Wednesday, August 22, 2018

সেক্স রোবট সামান্তা: যার কাজই মূলত যৌন দাসত্ব

বিশ্বের প্রথম সেক্স রোবট সামান্তা। যার কাজই মূলত যৌন দাসত্ব করা। তবে এই রোবট এবার থেকে না বলা শিখছে। কোন বিকৃতকামনাকে সায় দিবে না সেক্স রোবটটি। সঙ্গীর কামোত্তেজনা মাত্রা ছাড়ালেই ‘না’ বলে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে সামান্তা। তবে একেবারেই নিষ্ক্রিয় হচ্ছে না কিছু সময় বাদেই আবারও সচল হয়ে যাবে। দিন দিন ডিভোর্সের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বিশ্বজুড়ে। তাই এসব একাকী পুরুষদের জন্য তৈরি করা হয়েছে এই সেক্স রোবট। এর ফলে অবৈধ ও বিপদজনক শারীরিক সম্পর্ক অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব হয়েছে।
সামান্থার নির্মাতা স্পেনের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ডক্টর সার্গি সান্টোস জানান, সামান্থার মধ্যে একটা বিশেষ আপডেট আনার চেষ্টা চলছে। এতে বিশেষ কিছু সময়ে বন্ধ হয়ে যাবে রোবট। তাঁর মতে, কেউ যদি বিকৃতকাম হয়ে ওঠেন বা অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে যান, তাহলে বন্ধ হয়ে যাবে রোবটটি। এবার থেকে কার্যত ‘না’ বলতে শিখবে সামান্থা। তিনি জানান, সামান্থার মতো আরও ৩ লক্ষ রোবট বানানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

রোহিঙ্গা সঙ্কট স্থায়ী রূপ নিতে পারে

বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সঙ্কট একটি স্থায়ী রূপ নিতে পারে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের অনাগ্রহ থাকায় বাংলাদেশের জন্য এ সঙ্কট একটি স্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্য ন্যাশনাল পত্রিকায় প্রকাশিত ‘হোয়াই নিদার মিয়ানমার অর বাংলাদেশ ওয়ান্টস টু ডিল উইথ দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন ক্যাম্পবেল ম্যাকডারমিড। মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি সিঙ্গাপুরে রোহিঙ্গা সঙ্কটের জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করেন মঙ্গলবার। এরপরই তিনি ওই প্রতিবেদন লিখেছেন। এতে তিনি লিখেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটকে এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল শরণার্থী সঙ্কট বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এক বছর পাড় হয়ে চললেও তাদের দুর্ভোগ যেন অমার্জনীয় হয়ে উঠছে।
গত বছর আগস্ট মাস থেকে শুরু করে তিন মাসের মধ্যে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে ৭ লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়। এর ফলে জাতিসংঘের অভিবাসন বিষংক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম) এ পরিস্থিতিকে অত্যাশিত আকারে এবং দ্রুত গতিতে সংখ্যা বৃদ্ধি হিসেবে আখ্যায়িত করে। তারপর থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ থেকে একজন শরণার্থীকেও স্বাগত জানায় নি মিয়ানমার সরকার। এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের সহযোগিতা মেনে চলতে উল্লেখযোগ্য চাপ প্রয়োগে অনিচ্ছা দেখাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের তীব্র দাবি থাকা সত্ত্বেও পর্যবেক্ষক ও শরণার্থীরা উভয়ের মধ্যে আতঙ্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, তাদের এই নির্বাসন স্থায়ী হতে পারে।
কক্সবাজার থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে তমব্রু সীমান্তে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সীমান্তের মধ্যে যেসব রোহিঙ্গা বন্দি হয়ে পড়েছেন তাদের অবস্থা খুবই জটিল। এখানে মিয়ানমার সীমান্ত বেড়া ও কর্দমাক্ত খাড়ির ভিতরে নোম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করছেন প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী। এই এলাকাটি আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখার আওতায় নয়। এসব শরণার্থী বলছেন, তাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে যে, যদি তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন তাহলে তারা আর কখনো তাদের দেশে ফিরে যেতে পারবেন না। তারা এখন যে কুড়েঘরে বসবাস করছেন সেখান থেকে মিয়ানমারে তাদের আদি আবাস, ঘরবাড়ি দেখা যায়। জমি দেখা যায়। কিন্তু মিয়ানমার সরকার তাদেরকে ফেরত নিতে চায় না। রোহিঙ্গাদের এই আশ্রয় শিবির থেকে যদি একটি ঢিল ছোড়া হয় তাহলে যতদূর যাবে ঠিক ততদূরে পাহাড়ের চূড়ায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আউটপোস্ট।
সম্প্রতি মাসখানেক আগে, এই স্থান থেকে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশে সেনাবাহিনী ওই শিবিরের দিকে গুলি করে। মাঝে মাঝেই লাউডস্পিকারে সতর্কতা প্রচার করা হয়। বলা হয়, যারা মিয়ানমার থেকে অন্যায়ভাবে চলে গেছে সীমান্ত অতিক্রম করে তারা ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করলে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। আরিফ (৪২) নামে একজন রোহিঙ্গা বলেন, বিশ্ববাসী জানেন যে, আমরা এখানে অবস্থান করছি এক বছর ধরে। আরিফ নিজেকে শুধু একটি শব্দেই পরিচয় দেন। সহানুভূতিশীল বাংলাদেশী সীমান্ত এক রক্ষীর উপস্থিতিতে তিনি জানতে চান, কখন আমাদেরকে আমাদের জন্মভূতিতে ফিরতে দেয়া হবে?
রোহিঙ্গারা তাদের দেশে ফিরে যেতে উদগ্রীব। তবে তাদেরকে কিছু বিষয়ে নিশ্চয়তা দেয়া না হলে ফিরতে রাজি নন তারা। তারা নাগরিকত্বের অধিকার চান। এটা করা হলে তারা সরকারিভাবে মিয়ানমারের একটি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। এ ছাড়া তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নিরাপত্তা চান।
এসব দাবি পূরণের জন্য আরো হয়তো অপেক্ষা করতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ সরকারের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বলেছেন, আমার মনে হয় এ সঙ্কট সমাধানে উভয় পক্ষকে সমঝোতায় আসতে হবে। ওই কর্মকর্তা মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার এক্তিয়ার রাখেন না বলে নাম প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন।
বাংলাদেশে এ বছরটি নির্বাচনের। এরই মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এ দেশটিকে শাসন করার ক্ষমতা পাওয়ার জন্য নির্বাচনী লড়াই শুরু হয়ে গেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের মন্ত্রীপরিষদ বলেছে যে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বোঝা দীর্ঘদিন টানতে পারে না বাংলাদেশ। ওই কর্মকর্তা বলেছেন, আমরা চাই তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের দেশে ফিরে যাক।
গত বছরের নভেম্বরে মিয়ানমারের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। এর আওতায় বলা হয় শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন হতে হবে স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে ও নিরাপদ। কিন্তু ওই চুক্তিতে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয় নি। এখন পর্যন্ত এ চুক্তির আওতায় কোনো শরণার্থীই মিয়ানমারে ফিরে যান নি।
ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশী কর্মকর্তারা মনে করেন সমস্যাটা হলো মিয়ানমারের একগুঁয়েমি। স্বাক্ষরিত চুক্তির অধীনে প্রত্যাবর্তন শুরু হওয়ার আগে প্রথম পদক্ষেপ হলো মিয়ানমারের এসব নাগরিকের পরিচয় সনাক্ত করা। ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের কাছে প্রথম কিস্তিতে ৮০২৩টি নাম পাঠায় বাংলাদেশ। তারপর ছয় মাস হতে চলেছে। তার মধ্য থেকে এ পর্যন্ত ২ হাজারের সামান্য বেশি মানুষকে যাচাই করতে পেরেছে মিয়ানমার। এ সংখ্যা যেন সমুদ্রে এক ফোঁটা পানি ফেলার মতো।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা বাংলাদেশে ৮ লাখ ৯১ হাজার ২৩৩ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছেন বলে তাদের হিসাবে দেখতে পেয়েছে। বাংলাদেশী ওই কর্মকর্তা বললেন, এখন আপনি কল্পনা করতে পারেন এ প্রক্রিয়ায় কতটা সময় লাগতে পারে। বলতে বলতে তার কণ্ঠে এক অনিশ্চয়তা ফুটে ওঠে। সুসম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ খুব আগ্রহী। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বলছে, রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়া যাতে মিয়ানমার মেনে নেয় সে জন্য তাদেরকে আগ্রহী করে তোলার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। বাংলাদেশ সরকারের আরেকজন কর্মকর্তা বলেছেন, শুধু বৈশ্বিক চাপের কাছেই সাড়া দেয় মিয়ানমার।
কিন্তু এটা এমন একটি বিষয় নয়, যে বিষয়ে একীভূত একটি চুক্তি আছে। মিয়ানমার ইস্যুতে জাতিসংঘের রেজুলেশন বা প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে চীন ও রাশিয়া।
পক্ষান্তরে, গত সপ্তাহে মিয়ানমারের সামরিক জেনারেলদের বিরুদ্ধে টার্গেটেড অবরোধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, এসব সামরিক নেতা পুরো মিয়ানমারজুড়ে জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা চালানোর জন্য দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে জাতি নিধন। গণহত্যা। যৌন নির্যাতন। বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের টেরোরিজম অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আন্ডার সেক্রেটারি সিগাল মান্দেলকার বলেছেন, নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের অবশ্যই ন্যায়বিচচার পেতে হবে এবং বিচার হতে হবে তাদের যারা নৃশংসতাকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য কাজ করেছে। বিচার হতে হবে এই ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরও। মিয়ানমারের সেনা ইউনিটগুলো ও নেতাদেরকে অবশ্যই নৃশংসতা থামানোর ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে পর্যাপ্ত শুনানির উপযোগিতা আছে কিনা সে বিষয়ে জুরিসডিকশন দেবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। রাখাইনে সহিংসতার বিষয়ে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উভয়েই রিপোর্ট প্রকাশ করবে বলে প্রত্যাশা রয়েছে।
কিন্তু অবরোধের হুমকি অথবা উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুতি রোহিঙ্গাদের বিষয়ে মিয়ানমারের মন গলাতে পারবে না বলেই মনে হয়। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক রাখাইনের উন্নয়নে মিয়ানমারকে ১০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার প্রস্তাব করেছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন নিয়ে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে আপাতদৃষ্টে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনকে জাতিসংঘ যখন জাতিনিধন হিসেবে বর্ণনা করেছে তখন মিয়ানমার সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান।
রাখাইন সহিংসতা নিয়ে সম্প্রতি সেনাবাহিনী ১১৭ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এটি রচনা করেছে সেনাবাহিনীর জনসংযোগ বিষয়ক পরিচালনা পরিষদ ও মনোবিজ্ঞান বিষয়ক কল্যাণ শাখা। এ রিপোর্টে গণহত্যার কথা অস্বীকার করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। উল্টো তারা যুক্তি দেখিয়েছে বাঙালি অনুপ্রবেশকারীরা একটি স্বাধীন আরকিস্তান গঠন করার চেষ্টা করছিল। এতে বলা হয়, কাক ময়ূরপুচ্ছ ধারণ করলেই সে কখনো ময়ূর হতে পারে না।
এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি একটি নৈরাশ্য যোগ করে।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে জাতিসংঘের অনেক রিপোর্ট লিখেছেন নাগরিক সুরক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ লিয়াম মাহোনি। তিনি এ পরিস্থিতিতে বলেন, মানুষ এখন রোহিঙ্গাদের এ অবস্থাকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে তুলনা করছে। তিনি আরো বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এখানে শরণার্থী হিসেবে থেকে যেতে পারে।
এরই মধ্যে এ বিষয়টি পূর্বাহ্নেই বুঝতে পেরেছে এনজিওগুরো ও জাতিসংঘ। তারা এ সঙ্কটের দীর্ঘমেয়াদী সাড়া পাওয়ার পরিকল্পনা করছে, যদিও বাংলাদেশ সরকার আশা করছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন খুব শিগগিরই শুরু হবে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কথা বলার ক্ষেত্রে বেশি ভাগই সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেডড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অপারেশন ম্যানেজার ফ্রাঙ্ক কেনেডি। তিনি আশ্রয় শিবিরে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মানে সরকারের খুব আগ্রহকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা মধ্যম-দশা অবলম্বন করে কথা বলছেন।
রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কতদিন বাংলাদেশে থাকবে তার আরেকটি চিত্র ফুটে উঠেছে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য কনজারভেশন অব নেচার-এর প্রাণিবিজ্ঞানিদের কথায়। বাংলাদেশে বিলুপ্তপ্রায় এশিয়ান যেসব হাতি রয়েছে তাদের দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা ওই আশ্রয় শিবিরের ভিতর দিয়ে পশুদের মাইগ্রেশন করিডোর নির্মাণের জন্য তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।
ক্রমশ রোহিঙ্গাদের মধ্যেও আতঙ্ক দেখা দিচ্ছে যে, এই আশ্রয়শিবিরই হতে পারে অন্তহীন দিনের জন্য তাদের বাড়িঘর। ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া একটি ব্লকের নেতা ৩৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ সিরাজ বলেন, মিয়ানমারে শান্তি চেয়েছেন আমার প্রপিতামহ। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার আগে তা দেখে যেতে পারেন নি। আমার পিতাও পাবেন নি। আর এখন আমরা এখানে অবস্থান করছি একটি শান্তিপূর্ণ স্থানের আশায়। মনে হয় শান্তি চাইতে চাইতে আমরা সবাই মারা যাবো।

ইসরাইলি অবরোধ অবসানের পথে রয়েছে গাজা: হানিয়া

ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের নেতা ইসমাইল হানিয়া বলেছেন, ইহুদিবাদী ইসরাইলের পক্ষ থেকে অন্যায় অবরোধ অবসানের পথে রয়েছে গাজা উপত্যকা। এজন্য তিনি গাজার জনগণের দৃঢ়তা ও সংগ্রাম করার মানসিকতাকে ধন্যবাদ জানান।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে গাজায় এক ঈদের জামায়াতে দেয়া খুতবায় ইসমাইল হানিয়া গতকাল (মঙ্গলবার) এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমরা গাজা উপত্যকার ওপর ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া অন্যায় অবরোধ সরিয়ে দেয়ার পথে রয়েছি। এটা হচ্ছে আমাদের সংগ্রাম ও দৃঢ়তার ফল।”
হানিয়া আরো বলেন, ভবিষ্যতে গাজা উপত্যকার জন্য যেসব সহায়তা আসবে তাতে হামাসের আচরণ কিংবা নীতিতে পরিবর্তন আনার কোনো শর্ত থাকবে না। 
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথিত ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’কে হামাস নেতা ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’ বলে ঘোষণা করেন। এর পাশাপাশি ইসমাইল হানিয়া আরো বলেন, “ফিলিস্তিনি স্বশাসন কর্তৃপক্ষ থেকে যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তা তুলে নিলেই কেবল হামাস ও ফাতাহ আন্দোলনের মধ্যে পুনঃএকত্রীকরণের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।”

শহিদুল আলমকে ভয় পায় কে? -নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধ by গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক

বাংলাদেশের প্রথিতযশা আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে ৫ই আগস্ট তার বাসা থেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় ৩০ জনেরও বেশি সাদাপোশাকের পুলিশ। তারা জোর করে রাত সাড়ে দশটার দিকে তার বাসায় প্রবেশ করে। ভবনের নিরাপত্তারক্ষীর মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। নজরদারি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। তবুও ঘটনার মুহূর্ত সেলফোনে ধারণ করতে সক্ষম হয় কেউ একজন। সেখানে শহীদুল আলমকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, আমি নির্দোষ। আমি আইনজীবী চাই।
যাকে আমি ভীষণ অমায়িক ও মেধাবী মানুষ হিসেবে চিনি, সেই শহিদুলকে এভাবে চিৎকার করতে দেখে ভয়াবহ লাগছিল। এখন ঠিক এভাবেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ করে ত্রাস।
কয়েক দশক ধরে শহিদুল আলমের কর্মে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশ ও আশেপাশের অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু রাজনৈতিক ও পরিবেশগত প্রেক্ষাপট। আমার এক বন্ধু সেদিন জানালেন, নিউ ইয়র্ক শহিদুল আলমের আলোকচিত্র প্রদর্শনী দেখার পর মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের মর্মান্তিক কাহিনী সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠার কথা।
আমি প্রথম তার কাজের সঙ্গে পরিচিত হই ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে সাইক্লোন আঘাত হানার পর। আমি ত্রাণ কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। ঝড়ের পর আক্রান্ত অঞ্চলে সফরও করি। শহিদুলের ছবিতে যেন আমার অভিজ্ঞতার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছিল। যোগ্যতার কারণেই ২০১৪ সালে শহিদুল আলম বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে পেয়েছিলেন শিল্পকলা পদক। দেশের শিল্পীদের জন্য এটি সর্বোচ্চ একটি সম্মাননা।
শহিদুলকে গ্রেপ্তারের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে আল জাজিরায় দেওয়া তার এক সাক্ষাৎকার। ঢাকায় শিক্ষার্থী বিক্ষোভের ওপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার যেই নির্মম নির্যাতন চালায় তা সম্পর্কে সমালোচনা করেছিলেন তিনি। তিনি সরকারী দুর্নীতি, অপশাসন, ভিন্নমত দমন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ও গুমের প্রসঙ্গেও কথা বলেন। অদ্ভুত হলেও, শহিদুল আলমের গ্রেপ্তার তার বক্তব্যেরই যথার্থতা প্রমাণ করে।
জুলাইয়ের শেষ নাগাদ গতিশীল এক বাসের নিচে চাপা পড়ে মারা যায় দুই শিক্ষার্থী। এরপর থেকেই স্কুলশিশুসহ হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবাদে নামে রাজপথে। বিক্ষোভ যখন সরকার-বিরোধী বিক্ষোভে ত্বরান্বিত হয়, তখন সরকার শাসকদলের অনুগতদের লেলিয়ে দেয় শিক্ষার্থীদের ওপর। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষকরা বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা বর্ণনা করেছেন কীভাবে বিক্ষোভকারীরা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সদস্যদের হাতে আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
পুলিশের সামনে শিক্ষার্থীদের ওপর আওয়ামী লীগের অনুগতদের হামলা প্রত্যক্ষ করেছেন যেসব সাংবাদিক তাদের একজন ছিলেন শহিদুল আলম। তিনি বিক্ষোভ ও নির্যাতন দুইই ক্যামেরাবন্দী করেছেন। এই প্রখ্যাত সাংবাদিক নিজেই শুধু আটক হননি। আরও বহু প্রতিবাদকারী গ্রেপ্তার ও পুলিশি হেফাজতে নির্যাতিত হয়েছেন।
অক্টোবর ও ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নিজ দেশের গঠনমূলক সমালোচনা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের। হাসিনা সরকার নিশ্চিতভাবেই শহিদুল আলমের মতো গ্রহণযোগ্য ও সম্মানীয় ব্যক্তিকে নিয়ে ভীষণ ভীত। কারণ, তার সমালোচনা দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়। তার গ্রেপ্তার ও বন্দিত্ব সমালোচনাপ্রবণ কন্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়ার প্রচেষ্টার সমতুল্য।
হাসিনা সরকার শুধু একটি গ্রেপ্তারেই ক্ষ্যান্ত হচ্ছে না। তারা চেষ্টা করছে তার মানহানি ও সুনাম ক্ষুণœ করার পথ খুঁজে বের করতে। শহিদুলের পার্টনার নৃবিজ্ঞানী রেহনুমা আহমেদ তাকে কারাগারে দেখে এসেছেন। তখন তিনি বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করেন যে, তাদের কথাবার্তা গোপনে ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করছে কারাগার কর্তৃপক্ষ।
রেহনুমা আহমেদ এক ইমেইল বার্তায় বলেছেন, ‘ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় কর্মরত বন্ধুরা আমাকে বলেছেন যে, তাদেরকে বিভিন্ন সংস্থা থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে শহিদুল সম্পর্কে ‘নোংরা কাহিনী’ প্রকাশ করার। তাকে এমনকি শিশু যৌন নির্যাতনকারী হিসেবে উপস্থাপনেরও কথাবার্তা চলছে। বিষয়টি জঘন্য কারণ শিশুদের প্রতি শহিদুলের ভালোবাসার কথা সকলের জানা।’
এটি বিস্মিত হওয়ার মতো ঘটনা নয়। কারণ, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ক্রমেই কর্তৃত্ববাদের দিকে ঝুঁকছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যেমনটা রিপোর্ট করেছে, গত কয়েক সপ্তাহ বা মাসে শ’ শ’ মানুষকে ধরে নিয়ে গেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা গুম হয়ে গেছে। এদের অনেকের খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি। মাদকবিরোধী যুদ্ধের নাম শ’ শ’ মানুষকে বিচারবহির্ভূত কায়দায় হত্যা করা হয়েছে।
শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তারের দুই দিন পর তাকে ঢাকার একটি আদালতে উপস্থাপন করা হয়। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কুখ্যাত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগ, তিনি অনলাইনে এমন বক্তব্য রেখেছেন যা ‘জাতির ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে’। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, শহিদুল আলম যে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা গেছে। তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমাকে নির্যাতন করা হয়েছে। আমার রক্তাক্ত শার্ট ধুয়ে আবার পরানো হয়েছে। আমাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে যে তাদের নির্দেশনা মোতাবেক যদি আমি স্বাক্ষ্য না দিই, তাহলে আমাকে আরও...।’ এরপরের বক্তব্য আর বোঝা যায়নি।
আদালত এক সপ্তাহের জন্য শহিদুলকে পুলিশি হেফাজতে রাখার অনুমতি দেন। এ সময় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তাকে হাসপাতালে যাওয়ারও অনুমতি দেওয়া হয়। ১২ই আগস্ট শহিদুল আলমকে ফের আদালতে উপস্থাপন করা হয়। তবে অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে ফের কারাগারে পাঠানো হয়। দোষী সাব্যস্ত হলে তিনি ১৪ বছরের কারাদন্ড পেতে পারেন।
বাংলাদেশীদের মধ্যে এক ধরণের অনুভূতি রয়েছে যে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ আর কাজ করে না। পুলিশও সুরক্ষা প্রদান করে না। অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতাও নেই। ফলে সাংবিধানিক শাসনের বিকাশ ও পুনরুদ্ধারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। যৌন সহিংসতাও চলছে অহরহ। নির্বাচনী প্রক্রিয়া জোরপূর্বক সহিংসতায় নিমজ্জিত। এক ধরণের ভয়ের সংস্কৃতি বিরাজ করছে দেশজুড়ে।
শহিদুল আলম ন্যায়বিচার পাবেন বাংলাদেশে, তেমনটা অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে তার বিরুদ্ধে সহিংসতা উস্কে দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘তার মিথ্যা পোস্ট ও অভিযোগের কারণে শিক্ষার্থীরা ক্ষুদ্ধ হয়ে পুলিশ ও আমাদের দলীয় কার্যালয়ে আক্রমণ করে। অনেক পুলিশ সদস্য ও আমাদের বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন। এদের একজন আরাফাতুল ইসলাম বাপ্পি নিজের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। তিনি এখন স্থায়ীভাবে পঙ্গু।’ শহিদুল আলমের সঙ্গে পুলিশ ও আদালত যে ধরণের আচরণ করবে, তার ওপর এই ধরণের বক্তব্যের নিশ্চিত নেতিবাচক প্রভাব থাকতে বাধ্য।
শহিদুল আলমের অধিকার লঙ্ঘণের পাশাপাশি, বাংলাদেশে সামাজিক ন্যায়বিচার ভেঙে পড়ার আলামত দৃশ্যমান। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদেরকে বিচারের আওতায় আনার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে হাসিনা সরকার বিচারকে কেবল প্রতিশোধ হিসেবে দেখে।
শহিদুল আলমের গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও কারাবন্দিত্ব একজন মানুষের ওপর নিষ্ঠুরতা  এবং মুক্ত গণমাধ্যমের অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতির ওপর আক্রমণ। বাংলাদেশকে অবশ্যই তাকে ও আটককৃত প্রতিবাদকারীদের মুক্তি দিতে হবে ও অভিযোগ প্রত্যাহার করতে হবে।
(গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি সেখানে ইন্সটিটিউট ফর কম্পেয়ারেটিভ লিটারেচার অ্যান্ড সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা। তার এই নিবন্ধ নিউ ইয়র্ক টাইমসের ওয়েবসাইট থেকে অনূদিত।)

সৌদি থেকে নির্যাতিত নারীর করুণ আর্তি by রোকনুজ্জামান পিয়াস

ভাই আমাকে বাঁচান। আমাকে নিয়ে যান। না হলে আমি মরে যাবো। একরাতে ছেলে আসে, আর এক রাতে বাপ আসে। আমি আর থাকতে পারছি না। আমার ঠ্যাং বেয়ে রক্ত পড়ছে। আমাকে বাঁচান ভাই, আমাকে বাঁচান। সৌদি আরবে গৃহকর্মে যাওয়া এক নারী গতকাল মোবাইল ফোনে এভাবেই তার দুর্দশার কথা তুলে ধরে দেশে ফেরার  আকুতি জানান।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের মিডিয়া শাখার এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথোপকথনে তিনি তার এই দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। ওই নারী জানান, তিনি ৪ মাস আগে সেদেশে গেছেন। দেশটির আল বাহার এলাকার একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ দেয়া হয়েছে তাকে। একমাস সেখানে ভালোই ছিলেন। কিন্তু এরপর থেকেই তার ওপর শুরু হয়েছে নির্যাতন।
নির্যাতিত নারীর বাড়ি খুলনা জেলায়। তার ছোট বোন রুমা জানান, ১৫ বছর আগে তার বোনের স্বামী মারা যান। একমাস পর তার ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। এরপর তিনি রাজমিস্ত্রি জোগালের কাজ নেন। সৌদি যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ওই কাজেই নিয়োজিত ছিলেন। সেখানে দিনমজুরের কাজ করে যা পেতেন তা দিয়েই দু’জনের পেট চালাতেন। একইসঙ্গে ছেলের লেখাপড়ার খরচও চালাচ্ছিলেন।
রুমা জানান, হঠাৎ করেই তার বোন জানান, সৌদি আরব যাবেন। সেখানে গৃহকর্মীর কাজ করবেন। আয়-রোজগার ভালো। এতে তার ছেলেটা ভালোভাবে লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হবে। রুবি বলেন, আমরা তাকে বিদেশ যেতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু কথা শোনেনি। বলেছেন, তার ছেলের ভবিষ্যতের জন্য তাকে যেতে হবে। কে তাকে সৌদি আরব যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে জানতে চাইলে নির্যাতিতার বোন জানান, সে যেখানে কাজ করতো সেখানকার একব্যক্তি তাকে পরামর্শ দেয়।
ওই ব্যক্তির স্ত্রীও একই সময় সৌদিতে যান। তিনিও এখন খুব কষ্টে আছেন। তার ওপরও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালাচ্ছে সৌদির গৃহকর্তারা। নির্যাতিতার ছোট বোন বলেন, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর তার বোন বলেছিলেন তিনি ভালো আছেন। কিন্তু কিছুদিন পরই তিনি তার কষ্টের কথা জানান। রোজার ঈদের দিন ফোন করে অনেক কান্নাকাটি করেন। বলেন, ওইদিন তিনি শুধু পানি খেয়ে ছিলেন। তাকে কোন খাবার দেয়নি। গৃহকর্তারা খাবার পরও তাকে থালা-বাসন ধুতে দিয়েছে। মাঝে মাঝে তাকে কোনো খাবার দেয় না। একদিন ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে একটা আপেল খেয়েছিল, সেদিন তাকে অনেক মারধর করে।
সব কাজ ছাড়াও ওই বাড়িতে দু’জন বয়স্ক মানুষ থাকে যারা চলাফেরা করতে পারে না। তার বোন তাদের পরিচর্যাসহ পেশাব-পায়খানা পরিষ্কার করেন।
এদিকে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে ধর্না দিয়েও নির্যাতিতাকে ফেরত আনার কোনো উপায় না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের শরণাপন্ন হন। শুধু ওই নারীই নন। সংস্থাটি একই সময়ে আরো ১৭ নির্যাতিত নারীর পরিবারের কাছ থেকে একই ধরনের অভিযোগ পান। পরে গত ২৫শে জুলাই তাদেরকে ফেরত আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে অভিযোগ জানান। একইসঙ্গে বেসরকারি এ সংস্থাটি নির্যাতিতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন।
গতকাল খুলনার এই নির্যাতিত নারীর সঙ্গে মোবাইলে কথা হয় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এক কর্মকর্তার। ওই কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড মানবজমিনের হাতে এসেছে। রেকর্ডের কথোপকথন হুবহু তুলে দেয়া হলো-
কাঁদতে কাঁদতে হতভাগা এই নারী ব্র্যাক কর্মকর্তাকে বলেন, আপনি আমার আপন ভাই, আমাকে বাঁচান, রাত্রিরি...। এক রাত্রিরি ছেলে আসে, আরেক রাত্রিরি বাবা আসে। আমার জানডা বোরোয় যাচ্ছে। ‘ওই জায়গায়’ হালিস বেরোয় গেছে। জানডা বেরোয় যাচ্ছে। থাকতি পারতিছি নে ভাই। আমারে একটু বাঁচান ভাই। আমারে একটু নিয়ে যান ভাই। (কাঁদতে কাঁদতে) ওরে ভাই, আমি মরে গিলাম ভাই। কতদিন সেখানে গেছেন জিজ্ঞেস করলে ওই নারী জানান, চার মাস হলো গেছেন। এর মধ্যে এক মাস তিনি ভালো ছিলেন। বলেন, ‘চার মাসে একমাস ভালো ছিলাম আর তিন মাসে আমার জানডা বেরোয় গেছে ভাই। আমি এখানে থাকলে বাঁচতি পারবো নানে।’ ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে পুলিশের কাছে যাওয়ার সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না ভাই, বাইর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনটা গেটে তালা দিয়ে রাখে।’ তিনি বলেন, ‘ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা কলি নেই না। খালি একটা বড়ি দেয়। ডাক্তারের কাছে নিলি আমি দেহাবানে, কয়ে দিবানে, তাইতি নেয় না।’ নারী বিলাপ করতে করতে আবারো বলেন, আমাকে বাঁচান ভাই। না হলি, আমি বাংলাদেশে যাতি পারবো নানে। আমাকে নিয়ে যান। আমি বাংলাদেশে কাজ করে খাবানে। একেনে কাজ করতি পারবো নানে। আমার ঠ্যাং বেয়ে বেয়ে রক্ত পড়ছে। এ সময় নারী অঝোরে কান্না করতে থাকেন। একইসঙ্গে ভীতসন্ত্রস্ত মনে হয় তাকে। 
জানা গেছে, খুলনার ওই নারী গত ৩রা এপ্রিল আল মিনার ওভারসিজ (আরএল নং- ১২৩৫) নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরব যান। এ ব্যাপারে এজেন্সির মালিক মো. আকতার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ ব্যাপারে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, এসব নারীদের সৌদি পাঠাচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সি। তারাই তাদের বিদেশ পাঠিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। কিন্তু যখন তারা বিপদে তখন এসব এজেন্সি কোন দায় নিতে চায় না। উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তারা খারাপ আচরণ করে। তিনি বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিলেই কেবল তারা এসব অসহায় ভুক্তভোগী এসব নারীদের দায়ভার নিতে বাধ্য হবে। এ ছাড়া সৌদিতে আমাদের নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, সেদেশ নারীকর্মী পাঠানোর ব্যাপারে নতুন করে ভাববার সময় হয়েছে।

মুঠোফোন ক্ষতি করে চোখের, শুক্রাণুরও

‘স্মার্টফোন’ ছাড়া আধুনিক জীবন কল্পনাই করা যায় না৷ অধিকাংশ তরুণ-তরুণীকেই আজকাল কানে স্মার্টফোন গুঁজে রাখতে দেখা যায়৷ অর্থাৎ এদের বেশিরভাগই অত্যাধুনিক সব মুঠোফোনে আসক্ত৷ কিন্তু আসক্তি মাত্রই যে ক্ষতিকর!
আর স্মার্টফোনে আসক্তি যে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে, তা আবারো নতুন করে জানান দিলেন চিকিৎসকরা৷ বললেন, অতিরিক্ত স্মার্টফোনের ব্যবহার এবং স্মার্টফোন থেকে নির্গত আলো চোখের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি করে৷ ধীরে ধীরে ডেকে আনে সর্বনাশ, এমনকি কাছের জিনিস দেখার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে যেতে পারে এর ফলে৷
ব্রিটিশ চক্ষুরোগ-চিকিৎসক অ্যান্ডি হেপওর্থ জানান, মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় চোখের পলক কম পড়ে এবং স্বাভাবিকের তুলনায় স্মার্টফোন চোখের বেশি কাছাকাছি এনে কোনো বিষয় দেখা হয়। তাই দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেট ও ফ্ল্যাট স্ক্রিন টিভি দেখার বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেন চক্ষুরোগ-বিশেষজ্ঞরা৷ তাঁদের দাবি, যে যন্ত্রগুলো  থেকে আলো নির্গত হয় তা চোখের জন্য শুধু ক্ষতিকরই নয়, বিষাক্তও বটে৷
এতে করে ঘাড়ে ব্যথা, মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনও হতে পারে৷ তবে শুধু চোখের ক্ষতিই নয়, মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার শুক্রাণুর সংখ্যাও কমিয়ে দিতে পারে৷ অধিকাংশ পুরুষই মোবাইল ফোন তাঁদের প্যান্টের পকেটে রাখেন৷ এ সময় রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক  রেডিয়েশন পুরুষের প্রজননতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে৷ বলাই বাহুল্য, এ ধরণের ক্ষতিকর তরঙ্গ শুক্রাণুর ওপর প্রভাব ফেলে এবং শুক্রাণুর ঘনত্ব কমিয়ে  দেয়৷ এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে মুঠোফোনে মেসেজ বা বার্তা টাইপ করা হলে আঙুলের জয়েন্টগুলোতেও ব্যথা হতে পারে, দেখা দিতে পারে আর্থাইটিসের মতো রোগ৷
তাই ডাক্তারদের পরামর্শ, ঘন ঘন ‘অফলাইন’ হন এবং আরো বেশি করে মুঠোফোনের আলো নয়, দিনের আলো উপভোগ করুন৷
সূত্র: ডয়চে ভেলি

বাংলাদেশি গণমাধ্যম কি স্বাধীনতা হারাচ্ছে? -আল জাজিরার বিশ্লেষণ

নন্দিত আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলমের মুক্তির দাবি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছাত্রদের আন্দোলনে উস্কানি দেয়ার অভিযোগে তিনি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। যে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা দ্রুতই বিস্তৃতি লাভ করেছে, বৃহৎ পরিসরে রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনের বছরে বাংলাদেশ খুবই সংবেদনশীল সময় অতিবাহিত করছে। পরিস্থিতির পাশাপাশি মানুষের মুখের ভাষা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। তারা সহিংসতা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে। আর যেকোনো ধরনের ভিন্নমতকে চুপ করিয়ে তারা মানুষের মুখের ভাষা নিয়ন্ত্রণ করছে। যেন শুধুমাত্র সরকারের দেয়া বার্তাই মানুষের কাছে পৌঁছে।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। তাই তারা চায় না, সরকারের কোনো খারাপ বিষয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জানুক। এ জন্য যখন শহিদুল আলম বিভিন্ন উদ্বেগের বিষয়ে আওয়াজ তুলেছেন, পরিষ্কারভাবেই তারা অনুভব করেছেন যে, শহিদুলের বক্তব্য আন্তর্জাতিক পরিসরে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে। শহিদুল আলমকে বিচারের মুখোমুখি করা হলে তার বিরুদ্ধে ২০০৬ সালে জারি হওয়া আইসিটি আইনে অভিযোগ তোলা হয়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় বসার চার বছর পর  শেখ হাসিনা সরকার আইনটির সংস্কার করে। অনলাইনে মানুষের দেয়া বিভিন্ন পোস্টের বিষয়ে তারা ৫৭ ধারায় যে পরিবর্তন আনে, গণমাধ্যমের ওপর নজরদারি করা বিদেশি এনজিওগুলো তার সমালোচনা করে। বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতার অধিকারের পক্ষে আন্দোলনকারীরাও এর প্রতিবাদ করেন। উল্লেখ্য, সম্প্রতি অনলাইনে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর তীব্র উস্কানিমূলক পোস্ট সহিংসতার সৃষ্টি করেছে। এতে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
৫৭ ধারা খুবই অস্পষ্ট। এতে সরকারের সমালোচকদের সহজেই বেছে বেছে অভিযুক্ত করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। সরকার এই আইনকে ব্যবহার করে যেকোনো ধরনের সমালোচনা কঠোরভাবে দমন করছে। এর মাধ্যমে তারা মানুষকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে, আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। যেন তারা ভবিষ্যতে অনলাইনে সরকারের সমালোচনা করে কোনো মন্তব্য না করে। শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করে, একজনের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে অন্যদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকার জানতো, এতে তারা সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন। কিন্তু এর বিনিময়ে কর্তৃপক্ষ নির্বাচনের বছরে একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন। বাংলাদেশে ব্যাপক দমন-পীড়ন চলছে। যারা এর শিকার হচ্ছেন, তার মধ্যে সাংবাদিকরাও রয়েছেন।
(বিশ্লেষণীতে অবদান রেখেছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলি, সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান, ইয়োরস ইলেক্ট্রা বইয়ের লেখক ইখতিসাদ আহমেদ ও বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।)

তুরস্কের কি সত্যিই পশ্চিমের বিকল্প আছে? by অনিম আরাফাত

সম্প্রতি তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। গত কয়েক দশকে দেশ দু’টির মধ্যে কখনো এত বেশি তিক্ত সম্পর্ক বিরাজ করেনি। মার্কিন ধর্মযাজক অ্যান্ড্রু ব্রানসনকে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের দায়ে দণ্ডিত করাসহ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেশ কয়েকটি ইস্যু নিয়ে বিবাদ চলছে তুরস্কের। অবস্থা যখন এই তখন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েফ এরদোগান যুক্তরাষ্ট্রকে সাবধান করে বলেছেন, প্রয়োজনে তার দেশ নতুন মিত্র খুঁজবে।
চলমান এ সংকট শুরুর পর থেকে প্রেসিডেন্ট এরদোগান যুক্তরাষ্ট্রকে একের পর এক হুমকি দিয়েই যাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, তুরস্ক ইরান থেকে রাশিয়া, চীন কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্য থেকে নতুন মিত্র খুঁজে বের করবে। একইসঙ্গে তিনি তুরস্ককে ব্রিকস ব্লকে যুক্ত করার বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রকে এরকম হুমকি দেয়ার মধ্যেই ১৩ই আগস্ট তুরস্ক সফর করে গেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। আগামী ৭ই সেপ্টেম্বর ইস্তাম্বুলে রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি ও তুরস্কের নেতারা বৈঠকে বসবেন বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সের্গেই ল্যাভরভের তুরস্ক সফরে উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই নিজেদের মধ্যে পারসপরিক সহযোগিতা ও সম্পর্ক উন্নয়নের অঙ্গীকার করেছেন। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির অবস্থার দিকে তাকালে এটি খুব বেশি আশ্চর্যজনক মনে হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাশিয়া ও তুরস্কের এখন প্রায় একইরকম স্বার্থ রয়েছে। ইউক্রেন সংকটের জেরে রাশিয়ার প্রধান রাজনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগী  ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক বর্তমানে তলানিতে অবস্থান করছে। একইসঙ্গে, ২০১৪ সালের পর রাশিয়ার উপরে আরোপ করা অবরোধের কারণে দেশটির মুদ্রা রুবলের মান প্রায় অর্ধেক কমে গেছে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে রাশিয়ার বাজেটে অর্থ ঘাটতি ছিল লক্ষণীয়।
একই অবস্থা এখন তুরস্কের সঙ্গেও ঘটছে। রাশিয়ার পরিণতির দিকে আস্তে আস্তে ঠেলে দেয়া হচ্ছে দেশটিকে। কিন্তু তুরস্ক তার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত। পশ্চিমের মিত্রদের সঙ্গে আঙ্কারার সম্পর্ক দিন দিন খারাপ হয়েই চলেছে। পশ্চিমের সঙ্গে চলমান সংকটের কারণে তুরস্কের অর্থনীতি ক্রমাগত অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। যার প্রভাব পরেছে দেশটির মুদ্রা লিরার মানেও। সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে লিরার মানের রেকর্ড পতন তুরস্কের সামনে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের আভাস দিচ্ছে। তাই একই শত্রু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাশিয়া ও তুরস্ক এখন নিজেদের একই কাতারে বিবেচনা করছে। এটিই হয়তো দেশ দুটির মধ্যকার দীর্ঘকালের বৈরী সম্পর্ক ভুলে পরস্পরের মধ্যে মিত্রতা স্থাপনের কারণ হতে চলেছে।
রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যকার সম্পর্কের উত্থান পতনও লক্ষণীয়। ২০১৪ সালে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্যের ঘনত্ব ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। এরপরের বছরের নভেম্বরে সিরিয়া সীমান্তে রাশিয়ার একটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করে তুরস্ক। এরপরই দেশ দুটির মধ্যে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হয়। সে সংকটের পরে তুরস্কের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্যিক ঘনত্ব কমতে শুরু করে। এরপর বিশ্ব রাজনীতির নতুন পালাবদলে পুনরায় দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করে। কিন্তু এখনো ২০১৪ সালের থেকে অনেক দূরেই রয়েছে দেশদুটির মধ্যকার বাণিজ্যের অবস্থা। ২০১৭ সালে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্পন্ন হয়।
২০১৫-তে রাশিয়ার বিমান ধ্বংসের ঘটনার পর উভয়পক্ষ বেশ কয়েকবার পরসপরের বিরুদ্ধে আরোপ করা অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয়ার অঙ্গীকার করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কোনো পক্ষই এ লক্ষ্যে এগিয়ে আসেনি। উল্টো নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনাও ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গত বছরের মে মাসে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান উভয় দেশের মধ্যে আরোপ করা সকল অবরোধ তুলে নেয়ার বিষয়ে সম্মত হন। কিন্তু এরপরেও তুরস্ক রাশিয়ার গম আমদানির উপরে দুইবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। রাশিয়াও তুরস্কের টমেটো রপ্তানির উপরে নিষেধাজ্ঞা দেয়। তবে একইসঙ্গে দেশ দুটি আরো কিছু ইস্যুতে সহযোগিতাপূর্ণ আচরণও করেছে।
কিন্তু তুরস্কের কি সত্যিই পশ্চিমের বিকল্প আছে? তুরস্কের নতুন মিত্র খোঁজার প্রচেষ্টাগুলোকে স্বাভাবিকভাবেই কৃত্রিম মনে হয়েছে। তার পেছনে যথেষ্ট কারণও আছে। জোহানসবার্গে গত ব্রিকস সম্মেলন চলাকালীন এরদোগান আভাস দিলেন, তুরস্ক এই ব্লোকে যুক্ত হতে চলেছে। কিন্তু এরপর তুরস্ক কিংবা ব্রিকস ব্লোকের কোনো সদস্য রাষ্ট্র এ বিষয়ে কোনো আগ্রহই প্রকাশ করেনি। সম্মেলন চলাকালীন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানালেন, বর্তমান সদস্যদের নতুন করে কোনো দেশকে যুক্ত করার ইচ্ছে নেই। পাশাপাশি ব্রিকসে ঢোকার জন্য তুরস্কের কোনো মিত্র রাষ্ট্র নেই। সাউথ আফ্রিকার ঢোকার জন্য ব্রাজিল ও ভারতের প্রচুর তদবির করতে হয়েছিল। কিন্তু তুরস্কের আমদানি পণ্যের মাত্র ৪.২ শতাংশ আসে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো থেকে। আমদানির ক্ষেত্রে দেশটি পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের উপরে নির্ভরশীল। তাই ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর তুরস্কের জন্য তদবির করতে আগ্রহী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)তে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও তুরস্ক  একই সমস্যার মুখোমুখি হবে।
যাই হোক, তুরস্কের এ ধরনের নতুন জোট ও মিত্র খোঁজার উদ্যোগ শুধু পশ্চিমকে ধাক্কা দেয়ার জন্যই নেয়া। সত্যিকার অর্থে নতুন মিত্ররাষ্ট্র খুঁজে বের করার কোনো ইচ্ছেই নেই তুরস্কের। দেশটি রাশিয়া ও তার মিত্রদের দিকে হাত বাড়িয়েছে ওয়াশিংটনকে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে। তুরস্ক ওয়াশিংটনকে বোঝাতে চাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র যদি তুরস্কের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেয় তাহলে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ও বাণিজ্য সহযোগী রাষ্ট্রকে হারাতে চলেছে। এখন শুধু সময়ই বলে দেবে আঙ্কারার এ পরিকল্পনা সফল হবে কিনা!

ডলার সংকট প্রকট

ভাই আমাকে বাঁচান। আমাকে নিয়ে যান। না হলে আমি মরে যাবো। একরাতে ছেলে আসে, আর এক রাতে বাপ আসে। আমি আর থাকতে পারছি না। আমার ঠ্যাং বেয়ে রক্ত পড়ছে। আমাকে বাঁচান ভাই, আমাকে বাঁচান। সৌদি আরবে গৃহকর্মে যাওয়া এক নারী গতকাল মোবাইল ফোনে এভাবেই তার দুর্দশার কথা তুলে ধরে দেশে ফেরার  আকুতি জানান।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের মিডিয়া শাখার এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথোপকথনে তিনি তার এই দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। ওই নারী জানান, তিনি ৪ মাস আগে সেদেশে গেছেন। দেশটির আল বাহার এলাকার একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ দেয়া হয়েছে তাকে। একমাস সেখানে ভালোই ছিলেন। কিন্তু এরপর থেকেই তার ওপর শুরু হয়েছে নির্যাতন।
নির্যাতিত নারীর বাড়ি খুলনা জেলায়। তার ছোট বোন রুমা জানান, ১৫ বছর আগে তার বোনের স্বামী মারা যান। একমাস পর তার ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। এরপর তিনি রাজমিস্ত্রি জোগালের কাজ নেন। সৌদি যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ওই কাজেই নিয়োজিত ছিলেন। সেখানে দিনমজুরের কাজ করে যা পেতেন তা দিয়েই দু’জনের পেট চালাতেন। একইসঙ্গে ছেলের লেখাপড়ার খরচও চালাচ্ছিলেন।
রুমা জানান, হঠাৎ করেই তার বোন জানান, সৌদি আরব যাবেন। সেখানে গৃহকর্মীর কাজ করবেন। আয়-রোজগার ভালো। এতে তার ছেলেটা ভালোভাবে লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হবে। রুবি বলেন, আমরা তাকে বিদেশ যেতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু কথা শোনেনি। বলেছেন, তার ছেলের ভবিষ্যতের জন্য তাকে যেতে হবে। কে তাকে সৌদি আরব যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে জানতে চাইলে নির্যাতিতার বোন জানান, সে যেখানে কাজ করতো সেখানকার একব্যক্তি তাকে পরামর্শ দেয়।
ওই ব্যক্তির স্ত্রীও একই সময় সৌদিতে যান। তিনিও এখন খুব কষ্টে আছেন। তার ওপরও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালাচ্ছে সৌদির গৃহকর্তারা। নির্যাতিতার ছোট বোন বলেন, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর তার বোন বলেছিলেন তিনি ভালো আছেন। কিন্তু কিছুদিন পরই তিনি তার কষ্টের কথা জানান। রোজার ঈদের দিন ফোন করে অনেক কান্নাকাটি করেন। বলেন, ওইদিন তিনি শুধু পানি খেয়ে ছিলেন। তাকে কোন খাবার দেয়নি। গৃহকর্তারা খাবার পরও তাকে থালা-বাসন ধুতে দিয়েছে। মাঝে মাঝে তাকে কোনো খাবার দেয় না। একদিন ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে একটা আপেল খেয়েছিল, সেদিন তাকে অনেক মারধর করে।
সব কাজ ছাড়াও ওই বাড়িতে দু’জন বয়স্ক মানুষ থাকে যারা চলাফেরা করতে পারে না। তার বোন তাদের পরিচর্যাসহ পেশাব-পায়খানা পরিষ্কার করেন।
এদিকে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে ধর্না দিয়েও নির্যাতিতাকে ফেরত আনার কোনো উপায় না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের শরণাপন্ন হন। শুধু ওই নারীই নন। সংস্থাটি একই সময়ে আরো ১৭ নির্যাতিত নারীর পরিবারের কাছ থেকে একই ধরনের অভিযোগ পান। পরে গত ২৫শে জুলাই তাদেরকে ফেরত আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে অভিযোগ জানান। একইসঙ্গে বেসরকারি এ সংস্থাটি নির্যাতিতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন।
গতকাল খুলনার এই নির্যাতিত নারীর সঙ্গে মোবাইলে কথা হয় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এক কর্মকর্তার। ওই কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড মানবজমিনের হাতে এসেছে। রেকর্ডের কথোপকথন হুবহু তুলে দেয়া হলো-
কাঁদতে কাঁদতে হতভাগা এই নারী ব্র্যাক কর্মকর্তাকে বলেন, আপনি আমার আপন ভাই, আমাকে বাঁচান, রাত্রিরি...। এক রাত্রিরি ছেলে আসে, আরেক রাত্রিরি বাবা আসে। আমার জানডা বোরোয় যাচ্ছে। ‘ওই জায়গায়’ হালিস বেরোয় গেছে। জানডা বেরোয় যাচ্ছে। থাকতি পারতিছি নে ভাই। আমারে একটু বাঁচান ভাই। আমারে একটু নিয়ে যান ভাই। (কাঁদতে কাঁদতে) ওরে ভাই, আমি মরে গিলাম ভাই। কতদিন সেখানে গেছেন জিজ্ঞেস করলে ওই নারী জানান, চার মাস হলো গেছেন। এর মধ্যে এক মাস তিনি ভালো ছিলেন। বলেন, ‘চার মাসে একমাস ভালো ছিলাম আর তিন মাসে আমার জানডা বেরোয় গেছে ভাই। আমি এখানে থাকলে বাঁচতি পারবো নানে।’ ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে পুলিশের কাছে যাওয়ার সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না ভাই, বাইর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনটা গেটে তালা দিয়ে রাখে।’ তিনি বলেন, ‘ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা কলি নেই না। খালি একটা বড়ি দেয়। ডাক্তারের কাছে নিলি আমি দেহাবানে, কয়ে দিবানে, তাইতি নেয় না।’ নারী বিলাপ করতে করতে আবারো বলেন, আমাকে বাঁচান ভাই। না হলি, আমি বাংলাদেশে যাতি পারবো নানে। আমাকে নিয়ে যান। আমি বাংলাদেশে কাজ করে খাবানে। একেনে কাজ করতি পারবো নানে। আমার ঠ্যাং বেয়ে বেয়ে রক্ত পড়ছে। এ সময় নারী অঝোরে কান্না করতে থাকেন। একইসঙ্গে ভীতসন্ত্রস্ত মনে হয় তাকে।
জানা গেছে, খুলনার ওই নারী গত ৩রা এপ্রিল আল মিনার ওভারসিজ (আরএল নং- ১২৩৫) নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরব যান। এ ব্যাপারে এজেন্সির মালিক মো. আকতার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ ব্যাপারে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, এসব নারীদের সৌদি পাঠাচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সি। তারাই তাদের বিদেশ পাঠিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। কিন্তু যখন তারা বিপদে তখন এসব এজেন্সি কোন দায় নিতে চায় না। উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তারা খারাপ আচরণ করে। তিনি বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিলেই কেবল তারা এসব অসহায় ভুক্তভোগী এসব নারীদের দায়ভার নিতে বাধ্য হবে। এ ছাড়া সৌদিতে আমাদের নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, সেদেশ নারীকর্মী পাঠানোর ব্যাপারে নতুন করে ভাববার সময় হয়েছে।

একজন কফি আনান

প্রথম মুসলিম, কৃষ্ণাঙ্গ ও আফ্রিকান হিসেবে জাতিসংঘের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন কফি আনান। তিনি ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পরপর দুই মেয়াদে জাতিসংঘের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। কর্তব্যরত অবস্থায়ই তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান ২০০১ সালে। অবসরের পর তিনি সুইজারল্যান্ডের জেনেভার কাছে জার্মান ভাষাভাষী একটি গ্রামে বাস করছিলেন। শনিবার ৮০ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন একসময়কার বিশ্বের শীর্ষ এ কূটনীতিক। কফি আনানের পুরো নাম কফি আত্তা আনান। ১৯৩৮ সালে ঘানায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ইফুয়া আত্তা নামে তার এক যমজ বোনও ছিল। তার জন্মস্থান কুসামি ঘানার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। কফি আনানের বাবা ছিলেন ঘানার একজন প্রাদেশিক গভর্নর। ঘানাতেই তিনি লেখাপড়া শেষ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকালেস্টার কলেজ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি দুইবার বিয়ে করেছেন। তার কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাজেট অফিসার হিসেবে। ১৯৬৫ সালে তিনি তিতি আলাকিজাকে বিয়ে করেন। তাদের দুটি সন্তানও রয়েছে। ১৯৮৩ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হলে কফি আনান বর্তমান স্ত্রী নেইন লাগেরগ্রেনকে বিয়ে করেন। কফি আনান যখন জাতিসংঘের মহাসচিবের দায়িত্বে তখন পৃথিবী অনেক কঠিন সময় পার করছে। এ সময় শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার নানা উদ্যোগ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। ইরাক যুদ্ধ ও এইডস যখন মহামারী রূপ ধারণ করেছে তখন তিনি জাতিসংঘকে নিয়ে এর সমাধানের চেষ্টা করেন। এ জন্য ২০০১ সালে তিনি যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। কফি আনান দীর্ঘ ৪ দশক জাতিসংঘে কাজ করেছেন। তিনিই প্রথম মহাসচিব যে কিনা সাংগঠনিক পদ থেকে জাতিসংঘের প্রধান হয়েছেন। ইরাক যুদ্ধের সমালোচনা করতে গিয়ে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে হয়। এ সময় দেশটির সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক যুদ্ধকে অবৈধ বলে অভিহিত করেন তিনি। এর ফল ভোগ করতে হয় তাকে ২০০৫ সালে। সে বছর মহাসচিব হিসেবে কলঙ্কিত হন কফি আনান। খাদ্যের বিনিময়ে তেল কেলেঙ্কারি বিষয়ক এক তদন্ত প্রতিবেদনে তাকে ও তার ছেলেকে অভিযুক্ত করা হয়। অনেকেই মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিবাদে জড়ানোতেই তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তীতে নতুন করে তদন্ত করা হলে কফি আনানের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় না। তবে তার ছেলে কোজোকে ওই লাভজনক কন্ট্রাক্টটি পেতে সাহায্য করার প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে কফি আনান এ কথা স্বীকার করে নেন। এই কেলেঙ্কারি ছাড়া কফি আনান জাতিসংঘের সব থেকে জনপ্রিয় মহাসচিব হিসেবেই পদত্যাগ করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাকে কূটনীতির ‘রকস্টার’ বলে অভিহিত করা হয়। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা শেষ করার পরেও কফি আনান তার কূটনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। কেনিয়ার রাইলা ওডিঙ্গা ও মাওয়াই কিবাকিদের মধ্যে সংঘাত থামাতে মধ্যস্থতা করেন তিনি। সিরিয়া যুদ্ধে তিনি ছিলেন আরব লীগ ও জাতিসংঘের বিশেষ দূত। তিনি ৭ বছর ধরে চলমান সিরিয়া যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করেছিলেন। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানেও আন্তর্জাতিক কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন কফি আনান। আনান কমিশন নামে খ্যাত এ কমিশন রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সুপারিশ করে। সমগ্র পৃথিবী থেকেই কফি আনান পেয়েছেন অসামান্য সম্মান।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট তার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে তার জ্ঞান ও সাহসের প্রশংসা করেন। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল কফি আনানকে ভিন্নধর্মী কূটনীতিক অভিহিত করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি স্থাপনে তার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এখনো কিছু না বললেও জাতিসংঘে দেশটির দূত নিকি হ্যালি শোক জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, কফি আনান ক্লান্তিহীনভাবে আমাদের এক রাখতে কাজ করে গেছেন। মানুষের অধিকার রক্ষায় নিজেকে কখনো থামিয়ে রাখেননি তিনি। কফি আনানের বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার নোবেলজয়ী ডেসমন্ড টুটু বলেন, তিনি একজন অসাধারণ মানুষ। আমাদের মহাদেশকে তিনি বিশ্বের কাছে উদার ও শ্রেষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরেছেন। জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরাঁ বিবৃতিতে বলেছেন, এক কথায় কফি আনানই ছিলেন জাতিসংঘ। এছাড়া হিলারি ক্লিনটন ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ অনেক বিশ্বনেতাই কফি আনানের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন।

ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ

বাংলাদেশ থেকে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। তাদেরকে আটক রাখা হচ্ছে। এই দুর্ব্যবহারের ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তজর্জাতিক নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা জোরালো হয়েছে। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদে ফেরত যাওয়ার আগে মাঠ পর্যায়ে অবস্থা পরিদর্শন করা উচিত জাতিসংঘের। এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এতে বলা হচ্ছে, ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের আটক করে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদেরকে সন্ত্রাসী বলে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপ পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেছেন, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গারা ফেরত গেলে তাদের নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন সরকার যে মিথ্যে কথা বলছে তা ফুটিয়ে তোলে। তিনি আরো বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে ফেরত যাওয়ার বিষয়ে জোর গলায় গ্যারান্টি দেয়া সত্ত্বেও যারা এখন পর্যন্ত ফেরত গিয়েছেন তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জাতি নিধনের শিকার হয়ে ৬ জন রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছিলেন। তারা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে বলেছেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থান দিয়ে অর্থ উপার্জনের জন্য তারা রাখাইন যান। কিন্তু তাদেরকে ধরে ফেলে বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)। এরপর তাদের ওপর নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা বিচারের আগেই বন্দিশিবিরে রেখে নির্যাতন করে। তাদের প্রত্রেককে বিচার করে চার বছরের জেল দেয়া হয়। প্রায় এক মাস পর সরকার তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়। একই সঙ্গে আরো কয়েক ডজন রোহিঙ্গাকে মুক্তি দেয়া হয়। সফররত সাংবাদিকদের সামনে ২০১৮ সালের ১লা জুন কর্তৃপক্ষ তাদেরকে হাজির করে। উদ্দেশ্য, তাদেরকে দেখানো যে, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষ ভাল আচরণ করছে এবং তাদের ফিরে যাওয়াটা নিরাপদ। সাংবাদিকদের সঙ্গে ওই সাক্ষাতের পর ওই ৬ রোহিঙ্গা পালিয়ে চলে আসেন বাংলাদেশে। তিনজন রোহিঙ্গা পুরুষ ও তিন জন বালকের সাক্ষাতকার নিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট বালকটির বয়স ১৬ বছর। তাদেরকে মংডুর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে আটক রাখা হয়েছিল। তারা বলেছেন, যোদ্ধা গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি’র (আরসা) বিষয়ে তাদেরকে অস্ত্রের মুখে বার বার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বিজিপি অফিসাররা। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের ওার নানা রকম অত্যাচার করা হয়েছে। তাদেরকে প্রহার করা হয়েছে লাঠি দিয়ে। রড দিয়ে। শরীর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আরসার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে জোরপূর্বক স্বীকার করাতে দেয়া হয়েছে বৈদ্যুতিক শক। তাছাড়া আটক রাখার সময়ে তাদের পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানি ও খাদ্য দেয়া হয় নি। ওই ৬ জনই বলেছেন, তাদেরকে সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সাদা পোশাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে। ঘুষি দিয়েছে। লাথি দিয়েছে। ওই ৬ জনই বলেছেন, তাদেরকে যেখানে আটক রাখা হয়েছিল সেখানকার অবস্থা শোচনীয়। তাদেরকে দেয়া হয় নি কোনো আইনজীবী। বিচার প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে বার্মিজ ভাষায়, যা তারা বোঝেন না বললেই চলে। আদালত তাদের সবাইকে চার বছরের জেল দিলে কর্তৃপক্ষ তাদেরকে নিয়ে যায় মংডু শহরের বুথিডাং জেলখানায়। ২৩ শে মে মংডু জেলা প্রশাসন থেকে রোহিঙ্গাদের জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাদেরকে দেয়া হবে জাতীয় সনাকক্তকরণ কার্ড (এনভিসি) এবং তাদেরকে মুক্তি দেয়া হবে। এনভিসি হলো এমন একটি পরিচয় বিষয়ক ডকুমেন্ট যা রোহিঙ্গারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ, তাদেরকে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেয়ার দাবিকে এর মাধ্যমে খর্ব করা হচ্ছে।

থাইল্যান্ডে টর্চার সেল: মানবপাচারে কোটিপতি শিক্ষক by শুভ্র দেব

মানবপাচার করে শতকোটি টাকা কামিয়েছেন এমন এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মোহাম্মদ আছেম নামের ওই শিক্ষক রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের বিবিএ’র ডিপার্টমেন্টের একজন প্রভাষক। শিক্ষকতার আড়ালে প্রায় এক দশক ধরে তিনি গড়ে তুলেছেন মানবপাচার চক্রের বড় এক সিন্ডিকেট। ২০০৯ সাল থেকে অবৈধভাবে সাগর পথে মানুষকে পাচার করে হাতিয়ে নিয়েছেন অন্তত শতকোটি টাকা।
নিজের ও সহযোগীদের ব্যাংক হিসাব থেকে এখন পর্যন্ত ২৫ কোটি টাকা নেয়ার তথ্য পেয়েছে সিআইডি। এর বাইরে তিনি কর্মের সন্ধানে বিদেশ যেতে আগ্রহী এমন লোকদের কাছ থেকে প্রায় আরো শতকোটি টাকা নিয়েছেন। সিআইডি জানিয়েছে, আছেমের বাবা আনোয়ার হোসেন ও তার বড় ভাই মোহাম্মদ খোবায়েদ দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়া অবস্থান করছেন। সেই সুবাদেই আছেম তার ছোট ভাই জাবেদকে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় মানবপাচারের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। এই সিন্ডিকেটই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে গরিব ও মধ্যবিত্ত ঘরের বেকার মানুষকে টার্গেট করে।
কম টাকায় মালয়েশিয়া গিয়ে ভালো আয়ের প্রলোভন দেখায়। প্রলোভনে রাজি হয়ে অনেকেই তাদের তৈরি ফাঁদে পা দেয়। আছেমের সহযোগীরা লোকজন সংগ্রহ করে টেকনাফ থেকে ট্রলারযোগে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে নিয়ে আটকে রাখে। থাইল্যান্ডের জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের আসল চেহারা ফুটে ওঠে। সেখানে তাদের আটকে রেখে বেধড়ক পেটানো হয়। মৃত্যুর হুমকি দিয়ে দেশের স্বজনদের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়। মুক্তিপণ দিতে না চাইলে অত্যাচারের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। দেখানো হয় নানা রকম ভয়ভীতি।
একপর্যায়ে স্বজনরা যখন আছেম ও তার সহযোগীদের কাছে টাকা পাঠায় তখন তাদের মালয়েশিয়া পাঠানো হয়। আর যারা টাকা দিতে ব্যর্থ হয় তাদের থাইল্যান্ডের জঙ্গলে মেরে ফেলা হয়। এমনকি যাদের মালয়েশিয়া পাঠানো হতো তাদের কাছ থেকেও আদায় করা হতো আরো টাকা। সিআইডি সূত্র জানায়, পাঁচদিন আগে আছেমকে একবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিন দিনের রিমান্ড শেষে আদালত তাকে জেলখানায় পাঠায় রোববার জামিনে বের হয়ে গেলে অন্য একটি মামলায় তাকে কাওরানবাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে তিনটি পাসপোর্ট, একটি মোবাইল, তার প্রতিষ্ঠানের তিনটি রেজিস্টার, বিকাশের হিসাব রেজিস্টারসহ বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই ও অবৈধ সম্পত্তির কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, আছেম তার নিজ নামে, ছোট ভাই জাভেদ মোস্তফা, মা খদিজার নামে এবং তার সহযোগী আরিফ, একরাম, ওসমান সারোয়ারের নামে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফে বিভিন্ন ব্যাংকে হিসাব খুলে মানবপাচারের ২০-২৫ কোটি টাকা নেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর বাইরে বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি শতকোটি টাকা অবৈধভাবে নিয়েছেন। আছেম মানবপাচারের এই টাকা দিয়ে টেকনাফে বাড়ি ও জমি কিনেছেন। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভূঁইগড়ে একটি ছয়তলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। পরবর্তীকালে এই মানবপাচার ব্যবসার আরও প্রসারিত হলে মুক্তিপণের টাকা নেয়ার জন্য আছেম এসিএম করপোরেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।
মোল্যা নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ২০১৪ সালে এই চক্রটি সাগরপথে সিরাজগঞ্জের মাসুদকে মালয়েশিয়ায় পাচার করে। এরপর পাচারকারীরা মুক্তিপণ হিসেবে ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা দাবি করে। পরে মাসুদের বাবা আ. ছালাম ইসলামী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে মুক্তিপণের টাকা পাঠান। কিন্তু এরপরও তার ছেলে মুক্তি না পেলে এ ঘটনায় তিনি ২০১৬ সালের ১১ই মার্চ উল্লাপাড়া থানায় মামলা করেন।
সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম মুক্তিপণের টাকা পাঠানো ইসলামী ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সূত্র ধরে চক্রটি চিহ্নিত করে। মুক্তিপণের মাধ্যমে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে গত বছরের মে মাসে সিআইডি বাদী হয়ে মানিলন্ডারিং আইনে বনানী থানায় আরেকটি মামলা করে। তিনি বলেন, আছেমের ব্যাংক হিসাবে যে পরিমাণ টাকার লেনদেন পাওয়া গেছে এবং এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদে যে তথ্য পাওয়া গেছে, ধারণা করছি সে অন্তত হাজারের উপরে মানুষ পাচার করেছে। রিমান্ডে এনে তাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করলে বিস্তারিত জানা যাবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে বিলম্বের জন্য বাংলাদেশকেই কার্যত দায়ী করলেন সুচি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে  বিলম্বের জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করেছেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি। এ ইস্যুতে তিনি তেমন কথা বলেন না। এমনকি নিজ মুখে রোহিঙ্গা শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করেন না। তবে সিঙ্গাপুরে এক সফরে গিয়ে তিনি কার্যত রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে বিলম্বের জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করেছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। তিনি সোমবার রাখাইনে তার সরকারের কর্মকান্ডের বিষয়ে সিঙ্গাপুরে বক্তব্য রাখেন। এ নিয়ে বিবিসি লিখেছে, গত বছর অগাস্টের শেষ সপ্তাহে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর হত্যা- নির্যাতনের মুখে যে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম পালিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে, এক বছরেও তাদের প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ার জন্য কার্যত বাংলাদেশকেই দায়ী করেছেন অং সান সূচি। তিনি বলেন, মিয়ানমার শরণার্থীদের নিতে প্রস্তুত, তাদের পুনর্বাসনের জন্য জায়গাও ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের পাঠানোর দায়িত্ব মূলত বাংলাদেশের। তিনি বলেন, তাদেরকে ফেরত পাঠাতে হবে বাংলাদেশকে, আমরা শুধু তাদের সীমান্তে স্বাগত জানাবো। কত দ্রুত এই (প্রত্যাবাসন) প্রক্রিয়া শুরু হবে তা নির্ভর করছে বাংলাদেশের ওপর। মিয়ানমারের নেত্রীর এই বক্তব্যে তীব্র ক্ষোভ এবং বিস্ময় প্রকাশ করেছেন রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনার আবুল কালাম। তিনি বলেছেন, তার মতো একজন নেতার মুখ থেকে এ ধরণের বক্তব্য শুনে আমি দুঃখিত হলাম। প্রত্যাবাসনে বিলম্ব হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করার সত্যের আরেকটি অপলাপ। মি কালাম বলেন, গত বছর নভেম্বরে প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের যে চুক্তি হয়েছে বেশ কিছু "অবশ্য করণীয়" শর্ত রয়েছে। যেমন চুক্তিতে বলা আছে, রোহিঙ্গারা যে গ্রাম বা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছে, তাদেরকে সেখানেই জায়গা করে দিতে হবে, একান্তই তা সম্ভব না হলে, নিকটবর্তী জায়গায় বা তাদের (শরণার্থীদের) পছন্দমত কোনা জায়গায় তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। ফেলে আসা জমিজমা, বাড়ি, সম্পদ ফেরত দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ে তাদের মনে ভরসা তৈরি করতে হবে, কিন্তু এগুলো কিছুই করা হয়নি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে প্রতিনিধিদল এ মাসে রাখাইন সফরে গিয়েছিল, সে দলে ছিলেন আবুল কালাম। তিনি জানান, দুটি অভ্যর্থনা ক্যাম্প এবং একটি ট্রানজিট ক্যাম্প তৈরি ছাড়া এখনো কিছুই হয়নি। "রোহিঙ্গারা তো এখানে ক্যাম্পেই রয়েছে, তারা তো তাদের দেশে গিয়ে ক্যাম্পে থাকতে চায় না।"
মি কালাম জানান, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছেন, শরণার্থীদের জায়গা দিতে মংডুতে ৩১টি এবং বুড়িচঙে ১১টি সহ মোট ৪২টি গ্রাম চিহ্নিত করা হয়েছে। "এখন পর্যন্ত শুধু চিহ্নিত করার কথাই তারা বলছে।"
"প্রত্যাবাসন ঝুলিয়ে রাখার কোনো প্রশ্নই আসেনা, বাংলাদেশ বরং গভীর উদ্বেগে তাকিয়ে রয়েছে কবে তা শুরু হয়।"
ব্যাংকক থেকে বিবিসির একজন সংবাদদাতা জনাথন হেড জানিয়েছেন, রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে একটি কথাও উচ্চারণ করেন নি মিস সুচি। বরঞ্চ তিনি বলেছেন রাখাইনের সমস্যার মূলে রয়েছে সন্ত্রাসবাদ। তিনি বলেন, রাখাইনে সন্ত্রাস এখনও বিদ্যমান এবং পুরো অঞ্চলের জন্য তা "মারাত্মক পরিণতি" তৈরি করবে। "সন্ত্রাসী তৎপরতার কারণেই রাখাইনে মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে, এবং (সন্ত্রাসের) সেই ঝুঁকি এখনও সমানভাবে রয়ে গেছে।"
জনাথন হেড বলছেন, মিস সুচির বক্তৃতাটি ছিল আগে থেকে তৈরি, এবং তাকে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল সিঙ্গাপুরে তিনি 'সহানুভূতিশীল শ্রোতাই" পাবেন।