Friday, January 24, 2025

ছাত্ররা রাজনৈতিক দল গঠন করলে সরকার থেকে ‘বেরিয়ে আসা উচিত’ -বিবিসি বাংলাকে একান্ত সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল

বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করলে সরকার থেকে বেরিয়ে এসে সেটা করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেটি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে আসার আগেও হতে পারে বলে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন তিনি।

বিবিসি বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। তারেক রহমান কবে নাগাদ দেশে ফিরতে পারেন, সে বিষয়েও ধারণা দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব।

এছাড়া আগামী নির্বাচনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা কী হতে পারে, সে বিষয়েও কথা বলেছেন ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সাক্ষাৎকারে ভারত বিষয়ে বিএনপির অবস্থান, আগামী নির্বাচন নিয়ে দলের প্রস্তুতি, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি-দখলদারিত্বের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের নতুন দল গঠন, আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ আরও বেশকিছু বিষয় নিয়ে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপি মহাসচিব।

দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিবিসি বাংলার সম্পাদক মীর সাব্বির। পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারের শেষ পর্ব এখানে তুলে ধরা হলো-

বিবিসি বাংলা: শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের একটা অবনতি দেখা গেছে। সম্প্রতি আমরা বেশ কয়েকবার এটা দেখেছি এবং ভারত সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বলা হয়েছে যে, নির্বাচিত সরকার আসার আগ পর্যন্ত এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। তো ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আপনাদের দলীয় অবস্থানটা কী?

বিএনপি মহাসচিব: আমরা সবসময় যেটা বলে এসছি, সেটাই। আমরা ভারতকে আমাদের প্রতিবেশী মনে করি। একাত্তর সালের যুদ্ধে আমাদের সহযোগিতা করেছে, সেজন্য আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু বিগত নির্বাচনগুলোতে ভারতের ভূমিকা কখনোই বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে ছিল না।বিগত নির্বাচনগুলোয় ভারত অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে যে পতিত আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট সরকার ছিল, তার পক্ষ অবলম্বন করেছিল। যেটা আমরা মনে করি যে, ভারতের একটা ভুল রাজনীতি হয়েছে। কূটনীতির ক্ষেত্রে তারা একটা বড় ভুল করেছে। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা আমাদের দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি একজন প্রতিবেশী হিসেবে। তবে কখনোই আমার স্বার্থকে বিপন্ন করে নয়। আমার স্বার্থ পুরোপুরি ঠিক রেখে আমার তার সঙ্গে যতটুকু সম্পর্ক রাখা দরকার, ততটুকুই সম্পর্ক রাখার পক্ষে আমরা।

বিবিসি বাংলা: ছাত্র আন্দোলনের নেতারা একটা রাজনৈতিক দল গঠন করছে, আপনি নিজেও বলছিলেন, তারা একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন।

বিএনপি মহাসচিব: হ্যাঁ, এটা পত্র-পত্রিকায় আসছে এবং তারা বলেওছে।

বিবিসি বাংলা: তো এই যে রাজনৈতিক দল গঠন করা, এটাকে আপনারা কীভাবে দেখছেন?

বিএনপি মহাসচিব: না, করতেই পারে। এটা তো তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সেক্ষেত্রে আমরা তাদেরকে স্বাগত জানাবো। কিন্তু একটা কথা অলরেডি উঠে আসছে মিডিয়াতে। কিংস পার্টি বলে একটা কথা উঠছে। আমি মনে করি এখান থেকে তাদের বেরিয়ে আসা উচিত। অর্থাৎ সরকারের কোনো সাহায্য না নিয়ে তারা যদি দল গঠন করতে চায়, সেটা তাদের জন্যই ভালো হবে।

বিবিসি বাংলা: সেটা কীভাবে হতে পারে?

বিএনপি মহাসচিব: তারা নিজেরাই দল গঠন করবে? কেন, অন্যান্য দলগুলো কীভাবে দল গঠন করেছে?

বিবিসি বাংলা: সরকারে তাদের যারা আছেন, তাদের সেখান থেকে সরে যাওয়া উচিত?

বিএনপি মহাসচিব: উচিত অবশ্যই এবং সরকারের কোনো সুবিধাই তাদের নেওয়া উচিত না।

বিবিসি বাংলা: আপনি কি মনে করেন যে, সরকারের সুবিধা নিয়ে এখন তারা এটা করছে?

বিএনপি মহাসচিব: না, দল তো তারা গঠন করছে, তাদের প্রতিনিধিরা সরকারে আছে। দ্যাটস এনাফ। হেলিকপ্টারে করে গিয়ে আপনার শীতবস্ত্র দিচ্ছে বিভিন্ন এলাকাতে। আপনার অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওপরে, জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওপরে নানা রকম প্রভাব তো তারা বিস্তার করছেই।

বিবিসি বাংলা: আপনাদের সাবেক জোটসঙ্গী জামায়াত। জামায়াতের সঙ্গে আপনাদের সম্প্রতি একটা বিভেদ বা বলা যায় যে, অনেক ক্ষেত্রে কথা কাটাকাটি...

বিএনপি মহাসচিব: আপনি জামায়াতকে আমাদের জোট বলছেন..

বিবিসি বাংলা: সাবেক জোটসঙ্গী বলেছি।

বিএনপি মহাসচিব: হ্যাঁ, সাবেক।

বিবিসি বাংলা: আমি বলেছি সাবেক।

বিএনপি মহাসচিব: দ্যাটস দ্য এক্সাক্ট ওয়ার্ড (হাসি)। এখন কিন্তু আমরা কারো সঙ্গ জোটবদ্ধ নই। আমরা আছি যুগপৎ আন্দোলনে। আমাদের সঙ্গে যে দলগুলা আছে, আমরা যুগপৎ আন্দোলনে আছি। কিন্তু কোনো জোট আমাদের সঙ্গে নেই।

বিবিসি বাংলা: এটা আপনি বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন যে, এখন আপনাদের আর জোট নেই। সেজন্যই আমি বলছি, সাবেক জোটসঙ্গী। তাদের সাথে আপনাদের জোট তো ছিল। একসময় জামায়াত আপনাদের প্রতীকে নির্বাচনও করেছে।

বিএনপি মহাসচিব: গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে, নির্বাচনে এই জোটবদ্ধ হওয়াটা ইলেকশনের আগে এটা কমন ব্যাপার। সব দেশে, পৃথিবীর সব জায়গায় আছে। ভারতেও মুসলিম লীগ আর কমিউনিস্ট পার্টি একসাথে জোট বাঁধে। ভারতে যে ইলেকশন হয় যখন আর কি। অনেকগুলো জায়গায় দেখবেন জোট বাঁধে, আবার ভেঙে যায়। কংগ্রেস আবার তৃণমূলের সঙ্গে জোট বাঁধে। এটা নির্বাচনের স্বার্থে আপনার ইলেকটোরাল অ্যালায়েন্স যেটাকে বলা হয়, সেটা তারা করে। এটা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রচলিত আছে।

বিবিসি বাংলা: আপনি বলছেন, এটা নির্বাচনী জোট ছিল। আদর্শের দিক থেকে আপনাদের কোনো রকম সম্পর্ক আছে?

বিএনপি মহাসচিব: না, না। কোনো রকম সম্পর্ক ছিল না। আমাদের তো খুব পরিষ্কার যেটা আমরা বলি যে, আমরা এখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই।

বিবিসি বাংলা: আপনাদের এখন যেমন বিভেদ বলি, বা বিএনপি এবং জামায়াতের নেতারা নানা বিষয় নিয়ে দেখা যাচ্ছে যে, পাল্টা কথা-বার্তা চলছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে কি জামায়াত আপনাদের একটা মূল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে?

বিএনপি মহাসচিব: আমরা মনে করি না। রাজনৈতিক দলগুলো তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, যখন ইলেকশন আসবে, তখন তো সবাই সকলের প্রতিপক্ষ তো হবেই এবং রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রতিপক্ষ হতে পারে। আমরা মনে করি না। এখন কোনো রাজনৈতিক দল আমাদের প্রতিপক্ষ আছে আমরা মনে করি না।

বিবিসি বাংলা: কিন্তু আপনাদের বিষয়ে বেশ কঠোর কথাবার্তা বলতে দেখা গেছে। আমি যদি একটা উদাহরণ দিই, সম্প্রতি জামায়াতের আমির একটা অনুষ্ঠানে বলেছেন যে, এক চাঁদাবাজ চলে গেছে, আরেকজন চাঁদাবাজিতে লেগে গেছে-এ ধরনের কথা আর কি।

বিএনপি মহাসচিব: সেটা তো তারাও হতে পারে।

বিবিসি বাংলা: আপনাদের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছে।

বিএনপি মহাসচিব: আমাদেরকে তো নাম ধরে বলেননি। আমি রিঅ্যাক্ট করবো না এই জন্য যে, আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই এটার মধ্যে। যারা চাঁদাবাজি করছে, দে উইল অ্যান্সার ফর দ্যাট।

বিবিসি বাংলা: কিন্তু আমি যদি বলি যে, এর মধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এটা এসেছে যে, আপনার দলের, বিএনপির বিভিন্ন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এসেছে, দখলের অভিযোগ এসেছে।

বিএনপি মহাসচিব: তারা আমাদের দলের মধ্যে নেই। আমরা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি, প্রায় দেড় হাজারের বেশি এসব মানুষকে আমরা দল থেকে বহিষ্কার করে দিয়েছি।

বিবিসি বাংলা: আপনারা অনেককে বহিষ্কার করেছেন এটা সত্যি। কিন্তু এটা তারপরও নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন? এখনও কিন্তু এটা হচ্ছে, অভিযোগ বার বার আসছে।

বিএনপি মহাসচিব: না, আমাদের দলের লোকেরা এটা করছে এখনও-এ ধরনের কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ আমরা পাইনি। যদি পাই, আমরা সাথে সাথে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।

বিবিসি বাংলা: কিন্তু অভিযোগ আসছে।

বিএনপি মহাসচিব: আমাদের কাছে যদি আসে, সুনির্দিষ্টভাবে, আমরা সাথে সাথে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।

বিবিসি বাংলা: দলীয়ভাবে আপনাদের নেতাকর্মীদের কাছে আপনারা কোনো নির্দেশনা দিয়েছেন?

বিএনপি মহাসচিব: এটা আপনি খুব ভালো করেই জানেন যে, আমাদের অ্যাক্টিং চেয়ারম্যান দিয়েছেন। আমরা বলেছি, সব সময় বলছি। গত দুই-তিনটি মিটিংয়েও আমরা একই কথা বলেছি যে, এসব কোনো রকমে বরদাস্ত করা হবে না।

বিবিসি বাংলা: নির্বাচনে যদি ভোটারদের আস্থার কথা বলা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো বা এর আগের অভিজ্ঞতা থেকে ভোটারদের একটা ভয় থাকে চাঁদাবাজি বা দখলের মতো বিষয়গুলো নিয়ে। এর আগে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় হয়েছে। আওয়ামী লীগ তো করেছেই, এর আগেও হয়েছে। ভবিষ্যতে যে এ ধরনের কিছু হবে না বা বিএনপি যে এ ধরনের বিষয়গুলো আর সামনে করবে না বা প্রশ্রয় দেবে না- এই আস্থাটা আপনারা কীভাবে অর্জন করবেন?

বিএনপি মহাসচিব: এই প্রশ্নটা আমি মনে করি যে, আপেক্ষিক প্রশ্ন। কারণ রাজনৈতিক দলগুলোতে আমরা সব সময় কাজ করি জনগণের সমর্থন লাভের জন্যে। জনগণের সমর্থন তো আমরা অতীতেও লাভ করেছি। আমাদের আস্থা আছে যে, সামনের নির্বাচনেও জনগণের সমর্থন লাভ করবো। আমরা যদি খারাপ কাজ করি, তাহলে আমাদেরকে তারা ভোট দেবে না তো। ওই জন্যই ভোটটা চাই তো আমরা যে, জনগণ ডিসাইড করুক-আমাদের ভোট দেবে কি দেবে না। ভোট দিলে না আপনি নির্ধারণ করবেন। নির্বাচন হোক। জনগণ কাকে বেছে নেয় দেখা যাক।

বিবিসি বাংলা: আপনারা দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলছেন। জুলাই-অগাস্টের কথা এসেছে। যদি জুলাই-অগাস্টে নির্বাচন হয়, সময় তো খুব বেশি নেই। এর মধ্যে আপনাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। তো এখন যদি নির্বাচন হয় দ্রুত সময়ের মধ্যে, সেক্ষেত্রে দলের নেতৃত্বে নির্বাচন কীভাবে হবে?

বিএনপি মহাসচিব: আপনি দেখেছেন, গতবার দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০১৮ তে যখন উনি জেলে ছিলেন। আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশের বাইরে ছিলেন। আমাদের অসংখ্য নেতা জেলে ছিল, আমাদের প্রার্থীরা জেলে ছিল প্রায় ত্রিশ-বত্রিশ জন। তার মধ্যেও কিন্তু আমরা নির্বাচন করেছি ২০১৮ তে। তো আমরা নির্বাচনের জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকি। আমাদের দল নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত সবসময় থাকে। তো ওই নিয়ে আমার মনে হয় চিন্তার কোনো কারণ নেই।

বিবিসি বাংলা: তার (তারেক রহমানের) অনুপস্থিতিতেও সেটা হতে পারে?

বিএনপি মহাসচিব: কেন পারে না? আমরা করেছি তো। ২০১৮তে করেছি না?

বিবিসি বাংলা: তিনি (তারেক রহমানের) কবে ফিরবেন কোনো ধারণা দেওয়া যায়?

বিএনপি মহাসচিব: হ্যাঁ, অবশ্যই। তার কয়েকটা কেস বাকি আছে, এই কেসগুলা শেষ হলেই তিনি উপযুক্ত সময় চলে আসবেন।

বিবিসি বাংলা: আগামী নির্বাচনে আপনাদের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ভূমিকাটা কী হবে?

বিএনপি মহাসচিব: তিনি তো অসুস্থ। অত্যন্ত অসুস্থ। জানেন, তিনি লন্ডনে আছেন। তিনি যদি সুস্থ হয়ে আসেন, ডাক্তাররা যদি অ্যালাও করেন এবং তিনি যদি নিজে পারেন শারীরিকভাবে অবশ্যই তিনি অ্যাকটিভ রোল প্লে করবেন।

বিবিসি বাংলা: আপনারা নির্বাচনের কথা বলছেন। যেহেতু দ্রুত নির্বাচন করতে চান, তার মানে আপনারা প্রস্তুতি নেয়াও শুরু করেছেন ধরে নিতে পারি।

বিএনপি মহাসচিব: হ্যাঁ, আমাদের তো কাউন্সিল হচ্ছে। প্রত্যেকটি জেলাতেই আমাদের কাউন্সিলের জন্য প্রস্তুতি চলছে। আগামী এক মাসের মধ্যে প্রায় সব জেলাতে আমাদের কাউন্সিল হয়ে যাবে।এরপরেই আমরা ন্যাশনাল কাউন্সিল করবো। সংগঠন এমননিতেই আছে, তখন সংগঠন আরও শক্তিশালী হয়ে যাবে। এবং নির্বাচনের জন্য তো আমরা প্রস্তুত, আপনাকে আগেও বলেছি, আমরা সব সময় থাকি।

বিবিসি বাংলা: আপনাদের এখন যাদেরকে নমিনেশন দেবেন, মনোনয়ন দেবেন, সেক্ষেত্রে কী চিন্তা করছেন? কী ধরনের প্রার্থীদেরকে আপনারা দেবেন?

বিএনপি মহাসচিব: জনগণের কাছে যারা প্রিয় হবেন বলে আমরা মনে করবো, যারা গ্রহণযোগ্য হবেন, তারাই নমিনেশন পাবেন এবং আমাদের দল সেই সিস্টেমই চালু আছে। নিচের থেকে, যেসমস্ত এলাকাগুলো থেকে যারা থেকে ইলেকশন করে আসবেন, তাদের সেই এলাকার জনগণের বা আমাদের পার্টির যে সাবজেক্ট কমিটি আছে, যারা ডিসাইড করে আর কি, তাদের মতামত নিয়েই নমিনেশন দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে আমরা বেস্ট ক্যান্ডিডেটকেই নমিনেশন দেওয়ার চেষ্টা করি।

বিবিসি বাংলা: একটু পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে যাই। আপনি বলছিলেন যে, বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন-প্রতিবাদ চালিয়ে গেছে। বলছিলেন, অনেকের জেল হয়েছে, গুম হয়েছে। কিন্তু সেই দীর্ঘ সময়ে সফলতা, সরকার পতন তো হয়নি। সরকার পতনের কথা অনেকবার বলেছেন, কিন্তু হয়নি। শেষপর্যন্ত জুলাইতে এসে ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকার পতন হলো। আপনারা কেন এর আগে সফল হলেন না?

বিএনপি মহাসচিব: এটা আমরা সবসময় বলে এসেছি, বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, শুরু থেকেই, পাকিস্তান আমল থেকেই যখন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে, তখন থেকেই দেখবেন যে, ছাত্ররাই মূলত ভ্যানগার্ডের ভূমিকাটা পালন করেছে। বাহান্ন সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করেন আপনি, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, পরবর্তীকালে ঊনসত্তরের ছাত্র গণঅভ্যুত্থান, এরপরে সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ- ছাত্ররা কিন্তু সামনের সারিতে সবসময়। বাংলাদেশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, তরুণ-যুবক-ছাত্ররা যখন আপনার ফাইনালি নেমে আসে, তখনই আন্দোলন সফল হয়। আমরা ১৫ বছর ধরে আন্দোলন করছি, লড়াই করছি, কষ্ট করছি, গুম হয়েছি, খুন হয়েছে।তারপরও এটা সত্য কথা আমরা গভর্নমেন্টকে ফেলে দিতে পারিনি। তার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ যেটা ছিল বলে আমার মনে হয়েছে যে, ছাত্র বা তরুণরা তখন পর্যন্ত সেভাবে আন্দোলনে নেমে আসেনি। আমি নিজেই বহুবার বলেছি যে, কোথায় সেসব ছাত্ররা, যারা অতীতে পতন ঘটিয়েছে স্বৈরাচারী সরকারের? যারা একটা যুদ্ধ করেছে, দেশ স্বাধীন করেছে, সেই ছাত্রদেরকে সামনে দেখতে পাই না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটাও মিছিল বের হয়নি গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য। ভোট দিতে পারেনি, তার বিরুদ্ধে তাদের কোনো প্রতিবাদ ছিল না গত তিন টার্ম ইলেকশনে এবং মেজর কোনো ন্যাশনাল ইস্যুতে তাদেরকে আমরা বেরিয়ে আসতে দেখিনি। এবারও দেখুন, এই আন্দোলনটা শুরু হয়েছে কিন্তু তাদের ইন্টারেস্টের জায়গায়। অর্থাৎ চাকরির জন্যে কোটা সিস্টেম নিয়ে আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল। সেখান থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত। একেবারে সুনির্দিষ্টভাবে হাসিনার পতন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাবার দাবি নিয়ে কিন্তু আন্দোলন শুরু হয়নি। এটা সবশেষে তিন-চার দিন আগে থেকে তারা হাসিনার পতনের আন্দোলন শুরু করেছে। সুতরাং এই বিষয়ে কেন জানি না, মিডিয়া থেকেও একটা কথা উঠছে যে, জুলাই-আগস্টেই একমাত্র আন্দোলন হয়েছে বলি। এটা তৈরি হয়েছে, স্পার্ক একটা। একটা স্ফুলিঙ্গের দরকার ছিল। সেই স্ফুলিঙ্গটা ছাত্ররা জ্বালিয়েছে। সেজন্য গোটা জাতি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমরাও কৃতজ্ঞ এবং আমরা মনে করি যে, তারা ভ্যানগার্ডের কাজটা করতে সক্ষম হয়েছে।

বিবিসি বাংলা: সেসময় আপনাদের সাথে কি যোগাযোগ হয়েছিল?

বিএনপি মহাসচিব: অবশ্যই। সবসময় যোগাযোগ ছিল। সেই সময়ে আমাদের যে হিসাব প্রায় ৪২২ জনের মতো আমাদের ছেলেরা প্রাণ দিয়েছে, এই আন্দোলনে। আমাদের প্রায় চার-পাঁচ হাজার মানুষ আহত হয়েছে।

আমাদের সব বড় নেতারাই তো জেলে চলে গিয়েছিল সেসময়ে। সরকার ধরে নিয়ে গিয়েছিল, সিনিয়র লিডার্স, স্ট্যান্ডিং কমিটির মেম্বারস। প্রায় সাড়ে তিন হাজার এই ঢাকা জেলে ছিল ওই আন্দোলনের সময়।

বিবিসি বাংলা: আপনারা তখন তাহলে সামনে আসেননি কেন?

বিএনপি মহাসচিব: আমরাই তো সামনে। সব সময় সামনে।

বিবিসি বাংলা: ঘোষণাগুলো, কর্মসূচিগুলো আসছিল ছাত্রদের কাছ থেকে।

বিএনপি মহাসচিব: না, আমরা তো আমাদের ঘোষণা করছিলাম। কেন, ওই সারাদিন ধরে প্রেসক্লাবের সামনে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করেছে, আমরাই তো ছিলাম। আন্দোলন তো মাঠে আমরাই করছিলাম। আমাদের ছেলেরা করছিল, আমরাও করছিলাম।

বিবিসি বাংলা: কিন্তু বলছি, সরকার পতনের যে ডাক।

বিএনপি মহাসচিব: সেই ডাক আমরা ১৫ বছর আগে থেকে দিচ্ছি। তখনও দিয়েছি। প্রত্যেকটা প্রেস কনফারেন্সে আমি প্রতিদিন, আমি একা প্রেস কনফারেন্স করেছি আপনার সরকার পতনের ডাক দিয়ে। আপনি খেয়াল করেন, সেসময়টা, দেখেন। চার তারিখে দিয়েছি, তিন তারিখে দিয়েছি।

বিবিসি বাংলা: আপনারা সব দলকে নিয়ে একটা ঐকমত্যের সরকারের কথা বলেছিলেন, আগে একটা কথা এসেছিল।

বিএনপি মহাসচিব: আছে, আমরা বলছি।

বিবিসি বাংলা: সেই অবস্থান কি আপনাদের এখনও আছে?

বিএনপি মহাসচিব: হ্যাঁ। নির্বাচনের পরে, অবশ্যই, অবশ্যই। জাতীয় সরকার বলেছি আমরা।

বিবিসি বাংলা: যদি সেটা হয়, সেক্ষেত্রে বিরোধীদলের ভূমিকাটা তাহলে কীভাবে আসবে?

বিএনপি মহাসচিব: বিরোধীদল নিশ্চয় অনেক থাকবে, যারা আমাদের সঙ্গে আসবেন না। তারা বিরোধীদলে থাকবেন।

বিবিসি বাংলা: আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আওয়ামী নিয়ে তো নানা আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের বাইরে, আওয়ামী লীগের সাথেও অনেক রাজনৈতিক দল ছিল। যাদের এখন ওভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না, তাদের বিষয়ে আপনাদের অবস্থানটা কী? যারা আওয়ামী লীগের মিত্র ছিল।

বিএনপি মহাসচিব: দোসর তো ছিল তারা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিল মানে আওয়ামী লীগের দোসর ছিল, ফ্যাসিস্টের দোসর ছিল। একই কাজ করেছে তারা। সো ইক্যুয়ালি দে আর রেসপন্সিবল ফর দিজ জেনোসাইড।

বিবিসি বাংলা: তাদের নির্বাচনে আসা নিয়ে কী বলবেন?

বিএনপি মহাসচিব: আমি ভাই আগেই বলেছি, এগুলো ব্যাপারে তো আমরা কথা বলবো না। কারণ আপনাকে প্রথমদিকেই বলেছি যে, এটা পিপল উইল ডিসাইড, পলিটিক্যাল পার্টি কে কোনটা থাকবে, না থাকবে। এটা তাদের ব্যাপার।

বিবিসি বাংলা: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আপনাকে অনেক ধন্যবাদ বিবিসি বাংলাকে সময় দেওয়ার জন্য।

বিএনপি মহাসচিব: থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ। 

mzamin
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বিবিসি বাংলার সম্পাদক মীর সাব্বির। ছবি: বিবিসি বাংলা

বিয়ের আগেই কেন মেয়েদের জরায়ুমুখের ক্যানসারের টিকা নিতে হবে by রাফিয়া আলম

জরায়ুমুখ ক্যানসারের বহু রোগীই দেশে রয়েছে। এই ক্যানসারের জন্য দায়ী হিউম্যান প্যাপিলোমা নামের ভাইরাস। এই ভাইরাসের বেশ কয়েকটি ধরন রয়েছে। সবচেয়ে খারাপ ধরন দুটির বিরুদ্ধে কার্যকর, এমন টিকার ব্যবস্থাও দেশে রয়েছে।

সরকারি উদ্যোগেই মেয়েদের জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকা দেওয়া হলে সব থেকে বেশি কার্যকর হয়।

তাহলে এই বয়স যাঁদের পেরিয়ে গেছে, তাঁরা কি জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকা নিতে পারবেন না? আর নিলে কি কোনো কাজে আসবে? জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকা প্রসঙ্গে জানালেন স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. ফারজানা রশীদ।

বয়সটা কেন গুরুত্বপূর্ণ

যৌনসংসর্গের মাধ্যমে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ছড়ায়। তাই বিয়ের আগেই এই টিকা গ্রহণ করা জরুরি। ১৪ বছর বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পরও এই টিকা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে চেষ্টা করতে হবে, যেন বিয়ের আগেই নেওয়া হয়।

কারণ, যৌন সম্পর্ক গড়ে উঠলে একজন নারী এই ভাইরাসের সংস্পর্শে আসতে পারেন। তখন এই টিকা নেওয়া সত্ত্বেও ক্যানসার থেকে সুরক্ষিত তিনি না-ও থাকতে পারেন। তাই ১৪ বছর বয়সের মধ্যে মেয়েদের জরায়ুমুখের ক্যানসারের টিকা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কন্যাশিশুদের অভিভাবকদেরও এই বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

বিয়ের পর টিকা নেওয়া যাবে কি না

বিয়ের পরও যে জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকা নেওয়া যাবে না, তা অবশ্য নয়। তবে বিয়ের পর এই টিকা নিতে হলে আগে একটি বিশেষ ধরনের পরীক্ষা করাতে হয়। এই পরীক্ষার নাম প্যাপ স্মিয়ার।

টিকা নেওয়ার আগেই জরায়ুমুখের কোষে কোনো অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি হয়েছে কি না, তা নির্ণয় করাই এর উদ্দেশ্য। প্যাপ স্মিয়ার পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে চিকিৎসক জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে থাকেন।

আরও যা জানা প্রয়োজন


অন্তঃসত্ত্বা বা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়কালে একজন নারীর জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকা না নেওয়াই ভালো। কোনো টিকা নেওয়ার ফলে আগে যাঁদের অ্যালার্জির মতো কোনো সমস্যা হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকা নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরি।

তবে যে কারও জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকা নেওয়ার পর জ্বর, গায়ে ব্যথা, বমিভাব কিংবা বমির মতো কিছু সমস্যা হতে পারে। এতে ভয়ের কিছু নেই।

৯ থেকে ১৪ বছর বয়সে জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকা দেওয়া ভালো
৯ থেকে ১৪ বছর বয়সে জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকা দেওয়া ভালো। প্রতীকী ছবি

ফখরুলের বক্তব্যের কড়া জবাব নাহিদের: রাজনীতিতে চাঞ্চল্য

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের কড়া জবাব দিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মূলত আরেকটা ১/১১ সরকার গঠনের ইঙ্গিত বহন করে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ। তিনি বলেছেন, এমন কোনো পরিকল্পনা গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে এবং ছাত্র-জনতা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। এমন কিছুর চিন্তা হলে সেটা বিএনপি’র বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র মনে করেন সরকারের এই উপদেষ্টা।

মঙ্গলবার বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘যদি অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ণ নিরপেক্ষতা পালন করে, তাহলেই তারা নির্বাচন কন্ডাক্ট (পরিচালনা) করা পর্যন্ত থাকবে। তা না হলে তো নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজন হবে।’

বিএনপি মহাসচিবের এই বক্তব্যের বিষয়ে নাহিদ ইসলাম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দীর্ঘ পোস্ট দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। তার এই পোস্ট নিজের ফেসবুক আইডিতে শেয়ার করেন আরেক তরুণ উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। তাতে তিনি ক্যাপসন লিখেন, প্রফেশনালিজম রক্ষার্থে সরকারে থেকে আরও অনেক কিছুই বলতে পারি না। তবে জনগণকে অন্ধকারে রাখাটাও অনুচিত। পরে অন্য এক পোস্টে আসিফ বলেন, উপদেষ্টাদের কেউ রাজনীতি করলে পদ ছেড়েই করবেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য ও উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার সঙ্গে সরকারের উপদেষ্টার এই বাহাসকে নতুন রাজনৈতিক মেরূকরণের ইঙ্গিত বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। গতকাল বিকাল ৫টার দিকে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে নাহিদ ইসলাম লিখেন, ‘বিএনপি মহাসচিবের নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মূলত আরেকটা ১/১১ সরকার গঠনের ইঙ্গিত বহন করে। ১/১১ এর বন্দোবস্ত থেকেই আওয়ামী ফ্যাসিজমের উত্থান ঘটেছিল। বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যে সামনে আরেকটা ১/১১ সরকার, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা এবং গুম-খুন ও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ার আলামত রয়েছে। ছাত্র ও অভ্যুত্থানের নেতৃত্বকে মাইনাস করার পরিকল্পনা ৫ই আগস্ট থেকেই শুরু হয়েছে। ৫ই আগস্ট যখন ছাত্র-জনতা রাজপথে লড়াই করছে, পুলিশের গুলি অব্যাহত রয়েছে, তখন আমাদের আপসকামী অনেক জাতীয় নেতৃবৃন্দ ক্যান্টনমেন্টে জনগণকে বাদ দিয়ে নতুন সরকার করার পরিকল্পনায় ব্যস্ত ছিলেন (অনেকে ছাত্রদের কথাও বলেছেন সেখানে)। আমরা ৩রা আগস্ট থেকে বলে আসছি আমরা কোনো প্রকারের সেনা শাসন বা জরুরি অবস্থা মেনে নেবো না। আমাদের বার বার ক্যান্টনমেন্টে যেতে বলা হলেও আমরা যেতে অস্বীকার করি। শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবনে আলোচনা ও বার্গেনিং এর মাধ্যমে ড. ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।’

জাতীয় সরকার চেয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে একটা জাতীয় সরকার। জাতীয় সরকার হলে ছাত্রদের হয়তো সরকারে আসার প্রয়োজন হতো না। জাতীয় সরকার অনেকদিন স্থায়ী হবে এই বিবেচনায় বিএনপি জাতীয় সরকারে রাজি হয় নাই। কিন্তু অভ্যুত্থানের পরেই দেশে জাতীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি ছিল। অথচ বিএনপি জাতীয় সরকারের কথা বলছে সামনের নির্বাচনের পরে। ছাত্ররাই এই সরকারের এবং বিদ্যমান বাস্তবতার একমাত্র ফ্যাক্টর যেটা ১/১১ এর সরকার থেকে বর্তমান সরকারকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করে। বিএনপি কয়েকদিন আগে মাইনাস টু-এর আলোচনা করলেও এখন ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করার জন্য নিরপেক্ষ সরকারের নামে আরেকটি ১/১১ সরকারের প্রস্তাবনা করছে। এ ধরনের পরিকল্পনা গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে এবং ছাত্র-জনতা কোনোভাবেই এটা মেনে নেবে না। এবং আমি মনে করি এটা বিএনপি’র বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র। আর এই সরকার জাতীয় সরকার না হলেও সরকারে আন্দোলনের সব পক্ষেরই অংশীদারত্ব রয়েছে এবং সব পক্ষই নানান সুবিধা ভোগ করছে।’

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকার গঠনের আগেই ৬ই আগস্ট অ্যাটর্নি জেনারেল এবং পুলিশের আগের আইজি’র নিয়োগ হয়েছিল যারা মূলত বিএনপি’র লোক। এরকমভাবে সরকারের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত নানান স্তরে বিএনপিপন্থি লোকজন রয়েছে। নির্বাচনের নিরপেক্ষতার কথা বললে এই বাস্তবতায়ও মাথায় রাখতে হবে। রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন, সংস্কার, নতুন সংবিধান, জুলাই ঘোষণা সব ইস্যুতেই বিএনপি বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অথচ এগুলো কোনোটাই ছাত্রদের দলীয় কোনো দাবি ছিল না। কিন্তু দেশের স্থিতিশীলতা, বৃহত্তর স্বার্থ এবং জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার জন্য ছাত্ররা বারবার তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। কিন্তু এর মানে এই না যে, গণতন্ত্রবিরোধী ও অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বিরোধী কোনো পরিকল্পনা হলে সেখানে আমরা বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেবো।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ বিষয়ে ভারতের প্রধান দলগুলোর মধ্যে ঐক্য সম্ভব হয়েছে অথচ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বিষয়ে আমরা ঐক্য করতে পারি নাই এত হত্যা ও অপরাধের পরেও। হায় এই ‘জাতীয় ঐক্য’ লইয়া আমরা কি রাষ্ট্র বানাবো!’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে দুর্বল করা সহজ। কারণ বাংলাদেশকে সহজেই বিভাজিত করা যায়। এ দেশের বড় বড় লোকেরা অল্পমূল্যে বিক্রি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে। আমি মনে করি না সমগ্র বিএনপি এই অবস্থান গ্রহণ করে। বরং বিএনপি’র কর্মী-সমর্থকদের বড় অংশই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন চায়।

বিএনপি’র দেশপ্রেমিক ও ত্যাগী নেতৃত্বকে আহ্বান করবো, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে না গিয়ে ছাত্র-জনতার সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্য ও সংহতির পথ বেছে নিন।’

দ্রুত নির্বাচন না হলে অন্যান্য শক্তির উত্থান হতে পারে: ফখরুল
ওদিকে দ্রুত নির্বাচন না হলে অন্যান্য শক্তির উত্থান হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে শহীদ আসাদ পরিষদের উদ্যোগে ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক শহীদ আসাদের ৫৬তম মৃত্যুবার্ষিকী’ উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তিনি এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, একটা কথা আমি বলি, যে কথা বললে পরে আমার সমালোচনাও হয়। আমি বলি যে, নির্বাচনটা দ্রুত হওয়া দরকার। কেন বলি, এই কথাটা আমি বারবার বলার চেষ্টা করেছি। আমরা বিশ্বাস করি যে, নির্বাচন থেকে আমরা ১৫ বছর বঞ্চিত, এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করার একটা সুযোগ পাবে।

তিনি বলেন, আপনারা দেখছেন যে, জোর করে সেই বিষয়টাকে যদি বিতর্কিত করে ফেলা হয় তাহলে তো জনগণ আবার সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। আমাদের যে অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে, এই ধরনের নির্বাচন যদি দ্রুত না হয়, সময়ক্ষেপণ করা হয়, তাহলে অন্যান্য শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। তখন জনগণের যে চাহিদা, সেই চাহিদা থেকে তারা পুরোপুরিভাবেই বঞ্চিত হয়।

মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা এ কথাটা বারবার বলতে চাই, নির্বাচনে কে আসবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সেটার জন্য আমরা লড়াই করেছি দীর্ঘ ১৫ বছর। আমি সেই কারণে বলেছি যে, সত্যিকার অর্থেই বর্তমান যে অন্তর্বর্তী সরকার আছে, সেই সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। স্বাভাবিকভাবে একটা ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের পরেই জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এখন পর্যন্ত সমাজের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, সেই অবস্থায় কিন্তু আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না যে, সেখানে দেশের মানুষের প্রত্যাশাগুলো পূরণ হবে।
নির্বাচনের জন্য কতো অপেক্ষা এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন রকম প্রোগ্রাম আছে, সেই কর্মসূচি নিয়ে তারা এগোতে চায়। তবে একটা বিষয় সবাই একমত- একটা নির্বাচন হওয়া দরকার। নির্বাচনটা শুধু একটা দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য একটা পথ সৃষ্টি করা, একটা দরজা খোলা। আজকে প্রশ্ন উঠছে যে, সংস্কার সবগুলো করে নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্ন। তাহলে কি আমরা ৪-৫ বছর ধরে অপেক্ষা করবো বা যতদিন সংস্কার সম্পন্ন না হয় ততদিন ধরে অপেক্ষা করবে জনগণ? তারা তাদের ভোটের অধিকার থেকে তো বঞ্চিত হবে।
ফখরুল বলেন, আমরা এখনো দেখছি, আমাদের আমলাতন্ত্র আগের যে ব্যবস্থা ছিল, সেই ব্যবস্থায় তারা এখনো সচিবালয় থেকে শুরু করে সমস্ত প্রশাসনে একইভাবে তাদের ভূমিকা পালন করছে, কোনো রদবদল হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। স্কুল-কলেজগুলোতে সেই ধরনের লেখাপড়া হয় না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। এটা অতীত থেকেই এসেছে এবং সেই পরিবর্তন এত অল্প সময়ে সম্ভবও নয়। কিন্তু আমরা সেই পরিবর্তনগুলো চাই। সেই কারণে আমরা বলেছি যে, নির্বাচনটা দ্রুত হওয়া দরকার।

তিনি বলেন, আমি এ কথা বুধবারও বলেছি, আমাকে একজন সাংবাদিক ভাই এ নিয়ে প্রশ্ন করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকার যদি নিরপেক্ষ না থাকে তাহলে একটা নিরপেক্ষ সরকার দরকার হবে নির্বাচনের সময়ে। আমি কথাটা বলছি যে, এর কারণ আছে। কারণ হচ্ছে- আমরা দেখছি যে বেশ কিছু বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষতা পালন করতে পারছেন না। আমি অনুরোধ করবো, আমি প্রত্যাশা করবো, আমি আশা করি যে, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সেই নিরপেক্ষতা পালন করবে এবং দেশে যে সংকট আছে সেই সংকট থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য তারা কাজ করবেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমি মনে করি, আমাদের এই ন্যূনতম যে সংস্কার হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক, সেই সংস্কার শেষ করে আমাদের অতি দ্রুত নির্বাচনের পথে যাওয়া উচিত। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকার বেরিয়ে আসবে তাদের দায়িত্ব হবে এখানে পুরোপুরিভাবে সেই সংস্কারের যে কমিটমেন্ট আছে, সেই কমিটমেন্টগুলো বাস্তবায়িত করা, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা। আসাদের রক্ত, আবু সাঈদের রক্তকে আমরা বৃথা যেতে দিতে পারি না। সেই জন্য আমাদের সকল ঐক্য গড়ে তুলে শহীদদের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হবে। এই হোক আজকের প্রতিজ্ঞা।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ’র সভাপতিত্বে ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের সদস্য সচিব হাবিবুর রহমান রিজুর সঞ্চালনায় সভায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, জহির উদ্দিন স্বপন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) একাংশের সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমান, অপর অংশের সাধারণ সম্পাদক আসাদুর রহমান খান আসাদ, শহীদ আসাদের ছোট ভাই আজিজুল্লাহ এম নুরুজ্জামান নূর প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

হাসনাতের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা: ওদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ’র একটি বক্তব্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গতকাল নিজের ফেসবুক আইডিতে এক স্ট্যাটাসে বক্তব্য দেন। একজন বিএনপি নেতার উদ্দেশ্যে তিনি এই বক্তব্য দিলেও নাম উল্লেখ করেননি।
তিনি লিখেন, বিএনপি’র একজন সিনিয়র নেতা আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি’র কোনো দ্বন্দ্ব না থাকার কথা বললেন অকপটে। অথচ তিনি ভুলে গেলেন, এই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফ্যাসিজম কায়েম করেছে। গুম, খুন ও গণহত্যা করে বাংলাদেশকে অরাজকতার শীর্ষ চূড়ায় নিয়ে গেছে। এত সব অন্যায়-অনাচার ও জুুলুম-নিপীড়নের দায় এড়িয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক ব্ল্যাঙ্ক চেক দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাও করলেন না।
আবার তিনিই বললেন, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র কিছু আসে যায় না। অথচ উনি ভুলে গেলেন, এই আওয়ামী লীগই বিগত তিনবারের জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেছে, এই আওয়ামী লীগের কারণেই তার দল বিএনপি বিগত সময়ের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো বর্জন করতে বাধ্য হয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের কাঠামোগত পরিবর্তন করার সময় ও সুযোগ এলো অথচ বিএনপি দেশ পুনর্গঠনের এই সুযোগকে অবমূল্যায়ন করে হাজির হলো ১/১১ সরকারের ফর্মুলার আলাপ নিয়ে। ওদিকে অন্তর্বর্তী সরকার যখন দেশ সংস্কারের কাজে নিয়োজিত হলো তখন বিএনপি এসে বললো, এই সংস্কার করার ম্যান্ডেট বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। অথচ বিএনপি এ কথা ভুলে গেল, গণ-অভ্যুত্থানের ফলে গঠিত হওয়া সরকারের ম্যান্ডেট ষাট-সত্তরভাগ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হওয়া রাজনৈতিক দলের চেয়েও বেশি।

আবার, দেশ ও দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে গণ-অভ্যুত্থানের পরে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা উপস্থিত হলো জনসমক্ষে। ঠিক এ কারণেই ফ্যাসিবাদবিরোধী ও জুলাই স্পিরিট ধারণকারী ছাত্র-জনতার সম্মিলনে যখন নতুন একটি রাজনৈতিক দলের উত্থান হওয়ার আভাস পেলো ঠিক তখন বিএনপি সেটিকে চিহ্নিত করলো তাদের দলীয় স্বার্থের বিপক্ষে হুমকি হিসেবে।
mzamin

পানামা ক্যানেল দখলের হুমকি ট্রাম্পের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান পানামা-চীনের

পানামা ক্যানেল ও চীনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, পানামা ক্যানেল পরিচালনা করছে চীন। আমরা এটা চীনের হাতে তুলে দিই নি। এটা আমরা দিয়েছি পানামার হাতে। আমরা সেটাকে নিয়ে নেবো। ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক মহল সরগরম হয়ে উঠেছে। শুধু পানামা ক্যানেলই নয়, গালফ অব মেক্সিকো, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার বিতর্কিত মন্তব্য ভাবিয়ে তুলেছে সচেতন মহলকে। কিন্তু পানামা ক্যানেল কি আসলেই চীন পরিচালনা করে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনলাইন বিবিসি লিখেছে- ৫১ মাইল পানামা ক্যানেল মধ্য আমেরিকার এই দেশকে আলাদা করেছে। আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্ত করেছে। প্রতি বছর সংক্ষিপ্ত পথে যাত্রা করতে এই প্রণালী ব্যবহার করে কমপক্ষে ১৪ হাজার জাহাজ। তবে এই ক্যানেল নির্মাণের আগে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে দক্ষিণ আমেরিকা অতিক্রম করে তবেই চলাচল করতে হতো। তাতে খরচ পড়তো অনেক বেশি। ২০শে জানুয়ারি উদ্বোধনী বক্তব্যের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুধু প্রথমবারই মধ্য আমেরিকার দেশ পানামা এবং আন্তঃমহাসাগর বিষয়ক ক্যানেল নিয়ে মন্তব্য করেছেন এমন নয়। ২৫শে ডিসেম্বর বড়দিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রাম্প এক পোস্টে বলেছেন, চীনের সেনারা বিস্ময়করভাবে চমৎকারভাবে, কিন্তু অবৈধভাবে পানামা ক্যানেল পরিচালনা করছে। তবে তার এ অভিযোগ দ্রুততার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন পানামা সিটি এবং বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা। ওই সময় পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো এমন দাবিকে বাজে কথা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, পানামা ক্যানেলে একেবারেই চীনা হস্তক্ষেপ নেই। উল্লেখ্য, এই ক্যানেলটিকে জোর প্রয়োগ করে হলেও দখল করার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজগুলো থেকে কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত ফি আদায় করে। পানামা কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষণের পর প্রেসিডেন্ট মুলিনো আবার জোর দিয়ে বলেছেন, পালামা ক্যানেলে বিশ্বের কোনো দেশের উপস্থিতি নেই। কোনো দেশ আমাদের প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করে না। বিশ্বে সমুদ্রপথে যে পরিমাণ বাণিজ্য পরিচালনা হয় তার মধ্যে এই কৌশলগত পানিপথে হয় শতকরা প্রায় ৫ ভাগ বাণিজ্য। এই পথ পরিচালনা করে পানামা ক্যানেল অথরিটি। এটি পানামা সরকারের একটি এজেন্সি। এতে চীনের কোনো  সেনাসদস্য নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তার এমন সব দাবি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। 

পানামা ক্যানেলের ইতিহাস: ঐতিহাসিকভাবে এই পানিপথ নির্মাণে এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। প্রথমে এই পানিপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ফরাসি সরকার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এ প্রকল্প তাদের অধিকারে নিয়ে নেয়। ক্যানেলটির নির্মাণ সম্পন্ন হয় ১৯১৪ সালে। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এই ক্যানেল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ওই সময় পানামার সঙ্গে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। সেই চুক্তিতে পানামার কাছে আস্তে আস্তে পানিপথটি তুলে দেয়ার কথা বলা হয়। জিমি কার্টারের এই চুক্তিকে ডনাল্ড ট্রাম্প ‘বোকামি’ বলে অভিহিত করেছেন। ১৯৯৯ সাল থেকে পানামা ক্যানেল অথরিটি এই পানিপথের এক্সক্লুসিভ নিয়ন্ত্রণ হাতে পায়। স্বাক্ষরিত চুক্তিতে বলা হয়, এই পানিপথ স্থায়ীভাবে নিরপেক্ষ থাকবে। কিন্তু এই চুক্তির অধীনে এই পানিপথে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে যেকোনো হুমকি মোকাবিলার অধিকার রাখে যুক্তরাষ্ট্র।

কেন এলো চীনের নাম: তবে পানামা ক্যানেল নিয়ন্ত্রণে চীন সরকারের বা সামরিক কোনো উদ্যোগের পক্ষে প্রকাশ্য কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। তবে ওই এলাকায় চীনের বিভিন্ন কোম্পানির উপস্থিতি আছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই ক্যানেল দিয়ে শতকরা ২১.৪ ভাগ কার্গো অতিক্রম করেছে চীনের। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পর এই ক্যানেল ব্যবহারে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে এসেছে চীন। এই ক্যানেল বরাবর আছে ৫টি বন্দর। তার মধ্যে দু’টি বন্দর হলো বালবোয়া এবং ক্রিস্টোবাল। এর অবস্থান প্রশান্ত ও আটলান্টিকের পাশে। ১৯৯৭ সাল থেকে হাচিসন পোর্ট হোল্ডিংসের একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান এটি পরিচালনা করছে। এটি সিকে হাচিসন হোল্ডিংস-হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এর মূল মালিকানা হংকংভিত্তিক ব্যবসায়ী লি কা-শিং। বৃটেন সহ ২৪টি দেশে বন্দর অপারেশনে কাজ করে তারা। তবে এই প্রতিষ্ঠানটি চীন রাষ্ট্রের মালিকানাধীন নয়। এ কথা বলেছেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের আমেরিকাস প্রোগ্রামের পরিচালক রিয়ান বার্গ। তবে ওয়াশিংটনে এ নিয়ে উদ্বেগ হলো- এই কোম্পানির ওপর কতোটা চাপ প্রয়োগ করতে সক্ষম হবে বেইজিং। 

mzamin

যুক্তরাষ্ট্রে ৬০,০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে চায় সৌদি আরব

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের চার বছর ক্ষমতার মেয়াদে সেখানে বিস্তৃতক্ষেত্রে এবং বাণিজ্যে ৬০,০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে চায় সৌদি আরব। ট্রাম্পকে এরই মধ্যে এ কথা জানিয়ে দিয়েছেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদি আরবের সরকারি বার্তা সংস্থা বৃহস্পতিবার সকালেই এ খবর প্রচার করেছে। তার ওপর ভিত্তি করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, দুই নেতা টেলিফোনে কথা বলেছেন। এ সময় ক্রাউন প্রিন্স বলেছেন- তিনি আশা করেন ট্রাম্প প্রশাসন আগে দেখা যায়নি এমন অর্থনৈতিক সুযোগ ও সমৃদ্ধি সৃষ্টি করতে সংস্কার করবেন। তবে ৬০ হাজার কোটি ডলারের সূত্র কি সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেননি মোহাম্মদ বিন সালমান। বলেননি এই অর্থ সরকারি নাকি বেসরকারি খাত থেকে আসবে। কীভাবে সেই অর্থ বিনিয়োগ হবে তাও বিস্তারিত বলেননি তিনি। ক্রাউন প্রিন্স যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলেছেন, যদি আরও সুযোগ আসে তাহলে এই বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। উল্লেখ্য, ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে সৌদি আরব সহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় করেছিলেন ডনাল্ড ট্রাম্প। বিশেষ করে ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল দহরম মহরম। সৌদি আরব সফরে এসে সেই সম্পর্ককে আরও জোরালো করেন দুই নেতা। ট্রাম্পকে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা দেয়া হয় সৌদি আরবে। তার মধ্যে তিনি সোর্ড ড্যান্স (তরবারি হাতে বিশেষ নাচ) দেন। বিমান বাহিনীর জেট বিমান ফ্লাইপাস্ট দেয় তাকে। ট্রাম্পের জামাই এবং সাবেক সহযোগী জারেড কুশনারের গঠন করা একটি প্রতিষ্ঠান এই দেশে বিনিয়োগ করেছে দুইশত কোটি ডলার। ওদিকে গত সোমবার শপথ নেয়ার পর ট্রাম্প বলেছেন, রিয়াদ যদি তার প্রথম মেয়াদের মতো করে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ হাজার কোটি ডলারের পণ্য কিনতে সম্মত হয়, তাহলে তিনি প্রথম কোনো বিদেশ সফর হিসেবে সৌদি আরব যাওয়ার কথা বিবেচনা করবেন। ২০১৭ সালে তিনি সৌদি আরব সফর করেছিলেন। সেদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন- গত টার্মে আমি সৌদি আরবে গিয়েছিলাম। কারণ, তারা আমাদের ৪৫ হাজার কোটি ডলারের পণ্য কিনতে রাজি হয়েছিল। আমি বলেছি, আবারো আমি এটা করবো। কিন্তু তাদেরকে মার্কিন পণ্য কিনতে হবে। তা কিনতে রাজি হতে হবে। প্রথম ক্ষমতার মেয়াদে সৌদি আরবকে প্রথমেই আমলে নিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি তাদেরকে ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও নিরাপদ অংশীদার হিসেবে দীর্ঘদিন পেয়েছেন। কিন্তু হোয়াইট হাউস থেকে ট্রাম্পের বিদায়ের পর রিয়াদ এবং ট্রাম্প টিমের মধ্যেও সম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে বিনিয়োগ, নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের দিক দিয়ে।
mzamin

সংস্কারে ঐকমত্য কীভাবে

১৫ই জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে সংস্কার প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে চার কমিশন। এ ছাড়া আরও দুই কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব জমা দেয়ার কথা ছিল ৩১শে জানুয়ারির মধ্যে। কিন্তু এরইমধ্যে সরকার প্রধান ছয় কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবের মেয়াদ বাড়িয়ে ১৫ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় দিয়েছে। উদ্দেশ্য- মৌলিক বিষয়গুলোতে আগে কমিশনগুলোর সমন্বয়। তারপর সেগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসবে সরকার। যার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সরকার যখন রাজনৈতিক ঐকমত্যের চেষ্টায় তখন এ ঐক্য আদৌ সম্ভব কি না তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ বিভিন্ন ইস্যুতে ইতিমধ্যে দলগুলো ও সরকারের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি মনে করে, সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনার অনেকগুলোই জটিলতা বাড়াবে। অন্যদিকে, জামায়াত এসব সংস্কার প্রস্তাবনার পক্ষে অবস্থান নিলেও কিছু কিছু বিষয়ে তাদেরও দ্বিমত রয়েছে। বাকি দলগুলোও মনে করে এসব প্রস্তাবনার অধিকাংশই বাস্তবসম্মত নয়। তাই জাতীয় ঐকমত্য গঠন প্রক্রিয়া জটিল হবে। তবে সরকার চাইছে দলগুলোকে নিয়ে সংস্কার বাস্তবায়ন করা। কারণ এটি জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা। প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যেও বিষয়টি বারবার উঠে আসে।

এদিকে সরকারের চাওয়া অনুযায়ী সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশমালা সমন্বয়ে কাজ শুরু হয়েছে। যেসব বিষয়ে একাধিক কমিশনের সুপারিশ আছে, সেসব বিষয় চিহ্নিত করে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করবে কমিশনগুলো। প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে ছয় কমিশন প্রধানকে নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। যেখানে সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. আলী রিয়াজ। এ কমিশন সংস্কার কমিশনগুলোর চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ করে সংস্কার কাজে হাত দেবে। সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, এটি রিপোর্ট পেলে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেও পাওয়া যেতে পারে। সরকারের চাওয়া অনুযায়ী, সংস্কার প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনার আগেই অংশীজনদের মধ্যে মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। যেটি সরকার ও রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র  আন্দোলনের নেতাদের বক্তব্যে তা স্পষ্ট।
গত সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংস্কার কমিশনের কার্যালয়ে মতবিনিময় করেন কমিশন প্রধানরা। বৈঠক শেষে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ইতিমধ্যে যে কমিশনগুলো তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, সেসব কমিশনের সুপারিশমালা পর্যালোচনা এবং সমন্বয়ের জন্য কমিশন প্রধানদের মতবিনিময় সভা হয়। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান প্রফেসর আলী রীয়াজ, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধানের পক্ষে বিচারপতি এমদাদুল হক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। কমিশন প্রধানরা নিজ নিজ কমিশনের দেয়া সুপারিশগুলোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন এবং এগুলোর ভেতরে ভিন্ন মত থাকলে সেগুলো চিহ্নিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। কমিশন প্রধানরা আশু ও দীর্ঘমেয়াদে সংস্কারের বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট করার বিষয়ে একমত হন।

গতকাল বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যেখানে দলটি মনে করে, কমিশনগুলোর অনেক প্রস্তাব জটিলতা বাড়াবে। চারটি বিভাগকে চারটি প্রদেশ করার ভাবনা এবং সংস্কার কমিশনের অনেক প্রস্তাব অপ্রয়োজনীয়। এতে অঞ্চলভেদে বিভিন্ন গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগকেও অপ্রাসঙ্গিক মনে করছেন দলটির নেতারা। বলেন, ৫ই আগস্টের পর পরই যদি এ ধরনের কোনো ঘোষণা আসতো তাহলে তখন এ বিষয়ে একটা রাজনৈতিক মতৈক্য তৈরি হতে পারতো। জানা গেছে, বৈঠকে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দিক থেকে শিগগির সংলাপের আশা করছে বিএনপি। স্থায়ী কমিটির নেতারা বলেন, রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারে বিএনপি ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব জাতির সামনে দিয়েছে। এরপরও বিএনপি সরকার গঠিত সংস্কার কমিশনকে সহযোগিতা করতে চায়। এজন্য ছয়টি সংস্কার কমিটিও গঠন করেছে দলটি। কী কী সংস্কার করা যেতে পারে- এ ব্যাপারে কমিশনের কাছে প্রস্তাব জমাও দিয়েছে তারা। বৈঠকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র নিয়ে আলোচনা হয়।

এ ব্যাপারে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না মানবজমিনকে বলেন, আমার মনে হয় না এটি বাস্তবায়ন হবে। জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা হবে না। সরকার যদি উদ্যোগ নিয়ে ভালো কিছু আগে থেকেই করতো তাহলে সেটা বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল। তারা বলছে, কোনো কিছু চাপিয়ে দেবেন না। এই সরকারের পাঁচ মাস হয়ে গেল, এখনো ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হয়নি। এই রিপোর্টের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঐকমত্য হবে বলে মনে করি না। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, তারা একটা প্রস্তাবনা জমা দিয়েছেন। এটি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনা প্রয়োজন। আমাদেরও কিছু প্রস্তাবনা ছিল। ডান, বাম বিভিন্ন ধরনের দল আছে- সবাইকে নিয়ে ঐকমত্যে আসা কঠিন। আমার মনে হয়, মিনিমাম কিছু বিষয়ে একমত হয়ে বাকি বিষয়গুলো গণপরিষদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার এক অনুষ্ঠানে বলেন, সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে যেসব বিষয়ে ঐকমত্যে আসা যাবে সেসব বিষয়ে সংস্কার করা হবে। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমরা নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যে প্রস্তাবনা দিয়েছি সেগুলো নিয়ে জটিলতার কোনো কারণ দেখছি না। অন্য কমিশনের বিষয় বলতে পারবো না। আমরা দলগুলোর নিবন্ধন, ভোটাধিকার, সীমানা, নির্বাচনী আচরণবিধি, অপরাধ, নির্বাচন ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশ করেছি। যেগুলো নিয়ে ঐকমত্য না হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে দেখছি না। 

mzamin

ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নতুন দল

আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। বলেন, দলের নাম নিয়ে শতাধিক নামের প্রস্তাবনা এসেছে। ইতিমধ্যে দেশের ২০০টি থানা কমিটি গঠন করা হয়েছে। জানুয়ারির মধ্যে ৪০০টি থানা কমিটি করা হবে। যেটি জনগণের কাছে এবং দলের মোটো ধারণ করতে পারবে- সেই নামটি রাখা হবে।

গতকাল বিকালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ মাঠে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। সংবিধান নিয়ে আখতার হোসেন বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের আগে দেশে যেসব নিয়ম-কানুন চলেছে এ দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না। আমরা দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কথা বলছি। এতে আমরা বুঝেছি ’৭২-এর সংবিধান দিয়ে দেশের মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়। এজন্য নতুন সংবিধান প্রয়োজন। যেখানে জনগণ ও রাষ্ট্রের নানা অঙ্গের ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে। তিনি বলেন, নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের উদ্যোগে শিগগিরই একটি রাজনৈতিক আবির্ভাব হবে। অন্তর্বর্তী সরকার পতিত, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ছাড়া সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে শিষ্টাচার বজায় রেখেছে। আমাদের ছাত্রদের মধ্য থেকে ৩ জন প্রতিনিধি রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে। তারা তাদের মতো কাজ করছে। রাজনৈতিক দল নিয়ে কাজ করছে নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। আমরা স্বতন্ত্র-স্বনির্ভর থেকে সংগঠনের কলেবর বৃদ্ধি করছি।

জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব বলেন, দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরির কারণে জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে নতুন রাজনৈতিক দল করা হচ্ছে। অনেকে বলছেন সরকারের অনুকূলে কোন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। যদি এমন বক্তব্য হয় তাহলে সেটি সকল দলের জন্য প্রযোজ্য, এককভাবে নাগরিক কমিটির জন্য নয়। তিনি আরও বলেন, দেশের নাগরিকদের অধিকাংশ তরুণ। তরুণরা এই সফলতাকে দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। তারা নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বে থাকবে এবং দলের প্রাণশক্তি হিসেবে কাজ করবে। এখানে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মেলবন্ধন ঘটানো হবে। সিনিয়ররা গাইড করবেন এবং তরুণরা কাজ করবে। তরুণদের চিন্তা ও ভাবনাকে পাশ কাটিয়ে রাজনীতি হতে পারে না।

সীমান্ত নিয়ে আখতার হোসেন বলেন, দেশের অনেক জেলায় বর্ডার আছে। কুড়িগ্রাম সীমান্তের কাঁটাতারে ফেলানীকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। আমরা এমন পরিস্থিতি আর দেশে দেখতে চাই না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তে দেশের মানুষের ওপর অন্যায়-অত্যাচারে মানুষ কাস্তে হাতে প্রতিহতের জন্য নেমে এসেছে। এই সাহস ও উদ্দীপনার মূলে রয়েছে দেশের পররাষ্ট্রনীতি। দেশের মানুষ কোনোভাবে নতজানু পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী নয়। সীমান্ত্তে হামলা হচ্ছে, একজন বিজিবি’র আঙ্গুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে এসেছে। দেশের সকল মানুষকে এ জন্য অভিবাদন জানাই। সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে, সীমান্ত্ত হত্যার ন্যায্যবিচার যেন নিশ্চিত করা হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত ও শহীদ পরিবার নিয়ে তিনি বলেন, এখন দেশে অনেক শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়নি। সরকারের এই ব্যর্থতার জায়গা থেকে যেন শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করে এবং আহতদের ঘরে ঘরে সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। আর যেন কোনো ভাই চিকিৎসার অভাবে মেডিকেলে শাহাদতবরণ না করে সে ব্যবস্থা সরকারকে নিতে হবে। এ নিয়ে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন কাজ করছে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আছে বলে জেনেছি। তিস্তা চুক্তি নিয়ে তিনি বলেন, বিগত সময়ে একাধিকবার তিস্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। উত্তরের মানুষের জন্য দ্রুত তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে। ভারতের চোখ রাঙ্গানি না দেখে, দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে তিস্তা সমস্যা সমাধান করতে হবে। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক কমিটির রংপুরের সংগঠক আলমগীর নয়ন, এম আলমগীর কবির, শেখ রেজওয়ান, এম আই সুমন, খন্দকার ময়নুল হক, রিফাত হাসান প্রমুখ। 

mzamin

ভুপাল কার্বাইডের বিষাক্ত বর্জ্য নিয়ে আতঙ্ক

পূর্বে ভুপাল পরবর্তীতে পিথারামপুর উভয় জায়গাতেই দেখা দিয়েছে ইউনিয়ন কার্বাইডের বিষাক্ত বর্জ্য নিয়ে আতঙ্ক। তিন সপ্তাহ আগে ভুপাল থেকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য ৩৭৭ টন বিষাক্ত বর্জ্য সরিয়ে নেয়া হয় ভারতের শিল্পএলাকা পিথারামপুরে। এরপর থেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সেখানকার বাসিন্দারা। ওই শহরে এই বর্জ্য পৌঁছে ৩রা জানুয়ারি। এদিনই সেখানে প্রতিবাদ বিক্ষোভ দেখা দেয়। তা থেকে ইটপাথর নিক্ষেপ করা হয়। কেউ কেউ নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আত্মাহুতির চেষ্টা করেন। এরপর থেকে ওই এলাকা জুড়ে পুলিশ টহল জোরদার করা হয়। কিন্তু বেশ কিছুদিন কেটে যাওয়ার পরও স্থানীয়দের আতঙ্ক প্রশমিত হয়নি। তারা মনে করছেন, এই বিষাক্ত পদার্থের কারণে তারা ভুগবেন। তবে এসব বর্জ্য থেকে পরিবেশ দূষণের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে আশ্বাস দিয়েছেন কর্মকর্তারা। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর প্রায় ১০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুুলিশ। এ তথ্য দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। উল্লেখ্য, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ ও কখনও ক্ষয় হয় না এমন রাসায়নিক পদার্থ ছাড়াও প্রায় পাঁচ ধরনের বিষাক্ত উপাদান ছিল ওই বর্জ্যে। কয়েক যুগ ধরে আশপাশের এলাকার পরিবেশ দূষিত করেছে এসব বর্জ্য। ফলে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি। তবে পিথারামপুরে আনা বিপজ্জনক ওই বর্জ্য থেকে পরিবেশ দূষণের সম্ভাবনা নেই বলে আশ্বাস দেয়া হয়েছে কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে। সিনিয়র কর্মকর্তা স্বতন্ত্র কুমার বলেন, ১২০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস (২,১৯২ ফারহেনাইট) তাপমাত্রায় তিন মাসে এসব বর্জ্য পোড়ানো হবে।

তিনি আরও বলেন, চার স্তরের ফিল্টারের মাধ্যমে ধোঁয়া শুদ্ধ করা হবে। দুই স্তরের পর্দার মাধ্যমে অবশিষ্টাংশ পোড়ানো হবে বলেও জানান তিনি। এছাড়া বিশেষ প্রক্রিয়ায় তা মাটিতে পোঁতা হবে। যাতে মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দূষিত না হয়। মধ্য প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবও এ প্রক্রিয়াকে নিরাপদ ও প্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করেছেন। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে ভিন্ন মত প্রদর্শন করছেন। সুবাশ সি পাণ্ডে বিশ্বাস করেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয় করা হলে এতে কোনো ঝুঁকি নেই। তবে শ্যামলা মানি ও অন্যরা ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বনের তাগিদ দিয়েছেন। মিস মানি জৈব অণুজীব ব্যবহার করে বর্জ্যের ক্ষতিকর পদার্থ ভেঙ্গে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছেন।

mzamin