Wednesday, December 4, 2013

সংবাদমাধ্যম নিয়ে ফরহাদ মজহার : মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ঘৃণাযুক্ত বক্তব্য এবং আইনী মীমাংসার প্রশ্ন by বাধন অধিকারী

একুশে টেলিভিশনের এক টক শো-তে ফরহাদ মজহারের গণমাধ্যম সংক্রান্ত বক্তব্য এই লেখার প্রেরণা। কদিন আগে ‘একুশের রাত’ নামের ওই আলোচনায়, একাত্তর টেলিভিশনে পিকেটারদের হামলার প্রেক্ষাপটে সঞ্চালক আলাপ তুললে, রাজনীতিক কাজী ফিরোজ রশীদ এবং চিন্তক ফরহাদ মজহার এ নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান। কাজী ফিরোজ, হামলার বিরোধীতা করে সঞ্চালককে উদ্দেশ্য করে বলেন, তাদের মানে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল হতে হবে আরও। একপক্ষীয় অবস্থান নেয়া যাবে না। নাহলে হামলার ঘটনা এড়ানো যাবে না। অন্যদিকে ফরহাদ মজহারের কিছু সুনির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ ছিলো গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে। এমনকী গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও। একটা অভিযোগ: গণমাধ্যম বিরোধীদের জায়গা দেয় না। আরেকটা অভিযোগ; গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্টরা মাহমুদুর রহমানের গ্রেপ্তার- হয়রানি, দিগন্ত টেলিভিশন-আমার দেশ-চ্যানেল ওয়ান বন্ধ হওয়া নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। সর্বোপরি গণমাধ্যমকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়েছেন ফরহাদ মজহার। আর এইসব অভিযোগকে ভিত্তি করেই উনি বলেছেন; “আপনাদের তো বোমা মারাই উচিত।” উনি যা বলতে চেয়েছেন, তার তরজমা করলে এমনটা দাঁড়ায় যে; গণমাধ্যমগুলোর জনবিরোধী ভূমিকাই এইসব হামলার শর্ত তৈরী করেছে। আপনাদের তো বোমা মারাই উচিত বলতে আমি বুঝেছি, গণমাধ্যমের নেতিবাচক ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করেই উনি বলেছেন; এর প্রতিক্রিয়ায় তো বোমা হামলাই হবে। গণমাধ্যমগুলো যতোটা জনবিরোধী তাতে সন্ত্রাসের মাত্রা আরও বেশি হতে পারত; এমনটাই ফরহাদ মজহারের প্রস্তাবনা। সুতরাং একাত্তর টেলিভিশনে বোমা হামলা করতে বলেছেন; সরাসরি এমন অভিযোগ আনা যায় না তাঁর বিরুদ্ধে।
তবে আজকের এই লেখার উপজীব্যের স্বার্থেই গণমাধ্যম নিয়ে ফরহাদ মজহারের ওইদিনের গণমাধ্যম সংক্রান্ত আলাপটাকে খানিক বিচার করতে হবে আমাদের। পাঠক, এইতো কদিন আগের কথা, আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়; ফরহাদ মজহার কিন্তু উৎসাহ জুগিয়েছেন এই তথ্যহীন-ভিত্তিহীন প্রচারণায় যে, হেফাজতের সমাবেশে হাজার হাজার মানুষকে গুলি করে মারা হয়েছিলো। তিনি কিন্তু চুপ করে ছিলেন, যখন শাহবাগের তরুণরা সবাই নাস্তিক না হয়েও নাস্তিক্যের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলো। দেশব্যাপি ঘৃণাযুক্ত বক্তব্য (হেইট স্পিচ) প্রচার পেয়েছিলো। যাদের পক্ষে না দাঁড়ানোর কারণে তিনি আজকে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের অভিযুক্ত করছেন, সেই আমার দেশ, সেই দিগন্তই ছিলো এইসব ভিত্তিহীন প্রচারণার প্রাণভোমরা। আর শাসক শ্রেণীর সরকার-বিরোধী অংশের (আমার মতো অনেক মানুষের বিবেচনাতেই সরকার আর বিরোধী দল- দুই-ই শাসক শ্রেণীর অস্তর্গত) এইসব মিডিয়ার প্রচারণায় কেবল শাহবাগের তরুণদের ক্ষতি হয়নি; ক্ষতি হয় আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাঙ্কেও। সবগুলো সিটি নির্বাচনে আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন জোট হেরে যায় বেহালভাবে। প্রতিশোধ নিতে আইনগত সন্ত্রাস চালিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয় এইসব সরকারবিরোধী মিডিয়া।
আর এদিকে শাসকশ্রেণীর বিরোধীদলীয় অংশের হাতে তো আজ রাষ্ট্রের আইন নাই, নির্বাহী ক্ষমতা নাই, সেকারণে তারা শারীরিক সন্ত্রাস চালাচ্ছে। বোমা মারছে। খুব পরিস্কার কথা। আর সেই পরিস্কার কথাটা বলতে গিয়ে ফরহাদ মজহার ফাঁদে পড়েছেন। সরকারপন্থী মিডিয়াগুলো এবার সেই সময়ের আমার দেশ দিগন্ত টিভি কায়দায় মিথ্যা প্রচারণা করছে। সরকারবিরোধীরা করেছিলো ব্লগারদের বিরুদ্ধে, তাদের বানিয়েছিলো নাস্তিক। আজ সরকারপন্থীরা মিথ্যে প্রচারণা করছে ফরহাদ মজহারের বিরুদ্ধে, তাকে বানিয়েছে বোমাবাজ। একেই কি বলে ন্যাচারাল জাস্টিজ?
সে প্রশ্নে আমরা পরে আসছি। তারআগে একটা জরুরি দিক খেয়াল করতে হবে আমাদের। সেটা হলো; যে প্রতিশোধের রাজনীতির কথা বললাম, সেই রাজনীতিকেই ফরহাদ মজহার স্বাভাবিক বলে রায় দিলেন। তাহলে প্রশ্ন না উঠে যায় কোথায়, ফরহাদ মজহার শাসক শ্রেণীর বিরোধী দলীয় অংশের একজন প্রতিনিধি; যিনি প্রতিশোধকেই গন্তব্য বিবেচনা করেন? ফরহাদ ভাইয়ের মতে; শাহবাগের ছেলেমেয়েরা যুদ্ধাপরাধির ফাঁসি চেয়ে চিৎকার দিলে ফ্যাসিবাদ হয়; আর জামায়াত-শিবির একাত্তর টিভিতে বোমা মারলে তা একাত্তরের ভূমিকার দোষ হয়! এই বৈপরীত্যের পাঠ নেয়াই আদতে ফরহাদ মজহার পাঠ! ফরহাদ ভাইয়ের সূত্রেই পরিচিত হয়েছিলাম এ্যাডোয়ার্ড সাঈদের সঙ্গে। নিপীড়িতের পক্ষের আমৃত্যু লড়ে যাওয়া সেই সংগ্রামী বুদ্ধিজীবী সাঈদের জবানে প্রকৃত বুদ্ধিজীবী একা। না, জনবিচ্ছিন্ন নন তিনি। তবে ক্ষমতাবিচ্ছিন্ন। শাসক-শ্রেণী বিচ্ছিন্ন। ক্ষমতার বিপরীতে একাকী দাঁড়াতে পারেন যিনি, তিনিই সত্যিকারের বুদ্ধিজীবী। ফরহাদ মজহারের অন্য এক ক্ষমতাশক্তির পক্ষ হয়ে এখনকার এক ক্ষমতাশক্তির বিরুদ্ধে লড়ছেন। এটা দলবৃত্তি। বুদ্ধিবৃত্তি না। সেকারণেই এই বৃত্তি বড়জোর প্রতিশোধকেই নির্দিষ্ট করতে পারে। প্রতিশোধ-স্পৃহার উত্থান যেখানে, সেই জায়গাটাকে নির্দিষ্ট করতে পারে না।
ফরহাদ ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা অক্ষুণ্ন রেখে বলছি; একাত্তর টেলিভিশনে মারা এই বোমার ভেতরে যে প্রতিশোধের আগুন তার জ্বালানি সরবরাহকারী তো দুই পক্ষই। যে পক্ষ আজ একাত্তরকে সরকারের দালাল বলে বোমা হামলা করছে, সেই পক্ষইতো তাদের সংবাদমাধ্যমগুলো বন্ধ হওয়ার আগে মনের মাধুরী মিশিয়ে হলুদ গল্প লিখে গেছে দিনের পর দিন। তখন কি ফরহাদ মজহার বলেছিলেন, সরকারপক্ষকে কথা বলতে না দিলে তো এগুলো বন্ধ হবেই! বলেছিলেন কি, বন্ধ হওয়াই উচিত! বলেননি। বলার কথাও নয়। কাজের কথা ছিলো দাঁড়ানো। অবস্থান নেয়া। উনি নিয়েছেন। সিরকারবিরোধী মিডিয়াগুলোর পক্ষে। আর আজ সরকারপক্ষীয়রা নির্বাহী ক্ষমতায় নয়, একেবারে ডিরেক্ট বোমায় আক্রান্ত হবার পর উনি বলছেন, এটাই উচিত ছিলো! মানে এটাই হবার ছিলো! এখানেই তিনি বুদ্ধিজীবী থেকে দলীয় চিন্তাবিদে পর্যবসিত হন, হারিয়ে ফেলেন বোমার ভেতরের মানসিক উপাদানগুলো; যার নির্মিতি খোদ ক্ষমতাদখলের রাজনীতির মধ্যেই।
টক শোর আলোচনার এক পর্যায়ে গিয়ে ফরহাদ ভাই বলেছেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে তিনি। সেকারণে সরকারপন্থীরা যা করছে করুক না, তবে সরকারবিরোধী মিডিয়াগুলো বন্ধ করে দেয়া হলো কেন, সেটাই ফরহাদের অভিযোগ। এই অভিযোগের ভেতরেও রয়েছে, ক্ষমতা-রাজনীতির সীমাবদ্ধ অঞ্চল। উনি এই সরকার আর বিরোধীদের বাইরে এসে বলেননি; সরকারপক্ষীয় বা সরকারবিরোধী; যাই হোক না কেন, সবগুলো মিডিয়াই এন্টিপিপল (জনবিরোধী কিংবা এর সমার্থক শব্দ উনি উচ্চারণ করেছেন বটে, তবে তা কেবল বিরোধী দল-বিরোধী অর্থে। যেন বিরোধী দলটাই হলো মাস পিপল!)। তিনি বলেননি, সবগুলো বড় মিডিয়া হাসিনা-খালেদার কিংবা কথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, কিংবা বহুজাতিক কর্পোরেশনের পক্ষের রাজনীতি করে। ফরহাদ ভাই বলেননি, কেননা উনিও ওইসব পক্ষেরই কোনো একটার অন্তর্গত। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চান। তার পক্ষের জন্য। সেটাই তাঁর কাছে নিরপেক্ষতা।
আর এ কারণেই বিপরীত পক্ষ তাঁকে একাত্তর-টেলিভিশন বিরোধী হিসেবে শনাক্ত করে। আখ্যা দেয় বোমাবাজ। তাঁকে ফাঁদ পেতে ধরার চেষ্টা করে। একাত্তরে বোমা হামলা যেমন করে বিরোধীদের কণ্ঠস্বর বিলীন করবার প্রতিক্রিয়া; ফরহাদ মজহারের জন্য বোমা-ফাঁদ পাতাও তেমনি ওনার মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া। এটাই প্রতিশোধের খেলা। এরই নামতো রাজনীতি। ক্ষমতা দখলের লড়াই। ফরহাদ মজহার বুদ্ধিজীবী থেকে সেই দখলদারিত্বের খেলায় বিরোধী অবস্থানে থাকা রাজনৈতিক শক্তির একজন বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়েছেন। সরকার-পক্ষীয়রা এবার তাই তাঁর বিরুদ্ধে তৎপর; আইনগত সন্ত্রাস চালাতে।
এরইমধ্যে এই আইনগত সন্ত্রাসের পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্র সরবরাহ করেছেন আরেক মহাত্মা সলিমুল্লাহ খান। ক্ষমতাশক্তির সরকারপন্থী অংশের পক্ষে দলবৃত্তি করতে গিয়ে ফরহাদ মজহারের বক্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহীতা আখ্যা দিয়েছেন তিনি। এবার এও বলা হতে পারে; ফরহাদ মজহার হেট স্পিচ ছড়িয়েছেন। একটা কমিউনিটি হিসেবে সাংবাদিকদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়েছেন। তাদের হামলার মদদ দিয়েছেন। তবে এইসব অভিযোগ সত্য নয়; আমরা যারা সেদিনের টক শো টা দেখেছি, তারা সবাই জানি। আর যদি সত্যি হয়ও, তাহলেও কি আমরা ফরহাদ মজহারকে সরকারের আইনগত সন্ত্রাসের হাতে ছেড়ে দেব? তাঁকে গ্রেপ্তার হয়রানি রিম্যান্ড করবে সরকার; আর আমরা চেয়ে চেয়ে দেখব? তারপর টক শো-তে গিয়ে বলব; ফরহাদ মজহার কেবল সরকার-বিরোধীদের পক্ষেই বলে। সরকারের পক্ষে কোনো অবস্থান নেয় না। তার গ্রেপ্তার-রিম্যান্ড-হয়রানি তো হবারই কথা! তার ফাঁসি হওয়া উচিত! না বলব না।
‌তাহলে ফরহাদ মজহারের মতো, আমরাও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্তব্য ভুলে সরকারের দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হয়ে যাব। ব্যক্তিগতভাবে জানিয়ে রাখি; নির্বাহী আদেশে আমার দেশ বন্ধ করে দেয়ার পর প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি আমি। যদিও ওই পত্রিকাটা আমার কাছে আগাগোড়া হলদেটে! দগদগে হলুদ। আজ ফরহাদ মজহারের মতামতের প্রবল বিরোধী হয়েও তার বিরুদ্ধে পাতা সরকারপক্ষীয় ফাঁদের হাত থেকে তাকে বাঁচানোকেই তাই বুদ্ধিবৃত্তিক কর্তব্য হিসেবে নির্দিষ্ট করেছি। এমনকী ফরহাদ মজহার হেট স্পিচ ছড়াইলেও (যদিও আমার বিবেচনায় ফরহাদের বক্তব্য কোনোভাবেই হেট স্পিচ না) আমাদের সামগ্রিক মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষের অবস্থানের নৈতিক পাটাতন থেকে তাঁর অধিকারের পক্ষে আমাদের দাঁড়াতে হবে।
এখানে একটু বিস্তারিত বলে রাখি। ফরহাদ মজহার রাষ্ট্রীয় হয়রানির শিকার হলে তার বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড়াতে হবে; দিন দুয়েক আগে আমার এমন একটি স্ট্যাটাসের বিপরীতে ফেইসবুকে কথা হচ্ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের একজন প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে। উনি বলছিলেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নির্বিচারী হতে পারে কিনা। যিনি বলছেন, তার দায়দায়িত্বের প্রশ্ন আছে কি নেই। আলাপটা যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে এগোয়নি। তবে এটা কে না জানে, দায়িত্বহীন মন্তব্য অনেক ক্ষতি করে ফেলে। হেইট স্পিচ কিংবা হার্ম স্পিচ, যা কিনা, কোনো নির্দিষ্ট জাতি-বর্ণ-লিঙ্গ-ধর্ম অথবা অন্য কোনো অর্থে একটা কমিউনিটির প্রতি বিদ্বেষ ছড়াতে ব্যবহার করা হয়, তার ফলাফল খুবই ভয়ঙ্কর হয়। এতে দাঙ্গা-সংঘর্ষ-রক্তপাত অব্দি হয়। তবে একক মন্তব্যকারীকে বিচ্ছিন্নভাবে এজন্য দায়ী করে কোনো লাভ হয় না। তাকে আইনের আওতায় নিয়েও সত্যিকারের ইতিবাচক কিছু হয় না। কেননা হেট স্পিসের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আগে নয় কিন্তু, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনের পরিসর কাজ শুরু করে হেট স্পিস ছড়িয়ে পড়ার পরে। ততক্ষণে যা ক্ষতি হবার, তাতো হয়েই যায়। ইতিহাসের মুক্তিপন্থী-সমাজবাদীদের কাছে শিখেছি; যে বক্তব্য হেইট স্পিচ, হার্ম স্পিচ, তাকে ইতিবাচক মানবিক শুভ আর মঙ্গলের পক্ষের বক্তব্য দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। একটা হেট স্পিসের বিপরীতে ১০টা সমতা-ন্যায়ের পক্ষের বক্তব্য সামনে আনতে হবে। পাঠক খেয়াল করে দেখেছেন নিশ্চয়, হেইট স্পিসের ভাইরাস সবাইকে আক্রান্ত করে না। পাহাড়িদের বিরুদ্ধে কেউ এমন বক্তব্য ছড়ালেই কি আমি যাব, পাহাড়িদের ধ্বংস করতে? যাব না। অনেক মানুষ যাবে না। এই যারা যাবে না, তারা কিন্তু মানবীয়তার (দোহাই, আমাকে হিউম্যানিস্ট ভাববেন না) একটা পর্যায় অতিক্রম করেছে। সেকারণে হেট স্পিসের বিপরীতে আমাদের প্রতিরোধের অস্ত্র হলো, সমাজটাকে আরও মানবীয় করে তোলা। আরও মুক্ত করে তোলা। আরও শোষণহীন করে তোলা। যেন হেইট স্পিসের ভাইরাস মানুষকে আক্রমণ করতে না পারে। আইন করে তাকে বন্ধ করতে গেলে খুব একটা লাভ হবে না। আর তারও আগের কথা হলো, আইন মানেই তার রাজনৈতিক ব্যবহার হবে। কোনটা হেট স্পিচ, কোনটা হেইট স্পিচ না, তা নির্ধারিত হবে দলীয় কিংবা ক্ষমতাশালীর এজেন্ডার ভিত্তিতে। চোখের সামনেই উদাহরণ জ্বলজ্বল করছে। একাত্তরে বোমা হামলার প্রেক্ষাপটে ফরহাদের বক্তব্য সরকারপক্ষের কাছে ভয়ঙ্কর। তবে তাদের মন্ত্রী-এমপিরা হরতালকারীদের হত্যা করতে বললেও তা ভয়ঙ্কর হয় না।
সুতরাং, আমরা যারা ক্ষমতাশালীদের কোনো অংশেরই প্রতিনিধিত্ব করি না, তাদের দাঁড়াতে হবে যে কোনো মতামতের বিপরীতে রাষ্ট্রীয় হয়রানির বিরুদ্ধে। ব্যক্তি ফরহাদ মজহার নয়; নিজের মতামত প্রকাশকারী একজন নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকে যেন স্বাধীনতা ভোগ করে, সেই ন্যায়ভিত্তিক সমাজের প্রেরণার পক্ষে দাঁড়াতে গিয়েই আমাদের ফরহাদের হয়ে লড়তে হবে প্রয়োজনে; রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে। আদতে আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই দাঁড়াতে হবে। যেন আমার কথা বলার অধিকারটাও একদিন কেড়ে নিতে না পারে রাষ্ট্রযন্ত্র!
লেখক: সংবাদকর্মী

অপরিণামদর্শিতার খেসারত মানুষ কেন দেবে? আন্দোলনের নামে সহিংসতা

রাজনীতি জীবনের মূল্যে তার খাজনা প্রতিদিন নিচ্ছে। একতরফা নির্বাচনের ঘোষণা এবং তার জবাবে বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধ শুরুর পর থেকে রাজনীতি সহিংস মাত্রা পেয়েছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগুনে পুড়ে অথবা গুলিবিদ্ধ হয়ে মানুষের মৃত্যুর খবর আসছে।
সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব যতই সীমা ছাড়াচ্ছে, ততই তাদের ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। দুই জোটের বিনাশী তৎপরতা জনমনে ঘৃণার জন্ম দিচ্ছে। এই অবস্থার আশু অবসানই এখন জাতীয় দাবি।

বিরোধীদলীয় নেতা তাঁর কর্মীদের সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি না করতে আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বান শুনে মনে পড়ে যায়, ‘এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে!’ ইতিমধ্যে স্কুলগামী শিশু, ঘরফেরতা পেশাজীবী-গৃহবধূ, দিনমজুর বৃদ্ধ বীভৎস আগুনে পুড়ে অথবা গণশত্রু ককটেলের আঘাতে জীবন হারিয়েছেন। এ এমন মৃত্যু, যার কোনো সান্ত্বনা নেই; এ এমন মৃত্যু, কোনো মানুষেরই যা হওয়া উচিত নয়। অথচ যা হওয়া উচিত নয়, তা-ই ঘটছে। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার এই আহ্বান তাই অপরিণামদর্শী সহিংসতার দায় লাঘব করতে পারে না।

এমনকি সরকারি বাহিনীর গুলিতেও আন্দোলনকারীসহ সাধারণ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। সরকার সমঝোতার পথ ছেড়ে পুলিশ-বিজিবি ও ক্যাডারদের দিয়ে রাজপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছে। এই কৌশলও অপরিণামদর্শী। কারণ, রাজনৈতিক সমস্যাকে এভাবে বলপ্রয়োগে সমাধান করা যায় না। এতে করে বিরোধীরা পাল্টা বলপ্রয়োগে উৎসাহী হয় ওঠে এবং সেটাই ঘটছে। প্রমাণিত হয়েছে, সরকারি বাহিনীগুলো বিরোধী দল দমনে যতটা দক্ষ, জননিরাপত্তা প্রদানে ততটাই ব্যর্থ। নইলে পুলিশের নাকের ডগাতেই একের পর এক নাশকতা ঘটা এবং অপরাধীদের অধরা থেকে যাওয়া কীভাবে সম্ভব হচ্ছে? বাসে অগ্নিদগ্ধ গীতা সেনের কণ্ঠে তাই দেশবাসীর মনের কথাটাই প্রকাশিত হয়েছে যে ‘আমরা অসুস্থ সরকার চাই না’।

বিরোধী দলকেই প্রথমে নাশকতা থেকে আন্দোলনকে আলাদা করতে হবে। আর সহিংসতাই যদি আন্দোলনের একমাত্র ভাষা হয়, তাহলে পরিস্থিতির অবনতির দায় তাদেরও ছাড়বে না।

সহিংস রাজনীতি- চাই অহিংস নৈতিক শক্তির উত্থান by আলী রীয়াজ

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে আর যা-ই হোক, স্বাভাবিক বলে বর্ণনা করা যায় না। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর সারা দেশে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, সারা দেশে যে ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটেছে, তাতে কেবল যে উদ্বেগ, আশঙ্কা, আতঙ্ক ও ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে তা-ই নয়, অনেকেই এ প্রশ্ন তুলছেন যে এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে কি না।
পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে অসহায়ত্বের বোধ ছড়িয়ে পড়েছে, নিরাপত্তাহীনতা এখন সমাজের সর্বস্তরে। যাদের পরিবার-পরিজনের প্রাণনাশ হয়েছে, তাদের মানসিক অবস্থার কথা বর্ণনা করার চেষ্টা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তাদের ক্ষতি কোনো বর্ণনাতেই তুলে ধরা সম্ভব নয়। দলীয় অন্ধ বিবেচনার বাইরে দাঁড়িয়ে যে সাধারণ মানুষ এ পরিস্থিতিতে কথা বলছ, তাদের কণ্ঠস্বরকে আর্তনাদের মতোই শোনাচ্ছে। আর কত মানুষের মৃত্যু, আর কত মানুষের অগ্নিদগ্ধ শরীর, আর কত ধ্বংসযজ্ঞের পর সরকার ও বিরোধী রাজনীতিবিদেরা বুঝতে পারবেন যে এর অবসান দরকার? এ প্রশ্নই এখন সাধারণ মানুষের মনে। ক্ষমতার রাজনীতির পৃথিবী কি এতটাই অন্ধকার যে সেখানে জীবিত ও মৃত মানুষের মধ্যে ফারাক করা যায় না? সেই অন্ধকারে লাল রক্তের ধারা কি অদৃশ্য হয়ে যায়? সেই পৃথিবীতে কি মৃত মানুষের আর্তনাদ, জীবিতের আহাজারি কারও কানেই পৌঁছায় না?
সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো নতুন বিষয় নয়, কিন্তু গত কয়েক দিনের পরিস্থিতি থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এখনকার অবস্থা আগের কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে আর তুলনীয় নয়। কয়েক বছর ধরেই রাজনীতিতে সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং এ বছরের ফেব্রুয়ারির শেষে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে জামায়াতে ইসলামীর তাণ্ডব ও নির্বিচার আক্রমণ তা আগের যেকোনো সময়কে ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু গত কয়েক দিনের ঘটনা এর চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিরোধী দলের ডাকা হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াতের কর্মী ও সমর্থকদের নেতৃত্বে সারা দেশে তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ অবস্থা। সরকারের পক্ষ থেকে তা মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপ সাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে আমার মনে হয়েছে যে সহিংসতার প্রকৃতি, মাত্রা ও পরিসরে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে, যা মানবিক বিবেচনায় যেমন, তেমনি রাষ্ট্র ও রাজনীতির বিবেচনায়ও সবার মনোযোগ দাবি করে। তিনটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য তাগিদ থেকে এ লেখা। প্রথমত, সহিংসতা ক্রমেই ভৌগোলিকভাবে বিস্তার লাভ করছে। অতীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময়, সেটা ১৯৯৪-১৯৯৬ কিংবা ২০০৬ সালেও সহিংস ঘটনা কার্যত বড় বড় শহরকেন্দ্রিক ছিল।
কিন্তু এখনকার ঘটনাবলি কেবল নগরকেন্দ্রিক নেই; গত এক মাসের সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের দিকে তাকানোই এটা বোঝার জন্য যথেষ্ট। সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল হিসেবে কেবল আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর ওপরই নির্ভর করা হচ্ছে। তাতে করে এসব সহিংতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্যরা। সহিংসতার এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে এবং তা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়, তবে তা রাষ্ট্র ও একদল মানুষকে মুখোমুখি করে তুলবে কি না, সেটা বিবেচনায় নেওয়া দরকার। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে রাজনৈতিকভাবে সমাধান করার বদলে শক্তি প্রয়োগের ধারায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধীরা কয়েক কদম এগিয়ে আছে। কিন্তু তাদের এ পদক্ষেপ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে তুলছে কি না, তারা কি সেটা ভেবে দেখেছে? গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে গণতন্ত্রের প্রশ্নটি অবান্তর হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, সরকারের অনমনীয়তা এবং মূল রাজনৈতিক কারণের দিকে দৃষ্টি না দেওয়ার নীতির সম্ভাব্য পরিণতির বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা কতটা মনোযোগী, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। এই আশঙ্কা কি অমূলক যে এখন অবস্থা যা, তার আরও অবনতির অর্থ হবে যে দেশজুড়ে এক ‘অসম সংঘাতের’ (এসিমেট্রিক্যাল কনফ্লিক্ট) তৈরি হওয়া? যেকোনো ধরনের অসম সংঘাতের ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টে শক্তিশালী ও বৃহৎ শক্তি যদিও মনে করে যে তার বিজয় নিশ্চিত, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ঘটে না। কিন্তু তাতে রক্তক্ষয় ও প্রাণনাশের সংখ্যাই কেবল বাড়ে।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, এ সহিংসতার রূপ দেখে মনে হয় যে তা দেশে ‘সহিংসতার কুটিরশিল্প’ তৈরি করে দিচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহে সহিংসতায় ব্যবহূত বোমা ও অন্যান্য বিস্ফোরক যে দেশের ভেতরে তৈরি, সেটার একটা ইতিবাচক দিক হলো, এখনো তা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু উদ্বেগের বিষয়, এগুলো তৈরির একধরনের শিল্প সৃষ্টি হচ্ছে এবং একে কেন্দ্র করে বাণিজ্য শুরু হয়েছে। কোনো দেশে এ ধরনের একটা সহজ বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত হলে এবং তার অনুকূল পরিবেশ থাকলে তা একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে বাধ্য। আজকে যারা এ কাজে উৎসাহ জোগাচ্ছে, কাল তাদের প্রতিপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে এ কৌশল ব্যবহার করবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? ভবিষ্যতে তা যে রাজনীতির বাইরে বিস্তৃত হবে না, সে নিশ্চয়তা কে কাকে দিচ্ছে?
তৃতীয়ত, এই যে সহিংসতা, তা কি কারও নিয়ন্ত্রণের ভেতরে আছে? আজকে বিরোধীরা প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও হয়তো বলতে পারে যে অবস্থার পরিবর্তন ঘটলেই এর অবসান হবে। কিন্তু আমার আশঙ্কা, এ সহিংসতা শেষ পর্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসীদের হাতে না-ও থাকতে পারে। কেননা, এ ধারা অব্যাহত থাকলে সহিংসতার মাত্রা বাড়বে এবং তা নতুন নতুন রূপ নেবে। এতে করে এর ওপর এমন শক্তির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা নিয়মতান্ত্রিক সাংবিধানিক রাজনীতির জন্যই হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বিরোধী দলের যেমন তা বিবেচনায় নেওয়া দরকার, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকারকেও তা অনুধাবন করতে হবে। একটি নির্বাচনই গণতন্ত্র ও রাজনীতির শেষ কথা নয়।
রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে যে ভয়াবহ সহিংসতার পথে দেশ ইতিমধ্যে এগোতে শুরু করেছে, তার মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এ পরিস্থিতির অবসান কেবল রাষ্ট্রশক্তি বা রাজনীতিবিদদের শুভবুদ্ধির উদয়ের আশায় বসে থাকলে হবে বলে মনে করার কারণ নেই। এ জন্য ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। তাদের অহিংস নৈতিক শক্তির চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই। তাদের মধ্য থেকেই এ দাবি সামনে রেখে সমবেত হতে হবে যে আমরা শান্তি চাই, আমরা ক্ষমতার লড়াইয়ে পড়ে আর মরতে চাই না। তাদের নৈতিক চাপ প্রয়োগ করা দরকার বিরোধীদের ওপরে যেমন, তেমনি সরকারি দলের ওপরেও। অহিংস নৈতিক শক্তির দরকার বাংলাদেশে, যা এর আগে এত বেশি করে আর কখনোই অনুভূত হয়নি।

আলী রীয়াজ: পাবলিক পলিসি স্কলার, উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারস, ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র।

শুভবুদ্ধির উদয় হোক- দেশ কোন দিকে যাচ্ছে?

নির্বাচনের বিরোধিতা করে যখন বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচির সময় ক্রমশ বাড়ছে, তখন একতরফা নির্বাচনের নানা উদ্যোগ-আয়োজনও চলছে। সোমবার সারা দেশে মনোনয়নপত্র দাখিলের কাজ শেষ হয়েছে।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এই প্রক্রিয়ায় শরিক না হওয়ায় নির্বাচন-প্রক্রিয়া থেকে আনুষ্ঠানিকভাবেই নিজেকে সরিয়ে নিল দলটি। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকেও গতকাল দলের চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ পরিবেশ নেই—এই অজুহাতে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে তাঁর এ ঘোষণাই যে শেষ কথা, তা হলফ করে বলা যায় না। কাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিরোধী জোটের অবরোধের ডাক দেওয়া আছে, নির্বাচন ঠেকাতে এখন যদি তারা আরও কঠোর কর্মসূচি দেয়, তবে পরিস্থিতি আসলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সমঝোতার আহ্বানই উপেক্ষিত হয়েছে এবং দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় রয়েছে। দুই দফা অবরোধ কর্মসূচিতে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ জনে। এই অবস্থায় শান্তিপূর্ণ, অবাধ, অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কেবল দুরূহ নয়, অসম্ভবও।
জাতীয় পার্টির নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা যদি শেষ পর্যন্ত বহাল থাকে, তবে দেশ যে নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে, তা সব অর্থেই একদলীয় হিসেবেই বিবেচিত হবে। এ ধরনের একটি নির্বাচন দেশের জন্য কী ফল বয়ে আনবে?
গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু একটি নির্বাচনকে তখনই প্রকৃত নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করা যায়, যদি তা হয় অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ ও অবাধ। এর একটির অনুপস্থিতিই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে। দেশের প্রধান বিরোধী দল যদি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তবে সেটা আর যা-ই হোক অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে না। আর বিরোধী দল যখন সেই নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলন করছে, তখন নির্বাচন শান্তিপূর্ণ না হওয়ার আশঙ্কাই জোরালো হয়েছে।
আমরা আগেও বলেছি, আবারও বলি, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য প্রয়োজন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন। আর এ ধরনের একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল ও জোটের মতৈক্যে আসার কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে যে বিরোধ, তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের অযোগ্য নয়। কিন্তু যেকোনো সমঝোতা বা বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্রে যেটা জরুরি, তা হচ্ছে আন্তরিকতা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা। দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল এই দুটি ক্ষেত্রেই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দেশ আজ যে অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে এসে পড়েছে, এর দায় দুই পক্ষের হলেও একতরফা নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত ও সংঘর্ষের দায় প্রধানত সরকারকেই নিতে হবে। আমরা এখনো মনে করি, সমঝোতার সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি। সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

নির্বাচন- রাষ্ট্রীয় সংকট ও রাষ্ট্রপতি by আলী ইমাম মজুমদার

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে চলমান সংকটটি বিস্তারিত ব্যাখ্যার আবশ্যকতা নেই। পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্প খাতে নাশকতা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর বিচ্ছিন্ন হামলাসহ আরও কতিপয় বিষয় উপরিউক্ত সংকটকে বহুমাত্রিক করছে।

রাজনীতি- কী হবে এখন? by ইনাম আহমদ চৌধুরী

ঘোষণা করা হয়েছে, এখন নির্বাচনের কাল। তফসিলও হয়েছে প্রজ্ঞাপিত। আর খবরের কাগজে শীর্ষ সংবাদ—‘নিষিদ্ধ বিএনপি অফিস। ভোররাতে তছনছ। মুখপাত্র রিজভী কারাগারে।’

বিশ্বায়নের কাল- ক্ষমতার লড়াইয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি by কামাল আহমেদ

প্রায় তিন সপ্তাহ দেশে কাটানোর পর গত সপ্তাহে যখন আমরা অবরুদ্ধ ঢাকা ছাড়ি, তখনো অবরোধ এতটা আতঙ্কজনক রূপ নেয়নি। সেটা ছিল অবরোধের দ্বিতীয় দিন। তবে প্রথম দিনেই আটজনের প্রাণহানির খবর ছিল সেদিনের সংবাদ শিরোনাম।

নাগরিক মন্তব্য: গীতা সেন: শান্তিপ্রিয় জনতার মুখপাত্র

১৮ দলের অবরোধ চলাকালে গত ২৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে বাসে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারা হয়। এতে মেয়েসহ দগ্ধ হন গীতা সেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন গীতাসহ অন্যদের দেখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১ ডিসেম্বর সেখানে যান।

মন্ত্রীদের পদত্যাগের নির্দেশ- ‘এক চুলও নড়ব না’ -এরশাদ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মানবজমিনকে জানিয়েছেন, তিনি তার সিদ্ধান্তে অনড়, এক চুলও নড়বেন না। বুধবার সকালে অজ্ঞাত স্থান থেকে মুঠোফোনে তিনি এসব কথা জানান। পরে বিকালের তিনি বাড়ি ফিরেন।

এরশাদের সিদ্ধান্ত বদলের নেপথ্যে

তিন কারণে নির্বাচন বর্জন করলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। একটি বিশেষ পক্ষের নির্দেশনা, শক্তিধর একটি দেশের সর্বশেষ বার্তা এবং ১৮ দলীয় জোটের প্রতিরোধের ভয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। যদিও গতকাল জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এরশাদ বলেছেন, জাতির কাছে আমি তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। এককভাবে নির্বাচন করবো, কারও ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হবো না এবং সব দল অংশ না নিলে নির্বাচনে যাবো না। আমি আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি। তবে, এরশাদের বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্ক ভবন সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একটি বিশেষ পক্ষের প্রতিনিধিরা এরশাদের সঙ্গে দেখা করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান। তারা এরশাদকে বলেন, বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। গতকাল সকালে আঞ্চলিক শক্তিধর একটি দেশের পক্ষ থেকে বিশেষ বার্তা পান এরশাদ। তার এক সপ্তাহ আগে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ভারত সফর করেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতের সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে কাদের সিদ্দিকীও একটি বার্তা পেয়েছেন- যা দূত মারফত এরশাদ অবহিত হন। এ ছাড়া প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা প্রতিরোধের মুখে পড়েন। বিভিন্ন স্থানে হামলা ও আক্রমণের মুখে পড়েন। এতে এরশাদ তার প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও বিচলিত হয়ে পড়েন। এর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যায় দৃশ্যপট। আর সোমবার রাত থেকে একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে এরশাদের পক্ষ থেকে একটি বড় ধরনের ঘোষণা আসতে পারে। অবশ্য এর দু’দিন আগেই মানসিকভাবে সিদ্ধান্ত নেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন এরশাদ। প্রার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ওয়েট ফর মাই সিগন্যাল। তাই বিষয়টি দলের অন্য কোন নেতার সঙ্গে শেয়ার করেননি জাপা চেয়ারম্যান। এ কারণে এরশাদের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনেও গতকাল দেখা যায়নি কোন  নেতাকে।

বিএনপির রাজনীতি লাদেনের মতো: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন, ‘তাঁর আর কত লাশ লাগবে? আর কত লাশ হলে তাঁর আত্মা শান্তি পাবে? অবরোধ দিয়ে তিনি ঘরে বসে সুপ খান, মুরগির রোস্ট খান; আর বলেন, আন্দোলন সফল হয়েছেন। তাদের রাজনীতি লাদেনের মতো, ভিডিও টেপ করে কর্মসূচি দেয়।’

এরশাদের বাসভবনের চারপাশে কড়া নিরাপত্তা

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের বারিধারার বাসভবনের চারপাশে  র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও পুলিশের সদস্যের উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। র‌্যাব বলেছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কী দোষ ছিল স্বপনের?

রাজনীতির ধারেকাছেও ছিলেন না ইজিবাইকচালক স্বপন। কিন্তু রাজনীতির অশুভ ছোবল থেকে বাঁচতে পারেননি তিনি। সহিংসতার আগুনে ঝলসে গেছে তাঁর শরীর। অবরোধ চলাকালে গত সোমবার রাতে দুর্বৃত্তরা পেট্রল ছিটিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে তাঁর একমাত্র সম্বল ইজিবাইকটি। দগ্ধ হয়েছেন তিনি।

স্বপন এখন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বপনের একটাই প্রশ্ন, কী দোষ ছিল তাঁর? তাঁর পরিবার বলতে সাত বছরের মেয়ে স্বপ্ন। যে কি না, পঙ্গুত্ব বরণ করে ছয় মাস ধরে খুলনার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাই অবরোধের মধ্যেও মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগানোর তাগিদে ইজিবাইক নিয়ে বের হয়েছিলেন তিনি। দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে ঝলসে গেছে স্বপনের শরীরের ৭০ শতাংশ। এখন পর্যন্ত এলাকাবাসীর চাঁদায় কোনো রকমে তাঁর চিকিৎসা চলছে। আর্থিক সংকটের কারণে ঠিকমতো চিকিৎসাও করাতে পারছেন না তিনি।
হাসপাতালের বারান্দায় অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর স্বপন চিকিৎসক ও দেখতে আসা লোকদের বলছিলেন, ‘যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না। মনে হয়, তিনতলা থেকে লাফিয়ে পড়ি। কিছু একটা করেন আপনারা।’
স্বপন প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাত্রী সেজে আমার গাড়িতে উঠে দুর্বৃত্তরা সোনাডাঙ্গা আল ফারুক সোসাইটির কাছে অন্ধকার স্থানে নেমে ভাড়ার টাকা দেওয়ার অভিনয় করে ইজিবাইক ও আমার গায়ে পেট্রল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমি বাঁচার জন্য চিৎকার করে মাটিতে গড়াগড়ি দিই। পরে এলাকার মানুষ হাসপাতালে নিয়ে আসে। এখন জানি না আমার কী হবে, আমার পঙ্গু মেয়েটার কী হবে? আমার দোষ কী?’
খুলনা মেডিকেল কলেজের সহকারী রেজিস্ট্রার (সার্জারি) কমলেশ সাহা বলেন, স্বপনের শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে গেছে। আস্তে আস্তে তাঁর শরীরের ক্ষত আরও বৃদ্ধি পাবে। এখনই উন্নত চিকিৎসা করানো না গেলে অবস্থার ক্রমাবনতি হবে, যা রোগীর জীবনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
স্বপনের প্রতিবেশী ও বন্ধু নগরের নয়াবটি এলাকার ইজিবাইকচালক আযাদ জানান, টাকার অভাবে যার মুখে খাবার জোটে না, সে মানুষটির চিকিৎসা কীভাবে হবে? প্রতিবেশীরা চাঁদা তুলে কিছু ওষুধ কিনে দিয়েছেন। কিন্তু উন্নত চিকিৎসার সহায়তা করার সামর্থ্য তো তাঁদের নেই। তাই সরকারসহ সমাজের বিত্তবান মানুষের সহায়তা পেলে হয়তো জীবন ফিরে পাবেন দরিদ্র মানুষটি।

ক্ষমতার লড়াইয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি

ক্ষমতার লড়াইয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি
প্রায় তিন সপ্তাহ দেশে কাটানোর পর গত সপ্তাহে যখন আমরা অবরুদ্ধ ঢাকা ছাড়ি, তখনো অবরোধ এতটা আতঙ্কজনক রূপ নেয়নি। সেটা ছিল অবরোধের দ্বিতীয় দিন। তবে প্রথম দিনেই আটজনের প্রাণহানির খবর ছিল সেদিনের সংবাদ শিরোনাম। আগুনে বোমায় অগ্নিদগ্ধ খেটে খাওয়া মানুষের যন্ত্রণাকাতর চেহারা আর ততোধিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত স্বজনদের আহাজারির বর্ণনায় সেদিনের পত্রিকার পাতাগুলো ছিল ভরা। ওই সব করুণ কাহিনি একবারে পড়ে শেষ করা যায় না। বারবার থামতে হয়। নিজের মনের মধ্যে এক অজানা শঙ্কা বারবার উঁকি দেয়। ওই পরিণতি তো আমারও হতে পারত? যে রাজনীতির সঙ্গে এসব খেটে খাওয়া মানুষের সম্পর্ক পাঁচ বছরে শুধু এক দিন, ভোটের দিনের, সেই রাজনীতির লড়াইয়ের অসহায় শিকার এঁরা। এঁদের সংখ্যা এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। একুশ শতকের প্রথম দশকে আমরা প্রথম শুনতে পাই ‘কোলাটরাল ড্যামেজ’ কথাগুলো। যুদ্ধবাজ বুশ ও ব্লেয়ার জুটি যখন ইরাকে হামলা চালান, তখন হতাহত নিরীহ ইরাকিদের বর্ণনা করতে প্রথম ব্যবহূত হয় এই কোলাটরাল ড্যামেজ (অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি) শব্দমালা। বাংলাদেশে হাসিনা-খালেদার ক্ষমতার লড়াইয়ে নিহত ব্যক্তিরাও কি সেই একই ধরনের কোলাটরাল ড্যামেজের নিরীহ শিকার নয়?
লড়াইটা এখানে সামরিক না হলেও, ক্ষমতার দ্বন্দ্বটা একই রকম। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ও পাশ্চাত্যের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ভাষায় কোলাটরাল ড্যামেজের সংজ্ঞা হচ্ছে, যুদ্ধকালে সামরিক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সময় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঘটে যাওয়া বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করবে, তাতে অংশ নেওয়ার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করবে এবং তার মাধ্যমে জনসমর্থনের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর চেষ্টা করবে—সেটাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে দলীয় সমর্থকদের কেউ হতাহত হলে দলীয় নেতা-নেত্রীরা তাঁদের চিকিৎসা ও ক্ষেত্রবিশেষে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্বও নিয়ে থাকেন। বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে এ ধরনের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। দলের কর্মসূচি পালনের সময় ক্ষতিগ্রস্ত দলীয় কর্মী-সমর্থকদের প্রতি এই দায়িত্ব পালন অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু দলীয় কর্মসূচির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দলের বাইরের মানুষের ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের সেই দায়িত্ববোধ একেবারেই দেখা যায় না। এই দায়িত্বহীনতার অবসান প্রয়োজন। প্রতিটি দলকে তার রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিপূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে। না হলে যে কর্মসূচিতে জীবনহানির ঝুঁকি আছে,
সে ধরনের কার্যক্রম বাদ দিতে হবে। এটি যে শুধু বর্তমান বিরোধী দলের জন্য প্রযোজ্য তা নয়, সব দলের জন্যই এটা একটা নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত। রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার অসহায় নাগরিকদের ক্ষতিপূরণ দাবির কথা কেউ বলেন না। অথচ, তাঁদের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসার দায় তাঁদের নয়, রাজনীতিকদের। এঁদের পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের হলেও, সরকার তাঁদের নিজেদের ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করবে, সেই আশঙ্কা প্রবল। সুতরাং, এ ক্ষেত্রেও নাগরিক উদ্যোগ প্রয়োজন। আশা করি, রানা প্লাজায় হতাহতদের সহায়তায় যেসব নাগরিক গোষ্ঠী উদ্যোগী হয়েছিল, তারা এ ক্ষেত্রেও এগিয়ে আসবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়কারী সামন্ত লাল সেনের সঙ্গে আমার পরিচয় প্রায় দেড় যুগ আগে। তাঁর বাসার ওপর তলাতেই ছিল বিবিসির অফিস। অ্যাসিডে আক্রান্ত মেয়েদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য তাঁর যে অক্লান্ত পরিশ্রম, সেই সূত্রেই তাঁর কাজের সঙ্গে আমার পরিচয়। সেদিন টেলিভিশনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বোমার শিকার রোগীদের দুর্ভোগের নানা কাহিনি বলছিলেন।
তাঁর বর্ণনায় উঠে এল গণপরিবহনে আমাদের নিজেদের ডেকে আনা বিপদের কথা। ছিনতাই ও ডাকাতির উপদ্রব থেকে বাঁচতে কর্তৃপক্ষের পরামর্শে ঢাকার সব সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এখন নিরাপত্তামূলক লোহার খাঁচা লাগানো হয়েছে। অনেক বাসে, বিশেষ করে দূরপাল্লার বাসে লোহার দরজা বসেছে চালক ও যাত্রীদের মাঝখানে। আর, নগরের মধ্যে চলাচলকারী বাসগুলোর অনেকটিই চলাচল করে দরজা বন্ধ করে। ফলে এগুলোর ভেতরে পেট্রলবোমা বা গান পাউডার ছড়ানোর পর আগুন মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং এসব যানবাহন থেকে লাফিয়ে পড়ার কিংবা বেরোনোর কোনো পথ থাকে না। পরিবহনমালিক ও কর্তৃপক্ষের উচিত হবে বিষয়টি ভেবে দেখা। হরতাল-অবরোধ, ককটেলবাজি কিংবা বাসে আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ানোর রাজনৈতিক সংস্কৃতি বাংলাদেশে নতুন নয় এবং বড় দুই দলের কেউই এই দোষ থেকে মুক্ত নন। তবে, এই ভয়াবহ নৃশংসতা এখন অতীতের সব রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানুষ পোড়ানোর রাজনীতির জন্য তাঁর প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়াকে দায়ী করে বক্তৃতা করার সময় দিব্যি ভুলে থাকেন যে তাঁর মন্ত্রিসভার একজন প্রতিমন্ত্রী যুবনেতার বিরুদ্ধে রূপসী বাংলা হোটেলের সামনে বিআরটিসি বাসে আগুন দিয়ে ডজন খানেক যাত্রীকে অগ্নিদগ্ধ করার মামলা ছিল, যেটি তাঁর সরকার ক্ষমতার জোরে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
আদালতে তাঁর কোনো বিচার হয়নি। তিনি নির্দোষ হলে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি দলটির আস্থা থাকলে প্রশাসনিক আদেশে মামলা তুলে নেওয়ার প্রয়োজন হতো না। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো এই যে গণতান্ত্রিক শাসনামলে রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে উভয় পক্ষই একে অন্যের চেয়ে অধিকতর অনিষ্টসাধনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ফলে তৈরি হচ্ছে নৃশংসতার নতুন নতুন রেকর্ড। যানবাহনে হামলা, আগুনে বোমার ব্যবহার ও রেললাইন উপড়ে ফেলার মতো নাশকতার জন্য কারা দায়ী, সেই প্রশ্নে বিতর্কের শেষ নেই। সরকারের কেউ কেউ বলছেন, এগুলোর জন্য দায়ী বিরোধী দল, আবার কেউ কেউ বলছেন, বিএনপি এগুলোর ঠিকাদারি দিয়েছে জামায়াত-শিবিরকে। অন্যদিকে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেছেন, এসব হামলার সঙ্গে বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকেরা জড়িত নন, বরং সরকারের চর কিংবা ভাড়াটে দুষ্কৃতকারীরা বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপানোর জন্য এসব হামলা চালাচ্ছে। বিরোধী নেতাদের এই দাবি সত্য হলেও, এসব প্রাণহানির দায় তাঁরা এড়াতে পারেন না। রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়ার সময় তাঁদের ভাবা উচিত, সেই কর্মসূচি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি না। যে কর্মসূচির দায়িত্ব নিতে তাঁরা অক্ষম, সেই কর্মসূচি দেশবাসীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চল বা রীতি বন্ধ হওয়া দরকার। ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের এসব দাবি-পাল্টাদাবির কোনটা সত্যি,
সেই বিতর্কের হয়তো ইতি ঘটত যদি পুলিশ একটি হামলারও সুরাহা করতে পারত। কিন্তু বিস্ময়করভাবে তারা হুকুমের আসামি হিসেবে বিএনপির প্রথম সারির নেতাদের গ্রেপ্তার ও রিমান্ড চাওয়ায় যতটা তৎপর ও সফল, আসল অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করায় ততটাই নিষ্ক্রিয় বা ব্যর্থ। এর পাশাপাশি বিতর্কিত নির্বাচনকালীন সরকারের যোগাযোগমন্ত্রীর মন্তব্য ‘সমঝোতা হলে বিরোধী নেতারা কেউ কারাগারে থাকবেন না’ (ইত্তেফাক, ৩০ নভেম্বর ২০১৩) ভিন্ন ধরনের সন্দেহের জন্ম দেয়। যোগাযোগমন্ত্রীর বক্তব্যে ইঙ্গিত মেলে যে সরকার তার শর্ত মানতে বাধ্য করার কৌশল হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনীতিকদের আটক করেছে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের আগুনে পোড়া কিংবা প্রাণহানির ঘটনাগুলোয় সরকারের কিছুই আসে যায় না, বরং তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিরোধীদের বশে আনা।  ক্ষমতার রাজনীতিতে জীবনের প্রতি অবজ্ঞার এই অসুস্থ ধারার শেষ কোথায়?
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।

দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন কেন বাংলাদেশ?

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) দুর্নীতির ধারণা সূচক ২০১৩ প্রকাশ করেছে গতকাল। সূচকের শূন্য থেকে ১০০-এর স্কেলে ২৭ পেয়ে বাংলাদেশ ১৭৭টি দেশের মধ্যে ১৩৬তম অবস্থান পেয়েছে, যা তালিকার নিম্নক্রম অনুযায়ী ২০১১ ও ২০১২ এবং প্রাপ্ত ১৩তম অবস্থানের তুলনায় তিন ধাপ ওপরে। গতবারের তুলনায় বাংলাদেশের স্কোর ১ পয়েন্ট বেশি ও তালিকার ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী অবস্থান ৮ ধাপ ওপরে। গত বছর বাংলাদেশ ২৬ পয়েন্ট পেয়ে ১৪৪তম স্থানে ছিল। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ২৭ স্কোর নিয়ে তালিকার উচ্চক্রম অনুযায়ী ১২০তম স্থানে ছিল। স্কোর ও অবস্থান অনুযায়ী গতবারের তুলনায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশ এবারও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শুধু আফগানিস্তান ছাড়া সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। সূচকে অন্তর্ভুক্ত অন্য পাঁচটি এ অঞ্চলের দেশ—ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান এগিয়ে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে সর্বোচ্চ ৬৩ স্কোর পেয়ে তালিকার উচ্চক্রম অনুযায়ী ৩১তম অবস্থানে ভুটান, তারপর শ্রীলঙ্কা ৩৭ স্কোর পেয়ে ৯১তম স্থানে, ভারত ৩৬ স্কোর পেয়ে ৯৪তম, নেপাল ৩১ স্কোর পেয়ে ১১৬তম, পাকিস্তান ২৮ নম্বর পেয়ে ১২৭তম এবং আফগানিস্তান ৮ স্কোর পেয়ে গত বছরের মতো সোমালিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে বৈশ্বিক তালিকার সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের সমান স্কোর পেয়ে এবার একই স্থান পেয়েছে আইভরি কোস্ট, গায়ানা ও কেনিয়া।
১৯৯৫ সাল থেকে প্রণীত দুর্নীতির ধারণা সূচক বা সিপিআই সরকারি খাতে, বিশেষ করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির ব্যাপকতার ধারণার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক চিত্র দিয়ে থাকে। এটিকে যৌগিক সূচক বা জরিপের ওপর জরিপ বলা হয়, যার মাধ্যমে এক ডজনের বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত জরিপের তথ্যের বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক অবস্থান নিরূপণের প্রয়াস করা হয়। সিপিআই নিরূপণে এমন জরিপের তথ্যই ব্যবহূত হয়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা সম্ভব। অতএব জাতীয়ভাবে টিআইবি বা এর মতো অন্য কোনো দেশের টিআই চ্যাপ্টারের গবেষণা বা জরিপলব্ধ কোনো তথ্য বা উপাত্ত এ সূচকে বিবেচিত হয় না। অন্যদিকে সূচকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য কোনো দেশ সম্পর্কে কমপক্ষে তিনটি আন্তর্জাতিক জরিপ থাকতে হবে। এ বছরের জরিপে ১৩টি আন্তর্জাতিক জরিপ থেকে তথ্য নেওয়া হয়। বাংলাদেশের বেলায় যে সাতটি সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুলো হলো: বার্টলসম্যান ফাউন্ডেশন ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স, ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কান্ট্রি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট, গ্লোবাল ইনসাইট কান্ট্রি রিস্ক রেটিং, পলিটিক্যাল রিস্ক সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল কান্ট্রি রিস্ক গাইড, বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি পারফরম্যান্স অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনাল অ্যাসেসমেন্ট, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এক্সিকিউটিভ ওপিনিয়ন সার্ভে এবং ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের রুল অব ল ইনডেক্স।
তথ্যের সময়কাল ছিল ফেব্রুয়ারি ২০১১ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৩ সাল পর্যন্ত। এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আফগানিস্তান ছাড়া যেসব দেশের অবস্থান বাংলাদেশের তুলনায় নিম্নতর অবস্থানে রয়েছে, তাদের মধ্যে আছে লাওস, পাপুয়া নিউগিনি, মিয়ানমার ও কম্বোডিয়া। তা ছাড়া কাজাখস্তান, ক্যামেরুন, নাইজেরিয়া, ইউক্রেন, তাজিকিস্তান, জিম্বাবুয়ে, ভেনেজুয়েলা, হাইতি, ইয়েমেন, সিরিয়া, তুর্কমেনিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও সুদানের মতো দেশগুলো বাংলাদেশের তুলনায় কম স্কোর পেয়ে নিম্নতর অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে যেসব দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা সবচেয়ে কম বলে নিরূপিত হয়েছে, তার মধ্যে শীর্ষে যৌথভাবে রয়েছে ৯১ স্কোর পেয়ে ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড। এরপর ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা। কোনো দেশই শতভাগ স্কোর পায়নি। বিশ্বের সর্বোচ্চ উন্নত দেশগুলোর অনেকেই, যেমন জার্মানি, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ইত্যাদি ৮০ শতাংশের কম স্কোর পেয়েছে। ১৭৭টি দেশের মধ্যে ১২৩টি, অর্থাৎ প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ দেশ ৫০-এর কম স্কোর পেয়েছে। ১০৯টি দেশ সূচকে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর প্রাপ্ত গড় স্কোর ৪৩ বা তার চেয়ে কম পেয়েছে। দুর্নীতি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। যদিও আমাদের মতো দেশের ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের তুলনায় দুর্নীতি অনেক বেশি উদ্বেগের কারণ।
স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পর পর পাঁচবার বাংলাদেশ দুর্নীতি ব্যাপকতার ধারণার এই সূচকে শীর্ষে অবস্থান করেছিল। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ২০০৬ সালে তৃতীয়, ২০০৭-এ সপ্তম, ২০০৮-এ দশম, ২০০৯-এ ত্রয়োদশ, ২০১০-এ দ্বাদশ এবং ২০১১ ও ২০১২ সালে ত্রয়োদশ স্থান পাওয়ায় আন্তর্জাতিক তুলনামূলক অবস্থানের মাপকাঠিতে কিছুটা অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে আমাদের স্কোর ২০০১ সালে শূন্য থেকে ১০-এর স্কেলে শূন্য দশমিক ৪ থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে ২০১০-এ ২ দশমিক ৪ পর্যন্ত বাড়ে। পরবর্তী তিন বছরে অর্থাৎ ২০১১-২০১৩ পর্যন্ত সার্বিকভাবে কিঞ্চিৎ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও শূন্য থেকে ১০০ স্কেলে ২৬-২৭-এর মধ্যে স্থবিরতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এর চেয়ে ভালো করতে পারি না? যেসব কারণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি, তার মধ্যে রয়েছে দুর্নীতিবিরোধী নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক উদ্যোগ সত্ত্বেও কার্যকরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্তের ঘাটতি, বিশেষ করে পদ্মা সেতু প্রকল্প, রেলওয়ের নিয়োগ-বাণিজ্য, শেয়ারবাজার, হল-মার্ক ও ডেসটিনির মতো ‘রুই-কাতলা’ শ্রেণীর দুর্নীতির ঘটনাপ্রবাহ। ক্ষমতাবানদের একাংশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ বা সহায়তায় ভূমি-বনাঞ্চল-নদী-জলাশয় দখল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে টেন্ডারবাজিসহ আইনের শাসন পরিপন্থী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বেই রয়ে গেছে। জনপ্রতিনিধিরা ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে অধিষ্ঠিতজনেরা তাঁদের আয়-ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের প্রতিশ্রুতি পূরণ থেকে বিরত থেকেছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার অঙ্গীকারের বিপরীতে একগুচ্ছ সংশোধনী প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে সরকারের পুরো মেয়াদকালে কমিশনকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে রেখে প্রায় অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুদককে অনেক সময়ই দেখা গেছে সরকারের এক প্রকার বি-টিমের ভূমিকা পালন করতে। সংসদের শেষ অধিবেশনে সংবিধান ও সরকারের নিজস্ব নির্বাচনী অঙ্গীকার পরিপন্থী অবস্থান নিয়ে দুদক আইন সংশোধন করে জজ, ম্যাজিস্ট্রেট ও সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে দুদকের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দিয়ে দুদককে বাস্তবে অকার্যকর করে দেওয়া হলো। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একদিকে যেমন বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যাশিত দৃঢ়তা ও সক্রিয়তা দেখাতে পারেনি, অন্যদিকে অনেক সময়ই সরকারের অবস্থানের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতোই নিজেকে উপস্থাপন করেছে। তা ছাড়া যেভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগসংক্রান্ত অসংখ্য মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে, তা আইনের শাসনের যেমন পরিপন্থী, তেমনি বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রক্রিয়াকে উদ্বেগজনকভাবে গভীরতর করেছে। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে অন্যতম প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলের কেবল আসন সংরক্ষণের স্বার্থে উপস্থিতির বাইরে ধারাবাহিকভাবে সংসদ বর্জনের ফলে সংসদ রূপান্তরিত হয়েছে সরকারি দল ও জোটের একচ্ছত্র ভুবনে। তদুপরি সংসদীয় কমিটিতে অনেক ক্ষেত্রেই স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে সংসদ ব্যর্থ হয়েছে তার প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে, বিশেষ করে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে।
একদিকে সাংবিধানিক অঙ্গীকার এবং অন্যদিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে পদদলিত করে নির্লজ্জভাবে কালোটাকা অর্জনকে পুরস্কৃত করা অব্যাহত রয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে নির্বাচনী অঙ্গীকার ও সর্বোচ্চ পর্যায়সহ বহুমুখী রাজনৈতিক ঘোষণা ফাঁকা বুলি রয়ে গেছে। অন্যদিকে সরকারের নীতিকাঠামো ক্রমাগতভাবে দুর্নীতি-সহায়ক এবং দুর্নীতিতে লাভবান ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয়দানকারী মহলের করাভূত হতে চলেছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হয়তো আবারও ছোট-বড় সব রাজনৈতিক দলই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘দৃঢ় অবস্থান’ ঘোষণা করে জনগণের ভোট আদায়ের ‘ঐকান্তিক’ প্রয়াসে লিপ্ত হবে। নির্বাচনের পর ক্ষমতায় যাঁরা আসবেন, তাঁরা খুব সহজে নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পদক্ষেপ নেওয়া থেকে সরে আসবেন, এমনটি আশা করার খুব বেশি যুক্তিসংগত কারণ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবু আমাদের আশাবাদী হতেই হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো সৃষ্টিতে যতটুকুই অগ্রগতি ইতিমধ্যে হয়েছে, তার কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতির দায় যাঁরা পর্যায়ক্রমে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করছেন, মূলত তাঁদেরই নিতে হবে। জনগণকেও আরও সোচ্চার ও সক্রিয় হতে হবে। জনগণই চাইবে দুর্নীতি প্রতিরোধক জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর হোক; দুর্নীতি দমন কমিশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা পেশাদারির সঙ্গে ও দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে কার্যকর হোক, যেন বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিস্তার প্রতিহত করা যায়। এই দাবি যত বেশি কার্যকর পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে, আর রাজনৈতিক নেতারা জাতীয় স্বার্থকে যত কার্যকরভাবে অন্য সব বিবেচনার ঊর্ধ্বে স্থান দিতে সক্ষম হবেন, দুর্নীতি প্রতিরোধ ততই বেগবান হবে।
ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।

সারদা-কাণ্ডে উত্তাল পশ্চিমবঙ্গ

উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। এবার ইস্যু সারদা-কাণ্ড। এই ইস্যু নিয়ে এখন তোলপাড় হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে। বিরোধী দলের প্রতিবাদ, মিছিল, সমাবেশে জেরবার হচ্ছে রাজ্য রাজনীতি। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভায় এই ইস্যু নিয়ে বিরোধী বাম দল ইতিমধ্যে তিন দিন বিধানসভার অধিবেশন বয়কট করেছে। রাস্তায় নেমেছেন বাম দল ও কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা। প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে বিজেপিও। মোট কথা, এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সারদা-কাণ্ড। আগামী বছরের এপ্রিল অথবা মে মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ভারতের পার্লামেন্ট বা সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভার নির্বাচন। সেই নির্বাচনের আগে সারদা-কাণ্ড বিরোধী দলের হাতে নতুন এক অস্ত্র এনে দিয়েছে। আর শাসক তৃণমূল কংগ্রেসকে বাড়িয়ে দিয়েছে অস্বস্তি। এদিকে সব বিরোধী দলের একটাই দাবি উঠেছে রাজ্যব্যাপী, সারদা-কাণ্ড তদন্ত করাতে হবে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই দিয়ে। বিরোধীরা রাজ্য সরকারের পুলিশের তদন্তের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। রাজ্য সরকারও অনড়—সারদা ইস্যু যাতে সিবিআই পর্যন্ত না গড়ায়। বিরোধী দল যেমন মনে করছে, এই কাণ্ড সিবিআই দিয়ে তদন্ত করালেই বেরিয়ে পড়বে থলের বিড়াল।
ফাঁস হয়ে যাবে শাসক দলের বেশ কজন নেতা-মন্ত্রীর নাম। আর সে কারণেই শাসক তৃণমূল কংগ্রেস বা মুখ্যমন্ত্রী এখনো চাইছেন না সারদা-কাণ্ড সিবিআই দিয়ে তদন্ত করাতে। যদিও ইতিমধ্যে এই দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টে মামলাও দায়ের হয়েছে অন্তত চারটি। দাবি উঠেছে, সারদা-কাণ্ড তদন্ত করাতে হবে সিবিআই দিয়ে। বিরোধীদের কথা, হাজার হাজার কোটি টাকার নয়ছয়ের হদিস রাজ্য পুলিশ করতে পারবে না। এ জন্য তাঁরা চান ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার তদন্ত। সিবিআইয়ের তদন্ত। আর এই ইস্যু নিয়ে এখন তোলপাড় হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের গোটা রাজনীতিতে। কেন সরকারের সিবিআই দিয়ে তদন্ত করাতে এত অনীহা? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সিবিআইয়ের তদন্ত হলেই বেরিয়ে পড়বে এই কাণ্ডের সঙ্গে কারা কারা জড়িত, তাঁদের নাম? এই ভয়ে রাজ্য সরকার চাইছে না সিবিআই দিয়ে তদন্ত করাতে। সারদা গোষ্ঠীর কর্ণধার সুদীপ্ত সেন যখন এ বছরের এপ্রিল মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে কলকাতা থেকে পালিয়ে যান, তখনই তিনি সিবিআইকে লিখে যান এক চিঠি এবং তাতেই তিনি উল্লেখ করে যান ২২ জনের নাম, যাঁরা সারদা গোষ্ঠীর পতনের মূলে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়েছিলেন। যদিও ইতিমধ্যে সুদীপ্ত সেনের সেই তালিকায় উল্লিখিত তৃণমূল কংগ্রেসের এক সাংসদ, সাংবাদিক কুণাল ঘোষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের দিন আবার কুণাল ঘোষ তাঁর ফেসবুকে সারদা-কাণ্ডের কথা জানেন, এমন ১২ জনের নাম উল্লেখ করে যান।
এই তালিকায় রয়েছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও। আর এসব ঘটনায় এবার চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর কুণাল ঘোষ হয়ে যান মমতার ছায়াসঙ্গী। যেখানে মমতা, সেখানে কুণাল ঘোষ। আর মমতাও কুণাল ঘোষের ওপর প্রচণ্ড আস্থা রেখে চলছিলেন। এর পুরস্কারও দেন মমতা কুণাল ঘোষকে। ভারতের আইনসভার উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সাংসদ বা এমপি করেন তাঁকে। এদিকে কুণাল ঘোষকেও কাছে টেনে নেন সারদা গোষ্ঠীর কর্ণধার সুদীপ্ত সেন। সুদীপ্ত সেনও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন মিডিয়াজগৎকে হাতে নেওয়ার। কিনতে থাকেন এক এক করে বিভিন্ন মিডিয়া। প্রিন্ট থেকে ইলেকট্রনিক মিডিয়া। এমনিভাবে সারদার হাতে চলে আসে ১০টি মিডিয়া। কলকাতা ও আসামে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও উর্দু ভাষার ছয়টি দৈনিক এবং তারা, চ্যানেল-১০সহ চারটি টিভি চ্যানেল। আর মিডিয়া সেলের সিইও হয়ে যান তিনি। হঠাৎ ওলটপালট হতে থাকে সারদার সাজানো বাগান। সারদার মালিকানাধীন তারা মিউজিক ও তারা নিউজ চ্যানেলের কর্মীদের অনিয়মিত বেতন দেওয়া শুরু হয়। খবরটি চলে আসে অন্য মিডিয়ায়। কর্মীদের বেতন বাকিও পড়ে।
আন্দোলনে নামেন তারা টিভির কর্মকর্তা ও কর্মীরা। এরই মধ্যে এ বছরের ১০ এপ্রিল হঠাৎ গা ঢাকা দেন সারদার কর্ণধার সুদীপ্ত সেন। তোলপাড় হতে থাকে কলকাতার রাজনীতিতে। উঠে আসে সারদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা শাসক দলের বেশ কজন মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়কের নাম। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। সুদীপ্ত সেন কলকাতা থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় একটি চিঠি লিখে যান ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআইকে। ১৮ পাতার ওই চিঠিতেই সুদীপ্ত সেন জানিয়ে যান, কেন তাঁর এত বড় সাম্রাজ্যের পতন হলো। এ জন্য তিনি দায়ী করেছেন শাসক দলের বেশ কজন নেতা, মন্ত্রীসহ ২২ ব্যক্তিকে, যাঁরা তাঁর ওপর চাপ প্রয়োগ করে দিনের পর দিন আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন সারদা গোষ্ঠী থেকে। এই চিঠিকে সুদীপ্ত সেন এফআইআর হিসেবে গণ্য করে মামলা দায়ের করার জন্য অনুরোধও জানিয়ে যান সিবিআইকে। ইতিমধ্যে অর্থলগ্নিকারীদের সাড়ে ১৮ লাখের বেশি আবেদন পড়ে সরকারের কাছে। এদিকে কুণাল ঘোষ গ্রেপ্তার হওয়ার পর সারদা-কাণ্ড সিবিআইকে দিয়ে তদন্তের জোর দাবি ওঠে। বামফ্রন্ট, কংগ্রেস, বিজেপি—সব দলই এক দাবিতে অনড় থাকে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী মমতা জানেন, এই কেলেঙ্কারির তদন্তভার যদি সিবিআইয়ের হাতে চলে যায়, তবে আরও বেরিয়ে পড়বে শাসক দলের কেলেঙ্কারির নানা কাহিনি। ফলে তিনি শুরু করেন সিবিআই তদন্তের বিরোধিতা। অন্যদিকে বিরোধীরাও নাছোড়বান্দা। তাঁরাও শুরু করেন রাজ্যব্যাপী সিবিআই তদন্তের দাবিতে আন্দোলন। সেই আন্দোলন এখনো চলছে। দিনে দিনে জোরদার হচ্ছে।
অমর সাহা: প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।

থাই সেনাবাহিনীর গণঅভ্যুত্থান সমর্থন করা উচিত : সুথেপ

থাই প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগের দাবিতে সৃষ্ট বিক্ষোভ গণঅভ্যুত্থানের আকার ধারণ করলে রোববার ইংলাককে পদত্যাগ করার জন্য দুই দিনের সময় বেঁধে (আলটিমেটাম) দিয়েছে সরকারবিরোধীরা। থাইল্যান্ডের সরকারবিরোধী আন্দোলনের নেতা সুথেপ থাংসুবান প্রধানমন্ত্রী ইংলাকের সঙ্গে বৈঠকে তাকে দুই দিনের মধ্যে পদত্যাগ করতে আলটিমেটাম দেন। সুথেপ জানান, রোববার সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী ইংলাকের সঙ্গে একটি গোপন স্থানে বৈঠক করেন তিনি।
তিনি অভিযোগ করেন, সেখানে কোনো সমঝোতা ও সন্ধি স্থাপনের সুযোগ ছিল না। এ সময় সেনাপ্রধান জেনারেল প্রায়ুথ চান অকার উদ্দেশে সুথেপ বলেন, সেনাবাহিনীর গণঅভ্যুত্থানের প্রতি সমর্থন করা উচিত। আলটিমেটাম অনুযায়ী সরকার পতন না হলে কী পদক্ষেপ নেয়া হবে, এ ব্যাপারেও কিছু বলেননি সুথেপ। এদিকে সুথেপের পদত্যাগ প্রস্তাব প্রত্যাখান করে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা বলেন, আমি সংবিধানের রক্ষক হয়ে অসাংবিধানিকভাবে গণপরিষদ গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে না। সোমবার বিশ্ব গণমাধ্যমে এ খবর চাউর হয়েছে। ওদিকে বিক্ষোভকারীরা রোববারকে তাদের ভি-ডে (বিজয়ের দিন) ঘোষণা করে এই দিনকে তাদের ‘গণঅভ্যুত্থান’ বলে আখ্যা দেয়।
সরকারি কর্মচারীদের বিক্ষোভে আহ্বান
থাইল্যান্ডের সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য সরকারি কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। সোমবার কর্মক্ষেত্রে যোগ না দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বিক্ষোভে অংশ নেয়ার আহ্বান জানান বিক্ষোভকারীদের দলনেতা সুথেপ থাউঙসুবান। টানা ৯ দিনে থাই রাজধানী ব্যাংকক সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের কাছে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। সেখানকার মন্ত্রণালয়, সচিবালয়, সেনা সদর দফতর সবকিছুই এখন বিক্ষোভকারীদের দখলে।
ব্যাংককে কারফিউ
থাইল্যান্ডের চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রাকে অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে রাজধানী ব্যাংককে রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করা হয়েছে। জানমালের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য জনগণকে ঘরের বাইরে বের হতে নিষেধ করেছে থাই সরকার। রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত এ নির্দেশ বলবৎ থাকবে। চলতি সপ্তাহে দেশটিতে বিক্ষোভকেন্দ্রিক সহিংসতায় চারজন নিহত হয়েছে।

ইউক্রেনে আগাম নির্বাচন দাবি

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি প্রত্যাখ্যান করায় তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে ইউক্রেনের জনগণ। রাজধানী কিয়েভের ‘ইনডিপেন্ডেন্ট স্কয়ারে’ সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে বিক্ষুব্ধরা। সোমবার সকালে একহাজারের বেশি বিক্ষোভকারীরা বুলডোজার দিয়ে রাজধানী কিয়েভের প্রেসিডেন্ট কম্পাউন্ডের এক দিক ভেঙে ফেলেছে। এ সময় লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও ফ্ল্যাশ গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পুলিশ। তবু পিছু হঠেনি বিক্ষোভকারীরা। বিপ্লব স্লোগানে ঐক্যবদ্ধ থেকে দখল করে নিয়েছে ‘সিটি হল’। এদিকে, গত রাত থেকে ঐতিহাসিক ‘ইনডিপেন্ডেন্ট স্কয়ারে’ রাতভর অবস্থান করে বিক্ষোভকারীরা। ইইউ’র বাণিজ্য সংক্রান্ত চুক্তি প্রত্যাখ্যান করায় বিরোধী দল ও বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকুভিচের পদত্যাগের দাবি তুলছে। সেই সঙ্গে আগাম নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে তারা। বর্তমান সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা ইনডিপেন্ডেন্ট স্কয়ার ছেড়ে যাবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। এদিকে, বিক্ষোভ-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের রাস্তায় নেমে এসেছেন বিক্ষুব্ধ জনতা।রোববার সরকার বিক্ষোভ সমাবেশ নিষিদ্ধ করলে তিন লাখ মানুষ রাজপথে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেই তার প্রতিবাদ জানায়। ইউক্রেনের রাশিয়াপন্থী সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চুক্তি বাতিল করলে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে দেশটির বিরোধী দল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিক্ষোভ সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা ওলে তায়ানিবো দেশব্যাপী হরতালের ডাক দিয়েছেন। তার দল ফাদারল্যান্ড পার্টির সমর্থকরা সরকারি কয়েকটি ভবন দখল করে নিয়েছেন। ২০০৪-০৫ সালে অরেঞ্জ বিপ্লবের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে ইউক্রেনে। বিরোধী রাজনীতিকরা বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর দমনপীড়ন চালানো জায়েজ করার জন্যই প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানকভিচের সদর দফতরে সহিংসতার ঘটনা ঘটিয়েছে সরকার। বিরোধী দলীয় নেতা ভিটালি ক্লিৎকো প্রেসিডেন্ট এবং তার সরকারের পদত্যাগ দাবি করে বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্ত হওয়ার জন্য দেশবাসীর স্বপ্নকে তারা ‘চুরি করেছে’। বিক্ষোভকারীদের অবস্থান ইউক্রেনের রাজধানী কেইভে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাস্তায় তাঁবু খাটিয়ে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী অবস্থান নিয়েছে। অনেক বিক্ষোভকারী রাজধানী কেইভের ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স স্কয়ারে’ রাত কাটাচ্ছে। অনেক বিক্ষোভকারী স্থানীয় সিটি হলে পুলিশ প্রতিবন্ধকের মধ্যে অবস্থান করছে।ন এর আগে রোববার বিক্ষোভ র‌্যালি নিষিদ্ধের সরকারি সিদ্ধান্তে প্রতিবাদ জানাতে ১ থেকে ৫ লাখ বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে আসে। রাজধানী কিয়েভে প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস ছুড়ে মারে। এতে বেশ কিছু বিক্ষোভকারী আহত হয়। অন্যদিকে পুলিশ দাবি করে তাদের প্রায় ১০০ জন কর্মকর্তা আহত হয়েছে।
আলোচনায় ইউক্রেন সরকার
বিক্ষোভের মুখে রাজধানী কিয়েভে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ইউক্রেন সরকার ও বিরোধীরা। সোমবারই এই আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার ভ­াদিমির রিব্যাক জানিয়েছেন, চলমান সংকটের ব্যাপারে সব পক্ষকেই এই আলোচনায় মতামত ব্যক্ত করার সুযোগ দেয়া হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ব্যবসায় সংক্রান্ত চুক্তি সই করতে প্রত্যাখ্যান করায় প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকভিচের সরকারের বিরুদ্ধে গত সপ্তাহে রাস্তায় নামে বিরোধীরা। এএফপি, আল জাজিরা, সিএনএন রয়টার্স।

সিসির প্রেসিডেন্ট পথ সুগম

মিসরের সেনাসমর্থিত সরকারের সংবিধান সংশোধনী কমিটি নতুন সংবিধানের খসড়া অনুমোদন করেছে। এতে দেশটির গণহত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ সুগম করেছে। খবর রয়টার্স’র। রোববার রাতে সংবিধানের খসড়া অনুমোদন করা হয়। এতে আগে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে নাকি সংসদ নির্বাচন, সে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। অথচ মিসরের ইতিহাসে প্রথম অবাধ নির্বাচন জয়ী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ৩ জুলাই উৎখাত করার পর সেনাবাহিনী ক্ষমতা হস্তান্তরের যে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছিল তাতে বলা হয়েছিল, আগে সংসদ এবং পরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। সংশোধিত সংবিধানে বিষয়টি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আদলি মানসুরের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে যাকে সিসিই মনোনীত করেছেন। খসড়া সংবিধানে বলা হয়েছে, সংবিধান গণভোটে অনুমোদিত হওয়ার পর ছয়মাসের মধ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
এর মানে হচ্ছে আগামী ছয়মাস অনির্বাচিত সরকার দিয়েই চলবে আরব দুনিয়ার সবচেয়ে জনবহুল এই দেশটি। খসড়া সংবিধান কমিটির প্রধান আরব লীগের সাবেক প্রধান এবং প্রেসিডেন্ট মুরসির সঙ্গে নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী আমর মুসা বলেছেন, মঙ্গলবার (আজ) সংশোধিত সংবিধান অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টর কাছে পেশ করা হবে। খসড়া সংবিধানে মিসরের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করার সুস্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া সংশোধিত সংবিধানে বলা হয়েছে দেশটির পরবর্তী দুটি মেয়াদে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মন্ত্রী নিয়োগ দেবে সশস্ত্র বাহিনীর সুপ্রিম কাউন্সিল। এর মানে হচ্ছে সিসি কোনো কারণে প্রেসিডেন্ট হতে ব্যর্থ হলে তিনি হবেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করার কোনো বিধান রাখা হয়নি সংবিধানে। সূত্র জানায়, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সিসিকে জয়ী করার জন্য আগে থেকেই ক্ষেত্র প্রস্তুত শুরু হয়েছে। শত শত নিরস্ত্র নাগরিককে হত্যার জন্য সিসি দায়ী হলেও মিসরের সরকারি প্রচারযন্ত্র তাকে সিংহপুরুষ হিসেবে চিত্রিত করছে। একই অবস্থা বামপন্থী গণমাধ্যমের।

মুরসির উৎখাত ভুল ছিল

একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে যে, মোহাম্মদ মুরসির অপসারণ প্রক্রিয়া নিয়ে মিসরীয়রা দ্বিধাবিভক্ত। ৫১ শতাংশ মিসরীয় মনে করছেন, বৈধভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে অপসারণটা ভুল। আর ৪৬ শতাংশ মনে করছেন সিদ্ধান্তটা ঠিক হয়েছে। ‘জগবি রিসার্চ সার্ভিসেস (এলএলসি)’- নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চলতি সপ্তাহে তাদের জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেছে। এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো জরিপ করা হল। এ বছরের মে’র দিকে সামরিক অভ্যুত্থানের ঠিক আগে প্রথম জরিপটি হয়েছিল এবং দ্বিতীয়টি হয়েছে গত জুলাইয়ে। এ জরিপগুলোতে মিসরীয় রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন গোষ্ঠী, তাহরির স্কয়ার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, মুসলিম ব্রাদারহুডসহ নানা বিষয়ে মিসরীয় জনগণের মতামত নেয়া হয়। মোবারক অপসারণের পর গত দু’বছর ধরে মিসরীয় জনগণের মতামত কিভাবে পাল্টেছে এটা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। এক হাজার ৪০৫ জন ১৮ বছর ঊর্ধ্বে মিসরীয়দের সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার নিয়ে এই জরিপটি করা হয়েছে।
১৮ বছর ঊর্ধ্বে নারী ও পুরুষের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তাদের মতামত নেয়া হয়েছে। সাক্ষাতকার চলেছে ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। মিসরের উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণাঞ্চল, গ্রাম থেকে শহর সব জায়গা থেকেই সাক্ষাতকার নেয়া হয়েছে। এলাকাগুলোর মধ্যে আছে কায়রো, গিজা, আলেকজান্দ্রিয়া, পোর্ট সৈয়দ, সুয়েজ, মানসুরা, তান্তা, শুভ্র আল খীমাহ, আসিউত, মেনিয়া এবং বানি সুয়েইফ। গত মে মাসের জরিপে দেখা গিয়েছিল যে, সাধারণ মানুষ মনে করেছিল মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতা কুক্ষিগত করছে এবং তাদের আদর্শ দেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, দেশে অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসছে। তখন ৯৪ শতাংশ মানুষ সামরিক বাহিনীকে সমর্থন করতো। তবে সমর্থন বিভক্ত ছিল দুভাগে- ৪৪ শতাংশ সামরিক হস্তক্ষেপ সমর্থন করতো, আর ৫৬ শতাংশ ছিল এর বিপক্ষে। গত জুলাইতেও সামরিক বাহিনীর প্রতি সমর্থন ছিল ইতিবাচক। ইজিপ্ট ডেইলি।