Friday, October 3, 2025

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারের ভেতরেই: ফিলিপ্পো গ্রান্ডি

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কেবল মিয়ানমারের ভেতরেই সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) ফিলিপ্পো গ্রান্ডি। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, মিয়ানমারের সাহসী পদক্ষেপ ছাড়া রোহিঙ্গাদের দুর্দশার অবসান হবে না।

গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত ‘মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে ফিলিপ্পো গ্রান্ডি এসব কথা বলেন।

ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেন, ‘এই সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। আর সমাধানও সেখানেই।’ তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আট বছর আগে মিয়ানমারের সেনাদের নির্মম সহিংসতায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে যান। আর অনেকে রাখাইন রাজ্যেই বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়ে যান।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বলেন, এখন আরাকান আর্মি রাখাইনের বেশির ভাগ এলাকা দখলে নিলেও রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। তিনি বলেন, ‘তাদের জীবনে প্রতিদিনের বাস্তবতা হলো—গ্রেপ্তার ও আটক হওয়ার ভয়, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় প্রবেশাধিকার সীমিত, চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা, জোরপূর্বক শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ। প্রতিনিয়তই তারা বর্ণবাদ ও আতঙ্কের শিকার।’

বাংলাদেশের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেন, দেশটি বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। ২০২৪ সালে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের পর আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গাকে গ্রহণ করেছে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার আরও বলেন, ‘অনেক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো রোহিঙ্গার আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তারা দেখিয়েছে, উদাসীনতা ও দায়িত্বহীন মনোভাব যখন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে, সে সময়েও সহানুভূতি দেখানো সম্ভব। শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে জীবন রক্ষা করে বাংলাদেশ তা প্রমাণ করেছে।’

বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ১২৫ কোটি ডলারের সহায়তার প্রশংসা করেন ফিলিপ্পো গ্রান্ডি। তবে বাংলাদেশে মানবিক সহায়তা তহবিলের ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে বলেও উদ্বেগ জানান তিনি।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার সতর্ক করে বলেন, পর্যাপ্ত তহবিল পাওয়া না গেলে জরুরি সহায়তা কাটছাঁট করতে হতে পারে। ফলে শিশুদের পুষ্টিহীনতা বাড়বে এবং আরও রোহিঙ্গা বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবে।

ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে তহবিল, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, শুধু মানবিক সহায়তা এই সংকট সমাধান করতে পারবে না।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বলেন, ‘আমরা উদাসীনতার পথে চলতে পারি না। একটি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস হতে দিয়ে সমাধানের আশা করা যায় না।’

ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেন, রাখাইন উপদেষ্টা কমিশনের সুপারিশগুলো আগের মতোই প্রাসঙ্গিক। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে সেগুলো দিকনির্দেশনা হওয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু সাহসী পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।’

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মির সঙ্গে সক্রিয় সম্পৃক্ততা বাড়াতে প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, যাতে মানবিক সহায়তার প্রবেশ নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে আস্থা পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত জনগণের জন্য ন্যায়সংগত ও টেকসই সমাধান গ্রহণ করা যায়।

বক্তব্যের সমাপনীতে ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেন, ‘মিয়ানমারের জনগণের জন্য ন্যায়সংগত, বাস্তব ও ভবিষ্যৎমুখী নতুন অধ্যায় শুরু করতে চাই। রোহিঙ্গাদের দুর্দশার স্থায়ী সমাধানে আমাদের সামনে এ ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।’

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) ফিলিপ্পো গ্রান্ডি
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) ফিলিপ্পো গ্রান্ডি। ছবি: ইউএনএইচসিআরের ওয়েবসাইট থেকে

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় কি হামাস রাজি হবে by জেসন বার্ক

প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা (যা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও সমর্থন করেছেন) গাজার দীর্ঘ দুই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামানোর জন্য এখন পর্যন্ত যত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ।

ট্রাম্প নিজেই বলছেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের ‘হাজার বছরের’ পুরোনো সমস্যার সমাধান খুঁজছেন, আর সে লক্ষ্যে তিনি প্রচুর রাজনৈতিক ‘মূলধন বিনিয়োগ’ করেছেন। এই পরিকল্পনার পেছনে আঞ্চলিক দেশগুলোর সমর্থনও আছে বলে শোনা যাচ্ছে।

কিন্তু সমস্যা হলো, এটি আসলে কোনো স্পষ্ট ও বিস্তারিত রোডম্যাপ নয়। বরং এটিকে তাড়াহুড়া করে কাগজে টেনে দেওয়া একটা খসড়া বলা যেতে পারে। মানে, এতে গন্তব্যের দিকনির্দেশনা আছে বটে, কিন্তু তা এতটাই অস্পষ্ট ও ঝাপসা যে, যেকোনো মুহূর্তে পুরো পথ হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি হবে।

সহজভাবে বললে—এই পরিকল্পনা ঠিকঠাক কাজে লাগলে হয়তো সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারে, কিন্তু ভেতরে-ভেতরে এতে এত ফাঁকফোকর আছে যে ভুল পথে গেলে নতুন জটিলতাও তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ পরিকল্পনাটি যেমন বড় আশা দেখায়, তেমনি সমানভাবে তা ভেস্তে যাওয়ারও আশঙ্কাও বহন করে।

প্রথমত, হামাস এই পরিকল্পনা ভালো চোখে দেখবে, এমন সম্ভাবনা কম। কারণ, এতে বলা হয়েছে হামাসকে সব কিংবা অধিকাংশ অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে; আর গাজা পরিচালনা করবে স্বয়ং ট্রাম্পের নেতৃত্ব দেওয়া এক ‘শান্তি পরিষদ’। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান মেনে নেওয়া হামাস সদস্যদের জন্য সাধারণ ক্ষমার প্রস্তাবও খুব আকর্ষণীয় নয়।

হামাস দাবি করতে পারে, তাদের কারণে সাহায্য পৌঁছাচ্ছে। অর্থাৎ, তারা বলতে পারে, তাদের সক্রিয়তা ও শক্তি না থাকলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গাজায় প্রবেশ বা লজিস্টিক কাজ করতে পারত না। তাই শুধু সাহায্য পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক অস্তিত্ব ত্যাগ করানো কঠিন।

প্রশ্ন হলো, কাতার বা অন্যরা হামাসকে কি এতটা চাপ দিতে পারবে যে হামাস অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই পরিকল্পনায় সাময়িক সম্মতি দেবে? কারণ, হামাস সম্মতি দিলে তা মূলত গাজায় তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।

আরও প্রশ্ন হলো, হামাস নেতাদের কি বোঝানো সম্ভব হবে যে তাদের হাতে থাকা ৫০ জনের মতো ইসরায়েলি বন্দী আসলে এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে—কারণ এটিকেই অজুহাত বানিয়ে ইসরায়েল যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে? গাজার সামরিক কমান্ডাররা কি কাতার বা ইস্তাম্বুলে থাকা রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে একমত হবেন? এসব প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত জবাব নেই।

ট্রাম্প বলছেন, আরব দেশগুলো নাকি গাজাকে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে রাজি হয়েছে। যদি সত্যি তা–ই হয়, তাহলে এটি অবশ্যই বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর মানে আসলে কী? এসব আরব দেশ কি গাজায় সেনা পাঠাবে, শুধু টাকা দেবে নাকি দুটোই করবে?

এখন পর্যন্ত কোনো দেশ সরাসরি বলেইনি যে তারা সেনা পাঠাবে। অথচ কাজটা হবে ভীষণ জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। সেনা পাঠানো বা পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে মাসের পর মাস লেগে যাবে আর সেই সময়েই কে কী করবে, তা নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা অনেক।

ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারকে নিরস্ত্রীকরণের গতি ও মাত্রার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এটি ইসরায়েলের জন্য সুবিধাজনক। কারণ যেসব এলাকা তারা ছাড়বে, সেগুলো আগেই তাদের ধ্বংসাত্মক অভিযানে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ধীরগতির প্রত্যাহার তাদের জন্য ক্ষতির নয়। হয়তো একসময় তারা শুধু সীমানার পাশে গিয়ে অবস্থান করবে, কিন্তু কত দিন লাগবে, সেটি অনিশ্চিত। প্রকাশিত মানচিত্রও অস্পষ্ট। এগুলো হামাসের সাম্প্রতিক আলোচনায় করা দাবির সঙ্গে একেবারেই মেলে না। আর কোনো পর্যায়েই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি।

নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প দুজনই জোর দিয়ে বলেছেন, যদি বিষয়গুলো তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী না এগোয়, আর আরব দেশগুলো হামাসকে চাপ দিতে না পারে, তবে মার্কিন সমর্থন নিয়ে ইসরায়েল আবার সামরিক অভিযান শুরু করবে।

চুক্তি কার্যকর হওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হামাস বন্দীদের মুক্তি দিলেই ইসরায়েল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার সুযোগ পেয়ে যাবে। এর আগে মার্চ মাসে ইসরায়েল দুই মাসব্যাপী যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ভেঙেছিল।

আঞ্চলিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা (অর্থাৎ আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নত করা) এবং আব্রাহাম চুক্তি আরও এগিয়ে নেওয়া একধরনের আকর্ষণীয় লক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকেরা (সরকার ও নেতৃত্ব) আসলে এই লক্ষ্যগুলোকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না।

নিজ দেশে বিভাজন বাড়ছে, যুদ্ধবিরোধী মনোভাব ছড়াচ্ছে, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা বাড়ছে—এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহু হয়তো হিসাব কষেছেন, যুদ্ধ চালিয়ে গেলে সামান্য লাভ হলেও তার খরচ অনেক বেশি। তাই তাঁর জন্য এখনই ‘বিজয় ঘোষণা’র সময়।

এখন নেতানিয়াহু নতুন এক প্রচারণা শুরু করছেন। পুরো সংঘাতকালেই দুর্নীতির অভিযোগে কারাদণ্ডের হুমকির মুখে থাকা নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা আঁকড়ে রাখাকেই মূল লক্ষ্য করেছেন। এবার মনে হচ্ছে তিনি ভাবছেন, তাঁর জোটের অতি ডানপন্থী সদস্যরা সরকার ছাড়লেও তিনি টিকে থাকবেন। হয়তো তিনি তাঁদের হুমকিকে পাত্তা দেবেন না বা নেসেটে (পার্লামেন্ট) সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখবেন। তাঁর ধারণা, এক বছরের মধ্যে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে তিনি জিততেও পারেন।

ট্রাম্প যে পরিকল্পনা টেনেছেন, তাতে হামাস ছাড়া বাকিরা সম্মতি দিয়েছে—এটা বড় কথা। তবে সত্যিকারের কাজ এখন শুরু। হামাসকে রাজি করে নেওয়া গেলেও অনেক ছোট-বড় বিষয় পরিষ্কার করতে হবে, সবকিছু লিখে চুক্তিতে আনতে হবে এবং তারপর তা বাস্তব করতে হবে। এগুলো করতে সময় লাগবে এবং তা সহজও না। তাই সফল হওয়া বা স্থায়ী শান্তি পাওয়া এখনো অনিশ্চিত।

* জেসন বার্ক, দ্য গার্ডিয়ান-এর কলাম লেখক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

হোয়াইট হাউসে সোমবার যৌথ সংবাদ সম্মেলনে  ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
হোয়াইট হাউসে সোমবার যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

পৃথিবীর সব সরকারের ভেতরে সরকার থাকে -বিশেষ সাক্ষাৎকারে: আসিফ নজরুল

অধ্যাপক আসিফ নজরুল অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা। এক বছরে সরকারের সাফল্য–ব্যর্থতা, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, ঢালাও মামলা, গ্রেপ্তার, মব–সন্ত্রাস, রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ, সমাজে বৈষম্য, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কমিশন, নির্বাচন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। ১ আগস্ট আইন উপদেষ্টার সরকারি বাসভবনে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রাজীব আহমেদ

প্রথম আলো: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। আপনি কি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, সরকারের পতন আসন্ন?

আসিফ নজরুল: ধারণা করতে পেরেছিলাম। মিছিলে, সমাবেশে এমন পরিচিত মানুষদের দেখতে পারছিলাম, যাঁরা আগে কখনো আসেননি। তারপর শত নির্যাতনের পরও ছাত্রনেতাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় মানুষের ঢল, দ্রোহযাত্রা, সেনাসদরে সেনাপ্রধানের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছিল, শেখ হাসিনা এবার আর টিকতে পারবেন না। ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে ছাত্র–জনতার বিশাল সমাবেশে বলেছিলাম, জয় তোমাদের সুনিশ্চিত।

প্রথম আলো: সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কি আপনার সঙ্গে ৫ আগস্টের আগেই যোগাযোগ করা হয়েছিল? তারা কী বলেছিল?

আসিফ নজরুল: জুলাইয়ের একদম শেষ দিকে রাতের বেলায় সেনাবাহিনীর পরিচয় দিয়ে সিভিল ড্রেসে একজন এসেছিলেন আমাদের পাড়ায়।

আমাকে খুব সাবধানে থাকতে এবং রাতে বাসায় না ঘুমাতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি আদৌ সেনাবাহিনীর কি না, তা নিয়ে তখন সংশয় ছিল। ভয়ে অবশ্য তাঁর পরিচয় ভেরিফাই করার চেষ্টা করিনি। এরপর ৫ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে সেনাবাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার ফোন করে তাঁর পরিচয় জানিয়ে আমাকে ক্যান্টনমেন্টে আসার আমন্ত্রণ জানান। আমি রিজওয়ানা হাসান আর মির্জা ফখরুল ভাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমার স্ত্রী খুবই ভয় পেয়েছিল। সে দোয়া পড়ছিল, সেনাবাহিনী যে গাড়ি পাঠিয়েছিল, সে সেটার ছবি তুলে রেখেছিল। তারা তাকে বারবার অভয় দিচ্ছিল। এরপর ৫ তারিখ সারা দিন যে অভিজ্ঞতা হলো, তা অকল্পনীয় ও অবিশ্বাস্য।

প্রথম আলো: অন্তর্বর্তী সরকারের এক মাস পূর্তিতে আমি আপনার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তখন বলেছিলেন, মানুষের নিয়ত যদি সৎ হয়, দেশপ্রেম ও ইচ্ছাশক্তি থাকে, তাহলে যেকোনো কাজ করা সম্ভব। এখন এক বছর পূর্তিতে আমি জানতে চাই, সরকার আসলে কী করতে পারল, আপনার মন্ত্রণালয় কী করতে পারল?

আসিফ নজরুল: আপনাকে যেটা বলেছিলাম, তা অনেকাংশে সত্যি। যেকোনো কাজ করা সম্ভব না হলেও অনেক কিছু করা যায়। আমার মন্ত্রণালয় কী করেছে, তার একটা হিসাব দিয়েছি ৩১ জুলাই। আমরা ১৬-১৭টি আইন (নতুন ও সংশোধন) করেছি। দেওয়ানি ও ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন করা, লিগ্যাল এইড সার্ভিসকে সম্প্রসারিত করা, অনলাইন বেল (জামিন) বন্ড দেওয়ার আইন করা, ডিজিটালাইজেশনের পদক্ষেপ—এমন অনেক কিছু আছে। কিছু কাজ আমরা করেছি, যেটা আগের কোনো সরকারের আইন মন্ত্রণালয়কে করতে হয়নি। আমরা ১৬ হাজারের বেশি হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছি। এটা শুধু বৈঠক করে হয় না, মামলার নথি ধরে ধরে পর্যালোচনা করতে হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ রকম নেই যে একটা মন্ত্রণালয় এক বছরে প্রায় পাঁচ হাজার সরকারি আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছে, সেটি করেছি।

আমি মনে করি, সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য অর্থনৈতিক খাতের শৃঙ্খলা আনা। আমরা শেখ হাসিনার আমলে শুনতাম, তিনি নিজেও বলেছিলেন, দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে। অর্থনীতিতে ধস নামার লক্ষণ ছিল। সেটা ঠেকানো গেছে। আমি সব সময় শুনতাম যে এ রকম একটা পরিস্থিতিতে বিনিময় হার (ডলারের দাম) অত্যন্ত বেড়ে যায়। সেটা বাড়েনি, বরং এখন কমতির দিকে। আমাদের রিজার্ভ (বৈদেশিক মুদ্রার মজুত) বেড়েছে, ব্যবস্থাপনা ভালো হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা আসছে, মানুষের আস্থা ফিরছে। রোজার মাসে দ্রব্যমূল্য কিছু কিছু কম রাখা গেছে। হজ ব্যবস্থাপনার উন্নতি হয়েছে। অপচয় কমানো গেছে। ফাওজুল কবির ভাইয়ের (বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান) হাতে যেসব মন্ত্রণালয় আছে, সেখান থেকে তিনি ৪৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করেছেন। এটা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কাটছাঁট ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিয়ে করা হয়েছে।

বিপ্লব-উত্তর পরিস্থিতিতে যে বিশৃঙ্খল একটা অবস্থা থাকে, সেটা যদি না থাকত, আরও বেশি কিছু করা যেত।

প্রথম আলো: নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে আপনি ৩০ বছর বিভিন্ন সরকারের অন্যায় কাজের সমালোচনা করেছেন। এখন সরকারে আছেন। আসলে কী করতে পারেননি?

আসিফ নজরুল: আমাদের দুটি বড় ব্যর্থতা হচ্ছে ‘মব–সন্ত্রাস’ ও ঢালাও মামলা। মব–সন্ত্রাস দমন করার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, পুলিশ মোরাল (নৈতিক অবস্থান) ছিল না। যে পুলিশ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিপক্ষ ছিল, সেই পুলিশ যখন দেখে গণ-অভ্যুত্থানের দাবিদার বলে কিছু মহল মব করছে, তখন সেটা দমন করতে পারেনি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অসহায় হয়ে মাঝেমধ্যে বলেন, ‘আপনারা আমাকে ক্লিয়ারলি (পরিষ্কারভাবে) বলেন কী করব, বল প্রয়োগ করব, নাকি করব না।’ আমরা পুলিশের ভয়াবহ বলপ্রয়োগের স্মৃতির পর সেটা করতে বলতে পারি না। দেখবেন, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ উল্টো মার খেয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লব-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে শৃঙ্খলা একটু কমে যায়। কারণ, তারা একটা অন্য রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট রেজিমের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। হঠাৎ করে সবাই সুশৃঙ্খল হয়ে যায় না। আপনি মহান মুক্তিযুদ্ধের পরের অবস্থা দেখেন, সেখানে তো একটা দলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল। তারপরও তো শৃঙ্খলা আনতে পারেনি। তবে আমরা বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি।
প্রথম আলো: আপনি মুক্তিযুদ্ধের পরের কথা বললেন। সেটার মাশুল তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দিতে হয়েছে। তাঁর সরকার খুব দ্রুত অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি নৃশংস হত্যাকাণ্ডেরও শিকার হন।

আসিফ নজরুল: সেই সময় তো অনেক সন্ত্রাস হয়েছে সরকারের স্বার্থ পূরণের জন্য। যেমন রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ড বা সিরাজ শিকদারের মতো নেতাদের হত্যা। এখনকার সময়ে আপনি কী দেখেছেন, আসিফ নজরুল বা অন্য কোনো উপদেষ্টা মব–সন্ত্রাস করাচ্ছেন? কিংবা ক্ষমতায় থাকার জন্য আমরা বাহিনী লেলিয়ে দিচ্ছি। তখন এক দলের দুঃশাসন ছিল। এখন তো পার্সপেকটিভটা ডিফারেন্ট (পটভূমি ভিন্ন)।
প্রথম আলো: আসিফ নজরুলকে মব করাতে দেখিনি, তবে আমরা দেখেছি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তারা মব দমন করতে চেয়েছেন। পরে তাঁদের প্রত্যাহার করা হয়েছে।

আসিফ নজরুল: দু-একটা ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বার্থে প্রত্যাহার করতে হয়েছে। আপনি তো জানেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন কী রকম বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো কর্মকর্তাকে আরও ভালো জায়গায় (প্রত্যাহার করে) নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটা শাস্তি হিসেবে নয়।
প্রথম আলো:

ঢালাও মামলার কথা আপনি বলছিলেন।

আসিফ নজরুল: দেখেন, মামলা সরকার করেনি, করেছেন ভুক্তভোগীরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে মামলা–বাণিজ্যের প্রত্যাশী একশ্রেণির আইনজীবী জুটে গেছেন।
প্রথম আলো: কিছু দলের কিছু নেতাও জড়িত।

আসিফ নজরুল: প্রশ্ন হলো, পুলিশ ফিল্টার (যাচাই করে আসামি করা) করতে পারে না কেন? প্রথম দিকে পুলিশকে আমরা বলেছিলাম। পুলিশ যখন ফিল্টার করতে গেছে, তখন তাদের বলা হয়েছে যে তারা সারা জীবন ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েছে। এখন সমস্যা কী? পুলিশের ওই নৈতিক মনোবলটাই নেই। সারা হোসেন (সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী) বললেন, ‘আপনারা পারছেন না কেন?’ আমি বললাম, আপনি আমাকে সলিউশন (সমাধান) দেন। আজকে তিন মাস হয়ে গেছে। তারপর আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করেছি।
প্রথম আলো: দুঃখিত স্যার। আপনাকে থামিয়ে একটা প্রশ্ন করি। সেটা হলো, আপনি বলছেন সরকার একটা মামলাও করেনি। কিন্তু সরকারের পাবলিক প্রসিকিউটর, সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল মামলাগুলোয় জামিনের বিরোধিতা করছেন। কেউ হাইকোর্টে জামিন পেলে আপিল করে আটকে দেওয়া হচ্ছে। এক মামলায় জামিন পেলে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

আসিফ নজরুল: মামলাগুলো হত্যার ঘটনার। এসব মামলায় আওয়ামী লীগের লোকেদের সংশ্লিষ্টতা বা মদদ নিয়ে সন্দেহ করার অবকাশ কম। কিন্তু এর বাইরে যাঁরা নিরীহ সাধারণ মানুষ আছেন, তাঁদের অনেকে জামিন পাচ্ছেন। কয়েকজন নেতাও পেয়েছেন। আমি কয়েকটা নাম চট করে বলি, প্রফেসর আবদুল মান্নান জামিন পেয়েছেন, সাবের হোসেন চৌধুরী জামিন পেয়েছেন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে গ্রেপ্তারই করা হয়নি। এ রকম কিছু উদাহরণ কিন্তু আছে।
প্রথম আলো: আমিও যোগ করি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকও জামিন পেয়েছেন। এ রকম কয়েকটি ঘটনা আছে। কিন্তু সেটা সমালোচনা হওয়ার পর। এটাও বলা হয় যে বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের তো হত্যা মামলায় আটকে রাখার কারণ নেই। তাঁদের দুর্নীতি বা অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি খতিয়ে দেখাই সমীচীন।

আসিফ নজরুল: বোধ হয় শতাধিক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আমার জানামতে, সাত-আটজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। আপনাকে গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, মামলাগুলোর পেছনে সরকারের কোনো পক্ষের মদদ নেই। এখন আপনাকে বলি, ধরেন, যারা সাধারণ ভুক্তভোগী, তারা যখন দেখেছে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, তখন কোনো সাংবাদিক যদি রক্তপিপাসু প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘আপনি যা করছেন ঠিক আছে। আমরা আপনার সঙ্গে আছি,’ সেটা কি মদদ নয়?
প্রথম আলো: সেটার বিচার তো ট্রাইব্যুনালে হতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট হত্যা মামলায় তাঁদের আসামি করা কি যৌক্তিক?

আসিফ নজরুল: যাঁরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে অভিযুক্ত, তাঁদের ক্ষেত্রে তো কমান্ড রেসপনসিবিলিটির ব্যাপার আসবে। কিন্তু তার বাইরে যেটা আছে, এই ইনস্টিগেশন করা (উসকানি দেওয়া), এটা কেউ কেউ করেছে। এটা তো গুরুতর অপরাধ।
প্রথম আলো: তাহলে আপনি কি বলছেন, বিচার যত দিন চলবে, তাঁরা কারাগারে থাকবেন?

আসিফ নজরুল: সেটা তো আমি বলতে পারব না। বিচার চলাকালে যদি বিচারক মনে করেন...এটা বিচারকের বিবেচনার বিষয়।

প্রথম আলো: বিচারক কি স্বাধীনভাবে রায় দিতে পারেন? বলা হচ্ছে, বিচারালয়ে ভয়ের পরিবেশ আছে। ধরুন, আজকে বিচারক সাংবাদিক শ্যামল দত্তকে জামিন দিলেন। পরের দিন বিচারক মবের শিকার হবেন না, সেটা নিশ্চিত?

আসিফ নজরুল: আমি তো বিচারকের মানসিক অবস্থা বলতে পারব না। তবে আপনাকে একটা জিনিস বলি, ১৫ বছর বিচারকদের ভয়ের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করা হয়েছে। বলে দেওয়া হয়েছে, কাকে জামিন দেবেন, কাকে দেবেন না। সেই বিচারকেরও নিজের অতীতের কথা মনে পড়ে যে অতীতে আমি কী করেছি বা কীভাবে ইউজড (ব্যবহৃত) হয়েছি। ১৫ বছর ভয়ের পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে এবং ওই রাজনৈতিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দিয়ে এখন হঠাৎ করে তাঁর মানসজগতে নিজের অতীত বিবেচনা বা বর্তমান পরিস্থিতির বিবেচনা উঠে যাবে, এটা সবার ক্ষেত্রে না–ও হতে পারে।
প্রথম আলো: কিন্তু স্যার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তো একটা বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল ন্যায়বিচার।

আসিফ নজরুল: ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা কার কাছে কী? কমপক্ষে হাজার লোক মারা গেছেন, কমপক্ষে এক লাখ কোনো না কোনোভাবে আহত হয়েছেন, ১৫ বছরে লাখ লাখ মানুষ জীবিকা থেকে বঞ্চিত হওয়া, গুমসহ বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তাঁরা যদি মনে করেন, এটাই (মামলায় আসামি করা) তো আমার এখন ন্যায়বিচার। আমাকে একটা আইন দেখান যে আমরা কাউকে মামলা করা থেকে বিরত করতে পারি। আপনাকে আবার বলি, পুলিশ কেন স্ক্রুটিনি (যাচাই-বাছাই) করে না। আগের আমলে পুলিশ এক পক্ষের মামলা নিত, আরেক পক্ষের নিত না। এখন পুলিশ মামলা নিচ্ছে। ১৫ বছরের যে অপরাধবোধ, যে সংস্কৃতি, সেই একই পুলিশ, একই বিচারালয়, রাতারাতি মুক্ত হয়ে যাবে, এটা এত সহজ না। আরেকটা কথা আপনাকে বলি, মামলা তো ভুয়া না। আপনি অভিযোগ করতে পারেন যে মামলায় অনেক লোককে জড়ানো হয়েছে, যাঁরা এই মামলায় জড়িত হওয়ার কথা নয় এবং এর মাধ্যমে বাণিজ্য করা হচ্ছে।
প্রথম আলো: মামলা ভুয়া, সেটা বলছি না। আগের সরকারের আমলে ছিল ‘গায়েবি মামলা’। এখন ‘ইচ্ছেমতো’ আসামি।

আসিফ নজরুল: হ্যাঁ, বলতে পারেন। তবে পার্থক্য হলো, আগের সরকারের সময় সরকার মামলা করত। এখন ভুক্তভোগী মানুষ মামলা করছেন। আগের আমলে পুরো মামলাই ছিল গায়েবি, পুরোপুরি কল্পিত। এখন মামলার অভিযোগটা সত্যি, অনেক লোককে যে জড়ানো হচ্ছে, এটা হয়তো সত্যি নয় অনেক ক্ষেত্রে।
প্রথম আলো: কিন্তু স্যার, বিগত সরকারের আমলে মামলা দিয়ে দিনের পর দিন জেলে আটকে রাখা হতো, জামিন দেওয়া হতো না, এখনো আমরা সেটাই দেখি।

আসিফ নজরুল: পার্থক্য আছে। আগের সরকারের আমলে গায়েবি মামলা দিয়ে অনেক আসামি করা এবং প্রচুর আসামিকে ধরা হতো। আমরা পুলিশকে কড়াভাবে বলে দিয়েছি, প্রমাণ পেলেই কেবল আসামি ধরা যাবে। আমার ধারণা, আমাদের সরকারের সময় মোট আসামির বড়জোর ১০ শতাংশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রথম আলো: সর্বশেষ উদাহরণটি দেখি। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি (খায়রুল হক), যাঁর বিরুদ্ধে চরম বিতর্কিত রায় দেওয়া, রায় পরিবর্তনের অভিযোগ আছে। কিন্তু হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা কি যৌক্তিক মনে হচ্ছে?

আসিফ নজরুল: ওনার বিরুদ্ধে তিনটা মামলা রয়েছে। পুলিশ তাঁকে আদালতে তুলেছে হত্যা মামলায়। পরে তাঁকে রায় পরিবর্তন–সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং রিমান্ডও এই মামলায় শুধু চাওয়া হয়েছে। আপনাকে একটা কথা বলি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে চূড়ান্ত রায় যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের মধ্যে দুজন বিচারপতি লিখেছেন, বিচারপতি খায়রুল হক সংক্ষিপ্ত রায়ের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ রায়ের ব্যত্যয় করেছেন। এটা তো আইনসিদ্ধ নয়। তাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা, রিমান্ডে নেওয়া নিয়ে আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন না।
প্রথম আলো: না স্যার, তাঁকে গ্রেপ্তার-রিমান্ড নিয়ে আমার প্রশ্ন নেই। আমার প্রশ্ন, কেন রায় জালিয়াতির বদলে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার?

আসিফ নজরুল: ১৫ বছর পুলিশ নিয়োগ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিবেচনা ছিল আওয়ামী লীগ করে কি না, অনেক ক্ষেত্রে গোপালগঞ্জ বাড়ি কি না। সেই পুলিশের সবাই আমাদের জন্য শতভাগ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করবে—এটা বোধ হয় একটু বেশি চাওয়া। পুলিশে দক্ষতার ঘাটতিও আছে। পুলিশে আবার অনেকেই আছেন, যাঁরা দায়িত্বশীল ও আন্তরিক।
প্রথম আলো: জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বিচার কতটা এগোল?

আসিফ নজরুল: দুই জায়গায় বিচার হচ্ছে। একটা হলো সাধারণ আদালতে। অন্যটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। আমি মনে করি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা যথেষ্ট ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের তদন্ত ও প্রসিকিউশন দলের কাছে প্রথম থেকে প্রত্যাশা ছিল, মামলা যেন যেনতেনভাবে পরিচালিত না করা হয়। শক্ত প্রমাণ যাতে থাকে এবং তা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। আপিলের আদালতে রায় যেন টিকে থাকে। শেখ হাসিনার আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যে বিচার হয়েছিল, সেখানে টেলিফোনে-স্কাইপে রায় লিখে নিয়ে আসত। এখানে এ রকম কিছু হবে না। আমরা গত নভেম্বরে কাজ শুরু করেছি। আট মাসের মাথায় মামলার বিচার শুনানি পর্যায়ে চলে গেছে। আমি মনে করি, এটা যথেষ্ট অগ্রগতি।

আমি জানি, আপনি প্রশ্ন করবেন যে আমি বলছি বিচার এত দিনে হয়ে যাবে। দেখেন, এ বিষয়ে আমি আমার ধারণা ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে কথা বলি। যখন শহীদ পরিবারগুলো কাঁদতে থাকে, তখন খুব ইচ্ছা করে যে আমি নিজের ধারণার কথা বলি। প্রসিকিউশন টিমের সঙ্গে আমি যোগাযোগ রাখি। আমি জানি, মামলা কোন জায়গায় রয়েছে। সেটার ভিত্তিতে অ্যানালাইজ করে (বিশ্লেষণ) বলেছি। প্রথমবার বিচারে যথেষ্ট অগ্রগতি ছাড়াই বলেছি, অক্টোবরের মধ্যে হয়তো রায় হবে। এখন বিচারের গতি দেখে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, অক্টোবরে না হলেও ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে হবে। আমি যখন অক্টোবরের মধ্যে বলেছিলাম, তখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারপতিরা আমাকে সতর্ক করেছিলেন। এটাই তো প্রমাণ যে আমাদের আদালত কতটা নিরপেক্ষ।
প্রথম আলো: বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়ের অগ্রগতি কতটা?

আসিফ নজরুল: পৃথক সচিবালয় মানে শুধু চেয়ার-টেবিল দেওয়া নয়। কয়েক দিন আগে একটা রুলস (বিধি) পাস হয়েছে, যেখানে বিচার বিভাগের পদ সৃজন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে হওয়ার কথা বলা হয়েছে। পদায়ন বিধিমালা হয়েছে। আরও কিছু বিধিমালা করতে হবে। আমি মনে করি, আমাদের যে গতিপথ ও কর্মপরিকল্পনা রয়েছে, এটা (পৃথক সচিবালয়) ডিসেম্বরের আগে হয়ে যাবে।

প্রথম আলো: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরে গণ-অভ্যুত্থান হলো। সমাজে যে আয়বৈষম্য ও বৈষম্য, সেটা কমাতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সারা জীবন দরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে সরকারের কি আরও ভূমিকা রাখা উচিত ছিল? এই সরকার এক বছরে দরিদ্র মানুষের জন্য বাড়তি কী করেছে?

আসিফ নজরুল: আমি আসলে অর্থনৈতিক বিষয়টা খুব কম বুঝি। কিন্তু আমি সব সময় দেখতাম, বলা হতো যাতে কোনোভাবেই দ্রব্যমূল্য না বাড়ে। আর কর্মসংস্থান যেন বৃদ্ধি পায়। দুটি জিনিস উনি (অধ্যাপক ইউনূস) সব সময় বলতেন। এখন ধরেন দ্রব্যমূল্য তো অনেক ক্ষেত্রে সহনীয় রাখা গেছে।
প্রথম আলো: মূল্যবৃদ্ধি আগে হতো ১১-১২ শতাংশ, এখন সেটা ৮ শতাংশে নেমেছে।

আসিফ নজরুল: এটা সাকসেস (সফলতা) নয়?
প্রথম আলো: সফলতা নয়, সেটা বলছি না। বলছি, দরিদ্রদের জন্য এই মূল্যস্ফীতিও সহনীয় নয়।

আসিফ নজরুল: কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, আমাদের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগপদ্ধতিতে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। এখানে হয়তো আমাদের আরও কিছু করার ছিল।
প্রথম আলো: বাজেটে আমরা দেখলাম, দরিদ্র মানুষের ভাতা বেড়েছে ৫০ টাকা, কোনো ক্ষেত্রে ১০০ টাকা; যে হারে শেখ হাসিনাও বাড়াতেন। শ্রম কমিশনের প্রতিবেদন হিমাগারে পড়ে আছে।

আসিফ নজরুল: অনেকেই প্রশ্নটা তোলেন যে এই পাঁচটা কমিশন করা হলো কেন (জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় না থাকা পাঁচ কমিশন—নারী, স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম, শ্রম ও স্থানীয় সরকার)। এসব কমিশনের আশু বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ আমি নিজে স্যারের (অধ্যাপক ইউনূস) নির্দেশে দু-এক মাস আগে মন্ত্রণালয়গুলোয় পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, এটা ফলোআপ করার এখতিয়ার আমার নেই। তবে স্যার উপদেষ্টাদের সঙ্গে কিছুদিন পরপর বসছেন এবং জিজ্ঞাসা করছেন যে তাঁদের ক্ষেত্রে সংস্কারকাজের অগ্রগতি কী।
প্রথম আলো: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি প্রাণ দিয়েছেন শ্রমজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। সরকারি চাকরিজীবীরা বিগত সরকারকে শেষ সময়েও অসহযোগিতা করেননি। আমলাদের হাতে রাখতে শেখ হাসিনা গাড়ি কেনা, ফ্ল্যাট কেনায় ঋণসুবিধা দিয়েছিলেন। আপনারা সেটা বাতিল করেননি। আপনারা এসে সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়তি ইনক্রিমেন্ট (বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি) দিলেন, এখন আবার বেতন কমিশন গঠন করা হলো। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হোক, কিন্তু শ্রমজীবীদের জন্য কী করেছেন?

আসিফ নজরুল: বেতন কমিশনের বিষয়ে আমি আপনাকে ঠিক বলতে পারব না। কারণ, এটা জনপ্রশাসনের ব্যাপার। আর এই সরকারের প্রতি সবার (আমলাদের মধ্যে) লয়ালিটি (আনুগত্য) নিয়ে প্রশ্ন আছে, দক্ষতা ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এখন হঠাৎ করে বলব, আপনার ব্যবহৃত গাড়ি-বাড়ি সব ফেরত দেন, এটা কি বাংলাদেশের বাস্তবতায় সম্ভব?
প্রথম আলো: প্রকল্পের যে গাড়ি সরকারের পরিবহন পুলে জমা না দিয়ে আমলারা ব্যবহার করেন, সেগুলো তো ফেরত নিতে পারতেন।

আসিফ নজরুল: এটার ডিটেইল (বিস্তারিত) তথ্য আপনাকে দিতে পারব না। কিন্তু প্রকল্পের গাড়ির ক্ষেত্রে খুবই কড়া মনোভাব আমাদের রয়েছে।
প্রথম আলো: সরকারের ভেতরে কি কোনো সরকার আছে?

আসিফ নজরুল: আচ্ছা, পৃথিবীতে কোন দেশে সরকারের ভেতর সরকার থাকে না? পৃথিবীর সব সরকারের ভেতরে সরকার থাকে, যাকে ‘কিচেন কেবিনেট’ (যাঁদের প্রভাব বেশি) বলা হয়। তবে সরকারের বাইরের কেউ সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে না।

প্রথম আলো: সরকারের এক বছর পূর্তি হচ্ছে ৮ আগস্ট। এখন কি পারদর্শিতা মূল্যায়ন করে কোনো রদবদলের সম্ভাবনা আছে? আপনি হয়তো স্বীকার করবেন যে কোনো কোনো উপদেষ্টা ভালো করেছেন, কেউ কেউ সেটা পারেননি।

আসিফ নজরুল: আমাদের অনেক সমালোচনা হয়, যেটা খুব নির্দয়। তো আমি যখন ইনডিভিজুয়ালি (ব্যক্তি ধরে) দেখি, আমাদের অনেকেই খুব ভালো করছেন। আমাদের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ভাই, জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির ভাই, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ভাই ভালো করছেন। আমাদের ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন ভাই হজ ব্যবস্থাপনায় সেরা কাজ করেছেন। এ রকম আরও কারও কথা বলতে পারি। ব্যর্থতার কথা আমার বলা শোভনীয় নয়, এটা আপনাদের ব্যাপার।

স্যারের (অধ্যাপক ইউনূস) যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ (শরীরী ভাষা) থাকে, তাঁর যে কার্যপদ্ধতি, এটার মধ্যে কিন্তু আমরা প্রত্যেকে জানি, কার কাজের ব্যাপারে স্যারের মূল্যায়ন কতটুকু আছে।

প্রথম আলো: একটা সম্পূরক প্রশ্ন করে নিই। বিগত সরকারের আমলে আমরা দেখতাম, যত সমালোচনাই হোক, শেখ হাসিনা কাউকে বদলাননি। কোনো সমালোচনাকে তিনি পাত্তা দেননি। এই সরকারের আমলেও কি সেটাই হবে?

আসিফ নজরুল: না, কিছু সমালোচনা তো খুবই নির্দয়। এ রকম সমালোচনার কারণে যদি কাউকে বাদ দিতে হয়, তাহলে তো সবার বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু হবে।

প্রথম আলো: যৌক্তিক সমালোচনা কি নেই?

আসিফ নজরুল: সে ক্ষেত্রে সামগ্রিক বিবেচনা করতে হয়। ধরেন, যৌক্তিক সমালোচনা মনে হচ্ছে, কিন্তু ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টের (গোয়েন্দা প্রতিবেদন) ভিত্তিতে বা অন্য কোনো তথ্যের ভিত্তিতে স্যার (অধ্যাপক ইউনূস) যদি কনভিন্স (সামগ্রিক বিষয় অনুধাবন করে সম্মত হওয়া) না হন, তাহলে তো ব্যবস্থা নেওয়াটা তাঁকে ডিসকারেজ (নিরুৎসাহিত) করবে। আমাদের কারও কারও ক্ষেত্রে হয়তো অদক্ষতা, অনভিজ্ঞতার অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ শোনেন? একজন-দুজন সম্পর্কে হয়তো ক্যাম্পেইন (প্রচার) আছে, সেটা তো প্রমাণিত তথ্য নয়। আমরা অফিস করি না, এটা তো শোনেন না, স্বজনপ্রীতি করি, এটা শোনেন না।

প্রথম আলো: আমরা তো শুনি, কেউ কেউ বেলা দুইটার পরে অফিসে যান। আমরা তো দু-একজনের কথাই বলব। কেউ তো বলছে না, পুরো উপদেষ্টা পরিষদ চলে যাক।

আসিফ নজরুল: আমি এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে অবগত নই।
প্রথম আলো: উপদেষ্টা পরিষদে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে, আলোচনার ক্ষেত্রে বাইরের কেউ জেনে যাবে, এই ভয়ে থাকেন কি না।

আসিফ নজরুল: আমার মনে হয় না।
প্রথম আলো: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নির্বাচনে বাধা আসার আশঙ্কা—এ দুই পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে জানতে চাই, আপনারা কি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন তুলে আনতে পারবেন।

আসিফ নজরুল: অবশ্যই পারব।

প্রথম আলো: কেউ কেউ বলছেন, সেনাবাহিনীর আরও সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হবে না। সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব আছে বলে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে।

আসিফ নজরুল: মোটেও দূরত্ব নেই, এটা নিশ্চিত থাকেন। এগুলো সম্পূর্ণ বাইরের স্পেকুলেশন (অনুমান); বরং বাইরের শক্তিগুলো কেউ কেউ সেনাবাহিনীকে অন্যায়ভাবে কিছু ক্ষেত্রে দোষারোপ করার চেষ্টা করে। আমি গণ-অভ্যুত্থানের মাঠে থাকা একজন কর্মী হিসেবে বলি, সেনাবাহিনী সরকারের একটি বাহিনী হয়েও সামগ্রিকভাবে গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষে যে ভূমিকা রেখেছে, সেটা সম্পর্কে সমাজের কিছু কিছু স্তরের শ্রদ্ধাবোধের অভাব আছে। ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্নভাবে সেনাবাহিনীর কেউ কেউ জঘন্য কাজে লিপ্ত হতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে তাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আমার কথা হলো, সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব নেই। তবে নির্বাচনের সময় আরও বেশি দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলে সেটা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়।
প্রথম আলো: নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতি কি আপনাদের কোনো পক্ষপাত আছে? সরকারের দুজন উপদেষ্টা তাদের লোক বলে অনেকে বলে থাকেন।

আসিফ নজরুল: গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মুহূর্তে তো অবশ্যই ছাত্রদের নেতৃত্ব ছিল, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। যখন আমাদের সরকার গঠিত হয়, তখন তো আমি সমালোচনা শুনেছি যে এত কম ছাত্র উপদেষ্টা কেন। ছাত্র উপদেষ্টাদের বন্ধুরা যখন দল গঠন করলেন, তখন কিছু ক্ষেত্রে মনে হতে পারে, সরকার এনসিপিকে প্রিভিলেজ (বিশেষাধিকার) দিচ্ছে। আসলে প্রিভিলেজ দিচ্ছে না। গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃস্থানীয় ভূমিকার কারণে এনসিপি খুব বেশি ‘ভালনারেবল’ (নাজুক)। সে জন্য গোপালগঞ্জ বা কোনো কোনো জায়গায় তাদের বাড়তি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। বিএনপি বা জামায়াত অনেক পুরোনো দল, অনেক সুসংগঠিত। এনসিপি সেটা নয়। তাদের ওপর যদি কোথাও হামলা হয়, কোনো ঘটনা ঘটে, কেউ কি আমাদের ক্ষমা করতে পারবে?

প্রথম আলো: এনসিপির নেতাদের কথায় কিন্তু মনে হয় না তাঁরা ‘ভালনারেবল’।

আসিফ নজরুল: আমার বিচারে একটা সদ্য ভূমিষ্ঠ দলের অনেক সমর্থক থাকতে পারে, কিন্তু তাদের তো বেশি কর্মী নেই, অভিজ্ঞতা নেই। আরেকটা কারণে তাদের সুরক্ষা দেওয়া দরকার; সেটা হলো, পতিত আওয়ামী লীগের প্রথম টার্গেট (নিশানা) হওয়ার কথা এনসিপির নেতারা।
প্রথম আলো: বিএনপির সঙ্গে আপনাদের দূরত্ব আছে, সখ্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে—এ বক্তব্যের জবাবে কী বলবেন? বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি কথা বলেছেন। সেটি হলো, দক্ষিণপন্থীদের উত্থানে তিনি উদ্বিগ্ন।

আসিফ নজরুল: আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে ধর্মভিত্তিক দলগুলো প্রচণ্ড অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়েছে।
প্রথম আলো: অন্যায়-অবিচারের শিকার বিএনপিও হয়েছে।

আসিফ নজরুল: মধ্যপন্থী দলের মধ্যে বিএনপি, আর সংখ্যায় বেশি ধর্মভিত্তিক দল। তারা অসীম নির্যাতন, গ্রেপ্তার, গুমের শিকার হয়েছে এবং তারা এই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। তাদের সঙ্গে তো আমাদের বসতে হয়।

প্রথম আলো: বৈঠক তো হবেই। বলছি, বিএনপির চেয়ে তাদের সঙ্গে সখ্য বেশি কি না।

আসিফ নজরুল: কেউ বলেন এনসিপির সঙ্গে আমাদের সখ্য, কেউ বলেন ধর্মীয় দলের সঙ্গে। লন্ডনে অধ্যাপক ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠকের পর কেউ কেউ বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে সরকারের সখ্য। কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সচেতনভাবে বা জ্ঞাতসারে কোনো দলের পক্ষ অবলম্বন করা হয় না।
প্রথম আলো: কোনো কোনো সমাবেশে নাগরিক সমাজের কারও কারও ‘কল্লা ফেলে দেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হলো। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। কেন?

আসিফ নজরুল: আমার মনে হয় যাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, সেই পুলিশ হয়তো ভাবছে, এটা জাস্ট ‘পলিটিক্যাল রেটরিক’ (রাজনৈতিক বক্তব্য)। ব্যবস্থা নেওয়া হলে উগ্রবাদকে উসকে দেওয়া হবে এবং ওনাদের নিরাপত্তার জন্য জিনিসটা ভালো হবে না। আমি তো হুমকির পরও কারও কর্মকাণ্ড কম দেখছি না। অনেক সময় রাষ্ট্র পরিচালনার সময় বিবেচনায় রাখতে হয়, ব্যবস্থা নিলে আরও উসকে দেওয়া হয় কি না।
প্রথম আলো: আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। বিচার শেষ হওয়ার আগে তাদের কার্যক্রম চালাতে না দেওয়ার পক্ষে অনেক মানুষ রয়েছেন। কিন্তু কারও কারও প্রশ্ন, নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম স্থগিত রেখে যদি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হয়, সেই নির্বাচন নিয়ে বিদেশে প্রশ্ন উঠবে কি না?

আসিফ নজরুল: প্রশ্ন যারা তোলার, তারা তুলবে। কিন্তু দেখেন, আওয়ামী লীগের কারও মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই; বরং আওয়ামী লীগের নেত্রী ও অন্য নেতারা বলছেন, এই গণহত্যা নাকি আমরা করেছি এবং তাঁরা ফিরে এলে প্রতিশোধ নেবেন, আমাদের ফাঁসিতে ঝোলাবেন। এ ধরনের কথাবার্তা যে দল বলে এবং যে দল সুযোগ পেলেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাদের রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা চালাতে দিলে আপনি দেশ চালাতে পারবেন? তাদের বিচার করতে পারবেন? অসম্ভব একটা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে এবং মারামারি-খুনোখুনি করে বাংলাদেশকে বিপর্যস্ত করা হবে। বাংলাদেশে অন্যান্য যে অপশক্তি আছে, তাদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ তৈরি করা হবে। এই আশঙ্কা সত্যি, যৌক্তিকভাবেই আমাদের মধ্যে আছে।

প্রথম আলো: কেউ কেউ বলছেন, নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ না করে জনগণকে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ দেওয়াই কার্যকর পন্থা হবে।

আসিফ নজরুল: এটা ঠিক, জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়া আরও বেশি ইমপ্যাক্টফুল (কার্যকর)। কিন্তু আমাদের তো সত্যি সত্যি আশঙ্কা আছে যে আওয়ামী লীগ নির্বাচন তো দূরের কথা, রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় থাকলে দেশে কোনো দিন নির্বাচন করা যাবে না, দেশ পরিচালনা করাই যাবে না। আমাদের ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট (গোয়েন্দা প্রতিবেদন) আছে যে সরকারের বিরুদ্ধে আনসারের বিক্ষোভসহ বিভিন্ন বিক্ষোভে আওয়ামী লীগের ইন্ধন ছিল। ক্রেডিবল এভিডেন্স (বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ) আছে সেখানে।
প্রথম আলো: সরকার ভারতে আম পাঠাল। ভারত যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের পর চিকিৎসক পাঠাল। উপদেষ্টাদের মধ্যে ভারতবিরোধী বক্তব্য ইদানীং কম দেখছি। দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের কী অবস্থা?

আসিফ নজরুল: আমরা ভারতের শত্রু হতে চাই না, কিন্তু ভৃত্যও হতে চাই না। আমরা সমমর্যাদাভিত্তিক একটা সম্পর্ক চাই।
প্রথম আলো: তিস্তা প্রকল্প চীনা ঋণে করার জন্য দেশটিকে চিঠি দিয়েছে সরকার। এটা কি উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা হয়েছে?

আসিফ নজরুল: মাঝে মাঝে উপদেষ্টা পরিষদে, মাঝে মাঝে কিচেন কেবিনেটে (কয়েকজন উপদেষ্টা) আলোচনা হয়, মাঝে মাঝে স্যার ডেকে নিয়ে কথা বলেন। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো উপদেষ্টা এককভাবে নেন না।
প্রথম আলো: আপনি বা আপনার সরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কি ফেসবুকার বা ইউটিউবারদের দ্বারা প্রভাবিত হন, চাপে থাকেন? আপনি নিজেই বলেছিলেন, তদবির না শুনলেই অপপ্রচার চালানো হয়।

আসিফ নজরুল: সোশ্যাল মিডিয়ার চাপ সারা পৃথিবীতেই কমবেশি আছে। এখন তো যা ইচ্ছা লিখে দেওয়া যায়। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের প্রয়োগ নেই, গ্রেপ্তারের ভয় নেই, হুমকির ভয় নেই। তবে আমি নিজে ফেসবুক-ইউটিউব দেখে সিদ্ধান্ত নিই না। হতে পারে দু-একজন ফেসবুকে কোনো একটা নির্দিষ্ট প্রচারণা দ্বারা পীড়িত হন। সেটা দ্বারা সিদ্ধান্ত নেওয়া বা সিদ্ধান্ত না নেওয়ার চেষ্টা করেন।

প্রথম আলো: ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের মিশন খোলা হচ্ছে। কিন্তু আপনার মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আট মাস ধরে কোনো চেয়ারম্যান নেই।

আসিফ নজরুল: আপনি একটা ভালো সমালোচনা করেছেন। এখনকার যে মানবাধিকার কমিশন, তা প্রায় নখদন্তহীন বলতে পারেন। আইনের মধ্যে অনেক সমস্যা রয়েছে। অন্য অনেক সংস্কারকাজ করতে গিয়ে মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার করা যায়নি। এই কমিশনের আইনে ব্যাপক সংস্কার করা দরকার, তারপর নিয়োগ। খালি খালি কাউকে চাকরি দিয়ে তো লাভ নেই। তবে এটা আমরা খুব দ্রুত দেব।

প্রথম আলো: কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশে আসলে রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলন দরকার। আপনি রিকনসিলিয়েশন কমিশনের কথা বলেছেন। প্রধান বিচারপতি ও আপনি দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে এসেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বিচার হয়েছে, পরস্পর পরস্পরের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। আমরা কি রিকনসিলিয়েশনে যাব, নাকি অনন্ত বিভাজন ও সংঘাতের মধ্যে থাকব?

আসিফ নজরুল: দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী সত্যি সত্যি অনুতপ্ত ছিল। অনুতপ্ত থেকে তারা রিকনসিলিয়েশন করতে চেয়েছিল। আমাদের যারা হত্যাকারী, তাদের মধ্যে আপনি কোনো অনুতাপ দেখেন? আপনি তাদের সঙ্গে কীভাবে রিকনসিলিয়েশন করবেন?
প্রথম আলো:

আপনি যাঁদের কথা বলছেন, তাঁরা তো বিচারের আওতায় চলে আসবেন। এর বাইরে আওয়ামী লীগের বিপুল নেতা-কর্মী রয়েছেন, সমর্থক রয়েছেন।

আসিফ নজরুল: সারা দেশের মানুষের বিরুদ্ধে তো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। রিকনসিলিয়েশনের অনেকগুলো কনসেপ্ট আছে। একটা হচ্ছে ট্রুথ সিকিং (সত্য সন্ধান), সেটা আমরা করছি। দ্বিতীয়, মেমোরিয়ালাইজেশন (স্মরণ রাখার ব্যবস্থা)। সে জন্য জুলাই জাদুঘর করছি। তৃতীয়, ক্ষতিপূরণ। সেটা দেওয়া হচ্ছে। চতুর্থ, জাস্টিস (ন্যায়বিচার)। এই চারটা প্রক্রিয়ার পর রিকনসিলিয়েশন হয়। জাস্টিসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটার পরে রিকনসিলিয়েশন করার পরিবেশ-পরিস্থিতি এলে আমাদের সরকার না হোক, পরবর্তী সরকার বিবেচনা করবে।
প্রথম আলো: রিকনসিলিয়েশন ছাড়া কি আমরা বিভাজন ও প্রতিশোধের চক্রে পড়ে থাকব?

আসিফ নজরুল: যেকোনো ক্ষেত্রে খুব ভালো কনসেপ্ট রিকনসিলিয়েশন। মুক্তিযুদ্ধের পরেই রিকনসিলিয়েশন দরকার ছিল। নব্বইয়ের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পর রিকনসিলিয়েশন দরকার ছিল। কিন্তু রিকনসিলিয়েশন করার একটা পরিবেশ-পরিস্থিতি লাগে। আপনার যারা ক্ষতি করেছে, তাদের সঙ্গে আপনি সদ্ভাব কীভাবে রাখবেন, যদি তারা অনুতপ্ত না হয়।
প্রথম আলো: আমাদের তো একজন নেলসন ম্যান্ডেলা দরকার। অধ্যাপক ইউনূস ছাড়া এই নেতা কে হবেন?

আসিফ নজরুল: নেলসন ম্যান্ডেলাদের অপর দিকে তো ডি ক্লার্কের মতো নেতাও ছিলেন। আপনি ডি ক্লার্কের (এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক শ্বেতাঙ্গদের নেতা ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট) ভূমিকা দেখেন, নেলসন ম্যান্ডেলা তো একা একা সেটা (বর্ণবাদ বিলোপ ও রিকনসিলিয়েশন) করতে পারেননি। আমরা দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের উদ্যোগের কথা জানছি। পরে একটা উদ্যোগ সম্ভবত প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে নেওয়া হবে। আলোচনাটা থাক সমাজে।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

আসিফ নজরুল: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকারে সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন আসিফ নজরুল
সাক্ষাৎকারে সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন আসিফ নজরুল। ছবি: জাহিদুল করিম

ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার ব্যাখ্যা ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান by জেরেমি বোয়েন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধ শেষ করা ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত ভূখণ্ড পুনর্গঠনের জন্য প্রস্তাবিত কাঠামোগত চুক্তির পেছনে গতি তৈরি হয়েছে। এই গতি অনেকটাই এসেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজের কাছ থেকে। আরব ও ইসলামিক শীর্ষ দেশগুলিও এই পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছে। এর মধ্যে আছে জর্ডান, মিশর, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্ক। এমনকি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে এটিকে মেনে নেয়- যদিও এর ভেতরে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথের কথা বলা হয়েছে, যা তিনি বারবার নাকচ করে এসেছেন। গতি ধরে রাখতে ট্রাম্প বলছেন, হামাসের কাছে ‘তিন থেকে চার দিন’ সময় আছে হ্যাঁ বা না বলার জন্য। যদি উত্তর না হয়, যুদ্ধ চলতে থাকবে। প্রস্তাবিত এই চুক্তি অনেকটা সেই পরিকল্পনার মতোই, যা জো বাইডেন দেড় বছর আগে দিয়েছিলেন। তারপর থেকে বিশাল সংখ্যক ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, গাজা আরও ধ্বংস হয়েছে, দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে, আর গাজায় বন্দি ইসরাইলি জিম্মিরা আরও দীর্ঘ যন্ত্রণা সহ্য করেছে।

ইসরাইলি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে রিপোর্ট হয় যে, বাইডেনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়, কারণ নেতানিয়াহু তার কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রিসভার চাপের মুখে নতুন কিছু দাবি তুলে লক্ষ্যপোস্ট সরিয়ে দেন। তবুও, এই কাঠামোগত পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। প্রথমবারের মতো ডনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলের ওপর যুদ্ধ শেষ করার জন্য চাপ দিচ্ছেন। ট্রাম্প নিজেকে এমন এক নেতা হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন, যাকে না বলা কঠিন। কেউই চাইবে না ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ভলোদিমির জেলেনস্কি যে কঠিন অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছিলেন, সেটির মতো পরিস্থিতিতে পড়তে। তবে নেতারা হোয়াইট হাউস ছাড়লে পরিস্থিতি বদলে যায়।

ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ইসরাইল ফেরার আগে নেতানিয়াহুর কর্মীরা তাকে নিয়ে একটি ভিডিও ধারণ করেন, যেখানে তিনি নিজের সংস্করণ তুলে ধরেন। সেখানে একটি বিষয় ছিল- ইসরাইলের পাশে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন, অর্থাৎ দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান, যেটিকে বৃটেন ও আরও কিছু পশ্চিমা দেশ সম্প্রতি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে।
ট্রাম্পের দলিলটি ফিলিস্তিনি স্বাধীনতার ধারণাকে এক ধরনের অস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। তাতে বলা হয়েছে, রামাল্লাভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কারের পর, যেটি মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে, তখনই ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে একটি বিশ্বাসযোগ্য সুযোগ তৈরি হতে পারে, যেটিকে আমরা ফিলিস্তিনি জনগণের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে স্বীকৃতি দিই।
তবে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের দূরবর্তী সম্ভাবনার সামান্য ইঙ্গিতও নেতানিয়াহুর জন্য সহনীয় ছিল না। যদিও তিনি হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পকে পুরো সমর্থন দিয়ে ইংরেজিতে বলেন, আমি গাজা যুদ্ধ শেষ করার জন্য আপনার পরিকল্পনাকে সমর্থন করি, যা আমাদের যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণ করে।

কিন্তু ভিডিওতে, হিব্রু ভাষায় নিজ দেশের জনগণকে বার্তা দিতে গিয়ে নেতানিয়াহুকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি কি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রে সম্মত হয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, না, একেবারেই না। এটা কোনোভাবেই চুক্তিতে লেখা নেই। তবে আমরা একটাই বলেছি- আমরা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে জোরপূর্বক প্রতিহত করব। তিনি বলেন, ট্রাম্পও এতে সম্মত হয়েছেন।
পরিকল্পনার শক্তি হলো এর গতি। দুর্বলতা হলো এর অভাব, যা ট্রাম্পীয় কূটনীতির বৈশিষ্ট্য। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যে দলিলে সই করেছেন, যেটিকে বৃটেনসহ আরও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ সমর্থন করেছে, তাতে ইসরাইলি সেনাদের ধাপে ধাপে পিছিয়ে যাওয়ার একটি সাধারণ মানচিত্র আছে। কিন্তু সেসব সূক্ষ্ম দিক নেই যা নির্ধারণ করে একটি যুদ্ধ শেষ করার কূটনৈতিক চুক্তি টিকে থাকবে নাকি ভেঙে যাবে। এটি কার্যকর করতে হলে কঠিন আলোচনার প্রয়োজন হবে। সেই প্রক্রিয়ায় বারবার ভেঙে পড়ার সুযোগও থাকবে।

ইসরাইলের মূলধারার বিরোধী দলগুলো পরিকল্পনাটিকে সমর্থন করেছে। কিন্তু নেতানিয়াহুর জোটের চরমপন্থি জাতীয়তাবাদীরা এটি নাকচ করেছে। তারা বছরের শুরুতে যে ‘ট্রাম্প রিভিয়েরা’ পরিকল্পনা নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিল, সেটির ভিডিও প্রচারণায় ইসরাইল ও মার্কিন নেতাদের সমুদ্রসৈকতে ককটেল হাতে দেখানো হয়েছিল। সেখানে গাজার জায়গায় ঝকঝকে কাঁচের টাওয়ারসহ নতুন শহরের কল্পচিত্র আঁকা হয়েছিল। ইসরাইলি কট্টর ডানপন্থীরা আনন্দিত ছিল। কারণ ওই পরিকল্পনায় গাজার দুই মিলিয়নেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে উৎখাত করে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের কথা বলা হয়েছিল। নতুন পরিকল্পনা বলছে কোনো ফিলিস্তিনিকে উচ্ছেদ করা হবে না। চরম উগ্রপন্থী অর্থমন্ত্রী ও বসতি স্থাপনপন্থী নেতা বেজালেল স্মোটরিচ এটিকে ১৯৩৮ সালের মিউনিখ চুক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তখন বৃটেন ও ফ্রান্স চেকোস্লোভাকিয়াকে নাৎসি জার্মানির কাছে ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে বাধ্য করেছিল এবং অল্প কিছুদিন পরই দেশটি স্বাধীনতা হারায়।
যদি হামাস চুক্তি মেনে নেয়, আর যদি নেতানিয়াহু তার জোটের ক্ষমতাশালী চরমপন্থীদের তুষ্ট করার উপায় খোঁজেন, তবে তার হাতে প্রচুর সুযোগ থাকবে আলোচনাকে এমনভাবে ভেঙে দেওয়ার, যাতে দোষ চাপানো যায় হামাসের ওপর। ট্রাম্প কাঠামোগত চুক্তির গঠন এমন যে ইসরাইল যেসব পদক্ষেপ পছন্দ করে না সেগুলো ভেটো করার বহু সুযোগ পায়।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা গভীর সংঘাতের অবসান হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে বৃটেনসহ ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বহু দেশ মনে করে, ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা ছাড়া কোনো সমাধান শান্তি বয়ে আনবে না। আরব ও ইসলামিক দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তাদের সমর্থন জানাতে যে বিবৃতি দেন, তাতে বলা হয়, তারা বিশ্বাস করেন এই প্রক্রিয়া ইসরাইলি সেনাদের পূর্ণ প্রত্যাহার ও গাজা পুনর্গঠনের দিকে নিয়ে যাবে এবং ন্যায়সঙ্গত শান্তির পথ তৈরি করবে, যা দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ভিত্তিতে গাজাকে সম্পূর্ণভাবে পশ্চিম তীরের সঙ্গে একীভূত করে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এটি আন্তর্জাতিক আদালতের সেই সিদ্ধান্তের প্রতি এক ধরনের গোপন ইঙ্গিত হিসেবে ধরা যেতে পারে, যেখানে ফিলিস্তিনি ভূমি দখলকে ইসরাইলের জন্য অবৈধ বলা হয়েছে।

নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন এই চুক্তি তাকে হামাসের ওপর ইসরাইলের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা বিজয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি জর্ডান নদী থেকে সমুদ্র পর্যন্ত জমির ওপর কোনো ফিলিস্তিনি অধিকার অস্বীকার করেন। একটি পরিকল্পনা- কিন্তু এর অর্থ নিয়ে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা। কাঠামোটি এতটাই অস্পষ্ট যে উভয় ব্যাখ্যাই সম্ভব। এটি কোনো আশাব্যঞ্জক সূচনা নয়।
(অনলাইন বিবিসি থেকে অনুবাদ)

mzamin

জেন-জি বিদ্রোহ: এশিয়ায় ফিরছে আরব বসন্ত? by মীনা কান্ডাসামি

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত ভূখণ্ডে এক নতুন ‘ভিজ্যুয়াল ব্যাকরণে’ প্রতিরোধ রচিত হচ্ছে। এটি এখন আর কোনো লুকোনো বা আড়ালে চলা সংগ্রাম নয়; বরং একেবারে লাইভস্ট্রিম হয়ে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

এখানে বিপ্লবের চিত্রনাট্য যাঁরা লিখছেন, তাঁরা কোনো পেশাদার বিপ্লবী নন। তাঁরা সেই সব সাধারণ তরুণ-তরুণী, যাঁদের আর হারানোর কিছু নেই। তাঁদের আন্দোলনের ছবি আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে। আমরা শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে শয়নকক্ষের খাটে শুয়ে থাকা প্রতিবাদকারীদের সেলফি তুলতে দেখেছি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে ঢুকে পড়া উল্লসিত জনতার একই ছবি দেখেছি। আমরা নেপালের পার্লামেন্ট ভবন জ্বলতে থাকা আগুন দেখেছি।

এ সবই জেনারেশন জেড বা জেন-জির হতাশা, বঞ্চনা ও ক্ষোভের ভাষা। এখানে বিদ্রোহ এক প্রবল বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।

গত বছর বাংলাদেশে, ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় আর অতিসম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া ও নেপালে তরুণেরা ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছেন। কোথাও তাঁরা শাসকদের উৎখাত করেছেন, কোথাও–বা গদি নড়িয়ে দিয়েছেন। এতগুলো দেশে একসঙ্গে এমন দৃশ্য কি নিছক কাকতালীয়? মোটেও না। এর পেছনে রয়েছে একটি বড় বৈশ্বিক প্রবণতা—সংগঠিত বামপন্থী ও প্রগতিশীল আন্দোলনের পতন। যে আন্দোলনগুলো একসময় দুর্নীতি, বৈষম্য ও দমননীতির বিরুদ্ধে তরুণদের পাশে দাঁড়াত, আজ তারা ছিন্নভিন্ন, দুর্বল কিংবা অস্তিত্ব হারানোর পথে।

এশিয়ার একেক দেশে সামাজিক চুক্তি ভেঙে পড়েছে নানা কারণে। এর পেছনে কোথাও ভয়াবহ বেকারত্ব, কোথাও দুর্নীতিগ্রস্ত ও দমনমূলক অভিজাত শ্রেণি, কোথাও তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, আবার কোথাও ধনী-গরিবের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য কাজ করেছে। অথচ এসবের বিরুদ্ধে যে প্রগতিশীল শক্তি একসময় সোচ্চার ছিল, তারা এখন এতটাই অকার্যকর যে তরুণদের কাছে তারা আর কোনো বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না। ফলে রাগান্বিত তরুণদের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে তাঁদের স্মার্টফোন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তাঁদের মিছিল ও আন্দোলনের সমন্বয়ের হাতিয়ার। তবে এর ভেতরে কোনো দৃঢ় নেতৃত্ব নেই, নেই কোনো সুসংহত মতাদর্শ, নেই কোনো স্পষ্ট বিপ্লব-পরবর্তী স্বপ্নের রূপরেখা। তবু এই শূন্যতার মধ্যেই গড়ে উঠছে এক নতুন বাস্তবতা। এটি যেন এশিয়ায় আরব বসন্তের পুনর্জন্ম।

শ্রীলঙ্কায় যখন লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক ঋণের খেলাপি অবস্থায় লাখো মানুষ খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ কিনতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখনই আমরা রাজাপক্ষে পরিবারতন্ত্রের পতন ঘটতে দেখলাম। বাংলাদেশে যুব বেকারত্ব আর চাকরির কোটাব্যবস্থা (যা শাসক আওয়ামী লীগের সমর্থকদের পক্ষে বলে মনে করা হতো) সরকার পতনের মূল কারণ হয়ে ওঠে। ইন্দোনেশিয়ায় মুদ্রাস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং শ্রম অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষাকে খর্ব করা আইন আগুনে ঘি ঢালে। তা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ সহিংসতায় বিস্ফোরিত হয়। নেপালেও একই ধরনের বিষাক্ত সমীকরণ তৈরি হয়। সেখানে পুলিশের গুলিতে প্রতিবাদকারীদের মৃত্যু দেশকে রাজনৈতিক শূন্যতার দিকে ঠেলে দেয় এবং প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করে।

এই জনক্ষোভ যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন তা সরাসরি গিয়ে আঘাত করে পার্লামেন্ট ভবন, প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ কিংবা রাজনীতিবিদদের বাড়ির মতো ক্ষমতার প্রতীকগুলোর ওপর। ডিজিটাল সংহতির মাধ্যমেই এই আন্দোলনগুলো সংগঠিত হয়।

তরুণদের এই প্রতিবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে এক নতুন তাৎপর্য দিয়েছে। অনেকে মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল ডানপন্থী ইকো-চেম্বার ও বিভাজনের জায়গা। কিন্তু বাস্তবে এখানে জন্ম নিচ্ছে বিরোধী প্রতিষ্ঠান ও দুর্নীতিবিরোধী এক প্রবল তরঙ্গ। এটি জেন-জিকে একত্র করছে। তবে সমস্যাটা হলো এ অঞ্চলে উদারবাদী রাজনীতির ভয়াবহ ভগ্নদশার কারণে তরুণেরা কোনো ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব পাচ্ছেন না।

ইন্দোনেশিয়ায় সুহার্তোর শাসন (১৯৬৭-১৯৯৮) বামপন্থাকে নির্মূল করে দিয়েছিল। সেই ব্যবস্থা আজও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। নেপালের সাবেক মাওবাদীরা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ করে ক্ষমতায় এসে জড়িয়ে পড়েছে সেই একই দুর্নীতিতে, যা কিনা তারা একসময় ধ্বংস করার শপথ নিয়েছিল। শ্রীলঙ্কায় জাতিগত সংকীর্ণতা বামপন্থাকে গ্রাস করেছে। আর বাংলাদেশে বামপন্থা প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।

এক দশকের বেশি আগে টুইটার ছিল আরব বসন্তের চালিকা শক্তি। আজকের এশিয়ায় সেই জায়গা নিয়েছে ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক। প্রায়ই জেন-জিকে খাটো করে বলা হয়, তারা দুর্বল, ঝুঁকি নিতে ভয় পায় আর রিল-দুনিয়ার মধ্যে আটকে পড়েছে। অথচ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদ্রোহগুলো তার সম্পূর্ণ উল্টো প্রমাণ হাজির করছে। আদতে এই প্রজন্ম বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সোশ্যাল মিডিয়াকে তারা রূপান্তর করেছে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রে।

প্রতিটি ক্ষেত্রে লক্ষ করলে দেখা যাবে, প্রথম থেকেই আন্দোলন সহিংস হয়নি। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নই আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আন্দোলনকারীরা বুঝতে শিখেছেন, শুধু অর্থনৈতিক স্বস্তি বা রাজনৈতিক সংস্কার নয়, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার জবাবদিহিও তাঁদের দাবির অংশ হতে হবে।

নেপালে আন্দোলনের শুরুটা ছিল উৎসবমুখর ও নির্দোষ। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীরা নিজেরাই ভেবেছিলেন, আন্দোলন শেষে তাঁরা জায়গাটা পরিষ্কার করে দেবেন। কিন্তু সেই পরিবেশ একমুহূর্তেই বদলে যায়, যখন পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকতে চাওয়া প্রতিবাদকারীদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়। শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয় সহিংসতাই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

ইন্দোনেশিয়ায় আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তখনই, যখন তরুণ ডেলিভারি কর্মী আফফান কুরনিয়াওয়ান পুলিশের দমন অভিযানে এক সাঁজোয়া গাড়ির চাপায় মারা যান। ইতিহাসে এর অনুরূপ উদাহরণ আছে। ২০১০ সালে তিউনিসিয়ার তরুণ ফেরিওয়ালা মোহাম্মদ বুয়াজিজি তাঁর পণ্য পুলিশ কেড়ে নেওয়ায় আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। সেই আগুনই পুরো আরব বিশ্বকে গ্রাস করেছিল।

ইন্টারনেট সেন্সরশিপও পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। নেপালে যখন #নেপবেবি হ্যাশট্যাগ ভাইরাল হয়ে অভিজাতদের স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিকে প্রকাশ্যে আনল, তখন সরকার অনলাইন সমালোচনাকে প্রাণঘাতী হুমকি হিসেবে দেখল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে তারা ভেবেছিল তরুণদের রাগ দমন করবে। কিন্তু বাস্তবে তরুণেরা আরও বেশি বিদ্রোহী হয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন।

তবে আরব বসন্তের শেষ পরিণতি এক সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি হলো আশার জোয়ার থেকে ধ্বংসস্তূপে গড়িয়ে পড়া। আজকের এশিয়ার বিদ্রোহেরও একই পরিণতি ঘটতে পারে। কারণ, ক্ষোভ জিইয়ে রাখার মতো পরিস্থিতি এখনো বিদ্যমান। যদি তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো বিশ্বাসযোগ্য বামপন্থী বা প্রগতিশীল বিকল্প তৈরি না হয়, তাহলে সামনে অপেক্ষা করছে আরও ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা—ক্ষোভ, সামরিক অভ্যুত্থান, সাম্প্রদায়িক সংঘাত।

তবু এবার কিছু আলাদা। জেন-জি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে রাজনীতির পরিপূরক হিসেবে নয়, রাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে দেখছে। তারা বুঝে গেছে, পুরোনো আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। তাই তারা নতুন কিছু গড়ে তুলছে। তারা বিকেন্দ্রীভূত, কিন্তু ভয়ংকর কার্যকর। তারা নিজেদের কণ্ঠ খুঁজে পেয়েছে। আর যারা ক্ষমতায় আছে, যদি এই কণ্ঠকে উপেক্ষা করে, তবে সেই উপেক্ষা তাদের জন্যই এক ভয়ানক বিপদ হয়ে উঠবে।

মীনা কান্ডাসামি, ভারতের চেন্নাইভিত্তিক লেখক
- নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

নেপালে বাস্তবে তরুণেরা আরও বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন
নেপালে বাস্তবে তরুণেরা আরও বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। ছবি: এএফপি

গাজা অভিমুখী নৌবহরে ইসরায়েলি সেনাদের আক্রমণ, ধরে নেওয়া হলো অধিকারকর্মীদের

রয়টার্স ও আল–জাজিরাঃ ফিলিস্তিনের গাজা অভিমুখে যাত্রা করা ত্রাণবাহী নৌবহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়েছে। বহরের প্রায় সব নৌযানে থাকা অধিকারকর্মীদের আটক করেছে ইসরায়েল। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সুইডিশ অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ। ইসরায়েলের এমন পদক্ষেপকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে অনেক দেশ। বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভও হয়েছে।

বাংলাদেশ সময় গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টায় গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ৪২টি নৌযানের মধ্যে মাত্র একটি তখন পর্যন্ত ইসরায়েলি বাধা এড়িয়ে গাজা অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছিল। অন্য নৌযানগুলোয় থাকা অন্তত ৪৪৩ জন অধিকারকর্মীকে আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। একটি বাদে ফ্লোটিলার সব নৌযান থামিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলও। নৌযানগুলোতে গাজাবাসীর জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্য, চিকিৎসাসামগ্রী, তাঁবু ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছিল।

গাজায় প্রায় দুই বছর ধরে ইসরায়েলের ব্যাপক নৃশংসতার মধ্যে ত্রাণবাহী এই নৌবহর আটকে দেওয়ার ঘটনা ঘটল। গত দুই বছরে উপত্যকাটিতে ৬৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি ইসরায়েলের অবরোধে সেখানে দেখা দিয়েছে খাবারের তীব্র সংকট। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার বাসিন্দারা প্রতিদিন প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ২৬ শতাংশ খাবার পাচ্ছেন।

এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের অবরোধ ভেঙে ভূমধ্যসাগর দিয়ে গাজায় ত্রাণ সরবরাহ করতে যাচ্ছিল গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা। অনেকটা প্রতীকী হলেও ওই বৈশ্বিক প্রচেষ্টা বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। চারটি বৈশ্বিক জোট গ্লোবাল মুভমেন্ট টু গাজা (জিএমটিজি), ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (এফএফসি), মাগরেব সুমুদ ফ্লোটিলা ও সুমুদ নুসানতারা। বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও দৃক গ্যালারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল আলম ঢাকায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, তিনি ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের মিডিয়া ফ্লোটিয়ায় যোগ দিচ্ছেন। গাজামুখী একটি নৌযান থেকে শহিদুল আলম গতকাল রাত সাড়ে সাতটার দিকে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে তিনি অসুস্থতা বোধ করার কথা জানান। তিনি বলেন, সমুদ্র খুবই উত্তাল হয়ে আছে। তিনি আশা করছেন, দ্রুত এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠবেন।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা ছোট ছোট অনেক নৌযান নিয়ে ৩১ সেপ্টেম্বর স্পেন থেকে ত্রাণ নিয়ে গাজা অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। পরে তিউনিসিয়া, ইতালি ও গ্রিস থেকে বহরে আরও নৌযান যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত নৌযানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০টির বেশি।

সব ঠিকঠাক এগোলে গাজার স্থানীয় সময় গতকাল সকালে নৌবহরটির উপত্যকায় পৌঁছানোর কথা ছিল ফ্লোটিলার। তবে এর আগে বুধবার রাতে নৌবহরে হানা দেয় ইসরায়েলি বাহিনী। ভূমধ্যসাগরে গাজা উপকূল থেকে ১২৯ কিলোমিটার (৭০ নটিক্যাল মাইল) দূরে প্রথম ইসরায়েলের বাধার মুখে পড়ে তারা। নৌবহরের নৌযানগুলোকে যাত্রাপথ পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এর কিছুক্ষণ পর ইসরায়েলি নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে সেনারা নৌযানগুলোয় একে একে প্রবেশ শুরু করেন। বন্ধ করে দেওয়া হয় নৌযানগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা। সেগুলো লক্ষ্য করে জলকামান দিয়ে ছোড়া হয় পানিও। নৌযানগুলো থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা ভিডিওতে অধিকারকর্মীদের দিকে বন্দুক তাগ করে রাখতে দেখা যায় ইসরায়েলি সেনাদের।

ফ্লোটিলার নৌযানগুলোয় প্রায় ৪৪টি দেশের প্রায় ৫০০ আরোহীর মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচিত প্রতিনিধি, আইনজীবী, অধিকারকর্মী, চিকিৎসক ও সাংবাদিকেরা। নৌযানগুলো থামিয়ে দেওয়ার সময় অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গসহ তাঁদের আটক করা হয়।

থুনবার্গকে আটক করা হয় বুধবার রাতে। বৃহস্পতিবার তাঁর একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা। আগে ধারণ করা ওই ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘আমাকে অপহরণ করা হয়েছে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনী আমাকে নিয়ে গেছে। আমাদের মানবিক যাত্রাটি ছিল অহিংস এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী। সরকারকে আমার ও অন্যদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানাতে বলুন।’

রাখা হতে পারে উচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে

ইসরায়েলের হানার পর ফ্লোটিলার কয়েকটি নৌযান ইসরায়েলের আশদোদ বন্দরে নেওয়া হয়। গতকাল রাতে সেখানে অন্তত তিনটি নৌযান অবস্থান করছিল বলে জাহাজ চলাচলের তথ্য সরবরাহকারী ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিকে দেখা গেছে। এগুলো হলো ক্যাপ্টেন নিকোস, এস্ত্রেইয়া ইমানুয়েল ও আদারা। এর মধ্যে ক্যাপ্টেন নিকোসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আইনপ্রণেতা ছিলেন।

আটক আরোহীদেরও আশদোদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানিয়েছিল ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। থুনবার্গসহ অন্যরা ‘নিরাপদ ও সুস্থ’ আছেন বলে উল্লেখ করে তারা। পরে জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন বলেন, ইসরায়েলে ইয়ম কিপুর উৎসব উপলক্ষে ছুটি চলছে। ছুটি শেষে নৌযান থেকে আটক অধিকারকর্মীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

সে পর্যন্ত অধিকারকর্মীদের দক্ষিণ ইসরায়েলে উচ্চ নিরাপত্তার কোতজিওত কারাগারে রাখা হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্যারিসের সায়েন্সেস পো ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞ ওমের শাৎজ। তিনি বলেন, এত অধিকারকর্মীকে অন্যত্র আনা–নেওয়াটা বেশ কঠিন। তাই তাঁদের কোতজিওত কারাগারে রাখা হতে পারে। প্রতিকূল পরিবেশের জন্য এই কারাগারের কুখ্যাতি রয়েছে।

তবে ফ্লোটিলার আরোহীদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন–গভির। আর ইসরায়েলি মানবাধিকার গোষ্ঠী ‘আদালাহ’ জানিয়েছে, আগেও গাজার দিকে রওনা দেওয়া বিভিন্ন নৌবহর থেকে অধিকারকর্মীদের আটক করেছিল ইসরায়েল। তাঁদের চেয়ে এবার আটক অধিকারকর্মীদের কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন

ত্রাণবাহী এই নৌবহর আটকে দেওয়ার মাধ্যমে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের উপকূল থেকে সমুদ্রের গভীরে ২২ কিলোমিটার এলাকার নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ণ সার্বভৌমত্ব থাকে ওই দেশের। এরপর আরও ৩৭০ কিলোমিটার এলাকা বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কিছু কার্যক্রম চালাতে পারে ওই দেশ।

এই কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে মাছ ধরা ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনের মতো তৎপরতা। সেখানে অন্য দেশের নৌযান ও আকাশযান স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে। ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সনদের সমুদ্র আইনে বলা হয়েছে, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সব দেশের পতাকাবাহী নৌযান স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে। পাশাপাশি সেখানকার আকাশে উড়োজাহাজ চলাচল করতে পারবে।

আন্তর্জাতিক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের (আইটিএফ) মহাসচিব স্টিফেন কটন আল–জাজিরাকে বলেন, জাতিসংঘের আইনটি একেবারে পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক জলসীমায় অহিংস মানবিক কর্মকাণ্ড–সংশ্লিষ্ট কোনো নৌযানে হামলা অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য। এই আইন কোনো দেশ ইচ্ছেমতো অমান্য করতে পারবে না। সমুদ্রকে কোনোভাবেই যুদ্ধের মঞ্চ বানানো যাবে না।

ফ্লোটিলায় ইসরায়েলের হস্তক্ষেপের বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন নৌবহরে থাকা আইনজীবীরা। নৌবহর থেকে আল–জাজিরার সাংবাদিক হাসান মাসুদ বলেন, ইসরায়েলের সব কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা হয়েছে। ইসরায়েলের মাধ্যমে যেসব আন্তর্জাতিক ও সমুদ্র আইনের লঙ্ঘন হয়েছে, সেগুলো নথিবদ্ধ করে রাখা হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ–নিন্দা


গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরায়েলের বাধার প্রতিবাদে বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। বুধবার রাতে আক্রমণ শুরুর পরপরই ইতালিতে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। পরে বিক্ষোভ হয় কলম্বিয়া, তিউনিসিয়া, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, তুরস্ক, স্পেন, মালয়েশিয়া, জার্মানি, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সে। নৌবহরে ইসরায়েলের পদক্ষেপের কারণে আজ শুক্রবার ইতালিতে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন।

বুধবার রাতে ইতালির নেপলসে একটি রেলস্টেশনে ঢুকে পড়েন বিক্ষোভকারীরা। তারপর রেলপথের ওপর মিছিল করেন। গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে পররাষ্ট্র মন্ত্রালয়ের বাইরে জড়ো হন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটের বাইরে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানান বহু মানুষ। বিক্ষোভের সময় অনেকের হাতে ছিল ফিলিস্তিনের পতাকা।

ফ্লোটিলা ঘিরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। আঙ্কারায় নিজ দল ‘একে পার্টির’ সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, নৌবহরে থাকা তুরস্কের নাগরিকদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, তা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। আর তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, নৌবহরে ইসরায়েলের ‘হামলা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’।

নৌবহর থামিয়ে দেওয়ার ঘটনার পর কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো জানিয়েছেন, দেশটি থেকে ইসরায়েলের সব কূটনীতিককে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

এ ঘটনার সমালোচনা করা অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে কাতার, বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড, ব্রাজিল, মেক্সিকো, মিসর ও যুক্তরাজ্য। আর জাতিসংঘের মুখপাত্র থামেন আল খিতান এক ই–মেইলে রয়টার্সকে বলেছেন, গাজায় ইসরায়েল যে অবৈধ অবরোধ জারি রেখেছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বেসামরিক ত্রাণবাহী নৌবহরে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তা আরও বিস্তৃত হলো।

ফ্লোটিলায় আগে যত হামলা

ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের সঙ্গে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার সংযোগ রয়েছে বলে আগে থেকেই দাবি করে আসছিল ইসরায়েল। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি তারা। এ ছাড়া ফ্লোটিলাকে গাজার দিকে না এগোতে হুমকি দিয়ে যাচ্ছিল ইসরায়েলি বাহিনী। এমনকি গাজার দিকে যাত্রার সময় বহরের একটি নৌযানে ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছিল।

এমন পরিস্থিতিতে নৌবহরটিকে সুরক্ষা দিতে এগিয়ে এসেছিল কয়েকটি দেশ। বহরে মানবিক সহায়তা ও উদ্ধারকাজের জন্য নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন করেছিল ইতালি ও স্পেন। তবে নৌবহরটি গাজা থেকে ২৭৭ কিলোমিটার দূরে পৌঁছালে নিরাপত্তাকে কারণ দেখিয়ে নিজেদের জাহাজগুলো ফিরিয়ে নেয় ইতালি ও স্পেন। এরপর বুধবার নৌবহরটিকে বাধা দেয় ইসরায়েল।

এর আগেও গাজামুখী নৌবহরে ইসরায়েলের হামলার ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে নৃশংস ঘটনাটি ঘটে ২০১০ সালে। সে বছর ‘গাজা ফ্রিডম ফ্লোটিলায়’ ইসরায়েল হামলা চালালে ১০ অধিকারকর্মী নিহত হন। এরপর ২০১১, ২০১৫ ও ২০১৮ সালে বেশ কয়েকটি নৌবহর আটক করে আশদোদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০২৪ সালে আরেকটি নৌবহরের যাত্রা শুরুর আগেই থামিয়ে দেয় ইসরায়েল।

এ বছরও গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার আগে বেশ কয়েকটি নৌবহর ত্রাণ নিয়ে গাজার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। এর মধ্যে জুন মাসে ইতালি থেকে গাজার দিকে ত্রাণ নিয়ে যাওয়া ‘ম্যাডলিন’ নামের একটি নৌযান আটক করে ইসরায়েলি সেনারা। তখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। পরে জুলাই মাসে ‘হান্দালা’ নামের আরেকটি নৌযান আটক করা হয়।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার একটি নৌযানে আরোহীরা হাত উঁচিয়ে আছেন। তাঁদের দিকে বন্দুক তাক করেছেন এক ইসরায়েলি সেনা। গতকাল ভূমধ্যসাগরে গাজা অভিমুখে যাত্রাপথে
ছবি: রয়টার্স
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার একটি নৌযানে আরোহীরা হাত উঁচিয়ে আছেন। তাঁদের দিকে বন্দুক তাক করেছেন এক ইসরায়েলি সেনা। গতকাল ভূমধ্যসাগরে গাজা অভিমুখে যাত্রাপথে। ছবি: রয়টার্স

গাজায় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নতুন শান্তি পরিকল্পনা

গাজার জন্য একটি নতুন শান্তি পরিকল্পনায় একমত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। পরিকল্পনায় অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর অধীনে জীবিত ইসরাইলি ২০ জিম্মি এবং আরও দু’ডজনেরও বেশি মৃত বলে ধারণা করা জিম্মির দেহাবশেষ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি দিতে হবে। বিনিময়ে শত শত বন্দি ফিলিস্তিনি মুক্তি পাবে। একজন ফিলিস্তিনি সূত্র যুদ্ধবিরতি আলোচনার সঙ্গে পরিচিত। তিনি বিবিসিকে জানিয়েছেন, হামাস কর্মকর্তাদের হোয়াইট হাউসের ২০ দফা প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। প্রস্তাবে দাবি করা হয়েছে, হামাস গাজার শাসনে কোনোভাবেই ভূমিকা রাখতে পারবে না এবং ভবিষ্যতে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনার দরজা খোলা থাকবে। হোয়াইট হাউসে আলোচনার পর এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এই পরিকল্পনাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘শান্তির জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন’ হিসেবে। তবে তিনি আরও বলেন, হামাস যদি এই পরিকল্পনা না মেনে নেয় তবে হামাসের হুমকি ধ্বংস করার কাজ শেষ করতে নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করবে। নেতানিয়াহু বলেন, হামাস যদি পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করে বা তা অনুসরণ না করে, তবে ইসরাইল ‘কাজটি শেষ করবে।’

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রচেষ্টাকে আন্তরিক ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে আখ্যায়িত করেছে। সংবাদ সংস্থা ওয়াফাতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র, আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহ ও অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ প্রতিশ্রুতি নবায়ন করছে- যুদ্ধের অবসান, গাজায় যথেষ্ট মানবিক সহায়তা নিশ্চিতকরণ, জিম্মি ও বন্দিদের মুক্তির বিষয়ে কাজ করতে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, মিশর, জর্ডান, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও আন্তরিক প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত, যাতে এই চুক্তি চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন করা যায়। এ চুক্তি শেষ পর্যন্ত একটি দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে। যেখানে গাজা সম্পূর্ণভাবে পশ্চিম তীরের সঙ্গে একীভূত হয়ে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রে পরিণত হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ হবে এবং বিদ্যমান যুদ্ধরেখা অপরিবর্তিত থাকবে, যতক্ষণ না ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের শর্ত পূরণ হয়। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুসারে, হামাসকে অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে এবং তাদের সুড়ঙ্গ ও অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে হবে।

প্রত্যেক ইসরাইলি জিম্মির দেহাবশেষ ফেরত দেয়ার বিনিময়ে ইসরাইল ১৫ জন ফিলিস্তিনির দেহাবশেষ ফিরিয়ে দেবে। উভয় পক্ষ পরিকল্পনায় সম্মত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গাজায় পূর্ণ মানবিক সহায়তা পাঠানো হবে। যুক্তরাষ্ট্র গাজার ভবিষ্যৎ শাসনের জন্যও একটি পরিকল্পনা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, একটি প্রযুক্তিগত ও অরাজনৈতিক ফিলিস্তিনি কমিটি সাময়িকভাবে গাজা শাসন করবে। এর ওপর নজরদারি করবে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বোর্ড অব পিস, যার প্রধান হবেন ট্রাম্প। সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও এ শাসন কাঠামোর অংশ হবেন। তিনি পরিকল্পনাটিকে বলেছেন দুঃসাহসী ও বুদ্ধিদীপ্ত। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আমরা সব পক্ষকে আহ্বান জানাই যেন তারা একত্রিত হয়, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করে চুক্তিটি বাস্তবায়ন করে। হামাসকে এখনই পরিকল্পনা মেনে নিতে হবে, অস্ত্র নামিয়ে রাখতে হবে এবং সব জিম্মি মুক্তি দিয়ে দুঃখ-কষ্টের অবসান ঘটাতে হবে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বলেন, তিনি নেতানিয়াহুর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় উৎসাহিত হয়েছেন। তিনি যোগ করেন, সব পক্ষকে এ মুহূর্তে শান্তিকে একটি সত্যিকারের সুযোগ দিতে হবে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন প্রস্তাবটিকে প্রশংসা করে বলেছেন, ফ্রান্স শান্তি প্রতিষ্ঠা ও জিম্মি মুক্তির প্রচেষ্টায় অবদান রাখতে প্রস্তুত। ম্যাক্রন আরও বলেন, এই উপাদানগুলোকে অবশ্যই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি গড়ার জন্য গভীর আলোচনার পথ তৈরি করতে হবে, যা দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ভিত্তি গড়বে।

গাজায় ‘তাৎক্ষণিকভাবে’ যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনায় কী আছে
গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করতে ঐতিহাসিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউস। এই পরিকল্পনা নিয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এরপরই পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। এই পরিকল্পনায় আছে ২০ দফা প্রস্তাব। বলা হয়েছে, এই প্রস্তাব মেনে নিলে ইসরাইল তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ বন্ধ করতে পারে। হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়েছে, যদি ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাস প্রস্তাব মেনে নেয়, তবে যুদ্ধ মুহূর্তের মধ্যেই থেমে যাবে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের এ পরিকল্পনা মেনে নিয়েছেন। তবে হামাসের কর্মকর্তা মাহমুদ মারদাভি বলেছেন, তারা গাজার জন্য কোনো লিখিত শান্তি পরিকল্পনা পাননি। ২০ দফা পরিকল্পনায় কি আছে তা এখানে তুলে ধরা হলো- ১. গাজাকে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসমুক্ত অঞ্চলে পরিণত করা হবে। ২. গাজাকে পুনর্গঠন করা হবে। ৩. উভয় পক্ষ প্রস্তাবে রাজি হলে যুদ্ধ সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হবে। ইসরাইলি বাহিনী জিম্মি মুক্তির প্রস্তুতির জন্য নির্ধারিত সীমারেখায় সরে যাবে। এ সময় সব সামরিক অভিযান-বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ বন্ধ থাকবে। যুদ্ধক্ষেত্রের সীমারেখা স্থির থাকবে, যতক্ষণ না ধাপে ধাপে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহারের শর্ত পূরণ হয়। অর্থাৎ, দু’পক্ষই তাদের জায়গা বদলাবে না। সব শর্ত যেমন, জিম্মি ও বন্দিমুক্তি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ঠিক করা ইত্যাদি পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে। ৪. ইসরাইল প্রকাশ্যে এই চুক্তি মেনে নেয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সব জিম্মিকে (জীবিত ও মৃত) ফিরিয়ে দেয়া হবে। ৫. সব জিম্মি ফেরত আসার পর ইসরাইল যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ২৫০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে। এর সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের পর আটক করা ১ হাজার ৭০০ গাজাবাসীকেও মুক্তি দেবে। ৬. সব জিম্মি ফেরত আসার পর, হামাসের যেসব সদস্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান মেনে অস্ত্র ত্যাগ করতে রাজি হবেন, তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হবে। হামাসের যেসব সদস্য গাজা ছাড়তে চান, তাদের নিরাপদে অন্য দেশে যেতে দেয়া হবে। ৭. চুক্তি মেনে নেয়ার পরই গাজায় পুরোপুরি মানবিক সহায়তা প্রবেশ করবে। ন্যূনতম সহায়তা সেই মাত্রায় থাকবে, যা গত ১৯শে জানুয়ারির মানবিক সহায়তা চুক্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে অবকাঠামো (পানি, বিদ্যুৎ, নর্দমা ব্যবস্থা), হাসপাতাল, বেকারি মেরামত এবং ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে রাস্তা খোলার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আনার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ৮. জাতিসংঘ ও এর সংস্থাগুলো, রেড ক্রিসেন্ট এবং অন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, যারা কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্ত নয়, তারা গাজায় সহায়তা সরবরাহ ও বিতরণ করবে। রাফাহ সীমান্ত দুই দিকে খোলার বিষয়টি ১৯শে জানুয়ারির চুক্তির অধীনে একই ব্যবস্থায় চলবে। অর্থাৎ, সীমান্ত খোলা ও বন্ধ হবে পুরনো চুক্তির নিয়মে, দু’পক্ষের সম্মতি ও তত্ত্বাবধানে। ৯. গাজার প্রশাসন সাময়িকভাবে একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে থাকবে। রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ এ কমিটি গাজার মানুষের জন্য দৈনন্দিন সেবা পরিচালনা করবে। কমিটিতে যোগ্য ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ থাকবেন। তাদের তত্ত্বাবধান করবে একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা- ‘বোর্ড অব পিস’। এর প্রধান থাকবেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।

সংস্থার সদস্য হিসেবে সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের নাম পরে ঘোষণা করা হবে। এ সংস্থা গাজা পুনর্গঠনের জন্য অর্থ ও কাঠামো ঠিক করবে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ করে আবারো কার্যকরভাবে গাজার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম না হওয়া পর্যন্ত সংস্থা কাজ চালাবে। সংস্থাটির লক্ষ্য হবে গাজায় আধুনিক, কার্যকর ও বিনিয়োগবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা। সব জিম্মি ফেরত আসার পর ইসরাইল যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ২৫০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে। এর সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের পর আটক করা ১ হাজার ৭০০ গাজাবাসীকেও মুক্তি দেবে। এতে ওই সময় আটক সব নারী ও শিশুও থাকবে। প্রত্যেক ইসরাইলি জিম্মির মরদেহের বিনিময়ে ইসরাইল ১৫ জন গাজাবাসীর মরদেহ ফিরিয়ে দেবে। ১০. অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সফল আধুনিক শহরের পরিকল্পনায় কাজ করা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গাজা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিনিয়োগ-প্রস্তাব ও উন্নয়ন-পরিকল্পনা বিবেচনা করা হবে; যাতে কর্মসংস্থান, সুযোগ ও ভবিষ্যতের আশা তৈরি হয়। ১১. গাজায় একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সঙ্গে শুল্ক ও প্রবেশাধিকারের বিষয়ে আলোচনা হবে। ১২. কাউকে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না। যারা যেতে চাইবেন, যেতে পারবেন এবং ইচ্ছা করলে ফিরে আসতেও পারবেন। তবে মানুষকে গাজায় থাকতে উৎসাহ দেয়া হবে; যাতে তারা নতুন গাজা গড়ে তুলতে পারেন। ১৩. হামাস ও অন্যান্য সংগঠন প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ বা অন্য কোনোভাবে গাজার প্রশাসনে অংশ নেবে না। সব সামরিক অবকাঠামো- টানেল, অস্ত্র কারখানা ধ্বংস করা হবে এবং পুনঃনির্মাণের অনুমতি থাকবে না।

নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে নিরস্ত্রীকরণ করা হবে। অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করে সরিয়ে ফেলা হবে। অস্ত্র জমা দেয়ার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক তহবিল দিয়ে এটির ক্রয় কার্যক্রম চালানো হবে। নতুন গাজা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। ১৪. আঞ্চলিক অংশীদাররা নিশ্চয়তা দেবে যে, হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠী তাদের প্রতিশ্রুতি মানবে এবং নতুন গাজা প্রতিবেশী দেশ বা নিজের জনগণের জন্য হুমকি হবে না। ১৫. আরব ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র গাজার জন্য একটি অস্থায়ী বাহিনী ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ)’ গঠন করবে। এটি দ্রুত গাজায় মোতায়েন হবে। আইএসএফ গাজার জন্য বাছাই করা ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে এবং জর্ডান ও মিশরের সঙ্গে পরামর্শ করবে; যাদের এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ বাহিনী দীর্ঘমেয়াদে গাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে। আইএসএফ ইসরাইল ও মিশরের সঙ্গে মিলে সীমান্ত সুরক্ষার কাজও করবে। মূল লক্ষ্য হবে, গাজায় অস্ত্র প্রবেশ ঠেকানো এবং দ্রুত পুনর্গঠনের জন্য পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ বিষয়ে একটি সমন্বয় প্রক্রিয়ায় উভয়পক্ষ রাজি হবে। ১৬. ইসরাইল গাজা দখল বা সংযুক্ত করবে না। আইএসএফ স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করলে ইসরাইলি সেনারা ধাপে ধাপে গাজা ছাড়বে। এ জন্য নিরস্ত্রীকরণের অগ্রগতি ও নির্ধারিত সময়সূচির ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা হবে।

উদ্দেশ্য হবে এমন এক গাজা গড়ে তোলা, যা ইসরাইল, মিশর বা তাদের নাগরিকদের জন্য আর হুমকি হবে না। ইসরাইলি সেনারা ধাপে ধাপে গাজার নিয়ন্ত্রণ আইএসএফের হাতে তুলে দেবে। পুরো সেনা সরানোর পরও শুধু নিরাপত্তা রক্ষায় সামান্য সৈন্য থাকবে; যতক্ষণ না গাজা পুরোপুরি নিরাপদ হয়। ১৭. যদি হামাস এ পরিকল্পনা মানতে দেরি করে বা মেনে না নেয়, তবুও ইসরাইল যে জায়গা ছাড়বে (যেগুলো ‘সন্ত্রাসমুক্ত’ করা হয়েছে) সেই জায়গাগুলো আইএসএফের হাতে তুলে দেবে এবং ওই নিরাপদ এলাকায় সাহায্য ও পুনর্গঠনের কাজ চালু হবে। ১৮. গাজায় সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতে একটি আন্তঃধর্মীয় সংলাপ চালু হবে। এর লক্ষ্য হবে, ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বর্ণনা বদলানো; যাতে তারা শান্তির সুফল বুঝতে পারেন। ১৯. গাজা পুনর্গঠনের কাজ চলাকালে ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র গঠনে একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, এটাই ফিলিস্তিনি জনগণের আকাঙক্ষা। ২০. যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংলাপ শুরু করবে; যাতে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সহাবস্থানের জন্য একটি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় তারা একমত হতে পারে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-30%2F53lx7hgu%2FTrump-1.jpg?rect=0%2C0%2C695%2C463&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা by মো. সাহাবুল হক

সম্প্রতি চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত হলো সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলন। এই সম্মেলন ঘিরে বিশ্ববাসীর মধ্যে অনেক আগ্রহ ছিল। আঞ্চলিক জমায়েতের পাশাপাশি এটিকে বিশ্বরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আভাস হিসেবে অনেকে দেখছেন। গাজা সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির মতো বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

এ সম্মেলনে বিশ্বের ২০টি দেশের নেতা ও ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানেরা অংশগ্রহণ করেন। এতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি, মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা উপস্থিত ছিলেন।

এসসিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০০১ সালে। এর মূল লক্ষ্য ছিল সদস্যদেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধি করা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক ফোরামে পরিণত হয়েছে। এবারের সম্মেলনের মূল বিষয় ছিল ‘সব পক্ষের ঐকমত্য গঠন ও সহযোগিতার গতিশীলতা সৃষ্টি করা’। এই সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীন ও রাশিয়া নিজেদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আমেরিকার শুল্কনীতি এবং অন্যদিকে এক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তাঁর ভাষণে বলেন, ‘অস্থিরতার এই সময়ে বৈশ্বিক শাসন এক নতুন মোড়ের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের অবশ্যই আধিপত্যবাদ ও ক্ষমতার রাজনীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।’ তাঁর এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার প্রতি একটি পরোক্ষ চ্যালেঞ্জ ছিল।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, এসসিও ইউরেশিয়ায় একটি নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করেছে। এই নতুন ব্যবস্থা পুরোনো ইউরোকেন্দ্রিক মডেলগুলোর বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি এই সম্মেলনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তিনি পুতিনকে আলিঙ্গন করেন এবং সি চিন পিংয়ের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এটি দেখায় যে দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরাশক্তি এক মঞ্চে একত্র হতে পারে।

চীন, রাশিয়া ও অন্য অংশগ্রহণকারী দেশগুলো একযোগে আমেরিকার একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। চীন এই সম্মেলনের মাধ্যমে এক নতুন বৈশ্বিক নেতৃত্বে নিজেদের শক্তিশালী ভূমিকাকে তুলে ধরেছে। এই সম্মেলন দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এটি এমন একটি সময় ঘটেছে, যখন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে অস্থিরতা ও উত্তেজনা রয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত।

একদিকে ভারত চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। একদিকে পাকিস্তান ও চীন বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে, অন্যদিকে ভারত চীনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যার সমাধান করার চেষ্টায় রয়েছে। তবে এই সমস্যা সীমান্ত সমস্যার বাইরে গিয়ে আরও অনেক গভীরে বিস্তৃত এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণে শুধু সীমান্তের প্রশ্নই প্রধান নয়। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এ ব্যাপারে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন।

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এসসিও সম্মেলন একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে কাজ করেছে। এই সম্মেলনে চীন তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কগুলোকে আরও দৃঢ় করেছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সহযোগিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। চীনের এই কৌশলের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়াকে কেন্দ্র করে নতুন ভূরাজনৈতিক ধারণার সূচনা হতে পারে।

দেখা যাচ্ছে, চীন তার প্রভাব বাড়ানোর জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করছে এবং এটি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে, বিশেষ করে যখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের চাপ রয়েছে।

শেষে বলা যায়, সাংহাই সম্মেলন চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত, যা শুধু চীন-ভারত বা চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের ওপরে নির্ভরশীল নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর একটি কৌশলগত কাঠামো তৈরির একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়।

আর এটি যদি হয় তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে। এতে এ এলাকার প্রতিবেশী দেশগুলো মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলমান উত্তেজনার পরিবর্তে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করবে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই মুহূর্তে বড় প্রয়োজন।

এই সম্মেলন থেকে এটি স্পষ্ট যে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন একটি ধারা তৈরি হচ্ছে, যেখানে বহুপক্ষীয়তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তবে এটি অঞ্চলের শান্তি ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে অনেকের প্রত্যাশা। তবে সেই পথে হাঁটতে গেলে প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের মধ্যে আন্তযোগাযোগ আরও বাড়াতে হবে। বহুপক্ষীয় সম্পর্কে রূপান্তরিত করতে হবে।

* ড. মো. সাহাবুল হক, অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
- মতামত লেখকের নিজস্ব

কথা বলছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (বাঁয়ে), ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (মাঝে) এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং (ডানে)। চীনের তিয়ানজিনে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে
কথা বলছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (বাঁয়ে), ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (মাঝে) এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং (ডানে)। চীনের তিয়ানজিনে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে। ছবি: রয়টার্স