Tuesday, April 1, 2025
নজরুল-প্রমীলার প্রেমের সাক্ষী যে বাড়ি by রিপন আনসারী
জমিদার বাড়ির সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনেক স্মৃতি বিজড়িত থাকলেও তা সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। এ জমিদার বাড়ির পাশেই ছিল নজরুলের প্রিয়তমা স্ত্রী প্রমীলা দেবীর বাড়ি। প্রমীলা দেবীর বাবা বসন্ত সেনের ভ্রাতুষ্পুত্র বীরেন সেনের সঙ্গে কবি নজরুল ইসলামের পরিচয় ঘটে এবং তাদের বন্ধুত্বের সৃষ্টি হলে নজরুল মাঝে মধ্যেই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বীরেন সেনের সঙ্গে তাদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন। এরই মাধ্যমে বসন্ত সেনের পরমা সুন্দরী কন্যা প্রমীলা দেবী দুলির সঙ্গে আলাপ পরিচয়ে এক পর্যায়ে নজরুলের প্রেমের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। প্রমীলা নজরুলকে কবিদা বলে ডাকতেন।
জনশ্রুতি রয়েছে, নজরুল যখন প্রমীলা অনুরক্ত, তখন একদিন জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের পুকুরে স্নানরত প্রমীলার অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রেমিক নজরুল গান গেয়ে ওঠেন, তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ। এরপর প্রেম প্রণয়ের অনেকটা জায়গা জুড়েই আছে জমিদার বাড়ি, পুকুর ঘাট, নাটমন্দির ও নবরত্ন মঠ।
এক সময়কার সৌন্দর্যমণ্ডিত তেওতা জমিদার বাড়িটি সম্পর্কে এলাকার বয়োবৃদ্ধের মুখে মুখে এখনো কিংবদন্তির মতো অনেক অজানা কাহিনী, যা এক সময় মানুষকে অবলীলায় বিস্ময়ের আবর্তে টেনে নেয়।
জানা গেছে, পঞ্চদশ শতকের প্রারম্ভে পাচুসেন নামক এক পিতৃহীন যুবক তার সততা ও আন্তরিক চেষ্টায় তামাকের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ-সম্পদের মালিক হন। পাচুসেন দিনাজপুর অঞ্চলে প্রথম জমিদারী ক্রয় করে তার পাচু নাম পরিবর্তন করে পঞ্চনন্দ সেন নাম গ্রহণ করেন। পঞ্চনন্দ সেনের পুত্র শঙ্কর রায় বাহাদুর ১৬৭০;এর দশকে (বাংলা ১০৮০) তৎকালীন নাগপুরের নীলকুঠির ম্যানেজার উডীন সাহেবের কাছ থেকে কিনে নিয়ে তেওতা জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন।
সৌন্দর্যমণ্ডিত এ জমিদার বাড়ির নবরত্ন মঠটির শিলালিপি থেকে জানা যায়, এ মঠটি ১৭০২-১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত। এই হিসাবে প্রায় ৩০০ বছর পূর্ব থেকে তেওতা জমিদার বাড়ি সমৃদ্ধিশীল ছিল। জমিদার বাড়ির উত্তর দিকের ভবনগুলো নিয়ে হেম শংকর এস্টেট এবং দক্ষিণ দিকের ভবনগুলো নিয়ে জয় শংকর এস্টেট গঠিত। প্রতিটি এস্টেটের সামনের অংশে যে অট্টালিকা আছে তা বর্গাকৃতির এবং এর মাঝখানে আছে দৃষ্টিনন্দন নাট মন্দির। এ মন্দিরে পূজা ও নাচ গানের আসর হতো। এস্টেটের পূর্ব দিকে ছিল অন্দরমহল। দক্ষিণ দিকে ভবনের নিচে ভূগর্ভে আজও একটি চোরা কুঠি রয়েছে। যা এ এলাকার অন্ধকূপ নামে পরিচিত ছিল। এটি ক্রমান্বয়ে ভরে গেছে। সেখানে বর্তমানে সাপ বিচ্ছুদের আস্তানা। জমিদার বাড়ির সামনের একটি ভবনে রয়েছে দুটি কয়েদখানা। সাধারণ প্রজারা খাজনা দিতে বিলম্ব করলে তাদের কয়েকখানার ভেতরে বন্দি করে নির্যাতন চালানো হতো। কয়েদখানাটি এখন আর নেই। সেখানে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। জমিদার বাড়ির সামনে টলমলে দিঘিতে ছিল বাঁধানো ঘাট। ঘাট সংলগ্ন প্রায় ৮০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট সেই নবরত্ন মঠ। চারতলাবিশিষ্ট এই নবরত্নের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার চারদিকে ক্ষুদ্রাকৃতির মঠ বা রত্ন এবং মাথার মঠ বা রত্ন নিয়ে মোট আটটি মঠ থাকায় একে নবরত্ন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল বলে সেখানকার মানুষজনের কাছ থেকে শোনা গেছে।
এ নবরত্ন মঠটিতে সে সময় জাঁকজমকপূর্ণ দোল পূজা অনুষ্ঠিত হতো।
তেওতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শরৎচন্দ্র জমিদার বাড়ি প্রসঙ্গে বলেন, তেওতা জমিদার বাড়ি মূলত জমিদারদের সময় থেকেই ঐতিহ্য বহন করে আসছে। এরপর আমরা ছোট থেকে আস্তে আস্তে জেনেছি এখানে প্রেমের কবি, দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আমাদের এলাকার আশালতা সেনগুপ্তা প্রমীলা দেবীর একটা প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রমীলা দেবীর বাড়ি জমিদার বাড়ির পাশেই ছিল। আমরা যতটুকু জেনেছি প্রমীলা দেবীর সঙ্গে নজরুলের পরিচয়ের যে ব্যাপারটা ছিল সেটা মূলত তার বাবা বসন্ত সেনের ভ্রাতুষ্পুত্র বীরেন সেন। বীরেন সেনের সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটা সখ্যতা ছিল। তিনিও সাহিত্যপ্রেমী ছিলেন এবং কবিতা ভালোবাসতেন। এই সূত্রে কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কয়েকবার তেওতা জমিদার বাড়িতে আসা। এখানে প্রমীলা দেবী দুলির সঙ্গে নজরুলের পরিচয় ঘটে। বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি বিশেষ করে ছোট হিটলার কবিতায় তেওতার কথাটা নজরুল তার কবিতায় লিখেছিলেন। সেখানে তিনি একটা লাইন লিখেছিলেন, ভয় করি না পুলিশদের, জার্মানির ওই ভাঁওতাকে কাঁপিয়ে দিতে পারি আমার মামার বাড়ি তেওতাকে।’ এ ছাড়া লোকমুখে শোনা গেছে আরও বেশ কয়েকটি গান, আমার কোন কূলে আজ ভিড়লো তরী এ কোন সোনার গাঁয় অথবা তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ। এটা শুনেছি প্রমীলা দেবীকে দেখেই নজরুলের গান লেখা।
এই শিক্ষক জানান, প্রতিনিয়তই দেশি-বিদেশি অনেক দর্শনার্থী আসেন, দেখেন- তাদের ভালো লাগে। এটা আসলেই ভালোলাগার একটা জায়গা। কারণ এটা কাজী নজরুল ও প্রমীলার স্মৃতি বিজড়িত এলাকা। যত দিন যাচ্ছে আর দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে-বিদেশে পর্যন্ত তেওতা জমিদার বাড়ির নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে এখানকার জমিদাররা পরবর্তীতে ইন্ডিয়া চলে যায়। ইন্ডিয়া থেকে অনেকেই মায়ার টানে, নাড়ির টানে এখানে ছুটে আসেন।
এদিকে, বিপন্নপ্রায় তেওতা জমিদার বাড়ির কিছু অংশ প্রত্নতাত্ত্বিকরা গবেষণার জন্য ব্যবহার করছেন। জমিদার বাড়ির প্রায় আট একর জমির বেশির ভাগ অবৈধ দখলদারদের কব্জায়। ইটপাথরে গাঁথা অতি প্রাচীন অট্টালিকাগুলো আজ রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ধসে পড়ছে।
তবে জমিদার বাড়ির সম্মুখ রাস্তার পাশে নজরুল এবং প্রমীলার স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ইট পাথরে গাঁথা ছবি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়েছে। দর্শনার্থীরা জমিদার বাড়ির প্রবেশের আগেই নিজেদের সঙ্গে নজরুল-প্রমীলার ছবি ক্যামেরাবন্দি করেন। বিভিন্ন দিবসের মধ্যে বিশেষ করে ঈদের আগে-পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে জমিদার বাড়িটি।

Monday, March 31, 2025
পঞ্চান্ন বছর আগের ‘ঝিনুক’ ঈদসংখ্যা by হোসাইন মোহাম্মদ জাকি
১২ নভেম্বর ১৯৭০ সালে সংঘটিত হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাইক্লোনের ক্ষত তখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি ভোলার আপামর জনতা। তাইতো পত্রিকার শুরুতেই ‘আমাদের কথা’ শিরোনামে পুরো পৃষ্ঠা নিয়ে লেখা ছিল, ‘যার কেউ নেই, কিছু নেই, আপনি কি পারেন না তার কেউ হতে, তাকে কিছু দিতে? সর্বহারাদের সাহায্যে আপনার সাধ্যানুযায়ী দান আরো দানের অংকের সাথে যোগ হয়ে বিরাট আকার ধারণ করতে পারে। আপনার বাহুল্য ব্যয় সাময়িকভাবে পরিহার করলে কিছু আসবে যাবে না, কিন' ঐ অর্থ দ্বারা অন্তত একজন দুর্গত মানুষের অশেষ উপকার হবে। আপনার দৈনন্দিন ব্যয়-বরাদ্দ থেকে কিছু হলেও বাঁচিয়ে তা দুস' মানবতার সেবায় নিয়োজিত করুন। দক্ষিণ বঙ্গের উপকূলবর্তী সহায়-সম্বলহীন মানুষের জন্য মুক্তহস্তে দান করুন।’
ঈদ সংখ্যাটিতে মোট ৩১টি সাদাকালো ও রঙিন বিজ্ঞাপন স'ান পেয়েছে। পূর্ণ, অর্ধ ও সিকি পৃষ্ঠা জুড়ে ছিল এসব বিজ্ঞাপন। তন্মধ্যে ছিল ‘মায়ার বাঁধন’, ‘বাংলার বধূ’, ‘বড় বউ’, ‘চৌধুরী বাড়ি’, ‘প্রিয়তমেষু’, ‘সামনের পৃথিবী’, ‘পলাশের রং’, ‘জল ছবি’, ‘কাঁচ কাটা হীরে’ ও ‘দীপ নেভে নাই’ চলচ্চিত্র এবং বেঙ্গল মোশান পিকচার্স স্টুডিওজ লিঃ-এর বিজ্ঞাপন। এসব বিজ্ঞাপন দেখে সিনেমা শিল্পের জনপ্রিয়তা তখন কতোটা তুঙ্গে ছিল, তা বেশ অনুমান করা যায়। পাশাপাশি অনুধাবন করা যায়, কতোটা সুন্দর ও রুচিশীল নামের ছায়াছবি নির্মিত হয়েছিল সত্তর দশকে। তবে ষাটের দশকেই রচিত হয়েছিল সুন্দর সত্তরের ভিত্তি। আশির দশকেও তা বিরাজ করেছে। সত্তর দশকের ছবি শিখিয়েছে পারিবারিক মূল্যবোধ, শ্রেণিবৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা এবং সাহিত্যভিত্তিক ছবির গুরুত্বসহ আরও নানা দিক। ‘মায়ার বাঁধন’ এবং ‘বাংলার বধূ’ চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠাংশে ছিলেন শাবানা-উজ্জ্বল। ‘চৌধুরী বাড়ি’ ও ‘প্রিয়তমেষু’ চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠাংশে ছিলেন শাবানা-রাজ্জাক। এ ছাড়া রাজ্জাক-কবরী, ফারুক-কবরী, সুচন্দা-আজিম ছিলেন সেসময়ের বেশ জনপ্রিয় জুটি।
ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত পশ্চিম পাকিস্তান সংশ্লিষ্ট দু’টি বিজ্ঞাপন ছিল চোখে পড়ার মতো। একটি সেন্ট্রাল ডাইরেক্টরেট অব ন্যাশনাল সেভিংস ইসলামাবাদ কর্তৃক প্রচারিত ‘প্রাইজ বন্ডস’ এবং অপরটি কেন্দ্রীয় জাতীয় সঞ্চয় দপ্তর ইসলামাবাদ কর্তৃক প্রচারিত ‘ডিফেন্স সেভিংস সার্টিফিকেটস’। এ ছাড়া লালবাগ কেমিক্যাল এন্ড পারফিউমারী ওয়ার্কস-এর লক্ষ্মীবিলাস ভেষজ কেশ তৈল, এলিট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের এলিট পেইন্ট, ইস্টার্ন ফেডারেল ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোং লিঃ, দি গ্রেট ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এবং তিতাস গ্যাস-এর বিজ্ঞাপন ছিল উল্লেখযোগ্য। সাইক্লোন আক্রান্ত মানুষের জন্য পূর্ব পাকিস্তান শিল্পোন্নয়ন কর্পোরেশন-এর বিজ্ঞাপনের ভাষা পূর্ণতা পায় এভাবে, ‘গগনবিদারী শোকের পাথার কাঁপায় নিখিল ধরা/ভাষাও আজিকে মৌন নীরব হৃদয় আকুল করা!’ এতো গেল বিজ্ঞাপনের আলাপ। এবার প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র বিষয়ে পর্যালোচনা।
রূপ ও বাণীর প্রথম চিত্রার্ঘ্য ‘দীপ নেভে নাই’ ছবির নায়িকা কবরী ও নায়করাজ রাজ্জাককে নিয়ে ছিল ঈদসংখ্যার প্রচ্ছদ বিন্যাস। যা আমাদের অনেকের নিকট এখন অবিশ্বাস্য বলে মনে হবে। কারণ প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে আমাদের বিনোদনের ধারা বদলে গেছে। বিনোদন মাধ্যম বলতে আজ আমরা বুঝি ওটিটি, ইউটিউব, স্পটিফাইয়ের মতো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফরম। টেলিভিশন চ্যানেলও বুঝি পুরনো হয়ে গেছে। অথচ বেশিদিন আগের কথা না, সিনেমা প্রচারের অন্যতম মাধ্যম ছিল রেডিও। ঘরে ঘরে তখনো টিভি এসে পৌঁছেনি। দুই ব্যান্ডের রেডিও ছিল কিছু মানুষের হাতে। কখনো বা সেথায় দুই বা ততোধিক শ্রোতাও থাকতো। সেই রেডিওর প্রধান আকর্ষণ ছিল মুক্তি আসন্ন সিনেমার প্রচারণা। শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে এই বিজ্ঞাপন শুনতো। বিজ্ঞাপনে কণ্ঠ দিয়ে নাজমুল হুসাইন এবং মাজহারুল ইসলাম নামের দু’জন তো একপ্রকার তারকা খ্যাতিই অর্জন করে ফেলেছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী ছিলেন নাজমুল হুসাইন। হ্যাঁ ভাই, আসিতেছে... আসিতেছে... আগামী শুক্রবার ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে...। ঈদ মানেই ছিল তখন নতুন সিনেমা। টিকিট ব্ল্যাক হওয়া ছিল সাধারণ বিষয়। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে ঈদ উপলক্ষে ‘দীপ নেভে নাই’ চলচ্চিত্রটি একযোগে শুভ মুক্তি পেয়েছিল ঢাকার বলাকা, মধুমিতা, স্টার, নিশাত, আনারকলি ও রাণীমহল, নারায়ণগঞ্জের গুলশান, চট্টগ্রামের আলমাস, খুলনার চিত্রালী ও পিকচার প্যালেস এবং বগুড়ার উত্তরায়। প্রযোজক ও পরিচালনায় ছিলেন ‘মিতা’ এবং সংগীতে ছিলেন ‘সত্য সাহা’। পরিণত বয়সীরা দল বেঁধে যেতেন সিনেমা হলগুলোতে। ঈদ উপলক্ষে রাতব্যাপী বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস'া হতো, যা খ্যাত ছিল ‘ফুল-সিরিয়াল’ হিসেবে।
সিনেমা হলে ছবি দেখা নিয়ে কি উন্মাদনাই না ছিল সেকালে! হলগুলোতে নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি পেলে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তা ফলাও করে জানান দেয়া হতো। ২৮ মার্চ ১৯৬৫ সালে দৈনিক আজাদ-এর শিরোনাম ছিল, ‘মহানগরের টিকিট ক্রয়ের জন্য নজিরবিহীন ভিড়, জনতার উপর পুলিশের লাঠিচার্জের ফলে ১৪১ জন আহত’। রাষ্ট্রপ্রধান একে ফজলুল হক বন্ধু-বান্ধব নিয়ে নিয়মিত সিনেমা হলে গিয়ে মুভি দেখতেন। শুধু তাই নয়, দাপ্তরিক প্যাডে সেই মুভি (পুকার) সম্পর্কে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত মতামত প্রকাশ এবং প্রশংসা (২৬.০১.১৯৪০) করেছেন অকুণ্ঠ চিত্তে। সেসময় নারীদের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল এই সিনেমা হল। এ বিষয়ে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন একান্ত সাক্ষাৎকারে জানান, “সিনেমা হলে তখন মেনে চলা হতো কঠোর পর্দা প্রথা। সিনেমা হল থেকে রাস্তা পর্যন্ত দুইদিকে কালো পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। সিনেমা শুরু হওয়ার পর হল অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ার পরেই কেবল পর্দা সরিয়ে ফেলা হতো। নারীদের জন্য আসন ব্যবস'া ছিল পুরুষদের থেকে একেবারেই পৃথক। বিরতির সময় ঝি’রা (গৃহকর্মী) হাতে করে নিয়ে আসতো শাহী শরবতের গ্লাস, ফল বা বেকারী সামগ্রী। যারা এসব পাঠাতো তারা নাম বলে দিতেন। ঝি চড়া গলায় বলতো, কেঠা রহিমন নেছা আছো, কেঠা ভুবনেশ্বরী দাশ... দেখা যেতো রহিমন নেছা শরবত যখন খেয়ে সেরেছে, তখন দেখা গেল আরও একজন ছিল ঐ নামের। শরবতের মালিক ছিল সে।” তরুণ-তরুণীদের হাঁটাচলা এমনকি পোশাকেও ছিল চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকাদের প্রতিচ্ছবি। নায়ক জাফর ইকবাল আর রাজ্জাক স্টাইলের ডিভাইডার প্যান্ট আর চুলগুলো আঁচড়ে এক পাশ করে রাখা, নায়িকা ববিতার মতো প্যাঁচিয়ে শাড়ি পরা আর সুচন্দার মতো গালে তিল আঁকা-এসবই ছিল সেকালের সিনে সংস্কৃতির সামাজিক বাস্তবতা।
প্রযোজক-পরিচালক মুস্তাফিজ-এর সাক্ষাৎকারের জবাবে ‘আলোচনা প্রসঙ্গে’ শিরোনামে জহির রায়হানের একটি অমূ্ল্য নিবন্ধ সংযুক্ত হয়েছে সূচিপত্রের প্রারম্ভেই। এই নিবন্ধ সেকালের চলচ্চিত্র পরিচালকদের সম্পর্কে অনেক মূল্যবান ও অজানা তথ্য জানার সুযোগ করে দিয়েছে। জহির রায়হান লিখেছেন, “এদেশে চলচ্চিত্র শিল্পের জনক আব্দুল জব্বার খান নিজে একজন নাট্যকার। এদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে, বিশেষ করে মঞ্চের সঙ্গে দীর্ঘদিন তিনি জড়িত ছিলেন। পরিচালক ফতেহ লোহানী, মহীউদ্দিন, সালাহউদ্দীন এঁরা উচ্চশিক্ষিত-প্রত্যেকের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে একটি বিশেষ অবদান আছে। ফতেহ লোহানী ছবি পরিচালনার আগে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। পরিচালক মহীউদ্দিন দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন এবং চলচ্চিত্রে যোগদানের আগে রেডিও পাকিস্তানের প্রোগ্রাম প্রোডিউসার হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। পরিচালক সালাহউদ্দীন বামপনি' রাজনৈতিক আন্দোলনে বিশিষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন এবং এদেশের নাট্যশিল্পের সঙ্গে তাঁর সক্রিয় যোগাযোগ ছিল। এদেশের চলচ্চিত্র-শিল্পের সূচনাতে উপরোল্লিখিত ব্যক্তিরা ছাড়া আরও দু’জন ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। একজন খান আতাউর রহমান। দ্বিতীয়জন আমি। খান আতাউর রহমান চলচ্চিত্রে প্রবেশের আগে কবি, সমালোচক ও সংগীতজ্ঞ হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। নিজের কথা বলবো না। শিক্ষিত রুচিবান সংস্কৃতিসেবীদের হাতে এদেশের চলচ্চিত্র-শিল্পের যখন সূচনা হয়, তখন দু’জন ঠিকাদার এসে এই শিল্পের অঙ্গনে প্রবেশ করেন। একজন মুস্তাফিজ, আর একজন তাঁর ভ্রাতা এহতেশাম। এঁদের শিক্ষা-দীক্ষা কিংবা ঐতিহ্য বলতে কিছুই ছিল না। এদেশে চলচ্চিত্র-শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল বুদ্ধিজীবীদের হাতে। তাঁদের চিন্তা ছিল ভালো ছবি তৈরি করা।...বুদ্ধিজীবী পরিচালকেরা যখন ভালো ছবি তৈরির প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন, তখন উল্লিখিত ভ্রাতৃদ্বয় সস্তা চটকদার ছবি বানিয়ে অর্থ উপার্জনের বাজার মাত করার চেষ্টা করেছিলেন এবং তাঁদের এই সস্তা চটকদার ছবিগুলোর সঙ্গে ভালো ছবিগুলোর ব্যবসায়িক পাল্লা দেয়া স্বাভাবিক কারণেই সম্ভবপর হলো না। পরিবেশকরা চটকদার ছবির নির্মাতাদের নিজের ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি চরিতার্থের প্রয়োজনে দু’হাতে আলিঙ্গন করে কাছে টেনে নিলেন এবং ভালো ছবির নির্মাতাদের অবহেলার সঙ্গে দূরে ঠেলে দিলেন। এই দুই চটকদার ছবি নির্মাতার দাপটে ‘আসিয়া’র মতো ভালো ছবি বানিয়েও ফতেহ লোহানী বেকার হয়ে গেল। পরিচালক মহীউদ্দিন আর সালাহউদ্দীন জীবন সংগ্রামের কঠিন ধাক্কায় জর্জরিত হলেন। চলচ্চিত্র-শিল্পের সূচনাতে যদি এঁদের আবির্ভাব না হতো, তাহলে এদেশের চলচ্চিত্র-শিল্পের গতি অন্যরকম হতো। তাহলে ‘আসিয়া’র পরিচালক ফতেহ লোহানীকে ‘সাতরং’ ছবি বানাতে হতো না। ‘মাটির পাহাড়’ আর ‘শীত বিকেলের’ পরিচালক মহীউদ্দিনকে ‘গাজী কালু চম্পাবতী’ বানাতে হতো না। ‘যে নদী মরুপথে’, ‘সূর্যস্নান’ আর ‘ধারাপাত’-এর পরিচালক সালাহউদ্দীনকে ‘রূপবান’ বানাতে হতো না। ‘সুতরাং’ আর ‘আয়না অবশিষ্ট’-এর পরিচালক সুভাষ দত্তকে ‘পালাবদল’ বানাতে হতো না। ‘অনেক দিনের চেনা’ আর ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’র পরিচালক খান আতাউর রহমানকে ‘সাত ভাই চম্পা’ বানাতে হতো না। ‘কখনো আসেনি’ আর ‘কাঁচের দেয়ালে’র পরিচালককেও ‘বেহুলা’ বানাতে হতো না। পরিচালক মুস্তাফিজ ও এহতেশাম ভ্রাতৃদ্বয় শুধু যে এদেশে ভালো ছবি তৈরির পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়েছিলেন, তাই নয়, একটার পর একটা চটকদার উর্দু ছবি নির্মাণ করে এদেশে বাংলা ছবির ভবিষ্যৎ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলেছিলেন...”।
সে আমলের প্রখ্যাত শিল্পী এবং চিত্র নায়ক-নায়িকাদের দুর্দান্ত সব ছবি স'ান করে নিয়েছে আলোচ্য সংখ্যাটিতে। ২৮৮ পৃষ্ঠার এই ঈদ সংখ্যায় চলচ্চিত্র গবেষক ও সাংবাদিকদের নানামুখী চিন্তার খোরাক রয়েছে। প্রতি সংখ্যাতেই ছিল ঝিনুক শব্দ প্রতিযোগিতার আয়োজন। সমাধান পাঠানোর শেষ তারিখ ধার্য করা থাকতো। শব্দ প্রতিযোগিতার জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্তের উল্লেখ করা হতো। সঠিক উত্তর প্রদানের জন্য আর্থিক পুরস্কারেরও ব্যবস'া ছিল। ‘সচিত্র চিত্র-কাহিনী’ শিরোনামে ‘দীপ নেভে নাই’ চলচ্চিত্রের কাহিনী সংক্ষেপ বর্ণনা করা হয়েছে। পাশাপাশি স'ান পেয়েছে কবরী, রাজ্জাক, রোজী, আনোয়ার হোসেন, মাস্টার ববি ও হাসমত-এর রঙিন ছবি। ববিতা, শাবানা, কবিতা ও শাহানা এই চারজনকে নিয়ে ‘আপন ভুবনে চার-কুমারী’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। পঞ্চান্ন বছর আগের এই ছবিগুলো পাঠক-পাঠিকাদের নিঃসন্দেহে স্মৃতিকাতর করে তুলবে। এ ছাড়া সূচিপত্রের প্রথম অংশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে- মেসবাহুল হকের একটি সম্পূর্ণ উপন্যাস ‘নটীর মৃত্যু’, সা’দত হাসান মান্টোর বড় গল্প ‘পুস্তকের সারমর্ম’ (অনুবাদ: আখতার-উন-নবী), বুলবুল আজাদের ছোটগল্প ‘অন্ধকার ঘরে’, কুমার শচীন দেববর্মণের ধারাবাহিক আত্মকথা: ‘আমার জীবনে আমি’, মিয়া মতীনের ব্যক্তিগত আলেখ্য (ধারাবাহিক): ‘ফেলে-আসা দিনগুলো’, চিত্র সমালোচনা, পশ্চিম পাকিস্তানের চিত্র সংবাদ।
সূচিপত্রের প্রথম অংশে শিল্পী পরিচিতি শিরোনামে জাফর ইকবাল ও লায়লা আর্জুমান্দ বানু সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু তথ্য রয়েছে। জাফর ইকবাল সম্পর্কে শিল্পী পরিচিতিতে ক্যাপশন হিসেবে লেখা হয়েছে, ‘নায়ক সমস্যার যুগে জাফর ইকবালের আগমন একটি চ্যালেঞ্জস্বরূপ। পর পর দুটো ছবি মুক্তি পাবার পর আজ তার হাতে অনেক ছবি। একে নিয়ে বিভিন্ন নায়িকার সঙ্গে জুটি বাঁধবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন পরিচালক-প্রযোজকরা।’ অসামান্য ও বিরল প্রতিভার অধিকারী সংগীতশিল্পী লায়লা আর্জুমান্দ বানু। ঝিনুক ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর ছবিটি বর্তমানে বেশ দুষ্প্রাপ্য। তাঁকে নিয়ে নানা তথ্যে সমৃদ্ধ এই নিবন্ধটি। পাঠক-পাঠিকাদের স্মৃতিরোমন'ন ও ভাবনার জাগরণে এর বিশেষ-বিশেষ অংশ হুবহু তুলে ধরা হলো:
“প্রায় একশ’ বছর আগেকার কথা। সৈয়দ গোলাম মুস্তাফা ছিলেন তাঁর দাদার বাবা অর্থাৎ পরদাদা। টপ্পা গানের প্রতি তাঁর সাংঘাতিক ঝোঁক ছিল। তখনকার যুগে গান-বাজনার যে খুব একটা প্রচলন ছিল, তা নয়। তবে বড় বড় জমিদারদের বাড়ীতে শুধু গানের জলসা বসতো। অবসর সময়ে গ্রামের মানুষ পল্লীগীতি গাইতো। সেইসব গানের কোনো ধরাবাঁধা সুর ছিল না। তখন থেকেই তাঁদের বাড়ীতে সঙ্গীতের প্রবেশ। তারপর ধীরে ধীরে এলো বাবার যুগ। সৈয়দ তৈফুর তাঁর বাবা। তিনি ছিলেন সাব-রেজিষ্ট্রার। এই সৈয়দ বংশেই জন্মগ্রহণ করেন লায়লা আর্জুমান্দ বানু। তাঁরা তিন বোন। বড় বোন লুলু বিলকিস বানু বর্তমানে লণ্ডনে রয়েছেন। তিনি কিছুদিন ভিকারুননেসা নূন স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন। ছোট বোন মালেকা পারভিন বানুও ভালো গায়িকা। আর তিনি মেঝো। বাবা সৈয়দ তৈফুর সাহেব চেয়েছিলেন তাঁর বড় মেয়ে লুলু বিলকিস বানু ভালো গায়িকা হোক। কিন' গানের দিকে ঝোঁক ছিল না তাঁর। ঝোঁক ছিল লায়লা আর্জুমান্দ বানুর প্রবল। তখন তাঁর বয়স মাত্র চার। রমণীমোহন ভট্টাচার্যের কাছে বড় বোন গান শেখেন। আর বসে বসে তন্ময় হয়ে শুনতেন তিনি।...শেষ পর্যন্ত রমণীমোহন বাবু তাঁকেই গান শেখাতে শুরু করলেন।
...তেইশ বছর একনাগাড়ে শিখেছেন ওস্তাদ গোলাম মুহম্মদের কাছে।...১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৩৯ সনের এক সন্ধ্যায় তাঁর গান প্রথম এ দেশবাসী বেতারে শুনতে পায়। সে দিনটি ছিল ঢাকা বেতারের ‘খেলাঘর’-এর উদ্বোধনী দিবস।...নজরুলের আর একটি গানও সেদিন তিনি গেয়েছিলেন-‘নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখিজল।’...‘খেলাঘর’-এ যতদিন গেয়েছেন, ততদিন বেতার কর্তৃপক্ষ তাকে কোনো পারিশ্রমিক দেননি। তবে ১৯৪১ সনে বড়দের সাথে গান গাইবার সুযোগ যখন এলো, তখন তাঁকে পাঁচ টাকা করে পারিশ্রমিক দেয়া হতো।...তখন গানের প্রোডাকশনে জড়িত ছিলেন প্রভাত মুখার্জী ও নির্মল ভট্টাচার্যের মতো মানুষ। উৎপলা সেন, কল্যাণী মজুমদারের মতো মেয়েও তখন রেডিওতে গাইতেন। ১৯৪০ সালের কথা। ...নজরুল ইসলাম আর শচীন দেববর্মণ মিলে করলেন ‘পূর্বাণী’ বলে এক ‘মিউজিক্যাল স্কেচ’। সেই ‘পূর্বাণী’তে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন।
...বাংলাদেশে তখন বিত্তশালী পরিবারে গ্রামোফোন ছিল চিত্তবিনোদনের প্রধান সহায়ক। কলের গানের চোঙার চারপাশে শহর-গ্রামের লোক ভিড় জমাতো। সে যুগ ছিল ‘আবু হোসেন আলীবাবার’ রেকর্ড নাটকের যুগ। সে যুগ ছিল আশ্চর্যময়ী, বিনোদিনী দাসী, আঙ্গুরবালা ও ইন্দুবালা এবং কে. মল্লিকের যুগ। সে যুগে যে-সমস্ত মেয়ে গান রেকর্ড করতেন, তাঁরা ছিলেন সমাজের বাইরে। সমাজ তাঁদের গান শুনতো, আনন্দ উপভোগ করতো। কিন' সমাজে কখনও তাঁরা আসন পাননি। মুসলমানরা তখনও এগিয়ে আসেনি রেকর্ড করতে। কে. মল্লিক কাসেম মল্লিক বলে কোনও রেকর্ড প্রথম দিকে করেননি বলে মুসলমান সমাজ তাঁকে মুসলমান বলে জানতেই পারেনি। যেমন তালাত মাহমুদকে তপন কুমার নাম নিয়ে রেকর্ড করতে হয়েছিল। কারণ, মুসলমান সমাজ তাদেরকে সমাজচ্যুত করতো। কিন' ১৯৩৪ সালের দিকে বাংলাদেশের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মুসলমান মেয়ে কণ্ঠ দিয়েছিলেন গ্রামোফোন রেকর্ডে। মানিকগঞ্জ মহকুমার পারিল নওয়াধার মরহুম আলী আহমদ হামিদুল্লাহ সাহেবের কন্যা আশরাফী খানম। আমাদের অতি পরিচিত ও প্রখ্যাত সঙ্গীত-শিল্পী আফসারী খানমের বড় বোন। তারপর সুদীর্ঘ ৮ বছর আর কোনও বাঙালী মুসলমান মেয়ের রেকর্ড বের হয়নি। তাঁর নিজের কতোটি রেকর্ড আছে, এ প্রশ্নের জবাবে বললেন, খুব বেশি হলে ১৫ থেকে ২০টি রেকর্ড হবে। আজকের বায়তুল মোকাররমের পাশে যে ইসলামিক একাডেমী অবসি'ত, সেই ইসলামিক একাডেমী ছিল বিধবা আশ্রম। সেই বিধবা আশ্রমে একবার ‘এইচ. এম. ভি কোম্পানী’ উঠেছিলো। ১৯৪৬ সনের কথা। তখন চিন্ময় লাহিড়ীর পরিচালনায় তাঁর কয়েকটি গান রেকর্ড করা হয়েছিল। তারপর ১৯৪৮ সনে আবার যখন ‘এইচ. এম. ভি কোম্পানী’ এসেছিল, তখন কয়েকটি গান রেকর্ড করিয়েছিলেন তিনি। ১৯৫৫ সনে লাহোরের ‘কিসমৎ’ ছবির প্লে-ব্যাক করেছিলেন তিনি। এটিই হচ্ছে তাঁর জীবনের প্রথম নেপথ্যে কণ্ঠদান। ...১৯৪৯ সনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি. এ. পাস করেছেন আর ১৯৬০ সনে বিয়ে করেছেন তৎকালীন বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক শামসুল হুদা চৌধুরীকে। ...১৯৫২ সনে তুরস্কে, ১৯৫৪ সনে আশুতোষ কলেজে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলনে, ১৯৫৫ সনে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত সাউথ-ইষ্ট এশিয়া রিজিওনাল কনফারেন্সে, এরপর ১৯৬০ সনে ইরানে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কো কনফারেন্সে, ১৯৬৩ সনে সোভিয়েট রাশিয়া, ১৯৬৬ সনে কাবুল, ইংল্যান্ড, ১৯৬৮ সনে ইরান প্রভৃতি দেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গেয়েছেন। ...তিনি বাংলা, উর্দু, পার্শি ও রাশিয়ান ভাষায় গান গাইতে পারেন।...”
সূচীপত্রের দ্বিতীয় অংশে বিশেষ রচনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে-‘আমার চোখে ফিল্ম-ইন্ডাস্ট্রি:এবার বলেছেন মশিহুর রহমান’, ‘অন্তরঙ্গ আলোকে:ফতেহ লোহানী’, ‘আমার প্রতিবিম্বে আমি: রেশমা’, ‘আমার কথা: সুচন্দা’ এবং ‘মুস্তাফার প্রেম’। নিয়মিত বিভাগ ছাড়াও ‘ইতিহাস কথা কও’ এবং ‘বিশ্ব বিচিত্রা’ শিরোনামে দুটি অধ্যায় সংযুক্ত হয়েছে আলোচ্য ঈদসংখ্যায়। পঞ্চান্ন বছর পর আসিরুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত ‘ঝিনুক’ ঈদসংখ্যাটি আপামর পাঠকের দৃষ্টিতে কিরূপে ধরা দিলো তার বিচার পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিলাম।

Monday, March 10, 2025
যাঁর গানে শুনে মুগ্ধ সংগীতশিল্পীরাও, কে এই মমতাজ বেগম
হারমোনিয়ামের তালে ঘরোয়া আসরে গাইছেন, ‘খুঁজবে আমায় সেদিন, যেদিন আমি থাকব না’। এক প্রৌঢ় শিল্পীর কণ্ঠে গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো ছড়িয়ে পড়েছে।
৭ মার্চ গানের ভিডিওটি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন গিটারিস্ট রায়হান পারভেজ। সাধারণ শ্রোতারা যেমন তাঁর গায়কির প্রশংসা করছেন, সংগীতশিল্পীরাও তাঁর গায়কিতে লীন।
জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কনকচাঁপা গানের ভিডিওর মন্তব্যের ঘরে লিখেছেন, ‘আহা! কী অসাধারণ কণ্ঠ। অসাধারণ কারুকাজ। সুরের গিরিখাতের পথে ওঠানামা। আমি অভিভূত।’
সেই পৌঢ় শিল্পী মমতাজ বেগম। অনেকটা আড়ালেই ছিলেন তিনি। ৭২ বছরে পা দিয়েছেন, তবু কণ্ঠের ধারটা ধরে রেখেছেন।
ভারতীয় সংগীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লার গাওয়া ‘খুঁজবে আমায় সেদিন, যেদিন আমি থাকব না’ গানটি মমতাজের খুব প্রিয়; সেই গান গেয়ে শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পেলেন মমতাজ।
দুই দিনের ব্যবধানে মমতাজের গানের ভিডিওটি ৩ হাজার ৮০০ বার শেয়ার হয়েছে। ১১ হাজারের বেশি রিঅ্যাক্ট এসেছে, ১ হাজার ৩০০–এর বেশি মন্তব্য জমা পড়েছে। সংগীতশিল্পী স্বপ্নীল সজীব লিখেছেন, ‘কী অসাধারণ, আপনাকে অতলান্ত শ্রদ্ধা।’ পল্লবী সরকার নামের আরেক শ্রোতা লিখেছেন, ‘প্রাণটা জুড়িয়ে গেল।’
মমতাজ বেগমের ভাতিজা সরোদশিল্পী তানিম হায়াত খান মন্তব্যের ঘরে জানান, মমতাজ বেগমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায়। সারা জীবন কলকাতায় কাটিয়েছেন। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে থাকছেন তিনি।
মমতাজ বেগমের বাবা সেতারশিল্পী ওস্তাদ আলী আহমেদ। আলী আহমেদ ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর সরাসরি শিষ্য ছিলেন। মমতাজের ভাই চঞ্চল খান কণ্ঠশিল্পী হৈমন্তী শুক্লার সঙ্গে দীর্ঘদিন তবলা বাজিয়েছেন।
তানিম হায়াত খান লিখেছেন, ‘অসাধারণ ভালো মানুষ মমতা পিসি। ওনার কলকাতার তোপসিয়ার বাসাতেও গেছি আমি। আর আমরা কলকাতায় গেলেই হোটেলে চলে আসতেন গল্প–আড্ডা দেওয়ার জন্য।। কী যে দারুণ সময় কাটিয়েছি ওনার সাথে।’
![]() |
| শিল্পী মমতাজ বেগম। ভিডিও থেকে নেওয়া |
Monday, January 6, 2025
ঢাকার শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে by ফরিদুর রেজা সাগর
তখন নাচের শিল্পীদের রিহার্সেল হতো টেলিভিশনের দোতলায়। কোনার দিকে একটি রিহার্সেল রুম ছিল সেখানে। নাচের শিল্পীদের রিহার্সেল মানেই শিল্পী মোস্তফা মনোয়ারের উপস্থিতি। মোস্তফা মনোয়ারকে অনেক অনুষ্ঠানে দেখা যেতো বিশেষ করে নাটক, বিশেষ গানের অনুষ্ঠানে, ছোটদের অনুষ্ঠানে তো বটেই। আমরা দেখেছি মোস্তফা মনোয়ার নিজে থেকে এসে বিভিন্ন রকম পরামর্শ দিতেন। নাচের রিহার্সেল চলতো দীর্ঘসময় ধরে। মোস্তফা মনোয়ার আটকে যেতেন। বিশেষ করে ছোটদের অনুষ্ঠানের সময়। ছোটদের অনুষ্ঠানের সঙ্গে আমিও জড়িত ছিলাম, ফলে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কথা বলার জন্য অনেক সময় ধরে অপেক্ষা করতে হতো। তারপর এক সময় অপেক্ষা করতে করতে রিহার্সেল রুমে ঢুকে যেতাম। সবার দিকে তাকিয়ে বলতামÑ স্যার, একটু সময় লাগবে, এই এক মিনিট পরামর্শ ছিল। সবাই কেমন তাকিয়ে থাকতো। মাঝে মাঝে আমিই এই কাণ্ডটা করতাম। আমার সঙ্গে কখনো কখনো কাজী কাইয়ুমও রিহার্সেল রুমে চলে যেতেন।
একদিন অঞ্জনা সুলতানা বললেন, সাগর তোমার সব কাজই কি আমাদের এই নাচের রিহার্সেলের সময় পড়ে?
আমি বললাম, ঠিক তা নয়, আপনারা তো দীর্ঘ সময় ধরে রিহার্সেল করেন, আমরা আমাদের অনুষ্ঠানের জন্য একটু কথা বলা বা পরামর্শের জন্য আটকে যাই। তিনি বললেন, তোমাকে এমনিতেই বললাম, আমরা তো অনুষ্ঠানের জন্য মন্টু মামার (মোস্তফা মনোয়ার) পরামর্শ নিই। সুতরাং কি আর করার আছে তোমাদের লাগলে চলে আসবে। আমাদের রিহার্সেল যতক্ষণ করার ততক্ষণই করবো।
একজন শিল্পীর এই কথা আমরা রিহার্সেল অনেকক্ষণ ধরেই করবো। এটা আজকাল হারিয়ে গেছে। অনুষ্ঠান করা মানেই শো-এর আয়োজন করো, স্টেজে দেখিয়ে দেবো। কিন্তু অঞ্জনার মতো শিল্পীরা ভালো কিছু করার জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। রিহার্সেল করেছেন দীর্ঘক্ষণ ধরে। ভালো কিছু দর্শকদের উপহার দেয়ার জন্য অঞ্জনাদের চেষ্টা অব্যাহত থেকেছে। সেই সময় নাচের বিভিন্ন দল দেশের বাইরে অনুষ্ঠানে যেতো। সেই সমস্ত দলে অঞ্জনা ছিলেন নিয়মিত শিল্পী। ফিরে এসে তিনি প্রচুর ছোট ছোট উপহার দিতেন আমাদের। যে দেশে যেতেন সে দেশের গল্প শোনাতেন। তার এই গল্প বলার অভ্যাস যখন যেখানে যে অনুষ্ঠান হয়েছে অঞ্জনাকে দেখেছিÑ এফডিসিতে বা চ্যানেল আইয়ের যেকোনো অনুষ্ঠানে বেশ আগেই চলে আসতেন তিনি। বিশেষ করে চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে আমি বলতে পারি- তিনি এসেই গল্প করতেন, নানা রকম পরামর্শ দিতেন। যেতেনও বেশ দেরি করে। অর্থাৎ শিল্পের সঙ্গে শিল্পীদের সম্পৃক্ত থাকতে তিনি পছন্দ করতেন।
তখন তিনি সিনেমায় নাম লিখিয়েছেন। তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘সেতু’ হলেও প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘দস্যু বনহুর’। ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজ তখন তুমুল জনপ্রিয়। ১৯৭৬ সালে শামসুদ্দিন টগর পরিচালিত ‘দস্যু বনহুর’ সিনেমায় তিনি নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, তার বিপরীতে ছিলেন নায়ক সোহেল রানা। তিনি যখন টেলিভিশনে আসতেন আমরা অবাক বিস্ময়ে তাকে দেখতাম নায়িকা হিসেবে। তখন তাকে নায়িকা আপা বলে ডাকতাম।
তিনি বলতেন, আমি নৃত্যশিল্পী হিসেবেই সব সময় পরিচিত থাকতে চাই।
তারপরও ঘটনাযজ্ঞে তিনি খ্যাতিমান নায়িকা হয়েছেন। প্রায় শতাধিক বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এর বাইরে যৌথ প্রযোজনার সবচেয়ে বেশি চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। ৬০টি দেশের সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছেন নায়িকা হিসেবে। যার সাফল্যের এত বড় একটি তালিকা রয়েছে। সাফল্যের মুকুট হিসেবে তিনি তিনবার নৃত্যশিল্পী হিসেবে এবং দুইবার অভিনয়শিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। তালিকাটা এত দীর্ঘ তবুও তাকে দীর্ঘ সময় অসহায়ের মতো থাকতে হয়েছে। হাসপাতালে যে ক’দিন ছিলেন, শিল্পীরা কেউ কেউ তাকে দেখতে গিয়েছেন। তারপরও হাসপাতালের জীবন তো সুখকর নয়। নানান হিসাব-নিকাশ করতে হয়। অঞ্জনার বেলায়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শুনেছি প্রথম তিনি যে হাসপাতালে ছিলেন সেই হাসপাতালের বিল দিতে হয়েছে তার সমস্ত গয়না বিক্রি করে। অঞ্জনা বেশ কয়েকটি টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেছিলেন। প্রথম যে নাটকটিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন, সেই নাটকটি ছিল আমার লেখা। কাজী কাইয়ুম ছিলেন সেই নাটকের প্রযোজক। তখন তিনি নায়িকা হয়ে গেছেন। আমরা চিন্তা করলাম অঞ্জনা সুলতানাকে দিয়ে অভিনয় করানোর। এই নাটকে তাকে ভালো মানাবে। গল্পটা হলো- একটি পাহাড়ি এলাকায় কয়েকজন পর্যটক আটকে গেছে, তারপর তারা সেখান থেকে কিভাবে উদ্ধার পেলেন, সেই গল্পের নায়ক ছিলেন বুলবুল আহমেদ। প্রযোজক কাজী কাইয়ুম। কাজী কাইয়ুমের সঙ্গে ছিলেন শেখ রিয়াজউদ্দিন বাদশা। রিয়াজউদ্দিন বাদশা, অঞ্জনা সুলতানাকে রাজি করিয়েছিলেন। অঞ্জনা সুলতানা সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন এবং খুব সুন্দর অভিনয় করেছিলেন তিনি। তারপর তিনি আরও বেশ কয়েকটা নাটকে অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু আমার গর্ব তিনি আমার লেখা নাটকে প্রথম অভিনয় করেছিলেন। তারচেয়ে বড় অহংকার এই নায়িকার ‘ঢাকার শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে’ গানে অথবা ‘দস্যু বনহুর’ সিনেমায় অভিনয় দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছি। তিনি পরবর্তী জীবনে আমাদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে ছিলেন। অঞ্জনা’র সবচেয়ে কাছের বন্ধু প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন এসেছেন চ্যানেল আইতে। সাবিনা ইয়াসমিন এবং অঞ্জনা ছিলেন হরিহর আত্মা। সাবিনা ইয়াসমিন তার প্রিয় বন্ধুটিকে দেখতে এসেছেন। অঞ্জনাও এসেছেন কিন্তু তিনি নিথর, স্থির দেহ তার। তার সেই প্রিয় বন্ধুটিকে দেখে বুকে জড়িয়ে নিতে পারছেন না। চোখ বুজে আছে লাশবাহী গাড়িতে। সাবিনার চোখ ছলছল। অঞ্জনা কোনো কথা বলছেন না। কোনো সাড়া নেই নীরবে শুয়ে আছেন।
তার মতো শিল্পীবান্ধব মানুষ আমাদের চলচ্চিত্র বা টেলিভিশন জগতে খুব কম শিল্পীই ছিলেন। অঞ্জনা আপনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Monday, October 21, 2024
মনি কিশোরের মৃত্যু: গতকাল যা ঘটেছিল রামপুরার পপি ভবনে
ছোট একটি গেট। সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হয়। তিনতলায় গিয়ে দেখা গেল মনি কিশোর যে ফ্ল্যাটে থাকতেন, সেই রুমে তালা দেওয়া। ‘প্রবেশ নিষেধ’ চিহ্ন দিয়ে রেখেছেন পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তারা। তালার একপাশে তখনই আগরবাতি জ্বালিয়ে রাখলেন পাশের রুমের প্রতিবেশী তাজুল মিয়া। এই প্রতিবেদককে দেখে তিনি বললেন, ‘স্যার তো এখানে একা থাকতেন। তাঁর কেউ নেই। আগরবাতি দেবে, দেখতে আসবে, তেমন কেউ ছিল না মনি স্যারের। কোনো দিন কাউকে আসতে দেখিনি।’
তাজুল জানান, ছয় দিন আগেও মনি কিশোরকে দেখেছিলেন। দেখা হলে সৌজন্য বিনিময় হয়। মাঝেমধ্যে মনিই খোঁজখবর নিতেন। কিন্তু তিন–চার দিন ধরে বাসার ভেতর থেকে লক করা দেখছেন তাঁরা। এটা কিছুটা কৌতূহলী করেছে তাঁদের। কারণ, মনি কিশোর প্রতিদিন বেলা ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হতেন। বাসায় ফিরতেন রাত ১২টার দিকে। কিন্তু এই কয়েক দিন সব সময় রুমে লাইট জ্বালানো দেখে পরবর্তী সময়ে তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন কোনো কাজ করছেন। কারণ, বাসায় থাকলে অনেকটা নীরবেই থাকেন। কখনো মৃদুস্বরে কিছুটা গানের শব্দ শোনা যেত। তবে চার থেকে পাঁচ দিন তাঁরা কোনো গান শোনেননি।
গত শুক্রবার তাজুল ও অন্যদের সন্দেহ হয়। সেটাও তেমন আমলে নেননি। তাজুলের স্ত্রী পাশ থেকে বললেন, ‘একা মানুষ থাকতেন, হয়তো ভেতরে কিছু করছেন, এই ভেবে আমি ডাকিনি। তিনি গানের মানুষ, গান আর অফিস নিয়ে থাকতেন। কিন্তু শুক্রবার রাত থেকেই গন্ধ পাচ্ছিলাম। হঠাৎ গতকাল শনিবার দুপুরের পরে গন্ধ বাড়তে থাকে।’
গতকাল দুপুর থেকেই পপি ভবন ও পাশের লাগোয়া ভবনের বাসিন্দারা গন্ধ নিয়ে সচেতন হন। সন্ধ্যার দিকে বাসার মালিকও বুঝতে চেষ্টা করেন, কোথা থেকে গন্ধ আসছে। কিন্তু কোথা থেকে, সেটা কেউই বুঝতে পারছিলেন না। পরে তাঁর সন্দেহ হয় মনি কিশোরের রুম বন্ধ। পাশের প্রতিবেশী ও মনি কিশোরের রুমের জানালার পাশে ভাড়াটেরাও একই কথা বলেন।
বাসার মালিক শামসুদ্দোহা তালুকদার নিচতলায় থাকেন। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক পরিচালক। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মনি কিশোরের মুঠোফোন নম্বরে কল করেন। এক দিন আগেও তিনি ফোন করেছিলেন বকেয়া ভাড়ার জন্য, তখনো ফোন রিসিভ করেননি মনি কিশোর। ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো কারণে ফোন ধরছেন না। কোনো অনুষ্ঠানে হয়তো ঢাকার বাইরে গিয়েছেন। কিন্তু নম্বরটি শুক্রবারে চালু থাকলেও পরে গতকাল সন্ধ্যার পর বন্ধ পান।
গতকাল সন্ধ্যার পর পপি ভবনের সামনে ভিড় জমে। পরিস্থিতি বোঝার জন্য শামসুদ্দোহা আরও কয়েকজনকে নিয়ে চলে যান মনি কিশোরের দরজার সামনে। তখন গন্ধে তাঁরা দাঁড়াতেই পারছিলেন না। ধরে নেন, মনি কিশোরের কিছু একটা হয়েছে। অনেক ডাকাডাকি করেন। শামসুদ্দোহা আজ রোববার দুপুরে প্রথম আলোকে জানান, সন্দেহ হলে তিনি মনি কিশোরের বন্ধু আদনান বাবুকে প্রথম ফোন দিয়ে দ্রুত আসতে বলেন। তখন আদনান পরামর্শ দেন দ্রুত ৯৯৯–এ ফোন করতে।
রাত ৯টা ৪৫ এর দিকে ৯৯৯ ফোন দিয়ে পুলিশকে ঘটনা জানান। রাত ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। পরে বাড়ির মালিক ও পাশের বাসার প্রতিবেশীসহ আরও কয়েকজন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। দরজা খোলা হয়। তাঁরা দেখতে পান বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছেন মনি কিশোর। তিনি খালি গায়ে ছিলেন। পরনে ছিল প্যান্ট। তাঁর শরীর ফুলে গেছে। কিছু জায়গায় পচন ধরেছে। রাতেই লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
পাশের বাসার প্রতিবেশী তাজুল মিয়া জানান, মনি কিশোর বেশির ভাগ সময় বাইরে থেকেই খেয়ে আসতেন। আর মাঝেমধ্যে কাঁচাবাজার করে নিয়ে আসতেন। তবে সেগুলো তিনি নিজে তেমন রাখতেন না। এগুলো প্রতিবেশী অনেককেই দিয়ে দিতেন। তাঁদেরকেও অনেক সবজি দিয়েছেন। তাজুলের স্ত্রী পাশ থেকে বলেন, ‘মনি স্যারকে আমরা তিন বছর ধরে দেখছি এই বাসায়। এ সময় তাঁকে কখনোই খারাপ পাইনি। তিনি নিজের জন্য ফল কিনে আনতেন। একা মানুষ কত আর ফল খাবেন, অনেক ফল এটা–ওটা আমাদের দিয়ে দিতেন।’ এ সময় আফসোস করে তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই দেখতে আসছেন কিন্তু তাঁর আপন কেউ এখনো আসেনি। একটা মানুষ মরে গেল। কোথায় থাকত, কী অবস্থা কেউ দেখতে এল না। এমন মৃত্যু যেন কারও না হয়।’
বাসার মালিক শামসুদ্দোহা জানান, তিনি বিটিভির প্রযোজক হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। সেই নব্বইয়ের দশকের সময় থেকে তরুণ অনেককে দিয়ে গানের অনুষ্ঠান করিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছিল মনি কিশোর। সেই থেকে পরিচয় হলেও তিন বছর আগে তেমন যোগাযোগ ছিল না। তাঁর ওই বাসায় তিন বছর আগে থাকতেন আদনান। তিনি একদিন জানালেন, বাসায় তাঁর সঙ্গে থাকবে মনি কিশোর।
‘মনি কিশোর থাকবে শুনে খুশি হয়েছিলাম। আমাদেরই ছেলে। আমি মানা করিনি। মনিকে আমি সেই আগে থেকেই তুই বলতাম। সে আমাকে আব্বা বলত। ওকে মাঝেমধ্যে দেখতাম তিন-চার দিন কোনো খবর নেই। পরে বলত, শো করতে গিয়েছিল। সেটাও খুবই কম। এবার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও ভাড়া দিচ্ছিল না। আমি নিয়মিত ফোন দিতাম। কিন্তু ধরত না। পরে ব্যাকও দিত না। ধরে নিয়েছিলাম এবারও শো করতে গেছে। প্রতিদিনই ফোন দিতাম। পরে কাল রাতে যখন ফোন বন্ধ পাই, তখন মনে হয় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। এভাবে ওর চলে যাওয়াটা খুবই দুঃখজনক’, বলেন শামসুদ্দোহা।
জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন মনি কিশোর। এ ছাড়া মানসিক চাপেও থাকতেন। পরিবারের সঙ্গে তাঁর তেমন যোগাযোগ ছিল না। আগেই বিচ্ছেদ হয়। পরে তাঁর সাবেক স্ত্রী শামীমা চৌধুরী ও একমাত্র কন্যা নিন্তি চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। শামসুদ্দোহা বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে তেমন একটা যোগাযোগ ছিল না, যত দূর জানি। মাঝে কিছু সময় মানসিকভাবেও চিন্তিত ছিল। আবার কয়েক দিন আগেই শোনাল, আবার নিয়মিত গানে ফিরছে। এটা নিয়ে কিছু সাক্ষাৎকারও দেখলাম। এর মধ্যেই ছেলেটি মারা গেল। বিটিভিতে থাকা অবস্থায় তরুণদের নিয়ে অনেক প্রোগ্রাম করেছি। সেসব আয়োজন দিয়ে তৈরি হয়েছিল মনি কিশোর। এখনো সেই সম্মান করত।’
জানা গেল, মনি কিশোর সম্প্রতি একটি টেলিভিশনে যোগদান করেছিলেন। সেই কাজেও তাঁকে ব্যস্ত দেখেছেন বন্ধু ও সহকর্মীরা। শামসুদ্দোহা জানান, মনি কিশোর রামপুরা বাজারের পাশে ‘তাল তরঙ্গ’ নামের একটি দোকানে নিয়মিত আড্ডা দিতেন। সেই আড্ডার এক সহকর্মী মুঠোফোনে বলেন, ‘মনি একসময় যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, পরে সেভাবে ক্যারিয়ার দাঁড় করাতে পারেনি। এর জন্য বিভিন্নভাবে রাজনীতিরও শিকার হয়েছেন। এই নিয়ে মন খারাপ থাকত। পরে বিচ্ছেদ, আবার মেয়েটিও দেশের বাইরে থাকত। তার সঙ্গে তেমন কথা হতো না। সে অনেকটাই একা হয়ে গিয়েছিল। নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করত। কিন্তু বাইরে থেকে কাউকে বুঝতে দিত না। চেয়েছিল গান নিয়ে আবার ফিরতে। সেটা আর হলো না। নিঃসঙ্গভাবেই মরে গেল।’
এই সময় আড্ডার ওই সহকর্মী আরও বলেন, ‘আজ মনি কিশোরকে আঞ্জুমান মুফিদুলের মাধ্যমে দাফন করতে হয় কেন? অথচ শিল্পীদের সংগঠনের কেউ কোনো খবরও রাখেননি। কেউ বলেনি লাশটা দায়িত্ব নিয়ে দাফন করা হোক। এর চেয়ে হতভাগ্য আর কোনো শিল্পীর হয়েছে। মনি নিজেও জানত, সে মরে গেলে এমনই হবে। শিল্পী হয়েই আমরা শিল্পীদের সম্মান দিতে পারি না।’
‘কী ছিলে আমার বলো না তুমি’, ‘মুখে বলো ভালোবাসা’, ‘আমি মরে গেলে তুমি জানি কাঁদবে না’, এমন বহু গানের এই শিল্পী নীরবেই থাকতে পছন্দ করতেন। চলতেন সাধারণ যেকোনো মানুষের মতো। ভক্তরাও তাঁকে চিনতে পারতেন না। পপি ভবনের পাশের বাসার দারোয়ান আসাদ আলী আফসোসের সুরে বলেন, ‘মনি স্যারকে বহুদিন ধরেই চিনি। কিন্তু তিনি যে গায়ক সেই মনি কিশোর, এটা জানতাম না। কলেজে পড়ার সময় তাঁর গান নিয়মিত শোনতাম। তাঁর অ্যালবাম কিনেছি। তিনি আমার পছন্দের শিল্পী। কিন্তু গতকাল জানতে পারলাম, তিনি সেই মনি কিশোর। আগে জানলে তো ছবি তুলে রাখতাম।’
মরদেহ কী করতে হবে মনি কিশোর জানিয়ে গেছেন
নব্বই দশক থেকেই গান গেয়ে শ্রোতার মন মাতিয়েছেন মনি কিশোর। সেই কবে গেয়েছিলেন ‘কী ছিলে আমার, বলো না তুমি’; তা আজও অনেক সংগীতপ্রেমী গেয়ে ওঠেন আপন মনে। সেই গানের স্রষ্টা মনি কিশোর দীর্ঘ সময় ধরে ছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। অনেকটা অভিমান থেকে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন। শেষ দিকে তো এমনও হয়েছে, কেউ যাতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে, নিজের ব্যবহৃত পুরোনো মুঠোফোন নম্বর বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
রামপুরা টেলিভিশন ভবনের পাশে একটি ভাড়া বাসায় একা থাকতেন। গতকাল শনিবার রাতে চিরদিনের জন্য তাঁর শেষ পৃথিবী ভ্রমণের খবর পাওয়া যায়। পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন। মারা যাওয়ার পর মরদেহ কী করতে হবে, তা বলে গিয়েছিলেন একমাত্র মেয়ে নিন্তিকে।
মনি কিশোর পাঁচ শতাধিক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। রেডিও-টিভির তালিকাভুক্ত শিল্পী হলেও গান গেয়েছেন অল্প। সিনেমায়ও তেমন গাননি।
মূলত অডিওতে চুটিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর জনপ্রিয় গানের মধ্যে ‘কী ছিলে আমার’, ‘সেই দুটি চোখ কোথায় তোমার’, ‘তুমি শুধু আমারই জন্য’, ‘মুখে বলো ভালোবাসি’, ‘আমি মরে গেলে জানি তুমি’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তাঁর সবচেয়ে শ্রোতাপ্রিয় গান ‘কী ছিলে আমার’ তাঁরই সুর করা ও লেখা। মাঝে দীর্ঘদিন নতুন গান প্রকাশ থেকে দূরে ছিলেন এই গায়ক। চলতি বছর এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি আবারও গান করছেন। জানিয়েছিলেন, পুরোনো গানগুলো ইউটিউবে দিচ্ছেন পর্যায়ক্রমে। জনপ্রিয় গান ‘কী ছিলে আমার’ নতুন করে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য ছিল, এ প্রজন্মের শ্রোতারা গানটি শুনেছেন।
ইউটিউবে প্রচুর ভিউ। স্টেজে গেয়ে থাকেন তরুণেরা। কিন্তু গানের মূল গায়ককে তাঁরা চেনেন না। গানটির সুরকার ও গীতিকার কে, তা জানেন না। এ রকম জায়গা থেকে ভেবেছেন, এ প্রজন্মের কাছেও গানটি পরিচিত হোক। তাঁদের মধ্যে এটি ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। এ ছাড়া আলাদা করে দেড় শ গান তৈরি করেছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘গানগুলো আমার জীবদ্দশায় প্রকাশ করতে চাই না। কিছু গান মৃত্যুর পরও প্রকাশ পাবে।’ জীবদ্দশায় মনি কিশোর তাঁর এই গানগুলো প্রকাশের আগেই চলে গেলেন অনন্তযাত্রায়। এই শিল্পী যেমনটি চেয়েছিলেন, হয়তোবা সেই ইচ্ছা পূরণ করবে তাঁর পরিবার। তাঁর তৈরি হওয়া গানগুলো হয়তোবা সামনে প্রকাশিত হবে।
আজ রোববার সকালে কয়েক দফায় কথা হয় মনি কিশোরের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা অশোক কুমার মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি জানালেন, মনি কিশোর তাঁর পোশাকি নাম। প্রকৃত নাম অরুণ কুমার মণ্ডল। পুলিশ কর্মকর্তা বাবা অনিল কুমার মণ্ডলের ছেলে অরুণ কুমার মণ্ডল ছিলেন কিশোর কুমারের ভক্ত। ডাকনাম ছিল মনি। কিশোর কুমারের ভক্ত ছিলেন বলে নামের সঙ্গে ‘কিশোর’ জুড়ে নিয়েছিলেন। জীবিত থাকা অবস্থায় মনি কিশোর প্রথম আলোকে মজা করে বলেছিলেন, ‘কুমার শানু নিয়েছেন “ওস্তাদের” নামের একাংশ। আমি নিয়েছি তাঁর নামের আরেক অংশ।’
নব্বই দশকের শুরুতে বিয়ে করেন মনি কিশোর। দেড় যুগ আগে তাঁদের দাম্পত্যজীবনের ইতি ঘটে। বিয়ের সময়ই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন মনি কিশোর। সে হিসেবে তাঁর মরদেহের দাফন করা হবে বলে জানালেন ভাই অশোক কুমার। তিনি জানালেন, মনি কিশোর বেঁচে থাকা অবস্থায় তাঁর দাফনের বিষয়টি একমাত্র মেয়ে নিন্তিকে জানিয়েছিলেন। অশোক কুমার বললেন, ‘মেয়ে আমার বড় ভাইকে জানিয়েছে, তাঁর বাবাকে যেন দাফন করা হয়। এটা নাকি ওর বাবা ওকে বলে গিয়েছিল। মেয়েকে যেহেতু বলে গিয়েছে, তাই তার ইচ্ছামতো দাফনের কাজটাই করা হবে। এটা নিয়ে আমরা অন্য কোনো ধরনের সিদ্ধান্তে যাব না।’
কোথায় দাফন করা হবে, জানতে চাইলে অশোক কুমার মণ্ডল বললেন, ‘আমাদের সেভাবে কোনো চাওয়া নেই। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। এরপর ওরাই সিদ্ধান্ত নেবে, কোথায় মরদেহ দাফন করা হবে। থানা থেকে এটা যোগাযোগ করা হয়েছে বলে শুনেছি। মেয়ে শুধু এটুকু বলেছে, ওর বাবাকে যেখানে কবর দেওয়া হচ্ছে, সেখানে যেন একটা চিহ্ন রাখা হয়।’
অশোক কুমার মণ্ডল জানান, মনি কিশোর নানা রোগে ভুগছিলেন। এর মধ্যে হার্টের সমস্যা যেমন ছিল, তেমনি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টের সমস্যাও। কয়েক মাস ধরে এ সমস্যা আরও প্রকট হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা বাবার সাত সন্তানের মধ্যে মনি কিশোর চতুর্থ সন্তান। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভাই মারা গেছেন। দেড় যুগ আগে মনি কিশোরের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর বিচ্ছেদ হওয়ার পর থেকে একা থাকতেন। তাঁর একমাত্র মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। নড়াইল জেলার লক্ষ্মীপুরে মামাবাড়িতে ১৯৬১ সালের ৯ জানুয়ারি জন্ম মনি কিশোরের। পুলিশ কর্মকর্তা বাবার চাকরিসূত্রে দেশের বিভিন্ন জেলায় থাকা হয়েছে তাঁর।
নব্বই দশকের শুরুতে ‘চার্মিং বউ’ অ্যালবামের ‘কী ছিলে আমার’ শিরোনামের একটি গান মনি কিশোরকে প্রতিষ্ঠিত ও ব্যাপক পরিচিত করে দেয় সংগীতাঙ্গনে। একে একে ৩০টির বেশি একক অ্যালবাম করে ফেলেন। তারপর একসময় অডিও জগৎ নানা উত্থান–পতনের মধ্য দিয়ে যেতে থাকল। একটা সময় মনি কিশোরের আর নিয়মিত দেখা মেলেনি।
![]() |
| মনি কিশোর। ছবি: সংগৃহীত |
![]() |
| মনি কিশোর পাঁচ শতাধিক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ছবি: সংগৃহীত |
![]() |
| মনি কিশোর। ছবি: সংগৃহীত |
Wednesday, October 16, 2024
ঈর্ষার আগুন নয় ভালোবাসার শক্তিই হোক আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মূল প্রেরণা by রেজানুর রহমান
একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন সেটা বুঝা যায় দেশটির কোনো একটি শহরের রাস্তার পরিবেশ, পরিস্থিতি দেখে। হাঁড়ির একটি ভাত টিপলেই বুঝে নেয়া সম্ভব চাল সেদ্ধ হয়েছে কিনা। তেমনই দেশের কোনো একটি শহরের রাস্তার নিয়মকানুন দেখেও বুঝা যায় দেশটি কতোটা সভ্য? দেশ কী সভ্য হয়? নাকি দেশের মানুষকে সভ্য হতে হয়? প্রথম যেবার সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলাম রাস্তার নিয়মকানুন দেখে অবাক হয়েছি। ছোট্ট দু’টি শিশু রাস্তা পার হবে। সেজন্য রাস্তার দুই দিকেই চলন্ত সব গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। ট্রাফিক পুলিশ পরম যত্ন ও মমতার সঙ্গে শিশু দু’টির হাত ধরে রাস্তা পার করে দিলেন। এর চেয়ে সভ্য, সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে? আমাদের দেশে এই দৃশ্য কল্পনা করাও অমূলক। মাত্র দু’দিন আগে ঢাকার রাস্তায় দু’টি চলন্ত বাস কে আগে যাবে এই প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়ে একজন তরুণীকে পিষে মেরেছে। কী বীভৎস, নির্দয় ও নিষ্ঠুর ঘটনা। এজন্য কেউ গ্রেপ্তার হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। এর থেকে বুঝা যায় দেশের সড়ক ব্যবস্থা কতোটা অমানবিক।
একটি দেশ কতোটা সভ্য সেটা বুঝা যায় দেশটির সাংস্কৃতিক আচার-আচরণ ও অতীত ঐতিহ্য দেখেও। বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে নাচ, গান, নাটক, সিনেমা, খেলাধুলা এমনকী খাদ্যও একটি দেশের সংস্কৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করে। সেজন্য প্রতিটি দেশে বিদেশি কেউ এলে অর্থাৎ বিদেশি অতিথিদের সম্মানার্থে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রাখা হয়। নাচ, গান, নাটক, সিনেমার আয়োজন থাকে ওই সব জাতীয় অনুষ্ঠানে। কেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে? থাকে এই জন্য যে, দেশটি তার বিদেশি বন্ধুদের বুঝাতে চায় দেখো সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমরা কতোটা সভ্য। কতোটা উন্নত। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দেখো। তার মানে একটি দেশের সংস্কৃতিও দেশটির উন্নয়ন- অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রেরণা শক্তি। সাংস্কৃতিক জাগরণ একটি দেশকে আধুনিক ভাবনায় বিকশিত করে। অথচ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমাদের দেশে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে একটা বন্ধ্যত্ব দেখা দিয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে ছাত্র- জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রায় প্রতিটি সেক্টর বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সচেষ্ট হয়ে উঠেছে। শুধু ব্যতিক্রম দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন। সিনেমা হল খোলা। কিন্তু প্রাণচাঞ্চল্য নাই। ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার পর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে নাটকের মঞ্চ খুলেছে। কিন্তু সেটা না খোলার মতোই। শিল্পকলা একাডেমিতে প্রতিদিন ৩টি মঞ্চে নাটক মঞ্চস্থ হয়। সেখানে একটি মাত্র হল খুলে দেয়া হয়েছে। রাখা হয়েছে অনেক নিয়মকানুনের বেড়াজাল। নাটক, সিনেমা, নাচ, গান, উৎসবমুখর পরিবেশেই বিকশিত হয়। সেখানে কঠোর নিয়ম, নিরাপত্তার আয়োজন কতোটা কাজে দিবে- এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তবে শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগের প্রশংসাও হচ্ছে। ৩টি মঞ্চের একটি খুললো। এটা শুভ লক্ষণ। শুভ উদ্যোগ। অচিরেই হয়তো অন্য দু’টি মঞ্চও খুলে যাবে। শিল্পকলার আঙিনায় এখনো সেনাবাহিনীর ক্যাম্প রয়েছে। কাজেই শিল্পকলার আঙিনা ঠিক কতোদিন পর আবার সংস্কৃতি কর্মীদের সরব উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠবে তা বলা মুশকিল।
বেইলি রোডে মহিলা সমিতির মঞ্চ নাট্যকর্মীদের অনেক আস্থার জায়গা। এতদিন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ৩টি মঞ্চের পাশাপাশি মহিলা সমিতির মঞ্চেও নিয়মিত নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। এখনো হচ্ছে। কিন্তু মহিলা সমিতির ভাড়া নিয়ে দেখা দিয়েছে ব্যাপক অস্থিরতা। কিছু দিন আগেও ৫ হাজার টাকা ভাড়ায় মঞ্চ কর্মীরা এক বেলা মহিলা সমিতির মঞ্চ ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছেন। এখন ভাড়া হয়েছে দ্বিগুণ। কেন দ্বিগুণ হলো? এর ব্যাখ্যা দিয়েছে মহিলা সমিতি। এতদিন মহিলা সমিতির জন্য সরকারের তরফ থেকে একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা অনুদান দেয়া হতো। সেই অনুদানকে পুঁজি করে মহিলা সমিতি মঞ্চ ভাড়া ৫ হাজার টাকা ধার্য করেছিল। এখন মহিলা সমিতির জন্য ওই সরকারি অনুদান বন্ধ রয়েছে। সে কারণে মহিলা সমিতি বাধ্য হয়ে প্রতিদিনের হল ভাড়া দ্বিগুণ করেছে। ফলে বিপাকে পড়েছে নাট্য সংগঠনগুলো। ৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে যেখানে একদিনের মঞ্চ প্রযোজনা কঠিন হয়ে পড়েছিল; সেখানে ভাড়া দ্বিগুণ হওয়ার পর মঞ্চের সক্রিয় সংগঠনগুলোর অবস্থা কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। একটি ছোট্ট হিসাব উল্লেখ করছি। মহিলা সমিতিতে এখন একবেলা নাটক করতে হলে ছোট-বড় সব দলেরই সতের থেকে আঠার হাজার টাকা খরচ হবে। অনেক দলের ক্ষেত্রে টিকিট বিক্রির মাধ্যমে এই অর্থ জোগাড় করা সম্ভব হবে না। এমন পরিস্থিতিতে শিল্পকলা একাডেমিই মঞ্চকর্মীদের জন্য অন্যতম ভরসা। পাশাপাশি মহিলা সমিতির ক্ষেত্রে আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনার জোর দাবিও উঠেছে। যাতে করে আবার মঞ্চপাড়া সরব হয়ে ওঠে।
এত গেল মঞ্চের অবস্থা। সিনেমা হলের অবস্থা কেমন? এমনিতেই সিনেমার ক্ষেত্রে দুর্দিন চলছে। ১৩শ’ সিনেমা হল ছিল সারা দেশে। এখন সেই সংখ্যা একশ’রও নিচে এসে ঠেকেছে। দেশের অনেক বিভাগীয় শহরেও সিনেমা হল নাই। দেশের প্রতিটি জেলা শহরে সিনেপ্লেক্স করার কথা শোনা গিয়েছিল পতিত সরকারের আমলে। এখন সেই উদ্যোগ বোধকরি থেমে আছে। এফডিসিতে আধুনিক ভবন ও শুটিং ফ্লোর নির্মাণের কাজ চলছে। সে কারণে এফডিসিতে শুটিং বন্ধ রয়েছে। কবীরপুরে সিনেমা পল্লী নির্মাণের কল্প-কাহিনী অনেক বছর থেকেই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। কার্যত দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও দেখা দিয়েছে এক ধরনের অস্থিরতা। বিগত ১৫/১৬ বছরের বৈষম্য নিয়ে কথা উঠেছে। এতদিন যারা ছিলেন চরম অবহেলিত, এখন তারা গুরুত্ব পাচ্ছেন। এটাই তো হওয়ার কথা। বৈষম্য দূর না হলে শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ আদৌ সম্ভব নয়। কিন্তু বৈষম্যের কথা তুলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, প্রতিহিংসার মানসিকতা এতটাই গুরুত্ব পাচ্ছে যে, সংস্কৃতির বিকাশ ভাবনা দিনে দিনে শক্তি হারাচ্ছে। একথা সত্য, বিগত সরকারের আমলে সংস্কৃতির বিকাশ ভাবনায় দলীয় দৃষ্টিকোণকেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে ভিন্ন মতের সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল চরম অবহেলিত। ছাত্র- জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার সরকারের পতন ঘটায় অন্যান্য সেক্টরের মতো দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও একটি পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। এটাই স্বাভাবিক। পরিবর্তনের কথা বলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে চেয়ারের মানুষ বদল হচ্ছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বৈষম্য দূর হচ্ছে না। ‘ক’-এর জায়গায় ‘খ’ আসছেন। শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের চিত্র মোটেও পাল্টাচ্ছে না।
অতীতকালে দেখা গেছে যে, কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দলমত নির্বিশেষে সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভূমিকা বেশ জোরালো ছিল। কিন্তু এবার ছাত্র গণআন্দোলনে সংস্কৃতিকর্মীদের সেভাবে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ আছে। সে কারণে দেশবরেণ্য অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও বর্তমান সময়ে গুরুত্ব পাচ্ছেন না। বরং তাদেরকে উপেক্ষা করার প্রবণতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। এর ফলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ঐক্য ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে। যা ভবিষ্যতে দেশের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে।
আবারো বলি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিও বটে। ঈর্ষা, স্বার্থপরতা ও বৈষম্যকে গুরুত্ব দিয়ে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিকাশ ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেয়া বেশ কঠিন কাজ। নষ্ট মানুষ, নষ্ট সহকর্মী কারও বন্ধু নয়। তবে বিরুদ্ধ মতের অভিযোগ তুলে কাউকে নষ্ট মানুষ, নষ্ট সহকর্মীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করাও সমীচীন নয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দেশকে একটি নতুন ভোরের সন্ধান দিয়েছে। আলোকিত ভোর। এখন সময় ভোরের এই ঝলমলে আলোকে পরম যত্নে ছড়িয়ে দিয়ে পুরো দিনটাকে অনিন্দ্য সুন্দর করে তোলা। এজন্য ঐক্যের বিকল্প নাই। ঐক্যই শক্তি। ঐক্যেই মুক্তি। ঈর্ষার আগুন নয়, ভালোবাসার শক্তি হোক আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মূল প্রেরণা। শুভ কামনা সবার জন্য।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো।

Wednesday, February 12, 2020
অনন্য সংস্কৃতির ইতিহাস by রাজিউদ্দিন আকিল

গোলাম মুর্শিদের গ্রন্থটি এসেছে রেডিও প্রোগ্রাম ও পত্রিকার কলাম থেকে। এই মাধ্যমেই তিনি বৃহত্তর জনসাধারণের কাছে হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরেছেন। একটু মনোযোগী হলে দেখা যাবে যে অঞ্চল হিসেবে বাংলা, বাংলা ভাষা, ও বাঙালি লোকজন গত ছয় থেকে সাত শতকের ব্যাপ্তিতে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্ত্বা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বইটি ১৪টি অধ্যায়ে ৬৪৪ পৃষ্ঠায় বাংলার সংস্কৃতির পুরো ইতিহাস সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলা ভাষাভাষী ও মাছ-ভাত খাওয়া লোকজনকে বাঙলি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যদিও অঞ্চল, ধর্ম (বর্ণ), গ্রাম-শহর ব্যবধান ব্যাপক রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, তাছাড়া পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গ, বরেন্দ্র ও রাঢ় এগুলো স্রেফ ভৌগোলিক বিভক্তি নয়, এখানে সামাজিক ঐক্যের অভাবও ছিল। তিনি বলেছেন, ভাষাই আমাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে দিয়েছে। বাঙালি বলতে আসলে যারা বাংলা ভাষায় কথা বলে, তাদেরই বোঝায়।
আর তা কাকতালীয়ভাবে হয়নি। বাঙালি আড্ডাকে বাঙালি আড্ডায় পরিণত করতে সাংস্কৃতিক বিনিয়োগের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
ভাষার পর ধর্মের দিকে নজর দেয়া হয়েছে। সমসাময়িক পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দিয়ে থাকে। তাদের কাছে মুসলিমরা হলো মুসলিম, এমনকি তারা বাংলা ভাষায় কথা বললেও। বাঙালি মুসলিমরা তাদের দ্বৈত পরিচয় নিয়ে সংগ্রাম করেছে। জন্ম ও ভাষার সূত্রে তাই বাঙালি হওয়া সতর্কভাবে বাছাই করা পরিচয়।
বিজ্ঞ বাঙালি ব্যক্তিত্বরা সবসময়ই রাজনৈতিক বিভক্তির ঊর্ধ্বে ওঠে অভিন্ন সাংস্কৃতিক অবস্থানের ওপর জোর দিয়েছেন।
উপজাতীয় লোকজনের বাঙালি পরিচিতি নির্মাণের অসমাপ্ত কাজটি এখনো সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে জটিলতা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
বাঙালি ও মুসলিম
বাঙালি সংস্কৃতি গঠন নিয়ে সংক্ষিপ্ত একটি অধ্যায়ের পর মুর্শিদ যথাযথভাবেই ইন্দো-মুসলিম যুগের সাংস্কৃতিক রূপান্তরের দিকে ছুটে গেছেন। তিনি ১৩ শ’ শতক থেকে ১৮ শ’ শতক পর্যন্ত ব্যাপ্ত বাঙলার মুসলিম শাসনের প্রায় ৫৫০ বছরের ইতিহাসের দিকে মনোযোগী হয়েছেন। মুসলিম শাসকেরা এসেছিলেন মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন অংশ থেকে। তারা ভিন্ন ভাষায় কথা বলতেন, একক সংস্কৃতির অধিকারী ছিলেন না। তাদের অভিন্ন ধর্মীয় পরিচিতি থাকলেও তারা ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলা সফর করতেন না। আরবি, পাররি, তুর্কি ভাষাভাষী মুসলিম অভিবাসীরা সাথে করে নানা ধরনের সংস্কৃতি ও সভ্যতা নিয়ে এসেছিলেন। স্থানীয় রমণীদের বিয়ের মাধ্যমে ওই সংস্কৃতি স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে। একইভাবে উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণ অভিবাসীরাও সাঁওতাল রমণীদের বিয়ে করে বাঙালি ব্রাহ্মণ সৃষ্টি করেছে।
মুসলিম শাসক ও মধ্য ইসলামিক ভূমির অভিজাতদের ও সেইসাথে স্থানীয় মধ্যবর্তীদের সাথে মেলামেশার ফলে বাঙালি সভ্যতার উদ্ভব ঘটিয়েছে। আর তা ধর্ম, স্থাপত্য, সাহিত্যসহ সংস্কৃতির নানা উপাদানে নতুনত্ব সৃষ্টি করেছে। মসজিদ, মাজার, দরগায় এসব চিহ্ন বিপুলভাবে দেখা যায়।
সামাজিক ও ধর্মীয় অধ্যায়ে মুর্শিদ লিখেছেন যে মধ্য যুগে ইসলামের অভ্যুদয়ের ফলে স্থানীয় ও আমদানিকৃত ধর্মের মধ্যে নানা মাত্রিক সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
লেখক ধর্মীয় মাত্রার নানা দিক তুলে ধরেছেন। সমাজ ও সংস্কৃতিতে এর প্রভাব তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন ব্যাপক পরিসরে। ধর্মকে কেবল ধর্মীয় পরিসরেই সীমিত রাখা যায় না। ইসলাম ধর্ম ও হিন্দু ধর্মকে বাঙালিরা কিভাবে ব্যাখ্যা করেছে, সেটিও বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন রয়েছে। ভিন্নতার কারণেই বাঙালি মুসলিম কিন্তু বিহারি মুসলিম বা পাঞ্জাবি মুসলিম হয়নি।
লেখক ধর্মীয় একীভূত করার প্রক্রিয়ায় বৌদ্ধ তান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর বেশ গুরুত্বারোপ করেছেন। আবার শিবের স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রবধূ হিসেবে অনার্য দেবীরা হিন্দু ঐতিহ্যের দেবী হিসেবে গৃহীত হয়েছে। মঙ্গল কাব্যগুলোতে বিষয়টি প্রবলভাবে দেখা যায়। তাছাড়া চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে হিন্দু ধর্ম পুনর্জীবন আন্দোলন ইসলামের ব্যাপক রাজনৈতিক উপস্থিতিকে প্রতিরোধ করতে দেখা যায়।
বাঙলার বিশ্বাস সবসময়েই ছিল ভক্তিমূলক, গুরুদের প্রতি ছিল নিবেদিতপ্রাণ। এ কারণে গুরুমুখী ইসলামই এখানে বিকশিত হয়েছে। বৌদ্ধ সহজিয়া আদর্শ, সুফি ধ্যান ধারণা ও বৈষ্ণববাদের মিলন এখানে ঘটতে পেরেছে।
মাছ পছন্দ
লেখক ঐতিহাসিক তথ্যের সাহায্যে দেখিয়েছেন এই এলাকার লোকজন মাছের প্রতি বিপুলভাবে আকৃষ্ট ছিল। মুসলিম ও অন্যান্য আমলে খাদ্যাভ্যাসে বিপুল বৈচিত্র্য সৃষ্টি হলেও গত ১০০০ বছরে বাঙালি খাদ্য আলাদাই থেকে গেছে।
তবে মুর্শিদ কিন্তু কেবল ধর্ম বা খাদ্যেই সীমিত থাকেননি। তিনি সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, অন্যান্য ধরনের শিল্পকলার দিকেও নজর দিয়েছেন। এমনকি বাবু সংস্কৃতিও তিনি সামনে নিয়ে এসেছেন।
লেখক এই বইটিতে যেভাবে বাঙালি ইতিহাস তুলে ধরেছেন, তা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। বইটি বাঙলার সংস্কৃতির ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ বিবেচিত হতে পারে।
লেখক: শিক্ষক, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি এর আগে ছিলেন ফেলো, সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, কলকাতা। তার গ্রন্থরাজির মধ্যে রয়েছে ‘দি মুসলিম কোশ্চেন আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইসলাম অ্যান্ড ইন্ডিয়ান হিস্টরি’ (পেঙ্গুইন)।
Friday, June 21, 2019
এখনো স্থবির সংগীতাঙ্গন by ফয়সাল রাব্বিকীন

প্রকাশ হয়েছে হালের ভাইরাল শিল্পীদের গানও। কিন্তু সে অর্থে এবারের ঈদে কোনো গানই তেমন ভালো অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি। এরমধ্যে ঈদে প্রকাশিত কুমার বিশ্বজিতের ‘রস কইয়া বিষ খাওয়াইলো’ শীর্ষক গানটি ছিল প্রশংসিত। অন্যদিকে আসিফ আকবর-কর্নিয়ার ‘তোমার হাসি’, হাবিব ওয়াহিদের ‘মনের কিনারায়’, ইমরান-পড়শীর ‘আবদার’, কাজী শুভর ‘ভুলিয়া না যাইও’ ও মিলনের ‘পল্টি’ শীর্ষক গানগুলো ছিল শ্রোতাপ্রিয়তায়। তবে এর বাইরে অনেক গানই প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু সেসবের বেশিরভাগই মুখ থুবড়ে পড়েছে। আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় সংশ্লিষ্টরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন সংগীতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে। কারণ ওয়েলকাম টিউন থেকে আয় একেবারেই শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। কমেছে বিভিন্ন সেলফোন কোম্পানির অ্যাপস থেকে আয়ও। শুধু ইউটিউবের ওপর নির্ভর করে গানের বিনিয়োগ উঠিয়ে আনাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য। এদিকে সংগীত বোদ্ধারা জোর দিচ্ছেন মিউজিক ভিডিওর বাজেট কমিয়ে ভালো অডিওর প্রতি মনোযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে। কারণ তাদের মতে, ভালো গান হলে মোটামুটি মানের ভিডিও হলেই সেটি শ্রোতাপ্রিয়তায় চলে আসবে। এমন নজিরও কাছাকাছি সময়ে কম নয়। আর সেটি হলে গানের বিনিযোগ উঠিয়ে আনাও সহজ হবে। সেক্ষেত্রে গানে বিনিয়োগও বাড়বে। সুযোগ পাবে তারকা শিল্পী থেকে নতুন শিল্পীরাও। গানের বর্তমান অবস্থা নিয়ে এমআইবি সভাপতি ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান লেজারভিশনের চেয়ারম্যান এ কে এম আরিফুর রহমান বলেন, ইন্ডাস্টির অবস্থা সত্যিই ভালো না। কারণ একটি অডিও এবং ভিডিও করতে গিয়ে যে খরচ হয় সেটা উঠিয়ে আনা কঠিন। তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি মনে করি একটি ভালো মানের অডিওর সঙ্গে মোটামুটি বাজেটের কোয়ালিটিসম্পন্ন ভিডিও হলেই সে গানটি বেরিয়ে আসবে। এক্ষেত্রে ভিডিও কেবল সাপোর্ট হিসেবে কাজ করবে। আমরাও সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। তাছাড়া বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সেলফোন কোম্পানির সঙ্গে আলোচনাও চলছে। আমি বিশ্বাস করি হয়তো সামনে এ অবস্থা থেকে আমরা উত্তরণ ঘটাতে পারবো। সেই অপেক্ষাতেই আছি। এদিকে বিষয়টি নিয়ে তারকা সংগীতশিল্পী ফাহমিদা নবী বলেন, আমি সব সময় ভালো গানে বিশ্বাসী। এখনও আমি জানি একটি গান ভালো হলে সেটা মোটামুটি মানের ভিডিও হলেই শ্রোতাদের পছন্দের তালিকায় চলে আসবে। ব্যয়বহুল ভিডিও নিয়ে যে প্রতিযোগিতা চলছে সেটা আসলে সংগীতের জন্য ভালো বিষয় নয়। এতে করে অস্থিরতা বাড়ছে। আমার মতে ভালো কথা, সুর ও গায়কীর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। আর প্রচারের জন্য একটি ভিডিও হলেই চলে। সেটা যে ব্যয়বহুল হতে হবে তেমনটা আমি মনে করি না।
Sunday, April 15, 2018
স্বপ্নজাল: প্রেম ও শূন্যতার মায়াময় অনুবাদ by মাসুদ হাসান উজ্জ্বল

গতকালকে (৭ এপ্রিল) গিয়াসউদ্দিন সেলিম পরিচালিত ‘স্বপ্নজাল’ চলচ্চিত্রটি দেখে এলাম। আমি সাধারণত নির্মাতা বা সমালোচকের দৃষ্টিতে সিনেমা দেখি না, একদম সাধারণ দর্শকের মন নিয়ে কেবল উপভোগের উদ্দেশ্যে চলচ্চিত্র দেখে থাকি। তাছাড়া আমি চলচ্চিত্রের মাস্টারমশাই নাকি যে বলে দিলাম,ওটা ঠিক হয়েছে, এটা ঠিক হয়নি! সুতরাং আমার চলচ্চিত্র সমালোচনা কতখানি চুলচেরা হয়ে উঠতে পারে সে সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ রেখে দু-চারটি কথা শুরু করছি।
একটা চলচ্চিত্রের কাছে আমার প্রথম প্রত্যাশা থাকে সামষ্টিকভাবে সেই চলচ্চিত্র থেকে আমি কী পেলাম? তো totality’র বিচারে স্বপ্নজাল আমাকে তৃপ্ত করেছে। যদিও যানজটের কারণে আধঘণ্টা পরে হলে ঢুকতে পেরেছিলাম! আমি দেখতে শুরু করেছি শুভ্রার বাবা চরিত্রের রূপদানকারী মিশা সওদাগরের হত্যাদৃশ্য থেকে। অবশ্য গল্পের মধ্যে ভ্রমণ করতে করতে প্রথম আধঘণ্টা ইতিমধ্যে অনুমান করে নিয়েছি। তো এই হত্যাদৃশ্য দিয়েই শুরু করি। নৌকা থেকে ইরেশ যাকের তার দলবল নিয়ে হাতে ধারাল অস্ত্রসহ যখন নামে, ইরেশের চেহারা দেখে আমি ভড়কে যাই–কী হিংস্র চেহারা! এরকম একটা চেহারা নিয়ে হাজির হতে পারলে আর অভিনয় করা লাগে নাকি, চোখের সামনে বাস্তব ছবি এমনিতেই ধরা দিতে থাকে! পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম এই চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলার জন্য ইরেশ আট মাস দাড়ি রেখেছেন! সুতরাং যে ধরনের প্রস্তুতি না থাকলে একটা সিনেমা ঠিক সিনেমা হয়ে ওঠে না সেটা সম্পর্কে সচেতন হয়েই যে এটি নির্মিত হয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ থাকে না। নৌকা থেকে চরে নামার পরে শিল্পীদের অনেক ক্লোজ শট থাকতে পারত, আমরা খুনির জিঘাংসা আর খুন হতে থাকা মানুষের অসহায়ত্ব-আতঙ্ক আরও গভীরভাবে দেখতে পেতাম। কিন্তু পরিচালক অবাক করে দিয়ে একটিমাত্র শটে শিকার এবং শিকারিকে আস্তে আস্তে ক্লোজ থেকে মিড, মিড থেকে মিড লং এবং সবশেষে একদম লংয়ে ঠেলে দিয়ে অদ্ভুত এক Cinematic আবহ সৃষ্টি করলেন, এবং এতে যে তিনি শতভাগ সফল তার প্রমাণ হলো আমি লক্ষ করলাম সরাসরি খুনের দৃশ্য না দেখা সত্ত্বেও খুনের ভয়ে গা ছমছম করছে!
মাস্টার ফিল্মমেকার আকিরা কুরোসাওয়ার বিভিন্ন চলচ্চিত্রে এ ধরনের লেন্সিং টেকনিক দেখা যায়। শুভ্রা আর অপুর প্রেমের উপস্থাপনা একেবারেই স্বাভাবিক ছিল, মানে কোনোভাবেই সেটি অতি প্রেমে জর্জরিত নয়। বড়দের কাছে পাত্তা না পাওয়া Perfect teenage প্রেম বলতে যা বোঝায় আর কী! এবং এটিই সম্ভবত চলচ্চিত্রকে বাস্তবসম্মত হয়ে উঠতে সহযোগিতা করেছে। কারণ, অধিকাংশ ঢাকাই ছবিতে দেখা যায় প্রেম দেখাতে গিয়ে সমাজ, সংসার, কর্মজীবন সবকিছু গৌণ হয়ে যায়, সুতরাং সমাজ এবং বাস্তবতা বিবর্জিত সেই প্রেম তেমন কোনও আবেদন রাখতে সক্ষম হয় না! সেই বিচারে শুভ্রা আর অপুর প্রেম smartly told! অপুর বাবা নিয়মিত তার চালের আড়তে যাওয়ার সময়ে ছোট্ট যে কালো ব্যাগটি বগলদাবা করে যান সেই ব্যাগ ৮০’র দশকের আড়ত বা ঠিকাদারি ব্যবসার কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই অর্থে পিরিওডিক্যাল ছবি না হওয়া সত্ত্বেও এই ডিটেইলিং চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে সিরিয়াস হওয়ার বার্তা দেয়। স্বপ্নজালের পরতে পরতে সিনেম্যাটিক ভাষার ছড়াছড়ি। শুভ্রাকে বহনকারী স্টিমার যখন অপুকে ছেড়ে চলে যেতে থাকে তখন গতির বিপরীতে শুভ্রার দৌড়ে এসে দূরত্ব কমানোর তীব্র চেষ্টায় যে প্রগাড় প্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং তাতে যে সিনেম্যাটিক দ্যোতনা সৃষ্টি হয়, তা ছিল অতুলনীয়! কলকাতার অংশে কলকাতার শিল্পী ব্যবহার করায়, ঘটি-বাঙাল সংস্কৃতির পার্থক্যটা খুবই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমাদের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের মধ্য আচার-আর সংস্কৃতির পার্থক্য তীব্রভাবে ধরা দেয়! মনে পড়ে যায় দেশ বিভাগের আন্তর্জাতিক রাজনীতি অভিন্নধারার রক্তে ধর্মের নামে কীভাবে ছুরি চালিয়েছিল! ফজলুর রহমান বাবু কর্তৃক শুভ্রাদের সম্পত্তির জবরদখল এবং তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করায় এদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের করুণ বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। খলচরিত্রে ফজলুর রহমান বাবু যা করে দেখিয়েছেন তা দর্শক অনেকদিন মনে রাখবে। নানারকম অপারগতায় সীমাবদ্ধ মানুষ নিয়তির ওপর ন্যায় বিচারের দায়িত্ব সঁপে দিয়ে স্বস্তি খুঁজে ফেরে, তেমনি স্বস্তি খুঁজে ফেরার প্রবণতা দেখতে পাই ফজলুর রহমান বাবুর চূড়ান্ত পরিণতিতে। এই অংশটা অবশ্য একটু হলেও এতক্ষণ ধরে ঘটতে থাকা যৌক্তিক গল্প বয়ানে ছন্দপতন ঘটায় বলে আমার মনে হয়, নিয়তির প্রতিশোধ সিনেমার সম্ভাব্য জটিল বাঁকগুলোকে একটু হলেও হালকা করেছে বলে আমি মনে করি। এতো এতো অনাচার চারদিকে, কিন্তু প্রকৃতিকে কদাচিৎ প্রতিশোধ নিতে দেখি আমরা! বরং বাবু যেভাবে বিষ প্রয়োগে নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর ইরেশকে হত্যা করে, বা তারই বিশ্বস্ত উকিল যখন বিশ্বাসঘাতকতা করে সেটার উপস্থাপনা অনেক যৌক্তিক ছিল। শুভ্রা কলকাতায় চলে যাওয়ার পরে তার এবং অপুর পরস্পরের চিঠির অপেক্ষা করা এবং চিঠিতে অভিন্ন অনুভূতির প্রকাশ মনকে চিঠিপত্তরের যুগে ফিরিয়ে নিয়ে প্রেমময় করে তোলে। কলকাতায় যাওয়ার জন্য অপুর বয়সোচিত Desperateness অধিকাংশ দর্শককেই তার তরুণ বয়সের উত্তাল সরল প্রেমকে মনে যে করিয়ে দিয়েছে, সেকথা হলফ করে বলতে পারি। শুভ্রার সাবলম্বী হওয়ার টানাপড়েনটা আরো একটু জিটেইলিং দাবি করে বলে মনে হয়েছে। আর থিয়েটারের নায়িকা খুঁজতে গেলেই সেটি কোনো না কোনোভাবে রক্তকরবীর নন্দিনীই কেন হতে হয় সেটা আমার মাথায় আসে না! তবে নাটকের পরিচালক কর্তৃক বাঙাল উচ্চারণ শুধরে দেওয়ার ব্যাপারটি শুভ্রার Cultural transformation-এর চমৎকার ইঙ্গিত দেয়। বিসম্বরের মিডলাইফ ক্রাইসিসজনিত উদ্দেশ্য বুঝতে পারা সত্ত্বেও শুভ্রা যেভাবে স্বাভাবিকভাবে বিষয়টিকে হ্যান্ডেল করে সেটা একজন পরিস্থিতির শিকার তরুণীর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে পরিণত হয়ে ওঠার চমৎকার উদাহরণ সৃষ্টি করে। কারণ, এতটা পরিণত হয়ে না উঠলে পরবর্তীতে পিতৃহত্যার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা বা সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করার মতো দৃঢ় পদক্ষেপ যৌক্তিক হয়ে উঠতো না। গ্রেফতার হওয়ার পরে শারীরিকভাবে ভগ্নপ্রায় বাবু কর্তৃক আশপাশে কোনও সমর্থক না থাকা সত্ত্বেও ভিকটরি সাইন প্রদর্শন করতে গিয়ে পড়ে যাওয়া হাসির উদ্রেক করার পাশাপাশি আমাদের অসৎ রাজনীতিবিদদের অহেতুক আস্ফালনকে দুর্দান্তভাবে স্যাটায়ার করে! অপু-শুভ্রার প্রেম নিয়ে দুই পরিবারের কোনও প্রকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত না দেখানোতে সন্তানের প্রতি উদার এবং ভালোবাসাপূর্ণ পিতামাতাকে দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের দেশের বাস্তবতায় সন্তান অন্তপ্রাণ পিতামাতাকে ধর্মীয় অনুশাসনের অসহায়ত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করতে দেখিমাত্র, কিন্তু কোনোভাবেই তাদের নিষ্ঠুর পিতামাতা মনে হয় না! ফলে সেই উদার পিতামাতার সন্তান যখন চলন্ত লঞ্চ থেকে প্রেমের কারণে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেয় তখন কষ্টটা দ্বিগুণ হয়ে ওঠে! বাবা শহিদুল আলম সাচ্চুর জন্য মায়া আর অপু-শুভ্রার জন্য সর্বগ্রাসী শূন্যতা তৈরি হয়! মৃত অপুকে খুঁজে ফেরা শুভ্রা যখন মিডলং শটে জলের উপরে থপথপ করে পা ফেলে দৌড়াতে থাকে তখন আবারো আকিরা কুরোসাওয়ার রশমনের কথা মনে পড়ে। কাদা-জল মাড়িয়ে রশমনের গেটের দিকে এগিয়ে যাওয়া আর শুভ্রার দৌড় আদৌ একই রকম নয়, কিন্তু কুরোসাওয়া এই কাজটি খুব করতেন, ক্যামেরা মুভমেন্টে না গিয়ে Movement of nature, wind অথবা movement of artist ব্যবহার করতেন। বোঝা যায় সত্যজিৎ রায়সহ অগণিত বাংলা সিনেমার পরিচালকের মতো গিয়াস উদ্দিন সেলিমকেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কুরোসাওয়া হয়তোবা প্রভাবিত করে থাকবেন এবং নিঃসন্দেহে এই প্রভাব আশীর্বাদস্বরূপ! অপুর মৃত্যুর পরে পাখির সাদা পালকের হাইস্পিড শটটি সমস্ত আত্মাকে খালি করে দেওয়ার পাশাপাশি ব্রেভহার্ট চলচ্চিত্রে উইলিয়াম ওয়ালস চরিত্র রূপদানকারী মেলগিবসনের যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হওয়ার মুহূর্তে হাত থেকে রুমাল খসে পড়ার শটটির কথা মনে করিয়ে দেয়! এই সকল সাদৃশ্য বা অনুপ্রেরণা শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্রতী নির্মাতাকে সামনে নিয়ে আসে।
আমার মনে হয় গল্প বয়ান নিয়ে যথেষ্ট কথা বলে ফেলেছি, এবারে অন্যান্য কারিগরি দিক নিয়ে কিছু কথা বলি। প্রথমে বলতেই হয় একি করলেন কামরুল হাসান খসরু! প্রতিটি শট যেন একেকটা পেইন্টিং! কী অসামান্য লাইট ডিজাইনিং। নিকট অতীতে এমন অসামান্য ক্যামেরা নৈপুণ্য কোনও বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে দেখেছি বলে মনে হয় না! আর সেলিমের ছবিতে জলের ব্যবহার যেন তার সিগনেচারে পরিণত হয়েছে! বিপুল জলরাশিতে প্রেম এবং হাহাকারের তীব্র মিশ্রণ তাকে যেন অনন্য করে তোলে! সংগীতের পরিমিত ব্যবহার স্বপ্নজালকে আরো বেশি পরিপক্বতা দিয়েছে। তবে কিছু কিছু আবহসংগীত খুব চেনা বিদেশি চলচ্চিত্রের অনুরূপ না হলেই পারত! কিন্তু সাউন্ড ডিজাইনে যত্ন সম্পর্কে নিশ্চিত হই তখন যখন দেখি শুভ্রা থিয়েটার পরিচালকের সঙ্গে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে থিয়েটারের বাইরের সিঁড়িতে এসে বসে এবং বিসম্বরের সঙ্গে কথোপকথনের সময় হলে সাউন্ড শোনা যায়। এই ছবির প্রতিটি অভিনয়শিল্পী যথেষ্ট প্রশংসার দাবিদার। অভিনয়ের Ranking করতে গেলে অনেকেরই ওপর অবিচার করা হয়, কারণ প্রত্যেকেই তার চরিত্র অনুযায়ী সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে ফজলুর রহমান বাবু, ইরেশ যাকের, শিল্পী সরকার অপু, ফারহানা মিঠু, শহিদুল আলম সাচ্চু, শাহেদ আলী, মিশা সওদাগর, পরীমনি বা ইয়াশ রোহানকে মানুষ অনেকদিন মনে রাখবে। বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের নায়িকা পরীমনিকে গিয়াসউদ্দিন সেলিম যেভাবে বদলে ফেলেছেন, সেটা রীতিমত ম্যাজিশিয়ানের কাজ। পরীমনিও তার প্রতি সেলিমের আস্থার প্রতি যথেষ্ট সুবিচার করেছেন। লক্ষ করলাম বেশিরভাগ সমালোচক পরীমনির সংলাপ প্রক্ষেপণের প্রশংসা করছেন। কিন্তু আমি বলব পরীমনির যদি খুব সচেতনভাবে কোনো কিছুর ওপরে কাজ করার থাকে তাহলে সেটা হবে উচ্চারণ এবং বাচনভঙ্গির ওপরে। ঠোঁট খুলে কণ্ঠ প্রসারিত করে কথা বলার প্র্যাকটিস করতে হবে, পরিণত শিল্পীর কণ্ঠ এবং বাচনভঙ্গি অনেক অভিজাত হতে হয়, এটা মাথায় না রাখলে চলবে না। ইয়াশ রোহানের ভালো অভিনেতা হয়ে ওঠার সকল সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি চোখে প্রতিফলিত না হলে অভিনয়টা ঠিক জমে ওঠে না। স্বপ্নজালের প্রোডাকশন ডিজাইন, আর্ট ডিরেকশন, কস্টিউম সবকিছু অনবদ্য। তবে কস্টিউমের ক্ষেত্রে প্রাইমারি কালারগুলো এড়িয়ে যেতে পারলে ফ্রেমগুলো আরো বেশি শিল্পসম্মত হয়ে উঠতে সুবিধা হয়। মেকাপ নিয়ে কথা না বললেই নয়। কেবল ফজলুর রহমান বাবু আর পরীমনির মেকাপ দিয়েই চোখ বন্ধ করে বলা যায় বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা মেকাপ হয়েছে স্বপ্নজাল চলচ্চিত্রে। আমি বলবো না আহামরি নতুন গল্পের ছবি স্বপ্নজাল, বরং এটি নির্মাতার প্রথম চলচ্চিত্র মনপুরার আদলেরই একটা গল্প। কিন্তু নির্মাণের দক্ষতায় অনন্য হয়ে উঠেছে স্বপ্নজাল। পরিশেষে স্বপ্নজাল চলচ্চিত্রের পরিচালক গিয়াস উদ্দিন সেলিম, চিত্রগ্রাহক কামরুল হাসান খসরুসহ সকল অভিনয় শিল্পী এবং কলাকুশলীকে ধন্যবাদ জানাই বাংলাদেশি চলচ্চিত্রকে আরো একধাপ এগিয়ে নেওয়ার জন্য ।
লেখক: নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
Tuesday, April 10, 2018
সংস্কৃতির দূষণ by তুষার আবদুল্লাহ
![]() |
| তুষার আবদুল্লাহ |
বাণিজ্যের কর্কট রোগ আছে। এই রোগ সংস্কৃতিতে অর্থাৎ মানুষের অভ্যাস চট করে বদলে দেয়। বাড়িয়ে দেয় ভোগের তাড়না। বর্ষবরণ উৎসব এখন পণ্য উৎপাদক ও বাজারজাতকারীদের জন্য একটি মোক্ষম লগ্ন হয়ে উঠেছে। তারা বাঙালিকে একপ্রকার বুঝিয়ে ফেলতে পেরেছে কী কী পরিধান না করলে, জিভে চেখে না দেখলে তাদের পক্ষে ষোলআনা বাঙালি হওয়া সম্ভব নয়। কৃষকের ঘর যে উৎসবের আঁতুড় ঘর, সেই কৃষকও নিজের বটতলার আড়ংয়ের কথা ভুলে গিয়ে লোভাতুর হয়ে তাকিয়ে থাকে নগর থেকে আসা পসরার দিকে। মাটির সানকি, পুতুল, ঘোড়া, হাতির কথা ভুলে সে চমকে ওঠে রকমারি যান্ত্রিক পসরায়। নিজ ঘরে মাটির পুতুল সরিয়ে সেই যন্ত্রকে আলগোছে জায়গা করে দিচ্ছে। উৎসবে এখন নাগরিক জৌলুস।
সংস্কৃতিকে প্রবাহমান নদীর সঙ্গে তুলনা করেন অনেকে। উজান থেকে জল নেমে আসবে,তার সঙ্গে খড়কুটো ভেসে আসবে সঙ্গে। আবার ভেসেও যাবে সেই খড়কুটো। আমাদের সংস্কৃতিতে বরাবরই এমন খড়কুটো ভাসতে দেখা গেছে। আবার সেগুলো ভাসতে ভাসতে চলে গেছে দূর সমুদ্দুরে। তবে এখনকার অবস্থা যেন ভিন্ন। ঠিক বাংলাদেশের নদীর মতোই। নাব্য কমে গেছে। নদী প্রবাহমান না থাকায় খড়কুটো পচে নদীর তলদেশ ভরাট করে ফেলেছে। কমে গেছে আমাদের সংস্কৃতির গভীরতা। নগর মানুষের চলন-বলন যদি দেখে,যদি তাকাই নগরের মধ্যবিত্তের দিকে, উচ্চবিত্তের দেয়াল টপকে চোখ যদি যায় অন্দরে, নগরে যারা বুদ্ধিজীবী বলে আওয়াজ তুলছেন, তাদের দিকে যদি কান পাতি দেখতে পাবো কেমন সংস্কৃতি ও রুচির সংকটে পড়েছি আমরা। একপ্রকার রুচির দূষণে আছি। আমাদের নদী যেমন দূষিত হয়ে পড়েছে। তেমনি সংস্কৃতিও। সেদিন সংবাদপত্রের পাতার সঙ্গে একটি লিফলেট ঢুকে পড়লো বাড়িতে। রঙিন লিফলেটে জানান হয়েছে ঢাকার একটি গ্যালারিতে বৈশাখী মেলা ১৪২৫ আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে যে পণ্য সুলভ হবে বলে তালিকা তুলে দেওয়া হয়েছে, সেখানে রয়েছে–‘জুয়েলারি, কসমেটিক্স, ইন্ডিয়ান ড্রেস, পাকিস্তানি ড্রেস, ক্যাটালগ ড্রেস, শাড়ি, কুর্তি, লেহেঙ্গা,ব্যাগ, জুতা, হিজাব ও আরও ফ্যাশনেবল এক্সসোরিজ’। সংস্কৃতির দূষণের কথা যে বললাম, এই ফর্দে দূষণের কোনও ‘কণা’ কি দেখতে পেলেন? জানি না ১৪২৫ উদযাপনে আমরা প্রবহমান সংস্কৃতিকে কতটা দূষণমুক্ত রাখতে পারবো বা কতটা দূষিত করবো।
Sunday, February 14, 2016
বাংলা একাডেমি ব্যস্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর প্রদর্শনী নিয়ে : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
তিনি আরো বলেন, বাংলা ভাষা হচ্ছে সাধারণ মানুষের ভাষা। গরীর মানুষের ভাষা। এজন্য একে নিয়ে কাজ করে না বাংলা একাডেমি। তারা ধনী পুজিবাদীদের স্বার্থ দেখে। অথচ বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশে ভাষার ওপর অনুবাদ ও গবেষণা করতে।
তিনি বলেন, বাংলা ভাষার বিকাশ করতে হলে আমাদের জ্ঞানের সাধনা করতে হবে। আমাদেরকে আড়ম্বর ত্যাগ এবং দেশপ্রেমের চর্চা করতে হবে।
জাতীয়তাবাদ বিকাশের প্রধান মাধ্যম ভাষা উল্লেখ করে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের বাংলা ভাষা চর্চার এ আয়োজনকে স্বাগত জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমরা বাংলা ভাষার চর্চা করবো শৈল্পিকভাবে। ভাষার ব্যাপারে আমরা আঞ্চলিকতা চাই না, আন্তর্জাতিকতা চাই।
বাংলা বাচন পরিশীলন কর্মশালার উপকরণ হিসেবে প্রমিত বাংলা চর্চার সহায়ক ‘শৈল্পিক বাচন’ নামের সিডি-ডিভিডির মোড়ক উন্মোচন করা হয় অনুষ্ঠানে। বাচন কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সনদপত্রও প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন মিডিয়া সেলের আহবায়ক মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান এবং বাংলা বাচন পরিশীলন কর্মশালার প্রশিক্ষক নাট্য ব্যক্তিত্ব মো. গোলাম সারোয়ার।
সভাপতিত্ব করেন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের পরিচালক সমন্বয় মিসেস সুরাইয়া রহমান।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত এ কর্মশালার ২৪টি ব্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অংশ নেন নয় শতাধিক ব্যক্তি।
Friday, May 29, 2015
গান-নাচ কবিতায় নজরুলজয়ন্তী উদ্যাপন by শিহাব জিশান
![]() |
| নজরুলজয়ন্তীতে শিল্পকলা একাডেমীর মুক্তমঞ্চে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা l সৌরভ দাশ |
![]() |
| বাতিঘরের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস |
জেলা শিল্পকলা একাডেমী: জেলা শিল্পকলা একাডেমী ও জেলা প্রশাসনের যৌথ আয়োজনে মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় কবি নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তীর আয়োজন। বিকেল পাঁচটায় আলোচনা সভার মাধ্যমে সূচনা হয় অনুষ্ঠান। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিনের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) খলিলুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন শিক্ষাবিদ হাসিনা জাকারিয়া ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা কমান্ডার মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। আলোচনা সভা শেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। শুরুতেই সমবেত কণ্ঠে গান পরিবেশন করেন শিল্পকলা একাডেমীর শিক্ষার্থীরা। ‘দাও শৌর্য, দাও ধৈর্য’ ও ‘জাগো নারী জাগো’ গান দুটি পরিবেশন করেন তাঁরা। ছিল কামরুল হাসান ও শারমিন মৃত্তিকার কণ্ঠে আবৃত্তি। এরপর সমবেত কণ্ঠে নজরুলসংগীতের পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসে কুসুম ললিতকলা একাডেমি ও আর্য সংগীত সমিতির সদস্যরা।
গানের পর নৃত্যে মঞ্চ মাতায় বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা চট্টগ্রামের শিল্পীরা। ‘প্রথম প্রদীপ’ শিরোনামের গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনা মুগ্ধ করে দর্শকদের। এরপর ছিল উচ্চারক আবৃত্তিকুঞ্জের বৃন্দ পরিবেশনা ‘যেদিন আমি থাকব না’। এবার একক গান নিয়ে আসেন শিল্পী মালবিকা দাশ। তাঁর কণ্ঠে ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব’ গানটি আসর জমিয়ে তোলে। এ ছাড়া আবদুর রহিমের ‘এ কূল ভাঙে, ও কূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা’, লোকমান চৌধুরীর ‘এত জল এ কাজল চোখে’ গানেও দর্শকদের সাড়া পাওয়া যায়। এভাবে একে একে নাচ, গান ও কবিতার পরিবেশনায় মেতে থাকে শিল্পকলার মঞ্চ। নজরুলসংগীতশিল্পী সংস্থা চট্টগ্রামের শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি ফুল’ গানের মাধ্যমে শেষ হয় আয়োজন।
শ্রুতিঅঙ্গন বাংলাদেশ: নজরুলের জয়ন্তী উপলক্ষে ‘ভৈরবী রাগে সুরবর্ণালী’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শ্রুতিঅঙ্গন বাংলাদেশ। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় নগরের নন্দনকাননের এ কে খান স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজন করা হয় অনুষ্ঠান। উইলিয়াম ডি সাংমার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন অধ্যাপক বেনু কুমার দে। অতিথি ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান ও মো. মোস্তফা কামাল।
কথামালা শেষে শুরু হয় ভৈরবী রাগের তালে নজরুলকে স্মরণ। শুরুতেই ‘প্রভাত বীণা তব বাজে’, ‘নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম’, ‘মোরা আর জনমে’, ‘আল্লাহকে যে পাইতে চায়,’ ‘মোর ঘুম ঘোরে এলে মনোহর’ পাঁচটি সমবেত গান পরিবেশন করেন সংগঠনের শিল্পীরা। সেতারে ভৈরবী রাগ পরিবেশন করেন প্রদীপ কুমার চক্রবর্তী। এরপর একে একে ভৈরবী রাগে একক সংগীত পরিবেশন করেন নিলয় দত্ত, বৈশাখী নাথ, সৈকত দত্ত, জেকী দত্ত, নিপা দত্ত, সারিনা ফারহা, ধীমান নন্দী ও লিটন দাশ। সবশেষে ‘আলগা করো গো খেঁাপার বাঁধন’ গানের সমবেত পরিবেশনার মাধ্যমে শেষ হয় আয়োজন।
বাতিঘর : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ÿ২২ মে নগরের প্রেসক্লাব ভবনের গ্রন্থবিপণি বাতিঘর আয়োজন করে অনুষ্ঠানমালা। এতে আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম প্রথাগত মানুষ ছিলেন না। প্রচলিত সমাজভাবনা ও ধর্মচিন্তা দিয়ে তাঁকে বিবেচনা করা যাবে না। এ জন্য সমকালীন সময়ে তাঁকে অনেক অস্বস্তি, সাহিত্যিক আক্রমণ ও বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছিল।
বাতিঘরের স্বত্বাধিকারী দীপঙ্কর দাশের সঞ্চালনায় শিল্পী শিমু বিশ্বাসের দুটি নজরুলসংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুরু হয়। এরপর বক্তৃতা করেন কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস ও বিশ্বজিৎ চৌধুরী।
হরিশংকর জলদাস নজরুল জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি কুমিল্লায় নজরুল স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখার স্মৃতি বর্ণনা করেন।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী বক্তৃতায় নজরুল জীবনে প্রেম, নজরুলকে নিয়ে তাঁর উপন্যাস নার্গিস লেখার অভিজ্ঞতা পাঠকদের শোনান।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে কবিতা পাঠ করেন কবি খুরশীদ আনোয়ার, ওমর কায়সার, মানজুর মুহাম্মদ, মোজাম্মেল মাহমুদ ও তনুজা বড়ুয়া ।
অনুষ্ঠান শেষে দর্শক ও অতিথিরা বাতিঘরে ‘নজরুল রচিত ও নজরুলবিষয়ক গ্রন্থ প্রদর্শনী’ ঘুরে দেখেন। উল্লেখ্য, প্রদর্শনী চলবে ৩০ মে পর্যন্ত।
Sunday, May 10, 2015
চির নূতনেরে দিল ডাক পঁচিশে বৈশাখ
![]() |
| বরিশালে অমৃতলাল দে মহাবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশনা |
![]() |
| রাজশাহী ভুবনমোহন পার্কে রাজশাহী সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের অনুষ্ঠানে শিল্পীদের পরিবেশনা l ছবি: প্রথম আলো |
রাজশাহীতে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, নিক্বণ নৃত্যশিল্পী গোষ্ঠী, রাজশাহী জেলা প্রশাসন ও নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি পৃথক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
রাজশাহী শিল্পকলা একাডেমীতে বিকেলে আলোচনা সভা ও নৃত্যনাট্যানুষ্ঠান করে জেলা প্রশাসন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমদ। আলোচক ছিলেন রবীন্দ্র গবেষক গোলাম কবির। সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী। ধ্রুপদালোকের পরিবেশনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নৃত্যনাট্য শাপমোচন মঞ্চস্থ হয়।
সন্ধ্যায় নগরের ভূবনমোহন পার্কে রাজশাহী সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে ‘কবি প্রণাম’ শিরোনামে আলোচনা ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আলোচনা পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। সভাপতিত্ব করেন ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন। অনুষ্ঠানে অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্য ও আমিনুল হককে ‘রবীন্দ্র সম্মাননা ২০১৫’ দেওয়া হয়।
রাজশাহীর আলুপট্টিস্থ বঙ্গবন্ধু চত্বরে নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একাডেমিক ভবনের সম্মেলন কক্ষে সকালে কবিগুরুকে নিয়ে ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদেরই লোক’ শীর্ষক গবেষণামূলক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা হাবিবুল্লাহ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য লোকবিজ্ঞানী মুহম্মদ আবদুল জলিল উপস্থাপন করেন ‘লোকসাহিত্যচর্চায় রবীন্দ্রনাথ (প্রসঙ্গ শাহজাদপুর)’ শিরোনামের প্রবন্ধ। সভাপতিত্ব করেন পি এম সফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল কবিতা আবৃত্তি, সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠান।
সন্ধ্যার পর নিক্বণ নৃত্যশিল্পী গোষ্ঠী নিক্বণ মিলনায়তনে আলোচনা অনুষ্ঠান ও রবীন্দ্র নৃত্যালেখ্য ‘অমৃতসদনে চল যাই’ পরিবেশন করে।
বরিশালে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বরিশাল নাটক, প্রথম আলো বন্ধুসভা, খেয়ালী গ্রুপ থিয়েটারসহ বিভিন্ন সংগঠন দিনব্যাপী নানা আয়োজন করে।
সকাল সাতটায় নগরের অমৃতলাল দে মহাবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ প্রভাতি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু করে অনুষ্ঠানমালা। নয়টায় বসে রবীন্দ্র চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। ১০টায় হয় রবীন্দ্র কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা।
বিকেল পাঁচটায় উদীচী ভবনে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মানবেন্দ্র বটব্যাল, নারায়ণ সাহা, আজমল হোসেন, মুকুল দাস, বিশ্বনাথ দাস মুনশী প্রমুখ। পরে অনুষ্ঠিত হয় আবৃত্তি, গান ও নৃত্য।
বিকেল পাঁচটায় প্রথম আলোর বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ে বন্ধুসভা আয়োজন করে আলোচনা, আবৃত্তি ও সংগীতানুষ্ঠানের। আলোচনা করেন তন্ময় কুমার নাথ, অহিন পাল, অনিরুদ্ধ সরকার, রাশেদুল হাসান, হুমায়ুন কবির, সম্রাট প্রমুখ।
সন্ধ্যায় অমৃতলাল দে মহাবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের আয়োজনে হয় প্রদীপ প্রজ্বালন, আলোচনা, আবৃত্তি, সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠান। পরে চিত্রাঙ্কন ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে সনদ ও পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
Tuesday, March 3, 2015
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৬৪ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ
আলীগড় আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা মুসলমান নেতৃত্বের অনেকেই মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। যদিও পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ইংরেজদের সঙ্গে মুসলমানদের দূরত্ব বেড়ে গিয়েছিল। মুসলমানদের দীর্ঘদিনের রাজত্ব কেড়ে নেয়ায় তারা ইংরেজদের প্রধান শত্র“ বিবেচনা করে। যে কারণে ইংরেজ শাসন যুগে তারা ইংরেজি শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখে। উনিশ শতকের কয়েকজন শিক্ষিত মুসলমান নেতা বুঝেছিলেন মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত না করে তুললে তারা জাতি হিসেবে অনেকটা পিছিয়ে পড়বে। এদিকে দৃষ্টি রেখে নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী প্রমুখ শিক্ষিত মুসলিম নেতা প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে মুসলমানদের এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। মুসলমানরা ইতিমধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জন করেছিল বলে ১৮৮৫ সালে সর্বভারতীয় কংগ্রেস গঠিত হলেও অনেক মুসলমান নেতাই এতে যোগ দেননি। অতঃপর ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে প্রেরণা দেয়।
১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই মুসলিম লীগ গঠনের পটভূমি রচিত হয়েছিল। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত হিন্দু নেতৃবৃন্দই কংগ্রেস গঠন করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এ সংগঠনের মধ্য দিয়ে তারা যেন সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে নিতে পারে এবং ভারতে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে সহযোগিতা করতে পারে। এ সময় মুসলমান সমাজের কোনো কোনো শিক্ষিত নেতা বুঝেছিলেন, কংগ্রেসের মাধ্যমে মুসলমানের কোনো উপকার হবে না। তাই সর্বজন মান্য মুসলিম নেতা স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থে ভারতীয় মুসলমানদের কংগ্রেসে যোগ দিতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি আলীগড়ে একটি কলেজ স্থাপন করে একে কেন্দ্র করে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন শুরু করেন, যা আলীগড় আন্দোলন নামে পরিচিত। আলীগড় আন্দোলন মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রশ্নে যে ভূমিকা রেখেছিল, তার মধ্যেই মুসলিম লীগ গড়ার একটি প্রেরণা খুঁজে পাওয়া যায়।
বাংলার মুসলমানদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক ছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা। বাংলার অধিকাংশ মুসলমান পূর্ব বাংলায় বাস করে। কিন্তু শাসনকেন্দ্র কলকাতায় থাকায় নানা ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলা ছিল অবহেলিত। তাই বঙ্গভঙ্গের সূত্রে ঢাকা পূর্ব বাংলার রাজধানী হলে এ অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবে। এ কারণে পূর্ব বাংলার মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা শুনে উল্লাস প্রকাশ করে। কিন্তু অচিরেই এই উল্লাসের বেলুন চুপসে যায়। কলকাতা কেন্দ্রিক কংগ্রেস ও অন্য হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গ বাতিলের দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করে। এবার মুসলমান নেতৃত্ব বুঝতে পারেন, তাদের সম্প্রদায়ের অধিকারের দাবি সরকারের কাছে উত্থাপনের জন্য নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। এ পটভূমিতেই গঠিত হয়েছিল মুসলিম লীগ।
Monday, March 2, 2015
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৬৩ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ
একটি অর্থনৈতিক কারণের প্রতিও ইঙ্গিত রয়েছে। ইংরেজ শাসনের শুরু থেকে কলকাতা বাংলাদেশের রাজধানী থাকায় পূর্ব বাংলা বরাবরই অবহেলিত থেকেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা- প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ অঞ্চলের মানুষ পিছিয়ে পড়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়সহ বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কলকাতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে থাকে। ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গ অবহেলিত থেকে যায়। কৃষিপ্রধান অঞ্চল হলেও প্রশাসন কেন্দ্র থেকে দূরে থাকায় পূর্ব বাংলার কৃষির উন্নতিও তেমন হয়নি। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলা পিছিয়ে পড়ে।
বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের পেছনে সরকারের একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। প্রায় ১০০ বছর ধরে সামাজিক, শিক্ষা ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন এদেশের মানুষকে অধিকার সচেতন করে তুলেছিল। বাংলা তথা ভারতের নেতৃবর্গের রাজনীতি চর্চা এর সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ অর্থাৎ ভারতীয়রাও যে একটি ভিন্ন জাতি সে প্রশ্নে তারা সচেতন হয়ে ওঠে। লর্ড কার্জন বিষয়টির প্রতি নজর রেখেছিলেন। কারণ ইতিমধ্যে ভারতীয়দের রাজনৈতিক সংগঠন কংগ্রেস বিভিন্ন আন্দোলন পরিচালনা করছিল। লর্ড কার্জন ভারতীয়দের ঐক্য ভেঙে দিয়ে তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাইলেন। তিনি বুঝেছিলেন, এদেশের হিন্দু ও মুসলমান এ দুই সম্প্রদায়ের জনগণকে যারা পরস্পরের শত্র“তে পরিণত করতে পারবে, তাদের পক্ষে শাসন করা সহজ হবে। এ ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বঙ্গভঙ্গ চিন্তার পেছনে কাজ করেছে।
ব্রিটিশ শাসক চক্রের প্ররোচনায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণা ও বিদ্বেষ তীব্র আকার ধারণ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। পূর্ববঙ্গের উন্নয়নের প্রশ্ন এবং সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণেই মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে সোচ্চার হয়।
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন এক ঘোষণার মধ্য দিয়ে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করেন। মুসলমানদের জন্য এ সিদ্ধান্ত খুব দ্রুতই ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছিল। ঢাকা নতুন প্রদেশের রাজধানী হওয়ায় নানা দিক থেকে পূর্ববঙ্গের উন্নয়ন ঘটতে থাকে। ঢাকায় একে একে স্থাপিত হয় স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কলকাতার মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন কমে যায়। বঙ্গভঙ্গের সুফল হিসেবে রাজধানী শহর ঢাকায় বড় বড় ইমারত নির্মিত হতে থাকে। হাইকোর্ট, সেক্রেটারিয়েট, কার্জন হল ইত্যাদি নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এভাবেই পূর্ব বাংলার মানুষ নতুনভাবে আশাবাদী হয়ে ওঠে।
বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ঘোষিত হলে বাংলার মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। একটি অংশ মনে করে, ইংরেজরা নিশ্চিন্তে দেশ শাসন করার জন্য এ অঞ্চলের অধিবাসীদের দুর্বল করে ফেলতে চাইছে। এ কারণে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার দিন কংগ্রেস দেশব্যাপী শোক দিবস পালন করে। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে হরতাল পালিত হয়। প্রথম দিকে মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে সমর্থন জানায়নি। মৌলভী আবদুল রসুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কলকাতার রাজাবাজারের জনসভায় মুসলিম নেতৃবৃন্দ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। অবশ্য পরে মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানাতে থাকে। কংগ্রেস সমর্থক ও উচ্চবিত্তের হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা তাদের বক্তব্যে বলেন, এ বিভক্তি বাঙালির ঐক্যকে নষ্ট করে দেবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর হানবে চরম আঘাত। পশ্চিমবঙ্গের বড় বড় পত্রিকায় বঙ্গভঙ্গবিরোধী নিবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে। পত্রিকাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ইংরেজি পত্রিকা স্টেটসম্যান ও পাইওনিয়ার এবং বাংলা পত্রিকা যুগান্তর, সন্ধ্যা, হিতবাদী, সঞ্জীবনী, নবশক্তি ইত্যাদি।
Saturday, February 28, 2015
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৬০ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ
![]() |
| হাজী শরীয়তউল্লাহ |
![]() |
| ফরায়েজী আন্দোলনের জনক হাজী শরীয়তউল্লাহ ও দুদুমিয়ার বাড়ী |
হিন্দু সমাজে যখন সংস্কার চলছিল, তখন বাংলার মুসলমানদের, বিশেষ করে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসেন হাজী শরীয়তউল্লাহ। শরীয়তউল্লাহ লক্ষ্য করেছিলেন ইংরেজ শাসিত এদেশে মুসলমানরা নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। স্থানীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির আচার-আচরণ নিজেদের জীবনে প্রবেশ করায় ইসলামের মূল শিক্ষার প্রতি তারা উদাসীন হয়ে পড়েছে। এ কারণে ফরায়েজি আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি মনোযোগী করে তাদের শক্তি জাগিয়ে তোলা। একই উদ্দেশ্যে এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও অনুশাসন পালনে উদ্বুদ্ধ করা এবং সব ধরনের কুসংস্কার থেকে মুক্ত করারও প্রচেষ্টা নেয়া হয়। ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি জমিদার, নীলকর, মহাজন ও স্থানীয় প্রশাসনের শোষণ ও অত্যাচার থেকে কৃষকদের মুক্ত করাও ছিল এ আন্দোলনের লক্ষ্য।
হাজী শরীয়তউল্লাহ তার আন্দোলনের প্রধান বক্তব্য হিসেবে ইসলামের পাঁচটি মৌলিক আদর্শের ভেতর মুসলমানদের নিষ্ঠাবান থাকার নির্দেশ দেন। এই মূল আদর্শগুলোর ব্যতিক্রম কাজকে তিনি শিরক ও বিদাত বলে ঘোষণা দেন। ফরায়েজিরা জন্মদিন, বিয়ে, মৃত্যু ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত আচার অনুষ্ঠান, পীরপূজা, পীরের প্রতি অতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, তাজিয়া নির্মাণ ও মহররম মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
হাজী শরীয়তউল্লাহর জীবদ্দশায় ফরায়েজি আন্দোলন ফরিদপুর ছাড়াও ঢাকা, বরিশাল ও কুমিল্লা জেলায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শরীয়তউল্লাহ বুঝেছিলেন মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের নীতি ছিল শত্র“তামূলক। এ কারণে মুসলমানরা শিক্ষা-দীক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছিল। তিনি মুসলমানদের বোঝাতে চেয়েছিলেন, রাজনৈতিকভাবে তারা আর স্বাধীন নয়। তাদের দেশ এখন ‘দারুল হারব’ অর্থাৎ যুদ্ধরত বা অমুসলিমের দেশ। এমন দেশকে হয় শক্তি প্রয়োগ করে মুসলমান শাসিত দেশ অর্থাৎ ‘দারুল ইসলাম’ বানাতে হবে অথবা দারুল হারব ছেড়ে অন্য কোনো মুসলমানের দেশে চলে যেতে হবে। এর কোনোটি করা সম্ভব না হলে মুসলমানদের কয়েকটি নিয়ম মেনে এ দেশে থাকতে হবে। এ কারণেই শরীয়তউল্লাহ ঘোষণা দেন, দারুল হারবে মুসলমানদের শুধু ফরজ ইবাদতটুকু করলেই চলবে। তাই আন্দোলনটির নাম হয় ফরায়েজি আন্দোলন। শরীয়তউল্লাহ এমন প্রতীকী নিয়ম পালনের মধ্য দিয়ে বাংলার মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।
ইংরেজ সিভিলিয়ান জেমস ওয়াইজ হাজী শরীয়তউল্লাহকে মুসলমান কৃষকদের উজ্জীবিত করার কাজে একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা বলে উল্লেখ করেছেন। লক্ষ্য করা গেছে, যেসব অঞ্চলে ফরায়েজি আন্দোলন জনপ্রিয় হয়েছে সেখানে হিন্দু জমিদার ও নীলকররা শক্তিশালী ছিল এবং এদের দ্বারা কৃষকরা অত্যাচারিত হতো। কঠোরভাবে ধর্ম সংস্কার করায় একশ্রেণীর মুসলমান নেতা শরীয়তউল্লাহর আন্দোলনকে সমর্থন করেননি। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মওলানা কেরামত আলী জৈনপুরী। এই মতবিরোধের সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন হিন্দু জমিদাররা। তারা কৌশলে রক্ষণশীল মুসলমান কৃষকসহ নীলকরদের ফরায়েজিদের বিরুদ্ধে একত্রিত করেন। এভাবে ১৮৮০ সালের দিকে ফরায়েজিরা একটি সংঘাতময় অবস্থার মুখোমুখি হয়। এমন একটি পরিস্থিতি যখন বিরাজমান, তখনই হাজী শরীয়তউল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...












