Friday, October 3, 2014

কোরবানি : পাশবিকতারও জবাই হতে হবে by অধ্যাপক নইম কাদের

কোরবান ও কোরবানি শব্দ দু’টি আমাদের অতি পরিচিত। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী উৎপত্তিগত দিক দিয়ে শাব্দিক বিশ্লেষণে শব্দ দু’টির শাব্দিক অর্থ এবং পরিভাষায় কিছুটা পার্থক্য আছে। কোরবানি হচ্ছে- আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ত্যাগ বা উৎসর্গ এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন। কোরবানি সুন্নাতে ইবরাহিমে হিসেবেই পরিচিত। আবুল আম্বিয়া হজরত ইবরাহিম আ: এই মহান সুন্নাত প্রবর্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ত্যাগের এই মহান সুন্নাত উম্মতে মুহাম্মদি সা:-এর সামর্থ্যবানদের ওপর বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব) করা হয়।

কোরবান শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ দাঁড়ায় পরম নৈকট্য। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানুহু তায়ালার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া, নিকটতম স্থান লাভ করা। পশু জবাই এবং আনুষঙ্গিক ত্যাগের মাধ্যমে এই চরম নৈকট্য অর্জিত হয় বলেই এর নাম কোরবানি। এখানে কোরবানি দ্বারা এর প্রচলিত সাধারণ অর্থ গ্রহণ করলে ভুল হবে। সাধারণত এটাই ধারণা করা হয় যে, সুন্দর একটি পশু ক্রয় করে জিলহজ মাসের ১০ তারিখে জবাই করলেই কোরবানি আদায় হয়ে গেল এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়ে গেল। কোরবানির হাকিকত বা আসল রূপ আমাদের জানতে হবে এবং বুঝতে হবে।
হজরত ইবরাহিম আ:কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্বপ্নযোগে ওহি প্রেরণ করেন তিনি যেন তাঁর প্রিয় সন্তান হজরত ইসমাঈল আ:কে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে জবেহ করেন। পবিত্র কুরআনে জবেহ শব্দটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে তিনি তার প্রিয় সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় ঠিক সেভাবে উৎসর্গ করেন, জবাই করেন যেভাবে তিনি স্বপ্নযোগে আদিষ্ট হন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহর পয়গাম্বর হজরত ইবরাহিম আ: কর্তৃক প্রাণাধিক প্রিয়পুত্র হজরত ইসমাঈল আ:কে জবাইয়ের ঘটনাটি ‘কাদ সাদ্দাকতার রুইয়া’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জবাইয়ের ঘটনাটি ছিল বাস্তব। অর্থাৎ ইবরাহিম আ: সত্যি সত্যিই তার প্রিয়পুত্রের গলায় ছুরি চালিয়েছিলেন, জবাই করেছিলেন। তবে গলা কাটেনি, শিশুপুত্র ইসমাঈলের কোনো ক্ষতি হয়নি। এর কারণ হচ্ছে, আল্লাহ পাক ইবরাহিম আ:কে যেমন তার সন্তান জবাই করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তেমনি গলায় চালানো ছুরিকেও নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন সে তার কাটার কাজ না করে। এখানে ইবরাহিম আ: এবং ছুরি উভয়ে আল্লাহর নির্দেশ পালন করেছেন। তারপর ফেরেশতা কর্তৃক পশু হাজির করা এবং পশু জবাইয়ের বিবরণও পবিত্র কুরআনে এসেছে। প্রাণাধিক প্রিয়পুত্রের পরিবর্তে পশু জবাইয়ের এই সুযোগকে বৃদ্ধ বয়সে সাইয়্যেদানা ইবরাহিম আ:-এর প্রতি আল্লাহ পাকের বিরাট প্রতিদান বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক পুরো ঘটনাটিকে সুস্পষ্ট এক বিশাল পরীক্ষা হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর এই বিশাল পরীক্ষায় ত্যাগের সর্বোত্তম নজির স্থাপন করে কুরআনের ভাষায় ‘মুহসিনিন’ এর অন্তর্ভুক্ত হলেন হজরত ইবরাহিম আ:, হজরত ইসমাঈল আ: এবং হজরত হাজেরা আ:। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ত্যাগের এই মহান দৃষ্টান্ত হজরত ইবরাহিম আ: ও তার পরিবারের আগে মানব ইতিহাসে আর একটিও খুঁজে পাওয়া যায় না।
আল্লাহর রাস্তায় নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ করার নাম কোরবানি। এখানে আরো একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, কোরবানি কোনা ব্যক্তিগত ত্যাগের নাম নয়। এটা সামষ্টিক ত্যাগের প্রতিফলন। যেমন হজরত ইবরাহিম আ: একা এই কাজে অগ্রসর হননি। তার সাথে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন প্রিয়পুত্র হজরত ইসমাঈল আ: এবং হজরত হাজেরা আ:। এ থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, কোনো মুসলমান শুধু একা আল্লাহর রাস্তায় ত্যাগের জন্য প্রস্তুতি নিলেই হবে না, তার পুরো পরিবারকেও ত্যাগের এ পথে নিয়ে আসতে হবে। এটাই সুন্নাতে ইবরাহিমে ‘কোরবানির’ মর্মকথা।
আফসোস! মুসলিম সমাজে কোরবানি আজ নিছক আনুষ্ঠানিকতায় রূপ লাভ করেছে। আমরা ভুলে গেছি এর আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। লৌকিকতা আর আনুষ্ঠানিকতায় হারিয়ে গেছে কোরবানির আসল মকছুদ। কোরবানি যেন আজ তথাকথিত বড় লোকদের গরু প্রদর্শনী আর অহমিকা প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। বিয়ের প্রথম বছর মেয়ের বাপের বাড়ি থেকে কোরবানি উপলক্ষে বিরাট গরু পাঠাতে না পারায় অনেকের ঘর-সংসার ভেঙে যাওয়ার উপক্রমের খবরও পাওয়া যায়। ঢোল-বাদ্য সহকারে লাখ টাকায় কেনা গরু প্রদর্শনীর মিছিল আর হই হুল্লুড়ের কাছে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনি। অথচ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কত সুন্দরভাবেই না বলেছেন- আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর গোশত, রক্ত কিছুই পৌঁছে না, আল্লাহর কাছে পৌঁছে শুধু তাকওয়া। অথচ মানুষ আজ আল্লাহকে এর জবাব দিচ্ছে ঠিক বিপরীত। এক শ্রেণীর মানুষের কাছে কোরবানি আজ তাকওয়ার পরিবর্তে গোশত আর টাকার সস্তা খেল তামাশায় পরিণত হয়ে পড়েছে।
আর একশ্রেণীর মানুষের কাছে কোরবানি নিছক ব্যবসায় ছাড়া আর কিছুই নয়। কোরবানি উপলক্ষে মওসুমি পশু-ব্যবসায় খারাপ কিছু নয়, বরং নিয়ত ঠিক থাকলে তা এক বিরাট ইবাদত। কিন্তু কোরবানি উপলক্ষে পশুর চামড়া নিয়ে যা হয় তার সাথে সুন্নাতে ইবরাহিমের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। কোরবানির সময় প্রতি বছর আমাদের দেশে একশ্রেণীর চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে ফেলে। এ ছাড়া আর একশ্রেণীর মাস্তানের উপদ্রব ঘটে যাদের সামনে কথা বলার সাহসও রাখেন না কোরবানিদাতারা। এরা নিজেরাই চামড়ার দাম ঠিক করে দেয় এবং কোরবানিদাতারা তাদের নির্ধারিত মূল্যে তাদের হাতেই চামড়া তুলে দিতে বাধ্য হন। কোরবানির চামড়ার হকদার এতিম, মিসকিন গরিব মানুষগুলো। যারা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম ফেলে দেয়, কিংবা যারা চামড়া নিয়ে মাস্তানি করে তারা গরিবের হক তছরুফ করছে, এতিমের মুখের গ্রাস কেড়ে নিচ্ছে। এটা জঘন্য অপরাধ। দুনিয়ার জিন্দেগিতে তাদের বিচার হয়তো হবে না। কিন্তু কিয়ামতের মাঠে তারা ছাড়া পাবে না। স্বয়ং আল্লাহ পাক এতিম আর গরিবের পক্ষে তাদের হক আদায় করে ছাড়বেন।
যারা কোরবানির চামড়া নিয়ে মাস্তানি করে, যেসব ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পশুর মূল্য বাড়ায়, চামড়ার মূল্য ফেলে দেয় কিংবা যারা কোরবানিকে লোক দেখানো খেল তামাশায় পরিণত করে তাদের ভেবে দেখা উচিত কিয়ামতের মাঠে প্রত্যেককে নিজ নিজ কাজের জন্য অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। ত্যাগের বার্তা নিয়ে প্রতি বছর আমাদের কাছে কোরবানি হাজির হয়। শুধু আল্লাহকে খুশি করার জন্য, আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য যারা কোরবানি করেন, মাটিতে শোয়ানো পশুর গলায় ছুরি চালানোর পর গলা বেয়ে মাটিতে রক্ত পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়।
মনে রাখা দরকার পশু জবাইয়ের সাথে সাথে মনের ভেতরে অবস্থিত পাশবিকতারও জবাই হয়ে যেতে হবে। তা না হলে গোশত খাওয়া ছাড়া কোরবানি দ্বারা আর কিছু অর্জিত হবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।

কার প্রতিনিধি তুমি শিশু? by জুবাইদা গুলশান আরা

ছবিটা আমাকে ডাক দিলো। সে এক সুতীব্র মমতার তৃষ্ণায় হাতছানি দিলো আমাকে। শিশুটি একটি মুখ নয় শুধু। তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে যে অশ্রু, তা আমার হাত ছুঁয়ে গেল। একেবারে স্পষ্ট চোখের জল, যার স্পর্শে আমি শিউরে উঠলাম। আমার নিজের হৃদয় থেকে ডুকরে উঠল কান্নার হাহাকার। মরুভূমির লু হাওয়া কাঁপিয়ে দিলো আমার অনুভূতি।
হ্যাঁ, সে এই বিশ্বেরই শিশু; কিন্তু বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে তোলার মহৎ প্রতিজ্ঞা আজো অর্জিত হয়নি। রাষ্ট্রনীতি, রাজনীতি, ক্ষমাহীন অধিকারবোধ বিশাল এক যুযুধান লৌহরাক্ষস হয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি স্কুল, হাসপাতাল পর্যন্ত।
একসময় আমরা ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দেখেছি, কী এক বিরূপতা আর ঘৃণার শিকার হয়ে শত শত শিশু এবং মানুষকে হত্যা করে দিলো নাৎসি সেনারা। শুনেছি অসহায় মানবতার গুমরে গুমরে কান্না। ডায়েরি অব অ্যানি ফ্রাঙ্ক নামে একটি বই, দ্য বয় ইন ব্লু পাজামা বইগুলো পড়ে সন্দেহ জাগে, মানুষ কিভাবে কোন কারণে শিশুদের প্রতি এত ভয়ানক নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছিল? যে হত্যার মহাযজ্ঞ এখন সারা পৃথিবীকে আতঙ্কে ম্রিয়মাণ করেছিল, তার পেছনে ছিল জাতিগত বিদ্বেষ, রাজনৈতিক আকাক্সা এবং ক্ষমতার চূড়ান্ত অহমিকা।
এভাবেই ভয়ঙ্কর ঘৃণা ও নিষ্ঠুর মানুষ হত্যার এক ভয়ঙ্কর ইতিহাস তখন সৃষ্টি করেছিল নাৎসি বাহিনী, যা ইতিহাসের পাতায় এক মর্মন্তুদ স্মৃতিকাতর অধ্যায় হয়ে আছে। দুঃখের বিষয় এই যে, পৃথিবীতে দেশে দেশে এ ধরনের মৃত্যু ও যুদ্ধের ইতিহাস যুগের পর যুগ ধরে চলেছে। সবচেয়ে দুর্বল ও নাজুক জীবনধারাকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে পৃথিবীর যুদ্ধে মেতে ওঠা শক্তিগুলো।
আমাদের চোখের সামনে ঘটেছে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডÑ বসনিয়া হারজেগোভিনা, সেব্রেনিৎস্কায় ঘটে গেছে মৃত্যুর তাণ্ডব। চোখের পানি আর রক্ত স্রোতে ভেসে গেছে অগণিত শিশুর প্রাণ। আমরা বিশ্বের মানুষেরা সে অন্যায় মৃত্যু জেনে বিচলিত ও ব্যথিত হয়েছি। কবি, সাহিত্যিক ও সংবেদনশীল মানুষ তাদের লেখনীর মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন অন্যায় মৃত্যুর প্রতিবাদ; কিন্তু পৃথিবীটা মৃত্যুর নির্লজ্জ অনাচার থেকে রক্ষা করতে পারেনি সুন্দর ফুলের মতো শিশুদের। বাঁচাতে পারেনি নিষ্পাপ মানুষের ঘর গেরস্থি।
এই সময়ে আরো মৃত্যুর প্রেতমূর্তি কালো ছায়া ফেলেছে ইরাকে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে ধর্ম ও বিরুদ্ধতা এসে যোগ দিয়েছে। মানুষকে তার নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার তারা নিষিদ্ধ করে দিতে সর্বদা প্রস্তুত।
ইতিহাস বলে, ১৯৪০ সালে বিখ্যাত লাহোর প্রস্তাব আসে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিষয়ে। ওই সময়ে অবিভক্ত ভারত স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করছিল। সেই সাথে মুসলমানের জন্য আলাদা ভূখণ্ড জন্ম নেবে এই আকাক্সা নিয়ে বিশ্বের মুসলিম নেতৃবৃন্দ আলাপ-আলোচনা করছিলেন। প্যালেস্টাইন তথা ফিলিস্তিন নামের মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা বিষয়ে পিএলও ও তথা প্যালেস্টাইন লিবারেশন ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা ইয়াসির আরাফাত তার জীবনের সবটুকু শক্তি নিয়োজিত করেছিলেন ফিলিস্তিনের জন্য; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আরব দেশগুলো যেমন এ বিষয়ে এগিয়ে আসেনি তেমনই বিশ্বনেতাদের ভিন্ন মতের কারণে ফিলিস্তিনের নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধাবস্থা থেকে মুক্তি পায়নি ফিলিস্তিন। ইসরাইল একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র তার স্বীকৃতি পায়নি।
জাতিসঙ্ঘের সহযোগিতা বা বিশ্বকে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাজ্যের শর্ত তার কাক্সিত অবস্থানে নিয়ে আসার আগেই ইয়াসির আরাফাত মৃত্যুবরণ করেন। কেন যেন তার স্বপ্ন, যুদ্ধ থেকে মুক্ত একটি স্বাধীন মুসিলম রাষ্ট্রকে তার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে কেউ দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করেনি তার অধিকারের বিষয়টি বরং ১৯৭০ সালে জর্ডানে ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে জর্ডানের সৈন্যরা ভয়াবহ অভিযান চালায়। সেই অভিযানে কয়েক হাজার ফিলিস্তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জাতিসঙ্ঘের নির্দেশও মাঝে মধ্যেই উপেক্ষিত হয়। কারণ ইসরাইল গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনের নিশ্চিন্তে নিরাপদ অবস্থানগুলোতে কিছু দিন পরপরই হামলা চালিয়ে আসছে।
সাধারণভাবে দেখা যায়, গাজায় বাস করছে লাখ লাখ মুসলমান; কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় এই যে, তাদের চিন্তা, কর্মকাণ্ড কোনো কিছুই যেন গ্রহণযোগ্য নয়। ইসরাইলের কাছে অপাঙক্তেয় অর্থহীন। ২০০৯ সালে গাজায় চারজন ইসরাইলি কিশোর নিহত হয়। সাথে সাথে গাজার ওপর নেমে আসে প্রতিশোধের খড়গ। অন্তহীন এ আক্রমণ আজকে ২০১৪ সাল অবধি চলছে। এমনকি জাতিসঙ্ঘের নির্দেশ সত্ত্বেও নয়। এই মৃত্যু ও ধ্বংস অমানবিক হলেও যারা ফিলিস্তিনিদের জীবন চায়, তাদের কাছে অকিঞ্চিৎকর।
কেন এত কষ্ট মানুষের? এই দুঃখজনক প্রশ্নটির উত্তর কে দেবে?
চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফুলের মতো মেয়েটির বেদনা বিষাদে আঁকা মুখ যে শত শত নিরুচ্চারিত প্রশ্ন নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কী উত্তর দেবো ওকে?
হ্যাঁ, এ কথা সত্যি যে, ইংল্যান্ডের বড় শহর লন্ডনে ইসরাইলি দূতাবাসের সামনে শত শত মানুষ জমায়েত হয়ে ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। সেখানে সব সমাজের পৃথিবীর সব দেশের মানুষ নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, কবিরা কবিতায় শোনাচ্ছেন নির্যাতিত মানুষের কথা। সর্ব সমাজের মানুষ আজ গাজার মৃত্যুউপত্যকার যন্ত্রণা নিয়ে দাবি করছেন যুদ্ধ বিরতির। ধর্ম বর্ণ জাতির বিভক্তি সত্ত্বেও তাদের দাবি এক। মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করা হোক। এক সময়ে মুসলিম দেশগুলো এ বিষয়ে একমত হয়ে এই সবলের অত্যাচার বন্ধ করার কথা জাতিসঙ্ঘে তুলে এনেছিল; কিন্তু কোনো রহস্যজনক কারণে আবার যুদ্ধের তীব্র আক্রমণে ধ্বংস হয় ফিলিস্তিনি জনপদ।
মনে কেবলই প্রশ্ন জাগে, কেন এই আগ্রাসন? এক দিকে স্বাধীন ফিলিস্তিনের দাবি, অন্য দিকে বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য না করে নিষ্ঠুর ইসরাইলের আক্রমণ। জানা যায়, এবারের অপ্রতিহত আক্রমণে এক হাজার ৫০০ শিশু এতিম হয়েছে। এটি জাতিসঙ্ঘের হিসাব ও সরকারি হিসাবে ২ হাজার ১৬০ ফিলিস্তিনি নিহত ও ১১ হাজার আহত হয়েছেন। প্রায় অর্ধেক গাজাবাসী বাস্তুহারা হন। হাজার হাজার ঘর, মসজিদ, হাসপাতাল ও সমাধি বিধ্বস্ত হয়।
জাতিসঙ্ঘের পরিসংখ্যান মতে, অপারেশন প্রটেকটিভ এজ নামের অভিযানের ফলে গাজায় নতুন করে ১৫০০ শিশু এতিম হয়।
কিছু দিন আগে সংবাদপত্রে দেখেছি পাঁচ বছরের একটি শিশু ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে দু’হাতে তার ছোট বোনটিকে নিরাপদে রাখার চেষ্টা করছে। ছয় বছরের মধ্যে তিনবার ইসরাইল গাজায় বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। গাজার একমাত্র বড় এতিমখানা পরিবার হারানো নিঃসঙ্গ শিশুদের আশ্রয় দিচ্ছে, যতœ নিচ্ছে; কিন্তু সেখানেও হামলা হয়। সে হামলায় একজন নিহত হয়, অন্যজন হয় আহত। আমির হামাদ নামের একটি শিশুর কথা জানতে পারি। চার ভাইবোন ও বাবা-মায়ের সাথে তারা বাস করত। বাবা-মা সকালের নাশতার পরে কফি পান করছিলেন। এমন সময় একটি রকেট এসে পড়ে। আমিরের শিশু ভাইটি রক্তে ভাসছিল। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বাকি কয় ভাইবোন অলৌকিকভাবে রক্ষা পায়। এখন তারা দাদা-দাদীর সাথে বাস করছে। আমির জানে, বাবা-মা আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না। তাই বেঁচে থাকার সাথে সাথে ভাইবোনদের কথাও তাকে ভাবতে হবে।
আশ্চর্য বিষয় এই যে, যে শিশুদের নিয়ে বিশ্বমানবতা স্বপ্ন দেখায় এবং স্বপ্ন দেখে, সেই শিশুদের নিয়ে ইসরাইলের নিষ্ঠুরতা অীচন্তনীয়। প্রতি মুহূর্ত মৃত্যুই তাদের নিকটতম প্রতিবেশী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের সহায়তা দিতে এগিয়ে আসেন যারা, তাদেরও জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কতটুকু? মানুষের পৃথিবীর মূল যুদ্ধ কী নিয়ে? ক্ষমতার লড়াই। আর সেই যুদ্ধকে উপলক্ষ করেই এক পক্ষ অন্য পক্ষকে উচ্ছেদ করতে যুদ্ধ লাগায়। এর পেছনে জোরালো যুক্তি কেবল তাদেরই হাতে। শক্তির প্রদর্শন। তা না হলে কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উপলক্ষ করে হিরোসিমা-নাগাসাকির ঘটনা ঘটত? কিন্তু মানুষের মনে যদি ঘৃণা আর ক্ষমতার এত তীব্র ও তীè সহাবস্থান না থাকত, তবে এত রক্তস্রোতে ভাসত না দুর্বল দেশগুলো। সম্প্রতি আবারো প্রতিবেশী দুর্বল দেশগুলো এভাবেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে চলেছে আর তার শিকার বিশেষ করে শিশুরা। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, পৃথিবীজুড়ে শিশু অধিকার বজায় রাখার পক্ষে এত সমাবেশ, এত সহানুভূতি, এত আয়োজন তার অংশীদার হিসেবে যেকোনো দেশ গর্বিত হতে পারে; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সত্য স্বীকার করার সততা যদি থাকে, তাহলে নির্মম নিষ্ঠুরতার বহু চিত্রই বেরিয়ে আসবে, যা লক্ষ্য করে হৃদয়বান মানুষ হতবাক হয়ে যাবেন।
যুদ্ধাবস্থা অথবা শান্তির সময়েও আমরা জাতিসঙ্ঘকে পাই সঙ্কট নিরসনের সহায়ক হিসেবে। যেমনটি ঘটছে গাজা উপত্যকায়। জাতিসঙ্ঘের সহায়তায় এতিম শিশুদের জন্য আশ্রয় ও বড় হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে জাতিসঙ্ঘ। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে জানা যায়, বিসান দাবের নামে আট বছরবয়সী শিশুটি জানে না তার অপরাধ কী। তবুও সে এক আক্রমণে সবাইকে হারায়। শিশুটি বলে, আমাদের কাছে রকেট ছিল না। তবু আমার মা-বাবা ও সব ভাইবোন বেহেশতে চলে গেছেন। ইসরাইলি হামলার পরে সে ছয় ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়েছিল। হাসপাতালকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
আমি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারি, এই শিশুটিও সবাইকে হারিয়েছে। ব্যাপারটা এমনভাবে ঘটেছে যে, শোকদীর্ণ শিশুরা কাঁদে না, চিৎকার করে না। নিরাসক্তভাবে ঘটনাটা শ্রোতাকে বর্ণনা করে। থেকে থেকে ভয়ে-আতঙ্কে তার ভেতরটা কেঁপে ওঠে। তার মতো কয়েক লাখ শিশু এখন গাজায়। মা-বাবা হারানো এই এতিমদের বোবা কান্নায় আকাশও যেন ভারী হয়ে আছে।
এসব শিশু যখন সময়ের নিয়মে বড় হয়ে উঠবে, তখন কি তার ভেতরে এক ভীত, আতঙ্কিত একজন মানুষ জন্ম নেবে না? কোনো দিন কি এই শিশুরা প্রতিশোধস্পৃহায় ফুঁসে উঠবে না? সে কি প্রশ্ন করবে না, স্বাধীন দেশের জন্য আশা আর স্বপ্ন তৈরি করা কি অপরাধ? আমার মনে পড়ে ছেলেবেলায় মহররমের মিছিলে শিয়া সম্প্রদায় বিশাল শোকমিছিল বের করত। দুই হাতের অস্ত্র দিয়ে নিজেদের গায়ে আঘাত করত। সাথে থাকত দুলদুল ঘোড়া, যার সারা গায়ে আঁকা হতো অসংখ্য তীর। ইমাম হাসান, ইমাম হোসেন রাসূলুল্লাহ সা:-এর দৌহিত্র। দুই শহীদ ভাইয়ের স্মরণে এই তাজিয়া মিছিলে লোকের মাতম উঠত। ইতিহাসের এক দূরপনেয় কলঙ্কিত বেদনাবিধূর কাহিনীর স্মরণে মানুষ আহাজারি তোলে আজো। মূল কথা হলো, ক্ষমতার লড়াইয়ে নিষ্পাপ দুই তরুণ ভাইয়ের মৃত্যু মানুষ চিরকাল স্মরণ করে। অমর করে রেখে আজো শোকার্ত স্মৃতির কাছে মানুষকে ফিরিয়ে আনে।
এই মুহূর্তে ইতিহাসকে উপেক্ষা করে গাজায় ঘটে চলেছে হত্যার উৎসব। আমাদের হৃদয় যত আঘাতে বিদীর্ণ হোক, হত্যাকারীর হৃদয় তাতে দ্বিধাগ্রস্ত হবে না। শিশু হত্যার বিক্ষোভে ফেটে পড়লেও ইতিহাসের তাতে ভ্রƒক্ষেপ নেই। ‘শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা’,বলে কবির কলম যতই ফুঁসে উঠুক, ফেলানীর মৃত্যুর মতোই তার সুবিচার পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘকাল।
আজ তাই বিশ্ববিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখতে হয়Ñ কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন? সোনার শিশুদের এতিম করে ‘রোখে মানুষের দাবি’ এর উত্তর খুঁজে পাই না। তবু শিশুদের অশ্রু লাঞ্ছিত অসহায় মৃত্যু, অসহায় আত্মসমর্পণ থেকে একদিন হয়তো গর্জে উঠবে প্রতিশোধের আগুনে পোড়া এক হিংস্র নবীন জনপদ। তারা মোকাবেলা করবে নিষ্ঠুরতার সাথে নিষ্ঠুরতার অস্ত্র নিয়ে। অথবা মার খেতে খেতে প্রতিরোধহীন অসহায় মানবিকবোধ থেকে জেগে উঠবে ঘৃণার অস্ত্র। মানুষ ও সভ্যতার নিত্যনতুন অহমিকার মুখোমুখি দাঁড়াবে সে। বলবে, ‘যদি আমার কবিতা পরিশ্রমী শ্রমিকের হাতে হাতুড়ি এবং মুজাহিদের মুঠোয় বোমা হয়ে যায়।’ (ফিলিস্তিনি কবি দারবিশের লেখা থেকে নেয়া)
পৃথিবীতে যুগে যুগে, হাজার হাজার বছর ধরে সভ্যতা এসেছে রক্তস্রোত ও অগ্নিদাহকে ক্ষমতার সঙ্গী করে। গাজার নির্মম ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে সেই ইতিহাস, যা মুখে বলেÑ ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’ আর অসহায় মানুষ তাদের হাতেই মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছে। তাই বলতে হয়, সারা বিশ্ব কি ক্ষমা করবে এই হন্তারকদের, যারা মানবসভ্যতার সবচেয়ে অসহায় প্রজাতিকে হাসতে হাসতে তুলে দেয় মৃত্যুর হাতে? এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবার পবিত্র অঙ্গীকারকে পরিহাস করে?
কামনা করি, জেগে উঠকু বিবেক, মানুষ যেন বলতে পারে, ‘আমরা চোখ মেলে আর শিশুহত্যার নারকীয়তা দেখতে চাই না। ওরা কেন ওদের অজান্তে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ভোগ করবে?
সারা বিশ্বের শিশুদের কথা আজ নতুন করে ভাবতে হবে।
শত্রুর হাতে জীবনধ্বংসী যে অভিশাপ এই নিষ্পাপ শিশুদের হত্যা করছে, সারা বিশ্বের শিশুদের কথা মনে রেখে কামনা করিÑ আর নয় হিরোশিমা, আর নয় নাগাসাকি, আর নয় হত্যার মহোৎসব। শিশুদের কথা মনে রেখে গড়ে তুলি নতুন বিশ্ব, যেখানে ওরা মানুষ হওয়ার জন্য জায়গা পাবে। আজ জেগে উঠুক বিশ্বমানবতা। প্রতিরোধ সৃষ্টি করুক অন্যায় নরধম যজ্ঞের বিরুদ্ধে।

প্রেমের গল্প- সাবান by ফারজানা সুরভি

: আমাকে যদি কখনো জেলখানায় পাঠানো হয় সঙ্গে একটা সাবান নেব।
: সাবান?
: হ্যাঁ! আমাকে একবেলা খাবার দিক, কিচ্ছু বলব না। রোজ রাতে এসে পেটাক, কিচ্ছু বলব না। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের করবে, করুক! কিন্তু যদি এক টুকরা সাবান ওরা আমাকে না দেয়, লুকিয়ে রাখব ধারাল ব্লেড! প্রথম সুযোগে ধমনি কাটব। অথবা বন্দীদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে হাঙ্গামা বাঁধিয়ে দেব। ভীষণ হাঙ্গামা! পুলিশ ব্যস্ত লাঠিচার্জে, সেই ফাঁকে দেয়াল টপকে দোকানে যাব। একটা সাবান ভিক্ষা চাইব!
: অদ্ভুত মানুষ আপনি। করবেন কী সাবান দিয়ে? আর জেলেই বা যাবেন কেন!
: হাত ধোব। ঘণ্টায় পাঁচবার হাত ধুই আমি। দেখেন না কেমন কুঁচকানো হাত আমার। বুেড়াদের হাতের মতো!
: কেন এত ঘন ঘন হাত ধোন? জীবাণু ধ্বংস?
: না, পাপ ধুই। হাত দুইটা অনেক পাপী। অ-নে-ক!
: কিসের পাপ?
: তাকে একটা চড় মেরেছিলাম!
: কাকে?
: যাকে খুব ভালোবাসতাম, তাকে। ওর ওপর অনেক রাগ ছিল আমার। অনেক রাগ! অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বলতে দেখলেও মাথায় রক্ত উঠে যেত। দুই বছরের প্রেমের সময় এক ফোঁটা শান্তি দিইনি মেয়েটাকে। একদিন তো চড় মেরে বসলাম। মাথার ঠিক ছিল না। অনেক জোরে চড় মেরেছিলাম। ফরসা গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ পড়ে গেছিল। কেমন একটা নেশা ধরানো লাল ছাপ! দেখলে মনে হতো আরও মারি...আরও মারি...!
: তারপর?
: অনেক মানুষ ছিল সেখানে। সবাই হাঁ করে দেখছিল। বুঝলেন, চড়টা মারার পরে ও না আমাকে কিচ্ছু বলেনি। একটা শব্দও না। মনে হয় এত অবাক হয়েছিল, কথা বলতেও ভুলে গেছিল। এরপর অবশ্য আর কোনো দিন আমার সঙ্গে দেখা হয়নি তার। কথাও হয়নি। সেই শেষ দেখা। অপমানে চলে গেল মেয়েটা। আর ফিরেও তাকায়নি। কখনো না!
: আর কোনো খবর পাননি তার?
: অনেক ধুমধাম করে ওর বিয়ে হয়েছিল। শুনেছি, আমেরিকায় থাকে। অনেক সুখে আছে। ফুটফুটে একটা মেয়েও হয়েছে। অথচ ওই থাপ্পড়টা সেদিন না মারলে ও কখনো চলে যেত না। অনেক ভালো মেয়ে ও! কখনো আমাকে ফেলে চলে যেত না। আমার সঙ্গে ওর বিয়ে হতো! কত সুখে থাকতাম! পিরর মতো একটা ছোট্ট মেয়ে থাকত আমাদের! হলুদ ফ্রক পরে ‘বাবা! বাবা!’ বলে পুরো ঘরে টলমল করে হাঁটত। আর পড়ে যেত... আবার হাঁটত...আবার পড়ে যেত...! আমি তখন ওর আঙুল ধরে ঠিক ঠিক হাঁটতে শেখাতাম। কিন্তু কিচ্ছু হলো না। আমি এখন একলা একলা ঘুরি রাস্তায় রাস্তায়। আর আমার এই হাত দুইটা নেড়ি কুত্তার ঘিনঘিনে লেজের চেয়েও নোংরা!
আমার সহযাত্রী একটু থেমে শ্বাস নিলেন। পকেট থেকে বের করলেন সুগন্ধি সাবানের গোলাপি প্যাকেট। আর ব্যাগ থেকে মিনারেল ওয়াটারের বোতল। বাসের জানালা দিয়ে মাথা বের করে হাত ভিজিয়ে নিলেন। প্যাকেটের সাবান বের করে ঘষতে থাকলেন ডলে ডলে। সাদা ফেনার ওপর ঢালতে লাগলেন রংহীন পানি। কয়েকটা বুদ্বুদ উড়ে গেল বাতাসে।

পাটনায় পদদলিত হয়ে ৩২ জনের মৃত্যু

ভারতের পাটনায় দুসেরা (রাবন দহন বা রাবন বধ) উৎসবে পদদলিত হয়ে কমপক্ষে ৩২ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ২৫ জন নারী আর ৫ শিশু রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এছাড়াও আহত হয়েছে কমপক্ষে ১৫ জন। পাটনার গান্ধি ময়দানের বাইরে উৎসবের পর এ দূর্ঘটনা ঘটে। এ খবর দিয়েছে এনডিটিভি। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, বৈদ্যুতিক তার ছিড়ে পড়ে গেছে এমন একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর পদদলিত হবার ঘটনা ঘটে। গান্ধি ময়দানের দুসেরা উৎসব পাটনার মধ্যে সবথেকে বড় উৎসব। বিশালাকায় কুশপুত্তলিকা দাহ হবার দৃশ্য দেখতে প্রতিবছর অনেক মানুষের সমাগম হয়। উৎসবটি রাজ্য সরকার আয়োজন করে থাকে। বিহারের মূখ্যমন্ত্রী জিতান রাম মাঞ্জি উৎসবের সময় উপস্থিত ছিলেন। গণমাধ্যমের প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হচ্ছে উৎসব শেষে এতগুলো মানুষের ভেন্যু থেকে বের হবার জন্য সবগুলো দরজা খোলা ছিল না। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কথা না বলা সপ্তম দিন মধ্যরাতে by আন্দালিব রাশদী

বিশ্বাস না হয় জরিপ চালিয়ে দেখতে পারেন অধিকাংশ সুন্দরী পাত্রী পুরোপুরি আবদুল টাইপের একটি পাত্রকে বিয়ে করে থাকে। আবদুল শুধু আচরণে নয়, নামেও। আমার নাম আবদুল খালেক। আমার স্ত্রীর নাম তাথৈ।
আবদুল খালেকের স্ত্রী তাথৈ চৌধুরী। হোয়াট অ্যা কনট্রাস্ট! তাথৈর বড় বোন অথৈ চৌধুরীর স্বামী মহরম আলী মিঞা। এমনই হয়ে থাকে।
আমার নামটা তাথৈর পছন্দ নয়। কেউ জিজ্ঞেস করলেও এড়িয়ে যায়। স্বামীর নাম আবদুল খালেক লিখতে হবে- এমন একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে একটি ফর্মে ম্যারিটাল স্ট্যাটাস লিখেছে আনম্যারেড। তাথৈ নিজেই হাসতে হাসতে কথাটি বলে ফেলেছে।
আমিও জিজ্ঞেস করি, তাথৈ মানে কি? এটা কেমন নাম?
তাথৈ বলে, শোনোনি, তাথৈ তাথৈ থৈ দ্রিমি দ্রিমি দ্রাম দ্রাম?
আবার জিজ্ঞেস করি, এর মানে কি?
তাথৈ বলল, বাবা জানে। আমার নাম বাবা রেখেছে।
আমার নামও বাবা রেখেছে। সমস্যা কোথায়?
তোমার নাম ইশতিয়াক আহমেদ হলে আমার কোনো সমস্যা ছিল না।
ইশতিয়াক আহমেদ কেন? আদনান সামি কিংবা ওয়াহিদ মুরাদ কিংবা শাফকাত রানা নয় কেন? এগুলো তো আরও চমৎকার নাম।
আমাদের ঝগড়ার শুরুটা এভাবেই।
তাথৈ গলা ফাটিয়ে বলে, তোমার ওয়াইফের নাম হওয়া উচিত ছিল রূপবান কিংবা চন্দ্রবানু।
আমিও চেঁচিয়ে বলি, ইউ শাট আপ। হু ইজ ইশতিয়াক আহমেদ? কে তোমার ইশতিয়াক আহমেদ?
তাথৈ বলে, যদি চুপ না করি, যদি না বলি, তাহলে কী করবে? তুমি কি করবে? তোমার দৌড় আমার জানা আছে।
আমি আবারও চেঁচাই, ইউ শাট আপ!
সে রাতে আমাদের কারোই খাওয়া হয়নি। তাথৈ বলল, তোমার মতো অমানুষের সঙ্গে এক বিছানায় শুতে আমার বয়েই গেছে। তোমার জন্য উপযুক্ত এমন একজন চন্দ্র কি সূর্যবানু খুঁজে নাও।
আমি বলি, দরকার হলে তাই নেব। তোমার সাজেশনের প্রয়োজন নেই। তোমাকে আমার চেনা হয়ে গেছে।
এই এগার মাসেই? তাথৈ জিজ্ঞেস করে।
হ্যা, যথেষ্ট হয়েছে।
আমার বাবা তিন এগার ৩৩ বছরেও আমার মাকে চিনতে পারেনি। আর তুমি ১১ মাসেই। তাথৈ ফ্রিজ থেকে এক বোতল ঠাণ্ডা পানি বের করে ঢোক ঢোক করে, প্রায় অর্ধেকটা শেষ করে বোতলটা নিয়ে পাশের রুমে ঢুকে সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিল। আমি ছিটকিনি লাগানোর শব্দ শুনলাম।
আমি যথারীতি বেডরুমে। সকালের ঝগড়াটা এড়াতে বেডরুমের দরজাটা খুলে রাখি। তাথৈর টুথব্রাশ আরও কী সব এই রুমের সংলগ্ন বাথরুমে।
ভেবেছিলাম ঘুম হবে না, কিন্তু টিভির রিমোট কন্ট্রোলের বাটন টিপতে টিপতে এক সময় জিনিসটা হাত থেকে পড়ে গেল, আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম। টিভির সুইচ অফ করা হয়নি, সারারাতই চলেছে। আমাদের বিয়েতে উপহার পাওয়া এলইডি টেলিভিশন। অথৈ দিয়েছে, তাথৈর বড়বোন অথৈ। আমার পুরনো রঙিন টিভিটা পাশের ঘরে, এখনও বেশ চলে। সমস্যা সামান্যই। রিমোট কন্ট্রোলের ব্যাটারির শক্তি কমে এসেছে, পাল্টাতে হবে। ভোরের দিকে সম্ভবত অভুক্ত থাকার কারণে ঘুম ভেঙে যায়। আমি নিঃশব্দে উঠে পড়ি, ফ্রিজ খুলি। এক পেয়ালা ঠাণ্ডা পায়েস খেয়ে আবার বিছানায় ফিরি আমি এবং দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ি।
সাড়ে সাত কি আটটার দিকে ঘুম ভাঙে। দরজার বাইরে নিশ্চয়ই পড়ে আছে আজকের খবরের কাগজ। ঠিক শিয়রের কাছে ভাঁজ করা একটি কাগজ। বিয়ের পর এটাই আমাকে লিখা তাথৈর প্রথম চিঠি। তারপর প্রতিদিন একটি চিঠি। জবাব দিতে হয় আমাকেও। গত ১১ মাস এতটাই কাছাকাছি ছিলাম যে কারোই চিঠিপত্র লেখার প্রয়োজন হয়নি। আমরা এখন দূরে সরে যাচ্ছি। দূরের মানুষকে যে চিঠি লিখতে হয়।
তাথৈর প্রথম চিঠি
শোনো, আমি অনেক সহ্য করেছি। আর পারব না। তোমার মতো অমানুষের সঙ্গে আর সংসার করা সম্ভব নয়। তুমি সবদিক দিয়ে আবদুল টাইপের মানুষ। আমার বোন ও বান্ধবীরা আমাকে সতর্ক করেছিল, আমি গায়ে মাখিনি, এখন মনে হয় ভুল করেছি। তবুও ভালো, বিয়ের ১১ মাস পরে ভুলটা বুঝতে পেরেছি। ১১ বছর পর হলে কী করতাম, জানি না। আমি চাই, সাতদিনের মধ্যে তোমার সঙ্গে ডিভোর্সের সব ফর্মালিটিজ শেষ হোক।
তোমার সঙ্গে আর কথা বলতে চাই না। মুখেও না ফোনেও না। তুমি যদি কোনো ডিভোর্স লইয়ারের সঙ্গে কথা বলতে চাও, বলতে পার। দু’একদিনের মধ্যে সব হিসাব-নিকাশ করে ফেলবে। এটা-ওটার অজুহাতে ডিভোর্স যেন পিছিয়ে না যায়। তোমাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিনা।
ইতি তাথৈ।
আমার প্রথম চিঠি
তাথৈ, তোমাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার নেই। তুমি কাজটা অনেক সহজ করে দিলে। ভুলটা আমারই। চন্দ্র কিংবা সূর্যবানু টাইপের কোনো মেয়েকে বিয়ে না করে তোমার দিকে হাত বাড়িয়েছি। ঠিক করিনি। অবশ্য তোমার আমার বিয়েতে আমার ভূমিকা ছিল সামান্যই। তুমিই আমাকে টেনে-হিঁচড়ে মগবাজার কাজী অফিসে নিয়ে এসেছে, এমনকি কাজী অফিসের কর্মচারীদের একশ’ টাকা করে টিপস তুমিই দিয়েছ। বিয়ের পর দুইজন সাক্ষী ও কয়েকজন শুভানুধ্যায়ীকে নিয়ে আমরা যখন চাইনিজ খাবার খাচ্ছি, তোমার বান্ধবী নেহরিন শুনিয়ে দিল, তাথৈ বিয়ে না করলে এমন একজন আবদুল খালেককে ঢাকা শহরের আর কোনো মেয়ে পাত্তাই দিত না। হয়তো ঠিকই বলেছে। কিন্তু আমাকে পাঠানো নেহরিনের দুটি প্রেমপত্র তোমাকে দেখিয়ে বিব্রত করতে চাইনি। এখনও চাই না। ১১ মাসে আমার এগার বছরের শিক্ষা হয়েছে।
সাতদিন কেন লাগবে? আমি তার আগেই সব চূড়ান্ত করে ফেলতে চাই। সাতদিন পর আমি তালাকটা সেলিব্রেট করতে চাই। মুক্তির আনন্দে সেলিব্রেশন। তোমার কাছ থেকে মুক্তি।
ভালো থেকো।
ইতি আবদুল খালেক
(পাশের রুমের বন্ধ দরজার তলা দিয়ে চিঠিটি ঠেলে দিয়েছিলাম। তাথৈ যে চিঠি পেয়েছে এবং পড়েছে দ্বিতীয় চিঠিই তার প্রমাণ।)
তাথৈর দ্বিতীয় চিঠি
বেশ, তোমাকে মুক্তি দিচ্ছি। আর আগে জানতে চাই, নেহরিন কবে তোমাকে চিঠি দিল। আমাদের বিয়ের আগে না পরে? আগে হোক পরে হোক চিঠি দুটো হবে কেন? তুমি নিশ্চয়ই প্রথমটার জবাব দিয়েছিলে? কাগজে-কলমে না হলেও অন্তত ইশারায় ওকে আস্কারা দিয়েছ। তুমি কি ভুলে গিয়েছিলে তোমার ঘরে বিয়ে করা বউ আছে? আমি ওই হারামজাদিকে দেখে নেব। তোমার আমার ডিভোর্সের আগেই ওকে জনমের শিক্ষা দেব।
টিপস আমিই দিয়েছি, কারণ আমি তোমার মতো ছোটলোক নই। বিয়ের মতো এমন একটা আনন্দের ঘটনায় আমি হাত গুটিয়ে রাখার মতো মেয়ে নই। অবশ্য তখন বুঝিনি জন্মের পরিণতি যেমন মৃত্যু, বিয়ের পরিণতি ডিভোর্স।
ডিভোর্স লইয়ারের সঙ্গে কথা বলেছে? না বলে থাকলে দরকার নেই। দেনাপাওনা নিয়ে আমি কোনো ঝামেলা করব না। তোমার হাত থেকে তো মুক্তি পাব!
ইতি তাথৈ
(দ্বিতীয় চিঠিটিও বিছানার ওপরই ছিল, ঘুম ভাঙার পর চোখে পড়ে। আমার দ্বিতীয় চিঠিটিও একইভাবে দরজার তলা দিয়ে ঠেলে দিয়েছি। পাছে নেহরিন অপদস্ত হয় এই আশঙ্কায় দ্বিতীয় চিঠিতে একটা মিথ্যে কথা লিখতেই হয়।)
আমার দ্বিতীয় চিঠি
তাথৈ,
উকিলের সঙ্গে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই। আইনকানুন আমার ভালো জানা আছে। টিপস নিয়ে তুমি আমাকে ছোটলোক বললে? এবার দেখবে তালাকটা হয়ে গেলে পিয়ন-চাপরাশিদের প্রত্যেককে পাঁচশ টাকা করে টিপস দেব। তুমি বিয়ে করে যত খুশি হয়েছে, ডিভোর্সে আমি তার পাঁচগুণ আনন্দ পাব, মনে রেখ।
আর একটা কথা- নেহরিনের ব্যাপারটা তোমাকে চটাবার জন্য বলেছি; চটাতে পেরেছি। তবে চিঠি সত্যিই পেয়েছি, অন্য কেউ লিখেছে। দেখতে সে নেহরিনের চেয়েও ভালো, তোমার চেয়েও। সেও তোমার অচেনা নয়।
আর একটা কথা, তোমার ক্লাস তো নটায়। এত সকাল সকাল বের হচ্ছ কেন? রাস্তাঘাটে কত ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। আমার টেনশন হয়।
অবশ্য তালাকের দিন যতই এগিয়ে আসছে, আমি ততই স্বস্তি পাচ্ছি।
ভালো থেকো।
ইতি আবদুল খালেক
তাথৈর তৃতীয় চিঠি
শোনো, আমার জন্য তোমার টেনশন হয়- এমন একটা ডাহা মিথ্যে কথা তুমি কেমন করে বললে? তুমি চাও খুব সকাল বেলা একটা দশটনি ট্রাক আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দ্রুত পালিয়ে যাক। তুমি তো কোনো না কোনোভাবে আমার হাত থেকে মুক্তি নিয়ে ওই বেশ্যাটাকে তোমার পাশে শোয়াতে চাচ্ছ। আমি নেহরিনের কথা বলছি না তুমি যার কথা ভাবছ আমি তার কথাই বলছি। তুমি ভেবেছ ডিভোর্সটা হয়ে গেলে আমি তোমার চেয়ে কম খুশি হব? তোমার ডাবল খুশি হব। পিয়ন-চাপরাশিদের এক হাজার টাকার একটা করে চকচকে নোট দেব। আমি দশ হাজার টাকা আলাদা করে রেখেছি।
আর একটা কথা শোনো, কাল সারারাত তোমার ঘরে লাইট জ্বলেছে। সারারাত কী করেছ? রাতজেগে অসুখবিসুখ বাধিয়ে আমাদের ডিভোর্সটা পিছিয়ে দিয়ো না যেন।
তুমিও ভালো থেকো।
ইতি তাথৈ
আমার তৃতীয় চিঠি
তাথৈ,
তোমার সঙ্গে ডিভোর্স হোক এটা চাই সত্যিই, কিন্তু তোমার মৃত্যু চাই না। মরে গেলে তো সব শেষ হয়েই গেল। আমি চাই তুমি বেঁচে থেকে শুনে যাও কে আমার পাশে তোমার জায়গাটিতে ঘুমায়। এটাই হবে তোমার বড় শাস্তি।
সারারাত লাইট জ্বেলে কী করেছি? তালিকা করেছি- ঘরের কোন জিনিসটা তোমার টাকায় কেনা, কোনটা আমার টাকায়। তোমারগুলো তুমি তো নেবেই, আমারগুলোও নিতে পার। ফ্রিজটা অবশ্য দুজনের টাকায় কেনা। ঠিক আছে, এটাও তোমার।
তুমি কি রাতে ঘুমোও না? নাকি আমার রুমের পাশে ঘুরঘুর করে গোয়েন্দাগিরি কর?
তোমার-আমার একটা জয়েন্ট ব্যাঙ্ক একাউন্ট আছে। ডিভোর্সের পর এটার কি হবে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়ো। তোমার-আমার একটা যুগল পেইন্টিং আছে। আমার ছবিটা আমি রাখতে চাই, তোমারটা ক্যানভাসের মাঝ বরাবর কেটে দিয়ে দিতে পারি। তাতে আমারটার খানিকটা নষ্ট হয়ে যাবে, তোমারটাও। আমার সঙ্গে তোমার ছবি ভবিষ্যতে আমার সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করুক, এটা আমি চাই না।
দিনকাল খারাপ। সাবধানে চলাফেরা কর।
ইতি আবদুল খালেক
তাথৈর চতুর্থ চিঠি
আচ্ছা, তুমি নিজেকে কী ভাব? তোমার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর তুমি জুলিয়া রবার্টসকে নিয়ে ঘুমোলে না সান্দ্রা বুলককে নিয়ে- তাতে আমার কিছুই এসে যায় না। তোমার মতো আবদুল খালেকের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো বুয়ারও রাজি হবার কথা নয়।
কোনো প্রোট্রেটটা কাটাছেঁড়া করতে যেয়ো না। বরং ওটা আমি নিয়ে যাব। আমি চাই না আমার ছবিটা নষ্ট হোক।
আশ্চর্য! আজও দেখলাম তুমি বেডরুমের দরজা খোলা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছ। কারণটা শুনতে পারি? তুমি ভেবেছ তাথৈ বেহায়ার মতো ঢুকে তোমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলবে, আই অ্যাম সো সরি। আই লাভ ইউ।
আমার বয়েই গেছে। দরজা ভালো করে বন্ধ করে ঘুমিয়ো। তোমার বেডরুমে যাবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। আমার টুথপেস্ট ব্রাশ, স্যানিটারি ন্যাপকিন, বডি স্প্রে, পারফিউম সবই এই রুমে নিয়ে এসেছি। তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পার। আমি আপাতত মার সঙ্গে থাকব। কাল আমার রুমটা ঠিকঠাক করা হবে, বাথরুমটাও। তুমি তো আমাদের বিয়ের প্রথম দিকে কয়েকরাত ওখানেই ছিলে। রুমটা বেশ বড় তাই না?
ওই ছবিটা দেয়ালে টাঙিয়ে দেব। ফ্রিজটা দিতে পার, আমার রুমেই রাখব। তোমার প্রমোশনের কি হল? তোমাদের এমডি নাকি চাকরি হারাচ্ছেন?
রাতে মশারি টাঙাচ্ছো তো? এডিস মশা কিন্তু ড্যাঞ্জারাস। একবার হেমোরেজিক ডেঙ্গু হলে তোমাকে বাঁচানো যাবে না কিন্তু।
ভালো থেকো।
ইতি তাথৈ
আমার চতুর্থ চিঠি
তাথৈ,
তুমিই বা তোমার রুমের দরজায় ছিটকিনি লাগাও কেন? তোমার ধারণা দরজা খোলা রাখলে আমি বেহায়ার মতো ঢুকে পড়ে তোমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরব? অসম্ভব! সেদিন চলে গেছে। আবদুল খালেকের চোখ খুলেছে।
থাক আজ আর লিখতে চাচ্ছি না। একটু মাথা ধরেছে, সামান্য টেম্পারেচারও আছে।
ভালোয় ভালোয় ডিভোর্সটা হয়ে থাক।
তুমি ভালো থেকো।
ইতি আবদুল খালেক
(আমাদের রান্নাঘরে চুলো জ্বলে না। আমরা কেউ কারও সঙ্গে কথা বলি না। আমিও হোটেলে খাই, ফেরার সময় এটা ওটা কিনে আনি, ফ্রিজে রাখি। আমাদের দু’সেট চাবি। সমস্যা হয় না। আমাদের তালাক আসন্ন। তাথৈ আমার সঙ্গে আর থাকবে না। না থাকুক।)
তাথৈর পঞ্চম চিঠি
শোনো খালেক
আমার রুমের দরজার ছিটকিনি লাগাব কি না সেটা আমার ব্যাপার। তুমি জিজ্ঞেস করার কে?
সত্যি করে বল জ্বর বেশি না কম? মাথাব্যথা খুব বেশি? আমি তো এটাই সন্দেহ করেছিলাম। একটা না একটা অসুখ বাধিয়ে ডিভোর্সের বারোটা বাজাবে। তুমি মরো। তুমি মরলেই আমার শান্তি। আমি তোমার সঙ্গে একদিনও থাকতে চাই না।
ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুটা বরং নিরাপদ। কিন্তু তোমারটা যদি হেমোরেজিক ডেঙ্গু হয় তাহলে দ্রুত তোমার রক্তের প্ল্যাটিলেট ভাঙতে থাকবে। তারপর ব্যাপারটা কী ভয়ঙ্কর তোমার কোনো ধারণা আছে? আমি তোমার লাশ নিয়ে কোথায় যাব? তুমি যে কী! কেন আমাকে এত কষ্ট দাও? অসহ্য। আমি আর পারব না। তোমার যা হবার হোক। আমি কেন ভাবতে যাব?
ভালো থেকো।
ইতি তাথৈ
আমার পঞ্চম চিঠি
তাথৈ,
আমার লাশ নিয়ে তোমার বিপাকে পড়ার সম্ভাবনা আর নেই। প্রথমত আমার মাথাব্যথা ও জ্বর প্রায় সেরে গেছে। আর একটা দিন পার হলে পুরোপুরি সেরে যাবে। ডেঙ্গু বাধাবার সেই ঘাতক মশাটা আমাকে চিনতে পারেনি। এটা ঠিক আমি মশারি টাঙাইনি, একদিনও। আমি সবসময়ই ধরে নিয়েছি এটা স্ত্রীর কাজ। স্বামীরও কিছু কাজ আছে- যেমন বাল্ব বদলান।
দ্বিতীয়ত পরশুদিনই আমাদের ব্যাপারটা ঘটবে। সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে। অ্যাডভোকেট গোলাম রহমান আমার পক্ষে আর অ্যাডভোকেট মিথিলা পারভিন তোমার পক্ষে বলবেন। আজই কিছু ফি-ও অ্যাডভান্স দেয়া হয়েছে। আজকের পর মাঝখানে আর মাত্র একটি দিন।
আমরা দুজন একসঙ্গে যাব না আলাদা যাব তুমিই ঠিক কর। আমি মনে করি আলাদা যাওয়াই ভালো। একসঙ্গে গেলে হঠাৎ এটা-ওটা নিয়ে কথাবার্তা হয়ে যেতে পারে। তাতে আমার সঙ্গে কথা না বলার তোমার যে ব্রত তা ভেঙে যাবে।
বিয়ের আগে আমাকে লেখা তোমার ২২টা চিঠি আর বইচাপা দেয়া ১৩টা শুকনো গোলাপ কালরাতে খুঁজে পেয়েছি। নিরপেক্ষ বিচারকের মতো তোমার প্রথম তিনটি চিঠি আবার পড়বে, তা হলে বুঝতে পারবে চিঠিগুলোর সাহিত্যমূল্যও আছে। এগুলো তুমি ফিরিয়ে নিলে ভালো হতো। নিজের হাতে এগুলো নষ্ট করতেও ইচ্ছা করছে না। আবার যে তোমার স্থলাভিষিক্ত হবে সে যে খুশিমনে এগুলোকে গ্রহণ করবে তাও নয়।
ভালো থেকো।
ইতি আবদুল খালেক
(আমাদের চুলোতে আগুন না জ্বলার খবরটি কোনোভাবে তাথৈর বড়বোন অথৈর কাছে পৌঁছেছে। আমি জ্বরের দোহাই দিয়ে অফিসে যাইনি। তাথৈর চারটার আগে ফেরার কথা নয়। কিন্তু কেন দেড়টায় ফিরল সেই ভালো জানে। ফিরে দেখল প্রচুর খাবার নিয়ে আসা অথৈ টেবিলে খাবার সাজিয়েছে আর আমি হাভাতের মতো সে খাবারের দিকে তাকিয়ে আছি। বোনকে দেখে তাথৈ চেঁচিয়ে বলল, তোকে খাবার নিয়ে আসতে কে বলেছে? আমি তোর সব খাবার ফেলে দেব।
অথৈও মুখের ওপর বলল, তোর জন্য খাবার কে বলেছে? আমি যার জন্য এনেছি সে খাবে।
তাথৈ বলল, এত দরদ! বেশ, তুই থাক। আমি চললাম। তাথৈ সত্যিই গটগট করে বেরিয়ে গেল। চেঁচিয়ে বলল, তুই একটা বেশ্যা।
অথৈ বলল, আমি তোমাদের সমস্যাটাকে আরও জটিল করে ফেললাম না তো?
না আপু, পরশু আমরা ডিভোর্স করছি। সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে। তাথৈ ডিভোর্স চাইছে, আমিও।
অথৈ অবাক হয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। জিজ্ঞেস করল, তারপর? মানে তারপর একা থাকবে?
আমি বললাম, তাথৈ আর আমার ওয়েভলেঙ্গথ ভিন্ন। একই ওয়েভলেঙ্গথের কেউ রাজি হলে তখন দেখা যাবে।
অথৈ আমার প্লেটে খাবার দেয়, সবচেয়ে বড় রোস্টটা আমার জন্য তুলে আনে। অনেকদিন কেউ আমাকে এভাবে খাওয়ায়নি। রোস্টে কামড় বসিয়ে আমিও তার দিকে তাকিয়ে থাকি। জিজ্ঞেস করি, মহরম ভাইর ড্রিঙ্কিং হ্যাবিট কিছুটা হয়েছে? বাইপাস সার্জারি পর তো অনেক রেসস্ট্রিকশন থাকার কথা।
অথৈ বলল, এখন আরও বেড়েছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে রাশনা মুকতাদির। ওদের প্রবেশনারি অফিসার। দু’জন এক সঙ্গে ম্যাকাও থেকে ঘুরে এসেছে। জায়গাটা কোথায় তুমি জানো?
চীনের কাছাকাছি কোথাও, নাম শুনেছি।
অথৈ বলল, ওয়েভলেঙ্গথ একই কিন্তু দুই বাচ্চার মা হলে তোমার কোনো সমস্যা আছে? অবশ্য মহরম বাচ্চাদের ব্যাপারে খুব সেয়ানা, বাচ্চা হাতছাড়া করবে না।
আমি শুধু বললাম, আপু, মহরম ভাইর রাশনা ঘোর কেটে যাবে।
অথৈ বলল, তুমিও এড়িয়ে যেতে চাচ্ছো!
তাথৈর ষষ্ঠ চিঠি
শোনো খালেক, আজ আমার কাছে স্পষ্ট হল তোমার সেই মানসী হচ্ছে অথৈ আপু। যেভাবে মোটা হচ্ছে অথৈর ওজন একশ কেজি হতে বেশি বাকি নেই। দুই বাচ্চাসহ অথৈকে পালতে পারবে তো? বাচ্চা দুটোই পেছনে হাতির খরচ। অবশ্য অথৈকে তো তুমি আর আমার চেয়ে বেশি চেন না। ও প্রেম করেছে কবি টাইপের ঝোলাওয়ালা নাদিম ভাইর সঙ্গে। তারপর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। বাবা যখন মহরম দুলাভাইর মতো মালদার পার্টি হাজির করে অথৈ খুশিতে গদগদ হয়ে কবুল বলে ফেলে। তুমি তাকে যতই ভালোবাস গাড়িবাড়ি, এয়ার কন্ডিশনড রুম আর দুহাতে ছড়ানোর মতো টাকার উৎস ফেল অথৈ তোমার কাছে আসবে না, লিখে রাখতে পার। মালদার পার্টি কি আমার জন্য ছিল না? আমি তোমার সঙ্গে প্রেম করেছি, তোমাকেই বিয়ে করেছি। অবশ্য এটাও ঠিক, তুমি নাদিম ভাইর মতো ঝোলাওয়ালা হলে আমাকে পেতে না। আমি কবি টাইপের ছেলেদের দুচোখে দেখতে পারি না। তার চেয়ে আবদুল টাইপের ছেলেরা অনেক ভালো। কিন্তু তুমি আবদুল খালেক যে বিয়ের ১১ মাসেই এতটা স্মার্ট হয়ে উঠবে ভাবিনি- তুমি আমার হাত থেকে মুক্তি চাইছো!
যাকগে, একটা ভালো খবর দিচ্ছি। আমার কমনওয়েলথ স্কলারশিপ হয়ে গেছে, ম্যানচেস্টারে। ডেভিড হিউম আমার সুপারভাইজার হবেন। আজই কনফার্মেশন পেয়েছি। সেপ্টেম্বরের লাস্ট উইকে ফ্লাইট। কালপরশু টিকিট পেয়ে যাব। মানে বড়জোর আর এক মাস। আমার জন্য ভেব না। আমি সব ম্যানেজ করতে পারব। পিএইচডি হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গেই অ্যাসিন্ট্যান্ট প্রফেসর করে দেবে।
সব শিডিউল ঠিক আছে তো? ডিভোর্সের দিন আমি তোমার সঙ্গে যাব না, আলাদাই যাব। কিন্তু আমাকে এখানে যেন দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে না হয়, খেয়াল রেখো।
তুমিও ভালো থেকো
ইতি তাথৈ
আমার ষষ্ঠ চিঠি
প্রিয় তাথৈ,
তোমাকে অভিনন্দন। আর ক’বছর পরই তুমি ডক্টর তাথৈ। আমার আর পড়াশোনা হবে না। ব্যাংকিং ডিপ্লোমাটাই পাস করতে পারলাম না। আমারও একটা খবর আছে। একটা অফশোর ব্যাংকে ইন্টারভিউর জন্য শর্টলিস্টেড হয়েছি। লন্ডন অফিস থেকে ফোনে জানিয়েছে। কনফার্মেশন মেইল কাল পাব।
সব শিডিউল ঠিক আছে। তোমার আলাদা যাওয়াটাই ভালো দেখাবে। আমি আগেই পৌঁছব। আমার বিরুদ্ধে তোমার অভিযোগগুলো ঢাকঢোল পিটিয়ে বল না। আমিও বলব না। তালাকটা দুজন যখন মেনেই নিয়েছি, যত শান্তিপূর্ণভাবে হয় ততই মঙ্গল। আমার মাথাব্যথা ও জ্বর সেরে গেছে। ম্যানচেস্টারের এখন শীত পড়বে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিও হতে পারে। ঠাণ্ডা লাগিয়ো না, শরীরের যত্ন নিয়ো।
ভালো থেকো।
ইতি আবদুল খালেক
লিফট অকেজো থাকায় ঠিক আগের রাতে দশটার দিকে তাথৈ দু’হাত ভর্তি খাবারের প্যাকেট নিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে পাঁচতলায় আমাদের ফ্ল্যাটের খুব কাছাকাছি এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়। তার চিৎকার আমার কানে পৌঁছেনি। পাশের ফ্লাটের মিসেস রব্বানী তাকে তুলে এনে কলিংবেল টিপেন, আমাকে ধমকের স্বরে বলেন, নিজে আরামে শুয়ে আছেন আর বউটাকে দিয়ে বোঝা টানাচ্ছেন- দেখুন হাত-পা ভাঙলো কি না।
এতদিনের নীরবতা আমিই ভাঙি। জিজ্ঞেস করি, এতসব খাবারের বোঝা কেন এনেছ?
তাথৈ মাথা নিচু করে বলল, ভাবলাম ডিভোর্সের আগে তোমাকে নিয়ে শেষ খাবারটা একসঙ্গে খাই। দ্য লাস্ট সাপার।
তাথৈ পা টেনে টেনে ফ্রিজের দিকে এগোলো। বরফ লাগবে। না পেলে অন্তত ঠাণ্ডা পানি। দরজা টেনে তাথৈ চেঁচিয়ে উঠল, ফ্রিজে এত খাবার জমিয়েছ কেন?
আমিও মাথা নিচু করে বললাম, প্রত্যেকদিনই তো তোমার জন্য খাবার এনেছি, ভেবেছি যদি খাও। কিন্তু তুমি তো ফ্রিজও খোলোনি। আজকের খাবারটা ডাইনিং টেবিলে আছে।
তাথৈ বলল, তুমি খুব অপচয় কর। খাবার এনে রেখেছ তা বলবে তো?
কেমন করে বলি, তোমার সঙ্গে না কথা বন্ধ।
তাথৈ বলল, চিঠি তো বন্ধ ছিল না।
ফ্রিজে আধ বোতল ঠাণ্ডা পানিও ছিল না। বোতলসহ তাথৈর ডান পায়ের গোঁড়ালিও চেপে ধরি। তাথৈ চিৎকার করে ওঠে, আস্তে লাগাও, ব্যথা পাচ্ছি। মনে হয় ফ্র্যাকচার আছে।
আইস কিউব বানাবার পাত্রে পানি ঢেলে ডিপফ্রিজে ঢুকিয়ে দিই। আমার শরীরে ভর দিয়ে তাথৈ তার রুমে ফিরে আসে। বলে, পায়ে নিচে বালিশ দিয়ে আমাকে শুইয়ে দাও। আর খাবারটা গরম থাকতে থাকতে আমাকে খাইয়ে দাও, তুমিও খাও।
ফ্রায়েড রাইস, বিফ চিলি, প্রন বল আরও কী সব এক প্লেটে নিয়ে তাথৈর সামনে রাখি। তাথৈ বলে, তোমাকে এখানে রাখতে কে বলেছে, খাইয়ে দাও। পা’টা রাতারাতি না সারলে কাল যাব কেমন করে?
বললাম, এমন কিছু হয়নি। তোমার জন্য একটা গাড়ি ম্যানেজ করতে পারব। চিন্তা কর না। ডিভোর্সের এমন সুযোগ হাতছাড়া করা আমাদের কারও জন্যই লাভজনক হবে না।
তাথৈর মুখে খাবার দিতে গিয়ে টের পাই ও ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি নিঃশব্দে মশারি ছেড়ে তোষকে নিচের দিকটা গুঁজে দিই। এডিস মশার বিশ্বাস নেই। তাথৈর ঘরের আলো নিভিয়ে আমি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি সস্তা আবেগের ঊর্ধ্বে
থেকে মনে-প্রাণে চাইছি কাল আমাদের ডিভোর্সটা হয়ে যাক। তাথৈ কি তাহলে সিদ্ধান্ত থেকে সরে গেছে? সিঁড়িতে হুমড়ি খেয়ে পড়া, পায়ের গোঁড়ালিতে ফ্র্যাকচার কিংবা অন্যকিছু সবই কি সাজানো নাটক? হতভম্ব মানুষের মতো কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম মনে নেই। তাথৈর ককানোর শব্দে সম্বিত ফেরে। তাথৈ কাঁদতে থাকে। আমি আলো জ্বালি।
তাথৈ বলে, ব্যথা। প্রচণ্ড ব্যথা।
আমি মশারি তুলি। বালিশের ওপর গোড়ালির দিকে বেশ ফুলে উঠেছে। স্পর্শ করে দেখি জায়গাটা বেশ গরম। আমি দ্রুত ডিপফ্রিজ থেকে জমাটবাঁধা আইসকিউব নিয়ে আসি। আমি তাথৈর পায়ে বরফ চৌকো ঘষতে থাকি। কিছুক্ষণ পর তাথৈ বলে, এখন আরাম লাগছে।
আমি নতুন আরেক টুকরা বরফ হাতে নিই। তাথৈর পা-টা আমার কোলে নিয়ে আবার ঘষতে থাকি। পা শীতল হয়ে আসে, আমার হাতও ঠাণ্ডায় অসার হয়ে পড়ছে।
তাথৈ উঠে বসে। আমি চোখ তুলে দেখি তার অশ্রু টলটল চোখ। এক ফোঁটা দু’ফোঁটা করে কান্না ঝরতে শুরু করে। তাথৈ আমার দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দেয়। আমার এক হাতে তখনও আধেক গলা আইস কিউব।
(দুই)
পরের দৃশ্যগুলো আমাদের দুজনকে বদলে দিতে থাকে। বরফ যুগের একজোড়া শীতার্ত নরনারী পরস্পরের কাছ থেকে উষ্ণতা শুষে নিতে থাকে। সমুদ্রের তলদেশ থেকে উঠে আসা দুই একটি শব্দ আমাকে আকুল করে তোলে। প্লিজ আবদুল খালেক, আহ! আবদুল খালেক, শোনো না।
অনেকদিন পর তাথৈর শীৎকার আর তার হাঁপানোর শব্দ একাকার হয়ে যায়।
বহুদিন পর আমাদের প্রচণ্ড আবেগময় ব্যাপারটা ঘটে যাওয়ার পর দুটি রহস্যময় চোখ মেলে তাথৈ বলল, কাল আমাদের না গেলে হয় না? পরে যাব অন্য কোনোদিন।
আমি জিজ্ঞেস করি, কবে?
তাথৈ বলল, আমার তো এখন ডেঞ্জার পিরিয়ড চলছে। যদি বাবুটা লেগেই যায়!
বাবুটা?
হ্যাঁ, আমাদের একটা বাবু হবে না? বাবুটা একটু বড় হোক, তারপর যাব, তোমার সঙ্গেই যাব। বাবুটার নাম কি রাখব জান? নাম রাখব ইশতিয়াক আহমেদ।
তার মানে?
কোনো মানে নেই। আমাদের ডিভোর্সটা কী অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে গেল? তাথৈ বলল, আর শোনো আবদুল খালেক, এখন থেকে আমরা এই সিঙ্গেল খাটেই ঘুমোব।
আমি আবার বলি, তার মানে?
তাথৈ বলল, বাবু হওয়ার আগে ডাবল খাট না হলেও চলবে।
আমাদের কথা না বলা ৭ম দিন মধ্যরাতে তাথৈর ভেতরের বাবু তৈরির কারখানাটি সচল হয়ে উঠেছে। ততক্ষণে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তার ম্যানচেস্টার যাত্রা।
তাথৈ বলে, অনিশ্চিত হবে কেন? তুমিও আমার সঙ্গে ম্যানচেস্টার যাবে। স্কলারশিপের টাকায় তোমার খরচও চলে যাবে। আমাদের বাবুটাকে বড় করতে হবে না। আবদুল খালেক আমাদের বাবুটার জন্য তোমার চেয়ে ভালো বেবিসিটার কোথায় পাব?
সপ্তম রাতে আমাদের চিঠি লেখালেখি অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।

ঈদ উৎসবের চরিত্র সেকালে একালে by আহমদ রফিক

সন্দেহ নেই ঈদ মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়েও সেই সঙ্গে সামাজিক অনুষ্ঠান, উৎসবের চরিত্র নিয়ে। এ উৎসব সর্বজনীন। দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ থেকে মহাবিত্তবান নাগরিক একই রকম প্রেরণায় ঈদ উৎসব পালন করে থাকে। যদিও ‘পালনের’ মহিমায় দুইয়ের মধ্যে অনেক ফারাক। শুধু অর্থের হিসাবে নয়, মানসিকতার দিক থেকেও ভিন্নতা তাৎপর্যপূর্ণ।
ঈদে বিত্তবানদের কেনাকাটায় ও আচরণে এক ধরনের আর্থ-সামাজিক অহংকারবোধ প্রচ্ছন্ন থাকে, অভিজাত গৃহিণীদের ক্ষেত্রে তা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতার চরিত্র অর্জন করে। পোশাক ও গয়নাগাটির অভিজাত বিপণি বিতানের ভিড়ে তার প্রমাণ মেলে। নিুমধ্য বা নিুবিত্ত শ্রেণী থেকে নিুবর্গীয়দের মধ্যে ঈদ-উৎসবের আন্তরিকতাই বড় হয়ে থাকে। ধর্মীয় ও সামাজিক এ দুইদিক থেকেই। বড়দের জন্য ঈদের প্রথাসিদ্ধ আনুষ্ঠানিক (ধর্মীয় ও সামাজিক) দিকটিই প্রধান। ছোটদের জন্য ঈদের একটাই চরিত্র- তা হল উৎসব-আনন্দ।
দুই
ঈদের অনুষ্ঠান, উৎসব বা আনন্দ যেদিকটাতে হোক এর সেকাল একালের চিত্র চরিত্র ধর্মে এক হয়েও ভিন্ন। আজ যাদের বয়স ৭০-৮০ বা ততোধিক তারা সেকাল-একালের প্রভেদ বুঝতে পারবেন। পারবেন গ্রাম বনাম নগর বা রাজধানীর তুলনামূলক বিচারে। সেকালের শহর বা গ্রামে ঈদের ধর্মীয় সংস্কৃতি ও উৎসব-আনন্দের সামাজিক চরিত্রটিই ছিল প্রধান।
তাতে অবশ্যই নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ কেনা অপরিহার্য হলেও ছিল বইপত্র উপহার, সেই সঙ্গে নানা পদের সুখাদ্যের আহার্য-বিলাস। সকাল থেকে সব পরিবারে রান্নার ব্যস্ততায় ছড়িয়ে পড়া সুগন্ধ। রোজার ঈদে তাতে বিশেষ মাত্রা। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে ব্যক্তিক প্রীতিসম্ভাসনে ও মেলবন্ধনে দেখা গেছে আন্তরিকতা। তাতে সামাজিক চরিত্রের সামূহিক প্রকাশ।
ভোরে স্নান সমাপন। নতুন পোশাক, সেমাই-পায়েসের মিষ্টি সুস্বাদু, স্থানীয় মসজিদে নামাজ আদায়, আলিঙ্গন, দুপুরের সুস্বাদু আহার। বিকালে বাড়িতে প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের আমন্ত্রিত বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, গল্পগুজব, পরে আহার। এটা রোজার ঈদেরই বিশেষত্ব। ছোটদের, তরুণদের এবাড়ি-সেবাড়িতে আনন্দিত সময় যাপন, বই পড়া- এমন একটা দিনের ছবি তৈরি করে ঈদ পর্বের অভিজ্ঞতা শেষ। ছবিটা গ্রামের সেকালের। অন্তত ৬০-৭০ বছর আগেকার, গ্রামবাংলার তো বটেই। মফস্বল শহরে চিত্রটাও প্রায় একই রকম।
তিন
বাংলাদেশে একালের ঈদ নগর-বন্দরে, বিশেষত রাজধানী ঢাকায় যেন এক মহাযজ্ঞের আয়োজন। কোরবানির ঈদের কথা না-ই বলি। সেখানে বিত্ত ও সামাজিক মর্যাদা এবং আভিজাত্যের প্রতিযোগিতা প্রচ্ছন্ন হলেও বুঝে নিতে কষ্ট হয় না। কোরবানির ব্যয় ও পুণ্য অর্জনের প্রতিযোগিতা সেকালে বহুলদৃষ্ট ছিল না। একালে ঈদুল ফিতরও তার
ঐতিহ্য হারিয়েছে।
তাই সিয়াম সাধনার মাস, সংযম-আত্মশুদ্ধি ও কৃচ্ছ সাধনার মাস রমজান ব্যয়বহুল আহারের মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। অবশ্য বিত্তবান, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবর্গীয় শ্রেণীতে। এর চরম প্রকাশ ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটায়- বিশেষ করে পোশাক-পরিচ্ছদ ও অলংকারে। সেকালের ঈদ উৎসবের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষের পক্ষে ভাবা কঠিন যে লক্ষাধিক টাকা মূল্যের লেহেঙ্গাও কেনা যায় এবং কিনতে হয়। শুধু সোনায় মধ্যবয়সী গৃহিণী বা তরুণী গৃহিণীর এখন মন ভরে না। হিরার জৌলুসে আভিজাত্য না হোক অন্তত সামাজিক মর্যাদার প্রকাশ।
কমবয়সী তরুণীদেরও প্রবল ঝোঁক বিশেষ ব্র্যান্ডের পোশাকের প্রতি, মূল্য সেখানে কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। হতে পারে তা পণ্যবিশেষে লক্ষাধিক টাকার ব্যয়। এর পেছনে থাকে টি-ভি চ্যানেলগুলোর বাহারি বিজ্ঞাপন যা মন কাড়ে, আকাক্সক্ষার প্রসার ঘটায়। প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতার অথবা পছন্দের ঘোড়ায় সওয়ার হওয়া। এ ক্ষেত্রে তারুণ্যের জয়জয়কার।
চেইনশপ না হলেও ব্র্যান্ড শপজাতীয় পণ্য বিতান সাজসজ্জায় যেমন আকর্ষণীয় তেমনি অন্তত ঈদে কাগজে বা পর্দা-প্রচারে কার্পণ্য করে না। এদিক থেকে জুয়েলারি দোকানগুলো সবার সেরা। আর বিদেশী ব্র্যান্ড পণ্যের নামিদামি ‘শপ’গুলো। দরিদ্র বাংলাদেশ কত দ্রুত রাজধানী ও বন্দর নগরীতে ধনী, সমৃদ্ধ দেশের প্রতীক হয়ে উঠেছে তা বুঝতে পারা যায় ঈদ উৎসবের নির্বিচার কেনাকাটায়।
এ বিকিকিনির পেছনে রয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে অতিদ্রুত বিশাল একটা মহাবিত্তবান শ্রেণীর উদ্ভব। পোশাকই নয়, দামি গাড়ির নিত্য-নতুন ব্র্যান্ড বদল এক ধরনের শখ বা বলা যায় নেশা। একই জিনিস ব্যবহারে মলিন, কতদিন তা নিয়ে চলা যায়? সমাজ গ্রহণ করে না বিধায় ব্র্যান্ড বদলের মতো সবকিছু বদল সম্ভব হয় না। রসনায়-বাসনায় নতুনত্বের উপভোগ একালের তথা একুশ শতকের ঈদ উৎসবের বিশেষত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন বিত্তবান শ্রেণী তেমনি উচ্চমধ্যবিত্তের জন্য।
এতটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই মোটামুটি সচ্ছল বা একালের আটপৌরে মধ্যবিত্তের ঈদ। কেনাকাটার দৈর্ঘ্য পোশাকে মেলে না। তাই আটপৌরে মধ্যবিত্ত পেশাজীবীদের মহলে বহু প্রচলিত উক্তি- দু’মাসের আয় এক মাসে ব্যয়, বোনাস-বাড়তি আয় সবকিছুর মিলেও ঈদের মহাগ্রাসে শেষ। কারও কারও জমার হিসাবে টান পড়ে। মহার্ঘ মূল্যের টানে নীতিবোধ, মূল্যবোধ ভেসে যায়। বাংলাদেশের জন্য মস্ত বড় সুবিধা দুর্নীতিতে প্রতিযোগিতায় এক নম্বর হওয়ার কারণে।
কিন্তু সবাই তো আর সুবিধাভোগী শ্রেণীর সদস্য নন। কাজেই বাহারি পাঞ্জাবি, ফতুয়াদির জন্য বাড়তি আয়ের পথ ধরতে হয়-
ঈদ বলে কথা। নিুবিত্তের ঈদ নিয়ে আশা-আকাক্সক্ষা থাকবে না? শুনছি রাজধানীতে কড়া নিরাপত্তার কারণে, কোথাও কোথাও সিসি ক্যামেরার কল্যাণে আপাতত ছিনতাইয়ে ভাটা। কিন্তু হাইওয়েতে চাঁদাবাজির রমরমা ব্যবসা, পক্ষ-বিপক্ষ নির্বিচারে। নিরাপত্তা এ মুহূর্তে সর্বত্রবিস্তারি নয়। পবিত্র রমজান শেষে এমনটাই ঈদ সমাচার। নব্য প্রযুক্তিই বরং রাজধানীতে ঈদ নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে। অবশ্য সীমাবদ্ধভাবে।
পঞ্চাশের দশকের প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার কয়েক লাখ লোক সংখ্যা বেড়ে একুশ শতকে এখন শোনা যায় দেড় কোটির অধিক। আধুনিক চেতনার প্রসারে মানুষের চাহিদা বেড়ে যায় সংখ্যায় ও আকাক্সক্ষায়। ছোট বড় নানা পেশার জমজমাট তৎপরতা ঈদ উপলক্ষে। দর্জি দোকান থেকে রকমারি ব্যবসার দোকানদারি। হেন জিনিস নেই যা বেচাকেনা হচ্ছে না। ওই যে প্রাচীন প্রবাদ : ‘জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ’। সব কিছুই এখন পণ্য, ভোগবাদের কল্যাণে।
রাজধানীর বৈশিষ্ট্য হল, বাসিন্দাদের একটি অংশ ভাসমান জনসংখ্যা, দীর্ঘদিন থেকে এদের শিকড়-বাকড় গ্রামের মাটিতে, অথবা দূর শহরগঞ্জে। তাই ঈদ সন্ধ্যার বা ঈদ রাতের বেচা-বিক্রি শেষ করে এরা ছুটে যায় পিতৃ পিতামহের ভিটেবাড়িতে পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করবে বলে। ঢাকা মহানগরে পরিণত হওয়ার উপলক্ষে এই শ্রেণীর উদ্ভব। এদের মতোই ঢাকা ত্যাগী নিুমধ্যবিত্ত নানা পেশার মানুষ। তাদের মধ্যে চাকরিজীবীও রয়েছে।
ঈদ উৎসব এদের টেনে নিয়ে যায় রাজধানীর বাইরে নিজ নিজ স্বজন-অধ্যুষিত স্থানে। অনেক সময় পথ এদের নিয়ে যায় ফিরে না আসা লোকে। তাদের ঘরে তখন নিদ্রাহীন রাত জাগার পালা। তবু এদের যাওয়া বন্ধ হয় না। মহানগর ঢাকাকে দিন কয়েকের বিশ্রাম দিতে এসব নানা শ্রেণীর মানুষের রাজধানী ত্যাগ।
এরা একালের ঈদ উৎসবে গোটা দেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা প্রাণ বিবেচিত হলেও আসল কেন্দ্র মহানগর ঢাকা। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের নাভি কেন্দ্র ঢাকা-চট্টগ্রাম তথা নগর-বন্দর। স্বাধীন দেশে জাতীয় বুর্জোয়া নয়, কমপ্রেডর পুঁজিপতি- ধনিক-বণিক আমলা শ্রেণীর দ্রুত গড়ে ওঠা ভোগবাদী সমাজ তার ভালো-মন্দের বিস্তার ঘটাচ্ছে। গ্রামের সঙ্গে নগর-মহানগরের বিশাল ব্যবধান তৈরি করছে। গ্রাম উঠে আসতে চাইছে রাজধানীতে, বন্দর নগরীতে। তার অন্তত একটি দিক লাখে লাখে গ্রামীণ তরুণীর পোশাক-শিল্পের কাজে ঢাকায় বস্তিবাসী হওয়া। এদেরও শিকড় গ্রামে।
বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক নাগরিক চরিত্রই একালে ঈদ উৎসবের রাজধানীকেন্দ্রিক নাগরিক চরিত্রে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ভোগবাদ নাগরিক সমাজের আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমাজ গড়ে তুলেছে শিল্পপতি, বৃহৎ ব্যবসায়ী শ্রেণী, সেই সঙ্গে সামরিক-বেসামরিক আমলা, বৃহৎ আয়ের পেশাজীবীরা (অধ্যাপক, চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী) এবং অনুরূপ ধনিক শ্রেণী।
ঈদ উৎসব ঘিরে রাজধানী ঢাকা বা বন্দরনগরী চট্টগ্রাম বা অনুরূপ সমৃদ্ধ শহরে উল্লিখিত শ্রেণীর অর্থ ব্যয়ের সমারোহ, এমনকি তাদের ভোগবাদী চরিত্র ঈদের সেকাল ও একালের মধ্যে বিপুল ব্যবধান সৃষ্টি করেছে। ঈদ উৎসবকেন্দ্রিক সামাজিক-মানবিক মূল্যবোধ সুবিধাভোগী শ্রেণীতে অনুপস্থিত বললে চলে। এ শক্তিমান শ্রেণীর জীবনাচরণের প্রভাব পড়েছে এবং পড়ছে জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত অন্যান্য শ্রেণীর ওপর। এদেরও চরিত্র বদল ঘটছে ধীরগতিতে। কিন্তু ঈদের উৎসব-আনন্দের ঘরোয়া, সহজ, সবল দিক, এর মানবিক আবেগের দিক, এর পারিবারিক সামাজিক সহমর্মিতার দিকগুলো এসব গ্রামমুখী শ্রেণীর মধ্যে এখনও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তাই এদের ছুটে যেতে হয় শিকড়ের টানে গ্রামে-গঞ্জে বা ছোট ছোট শহরের স্থায়ী আবাসনে পিতৃ পুরুষের বাস্তুভিটায়। এ যাত্রা যদিও ঈদকেন্দ্রিক, তবু এ ক্ষেত্রে ধর্মবোধের চেয়ে মানবিক মমত্ববোধই প্রধান নিয়ামক শক্তি। তা যেমন পরিবারকেন্দ্রিক তেমনি সমাজকেন্দ্রিক।

ভোগ্যপণ্যের আমদানি বেড়েছে -১৮ জাহাজে এসেছে পৌনে সাত লাখ টন by মাসুদ মিলাদ

বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম কমতির দিকে। পড়তি দামের এসব পণ্যের আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বন্দর দিয়ে এখন একসঙ্গে ১৮টি বড় জাহাজে এসেছে প্রায় ছয় লাখ ৭৮ হাজার টন ভোগ্যপণ্য।
ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো পণ্য আমদানি করেছে। সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, এস আলম ও টিকে গ্রুপ এসব পণ্যের আমদানিকারক। এসব পণ্যের বাজারমূল্য প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম চেম্বার ও খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুবুল আলম মনে করেন, ভোগ্যপণ্যের আমদানি বাড়লে বাজারে সরবরাহ বাড়বে। ফলে দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকবে না। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম কম থাকায় আমদানিতেও খরচ আগের তুলনায় কম পড়বে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বড় জাহাজে থাকা ভোগ্যপণ্য খালাস করে কারখানায় নিতে অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগছে। ৩০ থেকে ৫০ হাজার টন ভোগ্যপণ্য বহনকারী এসব বড় জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারে না। তাই এগুলো সাগরে নোঙর করে রাখা হয়। এরপর বড় জাহাজ থেকে যন্ত্রের মাধ্যমে খালাস করে ছোট জাহাজে বোঝাই করা হয়। ছোট জাহাজে নদীপথে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এবং ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বেসরকারি ঘাটগুলোতে নিয়ে খালাস করা হয়।
বন্দরে এখন সবচেয়ে বেশি পণ্যবাহী জাহাজ আছে অপরিশোধিত চিনির। ছয়টি জাহাজে ব্রাজিল থেকে আনা এই চিনির পরিমাণ প্রায় তিন লাখ টন। বিশ্ববাজারে চিনির দর এখন কমতির দিকে। ২০১০ সালের জুনের পর চিনির দাম এখন সর্বনিম্ন বলে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বেসরকারি পরিশোধন কারখানা মালিকেরা কমতির দিকে থাকা এসব চিনি আমদানি করেছেন।
ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে দেশে চিনির চাহিদা ১৪-১৫ লাখ মেট্রিক টন। এ হিসাবে ছয় জাহাজের চিনি দিয়ে আড়াই মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব। চাহিদার তুলনায় গত অর্থবছর দেশে চিনির সরবরাহ বেশি ছিল বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বেশির ভাগ ভোগ্যপণ্যের দাম এখন নিম্নমুখী। পড়তি দামে কেনা পণ্য আমদানিও বেড়েছে। এর প্রভাবে সামনে স্থানীয় বাজারও স্থিতিশীল থাকবে।
বিশ্ববাজারে গত মে মাসের পর থেকে কমেছে গমের দাম। দেশে গম আমদানি হয় মূলত কানাডা, রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের গমের দাম তিন মাসের ব্যবধানে ২৮০ থেকে কমে ২৩৬ ডলারে নেমে এসেছে। কানাডার গমের দামও টনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ ডলার কমেছে।
বন্দরে এখন পাঁচ জাহাজে গম আমদানি হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টন। এসব গম আমদানি করেছে সিটি গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপ। এ ছাড়া সরকারি আমদানির প্রায় ৩৩ হাজার টন গমও রয়েছে। এসব গম আমদানি হয়েছে রাশিয়া, কানাডা ও ইউক্রেন থেকে।
বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বেশি কমেছে ভোজ্যতেলের দর। ইনডেক্স মুন্ডির তথ্যানুযায়ী, বিশ্ববাজারে সয়াবিনের দর কমে বিক্রি হচ্ছে টনপ্রতি প্রায় ৭১৯ ডলার। পামতেলের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে আসার পর এখন সামান্য বেড়ে টনপ্রতি ৬৭৭ ডলারে উঠেছে। বন্দরে নিয়মিতই আসছে ভোজ্যতেল। এখন সাত জাহাজে আসা ৫৬ হাজার টন সয়াবিন ও পামতেল খালাস হচ্ছে।
এসব পণ্য ছাড়াও দুই জাহাজে আসছে ৮৩ হাজার টন মটর ডাল। বিশ্ববাজারে শুধু এই পণ্যটির দাম সামান্য বাড়তির দিকে।

'সরকার নয়, লতিফ সিদ্দিকীই বেকায়দায়' -প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

আজ শুক্রবার বিকেলে গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
যুক্তরাষ্ট্রে হজ ও তাবলিগ জামাত নিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যে সরকার নয়, তিনি নিজেই বেকায়দায় পড়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজ শুক্রবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফর সম্পর্কে জানাতে এ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে টাঙ্গাইল সমিতির আলোচনা সভায় আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর মন্তব্যের কারণে সরকার বেকায়দায় পড়েছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যে সরকার নয়, তিনি নিজেই বেকায়দায় পড়েছেন। কারণ সরকার তো একথা বলেনি। এতে সরকারের বেকায়দায় পড়ার কিছু নেই।'
তিনি বলেন, 'কেউ যদি অবিবেচকের মতো কথা বলে সেটা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।'
এ সময় প্রধানমন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা ও দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ে সিন্ধান্তের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, 'আমি বলেছি তিনি মন্ত্রিসভায় থাকবেন না। এটাই হবে। একজন মন্ত্রীকে বিদায় দিতে হলে কতগুলো প্রসিডিওর মানতে হয়। আমি নির্দেশ দিলেই তিনি পদত্যাগ করবেন। রাষ্ট্রপতি এখন হজে আছেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিবও হজে আছেন। তারা দেশে ফিরে আসলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
এছাড়া লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে অব্যাহতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল। কাউকে বাদ দিতে হলে গঠনতন্ত্র মেনেই তা করতে হবে।'
এর আগে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তার সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৯তম অধিবেশনে যোগদান সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৯তম অধিবেশনে বিশ্বের প্রায় ১৪০টি দেশের সরকারপ্রধান যোগ দেন। তারা বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করেন।
এছাড়া তারা বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসার, নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকারের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রসঙ্গত, গত রোববার নিউ ইয়র্কে স্থানীয় টাঙ্গাইল সমিতি আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, 'আমি কিন্তু হজ আর তাবলিগ জামাতের ঘোরতর বিরোধী। আমি জামায়াতে ইসলামীরও বিরোধী।' তার মতে, এতে শ্রমশক্তির অপচয় হয়, উৎপাদনে প্রভাব পড়ে। এছাড়া তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয় ও টক শোর আলোচকদের নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করেন।

আফ্রিকার স্থাপত্য ও সংস্কৃতি : মুসলমানদের অবদান by সৈয়দ লুৎফুল হক

১৪০০ থেকে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ ও এশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়Ñ যা রোমানদের সাম্রাজ্যের যোগাযোগের অনুকরণে। ১০০০ খ্রিষ্টাব্দের পর দূরবর্তী রাজ্যগুলোর সাথে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি লাভ করে। ধর্মযাজকেরা বাণিজ্যের মাধ্যমে তাদের ধর্মকে এসব অঞ্চলে নিয়ে যায়। এর ফলে পূর্ব ও পশ্চিমের দেশগুলোর সাথে সাংস্কৃতিক বিনিময় সাধিত হয়। আফ্রিকায় আরবদের মুসলিম ধর্ম ও সংস্কৃতি বণিকদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সে সময়ে আরব বণিকেরা আফ্রিকা ও এশিয়ায় প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছিল। আরবদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ও তাদের ধর্ম ছিল ইসলাম। এর ফলে এসব অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তা ছাড়া উত্তর আফ্রিকায় তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল খুবই ভালো। সিল্করোডের মাধ্যমে এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে ভারত পর্যন্ত তাদের যোগাযোগ ছিল। তুরস্ক বা কনস্টান্টিনোপল থেকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত তাদের যোগাযোগ ছিল।

ভেনিসের একটি বণিক পরিবারে মার্কোপলো জন্মগ্রহণ করেন। ১২৫৪ থেকে ১৩২৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মুঘলদের সাথে মার্কোপলো বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি করেন। সময়টি ছিল কুবলাই খানের শাসনামল ১২৬০ থেকে ১২৯৪ খ্রিষ্টাব্দ। এ সময়ে মুঘলদের সাথে চীনের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কুবলাই খান চীন ও মুঘলদের সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করেন। কুবলাই খান দূরবর্তী যোগাযোগের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বিনিময় স্থাপন করেন। বিংশ শতাব্দীতে একই পথ ধরে ফ্রান্সিসকান ও দমিনিকান মংকরা ঈশ্বরের বিশ্বাসকে চীনে নিয়ে যান। এসব বিশ্বাস হিন্দু ও মুসলমানদের দারুণভাবে নাড়া দেয়। ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দ পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলগুলো শক্তিশালী হতে থাকে। এর ফলে নিকটবর্তী অঞ্চলগুলোতে ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা কমে যেতে থাকে। ফ্রান্সিসকো পিগোলেটি তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন তার চায়না গ্রন্থে ভ্রমণ সম্পর্কে। কনফুসিয়াস ও বুদ্ধিজম মুঘল শাসনের অবসানের পরও চীনে এর বিস্তার লাভ করে।
চীনাদের মূল সুবিধা ছিল ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ খ্রিষ্টাব্দে চীনারা বিরাট বিরাট কাঠের জাহাজ তৈরি করে, ২৮ হাজার নাবিক নিয়ে ভারত মহাসাগর পাড়ি দেয়। আফ্রিকার বন্দরগুলোতে পৌঁছে যায়। এর ফলে চীনাদের রাজনীতি ও বাণিজ্য এসব দেশে বিস্তৃতি লাভ করে। যেসব অঞ্চলে বুদ্ধিস্টদের প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল, পূর্ব এশিয়ার খ্রিষ্টানরা এসব অঞ্চলে পরবর্তী সময়ে ভ্রমণ করে এবং খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের চেষ্টা চালায়। এরপর মুসলমানরা আরো দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এবং এ সব অঞ্চলের লোকদের মক্কায় হজ পালনে উদ্বুদ্ধ করে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে নতুন কর্মকাণ্ড শুরু হয় সংস্কৃতি বিনিময়ের ক্ষেত্রে। ১৪৫৪ খ্রিষ্টাব্দে অটোমান সৈন্যরা কনস্টান্টিনোপলকে (তুর্কি) পরাজিত করে বাইজেন্টাইন সভ্যতার হাজার বছরের ঐতিহ্যকে হারিয়ে ফেলে। যার ফলে তুর্কিদের অবস্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থাপিত হয়। এশিয়ানরা কেরভেনের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক হিসেবে ইউরোপের সাথে বাণিজ্য শুরু করে। এ দিকে পশ্চিমা শাসকেরা দু’টি অগ্রগামী পথ হিসেবে সব নদীপথ দখল করে রাখে তুর্কিদের আক্রমণের জন্য কার্যকরী পথ হিসেবে ভেনিস ও স্পেনের অঞ্চলটি বেছে নেয়। ১৫৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ওয়েস্টার্ন গ্রিসে অটোমানদের যেখানে পরাজিত করেছিল, এটি ‘লিপেন্টো’ যুদ্ধ নামে পরিচিত। যেখানে অটোমান নৌবাহিনীর খুব কম উপস্থিতি ছিল। যদিও তুর্কিরা দ্রুততার সাথে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তাদের নৌবাহিনী পুনঃস্থাপিত করেছিল। আসলে এটি বাণিজ্যিকভাবে কোনো যোগাযোগের পথ ছিল না। সাধারণভাবে সোনা, রুপা অথবা মসলাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানির জন্য ব্যবহার করা হতো। আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপীয় দেশ আরব ও তুর্কিরা দখল করে নেয় বিদেশী বাজারগুলোর জন্য। নৌবাণিজ্যের যান্ত্রিক বিষয়গুলো অত্যন্ত কঠিন ছিল। ইউরোপীয়রা পুরনো নৌবাণিজ্য ও নৌযানের যান্ত্রিক বিষয়গুলো আরবদের তুলনায় উন্নতিসাধন করে কম্পাস ও দুরবিন আবিষ্কারের ফলে আরবদের চেয়ে ওরা এগিয়ে যায়।
পনেরো শতাব্দীর প্রথমার্ধে টলেমির জিয়োগ্রাফি ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হওয়ার পর ভৌগোলিক সীমারেখার ওপর তৈরি করা হয় ল্যাটিচউ ও লংগিচুডের সাহায্যে। পর্তুগিজ নাবিক প্রিন্স হেনরির উৎসাহ দেয়ার ফলে ১৩৯৪ থেকে ১৪৬০ খ্রিষ্টাব্দে একটি ম্যাপ ও চার্ট তৈরি করা হয়। পর্তুগিজ ও স্প্যানিশরা এই ম্যাপ ও চার্টের মাধ্যমে আরবদের চেয়ে অগ্রগামী হয়ে যায়। এর ফলে দুই থেকে তিনটি এসব যন্ত্রপাতি সংবলিত বিভিন্নমুখী যাত্রার দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং নির্ভরযোগ্য সমুদ্রযাত্রা নিশ্চিত করে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। এসব জাহাজে পিতলের কেনিওন এবং ফায়ার করার ক্ষমতা তৈরি করা হয়Ñ যা ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে ভাস্কোদাগামার ১৪৬০ থেকে ১৫২৪ খ্রিষ্টাব্দে সাউথ আফ্রিকার সমুদ্রভ্রমণে ঘটেছিল পর্তুগিজদের বাণিজ্য রোডে ভারতীয়দের বাণিজ্যিক স্থানগুলোতে।
ক্রিস্টফার কলম্বাস ১৪৫১ থেকে ১৫০৬ একজন ইতালীয় কর্মী স্পেনের জলরোর্টে যখন চীন ভ্রমণ করেছিলেন তখন তিনি আমেরিকা আবিষ্কার করেনÑ যা ইউরোপীয়রা কখনো কল্পনা করেনি। এর ফলে পৃথিবীর ইতিহাসের ধারাবাহিকতা পরিবর্তিত হয়ে যায়। স্প্যানিশরা তাদের সব নৌভ্রমণ বন্ধ করে দেয় চীন যাওয়ার পরিকল্পনা থেকে। তারা নৌভ্রমণের মাধ্যমে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে পর্তুগিজরা পূর্ব দিকে আফ্রিকা ও ভারত মহাসাগর পাড়ি দেয়। এই উদ্যোগের ফসল হিসেবে আমেরিকা ও আফ্রিকা আবিষ্কারের ফলে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়Ñ যা আধুনিক পৃথিবীতে পশ্চিমাদের প্রাধান্য স্থাপিত হয় এবং সংস্কৃতি বিনিময়ের কার্যক্রমের আরো সুযোগ করে দেয়।
আফ্রিকান আর্কিটেকচার বা স্থাপত্য : যদি আমরা আফ্রিকার প্রাচীন ভাস্কর্য দেখতে চাই দেখা যাবে আফ্রিকার স্থাপত্যের সামান্য কিছু নিদর্শন পাওয়া যাবে শত শত বছরের পুরনো। এতে প্রতীয়মান হবে না বিস্তৃতভাবে এ ধরনের স্থাপত্যকাঠামো গড়ে উঠে ছিল। একটি সর্ভেতে আফ্রিকান বাড়িঘর তৈরির পদ্ধতি তিন ডজনেরও বেশি বিভিন্ন ফর্ম রয়েছে। স্থাপত্যের ম্যাটেরিয়াল ছিল কাদামাটি, পথের, ব্রাশউড ও ইট রোদে শুকানো মিকচার মাটির তৈরি, এর সাথে স্ট্র ব্যবহার করা হতো। সামাজিক প্রতিষ্ঠানে উপজাতীয়দের অবস্থানে দেখে মনে হয় আফ্রিকানদের কোনো স্থায়ী কাঠামোর প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু প্রাচীন বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে যেমন জিম্বাবুয়েতে পাথরের তৈরি বাড়ির নিদর্শন পাওয়া যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যভাগে যেখানে একটি শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১০০০ খ্রিষ্টাব্দে। যেখানে বিরাট আকার পাথরের দেয়াল নির্মিত হয়েছিল। এই স্থাপনা প্রমাণ করে যে, এখানে একটি রাজকীয় বাসস্থান ছিল। এটি হলো সবচেয়ে বড় স্থাপনা পিরামিডের পর।
গ্রামীণ আফ্রিকানরা নিশ্চিত করে যে তাদের সামাজিক যে ব্যবস্থা ছিল তা স্থাপনা কিংবা স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনার মানসিকতা তাদের ছিল না। শহুরে আফ্রিকানদের মধ্যে মুসলমানদের আধিপত্য ছিল। শহরে যেসব দালানকোঠা তৈরি হয়েছিল সেগুলো দেখতে হৃদয় স্পর্শ করবে, বিশ্বের স্থাপত্যের ইতিহাসে। মালির মসজিদ উদাহরণ হিসেবে তাদের প্রকৃতিগতভাবে স্থাপন করা হয়েছে। বুলবাস টাওয়ার, ডিম্বাকৃতির ফিনিয়ালস (স্থানীয়দের চিহ্ন যা উর্বরতার দৃষ্টান্ত)। একটি অপূর্ব ক্যাসেল। এসব স্থাপনা প্রমাণ করে যে, এগুলো তৈরি করা হয়েছিল সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে। কোনো কোনোগুলো পরে পুনঃনির্মিত হয়েছে। এগুলো ধারাবাহিকভাবে ১২০০ শতাব্দী পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এসব দেয়াল ও টাওয়ার কাঠের তৈরি বিমের সাহায্যে পুনঃস্থাপিত হয়েছিল, এগুলো সম্পূর্ণ সেমিপার্মানেন্ট। আফ্রিকার মসজিদগুলোর স্থাপনা মুসলমানদের গৌরব। এশীয়া ও স্থানীয় স্থাপত্যের ধারাবাহিকতায় যেমন মন্দির ও কবরস্থান প্রাচীন সংস্কৃতির নিদর্শন বহন করে। আফ্রিকার প্রারম্ভ থেকে বিদ্যমান যেসব স্থাপত্য পাহাড়ের গাত্রে বা পাদদেশে পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়েছে। এর মধ্যে আফ্রিকানদের অধ্যাত্মবাদ ও তাদের অনুভূতির প্রকাশ পেয়েছে। এর ভেতর দিয়ে পৃথিবীর সাথে গোপনীয় সম্পর্কের বিষয়টি রয়েছে। এসব স্থাপত্য কর্মে মানুষের জীবন, সমাজের রূপ ফুটে উঠেছে। স্থাপত্যে ব্যবহৃত কাঠের খণ্ডগুলো মঞ্চনির্মাণের উপাদান হিসেবে কাজ করেছে।
সংস্কৃতি বিনিময় ও প্রতিবন্ধকতা : অষ্টম শতাব্দীতে পশ্চিম আফ্রিকায় ইসলামের আগমন ঘটে। সাহারা বাণিজ্যের ফলে সেখানে ইসলামের প্রাধান্য স্থাপিত হয়। যেকোনো কারণে হোক এসব অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে শক্তি প্রয়োগ ছাড়াই। সর্বপ্রথম সুদানে ইসলামের বিস্তার সাধিত হয়। ইসলামের শান্তি, জীবনাচার এবং ইসলামের প্রশাসন, জ্ঞান ইসলাম প্রচারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মালির শাসনব্যবস্থা ‘মনসা’ রাজা মুসা ১৩১২ থেকে ১৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মুসলমান সম্ভ্রান্তদের একত্র করেন হজের মাধ্যমে। ১৩২৪ খ্রিষ্টাব্দ তিনি তার সচিবদের অধিক পরিমাণে স্বর্ণ মালি থেকে মক্কায় প্রেরণ করেছিলেন হাজীদের জন্য। পশ্চিম আফ্রিকার শাসক মুসা সংস্কৃতির প্রতি উৎসাহিত ছিলেন তিনি চিত্রকলার প্রসারের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। মসজিদ তৈরির জন্য শিল্পীদের নিয়োজিত করা হয়। তিনি ইসলাম সম্পর্কে আলোচনার জন্য বুদ্দিজীবীদের উৎসাহিত করতেন।
বর্তমান যুগেও সাহিত্য, সংস্কৃতি বিনিময়ে নানারূপ প্রতিবন্ধকতা চোখে পড়ে যা ধারাবাহিকভাবে অতীতকাল থেকে চলে আসছে। মুসলিম পরিব্রাজক ইবনে বতুতা (১৩০৪-১৩৬৯) ধনী এক মুসলমান পরিবারে উত্তর আফ্রিকার টেঙ্গাইর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বতুতা আইন ও আরবি সাহিত্যে পড়াশোনা করেন। ১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রথম নৌভ্রমণ শুরু করেন। সারা জীবন তিনি ভ্রমণ করে কাটিয়ে দিয়েছেন। কখনো পায়ে হেঁটে কখনো উটে চড়ে এভাবে তিনি ৭৫০০০ মাইল ভ্রমণ করেছেন। তার ভ্রমণের স্থানগুলোর মধ্যে চীন, ইন্দোনেশিয়া, পার্শিয়া, ভারত, মিয়ানমার, স্পেন, আরব, রাশিয়া এশীয়া মাইনর, মিসর এবং পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকা। তিনি মূলত ভ্রমণ শুরু করেন ধর্ম প্রচারের জন্য। আফ্রিকার ভেতরে মুসলমান স্কলারদের সাথে মুসলমানদের আইন, ধর্মীয় আচার এবং জীবনযাপন ইত্যাদির মাধ্যমে কাজ করেন। ইসলামের আদর্শ, শান্তি ও শাসনব্যবস্থা সারা বিশ্বের অন্যদের মুসলমান হওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহান্বিত করেছিল। ১৩৫৪ খ্রিষ্টাব্দে তার ভ্রমণকাহিনীর ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন এবং মরক্কো ও মালিতে দুই বছর অবস্থানের ঘটনা তার এই ভ্রমণকাহিনীতে সম্পৃক্ত করেন। এই গ্রন্থ ও অভিজ্ঞদের জন্য একটি মূল্যবান দলিল হিসেবে কাজ করবে। গ্রন্থটির নাম দেয়া হয় ‘বিরলা’ অর্থাৎ ‘পর্যটকদের গ্রন্থ’। মালি সম্পর্কে এই গ্রন্থ চু উন্মোচিত করে দিয়েছে। ইবনে বতুতার এই সূক্ষ্মদৃষ্টি, ভ্রমণক্ষমতা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অবদান রাখবে।

ছেলেবেলার ঈদের স্মৃতি by এমাজউদ্দীন আহমদ

অতীতের স্মৃতি সব সময় অত্যন্ত মধুর। হাজারো অনিশ্চয়তায় ভরা বর্তমানের জন্য অনেক সময় মনটা ফিরে যেতে চায় অতীতে। অতীতের সব কিছু যেন আনন্দময়, সুখকর, কাক্সিত হয়ে ভেসে ওঠে স্মৃতিতে। সবটাই যেন নির্মল। সময়টাই আকর্ষণীয়। ছেলেবেলার সব কথা স্মৃতিতে আসে না। তখনো দুঃখবোধ ছিল চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে অপূর্ণতা। গালমন্দ যে ছিল না তা নয়; কিন্তু দীর্ঘ দিন পরে অতীতের অন্ধকারও স্মৃতিতে ভেসে ওঠে এক ঝিলিক উজ্জ্বল আলো হয়ে। সাত-আট বছর বয়স থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এখনো আমার স্মৃতিতে প্রায় স্পষ্ট, কোনো কোনোটা কিছুটা ঝাপসা হলেও বেশির ভাগই মনে পড়ে, বিশেষ করে ঈদের দিনের ঘটনাবলি ভুলি কিভাবে? বাবা-মা এবং বেশ ক’জন ভাইবোনের সমন্বয়ে ছিল আমাদের বড় পরিবার। দাদি বেঁচে ছিলেন সবার মুরুব্বি হয়ে। কথা কম বলতেন; কিন্তু যা বলতেন তা হুকুম যেন, অবশ্য পালনীয়। কৈফিয়ত তিনি তলব করতেন। স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হলে তার কাছেই জবাবদিহি করতে হতো। স্কুল থেকে ফিরে কে কী খেলো তা-ও তার দৃষ্টিতে থাকত।
একটা কথা আজকের তরুণ-তরুণীদের জন্য বলা প্রয়োজন এবং তা হলোÑ তখন জীবন ছিল খুব সহজ সরল। লোকজনের চাহিদা ছিল অত্যন্ত সীমিত। গ্রামে জন্মগ্রহণ করি। উচ্চ মাধ্যমিকপর্যায় পর্যন্ত লেখাপড়াও গ্রামীণ পরিবেশে সমাপ্ত হয়। উচ্চ মাধ্যমিকপর্যায়ের পরবর্তীপর্যায়ে রাজশাহী কলেজের ছাত্র হই। রাজশাহী কলেজের পরে সোজাসুজি ঢাকায়। রাজশাহী শহরেও তখন ছিল গ্রামীণ ছাপ। বিদ্যুৎ ছিল বটে; কিন্তু বিদ্যুৎচালিত কলকব্জা ছিল না বললেও চলে।
গ্রামের বাড়িতে সন্ধ্যায় দুটো তিনটে বারান্দায় হেরিকেন জ্বলে উঠত। পড়াশোনা, বাড়ির কাজ (home work) হেরিকেনের আলোয় করতে হতো। কোনো কোনো দিন হেরিকেন জ্বালাতে হতো আমাকে, কোনো দিন আমার বড় বোন জ্বালাত। ঈদের রাত্রিতে শুধু বারান্দায় নয়, ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠত। এই ঘটনা ঘটত ঈদের ক’দিন আগে থেকেই। ওই কয় দিন পড়াশোনা না করলেও কেউ খবরদারি করতেন না। ঈদের দিনের জন্য মোটামুটি একধরনের রুটিন অনুসরণ করা হতো। ছেলেদের জন্য নতুন পাজামা, পাঞ্জাবি অথবা শার্ট, একজোড়া জুতা বাবা কিনে আনতেন মালদহ শহর থেকে। মেয়েদের জন্য শাড়ি এবং স্যান্ডেল, কারো কারো দাবি অনুযায়ী একগোছা রঙিন চুড়ি, বিভিন্ন রঙের ফিতা এবং তখনকার দিনে পাওয়া যেত এমন কিছু আবদার করা জিনিস।
গ্রামে প্রাত্যহিক বাজার ছিল না। মাইল তিনেক দূরে শনি ও মঙ্গলবারে হাট বসত। সেই হাট থেকে সপ্তাহের জন্য মাছ এবং গোশত কেনা হতো। সবজি আমাদের Kitchen garden-এ প্রচুর হতো। আমাদের বাড়িটা ছিল ছয় বিঘা জমির ওপর। পেছনে সবজির ক্ষেত এবং তার পরেই আম ও লিচুর বাগান। বাড়ির পূর্ব দিকে ছিল ছোট্ট একটা পুকুর। আমাদের বৈঠকখানা ছিল দু’টি। একটি ছিল বাড়ি-লাগোয়া। আব্বা তার ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে বসতেন। আরেকটা ছিল রাস্তার পাশে অর্থাৎ বাড়ির উত্তরে। আব্বা শিক্ষকতা করতেন। এ সুবাদে স্থানীয়পর্যায়ে কোনো গোলমাল হলে মীমাংসার ভার পড়ত তার ওপর। এ জন্য সেই বৈঠকখানা ছিল বড় এবং বাড়ির শেষ প্রান্তে।
আমার মনে আছে, যেহেতু ঈদগাহ ছিল আমাদের বাড়ি থেকে মাইল দেড়-দুই দূরে, তাই গরুর গাড়িতে আমাদের যেতে হতো। আমি তো যেতামই, আমার ছোট ভাইও যেত। আগেভাগে গিয়ে জামায়াতে শামিল হতাম। নামাজের পরে বাবা-মা এবং দাদিকে কদমবুসি করে সালাম করতাম। ঈদের দিনে যেসব বন্ধু-বান্ধব আশপাশের, তারা ছুটে আসত। মা অতি আদরে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন।
ঈদের জন্য আব্বা যা কিনে এনেছেন, তা যে যার মতো লুকিয়ে রাখত এ জন্য যে, অন্যরা দেখে ওগুলোকে যেন পুরনো না করে দেয়। জুতা পায়ে ঠিকমতো লাগছে কি না তা পরখ করার জন্য বিছানায় এক-দু’বার হেঁটে দেখতাম।
আমাদের গ্রামের মধ্যখানে জুমা মসজিদ। কোরবানির ঈদের দিনে মসজিদের উঠানেই হতো খাসি এবং গরু জবাই। তখনকার দিনে এসব অনুষ্ঠানে গ্রামের সবাই মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করতেন। গোশত তৈরি হলে নিয়মমাফিক দরিদ্র-মিসকিনদের জন্য তিন ভাগের এক ভাগ সুনির্দিষ্ট করা হতো। গ্রামে ওই সময় দেখেছি (১৯৪০-৪২ সময়কালে) মিসকিনদের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। ফলে প্রত্যেকের ভাগে পড়ত বেশ পরিমাণ গোশত। চামড়া বিক্রির অর্থ গরিবদের জন্য ব্যয় হতো। মাঝে মাঝে গ্রামে ধর্মসংক্রান্ত জলসা বসতো। গ্রামের সর্দার যিনি তিনি এসব দেখাশোনা করতেন। আমাদের গ্রামের শেষ প্রান্তে ছোট্ট এক পাড়ায় কিছুসংখ্যক হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাস করতেন।
মুসলমানের ঈদেও তাদের অনেকেই আমাদের বাড়িতে আসতেন। আব্বা-আম্মা যতেœর সাথে তাদের জন্য প্রস্তুত খাবার পরিবেশন করতেন। আমার কয়েকজন বন্ধু ছিল। তারাও আসত। সবাই মিলে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে আমরা উপভোগ করতাম। স্কুল কয়েক দিন বন্ধ থাকায় আরো সুবিধা হতো।
আমাদের গ্রামের পশ্চিম মাথায় ছিল একটা মাঠ। এখন তা নেই। ওই মাঠে ঈদের দিন বিকেলে কোনো কোনো সময় ফুটবল খেলার ব্যবস্থা হতো। গ্রামের লোকজনের ভিড় সেই খেলাকে জীবন্ত করে তুলত।
আমার ছেলেবেলার ঈদের স্মৃতি অত্যন্ত আনন্দঘন। সবাইকে ঈদ মোবারক বলা, সমবয়সীদের সাথে কোলাকুলি করা, বন্ধু-বান্ধবের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগÑ সব কিছু মিলিয়ে ঈদ হয়ে উঠত মহা-আনন্দের উৎসব। কোনো কোনো সময় খেলাধুলার আয়োজন করে সবাই মিলে মেতে ওঠা ছিল খুবই সুখকর। আধুনিককালের টেলিভিশন বা রেডিওর মাতামাতি ছিল না বটে, ছিল না নতুন নতুন মোবাইল বা অন্যান্য চিত্তাকর্ষক আধুনিক সাজসরঞ্জাম; কিন্তু ছিল আদি অকৃত্রিম আনন্দের ঘন আস্তরণ, সমাজব্যাপী।

ইসরাইলি কারাগারে জীবন বিপন্ন পনেরো’শ ফিলিস্তিনির

ইসরাইলের কারাগারগুলোতে বন্দি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দেড় হাজারই অসুস্থ। ফিলিস্তিনি বন্দি বিষয়ক বিভাগ এক বিবৃতিতে এ তথ্য দিয়েছে। এ সব অসুস্থ ফিলিস্তিন বন্দির অনেকেরই জীবন বিপদের মুখে পড়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

এতে বলা হয়েছে, ইসরাইলি কারাগারগুলোর খারাপ চিকিৎসা ব্যবস্থা, অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা শৌচাগার এবং বন্দিদের চিকিৎসায় মারাত্মক অবহেলা ফিলিস্তিনি বন্দিদের অসুখের কারণ হয়ে উঠেছে।

ইসরাইলি কারাগারে এ পর্যন্ত ২০৬ জন ফিলিস্তিনি মারা গেছেন এবং এদের ৩০ শতাংশই মারা গেছেন নানা অসুখে ভুগে।

এ ছাড়া কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়া অনেক হতভাগ্য ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেয়ার পরপরই মারা গেছেন বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।

ইসরাইলের বন্দি শিবিরগুলোতে বর্তমানে সাত হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছে। এদের অনেককেই বিনা অভিযোগ আটক রাখা হয়েছে। - রেডিও তেহরান

দুর্নীতিবাজ ও হত্যাকারীদের সাথে কোনো আলোচনা নয় : প্রধানমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা যখন আগ্রহ দেখালাম তখন কোনো খবর ছিল না। এখন কার সাথে আলোচনা করবো? দুর্নীতিবাজ ও হত্যাকারীদের সাথে কোনো আলোচনা নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে হজ ও তাবলিগ জামাত নিয়ে মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যে সরকার নয়, তিনি নিজেই বেকায়দায় পড়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

আজ শুক্রবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফর সম্পর্কে জানাতে এ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে টাঙ্গাইল সমিতির আলোচনা সভায় আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর আপত্তিকর মন্তব্যের কারণে সরকার বেকায়দায় পড়েছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যে সরকার নয়, তিনি নিজেই বেকায়দায় পড়েছেন। কারণ সরকার তো একথা বলেনি। এতে সরকারের বেকায়দায় পড়ার কিছু নেই।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, কেউ যদি অবিবেচকের মতো কথা বলে সেটা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

প্রধানমন্ত্রী তার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে এবং নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে আমাদের সরকারের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন বিশ্ব নেতারা। একইসাথে তারা আমাদের দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নেরও প্রশংসা করেছেন।

বিনিয়োগবান্ধব দেশ গড়তে উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশ সরকারের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, এবার জাতিসংঘে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। এমডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এসব সাফল্য অর্জনে জাতিসংঘে বাংলাদেশে ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর হয়ে চলেছে।

নিজ বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী জানান, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাফল্য দেখানোয় জাতিসংঘে বাংলাদেশ সমাদৃত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবার জাতিসংঘে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। এমডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এসব সাফল্য অর্জনে জাতিসংঘে বাংলাদেশে ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর হয়ে চলেছে।

এদিকে বিএনপি ও এর জোটের সাথে কোনো ধরনের সংলাপের সম্ভাবনা আবারো নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ আওয়ামী লীগ সরকারের এ অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যখন আগ্রহ দেখালাম তখন কোনো খবর ছিল না। এখন কার সাথে আলোচনা করবো? দুর্নীতিবাজ ও হত্যাকারীদের সাথে কোনো আলোচনা নয়।

বায়তুল মোকাররম এলাকায় বিক্ষোভ, লতিফ সিদ্দিকীর ফাঁসি দাবি

মহানবী (সা.), হজ ও তাবলিগ জামায়াত নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় টেলিযোগাযোগমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ফাঁসির দাবিতে ঢাকায় বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে।

শুক্রবার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে জুমার পর হেফাজতে ইসলামসহ কয়েকটি ইসলামী দল ও সাধারণ মুসল্লিরা এ বিক্ষোভে অংশ নেন।

নামাজের পর বায়তুল মোকাররম থেকে মিছিলটি বের হয়ে পুরানা পল্টন এবং দৈনিক বাংলা মোড় হয়ে ফের বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেইটে সমাবেশে মিলিত হয়। এ সময় লতিফ সিদ্দিকীর ফাঁসি দাবি করে মুসুল্লিদের স্লোগান দিতে দেখা যায়।

এদিকে, পূর্ব ঘোষিত এই কর্মসূচি ঘিরে আজানের পরপর অতিরিক্ত পুলিশ অবস্থান নেয় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকায়। সমাবেশ চলাকালে ওই এলাকা কর্ডন করে রাখে তারা।

হেফাজতে ইসলামের লালবাগ কার্যালয়ের সামনে থেকে সংগঠনের নায়েবে আমির আবদুল লতিফ নেজামী ও যুগ্ম-মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহর নেতৃত্বে বিশাল মিছিল বের করা হয়। পরে আজিমপুরে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

অন্যদিকে, পূর্বঘোষিত এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে লতিফ সিদ্দিকীর বিচার দাবি করে আজ জুমার পর সারাদেশে বিক্ষোভ করেছে হেফাজতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ইসলামী দল এবং সাধারণ মুসুল্লিরা।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার সঙ্গে সফরে নিউ ইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে মহানবী (সা.), হজ, তাবলিগ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করে সমালোচিত হন লতিফ সিদ্দিকী।

এ ঘটনায় দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানায় আওয়ামী লীগ। তবে তাকে কেবল মন্ত্রিসভা থেকে নয়, দল থেকেও সরিয়ে দেয়া হবে বলে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা জানিয়েছেন।

এরশাদের সূর্যের দাম চার লাখ

এরশাদের সাদা সূর্যের দাম চার লাখ টাকা। সাদা রঙের সাড়ে তিন বছরের গরুটিকে খুব যত্ন করে লালনপালন করেছেন বলে জানান মোহাম্মদ এরশাদ। তাঁর দাবি সূর্যের ওজন ২০ মণ। সূর্যের উচ্চতা ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি। লম্বায় প্রায় ১০ ফুট।

রাজধানীর মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিংয়ের কোরবানির গরুর হাটের একটা অংশ এরশাদের দখলে। ১৮টি বড় গরু নিয়ে এসেছেন তিনি। এক একটির ওজন ১৫ থেকে ১৮ মণ বলে দাবি করেন এরশাদ। গড়পরতা এসব গরুর দাম তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা চাইছেন তিনি। জানালেন, গতকাল সকালে আড়াই লাখ টাকা দামে একটি গরু বিক্রি হয়েছে।

এরশাদ জানান, পাঁচ দিন আগে গরুর হাটে তিনি সূর্যকে নিয়ে আসেন। এ পর্যন্ত সূর্যের দাম উঠেছে দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা। সূর্যকে খাওয়ানো হয়েছে ছোলা, মসুর ডাল ও গমের ভুষি। খুদের ভাত ও চিটাগুড় সূর্যের খুব প্রিয়। প্রতিদিন সূর্যের পেছনে প্রায় ৪০০ টাকা খরচ ছিল।

তবে কোরবানির হাটে এবার মাঝারি ও ছোট গুরুর চাহিদাই বেশি। রাজধানীর বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতারা বড় গরুর চেয়ে মাঝারি ও ছোট গরু কিনতে বেশি আগ্রহী। এ ধরনের গরুর দাম গতবারের চেয়ে বেশি বলে জানান কয়েকজন ক্রেতা।

বেসরকারি একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা কাজি মইনুল হক বলেন, তিনি ২৭ হাজার টাকা দিয়ে পৌনে দুই মণ ওজনের একটি গরু কিনেছেন। গতবারের চেয়ে এবারের বাজারদর বেশি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, যে গরু গত বছর ২২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে ব্যাপারীরা এবার তার দাম চাইছেন ৪০ হাজার টাকা। অনেক দরদাম করেও ৩০ বা ৩২ হাজার টাকার কমে সেগুলো কেনা যাচ্ছে না।

ইস্টার্ন হাউজিং গরুর হাটের ব্যবস্থাপক এম আর খাজা বলেন, প্রচুর গরু আসছে। যা প্রত্যাশা ছিল আজ সকালে সেটি ছাড়িয়ে গেছে। ক্রেতা-বিক্রেতারা যাচাই-বাছাই করে গরু কিনছেন বলে তিনি জানান।

এম আর খাজা বলেন, ঈদের আরও দুদিন সময় আছে। তাই ভেবেচিন্তে সবাই বেচাকেনার কাজ করছেন।

তুর্কি সীমান্তের কাছে জঙ্গিরা -তুরস্কের সেনা মোতায়েন ,মার্কিন হামলায় দমেনি আইএস

অব্যাহত মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিমান হামলা সত্ত্বেও সিরিয়ার এক তুর্কি সীমান্তবর্তী শহরের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিরা। এ পরিস্থিতিতে সীমান্তে ট্যাংকসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে তুরস্ক। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য হলেও দৃশ্যত কৌশলগত কারণে দেশটির ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থী সরকার আইএসবিরোধী জোটে যোগ দেওয়া নিয়ে এখন পর্যন্ত দ্বিধাগ্রস্ত।

সিরিয়া ও ইরাকে আইএসের অবস্থার লক্ষ্য করে গত মঙ্গলবারও ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই দিনে ইরাকে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান প্রথমবারের মতো আইএসের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। খবর এএফপি, রয়টার্স ও সিএএনের।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলেছে, আইএসের জঙ্গিরা তুর্কি সীমান্তসংলগ্ন সিরিয়ার শহর কোবানি (আরেক নাম আইন আল-আরব) থেকে দু-তিন কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেছে তুরস্ক।
পেন্টাগন জানায়, মঙ্গলবার সিরিয়ায় আইএসের লক্ষ্যবস্তুতে ১২ বারের বেশি হামলা চালানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও জঙ্গিরা তুর্কি সীমান্তসংলগ্ন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর কোবানির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে পেন্টাগন বলেছে, আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই সহজ হবে না। শিগগিরই এ লড়াই শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। এর কারণ হিসেবে পেন্টাগনের মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল জন কারবি বলেন, ‘আমরা আইএসের লক্ষ্যবস্তুর বিষয়ে অস্পষ্ট ধারণার ওপর ভিত্তি করে ঢালাওভাবে বিমান হামলা চালাতে পারি না।’ তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে আরও দুই হাজার ৩০০ সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জরুরি প্রয়োজন পড়লে দ্রুত তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হবে। যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত বলে আসছে, ইরাক বা সিরিয়ায় কোনো স্থলসেনা পাঠানো হবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত মঙ্গলবার তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে আইএস নির্মূলের কৌশল নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
সিরিয়া ছাড়াও ইরাকে আইএসের লক্ষ্যবস্তুতে মঙ্গলবার ১১ বার হামলা চালানো হয়। মসুল, কিরকুক ও রাবিয়া শহরে এসব হামলা হয়। এ ছাড়া স্থলযুদ্ধে কুর্দি যোদ্ধাদের হাতে একটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে আইএস। গত মাসে ওই এলাকা দখল করে নিয়েছিল আইএসের জঙ্গিরা। যুক্তরাজ্য বলেছে, ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান গত মঙ্গলবার ইরাকে আইএসের বিরুদ্ধে প্রথমবার হামলা চালিয়ে বেশ কিছু সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সাঁজোয়া যান, মেশিনগানসহ ভারী অস্ত্রশস্ত্র।
আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগ দেবে কি না, এই প্রশ্নে তুরস্ক এ পর্যন্ত বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে যুদ্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য গত মঙ্গলবার সরকার পার্লামেন্টের মত জানতে চেয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে পার্লামেন্টে আলোচনা হওয়ার কথা।

রানা প্লাজা ধসে ক্ষতিপূরণের প্রথম কিস্তি প্রদান by শুভংকর কর্মকার

রানা প্লাজা ধসে নিহত শ্রমিক পরিবার ও আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের প্রথম কিস্তি দিয়েছে রানা প্লাজা সমন্বয় কমিটি। ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন নিহত শ্রমিকদের পরিবারের এক হাজার ৫৫২ সদস্য ও আহত ৩৫ শ্রমিক। গত বুধবার ক্ষতিপূরণের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক তহবিল রানা প্লাজা ডোনারস ট্রাস্ট ফান্ড থেকে আহত শ্রমিক ও নিহত শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে ক্ষতিপূরণ বাবদ ১২ কোটি ৭০ লাখ টাকা জমা হয়েছে। এর মধ্যে নিহত পরিবারের এক হাজার ৫৫২ সদস্যদের ব্যাংক হিসাবে ১২ কোটি ৫৭ লাখ ৮৩ হাজার ৪১৮ টাকা এবং ৩৫ জন আহত শ্রমিকের ব্যাংক হিসাবে ১৩ লাখ ৬ হাজার ৮৩২ টাকা জমা হয়েছে।

মাথাপিছু একজন নিহত শ্রমিক কত অর্থ পেলেন, তা জানা যায়নি। আবার নিহত শ্রমিক পরিবারের সদস্যসংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। তাঁরা সমানভাবে অর্থ পাননি। নিহত শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীলতা অনুযায়ী তাঁর সন্তান, স্ত্রী, ভাইবোন, মা-বাবার দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ কমবেশি হয়েছে।
এটি ক্ষতিপূরণের একটি অংশ। তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ জমা না পড়ায় পুরো অর্থ দেওয়া নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে। কারণ, প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ৫০ শতাংশ এখন পর্যন্ত জমা পড়েছে। তহবিলে জমা হয়েছে এক কোটি ৯৪ লাখ ডলার। দেশীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১৫৫ কোটি টাকা। পুরো ক্ষতিপূরণের জন্য প্রয়োজন ৩২০ কোটি টাকা।
রানা প্লাজা সমন্বয় কমিটির সদস্য ও ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলজ) সহকারী নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, এক হাজার ৫৮৭ জনের ব্যাংক হিসাবে ক্ষতিপূরণের টাকা চলে গেছে। এখন তাঁরা এ অর্থ প্রয়োজন অনুযায়ী উত্তোলন করতে পারবেন।
সমন্বয় কমিটির একাধিক সদস্য জানান, ক্ষতিপূরণের এ অর্থ ব্যাংকে জমা করার আগে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে দেওয়া অর্থ কর্তন করে রাখা হয়েছে। তা ছাড়া এখন যেসব আহত শ্রমিক ক্ষতিপূরণের অর্থ পেলেন, তাঁদের অধিকাংশ অধিক ক্ষতিগ্রস্ত (মেজর ইনজুরড)। তাঁদের সবাই প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে অর্থসহায়তা পেয়েছেন। ফলে তাঁরা এখন অর্থ কম পেয়েছেন। অন্যদিকে পরে যেসব আহত শ্রমিক ক্ষতিপূরণ পাবেন, তাঁদের আহতের পরিমাণ তুলনামূলক কম। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকেও অর্থ পাননি। ফলে তাঁরা ক্ষতিপূরণের বেশি অর্থ পাবেন।
এর আগে ক্ষতিগ্রস্ত দুই হাজার ৯৯৫ জনের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণের অগ্রিম দেওয়া হয়। এখনো ১১৭ জন এ অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন। গতকাল যেসব নিহত শ্রমিক পরিবারের সদস্য ও আহত শ্রমিক ক্ষতিপূরণের প্রথম কিস্তি পেয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে অগ্রিম সমন্বয় করে অর্থ দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত বছর ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে এক হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে। এ ঘটনার পর দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় উঠলে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নেতৃত্বে ক্ষতিপূরণের জন্য সমন্বয় কমিটি গঠিত হয়। এতে বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান, দেশি-বিদেশি শ্রম সংগঠন ও সরকারের প্রতিনিধিরা আছেন।
জানা যায়, কো-অর্ডিনেশন কমিটির সর্বশেষ ১৩ তম (১৪ আগস্ট) বৈঠকে ৪০ শতাংশ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার একটি ‘সময়সীমা’ চূড়ান্ত করা হয়। মোট পাঁচটি ধাপে ২৯ বা ৩০ অক্টোবরের মধ্যে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার কথা ছিল। কারণ, এখন পর্যন্ত তহবিলে যে অর্থ আছে তা দিয়ে এর বেশি দেওয়া যাবে না।
ক্ষতিপূরণ পেতে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই হাজার ৮৩২ জন আহত, নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিক পরিবারের পাঁচ হাজার ২২ জন সদস্য দাবিনামা পূরণ করেছেন। এঁদের মধ্যে নিখোঁজ শ্রমিক আছেন ১৪১। তাঁদের সবার জন্য আলাদা ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।
তহবিলে নতুন অর্থ: গত সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে ‘রানা প্লাজা ডোনারস ট্রাস্ট ফান্ডে ১৫ লাখ ডলার জমা পড়েছে। তহবিলে মোট অর্থের পরিমাণ এখন এক কোটি ৯৪ লাখ ডলার। তবে সব মিলিয়ে চার কোটি ডলার দরকার।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের জন্য চার কোটি ডলার খুব বড় অঙ্কের অর্থ নয়। আর এতগুলো শ্রমিকের মৃত্যুর দায়ভার তারা কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এর পরও তাদের এ তহবিলে টাকা না দেওয়াটা খুব দুঃখজনক।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে জাতিসংঘের সংস্থার উদ্বেগ- সুন্দরবনের ক্ষতির আশঙ্কা by ইফতেখার মাহমুদ

সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, অবৈধ নৌপথ ও কয়লার ডিপো নিয়ে জাতিসংঘের রামসার সচিবালয় উদ্বেগ জানিয়েছে। রামসার চুক্তি স্বাক্ষরকারী হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের কাছে এই তিনটি প্রকল্পের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়েছে। জবাবে সরকার তার অবস্থান ব্যাখ্যা করে রামসার সচিবালয়ের কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন), বন বিভাগ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর এ ব্যাপারে যে সুনির্দিষ্ট মতামত দিয়েছে, তা রামসার সচিবালয়ে পাঠানো হয়েছে গত ১ আগস্ট। রামসার ইরানের একটি শহর। জীববৈচিত্র্যপূর্ণ জলাভূমি রক্ষায় ১৯৭২ সালে এই শহরে যে চুক্তি সই হয়, তা রামসার চুক্তি নামে পরিচিত।

এর মধ্যে বন বিভাগ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত হওয়া উত্তপ্ত পানি, উড়ন্ত ছাই ও দূষণের ব্যাপারে তাদের উদ্বেগ তুলে ধরেছে। আইইউসিএন থেকে রামপাল প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বন বিভাগ উভয়ই অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রয়োজনে এই প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে তাদের প্রতিবেদনে।
গত ১২ জুন রামসার কর্তৃপক্ষ সরকারকে সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওর সম্পর্কে জানতে চেয়ে চিঠি দেয়। সুন্দরবনের পাশে রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, বনের আক্রাম পয়েন্টে ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের ডিপো স্থাপন এবং সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ ও কার্গো চলাচলের প্রভাব সুন্দরবনের ওপরে কীভাবে পড়ছে, তা জানতে চায় তারা। মনুষ্যসৃষ্ট কোনো কারণে বা সরকারের কোনো কর্মকাণ্ডের ফলে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হলে তা রামসার চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। বাংলাদেশের সুন্দরবন এবং টাঙ্গুয়ার হাওর রামসার এলাকা বা বিশ্বের জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকার স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ওই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে, এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে সুন্দরবন রামসার এলাকার সম্মান হারাবে। ১৯৭২ সালে রামসার শহরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে এমন শর্তই জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রামপাল প্রকল্পের কারণে যাতে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি না হয়, সে জন্য সরকার পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে অবৈধ নৌপথ সম্পর্কে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে সুন্দরবনের বাইরে দিয়ে একটি নৌপথ সৃষ্টির জন্য প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। একটি বিকল্প খাল খনন করে সেখান দিয়ে নৌযান চলাচলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ রামসার চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ। ফলে এই চুক্তি অনুযায়ী তারা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় বাধ্য। তাই সরকারের উচিত সুন্দরবনের স্বার্থে রামপাল প্রকল্প বাতিল করা।
আইইউসিএনের বাংলাদেশ প্রধান ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ বলেন, রামপাল প্রকল্পের প্রভাব সুন্দরবনের ওপর কতটুকু পড়বে, সে ব্যাপারে আরও বিজ্ঞানসম্মত সমীক্ষা দরকার। এ ব্যাপারে আইইউসিএন সরকারকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
রামপাল প্রকল্পের ব্যাপারে বন বিভাগের দুই পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সম্ভাব্য তিনটি ক্ষতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে ২০১২ সালের ২২ জুন রামসার সচিবালয় থেকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, সুন্দরবনের পাশে জয়মণি গ্রামে খাদ্য বিভাগের বড় গুদাম বা সাইলো নির্মাণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল। বন বিভাগ থেকে সে সময় এই দুটি প্রকল্প সম্পর্কেই আপত্তি তোলা হয়েছিল। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও বন বিভাগ থেকে একই ধরনের উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকারী সংস্থা বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাওয়ার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিজয় শংকর তাম্রকার রামসার কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ এবং বন বিভাগের বিশ্লেষণকে অমূলক হিসেবে চিহ্নিত করে প্রথম আলোকে বলেন, এই প্রকল্প নির্মিত হলে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি তো হবেই না, বরং বনের পরিবেশ আগের চেয়ে আরও ভালো হবে।
গরম পানি বর্জ্য মিশবে: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যে গরম পানি বর্জ্য হিসেবে নির্গত হবে, তা সুন্দরবনের পানির সঙ্গে মিশবে। এতে সুন্দরবনসংলগ্ন নদীগুলোতে বসবাসকারী প্রাণী ও উদ্ভিদ কণারা বাঁচতে পারবে না। সুন্দরবনের বিপুল মাছ, পাখি ও বন্য প্রাণী এই প্রাণী ও উদ্ভিদ কণা খেয়ে বেঁচে থাকে। এর ফলে সুন্দরবনের নদীগুলোতে বসবাসকারী ডলফিনদের বিচরণও বাধাগ্রস্ত হবে।
সুন্দরবনের জোয়ার-ভাটার স্থানগুলোতে পানির ওপরে নির্ভরশীল পাখিদের বসতি এলাকা। সেখান থেকে তারা খাবার সংগ্রহ করে ও বিচরণ করে। নদীর পানিতে গরম পানি ছাড়া হলে ওই পাখিদের পক্ষে সেখানে অবস্থান করা সম্ভব হবে না। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বের হওয়া উত্তপ্ত পানি সুন্দরবনের নদীর পাড় ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিশেষ করে সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়বে।
উন্মুক্ত স্থানে কয়লা মজুত ও পরিবহন: রামপাল প্রকল্পের জন্য সুন্দরবনের ভেতরে পশুর নদী দিয়ে কয়লা পরিবহন করা হবে। বন বিভাগের প্রতিবেদনে উন্মুক্তভাবে কয়লা পরিবহনের ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়েছে, এতে বিপুল পরিমাণে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড ও মারকারি নিঃসরিত হবে। এই তিনটি পদার্থ বাতাসে মিশলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অ্যাসিড বৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে সেখানকার জীববৈচিত্র্য এবং আশপাশে বসতি গড়া মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালায় পরিবেশগত প্রভাবকে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও এই প্রকল্প বাংলাদেশের অবকাঠামোগত, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। এটি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
বিশ্বের ১৬০টি দেশের এক হাজার ৯৭০টি প্রাকৃতিক জলাভূমি ‘রামসার এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৭২ সালে ইরানের রামসার শহরে একটি সম্মেলনের পর বিভিন্ন দেশ এ চুক্তিতে সই করে।

আজ হাটমুখী হবেন ক্রেতারা

মেয়র মোহাম্মদ হানিফ (গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী) ফ্লাইওভারের কুতুবখালী প্রান্তে নেমে কিছু দূর এগোলেই শনির আখড়া। কাজলা পেট্রলপাম্পের পর থেকে শনির আখড়া পর্যন্ত সড়কের পাশে বসেছে কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট। হাটে প্রচুর গরু। ফলে নতুন আসা গরুবাহী ট্রাকগুলো সড়কের এক পাশে রাখায় ব্যস্ত মহাসড়কে যানবাহনগুলোর গতি কিছুটা ধীর। কেবল এই হাট নয়, রাজধানীর বাড্ডার আফতাবনগর, গাবতলী, রহমতগঞ্জ, কমলাপুর হাটও গরু, ছাগল, মহিষে পরিপূর্ণ। গাবতলীর স্থায়ী হাটে দেখা গেল ভারতের রাজস্থান থেকে আনা উটও। গতকাল বৃহস্পতিবার হাটগুলোতে প্রচুর পশু দেখা গেলেও ক্রেতার তেমন দেখা মেলেনি। বিক্রেতাদের কেউ পশুর যত্ন করে আবার কেউ ক্রেতার অপেক্ষায় সময় কাটাচ্ছেন। আজ শুক্রবার থেকে ছুটি শুরু হচ্ছে। তাই বিক্রেতাদের আশা, আজ থেকে হাটে আসবে ক্রেতা। শেষ হবে অপেক্ষার পালা।

হাটগুলোর ইজারাদারেরা ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পশু নিয়ে হাটে আসা ব্যাপারী ও বিক্রেতারা বললেন, কয়েক দিন ধরেই রাজধানীতে কোরবানির পশু আসা শুরু হয়েছে। তবে গত দুই দিনে পশু আসার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। প্রচুর পশু এলেও বিক্রি শুরু হয়নি বললেই চলে। তাঁদের মতে, এখন ক্রেতার চেয়ে দর্শনার্থীর সংখ্যাই বেশি।
গতকাল সরেজমিনে চারটি হাট ঘুরে এসব কথার সত্যতাও পাওয়া গেল। সকাল থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত শনির আখড়া, কমলাপুর, আফতাবনগর ও গাবতলী হাটে পশু বিক্রি হতে দেখা গেছে খুবই কম। হাটে যে কজন আসছেন, তাঁদের অধিকাংশই দাম জিজ্ঞেস করছেন। আবার হাটের আশপাশের এলাকার উৎসুক মানুষ বাজার যাচাই করতে আসছেন। আফতাবনগর হাটে মোসলেমউদ্দিন আহমেদ নামের এক ব্যক্তি বেলা দেড়টার দিকে একটি মাঝারি আকারের গরু কিনলেন। দাম পড়েছে ৬৫ হাজার টাকা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গত দুই দিনে তিনি চারটি হাটে গেছেন। তিনি ওই দামে গরু কিনে জিতেছেন।
হাটগুলোতে দেখা গেল, দেশি ছোট আকারের গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। শনির আখড়ায় ছোট আকারের একটি গরু ২৬ হাজার টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেল। গাবতলী স্থায়ী পশুর হাটের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি রইসুল ইসলাম বললেন, তিনি এক বিক্রেতাকে একটি গরুর দাম সাত লাখ টাকা চাইতে দেখেছেন। এখন পর্যন্ত এক ব্যক্তি ওই গরুটির দাম তিন লাখ ২৫ হাজার টাকা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি হওয়া গরুর দাম হয় মূলত একশ্রেণির ধনী ব্যক্তির প্রতিযোগিতার কারণে। এমনিতে কোনো গরুর দাম এত হওয়ার কারণ নেই।’
বেলা দুইটা পর্যন্ত আফতাবনগর হাটে ২৬টি ট্রাক, কমলাপুরে ১৭টি, শনির আখড়ায় ২৮টি এবং গাবতলীতে বিকেল পর্যন্ত ৩৯টি ট্রাকভর্তি পশু এসেছে বলে হাটগুলোর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানা গেছে। তাঁরা জানান, প্রতিটি ট্রাকে গড়ে ২৫টির মতো গরু থাকে। আগামী তিন দিন প্রচুর গরু আসবে। সেই সঙ্গে বিক্রিও বেড়ে যাবে কয়েক গুণ। এখনো তেমন বিক্রি না হওয়ার কারণ সম্পর্কে তাঁরা বলেন, ঢাকায় আগে কিনে গরু রাখা কঠিন। এ জন্য ক্রেতারা শেষ মুহূর্তে পশু কিনতে আসেন।
পশুর হাটগুলোতে ছাগলও এসেছে অনেক। ক্রেতারা বলছেন, ছাগলের দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে। গাবতলীর হাটে আকারভেদে ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাগলের দাম চাওয়া হয়। তবে হাটগুলোতে ভারতের গরু গতকালও তেমন দেখা যায়নি।
ঝিনাইদহ থেকে ১৮টি গরু নিয়ে গত সোমবার বিকেলে কমলাপুরের হাটে এসেছেন হামদু মিয়া ও আরও দুজন। হামদু মিয়া বললেন, গতকাল বেলা দেড়টা পর্যন্ত তিনি মাঝারি আকারের একটি গরু ৫৩ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। তাঁর গরুগুলোর মধ্যে এটি ছিল ছোট। বিক্রি করে তাঁর মোটামুটি লাভ হয়েছে। আশা করছেন, বাকিগুলো বিক্রি করে ভালোই লাভ পাবেন। হাটে ভারতের গরু তেমন না থাকায় তিনি আশান্বিত। তবে ক্রেতাদের আনাগোনা কম থাকায় তাঁর মনে কিছুটা আশঙ্কাও কাজ করছে।
শনির আখড়া হাটেও ক্রেতার তেমন দেখা মিলল না। কয়েকজন ঘুরে ঘুরে গরু দেখছেন। বেশ কিছুক্ষণ অবস্থানকালে একটি ছোট গরু বিক্রি হতে দেখা গেল। সড়কের একাংশে গরুবাহী ট্রাক থাকা নিয়ে জানতে চাইলে ওই হাটের প্রধান ইজারাদার ওসমান গনি বললেন, প্রচুর গরু আসছে। হাটে ঢোকানোর জন্য গরুর ট্রাকগুলোকে সড়কের একাংশে দাঁড়াতে হচ্ছে। তাঁরা চেষ্টা করছেন যত দ্রুত সম্ভব ট্রাকগুলো সরিয়ে দিতে।

সব দুর্ভোগ সড়কপথে

ঈদে ঘরমুখী মানুষের যাত্রার মূল স্রোত শুরু হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের পর। ট্রেন, লঞ্চে ঝামেলা কম থাকায় আনন্দ নিয়েই বাড়ি গেছেন যাত্রীরা। তবে গতকালও সব দুর্ভোগ ছিল সড়কপথে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীদের।

রাজধানীর বিভিন্ন টার্মিনালে এসব গন্তব্যের যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়ক এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মহাসড়কের পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাটকেন্দ্রিক দীর্ঘ যানজট চলছে টানা চার দিন ধরে। চলছে দুর্ভোগও।
আজ শুক্রবার থেকে পবিত্র ঈদুল আজহা ও শারদীয় দুর্গাপূজার সরকারি ছুটি শুরু হচ্ছে। ফলে আজ সব পথেই ঘরমুখী যাত্রীদের চাপ বাড়বে।
গতকাল শেষ কর্মদিবসে দুপুরের পর থেকেই রাজধানীর তিনটি আন্তজেলা বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনাল এবং রেলস্টেশনের দিকে মানুষের স্রোত শুরু হয়। সন্ধ্যার পর তা আরও বেড়ে যায়। এতে টার্মিনালগুলোর আশপাশে যানজটের সৃষ্টি হয়।
বিভিন্ন বাস টার্মিনালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের নিয়ে পর্যবেক্ষণ দল বসানো হয়েছে। তারা সচেতনতামূলক প্রচারপত্র বিতরণ করে। মহাখালী টার্মিনালে এই দলের সদস্য ইমদাদুল হক বলেন, কোনো পরিবহনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দুপুরে মহাখালী টার্মিনাল পরিদর্শনে যান। তিনি যাত্রীদের কুশল জানতে গেলে অনেকেই বেহাল সড়ক নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মন্ত্রী তাঁদের আশ্বস্ত করেন, আগামী মার্চের মধ্যে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে আর দুর্ভোগ থাকবে না। তিনি দাবি করেন, মহাসড়কের বেহাল দশা নয়, যানজটের মূল কারণ কোরবানির পশুবাহী ট্রাক বিকল হওয়া।
বাস সময়মতো আসে না: গাবতলী বাস টার্মিনালের উল্টো দিকেই হানিফ পরিবহনের নিজস্ব টার্মিনাল। বাসের জন্য অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের বসার জন্য শামিয়ানা টানিয়ে চেয়ার পাতা হয়েছে। দুপুর সাড়ে ১২টায় গিয়ে দেখা যায়, চেয়ার পূরণ হওয়ার পরও অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে আছেন। গরমে ঘামছেন আর উদ্বেগ নিয়ে ছোটাছুটি করছেন অনেকে।
সেখানে দেখা হয় আলেয়া বেগম ও শহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তাঁরা যাবেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ। সঙ্গে দুই শিশুসন্তান। আলেয়া বেগম দুই ছেলেকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন। শহিদুল ইসলাম বলেন, ছেলেরা বাসা থেকে যে আনন্দ নিয়ে বের হয়েছিল, গরমে তা অনেকটাই চলে গেছে। অধৈর্য হয়ে বারবার বলছে, কখন বাসে উঠব।
শহিদুল জানান, তিনি হানিফ পরিবহনের যে বাসের টিকিট কেটেছেন, সেটি ছাড়ার কথা ছিল সকাল ১০টায়। কিন্তু এখনো বাস আসেনি।
কাউন্টারের সামনে গিয়ে দেখা যায়, অপেক্ষমাণ যাত্রীদের অনেকেই বাসের খবর জানতে সেখানে ভিড় করেছেন। একেকজন একেক পথের। কাউন্টারের ভেতরে একজন মাইকে বিভিন্ন কথা বলছেন। কিন্তু কোন বাস কখন আসবে, সে কথা জানাচ্ছেন না। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীদের সবার মুখে একটাই প্রশ্ন, বাস কখন আসবে?
এর মধ্যে রংপুরের একটি বাস এলে যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে উঠতে থাকেন। তাঁদের একজন সিরাজুল ইসলাম বলেন, মিরপুর থেকে সকাল সাতটায় এসেছেন। বাস ছাড়ার কথা ছিল আটটায়। সেই বাস এসেছে সাড়ে ১২টায়। ভাড়াও নিয়েছে বেশি।
হানিফ পরিবহনের চালক সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি সকালে যাত্রী নিয়ে রংপুর থেকে এসেছেন। বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে সাভারের নবীনগর পর্যন্ত যানজট ঠেলে ঠেলে আসতে হয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গন্তব্যের একটি পরিবহনের কল্যাণপুর কাউন্টারেও অপেক্ষমাণ যাত্রীদের দেখা যায়। ওই কাউন্টারের কর্মকর্তা বলেন, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের দৌলতদিয়া প্রান্তে সাত-আট ঘণ্টার যানজটে পড়তে হচ্ছে। ঢাকায় থাকা কিছু বিকল্প বাস দিয়ে যাত্রীদের সামলানো হচ্ছে।
কল্যাণপুরে কেয়া পরিবহনের কাউন্টারের সামনেও ছিল যাত্রীদের ভিড়। গরমে-ক্লান্তিতে কাউকে কাউকে ঝিমুতে দেখা গেল। যাত্রী সায়েদা বেগম বলেন, বগুড়ায় যেতে সকাল সাড়ে ১০টার বাসের টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু বেলা একটায়ও বাস আসেনি। কখন আসবে তাও বলতে পারছে না কেউ।
বিকেল সাড়ে চারটার দিকে সায়েদাবাদের পাশে মানিকনগরে স্টারলাইন পরিবহনের কাউন্টারে এবং সামনের সড়কে প্রচুর যাত্রীর ভিড় দেখা যায়। অধিকাংশেরই গন্তব্য ফেনী। তাঁদের অনেকে জানান, তাঁদের বাস বিকেল পাঁচটা থেকে সাতটার মধ্যে ছেড়ে যাওয়ার কথা। ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে যানজট এখন তেমন নেই বলে বাসগুলো সময়মতো ছাড়ছে। তবে বুধবার রাতেও ওই পথে যানজট ছিল।
একটু দূরে ইকোনো ও একুশে পরিবহনের কাউন্টারে বৃহত্তর নোয়াখালীর বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে। বিকেল পাঁচটায় অফিস শেষ হওয়ার পর সায়েদবাদ টার্মিনালের দিকে মানুষের স্রোত আরও বাড়তে থাকে।
মহাখালী বাস টার্মিনালেও বিভিন্ন পথের যাত্রীদের টিকিটের দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে বাসের জন্য ক্লান্তিকর অপেক্ষার প্রহর গুনতে দেখা যায়। ময়মনসিংহ, শেরপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়াসহ বিভিন্ন পথের যাত্রীদের ছিল বাড়ি ফেরা নিয়ে উৎকণ্ঠা। তবে স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে তাঁরা এ কষ্ট মেনে নিচ্ছেন।
টিআর পরিবহনে নওগাঁয় যেতে বাসের জন্য অপেক্ষারত দীন ইসলাম বলেন, চারটায় বাস ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু পাঁচটায়ও সেই বাস আসেনি।
কমলাপুরে মানুষের স্রোত, পূর্বাঞ্চলে ট্রেনের সূচিতে টান: ভিড়ের কারণে দরজা দিয়ে উঠতে পারছিলেন না। আবার যেকোনো মুহূর্তে ছেড়ে দিতে পারে ট্রেন। শেষে উপায় না দেখে স্ত্রীকে কাঁধে তুলে জানালা দিয়ে ট্রেনে উঠিয়ে দিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন। নিজে উঠলেন এক কুলির কাঁধে চড়ে। এ দৃশ্য ছিল কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রাজশাহীগামী সিল্কসিটি ট্রেনের। এটি কমলাপুর থেকে ছেড়ে যায় বেলা সাড়ে তিনটার দিকে। ট্রেনটির ইঞ্জিন, ছাদ ও দরজায় যাত্রীদের ঝুলে যেতে দেখা যায়। বিকেলের দিকে কমলাপুর স্টেশন থেকে নোয়াখালীর উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনেও উপচে পড়া ভিড় ছিল। উপকূলের কয়েকজন যাত্রী অভিযোগ করেন, ট্রেনে উঠে টিকিটে উল্লিখিত নম্বরের আসনই পাননি তাঁরা। রেলের কর্মকর্তাদের জানিয়েও লাভ হয়নি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শুভ চৌধুরী বলেন, তাঁর মতো ২০ জন আসন পাননি। পরে তাঁরা ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের দরজায় বসে ভ্রমণ করছেন। সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া কালনী এক্সপ্রেসে তুলনামূলক ভিড় কম ছিল।
মিরসরাইয়ে একটি ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়ার কারণে সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনটি নির্দিষ্ট সময়ের আড়াই ঘণ্টা পরে ছেড়ে যায়। চট্টগ্রাম পথের মহানগর গোধূলি ট্রেনটি রাত সাড়ে নয়টায়ও ছেড়ে যায়নি। এটি ছাড়ার কথা ছিল বিকেল সাড়ে চারটায়। বাকি ট্রেনগুলো গড়ে আধা ঘণ্টা দেরিতে ছেড়ে যায়।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও ছিল যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। ভিড় ঠেলে আনন্দ নিয়েই লঞ্চে উঠেছেন তাঁরা। যাত্রী পূর্ণ করে লঞ্চগুলো ছেড়ে গেছে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন গন্তব্যে।

মন্ত্রীকে রাস্তা ঠিক করতে বললেন যাত্রী

গতকাল দুপুরে মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে যান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ সময় তিনি ময়মনসিংহগামী এক যাত্রীর কাছে জানতে চান, তিনি টিকিট পেয়েছেন কিনা। মহিলা যাত্রী অবশ্য টিকিটের প্রসঙ্গ এড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগে রাস্তা ঠিক করে দিন। রাস্তা তো খুব খারাপ। ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের অবস্থা খারাপ। এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া-আসা কষ্টকর। সরজমিন বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে গিয়ে এ ভাবে অনেক যাত্রীর প্রশ্নবাণে জর্জরিত হন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এছাড়া মহাসড়কে যানজট, গরুর হাট, ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে যানজট, পরিবহন সার্ভিসগুলোর অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়েও অভিযোগ করেন তারা। সড়ক সংস্কারের বিষয়ে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, মার্চের পর রাস্তা ঠিক হয়ে যাবে। এ জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। আস্তে আস্তে দেশের সড়ক সমস্যার সমাধান হবে।
এদিকে রাস্তার দুরবস্থার জন্য দুর্ভোগ আর  যানজটের ভোগান্তি সঙ্গী করে বাড়ি ফিরছে মানুষ। ঈদকে সামনে রেখে গতকাল বাস টার্মিনাল, রেল স্টেশন ও লঞ্চ টার্মিনালে ছিল ঘরমুখো যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। এবার ঈদ ও পূজা প্রায় একই সময়ে হওয়ার কারণে ঘরমুখো মানুষের ভিড় শুরু হয়েছে গত এক সপ্তাহ আগ থেকেই।
সাধারণত প্রতিদিন রাজধানীর গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে ১৪০০ থেকে ১৫০০ যাত্রীবাহী বাস ছেড়ে যায়। ঈদ উপলক্ষে প্রতিদিন প্রায় ২০০০ যাত্রীবাহী বাস এই বাসস্ট্যান্ড থেকে ছেড়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গতকাল গাবতলী, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড ঘুরে দেখা গেছে, যাত্রীরা চাহিদামতো বাসের টিকিট পাচ্ছেন না। কারণ হিসেবে জানা গেছে, গত ১৫ই সেপ্টেম্বর থেকে অগ্রিম বাসের টিকিট দেয়া শুরু হয়। গত বুধবার থেকে তা বন্ধ রয়েছে। গতকাল দুপুরে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের সোহাগের কাউন্টারে টিকিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন যাত্রীরা। ওই কাউন্টারের টিকিট বুকিংম্যান আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, যাত্রীরা ফিরে যাচ্ছেন কারণ সোহাগের এসি বাসের টিকিট শেষ হয়ে গেছে। তবে গতকাল পর্যন্ত ওই পরিবহনের সাধারণ বাসের টিকিট বিক্রি করা হয়েছে। অন্যান্য পরিবহন বাসের টিকিটেরও একই অবস্থা। সোনার তরী নামক পরিবহন সার্ভিসের কাউন্টার ইনচার্জ মুহাম্মদ শাহিন বলেন, আজকের (বৃহস্পতিবারের) টিকিট নেই। আগামীকালের (আজ শুক্রবার) টিকিট বিক্রি করছি। অনেকে ফোনে টিকিট নিশ্চিত করেছেন, এখন কাউন্টারে এসে টিকিট নিয়ে যাচ্ছেন। গত ঈদের চেয়ে এবার যাত্রীদের চাপ বেশি বলে জানান পরিবহন সার্ভিসে কর্মরতরা। ঈদ ও পূজার কারণেই এই ভিড় বলে জানান তারা। তবে নিম্ন মানের বিভিন্ন বাসের টিকিট ডেকে ডেকে বিক্রি করতে দেখা গেছে গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে।  এক্ষেত্রে যার কাছ থেকে যত পারা যায় ভাড়া বেশি রাখা হচ্ছে। কিন্তু যাত্রীদের কোন অভিযোগ নেই। টিকিট পেয়েই তারা সন্তুষ্ট। যাত্রীদের অভিযোগ, ঈদ উপলক্ষে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সাতক্ষীরাগামী সোহাগ পরিবহনের যাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ফরিদা ইয়াসমিন জানান, আগে ভাড়া ছিল ৫৫০ টাকা, এখন নেয়া হচ্ছে ৬৭০ টাকা। এ বিষয়ে সোহাগের কর্মকর্তারা জানান, তারা আগে কম নিতেন। এখন সরকার নির্ধারিত ভাড়া নিচ্ছেন। একই কথা বলেন অন্যান্য পরিবহন সার্ভিসের কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী সদস্য ও অফিস কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন বলেন, কিলোমিটার প্রতি ১ টাকা ৪৫ পয়সা সরকার নির্ধারিত ভাড়া। ঈদের আগে অনেকে এর চেয়ে কম ভাড়া নিতেন, এখন তারা সরকার নির্ধারিত ভাড়া নিচ্ছেন। ঈদ ও পূজা উপলক্ষে ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়নি। তিনি জানান, অনিয়মের কোন সুযোগ নেই। অনিয়ম প্রতিরোধ ও যাত্রীদের সুবিধার জন্য বাসস্ট্যান্ডে পুলিশ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। পরিবহন শ্রমিকরা জানান,  সড়ক সংস্কার না হওয়ার কারণে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। সড়কে সংস্কার ও মহাসড়কে গরুর হাটের কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এতে সময় বেশি ব্যয় হচ্ছে।
এদিকে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের ঢাকা ত্যাগের অন্যতম মাধ্যম সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। বৃহস্পতিবার পূজা-ঈদ উপলক্ষে সদরঘাটে শুরু  হয়েছে লঞ্চের স্পেশাল সার্ভিস। স্পেশাল সার্ভিস চালু হলেও অতিরিক্ত যাত্রী নিতে নির্দেশনা অমান্য করে লঞ্চের ছাদে যাত্রী বহন করছেন লঞ্চ মালিকরা। ফলে ঝুঁকি নিয়েই ঢাকা ছাড়ছেন লঞ্চ যাত্রীরা। এ ছাড়া সময়মতো লঞ্চ না ছাড়া, পন্টুনে হকারদের উৎপাতসহ নানা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন তারা।
গতকাল কমলাপুর স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, ঘরমুখো মানুষের ভিড় ছিল ট্রেনে। যারা স্ট্যান্ডিং টিকিট কেটেছেন তাদের কেউ কেউ ভিড়ের দুর্ভোগ সহ্য করতে না পেরে পরে বাসে যাত্রা করেছেন। প্রতিটি ট্রেনেই ছিল উপচেপড়া ভিড়। এমনকি ট্রেনের ছাদেও ছিল উল্লেখযোগ্য যাত্রী। ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে গতকালও। অতিরিক্ত যাত্রী, শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে ট্রেনের যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে চট্টগ্রামের মীরসরাই এলাকায় মহানগর প্রভাতী ট্রেন দুর্ঘটনার শিকার হলে সাড়ে তিন ঘণ্টা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকে।