Monday, January 4, 2010

চলতি পথে রাজা সীতারাম রায়ের প্রাসাদ-দুর্গ দীপংকর চন্দ

একটানা দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকলেই অশান্তির অবদমিত অনলে দগ্ধ হয় মন। ক্লান্ত লাগে। অবসন্ন লাগে। লাগামহীন অসহনীয়তার বীজ রোপিত হয় নাগরিকজীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তখন? তখন অবসরের অপেক্ষায় না থেকে বেরিয়ে পড়ি—মহানগরের যান্ত্রিক আকর্ষণ উপেক্ষা করে দূরপথ অতিক্রম করি—খাল-বিল-নদী ছুঁয়ে ধানখেতের দিগন্তপ্রসারী সবুজের কাছে সমর্পিত করি নিজেকে। অশান্ত মন প্রশান্ত হয়—অচেনা গ্রামের সঙ্গে রচিত হয় আত্মীয়তা, অজানা পথের সঙ্গে সৃষ্টি হয় পরিচয়। সেই পরিচয়সূত্রেই আউনাড়া মোড় থেকে সামনে এগোলাম। যশপুরের কাইয়ুম মিয়ার রিকশাভ্যানে চেপে ধোয়াইল পৌঁছালাম ধীরে-সুস্থে। লাইবা নামের একটা দ্রুতগামী বাস পাশ কাটাল আমাদের। ধোয়াইল তিন রাস্তার মোড় পেছনে ফেলে বাঁ দিকে অগ্রসর হলাম আমরা। বড় বড় শিরীষগাছের স্নিগ্ধ ছায়া এই পথে। পথের অনেক ওপরের আকাশ মেঘমুক্ত, দ্বিধাশূন্য। পরিপার্শ্বের বাতাস অনুন্নত জনপদের গন্ধমাখা। রাজপথ ছেড়ে একটা শাখাপথে প্রবেশ করলাম এবার। ‘এই পথে মাইলদেড়েক এগোলেই মধুমতী নদী...’, উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানালেন ভ্রমণসঙ্গী সাধন পোদ্দার এবং তুষার সাহা, ‘...তবে নদী পর্যন্ত যাব না আমরা। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের মোহাম্মদপুর কার্যালয়ের কাছেই থামতে হবে আমাদের, নামতে হবে ভ্যান থেকে। কারণ, সেখানেই মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর উপজেলার অনন্য প্রত্নকীর্তি রাজা সীতারাম রায়ের প্রাসাদ-দুর্গ।’
মাগুরা সদর উপজেলা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মধুমতী নদীর তীরে অবস্থিত এই প্রত্নস্থানটি রাজবাড়ি এলাকা নামে পরিচিত সাধারণ্যে। এ মুহূর্তে এলাকাটিকে ভীষণ অনুন্নত, অপ্রাগ্রসর বলে মনে হলেও সপ্তদশ-অষ্টদশ শতাব্দীতে এখানে যে একটি উন্নত জনপদের পত্তন হয়েছিল, রাজা সীতারাম রায়ের প্রাসাদ-দুর্গের অবস্থিতিই তার স্মৃতিভারাতুর সাক্ষ্য বহন করে।
রাজা সীতারাম রায় প্রচলিত অর্থে রাজা ছিলেন না, ছিলেন মোহাম্মদপুর অঞ্চলের প্রখ্যাত জমিদার। তাঁর পিতা সত্যজিত্ রায় মুর্শিদাবাদের নবাব সরকারের একজন আমলা ছিলেন। সীতারাম রায় পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমলা থেকে জমিদারি এবং পরে স্বীয় প্রতিভাবলে রাজা উপাধি লাভ করেন। উপাধি লাভের পর সীতারাম রায় একজন রাজার মতোই রাজ্য বিস্তারে সচেষ্ট হন। সেনাবল বৃদ্ধি করে তিনি পার্শ্ববর্তী জমিদারদের ভূ-সম্পত্তি নিজ অধিকারে নিয়ে আসেন। তারপর নবাব সরকারের রাজস্ব প্রদান বন্ধ করে একজন স্বাধীন, সার্বভৌম নৃপতির মতোই মোহাম্মদপুর জমিদারিতে প্রবর্তন করেন নিজস্ব শাসনব্যবস্থা। নতুন শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের পরপরই জমিদারি সুরক্ষার পদক্ষেপ নেন রাজা সীতারাম। এ জন্য নদীতীরবর্তী এ স্থানটিতে তিনি গড়ে তোলেন দুর্ভেদ্য দুর্গ, কাঁচারিবাড়ি, পরিখা পরিবেষ্টিত রাজপ্রাসাদ, পূজার্চনার জন্য নির্মাণ করেন দেবালয়, জনহিতার্থে খনন করেন বেশ কিছু বিশালাকার জলাশয়। রামসাগর, সুখসাগর, দুধসাগর, কৃষ্ণসাগর নামের সেই জলাশয়গুলো কি এখনো রয়েছে মোহাম্মদপুরে? ভাবতে ভাবতে ভ্যান থেকে নামলাম আমরা। সংশয়াকীর্ণ মন নিয়ে পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের হলুদ দ্বিতল ভবনের সামনের পথটুকু পেরিয়ে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়ালাম। সেমিপাকা এই বিদ্যালয়টির একপাশেই রাজা সীতারাম রায়ের কাঁচারিবাড়ির প্রবেশদ্বার। জরাজীর্ণ সেই প্রবেশদ্বার অতিক্রম করে ভেতরে পা রাখতেই দৃষ্টিপ্রত্যক্ষে উন্মোচিত হলো কাঁচারিবাড়ির বিবর্ণ সৌন্দর্য। কাঁচারিবাড়ির উত্তরে দোলমঞ্চ। ভূমি সমতল থেকে খানিকটা নিচুতে অবস্থিত দোলমঞ্চের পশ্চিমে মূল রাজবাড়ি এলাকা। মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস পেছনে ফেলে সামনে এগোলাম এবার। দুধসাগর নামের অনতিবৃহত্ জলাশয়ের কাছেই রাজা সীতারাম রায়ের রাজবাড়ি। তবে বর্তমানে রাজবাড়ির সেই সুনির্দিষ্ট স্থানে সুপ্রাচীন কিছু ইট-সুরকির ভগ্নস্তূপ; স্তূপের ওপর সানন্দে বেড়ে ওঠা কিছু লতা, গাছপালা এবং সেসবের চারপাশজুড়ে বিস্তৃত হওয়া অবৈধ দখলদারি ব্যতীত দেখার মতো কিছুই নেই আর। রাজা সীতারাম রায়ের প্রতিষ্ঠিত দশভুজার মণ্ডপটি রাজবাড়ির ভগ্নস্তূপের কাছেই। মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় মন্দির হিসেবে ব্যবহূত এ মণ্ডপটির অনাড়ম্বর আঙিনায় আমরা দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ। মণ্ডপের অভ্যন্তরে উপবিষ্ট মৃত্তিকা নির্মিত শিবঠাকুর। হিন্দু শাস্ত্রমতে, শিবঠাকুর সংহারকর্তা, ধ্বংসের দেবতা। ধ্বংসের এই দেবতার মুখাবয়বে স্থির হয়ে থাকা রহস্যময় হাসি। সেই হাসি দেখতে দেখতে প্রাচীন মোহাম্মদপুরের উন্নত জনপদ ধ্বংস হওয়ার সূচনালগ্নের কথা ভাবি আমরা, ভাবি রাজা সীতারাম রায়ের শেষ দিনগুলোর কথা—বিরুদ্ধাচারী হওয়ার পর রাজা সীতারাম রায়কে দমন করার উদ্দেশ্যে নবাব মুর্শিদ কুলী খান ফৌজদার মীর আবু তোরাবকে প্রেরণ করেন মোহাম্মদপুরে। কিন্তু তাঁকে বিপুল বিক্রমে পরাস্ত করেন রাজা সীতারাম। এ পরাজয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন মুর্শিদাবাদের নবাব। এরপর তিনি আরও অধিকসংখ্যক সেনাসহ ফৌজদার বখত আলী খাঁকে প্রেরণ করেন। এবার আর শেষরক্ষা হয় না সীতারামের। ১৭১৪ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পরাজিত ও নিহত হন রাজা সীতারাম রায়। তাঁর মৃত্যুর পর নবাব সরকারের আনুকূল্যে নাটোরের জমিদারদের হাতে এ স্থানের তত্ত্বাবধানের ভার অর্পিত হলেও স্বাধীন-সার্বভৌম সত্তা হারানো মোহাম্মদপুরের প্রাণরস শুকিয়ে যায়—শুরু হয় একটি উন্নত জনপদ ধ্বংস হওয়ার সকরুণ প্রক্রিয়া।

রাজা সীতারাম রায়ের প্রাসাদ-দুর্গ by দীপংকর চন্দ

একটানা দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকলেই অশান্তির অবদমিত অনলে দগ্ধ হয় মন। ক্লান্ত লাগে। অবসন্ন লাগে। লাগামহীন অসহনীয়তার বীজ রোপিত হয় নাগরিকজীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তখন? তখন অবসরের অপেক্ষায় না থেকে বেরিয়ে পড়ি—মহানগরের যান্ত্রিক আকর্ষণ উপেক্ষা করে দূরপথ অতিক্রম করি—খাল-বিল-নদী ছুঁয়ে ধানখেতের দিগন্তপ্রসারী সবুজের কাছে সমর্পিত করি নিজেকে। অশান্ত মন প্রশান্ত হয়—অচেনা গ্রামের সঙ্গে রচিত হয় আত্মীয়তা, অজানা পথের সঙ্গে সৃষ্টি হয় পরিচয়। সেই পরিচয়সূত্রেই আউনাড়া মোড় থেকে সামনে এগোলাম। যশপুরের কাইয়ুম মিয়ার রিকশাভ্যানে চেপে ধোয়াইল পৌঁছালাম ধীরে-সুস্থে। লাইবা নামের একটা দ্রুতগামী বাস পাশ কাটাল আমাদের। ধোয়াইল তিন রাস্তার মোড় পেছনে ফেলে বাঁ দিকে অগ্রসর হলাম আমরা। বড় বড় শিরীষগাছের স্নিগ্ধ ছায়া এই পথে। পথের অনেক ওপরের আকাশ মেঘমুক্ত, দ্বিধাশূন্য। পরিপার্শ্বের বাতাস অনুন্নত জনপদের গন্ধমাখা। রাজপথ ছেড়ে একটা শাখাপথে প্রবেশ করলাম এবার। ‘এই পথে মাইলদেড়েক এগোলেই মধুমতী নদী...’, উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানালেন ভ্রমণসঙ্গী সাধন পোদ্দার এবং তুষার সাহা, ‘...তবে নদী পর্যন্ত যাব না আমরা। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের মোহাম্মদপুর কার্যালয়ের কাছেই থামতে হবে আমাদের, নামতে হবে ভ্যান থেকে। কারণ, সেখানেই মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর উপজেলার অনন্য প্রত্নকীর্তি রাজা সীতারাম রায়ের প্রাসাদ-দুর্গ।’
মাগুরা সদর উপজেলা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মধুমতী নদীর তীরে অবস্থিত এই প্রত্নস্থানটি রাজবাড়ি এলাকা নামে পরিচিত সাধারণ্যে। এ মুহূর্তে এলাকাটিকে ভীষণ অনুন্নত, অপ্রাগ্রসর বলে মনে হলেও সপ্তদশ-অষ্টদশ শতাব্দীতে এখানে যে একটি উন্নত জনপদের পত্তন হয়েছিল, রাজা সীতারাম রায়ের প্রাসাদ-দুর্গের অবস্থিতিই তার স্মৃতিভারাতুর সাক্ষ্য বহন করে।
রাজা সীতারাম রায় প্রচলিত অর্থে রাজা ছিলেন না, ছিলেন মোহাম্মদপুর অঞ্চলের প্রখ্যাত জমিদার। তাঁর পিতা সত্যজিত্ রায় মুর্শিদাবাদের নবাব সরকারের একজন আমলা ছিলেন। সীতারাম রায় পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমলা থেকে জমিদারি এবং পরে স্বীয় প্রতিভাবলে রাজা উপাধি লাভ করেন। উপাধি লাভের পর সীতারাম রায় একজন রাজার মতোই রাজ্য বিস্তারে সচেষ্ট হন। সেনাবল বৃদ্ধি করে তিনি পার্শ্ববর্তী জমিদারদের ভূ-সম্পত্তি নিজ অধিকারে নিয়ে আসেন। তারপর নবাব সরকারের রাজস্ব প্রদান বন্ধ করে একজন স্বাধীন, সার্বভৌম নৃপতির মতোই মোহাম্মদপুর জমিদারিতে প্রবর্তন করেন নিজস্ব শাসনব্যবস্থা। নতুন শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের পরপরই জমিদারি সুরক্ষার পদক্ষেপ নেন রাজা সীতারাম। এ জন্য নদীতীরবর্তী এ স্থানটিতে তিনি গড়ে তোলেন দুর্ভেদ্য দুর্গ, কাঁচারিবাড়ি, পরিখা পরিবেষ্টিত রাজপ্রাসাদ, পূজার্চনার জন্য নির্মাণ করেন দেবালয়, জনহিতার্থে খনন করেন বেশ কিছু বিশালাকার জলাশয়। রামসাগর, সুখসাগর, দুধসাগর, কৃষ্ণসাগর নামের সেই জলাশয়গুলো কি এখনো রয়েছে মোহাম্মদপুরে? ভাবতে ভাবতে ভ্যান থেকে নামলাম আমরা। সংশয়াকীর্ণ মন নিয়ে পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের হলুদ দ্বিতল ভবনের সামনের পথটুকু পেরিয়ে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়ালাম। সেমিপাকা এই বিদ্যালয়টির একপাশেই রাজা সীতারাম রায়ের কাঁচারিবাড়ির প্রবেশদ্বার। জরাজীর্ণ সেই প্রবেশদ্বার অতিক্রম করে ভেতরে পা রাখতেই দৃষ্টিপ্রত্যক্ষে উন্মোচিত হলো কাঁচারিবাড়ির বিবর্ণ সৌন্দর্য। কাঁচারিবাড়ির উত্তরে দোলমঞ্চ। ভূমি সমতল থেকে খানিকটা নিচুতে অবস্থিত দোলমঞ্চের পশ্চিমে মূল রাজবাড়ি এলাকা। মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস পেছনে ফেলে সামনে এগোলাম এবার। দুধসাগর নামের অনতিবৃহত্ জলাশয়ের কাছেই রাজা সীতারাম রায়ের রাজবাড়ি। তবে বর্তমানে রাজবাড়ির সেই সুনির্দিষ্ট স্থানে সুপ্রাচীন কিছু ইট-সুরকির ভগ্নস্তূপ; স্তূপের ওপর সানন্দে বেড়ে ওঠা কিছু লতা, গাছপালা এবং সেসবের চারপাশজুড়ে বিস্তৃত হওয়া অবৈধ দখলদারি ব্যতীত দেখার মতো কিছুই নেই আর। রাজা সীতারাম রায়ের প্রতিষ্ঠিত দশভুজার মণ্ডপটি রাজবাড়ির ভগ্নস্তূপের কাছেই। মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় মন্দির হিসেবে ব্যবহূত এ মণ্ডপটির অনাড়ম্বর আঙিনায় আমরা দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ। মণ্ডপের অভ্যন্তরে উপবিষ্ট মৃত্তিকা নির্মিত শিবঠাকুর। হিন্দু শাস্ত্রমতে, শিবঠাকুর সংহারকর্তা, ধ্বংসের দেবতা। ধ্বংসের এই দেবতার মুখাবয়বে স্থির হয়ে থাকা রহস্যময় হাসি। সেই হাসি দেখতে দেখতে প্রাচীন মোহাম্মদপুরের উন্নত জনপদ ধ্বংস হওয়ার সূচনালগ্নের কথা ভাবি আমরা, ভাবি রাজা সীতারাম রায়ের শেষ দিনগুলোর কথা—বিরুদ্ধাচারী হওয়ার পর রাজা সীতারাম রায়কে দমন করার উদ্দেশ্যে নবাব মুর্শিদ কুলী খান ফৌজদার মীর আবু তোরাবকে প্রেরণ করেন মোহাম্মদপুরে। কিন্তু তাঁকে বিপুল বিক্রমে পরাস্ত করেন রাজা সীতারাম। এ পরাজয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন মুর্শিদাবাদের নবাব। এরপর তিনি আরও অধিকসংখ্যক সেনাসহ ফৌজদার বখত আলী খাঁকে প্রেরণ করেন। এবার আর শেষরক্ষা হয় না সীতারামের। ১৭১৪ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পরাজিত ও নিহত হন রাজা সীতারাম রায়। তাঁর মৃত্যুর পর নবাব সরকারের আনুকূল্যে নাটোরের জমিদারদের হাতে এ স্থানের তত্ত্বাবধানের ভার অর্পিত হলেও স্বাধীন-সার্বভৌম সত্তা হারানো মোহাম্মদপুরের প্রাণরস শুকিয়ে যায়—শুরু হয় একটি উন্নত জনপদ ধ্বংস হওয়ার সকরুণ প্রক্রিয়া।

দিল্লি বৈঠকে অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে আমাদের দাবি -পানিসম্পদ by পাভেলপার্থ

দুনিয়ার ২০০টির বেশি নদী-অববাহিকা দুনিয়ার মোট ভূমির ৫০ শতাংশ। প্রতিটি অববাহিকাই ভৌগোলিকভাবে দু-তিনটি রাষ্ট্রের অধীন এবং যেখানে দুনিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের বসতি। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, নীল, নাইজার, কঙ্গো, জাম্বেসি, দানিয়ুব, রাইন, টাইগ্রিস, মেকং, পারানা-প্যারাগুয়ের মতো অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীগুলোর রয়েছে বৃহত্তম অববাহিকা। এসব আন্তর্জাতিক বৃহত্তম নদী-অববাহিকার জন্য কোনো ন্যায্য, সমতাকেন্দ্রিক, নদীর প্রতিবেশবান্ধব, বিশ্বস্ত, সর্বোপযোগী উদ্যোগ ও যৌথ নীতি-পরিকল্পনা করা খুবই কঠিন ব্যাপার। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নদীর উত্সমুখের কাছাকাছি উজানের রাষ্ট্রগুলো থেকে পানি অধিকারের জায়গায় বঞ্চিত থেকে যায় ভাটির দিকের রাষ্ট্রগুলো। ভারত-বাংলাদেশ কোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রেও দুটি দেশের অভিন্ন নদীকেন্দ্রিক সম-অধিকারের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় রাখাও হয়তো একটি ‘জটিল’ ব্যাপার। কিন্তু এই ‘জটিল’ ব্যাপারটিকে দ্বিরাষ্ট্রিক আমলাতান্ত্রিক ‘জটিলতা’র ভেতর দিয়ে বিবেচনা না করে দুটি দেশের প্রাণ ও প্রকৃতির সর্বস্বান্ত হওয়া ও নদীগুলোর ন্যায়বিচারের জায়গা থেকে ভাবা দরকার। জলবায়ু বিপর্যয়ের এ সময়ে এই উদ্যোগ আসন্ন দিল্লি বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারতের কেন্দ্রীয় মনোযোগ ও বিবেচনা হিসেবেই শুরু হতে পারে। এরই মধ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে দিল্লি বৈঠকে তিস্তা নদীর পানি বণ্টনসহ বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন সীমান্ত নদীবিষয়ক প্রস্তাব কার্যকরভাবে তুলে ধরবেন। ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, কেবল তিস্তা নয়, দিল্লি বৈঠক উজান-ভাটির সব অভিন্ন নদীজীবনের রক্তাক্ত আখ্যান বিবেচনা করবে, নিশ্চিত করবে অভিন্ন জলধারার ন্যায্য সুরক্ষা।
এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বাংলাদেশের ২৩০টি নদীর মধ্যে ৫৭টি প্রধান নদীর উত্স সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র ভারত ও মিয়ানমারের পাহাড়ি অঞ্চল। উজান থেকে ভাটিতে বয়ে যাওয়া জলপ্রবাহের মাধ্যমে বাংলাদেশের নদীপ্রণালী এক জটিল জলসার্কিট তৈরি করেছে, যা দুনিয়ার অন্য কোনো নদীপ্রণালী দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। ১৯৫৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান পানি ও শক্তি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়। সে কর্তৃপক্ষ ১৯৬৪ সালে বিদেশি ও দেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়োজিত করে ২০ বছর মেয়াদি পানি উন্নয়নের জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু এ পর্যন্ত দেশে বন্যা, জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি ঢল, অকাল বন্যা, খরা-পানিশূন্যতা নিয়ে পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কোনো কর্ম-উদ্যোগ দেশের অভিন্ন সীমান্ত জলধারাগুলোয় প্রতিবেশীয় রাজনৈতিক অধিকারের জায়গা থেকে নিশ্চিত করা হয়নি। উজান ও ভাটির উভয় রাষ্ট্রই অন্যায়ভাবে অভিন্ন নদীগুলো শাসন করেছে, উন্নয়নের নামে নৃশংস কায়দায় খর্ব করেছে অভিন্ন জলধারার গতি-প্রকৃতি।
১৯৭২ সালে গঠিত ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন এখন পর্যন্ত দেশের সব অভিন্ন নদ-নদীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেনি। যৌথ নদী কমিশনে ভারত বরাবরই কর্তৃত্ববাদী ভূমিকা বজায় রাখে, অথচ থাকার কথা সমমর্যাদাসম্পন্ন বন্ধুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পর্ক। যৌথ নদী কমিশনের বাংলাদেশ শাখা ভারতের অসন্তুষ্টি এড়ানোর জন্য গঙ্গা ও ফারাক্কা বিষয়ে সাম্প্রতিক তথ্য ও উপাত্ত নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে নিরুত্সাহিত করে। বলা যায়, সর্বশেষ ফারাক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক মাস পর, ১৯৯৬-৯৭ সালের শুকনো মৌসুমে গঙ্গার প্রবাহ ছয় হাজার কিউসেকে নেমে আসে, যা গঙ্গার পানিপ্রবাহের এ যাবত্কালের সর্বনিম্ন রেকর্ড। ভারত, নেপাল, চীন (তিব্বত) ও বাংলাদেশের আড়াই হাজার কিলোমিটার নিয়ে বিস্তৃত গঙ্গা ৫০ কোটি মানুষের জীবিকার উত্স। পৃথিবীর জনসংখ্যার আট ভাগের এক ভাগ এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৪১ ভাগ মানুষ গঙ্গার পানির ওপর নির্ভরশীল। গঙ্গা-অববাহিকায় বাংলাদেশের ৪০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল—যা দেশের মোট এলাকার ৩৬ ভাগ—এই অভিন্ন গঙ্গা নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। গঙ্গা নদী থেকে বাংলাদেশের মোট প্রবাহিত মিঠাপানির ১৮ শতাংশ আসে। ব্রহ্মপুত্র থেকে দেশের ভূপৃষ্ঠের পানিপ্রবাহের ৬৭ ভাগ আসে এবং মেঘনার মাধ্যমে ১৫ ভাগ আসে। শুকনো মৌসুমে গঙ্গার পানিপ্রবাহ দ্রুত পড়ে যায়, ভারত উজানে গঙ্গার পানি একতরফা প্রত্যাহারের ফলে আমাদের উত্তরাঞ্চলে দেখা দেয় খরা ও বিপর্যয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৪টি সীমান্ত নদীতে ভাঙনের ফলে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত ভূমি হারাচ্ছে। হাওরাঞ্চল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে মেঘালয়ের পাহাড়ি বালিতে। ১৯৯৬ সালে নেপালের সঙ্গে মহাকালী চুক্তি সইয়ের বছর ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু পরে বাংলাদেশের সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে কোনো ধরনের নীতিগত আলোচনা ছাড়াই ২০০২ সালে ভারত পাঁচ হাজার ৬০০ বিলিয়ন ভারতীয় রুপির আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের (আরএলপি) পরিকল্পনা ঘোষণা করে। পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারতের মণিপুর রাজ্যে বরাক নদীর ওপরে বিতর্কিত টিপাইমুখ জলবিদ্যুত্ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে, যার ফলে নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশঙ্কায় দিন গুনছে বাংলাদেশের মেঘনা অববাহিকা। কুশিয়ারা-সুরমা-মেঘনা মিলেই দেশের দীর্ঘতম নদীপ্রণালী, যার মূল উত্স বরাক নদী। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশও অভিন্ন নদ-নদী আপন কায়দায় রক্ষা করতে পারেনি। কখনো জলবিদ্যুত্ উত্পাদনের নামে, কখনো বাঁধ-স্লুইসগেট-ব্যারেজ-কালভার্ট-রাস্তা-সেতু-নদী ভরাট-ইজারা-দখল-নগরায়ণের মাধ্যমে বিরাট ক্ষতি করা হয়েছে দেশের নদীপ্রণালীর।
আসন্ন দিল্লি বৈঠকে অভিন্ন নদীর বিষয়ে আলোচনায় বসার আগে বাংলাদেশকে নিজের ভূগোলের ভেতর বয়ে চলা অভিন্ন নদী বিষয়ে স্পষ্ট-ন্যায্য-নদীবান্ধব উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের নদীনির্ভর জনগণের প্রস্তাব ও সুপারিশকে গুরুত্ব দিয়ে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর বিষয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনায় বসা জরুরি। টিপাইমুখ বাঁধ, আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পসহ ভারত ভূগোলের সঙ্গে সম্পর্কিত দেশের সব অভিন্ন নদীর বিষয়েই সরকারকে দিল্লি বৈঠকে নদীবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জাতিসংঘ নদী কনভেনশন, রামসার ঘোষণা, আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদগুলো বিবেচনা করে যৌথ নদী কমিশনকে কার্যকর করাসহ জলবায়ু বিপর্যয়ের বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দিল্লি বৈঠক সফল করার জন্য সরকারের প্রতিবেশবান্ধব প্রস্তুতি জরুরি। সাত হাজার কিলোমিটার লম্বা পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী নীল তিন মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার অববাহিকা তৈরি করেছে, যেখানে ১৫০ মিলিয়ন মানুষের বাস। বুরুন্ডি, কঙ্গো, মিসর, ইরিত্রিয়া, কেনিয়া, ইথিওপিয়া, রুয়ান্ডা, সুদান, তানজানিয়া, উগান্ডার মতো ১০টি রাষ্ট্র এই নদীর পানি ব্যবহার করে। আর আমাদের মাত্র দুটি রাষ্ট্র ৫৪টি অভিন্ন নদীর বিষয়ে কি কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না নতুন বছরের সূচনালগ্নে?
পাভেল পার্থ: প্রতিবেশবিষয়ক গবেষক।
animistbangla@yahoo.com

ছোট ছোট উদ্যোগ ও পরিবর্তন আনতে হবে -সুশাসন by আকবর আলিখান

সুশাসন নয়-ছয় করা যত সোজা, নষ্ট হয়ে যাওয়া সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা তত সোজা নয়। সুশাসন একটি ঘটনা নয়, সুশাসন একটি প্রক্রিয়া। কাজেই স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে সেটি প্রতিষ্ঠিত হবে—এ ধরনের আশা করা ঠিক হবে না। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এবং বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থার ক্রমেই অবনতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এই অবনতিশীল পরিস্থিতি রোধ করার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের প্রশাসনে দুটি প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ রয়েছে। প্রথম উদ্বেগের কারণ হলো বাংলাদেশে যারা ভালো কাজ করে, তারা পুরস্কার পায় না। আর যারা খারাপ কাজ করে, তাদের শাস্তি হয় না। এ কথা প্রশাসনের ক্ষেত্রে যেমন সত্যি, প্রশাসনের বাইরের সমাজ সম্পর্কেও সমভাবে সত্য।
দীর্ঘদিন আগে হজরত আলী (রা.) মিসরের নবনিযুক্ত গভর্নর মালিক আশতারকে বলেছিলেন, ভালো ও খারাপের সঙ্গে একই রকম ব্যবহার কোরো না। যদি করো, তাহলে ভালো লোকেরা ভালো কাজ করবে না। আর খারাপ লোকেরা খারাপ কাজ করা থেকে বিরত হবে না।
ভগ্বত গীতাতেও শ্রীকৃষ্ণ দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের কথা বলেছেন। শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে এই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর প্রতিফল আমরা দেখতে চাই সরকারের নিয়োগ ব্যবস্থায়, পদায়ন এবং পদোন্নতিতেও।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা জনপ্রশাসনের একটি মৌল নীতি থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে। এই মৌল নীতিটি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন চৈনিক দার্শনিক কনফুসিয়াস। কনফুসিয়াসকে একজন ভক্ত জিজ্ঞেস করেছিল, সুশাসন কাকে বলে? কনফুসিয়াস খুব সোজা কথায় বলেছিলেন, সুশাসন ব্যাপারটি খুব সহজ। সুশাসন হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে রাজা রাজার কাজ করে, মন্ত্রী মন্ত্রীর কাজ করে, পিতা পিতার কাজ করে ও সন্তান সন্তানের কাজ করে। যদি রাজা মন্ত্রীর কাজ করে, আর মন্ত্রী প্রজার কাজ করে, তাহলে সুশাসন থাকবে না।
দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা অতি কেন্দ্রীয়করণের ফলে সব ক্ষমতা মুষ্টিমেয় লোকের হাতে বন্দী হয়ে পড়েছে। এই ব্যবস্থায় সুশাসন সম্ভব নয়। প্রশাসনের এই অচলায়তন ভাঙতে আজকে তাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ।
কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাহী বিভাগের উচ্চতর পর্যায় থেকে নিম্নতর পর্যায়ে অধিকতর দায়িত্ব ও ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা স্থানীয় সরকারের হাতে প্রত্যর্পণ করতে হবে।
দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানবসম্পদ। কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থায় দেশের মানুষের সৃজনশীলতা কখনো মুক্তিলাভ করবে না।
এ কথা সত্যি, যেসব পরিবর্তনের কথা এখানে বলা হয়েছে, এগুলো রাতারাতি করা যাবে না। তবুও এ বছরে যদি এসব বিষয়ে ছোট ছোট উদ্যোগও নেওয়া হয়, তাহলে আমরা দিনবদলের আশায় বুক বাঁধতে পারি। শুধু কথা বলাই যথেষ্ট নয়, কাজের মাধ্যমে প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে।
আকবর আলি খান: সাবেক সচিব, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা।

পর্যটন খাতে বাংলাদেশ ব্যাংক যা করতে পারে -পর্যটনশিল্প by সিরাজুলইসলাম

বাংলাদেশ ব্যাংক বিদ্যুত্ ও গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলা, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণের স্বার্থে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য সহজ শর্তে সৌরশক্তি, বায়োগ্যাস ও বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ২০০ কোটি টাকার আবর্তনশীল তহবিল গঠন করেছে। গৃহস্থালি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সৌরশক্তি প্যানেল স্থাপনের পাশাপাশি সৌরশিল্প স্থাপন, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট স্থাপনে ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বোচ্চ শতভাগ পর্যন্ত পুনরর্থায়ন-সুবিধা দেবে।
পরিবেশ-সহায়ক বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগটি ব্যাংকিং সেক্টরে ইতিমধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে এবং যথেষ্ট প্রশংসাও কুড়িয়েছে। গভর্নর হিসেবে এটি আতিউর রহমানের বিশেষ উদ্যোগ হলেও তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন কৃষি বিনিয়োগের দিকে। দেশের আর্থিক সেক্টরের প্রধান হয়েও কৃষি খাতের স্বনির্ভরতা বাড়াতে কৃষিঋণ নিয়ে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে চলেছেন। বলা বাহুল্য, তাঁর এই প্রচেষ্টার কারণে প্রবল অনীহা থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো বেশ সাড়া দিতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি ব্যাংক ঢাকঢোল পিটিয়ে গ্রাম থেকে শহরে এনে কৃষকদের হাতে ঋণসুবিধা তুলে দিয়েছে।
পুঁজি বিনিয়োগের নানাবিধ ধারাবাহিকতায় আতিউর রহমান ব্যাংকিং সেক্টরে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছেন। অনেক আগ থেকে পণ্য বহুমুখীকরণের কথা বলা হলেও তিনিই প্রথম তা করে দেখালেন। এখন নতুন করে এগ্রিকালচার মডার্নাইজেশনের কথা ভাবা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি প্রশংসার দাবি রাখে।
দেশের আরেক সম্ভাবনাময় খাত পর্যটনশিল্পের জন্যও এমন কিছু যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিকাশের জন্য পর্যটনশিল্পকে সরকারের উন্নয়ন-সহযোগী খাত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে তা বাস্তরে রূপ নিতে পারে। সৌরশক্তির মতো বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে স্বল্প মুনাফায় একটি আবর্তনশীল পুনরর্থায়ন তহবিল গঠন করতে পারে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক যা করতে পারে: ১. তফসিলি ব্যাংকগুলোকে সম্মিলিতভাবে অথবা এককভাবে তাদের বিনিয়োগের পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ পর্যটনশিল্পের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করা। ২. তফসিলি ব্যাংকগুলোকে তাদের অলস তহবিল পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে ব্যবহার করার জন্য নির্দেশ দেওয়া। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বারবার উত্পাদনশীল খাতে অলস অর্থ বিনিয়োগের কথা বলা হলেও ব্যাংকগুলো তা করে না। বরং পারসোনাল লোন, কনজ্যুমার লোন, ফেস্টিভ্যাল লোন, কার লোন ইত্যাদি খাতে অলস অর্থের বেশি বিনিয়োগ হয়। ব্যাংকগুলো যদি পর্যটনশিল্পে অলস অর্থের বিনিয়োগ নিয়ে আসে, তাহলে একদিকে যেমন অর্থ বিনিয়োগের যথার্থতা পাবে, অন্যদিকে দেশের উন্নয়নও ঘটবে।
বর্তমান বিশ্বে পর্যটনশিল্প বিশাল আয়ের উত্স। প্রাচীন যুগে আমাদের দেশেও পর্যটনশিল্প উন্নত ও আয়ের উত্স ছিল। ইবনে বতুতা পর্যটক হিসেবে আমাদের দেশে ভ্রমণ করতে এসেছিলেন। বর্তমানে আরব দেশগুলো থেকে শুরু করে ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, ভারতসহ এশিয়ার সব দেশই পর্যটনশিল্পকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম উত্স হিসেবে নিয়েছে।
জাতীয় বাজেটে এ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। যারা হোটেল-মোটেল ও সাফারি পার্ক নির্মাণ করবে, তাদের ট্যাক্স হলিডে দিয়ে এ খাতে বেসরকারি উদ্যোগকে উত্সাহিত করা যায়। এই খাতে বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ করা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া যায়: ১. যেসব বিদেশি উদ্যোক্তা ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে, তাদের নাগরিকত্বসহ আবাসন সুবিধা দেওয়া; ২. ট্যাক্স হলিডে দেওয়া; ৩. তাদের বিনিয়োগ তদারকির জন্য গ্রহণযোগ্য লোক নিয়োগের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া।
আর বাংলাদেশকে বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করতে এসব দিকে নজর দেওয়া জরুরি: ১. পরিবেশকে স্বাস্থ্যসম্মত করার জন্য স্যানিটেশন-ব্যবস্থার উন্নয়ন; ২. যাতায়াতব্যবস্থা ও যানবাহনব্যবস্থার উন্নয়ন করা; ৩. হাটহাজারী থেকে কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ; ৪. বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত রাস্তার উন্নয়ন; ৫. কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা; ৬. কক্সবাজার থেকে মেরিন ড্রাইভ রোডটির উন্নয়ন; ৭. খুলনায় প্রস্তাবিত বিমানবন্দর দ্রুত নির্মাণ; ৮. পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
এসব অবকাঠামোর উন্নয়ন করা গেলে আমাদের দেশেও বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসবে। আর বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের জন্য এসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন: ১. বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর এ বিষয়ে তত্পরতা বাড়ানো; ২. দেশের দর্শনীয় স্থান ও থাকার ব্যবস্থার স্থানের ভিডিও চিত্রে ধারণ করে অন্যান্য দেশে আমাদের দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন সেমিনারে উপস্থাপন করা। ৩. মালয়েশিয়ার পেনাং ও কাশ্মীরের মতো নদী ভ্রমণের জন্য সুন্দর সুন্দর নৌকার ব্যবস্থা করা; ৪. খুলনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের মতো স্থানে তিন থেকে পাঁচতারকা হোটেল নির্মাণ করা। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস ও চীন পর্যটক আকর্ষণের জন্য ব্যাপকভাবে হোটেল-মোটেল তৈরি করছে। আমরা যদি পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন সাধন করতে পারি, তাহলে আমাদের দেশের বেকার সমস্যার অনেকখানি সমাধান হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বিদেশি পর্যটক ও অন্যান্য ভ্রমণকারীর কাছ থেকে গত বছর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ৬১২ কোটি ৪৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। ২০০৭ সালে এ খাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছিল ৫২৬ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। গত এক বছরে পর্যটন খাতে আয় বেড়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
সার্ক ও আসিয়ানের অনেক দেশেই পর্যটন খাত থেকে হাজার কোটি ডলারের বেশি আয় করে। ২০০৫ সালে থাইল্যান্ড আয় করে এক হাজার ২৬২ কোটি ডলার, সিঙ্গাপুর ৫৭৩ কোটি ডলার, ভারতের আয় প্রায় ৪০০ কোটি ডলার, পাকিস্তানের আয় ৮৩ কোটি ডলার, নেপালের আয় ১৬ কোটি ডলার। আর গত ২০০৫ সালে বাংলাদেশের আয় ছিল মাত্র সাত কোটি ডলার। আমাদের আয় অবশ্যই বাড়বে, যদি আমরা পর্যটনশিল্পের আরও উন্নয়ন ঘটাতে পারি।
সিরাজুল ইসলাম: ব্যাংকার, বনানী।

প্রথম দিনের সূর্য -চিরকুট by শাহাদুজ্জামান

বহু বহু যুগ আগে এই পৃথিবী-গ্রহেরই কোনো কোনো মানবগোষ্ঠী তাঁদের আদিম লোকাচারের অংশ হিসেবে প্রতি সন্ধ্যায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে একটি বিশেষ প্রার্থনা করতেন অস্তগামী সূর্যের কাছে। তাঁরা প্রার্থনা করতেন, ‘সূর্যদেব, দয়া করে আগামীকাল উদিত হবেন, ভুলে যাবেন না আমাদের।’ তাঁদের ভয় ছিল, এই যে তেজোদীপ্ত সূর্য ক্রমশ ম্লান হয়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন মহাশূন্যের অতলে। তিনি যদি আগামীকাল আর ফিরে না আসেন, যদি তাঁদের রাতের পর রাত এভাবে অন্ধকারে ফেলে রেখে সূর্যদেব চলে যান অন্য কোনো মহাশূন্যে কিংবা ভুলে যান তাঁদের! পরদিন পূর্বাকাশে সূর্যের মুখ দেখে গভীর স্বস্তি হতো তাঁদের। যুগের পর যুগ করজোড়ে সূর্যের কাছে প্রার্থনা করেছেন তাঁরা, আর সূর্যকে উদিত হতে দেখে আশ্বস্ত হয়েছেন। বলা বাহুল্য, আমরা আজকাল প্রার্থনা না করলেও সূর্যদেব প্রতিদিন পূর্বদিকে দেখা দেন। কেন দেখা দেন, এই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে বিজ্ঞানীদের।
নিয়মমাফিক এবারও বছরের প্রথম দিনে আকাশে দেখা দিয়েছেন পরিচিত, বিখ্যাত সেই সূর্যগোলক। প্রকৃতি কোনো সূর্যোদয়কেই বাদ্য বাজিয়ে বিশেষ সুর্যোদয় বলে ঘোষণা করে না। প্রকৃতির কাছে প্রতিটি সূর্যোদয়ই অন্য একটি সূর্যোদয়েরই পুনরাবৃত্তি। আমরাই আমাদের স্বপ্ন, ভাবনা, আবেগ দিয়ে নিত্যকার একটি সূর্যোদয়কে করে তুলি তাত্পর্যময়। বছরের প্রথম মাসের প্রথম সূর্য তাই আর আটপৌরে কোনো সূর্য থাকেন না। রোমানরা বছরের এই মাসটির নামকরণ করেছেন তাঁদের দেবতা জানুসের নাম অনুযায়ী। এই দেবতার দুটি মুখ। একটি মুখ তাকিয়ে থাকে সামনের দিকে, অন্যটি পেছনে। তিনিই একমাত্র দেবতা, যিনি একই সঙ্গে অতীত এবং ভবিষ্যেক দেখতে পান।
নতুন বছরের শুরুতে আমাদেরও সুযোগ রয়েছে জানুসের মতো স্মৃতি আর স্বপ্নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হিসাব-নিকাশ মেলানোর। আমরা এমন এক পৃথিবীতে এসে দাঁড়িয়েছি, যখন ব্যক্তিমানুষের স্মৃতি আর স্বপ্ন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে গেছে বৃহত্তর পৃথিবীর স্মৃতি আর স্বপ্নের সঙ্গে। কোনো দূরের এক শ্বেতাঙ্গ দেশে কৃষ্ণাঙ্গ এক রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন বলে দেখি নারায়ণগঞ্জের এক যুবক বুকভরে আনন্দের নিঃশ্বাস নিয়ে ভাবছে, আগামী বছরটি তার ভালো যাবে। মধ্যপ্রাচ্যে তেলের সংকট হলো বলে লালমনিরহাটের কৃষক সারা বছরেও জমাতে পারলেন না মেয়ের বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ। আগামী বছরও স্থগিত থাকবে মেয়েটির বিয়ে। মন্দা আঘাত করল বলে বিলাতে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ভারতীয় রেস্টুরেন্টে চিকেন টিক্কা মাসালার প্যাকেট সাজানোর কাজটি হারালেন নবাবপুরের তরুণ। হিম তুষারে বুট ডুবিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে নবাবপুরের তরুণ ভাবে, আগামী বছর দেশে ফিরবে সে। ভাবে, একটা ছোট চাকরিও কি জোগাড় হবে না ঢাকা শহরে, যা দিয়ে অন্তত সপ্তাহে একবার শুকনো কাঁঠালপাতার বাটিতে খাওয়া যাবে গরম ভাপ ওঠা হাজির বিরিয়ানি? অনেক দ্বিধার পর ধানমন্ডির ব্যবসায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আগামী বছর অভিবাসী হবেন ক্যাঙ্গারুর দেশে। দেশে তাঁর বিপুল সচ্ছলতা আছে, বিন্দুমাত্র স্বস্তি নেই। রাস্তার দুর্বিষহ যানজট, সন্তানের স্কুল, স্ত্রীর চিকিত্সা নিয়ে নারকীয় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে তাঁর গত বছর। বিশ্বায়নের পৃথিবীতে বিশ্বনাগরিক হওয়ার সামর্থ্য তাঁর আছে। কিন্তু যাঁরা থেকে যাবেন এই মানচিত্রে তাঁরা সবাই অজানা আশঙ্কায় তাকিয়ে আছেন আগামী বছরটির দিকে। তিল তিল করে যে ভুল, ক্লেদ আর অবহেলার ধুলো আমরা জমিয়েছি, তা কি একটু একটু করে সরতে শুরু করবে এবার? আজিমপুরের যে তরুণীর স্বামীকে একটি রহস্যময় মাটিলেপা মাইক্রোবাস যুদ্ধদিনে নিয়ে গিয়েছিল বধ্যভূমিতে, সেই তরুণী দিনের পর দিন বুকে দীর্ঘশ্বাস চেপে হয়েছেন প্রৌঢ়; প্রথমবারের মতো তিনি আশায় বুক বাঁধছেন, আগামী বছর তিনি হয়তো সেই দুর্বৃত্তদের দেখবেন কাঠগড়ায়। ফরিদপুরের যে বৃদ্ধ একটি লাল কাপড়-কাচা সাবান দিয়ে গোসল করিয়েছিলেন অবিসংবাদিত নেতার গুলিবিদ্ধ লাশ, অপেক্ষায় আছেন সেই দেশনেতার চোরাগোপ্তা লুকিয়ে থাকা ঘাতকদের প্রত্যেককে তিনি আগামী বছর দেখবেন গরাদের ওপারে। পুরোনো ধুলো সরানোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন হাওয়া জাগানোর প্রতিশ্রুতি যাঁরা দিয়েছেন, তাঁরা কি আন্তরিক থাকবেন? তাদের কি আন্তরিক থাকতে দেওয়া হবে? নাকি আবার আমরা নিক্ষিপ্ত হব দুঃস্বপ্নের ঘেরাটোপে? সবারই রুদ্ধশ্বাস জপ, তা যেন না ঘটে।
যেমন জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তেমনি আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ঝুলিতেও নিশ্চয়ই গত বছর জমা হয়েছে টুকরো কোনো অভিমান, অপমান, বেদনা। সেই ঝুলির অন্ধকার গহ্বরে সেসব ছুড়ে দিয়ে নিংড়ে আনা যাক যতটুকু অবশিষ্ট মধুরিমা। বারবার চোখের জলে মুছে যায় বলে যে নারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি আর চোখে কাজল লাগাবেন না, আগামী বছর আবার তাঁর চোখে উঠুক কাজল।
বছরের শেষ দিন। সাইবেরিয়ায় প্রচণ্ড তুষারঝড় হচ্ছে। বাড়ির বাইরে শুভ্র তুষারে ঢেকে আছে চারদিক। ঘরের ভেতর কাঠের আগুন জ্বালিয়ে ওম নিচ্ছে পুরো পরিবার। নাতি বলছে, ‘দাদু, একটা গল্প বলো।’ দাদু বলেন, ‘বুঝলি ইভান, আমাদের সবার বুকের ভেতর একটা চিড়িয়াখানা আছে। কাল নতুন বছরের প্রথম সূর্য উঠলেই সেই চিড়িয়াখানায় দুটো নেকড়ে আসবে। একটা নেকড়ে ভালো, সবার মঙ্গল চায়, বিশ্বাসী; আর অন্যটি মন্দ, হিংস্র, স্বার্থপর। সারা বছর ওই দুটোতে লড়াই করবে বুকের মধ্যে। বছর শেষে জিতবে একটি।’ নাতি বলে, ‘কোনটি জিতবে, দাদু?’ দাদু উত্তর দেন, ‘যেটিকে তুই বেশি খেতে দিবি।’
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।

বিরল সম্মান -ফজলে হাসান আবেদকে অভিনন্দন

দারিদ্র্য বিমোচন ও দরিদ্র মানুষের কল্যাণে অসামান্য অবদানের জন্য ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন ফজলে হাসান আবেদের নাইট উপাধিতে ভূষিত হওয়া শুধু তাঁর নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্যই আনন্দ ও গৌরবের বিষয়। বৃহস্পতিবার ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের নববর্ষের সম্মাননার তালিকায় তাঁর নাম ঘোষণা করে বলা হয়, ফজলে হাসান আবেদ হবেন ‘নাইট কমান্ডার অব দ্য মোস্ট ডিসটিংগুইস্ড অর্ডার অব সেন্ট মাইকেল অ্যান্ড সেন্ট জর্জ’। এই বিরল সম্মানের জন্য আমরা তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
১৯৪৭ সালের পর ফজলে হাসান আবেদই প্রথম বাংলাদেশি, যিনি এই উপাধি পেলেন। তাঁর কর্মক্ষেত্র বাংলাদেশ ছাড়িয়ে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের বহু দেশে বিস্তৃত। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ফজলে হাসান আবেদের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক চার দশক ধরে নিরলসভাবে কাজ করে আসছে। নাইট উপাধি তাঁর কাজের আরেকটি স্বীকৃতি। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, ১৯১৩ সালে ফজলে হাসান আবেদের বাবা সিদ্দিক হাসানের মামা বিচারপতি নবাব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদাও নাইট উপাধি পেয়েছিলেন। নাইট উপাধি পেয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও, যিনি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তা বর্জন করেন।
এর আগে ফজলে হাসান আবেদ র্যামন ম্যাগসেসাই অ্যাওয়ার্ড অব কমিউনিটি লিডারশিপ (১৯৮০), ইউনিসেফ মেরিট পেট অ্যাওয়ার্ডসহ (১৯৯২) বেশ কয়টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। পুরস্কার বা সম্মাননা মানুষকে অধিকতর দায়িত্বশীল করে, তা অনুধাবন করা যায় নাইট উপাধি পাওয়ার পর ফজলে হাসান আবেদের নিরহংকার প্রতিক্রিয়ায়। তিনি বলেছেন, ‘এই সম্মান আমি বিনম্রচিত্তে গ্রহণ করছি। এ জন্য আমি ব্র্যাকের আমার সব সহকর্মীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
যে কজন কৃতবিদ্য মানুষ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন, ফজলে হাসান আবেদ তাঁদের অন্যতম। একই সঙ্গে আমরা সানন্দচিত্তে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম উল্লেখ করতে চাই, যিনি গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মেডেল অব ফ্রিডম পদকে ভূষিত হন। তাঁরা আমাদের গর্ব ও নিত্যপ্রেরণা। তাঁদের কর্ম ও জীবনসাধনা হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্যকেই শুধু বদলে দেয়নি, বাংলাদেশকেও বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। ফজলে হাসান আবেদ কিংবা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করলেও এখন তাঁদের কর্মপরিধি সিন্ধু ছাড়িয়ে গেছে।
আমরা তাঁদের কর্মের সাথি, স্বপ্নের সহযাত্রী।

বেগম খালেদা জিয়ার উক্তি -দেশ ও দলের ভাবমূর্তির জন্য আত্মঘাতী

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া পল্টন ময়দানে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন; বিশেষ করে, সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামার ক্ষেত্রে তাঁর এবারের বক্তব্য অনেক স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট। এ ধরনের আন্দোলনের হুমকি এত দিন পর্যন্ত শুধু বিএনপির মহাসচিবসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতার বক্তব্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
দেশের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে জাতীয় নেতা হিসেবে তাঁর যে উদ্বেগ, তা বোধগম্য। কোনো সরকার যদি দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার প্রতিকার সাধারণ মানুষ সংগত কারণে বিরোধী দলের কাছেই আশা করবে। আমাদের রাজনীতির একটা বিরাট সমস্যা হলো অপরিমিতিবোধ। এটা অবশ্য আমরা আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় বহু ক্ষেত্রে বেদনা ও পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ করে আসছি। দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা আমাদের নেতা-নেত্রীরা অনেক সময় নির্বিকারভাবে এমন সব উক্তি ও মন্তব্য করেন, যা আক্ষরিকভাবে গুরুত্বের সঙ্গে নিলে দারুণ বিপাকে পড়তে হয়। তাই তাঁদের ভাষণের তাল-লয়-ছন্দ কখনো কখনো ভীষণ গোলমেলে। সে কারণেই তা কখনো কখনো উপেক্ষার যোগ্য। যেমন, বিরোধীদলীয় নেত্রী বলেছেন, ‘যারা ক্ষমতায় আছে তারা নয়, অন্য কেউ অন্য কোথাও বসে দেশ পরিচালনা করছে। সরকার বিদেশি শক্তির স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করছে।’
এ রকম একটি স্পর্শকাতর বক্তব্য অন্য কোনো দেশের গণতন্ত্রে ঘটলে হয়তো মস্ত হইচই পড়ে যেত। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি বলে কথা! জনগণ এ ধরনের প্রগলভতায় তাত্ক্ষণিকভাবে বিচলিত কিংবা বিপদাপন্ন না ভাবতে অভ্যস্ত। নিকট অতীতেই বেগম জিয়া বলেছিলেন, পার্বত্য চুক্তি হলে দেশের একটি অঞ্চল ভারত হয়ে যাবে। তখন সেখানে যেতে ভিসা লাগবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া ওই চুক্তি অটুট রাখতেই সতর্ক ছিলেন। এ রকম নজিরের কোনো অভাব নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভারত সফর সামনে রেখে বিরোধীদলীয় নেত্রীর ওই আক্রমণকে হালকাভাবে দেখা যায় না। তাঁর ভাষণের স্ববিরোধিতা দেখে, তাঁর আক্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান হতে হয়। তাঁর কথায়, ‘টিপাইমুখ বাঁধ, ট্রানজিট ও সমুদ্রসীমা নির্ধারণের মতো বিষয়ে যদি দিল্লিতে দেশের স্বার্থ রক্ষা হয়, তাহলে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হবে। আর যদি সবকিছু বিদেশিদের হাতে দিয়ে সরকার খালি হাতে ফিরে আসে, তবে তাদের পথে পথে কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া হবে।’
‘যদি’ দিয়ে এ ধরনের কঠোর বক্তব্যের নাহয় একটা যুক্তি থাকে। কিন্তু বিএনপির নেত্রী ইতিমধ্যে তাঁর বীতরাগ বা প্রেজুডিশ প্রকাশ করেছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন যখন বলেন, অন্য কেউ দেশ পরিচালনা করছে, তখন এই উক্তি বিএনপির ভারত-বিরোধিতা বলেই প্রতিভাত হবে।
আমরা বিরোধীদলীয় নেত্রীর দেশের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে যেকোনো সংগত উদ্বেগকে স্বাভাবিক মনে করি। কিন্তু তাঁর ও তাঁর সংসদ অধিবেশন বর্জনরত দলের কোনো হুজুগে কিংবা লোক খেপানোর যে সস্তা রাজনীতি, তা আমরা অগ্রহণযোগ্য ও আত্মঘাতী মনে করি। এ রকম বল্গাহীন উক্তি দেশের ও দলের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। এটা বিশ্বাসযোগ্য নয় যে বিরোধী দলের এ ধরনের বাগাড়ম্বরপূর্ণ বৈরিতা জাতীয় কূটনৈতিক অর্জনচেষ্টাকে সহায়তা দিতে পারে। এ ধরনের দায়িত্বহীনতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ভুল সংকেতও পৌঁছায়। সীমান্তের বাইরে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল ধারণা থাকলে তা দূর হয় না, বরং প্রকট হয়।

স্বদেশ বোস: ভালোবাসার মানুষ -জন্মদিন by জোবাইদা নাসরীন

স্বদেশ বোস একজন দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবিদ। আজ তাঁর ৮২তম জন্মদিন। প্রতিবার তাঁর জন্মদিনের আয়োজনে তাঁর সান্নিধ্য স্বজনেরা উপভোগ করতেন। কিন্তু এবার তাঁর অনুপস্থিতি এক বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি করবে। এক মাস আগে পৃথিবীর সঙ্গে বন্ধন ছিন্ন করে স্বদেশ বোস চিরবিদায় নেন।
বাংলাদেশের রত্নগর্ভা অঞ্চল বরিশালে তাঁর জন্ম। এই অঞ্চল ধারণ করেছে অনেক সাহসী, বিপ্লবী ও ত্যাগী মানুষকে। ১৯২৮ সালের ২ জানুয়ারি বরিশালের কাশিনাথ গ্রামে জন্মগ্রহণ করা স্বদেশ বোস কিশোর থেকেই স্বদেশি আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তখন বরিশাল আন্দোলনের তপ্ত জায়গা এবং স্বদেশি আন্দোলনের ঘাঁটি ছিল।
বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার অনন্য এই সৈনিক ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ভাষার দাবি তোলার প্রথম দিকে বাংলা ভাষার দাবিতে ধর্মঘট পালন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। সেই শুরু। এরপর দফায় দফায় মামলা দিয়ে দীর্ঘ সময় তাঁকে জেলের ভেতর রাখে পাকিস্তান সরকার। তাঁর আত্মীয়স্বজন সবাই যখন ওই অবস্থায় ভারতে চলে গেল, তখন তিনি একাই পড়ে রইলেন এ দেশে। স্বপ্নের দেশে থাকার সুফল স্বদেশ বোস ভোগ করতে পারলেন না। বরং ‘কমিউনিস্ট’ পরিচয়ের কারণে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পাওয়া সত্ত্বেও তাঁকে ভিসা দেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন কারাভোগ স্বদেশ বোসকে শারীরিকভাবে কাবু করেছিল, কিন্তু তাঁর প্রতিভাকে চাপিয়ে রাখতে পারেনি। যে কারণে পরবর্তী সময়ে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে এসে যোগদান করেন আগের কর্মস্থল পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসে (পিআইডিই)। শুধু বিপ্লবী জীবনের জন্য স্বদেশ বোস আলোর পথের যাত্রী নন, তাঁর পিএইচডি গবেষণাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বহু আগেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়া জাগানো শিক্ষার্থী কর্মজীবনেও রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর; কি দেশে, কি বিদেশে। চিরকাল সযতনে নিজেকে আড়াল করা এ মানুষটি ১৯৬৬ সালের ছয় দফার সঙ্গে নিজেকে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত করেন এবং অনেকের সঙ্গে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস (পিআইডিই) থেকে দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য তুলে ধরেন।
স্বদেশ বোস ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা সেলের একজন সদস্য ছিলেন। ছিলেন কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের সদস্য। শুধু তা-ই নয়, স্বদেশ বোস বুঝতে পেরেছিলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে একটি সমস্যা হবে খাদ্য সরবরাহ নিয়ে। তাই মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে বাংলাদেশে খাদ্য সরবরাহ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন।
ভারতে তাঁর আত্মীয়স্বজনের বড় অংশ চলে গেলেও স্বদেশ বোস কখনো এ দেশ ছেড়ে যাননি। অনেক চেষ্টা করেও তাঁর স্বজনেরা তাঁকে নিতে পারেনি ভারতে। নিজের ভাইয়ের সঙ্গে ২৫ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে দেখা হয়েছে স্বদেশ বোসের। কিন্তু দেশকে ভালোবেসে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে থেকে যান বাংলাদেশে।
শিক্ষায়, জীবনবোধে, ভালোবাসায় প্রথাগত বর্ণাঢ্য জীবনের বাইরে সমাজ পরিবর্তনে দায়বদ্ধ জীবন বলতে যা বোঝায়, তা-ই তৈরি করেছিলেন তিনি। তরুণ প্রজন্ম তাঁর সেই তারুণ্যের, জেল-জীবনের কিংবা সাম্যবাদের স্বপ্নে বিভোর হওয়া দিনগুলো দেখেনি। প্রথা ভেঙে, সমাজ ভেঙে, জীবন সাজানোর গল্প কেবল শোনা গেছে। তাঁর সম্পর্কে যিকঞ্চিত্ বইয়ে পড়া, বিভিন্ন জার্নালে তাঁর লেখার রেফারেন্স—সবকিছু মিলিয়ে এটুকুই সম্বল। শেষ বয়সে তাঁর উপস্থিতি ছিল একেবারে নির্বাক। সদা ফিটফাট, হাতে ঘড়ি, মাথার চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো স্বদেশ বোসকে দেখে বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো, তিনি কথা বলতে পারছেন না। অথচ অন্য সবাই তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন। তিনি হাসতেন, হাত উঁচিয়ে এটা-ওটা দেখাতেন, চোখ তুলে, চোখের ভাষায় খুশি ভাবটি প্রকাশ করতেন। শিশুদের মতো মাথা দুলিয়ে কোনো বিষয়ে তাঁর সম্মতি-অসম্মতি জানাতেন।
কিন্তু দিন দিন শরীর ভেঙে পড়ছিল। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার ফলে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হয়ে নির্বাক ছিলেন বহুদিন। প্রথমে লিখে, কম্পিউটারে মনের ভাব প্রকাশ করলেও পরবর্তী সময়ে সেটিও হয়ে পড়েছিল অসম্ভব তাঁর পক্ষে। কিন্তু দেখা হলেই রোগা কিন্তু হূদয়ের উষ্ণতামাখা হাত দুটো দিয়ে ধরে থাকতেন প্রিয়জনদের। সেই উষ্ণতার জন্য অনেকেই ছুটে হাজির হয়েছেন তাঁর বাসায়। দেখতে নয়, সঙ্গ দিতে। মানুষের সঙ্গ তিনি উপভোগ করতেন।
শেষবিদায়ের আগে স্বদেশ বোস তাঁর প্রিয় বরিশালে যেতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন বরিশালে তাঁর প্রিয়জনদের দেখতে। চল্লিশের দশকে রক্ত-সূত্রীয় প্রিয়জনদের সঙ্গে ভারতে না গিয়ে মনোরমা মাসিমা ও ঘনিষ্ঠজনদের ভালোবাসায় এ দেশে থেকে গেলেন, সেই তিনিই মৃত্যুর পরও মনোরমা বসুর ভালোবাসায়, আশ্রয়ে থাকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন। তাই তো তাঁর দেহভস্ম সমাধিস্থ হয়েছে বরিশালে মনোরমা বসুর সমাধির সঙ্গে। দেশপ্রেমিক স্বদেশ বোসের জন্মদিনে অভিবাদন।

বৈদেশিক মুদ্রার বড় রিজার্ভ: সুখের, তবে বোঝারও by আবু আহমেদ

আমাদের তহবিলে এখন ১০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা জমা আছে। বাংলাদেশ চাইলে এখন বিদেশ থেকে অনেক কিছু কিনতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে বিদেশি ঋণদাতাদের কাছ থেকে ধার-কর্জ করার প্রয়োজন পড়বে না। তবুও বাংলাদেশ সরকার ধার-কর্জ করার জন্য অতি পেরেশান। কিন্তু কেন?
সেই কেনর উত্তর হলো, বৈদেশিক মুদ্রা তো জমা আছে ব্যক্তিদের থেকে কেনার দরুন। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই তহবিলকে কিনে নিয়েছে। ব্যক্তি ও আমাদের রপ্তানিকারকেরা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে, তাদের থেকে বিনিময় হারে কিনে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমাদের অর্থনীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক হলো বৈদেশিক মুদ্রার একক ক্রেতা ও বিক্রেতা। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও এই মুদ্রা কিনতে পারে; তবে কেনার পর একটা পরিমাণ নিজের কাছে রাখতে পারে মাত্র। বাকিটা বিধি অনুযায়ী অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বাজারমূল্যে বেচতে হবে। কেনার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কিনে নিতে পারে।
বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয় বিদেশ থেকে পণ্য ও সেবা কিনতে। এ ছাড়া বৈদেশিক দেনা মেটানোর কাজেও এই মুদ্রার প্রয়োজন পড়ে। যেমন, বাংলাদেশ অতীতে বৈদেশিক মুদ্রায় যেসব ঋণ করেছে, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ওই সব ঋণ চুক্তি অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রায় ফেরত দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে যেহেতু ওই সব ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার, সেজন্য বাংলাদেশ সরকারকেই আমাদের বাজার থেকে বৈদেশিক মুদ্রা কিনে ওই ঋণ ফেরত দিতে হয়। সরকার নিজেও আমদানিকারক। যেমন, পেট্রোলিয়াম প্রডাক্টসের ক্ষেত্রে। তারপর লেটার অব ক্রেডিট বা আমদানির ঋণপত্র খুলতে হলে বৈদেশিক মুদ্রা বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কিনতে হবে। কেন বাংলাদেশ সরকার বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ চাইছে, সে প্রশ্নের উত্তর হলো, বাংলাদেশ সরকারের যে অর্থের অভাব, যে বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা আছে, সেই মুদ্রাকে বাংলাদেশ সরকার চাইলেই নিতে পারবে না। নিতে চাইলে তাকে দেশীয় মুদ্রা টাকায় কিনে নিতে হবে। আর এখানেই সমস্যা। সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে, ট্যাক্স আদায় করে, বন্ড বিক্রি করে যে অর্থ তুলছে, তার চেয়েও সরকারের ব্যয় অনেক বেশি। অর্থনীতির ভাষায়, আমরা এটাকে বলি ঘাটতি বাজেট। এ অবস্থায় সরকার যদি বৈদেশিক সূত্র থেকে ঋণ চায়, তাহলে সে তো অর্থটা পেল! যদিও সেই অর্থ ঋণ করে বৈদেশিক মুদ্রার অভাব ঘোচানোর প্রয়োজন নেই। সহজ কথায়, আজকের দিনে সরকার বিশ্ব ব্যাংক-এডিবি-আইএমএফ থেকে ঋণ করছে নিজের অর্থের অভাব মেটানোর জন্য। তবে এই ঋণেরও বোঝা আছে। সেদিন আমাকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকে ১০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা পড়ে আছে, সেখানে বাংলাদেশ সরকার কেন বাণিজ্যিক সুদে এডিবি থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নিচ্ছে? আমি তাঁকে ওপরের কথাগুলো বোঝাতে চাইলাম। আর সুদ সম্বন্ধে বললাম, ওতে কোনো অর্থনীতি নেই, বরং ক্ষতি।
বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে তার বৈদেশিক মুদ্রার তহবিলকে বিদেশি বাজারে খাটিয়ে দুই শতাংশের বেশি সুদ পাচ্ছে না, সেখানে আমাদের সরকার কেন পাঁচ শতাংশ সুদে বৈদেশিক মুদ্রায় বাইরে থেকে ঋণ নেবে? আসলে এ ক্ষেত্রে অর্থনীতির বিষয়টা কেউ দেখছে না। দেখলেও সরকার উপায় নেই বোধ করছে। সেই সাংবাদিক আমাকে এও বললেন, সরকারের অর্থের অভাব হলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ করলেই তো পারে। আমি উত্তর দিলাম, ঋণতো করছেই। বন্ড বেচে সরকার তো হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে। তবে ওই ক্ষেত্রেও সরকারকে উঁচু সুদ দিতে হচ্ছে। আট শতাংশ হারে।
বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার পক্ষে ওদের যুক্তি হলো, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার যদি ঠিক থাকে, তাহলে পাঁচ শতাংশ সুদ দিয়ে ডলারে বাইরে থেকে ঋণ নিলে তো ভালো। যুক্তি আছে বটে। তবে শঙ্কা হলো, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার যেমন ঠিক থাকবে না, আর ওই অর্থের ব্যবহারই বা সরকার কোথায় করবে? সরকারি খাতে লুটপাটের কথা তো আমরা সবাই জানি। সরকার ঋণ কিনে জাতিকে ঋণী করছে, অন্যদিকে সেই ঋণের সুবিধাভোগী সমাজের গুটিকতক লোক। এজন্যই আমাদের সবার উচিত, সরকারি ঋণের বিরোধিতা করা।
যা হোক, অন্য প্রসঙ্গে আসি। অর্থ ব্যবস্থাপনার মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনারও একটা ব্যাপার আছে বটে। অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রাকে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা করতে না পারে, তাহলে শুধুই অর্থ হারাবে। ধরে নিলাম, বাংলাদেশ ব্যাংক তার রিজার্ভে সিংহভাগ ডলার ও ডলারে উল্লিখিত সম্পদে রেখে দিল। এখন মার্কিন ডলারের মূল্য যদি ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক জিতবে, না হারবে? অবশ্যই হারবে। মার্কিন ডলারের মূল্য হারানোর বিষয়ে সন্দিহান হয়েই তো সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া তাদের রিজার্ভের একটা অংশ ব্যবহার করে স্বর্ণ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজকে যে স্বর্ণের মূল্য ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, এর মূল কারণ বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যাওয়া। প্রায় সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকই এখন ডলার নিয়ে বেকায়দায় আছে। তারা তাদের ধারণকে ইউরো ও স্বর্ণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অন্য পথ ছিল, বিদেশে প্রকৃত সম্পদ ধারণ করা। কিন্তু বাংলাদেশের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর পক্ষে আপাতত সেই পথ রুদ্ধ। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজে কোনো ব্যবসা করতে অভ্যস্ত নয় এবং বিধিতেও নিষেধ আছে। এই কাজটা করতে হয় ব্যক্তি খাতের মাধ্যমে। অর্থাত্ ব্যক্তি খাতের কাছে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা প্রাপ্য করে, ব্যক্তি খাতকেই স্বদেশে ও বিদেশে বিনিয়োগের জন্য উত্সাহ দিতে হয়। ঠিক এ কাজটিই এখন করছে চীন ও ভারত। ভারতীয় অনেক কোম্পানি যে বিদেশে এখন বিলিয়নস অব ডলারের সম্পদের মালিক হয়েছে, সেটা ভারত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা নেওয়ার কারণেই।
একপর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রার অত বড় হস্তান্তর আর দরকার হবে না। ওদের কোম্পানিগুলো বিদেশে আয় করে, বিদেশেই আয়কে বৈদেশিক মুদ্রায় ধারণ করতে পারবে। এভাবে বিদেশে সম্পদ কিনে লাখ লাখ ভারতীয় শেয়ার হোল্ডিংসের মাধ্যমে বিদেশি সম্পদের মালিক হয়েছে। যেসব দেশ বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহারকে উদারীকরণ করেছে, ওই সব দেশের জন্য বিশ্ব অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করা অনেক সহজ হয়েছে। ভারতীয় ব্যক্তি খাত এখন বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণও নিচ্ছে, যেটা আমাদের অর্থনীতিতে বিধিনিষেধের কারণে আজও অনেক সীমিত।
আমাদের অর্থনীতিতে বিনিয়োগকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধগুলো আরও শিথিল করতে হবে। আমাদের অর্থনীতিতে মুনাফার হার বেশি। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন কাঙ্ক্ষিত স্তরে বিনিয়োগ হচ্ছে না, তার অন্যতম কারণ এই যে আমাদের অর্থনীতি এখনো বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে ভালোভাবে যুক্ত হতে পারেনি। এই যুক্ত হওয়াটা একতরফা হওয়া উচিত নয়।
এখন বিদেশিরা এসে আমাদের ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়ে, আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করে আয়কে আবার বৈদেশিক মুদ্রায় বাইরে নিয়ে যেতে পারে। আমাদের বাংলাদেশিদের জন্য সেই সুযোগটা কি আছে? বৈদেশিক মুদ্রার শুধু মজুদ বাড়তে থাকলে এ মজুদের অপব্যবহার বাড়ারও আশঙ্কা আছে। দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করে অনেকে অর্থকে বাইরে নিতে চাইবে এ কারণে যে বৈদেশিক মুদ্রা তো অতি সহজলভ্য। তাই মুদ্রার ব্যবহারের বিষয়গুলো উদারীকরণের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতির ছিদ্রগুলোও আমাদের বন্ধ করতে হবে। শুধু বসে বসে বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল বড় করতে থাকলে সেটা মুদ্রাস্ফীতিও ঘটাতে পারে।
আবু আহমেদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আদিবাসীদের সম্পৃক্ত করা দরকার -শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন by ইলিরা দেওয়ান

প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে অনেক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে দেশের সব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শিশুদের জন্য নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের কথা বলা রয়েছে। এ ছাড়া আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ, আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। এমনকি পাঠ্যসূচি তৈরিতে আদিবাসী সমাজের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এসব প্রয়োজনীয়তার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করার ফলে বাংলাদেশের অনেক মানুষ আদিবাসীদের সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব লালন করে, যা আদিবাসীদের জন্য অসম্মানজনকও বটে। আমরা আশা করছি, এ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি সঠিকভাবে উপস্থাপন করে জনগণের মধ্যে আদিবাসী-সম্পর্কিত জ্ঞানের দীর্ঘদিনের বন্ধ্যত্ব দূর করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, ক্ষুদ্র জাতিসত্তাদের বর্ণিল ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সম্মিলন। তাই আদিবাসীদের সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন ও সংরক্ষণের জন্য সরকারকেই আন্তরিক হতে হবে।
পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক ১৯৯৮ সালের পার্বত্য জেলা পরিষদ সংশোধনী বিলের ৩৬ (ঠ) ধারায় ‘মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার’ বিষয়টি আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনিক কাজ বাদে প্রধান যে কাজটি এখনো অবাস্তবায়িত রয়েছে, তা হলো পাঠ্যবইয়ের পাঠ্যসূচি প্রণয়ন। বিশেষত, পার্বত্য এলাকার ভৌগোলিক, সামাজিক ও ভাষাগত দিক বিবেচনায় রেখে পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, পাঠদানের মাধ্যম নির্ধারণ ও একাডেমিক ক্যালেন্ডার তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এ কাজগুলো এখনো অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, যেহেতু বর্তমান প্রচলিত শিক্ষাকাঠামো পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক, তাই এ শিক্ষাকাঠামোর মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন ছাড়া পিছিয়ে পড়া আদিবাসী শিশুদের মূল স্রোতোধারায় আনা সম্ভব নয়। এ জন্য আদিবাসীদের মধ্যে স্থানীয় নেতৃত্ব এবং অভিজ্ঞ ও প্রবীণ শিক্ষাবিদ যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সেখানকার শিক্ষাকাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।
ভাষা হলো ভাব প্রকাশের প্রধানতম মাধ্যম। শিশুর মেধা বিকশিত করতে হলে প্রথমেই মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রেও আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারের কথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আদিবাসী শিশুরা এ অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে। শিক্ষার প্রথম পাঠ ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষাকেই তাদের ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে ভাষাগত দূরত্বের কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তযোগাযোগ গড়ে ওঠে না। এ কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আদিবাসী শিশুদের ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি। কাজেই আদিবাসী শিশুদের কাছে শিক্ষাকে সহজবোধ্য ও সর্বজনীন করে তুলতে হলে উল্লিখিত বিষয়গুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। তাই কোমলমতি এ শিশুদের কাছে শিক্ষাকে সহজতর করতে মাতৃভাষায় শিক্ষার পাশাপাশি আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকার স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং অন্য ভাষাভাষী শিক্ষকদেরও স্থানীয় ভাষার ওপর ওরিয়েন্টেশন কোর্সের ব্যবস্থা করা দরকার।
আদিবাসী শিশুদের শিক্ষালাভের আরেকটি প্রধান অন্তরায় হলো যোগাযোগব্যবস্থার প্রতিকূলতা। শিক্ষানীতিতে প্রস্তাবিত আবাসিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলে এ সংকটও দূর করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে প্রতি জেলায় পাহাড়ি ছেলেমেয়েদের জন্য দুটি করে আলাদা হোস্টেল চালু ছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এ হোস্টেলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে অনেক দরিদ্র মেধাবী ছেলেমেয়ের পড়ালেখা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। জেলা সদরে অবস্থিত এ হোস্টেলগুলো যদি সংস্কার করে আবার চালু করা হয় এবং প্রয়োজনে আরও নতুন আবাসন তৈরি করে দেওয়া যায়, তাহলে বহু দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী শিক্ষার সুযোগ পাবে।
মাতৃভাষায় আদিবাসী শিশুদের শিক্ষাদানের লক্ষ্যে এরই মধ্যে কিছু এনজিও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু এ কর্মসূচির ব্যাপকতা ও স্থায়িত্বের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আবশ্যক।
শুধু প্রাথমিক শিক্ষা নয়, উচ্চশিক্ষা এবং চাকরির ক্ষেত্রেও আদিবাসীদের সুযোগ বাড়ানো দরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (১৯৯৭) বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘উপজাতীয় কোটা’ সংক্রান্ত সরকারি একটি নীতিমালা গৃহীত হয়, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ও সংখ্যা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এ আসন বণ্টনব্যবস্থা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় না। এ ছাড়া পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ করা সব ক্যাডার ও নন-ক্যাডারভুক্ত চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের কথা বলা হলেও কোনো সময়ই তা কার্যকর হয়নি। ‘আদিবাসীদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে’ এ যুক্তি আর খাড়া না করে সব ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণ হচ্ছে কি না, সেদিকে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া দরকার।
আমরা চেয়েছি এমন একটি শিক্ষানীতি, যেটি টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সুষম শিক্ষাব্যবস্থার পথ সুগম করবে। বর্তমান শিক্ষানীতিটি ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে প্রণীত হলেও অন্যান্য কমিশন থেকে এটি যথেষ্ট উদার ও সুষমভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। তাই আমরা আশা করি, এ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর পাঠ্যসূচিতে আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করে স্বতন্ত্র কোর্স চালু করা হবে এবং আদিবাসীদের শিক্ষা নিশ্চিতকরণে অন্যান্য যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো দূর করার লক্ষ্যে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।
ইলিরা দেওয়ান: উন্নয়নকর্মী।
ilira.dewan@gmail.com

তথ্য কমিশনকে আমরা কেমন দেখতে চাই -তথ্য অধিকার by মুহাম্মদ লুত্ফুল হক

গত ২০০৯ সালের ১ জুলাই তথ্য অধিকার আইন কার্যকর হয়েছে। একই তারিখে তিন সদস্যবিশিষ্ট তথ্য কমিশনও গঠন করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলে, তথ্য অধিকার আইনের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে তথ্য কমিশনের ওপর। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম হবে না। অর্থাত্ নিরপেক্ষ, যোগ্য ও সত্ ব্যক্তিদের তথ্য কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিলে দেশবাসী এ আইনের সুফল পাবে, নইলে এটি কাগুজে বাঘে পরিণত হবে। তথ্য কমিশনার নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাই সর্বোচ্চ সতর্কতা ও যত্নশীলতা প্রয়োজন। আর এ ক্ষেত্রেই একটি শঙ্কা লক্ষ করা যাচ্ছে। গত ২৫ জুন প্রথম আলো তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ কর্তৃক ২১ ও ২২ জুন ২০০৯-এ অনুষ্ঠিত তথ্য অধিকার আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেন, তথ্য কমিশন গঠনের জন্য অনুসন্ধান কমিটি হয়েছে, তথ্য কমিশন গঠনের কাজও এগিয়ে চলেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তিন সদস্যবিশিষ্ট তথ্য কমিশন গঠিত হবে। সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এ জন্য যে, তথ্য কমিশন গঠনের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হচ্ছে এক ধরনের গোপনীয়তার মধ্যে এবং অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে সরকারের পক্ষ থেকে হয়তো রাজনৈতিক বিবেচনায় তথ্য কমিশনের সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হবে, যা কোনো মহলেই বাঞ্ছিত নয়। বিদেশি প্রতিনিধিরাও জোর দিয়ে বলেছেন, তথ্য কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া হওয়া উচিত অত্যন্ত স্বচ্ছ, খোলামেলা ও অংশগ্রহণভিত্তিক। নির্বাচিত কমিশনারেরা দলীয় আনুগত্যের বিচারে না যোগ্যতার কারণে নির্বাচিত হয়েছেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে বাছাই-প্রক্রিয়া এবং কমিশনারদের কিছু কিছু অতীত কার্যকলাপ যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্যের দিকে ইঙ্গিত বেশি দেয়।
তথ্য কমিশনার; বিশেষ করে, প্রধান তথ্য কমিশনার নিয়োগ স্বচ্ছ, খোলামেলা ও অংশগ্রহণভিত্তিক হওয়ার বিষয়ে ভারতের অভিজ্ঞতা আলোচনা করা যেতে পারে। খুব শিগগির ভারতের প্রধান তথ্য কমিশনার নিযুক্ত হবেন, এর জন্য ভারতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রবীণ সমাজসেবী আন্না হাজারে, অভিনেতা আমির খান, জি গ্রুপের মালিক সুভাষচন্দ্র, ইনফোসিসের প্রধান নারায়ণ মূর্তিসহ অনেকেই তাঁদের পছন্দের যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের জন্য জনমত সৃষ্টি করছেন, প্রধান তথ্য কমিশনার হিসেবে নাম আসছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা কিরণ বেদীসহ (বর্তমানে সমাজসেবী) বিখ্যাত সব ব্যক্তির। ভারতে তথ্য অধিকার নিয়ে কাজ করছেন এমন ব্যক্তি এবং সংস্থাও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, কংগ্রেসপ্রধান সোনিয়া গান্ধী প্রমুখকে চিঠি দিয়েছেন, যাতে প্রধান তথ্য কমিশনার নির্বাচনে রাজনীতিবিদ ও আমলারা হস্তক্ষেপ করতে না পারেন।
তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে তথ্য কমিশন গঠনের আইনগত সিদ্ধান্ত থাকলেও তা পাঁচ মাস বিলম্বে গঠিত হওয়ায় কমিশন তার কাজ শুরু করতেই পাঁচ মাস পিছিয়ে গেছে। তথ্য কমিশন যথাসময়ে গঠিত না হওয়ায় আইনের একটি দুর্বলতাও প্রকাশ পেয়েছে। অর্থাত্ সরকার না চাইলে বা বিপদে পড়লে ইচ্ছে করেই তথ্য কমিশনার নিয়োগ নাও করতে পারে। সে ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে, তাই আইনে শূন্যপদ পূরণে সময়ের আইনি ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকা প্রয়োজন ছিল।
বর্তমানে গঠিত তথ্য কমিশনের তিন সদস্যের দুজনই অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। অনেকে আশঙ্কা করছেন যে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর হলে সরকারি কার্যালয়ে দায়িত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। এমনকি ওই সব কার্যালয়ে প্রচলিত দুর্নীতি বাধাগ্রস্ত হবে। এর ফলে সরকারি কার্যালয়গুলো আইন বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। অথচ শুরুতেই এমন অনেক ঘটনা ঘটবে, যেখানে তথ্য কমিশনকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এ সময় তাঁরা এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারবেন কি না সন্দেহ। অন্তত একজন কমিশনার আমলাদের বাইরে গিয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, আইনবিদ, এনজিও কর্মকর্তা প্রমুখের মধ্য থেকে নিয়োগ করলে কমিশনে ভারসাম্য থাকত।
তথ্য অধিকার আইনের ধারা ১২ অনুযায়ী, তথ্য কমিশন সর্বোচ্চ তিনজন কমিশনার নিয়ে গঠিত, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের জন্য ভারতের প্রতিটি রাজ্যে ১০ জন করে কমিশনার আছেন, ভারতের কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনেও আছেন ১০ জন তথ্য কমিশনার। আমাদের দেশে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ যদি তথ্য অধিকার আইনের সুফল পাওয়া শুরু করে, তবে এ আইনের প্রয়োগ বাড়বে। ফলে তথ্য কমিশনের দায়িত্বও একই ধারায় বাড়তে থাকবে। তথ্য কমিশনে যেকোনো আবেদন সাধারণভাবে ৪৫ দিন এবং সর্বোচ্চ ৭৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও সে পরিস্থিতিতে তথ্য কমিশনারের স্বল্পতার কারণে আপিল আবেদনগুলো সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পড়ে থাকবে। তাই তথ্য কমিশনারের সংখ্যা তিন থেকে অন্তত পাঁচজনে বাড়ানো দরকার।
গত পাঁচ মাসে তথ্য কমিশনের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, তথ্য কমিশন এখনো গুছিয়ে উঠতে পারেনি। অর্থ, জনবল, স্থান ইত্যাদির অভাবে তারা বিশেষ কোনো কার্যকর ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারেনি। তথ্য কমিশনারদের কথায় বোঝা যায়, তথ্য কমিশনকে কার্যকর করতে বেশ কিছু মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা ও উদ্যোগ প্রয়োজন, অথচ প্রাপ্ত সহযোগিতার গতি প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত মন্থর। এর পরও অবশ্য বলতে হয় যে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তথ্য কমিশন যেসব জরুরি ও প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করতে পারত, তা তারা করতে পারেনি।
প্রধান তথ্য কমিশনারের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তাঁরা তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের জন্য স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। ইতিমধ্যে বিধি তৈরি করে তথ্য কমিশন তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন, খুব শিগগির তাঁরা প্রবিধান তৈরির কাজে হাত দেবেন। বিধি ও প্রবিধান প্রস্তুত এবং সরকারের অনুমোদন না হওয়ার কারণে তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তথ্য কমিশনারেরা বর্তমানে মাঠপর্যায়ে জনসংযোগ করছেন। তথ্য অধিকার আইনের বিষয়টি সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছেছে কি না, সেটি বোঝার জন্য তাঁরা জরিপ পরিচালনারও পরিকল্পনা করছেন।
তথ্য কমিশনের প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজেদের ও তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো এবং তাদের ষাণ্মাসিক স্বল্পকালীন পরিকল্পনা প্রকাশ করা। প্রধান তথ্য কমিশনার ও অন্য কমিশনারেরা এ বিষয়ে তথ্যমাধ্যমে বক্তৃতা, বিবৃতি ও বিজ্ঞাপন প্রকাশ করতে পারেন। তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নে তথ্যমাধ্যম বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। আশা করা যায়, এ কাজেও তারা তথ্য কমিশনকে সহযোগিতা করবে। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জনসংযোগ বা জরিপ করার চেয়ে এটি বেশি ফলপ্রসূ হবে বলে মনে হয়।
তথ্য অধিকার আইনের বিভিন্ন ধারা ব্যাখ্যা করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে তথ্য কমিশন এ বিষয়ে পুস্তিকা, লিফলেট, পোস্টার ইত্যাদি তৈরি করতে পারে এবং এ বিষয়ে এনজিওদের সহযোগিতা নিতে পারে। এ আইন প্রণয়নে তারাও বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের কাজে তারা সক্রিয়ভাবে সহযোগিতাও করছে। কিছু কিছু এনজিওর স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশিত পুস্তিকায় আবার দু-একটি বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তিরও সৃষ্টি হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে তথ্য কমিশনকে তত্পর হতে হবে।
তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে তথ্য বা দলিল সংরক্ষণ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। বাংলাদেশে দলিল সংরক্ষণের ব্যাপারে কিছু নির্দেশ থাকলেও প্রয়োজনীয় আইন নেই। তথ্য কমিশনকে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে তথ্য বা দলিলের অভাবে আইনটির বাস্তবায়ন পদে পদে বিঘ্নিত হবে।
আইনটির ৭ ধারার শেষাংশে উল্লেখ করা হয়েছে, যে তথ্য প্রকাশে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তেমন বিষয়ে আবেদন পেলে তথ্য কমিশন তা অনুমতি সাপেক্ষে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। এমন বিষয়ের তালিকা অত্যন্ত দীর্ঘ। ফলে এ কাজেই কর্তৃপক্ষকে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হবে। বাস্তবতার নিরিখে এ দায়িত্বটি আপিল কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারে রাখা যেতে পারে।
তথ্য কমিশন আইনটির ২৯ ধারার এমন একটি মৌখিক ব্যাখ্যা দিয়েছে যে তথ্য প্রদান বিষয়ে তাদের কোনো রায়ের বৈধতা নিয়ে আদালতে মামলা করা যাবে না। এ ব্যাখ্যা যে আইনটির অন্তর্নিহিত নৈতিকতা ও অভিপ্রায়ের পরিপন্থী, আইন বিশেষজ্ঞরাও সে বিষয়ে একমত।
দুর্নীতি সংক্রামক ব্যাধির মতো দেশের নানা স্তরে ভয়ংকরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তথ্য অধিকার আইন সে অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একটি সুযোগ আমাদের হাতের নাগালে এনে দিয়েছে। এ সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার যাতে আমরা করতে পারি, তার উদ্যোগ নাগরিক সমাজ থেকে আমাদেরই নিতে হবে।
মুহাম্মদ লুত্ফুল হক: গবেষক, লেখক।
lutful55@gmail.com

দুষ্টের দমনে কোনো শিথিলতা নয় -শিক্ষককে প্রহার

ঔদ্ধত্য ও ক্ষমতার দম্ভ লাগামছাড়া হলে কী ঘটে, সেটাই ঘটিয়ে দেখালেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা এমদাদ হোসেন। তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক শিক্ষককে পিটিয়ে আহত করে সন্ত্রাসের ‘অপূর্ব’ দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস-আশ্রিত ছাত্রসংগঠনের সদস্যদের হাতে এ ধরনের ঘটনা আগেও যে ঘটেনি, তা নয় এবং প্রতিবারই এ রকম ঘটনায় বিদ্যা, মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতা মুখ থুবড়ে পড়ে। আমরা এ ঘটনার নিন্দা জানাই এবং দোষী ছাত্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করি।
কাছাকাছি ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি)। সেখানেও ছাত্রলীগ তাদের বিভিন্ন দাবি আদায়ের কৌশল হিসেবে পর পর দুই দিন প্রশাসন ভবনে তালা দিয়ে ২০০ শিক্ষক-কর্মচারীকে অবরুদ্ধ করে রাখে। তাদের দাবি হলো: ২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ‘অবৈধ নিয়োগ’ পাওয়া ব্যক্তিদের নিয়োগ বাতিল, শূন্য পদে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগদান এবং ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান। দাবিগুলোর যৌক্তিকতা থাকতে পারে, কিন্তু এগুলো এমন জীবন-মরণ প্রশ্ন নয়, যার জন্য প্রশাসন ভবনে তালা দিয়ে ২০০ শিক্ষক-কর্মচারীকে অবরোধ করে রাখতে হবে। এ রকম অনিয়মতান্ত্রিক পন্থা অধিকার আদায়ের পথ নয়।
দুটি ঘটনা একটি জিনিসেরই প্রমাণ দেয়, সেটা হলো—ক্ষমতার দাপটে ধরাকে সরা জ্ঞান করা। বলা বাহুল্য, এই ক্ষমতা পেশিশক্তির উন্মত্ত প্রকাশ ছাড়া কিছু নয়। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন তাদের প্রশ্রয় দিয়ে থাকে, আবার রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাও এদের বেয়াড়াপনাকে নিরুত্সাহিত করেন না।
ছাত্রের স্থান শিক্ষাঙ্গন, কিন্তু যে ছাত্র তার শিক্ষককে প্রহার করে, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। ইতিমধ্যে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে এবং সরকার-সমর্থক ছাত্রসংগঠনটিও তাকে বহিষ্কার করেছে বলে পত্রিকায় খবর বের হয়েছে। এই তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থার পর ওই ছাত্রের গুরুতর অপরাধ যাতে লঘু করে না দেখা হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। একইভাবে যারা ক্ষমতার দর্পে শিক্ষাঙ্গনে যা খুশি তা করার প্রবণতার চর্চা করে, তাদের ছাত্র না বলাই শ্রেয়।
আমরা শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনার নিন্দা জানাই, কিন্তু যাদের দায়িত্ব এসব বন্ধ করার এবং দোষীদের শাস্তি দেওয়ার, সেই সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় দুটির কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান—দুষ্টের দমনে শিথিলতা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই।

সরকার উদার হোক, মূল কারণ শনাক্ত করুক -বিরোধী দলের সংসদে ফেরা

নতুন বছরের শুরুতে ৪ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন বসছে। অথচ বিরোধী দলের এতে অংশ নেওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। এমনকি নৈতিক অর্থে বিরোধীদলীয় নেত্রীর সাংসদ পদ খারিজ হয়ে ইতিমধ্যেই ১৭ দিন অতিক্রান্ত হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। কারণ, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বলা আছে, টানা ৩০ দিন সংসদ বর্জন করলে সদস্যপদ খারিজের পক্ষে আইন করবে তারা। দেশে সংসদীয় সংস্কৃতি গড়ে না ওঠার কারণে বিএনপিকে অবশ্য এ জন্য সমালোচনারও মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। ভ্রান্তি এমনই, বিরোধী দলে থাকলে আর আইন করার দায় বর্তায় না। অথচ বেসরকারি সদস্য বিল হিসেবে এ রকম জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিল আনার অনুশীলনই সংসদীয় গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে, বিএনপির প্রতিশ্রুতি ও নিজ দলের বিবেচনায়ও ওই ধরনের সংশোধনী আনতে পারে সরকারি দল। তারা এ যুক্তি মুখেও আনছে না। কারণ, তাহলে তাদের ওপর আইন করার নৈতিক দায়িত্ব বর্তায়। এটা তারা হয়তো করবে না, কিন্তু তাদের তা করা উচিত। এ রকম আইন বাঞ্ছনীয়।
সামনের সারিতে আসন, বেগম খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা জোরদার, তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বাড়িতে প্রবেশ করতে না দেওয়ার মতো বিষয়ে লাগাতার সংসদ বয়কট একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ এসব বিষয় সুরাহা করলেই বিএনপি সংসদে ফিরবে বলে ধারণা মিলছে। টিপাইমুখ বাঁধ, এশিয়ান হাইওয়ে, জনপ্রশাসন দলীয়করণ ইত্যাদি ইস্যুতে কথা বলা, যথাযথ ভূমিকা রাখার চেষ্টা একান্তভাবে সংসদেই সাজে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বিরোধী দল সংসদ বয়কট করে এসব নিয়ে সংসদে কথা বলার অধিকার চাইছে। এই স্ববিরোধিতা ও আত্মঘাতী অনুশীলনে বাংলাদেশের রাজনীতি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তবে স্পিকারের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় একটি আসন বৃদ্ধি, খালেদা জিয়ার বাড়িতে যাতায়াতে কড়াকড়ি শিথিল ও তাঁর নিরাপত্তা জোরদার—এই তিন দাবি পূরণকে বিএনপি আপাতত গুরুত্ব দিচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আমরা মনে করি, এটা ন্যূনতম দাবি এবং সরকারি দলের তা পূরণ করা উচিত। বিরোধী দলকে সংসদে ফেরাতে সরকারি দলকে অবশ্যই আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে। যদিও আমরা জানি যে বিরোধী দল একবার ফিরলেই তারা সংসদের অবশিষ্ট মেয়াদে সংসদেই থাকবে, তা নিশ্চিত নয়। কিংবা সরকারি দলের আচরণ সুশীল থাকবে, তাও ধরে নেওয়া যায় না।
১৯৯১ সালের পরের নির্বাচিত সংসদগুলো আইন প্রণয়ন এবং আলাপ-আলোচনা করে নীতি প্রণয়নের যে ধারা তৈরি করেছে তা এককথায় সমৃদ্ধ নয়, বরং দীনতায় আকীর্ণ। সংসদ বয়কট, কোরাম-সংকট, মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে স্বয়ং স্পিকারের কটাক্ষ প্রভৃতি ঘটনা প্রমাণ দেয়, যে সংসদকে আমরা চলমান দেখছি তা আসলে নিষ্প্রাণ, অনেক ক্ষেত্রে অন্তঃসারশূন্য। সাংসদ মানেই সংশ্লিষ্ট আসনের সবচেয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন রাজনীতিকের উপস্থিতি নয়। দুই দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র শক্তিশালী করার তোড়জোড় নেই। যে পরিবর্তনের আশায় নির্বাচনী আইনে দলগুলোর নির্বাচিত কাউন্সিল আমরা আশা করেছিলাম, তা অকার্যকর রয়ে গেছে। তাই আগামী নির্বাচনেও যে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিরা মনোনয়ন পাবেন, তা নিশ্চিত নয়। মূল সংকট মনোনয়ন-প্রক্রিয়ায়। দলে নেতা যোগ্য আসন পেলে সংসদে আসনসংকট তৈরি হবে না। ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধনীর প্রশ্নটি যতটা না সংসদের জন্য, তার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলের জন্য। দলের গণতন্ত্রায়ণ আগে, পরে সংসদ। আমরা আপাতত আশা করব, সরকার বিরোধী দলের ওই তিনটি দাবি পূরণের নির্দিষ্ট ঘোষণা দেবে। আর সংসদ জাতীয় জীবনে কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে সংসদেই একটি সাধারণ আলোচনায় সরকারি দল উদ্যোগী হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতার সম্পর্ক অবসানের আহ্বান পিয়ংইয়ংয়ের

উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতার সম্পর্ক অবসানের আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে তারা। সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়কে ক্ষুব্ধ করার সাত মাস পর পিয়ংইয়ং গতকাল শুক্রবার এ আহ্বান জানাল। রাষ্ট্রীয় পত্রপত্রিকায় নববর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত এক যৌথ সম্পাদকীয়তে এ কথা বলা হয়।
এতে বলা হয়, কোরীয় অঞ্চল ও বাকি এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের অবসান। কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) জানায়, সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়া সব সময়ই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করা এবং ওই এলাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে রয়েছে।
গত এপ্রিল মাসে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর উত্তর কোরিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক মহল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর পরই দেশটি পরমাণু কর্মসূচি-বিষয়ক ছয় জাতি আলোচনা বর্জন করে আসছে।
গত মাসে মার্কিন দূত স্টিফেন বসওয়ার্থ উত্তর কোরিয়া সফর করেন এবং তখন দুই পক্ষ ছয় জাতি আলোচনা পুনরায় শুরুর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সম্মত হয়। দুই কোরিয়া, জাপান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—এ ছয়টি দেশ পিয়ংইয়ংকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে আসছিল।

অমর্ত্য সেনের পরামর্শ নিলেন বুদ্ধদেব

নতুন বছর শুরুর আগের দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের কাছ থেকে পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক উন্নয়নের বিষয়ে পরামর্শ নিলেন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের নানা সমস্যা নিয়ে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে কথা বলেন এবং এসব সমস্যা থেকে উত্তরণেরও পথ খুঁজে নেন তাঁর কাছ থেকে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতার অভিজাত হোটেল তাজ বেঙ্গলে গিয়ে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে দেখা করেন বুদ্ধদেব। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে মুখ্যমন্ত্রী একান্তে কথা বলেন নোবেলজয়ীর সঙ্গে। আলাপচারিতায় উঠে আসে পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন এবং নানা সমস্যার কথা। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে গ্রামোন্নয়ন, তফসিলি জাতি, উপজাতি, আদিবাসী এবং বিশেষ করে মুসলিম সম্প্র্রদায়ের উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। এ সময় অমর্ত্য সেন এ লক্ষ্যে বেশ কিছু পরামর্শ দেন মুখ্যমন্ত্রীকে।
আলোচনা শেষে অমর্ত্য সেন সাংবাদিকদের জানান, এ রাজ্যে প্রাথমিক শিক্ষার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন আরও কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। অমর্ত্য সেন শিশুদের পাঠ্যক্রমের বোঝা আরও কমানোর পরামর্শ দেন।
বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি রাজ্যের উন্নয়নের জন্য অমর্ত্য সেনের কাছ থেকে বেশ কিছু পরামর্শ নিয়েছি। শিল্প ও গ্রামীণ উন্নয়নে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, সে সম্পর্কেও অবহিত করেছি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদকে। তিনি এ ব্যাপারেও পরামর্শ দিয়েছেন।’

ধর্মঘটে অচল করাচি

আশুরার শোভাযাত্রায় আত্মঘাতী হামলায় ৪৩ জন নিহতের ঘটনার প্রতিবাদে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের ডাকা ধর্মঘটে গতকাল শুক্রবার অচল হয়ে পড়ে পাকিস্তানের বন্দরনগর করাচি। জনশূন্য হয়ে পড়ে রাস্তাঘাট, বন্ধ হয়ে যায় স্টক এক্সচেঞ্জ, দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য।
সোমবার আশুরার দিন শিয়া মুসলিমদের শোভাযাত্রায় আত্মঘাতী হামলার দায় বুধবার স্বীকার করেছে তালেবান।
করাচিতে বোমা হামলার পর গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার সময় পুলিশ ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। সুন্নি পণ্ডিত মুফতি মুনিবুর রেহমান এ হামলার জন্য পাকিস্তান কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই হামলায় যারা নিহত হয়েছে কেবল তারাই নয়, যারা জীবিকা খুইয়েছে সরকার তাদের জন্যও ক্ষতিপূরণ দিক। এ কারণেই সর্বাত্মক ধর্মঘট ডাকা হয়েছে।’
এদিকে স্থানীয় অধিবাসীরা নতুন হামলার ভয়ে আছে। দোকানিরা দোকানপাট খোলার ঝুঁকি নিচ্ছে না। রয়টার্স অনলাইন।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: গোলযোগপূর্ণ উপজাতীয় এলাকায় বৃহস্পতিবার ও গতকাল শুক্রবার ভোরে মার্কিন চালকবিহীন বিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। ওই হামলায় কমপক্ষে চার জঙ্গি নিহত হয়েছে।
আফগান সীমান্তবর্তী উত্তর ওয়াজিরিস্তান উপজাতীয় এলাকার প্রধান শহর মিরানশাহের ২৫ কিলোমিটার পূর্বে মাচিখেল গ্রামে ওই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।

পাকিস্তানে ভলিবল মাঠে আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলা, নিহত ৭০

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের বান্নু জেলার শাহ হাসান খান গ্রামে গতকাল শুক্রবার একটি খেলার মাঠে আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলায় অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছে। ওই মাঠে ভলিবল ম্যাচ চলাকালে উপচে পড়া দর্শকদের মধ্যে এ হামলা চালানো হয়। এতে ১০০ জনেরও বেশি আহত হয়। খবর এএফপি ও বিবিসির।
বান্নু জেলার পুলিশপ্রধান আইয়ুব খান জানান, জেলার লাক্কি মারওয়াত শহর থেকে ১৮ মাইল দক্ষিণে শাহ হাসান খান গ্রামের একটি মাঠে গতকাল ভলিবল খেলা চলছিল। খেলা দেখতে সেখানে আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ জড়ো হয়।
খেলা জমে ওঠার একপর্যায়ে আত্মঘাতী হামলাকারী বিস্ফোরকভর্তি একটি গাড়ি নিয়ে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে ৭০ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আধাসামরিক বাহিনীর চারজন সদস্যও রয়েছেন। ঘটনাস্থলে উদ্ধার তত্পরতা চলছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পুলিশের মুখপাত্র শাহিদ হামেদ জানান, হামলাকারী ওই গাড়িটিতে ৩০০ কেজিরও বেশি বিস্ফোরক ব্যবহার করেছে বলে পুলিশ ধারণা করছে। শক্তিশালী বিস্ফোরণে মাঠের পাশের ২০টিরও বেশি বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। বাড়িগুলো থেকে আহত নারী ও শিশুদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
লাক্কি মারওয়াত সরকারি হাসপাতালের চিকিত্সক উসমান আলী জানান, হতাহত ব্যক্তিদের এখনো হাসপাতালে আনা হচ্ছে। তবে চিকিত্সাধীন ১৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
এই হামলার দায়িত্ব কেউ স্বীকার করেনি। কর্মকর্তারা জানান, ওই এলাকাটি জঙ্গিদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। সম্প্রতি সেখান থেকে জঙ্গিদের তাড়িয়ে দিয়ে এলাকার নিয়ন্ত্রণ স্থানীয়ভাবে গঠিত সরকার-সমর্থক মিলিশিয়াদের হাতে দেওয়া হয়। এরই প্রতিশোধ নিতে এ আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে তোপের মুখে ওবামা প্রশাসন by ইব্রাহীম চৌধুরী

সন্ত্রাসীদের হাত থেকে দেশকে নিরাপদ রাখা নিয়ে আবারও বিতর্ক শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। গত সপ্তাহে যাত্রীবাহী মার্কিন বিমান উড়িয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টার পর এ বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। খোদ প্রেডিডেন্ট বারাক ওবামা নিরাপত্তাব্যবস্থায় পদ্ধতিগত ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেছেন। তোপের মুখে পড়েছেন হোমল্যান্ড সিকিউরিটির প্রধান জেনেথ নেপোলিটেনো। জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে ওবামা প্রশাসনের ওপর রক্ষণশীলদের আক্রমণও তীব্র হয়ে উঠেছে।
জননিরাপত্তা বিষয়ে রক্ষণশীলদের প্রচলিত বিতর্কের অসারতা নিয়ে তথ্যবহুল একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায়। সেন্টার ফর ন্যাশনাল পলিসি নামের সংগঠনের প্রেসিডেন্ট স্টিফেন ফ্লিন জননিরাপত্তা-বিষয়ক প্রচলিত বিতর্কের যুক্তি তুলে ধরেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসী হামলায় মার্কিন নাগরিকদের মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি—এমন ধারণা অমূলক।
জর্জ বুশের সময় ব্যাপকভাবে বলা হতো, জঙ্গিদের উত্সমূলে আক্রমণ করতে হবে। আগাম আক্রমণে জঙ্গিগোষ্ঠী পালিয়ে বাঁচতে চাইবে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে হামলা চালানোর অবকাশ পাবে না। সন্ত্রাস মোকাবিলায় জর্জ বুশের এই আক্রমণাত্মক নীতিও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান এমনকি ইয়েমেনে জঙ্গি-উত্স এলাকায় হামলা চালিয়েও জঙ্গিদের থামানো যায়নি।
জাতীয় নিরাপত্তার নামে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার কথা বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। এতে সীমান্তে নিরাপত্তার নামে অবৈধ অভিবাসীদের ওপরই আইনের খড়্গ নেমে এসেছে। কানাডা কিংবা মেক্সিকো হয়ে অভিবাসনের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ক্রমে দুরূহ হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডা ও মেক্সিকোর ১২ হাজার মাইলেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্তে কার্যত কোনো সন্ত্রাসী জঙ্গি হামলার ঘটনাই ঘটেনি। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জঙ্গিবাদের উত্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফোর্টহুড সেনাঘাঁটিতে মার্কিন মেজর নিদালের গুলিবর্ষণের ঘটনা ছাড়াও অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বেশ কিছু জঙ্গি হামলার পরিকল্পনার খবর জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সীমান্তনিরাপত্তা জোরদারের মাধ্যমেই জঙ্গি হামলা প্রতিরোধ নিশ্চিত হবে, এমন যুক্তিও তেমন প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে না।
জঙ্গি হামলা মোকাবিলা ও প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি খাতে মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিসহায়ক হলেও অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা সমস্যার সৃষ্টি করছে। ডেট্রয়েটের আকাশে বিমান উড়িয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টার পর যুক্তরাষ্ট্রের সব বিমানবন্দরে এক্স-রে মেশিন বসানোর কথা উঠেছে। পুরো শরীরের এক্স-রে তল্লাশির পরই যাত্রীরা বিমানে ওঠার অনুমতি পাবেন। এতে নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও শারীরিক গোপনীয়তা বলতে আর কিছু থাকবে না। প্রযুক্তিকে পাশ কাটিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর চেষ্টা করবে আত্মঘাতী সন্ত্রাসীরা।
ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিজ্ঞ পেশাদারির বিকল্প হিসেবে প্রযুক্তিকে সমান কার্যকর মনে করার কোনো কারণ নেই।
স্টিফেন ফ্লিন তাঁর প্রতিবেদনে বলেছেন, সরকারি লোকজন নয়, সাধারণ জনগণই জঙ্গি হামলা মোকাবিলায় বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করেছিল সাধারণ মার্কিন বিমানযাত্রীরা। হোয়াইট হাউস অভিমুখে হামলার জন্য যাওয়া বিমানটি সাহসী যাত্রীদের প্রতিরোধে পেনসিলভানিয়ায় ধসে পড়ে। এমনকি বড়দিনে ডেট্রয়েটের আকাশে বিমান উড়িয়ে দেওয়ার জঙ্গি অভিযানটিও ব্যর্থ হয় সাধারণ যাত্রীদের প্রতিরোধের কারণেই।
নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে ওবামা প্রশাসনের সমালোচনায় আক্রমণাত্মক এখন রক্ষণশীল মহলগুলো। নির্বাচনের আগে থেকেই ওবামাকে জননিরাপত্তা বিষয়ে অনভিজ্ঞ হিসেবে চিত্রায়িত করার প্রয়াস ছিল রিপাবলিকান সদস্যদের। চলমান ঘটনাগুলো তাঁদের পুরোনো উদ্যোগকেই যেন উসকে দিয়েছে। পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্যবিনিময় ও সমন্বয় নিয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রধানদের সঙ্গে আগামী মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে বৈঠকে বসছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

স্পর্শের বাইরে স্পফোর্থ

১৩০ বছর আগে ঠিক আজকের দিনটিতেই এমন এক কীর্তি গড়েছিলেন ফ্রেডেরিক স্পফোর্থ, এর পর যেটি ৩৬ বার দেখেছে টেস্ট ক্রিকেট। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেলবোর্নে টানা তিন বলে নিয়েছিলেন তিন উইকেট। স্পফোর্থের মতোই দুই অস্ট্রেলিয়ান হিউ ট্রাম্বল ও জিমি ম্যাথুজ এবং পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরাম অবশ্য ছাড়িয়ে গেছেন স্পফোর্থকে। তিনজনই করেছেন দুটো করে হ্যাটট্রিক। অফ স্পিনার ট্রাম্বলের কীর্তিটি তো আরও অবিশ্বাস্য, এক টেস্টে এবং একই দিনে করেছিলেন হ্যাটট্রিক দুটি। ভারতের ইরফান পাঠান পাকিস্তানের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ম্যাচের প্রথম ওভারেই, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শ্রীলঙ্কার নুয়ান জয়সা ম্যাচের দ্বিতীয় ওভার আর নিজের প্রথম তিন বলে। তবে এঁদের সবার কীর্তিই ছোঁয়া বা ভাঙা সম্ভব। কিন্তু একটা জায়গায় সবাইকে ছাড়িয়ে সেই স্পফোর্থ। টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম হ্যাটট্রিক—এই রেকর্ড তো তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবেন না আর কেউ!

বছরের শুরুতে প্রত্যয়ী নন নাদাল

নতুন বছরটা কেমন যাবে রাফায়েল নাদালের?
উত্তরটা সময়ের হাতে। তবে বছরের শুরুতে নিজেকে খুব একটা প্রত্যয়ী মনে হচ্ছে না স্পেনের টেনিস তারকাকে। ‘যে অবস্থায় গত বছরটা শুরু করেছিলাম, এবার তার চেয়ে একটু খারাপ অবস্থায়ই আছি বলে মনে করি আমি’—স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক এসএ-কে বলেছেন নাদাল।
স্বীকার করেছেন প্রস্তুতিতে একটু ঘাটতি আছে, তবে এটি তাঁর জয়ের ক্ষুধাকে প্রভাবিত করার মতো নয়। নাদালের ভাষায়, ‘ফলাফল যা হয় হবে, তবে আমি তো চাইব সবগুলো টুর্নামেন্টই জিততে। সব টুর্নামেন্টেই সেরাটা খেলার চেষ্টা থাকবে আমার।’
দারুণ একটা সম্ভাবনা নিয়েই গত বছরটা শুরু করেছিলেন নাদাল। আগের বছর ফ্রেঞ্চ ওপেনে নিজের আধিপত্য ধরে রেখে উইম্বলডনে রাজ্যছাড়া করেছিলেন রজার ফেদেরারকে। ২০০৯-এ অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জয়ের পর সবাই যখন ধরেই নিয়েছিলেন নাদালের আধিপত্যই দেখা যাবে টেনিসে, তখনই ছন্দপতনের শুরু। আর একটিও গ্র্যান্ড স্লাম জিততে পারেননি। এর পেছনে ইনজুরিরও রয়েছে বড় ভূমিকা। হাঁটু আর পেটের পীড়ায় ভুগেছেন তিনি। মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে তিন মাস থেকেছেন টেনিস সার্কিটের বাইরে। গত বছর তাঁর পাঁচটি শিরোপার শেষেরটি এসেছিল এপ্রিলে। এর পরই তো ইনজুরির থাবা। কোর্টে ফিরে এলেও নিজের ছায়া হয়েই থেকেছেন নাদাল। লন্ডনে বছর শেষের এটিপি টুর্নামেন্টে হেরেছেন টানা তিন ম্যাচে। তবে এসব তাঁর ২০১০ টেনিস পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করবে না বলেই বিশ্বাস নাদালের।

অধরা পদকের আশায় ব্যাডমিন্টন-বাস্কেটবল

দক্ষিণ এশীয় গেমসে (এসএ) এই প্রথম ব্যাডমিন্টনে খেলবে মেয়েদের দলটি। ধানমন্ডি সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সের ক্যাম্পে থাকা কণিকা, এলিনা, শাপলা, দুলালীদের মধ্যে তাই আনন্দ। মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজের ডরমিটরিতে থাকা পরশ, রইচ, তুষার, এনায়েতরাও প্রস্তুত। দুই দলেরই লক্ষ্য একটাই—পদক জিততে হবে।
মজার ব্যাপার হলো, মাত্র তিন দিনের ক্যাম্প করেও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন মেয়েদের কেউ কেউ। আবার ১০-১২ দিনের ক্যাম্পও করেছেন রোজিনা-শাপলারা। তবে এমন লম্বা সময় ধরে ক্যাম্পে থাকার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। সেই মার্চে শুরু হওয়া ক্যাম্প এখনো চলছে।
এত দিন ধরে ক্যাম্প চললেও ব্যাডমিন্টনে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বলতে বড়জোর রুপা। সোনার আশা তারা করছেও না। কিন্তু রুপা জিততে হলেও ভারত বা পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলকে হারাতে হবে। এ জন্য প্রতিদিন দুবেলা জোর অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন। মালয়েশিয়ান কোচ আলভিন সিও বয়সে একেবারেই তরুণ। মাত্র ২৮ বছর বয়সী এই কোচ পরম যত্নে হাতে ধরে শেখাচ্ছেন ছেলেমেয়েদের। কখনো কখনো নিজেও খেলতে নেমে যান শিষ্যদের সঙ্গে। এমন কোচকে পেয়ে দারুণ খুশি ওরা।
এর আগে এসএ গেমসে দুবার অংশ নিলেও কোনো পদকই আসেনি ব্যাডমিন্টনে। তবে এবার যেহেতু দেশের মাটিতে খেলা এবং অনেক আগে থেকেই অনুশীলন শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে বাড়তি পাওয়া বিদেশি কোচ। রুপার জন্যই লড়াই করবেন দেশের শীর্ষ খেলোয়াড় পরশ, ‘আমাদের প্রস্তুতি ভালোই হচ্ছে। অবশ্যই আমাদের সোনার জন্য লড়াই করা উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভারত আমাদের চেয়ে অনেক ভালো দল। তবে আমরা আশা করছি অন্তত একটা পদক পাবই এবার। সেটা রুপাও হতে পারে।’ কোচের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তিনি, ‘কোচ খুবই আন্তরিক। আমরা ওনার কাছ থেকে যে টেকনিকগুলো শিখছি সেটা কাজে দেবে আমাদের। আমাদের ফিজিক্যাল ট্রেনিংটাও ভালো হচ্ছে। তা ছাড়া অনেক লম্বা সময় ধরে ক্যাম্প করছি, এটাও আমাদের জন্য বিরাট পাওয়া।’ ব্যাডমিন্টন দল গত ১৪ ডিসেম্বর উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য মালয়েশিয়া গিয়েছিল। সেখানে তারা বেশ কয়েকটি প্রস্তুতি ম্যাচও খেলে এসেছে। ফিরেছে গত ২২ ডিসেম্বর। ওখানকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে বলেই মনে করেন তিনি, ‘মালয়েশিয়াতে ওদের জাতীয় দলের সঙ্গে খেলিনি। তবে দ্বিতীয় সারির যে দলের সঙ্গে খেলেছি সেটাও কম শক্তিশালী ছিল না। ওদের সঙ্গেও ভালো খেলেছি।’ ব্যাডমিন্টনে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলগত সাফল্যের দিকেই বেশি নজর তাদের। দলের একেবারেই তরুণ খেলোয়াড় তুষার বললেন সেটাই, ‘ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের চেয়ে আমরা এখন দলগত সাফল্যের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছি।’ ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের দলেও একই লক্ষ্য। দুবারের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন শাপলারও ভাবনা তেমনই, ‘যেভাবে আমরা প্র্যাকটিস করে যাচ্ছি তাতে আমরা সবাই আশাবাদী।’
ব্যাডমিন্টনের মতো একই সমীকরণে দাঁড়িয়ে বাস্কেটবলও। চতুর্থবারের মতো দক্ষিণ এশীয় গেমসে খেলবে তারা। যদিও এর আগে কোনো পদকই পায়নি বাস্কেটবল। তবে এবার দেশের মাটিতে অন্তত একটা পদক জেতার আশা করছেন জাতীয় দলের অধিনায়ক রাশেদ, ‘আমাদের লক্ষ্য অবশ্যই একটা পদক জেতা। যদিও ভারতের মতো দলকে হারানো আমাদের পক্ষে সম্ভব না। তবে অন্তুত একটা পদক জিতবই।’ ক্যাম্প শুরুর পর গত সপ্তাহে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিল বাস্কেটবল দল। সেখানে ক্লাব পর্যায়ের দলগুলোর সঙ্গে খেলেছে তারা। এর বাইরে আর কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে পারেনি। তবে কোচ ওয়াসিফ এবং সাধারণ সম্পাদক এ কে সরকারের তত্ত্বাবধানে ভালোই প্রস্তুতি চলছে। সকাল-সন্ধ্যা দুবেলা অনুশীলন করছেন ধানমন্ডি বাস্কেটবল জিমনেসিয়ামে। দলের সবচেয়ে ভালো শ্যুটার মিঠুন, মিঠু ও রাশেদ। এঁদের দিকেই এখন তাকিয়ে কোচ। এঁরা ভালো করলে হয়তো অধরা পদকটা এবার হাতে এসে যেতে পারে।

আলজেরিয়ার পাশে জিদান

নিজের শেকড়কে কী করে ভুলে যাবেন? জিনেদিন জিদানের হূদয়ের বড় অংশ ফ্রান্সের জন্য বরাদ্দ হতে পারে, কিন্তু একটা অংশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া আলজেরিয়ার কাছেও। এই আলজেরিয়াতেই জন্ম তাঁর বাবা ইসমাইল আর মা মালিকার। ১৯৫৩ সালে ইসমাইল-মালিকা দেশ ছেড়ে ফ্রান্সে এতে বসত গড়েন। মার্শেইয়ে জন্ম নেন জিদান। নাড়ি তাঁর ফ্রান্সেই পোঁতা। কিন্তু আলজেরিয়ার জন্য মন টানে বলেই ছুটে গিয়েছিলেন সেখানে।
আলজেরিয়া ২৪ বছর পর আবার খেলতে যাচ্ছে বিশ্বকাপে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স দলের প্লে-মেকার জানাচ্ছেন, নিজের দ্বিতীয় দেশ আলজেরিয়ার জন্য তাঁর দুয়ার খোলা। তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া আফ্রিকার এই দেশটিকে দ্বিতীয় রাউন্ডে দেখতে চান রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক তারকা। আলজেরিয়ার কোচ রাবাহ সাদানেকে এরই মধ্যে বেশ কিছু পরামর্শ তিনি দিয়েছেন। দরকার হলে আরও সাহায্য করবেন।
‘বেশ কিছু বিষয় আছে যেগুলো আমি ওদের জন্য করতে চাই। কিন্তু সেগুলো কী, সেটি সবাইকে জানাতে চাই না। সেটা আমার আর খেলোয়াড়দের মধ্যেই থাকবে। যে খেলোয়াড়দের সঙ্গে এরই মধ্যে আমি বেশ ভালোভাবেই পরিচিত’—ফ্রান্স ফুটবল সাময়িকীকে বলেছেন ‘জিজু’।
জিদানের এই ঘোষণা ‘সি’ গ্রুপের দুই ফেবারিট ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যথেষ্ট হুমকির। জিদান আলজেরিয়াকে সাহায্য করছেন—এই খবর বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে ওই দুই দেশের পত্রপত্রিকায়। গুরুত্ব তো পাওয়ারই কথা। পেশাদার ফুটবলে তাঁর ১৮ বছরের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা। বিশ্বকাপ জিতেছেন। জিতেছেন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ। ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন তিন তিনবার। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে ২ গোল করে ব্রাজিলকে শিরোপা বঞ্চিত করেছেন। মাঝখানে ওই ঢুঁস-কাণ্ড না হলে ২০০৬ বিশ্বকাপেও হয়তো তাঁর গোলেই ফ্রান্স জিতত দ্বিতীয় শিরোপা।
ব্যক্তিগতভাবে আলজেরিয়া দলটার ভক্ত বলেও জানিয়েছেন জিদান, ‘ওরা বিশ্বকাপে ওঠায় আমি খুব আনন্দিত। আলজেরিয়া বিশ্বকাপে খেলার যোগ্য। এই স্টাইলে আলজেরিয়াকে খেলতে আমি অনেক দিন দেখিনি। এখন এটা পুরোটাই বোনাস। দক্ষিণ আফ্রিকায় ওরা পুরো চাপমুক্ত হয়েই খেলতে যাবে।’
শুধু কথার কথা নয়, কদিন পরেই অ্যাঙ্গোলায় শুরু হতে যাওয়া আফ্রিকান নেশনস কাপের প্রস্তুতি নিতে থাকা দলটার সঙ্গে এরই মধ্যে দেখা করে এসেছেন জিদান। জিদানকে পাশে পেয়েই খেলোয়াড়েরা কেমন উজ্জীবিত সেই কথা জানালেন কোচ সাদানে, ‘আমরা সবাই জিদানের আচরণে মুগ্ধ। এটা (সশরীরে হাজির হওয়া) আমাদের কাছে রীতিমতো বিস্ময়ের।’

শুধু অস্ট্রেলিয়ারই ১০ জন

টেস্ট ওপেনারদের সংজ্ঞাটাই পাল্টে দিয়েছেন বীরেন্দর শেবাগ ও ম্যাথু হেইডেন। একসঙ্গে যদি ব্যাটিং ওপেন করতেন এই দুজন! এই দুজনকে না হয় আউট করা গেল, পরের দুজন যদি হন রিকি পন্টিং ও শচীন টেন্ডুলকার! কিংবা ভাবুন দুই প্রান্ত থেকে বোলিং করছেন শেন ওয়ার্ন আর মুত্তিয়া মুরালিধরন! কল্পনার শেষ এখানেই নয়, যদি এমন হয় কোনো ওয়ানডেতে সনাত্ জয়াসুরিয়াকে নিয়ে ব্যাটিং ওপেন করছেন টেন্ডুলকার!
ক্রিকইনফোর দশক-সেরা টেস্ট ও ওয়ানডে দল দুটি যদি সত্যি সত্যি মাঠে নামত, তাহলে এই দৃশ্যগুলোই দেখা যেত। নতুন বছরের প্রথম দিনে ক্রিকেটের জনপ্রিয় ওয়েবসাইটটি ঘোষণা করেছে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের (২০০০-০৯) সেরা টেস্ট ও ওয়ানডে দল ঘোষণা করেছে। পাঠকের ভোটে নয়, দল নির্বাচন করেছেন ক্রিকইনফোর জুরি বোর্ড। ১৩ সদস্যের জুরি বোর্ডে ছিলেন ইয়ান চ্যাপেল, সঞ্জয় মাঞ্জরেকারদের মতো সাবেক ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার হার্সা ভোগলে, ক্রিকইনফো সম্পাদক সমবিত বাল, পিটার ইংলিশ, অ্যান্ড্রু মিলারের মতো ক্রিকেট লিখিয়েরা।
দুটি দলেই সর্বোচ্চ ৫ জন করে ক্রিকেটার আছেন অস্ট্রেলিয়ার। এঁদের মধ্যে রিকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও গ্লেন ম্যাকগ্রা আবার জায়গা পেয়েছেন দুটিতেই। ওয়ানডেতে অবশ্য ওপেনিংয়ে নয়, টেস্টের মতোই সাত নম্বরে ব্যাট করতে হবে গিলক্রিস্টকে। দুদলেই জায়গা হয়েছে আরও চারজনের—শচীন টেন্ডুলকার, জ্যাক ক্যালিস, শন পোলক ও মুত্তিয়া মুরালিধরন। আর কোনো দলেই জায়গা হয়নি পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোনো ক্রিকেটারের।
দশক-সেরা দল
টেস্ট
ম্যাথু হেইডেন, বীরেন্দর শেবাগ, রিকি পন্টিং, শচীন টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবিড়, জ্যাক ক্যালিস, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, শন পোলক, শেন ওয়ার্ন, মুত্তিয়া মুরালিধরন, গ্লেন ম্যাকগ্রা। দ্বাদশ ব্যক্তি: অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ।
ওয়ানডে
সনাত্ জয়াসুরিয়া, শচীন টেন্ডুলকার, রিকি পন্টিং, জ্যাক ক্যালিস, অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ, শন পোলক, ব্রেট লি, গ্লেন ম্যাকগ্রা, মুত্তিয়া মুরালিধরন। দ্বাদশ ব্যক্তি: শেন ওয়ার্ন।

আজ শুরু খুলনার দশ জেলার ফুটবল টুর্নামেন্ট

স্বাগতিক খুলনা, সাতক্ষীরা ও কুষ্টিয়া জেলায় আজ থেকে শুরু হচ্ছে প্রথম এটিএন বাংলা-শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড বিভাগীয় কমিশনার গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০১০। এই টুর্নামেন্টে খুলনা বিভাগের ১০টি দল অংশ নিচ্ছে।
আজ বিকেল তিনটায় সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হবে সাতক্ষীরা ও যশোর। মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম আবদুল আজিজ প্রধান অতিথি হিসেবে টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার ইউনুসুর রহমান, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি শেখ হেমায়েত হোসেন, টুর্নামেন্টের পৃষ্ঠপোষক শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান তৌহিদুর রহমান ও এটিএন বাংলার উপদেষ্টা নওয়াজিশ আলী খান।
কাল সংবাদ সম্মেলনে টুর্নামেন্ট সাংগঠনিক কমিটির সদস্য সচিব ও খুলনা বিভাগীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাবেক জাতীয় ফুটবলার শেখ মোহাম্মদ আসলাম টুর্নামেন্টের বিস্তারিত তথ্য জানান।
সম্মেলনে বলা হয়, খুলনা অঞ্চলে ফুটবলের হূত গৌরব ও সোনালি ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা এবং সর্বাধিক জনপ্রিয় এই খেলাকে আবার মানুষের কাছে উপভোগ্য করে তোলার প্রত্যাশায় প্রথমবারের মতো এই টুর্নামেন্টের আয়োজন। টুর্নামেন্টের সুফল বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তিনটি ভেন্যুতে ম্যাচ আয়োজন করা হচ্ছে। কুষ্টিয়া ভেন্যুর খেলা উদ্বোধন হবে আগামীকাল এবং ৯ জানুয়ারি বিকেল তিনটায় খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে হবে টুর্নামেন্টের ফাইনাল। খুলনা সিটি মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পুরস্কার বিতরণ করবেন। ফাইনাল খেলাটি এটিএন বাংলা খুলনা জেলা স্টেডিয়াম থেকে সরাসরি সম্প্রচার করবে।
সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিভাগীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আজমল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক মনসুর আজাদ, সাইফুল ইসলাম প্রমুখ।

গোড়ায় ফিরছেন ‘ফিরে আসা’ দুজন

ঠিক পাঁচ বছর আগে আজকের দিনটিতেই বহু আরাধ্য স্বপ্নটা পূরণ হয়েছিল দুজনের। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল শেন ওয়াটসন ও মোহাম্মদ আসিফের। তবে অভিষেকটা হয়তো ভুলে যেতে চাইবেন দুজনেই। প্রথম বলটি করতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলেন ওয়াটসন। দুই ইনিংসে নিয়েছিলেন মাত্র একটি উইকেট, আর এক ইনিংস ব্যাটিংয়ে করেছিলেন ৩২ রান। আর দুই ইনিংস মিলিয়ে ১৮ ওভারে ৮৮ রান দিয়ে কোনো উইকেটই পাননি আসিফ।
সেই সিডনিতেই কাল দুজন যখন মাঠে নামবেন, দলের বড় ভরসা দুজনই। ভালো একটা শুরুর জন্য ওয়াটসনের ব্যাট ও আসিফের বোলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে দুদল। অথচ কী অদ্ভুত মিল, এই ৫ বছরে দুজনই খেলতে পেরেছেন মাত্র ১৫টি করে টেস্ট! কারণটা অবশ্য ভিন্ন, নাছোড়বান্দা ইনজুরির কারণে ওয়াটসন, আর মাঠের বাইরের নানা বিতর্কে আসিফ। তবে তিক্ত অতীতকে পেছনে ফেলেছেন দুজনই। দুই বছর পর দলে ফিরে ৪ টেস্টে ২২ উইকেট নিয়েছেন আসিফ। আর ওপেনারের নতুন ভূমিকায় ১২ ইনিংসে ১টি সেঞ্চুরি ও ৬টি ফিফটি ওয়াটসনের, পাশাপাশি এই সময়ে উইকেটও নিয়েছেন ৯টি।
ওই বছরই বিশ্ব একাদশের বিপক্ষে সিডনিতে আরেকটি টেস্ট খেলেছিলেন ওয়াটসন। সিডনিতে আবার টেস্ট খেলার আগে স্মৃতির ডানায় ভর করে পেছনে ফিরে যাওয়া অস্ট্রেলিয়ান অলরাউন্ডার অনুধাবন করছেন সেদিনের ওয়াটসনের সঙ্গে আজকের ওয়াটসনের পার্থক্যও, ‘টেস্ট অভিষেক...মনে হচ্ছে কত আগেরই না ঘটনা! এটা অদ্ভুত, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধারণার কত পরিবর্তন হয়। তখন ভাবতাম, আমি হয়তো এই পর্যায়ে খেলার জন্য তৈরি। কিন্তু কোনো ধারণা ছিল না আমি কতটা শিখতে পারি, ক্রিকেটার ও ব্যক্তি হিসেবে কতটা উন্নতি করতে পারি। আত্মবিশ্বাস আজ আমাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। ২৩ বছর বয়সে যা ছিলাম, তার চেয়ে শারীরিকভাবেও আমার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সেই সময় আমার শরীর ছিল রাগবি খেলোয়াড়দের মতো, এখন অনেকটাই ক্রিকেটারের মতো।’
প্রথম টেস্ট বিশাল ব্যবধানে জিতে সিরিজে এগিয়ে অস্ট্রেলিয়া। তারপরও তারা পাকিস্তানকে যথেষ্ট সমীহ করছে মূলত দ্বিতীয় টেস্টটা সিডনিতে বলেই। অস্ট্রেলিয়ায় সিডনির উইকেটই ঐতিহ্যগতভাবে একমাত্র স্পিনসহায়ক। আর পাকিস্তান দলে আছে সাঈদ আজমল ও দানিশ কানেরিয়ার মতো দুজন স্পিনার। সিডনিতে খেলা সর্বশেষ টেস্টেই ৭ উইকেট নিয়েছিলেন কানেরিয়া। ওয়াটসনেরও বেশি ভয় ইনজুরির কারণে প্রথম টেস্টে না খেলা এই লেগ স্পিনারকে নিয়েই, ‘সে জানে সিডনিতে কীভাবে বোলিং করতে হয়। টার্ন, টপস্পিন, গুগলি, সব মিলিয়ে ওকে খেলাটা হবে বড় একটা চ্যালেঞ্জ।’ সিডনিতে খেলা বলেই আবারও ৫ উইকেট নেওয়ার আশা করছেন অস্ট্রেলিয়ান স্পিনার নাথান হরিজ।
তবে স্পিনারদের নিয়ে এত হইচই শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে যেতে পারে। কিছুদিন ধরেই আগের মতো যেন স্পিনারদের প্রতি উদার নয় সিডনি। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত, এখনই অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন না ইউনুস খান। নির্বাচকেরা ইউনুসকে পাঠাতেই চেয়েছিলেন, কিন্তু পিসিবি প্রধান ইজাজ বাট ইউনুসকে তাড়াহুড়ো করে পাঠাতে তো রাজি হননি, উল্টো নির্দেশ দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়া সফরকারী দলের সদস্য ১৭ থেকে ১৫-তে নামিয়ে আনতে। ফিরে আসছেন তাই ফাওয়াদ আলম ও আবদুর রউফ। ওয়েবসাইট।