Friday, December 18, 2009

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা বিল কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে অনুমোদন

মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে গত মঙ্গলবার ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপসংক্রান্ত একটি নতুন বিল বিপুল ভোটের ব্যবধানে অনুমোদিত হয়েছে। তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে চাপ সৃষ্টি করতে এ বিল অনুমোদনের মধ্য দিয়ে ইরানের কাছে বিদেশি কোম্পানিগুলোর পরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো।
প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি ৪১২-১২ ভোটে পাস হয়। এটি এখন সিনেটে পাস হলেই আইনে পরিণত হবে।
প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি অনুমোদনের ফলে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইরানের তেল শোধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যেকোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা পেলেন।
ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ তেলসমৃদ্ধ দেশ। কিন্তু এ বিপুল পরিমাণ তেল শোধন করার পর্যাপ্ত প্রযুক্তি নেই তেহরানের। ফলে বিদেশি বিভিন্ন তেল শোধনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে ইরান। চাহিদার ৪০ শতাংশ পরিশোধিত তেল এসব বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে আমদানি করে তেহরান।
প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হাওয়ার্ড বেরম্যান বলেন, ‘ইরান পরমাণু অস্ত্রের মালিক হলে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

ফিলিপাইনের স্বৈরশাসক মার্কোসের ছেলে প্রেসিডেন্ট হতে চান

ফিলিপাইনের সাবেক স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের ছেলে ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র বলেছেন, তাঁর আশা তিনি একদিন দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়বেন এবং জয়ী হবেন। কোনো ব্যাপারে মার্কোস পরিবারের লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ম্যানিলায় বিদেশি সাংবাদিকদের এক ফোরামকে মার্কোস জুনিয়র এসব কথা বলেন। খবর এএফপির।
৫২ বছর বয়সী মার্কোস তাঁর নামের সঙ্গে স্বৈরশাসক বাবার নামের মিল থাকাকে লজ্জাজনক বলে মনে করেন না। বরং তিনি মনে করেন, রাজনীতির ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে এটা তাঁর জন্য বড় সুযোগ এনে দেবে।
মার্কোস জুনিয়র বলেন, ‘আমার এ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার সর্বশেষ ধাপ পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই। আর ওই ধাপটা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া।
মার্কোস জুনিয়র এখন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের সদস্য। ২০০৭ সালে তিনি নিজের এলাকা ইলোকোস নোরতে প্রদেশ থেকে নির্বাচিত হন। সামনের বছর তিনি বিরোধী দলের টিকিটে সিনেট নির্বাচনে অংশ নেবেন। ওই নির্বাচনে জিতলে ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার পথ তাঁর জন্য সুগম হবে।
স্বৈরশাসক মার্কোস ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তাঁর শাসনামলে মার্কোস পরিবার সরকারি এক হাজার কোটি ডলার আত্মসাত্ করে।

ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে

ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সেজিল ২-এর উন্নত একটি সংস্করণের পরীক্ষা চালিয়েছে। তেহরান জানায়, এটি ইসরায়েলের ভেতরে আঘাত হানতে সক্ষম। গতকাল বুধবার ওই পরীক্ষা চালানো হয়। ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার খবরে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন। এএফপি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হয়, ‘এটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।’ তবে এর চেয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ইরান জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে সক্ষম। তেহরানের দাবি অনুযায়ী, ইরানের চিরশত্রু ইসরায়েল, অধিকাংশ আরব দেশ এবং তুরস্কের অধিকাংশ এলাকাসহ ইউরোপের অংশবিশেষ ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার ভেতরে পড়বে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ওই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকে গভীর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি এখন কোপেনহেগেনে রয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে কথা বলেছেন গর্ডন ব্রাউন। তিনি বলেন, ‘আমি তাঁর কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। তিনিও ইরানের ওই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।’

ওবামাকে জারদারি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পাকিস্তান সরকার সংকল্পবদ্ধ

পাকিস্তানের উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আরও কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পাকিস্তানের প্রতি যে আহ্বান জানিয়েছেন, তার জবাব দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য সামরিক সহায়তা বাড়ানোর জন্য হোয়াইট হাউসের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
প্রেসিডেন্ট ওবামার চিঠির লিখিত জবাবে প্রেসিডেন্ট জারদারি বলেন, আল-কায়েদা ও তালেবান গোষ্ঠীসহ অন্য জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে সরকার সংকল্পবদ্ধ। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার খবরে এ কথা বলা হয়।
পত্রিকাটি জানায়, পাকিস্তানের মাটিতে সক্রিয় জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে নিজস্ব সময়সূচি এবং প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে—ওবামার চিঠির জবাবে এ বিষয়টির ওপরই গুরুত্বারোপ করেছেন আসিফ আলী জারদারি।
পাকিস্তান সফররত মার্কিন জেনারেল ডেভিড পেট্রাউসের কাছেও জারদারির এই শক্ত অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক কায়ানি মার্কিন এই জেনারেলকে বলেছেন, উত্তর ওয়াজিরিস্তানে বড় ধরনের অভিযানের আশা করা উচিত হবে না ওয়াশিংটনের।
ওবামার আরও বেশি কিছু করার আহ্বান এবং জারদারির শীতল আচরণে স্পষ্ট হয়েছে, ইসলামাবাদ ও হোয়াইট হাউসের মধ্যকার বন্ধুত্বের ফাটল আরও প্রশস্ত হয়েছে।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা অবশ্য এ বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন যে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের প্রতি ইসলামাবাদ অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে এ ব্যাপারে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর কোনো নির্দেশনা চান না তাঁরা।

যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দিতে কংগ্রেসে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব উত্থাপন by ইব্রাহীম চৌধুরী

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন সংস্কারের নতুন একটি প্রস্তাব কংগ্রেসে উত্থাপন করা হয়েছে। প্রায় এক কোটি অবৈধ অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার জন্য আইন প্রণয়নের প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন কংগ্রেসম্যান লুইস গাটিয়ারেজ। গত মঙ্গলবার কংগ্রেসে নতুন করে বিল উত্থাপনের পর লুইস গাটিয়ারেজ বলেছেন, ভেঙে পড়া অভিবাসন-ব্যবস্থায় জন-অসন্তোষ এখন চরমে। লাখ লাখ কাগজপত্রহীন অভিবাসীর মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। উদারনৈতিক মহল, অভিবাসী গোষ্ঠী ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর ধৈর্যচ্যুতির আগেই প্রস্তাবটি আইনে পরিণত করার আহ্বান জানান লুইস।
স্বাস্থ্যনীতির সংস্কার নিয়ে বিভক্ত মার্কিন আইনপ্রণেতারা। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সবার জন্য স্বাস্থ্যবিমা নিশ্চিত করার আইন প্রণয়নে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বড়দিনের আগেই স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন নিয়ে ওয়াশিংটনে এখন চরম উত্তেজনা চলছে। অভিবাসন সংস্কার নিয়ে আগামী বছর উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। এর মধ্যে প্রেসিডেন্টের নিজ দল ডেমোক্রেটিক পার্টির ৮৭ জন আইনপ্রণেতা ঐক্যবদ্ধভাবে গত মঙ্গলবার অভিবাসন আইন সংস্কারের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের চলমান মন্দার কারণে অর্থনীতিতে অবৈধ অভিবাসীদের সংকট বেড়েছে দ্বিগুণ। কাগজপত্রহীন অভিবাসীরাই সাধারণত এখানে নিম্ন আয়ের কাজকর্ম করে থাকেন। মন্দার কবলে পড়ে গোটা যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে মার্কিন নাগরিক ও বৈধ অভিবাসীরাই এখন নিম্ন আয়ের সাধারণ কাজ করছেন। পাশাপাশি, কর্মক্ষেত্রে যেকোনো কর্মী নিয়োগের আগে অভিবাসন দপ্তর থেকে যাচাই করে নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে নিয়োগকর্তাদের জন্য। সংকটজনক এ পরিস্থিতিতে এক কোটিরও বেশি অবৈধ অভিবাসীর এখন নাভিশ্বাস অবস্থা।
অভিবাসন সংস্কার নিয়ে অবৈধদের বৈধতা দেওয়া নিয়ে এক দশক ধরে শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ উদ্যোগ নিলেও অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়ার জন্য আইন প্রণয়নের প্রস্তাবে কংগ্রেসের অনুমোদন লাভে ব্যর্থ হন।
গত নির্বাচনে অভিবাসী গোষ্ঠীগুলো ব্যাপকভাবে সমর্থন দিয়েছে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। ওবামা নিজেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিষয়টি যেভাবেই হোক সুরাহা করার। ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরের মধ্যে স্বাস্থ্যবিমা প্রণয়ন, অর্থনৈতিক সংস্কার ও যুদ্ধনীতির বিতর্কে আটকা পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। এর মধ্যে অভিবাসী গোষ্ঠীগুলোর চাপের মুখেই গত মঙ্গলবার অভিবাসন আইন সংস্কারের নতুন প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়েছে।
কংগ্রেসম্যান লুইস তাঁর প্রস্তাবে বলেছেন, অপরাধী নয়, এমন অবৈধ অভিবাসীরা ৫০০ ডলার জরিমানা দিয়ে এখানে বৈধতার আবেদন করতে পারবেন। অবৈধ অভিবাসীদের প্রমাণ করতে হবে, তাঁদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা আছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার রেকর্ড রয়েছে। নতুন এ প্রস্তাবে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতার জন্য স্বদেশে ফিরে যেতে হবে না। পাশাপাশি এখানকার শ্রমবাজারে কর্মীসংকট নিরসনের জন্য অস্থায়ীভাবে শ্রমিক আমদানির কথাও বলা হয়েছে কংগ্রেসম্যান লুইসের আইনপ্রস্তাবে।
অভিবাসন আইন সংস্কারের বিল উপস্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই নতুন করে বিতর্কও শুরু হয়ে গেছে। রিপাবলিকানদের বক্তব্য, অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশে এমনিতেই বেকারত্ব বেড়ে গেছে; নাগরিকেরাই কাজ পাচ্ছে না, এর মধ্যে এক কোটি অবৈধদের বৈধতা দেওয়ার পরিণাম হবে ভয়াবহ।
অ্যারিজোনা থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান দলীয় কংগ্রেসম্যান জেফ ফ্লেইক বলেছেন, সমন্বিত কর্মসূচি ছাড়া কার্যকরভাবে অভিবাসন আইনের সংস্কার সম্ভব নয়।

গুয়ানতানামোর বন্দীদের যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত -রিপাবলিকানদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

কিউবার গুয়ানতানামো বে কারাগারের বন্দীদের একটি অংশকে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ক্যারল কাউন্টির টমসন জেলে স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। ওবামা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিতর্কিত ওই কারাগার বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওই ঘোষণা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার এ ঘোষণা দেওয়া হলো। তবে এ ঘোষণায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিরোধী রিপাবলিকান সিনেটররা। খবর এএফপি ও বিবিসির।
মঙ্গলবার ওবামা প্রশাসন একটি চিঠিতে ঘোষণা দেয়, ইলিনয়ের প্রত্যন্ত টমসন সংশোধনী কেন্দ্রটি কেন্দ্রীয় সরকার ওই অঙ্গরাজ্যের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অধিগ্রহণ করেছে। সেখানেই গুয়ানতানামো বন্দীদের আটক রেখে বিচার করা হবে। নির্মাণের পর গত আট বছর কারাগারটি অব্যবহূত অবস্থায় পড়েছিল।
সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, গুয়ানতানামো বন্দিশিবিরে ২১০ জন সন্দেহভাজন এখনো আটক রয়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন দেশের নাগরিক। এর মধ্যে ঠিক কতজনকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করা হবে তা স্পষ্ট নয়।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস বলেছেন, বন্দীদের মধ্যে ১১৬ জনকে মুক্তি কিংবা তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। বাকি অন্যদের ইলিনয়ের কারাগারে রেখে সামরিক কিংবা বেসামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। ইতিমধ্যে স্থানান্তর করা পাঁচ বন্দীর বিচার সামরিক আদালতে চলছে।
ওবামা প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ইলিনয়ের গভর্নর প্যাট কুইন এবং অঙ্গরাজ্যের সিনিয়র ডেমোক্র্যাট সিনেটর ডিক ডারবিনসহ পার্টির অন্য নেতারা।
তবে ওই সিদ্ধান্তে যারপরনাই ক্ষুব্ধ হয়েছে রিপাবলিকান শিবির। ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইক পেন্স বলেন, ‘গুয়ানতানামো কারাগার বন্ধ করে কিভাবে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে? পরিচিত ৭০ জন সন্ত্রাসীকে আমাদের প্রিয় স্বদেশের একেবারে অভ্যন্তরে নিয়ে আসা হচ্ছে। এ অবস্থায় কীভাবে আমাদের পরিবার নিরাপত্তা বোধ করবে?’
সমালোচনার জবাবে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বন্দীদের এনে জেলে আটকে রেখে বিচার করা হবে, কাউকে যুক্তরাষ্ট্রে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আনা হচ্ছে না। কারণ, এ ধরনের বিধান বর্তমান মার্কিন আইনে নেই। তাই এ নিয়ে বিরোধীদের দুশ্চিন্তারও কিছু নেই।

গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স পেল ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিটি ক্রাউন পুরস্কার

গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড সম্প্রতি বিজনেস ইনিশিয়েটিভ ডাইরেকশনসের (বিআইডি) ডায়মন্ড ক্যাটাগরিতে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ ডাইরেকশনস অ্যাওয়ার্ড আইকিউসি-২০০৯’ পেয়েছে।
গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসির এ চৌধুরী লন্ডনে কোম্পানির পক্ষে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন। অন্তত দুই বছর ধরে পূর্ণাঙ্গ মানের গুণগত ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের জন্য গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স কোম্পানিকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

কলকাতার ২৩তম শিল্প ও বাণিজ্য মেলা শুরু হচ্ছে ২৪ ডিসেম্বর, যা শেষ হবে ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি। মেলার এবারের ফোকাস কান্ট্রি বাংলাদেশ। এ মেলায় বাংলাদেশের ৪৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যোগ দেবে বলে জানান আয়োজকেরা।
কলকাতার মিলন মেলা ময়দানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় যৌথভাবে মেলাটির উদ্বোধন করবেন।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিএনসিসিআই) এ মেলার আয়োজন করছে।
মেলা উপলক্ষে গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে বিএনসিসিআইয়ের সভাপতি ও পিয়ারলেসের কর্ণধার এস কে রায় বক্তব্য দেন। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব অশোক মোহন চক্রবর্তী এবং মুখ্য শিল্প ও বাণিজ্যসচিব সব্যসাচী সেন।
সংবাদ সম্মেলনে এস কে রায় জানান, এবারের মেলায় দেশ-বিদেশের ৭৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের উত্পাদিত পণ্য প্রদর্শন করবে। এতে স্বাগতিক ভারত আর বাংলাদেশ ছাড়াও যোগ দেবে চীন, পাকিস্তান, ভুটান, তুরস্ক, মিসর এবং ভিয়েতনামের বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী।
আয়োজকেরা জানান, বাংলাদেশ এবারের মেলায় ফোকাস কান্ট্রি হওয়ায় এ দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প ও বণিক সমিতির প্রতিনিধিরাও যোগ দেবেন।
কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের বাণিজ্যসচিব মো. ওমর ফারুক এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে জানান, এবারের মেলায় বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন নির্মাণ করা হয়েছে সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলে। মেলায় বাংলাদেশের ৪৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের উত্পাদিত পণ্য নিয়ে হাজির হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পোশাক শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে নতুন পত্রিকা ব্যাবিলন কথকতা

ব্যাবিলন কথকতা নামে পোশাকশিল্প-জগতে ব্যাবিলন গ্রুপ নতুন একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করছে। গ্রুপের শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত প্রয়াসে সৃজনশীল মেধার বিকাশে বের করা হয় এ বার্ষিক পত্রিকা। এতে গ্রুপের অপারেটর থেকে শুরু করে মেশিনম্যান, ম্যানেজার ও পরিচালক নির্বিশেষে সবাই লিখছেন।
রাজধানীতে ব্যাবিলন গ্রুপের করপোরেট কার্যালয়ে সম্প্রতি আয়োজন করা হয় ব্যাবিলন কথকতার চতুর্থ সংখ্যার প্রকাশনা অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক।
পত্রিকাটির সম্পাদক এস এম এমদাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন রিড কনসালটিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান রডনি জে রিড, ব্যাবিলন গ্রুপের পরিচালক আবিদুর রহমান, উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মাদ হাসান, আন্তর্জাতিক পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ প্রতিনিধি এইচঅ্যান্ডএম নিলাঞ্জনা, শিয়ার্স কে-মার্টের মুন্তাকিম, মুডি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ইরফানা কবীর, ব্যাবিলন কথকতার আহ্বায়ক মুহাম্মদ সাইফুল হক এবং নতুন লেখকদের মধ্যে উম্মে সালমা ও মাহমুদ সিদ্দিকী।
সৈয়দ শামসুল হক বলেন, পত্রিকাটি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমধর্মী। যেটি দেখার পর পোশাকশিল্প সম্পর্কে আমার যেমন অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছে, তেমনি এই জগত্ নিয়ে লোকমুখে শোনা অনেক ধারণা পরিবর্তনের চিন্তা মাথায়ও কাজ করছে।

মিয়ানমারে সিমেন্ট রপ্তানি বাড়ছে

কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমারে কয়েক মাস ধরে সিমেন্ট রপ্তানি বাড়ছে। প্রতি মাসে গড়ে ৭০০ মেট্রিক টন সিমেন্ট (১৪ হাজার বস্তা) মিয়ানমারে রপ্তানি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানান।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত জুলাই মাস থেকে মিয়ানমারে বাংলাদেশি সিমেন্টের রপ্তানি বাড়ছে। তবে চোরাচালানেও মিয়ানমারে সিমেন্ট পাচার হচ্ছে বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।
টেকনাফ স্থলবন্দর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে গত জুলাই মাসে সিমেন্টসহ গেঞ্জি, গেঞ্জি তৈরির কাপড় ও ওষুধ মিলিয়ে ২৯ লাখ ৯৮ হাজার ৬৬৯ টাকার পণ্য রপ্তানি হয়। পরের মাসে (আগস্ট) মোট রপ্তানিমূল্য বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ লাখ ২৭ হাজার ৯৭৫ টাকায়, যা সেপ্টেম্বর মাসে ৫৬ লাখ ৩১ হাজার টাকায় এবং অক্টোবরে আরও বেড়ে ৬২ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। টেকনাফ স্থলবন্দরের কাস্টমস সুপার আনোয়ার মাসুদ প্রথম আলোকে জানান, এসব রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ৯০ শতাংশ হচ্ছে সিমেন্ট আর গেঞ্জি। রপ্তানিকারক পায়েল অ্যান্ড ব্রাদার্স ও শাকিল ট্রেডার্সের মালিক কামরুল ইসলাম মিয়ানমারে সিমেন্ট রপ্তানি বাড়ছে বলে জানান।

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এক বছরের জন্য নয় হাজার ৭০০ কোটি ইউরো বা ১৪ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ ধার দিয়েছে। মন্দার কবলে পড়া আর্থিক খাত চাঙা করে তুলতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এই ঋণ দেয় ইসিবি।
২২৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংক গতকাল বুধবার ইসিবি থেকে এই ঋণ নেয়; যা গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংকগুলোকে দেওয়া ইসিবির ঋণের চেয়ে বেশি। তখন ইসিবি ব্যাংকগুলোকে সাড়ে সাত হাজার কোটি ইউরো ঋণ দেয়।
এ ছাড়া গত জুনে ইউরোপের এক হাজার ১০০টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে ১ শতাংশের নির্ধারিত সুদে ৪৪ হাজার ২০০ কোটি ইউরো ঋণ দেওয়া হয়েছিল। সেটিই হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে দেওয়া ইসিবির সবচেয়ে বড় অঙ্কের ঋণ।
তবে ইউরোপের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এবার ইসিবি যে ঋণ দিয়েছে, তার সুদের হার কত হবে, সেটি এখনো নির্ধারিত হয়নি। ভবিষ্যতে তা ইসিবির দেওয়া পুনরর্থায়ন সুবিধার বিপরীতে নেওয়া গড় সুদের সমান হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, ইসিবি থেকে কম সুদে ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে তা বেশি সুদে খাটিয়ে মুনাফা করার প্রবণতা থাকার কারণে এটি করা হয়েছে।
ইউরোপের আর্থিক খাতকে বিপর্যয়ের কবল থেকে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ইসিবি আগামী বছরের মার্চের শেষ দিকে আবার ঋণের জোগান দিতে পারে।
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে লেহম্যান ব্রাদার্স বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের বিপর্যয় রোধে ইসিবি আর্থিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে।
এদিকে আর্থিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচির আওতায় যে অর্থ দেওয়া হয়েছে, তা ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ১৬ জাতির ইসিবিকে।

জানুয়ারিতেই শিল্পনীতি চূড়ান্ত হচ্ছে, অগ্রাধিকার পাচ্ছে ২৮টি শিল্প খাত

সরকার আগামী জানুয়ারি মাসেই শিল্পনীতি-২০০৯ চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে শিল্পনীতির খসড়ার ওপর মতামত দেওয়ার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সংযোজন করা হয়েছে। এবারের শিল্পনীতিতে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও কৃষিপণ্য বা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পসহ মোট ২৮টি শিল্প খাতকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
উদ্যোক্তারা বলেন, সরকার বিভিন্ন সময় কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। কিন্তু কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড ও কৃষিপণ্য বা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের পরিধি সুনির্দিষ্ট করে না দেওয়ায় অনেকেই সরকারের দেওয়া এসব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এবারের খসড়া শিল্পনীতিতে সেই ব্যাপারে একটি তালিকা দেওয়ায় বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তারা উপকৃত হবে।
খসড়া শিল্পনীতিতে রেশমবস্ত্র ও বস্ত্র উত্পাদনকে কৃষিভিত্তিক শিল্পের তালিকায় রাখায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সিল্ক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আলাউদ্দিন আহমেদ। তবে তিনি পলু পোকা পালন, রেশম গুটি চাষ ও রেশম সুতা উত্পাদনকে এ তালিকায় না রাখায় হতাশ হয়েছেন। তিনি এগুলোকে তালিকায় রাখার দাবি জানান।
খসড়া শিল্পনীতিতে কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড ও কৃষিপণ্য বা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের তালিকায় যেসব খাত স্থান পেয়েছে সেগুলো হলো প্রক্রিয়া করা ফলজাত খাদ্য, ফল (টমেটো, আম, পেয়ারা, ইক্ষু, কাঁঠাল, লিচু, আনারস, নারকেল ইত্যাদি), শাকসবজি, ডাল প্রক্রিয়াকরণ, ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট, সেমাই, লাচ্ছা, চানাচুর ও নুডল্স্ ইত্যাদি প্রক্রিয়াকরণ, আটা, ময়দা, সুজি প্রস্তুতকরণ, মাশরুম ও স্পাইরুলিনা প্রক্রিয়াকরণ, দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ, স্টার্চ, গ্লুকোজ, ডেক্সট্রোজ এবং অন্যান্য স্টার্চপণ্য উত্পাদন, আলু থেকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উত্পাদন, বিভিন্ন গুঁড়ো মসলা উত্পাদন, ভোজ্য তেল পরিশোধন ও হাইড্রোজিনেশন এবং লবণ প্রক্রিয়াকরণ।
এ তালিকায় আরও স্থান পেয়েছে চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ প্রক্রিয়াকরণ ও হিমায়িতকরণ, হারবাল ও ভেষজ প্রসাধনী প্রস্তুতকরণ, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ প্রস্তুতকরণ, হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু এবং মাছের জন্য সুষম খাদ্য প্রস্তুতকরণ, বীজ প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ, পাটজাত দ্রব্য প্রস্তুতকরণ, রেশমবস্ত্র ও বস্ত্র উত্পাদন, কৃষিজাত পণ্য উত্পাদনে সহায়ক যন্ত্রশিল্প স্থাপন ও মেরামত, চাল, মুড়ি, চিঁড়া, খই ইত্যাদি প্রস্তুতকরণ, সুগন্ধি চাল উত্পাদন, চা প্রক্রিয়াকরণ, নারকেলের তেল প্রস্তুতকরণ, রাবার টেপ, লাক্ষা প্রক্রিয়াকরণ, কোল্ডস্টোরেজ, কাঠ, বাঁশ ও বেতের আসবাব তৈরি (কুটিরশিল্প ছাড়া), ফুল সংরক্ষণ ও রপ্তানি, মাংস প্রক্রিয়াকরণ, জৈব সার, মিশ্র সার ও গুটি ইউরিয়া তৈরি, বায়োপেস্টিসাইড, নিম উত্পাদিত পেস্টিসাইড তৈরি, মৌমাছি চাষ ও মধু তৈরি, পার্টিকেল বোর্ড ও মিষ্টিজাতীয় পণ্য।

শ্রীলঙ্কার জোড়া ধাক্কা

৪১১ রান করেও মাত্র ৩ রানে হার! এ নিয়ে হাপিত্যেশ করারও সময় নেই শ্রীলঙ্কার। রান-রোমাঞ্চের ম্যাচ হারের পরদিনই শুনতে হলো দুঃসংবাদ। আঙুলের চোটের কারণে ওয়ানডে সিরিজেই আর খেলা হচ্ছে না মুত্তিয়া মুরালিধরন ও ফাস্ট বোলার দিলহারা ফার্নান্ডোর। মুম্বাই টেস্টে পাওয়া চোটের কারণে দুটি টি-টোয়েন্টির পাশাপাশি প্রথম ওয়ানডেও খেলা হয়নি মুরালির। ফার্নান্ডো অবশ্য প্রথম ওয়ানডেটি খেলেছেন। মহেন্দ্র সিং ধোনির ফিরতি ক্যাচ নিতে গিয়েই আঙুলে চোট পান তিনি। মুরালির জায়গায় দেশ থেকে উড়িয়ে আনা হচ্ছে দুই অফস্পিনার মুথুমুদালিগে পুষ্পকুমারা ও সুরাজ রনদিভকে।

বার্সেলোনা-এস্তুদিয়ান্তেস ফাইনাল

প্রথম ক্লাব বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আবুধাবিতে পা রেখেছে বার্সেলোনা। সেই স্বপ্ন পূরণের মাত্র একটা ধাপই বাকি আছে। কাল সেমিফাইনালে কনক্যাকাফ চ্যাম্পিয়ন মেক্সিকোর ক্লাব আটলান্টেকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠে গেছে বার্সা। আগামী শনিবার অনুষ্ঠেয় ফাইনালে এস্তুদিয়ান্তেসের বিপক্ষে খেলবে পেপ গার্দিওলার দল।
আবুধাবির শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামে প্রথমে অবশ্য পিছিয়ে পড়েছিল ইউরোপসেরা বার্সেলোনাই। ৫ মিনিটে আটলান্টেকে এগিয়ে দিয়েছিলেন গুইলার্মো রোজাস। ৩৫ মিনিটে বার্সাকে সমতায় ফেরান সার্জিও বাসকেটস। চোটের কারণে না খেলারই কথা ছিল লিওনেল মেসির। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বদলি হিসেবে মাঠে নামান কোচ পেপ গার্দিওলা। মাঠে নামার পর ৫৫ মিনিটে প্রথম স্পর্শেই অসাধারণ এক গোল করে দলকে এগিয়ে দেন এই আর্জেন্টাইন তারকাই। ১২ মিনিট পর ব্যবধান বাড়ানো গোলটি করেছেন পেদ্রো।
এস্তুদিয়ান্তেস ফাইনালে উঠেছে পরশু এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন কোরিয়ান ক্লাব পোহাং স্টিলার্সকে ২-১ গোলে হারিয়ে। দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে অবশ্য সমানে সমান লড়েছিল পোহাং। তবে ৮ মিনিটের দুটি গোল এবং ২১ মিনিটের ব্যবধানে তিনটি লাল কার্ড এলোমেলো করে দেয় সব। প্রথমার্ধে ইনজুরি সময়ের দ্বিতীয় মিনিট এবং দ্বিতীয়ার্ধের ৫৩ মিনিটে লিওনার্দো বেনিতেজের করা দুই গোলে ০-২-এ পিছিয়ে পড়ে পোহাং।
এস্তুদিয়ান্তেস কোচ আলেজান্দ্রো সাবেল্লা ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন এটাকেই, ‘প্রথমার্ধের শেষ কুড়ি মিনিট তো সমানে সমান খেলা হয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুটাও হয়েছিল সে রকমই। কিন্তু দ্বিতীয় গোলটা আমাদের মানসিক দিক দিয়ে এগিয়ে দিয়েছে। আর ওদের করে দিয়েছে হতাশ।’
কিন্তু পোহাংয়ের কোচ সার্জিও ফারিয়াস দলের পরাজয়ের কারণ দেখছেন ৫৬ থেকে ৭৭ মিনিটের মধ্যে তিনটি লাল কার্ড দেখাতে,‘দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলতে পারি। আমাদের তিনজন খেলোয়াড় বহিষ্কৃত হয়েছে। তা না হলে গল্পটা অন্য রকম হতে পারত।’
৫৬ মিনিটে অধিনায়ক জা ওন দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। ৭১ মিনিটে ডেনিলসনের মাধ্যমে একটি গোল শোধ দিয়েছিল পোহাং। ওই গোলটি পাওয়ার পরের মিনিটেই যে হুয়ান ভেরনকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন কিম জা-সুং। ৬ মিনিট পর বক্সের বাইরে হাত দিয়ে বল ধরার অপরাধে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন গোলরক্ষক সিন হা ইয়ং। শেষ ১৩ মিনিট আটজনকে নিয়ে খেলতে হয় দক্ষিণ কোরিয়ান ক্লাবটিকে।

ক্যালিস এগিয়ে দিলেন দক্ষিণ আফ্রিকাকে -সেঞ্চুরিয়ন টেস্ট

অক্সিজেন-চিকিত্সা তা হলে ভালোই কাজে দিচ্ছে! জ্যাক ক্যালিসকে দেখে তা-ই মনে হচ্ছে। পাঁজরে চোটের কারণে ওয়ানডে সিরিজে খেলা হয়নি এই অলরাউন্ডারের। কাল থেকে শুরু হওয়া প্রথম টেস্টেও ছিলেন অনিশ্চিত। কিন্তু ওয়ানডে সিরিজে হেরে যাওয়ার পর মরিয়া কোচ মিকি আর্থার যেকোনো মূল্যে দলে চেয়েছিলেন ক্যালিসকে। এর জন্য তাঁকে অক্সিজেন চেম্বারে নিয়ে চিকিত্সা করা হবে বলে জানিয়েছিলেন কোচ।
শেষ পর্যন্ত ক্যালিস অক্সিজেন-চিকিত্সা নিয়েছেন কি না, কে জানে। তবে কাল তাঁর ব্যাটিং দেখে মনে হলো, চিকিত্সা তিনি নিয়েছেন। এবং সেটি দারুণ কাজেও দিয়েছে। ক্যারিয়ারের ৩২তম সেঞ্চুরি করে সর্বোচ্চ টেস্ট সেঞ্চুরির তালিকায় ছুঁয়ে ফেলেছেন স্টিভ ওয়াহকে। এই তালিকায় তাঁর আগে আছেন আরও চারজন। সুনীল গাভাস্কার আর ব্রায়ান লারা দুজনেরই ৩৪টি করে। ৪৩টি সেঞ্চুরি নিয়ে সবার ওপরে শচীন টেন্ডুলকার। দ্বিতীয় স্থানে রিকি পন্টিং (৩৮)। এতে শুধু যে নিজের ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ হয়েছে, তা নয়; প্রথম দিন শেষে দলকেও এগিয়ে দিলেন ক্যালিস। তাঁর সেঞ্চুরিতে প্রথম দিনের খেলা শেষের আগে ৪ উইকেটে ২৬২ রান তুলেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ১১২ রান নিয়ে ব্যাট করছেন ক্যালিস, সঙ্গী জেপি ডুমিনির রান ৩৮।
তবে স্কোরবোর্ডে এক রান উঠতে না-উঠতেই গ্রায়েম স্মিথকে তুলে নিয়ে দারুণ শুরু এনে দিয়েছিলেন স্টুয়ার্ট ব্রড। ক্যারিয়ারে দশমবারের মতো শূন্য রানে আউট স্মিথ, যার তিনটি শূন্যই সেঞ্চুরিয়নে। এ মাঠের সঙ্গে বুঝি শত্রুতা আছে দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়কের! সেঞ্চুরিয়নে সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছিলেন সেই ছয় বছর আগে। পরের ১১ ইনিংসে কোনো ফিফটি পর্যন্ত নেই।
সেঞ্চুরিয়নের সঙ্গে আবার হাশিম আমলার দারুণ সুসম্পর্ক। এ মাঠে এর আগে খেলা চার ইনিংসে তিনটি ফিফটি আর একটা সেঞ্চুরি করেছিলেন। কিন্তু কাল আমলাকেও বঞ্চিত করল সেঞ্চুরিয়ন। বঞ্চিত করলেন আসলে গ্রাহাম অনিয়নস, স্লিপে কলিংউডের ক্যাচ বানিয়ে। ক্যালিসের সঙ্গে ৪২ রানের জুটি গড়ার পর অ্যাশওয়েল প্রিন্সও বিদায় নিলে দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর হয়ে যায় ৯৩/৩।
কিন্তু প্রথম দিনটা যে ইংল্যান্ডের হতে দেবেন না বলে পণ করেছিলেন ক্যালিস! এবি ডি ভিলিয়ার্সের সঙ্গে দারুণ এক জুটি গড়ে তুললেন। জুটি ভাঙার সব রকম চেষ্টা, এমনকি হাতে থাকা শেষ ‘রেফারেল’টাও খরচ করে ফেলেছিল ইংল্যান্ড। ঠিক তখনই গ্রায়েম সোয়ানের আপাত নিরীহ-দর্শন কিন্তু খানিকটা বাড়তি টার্ন ও বাউন্স পাওয়া বলের শিকার ডি ভিলিয়ার্স। ৬৬ রানের জুটির সেখানেই সমাপ্তি।
তবে ক্যালিস এখনো অটল। ডুমিনিকে সঙ্গে নিয়ে পঞ্চম উইকেট জুটিতে এরই মধ্যেই তুলে ফেলেছেন ১০৩ রান।

ভিক্টোরিয়ার প্রথম সুপার লিগে

সুপার লিগে প্রথম জয় পেল ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব। কাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে নিজেদের তৃতীয় সুপার লিগ ম্যাচে ভিক্টোরিয়া ৫ উইকেটে হারিয়েছে পয়েন্ট তালিকায় সবার নিচে থাকা ক্রিকেট কোচিং স্কুলকে (সিসিএস)। সুপার লিগে সিসিএসের এটি টানা তৃতীয় পরাজয়। টস জিতে ব্যাটিংয়ে যাওয়া সিসিএস ৮ উইকেটে তুলেছিল ২২২ রান। ২ ওভার হাতে রেখে ৫ উইকেটেই জয় ছুঁয়ে ফেলে ভিক্টোরিয়া।
উত্তম ও তারেকের ৭২ রানের ওপেনিং জুটির পর তৃতীয় উইকেটে পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান শাহবাজ বাট (৬১) ও তাপস ঘোষের জুটিটি সিসিএসকে দেখাচ্ছিল বড় স্কোরের স্বপ্ন। কিন্তু তাপস (১৮) দলকে ১২০ রানে রেখে আউট হওয়ার পর নিয়মিতই পড়তে থাকে উইকেট। ১৪৯ রানে চতুর্থ, ১৬৩ রানে পঞ্চম, ১৯৫ রানে ষষ্ঠ এবং ২০১ রানে পরপর দুই বলে পড়ে সপ্তম ও অষ্টম উইকেট।
২২৩ রানের জয়ের লক্ষ্য নিয়ে খেলতে নেমে ৪৮ রানের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলে ভিক্টোরিয়া। কিন্তু কামরুল (৮৮ বলে ৮৬, ৪ চার ও ১ ছয়) এবং আবুল বাশারের হাফসেঞ্চুরি (৫৪) দলকে দেখায় জয়ের রাস্তা। তাঁরা চতুর্থ উইকেটজুটিতে তোলেন ১০৯ রান। এরপর আবুল বাশার আউট হয়ে গেলেও পঞ্চম উইকেটে আরাফাত সালাউদ্দিনের (৩১) সঙ্গে ৪৩ রানের জুটি গড়ে আউট হন কামরুল। বাকি কাজটুকু সারেন আরাফাত ও মোহাম্মদ শরীফ।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: সিসিএস: ৫০ ওভারে ২২২/৮ (শাহবাজ ৬১, উত্তম ৩২, তারেকুজ্জামান ২৯, নাজমুল ২৩; মনির ৩/৫২, সাজু ২/৩৩, আবুল বাশার ১/৩১, শরীফ ১/৫৫)। ভিক্টোরিয়া: ৪৮ ওভারে ২২৫/৫ (কামরুল ৮৬, আবুল বাশার ৫৪, আরাফাত ৩১; আসলাম ২/৩৪)। ফল: ভিক্টোরিয়া ৫ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: কামরুল ইসলাম।

হকি খেলোয়াড়দের ক্যাম্প বর্জন

খেলা শেষ। ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা কোচ পিটার গেরহার্ডের সঙ্গে একে একে লাইন ধরে হাই-ফাইভ করলেন রাসেল মাহমুদ জিমি, আসাদুজ্জামান চন্দনরা। বিজয় দিবস হকিতে বাংলাদেশ পুলিশের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়ে বেশ তৃপ্তই মনে হলো জার্মান কোচকে। কিন্তু তখনো তিনি জানেননি খেলোয়াড়দের মনে কী ক্ষোভটাই না লুকিয়ে!
একটু পরই ব্যাপারটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার করে দিলেন আসাদুজ্জামান চন্দন। জার্মানিতে থাকার সময় কোচের সঙ্গে নানা কারণে মতবিরোধ এবং তাঁর ‘স্বেচ্ছাচারিতা’র কথা তুলে আসন্ন এসএ গেমসের ক্যাম্প বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ক্যাম্পের ১৯ জন খেলোয়াড়।
ক্ষোভের সলতেটা জ্বলছিল জাতীয় দল জার্মানিতে থাকার সময়ই। দেশে ফিরে খেলোয়াড়েরা নানা অভিযোগ তোলেন কোচের বিরুদ্ধে। প্র্যাকটিসে না আসা, তাঁদের সময় না দেওয়া, কোনো ম্যাচ না দেখেই খেলোয়াড়দের মূল্যায়ন করা—অভিযোগের তালিকা বেশ লম্বাই ছিল। আগুনে ঘি ঢেলে দিল বিজয় দিবসের টুর্নামেন্টে হকি ফেডারেশন একাদশ থেকে কয়েকজন সিনিয়র খেলোয়াড়ের বাদ পড়ার ব্যাপারটা। প্রথম ম্যাচ শেষেই তাঁরা নিয়ে নিলেন চরম ওই সিদ্ধান্ত। দলের স্ট্রাইকার রাসেল মাহমুদ জিমি জানালেন, ‘আমরা পুরো সফরটা শেষ করে এলাম, কিন্তু কোচের দেখা পাইনি। ছিনতাইকারীর হাতে মার খেয়েছি, তিনি আমাদের জন্য কিছুই করেননি।’ তিনি এমনও বলেছেন, ‘কোনো জিমিকে চিনি না, চন্দনকে চিনি না। আমি নাম্বার হিসেবে চিনি। যদি নাম্বার হিসেবেই চিনে থাকেন আমাদের, তাহলে চন্দনকে কেন বাদ দিলেন? এখন আমরা এ কোচের অধীনে ক্যাম্প করব না।’ কোচ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘ওরা যা বলেছে, সেটা মিথ্যা। ওদের কথা ঠিক নয়।’ তিনি খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স মাঠে বসে দেখেননি সত্যি, তবে ইউরোপ সফরের আটটি ম্যাচের ভিডিও জোগাড় করে সেটি দেখেই খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করেছেন। সফরের বেশির ভাগ সময় দলের সঙ্গে থাকতে না পারার কারণ হিসেবে ফেডারেশনের আর্থিক সমস্যার কথাই বললেন তিনি, ‘ফেডারেশন যদি আমাকে সব কটি ম্যাচে যাওয়ার খরচ না দেয়, তাহলে আমার নিজের টাকা খরচ করে তো আর সব ম্যাচ দেখতে যাওয়া সম্ভব নয়।’
কাল অবশ্য খেলা দেখে বেশ খুশিই হয়েছেন কোচ, ‘আমি খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে খুশি।’ তবে এই একাদশে চন্দন এবং অন্য তিন সিনিয়র খেলোয়াড়কে না রাখার পক্ষে তাঁর যুক্তি, ‘এটা আসলে প্র্যাকটিস ম্যাচ। এখানে আমি সবাইকে না-ও খেলাতে পারি। এরপর যেকোনো ম্যাচেই ওরা খেলতে পারে।’ জিমির ব্যাপারে তিনি একটু হতাশই, ‘ওর পারফরম্যান্স আসলেই নিচে নেমে গেছে। ওর আরও উন্নতি করা উচিত ছিল।’ এমন আন্দোলনে খেলোয়াড়েরা নিজেদেরই ক্ষতি করছে বলে মত দিলেন তিনি। ভারতের ঘরোয়া হকি দল এয়ার ইন্ডিয়ার সঙ্গে কয়েকটি প্রস্তুতিমূলক ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা আছে কোচের, ‘এয়ার ইন্ডিয়া ভারতের অনেক উঁচু মানের দল। ওদের সঙ্গে ফেডারেশনের কথাবার্তা চলছে। খুব তাড়াতাড়ি হয়তো ওরা এখানে খেলতে আসবে। সাফের প্রস্তুতিতে এটা দারুণ কাজে লাগবে।’ কোচ যখন দলের প্রস্তুতির কথা ভাবছেন, ফেডারেশন কর্তারা ভাবছিলেন সমস্যা সমাধানের পথ। কাল গভীর রাত অবধি আলোচনা করে এর সমাধানও করে ফেলেছেন বলে জানালেন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার জামিলউদ্দিন, ‘এটা আসলে সাময়িক ভুল বোঝাবুঝি ছিল, সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কাল (আজ) সকাল থেকে যথারীতি প্র্যাকটিস হবে।’ তবে সিনিয়র খেলোয়াড় আসাদুজ্জামান চন্দন বলেছেন, ‘কোনো সমাধানই হয়নি। আমরা সিনিয়ররা প্র্যাকটিস করছি না। জুনিয়র খেলোয়াড়েরা করলে করতে পারে।

বিজয় দিবসের প্রত্যাশা -বিজয়কে সামনে এগিয়ে নিতে by আমিন আহমেদ চৌধুরী

একাত্তরের ষোলোই ডিসেম্বর আমাদের জীবনে কেবল নতুন একটি মাত্রা সংযোজন করেনি; বরং চিন্তা-চেতনা ও মননে এক বিরাট পরিবর্তনের সূচনা করেছে। প্রাদেশিকতার গণ্ডি থেকে বের হয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের পরিমণ্ডলে হঠাত্ করে এক আত্মপ্রত্যয়ী গর্বিত চির উন্নত মম শির উচ্চারিত বিজয়ী এক বাঙালির আবির্ভাব ঘটে। সারা বিশ্ব বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে সৌম্য সুহাসে মহীয়ান সেই বাঙালির দিকে, যার প্রতিভূ ছিলেন ফাঁসির মঞ্চে রজ্জু ছিন্নকারী সুপুরুষ—সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা সেদিন কেঁদেছিলাম তাঁর আশু মুক্তির জন্য। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমরা সেদিন হেসেছিলাম। কোমর বেঁধে নেমে পড়েছিলাম যুদ্ধবিধ্বস্ত সোনার বাংলা পুনর্গঠনে।
প্রাথমিকভাবে আমরা দুরু দুরু পদক্ষেপে সঠিক পথে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের সামনে লক্ষ্য ছিল জনগণের কাছে স্বাধীনতার সুফল বয়ে আনা। সমবায়ভিত্তিক মিশ্র অর্থনীতির স্বপ্নে ছিলাম বিভোর। সেই সময় যাঁরা আমাদের নেতৃত্বে ছিলেন, তাঁরা প্রায় সবাই ছিলেন মানবসেবায় নিবেদিতপ্রাণ। তাঁরা প্রত্যেকেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ত্যাগ ও তিতিক্ষার প্রতীক ছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের আপামর দুঃখী জনগণ আশার আলো দেখতে পাচ্ছিল। দুঃখ-কষ্টের মধ্যে অর্থনীতির বুনিয়াদ ধীরে ধীরে সমাজে গ্রথিত হচ্ছিল। তাঁদের প্রয়োগ পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তাঁদের নৈতিকতা-সততার প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য ছিল। সেখানে ফাঁকিজুঁকি নিতান্তই কম ছিল। তার পরই কুচক্রীদের খপ্পরে পড়ে দেশ ধীরে ধীরে দিক-নির্দেশনাহীনভাবে চলতে শুরু করে। এলোমেলো চিন্তা, দিন এনে দিন খাওয়া দেশের অগ্রগতি দারুণভাবে ব্যাহত করতে থাকে। যদিও বেসরকারি খাতে ও বিচ্ছিন্নভাবে অন্য কয়েকটি খাত নিজেদের প্রচেষ্টায় প্রভূত উন্নতি সাধন করে। নারীশিক্ষার বেলায়ও আমাদের অগ্রগতি লক্ষণীয়। কিন্তু তার পরও সমুন্নত কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখনো নিতে পারিনি। চিন্তা-চেতনার দৈন্য এবং ধারাবাহিকতার অভাব, কর্মে নিষ্ঠার অভাব। সেই উচ্ছ্বাস-উদ্যম, স্বতঃস্ফূর্ততা সময়ের ব্যবধানে ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়। আত্মকলহ, কোন্দল, চিন্তা ও চেতনার দৈন্য আমাদের সংকীর্ণ থেকে সংকীর্ণতর পরিবেশের দিকে ঠেলে দিতে থাকে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী নয় মাসের মধ্যে বিশ্বমানের সংবিধান প্রণয়ন করেও কিছুদিনের মধ্যে আমরা তা থেকে সরে এলাম এবং ক্রমান্বয়ে সরে আসতে লাগলাম। বলতে গেলে সেই থেকে আমাদের পিছু হটা শুরু। সেই পিছু হটার আর শেষ নেই। পিছু হটতে গিয়ে পঙ্কিলতায় ডুবে গেলাম। শিক্ষাব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক যন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, রাজনীতি এবং রাজনৈতিক মূল্যবোধ থেকে শুরু করে সব প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হয় ধ্বংস করতে থাকি, নতুবা কলুষিত করতে থাকি। শুধু তা-ই নয়, তা থেকে নিস্তার পাওয়ার কার্যকর কোনো পথ আজও বের করতে পারলাম না। এই ৩৭ বছর শুধু ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার বিদ্যায় উত্কর্ষতা লাভ করলাম। স্থিতিশীলতার নামে ন্যক্কারজনক দলীয়করণ কৌশল প্রয়োগে একে অপরকে পরাস্ত করে একেবারে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে আছি। ফলে দেশ রাডারবিহীন অবস্থায় চলতে শুরু করল। তীরে ভেড়ার কোনো সম্ভাবনা এখনো দেখা দেয়নি। এর প্রধান কারণ, এ দেশের শিক্ষিত সমাজের একটি অংশের স্বার্থান্বেষী তত্পরতা। এ দেশের সাধারণ মানুষ অসাধারণ গুণে গুণান্বিত। খেতখামারে খেটে-খাওয়া মান্ধাতার আমলের কৃষক আজও স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে শুরু করে এ দেশের সব কাজের বৈতালিক এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি। তার পরও আমাদের দুর্গতির শেষ নেই। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হিমালয়সম অব্যবস্থা এবং অসুস্থ মনমানসিকতা থেকে আমাদের মুক্তি পেতেই হবে। বর্তমান সরকার জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। এই সরকারের অনেক কিছু করার রয়েছে। বিজয়ের এই মাসে বতর্মান সরকারের কাছে আমার কিছু প্রত্যাশা রয়েছে। আমি মনে করি, আমাদের বিজয়কে এগিয়ে নিতে হলে এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি বলে মনে করছি।
১. সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে অনতিবিলম্বে ’৭২ সালের মূল ও অপরিবর্তিত সংবিধানে ফিরে গিয়ে তা সর্বস্তরে চালু করা।
২. একক বিজ্ঞানমনস্ক সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা। অনতিবিলম্বে মাদ্রাসা বোর্ড ভেঙে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত একক সর্বজনীন বাংলা মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থা সর্বস্তরে চালু করা, যেখানে তৃতীয় শ্রেণী থেকে ইংরেজি বাধ্যতামূলক বিষয় থাকবে। খোদ আরব দেশেও মাদ্রাসা বোর্ড বলে আলাদা কোনো বোর্ড নেই, রয়েছে সর্বজনীন শিক্ষা বোর্ড।
. স্বাধীন বিচারব্যবস্থা মুখরোচক কথা হিসেবে ব্যবহার না করে এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। অর্থাত্ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধান বিচারপতি নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি সব ধরনের বিচারপতিদেরসহ দেশের সার্বিক বিচারব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক হবেন। প্রধান বিচারপতি নিয়োগকালে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন।
৪. কর্মকমিশন প্রশাসনিক চাহিদা মোতাবেক সব ধরনের রিক্রুটমেন্ট করবে। কর্মকমিশনের অধীনে জ্যেষ্ঠতার তালিকা সংরক্ষণ ও পদোন্নতিসহ আমলাতন্ত্র চলমান থাকবে। সংস্থাপন মন্ত্রণালয় উপসচিব পদমর্যাদা থেকে নিম্নে স্থানীয় পর্যায়ে বদলি করতে পারবেন। কিন্তু উপসচিব থেকে তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মজীবীদের পদোন্নতি দেবে কর্মকমিশন। সংস্থাপন মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে সাচিবিক কাজ করে তালিকাগুলো কর্মকমিশনের কাছে পাঠাবেন পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদাসম্পন্ন সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হবেন এবং সদস্যরা সচিব পদমর্যাদাসম্পন্ন ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব হবেন, যাঁদের নাম সংসদীয় কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।
৫. মন্ত্রিপরিষদ ও সার্বভৌম সংসদ দেশের নীতিনির্ধারক ও আইন প্রণয়নকারী। তাঁদের অধীনে আমলারা তাঁদের সরকারি দায়িত্ব পালন করবেন। তবে প্রশাসনযন্ত্র মন্ত্রিপরিষদ সচিবের অধীনে সরকারি বিধান ও নির্দেশ মোতাবেক পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করবে। মন্ত্রণালয়ের সচিব মন্ত্রণালয়ের চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট অফিসার হবেন। তিনি সব রকম হিসাব-নিকাশের জন্য সংসদীয় কমিটির কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।
. মানবসম্পদ, জ্বালানি, মানবাধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিক্ষাব্যবস্থাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্বাধীন কমিশন দ্বারা পর্যবেশিত হওয়া একান্তভাবে উচিত। প্রয়োজনে বিষয়ভিত্তিক ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে। অফিসের সময় হওয়া উচিত সকাল ১০টা থেকে বিকেল পাঁচটা। শুক্রবার সকাল আটটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত অফিস হবে এবং কর্মচারীদের মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা থাকবে। শনি ও রোববার ছুটি থাকবে।
৭. ঢাকা শহরকে বুড়িগঙ্গা থেকে শুরু করে টঙ্গীর তুরাগ নদ পর্যন্ত একটি বেষ্টনীর মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা। কোনো অবস্থাতেই নগরায়ণ ও আবাসনের নামে ফসলি জমি, জলাশয়, নদী-নালা ভরাট করে ব্যবহার করা যাবে না। অনতিবিলম্বে ব্যক্তিগত প্লট বরাদ্দ বন্ধ করে অবৈধ স্থাপনা স্থাপনকারী, রাজউকের সদস্যসহ সবাইকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। আবাসিক ও অন্যান্য এলাকায় খেলার মাঠের চারপাশে কমপক্ষে ২০ তলা ভবন নির্মাণ করে ফ্ল্যাট বিক্রি অথবা বরাদ্দ দেওয়া। জয়দেবপুর থেকে খিলক্ষেত এবং সদরঘাট হয়ে আশুলিয়া পর্যন্ত শহরের চারদিকে সার্কুলার রেলপথ, হাইওয়ে ও বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা। আব্দুল্লাহপুর থেকে টিএসটি চত্বর পর্যন্ত (একটি বিশ্বরোডের ওপর দিয়ে যাবে) এবং দাউদকান্দি থেকে গাবতলী পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ করা। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে অবৈধ পার্কিং, স্টেডিয়ামসহ আবাসিক এলাকার রাস্তার শেষ মাথায় ঘরবাড়ি বা স্থাপনা নির্মাণ চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
৮. ভূমি সংস্কার কমিশন সব অবস্থায়ই ভূমির সদ্ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ, বিশেষ করে ফসলি জমির পরিমাণ এবং উত্পাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে খবরদারি করবে।
৯. সিভিল সার্ভিস ও পুলিশ সার্ভিসসহ সব সার্ভিসের ক্যাডারদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কমপক্ষে আড়াই বছর হবে। বর্তমান প্রশিক্ষণ একাডেমিগুলো ধুলোর সঙ্গে মিশে গেছে। এগুলোকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য ব্রিটিশ বা কোনো ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে চুক্তি করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা (পুলিশ সার্জেন্ট/কাস্টম/ইনকাম ট্যাক্স সুপারভাইজারসহ) যাতে নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ তাদের মনে গ্রথিত হয়। দেশপ্রেমে উদ্ভাসিত সুনাগরিক হিসেবে তাঁরা দেশের সেবা করবেন। আমলাসহ সর্বস্তরের কর্মজীবীদের বেলায় মেধা সর্বাগ্রে স্থান পাবে। দেশের চাহিদা অনুযায়ী ৪০টির অধিক মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয়তা নেই। সেই অনুযায়ী করপোরেশনসহ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে ৫০-৬০ জনের বেশি নিয়োগ না করা।
১০. রাজনৈতিক দলে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা সর্বস্তরে অবশ্যই হতে হবে। বার্ষিক সম্মেলন যদি নাও করা হয়, তাহলেও প্রতি তিন বছরে একবার অবশ্যই করতে হবে এবং প্রতি সম্মেলনে দলের যাবতীয় খরচ, অডিট করা আয় ও ব্যয়ের হিসাব সব সদস্যকে দিতে হবে এবং তা সম্মেলনে দাখিল করতে হবে।
১১. আমার প্রস্তাব হচ্ছে, তিন স্তরবিশিষ্ট রাজনৈতিক অবকাঠামো সৃষ্টি করে দেশকে পরিচালিত করা। স্তরগুলো হলো স্বশাসিত ইউনিয়ন কাউন্সিল, স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ ও সার্বভৌম জাতীয় সংসদ। ইউনিয়ন কাউন্সিল আয়তনধর্মী না হয়ে জনসংখ্যাভিত্তিক হতে হবে। থানা প্রশাসন জেলা প্রশাসনের অধীনে ইউনিয়নের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সদা সচেষ্ট থাকবে। উচ্চতর ও কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থাও অঞ্চলভিত্তিক হতে পারে।
বিভাগীয় প্রশাসন ভূমি জরিপ থেকে শুরু করে ভূমি-পরিবেশের ব্যবহার তদারক করবে, সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা ও জেলা প্রশাসনের কাজ তদারক করবে। জাতীয় সংসদের সদস্যরা আইন প্রণয়নের কাজে ব্যাপৃত থাকবেন। উপজেলা বা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ঠেলাঠেলি না করে, প্রশাসনিক পদে না থেকে এলাকার প্রশাসনে নজরদারি করবেন।
যাঁর যা দায়িত্ব, তাঁকে তা নির্ভয়ে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে পালনে উদ্বুদ্ধ করাই ক্ষমতাসীন সরকারের আরব্ধ কাজ হওয়া উচিত। তাঁবেদারি নয়, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সামনের দিকে এগোনোর ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাবান হতে হবে। তবেই দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠালাভের পথ সুগম হবে। নৈতিকতার যে ধস আমাদের সমাজে নেমেছে, সর্বশক্তি দিয়ে তা রোধ করতে হবে। প্রচলিত আইনকে আত্মস্থ করে চিন্তা-চেতনার ধারাবাহিকতা বহমান রাখা ও আত্মশুদ্ধিই একমাত্র উত্তরণের পথ। এবারের বিজয় দিবসে এটাই হোক আমাদের চাওয়া।
মেজর জেনারেল (অব.) আমিন আহমেদ চৌধুরী (বীর বিক্রম): মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রদূত।

বিজয় দিবস -পৌষের এই দিনে by আনিসুল হক

উত্তাপটা টের পাচ্ছিলাম কোপেনহেগেনে বসেই। প্রধানত ফেসবুকে। ফেসবুকের বন্ধুরা তাদের মুখচ্ছবি হিসেবে ব্যবহার করছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন জাতীয় পতাকা, যার মাঝখানে আছে হলুদ রঙের মানচিত্র। কেউ কেউ ব্যবহার করছে রাইফেলের ডগায় বাঁধা সেই পতাকাটি। তার মানে বাংলাদেশে এসে গেছে বিজয়ের মাস। ঢাকা শহরে ঢুকতেই দেখি, গাড়িতে গাড়িতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়ছে। কেউ কেউ বনেটে সেঁটেও দিয়েছেন জাতীয় পতাকা। বুকের ভেতরে কী যে একটা শিরশির অনুভূত হয়! চোখ ছলছল করে। আহা, আমার বাংলাদেশ। নিজেদের মধ্যে কত অনৈক্য, কত ভুল বোঝাবুঝি, কিন্তু একটা বিষয়ে সবাই একমত—দেশ, একটা প্রেম, সবার ওপরে; দেশ, দেশপ্রেম। আমি জানি না, পৃথিবীতে আর কোনো জনগোষ্ঠী আছে কি না, যারা দেশের নামে এভাবে আবেগাপ্লুত বোধ করে।
আমাদের দেশপ্রেমের প্রধান প্রতীক আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আর আমাদের বিজয়। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সারাক্ষণ পথ দেখায়, আমাদের বলে দেয়, আমরাও ঐক্যবদ্ধ হতে জানি, আমরাও পারি আত্মত্যাগের চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে, আমরাও পারি সাহসিকতা ও বীরত্বের উজ্জ্বলতম ইতিহাস সৃষ্টি করতে।
কিন্তু আজকে যার বয়স ৩৮, সে তো মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। আমাদের জনসংখ্যার বেশির ভাগ মানুষই তো মুক্তিযুদ্ধের পরের প্রজন্মের। তাহলে আজও মুক্তিযুদ্ধ আর বিজয় কেন আমাদের এতটা উদ্দীপিত করে? কীভাবে করে?
কিছুদিন আগে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সপ্তাহের সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার। ওখানকার ছেলেমেয়েরা কয়েক ঘণ্টাব্যাপী একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করল। ওই অনুষ্ঠান দেখে আমি হাঁ হয়ে গেছি। আমি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার ছাত্র ছিলাম আশির দশকে। আমরাও অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। এখনো এ ধরনের নানা অনুষ্ঠানের আয়োজনের পেছনে আমি বুদ্ধি ও শ্রম ব্যয় করে থাকি। লেখালেখির সুবাদে টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গেও আমার কিছুটা হলেও আলাপ-পরিচয় ও মেলামেশা আছে। কিন্তু খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা যা দেখিয়েছে, তা আমার প্রত্যাশার সকল মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের সময়ে আমরা হারমোনিয়াম, তবলা, বড়জোর কি-বোর্ড-সহযোগে নজরুল-রবীন্দ্রসংগীত-আধুনিক গান পরিবেশন করতাম। তারপর দেশের কোনো খ্যাতিমান দল বা শিল্পী যখন গান ধরতেন, তখন দর্শকের সংখ্যা বাড়ত। কিন্তু খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে কোনো অতিথি শিল্পী ছিলেন না। যা করার তা নিজেরা করেছে। ধরা যাক, একটা নাচ হলো। নেচেছে ওখানকার ছেলেমেয়েরাই, নিজেরা শিখে নিয়ে। তারপর একটা গান হবে। দুটো পরিবেশনার ফাঁকের সময়টাতে কী হবে। ওরা যা করেছে তা হলো, ওই সময়টায় পর্দায় দেখিয়েছে একটা করে ছোট্ট চলচ্চিত্র। এক মিনিট দেড় মিনিট বা দুই-চার মিনিটের এই চলচ্চিত্রগুলোর কোনোটায় ছিল ছোট্ট কাহিনিচিত্র, কোনোটা মিউজিক ভিডিও। প্রায় বিশ-ত্রিশটা শর্টফিল্ম এরা প্রদর্শন করল অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে। মজার ব্যাপার হলো, এই ছবিগুলো তারা নিজেরা বানিয়েছে। ক্যামেরা বলতে সাধারণ স্থিরচিত্র তোলার ক্যামেরা। সেটাতে যে দুই-চার মিনিট ভিডিও করা যায়, তা-ই তারা করেছে। তারপর সেই ভিডিও তারা কপি করে নিয়েছে কম্পিউটারে। ইন্টারনেট থেকে সম্পাদনার সফটওয়্যার নামিয়ে নিয়ে তারা সম্পাদনার কাজ সেরেছে নিজেরাই। নিজেরাই শব্দ ও সংগীত যোজনা করেছে। কাহিনিও তাদের নিজেদের রচনা। অভিনয়ও করেছে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আমি আগেই বলেছি, আমি দেশের টেলিভিশনগুলোর নাটক ইত্যাদি লিখে থাকি। আমাদের জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানের মান সম্পর্কে আমার একটা ধারণা আছে। আমি স্পষ্টভাবে দায়িত্ব নিয়ে বলছি, খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ভিডিওচিত্রগুলোর মান জাতীয় পর্যায়ের চেয়ে কোনো অংশে খারাপ তো নয়ই, বরং কোনো কোনোটা খুবই ভালো। কোনো রকম কাঁচামো নেই। নিজেদের ক্যাম্পাসের মজার ঘটনা, পড়ার চাপ, পরীক্ষা নিয়ে তারা রসিকতা করেছে, ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তারা চমত্কার উদ্দীপনামূলক কাহিনি ফেঁদেছে, আবার দেশাত্মবোধক গান নিয়ে বানিয়েছে অনেকগুলো সংগীতচিত্র। কিন্তু একটা বিষয় ঘুরেফিরে এসেছে। সেটা হলো, দেশ। দেশের ইতিহাস। মুুক্তিযুদ্ধ। একটা ভিডিওচিত্রে তো বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো দেখানো হলো। আর আছে আমাদের ক্রিকেট দলের শটের শট। মাথায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বাঁধা ক্রিকেটার যখন ছক্কা মারেন, তখন কার না ভালো লাগে। শুধু ভিডিওচিত্রতে নয়, মঞ্চেও তারা যা পরিবেশন করল, তাতেও ঘুরেফিরে আসে দেশের কথা, মুক্তির কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা। প্রথমেই ছিল একটা কোরিওগ্রাফি, দেশ নিয়ে, পতাকা হাতে। আমি মুগ্ধ ও বিস্মিত তাদের কাজ দেখে। আবৃত্তির দল যে আবৃত্তি করল, তার মান কোনো অংশেই কম নয়। এই ছেলেমেয়েরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। প্রান্তবর্তী শহরে থাকে। পরীক্ষা আর ক্লাস-টেস্টের চাপে এরা সারাক্ষণ থাকে পিষ্টপ্রায়। অথচ কী তাদের সৃজনশীলতা, চর্চা ও কল্পনাশক্তি ও সাংগঠনিক ক্ষমতার অপূর্ব বহিঃপ্রকাশ! এদের কারও কারও সঙ্গে কথা হয়েছে আমার। তারা বলে, তারা ছবি দেখে দেশ-বিদেশের। তারা কম্পিউটারে ইন্টারনেটে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রগুলো ডাউনলোড করে নেয়। কখনো এক সপ্তাহ লেগে যায় ছবি নামাতে। তবু নামায়, তবু দেখে।
মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরের প্রজন্ম এরা। আমাদের সঙ্গে এদের প্রজন্মের পার্থক্য অনেক। সব দিক থেকেই এরা চৌকস, চটপটে, স্মার্ট। এরা কম্পিউটারকে এদের এগিয়ে যাওয়ার আর সারা পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে খেলনার মতো ব্যবহার করে। এরা ক্রিকেট খেলে। এরা সংগীতের দল গড়ে। কিন্তু একটা বিষয়ে ওদের সঙ্গে আমাদের কোনো জেনারেশন-গ্যাপ বা প্রজন্ম-ব্যবধান নেই, তা হলো মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ, দেশ, পতাকা, জাতীয় সংগীতের প্রতি তাদের ভালোবাসার কোনো তুলনা নেই।
নতুন প্রজন্ম আসছে। বাংলাদেশকে পাল্টে দিতে। এরা চিন্তায় আধুনিক, চেতনায় এদের মুক্তিযুদ্ধ।
সারাটা দেশ আজ কীভাবে মেতে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়টাকে উদ্যাপন করে নিতে। এসব আনুষ্ঠানিকতারও দরকার আছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে শোষণ থেকে মুক্তি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে দেশের জন্য নিজেকে উত্সর্গ করতে প্রস্তুত থাকা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে গণতন্ত্র। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে আধুনিক, অগ্রসর, সুখী ও আলোকিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সে কাজটিই করবে। সেই কাজটিই করছে।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একটা কথা বলেন। কথাটা তিনি বলেন সক্রেটিসকে উদ্ধৃত করে। প্লেটো জিজ্ঞেস করেছিলেন সক্রেটিসকে, সর্বোচ্চ দেশপ্রেম কী? প্লেটো জবাব দিয়েছিলেন, সর্বোত্তমভাবে নিজের কাজটুকু করা। আমাদের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা নিজের কাজটুকু সুন্দরভাবে, উত্তমভাবে করছে। যে ক্রিকেট খেলছে, সে আন্তর্জাতিক মানে যাওয়ার জন্য খেলছে। যে লেখাপড়া করছে, সে মন দিয়ে লেখাপড়া করছে। কম্পিউটার ইন্টারনেটে সে মুহূর্তে জেনে নিচ্ছে পৃথিবীর দূরতম অঞ্চলে ঘটে যাওয়া সর্বশেষ তথ্যটা।
আর এরা যুক্ত হচ্ছে বইপড়া, সংগীতচর্চা, নাটক, বিতর্ক, আবৃত্তি, চলচ্চিত্র ইত্যাদি কার্যক্রমে। সে শুধু নিজেকে সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছে না, নিজের মধ্যে গড়ে তুলছে সাংগঠনিক ক্ষমতা, নেতৃত্বের গুণ।
এই ছেলেমেয়েরা আসছে। হাজার হাজার জন। লক্ষ লক্ষ জন। এরা আসছে এক বিজয় থেকে আরেক বিজয়ে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে বলে। এদের কাছে দেশপ্রেম মানে কেবল বানানো কথার ফেনানো তুবড়ি নয়, এদের কাছে দেশপ্রেম মানে কাজ, নিজের কাজ।
আমরা একাত্তরের ষোলোই ডিসেম্বর এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটিয়েছিলাম, আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিলাম একটা ভয়ংকর সেনাবাহিনীকে। কিন্তু আমরা যে বিজয় সামনে অর্জন করতে যাচ্ছি, সেটা খুব অবিশ্বাস্য রকম কিছু নয়। মধ্য আয়ের একটা দেশ, অগ্রসর, বাসযোগ্য একটা দেশ, আলোকিত পরমতসহিষ্ণু ও বৈষম্যহীন একটা সমাজ। ষোলোই ডিসেম্বরের বিজয়ের পতাকার মাঝখানে লাল সূর্যটা আমাদের অভয় দিচ্ছে, শহীদদের শুভেচ্ছা আছে আমাদের সঙ্গে, আমরা পারবই।
বিদেশ থেকে বাংলাদেশের মাটিতে নেমে বিজয়ের স্মারক বাংলাদেশের পতাকা চারদিকে উড়তে দেখে সেই আশ্বাসই পাই। পৌষ মাস আমাদের উত্সবের মাস। আসলে অগ্রহায়ণ মাসে ধানকাটা, মাড়াই, সেদ্ধ করা, শুকানো, আমাদের জনপদবাসীর ব্যস্ততার কাল। পৌষ মাস হলো আমাদের উত্সবের মাস। নবান্নের আসল উত্সব হয় পৌষেই। ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয় রে ছুটে আয়, ডালা যে তার ভরে গেছে পাকা ফসলে...’ এই গানের তাত্পর্য এইখানে। ছোটবেলায় গ্রামে ছড়া শুনেছি, ‘আগন মাসে ধান কাটিব, পৌষ মাসে বেটার বিয়া লো লো লো...।’ পৌষে চিরন্তন নবান্নের উত্সবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিজয়ের উত্সব। এ যেন সোনায় সোহাগা। এই উত্সব ১৬ কোটি মানুষের হূদয়কে উদ্দীপিত করুক, এগিয়ে নিয়ে যাক আমাদের বাংলাদেশকে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক, সাংবাদিক।

বিজয় দিবস -বিকশিত গণতন্ত্র ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রত্যাশা

আজ বিজয় দিবস। সেই বিজয়, যার জন্য যুগের পর যুগ এই ভূখণ্ডের নিপীড়িত মানুষ স্বপ্ন দেখেছে; সেই বিজয়, যার জন্য বাংলাদেশের মানুষ নয়টি মাস রক্তসাগর পাড়ি দিয়েছে; সেই বিজয়, লাখ লাখ প্রাণের মূল্যে যা অর্জিত হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা দিয়েছে। বিজয়ের ৩৮তম বার্ষিকীতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে শহীদ প্রত্যেককে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এবং সব মুক্তিযোদ্ধাকে জানাই রক্তিম অভিনন্দন।
উপমহাদেশের মানচিত্রে বাংলাদেশের আবির্ভাব ছিল সব অর্থেই যুগান্তকারী ঘটনা। সেই সময়ের বিশ্বপরিস্থিতিতে নতুন কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের আবির্ভাব সহজতর ছিল না। কিন্তু সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিচল প্রত্যয়, অশেষ ত্যাগ স্বীকার, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সুযোগ্য ভূমিকা এবং ভারত ও তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সার্বিক সহযোগিতায় সেই অসম্ভবকে সম্ভব করা গিয়েছিল। মুক্তিকামী বাংলার লড়াই সে সময় বিশ্বব্যাপী বিপুল আবেগ, সমর্থন টানতে সক্ষম হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের এ-দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস প্রভৃতি ঘাতক বাহিনীর গণহত্যা বিশ্ববিবেককেও কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার স্বাধিকার দাবি থেকে একাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রের গর্জন স্বাধীনতার দাবিকে অনিবার্য করে তুলেছিল। সোনার বাংলার স্বপ্নে বাংলার ছাত্রসমাজ ও শ্রমিক, কৃষক, নারী, মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবীসমাজ এমনই উদ্দীপ্ত হয়েছিল যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে নস্যাত্ করা কারও পক্ষেই সম্ভব ছিল না। এবং সেই স্বপ্ন ছিল একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।
কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ, বারবার সামরিক অভ্যুত্থান ও শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতির কারণে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। বারবার ব্যাহত হয়েছে গণতন্ত্রের জয়যাত্রা। তবে এত কিছু সত্ত্বেও এ দেশের জনগণের উদার গণতান্ত্রিক চেতনা, উত্পাদনমুখিতা ও দৃঢ় প্রত্যয়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হয়েছে। দারিদ্র্য এখন ৩৮ বছর আগের মতো প্রকট নয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ঘটেছে, দেশের উত্পাদন-ভিত্তি নাজুক নয়, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে। ধীরে হলেও প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। গণতন্ত্রে ছেদ পড়লেও বারেবারে তা উঠে দাঁড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও রাজনীতি ও প্রশাসনের সব স্তরে জনগণের শাসন তথা গণতান্ত্রিক চর্চা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। সর্বোপরি দুর্নীতির ভূত জাতির কাঁধ থেকে চূড়ান্তভাবে নেমে যায়নি।
সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার, একাত্তরের গণহত্যার ৩৮ বছরের মাথায়ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা যায়নি। তবে আশার কথা, বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জনগণের মধ্যেও অভূতপূর্ব আগ্রহ লক্ষ করা গেছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার সফল বাস্তবায়ন। আমরা আশা করব, সরকার অচিরেই সব বাধা উপেক্ষা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ শুরু করবে।
দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে যারা অবস্থান নিয়েছে, শতাব্দীর ভয়াবহতম গণহত্যা যারা চালিয়েছে, তাদের বিচার এবং রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে যুদ্ধাপরাধী ও খুনিদের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে না পারলে গণতন্ত্র ও জাতি গঠনের কাজ যেমন সম্পূর্ণ হতে পারে না, তেমনি ১৬ ডিসেম্বরের গৌরব ও বিজয় পরিপূর্ণতা পাবে না।

চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের বইমেলা -চারদিক by শান্তনু চৌধুরী

গোবিন্দ হালদারের কথা ও আপেল মাহমুদের সুরে কালজয়ী গান ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না’। জাগরণের গানটি শুনতে শুনতে কথা বলছিলাম সমাজবিজ্ঞানী অনুপম সেনের সঙ্গে। আজ বৃহস্পতিবার থেকে চট্টগ্রামের ডিসি হিলে শুরু হচ্ছে ১০ দিনের ‘স্মৃতি একাত্তর’ শীর্ষক মুক্তিযুদ্ধের বইমেলা। তিনি এ মেলার আয়োজকদের অন্যতম।
মেলার মাধ্যমে কোন বার্তাটি তাঁরা মানুষের কাছে পৌঁছাতে চান, জানতে চাইছিলাম সেটা। অনুপম সেন বলেন, ‘বাঙালির হাজার বছরের জীবনে মুক্তিযুদ্ধ একটি বৃহত্ ঘটনা। এর মাধ্যমেই বাঙালি প্রকৃত অর্থে প্রথম স্বাধীনতা অর্জন করে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাঙালির জীবনে যেভাবে স্বাধীনতা এসেছে, তা জনগণের ছিল না। ফলে রাষ্ট্রটিও ছিল না জনগণের। কিন্তু ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাসংগ্রামের মাধ্যমে জনগণ একটি রাষ্ট্র পেল, অবশ্য এর জন্য অনেক মূল্যও দিতে হয়েছে। বাঙালির এই স্বাধীনতার ইতিহাসটি হাজার হাজার বছর ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পাবে। আমরা চাইছি বইমেলার মাধ্যমে আমাদের তরুণ প্রজন্মের হাতে বই তুলে দিতে, যা তাদের মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগকে জানাতে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি যথাযথ সম্মান জানাতে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে শেখাবে।’
বাংলাদেশে এটাই প্রথম মুক্তিযুদ্ধের বইমেলা বলে দাবি করেন আয়োজকেরা। মূলত ২০০৬ সাল থেকে এ বইমেলা শুরু হয়। তখন এটিকে মুক্তিযুদ্ধের বইমেলা নাম দেওয়া হয়নি। তরুণ সংগঠক ও সাংবাদিক শওকত বাঙালির ইচ্ছা ছিল, ঢাকায় যেমন একটি বইমেলা হয়, তেমনি চট্টগ্রামেও বইমেলা হোক। সেই সময় মাত্র তিন দিন বইমেলা হয়। ২০০৭ সালে মেলা হয় সাত দিন, ২০০৮ সালে নির্বাচনের কারণে দুই দিন। শওকত বাঙালি জানালেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের প্রতিদিনের অহংকার। এই স্লোগান সামনে রেখে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে আমরা সেসব তরুণকে ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাই, যারা গত নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিল, তারাই অন্ধকার দূর করে আলো জ্বালাবে। সেসব তরুণকে আমরা জানাতে চাই, তাদের বয়সী তরুণেরাই ’৭১ সালে জীবন বাজি রেখে, জীবন দান করে এ দেশ আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিল। বইয়ের মাধ্যমে আমরা তরুণদের আলোকিত করতে চাই। তাই এবারের মেলায় আমাদের দাবি, অবিলম্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক।’
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা জানাতে এবারের মেলার ১০ দিন নামকরণ করা হয়েছে ১০ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর নামে। প্রতিদিন তাঁদের স্বজনেরা করবেন স্মৃতিচারণা। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যেসব স্বজন স্মৃতিচারণা করবেন, তাঁরা হলেন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর ছেলে আসিফ মুনীর, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মেয়ে মেঘনা গুহঠাকুরতা, জহির রায়হানের ছেলে অনল রায়হান, শহীদুল্লা কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার, আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ, সিরাজুদ্দীন হোসেনের ছেলে জাহীদ রেজা নূর, সেলিনা পারভীনের ছেলে সুমন জাহিদ, অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিনের বোন অধ্যাপক হামিদা বানু, ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. শম্পা আলীম ও অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিনের স্বজনেরা। বইমেলার উদ্বোধন করবেন প্রবীণ সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। বইয়ের আদলে তৈরি ক্যানভাসে স্বাক্ষর করে এ মেলার উদ্বোধন করা হবে। মেলায় প্রতিদিন থাকছে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেওয়া যোদ্ধাদের কথামালা দিয়ে সাজানো ‘রণাঙ্গনের স্মৃতিচারণ’। প্রথম দিনে এ স্মৃতিচারণায় অংশ নেবেন বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান।
মেলায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নাটক, প্রামাণ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হবে প্রতিদিন। এর মধ্যে রয়েছে জীবন থেকে নেয়া, পলাশী থেকে ধানমন্ডি, ধ্রুবতারা, যুদ্ধাপরাধ, স্পার্টাকাস ’৭১, শরত্ ’৭১, আলোর মিছিল, মুক্তিযুদ্ধের গান, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জয়যাত্রা ও মাটির ময়না। প্রথমা থেকে প্রকাশিত প্রথম আলোর সংকলন একাত্তরের চিঠি থেকে প্রতিদিন পাঠ করবেন আবৃত্তিকারেরা। দেশের খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, নাট্যকার ও কবিরা অংশ নেবেন প্রতিদিনের আলোচনায়। এ ছাড়া রয়েছে শিশু-কিশোরদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। এবারের বইমেলায় বাংলা একাডেমী, শিশু একাডেমী, নজরুল ইনস্টিটিউটসহ খ্যাতনামা প্রকাশনীর ৫০টি স্টল রয়েছে। মেলার আয়োজক ‘আমরা করবো জয়’ নামে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী একটি সংগঠন। এ ছাড়া সহযোগী সংগঠন হিসেবে থাকছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতি পাঠাগার এবং ও এফ মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন।
মুক্তিযুদ্ধের বইমেলায় শহীদদের স্বজনদের প্রতিদিনের স্মৃতিচারণার বিষয়টি অনুভব করার জন্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ প্রস্তুত। তাঁদের এ স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে আজকের তরুণেরা হয়তো সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ সন্ধান করবে। মুক্তিযুদ্ধের বইমেলা সফল হোক—সেটাই চাইছে চট্টগ্রামবাসী।

সেদিন জ্যাক জেকব ব্যর্থ হলে কী ঘটত by মিজানুর রহমান খান

জেনারেল জ্যাক ফ্রেডরিক রালফ জেকবের কাছ থেকে একটি ই-মেইল পেয়েছিলাম ১০ ডিসেম্বর। তিনি লিখেছেন, ‘শুভেচ্ছা। গুগলে গিয়ে ইউটিউবে যান। সেখানে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণসংক্রান্ত একটি সবাক শর্ট ফিল্ম পাবেন। আরও কিছু সবাক প্রামাণ্যচিত্র পাবেন ডান দিকে। এর মধ্যে ভুট্টোকে দেখা যাচ্ছে, তিনি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পোলিশ রেজুলেশন ছিঁড়ে ফেলছেন। আপনি চাইলে এসব প্রামাণ্যচিত্র বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ডিস্কে স্থানান্তর করে দেখতে পারেন। এ সবই ইতিহাসের রেকর্ড।’
১৫ ডিসেম্বর মধ্যরাতে জেকবকে শুভেচ্ছা জানালাম একাত্তরে তাঁর বীরোচিত ভূমিকার জন্য। ‘একাত্তরের এই দিনটিতে আপনার অবিস্মরণীয় ভূমিকা শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। বাইবেলের নিউটেস্টামেন্ট থেকে উদ্ধৃতি দিই। এর সার কথা হচ্ছে—তোমার কাছে যার যা প্রাপ্য, তাকে তা দিয়ে দাও। যে কর আদায় করে, তাকে কর দাও; যাদের শ্রদ্ধা করা উচিত, তাদের শ্রদ্ধা করো; যাদের সম্মান পাওয়া উচিত, তাদের সম্মান করো। শুধু পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার ঋণ ছাড়া কারও কাছে ঋণী থেকো না।’ (রোমীয় ১৩:৭-৮)
এরপর তাঁকে বলি, ‘এবার ঠিক ১৬ ডিসেম্বরে আপনার কী অনুভূতি, জানতে পারলে খুশি হতাম।’ বয়সের কথা ভেবে সতর্ক থাকি। এ বয়সে আমরা অনেকেই যখন ই-মেইলে চিঠির জবাব দিতে আলস্য করি, তখন জেকব ই-মেইলে দারুণ চটপটে, প্রাণোচ্ছল। কিন্তু তার পরও তাঁর বয়স পঁচাশি অতিক্রান্ত। তিনি যা লিখেছেন তার তরজমা নিচে দেওয়া হলো: ‘‘হাই। নিয়াজি একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠালেন। এতে নির্দিষ্টভাবে জাতিসংঘের অধীনে সামরিক, আধাসামরিক বাহিনী এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রত্যাহারের কথা বলা হলো। সরকার তুলে দিতে হবে জাতিসংঘের কাছে। যুদ্ধাপরাধের কোনো বিচার করা যাবে না। তাঁর প্রস্তাবে ভারতের কোনো উল্লেখই ছিল না। যুদ্ধাপরাধের প্রস্তাবগুলো ভুট্টো সরাসরি নাকচ করে দেন। ১৫ ডিসেম্বর ভারত একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করল। ১৬ ডিসেম্বরের সকালে জেনারেল মানেকশ আমাকে শুধুই জানিয়ে দিলেন, ঢাকায় যাও এবং আত্মসমর্পণের ব্যবস্থা করো। আমি আত্মসমর্পণের দলিলের খসড়া নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করলাম। এই খসড়ার অনুলিপি আগেই দিল্লিতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু দিল্লি থেকে কোনো জবাব আসেনি। এখানে হামুদুর রহমান কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে একটি উদ্ধৃতি দেওয়া প্রাসঙ্গিক। হামুদুর রহমান প্রশ্ন রেখেছিলেন জেনারেল নিয়াজিকে:
মি. নিয়াজি, যখন আপনার ২৬ হাজার ৪০০ সেনা ছিল ঢাকায়, তখন মাত্র কয়েক হাজার ভারতীয় সেনা ছিল ঢাকার বাইরে। আপনি তো অন্তত আরও দুই সপ্তাহের বেশি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারতেন। ওই সময় জাতিসংঘের অধিবেশন চলমান ছিল। এবং আপনি যদি আর একটি দিনও বেশি যুদ্ধটা চালিয়ে নিতেন, তাহলে ভারতীয়দের হয়তো পিছু হটতে হতো। তাহলে কেন আপনি একটি লজ্জাজনক, জনতার সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ কবুল করেছিলেন? কেনই বা আপনি আপনার খোদ এডিসির নেতৃত্বে এমনকি একটি গার্ড অব অনার প্রদানেও রাজি হয়েছিলেন?
নিয়াজি উত্তর দিয়েছিলেন, আমাকে এসব করতে জেনারেল জেকব বাধ্য করেছিলেন। জেকব আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে আত্মসমর্পণ ইত্যাদি করিয়েছিলেন। জেনারেল নিয়াজি কিন্তু এই মন্তব্য তাঁর বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান বা পূর্ব পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতকতা শীর্ষক গ্রন্থেও উল্লেখ করেছেন।’’
গত বছর সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে তাঁর আরকে পুরমের স্বল্প আয়তনের নিরাভরণ ফ্ল্যাটে (আমাদের চাকচিক্যের সঙ্গে তুলনা করলে জেকব অপাঙেক্তয়, বড় অভাজন!) আমাকে সাক্ষাত্কার প্রদানের সময়ও লক্ষ করেছি, জেনারেল জেকব ঢাকার আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান যে দিল্লির হাইকমান্ড কিংবা তাঁর বস জেনারেল মানেকশয়ের পরিকল্পনামাফিক হয়নি, এখানে তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনার প্রতিফলনজনিত একটি অনন্য কৃতিত্ব রয়েছে, তা তিনি সংযত সন্তোষের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন।
দিল্লি বা জেনারেল মানেকশয়ে নয়, তাঁর একক পরিকল্পনায় ঢাকার পতন ঘটে। বিষয়টি তিনি তাঁর বই সারেন্ডার অ্যাট ঢাকায় বিস্তারিত উল্লেখ করেন। মনে হচ্ছিল, তাঁর এই কৃতিত্ব ভারতের বিভিন্ন মহলে তেমনভাবে স্বীকৃত হয়নি। তাই ঈষত্ হলেও হয়তো তাঁর এ নিয়ে একটি সুপ্ত উষ্মা রয়েছে। ‘আপনার বই প্রকাশের সময় মানেকশ কি বেঁচেছিলেন?’ তিনি দিল্লিতে আমাকে বলেছিলেন, তিনি তখন বেঁচে। মানেকশ তাঁর দাবি খণ্ডন করেননি। জেকব মনে করেন ঢাকাকেন্দ্রিক কোনো পরিকল্পনাই মানেকশর মাথায় ছিল না। তিনি লিখিতভাবে যেটা পেয়েছিলেন তাতে শুধু খুলনা ও চট্টগ্রামের কথাই ছিল। এসব সত্ত্বেও জেকবের দাবির সঙ্গে অনেকে ভিন্নমত পোষণ করেন। কিন্তু জেকব তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। তাঁর দ্ব্যর্থহীন যুক্তি: তাঁর দাবি উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও দলিলনির্ভর। এসব এখনো অপ্রকাশিত কিন্তু সংরক্ষিত। জেকব দাবি করেন, মানেকশর জারি করা আদেশগুলোতে কখনো ঢাকার উল্লেখ ছিল না। একাত্তরে ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রধান পি সি লাল তাঁর মাই ইয়ার্স উইথ দি আইএএফ গ্রন্থে লিখেছেন, ভারতীয় বাহিনী এটা আশা করেনি যে পাকিস্তানি সেনারা এভাবে ভেঙে পড়বে এবং ঢাকার পতন ঘটবে। এখানে আমরা কিন্তু লাল ও নিয়াজির বক্তব্যের মধ্যে একটা যোগসূত্র খুঁজে পাই। তবে একদিন নিশ্চয় বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
জেকবের সঙ্গে দিল্লিতে পর পর দুই দিন প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনা করেছি। তিনি শিশুর সারল্যে বিনম্র চিত্তে তাঁর বাংলাদেশ যুদ্ধবিষয়ক অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছেন। মুজিবনগর সরকার গঠনের সূচনায়ও তাঁর একটা কার্যকর ভূমিকা ছিল। ঢাকায় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা সম্পর্কে নিজের কৃতিত্ব বলেছেন। কিন্তু সে জন্য তিনি কখনোই অন্যকে খাটো করতে চাননি। ভারত ও বাংলাদেশের বাহিনী-সংশ্লিষ্ট যাদের সঙ্গে তাঁর মতভিন্নতা হয়েছে, তা তিনি যুক্তির নিরিখেই বর্ণনা করেছেন। জেনারেল ওসমানী, জিয়া কিংবা মানেকশ সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তিনি তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। যদিও ওসমানী ও মানেকশর বাংলাদেশ যুদ্ধ পরিকল্পনা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিগত অনেক মৌলিক তফাত্ ছিল।
জেনারেল জেকব ঢাকায় বেড়াতে এসে যেমন তেমনি তাঁর বাসভবনে সাক্ষাত্কার প্রদানকালে বাংলাদেশের জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা অনেক বড় করে দেখেছেন। তাঁর বইয়ের প্রচ্ছদে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু ঢাকার প্রকাশনায় সেটি বাদ দিয়ে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের আলোকচিত্র ব্যবহার করায় তিনি ব্যথিত। বারবার আক্ষেপ করলেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রেষ্ঠত্ব গতকালও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন অকপটে: বিজয় এসেছিল মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় বাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টায়। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের অর্জিত বিজয়ের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধারাই ডিসাইসিভ (চূড়ান্ত) ভূমিকা পালন করেন। তিনি তাঁর এই ই-বার্তাটি শেষ করেন এই বলে যে ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব দীর্ঘজীবী হোক। ইতি জ্যাক জেকব।
সংগতকারণেই জ্যাক জেকবের ঢাকার আত্মসমর্পণ পরিকল্পনার যথার্থতা সম্পর্কে মন্তব্য করব না। তবে জেকবের এই বার্তার একটি অংশ আমাকে লন্ডনের পর্যটক আকর্ষণ ট্রাফালগার স্কয়ারের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়। লন্ডনে গিয়ে অন্য অনেকের মতো আমিও ওই চত্বরে গিয়ে শুধু সিংহের মূর্তি দেখে আসি। কিন্তু তখনো বুঝিনি যে এর সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের একটি যোগসূত্র সৃষ্টি হয়ে গেছে। অন্তত একজন জ্যাক জেকবের কল্পনায়।
ঝরনাবেষ্টিত ট্রাফালগার স্কয়ারে চারটি সিংহ। প্রহরারত সিংহগুলো আগলে রেখেছে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে বহু লড়াইয়ের নন্দিত নায়ক হোরেসিয় নেলসনকে। এই নেলসনই (জন্ম ১৭৫৮) ট্রাফালগার অভিমুখে ব্রিটিশ নৌ বহরের নেতৃত্ব দেন। ১৮০৫ সালে তিনি ট্রাফালগার যুদ্ধেই নিহত হন। ফরাসিদের বিরুদ্ধে ১৮০১ সালের কোপেনহেগেনের যুদ্ধে তিনিই ছিলেন অধিনায়ক। তাঁর এক চোখ তখন অন্ধ। অ্যাডমিরাল হাইড পারকার ছিলেন নেলসনের বস। যেমন জেকবের কাছে ছিলেন মানেকশ। নেলসন যখন অমিত বিক্রমে কোপেনহেগেনের পতন ত্বরান্বিত করছিলেন। তখন অ্যাডমিরাল পারকার পতাকা দুলিয়ে তাঁকে যুদ্ধবিরতির সংকেত দেন। বিস্মিত নেলসন কৌশলী হন। তিনি তাঁর হাতে থাকা টেলিস্কোপ তাঁর অন্ধ চোখের সামনে ধরেন। আর বলেন, ‘আমি সত্যিই কোনো সংকেত দেখতে পাচ্ছি না!’ নেলসনের সেই প্রত্যুত্পন্নমতিত্বে ডেনিশ সেনারা সেদিন পরাজিত হয়। পারকার সমালোচিত হন। তাঁকে তলব করা হয়। তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ভাইস অ্যাডমিরাল থেকে অ্যাডমিরাল হন নেলসন।
জেকবের যুক্তি: যুদ্ধক্ষেত্রে ওপরের আদেশ উপেক্ষার ওই নজির আমার জানা ছিল। ‘নেলসনের কোপেনহেগেনের মতো আপনি ঢাকায় পাকিস্তানিদের পতন ঘটাতে চোখের সামনে একটি টেলিস্কোপ(!) তুলে ধরেছিলেন?’ গতকাল সন্ধ্যায় জেকবের জবাব পাই: ‘একদম ঠিক বলেছেন।’ ২ জুলাই ১৮০১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। নেলসন থেকে জেকব। মাঝখানে ১৭০ বছর। জেকব ব্যর্থ হলে কী ঘটত?
১৬ ডিসেম্বর ২০০৯ জেকব নিজেই তা উল্লেখ করে লিখেছেন: ‘ধরুন নিয়াজির প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতিকে যদি একটি নিঃশর্ত প্রকাশ্য আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে, যা কি না ইতিহাসের একমাত্র উদাহরণ, পরিণত করতে সেদিন আমি ব্যর্থ হতাম, তাহলে জাতিসংঘ সেনা প্রত্যাহারের একটি আদেশ দিত এবং তারা পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনের দায়িত্বভার তুলে নিত।’
পুনশ্চ: জেকব গতকাল তাঁর সন্ধ্যার ই-মেইলে আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও আমাদের মধ্যে এক অত্যুত্কৃষ্ট ঐক্যবদ্ধ সম্পর্ক ছিল। পূর্ব কমান্ডে কর্মরত ও মুক্তিযোদ্ধারা হাজির ছিলেন। আমরা স্মরণ করি যে সেটা ছিল আমাদের যৌথ প্রচেষ্টা, যা আমাদের বিজয় এনে দেয়।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

নারী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে -জলবায়ু পরিবর্তন by জোবাইদা নাসরীন

বিশ্ববাসীর চোখ এখন কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনের দিকে। কয়েক শ বছর ধরে চলতে থাকা জলবায়ু পরিবর্তন জানান দিতে শুরু করেছে, এর ভয়াবহতা কতটা ব্যাপক হতে পারে। আতঙ্কিত এখন পুরো বিশ্ব, কেননা বিশ্বের জনসংখ্যা এবং প্রতিবেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে, ভবিষ্যতে এর তীব্রতা আরও বাড়বে। এতে দারিদ্র্য বাড়ছে, অবকাঠামো ভেঙে পড়ার দিকে। যুগ যুগ ধরে তৈরি হওয়া উন্নয়নপ্রচেষ্টার প্রতি এটি এক বড় ধরনের হুমকি। সবার ওপরই এর প্রভাব পড়ছে, ভবিষ্যতেও পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার আগেই একে সুস্থিত করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে এ সম্মেলনে, বিশ্বের জনগণ এমন আশায় বুক বাঁধছেন। বিশ্বজুড়েই এক বড়সড় আয়োজন চলছে।
কিন্তু সবার কাছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একই রকমভাবে অনুভূত হবে না। সবচেয়ে কম সম্পদ আছে যার, সে-ই ভুক্তভোগী হবে সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে নারীর ওপরই এই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে বেশি। নারীরা আবার দরিদ্রও বটে। সম্প্রতি জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গরিব দেশের দরিদ্র নারীদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি, যদিও এই পরিবর্তনে তাদের অবদান খুবই কম। দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশনের মতে, বিশ্বের ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন দরিদ্র নারী জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের তালিকায় সবচেয়ে সামনের সারিতে।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে, তা নারীকে আঘাত করে সবচেয়ে বেশি। এ সময় নারীর সংসারের কাজ বেড়ে যায়, তাকে প্রতিকূল পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত, জ্বালানি ও পানি সংগ্রহের জন্য অনেক বেশি সময় দিতে হয়, শ্রম দিতে হয়। মেয়েশিশুদের ঘরের কাজে সহায়তার পরিমাণ বেড়ে যায়, তার স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এ সময় বাল্যবিবাহের প্রবণতাও বাড়ে। প্রাকৃতিক বিপর্যস্ততার সময় নারী একদিকে শিশুকে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করে, অন্যদিকে গৃহস্থালির জিনিসপত্র রক্ষার চেষ্টা করে। এ কাজগুলো তাদের জন্য খুব কষ্টের হয়। এ কারণেই অনেক নারী মারা যায়। ছোট শিশুরা এ সময় মায়ের কোল থেকে নামতে চায় না; সেই শিশুকে কোলে নিয়েই নারীকে চলতে হয়, ফলে নারী ও শিশু উভয়ে দুরবস্থার শিকার হয়। কোনো কোনো সময় মৃত্যুমুখে পতিত হয়। বাংলাদেশে কোন এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটার (বিশেষ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকায়) পর গর্ভবতী, দুগ্ধবতী ও বয়স্ক নারীর ক্ষেত্রে এই জলবায়ু পরিবর্তন স্বাস্থ্য-হুমকি বাড়ায়। এ সময় সাধারণত পরিবার পরিকল্পনা, প্রজনন স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কমে যায় এবং গর্ভবতী নারীর মৃত্যুর হার বেড়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়েছে, ভবিষ্যতে আরও হবে। ফলে ফসল কম হবে। তখন নারীর অপুষ্টি দেখা দেবে সবচেয়ে বেশি। কারণটিও স্পষ্ট। বাংলাদেশের মতো পিতৃপ্রধান দেশে পরিবারে খাদ্যের অসম বণ্টন, খাদ্যের মতো মৌলিক অধিকারেও নারীর প্রবেশাধিকার কম হওয়ায় এবং সামাজিক মতাদর্শের কারণে নারীর জন্য ক্যালরির পরিমাণ কমে যাবে।
বাংলাদেশের চর ও উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকে নারীরা। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সাধারণত কাজের খোঁজে শহরে বা অন্য জায়গায় যায়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এলে সেখানে থেকে যাওয়া নারীরাই তখন সন্তান আর বয়স্কদের দেখে রাখে। তীব্র সংকটের মুহূর্তেও তারা অসহায় হয়ে না পড়ে চেষ্টা করে প্রতিকূল পরিস্থিতি উতরে যেতে। নারীর এ লড়িয়ে ভূমিকার স্বীকৃতি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যেও উঠে এসেছে। গত মাসে রোমে আয়োজিত খাদ্যনিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্বসম্মেলনে অংশ নিতে গিয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রক্রিয়ায় তিনি নারীকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার জ্ঞান তাদের আছে; আর তাই জলবায়ু পরিকল্পনাবিষয়ক নীতি, পরিকল্পনা, কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মতো সকল ক্ষেত্রে নারীকে অবশ্যই জড়িত করতে হবে।’ (ইউএনবি, ১৯ নভেম্বর, ২০০৯) আমাদের সরকারপ্রধানের এমন উপলব্ধি নিঃসন্দেহে আশাসঞ্চারী। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীকে বাদ দেওয়া হয়; সমন্বিত দুর্যোগ মোকাবিলায় নারীর নিজস্ব জ্ঞান কাজে লাগানো হয় না। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সব ক্ষেত্রে নারীকে জড়িত করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ও এর প্রভাবকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সব উদ্যোগে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বজুড়েই প্রতিবেশকে বিপর্যস্ত করছে, মানুষকে স্থানান্তর করছে, উদ্বাস্তু করছে, সীমিত সম্পদের ওপর বেড়ে যাচ্ছে অকল্পনীয় প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বিপর্যস্ত এলাকায় বেড়ে যায় নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা। ধর্ষণ, যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয় নারীকে। বিপর্যয়-পরবর্তী অবস্থায় ঘরে ও শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে নারী-সহিংসতার শিকার হয়।
এর বাইরের চিত্রও আছে, বাংলাদেশের নারীরা এ অবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল নেয়। তারা বিপর্যয়ের প্রস্তুতি হিসেবে খাদ্য মজুদ রাখা, জ্বালানি, গৃহপালিত পশুদের খাবার সংগ্রহ করে রাখার চেষ্টা করে। তারা গৃহ পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়াসহ গৃহস্থালির পুনর্ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশ নেয়। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ NAPA (National Adaptation Programme of Action) তৈরি করেছে এবং এখন এটি বাস্তবায়নের পথে আছে। এখানে লক্ষণীয় যে নারীকে সব সময় জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হিসেবেই দেখানো হয়েছে; কিন্তু এ ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনাকে সামনে আনা হয়নি।
জলবায়ু পরিবর্তনে নারীর নাজুকতা এত দিন খুব বেশি স্পষ্টভাবে দেখা বা এটিকে রাজনৈতিকভাবে সামনে আনা হয়নি। কারণ, তারা এই পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন করার কৌশল জানে এবং কীভাবে এর প্রভাব কম হবে, সেটিও জানে। সংগঠক হিসেবে, নেতা হিসেবে এবং সংসারের দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে নারী জলবায়ু পরিবর্তনের সময় কার্বন ডাই-অক্সাইডের ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রেও সাহায্য করছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের নীতিতে নারীর অভিজ্ঞতা, অভিযোজন কৌশল কিংবা প্রভাবের লিঙ্গীয় দিকটি অনুল্লিখিত রয়েছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনভিত্তিক কৌশলপত্র, অর্থায়ন এবং প্রকল্পে লিঙ্গীয় দৃষ্টিভঙ্গি অতি জরুরি। এ মাসে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠেয় জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে বিষয়টি সামনে আসা প্রয়োজন।
এ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নারীর অভিজ্ঞতা ও লিঙ্গীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর প্রভাব দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে বিশাল ঝুঁকিতে থেকে যাবে বিশ্বের বড় অংশের দরিদ্র নারীরা।
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
zobaidanasreen@gmail.com

আমাদের গণতান্ত্রিক মানসের স্বরূপ -রাজনৈতিক সংস্কৃতি by মোহীত উল আলম

বাংলাদেশ আবার সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসার পর এটাই প্রথম বিজয় দিবস পড়ল। এর আগে একাধারে ১৫ বছরের সংসদীয় গণতন্ত্রের পর দুই বছর গেল ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল। সে সময় মানুষ জীবনযাপনে অধিকতর নিরাপদ বোধ করলেও স্বস্তি বোধ করেনি। মানুষ আবার গণতন্ত্রে ফিরে আসতে চেয়েছে। বিপুলভাবে তারা ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোট প্রয়োগ করেছে। আমাদের দেশের মানুষ হুজুগে, আবেগপ্রবণ, নিষ্ঠুর; আবার দয়ালু, কিন্তু তারা গণতন্ত্রমনা। আমাদের রাজনৈতিক মানসের স্বরূপ হলো, আমরা রক্তের ভেতর খাঁটি গণতন্ত্রী।
তবে রক্তের ভেতর খাঁটি গণতন্ত্রমনা হলেও আমাদের গণতান্ত্রিক মানসিকতার আরেকটি দিক হলো, আমরা উত্তরাধিকারসচেতন। অর্থাত্ বংশ বা পরিবারসচেতন। এটি পুরো ভারতবর্ষীয় সংস্কৃতির অংশ। এরই প্রতিফলন ঘটেছে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে। ভারতে গান্ধী পরিবার, পাকিস্তানে ভুট্টো পরিবার, শ্রীলঙ্কায় বন্দরনায়েকের পরিবার এবং বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ও জিয়ার পরিবারের কর্তৃত্ব বা শাসন চলছে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে—একটানাভাবে না হলেও।
প্রাচীন ভারতবর্ষীয় এ সামন্তপ্রথা বাংলাদেশে পুরোপুরি বজায় রয়েছে। একদিকে আমরা যেমন চাই যে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া পর্যায়ক্রমে দেশটাকে ভাগাভাগি করে চালান, অন্যদিকে আমরা চাই যে দেশের শাসন যেন তাঁদের দুই বংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এদিক থেকে আমরা পুরোপুরি সামন্ততান্ত্রিক। আমাদের গণতন্ত্রের মধ্যে মেঘনা নদীতে পদ্মা নদী যেমন এসে মিশেছে, তেমনি আধুনিক গণতন্ত্রের ধারার মধ্যে মোটা ধারার সামন্ততন্ত্রও মিশে গেছে।
গণতন্ত্রের সঙ্গে সামন্ততন্ত্রের মৌলিক তফাত হলো, প্রথমটা চলে যোগ্যতার ভিত্তিতে, আর দ্বিতীয়টা চলে রক্তের বাঁধনে। অষ্টাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত মনীষী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন (১৭০৬—১৭৯০) একটি রচনা লিখেছিলেন সেসব ইউরোপবাসীর জন্য, যাঁরা সে সময় আমেরিকায় অভিবাসী হওয়ার কথা চিন্তা করছিলেন। ১৭৮৪ সালে লিখিত এ রচনাটির নাম ছিল, ‘অ্যাডভাইস টু সাচ অ্যাজ উড রিমুভ টু অ্যামেরিকা।’ ফ্র্যাঙ্কলিন আমেরিকায় আগমনে ইচ্ছুক লোকদের আহ্বান জানালেও এ বলে তাদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক সমাজে মানুষের পরিচয় হলো, ‘আপনি কে?’ এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া। অর্থাত্ কার ছেলে আপনি বা কার আত্মীয় বা আপনি কোন বংশের? ফ্রাঙ্কলিন জানালেন, কিন্তু, আমেরিকায় মানুষের পরিচয় হলো, ‘আপনি কী?’ অর্থাত্, আপনি কী করেন বা কী জানেন। এটা হলো যোগ্যতার পরিচয়। বংশ বা পরিবার কোনো ব্যাপার নয়।
সম্ভবত নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি কিশোরতোষ গল্পে বাংলাদেশের গ্রামের প্রেক্ষাপটে অনুরূপ ভাবের একটি কাহিনী আছে। স্কুলের হেড পণ্ডিত লক্ষ করলেন, একটি নতুন ছেলে এসেছে ক্লাসে। তিনি ছেলেটাকে দাঁড়াতে বলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর নাম কী রে?’ ছেলেটি উত্তরে বলল, ‘বঙ্কু পালের ভাগ্নে আমি’। বঙ্কু পাল হলেন সে গ্রামের ক্ষমতাধর জমিদার।
আমেরিকায় গণতন্ত্র সে জন্য যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। বারাক ওবামাকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করার ক্ষেত্রে আমেরিকার কুশলী রাজনীতিবিদদের মনে নানা কূটকৌশল কাজ করলেও (যেমন এ চিন্তাটা যে বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদী ইসলামের দমনের ক্ষেত্রে একজন শ্বেতাঙ্গ রাষ্ট্রপতির চেয়ে একজন কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতিই বেশি কার্যকর হবে), এটা তো সত্য যে স্রেফ তাঁর যোগ্যতাবলেই ওবামা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পেরেছেন।
কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক চেতনায় দেখা যাচ্ছে, ‘আপনি কী’-এর চেয়ে ‘আপনি কে’ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সে জন্য দেখা যাচ্ছে, যখন বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরপর আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই দাঁড়াতে পারছিল না, তখন শেখ হাসিনাকে এনে দলের হাল ধরালে দলটি দাঁড়ায়। তখন যে আওয়ামী লীগে যোগ্য নেতা ছিলেন না তা নয়, আব্দুস সামাদ আজাদ, কামাল হোসেনরা তো ছিলেনই, আরও অনেকে ছিলেন। কিন্তু কেউ জনসমর্থন পাচ্ছিলেন না। শেখ হাসিনাকে মানুষ মেনে নিল তাঁর কোনো রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে নয়, বঙ্গবন্ধুকন্যা বলে। কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গেলেন, কিন্তু জনপ্রিয়তাভিত্তিক রাজনীতিতে আর দাঁড়াতে পারলেন না। সে রকম আব্দুর রাজ্জাকসহ আরও অনেকে আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে দাঁড়াতে না পেরে আবার আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ফিরে এসেছেন। বিএনপিতে কে এম ওবায়দুর রহমান, অধ্যাপক বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরী কিংবা কর্নেল অলি আহমদও খালেদা জিয়ার ছায়া থেকে বের হয়ে শেষ পর্যন্ত দাঁড়াতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ যেমন সমস্যায় পড়েছিল এবং সে সমস্যার সমাধান হয়েছিল শেখ হাসিনার আগমনে, তেমনি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও খালেদা জিয়াকে অনেকটা বাধ্য হয়ে রাজনীতিতে নামতে হয় এবং দলের হাল ধরতে হয়। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এখন অনেক রাজনীতি শিখেছেন, কিন্তু তাঁদের নিজ নিজ রাজনৈতিক জীবনের প্রারম্ভে একজন ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা, আরেকজন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। শেখ হাসিনা তাও পৈতৃকসূত্রে কিছুটা রাজনীতি চিনতেন, কিন্তু খালেদা জিয়া ছিলেন একান্তই আগন্তুক। কিন্তু তাঁদের কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতি আবর্তিত হতে থাকলে এবং অন্যদিকে দলত্যাগকারী সম্ভাবনাময় নেতা-নেত্রীরা নতুন দল গঠন করে সফল হতে না পারলে বুঝতে পারা যায় যে দেশের মানুষ চায়, বঙ্গবন্ধুর পরিবার এবং জিয়াউর রহমানের পরিবারের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে কেউ না কেউ নেতৃত্বে থাকুন। এটা আমাদের সামন্ততান্ত্রিক চাওয়া, কিন্তু এটা বাংলাদেশি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিও বটে।
৮ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ১৬ বছর পর বিএনপির কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হলে সর্বসম্মতিক্রমে যে খালেদা জিয়ার মামলাপীড়িত জ্যেষ্ঠ ছেলে তারেক রহমানকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারপারসনের পদ সৃষ্টি করে সে পদে বসানো হলো, তাতে প্রকৃত গণতন্ত্রের সমঝদারেরা মাথা চাপড়াতে পারেন, কিন্তু এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা। তারেক রহমান, তাঁর বাবার মতো এক জোড়া কালো চশমা পরে লন্ডন থেকে যখন ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে সম্মেলনে উপস্থিত কাউন্সিলরদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখছিলেন, তখন মাঠে উপস্থিত কয়েক হাজার লোক পিনপতন নিস্তব্ধতায় তা শুনছিলেন। তা হলে?
আমাদের গণতান্ত্রিক মানসিকতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো বিস্মৃতিপ্রবণতা। অর্থাত্ ভুলে যাওয়া। যে দ্রুতগতিতে আমরা বঙ্গবন্ধুর অশেষ অবদানের কথা ভুলে গেছি (যেন এ দেশটি আমাদের দিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি ধিক্কারযোগ্য), ঠিক তার চেয়েও দ্রুতগতিতে আমরা ভুলে গেছি তারেক রহমানকৃত নাজায়েজ কাজগুলো। তা হলে?
বিস্মৃতিপরায়ণতা যদিও নৈতিক দিক থেকে অকৃতজ্ঞতাপূর্ণ মনোভাবের শামিল, কিন্তু সুযোগসন্ধানী মনোভাব ও আধুনিক অর্থে যাকে জঙ্গম বা সচলতা বলা যায়, তারও সমার্থক আচরণ এটি। অর্থাত্, বিস্মৃতিপরায়ণতার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে সুযোগসন্ধানী রাজনীতির। আর দুঃখের বিষয় হলো, সুযোগসন্ধানী প্রক্রিয়া ছাড়া রাজনীতি চলে না।
তাহলে আমাদের গণতান্ত্রিক মানসিকতার আরেকটি শেকড় হলো সুযোগসন্ধানী প্রবণতা।
তবে সমাজ নিতান্তই অশিক্ষিত বলে আমাদের গণতান্ত্রিক মানসিকতার স্বরূপ হলো অশিক্ষানির্ভর। রাজনীতির জগতে পদচারণ করছেন এমন কর্মী ও সমর্থক বিশাল বাহিনীর ৮০ থেকে ৯০ ভাগ হচ্ছে প্রায় নিরক্ষর কিংবা লেখাপড়া জানলেও নিজের বিবেচনা বোধ দিয়ে চলতে পারেন না। নিজেরা যাচাই-বাছাই না করে অন্যের কথায় চলতে ভালোবাসে আমাদের জনগণ। ভালো করে বিবেচনা করলে দেখা যাবে, জিয়াউর রহমানের ব্যাপকভাবে সমালোচিত ছেলে তারেক রহমানের একটি বড় দলের নেতৃত্বে গঠনতান্ত্রিকভাবে এসে যাওয়ার মধ্যে যে চাপটা ছিল, সেটি সামন্ততান্ত্রিক চাপ হলেও তা ছিল একটি কারণ মাত্র, অপর কারণটি ছিল তাঁর পক্ষে যুবদলের একটি অংশ আওয়াজ তুলেছিল। তারা খালেদা জিয়ার ওপর চাপ দিয়ে সিদ্ধান্তটি বের করে নেয়। বিস্মৃতিপরায়ণতার সঙ্গে যখন, এ ধরনের আওয়াজ তোলা হয় তখন রাজনৈতিক ঘটনাপরম্পরায় তারেক রহমানের ভবিষ্যতে দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তা হলে?
যদি এটিই আমাদের গণতান্ত্রিক ভবিতব্য হয়, তাহলে সে ভবিতব্যকে মেনে নেওয়া কি হবে আরেকটি গণতান্ত্রিক বাস্তবতা? জানি না।
মোহীত উল আলম: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি ও মানববিদ্যা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস।

পুলিশ যখন ছিনতাইকারী -পুলিশ বাহিনীর ফলপ্রসূ সংস্কার প্রয়োজন

পুলিশ ও র্যাবের বিশেষ তত্পরতার ফলে ছিনতাইকারীদের উপদ্রব যখন কিছুটা কমে এসেছিল, তখন খবর বেরোল, খোদ পুলিশেরই একজন কর্মকর্তা সাদা পোশাকে ছিনতাই করতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়েছেন। গণপিটুনির পর গ্রেপ্তার এবং থানা-হাজতে আশ্রয় পাওয়া পুলিশের ওই সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) জিজ্ঞাসাবাদের সময় পুলিশকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় মোটরসাইকেলযোগে ছিনতাইয়ের ওই অভিযানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরও দুজন—যাঁরা পালিয়ে বেঁচেছেন—তাঁরাও পুলিশ বিভাগের সদস্য।
এক দিন আগেই সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে, ব্রাসেলস-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী এমন এক দুর্দশায় রয়েছে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গত মঙ্গলবারের ওই ঘটনা আইসিজির বক্তব্যের পক্ষে আরেকটি দৃষ্টান্ত যোগ করল বৈকি। আসলেই পুলিশের অবস্থাকে দুরবস্থা বলা ছাড়া অন্য কোনোভাবে বর্ণনা করা যায় না, এবং এ অবস্থা আজকের নতুন নয়। এ নিয়ে অনেক দিন ধরে অনেক আলোচনা, অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, পুলিশ সংস্কার নামে একটা উদ্যোগ চলেছে প্রায় চার বছর ধরে। কিন্তু পুলিশ বিভাগের উন্নতি হচ্ছে এমন কোনো লক্ষণ নেই। বরং জনগণের সেবার পরিবর্তে হয়রানি ও জবরদস্তির কাজে পুলিশ বিভাগের সদস্যদের উত্সাহ যেন দিন দিন বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে, রাজনীতিক, আমলা ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে পুলিশকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাহলে সেই বাহিনীর সদস্যদের নৈতিকতার মান বাড়বে, না কমবে, সেটা গবেষণা ছাড়াই বলা যায়।
পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের জন্য জাতিসংঘ গত চার বছরে প্রায় এক শ কোটি টাকা দিয়েছে। কিন্তু এই সংস্কারের কোনো প্রভাব পুলিশের ওপর পড়েছে এমনটি বলা যাচ্ছে না। কোনো সরকারই পুলিশকে সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবকে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়নি; বর্তমান সরকারেরও এ বিষয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রমাণ মিলছে না। আমাদের মনে হয়, সরকারের উচিত খুব গুরুত্বের সঙ্গে এসব বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ বাহিনীর সংস্কার সাধন করা। নইলে করের টাকায় জনগণ এমন পুলিশ বাহিনী কেন পুষবে।

কুয়েতে বাংলাদেশি শ্রমিক -সরকারের এখনই কিছু করা উচিত

বাংলাদেশ যে বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল ভান্ডার গড়ে তুলেছে, এর সিংহভাগ অবদানই প্রবাসী শ্রমিকদের। এই প্রেক্ষাপটে কুয়েত থেকে ৩০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক ফেরত পাঠানোর বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কুয়েত সরকার বলেছে, কাজের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও এসব শ্রমিক সেখানে অবৈধভাবে বসবাস করছিলেন। তিন মাসের মধ্যে তাঁদের দেশে ফিরে যেতে হবে। বাস্তবেই যদি এমনটা ঘটে, তবে তা শুধু এই ৩০ হাজার শ্রমিক-পরিবারের জীবন-জীবিকার ওপরই আঘাত করবে না, অর্থনীতিতেও ফেলবে নেতিবাচক প্রভাব।
১৪ ডিসেম্বর কুয়েত পার্লামেন্টে মানবাধিকার কমিটির প্রধান অবৈধ অভিবাসীদের প্রতি তিন মাসের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আইন অমান্য করে যাঁরা কুয়েতে থেকে যাবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সে দেশের সরকার। কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দাবি, দুর্বল বা অস্তিত্বহীন কোম্পানিতে যাঁরা চাকরি করেন, তাঁরাই সমস্যায় পড়েছেন। এসব কোম্পানিতে চাকরিরত শ্রমিকদের কাজ করার অনুমতিপত্র বা আকামা নেই।
সমস্যাটি পুরোনো। কুয়েত সরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলো না কেন? এ জন্য দূতাবাসের কর্মকর্তারা কোম্পানির ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে চাইছেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সভাপতি বলেছেন, তিন বছরের চুক্তি করে এসব শ্রমিক কুয়েতে গেলেও ১০-১৫ বছর ধরে সেখানে আছেন। এর মাধ্যমে তাঁরা পরিবার-পরিজনকে যেমন সাহায্য করছেন, তেমনি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন।
এর আগে মালয়েশিয়ার সরকারও সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের ফেরত পাঠানোর জন্য চাপ দিতে থাকে। সৌদি আরবে কর্মরত শ্রমিকদের অনেকে আকামা নবায়ন করতে না পেরে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। শ্রমিকেরা ফেরত আসছেন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকেও।
মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ১১-১২ মাসে জনশক্তির নতুন বাজার সৃষ্টি নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। মন্ত্রী-সচিবেরা দৌড়ঝাঁপ করেছেন। কিন্তু জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন কোনো সুসংবাদ নেই। এখন কুয়েতে অবস্থানরত শ্রমিকদের যাতে দেশে ফিরে আসতে না হয়, সে ব্যাপারে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। প্রয়োজনে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়েও সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। যে দেশে সাড়ে চার লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন, সেখানে আরও ৩০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান কঠিন কিছু হবে না। এ জন্য প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা। কেবল কুয়েতের বাংলাদেশি শ্রমিকদেরই নয়, অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বও সরকারের। আশা করি, সরকার শিগগিরই এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।