটকে গেল। ওটা নিয়ে ধোউয়ালির হাটে গেলে এক কিলো চাল হয়ে যেত নিশ্চয়।

কে নেবে মোরে by সমরেশ বসু

সুরজিৎ মণ্ডল বাঁধানো ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে সামনের দিকটা একবার দেখে নিচ্ছে। তার পিছনেই সেই প্রকাণ্ড বিল। স্থানীয় লোকেরা কখন কে কী বলে, বোঝা যায় না। মনেও থাকে না। হাওড়া নাকি সায়র, কী যেন সব বলে। বিল ঝিল, তাও বলে। ওরা যা খুশি তাই বলতে পারে। আরশিয়া বিল, এই হচ্ছে আসল নাম।

ক্লাস ফ্রেন্ড by সত্যজিৎ রায়

সকাল সোয়া নটা। মোহিত সরকার সবেমাত্র টাইয়ে ফাঁসটা পরিয়েছেন, এমন সময় তাঁর স্ত্রী অরুণা ঘরে ঢুকে বললেন, 'তোমার ফোন।' 'এই সময় আবার কে?'
কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে নটায় অফিসে পেঁৗছানোর অভ্যাস মোহিত সরকারের; ঠিক বেরোনোর মুখে ফোন এসেছে শুনে স্বভাবতই তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ল।

ক্লাস ফ্রেন্ড by সত্যজিৎ রায়

সকাল সোয়া নটা। মোহিত সরকার সবেমাত্র টাইয়ে ফাঁসটা পরিয়েছেন, এমন সময় তাঁর স্ত্রী অরুণা ঘরে ঢুকে বললেন, 'তোমার ফোন।' 'এই সময় আবার কে?'
কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে নটায় অফিসে পেঁৗছানোর অভ্যাস মোহিত সরকারের; ঠিক বেরোনোর মুখে ফোন এসেছে শুনে স্বভাবতই তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ল।