Friday, January 31, 2014

গদ্যকার্টুন- গম্ভীর ও অপ্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য নয় by আনিসুল হক

কিছু কিছু মানুষ আছেন, সব সময় সিরিয়াস। তাঁরা হাস্যরস নিতে পারেন না। হাস্যকৌতুককে তাঁরা অগ্রহণীয় বলে মনে করেন।
এ ধরনের এক মানুষের কথা পড়েছিলাম একটা রুশ কৌতুক ম্যাগাজিনে।
অফিসের বস তিনি। তাঁর অফিসের একজন কর্মচারী বলল, ‘এই, আমি একটা কৌতুক বলব।’
সবাই বলল, ‘বলো বলো।’
কর্মচারীটি কৌতুক বলতে শুরু করল: ‘এক লোক একটা পার্টিতে ঢুকেছে। তার দু পায়ে বেড়ি করে ব্যান্ডেজ বাঁধা। সে ঠিকমতো হাঁটতেও পারছে না। সবাই বলল, তোমার পায়ে কী হয়েছে? লোকটা বলল, আমার পায়ে নয়, মাথায় হয়েছিল। আমার মাথা ফেটে গিয়েছিল। মাথা ফেটে গেছে? তাহলে তুমি পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধেছ কেন? আরে, আমি পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধেছি নাকি? ডাক্তারের কাছে গেছি। ডাক্তার আমার মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছেন। এত ঢিলা করে ব্যান্ডেজটা বেঁধে দিয়েছেন যে গড়াতে গড়াতে পায়ে এসে পড়েছে।’
এই কৌতুক শুনে অফিসের সবাই হেসে উঠল। শুধু বস হাসতে পারলেন না। তাঁর মনে হতে লাগল, এটা কি সম্ভব?
মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা হলে সেটা কি পা পর্যন্ত নেমে যেতে পারে?
রাতের বেলায় তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি তাঁর বউকে ঘুম থেকে জাগালেন। বললেন, ‘আচ্ছা বলো তো, একটা লোকের মাথা ফেটে গেছে বলে ডাক্তার তার মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছেন। সেই ব্যান্ডেজটা কি পা পর্যন্ত নেমে যেতে পারে?’
রুশ কৌতুক ম্যাগাজিনটিতে বলা হয়েছে, এই বস আর কেউ নন, তিনি নিজেই একটা কৌতুক ম্যাগাজিনের সম্পাদক।

কৌতুককে কৌতুক হিসেবে নিতে পারতে হবে। কৌতুকে যুক্তি খোঁজা উচিত নয়।
ধরা যাক এই কৌতুকটা: সিংহের বিয়ে হবে, ভেড়া খুব লাফাচ্ছে। সিংহের বিয়ে, দাওয়াতে যেতে হবে। একজন বলল, ‘সিংহের বিয়ে তো তুই ভেড়া লাফাচ্ছিস কেন?’ ভেড়া বলল, ‘আরে, বিয়ের আগে আমিও তো সিংহ ছিলাম, বিয়ের পরে না ভেড়া হয়ে গেছি!’
এই কৌতুক শুনে যদি কেউ বলে, যাহ্, একটা সিংহ কীভাবে ভেড়া হয়ে যাবে? এটা সম্ভবই না, তাহলে কিন্তু চলবে না।

কিন্তু অনেক পাঠকই আছেন খুব সিরিয়াস। মিলান কুন্ডেরার একটা উপন্যাস আছে—ফেয়ারওয়েল পার্টি। ওই উপন্যাসে মিলান কুন্ডেরা একজন ডাক্তারের চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। তাঁর নাম ডাক্তার স্ক্রেটা। ডাক্তার স্ক্রেটা বন্ধ্যা নারীদের চিকিৎসা করেন। তিনি নিজের স্পার্ম বন্ধ্যা নারীদের ইনজেক্ট করে দেন। তাদের অনেকেই সন্তান লাভ করে। উপন্যাসের একটা জায়গায় বর্ণনা আছে, ডাক্তার স্ক্রেটা পথ দিয়ে যাচ্ছেন, বাচ্চারা মাঠে খেলছে, তিনি তাকিয়ে দেখছেন, কয়টা বাচ্চা দেখতে তাঁর মতো হয়েছে।
মিলান কুন্ডেরা বলছেন, তিনি এই চরিত্র ও ঘটনা লিখেছেন একেবারেই হালকা চালে। কৌতুক করার জন্য। কিন্তু ব্যাপারটা কৌতুক রইল না। একদিন মেডিসিনের এক অধ্যাপক তাঁর কাছে এসে হাজির। অধ্যাপক বললেন, ‘আমি আপনার লেখার খুব সিরিয়াস পাঠক। আপনার প্রতিটা লাইন আমার মুখস্থ। আমি একটা সেমিনারের আয়োজন করছি। এটার বিষয় হলো “বন্ধ্যত্ব ও স্পার্ম ডোনেশন”। আপনার উপন্যাস ফেয়ারওয়েল পার্টিতে এই ব্যাপারটা আছে। এটা অত্যন্ত সিরিয়াস একটা বিষয়। এভাবে একটা কঠিন সমস্যার সমাধান হতে পারে। আপনি অবশ্যই আমার সেমিনারে আসবেন। আপনি বক্তব্য দেবেন।’
কুন্ডেরা বললেন, ‘আমার উপন্যাসকে সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই। আমি এটা নিতান্তই কৌতুক করার জন্য লিখেছি।’
অধ্যাপক পরম বিস্ময়ে কুন্ডেরার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার উপন্যাসকে আমরা সিরিয়াসলি নেব না? আপনি নিজে লেখক হয়ে এ কথা বলতে পারলেন? আপনার লেখাকে আমরা সিরিয়াসলি নেব না?’
কুন্ডেরা বললেন, ‘ভাই, লেখকদের সব কথা সিরিয়াসলি নেবেন না। আরেকটা কথা, ফিকশন লেখকেরা কিন্তু খুব বানিয়ে গল্প করে। গল্প লেখকদের জন্য উপদেশ প্রচলিত আছে, ডোন্ট রুইন ইয়োর স্টোরিজ উইথ ফ্যাক্টস। সত্য ঘটনা বলে তোমার গল্প নষ্ট কোরো না।’
ফেসবুকে একটা চমৎকার কৌতুক পেয়েছি। এটা যে কৌতুক, তা আগেই বলে রাখলাম। একজন কৃষি বিশেষজ্ঞ উপস্থাপক টেলিভিশনের ক্যামেরায় একজন ছাগলচাষির সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন।
উপস্থাপক: আপনি আপনার ছাগলকে কী খাওয়ান?
ছাগলচাষি: কোনটারে? কালোটা না সাদাটা?
উপস্থাপক: কালোটারে...
ছাগলচাষি: ঘাস।
উপস্থাপক: আর সাদাটারে?
ছাগলচাষি: ওইটারেও ঘাস খাওয়াই।
উপস্থাপক: ও আচ্ছা। আপনে ওইগুলানরে রাতে কই রাখেন?
ছাগলচাষি: কোনটারে? কালোটা না সাদাটা?
উপস্থাপক: কালোটারে?
ছাগলচাষি: ওইটারে বাইরের ঘরে বাইন্দা রাখি।
উপস্থাপক: আর সাদাটারে?
ছাগলচাষি: ওইটারেও বাইরের ঘরে বাইন্দা রাখি।
উপস্থাপক: আপনি ওগুলানরে কী দিয়া গোসল করান?
ছাগলচাষি: কোনটারে? কালোটা না সাদাটা?
উপস্থাপক: কালোটারে?
ছাগলচাষি: পানি দিয়া গোসল করাই।
উপস্থাপক: আর সাদাটারে?
ছাগলচাষি: ওইটারেও পানি দিয়া গোসল করাই।
উপস্থাপক: সবকিছু দুইটার বেলায় একই রকম করলে তুই বারবার কালোটারে সাদাটারে জিগাস কেন?
ছাগলচাষি: কারণ, কালো ছাগলটা আমার।
উপস্থাপক: আর সাদা ছাগলটা?
ছাগলচাষি: ওইটাও আমার।
আমার গল্প শেষ। এই গল্প পড়ে আমি হা হা করে হেসেছি। কিন্তু একজন-দুজনকে বলতে গেছি। শুনে তাঁরা হাসলেন না। জানি না, কেন হাসলেন না। হয়তো আমি কৌতুক বলতে পারি না বা সবাই হিউমার নিতে জানে না।
এখন কি ভয়ে ভয়ে একটা কথা বলতে পারি? আসলে এ দল, বি দল দুইটা একই রকম। দুইটাই আমাদেরই দেশের দল। তবু দুইটার কথা আলাদা আলাদাভাবেই বলতে হয়। এক নিঃশ্বাসে আমরা বলতে পারি না।
এর অনেক কারণ আছে। একটা নিশ্চয়ই যুদ্ধাপরাধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে গাটছড়া বাঁধা।
এই প্রশ্নটার একটা সমাধান যদি হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির ৮০ শতাংশ সমস্যার সমাধান হয়।
আমি যদি এ রকম হালকা গল্প দিয়ে লেখা শেষ করি, আপনারা বলবেন, হালকা লেখক। শুক্রবারটাই মাটি। এবার একটা সিরিয়াস গল্প। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের লেখা গল্প আমি ছোট করে বলি:
একজন ডিগ্রিহীন ডেনটিস্ট সকালবেলা তাঁর চেম্বার খুলে যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করছেন। এ সময় ফোন বাজল, ডেনটিস্টের ছেলে ফোন ধরল। তারপর এসে ডেনটিস্টকে বলল, ‘বাবা, মেয়র ফোন করেছেন, তিনি জানতে চান তুমি কি চেম্বারে আছ?’
ডেনটিস্ট বললেন, ‘নাই। বলে দাও, নাই।’
ছেলেটা গেল এবং ফিরে এসে বলল, ‘মেয়র জিগ্যেস করছেন, তিনি কি এখন আসতে পারেন?’
‘বলে দাও, আমি নাই।’
‘তিনি তোমার সব কথা ফোনে শুনতে পাচ্ছেন।’
‘গিয়ে বলো, দেখা হবে না।’
একটু পরে ছেলে এসে বলল, ‘বাবা, উনি বলেছেন, তুমি যদি তাঁকে না দেখ, তিনি তোমাকে গুলি করে মারবেন।’
এবার ডেনটিস্ট তাঁর ছেলেকে বললেন, ‘তাঁকে আসতে বলো।’
মেয়র এলেন। ডেনটিস্টের চেয়ারে চিৎ হয়ে শুলেন। হা করলেন। ডেনটিস্ট দেখলেন, একটা আক্কেল দাঁতের অবস্থা খারাপ। বললেন, ‘দাঁতটা তুলে ফেলতে হবে।’
মেয়র বললেন, ‘তুলে ফেলুন।’
ডেনটিস্ট বললেন, ‘কিন্তু কোনো অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহার করা যাবে না।’
‘কেন?’
‘কারণ, ওখানে পুঁজ হয়ে গেছে। রাজি?’
‘হ্যাঁ। তুলে ফেলুন।’
এবার ডেনটিস্ট মেয়রের পা বাঁধলেন। হাত বাঁধলেন। বললেন, ‘হা করুন।’ সাঁড়াশিটা হাতে নিয়ে বললেন, ‘আপনি আমাদের কুড়িজনকে হত্যা করেছেন গুলি করে। এবার তার মূল্য আপনাকে দিতে হবে।’ তিনি দাঁতটা টেনে তুলে ফেললেন।
মেয়রের চোখে পানি চলে এসেছে। ডেনটিস্ট তাঁকে একটা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে বললেন, ‘চোখের পানি মুছে ফেলুন।’
যাওয়ার সময় মেয়র বললেন, ‘বিলটা পাঠিয়ে দেবেন।’
‘বিল কার নামে পাঠাব? আপনার ব্যক্তিগত নামে, না সিটি করপোরেশনের নামে?’
মেয়র বললেন, ‘দুইটা তো একই।’

আনিসুল হক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

সময়চিত্র- অদ্ভুত সংসদ, অনিশ্চিত যাত্রা by আসিফ নজরুল

দশম জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়েছে ২৯ জানুয়ারি। এমনিতে সংসদের উদ্বোধনী দিনটিকে ঘিরে থাকে নানা আগ্রহ আর উদ্দীপনা।

ক্রিকেট ও ভারত- অতি লোভে তাঁতি নষ্ট হবে না তো! by এ কে এম জাকারিয়া

‘ক্রিকেট একটি ভারতীয় খেলা, যা ঘটনাচক্রে আবিষ্কৃত হয়েছে ইংল্যান্ডে। এটা অনেকটা মরিচের মতো, যা আবিষ্কৃত হয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকায়, সেখান থেকে ভারতে এসেছিল মধ্যযুগে।
এখন ভারতীয় খাবারের অন্যতম অনুষঙ্গ এই মরিচ। ভারতে ক্রিকেটকে বিদেশি খেলা হিসেবে দেখতে পান শুধু ইতিহাসবিদ আর ভারতবিদ্যার বিশেষজ্ঞরা। অধিকাংশ ভারতীয়ের কাছে ক্রিকেট এখন ইংলিশদের চেয়েও বেশি ভারতীয়।’ ভারতীয় রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ববিদ ও সমাজতাত্ত্বিক আশিষ নন্দী এই মন্তব্য করেছিলেন তাঁর দ্য তাও অব ক্রিকেট বইয়ে। ভারতে এখন ক্রিকেট যে পরিমাণ জনপ্রিয় আর সেখানে এই খেলার ‘বাজার’ এতই বড় যে এমন দাবি এখন ভারতীয়রা করতেই পারে। কিন্তু ‘অধিকাংশ ভারতীয়’ কি এখন ক্রিকেটকে ইংলিশদের চেয়ে বেশি ভারতীয় ভেবেই খুশি থাকতে রাজি নয়? খেলাটির ওপর খবরদারি ও কর্তৃত্বের নেশাও কি এখন তাদের মনোজগতে চেপে বসেছে? বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়ার (বিসিসিআই) প্রেসিডেন্ট এন শ্রীনিবাসনের মাথা থেকে বের হওয়া ন্যক্কারজনক প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে কি এরই প্রতিফলন ঘটল?

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) আর ইংল্যান্ড ও ওয়ালস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) সঙ্গে মিলে বিসিসিআই বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের ‘জমিদারি’ কায়েম করার যে চেষ্টা করেছিল, তা আপাতত ঠেকেছে। দুবাইয়ের প্রতিরোধপর্ব শেষ হওয়ার পর ৮ ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুরে সমঝোতা পর্বের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বের তিন শক্তিশালী দেশের যে মনোভাবের পরিচয় মিলল বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসির বোর্ড মিটিংকে কেন্দ্র করে, তার রেশ সহজেই মিটবে বলে মনে হয় না। কারণ, যে শ্রীনিবাসনের মাথা থেকে ক্রিকেটে তিন দেশের জমিদারি কায়েমের প্রস্তাব এসেছে, তিনিই হতে যাচ্ছেন আইসিসি বোর্ডের পরবর্তী চেয়ারম্যান।
‘আধুনিক’ ক্রিকেট বলতে আমরা যা বুঝি, তার বয়সই ২০০ ছাড়িয়েছে। তবে আধুনিক ক্রিকেটের দুই শতকের এই পথচলা ও অনেক পরিবর্তনের পরও কিছু বিষয় শুধু ক্রিকেটের জন্যই তোলা রয়েছে। কিছু ধ্রুপদি বাক্য এখনো আমরা শুধু ক্রিকেটকে নিয়েই ব্যবহার করে থাকি: ‘আপনি হারলেন কি জিতলেন, এটা বড় কথা নয়, খেলাটা কীভাবে খেললেন, সেটাই বড় কথা’ (It is not whether you win or lose, it is how you play the game) অথবা ‘এটা ক্রিকেট নয়’ (It is not cricket) অথবা ‘আম্পায়ারের কথাই চূড়ান্ত, কোনো প্রশ্ন করা যাবে না’ (The umpires word is final, not to be questioned)। এই কথাগুলো শুধুই ক্রিকেটের। ক্রিকেটের এই দীর্ঘ যাত্রার পর ২০১৪ সালে এসে ‘পজিশন পেপারের’ নামে তিন বোর্ড মিলেমিশে যে প্রস্তাব তৈরি করেছিল, সে প্রসঙ্গে যে কথা সবচেয়ে বেশি যায়, তা সম্ভবত; It is not cricket.
তিন দেশের পজিশন পেপারের মূল বিষয়টি তুলে ধরতে প্রথম আলোতে প্রকাশিত উৎপল শুভ্রের প্রতিবেদনের তথ্য ও মন্তব্যের ওপর ভর করছি। তিনি যা লিখেছেন, তা অনেকটা এ রকম: মূল প্রস্তাবগুলোর সব কটির একটাই লক্ষ্য, আইসিসিতে ওই তিন দেশের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। যেটির প্রথমেই আছে, আইসিসির পূর্ণ সদস্যদেশগুলোর সম-অধিকার ক্ষুণ্ন করে এক্সপো নামে নতুন একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব। এর স্থায়ী সদস্য হিসেবে থাকবে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ড। কমিটিতে বাকি সাতটি দেশের প্রতিনিধি হিসেবে থাকবে একটি দেশ। আইসিসির বাকি সব কমিটির ওপর এর কর্তৃত্ব থাকবে। অর্থাৎ, এটিই হবে বিশ্ব ক্রিকেটের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তিনি আরও লিখেছেন, টাকার লোভের কাছে খেলার মূল চেতনা অনেক দিন ধরেই গৌণ হয়ে বসেছে। প্রস্তাবিত পজিশন পেপারে সেটি প্রকাশিত হয়েছে আরও উৎকট রূপে। কারণ, সেখানে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে টাকার ভাগাভাগিটা আগের মতো সমান না থাকার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পজিশন পেপারের সবচেয়ে আপত্তিকর প্রস্তাবটি ছিল টেস্টে উত্তরণ ও অবনমনের বিষয়। র‌্যাঙ্কিংয়ের ৯ ও ১০ নম্বর দল আইসিসির সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ খেলবে ও জয়ী দল ৮ নম্বর দলের সঙ্গে প্লে অফ খেলে ওপরে ওঠার সুযোগ পাবে। সব দলের জন্য একই বিধান হলো না হয়, এমন একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা যায়, কিন্তু পয়েন্ট তালিকার শেষে থাকলেও ওই তিন দেশকে কখনো নামানো যাবে না—এমন একটি অগণতান্ত্রিক প্রস্তাবও করেছে তিন ‘গণতান্ত্রিক’ দেশের সর্বোচ্চ ক্রিকেট সংস্থা! ভারতের ইতিহাসবিদ ও বিশিষ্ট ক্রিকেট লেখক রামচন্দ্র গুহ টুইট করেছেন, ‘টেস্টের দ্বিস্তর লিগে অবনমনের ক্ষেত্রে ভারত, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাবটি ন্যক্কারজনক, আশা করছি অন্য দেশগুলো তা প্রত্যাখ্যান করবে।’ এসব চরম অগণতান্ত্রিক প্রস্তাব ও বিধিবিধান কার্যকর করার চেষ্টা ছিল গোপনে। তিন দেশ তলে তলে পজিশন পেপার তৈরি করে কয়েকটি দেশের ক্রিকেট বোর্ডকে নানা আর্থিক সুবিধা ও প্রলোভন দেখিয়ে হাতও করে ফেলেছিল। কিন্তু পজিশন পেপারের বিষয়টি গোপন থাকেনি। দুবাই বৈঠকে আইসিসি প্রেসিডেন্ট নিউজিল্যান্ডের অ্যালান আইজ্যাক স্বীকার করলেন যে সমস্যাটি তৈরি হয়েছে তিন দেশের তৈরি পজিশন পেপার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায়। ভাগ্যিস বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল, তা না হলে দুবাইয়ের প্রতিরোধপর্ব যে মঞ্চস্থ হতো না!
২০১১ সালে বাংলাদেশে যখন বিশ্বকাপ ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হয়, তখন একটি লেখা লিখেছিলাম ক্রিকেট ও গণতন্ত্র বিষয়ে। শিরোনাম ছিল ‘ক্রিকেট ও গণতন্ত্রের কাকতালীয় সম্পর্ক!’ লিখেছিলাম, ‘রাষ্ট্রের একটি সংবিধান লাগে, আবার রাষ্ট্র চালানোর জন্য নিয়মিত সংবিধান মেনে নতুন বিধিবিধান তৈরি করতে হয়। রাষ্ট্রের আইনসভা বা পার্লামেন্ট তা করে থাকে। ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে সত্য। খেলার নতুন নতুন বিধিবিধান তৈরি ও ক্রিকেট আইনের ব্যাখ্যা করার একক কর্তৃত্ব খাঁটি ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠান এমসিসির। তাদের করা ক্রিকেট আইনের সর্বশেষ সংস্করণ, যা “2000 Code 4th Edition 2010” নামে পরিচিত, তা ১ অক্টোবর ২০১০ সাল থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে আইন কার্যকর করার একক ক্ষমতা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পরিষদের (আইসিসি)। বিষয়টি অনেকটা আধুনিক রাষ্ট্রের আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মতো। এ ক্ষেত্রে “আইনসভা” এমসিসি আর “নির্বাহী বিভাগ” হচ্ছে আইসিসি। তবে গঠনের দিক দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান দুটির চরিত্র “আইনসভা” আর “নির্বাহী বিভাগের” প্রায় উল্টো। “নির্বাহী বিভাগ” হলেও আইসিসি বিভিন্ন ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের সদস্যদের নিয়ে গঠিত, বলা যায় প্রতিনিধিত্বমূলক, গণতান্ত্রিক।...২০০৫ সালের আগ পর্যন্ত এমসিসি ও আইসিসি—দুটোরই মূল দরবার ছিল লন্ডনের লর্ডসের মাঠ। সে বছর আইসিসির সদর দপ্তর দুবাইয়ে সরে আসার পর ক্রিকেটের ওপর ইংল্যান্ডের আধিপত্য প্রতীকীভাবে হলেও কমছে।...২০০৬ সালে এসে অবশ্য “এমসিসি বিশ্ব ক্রিকেট কমিটি” নামে একটি নতুন কমিটি তৈরি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বর্তমান ও সাবেক ক্রিকেটার ও আম্পায়ারদের নিয়ে গঠিত হয়েছে এই কমিটি। তাঁরা বছরে দুবার বসেন খেলাটির “prevalent issues” নিয়ে আলোচনার জন্য। এমসিসিও পরিবর্তন ও গণতন্ত্রায়ণের পথে হাঁটা শুরু করেছে বলে মনে হচ্ছে।’
২০১৪ সালে এসে কি তবে উল্টো পথে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে আইসিসিকে? আর ব্রিটিশ আধিপত্য থেকে ক্রিকেটকে মুক্ত করা বা ক্রিকেটের আরও গণতন্ত্রায়ণের বদলে অতীতের দিকে যাত্রার এই আয়োজনে নেতৃত্ব দিচ্ছে ভারত! এশিয়ার সব কটি দেশকে বাদ দিয়ে ভারতের গাঁটছড়া এখন ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে। পাকিস্তান দলের সাবেক অধিনায়ক ইমরান খান টুইট করেন, ‘বড় তিনটি দেশের এই প্রস্তাব ক্রিকেট দুনিয়াকে বিভক্ত করবে। মনে আছে, আমি ১৯৯৩ সালে আইসিসিতে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেছিলাম। সেখানে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার স্বৈর মনোভাব ভুলিনি।...আর এখন শুধু আর্থিক শক্তির জোরে ভারত ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে মিলেছে।’
বিশ্ব ক্রিকেটে মোড়লির আশায় এশীয় ক্রিকেটের সঙ্গে দূরত্বই তৈরি করে ফেলল ভারত। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারতের এই গাঁটছড়া কি চিরস্থায়ী কোনো বিষয়? এই তিন দেশের মধ্যে কোনো ইস্যুতে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া যদি এক থাকে, সেখানে তো একাই হয়ে পড়বে ভারত! ক্রিকেটে গণতন্ত্রায়ণের পথ বন্ধ করলে ভারতের বিপদে পড়ার আশঙ্কাই বেশি। অতি লোভেই তো তাঁতি নষ্ট হয়!

এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

দশম জাতীয় সংসদ- কেন বিরোধী দল জরুরি? by আলী রীয়াজ

দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে আজ ২৯ জানুয়ারি। দিনটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতি এবং সংসদীয় ইতিহাসের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন বলে আমাদের বিবেচনা করা দরকার।

ফ্রাঙ্কফুট বইমেলার সুযোগ কাজে লাগাতে চায় ইন্দোনেশিয়া

জনসংখ্যার দিক থেকে ইন্দোনেশিয়া হচ্ছে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম দেশ। তবে সে তুলনায় বিশ্ব সাহিত্যের পরিসরে এ দেশটির তেমন কোনো অংশ নেই। খুব বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এমন ইন্দোনেশীয় সাহিত্যের পরিমাণ খুবই অনুল্লেখ্য। দেশের ভেতরেও সাংস্কৃতিক পরিসরে সাহিত্যের প্রতিপত্তি তেমন কিছু জোরালো নয়। এই যখন অবস্থা, তখন আগামী ২০১৫ সালের মেলায় গেস্ট অব অনর হিসেবে বাছাই করেছে ফ্রাঙ্কফুট বইমেলা কর্তৃপক্ষ। জার্মানিতে বিশ্বের এ অন্যতম প্রধান বইমেলায় এমন সম্মানীয় অতিথি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছে ইন্দোনেশীয় সাহিত্য জগৎ।
দেশটির বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত নিবন্ধের থেকে এটা তের করা যাচ্ছে যে, ফ্রাঙ্কফুট বইমেলায় পাওয়া এ সম্মানকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছে সবাই। একটি কাজেই সবার আগ্রহ বেশি। তা হচ্ছে, এ সুযোগে বিশ্ব সাহিত্যের পরিসরে যথাসম্ভব জায়গা করে নেয়া। এ লক্ষ্যে ইন্দোনেশীয় সাহিত্যের অনুবাদের ওপর জোর দিচ্ছেন রচয়িতারা। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় দেশীয় সাহিত্য অনুবাদের লক্ষ্যে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে পত্রিকাগুলো।
যেমন গত বুধবার জাকার্তা গ্লোবে এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, দেশীয় সাহিত্যকে সরকার দীর্ঘকাল ধরেই অবহেলা করে আসছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রমে সাহিত্যের প্রায় না থাকা অবস্থা এর প্রমাণ। রচয়িতা বা তাদের কাজের প্রতি সমঝদারির মনোভাবও কখনও দেখায়নি সরকারগুলো। এ ব্যাপারে কোনো সরকারি কর্মদ্যোগ না থাকায় বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় দূরে থাকা, নিজেদের চমৎকার কাজগুলো ইংরেজি ভাষায়ও অনুবাদের সুযোগ পাননি ইন্দোনেশিয় সাহিত্যিকরা।
আ নিউ চ্যাপ্টার ফর ইন্দোনেশীয় লিটারেচার শীর্ষক নিবন্ধে আরও বলা হয়, লেখক ও প্রকাশকরাই বরং ইন্দোনেশিয়ার সাহিত্যের ঐতিহ্যকে লালন করে আসছেন। তবে বিশ্ব সাহিত্যে পরিচিত হতে হলে সেটুকু যথেষ্ট নয় বলেই মনে করে সংশ্লিষ্টরা। ফলে তাদের আশা, বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক এ বইমেলায় পাওয়া সুযোগ কাজে লাগাবে সরকার। অন্তত জার্মান ও ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করা হবে ইন্দোনেশীয় সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কাজগুলো। তাদের বক্তব্য এতে করে দ্বিতীয় যে উপকারটি হবে তা হবে নিজেদের ঘরে। দেশের ভেতরে লেখকদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা বাড়বে।
খুন করলেন রুশ কাব্যপ্রেমী
সাহিত্যের ভাষা হিসেবে গদ্য না কাব্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ? এ নিয়ে শুরু হওয়া তর্ক শেষতক শেষ হল বন্ধুর হাতে বন্ধুর খুন হওয়ার মধ্য দিয়ে। ঘটনাটি ঘটেছে ২০ জানুয়ারি রাশিয়ায়। গত বুধবার এ খবর দিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম আরটি। খবরে বলা হয়, উরাল অঞ্চলে ভার্দলভস্ক অঞ্চলে এ ঘটনা ঘটে। সেদিন রাতে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে বন্ধুকে ছুরিকাঘাত করেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক, যিনি সাহিত্যের ভাষা হিসেবে কাব্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার পক্ষে।
এই সাহিত্যিক খুনটি ঘটার রাতে ইরবিট শহরে বন্ধুগৃহে অতিথি হয়েছিলেন ৫২ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষক। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, অপর বন্ধুটির বয়স ৬৭, যিনি সাহিত্য-ভাষা হিসেবে গদ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার পক্ষে ছিলেন। রাতে কিছুটা পানাভ্যাস করেন দুই বন্ধু। এরই মধ্যে জনসংস্কৃতিতে কাব্য বনাম গদ্যের জায়গা নিয়ে তর্ক গড়ায় বহুদূর। শহরটির এক প্রসিকিউটর বিবৃতিতে জানান, কিছু সময়ের মধ্যেই সাহিত্যিক তর্কটি আর সাধারণ ১০টা ঝগড়ার পথেই এগোয়। একপর্যায়ে কাব্যপ্রেমী খুন করে গদ্যপ্রেমীকে। এরপরই পালিয়ে যান তিনি। পরে অপর এক বন্ধুর গ্রামস্থ গৃহ থেকেই আটক করা হয় অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষককে। প্রসিকিউটররা বলছেন, অপরাধ প্রমাণ হলে ১৫ বছর মেয়াদে কারাবাসের সাজা হতে পারে তার। সাহিত্য রুচিকে কেন্দ্র করে এমন নিষ্ঠুর খুনাখুনি রাশিয়ায় মোটামুটি পরিচিত। গত বছরের সেপ্টেম্বরেও এমন এক ঘটনা ঘটে দেশটিতে। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের চিন্তা ও দর্শন নিয়ে তর্কের একপর্যায়ে হাতাহাতিতে জড়ায় দুই পক্ষ। এরপর চলে দেশীয় বন্দুকের গোলাগুলি। অবশ্য ওই ঘটনায় কেউ মারা যাননি।
হ মোহাম্মদ আরজু

নীল অপরাজিতা নান্দনিক

গল্পে অজস নাটকীয় সংলাপের মাধ্যমে পাঠকের কৌতূহল সৃষ্টির একটি কৌশল রপ্ত করেছেন কথাসাহিত্যিক মাসুদ আহমেদ। ঘটনা পরম্পরায় শেষটায় রহস্য উন্মোচিত হয় বটে; চলতি পথে অনেক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং না জানা কথার আস্বাদনে পাঠক তৃপ্ত হবেন। জনাব আহমেদের ‘বিপ্রতীপ’ এমন একটি কাহিনী। প্রয়োজন যখন আদর্শকে ছাপিয়ে যায় তখন এরকম বর্ণনায় ভাববাদীরা ব্যথিত হতে পারেন তবে বাস্তববাদীরা তৃপ্ত হবেন। তুখোড় বাম রাজনীতির নায়ক লেনিন যখন, একই আদর্শের পরিণত প্রেমিকা নায়িকা অর্পাকে ছেড়ে মরু দেশের উদ্দেশে পাড়ি জমায় আদর্শ বিচ্যুতির কথা বলে, তখন সন্দেহ হয় লেখক কোনো ঘরানার হয়ে এসব চিত্রকল্প সৃষ্টি করেছেন কিনা। যদিও লেখকের এ অবস্থানের যুক্তিও অস্বীকার করার পথ নেই। ইংরেজদের ভারত দখল এমনকি বিশ্বজয়ের ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এককালের ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীর ক্ষুব্ধ অবস্থান আর সে বিষয়কে বিদেশে অবস্থানকারী প্রবাসী চাচার ভিন্ন মাত্রায় চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে প্রো এবং এন্টি সাম্রাজ্যবাদের একটি অবস্থান খোলাসা করতে লেখক আগাগোড়া সচেষ্ট ছিলেন। সম্ভবত এ বিবেচনাতেই বইটির নাম হয়েছে ‘বিপ্রতীপ’। তবে তত্ত্ব এবং তথ্য উপস্থাপনের কড়া বুলিতে অর্পা লেনিনের প্রেম ফিকে হয়ে গেছে কখনও কখনও। লেখক দেখানোর চেষ্টা করেছেন জীবনে বাস্তবতাই সব। প্রেম, আবেগ, আদর্শ নিয়ে শ্রেণী চরিত্র দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে বেঁচে থাকাটাই সত্যি।
নায়ক লেনিন কোন প্রক্রিয়ায় ইরাক যুদ্ধে যুক্ত হলেন তার বিশদ বর্ণনা না থাকলেও কাবুলে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন সেনা নিধনের দুর্মর স্পৃহা তাকে সম্মুখ যুদ্ধে ধাবিত করে। এখানে যুদ্ধের বর্ণনাটি দুর্ধর্ষ, টান টান উত্তেজনা সৃষ্টির মতো। নায়ক নিজেই বুলেটবিদ্ধ হয়ে টের পান যে তিনিও একজন সাধারণ মানুষ এবং তারও চিকিৎসার প্রয়োজন। বেঁচে থাকার জন্য তখন দেশে ফিরে জাল কাগজ তৈরি করে ইংল্যান্ডে সেই চাচার কাছে তাকে ফিরে যেতে হয়। যাকে সে চিহ্নিত করেছিল ভোগবাদী, সাম্রাজ্যবাদী বলে। অর্থাৎ লেনিন স্থিত হল শ্রেণী চরিত্রের মধ্যে। যা পুঁজিবাদের অমোঘ ক্রিয়াকৌশলের সফলতা বলে পাঠকের কাছে মনে হবে। এখানে লেখকের অবস্থান নির্মোহ। কারণ অন্যসব মত, বিশেষ করে সম্পদ সম বণ্টনের সব তত্ত্ব মিলিয়ে গিয়ে শ্রেণীবিভক্ত মানব সমাজের দৃঢ় প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে ৯০-এর দশকের দিকে বিশ্ব দৃকপাত করতে পারে। হ্যাঁ, ঘুরেফিরে পুঁজিবাদ, বিজ্ঞান এবং আভিজাত্যবাদের জয়জয়কার। বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদীরা উধাও। তাদের কন্যারা যুক্তরাজ্যে ব্যারিস্টারি পড়েন। নায়ক-নায়িকা, এই তন্ত্রের প্রতিনিধি হিসেবে স্ববিরোধিতায় আক্রান্ত। এ ছবি নির্মাণে লেখক সফল- বলতেই হবে। সেই সঙ্গে আস্তিকতা, পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানের আকর্ষণ, মেধার আধিপত্যের যে চিত্রকলা লেখক একেছেন তা খণ্ডন করা দুঃসাধ্য হবে।
এ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসটির খুব কাছাকাছি। বক্তব্যে এবং মানের দিক দিয়ে। বাঙালির দেশত্যাগ (Emigration)-এর বাস্তব কার্যকারণ নিয়ে মাসুদ এ বইতে যুক্তিগ্রাহ্য আলোচনা করেছেন। এ কথা তো সত্য যে ধনিক শ্রেণী এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর মানুষ পাশ্চাত্যের প্রতি অনুরক্ত। সম্পদের, যোগ্যতাভিত্তিক বণ্টনের সুবিধা এবং ইহলোকে ভোগ করার এমন চমৎকার ব্যবস্থা পাশ্চাত্য ছাড়া আর কোথায় আছে? লেখক তাই অনেক আগের লেখক নিরোদ চৌধুরীর ‘আত্মঘাতী বাঙালি’ বই থেকে যুৎসই উদ্ধৃতি টানেন যা তার উপস্থাপনা কৌশলকে আরও শক্তিশালী করে। বঙ্গবন্ধু, ইন্দিরা গান্ধী, সম্রাট বাহাদুর শাহ, লর্ড ক্যানিং, সিপাহী বিদ্রোহ ইত্যাদির প্রসঙ্গ টেনে লেখক বইটির বিশ্বাসযোগ্যতাকে বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তারপরও বলতে হয় যে লেখক তার লেখা থেকে আর একটু দূরত্ব বজায় রাখতে পারতেন।
শ্রেণী চরিত্রের কারণেই নিজ দেশের জনভিত্তি, শাসনব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নায়কের আস্থা নেই। তাই এ ক্ষেত্রে নায়কের বন্ধু ডাক্তারের এত প্রয়াসের পরও বেঁচে থাকার তাগিদে যে ছল চাতুরির আশ্রয় লেনিনকে নিতে হল, তার প্রয়োজন ছিল। এখানকার সেরা ডাক্তারও বলেছিলেন, এবডোমেন রিওপেন করতে হবে। এ স্থানটিতে লেখকের যে বিশ্বাস বাস্তবতাকে নির্মাণ করেছে সে বাস্তবতা নিজে পূর্ণ সত্যে পরিণত হয়েছে।
বিপ্রতীপ উপন্যাসের লেখক যে কারণে গল্পটি উপস্থাপনে পূর্ণভাবে সফল তা চিত্রিত হয়েছে এভাবে: জীবনে বেঁচে থাকা, ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য যিনি বা যারা বেশি সেবা দেবেন তারাই নমস্য। মতাদর্শিক পার্থক্য বাস্তবসম্মত নয়, বরং তা শ্রেণী স্বার্থ জড়িত। এরকম একটি সাহিত্য রচনায় চিন্তাশীল মানুষ নতুনভাবে কিছু বিষয়কে দেখার সুযোগ পাবেন বলে অনুমান করি। অনতিক্রম্য অনুষঙ্গ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বীরদর্পে এ উপন্যাসে নিজের উপস্থিতির জানান দিয়েছেন। ঠাকুর কবির কাছে মানুষ জীবনযাপনের সব পর্বে আশ্রয় পেতে পারে এরকম দৃঢ় বিশ্বাস থেকে জনাব আহমেদ তার উপন্যাসে রবীন্দ্র সাহিত্য থেকে উদ্ধৃতি দেন। রবীন্দ্রনাথকে প্রতিদিনের জীবনে বাস্তব করে তোলার এরকম চেষ্টা আমাদের সাহিত্যে এর আগে হয়েছে কিনা তার কোনো ভূরিভূরি প্রমাণও নেই। সাতচল্লিশ-পূর্ব থেকে লাদেনের হত্যাকাণ্ডের মধ্যে চিত্রিত এ উপন্যাসটি ১২০ পৃষ্ঠার কলেবরে ক্ষীণ স্বাস্থ্যের হয়েছে বলতে দ্বিধা নেই। তবুও বইটি সংগ্রহে রাখা যে কোনো সচেতন পাঠকের কাম্য হবে বলে বিশ্বাস রাখা যায়।
ইলিয়াস আহমেদ

রূপনগর by শওকত চৌধুরী

মিলনের প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। ইচ্ছে করছে বদমাশটার গালে একটা ঠাস করে চড় বসিয়ে দিতে। বদমাশটা আর কেউ নয় তার ছোট ভাই রঞ্জু। বদমাশটা বলছে কি-না সে দোকানে যেতে পারবে না। পারবে না কী জন্য? পার্টি কি সে নিজে করে?
মিলন চড়-থাপড়ের দিকে গেল না। এখন মাথা গরম করলে হবে না। যখন সময় খুব অস্থির থাকে তখন মাথা সবচেয়ে বেশি ঠাণ্ডা রাখতে হয়। তার চেয়ে বড় ব্যাপার তার এখন প্রচণ্ড সিগারেটের তৃষ্ণা পাচ্ছে। এই তৃষ্ণা বেশিক্ষণ বুকে চেপে রাখা ঠিক হবে না। তার উচিত এখন রঞ্জুকে কাঁধে হাত রেখে অনুরোধ করে বলা।
রঞ্জু?
জি।
যাবি আর আসবি। এখান থেকে বাবুলের দোকানে যেতে কতক্ষণ লাগে? বড়জোর পাঁচ মিনিট! এক প্যাকেট সিগারেট এনে দিবি- দুশ টাকা বখশিশ পাবি। তুই না আমার ভাই!
রঞ্জু কোনো কথা বলল না। তার হাতের আঙুলগুলো এখন কাঁপছে। কপালে এবং সদ্য ফিনফিনে গজিয়ে ওঠা গোঁফের জায়গায় ঘাম জেগে উঠেছে।
রঞ্জু? অ্যাই রঞ্জু? তুই কী ভয় পাচ্ছিস? তুই ভীতু ধরনের মুখ করেছিস কেন? রঞ্জু?
রঞ্জু শুধু ভয়ই পাচ্ছে না। তার কান্নাও পাচ্ছে। বাবুলের দোকানের সামনে কয়েকটা ছেলে সবসময় টুলের উপর বসে থাকে। তারা তাকে দেখলেই মিলনের কথা জানতে চায়। শুধু মিলনের কথা নয়, তারা প্রায় তার সঙ্গে অশোভন আচরণ করে। তাদের মধ্যে যার নাম নুরুল, রোগা পাতলা মতো, সে প্রায় তার প্যান্টের জিপার ধরে টান দিতে চায়। এটা কোন ধরনের মজা কে জানে! সেদিন সে বাবুলের দোকানে মশার কয়েল আনতে গিয়েছিল। নুরুল ছিল টুলের উপর শোয়া। তার শিয়রে বসে চা খাচ্ছিল অন্য একজন। তার নাম গেনু।
গেনু বলল- রঞ্জু না?
রঞ্জু কোনো উত্তর করল না। সে প্রায় দৃষ্টিশূন্য হয়ে চারপাশটা দেখতে থাকল। চারপাশে সব মিলে জনাকুড়ি মানুষ।
অ্যাই বড় ভাইরা কথা বললে উত্তর দিস না কেন? কিসে পড়িস তুই?
নাইনে।
নুরুল শোয়া থেকে উঠল না। সে শুয়ে শুয়ে পা নাচাতে থাকল।
বদি মাস্টারের মেয়ে সঙ্গে পড়ে। উত্তরমুখীতে।
রঞ্জু কিছুই বুঝতে পারল না। কীভাবে বদি মাস্টারের মেয়ের বিষয়টা চলে এলো- সেটাও সে ধরতে পারল না।
জিজ্ঞেস করল গেনু বদির মেয়ে কোন গ্র“পে পড়ে।
গেনু মুখ থেকে চায়ের কাপ নামাল।
মেয়েটা কোন গ্র“পে?
সাইন্সে।
তুই?
রঞ্জুর প্রায় হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এলো।
সাইন্সে।
অ্যাই খেলা, না?
রঞ্জুর হাত-পা থর থর করে কাঁপছে। অ্যাই খেলা না-- কথার অর্থ কী? বদি মাস্টারের মেয়ে নতুন এই স্কুলে এসেছে। তার সঙ্গে এখনও তার দু-চারটার বেশি কথা হয়নি। কিন্তু এই লোকগুলো কি তার এই কথাটা বিশ্বাস করবে?
নুরুল উঠে বসল। তার মুখ কঠিন।
এদিকে আয়।
রঞ্জু ভয়ে ভয়ে কাছে গেল।
কী কিনবি?
মশার কয়েল।
চা খাবি?
রঞ্জুর বুকের ভেতরটায় আতংকে বমি বমি ভাব জেগে উঠল। এই লোকটা তাকে চা খেতে বলছে! লোকটা তাকে চা খেতে বলছে কেন?
একটা চা খাও সোনা! বদি মাস্টারের মেয়ের সঙ্গে পড়- একটু চা না খেলে হয়! প্লিজ, খাও!
পরের ঘটনা আর রঞ্জুর মনে নেই। তার মনে হল সে প্রায় হঠাৎ করেই দৃষ্টি শূন্য হয়ে গেছে। চারপাশের লোকজন কাউকেই সে আর দেখতে পাচ্ছে না। গলার ঘাম নেমে বুকের গেঞ্জির একটা অংশ ভিজে গেছে। এর ভেতর সে একবার খেয়াল করল- লোকটা তার প্যান্টের জিপার একবার উঠানো এবং একবার নামানো ধরনের অদ্ভুত একটা খেলা করছে। আর এক দৃষ্টিতে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করছে- চায়ে কয় চামচ চিনি লাগবে আপনার? দু’চামচে হবে? বেশি সুগার খাবেন না সোনা! ডায়াবেটিসে পড়বেন! বুঝতে পেরেছেন?
সেদিন রাতে রঞ্জুর শরীরে জেঁকে জ্বর এলো। সে বাসায় কাউকে কিছু বলল না। সামনে তার পরীক্ষা। তারপরও তাকে সকাল সকাল পড়ার টেবিল থেকে উঠে পড়তে হল। মোটা দুটো চাদর গায়ে জড়িয়ে যখন সে শুতে গেল- তখন মাত্র রাত এগারটা। রাত এগারটায় কারও ঘুম গাঢ় হয় না। রঞ্জুর হল। ঘুম গাঢ় হওয়ার কারণেই কিনা সে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। স্বপ্নটা টিনাকে নিয়ে। স্বপ্নে টিনা খুব অবাক হয়ে বলছে- এই ছেলে তুমি আমার সঙ্গে কথা বল না কেন?
রঞ্জু কী বলবে খুঁজে পেল না। অনেকক্ষণ পর সে বলল- তুমি সেকশন সি-তে আর আমি এ-তে।
আমার তো মনে হয় তুমি আমাকে লজ্জা পাও। লজ্জা পাও কেন?
রঞ্জু আবারও কী বলবে বুঝতে পারল না।
তোমাকে নাকি গেনুরা ধরেছে? ধরে নাকি জিপার টানাটানি করেছে?
রঞ্জুর কান লাল হয়ে উঠল। এ ঘটনা তো টিনার জানার কথা নয়। টিনা জানল কী করে!
কোক খাবে?
রঞ্জু একবার আকাশের দিকে তাকাল। আকাশ নীল হয়ে আছে। আজ কয়েক দিন ধরে বেশ রোদ হচ্ছে। প্রচণ্ড রোদ।
এটা খাও।
রঞ্জু খেয়াল করল অর্ধেক খাওয়া কোকের ক্যানটা টিনা তার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। কী আশ্চর্য সে কি টিনার মুখে লাগা কোকটা খাবে?
কী ব্যাপার নাওনা কেন? আমার মুখে লাগা জিনিস খেতে তোমার সমস্যা আছে?
এমন সময় রঞ্জুর ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘুমের ভেতর তার তীব্র পানির তৃষ্ণা পেয়েছিল। সে পাগলের মতো বিছানার পাশে রাখা পানির জগটা খুঁজতে শুরু করল।
২.
আজ বাবুলের দোকানে লোক সমাগম কম।
সম্প্রতি গেনুরা একটা মোটর সাইকেল কিনেছে। জাপানের তৈরি। মোটরসাইকেলের আয়নার দিকে তাকিয়ে সিগারেট টানছে নুরুল। আয়নায় তাকিয়ে সিগারেট টানার অর্থ কী কে জানে। ভয়ংকর কিছু?
রঞ্জু বলল- বাবুল ভাই এক প্যাকেট সিগারেট।
কোনটা?
গোল্ডলিফ।
আর কিছু?
না।
তুমি তো প্রায় মশার কয়েল কেন। কয়েল দেব?
জি না বাবুল ভাই।
সিগারেটের টাকা পরিশোধ করার সময় রঞ্জু খেয়াল করল তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে নুরুল।
কিরে উত্তরমুখী, খবর কী?
রঞ্জু কিছু বলল না।
তোর ভাইজান কোথায়?
ভাইয়া বাসায় নেই।
কোথায় গেছে?
রঞ্জুর বুকটা ধক করে উঠল। লোকটা তার হাতের সিগারেটের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লোকটা কি তাহলে সে যে মিথ্যা বলছে সেটা বুঝে ফেলেছে?
কোথায় গেছে বললি না?
আমি জানি না।
লোকটা শক্ত করে রঞ্জুর কাঁধটা চেপে ধরল।
চালাক হয়ে গেছিস তাই না? এমন একটা ‘চাপ’ দেব মুখ দিয়ে ভক করে রক্ত বের হয়ে আসবে। উত্তরমুখীর বাচ্চা উত্তরমুখী, যা এখান থেকে!
পাশ থেকে গেনু বলল- যাস না ক্যান? দৌড় দে!
রঞ্জু দৌড়াল না। সে মাথা নিচু করে এক পা এক পা ঘরের দিকে এগুতে থাকল বাসার দিকে।
কোনো এক বিচিত্র কারণে রঞ্জু উত্তরমুখী স্কুলের কাছে এসে একবার দাঁড়াল। স্কুলের পেছনের দিকে কবুতরের জন্য কয়েকটা কাঠের তৈরি ঘর করা হয়েছে। সে ঘরগুলোতে এখন আর কোনো কবুতর নেই। কারা যেন সব কবুতর জবাই করে খেয়ে ফেলেছে। রঞ্জু অনেকক্ষণ ধরে কবুতরের ঘরগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকল। সবচেয়ে ডান পাশের যে ঘরটা- সেখানে একটা সাদা কবুতর থাকত। ওটাকে সে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করত। পাউরুটির টুকরো হাতে নিলে ওটা উড়ে আসত হাতে। বিচিত্র একটা আওয়াজ করতে করতে পাউরুটি খেত। রঞ্জুর কেন হঠাৎ করে এই স্মৃতিগুলো মনে পড়ল- কে জানে।
৩.
আজ সকাল থেকেই বেশ শীত পড়ছে। ঘাসের উপর নরম হয়ে ছড়িয়ে আছে রোদ। শিখাকে সকাল সকাল কলেজের উদ্দেশে বের হতে হয়েছে। অবশ্য শিখা একা বের হয়নি। তার সঙ্গে রঞ্জুও আছে। সে রঞ্জুর একটা হাত শক্ত করে ধরে আছে। রঞ্জুর হাতটা ধরে থাকলে একটু ভরসা লাগে।
গলির পথটা পেরুনোর পর হঠাৎ রঞ্জু বলল- ভাইয়া আর আসবে না, তাই না আপা?
কে বলল তোকে? আসবে। অবশ্যই আসবে।
তুমি কীভাবে জানো ভাইয়া আসবে?
শিখা কোনো উত্তর করল না।
টিনা বলেছে এই শহরে যারা একবার হারিয়ে যায় তারা আর আসে না।
শিখা আবারও কিছু বলল না।
ভাইয়াকে ওরা মেরে ফেলেছে, তাই না আপা?
শিখা দাঁড়িয়ে পড়ল। রঞ্জু কী তাহলে এখনও বিশ্বাস করে মিলন এক দিন ফিরে আসবে?
আজ তিন মাস হয়ে গেল! ওরা কি আমাদেরও মেরে ফেলবে আপা?
শিখা কোনো কথার উত্তর করল না। সে খেয়াল করল রঞ্জুর চোখগুলো ভারী হয়ে আসছে। সে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ ডলছে।
৪.
বাবুলের দোকান পর্যন্ত ওরা আর কোনো কথা বলল না। বাবুলের দোকানের বাম পাশে ইউক্যালিপটাসের গাছটার নিচে এসে রঞ্জু প্রায় থমকে দাঁড়াল।
শিখা বলল- কী হয়েছে রঞ্জু?
রঞ্জু কোনো কথা বলল না। তাদের সামনে দুটো ছেলে বিপরীত মুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত মোটরসাইকেলের আয়নায় তাদের দেখার চেষ্টা করছে। শিখা রঞ্জুর হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। আচ্ছা ছেলেগুলো সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কেন? তারা কি এখন যে কোনো সময় শিখার দিকে এগিয়ে আসবে? শিখার দিকে এগিয়ে এসে কী করবে? শরীরের সঙ্গে শরীর লাগিয়ে বিশ্রী ভঙ্গিতে বলবে- একটা উপহার দিতাম! সাইজটা তো বললেন না?
শিখার গলা শুকিয়ে আসছে। তাদের এখন খুব দ্রুত পা চালানো উচিত।
শিখা এবং রঞ্জু এখন প্রায় দৌড়াচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই যেন পথ শেষ হচ্ছে না। আচ্ছা বাবুলের ছোট্ট দোকানটা পার হতে তাদের এত সময় লাগছে কেন?
তারা কি কোনো দিনই বাবুলের দোকানটা পার হতে পারবে না?

কপিরাইট : জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত by খান মাহবুব

মহাকাল মানুষকে দেহনাশের মাধ্যমে লোকসমাজ থেকে ধীরে ধীরে অন্তরাল করে ফেলে। মানুষের সারাজীবনের শ্রম-ঘামের সম্মিলনের মাধ্যমে অর্জিত ধন-সম্পদও দেহনাশের পর সমাজে খুব একটা গুরুত্ব বহন করে না। তবে মেধাজাত সৃষ্টকর্ম থাকলে তা জীবনকাল ও মৃত্যুর পরও সমানভাবে মানুষকে প্রাসঙ্গিক ও সমাদৃত করে। পরিতাপের বিষয় বস্তুগত সম্পদ অর্জন, রক্ষণ ও বৃদ্ধিতে মানুষের চিন্তা ও প্রচেষ্টা অবিরাম। কিন্তু মেধাসম্পদের সুরক্ষা এবং এ থেকে আর্থিক প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে মানুষের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়।
মানুষের চিন্তা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে উদ্ভাবনী মেধাসম্পদকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়- যথা : ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোপার্টি (পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইন, জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন); অন্যটি কপিরাইট (সাহিত্য ও শৈল্পিক কাজের পরিমণ্ডল) মানব মনের সব সৃষ্টিই মেধাসম্পদ। মানুষের সৃষ্টিশীল সব কর্মই স্রষ্টা বা মালিকের অনুমতি ছাড়া পুনরুৎপাদন, বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারে স্রষ্টার অধিকারকে হরণ করা হয়। এই জন্যই কালের বিবর্তনে এবং মানুষের অধিকার সচেতনতার ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কপিরাইট ধারণার উদ্ভব হয়েছে। কপিরাইট রক্ষায় সৃষ্টিশীল মানুষের আর্থিক ও নৈতিক অধিকার প্রাপ্তির মিলিত দাবির ফলে ১৮৮৩ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত কনভেনশনে পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইন, জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন ইত্যাদি সৃষ্টিকারীদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে অগ্রগণ্য। বাংলাদেশসহ এই কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা ১৭৩। এ ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে বিভিন্ন দেশের মেধাস্বত্বধারীদের প্রাপ্ত অধিকারের পার্থক্য কমিয়ে এনে একটা সমন্বয় সাধন করতে ফরাসি লেখক ভিক্টর হুগোসহ অন্যরা ১৮৮৬ সালে বার্ন-এ একটি কনভেনশন করে- যা বার্ন কনভেনশন নামে খ্যাত। এই কনভেনশনে স্রষ্টার সৃষ্টিকর্মের প্রতি অধিক দায়িত্বশীলতা দেখিয়ে এই মতে উপনীত হয়- যে কপিরাইট সুরক্ষার জন্য কোনো কর্মকে রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে না। যে মুহূর্তে কর্মটি সৃষ্টি হয় আপনাআপনি সেটি সে মুহূর্ত থেকে সুরক্ষা পাবে। বার্ন কনভেনশনে আরও বলা হয়- যখন সৃজনকর্ম প্রদর্শন ব্যবহার করা হবে তখন স্রষ্টার নামসহ তার স্বীকৃতি ও উপস্থাপনায় বাধ্যতামূলক। এই নৈতিক অধিকার স্রষ্টার রাইট টু-প্যাটারনিটি ও রাইট টু ইন্টেগ্রিটিকে সুরক্ষা দেয়। বাংলাদেশ ১৯৯৯ সালের ৪ মে এই চুক্তি মান্য করে চলতে সম্মত হয়ে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
বিশ্বমানবের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সুরক্ষার প্রত্যয়ে ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ওয়াইপো (WIPO, ওয়ার্ল্ড ইনটেলেকচুয়াল প্রোপ্রার্টি অর্গানাইজেশন)। বাংলাদেশ ১৯৮৫ সালে ওয়াইপোর সদস্যভুক্ত হয়। এই সংস্থার সদস্য সংখ্যা বর্তমানে ১৮৪। বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ রক্ষায় বিশ্বে প্রথম সুসংহত কপিরাইট আইন ‘দি স্ট্যাটিউট অব অ্যানি ১৯১০ সালে ইংল্যান্ডে প্রবর্তিত হয়। কপিরাইট নিয়ে উন্নত বিশ্ব সোচ্চার হলেও বাংলাদেশে এই শব্দটির সঙ্গেই সাধারণ মানুষের পরিচয় কম। যে দেশের মানুষ নিজ ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষার নিমিত্তে অপরের স্বত্ববান সম্পদ দখলে ভ্রুক্ষেপ করে না; এমনকি রাষ্ট্রের বন-বাদাড়, নদী-নালা, দখলে-মগ্ন রাষ্ট্রের মালিক ধনলোভী একশ্রেণীর জনগোষ্ঠী সে দেশের মানুষের সুকুমার মননের সৃষ্টি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ রক্ষার তাগাদা খুব একটা অনুভব করে না।
রাষ্ট্রীয়ভাবে কপিরাইট সুরক্ষার জন্য স্বাধীনতার পর থেকে পেটেন্ট রাইট অফিস শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করতে শুরু করে। মগবাজারের একটি ভাড়া বাড়িতে কামালউদ্দিনের তত্ত্বাবধানে অফিসটি চলে। ১৯৭৩ সালে সরকার বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামতের ভিত্তিতে পাকিস্তান আমলে কার্যকর ১৯৬২ সালের কপিরাইট অধ্যাদেশের কিছু ধারাকে সংশোধন করে পাকিস্তানি আমলের আঞ্চলিক পেটেন্ট রাইট অফিসকে জাতীয় পর্যায়ের একটি সংযুক্ত দফতরের দায়িত্ব দিয়ে স্থাপন করে রেজিস্ট্রার অব কপিরাইটের কার্যালয়। বাংলাদেশের প্রথম কপিরাইট রেজিষ্ট্রার নুরুল আলম (কার্যকাল ১-৬-১৯৭৩ থেকে ৩-৩-১৯৭৮)। প্রথম পর্যায়ে কপিরাইট রেজিস্ট্রারের কার্যালয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল। ১৯৮৭ সালে কপিরাইট অফিস সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ হয়। এরশাদ সরকারের আমলে কপিরাইট অফিস আগারগাঁওয়ের জাতীয় গ্রন্থাগার ভবনে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে কপিরাইট অফিসে লোকবল ২৯ জন (অনুমোদিত লোকবল ৪৯ জন)। বাংলাদেশে বলবৎ কপিরাইট আইন ২০০০ (২০০৫ সালে সংশোধিত ১৭টি অধ্যায় ও ১০৫টি ধারা বিদ্যামান)-এর বিধান মতে কপিরাইট অফিস একটি আধা বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান। যথার্থ আইন ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ হরণের বিপরীতে প্রতিকারের ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ রক্ষায় তদারককারী আন্তর্জাতিক সংস্থার (যেমন : UNESCO, WIPO, WTO) সদস্য বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভিন্ন দেশের কপিরাইট সুরক্ষার জন্য যে সব কনভেনশন হয়েছে বাংলাদেশ অধিকাংশ কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে (যেমন প্যারিস কনভেনশন ১৮৮৩, বার্ন কনভেনশন ১৮৮৬, ইউনিভার্সেল কপিরাইট কনভেনশন ট্রিপস ১৯৯৪,) সব কিছুর পরেও এ দেশে সচেতনতার অভাবে কপিরাইট রক্ষার আন্দোলন উপেক্ষিত। কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করে পাইরেসির মাধ্যমে আমাদের সৃজনশীল কর্ম বিশেষত বইয়ের বাজার আজ এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন। পাইরেসি শুধু সৃজনকর্মের স্রষ্টার আর্থিক প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করে না, নতুন কর্ম সৃষ্টিতেও উদ্যম, উৎসাহ ও সামর্থ্যকে হ্রাস করছে। কপিরাইট লঙ্ঘনজনিত অপরাধ, অপরাধের প্রকৃতি এবং তার বিপরীতে শাস্তির বিধানের বর্ণনা রয়েছে। এক্ষেত্রে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে। দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা ক্ষতিপূরণ আদায়, ফৌজদারি আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা সংক্রান্ত শাস্তির বিধান রয়েছে (ধারা-৭৫-৮১)। কিন্তু অনুমোদনবিহীন প্রকাশনার বা পাইরেসির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেন রেকর্ড গড়েছে।
ঢাকার নীলক্ষেতের বইয়ের বাজারে কোন বই, কে লেখক, কে প্রকাশক ইত্যাদি এখানকার বই উৎপাদকদের কাছে কোনো বিচার্য বিষয় নয়। মূল্যায়নের বিষয় হচ্ছে বইটি পুনরুৎপাদন হলে বাজারে চাহিদা কত বা কস্ট বেনিফিট এনালাইসিজে উৎপাদিত বইয়ের বাজার ইতিবাচক কী না। এখানে সিন্ডিকেট করে, গ্র“প করে পাইরেটেড বই প্রকাশ হয়। পাইরেটেড বই প্রকাশের ক্ষেত্রে বিভাজন আছে, অর্থাৎ সৃজনশীল বই, কম্পিউটার বিষয়ক বই, ডাক্তারি বই কারা প্রকাশ করবে তা সুনির্দিষ্ট। নীলক্ষেত বাজারে পাইরেসি বই উৎপাদক চক্র এতটাই সংঘবদ্ধ যে উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থা দেখে মনে হবে যেন এ এক সুচারু সৃজনশীল কর্ম। এক্ষেত্রে আইনের বিধানের কোনো ব্যত্যয় হচ্ছে বলে তাদের কাছে মনে হয় না। নীলক্ষেতে বই বিক্রেতাদের কাছে এসব পাইরেসি বই বিক্রি অন্যায় ও অনৈতিক বলতে গেলে বিক্রেতারা পাল্টা বলে- ‘এসব নিয়ে কেউ কোনো কথা বলে না। কম পয়সায় পায় ক্রেতা, প্রয়োজন মিটে যায়- এ পর্যন্তই। আর আমাদের এসব নিয়ে এত ভাববার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বইয়ের পাইকারি বাজার বাংলাবাজারেও পাইরেসি নিয়ে দেন-দরবার করে পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি। ঢাকার বাইরের বইয়ের বাজারও পাইরেটেড বইয়ে সয়লাব।
সরকারের কপিরাইট আইন, এই আইনের অধীনে কপিরাইট টাস্কফোর্স আছে। অভাব, যথার্থ আন্তরিকতা ও উদ্দীপ্ত দায়িত্ববোধের। আমরা মনে করি কপিরাইট লঙ্ঘনকারীরা জ্ঞাতসারে এই কাজটি করে। তাই সেমিনার, সিম্পোজিয়াম করে হেদায়েতের আলো দিলেই চলবে না, প্রয়োজন আইনের যথার্থ প্রয়োগের। এই ক্ষেত্রে উল্লেখ্য, কপিরাইট টাস্কফোর্স ২০০৯ সাল থেকে এই পর্যন্ত মাত্র ৯টি অভিযান পরিচালনা করেছে, যা নিতান্তই কম। কপিরাইট আইনের ৯৩(১) ধারায় সাব-ইন্সপেক্টরের নিুতর পদাধিকারী নন এমন যে, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়াই পাইরেসি সংক্রান্ত কর্মের সব অনুলিপি বা যন্ত্রপাতি বা দ্রব্যসামগ্রী এবং অনুলিপি তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত সব প্লেট বা যন্ত্রপাতি বা দ্রব্যসামগ্রী যেখানেই পাওয়া যাক তা জব্দ করতে পারেন। ৯৯ ধারায় কপিরাইট রেজিস্ট্রারকে দেওয়ানি আদালতের অনুরূপ কিছু ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে। কপিরাইট অফিস আরও আন্তরিক হলে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে থেকেও অনেক করতে পারে।
আজকাল বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত অনেক বই বাজারে আসার দু’চার দিন পরই কোনো কোনো ওয়েবসাইটে দেয়া হয় লেখক বা প্রকাশকের অনুমতি ব্যতিরেকে, মেধাস্বত্বকে বুড়ো আঙুল প্রদর্শন করে!
বাংলাদেশে বলবৎ কপিরাইট আইনে সৃজনশীল কর্মের স্রষ্টার মৃত্যুর পর ৬০ বছর কপিরাইটের দাবিদার থাকে। এই সময়সীমা পার হলে সৃষ্টিকর্মের স্বত্ব পাবলিক ডমেইন-এ চলে আসে। এ সময় এ সৃষ্টকর্মকে জনসম্পদ বলা যায়। অর্থাৎ সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। তবে কপিরাইটের সময়সীমা পার হলেও সৃজনশীল কর্মের প্রতি অর্থনৈতিক প্রাপ্তির অধিকারের দাবি অগ্রাহ্য হলেও সৃষ্টার সৃজনকর্মের উপর নৈতিক অধিকার চিরকাল বহমান থাকে। তাই এরিস্টটল, প্লেটো কিংবা সক্রেটিসের বই চিরকাল রচয়িতা হিসেবে তাদের নামেই নামাঙ্কিত থাকবে।
উন্নত বিশ্ব মেধাস্বত্বের বিষয়ে সচেতন এবং এ অধিকার রক্ষায় আইনের বিধি-বিধান ও তার প্রতিপালনে দায়িত্বশীল ও নিষ্ঠাবান। পাইরেসি বা কপিরাইট ভঙ্গকারীদের তারা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। উদাহরণস্বরূপ বলতে হয়- সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার এক তরুণ না বুঝে একটা গান অনুমতি না নিয়ে ডাউন লোড করে। বিষয়টি জানাজানি হলে পুলিশের আতঙ্কে ছেলেটি আÍহত্যা করে বলে জানা যায়। বিষয়টি নিয়ে কোরিয়ার গণমাধ্যমে তোলপাড় শুরু করে। আর আমাদের দেশে এ মাটির সঙ্গে মিশে থাকা বাউল গানকে কতই না রঙ মাখিয়ে রিমিক্স করা হচ্ছে। কিন্তু কেউ কি দেখার আছে? অথচ কপিরাইট আইনের বিধান শক্তিশালী ও স্বচ্ছ। কপিরাইট আইনের ধারা ২এ আছে, ‘অনুলিপি অর্থ বর্ণ, চিত্র, শব্দ বা অন্য কোনো মাধ্যমে ব্যবহার করিয়া লিখিত, শব্দ রেকর্ডিং, চলচ্চিত্র, গ্রাফিক্স চিত্র বা অন্য কোনো বস্তুগত প্রকৃতি বা ডিজিটাল সংকেত আকারে পুনরুৎপাদন (স্থির বা চলমান), দ্বিমাত্রিক, ত্রিমাত্রিক বা পরাবাস্তব’। অথাৎ কোনোরূপ অনুলিপির বিধান নেই বিনানুমতিতে।
বিশ্বের উন্নত দেশে মুদ্রণ ও প্রকাশনা এককভাবে সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক শিল্প বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের উপাদান বই, সংবাদপত্র, পত্রিকা, সাময়িকী ও বৈজ্ঞানিক জার্নাল। বিশ্বের প্রকাশনা শিল্পের আর্থিক মূল্য ১১৯ মিলিয়ন ডলার। বছরে বিশ্বে ১ মিলিয়ন বই ও প্রায় ৬৬০০টি সংবাদপত্র প্রতিদিন প্রকাশিত হয়। প্রতি মাসে হাজার হাজার বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ, জার্নাল, বই অনলাইনে প্রকাশিত হয়। এসব প্রকাশনার রচয়িতা, অনুবাদক, সাংবাদিক, বৈজ্ঞানিকরা সবাই তাদের সৃজন কর্মের জন্য কপিরাইটের দাবিদার। এ রচয়িতাদের রচনা কতটুকু মেধাস্বত্বের রক্ষা পাচ্ছে তা ভাববার বিষয়। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফটোকপি করে যে ‘কোর্স প্যাক’ প্রদান করা হয় তা অনুমোদিত। তাই এ ক্ষেত্রে রিপ্রোডাকশন রাইটস্ অর্গানিজেশন (চজঙঝ) নামক এক প্রকার যৌথ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এসব প্রতিষ্ঠান মধ্যস্থতাকারী হয়ে প্রয়োজনীয় কপিরাইট ছাড়পত্র পেতে সাহায্য করে। বর্তমানে ৫০টির মতো দেশে এ প্রতিষ্ঠানে সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে কাজ করছে। এ জাতীয় তিনটি প্রতিষ্ঠান দি কপিরাইট লাইসেন্সিং অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সোসাইটি অব সিঙ্গাপুর লিমিটেড, দি রিপ্রোডাকশন রাইটস সোসাইটি অফ নাইজিরিয়া, দি কপিরাইট ক্লিয়ারেন্স সেন্টার অফ আমেরিকা।
আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির অবস্থাও পাইরেসির কারণে নাকাল। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এম আই বি) তথ্যমতে চলতি বছর অডিও বাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ এক কোটি টাকার কম এবং রিলিজকৃত অ্যালবামের সংখ্যা শতকের ঘরে পৌঁছতে পারেনি। যার জন্য দায়ী পাইরেসি অথচ ২০০৭ সালেও এ সেক্টরে বিনিয়োগ ছিল পাঁচ কোটি টাকা এবং নতুন প্রকাশিত অ্যালবামের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০টি। আমাদের দেশে কপিরাইট নিয়ে সচেতনতা নেই। বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেনি কোনো কপিরাইট সমিতি। সারা বিশ্বময় মেধাস্বত্ব রক্ষায় বিভিন্ন সমিতি গড়ে উঠলেও আমাদের দেশে এই জাতীয় উদ্যোগ একেবারেই অনুপস্থিত। তবে বাংলাদেশে বলবৎ আইনে কপিরাইট সমিতি (ধারা ৪১-৪৭) গঠন লাইসেন্স গ্রহণের সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশের টকশোনির্ভর সুশীল সমাজ মেধাস্বত্বের রক্ষায় একটা মেধাস্বত্ব সমিতিও গড়ে তুলেনি। বাংলাদেশের কপিরাইটের বিষয় দেখভাল করার একমাত্র প্রতিষ্ঠান রেজিস্ট্রার অব কপিরাইটের কার্যালয়। প্রতিষ্ঠানটি আগারগাঁয়ের ছায়াশীতল জাতীয় গ্রন্থাগারের ভেতর শীতলভাবেই কাজ করে। এই কার্যালয়ের তথ্য মতে ৩১ অক্টোবর ২০১২ তারিখ পর্যন্ত কপিরাইট আইনে রেজিস্ট্রেশনকৃত কর্মের সংখ্যা ১১৬৯৯টি (রেকর্ড কর্ম ৬৮৯, শিল্পকর্ম ৭১১০টি এবং সাহিত্যকর্ম ৩৯০০টি)। ২০১৩ সালে কপিরাইটের জন্য আবেদনকৃত ৪৯৯টি কর্মের মধ্যে ৩৭২টিকে রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়েছে। যদিও কপিরাইট অফিসে প্রয়োজনীয় জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্টের অপ্রতুলতা রয়েছে। কপিরাইটের বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে আগে প্রয়োজন মেধাস্বত্বের রক্ষার প্রত্যয়ে উজ্জীবিত নাগরিক সমাজ। প্রয়োজন কপিরাইট অফিসের অটোমেশন। কারণ দেশের যে-কোনো প্রান্তে বসে যেন কপিরাইট রেজিস্ট্রেশনের যাবতীয় কাজ করা যায়, তার ব্যবস্থা ত্বরিত গ্রহণ প্রয়োজন। এ সংক্রান্ত কাজে যেন ঢাকার কপিরাইট অফিসে না-আসতে হয় তার ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারিভাবে কপিরাইট অফিসের জন্য ঢাকার আগারগাঁয়ে প্রাপ্ত জমিতে স্বনির্ভর কপিরাইট অফিস স্থাপন হলে এই প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মেধাসম্পদ রক্ষার প্রধান তিনটি নিয়ামক (আইন, ব্যবস্থাপনা, আইনের প্রয়োগ) প্রয়োগ কাম্য মাত্রায় নেই। অবশ্যই মেধাস্বত্বের রক্ষণে প্রয়োজনীয় করণীয় গ্রহণের মাধ্যমে শুধু সৃজনকর্ম নয়, এ কে পণ্যে রূপান্তর করতে বিনিয়োগকৃত অর্থেরও মুনাফা নিশ্চত করা দরকার। কেননা, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গত শতাব্দী ছিল আইটির (ওঞ); আর এ শতাব্দী হবে আইপির (ওচ, ইনটেলেকচুয়াল প্রোপ্রার্টি)।
প্রযুক্তির হাওয়া বিশ্বকে এফোঁড়-ওফোঁড় করছে। প্রযুক্তির প্রভুত্ব আমরা মানতে বাধ্য। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে যেভাবে তথ্যভাণ্ডার সৃষ্টি করে ব্যবহারকারীদের দ্রুত ও সহজে হাতের নাগালে তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে, সে ক্ষেত্রে লেখকের মেধাস্বত্ব নিয়ে বিশ্ব আজ চিন্তিত। প্রযুক্তির সম্প্রসারণশীল বক্তব্য হচ্ছে : ‘যা নাই ভূগোলে/ তা আছে গুগলে।’ কিন্তু প্রযুক্তিবিদরা নিজেদের ডামাডোল বাজাতে গিয়ে বেমালুম ভুলে যান- ভূগোলের জ্ঞান নিয়েই কিন্তু গুগলের সৃষ্টি হয়েছে। আর এই সৃষ্টিরও মেধাস্বত্বের রক্ষণ প্রয়োজন। তথ্য প্রযুক্তির অবারিত দ্বার খুলে দিতে গিয়ে মেধাস্বত্বের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হচ্ছে। মেধাস্বত্বের রক্ষায় আইনের মান্যতা ছাড়াও সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক স্থাপন করে সৃষ্টিশীল কর্মের মর্যাদা রক্ষার বোধে মিছিলে শামিল হওয়া।

দশম জাতীয় সংসদ- কেন বিরোধী দল জরুরি? by আলী রীয়াজ

দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে আজ ২৯ জানুয়ারি। দিনটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতি এবং সংসদীয় ইতিহাসের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন বলে আমাদের বিবেচনা করা দরকার।
সেটা কেবল এই কারণে নয় যে এই সংসদে আসন নেবেন এমন সাংসদের অর্ধেকেই প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হননি। কেবল এই কারণেও নয় যে এই নির্বাচন বিতর্কিত। এই কারণে যে এই সংসদে কোনো বিরোধী দল থাকবে না। গতকালের আলোচনায় আমরা দেখেছি, কেউ কেউ এই যুক্তিতে একে সমর্থন করছেন যে গত সংসদের বিরোধী দল বিএনপি তার ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো রকম ভিন্নমত না পোষণ করেও বলা যায়, ১৯৯১ সালে থেকেই সংসদে বিরোধী দল তার ভূমিকা পালনে সফল হয়নি।

তার পরেও আমরা কেন সংসদে বিরোধী দল থাকার ওপর জোর দিতে চাই?
সংসদীয় ব্যবস্থার উদ্ভবের ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁদের এ কথা অজানা নয় যে ব্রিটেনের পার্লামেন্টে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে সাংসদেরা যদি তাঁদের ব্যক্তিগত, স্থানীয় কিংবা বিশেষ ধরনের ক্ষোভের বাইরে কিছু বক্তব্য দিতেন, তবে তাঁর পরিণতি হতো ভয়াবহ। রাজার বিরোধিতা, উত্তরাধিকারের অধিকার, পররাষ্ট্রনীতি বা ধর্মের মতো জাতীয় বিষয় নিয়ে বিতর্ক করলে কারাবাস ছিল নিশ্চিত, প্রাণহানির আশঙ্কা কোনো কল্পিত বিষয় ছিল না। তার অর্থ হলো, পার্লামেন্ট সদস্যরা রাজার বিরোধী হতে পারবেন না; ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তাঁরা সংসদে নির্বাচিত হননি। তাঁদের কাজ বড়জোর আলাদাভাবে ব্যক্তি হিসেবে তাঁদের ভোটারদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে রাজার দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
ইতিহাসবিদেরা এও জানান যে অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে পরিচিত ইংল্যান্ডেও বিরোধী দলের ধারণার উত্থান হয়নি। বিরোধী দলের ধারণার উদ্ভবের আগে ‘বিরোধী’দের প্রধান ভূমিকা কী, সেটা স্পষ্ট রূপ লাভ করতে শুরু করে। বিরোধীরা কেবল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিরোধিতা করবে তা-ই নয়, তাঁরা বিকল্পও উপস্থাপনও করবে, সামগ্রিকভাবে রাজ্য শাসনের বিকল্প। এই বিকল্পের প্রশ্নেই ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক দলের উদ্ভব ঘটে; অন্যথায় সপ্তদশ শতকের গোড়ায়ও ‘দলাদলি’ এবং ‘পার্টি’কে কলঙ্কজনক বলেই মনে করা হতো। এ শতকেই আমরা দেখতে পাই, এই ধারণা সুস্পষ্ট রূপ নিতে শুরু করেছে যে ক্ষমতাসীন শক্তির বিরোধিতা করার বিষয়টি কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, তার জন্য সংগঠিতভাবে দল গঠন এবং আদর্শিক ও ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনার মধ্য দিয়েই সরকারের বিকল্প উপস্থাপন করা যেতে পারে। যে দেশে ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে বলাকে বিবেচনা করা হতো রাষ্ট্রদ্রোহ বলে, সেখানে ক্ষমতাসীনেরাও বিরোধীদের দল গঠন এবং জাতীয় বিভিন্ন প্রশ্নে তাদের অবস্থানকে বৈধ এবং সংগত বলে মনে করতে থাকে। ইংল্যান্ডে সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে রাজার উত্তরাধিকারের প্রশ্নকে, বিশেষত রাজা দ্বিতীয় জেমসের ক্ষমতায় আরোহণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কেই দল হিসেবে টোরি এবং হুইগ পার্টির আবির্ভাব ঘটে। রাজসিংহাসনে উত্তরাধিকারের প্রশ্ন সামনে নিয়েই সাংগঠনিকভাবে সংসদীয় বিরোধী দলের আবির্ভাব ঘটেছে।
জন স্টুয়ার্ট মিল ১৮৫৯ সালে অন লিবার্টি বইয়ে লিখেছেন, সুস্থ রাজনীতির জন্য যেমন দরকার স্থিতিশীলতার পক্ষের দল, তেমনি দরকার প্রগতিশীলতার বা সংস্কারের পক্ষের দল। বিপরীতমুখী চিন্তাভাবনার এবং আদর্শের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা সমাজে উপস্থিত থাকলে আমরা তার প্রতিফলন দেখতে পাব রাজনীতিতে সংসদে এবং সংসদের বাইরেও। আধুনিক অর্থে রাজনৈতিক দলের উদ্ভবের প্রশ্নটি গণতন্ত্রের সঙ্গেই জড়িত, সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার যে কারণে রাজনৈতিক দলকে ‘গণতন্ত্রের সন্তান’ বলে বর্ণনা করেছেন। গণতন্ত্রের একটা প্রধান লক্ষণ হচ্ছে যে এই ব্যবস্থা জনসাধারণকে পছন্দের সুযোগ দেয়; বিভিন্ন বিকল্পের মধ্য থেকে তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার নিশ্চয়তা কেবল গণতন্ত্রই দিতে পারে। একই সঙ্গে গণতন্ত্র সেই ভুল সংশোধনের সুযোগও উন্মুক্ত রাখে। রাজনীতিতে সেই সুযোগ দেওয়ার অবকাশ থাকে কেবল বিপরীতমুখী রাজনৈতিক দলের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে। কেবল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় একত্র মানুষের গোষ্ঠীকেই আমরা রাজনৈতিক দল বলে বিবেচনা করি না এই কারণে যে রাজনৈতিক দল গঠনের পেছনে আদর্শের প্রশ্নটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সে কারণে রাজনৈতিক দলকে জনগণের প্রতিনিধিত্বের দাবি করতে হলে আদর্শিকভাবে তার অবস্থানকে তুলে ধরতে হয় এবং ক্ষমতাসীনের বিপরীতে তাদের নীতিকে তুলে ধরতে হয়। একইভাবে তা ক্ষমতাসীন দলের জন্যও প্রযোজ্য, তাকে দেখাতে হয় যে সে কেন বিরোধীদের থেকে শ্রেয়।
তাহলে আমরা দেখতে পাই যে রাজনৈতিক দল এবং সংসদীয় বিরোধী দলের প্রধান কাজ হচ্ছে জবাবদিহির দাবি তোলা এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া। সংসদীয় ব্যবস্থায় সংসদের প্রধান কাজই হচ্ছে সেই নির্বাহী বিভাগের ওপরে নজরদারি করা। কিন্তু ১৯৯১ সালের পরে আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সেই ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাতে করে আমরা নির্বাচনের মাধ্যমে যে ধরনের সংসদ তৈরি হতে দেখেছি, তাতে যে দলই ক্ষমতায় গেছে, তারা সংসদকে তাদের প্রতিশ্রুত রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে পারেনি কিংবা চায়নি।
১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের পেছনে দলনির্বিশেষে যে ঐক্য হয়েছিল, তার অন্যতম কারণ ছিল এই যে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, তাতে করে ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ ঘটে এবং শাসন হয়ে পড়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এই ব্যবস্থা ব্যক্তিকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। সেই বিবেচনায়ই সংসদের কাছে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহির ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। সেটাই হলো সংসদীয় ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় কাজ। আর সেখানে সরকারি দলকে তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব বর্তায় বিরোধী দলের ওপর। মনে রাখতে হবে, তার আগে বাংলাদেশে সংসদীয় শাসনের অভিজ্ঞতা ছিল তিক্ত। কিন্তু স্বল্প সময়ের সেই অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে দেশের রাজনীতিবিদেরা সংসদীয় ব্যবস্থাকে অগ্রহণযোগ্য মনে করেননি। বিজয়ী দল হিসেবে বিএনপি তাদের ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থার কথা থাকা সত্ত্বেও জনমত এবং বিরোধী দলের যুক্তিসংগত সংসদীয় চাপের মুখে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সংবিধানের যে দুটি সংশোধনী সর্বসম্মতভাবে পাস হয়েছে, এটি তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের যে কারণ, সেই জবাবদিহির ব্যবস্থার ক্ষেত্রেই সরকারি দল এবং সংসদ দুই-ই ব্যর্থ হয়েছে। তাতে করে আমরা দেখতে পেয়েছি, সাংবিধানিকভাবেই প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং তার উপর্যুপরি অপব্যবহার হয়েছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সাংসদেরা কার্যত এক ব্যক্তির ইচ্ছাধীন হয়ে পড়েছেন। সেটা কোন দল ক্ষমতায় থাকল, তার ওপর নির্ভর করেনি। বাংলাদেশের প্রায় সব দলের ভেতরেই গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি এবং দলের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা রাজনীতিতে জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থাকেই যখন তিরোহিত করে ফেলেছে, সে সময়ে সংসদে বিরোধী দলের অনুপস্থিতির কারণে গোটা সংসদই প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। আর তা কোনো অবস্থাতেই ১৯৯১-পূর্ববর্তী জবাবদিহির ঊর্ধ্ব বিরাজমান ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতির চেয়ে ভিন্ন কিছু হবে না। শুধু তা-ই নয়, এ ক্ষেত্রে যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক এবং সংবিধান-বহির্ভূত ক্ষমতা হবে সীমাহীন, সেহেতু তার প্রয়োগ এবং অপপ্রয়োগের প্রভাব হবে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি।
আলী রীয়াজ: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, রাজনীতি ও সরকার বিভাগ, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র।

দশম জাতীয় সংসদ- বিরোধী দলবিহীন সংসদ by আলী রীয়াজ

বাংলাদেশে যে অভূতপূর্ব সংসদীয় ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছে এবং ২৯ জানুয়ারি যার অভিষেক হতে চলেছে, তাতে বিরোধী দলের কোনো অস্তিত্ব নেই।
জেনারেল এরশাদ বা রওশন এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিকে গেজেট প্রকাশ করে বিরোধী দলের আসনে অভিষিক্ত করার পরেও একে সরকারি-বিরোধী দল বা বিরোধী-সরকারি দল বলেই আমরা জানব। কবি হলে জাতীয় পার্টির অবস্থানকে আমরা ‘ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি’ বলে বর্ণনা করতে পারতাম। সংসদীয় ব্যবস্থার ইতিহাসে বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের অনুপস্থিতির কোনো ইতিহাস না থাকলেও আমরা এখন এক নির্বাচনের মধ্য দিয়েই তার আবির্ভাব দেখতে পাচ্ছি। তার পরিণতি কী হতে পারে, সে বিষয়ে আমরা কতটুকু জ্ঞাত এবং চিন্তিত?

১৯৯০ সালের স্বৈরশাসনের অবসানের পর ১৯৯১ সালে গঠিত পঞ্চম সংসদে সব দলের সম্মতিতে সংবিধান সংশোধন করে সংসদীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং একটি গণভোটের মধ্যে যাতে নাগরিকদের সম্মতি নেওয়া হয়েছিল, তার মর্মবাণীই কি এখন ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে? এই বিষয়টি আরও বেশি করে বিবেচনার দাবি করে এই কারণে যে আজকে বিকাশমান এই অবস্থায় তৎকালীন স্বৈরশাসকের ছায়া নয়, তাঁর এবং তাঁর দলের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি দেখতে পাই। প্রশ্নবিদ্ধ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত একটি সংসদ, যাতে অধিকাংশ নাগরিকের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ ছিল না, তার গঠনই এখন সংসদের মূল দায়িত্ব থেকে সরে এসে কী ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশের সূচনা করতে চলেছে, তার প্রতিক্রিয়া কী, সেটা গভীরভাবে ভাবা দরকার।
এই নতুন পরিস্থিতিতে যাঁরা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সমর্থন করেছেন, তাঁদের অনেকে এই কথা বলার চেষ্টা করছেন যে যেহেতু গত পাঁচ বছরে সংসদীয় বিরোধী দল বিএনপি কার্যত কোনো ভূমিকা পালন করেনি, সে ক্ষেত্রে বিরোধী দল থাকা না-থাকায় আদৌ কিছু যায়-আসে না। তাঁদের এই কথার পেছনে তাঁরা যে তথ্যগুলো হাজির করেন, সেটা অবশ্যই আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। নবম জাতীয় সংসদে বিরোধী দল বিএনপি ৭৪ শতাংশ অধিবেশন বর্জন করেছে এবং কার্যত কোনো ধরনের বিতর্কে অংশ নেয়নি। বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ৪১৮টি বৈঠকের মাত্র ১০টিতে উপস্থিত ছিলেন। এটি দল হিসেবে বিএনপির এবং সাংসদ হিসেবে খালেদা জিয়ার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যর্থতা বললে সামান্যই বলা হবে। যাঁরা এখন সংসদে বিরোধী দলের না থাকাকে বড় কিছু নয় মনে করছেন, তাঁরা এখানেই আলোচনাটি শেষ করতে চাইবেন।
কিন্তু এই তথ্য আমরা কি অতীতে, ১৯৯১ সালে থেকে যত সংসদ বহাল থেকেছে, তার থেকে আলাদা করে বিবেচনা করব? প্রথমেই যেটা স্মরণ করা দরকার তা হলো ১৯৯৬ সাল থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সংসদে বিরোধী দলের আকার ছোট হয়ে আসছে। ১৯৯১ সালে সংসদে বিরোধী দলের আসন ছিল ১৩৯টি, ১৯৯৬ সালে তা হয় ১২০টি, ২০০১ সালে ৭৮টি এবং ২০০৮ সালে ৩৪টি। যদিও এসব আসনসংখ্যা সরকারি ও বিরোধী দলের প্রাপ্ত ভোটের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না কিন্তু বিরাজমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের জনগণ সেটাকে অনিবার্য বলেই ধরে নিয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এও মনে রাখা দরকার, ১৯৯১-৯৬ সালে বিরোধী দল অনুপস্থিত থেকেছে ৩৪ শতাংশ অধিবেশন, ১৯৯৬-২০০১ সালে এই অনুপস্থিতির হার ছিল ৪৩ শতাংশ এবং ২০০১-০৬ সালে ছিল ৬০ শতাংশ। বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা ১৯৯১-৯৬ সালে ৪০০ বৈঠকের ১৩৫টিতে যোগ দেন, ১৯৯৬-২০০১ সালে খালেদা জিয়া যোগ দেন ৩৮২ বৈঠকের ২৮টিতে, ২০০১-২০০৬ সালে শেখ হাসিনা যোগ দেন ৩৭৩ বৈঠকের ৪৫টিতে। এই তথ্যগুলো আমাদের কাছে স্পষ্ট করে দেয় বাংলাদেশের দুই প্রধান দল, যারা পালাক্রমে সরকার ও বিরোধী দলের আসনে বসেছে, তারা সরকার চালাতে যতটা উৎসাহী হয়েছে, বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালনে ততটাই অনুৎসাহী হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, সংসদে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই যে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ক্রমাগতভাবে কমেছে। খুব সোজা ভাষায় বললে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল হিসেবে সব দলই ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এই প্রবণতার সঙ্গে ক্রমহ্রাসমাণ বিরোধী দলের আসনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং সরকারি দলের আকার বিরোধী দলের প্রতি তাদের আচরণকে প্রভাবিত করেছে কি না,
সেটা বাংলাদেশের রাজনীতির গবেষকেরা খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন বলে চোখে পড়েনি।
এই যোগসূত্র খোঁজার বদলে, তার কারণ অনুসন্ধানের বদলে আমরা কি এই শিক্ষা নেব যে বিরোধী দলেরই দরকার নেই? আমরা কি তাহলে ধরে নিচ্ছি যে আজকে যারা ক্ষমতাসীন, তাদের আর কখনোই বিরোধীদের আসনে বসতে হবে না? এই রকম ধারণার ইঙ্গিতই দেশে একদলীয় ব্যবস্থার আশঙ্কাকে সামনে নিয়ে আসছে। বিরোধী দলের দরকার নেই এই কথা মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলার পরামর্শের মতোই শোনায়। মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলার সমাধান যত সহজ শোনায় তার পরিণতি ততটাই ভয়াবহ।
বরং আমাদের এখন বিবেচনা করা উচিত যে বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দল কেন তার ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয় এবং এই বৃত্তচক্র ভাঙার পথ কী হতে পারে? সমাধান এটা হতে পারে না যে বিরোধী দলের ধারণাকেই সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়ে দিতে হবে। ২০০১
সালে বিএনপি যদি এই যুক্তি হাজির করত, তা যেমন অগ্রহণযোগ্য হতো, আজকে যাঁরা এই কথাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন করছেন, তাঁদের বক্তব্যও ততটাই অগ্রহণীয়। সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলের প্রয়োজন কেন, সেটা আমাদের বুঝতে হবে সংসদীয় ব্যবস্থার এবং
সুস্থ রাজনীতির ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে এবং সংসদ এবং রাজনীতিতে দলের ভূমিকার কথা মাথায় রেখে।

আলী রীয়াজ: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, রাজনীতি ও সরকার বিভাগ, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র।

দশম জাতীয় সংসদ- বিরোধী দলবিহীন সংসদ by আলী রীয়াজ

বাংলাদেশে যে অভূতপূর্ব সংসদীয় ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছে এবং ২৯ জানুয়ারি যার অভিষেক হতে চলেছে, তাতে বিরোধী দলের কোনো অস্তিত্ব নেই।

সরল গরল- ‘তথাকথিত বিরোধী দল’ ও বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গি by মিজানুর রহমান খান

একজন আর্জেন্টাইন বিচারকের কথা মেনে আজকের সংসদ অধিবেশন সামনে রেখে এই লেখা। সামরিক অভ্যুত্থান ঘটলে বিচারক কী করবেন?
দুটো বিকল্প—ইস্তফা দিয়ে বাড়ি চলে যাবেন, না-হয় স্বপদে বহাল থেকে আইনের শাসনের ঝান্ডা যদ্দুর সম্ভব আগলানোর চেষ্টা চালাবেন। ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পরে আমার কাছে দ্বিতীয় বিকল্পই ভরসা।

বিরোধী দল ছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্র চলতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশে চলে। এবং তা এবারই প্রথম নয়। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদে বিরোধী দলের নেতা ছিলেন না। সেই প্রেক্ষাপট ভিন্ন। অবৈধ উপায়ে মন্ত্রিত্ব লাভ ঠেকাতেই বঙ্গবন্ধু ৭০ অনুচ্ছেদ এনেছিলেন। এবারে তার শ্রাদ্ধ ঘটল। সরকারের ‘বিরোধিতাকারী’ দল মন্ত্রিত্ব করে গাছেরটা খাবে। মন্ত্রীর পদমর্যাদায় বিরোধী দলে থেকে তলারটাও কুড়াবে। সত্যি, এর কোনো তুলনা নেই। অভাবনীয়, অভূতপূর্ব, অশ্রুতপূর্ব। এবারে আইনের একটা ফাঁক বলব। রওশন এরশাদের ‘সরকার বিরোধিতা’ ও তাঁর দলের মন্ত্রীদের যৌথ জবাবদিহির আইনগত বৈধতা স্বতন্ত্র সদস্যদের গ্রুপটি তুলতে পারবে। যদি কখনো পরিবেশ আসে, তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তাঁরা এটি ব্যবহার করতে পারেন। এই গ্রুপটিতে সুযোগসন্ধানী আছেন। আবার কিছু ভূমিকা রাখার হিম্মতওয়ালাও আছেন।
স্পিকার যখন বিরোধী দলের নেতার প্রজ্ঞাপন দেন, তখনো জাপা মন্ত্রিত্ব নেয়নি। তাই তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন। বিরোধী দলের নেতা প্রসঙ্গ ছাড়া কোথাও রওশনের ‘দল’ এবং হাজি সেলিমের ‘গ্রুপ’ শব্দ দুটিতে পার্থক্য দেখা যাবে না। কেবল বিরোধীদলীয় নেতার সংজ্ঞা দিয়েছে কার্যপ্রণালি বিধি। এটি বলেছে, ‘বিরোধী দলের নেতা অর্থ স্পিকারের বিবেচনামতে সরকারি দলের বিরোধিতাকারী সর্বোচ্চসংখ্যক সদস্য নিয়ে গঠিত দল বা গ্রুপের নেতা।’
কে বিরোধী দলের নেতা হবেন, তা নিয়ে ১৯৭৩ সালের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনার দাবি রাখে। আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন পেয়েছিল। সংসদীয় দল ও গ্রুপ সম্পর্কে প্রথম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকালেই বিতর্ক ওঠে। সরকারদলীয় একজন সদস্য সংসদে সরকারের বিরোধিতাকারী সদস্যদের ‘তথাকথিত বিরোধী দল’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। সরকারের বিরোধিতাকারী গ্রুপের এক সদস্য আপত্তি তোলেন। বৈধতার প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আমরা সরকার কর্তৃক স্বীকৃত বিরোধী দল’। দুর্বল যুক্তি ছিল তাঁদের। সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতির ওপর তাঁরা জোর দেননি। যুক্তি দিয়েছেন, ‘বিরোধী দলের নেতাকে একটি কক্ষ দেওয়া হয়েছে। মাননীয় স্পিকার যখন এভাবে আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছেন, তখন সংসদে বিরোধী দল আছে কি না, এ সম্পর্কে রুলিং চাই। তিনি ১৯৬৫ সালের দ্য লিডার অব দি অপজিশন (প্রিভিলেজেস) অ্যাক্ট উল্লেখ করে বলেছিলেন, বিরোধী দলের নেতা হওয়ার জন্য কয়জন সদস্য বিরোধী দলে থাকতে হবে, ওই আইনে তা বলা নেই। বৈধতার এই প্রশ্ন নিয়ে সংসদে প্রায় ২০ মিনিট ধরে বিতর্ক হয়।
সরকারের বিরোধিতাকারী কয়েকটি দলের সংসদ সদস্য ও কয়েকজন নির্দলীয় সংসদ সদস্য সংসদকক্ষে আলাদা বসার ব্যবস্থা করার জন্য স্পিকারের কাছে অনধিক সাতজন একটি আবেদন করেছিলেন। ১৯৭৩ সালের ১৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ওই বিতর্কে জাতীয় লীগের আতাউর রহমান খান, জাসদের আবদুস সাত্তার এবং চারজন নির্দলীয় সদস্য অংশ নেন। নির্দলীয়রা ছিলেন—সৈয়দ কামরুল, মুহাম্মদ আবদুল্লাহ সরকার, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এবং চাই থোয়াই রোয়াজা।
ওই আবেদনে স্বাক্ষরকারীরা স্পিকারকে জানিয়েছিলেন, আতাউর রহমান খান তাঁদের নেতা। সেদিন যদি সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হতো, তাহলে খান হতেন দেশের ইতিহাসের প্রথম বিরোধী দলের নেতা। সেটা কেন হয়নি, তা অনুমান করা কঠিন নয়। কারণ, সংসদ নেতা সেটা চাননি। বিরোধী দলকে সংখ্যার নিক্তিতে মাপা হয়েছিল। এখনো সেই ধারা চলমান।
আতাউর রহমান খান মত দিয়েছিলেন, সংখ্যা দেখবেন না। সংসদে সরকারের বিরোধিতাকারী দল বা গ্রুপ নেতাকে স্পিকার বিরোধী দলের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেন। তাঁর মতে, ‘স্পিকারের স্বীকৃতির জন্য দল বা গ্রুপ ন্যূনতম কতজন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে, কার্যপ্রণালি বিধিতে তার কোনো উল্লেখ নেই।’ এই আইনগত অবস্থান আজও একই রয়ে গেছে। আতাউরের যুক্তি আজ বেশি বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ, রওশন এরশাদের নেতৃত্বাধীন দলটি সংখ্যায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হলেও তারা ‘সরকারের বিরোধিতাকারী’ সংজ্ঞায় পড়ে না। পদে পদে বিধিবিধান লঙ্ঘিত হবে। তাই আতাউরের যুক্তি আজও বিবেচনাযোগ্য যে, ‘যেকোনো সংখ্যক সদস্য নিয়ে গঠিত দল বা গ্রুপের নেতাকে স্পিকার বিরোধী দলের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেন।’ ১৬ সদস্য নিয়ে স্বতন্ত্রদের গ্রুপটি বৃহত্তম।
তিয়াত্তরে ওই বিতর্কের সমাপনী বক্তৃতায় সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে যুক্তি দিয়েছিলেন, তা তখন খুব সঠিক ছিল না এবং আজকের প্রেক্ষাপটে তো সঠিক বলে মানার সুযোগ আরও সীমিত। সংসদ নেতা বলেছিলেন, ‘আতাউর রহমান খান একা এক দলের একজন, আরেকদলের একজন, আর কয়েকজন নির্দলীয় সদস্য মোট পাঁচ-সাতজন সদস্য সংসদ ভবনে একটি কক্ষে একটি জায়গায় বসতে চেয়েছেন এবং এ ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।’ বঙ্গবন্ধুর সংখ্যাতত্ত্বের কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না, এখনো নেই। সংসদ নেতা হিসেবে তাঁর যুক্তি ছিল, ২৫ জনের কম সদস্য নিয়ে গঠিত কোনো দলকে বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। তবে ২৫ জনের কম সদস্য নিয়ে কোনো দল গঠিত হলে এবং ওই দলে কমপক্ষে ১০ জন সদস্য থাকলে ওই দলকে পার্লামেন্টারি গ্রুপ বলা যেতে পারে। কিন্তু সংসদীয় দল বলা যাবে না। (সংসদ বিতর্ক, ১২ এপ্রিল ১৯৭৩, পৃষ্ঠা: ৯৬-৯৭)।
কতজন সাংসদকে নিয়ে বিরোধী দল হতে পারে, তা অনিষ্পন্ন থেকে গেছে। বঙ্গবন্ধুর ওই অভিমতই এ বিষয়ে একমাত্র দিকনির্দেশনা। তবে সিঙ্গাপুরের জনক লি কুয়ান টানা চারটি সংসদে বিরোধী দল না থাকার পরে ১৯৮৪ সালে মত বদলান। এখন সংবিধানমতে বিরোধী সাংসদ থাকতেই হবে। কেউ না জিতলেও বেশি ভোটে পরাজিত অনধিক নয় প্রার্থী সংসদে সমমর্যাদায় বসবেন। এঁদের বলা হয় নন-কনস্টিটিউয়েন্সি মেম্বার অব পার্লামেন্ট বা এনসিএমপি।
সংসদ বিশেষজ্ঞ খোন্দকার আবদুল হক বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ওই দিকনির্দেশনা পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের অভিজ্ঞতা থেকে বর্ণিত এবং ভারতসহ এই উপমহাদেশের সংসদীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।’ তাঁর মতে, ‘খান নিজেও সংসদীয় কনভেনশন সম্পর্কে সংসদ নেতার সঙ্গে দ্বিমত করেননি। খানের যুক্তি ছিল, প্রধানমন্ত্রীর বর্ণিত কনভেনশন আইন দ্বারা অগ্রাহ্য করা সম্ভব।’ সেই আইন হয়নি। আর ওই কনভেনশন মানলেও ২০১৪ সালের রওশনের দলের মন্ত্রিত্ব ও তাঁর ‘স্বামীর দোয়ায়’ বিরোধী দলের নেতা হওয়া সংবিধান ও কনভেনশন দুটোরই পরিপন্থী। তাই আজ থেকে সংসদে যত ভোটাভুটি হবে, তার গোটা প্রক্রিয়ার আইনগত বৈধতার প্রশ্ন খড়্গের মতো ঝুলতে থাকবে।
খোন্দকার আবদুল হকের মতে, ৩১৫ সদস্যবিশিষ্ট প্রথম সংসদে আওয়ামী লীগ ৩০৭টি আসন লাভ করেছিল বলে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে কোনো সদস্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ ছিল না। এর সঙ্গে আমি দ্বিমত করি; বরং বলব, এটা করে গোড়াতেই বিরোধী দলের প্রতি আওয়ামী লীগের ভ্রান্ত ধারণার বীজ রোপিত হয়েছে।
২০১৪ সালের আইনগত প্রশ্ন আর ১৯৭৩ সালের আইনগত প্রশ্নের মতো আরও অনেক মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সেটা হলো, কার্যপ্রণালি বিধি প্রতিনিয়ত লঙ্ঘন করে একটি সংসদ চলতে পারে না। কারণ, জাতীয় পার্টি থেকে যারা মন্ত্রিসভায় রয়েছেন, তাঁদের দলনেতা প্রধানমন্ত্রী এবং একই সঙ্গে তাঁদের দলনেতা রওশন এরশাদ। এটা আইনসংগত বা সংবিধানসম্মত নয়। সুতরাং হাজি সেলিমের গ্রুপের যে কেউ রওশন এরশাদ বিরোধী দলের নেতা কি না, সেই প্রশ্ন তুলতে পারেন। সত্যিকারের ‘সরকারবিরোধী’ হিসেবে যদি অনধিক ১০ জনও দাবি করতে পারেন, তাহলে স্পিকার তাঁদের গ্রুপের নেতাকেই বিরোধী দলের নেতা করবেন।
কোনো সংসদীয় দল বা গ্রুপের নেতা নির্ধারণে স্পিকারের কোনো ক্ষমতা নেই। স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সপ্তম সংসদে বলেছিলেন, ‘সরকারি দল এবং প্রধান বিরোধী দল ব্যতীত অন্য কোনো সংসদীয় দল বা গ্রুপের নেতা-সম্পর্কিত কোনো বিধান নেই। সুতরাং এসব দল বা গ্রুপের নেতা নির্বাচনের বিষয়টি তাঁদের নিজস্ব ব্যাপার। এখন পর্যন্ত সংসদে অন্য কোনো দল বা গ্রুপের নেতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি বা অনুরূপ স্বীকৃতিদানের কোনো সুযোগ রয়েছে বলে দেখা যায় না।’ (সংসদ বিতর্ক, ৬ জুন ২০০১)।
সংবিধানে বর্ণিত একটি বিশেষ অবস্থায় স্পিকারের ওপর ‘সংসদীয় দলের নেতৃত্ব’ নির্ধারণের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে। কিন্তু কতজনকে নিয়ে এই দল হবে, সংবিধান সে বিষয়ে নীরব।
নির্বাচনের পরে প্রত্যেক সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন সম্পর্কে স্পিকারকে যথাযথভাবে অবহিতকরণের একটি বিধান থাকা দরকার। এটা না থাকার সুযোগ স্পিকার নিয়েছেন। এরশাদকে শপথ পড়িয়েই তিনি বিরোধী দলের নেতার প্রজ্ঞাপনটি জারি করেন।
চেতনাগতভাবে হাজি সেলিমের গ্রুপকেই প্রকৃত বিরোধী দল মনে হতে পারে। এদের মতো সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলার মতো উক্তিও সাবেক ফার্স্ট লেডির পার্টি করছে না। এটা কৌতূহলোদ্দীপক যে, রওশন ও হাজি সেলিম সংসদে কখন কে কার হবেন? তাঁরা আমাদের আইনপ্রণেতা। আইনকানুন ভাঙচুর করতে করতে তাঁরা এগিয়ে যাবেন। তা সত্ত্বেও খুশি হব, যদি ১৯৭৩ সালের সংসদ নেতার সিদ্ধান্তটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

সরল গরল- ‘তথাকথিত বিরোধী দল’ ও বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গি by মিজানুর রহমান খান

একজন আর্জেন্টাইন বিচারকের কথা মেনে আজকের সংসদ অধিবেশন সামনে রেখে এই লেখা। সামরিক অভ্যুত্থান ঘটলে বিচারক কী করবেন?

যুক্তরাষ্ট্র- ‘বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসীদের’ নিয়ে উদ্বেগ by রাহীদ এজাজ

টুইন টাওয়ারে হামলার (৯/১১) পর গোয়েন্দা সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট মার্কিন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বেড়েছে। জোরদার হয়েছে সন্ত্রাসবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও।
আর ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর ৯/১১-এর মতো তাণ্ডব চালানোর সামর্থ্য এখন আর আল-কায়েদার নেই বলেই ধারণা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের। এর পরও স্বস্তিতে নেই যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, দেশটির অভ্যন্তরের বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গজিয়ে উঠেছে। গত এক দশকে দেশের নানা প্রান্তে বিচ্ছিন্নভাবে বেড়ে ওঠা এসব গোষ্ঠীকেই নিয়েই এখন উদ্বেগ মার্কিন প্রশাসনের। সন্ত্রাস আর জঙ্গি তৎপরতা থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে মার্কিন নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের নজরদারি বেড়েছে। নিউইয়র্কে এ নজরদারিটা অভিবাসী এশীয় ও মুসলিমদের ওপর বেশি এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নজরদারি নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের ছবিটা নিউইয়র্কের ঠিক উল্টো। লস অ্যাঞ্জেলেসের পুলিশ বিভাগের (এলএপিডি) উপপ্রধান মাইকেল ডাউনিং জানান, অভিবাসী লোকজনের ওপর নজরদারি নয়, তাদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনে সফল হতে হবে। এরই অংশ হিসেবে এলএপিডির কর্মকর্তারা বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা লোকজনের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনে যুক্ত থাকেন।
সামগ্রিকভাবে গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের ঝুঁকি অনেকখানি কমেছে। এ জন্য দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এজেন্সি, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এফবিআই), জাতিসংঘের সন্ত্রাসবাদ দমন কমিটি, উইলসন সেন্টার, ব্রুকিংস ও র‌্যান্ডের মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ অভিমত পাওয়া গেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ফরেন প্রেস সেন্টার এ মাসের শুরুতে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের গণমাধ্যমকর্মীদের সন্ত্রাসবাদ দমনবিষয়ক এক সফরের আয়োজন করে। এ সফরের অংশ হিসেবে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেস সফর করি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ দমন বিভাগের উপ-সমন্বয়কারী জাস্টিন সিবেরেল মনে করেন, আল-কায়েদার প্রভাববলয় গুঁড়িয়ে দেওয়া গেলেও ভৌগোলিকভাবে এর মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন স্থাপনায় হামলার ক্ষমতা হয়তো তাদের নেই। তবে ওসামা বিন লাদেনের জিহাদি আদর্শে তরুণদের প্রলুব্ধ করার ক্ষমতা আছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যান্ড করপোরেশনের নীতিমালাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক এন্ড্রু লিয়েপমেনের মতে, লিবিয়ার বেনগাজিতে মার্কিন দূতাবাসে হামলা ও বোস্টন ম্যারাথনে বোমা হামলা সন্ত্রাসবাদ দমন নিয়ে নতুন করে ভাবনা জাগায়। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তো বটেই বিশ্বের নানা প্রান্তে ওসামা বিন লাদেনের আদর্শকে ধারণ করে অনেক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এসব গোষ্ঠীর এজেন্ডাগুলো বৈশ্বিক না হয়ে আঞ্চলিক হয়ে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে এরা খেলাফত প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করছে। তাই সামগ্রিকভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জয় হয়েছে বলাটা কঠিন।
র‌্যান্ড করপোরেশনের প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রায়ান মাইকেল জেনকিন্স লাদেনের মতাদর্শের ভিত্তিতে দেশের নানা প্রান্তে বেড়ে ওঠা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন নেকড়ে হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, বিচ্ছিন্ন হলেও এসব গোষ্ঠী লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় নিজেদের পারঙ্গম করে তুলছে। তবে মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ব্রায়ানের ভয়টা আগামী দিনগুলো নিয়ে। কারণ, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রায় দেড় হাজার মানুষ সিরিয়া যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে, তাদের মধ্যে ৭০ জনেরও বেশি মার্কিন নাগরিক যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা হুমকি সৃষ্টি করবে, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
লস অ্যাঞ্জেলেস শেরিফের দপ্তরের জরুরি ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক জেফ রিব জানান, বিচ্ছিন্নভাবে দেশের নানা প্রান্তে এসব সন্ত্রাসী সংগঠন গড়ে উঠছে। বিশেষ করে, কারাগারে যাওয়ার পর চিরকুট বিনিময়সহ নানাভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে এই সন্ত্রাসীরা পারস্পরিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। দেশের ভেতরেই সন্ত্রাসীরা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে, বিচ্ছিন্নভাবে এসব গোষ্ঠী বিকশিত হচ্ছে—এমন উদ্বেগ থেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর সন্দেহ ও নজরদারি বেড়েছে।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের লিবার্টি অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের সহপরিচালক ফাইজা প্যাটেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীকে অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ বা অপরাধমূলক কাজ করতে পারে—এমন সন্দেহের দৃষ্টি পড়ছে এশীয় ও মুসলমানদের ওপর। তাই মুসলমান তরুণেরা কখন, কোথায় যায় এবং মসজিদে ইমাম কী বলেন, সেদিকে তীক্ষ নজর রাখা হচ্ছে।
সন্দেহের বশবর্তী হয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক মার্কিন তরুণের সঙ্গে দেখা হয়েছিল নিউইয়র্কে। প্রায় দেড় দশক আগে মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওই তরুণ পাড়ি দেন যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর কাছে জানা গেল মাস চারেক আগে এক ভোরে এফবিআই কর্মকর্তারা হাজির তাঁর বাড়ির দুয়ারে। এফবিআই কর্মকর্তাদের দেখে সংগত কারণেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তরুণের বাড়ির লোকজন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গোয়েন্দারা তাঁকে সঙ্গে নিয়ে দপ্তরে যান। নিরাপত্তা সংস্থার লোকজনের প্রশ্ন শুনে তরুণটি বুঝে ফেলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি গোয়েন্দাদের নজরদারিতে ছিলেন। তিনি মুসলিম কি না, তাঁরা জানতে চান। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাঁকে বলেন, মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু দেখলে তিনি যেন তাঁদের অবহিত করেন।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আন্তদেশীয় সহযোগিতার পাশাপাশি নিজেদের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সহযোগিতা বাড়ার কারণে নিরাপত্তার ঝুঁকি আগের চেয়ে কমেছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এজেন্সির ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, বিদেশি শত্রুদের বিরুদ্ধে আন্তসরকার সহযোগিতা করাই তাদের মূল কাজ। অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ঠেকানো, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সন্ত্রাসবিরোধী উদ্যোগকে মাথায় রেখে অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করাও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। শুধু মানুষ নয়, পণ্য চলাচলের ওপরও দৃষ্টি রাখে ওই বিভাগ।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অর্ধেকটাই প্রচার মাধ্যমকেন্দ্রিক বলে মনে করে মার্কিন প্রশাসন। তাই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাল্টা প্রচারণাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জঙ্গিদের বার্তা ব্যবহার করেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের কাজের সমালোচনার মাধ্যমে জঙ্গিদের চরিত্র উন্মোচিত করার দাবি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের।
ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক কাউন্টার টেররিজম কমিউনিকেশনসের (সিএসসিসি) সমন্বয়ক আলবার্তো ফার্নান্দেজ জানালেন, ২০১১ সাল থেকে তাঁর দপ্তর প্রচারমাধ্যমে জঙ্গিদের এভাবেই প্রতিহত করছে।
আলবার্তো বলেন, ‘আমরা গত ডিসেম্বরে ইয়েমেনের রাজধানী সানার হাসপাতালে আল-কায়েদার নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ভিডিও প্রচার করেছি। এরপর ওই ভিডিওতে প্রশ্ন তুলেছি ইসলাম ও শান্তির ডাক যারা দিচ্ছে, তারা কি আসলেই শান্তি চায়? এতে জনসমক্ষে তারা হেয়প্রতিপন্ন হয়েছে। ফলে ওই হামলার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে আল-কায়েদা। এ থেকেই লোকজন বুঝতে পারছে এদের স্বরূপ।’
শুরুতে সিএসসিসি প্রচারণা কার্যক্রমের বড় অংশটাই ছিল আরবিতে। এ ছাড়া সোমালি ভাষায়ও হয়। সম্প্রতি পাঞ্জাবি ও উর্দুর পাশাপাশি ইংরেজিতেও এ প্রচারণা শুরু হয়েছে। এমনকি জঙ্গিদের প্রতিটি ভিডিও বার্তা কিংবা প্রতিদিন ফেসবুক, টুইটারের প্রতিটি পোস্টের পাল্টা জবাব দেওয়া হয়।
তবে আল-কায়েদার মতো জঙ্গি সংগঠন মোকাবিলায় নিজেদের সাফল্য নিয়ে আত্মতুষ্টি থাকলেও আলবার্তো ফার্নান্দেজ প্রতিপক্ষের দক্ষতা স্বীকার করতে ভোলেননি। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি জঙ্গি সংগঠনেরও মানসম্পন্ন প্রচারযন্ত্র রয়েছে, যাদের কর্মীরা যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন। তাদের প্রচারযন্ত্র যথেষ্ট দক্ষ, বৈচিত্র্যপূর্ণ ও আগ্রাসী মনোভাবসম্পন্ন। তাই তাদের বিরুদ্ধে আমাদেরও আক্রমণাত্মক হয়েই লড়তে হচ্ছে।’
এর পরও সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে বলে মত দেন সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা পল আর পিলার। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ব্রুকিংসে কর্মরত পল মনে করেন, অনেক উদ্যোগের পরও যুক্তরাষ্ট্রের এখনো অনেক মৌলিক ঝুঁকি রয়ে গেছে। নতুন করে বড় ধরনের কোনো সন্ত্রাসী হামলা ঘটলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

রাহীদ এজাজ: সাংবাদিক।

যুক্তরাষ্ট্র- ‘বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসীদের’ নিয়ে উদ্বেগ by রাহীদ এজাজ

টুইন টাওয়ারে হামলার (৯/১১) পর গোয়েন্দা সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট মার্কিন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বেড়েছে। জোরদার হয়েছে সন্ত্রাসবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও।

গদ্যকার্টুন- গম্ভীর ও অপ্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য নয় by আনিসুল হক

কিছু কিছু মানুষ আছেন, সব সময় সিরিয়াস। তাঁরা হাস্যরস নিতে পারেন না। হাস্যকৌতুককে তাঁরা অগ্রহণীয় বলে মনে করেন।

ক্রিকেট ও ভারত- অতি লোভে তাঁতি নষ্ট হবে না তো! by এ কে এম জাকারিয়া

‘ক্রিকেট একটি ভারতীয় খেলা, যা ঘটনাচক্রে আবিষ্কৃত হয়েছে ইংল্যান্ডে। এটা অনেকটা মরিচের মতো, যা আবিষ্কৃত হয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকায়, সেখান থেকে ভারতে এসেছিল মধ্যযুগে।

সময়চিত্র- অদ্ভুত সংসদ, অনিশ্চিত যাত্রা by আসিফ নজরুল

দশম জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়েছে ২৯ জানুয়ারি। এমনিতে সংসদের উদ্বোধনী দিনটিকে ঘিরে থাকে নানা আগ্রহ আর উদ্দীপনা।
এ দিন রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেন। তাঁর ভাষণ নিয়ে বিরোধী দল তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। পত্রিকায় তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিশদ আলোচনা হয়। প্রথম দিনেই বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে সাধারণত। ওয়াকআউটের আগে গরম কিছু বাক্যবিনিময় হয় সংসদে। টিভির সামনে এসব দেখে আমরা নানা আলোচনায় জড়িয়ে পড়ি। সংসদের কার্যকারিতার জন্য আসলে কী কী করা দরকার, তা নিয়ে আশাবাদ আর হায়-হুতাশ চলে। সংসদীয় কমিটিগুলো কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়েও চলে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। এবার তার অনেক কিছু নেই। এই সংসদে প্রকৃত বিরোধী দল নেই, এতে এমনকি প্রকৃত জনপ্রতিনিধি রয়েছেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলার বহু কারণ রয়েছে।

সংসদ আইন তৈরি, সংশোধন আর সরকারের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠান। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে সংসদ। একমাত্র এর প্রতিনিধিরা হন জনগণ কর্তৃক সরাসরিভাবে নির্বাচিত। সংসদীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক এই বৈশিষ্ট্যই এবার সংসদে অনেকাংশে অনুপস্থিত। এই সংসদে এমন বহু প্রতিনিধি রয়েছেন, যাঁদের জেতার কোনো সম্ভাবনা ছিল না, যাঁদের এলাকার মানুষ চেনে না, কেউ
কেউ এলাকায় যান কদাচিৎ। এমন বহু প্রতিনিধিও আছেন, যাঁরা আসলে নির্বাচিতই হয়ে আসেননি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৫১টি আসনে জয়। একটিমাত্র ভোট পড়ার আগে, নির্বাচনের দিন আসার আগেই দশম সংসদে তার চেয়ে বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়ে গেছেন ‘জনপ্রতিনিধিরা’। এই সংসদের আইনগত, নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এই সংসদ যদি শুধু সংবিধান রক্ষার নির্বাচন হয়ে থাকে, তাহলে এর আয়ু যত কম হবে, তত তা মঙ্গলজনক হবে দেশের জন্য।

২.
দশম সংসদ নিয়ে তবু আমাদের অনিশ্চয়তা কাটছে না। এই সংসদ পাঁচ বছরই থাকবে, এমন কথা বলার অনৈতিক ও অযৌক্তিক মনোভাব দেখাচ্ছেন সরকারি দলের কিছু নেতা। ইতিপূর্বে দেশে ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালে এ ধরনের একতরফা নির্বাচন হয়েছিল। আওয়ামী লীগ দুটি নির্বাচনকেই অবৈধ আখ্যায়িত করেছিল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে তাকে সম্পূর্ণভাবে অমান্য করতে সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিল। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী এরশাদের লাজলজ্জা আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কম ছিল। তিনি জোর করে দুই বছর পর্যন্ত থাকতে পেরেছিলেন। কিন্তু ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বিএনপির আত্মগ্লানি ছিল। তাই নির্বাচনের আগেই বিএনপি সেটি শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য, এমন ঘোষণা দিয়েছিল। নির্বাচনের দেড় মাসের মাথায় নতুন নির্বাচনের জন্য সংসদ ভেঙে দিয়েছিল। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সাংসদ এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যার হিসাবে ২০১৪ সালের নির্বাচন ১৯৮৮ এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের চেয়েও বেশি অগ্রহণযোগ্য ও একতরফা। কিন্তু এই নির্বাচনের মাধ্যমে অদ্ভুত ও নজিরবিহীন এক সংসদ গঠন করার পর এটিই পাঁচ বছরের জন্য বিরোধী দল ও জাতিকে মেনে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এখন।
দশম সংসদের পক্ষের লোকদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে এই সংসদের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ। এটি ঠিক যে আমাদের সংবিধান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন নিষেধ করেনি। কিন্তু অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টিকেও আমাদের সংবিধান অনুমোদন করেনি। যে দেশে কোনো স্কুলের অভিভাবক সমিতি বা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একটি আসনে বহু লোক দাঁড়িয়ে যান, সেখানে সংসদ নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে কেউ না দাঁড়ানোই একটি চরম অস্বাভাবিক পরিস্থিতির প্রমাণ। ১৯৯০ সালের পর কোনো নির্বাচনে একটি আসনেও এমন ঘটনা ঘটেনি, শুধু ১৯৯৬ সালে ৪৮টি আসনে এটি ঘটেছিল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনকে তাই আমরা অস্বাভাবিক ও অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলি, একই বিবেচনায় ২০১৪ সালের নির্বাচন বহুগুণ বেশি অস্বাভাবিক।
অস্বাভাবিকতা এক অর্থে বৈধতার সংকটের ইঙ্গিতবাহী। সরকারি কাজে যখন একটিমাত্র টেন্ডার প্রদানের ঘটনা ঘটে, তখন আমরা এটি অস্বাভাবিক বলে ধরে নিই। কোনো সন্ত্রাসী বা মাস্তানের ভয়ে অন্যরা টেন্ডার প্রদানে বিরত থাকে, এমন রিপোর্ট পত্রিকায় বের হয়, টেন্ডার বাতিল করা হয়। তখন কি আমরা বলি, আইনগতভাবে একটি টেন্ডার পড়লে সেটিই বৈধ ধরে নিতে হবে? বলি না। কারণ, আইন মানে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করে অন্যকে অংশ নিতে বাধা দিয়ে বা নিরুৎসাহিত করে নিজের স্বার্থোদ্ধার নয়।
দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, নতজানু নির্বাচিত কমিশন ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন নির্বাচনের ক্ষেত্রে একই ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করে, তা গত ৩০ বছরে আমরা আওয়ামী লীগসহ বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে বলতে শুনেছি। এবারের নির্বাচনে তা জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন আওয়ামী লীগের পক্ষে এমন কিছু নজিরবিহীন কাজ করেছে, যা আইনের চোখেও অবৈধ। নির্বাচন কমিশন সময় পার হওয়ার পর আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহার গ্রহণ করেছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও দলের প্রার্থীরা নিজেরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করার পরও কমিশন তা গ্রহণ করতে অসম্মতি জানিয়েছে। কমিশন যেভাবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের নিষেধ সত্ত্বেও দলটির প্রার্থীদের লাঙল প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে, তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদাও, যাঁর ভূয়সী প্রশংসা আওয়ামী লীগ বহু সময়ে করে থাকে।
এমন একতরফা নির্বাচনেও ভুয়া ভোট পড়েছে, কেন্দ্র দখল হয়েছে এবং প্রশাসন নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দিয়েছে—এমন সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাচনে কারচুপি, সন্ত্রাস ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যে হারে নির্বাচনের দিনই সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা-ও ছিল নজিরবিহীন।
দশম সংসদের বৈধতার সংকট রয়েছে আরও বহু ক্ষেত্রে। এই নির্বাচন যে সরকারের অধীনে হয়েছে, তা থেকে জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করা, নবম সংসদ থাকা অবস্থায় দশম সংসদের শপথ গ্রহণ, একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির অবস্থান গ্রহণ বৈধ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রশ্নের যৌক্তিক-অযৌক্তিকতা নিয়ে নানা তর্ক হয়তো তবু সম্ভব। কিন্তু আমরা কি এই নিরেট সত্যকে অস্বীকার করতে পারি যে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে দশম নির্বাচনের ফলাফল এ রকম হতো না? এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এমনকি জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি বা বিএনএফ যেভাবে বিজয়ী হয়েছে, তা কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সম্ভব হতো না।

৩.
২০১৩ সালের স্থানীয় নির্বাচনসমূহ ও দেশি-বিদেশি সব জরিপ অনুযায়ী দশম নির্বাচনে বিরাট ব্যবধানে বিজয়ী হওয়ার কথা ছিল বিএনপির। তারা নির্বাচন বর্জন করায় সমালোচনা রয়েছে সমাজে। কিন্তু নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিএনপির অনুপস্থিতির মধ্যেও সরকার, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন যে পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা রেখেছে, তাতে নির্বাচনে কারচুপি নিয়ে বিএনপির আশঙ্কা প্রমাণিত হয়েছে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের অগ্রহণযোগ্যতাও তাতে ফুটে উঠেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ইংল্যান্ডের হাউস অব কমন্সকেও তাই আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবিলম্বে একটি অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিতে দেখেছি এই নির্বাচনের পর।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিরোধকে আমরা ছোট করে এনেছিলাম গত বছরের ডিসেম্বরে তারানকোর সফরকালে। প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমিয়ে নির্বাচনকালে জাতীয় সরকারের একটি মডেল কি আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পারি আগামী নির্বাচনের জন্য? নির্বাচনকালীন সরকার শুধু কেন, পুরো মেয়াদের জন্যই কি প্রধানমন্ত্রীর সর্বগ্রাসী ক্ষমতা কমিয়ে অন্তত ভারতীয় মডেলের একটি ভারসাম্যমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার কথা আমরা ভাবতে পারি? বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করে অবিলম্বে নতুন নির্বাচনের জন্য সহায়ক সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনার উদ্যোগ কি এই সংসদ গ্রহণ করতে পারে না?
আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, ‘জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো’। দশম সংসদের জন্ম যেভাবেই হোক, ভালো কাজ করার সুযোগ তো তার রয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ দশম সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি বা পেলেও ভোট দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পায়নি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের বেদনা, হতাশা, বঞ্চনাবোধ দূর করার আশু পদক্ষেপ এই সংসদকে নিতে হবে।
জনসমর্থনহীন ও বৈধতার সংকটে জর্জরিত সরকারকে টিকে থাকতে হয় জনগণকে নিষ্পেষিত করে, চরম অত্যাচার আর অনাচার করে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকায় এমন বহু উদাহরণ রয়েছে। আমরা চাই না এমন উদাহরণ বাংলাদেশে তৈরি হোক স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারী দল আওয়ামী লীগের হাতে।

আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

যে কারণে বিরোধী দলকে হতাশ করলো ইইউ by মীর রাশেদুল হাসান

বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন উত্তেজনা একটি প্রচলিত রীতি। কিন্তু গত বছরজুড়ে যে সহিংসতা এবং ৫ই জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশকে আত্মপরিচয় ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বড় বড় দেশ ও সংগঠন স্বীকৃতি দেয়নি বাংলাদেশের নির্বাচনকে। বিরোধী দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের জনমত একেবারে পরিষ্কার। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি নির্বাচনের জন্য বিরোধী দলের পক্ষ নিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের কাছে তা কোন দাগ কাটেনি। শাসকগোষ্ঠীর ভয়াবহ দুর্নীতি, নিষ্ঠুরতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নীরব জনগোষ্ঠীর মাঝে সৃষ্টি করেছে অসন্তোষ। ভারতের একনিষ্ঠ সমর্থন নিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ স্পর্শকাতর ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্ম ও সার্বভৌমত্ব ইস্যুতে দেশে মেরুকরণ করেছে। এ মেরুকরণ কার্যত উল্টো ফল দিয়েছে। এতে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সব স্থানেই হেরেছে আওয়ামী লীগ। এটা অবশ্যই বলা যায় যে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর আতঙ্কে ছিল। তারা যে দমন ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে তা সংশোধন করার পরিবর্তে এ দলটি দমনপীড়ন দ্বিগুণ করে এবং অব্যাহতভাবে কূটনৈতিক অতিথি আসায় ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের নিশ্চয়তা পেয়ে তারা আরও উৎসাহী হয়ে ওঠে এবং যে কোন গণতান্ত্রিক দাবিকে উপেক্ষা করার সাহস পায়। ফল হিসেবে বিরোধীদের এবং সাধারণ জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুরোপুরি হরণ করা হয়। ভিন্নমতাবলম্বী বা বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয় তীব্র শক্তি। সেটা হয় মিডিয়ার বিরুদ্ধে। হতে পারে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। হতে পারে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে। সুশীল সমাজের সদস্যদের বিরুদ্ধে অথবা বিরোধী রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে। পশ্চিমা কূটনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক সঙ্কটে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ। কিন্তু দুঃখজনক হলো, বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষিত বিবেচনা করে, যেখানে গণতন্ত্র নয়Ñ এ সময়ে দেশ চলছে কর্তৃত্ববাদী শাসনে, সেখানে ব্যর্থ হয় তাদের সে উদ্যোগ। নিজেদের গণতান্ত্রিক দাবির বিষয়ে বাইরের দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া কি সেদিকে তাকিয়ে থাকে বেশির ভাগ বাংলাদেশী। বাংলাদেশী পণ্যের বড় রপ্তানি বাজার হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বাংলাদেশীদেরও গন্তব্য সেখানে। এসব বাংলাদেশীর বেশির ভাগই বসবাস করেন শহর এলাকায়। তারা শিক্ষিত। প্রয়োজনের সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নকে তারা পাশে পেতে ছিলেন উদগ্রীব। অবশেষে ১৬ই জানুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে, যা উত্তরের চেয়ে বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অন্য পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে ইইউ বিরোধী দলের প্রতিবাদ বিক্ষোভকে ‘সহিংস’ আখ্যায়িত করেছে। তারা প্রধান বিরোধী দলের অংশীদারদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যায়িত করছে। ইইউ যে প্রস্তাবনা এনেছে তাতে সহিংসতার মূল কারণ অনুসন্ধানে ব্যর্থ হয়েছে তারা। এখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও অধিকার ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের ভয়াবহ দমনপীড়ন ও নৃশংসতার বিষয়টি তারা তুলে ধরেননি। ক্ষমতাসীনদের হাতে বিরোধী দলের যেসব নেতাকর্মীকে গুলি করা হয়েছে, অপহৃত হয়েছেন অথবা হত্যা খুন হয়েছেনÑ কেউ যদি এ বিষয়ে পরিসংখ্যান ও রিপোর্টের বিষয়ে খোঁজ নেন তাহলে এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে সহিংসতার মূল হোতা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী। অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা হয়েছে:
১. মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে শাসকগোষ্ঠীর সমালোচনা করেছে ইইউ। অনিচ্ছাসত্ত্বেও একনায়কসুলভ শাসন মেনে নেয়া হয়।
২. সহিংসতার জন্য বিরোধীদের দায়ী করেছে ইইউ।
৩. জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামকে ‘জঙ্গি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ইইউ।
৪. ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে পরামর্শ দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে।
৫. ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বিরোধীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইইউ।
প্রথমত, হেফাজতে ইসলামীকে সহিংসতায় জড়িত করা একটি ভুল। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর মতো একই আওতায় হেফাজতকে নিয়ে আসে ইইউ। এটা তাদের আরেকটি বড় ভুল।
হেফাজতে ইসলামী কোন রাজনৈতিক দল নয়। তারা কোন রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেয় নি। এটা একটি সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলন। তারা আন্দোলন করছে ইসলামী বিশ্বাসের পবিত্রতা রক্ষার দাবিতে। জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলাম থেকে বিএনপিকে দূরে সরে থাকার যে আহ্বান জানানো হয়েছে তাতে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। যেমন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি বাংলাদেশের মৌলিক ইস্যুগুলো অনুধাবন করতে পেরেছে? বাংলাদেশে বর্তমানে মূল ইস্যু হলোÑ অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচনে সরকার নির্বাচিত করতে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার। এমন বৈধ গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের সমর্থন দেয়ার রীতি আছে। তাহলে কেন বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল তার কোন জোটসঙ্গী অথবা কোন গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে? এক্ষেত্রেও তো একই গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন আসে। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর মাধ্যমে বর্তমানের সঙ্কট সমাধানের জন্য পথ খুঁজে বের করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চায় না বলেই জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিরোধীদের সমঝোতা উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন না দেয়ার ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের সমর্থন দেয় ভারত। এতে উৎসাহী হয় তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাব সম্পর্কে বাংলাদেশীদের প্রশ্ন তোলার আরও একটি কারণ আছে। ধরা যাক ইউক্রেনের কথা। সেখানে শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়নের মুখে চলমান আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। ইউক্রেনের বিরোধীর বাধ্য হয়ে যে আন্দোলন করছে তার দিনপঞ্জি ও ধরন অনেকাংশে বাংলাদেশের মতোই। সরকার বিরোধী এ দু’টি প্রতিবাদ বিক্ষোভের মধ্যে একটিই পার্থক্য। তা হলোÑ ইউক্রেনের বিরোধীদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের। তাদেরকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেইনি, উপরন্তু তারা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে দেয়নি। তাহলে বাংলাদেশের বিরোধীদের বেলায় তাদের কেন এ ভিন্নতা? এরই মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সলমন খুরশিদ বলেছেন, বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতকে অনুসরণ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে পরামর্শ দিয়েছেন তারা। কারণ, প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশকে তারা ভাল জানেন। সারসংক্ষেপ হলো, ভারত চায় কোন ম্যান্ডেট ছাড়া হলেও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে। যদি তা না হয় তাহলে বাংলাদেশ শাসন করবে সন্ত্রাসীরাÑ এমনটা তাদের ধারণা। ভারত ও ক্ষমতাসীনরা হিসাব কষে দেখেছেন যে, ‘সন্ত্রাসী’দের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন চালালে তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পশ্চিমা দেশগুলো থেকে মৌন সম্মতি পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে জঙ্গিদের কখনও কোন তৎপরতা ছিল না এবং বিরোধীদের ভিতর থেকে কোন সমর্থন নেইÑ এ সত্যটিকে চাপা দিয়েছে ভারতীয় প্রচারণা। ‘জঙ্গি’দেরকে বিরোধী দলীয় শিবিরে ফেলে ভারতীয় কোরাসে যোগ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর মাধ্যমে কি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও জনপ্রিয় দাবিকে দুর্বল করে দিচ্ছে না ইউরোপীয় ইউনিয়ন? রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার শিকার কোন ব্যক্তি কিভাবে ‘জঙ্গি’ হতে পারে এবং সহিংসতার মূল হোতা হতে পারে? রাজনৈতিক দলগুলোর সমপর্যায়ে কিভাবে নেয়া যেতে পারে সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলন হেফাজতকে? হাজার মাইল দূরত্বে থেকে ইইউ সংসদ সদস্যরা তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তাদের তথ্যের যোগান দিয়েছেন কারা? ইইউতে যাদেরকে বক্তব্য দিতে আহ্বান জানানো হয়েছে তাদের অবস্থান মারাত্মকভাবে পক্ষপাতমূলক। অভিযুক্তদের তাদের অবস্থান উপস্থাপন করতে দেয়ার সুযোগটা প্রথাগত। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতকে জঙ্গি তকমা দেয়ার আগে কি তাদের অবস্থান উপস্থাপন করার কোন সুযোগ দেয়া হয়েছিল? না। বরং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সম্ভ্রান্তদের ইইউ রেজল্যুশনে তাদের বানোয়াট ভাষ্য ঢুকিয়ে দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছিল, যাদেরকে প্রায়ই ইইউ দূতদের সঙ্গে আলোচনা করতে দেখা গেছে। কে ঘটনার বলি আর কে জঙ্গি সেটা নিরূপণ করার জন্য ইইউর সম্ভবত সত্যিকার অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে ইইউর অভিপ্রায় স্পষ্ট। বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পে ইইউ ক্রেতারাই উপকৃত হয়ে থাকে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের শহুরে সম্ভ্রান্ত আর ধর্মনিরপেক্ষ শ্রেণীর বাইরে সাধারণ জনগণের সঙ্গে একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে ইইউ কতটা প্রস্তুত?

মীর রাশেদুল হাসান বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে আইটি পেশায় যুক্ত।
(গতকাল হংকং ভিত্তিক অনলাইন এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত ‘ইইউ লেটস ডাউন বাংলাদেশী অপোজিশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনের অনুবাদ)

যে কারণে বিরোধী দলকে হতাশ করলো ইইউ by মীর রাশেদুল হাসান

বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন উত্তেজনা একটি প্রচলিত রীতি। কিন্তু গত বছরজুড়ে যে সহিংসতা এবং ৫ই জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশকে আত্মপরিচয় ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

তৃতীয় মত: অলঙ্কারিক সংসদ by মাহফুজ আনাম

সংসদ জনগণের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। জাতিকে দিক-নির্দেশনা দেয়ার জন্য জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী গঠন করা হয় সংসদ। যারা তাদের নির্বাচিত করেন সে জনগণের স্বার্থে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
যেখানে গণতন্ত্র পূর্ণমাত্রায় কাজ করে সেখানে ধারণা, আদর্শ এবং মতবিনিময়ের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। সংসদ এমন একটি জায়গা যেখানে গঠনমূলক বিতর্কের মাধ্যমে জাতীয় পরিকল্পনা গৃহীত হয়। যেখানে ব্যক্তির ক্ষমতা পরাভূত হয় সমষ্টিগত ইচ্ছার কাছে। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের ভাগ্য এত ভালো নয়। আমাদের প্রারম্ভিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে। এরপর ১৬ বছর চলে যায় সামরিক সরকার এবং সেনা নেতৃত্বাধীন সরকারের মাধ্যমে। যখন জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য সতিক্যর অর্থে সংসদের কোন অস্তিত্বই ছিল না।
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর একটি কার্যকর এবং স্পন্দনশীল সংসদই ছিল আমাদের সর্বোচ্চ চাওয়া। কিন্তু আমাদের সে চাওয়া পূরণ হয়নি। এরশাদের পতনের পর প্রথম নির্বাচনে পরাজয় আওয়ামী লীগ কখনোই প্রসন্নচিত্তে গ্রহণ করেনি। প্রথম দিন থেকেই আক্ষরিক অর্থেই তারা সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। প্রতিনিয়ত ওয়াকআউট, সংসদ বয়কটের মাধ্যমে সংসদের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করা, সর্বোপরি সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর আগেই তারা সদলবলে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিল। ১৯৯৬ সালে বিএনপি যখন বিরোধী দলের আসনে বসে তখন তারা আওয়ামী লীগকে আরও রুক্ষতা এবং রুঢ়তার সঙ্গে ওই আচরণ ফেরত দিয়েছিল। ২০০১ এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সামনে বিরোধী দলের আচরণ পরিবর্তনের সুযোগ এসেছিল। কিন্তু সে সুযোগ কাজে লাগানোর পরিবর্তে আমরা তাদের মধ্যে সংসদের ভেতরে-বাইরে সম্পর্ক আরও খারাপ হতে দেখলাম।
২৩ বছরের সংসদের এমন ইতিহাসের পর বুধবার যে দশম সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে এ সংসদের কাছে আমরা কি প্রত্যাশা করতে পারি। এ সংসদে এখন পর্যন্ত ২৯৮ আসনের মধ্যে ২৩২ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা রয়েছেন, যা মোট আসনের ৭৭ শতাংশ। জাতীয় পার্টির আসন ৩৪টি বা ১১%, ওয়ার্কার্স পার্টির (মেনন) ৬টি বা ২%, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু) ৫টি বা ২%, জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) ২টি, তরিকত ফেডারেশনের ২টি, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১৬টি বা ৫.৩%। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৭৭% আসনের তথ্যটিও পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ বাকি দলগুলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছে এবং আওয়ামী লীগের সমর্থনেই সংসদে প্রবেশ করেছে। শুধু তাই নয়, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ এবং তরিকত ফেডারেশনের প্রার্থীরা নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন, যা ছাড়া নির্বাচনে জয়লাভ তাদের পক্ষে আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব হতো।
কিছুদিনের মধ্যেই যখন সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নির্বাচিত হবেন তখন আওয়ামী লীগ পাবে আরো ৩৬টি আসন অর্থাৎ মোট ৩৫০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পাবে মোট ২৬৮টি আসন, পরে আরো দুটি আসন যোগ করা হতে পারে। স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী ১৬ সংসদ সদস্যও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী, তারা যেকোন সময় সরকারি দলে ঢুকে যেতে পারেন। জাতীয় পার্টি, যাদের সংসদে ৩৫টি আসন রয়েছে তারাও তা পেয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে চুক্তি করে। এ অবস্থায় তাদের বিরোধী দলে থাকা হবে কেবই কাগুজে। এটা কেউ যুক্তি দেখাতে পারেন যখন সত্যিকার অর্থে বিরোধী দল তখন ভালো কী হয়েছে, তখনতো আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বছরের পর বছর সংসদ বয়কট করেছে। এটা সত্য হলেও সংসদীয় কমিটিগুলো বহুক্ষেত্রেই সঠিক কাজ করেছে। মার্জিনাল হলেও তারা কিছু ভালো কাজ করেছে। বুধবার সংসদে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের দেয়া ভাষণ যদি মানদণ্ড হয় তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, দশম সংসদের বহু সময় ব্যয় হবে প্রধানমন্ত্রীর নীতির প্রশংসায়। প্রেসিডেন্টের ভাষণের  কোথাও আগের কোন ভুলভ্রান্তির কথা উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি গত ৫ই জানুয়ারি বিরোধী জোটের নির্বাচন বর্জন প্রসঙ্গেও কিছু বলা হয়নি। এর পরিবর্তে এ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে এবং সব দোষ চাপানো হয়েছে বিরোধীদের ওপর। অন্য অর্থে এ ভাষণ সরকারের নীতিরই প্রতিফলন।
গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রাথমিক গুণ যদি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে থাকে, উন্নত শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি যদি ভারসাম্যতা হয়ে থাকে এবং জনগণের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতির কথা বলা হয়, তার কোন কিছুই এখন বাংলাদেশে বিদ্যমান নেই। বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছেÑ কিভাবে আমরা আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারি এবং বিলুপ্তির পথে থাকা জবাবদিহিতা প্রক্রিয়াকে পুনরুদ্ধার করতে পারি। কিন্তু দশম সংসদ এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার কোন পথতো দেখাচ্ছে না এমনকি এব্যাপারে কোন দিকনির্দেশনাও দিচ্ছে না।

(মাহফুজ আনাম: ডেইলি স্টার সম্পাদক, পত্রিকাটিতে শুক্রবার প্রকাশিত মন্তব্য প্রতিবেদন থেকে অনূদিত)

তৃতীয় মত: অলঙ্কারিক সংসদ by মাহফুজ আনাম

সংসদ জনগণের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। জাতিকে দিক-নির্দেশনা দেয়ার জন্য জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী গঠন করা হয় সংসদ। যারা তাদের নির্বাচিত করেন সে জনগণের স্বার্থে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

ফিলিপাইনে বিদ্রোহের অবসান হচ্ছে? by নওয়াজ ফারহিন

অবশেষে ফিলিপাইনের সরকার ও দেশটির সবচেয়ে বড় মুসলিম বিদ্রোহী গোষ্ঠী মরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের মধ্যে (এমআইএলএফ) একটি শান্তিচুক্তি হতে যাচ্ছে।
গত শনিবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে এ ব্যাপারে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। অনেকে আশা করছেন, এর মধ্য দিয়ে অবসান হতে যাচ্ছে ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সহিংসতার।

এমআইএলএফ ছাড়াও বেশ কয়েকটি মুসলিম বিদ্রোহী গোষ্ঠী দক্ষিণাঞ্চলের মিন্দানাও দ্বীপসহ দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকায় ম্যানিলার শাসনের বিরুদ্ধে এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই চালিয়ে আসছে। গত কয়েক দশকের লড়াইয়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়েছে, ঘরছাড়া হয়েছে ২০ লাখ মানুষ এবং চরম দারিদ্র্যের কবলে পড়ে দেশটির দক্ষিণাঞ্চল। পাশাপাশি এই সহিংসতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে ইসলামি চরমপন্থা।
এই সমঝোতাকে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট বেনিগনো নয়নয় অ্যাকুইনোর বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১২ সালের অক্টোবর মাস থেকে ফিলিপাইন সরকার ও এমআইএলএফের মধ্যে এই শান্তিচুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়। চুক্তিতে কী কী থাকবে, সে ব্যাপারে তারা এত দিন আলোচনা করেছে। গত শনিবার চূড়ান্ত পর্বের আলোচনা শেষে সমঝোতাপত্র সই হয়। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সই হবে বলে ফিলিপাইন সরকার সূত্র জানিয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, ফিলিপাইন সরকার মিন্দানাওসহ দক্ষিণের বেশ কয়েকটি এলাকায় স্বায়ত্তশাসন দেবে। বিনিময়ে এমআইএলএফের ১১ হাজার যোদ্ধার একটি বড় অংশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেবে এবং অন্যরা পর্যায়ক্রমে তাদের অস্ত্র সমর্পণ করবে। এই সমর্পণের কাজ পর্যবেক্ষণ করবে তৃতীয় একটি পক্ষ। এ ছাড়া স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলগুলোর বিভিন্ন খনি থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের ৭৫ শতাংশ মিন্দানাওতে থাকবে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পাওয়া করের অর্ধেক সেখানকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এমন একটি শান্তিচুক্তির সম্ভাবনায় ফিলিপাইনের অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। অ্যাটেনিও ডি ম্যানিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক রিচার্ড জাভাদ হেদারিয়ান বলেন, মিন্দানাও দ্বীপের সহিংসতার অবসানে কয়েক দশক ধরে কূটনীতিকেরা যে কষ্টকর চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে এর অবসান ঘটবে। এই চুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা লড়াইয়ের অবসানের এক অপূর্ব সুযোগ এনে দেবে।
তবে এই শান্তিচুক্তির সফলতা নির্ভর করবে এমআইএলএফের সক্ষমতার ওপর। স্বায়ত্তশাসিত এলাকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার রক্ষার দায়িত্ব তাদের হাতে থাকবে। অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীর সহিংসতা দমন করাই হবে তাদের প্রধান কাজ। এটা করতে না পারলে শান্তি আসবে না।
১৯৯৬ সালে আরেকটি বড় জঙ্গি গোষ্ঠী মরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের সঙ্গে ফিলিপাইন সরকারের শান্তিচুক্তি হয়েছিল। তবে ওই চুক্তিতে বিদ্রোহীদের হাতে অস্ত্র রাখার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন হয়নি।

এমআইএলএফ সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে রাজি হলেও আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠী আবু সায়াফ, এমআইএলএফসহ বাকি লড়াইরত জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই চুক্তিতে যোগ দেবে না। আর এ কারণে অনেকে শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন দ্য ফিলিপাইন স্টার পত্রিকার কলামিস্ট ববিট আভিলা। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট অ্যাকুইনোর প্রশাসন চুক্তিটি করার জন্য খুব ব্যতিব্যস্ত। তারাই শান্তিচুক্তি করতে পেরেছে—এমন একটি কৃতিত্ব নিতে চাইছে। কিন্তু এই শান্তিচুক্তি শান্তি আনবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলের সব সশস্ত্র গোষ্ঠী এই চুক্তিতে না যোগ দেবে।
আভিলা বলেন, ‘বিশ্বের যেকোনো মুসলিম দেশে আমি ভয় ছাড়াই ঘুরতে পারি। কিন্তু মিন্দানাওয়ে আমি সেটা পারব না। হয় আমি খুন হব, নয়তো অপহূত হব। শান্তিচুক্তি এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না।’
সরকার ও বিদ্রোহী—উভয় পক্ষই স্বীকার করেছে যে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে রাতারাতি সহিংসতার অবসান ঘটবে না। কেননা, সেখানে এখনো গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব অব্যাহত রয়েছে, রয়েছে বিপুলসংখ্যক অবৈধ অস্ত্র ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা।
নওয়াজ ফারহিন
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ, এএফপি ও বিবিসি

ফিলিপাইনে বিদ্রোহের অবসান হচ্ছে? by নওয়াজ ফারহিন

অবশেষে ফিলিপাইনের সরকার ও দেশটির সবচেয়ে বড় মুসলিম বিদ্রোহী গোষ্ঠী মরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের মধ্যে (এমআইএলএফ) একটি শান্তিচুক্তি হতে যাচ্ছে।

মিসর ও তিউনিসিয়া- এক যাত্রা পৃথক ফল by রোকেয়া রহমান

মিসর ও তিউনিসিয়া—আরব বিশ্বের দুটি দেশ। তাদের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি করেছে লিবিয়া। এই দূরত্ব সত্ত্বেও দেশ দুটির মধ্যে কত-না মিল ছিল।
দেশ দুটি দীর্ঘদিন স্বৈরশাসকদের শাসনে ছিল। ধর্মীয় কট্টরপন্থা যাতে সে দেশের শাসনব্যবস্থায় গেড়ে না বসতে পারে, এ জন্য মিসর ও তিউনিসিয়ার শাসকেরা ছিলেন নির্দয়। কিন্তু তলে তলে দেশ দুটিতে কট্টর ইসলামপন্থীদের সক্রিয় হয়ে ওঠা ও ক্ষমতা দখল—দুটোই কঠিন বাস্তব।

কিন্তু এই বাস্তবতা মোকাবিলায় দেশ দুটি আবার ভিন্ন পথে হেঁটেছে। একজন বেছে নিয়েছে আলোচনার পথ, অন্যজন বলপ্রয়োগের। অথচ ‘কথিত’ আরব বসন্তের সূত্রপাত করেছিল এই মিসর ও তিউনিসিয়া। এখন দুই বিপরীতমুখী ধারার সম্মিলন গোটা আরব বিশ্বকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে বলা যায়।
১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে তিউনিসিয়া সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবেই পরিচিত ছিল। নামে গণতন্ত্র হলেও ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরাচার ও অনাচার দেশটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। শেষমেশ ২০১১ সালের জানুয়ারিতে এক গণ-অভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বেন আলী। এরপর অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সংবিধান পরিষদ নির্বাচিত হয়। ১৫ জানুয়ারি এই সংবিধান পরিষদ ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন সংবিধান গ্রহণ করেছে, যা আরব বিশ্বে এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে উদার সংবিধানই বলা যায়। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্ট গত রোববার দেশটির নতুন সংবিধান অনুমোদন দিয়েছে। সংবিধানে অনুমোদনের পক্ষে ২১৬ ভোটের মধ্যে ২০০টি ভোট পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে এই সংবিধানে শব্দ চয়ন করা হয়েছে এমনভাবে, যাতে শাসক ইসলামপন্থী দল ও এর বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ দলের কাছে তা গ্রহণযোগ্য বলেই মনে হয়েছে। সামাজিক জীবনে ইসলামের ভূমিকা ঠিক কী হবে, এই কঠিন প্রশ্নে দল দুটি মতৈক্যে আসতে পেরেছে, যা আপস বা সমন্বয়ের এক বিরল নিদর্শন।
তিউনিসিয়ার নতুন সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘তিউনিসিয়া হবে মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ; ইসলাম এর ধর্মীয় পরিচয়; আরবি এর ভাষা এবং এর শাসনব্যবস্থা প্রজাতান্ত্রিক।’ এতে আরও বলা হয়েছে, ‘তিউনিসিয়া হবে নাগরিক রাষ্ট্র, যা জনমতের ইচ্ছায় গড়ে উঠবে এবং এখানে আইনই সর্বোচ্চ।’ ভবিষ্যতে কোনো দল যত গরিষ্ঠতা নিয়েই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সংবিধানের এই দুই মৌলিক বিষয়কে তারা কখনো সংশোধন করতে পারবে না।
তিউনিসিয়ার পার্লামেন্ট গত বুধবার একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়টি অনুমোদন করে। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এই সরকার দেশ পরিচালনা করবে।
অন্যদিকে, পিরামিডখ্যাত মিসরকে দেখুন। উত্তাল তাহরির স্কয়ারের কথা এ দেশের পাঠকের কে না জানে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সংগঠিত আন্দোলন ও হাজারো তরুণের আত্মত্যাগ স্বৈরশাসকবিরোধী এ আন্দোলনকে স্মরণীয় করে রেখেছে। ২০১১ সালের জানুয়ারির সেই হোসনি মোবারকবিরোধী আন্দোলন ও ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট মোবারকের পতন মিসরবাসীকে নতুন স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিল।
কিন্তু তারুণ্যের এই আত্মত্যাগের ফসল তুলল মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড। ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে নিয়ে প্রেসিডেন্ট হলেন ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসি। চলতে শুরু করলেন নিজের পথে, নিজের মতো করে। এক বছরের মধ্যে নতুন সংবিধান অনুমোদনের জন্য গণভোটের ব্যবস্থা করলেন। বিরোধী রাজনীতিকেরা শুরু থেকে ব্রাদারহুডের বিপক্ষে অবস্থান নেন। বুদ্ধিমান মুরসি তাঁদের কাছে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও নিজের উদ্দেশ্য পূরণে অটল থাকলেন; যার ফলে গত বছরের মাঝামাঝি মিসরজুড়ে শুরু হয় মুরসিবিরোধী আন্দোলন।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবের আইনকানুনের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নাথান ব্রাউন বলছেন, প্রথমত, বিরোধীরা এটা জানত যে পরের নির্বাচনেও তারা কোনোভাবেই জিততে পারবে না। দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনী সেখানে ছিল। কার্যক্ষেত্রে হলোও তা-ই।
ঘরে-বাইরে মুরসিবিরোধী তীব্র মনোভাবের সুযোগ নিল সে দেশের সেনাবাহিনী, যারা ১৯৫২ সাল থেকে একটানা ৬০ বছর মিসরের শাসন পরিচালনা করেছে। ক্ষমতা হারালেন মুরসি। সেনাশাসনকে পাকাপোক্ত করতে কোনো ধরনের মতৈক্য ছাড়াই আয়োজিত গণভোটে রায় এল ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এবং বিপুলভাবে। আসলে ‘না’ যে বলা যাবে, এটাই বহু ভোটার জানতেন না। মিসরের নতুন শাসকেরা ব্রাদারহুডকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দিয়ে নিষিদ্ধ করেছেন, কারাগারে পাঠিয়েছেন এ দলের নেতাদের, জব্দ করেছেন সম্পদ। ইজিপশিয়ান ইনিশিয়েটিভ ফর পার্সোনাল রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা হোসাম বাঘাতের ভাষায়, এই শাসকেরা মোবারকের জামানাকেও হার মানিয়েছে। উল্লেখ্য, হোসনি মোবারক নিজেও সেনাবাহিনী থেকে এসে প্রায় ৪০ বছর মিসর শাসন করে গেছেন।
সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় আসার মিসরের উদারপন্থীরা খুশি। তাদের সেই খুশি ঝরে পড়ছে সেনাশাসক সিসির প্রতি আপ্লুত ভাবাবেগে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেনাবাহিনী কি শেষ পর্যন্ত দেশটিতে শান্তি আনতে পারবে? নাকি এখানেও দুই পক্ষের মধ্যে একটা সমঝোতার দরকার ছিল, যে পথ ইতিমধ্যে তিউনিসিয়া দেখিয়ে দিয়েছে। কায়রোর আইনজ্ঞ জায়েদ আল-আলীর কথায়, ‘তিউনিসিয়ায় পুরো পাতাটাই উল্টানো হয়েছে এবং তাই তুমি বুঝতে পারবে যে সেখানে বিপ্লব এসেছিল। কিন্তু মিসরের ক্ষেত্রে তা (বিপ্লব/আরব বসন্ত) তা বিতর্কিতই থেকে গেল।’
২০১১ সালের একই সময়ে একই পথে যাত্রা করে আরব বিশ্বের দুটি দেশের যাত্রা কেন বিপরীতমুখী হয়ে গেল, তা হয়তো ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য তোলা থাকবে। তত দিনে নীল নদের তীরের এই দেশে আর কত রক্তপাত হবে কে জানে!
ইন্টারন্যাশনাল নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে