Friday, March 6, 2015

পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে by এ কে এম শাহনাওয়াজ

ছোটবেলায় যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি, তখন দারুণ পুলিশভীতি ছিল। আমার ভয়ের প্রধান কারণ ছিল পুলিশের খাকি পোশাক, হাতে লাঠি, কাঁধে রাইফেল। আমাদের স্কুলে যাওয়ার পথে একটি পুলিশ ফাঁড়ি ছিল। এখনও আছে। সে সময় রিকশায় করে স্কুলে পাঠানোর বিলাসিতা অনেক পরিবারেরই ছিল না। আমাদেরও তাই। হেঁটেই যেতে হতো। মনে পড়ে আসা-যাওয়ার পথে পুলিশ ফাঁড়িটি নজরে আসতেই বুক ধক করে উঠত। চোখ প্রায় বন্ধ করে কোনোভাবে ফাঁড়ি এলাকা পার হতাম। একই কারণে সম্ভবত খাকি পোশাক পরা পাটকলের দারোয়ানকেও পুলিশ ভেবে ভয় পেতাম। পরে শৈশবেই ধীরাজ ভট্টাচার্যের ‘যখন পুলিশ ছিলাম’ বইটি পড়ি। ওই সময় থেকেই সম্ভবত পুলিশের প্রতি ভয় কাটতে থাকে। পুলিশকে মানবিক হিসেবেই দেখতে থাকি। অনেক দিন থেকেই আমাদের সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে, নাটকে পুলিশকে খল চরিত্রে দেখানো হয়। উপস্থাপন করা হয় দুর্নীতিপরায়ণ হিসেবে। সাহিত্যে জীবনের ছবিই প্রতিফলিত হয়। হয়তো ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ আছে বলেই কোনো কোনো পুলিশ সদস্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকতে পারেন।
অনেক বছর আগের কথা। বিশেষ প্রয়োজনে সাভার থানায় যেতে হয়েছিল। এর আগে থানায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল না। আমার প্রয়োজন ওসি সাহেবের সঙ্গে কথা বলার। তিনি বিশেষ কাজে বাইরে ছিলেন। চলে আসবেন। পরিচয় জেনে এসআই পদমর্যাদার একজন সমাদর করে বসালেন। চা খেতে খেতে কথা বলছিলাম। গরমের দিন। ঘরে একটি বৈদ্যুতিক পাখা ছিল। নষ্ট থাকায় থেমে আছে। আসবাবপত্রের অবস্থা ভালো না। জোড়াতালি দেয়া। দীনহীন অবস্থা। জানলাম সরকারি বরাদ্দের অপ্রতুলতার কথা। বুঝলাম অপরাধীদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে প্রয়োজন মেটাতে হয়। তা ছাড়া দায়িত্ব অনুযায়ী পুলিশের বেতন ও আনুষঙ্গিক সুযোগ সম্মানজনক নয়। এসব কারণেই সম্ভবত কোনো কোনো পুলিশ সদস্য দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তবে সামগ্রিকভাবে পুলিশকে নেতিবাচক চরিত্রে উপস্থাপন করা খুব বাস্তবসম্মত হবে না।
পুলিশের প্রতি বড় শ্রদ্ধা তৈরি হল মুক্তিযুদ্ধের সময়। রাজারবাগে পুলিশের যে বীরোচিত ভূমিকা রাখার কথা জেনেছি, তাতে তাদের দেশপ্রেম আমাকে মুগ্ধ করেছে। পুলিশের প্রতি আমার মনে শ্রদ্ধার আসন অনেক বেড়ে গিয়েছিল তখন। তাই যখন পুলিশ সদস্যদের কোনো বড় স্খলনের কথা সামনে আসে, তখন খুব কষ্ট পাই। মুক্তিযুদ্ধে আত্মাহুতি দেয়া বীর পুলিশ সদস্যদের কথা ভেবে ভীষণ বিব্রত হই।
কয়েক বছর আগের কথা। নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গিয়ে একজন অসাধারণ মেধাবী ছাত্রকে পাই। মাশরুর ওর নাম। ছ’ ফুটের ওপর লম্বা, সুদর্শন ছেলে। ও প্রায় দিনই ক্লাসের পর সুযোগ পেলে আমার কাছে আসত। নানা বিষয়ে কথা হতো। প্রচুর পড়াশোনা করত মাশরুর। আমার কাছ থেকে অনেক বইয়ের খোঁজ নিত। ওর কাছ থেকেও অনেক বইয়ের সন্ধান পেতাম। কথায় বুঝতাম দেশের প্রতি ভীষণ ভালোবাসা ওর। মাশরুরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষের দিকে তখন। ও জানাল বিসিএস পরীক্ষা দেবে। আমার পরামর্শ ও পরিচর্যা চায়। আমাকে বিস্মিত করে জানাল ওর একমাত্র লক্ষ্য পুলিশ ক্যাডারে চাকরি করা। কারণ জানতে চাইলাম। বলল, স্যার মুক্তিযুদ্ধে রাজারবাগে পুলিশের বীরত্বগাথা শুনে আমি গর্ববোধ করি। যখন নানা কারণে পুলিশের প্রতি মানুষ নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে, আমার তখন খুব খারাপ লাগে। আমি চাই পুলিশে যোগ দিয়ে পুলিশের সম্মান ফিরিয়ে আনায় ভূমিকা রাখতে। ওর কথায় আমি আপ্লুত হয়েছিলাম। মাশরুরের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এএসপি হিসেবে রাজধানীর এক মডেল থানায় দায়িত্বরত ছিল। আমি জেনেছি বেশ কিছু অসাধারণ সাফল্যে ও পুলিশ বিভাগে অনেকের নজর কেড়েছে। জানলাম এখন উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে রয়েছে।
এ দেশে রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কোনো সরকারই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ছে প্রশাসনের সর্বত্র। ক্ষমতার রাজনীতি কলুষিত করছে চারপাশের সব প্রতিষ্ঠানকে। সব ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনরা পুলিশ প্রশাসনকে তাদের রাজনীতির হাতিয়ার বানাতে চেয়েছে। ভেতরে ভেতরে রাজনীতিকরণও সম্পন্ন হয়েছে। পুলিশের উচ্চতর পদে পদ-পদায়ন, পদোন্নতিতে নাকি রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। এতে বৃদ্ধি পাচ্ছে পারস্পরিক ক্ষোভ ও হতাশা। অন্যান্য দিক ছাড়াও পুলিশের নিয়োগ বাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট। এ অবস্থা পুলিশের ভেতরকার শক্তিকে অনেক বেশি দুর্বল করে দেয়। রাজনীতিকরণের কুফল চারিত্রিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে পুলিশকে। এর দীর্ঘ কুপ্রভাব বয়ে বেড়াতে হবে এই প্রতিষ্ঠানকে। ‘ক্রস ফায়ার’ নামের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নির্দেশনাতেই হয়।
পুলিশকে অনেককাল ধরেই ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দলনের হাতিয়ার হিসেবে। এর পথ ধরে গ্রেফতার বাণিজ্য, ঘুষ বাণিজ্যের কথা আজকাল অনেক বেশি শোনা যাচ্ছে। সৎ পুলিশ অফিসার ও সদস্যরা এসব কারণে মানসিক পীড়নে ভুগছেন।
অনেক স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে নিকট অতীতে, যার কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। এর পেছনে তিনটি কারণের কথা অনেকেই বলে থাকেন। এক. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব, দুই. পুলিশের দুর্নীতিপরায়ণতা এবং তিন. পুলিশের সঠিক প্রশিক্ষণের অভাব। বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় নানা দিক থেকে পুলিশের সক্ষমতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ব্লগার অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের পর প্রশ্নটি অনেক বেশি সামনে চলে এসেছে। পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা এ ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা দেননি। পেট্রলবোমা মারা আর ককটেল ফোটানোর মাঝখানেই এবার বইমেলা হয়ে গেল। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী নিশ্চয়তা দিয়েছিল তারা নিñিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। উপরন্তু অভিজিৎ রায়কে হত্যার হুমকির ব্যাপারটি পুলিশকে অবহিত করা হয়েছিল আগেই। সেই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা বলয়ের ভেতর লোকারণ্যে ক’জন খুনি আড়াল থেকে গুলি নয়- অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করল, তার স্ত্রীকে আহত করা হল, তারপর খুনিরা বিনা চ্যালেঞ্জে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেল! কাছেপিঠে নিরাপত্তা বলয়ে নিয়োজিত পুলিশ থাকলেও কেউ এগিয়ে এলো না। এই যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে পুলিশের নিরাপত্তার আশ্বাসে মানুষ আশ্বস্ত হবে কীভাবে! আরও দু-একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসছে। বুঝলাম বোমাবাজদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারা দেশে পুলিশ নজরদারি করতে পারবে না। কিন্তু বলতেই হয়, হরতাল-অবরোধের প্রথম থেকেই বারবার নীলক্ষেত-নিউমার্কেট এলাকায় ককটেল মারা হচ্ছে, মানুষ আহত হচ্ছে, সেখানে পুলিশি তৎপরতা নেই কেন? ধরা পড়ছে না কেন হত্যাকারী? একইভাবে লক্ষ্মীবাজার-বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় উপর্যুপরি কয়েকবার বোমা হামলা হল, আগুনে পোড়ানো হল গাড়ি। একাধিক মানুষ আহত হল। পুলিশি কার্যকর নজরদারি থাকলে একই জায়গায় অপরাধীদের বারবার অপরাধ সংঘটনের সাহস থাকত না। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, এই চিহ্নিত বিশেষ এলাকাটি পুলিশি নজরদারির বাইরে রয়ে গেল কেমন করে? আমাদের দুর্ভাগ্য, কেতাবি ভাষায় পুলিশ জনগণের সেবক হলেও এসবের কোনো ব্যাখ্যা পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া যায় না।
এসব কারণে আমাদের সামনে পুলিশি নিরাপত্তার বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সত্যিই কি আমাদের দেশের পুলিশ বাহিনী এতটা দুর্বল? পুলিশের উল্লেখ করার মতো অনেক সাফল্য আছে। তাহলে কি পুলিশ বাধ্য হচ্ছে ব্যর্থতার কলংক তিলক কপালে পরতে? পূর্বসূরিদের গৌরবময় ঐতিহ্য ধারণ না করে নিজেদের নিষ্প্রভ করে তুলছে?
আমাদের ধারণা পুলিশি শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে গিয়ে পুলিশের ভেতরের নৈতিক ও আদর্শিক জায়গাটিকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার আমাদের দেশে নতুন নয়। বিএনপির শাসনামলে আমি একটি হলের প্রভোস্টের দায়িত্ব পালন করেছি। সহিংস ছাত্র সংঘাতের সময় সশস্ত্র সরকারদলীয় ছাত্রদের কখনও স্পর্শ করতে পারেনি পুলিশ। আওয়ামী লীগের শাসনযুগে ছাত্রলীগের দাপটও একই রকম। এখানেও পুলিশকে নীরব থাকতে হয়েছে। অনেক পুলিশ অফিসার একান্ত আলাপে তাদের অসহায়ত্বের কথা বলে থাকেন।
এভাবে পুলিশকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করতে গিয়ে বিনিময়ে এদের নৈতিক স্খলনকে প্রশ্রয় দিতে হচ্ছে শাসক দলকে। ফলে শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে পুলিশকে দুর্বল করে ফেলা হচ্ছে। দুর্নীতিপরায়ণ করে ফেলা হচ্ছে। এর ফল কখনও ভালো হতে পারে না।
হরতাল-অবরোধ ও সহিংসতায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখা, পরীক্ষা সচল রাখার জন্য আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে হলে পুলিশকে দৃঢ় ভূমিকা রাখতে হবে। এই দৃঢ়তা বাস্তবক্ষেত্রে নেই বলে সরকার আদালতের নির্দেশ পালন করতে পারছে না।
আমরা মনে করি বিশেষ সংকটে বিজিবি, র‌্যাব ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হলেও আইনশৃংখলা রক্ষায় সাংবাৎসরিক যারা ভূমিকা রাখেন, তারা হচ্ছেন আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্য। এই বাহিনীর রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ না হলে দৃঢ় ও আদর্শিক পুলিশ আমরা পাব না। রাজনীতিকদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কোন পথে হাঁটব।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৬৭ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনের কতগুলো বৈশিষ্ট্য ছিল। যেমন- ১. কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভা গঠন। কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য সংখ্যা নির্ধারিত হয় ১৬-৬০। এর মধ্যে অনধিক ২৮ জনকে সরকার মনোনীত করতে পারবে, ২. গভর্নর জেনারেলের নির্বাহী পরিষদে (ক) পদাধিকার বলে সদস্য, (খ) মনোনীত সরকারি সদস্য, (গ) মনোনীত বেসরকারি সদস্য, (ঘ) নির্বাচিত সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা হয়, ৩. এই সংস্কারে আইনে পরিষদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়, ৪. মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা স্বীকৃত হয় এবং ৫. এ আইনে সর্বপ্রথম ব্রিটিশ ভারতে প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার ধারণা স্বীকৃত হয়। আইনের ফলে মুসলমানদের দাবি অনেকাংশ স্বীকৃত হলে মুসলমান নেতৃবৃন্দ সন্তুষ্ট হন। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের মনে হতাশা সৃষ্টি হয়। ফলে এ আইন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কিছুটা ব্যবধানও গড়ে তুলেছিল।
বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১) : কংগ্রেস ও বাঙালি হিন্দুদের বিরোধিতা এবং সন্ত্রাসবাদীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে অবশেষে বঙ্গভঙ্গ প্রসঙ্গে নতুনভাবে ভাবতে হয় ইংরেজ শাসকদের। লর্ড হার্ডিঞ্জ বড়লাট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ১৯১১ সালের ২৫ আগস্ট গোপনীয়ভাবে ভারত সরকারকে প্রকৃত অবস্থা জানিয়ে প্রশাসনিক পরিবর্তনের সুপারিশ করেন। এক্ষেত্রে নতুন একটি পরিকল্পনাও করা হয়। পরিকল্পনা অনুসারে প্রেসিডেন্সি, বর্ধমান, ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে পাঁচটি বাংলা ভাষাভাষী বিভাগ নিয়ে বাংলা প্রদেশ গঠনের সুপারিশ করা হয়। নতুন বাংলা প্রদেশের রাজধানী করা হয় কলকাতাকে।
১৯১১ সালের ডিসেম্বরে রাজা পঞ্চম জর্জ দিল্লিতে তার রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করে উপরে উল্লিখিত প্রস্তাব পেশ করেন। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ১৯১২ সালের ১ এপ্রিল দুই বাংলা আবার একত্রিত হবে। বঙ্গভঙ্গ রদ করে গৃহীত নতুন ব্যবস্থাটি ১৯১২ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। তারা একে সরকারের বিশ্বাসঘাতকতা বলে আখ্যা দেন। পাশাপাশি বর্ণ হিন্দু ও কংগ্রেস নেতারা বিজয়োল্লাস প্রকাশ করতে থাকেন। প্রচণ্ড কষ্ট ও হতাশায় নবাব সলিমুল্লাহ রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ পূর্ব বাংলার মুসলমানদের শান্ত করার জন্য আশ্বাস দেন, ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনার জন্য একটি সংস্থাও গঠন করা হয়। বাংলার অনেক হিন্দু এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের নিপীড়িত বাংলার মুসলমানরা যেভাবে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল, ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা ঠিক সেভাবেই তাদের হতাশার অন্ধকারে টেনে নেয়। মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজ ও কংগ্রেসবিরোধী মনোভাব বাড়তে থাকে। ফলে হিন্দু-মুসলমান দুই গোষ্ঠীর মধ্যেই কিছুটা দূরত্ব বেড়ে যায়। এ অবস্থায় হিন্দু ও মুসলমান নেতৃবর্গ খুব স্বস্তিতে ছিলেন না। তারা অনুভব করেন, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার দূরত্ব ইংরেজ সরকারকে লাভবান করবে। এ কারণে উভয় সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গ এ সময়ের রাজনীতিতে নতুন কিছু পদক্ষেপ নেয়ার চিন্তা করেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা স্থাপনের জন্য ১৯১৬ সালে লক্ষ্মৌ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর পরে সে সময়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলন এদেশীয়দের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী ঐক্য গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। এভাবে এক পর্যায়ে শুরু হয় ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন। হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা সামনে রেখে ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত হয় বেঙ্গল প্যাক্ট। বঙ্গভঙ্গের পরবর্তী সময়ের এই রাজনীতি ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত একই ধারা বজায় রাখে। পরে আবার রাজনীতিতে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

নেতানিয়াহুর বক্তব্যে ইরান সম্পর্কে নতুন কিছু নেই

ইরানের সঙ্গে অব্যাহত আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি অনুষ্ঠিত হলে তা দেশটিকে পারমাণবিক বোমা তৈরির পথ করে দেবে বলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মন্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
তিনি নেতানিয়াহুর ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, ‘তার বক্তব্য আমি শুনিনি। তবে সেটির ট্রান্সক্রিপ্ট দেখে নতুন কিছু পাইনি।’ নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে তেহরানের সঙ্গে সমঝোতার জন্য বাস্তবসম্মত কোনো বিকল্প পথ দেখাননি। ওবামা আরও বলেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তিনি দেখা করবেন না। কারণ নেতানিয়াহু মার্চে অনুষ্ঠেয় তার দেশের জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্যদিকে সিনিয়র ডেমোক্রেট নেতারাও নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সমালোচনায় সরব হয়েছেন। ওবামা বলেন, নেতানিয়াহু সমস্যা সমাধানের কোনো গ্রহণযোগ্য বিকল্প প্রস্তাব দিতে পারেননি। তিনি যে প্রস্তাব দিয়েছেন সেটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ এর মাধ্যমে আমাদের অগোচরে নতুন করে পারমাণবিক কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার সুযোগ পাবে ইরান। ওবামা আরও বলেন, ইরানকে কোনো ভালো বিকল্প পথ না দিয়ে শুধু নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা যাবে না। অপরদিকে ডেমোক্রেট কংগ্রেসম্যান স্টিভ কোহেন বলেছেন, নেতানিয়াহু যে নাটক উপস্থাপন করেছেন তাতে তিনি অস্কার পেতে পারেন। তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয় নেতানিয়াহু সম্ভবত তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য সফল হয়েছেন। আমি নিশ্চিত, তার এ বক্তব্য ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচনে বেশ ভূমিকা রাখবে।
ডেমোক্রেট সিনেটর ডায়ানে ফিনস্টেইন বলেছেন, আমি আশা করছি, নেতানিয়াহুর এ বক্তব্যের কারণে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির সম্ভাবনা নস্যাৎ হবে না।
এর আগে নেতানিয়াহু তার ভাষণে বলেন, এটা (অনুষ্ঠিতব্য চুক্তি) ইরানের বোমা তৈরির পথ বন্ধ করবে না, বরং এটা ইরানকে বোমা তৈরির পথ করে দেবে। বিশ্ববাসীকে ইরানের বিরুদ্ধে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে যুদ্ধবাজ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করা ইসরাইলি এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইরানের বিজয়যাত্রা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা বলে আসছি, বাজে চুক্তির চেয়ে কোনো চুক্তি না হওয়াই ভালো। এটা একটি বাজে চুক্তি, খুবই বাজে চুক্তি। প্রসঙ্গত, শিগগিরই ইরানের পরমাণু ইস্যুতে বিশ্বের শক্তিধর ছয় রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানির সঙ্গে দেশটির একটি চুক্তি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চুক্তি স্বাক্ষর বন্ধ করার উদ্দেশ্যে সর্বাÍক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। এরই ধারাবাহিকতায় রিপাবলিকানদের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসের বিরোধিতা সত্ত্বেও কংগ্রেসে এ ভাষণ দিলেন নেতানিয়াহু। তবে তিনি এই সফরে প্রেসিডেন্ট ওবামার সাক্ষাৎ পাবেন না। বিবিসি, আলজাজিরা, এএফপি।

সংস্কার কাজে অবহেলা : যাত্রী দুর্ভোগ চরমে by আজহারুল হক ও দেলোয়ার হোসেন

ঢাকা-নবাবগঞ্জ-দোহার সড়কটি খানাখন্দে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন এ পথে যাতায়াত করছে শত শত মানুষ
রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত দোহার উপজেলা। জনসংখ্যা তিন লাখ। ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জ ও নবাবগঞ্জ হয়ে দোহার পর্যন্ত আঞ্চলিক সড়কই একমাত্র পথ। সামান্য এ পথ অতিক্রম করতে অসংখ্য খানাখন্দে চরম ঝাঁকুনি, ডোবায় কাদা মেখে আর ধুলি-মেঘে ভেসে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ ও দোহারের অধিবাসী এবং দক্ষিণাঞ্চলের বহু মানুষের এ দুর্ভোগ এখন নিত্যসঙ্গী। রাস্তার সংস্কার কাজ শুরু হয়ে আবার বন্ধ থাকার কারণে এ দুর্ভোগ আরও বেড়েছে এলাকাবাসীর। এ পথের নিত্য দুর্ভোগ আর ভোগান্তির কথা জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনে বহুবার বলেছেন স্থানীয়রা। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও উঠে এসেছে দুর্বিষহ এ সড়কের চিত্র। কিন্তু যাদের তা দেখার কথা তারা দেখছেন না। উদ্যোগ নিচ্ছেন না এলাকাবাসী দুর্ভোগ লাঘবে। সংস্কার কাজে ধীরগতি দেখে এলাকাবাসী মনে করছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সড়কের ৮ কিলোমিটার অংশের কাজ শেষ না করেই সটকে পড়ার চেষ্টা করছেন। এ পরিস্থিতিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যেন অতি দ্রুত সংস্কার কাজ সম্পন্ন করে সে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এলাকাবাসী।
বাবুবাজার হয়ে বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতু পার হলেই ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ উপজেলা। সোজা রাস্তা গেছে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে। আর ডানে মোড় নিলেই কেরানীগঞ্জ-নবাবগঞ্জ-দোহার আঞ্চলিক সড়ক। কেরানীগঞ্জের কদমতলী থেকে তুলসীখালী সেতু পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার পথের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক ও জনপদ বিভাগ। এর মধ্যে কদমতলী থেকে রোহিতপুর ঢাকা এবং রোহিতপুর থেকে নবাবগঞ্জ মুন্সীগঞ্জ সওজের আওতায়।
কদমতলী থেকে রোহিতপুর পথ তৈরি সড়ক বিভাগের ভাষায় সিঙ্গেল বিটুমিনে। আর সিঙ্গেল বিটুমিন মানেই কোনো ভারি যানবাহন, যেমন ট্রাক কিংবা বড় বাস চললেই দেবে গিয়ে তৈরি হয় খানাখন্দের। যানবাহনের অতিরিক্ত চাপে তা ভেঙে অল্প ক’দিনেই তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। শুরু হয় ভোগান্তি। কদাচিৎ কোনো মন্ত্রী, বিশেষ করে সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ পথে পা বাড়ালে তাৎক্ষণিকভাবে সংস্কার করা হয়। কিন্তু সংস্কারের নামে টাকা নয়ছয়, তড়িঘড়ি ও নিুমানের কাজের পরিণতি দাঁড়ায় ক’দিন পরেই পুরনো চেহারায় ফিরে আসা। মন্ত্রী চলে যায়, গর্ত তাই গর্তই রয়ে যায়। আর বৃষ্টি নামলেই তা পরিণত হয় ডোবায়।
এলাকাবাসী যুগান্তরকে জানান, যতদিন জোড়াতালি দিয়ে মেরামত বন্ধ না হবে, ডাবল বিটুমিন ও ভালো মানের কাজ না হবে এ ভোগান্তি থেকে বাঁচার পথ নেই। দোহার অংশের ১০ কিলোমিটার পথ মানে বছরের পর বছর ধরে খানাখন্দ আর ডোবা। যেন মরণফাঁদ। পালামগঞ্জ থেকে পদ্মা তীরবর্তী মৈনটঘাট পর্যন্ত রাস্তাটিকে সড়ক বলাই মুশকিল। যদিও দোহার নবাবগঞ্জবাসী ছাড়াও অর্থ ও সময় সাশ্রয়ের আশায় ফরিদপুর, রাজবাড়ীসহ দক্ষিণাঞ্চলের অনেক মানুষ এ পথ ধরেন। কিন্তু শুধু ভোগান্তিই জোটে তাদের। এ সড়কের কাজ বন্ধ থাকায় জনসাধারণের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। এলাকাবাসী দ্রুত এ সড়কের কাজ সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন।
ফরিদপুরের ভাঙ্গার রেজাউল করিম বলেন, অল্প সময়ে ঢাকা যেতে এ রাস্তাই আমাদের কাছে খুব সহজ। কিন্তু রাস্তার কারণে এক ঘণ্টার পথ যেতে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। আর কষ্ট তো আছেই।
একই অভিযোগ দোহারের কার্তিকপুরের বাসিন্দা সোহরাব হোসেনেরও। তিনি বলেন, ২০০৫ সালে রাস্তাটিতে সর্বশেষ কাজ হয়েছে। এরপর ১০ বছর চলে গেলেও সংস্কার হয়নি। এমনকি এলাকার একজন প্রতিমন্ত্রী থাকলেও (সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান) তার আমলে তা হয়নি। মান্নান খানের কাছে বহুবার গিয়েও কাজ হয়নি। ফলে আমাদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, রাস্তায় কোথাও কোথাও না আছে খোয়া, না ইট না পাথর। স্থানে স্থানে খানাখন্দ ও ধুলোবালুর স্তূপ। বৃষ্টি নামলেই যা পরিণত হয় ডোবায়। পথের আশপাশের বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও ঢেকে গেছে ধুলোবালুতে। পথচারীদের দুর্ভোগ বর্ণনাতীত।
যমুনা বাস সার্ভিসের চালক রুপম বলেন, ছেলেমেয়েদের জীবিকার স্বার্থেই এ রাস্তায় গাড়ি চালাই। ধুলোবালুতে গাড়ির যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে পড়ে। গর্তে পড়ে গাড়ির ঝাঁকুনির কারণে যাত্রীদের গালিগালাজও শুনতে হয়। ৪০ কিমি. রাস্তা যেতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
২০১০ সালে অগ্রাধিকার সংস্কার প্রকল্পের (পিএমপি) আওতায় নবাবগঞ্জ অংশে বর্ধনপাড়া থেকে দোহারের বাঁশতলা পর্যন্ত রাস্তার সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ৫ কিমি. রাস্তার কাজ বন্ধ থাকে। গত বছরের শেষের দিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এ কাজের দরপত্র আহ্বান করে। মেসার্স কামাল অ্যাসোসিয়েটস নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পায়। চলতি বছরে জানুয়ারির প্রথমদিকে কাজ শুরু করলেও তা থেমে যায়। তারপর কেটে গেছে ২ মাস। কাজ থেমে থাকার কারণ হিসেবে সওজের কর্মকর্তারা কিছু বলতে না চাইলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের একজন মো. মোর্শেদুল হক বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মালামাল আনার সমস্যার কারণেই কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে দ্রুত শেষ করা হবে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী তারেক ইকবাল বলেন, তিনি নতুন যোগদান করেছেন। এসব রাস্তার বিষয়ে তার ভালো তথ্য জানা নেই। তবে সব জেনে দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন তিনি। এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী খায়রুল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি ফোন ধরেননি।

বাংলাদেশে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে

গর্হিত পেট্রলবোমা হামলায় দায়ী সকলকে সুষ্ঠু বিচারপ্রক্রিয়ায় তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। একইসঙ্গে পুলিশি অভিযানে নিহতের ঘটনাগুলোতেও উদ্বেগ প্রকাশ করে সংস্থাটি বলেছে, এসব হত্যাকা-গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে কর্তৃপক্ষকে। বিচারের আওতায় আনতে হবে বেআইনি হত্যাকান্ডে জড়িত প্রত্যেককে। ৫ই মার্চ অ্যামনেস্টির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জানুয়ারি থেকে ঢাকা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর রাজপথে সরকার ও বিরোধী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে বাংলাদেশের মানবাধিকতার পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। সংস্থাটির বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষক আব্বাস ফয়েজ বলেন, রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ প্রান্তসীমায় অবস্থান করছে। আর সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। এমনটা যেন না হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাজনৈতিক অঙ্গনে সকল পক্ষের নেতৃবৃন্দের। তাদেরকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে এবং তাদের সমর্থকদের জনসমক্ষে আহ্বান জানাতে হবে তারা যেন মানবাধিকতার লঙ্ঘনে সম্পৃক্ত না হয়।

বাংলাদেশে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে

গর্হিত পেট্রলবোমা হামলায় দায়ী সকলকে সুষ্ঠু বিচারপ্রক্রিয়ায় তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। একইসঙ্গে পুলিশি অভিযানে নিহতের ঘটনাগুলোতেও উদ্বেগ প্রকাশ করে সংস্থাটি বলেছে, এসব হত্যাকা-গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে কর্তৃপক্ষকে। বিচারের আওতায় আনতে হবে বেআইনি হত্যাকান্ডে জড়িত প্রত্যেককে। ৫ই মার্চ অ্যামনেস্টির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জানুয়ারি থেকে ঢাকা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর রাজপথে সরকার ও বিরোধী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে বাংলাদেশের মানবাধিকতার পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। সংস্থাটির বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষক আব্বাস ফয়েজ বলেন, রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ প্রান্তসীমায় অবস্থান করছে। আর সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। এমনটা যেন না হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাজনৈতিক অঙ্গনে সকল পক্ষের নেতৃবৃন্দের। তাদেরকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে এবং তাদের সমর্থকদের জনসমক্ষে আহ্বান জানাতে হবে তারা যেন মানবাধিকতার লঙ্ঘনে সম্পৃক্ত না হয়।

ভারতের রাজ্যসভা টিভির টক শোতে বাংলাদেশ- সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ সংলাপ

ভারতের সবচেয়ে বড় চাওয়া গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। কিভাবে সবার অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন করা যায় তা নিয়ে সংলাপের কথা হতে পারে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের জন্য এই সংলাপ অত্যাবশ্যক। ভারতের দিক থেকে স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ঘিরে নিজস্ব প্রোপাগান্ডা নিয়ে ভারতের আচ্ছন্ন হওয়া উচিত হবে না। এসব মত দিয়েছেন ভারতের বিশিষ্টজনরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাই কমিশনার বীণা সিক্রি, সিনিয়র সাংবাদিক ভারত ভূষণ, আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষাল, ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড এনালাইসিস (আইডিএসএ)-এর ফেলো গবেষক শ্রুতি পাটনায়েক। সম্প্রতি রাজ্যসভা টিভির দ্য বিগ শো’তে ‘পলিটিক্যাল টারময়েল ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা বলেন তারা। এতে তারা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার আইনগতভাবে বৈধ। তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে বিদেশী বিভিন্ন দেশ। কিন্তু তার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও সমালোচনা করা হয়। বলা হয়,  যেভাবেই দেখেন এটা একদলীয় গণতন্ত্র। পার্লামেন্টে কথা বলার জন্য কোন বিরোধী দল নেই। মিডিয়ায় কোন বিরোধিতা নেই। বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে পার্লামেন্টের হাতে। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ভিজুয়াল ও ইন্টারনেট মিডিয়ায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, সরকারের বিরুদ্ধে কিছু লিখার অনুমতি নেই। বন্ধুত্বপূর্ণ এই রাষ্ট্রে বিরোধিতা করে কিছু বলার জায়গা নেই। ওই অনুষ্ঠানে কোন কোন বক্তা সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তারা বলেন, গত নির্বাচনে যায় নি বিরোধীরা। তাদেরকে নির্বাচনে আনা গেলে কার্যকর হতো গণতন্ত্র। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন ইশান রাসেল। এতে বলা হয়, বিরোধীরা সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছে। তারা নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ভুল করেছে। বারবারই তারা বাংলাদেশের বর্তমান সঙ্কট থেকে উত্তরণে একটি সংলাপের ওপর জোর দেন। বলেন, সংলাপ হলো সক্রেটারিয়াল মেথড। এটাই একমাত্র সমাধান। বাংলাদেশের মানুষ চায় গণতন্ত্র। তারা নির্বাচন চায়। তারা ভোট দেয়ার অধিকার চায়। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ বেশ অজনপ্রিয় হয়েছে। তারা ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। জনগণ তাদের ভোটের অধিকার হারিয়েছে। নিচে ওই অনুষ্ঠানের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো:
ইশান রাসেল: বাংলাদেশে বিতর্কিত নির্বাচনের এক বছর পার হয়েছে। তা নিয়ে এ জাতির মধ্যে এখনও বিতর্ক চলছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার অফিসে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সহিংসতা। বিরোধী দলীয় কিছু সমর্থক নিহত হয়েছেন। বিরোধী দল সরকারের কাছে নতুন নির্বাচন দাবি করছে। কিন্তু পরিস্থিতি দিনকে দিন ক্রমশ ঘোলা হয়ে যাচ্ছে। এ নিয়েই আমাদের অনুষ্ঠান ‘দ্য বিগ পিকচার’। এতে যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাই কমিশনার বিনা সিক্রি। সিনিয়র সাংবাদিক ভারত ভূষণ। শ্রুতি পাটনায়েক, গবেষক আইডিএসএ। আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষাল। বাংলাদেশ থেকে যোগ দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক শামসুল আরেফিন। প্রথমেই আমি বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে যোগ দেব শামসুল আরেফিনের সঙ্গে।
প্রশ্ন: শামসুল, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে অবস্থানটা কি। এর কি কোন শেষ নেই?
শামসুল আরেফিন: আসলে গত বছর ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পরে বিতর্ক চলছেই। এর কারণ, ওই নির্বাচনে অংশ নেয় নি বিএনপি। তারা বলছে, ওইদিন গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বলেছিল, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থেকেই তারা নির্বাচন করবে। এরপর এক বছর পার হয়েছে। বিএনপি ৫ই জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা দিবস পালন করতে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু তারা ঢাকা শহর ও দেশের অন্য কোন স্থানে সভা করতে পারে নি। এদিন দুপুরের পর দলীয় অফিসে গিয়ে র‌্যালিতে যোগ দেয়ার কথা ছিল বেগম খালেদা জিয়ার। কিন্তু তাকে যেতে দেয়া হয় নি। তাকে আটকে রাখা হয় গুলশানের অফিসে। পুলিশ তাকে ঘেরাও করে রেখেছে। তিনি বাইরে বের হতে পারছেন না। ৫ই জানুয়ারি তিনি দুপুরের পর বের হতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাকে বাইরে যেতে অনুমতি দেয়া হয় নি। সেখানেই তিনি সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য রাখেন। ঘোষণা করেন দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের অবরোধ। এ দিনে ঢাকায় খুব সংঘর্ষ হয় নি। তবে দেশের অন্যান্য স্থানে সংঘর্ষ হয়েছে। নিহত হয়েছেন তিন জন। প্রচুর মানুষ আহত হয়েছেন। ভাঙচুর করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক যানবাহন। আন্তঃজেলা বাস, নৌযান চলাচল করে নি সারা দেশে। অবরোধ হিসেবে এসব পরিবহন বন্ধ করে দেয় সরকার। ৫ই জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রশ্ন: আমি এবার আসছি বীনা সিক্রির কাছে। এম্বাসেডর সিক্রি, আমি আপনার কাছে জানতে চাই এ সরকার কতটা বৈধ? বিরোধীরা নির্বাচনে অংশ নেয় নি। তাই ভারতেও এ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে। বিরোধীদের এমন দাবির পক্ষে কি কোন যুক্তি আছে?
বীণা সিক্রি: ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচন ছিল বাস্তবতা। আইনগতভাবে বর্তমান সরকার ৫ বছর মেয়াদের জন্য বৈধ। আমি কয়েকটি দিক থেকে বিষয়টি দেখতে চাই। গত বছর নির্বাচনের আগে-পরে ডিসেম্বর ২০১৩, সেপ্টেম্বর ২০১৩ জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল নির্বাচন ভণ্ডুল করার। তাদের দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। কিন্তু এ সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে জাতীয় সংসদ। ওই সময়ে সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। তারা বলেছিল, এ ব্যবস্থা সংবিধান পরিপন্থি। সংসদীয় গণতন্ত্রে কোন রাষ্ট্রের প্রধান কোন অনির্বাচিত ব্যক্তি হতে পারেন না। এটা একটি সাধারণ বিষয়। ওই সময়ে বিএনপি গিয়েছে বিশ্ব মিডিয়ায়, আমেরিকায়, যুক্তরাজ্যে, পশ্চিমা দেশে সমর্থন পাওয়ার জন্য, যাতে নির্বাচন না হয়। নির্বাচনে অংশ নিতে মুখিয়ে ছিল বিএনপি। একপর্যায়ে খালেদা জিয়ার ছেলে লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ না নিতে বলেন শেষ মুহূর্তে। তারা নির্বাচনে অংশ নিলে হয়তো জিতে যেত। তাই এখন ওই নির্বাচনের বৈধতার প্রশ্ন তুললে সেটা অতীতের ইস্যু হয়ে যাবে। সারা বিশ্ব এ নির্বাচনকে মেনে নিয়েছে। শেখ হাসিনা গত এক বছরে চীন থেকে জাপান, যুক্তরাজ্য সহ অনেক দেশ সফর করেছেন। কেউই তার নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলে নি। বাংলাদশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত খোলামেলাভাবে এ নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছিল না। কেউ এ নিয়ে আর কথা বলে নি। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের প্রয়োজন। এদিকেই নজর দেয়া উচিত। এই সংলাপ একটি নির্বাচন দেয়ার জন্য হতে পারে না। এ নির্বাচন শুধু হতে পারে ৫ বছর পরে। সংলাপ হতে পারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা নিয়ে। তা হতে পারে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা নিয়ে, বুরে‌্যাক্রেসির বিরাজনীতিকরণ করা নিয়ে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে। এর মাধ্যমে জনগণকে একটি আস্থায় নিতে হবে যে, যখনই নির্বাচন হোক, সেটা যদি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেও হয়, তাহলে যথেষ্ট চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সেস থাকবে। নির্বাচন হতে হবে অবাধ ও সুষ্ঠু। এসব ইস্যু খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, বাংলাদেশে কেউই এখন এত তাড়াতাড়ি আরেকটি নির্বাচন চায় না। কারণ, সহিসংতা ছড়ানো নিয়ে সবাই আতঙ্কিত। হাসিনা জারি করেছেন ১৪৪ ধারা। দমন করছেন যেকোন রকম বিক্ষোভ-সমাবেশ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে তার অফিসে আটক রাখায় ব্যাপক সোরগোল হচ্ছে। অন্যভাবে দেখা যেতে পারে-  কোন বাস, কোন বোট ঢাকা আসতে পারে নি ৫ই জানুয়ারি। এসব মিলে ঢাকা একটি স্থবির শহরে পরিণত হয়। তাদের উচিত সহিংসতা পরিহার করা। সাধারণ মানুষ সহিংসতা চায় না। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের জন্য সংলাপ অত্যাবশ্যক।
প্রশ্ন: ভারত ভূষণ আপনি সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছেন। আপনি কি মনে করেন যে, শেখ হাসিনার সামনে বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা আছে?
ভারত ভূষণ: বিরোধীরা যদি শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেনই তাহলে কি নিয়ে কথা বলবেন? যদি বলা হয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করার কথা, তাহলে কিভাবে সেই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবেন। যেভাবেই দেখেন এটা একদলীয় গণতন্ত্র। পার্লামেন্টে কথা বলার জন্য কোন বিরোধী দল নেই। মিডিয়ায় কোন বিরোধিতা নেই। বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে পার্লামেন্টের হাতে। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ভিজুয়াল ও ইন্টারনেট মিডিয়ায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী ও সরকারের বিরুদ্ধে কিছু লিখার অনুমতি নেই। বন্ধুত্বপূর্ণ এই রাষ্ট্রে বিরোধিতা করে কিছু বলার জায়গা নেই। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মতো সুশীল সমাজ নীরব। উপজেলা নির্বাহী অফিসার গিয়ে একটি এনজিও বন্ধ করে দিতে পারেন। এটাই কি সরকারের বৈধতা। হ্যাঁ তারা নির্বাচনের মাধ্যমে এসেছে। তাতে প্রধান বিরোধী দল অংশগ্রহণ করে নি। যদি আপনি সরকারে বৈধতার কথা বলেন, তাহলে সারা বিশ্বই স্বীকার করে- হঁ্যাঁ সরকার আছে। তারা মনে করতে পারে গণতন্ত্রের সবচেয়ে ভাল উপায় এটা, এ পন্থাই অনুসরণ করা উচিত। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা মেনে নিয়েছে এটাই উত্তম সরকার। কারণ, বিরোধীরা নির্বাচনে যায় নি। যদি বিরোধীদের নির্বাচনে আনা যেত তাহলে পরিস্থিতি পরিবর্তন ঘটতো। তাহলে গণতন্ত্র কার্যকর হতো। যখন তারা মনে করবে বিরোধীরা সব সময়ই ভুল কথা বলে না, তখনই সংলাপ হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দল সব সময়ই মনে করে, বিরোধীরা ভুল। তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। থামিয়ে দিতে হবে। সুতরাং সেখানে কোন সংলাপ হতে পারে না। এ ধারণাটি আসলে কাজ করছে না।
প্রশ্ন: শ্রুতি পাটনায়েক রাজপথে সহিংসতা চলছে। এ সময়ে ঢাকার সাধারণ মানুষ কি ভাবতে পারেন। আমি আরও সহজ করে বলি রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কি পরিবর্তন আসছে?
শ্রুতি: আমার মনে হয় বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ হলো সহিংসতা নিয়ে। তারা সহিংসতাকে সমর্থন করছে না। সমর্থন করছে না হরতাল রাজনীতি। দ্বিতীয়ত, ম্যাডাম সিক্রি ঠিকই বলেছেন- দু’দলের মধ্যে সংলাপ হওয়া উচিত। এখন প্রশ্ন হলো কি ইস্যুতে সংলাপ হবে? বিএনপির দাবি নির্বাচন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তাতে অংশ নেবে বিএনপি। আওয়ামী লীগের অবস্থান- এরই মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে। এখন নির্বাচন হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। দুই প্রধান রাজনৈতিক দল এ দুটি অবস্থানে অনড়। এটা সমঝোতা হওয়ার মতো নয়। যদি আপনি দুই রাজনৈতিক দলের নেতাকে একটি কক্ষে বসিয়ে রাখেন তাহলে সেখান থেকে কোন ফল আসবে না। এখন প্রশ্ন হলো- দুই রাজনৈতিক দলকেই ভাবতে হবে এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার পথ কি তা খুঁজে বের করা। রাজনীতি সম্পৃক্ত নন, এমন লোকজনের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তারা কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। শিক্ষিত মানুষ তারা। উদ্বেগ হলো ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি মধ্যে কি ঘটেছে? ৫ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন পেট্রলবোমায়। মানুষ পুড়ে মারা গেছে। মানুষ মনে করে হ্যাঁ সংলাপ হওয়া উচিত। সবকিছুতেই তাদের সায় আছে। বিএনপির উচিত নির্বাচনে অংশ নেয়া। চার মাসের মধ্যে বাংলাদেশে কি ঘটেছে তা দেখেছি। হতে পারে সহিংসতার উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তারা হরতালে সমর্থন পায় নি। তাই ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে সহিংসতা সৃষ্টি করে বাংলাদেশের দিকে বিশ্ববাসীকে আকৃষ্ট করা হয়েছে। যাতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়, সমঝোতায় আসতে। গত এক বছরে আওয়ামী লীগ সুশাসনে উন্নতি করেছে, বিশেষ করে দুর্নীতির বিষয়ে দৃষ্টি দিয়ে।
প্রশ্ন: জয়ন্ত ঘোষাল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে অবাধে কাজ করছে না। সরকার এ জন্য বিরোধীদের দায়ী করছে। এক্ষেত্রে কি রেজুলিউশন হতে পারে?
জয়ন্ত: আমার হিসাব ভিন্ন। আমি আওয়ামী লীগপন্থি বা আওয়ামী লীগ বিরোধী এমন কোন অবস্থান নিতে পারি না। একইভাবে বিএনপিপন্থি বা বিএনপি বিরোধী অবস্থান নিতে পারি না। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি বলতে পারি ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি বেশ কিছু আসনে বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু তারা পার্লামেন্ট বর্জন করেছে। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, এবার নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফোন করেছিলেন খালেদা জিয়াকে। নির্বাচনে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ফলে বিরোধীদের উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। আপনি বলতে পারেন, এক্ষেত্রে বিদেশী চাপও ছিল। এর সঙ্গে আমি একমত। তারা চেষ্টাও করেছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে রয়েছে প্রচণ্ড রকম মেরুকরণ। যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল আমরা সেদিনগুলোর কথা ভুলি নাই। কেন মুখ্যসচিব ব্রজেশ মিশ্রকে বাংলাদেশে যেতে দেয়া হয় নি। এসবই ইতিহাস। ইতিহাস হলো সমসাময়িক। আমাদের সেসব দিনের কথাও ভোলা উচিত নয়। আপনি জানেন,  এর আগে শেখ হাসিনার সরকার বিরোধীদের বলেছেন, আপনারা পার্লামেন্ট বর্জন করেছেন। কিন্তু পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য হিসেবে বেতনভাতা নিচ্ছেন। এ ইস্যুটি তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেছেন, এক্ষেত্রে দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করা উচিত নয়। আপনাদের নির্বাচনে আসা উচিত। এখন আমরা দেখছি সহিংসতা। নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে বিরোধী দল একটি র‌্যালি করার মতো স্বাধীনতা পাচ্ছে না। আমি তো এটাও সমর্থন করতে পারি না। এটা আসলে গণতন্ত্র নয়। বিরোধীদের সঙ্গে নিয়ে সংলাপের পুরনো পথে ফেরা উচিত। ভারত ভূষণ, শ্রুতি বলেছেন কিসের সংলাপ, কিসের ভিত্তিতে সংলাপ? কোথা থেকে সূত্রপাত করতে হবে? কিন্তু আপনারা হয়তো জানেন, সংলাপ হলো সক্রেটারিয়াল মেথড। এটাই একমাত্র সমাধান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তুতু ম্যা ম্যা সংস্কৃতি আছে। এটা আমি জানি। যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফরে যান, যখন সালমান খুরশিদ, প্রণব মুখার্জি, মিস্টার কৃষ্ণা সফরে গিয়েছিলেন আমি তাদের সঙ্গে সফরে ছিলাম। আমি দেখেছি তারা খালেদার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। কিন্তু ওই সময় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ তারা জানে না যে, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিকল্পনা কি? তিনি কি বিএনপি অফিসে যাবেন কি যাবেন না, তারা তা ঠিক করে দেয়। ফলে সেখানে একটি বদ্ধমূল মানসিকতা রয়েছে। মনের ভেতর ব্লক রয়েছে। আমি স্বীকার করি সেখানে প্রচণ্ডরকম রাজনৈতিক মেরুকরণ আছে। কিন্তু সংলাপ ছাড়া আর কি পন্থা আছে সমস্যা সমাধানে? সংলাপই একমাত্র সমাধান। এ ছাড়া আমরা সহিংসতাকে প্রশ্রয় দিতে পারি না।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের সমস্যা সমাধানে একমাত্র সমাধান বলা হচ্ছে সংলাপ। ভারত ভূষণ এ বিষয়ে আপনার কিছু বলার আছে?
ভারত ভূষণ: আমি বলতে চেয়েছি কিভাবে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা যায়, কিভাবে সবার অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন করা যায় তা নিয়ে সংলাপের কথা। কিন্তু আমি যেমনটা বলেছি, এমন সংলাপে কোন কাজ হবে বলে মনে হয় না। কারণ, শেখ হাসিনা তার ক্ষমতাকে সুসংহত করেছেন। তিনি কোন মধ্যবর্তী নির্বাচন দেবেন না। নির্বাচনের আগে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নিতে বলা হয়েছিল। ওই সময় বিএনপি রাজি হয় নি। তারা আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের দিকে এগিয়েছে। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পারছে তাদের সেই পদক্ষেপ ছিল ভুল। ফলে তারা মধ্যবর্তী নির্বাচন দাবি করার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে। শেখ হাসিনা তার ক্ষমতা দেশে যেমন সুসংহত করেছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পেয়েছেন সমর্থন। তিনি রাজপথের প্রতিবাদ কঠোর হস্তে দমন করবেন। তিনি সফলতার সঙ্গে তা করছেনও। যখন পরিস্থিতি ভাল দেখবেন তখনই নির্বাচন দিতে পারেন। কারণ, তিনি আরেক দফা ক্ষমতায় থাকতে চান।
জয়ন্ত: আমি কিছু বলতে চাই। জাতীয় নির্বাচনের আগে হয়েছে উপনির্বাচন। ওইসব উপনির্বাচনে বিএনপি ভাল করেছে। অনেক আসনে আওয়ামী লীগের ফল ভাল ছিল না। তাহলে কি করে নির্বাচনের আগে আপনি এটা বলতে পারেন? ওই সময় বিএনপিকে খোশমেজাজে দেখা গেছে। কারণ, উপনির্বাচনে তারা আওয়ামী লীগকে বেশ কিছু আসনে পরাজিত করতে পেরেছে। তাই আমার মনে হয় নির্বাচন ও সংলাপ এটা হতে পারে হপসন চয়েস। আমাদেরকে নির্বাচন করতে হবে সংলাপের মাধ্যমে।
প্রশ্ন: এম্বাসেডর সিক্রি আপনি বাংলাদেশে ছিলেন। সেখানে শেখ হাসিনাকে ভারতপন্থি হিসেবে দেখা হয়। এ বিষয়ে আপনার মত কি?
সিক্রি: কে ভারতপন্থি, কে ভারতপন্থি নয়, তা নিয়ে কথা বলবো না আমি। কিভাবে সবার অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন করা যায় তা নিয়ে সংলাপের কথা বলবো আমরা। ভারতের দিক থেকে স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপপূর্ণ। আমি মনে করি এর মধ্যে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ হলো ভারতের সবচেয়ে বড় চাওয়া। কারণ, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়ই বাংলাদেশে কট্টর ইসলামপন্থি জামায়াতকে পরাজিত করা যায়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই জামায়াতে ইসলামীই বিএনপি সরকারে ছিল। তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেন। আমরা স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ দেখতে চাই। আমাদের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন আমাদের দেখার বিষয় বাংলাদেশের মানুষ কি চায়। তারা গণতন্ত্র চায়। তারা নির্বাচন চায়। তারা ভোট দেয়ার অধিকার চায়। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ বেশ অজনপ্রিয় হয়েছে। তারা ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। জনগণ তাদের ভোটের অধিকার হারিয়েছে। একই সঙ্গে তারা বিএনপির দুর্বলতা সম্পর্কে জেনেছে। তারা জেনেছে, বিএনপি সুশাসন দিতে পারে না। তারা বিভক্ত। তাদের নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত ছিল। তাই যেকোন সংলাপে সরকারকে ৫ বছর সময় দেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতসহ আন্তর্জাতিক দুনিয়া যদি এ বিষয়ে একমত হয় তাহলে সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে সংলাপ হতে পারে। মেয়াদ শেষে যে নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচনকে আরও শক্তিশালী করবেন কিনা, এটা শেখ হাসিনার ইস্যু। যে জিনিসটা প্রয়োজন তাহলো, প্রথমত এ সরকার ৫ বছর মেয়াদে থাকবে, এতে সম্মত হওয়া। সংলাপের শুরুর ক্ষেত্রে এটা প্রাথমিক একটি বিষয়। এটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি ভারত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এতে একমত হবে। সবাই যদি এতে সম্মত হয়, তাহলে আমি মনে করি সংলাপ শুরু করার জন্য খুব ভাল একটি পরিবেশ সৃষ্টি হবে। কেন না এটা জরুরি, পরবর্তী নির্বাচনে যখনই সেটা হোক না কেন, সেটা চার বছর পরে হবে- শেখ হাসিনার স্বার্থে তিনি যদি পুনর্নির্বাচিত হতে চান, শক্তিশালী একটি নির্বাচন কমিশন থাকতে হবে। তার নৈপুণ্যের দিক দিয়ে জনগণকে অবশ্যই বোঝাতে পারতে হবে। নাগরিক সমাজ, অর্থনৈতিক প্রগতি, মানুষের সমৃদ্ধি, অর্থনীতি কার্যকর করা, শান্তিপূর্ণ জীবনধারা- এসব ক্ষেত্রে তার নৈপুণ্যগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে। দ্বিতীয় যে বিষয়টা নিয়ে বাংলাদেশের জনগণ সম্পূর্ণ বিরক্ত তা হলো সহিংসতা। তারা হরতাল চায় না, তারা সহিংসতা চায় না। সেদিক থেকে হয়তো তারা এটা মেনে নিতে পারে যে, শেখ হাসিনা সভা-সমাবেশ করার  অনুমতি দিচ্ছেন না। হয়তো। কিন্তু তারপরও সংলাপ প্রয়োজন। কেননা পরবর্তী বারের জন্য সবার অংশগ্রহণের প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। বুরে‌্যাক্রেসির নিশ্চয়তা থাকতে হবে। এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেখান থেকে ইঙ্গিত মেলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আর সেটা ভারতের জন্য খুবই উদ্বেগের কারণ। মৌলবাদ দমনে শেখ হাসিনার সফলতা আমরা বারবার দেখেছি। তারা পশ্চিমবঙ্গে এসে ঘাঁটি গেড়েছে বর্ধমান ও অন্যান্য জায়গায়। কাজেই ভারতের বড় ধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে। ভারতকে বাংলাদেশের জনগণ, সরকার ও সকল রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
প্রশ্ন: আমি সবার কাছ থেকে সর্বশেষ মন্তব্যগুলো নিচ্ছি, কেননা আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। শ্রুতি আপনার থেকে শুরু করবো। বিনিয়োগের দিক থেকে- শিনজো আবেকে বাংলাদেশ সফরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন শেখ হাসিনা। বিমসটেক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চীনা নৌপথ (ম্যারিটাইম সিল্ক রুট) প্রসঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে। ওই অঞ্চলে অনেক বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। তো এসব বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না। কেননা ভারত ও অন্যান্য দেশও এ ধরনের চুক্তি থেকে উপকৃত হবে। 
শ্রুতি: নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সভা-সমাবেশ আর গুলশান বিএনপি কার্যালয়ে বেগম জিয়ার অবরুদ্ধ থাকার ইস্যুগুলো সরকার কিভাবে মোকাবিলা করছে তার ভিত্তিতে সম্ভবত যে ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা মানুষ করছে, আমি মনে করি ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে যাবে তার একটা প্রভাব পড়বে। আমি মনে করি সহিংসতার প্রভাব পড়ছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে আগেও সহিংসতার প্রভাব পড়েছে। অন্যান্য দেশে বাংলাদেশের রপ্তানিতে এর প্রভাব পড়বে। কেননা হরতাল থাকলে মানুষ চলাফেরা করতে পারে না। কারখানায় কাজে যেতে পারে না। সেটা নিশ্চয়ই কারখানার উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে এমন একটি দেশে বিনিয়োগ করার জন্য বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বোঝানো খুবই কঠিন হয়ে যায়, যেখানে আপনি জানেন না পরদিন কি ঘটতে যাচ্ছে। কাজেই আমি মনে করি, বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমি এর সঙ্গে এটাও বলতে চাই, গত কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ ধরে রাখতে পেরেছে এ দেশটি; যেটা এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রশংসার দাবিদার। এ কারণে আমি মনে করি স্থিতিশীলতা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
প্রশ্ন: অর্থাৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থেকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সুফল বয়ে নিয়ে আসবে। আমি ভারত ভূষণের কাছে সর্বশেষ মন্তব্যের জন্য যাবো। জয়ন্ত আমি দুঃখিত, আমাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে। ভারত, সবকিছু যদি আমরা সারমর্ম করি তাহলে আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশের পরিস্থিতি সামনের দিনগুলোতে সমাধা হবে নাকি আপনি যেমনটা বলেছেন,  শেখ হাসিনা এ বিদ্রোহ পরিস্থিতি এখনকার মতো দমন করবেন এবং পরবর্তীকালে কোন এক সময় বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তিতে এ নিয়ে বক্তব্য দেবেন।
ভারত: আমি মনে করি তিনি এ বিদ্রোহ দমন করবেন। এটা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে আমরা জানি না কি ঘটতে পারে। কিন্তু একজন ভারতীয় হিসেবে আমি বলবো, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ঘিরে নিজস্ব প্রোপাগান্ডা নিয়ে আমাদের আচ্ছন্ন হওয়া উচিত হবে না। আমরা মনে করি আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ। আওয়ামী লীগই কিন্তু বাংলাদেশ সংবিধানে ইসলামিক শব্দটা অন্তর্ভুক্ত করেছে।
বিনা সিক্রি: না না। তারা ইসলামিক শব্দটা চালু করে নি। সংবিধান সংশোধনের সময় তারা ওটা বাদ দেয় নি।
শ্রুতি: ’৮০-র দশকে, জেনারেল এরশাদ।
ভারত: বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ।  আমাদের বিএনপি-বিরোধী হওয়াও উচিত নয়। বিষয়টা হচ্ছে, জামায়াতের সঙ্গে স্রেফ নির্বাচনী লক্ষ্যেই বিএনপির যেতে হবে। আর তারা তাদের শিক্ষাটা পেয়ে গেছে। কেননা জামায়াতে ইসলামী প্রকৃতপক্ষে তাদেরকে বর্তমান অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। কাজেই কিভাবে এ সমস্যা সমাধান করা যায় তা নিয়ে বিএনপিকে ভাবতে হবে। এটা শুধু আওয়ামী লীগের সমস্যা নয়, এটা বিএনপিরও একটি সমস্যা।
ইশান রাসেল: সমস্যা সমাধানে সম্ভবত বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলকে তাদের থিংকট্যাঙ্কদের নিয়ে বসতে হবে। এরপর একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। সারসংক্ষেপ বলা যেতে পারে, সংলাপ জরুরি। কিন্তু একইসঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যাপক অন্তর্নিরীক্ষণ প্রয়োজন। দেশটিতে সম্ভবত গণতন্ত্রের সার্বিক ধারণাটাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ৬০ নেতাকর্মী

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) নবনিযুক্ত মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর
আহমেদ বলেছেন, একটি বিশেষ মহল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এনে সেটিকে ‘সস্তা প্রচার’ হিসেবে
কাজে লাগাচ্ছে। তিনি বলেছেন, অপরাধ দমন করতেই সরকার আইনশৃঙ্খলা
বাহিনীর হাতে অস্ত্র দিয়েছে, ‘হা-ডু-ডু খেলার’ জন্য নয়
অবরোধ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ২০ দলীয় জোটের ৬০ নেতাকর্মী ও সমর্থক। এ সময় সরকার সমর্থকদের হামলায় নিহত হন আরও অন্তত ১৫ জন। এ সময় গুম হয়েছেন ২১ জন। সরকারদলীয় বেশ কয়েকজন কর্মী-সমর্থকও দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ছিল- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর কথিত ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গণপিটুনি ও গাড়িচাপায় মৃত্যু। এর মধ্যে ৫ই জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে পুটিয়ায় বিএনপিকর্মী মজিরউদ্দিন, কানসাটে বিএনপিকর্মী জামশেদ আলী, নোয়াখালীতে যুবদলকর্মী মিজানুর রহমান রুবেল নিহত হন। ৭ই জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে সেনবাগে ছাত্রদলকর্মী মহিউদ্দিন বাবুর্চি নিহত হন। ১৫ই জানুয়াারি র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কানসাটে ছাত্রদল নেতা মতিউর রহমান নিহত হন। ১৯শে জানুয়ারি মতিঝিলে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নড়াইল পৌরসভার কাউন্সিলর ইমরুল কায়েস নিহত হন। ২০শে জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলাবাহিনী আটকের পর রাজশাহীতে ট্রাকচাপায় মৃত্যু হয় যুবদলের ওয়ার্ড সভাপতি এসলাম হোসেনের। ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তারের পর একই দিন ঢাকার খিলগাঁওয়ে ছাত্রদল নেতা নুরুজ্জামান জনির লাশ পাওয়া যায়। ২৩শে জানুয়ারি র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে লক্ষ্মীপুরে মারা যান দাউদকান্দির ছাত্রদল নেতা সোলায়মান উদ্দিন জিসান। এক মাস নিখোঁজ থাকার পর ২৬শে জানুয়ারি রামপুরায় র‌্যাবের গুলিতে মারা যান আবুল কালাম আজাদ ও  রাজমিস্ত্রি সুলতান বিশ্বাস নামে দুই বিএনপি কর্মী। ২৭শে জানুয়ারি সিটি কলেজ শিবির সভাপতি আসাদুল্লাহ তুহিনকে ট্রাকচাপায় হত্যা করা হয়। পরিবার জানায়, আগের দিন তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। গোয়েন্দাদের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ২৮শে জানুয়ারি নিহত হন রাজশাহীর কলেজ শিক্ষক নুরুল ইসলাম। আগের দিন গ্রেপ্তারের পর ২৯শে জানুয়ারি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন বিএনপিকর্মী রফিকুল ইসলাম। একই দিন পুলিশেল নির্যাতনে রাজশাহীর বিএনপি নেতা আইনুর রহমান মুক্তা, চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার শিবিরকর্মী সাকিব হাসান হাসপাতালে মারা যান। গোয়েন্দাদের হাতে গ্রেপ্তারের পর এদিনই চরফ্যাশনের ছাত্রদল নেতা আরিফুল ইসলাম মুকুলের মরদেহ পাওয়া যায় ঢাকার রূপনগরে। ৩০শে জানুয়ারি মিরপুরের বেড়িবাঁধে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন শিবিরকর্মী এমদাদ উল্লাহ। ২রা ফেব্রুয়ারি উল্লাপাড়ায় পুলিশ হেফাজতে মারা যান ২০ দল নেতা সাঈদুল ইসলাম। ৩রা ফেব্রুয়ারি কথিত বন্দুকযুদ্ধে ২ যুবদল কর্মী যশোরের মণিরামপুরের ইউসুফ মিয়া ও একই এলাকার লিটন আলীকে নিরাপত্তা বাহিনী তুলে নেয়ার পর ট্রাকচাপায় হত্যা করা হয়। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ঢাকার ফার্মগেটে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান মোটরপার্টস বিক্রেতা ও বিএনপি সমর্থক সাখাওয়াত হোসেন ও কাওরান বাজারের সবজি বিক্রেতা মুজাহিদুল ইসলাম জিহাদ। এ ছাড়া এদিন ভাষানটেক বালুর মাঠে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে বিএনপি সমর্থক আল-আমিন মারা যান। একই দিন একই স্থানে লাশ পাওয়া যায় বিএনপি সমর্থক গাজী মোহাম্মদ নাহিদের। ৫ই ফেব্রুয়ারি মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বুন্দুকযুদ্ধে মারা যান বিএনপি সমর্থক মনির হোসেন। ৬ই ফেব্রুয়ারি পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে চৌদ্দগ্রামে শিবির নেতা শাহাবুদ্দিন পাটোয়ারী, সাতক্ষীরার শিবিরকর্মী শহিদুল ইসলাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক শাহাবুদ্দিন রিপন মারা যান। ৭ই ফেব্রুয়ারি পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান মো. বাচ্চু। ৮ই ফেব্রুয়ারি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে শিবিরকর্মী জসীম উদ্দিন আগারগাঁও তালতলায় ও কুমিল্লায় পুলিশি হেফাজতে মারা যান বিএনপি সমর্থক স্বপন। যশোরে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান বিএনপি সমর্থক রাজু আহম্মেদ। ৯ই ফেব্রুয়ারি নিহত হন বিএনপির ৩ নেতাকর্মী। যাত্রাবাড়ীতে ডিবির সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মোবাইল সার্ভিসিং কর্মী বিএনপি সমর্থক রাসেল সরদার মারা যান। একইদিন চৌদ্দগ্রামের বিএনপি নেতা সোহেল মিয়া ও মিরপুরের কালশীতে এক বিএনপি সমর্থকের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। ১৩ই ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ী যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নূরে আলমের লাশ পাওয়া যায় গাজীপুরে। পরিবার জানায়, ৮ই ফেব্রুয়ারি তাকে ডিবি বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। ১৪ই ফেব্রুয়ারি বরগুনার আমতলীতে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যায় বিএনপি কর্মী মোজাম্মেল। একই দিন চট্টগ্রামে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান যুবদল নেতা আরিফ হোসেন। এ সময় তিনি তার সন্তনসম্ভবা স্ত্রীর জন্য ওষুধ কিনতে গিয়েছিলেন। ১৫ই ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে মাগুরার শালিখা থানার ছয়ঘরিয়ার ওয়ার্ড নেতা মশিউর রহমান ও ময়মনসিংহের বিএনপি সমর্থক লিটন মিয়া নিহত হন। দিনাজপুরে বিজিবি পুলিশের যৌথ অভিযানে মারা যান স্থানীয় শিবির নেতা মতিয়ার রহমান। ১৬ই ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জে বিএনপি সমর্থক মো. ইয়াছিনের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। পরিবার দাবি করে আগেই তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। ১৭ই ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধা শহরের শিবির নেতা মোস্তফা মঞ্জিল র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান। আগের দিন পুলিশ গ্রেপ্তারের পর ১৮ই ফেব্রুয়ারি যশোরের মণিরামপুরে ডুমুরিয়ার বিএনপিকর্মী আবু সাঈদ ও বজলুর রহমান কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান। এদিন টেকনাফে বিজিবির গুলিতে নিহত হন বিএনপির সক্রিয় কর্মী হোসেন আহমেদ।  ১৯শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে মারা যান ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বিএনপি সমর্থক রফিকুল ইসলাম খোকন। ২১শে ফেব্রুয়ারি বরিশালের আগৈলঝড়ায় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান যুবদল নেতা কবির হোসেন মোল্লা ও ছাত্রদল নেতা টিপু হাওলাদার। ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করার পর বরিশালে তাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়। ২২শে ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন শ্রমিক দল নেতা আবদুল ওদুদ। একই থানা এলাকা থেকে আরও তিনজনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে সুমন ও রবিনের পরিচয় মিলেছে। একজনের লাশ এখনও মর্গে পড়ে আছে। ওই দিন ঝিনাইদহে গুলিতে নিহত হন এক বিএনপি নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলের ছেলে পলাশ এবং বিএনপিকর্মী দুলাল। পরিবার বলছে, দুই দিন আগে তাদের আটক করা হয়েছিল। ২৪শে ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে ক্রসফায়ারে নিহত হন যুবক শাহীন। পুলিশ বলছে, শাহীনের নেতৃত্বে পুলিশের ওপর হামলার পর সেখানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শাহীন নিহত হন। একই দিন মাগুরায় নিহত হয়েছেন টাইগার দাউদ। ২৬শে ফেব্রুয়ারি সুন্দরবনে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন তিন জন। এদের মধ্যে সাদ্দাম ও সোহেলের পরিচয় পাওয়া গেছে। র‌্যাবের দাবি তারা বনদস্যু। অন্যদিকে সরকার সমর্থকদের হামলায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন- ৫ই জানুয়ারি নাটোরে গুলিতে ছাত্রদল নেতা রকিব মুন্সী ও রায়হান হোসেন, ১৪ই জানুয়ারি চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় ট্রাকের চাকায় শিবিরকর্মী জুবায়ের, ১৫ই জানুয়ারি সোনাইমুড়িতে ছাত্রদল নেতা মোরশেদ আলম পারভেজ, ১৮ই জানুয়ারি বিএনপি নেতা সিরাজুল ইসলাম, ২১শে জানুয়ারি রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপি সমর্থক জিল্লুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে সরকার সমর্থকরা। ২২শে জানুয়ারি লালবাগে বোনের বাসায় বেড়াতে গিয়ে সন্দেহজনক বোমা হামলায় নিহত হন ছাত্রদল নেতা মাহবুবুর রহমান। ২৭শে জানুয়ারি চরফ্যাশনে ছাত্রদল নেতা হারুনুর রশিদ, ৩০শে জানুয়ারি সীতাকুণ্ডে যুবদল নেতা ইমাম হোসেন, যশোরের চৌগাছার বিএনপিকর্মী আবদুস সামাদ মোল্লা, ৪ঠা ফেব্রুয়ারি খুলনা বিএল কলেজের ছাত্রদলকর্মী শেখ আবু সাঈদকে শ্বাসরোধ করে, ৬ই ফেব্রুয়ারি বেগমগঞ্জের যুবদল নেতা সোহেলকে গুলি করে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ছুরিকাঘাতে জামায়াত নেতার মেয়ে, ৮ই ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতা মনিরুল ইসলাম তালুকদার এবং ১৯শে ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুর সদরে যুবদল নেতা মাঈনুদ্দিন বাবলুকে গুলি করে হত্যা করে সরকার সমর্থকরা। তবে সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ (বিএসপিপি) দাবি করে, চলমান অবরোধের ৫৭ দিনে বিচারবহির্ভূত ও সরকারি দল সমর্থকদের হাতে সারা দেশে ১১৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

‘টিপুকে ঢাকা থেকে ধরে নিয়ে আগৈলঝাড়ায় হত্যা করা হয়’

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ছাত্রদল নেতা টিপু হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করে বরিশালের অগৈলঝাড়ায় নিয়ে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। আজ জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে টিপু হাওলাদারের মা রাজিয়া বেগম ও স্ত্রী সোমা আক্তার এ অভিযোগ করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাজিয়া বেগম বলেন, ‘দ্যাশে তো আইন-কানুন আছে। অপরাধ করলে তার শাস্তি হইবে। তাই বইল্লা কি বিচার ছাড়াই পুলিশ একটা মানুষ মাইরা হালাইবে। এহন মুই দুইডা নাতনি ও পোলার বউ নিয়া কই যামু। ওরে আল্লারে, আমার টিপুরে ফিরাইয়া দেন।’ সোমা আক্তার বলেন, আমরা জানতে পারি- ১৯শে ফেব্রুয়ারি ডিবি পুলিশ ঢাকা থেকে টিপুকে আটক করে হাজারীবাগ থানায় নিয়ে  গেছে। পরদিন সকালে তাকে আগৈলঝাড়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ খবর শুনে শাশুড়িসহ আগৈলঝাড়া থানায় গেলে পুলিশ বলে- টিপু এখানে নেই। তারপর থানার দারোগা আমাদের থানা  থেকে বের করে দেন। তিনি বলেন, আগৈঝাড়া থানার পাশেই আমাদের বাড়ি। ২০শে ফেব্রুয়ারি রাত ২টার দিকে থানার পাশে ৮-১০টা গুলির শব্দ পাই। পরদিন সকাল বেলা শুনতে পাই- টিপু ও জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির হাওলাদার বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। সোমা আক্তার বলেন, একটি মিথ্যা গাড়ি পোড়ানো মামলায় এভাবে পুলিশ একজনকে গুলি করে হত্যা করতে পারে? আমার তিন বছরের মেয়ে হাফসা ও তিন মাস বয়সী আফরোজাকে নিয়ে এখন কোথায় যাবো? তাদের আমি কেমন করে মানুষ করবো? এ সময় তিনি তার স্বামীর হত্যার সঠিক বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। সংবাদ সম্মেলনে টিপু হওলাদারের শাশুড়ি নুরুন্নাহার বেগম উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, ২০শে ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে আগৈলঝাড়া উপজেলার বাইবাস সড়কের কুয়াতিরপাড়ে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ বরিশালে আগৈলঝাড়া উপজেলার ছাত্রদলের য্গ্মু সম্পাদক টিপু হওলাদার ও জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির হাওলাদার নিহত হয়।

সর্বত্র রক্তক্ষরণ by কাফি কামাল ও সিরাজুস সালেকিন

৬০ দিন ধরে চলছে নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট আহূত অনির্দিষ্টকালের অবরোধ। প্রতি সপ্তাহে দুই দফায় ৫ দিন করে পালিত হচ্ছে হরতাল। ৫ই জানুয়ারি শুরু হওয়া এ আন্দোলনে প্রতিদিনই ঘটছে সহিংস ঘটনা। বিরোধী জোটের আন্দোলন কর্মসূচি ও সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে তৈরি হয়েছে এক দমবদ্ধ পরিস্থিতি। জাতীয় জীবনের সর্বত্রই রক্তক্ষরণ। বিপর্যস্ত জনজীবন। প্রতিনিয়তই ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। রাজপথে পুড়ে কয়লা হচ্ছে মানুষ। দুর্বৃত্তদের পেট্রলবোমার আঘাতে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৬৫ জনের। আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন অন্তত ১৪০০ জন। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথিত ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় মারা গেছে বিরোধী জোটের ৬০ নেতা-কর্মী-সমর্থক। এ সময় সরকার সমর্থকদের হামলায় নিহত হন আরও অন্তত ১৫ জন। এ সময় গুম হয়েছেন ২১ জন। এ সময় সরকার দলীয় বেশ কয়েকজন কর্মী-সমর্থকও দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন। পুলিশের গুলি ও সরকার সমর্থকদের হামলায় আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। গ্রেপ্তার হয়েছেন ২০ দলীয় জোটের শীর্ষস্থানীয় শতাধিক নেতাসহ অন্তত ২৫ হাজার নেতাকর্মী। নৈরাজ্য ও নাশকতার ঘটনায় দায়েরকৃত অন্তত ১৪০০ মামলায় আসামি করা হয়েছে আড়াই লাখের বেশি বিরোধী জোট সমর্থকসহ সাধারণ মানুষকে। গ্রেপ্তার আতঙ্কে ঘর ছাড়া বিরোধী জোটের নেতা-কর্মীসহ কয়েক লাখ সাধারণ মানুষ। আতঙ্কে স্থবির হয়ে পড়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। অচল হয়ে পড়েছে দেশের অর্থনীতিসহ উৎপাদনশীল খাত। দফায় দফায় পরীক্ষা পেছানো ও ক্লাস বন্ধ থাকায় হুমকির মুখে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ। প্রতিদিন রাজপথের পাশাপাশি রেলপথ-নৌপথেও ঘটছে নাশকতা। দুই মাসে রাজধানীর সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত অচল অবস্থায় আছে। মহাসড়কে চলন্ত গাড়িতে একের পর এক পেট্রলবোমা হামলার কারণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে দূরপাল্লার যাত্রীদের মাঝে। অবরোধে আক্রান্ত হয়েছে অন্তত ২২০০ যানবাহন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের তথ্যানুসারে, দেশে এক দিনের হরতাল বা অবরোধে গড়ে দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এ হিসাবে ৬০ দিনে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। এদিকে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ৩রা জানুয়ারি থেকে নিজের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ এবং পরবর্তীতে কৌশলগত কারণে অবস্থান করছেন খালেদা জিয়া। তাকে কার্যালয় থেকে বের করতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও খাবার সরবরাহ বন্ধ করেছে সরকার। নাশকতার ঘটনায় হুকুমের আসামি হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা হয়েছে একাধিক হত্যা মামলা। দুর্নীতির মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ও কার্যালয় তল্লাশির ব্যাপারে আদালতের অনুমতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের আন্দোলনের প্রধান দাবি নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু সরকারের কঠোর মনোভাবের কারণে দিনদিন খারাপের দিকে যাচ্ছে পরিস্থিতি। বাংলাদেশের চলমান নৈরাজ্যময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার ও বিরোধী জোট দুই পক্ষকে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রভাবশালী বন্ধু রাষ্ট্রগুলো। সংলাপের ব্যাপারে বিরোধী জোট ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও কঠোর অবস্থান থেকে একচুলও নড়েনি সরকার।
পেট্রলবোমায় নিহত ৬৪ ও আহত ১৪০০: ২০ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধ ও দফায় দফায় হরতালকে কেন্দ্র করে ৪ঠা জানুয়ারির পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই দেশের নানা জায়গায় যাহবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পেট্রলবোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আগুনে পুড়ে প্রাণহানি ঘটেছে ৬৪ জনের। যাদের বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ। নিহতদের মধ্যে সাধারণ যাত্রী ২৯ জন ও বাকি ২১ জন পরিবহন শ্রমিক। নিহত যাত্রীদের মধ্যে পুলিশ সদস্য, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, বয়স্ক নারী এবং শিশুও রয়েছেন। যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও পেট্রলবোমা হামলায় আহত হয়েছে ১৪০০ জন। যাদের মধ্যে আগুনে পুড়েছে ৩৫০ জন। রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ২০০ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৫০ জন। তাদের মধ্যে চারজনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।
১৪০০ মামলা, আসামি আড়াই লাখ, গ্রেপ্তার ২৫০০০ হাজার: অবরোধ-হরতালকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আর এসব ঘটনায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়াসহ বিরোধী জোটের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই দায়ের হচ্ছে একের পর এক মামলা। খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করে দায়ের হয়েছে একাধিক নতুন মামলা। ইতিমধ্যে সারা দেশে দায়ের হয়েছে অন্তত ১৪০০ মামলা। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে আড়াই লাখের বেশি নেতাকর্মী ও সমর্থকসহ সাধারণ মানুষকে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিরোধী জোটের অন্তত ২৫ হাজার নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষকে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য, দৈনিক মানবজমিনের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের দাবিকৃত সংখ্যা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া যায়। এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে রাজধানীর নাশকতাপ্রবণ এলাকা থেকে জামায়াত-শিবিরের প্রায় ৫০০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে বিএনপি-জামায়াতের কয়েকজন সিনিয়র নেতা এবং বিএনপিপন্থি আইনীজীবীরা দাবি করেছেন, গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৩০ হাজারের মতো। তারা জানান, দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় বিরোধী নেতাকর্মীদের প্রতিদিনই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তার অনেক তথ্যই গণমাধ্যমে পৌঁছে না। অনেক তথ্য প্রকাশিত হয় না। এদিকে একই সময়ে রাজধানী ঢাকা, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, রাজশাহী, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, যশোর, মাগুরা, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, হবিগঞ্জ, ঝালকাঠি, বরিশালসহ দেশের বেশ কয়েকটি বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক মামলা দায়ের ও এসব জেলায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়েছে দফায় দফায়। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, যশোর, গাইবান্ধা, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুরসহ কয়েক জেলা প্রতিদিনই উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক নেতাকর্মী-সমর্থক গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ দলের স্থায়ী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, যুগ্ম মহাসচিব ও বিভিন্ন জেলা বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অঙ্গসংগঠনের অন্তত দুই শতাধিক সিনিয়র নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 
অতীতের আন্দোলনে হতাহতের চিত্র: ১৯৯৬ সালে ফেব্রুয়ারি-জুন মাসে ৬ষ্ঠ ও সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিহত হয়েছিল ৮২ জন। এর মধ্যে দলীয় নেতাকর্মী ৩৬ ও সাধারণ মানুষ ৩২ জন এবং অজ্ঞাত ১৪ জন।  ৮২ জনের মধ্যে পুলিশের গুলিতে ২২ জন, সংঘর্ষ-হামলায় ২৬ জন, বোমা হামলায় ১৯ জন ও অন্যান্য ১৫ জন।  ২০০১ সালে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিহত হয়েছে ৯৬ জন। এর মধ্যে দলীয় কর্মী ৭৯ জন ও সাধারণ মানুষ ১৭ জন। হামলায় ৫৫ জন, বোমায় ১৮ জন, গুলিতে ১৪ জন ও অন্যান্য ৯ জন। ২০০৬ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিহত হয়েছে ৩২ জন। এর মধ্যে দলীয় কর্মী ২৮ জন, সাধারণ মানুষ ৪ জন। হামলায় নিহত হয়েছে ২৭ জন, গুলিতে ৩ জন ও অন্যান্য ২ জন। সর্বশেষ ১০ম জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ৫ই জানুয়ারি পর্যন্ত ৫৯ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জন দলীয় কর্মী ও ৪০ জন সাধারণ মানুষ। হামলায় নিহত হয় ২৫ জন, পেট্রলবোমায় ২২ ও অন্যান্য ১২ জন।
বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা: গত দু’মাসে রাজধানীর সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত অচল অবস্থায় আছে। মহাসড়কে চলন্ত গাড়িতে একের পর এক পেট্রলবোমা হামলার কারণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে দূরপাল্লার যাত্রীদের মাঝে। অবরোধে আক্রান্ত হয়েছে অন্তত ২২০০ যানবাহন। পোড়ানো হয়েছে সহস্রাধিক গাড়ি। অবরোধ-হরতালে মহাসড়কে যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক হয়নি দু’মাসেও। ব্যাহত হচ্ছে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-রাজশাহী, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, ঢাকা-বগুড়া, ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-বরিশাল, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কমপক্ষে ৮০০ স্থানে নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। সর্বাধিক নাশকতা হয়েছে নাটোর, রাজশাহী, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, নোয়াখালী, রংপুর, লক্ষ্মীপুর, গাজীপুর, ফেনী, ঢাকা, সিলেট, বগুড়া, গাইবান্ধা, চট্টগ্রামে। যানবাহনে বড় ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটেছে রংপুর, গাইবান্ধা ও কুমিল্লায়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির হিসাবে, একদিন গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকলে ৩৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এ যাবৎ এ খাতে ২১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সরকার ১৪৬ জন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবহন মালিককে ৪ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। তবে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-রাজশাহী, নীলফামারী-রাজশাহী, ঢাকা-খুলনা রুটের অন্তত ১০০টি স্থানে ট্রেন, রেলপথ ও রেল স্টেশনে দফায় দফায় নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রুটে এর পরিমাণ ছিল সর্বাধিক। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, পর্যটনের এ মওসুমে অবরোধের কারণে রেলে আয় কমেছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। একই সময়ে অবরোধে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি টাকা। সংস্থাটির ৬০ শতাংশ গাড়ি বন্ধ রাখা হচ্ছে। নৌপথে নাশকতা চালানো হয়েছে ৬ দফা। এদিকে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের হিসাব মতে, অবরোধে রাজধানীতে প্রায় ৩০০ গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। নাশকতার ঘটনায় ৩৩০টি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় এক হাজার ৬০০ জনকে। পুলিশের তথ্যানুসারে, তেজগাঁও, রামপুরা, বনশ্রী, যাত্রাবাড়ীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নাশকতা ঘটানো হচ্ছে বেশি। তবে ককটেল বিস্ফোরণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকা। অবরোধ শুরুর পর থেকে এ এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণেই আহত হয়েছে অন্তত ৫৫ জন।
আর্থিক ক্ষতি দেড় লাখ কোটি টাকা: অবরোধ-হরতালে দু’মাসে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কমপক্ষে ১ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের তথ্যানুসারে, দেশে এক দিনের হরতাল বা অবরোধে গড়ে ২৭০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এ হিসাবে ৬০ দিনে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। সরকার বলে আসছিল আগামী এক সপ্তাহের মাঝেই অবস্থা স্থিতিশীল হবে। কিন্তু দুই মাস পার হলেও অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। তবে অবস্থার পরিবর্তন না হলেও ইতিমধ্যেই দেশের অর্থনীতির দশা বেহাল হয়েছে। সার্বিক অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিশ্লেষকরা জানান, হরতাল-অবরোধে দেশের সব খাতেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলছে। উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রপ্তানিতে সমস্যায় পড়েছে। বিদেশী অর্থছাড় কমেছে। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা তাদের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। অর্থনীতিতে সবদিকে এতটা অচলাবস্থা আর কখনও দেখা যায়নি বলে তারা মনে করেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মীর্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম মানবজমিনকে জানান, এভাবে চলতে থাকলে দেশে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে। খোঁজ নিলে জানা যাবে, নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ এখন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন পার করছে। মানুষের হাতে কোন কাজ নেই। কর্মহারা এসব মানুষ পথে পথে ঘুরছে। অস্বস্তিকর পরিবেশ দীর্ঘায়িত হলে প্রবৃদ্ধির টার্গেট, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা কোন ভাবেই বাস্তবায়ন হবে না বলে জানান এ অর্থনীতিবিদ। অন্যদিকে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) হিসাবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে প্রতিদিন অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হচ্ছে তা ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রাক্কলিত জিডিপির হিসাব অনুযায়ী ০.১৭ শতাংশ। সে হিসাবে প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২,২৭৭ কোটি ৮৬ হাজার টাকা, তবে প্রতিদিন শিল্প উৎপাদন সক্ষমতায় ২৫ শতাংশ ক্ষতি ধরলে এর পরিমাণ প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকারও বেশি। এ হিসাবে গত ৬০ দিনে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। সংগঠনগুলোর হিসাবে দেখা গছে, গত দুই মাসের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে- পোশাক রপ্তানি বাধাগ্রস্তে ক্ষতি ৪১,৭০০ কোটি টাকা। পরিবহন খাতে ১৮,০০০ কোটি টাকা। কৃষি খাতে ১৭,২৮০ কোটি, আবাসন খাতে ১৫,০০০ কোটি, পর্যটন ১২,৬০০ কোটি, পাইকারি বাজার ৯,০০০ কোটি, উৎপাদন খাত ৬০০০ কোটি, রাজস্ব আদায় ১,৯৮০ কোটি, সিরামিক খাতে ১,২০০ কোটি, পোল্ট্রি শিল্প খাতে ১,০৮০ কোটি, প্লাস্টিক খাতে ১,০২০ কোটি, বীমা খাতে ৯০০ কোটি, হকার্স খাতে ৯০০ কোটি, স্থলবন্দরে ক্ষতি ৬০০ কোটি ও হিমায়িত খাদ্য খাতে ৪৮০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। সংগঠনের তথ্যানুসারে, অবরোধ-হরতালের প্রথম ৪৫ দিনে পোশাক খাতে ৪০ হাজার কোটি, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ১২ হাজার ৭৫০ কোটি, খুচরা ও পাইকারি বিক্রিতে ২০ হাজার কোটি, আবাসন খাতে ১০ হাজার ৫০০ কোটি, কৃষি ও পোল্ট্রি খাতে ১২ হাজার ৭৫০ কোটি, পর্যটন খাতে ৯ হাজার কোটি ও উৎপাদনশীল শিল্প খাতে ৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রাজধানীতে অসুস্থ রোগীদের যাতায়াতও ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা।
বিপর্যস্ত শিক্ষা খাত: অবরোধ-হরতালে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছে দেশের ৫ কোটি শিক্ষার্থী। বছরের শুরুতেই অবরোধ হরতালের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে শিক্ষাসূচি। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে চার কোটি ৪৪ লাখ শিক্ষার্থীকে নতুন বই দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা পুরোপুরি ক্লাস শুরু করতে পারেনি। হরতালের কারণে প্রতি শুক্রবার ও শনিবার স্কুল খোলা রাখা হলেও অবরোধের কারণে এ দু’দিনও ঠিকমতো ক্লাস হচ্ছে না। নিরাপত্তার কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কম। অন্যদিকে ২রা ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয় ৬ই ফেব্রুয়ারি। এতে ১৫ লাখ পরীক্ষার্থী ভোগান্তির শিকার হয়। একটি পরীক্ষাও নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী হয়নি। হরতালের কারণে পরীক্ষা হয় শুধু শুক্র ও শনিবার। এ ছাড়া আগামী ১লা এপ্রিল থেকে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়েও সংশয়ে আছে ১৩ লাখ শিক্ষার্থী। এছাড়া ফেনীসহ কয়েকটি জায়গায় শিক্ষার্থীরাও হামলার শিকার হয়েছে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সুশীল সমাজ আক্রান্ত

বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সুশীল সমাজ আক্রান্ত। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করে এমন পদক্ষেপের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে এ কথা বলেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার যেইদ রা’আদ আল হুসেন। গতকাল জেনেভায় হাই কমিশনারের বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন তিনি। এতে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের বিষয়ে তিনি উদ্বেগ জানান। এ সময় তিনি বলেন, কেবল চরমপন্থিদের দ্বারাই নয়, সরকারের তরফ থেকে কঠোর প্রতিক্রিয়ার কারণেও বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সুশীল সমাজ আক্রান্ত। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সহযোগী সংস্থাটির প্রধান বলেন, আমি জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে একযোগে সব রাজনৈতিক নেতার প্রতি সহিংসতা বন্ধ, রাজনৈতিক সংলাপের পথ খোঁজা ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান নিশ্চিতের আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে গত সপ্তাহে এক মুক্তমনা ব্লগার ও তার স্ত্রীর ওপর হামলার ঘটনা সর্বশেষ বেদনাদায়ক ঘটনা। তিনি আরও বলেন, অনেক শিশুসহ কমপক্ষে ৮০ জন মানুষ পেট্রলবোমা হামলা, রাজনৈতিক দলসমূহ ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন। তিনি আহ্বান জানান, সমাজ যেখানে সন্ত্রাসী কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই করছে সেখানে মানবাধিকারের নীতিতে অবহেলা করা উচিত নয় রাষ্ট্রের। যুদ্ধের ভয়াবহতা এড়ানোর জন্য জাতিসমূহ ৭০ বছর আগে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি নীতি গ্রহণ করে। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যেসব ব্যবস্থা গৃহীত হচ্ছে তাতে ওই নীতির ওপর থেকে নীতিনির্ধারকরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবেন। এটা সত্যিকার অর্থে একটি মারাত্মক ঝুঁকি।

বাংলাদেশে শেষের খেলা শুরু -দ্যা ইকোনমিস্ট

শেষের খেলা হয়তো শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এ সপ্তাহে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে খেলার শেষ হতে সময় নেবে। ২৫শে ফেব্রুয়ারি বিরোধী দল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করা হয়। এ সপ্তাহে তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করবে বলে অনেকে ধারণা করেছিলেন। খালেদা জিয়া শুধু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীই নন, তিনি কার্যত তার সরকারের সর্বশেষ প্রতিপক্ষ। দু’মাস ধরে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি অবস্থা যখন চরম উত্তেজনায় পৌঁছেছে  মানুষ তখন এ প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিয়েছে যে শেখ হাসিনা খালেদা জিয়াকে কারান্তরীণ করার রাস্তা খুঁজে পাবেন কিনা;  এখন তাদের প্রশ্ন কখন তা ঘটবে। ৪ঠা মার্চ একটি আদালত জবাব দিয়েছেন যে এখনই নয়।
লন্ডনের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন দ্যা ইকোনমিস্টের গতকালের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। ‘অন দ্যা বয়েল’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বুধবার খালেদা জিয়ার মামলার শুনানি এক মাস পেছানো হয়েছে। এ বিলম্বকরণ বিচারিক বিবেচনার থেকে সম্ভবত রাজনীতির সঙ্গেই বেশি জড়িত। ৪ঠা মার্চ তাকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে জল্পনা-কল্পনা ছিল। এর একদিন আগে সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও তুরস্কসহ নয়টি দেশের কূটনীতিকরা তার কার্যালয়ে হঠাৎ উপস্থিত হন। কার্যালয়ের ভেতরে পুলিশ গত দু’মাস ধরে ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে। কূটনিতীকদের সফরে সম্ভবত সরকারের উপলব্ধি হয়েছে যে যদি ৬৯ বছরের এক নারীকে অন্যায়ভাবে কারাগারে পাঠাতে দেখা যায় তাহলে এটা কার্যত বেগম জিয়াকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হতে সহায়তা করবে। এর পরিবর্তে সরকার খালেদা জিয়ার বিচার প্রক্রিয়ার শেষ হওয়া পর্যন্ত নিজেদেরকে তুষ্ট রেখেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
খালেদা জিয়ার অনানুষ্ঠানিক আটকাবস্থা ও তার মাথার ওপর এখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। তিনিই একমাত্র উল্লেখ করার মতো ব্যক্তি, যিনি এখনও কারারুদ্ধ নন। সাম্প্রতিক সময়ে সিনিয়র অন্য অনেক নেতাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। গৃহবন্দি করা হয়েছে অথবা নির্বাসনে রয়েছেন। ২৫শে ফেব্রুয়ারি পুলিশ আটক করেছে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নাকে। হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। নির্বাচনে বিএনপির ঘনিষ্ঠ মিত্র জামায়াতে ইসলামীর প্রধান নেতাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে যুদ্ধাপরাধবিষয়ক আদালত। ৫ই জানুয়ারির পর রাজপথের সহিংসতায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১২০ জন। এর বেশির ভাগই নিহত হয়েছেন পেট্রলবোমা নিক্ষেপে। এসব পেট্রলবোমা ছুড়েছে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা। তবে অনেকে নিহত হয়েছেন পুলিশের গুলিতে।
ভবিষ্যতের বিশ্বাসযোগ্য কোন নির্বাচনের জন্য পরিস্থিতি অনুকূল নয়। বেগম জিয়া ও তার প্রবীণ উপদেষ্টাদের দেখে মনে হচ্ছে অচলাবস্থার তীব্রতা তারা উপভোগ করছেন। বিরোধী দলের তুলনামূলক উদারপন্থী নেতাদের কোনঠাসা করে রাখা হয়েছে। বরং চরমপন্থি, উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় কট্টরপন্থি, যারা ক্রমবর্ধমান হুমকি প্রদর্শন করছেন, তাদের জন্য জায়গা খালি করা হচ্ছে। এর একটি প্রতিফলন দেখা গেল ২৬শে ফেব্রুয়ারি যেদিন এক আমেরিকান-বাংলাদেশী লেখককে ঢাকায় রিকশা থেকে নামিয়ে রাস্তায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি ইন্টারনেটে ইসলামি চরমপন্থিদের সমালোচনা করার সাহস দেখিয়েছিলেন, তার পাল্টা হিসেবে তাকে হত্যা করার সংকল্প নিয়েছিল চরমপন্থিরা।
কোন শান্তিপূর্ণ পথ পাওয়া যাবে কিনা এটি এখনও পরিষ্কার নয়। বেগম জিয়ার এক উপদেষ্টা মনে করেন জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচন হবে একটি সম্ভাব্য পথ। শেখ হাসিনার এক উপদেষ্টা জানিয়েছেন বিএনপিকে অবশ্যই ‘২০১৯ সালের পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’ এদিকে অর্থনীতি অব্যাহতভাবে ধুঁকছে। রাজপথের প্রতিবাদকারীরা উৎপাদিত পোশাকের বিশাল অংশ বাজারে পৌঁছতে দিচ্ছেন না। ফলে অর্ডারের সংখ্যা কমছে। ব্যবসায়ী নেতারা ও ঢাকার অভিজাতরা এতে হতাশ হচ্ছেন। এদের অনেকে মনে করছেন, আরেক ধরনের পরিবর্তন হয়তো আসন্ন। যদি বাংলাদেশে তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত সেনাবাহিনী বেসামরিক রাজনীতিবিদদের আচরণে অধৈর্য হয়ে যান এবং তাদের সমূলে উৎপাটিত করেন, তবে এটিই প্রথম উদাহরণ হবে না। দেশটির তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ বিদেশী আংশীদাররা যেমন, আমেরিকা, ভারত ও সৌদি আরব বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ আবারও প্রত্যক্ষভাবে ভেঙে পড়তে দেখে খুশি হবে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শিগগিরই বাংলাদেশ সফরের কথা রয়েছে। তিনি হয়তো ইসলামিস্ট চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার কঠোর অবস্থানের কারণে তাকে নৈতিক সমর্থন দিতে পারেন। তবে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিকে যতটা সম্ভব স্থিতিশীল ও সহনীয় দেখতে চাইবেন। সাধারণত, সফররত একজন ভারতীয় নেতা এ ধরনের সফরে অন্তত প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আশা করেন। তবে এবার তা জটিল বলে প্রমাণিত হতে পারে।

হত্যার মাধ্যমে বাকস্বাধীনতা রোধ করা যাবে না -দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

লেখকদের সুরক্ষায় আরও অনেক কিছু করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। একই সঙ্গে একটি পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে যে, হত্যা করার মাধ্যমে বাকস্বাধীনতার কণ্ঠ রোধ করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ  হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার মধ্যকার রাজনৈতিক মেরুকরণ এ সঙ্কটের নেপথ্যে অবদান রাখছে। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক সম্পাদকীয়তে এ কথা বলা হয়েছে। গত সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়। এ নিয়ে ‘এ মার্ডার ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই সম্পাদকীয়তে বলা হয়- এটা ছিল একের ভেতরে দুই-এর মতো। ২৬শে ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ঢাকায় অভিজিৎ রায়তে কুপিয়ে হত্যার পর টুইটারে বাংলাদেশী জঙ্গিবাদী ইসলামি গ্রুপ আনসার বাংলা-৭ টুইটারে লিখেছিল- ‘টার্গেট ছিল এক আমেরিকান নাগরিক। একের ভেতর দুই।’ একের ভেতর দুই- কারণ, লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় ছিলেন একাধারে স্বীকৃত নাস্তিক ও আমেরিকান নাগরিক। ওই টুইটে আরও লেখা ছিল #রিভেঞ্জ + #পানিশমেন্ট (প্রতিশোধ ও শাস্তি)। জঙ্গিদের মনোভাব অনুযায়ী- ছুরি দিয়ে এক লেখকের মস্তিষ্কে আঘাত করা এমন এক মতপ্রকাশের শাস্তি, যা তারা পছন্দ করে না। এছাড়া আফগানিস্তান ও সিরিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকলাপের এক ধরনের অসুস্থ প্রতিশোধস্বরূপ হত্যা করা হয় এই মার্কিনিকে। ২০১৩ সালে ব্লগার রাজিব হায়দারকেও ঢাকার এক সড়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। অভিজিৎ রায়ের মতো রাজিব হায়দারও ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করেছিলেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অনেকেই ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামীর সদস্য।
বাংলাদেশের আইন তেমন একটা সহায়তা করে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ সরকার ধর্ম অবমাননার দায়ে দেশটির ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা অনুযায়ী বিভিন্ন জনকে গ্রেপ্তার ও বিচার করেছে। ওই আইনে ‘ধর্মানুভূতিতে আঘাত করে কিংবা করতে পারে অথবা কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে’ এমন তথ্য প্রচার করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার মধ্যকার রাজনৈতিক মেরুকরণ এ সঙ্কটে অবদান রাখছে। জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট দলগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ ৯ দেশের কূটনীতিকরা মঙ্গলবার সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
এবার সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর ঘটনায় শফিউর রহমান ফারাবি নামের এক সন্দেহভাজনকে আটক করেছে। ওই হামলার কিছুক্ষণ পরই সংশ্লিষ্ট কিছু ছবি পোস্ট করেছিলেন ফারাবি। এছাড়া এ ঘটনার তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার একটি প্রস্তাবও মেনে নিয়েছে বাংলাদেশ। অভিজিৎ রায় দৃশ্যত খুন হয়েছেন শুধু একজন আমেরিকান নাগরিক হওয়ার কারণে। গত বছর, ফারাবি ফেসবুকে একটি বার্তা পোস্ট করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অভিজিৎ রায় আমেরিকায় বাস করেন। সুতরাং এখন তাকে হত্যা করা সম্ভব নয়। যখন তিনি দেশে আসবেন, তখন তাকে হত্যা করা হবে। লেখকদের সুরক্ষায় আরও অনেক কিছু করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। একই সঙ্গে একটি পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে যে, হত্যা করার মাধ্যমে বাকস্বাধীনতার কণ্ঠ রোধ করা যাবে না।

সীমান্তে হত্যা ও দ্বিপক্ষীয় সমস্যা by আলী ইমাম মজুমদার

সংবাদপত্রের পাতায় প্রায়ই খবর আসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার। খবর খুবই ছোট হয়। এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও বিরল ক্ষেত্র ব্যতীত তেমন একটা লক্ষণীয় হয় না। নিহত ব্যক্তির পরিবার-পরিজনেরও কেউ খোঁজ নেয় না। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি একটি প্রথাগত প্রতিবাদ পাঠায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও মোটামুটি নীরবই থাকে। ভারতের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিজিবি কিংবা জেলা প্রশাসক সম্মেলনে মাঝেমধ্যে বিষয়টি আলোচিত হয়। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক বিষয় নিয়ে মাঝেমধ্যে দেশ উত্তাল করলেও এ ধরনের ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা থাকছে তাদের দৃষ্টিসীমার আড়ালে। এমনকি তাদের সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলা শাখাগুলোও বিষয়টি এড়িয়ে যেতেই পছন্দ করছে। স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোও নীরব। হয়তো ধরে নিয়েছে এটাই নিয়ম। অথবা প্রতিবাদে লাভ কী?
জানা যায়, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার একজন রাখাল মারা গেছে গরু চোরাচালান করতে গিয়ে। সে মাসেই দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলায় বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে একজন শ্রমিক গুলিতে নিহত হয়। ঝিনাইদহ জেলার সীমান্তেও গুলিতে নিহত হয় দুজন। সবগুলোই বিএসএফের গুলিতে। খবরের উৎস সংবাদপত্র। বিরামপুরের নিহত শ্রমিকের কী অপরাধ, জানা যায় না। সে সীমান্তও পাড়ি দেয়নি। অন্য তিনজন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চোরাচালান করতে গিয়ে প্রাণ হারায়। চোরাচালান ও পাসপোর্ট ভিসা ব্যতীত সীমান্ত পাড়ি দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে মৃত্যুদণ্ড নয়। আর দণ্ড আরোপের কোনো ক্ষমতা কোনো দেশই তার সীমান্তরক্ষীকে দেয় না। এর জন্য উপযুক্ত আদালত রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে থাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ।
প্রশ্ন আসবে, এসব ঘটনার শিকার কারা? কেন হয় এমনটা? ঘটনার শিকার নিতান্তই হতদরিদ্র শ্রেণির লোক। তাদের কেউ কেউ চোরাচালানি চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। মূলত তারা ওপার থেকে নিয়ে আসা গরুর রাখাল কিংবা অন্য কোনো মালামাল বহনের শ্রমিক। এ চক্রের যারা মূল হোতা, তারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা যখন সীমান্ত পাড়ি দেয়, তখন ক্ষেত্রবিশেষে উভয় দিকেই রক্ষীরা কর্তৃক সমাদৃত হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। চোরাচালানি ছাড়া এপার-ওপারে রয়েছে অনেক সামাজিক যোগাযোগ। তারাও ক্ষেত্রবিশেষে এ ধরনের আসা-যাওয়া করে। তাদেরও কখনোবা ঘটে এরূপ করুণ পরিণতি। ২০১১ সালে ফেলানি নামের এক কিশোরী কন্যার নির্মম হত্যা বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। সংশ্লিষ্ট বিএসএফ সদস্যের বিচার হয়েছিল কোর্ট মার্শালে। বেকসুর খালাস পেয়েছে সে অভিযুক্ত। আবার তোলপাড় শুরু হলে পুনর্বিচারের আদেশ হয়। তবে একই আদালতে। শুনানির একটি তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর থেমে আছে সে প্রক্রিয়াও।
কেন এমনটা হয়, এটা বিশ্লেষণ করলে যেতে হবে ১৯৪৭ সালে। দেশ বিভাগ হলো। সে বিভক্তি সীমারেখা যে বা যাঁরা করেছিলেন, তাঁরা আর যা হোক অনেক ক্ষেত্রে বিসর্জন দিয়েছিলেন বাস্তবতাকে। একই দেশ বা প্রদেশ শুধু ভাগ হয়নি। ভাগ হয়েছে জেলা, মহকুমা, থানা এমনকি বাড়ি। একই বাড়ির বাসগৃহ আর পুকুর সীমান্তের এপার-ওপারে পড়েছে—এমন ঘটনা বিরল নয়। তা ছাড়া এ সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো ঘনবসতিপূর্ণ এবং উর্বর। তাই নিজ দেশের সীমারেখার মধ্যেই কৃষক চাষ করেন সীমান্ত পিলারের কাছাকাছি পর্যন্ত। এ সীমান্ত রেখার দৈর্ঘ্যও বিশাল। ৪০৯৬ কিলোমিটার। পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম স্থলসীমান্ত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তরেখা। ভারতের পাঁচটি রাজ্য এ সীমারেখায় রয়েছে। এগুলো হচ্ছে আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মেঘালয় আর পশ্চিমবঙ্গ। আমাদের দুর্ভাগ্য, এ জাতীয় ঘটনাগুলো প্রায় সবই পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে। অবশ্য উল্লেখ্য যে বিএসএফ কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন, রাজ্য সরকারের নয়। এ সীমান্তরেখার এপার-ওপার কিছু লোকজন চলে পাসপোর্ট–ভিসা ব্যতিরেকে। চোরাচালান হয় স্বর্ণ, ইলিশ থেকে ফেনসিডিল আর গরুসহ অনেক কিছু। সীমান্তে মাঝেমধ্যে এ ধরনের হত্যার ঘটনা আমাদের বিচলিত করে। বিচলিত করার কথা যেকোনো বিবেকবান ভারতীয় নাগরিককেও। সেখানকার কোনো কোনো মানবাধিকার সংগঠন এসব বিষয়ে প্রতিবাদী ভূমিকায় আছে। তবে বারবার বিভিন্ন পর্যায়ের আশ্বাস সত্ত্বেও ঘটনাগুলো ঘটেই চলছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নামের একটি সংস্থার হিসাবে একুশ শতকের প্রথম দশকে এভাবে প্রাণ হারিয়েছে সহস্রাধিক বাংলাদেশি। এ বিষয়ে বিএসএফ বলে থাকে, বেআইনি অনুপ্রবেশ এবং আন্তসীমান্ত সন্ত্রাস দমনে তারা কঠোর পন্থা নিয়ে থাকে। আন্তসীমান্ত সন্ত্রাস প্রশ্নে ভারতের উদ্বেগ প্রশমনে বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সাল থেকে ব্যাপক কার্যক্রম নিয়েছে। ফলে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। সুতরাং এ যুক্তিতে গুলি চালানোর বিষয়টি এখন আদৌ প্রাসঙ্গিক নয়। তা ছাড়া মূলত গুলি চলে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের দিক থেকে। পাহাড়ি রাজ্যগুলোর দিক থেকে নয়। এখন আসে বেআইনি অনুপ্রবেশের প্রশ্ন। বাংলাদেশ থেকে ভারতে বেআইনি অনুপ্রবেশের অভিযোগ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ প্রায়ই করে থাকে। অভিযোগটির সঙ্গে বাংলাদেশ একমত নয়। তবুও যদি অনুপ্রবেশকারী বিএসএফের নজরে বা আওতায় আসে, তাদের বিতাড়িত করা কিংবা ধরে নিয়ে ভারতীয় আদালতে বিচারের মুখোমুখি করারই কথা। গুলির প্রশ্ন তো এখানে আসে না।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ প্রায়ই আমাদের আশ্বস্ত করে সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহারের পরিমাণ তারা কমিয়ে আনবে। তা হয়তো ক্ষেত্রবিশেষে বিএসএফ এখন পরিহার করছে। তবে হত্যা কিন্তু বন্ধ হয়নি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, ২০১৪ সালে জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়কালে সীমান্তে বিএসএফের হাতে ২৫ ব্যক্তি নিহত হয়। এর মধ্যে গুলিতে ১১ আর দৈহিক নির্যাতনে ১৪ জন। অপহৃত হয়েছে ৭৮ জন। তাদের মধ্য থেকে ২২ জনকে ফেরত পাওয়া গেছে। বাকি ৫৬ জন নিখোঁজ। তাদের হয়তোবা কেউ ভারতীয় জেলে। কারও বা লাশ ভেসে গেছে নদীতে। সুতরাং আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার কমালেই যে সীমান্তে হত্যা বন্ধ হবে, এমন নয়। সশস্ত্র দুষ্কৃতকারী ছাড়া অন্য কারও প্রতি বিএসএফের গুলি না চালানো নিশ্চিত করতে হবে ভারত সরকারকে।
বাংলাদেশ ভারতের বৃহত্তম প্রতিবেশী। এ দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে তাদের সর্বাত্মক সহায়তা সবাই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে। সে দেশটি একটি উদীয়মান পরাশক্তিও বটে। অর্থনৈতিক ও সামরিক উভয় বিবেচনাতেই এমনটা লক্ষণীয় হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বসমাজে নেতৃত্বের আসনে যাওয়ার জন্য তার প্রতিবেশীদের মধ্যে আস্থার ভাব সৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের সহায়ক তাদের অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতায়। বাংলাদেশের সঙ্গে আস্থার ভাব সৃষ্টি করতে বিএসএফের আচরণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, এটা ভারতকে বুঝতে হবে। দুই দেশের মাঝে সহযোগিতার ক্ষেত্রকে ক্রমান্বয়ে প্রসারের জন্য উভয় পক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। নিজ গাড়ি নিয়ে এক দেশ থেকে অপর দেশে যাওয়ার ব্যবস্থাও প্রায় পাকা হওয়ার পথে। সে ক্ষেত্রে সীমান্তের এ হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী কেন অমানবিক আচরণের শিকার হতে থাকবে, তা বোধগম্য নয়। সবাই তো আশা করে, সহসাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সার্কভুক্ত দেশগুলোর মাঝে চলাচলের জন্য পাসপোর্ট–ভিসা উঠে যাবে। তবে উল্টো পথে চলা যাত্রী গন্তব্যে পৌঁছাবে, এমনটা আশা করা অসংগত।
সেটা যা হোক, সীমান্তের এসব মানুষের প্রতি বিএসএফের নিষ্ঠুর আচরণ বন্ধ করতে ভারত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা দরকার জোরদারভাবে। দুই দেশের বিরাজমান সমস্যাগুলোর মাঝে এটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কাজটি করতে হবে আমাদের সরকারকেই। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিষয়টির প্রতি জানানো দরকার সমর্থন। মানবাধিকার নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের আরও নিবিড় ও বস্তুনিষ্ঠভাবে এ ঘটনাগুলো তুলে ধরা দরকার। তদুপরি, ভারতের এ ধরনের সংগঠনগুলোর নজরেও তাঁরা অব্যাহতভাবে আনতে পারেন এসব বিষয়া। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি অনুকূল হতে পারে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

ট্রাম্প ‘প্রতারক’: রমনি

একই দিনে টানা সাতটি রাজ্যে প্রাইমারি নির্বাচনে জয়লাভ করার দুই দিন পর রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজের দলের শীর্ষ নেতাদের তীব্র আক্রমণের মুখে পড়লেন। বৃহস্পতিবার সল্ট লেক সিটিতে এক সভায় ২০১২ সালে রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মিট রমনি ট্রাম্পকে একজন ‘প্রতারক’ ও ‘দুষ্কৃতকারী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। একই দিনে দলের ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সিনেটর জন ম্যাককেইন ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার বিরুদ্ধে সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলেন, ট্রাম্প বৈদেশিক নীতি বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে তাঁর কথাবার্তা অত্যন্ত ভয়াবহ। গত দুই সপ্তাহ ধরেই রিপাবলিকান মহলে ট্রাম্পের ব্যাপারে ক্রমেই কঠোর ভাষায় আক্রমণাত্মক বক্তব্য শোনা গেছে। আট মাস আগে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর সময় অধিকাংশ রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেননি। যেসব প্রার্থী তাঁর সঙ্গে দলের মনোনয়ন লাভের জন্য লড়াই করছেন, ট্রাম্পের জনসমর্থন লক্ষ করে তাঁরাও ট্রাম্পের প্রতি সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। কিন্তু এখন তাঁর মনোনয়ন সম্ভাবনা লক্ষ করে সব মহল থেকেই সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ডেট্রয়েটফক্স নিউজ আয়োজিত রিপাবলিকান প্রার্থীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত তাঁদের ১১তম বিতর্কেও সেই আক্রমণ অব্যাহত থাকে। রমনির বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সিনেটর ম্যাককেইন এক লিখিত বিবৃতিতে জানান, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে,  সে সময় ট্রাম্পের মতো একজন অজ্ঞ মানুষকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা বিপজ্জনক হবে। এদিকে রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত ৬৫ জন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এক খোলা চিঠিতে ট্রাম্পের মনোনয়নের বিরুদ্ধে মত রেখেছেন। বিগত দুই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট, জর্জ বুশ সিনিয়র ও জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় এসব কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ট্রাম্প আমেরিকা বিষয়ে যে দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থিত করেছেন তা অবাস্তব ও রিপাবলিকান আদর্শের পরিপন্থী। তিনি একই বাক্যে সামরিক অ্যাডভেঞ্চারের প্রস্তাব করেন, আবার আমেরিকাকে অন্য সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার স্বপ্ন দেখেন। তবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে মিট রমনির বক্তব্য। ২০১২ সালের নির্বাচনে রমনি নিজে তাঁর প্রার্থিতার পক্ষে ট্রাম্পের সমর্থন প্রার্থনা করেছিলেন। সে সময় তিনি ট্রাম্পকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন। সল্ট লেক সিটিতে তাঁর বক্তব্যে রমনি সেই ট্রাম্পকে বলেন একজন ‘জাল মানুষ’। এমন লোক প্রেসিডেন্ট হলে দেশ চরম দুর্দশায় নিক্ষিপ্ত হবে। রমনি বলেন, প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য যে মেজাজ ও বুদ্ধিমত্তা দরকার, ট্রাম্পের তা নেই। রমনির কথার তীব্র সমালোচনা করে ট্রাম্প এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানান, রমনি একজন ব্যর্থ রাজনীতিক। চার বছর আগে রমনি কীভাবে তাঁর সমর্থন চেয়েছিলেন, সে কথা স্মরণ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি যদি তাঁকে বলতাম হাঁটু মুড়ে অনুরোধ জানাও, তিনি তাই করতেন।’

‘এখন কী করে চলব’ -হাটহাজারীতে পেট্রলবোমায় দগ্ধ দুই ব্যক্তি by সুজন ঘোষ

(অন্ধকার নে​েম এসেছে ছবি নাথের জীবনে। তাঁর স্বামী দিনমজুর রণজিৎ​ গত বুধবার রাতে দুর্বৃত্তের ছোড়া পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়েছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় কাঁদছেন ছবি নাথ (বাঁয়ে)। ভাতিজাকে ​িকছু একটা বলার চেষ্টা করছেন একই ঘটনায় দগ্ধ অটোরিকশাচালক সাবের আহমেদ l ছবি: প্রথম আলো) দিনমজুর রণজিৎ নাথের প্রায় পুরো শরীর পেট্রলবোমায় ঝলসে গেছে। তাঁকে রাখা হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। আইসিইউ থেকে বের হয়ে রণজিৎ নাথের স্ত্রী ছবি নাথ বলেন, ‘আমরা দুজনে (স্বামী-স্ত্রী) মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাই। তাঁর (রণজিৎ) চিকিৎসার খরচ কোথা থেকে জোগাড় করব আমি? আমরা এখন কী করে চলব? স্বামী-সন্তান ছাড়া আমার আর কেউ নেই।’
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে হাসপাতালে রণজিৎকে দেখার পর তাঁর ভাগনি সরস্বতী নাথ প্রথম আলোকে জানান, মামার মুখ এমনভাবে পুড়েছে যে তাঁকে চেনা যাচ্ছে না। এভাবে কেউ কাউকে পোড়াতে পারে, তা কল্পনায়ও ভাবা অসম্ভব।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার বুড়ির পুকুরপাড় এলাকায় গত বুধবার রাত সাড়ে আটটার দিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পেট্রলবোমা হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে অটোরিকশাচালক সাবের আহমেদ (২৮) ও যাত্রী রণজিৎ নাথ (৩২) গুরুতর দগ্ধ হন।
আহত দুজনের স্বজনেরা জানান, হামলার পর স্থানীয় লোকজন তাঁদের উদ্ধার করে প্রথমে নাজিরহাট হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে রাত ১২টার দিকে তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে রণজিৎ নাথকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক মিশমা ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, আগুনে রণজিৎ নাথের ৮২ শতাংশ ও সাবের আহমেদের ৪৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁদের শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে রণজিতের অবস্থা বেশি খারাপ। তাই তাঁকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।
রণজিতের বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের এনায়েতপুরে। তাঁর দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ে শান্তি নাথ তৃতীয় শ্রেণিতে ও ছেলে প্রান্ত নাথ প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।
স্ত্রী ছবি নাথ বলেন, ‘কোনো রকম সংসার চালাতে পারলেও সন্তানদের পড়ালেখার খরচ জোগাড় করতে পারি না। এখন তাদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাবে।’
স্বজনেরা জানান, হাটহাজারীর চারিয়া এলাকায় বড় বোন শেফালী নাথের বাড়িতে বুধবার সকালে যান রণজিৎ। রাতে আরেক আত্মীয়র বাড়িতে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের পেট্রলবোমা হামলার শিকার হন তিনি।
আইসিইউর বারান্দা থেকে বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, পেট্রলবোমায় সাবেরের মুখ ঝলসে গেছে। গলা থেকে কোমর পর্যন্ত ব্যান্ডেজে মোড়ানো। তাঁর বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন বড় ভাই অলি আহমেদ ও ভাতিজা।
অলি আহমেদ জানান, অটোরিকশায় গ্যাস ভরে হাটহাজারী থেকে নাজিরহাট যাচ্ছিলেন সাবের। চারিয়ার বুড়ির পুকুরপাড় এলাকায় পৌঁছানোর পর চার-পাঁচজন যুবক গাড়ি লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে। ওই সময় গাড়িতে সাবেরসহ পাঁচজন ছিলেন। পেছনের আসনে থাকা তিনজন যাত্রী কোনোভাবে রক্ষা পেলেও সাবের ও তাঁর পাশে বসা রণজিৎ আগুনে পুড়ে যান।
অলি আহমেদ জানান, মাত্র মাস খানেক আগে কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন সাবেরের স্ত্রী কুমরুন নাহার। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি। স্বামীর অবস্থা জানতে একটু পর পর ফোন করছেন তিনি। কিন্তু সাবের ভালোভাবে কথা বলতে পারছেন না। তিনি জানান, টাকার অভাবে আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে ধার করে চলছে সাবেরের চিকিৎসা। তাঁদের বাড়ি ফটিকছড়ির দমদমা গ্রামে। সেখানেই স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকেন সাবের।
হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইসমাইল প্রথম আলোকে জানান, অটোরিকশায় পেট্রলবোমা হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে জামায়াত-শিবিরের ১২ জন ও বিএনপির চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

খাদে পড়তেই যাচ্ছে বাংলাদেশ! by মাসুম খলিলী

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন বিশ্ব প্রচারমাধ্যমের একটি প্রধান বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে হয়তো ততটা মাথা ঘামাতো না বিশ্ব সম্প্রদায়। স্নায়ুযুদ্ধে সক্রিয় বিশ্বশক্তি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মনোযোগের রাডারে মূলত সীমিত থাকত বাংলাদেশ। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। বিশ্বের অন্যতম প্রধান পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে নানা সময়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে স্থান করে নিতে দেখা যাচ্ছে। ১৬ কোটি মানুষের এই দেশটি ভৌগোলিকভাবেও এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যে অঞ্চলটি বিশ্ব শক্তিগুলোর কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে কেউই সেভাবে উপেক্ষা করতে পারছে না। তবে এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া এবং একই সাথে বিশ্ব রাজনীতি এমন এক জটিল আবর্তে পড়ে গেছে যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন বিশ্বের প্রভাবশালী পরাশক্তির পক্ষেও সহজ হয়ে উঠছে না।
এর মধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের অন্য দিকগুলোকে ছাড়িয়ে মুখ্য হয়ে উঠছে এর অর্থনীতির ভয়াবহ ক্ষতির দিকটি। এ ক্ষতি অব্যাহত থাকলে দেশটি যেভাবে দ্রুত অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল সেটি বড় রকম বাধার মুখে পড়তে পারে এমন পূর্বাভাস বিশ্বের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো বাংলাদেশের সার্বক্ষণিক উন্নয়ন অংশীদাররাও উদ্বেগ প্রকাশ করছে এই সঙ্কটে। যদিও তাদের সামনে এ রকম একটি শঙ্কাও কাজ করে যে বাংলাদেশে বর্তমান যে সরকার রয়েছে তাতে এখানকার অবস্থা সম্পর্কে মুক্তভাবে মন্তব্যের নানা ধরনের বিপদাপদ রয়েছে। এখানে বাস্তবে যা ঘটছে তা আড়াল করার এমন এক পেশাদারী প্রক্রিয়া সক্রিয় রয়েছে যাতে বাস্তব অবস্থার তথ্য-উপাত্ত সব সময় লভ্যও হয়ে ওঠে না।
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ১৩ হাজার কোটি ডলারের মতো। বিশ্বব্যাংক কয়েক দিন আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষতির পর্যালোচনা করেছে। এতে বিশ্ব উন্নয়ন সংস্থাটি বলেছে, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শুধুই উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে ১৪০ কোটি ডলারের, যা টাকার অঙ্কে দাঁড়ায় ১১ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। উৎপাদন ক্ষতির বাইরে আরো নানা ধরনের ক্ষতি আছে যা হিসাবের মধ্যে আনা হলে রাজনৈতিক অস্থিরতার অর্থনৈতিক মূল্য আরো অনেক বেশি হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) জানুয়ারি মাসের ১৬ দিনের এ ধরনের সার্বিক ক্ষতির একটি হিসাব দিয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে বেসরকারি নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ জানুয়ারি মাসের অবরোধজনিত সার্বিক ক্ষতির একটি হিসাব করেছে। এই হিসাব অনুসারে অবরোধের প্রথম মাসে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ৬৮ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। যার মধ্যে তৈরী পোশাক খাতের ক্ষতির পরিমাণ হলো ২৫ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। এর বাইরে অবরোধের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ক্ষতির খাত পরিবহনে ৯ হাজার কোটি টাকা, কৃষি খাতে আট হাজার ৬৪১ কোটি টাকা, আবাসন খাতে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা এবং পর্যটনে ছয় হাজার ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।
সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রায় বছরব্যাপী যে সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল তার ক্ষতির চেয়ে বর্তমান ক্ষতি অনেক বেশি। আগের রাজনৈতিক অস্থিরতার মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির অঙ্ক হিসাব করা হয়েছিল ৫০ হাজার কোটি টাকা। ঢাকা চেম্বারের হিসাবকে ভিত্তি ধরে সিপিডির হিসাবে দুই মাসে এ ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়াচ্ছে এক লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির সাড়ে সাত শতাংশের মতো। এবারের রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষতি যেভাবে নিরূপণ করা হচ্ছে তাতে প্রকৃত ক্ষতির কতটা প্রতিফলন ঘটছে তা নিয়ে কিছুটা মতান্তর হতে পারে। তবে এই অস্থিরতা যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে তাতে সংশয়ের অবকাশ থাকছে না।
বিশ্বব্যাংক অর্থবছরের যে সাত মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে উৎপাদন ক্ষতির হিসাব করেছে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব জিডিপির ওপর পড়বে। এ সময়ের মধ্যে অবরোধ ছিল এক মাসের মতো। বাকি ছয় মাস ছিল পুরোপুরি স্থিতিশীল। এ ছয় মাসে বিরোধী জোটকে সেভাবে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে দেখা যায়নি। বিশ্বব্যাংকের রক্ষণশীল হিসাবেও এ পর্যন্ত যে সময়টাতে অবরোধ হরতাল হয়েছে তা হিসাব করা হলে মোট উৎপাদন ক্ষতি দাঁড়াবে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা জিডিপির আড়াই শতাংশের কাছাকাছি।
সরকার চলতি অর্থবছরের জন্য ৭.৩ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ লক্ষ্যমাত্রাকে পরে ৬.২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। জানুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যমান পরিস্থিতিকে সামনে রেখে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ হলো জিডিপি কোনোভাবে ৫.৪ শতাংশের বেশি হবে না। মার্চের প্রথম সপ্তাহনাগাদ সেভাবে রাজনৈতিক স্থবিরতা কাটার কোনো লক্ষণ যেখানে দেখা যাচ্ছে না সেখানে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে বলা কঠিন। অবশ্য সরকারের হিসাব নিকাশের নির্ভরতার ব্যাপারে বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সংশয় প্রকাশ এখন একটি নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সরকারের শীর্ষপর্যায়ের নীতিনির্ধারকেরা একদিকে বলেন হরতাল অবরোধে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে অন্য দিকে আবার দাবি করেন হরতালে দেশের জনজীবনে কোনো প্রভাব নেই। এ ধরনের রেটরিক শুধু রাজনৈতিক সুবিধার জন্য হয়ে থাকলে এর প্রভাব থাকে এক রকমের, কিন্তু পরিসংখ্যানের হিসাব নিকাশকে এর দ্বারা প্রভাবিত করা হলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য হয়ে দাঁড়ায় মারাত্মক।
এক সময় উৎপাদন বেশি দেখাতে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ খাদ্যশস্য উৎপাদনের একটি হিসাব দিয়ে তা গ্রহণ করতে পরিসংখ্যান ব্যুরোকে বাধ্য করত। একইভাবে শিল্প উৎপাদনকেও স্ফীত করে দেখিয়ে মাঠপর্যায় থেকে তথ্য দেয়ার ব্যবস্থা করা হতো। আর সেবা খাতে এমন কিছু উপখাত রয়েছে যেগুলোর উৎপাদন বাড়িয়ে দেখানো সরকার চাইলে সহজভাবে করা যায়। ফলে অতীতে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ যে ধরনের প্রবৃদ্ধি হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল বাস্তবে সরকারের হিসাবে তার চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা, এর পেছনে রয়েছে তথ্য-উপাত্তের কারসাজি।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবে ডাটা কারসাজির নানা তথ্য আসছে। এর মধ্যে মুদ্রা সরবরাহের মতো স্পর্শকাতর খাতও রয়েছে। প্রাপ্ত অনানুষ্ঠানিক তথ্য অনুসারে রাজনৈতিক সঙ্কটের প্রভাব যাতে অর্থনৈতিক সূচকে দৃশ্যমান না হয় তার জন্য বাজারে চলন অনুপযোগী টাকার বিপরীতে নতুন টাকার সরবরাহের কথা বলে বাজারে মুদ্রা ছাড়া হচ্ছে। কিন্তু যে পরিমাণ নতুন টাকা বাজারে যাচ্ছে তার বিপরীতে সে অঙ্কের অচল টাকা বাজার থেকে প্রত্যাহার হচ্ছে না। আনুষ্ঠানিক হিসাবেও এই বাড়তি টাকা দেখানো হচ্ছে না।
ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ সৃষ্টি করে বিপুল অর্থ পাচারের ব্যাপারে সিপিডির পক্ষ থেকে একাধিকবার সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। এ ক্ষেত্রে আমদানির অর্থ বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে সেই আমদানি পণ্য দেশে না আনা অথবা ঘোষণার চেয়ে কম মূল্যের পণ্য আসা আর রফতানি করার পর সেই টাকা অপ্রত্যাবাসিত থেকে যাওয়াসহ নানাভাবে টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া যায়। একই সাথে বিভিন্ন ব্যাংকে বিশেষত সরকারনিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক ঋণ জালিয়াতির ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু খেলাপি ঋণের চিত্রে এর প্রতিফলন ঘটছে না। এটি আড়াল করতে প্রচলিত নিয়ম শিথিল করে কোনো ডাউন পেমেন্ট ছাড়া বড় বড় ঋণ গ্রহীতাদের ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাংকিং খাতে ঋণ জালিয়াতির কারণে যে পরিস্থিতি দেশের আর্থিক খাতে সৃষ্টি হচ্ছে তা আনুষ্ঠানিক তথ্য-উপাত্তে সেভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নির্বাচিত সূচকে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর ২০১৪ শেষে খেলাপি ঋণের হার যেখানে ১১.৬০ শতাংশ ছিল তা ডিসেম্বর ২০১৪ শেষে ৯.৬৯ শতাংশে নেমে আসে। এ সময়ে দেশের আর্র্থিক খাতের কোনো উন্নয়ন আদৌ ছিল না। শুধু হিসাবের মারপ্যাঁচে খেলাপি ঋণকে কমিয়ে দেখানো হচ্ছে। কল মানি মার্কেটে সুদের হার কমিয়ে দেখানোর জন্যও মাঝে মধ্যে কারসাজির আশ্রয় নেয়া হয়।
অর্থনীতির এ ধরনের অবস্থা কোনোভাবেই দীর্ঘ সময়ের জন্য আড়াল করা সম্ভব হবে না। এক সময় এর প্রভাব আর্থিক খাতে ধসের মতো অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষত রাজনৈতিক অস্থিরতাকে যেভাবে প্রলম্বিত করা হচ্ছে তাতে যেকোনো সময় এ অবস্থা ঘটতে পারে। এ ছাড়া রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার যদি ক্ষমতায় আসে তাদের পক্ষে অতীত অর্থনৈতিক কারসাজির প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে স্বল্প সময়ে দৈনন্দিন আর্থিক ব্যবস্থাপনা চালিয়ে নেয়াও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের সার্বিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে আশঙ্কা সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে আরো বাড়ছে। প্রতিবেশী ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক হিন্দুস্থান টাইমস গত ২ মার্চের এক নিবন্ধে বলেছে, ‘বাংলাদেশের অবনতিশীল পরিস্থিতির জন্য শেখ হাসিনাকে তার হিস্যার দায় কাঁধে নিতে হবে। যদিও তার শক্তিশালী ধর্মনিরপে গ্রহণযোগ্যতা আছে। কিন্তু তিনি চাপের মুখে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা দেখিয়েই চলেছেন। তার ছেলে ও প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট সদস্য, একজন বিশিষ্ট আইনবিদ (পড়ুন ড. কামাল হোসেন) এবং স্টার সম্পাদককে (পড়ুন মাহফুজ আনাম) দেশদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতারের আহ্বান জানিয়েছেন।’ হিন্দুস্থান টাইমস বলেছে, ‘ওই গ্রেফতারের আহ্বান তিনি যে অভিযোগের ভিত্তিতে করেছেন তা স্পষ্টত ভিত্তিহীন। প্রধানমন্ত্রী হাসিনার উচিত হবে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া থেকে বিরত থাকা এবং দেশকে আরো বেশি নৈরাজ্যের দিকে না ঠেলে দিতে পারে এমন ঝুঁকি না নেয়া।’ পত্রিকাটি আরো বলেছে,‘বাংলাদেশের রাজনীতি ভেঙে পড়েছে। এবং তার আইনের শাসনও দুর্বল হয়ে পড়েছে। দেশটি এত বেশি বিশৃঙ্খলা দেখছে যে, দৈনন্দিন ভিত্তিতে ঠিক কোন ব্যবস্থা কাজ করে তা নির্দিষ্ট করে অনুভব করা কঠিন।’
বিশ্বব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে বলেছে বাংলাদেশ তিন ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে যার প্রভাব অর্থনীতির ওপর প্রবলভাবে পড়তে পারে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো, স্থিতিশীলতা রক্ষা করা এবং সৃষ্ট রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান করা। দ্বিতীয়টি হলো তৈরী পোশাক শিল্পে যে রূপান্তরপর্ব চলমান রয়েছে সেটি অতিক্রম করা। আর তৃতীয়টি হলো রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয়ের ক্রমাবনতি ঠেকানো। বাংলাদেশের এ তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য যে ধরনের পরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত প্রয়োজন তার কোনোটাই দেখা যাচ্ছে না এখন। এ কারণে ইকোনমিস্টের মতো বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিনের মন্তব্য হলো- বাংলাদেশ এখন খাদের কিনারায় গিয়ে পৌঁছেছে। এই কিনারা থেকে চিৎপটাং হয়ে খাদে পড়ার কৃতিত্বটা শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নিয়েই নিচ্ছেন কি না সে সংশয় চার দিকে নানা আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
মাসুম খলিলী