Saturday, December 14, 2013

গণবিশ্ববিদ্যালয় : এক অনন্য বিদ্যানিকেতন by মনসুর মুসা

মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে কোলাহলপূর্ণ ঢাকা শহরের উপকণ্ঠে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্নিকটে স্নিগ্ধ, মনোরম গ্রামীণ পরিবেশে গণবিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য তাঁবু গেড়ে যে প্রতিষ্ঠানের শুভ সংগ্রামী যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা-ই পরবর্তীকালে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সমন্বিত না হলে জাতীয় জীবনে দক্ষ মানব সম্পদ সৃষ্টি করা যায় না। এ উপলব্ধি থেকেই গণস্বাস্থ্য ট্রাস্টি বোর্ড কর্তৃক গণবিশ্ববিদ্যালয় নামে এই শিক্ষানিকেতন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
লক্ষ্য : জ্ঞানভিত্তিক গণসমাজ গড়ে তোলার মৌলিক লক্ষ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম প্রণীত হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হলে শিক্ষার্থীদের দ্বিভাষিক যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে বাংলা ভাষা ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষাদান করা হয়। শুধু ভাষা সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নয়, তাত্ত্বিক বিজ্ঞান, ফলিত বিজ্ঞান, কম্পিউটার প্রযুক্তি, ওষুধ ও চিকিৎসা প্রযুক্তিতে যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন, তাদের জন্যও এ বিষয়গুলো অবশ্যই পাঠ্য। দর্শন, নৈতিকতা ও পরিসংখ্যান- এ বিষয়গুলোর পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা সচেতনভাবে অনুশীলন করা হয়। যে কোনো বিভাগের শিক্ষার্থী যদি সঙ্গীতের প্রেষণা নিয়ে ভর্তি হয়, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সুবিধার্থে বিশিষ্ট সঙ্গীত শিক্ষক নিয়োগ করে সঙ্গীত বিভাগের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে দূরে থাক, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া, অন্যত্র নেই। আরবীয় সভ্যতার পরিচয় জানার জন্য আরবি শিক্ষারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রাচ্যবিদ্যাকে পুনর্জাগরণের জন্য সংস্কৃতি পাঠেরও ব্যবস্থা আছে।
বিশ্বায়ন একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক বাস্তবতা হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত আছে। রাজনীতি ও জনপ্রশাসন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য সংবলিত বিভিন্ন কোর্স আছে, যা ষাণ্মাসিক শিক্ষাক্রমে কোনো না কোনো কোর্সে রয়েছে। শিক্ষার্থীরা যেন গণবিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে, সে জন্য শিক্ষাক্রমের মধ্যে গ্রামে অবস্থান করে গ্রামীণ জনগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জ্ঞান ও সেবা গ্রহণ এবং বিতরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাঠ্যক্রম : গণবিশ্ববিদ্যালয় মূলত স্বাস্থ্যবিদ্যা, ওষুধ বিজ্ঞান, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং, জৈবপদার্থ বিজ্ঞানের প্রসারের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। আইন বিদ্যা ও ব্যবসা-বাণিজ্য সমাজ জীবনের অপরিহার্য বিষয়। এ দুটো বিষয়ও শিক্ষাক্রমে যথাযথ গুরুত্বসহকারে পঠন-পাঠন করা হয়। পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি গতিশীল কর্ম। উন্নয়নশীলতাকে ধারণ করার জন্য রয়েছে শিক্ষকের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ব্যবহারের অপূর্ব সুযোগ। এ বিশ্ববিদ্যালয় গতানুগতিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়, একটি অত্যাধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়। আধুনিকের ব্যাখ্যা অর্থাৎ আমরা ধূমপান করি না- এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কঠোরভাবে মান্য করা হয়। এখানে কেউ ধূমপান করে না। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী কেউ না।
সংশ্লিষ্টতা ও সহযোগিতা : এই পরিকল্পনার বিভিন্ন পর্যায়ে গণবিশ্ববিদ্যালয় আশীর্বাদ লাভ করেছে দেশ-বিদেশের বহু খ্যাতনামা মানুষের। এ তালিকায় আছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ আনিসুর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, ইংরেজি বাংলা অভিধানের সংকলক অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, উপাচার্য অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম চৌধুরী, সাংবাদিক আতাউস সামাদ, ড. বিনায়ক সেন, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. মনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক মুজাফ্ফর আহমেদ, মাহবু উর রহমান খান, ড. নওজেশ আহমেদ, অধ্যাপক মোঃ ইব্রাহিম, নুরুল কাদির খান, ড. পারভীন হাসান, ড. সালেহ উদ্দীন আহমেদ, সমাজকর্মী শিরিন হক, অধ্যাপক ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ, ড. আহমদ কামাল, ড. ফেরদৌস আজিম, ড. ফ্লোরা মজিদ, ড. সৈয়দা রওশন কাদির খান। প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম, শিক্ষাব্রতী, ভাষাসৈনিক ও শিশুসাহিত্যিক হালিমা খাতুন, কথাশিল্পী ও অধ্যক্ষ হোসনে আরা শাহেদ, শিক্ষাব্রতী জাহেদা খানম, মুক্তিযোদ্ধা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, উপাচার্য আবুল কাসেম চৌধুরী, নোবেল বিজয়ী গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইউনূসসহ আরও অনেকেই।
গবেষণার সুযোগ : গবেষণা একজন শিক্ষককে পড়–য়া থেকে শিক্ষকে রূপান্তর করে। এ প্রক্রিয়া সম্পর্কে গণবিশ্ববিদ্যালয় সচেতন। শিক্ষকদের গবেষণার জন্য অধ্যয়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদেরও এ ধরনের প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিজ্ঞান, বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য যেমন প্রয়োজনীয় রাসায়নিক গবেষণাগার আছে, তেমনি আছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের জন্য কম্পিউটার ল্যাবরেটরি। ভাষাশিক্ষার জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ভাষা গবেষণাগারের।
গণবিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোচিং বিদ্যালয় কিংবা তকমা বিতরণে বিশ্বাস করে না। বিশ্বাস করে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ মানুষ যাতে শিক্ষার সুযোগ পেয়ে সুদক্ষ মানুষের মতো মানুষ হতে পারে। পাঠ অভ্যাস গড়া : গ্রামীণ পরিবেশে নিত্য নতুন পাঠ্যবইয়ের অভাব থাকায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটি ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার সপ্তাহে একদিন (সোমবার) গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবস্থান করিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে বই সুলভ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে গণবিশ্ববিদ্যালয়কে সহায়তা করে যাচ্ছেন। গণবিশ্ববিদ্যালয় দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য দরিদ্রদের প্রতি বেশি মনোযোগী। তবে এর মানে এই নয় যে, এখানে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত কিংবা বিদেশীদের স্থান নেই। তাদের জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা আছে।
মিথস্ক্রিয়া ও জ্ঞানসৃষ্টি : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাজধানী থেকে বহুদূরে শান্তি নিকেতনে নির্মাণ করেছিলেন একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় যার নাম বিশ্বভারতী। সেই দৃষ্টান্তের সূত্র ধরে গণবিশ্ববিদ্যালয়ে একদিকে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা আসে, অপরদিকে বিশ্বখ্যাত পণ্ডিতেরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন করেন। তাদের মধ্যে অর্থপূর্ণ সংলাপ ও মিথস্ক্রিয়া হয়, যাতে করে গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান-সন্ততিরা আধুনিক জীবনের মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞান ভাবনা ও মহৎ মানুষের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।
আবহমান গ্রামীণ ঐতিহ্য : গণবিশ্ববিদ্যালয় গ্রামভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিবেশী গ্রামের বিত্তবান মানুষেরা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুবিধার জন্য ছাত্রাবাস নির্মাণ করে তাদের বাসস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব অর্থায়নেও ছাত্রছাত্রী নিবাস তৈরি করেছে। সম্প্রসারণশীল বিশ্ববিদ্যালয় : গণবিশ্ববিদ্যালয় একটি দ্রুত সম্প্রসারণশীল বিশ্ববিদ্যালয়। পড়াশোনার জন্য আছে একটি বিশেষায়িত গ্রন্থাগার, খেলার জন্য আছে বিস্তীর্ণ খেলার মাঠ। অদূর ভবিষ্যতে আধুনিক জিমনেশিয়াম করার চিন্তা আছে কর্তৃপক্ষের। গণবিশ্ববিদ্যালয় দারিদ্র্য দূরীকরণের অঙ্গীকারবদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান। সে জন্য এ বছর গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের কন্যা সন্তানের জন্য ৩০০ বৃত্তির প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এতে করে গ্রামীণ মেধাবী ছাত্রীরা, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মেয়েরা উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে।
গ্রামীণ দরিদ্র মানুষ যাতে একবিংশ শতাব্দীর মানুষ হিসেবে বিশ্বের অন্য দেশের সঙ্গে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে পারে এটাই গণবিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
অধ্যাপক মনসুর মুসা : সাবেক অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কাদের কাদের কাদের হত্যা করেছিল? সবাই আমাদেরই স্বজন by মাহবুব কামাল

এক অর্থে খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারের প্রতিটি দিনই বাংলাদেশের জন্য একেকটি রেড লেটার ডে। বিশেষত ১৯৭১ সালের নয় মাসের প্রতিদিনই এমন কিছু মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে যে, সেই দিনগুলো স্মরণে রাখার মতো। তবে ১৪ ডিসেম্বরের একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এ দিনটি এলেই একটা বিষয় ভাবি আমি। মুক্তিযুদ্ধটা যদি আর কিছুদিন দীর্ঘায়িত হতো, তাহলে কি এ দেশে বুদ্ধিজীবী কেউ বেঁচে থাকত? পাকিস্তানি সেনা ও বঙ্গভাষী তাদের দোসররা বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা করেছিল ডিসেম্বরের প্রথম দিকে। এ সময় তাদের চিন্তাটা সম্ভবত এমন ছিল যে, যুদ্ধে তো হেরেই যাচ্ছি, আনুষ্ঠানিক পরাজয় স্বীকার করার আগে বাঙালিকে মেধাশূন্য করে যেতে হবে, যাতে তারা একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে দাঁড়াতে না পেরে আবারও পাকিস্তানের সঙ্গে মিলিত হতে পারে। এখন এটাকে ভাগ্যই বলতে হবে যে, তাদের নীলনকশার পর স্বাধীনতার জন্য আমাদের বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। এ প্রসঙ্গে ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে আরেকবার ধন্যবাদ। তবে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশার যতটুকুই বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তাতে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে তা অসামান্য। বুদ্ধিজীবী হত্যা কিংবা যদি বলি গণহত্যা- কেন মেতে উঠেছিল পাকিস্তানিরা? কারণ একটাই- পাঞ্জাবের শাসকগোষ্ঠী মনে করত, তারা পাকিস্তানের রাজন্যবর্গ আর বাঙালিরা হচ্ছে বিদ্রোহী প্রজা। প্রজার এত বড় সাহস, তারা স্বাধীনতা চায়! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নাৎসি শাসক হিটলার ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের কেন নির্বিচারে হত্যা করেছিল, তার ব্যাখ্যা তিনি তার বক্তৃতায় দিয়েছিলেন। সেসব ব্যাখ্যা সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও কোন কোন মহল সেটাকে গ্রহণ করেছে। কিন্তু পাকিস্তানিরা যে গণহত্যা চালিয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা বিশ্বের কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়নি, হবেও না। প্রথমত, পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটিই ছিল কিম্ভূতকিমাকার। হাজার-বারোশ’ মাইলের ভৌগোলিক দূরত্বেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ অর্থাৎ স্বাধীনতা-পূর্ব পূর্ব পাকিস্তান। এমন একটি অবাস্তব কাঠামো তার অন্তর্গত ছটফটানির কারণেই ভেঙে পড়তে চেয়েছে। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানিদের সঙ্গে বাঙালির একমাত্র ধর্মীয় মিল ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রেই কোনো সাদৃশ্য নেই। ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি-কৃষ্টি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, বেড়ে ওঠার সংগ্রাম পর্যন্ত সবক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ আলাদা এই দুই সত্তা। এই পারস্পরিক বিরোধিতা নিয়ে পাকিস্তান যে ২৪ বছর টিকে ছিল, সেটাই বরং আশ্চর্যের বিষয়। বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব এই যে, পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব (Contradiction) বিরাজ করছিল, সেটাকে শার্প বা তীক্ষ্ণ করেছেন তিনি। আমরা বিজ্ঞানের নিয়মেই জানি, দুই পরস্পরবিরোধী সত্তা যখন পরস্পরের সঙ্গে চরম দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, তখন সেখান থেকে একটা নতুন কিছু বেরিয়ে আসে। স্বাধীন বাংলাদেশ যেমন নতুন এক সৃষ্টি। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বিরাজমান দ্বন্দ্বের মীমাংসা হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগত।
তদানীন্তন পাকিস্তানিরা ছিল এতই অসভ্য জাতি যে, তারা বিজ্ঞান বুঝত না, সোশ্যাল ডিনামিক্স বা সামাজিক গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল না। অসভ্যরা সাধারণত কী প্রদর্শন করে থাকে? শক্তি। এটা পেশির শক্তি হতে পারে, আবার অস্ত্রের শক্তিও। পাকিস্তানি শাসকদের হাতে অস্ত্র ছিল বলে তারা সেটাই প্রয়োগ করেছে। প্রকৃতপক্ষে, অস্ত্র পাকিস্তানিদের পরিণত করেছিল এক যুক্তিহীন (Irrational) জাতিতে। হত্যা এবং একমাত্র হত্যাই হয়ে উঠল তাদের রাজনৈতিক দর্শন। কিন্তু হত্যা কিংবা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে যে সোশ্যাল ডিনামিক্সের স্বাভাবিক অগ্রসরমানতা রোধ করা যায় না, সেটা তাদের বুদ্ধিতে কুলোয়নি। তারা আসলে হেরে গেছে সমাজের গতিসূত্রের কাছে, বিজ্ঞানের কাছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পাকিস্তানিরা না হয় একটা ভিন্ন জাতিকে নির্মূল করার ব্রত নিয়েছিল; বাঙালিদের মধ্য থেকে কেন একশ্রেণীর মানুষ তাদের সহযোগিতায় মাঠে নামল? বস্তুত বাঙালির মধ্য থেকেই কিছু সংখ্যক সহযোগীর কারণে পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞটা সর্বব্যাপী হতে পেরেছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, বিশেষত যারা মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত আগে এখানে এসেছিল, তাদের এ দেশ সম্পর্কে সম্যক কোনো ধারণা ছিল না। তাদের এক ধরনের এলিয়েন বলা যেতে পারে। বাঙালির সঙ্গে তাদের ভাষাগত অমিল তো ছিলই, এছাড়া বাংলাদেশের ভূগোল সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ছিল সীমিত। বাঙালি নরাধমরাই তাদের এই শূন্যস্থান পূরণ করেছে। চিনিয়েছে কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে হিন্দু। বুঝিয়েছে কোথায় আগুন দিতে হবে। স্বজাতির প্রতি এমন বিশ্বাসঘাতকতা খুঁজে পেতে হলে ইতিহাসকে বিস্তর ঘাঁটতে হবে। স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা মানুষের সহজাত (Inharent); এমনকি একটি শিশুও বাবা-মার শাসন অমান্য করে স্বাধীনতা ভোগ করতে চায়। অথচ কিছু বাঙালি স্বাধীনতার এই স্পৃহাকে জলাঞ্জলি দিয়ে পাকিস্তানিদের অধীন থাকতে চেয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা তাদের পরাধীনতাকে আরও গৌরবময় করতে চেয়েছে বাঙালি নিধনে পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করে। কী বিচিত্র মানুষ! কী বিচিত্র তাদের স্বভাব! কী অদ্ভুত তাদের চিন্তা পদ্ধতি!
১৪ ডিসেম্বর যে আমরা শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করি, তার মানে এই নয় যে, শুধু এ দিবসটিতেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল। এটি একটি প্রতীকী দিবস। বস্তুত ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ক্যালেন্ডারের প্রতিটি দিনই একেকটি শহীদ দিবস। আর বধ্যভূমি? সারা বাংলাদেশই যেন এক বিশাল বধ্যভূমি। নাটোর জেলায় একটি বধ্যভূমি আছে, যেখানে এক বিকালেই ৬৯ জনের লাশ কবর দেয়া হয়েছে। সেখানে একটি টিনের ফলকে ৬৯ জন শহীদের নাম লেখা রয়েছে। বাকি সবাই অজ্ঞাত। এমন বধ্যভূমি ছড়িয়ে আছে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায়। আমরা কয়টি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করব, কয়টা নির্মাণ করব শহীদ মিনার? অথবা বলা যায়, ১৯৭১ সালে গোটা বাংলাদেশটাই যে বধ্যভূমি ছিল, সেটা কি অভয়ারণ্য হতে পেরেছে, নাকি তা এখনও বধ্যভূমিই?
এই ১৪ ডিসেম্বরে একটি অন্যরকম ভাবনা আমাকে আলোড়িত করছে। আজ থেকে একশ’ কি দুইশ’ বছর পর বাংলাদেশের ইতিহাসটি কেমন হয়ে ধরা দেবে তখনকার প্রজন্মের কাছে। এই মুহূর্তে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রজন্মের মানুষ বেঁচে থাকতেই যেভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল করার উদ্যোগ ও চেষ্টা চলছে, তাতে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক- মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম যখন আর থাকবে না, তখন কি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অন্যরকম হয়ে যাবে? এমন একটা সময় কি আসবে, যখন রাজাকার-আলবদররাই হয়ে উঠবে দেশপ্রেমিক আর মুক্তিযোদ্ধারা রাষ্ট্রদ্রোহী? বঙ্গবন্ধু বিশ্বাসঘাতক আর জিয়াউর রহমান প্রকৃত নেতা? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে চিরকালের জন্য অবিকৃত ও অবিকল রাখার স্বার্থে আমাদের করণীয় আছে অনেক কিছুই। সমাজবিজ্ঞানী, গবেষক থেকে শুরু করে আমাদের সবাইকে সযত্নে সংরক্ষণ করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের দালিলিক প্রমাণাদি। বেশি বেশি করে লিখতে হবে প্রকৃত ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে এমন সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে যাতে ভবিষ্যতের প্রজন্ম ভুল তথ্য দ্বারা পরিচালিত হতে না পারে। যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করে তার প্রসিডিংসকেও করতে হবে ইতিহাসের বিষয়বস্তু। এসব কাজ করা না গেলে একদিন হয়তো সিরাজউদ্দৌলাহ হয়ে উঠবে দেশদ্রোহী আর মীরজাফর-ক্লাইভ দেশপ্রেমিক।
স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের রক্ত আপাতত বৃথাই রয়েছে। আমরা যারা জীবিত, তাদের যে কেউই ১৯৭১ সালে নিহত হতে পারতাম। সে ক্ষেত্রে আজকের যে স্লোগান- শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না- সেই শহীদের তালিকায় আমি, আপনি যে কেউই অন্তর্ভুক্ত হতে পারতাম। যে কোনো কারণেই হোক, আমরা যেহেতু বেঁচে রয়েছি, সেহেতু শহীদের রক্ত সফল করতে আমাদের সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে।
পুনশ্চ : এ লেখাটির শিরোনাম অন্যরকম ছিল। লেখাটি শেষ করার পরপরই কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এই সেই কাদের, যিনি নির্বিচারে হত্যা করেছিলেন আমাদেরই স্বজনদের। অর্বাচীনের ধর্ম এই যে, সে পরিণাম ভেবে কাজ করে না। কাদের শুধু একজন নিষ্ঠুর ঘাতকই নন, তিনি একজন অর্বাচীনও বটে। এ ধরনের ব্যক্তির বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। এবারের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের প্রাক্কালে এমন একজনের ফাঁসি কার্যকর করে আমরা জাতি হিসেবে সভ্যতার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছি।
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক

সবকিছুই সম্ভব, সবাই যখন এক হয় by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

রাজনীতিকদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি মোক্ষম সময় বেছে নিতে হয়। কেননা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে এমনই একটি যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই সংকট শেষ পর্যন্ত সর্বগ্রাসী সংকটে রূপ নেবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। যে দেশটির সম্ভাবনা বিশ্বের খ্যাতনামা মানুষের মুখে মুখে প্রকাশ পাচ্ছে; বিশ্বের নামকরা পত্রিকাগুলো যে দেশকে উদীয়মান দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করছে- সে দেশটি এখন উদ্বেগ ও আতংকের দেশ। নিরীহ মানুষের মৃত্যু, গাড়ি-বাড়ি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও আক্রমণ হচ্ছে। বিশ্ব মিডিয়ায় শিরোনাম হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান অগ্নিগর্ভ ও সহিংস পরিস্থিতি। বাংলাদেশকে নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশ্ববাসী, উদ্বিগ্ন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। জাতিসংঘ যখন বাংলাদেশকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তখন আর বুঝতে বাকি নেই- বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক বিভাজন প্রত্যেক দেশেই আছে, আছে আদর্শগত বিরোধও, কিন্তু দেশের স্বার্থে সবাই এক; কেননা দেশ বাঁচলে রাজনীতি, দেশই যদি না থাকে তাহলে রাজনীতি কার জন্য? কাজেই দেশের স্বার্থে রাজনীতিকদের এক হতে হবে এবং আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছতে হবে; সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়।
ধ্বংসের রাজনীতি সহজ কিন্তু গড়ার রাজনীতি কঠিন। এ দেশটির জন্ম দিয়েছে সাধারণ মানুষ এবং দেশটি গড়ার পেছনেও ভূমিকা সাধারণ মানুষেরই। আমেরিকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে এক সময় বলেছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি।’ এ দেশের মানুষ নিরন্তর পরিশ্রম করে এই বদনাম থেকে এটিকে বের করে এনেছে। তারপর বাংলাদেশকে বলা হল জঙ্গি রাষ্ট্র। আমরা প্রমাণ করলাম বাংলাদেশ জঙ্গি রাষ্ট্র নয়, বাংলাদেশ মডারেট মুসলিম রাষ্ট্র; এরপর এ দেশকে অপবাদ দেয়া হল দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, এই অপবাদও আমরা ঘোচানোর চেষ্টা করছি। এখন বাকি আছে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের তকমা। রাজনৈতিক খেলা দেখে মনে হচ্ছে, আমাদের সেদিকেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
শেরেবাংলা একে ফজলুল হক পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে হরহামেশাই তার সমালোচনা করত ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা। একদিন তার এক ভক্ত এসে বললেন, ‘স্যার আজকে আনন্দবাজার পত্রিকা আপনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে।’ শেরেবাংলা বললেন- তাই নাকি? তাহলে তো ভাবতে হবে আমি সঠিক পথে নেই; আমি মনে হয় ভুল করছি।’ যাই বলুন না কেন, যেভাবেই পরিস্থিতির মূল্যায়ন করেন না কেন- বাংলাদেশ সঠিক পথে নেই। রাজনীতির ভুল খেলার কারণে চোখের সামনে বাংলাদেশ অতলে তলিয়ে যাচ্ছে আর বাংলাদেশের এ পরিস্থিতির প্রশংসা করছে পার্শ্ববর্তী দেশের কিছু মিডিয়া। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হল, আইন-শৃংখলা বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করান হচ্ছে আর আইন-শৃংখলা বাহিনী ও জনগণ মুখোমুখি হওয়া মানে রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়া। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, রাষ্ট্রের ভিত্তিও জনগণ; কাজেই আইন-শৃংখলা বাহিনী ও জনগণের মুখোমুখি অবস্থান কোনোভাবেই কাম্য নয়, কাক্সিক্ষতও নয়। এই বিপজ্জনক খেলা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে সবাইকে। আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে বিবৃত করেছেন, ‘আমি সৃষ্টি করেছি মহাবিশ্ব, তাতে রেখেছি সুস্পষ্ট ভারসাম্য; যাতে ভারসাম্য লঙ্ঘিত না হয়।’ কেননা ভারসাম্য যেখানে থাকে না, সেখানে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল একে অপরের ক্ষেত্রে ভারসাম্য। এর একটি বাদ দিয়ে অন্যটি চলতে পারে না। রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী ভালোই খেলছিলেন। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক খেলার চালে তিনি এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনের খেলায় তিনি এগিয়ে থাকতে পারবেন বলে মনে হয় না, শেষ পর্যন্ত সবকিছু দ্রুত তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তিনি নিজে, তার দল এবং দেশও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। সুতরাং সময় আছে পরিস্থিতি অনুকূলে আনার এবং পুনঃতফসিলের মাধ্যমে নির্বাচনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার।
গত কয়েক দিনে রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়েছে শহর-বন্দর, গ্রামগঞ্জ সর্বত্র। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, প্রায় ৩০ জেলার জেলা প্রশাসকরা নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। অনেক উপজেলা কার্যত প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। পুলিশ, বিজিবি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে; সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি উঠছে। গত কয়েক দিনের সহিংসতায় অনেক নিরীহ মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে গেছে এবং এই মৃত্যুর মিছিল দিন দিন বাড়ছে, অনেক সম্পদও ধ্বংস হয়েছে এবং হচ্ছে। এভাবে একটি রাষ্ট্র চলতে পারে না- বিশেষ করে একটি রফতানিমুখী রাষ্ট্র। বিভক্তি ও বিভাজন নিয়ে কোনো জাতি সামনে এগোতে পারে না। দেশের রাজনীতিতে বিভক্তি ছড়িয়ে পড়েছে। এই বিভক্তি থেকে জাতিকে বের করে আনার কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হচ্ছে না। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় মানুষ চোখে শর্ষে ফুল দেখছে। কোথাও কোনো আশার বাণী তারা শুনতে পাচ্ছেন না, কেউ তাদের আশ্বস্ত করছে না; হরতালের পর হরতাল দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। সড়ক অবরোধ, বন্দর বন্ধ থাকায় রফতানি খাতে দেখা দেবে বিপর্যয়। এর প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে। ব্যাংকের লেনদেন দ্রুত কমে যাচ্ছে। শেয়ার বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, সূচক দ্রুত নিচের দিকে নামছে। নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ছে। এর শেষ কোথায় কেউ জানে না। সরকার ও বিরোধী দল নির্বিকার। মানুষ যাবে কোথায়, কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না।
বাংলাদেশ রফতানি আয় ও রেমিটেন্সের ওপর নির্ভরশীল একটা দেশ। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ-আমেরিকা থেকে টাকা না এলে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা শ্লথ হয়ে যাবে। বিশ্ব মিডিয়ায় বাংলাদেশ নিয়ে যেভাবে নেতিবাচক প্রচারণা হচ্ছে- ভবিষ্যতে রফতানি আয় ও রেমিটেন্সের ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। তখন এ দেশের ১৬ কোটি মানুষ কীভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকবে- এই চিন্তাটা কোনো রাজনীতিক করেন বলে মনে হয় না।
দেশের আবাসন ব্যবসা আজ ধ্বংসের পথে, ধ্বংসের পথে জনশক্তি রফতানি খাত; তৈরি পোশাক শিল্পের অবস্থাটাও ভালো নয়, ইউরোপ-আমেরিকা থেকে অর্ডার আসা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। পর্যটন খাত মুখ থুবড়ে পড়ছে। এভাবে একের পর এক বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে কর্মসংস্থান ব্যাহত হবে; মানুষ কর্ম হারিয়ে বেকার হবে, সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। দেশের আইন-শৃংখলার অবনতি ঘটবে। এসব কি আমাদের রাজনীতিবিদরা ভাবেন? ভাবলে রাজনীতিতে এত বিভেদ-বিভক্তি ও বিভাজন কি তৈরি হতো?
দেশে নির্বিচারে সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে, রেল লাইন উপড়ে ফেলা হচ্ছে, ট্রেন ও রেল স্টেশন জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, হাইওয়ের বেইলি ব্রিজ ভেঙে ফেলা হচ্ছে, রাস্তা কেটে দেয়া হচ্ছে, বিদ্যুৎ অফিস জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, একে অপরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর ও আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে, ব্যাংক, যানবাহন, শিল্প প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাংচুর হচ্ছে ও আগুন দেয়া হচ্ছে। এক কথায় মানুষ জানমাল ও ইজ্জত নিয়ে এক মহাআতঙ্কে আছেন। কিন্তু সরকারের ভাবখানা এমন যে, দেশে কিছুই হয়নি; সব ঠিক আছে।
রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কৌশল অবলম্বন করবে এটা স্বাভাবিক। তবে সেই কৌশল হতে হবে গণতন্ত্রসম্মত। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার অভিপ্রায়ে যে কৌশল অবলম্বন করছে, তা অবশ্যই বিপজ্জনক; এই কৌশল কোনোভাবেই ভালো ফল বয়ে আনবে না। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, তাদের জিম্মি করে রাজনীতি হতে পারে না। নির্বিচারে হত্যাও সমস্যা সমাধানের পথ নয়। নিরীহ মানুষ হত্যা করে ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকায় নাম লিখিয়েছে; বাংলাদেশও তাদের পথ অনুসরণ করছে। এই ভয়াবহ পথ থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনার নিয়ন্ত্রণ রাজনীতিবিদরা হারিয়ে ফেলছেন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
এখনও যে সময় ও সুযোগটুকু হাতে আছে, তার সর্বোত্তম ব্যবহার করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে, বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ যারা আছেন, তাদের এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে পালন করতে হবে অগ্রণী ভূমিকা। সরকারকে অনুধাবন করতে হবে, বিরোধী দলবিহীন নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে তাদের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না; এর মাধ্যমে গঠিত সরকার দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না এবং এ সরকারের মেয়াদও হবে ক্ষণস্থায়ী, স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডও এ সরকার সম্পাদন করতে পারবে না। উপরন্তু বদনামটা নিতে হবে পুরোপুরি সরকারি দলকেই।
অন্যদিকে বিরোধী দলকেও শান্তির পথে আসতে হবে, জনগণের ভোগান্তি হয় এমন রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিহার করতে হবে। জনসম্পৃক্ততামূলক কর্মসূচি দিয়ে দাবি আদায়ের কৌশল নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা কোনো উদ্যান বা খোলা জায়গায় টানা অবস্থান নিয়ে তাদের দাবির ব্যাপারে জনমত সংগঠিত করতে পারেন। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সচল থাকবে এবং সরকারের ওপর নৈতিক চাপও বৃদ্ধি পাবে। বিরোধী দলকে স্মরণে রাখতে হবে, তাদের নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিটি নিরেট গণতান্ত্রিক ও সর্বজনীন দাবি। এ দাবির প্রতি এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন রয়েছে। জ্বালাও-পোড়াওয়ের মাধ্যমে এ দাবি আদায়ের পথে হাঁটলে, ধীরে ধীরে দাবিটি জনগণের কাছে পানসে হয়ে যাবে; তারা এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। কাজেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবি আদায়ের চিন্তা করতে হবে, যাতে প্রতিপক্ষ এটিকে কোনো বিচ্ছিন্ন আন্দোলন হিসেবে প্রমাণ করতে না পারে।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা উপলব্ধিতে আনাই দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচায়ক। সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে প্রতিবাদের অধিকার সাধারণ মানুষের রয়েছে এবং এই প্রতিবাদ জরুরি; কারণ তা সরকারকে সঠিক পথে চালিত করতে সাহায্য করে। এটিই গণতন্ত্রের রীতি। গণতন্ত্রকে পরিপক্ব করতে হলে এ ভাষার প্রতি শাসকদের অবশ্যই সম্মান দেখাতে হবে। দেশ যাতে কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকটের কবলে না পড়ে, এর জন্য শাসকদলকেই পালন করতে হবে মুখ্য ভূমিকা। মনে রাখতে হবে, দেশ যদি সংকটে পড়ে সবাইকেই এর ফল ভোগ করতে।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বদ্ধচিন্তার খাপ থেকে মুক্তি দরকার by ফরহাদ মজহার

এ লেখাটি লিখছি শহরে, গ্রামে ও প্রবাসে সেসব বাংলাদেশের নাগরিকের জন্য যারা বয়সে তরুণ। যারা ‘তরুণ প্রজন্ম’ অবশ্যই, কিন্তু শুধু ঢাকা শহরের নয়। মফস্বল ও গ্রামেরও। গ্রামে আছে তরুণ প্রজন্মের বিশাল একটি অংশ, যারা কৃষিসহ বিভিন্ন উৎপাদনমূলক কাজে জড়িত। কলকারখানায় মেহনত দিয়ে অর্থনীতির চাকা যারা সচল রাখছেন; প্রায় পুরনো দাস ব্যবস্থার মতো ‘তরুণ প্রজন্ম’ তরতাজা শ্রমশক্তি হয়ে চালান হয়ে যাচ্ছে বিদেশে, বিশাল একটি অংশ চলে যাচ্ছে নিজের দেশ থেকেই, অথচ মন পড়ে থাকে দেশে মা-বাবা, ভাইবোন, পাড়া-প্রতিবেশীর জন্য; মাসে মাসে ঘামে-রক্তে কামাই করা আয় দেশে পাঠান, দেশের অর্থনীতি প্রবাসীদের সেই আয়ের ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় আয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় তরুণ প্রজন্মের আরেক অংশের জন্য, যারা মূলত কনজিউমার বা ভোগী, দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনে যাদের বিশেষ কোনো অবদান নেই। কিন্তু দেখা যায় তারাই সমাজ সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি সরব। খুব কম তরুণই ভাবেন, তারা যে কম্পিউটারটি ব্যবহার করেন, যে প্রাইভেট গাড়িটি চালান, যে ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে খান, কিংবা যে টেলিফোন ব্যবহার করেন- সেই প্রতিটি ভোগের জিনিস বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়েছে। আর এ আমদানির অর্থ জুগিয়েছে কারখানার শ্রমিকরা, বিশেষত পোশাক কারখানার কিশোর-কিশোরীরা। যারা পুড়ে মরে, ভবন ধসে মাটির নিচে চাপা পড়ে কিংবা ন্যায্য দাবি জানাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিরন্তর প্রাণ দেয়।
অথবা এর অর্থ জোগাচ্ছে সেই সব শ্রমিক, যারা দাসের মতো মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে মরুভূমিতে পুড়ে মরছে। কিংবা মালয়েশিয়ায় বিপদসংকুল রাবার বাগানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে, সাপের কামড় খেয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। কেউ ট্যাক্সি চালাচ্ছে নিউইয়র্কে, টরেন্টোতে; কেউ হোটেলের বাসন মাজছে বিলাতে। আবার কেউ রোমে, মাদ্রিদে, গ্রিসে কোনো রকমে টিকে আছে নিত্যদিনের অসম্ভব যুদ্ধে।
এই অসাম্য কুৎসিত। তরুণদের মধ্যে যারা এ অসম সম্পর্ক সম্বন্ধে ভাবতে সক্ষম, তারা অন্যদের তুলনায় সুবিধাভোগী হলেও কখনোই অহংকারী নন। তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই হোক, তাদের ভাবনার দিগন্ত প্রসারিত থাকারই কথা, এটা অনায়াসেই অনুমান করা যায়। অন্যদিকে যারা জীবিতভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার প্রায় পুরো সময়টাই প্রাণ ধারণের জন্য লড়ে যাচ্ছেন, সেসব মেহনতি মানুষ অন্যদের প্রতি ক্রোধ আর হিংসা দ্বারা তাড়িত হয়ে থাকেন, এটা ভাবাও ঠিক নয়। যারা সমাজ ও ইতিহাসকে আর দশটা বিজ্ঞানের মতো নৈর্ব্যক্তিক জায়গা থেকে বিচার বিশ্লেষণ করতে সক্ষম, তারাও এই অসাম্যকে নিছকই নৈতিক অন্যায় বলে নিন্দা করে নিজেদের বিবেকের দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেন না। ইতিহাস বলে, আধুনিক যুগে আসলে শিক্ষিত শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি অংশের সচেতনতাই একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে। তাদের চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতিই সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির নির্ধারক শক্তি হয়ে ওঠে।
তরুণ প্রজন্মের প্রতি আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এমন কোনো চিন্তা, মতাদর্শ ও সংস্কৃতি আমরা তৈরি করতে পেরেছি কিনা, যা ১৬ কোটি মানুষকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। যদি সে মতাদর্শকে ‘জাতীয়’ হতে হয় তাহলে তার কেন্দ্রে শ্রমিক, কৃষক মেহনতি মানুষের স্বার্থের কথা থাকবে। শুধু অর্থনৈতিক স্বার্থ নয়, তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, লোকায়ত চিন্তা, বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলি সম্পর্কে তাদের নিজেদের মূল্যায়ন এবং সর্বোপরি নৈতিক মূল্যবোধ ও সংবেদনা- অর্থাৎ তাদের সজীব জীবনের সব বিষয়ই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে বাধ্য। কিন্তু এ ব্যাপারে আমরা কতটা ‘মুক্ত’ চিন্তার অধিকারী? কতটা সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাকে তথাকথিত শিক্ষিত শ্রেণী আমলে নিতে রাজি? সাধারণ মানুষের ভাবনা-চিন্তার বিপরীতে কতটা নিজেদের চিন্তা ও আদর্শ সম্পর্কে আত্মপ্রত্যয়ী? আমার মনে হয়, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী আত্মপ্রত্যয়ী হওয়া দূরে থাকুক, তারা কী বলে বা কী বলছে সে সম্পর্কে তাদের নিজেদের কোনো হুঁশ আছে বলে মনে হয় না।
আত্মপ্রত্যয়ী হতে হবে কেন? এই অর্থে আত্মপ্রত্যয়ী যে, জনগণ যদি ভুল চিন্তা করে বা মতাদর্শিক বিচারে পশ্চাৎপদ থাকে, নিজের চিন্তার জায়গা থেকেই তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা ও সঠিকভাবে অবশ্যই বোঝানো সম্ভব। কিংবা নিজে শিক্ষিত হয়ে ওঠারও সুবিধা। জনগণের চেয়ে ভালো শিক্ষক আর কেউই হতে পারে না। যদি আমরা নিজেদের সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্ম গণ্য করি, সাধারণ মানুষের সঙ্গে চিন্তার পার্থক্য হওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ নিজেদের যদি একই রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করি, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা কঠিন হতে পারে না। কিন্তু যারা নিজেরা চিন্তার গোঁড়ামিতে ভোগে, নিজেরা চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়েছে, যাদের বুদ্ধির জগৎ মরুভূমিতে পরিণতি হয়েছে, বালু ছড়ানো ছাড়া তাদের আর বিশেষ কোনো প্রতিভাব অবশিষ্ট নেই। তারা আত্মপ্রত্যয়ী হতে পারে না। তারা যে রাজনীতি সামনে নিয়ে আসে, তাকে বলা যায় আতংকবাদ। আবারও বলি, সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ভুল ও পশ্চাৎপদ চিন্তা থাকতেই পারে, কিন্তু কারবারটা মানুষের সঙ্গেই হতে হবে, মানুষের সঙ্গেই করতে হবে, কোনো বিমূর্ত মতাদর্শের সঙ্গে নয়। যারা জীবন্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনের লড়াই সংগ্রাম থেকে জাত চিন্তা মোকাবেলা করতে অক্ষম, তারাই নানা মতাদর্শিক জুজুর ভয় দেখায়। একসময় এটা ছিল কমিউনিজম। আজ ইতিহাসের কী প্রহসন, সেটা হয়েছে ইসলামী জঙ্গিবাদ। সোজা কথায় ইসলাম। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের যে অংশ নিজেদের খামাখা প্রগতিশীল ভাবে, তারা ইসলামের ভয়ে ভীত! এই ভীতি রীতিমতো কৌতুককর।
আজ আমরা কথায় কথায় জাতি এই চায়, জাতি ওই চায়, অনায়াসে ‘জাতি’ নিয়ে হাজার প্রকার চাওয়ার কাহিনী ফেরি করি, বাগাড়ম্বর করি। জাতিকে দিয়ে বহু কিছু চাওয়াই, নিজে যা চাই তা জাতির নামে বলি। ‘জাতি’ বিমূর্ত কিছু নয়, জীবন্ত মানুষ নিয়েই জাতি। আর জাতির চিন্তা অনড় বা অপরিবর্তনীয় কিছু নয়। জাতি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান চেয়েছিল, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ, আগামী দিনে কী চাইবে জানি না, কিন্তু কোনো জাতীয়তাবাদ চাইবে বলে মনে হয় না। জাতিকে অখণ্ড ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলতে পারে, কিংবা বিপরীতে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টাও কোনো অংশে কম তীব্র হবে না। পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এই কালে আন্তর্জাতিকতাবাদের আবেদন থাকবে। সেটা ইসলাম হোক, কিংবা হোক কমিউনিজম।
রাজনৈতিক মতাদর্শ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। একটু যদি আমরা খেয়াল করি তাহলে দেখব সমাজে যে বিভক্তি, বিভাজন, রক্তপাত, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও নির্বিচারে গুলি, হরতাল, অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, লাশের উৎসব- সবকিছুর হোতা হচ্ছে সেই শ্রেণী, যারা অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী। রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতি করে, লুটপাট করে, এগুলো আমাদের জানা। কিন্তু যে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কথা বলে আজ দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিতর্ক। এই বিতর্কের কোনো গুরুত্ব নেই, সেটা আমার দাবি নয়। কিন্তু এত রক্ত ও এত লাশের পরও এমন কোনো মতাদর্শিক বয়ান গড়ে ওঠেনি, যা বিভক্তি ও বিভাজনের বাইরে একটা ঐক্যের জায়গা শনাক্ত করতে পারে। আমাদের নিশ্চয়ই চোখ নষ্ট হয়নি। যদি না হয়, আমরা অনায়াসেই দেখব রাজনীতির পক্ষাপক্ষ যেভাবে স্থির হয়েছে, তার কোনো পক্ষেই কৃষক বা শ্রমিক দৃশ্যমানভাবে হাজির নেই। তাদের কোনো পক্ষে সম্পৃক্ত হওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিণতি কী হবে জানি না, কিন্তু এই অনুপস্থিতি ইঙ্গিত করে যে আমরা ঠিক পথে যাচ্ছি না। আমরা ঠিকই একটি খাদের কিনারে এসে পড়েছি। এজন্য নয় যে, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা সংলাপ করছেন না। এই জন্য যে, আমরা এমন একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কবলে পড়েছি, যে শ্রেণী চিন্তার দিক থেকে প্রাচীন ও অন্তঃসারশূন্য। নতুনভাবে চিন্তার ক্ষমতা তার নেই। বাংলাদেশে এখনকার যে রাজনৈতিক বাস্তবতা, সেই পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতিতে আস্থা রাখা দুঃসাধ্য। এটা একটি জনগোষ্ঠীর জন্য খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি, কিন্তু বাস্তবতা এটাই। যারা রাজনীতি করেন, তারা প্রধানত কোনো না কোনো দল করেন। সেটা দোষের নয়। কিন্তু সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ যখন বিবেক ও চিন্তার ক্ষমতাকে রুদ্ধ করে দেয়, তখন সেটা একটি জনগোষ্ঠীর অধঃপতনের কারণ হয়ে ওঠে।
এই দ্রুত অধঃপতন আমরা দ্রুত রুদ্ধ করতে পারব কিনা? আমি মনে করি, সেটা সম্ভব যদি আমরা চিন্তার পদ্ধতি হিসেবে খাঁজকাটা পাথুরে মতাদর্শ থেকে শুরু না করে সাধারণ মানুষের দাবি-দাওয়ার দিকে আন্তরিকভাবে কান পাততে শিখি। শুধু অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়ার কথা বলছি না। পুরনো অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানের দাবি থাকুক, কিন্তু এগুলো অর্থনৈতিক দাবি। সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দাবি সমান গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত এ সময় অনেক বেশি নির্ধারক। এ বিবেচনা থেকেই আমি সব সময় বলছি, ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতার যে পাথুরে বিভাজন আগাম অনুমান করে রাজনীতির নীতি ও কৌশল নির্ণয়ের পুরনো পদ্ধতি নিয়ে আমরা চলি, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। কেউ চাক বা না চাক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে হাজির রয়েছে। এর বেগ বাংলাদেশে রুদ্ধ করা কঠিন। কিন্তু তা আমাদের এগিয়ে নেবে নাকি পিছিয়ে দেবে তা নির্ভর করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ও ইহলৌকিক লড়াই-সংগ্রামে তাকে আত্মস্থ করার ওপর। ‘ইসলাম’ কোনো একাট্টা একরকম ব্যাপার নয়। যারা ইসলামপন্থী তারা তাদের জায়গা থেকে কথা বলবেন, সে অধিকার তাদের আছে। কিন্তু চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির জায়গা থেকে যে কাজ দরকার সেটা হচ্ছে, কী ধরনের চিন্তা সমাজকে পিছিয়ে দেয় আর কী চিন্তা এগিয়ে নিয়ে যায়, খোলা মনে সেই তর্ক করা। আলোচনাকে ইসলামী মৌলবাদ বনাম প্রগতিশীলতা নামক বদ্ধ খাপের মধ্যে পুরে ফেলা নয়। ওতে আমরা বদ্ধ জায়গাতেই বন্দি হয়ে থাকব।
আগামী দিনে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তরুণরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবেন; দর্শন, বুদ্ধি, জ্ঞানবিজ্ঞান, সংস্কৃতিসহ সবকিছুতেই। প্রধানত রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি, কারণ সব ক্ষেত্রে একটি জনগোষ্ঠীর চিন্তা ও চৈতন্যের সারসত্তা রাজনৈতিকতার মধ্য দিয়েই পরিস্ফুট হয়। রাজনীতির যে দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্দশা ঘটেছে, তার কারণে রাজনীতির পক্ষে গলা ফুলিয়ে কিছু বলা কঠিন। কিন্তু ইতিহাস শিক্ষা দেয়, রাজনৈতিকভাবেই একটি জনগোষ্ঠী পরাধীন চিন্তা ও পরাধীনতা থেকে মুক্ত হতে পারে; নিজেদের পথ নিজেদের নির্ণয় করার আর কোনো শর্টকাট পথ আছে বলে আমার জানা নেই।

‘ছাড় না দিলে এই মধ্যস্থতা সফল হবে না’ by রিয়াজুল ইসলাম দীপু

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম বলেছেন, জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নানদেজ তারানকো বাংলাদেশের চলমান সঙ্কট নিরসনে আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
তাঁর এই সফর ইতিবাচক। কিন্তু দুই পক্ষ ছাড় না দিলে এই মধ্যস্থতা সফল হবে না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গণমাধ্যমের খবর অনুসারে শেখ হাসিনা তাঁর অবস্থানে এখনও অনড় রয়েছেন। অপর দিকে খালিদা জিয়াও কাউকে বিশ্বাস করতে নারাজ। এমন অবস্থা হলে সমঝোতা সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেই আগে ছাড় দিতে হবে। শেখ হাসিনা যদি পদত্যাগ করেন তাহলে হয়ত বিএনপি নমনীয় হবে। এবং তারা সঙ্কট এড়ানো জন্য কিছুটা ছাড় দিতে রাজি হবে। জাতিসংঘের অধীনে নির্বাচনের প্রস্তাব হাসিনা-খালেদা কারও জন্যই মেনে নেয়া উচিত হবে না বলে মত দিয়ে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, এটা বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক হবে না। দুই জোট সমঝোতায় এসে একটি নির্বাচনের ব্যবস্থায় যেতে পারলেই ভাল। সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার প্রশ্নে তিনি বলেন, সমরিক হস্তক্ষেপের কোন সম্ভাবনা নেই। আর কখনোই সামরিক হস্তক্ষেপ রাজনৈতিক সংকটের সমাধান দিতে পারে না। দীর্ঘ মেয়াদে এই হস্তক্ষেপ দেশকে আরও একটি নতুন সঙ্কটের দিকে নিয়ে যাবে।

বিভিন্ন সময়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও মধ্যস্থতার জন্য উদ্যোগ করেছিল জাতিসংঘ। সেটি সফল হয়নি। ১৯৭১ যুদ্ধের সময়ও মধ্যস্থতার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সেটিও সফল হয়নি। ৯৬ সালেও একই অবস্থা দেখতে পেয়েছি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সংঘাত ছাড়া আমাদের কোন সরকারকেই নমনীয় হতে দেখা যায় নি। ২০০৬ সালেও আওয়ামী লীগের আবদুল জলিল ও বিএনপি’র আব্দুল মান্নান ভুইয়া সমঝোতায় আসার চেষ্টা করেছিলেন। ছাড় দেয়ার মনোভাব না থাকায় তা সফল হয়নি। এরকরফা কোন নির্বাচন হলে তা শেখ হাসিনার জন্য আত্মঘাতী হবে। নির্বাচনটি দেশীয় বা আর্ন্তজাতিকভাবে গ্রহনযোগ্য হবে না। নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার সম্ভাবনাও কম। ইতিমধ্যে বিরোধী দলের দুই সপ্তাহের অবরেধে দেশের কাঠামো ভেঙ্গে পড়েছে। ভোগন্তিতে পড়েছে সাধারণ জনগণ। পঞ্চদশ সংশোধনীকে চলমান সংকটের মূল কারণ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট থেকে বলা হয়েছিল আগামী দুটি নির্বাচন কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে করা যেতে পারে। শেখ হাসিনা তা মেনে নিলে দেশ এতটা সংঘাতে যেত না। আসলে রাষ্ট্রের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা ক্ষমতাকেই বড় করে দেখছেন, এটাই মূল সমস্যা। হুসেই মুহম্মদ এরশাদের অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার অবস্থান এখনও প্রশংসনীয় হলেও নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তিনিও এক সময় একতরফা নির্বাচন করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত দেখা যাক তার অবস্থান পরিবর্তন হয় কি না।

সিএমএইচ থেকে বিশেষ বার্তায় এইচ এম এরশাদ : আমি অসুস্থ নই, গ্রেফতারের জন্য আটকে রাখা হয়েছে

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, ‘আমি অসুস্থ নই। আমাকে গ্রেফতারের জন্য এখানে আটকে রাখা হয়েছে।’
গতকাল সন্ধ্যায় সিএমএইচ (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) থেকে তার বিশেষ উপদেষ্টা ববি হাজ্জারের মাধ্যমে বিশেষ বার্তায় তিনি এ তথ্য জানান। একতরফা নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১২টায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এইচ এম এরশাদকে তার বাসা থেকে নিয়ে যায়। এরপর তারা তাকে সিএমএইচে ভর্তি করেন।

জাতীয় পার্টি সূত্রে জানা গেছে, এখন এরশাদকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। আর তার অনুপস্থিতিতে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে রওশন এরশাদকে একতরফা নির্বাচনের সহযাত্রী করতে সব ধরনের তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ লক্ষ্যে গতকাল
দিনভর রওশনের গুলশানের বাসভবনে দফায় দফায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় রওশনের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী এবং আওয়ামী লীগ নেতা শিল্পমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, রওশনকে ৪৭টি আসন দিতে চায় আওয়ামী লীগ। কিন্তু এ ব্যাপারে পূর্ণ নিশ্চয়তার অপেক্ষায় রয়েছেন রওশন।
তবে গতকাল সন্ধ্যায় পাঠানো বিশেষ বার্তায় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ঘোষিত তফসিলে জাতীয় পার্টি আসন্ন জতীয় সংসদ নির্বাচনে যাবেন না বলে আবারো খোলাসা করে জানিয়েছেন। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তাকে চিকিত্সার নামে আটকে রাখার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি জাতীয় পার্টির সব নেতাকর্মীকে ধৈর্য ধরার এবং ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিচ্ছি। আমি কাউকে আমার মুখপাত্র নিযুক্ত করিনি। একজন নেতা (মুজিবুল হক চুন্নু) পার্টির মুখপাত্র হিসেবে বিবৃতি দিচ্ছেন বলে শুনেছি। তিনি যদি এটা করে থাকেন, তাহলে এর দায়িত্বও তার নিজের। এবং এটি তার নিজস্ব মতামত হিসেবে বিবেচিত হবে। পার্টির শৃঙ্খলাবিরোধী যে কোনো কাজের জন্য আমি যে কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি।’
এরশাদ বলেন, ‘পার্টির মহাসচিব রুুহুল আমিন হাওলাদার ও আমার ভাই এবং পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের আমার কাছ থেকে প্রাপ্ত দিকনির্দেশনা দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেবেন। ববির মাধ্যমে আমি গণমাধ্যমকে আমার বক্তব্য জানাবো। অন্য কারো বক্তব্য, বিবৃতি এবং প্রচারণায় আপনারা বিভ্রান্ত হবেন না।’
তিনি আরো বলেন, ‘সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া জাতীয় পার্টি কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। এজন্য ইতোমধ্যেই আমাদের দলের প্রার্থীরা তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার স্বার্থেই এটা দরকার বলে তিনি মনে করছেন।
এদিকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ছাড়া জাতীয় পার্টির বিকল্প চেয়ারম্যান হিসেবে কাউকে মেনে নেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব এবিএম রুুহুল আমিন হাওলাদার।
গতকাল সন্ধ্যায় বনানীতে দলের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এইচ এম এরশাদ যতদিন আছেন ততদিন দলে বিকল্প চেয়ারম্যান মেনে নেয়া হবে না। এরশাদই চেয়ারম্যান থাকবেন।’
নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে না যাওয়ার ব্যাপারে এরশাদের সিদ্ধান্তে আমরা অটল। দেশ ও জাতির স্বার্থে সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দেয়ায় এরশাদ এখন সিএমএইচে। আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি। প্রয়োজনে কঠোর কর্মসূচি দেব। রাতে একটি বৈঠক শেষে কর্মসূচি সম্পর্কে জানানো হবে।’ মনোনয়ন প্রত্যাহার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘২৯০টি আসনে জাতীয় পার্টি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিল। দলের সবাই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বলে খবর পেয়েছি। রাতে জানানো হবে কত আসনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার হয়েছে।’ এ সময় জাতীয় পার্টির মহাসচিব পটুয়াখালী-১ আসন থেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।
এর আগে গতকাল দুপুরে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং এইচ এম এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের অভিযোগ করে বলেছেন, এরশাদকে অস্বাভাবিকভাবে হাসপাতাল নেয়া হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টায় গুলশানে হাওলাদার কমপ্লেক্সে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ অভিযোগ করেন। এ সময় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার উপস্থিত ছিলেন। প্রেস ব্রিফিং চলাকালে উপস্থিত নেতাকর্মীরা রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরকারের দালাল দালাল বলে স্লোগান দিতে থাকে।
সাবেক মন্ত্রী জিএম কাদের বলেন, পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদকে স্বাভাবিকভাবে হাসপাতালে নেয়া হয়নি। তিনি জানান, নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে এরশাদ তার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। তিনি (এরশাদ) আজকের (গতকাল) মধ্যে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের জন্য সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশ অমান্য করা হলে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে বলেও সতর্ক করে দেন। রওশন এরশাদ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কি-না, জানতে চাইলে কাদের বলেন, পার্টির চেয়ারম্যান এখনো জীবিত এবং দেশেই আছেন। কাজেই কাউকে ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়ার সম্ভাবনা নেই। চেয়ারম্যান দেশের বাইরে গেলে কাউকে দায়িত্ব দেয়া হবে কি-না, সেটি পরের ব্যাপার।

রাজনীতিকদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক by রোজিনা আক্তার

‘কী দেখার কথা, কী দেখছি? কী শোনার কথা, কী শুনছি? কী ভাবার কথা, কী ভাবছি? কী বলার কথা, কী বলছি? তিরিশ বছর (৪২ বছর) পরও আমি স্বাধীনতাকে খুঁজছি।’ এই গানের কথাগুলোই আমাদের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে দেখা দিয়েছে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিশ্বের দরবারে স্বাধীন ও সাহসী জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ইতিহাস। এই ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক ও নির্ভুল তথ্য জানা আমাদের প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য। স্বাধীনতার অনেক বছর পর আমার জন্ম। তাই স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে আমি গর্বিত। এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা প্রথম শুনি আমার পরিবার থেকে, তারপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি কিন্তু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি-নাটক দেখে, বই পড়ে মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী ও একাত্তরে শারীরিকভাবে নির্যাতিত নারীর সঙ্গে কথা বলে, তাদের মুখ থেকে সেই আগুনঝরা দিনগুলোর কথা জেনেছি। এসব ঘটনা আমাকে অনেক বেশি আলোড়িত করে। যখন একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেন—‘এই হাতে অস্ত্র ধরেছি, শত্রুসেনা খতম করেছি; তখন নিজের অজান্তেই চলে যাই সেই সময়ের কাছে। যখন একজন মুক্তিযোদ্ধা নারী তার ত্যাগের কথা ও নির্যাতনের কথা করুণ কণ্ঠে বর্ণনা করেন, তখন চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস না জানলে কারও মধ্যেই দেশপ্রেম বা দেশাত্মবোধ তৈরি হবে না। জাগবে না দেশের প্রতি প্রকৃত সম্মান। একজন বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধা বা বীরাঙ্গনা দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য নিজেদের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন, দেশপ্রেমের জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে জাতির কাছে স্মরণীয়-বরণীয় হয়েছেন। তারা তখনও সংগ্রাম করেছেন, এখনও করছেন। তাই পরিবারের পাশাপাশি চাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, এরপর মিডিয়ার ভূমিকা। প্রযুক্তির যুগে মিডিয়াই পারে সঠিক ইতিহাস জাতির কাছে তুলে ধরতে।
কষ্ট হয় যখন দেখি একজন মুক্তিযোদ্ধা দীনহীন অবস্থায় চরম আর্থিক সঙ্কটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা নারী তার প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হন। অন্যদিকে একজন ঘাতক দালাল দেশের প্রশাসনে সম্মানিত পদে বসে দেশের পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরছে। আসলে দেশপ্রেম বা দেশের প্রতি ভালোবাসা কখনও জোর করে তৈরি হয় না, এটা নিজের ভেতর জন্ম নেয়, যেমনি নিয়েছিল ’৭১-এ। নিজের অস্তিত্বের জন্য মানুষ তখনও অশুভ শক্তির কাছে হার মানেনি, এখনও মানবে না। আজকে লড়াই করে দেশ স্বাধীন হয়েছে বলে আমরা নিজেদের জন্য শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারছি। সে হিসেবে আমাদেরও উচিত দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ সঠিকভাবে পালন করা। দেশ আমাকে কী দিয়েছে এটা না ভেবে, নিজের স্বার্থকে বড় করে না দেখে দেশের উন্নতির জন্য কাজ করে যাওয়া প্রতিটি সুনাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আজ দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। রাজনীতিবিদদের উচিত ক্ষমতার লোভ ও নিজের স্বার্থকে বড় করে না দেখে দেশের মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে কাজ করা। আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠী ও রাজনীতিবিদরা যতদিন না দেশের মানুষের সবার আগে না ভেবে নিজেদের ক্ষমতালোভী করে প্রকাশ করবে, ততদিন দেশের মানুষকে নতুন করে বারবার স্বাধীনতা খুঁজতে হবে। মহান বিজয় দিবস সামনে রেখে রাজনীতিবিদদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক, দেশে শান্তি ফিরে আসুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

‘লুটপাটতন্ত্র বন্ধ করলে মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র পূর্ণতা পাবে’

গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বাস্তবায়নের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে মাত্র।
কিন্তু এটাই শেষ নয়। মূল মর্মটা তখনই বাস্তবায়ন হবে, যখন দেশের সার্বভৌমত্ব নিরাপদ হবে। কিন্তু এখন আমাদের সার্বভৌমত্ব নিরাপদ নয়। সার্বভৌমত্বের উপর এখন নানামুখী আক্রমণ হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র পূর্ণতা পাবে যদি লুটপাটের রাজনীতি বন্ধ করে উৎপাদনশীল অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা যায়। কিন্তু তা হচ্ছে না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ৭২ সাল থেকে নির্বাচিত কিংবা অনির্বাচিত কায়দায় স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোতেই চলেছে সরকারগুলো। ফলে, আমরা কাঙ্খিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ পাইনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আনুষ্ঠানিকতার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।

রাজনৈতিক সংকটের মোকাবিলায় বিদেশীদের কূটনৈতিক পদক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দল নিজেদের দাবিতে অনড় থেকে সমাধান চাইছে। এটা সম্ভব নয়। তাই সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ছাড় দিতে পারলে নিজেরাই সমস্যার সমাধান করা যেত। কিন্তু তা করতে পারে নি শাসকদলগুলো। ফলে এখন কূটনীতিকরা হস্তক্ষেপ করে আমাদেরকে একটা লজ্জাজনক অবস্থায় ফেলেছে।
জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক মোকাবিলার উপায় প্রসঙ্গে এই বাম রাজনীতিক বলেন, জামায়াত-শিবিরের বাড়বাড়ন্ত অবস্থা শাসক দলগুলোর আপোষকামিতার ফল। জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার জন্য গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামো ও গণমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলা দরকার। কিন্তু তা গড়ে ওঠেনি এবং তার দিকে ক্ষমতাসীন দলগুলো মনোযোগীও নয়। এই বিষয়ে জনগণের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

‘হাসিনা ঘুঘু দেখেছে ফাঁদ দেখেননি, এবার ফাঁদ দেখাতে হবে’

‘হাসিনা ঘুঘু দেখেছে ফাঁদ দেখেননি, এবার ফাঁদ দেখাতে হবে’ বলে মন্তব্য করেছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম।

গতকাল বিকালে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক রথখলা ময়দানে জেলা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় তিনি এ কথা বলেন।

বঙ্গবীর শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনার বিচার হবে, এমন বিচার হবে আপনি তা ভাবতেও পারেন না। আপনি লাফালাফি বন্ধ করেন, আর দেশটাকে জ্বালাবেন না। আপনার জন্য দেশে যতো অশান্তি। আপনি যদি পঞ্চদশ সংশোধনী না আনতেন, তাহলে দেশে এ অশান্তি হতো না। এতো মানুষ মারা যেতো না। কাজেই এর সব দায়দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। আপনি অবিলম্বে পদত্যাগ করেন। আপনাকে বাংলার মানুষ চায় না।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী শেখ হাসিনাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, আপনি এতো জনপ্রিয় হলে পদত্যাগ করে নির্বাচনে জনপ্রিয়তা যাচাই করুন। সখিপুর-বাসাইলে পারবেন না, আপনার গোপালগঞ্জেই আমি ভোটে দাঁড়িয়েই এর প্রমাণ করব।

তিনি বলেন, শাহবাগে ৩ মাস আপনি পোলাও-মাংস খাইয়েছেন। আর আমার দেশের গরিব নিরন্ন মুসলমান আল্লাহর বিরুদ্ধে যারা কথা বলেছে, তার প্রতিবাদ করতে শাপলা চত্বরে গিয়েছিল, আল্লাহর পথে একরাত তাদেরকে থাকতে দেন নাই। বাতি নিভিয়ে দিয়ে তাদেরকে গুলি করে মেরেছেন। আপনার কবরের বাতি আল্লাহ নিভিয়ে দেবে। কাদের সিদ্দিকী আরও বলেন, জনগণ ভোট চায় না, তারপরও হাসিনা ভোট করতে চায়। গায়ের জোরে ভোট করে খালেদা জিয়া ৪২ দিন ছিলেন। আপনি না হয় ৪২ দু’গুনে ৮৪ দিন বড়জোর থাকতে পারবেন।

বঙ্গবীর খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে বলেন, ঘরে বসে অবরোধ আর দিয়েন না। মানুষ পোড়ানোর অবরোধ করবেন না। অবরোধ অবরোধ খেলা আর খেলবেন না। সাহস থাকলে বাইরে আসেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করুন।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়ে ভারতের ভূমিকা বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা বড় ভাই চাই না, মুরব্বি চাই না। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের বন্ধুত্ব চাই, খবরদারি নয়।

কার অধীনে জাতীয় নির্বাচন মূল সঙ্কট সেখানেই by আমীর খসরু

এক ভয়াবহ জটিল এবং কঠিন সঙ্কটে পড়েছে দেশ। সঙ্কটটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই। আর এটা অপ্রত্যাশিত তো নয়ই বরং এতকাল ধরে এই সঙ্কটের পূর্বাভাস দিয়ে যাচ্ছিলেন সবাই।

সুজাতা হাসিনার ভাবনা by আমিরুল ইসলাম কাগজী

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বলে গেছেন, গণতন্ত্রের স্বার্থেই বাংলাদেশে নির্বাচন হওয়া উচিত। ঢাকা সফরের সময় তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও

ঢাকা বেড়াতে আসাই কাল হলো শান্তর by মোর্শেদ নোমান

‘আমার পোলাডার কী অইব? ক্যান যে ঢাকা আইছিল! আর ক্যান যে আমার লাইগ্যা খাওন লইয়্যা গেছিল!’ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি ইউনিটের ২০৪ নম্বর ওয়ার্ডের সামনে মোহাম্মদ সোবহানের এ রকম বিলাপ আর বুকফাটা কান্নায় থমকে দাঁড়াচ্ছিলেন সবাই।

গুলিবিদ্ধ শিশুটি রাস্তায় পড়ে ছিল ১৫ মিনিট! by কাজী আনিছ

উল্টো হয়ে পড়ে আছে প্লাস্টিকের বাটি। পাশে উপুড় হয়ে আছে ১১ বছরের শিশু শান্ত ইসলাম। পরনে লাল-খয়েরি রঙের প্যান্ট আর সাদা ফুল হাতা গেঞ্জি। গেঞ্জিতে ছোপ ছোপ রক্ত।

সংকট উত্তরণ- বাংলাদেশ প্যারাডক্স by উইলিয়াম বি. মাইলাম

বাংলাদেশে আবার সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাঁচ বছর পর পর আসে এই রাজনৈতিক সংকট। ব্যাপারটা টের পাওয়া যায় দেশটিতে বর্ষাকালের আগমনের মতোই, তবে অতটা একঘেয়েভাবে নয়।

কালের পুরাণ- কোথায় র‌্যাব, কোথায় পুলিশ, কোথায় সরকার? by সোহরাব হাসান

১৯৭১ সালে যে স্বপ্ন ও অঙ্গীকার নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, তার অন্যতম ছিল গণতন্ত্র ও সুশাসন। কিন্তু স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও আমরা সেই গণতন্ত্র ও সুশাসনের দেখা পাইনি।

নতুন পাসপোর্টের প্রিন্ট বন্ধ, দুর্ভোগ চলছে by দীন ইসলাম

নতুন মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) প্রিন্ট হচ্ছে না। গত চার দিন ধরে প্রিন্ট বন্ধ রয়েছে। ফলে পাসপোর্টের আবেদন জমা নেয়া হলেও প্রসেসিং বন্ধ রয়েছে।
বিষয়টি  বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের চার দেয়াল ভেদ করে সাধারণ মানুষ খুব একটা জানতে পারেনি। এর আগেই প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা বিষয়টি সমাধানের জন্য দৌড়ঝাঁপ করে যাচ্ছেন। এ জন্য দফায় দফায় সভা করছেন। গত দুই দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তারা বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করেছেন। কিন্তু পাসপোর্ট প্রিন্ট সমস্যার সুরাহা করতে পারেননি। বাধ্য হয়ে নতুন এমআরপি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডি লা রুকে অব্যাহত চাপ দিচ্ছে পাসপোর্ট অধিদপ্তর। চাপের জবাবে নতুন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগে পাসপোর্ট ছিল ৭ ডিজিটের। নতুন করে ১১ ডিজিটের পাসপোর্ট দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তাই প্রিন্ট করার ক্ষেত্রে কিছু তো সমস্যা হবেই। সফটওয়্যারগত কিছু ত্রুটি রয়েছে। আশা করছি, তার সমাধান হয়ে যাবে। ওদিকে অনেক সরকারি কর্মকর্তা বা প্রবাসী বাংলাদেশীরা এমআরপি’র মাধ্যমে নতুন করে বিদেশে যাওয়ার চিন্তা করেছেন। অতি জরুরি পাসপোর্ট নিতে ইচ্ছুক ওই সব ব্যক্তি পড়েছেন মহা ফাঁপড়ে। সহসা পাসপোর্ট পাওয়ার লক্ষণ দেখছেন না তারা। এ কারণে ভিসার আবেদন জমা দিতে পারছেন না। এমন ব্যক্তিদের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে প্রতিদিন সর্বনিম্ন ১০ হাজার ও সর্বোচ্চ ১২ থেকে ১৪ হাজার পাসপোর্ট প্রিন্ট করা হয়। তাই সব মিলিয়ে গত কয়েক দিনে অর্ধ লাখ পাসপোর্ট প্রিন্ট হয়নি। পাসপোর্ট প্রিন্টের এমন জ্যামের রেশ কাটাতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সিরাজউদ্দিন মানবজমিনকে জানান, সফটওয়্যার সংক্রান্ত জটিলতার কারণে পাসপোর্ট প্রিন্ট হচ্ছে না। এটা সাময়িক। আশা করছি দুয়েক দিনের মধ্যে সমস্যা কেটে যাবে। বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এতদিন মালয়েশিয়ান কোম্পানি আইরিশ কর্পোরেশন বারহাড জেভি’র (আইরিশ জেভি) মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) দেয়ার কাজটি করতো। গত দুই বছর বেশ সফলতার সঙ্গে তারা সেনাবাহিনীর সহায়তায় এমআরপি দিয়েছে। তবে গত মে মাসে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ডি লা রু’র কাছ থেকে দেড় কোটি এমআরপি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করে। ওই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের প্রস্তাবে জানায়, ২৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির প্রস্তাবটি বেশ ভাল। তাদের ডিজাইনও নতুন। নতুন এমআরপি’র কভার পৃষ্ঠার পুরুত্ব ২৯০ মাইক্রোন থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ মাইক্রোন, ভেতরের পৃষ্ঠার পুরুত্ব ১০৫ মাইক্রোনের বদলে ১২০ মাইক্রোন, সিকিউরিটি ফাইবার রেড ভিজিবলের বদলে পিংক ভিজিবল, দুই স্তরবিশিষ্ট বাইন্ডিং সুতার স্তরের বদলে তিন স্তরবিশিষ্ট সুতার স্তর, জাতীয় সংগীতের নির্ভুল টেক্সট ব্যবহার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও জাতীয় সংসদের ছবি গ্রাফিক্স ডিজাইনের মাধ্যমে বিদ্যমান ছবি উন্নত করা, ডাটাপেজ করা হবে। এর আগে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে ১৯০টি দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে ২০১১ সালের ১লা এপ্রিল থেকে সব দেশকে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট ও ভিসার প্রচলন করার সিদ্ধান্ত হয়। সেই চুক্তির শর্তানুসারে বাংলাদেশে ২০১০ সালের ১লা এপ্রিল থেকে এমআরপি পাসপোর্ট চালু হয়। এ প্রকল্পের আওতায় তিন বছরে ৬৬ লাখ পাসপোর্ট ও ১৫ লাখ ভিসা স্টিকার দেয়া হয়েছে। তিন বছরের জন্য এ খাতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৫২৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা। নতুন করে আরও প্রায় ৩০০ কোটি টাকা খরচ করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার : জামায়াত-শিবিরকে দেখা মাত্র গুলি করতে বললেন ‘মুরগি শাহরিয়ার’

জামায়াত-শিবিরকে দেখামাত্র গুলি করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ‘মুরগি শাহরিয়ার’-খ্যাত ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির (ঘাদানিক) সভাপতি শাহরিয়ার কবির।

বাংলাদেশীদের জন্য হজে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ by সালমান ফরিদ

এখন থেকে হজ পালনে গিয়ে কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দেয়া যাবে না। এমনকি হজপালনকারী রাজনৈতিক নেতাকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল-সমাবেশও করা যাবে না।

আজও বৈঠক চলছে রওশনের বাসায়

জাতীয় পার্টির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদের গুলশানের বাসায় আজ শনিবারও সকাল থেকে বেশ কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বৈঠক করছেন।

বৈঠকে অংশ নিয়েছেন জিয়াউদ্দিন আহমেদ, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশিদ, লিলি হাসনাত প্রমুখ। তবে গতকালের মতো আজও বৈঠক নিয়ে মুখ খুলছেন না তাঁরা।
এদিকে, পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ গ্রেপ্তার হয়েছেন, না আটক আছেন, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য না দেওয়ায় নেতা-কর্মীরা মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের ওপর ক্ষিপ্ত। গতকাল জাতীয় পার্টির বিভিন্ন সূত্র থেকে বলা হয়েছিল, নির্বাচনে যাওয়া প্রসঙ্গে আজ শনিবার জাতীয় পার্টি সংবাদ সম্মেলন করে অবস্থান পরিষ্কার করবে। তবে বার বার চেষ্টা করেও মহাসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না সাংবাদিকেরা। দলের শীর্ষ নেতারাও সংবাদ সম্মেলন নিয়ে কোনো কথা বলছেন না।
রওশনের বাসায় গতকাল দিনভর তত্পরতা
এদিকে গতকাল দিনভর রওশন এরশাদের গুলশানের বাসায় আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুসহ দলের একাংশ দফায় দফায় বৈঠক করে। সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে তাঁর বাসায় যান আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা তোফায়েল আহমেদ ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী। তাঁরা প্রায় ৪০ মিনিট সেখানে ছিলেন। এ সময় হঠাত্ রওশনের বাসার সামনে র্যাব ও পুলিশের উপস্থিতি বেড়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার চলে যায়। তোফায়েল আহমেদ ওই বাসা থেকে বেরিয়ে সিএমএইচে গিয়ে এরশাদের সঙ্গে দেখা করেন বলেও রাতে খবর বের হয়।
রওশনসহ পাঁচ মন্ত্রী-উপদেষ্টা নির্বাচনে
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৪৮ আসনে জাপার প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এরপর ৩ ডিসেম্বর এরশাদ আকস্মিক নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা এবং পরদিন দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র তুলে নিতে নির্দেশ দেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদসহ সরকারে থাকা জাপার পাঁচজন মন্ত্রী-উপদেষ্টা গতকাল শেষ দিনেও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। এর মধ্য দিয়ে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাপার একটি অংশের নির্বাচনে থেকে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে উঠেছে। বেশ কিছু আসনে গতকাল শেষ দিনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে জাপাকে আসন ছেড়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রওশন এরশাদ (ময়মনসিংহ-৪), আনিসুল ইসলাম মাহমুদ (চট্টগ্রাম-৫ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত), জিয়াউদ্দিন আহমেদ ববলু (চট্টগ্রাম-৯), মুজিবুল হক চুন্নু (কিশোরগঞ্জ-৩), সালমা ইসলাম (ঢাকা-১) অন্যতম।

তবে জাপার মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার ও তাঁর স্ত্রী রত্না আমিন হাওলাদার গতকাল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। আর এরশাদ এবং জি এম কাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করলেও তা গৃহীত হয়নি। আর জাপার সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ প্রথম আলোকে বলেছেন, তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। কিন্তু রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় বলছে, তাঁর মনোনয়ন বহাল আছে।

এরশাদকে নির্বাচনে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়ে সরকার বিকল্প হিসেবে রওশন-আনিস-বাবলুর নেতৃত্বে জাপার একটি অংশকে নির্বাচনে রাখার কৌশল নেয়। তাঁদের সঙ্গে সরকার ১০ দিন ধরে নানা দেনদরবার ও গোপন সমঝোতা করে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানায়।

এরপর গত বৃহস্পতিবার এরশাদ নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়ে দলীয় প্রতীক লাঙ্গল কাউকে বরাদ্দ না দিতে অনুরোধ জানান। এর ১২ ঘণ্টার মধ্যে বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ৪০ মিনিটে এরশাদকে তাঁর বাসা থেকে ‘আটক’ করে সিএমএইচে নেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের আহ্বান বি. চৌধুরী, রব ও কাদের সিদ্দিকীর

তফসিল স্থগিত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিকল্পধারা বাংলাদেশ-এর প্রেসিডেন্ট ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জেএসডি সভাপতি আসম আবদুর রব এবং কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।
একই সঙ্গে বিরোধী নেতাকে সহিংস কর্মসূচি প্রত্যাহার করে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করার আহ্বান জানানো হয়। গতকাল এক যুক্ত বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী নেতার প্রতি এ আহ্বান জানান তারা। বিবৃতিতে শীর্ষ এ তিন নেতা বলেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধ্বংসোন্মুখ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। একদিকে সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর একগুঁয়েমি এবং বিরোধী দলহীন একতরফা নির্বাচনের পথে এগিয়ে চলা, অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতার আহ্বানে বিরামহীন অবরোধ এবং কোথাও কোথাও হরতালের কারণে রাজনীতি সহিংস হয়ে উঠেছে এবং জনজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। তারা বলেন, বিরামহীন অবরোধের কারণে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে এবং বিশেষ মহলের উস্কানিতে এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অমানবিক আচরণে হত্যাসহ ঝরে গেছে অনেক নিরীহ প্রাণ, পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে হিন্দু সম্প্রদায় সাধারণ মানুষের বিষয়-সম্পত্তি। আমরা এর কোনটাই সমর্থন করি না। তারা আরও বলেন, আমরা চাই, প্রধানমন্ত্রী দেশের এই পরিস্থিতিতে এবং জনস্বার্থে নির্বাচনী তফসিল স্থগিত এবং দেশ রক্ষার তাগিদে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করুন। অন্যদিকে বিরাধীদলীয় নেতার কাছে আমাদের আহ্বান, অনুগ্রহ করে আপনার কর্মীদের কঠোর নির্দেশ দিন- জান-মালের ক্ষতি থেকে নিরীহ জনগণকে রক্ষার জন্য। অহিংস শান্তিপূর্ণ আন্দোলন যেমন, ‘মহাবস্থান’, সভা, সমাবেশ মানববন্ধনের মাধ্যমে প্রতিবাদ কর্মসূচি দিয়ে রাজনীতিতে নতুনমাত্রা এবং নতুন দিক-নির্দেশনা যোগ করুন। তারা বলেন, এই দুইটি পদক্ষেপের কারণে ইতিহাস তাদের দু’জনকেই স্মরণ রাখবে। না হলে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে না।

দুই দলের প্রস্তাবে যা আছে-

তৃতীয় দফা বৈঠকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য প্রস্তাব দিয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। দুই দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রস্তাব নিয়ে তারা শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করা হবে।

ড. সুমিত গাঙ্গুলির বিশ্লেষণ- সামরিক বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণে অনাগ্রহী

প্রখ্যাত ভারতীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. সুমিত গাঙ্গুলি মনে করেন দুই নেত্রীর মধ্যকার বিরোধ যতটা না আদর্শগত তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যক্তিগত।

টবি ক্যাডম্যানের সংবাদ সম্মেলন

আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান বলেছেন, জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাকে বাংলাদেশ সরকার বিচার বিভাগের মাধ্যমে হত্যা করেছে।

কোনো শর্টকাট নেই

আজ ১৩ ডিসেম্বর। আজকের দিনটা পার হলেই আসবে সেই রাত, যখন আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগীরা—আলবদর, আলশামস, রাজাকাররা। ঘরের কড়া নেড়ে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের আতঙ্কভরা চোখের সামনে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাংলার শ্রেষ্ঠ লেখক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক ও শিক্ষকদের। চোখ বাঁধা হয়েছিল। পিঠমোড়া করে বাঁধা হয়েছিল হাত।
১৬ ডিসেম্বর বিজয় এল, কিন্তু তাঁরা আর ফিরে এলেন না, তাঁদের গুলিবিদ্ধ দেহ পড়ে রইল রায়েরবাজার, মিরপুর এলাকার জলা-জংলায়। ১৯৭১ সালে আমাদের সহস্রাধিক বুদ্ধিজীবীকে খুন করা হয়েছে। খুন করা হয়েছে তালিকা তৈরি করে। এই তালিকা কারা প্রস্তুত করেছিল? কারা নির্দেশ দিয়েছিল তাঁদের হত্যা করার? পরিকল্পনা কারা করেছিল? কারা সেটা বাস্তবায়ন করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে ‘স্যার, আমার সঙ্গে চলেন’ বলে যারা ডেকেছিল, তারা ছিল বাঙালি। সেই খুনিদের, তাদের রাজনৈতিক নেতাদের, সেই নীলনকশাকারীদের বিচার সম্পন্ন হবে না? শাস্তি নিশ্চিত হবে না? এই রকম একটা প্রশ্ন নিয়ে এবারের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আর বিজয় দিবস আমাদের সামনে এসেছে। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতার পঙিক্ত উচ্চারিত হচ্ছে, ‘আজও আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই, ধর্ষিতার কাতর আর্তনাদ শুনি আকাশে বাতাসে, এদেশ কি ভুলে গেছে সেই রক্তাক্ত সময়? জাতির পতাকা খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন।’ পাশাপাশি এটা নির্বাচনেরও মৌসুম। আমাদের একটা নির্বাচন করতেই হবে, এটা আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতা।
প্রশ্ন হচ্ছে, সেই নির্বাচনটা কি একটা বাধ্যবাধকতা পূরণের নির্বাচন হবে, নাকি হবে সত্যিকারের নির্বাচন? যে নির্বাচনের মাধ্যমে জনমত প্রতিফলিত হবে? জনগণ যাকে চাইবে, সেই দল বা জোট জয়লাভ করবে? অন্য একটা বিতর্কও দেখতে পাচ্ছি। তা হলো, গণতন্ত্র বড়, নাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বড়? কোনটা আগে। এখানে উত্তরটা আগেভাগেই দিয়ে দেওয়া যাক, গণতন্ত্রের চেতনা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে ফারাক নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক নম্বর উপাদান হলো গণতন্ত্র। এটা ১৯৫২ সালেরও শিক্ষা, এটা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেরও শিক্ষা। ভাষা আন্দোলনের মূলেও ছিল মহান গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এই সময় বাঙালিরা একমাত্র বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবি তোলেনি, অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছিল এবং তারাই ছিল সংখ্যাগুরু। পাকিস্তানি শাসকেরা যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মানশীল হতেন, তাহলে তাঁরা এই সহজ যুক্তিটাকে অস্ত্রের ভাষায় উড়িয়ে দিতে চাইতেন না। তেমনিভাবে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ, কাজেই তাদের দাবিদাওয়া মেনে নেওয়াটাই হতো গণতান্ত্রিক। গণতান্ত্রিক আচার ও আচরণ জানা ছিল না পাকিস্তানি শাসকদের, জান্তাদের, কাজেই তাঁরা অস্ত্রের ভাষাকেই একমাত্র ভাষা হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, নিযুত মানুষের রক্তের বিনিময়ে শেষতক বাংলাদেশ হলো স্বাধীন।
আজও এই প্রশ্নটা আসছে বটে। প্রশ্ন উঠছে কী হবে, আজ যদি নির্বাচনের মাধ্যমে এমন গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসে, যারা মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনাকেই ধূলিসাৎ করে দেবে? আমাদের উত্তর হলো, গণতন্ত্রে কোনো শর্টকাট নেই। গণতন্ত্রে চালাকি, ফন্দি, অপকৌশলের স্থান নেই। গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। গণতন্ত্রের বিকল্প হলো আরও গণতন্ত্র। আজ আমাদের দেশে যে চরম সংকট দেখা দিয়েছে, যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা প্রতিদিন হত্যা করছে মানুষকে, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছে নিরপরাধ মানুষ ও তাদের সম্পদকে, স্রেফ সন্ত্রাসবাদী কায়দায় আগুন দেওয়া হচ্ছে বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে; উপড়ে ফেলা হচ্ছে রেললাইন, হত্যা করা হচ্ছে মানুষকে—সেটা মোটেও গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উপাদান নিশ্চয়ই সুন্দর নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব বাছাই, কিন্তু গণতন্ত্র মানে জবাবদিহি, গণতন্ত্র মানে একজন মানুষেরও ভিন্নমত পোষণ ও প্রকাশের অধিকার। গণতন্ত্র মানে সংখ্যাগুরুর শাসন নয়; সংখ্যালঘু মানুষ, ভিন্নমতাবলম্বীরা সেখানে কীভাবে আছে, কত ভালো আছে—সেটাও গণতন্ত্রের পরীক্ষা। গণতন্ত্র মানে সমাজে, পরিবারে, দলে, রাষ্ট্রে—সর্বত্র গণতন্ত্র। আজকের যে সংকট, সেই সংকট থেকে উত্তরণের পথও আসলে গণতন্ত্রই। তবে দুঃখের কথা হলো, আমাদের দেশে গণতন্ত্রের নামে চলে নিপীড়নতন্ত্র, এখানে চলে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র। আমাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি দল ও তাদের নেতৃত্ব এবং আমাদের সরকারের রুলস অব বিজনেস আসলে একনায়কতন্ত্রকেই পোষণ করে এসেছে।
আজ বহু সমস্যার মূলে এই স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতাই। এবং আছে এই মানসিকতা, যদি তুমি আমার কথা না শোনো, তাহলে তোমাকে উড়িয়ে দেওয়ার-পুড়িয়ে দেওয়ার অধিকার আমার আছে—এটা মোটেও গণতন্ত্রের ভাষা নয়। তবু এ থেকে উত্তরণের জন্যও কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই। অ্যাবরশন করে আমাদের গণতন্ত্রের পথের জটিলতা নিরসন করা যাবে না। দুই বড় দলের অংশগ্রহণে একটা সত্যিকারের অর্থবহ নির্বাচন হতেই হবে। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী জোটকে ক্ষমতায় বসতে দেওয়া যাবে না, তাতে দেশের ক্ষতি হবে; কিংবা কেবল আমরাই দেশপ্রেমিক, আমাদের প্রতিপক্ষ মোটেও দেশপ্রেমিক নয়, তাদের দেশের ভালো করার ক্ষমতাই নেই—এই মানসিকতাটাই অগণতান্ত্রিক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষা করার জন্য একটা দলকে ক্ষমতায় থাকতেই হবে, তা যদি হয় পূর্বশর্ত, এ কথা যদি আমি ভাবি, তাহলে বুঝতে হবে, আমার নিজের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই দুর্বল। ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়াতেই কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করা যায়, তা যদি ভাবা হয়, তাহলে ভুল ভাবা হবে। বরং যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশই রাখতে পারতে হবে। এবং সেটা বিরোধী দলে থেকে আরও ভালোভাবে সম্ভব। সেটা হতে হবে সমাজের ভেতর থেকে। সেটা হতে হবে অবিরাম উজান স্রোতে সাঁতার কেটে, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে।
আমাদের দুঃখ হলো, এই দেশে ক্ষমতাধরেরা দুর্নীতি করে, লুটপাট করে, অনৈতিক কাজকর্ম করে, আর আমাদের জুজুর ভয় দেখায়, ওই যে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এল, ওই যে ধর্মবিরোধী শক্তি এল। তবে আশার কথা হলো, দেশের মানুষ এই জুজুর ভয়ে ভিত নয়। অমুক দল ক্ষমতায় এলে বিসমিল্লাহ উঠে যাবে, মসজিদে উলুধ্বনি দেওয়া হবে বলেও কোনো লাভ হয় না, মানুষ বানের স্রোতের মতো সেই দলকেই ভোট দেয়। আবার অমুক দল ক্ষমতায় এলে দেশ আর মুক্তিযুদ্ধের দেশ থাকবে না বলেও কোনো লাভ হয়নি, মানুষ ভোট দেওয়ার সময় সাদা মন নিয়ে ভোট দিয়েছে। সত্যি সত্যি দেশের মানুষ বারবার দই ভেবে চুন খেয়ে মুখ পুড়িয়েছে। ফলে এখন সাদা কিছু দেখলেই ভয় পায়। এবং বর্তমানে দেশে নৈরাজ্য চলছে, যেভাবে মানুষ পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, তা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই অচলাবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে এবং অবশ্যই যারা যারা বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও ভবনে অগ্নিসংযোগ করে মানুষ মেরেছে, তাদের সত্যিকারের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে। অন্যদিকে, গণতন্ত্র ও সংবিধানের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতায় এসে কেউ যেন গণতন্ত্র ও সংবিধান তথা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌল প্রত্যয়গুলো রদ করতে না পারে, তা নিশ্চিত রাখতে হবে। হুমায়ূন আহমেদের সায়েন্স ফিকশনে একটা রোবটকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বলো তো, একটা সাপ তার লেজ থেকে খেতে শুরু করেছে, খেয়েই চলেছে, কী হবে। মুখ নিজেকে কি খেয়ে ফেলবে?
এই ধাঁধার হিসাব করতে গিয়ে রোবট হ্যাঙ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের দেশে যে শক্তি গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না, তেমন শক্তিকে আমরা গণতন্ত্রের নামে শক্তি সংহত করতে দিতে পারি না। পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক সভ্য দেশেই ফ্যাসিবাদকে চলতে দেওয়া হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের বহুদলীয় গণতন্ত্রকে চলতে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর গণতন্ত্রের চেতনা পরস্পরবিরোধী নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই হলো গণতন্ত্রের চেতনা। এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে সম্প্রীতি ও ন্যায়বিচার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে শোষণহীন সমাজ। এবং তা সব ধর্মের মানুষকে স্বাধীনভাবে নিরাপদে ধর্মকর্ম করার নিশ্চয়তাও দেয়। একাত্তর সালে যেমন বলা হতো, মুক্তিযোদ্ধারা কাফের, এখন তেমনিভাবে বলার চেষ্টা করা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীরা বা গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা নাস্তিক—সেটাও খুব অন্যায় কথা, মিথ্যা কথা এবং অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী কথা। বিজয় দিবস ও শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস সামনে রেখে আবারও বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশই থাকবে। ১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার মাধ্যমে সৃষ্ট শূন্যতা দেশে আজও পূরণ হয়নি—শহীদুল্লা কায়সার কিংবা আনোয়ার পাশার মতো কথাসাহিত্যিক আর আমরা পেলাম না, জহির রায়হানের মতো চলচ্চিত্রকার কোথায় পাব? সিরাজুদ্দীন হোসেনের মতো সাংবাদিক, ফজলে রাব্বির মতো চিকিৎসক আর কি আসবেন? আমরা সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত দল ও মানুষগুলোকে ক্ষমা করিনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমরা চাইবই, এবং বাংলার মাটিতে সেই বিচার সুসম্পন্ন হতেই হবে। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকেও আমরা একচুলও যেন না নড়ি।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

স্থায়ী সাংবিধানিক সমাধানে কিছু প্রস্তাব

নির্বাচনপদ্ধতি স্থায়ী ব্যবস্থায় রূপ নেবে, যদি সাংবিধানিকভাবে একটি গ্রহণযোগ্য কার্যকর নির্বাচন কমিশন এবং এর আইনি প্রায়োগিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং নির্বাচনকালে রাষ্ট্রক্ষমতার অপপ্রয়োগের সুযোগ রোধ এবং উক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব হয়। এ জন্য সংবিধানের কতিপয় অনুচ্ছেদ এবং নির্বাচনী আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংযোজন করা আবশ্যক। নির্বাচন কমিশন গঠন: নতুন বিধান করতে হবে যে, সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের বিধানাবলি প্রয়োগে ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে না। এর মানে কমিশনার নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা থাকবে না। সংবিধান সংশোধনের সাত কার্যদিবসের মধ্যে এবং পরবর্তীকালে নিয়োগকৃত কমিশনের কার্যকাল শেষ হওয়ার ষাট দিন আগে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সরকারি ও বিরোধী দল নিজ নিজ দলীয় সদস্যের বাইরে, সংবিধান-নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন সম্মানিত নাগরিকদের মধ্য থেকে, প্রত্যেকে ২০ জন করে দুটি তালিকা স্পিকারের মাধ্যমে একে অপরকে প্রদান করবেন। উভয় তালিকায় কারও নাম অভিন্ন হলে তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাবেন। তবে একাধিক নাম অভিন্ন হলে রাষ্ট্রপতি তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেবেন। তালিকাপ্রাপ্তির সাত কার্যদিবসের মধ্যে সরকারি দল বিরোধী দলের এবং বিরোধী দল সরকারি দলের প্রদত্ত তালিকা থেকে যৌথভাবে মিল পাওয়া যায়নি এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বাধ্যতামূলকভাবে দুজনের নাম গ্রহণ করে স্পিকারের কাছে লিখিতভাবে জমা দেবেন। স্পিকার উভয় পক্ষের গৃহীত নামসংবলিত পত্রপ্রাপ্তির পর তা মূল তালিকাসহ অভিন্ন নাম এবং উভয় পক্ষের গৃহীত নামের পত্র অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণ করবেন।
রাষ্ট্রপতি স্পিকারের কাছ থেকে পত্রপ্রাপ্তির পর অনতিবিলম্বে যৌথভাবে মিল পাওয়া ব্যক্তিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং গৃহীত চারজনকে কমিশনার হিসেবে শপথ পাঠ করাবেন। উভয় পক্ষের প্রদত্ত তালিকায় অভিন্ন নাম না পাওয়া গেলে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে একক এখতিয়ারে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের যেকোনো একজন বিচারপতিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেবেন। যদি কোনো পক্ষ, সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তালিকা প্রদানে বিরত থাকে বা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে রাষ্ট্রপতি অন্য প্রাপ্ত তালিকা থেকে চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিতে পারবেন। একইভাবে কোনো পক্ষ যদি অপর পক্ষের প্রাপ্ত তালিকা থেকে কোনো ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া থেকে বিরত থাকে বা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে রাষ্ট্রপতি ওই তালিকা থেকে দুজনকে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিতে পারবেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ মেয়াদপূর্তির আগে শূন্য হলে জাতীয় সংসদের সরকারি দল ও বিরোধী দল উক্ত পদ শূন্য হওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে ঐকমত্যে যৌথভাবে একটি নাম স্পিকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণ করবেন এবং রাষ্ট্রপতি অনতিবিলম্বে তাঁকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে শপথ পাঠ করাবেন। উভয় পক্ষ সাত কার্যদিবসের মধ্যে যৌথভাবে একটি নাম নির্ধারণে ঐকমত্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হলে, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে একক এখতিয়ারে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের যেকোনো একজন বিচারপতিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেবেন। অন্য নির্বাচন কমিশনারদের পদ মেয়াদপূর্তির আগে শূন্য হলে,
বিদায়ী নির্বাচন কমিশনার যে পক্ষের তালিকা থেকে মনোনীত হয়েছিলেন, সে পক্ষ পুনরায় উক্ত পদ শূন্য হওয়ায় সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে নিজ দলীয় সদস্যের বাইরে, সংবিধান-নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন সম্মানিত নাগরিকদের মধ্য থেকে ১০ জনের নামের তালিকা স্পিকারের মাধ্যমে অপর পক্ষের কাছে প্রেরণ করবেন এবং অপর পক্ষ উক্ত তালিকা থেকে প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে বাধ্যতামূলকভাবে একটি নাম গ্রহণ করে স্পিকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণ করবেন এবং রাষ্ট্রপতি ওই নামপ্রাপ্তির পর অনতিবিলম্বে তাঁকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে শপথ পাঠ করাবেন। শূন্য পদে মনোনীত প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনার বিদায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনারের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। নির্বাচনকালীন নির্বাহী ক্ষমতা: সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৫(১) ও (২) ধারা অনুসারে নির্বাহী কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে। কিন্তু নির্বাহী কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সহায়তা না করলে বাস্তবে নির্বাচন কমিশনের সংবিধান এবং নির্বাচনী আইন অনুসারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। উপরন্তু সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা কর্তৃত্বে প্রযুক্ত হয়। ফলে নির্বাচনকালীন সরকারের যাবতীয় কর্মকাণ্ড যথানিয়মে প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্বে পরিচালিত হওয়ায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা দুরূহ হতে পারে। অতএব, নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর করতে এবং নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্বের ভারসাম্য আনতে নির্বাচনকালীন নির্বাহী ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস করার প্রয়োজনে সংবিধান ও নির্বাচনী আইনের নিম্নলিখিত সংশোধন বাঞ্ছনীয়। (১) সরকারি দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি পক্ষ হওয়ায়, তার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার নিয়ামক কোনোভাবেই নির্বাচনে সমতা আনয়নে সহায়ক নয়।
তাই সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৫(২)-এ নিম্নোক্ত সংযুক্তি দেওয়া যেতে পারে। ‘নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর হতে সাধারণ নির্বাচন পরবর্তী নিয়োগকৃত প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়া পর্যন্ত প্রজাতন্ত্রের সকল নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বা তাহার কর্তৃত্বে প্রযুক্ত হবে।’ (২) প্রজাতন্ত্রের সকল নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বা তাঁর কর্তৃত্বে প্রযুক্ত হওয়ায় সাধারণ নির্বাচনকালীন রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করার প্রয়োজন পড়বে না এবং তা সমীচীনও হবে না। অতএব সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে সাধারণ নির্বাচন-পরবর্তী নিয়োগকৃত প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে না মর্মে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা যেতে পারে। (৩) সাধারণ নির্বাচনকালীন নির্বাহী কর্তৃপক্ষের মধ্যে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করে এবং নির্বাচনকে প্রভাবিত কিংবা সুষ্ঠু করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। নির্বাচনকে দলীয় সরকারের প্রভাবমুক্ত রাখতে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে রাষ্ট্রপতির অধীনে ন্যস্ত করতে সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে প্রয়োজনীয় সংযুক্তি আনা যেতে পারে।
রাষ্ট্রপতির অধীনে ন্যস্ত করলেও নির্বাচন কমিশনের উক্ত দুই মন্ত্রণালয়ের ওপর প্রত্যক্ষ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এ নিম্নলিখিত সংযোজন করা যেতে পারে। (ক) সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে সাধারণ নির্বাচন-পরবর্তী নিয়োগকৃত প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়া পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যেকোনো প্রশাসনিক নিয়োগ, বদলি, প্রেষণে প্রেরণ, পদায়ন, পদ থেকে অপসারণ বা অব্যাহতির প্রয়োজন বোধ করলে নির্বাচন কমিশন সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করবেন। রাষ্ট্রপতি অন্যূন তিন কার্যদিবসে উক্ত প্রস্তাব বাস্তবায়নের অনুমোদন দেবেন, নতুবা তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর বলে গণ্য হবে। অন্য সব মন্ত্রণালয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠান ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবে। (খ) রাষ্ট্রপতি সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে সাধারণ নির্বাচন-পরবর্তী নিয়োগকৃত প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়া পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যেকোনো প্রশাসনিক নিয়োগ, বদলি, প্রেষণে প্রেরণ, পদায়ন, পদ থেকে অপসারণ বা অব্যাহতির প্রয়োজন বোধ করলে তিনি নির্বাচন কমিশনকে প্রস্তাব দেবেন। নির্বাচন কমিশন তিন কার্যদিবসে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে এবং তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। অন্য সব মন্ত্রণালয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠান ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবে।
মঈন ফিরোজী: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

মানুষ হত্যার পরিণতি ভয়াবহ

প্রাক-ইসলামি যুগে আরব সমাজে যখন ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতির প্রচলন ছিল তখন পেশিশক্তির জোরে খুনখারাবি, হত্যাকাণ্ড, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, ঘুষ-দুর্নীতি—সবকিছুই অবাধে চলত। শান্তির ধর্ম ইসলামের আবির্ভাবে সব রকম হত্যা, রক্তপাত, অরাজকতা, সন্ত্রাস ও সহিংসতাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে শান্তি, স্থিতিশীলতা, সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার মর্মবাণী ঘোষণা দিয়ে বিদায় হজের ভাষণে বললেন, ‘তোমাদের রক্ত তথা জীবন ও সম্পদ পরস্পরের জন্য হারাম; যেমন আজকের এই দিনে, এই মাসে ও এই শহরে অন্যের জানমালের ক্ষতিসাধন করা তোমাদের ওপর হারাম।’ ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানবজাতির জীবন-মরণ, মানসম্মান—সবকিছুই আল্লাহর পবিত্র আমানত। কোনো ব্যক্তি যদি এ আমানতের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে, তবে এর জন্য তাকে আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। হত্যার বদলে হত্যার ন্যায় কঠিন শাস্তি পেতে হবে। তা সত্ত্বেও সামান্য তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে অথবা হরতাল-অবরোধের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করে বা পেট্রলবোমা মেরে বা গুলি করে অহেতুক নিরীহ মানুষজনকে হত্যা করা হচ্ছে। কেউ আবার সামান্য অর্থসম্পদের মোহে গোটা পরিবারকে হত্যা করতেও কুণ্ঠিত হয় না।
প্রতিদিনের সংবাদপত্রে ভেসে ওঠে এসব হত্যাকাণ্ডের বীভৎস চিত্র। অথচ হত্যা এমন একটি জঘন্য অপরাধ, যা আল্লাহর কাছে কঠিন ও মারাত্মক গুনাহ হিসেবে বিবেচিত। হাদিসের কথায়, ‘দুনিয়া ধ্বংস করে দেওয়ার চেয়েও আল্লাহর কাছে ঘৃণিত কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।’ (তিরমিজি) একজন নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যা করারই নামান্তর। আর কোনো ব্যক্তি যদি কারও প্রাণ রক্ষা করে, সে যেন পৃথিবীর সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। তাই তো অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যাকে সবচেয়ে বড় গুনাহ বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে নরহত্যার ভয়ানক পরিণাম সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করল; আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে প্রাণে রক্ষা করল।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৩২) ইসলাম অন্যায়ভাবে মানব সন্তানকে হত্যা করা কঠোর ভাষায় নিষিদ্ধ করেছে। নিরপরাধ ব্যক্তিদের হত্যা করা ইসলামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। পরিবারের কোনো একজন সদস্য নিহত হলে গোটা পরিবারের ওপরই নেমে আসে শোকের ছায়া। আজীবন তারা এ শোক বয়ে বেড়ায়।
তা ছাড়া পারিবারিক, সামাজিক ও আর্থিক নানাবিধ সমস্যা তাদের ওপর চেপে বসে। সর্বোপরি মাতৃ ও পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয় নিহতের সন্তান-সন্ততিরা। বিধবা হয় স্ত্রী অথবা স্বামী হয় স্ত্রীহারা। মা-বাবা হারান তাঁদের কলিজার টুকরা সন্তান। এর চেয়ে বড় জুলুম আর কী হতে পারে? তাই তো আল্লাহ তাআলা জালিমকে অবকাশ দেন, এরপর যখন পাকড়াও করেন তখন আর তাকে ছাড় দেন না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে, যারা মানুষের ওপর জুলুম করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।’ (সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ৪২) কিয়ামতের দিন নরহত্যার বিচার করা হবে সর্বাগ্রে, তারপর অন্যান্য অপরাধের শাস্তি হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে মোকদ্দমার ফায়সালা হবে, তা হলো রক্তপাত বা হত্যা সম্পর্কিত।’ মানবতা ও নৈতিকতার কোনো স্তরেই নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ও অহেতুক রক্তপাতকে সমর্থন করা হয় না। মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পবিত্র কোরআনে সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে, ‘আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তোমরা তাকে হত্যা করো না।’ ( সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত-৩৩) কোনো মুসলমান যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো অবৈধ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত না হবে,
ততক্ষণ দ্বীনের পাকড়াও থেকে মুক্ত থাকবে। অবৈধ হত্যার আগ পর্যন্ত প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহর রহমতের মধ্যে বিচরণ করতে থাকে। যখনই কেউ অবৈধ হত্যায় লিপ্ত হয় তার ওপর থেকে আল্লাহর রহমত উঠে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন প্রকৃত মুমিন তার দ্বীনের ব্যাপারে পূর্ণ প্রশান্ত থাকে, যে পর্যন্ত সে অবৈধ হত্যায় লিপ্ত না হয়।’ (বুখারি) সব গুনাহ ক্ষমা করলেও হত্যাকারীকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। হত্যাকৃত ব্যক্তি ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, যুবক-বৃদ্ধ—যে রকমই হোক না কেন, হত্যাকারীকে এর শাস্তি পেতেই হবে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যদি আসমান-জমিনের সব অধিবাসী একজন মুসলমানকে অবৈধভাবে হত্যা করার জন্য একমত পোষণ করে, তবে আল্লাহ তাদের সবাইকে অবশ্যই জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ) মানবসমাজে কোনো রকম অশান্তি সৃষ্টি, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, হানাহানি, উগ্রতা, বর্বরতা, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড কোনো বিবেকবান ও ধর্মপ্রাণ মানুষের কাম্য নয়। বিশ্বজনীন শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবজাতির জন্য কল্যাণকামী একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ইসলামের অনুসারীদের চিরশান্তির প্রত্যাশা একটি সার্বক্ষণিক চেতনা আর অপরাধ দমন কৌশল ইসলামকে দিয়েছে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা। তাই সহিংসতা, হত্যা, নৈরাজ্য, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, সংঘাতমুক্ত দেশের প্রয়োজনে ইসলামের শান্তিপ্রিয় মর্মবাণীর আদর্শে জাতীয় সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সময়ের দাবি।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।

আস্থা ভোটে জয় ইতালির প্রধানমন্ত্রী লেত্তার

সিনেটের আস্থা ভোটে জয়ী হয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী এনরিকো লেত্তা। এর ফলে তার সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হল। খবর রয়টার্সের। সম্প্রতি লেত্তা দেশটির সংসদে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রতিশ্র“তি দেন। সেইসঙ্গে নীতিনির্ধারকদের তাতে সমর্থন দেয়ার আহ্বান জানান। গত ২০ বছরে ইতালির সংসদে কোনো সংস্কার হয়নি। তাই আর দেরি করার কোনো মানে হয় না জানিয়ে লেত্তা বলেন, ‘আমার পক্ষে যা সম্ভব তার সবই আমি করব। যারা বলে বিশৃংখলা অনেক বেড়ে গেছে এবং আমরা কিছুই করতে পারব না তাদের আমি ছেড়ে দেব না।’ বুধবার সিনেটে ১৭৩ ভোটের মধ্যে ১২৭ ভোট পেয়ে জয় লাভ করেছেন লেত্তা। মধ্যবামপন্থী ডেমোক্রেট পার্টি, মধ্যপন্থী ও মধ্যডানপন্থী গোষ্ঠী লেত্তাকে সমর্থন করেছে। নভেম্বরে ক্ষমতাসীন জোট থেকে মধ্যডানপন্থী নেতা সিলভিও বারলুসকোনির দল ফোরজা ইতালিয়া পার্টি বেরিয়ে গেলে লেত্তাকে এই আস্থা ভোটের মুখোমুখি হতে হয়। আর এই জয় লেত্তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করল।
যদিও বুধবার ভোটের সময় কয়েকশ’ প্রতিবাদকারী সংসদের কাছে জড়ো হয়েছিল। পুলিশ এই সময় রাজধানী রোমের কিছু অংশ অবরুদ্ধ করে রাখে। ইতালির অর্থনীতি বর্তমানে বেশ সংকটের মধ্যে রয়েছে। আর এই সংকট মোকাবেলায় লেত্তা ‘সিংহের মতো’ লড়াই করেছেন বলেই অনেকের মত। কয়েক বছর ধরে চলা মন্দা ও স্থবিরতার কারণে এক দশক আগের তুলনায় ইতালির বর্তমান অর্থনীতি অনেক ছোট হয়ে এসেছে। দেশটিতে বর্তমান বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশেরও বেশি। এছাড়া দুর্নীতিও অনিয়ন্ত্রিত হারে বেড়েছে। দুর্বল রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে কর ফাঁকির পরিমাণও অনেক বেশি। ইতালির কর কর্তৃপক্ষের প্রধান এই সপ্তাহে বলেছিলেন, যে পরিমাণ কর ফাঁকি দেয়া হচ্ছে সেটা একটি গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। লেত্তা বলেন, বিস্তৃতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য আগামী ১৮ মাস গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করা হবে, যাতে অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য একটি স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছানো যায়। এর মাধ্যমে ২০১৪ সালের ১ শতাংশ অগ্রগতিকে তিনি ২০১৫ সালের মধ্যে ২ শতাংশে উন্নীত করতে চান। যদিও ইউরো জোনের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রগতি গত ১২ বছরে মাত্র একবার ২ শতাংশ হারে হয়েছে।

বিমান দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলেন রাহুল গান্ধী

ভারতের দিল্লি বিমানবন্দরে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী। তাকে বহনকারী বেসরকারি বাণিজ্যিক বিমানটি অবতরণ করার সময় পাইলট একই রানওয়েতে আরেকটি বিমান দেখতে পান। এ অবস্থায় রাহুলকে বহনকারী বিমানটিকে রানওয়ে স্পর্শ করার কয়েক সেকেন্ড আগে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে অবতরণ না করে আবার আকাশে উড়াল দিতে বলা হয়। এ সময় সেসনা সিট্যাশন জেট বিমানটির পাইলট দক্ষতার সঙ্গে আবার আকাশে উড়ে যান। ফলে রানওয়েতে থাকা বিমানটির সঙ্গে নিশ্চিত সংঘাত ও মারাÍক দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যান রাহুল গান্ধী। মঙ্গলবার দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ ঘটনা ঘটে বলে বৃহস্পতিবার খবর দিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।
সূত্রের বরাত দিয়ে দৈনিকটি জানায়, রাহুল গান্ধী রায় বেরেলি থেকে দিল্লি আসার পথে ওই ঘটনার সম্মুখীন হন। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল থেকে বাণিজ্যিক জেট বিমানটিকে অবতরণের ক্লিয়ারেন্স দেয়া হয়। এটি অবতরণের আগে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি প্লেন ওই একই রানওয়েতে অবতরণ করে। কন্ট্রোল টাওয়ার ধারণা করে, বিমান বাহিনীর চলমান বিমানটি রাহুলকে বহনকারী জেট বিমানের অবতরণের আগেই সেখান থেকে সরে যাবে। কিন্তু সেসনা জেটটি অনুমিত সময়ের আগেই রানওয়ের কাছাকাছি চলে আসে। তখনও বিমান বাহিনীর প্লেনটি রানওয়ে থেকে বাঁক নিয়ে অন্য লাইনে সরে যেতে পারেনি। এ অবস্থায় দুইটি বিমানের নিশ্চিত সংঘর্ষ এড়াতে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে সেসনা বিমানের পাইলটকে আবার টেক অব করতে বলা হয়। আর এভাবেই মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান রাহুল গান্ধী। তথ্যসূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া।

শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত ম্যান্ডেলা

দক্ষিণ আফ্রিকা বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের মতো তাদের প্রয়াত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার প্রতি রাষ্ট্রীয়ভাবে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। বর্ণবাদ বিরোধী এই মহান নেতার উন্মুক্ত কফিনটি সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য প্রশাসনিক রাজধানী প্রিটোরিয়ার একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হয়েছে। কফিনের দুই প্রান্তে সাদা ইউনিফর্ম পরা দুই নৌ-কর্মকর্তা চোখ মুছে, মাথা নুইয়ে ও তাদের তরবারি নিুমুখী করে দাঁড়িয়ে আছেন। বুধবার বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও দক্ষিণ আফ্রিকার হাজার হাজার মানুষ এই মহান নেতার কফিনে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। শ্রদ্ধা জানাতে আসা অনেকে শোকে ভেঙে পড়েন। ম্যান্ডেলার সাবেক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট এফডব্লিউ ক্লার্ক, সাবেক স্ত্রী উইনি মাদিকিজেলাসহ অনেকেই আসেন শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।
বুধবার হাজার হাজার মানুষ সারি বেঁধে ম্যান্ডেলার কফিনের পাশ দিয়ে শ্রদ্ধাবনত ভঙ্গিতে হেঁটে যান। মানুষের সারি এক পর্যায়ে দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে পড়ে। অনেকে এমনকি শেষ পর্যন্ত কফিন পর্যন্ত পৌঁছুতে ব্যর্থ হন। তারাও বৃহস্পতিবার আরও হাজার মানুষের সঙ্গে নেতার কফিনে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পাচ্ছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানোর দ্বিতীয় দিন একটি কালো গাড়িতে করে রাজধানী প্রিটোরিয়া প্রদক্ষিণ করা হয়। এরপর সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদন শুরু হয়। ১৬টি মোটরসাইকেলের পাহারায় ম্যান্ডেলার জাতীয় পতাকা মোড়ানো কফিনবাহী গাড়িটি প্রিটোরিয়ার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ সময় রাস্তার পাশে দাঁড়ানো জনতা জাতীয় পতাকা নাড়িয়ে তাদের প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। ম্যান্ডেলার উন্মুক্ত কফিনটি ইউনিয়ন বিল্ডিংয়ের এম্ফিথিয়েটারে রাখা হয়েছে। এটি শিগগির ম্যান্ডেলার সম্মানে পুনঃনামকরণ করা হবে। তথ্য সূত্র : এএফপি।