Saturday, November 7, 2015

খোলাসা হচ্ছে না কিছুই by সাজেদুল হক ও রুদ্র মিজান

উদ্বেগ-আতঙ্কের ৪০ দিন। সিজার তাভেলা হত্যা দিয়ে শুরু। সর্বশেষ আশুলিয়ায় পুলিশ হত্যা। একের পর এক অঘটন। হুমকির পর হুমকি। ভয় আর আতঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছেন বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ। সন্ত্রাসের একটি নতুন অধ্যায়েই যেন প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে সন্ত্রাসী আক্রমণে নিহত প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনের পিতা প্রবীণ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে তিনি এমন আতঙ্ক বোধ করতেন। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় কোন কিছুই খোলাসা হচ্ছে না। এসব হামলায় কারা জড়িত তার কোন বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
৪০ দিনের ঘটনা প্রবাহে দেখা যায়, ২৮শে সেপ্টেম্বর সিজার তাভেলা হত্যার পর ৩রা অক্টোবর রংপুরে খুন হন জাপানের নাগরিক হোশি কুনিও। ৫ই অক্টোবর মধ্য বাড্ডায় নিজ বাসায় হত্যার শিকার হন কথিত পীর ও পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খান। ২২শে অক্টোবর দারুস সালামে চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ছুকিরাঘাতে নিহত হন পুলিশের এএসআই ইব্রাহীম মোল্লা। ২৩শে অক্টোবর দিবাগত রাতে হোসনি দালানে আশুরার প্রস্তুতি সভায় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে দুজন নিহত হন। ৪ঠা নভেম্বর সাভারের আশুলিয়ায় সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারান পুলিশ কনস্টেবল মুকুল হোসেন।
কয়েকটি রাষ্ট্র কেন সতর্কতা জারি করেছিল
২৬শে সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড জানায়, তারা অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য দপ্তরের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছেন যে, জঙ্গিরা বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ান স্বার্থের ওপর হামলা করতে পারে। এ তথ্য পাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট টিমের বাংলাদেশ সফর পিছিয়ে দেয়া হয়। পরে ওই সফর স্থগিতই হয়ে যায়। এখন জানা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং কানাডা- এই পাঁচটি দেশের জোট গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিল যে, বাংলাদেশে পশ্চিমা স্বার্থের ওপর হামলা হতে পারে। এ তথ্য পাওয়ার পর কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ সফরের ব্যাপারে সতর্কতা জারি করে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারের এক প্রতিনিধিকে জানিয়েছিল, বাংলাদেশে আইএস সংগটিত হচ্ছে- এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাটও পরিষ্কার করে বলেছিলেন, হামলার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারকে তথ্য দেয়া হয়েছিল। সরকারের তরফে অবশ্য এ ব্যাপারে দুই ধরনের মন্তব্য পাওয়া যায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছিলেন, তারা তথ্য দিয়েছিল। তবে যেখানে হামলার কথা বলা হয়েছে, সেখানে হামলা হয়নি। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছিলেন, এ ধরনের কোন তথ্য কোন বিদেশী রাষ্ট্র দেয়নি। এখন পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, কথিত বড় ভাইয়ের নির্দেশে ভাড়াটিয়া খুনিরা বিদেশী নাগরিক হত্যা করতে পারে, সে তথ্যের কারণেই কি একাধিক রাষ্ট্র সতর্কতা জারি করেছিল।
‘আইএসের দায় স্বীকার’, সরকারের প্রত্যাখান
বাংলাদেশে গত ৪০ দিনে সংঘটিত অঘটনগুলোর মধ্যে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যা, আশুরার প্রস্তুতি সভায় হামলা এবং সাভারে পুলিশ হত্যার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গি সংগঠন আইএস। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ দায় স্বীকারের প্রাথমিক খবর দেয় যুুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ। বাংলাদেশ সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ দাবি অস্বীকার করেছে। তারা পরিষ্কার করে বলছেন, বাংলাদেশে আইএসের কোন অস্তিত্ব নেই। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাইট ইন্টিলিজেন্সের এ খবর প্রচারের পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে। যদিও সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও বাংলাদেশে আইএসের তৎপর থাকার তথ্য রয়েছে। ওদিকে, সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ এক বিবৃতিতে বলে, যাছাই-বাছাই করে তারা নিশ্চিত হয়েই আইএসের বার্তা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ সরকারকে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার পরামর্শও দিয়েছে তারা।
দোষারোপের রাজনীতি
দোষারোপের রাজনীতি বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে তা নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘটনার পরপরই দায়ী করা হয়েছে, বিএনপি-জামায়াতকে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বলেছেন, লন্ডনে বসে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ষড়যন্ত্র করছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ লন্ডন থেকে আসছে বলেও দাবি করেছেন তারা। অন্যদিকে, বিএনপির পক্ষ থেকে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরকারকে দায়ী করা হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরবিরোধী স্বার্থের রাজনীতি অনেক পর্যবেক্ষককেই হতবাক করেছে।
তদন্তে অগ্রগতি সামান্য
গত ২৩শে অক্টোবর বোমা হামলায় রক্তাক্ত হয় শিয়া মুসলিমদের পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল। ঘটনাস্থলেই নিহত হয় কিশোর সাজ্জাদ। আহত হন শতাধিক মানুষ। পরে আরও একজন নিহত হন। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করে পুলিশ। ডিবি পুলিশের একাধিক টিম এ বিষয়ে তদন্ত করলেও কোন ক্লু উদঘাটন হয়নি। যদিও ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করা হয়েছিল।
গত ২২শে অক্টোবর রাজধানীর গাবতলীতে চেকপোস্টে তল্লাশি করার সময় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে দারুসসালাম থানার এক এএসআই নিহত হন। তার নাম ইব্রাহীম মোল্লা। চেকপোস্টে পুলিশ হত্যার ঘটনায় হতভম্ব হয়ে যান পুলিশ সদস্যরা। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে মাসুদ রানা সোহেল নামে একজনকে আটক করা হয়। পরবর্তীকালে আরও পাঁচজনকে আটক করা হলেও মূল অভিযুক্ত হিসেবে পুলিশ যার নাম বলেছে তাকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
৪ঠা নভেম্বর ঢাকার অদূরে সাভারের আশুলিয়ায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এতে গুরুতর আহত হন কনস্টেবল নূর আলম সিদ্দিক (২২)। এখনও এ ঘটনার কোন ক্লু উদঘাটন হয়নি। এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহসিনুল কাদির বলেন, পুলিশের একাধিক টিম এ ঘটনার তদন্ত করছে।
ব্লগার অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যার ঘটনায় এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। গত ৩১শে অক্টোবর বিকালে আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় দীপনের জাগৃতি প্রকাশনীতে ঢুকে তাকে হত্যা করা হয়। ওই দিনই অভিজিৎ রায়ের আরেক প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলের লালমাটিয়ার শুদ্ধশ্বরের অফিসে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এসময় আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল, লেখক সুদীপ কুমার বর্মণ ওরফে রণদীপম বসু ও তারেক রহিম গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
রংপুর জেলার কাউনিয়ায় জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও হত্যা মামলায় হুমায়ুন কবির হীরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এ ঘটনায় বিএনপি নেতা হাবীন-উন নবী খান সোহেলের ভাই রাশেদুন নবী খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ২৮শে সেপ্টেম্বর ঢাকার কূটনীতিকপাড়া গুলশানে গুলি করে হত্যা করা হয় ইতালিয়ান নাগরিক সিজার তাভেলাকে। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। সর্বশেষ বিএনপি নেতা এমএ কাইয়ুমের ছোট ভাই এমএ মতিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার অনেকের বাসা সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন ইতালিয়ান দূতাবাসের কর্মকর্তারা। যাদের গ্রপ্তার করা হয়েছে তাদের গ্রেপ্তারের সময় নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। পুলিশ এবং পরিবারের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, তাভেলা হত্যার ক্লু উদ্ধার ও আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের অনেকে ১৬৪ ধারায় দায় স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত অন্যদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি। হোসনি দালানে তাজিয়া মিছিলে হামলা ও প্রকাশক দীপন হত্যার ঘটনায় এখনও কাউকে আটক করা না গেলেও ডিবির দক্ষ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কাজ করছেন। তবে গাবতলীতে পুলিশ হত্যার ঘটনায় ছয়জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

‘বাম জাগছে: সত্যি না কল্পনা’ by নূহ-উল-আলম লেনিন

৮ অক্টোবর প্রথম আলোয় প্রকাশিত হাসান ফেরদৌসের ‘বাম জাগছে: সত্যি না কল্পনা’ শীর্ষক উপসম্পাদকীয়টি পড়লাম। নিঃসন্দেহে তাঁর লেখা আমাকে আকৃষ্ট করে এবং ঔৎসুক্য জাগায়। হাসান ফেরদৌসের এই লেখাটিও চিন্তা উদ্রেক করার মতো। এ জন্য তাঁকে ধন্যবাদ।
ফেরদৌস তাঁর নিজস্ব অবস্থান থেকে নির্মোহ দৃষ্টিতে লিখেছেন। বাংলাদেশে ও বিশ্বপরিসরে বামপন্থার ভবিষ্যৎ ও ভূমিকা নিয়ে আরও বিস্তারিত এবং গভীর আলোচনা দরকার। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বিশ্ব-সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের কার্যকারণ নিয়ে কমিউনিস্ট ও বাম দলগুলো এখন পর্যন্ত তেমন বস্তুনিষ্ঠ ও আত্মসমালোচনামূলক আলোচনা বা মূল্যায়ন করেছে—এমনটি আমার চোখে পড়েনি। আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যানুসন্ধান এবং নতুন করে একটি ভেদ-বৈষম্যহীন সাম্যের সমাজ নির্মাণের পথনির্দেশও করতে পারেননি বামপন্থার অনুসারীরা।
আমি মনে করি, ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’ হলেও বাস্তবায়নযোগ্য বা প্র্যাগমেটিক নতুন কোনো স্বপ্নের ঠিকানা আমরা এখনো খুঁজে পাইনি। বামপন্থার একাংশ এখনো মতান্ধতার ফাঁদে বন্দী। তারা ‘তত্ত্ব ঠিক, প্রয়োগে ভুল ছিল’ বলে আত্মপ্রসাদ লাভ করছে এবং পুরোনো ছিন্ন পতাকা হাতে অবশিষ্ট ক্ষমতাটুকু নিঃশেষিত করছে। অন্য একটি অংশ পথানুসন্ধানে ব্রতী হয়ে নানা মাত্রার সোশ্যাল ডেমোক্রেসি বা ধনতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যেই কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত মূলধারার বুর্জোয়া বা ঐতিহ্যবাহী অকমিউনিস্ট বা নন-মার্ক্সিস্ট এবং পুরোনো ঘরানার সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দলগুলোর মধ্যেও পরিবর্তনকামী প্রবণতা জোরদার হচ্ছে। সেই সঙ্গে গ্রিস ও স্পেনের একসময়ের কমিউনিস্টদের নতুন ধরনের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলন গড়ে তোলাও একটি নতুন প্রপঞ্চ। লেখক যে ‘নয়া বাম’ ও বাম জাগরণের কথা বলছেন, সম্ভবত তা শেষোক্ত ধারার।
মানবজাতি এখন একটা ভাবাদর্শগত সংকটকাল অতিক্রম করছে। বিদ্যমান বিশ্বায়িত অর্থনীতি বা করপোরেট পুঁজিবাদের কোনো বিকল্প দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ অথবা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতাজনিত ভাবাদর্শগত শূন্যতা এবং অন্য কোনো অগ্রসর ভাবাদর্শ বা চিন্তাধারা দ্বারা পূরণ হয়নি। উত্তরাধুনিক বাস্তবতা নিয়ে নানা মাত্রার অনুসন্ধিৎসা ও ডিসকোর্স অবশ্য লক্ষণীয়। কিন্তু কোনো নির্ভরযোগ্য তাত্ত্বিক রূপরেখা বা ছক চোখে পড়ে না।
আমরা যারা ‘কেটে পড়েছি’, তারা যে এই পরিণতির জন্য অপেক্ষা করিনি, বরং অযুতসংখ্যক মানুষের মধ্যে থেকে পরিবর্তনের জন্য লড়তে পারছি, এতেই আমরা সন্তুষ্ট সম্ভবত কোনো একটা নির্দিষ্ট ছকবাঁধা পথে ইতিহাস এগোবে না। আমাদের অজানা-অভাবিত নানা বিচিত্র পথে সভ্যতার রথ আগানোর চেষ্টা করবে। সভ্যতার একটা নিজস্ব নিয়ম ও ডায়নামিকস আছে—সেটা যে কী, তার যথার্থ উপলব্ধিই হয়তো রথের চালিকা হয়ে উঠবে। আপাতত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, তবে নিশ্চেষ্ট হয়ে নয়। দৃষ্টিসীমার মধ্যে হলেও রথের রশি আমাদের টেনে নিতেই হবে। আমরা যারা সমাজ পরিবর্তনে এবং একটা ভেদ-বৈষম্যহীন মানবিক সমাজে বিশ্বাসী, তারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সে চেষ্টাই করছি।
হাসান ফেরদৌসের লেখায় বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের (সিপিবি) মধ্যে যাঁরা আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন, তাঁদের প্রতি একটা খোঁচা আছে। তিনি লিখেছেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল, তিনি (সেলিম) এগিয়ে এসেছেন। তাঁর চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান সতীর্থরা অবশ্য সুযোগ বুঝে কেটে পড়েছেন, তাঁদের কেউ কেউ এখন মন্ত্রী বাহাদুর। অনুমান করি, চাইলে তিনিও সে কোটায় ঢুকে পড়তে পারতেন।’
হাসান ফেরদৌস জ্ঞানী মানুষ। নিঃসন্দেহে সবকিছু জেনেবুঝেই তিনি লিখেছেন। তবে তিনি জানেন কি, সিপিবি যখন দ্বিধাবিভক্ত হয়, তখন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বাধীন অংশটি ছিল সংখ্যালঘু, দলের সভাপতি, সাধারণ-সম্পাদকসহ সভাপতিমণ্ডলীর তিন-চারজন ছাড়া আর সবাই এবং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ‘রূপান্তরিত কমিউনিস্ট’ পার্টির পতাকাতলে সমবেত হন। প্রথমে তঁাদের তরফে কমিউনিস্ট পার্টিকে একটি কর্মসূচিভিত্তিক সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলে। কিন্তু নানা কারণে সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। অতঃপর রূপান্তরকামীরা কার্যত আবারও বিভক্ত হন। প্রধান অংশটি গণফোরামে যোগদান করে (আমার ও অনেকের আপত্তি সত্ত্বেও)। অজয় রায় ও ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান পৃথক ‘কমিউনিস্ট কেন্দ্র’ গঠন করেন। দুজন সাংসদসহ ক্ষুদ্র একটি অংশ বিএনপিতে যোগদান করে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের ভেতর দিয়ে গণফোরাম কার্যত কার্যকারিতা হারায়। নির্বাচনের আগেই দুজন সাংসদসহ নুরুল ইসলাম নাহিদের নেতৃত্বে একটি অংশ আওয়ামী লীগে যোগদান করে। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণফোরাম থেকে বেরিয়ে রূপান্তরিত কমিউনিস্টদের প্রধান অংশটি আওয়ামী লীগে যোগদান করে। এরাই ছিল সিপিবির মূলধারার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। না, এঁদের কেউই ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ অথবা মন্ত্রী-এমপি হননি (অবশ্য এমপি-মন্ত্রী হওয়া কি অপরাধ? এতে তো জাত যাওয়ার কথা নয়)। এখনো তাঁরা সততার সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
হাসান ফেরদৌসের ভাষায় যাঁরা ‘কেটে পড়েন’, তাঁরা কেউই সেলিমের চেয়ে ‘বুদ্ধিমান’ নন। সেলিম আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন এবং অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ‘কেটে পড়ারা’ কেবল মন্ত্রিত্বের লোভে আওয়ামী লীগে যোগদান করেননি। হাসান ফেরদৌসের মতে, আমেরিকা-ইউরোপের মূলধারার দলগুলোতেও যদি পরিবর্তনকামী শক্তি থেকে থাকে, তাহলে যে দলটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, যে দলটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে এবং যে দলটি এমডিজি অর্জনসহ সামাজিক-মানবিক খাতে, অমর্ত্য সেনের ভাষায়, দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ সূচক অর্জন করেছে (দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনা, খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন, টেকসই সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলা, গড় আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনা প্রভৃতি সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে থাকা, শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন ও নারীর ক্ষমতায়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্জনগুলো), সেই দলটি কি পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করছে না?
ইংল্যান্ডে লেবার পার্টি যদি পারে, তবে হতদরিদ্র বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ কেন পারবে না? পুঁজিবাদের (নিঃসন্দেহে অপুষ্ট ও দুর্বৃত্তায়িত পুঁজিবাদ) কাঠামোর মধ্যেই আমাদের এসব জনকল্যাণমূলক কাজ, উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নিতে হচ্ছে। সোভিয়েত তাত্ত্বিকদের দেওয়া পুঁজিবাদ এড়িয়ে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের (বাই পাসিং ক্যাপিটালিজম) তত্ত্ব তো এখন আর কেউ বলছে না। তেমন তত্ত্ব লেখকের জানা থাকলে জানাবেন, উপকৃত হব।
যা হোক, হাসান ফেরদৌসের সঙ্গে বাহাসে লিপ্ত হওয়ার লক্ষ্য থেকে আমি লিখছি না। আমাদের নির্বুদ্ধিতাকে তিনি উপহাস করতেই পারেন। তিনি লিখেছেন, ‘বস্তুত ইথিওপিয়া থেকে ইয়েমেন—যেখানেই কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখল করেছে, দেশটা চিড়ে-ছিবড়ে খেয়ে তারপর মানুষের দাবড়ানি খেয়ে ইঁদুরের গর্তে ঢুকেছে।’ আমরা যারা ‘কেটে পড়েছি’, তারা যে এই পরিণতির জন্য অপেক্ষা করিনি, বরং অযুতসংখ্যক মানুষের মধ্যে থেকে পরিবর্তনের জন্য লড়তে পারছি, এতেই আমরা সন্তুষ্ট। বন্ধু সেলিম ‘চুলায় ভাত রান্না’ করুক, তাতে কারও আপত্তি নেই। শুধু দেখার বিষয়—পাত্রে চাল আছে কি না, নাকি কেবল পানি সেদ্ধ হচ্ছে? লেখককে পুনশ্চ ধন্যবাদ।
নূহ-উল-আলম লেনিন: সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

তাইওয়ানকে ফাঁদে ফেলছে চীন?

গৃহযুদ্ধে বিভক্ত হওয়ার ৬৬ বছর পর প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনায় বসছে চীন ও তাইওয়ান। আজ সিঙ্গাপুরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট মা ইং জিউয়ের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ১৯৪৯ সালের পর দু’দেশের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক। ২০০৮ সালে মা ইং জিউ নির্বাচিত হওয়ার পর সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে মোড় নেয়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ চীনের এত আগ্রহের পেছনে অন্য উদ্দেশ্য রয়েছে। আঞ্চলিক স্বার্থে তাইপেকে ফাঁদে ফেলতে চায় বেইজিং। বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশ্লেষণে এ কথা বলা হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ বৈঠককে ১৯৭২ সালের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘স্মরণীয় পদক্ষেপ’ বলে বর্ণনা করেছে। ১৯৭২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন মাও সেতুং। বিশ্লেষকরা বলছেন,
দক্ষিণ চীন সাগরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা থেকে বিশ্বের দৃষ্টি ফেরাতে তাইওয়ানের সঙ্গে হঠাৎ যোগাযোগ শুরু করেছে বেইজিং। তাইপের সঙ্গে সমঝোতা করে সমুদ্রসীমা নিয়ে অন্য আঞ্চলিক প্রতিযোগীকে মোকাবেলা করতে চায় চীন। বিশেষ করে ঐতিহাসিক শত্র“ জাপান ও ভিয়েতনামকে বার্তা দিতে চায় বেইজিং। তাইওয়ানের সান ইয়েত সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন ও এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় গবেষণা ইন্সটিটিউটের তিতুস চেন বলেন, দক্ষিণ চীন সাগর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে শান্তির প্রতীক হিসেবে নিজেকে দেখাতে চাচ্ছে বেইজিং। প্রতিবেশী সামুদ্রিক প্রতিযোগীসহ যুক্তরাষ্ট্রকে জানান দিতে চায়, চীন আঞ্চলিক নিরাপত্তায় কতটা ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ হয়ে ভূমিকা রাখতে পারে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র শেন ই-সিন বলেন, ‘বৈঠকটির লক্ষ্য আন্তঃদেশীয় শান্তি নিশ্চিত করা। বিশেষ করে তাইওয়ান প্রণালিতে অস্থিরতা হ্রাসে এ বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করছি।’
তাইওয়ান : দেশ নাকি দ্বীপ : মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কোনো সম্মেলনে তাইওয়ানকে নিয়ে বেশ সংকটে পড়তে হয়। একে ‘দেশ’ নাকি ‘দ্বীপ’ বলে অভিহিত করবে বুঝতে পারে না কেউ। কারণ তাইওয়ানকে বিশ্বের অনেকেই চীনের ‘স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড’ হিসেবে মনে করে। তাইওয়ান জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক কিংবা আইএমএফের সদস্য নয়। এমনকি মাত্র ২২টি দেশের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। চলতি বছর চীন নেতৃত্বাধীন এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) প্রতিষ্ঠায় তাইওয়ান অংশগ্রহণ করতে চাইলে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। এডিবি তাইওয়ানকে ‘তাইপে চীন’, মিস ইউনিভার্স ও ফিফা ফুটবলে ‘চীনা তাইপে’ বলে উল্লেখ করা হয়। তবে তাইওয়ানের জন্য স্বতন্ত্র পতাকা ব্যবহৃত হয়।

মাশরাফির কাছে মুখ্য জয়

সাকিব আল হাসান বলেছিলেন, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দাপুটে জয় চায় বাংলাদেশ। অধিনায়ক মাশরাফি মুর্তজা চলতে চান ভিন্নপথে। তার কাছে দাপট দেখানোর চেয়ে জয়টাই জরুরি। বড় দলগুলোর বিপক্ষে টানা তিন সিরিজ জেতার পর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজও তার কাছে চ্যালেঞ্জ-
প্রশ্ন : প্রস্তুতি ম্যাচে হেরে যাওয়াটাকে কিভাবে দেখছেন?
মাশরাফি : অবশ্যই হারতে ভালো লাগে না। সে জায়গা থেকে খুব খারাপ লেগেছে। ম্যাচ খেলার যে উদ্দেশ্য ছিল সে দিক থেকে বলতে গেলে- মুশফিক পুরোটা সময় ব্যাটিং করতে পেরেছে। লিটন কিছুটা পেরেছে, ইমরুল ছিল, সেও ফিফটি করেছে। আমি ৭ ওভার বোলিং করেছি। সব মিলিয়ে অনুশীলনের দরকার ছিল- সেটা হয়েছে।
প্রশ্ন : সাম্প্রতিক ভালো পারফরম্যান্স এই সিরিজে কী আপনাদের চাপে রাখবে ?
মাশরাফি : প্রতিটি সিরিজই চাপের এবং চ্যালেঞ্জের। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তো সব সময়ই চ্যালেঞ্জ ছিল। গুরুত্বপূর্ণ হল যে, আমরা পরস্পরের সঙ্গ যেভাবে উপভোগ করে থাকি, সেভাবে করতে পারলে ভালো কিছু না হওয়ার কারণ নেই।
প্রশ্ন : আপনার অবস্থা এখন কেমন?
মাশরাফি : প্রস্তুতি ম্যাচে ৩৫ ওভার ফিল্ডিং করেছি। ৫০ ওভার করতে পারলে ভালো হতো। আসলে প্রথম ম্যাচ থেকে চাপ নেয়া কঠিন। বলতে পারি, একটা ম্যাচের আগে যেভাবে স্বাভাবিক থাকি, সেভাবে এখন নেই। তবে আমি আÍবিশ্বাসী। আরেকটু অনুশীলন করতে পারলে ভালো হতো। আসলে এটা বাংলাদেশ দলের খেলা। আর যখন মনে করি যে, আমি পারব তখন ঝুঁকিটা নিই।
প্রশ্ন : নিজেদের শক্তি, না প্রতিপক্ষের দুর্বলতা বিবেচনা করে একাদশ সাজানো হবে?
মাশরাফি : দুটো জিনিসই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দুর্বলতা এই মুহূর্তে আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর অন্যতম কারণ অবশ্যই উইকেট। একই সঙ্গে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, তারা কোন বোলার এবং কোন ধরনের আক্রমণে বেশি দুর্বল।
প্রশ্ন : জয়ের মানসিকতা...?
মাশরাফি : প্রস্তুতি ম্যাচ হেরেছি সেটা নিয়ে অবশ্যই ভাবছি। বাংলাদেশ দলের হয়ে আপনি যার বিপক্ষেই হারেন না কেন, ২০০৭ এর পর থেকে আমরা এই বিশ্বাস অর্জন করেছি যে, যে কাউকে হারাতে পারি। এখন ভালো খেলাটা জরুরি। প্রস্তুতি ম্যাচে হেরেছি। এ নিয়ে আমি চিন্তিত। তারা প্রায় ২৮০ রান তাড়া করেছে। অবশ্যই ভালো ব্যাটিং করেছে। তাদের হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।
প্রশ্ন : তিনটি ম্যাচ জিতলে মাত্র এক পয়েন্ট পাবেন...?
মাশরাফি : এসব নিয়ে একেবারেই ভাবিনি। খেলতে যাওয়ার আগে এসব নিয়ে আলোচনা করা নেতিবাচক হয়ে যাবে।
প্রশ্ন : হোয়াইটওয়াশ করার চিন্তাটা নিশ্চয় আছে?
মাশরাফি : সবাই প্রত্যাশা করছে। আমাদের পক্ষ থেকে এখনই এই বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। একটা সিরিজের জন্য প্রথম ম্যাচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ম্যাচে খানিকটা চাপ থাকে। এই মুহূর্তে প্রথম ম্যাচ নিয়ে চিন্তা করছি।
প্রশ্ন : জিম্বাবুয়ের এই দলে অনেক পুরনো খেলোয়াড় নেই...?
মাশরাফি : আগের দলে ছিল মাসাকাদজা-টেলর। মাসাকাদজা জিম্বাবুয়ের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। উইলিয়ামসন ছিল না। আরভিন ছিল, কিন্তু একটা ম্যাচও খেলেনি। এরাও কিন্তু জিম্বাবুয়ের সেরা ক্রিকেটার। প্রস্তুতি ম্যাচ দেখে মনে হল, ওদের ব্যাটিং ভারসাম্যপূর্ণ। আফগানিস্তানের সঙ্গে ওরা হেরেছে। এখানে অবশ্যই ভালো কিছু করার লক্ষ্য থাকবে। আমার কাছে জয়টাই মুখ্য। হারাটাই লেখা হয়। শেষ পর্যন্ত জয়টাই থাকে। আমরা জিততে চাই।
প্রশ্ন : প্রস্তুতি ম্যাচে হারের পর সাকিবের ওপর কী দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল?
মাশরাফি : সাকিব বাংলাদেশ দলে সব সময় নির্ভরতার প্রতীক। শেষ কয়েকটি সিরিজে অন্যরা পারফর্ম করায় ওর ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। সাকিবের দিকে পুরো বাংলাদেশই তাকিয়ে থাকে যে, ও কিছু একটা করবে। প্রস্তুতি ম্যাচের কম্বিনেশন থেকে জাতীয় দলে আমাদের কম্বিনেশন অনেক ভালো। বাংলাদেশ দলে আরও অপশন আছে ওদেরকে আটকানোর।
প্রশ্ন : সৌম্যকে মিস করবেন?
মাশরাফি : সৌম্যকে পুরো দল মিস করবে। শুধু ভালো ক্রিকেটারই নয়, দারুণ টিমমেটও। খুবই রোমাঞ্চকর ক্রিকেটার। শেষ ম্যাচেও ৮০-র বেশি রান করেছে। তবে এটা একটা ভালো সুযোগ অন্যদের জন্য। লিটন খেলেছে আগে, ইমরুল ফিরেছে। ওদের জন্য সুযোগ নিজেদের মেলে ধরার। যারা আছে তারাও ভালো করবে।
প্রশ্ন : জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং নিয়ে কী বলবেন?
মাশরাফি : বিশ্বের সবচেয়ে ভালো ক্লিন হিটারদের একজন চিগুম্বুরা। চিবাবা আছে টপ অর্ডারে, সেও রানে আছে। যতটা সহজ ভাবা হচ্ছে, ততটা সহজ হবে না। ৬০০ বলে আমাদের মনোযোগ ধরে রাখতে হবে। শেষ সিরিজে দক্ষিণ আফ্র্রিকার বিপক্ষে যেভাবে খেলেছি, সেভাবে খেলতে পারলে আশা করি সমস্যা হবে না। ক্রিকেট এমনই খেলা যে, একহাতে চেঞ্জ হয়ে যায়।
প্রশ্ন : সাকিব বলেছেন, দাপট দেখিয়ে জিততে চাই। আপনি কী বলবেন ?
মাশরাফি : একেকজনের বলার ধরন একেক রকম। মাঠে নেমে অবশ্যই আমি দাপট দেখাতে চাইব। তবে আগে জয়টা জরুরি। পরিকল্পনা করব আগে ম্যাচটা কিভাবে জিততে পারি। আসলে ভালো খেললে দাপট দেখানো হয়ে যায়।
পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে ওডিআই
দল সময় ম্যাচ জয় হার সাফল্য
বাংলাদেশ ১৯৯৭-২০১৪ ৬৪ ৩৬ ২৮ ৫৬.২৫%
জিম্বাবুয়ে ১৯৯৭-২০১৪ ৬৪ ২৮ ৩৬ ৪৩.৭৫%

তিথির গানের অ্যালবাম শর্ট স্টোরি

ক্যাপ্টেন মাকসুদ আহমেদের কথায় ও মাকসুদ জামিল মিন্টুর সুরে আত্মপ্রকাশ পেল জান্নাতে রোম্মান তিথির দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘শর্ট স্টোরি’। সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যালবামের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ড. রফিকুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন আরও অনেকে।
‘শর্ট স্টোরি’ অ্যালবামটিতে মোট ৯টি গান রয়েছে। গানগুলো হল- দোলাচল, স্বপ্ন, লুকোচুরি, শূন্যতা, মনের ঘর, কাশবন, বিষণ্ণ কেন তুমি, জ্যোৎস্না জল এবং প্রজাপতি মেয়ে। এখানে ‘দোলাচল’ গানটির সুর করেছেন সঙ্গীতশিল্পী সুমন রাহাত এবং ‘প্রজাপতি মেয়ে’ ও ‘স্বপ্ন’ শিরোনামের গান দুটির সুর করেছেন শিল্পী নিজেই। সঙ্গীতায়োজন করেছেন কলকাতার জয়দ্বীপ চান্দা এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ইবনে রাজন।

ছায়াতে ভয়

বাংলাদেশে দিনে দুপুরে প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের খুন করাটা রুটিনে পরিণত হয়েছে। ৩১শে অক্টোবর রাজধানী ঢাকায় একটি অফিসে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা। চাপাতি দিয়ে খুনিরা সেখানে প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করে। একই দিনে আরেক প্রকাশক ও তার পাশে উপস্থিত আরও দু’জনকে গুরুতরভাবে আহত করা হয়েছে। আল কায়েদা থেকে অনুপ্রাণিত নিষিদ্ধ সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (আনসার-আল-ইসলাম) এ হত্যা সহ বাংলাদেশে বেশির ভাগ ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাবিদকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। তাদের ‘হিট লিস্টে’ নাম রয়েছে, তাদের দৃষ্টিতে ইসলামের সমালোচকদের। সংগঠনটি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, ‘যারাই নাস্তিকদের সমর্থন দেবে, তাদের কাউকেই ছাড়া হবে না’।
১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান নামে যখন পরিচিত ছিল বাংলাদেশ, তখন থেকেই উগ্র ইসলামপন্থিদের একটি ক্ষুদ্র অংশ রাজনীতিতে টিকে ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ চলাকালে এ ক্ষুদ্র অংশটিরই শক্তিসমেত বাড়তে থাকে। শাসকদল আওয়ামী লীগ এখনও দেশের একমাত্র মূলধারার ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি হিসেবে বহাল রয়েছে। কিন্তু দলটির নেতা শেখ হাসিনা তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ও এর ইসলামপন্থি শরিক জামায়াতে ইসলামী দ্বারা গঠিত বিরোধী জোট ধ্বংস করতে হন্য হয়ে আছেন। এটিই বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও সহিষ্ণু ঐতিহ্যকে দুর্বল করছে।
আইএস-এর মতো আন্তর্জাতিক সংন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে দেশীয় ইসলামপন্থি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটি একত্রিত হয়েছে, এ দাবি শেখ হাসিনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। বরং, তার দল বিএনপি ও জামায়াতকে সামপ্রতিক খুনাখুনির নেপথ্য শক্তি হিসেবে অভিহিত করেছে।
কিন্তু দৃশ্যত আওয়ামী লীগও কিছু ইসলামী মৌলবাদীদের শক্তিশালী করছে। সমালোচকরা বলছেন, বিরোধী রাজনীতিক ও অন্য বিরোধীদের ওপর সরকারের ধরপাকড় অনেককে আরও বেশি চরমপন্থি গোষ্ঠীর দিকে ঠেলছে। এ ছাড়া নিজেদের ধর্মবিরোধী অক্ষ হিসেবে না দেখাতে, যার ফলে সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর আন্দোলন সৃষ্টি হতে পারে, আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ আইন পাস না করার দাবির প্রতি নতি স্বীকার করে ইসলামী রক্ষণশীলদের তুষ্ট করছে। এ ছাড়া যারা ইসলামের ও আওয়ামী লীগের সমালোচনা করছে, বেছে বেছে তাদেরই টার্গেট করতে মানহানি সংক্রান্ত আইন ব্যবহার করা হচ্ছে।
এক ইতালিয়ান সাহায্য কর্মী ও এক জাপানি খামারি সহ দুই বিদেশীকে গুলি করে হত্যার দায় আইএস স্বীকার করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সর্বশেষ চাপাতি হামলার ঘটনা ঘটল। ঢাকার কূটনীতিক এলাকাকে হাই-সিকিউরিটি জোনে পরিণত করা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ প্রকাশকদের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিদেশী হত্যার বিষয়টি হয়তো সমপর্কহীন। কিন্তু নিম্নমানের ও রাজনীতি-আচ্ছন্ন পুলিশি পদক্ষেপের মানে হলো, বিদেশী কিংবা স্থানীয়- কেউই কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাস করে না। নিজেদের ক্রিকেট  দলকে ঢাকায় ক্রিকেট সফরে পাঠানো নিরাপদ হবে কিনা এ নিয়ে অস্ট্রেলিয়া যখন সংশয়ে ছিল, তখনই ইতালিয়ান লোকটিকে হত্যা করা হলো। এ হত্যাকাণ্ড সফরটি বাতিলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
অন্য হত্যাকাণ্ডগুলো এক ধরনের ত্রাসের পরিবেশ নতুন ব্যাপ্তি যোগ করেছে। ২৪ই অক্টোবর, পুরান ঢাকায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র শিয়া সমপ্রদায়ের ওপর বোমা হামলায় দুই জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। এ হামলাটি ছিল শিয়া সমপ্রদায়ের ওপর স্মরণকালের একমাত্র হামলা। উদারপন্থি অংশ সুফি ইসলামের অনুসারীরাও হামলার মুখে পড়েছে। লেখক, ব্লগার ও নারী সাংবাদিক, যাদের কেউ কেউ টেলিভিশনে পর্দা ছাড়া হাজির হয়েছেন, তাদেরকেও হুমকি দেয়া হয়েছে।
এ পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে মোড় নিতে পারে। শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধের বিচার অব্যাহত রেখেছেন, যার উদ্দেশ্য স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে ফায়দা অর্জন। নিজস্ব-ঘরানার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিটি) দণ্ডিত হয়েছেন জামায়াতের শীর্ষ নেতারা। আরও দুই জ্যেষ্ঠ ইসলামী নেতা ফাঁসির জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। আলি আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, যিনি জামায়াতে ইসলামির সাধারণ সমপাদক, খুন সহ পাকিস্তানপন্থি আধা-সামরিক গোষ্ঠীর দ্বারা সংঘটিত অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। সরকারি কৌঁসুলিরা বলছেন, এসবের জন্য মুজাহিদ দায়ী। আরেকজন হলেন ধনাঢ্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, যিনি বেগম জিয়ার সাবেক উপদেষ্টা ও পাকিস্তানের সঙ্গে যার ঘনিষ্ঠ সমপর্ক রয়েছে। বিচার চলাকালে তিনি তাকে দণ্ড প্রদানকারী বিচারকদের বিদ্রূপ করেছেন, বক্তব্যে ব্যাঘাত ঘটিয়েছেন। ১৭ই নভেম্বর এ দু’জনের একটি রিভিউ আবেদন শুনানির কথা রয়েছে। যদি আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে, তবে এ বছরের শেষের দিকে হয়তো তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হতে পারে। এর ফলে সারা দেশে শহরগুলোতে অস্থিরতা ছড়াতে পারে।
সব শঙ্কার মধ্যেও যুদ্ধং  দেহী দুই বেগম (ব্যাটলিং বেগমস) একে অপরকে আক্রমণ দাগিয়েই যাচ্ছেন। লন্ডনে দীর্ঘ সফরে বেগম জিয়া সমপ্রতি শেখ হাসিনাকে ‘লেডি হিটলার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূল স্তম্ভ- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এর মধ্যে সর্বশেষ তিনটিই দৃশ্যত ধসে পড়ছে কিংবা হুমকির মুখে। স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশকে নিয়ে যে চিন্তা করা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের অধীনে দেশটি সে লক্ষ্য থেকে ক্রমেই দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
[বৃটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ইকোনমিস্টে প্রকাশিত ‘ফিয়ার ইন দ্য শ্যাডোজ’ শীর্ষক লেখার অনুবাদ]

রাজনীতিতে ব্যবসায়ী, দায় মুক্তবাজার অর্থনীতির by মইনুল ইসলাম

সম্প্রতি মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, এ দেশের রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে গেছে। এই সময়োপযোগী সত্য ভাষণের জন্য তাঁকে অভিনন্দন। পরিস্থিতি জানান দিচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য আরও বহুদিন বহাল থাকবে। টাকার জোর না থাকলে এ দেশে নির্বাচনে জেতা অসম্ভব হয়ে গেছে, এমনকি এখন প্রধান দলগুলোর মনোনয়নও পাওয়া যায় না। প্রান্তীয় পুঁজিবাদের যে স্তর এখন বাংলাদেশ অতিক্রম করছে, তাতে এটা হতেই পারে। বিশেষত, সামরিক শাসন বারবার পাকিস্তান ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করার কারণেই এ সমস্যার উদ্ভব হয়েছে, ভারতে এ সমস্যা নেই। তবে এটা বেশি দিন স্থায়ী হবে না, মানুষের রাজনৈতিক চেতনা বিকশিত হলে এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতি জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক ও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার কায়েমের ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকতা দিতে পারলে রাজনীতির এই শনির দশা কেটে যাবে।
প্রকৃতপক্ষে এ সমস্যাটার মূল রয়ে গেছে অর্থনীতির দুর্বৃত্তায়নের মধ্যে, যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলো রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন ও বৈশ্যকরণ। বিশেষত, এ দেশের ব্যবসায়ীরা যেহেতু প্রধানত বাণিজ্যনির্ভর ‘মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি’ হিসেবে বিকশিত হয়ে থাকেন, তাই রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন মহল ও আমলাদের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া তাঁদের বিকাশ দুরূহ। রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণও তাঁদের ব্যবসায়িক সাফল্য ত্বরান্বিত করার প্রয়োজনেই। ১৯৯১ সালে ভোটের রাজনীতি চালু হওয়ার পর এ প্রবণতায় আরও গতি সঞ্চার হয়েছে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে কারা নির্বাচিত হয়েছিলেন, আর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ এবং ২০১৪-এর নির্বাচনে ব্যবসায়ীরা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কত শতাংশ সংসদ সদস্যের প্রার্থিতার মনোনয়ন বাগিয়েছেন, তা বিবেচনা করলেই রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের ক্রমবর্ধমান দাপট কোথায় পৌঁছে গেছে, তা বুঝতে অসুবিধা হবে না। এ সম্পর্কে সুসংবদ্ধ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে অনুন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতির তত্ত্বগুলোতে। আমাদের দেশের পুঁজিপতিদের রাষ্ট্রের ওপর ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ সঠিকভাবে বোঝার জন্যই এই তত্ত্বগুলোর আলোকে উপস্থাপন করছি আজকের কলামের আলোচনা।
অনুন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতি স্কুলের পথিকৃৎ পল বারান মুৎসুদ্দি পুঁজি ও মুৎসুদ্দি সরকার কনসেপ্ট দুটিকে অর্থনীতিশাস্ত্রে প্রবর্তন করেছেন। তিনি মুৎসুদ্দি পুঁজি বা প্রচলিত অর্থে দালাল পুঁজি কনসেপ্টটির সংজ্ঞা দিয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর নব্য ঔপনিবেশিক বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিল্পায়িত দেশগুলোর বহুজাতিক করপোরেশনের পণ্যের বাজারজাতকরণ নেটওয়ার্কে তৃতীয় বিশ্বের পুঁজিপতিদের ছোট তরফ বা এজেন্টের ভূমিকা পালনের বিষয়টিকে ফোকাস করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইন্ডেন্টর, আমদানিকারক, সোল এজেন্ট, পরিবেশক, অ্যাসেমব্লি প্ল্যান্ট স্থাপনকারী শিল্পপতি, ফ্র্যাঞ্চাইজি কিংবা সেলস এজেন্টের ভূমিকা পালনের মাধ্যমে যেসব বাণিজ্যনির্ভর পুঁজিপতি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় মুনাফা আহরণে ব্যাপৃত থাকে, তাদেরই পল বারান মুৎসুদ্দি পুঁজির এই সংজ্ঞার মাধ্যমে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন, যেটা একটা প্রিন্সিপাল এজেন্ট সম্পর্ক নির্দেশ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যে নব্য সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, তাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বহুজাতিক করপোরেশন, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা সংস্থা, এনজিও, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়ন—এগুলো সবই সুনির্দিষ্ট ডাইমেনশন হিসেবে ভূমিকা পালন করে চলেছে। দু-দুবার স্বাধীনতা অর্জন সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজও এই বিশ্বব্যবস্থার প্রান্তীয় পুঁজিবাদী একটি রাষ্ট্র।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পেলেও বাংলাদেশকে ২৪ বছর ধরে পাকিস্তানের নব্য ঔপনিবেশিক শোষণ-লুণ্ঠনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে স্বাধীনতার পথ বেছে নিতে হয়েছিল। আর তাই রাষ্ট্রের চার মূলনীতিতে গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। কিন্তু পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাকিস্তানের স্টাইলে পুঁজিবাদী বিশ্ব প্রভুদের মক্কেলরা এই রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পুঁজিবাদের যে মডেলটা আবারও চালু করে দিয়েছিল, তাতে যে ধরনের পুঁজির বিকাশ এ দেশে ঘটেছে, তার চরিত্র প্রধানত মুৎসুদ্দি পুঁজির। এই পুঁজি চরিত্রগতভাবেই বাণিজ্যমুখী হবে অধিক মুনাফার লোভে। এই পুঁজিকে শিল্প খাতের বিকাশে নিয়োজনের যত প্রয়াসই চালানো হোক না কেন, তাকে শিল্প খাতে ধরে রাখা কঠিন হবে। তাই শিল্প স্থাপনের জন্য উদার ব্যাংকঋণ প্রদান করা হলেও পাচার হয়ে গেছে বাণিজ্যে এবং অনেকে ক্ষেত্রে চোরাচালানে। ব্যাংকঋণের সহায়তায় আমদানি করা শিল্প প্ল্যান্ট-যন্ত্রপাতির খরচ ওভার ইনভয়েসিং করে বিদেশে পুঁজি পাচার করে দেওয়া হয়েছে। জিয়াউর রহমানের আমলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই উদার পৃষ্ঠপোষকতার জোয়ারে শামিল হতে বাধ্য করা হয়েছিল।
আবার আশির দশকে স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে আমদানি উদারীকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে; রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানাকে বেসরকারি মালিকানায় অর্পণের প্রক্রিয়াকে জোরদার করা হয়েছে; বেসরকারি মালিকানার ব্যাংক ও বিমা কোম্পানি গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু এতত্সত্ত্বেও উদার সহায়তাপুষ্ট শিল্পায়নের প্রয়াস কয়েকটা ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে তেমন সফলতা পায়নি। বরং দ্রুত আমদানি উদারীকরণ করতে গিয়ে চোরাচালানকে উসকে দেওয়া হয়েছে, কারণ আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের তুলনায় এ দেশের উদারীকরণের গতি মাত্রাতিরিক্ত থাকায় নতুন নতুন পণ্য চোরাচালানিদের কাছে আদান-প্রদানের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ আমদানি-বিকল্প দ্রব্য উৎপাদনকারী শিল্পগুলো রুগ্ণতার নিশান তুলে দিয়ে ঋণখেলাপি পুঁজিপতিদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। এখানেই মুৎসুদ্দি পুঁজির কনসেপ্টটা আমাদের বিষয়টি ব্যাখ্যায় সাহায্য করবে। বিশ্ব পুঁজিবাদ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে জাতীয় বুর্জোয়ার বিকাশের চেয়ে মুৎসুদ্দি পুঁজির বিকাশেই আগ্রহী। এ জন্যই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে অবাধ করার তাগিদে গ্যাট-এর আট রাউন্ড পার হয়ে এসে ১৯৯৫ সাল থেকে ডব্লিউটিওর সাম্রাজ্যে প্রবেশ করেছে বিশ্ববাসী। বাজার দখলের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে উন্নত দেশগুলো তৃতীয় বিশ্বকে আধিপত্য-পরনির্ভরতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখতে চাইছে।
আমাদের বুঝতে হবে, মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করার নামে দেশের বিনিয়োগযোগ্য পুঁজিকে মুৎসুদ্দি পুঁজিপতির সিন্দুকে পাচার করার ব্যবস্থা জোরদার করলেই শিল্পায়ন হয়ে যাবে, এটা অতি সরলীকরণ। ওই পুঁজির একাংশ হয়তো অ্যাসেমব্লি প্ল্যান্ট টাইপের ‘পার্ভার্স’ শিল্প স্থাপনে অপচয় হবে, বাকিটা দুর্নীতির অর্থনীতির নিয়ম অনুসারে লুণ্ঠিত হয়ে যাবে। আমি আবারও বলছি, বাংলাদেশে বর্তমানে বাজার অর্থনীতি নিয়ে যে ধরনের মাতামাতি চলেছে, তাতে পুঁজি সর্বোচ্চ মুনাফা পাচ্ছে বাণিজ্য এবং চোরাচালান থেকে। এ বাজারে দেশীয় পণ্য মার খাচ্ছে, অথচ বাজারের ক্রমবর্ধমান অংশ চলে যাচ্ছে বিদেশি পণ্যের দখলে। পুঁজি পাচার হয়ে যাচ্ছে চোরাচালানে, নয়তো পালিয়ে যাচ্ছে বিদেশে। এ দেশের পুঁজি গিয়ে জমা হচ্ছে রাজনীতিবিদ, সামরিক অফিসার এবং সিভিল আমলার গোপন সিন্দুকে, নয়তো তাঁদের এবং ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পলাতক পুঁজির অবয়বে বিশ্বের নানা দেশে, টরন্টোর ‘বেগমপাড়া’ কিংবা মালয়েশিয়ার ‘সেকেন্ড হোম’ যার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে যে প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের চলতি হিসাব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্টে উদ্বৃত্ত থাকার প্রবণতা পরিবর্তিত হয়ে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, যার পেছনে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির শ্লথগতির পাশাপাশি আমদানি প্রবৃদ্ধির হারের বিশাল উল্লম্ফন প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। খাতওয়ারি আমদানির প্রবৃদ্ধি বিবেচনা করে দেখা যাচ্ছে, শূন্য শুল্কহার সুবিধাভোগকারী মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পরিষ্কারভাবে জানান দিচ্ছে যে ওভার ইনভয়েসিং পদ্ধতিতে দেশ থেকে পুঁজি পাচার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি কানাডাপ্রবাসী এক আত্মীয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল টরন্টোর বেগমপাড়া সম্পর্কে। তিনি টরন্টোয় থাকেন, তাই বেগমপাড়া সম্পর্কে ভালোই খোঁজখবর রাখেন। তিনি জানালেন, ওখানকার প্রায় ৮০ শতাংশই পোশাকমালিকদের পরিবার, বাকি ২০ শতাংশের মধ্যে প্রকৌশলী, আমলা এবং রাজনীতিবিদদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনই সংখ্যাগুরু।
তবু বলব, বাংলাদেশ গত সাড়ে তিন দশকে তৈরি পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প, কৃষিজাত দ্রব্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সিরামিকস, জাহাজ নির্মাণ, চামড়াজাত দ্রব্য ও পাদুকাশিল্পের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর বিকাশে প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু অনেক জ্ঞানপাপী স্বীকারই করতে চায় না যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের চমকপ্রদ বিকাশ মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে হয়নি, মাল্টি ফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্টের (এমএফএ) কোটাব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই এর দ্রুত বিকাশ সম্ভব হয়েছে। এমএফএ বিলুপ্ত হওয়ার পর এখন বাংলাদেশের ওভেন গার্মেন্টস ও নিটওয়্যার শিল্প তুলনামূলক সুবিধা এবং ‘প্রতিযোগিতা সক্ষমতার’ জোরেই এগিয়ে যাচ্ছে; যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দয়ায় বা করুণায় নয়।
শিল্পায়নের এই সাফল্যকে আমরা খাটো করছি না, কিন্তু তারপরও মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলব, রাজনীতিকে ব্যবসায়ীদের মুনাফা অর্জনের লোভনীয় ক্ষেত্রে পরিণত করার যে প্রবণতা জোরদার হয়ে চলেছে, তা দেশের জন্য কল্যাণকর হবে না। তৈরি পোশাকশিল্পের সাফল্যের আসল দাবিদার এ দেশের নারী শ্রমিকেরা হলেও এই সাফল্যের জোয়ারে অবগাহন করে এ দেশে কয়েক হাজার ব্যবসায়ী অতি দ্রুত কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন। একই সঙ্গে ওনারা এবং অন্যান্য বাণিজ্যনির্ভর মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি গোষ্ঠী প্রধানত ব্যাংকঋণের ফায়দাভোগী হয়ে এ দেশে গত চার দশকে পুঁজি লুণ্ঠনে কামেলিয়ত হাসিল করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মোতাবেক দেশে এখন ৫৪ হাজারের বেশি কোটিপতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ত্যাগী ও জনদরদি রাজনীতিবিদদের হটিয়ে দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক আমলা ও সিভিল আমলা এবং মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ক্রমেই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রবল প্রতাপান্বিত ভাগীদারে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিতে এখন দখলদারি প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা চলছে প্রধানত এঁদের মধ্যেই।
ব্যবসায়ীদের রাষ্ট্রক্ষমতার ভাগীদার হওয়ার এই প্রতিযোগিতা রাজনীতির মাধ্যমে জনকল্যাণে ব্রতী হওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবসার কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্যই এই রাজনীতি। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ক্ষোভ এই অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে। তাঁকে এ জন্য সাধুবাদ জানাতেই হবে। তবে আজন্ম একটি রাজনৈতিক পরিবারের ত্যাগ-তিতিক্ষার পরিবেশে জীবন কাটানো প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিকে এভাবে ব্যবসার হাতিয়ারে পরিণত করা যে জাতির জন্য অমঙ্গলজনক, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন, আশা করি।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

‘আক্রান্ত হলেই গুলি’, নিরস্ত্র মানুষ কী করবে? by সোহরাব হাসান

গতকাল শুক্রবারের প্রথম আলো ও ইত্তেফাক-এর দুটি খবর পাশাপাশি রেখে পড়লে কেউ হাসি ধরে রাখতে পারবেন না।
ইত্তেফাক-এর প্রধান শিরোনাম: ‘আক্রান্ত হলেই পাল্টা গুলি’। ভেতরের সারমর্ম হলো, গত বৃহস্পতিবার পুলিশের সব শাখার শীর্ষ কর্মকর্তারা একবাক্যে ঘোষণা দিয়েছেন, নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ গুলি করবে। আক্রান্ত হলেই পাল্টা গুলি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, টহল বা চেকপোস্টে পুলিশ গুলিবিদ্ধ হবে, সন্ত্রাসীরা গুলি করে চলে যাবে, পুলিশ গুলি করবে না—এটা হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার্থে তাৎক্ষণিকভাবে গুলি চালাতে হবে। র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাবপ্রধান বেনজীর আহমেদও একই কথা বলেছেন। পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও সারা দেশে কর্মকর্তাদের কাছে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার বার্তা পাঠানো হয়েছে।
আর প্রথম আলোর খবরটির শিরোনাম ছিল, ‘পুলিশের রাইফেলে গুলি ছিল না’। ভেতরে আছে, ‘আশুলিয়ার বাড়ইপাড়ায় কর্তব্যরত পুলিশের পাঁচ সদস্যের কারও রাইফেলেই গুলি ছিল না। তাই হামলার শিকার হওয়ার পর তাঁরা কোনো পাল্টা প্রতিরোধ গড়তে পারেননি। পুলিশের তিনজন সদস্য তো শালবনের দিকে দৌড়ে পালিয়েই গেছেন।’ গত বুধবার সকালে রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ার বাড়ইপাড়ায় পুলিশের একটি তল্লাশিচৌকিতে হামলা চালায় দুই ব্যক্তি। তাদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কনস্টেবল মুকুল হোসেন নিহত ও কনস্টেবল নূরে আলম সিদ্দিকী গুরুতর আহত হন।
প্রশ্ন হলো, গুলি যদি রাইফেলে ভরাই না থাকে, তাহলে পুলিশের সদস্যরা আক্রান্ত হওয়ার পর পাল্টা গুলি করবেন কীভাবে? রাইফেলে গুলি ভরতে ভরতে সন্ত্রাসীরা বীরদর্পে জায়গা ত্যাগ করবে। মিরপুর, আশুলিয়া, শাহবাগ কিংবা লালমাটিয়ার ঘটনায় দেখা গেল, সন্ত্রাসীরা তাদের উদ্দেশ্য পুরোপুরি কিংবা আংশিক পূর্ণ করে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে গেছে। কোথাও বাধার মুখোমুখি হয়নি। মিরপুরে সহযোগী পুলিশ সদস্য নির্বিকার দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর আশুলিয়ায় তিন সদস্য পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছেন। নির্ভীক পুলিশই বটে!
পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা কিংবা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তৃতা-বিবৃতি দেখে মনে হতে পারে যে, আক্রান্ত হলে আগে পুলিশ গুলি করত না বা এ ক্ষেত্রে আইনি বাধা আছে। পুলিশ প্রবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, কেউ আক্রান্ত হলে পাল্টা আক্রমণ চালাতে পারবেন। বাংলাদেশের পুলিশ আইনে কোনো সংস্কার হয়নি। সেই ঔপনিবেশিক আইন দিয়েই চলছে।
এ ছাড়া আমরা তো প্রায়ই পত্রিকায় বন্দুকযুদ্ধ বা এনকাউন্টারের গল্প পড়ি। এতে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো চিহ্নিত সন্ত্রাসী বা সন্দেহভাজনকে ধরল এবং সেই সন্ত্রাসী বা সন্দেহভাজনের জবানবন্দি অনুযায়ী তার সহযোগীদের ধরতে বা আস্তানায় হানা দিতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হলে তারাও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এরপর অনিবার্যভাবে যে ঘটনাটি ঘটে তা হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আগে থেকে আটক সন্ত্রাসী বা সন্দেহভাজন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায়।
আমরা এও জানি যে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নয়, একজন সাধারণ নাগরিকও আক্রান্ত হলে নিজেকে রক্ষার জন্য পাল্টা আঘাত করতে পারে। এবং ওই ব্যক্তি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে আক্রান্ত হওয়ার পরই পাল্টা আঘাত হেনেছেন, তাহলে তাঁর এই আঘাত ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হবে না।
আশুলিয়ার ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের বক্তৃতা-বিবৃতি ও তৎপরতা দেখে মনে হবে, ‘গুলি ছোড়া না-ছোড়ার’ ওপরই সর্বাংশে তাঁদের ও দেশের মানুষের নিরাপত্তা নির্ভর করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপযুক্ত শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা, সততা সর্বোপরি যোগ্য লোককে যোগ্য স্থানে বসানোর কোনো প্রয়োজনই নেই। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা পুলিশ বাহিনীতে সংস্কারের কথা শুনে আসছিলাম। এর জন্য ইউএনডিপির তত্ত্বাবধানে একটি সুপারিশও করা হয়েছিল। ওই পর্যন্ত। কোনো কাজ হয়নি।
দ্বিতীয়ত, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো চলছে ঔপনিবেশিক আমলের আইনে কিন্তু সন্ত্রাসীরা ইতিমধ্যে ব্যবহার করছে অপেক্ষাকৃত উন্নত অস্ত্র ও প্রযুক্তি। ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলে অপরাধীরা প্রধানত দেশীয় অস্ত্র তথা রামদা, ভোজালি, ছোরা, চাকু, চাপাতি বড়জোর পিস্তল ব্যবহার করত। এখন তাদের হাতে সব ধরনের আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি এসেছে। এসব অস্ত্রধারীকে মোকাবিলা করতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হতে হবে।
স্বীকার করতে হবে সম্প্রতি মিরপুর ও আশুলিয়ায় সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় যে দুজন পুলিশ সদস্য মারা গেলেন, তার পেছনে যেমন সতর্কতার অভাব ছিল, তেমনি ছিল পেশাদারির ঘাটতিও। কোথায় কোন তল্লাশিচৌকিতে কতজন সদস্য রাখা হবে, কে নেতৃত্ব দেবেন—সেসব বিষয়ে কি সুবিন্যস্ত পরিকল্পনা ছিল? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্তরা ছিলেন বয়সে নবীন। কিন্তু সেই নবীনদের কি যথেষ্ট প্রশিক্ষণ দিয়ে সেখানে পাঠানো হয়েছিল। হলে এমনটি হওয়ার কথা নয়।
প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নূরুল হুদা বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে নিরাপত্তাচৌকিতে পুলিশের যতটুকু সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন ছিল, ততটুকু নেওয়া হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী একজন যখন তল্লাশি করবেন, অন্যজন তখন পাহারা দেবেন।’
এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নিতে হয়, সেই প্রশিক্ষণ কি তাদের দেওয়া হয়েছিল। সম্ভবত হয়নি।
আর পুলিশ বিভাগের আরেকজন সাবেক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আলাপে বলেছেন, পুলিশ বিভাগের নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতি এখন আর এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নেই। এটি পুরোপুরি চলে গেছে রাজনৈতিক নেতা তথা সাংসদদের হাতে। তাঁরাই ঠিক করে দেন কোন পদে কাকে নিয়োগ করা হবে, কাকে কোথায় পদায়ন করা হবে। এখানে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়নের সুযোগ খুব কম। তিনি আরও বলেছেন, পাঁচ-দশ লাখ টাকা দিয়ে কেউ পুলিশ বিভাগে ঢুকলে তাঁর প্রধান দায়িত্ব হয়ে পড়ে সেই টাকাটি দ্রুত তুলে নেওয়া। সে ক্ষেত্রে ন্যায় ও সততার পাশাপাশি পেশাগত দক্ষতাও নিহত হয়। তদুপরি কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ তো আছেই।
আজকের লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা নয়। তাঁদের নিরাপত্তার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। আশুলিয়ার ঘটনার পর তল্লাশিচৌকিগুলোতে জনবল বাড়ানো হয়েছে। হয়তো এর কিছুটা ফলও পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাবে। তাদের হাতে অস্ত্র আছে। কিন্তু যারা নিরস্ত্র, নিরীহ সাধারণ মানুষ, তাদের নিরাপত্তা কে দেবে? তারাও নিশ্চয়ই চাইবে না প্রকাশনা সংস্থার অফিস খুলে ফয়সলের মতো বেঘোরে সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ দিতে কিংবা টুটুলের মতো গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের বেডে কাতরাতে? তারা নিশ্চয়ই চাইবে না ঘরে বা বাইরে দুর্বৃত্তদের হানায় বাবা সন্তানকে কিংবা স্ত্রী স্বামীকে হারান।
আমাদের সমাজে কিছু ভাগ্যবান মানুষ আছেন, যারা সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র রাখতে পারেন। শুনেছি আরও বেশি ভাগ্যবান যারা তারা প্রাইভেট বাহিনীও গড়ে তোলেন। আবার এসব অনুমোদিত অস্ত্রের বেআইনি ব্যবহারও আমরা দেখেছি। কিন্তু আমাদের উদ্বেগ হলো একেবারেই সাধারণ মানুষকে নিয়ে, যাদের দল নেই, সংঘ কিংবা সংঘবদ্ধ বাহিনী নেই, তাদের কী হবে? সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত প্রকাশক ফয়সলের শোকাহত পিতা বলেছেন, ‘আমি আমার নিরাপত্তায় পুলিশ চাই না। আমি চাইলে হয়তো সরকার পাঁচজন পুলিশ পাঠাবে। কিংবা তার চেয়েও বেশি পাঠাবে। কিন্তু দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের কী হবে? তারা কার কাছে নিরাপত্তা চাইবে?’
আসলে নিরাপত্তা তো চাওয়ার বিষয় নয়। যেকোনো রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া। নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যই তো আমরা পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা, বিজিবি, সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছি। সাধারণ মানুষের হাতে কোনো অস্ত্র নেই। তারা নিরস্ত্র। এই নিরস্ত্র মানুষ তখনই নিরাপদ বোধ করবে, যখন দেখবে রাষ্ট্র অপরাধীদের প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে। আইনের প্রয়োগে কোনো বৈষম্য বা ব্যত্যয় ঘটছে না। এ কারণেই যেকোনো ফৌজদারি অপরাধকে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে চালিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। প্রতিকারের উদ্যোগ নেয়। যে রাষ্ট্র যত কার্যকরভাবে সেই প্রতিকার করতে পারে, সেই রাষ্ট্রেই নাগরিকেরা তত নিরাপদ ভাবে। রাষ্ট্রের আরেকটি কর্তব্য হলো, জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানো। আধুনিক যুগে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র মৌলিক চাহিদা নয়। এর সঙ্গে তার নাগরিক অধিকার তথা পছন্দমতো প্রতিনিধি বাছাই এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাও তাকে দিতে হবে।
আমরা ধরে নিলাম, পুলিশ সদর দপ্তর যেসব নির্দেশনা দিয়েছে, সেটি পুরোপুরি প্রতিপালিত হলো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আরও সজাগ ও সতর্ক থাকলেন। তাঁদের প্রত্যেককে লাগসই প্রযুক্তি, সরঞ্জাম ও অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়া হলো। এসব বাহিনী এমনভাবে গড়ে তোলা হলো যে কেউ তার কোনো সদস্যের ওপর আক্রমণ করতে সাহস পাবে না। সেই সঙ্গে এই নিশ্চয়তাও রাষ্ট্রকে দিতে হবে যে তার আইনানুগ বাহিনীর কোনো সদস্য বেআইনি কিছু করবেন না। দল-মত-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে সমদৃষ্টিতে দেখবে। সেই রাষ্ট্র কেবল দুষ্টের দমনই করবে না, দুষ্ট যাতে তৈরি হতে না পারে, সেই ব্যবস্থাও তাকে নিতে হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে তখনই নিরাপত্তা বোধ জাগ্রত হবে, যখন রাষ্ট্র ন্যায়ানুগ আচরণ করবে। সমাজে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হবে। আর আক্রান্ত মানুষ পাবে ন্যায়বিচার।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল: দালালে জিম্মি টাকায় মুক্তি by আরিফুল হক

গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা। শ্বাসকষ্ট নিয়ে কুড়িগ্রাম থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এলেন আহমেদ আলী। চিকিৎসক পরামর্শ দিলেন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার। ভর্তির যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ। কিন্তু ওয়ার্ডে যেতে পারছেন না রোগী। দুই দালালের ২০০ টাকা দাবি। টাকা না দিলে ওয়ার্ডে নেওয়া যাবে না। এ নিয়ে দালালদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের চলল কথা-কাটাকাটি। শেষমেশ টাকা দিয়েই মিলল অনুমতি।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের রাজীবপুর গ্রাম থেকে আসা হায়দার আলীও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তাঁকে নিয়ে সকাল সাড়ে ১০টায় জরুরি বিভাগে এলেন তাঁর ভাই মনোয়ারুল ইসলাম। দালালদের ২০০ টাকা দিয়ে তবেই ভাইকে ওয়ার্ডে নেওয়ার অনুমতি পেলেন তিনি।
দালালদের খপ্পরে পড়ে রংপুরের বদরগঞ্জের মোমেনা বেগমের পরিবারের ২০০ টাকা খোয়া গেছে। এ ঘটনা বেলা সাড়ে ১১টার। পা ভেঙে যাওয়া মোমেনার মেয়ে দালালদের হাতে ২০০ টাকা তুলে দেন।
শুধু আহমেদ আলী, হায়দার আলী ও মোমেনা বেগম বা তাঁদের পরিবার নয়। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ রোগীই এমন ভোগান্তির শিকার। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে এমন ঘটনা প্রতিদিনের। গতকাল দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে এ তিনটি ঘটনাই এই প্রতিবেদকের সামনে ঘটেছে।
হাসপাতাল সূত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, শুধু জরুরি বিভাগে নয়, হাসপাতালটির সর্বত্র দালালদের দৌরাত্ম্য। তাদের কারণে ওয়ার্ডে ওষুধ, মুঠোফোন ও টাকা চুরির ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। গত অক্টোবর মাসেই বিভিন্ন ওয়ার্ডে ৫০টির বেশি চুরির ঘটনা ঘটেছে।
গত মঙ্গলবার ২ নম্বর মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে একজন রোগীর স্বজনের কাছ থেকে ২২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে কর্মচারী (এমএলএসএস) তাপসী রায়কে ওই ওয়ার্ড থেকে প্রত্যাহার করা হয়। আগের দিন চুরি হয় ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের একজন রোগীর মুঠোফোন। এসব ঘটনায় পরিচালকের কাছে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ করা হয়েছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে গত বছরের ১৫ অক্টোবর প্রথম আলোয় ‘১০০ দালালের দাপট’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। কিন্তু এখনো অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে বলে জানালেন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
হাসপাতালের পরিচালক আ স ম বরকতুল্লাহ বলেন, ‘দালালদের কাছে রোগী ও তাঁদের স্বজন, এমনকি আমরাও জিম্মি হয়ে পড়েছি। তাদের রুখতে প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।’
অভিযোগ পাওয়া গেছে, হাসপাতালের কতিপয় কর্মচারীর নেতৃত্বে বিভিন্ন ওয়ার্ডে এসব দালাল দিনরাত ঘোরাফেরা করে। তারা হাসপাতালের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। পরে বাইরে থেকে ওষুধ নিয়ে আসার কথা বলে টাকা হাতিয়ে নেয়। চুরি করে ওষুধ, টাকা ও মুঠোফোন।
দালালদের খপ্পরে পড়ে টাকা খোয়ানো এক রোগীর স্বজন আশরাফুল ইসলাম বলেন, কর্মচারী পরিচয় দিয়ে জরুরি ওষুধ কিনে এনে দেওয়ার কথা বলেও টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দালালেরা।
বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জরুরি বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫ জন রোগী দালালদের খপ্পরে পড়েন। মাত্র ৩০ টাকা দিয়ে রোগী ভর্তির পর ওয়ার্ডে নিতে লাগে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। দিনে ২০০ টাকা করে নিলেও রাতে টাকার অঙ্ক বেড়ে যায়।
দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে গত ৩১ অক্টোবর হাসপাতালের পরিচালকের কক্ষে এক সমন্বয় সভা হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে রোগীদের কাছ থেকে দালালদের টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পরে চিঠি দিয়ে বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনকে জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
গতকাল জরুরি বিভাগের সামনে কথা হয় সোহেল ও মিনহাজুল নামের দুই দালালের সঙ্গে। তাঁরা দাবি করেন, জরুরি বিভাগ থেকে ওয়ার্ডে নিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন বলেই তাঁরা রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেন। কর্মচারী ইউনিয়নের নেতা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও বিষয়টি জানে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোখলেছুর রহমান বলেন, দালালদের বিতাড়িত করতে শিগগিরই অভিযান শুরু করা হবে।
মোট ৪০ ওয়ার্ডের এক হাজার শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার রোগী রোগী ভর্তি থাকে। বিভাগের আট জেলার মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য এখানে আসে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা একজন রোগীকে জরুরি বিভাগ থেকে সার্জারি ওয়ার্ডে নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন দালাল রজব মিয়া (ট্রলির সামনে) ও রোকনুজ্জামান (ট্রলির পেছনে)। গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ছবিটি তুলেছেন মঈনুল ইসলাম

ময়মনসিংহে দুর্ঘটনায় নিহত ৭, আহত ১৫

ময়মনসিংহের ভালুকায় সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ১৫ জন। আজ শনিবার ভোর পৌনে ৬টায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভালুকা উপজেলার মেহেরাবাড়ি নামকস্থানে এ ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে তিনজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এরা হলেন ভালুকা পৌরসভার ভান্ডাব গ্রামের ফুরকান আলীর ছেলে ফজলুল হক (৪৫), ত্রিশালের আব্দুল মোতালেব (৪২) ও নিলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার নওশেদ (৩৫)।
ভালুকা থানার এসআই সাইদুর রহমান জানায়, নেত্রকোনা থেকে ঢাকাগামী শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা মেট্টো ব-১১-৩৬৬৬) ভালুকার মেহেরাবাড়ি পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বালু বোঝাই ট্রাকের সাথে ধাক্কা লাগে। পরে বাস ও ট্রাক রাস্তার পাশে উল্টে যায়। এতে ঘটনাস্থলে ভালুকা পৌরসভার ভান্ডাব গ্রামের ফুরকান আলীর ছেলে ফজলুল হক (৪৫) ও অজ্ঞাত মহিলা (৩০) বাসযাত্রী নিহত এবং আরো ১৫ জন আহত হন।
ভালুকা মডেল থানার ওসি মামুনুর রশিদ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধার করে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনার পথে ত্রিশালের আব্দুল মোতালেব (৪২) ও নিলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার নওশেদ (৩৫)সহ আরো চারজন মারা যান। অপর দু'জনকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল ৮টার দিকে আরো একজন মারা যান।

ক্যানসারের প্রকোপ বেশি, চিকিৎসা অপ্রতুল by শেখ সাবিহা আলম

বরুণ কৃষ্ণ অধিকারীর ফুসফুসে ক্যানসার। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থেকে রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এসেছেন বিকিরণ চিকিৎসা বা রেডিয়েশন থেরাপি নিতে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার রেডিয়েশন থেরাপির যন্ত্র দেড় মাস নষ্ট। এসেছেন কুড়িগ্রামের আবদুল আজিজ, ভোলার মহিবুল্লাহ, নওগাঁর রুমানা বেগম। কারণ একটাই, তাঁদের এলাকার সরকারি হাসপাতালের রেডিয়েশন থেরাপির যন্ত্র নষ্ট।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে উপচে পড়া রোগীর ভিড়। তবে এ প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও নাজুক—সবাইকে ঠিক সময়ে প্রয়োজনমতো রেডিয়েশন থেরাপি দিতে পারছে না। গত বুধবার ক্যানসারের চিকিৎসায় দেশের শীর্ষ এই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে জানা যায়, রেডিয়েশন থেরাপির ছয়টি যন্ত্রের তিনটিই নষ্ট। আশা নিয়ে অনেকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। অপেক্ষায় আছেন, কখন বিকিরণ দেওয়ার সুযোগ পান।
বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। এর সঙ্গে প্রতিবছর নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আড়াই লাখ রোগী। আর বছরে মারা যাচ্ছে দেড় লাখ মানুষ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও রোগের প্রকোপের বিবেচনায় দেশে কমপক্ষে ১৬০টি ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র বা হাসপাতাল থাকা দরকার।
তবে দেশে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ খুবই সীমিত। সরকারি পর্যায়ে ১৫টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ক্যানসার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি (ওষুধে চিকিৎসা) দেওয়া হয়। তবে জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপক বলেছেন, সঠিক কেমোথেরাপি দিতে পারেন মেডিকেল অনকোলজিস্ট। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানে মেডিকেল অনকোলজিস্ট নেই। অন্যরা এই চিকিৎসা দিচ্ছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও রোগের প্রকোপের বিবেচনায় দেশে কমপক্ষে ১৬০টি ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র বা হাসপাতাল থাকা দরকার। তবে দেশে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ খুবই সীমিত বিএসএমএমইউয়ের অনকোলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, সচেতনতার অভাবে রোগের একেবারে শেষ পর্যায়ে চিকিৎসকের কাছে আসে মানুষ। ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ রোগীর রেডিয়েশন থেরাপি দরকার।
তবে সরকারি পর্যায়ে জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই শুধু বিকিরণ চিকিৎসা চালু আছে। চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর মেডিকেল কলেজ, সিলেট এম এ জি ওসমানী ও বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিকিরণ চিকিৎসার যন্ত্র নষ্ট।
এর বাইরে ১০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও কেন্দ্রে ক্যানসার চিকিৎসা ও সেবা দেওয়া হয়। কিন্তু এসব হাসপাতালে ব্যয় বেশি। সরকারি হাসপাতালে স্তন ক্যানসারে ১৬টি রেডিয়েশন থেরাপি দিতে খরচ পড়ে ১৪ হাজার ২০০ টাকা, বেসরকারি হাসপাতালে খরচ পড়ে দেড় লাখ থেকে তিন লাখ টাকা। অন্যান্য ক্যানসারের চিকিৎসায়ও খরচের পার্থক্য ব্যাপক।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের অনকোলজি বিভাগের প্রধান গোলাম মহিউদ্দীন ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্যানসার রোগের যে ভালো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব, আমরা তার প্রমাণ দিতে পারছি না। আজ যে রোগীর চিকিৎসা প্রয়োজন, তাঁকে আমরা তারিখ দিচ্ছি ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে অথবা মার্চের শুরুতে।’
গত বুধবার জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা যায়, বিকিরণ চিকিৎসা দেওয়ার কক্ষের বাইরে কম্বল পেতে শুয়ে ছিলেন রুমানা বেগম। তাঁর মেরুদণ্ডে ক্যানসার। ঢাকায় এসেছেন বগুড়ার ওপর দিয়ে। বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে চিকিৎসক আছেন, কিন্তু বিকিরণ যন্ত্র অচল। ময়মনসিংহের বরুণ কৃষ্ণ অধিকারীকে নিতে হবে ৩৩টি থেরাপি।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক মো. মোয়াররফ হোসেন বলেন, রাতারাতি ১৬০টি কেন্দ্র তৈরি করা যাবে না। কমপক্ষে ২০টি কেন্দ্রেও যদি সেবা দেওয়া যেত, তাহলে রোগীদের কষ্ট কমত। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দীন মো. নুরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সেবা সম্প্রসারণের জন্য কী কী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্রুত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিকিরণ চিকিৎসায় কোন যন্ত্র ব্যবহৃত হবে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মধ্যে মতভেদ আছে। বিকিরণ চিকিৎসার অত্যাধুনিক যন্ত্র লিনিয়ার এক্সিলারেটর। এটা বাজারে আসার আগে ছিল কোবাল্ট-৬০ মেশিন। দুটি যন্ত্রের দামের ফারাক আছে। লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিনের দাম ২০ কোটি টাকার মতো। যন্ত্রটি ভালো, তবে বেশি ব্যবহারে দ্রুত অচল হয়ে যায়। অন্যদিকে কোবাল্ট-৬০ মেশিনের দাম ছয় থেকে নয় কোটি টাকা ও বাংলাদেশে ভালো কাজ করছে। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটে দিনে লিনিয়ার এক্সিলারেটর যন্ত্রে রেডিয়েশন থেরাপি দেওয়া যায় ৫০-৫৫ জনকে, কোবাল্ট মেশিনে দেওয়া হচ্ছে এক শ থেকে দেড় শ জনকে। এ ছাড়া লিনিয়ার এক্সিলারেটর যন্ত্র চালানোর জন্য চিকিৎসা পদার্থবিদ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জনবল নেই।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ক্যানসার এপিডেমিওলজি বিভাগের প্রধান হাবিবুল্লাহ তালুকদার বলেন, মানুষের মধ্যে ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। কিন্তু সেবাটা অপ্রতুল। প্রথমে কোবাল্ট মেশিন দিয়েই সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়ার একটা লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া যায়। ধীরে ধীরে লিনিয়ার এক্সিলারেটর যন্ত্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

পথে নামার এখনই সময় by হাসান ফেরদৌস

ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যার প্রতিবাদ
খুন-জখম বা রাহাজানি বাংলাদেশে হয়, হরহামেশাই হয়। গাড়িচাপা পড়ে মানুষ মরে, অভাবে-রোগশোকেও মানুষ মরে। সেসব মৃত্যু অধিকাংশের চোখে পরিসংখ্যান ছাড়া অন্য কিছু নয়। কিন্তু যখন সুপরিকল্পিতভাবে ভরদুপুরে বইয়ের দোকানে ঢুকে একদল লোক—লোকই তো, নাকি অন্য কিছু—চাপাতি দিয়ে, ছুরি দিয়ে কারও গলা কেটে, তাকে রক্তের সাগরে ভাসিয়ে সে ঘরে তালা ঝুলিয়ে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যায়, তখন আমাদের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে?
প্রথম ও প্রধান প্রতিক্রিয়াভয়। আমরা কেউ নিরাপদ নই, যে কেউ যেকোনো সময় হামলার শিকার হতে পারি এবং আশপাশে উর্দি পরা কেউ নেই যে আমাদের রক্ষা করবে। এই জাতীয় রাজনৈতিক খুন আগেও ঘটেছে, তার সুরাহা হয়নি। যারা এই সর্বশেষ খুনের জন্য দায়ী, তাদের কেউ ধরা পড়বে কি না, সে ব্যাপারে গভীর সংশয় থেকে যায়।
সবচেয়ে যা আমাদের বিস্মিত করেছে, যাঁরা ক্ষমতাধর, এই ঘটনায় তাঁদের প্রতিক্রিয়া। নিজের পুত্রকে ঘাতকের খঞ্জরে হারানোর পর এক পিতা ক্ষোভে, বেদনায় ও তীব্র ধিক্কারে বলেছেন, তিনি বিচার চান না। তাঁর সে কথা শুনে ক্ষমতাসীন দলের একজন নেতা বলেছেন, সম্ভবত সেই পিতাও ঘাতকদের মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল। ‘যারা তাঁর পুত্রকে হত্যা করেছে, তাঁর বাবা অধ্যাপক সাহেব হয়তো ওই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। ওনার দলের লোকজনদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান না বলেই উনি এ ধরনের কথা বলছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক।’ পরে অবশ্য তিনি এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু দুঃখ প্রকাশই কি যথেষ্ট?
পিতা নিহত পুত্রের বিচার কেন চাইছেন না, সরকারি দলের নেতা এ কথা বোঝেননি অথবা বুঝতে চাননি। কার কাছে তিনি বিচার চাইবেন? একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, সেসবের সমাধান তো দূরের কথা, বরং সেসব খুনের ঘটনাবলি নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশে্য ব্যবহারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সরকারি দলের কোনো কোনো কর্তাব্যক্তি এমন কথাও বলেছেন, আমেরিকার মতো দেশে হরহামেশাই খুনখারাবির ঘটনা ঘটছে। কই, সেসব নিয়ে তো কোনো মাতামাতি নেই! স্পষ্টতই এই সব কর্তাব্যক্তি জানেন না প্রতিটি খুনের ঘটনা নিয়ে সে দেশে ঠিক কী পরিমাণ মাতামাতি হয়। তার চেয়েও বড় কথা, এমন কোনো খুনের ঘটনা নেই, যা এখানে দিনের পর দিন অমীমাংসিত পড়ে থাকে। খুনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াবে, অথচ খুনের সুরাহা করার বদলে সে ঘটনা নিয়ে জল ঘোলা করা হবে, এমন ঘটনা আমেরিকায় কার্যত অসম্ভব। কিন্তু এসবই অবান্তর কথা। আমেরিকায় যদি সরকার তার নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তো সেটাই হবে আমাদের মডেল? সে ব্যর্থতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করব নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে?
বস্তুত, স্বাধীনতার পর থেকে আমরা এত লাশ গুনেছি, এত মৃত্যু দেখেছি যে এখন দু-দশটি লাশ পড়ার ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করে না। একদিকে সহিংসতার সামাজিকীকরণ ঘটেছে। অর্থাৎ সহিংসতাকে আমরা নিজেদের জীবনের আরেকটি দৈনন্দিন ঝুটঝামেলা হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছি। যানজট যেমন ঝুটঝামেলা, এ নিয়ে আমাদের অভিযোগের অন্ত নেই, কিন্তু ব্যাপারটাকে নিয়মিত একটি বাস্তবতা বলে মেনে নিয়েছি। আমাকে সরকারি দলের এক নেতা যানজট প্রসঙ্গেই বলেছিলেন, এ হচ্ছে নতুন জুতো পরার পর পায়ের বুড়ো আঙুলে টনটনে ব্যথার মতো। কিছুদিন পর ও ব্যথা গা-সওয়া হয়ে যায়। অনুমান করি, সহিংসতাও সে রকম একটা ব্যাপার। সে বিপদ যতক্ষণ না আমার-আপনার দোরগোড়ায় এসে আঘাত হানছে, তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই।
অন্যদিকে, আমরা সহিংসতার পাশাপাশি অসহিষ্ণুতাকে নাগরিক সংস্কৃতির অঙ্গীভূত করে নিয়েছি। ধর্ম থেকে রাজনীতি, নাগরিক জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা কোনো রকম ভিন্নমতকে মেনে নিতে অভ্যস্ত নই। ভিন্নমত ধারণ করে এমন কাউকে আমরা নির্দ্বিধায় শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলি। অসহিষ্ণুতার যে সংস্কৃতি রাজনীতিতে এত দিন নির্বিচারে ব্যবহৃত হয়েছে, অবাক কি নাগরিক জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও তার ছাপ থাকবে।
সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতা—যা বস্তুত পয়সার এপিঠ আর ওপিঠ—তার উভয়ের ক্ষেত্রেই সরাসরি অথবা অলক্ষ্য সমর্থন এসেছে দেশের সব প্রধান রাজনৈতিক দল থেকে। দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজেই অভিযোগ করেছেন, প্রধান বিরোধী দল বিদেশি হত্যার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তার পক্ষে তথ্য–প্রমাণ হাজির করতে দেখি না। তাঁর এই কথা অনেকেই বিশ্বাস করেন। সত্যিই তো, যারা জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি করে, তারা অধিক রাজনৈতিক ফায়দা মিলবে—সেই হিসাব থেকে বিদেশি বা ব্লগারদের খুনও করতে পারে।
একটি চূড়ান্ত দায়বদ্ধহীন পরিস্থিতি (বা স্টেট অব ইম্পিউনিটি) থেকেই ব্লগার হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে। শুধু একদল ধর্মান্ধ ও কূপমণ্ডূক ব্যক্তির ওপর সে ঘটনার সব দোষ চাপালে নিজেরা কম দোষী বোধ করতে পারি বটে, কিন্তু তাতে অবস্থা বদলাবে না। সংকটটা সমাজের, কেবল সে সমাজভুক্ত ব্যক্তিবিশেষ বা দলের নয়। এই পরিস্থিতির বদল যদি চাই তো সবার আগে স্বীকার করতে হবে, এই অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি নির্মাণে আমরা সবাই কমবেশি দায়ী। আর সে সংস্কৃতির যদি পরিবর্তন চাই, তাও সম্ভব শুধু আমাদের সবার সচেতন অংশগ্রহণে। আজকের সহিংস ও অসহিষ্ণু সংস্কৃতি একদিনে গড়ে ওঠেনি, তার পরিবর্তনও একদিনে সম্ভব নয়। সে পরিবর্তনের লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব বিপদ কেবল বাড়াবেই।
কিন্তু ঠিক কী ব্যবস্থা আমরা নিতে পারি?
এই মুহূর্তে সর্বাগ্রে যা প্রয়োজন তা হলো এসব খুনের ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, অবিলম্বে তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা। সে ব্যবস্থা করার দায়িত্ব সরকারের। শুধু প্রতিশ্রুতি দেওয়াই যথেষ্ট নয়। কাগজে-কলমে সে দায়িত্ব পালনের প্রমাণ রাখতে হবে। সরকারের হাতে নিরাপত্তা প্রহরার সব হাতিয়ার মজুত রয়েছে। অভিজিৎ রায় খুন হয়েছেন আট মাস আগে। এখনো সে হত্যার সুরাহা হয়নি। একের পর এক নির্বিকার এসব খুনের সুরাহায় অব্যাহত ব্যর্থতার অর্থ, যারা দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁরা হয় অযোগ্য অথবা দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহী। এই দুই অবস্থাই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্য জরুরি কাজ সহিংস ও অসহিষ্ণু সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় সংলাপ। এই কাজটি সম্পাদনে দেশের গণমাধ্যমের ভূমিকা ইতিবাচক ও সাহসী। ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের অনেক কর্তাব্যক্তি নাখোশ হবেন জেনেও তারা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারে নিরলস। সরকারের যে কর্তাব্যক্তিটি অধ্যাপক আবুল কাসেমকে ঘাতকদের দোসর বলে বিষোদ্গার করেছিলেন, পত্রিকার পাতায় সেই ভিডিওটি থেকেই এই কথার প্রমাণ মিলেছে। সেই একই সাহস আমাদের প্রধান বুদ্ধিজীবীরাও দেখাবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। ভারতের প্রথম সারির বুদ্ধিজীবীরা ঠিক সেই কাজটিই শুরু করেছেন। সরকার নাখোশ হবে জেনেও অসহিষ্ণুতাকে উসকে দেওয়ার প্রধান অভিযোগ তার বিরুদ্ধেই তুলেছেন।
আমাদের আশা, দেশের প্রধান বুদ্ধিজীবীরা, যাঁদের অনেকেই হয় সরকার নয়তো বিরোধী দলগুলো থেকে আমটা-কলাটা সময় সময় চেয়ে নিচ্ছেন, তাঁরা এই বিষয়টি পরিষ্কার করবেন যে মুক্তবুদ্ধির গলা টিপে যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষিত হবে না, তেমনি হবে না গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার।
আমাদের চোখের সামনে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পথে নামার এখনই সময়।
হাসান ফেরদৌস, নিউইয়র্ক: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

জামায়াত দুর্বল হলে আইএসও হবে -সাক্ষাৎ​কার: সিগফ্রিড উলফ by মিজানুর রহমান খান

সিগফ্রিড উলফ, জার্মান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ
দুই বিদেশি হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব নিয়ে চলছে বিতর্ক। এর মধ্যে হোসেনি দালানে গ্রেনেড হামলা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দুজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মুনিরুজ্জামান এবং ড. সিগফ্রিড ও. উলফ প্রথম আলোর মুখোমুখি হন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান
প্রথম আলো: আইএসের হুমকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর মূল্যায়ন করবেন?
ড. সিগফ্রিড উলফ: এ মুহূর্তে আইএসের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকির দৃশ্যপট, যা তারা ইতিমধ্যে তৈরি করেছে, তা মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের তরফে কোনো ব্যাপকতর কৌশল দেখি না। আইএস যে একটি ঝুঁকি, অন্তত প্রকাশ্যে সেটা তারা এখন বলছে না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এটা স্পষ্ট করে বলছে যে জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ভয়ানক হুমকি। সরকারের এই মূল্যায়ন একটি সঠিক পদক্ষেপ। কিন্তু তাতে বৃহত্তর ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে আইএস কী করেছে, তাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। অবশ্য, বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল জামায়াতে ইসলামী এবং তার সঙ্গে বিএনপির সুস্পষ্ট সম্পৃক্ততাকে চিহ্নিত করার মধ্যেই সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমকে সীমিত করে ফেলার মতো মনোভাব প্রদর্শন করা সংগত নয়। উপরন্তু আইএসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় জিহাদি গোষ্ঠীর সঙ্গে তার নতুন স্থানীয় সহযোগী জামায়াতের যোগসাজশকে অবশ্যই মনোযোগের কেন্দ্রে আনতে হবে। একই সঙ্গে এটাও বলব যে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার পরোক্ষভাবে আইএসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।|
প্রথম আলো: এখানে কি আপনার বক্তব্য স্ববিরোধী মনে হচ্ছে না?
সিগফ্রিড উলফ: আপাতদৃষ্টিতে এটা স্ববিরোধী মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে তা নয়। আইএস মতাদর্শগতভাবে জামায়াত বা মওদুদীবাদের অনুসারী। তাই জামায়াত পর্যুদস্ত থাকলে সেটা আইএসকেই দুর্বল করে রাখে। কিন্তু আমি বলব, এই ফলাফলটা আসে পরোক্ষভাবে। সরকার তো আইএসের উপস্থিতি প্রকাশ্যে স্বীকার না করার নীতি বা কৌশল অবলম্বন করে চলেছে। তাই আমি এই যুক্তি দেব যে, এমনটা যদিও ঘটছে বলে খালি চোখে দেখা যাচ্ছে, তবে তা ঘটছে সরকারের অজ্ঞাতসারে। আবার এটা এ ধারণারও জন্ম দিচ্ছে যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ওয়ার অন টেররের কোয়ালিশনের আওতাধীন সামরিক কার্যক্রমকে ফাঁকি দিয়ে সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে পারছে। আবার বাংলাদেশ নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকেও তাদেরকে কোনো বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে না। উপরন্তু তারা বাংলাদেশের সমাজে সহজে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারছে। এর ফলে এটা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সুপারিশ করা সমীচীন হবে যে ইতালীয় ত্রাণকর্মী সিজার তাবেলা ও জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি হত্যার ঘটনাকে আলাদাভাবে দেখা উচিত নয়। এবং এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকা-সংক্রান্ত আইএসের দাবি সরকারের তরফে সরাসরি নাকচ করা সমীচীন নয়।
প্রথম আলো: বাংলাদেশের সামনে এখন অগ্রাধিকার কী?
সিগফ্রিড উলফ: এ মুহূর্তের করণীয় খুবই পরিষ্কার। বাংলাদেশকে যত দূর সম্ভব অবশ্যই তার যত রকমের হুমকির ধারণা (থ্রেট পারসেপশনস) রয়েছে, সেসবের ব্যাপকভিত্তিক বিশ্লেষণ করতে হবে। বিশেষ করে আইএস যেভাবে সুবিধা পাচ্ছে এবং পাকিস্তানের মাটি থেকে যেভাবে সহায়ক তৎপরতা চালাতে সক্ষম হচ্ছে, হুঁশিয়ার হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট। এই পরিস্থিতিতে আইএসের উপস্থিতিকে অস্বীকার করার যেকোনো নীতি উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। আর সে জন্য বেশি খেসারত দিতে হতে পারে বাংলাদেশের জনগণকেই। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০১৪ সালের সন্ত্রাসবাদ-বিষয়ক কান্ট্রি প্রতিবেদনের এই পর্যবেক্ষণকে গুরুতর রূপে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাই। কারণ, তারা সেখানে বলেছে, সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ একটি কঠিন স্থান। আমি বলব, হোসেনি দালানের সন্ত্রাসী ঘটনাতে আবারও প্রমাণিত হলো যে সরকারি তরফে আইএসের অস্তিত্ব সরাসরি অস্বীকার করার মতো অবস্থান গ্রহণ করার নীতি কতটা নাজুক। বাংলাদেশে আইএস থাকা না-থাকার প্রশ্নটি যেকোনো বিচারে সরাসরি নাকচ করার পরিবর্তে বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত অনুষ্ঠানের ওপর ভরসা করাই যৌক্তিক।
প্রথম আলো: আপনি কি বিশ্বাস করেন যে বাংলাদেশ নাশকতায় আইএসের দায়িত্ব স্বীকারের নামে যেসব দাবি করা হচ্ছে, তা নির্ভরযোগ্য?
সিগফ্রিড উলফ: অবশ্যই, বিশ্লেষণ সেদিকেই ইঙ্গিত করে। এমন আশঙ্কাই প্রবল যে, সাম্প্রতিক নাশকতাগুলো আইএস নিজেরাই কিংবা তাদের স্থানীয় মিত্রদের দিয়ে করাচ্ছে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় আইএস যেসব সামরিক কলাকৌশল প্রয়োগ করছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের ঘটনাবলির মিল দেখতে পাচ্ছি।
প্রথম আলো: প্রযুক্তিগতভাবে আইএসের ডিজিটাল দাবির সত্যতা কি যাচাই করা সম্ভব?
সিগফ্রিড উলফ: যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই আইএসের দাবি যাচাই করার সংশ্লিষ্ট সেরা প্রযুক্তি রয়েছে। তারা এ-সংক্রান্ত কোনো আন্তর্জাতিক বা জাতীয় আইনকানুনকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় বলে প্রতীয়মান হয় না, বিশেষ করে সেটা যখন কারও ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য সংরক্ষণের মতো কোনো ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি সেটা যদি তার কয়েক দশকের পুরোনো মিত্র দেশও হয়ে থাকে, তাহলেও যুক্তরাষ্ট্র তাকে ছাড় দেয় না। আমি কল্পনা করতে পারি যে আইএস যে দাবি করছে, তার সত্যতা যাচাইয়ের বিকল্প প্রযুক্তির অস্তিত্ব আছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ সে ধরনের কারিগরি প্রযুক্তি সুবিধা থেকে বহুদূরে রয়েছে।
প্রথম আলো: সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পাশে আছে। তারা সহায়তা দিতে পারে না?
সিগফ্রিড উলফ: আমি নিশ্চিত নই যে বাংলাদেশে আইএস থাকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা ‘উল্লেখযোগ্য’ প্রমাণাদি এবং তথ্যভান্ডার ভাগাভাগি করার ব্যাপারে মার্কিনরা কতটা আগ্রহী। তবে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট সাম্প্রতিক সময়ে যেসব বিবৃতি দিয়েছেন, তাতে মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্র যতটা সম্ভব বাংলাদেশকে তার সন্ত্রাস দমন তৎপরতায় সহায়তা দিতে আগ্রহী।
প্রথম আলো: পশ্চিমা গণমাধ্যম কেন যাচাই ছাড়া আইএস দাবি করেছে মর্মে যেসব টুইটার কিংবা কোনো ওয়েবসাইটে ভেসে ওঠা খবর দ্রুততার সঙ্গে প্রকাশ করে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়ে থাকে?
সিগফ্রিড উলফ: সত্যি বলতে কি, আমি পেশাগত দায়িত্ব পালনের কিছু ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া কিংবা পশ্চিমা গণমাধ্যমের কর্মপ্রক্রিয়ার মধ্যে তেমন পার্থক্য দেখতে পাই না। আসলে বাংলাদেশে এখন সব থেকে জরুরি বিষয় হলো, ইসলামি মৌলবাদ নিয়ে লেখালেখি-সংক্রান্ত বাক্স্বাধীনতার বিষয়ে ক্রমবর্ধমান হুমকি এবং মিডিয়ার ভেতরের ও বাইরের ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারার লেখকদের পদ্ধতিগতভাবে নীরব করে দেওয়ার বিষয়গুলো। সুতরাং কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন যে বাংলাদেশ সরকার বাক্ ও মতামত প্রদানের স্বাধীনতাকে সুরক্ষা এবং একই সঙ্গে দেশের সাংবাদিক ও স্বাধীন বুদ্ধিজীবীদের নিরাপত্তা প্রদানে কী পদক্ষেপ নিতে চাইছে?
প্রথম আলো: বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশে আইএসের উত্থান ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সামর্থ্য রয়েছে।
সিগফ্রিড উলফ: এ ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত হতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি পরিকল্পনা করে থাকে, তাহলে আমি তাদের জন্য এই আশাবাদ ব্যক্ত করব যে তারা যেন আফগানিস্তান, ইরাক বা পাকিস্তানের এফএটিএ অঞ্চলের (ফেডারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইবাল এরিয়া) চেয়ে অধিকতর সাফল্য অর্জন করে।
প্রথম আলো: আমাদের একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ (মেজর জেনারেল অব. মুনিরুজ্জামান) বলেছেন, বাংলাদেশে আইএসের নিজস্ব ক্যাডার ‘শারীরিকভাবে উপস্থিত’ না-ও থাকতে পারে। অনেক সময় তারা অন্যের দ্বারা সাধিত নাশকতামূলক কাজের দায়িত্ব স্বীকার কিংবা তার প্রতি সমর্থন প্রদান করে থাকতে পারে। আপনি কীভাবে দেখছেন?
সিগফ্রিড উলফ: আমি কেবল আংশিকভাবে তাঁর সঙ্গে একমত হব। কারণ, ব্যক্তিগতভাবে আমার এই সন্দেহটাই প্রবল যে, আইএসের কর্মীরা বেশ কিছুটা সময় ধরে সক্রিয় থাকতে পারে। কিছুদিন আগ পর্যন্ত আইএস বাংলাদেশকে তাদের যোদ্ধা নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ স্থান হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে এবং তারা এত দিন সরাসরি সক্রিয় সন্ত্রাসী তৎপরতায় যুক্ত হয়নি। অবশ্য একে এভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত হবে না যে আইএস বাংলাদেশকে তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেনি। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোতে আইএস নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিতে যেসব কৌশল অবলম্বন করেছে, তা বিশ্লেষণ করে কেউ একজন ভাবতে পারেন যে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের মতো স্থানীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তারা ইতিমধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করেছে।
প্রথম আলো: রাজনৈতিক সংকট জঙ্গিবাদ বেড়ে ওঠার জন্য বেশ অনুকূল, সত্যি?
সিগফ্রিড উলফ: আমি একমত। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই মনে হচ্ছে যে দেশটির চরম ‘উত্তেজনাকর’ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেই সঙ্গে অনগ্রসর আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ইসলামি মৌলবাদ বিস্তারের জন্য অনুকূল। আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় অধিকাংশ জিহাদি সংগঠন এখন বাংলাদেশকে তাদের নতুন একটি অভয়ারণ্য হিসেবে দেখতে পারে।
সিগফ্রিড উলফ: আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক।

স্বামীর বর্বরতায় আলো নিভে গেল শিউলির by রোকনুজ্জামান পিয়াস

আমার কী দুই চোখই নেই? শিউলির এমন প্রশ্নে আঁতকে ওঠেন নার্স নাজমা সুলতানা। থমকে যান তিনি। তাহলে কী শিউলি এখনও জানেন না তার ওপর চালানো স্বামীর পৈশাচিকতার ভয়াবহতা? শিউলির ধারণা, তার চোখের ব্যান্ডেজ খুলে দিলেই হয়তো তিনি আবার আগের মতো দেখতে পাবেন। এই সময়টার চিকিৎসা ব্যয় নিয়েও চিন্তিত তিনি। আসলে শিউলি তার চোখের আলো ফিরে পাবেন না- এটা তিনি জানেন না। এ ব্যাপারে সন্দিহান চিকিৎসকরাও। চিকিৎসকদের ধারণা, আজ অপারেশনের পর কিছুটা নিশ্চিত হওয়া যাবে। এর মধ্যে যতটুকু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন তাতে ফলাফল হতাশাজনকই। স্বামী জুয়েল হাসান ধারালো চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তার দু-চোখ তুলে ফেলেছে। ভেতরে আর তেমন কিছুই নেই। চোখের পাতাও এবড়োথেবড়োভাবে ছিড়ে ফেলেছে। গতকাল রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের কমিউনিটি ইউনিটে ৬নং বেডে চিকিৎ?সাধীন শিউলি আক্তারের দুই চোখে ব্যান্ডেজ। পাশ দিয়ে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। এ অবস্থা দেখেই যে কেউ বলে দিতে পারবে কি ধরনের বর্বরতার শিকার হয়েছেন তিনি। ঘটনার পর এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শিউলিকে এ হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়। এর আগে ৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসা প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকেই এই হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
বৃহস্পতিবার বিকালে টঙ্গীর পাগাড় মধ্যপাড়া এলাকার ভাড়া বাসায় স্বামী জুয়েল স্ত্রী শিউলি আক্তারকে চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে চোখ তুলে ঘরের ভেতরে রেখেই বাসা তালাবদ্ধ করে চলে যান। চিৎকার শুনে পরে প্রতিবেশীরা পুলিশের সহায়তায় ঘরের তালা ভেঙে শিউলিকে উদ্ধার করেন। গৃহবধূ শিউলি বলেন, তার বাড়ি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার দলিরহাট গ্রামে। এটি তার দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম স্বামী আনোয়ার হোসেন মারা যাওয়ার পর তিনি পাঁচ বছর আগে দ্বিতীয়বার জুয়েলের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ বিয়ের পর থেকেই তিনি দেখছেন স্বামী জুয়েল নেশাগ্রস্ত। তিনি সব সময়ই নেশা করে বাড়ি ফেরেন। বাড়ি ফিরে প্রায়ই স্ত্রীকে মারধর করে। এছাড়া আগের স্বামীর কাছ থেকে যে সম্পত্তি পাবেন, তা এনে দেয়ার জন্যও তাকে মারধর করতো জুয়েল। আর নেশার পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে তার চরিত্র নিয়েও সন্দেহ করতো। তাছাড়া জুয়েল কোন কাজ করে না। তার বোনের জায়গা বিক্রি করা টাকা নিয়ে চলতো।
শিউলি বলেন, ‘অন্যান্য দিনের মতো বৃহস্পতিবার বিকালেও সে নেশা করে বাড়ি ফেরে। ইয়াবা না কি যেন খেয়ে আসে। ঘরে ঢুকেই আমাকে সন্দেহ করতে থাকে। বলে, ঘরে কে আসছিলো বল। কেউ আসেনি বললে সে বিশ্বাস না করে মারধর করতে থাকে। পরে বলে কবে জায়গা বিক্রি করবি? একপর্যায়ে আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ে। আমাকে বলে, যা যা বলবো সত্যি বলবি। কিন্তু সে আমার কোন কথায়ই কান দেয় না। মারধর করতে থাকে। একপর্যায়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুখে স্কচটেপ লাগাইয়া দেয়। আমার দুই হাত পিঠমোড়া দিয়ে বাইন্ধ্যা ফেলে। দুই পা বান্ধে। এক সময় চাকুর শব্দ পাই। চোখে কী করলো জানি না। জ্ঞান হারাইয়া ফেলি। কতক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে দেখি হাত খোলা। চারদিকে অন্ধকার। চোখে কিছু দেখতে পারি না। মুখ থেইক্যা স্কচটেপ টাইন্যা একটু খুইল্যা টুকাতে টুকাতে জানালার ধারে গিয়া চিৎকার দিই। পরে আর কিছু মনে নাই।’ প্রতিবেশীরা গিয়ে দেখেন বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে জুয়েল পালিয়ে গেছে। পরে তারা পুলিশের সহযোগিতায় শিউলিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসে।
গতকাল সন্ধ্যায় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের নার্স নাজমা সুলতানা জানান, তার দুই চোখের অবস্থা দেখে মনে হয়েছে মানুষ এত বর্বর হাতে পারে! তার সারা শরীর রক্তমাখা। ভেতরের কাপড়-চোপড়ও রক্তে ভিজে গেছে। পরে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে গোসল করানো হয়েছে। মানুষ এমনভাবে চোখে আঘাত করে এমন কথা বলতেই শিউলি বলেন, আমার কী দুটো চোখই নেই। তখন আমি আঁতকে উঠি। ভাবলাম তিনি হয়তো এখনও জানেন না। তাকে বলেছি, আমি তো আপনাকে ব্যান্ডেজ করা অবস্থায় পেয়েছি। ভেতরে কী হয়েছে আমি জানি না।  নাজমা বলেন, তিনি হয়তো মনে করছেন তার চোখ ভালো আছে। হাসপাতালের ইমারজেন্সি মেডিক্যাল অফিসার ডা. তৌহিদ আনোয়ার বলেন, রাত ১২টা ৫০ মিনিটে শিউলি আক্তার এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর আগে ঘটনার পর প্রথমে তাকে টঙ্গী ৫০ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়। তিনি বলেন, ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিউলির চোখ তুলে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। অনেকটা অংশ তুলে ফেলা হয়েছে। দুই চোখের ভেতরে আর কিছু নেই। এখন শুধু চোখের অবয়ব আছে। অবস্থা খুব ভয়াবহ। চোখের পাতাও এবড়োথেবড়োভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। ডা. আনোয়ার বলেন, আমাদের এখানে মেডিক্যাল বোর্ড আছে। যার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক। এই বোর্ডের তত্ত্বাবধানে সবকিছু হচ্ছে। আজ রোগীর অপারেশন হবে। তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যে অবস্থা তাতে চোখের আলো ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
শিউলির প্রথম স্বামী মারা যান ২০০৯ সালে। এর এক বছর প্রথম স্বামীর চাচাতো ভাই জুয়েলের সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। এ বিয়েতে পরিবারের লোকজন রাজি না ছিল না। ফলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয় পক্ষে কোন সন্তান না হলেও শিউলির প্রথম পক্ষে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তারা উভয়ে নানার বাড়ি থেকে পড়ালেখা করছে। ছেলে শিবলু একাদশ শ্রেণীতে এবং মেয়ে আঁখি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ালেখা করে। ঘটনা শোনার পরপরই মেয়ে আঁখি বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে গতকাল বিকালে মায়ের কাছে পৌঁছে। আঁখি জানায়, সে মায়ের কাছে মাঝে মাঝে আসতো। তার চাচা (জুয়েল) কখনও কখনও খারাপ, আবার কখনও ভালো ব্যবহারও করতো তার সঙ্গে।

গোষ্ঠী দ্বন্দ্বে সন্ত্রাস নতুন সমস্যা -সাক্ষাৎ​কার: মুনিরুজ্জামান by মিজানুর রহমান খান

মেজর জেনারেল (অব.) মুনিরুজ্জামান,
বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষক
বাংলাদেশে আইএস–বিতর্ক : দুই বিদেশি হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব নিয়ে চলছে বিতর্ক। এর মধ্যে হোসেনি দালানে গ্রেনেড হামলা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দুজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মুনিরুজ্জামান এবং ড. সিগফ্রিড ও. উলফ প্রথম আলোর মুখোমুখি হন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান
প্রথম আলো: হোসেনি দালানের বিস্ফোরণকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
মুনিরুজ্জামান: ধর্মীয় গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের সঙ্গে সন্ত্রাসের জড়িত হওয়াটা একটি নতুন উদ্বেগজনক দিক উন্মুক্ত করল আমাদের জন্য। বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের সঙ্গে এই সম্পৃক্ততা এর আগে ছিল না। ধর্মীয় গোষ্ঠীগত দৃষ্টিকোণ থেকে একটা নতুন মাত্রা যুক্ত হলো, যেটা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে দিতে পারে।
প্রথম আলো: ইসলামিক স্টেটের (আইএস) শিয়াবিরোধী অবস্থানের দিক থেকে তাদের নামে এবারের ঘটনার দাবি করাটা তো মনে হচ্ছে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মুনিরুজ্জামান: হ্যাঁ। তবে এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করব না।
প্রথম আলো: সরকার ১৫ জনকে আইএস সন্দেহে ধরেছিল। আবার বলছে আইএস নেই। এই স্ববিরোধিতাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী চোখে দেখছে?
মুনিরুজ্জামান: বিষয়টি খুব গুরুতর। এটি জাতীয় নিরাপত্তাগত প্রশ্ন। আমি মনে করি, এভাবে নাকচ করে দেওয়া উচিত নয়। এটা আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করে খতিয়ে দেখা উচিত। এর ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে আমাদের পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া—এ রকম পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে বাংলাদেশের একটি সহযোগিতার সম্পর্ক আছে।
প্রথম আলো: এর আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, তাঁদের কাছে আগাম তথ্য ছিল এবং তাঁরা বাংলাদেশকে অবহিত করেছিলেন।
মুনিরুজ্জামান: সেটাই কিন্তু স্বাভাবিক। তবে এ বিষয়ে আমরা এখনো পুরোপুরি তথ্য জানতে পারিনি।
প্রথম আলো: ওয়াশিংটনভিত্তিক হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের লিসা কার্টিজ কথিত জঙ্গি উত্থানের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধকে দায়ী করছেন। তাঁর সঙ্গে কি আপনি একমত?
মুনিরুজ্জামান: আমি অনেকটা একমত। আমরা গোড়া থেকেই বলে আসছি, এই সংকটের মূলে আছে রাজনৈতিক সমস্যা। সে কারণে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে উগ্রবাদীরা একটা সুযোগের সন্ধান করছে।
প্রথম আলো: কিন্তু উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজ থেকেও তো আইএসে যোগদানের ঘটনা ঘটেছে। তার ব্যাখ্যা কী?
মুনিরুজ্জামান: বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের পরিবেশ ও প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়। সেটা একটির সঙ্গে অন্যটির মেলে না। বাংলাদেশের জন্য যা খাটে, সেটা অন্যদের জন্য খাটে না। যেমন চেচনিয়া থেকে যারা আইএসে গেছে, তারা সবাই স্বাধীনতাকামী জনগণ। যুক্তি হলো, সম্পূর্ণভাবে নিজেদের ওই সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি বলে তারা গেছে। তারা সংগ্রামই করছে, কিন্তু কেবল জায়গা বদল করেছে। বাংলাদেশের জন্য মূল সংকট তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। নাগরিক সমাজ ও বাকস্বাধীনতার জন্য জায়গা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, এখানে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এই শূন্যতার মধ্যেই উগ্রবাদীরা, তা সে যারাই হোক, তারা মাথাচাড়া দিচ্ছে। অতীতে হিযবুত তাহ্‌রীরের নামে যা প্রকাশ পেয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা এই রাজনৈতিক অচলাবস্থাকে নিজেদের জন্য কাজে লাগানোর একটা অনুকূল পরিবেশ হিসেবে দেখছে এবং সেটাকে এখন তারা কাজে লাগাতে চায়।
প্রথম আলো: সাম্প্রতিক কালে আকস্মিকভাবে যে নাশকতা শুরু হয়ে গেল, তার কারণ কী? তারা কি কিছু পেতে চায়? ক্ষমতাকেন্দ্রিক কিছু কি?
মুনিরুজ্জামান: বাংলাদেশে এর আগে আইএসের মতাদর্শে কিছু ঘটেছে, তার কোনো চিহ্ন আমরা দেখতে পাইনি। আগে যেটা আমরা দেখেছি, সেটা হলো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের কেউ কেউ সিরিয়ায় গেছে। কিন্তু আমাদের ভূখণ্ডে কিছু ঘটেনি। এখন সংশয় তৈরি হয়েছে যে তারা বাংলাদেশে মনোনিবেশ করেছে এবং তাদের কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটাতে চাইছে।
এ প্রসঙ্গে কেউ হয়তো এটা উল্লেখ করবেন যে আমাদের এই উপমহাদেশে যেসব বড় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী রয়েছে, তাদের ভেতরে একটা প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ২০১৪ সালের জুনে আইএস প্রতিষ্ঠার তিন মাসের কম সময়ের মধ্যে আল-কায়েদার নেতা আইমান আল জাওয়াহিরি ৫৫ মিনিটের একটি ভিডিওর মাধ্যমে একিউআইএস, অর্থাৎ আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের শাখা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই এই অঞ্চলে আল-কায়েদা ও আইএসকেন্দ্রিক জঙ্গিগোষ্ঠীর মধ্যে আমরা একটা প্রতিযোগিতা লক্ষ করি।
প্রথম আলো: তাহলে তাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব কি ছড়িয়ে পড়তে পারে?
মুনিরুজ্জামান: আমরা আশঙ্কা করতে পারি যে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে একটা তীব্র প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তারা এখন নিজ নিজ প্রভাববলয় বাড়ানোর একটা প্রয়াস চালাবে। সেই প্রয়াসেরই অংশ হিসেবে দুই বিদেশি হত্যা এবং হোসেনি দালানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে সতর্কতার সঙ্গেই আশঙ্কা ব্যক্ত করছি। একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষকের জায়গা থেকে এই যুক্তির অবতারণা। একেই ষোলোআনা ভাবার দরকার নেই। আমি আশা করব, এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ফল শিগগির আমরা জানতে পারব। আর তাতে সন্দেহ-সংশয়েরও অবসান ঘটবে।
প্রথম আলো: যুক্তির খাতিরেই প্রশ্ন তোলা যায় যে বিদেশি হত্যাকাণ্ড দিয়ে শুরু করেছিল। এবার কিন্তু দেশের মানুষ হত্যার মধ্যে এসে গেল। তাহলে কি কেউ এমনটা ভাবতে পারেন যে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে ইতালি বা জাপান সরকারের কোনো ভূমিকার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কারণে আগের দুই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে?
মুনিরুজ্জামান: এ রকম কিছু এখন মনে হচ্ছে না। তবে এমন ধারণায় অনেকেই একমত হতে পারেন যে এটা তারা হঠাৎ ঘটায়নি, পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে বলে মনে হচ্ছে। টার্গেট বাছাইয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে বলা যায়, জাপান তার নাগরিকদের ব্যাপারে সব সময় শক্ত ভূমিকা নিয়ে থাকে। জাপানি হত্যা করা হলে বড় আলোড়ন সৃষ্টি হবে, সেটা হয়তো বিবেচনায় থাকতে পারে। জঙ্গিরা সাধারণত আকস্মিকভাবে কিছু করে না। অঘটন একটা ঘটালে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে, সেটা আগাম বিশ্লেষণ করে তবেই তারা অভিযানে নামে। কে জানে এমনও হতে পারে, ইতালি ও জাপানি নাগরিক বেছে নিয়ে তারা হয়তো পশ্চিমা বিশ্বের নজর কাড়তে চেয়েছে।
প্রথম আলো: আইএস তার ভূখণ্ডের বাইরে এর আগে কোথাও কি এমন কিছু করেছে?
মুনিরুজ্জামান: আইএস তার এলাকার বাইরে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অভিযান চালায়নি। তবে প্রভাববলয় সৃষ্টির লক্ষ্যে তাদের যে প্রচেষ্টা, সেটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেটা আর মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তারা ঘোষণা দিয়েছে, যেখানেই মুসলমানরা নিপীড়িত হচ্ছে, যেখানে মুসলমানদের ওপরে আঘাত আসতে পারে বা আসছে, সেখানেই তারা তাদের প্রভাববলয় সৃষ্টি করবে। চেচনিয়ায় একজন গভর্নরকে নিয়োগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তারা তাদের সেই নীতিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। তবে এটা ঠিক, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বাংলাদেশেই এই প্রথম কোনো সহিংসতায় দায় স্বীকারের দাবির কথা জানা যাচ্ছে। আমরা মনে রাখব, তারা কিন্তু এটাও বলেছে, বাস্তবে অ্যাকশনে যেতে সরাসরি আইএসের যোদ্ধা না হলেও চলবে। ঘটনা ঘটাবে আদর্শের সৈনিকেরা, পরে তারা সেটার স্বীকৃতি দেবে।
প্রথম আলো: বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে কি তারা যোগাযোগ রাখে?
মুনিরুজ্জামান: তাদের শক্তিশালী মিডিয়া সেল আছে। সামাজিক মিডিয়াকে তারা ব্যবহার করে। আইএসের সন্দেহভাজন ওয়েবসাইটগুলো পশ্চিমা বিশ্ব প্রতিনিয়ত বন্ধ করে দেয়। পশ্চিমা বিশ্ব থেকে যারা আইএসে যোগ দিয়েছে, সেটা কিন্তু প্রধানত সাইবার মাধ্যমেই ঘটেছে। এবং বাংলাদেশে তাদের সংশ্লেষ ঘটে থাকলে তা-ও সাইবার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় ঘটে থাকতে পারে।
মেজর জেনারেল (অব.) মুনিরুজ্জামান: প্রেসিডেন্ট , বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস এণ্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ।