Monday, February 9, 2026

বাংলাদেশের ছাত্র সংসদ নির্বাচন আঞ্চলিক রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে

ডেইলি সাবাহ’র প্রতিবেদনঃ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশের প্রধান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও তুলনামূলকভাবে হস্তক্ষেপমুক্ত এসব নির্বাচনে রক্ষণশীল ছাত্র প্যানেলগুলোর ব্যাপক বিজয় দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে থাকা পছন্দ-অভিরুচিকে সামনে এনেছে।

দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও পূর্বনির্ধারিত ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত ক্যাম্পাসগুলোতে এবার ব্যালট বাক্স ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের আদর্শ হঠাৎ করেই বদলে গেছে- শুধু এ কারণেই এই নির্বাচনগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন এক পরিসরে, যেখানে দীর্ঘদিন পর রাজনৈতিক পছন্দ তুলনামূলক স্বাধীনভাবে প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে জাতীয় রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক সমীকরণ, কূটনৈতিক হিসাব ও নিরাপত্তা বিবেচনায় প্রভাবিত। আগের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পরই ছাত্র সংসদগুলো ভিন্ন পরিবেশে কার্যক্রম শুরু করে। যেখানে প্রার্থীরা প্রকাশ্যে প্রচার চালাতে পারেন, ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন, এখন আর ক্ষমতাসীন দলের ছায়া ক্যাম্পাস রাজনীতির কোনো পক্ষকে সুরক্ষা দেয় না।

ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে ছাত্র সংসদ কখনোই প্রান্তিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। পাকিস্তান আমল থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকগুলোতে ক্যাম্পাস ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্ব গঠনের প্রশিক্ষণভূমি। ছাত্র সংসদ কার্যকর থাকলে তা তরুণদের নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও বৈধতার বিষয়ে মূল্যায়নের প্রতিফলন ঘটায়।

সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্য ক্ষয়ে যায়। ছাত্র সংগঠনগুলো প্রধান রাজনৈতিক দলের শাখায় পরিণত হয়ে পৃষ্ঠপোষকতা ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো অনুকরণ করতে থাকে। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত থাকে। ফলে ছাত্র রাজনীতি প্রতিনিধিত্বের বদলে ক্রমে জবরদস্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও এটিকে পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার নয়, বরং সীমিত পরিসরে নির্বাচন ব্যবস্থার আংশিক প্রত্যাবর্তন হিসেবেই দেখা হয়। অংশগ্রহণ ছিল অসম, বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রার্থীতা ও প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন অধিকাংশ পদ দখল করে। নব্বইয়ের দশক থেকে কার্যত নিষিদ্ধ থাকা ইসলামী ছাত্রশিবির তখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে ছিল।

পরবর্তী সময়ের নির্বাচনগুলো সেই ধারা ভেঙে দেয়। কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো সব বড় ছাত্র গোষ্ঠী প্রকাশ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। ফলাফল ছিল বিস্ময়কর—একাধিক শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূমিধস বিজয়। বিশেষ করে ডাকসুতে ফলাফল নজর কেড়েছে, যা দীর্ঘদিন বাম ও জাতীয়তাবাদী ধারার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল।

এই পরিবর্তনের নানা ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন দমন হওয়া গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতিক্রিয়া, কেউ আস্থা সংকট বা সংগঠনিক সক্ষমতার কথা তুলছেন। তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে অংশগ্রহণ। শিক্ষার্থীরা ব্যাপক হারে ভোট দিয়েছেন, কারণ তারা বিশ্বাস করেন ভোটের মূল্য আছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রার্থীদের মূল্যায়ন হয়েছে আচরণ ও সক্ষমতার ভিত্তিতে। চাপের মুখে তারা কেমন ছিলেন, ভয়ভীতি ছাড়াই সংগঠিত হতে পেরেছেন কি না, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করে দৈনন্দিন ছাত্র সমস্যা মোকাবিলা করতে পারবেন কি না, এসব প্রশ্নই মুখ্য হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ফলাফল ধর্মীয় রাজনীতির উত্থানের চেয়ে বাস্তব আস্থার প্রতিফলন হিসেবেই ধরা পড়ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও এসব নির্বাচন তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় যেখানে জাতীয় নির্বাচন নানা নিয়ন্ত্রণ ও দূরবর্তী শক্তির প্রভাবে পরিচালিত হয়, সেখানে ক্যাম্পাস রাজনীতি অনেক সময় পরিবর্তনের আগাম ইঙ্গিত দেয়। মুখোমুখি নেতৃত্বের পরীক্ষা হয়, ব্যর্থতা ঢাকার সুযোগ কম থাকে।

আঞ্চলিক অভিজ্ঞতাও তাই বলে। ভারতে ছাত্র রাজনীতি বহুবার জাতীয় জোট বদলের আগাম সংকেত দিয়েছে। পাকিস্তানে প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে ক্যাম্পাস আন্দোলন আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়—মূলধারার রাজনৈতিক পথ সংকুচিত হলে ছাত্র পরিসরেই প্রথম বৈধতার পরীক্ষা হয়।

এতে ধরে নেয়ার কারণ নেই যে ক্যাম্পাসের বিজয় সরাসরি জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। ছাত্র নির্বাচন সাধারণ নির্বাচনের ক্ষুদ্র সংস্করণ নয়। তবে এগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উন্মোচন করে- রাষ্ট্রের বাইরে কে সংগঠিত হতে পারে, জবরদস্তি ছাড়া কে আস্থা অর্জন করে, আর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে কে বৈধতা পায়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচন ভবিষ্যৎ বলে দেয় না, তবে বর্তমানকে স্পষ্ট করে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির গতিপথ বুঝতে এই বার্তাকে উপেক্ষা করা কঠিন।

https://mzamin.com/uploads/news/main/201938_sdgh.webp

সরেজমিনে পাবনার মানসিক হাসপাতাল: ‘অমানবিকতা’র নানা গল্প জমা যেখানে by মানসুরা হোসাইন

রোগীর ফাইলে মো. সাইদ হোসেনের বয়স ৬৫ বছর। তাঁর ঠিকানা পাবনার মানসিক হাসপাতালের ৪ নম্বর ওয়ার্ড। গত ৩০ অক্টোবর ২০২৫ দুপুরে গিয়ে দেখা গেল, খালি গায়ে শুধু ডায়াপার পরা সাইদ মেঝেতে ময়লা-জীর্ণ তোশকে শুয়ে আছেন। তোশক ও বালিশে কভার নেই। বাঁ হাতটি বাঁকা করে বুকের কাছে ধরে রেখেছেন। মাথার কাছে একটি প্লেটে কিছু ভাত লেগে শুকিয়ে আছে। কিছু ভাত মাথার কাছে তোশকে পড়ে আছে।

১৯৯৬ সালের লালচে হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছিঁড়ে যাওয়া এ হাসপাতালের রোগী ভর্তির ফরমে আবু সাইদের বয়স লেখা ছিল ৩৬ বছর। সেখানে সাইদের বাড়ির ঠিকানা (পাবনা), স্বজনের নাম আছে। তবে এত বছরেও সাইদকে কেউ বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আসেননি। চিকিৎসকদের বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাইদ সুস্থ আছেন বহুদিন ধরে। এরপরও হাসপাতালে থাকার জন্য তিনি একজন রোগী হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছেন।

সাইদের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলাম, কেমন আছেন? কথা জড়িয়ে যায়, বললেন, ‘ভালো আছি।’ বাড়ি যেতে মন চায় কি না, জানতে চাইলে শিশুর মতো কান্না শুরু করলেন। অস্পষ্টভাবে বলতে থাকেন, ‘বাড়ি যাব, বাড়ি যাব।’ সেদিন ওয়ার্ডটিতে সাইদসহ ২২ জন রোগী ছিলেন।

সাইদকে এখন হাসপাতালে কর্মরতরা ডাকেন ‘সাইদ চাচা’। কয়েকজন বললেন, সাইদ চাচার হয়তো এই জীবনে আর বাড়ি ফেরা হবে না। তবে অন্যরা চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি যাবেন, সে আশায় দিন গুনছেন।

পাবনার তৎকালীন সিভিল সার্জন মোহাম্মদ হোসেন গাংগুলী ছিলেন হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৫৭ সালে প্রথমে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল পাবনা শহরের শীতলাই জমিদারবাড়িতে। পরে সদর উপজেলার হিমাইতপুর ইউনিয়নের হিমাইতপুর গ্রামে অধিগ্রহণ করা হয় ১১১ দশমিক ২৫ একর জমি। এ জমির বেশির ভাগই ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় গুরু শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের। হাসপাতালের মোট জমি থেকে পাবনা মেডিকেল কলেজকে ৮১ দশমিক ২৫ একর জমি দেওয়া হয়েছে।

৬০ শয্যা থেকে শুরু করা মানসিক হাসপাতালটি দফায় দফায় বেড়ে ৫০০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। ৩০ অক্টোবর হাসপাতালটিতে মোট রোগী ভর্তি ছিলেন ৪৭৩ জন। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ২৮১। ছাড়পত্র পেয়েছেন ২ হাজার ২১১ জন। এ সময় মানসিক রোগের পাশাপাশি অন্যান্য অসুখ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৯ জন হাসপাতালে মারা গেছেন।

ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৮-১৯) বলছে, দেশের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ (প্রাপ্তবয়স্ক) কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছে। আর শিশুদের (১৮ বছরের কম বয়সী) মধ্যে এ হার ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে মানসিক রোগ থাকা ৯১ শতাংশ মানুষই চিকিৎসার বাইরে আছেন।

পাবনার মানসিক হাসপাতালটিতে বিনা মূল্যের শয্যা আছে ৩৫০টি। আর টাকা দিয়ে সেবা নিতে হয় ১৫০টি শয্যায়। মোট ১৯টি ওয়ার্ডে (মাদকাসক্ত পুরুষদের জন্য একটি পেয়িং ওয়ার্ডসহ) নারী ও পুরুষ রোগী ভর্তি করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পথ্য বাবদ ৩ কোটি টাকা এবং ওষুধ, যন্ত্রপাতি কেনাসহ অন্যান্য খাতে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা সরকার বরাদ্দ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টিকিট, সিটভাড়াসহ বিভিন্ন খাতে ১ কোটি ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ১১০ টাকা আয় করে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে।

সরেজমিনে মানসিক হাসপাতাল

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে ২৯ ও ৩০ অক্টোবর হাসপাতালটির সার্বিক চিত্র দেখার সুযোগ হয়। হাসপাতালের একটি কক্ষের সামনে ‘সিনেমা অপারেটর’ লেখা দেখে থমকে যেতে হলো। জানা গেল, রোগীদের বিনোদনের জন্য হাসপাতালের ভেতরেই বানানো হয়েছিল সিনেমা হল। বর্তমানে সিনেমা হলকে মিলনায়তন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

১৯৯৩ সালে কাজে যোগ দেওয়া রেখা আক্তার বর্তমানে নার্সিং বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বললেন, কাজে যোগ দেওয়ার পর তিনি শুনেছেন, রোগীরা এখানে সিনেমা দেখতেন। রোগীদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। হাসপাতালে গরু পালন করা হতো, গরুর দুধ খাওয়ানো হতো রোগীদের। তবে এসবই এখন অতীত।

হাসপাতালের স্টাফ নার্স মঞ্জুয়ারা খাতুন প্রায় ২২ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত। এলাকার মেয়ে হিসেবে ছোটবেলায় হাসপাতালে এসেছেন, সে স্মৃতিও মনে আছে তাঁর। তিনি বলেন, আগে হাসপাতাল আয়নার মতো ঝকঝক করত! এখন তো অবস্থা খুব খারাপ। সারাক্ষণ ভয় লাগে ছাদ থেকে কখন মাথায় পলেস্তারা খসে পড়ে!

এবার ফেরা যাক অতীত থেকে বর্তমানে। হাসপাতালের মূল ফটকে ঢোকার আগে চারপাশে যত দূর চোখ যায়, তার সবই মানসিক হাসপাতালের জমি। ফটক দিয়ে ঢুকেই যে সড়ক, সেটি বেহাল। ফটকের বাইরে ও ভেতরে একটু পরপর পরিত্যক্ত বাড়ি চোখে পড়ল। একসময় এগুলো হাসপাতালে কর্মরত ব্যক্তিদের আবাসিক ভবনসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো। কর্মরত ব্যক্তিরা জানান, বৃষ্টি হলে হাসপাতালের ভেতরে একতলায় পানি ঢুকে যায়। চারপাশের ঝোপঝাড়ে সাপ দেখা যায় মাঝেমধ্যে।

৩০ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বহির্বিভাগের আশপাশে দেখা গেল, প্রকাশ্যেই চলছে এ হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার জন্য দালালদের তৎপরতা। হাসপাতাল চত্বরের বিভিন্ন গাছে মনোরোগ চিকিৎসক এবং জিন-পরি ধরলে কোথায় চিকিৎসা করাতে হবে, সেসবের বিজ্ঞাপন ঝুলছে।

মানসিক রোগ আছে, এমন ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের হাসপাতালটিতে ভর্তি করা হচ্ছে। অর্থাৎ শিশু-কিশোর মানসিক রোগীদের এ হাসপাতালে জায়গা নেই। এ ছাড়া কারও মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা থাকলেও ভর্তি করা হচ্ছে না।

হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার মো. শরিফুল হক ৪২ বছর বয়সী মো. শাহাবুদ্দিনের ছাড়পত্র লিখছিলেন। শরিফুল হক বলেন, নিয়মিত ওষুধ খেলে মানসিক রোগীর সুস্থ হতে ৮ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। বর্তমানে হাসপাতালে দুই মাসের বেশি সময় রোগী ভর্তি রাখা হয় না। হাসপাতাল থেকে পাবনার ঈশ্বরদীতে বারবার ফোন করলেও শাহাবুদ্দিনের পরিবারের কেউ তাঁকে নিতে আসেননি। তাই হাসপাতালের কর্মী দিয়ে তাঁকে বাড়ি পাঠানো হচ্ছে। অবশ্য স্থানীয় থানা ও প্রশাসনের মাধ্যমে দেনদরবার করার পরও পরিবারের কেউ রোগীকে রাখতে না চাইলে আবার হাসপাতালে ফেরত আনতে হবে। হাসপাতালের কর্মী দিয়ে বাড়ি পাঠাতে হয় বলে যাতায়াতের ভাড়ার জন্য ভর্তির সময় জামানত বাবদ টাকা জমা রাখা হচ্ছে।

ভর্তির সময় রোগীর হালনাগাদ নাগরিকত্বের সনদ ও জন্মসনদ রাখা হচ্ছে। রোগী ও অভিভাবকের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপিও রাখা হচ্ছে। মা-বাবা, ভাই-বোন ও স্বামীর ক্ষেত্রে স্ত্রী, স্ত্রীর ক্ষেত্রে স্বামী—এমন অভিভাবকদের রোগী ভর্তির জন্য চিকিৎসকদের বোর্ডে উপস্থিত থাকতে হচ্ছে। ভর্তি ফি ১৫ টাকার পাশাপাশি সাধারণ ও মাদকাসক্ত পেয়িং বেডের এক মাসের ভাড়া বাবদ ৯ হাজার ৭৫০ টাকা জমা রাখা হচ্ছে।

হাসপাতালটিতে রোগীর সঙ্গে অভিভাবকেরা থাকতে পারেন না। ভর্তির পর দেখা করারও সুযোগ নেই। নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডের রোগীদের কেউ কেউ ওষুধ বা খাবার না খেলে কর্মচারীরা বেত দিয়ে মারেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেল। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বলেন, একটু কঠোর না হলে তাঁদের মানানো যায় না।

রোগী ভর্তির সময় হাসপাতালের মসজিদ উন্নয়নের জন্য ১০০ টাকা এবং রোগী কল্যাণ তহবিলের জন্য ২০০ টাকা করে রাখা হচ্ছে। কর্মরত ব্যক্তিরা জানান, মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণে স্থায়ী বরাদ্দ না থাকায় এটা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ভর্তির প্রথম দিন রোগীর খাবারের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। খাবার ও প্রথম দিনের অন্যান্য খরচের জন্য কল্যাণ তহবিলে এ টাকা রাখা হচ্ছে।

হাসপাতালটিতে এক্স-রে, ইসিজি ও রক্তের কিছু পরীক্ষা করা হচ্ছে। একসময় ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপির (ইসিটি) মতো থেরাপি পেতেন রোগীরা। বর্তমানে থেরাপির নষ্ট যন্ত্রটি পরিচালকের কক্ষে রাখা আছে। মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরিমাপ করার ইইজি পরীক্ষা করার যন্ত্রটিও নষ্ট।

পথ্য বা খাবারের জন্য রোগীপ্রতি বরাদ্দ ১৭৫ টাকা, এ টাকা দিয়েই চার বেলা খাবার দেওয়া হচ্ছে। তবে এই ১৭৫ টাকা থেকে ভ্যাট ও ইনকাম ট্যাক্স বাবদ ১৮ শতাংশ কেটে রাখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এই টাকায় পুষ্টিমান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া একই ধরনের খাবার খেতে চান না অনেকে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক মো. এহিয়া কামাল প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালটিতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা রোগীর লাইন লেগেই থাকে। শয্যাস্বল্পতায় সবাইকে ভর্তি করা সম্ভব হয় না। মানসিক রোগ অনেকটা ডায়াবেটিস রোগের মতো। নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। হাসপাতালে অন্যান্য অসুস্থ রোগীর সঙ্গে থাকলে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাই রোগীর সুস্থতার জন্য পরিবারের যত্নও প্রয়োজন।

জনবলসংকটে ব্যাহত সেবা

১৯৯৬ সালে হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যার করা হলেও জনবলকাঠামো পরিবর্তন করা হয়নি। হাসপাতালে তিনটি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পদ আছে। এর মধ্যে একজন দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত, গত বছর একজন অবসরে গেছেন, আরেকজন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে একজন ইকোলজিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার দায়িত্ব পালন করছেন।

পদ না থাকায় হাসপাতালটির সহকারী অধ্যাপক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সৌবর্ণ রায় মেডিকেল অফিসারের পদে কাজ করছেন। তিনি জানান, হাসপাতালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই সংযুক্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন।

সৌবর্ণ রায় বলেন, ‘বর্তমানে মোবাইল, ইন্টারনেট, পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত, পড়াশোনায় মনোযোগ কম—এমন রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। প্রসবপরবর্তী নানা জটিলতা নিয়ে নারীরা আসছেন। মানসিক রোগীদের চিকিৎসায় কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি বিশেষায়িত বিভাগ এবং দক্ষ জনবল থাকা জরুরি।’

হাসপাতালটিতে সিনিয়র কনসালট্যান্টের দুটি পদই শূন্য। ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট, বায়োকেমিস্ট, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, সহকারী শরীরচর্চা প্রশিক্ষকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য। সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কারের চারটি পদের মধ্যে দুটি, ইইজি টেকনিশিয়ানের দুটি পদের মধ্যে একটি, সহকারী অকুপেশনাল থেরাপিস্টের ৯টি পদের মধ্যে ৪টিই শূন্য। সব মিলিয়ে (চিকিৎসকসহ অন্যান্য) প্রথম শ্রেণির ৩৮টি পদের মধ্যে ১১টি শূন্য। দ্বিতীয় শ্রেণির ৩১৬টি পদের মধ্যে ১০টি, তৃতীয় শ্রেণির ১১৯টি পদের মধ্যে ২৩টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ১৭০টি পদের মধ্যে ১০৯টি পদ শূন্য। মোট ৬৪৩টি পদের মধ্যে ১৫৩টি পদ শূন্য। অবসর, বদলি ও মারা যাওয়ায় পদগুলো শূন্য হয়েছে।

১৯৯৪ সালে ওয়ার্ডবয় হিসেবে কাজ শুরু করা মো. বজলুর রহমান বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের ‘সরদার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, এক ওয়ার্ডে কর্মীরা কাজ করলে অন্য ওয়ার্ডের কাজ ঠিকমতো হয় না। রোগীদের ‘আক্রমণ’ ঠেকানো থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজ করতে গিয়ে পেরেশানি পোহাতে হয়। রোগীরা কখনো কামড় দেন, গলা টিপে ধরেন। তবে কর্মীদের কোনো ঝুঁকি ভাতা নেই।

৪ নম্বর কক্ষের মেঝেতে থাকা আবু সাইদকে পরিষ্কার করিয়ে দেওয়ার জন্য সেদিন দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে পাওয়া গেল না। ওয়ার্ডের অন্য রোগীদের কয়েকজন তাঁদের বুদ্ধিতে যতটুকু কুলায়, সেভাবেই সাইদকে হুইলচেয়ারে বসানো এবং জামা পরানোর চেষ্টা করছিলেন।

খাওয়া ও ঘুমানো ছাড়া কিছু করার নেই

হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খাওয়া আর ঘুমানো ছাড়া তেমন কিছু করার নেই। ওয়ার্ডের ভেতরেই গোসলের ব্যবস্থা। পরনের কাপড় নিজেদের ধুতে হয়। ওয়ার্ড থেকে খাওয়ার রুমে গিয়ে খাবার খান রোগীরা। খাওয়ার আগে খাবারের পাত্র নিতে সহায়তা করার পাশাপাশি খাওয়ার পর নিজেদের প্লেট ধুতে হয়। খাওয়া শেষে লাইন ধরে নির্দিষ্ট কক্ষে ফেরার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা একজন একজন করে গুনে দেখেন হিসাব ঠিক আছে কি না। নিজের কাপড় ধোয়া, প্লেট ধোয়া—এমন কিছু কাজ ছাড়া আর কিছু করার নেই। একসময় রোগীদের জন্য তাঁত ও বেতের জিনিস তৈরি, কাঠের কাজ, দরজির কাজসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। রোগীরা বিভিন্ন পণ্য তৈরি করতেন। এখন সবই বন্ধ। এসব কারিগরি প্রশিক্ষণ ভবনে আনসার বাহিনীর সদস্যরা থাকছেন।

বিনোদন বলতে ওয়ার্ডের গ্রিলের কাছে দাঁড়িয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে থাকা। এ টেলিভিশন রয়েছে নার্সরা যেখানে বসেন, সেখানকার দেয়ালে। রোগী ও টেলিভিশনের মাঝখানে অনেকটাই দূরত্ব। কেউ কেউ মাঝেমধ্যে চ্যানেল পাল্টে দেওয়ার দাবি করেন। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে উদাস ভঙ্গিতে নিজের বিছানার দিকে হাঁটা দেন কেউ কেউ। আগে ওয়ার্ডের মধ্যে বসে সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে গান শোনানোর ব্যবস্থা ছিল, এখন তা–ও নেই।

ক্যারম বোর্ড, দাবার বোর্ড, একটি কাচের ছোট আলমারিতে কিছু বই ও চারটি পত্রিকা রাখা আছে মিলনায়তনে। তুলনামূলকভাবে ভালো রোগী ছাড়া অন্যদের ওয়ার্ড থেকে বাইরে বের করা হয় না। নারীদের জন্য বাগান করার কথা থাকলেও তা আলোর মুখে দেখেনি। অবশ্য গোলাপসহ কিছু ফুলের গাছ আছে হাসপাতাল চত্বরে।

তবে হাসপাতালটিতে কর্মরত ব্যক্তিরা সুদিনের সম্ভাবনা দেখছেন। এখানে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট করার জন্য সম্প্রতি একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন দিয়েছে। ১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির শুরু হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক স্নাতকোত্তর পাঠ্যক্রম, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু; টেলিমেডিসিন সেবা সম্প্রসারণ, পুনর্বাসনকেন্দ্রসহ নানা কিছু থাকার কথা। আশা করা হচ্ছে, এসবের মাধ্যমে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন যথাযথভাবে হবে।

তাঁদেরও কি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হবে!

জীবনের দীর্ঘ সময় হাসপাতালের চার দেয়ালের ভেতরে কাটিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন সাইদ হোসেনের মতো ব্যক্তির সংখ্যা ৭। ঢাকার শাহানারা আক্তার ২৬ বছর বয়সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, এখন বয়স ৫৩ বছর। ২৫ বছরের অনামিকা বুবির বয়স হয়েছে ৫১ বছর। ২১ বছরের জাকিয়া সুলতানার ৩৭ বছর, ২৫ বছরের নাইমা চৌধুরীর ৪০ বছর, ২৩ বছরের গোলজার বিবির ৪৮, ৩২ বছরের শিপ্রা রানী রায়ের বয়স হয়েছে ৫৮ বছর।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মেজবাহুল ইসলাম হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে পারছেন না—এমন ব্যক্তিদের বাড়ি পাঠানোর জন্য ২০১৪ সালে একটি রিট করেছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভর্তির সময় ভুল ঠিকানা দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে তাঁদের বাড়ি পাঠানো যাচ্ছে না। রিট করার সময় সংখ্যাটি ছিল ২৩। রিটের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কয়েকজনকে বাড়ি পাঠাতে পেরেছিল। অন্যরা হাসপাতালেই মারা গেছেন। যাঁরা জীবিত, তাঁদের পুনর্বাসনের বিষয়টি এখনো আদালতে বিচারাধীন।

হাসপাতালে গিয়ে জানা গেল, ঢাকার নাজমা নিলুফার ২৮ বছর বয়সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, হাসপাতালেই ৬৩ বছর বয়সে মারা যান। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে স্থানীয় কবরস্থানে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে তাঁকে দাফন করা হয়।

‘পরিবার মনে হয় আমার কথা ভুইলেই গেছে’

ভর্তির পর পরিবারের সদস্যদের অনুমতি নিয়ে নারীদের চুল একদম ছোট করে কেটে দেওয়া হয়। মাথায় উকুন হয়। এ ছাড়া মারামারি লাগলে চুল টানাটানি করেন বলে এ ব্যবস্থা।

১৩ নম্বর নারী ওয়ার্ডের সামনে গেলে একজন আপন মনে বললেন, ‘পরিবার মনে হয় আমার কথা ভুইলেই গেছে।’ আরেকজন বললেন, ‘আমি কি বুঝি না, ভুলায়–ভালায় আমারে এইখানে রাইখ্যা গেছে। এইটা তো জেলখানা।’ সাংবাদিক পরিচয় জানার পর একজন গম্ভীর মুখে বললেন, ‘দেশের সবাই তো জাইন্যা যাইব আমরা পাগল!’ এ প্রতিবেদক যাতে তাঁদের বাড়িতে ফোন করেন, তেমন বায়না ধরলেন কয়েকজন। ছুটির ব্যবস্থা করতে পারবেন কি না, তা–ও জানতে চাইলেন। একজন নিজে থেকেই বললেন, ‘শেখ হাসিনা (সাবেক প্রধানমন্ত্রী) তাঁকে এখানে দিয়ে গেছেন; আর শেখ হাসিনা পাকিস্তানে পালিয়ে গেছেন।’

বিভিন্ন ওয়ার্ডে গেলে রোগীর বয়স যা-ই হোক, একেকজন শিশুদের মতো ছড়া বলতে থাকেন। কেউ গান গাওয়া শুরু করেন। পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেও শোনান। কেউ কেউ নেচেও দেখালেন। বয়স ও পরিবেশ–পরিস্থিতি ভুলে তাঁরা একেকজন শিশুর মতো আচরণ করতে থাকেন। অনেকে গালিও দেন। বাদাম খাওয়ার জন্য বকশিশ দেওয়ার আবদার করেন। এই রোগীদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় কয়েকজন বললেন, ‘আপা, আবার আসবেন।’

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সরোয়ার মোরশেদ, প্রতিনিধি, পাবনা)
পাবনার মানসিক হাসপাতাল
পাবনার মানসিক হাসপাতাল ছবি: হাসান মাহমুদ

তরুণ প্রজন্মের হাতে স্বৈরাচারের পতন, কিন্তু নির্বাচনে পুরনো শক্তিই এগিয়ে

বিবিসির প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ছিলেন তরুণরা। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সেই আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন ঘটায়। কিন্তু এক বছর না যেতেই প্রশ্ন উঠছে—এই বিপ্লব কি আদৌ তরুণদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে পারবে?

২৪ বছর বয়সী রাহাত হোসেন ছিলেন সেই আন্দোলনের একজন মুখ। ২০ জুলাই ঢাকায় আন্দোলন দমনের সময় পুলিশের গুলিতে তার বন্ধু এমাম হাসান তাইম ভূইঁয়া নিহত হন। সেই মুহূর্তে আহত বন্ধুকে টেনে নিরাপদ স্থানে নেয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেও গুলিবিদ্ধ হন রাহাত। ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে প্রাণ হারান। দুই সপ্তাহের মধ্যেই সরকার ভেঙে পড়ে এবং শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।

এই আন্দোলনকে বিশ্বজুড়ে জেন জি বা তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে সফল গণ-অভ্যুত্থান হিসেবে দেখা হয়। আন্দোলনের কয়েকজন ছাত্রনেতা অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদেও জায়গা পান। ধারণা করা হচ্ছিল, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আধিপত্যের পর এবার তরুণরাই রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।কিন্তু আগামী সপ্তাহের জাতীয় নির্বাচন সামনে আসতেই সেই আশায় বড় ধাক্কা লেগেছে।

জাতীয় নির্বাচন সামনে আসতেই দেখা যাচ্ছে, ছাত্রদের নতুন গড়া রাজনৈতিক দলটি ভাঙনের মুখে এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নারীরা অনেকটাই কোণঠাসা। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসছে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোই।

রাহাত বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনে তিনি যোগ দিয়েছিলেন সরকারি চাকরিতে নতুন কোটা ব্যবস্থার প্রতিবাদে। কিন্তু আন্দোলন চলতে চলতে তা রূপ নেয় ‘স্বৈরশাসনের অবসান’—এই একক লক্ষ্যে। এতে ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মীয় নানা পটভূমির তরুণ-তরুণীরা যুক্ত হন।

তবে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার তার প্রত্যাশিত শান্তি, সমতা, ন্যায়বিচার ও সুবিচারের ভিত্তিতে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

ছাত্রনেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-কে তিনি অভিজ্ঞতাহীন মনে করেন। বরং তার দৃষ্টি কেড়েছে অনেক পুরোনো একটি দল—জামায়াতে ইসলামী।

ইসলামপন্থি দলটি দীর্ঘদিন ছোট জোটসঙ্গী হিসেবে থাকলেও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তারা নিজস্ব শক্তি নিয়ে সামনে এসেছে।

১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। সে সময় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন, ঘরছাড়া হন এক কোটির বেশি মানুষ। জামায়াতের তৎকালীন কিছু নেতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানিদের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।

তবে রাহাতের মতে, সেই ইতিহাস এখন আর বড় বাধা নয়। তার বিশ্বাস, জামায়াত আধুনিক হয়েছে। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের সহযোদ্ধা ও ছাত্রদের জামায়াত নানাভাবে সহায়তা করেছে।

জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান বিবিসিকে বলেছেন, তার দল দুর্নীতি বন্ধ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে। উচ্চমাত্রার দুর্নীতির ইতিহাস থাকা দেশে এসব বাস্তবায়ন কঠিন হলেও অনেক ভোটারের কাছে এই বার্তা সাড়া ফেলেছে।

ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তৌফিক হক বলেন, একাত্তরের অনেক পরে জন্ম নেয়া তরুণ ভোটাররা জামায়াতের অতীতকে আলাদা করে দেখতে পারেন এবং একে ‘লাল দাগ’ হিসেবে দেখেন না। তার কথায়, এটি প্রজন্মগত বিষয়। তারা এই বিতর্কে আটকে থাকতে চায় না।

তৌফিক হকের মতে, তরুণ ভোটারদের চোখে জামায়াতও শেখ হাসিনার শাসনের ভুক্তভোগী। রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি তাদের অনেক নেতা কারাবন্দি হয়েছিলেন।

গত বছরের সেপ্টেম্বর দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন–সমর্থিত প্রার্থীরা ভূমিধস জয় পায়। অনেকেই একে জাতীয় রাজনীতির মনোভাবের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন।

বিশেষ করে, স্বাধীনতার পর এই প্রথম ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ইসলামপন্থি দল ছাত্র সংসদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

দেশে যেখানে প্রতি ১০ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় চারজনের বয়স ৩৭ বছরের নিচে, সেখানে এটি ছাত্রনেতাদের জন্য বড় সতর্ক সংকেত হয়ে উঠেছে।

ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) প্রতি আস্থার ঘাটতি ছাত্রনেতৃত্বের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বর্তমানে এনসিপির নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান ২৭ বছর বয়সী আসিফ মাহমুদ বলেন, আমরা আশা করেছিলাম আরও ভালো করব।

তবে তার দাবি, শুরু থেকেই পরিস্থিতি তাদের পক্ষে ছিল না। তিনি বলেন, গত ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশ মূলত দুটি দলই শাসন করেছে। আমরা নিজেদের প্রমাণ করার চেষ্টা করছি।

এই বাস্তবতায় এনসিপি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়। গত ডিসেম্বর মাসে দলটি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে একটি বহুদলীয় জোটের ঘোষণা দেয়।

জামায়াতের মতো এনসিপিও দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে তাদের ইশতেহারে রয়েছে—গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের জন্য বিচার, ভোটের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করা এবং কর ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

আসিফ মাহমুদের ভাষায়, কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও জামায়াতের তৃণমূল সাংগঠনিক শক্তির সহায়তা এনসিপির প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, আমরা বরাবরই বলেছি, আমরা ইসলামপন্থি দল নই। এটি আদর্শিক জোট নয়।

তবে এই জোট ঘিরেই তৈরি হয়েছে বড় বিতর্ক। জামায়াত যে ৩০টি আসনে এনসিপিকে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে, সেখানে নারী প্রার্থী মাত্র দুজন। অন্যদিকে জামায়াত নিজে ২০০টির বেশি আসনে প্রার্থী দিয়েছে, যাদের সবাই পুরুষ।

এনসিপির জ্যেষ্ঠ নারী নেত্রী তাসনিম জারা এই সমঝোতাকে নৈতিক সীমারেখা অতিক্রম বলে উল্লেখ করেছেন। এই কারণেই তিনি ও আরও কয়েকজন নারী নেতা দল ছাড়েন।

২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী শিমা আক্তার, যিনি আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন, বলেছেন- তারা আমাদের একপাশে ঠেলে দিতে চেয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, গণ-অভ্যুত্থানে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এখনও মূলত পুরুষপ্রধান।
তার প্রশ্ন, নারীরা কোথায়?

আন্দোলনের পর শিমাসহ নারী আন্দোলনকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণের শিকার হন।

শিমা বলেন, কিছু মিম ভিডিও ছিল ভয়ংকর ও অত্যন্ত অপমানজনক। আমাদের চরিত্রহনন করা হয়েছে, ট্রল করা হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা নিয়ে কটূক্তি, বিয়ে নিয়ে কুৎসা এবং এমনকি শিমার গায়ের রঙ নিয়েও আক্রমণ চালানো হয়।

এনসিপি ও জামায়াত—দুই দলই নারীদের কোণঠাসা করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম হওয়ার পেছনে বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো দায়ী। জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান বলেন, ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে বলে তিনি আশাবাদী।

তবে শিমা আক্তার এই ব্যাখ্যাকে ‘পুরুষতান্ত্রিক অজুহাত’ বলে মন্তব্য করেন।

তিনি জানান, আপাতত তার ঝোঁক বিএনপির দিকে, যারা ২৫০টির বেশি প্রার্থীর মধ্যে ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি মনে করেন- এটি মন্দের ভালো।

এনসিপির দুর্বল জনসমর্থন এবং আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে বিএনপি—যারা নিজেদের নতুন করে একটি উদার গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে ব্র্যান্ডিং করছে।

আওয়ামী শাসনামলে হাজার হাজার কর্মী ও শীর্ষ নেতা কারাবন্দি হওয়ার পর, এখন নির্বাচনী লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় দল বিএনপি। এর ফলে ছাত্রদের দলটিও আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।

আওয়ামী লীগের মতোই বিএনপিও রাজনৈতিক বংশের সঙ্গে যুক্ত। শেখ হাসিনা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। অন্যদিকে, বিএনপির বর্তমান নেতা তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার ছেলে। খালেদা জিয়া ছিলেন সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী।

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বর্তমানে বিএনপির প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিবিসিকে বলেন- “আপনি কোনো রাজনৈতিক বংশ থেকে এসেছেন কি না— এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তবে আইরোনি (বিদ্রুপ) হলো— এই বংশানুক্রমিক রাজনীতির ধারাবাহিকতা সম্ভব হয়েছে মূলত ছাত্রনেতৃত্বাধীন সেই অভ্যুত্থানের ফলেই। সেই আন্দোলনের পরই ১৭ বছর স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা তারেক রহমান দেশে ফিরতে পেরেছেন। শেখ হাসিনার বিদায়ের পর তারেক রহমান ও তার মায়ের বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির মামলাগুলো থেকে তারা খালাস পান। যেগুলোকে তারা বরাবরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছিলেন।

তারেক রহমান জামায়াতকে ধর্মীয় আবেগ কাজে লাগিয়ে ভোট আদায়ের অভিযোগে সমালোচনা করেছেন। তিনি অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, পাশাপাশি একটি ‘রেইনবো নেশন’ (রংধনু রাষ্ট্র)-এর কথা বলেছেন। যেখানে নতুন একটি জাতীয় পুনর্মিলন কমিশন দেশের বিভাজন কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।

শেখ হাসিনা ১৫ বছর বাংলাদেশ শাসন করেছেন। তার আমলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হলেও, বিরোধী কণ্ঠ দমনে ক্রমেই কঠোর হন তিনি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তার, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ছিল নিত্যনৈমিত্যিক বিষয়। ২০২৪ সালের দমন-পীড়নের ঘটনায় গত বছর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ  ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

নির্বাসন থেকে শেখ হাসিনা তার দলের ওপর নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়েছেন। তার সঙ্গে ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন আওয়ামী লীগের আরও অনেক শীর্ষ নেতা। দেশে থাকা কয়েকজন ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন।

বিবিসি আওয়ামী লীগের এক নেতার সঙ্গে কথা বলেছে, যিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে কখনোই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শেখ হাসিনা নির্দেশ দিলে দল ও তাদের সমর্থকেরা নির্বাচন প্রতিরোধ করবে। তিনি যদি বলেন ভোটকেন্দ্রে না যেতে, আমরা যাব না। যদি তিনি বলেন নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে, তাহলে আমরা নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করব।

স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে রাজনৈতিক গ্রেপ্তার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা তিনি মিথ্যা ও মনগড়া বলে দাবি করেন।

আগামী সপ্তাহের ভোটের পর ছাত্ররা বুঝতে পারবেন। তাদের বিপ্লব এবং রক্তপাত আদৌ সার্থক ছিল কি না।

যেখানে বন্ধুকে হারিয়েছেন, সেই ঢাকার যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের পাশে বসে রাহাত এখনো সব পুলিশ সদস্যের বিচার শেষ হওয়ার অপেক্ষায়।

তাইম ভূঁইয়ার নিজের বাবা একজন পুলিশ কর্মকর্তা। ছেলের মৃতদেহ শনাক্ত করার সময় তিনি বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, স্যার, একটা ছেলেকে মারতে কতগুলো গুলি লাগে?

হোসেন বলেন, সেদিনের স্মৃতি এখনও তাকে তাড়া করে বেড়ায়।

দেশের ইন্টারনেট চালু হওয়ার আট দিন পর তিনি সেই ভিডিওটি দেখেন। তিনি বলেন, আমার পুরো চিৎকার শোনা যায়, আমি অনবরত কেঁদেছি। তিনি তার অন্যান্য অভ্যুত্থানের সহযোদ্ধাদের সঙ্গে এক বছর পর, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের প্রথম বার্ষিকী উদযাপন করেন।

তবে হোসেন স্বীকার করেন, তাদের নতুন বাংলাদেশ এখনও আসেনি। তার বিশ্বাস, একটি নির্বাচিত সরকার সংস্কার না করা পর্যন্ত তা সম্ভব নয়। তার মন্তব্য, তেঁতুল গাছ থেকে আম আশা করা যায় না।

https://mzamin.com/uploads/news/main/201942_fredom.webp

গাজিয়াবাদে তিন বোনের ‘আত্মহত্যা’: বাবা সম্পর্কে বেরিয়ে এল নতুন আরও তথ্য

ভারতের গাজিয়াবাদে বহুতল ভবনের ৯ তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে তিন বোনের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। এতে দেখা গেছে, এ তিন শিশুর বাবা চেতন কুমারের সঙ্গে ২০১৫ সালের আরেকটি আত্মহত্যার ঘটনার যোগসূত্র আছে। ফলে তিন বোনের মৃত্যুর ঘটনায় চলমান তদন্তটি নতুন মোড় পেয়েছে।

তদন্তে দেখা গেছে, দুই স্ত্রী থাকা অবস্থাতেই চেতন কুমার অন্য এক নারীর সঙ্গে ‘লিভ–ইন’ সম্পর্কে ছিলেন। ২০১৫ সালে সেই নারী সাহিবাবাদ এলাকার রাজেন্দ্র নগর কলোনির একটি ফ্ল্যাটের ছাদ থেকে পড়ে মারা যান। পরে এ ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে সাব্যস্ত করা হয় এবং এ–সংক্রান্ত মামলার বিচারকাজ বন্ধ হয়ে যায়।

বার্তা সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উপপুলিশ কমিশনার নিমিষ প্যাটেল এ তথ্য দিয়েছেন।

পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ ঘটনাও এখন গাজিয়াবাদে তিন কন্যাশিশুর আত্মহত্যা তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ, এর মধ্য দিয়ে ওই শিশুদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানার চেষ্টা চলছে।

ওই তিন বোনের নাম পাখি (১২), প্রাচী (১৪) ও নিশিকা (১৬)। গত বুধবার ভারত সিটি আবাসিক কমপ্লেক্সে অবস্থিত অ্যাপার্টমেন্টের নবম তলা থেকে লাফ দেয় তারা। অভিযোগ অনুযায়ী, এ তিন শিশু অনলাইনে কোরীয় গেমের প্রতি আসক্ত ছিল। তাদের বাবা-মা গেম খেলায় বাধা দিয়েছিলেন এবং ফোন কেড়ে নিয়েছিলেন।

মেয়েরা ঘরের দরজা ভেতর থেকে আটকে দেয় এবং বারান্দায় গিয়ে একে একে নিচে লাফিয়ে পড়ে। রাত ২টা ১৫ মিনিটের দিকে এ ঘটনা ঘটে। লাফিয়ে পড়ার শব্দে আবাসিক কমপ্লেক্সের অনেকে জেগে যান। ওই শিশুদের উদ্ধার করে দ্রুত লোনি এলাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

গাজিয়াবাদের এ ঘটনা তদন্ত করতে নেমে কর্তৃপক্ষ জানতে পেরেছে, কুমারের বর্তমানে তিনজন স্ত্রী আছেন। তাঁরা হলেন  সুজাতা, হীনা ও টিনা। সম্পর্কে তাঁরা তিন বোন। এর মধ্যে সুজাতা হলেন নিশিকার মা আর হীনা প্রাচী ও পাখির মা। তৃতীয় স্ত্রী টিনার ঘরে কুমারের আরেকটি মেয়ে আছে। নাম দেবু (৪)। তাঁরা সবাই একসঙ্গে থাকছিলেন।

চেতন কুমার শেয়ারবাজারের একজন বিনিয়োগকারী। পুলিশের তথ্যমতে, তাঁর ২ কোটি রুপি ঋণ আছে। এমনকি বিদ্যুতের বিল মেটানোর জন্য মেয়েদের মুঠোফোন পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলেন তিনি। ওই মেয়ে শিশুরা দুই বছর ধরে স্কুলেও যাচ্ছিল না।

কোরীয় আসক্তি নিয়ে তদন্ত

তদন্তে জানা গেছে, তিন শিশু কোরীয় বিনোদন মাধ্যমগুলোর প্রতি বিশেষভাবে আসক্ত ছিল। আট পৃষ্ঠার ছোট ডায়েরিতে কোরীয় সংস্কৃতির প্রতি তাদের এমন আসক্তির পাশাপাশি পারিবারিক অশান্তির ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

‘আত্মহত্যার নোটে’ বাবাকে উদ্দেশ করে ওই তিন শিশু লিখেছিল, ‘আমরা কোরীয়দের ভালোবাসি।’ ধারণা করা হচ্ছে, ওই তিন শিশু এমন একটি কোরীয় গেম খেলছিল, যার শেষ ধাপে আত্মহত্যা করতে হতো। তারা অনলাইনে নিজেদের জন্য কোরীয় নামও বেছে নিয়েছিল।

পুলিশ বলেছে, তারা ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবেই বিবেচনা করছে। শিশুরা গেমের প্রতি আসক্ত ছিল বলে তাদের বাবা যে দাবি করেছেন, সেটিকে তদন্তে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ দাবির সত্যতা যাচাই করার পাশাপাশি পারিবারিক জটিলতা–সংক্রান্ত বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দিল্লির উপকণ্ঠে গাজিয়াবাদের এ আবাসিক এলাকার একটি ভবনের নয়তলা থেকে তিন বোন লাফিয়ে পড়ে মারা যায়। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, নয়াদিল্লি
দিল্লির উপকণ্ঠে গাজিয়াবাদের এ আবাসিক এলাকার একটি ভবনের নয়তলা থেকে তিন বোন লাফিয়ে পড়ে মারা যায়। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, নয়াদিল্লি। ছবি: এএনআই

কুল উৎপাদনে রাজশাহী শীর্ষে, এরপরেই ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা by ইয়াহইয়া নকিব

একসময় শুধু বসতবাড়ির আঙিনায় লাগানো গাছেই কেবল দেশি ফল বরই পাওয়া যেত। এখন সে বরই বা কুলের চাষ হয় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। দিন দিন চাহিদাও বেড়েছে দেশি ফলটির। বাসাবাড়ির পাশাপাশি অফিসেও ‘কুল-বরই’ খাওয়ার রেওয়াজ তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে দেশি জাতের টক–মিষ্টি বরই থেকে শুরু করে আপেল কুল, বাউকুল, থাইকুল, বনসুন্দরীসহ উচ্চফলনশীল বিভিন্ন জাতের মিষ্টি বরইয়ের বাণিজ্যিক আবাদ হচ্ছে। কুলের মৌসুম শুরু হয় জানুয়ারিতে, যা শেষ হয় এপ্রিলে। বছরের এই সময় অন্য দেশি ফল তুলনামূলক কম থাকায় ভালো বাজার পায় কুল।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপযোগী মাটি ও আবহাওয়ার কারণে দেশে সবচেয়ে বেশি কুল উৎপাদন হয় রাজশাহী ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিসিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে কুল উৎপাদন হয় ১ লাখ ১ হাজার ৫২৩ টন। এর ভিত্তিতে বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ও কৃষিবিদ মো. মেহেদী মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি কেজির দাম ১০০ টাকা করে ধরলেও দেশে উৎপাদিত কুলের বাজারমূল্য এক হাজার কোটি টাকার বেশি হবে।

আগের ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১ লাখ ৮১৮ টন কুল উৎপাদন হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২২–২৩ ও ২০২১–২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল যথাক্রমে ৯৭ হাজার ও ৯৫ হাজার টন। কৃষিবিদ ও ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলেন, প্রকৃত উৎপাদন সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে।

বাজারদর ও লাভ

মৌসুমের শুরুতে এখন ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি কুল (বড়) ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। ছোট আকারের দেশি বরই বিক্রি হয় ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে। কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা নাহিদ হোসেন বলেন, কিছুদিনের মধ্যে সরবরাহ বাড়লে দাম কমতে পারে।

মাগুরার নাসির অ্যাগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী নাসির হোসেন প্রথম আলোকে জানান, তিনি এবার পাঁচ বিঘা জমিতে কুল চাষ করছেন। প্রতি একরে খরচ পড়েছে প্রায় ২ লাখ টাকা। প্রতি মণ কুল এখন আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাতে একরপ্রতি ৬ থেকে ৭ লাখ টাকার কুল বিক্রি হতে পারে। এ থেকে তিনি একরে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লাভ হবে বলে আশা করছেন।

শীর্ষে রাজশাহী

২০২৩–২৪ অর্থবছরের উৎপাদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজশাহী জেলায় সর্বোচ্চ ৮ হাজার ৭৫৯ টন কুল উৎপাদন হয়েছে। ৭ হাজার ২২৯ টন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ। এ ছাড়া ৪ হাজার ১২৮ টন উৎপাদন নিয়ে কুমিল্লা আছে তৃতীয় স্থানে। এ ছাড়া কুষ্টিয়া ৩ হাজার ৬৩৬ টন ও চট্টগ্রাম ৩ হাজার ৫৯৪ টন নিয়ে যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, উপযোগী মাটি ও সহজ বাজারজাতের ব্যবস্থার কারণে রাজশাহী ও ময়মনসিংহে কুল চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ জেলার উপপরিচালক মো. এনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এখানকার মাটি কুল চাষের উপযোগী। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় বাজারজাতকরণ সহজ হয়। ফলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পান। তাই ফুলবাড়িয়া ও ভালুকায় ব্যাপকভাবে কুলের চাষ হচ্ছে।

বিভিন্ন জাত

কৃষিবিদদের মতে, দেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় বনসুন্দরী, আপেল কুল ও স্থানীয় জাত ঢাকা–১৯ ও বাউকুল। ১ ফুট উচ্চতার একটি গাছে এক বছরের মধ্যেই ২০ কেজি পর্যন্ত কুল পাওয়া যায়। প্রতি একর জমিতে গড়ে ৩০০টি গাছ লাগানো যায়। পরের বছর গাছের গোড়া থেকে এক হাত পর্যন্ত রেখে বাকিটা ছেঁটে দিতে হয়। সেখান থেকে নতুন ডালপালা গজায়। তবে ডালপালা সঠিকভাবে ছাঁটাই না হলে ফলন কমে যায়।

দেশে বাণিজ্যিক কুল চাষের সূচনা সম্পর্কে কৃষিবিদ মো. মেহেদী মাসুদ জানান, ২০১৪ সালের দিকে ভারতের মহারাষ্ট্র ও কাশ্মীর থেকে আনা জাত দিয়ে দেশে কুলের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। পরে স্থানীয় হর্টিকালচার সেন্টার থেকে এসব চারা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বাউকুলে বিপ্লব

কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, কুল মূলত বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও মিয়ানমার অঞ্চলের ফল। আশির দশকে ভারত থেকে উন্নত জাত আমদানির পর চাষ বাড়তে থাকে। কুল খরাসহিষ্ণু, রোগবালাইও তুলনামূলক কম হয়। অর্থাৎ এটি সহজে উৎপাদন করা যায়। শীতের শেষ দিকে অন্য দেশি ফল না থাকায় কুল ভালো কদর পায়।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মসিউর রহমান বলেন, বারি থেকে পাঁচটি কুলের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে নারিকেলি জাতটি কুমিল্লা এলাকায় বেশি চাষ হচ্ছে। আপেল কুল এনেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) থেকে বাউকুল জাত উদ্ভাবনের পর কুল চাষে বিপ্লব ঘটে।

মো. মসিউর রহমান বলেন, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্য দেশি ফল তেমন থাকে না। জানুয়ারির পর দেশি কমলাও পাওয়া যায় না। বিদেশি আপেল ও কমলার দাম বেশি। এ ছাড়া ফল খাওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বেড়েছে এবং কুলের স্বাদও আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। এসব কারণে কুল জনপ্রিয় ফল হয়ে উঠেছে।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্যমতে, কুল পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। এটি রক্ত শোধন ও হজমে সহায়ক। পেটের গ্যাস ও অরুচি দূর করতে কুলের ফুল থেকে তৈরি ওষুধও ব্যবহৃত হয়।

মৌসুমের শুরুতেই রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে এখন হরেক রকমের কুল-বরইয়ের সমাহার দেখা যাচ্ছে
মৌসুমের শুরুতেই রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে এখন হরেক রকমের কুল-বরইয়ের সমাহার দেখা যাচ্ছে। ছবি : প্রথম আলো