Tuesday, October 8, 2013

আগুনের পরশমণি

পাষাণপুরীতে জেগে উঠছে প্রাণের স্পন্দন
আশি হাজারেরও বেশি ছেলেমেয়ে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে টেলিটকের সহযোগিতায় দেশব্যাপী আয়োজন করা হয়েছিল এই ছেলেমেয়েদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। গত শুক্রবার শেষ দুটো অনুষ্ঠান হলো ঢাকার অদূরে নন্দন পার্কে। এতে যোগ দিয়েছে প্রায় ১৫ হাজার ছাত্রছাত্রী। এর আগে এ রকম অনুষ্ঠান হয়েছে প্রতিটি জেলায়। রংপুরের অনুষ্ঠানে আমি গিয়েছিলাম। আর গিয়েছিলাম গাজীপুরের নন্দন পার্কের অনুষ্ঠান দুটোয়। এসব অনুষ্ঠানে গেলে, এই তরুণ মেধাবীদের আশা আর কৌতূহলে ভরা চোখগুলোর দিকে তাকালে আপনি নতুন উদ্যম লাভ করবেন, নতুন আশায় আপনার চেতনা যেন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল গণিত অলিম্পিয়াডের ছেলেমেয়েদের উদ্দেশে একটা কথা বলেন: মোবাইল ফোনের ব্যাটারি নিয়মিত চার্জ দিতে হয়। তেমনিভাবে আমাদের শরীরমনেরও চার্জ লাগে। এ রকম মেধাবী তরুণদের দেখলে আমরা সেই চার্জটাই যেন লাভ করি। এই ছেলেমেয়েরা দেশপ্রেমের শপথ নেয়।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ঘোষণা করে চিৎকার করে। মাদক আর মিথ্যাকে ‘না’ বলে। বাবা-মা, শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। মন দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে বলে প্রতিজ্ঞা করে। আর তারা ব্যক্ত করে তাদের জীবনের উদ্দেশ্য, মানুষের মতো মানুষ হওয়া। তারা সবাই ভালো মানুষ হতে চায়। আজকে বাংলাদেশে ৯৮ ভাগের বেশি ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়। আমাদের দেশে যত ছেলেমেয়ে নবম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ছে, পৃথিবীর অনেক দেশের লোকসংখ্যাই তার সমান নয়। নিউজিল্যান্ডের জনসংখ্যা ৪৪ লাখ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বেশির ভাগই তরুণ। এদের বেশির ভাগই লেখাপড়া করছে। শিক্ষা একটা পরশমণি। আলোর পরশমণি। এর ছোঁয়ায় মানুষ সোনা হয়ে যেতে পারে। সত্যিকারের আলোকিত মানুষ হয়ে উঠতে পারে। ধরা যাক বেগম রোকেয়ার কথা। রংপুরের মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দের এই মেয়েটির বাড়িতে বাংলা পড়া ছিল নিষিদ্ধ, ইংরেজি পড়া ছিল পাপ। মেয়েরা পড়বে, সেটা ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু বালিকার অপরিসীম আগ্রহ, সে পড়া শিখবে। ভাইয়ের কাছ থেকে চুপি চুপি সে লেখাপড়া শেখে।
সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, একা জেগে মেয়েটি বই পড়ে। ঘুমন্ত গৃহবাসীর যাতে ঘুম ভেঙে না যায়, তাই প্রদীপের আলো আড়াল করে একটা কার্ড দিয়ে। সেই মেয়েটি বাংলা শিখল, ইংরেজি শিখল। এত সুন্দর বাংলা শিখল যে তার বই অবরোধবাসিনী কিংবা মতিচূরের ভাষা আজও আমাদের মুগ্ধ করে। সে এত সুন্দর ইংরেজি শিখল যে সুলতানা’স ড্রিম নামে ইংরেজি বই লিখে ফেলল নিজেই। আর একটা হূদয় যখন আলোকিত হলো, সে আলো তো কেবল নিজের মধ্যে সীমিত রইল না, সে স্কুল প্রতিষ্ঠা করল, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রী আনার চেষ্টা করল। আজকে যখন বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তখন দেখি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী আর বিরোধী নেত্রী নারী, স্পিকার নারী, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অনেক মন্ত্রী নারী, তিনজন ছেলে এভারেস্টে উঠল তো দুজন মেয়েও উঠে গেল এভারেস্টে। ওই যে একটা হূদয় শিক্ষার পরশমণিতে হূদয় ছুঁয়েছিল, তারই ছোঁয়ায় আলোকিত হচ্ছে সারা দেশ, আজও। জানি, আমাদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হারও বেশি। জানি, আমাদের শিক্ষার পরিমাণগত বৃদ্ধি যতটা ঘটছে, গুণগত উৎকর্ষ নিয়ে আমাদের উদ্বেগও তত বাড়ছে। তবু বলি, শিক্ষা কাকে যে কীভাবে সোনার মানুষ করে তুলবে, আমরা কেউ জানি না। প্রত্যেক মানুষের ভেতরে একটা বিশাল সম্ভাবনা রয়ে গেছে। কেউ হয়তো অঙ্কে ভালো, কেউ সাহিত্যে, কেউ হয়তো বিজ্ঞানে, কারও বা আছে নেতৃত্বের গুণ, কারও আছে উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষমতা। কেউ ভালো ব্যবসায়ী হবে, কেউ বা হবে সমাজসেবক।
শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, তবে পরিমাণগত বিশালত্বও একটা বড় আশার কারণ। অনেক বড় হিমালয় পর্বতমালা আছে বলেই একটা এভারেস্ট শৃঙ্গ আছে। এত লাখ লাখ ছেলেমেয়ে আছে, এদের ভেতর থেকে অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষ তৈরি হবে, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। আবার এই বিশাল অঙ্কটাও আমাদের কাজে লাগবে। ২০ বছর পরে এই দেশের কৃষকেরা সবাই হবেন শিক্ষিত, শ্রমিকেরাও হবেন শিক্ষিত। এখনই কৃষকেরা বিপ্লব করে ফেলেছেন। মাছ চাষে বিপ্লব ঘটে গেছে, পোলট্রিতে বিপ্লব ঘটে গেছে, ধান থেকে আম—সর্বত্রই তো আমাদের কৃষকদের পরিশ্রম, সৃজনশীলতা আর মেধার চিহ্ন স্পষ্ট। ২০ বছর পরে এই বাংলাদেশটা একটা উন্নত বাংলাদেশ হবেই। আর এই মেধাবীরা যখন দেশের হাল ধরবে, তখন সব দিক থেকেই আলোয় আলোয় ভরে উঠবে বাংলাদেশ। প্রায় ৯০ লাখ বাংলাদেশি আজ ছড়িয়ে আছে সারা পৃথিবীতে, এই সংখ্যা আগামী ১০ বছরে তিন কোটি হবে বলে আমার বিশ্বাস। প্রবাসীদের পাঠানো টাকা, আমাদের শিল্প খাতের অর্জিত বিদেশি মুদ্রা, আমাদের সৃজনশীল কৃষকের উৎপাদনশীলতা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আমাদের তরুণ প্রজন্মের সাফল্য—সবটা একত্র করলে ২০ বছর পরের বাংলাদেশ একটা উন্নত, সম্পদশালী, আলোকিত বাংলাদেশ ছাড়া কিছুই নয়। আমাদের মাথাপিছু আয় তখন বৃদ্ধি পাবে অনেক গুণ।
আর ড. মোশতাক খানের তথ্যটায় আমি বেশ আস্থা পাই, মাথাপিছু আয় বাড়লে সুশাসনও আসবে। শুধু আমাদের রাজনীতিকে হতে হবে উন্নয়নবান্ধব। বাংলাদেশ নানা দিক থেকে এত ভালো করছে। নব্বইয়ের পরে গণতন্ত্রের আমলেও আমরা খুবই ভালো করেছি। এ জন্য উভয় দলের সরকারের দুই দুই চার মেয়াদের শাসনকালেরও কৃতিত্ব আছে। যেমন, বেগম জিয়ার সরকার মেয়েদের জন্য বৃত্তি চালু করেছিল, শেখ হাসিনার সরকার সেটাকে আরও জোরদার করেছে। মানব উন্নয়ন সূচকে আমরা অনেক ক্ষেত্রে ভালো করছি ভারতের চেয়েও, অমর্ত্য সেন বারবার সে কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ, আমাদের সরকার, আমাদের বেসরকারি সংস্থা—সবাই মিলেই দেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে গেছে। আবার আমাদের উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের দুর্নীতি, সুশাসনের অভাব এবং রাজনৈতিক দলাদলি। আমরা আরও কত উন্নতি করতে পারতাম, যদি হরতাল না হতো! আমরা আরও কত উন্নতি করতে পারতাম, যদি আমাদের লাভের গুড় দুর্নীতিতে খেয়ে না ফেলত। যদি দেশের টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার না করা হতো। যদি আমাদের আমলাতন্ত্র মানুষের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়াত!
দেশের জনসংখ্যার ৬০ ভাগ তরুণ। এরা আমাদের ছেলেমেয়ে। প্রত্যেক অভিভাবক—প্রত্যেক বাবা, প্রত্যেক মা সন্তানের আমরা ভালো চাই। তারা সুখে থাকুক, শান্তিতে থাকুক, নিরাপদ থাকুক, সেটা চাই। তাহলে দেশের যাঁরা অভিভাবক, এই ৬০ ভাগ তরুণসহ ১৫ কোটি মানুষের যাঁরা অভিভাবক, তাঁরা ঘুমান কী করে? তাঁরা কী করে এমন ভাব দেখান যে দেশের ভবিষ্যৎ যা-ই হোক না কেন, আমারটা আমি ছাড়ব না? আসলে আমাদের মনের মধ্যে গণতন্ত্র নেই। আমাদের মানসিকতার মধ্যে গণতন্ত্র নেই। একটা খুব খারাপ ধারণা আমাদের মনে বদ্ধমূল হয়ে আছে: দেশপ্রেমিক কেবল আমরাই, দেশের উন্নতি করার ক্ষমতা কেবল আমাদেরই আছে, কাজেই দেশের স্বার্থেই ক্ষমতা আমারই চাই। এই মানসিকতা মোটেও গণতান্ত্রিক নয়। ওদের চেয়ে আমরা দেশ ভালো বুঝি, রাজনীতি ভালো বুঝি, ওরা কী বোঝে, আর ওদের দেশপ্রেমই বা কই—এই মানসিকতা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের একটা উদাহরণই তো যথেষ্ট। বুশ জুনিয়র তো দ্বিতীয়বার কম ভোট পেয়ে আদালতের রায়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তার পরও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটরা সেই রায় মাথা পেতে নিয়েছিলেন। গণতন্ত্র মানে সরকার আর বিরোধী দল উভয়ে মিলেই দেশের ভালোর জন্য কাজ করে যাওয়া। এটা খুবই দুঃখজনক যে মেয়াদ শেষে একটা সর্বজনগ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া আমরা পেলাম না। নির্বাচন সামনে রেখে দেশে আবারও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা, সংঘাতের আশঙ্কা।
এই দ্বন্দ্ব-সংঘাত আমাদের উন্নয়ন ব্যাহত করবে। এই যে কোটি কোটি ছেলেমেয়ে স্কুলে যাচ্ছে, এই যে আট কোটি তরুণ জনগোষ্ঠী, তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমাদের উচিত হানাহানির পথ পরিহার করে সমঝোতার মাধ্যমে গণতন্ত্রের ঝান্ডা ঊর্ধ্বে তুলে ধরা। রংপুরের জিপিএ-৫ পাওয়া ছেলেমেয়েদের সংবর্ধনায় এক ছেলে এসেছিল, যার বাবা জেলে। সে রাতের বেলা মাছ ধরে, দিনের বেলা স্কুলে যায়। ঢাকায় প্রথম আলো অদম্য মেধাবীদের বৃত্তি প্রদানের একটা অনুষ্ঠান করেছিল ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগিতায়। সেখানেও আমরা দেখেছি, কত কষ্ট করে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করছে, আর ভালো করছে। আমরা সেই অনুষ্ঠানেই পেয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে, যাঁর পারিবারিক অবস্থা ছিল খুবই সঙিন, তার ভাষায়, ‘আমাদের ভাঙা ঘরে সূর্যের আলো তো ঢুকতই, চাঁদের আলোও ঢুকত, কুকুর-বিড়ালও ঢুকত।’ তাঁদের পরিবারে কেউ কোনো দিন লেখাপড়া করেনি। সেই ছেলে পড়াশোনায় ভালো করল, বৃত্তি পেল,
একসময় প্রথম আলোর অদম্য মেধাবী বৃত্তিও সে পেয়েছিল, অবশেষে সে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি তাই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে শিক্ষা একটা জাদুর কাঠি, যা মানুষকে জাগিয়ে তোলে, মানুষের ভেতরের অনন্ত সম্ভাবনাকে বিকশিত করে। আমাদের ছেলেমেয়েরা সেই জাদুর কাঠির ছোঁয়া পাচ্ছে। পাষাণপুরীতে জেগে উঠছে প্রাণের স্পন্দন। এই স্পন্দনেই আমাদের বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সুন্দর হয়ে উঠবে। কিন্তু নিকট ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তা তো বলতে পারছি না। বারবার নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছি, বাংলাদেশের মানুষের সৃজনশীলতার কোনো তুলনা হয় না, বর্তমান সংকট ঘোরতর বিপদে পরিণত হওয়ার আগেই নিশ্চয়ই কোনো সৃজনশীল সমাধান আমরা পেয়ে যাব। আশা করতে দোষ নেই। কিন্তু আশাকে বাস্তবে পরিণত করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরা যেন একটিবার ভাবেন, তাঁরা কেবল নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলছেন না, তাঁদের সঙ্গে ১৫ কোটি মানুষের নিয়তিও বাঁধা। শুভবুদ্ধির পরিচয়ই যেন তাঁরা দেন।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

ছারপোকা

ভারতের রাজনীতিতে এক বর্ণাঢ্য চরিত্র লালুপ্রসাদ যাদব। গত সিকি শতাব্দীতে তিনি বহুবার সংবাদ শিরোনামে এসেছেন। যখন তিনি বিহারের মুখ্যমন্ত্রী, তখন তাঁকে দেখা গেছে ধর্মপত্নী রাবড়ি দেবীর হাতে সেঁকা রুটি খাচ্ছেন রান্নাঘরে বসে। গরুর ওলান থেকে দুধও দোহায়েছেন নিজ হাতে। রাবড়ি দেবীর হাতের রুটি নয়, গত কয়েক দিন যাবৎ তিনি ঝাড়খন্ডের রাজধানী রাঁচির বীরসা মুন্ডা কেন্দ্রীয় কারাগারের কয়েদিদের হাতে বানানো রুটি খাচ্ছেন। ওই উঁচু প্রাচীরঘেরা স্থাপনার নিবাসী হিসেবে প্রথমে তাঁর নম্বর ছিল ৩৩১২। তিনি ভিআইপি, তাই এখন তাঁর কয়েদি নম্বর কমে হয়েছে ১৫২৮। প্রাচীরঘেরা ভবনে ঢুকে প্রথম রাতটি কেটেছে তাঁর চরম অস্বস্তিতে। বলতে গেলে বিনিদ্র। ছারপোকা তাঁকে ঘুমাতে দেয়নি।
যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁদের বাসভবন থেকে জেলখানার দূরত্ব খুবই কম। রাজনৈতিক কারণে জেলে যাওয়া কোনো অসম্মানজনক ব্যাপার নয়। কখনো কখনো জেলে গেলেই বরং গৌরব বাড়ে। জেলখানায় রাজার হালে থাকা যায়। রাজবন্দীদের ক্ষেত্রে আগে তাই ছিল। বেরোনোর দিন জেলগেটে প্রচুর ফুলের মালা পাওয়া যেত। কিন্তু দুর্নীতির মতো অপরাধ করে জেলে যাওয়া গ্লানিকর। ছারপোকার কামড়ের চেয়ে অসম্মানের দংশন অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক। ছারপোকা অতি ক্ষুদ্র প্রাণী। কিন্তু প্রাণী বটে! প্রাণী হিসেবে ছারপোকার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই, যা অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে লক্ষ করা যায় না। এক. কামড়ে মানুষকে কষ্ট দেয়। ছারপোকার সূক্ষ্ম দংশন এমন যন্ত্রণাদায়ক, যা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউ টেরও পায় না। (রাজনীতিকেরাও ক্ষমতায় গিয়ে বা না গিয়েও জনগণকে এমন যন্ত্রণা দেন, যার কিছু দেখা যায়, কিছু থাকে অদৃশ্য।) দুই. ছারপোকা শুধু কামড়ায় না, মানুষের রক্ত শোষণ করে।
রক্ত চুষে পেট ফোলায়। (রাজনীতিকেরাও জনগণের রক্ত অর্থাৎ তাদের অর্থ ও সম্পদ শোষণ করে মোটাতাজা হন ছারপোকার মতো।) তিন. ছারপোকা একটি দুর্গন্ধময় প্রাণী। (পেশাজীবী হিসেবে রাজনীতিকদের শরীরে কোনো দুর্গন্ধ আছে তা আমরা কস্মিনকালেও বলব না। বরং দামি সেন্ট ব্যবহার করার ফলে তাঁদের শরীর থেকে ভুরভুর করে তীব্র সুগন্ধই বের হয়।) লালুপ্রসাদ জেলে গেছেন অনেক দিন আগের এক অপরাধে। অনেক দেশ আছে, যেখানে হাতেনাতে ধরা পড়লেও হাজতে যাওয়া তো দূরের কথা, পদটি পর্যন্ত যায় না। কর্তৃপক্ষ তার লোমটিও স্পর্শ করার প্রয়োজন মনে করে না। সাবেক রেলমন্ত্রী, তার আগে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, লালুপ্রসাদকে সিবিআই আদালত বহু বছর আগের পশুখাদ্য দুর্নীতিতে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। সিবিআই আদালত তাঁকে ছেড়ে দিয়ে তাঁর আরদালি, ড্রাইভার, পিএ, অফিসের কেরানি বা বাড়ির দারোয়ানকে পাকড়াও করেননি। এই দুনিয়ার কোনো কোনো দেশ হলে তা-ই করত। যেসব দেশে আইনের শাসন নয়—ব্যক্তির শাসন, সেখানে যেকোনো রকমের দুর্নীতি, বস্তা বস্তা টাকা চুরি-চামারি, দু-পাঁচজনকে খুনখারাবি করেও বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায়। গোলটেবিলে কষে নীতিকথামূলক বক্তৃতা দেওয়া যায়। ভারতে বহু মন্ত্রী, সাংসদ, পদস্থ কর্মকর্তা জেলের ভাত খেয়েছেন এবং খাচ্ছেন। অন্যান্য দেশেও। তবে কোনো কোনো দেশে একজন সাংসদের গাড়িতে, সাংসদের পিস্তলে তাঁরই কোনো সহকর্মী খুন হলেও থানা-পুলিশের সাধ্য নেই সাংসদকে আটক করার।
কোনো কোনো দেশে দুর্নীতি তো কোনো ব্যাপারই নয়। সেসব দেশে দুর্নীতি দমন বিভাগের কাজ দুই রকম। সরকারি দলের দুর্নীতিবাজদের জন্য একটি উদার শাখা। এই শাখার কাজ তাদের দুর্নীতি যত ধামাচাপা দেওয়া যায়। অভিযুক্তকে সাজা না দিক, তাদের ডেকে যে জিজ্ঞেস করবে সে মুরোদটুকু পর্যন্ত নেই। বিরোধী দলের জন্য আর একটি শাখা। এটি বড়ই কঠোর। খুবই নির্মম। এখানে লোকবল বেশি। কাজের চাপও প্রচণ্ড। অনেক রাত অবধি কর্মকর্তাদের কাজ করতে হয়। যেসব গণতান্ত্রিক দেশে আইনের শাসন রয়েছে, সেখানে সরকারেই থাকুন আর সরকারের বাইরেই থাকুন, যিনি যত বড়ই হোন, অপরাধ ও দুর্নীতি করে পার পান না কেউ। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিছু সময়ের জন্য বাঁচা গেলেও পাঁচ-দশ বছর পরে হলেও ধরা পড়তেই হবে। বিচার হবে। সাজা হবে, জেলের শয্যায় শুতে হবে। ছারপোকার কামড়ও খেতে হবে। লালুপ্রসাদের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে। বসে বসে খাওয়া আর ঘুমানো চলবে না। যত জনপ্রিয় নেতাই হোন, কিছু শ্রম দিতে হবে। ওই কারাগারে শিক্ষিত কয়েদি আছেন অনেকে। লালুপ্রসাদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স। তাঁকে দিয়ে কয়েদিদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ানোর কথা ভাবছে জেল কর্তৃপক্ষ। এথিকস বা নীতিশাস্ত্র পড়ানোর দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হবে না। তাঁর যোগ্যতা-দক্ষতা যথেষ্ট। ভাড়া না বাড়িয়েও তিনি ভারতের রেলওয়েকে লাভজনক করেছিলেন। সুতরাং ছারপোকা নির্মূলেও তিনি একটি ভূমিকা রাখতে পারেন।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

দুদক আইন কি পাস হবে না?

আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ গত ২৪ সেপ্টেম্বর পিআইবির এক অনুষ্ঠানে বলেন, সংসদের চলতি অধিবেশনেই ২০০৪ সালের দুদক আইনে সংশোধনী আনা হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত সংসদে বিল ওঠেনি। ‘নখদন্তহীন’ হিসেবে দুদক মিডিয়ায় আলোচিত। এটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে অপারগ। এর বড় কারণ এর প্রয়োজনীয় আইনি শক্তি নেই। একাধিক কমিটি তিন বছর ধরে কাজ করেছে, সুপারিশমালাও পেশ করেছে। কিন্তু তা বিল আকারে সংসদীয় কমিটিতে পড়ে আছে। এটি প্রস্তাবিত আকারে পাস হলে দুদক সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থা হবে। উদাহরণ দিই। বিদ্যমান আইনে সাক্ষীর প্রতি সমনের কথা আছে। আর প্রস্তাবে সাক্ষীর প্রতি নোটিশের কথা বলা হয়েছে। সাক্ষীর প্রতি সমন আদালতের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‌্যাবের মহাপরিচালক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে ঘোষিত এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দুর্নীতি সম্পৃক্ত যেকোনো তথ্য চাইতে পারা দুদকের শক্তির অপার উৎস।
বিলে এসব সংস্থা দুদককে সব তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে মর্মে কথা আছে। তারা যথাসময়ে তথ্য না দিলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে দুদক। দুদকের অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা ও চার্জশিটে আনীত অপরাধের ধরন হবে আমলযোগ্য, অ-আপসযোগ্য ও জামিনের অযোগ্য। বর্তমানে দুদক আইনে এ বিধান নেই। বিলে দেশ-বিদেশে সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের সম্পত্তি রাখা এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা আছে। এটি আইনে পরিণত হলে এনবিআর, পুলিশ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, ব্যাংক ও ভূমি অফিসের কাছ থেকে দুর্নীতির বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য মিলবে। কমিশন হবে একটি স্বশাসিত সংস্থা। দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তকাজের সুবিধার জন্য সরকারের অধীন যেকোনো কর্তৃপক্ষ বা সংস্থা থেকে যেকোনো প্রতিবেদন বা তথ্য চাইতে পারবে। এমনকি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও পারদর্শী এক বা একাধিক কর্মকর্তার সহায়তাও চাইতে পারবে। বিদ্যমান আইনের কারণে দুদকের কাছে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তি দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করতে ভরসা পাচ্ছে না। কারণ, তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় গোপন রাখার রক্ষাকবচ নেই। দুদককে আদালতের মামলায় ‘পক্ষভুক্ত’ করার বিষয়টি বিরাট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কারণ, তাকে পক্ষভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা না থাকায় আসামিরা অন্যায্য সুযোগ নিয়ে থাকেন। নতুন সংশোধনী পাস হলে এটা আর ঐচ্ছিক বিষয় থাকবে না। দুদককে একদম না শুনে কারও জামিন কিংবা অন্য কোনো প্রকার প্রতিকার মিলবে না। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দুটি রায়ে দুদককে প্রয়োজনীয় পক্ষ হিসেবে অভিহিত করেছেন। দুদককে শুনতেও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। দুদক আইনের তফসিল থেকে দণ্ডবিধির ৪০৮ ধারা বাতিল করা জরুরি। এটি কর্মচারী কর্তৃক অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গকরণ-সংক্রান্ত। দণ্ডবিধির ৪০৮ ধারাটি দুদক আইন ২০০৪ আগে আপসযোগ্য ছিল। তবে আপস চাইলে আদালতের অনুমতি লাগবে। যেমন একজন কর্মচারী তাঁর মালিক বা প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের দায়ে অভিযুক্ত হলেন। এরপর তিনি যদি আদালতে বিচার চলাকালে দোষ স্বীকার করে মেরে দেওয়া টাকা ফেরত দিতে চান, তাহলে আদালতের অনুমতি নিয়ে মামলাটি আপস করা যেত। মামলার বাদী তাঁর টাকা ফেরত পেলে তাঁরও কোনো অভিযোগ থাকত না। কিন্তু এখন আর তেমন অবস্থায় মামলাটি আপসের কোনো সুযোগ নেই।
বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিশেষ আদালতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলার বিচারকাজ চলছে দণ্ডবিধির ৪০৮ ধারায়। মামলার বাদী আত্মসাৎ করা টাকা ফেরত পেলে তিনি মামলায় সাক্ষ্য দিতে চান না। মামলার তদবিরও করতে চান না সংগত কারণেই। কিন্তু দুদক যদি মামলা প্রমাণ করতে পারে, তাহলে সাজা নিশ্চিত। কিন্তু এ কেমন আইন, টাকাও ফেরত দিতে হবে আবার সাজাও খাটতে হবে। অপার সম্ভাবনাময় এ দেশটি যে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নসূচকে পৌঁছতে পারছে না, তার মূলে রয়েছে দুর্নীতি। দুর্নীতির কারণে শুধু দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে না, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও নষ্ট হচ্ছে আমাদের ভাবমূর্তি। এর লাগাম টানতে সদুপদেশ খুব একটা কাজে আসবে না। এ জন্য চাই দুর্নীতি দমনে শক্তিশালী সংস্থা। দুর্নীতি দমন ব্যুরোকে একটি কমিশনে রূপান্তর ঘটানোর পর সংস্থাটি যখন দুদক নাম ধারণ করেছিল, তখন সবাই আশাবাদী হয়ে উঠেছিল এই ভেবে যে এবার একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে দুদক দুর্নীতি দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সমর্থ হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। দুদক আইনে উপযুক্ত সংশোধনী আনা জরুরি।
চলতি সংসদের শেষ অধিবেশনেও যদি আইনটি পাস না হয়, তা হবে দুর্ভাগ্যজনক। আশা করব, আইনপ্রণেতারা কয়েকটি নতুন বিষয় বিবেচনায় নেবেন। কমিশনারদের মেয়াদ চার বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছর হওয়া উচিত। আর যে সংশোধনী না আনলেই নয়, সেটি হলো কমিশন চেয়ারম্যান এবং কমিশনারদের মধ্যকার বৈষম্য দূর করা। বর্তমান আইনে অনেক ক্ষেত্রে কমিশনারদের চেয়ারম্যানের অধীন করা হয়েছে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, চেয়ারম্যানসহ প্রত্যেক কমিশনারই আধা সাংবিধানিক পদমর্যাদায় আছেন। তাঁদের প্রত্যেকের জবাবদিহি কার্যত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে নিশ্চিত করা আছে। তাঁদের নিয়োগও অভিন্ন বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঘটছে। অথচ আইনের একটি অদ্ভুত বিধান হলো চেয়ারম্যান সার্বিক তত্ত্বাবধান করবেন আর কমিশনাররা প্রশাসনিক বিষয়ে চেয়ারম্যানের কাছে জবাবদিহি করবেন। প্রশাসনিক বিষয়ের সংজ্ঞা বিদ্যমান আইনে নেই। এই বিধান কমিশনারদের স্বাধীনতার জন্য অস্বস্তিকর। এটি অপ্রয়োজনীয় মনস্তাত্ত্বিক বাধা।
খুরশীদ আলম: প্যানেল আইনজীবী, দুদক।

ভর্তি-শৃঙ্খলা ফিরবে কবে

আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি-প্রক্রিয়ায় এখনো শৃঙ্খলা আসেনি। সে কারণে বিভিন্নভাবে ভর্তি পরীক্ষার্থীরা ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। ক্ষতিগুলো অব্যবস্থাপনাজনিত কারণেই হয়ে থাকে। এটা দূর করতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আন্তবিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত চেষ্টা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে যেসব ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা রয়েছে, সেগুলো দূরীকরণে কার্যকর সিদ্ধান্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, তাঁদের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ যেটি হয়, তা পালনের চেষ্টা করা। প্রতিবছর সব উপাচার্য আলোচনা করে তারিখ নির্ধারণ করেন। প্রায় কোনো বছরেই এই তারিখ মেনে সব বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা নিতে পারে না। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সকালে ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করে বিকেলে পরিবর্তন করেছে। যদি কোনো কারণে নির্দিষ্ট তারিখে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে অবশ্যই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা একই দিনে হয়—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। গত বছরগুলোয় একই দিনে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিংবা এমন দূরত্বে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা হয়েছে যে একটিতে অংশ নেওয়ার পর অন্যটিতে অংশ নেওয়া সম্ভব হয় না।
ভর্তি পরীক্ষার ফরম বিক্রির সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন হার নির্দিষ্ট হওয়া জরুরি। ভর্তি ফরমের মূল্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের এতটাই পার্থক্য থাকে, যেটি খুবই অশোভন। ভর্তি-ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভর্তি ফরমের মূল্য ঠিক করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার পর কোনো শিক্ষার্থী যদি ভর্তির সময়সীমার মধ্যে ভর্তি বাতিল করেন, তাহলে ভর্তির সময়ে গৃহীত সমুদয় অর্থ সেই প্রার্থীকে ফেরত দেওয়া প্রয়োজন। কেননা, একজন শিক্ষার্থী হয়তো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে ভর্তি হলেন, পরে পরীক্ষা হওয়ার কারণেই হোক আর অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার কারণেই হোক, তিনি হয়তো তুলনামূলক ভালো কোথাও ভর্তির সুযোগ পেলেন; সেই ক্ষেত্রে তাঁর ভর্তির টাকা ফেরত পাওয়াটা তাঁর অধিকার। তিনি তো ভর্তি বাতিল করলে সেই আসনে অন্য একজন ভর্তি হবেন। একই আসনে দুজনের ভর্তির টাকা নেওয়া অযৌক্তিক। একটি মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন পরিবারের শিক্ষার্থীর কাছে এটা অনেক বড় বিষয়। ভর্তি পরীক্ষা থেকে যে আয় হয়, তার ৪০ শতাংশ টাকা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ আয় বলে গণ্য করে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা থেকে সরকার অভ্যন্তরীণ আয় না করলে ভর্তি পরীক্ষার সময়ে ভর্তি ফরমের মূল্য কম করা সম্ভব। যে শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতেই পারলেন না,
তাঁর কাছে ফরম বিক্রি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ আয় বৃদ্ধি করা অনেকটা অমানবিকও বটে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যেসব ক্যাম্পাস বৈধ নয়, সেগুলো যাতে ভর্তি-প্রক্রিয়া চালাতে না পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতখানি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, তাও নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ইচ্ছামতো যাতে সেমিস্টার বাবদ অর্থ নিতে না পারে, সে ব্যবস্থা করা জরুরি। সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে না হলেও কয়েকটিতে ভর্তি পরীক্ষায় সরকারের তদারকি প্রয়োজন। যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নির্ধারিত সময়ে তাদের নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে ব্যর্থ হয়েছে, সেগুলোতে এ বছর ভর্তি বন্ধ রাখা উচিত। বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় ভর্তির শর্তপূরণে ব্যর্থ শিক্ষার্থীরা যাতে ভর্তি হতে না পারেন, সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের তৎপর হওয়া প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বাংলা বিভাগ খোলা প্রসঙ্গে ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে আমরা খুব সরব থাকলেও তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। তাই ভর্তির আগেই সে-বিষয়ক নির্দেশনা জরুরি। দেশের সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন কোর্স বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতার সময়টা প্রার্থীদের কাছে এতটাই কঠিন যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে বরিশাল এবং সেখান থেকে রংপুরে তাঁদের ছুটতে হয়। কখনো কখনো ভর্তি পরীক্ষার্থীরা বাস রিজার্ভ করে ছুটতে থাকেন এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁদের কষ্ট লাঘব করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ইউনিটভিত্তিক অনেক দিন পর পর পরীক্ষা না নিয়ে দুই দিনের মধ্যে শেষ করা প্রয়োজন। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় একাধিক ইউনিটে পরীক্ষার জন্য আলাদা আলাদা সময়ে ঢাকায় যেতে হয়। অথচ পরীক্ষা যদি সকাল-বিকেল ও ধারাবাহিক প্রতিদিন নেওয়া হয়, তাহলে প্রার্থীদের এক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষার জন্য অর্থ ও সময় ব্যয় করে হরতালের বাংলাদেশে বারবার ছুটতে হয় না। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া যাবে না, এমনটাও ঠিক নয়। পিএসসির যে পরীক্ষা হয়, তার মধ্যে বিসিএস লিখিত পরীক্ষাগুলো ছুটির দিন ছাড়াই হয়।
প্রয়োজনে অঞ্চল ধরে পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা যেতে পারে। যেমন রাজশাহীতে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য চট্টগ্রামের একজন পরীক্ষার্থীকে দুবার যেতে হয়। যদি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর পর পরীক্ষা হতো, তাহলে যাঁরা দূর থেকে দুবার রাজশাহীতে যান, তাঁদের দুবার যেতে হতো না। একইভাবে ঢাকায় যতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা হবে, সব কটিতে যদি একটির পর অন্যটি হয়, তাহলে ভর্তি পরীক্ষার্থীদের অনেক সময়-অর্থ-শ্রম সাশ্রয় হবে। শিক্ষার্থীদের সময়-অর্থ-শ্রম সাশ্রয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তৎপর হলে সম্মান শ্রেণীর ভর্তি-প্রক্রিয়ায় অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। যে অব্যবস্থাপনা এ বছর দূর করা সম্ভব, তা এ বছরেই দূর করা উচিত। আর যেগুলো এ বছর সম্ভব নয়, সেগুলো আগামী বছর ভর্তি-প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই দূরীকরণে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

পাকিস্তানে জঙ্গিদের হাতে পরমাণু অস্ত্র! by আসিফ রশীদ

পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা এখন নিত্যঘটনা। এমন কোনো দিন নেই যেদিন দেশটির কোথাও না কোথাও বোমা হামলায় প্রাণহানি না ঘটছে। এসব ঘটনার জন্য পাঞ্জাবি তালেবান নামে পরিচিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও তাদের মিত্র সংগঠনগুলোকে দায়ী করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের তৎপরতা এতই বেড়েছে যে, দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত উদ্বিগ্ন। উল্লেখ্য, পাকিস্তানে পারমাণবিক অস্ত্র প্রকল্প গড়ে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্রেরই গোপন সহায়তায়। পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ- সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, সোয়াত উপত্যকায় বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং ওয়াজিরিস্তান ও ফাতা অঞ্চলে পশতুনদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিষয় সামনে এসেছে। তা হল, প্রশিক্ষিত জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলো অথবা সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে তাদের লোকরা এখন দেশটির পারমাণবিক, জীবাণু ও রাসায়নিক অস্ত্রের দিকে নজর দিতে পারে। গত ৪ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলো সে দেশের পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, পাকিস্তানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোয় পাঞ্জাবি তালেবান ও অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের সম্ভাব্য হামলার বিষয়টি পেন্টাগন ও সিআইএকে ভাবিয়ে তুলেছে। এর আগে ৯ আগস্ট নিউইয়র্ক টাইমসে বলা হয়, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী হঠাৎ করেই দেশের সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর সম্ভাব্য তালেবান হামলার ব্যাপারে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। কারণ তালেবান ও তার মিত্ররা দেশের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে নাশকতা চালানো এবং বোমা হামলার পরিকল্পনা করছে।
উদ্বেগের আরেকটি কারণ হল পাকিস্তানের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় কালোবাজারে পরমাণু সামগ্রী সহজলভ্য হয়ে ওঠা। জঙ্গিরা পরমাণু অস্ত্র ও এ-সংক্রান্ত প্রযুক্তি পেলে তার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। আসলে নব্বইয়ের দশকেই পাকিস্তান পরমাণু সামগ্রীর চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েছিল। দেশটির পরমাণু বিজ্ঞানীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব কারণে কিছু সামরিক ও পরমাণু বিশেষজ্ঞ পারমাণবিক নিরাপত্তার ব্যাপারে দেশটির ওপর আস্থাশীল নন। পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং ডিভিশনের মহাপরিচালক লে. জেনারেল কিদওয়াই একবার বলেছিলেন, সারাদেশে ১৫টি আণবিক প্রকল্পে কাজ করছেন ৭০ হাজারেরও বেশি বিশেষজ্ঞ। তাদের মধ্যে রয়েছেন ৮ হাজার সুপ্রশিক্ষিত বিজ্ঞানী। তাদের মধ্যে আবার ২ হাজারেরও বেশি বিজ্ঞানী এ বিষয়ে সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারী। এসব বিজ্ঞানীর একটি অংশ জঙ্গিদের পক্ষে কাজ করলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
আফগানিস্তানে যখন তালেবান সরকার ছিল, সে সময় আল কায়দা পাকিস্তানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য সহায়তা চেয়েছিল। পাকিস্তানি বিজ্ঞানী সুলতান বশিরউদ্দিন মাহমুদ এবং চৌধুরী আবদুল মজিদ তালেবান ও আল কায়দাকে সহায়তা করতে চেয়েছিলেন। তারা ২০০১ সালের আগস্টে বিন লাদেনের সঙ্গে দেখা করেন এবং আফগানিস্তানে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের অবকাঠামো নিয়ে আলোচনা করেন। ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ এসব জঙ্গি সংগঠনকে নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন। কারগিল যুদ্ধেও তাদের ব্যবহার করা হয়। এ যুদ্ধে দু’শরও বেশি আফগান তালেবান যোদ্ধা প্রাণ হারায়। এ ঘটনা তালেবান ও জঙ্গিদের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি অংশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টিও প্রমাণ করে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে জঙ্গিবাদীদের অনুপ্রবেশের ব্যাপারে নীতিনির্ধারক ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই চিন্তিত। আশংকা করা হয়, সেনাবাহিনীর ভেতরে কিছু জঙ্গি উপাদান পাঞ্জাবি তালেবান ও অন্যান্য সংগঠনকে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় হামলা চালানোর বিষয়ে সহায়তা করতে পারে। পাকিস্তানের জঙ্গিবাদ, তালেবানিকরণ এবং সন্ত্রাসবাদ ‘রফতানি’ আফগানিস্তানেও অস্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় উৎস। ইতিপূর্বে করাচির নৌঘাঁটি, রাওয়ালপিন্ডির ওয়াহ অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি, সারগোদার দেরা গাজি খান পারমাণবিক কেন্দ্র এবং কামরার অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সে এসব সংগঠনের কমান্ডো স্টাইলের হামলায় বোঝা যায়, পাকিস্তানের নিরাপত্তা অবকাঠামো বেশ দুর্বল এবং সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদে জঙ্গিবাদীদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ২০১১ সালের ২২ জুন ব্রিগেডিয়ার আলী খানকে গ্রেফতার করা হয় জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে। তার স্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে নিশ্চিত করেন, ওসামা বিন লাদেন হত্যা এবং ওয়াজিরিস্তানে ড্রোন হামলার বিরোধী ছিলেন আলী খান। আইএসপিআরের (পাকিস্তান) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আতহার আব্বাস এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সেনাবাহিনীতে জেহাদি মতবাদের প্রবণতা এবং সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে এর সম্পৃক্ততা সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ থেকেও বোঝা যায়, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে জঙ্গিবাদের উপাদান রয়েছে।
পাকিস্তানের জঙ্গিবাদ বিশেষজ্ঞ মুসা খান জালালজাই এক নিবন্ধে লিখেছেন, পাঞ্জাবি তালেবান ও তাদের মিত্ররা ইতিমধ্যেই সশস্ত্র বাহিনীর সদর দফতরে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলায় পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রকল্প, গবেষণা চুল্লি এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ প্রকল্পগুলো যে কোনো সময় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতিপূর্বে পাকিস্তানের বিভিন্ন পারমাণবিক কেন্দ্রে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় এটা স্পষ্ট যে, পাঞ্জাবি তালেবান ও অন্যান্য জঙ্গি সংগঠন সশস্ত্র বাহিনীতে তাদের মিত্রদের সহায়তায় পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোয় প্রবেশে সক্ষম। এছাড়া হামলার মাধ্যমেও এসব কেন্দ্রে প্রবেশ করা সম্ভব হতে পারে। ২০১১ সালে ইসলামাবাদ থেকে ২৫ মাইল দূরে অবস্থিত মিনহাস বিমান ঘাঁটিতে এক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামলা চালিয়েছিল, যেখানে একশ’রও বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড মজুদ ছিল। ওই সংঘর্ষে এক সৈন্য ও আট সন্ত্রাসী নিহত হয়।
পাকিস্তান ১৫ বছর আগে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তার পারমাণবিক অস্ত্রের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনও দুর্বল। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, পাকিস্তানে পারমাণবিক অস্ত্রগুলো সিআইএ’র কাছ থেকে লুকানোর জন্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়ার কাজ চলে খুবই নিম্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থাধীনে, ভ্যানের মাধ্যমে। পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর কাছে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম সামরিক নিরাপত্তা আচ্ছাদিত বাহন না থাকাই এর কারণ বলে মনে করা হয়।
২০১০ সালে বেফার সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের এক সমীক্ষায় পাকিস্তানের সামরিক ভাণ্ডার জঙ্গিবাদীদের দ্বারা বড় ধরনের হুমকির সম্মুখীন বলে সতর্ক করে দেয়া হয়। খ্যাতনামা পাকিস্তানি বিজ্ঞানী ড. পারভেজ হুদভয় সতর্ক করে দিয়েছেন, সেনাবাহিনীর ব্যারাকগুলোয় জঙ্গি মতবাদ ছড়িয়ে পড়ায় দেশের পারমাণবিক অস্ত্র জঙ্গিরা ছিনিয়ে নিতে পারে।
তবে পাঞ্জাবি তালেবান ও তাদের মিত্ররা এখনই ক্ষুদ্রাকৃতির অনুন্নত পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে বলে অনেক পাকিস্তানি বিশেষজ্ঞ মনে করেন। এর অর্থ হল, এসব অস্ত্র ইতিমধ্যেই জঙ্গি সংগঠনগুলোর হাতে এসেছে। ২০০৯ সালের ১৬ মে একটি ইসরাইলি ওয়েবসাইটে বলা হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে অবস্থিত পারমাণবিক কেন্দ্রটি ‘ইতিমধ্যেই আংশিকভাবে’ ইসলামি জঙ্গিদের হাতে চলে গেছে। এ তথ্য সত্য হয়ে থাকলে তা ভাবনার বিষয় বৈকি!
জঙ্গিরা পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে নানাভাবেই। কমান্ডো স্টাইলের হামলা হলে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়বে। কোনো পরমাণু চুল্লির ওপর বিমান বিধ্বস্ত করে হামলা চালানো হতে পারে। সাইবার আক্রমণও চালানো হতে পারে। সব ক’টিরই পরিণতি হবে ভয়াবহ। পাকিস্তানের পারমাণবিক কেন্দ্রে একটি ছোট হামলাও দেশটির চেহারা পাল্টে দেবে। বস্তুত পারমাণবিক অস্ত্র ও এ-সংক্রান্ত প্রযুক্তি সন্ত্রাসবাদীদের হাতে আসা শুধু সে দেশের জন্য নয়, বহির্বিশ্ব বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও হুমকিস্বরূপ। কারণ জঙ্গি সংগঠনগুলোর রয়েছে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। যেহেতু পারমাণবিক অস্ত্র পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাধীনে নেই, সেহেতু পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে জঙ্গি-সমর্থক জেনারেলরা কখনও ক্ষমতা দখল করলে স্বভাবতই অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। কারণ তাদের তীব্র পাশ্চাত্য ও ভারতবিরোধী নীতির কারণে তারা এসব অস্ত্র ব্যবহারে তৎপর থাকবেন। বিশেষ করে যুদ্ধ হলে এক্ষেত্রে কোনো চেইন অব কমান্ড কাজ না করায় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বেশি।
পাকিস্তানি তালেবান গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কমান্ডিং পদ দখল করতে না পারলেও তারা শক্তি প্রয়োগ করে অথবা সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে তাদের লোকদের মাধ্যমে কোনো একটি পারমাণবিক স্থাপনার একটি ওয়ারহেড নিজেদের দখলে নিতে পারে। তখন তারা এর দ্বারা পাকিস্তান এমনকি বিশ্বকেও ব্ল্যাকমেইল করতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে সামনের দিনগুলোয় পাকিস্তানকে দীর্ঘমেয়াদি উৎকণ্ঠার সময় কাটাতে হবে বলেই মনে হয়।
আসিফ রশীদ : সাংবাদিক ও লেখক

শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন চাই by ধীরাজ কুমার নাথ

নির্বাচন নিয়ে ভাবনা শুরু হয়েছে প্রায় সব মহলেই। নির্বাচন হবে কী হবে না, হলে কেমন হবে, কোন দল ও জোটের জনসমর্থন কেমন- কত কথা ভাবছে জনগণ! একই সঙ্গে বিতর্ক শুরু হয়েছে ২৫ অক্টোবর পরবর্তী সরকারের কাঠামো এবং ২৪ জানুয়ারির আগে কখন নির্বাচন হবে- এসব নানা বিষয়ে। রাজনীতিকরাও নির্বাচন নিয়ে বিবিধ ভাবনায় বিভোর। যে যেমন ভাবছে, তেমনই বলছে। আশংকা ও অনিশ্চয়তার মাঝে দোদুল্যমান দেশবাসী। বাংলাদেশের সংবিধানের সপ্তম ভাগে ১১৮ থেকে ১২৬ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং কমিশনের দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ আছে। নির্বাচন কমিশন হচ্ছে সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি সংস্থা, যা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার একমাত্র অভিভাবক। এছাড়াও নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা প্রণয়ন, রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধীকরণ, নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ভোটার তালিকা প্রণয়ন, নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ ইত্যাদি কমিশনের দায়িত্ব। সংক্ষেপে বলা যায়, দেশের শাসনভার কাদের হাতে ভবিষ্যতে অর্পিত হতে পারে, তার নিয়ামক হচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
কমিশনের পৃথক সত্তাকে প্রোজ্জ্বল করার লক্ষ্যে সরকার ২০০৯ সালে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় অ্যাক্ট বা আইন প্রণয়ন করে কমিশনের সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করে। এভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত করা হয় নির্বাচন কমিশনকে। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের ১০টি আঞ্চলিক অফিস, বিভাগীয় সদর দফতরে ৭টি এবং জেলা সদরে ৩টি কার্যালয় আছে। প্রায় ৮৩টি নির্বাচনী অফিস ৬৪টি জেলায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সংক্ষেপে বলা যায়, নির্র্বাচন কমিশন একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে অমূল্য অবদান রাখতে পারে এবং যার পর্যাপ্ত অবকাঠামো বিরাজমান।
কিন্তু নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের অনেক প্রতিনিধি এটিকে একটি শক্তিশালী নিরপেক্ষ সংস্থা হিসেবে বিবেচনা করেননি। একে সরকারের একটি ‘দীর্ঘহাত’ বলে অনেক সময় আখ্যায়িত করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো এমন অভিযোগ সঠিক নয়, আবার কিছু সময়ে তা দৃশ্যমানও হয়েছে। তবে সবচেয়ে হাসির খোরাক সৃষ্টি হয় যখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আজিজের সমর্থনে বরিশালের কিছু মানুষ জাজেস কমপ্লেক্সে দুধ-কলা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। ঢাকার ব্যবসায়ীরা সাবেক এই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে কোনো কিছু বিক্রি করতেই অপারগতা জানিয়েছিলেন। পৃথিবীর কোনো দেশে এ ধরনের আধা-বিচারিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে নিয়ে এমন কাণ্ড ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই।
এর মূল কারণ হচ্ছে, এমন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা সদস্য হওয়ার জন্য যে সততা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা সম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রয়োজন, অনেক সময় তা হয়েছে উপেক্ষিত। পক্ষান্তরে দলীয় সমর্থক ও দুর্বল মানসিকতার লোকজনকে এমন একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার করা হয়েছে, যা অবশ্যই অনভিপ্রেত। তাই বিভিন্ন সময়ে অবাঞ্ছিত অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষুণœ হয়েছে। তবে অনেক ভালো ও দক্ষ ব্যক্তিও কমিশনের বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন এবং তারা নির্বাচনী কর্মকাণ্ড ভালোভাবে পরিচালনা করে দেশের গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। দেশবাসী তাদের কথা এখনও স্মরণ করে।
নির্বাচন সমাগত। দেশবাসীর প্রত্যাশা, নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে। বড় কথা হচ্ছে, কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব দেশবাসী বরদাশত করবে না। সবার জন্য সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন শুধু নিরপেক্ষ থাকলেই চলবে না, তার নিরপেক্ষতাকে দৃশ্যমানও করতে হবে। কথায় ও কাজে স্বচ্ছ হতে হবে, যেন বোঝা যায় কমিশনের কর্তাব্যক্তিরা নিরপেক্ষতা বজায় রাখছেন। কমিশন বলতে শুধু প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনারদের মনে করা সঠিক হবে না। নির্বাচন কমিশনের ১০টি আঞ্চলিক অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মীবাহিনী তাদের কাজে কোনো অবস্থাতেই পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করতে পারবেন না। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এ কথা পরিষ্কারভাবে তার কর্মীবাহিনী এবং সব কর্মকর্তাকে বোঝাতে হবে। তারা যেন তা প্রতিপালন করেন, এ ব্যাপারে কমিশনকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। প্রথমে নিজের ঘরকে নিরপেক্ষ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরপরই সব রিটার্নিং অফিসারকে নিয়ন্ত্রণের এবং কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব হবে নির্বাচন কমিশনের। তাদের চাকরি ন্যস্ত হবে কমিশনের ওপর। কমিশন নতুন করে ভাবতে পারে কাকে কোথায় রাখতে হবে অথবা কাকে বদলি বা প্রত্যাহার করতে হবে। বর্তমানে যা আলামত দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় নির্বাচন কমিশনে নিরপেক্ষতার স্বার্থে প্রচুর রদবদল করতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জেলা-উপজেলা এবং অন্যান্য পর্যায়ের কর্মীবাহিনীর চাকরি নির্বাচন কমিশনের কাছে ন্যস্ত করতে হবে। এছাড়া নির্বাচন কমিশন ঠিক করবে আইন-শৃংখলা বাহিনীকে কীভাবে কোথায় নিয়োজিত করবে। প্রয়োজনে স্ট্রাইকিং ফোর্স ও রিজার্ভ বাহিনীকে জরুরি হস্তক্ষেপের জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে। কমিশনকে এসব বিষয়ে এখনই কাজ শুরু করতে হবে এবং নির্বাচনকালীন সব বিশৃংখলা নিরাময়ের লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিতে হবে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেশবাসীকে উপহার দেয়ার। কমিশন যাতে সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে সেজন্য সব রাজনৈতিক দলেরই উচিত সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা। আমাদের মতো দেশে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা অথবা ক্ষমতায় যাওয়া। এ ব্যাপারেও কমিশনকে কঠোর হতে হবে। কুঠারকে কুঠার বলার সাহস ও সদিচ্ছা তাদের অবশ্যই থাকতে হবে।
চতুর্থ যে বিষয়টিতে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা প্রাধান্য দিয়ে থাকেন তা হচ্ছে, নির্বাচনী আচরণবিধি প্রণয়ন এবং তা কঠোরভাবে প্রতিপালন করা। নির্বাচন কমিশন প্রণীত বিধিমালা অনুসরণ করতে বাধ্য সব প্রার্থী। অনেক সময় দেখা যায়, নির্বাচন কমিশনের কর্মীরা কোনো কোনো প্রার্থীর প্রতি দুর্বল, তাদের খারাপ কাজ দেখেও দেখেন না। আবার কারও ক্ষেত্রে রাস্তায় চলতে গেলেই দোষ-ত্র“টি খুঁজে পান। এমনটি হলে অভিযোগের আঙুল উত্থাপিত হবে কমিশনের দিকে। তাই রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসারসহ প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার নিয়োগের ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব না হয় তার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। নির্বাচন আচরণ বিধিমালায় টাকার খেলা কীভাবে বন্ধ করতে হবে, তা অবশ্যই কমিশনের কর্মকর্তাদের অজানা নয়। টাকা দিয়ে যেসব বণিক সংসদে বসার অভিলাষে বিভোর, তাদের অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে কঠোর আচরণ বিধিমালা প্রণয়ন করে।
বর্তমান বাস্তবতায় দেশবাসীর একমাত্র আশা-ভরসার স্থল হচ্ছে নির্বাচন কমিশন এবং তাদের নিরপেক্ষতা ও সততা এবং দৃশ্যমান দক্ষতা। এক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করতে প্রজাতন্ত্রের সর্বস্তরের কর্মচারী প্রস্তুত থাকবে, যদি তারা কমিশনের কাছ থেকে সাহস ও শক্তি পায়। পৃথিবীর প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন কমিশন সাহসী ভূমিকা রেখে থাকে এবং নির্বাচন কমিশনকে সবাই যমের মতো ভয় করে। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জনাব টি এন সেসানের দায়িত্ব গ্রহণের আগে উত্তর প্রদেশে এক নির্বাচনী সংঘর্ষে ৯১ জন নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ পঙ্গু হয়েছিল। কিন্তু মি. সেসন নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর একটিও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। দাঙ্গাবাজদের নিরস্ত্র করা হয়েছে এবং তারা প্রশাসনের ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। প্রশাসন নিরপেক্ষ ও কঠোর হলে সুযোগসন্ধানীরা পালানোর পথ খুঁজে বেড়ায়, রুদ্ধ হয় দুর্বৃত্তায়নের পথ।
দেশের বর্তমান ক্রান্ত্রিলগ্নে নির্বাচন কমিশনের সত্যিকার নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকা দেখতে চায় দেশবাসী। কমিশন নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী হলে দেশের গণতন্ত্রের সুরক্ষায় বড় ধরনের অবদান রাখতে সক্ষম হবেন তারা।
ধীরাজ কুমার নাথ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সাবেক সচিব

জাহাঙ্গীরনগর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে by মোঃ মুজিবুর রহমান

কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি বছরজুড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করে, তাহলে সেখানে স্বাভাবিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্ট অস্থিরতার কারণে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের পড়ালেখায় বিঘ্নিত ঘটে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এ বছরের শুরু থেকেই নানা কারণে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়ে আসছে। শিক্ষকদের একটা অংশ উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন। একপর্যায়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু কার্যত বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থার নিরসন হয়নি। ফলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন ৬ মাসেরও বেশি সময়ের সেশনজটে পড়তে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানের শিক্ষাজীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেন এ ব্যাপারে কিছুই করণীয় নেই। আমরা দেখছি, সর্বশেষ কর্মসূচি হিসেবে শিক্ষক ফোরাম নামে শিক্ষকদের একটি সংগঠন এখন উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেনের পদত্যাগের এক দফা দাবি নিয়ে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করছে। এর ফলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আবারও হুমকির মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি উত্তরণের আপাতত কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিরসন করে ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।
সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পড়ালেখা করতে চায়। অভিভাবকরা তাদের সন্তানের পেছনে টাকা ঢালেন উজ্জ্বল শিক্ষাজীবনের প্রত্যাশায়। সরকারও বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের পেছনে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে চলেছে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার কোনো পরিবেশই এখন দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার প্রধান দায়িত্ব উপাচার্যের হলেও এ ব্যাপারে শিক্ষকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু শিক্ষকরাই এখন রয়েছেন নানামুখী আন্দোলনে। উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেনকে নিয়েই মূলত মূল আন্দোলন চলমান রয়ের্ছে কয়েক মাস ধরে। ড. আনোয়ার হোসেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ফলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে তার নিয়োগকে শিক্ষকরা সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন বলে মনে হয় না। দৃশ্যত উপাচার্যও সবাইকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে পারছেন না। এর আগে প্রায় একই ধরনের আন্দোলনের মুখে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির তার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়। আশা করা হয়েছিল নতুন উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ড. আনোয়ার হোসেনকে উপাচার্য নিয়োগ করার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসেনি। বরং পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। নতুন উপাচার্যকে অবরুদ্ধ হয়ে অফিসে দিন কাটাতে দেখা গেছে। তার বাসভবনের সামনেও শিক্ষকদের অবস্থান ধর্মঘট চলছে। এমনকি শিক্ষকদের কর্মসূচির মুখে উপাচার্য নিজেও বাসভাবনে প্রবেশ না করে সেখানেই সস্ত্রীক অবস্থান গ্রহণ করেন। এসব কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে ব্যাপকভাবে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কী, তা এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়েই রইল।
অতীতে দেশের প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যত ধরনের আন্দোলন ও অস্থিরতা সৃষ্টি হতে দেখা গেছে, তার প্রায় সব ক’টির পেছনেই কোনো না কোনোভাবে শিক্ষার্থীদের কিছু অংশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তার পেছনে রয়েছে শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা। শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো বন্ধ করে দিয়ে উপাচার্য অপসারণের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। আবার অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কীভাবে স্বাভাবিক করা যায়, সে বিষয়ে উপাচার্যও তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিন নিয়োগকে কেন্দ্র করে রেজিস্ট্রার ও ডেপুটি রেজিস্ট্রারকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাও ঘটে চলেছে। তাদের মুক্ত করার দাবিতে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার্স সমিতি। অন্যদিকে ‘শিক্ষা অধিকার মঞ্চ’ নামে শিক্ষার্থীদের একটি নতুন সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল ও সংবাদ সম্মেলন করার উদ্দেশ্যে লিফলেটও বিতরণ করেছে বলে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা চরম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে সন্দেহ নেই। সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ছুটিকে উপলক্ষ করে এরই মধ্যে অনেকেই হল ছাড়তে শুরু করেছে। অথচ এ বছর তাদের নিয়মিত ক্লাসই হতে পারল না। পরীক্ষা অনুষ্ঠানও বিঘিœত হয়েছে। স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কী করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় সামনে এগিয়ে যাবে, তা আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
দেশে আরও অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। সেসব বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রায়ই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে দেখা যায়। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ধরনের লাগাতার অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা অভাবিত। মাঝখানে কিছুদিন শান্ত থাকার পর আবারও বিশ্ববিদ্যালয় অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে কারণ যা-ই থাকুক না কেন, উপাচার্য ও শিক্ষকদের পাল্টাপাল্টি ও বিপরীতমুখী অবস্থান শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও গভীর সংকট তৈরি করছে। এ দিকটিই গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখতে হবে সবাইকে।
বর্তমান উপাচার্য একজন খ্যাতিমান শিক্ষক। যারা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন, তারাও বিশ্ববিদ্যালয়েরই গুণী শিক্ষক। যে কোনো বিষয়ে তাদের মধ্যে পরস্পর মতপার্থক্য দেখা দিতেই পারে। কিন্তু তাই বলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে জিম্মি করে আন্দোলন-ধর্মঘট চলবে দীর্ঘমেয়াদে, এটা সমর্থন করা যায় না। আমরা চাই, উপাচার্য ও আন্দোলনরত শিক্ষকরা একসঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করবেন দ্রুত। শিক্ষামন্ত্রী নিজেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধানের জন্য আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এসব নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ হচ্ছে না কোনো কিছুতেই।
আমরা মনে করি, শিক্ষকদের সমস্যা শিক্ষকদেরই সমাধান করা উচিত। সেখানে কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। অথচ বারবার দেখা যাচ্ছে, নিজেদের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়ে উপাচার্য ও শিক্ষকরা অনাকাক্সিক্ষত কর্মসূচির পথ বেছে নিচ্ছেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে নেমে আসছে চরম অনিশ্চয়তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে দেখা দিচ্ছে স্থবিরতা। সৃষ্টি হচ্ছে সেশনজটের। এরই মধ্যে চলতি শিক্ষাবর্ষের অনার্সে ভর্তি কার্যক্রম নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে জনমনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হওয়ার আগেই শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে- এটাই প্রত্যাশা।
মোঃ মুজিবুর রহমান : সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ

ইতিহাসে নাম লেখাবার সুযোগ সমাগত by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

স্বাভাবিক সময়ের রাজনীতির সঙ্গে জাতীয় সংকটকালীন রাজনীতির পার্থক্য অনেক। স্বাভাবিক সময় রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেদের জনসেবা ও জনকল্যাণে নিবেদিত বলে দাবি করেন। তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করে জনগণকে প্রতিশ্র“তি দেন, স্বপ্ন দেখান। জনগণের সমস্যা সমাধানে নিজেদের বিশেষজ্ঞ দাবি করতে কার্পণ্য করেন না। এমন কাজ করা রাজনৈতিক নেতাদের সহজাত স্বভাব। এ দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রায় সব নেতাই এমন কাজে পারদর্শী। কিন্তু এসব নেতাই জাতীয় সংকটকালে সব সময় দেশপ্রেমের পরীক্ষায় ভালো করতে পারেন না। বড় মন আর ত্যাগের মানসিকতা না থাকলে জাতীয় সংকটকালে মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখা যায় না। যারা জাতীয় সংকটকালে জনকল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারেন, মানুষ তাদের সম্মান করে, ইতিহাস তাদের জায়গা করে দেয়। সবাই চাইলেও এমন কাজ করতে পারেন না। কারণ, সব নেতার সামনে হরহামেশা জাতীয় সংকট মোকাবেলার সুযোগ আসে না। যারা নেতৃত্বে থাকাকালে জাতীয় সংকট সৃষ্টি হয় এবং যারা ওই সংকটে ভূমিকা রাখার সুযোগ পান, কেবল তারাই জাতীয় সংকটে দেশপ্রেমের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে জনগণের হৃদয়ে ও জাতীয় ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম লেখাতে পারেন। এ রকম সুযোগ পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার সামনে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অভ্যন্তরীণ উপনিবাসবাদের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের শোষিত ও অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের সুযোগ এসেছিল। আর সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক শোষণ-বঞ্চনা রোধে তিনি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আপসহীন আন্দোলন করে সে আন্দোলনে সফলকাম হয়েছিলেন। তার এ অকুতোভয় নেতৃত্ব ও আপসহীন সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ ইতিহাস বঙ্গবন্ধুকে নিজবক্ষে সম্মানজনক আসন দিতে কার্পণ্য করেনি। নিজের জীবন বাজি রেখে দেশের মানুষের স্বার্থের জন্য যে নেতা লড়াই করেন, তাকে সম্মান দিতে দেশবাসী কার্পণ্য করবেন কেন? স্বাধীনতা-পরবর্তী ষড়যন্ত্র ও সমস্যা সংকুল রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা আলোচনা করে তার আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা গেলেও এ মহান নেতার অবদান ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
আবার রাজনীতির ধারাবাহিকতায় দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র যখন পথভ্রষ্ট হয়, রাজনীতি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হয় সংকুচিত, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের চাপে সততা ও ন্যায়নীতি হয়ে পড়ে রুগ্ন, জাতীয় পরিচিতি নিয়ে দেখা দেয় দ্বন্দ্ব- ১৯৭৫-এর পর তেমন দুঃসময়ে সেনাবাহিনী থেকে রাজনীতিতে এসে স্বাধীনতাযুদ্ধের লড়াকু সেনানী জিয়াউর রহমান স্বজনপ্রীতি দূর করে, একদলীয় প্রবণতা থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ধারা চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী ধারা তৈরি ও জনপ্রিয় করে ওই সংকটকালীন রাজনীতিতে অবদানমূলক ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের কাছে গ্রহণীয় হন। সামরিক বাহিনী থেকে রাজনীতিতে আগত নেতাদের সৃষ্টি করা দল ওই নেতার অবর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিলীন বা দুর্বল হয়ে গেলেও জাতির বিপদকালীন রাজনীতিতে জিয়ার সাহসী অবদানমূলক ভূমিকার কারণে তার সৃষ্ট দলটি তার মৃত্যুর পর আরও জনপ্রিয় হয়ে একাধিকবার নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করে। এসব কারণে এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসের পাতায় জিয়া তার স্থান পান।
পরবর্তী সময়ে এ সুযোগ পান রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ জিয়াপত্নী ও গৃহবধূ খালেদা জিয়া। ১৯৯০-এর দশকে এরশাদ শাসনামলে সামরিক শাসন যখন দীর্ঘায়িত হয়, দুর্নীতি পায় প্রাতিষ্ঠানিকতা, নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হওয়ায় ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত বোধ করেন, তেমন এক সময়ে বেগম জিয়ার সামনে দেশের রাজনীতিকে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার সুযোগ আসে। অনেক রাজনৈতিক দল যখন সামরিক সরকারের পাতা ফাঁদে পড়ে আন্দোলনবিমুখ হয়, প্রলোভনের টোপ গিলে অনেক রাজনৈতিক নেতা যখন দেশপ্রেম জলাঞ্জলি দিয়ে পরোক্ষভাবে ক্ষমতাসীনদের পরোক্ষ সমর্থন দেন, অনেক বড় দলও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে হঠাৎ সরে এসে নির্বাচনে অংশ নিয়ে সামরিক সরকারকে নির্বাচন করতে সুবিধা করে দেয়, রাজনীতির বেচাকেনার মাঠে তেমন এক সংকটকালে বেগম জিয়া সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে অনড় ও আপসহীন ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে নিজের স্থান করে নেন। তার সামরিক শাসনবিরোধী আপসহীন ভূমিকায় পরবর্তীকালে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে এরশাদের সামরিক সরকারের অবসান ঘটে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাও গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিতে ১৯৭৫-পরবর্তী বিশৃংখল আওয়ামী লীগকে গঠনমূলকভাবে পরিচালনা করে স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রধান ভূমিকা পালনকারী এ দলটিকে শক্তিশালী করে তোলেন। ১৯৯৪-১৯৯৬ সালে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন করে সে আন্দোলনে সফলতা পাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের ভাবমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এ নেত্রী ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে ২১ বছর পর আবারও ক্ষমতায় এনে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা প্রমাণের মধ্য দিয়ে নিজের স্থান করে নেন। পরবর্তী সময়ে তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সুকৌশলে ২০০৭ সালের রাজনৈতিক সুনামি মোকাবেলা করে নবম সংসদ নির্বাচনে জনগণকে দিন বদলের প্রতিশ্র“তি দিয়ে আবারও বিশাল বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনার সুযোগ পান। গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাবাহিকতায় অবদান রেখে শেখ হাসিনাও বাংলাদেশী রাজনীতির ইতিহাসে নিজের স্থান করে নেন।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তিত হলে ওই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক নেতাদের অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে ওঠে না। কেবল জাতীয় রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হলে তারা ওই সংকট থেকে জাতিকে মুক্ত করার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে স্মরণীয় হয়ে ওঠেন। মহাজোট আমলে উচ্চ আদালতের একটি বিভক্ত রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশের একাংশের ওপর ভিত্তি করে জনমতের তোয়াক্কা না করে জাতীয় সংসদে এককভাবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করায় জাতি এক সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। বিরোধী দলগুলো সরকারি দলকে বিশ্বাস করছে না। তারা মনে করছে, দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচন করার মতো পরিবেশ এখনও দেশে তৈরি হয়নি। সে কারণে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে প্রধান বিরোধী দলের নেতৃত্বে গঠিত ১৮ দলীয় জোট ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তুলেছে। সরকার এ আন্দোলন দমন করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় দেশবাসী এক নিশ্চিত রক্তপাত ও দীর্ঘমেয়াদি সহিংসতার আশংকার মধ্যে রয়েছেন। এ অবস্থায় শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের সামনে জাতিকে উল্লিখিত সংকট থেকে উদ্ধার করার সুযোগ এসেছে। কোনো রাজনৈতিক নেতা তার মেধা ও দূরদর্শিতা ব্যবহার করে আসন্ন সংকট থেকে জাতিকে উদ্ধার করে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দিতে পারলে ওই নেতা একদিকে কেবল দেশবাসীর প্রশংসাভাজনই হবেন না, সেই সঙ্গে দেশের রাজনীতির ইতিহাসে নিজের নামটিও লেখাবার বিরল সুযোগ পাবেন।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ সুযোগ কেবল দেশের প্রধান দুই নেত্রীরই ব্যবহারের সম্ভাবনা বেশি। দেশের অন্য নেতাদের পক্ষে এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সহজেই এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আলোচ্য সংকটের সমাধানের মধ্য দিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দিয়ে ওই নির্বাচনে দলীয় জয়-পরাজয় যা-ই হোক না কেন, সে ফলাফল মেনে উদার মনের পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশী রাজনীতির ইতিহাসে নিজ আসনকে উজ্জ্বল করে তোলা সম্ভব। তিনি সহজ ও শান্তিপূর্ণ পথে আলোচ্য সমস্যার সমাধান করে ফেললে বেগম জিয়ার পক্ষে আর এ সংকট থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে না। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি সহজ পথে না গিয়ে বিরোধীদলীয় আন্দোলন দমন করে শক্তি প্রয়োগ এবং সহিংসতা ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে একতরফা নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাহলে এ সংকট উত্তরণে বেগম জিয়া ভূমিকা পালনের সুযোগ পাবেন। সেক্ষেত্রে ১৮ দলীয় জোটনেত্রী হিসেবে তিনি যদি দেশবাসীকে তার দাবির পক্ষে সম্পৃক্ত করে বৃহত্তর আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করাতে সক্ষম হন, তাহলে একজন বিচক্ষণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তার পক্ষে রাজনীতির ইতিহাসের পাতায় অধিকতর উজ্জ্বল হয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য-বিবৃতি শুনে মনে হয়, তিনি রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা পালনের চেয়ে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার দিকে বেশি মনোযোগী। দেশের স্বার্থের চেয়ে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে অধিক মনোযোগী হয়ে প্রধানমন্ত্রী কি ইতিহাসের পাতায় নাম উজ্জ্বল করার সুযোগটি বিরোধীদলীয় নেত্রীর দিকেই ঠেলে দিচ্ছেন? লক্ষণীয়, রাজনীতির সাম্প্রতিক খেলায় বিরাধীদলীয় নেত্রী বিচক্ষণতার পরিচয় দিচ্ছেন। বিশেষ করে সরকারি নেতাদের ‘আন্দোলনের মুরোদ নেই’ ধরনের অনেক খোঁচা খেয়েও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বড় ধরনের আন্দোলন কর্মসূচি না দিয়ে তিনি জনগণকে নিজ দাবির পক্ষে সভা-সমাবেশ ও অহিংস কর্মসূচির মধ্য দিয়ে অধিকতর সম্পৃক্ত করার কর্মসূচি দীর্ঘায়িত করে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, প্রধানমন্ত্রী কিছুটা নমনীয় হয়ে জয়-পরাজয়ের বিষয়টিকে প্রাধান্য না দিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে যদি রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার সুযোগ কাজে না লাগান, তাহলে বেগম জিয়া ১৮ দলীয় জোটের আন্দোলনের মাধ্যমে শেষ মুহূর্তে জোরালো চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা আদায় করে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে ইতিহাসে নিজের নাম উজ্জ্বল করতে পারেন কি-না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই নেত্রীর সামনেই চলমান সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান করে ইতিহাসে নিজ নাম উজ্জ্বল করার সুযোগ সমাগত। প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক হলে খুব সহজেই এ কৃতিত্ব অর্জন করতে পারেন। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেতার জন্য সুযোগ এলে তাকে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে হয়তো এ কৃতিত্ব অর্জন করতে হবে। আর কিছুদিন পরই দেশবাসী বুঝতে পারবেন, আলোচ্য সংকট সমাধানের খেলায় কে সফল ভূমিকা রেখে রাজনীতির ইতিহাসের পাতায় তার নাম উজ্জ্বল ও স্থায়ী করতে পারবেন।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

কঙ্গোর মাদার তেরেসা সিস্টার অ্যাঞ্জেলিকা

অ্যাঞ্জেলিক নামাইকা, যাকে বলা হয় কঙ্গোর ‘মাদার তেরেসা’। নির্যাতিত নারী ও শিশুদের মুখে হাসি ফুটিয়ে যিনি জয় করেছেন জাতিসংঘ পুরস্কার। তাকে নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর হর এমন- কঙ্গোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এলআরএ বিদ্রোহীদের দ্বারা নির্যাতিত নারীদের সহায়তা করার জন্য এ বছর জাতিসংঘ পুরস্কার পেয়েছেন অ্যাঞ্জেলিক নামাইকা। তিনিও একদিন ওই বিদ্রোহীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ৪৬ বছরের নারী অ্যাঞ্জেলিকা, যার হাসি, কর্মোদ্যম হাজারো নারীকে অনুপ্রাণিত করেছে নতুন করে নিজেকে গড়ে তুলতে। ১-২ বছর নয়, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে লর্ডস রেসিসটেন্স আর্মির (এলআরএ) নির্যাতনের শিকার উগান্ডা, গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান এবং আফ্রিকান রিপাবলিকের মধ্যাঞ্চলের সীমান্তে বসবাসকারী নারীরা। এসব এলাকায় নারীদের ত্রাস এলআরএ। এই বিদ্রোহীদের জন্য ৩৫ লাখ মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কেননা প্রায়ই গ্রাম থেকে শিশুদের অপহরণ করে নিয়ে যায়, নারীদের ধর্ষণ ও নির্যাতন করে তারা। এসব নারীদেরই সহায়তা দেন ‘সিস্টার’ অ্যাঞ্জেলিক। পরবর্তী পরিস্থিতিতে তারা যাতে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারেন সে ব্যাপারে তিনি উৎসাহিত করেন নির্যাতিত নারীদের। আর এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছেন নির্যাতিতের আশার আলো।
শুধু তাই নয়, তাদের উপার্জনের বিভিন্ন পন্থাও দেখিয়ে দেন তিনি, দেন প্রশিক্ষণ। তরুণী বয়সে এই বিদ্রোহীদের জন্যই গ্রাম ছেড়ে একটি ঝোঁপের ভেতর দীর্ঘ ১ বছর গা ঢাকা দিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তাই এই ঘর ছাড়া এবং পালিয়ে বেড়ানোর কষ্টটা ভালোই বোঝেন অ্যাঞ্জেলিক নামাইকা। সে কারণেই তিনি এসব নারীদের ভেতরকার প্রতিভাগুলো বের করে আনতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। যদিও এসব নারীদের সহায়তা করা খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। তিনি মনস্থির করেছিলেন লক্ষ্য পূরণে পিছপা হবেন না। অ্যাঞ্জেলিক হেরে যাননি। ৩০ সেপ্টেম্বর জেনেভায় জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন। পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, পুরস্কার পেয়ে তিনিই একইসঙ্গে আনন্দিত এবং বিস্মিত। সিস্টার অ্যাঞ্জেলিক যে পুরস্কার পেয়েছেন তার মূল্য ৭৪ হাজার ইউরো। এটি দিয়ে তিনি এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চান, যেখানে নির্যাতিতা নারীরা তাদের বানানো জিনিস বিক্রি করে উপার্জন করবেন এবং স্বাবলম্বী হবেন, যা তাদের কষ্টকর অতীতকে ভুলতে হয়তো একটু হলেও সাহায্য করবে। তথ্যসূত্র : আলজাজিরা।